Monday, April 28, 2025

শেখ হাসিনাকে চুপ রাখতে বললেন ড. ইউনূস, মোদি বললেন, ‘পারবেন না’ -আল জাজিরাকে প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সময় জুলাই বিপ্লব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া, সাবেক সরকারের দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন।

রোববার (২৭ এপ্রিল) আল জাজিরায় প্রধান উপদেষ্টার এই ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারটি নেন আল জাজিরার সাংবাদিক নিয়েভ বার্কার। তিনি প্রধান উপদেষ্টার কাছে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রাখেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেখানে শেখ হাসিনাকে ‘চুপ’ রাখতে বলেছিলেন তিনি। কিন্তু জবাবে মোদি বলেছিলেন তিনি এটি পারবেন না। কারণ ভারতে সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ শেখ হাসিনা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে কিছু বললে সেটি তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

‘শেখ হাসিনা দাবি করেন তিনি এখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ভারত থেকে এসব বিবৃতি দিচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতে তার অবস্থানকে কীভাবে দেখে?’

আল জাজিরার সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলন হয়েছিল। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিমসটেকভুক্ত দেশের সব সরকারপ্রধান এসেছিলেন। তার সঙ্গে আমার কথা হয় এবং আমি তাকে স্পষ্ট করি, ঠিক আছে, যদি শেখ হাসিনাকে আপনি রাখতে চান, তাহলে এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমি কিছু করতে পারব না। কিন্তু অবশ্যই তিনি যখন সেখানে থাকবেন, তার কথা বলা উচিত হবে না। কারণ তার বক্তব্য আমাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে। তিনি বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে উত্তেজিত করেন। এতে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

সাংবাদিক নিয়েভ বার্কার তখন জিজ্ঞেস করেন, ‘মোদি কী বলেছিলেন?’

ড. ইউনূস বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন, ভারত হলো এমন দেশ, যেখানে সামাজিক মাধ্যম সবার জন্য উন্মুক্ত। আমি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।’

সাংবাদিক প্রশ্ন রাখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে আপনি কেমন নেতা দেখতে চান, যিনি দেশকে এগিয়ে নিতে পারবেন?

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা পুরনো ফ্যাসিবাদী শাসনে ফেরত যেতে চাই না। আমরা অর্থপাচারে ফিরে যেতে চাই না। আপনি নেতাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না। কিন্তু আপনি সিস্টেমকে নিশ্চয়তা দিতে পারবেন।

এ সময় আগামী ডিসেম্বরে অথবা পরের বছরের জুনে নির্বাচন দেওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে জানতে চান সাংবাদিক নিয়েভ বার্কার।

জবাবে প্রধান উপেদেষ্টা বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ‘সংক্ষিপ্ত সংস্কার প্যাকেজ’ নিয়ে একমত হলে জাতীয় নির্বাচন ডিসেম্বরেই হতে পারে। তবে ‘বৃহৎ সংস্কার প্যাকেজ’ চাইলে নির্বাচন আগামী বছরের জুনে অনুষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আমরা একটি সেরা নির্বাচন উপহার দিতে যাচ্ছি, যা এর আগে কেউ দেখেনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত



সীমান্তে কান্না, সন্তান গেল পাকিস্তান — মা রইলেন ভারতে

পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর পাকিস্তানি নাগরিকদের ভারত ছাড়ার নির্দেশের প্রেক্ষিতে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হলো অটারি সীমান্ত। সন্তানদের নিয়ে স্বামীর কাছে ফেরার পথে সীমান্তেই আটকে গেলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাটের বাসিন্দা সানা।

রোববার (২৭ এপ্রিল) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ বছর বয়সী সানা ২০২০ সালে পাকিস্তানের করাচির এক চিকিৎসক বিলালের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সম্প্রতি তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে ভারতের মিরাটে আসেন। তবে, গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত সরকার পাকিস্তানি নাগরিকদের দ্রুত দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়।

এই নির্দেশের পর, সানা তার তিন বছর বয়সী ছেলে ও এক বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) অটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানে ফিরতে রওনা দেন। কিন্তু সীমান্তে পৌঁছানোর পর এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। কারণ, সানার নিজের পাসপোর্ট ভারতীয় হলেও তার সন্তানদের পাসপোর্ট পাকিস্তানি। ফলে সন্তানদের ছেড়ে দিতে বলা হলেও সানাকে ভারতে ফিরে যেতে বলা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সানা। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমার সন্তানরা এখানে থাকতে পারবে না, আবার আমি ওদের নিয়ে পাকিস্তানেও যেতে পারছি না। তিনি জানান, তার স্বামী বিলালও সীমান্তে এসে স্ত্রী-সন্তানদের নিতে অপেক্ষা করছিলেন।

সানা এবং তার পরিবার সীমান্তের কর্মকর্তাদের জানান, শিশুরা মায়ের ছাড়া থাকতে পারবে না। তবে কর্মকর্তারা তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং জানান, নতুন সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সানা আরও জানান, বিয়ের পর এটি তার দ্বিতীয় ভারত সফর। তিনি সরকারকে অনুরোধ করে বলেন, পেহেলগামের হামলাকারীদের কঠোরতম শাস্তি দিন, কিন্তু আমাদের মতো নিরীহ পরিবারগুলোর মানবিক পরিস্থিতির দিকে দয়া করে নজর দিন। আমাকে ও আমার সন্তানদের পাকিস্তান যেতে দিন।

প্রসঙ্গত, গত দুই দিনে অটারি-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ২৫০ জনের বেশি পাকিস্তানি নাগরিক ভারত ছেড়েছেন।

ভারত সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবসা, চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা, ট্রানজিট, সম্মেলন, পর্বতারোহন, শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী, গ্রুপ ট্যুরিস্ট, তীর্থযাত্রীসহ ১২ ধরনের স্বল্পমেয়াদি ভিসাধারীদের ২৭ এপ্রিলের মধ্যে ভারত ছাড়তে হবে। এছাড়া সার্ক ভিসাধারীদের জন্য সময়সীমা ছিল শনিবার এবং চিকিৎসা ভিসাধারীদের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ২৯ এপ্রিল।

ভারত পাকিস্তানের অটারি-ওয়াঘা সীমান্ত এবং সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন হওয়া অশ্রুসজল মা। ছবি : সংগৃহীত
ভারত পাকিস্তানের অটারি-ওয়াঘা সীমান্ত এবং সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন হওয়া অশ্রুসজল মা। ছবি : সংগৃহীত



ভারতে ওয়াক্ফ আইন: যেখানে বুলডোজার নয়, আমলার কলমই যথেষ্ট by ইনসিয়া বাহনবতী

একবার ভাবুন—আপনার পরদাদা নিজের রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে একটি ছোট্ট পান্থশালা গড়ে তুলেছিলেন। শতাব্দীপ্রাচীন সেই পান্থশালা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তবে নিছক ইটপাথরের ভবন হিসেবে সেটি টিকে আছে, এমন নয়। এটি যুগের পর যুগ মানবসেবায় নিয়োজিত এমন এক আশ্রয় হিসেবে টিকে আছে, যার দরজা কখনো কোনো অনাহারী বা পথহারা মানুষের জন্য বন্ধ হয়নি।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আপনি আর আপনার পরিবার অগণিত মানুষের সেবায় এই আশ্রয়স্থলটাকে টিকিয়ে রেখেছেন। তারপর একদিন নির্বিকার এক ঘূর্ণি বাতাসে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল। রাতারাতি সব বদলে গেল। একটা নতুন আইন পাস হলো।

কলমের এক নিঃশব্দ আঁচড়ে আইনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দিয়ে দেওয়া হলো।

বহুদূরের কোনো এক দপ্তরের কোনো এক চেয়ারে বসা একজন সরকারি কর্মকর্তা ভুরু নাচিয়ে একটা ফাইলের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘ওটা’। তারপর ফাইল থেকে চোখ সরিয়ে আপনাকে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এই জমি বা বাড়িটা আপনার পরিবারকে কেউ দান করেছিল বা যে মহৎ কাজে আপনি এটি ব্যবহার করছেন, সেটি জমির দাতা তা ঠিক করে দিয়েছিলেন—আমার তো তা বিশ্বাস হয় না।’

এরপর সেই কর্মকর্তা ঠান্ডা গলায় জানিয়ে দিলেন—এই জমি এখন সরকারের। আপনি এক নিমেষেই ‘দখলদার’ হয়ে গেলেন। এখন থেকে এই জমির ওপর আপনার আর কোনো অধিকার থাকল না। সরকার এর দায়িত্ব নিয়ে নিল।

আপনার পরিবার যে পান্থশালাটা প্রজন্ম ধরে আগলে রেখেছে, দান আর সেবায় ব্যবহার করেছে, সেটা আর আপনার হাতে রইল না। আপনি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আপত্তি তুললেন। বিচার দাবি করলেন। কিন্তু এখানে কোনো সঠিক বিচারপ্রক্রিয়া নেই। কর্মকর্তারা শুধু বলে দেন, পরে তদন্ত হবে। কিন্তু তদন্ত কবে হবে, তার কোনো তারিখ বা সময়সীমা তাঁরা বলেন না।

এ অবস্থায় আপনি শুধু আপনার সেই পান্থশালার ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পারেন। কারণ, এখন আপনাকে আপনার নিজের পূর্বপুরুষদের বানানো বাড়িতে ঢুকতে হলে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। এই কথা শুনে আপনার হয়তো মনে হবে, এটি কোনো কল্পনার জগতের এক ভয়াবহ দুনিয়ার কথা বলছি। কিন্তু ভারতের ওয়াক্ফ সংশোধন আইন অনুযায়ী সে দেশের মুসলমানদের জন্য এটিই এখন বাস্তব জীবন। এই আইন মালিকানা, ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়া আর ধর্মনিরপেক্ষতার মতো মূলনীতিগুলোকেই উপড়ে ফেলেছে।

ওয়াক্ফ শব্দের মানেই হলো আল্লাহর নামে চিরস্থায়ী দান। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দানের মতো সমাজকল্যাণের জন্য কাজ করা। ওয়াক্ফ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি একজন মোতোওয়ালির (অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়ক) হাতে আমানত হিসেবে থাকে এবং রাষ্ট্র এর সুরক্ষা দিয়ে থাকে। কিন্তু ওয়াক্ফ সংশোধন আইন, ২০২৫ এই ধারণাকেই পাল্টে দিয়েছে।

আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল—যদি কোনো জমি অনেক দিন ধরে দান বা সেবামূলক কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটিকে ওয়াক্ফ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং সেটি যেকোনো ধরনের অবৈধ দখল বা দাবি থেকে রক্ষা পাবে। এখন সেই ধারা মুছে ফেলা হয়েছে। তার বদলে এসেছে একতরফা সরকারি নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে এখন একজন সরকারি কর্মকর্তা একাই ঠিক করে দিতে পারেন—এই জমি ওয়াক্‌ফর নাকি সরকারের মালিকানাধীন।

এ সিদ্ধান্ত নিতে তার কোনো প্রমাণ দেখানোর দরকার নেই, কোনো সঠিক বিচারপ্রক্রিয়া মানার দরকার নেই, এমনকি কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ারও দরকার নেই। একটা মতামত। একটা নোটিশ। আর তারপর পুরো সম্পত্তি আইনি পদ্ধতিতে কেড়ে নেওয়া। এটাই এখন সেখানকার বাস্তবতা। আর আপিল করার প্রক্রিয়া? সেটিও মজার—আপনি যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, সেই একই দপ্তরেই আপনাকে আপিল করতে হবে।

সংশোধিত আইনে এক চমকপ্রদ ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নাটক সাজিয়ে এখন ওয়াক্ফ বোর্ডে অমুসলিমদের রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। অন্য কোনো ধর্মীয় ট্রাস্টের জন্য এমন কিছু করতে বলা হয় না। মন্দির পরিচালনা কমিটিতে কখনো কোনো ইমামকে রাখতে বলা হয় না। চার্চ কমিটিকেও কোনো নাস্তিক বা অন্য ধর্মাবলম্বীকে নিতে বলা হয় না। কিন্তু এই বিভ্রান্তিকর সংশোধিত আইনের অধীনে মুসলিম ওয়াক্ফগুলোর ক্ষেত্রে এমন লোকজনকে ব্যবস্থাপনায় রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ইসলামি বিশ্বাস, ঐতিহ্য বা শিক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কখন অন্তর্ভুক্তির নামে আসলে মৌলিকত্ব নষ্ট করা হয়? এই নামে যে ‘সমতা’ আনা হয়েছে, তা আসলে মনে হয় নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর ইচ্ছেমতো হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।

এরপর আসে নিরীক্ষা (অডিট) ইস্যু। সংশোধিত আইন অনুযায়ী এখন কেন্দ্রীয় সরকার নিজের নিয়োজিত নিরীক্ষকের মাধ্যমে ওয়াক্ফ সম্পত্তির হিসাব পরীক্ষা করতে পারবে।

সরকার বলছে, ওয়াক্ফ বোর্ডের ভেতরের দুর্নীতি ধরার জন্য ‘স্বচ্ছতা’ আনার উদ্যোগ হিসেবে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালে দেখা যাবে, এটি আসলে এমন এক নজরদারি, যেখানে কোনো ভারসাম্য বা নিরপেক্ষতা রাখার ব্যবস্থাই নেই। কারণ, পাহারাদার যদি মালিকের আদেশে চলে, তাহলে তার নিরপেক্ষতা কতটুকু থাকবে, তা বুঝতে বিশেষ কষ্ট হয় না।

এটি সরাসরি কোনো আক্রমণ নয়। এটি নিঃশব্দে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কোনো বুলডোজার নেই। কোনো শিরোনাম নেই। শুধু নোটিশ, ফুটনোট আর সংজ্ঞা পরিবর্তন। এতেই এখন সবকিছু ‘আইনসম্মত’।

হ্যাঁ, পান্থশালাটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে; এর দেয়াল অক্ষত; দরজা এখনো খোলে। কিন্তু আল্লাহর নামে দান করা এই সব সম্পত্তি কে ভোগ করবে, তা এখন পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

আমরা যা দেখছি, তাকে অন্ধকারে চুরি বলা যাবে না; এটি আরও সূক্ষ্ম কিছু। এটি মালিকানা পরিবর্তনের একটা প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়া কোনো গোপন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে ঘটছে।

এটি সংস্কার নয়। এটি ধীরে, নীরবে এবং সম্পূর্ণভাবে সম্পদের দখল। এটি ঘটছে কাগজপত্রের মাধ্যমে, অস্ত্রের মাধ্যমে নয়।

ইনসিয়া বাহনবতী একজন ভারতীয় লেখক, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার, ঘৃণার রাজনীতি ও গণতন্ত্রবিষয়ক গবেষক

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন নিয়ে ভারতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে
সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন নিয়ে ভারতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: এএফপি

অভ্যুত্থানে শহীদের মেয়ে কেন আত্মহত্যা করে by মনজুরুল ইসলাম

আজকে পত্রিকা পড়তে গিয়ে দুটি খবরে চোখ আটকে গেছে। প্রথম খবরটি আসন্ন বাজেটে শহীদ পরিবার ও আহতদের সহযোগিতায় সরকারের বরাদ্দ বৃদ্ধি নিয়ে। এতে বলা হয়েছে, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তায় বরাদ্দ আগামী অর্থবছরে আড়াই গুণ বেড়ে ৫৯৩ কোটি টাকা হচ্ছে। অর্থবছরের শুরু থেকেই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি এককালীন অর্থ এবং চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হবে।’ (শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য বরাদ্দ বাড়ছে, সমকাল, ২৭ এপ্রিল ২০২৫)

শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য সরকার বরাদ্দ বৃদ্ধি করবে—এটাকে ইতিবাচক পদক্ষেপই বলতে হবে। যাঁরা জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে তাঁদের জন্য কিছু করার। রাষ্ট্রের তরফ থেকে আর্থিক সহযোগিতা, সম্মানী বা ভাতা দেওয়া সে রকমই একটা কিছু। এ কারণে খবরটা পড়ে একধরনের ইতিবাচক বা ভালো লাগার অনুভূতিই তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু ভালো লাগার ওই অনুভূতি খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে আরেকটি খবরের দিকে চোখ যায়। সেটি হলো ধর্ষণের শিকার এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। এই খবরের শিরোনাম হলো, ‘ধর্ষণের শিকার জুলাই আন্দোলনে শহীদের মেয়ের আত্মহত্যা’। (সমকাল, ২৭ এপ্রিল ২০২৫)

আন্দোলন চলাকালে মেয়েটির বাবা গত বছরের ১৯ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ১০ দিন পর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় বাবার কবর জিয়ারত করে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাঙ্গাসিয়া ইউনিয়নে নানাবাড়িতে ফেরার পথে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন কলেজশিক্ষার্থী মেয়েটি।

ধর্ষণের সময় মেয়েটির নগ্ন ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিল ধর্ষণকারীরা। এরপরও সব হুমকি, ভয়ভীতি ও ‘লোকলজ্জা’ উপেক্ষা করে মেয়েটির পরিবার ২০ মার্চ থানায় গিয়ে অভিযোগ করে। এরপর পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তারও করেছিল।

মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিরা জামিন পেয়েছে। এ নিয়ে কিছুদিন ধরে হতাশ ছিলেন মেয়েটি। ধারণা করা হচ্ছে, আসামিরা জামিনে ছাড়া পাওয়ায় মর্মাহত হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। (সমকাল, ২৭ এপ্রিল ২০২৫)

বাংলাদেশে ধর্ষণ ‘বিরল’ কোনো ঘটনা নয়, আত্মহত্যাও নতুন কিছু নয়, এমনকি ধর্ষণের শিকার মেয়ে বা নারীর আত্মহত্যার খবরও ‘অভূতপূর্ব’ নয়। তাহলে এ ঘটনা নিয়ে এত বিচলিত হওয়ার বা মুষড়ে পড়ার কী আছে?

বিচলিত হতে হচ্ছে, কারণ আত্মহত্যা করা মেয়েটি একজন শহীদের মেয়ে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে মেয়েটি প্রথমে তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। এরপর মার্চ মাসে তিনি নিজে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ‘অপমান’ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলেন। একজন শহীদের কন্যা হিসেবে মেয়েটির যখন সম্মান পাওয়ার কথা, তখন তাঁকে কেন ধর্ষণের শিকার হয়ে ‘অপমানিত’ হতে হলো? এটা কি শহীদ পরিবারটির প্রতি রাষ্ট্রের চরম অবহেলার ফলাফল?

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেছেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম দায়িত্ব ছিল। কিন্তু এই নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। (শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে: স্নিগ্ধ, জাগোনিউজ২৪ডটকম, ২৭ এপ্রিল ২০২৫)

একজন শহীদের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া এবং তার আত্মহত্যার ঘটনাটি শুধু রাষ্ট্রেরই ব্যর্থতা নয়; এটা একই সঙ্গে আমাদের রাজনীতিরও ব্যর্থতা। ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে বহুল আলোচিত একটি শব্দ হলো ‘জুলাই স্পিরিট’ বা জুলাইয়ের চেতনা। যে দল বা রাজনৈতিক শক্তি এই জুলাইয়ের চেতনার কথা বেশি বেশি বলেছে, আমরা ধারণা করেছি তারা গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে থাকবে; তাঁদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবে। বাস্তবে তেমনটা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য আর্থিক সহযোগিতা বা ভাতা একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। কিন্তু তাঁদের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে তাঁদের সেই সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারিনি, শহীদের মেয়ের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে সেটি প্রমাণ হয়ে গেল।

একজন শহীদের মেয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে, সেই বিষয়ে কারও কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই। শহীদের মেয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়াও এখন আর সম্ভব নয়। তার চেয়েও বড় কথা, মেয়েটির প্রতি যে চূড়ান্ত অবহেলা করা হয়েছে, তার কোনো ক্ষমা হতে পারে না।

মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলো’র জেষ্ঠ্য সহসম্পাদক

পটুয়াখালীর দুমকিতে গ্রামের বাড়িতে বাবার কবরের পাশে কলেজছাত্রীকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে। কবর খুঁড়ছেন বৃদ্ধ দাদা
পটুয়াখালীর দুমকিতে গ্রামের বাড়িতে বাবার কবরের পাশে কলেজছাত্রীকে দাফনের প্রস্তুতি চলছে। কবর খুঁড়ছেন বৃদ্ধ দাদা। ছবি : প্রথম আলো

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাগলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে by আমির দফতরি

কাশ্মীরে সাম্প্রতিক হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। ব্যাপারটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই দুই দেশ যখন আরও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে, তখন যুক্তরাষ্ট্রকে সামলাতে হচ্ছে অত্যন্ত জটিল এক কূটনৈতিক সমীকরণ।

যুক্তরাষ্ট্রকে এখন এই অঞ্চলে কয়েকটা জটিল বিষয় সামলাতে হবে। এদিকে আছে ভারতকে সমর্থন দেওয়া, ভারতের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্ব বজায় রাখা। সঙ্গে আছে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক রক্ষার কৌশল তৈরি করা।

এগুলোর কোনোটাতেই কোনো রকম শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন হিসেবে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলেই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং একটি বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে।

ভারত-পাকিস্তান সংঘাত আর কেবল আঞ্চলিক কোনো বিষয় নয়। এই সংঘাতের প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। ফলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়াতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। এই অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—দুটিই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

কাশ্মীর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামান্যতম ভুল কূটনৈতিক পদক্ষেপও নেয়, তাহলে তা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নয়; বরং বৈশ্বিক পরিসরেও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

সাম্প্রতিক হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি এ সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছে ও ভারতের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পাশে রয়েছে। আমরা সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানাই।’

ব্রুস আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তানের সীমান্ত-বিতর্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নিচ্ছে না। কারণ, এই জটিল সংকট সামাল দিতে সংবেদনশীল ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি বলে তাঁরা মনে করেন।

কাশ্মীরে হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ভারত সফরে ছিলেন। তবে এ সফর ছিল পূর্বনির্ধারিত কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা।

হামলার পর ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি হামলার নিন্দা জানান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর এই সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

পেহেলগাম হত্যাকাণ্ড নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনা যখন বাড়ছিল, তখন ভ্যান্সের ভারতে উপস্থিত থাকার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও কৌশলগত আলোচনা সম্ভব করে তোলে। এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন দিল্লিকে শুধু কৌশলগত নয়, বরং সামরিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে, বিশেষ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কমপ্যাক্ট’ উদ্যোগ চালুর মাধ্যমে। এই অংশীদারত্বের মূল লক্ষ্য হলো সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও জোরদার করা।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় একটি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও এগোচ্ছে। ২০২৫ সালের শরতেই তা চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়ছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।

সব মিলিয়ে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে যে প্রতিষ্ঠিত হবে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ট্রাম্প প্রশাসন খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে যে সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পাশে থাকবে এবং এ সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

এর বিপরীতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে সক্রিয় হয়েছে পাকিস্তানও। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলী জারদারি চীন সফর করেন। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া—বিশেষত চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

এই অংশীদারত্বকে দুই দেশই ‘সর্বকালীন মৈত্রী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাইরের চাপ মোকাবিলায় একে অপরকে সব সময় সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে। যদিও পাকিস্তানে চীনের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে, তবু সামগ্রিকভাবে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এখনো শক্ত ও টেকসইভাবে এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভারতের পাশে আছে এবং সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানায়। আমরা নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করি, আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য লাভের প্রার্থনা করি এবং এ নৃশংস ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, ‘গত এক দশকে আমাদের দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কই যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতকে মেজর ডিফেন্স পার্টনার হিসেবে ঘোষণা দিতে উৎসাহিত করেছে—এই শ্রেণিতে ভারতই প্রথম।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। চীন সন্ত্রাসবাদের সব রূপের বিরোধিতা করে। আমরা নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শোক প্রকাশ করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’

উত্তেজনা ক্রমে বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ—একদিকে ভারতকে সমর্থন জানানো, অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আসা সংযমের আহ্বানকেও গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। সামান্য ভুল পদক্ষেপ থেকেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ওয়াশিংটন সম্ভবত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে এই সংকট নিরসনের চেষ্টা করবে, যাতে সহিংসতা আর না বাড়ে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যায়।

এই পরিস্থিতির পরিণতি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তো তা খুবই স্পর্শকাতর, কারণ, চীনের আঞ্চলিক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

* আমির দফতরি নিউজ উইকের প্রতিবেদক

- নিউজ উইক থেকে, ইংরেজি থেকে অনুবাদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি এবং শাহবাজ শরীফ
ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি এবং শাহবাজ শরীফ। কোলাজ: প্রথম আলো

পটুয়াখালীতে শহীদ বাবার কবরের পাশে শা‌য়িত কলেজছাত্রী, কান্না থামছে না মায়ের

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় জুলাই আন্দোলনের শহীদ বাবার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে কলেজছাত্রী মেয়েকে। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে নিজ গ্রামের বসতঘরের সামনের আঙিনায় তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সন্ধ্যা সাতটার দিকে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান স্বজনেরা।

গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার বাসা থেকে ওই কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ১৮ মার্চ তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দুমকি থানায় মামলা রয়েছে। আজ রোববার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা সাতটার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। একই অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন কলেজছাত্রীর মা। তিনি অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নার একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় স্বজনেরা তাঁকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যান। নিজ ঘরে পৌঁছানোর একপর্যায়ে জ্ঞান ফিরলে তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। এমন অবস্থা থেকে কলেজছাত্রীর বৃদ্ধ দাদাও সেখানে কান্নাকাটি শুরু করেন।

পরে বাড়ির পাশে একটি স্কুলমাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ওই জানাজায় বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সার্জিস আলমসহ নেতা–কর্মীরা অংশ নেন।

এর আগে কলেজছাত্রীর মা জানিয়েছিলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ১৯ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে তাঁর স্বামী গুলিবিদ্ধ হন। ১০ দিন পর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর শহীদ স্বামীকে দুমকি উপজেলার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

ওই নারী আরও বলেন, গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় বাবার কবর জিয়ারত করে নানাবাড়িতে ফেরার পথে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তাঁর মেয়ে। ধর্ষণের সময় এজাহারভুক্ত আসামিরা তার অশালীন ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলে। এরপর তাঁরা গত ২০ মার্চ থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে উপজেলার একটি ইউনিয়নের দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়। সেই দুজন কিশোর। তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে যশোর শিশু সংশোধনাগারে পাঠানো হয়।

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় কলেজছাত্রীর জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। আজ রোববার রাতে
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় কলেজছাত্রীর জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। রোববার রাতে ছবি: প্রথম আলো

কুরস্ক ‘পুনর্দখলে’ রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সেনারা, প্রশংসায় মাতল মস্কো

ইউক্রেনীয় বাহিনীর দখলে থাকা রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ফিরে পাওয়ার দাবি করেছে মস্কো। ইউক্রেনের সেনাদের কাছ থেকে ওই অঞ্চলের শেষ গ্রামটি দখল করে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। এ কাজে রুশ সেনাদের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সেনারাও লড়াই করেছেন বলে উল্লেখ করেছে মস্কো।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে অভিযান শুরু করে রাশিয়া। পরে গত বছরের আগস্টে হঠাৎ করেই কুরস্কের বড় অংশ দখল করে নেয় ইউক্রেন। ওই ঘটনায় বেশ বিব্রত হয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তখন থেকেই কুরস্ক থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের হটাতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। এর আগেও কুরস্কে বেশ কিছু এলাকার দখল ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি করেছিল তারা।

এরই মধ্যে গতকাল শনিবার একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্রেমলিন। তাতে দেখা যায়, রুশ সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভ পুতিনের হাতে একটি প্রতিবেদন তুলে দিচ্ছেন। এ সময় গেরাসিমভ বলেন, কুরস্ক পুনর্দখলে রুশ সেনাদের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দায়িত্ব পালন করেছেন উত্তর কোরিয়ার সেনারা। তাঁরা ‘উচ্চ পেশাদারি, দৃঢ়তা, সাহস ও বীরত্ব’ দেখিয়েছেন।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার হয়ে লড়াই করার জন্য আনুমানিক ১৪ হাজার সেনাসদস্য পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া। সাঁজোয়া যান ও ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দিকে ওই সেনারা বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। অনেকের মৃত্যু হয়েছিল। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতই নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

এ ছাড়া উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা, রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে বলে জানিয়েছে কিয়েভ। এই অস্ত্র আদান-প্রদানের কথা স্বীকার করেনি মস্কো। কারণ, এমন আদান-প্রদানের ফলে জাতিসংঘের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘিত হবে। যদিও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে সেনা সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি কখনোই অস্বীকার করেনি ক্রেমলিন।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য
উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের ভাইকে কোপাল কিশোর গ্যাং সদস্যরা

জুলাই বিপ্লবে শহীদ নোয়াখালীর মাহমুদুল হাসান ওরফে রিজভীর ছোট ভাই স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসানকে (১৬) এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। আজ রোববার বিকেল সোয়া চারটার দিকে জেলা শহর মাইজদীর বার্লিংটন মোড় এলাকায় ওই হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলায় শাহরিয়ার হাসান গুরুতর আহত হয়। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাত আটটার দিকে আহত শাহরিয়ারকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। শাহরিয়ার শহরের হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র।

এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ রাত পৌনে দশটার দিকে জেলা শহর মাইজদীতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিক্ষোভ-সমাবেশে শহীদ রিজভীর ভাই শাহরিয়ারের ওপর হামলার ঘটনার জন্য আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের লালিত কিশোর গ্যাংকে দায়ী করা হয় এবং হামলাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

শাহরিয়ারের মা ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, তাঁর ছেলে শাহরিয়ার স্থানীয় হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। গত দুই দিন আগে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে বাইরের কয়েকজন তরুণের ঝগড়া হয়। বিষয়টি তাঁকে (মা) এবং স্কুলের শিক্ষকদের জানায় শাহরিয়ার। পরে বিষয়টি সে মীমাংসা করে দেয়। এ জন্য বহিরাগত তরুণেরা তার বন্ধুদের মারতে পারেনি। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয় শাহরিয়ারের ওপর। আজ বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওই তরুণেরা শাহরিয়ারের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে।

শাহরিয়ারের বাবা জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, হামলাকারীরা প্রথম দুটি মোটরসাইকেলে করে আসে। এরপর আরও কয়েকজন এসে তাঁর ছেলেকে ঘিরে ধরে ব্যাগের ভেতর থেকে ধারালো অস্ত্র বের করে কোপাতে থাকে। এতে তাঁর ছেলে মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রাজীব আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ার হাসান নামের এক কিশোরকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড থেকে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের কিশোর গ্যাং শহীদ রিজভীর ছোট ভাই শাহরিয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে। তারা তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। ঘটনার প্রতিবাদে তাঁরা আজ রাতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। এ ছাড়া হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল সোমবার সকালে হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করা হবে।

সুধারাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ারের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। বড় ভাই–ছোট ভাই মধ্যকার বিরোধের জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই হামলা চালিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কিশোরগ্যাং সদস্যদের হামলায় আহত স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসানকে হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে
কিশোরগ্যাং সদস্যদের হামলায় আহত স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসানকে হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। ছবি: প্রথম আলো।

দাউদের জীবনযাপন ছিল ওর নিজের মতো by আফসান চৌধুরী

আজ সকাল সাতটা-আটটার দিকে জার্মানি প্রবাসে নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার, আমাদের দাউদের মৃত্যুর খবর পেলাম। মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। দাউদ আমার বন্ধু। আমি তো ওকে কবি-সাহিত্যিক হিসেবে দেখতাম না। বন্ধু হিসেবেই দেখি।

দাউদের ছোট ভাই জাহিদ হায়দার আমাকে কদিন ধরেই বলছিল যে মনটা শক্ত করুন। ডাক্তার বলে দিয়েছে, দাউদ আর ফেরত আসবে না। আমি তাই প্রস্তুত ছিলাম একরকম। কষ্টটা কম করে গেছে আশা করি। ওর জ্ঞান ফিরেছিল। কথা বলতে পারেনি।

দাউদ এত কথা বলত, এত এত কথা! আমরা এত আড্ডা-গল্প দিয়েছি। ১৯৬৯ সাল থেকে। হাসান ফেরদৌস আর দাউদ খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওরা একই পাড়ার। ঢাকার মালিবাগ মোড় এলাকার।

একসঙ্গে একটা পত্রিকা করতাম আমরা। পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিল হাসান ফেরদৌস। আমিও ছিলাম সম্পাদনা পর্ষদে। আরেকজন মারা গেছে আমাদের বন্ধু তৌফিক খান মজলিশ, সেও ছিল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকজন। যেমন ওয়াসি আহমেদ।

তো আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দাউদ চলে গেল। দুর্দান্ত কবিতা লিখত দাউদ। কবিতা লিখে কীভাবে বিখ্যাত হতে হয়, তা ও জানত। এ নিয়ে আমরা ওকে ঠাট্টাও করতাম। ওর প্রথম কবিতার বইটা যখন ছাপা হলো, সেই কবিতার বইয়ের জন্য পুরস্কার পেল। ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’। অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ও। পুরস্কার পাওয়ার পরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে একটা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করি আমরা দাউদের জন্য। সেখানে লোকজন অনেক প্রশংসা করেছে। শওকত ওসমান অনেক দীর্ঘ এক আলোচনা করেছিলেন দাউদের কবিতা নিয়ে। এটা একটা বিরাট পাওয়া। তিনি আমাদের ‘স্যার’ ছিলেন ঢাকা কলেজে।

পরবর্তী সময় দাউদ দৈনিক ‘সংবাদ’-এ যোগ দিল সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। সেই কম বয়সী দাউদ। সবার কাছে লেখার জন্য যোগাযোগ করত। আমিই খুব একটা লিখিনি।

দাউদ সজ্জন মানুষ ছিল। খুবই সজ্জন। এরপর সে লিখল তার সেই কবিতাটা— ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নার কালো বন্যায়’। ওটাই ওর কাল হলো। খুব বিখ্যাত হলো বটে। কিন্তু বিরাট ঝামেলাও শুরু হলো। আমরা তাও প্রতিবাদ করেছিলাম যে এ তো কবির লেখা, কবিতাই। আহমদ ছফা, ছফা ভাই আমাদের সঙ্গে শামিল ছিলেন সে সময়। গুণদা, নির্মলেন্দু গুণ ছিলেন। কবি-সাহিত্যিকেরা মিলে একটা প্রচেষ্টা নিয়েছিল তখন।

দাউদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। এখন যেমন আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়, সে রকম নয়। প্রিভেনটিভ কাস্টডি। যাতে দাউদের ক্ষতি না হয়। দাউদের পরিবার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী সাহেবের পরিচিত ছিল। বৃহত্তর পাবনার লোক ওরা।

তখন বলা হলো যে নিরাপদ হয় দাউদ যদি দেশ ছেড়ে চলে যায়। দাউদ দেশ ছেড়ে চলে গেল। প্রথমে কলকাতায়, পরে নানা স্থান ঘুরে জার্মানি।

তারপর তো আর দেখা হয় না। কিন্তু আমাদের যোগাযোগ ছিল। তখনকার দিনে তো যোগাযোগব্যবস্থা এখনকার মতো এত সুলভ ছিল না, এত কিছুও ছিল না। তারপরও ছিল যোগাযোগ।

একবার কলকাতায় গিয়েছিলাম। ১৯৭৮ সালের পরে। দাউদ তখন লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাসায় থাকত। ওইখানে নিয়ে গেল। অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী লীলা রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর স্ত্রী বোধ হয় আমেরিকান ছিলেন। ওই সময় আরও অনেকের সঙ্গেই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল দাউদ। দাউদ আমাদের নাটক দেখাতেও নিয়ে গেল। আমরা গিয়ে নাটক দেখলাম। চা-কফি খেলাম। তারপর আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে। তখনই বুঝেছিলাম, ও খুব কষ্টে আছে। দেশে ফিরতে পারছে না, এইটাই হচ্ছে প্রধান কষ্ট। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন যখন হলো, পঁচাত্তরের পরে, দেশে এসেছিল কয়েকবার। আমার সঙ্গে যে সব সময় দেখা হয়েছে, তা না। শেষে তো নির্বাসনেই চলে গেল।

দাউদের জীবনযাপন ছিল ওর নিজের মতো। কখনো এখানে, কখনো ওখানে। কোথাও স্থির তো সে ছিল না। বিলেতে থাকল, আমেরিকায় থাকল। এরপর জার্মানিতে চলে গেল। হয়তো কোনো জায়গায় নিরাপদ বোধ করছিল না সে।

আমার মনে আছে, গুন্টার গ্রাস যখন কলকাতায় এসেছিলেন, দাউদ তাঁর সঙ্গে অনেক ঘুরেছে কলকাতায়। আমাকে গুন্টার গ্রাস বলেছিলেন যে ‘দাউদ এত সজ্জন, যা-ই চাই না কেন ও একটা ব্যবস্থা করে দেয়।’

এরপর দাউদ চলে গেল জার্মানি। হাসান ফেরদৌসের সঙ্গে হয়তো তার যোগাযোগটা বেশি ছিল। আমার সঙ্গে ফোনে, মাঝেমধ্যে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে কথা বলতাম। পুরোনো বন্ধুদের আড্ডা-ফাজলামো যেমন হয় আরকি। ওর সঙ্গে আর সিরিয়াস আলাপ কিসে!

জীবনে ওর অনেকগুলো আঘাত ছিল। একটা অ্যাকসিডেন্টের মধ্যে পড়ে গেল। সেই তার শরীর খারাপের শুরু। সম্প্রতি ওর ভাই জাহিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শুনলাম যে ও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিল। আগেও ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছে, দুবার নাকি তিনবার। সেই ক্যানসার তো ছিলই। একবার স্ট্রোক করে পড়ে গেল।

তো এই বয়সে এসে আর টিকে থাকা কঠিন। কখনোই সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করত না দাউদ। থাকত একা। কে তাকে দেখাশোনা করবে?

এই যে তেরো তলা থেকে বারো তলা পর্যন্ত সিঁড়ি থেকে পড়ে গেল! ডাক্তার ওকে জিজ্ঞেস করেছিল যে তোমাকে কি কেউ আক্রমণ করেছে? ওকে কে আক্রমণ করবে?

লোকজন ওর ছবি পাঠাত আমার কাছে। হাসপাতালে শুয়ে আছে। বড্ড খারাপ লেগেছে তা দেখে! এই উচ্ছল বাচাল মানুষটা নীরব হয়ে গেছে। আমি হয়তো মনের দিক থেকে তখনই মেনে নিয়েছি যে দাউদ আর থাকবে না।

আজকে সকালবেলা শুনলাম যে দাউদ নেই। এই বয়সেও মানুষের এত কষ্ট হতে পারে, এটা আমি ভাবিনি। আমাদের বন্ধুবান্ধবের মধ্যে হাসান ফেরদৌস দেশের বাইরে। মনজুরুল হক জাপানে চলে গেল। ওয়াসির সঙ্গে তো আজকাল যোগাযোগও হয় না। আমি আছি নতুন বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের সঙ্গে।

উনিশ শ উনসত্তরের আগে সাহিত্যের যে ধারাবাহিকতা ছিল, তার একটা অংশ দাউদ। দাউদ অনেক ভালো কবিতা লিখেছে। কিন্তু সেগুলোর কথা মানুষ বলে না। দাউদের ‘পাবলিক-পার্সোনালিটি’ বড় হয়ে গেল ওর কাব্য-ব্যক্তিত্বের চেয়ে।

দাউদের মৃত্যুতে কী আর বলি! পাঠক ওর কবিতা পড়লেই বুঝতে পারবেন, কেমন কবি ছিল আমার বন্ধু দাউদ হায়দার।

কবি দাউদ হায়দার
কবি দাউদ হায়দার। ছবি: কবির পরিবারের সৌজন্যে

সারা দেশে পাথর কোয়ারি খুললো, সিলেটে বন্ধ, রহস্য কী? by মিজানুর রহমান

সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সিলেটকে বাদ দিয়ে সারা দেশের পাথর কোয়ারিগুলো খুলে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরিবেশ বিপর্যয়ের অজুহাতে প্রায় ৮ বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকার। ৫ই আগস্টের পর থেকে পাথর রাজ্য সিলেটসহ দেশের ৫১টি কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছিল। তবে অতীতের ধারাবাহিকতায় তা বন্ধ রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছিলেন পরিবেশবাদীরা। মুখোমুখি বা পাল্টাপাল্টি ওই অবস্থায় উভয় দিক বিবেচনায় গতকাল একটি গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজতে বৈঠকে বসেছিল এ সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ। পাথর/সিলিকাবালু, নুড়ি পাথর/সাদা মাটি কোয়ারিসমূহের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাটি হয় হাইব্রিড ফরমেটে। কেন্দ্র ছিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সভাকক্ষ ১২১। সভায় ফিজিক্যালি উপসি'ত থেকে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপসি'ত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কোয়ারি থাকা জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। সভায় খোলাসা করে বলা হয়, হাসিনা সরকার পরিবেশ রক্ষার নামে ৮ বছর ধরে কোয়ারিগুলো বন্ধ করে রাখলেও এক সেকেন্ডের জন্য পাথর লুট বন্ধ হয়নি। এতে শাসক দলের মদদপুষ্ট অসাধু নেতাকর্মীরা উপকৃত হয়েছে, কিন্তু  সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর কোয়ারিগুলোর নিয়ন্ত্রণে হাত বদল হয়েছে। আগে এটি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের শেল্টারে পাথর লুট হতো। যার বখরা পেতো আওয়ামী প্রশাসন। ৫ই আগস্টের পর কিছু দিন বন্ধ থাকলেও এখন কোয়ারিগুলো থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন তথা লুটপাট অব্যাহত রয়েছে সমান গতিতে। এই লুটপাটে এখন ‘বহুদলীয়’ সিন্ডিকেট। যার মধ্যস্থতা করছে কোথাও বিএনপি নেতা, কোথাও সমন্বয়ক পরিচয়ধারী আবার কোথাও বা জামায়াত। পুনর্গঠিত সিন্ডিকেটে সামাজিক, ব্যবসায়িক এবং শ্রমিক পরিচয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী যুক্ত রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসন তথা বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের বক্তব্য ছিল হাজার হাজার কোটি টাকার পাথর লুট বন্ধ করতে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। যদিও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযান শেষে স্থানচ্যুত হওয়ার আগেই ফের লুট শুরু  হয় এমন মন্তব্য করে এক কর্মকর্তা বলেন, সীমিত পরিসরে কোয়ারি খুলে না দিলে লুট পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। এ সময় বিজিবি’র টহল বাড়ানোর কথাও ওঠে। যার যৌক্তিকতা নিয়ে খোদ সভাতে প্রশ্ন ওঠে।

বলা হয়, বিজিবি’র কাজ সীমান্ত রক্ষা। পাথর লুট ঠেকানো নয়। পুলিশ লুট হওয়া পাথর পরিবহন বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু  সেটি খুব একটি দৃশ্যমান নয়; বরং প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানে গতকালও একজন পুলিশ সদস্যকে পাথর লুটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ক্লোজ করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সনাতন পদ্ধতিতে উত্তোলনের অনুমতি প্রদানের পক্ষে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বলেন, সিস্টেমেটিক ইজারা দিলে অন্তত ইজারাদারকে জবাবদিহির মধ্যে রেখে অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা করে তার মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করানো সম্ভব। এতে লুট ঠেকানো এবং রাজস্ব দু’টিই মিলতো। তারা ইসিএভুক্ত এবং মামলার আওতায় না থাকা দেশের সব কোয়ারি খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান। মাঠের কর্মকর্তারা বলেন, ইজারা দিলে নির্ধারিত ইজারাদার পাথর তুলবে। এখন যে যার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে দিনে রাতে পাথর তুলছে, লুট করছে। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই। এটি চলতে পারে না। কোয়ারি বন্ধ থাকায় এ খাতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে। পাথর লুটকে কেন্দ্র করে নব্য সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-রাহাজানি তথা অঞ্চল ভেদে অস্থিতিশীলতা চরম আকার ধারণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু না, এ নিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে হাঁটেনি উপদেষ্টা পরিষদ। মাঠ প্রশাসনের রিপোর্ট তথা বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে তারা নিজেদের মতো করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! যা নিয়ে সভাতেই প্রশ্ন উঠে। বিশেষ করে পাথরের রাজ্য সিলেটের কোয়ারিগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। সরকারের হাজার কোটি টাকার রাজস্বের ক্ষতি তো বটেই, এ নিয়ে শান্ত সিলেট উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সভায় এও বলা হয়, ২০২২-২৩ সালে সিলেট অঞ্চলের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখায় নদীগুলোর পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়াকে চিহ্নিত করা হয়।

সে সময় বলা হয়, নদীগুলোতে পাথর স্তূপের কারণে মৎস্য প্রজননও ঝুঁকিতে। সিলেট চেম্বার অব কমার্সের একাধিক সেমিনারে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের সুযোগ উন্মুক্তকরণের জোর দাবি জানানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ হাসিনার সরকারের পথ ধরে পাথর রাজ্য সিলেটকে বাদ দেয়ার বিষয় জানতে চাইলে সভায় উপসি'ত একজন কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারি, সিলিকাবালু কোয়ারি, নুড়িপাথর, সাদা মাটি উত্তোলনসহ অন্যান্য সকল কোয়ারির ইজারার পক্ষেই বলেছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু  উপদেষ্টা পরিষদের ৩ সদস্যের মধ্যে এ নিয়ে বিভাজন দেখা দেয়। সিলেটের কোয়ারিগুলো উন্মুক্তকরণে কোনো অবস্থাতেই একজন উপদেষ্টা রাজি হননি। বরং তিনি পরিবেশ রক্ষায় আরও কঠোর হতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১২ সালে জাফলংয়ের পিয়াইন নদীসহ ১৫ কিলোমিটার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে ইসিএভুক্ত এলাকা জাফলং এবং মামলা থাকায় শারপিনটিলা থেকে পাথর উত্তোলনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সবাই অবগত। কিন্তু  সিলেটের বাকি কোয়ারিগুলো কেন এখনো বন্ধ? তা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রশ্ন ওঠে। তবে কোনো সদুত্তর মেলেনি। এ বিষয়ে সভার সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে দেখা করে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চায় মানবজমিন। কিন্তু  তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং রেফার করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাছে। সচিবের দপ্তরে সন্ধ্যা অবধি অপেক্ষা, পিএস এর মাধ্যমে দফায় দফায় বার্তা পাঠানো বিশেষ করে উপদেষ্টার রেফারেন্স দেয়া হলেও সচিব কথা বলতে রাজি হননি। 

mzamin

পেহেলগামে হামলার ময়দান থেকে বেঁচে ফেরার গল্প

বিশ্ববাসীর কাছে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও সমপ্রতি মর্মান্তিক এক হত্যাকাণ্ডের জন্য ট্রাজিক স্থানের তকমা পেয়েছে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের  পেহেলগাম। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার দুপুরের পরপরই আকর্ষণীয় ওই পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের ওপর নিষ্ঠুর হামলা চালায় একদল বন্দুকধারী। যাতে ঝরে পড়ে এক এক করে ২৬টি তাজা প্রাণ। প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশে একান্ত সময় কাটাতে পরিবার নিয়ে বছর জুড়েই পেহেলগামে বেড়াতে যান হাজার হাজার পর্যটক। যাদের স্মৃতিতে জমা হয় মনোরম সব গল্প। তবে ২২শে এপ্রিল পর্যটকদের জন্য ছিল ভয়াবহ একটি দিন। হঠাৎ মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণে জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটেছেন তারা। জীবন বাঁচাতে অনেকে গাছের আড়ালে, আবার অনেকে কাছে থাকা ছোট ছোট গর্তে লুকিয়ে পড়েছিলেন। কাউকে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়েছে। আবার কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারার এক লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ভারতের কর্ণাটকের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এক্স হ্যান্ডেলে শেয়ার করা ওই কাহিনী প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেছে অনলাইন এনডিটিভি। যাতে বলা হয়েছে, প্রসন্ন কুমার ভাট। কর্ণাটকের এই বাসিন্দা পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ২২শে এপ্রিল, মঙ্গলবার  পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর চালানো হামলার দিন তিনিও সেখানে ছিলেন। এক্স হ্যান্ডেলে শেয়ার করেছেন নিজের এবং অন্য আরও ৩০-৪০ জন পর্যটকের বেঁচে ফেরার গল্প। জানিয়েছেন, অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছিলেন তারা। ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক্সের পোস্টে প্রসন্ন কুমার লিখেছেন, সেদিন এক মর্মান্তিক ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। ভাগ্যক্রমে এখনো বেঁচে আছি। ওই ঘটনাকে ভয়াবহ কাহিনী হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে। কেননা, বন্দুকধারীদের হামলা সেখানকার স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে।

প্রসন্ন কুমারের দাবি ভারতীয় শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা তার ভাই। যার প্রচেষ্টায় সেদিন ৪০ জন পর্যটকের জীবন বেঁচে গেছে। প্রসন্ন বলেন, ঈশ্বরের করুণা, ভাগ্য এবং একজন সেনা কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় সেদিন আমাদের ৩০-৪০ জনের জীবন বেঁচে গেছে। ২২শে এপ্রিল দুপুরে পেহেলগাম সংলগ্ন বৈসারণ উপত্যকায় পৌঁছেছিলেন প্রসন্ন ও তার পরিবার। তাদের সঙ্গে তার ভাই এবং ভাবিও ছিলেন। দু’দিন আগেই সেখানে যেতে চেয়েছিলেন তারা। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের সময় পরিবর্তন করে ২২শে এপ্রিল করা হয়। ওই দিন দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে প্রথম গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। সবাই শুধু ভাবছিল কী ঘটছে। এসময় উপত্যকাটিতে শিশুরা তাদের সময়গুলো উপভোগ করছিল। প্রসন্ন বলেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দুটি মৃতদেহ দেখতে পান তারা। ততক্ষণে তার ভাই বুঝে গিয়েছিলেন যে, পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলা করা হয়েছে। ওই সময়টাতেই চারদিক থেকে মুহুর্মুুহু গুলির শব্দ আসতে থাকে। মানুষজন এদিক সেদিক দৌড়াতে থাকে। সকলেই নির্দিষ্ট মুখের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। তবে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে ওই স্থানটিতেই অবস্থান নিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। প্রসন্ন লেখেন, আমরা দেখতে পাই একজন সন্ত্রাসী আমাদের দিকে আসছে। তাকে দেখে আমরা উল্টো দিকে দৌড়াতে শুরু করি। ভাগ্যক্রমে আমরা উল্টো পথে একটি গর্ত খুঁজে পাই। পরে বেশির ভাগ পর্যটককেই আমাদের পালানোর স্থানটি দিয়ে পালাতে দেখেছি।

তিনি বলেছেন, তার ভাই দ্রুত পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে এবং তার পরিবারসহ প্রায় ৪০ জন পর্যটক নিয়ে নতুন একটি পালানোর পথ আবিষ্কার করেন। প্রসন্নের ভাইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটকরা এমনভাবে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন, যেন তাদের গায়ে গুলি না লাগে। স্থানটি ছিল পাহাড়ের একটি পাদদেশ। যেখান দিয়ে জলধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। তারা মাটির কিনার ধরে এগিয়ে যাওয়ায় অনেকটাই সুরক্ষিতভাবে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন প্রসন্ন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, এভাবে যেতে যেতে ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশ’ মিটার দূরে গাছের শিকরের সংকীর্ণ একটি গর্তে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। সেখানে তার পরিবারের চারজনই ছিলেন। সকলেই প্রার্থনা করছিলেন। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে গুলির শব্দ। জীবনের চরম ভয়, হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা নিয়ে এই আধা ঘণ্টা পার করেছেন তারা। প্রসন্ন বলেন, লুকিয়ে থাকার সময়টাতে আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে, আমরা কি সেখানে থাকবো নাকি অন্যস্থানে পালিয়ে যাবো। মনে হচ্ছিল বেঁচে ফেরার আশায় এক মৃত্যু ফাঁদে আটকা পড়েছি আমরা। পুরো সময়টা আমরা বাড়িতে থাকা আমাদের শিশু আর বাবা-মায়ের কথা ভাবছিলাম। জানতাম না তাদের সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা। পরে বিকাল ৩টা ৪০ থেকে ৪টার মধ্যে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে সংকেত দিলো। তারা আমাদের উদ্ধার এবং নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন প্রসন্ন। তিনি বলেন, তখন আমাদের কানে গুলির তাজা আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছিল। ওই হামলা এতটা ভয়াবহ ছিল যা আমাদের জীবনে একটি দাগ কেটে দিয়েছে। এমন এক স্মৃতি যা কখনোই মুছে ফেলা যাবে না। যে স্মৃতিটি জন্ম নিয়েছে কাশ্মীরের সৌন্দর্যের ছায়ায়।

mzamin

চলন্ত কারে ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে টান দিলো ব্যাগ: নারীর আর্তচিৎকারে কাঁপলো সিদ্ধেশ্বরী

শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটা। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকার গ্রিনল্যান্ড টাওয়ারের সামনের সবকিছু তখনো ঠিকঠাক ছিল। মানুষের চলাফেরা, যানবাহন চলাচল সবকিছু স্বাভাবিক। রাস্তার পাশে শাড়ি পরা একজন নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, পাশে একটি ট্রলি ব্যাগ। গাজীপুরে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। হঠাৎ সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার এসে থামে তার সামনে। মুহূর্তেই ঘটে যায় ভয়ঙ্কর এক দৃশ্য।  যা ধরা পড়ে পাশের এক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে।

সাদা প্রাইভেট কারের জানালা খুলে এক ব্যক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু ব্যাগ না ছাড়ায় মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। ব্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও টেনে নিয়ে যেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের গাড়ি চলে যায়। রাস্তায় পড়ে আর্তচিৎকার করছিলেন ওই নারী। তার চিৎকারে আশপাশে থাকা লোকজন ওই নারীকে উদ্ধারে ছুটে আসেন। ব্যস্ত সড়কে এই ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ছিনতাইয়ের মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে চলে ছিনতাইকারীদের প্রাইভেটকারটি। পাশে থাকা ট্রলি ব্যাগটি যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে থাকে। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দৌড়ে ছুটে আসেন। একজন ট্রলি ব্যাগের সামনে দাঁড়িয়ে যান, আর বাকি দু’জন এগিয়ে যান আহত নারীর দিকে। ৫০ সেকেন্ডের মাথায় আবারো ক্যামেরায় দেখা যায়, ওই নারী ফিরে এসে দাঁড়িয়ে আছেন, ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখে সহায়তার আশায় কথা বলছেন উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে। নিজের কনুইয়ের আঘাতের চিহ্ন দেখাচ্ছেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই নারী গুরুতর শারীরিক আঘাত পেয়েছেন। তবে, প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তার অবস্থা সংকটমুক্ত হলেও মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছেন। এরই মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার তথ্য জানার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার শিকার নারী গাজীপুরের একটি কলেজের শিক্ষক। তিনি সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসায় থাকেন। গাজীপুরের উদ্দেশ্যে তিনি বের হয়েছিলেন একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে। ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা  নেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে এবং তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছেন। ইতিমধ্যে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মামলা হয়নি, কারণ ভুক্তভোগী নারী এখনো পুলিশ স্টেশনে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করেননি। তবে প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি জানান, ঘটনার শিকার নারী আহত হওয়ার পর চিকিৎসা নিয়ে পরে প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

এদিকে, এই ঘটনার পর থেকে রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিকরা। বিশেষত, নারীদের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি শুধু ঘটনার তীব্রতা বাড়ায়নি, বরং সাধারণ মানুষের মনে ভয়ও সৃষ্টি করেছে। অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা পথে চলাচলকারী নারীরা।

ডিএমপি রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম বলেন, ঘটনাটি শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটায় ঘটে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসার আগে আমরা বিষয়টি জানতে পারিনি। ভুক্তভোগী ওই নারী একজন শিক্ষিকা। হয়তো গাজীপুরের একটি ট্রেনিং সেন্টারে চার-পাঁচ মাস মেয়াদি একটি কোর্সে প্রশিক্ষণ করছেন। তিনি ঘটনাটি এখনো পর্যন্ত আমাদের জানাননি। আমরা ভুক্তভোগী ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমাদের কাজ করতে আরও সুবিধা হবে, তার ব্যাগে থাকা মোবাইল ও ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

mzamin

৫ দিন ধরে নিখোঁজ দেড় বছরের শিশু তানিশা by ফাহিমা আক্তার সুমি

দেড় বছরের শিশু তানিশা আক্তার। নিখোঁজের ৫ দিনেও সন্ধান মিলছে না তার। সৌদি প্রবাসী তাইজুল ইসলাম ও কোহিনূর দম্পতির সন্তান সে। তিন ছেলে সন্তানের পরে  তাদের কোল জুড়ে এসেছিল মেয়ে তানিশা। তার বাবাকে এখনো দেখেনি তানিশা। তার বাবাও ছুঁয়ে দেখতে পারেনি ফুটফুটে মেয়েটিকে। চার সন্তানকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরে মধ্য পাইকপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন কোহিনূর। মঙ্গলবার রাতে বাসা থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সন্তানকে খুঁজে পেতে আকুতি জানিয়েছেন তার মা। পুলিশ বলছে, নিখোঁজ শিশু তানিশাকে খুঁজে বের করতে তারা কাজ করছেন।

তানিশার মা কোহিনূর মানবজমিনকে বলেন, সন্তানহারা বাবা-মা শুধু বোঝে এই কষ্ট। অলি-গলিতে রাত-দিন খুঁজছি কোথাও তার খোঁজ পাচ্ছি না। আমার নিষ্পাপ শিশুটিকে খুঁজে দেন। তিন ছেলে সন্তানের পরে মেয়েটি আমার কোল জুড়ে এসেছিল। কে বা কারা আমার সন্তানটিকে নিয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না। সে কোথায়? তার কোনো সন্ধান নেই। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে আমি মেয়েটিকে ঘরে কোল থেকে নামিয়ে রান্না ঘরে ভাত দেখতে যাই। কিছুক্ষণ পরে আমার কাছে আসলে আবার ঘরে পাঠিয়ে দেই। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার বাচ্চাটা দেখি কোথাও নেই। কোথায় গেল? কি হলো, কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার সামনে রাস্তা থেকে লোকজন যাতায়াত করে কিন্তু ঘরের দিকে কোনো লোকজন তেমন দেখতে পাইনি সেদিন। কে বা কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে কিছুই জানি না। আমি কখনো বুঝতে পারিনি আমার কোলের সন্তান এভাবে হারিয়ে যাবে। আমার অনেক সাধনার মেয়ে। আমি তো মা এই কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারছি না, আমার কোল থেকে কি হারিয়েছে।

সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে বাসার সামনে রাস্তায় তানিশা তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলছিল। ৯-১০ মিনিট পরে সেখান থেকে ভাইয়ের সঙ্গে বাসায় চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘটে এই ঘটনা।

তানিশার ফুপাতো ভাই মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমরা শুরু থেকে খুঁজছি। র‌্যাব-পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করছেন। তবে ঘটনাটির এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু খুঁজে পাচ্ছি না। আশেপাশে থাকা অনেকগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করা হয়েছে কিন্তু কোথাও কোনো প্রকার কিছু দেখা যাচ্ছে না। এই পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো প্রকারের ঝগড়া, দ্বন্দ্ব্ব কিছুই নেই। তানিশার বাবা-মা বিগত ১৪-১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তানিশা তাদের একমাত্র মেয়ে। আমার মামার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। তিনি বলেন, ঘটনাটি ২২শে এপ্রিল রাত ৮টা ৪০-৫৫ মিনিটের মধ্যে ঘটে। তানিশাকে ঘরে রেখে ওর মা রান্নাঘরে ভাত দেখতে এসেছিল। তখন তানিশার সঙ্গে ওর ছোট ভাই ছিল সে মোবাইল দেখছিল। সেখান থেকে আমার বোন তার মায়ের কাছে আসে। কিছুক্ষণ পর তার মা তাকে ঘরে ভাইয়ের কাছে যেতে বলে। কিছুক্ষণ পরেই তানিশাকে কোলে নেয়ার জন্য তার মা ঘরে গিয়ে দেখে তানিশা নেই। এরপর তার ছেলেকে রাস্তায় পাঠায় দেখার জন্য। সেখানে গিয়ে না পেয়ে তানিশার মা পুরো এলাকায় খুঁজতে থাকে। বাসাটির সামনে এবং পেছনে সিসি ক্যামেরা আছে কিন্তু বাসার সামনের বরাবর কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে ফলো করতো।

মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, তানিশা নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকে তাকে খুঁজে পেতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশেপাশে থাকা বেশ কিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্লু পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। 

mzamin

নির্বাসিত দাউদ হায়দার না আমরা? by আরিফ হায়দার

আমাদের পারিবারিক মিলনমেলা আর হবে না। অগ্রজ দাউদ হায়দার, আমাদের  খোকন ভাই চলে গেলেন  না ফেরার দেশে। ১৯৭৪ সালে একটি কবিতা লেখার জন্য বাংলাদেশ থেকে  নির্বাসিত  করা হয় তাকে। প্রথমে নির্বাসিত জীবন কাটান ভারতে, পরবর্তীতে জার্মানিতে।

কবি দাউদ হায়দার দুইবার নির্বাসিত হন। প্রথমবার  বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয়বার ভারত থেকে। শেষ ডেরা বাঁধেন জার্মানিতে। সে অনেক কথা। তবু ভারত সরকার মাঝেমধ্যে ভারতে আসবার অনুমতি (ভিসা) দিতেন আর সেই সুবাদে খোকন ভাই আমাদের দেখার জন্য কলকাতায় ছুটে আসতেন। আর আসার সময় সূচি পেলেই আমাদের পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে আনন্দের ঝড় বয়ে যেত। এ যেন একটা উৎসব। আমরা সবাই মিলে মিটিং করতাম কে কবে কলকাতায় যাচ্ছি। সিদ্ধান্ত হতো সবাই যেন একসঙ্গে যেতে পারি, তাতে মিলনমেলাটা ভালো হবে, আর খোকন ভাইয়ের  সময়টাও অনেকটা বাঁচবে। সময় বাঁচার কথাটা বলার কারণ তার অনেক সেমিনার থাকতো, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করা। মাত্র এক মাসের জন্য ভারতে থাকার অনুমতি এর মধ্যে সবকিছু ঠিক ঠাক করতে হবে। ২০২৪-এর জানুয়ারিতে শেষ দেখা হলো। শরীরটা বেশ একটা ভালো ছিল না, তবু মনের শক্তিতে যেন চলাফেরা। এর আগে কখনো বলতে শুনিনি “এবার আসলাম, আগামীতে আসতে পারবো কিনা জানি না...। “তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে হাঁটতে শুরু করলেন।

২০২৪-এ অনেকটা সময় ছিলাম। আমরা চার ভাই, এক বোন। আমি  নোয়া ভাই (মাকিদ হায়দার), স্বপন ভাই (জাহিদ হায়দার),  হেনা আপা (ফরিদা হায়দার) তখন থেকেই নোয়া  ভাইয়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। কলকাতা থেকে ফিরে এসে না ফেরার দেশে চলে গেলেন নোয়া ভাই। আর আজ (গতকাল) ২৭শে এপ্রিল ২০২৫ চলে গেলেন খোকন ভাই (দাউদ হায়দার)।  এখন বুঝতে পারছি নিজের মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার সময় কাছে থাকতে না পারাটা কতো কষ্টের। ঠিক এই রকম ভাবে মা, সোনা ভাই (জিয়া হায়দার),  দাদু ভাই (রশীদ হায়দার),  নোয়া ভাই (মাকিদ হায়দার)  এরকম পরিবারের অনেক আত্মীয়স্বজন যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তখন দূর থেকে ফোনে খোকন ভাই শুধু বলতো “সবাই আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে...)’’। তার এই কথার মধ্যে যে কি যন্ত্রণা ছিল তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝতে পারছি- না দেখার যন্ত্রণাটা কি! আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আর কখনো খোকন ভাইকে   ঘিরে মিলনমেলা হবে না।

চার ভাই পৃথিবী ছেড়ে একে একে চলে গেলেন। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না- দাউদ হায়দার ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবরটা কতোটুকু সত্য।  কথাটা বলার কারণ, আমাকে যারা ফোনকল করছেন প্রত্যেকের একটাই কথা “সংবাদটা কি সত্য!’’ আমার বাংলাদেশ এখন সত্য-মিথ্যার উপর ভাসমান। অনুজ হিসেবে অনেক কথা বলার আছে, তা হয়তো এ সময়ে বলা যাবে না। আমাদের ভাগ্য এতটাই খারাপ খোকন ভাইয়ের শেষ সময় কাছে থাকতে পারলাম না। আজ যারা তার কাছে আছেন তারাই বড্ড আপন  মানুষ।  বার্লিনে থাকা তার বাঙালি বন্ধুরা শেষ কাজটি  করছেন, এই দূরে থেকে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা  ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। এখন আপনারাই খোকন ভাই (দাউদ হায়দার)-এর কাছে একখণ্ড বাংলাদেশ। দাউদ ভাইয়ের ঘরে একটা কাঁচের বোতলে বাংলাদেশের মাটি ছিল, সেই মাটিগুলো তার সমাধির উপর দিয়ে দিলে হয়তো বাংলাদেশের মাটি বুকে করে ঘুমিয়ে থাকবে।

mzamin

কেন টার্গেটে শিমলা চুক্তি, কার লাভ কার ক্ষতি? -দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণ

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে হামলার পর থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভিন্নমাত্রা তৈরি হয়েছে। দুই দেশই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এর কারণ উভয়ের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ। ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই হামলার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করেছে ভারত। জানিয়েছে কঠোর প্রতিক্রিয়া। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে করা সিন্ধু পানি চুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে ভারত। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে, যদি সিন্ধু নদীর পানি বন্ধ হয় তাহলে প্রয়োজনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতেও পিছপা হবে না তারা। বিশ্লেষকরা একে যুদ্ধের ইঙ্গিত বলেই বর্ণনা করছেন।

এছাড়া আরেকটি বিষয় জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে, সেটি হলো- ভারত তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করলে ১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত শিমলা চুক্তি স্থগিত করতে পারে ইসলামাবাদ। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান যদি শিমলা চুক্তিকে টার্গেট করে তাহলে এর প্রভাব কেমন হবে- সে প্রশ্ন উঠছে এখন।

ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, শিমলা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ২ জুলাই। এতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো। যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয়ের মুখোমুখি হন এবং পাকিস্তানের বিভাজনের স্বাক্ষী হন। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় শিমলা চুক্তির বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন তারা। যেটি মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই চুক্তিতে মূলত দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রথমত যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, যার মধ্যে ছিল ৯৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির প্রত্যাবর্তন। দ্বিতীয়ত, জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে বিরোধের সমাধান। এতে উভয়পক্ষই একমত হয় যে, কাশ্মীর নিয়ে মতবিরোধ সমাধানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিংবা পরস্পরের সম্মতিতে যেকোনো শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির আশ্রয় নেবে তারা। এছাড়া এই শিমলা চুক্তির মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়।

শিমলা চুক্তির জেরে ভারতে তীব্র সমালোচনা মুখোমুুখি হয়েছিলেন মিসেস গান্ধী। তখন কারণ হিসেবে বলা হয়, তিনি যুদ্ধবিরতির সীমারেখাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে পাকিস্তানের স্বীকৃতি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। উভয় দেশ তখন ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) নামকরণে সম্মত হয়।

অন্যদিকে পাকিস্তানে ভুট্টোর তীব্র সমালোচনা হয়। বলা হয়, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সম্মত হয়েছিলেন তিনি। শ্রীনগরে শেখ আবদুল্লাহর সমালোচনার মূল কারণ ছিল, এই আলোচনায় কোনো পক্ষই কাশ্মীরি জনগণের মতামত নেননি।

পরবর্তী বছরগুলোতে পাকিস্তান এই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছে ভারত। দিল্লির অভিযোগ- কাশ্মীরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাতের সময় নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে সেনা পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ। এছাড়াও, পাকিস্তান জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশের কাছে কাশ্মীর ইস্যুতে অভিযোগ জানিয়েছে, যা চুক্তিতে উভয় পক্ষের সম্মত শর্তাবলীর পরিপন্থী।  

অন্যদিকে ১৯৯৪ সালে ভারতের সংসদ ঘোষণা দেয় যে, পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরসহ পুরো কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করায়, শিমলা চুক্তিটি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। ভারতের সাবেক কূটনীতিক অবতার সিং ভাসিন তার ‘নেগোশিয়েটিং ইন্ডিয়া’স ল্যান্ডমার্ক এগ্রিমেন্টস’ বইতে চুক্তিটির একটি বিশ্লেষণ করেছেন। তার দাবি শিমলা চুক্তি থেকে সরে যাওয়া কোনো দেশের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেছেন, শিমলা চুক্তি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হিসেবে প্রণয়ন করা হয়নি। মূলত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে নেয়া, বাণিজ্য, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ সংযোগ পুনরুদ্ধার করাই ছিল চুক্তিটির তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে কাশ্মীর সম্পর্কিত অনুচ্ছেদগুলো প্রতীকী ছিল বলে মনে করেন সাবেক ওই কূটনীতিক।

এটি লক্ষ্য করা উচিত যে, ২৪ এপ্রিল পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (পিএমও) থেকে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে সব দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধিকার ব্যবহার করবে পাকিস্তান। যার মধ্যে শিমলা চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। যদিও এখনও স্পষ্ট নয় যে, ইসলামাবদ এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো বার্তা দিয়েছে কিনা। কেননা এ বিষয়ে ভারতকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া হয়নি। তবে অনেকেই মনে করেন যে, শিমলা চুক্তির বিষয়টি জম্মু ও কাশ্মীর বিরোধের ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। অবশ্য এ বিষয়টি নির্ভর করবে শিমলা চুক্তিতে উল্লেখিত কাশ্মীর নিয়ন্ত্রর রেখা এলওসি অতিক্রম করা থেকে পাকিস্তান নিজেদের বিরত রাখবে কিনা। বিশ্লেষকরা মনে করেন যদি পাকিস্তান এটি অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তাহলে ভারতও হয়তো চুক্তি উপেক্ষা করবে এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে অপারেশন চালাবে। যাতে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পাকিস্তান অন্য কোনো চুক্তির নাম উল্লেখ না করলেও, শেহবাজ শরীফ সরকারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উল্লেখটি বিভিন্ন চুক্তির প্রতি ইঙ্গিত করতে পারে। যেগুলো দুই দেশ বছরের পর বছর ধরে মেনে চলছে। ১৯৪৮ সালের প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধ থেকে ১৯৯৯ সালের কারগিল পর্যন্ত একাধিক সশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ।  যার মধ্যে একটি হচ্ছে ১৯৫০ সালে স্বাক্ষরিত নেহরু-লিয়াকত চুক্তি। উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের বিষয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন তারা। এছাড়া ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল রিলিজিয়াস পিলগ্রিমেজ সংক্রান্ত চুক্তি পাকিস্তানের ১৫টি মন্দির এবং গুরুদ্বারে হিন্দু ও শিখ তীর্থযাত্রীদের যাত্রা সহজতর করার পাশাপাশি ভারতেও মুসলিমদের পাঁচটি মসজিদ ও মাজারে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে, উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইমরান খান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত কার্তাপুর করিডর চুক্তিও প্রভাবিত হতে পারে।

দুই দেশের মধ্যে আরও যেসকল চুক্তি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোও প্রভাবিত হতে পারে। ১৯৮৮ সালে পারমাণবিক বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত ও পাকিস্তান। এর মাধ্যমে প্রতিবছরের ১লা জানুয়ারি উভয় দেশই নিজ নিজ পারমাণবিক স্থাপনা সম্পর্কে অন্য পক্ষকে অবহিত করে।

১৯৯১ সালে দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়, তাতে সব ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার বিষয়ে আগাম সচেতনতা দিতে বাধ্য করে। এছাড়া ওই চুক্তির মাধ্যমে আকাশসীমা লঙ্ঘন না করতেও উভয় দেশ সম্মত হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও পাকিস্তান একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে, যা ২০০৩ সালে প্রথম স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের যেসব স্থানকে টার্গেট করে ভারত সামরিক অভিযান পরিচালনার হুমকি দিয়েছে তা যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে এই যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি ভেঙে যেতে পারে। এছাড়া, ভারত যদি সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে তাহলে এর পরবর্তী প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। কারণ পাকিস্তান হুমকি দিয়েছে, তারা ভারতকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাবে এবং পানি বন্ধের সিদ্ধান্ত ‘যুদ্ধের উস্কানি’ বলে বিবেচিত হবে। মোটাদাগে সিন্ধু পানি চুক্তি ভারত ও পাকিস্তান ইস্যু হলেও এর প্রভাব বাংলাদেশ ও চীনেও পড়বে। তাই এই দেশগুলোও এ বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। 

mzamin

পাকিস্তান-আফগান সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা, নিহত ৫৪

পাক-আফগান সীমান্তে অনুপ্রবেশের সময় পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত কমপক্ষে ৫৪ সন্ত্রাসী। রোববার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং আইএসপিআরের তরফ থেকে জানানো হয়, উত্তর ওয়াজিরিস্তান জেলার হাসানখেল এলাকায় ওই সন্ত্রাসীদের হত্যা করা হয়। আরও বলা হয়, তারা ২৫-২৭ এপ্রিল সময়ের মধ্যবর্তী রাতে হাসানখেল এলাকার কাছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। মিডিয়া উইং জানায়, আমাদের সৈন্যরা তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। সৈন্যদের দক্ষতায় ৫৪ সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। উল্লেখ্য, পাকিস্তান নিষিদ্ধ তেহরিকে তালেবানকে বুঝাতে ফিতনা আল খাওয়ারজি নাম ব্যবহার করে। নিরাপত্তা বাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়, ওই সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। আইএসপিআর-এর তরফ থেকে বলা হয়, গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে খাওয়ারজি দলটি তাদের বিদেশী মদতদাতাদের সাহয্যে পাকিস্তানে হাই-প্রোফাইল সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টায় ছিলো। আরও বলা হয়, বর্তমানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে ভারত। এমন সময় এ ধরণের কার্যকলাপ প্রমাণ দেয়, তারা কার ইশারায় এমন কাজ করেছে। আইএসপিআর আরও জানায়, এ ধরণের কর্মকাণ্ড দেশ ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকের কথা উল্লেখ করে আইএসপিআর জানায়, সন্ত্রাসবাদ দমন থেকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ অন্যদিকে নিয়ে যাওয়াই যে ভারতের উদ্দেশ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ২৫০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। এতে বেশ কয়েকটি ক্রসিং পয়েন্ট আছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে সীমান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সন্ত্রাসবাদের ইস্যুটি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে। আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে যেন টিটিপি’র মতো সন্ত্রাসী গ্রুপ পাকিস্তানে হামলা চালাতে না পারে এ জন্য দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। এ মাসের শুরুতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করায় কমপক্ষে ৮ সন্ত্রাসী হত্যা করে পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনী।
mzamin

ইরানের বন্দর আব্বাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ২৫, আহত ৭৫০

ইরানের বন্দর আব্বাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার বন্দরটির বিস্তীর্ণ শহীদ রাজাই অংশে বিশাল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে আহতের সংখ্যাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। আহতের সংখ্যা ৭০০ ছড়িয়ে গেছে। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা ও তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

এতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইসকান্দর মোমেনি জানিয়েছেন, বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৫ জন থেকে বেড়ে ২৫ জন হয়েছে। এছাড়া আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ জনে। যাদের মধ্যে ২১২ জনকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। বাকিদের হরমুজগান এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসকান্দর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ফায়ারসার্ভিসের কর্মীরা। উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে তৎপরতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ইসকান্দর মোমেনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য শহর থেকে সকল সরঞ্জাম বন্দর আব্বাসে পাঠানো হয়েছে।  আশা করা হচ্ছে যে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসবে। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে যারা হতাহত হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এক্সে পোস্ট করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাশাপাশি এই ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতেও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এ বিষয়গুলো তদারকি করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিশেষ দায়িত্বপালন করার কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বিস্ফোরণের কারণ খুঁজে বের করতে বিশেষ দল গঠনে ইসকান্দর মোমিনেকে বিশেষ তাগাদা দিয়েছেন তিনি। এর আগে এক নির্দেশনায় ইরানের কাস্টমস প্রশাসন সকল কাস্টমস অফিসকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্দর আব্বাসের শহীদ রাজাই কাস্টমসের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

mzamin

ফের কাশ্মীর সীমান্তে গোলাগুলি: লন্ডনে পাকিস্তান হাই কমিশনে হামলা

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। উভয় দেশই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে কাশ্মীর সীমান্তে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, এনিয়ে টানা তিনরাত ধরে কাশ্মীর সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটল। এ বিষয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে একতরফা দোষ দিলেও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ইসলামাবদ। এনডিটিভি বলছে, পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ হামলার পর ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বরাবর পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে রয়েছে। পাকিস্তানি সেনা ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে নিয়মিত গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, পাকিস্তানি সেনারা নিয়মিতভাবেই নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। গতকাল রাতেও পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে ছোট অস্ত্রের উস্কানিমূলক গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ২৬ ও ২৭ এপ্রিল রাতের মধ্যে পাকিস্তানের সেনা পোস্টগুলো তুতমারিগালি এবং রামপুর সেক্টরের বিপরীতে কোনো উস্কানি ছাড়াই ছোট অস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়েছে। আমাদের সেনারা যথাযথভাবে এর জবাব দিয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
লন্ডনে পাকিস্তান হাই কমিশনে হামলা
ভারতীয়দের প্রতিবাদ বিক্ষোভের একদিন পরেই লন্ডনে পাকিস্তান হাই কমিশনে হামলা হয়েছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন জিও নিউজ বলছে,  একদিন আগে হাই কমিশন ভবনের বাইরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন কয়েক শত ভারতীয়। সেখান থেকে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরের দিনই হাই কমিশনে হামলা চালানো হয়েছে। এতে হাইকমিশনের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে দেয়া হয়েছে জানালার কাচ। ভবনটির সাদা দেয়ালে এবং ফলকে ছুড়ে মারা হয়েছে গেরুয়া রঙ। তবে কারা হামলা চালিয়েছে তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। 
mzamin

বাবা জুলাই আন্দোলনে শহীদ: ধর্ষণের শিকার মেয়ের আত্মহত্যা

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ হন বাবা। বাবা হারানোর একরাশ কষ্ট বুকে নিয়ে জীবন চলছিল কলেজ পড়ুয়া মেয়ের। কিন্তু এরই মাঝে তার জীবনেও ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন তিনি। এরপর আসামি গ্রেপ্তার হলেও ক’দিন বাদেই বেরিয়ে আসেন। এই ক্ষোভে, আতঙ্কে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে গলায় ফাঁস দিয়ে ‘আত্মহত্যা’র চেষ্টা করেন তিনি। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

গত ১৮ই মার্চ পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার পাঙ্গাসিয়া ইউনিয়নে এই কিশোরীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তার পরেরদিনই সাকিব মুন্সী নামে অভিযুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, ঘটনার দিন মেয়েটি তার বাবার কবর জিয়ারত শেষে নানাবাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়। পথে নলদোয়ানী এলাকা থেকে সাকিব ও সিফাত তাকে অনুসরণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা মুখ চেপে ধরে পাশের জলিল মুন্সির ভিটা বাগানে নিয়ে যান। সেখানে তারা ধর্ষণ করেন এবং ঘটনার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন। এ ঘটনায় দু’জনের নাম উল্লেখ করে দুমকি থানায় মামলা করেছিলেন ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী।

রাজধানীর আদাবর শেখেরটেক এলাকার একটি বাসায় জুলাই আন্দোলনের শহীদ জসীমউদ্দীনের মেয়ে লামিয়া ‘আত্মহত্যা’ করেন। এর আগে লামিয়াকে অচেতন অবস্থায় তার পরিবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে শারীরিক পরীক্ষার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম জাকারিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, লামিয়া গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। রাজধানীর শেখেরটেক এলাকায় মায়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পটুয়াখালীতে সেই কলেজছাত্রীর বাড়ি
"আমার নাতনিটা আজ বাড়ি আসবে বলছিলো। কিন্তু সে যে লাশ হয়ে আসবো তা তো বুঝি নাই। আমি এখন তার জন্য কবর খুঁড়ি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নিজ এলাকায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ঢাকায় এসে আত্মহননের পথ বেছে নেয়া পটুয়াখালীর কলেজছাত্রীর দাদা আব্দুস সোবহান। (ছবির ক্যাপশান, পটুয়াখালীতে সেই কলেজছাত্রীর বাড়ি) বিবিসি বাংলা



মডেল তনয়ার হানিট্র্যাপ

সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সংস্কৃতি অঙ্গনেও আছে বিচরণ। থাকেন চট্টগ্রামে। একটি মিউজিক ভিডিও’র সূত্র ধরে পরিচয় হয় ঢাকার ২৮ বছর বয়সী মডেল তনয়া হোসেন ওরফে নাজমুন নাহার সুখী ও তার বোন ৩২ বছর বয়সী তানিশা রহমান ওরফে কামরুন নাহার আঁখির সঙ্গে। পরিচয়ের পর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেন দুই বোন। প্রায়ই তাদের মধ্যে কথাবার্তা হতো। সরকারি কর্মকর্তাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান তনয়া ও তানিশা। ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের জানাশোনা হলেও তানিশা তার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন তাই চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার চান। শর্ত ছিল কিছুদিনের ভেতরে ফেরত দিবেন। পরে তিনি তানিশাকে ৫ লাখ টাকা ধার দেন। অল্প সময়ের ভেতরে টাকা ফেরতের কথা থাকলেও কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। তানিশা টাকা ফেরত দেননি। কিন্তু ওই কর্মকর্তা একাধিকবার তানিশার কাছে টাকা ফেরত চান। একপর্যায়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি তানিশা টাকা নেয়ার জন্য ওই কর্মকর্তাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না টাকা ফেরত নিতে আসলে তার জীবনে কতোটুকু ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। চলতি মাসে টাকা নিতে ঢাকা আসেন তিনি। তাকে নেয়া হয় একটি বাসায়। সেখানে যাওয়ার পর শুরু হয় কর্মকর্তার ওপর অমানবিক নির্যাতন। দুই বোন ও তাদের হানিট্রাপের সহযোগীরা মারধর, নির্যাতন করে আহত করেন। ধারণ করা হয় নগ্ন ভিডিও। সেই ভিডিও’র হুমকি দিয়ে হানিট্র্যাপ চক্রটি ৬০ লাখ টাকা আদায় করে। নগ্ন ভিডিও ধারণ করার পর ওই কর্মকর্তাকে ছেড়ে দেয় চক্রটি।

চট্টগ্রাম ফিরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে পরিচিতদের সহযোগিতায় ভাটারা থানায় গিয়ে সব খুলে বলেন। ভাটারা থানা বিষয়টি আমলে নিয়ে অভিযান চালিয়ে তনয়া-তানিশাসহ তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। শুনানিতে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাইবে পুলিশ। শনিবার রাতে ভাটারা এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে আদায়কৃত চাঁদার ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- নাজমুন নাহার সুখী ওরফে তনয়া (২৮),  কামরুন নাহার আঁখি (৩২) ওরফে তানিশা,  রুমানা ইসলাম স্মৃতি (৫০) ও মো. সাফাত ইসলাম লিংকন (২৫)।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৯শে এপ্রিল ওই কর্মকর্তা ঢাকা এসে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তানিশা তাকে সন্ধ্যায় বসুন্ধরা এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে দাঁড়াতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন তনয়া তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন। পরে তাকে নিয়ে তনয়া এভার কেয়ার হাসপাতালের গেট থেকে ছোলমাইদ উত্তরপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তাররকৃত চারজনসহ আরেকজন অজ্ঞাতনামা ভুক্তভোগীকে বন্দি করে ফেলে। সেখানে সাফাত ইসলাম বালিশ দিয়ে তার মুখ চেপে শ্বাসরোধের চেষ্টা করে এবং অন্যরা তার হাত-পা বেঁধে মারধর করে। ভুক্তভোগীর চিৎকার যাতে বাইরে না যায়  সেজন্য উচ্চ শব্দে টিভিতে গান বাজায় তারা। সেই আওয়াজের মধ্যেই হকিস্টিক হাতে দুই যুবক তাকে পেটাতে থাকে। তাকে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়, মুখে বালিশচাপা দিয়ে দফায় দফায় নির্যাতন চালানো হয়। ওই কর্মকর্তা তখন প্রাণে বাঁচার জন্য নানা আকুতি করেন। তাকে আর কখনো টাকা ফেরত দিতে হবে না বলেও জানান। তার বিনিময়ে যেন তাকে মারধর করা না হয়। কিন্তু তাদের মন গলেনি, বরং অত্যাচারের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। পরে তার কাছে ১ কোটি টাকা চাওয়া হয়। টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু এত টাকা দিতে অপারগতার কথা জানান। তখন আবার মারধর করে কর্মকর্তার বোনের কাছে ফোন দিতে বলে। প্রাণ বাঁচাতে তখন বোনকে তিনি ফোন করে বলেন, আমি বিপদে আছি। আমার এক কোটি টাকা দরকার। পরে আবার বোনকে ফোন দিয়ে বলেন, যা স্বর্ণ আছে বিক্রি করে বা ধার করে হলেও টাকা পাঠাও। পরে তার বোন ও বন্ধু মিলে মোট ৫২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। তনয়ার নাম্বারে ফোন করে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। ওই নাম্বারটি ছিল পুরুষের নামে। টাকা দুই কিস্তিতে ২৬ লাখ করে মোট ৫২ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এরপর এসএ পরিবহনের গুলশান-২ শাখা থেকে ফোন পেয়ে তনয়া ও সঙ্গী সেই টাকা সংগ্রহ করেন। সব মিলিয়ে তারা তার কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা আদায় করে। টাকা পাওয়ার পর তনয়া, তানিশা ও তাদের সহযোগীরা ওই কর্মকর্তার সমস্ত পোশাক খুলে উলঙ্গ অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। তারা তাকে হুমকি দিয়ে বলে, এসব ঘটনা কাউকে বললে বা থানা পুলিশ করলে নগ্ন ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে মানহানি করে ক্যারিয়ার শেষ করে দিবে।  ওই রাত ১১টার দিকে তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে তার মোবাইল ও ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং একটি গেঞ্জি পরিয়ে গাড়ি থেকে বাড্ডার অন্ধকার এলাকায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। প্রথম রিকশাচালক ভয় পেয়ে চলে গেলেও, দ্বিতীয় একজন তাকে উদ্ধার করে হোটেলে পৌঁছে দেন। পরদিন তিনি চট্টগ্রামে ফিরে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর চট্টগ্রামেরই একজন সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক নেতার সহায়তায় ২৪শে এপ্রিল ঢাকার ভাটারা থানায় গিয়ে সব খুলে বলেন। এ ঘটনায় ২৬শে এপ্রিল ভাটারা থানায় মামলা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তনয়া মডেল হিসেবে বিভিন্ন মিউজিক ভিডিও ও ইউটিউবভিত্তিক নাটকে কাজ করেন। আর তানিশারও একই জগতে বিচরণ আছে। তার স্বামী দুবাইয়ে থাকেন এবং তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও তিনি প্রচার করেন। থাকেন অভিজাত বসুন্ধরা এলাকার আই ব্লকে। তাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদরের বড়ালিয়ায়। তারা মূলত একটি হানিট্র্যাপ চক্রের সদস্য। তাদের নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তিদের টার্গেট করে তারা হানিট্র্যাপে ফেলে টাকা আদায় করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রুবেল মিয়া মানবজমিনকে বলেন, মিউজিক ভিডিও’র সূত্র ধরে ওই কর্মকর্তার তাদের সঙ্গে পরিচয় হলেও এক সময় পারিবারিকভাবে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। তনয়ার পাশাপাশি তানিশার সঙ্গে সখ্যতা ছিল। একপর্যায়ে একটি সমস্যার কথা বলে তানিশা ৫ লাখ টাকা ধার নেয়। টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলে একটি বাসায় নিয়ে তারা দুই বোন ও আরও তিনজনসহ শারীরিক মানসিকভাবে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে। তারা তার নগ্ন ভিডিও ধারণ করে। মূলত এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা মামলা নিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করি। ঘটনার সত্যতাও পাই। তিনি বলেন, এই মডেলরা হানিট্র্যাপের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। আমরা ওই কর্মকর্তার কিছু টাকা উদ্ধার করেছি। এখন রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবো।

mzamin

আরব নেতাদের চাপেই কি উত্তরসূরি বেছে নিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের বয়স হয়েছে। তাঁর একজন উত্তরসূরি বেছে নিতে তাই চাপ বাড়ছিল প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) ওপর। এ অবস্থায় গত ২৪ এপ্রিল জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক শেষে পিএলও ভাইস প্রেসিডেন্ট নামে নতুন এক পদ সৃষ্টি করে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গত মার্চে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্বাচনের অংশ হিসেবে একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মার্চের শুরুতে এক জরুরি আরব সম্মেলনে তিনি ওই প্রতিশ্রুতি দেন।

অবশেষে গতকাল শনিবার আব্বাস প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হুসেন আল-শেখের নাম ঘোষণা করেছেন। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংশয় দূর করতে এ পদক্ষেপ জরুরি ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

কারণ, আব্বাসের পর পিএ প্রেসিডেন্ট কে হবেন, তা নিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। যদি ভবিষ্যতে তেমন কিছু হয় তবে ইসরায়েল এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পিএকে শেষ করে দিতে পারে বলেও উদ্বেগ ছিল। এমনকি ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে ও গাজায় জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

যদিও কানাডীয় আইনজীবী ডায়ানা বুট্টু বলেছেন, আব্বাস চলে যাওয়ার পর পিএতে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তৈরি করলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এড়ানো যাবে না; বরং এটি সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। আইনজীবী ডায়ানা পিএলওর আইনবিষয়ক পরামর্শক ছিলেন।

ডায়ানা সতর্ক করে আরও বলেছেন, ‘পিএ যত বেশি খণ্ডিত হবে, তত বেশি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে...এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বাইরের শক্তি দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ হতে পারে।’

বৈধতার সংকট

মাহমুদ আব্বাসের বয়স এখন ৮৯ বছর। ২০০৪ সালের নভেম্বরে ফিলিস্তিনের অবিসংবাদী নেতা ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর আব্বাস পিএলও এবং পিএর নিয়ন্ত্রণ নেন। ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনি পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করার পর জনমত যাচাই ছাড়াই আব্বাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পিএ এবং পিএলও জোটে তাঁর ফাতাহ পার্টি সবচেয়ে প্রভাবশালী।

দীর্ঘদিন ধরে বিলুপ্ত থাকায় পিএ পার্লামেন্ট এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। সমালোচকেরা এমন পরিস্থিতির জন্য আব্বাসকে দায়ী করেন। তাঁরা মনে করেন, পার্লামেন্টকে পুনরুজ্জীবিত করতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, আব্বাস তা দুর্বল করে দিয়েছেন। পার্লামেন্ট না থাকায় পিএলওর প্রেসিডেন্টের উত্তরসূরি নির্বাচন করার কথা। কিন্তু আব্বাস এ কাজটি স্থগিত রেখেছেন। এমনকি তিনি গত বছর একটি ডিক্রি জারি করে বলেছেন, কোনো কারণে যদি হঠাৎ প্রেসিডেন্টের পদ খালি হয়, তবে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত যেন একজন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রধান রাওহি ফাত্তৌহ।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি আরব স্টাডিজের শিক্ষক খালেদ এজিন্দি বলেন, ‘যদি কাউকে সামনে নিয়ে আসেন, তবে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন—এই আশঙ্কা থেকে আব্বাস এ (উত্তরসূরি নির্বাচন) উদ্যোগ স্থগিত রেখেছেন।’

অসলো শান্তি চুক্তি দিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠিত হয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে ওই চুক্তিতে সই করেন।

পিএ সরকারের দায়িত্ব ছিল ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পশ্চিম তীর ও গাজা শাসন করবে। কিন্তু পিএ গঠিত হওয়ার পর ইসরায়েলের দখলদারি আরও বেড়ে যায় এবং তারা নিপীড়নও বাড়িয়ে দেয়। অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমি দখলও অব্যাহত রাখে।

অসলো চুক্তির পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ২ লাখ থেকে বেড়ে সাড়ে ৭ লাখে পৌঁছেছে। অথচ আন্তর্জাতিক আইনে ইহুদিদের এই বসতি স্থাপন অবৈধ।

২০০৭ সালে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে একটি সহিংস বিভাজনের ফলে অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিছু অংশে পিএর কর্তৃত্ব সীমিত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও পিএ নিজেদের ফিলিস্তিনের একক প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও আব্বাসের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। কারণ, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নিপীড়ন যখন দিন দিন বাড়ছে, তখন পিএ ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয় অব্যাহত রেখেছে।

ইসরায়েলি সেনা ও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হাত থেকেও পিএ ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে পারছে না। অন্যদিকে বেসামরিক জনগণের বিক্ষোভ ও বিরোধীদের দমনে নিপীড়ন চালাচ্ছে পিএ।

এজিন্দি বলেন, ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে আব্বাস যাঁকেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেন, তিনি খুব সম্ভবত জনগণের মন জয় করতে পারবেন না। আব্বাসের পছন্দের উত্তরসূরি হিসেবে যাঁর নাম প্রায়ই শোনা গেছে, তিনি হলেন পিএলও নির্বাহী কমিটির মহাসচিব হুসেইন আল-শেখ।

আল-শেখ পিএর জেনারেল অথরিটি ফর সিভিল অ্যাফেয়ার্সেরও প্রধান। পিএর এই অধিদপ্তর থেকে ইসরায়েল অনুমোদিত পারমিট দেওয়া হয়। অল্প কয়েকজন ফিলিস্তিনি এ পারমিট পান ও পশ্চিম তীরে বিনা বাধায় ভ্রমণ করতে পারেন। ইসরায়েল অধিকৃত এ অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।

নানা মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপ করা ইসরায়েলের ওই বিধিনিষেধকে বর্ণবাদ বলে সংজ্ঞায়িত করেছে।

বাইরের চাপ

অনেক বছর ধরেই আব্বাসের ওপর উত্তরসূরি নির্বাচনের চাপ তেমন একটা ছিল না। তবে গত কয়েক মাসে আরব দেশগুলো একজন উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য আব্বাসের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে পিএ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আটকাতেই আরব দেশগুলো এ চাপ দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে মিসর আব্বাসের একজন উত্তরসূরি নিশ্চিত করতে উদ্‌গ্রীব।

এ জন্য মার্চে মিসর আরব লিগের একটি জরুরি সম্মেলন ডাকে। মিসরে ওই সম্মেলনে গাজা কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে সেই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় গাজায় পিএর নজরদারিতে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন গঠনের কথা বলা হয়। ওই প্রশাসন কাউকে বাস্তুচ্যুত না করে গাজা পুনর্গঠনের কাজ করবে।

যদিও গাজায় পিএর চলার পথ মোটেও মসৃণ হবে না। হামাস ও ইসরায়েল উভয় পক্ষ থেকেই বাধা আসবে। হামাস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গাজার প্রশাসক। গাজা নিয়ে ইসরায়েলেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

অনেক আরব দেশ হামাসের সঙ্গে ফাতাহর বিরোধ মিটমাটে ব্যর্থতার জন্য আব্বাসকে দায়ী করেন। যে কারণে আরব দেশগুলো পিএর নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তাহানি মুস্তফা।

তাহানি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ফিলিস্তিন আন্তরাজনীতি বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ।

নিজেদের মধ্যে বিরোধ কমিয়ে আনতে ২০০৭ সালের পর হামাস ও ফাতাহ বেশ কয়েকটি চুক্তি সই করেছে।

আল–জাজিরাকে তাহানি মুস্তফা বলেন, ‘আমার ধারণা, আব্বাসকে নিয়ে সেখানে বড় ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি ফ্রন্ট তৈরির প্রচেষ্টায় আব্বাসকে বাধা ও বিনষ্টকারী বলে মনে করা হচ্ছে। গাজায় ইসরায়েল যা করছে, তা তাকে চালিয়ে যেতে একটি অজুহাত এনে দিয়েছে তাঁর এমন ভূমিকা।’

ডায়ানা বুট্টু বিশ্বাস করেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন একটি রাজনৈতিক পদ তৈরি করার পরিবর্তে মাহমুদ আব্বাসের একটি নির্বাচন দেওয়া উচিত। এতে ফাতাহ, পিএলও এবং পিএ সবার জন্য ভালো হবে বলেও মনে করেন এই আইনজীবী।

হামাস ও ফাতাহর মধ্যে লড়াইয়ের আগে ফিলিস্তিনে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৬ সালে। ওই নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জিতেছিল হামাস।

ডায়ানা বুট্টুর আশঙ্কা, আব্বাস সরে গেলে পিএর ভেতর যে বৈধতার সংকট বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তা নতুন একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে আব্বাসের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আছে বলেও মনে করেন তিনি।

তবে ডায়ানা বুট্টু এ–ও স্বীকার করেছেন, গাজায় ইসরায়েল যে ধ্বংসাত্মক অভিযান চালাচ্ছে, গণহত্যা করছে এবং পাশাপাশি পশ্চিম তীরে যে নৃশংসতা চালাচ্ছে ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাতে এ সময়ে একটি নির্বাচন আয়োজন কৌশলগতভাবে অনেক কঠিন। এরপরও ফিলিস্তিনিরা ভোট দেওয়ার একটি উপায় খুঁজে নেবে, মনে করেন তিনি।

ডায়ানা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এমনকি ফাতাহর ভেতরও অনেকে একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তৈরির বিপক্ষে। তাঁরা এর পরিবর্তে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন। আব্বাস এমন একটি ক্ষতের ওপর পট্টি দিয়ে রেখেছেন, যেখানে আসলে অস্ত্রোপচার দরকার।’

ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ফাইল ছবি: রয়টার্স