Sunday, January 27, 2019

শোকে পাথর জলঢাকার মানুষ by দীপক আহমেদ

শোকে পাথর। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। স্তব্ধ। বাকরুদ্ধ সকলেই। যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ ও শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের অর্ধ লাখ মানুষ। কুমিল্লা ট্র্যাজেডির শিকার হতভাগ্য ইটভাটা শ্রমিকদের লাশ গতকাল শনিবার সকালে গ্রামে এসে পৌঁছলে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয় গ্রামগুলোতে। জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের রাজবাড়ি কর্ণময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মৃতদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। এসময় প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা, ১টি করে কম্বল ও শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়।
এদিকে স্বজন হারানো হতদরিদ্র পরিবারগুলোর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় অনেকে।
যে যার মতো করে মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে থেকেই লাশ দাফন ও সৎকারের সব প্রস্তুতি নেয়ায় দুপুর গড়ানোর আগেই ধর্মীয় রীতিতে একে একে নিহত সব শ্রমিকের সৎকার সম্পন্ন করেন গ্রামবাসী। ওদিকে নিজপাড়া গ্রামের নিহত রঞ্জিত চন্দ্র রায়ের পিতা সুরেশ চন্দ্র বাকরুদ্ধ । শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন মানুষের দিকে। পরিবারের উপার্জনক্ষম তরতাজা পুত্রকে হারিয়ে পাগলপ্রায় একই গ্রামের মানিক চন্দ্র। ঘাতক কয়লাভর্তি ট্রাক কেড়ে নিয়েছে তার বুকের ধন ২৫ বছর বয়সী তরুণ চন্দ্র রায়কে। একই অবস্থা পাঠানপাড়া গ্রামের দিনমজুর নূর আলমের। ১৮ বছর বয়সী ছেলে মোরসালিনকে হারিয়ে তিনি যেন বোবা হয়ে গেছেন।
কারো সঙ্গেই কোনো কথা বলছেন না। চোখের কোণে ছলছল পানি নিয়ে নিহত মিনাল চন্দ্র রায়ের পিতা দীনেশ চন্দ্র সাংবাদিকদের বলছিলেন ‘বাপো তোমরা মোর ছাওয়াক আনি দেও।’ এরকম আকুতিতে এলাকার পরিবেশ এতটাই ভারি হয়ে ওঠে যে চোখে জল ধরে রাখতে পারেন নি কেউ। এদিকে নিহতদের পরিবারকে সরকারি ভাবে এক লাখ করে টাকা সাহায্য দেয়ার ঘোষণা অপ্রতুল বলে দাবি করেছেন স্থানীয় লোকজন। উল্লেখ্য, ২৫শে জানুয়ারি ভোররাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোলপাশা ইউনিয়নের নারায়ণপুরে কয়লাভর্তি ট্রাক উল্টে ঘুমন্ত অবস্থায় নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ ইউনিয়নের পাঠানপাড়া ও শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের ঘুঘুমারী গ্রামের ১৩ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

কুড়িগ্রামে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন রফিতন বেওয়া

মা-বাবার খোঁজে আসা সুইজারল্যান্ডের নারী রওফির মায়ের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কুড়িগ্রামের রফিতন বেওয়া (৬৫)। ঘটনার অনেক অমিল থাকলেও তার দাবি প্রায় ২৮/৩০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তার নাড়িছেঁড়া ধন শাহেরাই বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের রওফি। তবে রওফির দাবি প্রায় সাড়ে ৩ বছর আগে হারিয়ে যাওয়ার সময় তার নাম ছিল খোদেজা।
সে হারিয়ে যাওয়ার পর চিলমারী ছিন্নমুকুলে (বেসরকারি সাহায্য সংস্থা) তার আশ্রয় মেলে। এখানে চার বছর থাকবার পর ১৯৭৮ সালের দিকে সুইজারল্যান্ডের এক দম্পতি তাকে দত্তক নিয়ে চলে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে বেড়ে ওঠেন রওফি ওরফে খোদেজা। সম্প্রতি নাড়ির টানে জন্মভূমি বাংলাদেশে এসেছিলেন হারিয়ে যাওয়া বাবা-মা বা বংশধরদের খোঁজে। সপ্তাহখানেক বিভিন্ন জায়গায় চষে বেড়িয়ে দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে শূন্যহাতে ফিরে যান সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে পালিত বাবা-মায়ের কাছে। তার ফিরে যাওয়ার তিনদিন পর শুক্রবার সকালে মায়ের দাবিতে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন চত্বরে খুঁজে ফিরছেন সন্তান হারানো মা রফিতন।
রওফি ওরফে খোতেজাকে নিজের সন্তান বলে দাবি করছেন তিনি। এজন্য তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সহায়তা চান সাংবাদিকদের কাছে।
মায়ের দাবিদার রফিতন বেওয়া জানান, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের অর্জুন গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার স্বামীর নাম ছাত্তার আলী। ২২ বছর পূর্বে স্বামী মারা যান। স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন তিনি। তার সংসারে দুটি মেয়ে এবং একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। বড় সন্তান শাহেরা ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় হারিয়ে যায়। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ঘরোত খাবার নাই। চারপাকোত মঙ্গা। খাবার দিবের পাং না। ছওয়াটা মোড় হারি গেইল।’ সেসময় ৭/৮ বছরের বড় মেয়ে খাবারের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে যায়। এরপর অনেক খুঁজেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। সুজারল্যান্ডের অধিবাসী রওফি থেথরাইয়ে আসার সময় তিনি ছোট মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করায় তার সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে ফেসবুকে ঘটনা জানাজানি হলে প্রতিবেশীরা তাকে খবর দেন। শুক্রবার সকালে অনেক আশা নিয়ে ছেলে রফিকুলসহ তিনি কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আসেন। সেখানে তখন সুনসান নীরবতা। বড়বড় তালা ঝুলছে অফিসগুলোতে। চারদিকে ফ্যালফ্যাল চোখে লোকজন খুঁজছিলেন তিনি। কাকে কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। পরে বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে এলে তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘মোর বেটি কই? এক নজর তাক মুই দেখিম। তোমরা একনা ব্যবস্থা করি দেও।’
বর্তমানে থেথরাই বাজারে ঝালবুটের দোকানদার রফিতন বেওয়ার পুত্র রফিকুল জানান, হারিয়ে যাওয়া শাহেরা ছিল সবার বড় বোন। সে কয়েক মাস স্কুলেও পড়েছিল। তার বাবা ছাত্তার আলী ছিলেন ধবধবে ফর্সা লোক। তার মাও ফর্সা। তারা প্রথমে দলদলিয়ার অর্জুন গ্রামে থাকলেও তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে সেই বাড়ি বিলীন হয়ে যায়। এর ছয় বছর পরে (২০১৩ সালে) তারা থেথরাই শেখের খামার গ্রামে ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নেন। এখন মাকে নিয়ে সেখানেই অবস্থান করছেন তারা।
রফিতন বেওয়া ও পুত্র রফিকুলের কথার সঙ্গে সুজারল্যান্ডের অধিবাসী রওফির কথার অনেক অমিল পাওয়া যায়। রওফি শ্যামবর্ণের হলেও রফিতন ও তার স্বামী ছিলেন অনেক ফর্সা। রওফি সাড়ে ৩ বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়ার কথা বললেও রফিতন বেওয়ার মেয়ে শাহেরা হারিয়ে যায় ৭-৮ বছর বয়সে। দু’জনের নামের মধ্যেও রয়েছে গরমিল। এছাড়াও ১৯৭৪ সালে তারা ছিলেন পার্শ্ববর্তী দলদলিয়া ইউনিয়নের অর্জুন গ্রামে। দু’পক্ষের বর্ণনার মধ্যে যথেষ্ট ফারাক থাকলেও এক হারিয়ে যাওয়া কন্যার আকুতি আর মেয়ের জন্য মায়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো এলাকায় এখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
এ ব্যাপারে থেথরাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল জলিল শেখ জানান, আমরা এলাকাবাসী রফিতনের হারিয়ে যাওয়া মেয়ের ঘটনার কথা সবাই জানি। এর আগেও চট্টগ্রামে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের খোঁজে গিয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে সুজারল্যান্ডের অধিবাসী রওফির সঙ্গে রফিতনের মেয়ের অনেক মিল পাওয়া যায়। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজনে উভয়ের ডিএনএ টেস্ট করে দেখা দরকার। তাহলে বিধবা রফিতন মনে একটু শান্তি পাবেন।
রওফি’র বক্তব্য ও ঘটনার আদ্যোপান্ত
কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারীতে হারানো বাবা-মায়ের খোঁজে হন্যে হয়ে পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক সুইজারল্যান্ডবাসী কন্যা। স্বামী ও প্রবাসী বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান করেও কোনো সূত্র না পেয়ে হতাশ পরিবারটি। তারপরও মনের কোণে আশা হয়তো ফিরে পাবেন হারানো বাবা-মাকে। পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের অতীত ইতিহাস।
মেয়েটি জানান, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তিনি। বিদেশ-বিভুঁইয়ে মানুষ হয়েছেন দত্তক সন্তান হিসেবে। কোনো কিছুর ঘাটতি রাখেননি সেই বাবা-মা। তারপরও কোথায় যেন একটু রক্তক্ষরণ! চিনচিনে ব্যথা মনে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল। সংসার-স্বামী-সন্তানকে নিয়ে সুখে থাকলেও একটা বিনা সুতোর টান অনুভব করতেন মনের খাঁচায়। বড় হয়ে যখন জানলেন তার দেশ সুইজারল্যান্ড নয়। জন্ম বাংলাদেশে। তখন থেকেই খচখচ করছিল মনটা। এক সময় স্বামীকে বলেই ফেললেন আরাধ্য কথাটি। স্বামীও রাজি হলেন তার কথায়। তারপর বাংলাদেশে খুঁজতে এলেন হারিয়ে যাওয়া বাবা-মাকে। এই হলো পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের নাগরিক রওফি ওরফে খোদেজার জীবন কাহিনী।
প্রবাসী খোদেজা এখন চষে বেড়াচ্ছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জ। তার সফরসঙ্গী ও অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে সাড়ে ৩ বছর বয়সী খোদেজাকে উলিপুর উপজেলার থেতরাই বাজারে কাঁদতে দেখে পার্শ্ববর্তী চিলমারী উপজেলায় অবস্থিত বেসরকারি শিশু সংগঠন টেরেডেস হোমস-এর একটি নোঙ্গরখানায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ছিল সে। এরপর সুইজারল্যান্ডের রওফি পরিবার তাকে দত্তক নেয়। ছোট্ট বেলার স্মৃতি একটি সাদাকালো ছবি নিয়ে সে নতুন বাবা-মায়ের সাথে পাড়ি দেয় জেনেভা শহরে। সেখানেই সন্তান হিসেবে পরিচতি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করে জেনেভার সাইকেল ডেলা গোলেহে স্কুলের শিক্ষক হিসেবে ২০০১ সাল থেকে কাজ করছেন। মা-বাবা হারানোর সময়ের স্মৃতি হিসেবে তার কোনো কিছু মনে নেই। তবে তিনি জানান এতটুকু মনে রয়েছে আমি তখন অন্য কোনো শহরে চলে এসেছি। এতদিন পরে আমি আমার নিজের জন্মভূমিতে এসেছি শুধুমাত্র আমার প্রকৃত মা-বাবার খোঁজে। কিন্তু আমি তাদের নাম-ঠিকানা কিছু্‌ই জানি না। আছে শুধু আমার নিজের একটি ছোটবেলার সাদাকালো ছবি। শেষ বয়সে এসে যদি আমার মা-বাবা এবং বংশধরদের খুঁজে পাই। জানি না পাবো কিনা। তবে পেলে আমার থেকে বড় খুশি আর কেউ হবে না। খোদেজা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পড়াশোনা শেষ করে সেখানকার এক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার জিইয়াস মরিনোকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ৫ বছরের ইলিয়াস নামের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।
খোদেজার সফর সঙ্গী হিসেবে ইনফ্যান্টস ডু মনডে’র কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর রাকিব আহসান জানান, প্রাথমিকভাবে আমাদের সোর্সদের কাজে লাগিয়ে আমরা খোদেজার মা-বাবা এমনকি তার স্বজনদের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু কেউ কোনো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেনি। তবে কেউ যদি কখনো খোদেজার মা-বাবার পরিচয় দাবি করেন সে বিষয়ে আমরা সঠিক তথ্য-উপাত্তসহ ডিএনএ টেস্ট করিয়ে শতভাগ নিশ্চিত হব। কেননা আমরা চাই না এই সময় এসে খোদেজা কোনো প্রতারণার শিকার হোক।
অপর সফর সঙ্গী জেনেভা বাংলা পাঠশালার পরিচালক ও সুইস বাংলাদেশ কালচারাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক বলেন, খোদেজার সঙ্গে আমার পাঠশালাতেই পরিচয় হয়। সেখানে আলাপচারিতার তার শৈশবের কথা জানালে আমিও তার মা-বাবার খোঁজে এসেছি। কিন্তু বিষয়টি খুবই জটিল। কেননা কোন ডকুমেন্টস আমাদের হাতে নেই। কিন্তু তারপরেও যদি মিরাকল কিছু ঘটে।
স্থানীয় এনজিও কর্মী নুরুল হাবীব পাভেল জানান, সেই সময় কুড়িগ্রামে খুবই দুর্ভিক্ষ ছিল। তখনকার পরিস্থিতি দেখে চিলামারীর নুরন্নবী চৌধুরী, দেলোয়ার মাস্টার, ছমচ হাজীসহ অনেকেই একটি নোঙ্গর খানা খোলেন। পরবর্তীতে টিডিএইচ নোঙ্গরখানাটি নেন। সেখানে ১২শ’ শিশু ছিল নোঙ্গরখানায়। প্রতি ৫০ জন শিশুকে দেখার জন্য একজন করে টিম লিডার ছিল। খোদেজার টিম লিডার আনিছুর ছিলেন। সে খোদেজার ছবি দেখে চিনতে পেরেছে। কিন্তু তার মা-বাবার বিষয়ে কিছুই বলতে পারেনি। তিনি আরো জানান, ১৯৭৮ সালে আমার জানা মতে ৩৬ জন এতিম শিশুকে অনেক বিদেশি দত্তক নিয়েছিল। খোদেজার সঙ্গে তার সমবয়সী পিপিজ এবং কুরানী নামের আরো দুটি শিশু বিদেশে গিয়েছিল। সেই সময় টিডিএইচ-এ যেসব শিশু বড় হয়েছিল তাদের মধ্যে যাদের মাতা-পিতা মারা গেছে তাদেরকে শুধু বিদেশে দত্তক দিয়েছে। আর যাদের পিতা মাতা ছিল তাদের স্বাবলম্বী করে দেয়া হয়। আর খোদেজাকে রাস্তা থেকে নিয়ে আসায় তার পিতা-মাতা সম্পর্কে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারছে না।

যে ভয়ে সৌদি ছেড়েছিলেন বাসমা

চিকিৎসক বাবার চাকরিসূত্রে সৌদি আরবে জন্ম নেন বাসমা খলিফা। এখন বয়স ২৯ বছর। বাবার কারণে শৈশব–কৈশোর বিভিন্ন দেশে কেটেছে সুদানি এই নারীর। তবে জন্মস্থান হওয়ায় সৌদির প্রতি অধিকারবোধ যেন একটু বেশিই ছিল তাঁর। ২৫ বছর পর আবার ফিরে গিয়েছিলেন সৌদি আরবের জীবনযাপন দেখতে। তবে সে অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। কাজ ফেলে ভয়ে তাড়াহুড়ো করে তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল সৌদি আরব। তিনি দেশটির সমালোচনা করেছেন, এমন অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
বাসমা খলিফা বিবিসির জন্য একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করছিলেন। বাসমা বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে যখন সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁকে বলা হলো, নারীদের গাড়ি চালনার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করা অধিকারকর্মীদের নিয়ে তিনি যেন কথা না বলেন। দুশ্চিন্তা ও ভীতি তাঁকে ভর করল। ঘটনাটি এত আকস্মিকভাবে ঘটেছিল যে কিছু চিন্তা করারও সময় পাননি তিনি। চোখে জল নিয়ে ছেড়েছিলেন সৌদি আরব।
সৌদি আরবে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখে পড়া বাসমা খলিফার ‘হোয়াই আই হ্যাড টু লিভ সৌদি আরব’ (আমাকে কেন সৌদি আরব ছাড়তে হলো) লেখাটি বিবিসি অনলাইন প্রকাশ করেছে।
বাসমা বলেন, ‘সাহস করে থেকে গেলে তারা আমার ভিসা বাতিল করতে পারত। সেদিনই একটি ফ্লাইটে করে লন্ডনে নিজ বাড়িতে ফিরে আসি।’
২৫ বছর আগে যখন সৌদি আরব ছিলেন বাসমা, তখন তিনি শিশু। গত বছর তিনি শেষবার যখন গেলেন তখন সেখানের সৈকত, মল ও ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁ দেখে অবাক হয়ে যান। তিনি ছয় দিন ছিলেন। পুরো সময়টা বৃষ্টি ছিল, সৌদি আরবের জন্য এমন বৃষ্টি বিরল ঘটনা। তাঁকে কৌতুক করে বলা হচ্ছিল, লন্ডন থেকে বৃষ্টি নিয়ে সৌদি এসেছেন তিনি।
বাসমা বলেন, সৌদি আরবে ১৯৮৯ সালে তিনি জন্ম নেন। রাজধানী রিয়াদে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর বয়স যখন তিন বছর, বাবা আয়ারল্যান্ডে চাকরি নিয়ে পুরো পরিবারসহ সৌদি আরব থেকে চলে যান। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে থাকার পর তাঁরা স্কটল্যান্ডে চলে যান। সেখানে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন। এরপর ফ্যাশনবিষয়ক কাজের জন্য বাসমা ছয় মাস নিউইয়র্কে থাকেন। ২১ বছর বয়স থেকে তিনি লন্ডনে থাকা শুরু করেন এবং ফ্যাশন স্টাইলিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বাসমার ভাষায়, যখন আপনি বারবার স্থান পরিবর্তন করবেন, তখন আপনার বাড়ি সম্পর্কে খুব জোরালো কোনো অনুভূতি কাজ করবে না। এটা আশীর্বাদ হতে পারে, অভিশাপও হতে পারে। আপনি যেকোনো জায়গাকে আপনার বাড়ি মনে করতে পারেন অথবা কোনো জায়গাকেই আপনার নিজের বাড়ি বলে মনে না হতে পারে। তবে এত বেশি স্থান পরিবর্তনের কারণে তিনি নতুন মানুষ ও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর বন্ধু রয়েছে।

নিজের বাড়ি সম্পর্কে অনুভূতি উপলব্ধি করার প্রয়োজনে বাসমা আবার ফিরে যান সৌদি আরবে। সেখানে তাঁর তিন খালার বাসা রয়েছে। সৌদি আরব সম্পর্কে গণমাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক খবর প্রকাশ হয়। কিন্তু পরিস্থিতি আসলেই কী, তা জানার জন্য হাজির হন তাঁর জন্মস্থান সৌদি আরবে। দেশটিতে তাঁর ফেরা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তথ্যচিত্র বানানোর জন্য ই–মেইলে অনুরোধ জানান তিনি। এ নিয়ে দুই বছর ধরে পরিকল্পনা করেন তিনি। শেষে বিবিসি সাড়া দেওয়ায় পরিচালক জেসকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে যান বাসমা।
মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি রয়েছে, এমন কোনো কিছু তিনি করতে চাননি বলে জানান বাসমা। তিনি বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য ছিল, পশ্চিমা ও আরব সংস্কৃতিতে দিন যাপন করা আমি যদি সৌদি আরবে একজন তরুণী হিসেবে বাস করতাম, তাহলে জীবন কেমন হতো। আমি দৈনন্দিন কাজ করে দেখাতে চেয়েছিলাম। যেমন কেনাকাটা, খাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা। সৌদি আরব এখন নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, আমি এই নতুন স্বাধীনতার সুযোগ নিতে সেখানে গাড়ি চালাতে চেয়েছিলাম।’
বাসমা বলেন, ‘আমি জানতাম যে সৌদি আরবের জীবন ভিন্ন। নারীদের সেখানে অধিকার কম। যেমন নারীরা পুরুষের অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়তে পারেন না, ব্যাংক হিসাব খুলতে পারেন না। রেস্তোরাঁয় পুরুষের কাছ থেকে আলাদা জায়গায় বসতে হয়।’
বাসমা বলেন, এসব বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দেশটিতে পরিবর্তন আসছে। মাথা স্কার্ফ দিয়ে না ঢেকেও নারীরা সেখানে ঘুরতে পারেন। সামাজিক মেলামেশা আরও অবাধ হয়েছে। নারীরাও পেশা নিয়ে ভাবতে পারেন। এরপরও দেশটি তার হাতের মুঠোয় রাখে সবকিছু এবং বিরোধী মত কঠোরভাবে দমন করে। তিনি সৌদি আরবে থাকার সময় ২ অক্টোবর সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসগির নিখোঁজ হওয়ার খবর বের হয়। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবন থেকে নিখোঁজ হন তিনি। পরে জানা যায়, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
এই ভয়াবহ ঘটনার পরও বাসমা ভয় পাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি তো সাংবাদিক হিসেবে সৌদি আরব যাননি। তিনি নির্মাতা হিসেবে গেছেন। সেখানে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। দুই সপ্তাহের কাজ নিয়ে যাওয়ার সময় একবার তাঁর মনে হয়েছিল, ‘এটা কী করলেন, কেন এলেন?’ তবে খালাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাঁর সেই আশঙ্কা দূর হয়ে যায়। তাঁর খালা সেখানে সফল একজন নারী। খালা তাঁকে ভাবতে সাহায্য করছিলেন যে সৌদি আরবে থাকা যায়।
সৌদি আরবে গিয়ে খালারা ছাড়াও অন্য লোকদের সঙ্গেও তাঁর মেলামেশা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে একজন তত্ত্বাবধায়ক দিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি খেয়াল রাখতেন বাসমা ও তাঁর দল সৌদি রীতিনীতি মানছেন কি না। তাঁদের সঙ্গে একটি সৌদি প্রোডাকশন দলও ছিল—একজন গাড়িচালক, ক্যামেরা সহকারী এবং দুজন কর্মী। তত্ত্বাবধায়ক যতটা খবরদারি করবেন বলে ভেবেছিলেন বাসমা, ততটা করেননি। কিন্তু তাঁর কাছে ওই ব্যক্তিকে একজন উটকো ঝামেলা বলে মনে হতো। তত্ত্বাবধায়কের বিষয়টি বাদ দিলে তাঁরা সৌদির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দেখেছেন। মলে কেনাকাটা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো।
এক সন্ধ্যায় বাসমা তাঁর বন্ধু, বন্ধুর বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর দলের লোকজনকে নিয়ে পার্টি করলেন। লন্ডনের পার্টিগুলো থেকে তা কিছুটা আলাদা ছিল। এই পার্টিতেও মেয়েরা মেকআপ করে সুন্দর পোশাকে সজ্জিত ছিল, তবে লন্ডনের চেয়ে মার্জিত ছিল পোশাক, লোকজন তুলনামূলক বেশি রক্ষণশীল। মূল পার্থক্য ছিল পার্টিতে কোনো মদ ছিল না। সৌদি আরবে মদ খাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাসমার মদের অভ্যাস নেই। যদি থাকত তবে তিনি ওই সফরে গিয়ে বড় বিপদে পড়তেন বলে মনে করেন।
ওই পার্টির পর একদিন তিনি তত্ত্বাবধায়ককে বললেন তিনি গাড়ি চালাতে চান। কয়েক বছর ধরে অধিকারকর্মীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের জুন মাসে সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। সৌদি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ ঘটনা ঘটল। এ ঘটনাকে সৌদি আরবে বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। যে দেশে এই সাধারণ একটি বিষয় থেকে নারীদের দীর্ঘ সময় ধরে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল, সেটার স্বাধীনতা পরখ করে দেখতে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেছিলেন বাসমা। তবে এ থেকেই ঘটে বিপত্তি। তত্ত্বাবধায়ক অন্য একটি গাড়ি থেকে তাঁকে একটি তার এনে দিয়েছিলেন, যাতে স্টেরিওর সঙ্গে তিনি নিজের ফোনের গান সংযোগ করতে পারেন। গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সময়েও অনেক নারী অধিকারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি সেটা নিয়ে লেখা এক নিবন্ধ জোরে জোরে পড়ছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ওই নারীরা মুক্তি পেয়েছেন কি না, কিন্তু তাঁর সন্দেহই সত্য নয়। ওই নারীরা তখনো কারাবন্দী ছিলেন।
বাসমা বলেন, ‘আমি যখন খবরটি পড়ছিলাম, তখন সৌদি আরবের ওই প্রোডাকশন দলের একজন তা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। যে ইস্যুতে খবর, সে ব্যাপারে তাঁর রাগ ছিল না। তাঁর মনে হয়েছে, আমি সৌদি আরবের সমালোচনা করেছি। নারীদের সাহসিকতাকে উদ্‌যাপন করছি না, অথচ আমি তাই করেছিলাম।’
বাসমার অজ্ঞাতেই এ খবর চলে যায় ওই প্রোডাকশন দলরে বস এবং যুক্তরাজ্যে বাসমার প্রোডাকশন দলের কাছে। তিনি এতটাই বেদনাহত হন এবং ভয়ও পান। তিনি কারও অনুভূতিতে আঘাত করতে চাননি, কাউকে ছোট করতে চাননি। তিনি শুধু একটি খবর পড়েছেন। পৃথিবীর কোন গবেষণায় আছে যে এতে দোষ হয়!
যুক্তরাজ্য থেকে বাসমার সম্পাদক ফোন দেন যে তাঁকে এখনই সৌদি আরব ছাড়তে হবে। তিনি মাত্র ছয় দিন ছিলেন সেখানে। আরও কত কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। নারী উদ্যোক্তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল। সব ফেলে তাঁকে তল্পিতল্পা বাঁধতে হলো।
বাসমা জানান, তিনি মনে করেননি তিনি এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। কিন্তু তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি। অশ্রু চোখে বিদায় জানালেন খালাদের। হিথরো বিমানবন্দরে নামার পর প্রথম তিনি হাঁপ ছাড়েন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি সৌদি নাগালের বাইরে পৌঁছেছেন। এর আগে কখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে তাঁর এত উচ্ছ্বাস হয়নি, ওই মুহূর্তে যেমন হয়েছিল। তবে সৌদি আরবে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও দেশটি নিয়ে আশাবাদী বাসমা। সৌদি আরবে অনেক ইতিবাচক ঘটনাও ঘটছে, যাতে বোঝা যাচ্ছে সেখানে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে। তবে তিনি সেখানে গিয়ে নিজ চোখে তা কখনো দেখতে পারবেন কি না, জানেন না।

রাতের শহরে নিশিকন্যাদের হাট by রুদ্র মিজান

ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, মুখে ফেস পাউডার, চোখে আইশ্যাডো। সিনেমার নায়িকাদের মতো সাজতে গিয়ে অনেকটা অতিরঞ্জিত মেকআপ নেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে  এভাবেই সাজগোজ শুরু করেন। পাতলা শিপন শাড়িটা গায়ে জড়ান। পুরান ঢাকা থেকে কেনা পারফিউমের সুগন্ধ গায়ে মেখে বের হন বাসা থেকে। তারপর বাসযোগে সাভার থেকে ফার্মগেট। দীর্ঘ প্রায় ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টায় পৌঁছেন। গভীর রাত পর্যন্ত ফার্মগেট মোড়ে হেঁটে-বসে কাটান তিনি।
চারপাশে বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে, এমনকি কেউ চলতে চলতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেন এই নারীকে। কেউ কেউ উৎসুক হয়ে কথা বলেন। তাদের মধ্যে কারো সঙ্গে কথা চূড়ান্ত হলে মুহূর্তের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যান। এভাবে একাধিকবার এই এলাকা থেকে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টার জন্য উধাও হয়ে যান তিনি। ফিরে আসেন। তখন ঠোঁটের লিপস্টিক আর ঠোঁটে নেই, ছড়িয়ে গেছে ঠোঁটের ওপরে-নিচে। ভ্যানেটি ব্যাগ থেকে আয়না বের করে দ্রুত তা ঠিক করে নেন।
পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব এই নারীর নাম আসমা বেগম। সপ্তাহে অন্তত চার দিন এভাবেই সেজেগুজে ফার্মগেটে হাজির হন তিনি। আসমা জানান, তার তিন সন্তান। এক ছেলে, দুই মেয়ে। সবাই স্কুলপড়ুয়া। স্বামী নেই। গাড়ি চালক স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই অর্থের প্রয়োজনে রাতের হাটে হাজির হন তিনি। গত রোববার রাতে ফার্মগেটের বাস্টস্টপেজে দীর্ঘ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। এসময় আশপাশে ভিড় করেছিলেন ওই হাটের অন্য নারীরাও। তবে তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েক জন ছাড়া সবার পরনেই কালো বোরকা। মুখ ঢাকা।
আসমা জানান, ২০১৬ সালের শেষের দিকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার স্বামী। ভোলার ভাঙনকবলিত এলাকায় তাদের বাড়ি। বাড়িতে সম্পদ বলতে কিছু নেই। আসমা বলেন, কখনো ভাবিনি স্বামী ছাড়া অন্য কারো বিছানায় সঙ্গী হবো। কিন্তু ভাগ্য আমাকে টেনে নিয়ে গেছে। তিনি জানান, গার্মেন্টে চাকরি নিয়েছিলেন। সেখানে সুপারভাইজারের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় চাকরিটা যায় যায় অবস্থায় ছিল। একপর্যায়ে সহকর্মী আরেক নারীর পরামর্শে চাকরির পাশাপাশি রাতের হাটের বাণিজ্য শুরু করেন তিনি। এই কাজে আয় বেশি। তাই চাকরিটা ছেড়ে দেন।
তার মতোই আরেক নারীর নাম শান্তা। শান্তা থাকেন শনির আখড়া। রাত ৮টার পরেই সেজেগুজে ফার্মগেট বা পান্তকুঞ্জে হাজির হন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে কথা বলতে চান না তিনি। শান্তা জানান, এটাকে তিনি ব্যবসা মনে করেন। তার মতে এখানে চরিত্র হারানোর কিছু নেই। টাকার বিনিময়ে সেবা দেন তিনি। শান্তা বলেন, আমিতো কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা নিচ্ছি না। চুরি-ছিনতাই করি না। আমি একজনের প্রয়োজন মেটাচ্ছি, বিনিময়ে তিনি টাকা দিচ্ছেন। ২৭ বছর বয়সী এই তরুণী জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ পান্তকুঞ্জে যান না তিনি। এখানে স্থানীয় কিছু বখাটেদের চাঁদা দিতে হয়, নইলে তাদের ছিনতাইয়ে সহযোগিতা করতে হয়। তাছাড়া প্রায়ই পুলিশ ঝামেলা করে।
মহাখালী বাসস্টপেজে দীর্ঘসময় পাঁয়চারি করছিলেন ত্রিশ বছর বয়সী এক নারী। পুরুষদের দেখলেই এগিয়ে যান। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকেন। চোখে চোখ রাখেন। অকারণেই মুচকি হাসেন। কখনও কখনও মোবাইলফোনে কথা বলেন। এর মধ্যেই একটি সিএনজি অটোরিকশা থামে তার পাশে। আস্তে আস্তে কথা বলেন চালক। ওই নারীর কণ্ঠ স্বাভাবিক। তার উচ্চারিত শেষ বাক্যটি ছিল ‘ইশ, এত কম টাকায়। যান বাসায় গিয়ে কম্বলের উপরে শুয়ে থাকেন।’
কথা হয় ওই নারীর সঙ্গে। নাম মনিরা। তিনি জানান, আগে থাকতেন করাইল বস্তিতে। এখন থাকেন কুড়িলে।
লেখাপড়া করেছেন নবম শ্রেণি পর্যন্ত। সারাদিন বাসায় থাকেন। চেহারার যত্ন নেন। সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হন। রাস্তায় এভাবে খদ্দের সংগ্রহ করতে ভালোলাগে না তার। একসময়ে ঢাকার বেশির ভাগ হোটেলে এই বাণিজ্য করা যেত। এখন হোটেলগুলোতে আগের মতো তা হয় না। যে কারণে বাধ্য হয়েই রাস্তায় দাঁড়িয়ে খদ্দের সংগ্রহ করেন। বনানী এলাকায় পরিচিত জনের বাসায় নিয়ে যান, কখনও হোটেলে রুম নেন। দুই ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া দিতে হয় রুমের মালিককে। তিন-চার জন খদ্দের পাওয়া গেলেই কয়েক হাজার টাকা পান মনিরা।
গুলিস্তান এলাকায় কথা হয় রাতের হাটের আরেক নারী পূর্ণিমা দাশের সঙ্গে। শুরুতেই শর্ত দেন ‘কাজ করলে কথা, নইলে আজাইরা প্যাঁচাল কইরা লাভ নাই। আপনারা শুধু শুধু প্যাঁচাল করেন, চেহারা দেখলেই বুঝি কারা কাজের কারা অকাজের।’ তবে চটপটি খাওয়ার প্রস্তাব দিলে রাজি হন তিনি। পূর্ণিমা জানান, ঢাকার গুলিস্তানসহ বেশ কয়েকটি হোটেলে নিয়মিত খদ্দের নিয়ে যান তিনি। মাঝে মাঝে পার্টিতে যান। নাচ করেন। গাজীপুরে, নারায়ণগঞ্জে, মাদারীপুর ও শরিয়তপুরে বিভিন্ন দলের সঙ্গে যান তিনি। নাচে গেলে একরাতে কয়েক হাজার টাকা বকশিশ পাওয়া যায়। শেষ রাতে বিছানায় সঙ্গী হলে বেশ ভালো আয় করতে পারেন।
পুরান ঢাকায় একটি বাসায় সাবলেট থাকেন তিনি। বাড়িতে সবাই জানে চাকরি করেন। বাড়িতে মা-বাবা, ভাই, বোন সবাই আছে। এই হাটে নিজের শরীর বিক্রি করতে ভালো লাগে না তার। একটা ভালো চাকরি পেলে এই পথ ছেড়ে দিবেন। পূর্ণিমা বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় শিক্ষিত ছেলেরা আমাদের কাছে কম আসে। তাদের প্রত্যেকের এখন গার্লফ্রেন্ড আছে। অযথা আমাদের টাকা দেবে কেন। তবে যাদের নেশা হয়ে গেছে তারা আসে। এ ছাড়াও সিএনজি অটোরিকশা, বাসচালক, ক্ষুদে ব্যবসায়ী, কর্মচারীরাই তাদের খদ্দের। তবে কম বয়সী ছেলেরা প্রায়ই তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়। পূর্ণিমা জানান, বাসা খালি হলেই দু’তিন জন বন্ধু মিলে পার্টি দেয় কম বয়সী ছেলেরা। এসব পার্টিতেও ডাক পড়ে তার।
এছাড়াও রাত নেমে এলে ঢাকার বিজয় সরণি, মানিকমিয়া এভিনিউ’র খেজুরবাগান এলাকা, গুলশান-বাড্ডা লিঙ্ক রোড, প্রেস ক্লাব-হাইকোর্ট সংলগ্ন এলাকায় ভিড় করেন রাতের হাটের নিশি কন্যারা। তাদের মধ্যে একটা শ্রেণি রয়েছে ভাসমান। তারা ফুটপাতে থাকেন। ফুটপাতেই মশারি-কাপড় টানিয়ে নিজের শরীর বিক্রি করেন। তাদের খদ্দের অতিনিম্ন আয়ের পুরুষ। এছাড়াও আরেকটা শ্রেণি হচ্ছে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারী। তারাও সেজেগুজে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। অর্থের বিনিময়ে তারাও শরীর বিক্রি করে। এসব পেশায় সংশ্লিষ্টরা নিজেদের নিরাপত্তা চান। নানা রকম হয়রানি থেকে মুক্ত থাকতে চান। বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার অনুরোধ তাদের।

একজন রক্ষিতার বয়ান

ক্লোই একজন রক্ষিতার নাম। তবে নামটি ছদ্ম। তিনি এক দশক রক্ষিতা হিসেবে যৌনপেশায় নিয়োজিত ছিলেন। টিনেজ বয়সের সেই সময়টাতে তার কদর ছিল ভীষণ। বলা যায়, রমরমা ব্যবসা। নিজে অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক পছন্দ না করলেও তাকে এ পেশায় আসতে হয়েছিল। কেমন ছিল সেই জগত, কিভাবে সেই পেশা চালিয়ে নিয়েছেন, পুরুষরা তার কাছে কি অন্বেষণ করতো এর সবই তিনি বলে দিয়েছেন এক সাক্ষাতকারে। বলে দিয়েছেন কোনো এক সুপারমার্কেটের কার পার্কে কখনো অপেক্ষায় থাকতেন খদ্দেরের আশায়।
বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ পেয়েছে তার সেইসব কথা। ক্লোই বলেছেন, এ পেশা আমাকে বাড়িতেই চালাতে হতো। অনেক স্থানেই এমন রক্ষিতা আছে। দিনে ৫০ জন পুরুষের কাছ থেকে আমি ৫০টি কল পাই। মানুষ যা কল্পনা করে, এ সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। আমি কলেজে যখন পড়ি তখন বয়স আমার ১৯। সেই টিনেজ বয়সেই আমি শুরু করেছি। আইনের সমস্যা তো ছিলই। তারপর আমি পুরোপুরি এ বিষয়ক ‘ইন্ডাস্ট্রির’ সঙ্গে যুক্ত হই। সত্যি করে বলতে কি, এটা করেছি আমি অর্থের জন্য।
তার ভাষায়, আমাকে তুলে নিয়ে যেতো ‘এসকর্ট’ এজেন্সি। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত এ পেশায় ব্যস্ত থাকতে হতো আমাকে। আর এটা করেছি আমার পরিবারের সঙ্গে থাকা অবস্থায়ই। পরে তারা জানতে পারে, আমি কি করছি। আমি মাঝে মাঝেই বন্ধুদের সোফায় গিয়ে সময় কাটাই।
বার্কিং অ্যান্ড ডেগেনহ্যাম এলাকায় বসবাস করেন ক্লোই। যখন তিনি সাক্ষাতকার দিচ্ছিলেন তাড়া করছিলেন। বলছিলেন, কয়েক মিনিট বা এক ঘন্টার মধ্যে তার কাছে ক্লায়েন্ট আসবে। ক্লোই এ বিষয়ক এজেন্সিগুলোকে নতুন নতুন ফ্লেভার আনার বুদ্ধি দেন। বলেন, ‘নিউ গার্ল ইফেক্ট’ ব্যবহার করতে হবে। কারণ, ক্লায়েন্টরা নিয়মিত একই ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করে আনন্দ পায় না। এ জন্য পরিবর্তন আনা উচিত। ক্লোই বলেন, পুরুষরা লিস্ট দেখে নতুন নতুন যুবতীকে খোঁজে। আবার অনেক সময় রক্ষিতাদের নিয়ে এজেন্সিগুলো অস্বস্তিতে পড়ে। তারা রক্ষিতাদের সরিয়ে দেয়। নতুন মুখ খোঁজে। ক্লোই জানান, এ পেশায় এজেন্সির সঙ্গে যেসব মেয়ে কাজ করেন তাদের আয়টা ভাগ হয়ে যায়। শতকরা মাত্র ৫০ ভাগ ফি তিনি পান। ক্লোই বলেন, যদি আমি ১২০ পাউন্ড ফি পাই। তাহলে এজেন্সি অথবা ড্রাইভারকে দিতে হবে ৫০ থেকে ৬০ পাউন্ড। কেউ যখন এজেন্সিভিত্তিক এসকর্ট সার্ভিসে কাজ করেন তখন তাকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। চালক নিয়ে যান নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
ক্লোই বলেন, তার ক্লায়েন্টদের বেশির ভাগই বিবাহিত অথবা তাদের পার্টনার আছে। এক্ষেত্রে ক্লোই দিনে সবচেয়ে বেশি ফোন পান দুপুরের খাবার সময় অথবা কোনো ব্যস্ত সময়ে। অনেক পুরুষ কাজ থেকে ফেরার পথে তার সঙ্গে সাক্ষাত মেলামেশা করে যায়। ক্লোইকে বলেন, যাদের স্ত্রী আছেন এবং তাদেরকে বঞ্চিত রাখছেন এমন পুরুষকে সন্তুষ্টি দিয়ে থাকি আমি। তারা আমার কাছে এসে যদি অর্থ দেন তা নিতে কিছু মনে করি না। তবে এসকর্ট পেশায় এসে ভালবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন। আবার এটাও নয় যে, যৌনপেশায় এসে ভালবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেবো। তাই আমি একজন ক্লায়েন্টের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলান। আমার কাছে যেসব পুরুষ আসে যারা মেয়েদের সম্মান করে না। কিন্তু আমি এমন একজনকে ঠিক সেই সময়ই খুঁজে পাই। তার সঙ্গে জীবনকে বাঁধবো বলে ঠিক করি। কিন্তু সে ছিল ঋণের ভারে জর্জরিত। ফলে বিষয়টি কঠিন হয়ে ওঠে।

সেলিব্রেটিরা কেন কম বয়সী প্রেমিক খোঁজেন!

নিজের চেয়ে কম বয়সী যুবতীর সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছেন এমন যুবকরা গর্ব করতেই পারেন, করে থাকেন। কিন্তু কোনো নারী, বিশেষ করে কোনো সেলিব্রেটি যদি তার বয়সকে উপেক্ষা করেন, বগলদাবা করেন তার চেয়ে বয়সে অনেক কোনো যুবককে! তাহলে সবাই হা করে তাকিয়ে দেখবেই তো! এমনই দেখা গেছে লন্ডনের ‘লাভ আইল্যান্ড’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা ৩৯ বছর বয়সী ক্যালোলাইন ফ্লেককে। তিনি জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার অনুষ্ঠানে বগলদাবা করে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ‘স্ট্রিক্টলি কাম ড্যান্সিং’-এর এজে প্রিটচার্ডকে। তার এই টয়বয়টি তার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট। পিটচার্ডের বয়স মাত্র ২৪ বছর। টগবগে যুবক এক। ক্যারোলিন কিন্তু তার প্রেমিক অ্যান্ড্রু ব্রাডির কাছ থেকে খুব বেশি দিন আলাদা হন নি। ব্রাডিও ছিলেন তার চেয়ে ১৩ বছরের ছোট।
ক্যারোলিনের রোমান্সের অধ্যায় এখানেই শেষ নয়। তিনি তিনি ‘ওয়ান ডিরেকশন’-এর হ্যারি স্টাইলসের সঙ্গেও চুটিয়ে প্রেম করেছেন। তখন হ্যারি স্টাইল ছিল মাত্র ১৭ বছরের। আর ক্যালোলিন ছিলেন ৩১ বছরের। তিনি আরো প্রেম করেছিলেন ‘রিজল কিকস’-এর জর্ডান স্টিফেনসের সঙ্গে। তিনিও তার চেয়ে ১৩ বছরের ছোট ছিলেন।
না। শুধু ক্যারোলিন একাই নন। এমন যাত্রায় আছেন জর্ডি বিচারক চেরিল। তিনি ২০০৮ সালে যখন লিয়াম পাইনের এক্স-ফ্যাক্টরের অডিশনে যান সেখানেই তার ওপর চোখ পড়ে যায় চেরিলের। ২০১৬ সালে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের গুজব ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাদের বয়সের ব্যবধান ১০ বছরের। তবে গত বছর তা ভেঙে গেছে। এ নিয়ে চেরিল বলেছেন, আমি এত খারাপ। আমি যাকে দেখি তারই প্রেমে পড়ে যাই।
অন্যদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ও ফার্স্টলেডি ব্রিজিট ম্যাক্রোনের প্রেমের কাহিনী তো জগৎজোড়া বিখ্যাত। সবাই জানেন। তাদের প্রেমের কাহিনী শুরু হয়েছিল স্কুলে। তখন ব্রিজিতের বয়স ৩৯ বছর। ইমানুয়েল ম্যাক্রনের বয়স ১৫ বছর। সে সময় থেকেই শুরু। একটু একটু করে প্রেম জমতে শুরু করেছিল ম্যাক্রনের মধ্যে। তার বয়স যখন ১৬ বছর তখন তারা পুরোপুরি প্রেমে মজে যান। তারই ধারাবাহিকতায় তারা বিয়ে করেন। ব্রিজিত ম্যাক্রনের বয়স এখন ৬৪ বছর। তিনি তিন সন্তানের মা। আর ইমানুয়েল ম্যাক্রনের বয়স ৪০ বছর।
অন্যদিকে মেলানিয়া শেখ এবং তার বয়ফ্রেন্ড জ্যাক কোকিংয়ের কাহিনী পশ্চিমা দুনিয়া জানে। মেলানিয়া দু’বার বিয়ে করেছেন। প্রথম স্বামী অভিনেতা ডানিয়েল কাল্টাগিরোনে (৪৬)। পরে বিয়ে করেছেন জ্যাক ককিংকে। দ্বিতীয় স্বামী তার চেয়ে ১৫ বছরের ছোট। তাদের জানাশোনা হয় টুইটারে। তারপর বিয়ে। তবে তার আগে তারা রোমান্সের বড় একটি অধ্যায় খেলেন। ২০১৭ সালের দিকে দু’সন্তানের মা মেলানিয়া শেখ গোপনে ৩৪ বছর বয়সী পপ তারকা ওলি মারসের সঙ্গে প্রেম করছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় নি।

ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকি, মাদুরোকে রক্ষা করতে ৪০০ সেনা পাঠিয়েছে রাশিয়া

ভেনিজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, তখন তাকে রক্ষা করতে প্রায় ৪০০ সেনা পাঠিয়েছে রাশিয়া। ভেনিজুয়েলাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ এক যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভেনিজুয়েলায় নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে। তাদেরকে পুলিশি প্রহরা দিতে অনুরোধ জানানো মার্কিন দূতাবাসের একটি চিঠি ফাঁস হয়ে গেছে। এসব খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, গত বুধবার হুয়ান গাইডো নিজেকে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই গ্রেপ্তার আতঙ্কে তিনি পলাতক। তাকে সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা সহ এক ডজনেরও বেশি দেশ।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে মাদুরোকে সমর্থন দেয় রাশিয়া, চীন, সিরিয়া, তুরস্ক সহ বেশ কিছু দেশ। এক্ষেত্রে মাদুরোর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন দেশের সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছেন। তবে বিপোর্ট ছড়িয়ে পড়েছে যে, মাদুরোকে রক্ষা করতে রাশিয়ার ৪০০ সেনা পাঠানো হয়েছে। তারা তাকে সুরক্ষা দেবেন।
নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব কূটনীতিককে দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে তার দেশের দূতাবাস বন্ধ করে দেন। নিজের সব কূটনীতিককে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় রাজধানী কারাকাসের বিমানবন্দরের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের। তাদেরকে বহনকারী ১০টি গাড়িকে পুলিশি নিরাপত্তা দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছিল মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তা। এমন একটি চিঠি ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্র পরিচালিত টিভি নেটওয়ার্ক টেলেসুর প্রচার করেছে। ওদিকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যেসব নির্দেশ দিয়েছেন তা মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, মাদুরোর নির্দেশ অবৈধ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভেনিজুয়েলার বৈধ শাসক মনে করে না। তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সব রকমের বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো কড়া অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারেন। এখানে উল্লেখ্য, ভেনিজুয়েলায় উত্তোলন করা তেলের এক তৃতীয়াংশ যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। মাদুরোকে বৈধ নেতা হিসেবে মানেন না বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট।
তেলসমৃদ্ধ অথচ ভেঙে পড়া অর্থনীতির এ দেশটি গত বুধবার ভয়াবহ এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ওইদিন ৩৫ বছর বয়সী বিরোধী নেতা হুয়ান গাইডো নিকেজে দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। তাকে দ্রুততার সঙ্গে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও কলোম্বিয়া সহ আঞ্চলিক অনেক দেশ সমর্থন করে। অন্যদিকে নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন দেয় রাশিয়া, চীন সহ বেশ কিছু দেশ। এর ফলে নতুন করে একটি ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার মাদুরো সঙ্কট সমাধানে হুয়ান গাইডোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে চেয়েছেন। কিন্তু গাইডো তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওদিকে রাজধানী কারাকাসে তীব্র বিক্ষোভ চলছে। কেউ মাদুরোর পক্ষে। কেউ বিপক্ষে। এ সপ্তাহে সেখানে সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে। এর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিশেলে ব্যাচেলেট। তিনি জেনেভায় দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমি চরমভাবে উদ্বিগ্ন যে, ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাতে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ এক বিপর্যয়।

সৌদি আরবে গোপন কারাগারে নারী অধিকারকর্মীদের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তার এক রিপোর্টে বলেছে, সৌদি আরবে গোপন কারাগারে আটক নারী অধিকারকর্মীদের যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে । তদন্তকারীদের সামনে একজন নারীকে অন্য একজন নারীর চুমু দিতে বাধ্য করানো হয়েছে। ভয় দেখানো হয়েছে ওয়াটারবোর্ডিং বা পানিতে ডুবিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের। এসব নারীর কাছে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য বৃটিশ এমপিরা রিয়াদের ওপর চাপ বৃদ্ধি করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
অ্যামনেস্টি শুক্রবার প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলেছে, কমপক্ষে ১০ জন নারী অধিকারকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন অধিকারকর্মীকে তদন্তকারীরা বলেছেন, তার পরিবারের সদস্যরা মারা গেছেন।
আসলে এটা ছিল মিথ্যা কথা। ওই অধিকারকর্মী পরিবার হারানোর বেদনা এক মাস ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। গোপন কারাগারে আটক রাখা হয়েছে বন্দিদের। তাদেরকে এতটাই দুর্বল করে দেয়া হয়েছে যে তারা দাঁড়াতেই পারেন না।
গত বছর ব্যাপক হারে যখন সৌদি আরবে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয় তখন এসব নারী অধিকারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এর মধ্যে আছেন সুপরিচিত অধিকারকর্মী লুজাইন আল হাতলোল এবং আজিজা আল ইউসেফ। তারা নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকারের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এ ছাড়া পুরুষ শাসিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তারা কথা বলছিলেন। তবে তাদের কাউকেই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয় নি বা বিচারে তোলা হয় নি। অনেকের আইনী সহায়তা দেয়ার কোনো প্রতিনিধিও নেই। এসব বিষয় তখনই বেরিয়ে এলো যখন বৃটেনের আন্তঃদলীয় এমপি ও আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা সৌদি আরবকে একমাসের সময় দিয়েছে, তাদেরকে ওইসব নারীদের কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে। এ বিষয়ে এই গ্রুপটি বৃটেনে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নাওয়াফ বিন আবদুল আজিজের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। তারা চাইছেন আটক ১০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলে তাদের অবস্থা জানতে। এই গ্রুপটি বলছে যদি ২৯ জানুয়ারির মধ্যে এ বিষয়ে সৌদি আরব কোনো ইতিবাচক সাড়া না দেয় তাহলে ওইসব নারীদের বিরুদ্ধে যেসব দুর্ব্যবহার করা হয়েছে তার বিস্তারিত শিগগিরই প্রকাশ করে দেয়া হবে।  অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিডল ইস্ট রিসার্চ বিষয়ক পরিচালক লিন মালুফ বলেছেন, এসব নারী অধিকারকর্মী মানবাধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে তাদের ৯ মাস খেয়ালখুশিমতো আটকে রাখা হয়েছে। তাদের সুস্থতা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
সৌদি আরব বার বার বন্দিদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।