Friday, August 14, 2009

শ্রীকৃষ্ণ: পুণ্যপ্রভু পরমেশ্বর -জন্মাষ্টমী by তাপস কুমার নন্দী

সনাতনী ভারতবর্ষের ধর্ম ও ইতিহাসের প্রাণপুরুষ লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভাদ্র মাসের শ্রীকৃষ্ণাষ্টমীতে তাঁর আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী সংক্ষেপে সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে জন্মাষ্টমী তিথি নামে বহুল সমাদৃত। তিনি এক সবর্গ, স্তবনীয়। তিনি স্বয়ং ভগবান। তাই সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে চিরকালীন বিশ্বাস ‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং’। তিনি সর্বকারণের কারণ। তিনি সত্ ও আনন্দস্বরূপ। তাঁর সমান কেউ নেই, তাঁর ঊর্ধ্বেও কেউ নেই। গোপাল তাপনী, উপনিষদের ভাষায়—‘তিনি এক সবর্গ ও স্তবনীয় পুরুষোত্তম’।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মবৃত্তান্ত একটু ভিন্ন ধরনের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক ঐতিহাসিক পটভূমি।
সচ্চিদানন্দ শ্রীকৃষ্ণ ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিনী নক্ষত্রে ভোজ বংশীয় রাজা উগ্র সেনের পুত্র কংসের কারাগারে দৈবকীর কোলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শাস্ত্রে দেখা যায়, এই আবির্ভাব ছিল বসুদেব-দৈবকীর প্রতি ভগবানের তৃতীয়বারের প্রতিজ্ঞা পালন। অষ্টমী তিথিতে দৈবকীয় অষ্টম গর্ভে জন্ম নিয়েছিল বলে এই তিথির নাম ‘জন্মাষ্টমী’ তিথি। আর এ উপলক্ষে যে আয়োজন বা উত্সব, তার নাম ‘জন্মাষ্টমী’ উত্সব।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন অত্যাচারী কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন, তখন কংসের অত্যাচারে সমগ্র এলাকায় মহা ত্রাস দেখা দিয়েছিল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মক্ষণে কোনো উত্সাহ-উদ্দীপনা হয়নি। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি তো দূরের কথা, কোনো মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানাদিও করা সম্ভব ছিল না। সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে এটা অত্যন্ত দুঃখ ও গ্লানিকর স্মৃতি। তবুও শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাবে ধরণী হয়েছে পাপভারমুক্ত। সাধুসজ্জন ভক্তদের মনে সঞ্চার হয়েছে বুকভরা আনন্দ।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবদেহ ধারণ করে ১২৫ বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর এই জীবনকালকে বিন্যস্ত করলে দেখা যায়, ‘মথুরায় তাঁর জন্ম, গোকুলে নন্দালয়ে তাঁর পরিবর্ধন, মথুরায় করেছেন কংস বধ, রাজ্যাধিকার, কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডবদের কাছে তিনি সখা, দ্বারকায় রাজধানী স্থানান্তর ও অতপর লীলাবসান।
সনাতনী সমাজে শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ অবদান শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলায় পুতনাবধ, দাম বন্ধন লীলা, কালীয়দমন, গোবর্ধন ধারণ প্রভৃতি কার্যের মধ্যে তাঁর অলৌকিক শক্তির পরিচয় মেলে। এ ছাড়া মুষ্টিক ও চানুর নামক দুই মল্লযোদ্ধার নিধন, কংস বধ, অকাসুর বধ, শিশু পাল বধ প্রভৃতি ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক শক্তির প্রকাশ লক্ষ করা গেছে। তবে কুরুক্ষেত্রে সমরাঙ্গনে যুদ্ধবিমুখ হতোদ্যম অর্জুনকে তিনি যুদ্ধকর্মে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ভগবান বলে পরিচয় দিয়েছেন।
সনাতনী সম্প্রদায়ের অমূল্য সম্পদ মহাভারত, গীতা, ভাগ্বত ও বৈষ্ণবীয় পুরাণসমূহে শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত এবং ভক্তদের নিবিড় সাধনার পরম পুরুষোত্তম হিসেবে তিনি পূজিত।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের পরমাত্মীয় এবং বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের আত্মা। তিনি যখন দেখলেন মাধুর্যের মাধ্যমে অত্যাচারীর দুঃশাসন থেকে মানব সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল সাধন করা যাবে না, তখনই তাঁকে রাজার ভূমিকা নিতে হয়েছে। রথের সারথ্য গ্রহণ করে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। তিনি আধ্যাত্মিক বলে বলীয়ান মানব সমাজ একান্তভাবে কামনা করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ জানতেন, ভক্তির সঙ্গে শক্তি না থাকলে কল্যাণ রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই গঠন করা যায় না। তাই তিনি একদিকে প্রেমের বাঁশি বাজিয়েছিলেন, অন্যদিকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অপশক্তির আস্ফাালন ধূলিসাত্ করে প্রমাণ করলেন ‘যথা ধর্ম তথা জয়’।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণীসমূহই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় স্থান পেয়েছে। সব বেদ ও উপনিষদের সারসংক্ষেপ হলো এই গীতা। গীতার ঈশ্বর সাধনার বিভিন্ন পথ আছে। জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি যেকোনো পথ ধরে সাধনা করলে ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সবই পরিচালিত হচ্ছে ভগবানের ইচ্ছানুসারে। জীব হচ্ছে ভগবানের অংশ। ঈশ্বর, জীব, জরা প্রকৃতি এবং অনন্তকাল একে অপরের পরিপূরক এবং সর্বত্রই নিত্য। ভগবান হলেন সব চেতনার উত্স। জীব যেহেতু ভগবানের অংশ, তাই সে চেতন। তবে জীব কেবল তার নিজের দেহ সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু ভগবান হচ্ছে সব জীবের দেহসহ সবকিছু সম্পর্কে সচেতন। তা ছাড়া গীতার পরমতত্ত্ব পরম প্রাপ্তি, মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন বিশ্ব দর্শনের কথ্য বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
মহাভারতের ঐতিহাসিকতা ও দেশি-বিদেশি পণ্ডিতদের মতামত থেকে এবং বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করে জানা যায়, পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একজন ঐতিহাসিক পুরুষ। তিনি অপরাজেয়, ধর্মাত্মা বেদজ্ঞ, লোকহিতৈষী, ক্ষমাশীল, নিরহঙ্কার, তপস্বী এবং পুণ্যময়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথিতে বিশ্বের সব মানব সমাজ ও জীবের কল্যাণ কামনা করছি। সব অনাচার, কুসংস্কার, সন্ত্রাস, যুদ্ধ, লোভ, হিংসা দূর করে প্রেম, প্রীতি আর মানবতার আদর্শে নতুন বিশ্ব সভ্যতা গড়ে উঠুক—ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে এ প্রার্থনাই করি।

বেতার-টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স: কে পাবে কে পাবে না by মশিউল আলম

সেদিনের সেমিনারটি ছিল বাংলাদেশে বেসরকারি বেতার-টিভি বা সম্প্রচার গণমাধ্যমের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে। এ বিষয়ে একটি লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির গবেষক ফারহানা আফরোজ। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মালিকানার বেতার-টিভির কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে এ দেশে কোনো সম্প্রচার আইন বা নীতিমালা নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে একটি সম্প্রচার নীতিমালার দাবিতে লেখালেখি চলছে। ওই সেমিনারের মাধ্যমে বিষয়টির গুরুত্ব সরকারের সামনে আবারও তুলে ধরা হলো।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর এ দেশে প্রথম বেসরকারি খাতে একটি টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করা হয়। একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) নামে সেই চ্যানেলটিকে টেরেস্ট্রিয়াল সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রচার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার অবসান ও প্রকৃতপক্ষে টেলিভিশন সাংবাদিকতার সূচনা ছিল সেটি। এর কৃতিত্ব সেই সময়কার আওয়ামী লীগের সরকারের; প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা অনেকেই এ বিষয়টি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় একটি মাত্র বেসরকারি উদ্যোক্তাকে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তা জানা যায়নি। সেদিনের সেমিনারে যিনি মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি তাঁর গবেষণায় জানার চেষ্টা করেছিলেন কি না যে এ দেশে কী পদ্ধতিতে, কিসের ভিত্তিতে বেসরকারি বেতার-টিভির লাইসেন্স দেওয়া হয়। তিনি উত্তরে বলেন, তিনি জানার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার কোনো জবাব দেয়নি।
আমরা জানি, কোনো সুনির্ধারিত নীতি বা প্রক্রিয়া মেনে বেতার-টিভির লাইসেন্স দেওয়া হয় না। আওয়ামী লীগের সরকার বিদায় নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এলে একুশে টিভি যে কোপানলে পড়েছিল, তাতে তার মৃত্যুই হয়েছিল। প্রথমে নির্বাহী আদেশে চ্যানেলটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়, তারপর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অনেক ঝক্কি-ঝামেলার পর চ্যানেলটি জীবন ফিরে পায়; তবে তার মালিকানা বদলে যায়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এসে নতুন কয়েকটি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেয়, যাঁরা লাইসেন্সগুলো পান তাঁরা সবাই কমবেশি সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। অর্থাত্ সরকারের পছন্দমতো লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়। নিয়ম-নীতি নয়, এখানে কাজ করেছে সরকারের মর্জি।
এ কথাগুলো সেদিন তথ্যমন্ত্রীকে বলেছিলাম। এ জন্য নয় যে এসব তথ্য তাঁর জানা নেই; বরং এই প্রশ্ন করার জন্য যে বেতার-টিভির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা বা আইনকানুন তৈরির কথা বর্তমান সরকার ভাবছে কি না। কারণ শোনা যাচ্ছে, আরও কয়েকটি টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দেওয়া হবে; বেশ কিছু আবেদন জমা পড়েছে। এবারও কি আগের সরকারগুলোর মতোই স্রেফ মর্জিমাফিক লাইসেন্স দেওয়া হবে, নাকি একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে তা করা হবে। তথ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বললেন না। তিনি জানালেন, সরকারের সামনে অগ্রাধিকারভিত্তিক কিছু কাজ রয়েছে, যেসবের মধ্যে এই বিষয়টি আপাতত নেই।
আমাদের মনে হয়, শুধু অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজগুলো নিয়েই পুরো সরকারের এমন ব্যস্ত হয়ে থাকা উচিত যে অন্য কাজগুলো হেলায় পড়ে থাকে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকারগুলো কী? তথ্য অধিকার আইন একটা অগ্রাধিকার ছিল। সেটা পাস হয়ে গেছে, এখন সেটা বাস্তবায়নের অবকাঠামো তৈরি করা একটা বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে সম্প্রচার গণমাধ্যমের বিষয়টিও অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, যাঁরা বিশেষত টিভি চ্যানেলের লাইসেন্সের আবেদন করেছেন বা করতে যাচ্ছেন, তাঁদের কীভাবে লাইসেন্স দেওয়া হবে সেটা স্থির করা উচিত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। যাঁরা তাঁর সুনজরে আছেন, তাঁরা লাইসেন্স পেতে যাচ্ছেন, অন্যরা হয়তো পাবেন না।
এ রকম হওয়া উচিত নয়। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে, এখন লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও নীতিপূর্ণ হওয়া উচিত। সে জন্য প্রথমেই উচিত একটি আইন, তারপর সেই আইনের ভিত্তিতে রচিত কিছু সুনির্দিষ্ট বিধান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৪ সালে গৃহীত হয়েছে কমিউনিকেশন্স অ্যাক্ট নামে একটি আইন, পরে বিভিন্ন সময়ে তাতে সংযোজন-সংশোধন করা হয়েছে। সে আইনের অধীনে সে দেশে গঠিত হয়েছে ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন (এফসিসি)। বেসরকারি বেতার-টিভির লাইসেন্স দেওয়া, তা নবায়ন বা বাতিল করা, সম্প্রচার শিল্পের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা, তাদের সম্পর্কে জনগণের কোনো অভিযোগ থাকলে সেসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা, তার প্রতিকার করাসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করে এফসিসি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যেও কমিউনিকেশন্স অ্যাক্ট নামে একটি আইন আছে; এ আইনের অধীনে চলে অফিস অব কমিউনিকেশন্স (অফকম), যার ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের এফসিসির মতোই। অফকম-এর একটি ব্রডকাস্ট কোড বা সম্প্রচার নীতিমালা আছে। বেতার-টিভির লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হয়, লাইসেন্স পেতে হলে কী কী যোগ্যতা থাকতে হয়, কী কী শর্ত মেনে চলতে হয়—এ সবকিছু পরিষ্কারভাবে নিরূপণ করা আছে। শুধু তা-ই নয়, অফকম তাদের ওয়েবসাইটে লাইসেন্সের আবেদনপত্রের ফরমও দিয়ে দেয়, কীভাবে আবেদনপত্র দাখিল করতে হবে, সঙ্গে কী কী কাগজপত্র জমা দিতে হবে—এসব টিপস্ তারা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। অর্থাত্, একটি আইনের ভিত্তিতে রচিত সুনির্দিষ্ট কিছু বিধান অনুযায়ী, যথাযথ একটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বেতার-টিভির লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, মর্জি-নাখোশ এই ক্ষেত্রে কাজ করে না। সব যোগ্যতা থাকা এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় লাইসেন্সের আবেদন করার পরও যদি কাউকে লাইসেন্স দেওয়া না হয়, তাঁকে ব্যাখ্যা করতে হবে কী কী কারণে তিনি লাইসেন্স পাবেন না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সম্প্রচার মাধ্যমে এর উল্টো চিত্র। বিএনপির সরকারের আমলে আওয়ামী লীগপন্থী কেউ লাইসেন্স পাবেন না, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে বিএনপিপন্থী কেউ লাইসেন্স পাবেন না—এটাই যেন স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। যাঁরা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের অনেকেই এটা জানেন এবং মানেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তো এভাবে চলতে পারে না, চলা উচিত নয়। আমাদের অবশ্যই একটি সম্প্রচার আইন প্রয়োজন, তার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো একটি স্বাধীন সম্প্রচার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যে কমিশন ওই আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিধান মেনে বেসরকারি খাতে বেতার-টিভির লাইসেন্স দেবে।
সেদিনের সেমিনারে অনেক কথার মধ্যে তথ্যমন্ত্রী কয়েকটি টিভি চ্যানেলের টক শো সম্পর্কে উষ্মা প্রকাশ করলেন এই বলে যে ওগুলোতে অনেক ভিত্তিহীন, নেতিবাচক ও দায়িত্বহীন কথাবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। এটা অনেকাংশেই সত্য। অবশ্য মন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণের কথা বলেননি। প্রবন্ধপাঠকের লিখিত প্রবন্ধে অনেক পরামর্শের মধ্যে এ রকম একটা পরামর্শও ছিল যে সম্প্রচার মাধ্যমের রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও থাকা উচিত। আলোচকদের মধ্যে কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করে বলেছেন, সম্প্রচার মাধ্যম ভালোভাবে না দাঁড়াতেই একে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ হিতে বিপরীত হতে পারে। তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বললেন, বর্তমান সরকার বেতার-টিভি শুধু নয়, কোনো সংবাদমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টা করেনি, করছে না। উদাহরণ হিসেবে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের সময় কোনো টিভি চ্যানেল বা সংবাদপত্রের অফিসে সরকারের তরফ থেকে কোনো নির্দেশনা পাঠানো হয়নি।
যাহোক, সরকার যে কিছু টিভি চ্যানেলের আচরণে নাখোশ, তার ইঙ্গিত তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আঁচ করা কঠিন ছিল না।
বর্তমান সরকার যদি মনে করে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাদের নিজেদের লোকজনকে টিভি-চ্যানেলগুলোর লাইসেন্স দিয়েছে, এখন আমরা আমাদের পছন্দের লোকদের দেব, তা হবে খুবই দুঃখজনক। পরিবর্তনের শপথ নিয়ে, দিনবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তো আর পুরোনো দিনের নেতিবাচক মানসিকতায় ফিরে যাওয়া চলে না। নিয়মকানুন, স্বচ্ছতা-ন্যায্যতার ভিত্তিতের পথ চলা তো শুরু করতে হবে।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

সামরিক আদালতে সু চির শাস্তি দুঃস্বপ্ন শেষ হয়নি -মিয়ানমার by আইরীন খান

গৃহবন্দী থাকার শর্তাবলি লঙ্ঘনের জন্য অং সান সু চির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মিয়ানমারের আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং তার মধ্যে ১৮ মাসের গৃহবন্দী রাখার রায় দিয়েছেন। আমরা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশা করেছিলাম, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে হয়তো মিয়ানমার সরকার এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে একজন দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চের তুলনায় কম শাস্তি দেওয়া হয়।
এখনো অং সান সু চি বিবেকের বন্দী। এবং এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর শিগগির এবং শর্তহীন মুক্তি।
আং সান সু চির সাজা ঘৃণ্য এবং জঘন্য। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুখে চড় মারার মতো। অবস্থা এমন যে, কূটনৈতিক পরিস্থিতি যদি তাঁকে পাঁচ বছর জেলের মধ্যে রাখার মতো অনুকূল থাকত, তবে জেনারেলরা নিঃসন্দেহে তা-ই করত।
দুর্ভাগ্যবশত, জাতিসংঘ ও অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট নেশন (আসিয়ান) —উভয়েই অং সান সু চির মুক্তির জন্য কয়েক মাস ধরে বলে আসছে। তাদের এমনটি করা আর উচিত হবে না, এখন প্রয়োজন কথাকে কাজে পরিণত করা।
জেনারেলদের ইনসেইন কারাগারে সু চিকে সাড়ে তিন বছর কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের কিছুই খোয়াতে হয়নি। সহজ গাণিতিক হিসাব আপনাকে বলে দেবে যে নির্বাচন ৩১ ডিসেম্বর, ২০১০-এর মধ্যে হতে পারে এবং সে পর্যন্ত আটকে রাখার জন্যই এই রায়।
মানবাধিকারের সঙ্গে সংগতি রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দেখানো দরকার এবং এই অপ্রত্যাশিত ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা উচিত। তাদের স্মরণ রাখা উচিত, আং সান সু চি সেই অগণিত কারাবন্দীদের একজন, যাঁরা মিয়ানমারের বিবেক এবং তাঁদের অনেককেই এ রকম ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্য দিনযাপন করতে হচ্ছে।
ব্রিটেনের দি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।
আইরীন খান: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল।

সামরিক আদালতে সু চির শাস্তি দুঃস্বপ্ন শেষ হয়নি -মিয়ানমার by আইরীন খান

গৃহবন্দী থাকার শর্তাবলি লঙ্ঘনের জন্য অং সান সু চির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মিয়ানমারের আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং তার মধ্যে ১৮ মাসের গৃহবন্দী রাখার রায় দিয়েছেন। আমরা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশা করেছিলাম, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে হয়তো মিয়ানমার সরকার এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে একজন দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চের তুলনায় কম শাস্তি দেওয়া হয়।
এখনো অং সান সু চি বিবেকের বন্দী। এবং এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর শিগগির এবং শর্তহীন মুক্তি।
আং সান সু চির সাজা ঘৃণ্য এবং জঘন্য। এটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুখে চড় মারার মতো। অবস্থা এমন যে, কূটনৈতিক পরিস্থিতি যদি তাঁকে পাঁচ বছর জেলের মধ্যে রাখার মতো অনুকূল থাকত, তবে জেনারেলরা নিঃসন্দেহে তা-ই করত।
দুর্ভাগ্যবশত, জাতিসংঘ ও অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট নেশন (আসিয়ান) —উভয়েই অং সান সু চির মুক্তির জন্য কয়েক মাস ধরে বলে আসছে। তাদের এমনটি করা আর উচিত হবে না, এখন প্রয়োজন কথাকে কাজে পরিণত করা।
জেনারেলদের ইনসেইন কারাগারে সু চিকে সাড়ে তিন বছর কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের কিছুই খোয়াতে হয়নি। সহজ গাণিতিক হিসাব আপনাকে বলে দেবে যে নির্বাচন ৩১ ডিসেম্বর, ২০১০-এর মধ্যে হতে পারে এবং সে পর্যন্ত আটকে রাখার জন্যই এই রায়।
মানবাধিকারের সঙ্গে সংগতি রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া দেখানো দরকার এবং এই অপ্রত্যাশিত ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা উচিত। তাদের স্মরণ রাখা উচিত, আং সান সু চি সেই অগণিত কারাবন্দীদের একজন, যাঁরা মিয়ানমারের বিবেক এবং তাঁদের অনেককেই এ রকম ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্য দিনযাপন করতে হচ্ছে।
ব্রিটেনের দি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।
আইরীন খান: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল।

প্রেরণাদায়িনী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব -সময়ের প্রতিবিম্ব by এবিএম মূসা

আইন করে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-তনয়া বাস করেন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে। এই কারণে নতুন আইন অনুসরণে তাঁর জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকা স্বাভাবিক। পঁচাত্তরের আগে এই নিরাপত্তা বলয়টি যথেষ্ট না হলেও সামান্যতম হলেও ছিল গণভবনে আর বঙ্গভবনে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডটি ১৫ আগস্টের খুনিরা এত সহজে বিনা বাধায় করতে পেরেছিল কারণ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িটির অবস্থানের কারণে। সেখানে একই মাত্রার সামান্যতম নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের সরকারি বাসস্থান ছিল গণভবন (পুরোনো ও নতুন), পঁচাত্তরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তাঁর বঙ্গভবনে থাকাটাই তো ছিল স্বাভাবিক। এই দুই স্থানের কোনো একটিতে থাকলেই কি সেদিন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর মুষ্টিমেয় দেহরক্ষীরা প্রতিহত করতে পারতেন? অনেকে মনে করেন হয়তো পারতেন, যদিও তখন এসএসএফ বা বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গঠিত হয়নি।
অনেকের এই মত যদি গ্রহণ করি তবে প্রশ্ন হলো, সারা দিনের কর্মমুখর দিবসের শেষে ক্লান্ত মুজিব ভবন দুটির সুরক্ষিত দুর্গে না থেকে কেন অরক্ষিত ৩২ নম্বরের বাড়িতে রাত কাটাতে আসতেন? উত্তর একটি, বেগম মুজিব ৩২ নম্বরের বাড়িটির দোতলার পূর্ব-দক্ষিণ কোণের কক্ষটি ছেড়ে আসতে রাজি হননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হয়ে অথবা রাষ্ট্রপতির পত্নী পরিচয়ে ‘ফার্স্টলেডি’ হতে চাননি। বহু বছর আগে স্বামীর সঙ্গে গ্রাম্য বধূর যে লেবাসটি পরে এসেছিলেন, গণভবন বা বঙ্গভবনে এসে তা ছাড়তে চাননি। তিনি রাজনীতি-নিবেদিত জননেতা স্বামীর দীর্ঘ রাজনৈতিক দুর্যোগপূর্ণ সময়ের সহযাত্রী ও সহমর্মী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার হওয়ার কোনো বাসনা ছিল না। তার পরও স্বামীর জীবনযুদ্ধে, আদর্শের সংগ্রামে, এমনকি জনসম্পৃক্ততায় তাঁর একটি অপ্রকাশ্য ভূমিকা অবশ্যই ছিল। পারিবারিক জীবনে সুখ-দুঃখের ভাগীদার যেমন ছিলেন, তেমনি রাজনৈতিক জীবনে ছিলেন তাঁর আদর্শের ‘প্রেরণাদাত্রী বিজয়লক্ষ্মী একজন নারী’।
এ কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নজরুলের একটি কবিতাংশ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তপার্লামেন্টারি বৈঠকে উদ্ধৃতির মাধ্যমে। নজরুলকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘জগতের যত বড় জয় বড় অভিযান, মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।’ সেই সব মা ও বধূর উদাহরণে যোগ করেছিলেন একটি নাম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। গান্ধীজির কথা যেমন লোকে জানে, তেমনি কস্তুরবাইয়ের কথাও ইতিহাসে সামান্যতম হলেও স্থান পেয়েছে। তিনি চরকা কেটেছেন, স্বামীর সঙ্গে জেলে গিয়েছেন। জওহরলাল নেহরু যেমন আলোচিত হয়েছেন, তেমনি বারবার উচ্চারিত হয়েছে কমলা নেহরুর কথা। রাজনীতিতে স্বামীর সঙ্গী হয়েছেন, তাঁর স্বাধীনতার সংগ্রামে কারাবরণ করেছেন। গান্ধী বা নেহরু যতবার বা যত দিন জেলে ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর কারাবাসের সময়কাল তার চেয়ে কম নয়। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা তো স্বামীর কারাসঙ্গী ছিলেন না। তখন কোথায় ছিলেন, কী অবস্থায় ছিলেন মুজিব-পত্নী, কীভাবে নিত্যদিনের অভাবের সংসার চলেছে, ছেলেমেয়েদের আগলিয়ে চরম আর্থিক দুর্দশার মাঝে? সেই সব কাহিনী কেউ জানে না, জানতে চায়ও না। তাই তো ১৫ আগস্ট শোকের বন্যায় ভেসে যাঁরা সেমিনার আর স্মরণসভা করেন, তাঁরা কেউ এসব বলেন না, নামটিও উচ্চারণ করেন না। জীবন ও যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টি যে নারীর জীবন থেকে বারবার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর কথা কেউ ভাবেন না। কারণ বোধহয়, বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব একজন সাধারণ গৃহবধূ হয়েও রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে বা প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট না থেকেও অন্তরালে থেকে যে অবদান রেখেছিলেন তার সব বিবরণ সবার জানা নেই।
অন্তরঙ্গ আলোকে সেই সংশ্লিষ্টতার কিছু বিবরণ রয়েছে এই প্রতিবেদনে। রাজনীতির উন্মাদনায় ছুটে বেড়ানো শেখ মুজিবের পত্নীকে আমি দেখেছি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পত্নী ‘ফার্স্টলেডিকে’ দেখিনি। দেখেছি আটপৌরে কাপড়ে পালঙ্কে বসে বাটা হাতে পান সাজতে। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে রাষ্ট্রীয় বাহনে দেখিনি, তাঁর সঙ্গী হয়ে বিমানে করে রাষ্ট্রীয় সফরে যেতে দেখিনি। সভা-সেমিনার সংবর্ধনায় জর্জেট পরা রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের স্ত্রীকে দেখিনি। কারণ সুদূর গ্রাম থেকে যে গ্রাম্য ছাপটি মুখে নিয়ে স্বামীর হাত ধরে শহরে এসেছিলেন, সেই ছাপটি কোনো দিন মুছতে দেননি। এই অনিচ্ছার প্রতিফলনে তিনি ‘ফার্স্টলেডি’ হতে পারেননি। দেখেছি ৩২ নম্বরের বাড়ির দোতলায় বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে জাঁতি দিয়ে সুপারি কাটছেন, মুখে পান। কোনো দিন সকালবেলায় বাড়ির পেছনের সিঁড়িটি বেয়ে দোতলায় শোয়ার ঘরে দরজায় উঁকি মারতেই বলতেন, ‘আসুন, পান খান।’ আমাকে যখন পানটি এগিয়ে দিতেন পাশে আধশোয়া মুজিব ভাই পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে মুখের পাইপের ফাঁকে মৃদু হাসতেন। আমার দিকে তাকিয়ে সুর করে বলতেন, ‘বাটা ভরে পান পাবে গাল ভরে খেয়ো।’ এই ছিল মুজিব-গিন্নির ঘরোয়া রূপ। এই ঘরোয়া পরিবেশের আকর্ষণে সুরক্ষিত ভবন ছেড়ে রাতে অরক্ষিত সাধারণ বাড়িতে ফিরতেন প্রধানমন্ত্রী, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি।
আচ্ছা, সেই পানের বাটাটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে তেমনি সাজানো আছে কি? জানি না, কারণ ১৫ আগস্টের পর কোনো দিন সেই বাড়িতে যাইনি। এই পানের পিতলের বাটা যার থরে থরে সাজানো থাকত পান, সুপারি, জর্দা, দোক্তা, সাদা-পাতা। এ নিয়ে একটি কৌতুকী কাহিনী মনে পড়ছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় এলেন, রেসকোর্স ময়দানে নির্মিত হলো ‘ইন্দিরা মঞ্চ’। জীবনে সেই প্রথম ও সেই শেষ বেগম মুজিব প্রকাশ্যে এলেন। অর্থাত্ বেগম মুজিব একবেলার জন্য ফার্স্টলেডি হয়ে অন্দর থেকে বাইরে এসেছিলেন। পরে জেনেছি, বঙ্গবন্ধু বহু খোশামোদ করে বেগম সাহেবকে সেই মঞ্চে আনতে পেরেছিলেন। মঞ্চে তাঁকে দেখে মনে হলো, চিরকাল আটপৌরে শাড়ি-পরা বেগম মুজিব বহু আয়াসসাধ্য প্রচেষ্টায় একটি কাতান পরেছিলেন। মঞ্চের কাছাকাছি ছিলাম তাই দেখলাম এক হাতে বারবার কাতান শাড়িটি সামলাচ্ছেন, অপর হাতে পানের বাটাটি ধরে আছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্মানীয় মহিলাটি আঁচলের আড়ালে পানের বাটা আগলিয়ে রেখেছেন, দেখে আমারই হাসি পাচ্ছিল। অদূরে বসে শুনলাম, বঙ্গবন্ধু মৃদুস্বরে ধমকিয়ে উঠলেন, ‘এটি আবার নিয়ে আসলা ক্যান?’ বেগম মুজিবের মুখে দেখলাম অপ্রস্তুত হাসি, তারপর বাটাটি আঁচলের তলে ভালো করে ঢাকা দিতে থাকলেন। এ হচ্ছে সহজ-সরল গ্রাম্যবধূ প্রধানমন্ত্রী-জায়ার চিত্ররূপ।
আজ এই সাদাসিধে গৃহিণীর কাহিনী বিবৃত করা আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। নজরুলের ভাষায় ‘শক্তি-সাহস যুগিয়েছে’ যে নারী তাঁর অন্য পরিচয়ও পেয়েছি। সেই পরিচয়ে রয়েছে একজন প্রেরণাদানকারী মহিলার এই দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে যুগান্তকারী অবদান। সেই কাহিনী নেহাত কিংবদন্তি নয়, হলেও সেই কিংবদন্তি ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ভেস্তে যাওয়ার ইতিহাসভিত্তিক। ঢাকা সেনানিবাসে ষড়যন্ত্র মামলার বিচার চলছে। সাল ঊনসত্তরে সারা দেশে আগুন জ্বলছে, ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। এই স্লোগানে রাওয়ালপিন্ডির ক্ষমতার মঞ্চ কেঁপে উঠেছে। গণ-অভ্যুত্থানে বিধ্বস্ত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবকে বাদ দিয়ে গোলটেবিল বৈঠক হয় কী করে? শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান বৈঠক সফল করতে রাজনৈতিক নেতাদের চাপে বাধ্য হলেন কারাবন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানাতে। কিন্তু দেশদ্রোহের দায়ে বিচারের আসামি, ক্যান্টনমেন্টে বন্দী আসবেন কীভাবে? অবশেষে আইয়ুব খান সিদ্ধান্ত নিলেন, প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তাঁকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাওয়া হবে। ফেব্রুয়ারির ১৭ বা ১৮ তারিখ থেকে বিভিন্ন মহল থেকে শেখ সাহেবের কাছে প্যারোলে যাওয়া প্রস্তাব আসতে থাকে। গোলটেবিল বৈঠক থেকে তত্কালীন রাজনৈতিক ফ্রন্ট এনডিএফের নেতা মৌলভি ফরিদ আহমদ সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানান প্যারোলে মুক্তি নিতে। একই সঙ্গে ঢাকার তাঁর অন্তরঙ্গ দুজন প্রভাবশালী সম্পাদক জেলে দেখা করে একই অনুরোধ জানান। ঢাকায় তখন তাঁর মুক্তির দাবিতে কারফিউ ভেঙে রোজ রাতে মানুষের ঢল নামছে রাস্তায়। এরই মাঝে প্যারোলের বার্তা রটে গেল জনগণের মধ্যে। চলছে জল্পনা-কল্পনা, শেখ সাহেব কি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুবের বৈঠকে যাবেন?
ক্যান্টনমেন্টে বসে শেখ সাহেব কী ভাবছেন কেউ তা জানে না। সারা দেশের মানুষও কিছুটা বিভ্রান্ত। তারা প্রাণ দিচ্ছে, রক্ত দিচ্ছে প্রিয় নেতাকে মুক্ত করে আনার জন্য, মুচলেকা দিয়ে আইয়ুবের দরবারে যাওয়ার জন্য নয়। কিন্তু এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন যিনি তিনিও ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। সেদিন মুচলেকা দিয়ে, নাকি নিঃশর্ত মুক্তি—সেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন একজন নারী। মুজিবের সহধর্মিণী যিনি রাজনীতি বুঝতেন না কিন্তু নিজের স্বামীকে জানতেন। বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর স্বামীর মানসিক দ্বন্দ্ব। বন্দী স্বামীকে খবর পাঠালেন, ‘হাতে বঁটি নিয়ে বসে আছি, প্যারোলে মুচলেকা দিয়ে জীবনে বত্রিশ নম্বরে আসবেন না।’
এখন ভাবতে অবাক লাগে অর্ধশিক্ষিত সাধারণ গৃহবধূ রাজনীতি বোঝেন না রণচণ্ডিনী মূর্তি ধারণ করে একটি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। দূর থেকে শক্তি জোগালেন স্বামীকে। সত্যিই তিনি এ ধরনের কোনো খবর পাঠিয়েছিলেন কি না, তাঁরই প্রভাবে শেখ সাহেব প্যারোলে রাওয়ালপিন্ডি যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন কি না তা কোনো দিন জানতে পারিনি। অনেক দিন পর ভাবীর সামনেই বঙ্গবন্ধুর কাছে এর সত্যতা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি হেসে আঙুল দিয়ে ভাবীকে দেখিয়ে বলতেন, ‘ওনাকে জিজ্ঞেস করো না।’ ভাবীর দিকে তাকাতে তিনি মুচকি হেসে এক খিলি পান এগিয়ে দিলেন। এই দেশের ভবিষ্যত্ ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো যদি কিংবদন্তি সত্যি না হতো, শেখ মুজিব মুচলেকা দিয়ে সহবন্দীদের ক্যান্টনমেন্টে রেখে রাওয়ালপিন্ডি যেতেন।
প্রকৃতপক্ষে বেগম মুজিব স্বামীর প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত না থেকেও দেশে কী ঘটছে, জনগণ কী ভাবছে আর বলছে তার খোঁজখবর রাখতেন, কিন্তু রাষ্ট্রপরিচালক স্বামীর কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতেন না। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। স্বাধীনতার পর আমি যখন মর্নিং নিউজ-এর সম্পাদক তখন উক্ত সংবাদপত্র বিলি-বণ্টন নিয়ে হকারস সমিতি ও বণ্টনের দায়িত্বে নিযুক্ত একটি এজেন্সির মধ্যে বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছানোতে পুলিশি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। ঢাকার তখনকার এসপি মাহবুবকে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বী পত্রিকার মালিক-সম্পাদক আমাদের বিরুদ্ধে হকার্স সমিতির পক্ষে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। অবস্থা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে রাত ১২টায় ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও আমি বত্রিশ নম্বরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এসে তাঁকে সব অবহিত করলাম। সবকিছু শুনে প্রধানমন্ত্রী কিছু বলার আগেই ভাবী পরমাত্মীয় সম্পাদক-মালিকের নাম করে বললেন, ‘এদের কথাই তোমাকে বারবার বলেছি। এরাই শেষ পর্যন্ত তোমার কাল হবে।’ শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি কোথায় গড়িয়েছিল তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, বত্রিশ নম্বরে খাটের ওপর বসে তিনি শুধু পান বানাতেন না। সারা দেশের রাজনীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি কার্যক্রম তাঁর জ্ঞাত ছিল। বঙ্গবন্ধুর কোনো পদক্ষেপ তাঁর উদ্বেগের কারণ ঘটালে প্রকাশ করতেন। এমনকি বাকশাল গঠনের পর তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘এবার থেকে তুমি এই বাসায় নয়, তোমার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে গণভবনেই থাকবে।’ বেগম মুজিব কি তাঁর দূরদৃষ্টিতে ভবিষ্যত্ দেখতে পেয়েছিলেন?
গান্ধী-পত্নী কস্তুরবাই, নেহরুর কারাসঙ্গিনী কমলা, দেশবন্ধুর সহধর্মিণী বাসন্তী দেবী বা ম্যান্ডেলা-পত্নী উইনি ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির মুক্তিদাতার স্ত্রী শক্তিদায়িনী, প্রেরণাদায়িনী মহিলার স্থান কেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় থাকবে না? আমার এই আফসোস অনেকখানি মিটিয়েছেন কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ টিএসসিতে স্মরণসভার আয়োজন করে। সেই সভায় এ জন্য তাদের মোবারকবাদ জানিয়েছিলাম।
পাদটীকা: সারা শহরে এখন কালো ব্যানারের ছড়াছড়ি। ব্যানারের এক প্রান্তে বঙ্গবন্ধু, অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনা কেন? ফজিলাতুন্নেসা মুজিব নয় কেন?
এবিএম মূসা: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ এখনই থামাতে হবে -গোপন ভিডিও ধারণ

আমাদের দেশে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা নানা বৈষম্য ও প্রতারণার শিকার হয়। ভিডিওতে নারীর চরম অবমাননাকর ছবি তুলে বাজারে ছেড়ে দেওয়া এসবের মধ্যে ঘৃণ্যতম অপরাধ। ফরিদপুরে অস্ত্রের মুখে ১৪ বছরের এক স্কুলছাত্রীকে নির্যাতন করে সেই দৃশ্য ভিডিও-তে ধারণ করেছে চার যুবক। আমরা এ ধরনের জঘন্য ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। কোনো সভ্য সমাজে এমনটি ঘটার কথা নয়।
এখানে একই সঙ্গে দুটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে: ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণ। দুটিই ফৌজদারি অপরাধ। ওই ঘটনায় কালাম খান (২২), তুষার খানসহ (২৩) চারজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে। বিচারক তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। ঘটনার অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। বিচারক একই সঙ্গে ঘটনার ভিডিওচিত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং ভিডিওচিত্র যার কাছে পাওয়া যাবে তাকেও গ্রেপ্তার করে তা জব্দ করতে বলেছেন। আমরা আশা করব, এ ভিডিওচিত্র যাতে কোনোভাবেই ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় থাকবে।
দেশে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য বিপথগামী তরুণ। এই অপরাধী চক্রকে এখনই থামাতে হবে। আমরা এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকায় দেখতে চাই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে জঘন্য এই অপরাধ নির্মূল করতে।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নারীর নগ্ন ছবি হাতবদলের উদ্বেগজনক তথ্য এর আগেও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও নিশ্চয় এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। স্পর্শকাতর বলে এসব ঘটনায় মেয়েরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা করতে ভয় পায়। আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা। অপরাধ দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা।

সু চির আটকাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার হওয়া জরুরি -মিয়ানমারে ‘বর্বর’ বিধান

বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সে দেশের নির্বাচনজয়ী নেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা অং সান সু চিকে নতুন করে দেড় বছরের আটকাদেশ দিয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সামরিক শাসনাধীন মিয়ানমারের দীর্ঘতম সময়ের বন্দী হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি। সু চি মিয়ানমারের অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা, এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে ৮০ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েও তিনি ও তাঁর দল দেশসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। প্রতিবেশী হিসেবে, গণতন্ত্রের পথযাত্রী হিসেবে বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একযোগে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের এই কলঙ্কিত আদেশের নিন্দা জানানো।
আগামী বছরের ৩১ ডিসেম্বর মিয়ানমারের নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন। জেনারেলদের জন্য এটা একটা জটিল সময়। একদিকে তাঁদের দেখাতে হবে যে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায় যাওয়াও ঠেকাতে হবে। মুক্ত সু চি নির্বাচনে জয়ী হবেন—এ বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই। জনগণও উজ্জীবিত হয়ে ১৯৯৫ ও ২০০২ সালের মতো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিল হবে। এ জন্যই যেকোনো উপায়ে সু চিকে আটকে রাখতে জেনারেলরা মরিয়া।
অং সান সু চি গত ২০ বছরে ১৪ বছরই বন্দী রয়েছেন; কারাগারে কিংবা গৃহবন্দী-দশায়। প্রতিবারই মিথ্যা অজুহাতে তাঁকে আটক করা হয়। এ বছরের জুলাই মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মিয়ানমার সফর করে সু চির মুক্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের দূত ইব্রাহিম গাম্বারি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সফর করে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু সবই নিষ্ফল, ‘সকলই গরল ভেল’। সু চির নতুন আটকাদেশ এরই প্রমাণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল আইরিন খান একযোগে এর নিন্দা করে হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, যত গর্জন তত বর্ষণ এখনো দেখা যায়নি। বিশ্বের পরাশক্তি রাষ্ট্র তথা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইসরায়েল এবং চীন ও ভারত এখনো পরোক্ষে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন কোম্পানি শেভরন ও হ্যালিবার্টন এবং ফরাসি কোম্পানি টোটাল সেখানকার গ্যাসক্ষেত্র ও পাইপলাইনের বড় অংশের মালিক। ব্রিটিশ ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, আসিয়ান এক্সপ্লোরার, একুয়াটিক এবং রোলস-রয়েসের সঙ্গে সামরিক জান্তার কারবার রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও রাশিয়া মিয়ানমারে দীর্ঘদিন যাবত অস্ত্র বিক্রি করে চলেছে। ইসরায়েলও তাদের পুরোনো মিত্র। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া তাদের সামরিক সহযোগী। উপমহাদেশে মিয়ানমারের দুই বড় খুঁটি হলো চীন ও ভারত। বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের যেমন ইসরায়েল, চীনের তেমনি মিয়ানমার। ভারতও বন্দর ও গ্যাস-সুবিধার বিনিময়ে মিয়ানমারের সামরিক কর্তাদের খুশি রাখছে। ২০০৭ সালের বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাহসী প্রতিবাদের মর্মান্তিক দমনও শক্তিমান দেশগুলোর এ সমর্থনকে টলাতে পারেনি। এসবের কারণেই দিনকে দিন জেনারেলদের পক্ষে মিয়ানমারের জনগণ ও বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে চলা সম্ভব হচ্ছে।
এর পরও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের ওপর চূড়ান্ত চাপ দিতে সর্বাত্মক অবরোধের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের উচিত এ অবস্থায় নীরব না থেকে বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য কাজ করে যাওয়া। সেটাই হবে গণতন্ত্রমনা বাংলাদেশের দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত

কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট অস্কার অ্যারিয়াস সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার কোস্টারিকার সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এএফপি ও বিবিসি।
প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়াসের ভাই কোস্টারিকার সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ রড্রিগো অ্যারিয়াস বলেন, সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি অস্কারকে জানানো হয়েছে। তিনি চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে আছেন। প্রেসিডেন্টকে অন্তত সাত দিন পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে থাকতে হবে। তিনি হাঁপানিতেও ভুগছেন।
সরকারের মুখপাত্র মেয়ি অ্যান্টিলন জানান, প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়াস বাড়িতে থেকেই সব কাজ চালিয়ে যাবেন। ৬৮ বছর বয়সী অ্যারিয়াস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জ্বর ও গলাব্যথা হওয়া ছাড়া আমি ভালো আছি। টেলিফোনের মাধ্যমে সব কাজ চালিয়ে নিতে পারব।’ কোস্টারিকায় সোয়াইন ফ্লুতে এ পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নোবেলজয়ী অ্যারিয়াস হন্ডুরাসের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিদলের মধ্যে দুই দফা সমঝোতা আলোচনায় মধ্যস্থতা করেন। কিন্তু সেসব আলোচনা ব্যর্থ হয়।

চীন একটু চেষ্টা করলেই ভারত ভেঙে যাবে

ভারত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে এমন একটা ধারণা অতীতে পশ্চিমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ছিল। পশ্চিমা বিশ্ব এত দিনে সেই ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে এসেছে। তবে একই ধারণা আজও পোষণ করছে চীন। সে দেশের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে অন্তত এ রকমই ধারণা পাওয়া যায়। চীনের একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের লেখা নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, চীন সামান্য উদ্যোগ নিলেই ভারত ভেঙে অন্তত ২০ থেকে ৩০ খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। নিবন্ধটি ঘিরে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বেইজিংয়ের চায়না ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (ররংং.পহ) ওয়েবসাইটে গত ৮ এপ্রিল নিবন্ধটি প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটিকে চীন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ থিংক ট্যাংক হিসেবে গণ্য করা হয়। নিবন্ধে ভারতকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার রোডম্যাপও দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, আসামের স্বাধীনতার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফাকে সমর্থন দিতে পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানকে কাজে লাগাতে পারে চীন। তামিল ও নাগাদেরও একই কায়দায় উত্সাহ জোগানো সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশ প্ররোচনা দিতে পারে। এই কায়দায় চীন দক্ষিণ তিব্বতের ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করতে পারে।
নিবন্ধটিতে এও বলা হয়, ইতিহাসে ‘ভারতীয় জাতি’র আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ভারত জোটবদ্ধ হয়েছিল ‘অবক্ষয়ী’ হিন্দুত্ববাদী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে।
চীনের স্বার্থে এবং গোটা এশিয়ার উন্নয়নের স্বার্থে অসমিয়া, তামিল ও কাশ্মীরিদের মতো ভারতের বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেইজিংয়ের হাত মেলানো উচিত। তাতে ওই জাতি সম্প্রদায়গুলো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে। তাতে ভারতও ভেঙে টুকরো টুকরো হবে। নিবন্ধটিতে জোর দিয়ে বলা হয়, ভারত ২০-৩০টি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়লে তা আর পুনর্গঠিত হতে পারবে না।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের থিংক ট্যাংকের ওয়েবসাইটের ওই নিবন্ধে যেসব পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, তা নয়াদিল্লির উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে চীনকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, কোনো মতামত প্রকাশের আগে যেন বেইজিং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা করে।
নিবন্ধটি সম্পর্কে চীন সরকারের মতামত জানতে চাইলে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, ওই লেখায় একজন ব্যক্তির স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে চীন সরকারের কোনো যোগ নেই। নিবন্ধটি চীন ও ভারতের সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

হাতেনাতে ধরা

স্কুল-কলেজের উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্নো বিষয়বস্তু (অশ্লীল চলচ্চিত্র, ভিডিও, ছবি) দেখার প্রবণতা কাজ করে। বয়স্ক অনেক পেশাজীবীর মধ্যেও এ ধরনের রুচিবিকৃতি থাকে। তবে ধর্মযাজক বা পুরোহিতদের মধ্যেও যে এই বিকৃতি রয়েছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা কল্পনা করাও কষ্টকর। সম্প্রতি ভারতে উপাসনালয়ে বসে এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন একজন পুরোহিত।
ভারতের লুধিয়ানার ঝর সাহাব এলাকার গুরুদুয়ারায় (শিখ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়) একজন ‘গ্রন্থী’ (শিখ পুরোহিত) মোবাইল ফোনে অশ্লীল ভিডিওচিত্র দেখার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। গত মঙ্গলবার উপাসনালয়ে ধর্মগ্রন্থের নিচে লুকিয়ে ওই ভিডিও দেখার সময় তিনি ধরা পড়েন। এ ঘটনায় গুরুদুয়ারায় উপাসনার জন্য আসা শিখেরা একেবারে হতবাক হয়ে যান।
ঝর সাহাবের সরপঞ্চ (গ্রামপ্রধান) আমৃক সিং জানান, সকালে উপাসনা চলার সময় গুরপ্রিত সিং নামের ওই গ্রন্থী হাতেনাতে ধরা পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শী জসবীর সিং বলেন, ‘আমি ওই গ্রন্থীর পাশে বসে উপাসনা করছিলাম। হঠাত্ পাশে তাকিয়ে দেখি তিনি মোবাইল ফোনে অশ্লীল ভিডিও দেখছেন। আমি তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটনাটি প্রধান গ্রন্থী যশপাল সিংকে জানাই এবং আমরা তাঁকে হাতেনাতে আটক করি।’ ঝর সাহাবের এসএইচও (সরকারি কর্মকর্তা) রাজেশ কুমার জানান, মোবাইল ফোনে অশ্লীল ভিডিওচিত্র পাওয়া গেছে। গুরপ্রিত সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

মুম্বাইয়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাত দিনের জন্য বন্ধ- ভারতে সোয়াইন ফ্লুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬

ভারতে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত তারা সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মঙ্গলবার মহারাষ্ট্রের নাসিকে একজন মারা গেছে। গতকাল কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরমে একজন, পুনায় তিনজন ও মুম্বাইয়ে একজন মারা গেছে। এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
মোট নয়টি রাজ্যে সোয়াইন ফ্লু ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্যগুলো হলো: দিল্লি, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, জম্মু-কাশ্মীর, আসাম ও কেরালা।
পুনের পর এবার মুম্বাইয়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাত দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার। তিন দিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব বিপণিকেন্দ্র, সিনেমা, থিয়েটার হলসহ চিত্তবিনোদনের বিভিন্ন কেন্দ্র।
সোয়াইন ফ্লু এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মহারাষ্ট্রের পুনেতে। শুধু পুনেতেই মারা গেছে নয়জন। এ ছাড়া মুম্বাইয়ে মারা গেছে দুজন, গুজরাটে দুজন, কেরালার তিরুবনন্তপুরমে একজন, নাসিকে ও চেন্নাইয়ে একজন করে মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ১০০।
মঙ্গলবার ও গতকাল কলকাতার বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে আরও তিনজন ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে কলকাতায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩ জনে।
সোয়াইন ফ্লু ছড়িয়ে পড়ায় আক্রান্ত রাজ্যগুলোতে মাস্ক কেনার ধুম পড়ে গেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গোলাম নবি আজাদ সোয়াইন ফ্লু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২২টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন সু চি

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি ও মার্কিন নাগরিক জন ইয়েত্ত তাঁদের দেওয়া সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করবেন। গতকাল বুধবার তাঁদের আইনজীবীরা এ কথা জানান। এদিকে সু চির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের আদালতের দেওয়া রায়কে ‘হতাশাজনক’ অভিহিত করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নেতারা। এদিকে জান্তা সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের প্রতি সবাইকে শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
গৃহবন্দী থাকার সময় তাঁর বাড়িতে মার্কিন নাগরিক জন ইয়েত্তর অনুপ্রবেশের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে গত মঙ্গলবার ইনসেইন কারাগারে স্থাপিত একটি বিশেষ আদালত প্রথমে সু চিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। এ ছাড়া মার্কিন নাগরিক ইয়েত্তকেও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে জান্তাপ্রধান থান শোয়ে বিশেষ ক্ষমতাবলে সু চির সাজার মেয়াদ দেড় বছর কমিয়ে দেন এবং কারাদণ্ডের পরিবর্তে তাঁকে গৃহবন্দী রাখার নির্দেশ দেন।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, সু চিকে আরও দেড় বছর অন্তরিন রাখার অর্থ আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা।
সু চির আইনজীবী নিয়ান উইন গতকাল বলেছেন, রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা আপিল করবেন। কারণ রায় নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাঁরা মনে করেন, আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে রায় ঘোষণা করা হয়নি। এ ব্যাপারে আপিল করার জন্য সু চির সম্মতিও পেয়েছেন তাঁরা। জন ইয়েত্তর আইনজীবী খিন মঙ জানান, তাঁর মক্কেলের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করবেন তিনি। দরকার হলে ইয়েত্তকে মিয়ানমার থেকে বহিষ্কার করার জন্য জান্তাপ্রধান থান শোয়ের কাছেও আবেদন জানানো হবে।
ওদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান সু চির বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায়কে ‘গভীর হতাশাজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। জোটের নেতারা নোবেলজয়ী এই নেত্রীর দ্রুত মুক্তি দাবি করেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, আসিয়ান নেতাদের এই বিবৃতিতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার কান দেবে বলে মনে হয় না। বরং প্রতিবেশী চীন ও ভারতের প্রতিক্রিয়াকে তারা বেশি গুরুত্ব দেবে। ভারত সরকার এই রায়ের ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোনো বিবৃতি না দিলেও চীন বলেছে, মিয়ানমারের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যাগুলো দূর করবে বলে বেইজিং আশা করে।
তবে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা সু চির গৃহবন্দিত্বের মেয়াদ বাড়ানোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ইব্রাহিম গাম্বারি বলেছেন, সু চিকে ছাড়া সেখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। সু চির সাজাকে অনৈতিক উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দ্রুত তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান। অস্ট্রেলিয়াও সে দেশে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে তাদের নিন্দার কথা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও কঠোর বাণিজ্য অবরোধ আরোপের প্রস্তাবকে সমর্থন জানায় তারা। এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভেঙে গেছে। সু চি গত ২০ বছরের মধ্যে ১৪ বছরই গৃহবন্দী।

বাংলা পারফিউমের দ্বিতীয় আউটলেট ঢাকার গুলশানে

প্রসাধনসামগ্রী প্রস্তুতকারী ল্যাকস্টের লাভ অব পিঙ্ক ব্রান্ডের পণ্য নিয়ে ঢাকার গুলশান সার্কেলের নাভানা টাওয়ারে বাংলা পারফিউমের দ্বিতীয় আউটলেট সম্প্রতি খোলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিজাইনার শাহরুখ শহীদ, বিউটিশিয়ান ফারজানা শাকিল, ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক, বিপ্লব সাহা, শাহরুখ আমীন ও শিল্পী শাহেদ।
এ আউটলেটে ৩০ মিলিলিটার, ৫০ ও ৯০ মিলিলিটার সাইজের লাভ অব পিঙ্ক ব্রান্ডের প্রসাধনী পাওয়া যাবে।

কৃষি উত্পাদন বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ দেবে সরকার- সিলেটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান বলেছেন, গ্রাম ও শহরে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ দেবে সরকার। আগে শুধু গ্রামে দেওয়া হলেও এখন শহরেও কৃষিভিত্তিক উত্পাদন বাড়াতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার সিলেটে কয়েকটি মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলনকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম। সভাগুলোতে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মীর আবদুর রহিম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘গ্রামভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা শক্তিশালী থাকার কারণে আমরা বিশ্বমন্দা থেকে বেঁচে গেছি। বাম্পার ফলন অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেছে। এ জন্য কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।’
গভর্নর সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেট কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মো. কমরউদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ডের আহ্বায়ক মো. আবু তাহের, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল হাদি ও সিবিএর সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহিদ।
এরপর গভর্নর মতবিনিময় সভা করেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও সিলেটের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে। এতে বক্তব্য দেন সিলেট চেম্বারের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ, পরিচালক ফখরউদ্দিন আলী আহমদ ও জিয়াউল হক, রপ্তানিকারকদের পক্ষে সালেহ উদদৌলা, নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বর্ণলতা রায়, কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফালাহউদ্দিন আলী আহমদ এবং সিলেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল হান্নান চৌধুরী।
এ সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, সঠিক ব্যবহারের অভাবে সিলেটে প্রচুর অলস টাকা পড়ে আছে। এসব টাকা কাজে লাগাতে তাঁরা এ অঞ্চলে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের সুপারিশ করেন।
দুপুর সাড়ে ১২টায় সিলেটের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও এনজিওপ্রধানদের সঙ্গে গভর্নর মতবিনিময় সভা করেন। এ সভায় বক্তব্য দেন সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল আউয়াল, সিমান্তিকের চেয়ারম্যান মাজেদ আহমদ, গ্রামীণ জনকল্যাণ সংসদের চেয়ারম্যান জামিল চৌধুরী, এসএসকেএসের কর্মকর্তা বেলাল আহমদ, আশার কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম, ভার্ডের উপপরিচালক আশিকুর রহমান, সিপিএফের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ও এফআইভিডিবির জ্যেষ্ঠ পরিচালক রুহেল কবির।
গভর্নর বিকেলে মতবিনিময় সভা করেন সিলেট অঞ্চলে ব্যবসায়রত ব্যাংকগুলোর প্রধানদের সঙ্গে। এতে সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান, এবি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জিএম রিজভী, ইসলামী ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট কবির হোসেন, ব্র্যাক ব্যাংকের ক্লাস্টার লিডার চৌধুরী তোফায়েল আহমদ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ফাহমিদা সাদিক মিতু।
বিকেল পাঁচটায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বিশ্বমানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। এ জন্য এ ব্যাংকসহ দেশের সব ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা প্রয়োজন।’

রমজান মাসে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে এফবিসিসিআইয়ের কার্যক্রম শুরু

আসন্ন রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) দ্রব্যমূল্য মনিটরিং টাস্কফোর্স বাজার পরিদর্শন শুরু করেছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ হিসেবে তারা অন্যান্য বছরের মতো এবারও রাজধানীর বাজারগুলো পরিদর্শনের পদক্ষেপ নিয়েছে। মঙ্গলবার থেকে তারা রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন শুরু করেছে।
জানা গেছে, তদারকির প্রথম পর্যায়ে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হকসহ পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য সদস্য এবং টাস্কফোর্সের সদস্যরা আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার পরিদর্শন করবেন।
জানা গেছে, সংগঠনটির প্রথম সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি ও পরিচালকেরা মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার পাইকারি ও খুচরা বাজার পরিদর্শন করে দ্রব্যমূল্য পর্যবেক্ষণ করেন। এ ছাড়া গতকাল এর পরিচালকেরা গুলশান, শান্তিনগর ও ফকিরাপুল কাঁচাবাজার পরিদর্শন করেছেন।
জানা গেছে, প্রথম সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি ও পরিচালকেরা এখন থেকে সপ্তাহের প্রতি চতুর্থ দিনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে বাজারগুলোতে বাজার কমিটি কর্তৃক বিভিন্ন দ্রব্যমূল্যের তালিকা প্রদর্শন করা হচ্ছে কি না এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা তাঁদের পণ্য কেনার রসিদ নিয়মিত সংরক্ষণ করছেন কি না তা তদারক করবেন।
এফবিসিসিআই জানিয়েছে, রমজান মাসে ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংগঠনটির প্রথম সহ-সভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ ও পরিচালক মাহবুব ইসলাম কারওয়ান বাজার পরিদর্শন করবেন। সহ-সভাপতি আবু আলম চৌধুরী ও পরিচালক শাফকাত হায়দার গুলশান কাঁচাবাজার পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া পরিচালক কামালউদ্দিন আহমেদ ও শাফকাত হায়দার নিউমার্কেট বাজার; আনোয়ার হোসেন খিলগাঁও ও মালিবাগ বাজার; মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন ফকিরাপুল ও শান্তিনগর বাজার; আলহাজ বেলায়েত হোসেন মৌলভীবাজার, ঠাটারিবাজার, বাবুবাজার ও শ্যামবাজার; মো. বজলুর রহমান যাত্রাবাড়ী এবং ফারুকুল ইসলাম মিরপুর বাজার পরিদর্শন করবেন।
দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে এফবিসিসিআই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নিয়মিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এফবিসিসিআই ওয়েবসাইটের (ভনপপর-নফ.ড়ত্ম/সধত্শবঃঢ়ত্রপব) মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যও প্রতিদিন নিয়মিতভাবে মনিটরিং ও প্রকাশ করা হচ্ছে।

অভিষেকে ফিফটি অধিনায়ক আফ্রিদির

ম্যাচটাকে বলতে পারেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ফিরতি ম্যাচ। কিংবা বলতে পারেন অধিনায়ক আফ্রিদির অভিষেক ম্যাচ। কাল এই প্রতিবেদন লেখার সময় এই দুটো তথ্যই মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন আফ্রিদি নিজেই। অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক ম্যাচে ৩৭ বলে ৪টি চার আর ২ ছক্কায় ফিফটি করেছেন। টস জিতে ব্যাট করতে নামা পাকিস্তান করেছে ৫ উইকেটে ১৭২। টানা তৃতীয় ফিফটি পেলেন আফ্রিদি।
অথচ ম্যাচের শুরুটা একেবারেই অন্য রকম হয়েছিল। প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে ফেরেন কামরান আকমল। আইসিএল-ফেরত ইমরান নাজির আর শোয়েব মালিক শুরুর ধাক্কা সামলে ওঠেন। একবার জীবন ফিরে পাওয়া নাজির শেষ পর্যন্ত ২৮ বলে ৫টি চার আর ১টি ছক্কায় ৪০ রান করে ফেরেন। আরেক আইসিএল-ফেরত আবদুল রাজ্জাক করেছেন ১৭ বলে ২৫।

প্রথম দফায় জার্মানি গেলেন তিনজন

উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য জার্মানি যাওয়ার কথা ১৯ জন হকি খেলোয়াড়ের। কিন্তু প্রথম দফায় যেতে পারলেন মাত্র তিনজন। জার্মানির উদ্দেশে পরশু রাতে ঢাকা ছেড়েছেন রাসেল মাহমুদ, মামুনুর রহমান ও মোশাররফ হোসেন। সরকারের অনুমতিপত্র না মেলায় বাকিদের জার্মানি-যাত্রা পিছিয়ে গেছে।
জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের দল ফ্রাঙ্কটেন ক্লাবে খেলবেন রাসেল, মামুন ও মোশাররফ। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের নিকটবর্তী ক্লাবটিতে গিয়ে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা। হকি ফেডারেশনের সদস্য আনভির আদেল খান ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছেন কাল, ‘ওরা ভালোভাবেই জার্মানি পৌঁছেছে। সেখানে তাদের জার্সি, কাপড়-চোপড় আর আবাসন ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে।’ বাকি ১৬ জনও আগামী সপ্তাহেই যেতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি, ‘আগামীকাল ও পরশু সরকারি ছুটির কারণে জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) জোগাড় করতে পারব না। আশা করছি আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যেই সব কাগজপত্র আমাদের হাতে এসে পৌঁছাবে।’ তিন মাসের প্রশিক্ষণের পর স্কটল্যান্ডে গিয়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা স্থানীয় ক্লাবের বিপক্ষে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে পারেন।

মেসির জন্য ম্যানসিটির খালি চেক

লিওনেল মেসি
কাকার মূল্য ৬৫ মিলিয়ন ইউরো। ৯৪ মিলিয়ন ইউরো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দাম। আর লিওনেল মেসি? কত দাম তাঁর? মেসি যা নির্ধারণ করেন। এক কথায় বললে অসীম। ম্যানচেস্টার সিটি খালি চেক রেখে দিয়েছে। মেসি যা লিখবেন, সেটাই হবে তাঁর মূল্য!
বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি কিংবা মেসির এক কথায় ‘বার্সা ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না’ বলে দেওয়া; কিছুই দমাতে পারছে না ইংলিশ লিগের ক্লাব ম্যানসিটিকে। আগের মতো এখনো মেসিকে পেতে মরিয়া ম্যানসিটি। এখনো অপেক্ষায় আছে তারা। ম্যানসিটি আগে একবার জানিয়েছিল তাঁকে পেতে ১৫০ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতেও রাজি তারা। আর এবার একেবারে খালি চেক রাখতে চাইছে তাঁর জন্য!
শুধু কি ট্রান্সফার ফির বিশ্ব রেকর্ডই করতে চাইছে? কর-টর কেটে মৌসুমপ্রতি ১২ মিলিয়ন ইউরো বেতনও দিতে চাইছে এরই মধ্যে রবিনহোর পর কার্লোস তেভেজ, ইমানুয়েল আদেবায়োরকে চুক্তিবদ্ধ করা ম্যানসিটি।
কিন্তু কোনো কিছুই মেসিকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। তিনি সেই আগের মতোই বলে দিয়েছেন, ‘আমি বার্সেলোনা ছাড়ছি না।’ আর ম্যানসিটির খালি চেকে মেসি সই দেবেনই বা কী করে, হূদয়ে যে কেবল ‘বার্সেলোনা’ শব্দটিই লেখা আছে। টাকা দিয়ে কি আর মন কেনা যায়!

ক্রিকেটারদের গায়ে এমন পোশাক

যেখানে জার্সির শেষ, সেখানে ট্রাউজারের শুরু। যারা একটু লম্বা, শরীরের হেলদোলে জার্সি আর ট্রাউজারের মাঝে ‘নোম্যান্সল্যান্ড’ হয়ে ওঠে তাদের ‘মধ্য প্রদেশের’ কিছু অংশ। জাতীয় ক্রিকেট দলের পোশাক এখন এতটাই ‘স্মার্ট’!
‘পোশাকে পরিচয়’ কথাটাকে শেখ সাদীও পুরোপুরি কবর দিয়ে যেতে পারেননি। কুইন্স স্পোর্টস ক্লাবের চেয়ারম্যানস লাউঞ্জে ঢুকতে হলে যেমন টাই আর শু পরে আসতে হয়, বাংলাদেশেও এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে আপনি ইচ্ছেমতো পোশাক পরে যেতে পারবেন না।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) সম্ভবত মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ক্রিকেট মাঠ সে রকমই একটা জায়গা। আর ক্রিকেটাররা জাতির এমন প্রতিনিধি, যাদের অন্তত পোশাক নিয়ে বিব্রত হওয়া মানায় না। দূর থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের গায়ে থাকা লাল-সবুজ জার্সি যত সুন্দরই দেখাক না কেন, সেটা আসলে মরীচিকা। কাছে গেলে সৌন্দর্য ধুয়ে ভেসে ওঠে কত না দৈন্য! সবচেয়ে হতাশার কথা, পুরো জার্সিতে কোথাও ‘বাংলাদেশ’ নামটাই নেই! বিদেশি কোনো দর্শক হঠাত্ করে দেখলে বুঝতেই পারবে না, লাল-সবুজ জার্সি পরা এই খেলোয়াড়েরা আসলে কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। অথচ খেলোয়াড়েরাই তো দেশের সবচেয়ে বড় দূত। তাদের জার্সিতে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি জুড়ে দিতে আপত্তি কিসের!
সেদিন নেটে জাতীয় দলের এক পেসারকে একেকটা বল করার পরই নিচের দিকে জার্সি টানতে টানতে এদিক-সেদিক তাকাতে দেখা গেল। যেন বল করার চেয়ে সম্ভ্রম রক্ষাতেই বেশি মনোযোগ। কী আর করবেন বেচারা, বল ডেলিভারি দেওয়ার সময় জার্সি যে উঠে চলে আসছে বুকের কাছাকাছি! বলতে পারেন, ‘বোলার ব্যাটা ইন করে না কেন?’ করবে কোত্থেকে? ট্রাউজারের যেখানে শুরু, জার্সির পথচলা যে তার আগেই সারা! ইন করতে যে অতিরিক্ত কাপড়টুকু লাগে, সেটা তো জার্সিতে থাকতে হবে!
সমস্যা নানাবিধ। অনুশীলনের ট্রাউজার শরীরের সঙ্গে এতটাই আঁটোসাঁটো যে অনুশীলনে গিয়ে অনেকেই আর সেটা পরে থাকার সাহস করেন না। যদি ছিঁড়েটিড়ে যায়! মাঠে এসে তাই ট্রাউজার খুলে পরে ফেলতে হচ্ছে শর্টস। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাওয়ার সময় খেলোয়াড় ও টিম ম্যানেজমেন্টকে দেওয়া এই পোশাক সংকুচিত হয়ে এখন পরার একেবারেই অনুপযোগী। পরশু ম্যাচ শেষে এক ক্রিকেটার নিজের জার্সি দেখিয়ে বললেন, ‘বিশ্বাস করবেন না ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এই জার্সি এতটুকু লম্বা ছিল (হাত দিয়ে হাঁটুর একটু ওপর পর্যন্ত দেখালেন), আর এখন ছোট হয়ে এখানে (এবার দেখালেন কোমরের ওপরে)।’ শুধু খেলা বা অনুশীলনের জার্সি কেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর জিম্বাবুয়ে সফরে যে ট্রাভেল শার্ট পরে এসেছেন ক্রিকেটাররা, সেটা নিয়েও আছে অভিযোগ। বস্তার মতো ভারী টি-শার্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজের গরমে গলার ফাঁস হয়ে গেল ক্রিকেটারদের। ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে সিরিজ জয়ের ‘শাস্তি’টা হলো জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত প্রায় ৩৬ ঘণ্টার বিমানভ্রমণ। তবে ক্রিকেটারদের জন্য সুখবর, ঢাকায় ফেরার সময় নতুন ট্রাভেল শার্ট পাচ্ছেন তাঁরা। এনামুল হক জুনিয়র আসার সময় ঢাকা থেকে সেসব নিয়ে এসেছেন বুলাওয়েতে।
টিম স্পনসর গ্রামীণফোনের কাছ থেকে স্পনসর মানির বাইরে প্রতিবছর পোশাক ও কিট্স বাবদ ৪৫ লাখ টাকা পায় বিসিবি। এর বাইরে বাটার সঙ্গে আছে পোশাক বাবদ তিন বছরের জন্য আড়াই লাখ ডলারের চুক্তি। সেই টাকা দিয়ে বোর্ড নিজেরাই পোশাক ও কিটেসর ব্যবস্থা করে। কিন্তু খেলোয়াড়দের গায়ে যে নিম্নমানের জার্সি উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে এই টাকা কীভাবে খরচ হয় কে জানে!
দলনেতা হিসেবে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে জিম্বাবুয়ে সফরে আসা বোর্ড পরিচালক গাজী আশরাফ হোসেনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে লাভ হলো না। ‘জার্সি নিয়ে কথা বলব’ বলার পরই মাঠের ওপর দিয়ে কৌণিক পথে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে বলে গেলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছুই বলতে পারব না।’
ক্রিকেটারদের জার্সি নিয়ে তাহলে বোর্ড পরিচালকেরাও বিব্রত!