Wednesday, January 15, 2014

সহজিয়া কড়চা- ভবের নাট্যশালায় নেতা চেনা দায় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

প্রাজ্ঞ লোককবি গেয়েছেন, ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়। বাংলাদেশটা ভবের বাইরে নয়; তবু বাংলার মাটিতে মানুষ চেনা সোজা।

এই ভবের সব জায়গায় গণতন্ত্র নেই। কোনো কোনো জায়গায় গণতন্ত্র এই আছে তো এই নেই। থাকলেও কী রকম আছে, তা বিধাতার পক্ষেও বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। বিশেষ করে তাঁর পক্ষে না বোঝার কারণ তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকায় বাংলাদেশের সংবিধানটি পাঠ করেননি। কিন্তু বাংলাভাষী যাঁরা ওই বইটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন, ওতে যেসব শ্লোক লেখা আছে, তার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো সম্পর্কই নেই। বাংলাদেশিরা জাতীয় কবির প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাবশত তা-ই করে যখন যা চাহে মন। সংবিধান, আইন-কানুন, প্রচলিত রীতিনীতি— কোনো কিছুই বঙ্গসন্তানদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
ঐতিহাসিক রানা প্লাজার স্তম্ভ নাড়াচাড়ার কিছুকাল পরেই আমরা শুনলাম, বাংলাদেশে যথাসময়ে নির্বাচন হবে ‘গণতন্ত্রের সূত্র’মতো। আমরা বীজগণিত আর জ্যামিতির সূত্রের কথা জানতাম, এবার জানলাম গণতন্ত্রের সূত্র। শুধু যদি গণতন্ত্রের সূত্রমতো নির্বাচন হতো, তাহলেও কথা ছিল না। বলা হলো ‘নিয়মরক্ষার নির্বাচন’। গণতন্ত্রের সূত্র নিয়ে মাথা ঘামায় না, এমন সব গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগে যেসব বিষয় ও উপকরণের কথা শোনা যায়, তা হলো সভা-সমাবেশ, বাড়ি বাড়ি প্রচারাভিযান, লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ভোটকেন্দ্রে ভোটের বাক্স প্রভৃতি। আমাদের সূত্রাবদ্ধ গণতন্ত্রে নির্বাচনের আগে দেখা গেল সেকেলে ককটেলের পরিবর্তে পেট্রলবোমা, বাসে-ট্রাকে-বেবিট্যাক্সিতে আগুন। বালুভর্তি ছয়টি ট্রাক যে বাড়ির পাহারায়, তার চারপাশে ১০ জন পুলিশই যথেষ্ট, সেখানে পুলিশ-র‌্যাবের শত শত সদস্য, ফুটন্ত গরম পানিভর্তি পানিকামান, আরও এমন সব উপকরণ, যা দেখলে গণতন্ত্র ভয়ে কাঁপতে থাকে।
এ এমন এক সূত্রায়িত গণতন্ত্র যে একটি বড় দলের যুধিষ্ঠিরের মতো সত্যবাদী নেতা তিন দিব্যি দিয়ে বললেন, আমি নির্বাচনে যাব না, যাব না, যাব না। সেটি তাঁর মুখের কথা, না মনের কথা, তা তাঁর অন্তর্যামীর জানার কথা, সংবাদমাধ্যমের মানুষদের নয়। কিন্তু তাঁর ওই ঘোষণার পরে যা ঘটল, গণতন্ত্রের সূত্র ও নিয়মরক্ষার নির্বাচনে তাতে বীরভূমের এক লোকগায়কের গাওয়া একটি চরণ আমার মনে পড়ছে: ‘সত্য পীর বলে আমি শিন্নি নাহি খাব/ ভক্তেরা কহে তোমার পোঙ্গায় বেঁধে দেব’।
নির্বাচন করা না-করা, সাংসদ হওয়া না-হওয়া চাওয়াচাওয়ির ব্যাপার নয়, ওপরওয়ালার মর্জি হলে এ মাটিতে জীবিতের মৃত আর
মৃতের জীবিত হওয়া, নমিনেশন জমা না দিয়েও সাংসদ হওয়া কোনো ব্যাপার নয়। আদেশ হবে: তুমি হও। আপনি অবলীলায় হয়ে যাবেন।
এ এমন এক সূত্রাবদ্ধ গণতন্ত্র যে এই গণতন্ত্রে রোগবালাই পর্যন্ত ভূমিকা রাখে। কারও কোনো ব্যামো হয়েছে কি হয়নি,
সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। নির্বাচনের আগে রোগ একটা বাধাতেই হবে। সে রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক-কবিরাজ-হেকিম-বৈদ্য ডেকে বাড়িতে করা সম্ভব নয়। বিমারিস্থানেই যেতে হবে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতন্ত্রের স্বার্থে।
কোনো ব্যক্তির বিমারি হলেও তার বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ রোগশয্যায় রোগীকে লুডু খেলতে দেখা যায়। তা সে মইলুডুই হোক আর সাপলুডুই হোক। চিকিৎসক বললেন, আপনার কঠিন ব্যামো, আপনার একটাই ওষুধ—গলফ খেলতে হবে। নয় বছর দেশের মানুষের ঘাম ঝরিয়েছেন, এখন নিজের শরীরে ঘাম ঝরাতে হবে। শয্যা থেকে লাফিয়ে উঠে রোগী ট্র্যাকস্যুট পরে নিলেন। গলফ মাঠে যেতে হবে। এবং রাজনীতির খেলার মতো আসল খেলা খেলেও শরীরে ঘাম ঝরাতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোনো রোগী গলফ খেলে গণতন্ত্র রক্ষা করলেন। এরপর গণতন্ত্রের ইতিহাস যখন নতুন করে লেখা হবে, তার শেষ অধ্যায়টির শিরোনাম হবে: ‘গলফ ও গণতন্ত্র’। এই যে গণতন্ত্রের গলফ থেরাপি, এর কথা বঙ্গীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একদিন লোহার অক্ষরে লেখা থাকবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন, তবু নির্বাচন কমিশনের আনুকূল্যে নির্বাচিত হলেন এবং সুড়সুড় করে এসে শপথও নিলেন। এ জন্যই তো পল্লিবন্ধুর ক্ষেত্রে পল্লিকবির গানটি শতভাগ সত্য: ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়।
তবে বঙ্গীয় গণতন্ত্রশালায় মানুষ তথা নেতা চেনা মোটেই কষ্টকর নয়। প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে বিমারিস্থান, রোগশয্যা থেকে গলফের মাঠ, হাসপাতালের খাটিয়া থেকে স্পিকারের কক্ষে গিয়ে সংগোপনে শপথপাঠ, আবার হাসপাতালে প্রত্যাবর্তন, সেখান থেকে অতিথিদের করতালির মধ্যে বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রবেশ—এসব দৃশ্যই গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী পর্যবেক্ষণ করেছে। এক বুড়া রিকশাচালক আমাকে বলেছেন, আমাগো
এত বোদাই মনে কইরেন না। আমিও তাঁকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি, কে আপনাদের তা মনে করে তা জানি না, আমি আপনাকে আকসার তা মনে করি না।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে থেকেই আমাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পিপলস রিপাবলিক না হয়ে এটি পরিণত হয়েছে গণতন্ত্রশালায়। গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত দল বা দলগুলো থাকে সরকারে। তারা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী। সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত বিরোধী দলও থাকে সংসদে। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ কোনো দিন শোনেনি: আমরা সরকারেও আছি, বিরোধী দলেও আছি। সরকারের মন্ত্রীও হব, সংসদে সরকারের সমালোচনাও করব। গণতন্ত্রের একটি নতুন সূত্র আবিষ্কৃত হলো। এসব কাণ্ড-কারবারে ওই রিকশাচালকের কথাই সত্য মনে হয়। দেশসুদ্ধ সব মানুষ তো ইয়ে হয়ে যায়নি। এখনো কিছু মানুষের কিছু আক্কেলবুদ্ধি আছে।
সরকারের মন্ত্রিত্বও করব, বিরোধী দলেও থাকব—এই অকল্পনীয় থিওরি বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালাকে একটি গোশালার পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। জাতীয় পার্টির মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি এবং তাদের নেত্রীর ‘বিরোধী দলের নেতা’র মর্যাদাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ৪৩ বছর আগে মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত আদর্শ ধুলায় মিশে গেছে। বাহাত্তরের সংবিধানের এত বড় অপমান এর আগে আর কখনো হয়নি—যত আজেবাজে সংশোধনীই হোক না কেন।
যুক্তফ্রন্ট সরকার, জাতীয় সরকার, জাতীয় ঐকমত্যের সরকার—সেসব অন্য জিনিস। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের নেতাদের মন্ত্রিত্ব গ্রহণে কোনো দোষ নেই। তাঁরা ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছেন। কোয়ালিশন সরকারে তাঁরা মন্ত্রী হতেই পারেন। এবং হওয়াটা তাঁদের প্রাপ্য। কিন্তু যেসব নেতা শাহবাগ চত্বরের কঠোর সমালোচক এবং শাপলা চত্বরের আদর্শের অনুসারীই শুধু নন, লাখ লাখ বোতল পানি সরবরাহকারী, তাঁরা মহাজোটে থাকেন কী করে। যিনি বলেছেন, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ আমাকে ‘থুতু দেবে’, তিনি প্রক্সি নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়ে নীরবে নৌকার পাটাতনে গিয়ে বসলেন। আঁতাতের মাধ্যমে ‘ভাগাভাগি’ করে দলের এক অংশ মন্ত্রিত্ব করবে, আরেক অংশ বিরোধী দলের সুবিধা ভোগ করবে—একি একটা পুতুল খেলা? ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে জাতীয় সংসদকে বিরোধী দলহীন করা বাংলাদেশের সংবিধানকেই কলঙ্কিত করা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই নিশ্চিহ্ন করা। দলবল করে না, এমন সাধারণ মানুষও এখন মনে করবে, খালেদা জিয়াকে অপমান করতেই জাতীয় পার্টির অসুস্থ নেতার সুস্থ পত্নীকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদটি উপহার দেওয়া হয়েছে। এ যেন তাঁকে বলা: তোমাকে পর পর দুবার বিরোধীদলীয় নেত্রী করতে চেয়েছিলাম। তুমি বেঁকে রইলে। দ্যাখো, তোমার পাপ্য পদটি কাকে দিলাম। আমরা যাকে খুশি যা-খুশি দিই, যার কাছ থেকে যা খুশি ছিনিয়ে নিই।
জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রিত্ব ও বিরোধীদলীয় নেতার পদ উপহার দিয়ে শুধু সংবিধানকে অবমাননা নয়, নিবেদিত আওয়ামী লীগের নেতাদেরও ক্ষতি করা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ করছেন, এমন অনেক নেতাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বঞ্চিত করে উড়ে এসে জুড়ে বসাদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া দলের নেতাদের প্রতি মারাত্মক অবিচার। একটি পুরোনো গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ। প্রচুর তার নেতা। তাঁদের অবহেলা করা তো অপমান করারই নামান্তর।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যারা সরকারের সঙ্গে নেই, তারাও এসব নিয়ে জোরালো প্রশ্ন করছে না। বর্তমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালায় তাদের ভূমিকাটা বোঝা যাচ্ছে না। দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে, জনগণের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে, তাঁরা দিনের প্রথম অংশে বসে বসে পত্রিকার উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখেন, সন্ধ্যাটি হলে চলে যান চ্যানেলে টক শোয়। চেতনার পক্ষে কথা বলার জন্য টক শোয় নতুন নতুন অজ্ঞাত লোক নিযুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে থাকছেন ছোট রাজনৈতিক দলের খ্যাতিমান নেতারা। চুটিয়ে তাঁরা বক্তব্য দিচ্ছেন। মানুষের কাছে না গিয়ে, মানুষকে সংগঠিত না করে উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখে এবং টক শোয় হড়হড় করে গণতন্ত্র বিষয়ে বক্তৃতা দিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতের অপরাজনীতির সমালোচনা করি, ছোট দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তা চোখের আড়ালে থেকে যায়। একটি বলিষ্ঠ নাগরিক সমাজও তৈরি হয়নি। যা আছে, তা-ও সুবিধাবাদে আক্রান্ত।
গণতন্ত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকাটা হওয়ার কথা হেডমাস্টারের মতো। যেমনটি আমরা দেখেছি ভারতে টিএন সেশনের মধ্যে। কিন্তু আমাদের দেশে হেডমাস্টার নয়, দপ্তরির দায়িত্ব পালন করেন। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। মেয়র নির্বাচনে যাঁরা বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হলেন, তাঁদের সম্পর্কে ফতোয়া দেওয়া হলো সরকারি দলের মেয়রদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তাঁরা দায়িত্ব বুঝে পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের পর তাঁরা বলতে পারলেন না, বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আছে। তার আগে নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। দোতলা থেকে প্রতিদিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সিঁড়ির গোড়ায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রচারের জন্য কিছু খোশালাপ করা এক কথা আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্য কথা।
আমাদের সংবিধানে এমন কিছু বিধান আছে, যা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলে ব্যালট বাক্সের প্রয়োজন হবে না। নির্বাচন কমিশন ও সরকার বলতে পারে, সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে এবার ১৫৩টি আসনে। কোনো কারচুপি হয়নি। সন্ত্রাস হয়নি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তা-ই হয়েছে। কে তা অস্বীকার করবে? অবশ্য সংবিধানে জনপ্রতিনিধিদের জনগণের দ্বারা ‘নির্বাচিত’ হওয়ার কথাও বলা আছে। তার জবাবে আমাদের ইসি ও বিজয়ী প্রার্থীরা বলবেন, ১৫৩টি আসনে যে এক শ ভাগ ভোটারই সমর্থন দেননি, তার প্রমাণ কী? বিতর্কপ্রবণ কেউ বলতে পারে, একজন ভোটারও যে তাঁদের সমর্থন দেননি, তারই বা প্রমাণ কী?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালার যে অবস্থা, তাতে মন্ত্রীর সূত্র নয়, সাংবিধানিক সূত্র অনুসারেই তিন লাখ ৬২ হাজার ভোটারের আসনে মাত্র তিনটি ভোট পেয়েও একজন প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন, যদি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান দুই ভোট। এমন দিন হয়তো আসবে, যখন কোনো প্রার্থী পাবেন তাঁর নিজের একটি ভোট, তাঁর স্ত্রী/স্বামীর একটি আর শ্যালক/শ্যালিকারটি। তিন ভোটওয়ালাকে বিজয়ী করতে নির্বাচন কমিশনের আইনগত ও সাংবিধানিক কোনো সমস্যা নেই।
বঙ্গীয় গণতন্ত্রশালার অনেকের প্রসঙ্গেই বলা হলো। স্থানের অভাবে বাদ পড়লেন পঞ্চমী নির্বাচনের একক নির্বাচন পর্যবেক্ষকের কথা। একটি সাধারণ নির্বাচনে একজন মাত্র নির্বাচন পর্যবেক্ষকই যথেষ্ট। তিনি যত ভোটকেন্দ্রে গেছেন, তার চেয়ে বেশি গেছেন টিভিকেন্দ্রে। আবারও সেই একই কথা বলতে হয়: ভবের নাট্যশালা বা গণতন্ত্রশালায় মানুষ চেনা দায়।
নূর হোসেন বেটা তুই শান্তিতে থাক। তুই যা চেয়েছিলি, সে জিনিসের মুক্তি পেতে বহু দেরি। বরং তোর সময় যার দুহাত ছিল পিঠমোড়া করে বাঁধা, আজ তার দুপায়েও শক্ত করে শিকল বাঁধা। চোখে ঠুলি। মুখে কুলুপ।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য @১৫ জানুয়ারি ২০১৪

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।

অন্তরঙ্গ অবস্থায় ধরা পড়লেন উদয়-নার্গিস

স্পেনে বিচ হলিডে কাটানো অবস্থায় একসাথে পাওয়া গিয়েছিল রণবীর ক্যাটরিনাকে। স্থিরচিত্রে দেখা গেছে তাদের একান্ত সময় কাটানোর কিছু মুহুর্তের ছবি। অথচ নিজেদের মধ্যকার প্রেমের বিষয়টি কখনোই স্বীকার করেননি তারা।

এবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। তবে পাত্র পাত্রী আর জায়গা ভিন্ন। বলিউড তারকা উদয় চোপড়া আর নার্গিস ফাকরি দুজনের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে সবসময় চুপ। কিন্তু মালদ্বীপের বিচে দুজনকে একসাথে পাওয়া গেল শর্টস আর বিকিনি পরা অবস্থায়।

সম্প্রতি মালদ্বীপের বিচে ঘোরাঘুরি করছিলেন ভারতীয় এক চিত্রগ্রাহক। হঠাৎই তার সামনে এক্সক্লুসিভ ছবির আইটেম। খোশ মেজাজে বিচ হলিডে কাটাচ্ছেন নার্গিস ফাকরি ও উদয় চোপড়া। ওয়েভ সার্ফিংয়ের পরে বিচ শ্যাকে ফিরতেই সুইম স্যুট পরা অবস্থায় ক্যামেরায় ধরা পড়লেন দুজন। রণবীর ক্যাটের সম্পর্কের মত উদয়-ফাকরির সম্পর্কও এখন প্রমাণিত।

অল্প কয়দিন আগে এক সাক্ষাৎকারে নার্গিস ফাকরি বলেছিলেন, ‘উদয়ের সাথে আমার কোন ভালোবাসার সম্পর্ক নাই। আমি বিয়ে নাম প্রতিষ্ঠানেও বিশ্বাসী না। যতটা সম্ভব বড় হওয়া আর অর্থ কামাই করতেই আমি ইন্ড্রাস্ট্রিতে এসেছি।”

ভবের নাট্যশালায় নেতা চেনা দায়

প্রাজ্ঞ লোককবি গেয়েছেন, ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়। বাংলাদেশটা ভবের বাইরে নয়; তবু বাংলার মাটিতে মানুষ চেনা সোজা। এই ভবের সব জায়গায় গণতন্ত্র নেই। কোনো কোনো জায়গায় গণতন্ত্র এই আছে তো এই নেই। থাকলেও কী রকম আছে, তা বিধাতার পক্ষেও বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। বিশেষ করে তাঁর পক্ষে না বোঝার কারণ তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকায় বাংলাদেশের সংবিধানটি পাঠ করেননি। কিন্তু বাংলাভাষী যাঁরা ওই বইটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন, ওতে যেসব শ্লোক লেখা আছে, তার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো সম্পর্কই নেই। বাংলাদেশিরা জাতীয় কবির প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাবশত তা-ই করে যখন যা চাহে মন। সংবিধান, আইন-কানুন, প্রচলিত রীতিনীতি— কোনো কিছুই বঙ্গসন্তানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ঐতিহাসিক রানা প্লাজার স্তম্ভ নাড়াচাড়ার কিছুকাল পরেই আমরা শুনলাম, বাংলাদেশে যথাসময়ে নির্বাচন হবে ‘গণতন্ত্রের সূত্র’মতো। আমরা বীজগণিত আর জ্যামিতির সূত্রের কথা জানতাম, এবার জানলাম গণতন্ত্রের সূত্র। শুধু যদি গণতন্ত্রের সূত্রমতো নির্বাচন হতো, তাহলেও কথা ছিল না।
বলা হলো ‘নিয়মরক্ষার নির্বাচন’। গণতন্ত্রের সূত্র নিয়ে মাথা ঘামায় না, এমন সব গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগে যেসব বিষয় ও উপকরণের কথা শোনা যায়, তা হলো সভা-সমাবেশ, বাড়ি বাড়ি প্রচারাভিযান, লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ভোটকেন্দ্রে ভোটের বাক্স প্রভৃতি। আমাদের সূত্রাবদ্ধ গণতন্ত্রে নির্বাচনের আগে দেখা গেল সেকেলে ককটেলের পরিবর্তে পেট্রলবোমা, বাসে-ট্রাকে-বেবিট্যাক্সিতে আগুন। বালুভর্তি ছয়টি ট্রাক যে বাড়ির পাহারায়, তার চারপাশে ১০ জন পুলিশই যথেষ্ট, সেখানে পুলিশ-র‌্যাবের শত শত সদস্য, ফুটন্ত গরম পানিভর্তি পানিকামান, আরও এমন সব উপকরণ, যা দেখলে গণতন্ত্র ভয়ে কাঁপতে থাকে। এ এমন এক সূত্রায়িত গণতন্ত্র যে একটি বড় দলের যুধিষ্ঠিরের মতো সত্যবাদী নেতা তিন দিব্যি দিয়ে বললেন, আমি নির্বাচনে যাব না, যাব না, যাব না। সেটি তাঁর মুখের কথা, না মনের কথা, তা তাঁর অন্তর্যামীর জানার কথা, সংবাদমাধ্যমের মানুষদের নয়। কিন্তু তাঁর ওই ঘোষণার পরে যা ঘটল, গণতন্ত্রের সূত্র ও নিয়মরক্ষার নির্বাচনে তাতে বীরভূমের এক লোকগায়কের গাওয়া একটি চরণ আমার মনে পড়ছে: ‘সত্য পীর বলে আমি শিন্নি নাহি খাব/ ভক্তেরা কহে তোমার পোঙ্গায় বেঁধে দেব’। নির্বাচন করা না-করা, সাংসদ হওয়া না-হওয়া চাওয়াচাওয়ির ব্যাপার নয়, ওপরওয়ালার মর্জি হলে এ মাটিতে জীবিতের মৃত আর মৃতের জীবিত হওয়া, নমিনেশন জমা না দিয়েও সাংসদ হওয়া কোনো ব্যাপার নয়। আদেশ হবে: তুমি হও। আপনি অবলীলায় হয়ে যাবেন।
এ এমন এক সূত্রাবদ্ধ গণতন্ত্র যে এই গণতন্ত্রে রোগবালাই পর্যন্ত ভূমিকা রাখে। কারও কোনো ব্যামো হয়েছে কি হয়নি, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। নির্বাচনের আগে রোগ একটা বাধাতেই হবে। সে রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক-কবিরাজ-হেকিম-বৈদ্য ডেকে বাড়িতে করা সম্ভব নয়। বিমারিস্থানেই যেতে হবে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতন্ত্রের স্বার্থে। কোনো ব্যক্তির বিমারি হলেও তার বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ রোগশয্যায় রোগীকে লুডু খেলতে দেখা যায়। তা সে মইলুডুই হোক আর সাপলুডুই হোক। চিকিৎসক বললেন, আপনার কঠিন ব্যামো, আপনার একটাই ওষুধ—গলফ খেলতে হবে। নয় বছর দেশের মানুষের ঘাম ঝরিয়েছেন, এখন নিজের শরীরে ঘাম ঝরাতে হবে। শয্যা থেকে লাফিয়ে উঠে রোগী ট্র্যাকস্যুট পরে নিলেন। গলফ মাঠে যেতে হবে। এবং রাজনীতির খেলার মতো আসল খেলা খেলেও শরীরে ঘাম ঝরাতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোনো রোগী গলফ খেলে গণতন্ত্র রক্ষা করলেন। এরপর গণতন্ত্রের ইতিহাস যখন নতুন করে লেখা হবে, তার শেষ অধ্যায়টির শিরোনাম হবে: ‘গলফ ও গণতন্ত্র’। এই যে গণতন্ত্রের গলফ থেরাপি, এর কথা বঙ্গীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একদিন লোহার অক্ষরে লেখা থাকবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন, তবু নির্বাচন কমিশনের আনুকূল্যে নির্বাচিত হলেন এবং সুড়সুড় করে এসে শপথও নিলেন। এ জন্যই তো পল্লিবন্ধুর ক্ষেত্রে পল্লিকবির গানটি শতভাগ সত্য: ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়। তবে বঙ্গীয় গণতন্ত্রশালায় মানুষ তথা নেতা চেনা মোটেই কষ্টকর নয়।
প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে বিমারিস্থান, রোগশয্যা থেকে গলফের মাঠ, হাসপাতালের খাটিয়া থেকে স্পিকারের কক্ষে গিয়ে সংগোপনে শপথপাঠ, আবার হাসপাতালে প্রত্যাবর্তন, সেখান থেকে অতিথিদের করতালির মধ্যে বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রবেশ—এসব দৃশ্যই গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী পর্যবেক্ষণ করেছে। এক বুড়া রিকশাচালক আমাকে বলেছেন, আমাগো এত বোদাই মনে কইরেন না। আমিও তাঁকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি, কে আপনাদের তা মনে করে তা জানি না, আমি আপনাকে আকসার তা মনে করি না। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু আগে থেকেই আমাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পিপলস রিপাবলিক না হয়ে এটি পরিণত হয়েছে গণতন্ত্রশালায়। গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত দল বা দলগুলো থাকে সরকারে। তারা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী। সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত বিরোধী দলও থাকে সংসদে। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ কোনো দিন শোনেনি: আমরা সরকারেও আছি, বিরোধী দলেও আছি। সরকারের মন্ত্রীও হব, সংসদে সরকারের সমালোচনাও করব। গণতন্ত্রের একটি নতুন সূত্র আবিষ্কৃত হলো। এসব কাণ্ড-কারবারে ওই রিকশাচালকের কথাই সত্য মনে হয়। দেশসুদ্ধ সব মানুষ তো ইয়ে হয়ে যায়নি।
এখনো কিছু মানুষের কিছু আক্কেলবুদ্ধি আছে। সরকারের মন্ত্রিত্বও করব, বিরোধী দলেও থাকব—এই অকল্পনীয় থিওরি বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালাকে একটি গোশালার পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। জাতীয় পার্টির মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি এবং তাদের নেত্রীর ‘বিরোধী দলের নেতা’র মর্যাদাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ৪৩ বছর আগে মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত আদর্শ ধুলায় মিশে গেছে। বাহাত্তরের সংবিধানের এত বড় অপমান এর আগে আর কখনো হয়নি—যত আজেবাজে সংশোধনীই হোক না কেন। যুক্তফ্রন্ট সরকার, জাতীয় সরকার, জাতীয় ঐকমত্যের সরকার—সেসব অন্য জিনিস। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের নেতাদের মন্ত্রিত্ব গ্রহণে কোনো দোষ নেই। তাঁরা ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছেন। কোয়ালিশন সরকারে তাঁরা মন্ত্রী হতেই পারেন। এবং হওয়াটা তাঁদের প্রাপ্য। কিন্তু যেসব নেতা শাহবাগ চত্বরের কঠোর সমালোচক এবং শাপলা চত্বরের আদর্শের অনুসারীই শুধু নন, লাখ লাখ বোতল পানি সরবরাহকারী, তাঁরা মহাজোটে থাকেন কী করে। যিনি বলেছেন, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচনে গেলে মানুষ আমাকে ‘থুতু দেবে’, তিনি প্রক্সি নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়ে নীরবে নৌকার পাটাতনে গিয়ে বসলেন। আঁতাতের মাধ্যমে ‘ভাগাভাগি’ করে দলের এক অংশ মন্ত্রিত্ব করবে, আরেক অংশ বিরোধী দলের সুবিধা ভোগ করবে—একি একটা পুতুল খেলা?
ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে জাতীয় সংসদকে বিরোধী দলহীন করা বাংলাদেশের সংবিধানকেই কলঙ্কিত করা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকেই নিশ্চিহ্ন করা। দলবল করে না, এমন সাধারণ মানুষও এখন মনে করবে, খালেদা জিয়াকে অপমান করতেই জাতীয় পার্টির অসুস্থ নেতার সুস্থ পত্নীকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদটি উপহার দেওয়া হয়েছে। এ যেন তাঁকে বলা: তোমাকে পর পর দুবার বিরোধীদলীয় নেত্রী করতে চেয়েছিলাম। তুমি বেঁকে রইলে। দ্যাখো, তোমার পাপ্য পদটি কাকে দিলাম। আমরা যাকে খুশি যা-খুশি দিই, যার কাছ থেকে যা খুশি ছিনিয়ে নিই। জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রিত্ব ও বিরোধীদলীয় নেতার পদ উপহার দিয়ে শুধু সংবিধানকে অবমাননা নয়, নিবেদিত আওয়ামী লীগের নেতাদেরও ক্ষতি করা হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ করছেন, এমন অনেক নেতাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বঞ্চিত করে উড়ে এসে জুড়ে বসাদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া দলের নেতাদের প্রতি মারাত্মক অবিচার। একটি পুরোনো গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ। প্রচুর তার নেতা। তাঁদের অবহেলা করা তো অপমান করারই নামান্তর। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যারা সরকারের সঙ্গে নেই, তারাও এসব নিয়ে জোরালো প্রশ্ন করছে না। বর্তমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালায় তাদের ভূমিকাটা বোঝা যাচ্ছে না।
দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে, জনগণের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে, তাঁরা দিনের প্রথম অংশে বসে বসে পত্রিকার উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখেন, সন্ধ্যাটি হলে চলে যান চ্যানেলে টক শোয়। চেতনার পক্ষে কথা বলার জন্য টক শোয় নতুন নতুন অজ্ঞাত লোক নিযুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে থাকছেন ছোট রাজনৈতিক দলের খ্যাতিমান নেতারা। চুটিয়ে তাঁরা বক্তব্য দিচ্ছেন। মানুষের কাছে না গিয়ে, মানুষকে সংগঠিত না করে উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখে এবং টক শোয় হড়হড় করে গণতন্ত্র বিষয়ে বক্তৃতা দিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতের অপরাজনীতির সমালোচনা করি, ছোট দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তা চোখের আড়ালে থেকে যায়। একটি বলিষ্ঠ নাগরিক সমাজও তৈরি হয়নি। যা আছে, তা-ও সুবিধাবাদে আক্রান্ত। গণতন্ত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকাটা হওয়ার কথা হেডমাস্টারের মতো। যেমনটি আমরা দেখেছি ভারতে টিএন সেশনের মধ্যে। কিন্তু আমাদের দেশে হেডমাস্টার নয়, দপ্তরির দায়িত্ব পালন করেন। একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। মেয়র নির্বাচনে যাঁরা বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হলেন, তাঁদের সম্পর্কে ফতোয়া দেওয়া হলো সরকারি দলের মেয়রদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তাঁরা দায়িত্ব বুঝে পেলেও পেতে পারেন। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের পর তাঁরা বলতে পারলেন না, বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আছে।
তার আগে নতুন মন্ত্রিপরিষদের শপথ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। দোতলা থেকে প্রতিদিন সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সিঁড়ির গোড়ায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রচারের জন্য কিছু খোশালাপ করা এক কথা আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা অন্য কথা। আমাদের সংবিধানে এমন কিছু বিধান আছে, যা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলে ব্যালট বাক্সের প্রয়োজন হবে না। নির্বাচন কমিশন ও সরকার বলতে পারে, সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে এবার ১৫৩টি আসনে। কোনো কারচুপি হয়নি। সন্ত্রাস হয়নি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তা-ই হয়েছে। কে তা অস্বীকার করবে? অবশ্য সংবিধানে জনপ্রতিনিধিদের জনগণের দ্বারা ‘নির্বাচিত’ হওয়ার কথাও বলা আছে। তার জবাবে আমাদের ইসি ও বিজয়ী প্রার্থীরা বলবেন, ১৫৩টি আসনে যে এক শ ভাগ ভোটারই সমর্থন দেননি, তার প্রমাণ কী? বিতর্কপ্রবণ কেউ বলতে পারে, একজন ভোটারও যে তাঁদের সমর্থন দেননি, তারই বা প্রমাণ কী?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রশালার যে অবস্থা, তাতে মন্ত্রীর সূত্র নয়, সাংবিধানিক সূত্র অনুসারেই তিন লাখ ৬২ হাজার ভোটারের আসনে মাত্র তিনটি ভোট পেয়েও একজন প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন, যদি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান দুই ভোট। এমন দিন হয়তো আসবে, যখন কোনো প্রার্থী পাবেন তাঁর নিজের একটি ভোট, তাঁর স্ত্রী/স্বামীর একটি আর শ্যালক/শ্যালিকারটি। তিন ভোটওয়ালাকে বিজয়ী করতে নির্বাচন কমিশনের আইনগত ও সাংবিধানিক কোনো সমস্যা নেই। বঙ্গীয় গণতন্ত্রশালার অনেকের প্রসঙ্গেই বলা হলো। স্থানের অভাবে বাদ পড়লেন পঞ্চমী নির্বাচনের একক নির্বাচন পর্যবেক্ষকের কথা। একটি সাধারণ নির্বাচনে একজন মাত্র নির্বাচন পর্যবেক্ষকই যথেষ্ট। তিনি যত ভোটকেন্দ্রে গেছেন, তার চেয়ে বেশি গেছেন টিভিকেন্দ্রে। আবারও সেই একই কথা বলতে হয়: ভবের নাট্যশালা বা গণতন্ত্রশালায় মানুষ চেনা দায়। নূর হোসেন বেটা তুই শান্তিতে থাক। তুই যা চেয়েছিলি, সে জিনিসের মুক্তি পেতে বহু দেরি। বরং তোর সময় যার দুহাত ছিল পিঠমোড়া করে বাঁধা, আজ তার দুপায়েও শক্ত করে শিকল বাঁধা। চোখে ঠুলি। মুখে কুলুপ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সংবিধান ব্যাখ্যায় গওহর রিজভীর ভ্রান্তি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী প্রচলিত রাজনীতিক হলে তাঁর লেখার প্রতিক্রিয়া দেখাতাম না। ১২ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত লেখায় তাঁর মন্তব্য: ‘আমাদের সংবিধান সুনির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট এবং সন্দেহ করার কোনো সুযোগ এতে রাখা হয়নি।’ অথচ বাহাত্তর থেকেই এ-সংক্রান্ত বিধানাবলি অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট এবং ধূম্রজাল সৃষ্টি করার মতো উপাদানে ঠাসা। কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণ দিচ্ছি। ২৪ জানুয়ারির ৯০ দিন আগে নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু কী কারণ ঘটলে ৯০ দিন পরও করা যাবে, তা সংবিধানের কোথাও বলা নেই। কোনো কারণে যদি সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা লাভজনক মনে হতো, তাহলে প্রধানমন্ত্রী তা-ই করতেন। আবার গত ২৭ অক্টোবর বা তার পরপরই যদি সাধারণ নির্বাচনটা সারতেন, তাহলে তা-ও সংবিধানসম্মত হতো। নির্বাচন যদি ৫ অক্টোবর হতো, তাহলে ৭২(২) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হতো। কারণ, এটি বলেছে, যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদকে বসতে হবে। ৫ অক্টোবর নির্বাচনের ফল পেলে এর ৩০ দিন শেষ হতো নভেম্বরের গোড়ায়। অথচ ড. রিজভী একমত যে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নবম সংসদ বলবৎ থাকবে। তাহলে নভেম্বরের মধ্যে দশম সংসদ ডাকা আর ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নবম সংসদ বলবৎ থাকার মধ্যে অস্পষ্টতা তিনি কী করে অস্বীকার করবেন? আইনমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে আনিসুল হকের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি মন্ত্রিসভার আগাম শপথ গ্রহণের কারণ হিসেবে ৭২(২)
অনুচ্ছেদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বললেন, এটা রীতি যে সংসদ আহ্বান থেকে বৈঠকে বসার মধ্যে ১৫ দিনের ব্যবধান থাকতে হবে। গতকাল রাষ্ট্রপতি ২৯ জানুয়ারি বৈঠক ডেকেছেন। কিন্তু আইনে ১৫ দিনের কথা বলা নেই। এমনকি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেও সংসদ ডাকা যায়। বিধি ৩ বলেছে, স্বল্পকালের নোটিশেও ডাকা যাবে। এমনকি সদস্যদের ‘আহ্বানপত্র’ও দিতে হবে না। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা তারযোগে অবগত করালেও চলবে। সুতরাং ২৫ জানুয়ারি শপথ নিয়ে চার দিনের নোটিশেও ২৯ জানুয়ারিতে বৈঠক করা যেত। শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীরা নিজ নিজ পদে অনির্দিষ্টকাল ধরে বহাল থাকতেন। ড. রিজভীর কথায়, ‘এ মুহূর্তে এটা সুস্পষ্ট যে একই সঙ্গে দুটি সংসদ—নবম ও দশম সংসদ—বিরাজ করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। নবম সংসদ ২৪ জানুয়ারিতে বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দশম সংসদ ২৫ জানুয়ারি বা এর পরে যথাশীঘ্র সম্ভব কোনো দিনে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আহূত হওয়ার পরই বহাল হবে।’ সত্য হলো, ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নবমই একমাত্র বৈধ সংসদ। দশম সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকারী মন্ত্রীরা আইনিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তিনিও বলেছেন, নবম বলবৎ থাকবে। আবার বলছেন, দশম সংসদ ২৫ জানুয়ারির পর বহাল হবে। আমরাও তো তা-ই বলি। তাহলে তিনি এখন কোন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা?
নবমের, না দশমের প্রধানমন্ত্রীর? একসঙ্গে দুটি সংসদ যদি বিরাজ না-ই করে, তাহলে দশমের ২৮ সাংসদ মন্ত্রী হলেন কীভাবে? রাষ্ট্রপতি কোন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিলেন? ১৯৭৩ সালে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান যেমন ছিল, ২০১৪ সালেও অবিকল তা-ই। তাহলে তিয়াত্তরের সংসদ নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু কেন পদত্যাগ করেছিলেন? কেন সেদিনের রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছিলেন? তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে এ নিয়ে আগে কথা বলেছিলাম। তিনি সেদিন বঙ্গভবনে পদত্যাগী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই ছিলেন। তিয়াত্তরে সংবিধান বা সংসদীয় রীতি যা ছিল, আজও তাই। তাহলে কেন তার পুনরাবৃত্তি ঘটল না। শেখ হাসিনাকে কে সর্বদলীয় সরকার করতে বলেছিল? সংবিধানে এর সমর্থন ছিল না। বরং সংসদে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে জাতীয় পার্টিকে হালুয়ারুটি বিলিয়ে সংসদীয় রীতি তছনছ করা হয়েছে। এখন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনেরা বলছে, এসব ভুলে যান। তর সইবে না। তাই নবম সংসদ থাকতে দশম সংসদের প্রধানমন্ত্রী দেখতে হলো। অথচ সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ বলেছে, সকল পরিস্থিতিতে দেশে একটি সংসদ থাকবে। মাহমুদুর রহমান মান্নার উপস্থাপনায় একটা টক শো হচ্ছিল। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য সেখানে ছিলেন। বললাম, সংসদ ও নির্বাচনসংক্রান্ত আধা ডজনের বেশি অনুচ্ছেদ আছে,
এমনটা বিশ্বের অন্যান্য সংবিধানে দেখা যায় না। একটি অনুচ্ছেদ অন্যটির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করেছে। তখন ওই বিজ্ঞ আইনবিদ আমাকে নাকচ করে বলেছিলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিকল্প। তিনি যেটা খুশি বেছে নেবেন। কোনো সংঘাত নেই। তখন একজন দর্শক প্রশ্ন করেছিলেন, বিকল্পই যদি হবে, তাহলে তো ঐচ্ছিক হিসেবে থাকতে হবে। অথবা দিয়ে বলতে হবে। সংবিধানে সবই যখন ‘শ্যাল’ বা বাধ্যকর হিসেবে চিহ্নিত তখন আপনার যুক্তি টেকে কি? এর উত্তর দেননি তিনি। পরে একান্তে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ’৭২ সালে তারা ব্রিটিশ রেওয়াজকে যথাসম্ভব লিখিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এটা সত্যি হতে পারে। তবে এর ফলে তাঁরা সবই নষ্ট করে দিয়েছেন। একটা গোলকধাঁধা সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধানপ্রণেতারা সম্ভবত বিবেচনায় নেননি যে সব রীতি-রেওয়াজ লিখতে গেলে ঝামেলা কমে না, বাড়ে। হাউস অব কমনস কয়েক বছর ধরে সংবিধান সংস্কার নিয়ে মহাব্যস্ত। সেখানে কয়েক পিপে কালি খরচ হলো কেবল এটা খতিয়ে দেখতে গিয়ে যে শত শত বছর ধরে অনুসরণ করা সব রীতি-রেওয়াজকে গ্রন্থনা করা ঠিক হবে কি হবে না। কতটুকুর লিখিত রূপ দেবেন, কতটুকু দেবেন না। রিজভী যুক্তি দেন যে, ‘যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, শব্দাবলি দ্ব্যর্থহীনভাবে পরিষ্কার করছে যে, নতুন এমপিদের শপথ গ্রহণ এবং নিকট ভবিষ্যতে সম্ভাব্য কোনো তারিখে কার্যভার গ্রহণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।’ এই বাক্য প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরাও পাঠ করেছেন।
তাহলে কি তাঁরাও কার্যকর শপথ নেননি? তাঁদেরও বাস্তব কার্যভার ঘটেনি? ড. রিজভী লিখেছেন, ‘শপথ না হলে সংসদীয় নেতা নির্বাচন হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের সভা ডাকতে অনুরোধ করতে পারেন না।’ এটা তাঁর একটি গুরুতর ভ্রম। এই যুক্তি অসাংবিধানিকও। কারণ, সংবিধানমতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ডাকতে অনুরোধ করা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে যায় না। প্রয়াত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ব্রিটেনের উদাহরণ টেনে বলতেন, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হবেন দুজন আলাদা মানুষ। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২(১)(ব) বিধি বলেছে, ‘সংসদ নেতা অর্থ প্রধানমন্ত্রী বা এমন কোন মন্ত্রী যিনি সংসদের অন্যতম সদস্য এবং সংসদ নেতা রূপে কাজ করবার জন্য প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত।’ এর অর্থ হচ্ছে আমাদের আইনও কল্পনা করেছিল যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা এক ব্যক্তি হবেন না। অথচ ড. রিজভী স্বতঃসিদ্ধ যুক্তি দিচ্ছেন যে, ‘সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যিনি সংসদের নেতা নির্বাচিত হবেন তিনি একই সাথে প্রধানমন্ত্রী পদাধিকারী। তাঁকে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাছাই করতে হবে, তাদের শপথ নেওয়াতে হবে এবং বিলম্ব ছাড়াই রাষ্ট্রের কার্যাবলি শুরু করতে হবে।’ এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের মনমোহন সিং ও ব্রিটেনের ডেভিড ক্যামেরন উভয়ে শুধু প্রধানমন্ত্রী, কেউ সংসদ নেতা নন। সংসদ ও মন্ত্রিসভা গঠন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। নবম সংসদ না থাকলে, এমনকি দশম সংসদ গঠন করা সম্ভব না হলেও শেখ হাসিনাসহ সব মন্ত্রী তাঁদের উত্তরাধিকারীরা শপথ গ্রহণ, মানে কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। তবে গওহর রিজভীর সঙ্গে একমত যখন তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক শুদ্ধতা এবং আইনের শাসন গণতন্ত্র সংহতকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।’ তবে এটা তাঁর স্বীকার না করার অপারগতা অবোধগম্য নয় যে, নবনির্বাচিত সরকার সাংবিধানিক রীতি ও ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেনি। অবিশ্বস্ততা ও শঠতার আশ্রয় নিয়েছে। রিজভী তাঁর নিবন্ধে ‘অপ্রয়োজনীয় সংশয়, নৈরাজ্য ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে সরকারকে জনগণের জরুরি বিষয়গুলিতে কাজ করা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে’ সরাতে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু বলব, আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)

ইসলামের দিশারি বিশ্বনবী (সা.) শান্তির পয়গাম নিয়ে ভূপৃষ্ঠে আগমন করেছেন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে রাসুলুল্লাহ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের মূর্ত প্রতীক ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’। মানবসমাজের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা শান্তির বাণীবাহক ও দূতস্বরূপ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তিনি মানবগোষ্ঠীর প্রতি সত্য প্রচারে নিবিষ্ট হন এবং তাদের সরল, সঠিক ও শান্তির পথে পরিচালিত করেন। যাতে তারা জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে আর ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক সৌভাগ্য লাভ করতে সক্ষম হয়। নবী করিম (সা.)-কে শান্তি, মুক্তি, প্রগতি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য বিশ্ববাসীর রহমত হিসেবে আখ্যায়িত করে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭) মহানবী (সা.)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ ও পদ্ধতি ছিল অনন্য। দল-মত-গোত্রনির্বিশেষে আরবের জাতি-ধর্ম-বর্ণ—সবার মধ্যে শান্তিচুক্তি ও সন্ধি স্থাপনের মধ্য দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে তিনি সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুপম চরিত্র-মাধুর্য ও সত্যনিষ্ঠার কথা বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি যুদ্ধবাজ আরবদের শান্তির পতাকাতলে সমবেত করেন এবং বিবদমান গোত্রগুলো একটি সুসংহত জাতিতে রূপান্তরিত হয়। তিনি ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের শান্তিসংঘ গঠন করে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আর্তের সেবা করা, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা, অত্যাচারিতকে সহযোগিতা করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং গোত্রীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা ছিল শান্তিসংঘের অঙ্গীকার বাণী।
মানুষের কল্যাণে তাঁর গড়া স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সাংগঠনিক রীতিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এভাবে প্রাক্-নবুয়তি জীবনে মক্কায় অবস্থানকালে তিনি একটি সুস্থ সমাজ অবকাঠামোর প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেছেন। যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সমাজজীবনে শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। মহানবী (সা.) হিলফুল ফুজুল বা শান্তিসংঘ গঠনের মাধ্যমে মক্কা থেকে যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচার ও সন্ত্রাসবাদ উচ্ছেদ করে আদর্শ সমাজ গঠনে সচেষ্ট হন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি সেখানে শান্তিপূর্ণ ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় বসবাসরত মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাজমান কলহ-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষপূর্ণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তিনি একটি ইসলামি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প করেন। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের আহ্বান করে একটি বৈঠকে বসে তাঁদের বিশ্বমানবতার ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবশ্যকতা বুঝিয়ে একটি সনদ প্রস্তুত করেন। মদিনায় বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সবাই এ সনদ মেনে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বিশ্বশান্তির অগ্রনায়ক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নাগরিকদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ নানা দিক বিবেচনা করে মদিনার সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন মানবেতিহাসের প্রথম প্রশাসনিক সংবিধান ‘মদিনা সনদ’। মদিনায় স্থায়ীভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মদিনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী, বিশেষ করে ইহুদিদের সঙ্গে তিনি এক শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। এভাবে তিনি মদিনার জীবনে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করে শান্তি স্থাপনের বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)-এর অনবদ্য ভূমিকার অনন্য স্মারক হুদায়বিয়ার সন্ধি। বাহ্যিক পরাজয়মূলক হওয়া সত্ত্বেও কেবল শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তিনি এ সন্ধিতে স্বাক্ষর করেন। বিশ্বশান্তির অগ্রদূতের সাহস, ধৈর্য ও বিচক্ষণতা তখনকার মানুষকে যেমন বিমুগ্ধ করে, তেমনি অনাগত মানুষদের জন্যও শান্তি প্রতিষ্ঠার আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। মহানবী (সা.)-এর শান্তিপূর্ণ ‘মক্কা বিজয়’ মানবেতিহাসের এক চমকপ্রদ অধ্যায়।
কার্যত তিনি বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে, বিনা ধ্বংসে মক্কা জয় করেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে কি মক্কার জীবনে, কি মদিনার জীবনে—সর্বত্রই ষড়যন্ত্র, সংঘাত, যুদ্ধ ও মুনাফেকি মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। শত অত্যাচার-নির্যাতন ও যুদ্ধ করে আজীবন যে জাতি নবী করিম (সা.)-কে সীমাহীন কষ্ট দিয়েছে, সেসব জাতি ও গোত্রকে মক্কা বিজয়ের দিন অতুলনীয় ক্ষমা প্রদর্শন করে এবং তাদের সঙ্গে উদার মনোভাব দেখিয়ে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমা ও মহত্ত্বের দ্বারা মানুষের মন জয় করে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার এমন নজির বিশ্বে দুর্লভ। ৬৩ বছরের মাক্কি ও মাদানি জীবনে তিনি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহ-প্রদত্ত দায়িত্ব সূচারুভাবে সমাপন করে গিয়েছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন যেমন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, তেমনি প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ করেছেন শান্তি রক্ষার জন্য। জীবনে অনেক যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে, অথচ এর কোনোটিই আক্রমণাত্মক যুদ্ধ ছিল না। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) ২৭টি প্রতিরোধমূলক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সাহাবিদের নেতৃত্বে ৫৭টি অভিযান পরিচালনা করেন। ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের পর মহানবী (সা.) বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে সংলাপ, সমঝোতা করে অসংখ্য চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন। এগুলো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রাখে। সমস্যাসংকুল বিশ্বে যেখানে মানুষ মৌলিক মানবিক অধিকারবঞ্চিত, দেশে দেশে হানাহানি ও যুদ্ধবিগ্রহ, ঝরছে নিরীহ মানুষের রক্ত, যেখানে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্য সহ্য করা হচ্ছে না, সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম জীবনাদর্শ এবং সর্বজনীন শিক্ষা অনুসরণই বহুপ্রত্যাশিত শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

লাঞ্ছিত মানবতা, রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হয়ে গেল, তা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা বিতর্ক চলছে। সরকারি দল একে ফাঁকা মাঠে গোল হিসেবে দেখছে এবং সরকার গঠনের কাজটিও শেষ করেছে। বিরোধী দল পুরো নির্বাচন-প্রক্রিয়াটিকেই অবৈধ ঘোষণা করে গতকাল পর্যন্ত আন্দোলন কর্মসূচি জারি রেখেছে। বিদেশি বন্ধুরা যত দ্রুত সম্ভব সবার অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচনের জন্য দুই পক্ষকে তাগিদ দিয়েছে। নাগরিক সমাজের যে অংশ নির্বাচন স্থগিত রাখার কথা বলেছিল, তারা হতাশ এবং যে অংশ সংবিধান রক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল, তারা উল্লসিত। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা একটি সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদের সদস্যরা শপথ নিতে পারেন কি না, সে নিয়ে তর্কযুদ্ধে লিপ্ত। কিন্তু এই আশা-হতাশা এবং কূটতর্কের মধ্যে আরেকটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটল, বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণ; তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, ভাঙচুর, লুটপাট করা হলো। এসবের চেয়েও ন্যক্কারজনক হলো নারীদের ওপর নির্যাতন। অভয়নগরে ঋষিপাড়ায় দুই গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক জানালেন, তাঁর বন্ধুর ১২ বছরের মেয়েও ধর্ষিত হয়েছে দুর্বৃত্তদের হাতে। কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই যে এসব আক্রমণের শিকার হচ্ছে তা-ই নয়, আক্রান্ত হচ্ছে আদিবাসীরাও। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রতিটি নির্বাচনের পরে এবং আগে, প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে সংখ্যালঘুরাই বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। কেন হয়, তা নিয়ে তর্কের শেষ নেই। রাজনৈতিক দলের নেতারা একে অপরকে দায়ী করেন। এনজিওগুলো এসব নির্যাতনকে পুঁজি করে নতুন প্রকল্প খোলে। নাগরিক সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিক তর্কে মাতে।
সমাজতাত্ত্বিকেরা গবেষণার নতুন বিষয় পেয়ে যান। কিন্তু ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা যে প্রতিবার নির্যাতন ও নৃশংসতার শিকার হয়, তা থেকে তাদের উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ নেই সরকার কিংবা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের লালন করছে, সমাজ তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। না হলে গুটি কয়েক দানব কী করে মানবের ও মানবতার ওপর এ ধরনের নিষ্ঠুরতা চালানোর সাহস পায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট তো শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা দেননি, ভোট দিয়েছেন সংখ্যাগুরুরাও। কিন্তু আক্রান্ত হলেন বেছে বেছে সংখ্যালঘুরাই। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের দুটি প্রধান কারণ ভোট ও জমি। জমি দখলের প্রক্রিয়া সব আমলেই চলে। যেখানে যার জোর আছে, সেখানে সে দখল করে নেয়। কিন্তু এবারের কারণ প্রধানত ভোট ও ভোটের রাজনীতি। দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা হিন্দু ও আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, তাঁরা যেন ভোট দিতে না যান। কিন্তু তাঁদের সেই নিষেধাজ্ঞা না শুনে ভোট দেওয়ার কারণেই তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, লুটপাট করা হয়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি ও জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার কারণে সংখ্যালঘুরা মার খেয়েছিলেন। এবারও মার খেলেন তাঁদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভোট দেওয়ার কারণে। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ যুক্তি দেখাবেন, ভোটকেন্দ্রে না গেলে তো হামলার ঘটনা ঘটত না। এঁরাই অবার সভা-সেমিনারে ভোটাধিকার নিয়ে বুলন্দ আওয়াজ তোলেন। সভ্য সমাজে এভাবে ভোটকেন্দ্রে কাউকে যেতে নিষেধ করলে তাঁকে সোজাসুজি কারাগারে যেতে হতো। আমাদের সমাজটি প্রাগৈতিহাসিক, আর রাষ্ট্রটি দুর্বৃত্তের রক্ষক বলেই সবাই সবকিছু বলে ও করে পার পেয়ে যায়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা সুহূদহীন, নিরাপত্তাহীন। এক পক্ষ তাদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করে,
আরেক পক্ষ সেই ভোটব্যাংক ভেঙে দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ভোটব্যাংক ভেঙে দেওয়ার মোক্ষম উপায় ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যখন সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী সেটিকে রাজনৈতিক ঘটনা বলে সাফাই গাইতে সচেষ্ট ছিলেন। আর সে সময়ে যাঁরা বলেছিলেন, বিএনপি-জামায়াত আমল সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপদ নয়, এখন তাঁরা কী বলবেন? বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর কর্মীর জড়িত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর জবাব কী? নির্বাচন শেষ হলেও নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে যে লড়াই, তা শিগগিরই শেষ হবে বলে মনে হয় না। আর এই লড়াই যত তীব্র হবে, ততই সংখ্যালঘুরা আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘ বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে হতাশা ব্যক্ত করে দ্রুত নতুন নির্বাচনের লক্ষ্যে উভয় পক্ষকে সংলাপে বসার আহ্বান জানালেও সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে রুটিনমাফিক উদ্বেগ প্রকাশের বেশি কিছুই তারা করছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী আছেন। কিন্তু তার আগে তাঁকে জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়তে হবে, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। জবাবে খালেদা জিয়া বলেছেন, তাঁর দল কাকে ছাড়বে না ছাড়বে, সেটি অন্য কেউ নির্দেশ করতে পারে না। বিএনপির নেতা তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেওয়া বিবৃতিতে সরকারকে অবৈধ আখ্যায়িত করে আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। এ অবস্থায় শিগগিরই সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নেই বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ। গণজাগরণ মঞ্চ যশোরে রোডমার্চ করেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। কিন্তু যারা দুর্বৃত্ত, যারা সাম্প্রদায়িকতা লালনকারী অপশক্তি, তাদের কাছে এই শান্তির ললিত বাণী কোনো কাজে দেবে না। তাদের জন্য চাই যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছে কি? ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পরও বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশ কটি হামলা হয়। বর্তমান আমলেও একই ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু দায়ী ব্যক্তিরা কেউ শাস্তি পায়নি। ২০০১ সালের ঘটনায় বর্তমান সরকার ২৭টি মামলা করলেও কারও বিচার হয়নি। এই শাস্তিহীনতাই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের সাহস জোগাচ্ছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্যই এটি লজ্জাজনক। এর আগে রামু, নোয়াখালী ও সাতক্ষীরায় যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটল, সরকার বলল সব বিরোধী দলের কাজ। কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি হলো না কেন?
এই যে শত শত বছর ধরে পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বাস করে আসছে, তাদের মধ্যে যে প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, দুর্বৃত্তরা সেটি ছিন্ন করে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাত ফুল চেনে না, রক্ত চেনে। ওদের চোখে ভালোবাসার দ্যুতি নেই, আছে জিঘাংসার আগুন। সেই আগুনে পুড়ছে দেশ। এখনই সময় রুখে দাঁড়াবার। এই বিপন্ন মানুষগুলোর পাশে যেভাবে রাষ্ট্রের দাঁড়ানোর কথা, সেভাবে তা দাঁড়ায়নি। সরকার নিরাপত্তা দেয়নি। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনে জয়ে এতটাই বেসামাল যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার কথা ভাবার ফুরসত পাননি। অভয়নগরের সংখ্যালঘু পাড়ার মানুষগুলো যখন তাঁদের বিপদের কথা টেলিফোনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের জানান, কেউ এগিয়ে আসেননি। তাঁরা এসেছেন দুর্বৃত্তদের হাতে বাড়িঘর লুট ও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর। পাকিস্তান আমল থেকে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে এসেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলা হয় নব্বই সালে। এরশাদের উসকানিতে। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ নামে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর। সেবার বিএনপি-জামায়াত জোট জয়ী হয়েছিল। তাদের রাগ ছিল সংখ্যালঘুরা বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেননি বলে। এবারের রাগ তাদের কথা অগ্রাহ্য করে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেন বলে। এভাবে ভোটের জন্য, জমির জন্য আর কত মার খাবে সংখ্যালঘুরা?
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য হারাচ্ছে বলে যারপরনাই উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন। আমরাও মনে করি, বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কিন্তু এই নাগরিক সমাজেরই একাংশ যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের ব্যাপারে সোচ্চার, কিন্তু বহুধর্মীয় সমাজের ব্যাপারে নীরব থাকে, তখন তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পায়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর কালীগঞ্জের এক আক্রান্ত গ্রামে গেলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক বৃদ্ধ নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাবা, ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নামটি বাদ দিয়ে দাও। তাহলে আমরা পৈতৃক ভিটেবাড়িতে থাকতে পারব। না হলে প্রতিটি নির্বাচনের পর আমাদের এভাবে হামলার শিকার হতে হবে।’ ১২ বছর পর একই আহাজারি শোনা গেল। যারা অভয়নগরের, দিনাজপুরের, সাতক্ষীরার সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা এই সমাজ ও রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তারা অচেনা নয়। আমাদের সমাজেরই লোক। আমরা যদি তাদের নিবৃত্ত করতে না পারি, সরকার যদি শাস্তি দিতে না পারে, তাহলে দুর্বৃত্তদের রাজত্বই কায়েম হবে, যা কখনোই কাম্য নয়। তাই আসুন, সবাই মিলে এই দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করি। সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।



সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

ব্যাংকক অচলের সূচনা

ব্যাংকক অচলের শুভ সূচনা করে সরাকারবিরোধীরা। রাজধানী ব্যাংকক অচল করে দেয়ার আন্দোলনে রাস্তায় নামে থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। ২ ফেব্র“য়ারির আগাম নির্বাচনের আগে সরকারকে উৎখাত করতে এ কর্মসূচি পালন করে তারা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টানা অবরোধের সূচনা হিসেবে এ অভিযাত্রাকে সফল বলা যায়। সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অবরোধ করা ছাড়াও রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়াসহ প্রধান প্রধান মোড়গুলো দখলে রেখেছে বিক্ষোভকারীরা। সরকারকে উৎখাত করে সে জায়গায় একটি অনির্বাচিত ‘গণপরিষদ’ গঠনই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে। সরকার আইন-শৃংখলা রক্ষায় ১৮ হাজার পুলিশ মোতায়েন করলেও বিক্ষোভকারীরা বিনা বাধাতেই কর্মসূচি পালন করছে। কর্তৃপক্ষ থেকে তাদের ওপর কোনো বাধা আসেনি। রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। অনেকে নাচ- গানও করছে। রাজধানী অচল করার কর্মসূচি সফল করতে রাস্তায় নেমেছে হাজারও মানুষ। ‘সরকারকে যেতে হবে, হতে হবে সংস্কার। আমরা একই দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের বার বার দেখতে চাই না’, বলেন এক বিক্ষোভকারী। সরকারবিরোধীরা রাস্তার সাতটি প্রধান সংযোগস্থল বন্ধ করে দিয়েছে। রাজধানী অচলের কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো ঘেরাও করা ছাড়াও সেগুলোর বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ারও পরিকল্পনা আছে তাদের। সেই সঙ্গে প্রায় ১৫০টি স্কুলও বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থাগসুবান এ আন্দোলনকে ‘জনগণের বিপ্লব’ আখ্যা দিয়েছেন। বিপ্লবের মুখে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা বিক্ষোভকারীদের নেতা ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বুধবার বৈঠকে ডেকেছেন। নির্বাচন কমিশনের ভোট পেছানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য এ বৈঠক ডাকেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এক ঊর্ধ্বতন সহযোগী এ কথা জানিয়েছেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা নির্বাচনী ব্যবস্থা বদলানো এবং অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রমের জন্য বর্তমান সরকারের বদলে একটি গণপরিষদ গঠনের দাবিতে এখনও অটল। ‘এ অচলাবস্থার অবসান সহজে হবে না। ব্যাংকক অচলের আন্দোলনে চোখে পড়ার মতো লোক সমাগম হয়েছে।
আর সে কারণে অচলাবস্থা চলতেই থাকবে’ বলে মন্তব্য করেছেন ব্যাংককের এক রাজনীতি বিশ্লেষক। ইংলাক তার ভাই ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার কথায় দেশ পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করছে বিরোধীরা। এ কারণে ইংলাকের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ এবং তার ডাকা ২ ফেব্র“য়ারি নির্বাচন প্রতিহত করতে বিক্ষোভ চলছে। রোববার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থাগসুবান সরকারের সঙ্গে কোনো আপসের সম্ভাবনা নাকচ করলেও গৃহযুদ্ধের হুমকি দেখা দিলে আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাবেন বলে জানান। রোববার সরকারবিরোধী নেতা সুথেপ থাগসুবান বলেছেন, পরাজিত হই কিংবা জয়লাভ করি আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা কিংবা সমঝোতা করব না। প্রধানমন্ত্রী ইংলাককে পদত্যাগ করতেই হবে। এদিকে ইংলাক সিনাওয়াত্রার সমর্থকরা বিক্ষোভ করছেন ব্যাংককের প্রতিবেশী প্রদেশ উদন থানিতে। সেখানে হাজার হাজার রেড শার্ট আর্মি সমবেত হয়েছেন। এ অবস্থায় দেশটিতে গৃহযুদ্ধের আশংকা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, টেলিকম খাতে দুর্নীতির অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত থাকসিন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তবে তার দল এখন পর্যন্ত দেশটিতে অনুষ্ঠিত মোট চারটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। আগামী ২ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনের অংশ নেবে দলটি। তবে থাইল্যান্ডের প্রধান বিরোধী দল ওই নির্বাচন বয়কটের ডাক দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা নভেম্বর থেকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত প্রায় আটজন নিহত হয়েছেন। বিবিসি, রয়টার্স।

ফরাসি ফার্স্টলেডি হাসপাতালে

প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের গোপন প্রণয়ের খবর জানার পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ফ্রান্সের ফার্স্টলেডি ভেলিরিয়া ত্রিয়াবেলা। রোববার তার কার্যালয় থেকে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এ খবরের সত্যতা স্বীকার করা হয়। ফার্স্টলেডির চিফ অব স্টাফ জানান, প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের সঙ্গে একত্রে বসবাসকারী সাংবাদিক ত্রিয়াবেলা (৪৮) যাকে ফ্রান্সের ফার্স্টলেডি হিসেবে মনে করা হয়, তিনি গত শুক্রবার থেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্রাম এবং কয়েকটি পরীক্ষার জন্য তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সোমবার তার হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার কথা রয়েছে। গত শুক্রবার ফ্রান্সের বিনোদনবিষয়ক সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড ক্লোজার চিরকুমার ওঁলাদ (৫৯) ও অভিনেত্রী জুলি গায়েতের (৪১) বেশ কিছু অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ করে। ওই অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের প্রেম চলছে বলেও পত্রিকাটি জানায়। জুলি গায়েত ফ্রান্সের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের নামকরা অভিনেত্রী। ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ওঁলাদের নির্বাচনী প্রচারণার এক বিজ্ঞাপনেও মডেল ছিলেন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, সরকারি বাসভবন এলিসি প্রাসাদের কাছেই একটি বাড়িতে মিস গায়েতের সঙ্গে রাতযাপন করেন ওঁলাদ।
পত্রিকায় প্রকাশিত অন্তরঙ্গ ছবিতে দু’জনকে একসঙ্গে সেখানে যেতেও দেখা গেছে। এ সময় ওঁলাদ একটি হেলমেট পরেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ সরাসরি ব্যাপারটি অস্বীকার করেননি। তবে তিনি এক ব্যক্তিগত বিবৃতিতে জানান, দেশের সব নাগরিকের মতো তারও কিছু ব্যক্তিগত বিষয় রয়েছে। সেগুলো গোপন রাখার অধিকারও তার আছে। ওই পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছেন বলেও জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। দেশটির রক্ষণশীল বিরোধীদলীয় নেতা জাঁ ফ্রাঁসোয়া কোপ বলেন, এই ‘নাটক’ বহির্বিশ্বে ফ্রান্সের ইমেজ নষ্ট করে দিয়েছে। সম্প্রতি এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এই প্রজন্মের কাছে ওঁলাদে সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। মাত্র ২৫ শতাংশ লোক তাকে বিশ্বাস করে। ফ্রান্সের গণমাধ্যমগুলোকে গোপনীয়তা আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় বড় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন বিষয়গুলো ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। তবে জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ফ্রান্সের লোকজন রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশের বিপক্ষে। গত রোববার প্রকাশিত ওই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন মনে করেন, জুলি গায়েতের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের সম্পর্ক তার ব্যক্তিগত বিষয়।