Monday, July 13, 2015

বর্বরতা by ওয়েছ খছরু

মধ্যযুগকেও হার মানিয়েছে এ বর্বরতা। লোহার রড দিয়ে পেটানো, এরপর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারার দৃশ্য ভিডিও ফুটেজে দেখে গা শিহরে ওঠে। শিশুটিকে বেঁধে নির্যাতনের এ দৃশ্য দেখে কেঁপে উঠে মানবিক হৃদয়। কিন্তু পাষাণ সেই নির্যাতনকারীদের মন গলেনি। চোর অপবাদে নির্যাতনের একপর্যায়ে জীবন প্রদীপ নিভে যায় ১৩ বছরের শিশু রাজনের। এর আগে শত আকুতিও মন গলাতে পারেনি পাষণ্ডদের। আমাকে আর মারবেন না, মরে যাবো। হাড়-গুড় ভেঙে গেছে। পুলিশের কাছে দিয়ে দেন। রাজনের এমন আকুতিও তাদের দমাতে পারেনি। মৃত্যুর আগে পানি খেতে চেয়েছিল রাজন। তাও দেয়া হয়নি। ২৮ মিনিটের ভিডিওচিত্র যারাই দেখেছেন কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। রাজনের শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে নির্যাতন করা হয়নি। ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, নির্যাতন সইতে না পেরে রাজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্তব্ধ হয়ে যায় তার শরীর। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তখনই নির্যাতনকারীরা মাইক্রোবাসে তুলে লাশ গুম করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু স্থানীয় লোকজন ঘেরাও করে মাইক্রোবাসসহ লাশ আটক করেন। ঘটনার ৫ দিনের মাথায় গতকাল রাজনকে নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পায়। রাজনের পুরো নাম সামিউল ইসলাম রাজন। বয়স ১৩। বাড়ি সিলেট শহরতলির কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে। পিতার নাম আজিজুর রহমান। তিনি পেশায় মাইক্রোচালক। আর মা লুবনা বেগম গৃহিণী। ঘাতকদের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে রাজন জানিয়েছে, তারা দুই ভাই। সে বড়। তার ছোট আরও এক ভাই রয়েছে। সিলেট শহরতলির অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে সে। অভাব-অনটনের সংসারে আর পড়ালেখা করতে পারেনি। পিতাকে সাহায্য করতে সবজি ব্যবসায় নামে। এ কারণে রাজনকে রমজানে খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হতে হতো। ফিরতো বিকালে। রাজনের পারিবারিক সূত্র জানায়, বুধবার খুব ভোরে রাজন বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর সারাদিন সে বাড়ি ফিরেনি। কোন খবরও মিলেনি। রাতে থানায় গিয়ে তার লাশ পাওয়া যায়। দুপুরের দিকে জালালাবাদ থানা পুলিশ রাজনের লাশ উদ্ধার করে। রাত পর্যন্ত লাশটি অজ্ঞাত হিসেবেই ছিল। পরে থানায় জিডি করতে গিয়ে রাজনের পিতা আজিজুর রহমান লাশ শনাক্ত করেন। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, ভোরের দিকে কয়েকজন কিশোর স্থানীয় শেখপাড়া গ্রাম থেকে একটি ভ্যানগাড়ি চুরি করে। আর চুরি করা ভ্যান গাড়িটি নিয়ে যাওয়ার সময় পাহারাদার তাদের ধাওয়া করে। এ সময় ভ্যান গাড়ি রেখে চোররা পালিয়ে যায়। আর ওই সময়ই এ পথ দিয়ে যাচ্ছিল রাজন। পাহারাদার ময়না মিয়া বড়গাঁও এলাকার সুন্দর আলী ও গাজী মিয়া লালই মার্কেটের সামনে থেকে রাজনকে চোর সন্দেহে আটক করে। এরপর ময়না মিয়া বিষয়টি ভ্যান গাড়ির মালিক শেখপাড়া গ্রামের মুহিত আলম, তার ভাই কামরুল ইসলামকে জানায়। খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। দেখেন রাজনকে আটকে রেখেছে পাহারাদার ময়না মিয়া। রাজনকে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে মুহিত ও কামরুল। তারা মারধর শুরু করেন রাজনকে। এরপর তারা রাজনকে নিয়ে যায় কুমারগাঁও বাস্টস্ট্যান্ডের একটি বন্ধ থাকা দোকানের সামনে। সেখানে নিয়ে তারা টানা তিন ঘণ্টা নির্যাতন চালায় রাজনের ওপর। নির্যাতনের একপর্যায়ে রাজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রাজনের মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। আর ঘটনা ধামাচাপা দিতে মুহিত ও কামরুল নিজেদের রক্ষা করতে লাশ গুমের চেষ্টা চালায়। দুপুর তখন ১২টা। রাজনের মৃতদেহ পড়েছিল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায়। এ সময় রাজনের লাশ হাসপাতালে নেয়ার জন্য একটি মাইক্রোবাসে (নং-ঢাকা মেট্রো-চ-৫৪০৫১৬) তুলে মুহিব ও কামরুল। উপস্থিত অনেকেই তখন বুঝেছিলেন লাশটি তারা হাসপাতালেই নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লাশ গাড়িতে তোলে টুকেরবাজার থেকে গ্রামের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। স্থানীয় লোকজন ধারণা করেন, রাজনের লাশ গুমের জন্যই গ্রামের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় তারা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তারা ধাওয়া করেন। লাশবাহী গাড়ি আটক করেন। সঙ্গে মুহিত আলমকেও আটকে রাখে। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছেন জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন। তিনি লাশ উদ্ধার এবং মুহিতকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। এদিকে, থানায় গিয়ে মুহিত মৃত রাজনকে চেনেন না বলে জানায়। এ কারণে পুলিশ রাজনের লাশটিকে অজ্ঞাত হিসেবেই চিহ্নিত করে। আর ওদিকে বিকাল পর্যন্ত রাজনের কোন খোঁজ না পেয়ে রাজনের পিতা আজিজুর রহমান ছুটে যান জালালাবাদ থানায়। সেখানে জিডি করতে গিয়ে দেখেন লাশ পড়ে আছে। কেঁদে ওঠেন অঝোরে। এরপর খুলতে থাকে রহস্য।
আধাঘণ্টা ধরে নির্যাতনের সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন নির্যাতনকারীরা
ওসি আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, রাজনকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। পুলিশ পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ঘটনায় মুহিত তার ভাই কামরুল ছাড়াও পাহারাদার ময়না মিয়া ও তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলীকে আসামি করা হয়েছে। আর মামলার বাদী পুলিশ নিজেই। গ্রেপ্তারকৃত মুহিতের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আজ সিলেটের আদালতে রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান ওসি। গ্রেপ্তারকৃত মুহিত আলম জালালাবাদ থানার শেখপাড়া গ্রামের মৃত আবদুল মানিকের পুত্র। সে স্থানীয় কুমারগাঁও তেমুখী পয়েন্টে মা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক। তার ভাই কামরুল ইসলাম সৌদি প্রবাসী।
১৩ বছরের শিশু রাজনকে চোর অপবাদে নির্যাতন করছে পাষণ্ডরা
২৮ মিনিটের ভিডিও: রাজনকে নির্যাতনের ভিডিও চিত্রটি এখন সিলেটের আলোচিত ঘটনা। ভিডিওচিত্র যেই দেখেছেন সেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। ১৩ বছরের শিশু বাঁচার জন্য প্রাণভিক্ষা চাইছে আর কয়েকজন যুবক তাকে বিভিন্ন স্টাইলে নির্যাতন করছে। উল্লাস করছে। নির্যাতনে শিশু রাজন যখন চিৎকার করছিল তখন উচ্চস্বরে হাসছিল ঘাতকরা। তাদের একজনই ওই ভিডিওচিত্র ধারণ করে। ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে টুকেরবাজার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন একটি দোকানের সামনের পিলারে পেছন থেকে হাত বেঁধে রাখা হয়েছে রাজনকে। তার সামনে লোহার রড ও পাইপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে কখনও একজন, কখনও তিন যুবক। তারা হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে রাজনকে পেটাচ্ছে। এ সময় বাঁচার জন্য বারবার আকুতি জানায়। বলে, ‘আমাকে পুলিশে দিয়ে দিন, আর মারবেন না। মরে যাবো।’ একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজন। এর পরও তাকে নির্যাতন করা হয়। মৃত্যুর আগে রাজন বারবার পানি পানি বলে চিৎকার করে।
এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ: রাজন হত্যার পর এলাকার সর্বত্র বিরাজ করছে ক্ষোভ। বাদে আলী বাইয়ারপাড়া গ্রামবাসী হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি তেমুখী পয়েন্ট থেকে শুরু করে জালালাবাদ থানার সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে এলাকাবাসী বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বিক্ষুব্ধ জনতা অবিলম্বে রাজনের খুনিদের গ্রেপ্তার এবং ফাঁসির দাবি জানান। পরে নিহতের পিতা বাদে আলী বাইয়ারপাড়া গ্রামের শেখ মো. আজিজুর রহমান ৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত করে জালালাবাদ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেন।

শিশু রাজন হত্যায় মুহিতের ৫ দিনের রিমান্ড

সিলেট নগরে সবজিবিক্রেতা শিশু শেখ মো. সামিউল আলম ওরফে রাজন (১৩) হত্যা মামলার আসামি মুহিত আলমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মহানগর হাকিম আদালত (এমএম-২) এর বিচারক ফারহানা ইয়াসমিন সোমবার এ আদেশ দেন।
মুহিতকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগরের জালালাবাদ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন। শুনানি শেষে মুহিতের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরেক আসামি ইসমাঈল হোসেন আবলুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার ভোরে এসএমপির জালালাবাদ থানা এলাকার লামাকাজি মিরেরগাঁও থেকে ইসমাঈলকে গ্রেফতার করা হয়। ইসমাইল শিশু রাজন হত্যার প্রধান আসামি মুহিত আলমের তালতো ভাই। জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন মানবকণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
অপরদিকে পলাতক আসামিদের ধরতে ও মামলার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পুলিশের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওসি আকতার জানান, এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে প্রধান করে চার সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়।
রাজন হত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠছেন এলাকাবাসী। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে তারা প্রশাসনকে সময়ও বেঁধে দিয়েছেন। না হলে গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন এলাকাবাসী।
গত রোববার রাতে রাজনের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে এলাকাবাসী বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ১৫-২০টি গ্রামের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
নির্যাতনকারী ঘাতকদের ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দেন স্থানীয় এলাকাবাসী। রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত চলা বৈঠক শেষে স্থানীয় এলাকাবাসী এ আল্টিমেটাম দেন।
সিলেট নগরীর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের পাশে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে রাজনের বাড়ির উঠোনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের খবর পেয়ে এসএমপির জালালাবাদ থানার ওসি আকতার হোসেন সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি রাজন হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতার আশ্বাস  দেন।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে রাজনকে চুরির অপবাদ দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে রাজন মারা গেলে তার লাশ গুম করার চেষ্টাকালে পুলিশের হাতে আটক হয় মুহিত আলম।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মহানগরের জালালাবাদ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলায় আটক মুহিত আলম (৩২) ও তার ভাই সৌদি প্রবাসী কামরুল ইসলাম (২৪), তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী (৩৪) ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে। সৌদি প্রবাসী কামরুল ইসলাম যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সে জন্য পুলিশ ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়েছে।

পদপিষ্ট হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু- এই নির্দয় দায়িত্বহীনতা বন্ধ করুন

জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে ২৭ জন অভাবী মানুষের মৃত্যুর মর্মান্তিকতা ও নির্দয় দায়িত্বজ্ঞানহীনতা মেনে নেওয়া যায় না। ইসলামের বিধান অনুসারে জাকাত দরিদ্রের অধিকার; সম্পদবানের জন্য তা বাধ্যবাধকতা। তাই জাকাত দিতে গিয়ে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলা তো দূরের কথা, অসম্মান ও হয়রানিও অনুচিত। ফি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে জাকাতঘটিত কারণে গণমৃত্যু বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া তাই জরুরি।
ময়মনসিংহ শহরে জাকাতের কাপড় নেওয়ার হুড়োহুড়িতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের ২২ জনই নারী এবং বাকি পাঁচজন কোলের শিশু। এক ধনীর দানবিলাসের খেসারত কি এই ২৭ প্রাণের অপচয়? নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের ঈদ কে কেড়ে নিল? জাকাত দেওয়ার চেয়ে এলাকায় ‘দাতা’ হিসেবে নাম করার ইচ্ছা কি এর জন্য দায়ী নয়?
ইসলামি দানের শর্ত হলো যাতে ডান হাতের দান বাঁ হাতও জানতে না পারে। অর্থাৎ জাকাতগ্রহীতাকে খাটো না করেই তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। এ জন্য ডেকে আনার চেয়ে তাদের কাছে গিয়ে জাকাতের অর্থ বা সামগ্রী দেওয়াই শ্রেয়। তাহলে পদদলিত হয়ে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় পুরোটাই লোপ পেত। দ্বিতীয়ত, যেখানে প্রতিবছর জাকাত নিতে গিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটছে, সেখানে ধনশালী ব্যক্তিদের উচিত সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, যেখানে আগাম ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঘটানো হচ্ছে, সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকেনি কেন?
জাকাতসহ বড় আকারের দান-খয়রাতের জমায়েতে প্রায়ই গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পদপিষ্ট হয়ে ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে ১৩ জন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তিন শিশু, ১৯৮৭ সালে চারজন, ১৯৮৯ সালে চাঁদপুরে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটে ১৯৯০ সালে, চট্টগ্রামে নিহত হন ৩৫ জন। দরিদ্রদের পায়ের নিচে দরিদ্রদের এমন মৃত্যু দারিদ্র্যের প্রতি মারাত্মক উপহাস নয় কি?
শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে দরিদ্রদের প্রাপ্য তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। এ ধরনের ঘটনাকে সজ্ঞান অবহেলা হিসেবে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার হোক।

কাঁটাবিদ্ধ আশরাফ

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একজন সৎ রাজনীতিক। তার বিরুদ্ধে কখনও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। তার আকস্মিক প্রস্থান বিদেশী কূটনীতিকদেরও অবাক করেছে। তাকে অপসারণ করার পরপরই ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এবং বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানা গেছে।
তার প্রস্তানকে কেবল আওয়ামী লীগের দিক থেকে দেখা হলেও এই ঘটনার আরও বড় তাৎপর্য রয়েছে। ২০১৯ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রস্তুতির সঙ্গেও এর কোন যোগসূত্র থাকতে পারে কিনা তা অনেকে খতিয়ে দেখছেন। আপাতত অনেকে তার কথিত নিষ্ক্রিয়তা, অফিস না করা এবং ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রভাবশালী অংশের ঈর্ষা এবং তাদের তরফে কানভারি করার মতো বিষয় মিডিয়ায় বেশি আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক এই পরিবর্তনকে এরকম কোন সাধারণ হিসেব নিকেষ থেকে দেখছেন না। অনেকের মতে বিরোধী দল ও মিডিয়া মোকাবিলায় এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে সরকার প্রধানের একজন নিকটাত্মীয়কে আনা হয়েছে। আর ভবিষ্যতে বিরোধী দল মোকাবিলায় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অপেক্ষাকৃত একজন কট্টরপন্থিকে আনার সম্ভাবনা থাকবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সৈয়দ অশরাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণকে উৎসাহিত করেননি। বরং এটাই জানা যায় যে, জাতিসংঘের দূত জর্জ ফারনান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠককালে তিনি বিএনপির সঙ্গে চারটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। এক. বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মুক্তি, দুই. মামলা প্রত্যাহার, তিন. অফিস খুলে দেওয়া ও চার. সভা-সমাবেশের ওপর থেকে বাধানিষেধ প্রত্যাহার করা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তারানকোর মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধি দল বৈঠকে বসেছিল। আলোচনার শেষপর্যায়ে ওই চারটি বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়। দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, হঠাৎ মোবাইলে একটি কল আসে। আর তার পরই সমঝোতা প্রয়াস ভণ্ডুল হয়। তখন তাকে ম্লান হতে দেখা গিয়েছিল। তাকে বিব্রত মনে হয়েছিল। যদিও তিনি নিজে কখনও এ বিষয়ে কোন বক্তব্য দেননি।
সৈয়দ আশরাফের একটি দীর্ঘ সময় কেটেছে বৃটেনে। সেখানকার লেবার দলীয় রাজনীতিতে বেশ ভালও অবস্থানে দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকারও সুযোগ ঘটেছে। তিনি তার এলাকায় কম যেতেন, সচিবালয়ের তদবির থেকে নিজকে রক্ষা করতে সর্বদা সতর্ক থাকতেন। কারণ তিনি জানতেন তদবিরকারীদের শুনতে গেলেই তাকে অন্যায় পথে হাঁটতে হবে। কারণ আইন মেনে কোন তদবির হয় না। গত সপ্তাহে তিনি তাঁর নিজ শহর কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলেন। স্থানীয় উন্নয়নে তিনি ছোটখাটো প্রকল্পে জড়াননি, বড় প্রকল্পের মধ্যে তাঁর প্রয়াত পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামে একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, কয়েক কিমি. দীর্ঘ একটি নদ খনন, কিশোরগঞ্জকে তিলোত্তমা শহরে রুপান্তর করেছেন। ওই শহরের অলিগলিও সোডিয়াম আলোয় উদ্ভাসিত। কিন্তু তবু তিনি সেখানকার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোর উপরের দিকের নেতা-কর্মী, যারা মূলত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন, তাঁদের অনেকেই তার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। সৈয়দ আশরাফকে অপসারণের  পরে কিশোরগঞ্জের সাধারণ মানুষ ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখালেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা নীরবতা পালন করেছেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের কি বলার আছে? অথচ স্থানীয় বিএনপি নেতারা সৎ মানুষের প্রস্থান হিসেবে আক্ষেপ করেছেন।  
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিস্মিত যে, এত মন্ত্রণালয় থাকতে তার হাতে কোন মন্ত্রণালয়ের ভার দেওয়াই সম্ভব হলো না। মন্ত্রী হয়ে নির্লোভ থাকা, সাধারণ জীবনযাপন করা, বাড়িগাড়ি না করা, স্বজনপ্রীতি না করা, বিলাসী জীবনে অভ্যন্ত না হওয়ার পুরস্কার (!) জুটেছে তার। সৈয়দ আশরাফকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠান, তারা প্রায় এক ঘণ্টা একান্তে কথাও বলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার দাবি, এ সময় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাব তিনি মেনে নেন। তিনি দপ্তরবিহীন মন্ত্রী থাকতে রাজি হন, এর কারণটা তিনি পরিষ্কার করেছেন। বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রতি তিনি অনুগত। মুজিব পরিবারের প্রতি তিনি তার পিতার মতোই রক্ত ঋণে আবদ্ধ। দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বেও তিনি থাকবেন। আগামী ডিসেম্বরে ওই কাউন্সিল হওয়ার কথা। তবে তার পরেও তাঁকে এই পদে দেখা যাবে বলে অনেকেই মনে করেন না।
গত মঙ্গলবার একনেকের সভায় অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নিতান্ত একটি উপলক্ষ মাত্র। দলের ভেতরের অনেক প্রভাবশালীরই অসুবিধা হচ্ছিল তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে রাখা। শোনা যায়, পরিবারের কাউকে ওই মন্ত্রণালয়ে রাখাটা অপরিহার্য মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এ ধরনের বিষয় মিডিয়ায় প্রচার পায়নি। বরং তাঁর অফিস কামাই বেশ প্রচার চালানো হচ্ছে যাতে তাকে অপসারণের সিদ্ধান্তটি অধিকতর রাজনৈতিক বৈধতা লাভ করে। বলা হচ্ছে, বেশ কিছুদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। মন্ত্রণালয়ে না যাওয়া, সরকার ও দলের অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যে যোগ দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে সরকার ও দলের ভেতর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া সরকার ও দলের নিচু থেকে উঁচু স্তরের নেতাদের অনেকেই তার সমালোচনা করতেন, এর প্রধান কারণ এই নয় যে তার কারণে দল দুর্বল হয়ে পড়ছিল। বরং তার উপস্থিতির কারণে অনেকের অনেক কিছু করার ব্যাপারে সমস্যা হচ্ছিল। এমনও নয় যে, তিনি বাধা দিতেন। কিন্তু পদে থাকার কারণে বিষয়টি তার জানা থাকত, এটাই ছিল তাদের অপছন্দের।
একনেক সভায় যে প্রকল্পটি পাসের সময় তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, সেই প্রকল্পটির আওতায় সংসদ সদস্যরা আশা করেছিলেন যে, তাদের প্রত্যেকের হাতে ২৫ কোটি টাকা নগদ তুলে দেয়া হবে। কিন্তু তিনি এমন ভূমিকা রেখেছিলেন যাতে এখন আর কেউ নগদ অর্থ পাবেন না।
একজন সংসদ সদস্য বললেন, তিনি এক মাসে ১৭ দিন অফিস কামাই করেছেন। তিনি মন্ত্রণালয়ে যান না। কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ সময়মতো হয়নি কিংবা কাজে দুর্নীতি বা অনিয়ম হয়েছে, এমন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল না। যদিও দল থেকে নেয়া তার একজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়ম-সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে বিশেষ করে বলা হয়েছে তার এপিএস এর একাত্তরের ভূমিকা ভাল ছিল না। কিন্তু এসব অভিযোগ কোনটিই নতুন নয়, তার মন্ত্রিত্বের মতোই পুরনো। তাহলে আকস্মিকভাবে তার উপরে এই বিপর্যয় নেমে এল কেন?
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সব অমলে অনিয়মর আখড়া হিসেবে পরিচিত। এটিসহ ঢাকা ওয়াসা এবং এরকম বহু আকর্ষণীয় সংস্থায় শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলিতে তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন এর ময়লা তিনি চাইলেও ঝেড়ে ফেলতে পারবেন না। তবে ওই সব পদে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে মতবিরোধ সৃষ্টি  হয়। এর অনেকগুলোই হয়েছে তার অমতে।
বেগম খালেদা জিয়ার অবরোধের পরে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান ছিল একটি বিরাট রাজনৈতিক চাল। এখন শোনা যাচ্ছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে ওই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এবং তা পদ্ধতিগতভাবে সঠিক না হওয়ায় আগের প্রস্তাব ফেরত এনে নতুন করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়। জেলা পরিষদে সরকারের মনোনীত প্রশাসক দেয়ার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। তার মত ছিল, জেলা পরিষদে নির্বাচন করা অথবা কিছুই না করা। এ ছাড়া গত আড়াই বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ১৪ জন প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে তার মত নেয়া হয়নি। এ রকম আরও কিছু পদ্ধতিগত ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এসবের কোনটিই তাই বলে আকস্মিক ছিল না।
‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ নিয়ে বেপরোয়া দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর প্রকল্প পরিচালক প্রশান্ত কুমার কর্মকার তাকে বাইপাস করার নজির স্থাপন করেন। তিনি রুষ্ট হন। কষ্ট পান। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি তিনি। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করেন তিনি। সমপ্রতি গণমাধ্যমে প্রশান্ত কুমারের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন বেরুনোর পর তিনি তদন্ত আশা করেছিলেন। কিন্তু তা না হওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এই প্রকল্প বিষয়ক ফাইলে সই দেয়া বন্ধ করে দিলেও তিনি লক্ষ্য করেন সবই আগের মতো চলছে।
এর আগে নবম সংসদে প্রথম সংসদ সদস্যদের হাতে সরাসরি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। দল চেয়েছিল এটা সরকারি দলই পাবে। তখন তিনি এর বিরোধিতা করেন। তার কারণেই নগদে বিলির বিধান লাটে ওঠে। একনেকের সভায় ৬ হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্প পাস হল, তাতে সরকারি দলের অনেকেই নাখোশ। কারণ কেউ নগদ টাকা পাবেন না, প্রকল্প পাস হলে যথানিয়মে টাকা যাবে।
অনেকের মতে, তাকে সরানোর প্রক্রিয়া অনেক পুরনো, শুধু সময়টাই এখন বেছে নেয়া হয়েছে। ভিন্ন দল থেকে একজনকে প্রতিমন্ত্রী করাটাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ এর ফলে তাকে পাশ কাটানোর প্রবণতা বিরাট একটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমলাতন্ত্র ছড়ি ঘোরাতে পেরেছে।
গত শনিবার রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে ঢাকাস্থ হোসেনপুর সমিতির ইফতার মাহফিলে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত।’
এক এগারোতে কোণঠাসা থাকা অংশ যারা বিলম্বে হলেও ফিরে এসেছেন, তাদের কারো চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টির জন্য তাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টায় ছিল। শুধু একটি বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার জন্য এত বড় ঘটনা ঘটেনি।
অপসারিত হওয়ার পরে সৈয়দ আশরাফ প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে নজির স্থাপন করেছেন। অভিমান লুকিয়ে তিনি হেসেছেন। তার হাসি মলিন হয়নি। তিনি কোন বিরূপ মনোভাবের পরিচয় দেননি। দপ্তরবিহীন হওয়ার দুই ঘণ্টা পর যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ও আশরাফের সম্পর্ক অনেক গভীর ও বিশ্বস্ততার এটা কেউ অস্বীকার করছেন না। দলের নেত্রীর প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন তেমনি তার লন্ডন প্রবাসী ছোট বোন শেখ রেহানা স্বাভাবিকভাবেই সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে ফোনে কথা বলা বজায় রাখছেন।
অন্য সবার চেয়ে আলাদা থেকে তিনি সততার সঙ্গে মন্ত্রিত্ব করে চলছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন এক আরেক ভুবন। হঠাৎ সেখানে বিরাট ছন্দপতন হলো। তিনি কাঁটাবিদ্ধ হলেন। একজন সৎ মানুষ সততা ধরে রাখতে গিয়ে আপাতত শরবিদ্ধ হলেন। আর যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ তারা প্রত্যেকে বহাল তবিয়তে আছেন। সৈয়দ আশরাফকে দেখে সাধারণ মানুষ বলাবলি করছেন, সত্যি ভাল মানুষের ভাত নেই।

ফখরুদ্দিনের অস্থির অপেক্ষা by কাফি কামাল

ওয়ান ইলেভেন। বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বাঁক পরিবর্তনের দিন। হঠাৎ আসা ঝড়ে হতচকিত হয়ে পড়ে বিএনপি। যে ধাক্কা এখনও সামলাতে পারেনি দলটি। ভুল ছিল কোথায়? কেনইবা বাড়ানো হয়েছিল বিচারপতিদের বয়স। পঞ্চম সংশোধনী মামলায় কৌশলের খেলায় কোথায় হেরে গেছে বিএনপি। অনিবার্য ক্রান্তিকালে দাঁড়ানো বিএনপির ভেতরে-বাইরে উচ্চারিত নানা প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছেন আমাদের রাজনৈতিক সংবাদদাতা কাফি কামাল। তার লেখা ‘বিএনপির ময়নাতদন্ত’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ছাপা হলো তৃতীয় পর্ব-
এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের পর সর্বসম্মতভাবে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন। সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক নানা হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনে গঠিত ১১ দিনের সংসদে বিএনপিই প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন বিরোধী জোটের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বাসভবনে উভয় পক্ষের মধ্যে একটা আপোষ হয়েছিল, সেই সূত্রেই ওই বিল পাস হয়। অনেকের মতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সংলাপ করেনি কখনও। তারা বলেন, সংলাপ কখনও সমাধান দেয়নি। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনী ছিল পর্দার আড়ালের সংলাপ ও বোঝাপড়ার ফল।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তিন মাসের মধ্যেই বিদায় নেন। একইভাবে ২০০১ সালে নির্বাচনের পর বিদায় নেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৬৭ করাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নতুন জটিলতা। এ ঘটনায় বেঁকে বসে আওয়ামী লীগসহ অনেক রাজনৈতিক দল। তারা অভিযোগ করে, প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার জন্যই বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়। শুরু হয় জোরেশোরে এসবের প্রচার ও আন্দোলন।
উইকিলিকস প্রকাশিত ২০০৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ঢাকার সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস পাঠানো তারবার্তায় উল্লেখ করেছেন, খোদ শেখ হাসিনাই জানিয়েছেন, বিচারপতি কেএম হাসান বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার পিতার হত্যাকাণ্ডের দুই দণ্ডিতের আত্মীয়। হাসানকে মানতে না পারার ক্ষেত্রে সেটাই ছিল ‘প্রকৃত, খুবই আবেগপূর্ণ’ কারণ। আর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো না আওয়ামী লীগ। এখানে বিএনপির ভুল ছিল আওয়ামী লীগের বিরোধের আসল কারণ অনুসন্ধান না করা ও বিকল্প চিন্তা না করে প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। এরকম একটি নাজুক সময়ে বিএনপি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পদে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত কোন জ্যেষ্ঠ ও বিশেষজ্ঞ ধরনের কাউকে নিয়োগ দেয়নি। বরং মোখলেসুর রহমান চৌধুরীকে নিয়োগ দিয়ে আরও কাঁচা কাজ করেছিল। ড. আকবর আলি খানসহ কয়েকজন বিশিষ্ট উপদেষ্টা  তার বিরুদ্ধে ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তির’ অভিযোগ এনে পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়। অথচ বিএনপি এধরনের একটি সম্ভাব্য অবস্থার উদ্ভব ঘটার কথা কল্পনাই করতে পারেনি।
সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদত্যাগ করে এবং ১২ই জানুয়ারি ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যদিও এক-এগারোতে দুই নেত্রীকে গ্রেপ্তারের পরে প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা মন্তব্য করেছিলেন যে, কেএম হাসানকে মানতে না পারা ছিল আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্ত। রাজনীতিক বিশ্লেষকদের বিবেচনায়, বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর পর বিএনপি দ্বিতীয় ভুলটি করেছে ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মাধ্যমে। মূলত ৮ম জাতীয় সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী ২০০৬ সালের শেষদিকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর পেছনে ছিল সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী। যদিও এটা সত্য যে, বিচারকদের বয়সসীমা বাড়ানোর দরকার ছিল এবং এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সকল বিচারক এটা চাইছিলেন। কিন্তু মওদুদ আহমদরা বুঝতে পারেননি যে, কেএম হাসানের ফারুকের ভায়রা পরিচয়ের স্পর্শকাতর কার্ডটি খেলতে আওয়ামী লীগ কোন দ্বিধা করবে না। অনেকেরই ধারণা, এ সংশোধনীর মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স না বাড়ানো হলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ অনেক সীমিতই থাকতো। অন্যদিকে দেশে চরম রাজনৈতিক সংকটকালে আবির্ভাব ঘটেছিল ওয়ান-ইলেভেন সরকারের। সে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান উভয়ে বিএনপি সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবেই অতীতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যে রাজনৈতিক ভুলের সূত্র ধরে ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়, সেটাকে ভুল হিসেবেই উপলব্ধি করতে পারেনি বিএনপি। ফলে বিএনপি ওই সরকারের বিরোধিতা করলেও আওয়ামী লীগ তাকে তাদের ‘আন্দোলনের ফসল’ আখ্যায়িত করে একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে। ফখরুদ্দীন সরকার যেদিন শপথ নেয়, সেদিন আওয়ামী লীগ নেতারা সেখানে অংশ নিলেও বিরত থাকে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদসহ সে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন উপদেষ্টা বিএনপি নেতাদের জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল অস্থিরতা। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং ঢাকার তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। পথিমধ্যে তাদের কাছে একটি ফোন আসে। বলা হয়, বঙ্গভবনে কি আর কখনও যাননি। বার্তা বুঝতে পেরে বাসায় ফিরে যান তারা। কেন তাদের এ ফোন করা হয়েছিল তা নিয়ে বিএনপির ভেতরে নানা আলোচনা রয়েছে। জানা যায়, বিএনপির তখনকার থিঙ্কট্যাঙ্কের দু’জন সদস্য দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে ক্যু হয়েছে। এখন আমাদের বঙ্গভবনে যাওয়া হবে ওই ক্যুকে সমর্থন করা। পর্যবেক্ষকরা বলছেন এটাই ছিল বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত। সেদিন রাগ-ক্ষোভ এড়িয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারলে অন্তত সে সরকারের রোষানলে পড়ে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তো না বিএনপি। পরবর্তীকালে বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক সদস্যকে ঘরোয়া আলোচনায় এ নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে উইকিলিকসে প্রকাশিত তারবার্তা সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের ১০ই জুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে তৎকালীন উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, বেসামরিক উপদেষ্টারা কারাবন্দি দুই নেত্রীর সঙ্গে সমঝোতার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলেও সে সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যাপারে বিরোধী মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বিএনপি।
৫ম সংশোধনী মামলাটি কতদূর গড়াতে পারে তা ধারণা করতে পারেনি বিএনপি। ২০০৫ সালে রায়ের পরে মধ্যরাতে তারা কোর্ট বসিয়ে ওই রায় স্থগিত করিয়েছিল। অথচ তার কোন দরকার ছিল না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এবিষয়ে ভুল পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল মুন সিনেমা হলের মালিকানা ফেরতের দাবিতে। বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৫ সালে হাইকোর্ট সেই মামলার রায়ে বাতিল ঘোষণা করা হয় সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম সংশোধনী। বিএনপি সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকার পরও রহস্যজনক কারণে মামলার আপিল শুনানি করা হয়নি। বিএনপি ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর সে মামলায় পক্ষভুক্ত হন দলের তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। কিন্তু সরকারপক্ষের অবস্থান বদলে যায়। আর আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের রায় বহাল থাকায় বাতিল হয়ে যায় জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালের ৬ই এপ্রিল করা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও বাদীপক্ষ সিনেমা হল ফেরত না পেলেও রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বিএনপি।
হাইকোর্ট তার রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল পর্যন্ত জারি করা সব ধরনের ফরমান কতিপয় বিধানের মার্জনা সাপেক্ষে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশ্‌তাক আহমাদ, একই বছরের ৬ই নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ এবং সামরিক শাসন জারি অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থি বলে ঘোষণা করা হয়। পরিহাস হলো এই রায়েই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং বিচারপতি নিয়োগ নীতিমালা সহ জিয়ার প্রবর্তিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বহাল রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি নেতারা তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেননি। জিয়া ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ফরমান জারি করেননি। তাই বিএনপি সামরিক শাসনের নিন্দা করে একই সঙ্গে জিয়ার সংস্কারের পক্ষে দাঁড়াতে পারতো। কিন্তু সেদিকে তারা যায়নি।  
ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ির বিষয়টি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এই বাড়ি নিয়ে আদালতে না যেতে খালেদা জিয়ার প্রতি পরামর্শ ছিল দলটির একাধিক নেতার। কিন্তু দুইজন প্রভাবশালী আইনজীবী নেতার বুদ্ধিতে সেই পথেই হাঁটে বিএনপি। ২০১০ সালে উচ্চ আদালত বিএনপি চেয়ারপারসনের আবেদন খারিজ করে দিলে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। ১৩ই নভেম্বর খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বাড়ি রক্ষার জন্য আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়ে পরে দলীয় ফোরামে নেতারা অনেক সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহযোগিতাই করেছে বিএনপি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২৪ জন নিহত ও তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গুরুতর আহত হয়। বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষ করে আওয়ামী লীগের জন্য এটা ছিল দ্বিতীয় রক্তাক্ত আগস্ট। চারদলীয় জোট সরকার এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে এ ঘটনায় ‘জজ মিয়া নাটক’ পুরো বিষয়টির দায়ভার বিএনপির দিকে ঠেলে দেয়। সেদিন বিএনপি যদি বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতো তাহলে পরবর্তীতে প্রতিহিংসার রাজনীতির মুখে পড়তে হতো না দলটিকে। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে দলটির গবেষণা কেন্দ্র হাওয়া ভবন ও তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে ঘিরে নানা ধরনের নেতিবাচক তথ্য প্রচার হয় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে। কিন্তু বিএনপি সেসব অপপ্রচারের কার্যকর প্রতিবাদ বা সৃষ্ট অপধারণার জাল ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়। বলতে গেলে নেতিবাচক প্রপাগান্ডা মোকাবিলায় ন্যূনতম দক্ষতাই দেখাতে পারেনি দলটি। এ প্রচারণায় দলের একটি অংশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেনি বিএনপি।
উইকিলিকসের তারবার্তায় দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকী হাওয়া ভবনকে বলতেন ‘উইন্ড টানেল’। সে ‘উইন্ড টানেলে’ তারেক রহমানের কতিপয় চিত্তবিকারগ্রস্ত বন্ধু রয়েছে। এছাড়া, অনেক মন্ত্রী-এমপিও তখন স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় বিক্রি করেছেন হাওয়া ভবনের নাম। কিন্তু এমন অপপ্রচারের বিষয়টিও বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে কোন উদ্যোগ নেয়ার দরকার মনে করেনি বিএনপি। এছাড়া, ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং দলের নেতাদের ব্যাপারে নানা মহলে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার ব্যাপারে তদন্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উদ্যোগই দৃশ্যমান করেনি বিএনপি নেতৃত্ব। অন্যদিকে গণমাধ্যমকে বোঝা ও তাকে হ্যান্ডেল করতে না পারার ব্যর্থতাকে দলটির একটি বড় ভুল হিসেবে বিবেচনা করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপির আমলে গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে বিকশিত হলেও নিজেদের ভুল ও অদূরদর্শী পলিসির কারণে তার কোন সুবিধা বা সহায়তাই পায়নি তারা। উল্টো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গণমাধ্যম পরিণত হয়েছে দলটির অদৃশ্য প্রতিপক্ষে। উপযুক্ত লোকের বদলে অনভিজ্ঞ ও সুবিধাবাদী লোকজনের হাতে গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়ায় এ পরিণতি ঘটে। বেশির ভাগ গণমাধ্যমের মালিকানা চলে যায় আওয়ামী লীগ নেতা বা তাদের রাজনীতির প্রতি অনুগতদের হাতে। এরপরও গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে এবং সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয় দলটি। গণমাধ্যমের সঙ্গে দলটির নেতাদের যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতেই ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটি। বিএনপি ভাবতেই পারেনি এটি কতদূর যেতে পারে। তরুণ প্রজন্ম দারুণভাবে এই ইস্যুটি নিয়েছিল।  আওয়ামী লীগ তাই ক্ষমতায় এসেই সে বিচার শুরু করে। কিন্তু এ ইস্যুতে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি অবলম্বন করে বিএনপি। অথচ তারা এবিষয়ে পলায়নপর নীতি না নিয়ে পরিষ্কার অবস্থান নিতে পারতো। প্রায় ৮শ’ দণ্ডিত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী কিভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল তার তদন্ত দাবি করে বিএনপি মাঠে নামতে পারতো। জিয়ার বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়া হয়েছে তিনি তাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। অথচ ৫ম সংশোধনীতেই বিধান ছিল যে, দালাল আইন বাতিল করা হলেও এই আইনে দণ্ডিতরা মুক্তি পাবেন না। অথচ বিএনপি নেতারা জিয়ার এই বিধানের পক্ষে কোনদিন কথা বলেননি। নতুন প্রজন্মকে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে, এই বিচার কোনদিন হয়নি, যা এবার আওয়ামী লীগ করছে। এমনকি এই বিষয়ে বিচার করার বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাও আওয়ামী লীগ মুছে দিতে পেরেছে।  নাইন ইলেভেনের পরের বদলে যাওয়া বিশ্বে বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে সরকার করেছে। আবার আইএস (ইসলামিক স্টেট)-এর যুগে এসে বিএনপি সেই জামায়াতকে নিয়েই সরকার পতনের আন্দোলনে নিয়োজিত রয়েছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে এক আধজন নেতা যারা অভিযুক্ত হয়েছিলেন তাদের থেকে দল নিজকে আলাদা করতে পারতো। কারণ  তাদের কেউ বিএনপির কোন গ্রুপের সদস্য নন এবং কখনও ছিলেন না।
বিচার প্রক্রিয়ার শুরুতেই কেবল জামায়াত নয়, ‘‘বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের শরিক’’ হিসেবে পরিচিত জামায়াতের নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার করা হয়। আর প্রথম থেকেই বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন ইস্যুকেই যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের আন্দোলন হিসেবে দেখাতে থাকে আওয়ামী লীগ। বিএনপি এর কোন পাল্টা কৌশল নির্দিষ্ট করতে পারেনি। তাই সহজেই এরকম একটি প্রচারণা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে সরকার। অন্যদিকে ঠিকই জামায়াতের সঙ্গে তার তৈরি হতে থাকে ভেতরগত ফারাক। এক পর্যায়ে বিএনপির একাধিক নেতাকে এ বিচারে যুক্ত করা হয় ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, বিচারের বিষয়ে তাদের নীরবতা বা পলায়নপরতার  নীতি কোন সুফল আনেনি।
প্রথমেই বিএনপি এ বিচারের পক্ষ নিলে সাধারণ মানুষের সমর্থন যেমন তাদের দিকে ঝুঁকতো, তেমনি অপপ্রচারের দায় চাপতো না কাঁধে। সরকারও অধিকতর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া চালাতে পারতো। এদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জোটে থাকলেও জামায়াতের বহু সিদ্ধান্ত ছিল বিএনপির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওয়ান-ইলেভেনের পর দেশের শীর্ষ দুই নেত্রী যখন কারারুদ্ধ তখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে জামায়াত। প্রকাশ্যেই তারা ঘোষণা দিয়েছে, বিএনপির দুর্নীতির দায় নেবে না জামায়াত। দলটির সবাই বিশ্বাস করেন বিএনপির সঙ্গে সরকারে থেকে তাদের গায়ে কালি লেগেছে। অথচ  ফখরুদ্দীন সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যেতে রাজি না হলেও জামায়াতের চাপের কারণে সে নির্বাচনে তাকে অংশ নিতে হয়। সে নির্বাচনের পর প্রায় এক বছর দল দুইটির মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোন আলাপ-আলোচনা পর্যন্ত হয়নি। বিএনপির অনেকে এখন বলেন, জামায়াত বাগড়া না দিলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের তকমাটা আওয়ামী লীগের ললাটে ২০০৮ সালেই লেপন করা যেত। আর তাহলে সেই ‘একতরফা নির্বাচনে’ জিতে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে আজ যেখানে নামিয়ে এনেছে সেখানে আনতে পারতো না।  
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বিতীয় উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে রীতিমতো দ্বৈরথ জুড়েছে জামায়াত। সরকারের সঙ্গে সমঝে চলে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নিজেদের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করলেও তাদের এ আচরণে চেয়ারম্যান পদে হেরেছে বিএনপি প্রার্থীরা। লক্ষণীয় যে, সাম্প্রতিক ঢাকা সিটি নির্বাচনেও দেখা গেছে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে গেলেও জামায়াত তার প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে তক্কে তক্কে থেকেছে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। 
জামায়াতের কারণে বিএনপির আন্দোলনের প্ল্যাটফরমে যুক্ত হয়নি সরকারের বাইরে থাকা একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। উল্টো জামায়াতের কারণে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রামসহ অনেক জেলায় সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। সেখানেই শেষ নয়, উইকিলিকস সূত্রেই জানা যায়, ওয়ান-ইলেভেনের আগে চারদলীয় জোটে যোগ দেয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করে এরশাদ বলেছেন, ‘কেয়ারটেকার সরকার আসার আগেই চারদলীয় জোটে আসার ঘোষণা দেব।’ কিন্তু জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান দলের পক্ষে মার্কিন দূতাবাসকে বলেছিলেন, ‘চারদলীয় জোটে এরশাদের প্রয়োজন নেই। শরিকদের সঙ্গে আলোচনা না করে জাতীয় পার্টিকে চারদলীয় জোটে ডাকার এখতিয়ার তারেক রহমানের নেই।’ অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে অস্বস্তির বিষয়টি নতুন নয় বিএনপিতে। উইকিলিকস প্রকাশিত তারবার্তায় দেখা যায়, ২০০৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বর তদানীন্তন জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকী মার্কিন দূতাবাসের সাবেক চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জুডিথ শামাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামী, জেএমবি প্রসঙ্গে তাঁর বিপরীত মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। কামাল সিদ্দিকী জুডিথকে বলেছিলেন, বিএনপির ৫০ জন এমপি ক্ষমতাসীন জোট সরকার থেকে জামায়াতকে সরিয়ে দিতে চান। সরকার (চারদলীয় জোট সরকার) জেএমবি’র সন্ত্রাসী চরিত্র অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মহল ও বিদেশী কূটনীতিক মহলের স্বস্তির বিষয় হচ্ছে- বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান সমপ্রতি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিয়ে বলেছেন, ধর্মের অবদান থাকতে পারে রাজনীতিতে, কিন্তু রাজনৈতিক দল ধর্মকে কেন্দ্র করে হতে পারে না। ধর্মভিত্তিক দল সম্পর্কে তারেক রহমানের বক্তব্য আসলে তিন যুগ আগে দেয়া দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি বক্তব্যের প্রতিধ্বনি। সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে তার এ বক্তব্য দলটির উপলব্ধির প্রকাশ ধরে নেয়া যায়। অনেকের মতে বিএনপির উচিত তারেকের এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ধর্মনিরপেক্ষ কথাটিকে গ্রহণ করতে সচেষ্ট হওয়া। তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া উচিত রাষ্ট্র ধর্ম করা কখনও জিয়ার এজেন্ডা ছিল না। মওলানা ভাসানী ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ গ্রহণ করেছিলেন। ৭ দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া এরশাদের অষ্টম সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিলেন। 

আ.লীগে রাজনৈতিক আশ্রয়! by শরিফুজ্জামান

সাধারণত দলবদলের হিড়িক পড়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে। এবার ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা সরকারি দলে যোগ দিতে শুরু করেছেন। গত দেড় বছরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ রকম যোগদানের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬২টি। আর যোগদানকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজারের বেশি।
বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবর, সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য এবং যোগদানকারী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই সংখ্যা পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা, এমনকি বিএনপি বা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও মনে করছেন, দলবদলের এই প্রক্রিয়ায় আদর্শিক কোনো বিষয় নেই, পুরোটাই ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ, আত্মরক্ষা এবং রাজনীতিতে টিকে থাকার কারণে ঘটছে।
দেড় বছরে যোগদানের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়া বা টিকে থাকা, মামলা থেকে রক্ষা পাওয়া, নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া, পুলিশের ধাওয়া থেকে সুরক্ষা, আত্মীয়স্বজনের চাকরির সুযোগ, বিএনপির স্থানীয় কোন্দল, হতাশা ও যুদ্ধাপরাধের কালিমা জামায়াতের গায়ে মেখে যাওয়াসহ নানা কারণে ওই দুটি দল ছাড়ার ঘটনা ঘটছে। তবে জাতীয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা এখনো দলবদলের সারিতে আসেননি।
এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকেই বলছেন, বহুমুখী রাজনৈতিক সংকট অতিক্রম করে সরকার যখন ঘর গুছিয়ে ফেলছে, তখন অন্য দলের বিতর্কিত ও সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীদের এভাবে বরণ করে নেওয়ার যুক্তি নেই।
মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, আসন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের অনেকেই দলবদল করছেন। গত উপজেলা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এসব নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে না। তাই নির্বাচনে জিততে চাইলে সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকতেই হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচন গত মেয়াদে অনেক ভালো হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর আগামী স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে শঙ্কা আছে। এ কারণে অনেকে হয়তো নিজের পদ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সরকারি দলে ভিড় করতে পারেন।
এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলবদল বন্ধ করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একাধিকবার ছাত্রলীগে শিবিরের নেতা-কর্মীদের অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা বলেছেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর ও দক্ষিণ মেরু এক হতে পারে না। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির পরবর্তী সভায় বিষয়টি তোলা হবে। বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন বলেও জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আদর্শের জন্য নয়, মামলা থেকে রক্ষা বা অন্য কোনো কারণে এই দলবদল হচ্ছে বলে মনে হয়।’
বিএনপির নেতারাও মনে করছেন, আদর্শের জন্য এই দলবদল নয়। একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, কিছু নেতা-কর্মী গেলে তাতে বড় দলের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, দলবদলের মাধ্যমে হয়তো কিছু লোক সাময়িক স্বস্তি খুঁজছে। মাঠপর্যায়ে নির্যাতন, অব্যাহত চাপ, পুলিশের তাড়া ও মামলা, ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা, নিশ্চিন্তে বাড়িতে ঘুমাতে পারার মতো কয়েকটি কারণ রয়েছে দলবদলের পেছনে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত প্রভাবিত এলাকাগুলোতেই দলবদল হয়েছে বেশি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বা নির্বাচনের বর্ষপূর্তির পরে যেসব এলাকায় সহিংসতা ও নাশকতা হয়েছে, সেসব এলাকায় দলবদলের প্রবণতা বেশি। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে রাজশাহী, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, নাটোর, কুমিল্লা, চাঁদপুর, গাইবান্ধা, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলা।
মাহবুবুর রহমানের মতে, কোনো কোনো এলাকায় সরকারি দলের লক্ষ্য হচ্ছে নিজেদের দল ভারী করা। যেখানে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা ভালো, সেখান থেকে কিছু লোক ভাগিয়ে নেওয়া। এ ছাড়া দলবদলের প্রক্রিয়ায় কিছু আর্থিক লেনদেন ও সুযোগ-সুবিধা ভাগাভাগি হয় বলেও জানান তিনি।
তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ২০০১ সালের পর থেকে ক্ষমতায় থেকে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ও জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করা, এরপর ক্ষমতার বাইরে গিয়ে নাশকতা ও মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর বাগমারা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ
সহসভাপতি মতিউর রহমানের হাতে ফুল দিয়ে
গত ১০ এপ্রিল দলটিতে যোগ দেন জামায়াতের
বাগমারা উপজেলা শাখার সম্পাদক নুরুল ইসলাম
(বাঁ থেকে দ্বিতীয়) l ছবি: প্রথম আলো
জামায়াতের নেতা-কর্মী এবং সন্ত্রাস বা নাশকতায় অভিযুক্ত কাউকে দলে নিতে নিরুৎসাহিত করার কথা উল্লেখ করে হানিফ বলেন, কোনো সমাজসচেতন নাগরিক ভুল বুঝে ও সরকারের উন্নয়নকাজে আকৃষ্ট হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাইলে না বলাটা উচিত হবে না। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে দেড় বছরে ১৯ হাজার নেতা-কর্মীর আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় বলেও মনে করেন কেন্দ্রীয় ওই নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের সময়ে দলবদলের ঘটনা এতটাই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে যে তখন কৌতুক হিসেবে বলা হতো, নয় বছরে নয় কোটির বেশি মানুষ জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। নব্বইয়ে এরশাদের পতনের আগে তিন জোটের রূপরেখায় জাপা নেতাদের দলে না ভেড়ানোর অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু পরে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জাতীয় পার্টি থেকে দলে দলে নেতা-কর্মীদের সরকারি দলে যোগ দিতে দেখা গেছে। এরপর থেকে এই ধারা চলতে থাকে। এখন তো জাতীয় পার্টির প্রায় পুরোটাই সরকারি দল হয়ে গেছে।
তবে ৫ জানুয়ারির আগে দলবদল সেই অর্থে হয়নি। তখন দলবদলের একটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের নেতা নওশের আলী স্থানীয় যুবলীগ আয়োজিত এক নির্বাচনী সভায় দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকারি দল এর আগে বিভিন্ন ঘটনার পর বলেছে, এগুলো ঘটিয়েছে অনুপ্রবেশকারীরা। এখন তো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, যুদ্ধাপরাধের মামলা শুরু হওয়ার আগে জামায়াত বা খেলাফত এতটা ঘৃণিত ছিল না। এখনকার সরকারি দল তাদের সঙ্গে আন্দোলন করেছে, এক মঞ্চে বসেছে, খেলাফতের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছিল আওয়ামী লীগের।
এখনকার দলবদল নিয়ে ১৪ দলের শরিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও প্রতিক্রিয়া আছে। ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ বিভিন্ন দল এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করছে। ১৪ দলের শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই, তাদের ঘরে ডেকে আনলে লড়াই হবে কীভাবে এবং কার সঙ্গে—সরকার বা সরকারি দলের সেই ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর জাসদে কিছু জামায়াতের কর্মী ঢুকে পড়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতকে যেভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক ও বিস্ময়কর।
মিলেমিশে রাজনীতি করা: দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা অস্তিত্বের স্বার্থে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে থাকছেন। এর বড় উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ। সেখানে সরকারি দলের গডফাদারখ্যাত একজন রাজনীতিকের সঙ্গে সখ্য রাখার জন্য বিএনপির নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একজন সাবেক সাংসদও গত বছরের ৫ জানুয়ারি পুলিশের করা মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের আশীর্বাদে। গত বছরের ২০ অক্টোবর আড়াইহাজারে আওয়ামী লীগে যোগ দেন চার খুনের আসামি ও প্রভাবশালী বিএনপির নেতা আবুল বাশার।
স্থানীয় সাংসদ নজরুল ইসলামকে নৌকা প্রতীকসংবলিত সোনার কোটপিন উপহার দেন এই সাবেক চেয়ারম্যান। বিএনপির ২৫ নেতা-কর্মীকে নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তিনি ভালোই আছেন। ২০০২ সালের ১২ মার্চ বর্তমান উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই বারেকসহ চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। এক যুগ পর মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে। এখন স্থানীয় সাংসদ এলাকায় গেলে নিহত বারেকের ভাই রফিকুল ইসলাম ও আসামি আবুল বাশার একই মঞ্চে থাকেন।
ফুল নিয়েছেন যেসব মন্ত্রী-সাংসদ: বিএনপি ও জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান অনুষ্ঠানগুলো আয়োজন করছে সরকারি দলের স্থানীয় কমিটি। যেসব অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বা সাংসদ অংশ নিচ্ছেন, সেগুলো গণমাধ্যমে প্রচার পাচ্ছে। ইতিমধ্যে মন্ত্রী ও সাংসদদের মধ্যে যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ। সাংসদদের মধ্যে আছেন সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, নজরুল ইসলাম, সুবিদ আলী ভূঁইয়া, এনামুর রহমান, হাবীবে মিল্লাত, জাহিদ আহসান, শামসুল আলম, আবুল কালাম আজাদ, নুর-ই-আলম চৌধুরী, আনোয়ারুল আজীম, আলী আজম প্রমুখ।
পরিকল্পনামন্ত্রীর উদারতা: ৪ জুলাই বিএনপির স্থানীয় নেতা শরিফুল ইসলামের হাত দিয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ উদ্বোধন করান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিএনপি-জামায়াতের প্রায় ২০০ নেতা-কর্মী ওই দিন মন্ত্রীর হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
ইউনিয়ন বিএনপির নেতা শাহ আলমের যোগদানে মন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘আপনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ করেন নাই। তাই কাফফারা হিসেবে সবাইকে চা খাওয়াবেন।’ রাজনৈতিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এ কাজ করেছেন বলে মুস্তফা কামাল জানান।
ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে আওয়ামী লীগে: ৪ জুলাই রাজশাহীর চারঘাটে ভোটকেন্দ্রে হামলাসহ কয়েকটি মামলার আসামি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের শলুয়া ইউনিয়ন শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোখলেছুর রহমান ও জামায়াত-সমর্থক শিক্ষক হুমায়ূন কবির আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। ফুলের তোড়া দিয়ে তাঁদের বরণ করে নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
ভোটকেন্দ্র পোড়ানোর মামলায় মোখলেছুরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তবে অনুষ্ঠানে মোখলেছুর রহমান বলেন, যে দলের নেত্রী দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও ভোট বানচাল করার জন্য নেতা-কর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার নির্দেশ দেন, তাঁর রাজনীতি আর করবেন না। মোখলেছুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগ দেখবে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সোজা কথায় বলা যায়, বাঁচার জন্য এই দলবদল হচ্ছে। তবে আমাদের সমাজে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ তো আছেই, যারা আর্থিক সুবিধার জন্য যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সেই সরকারের পেছনে ছোটে। আবার দলবদল না করেও টাকাপয়সা খরচ করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজকর্ম করার মতো স্থানীয় নেতার সংখ্যাও কম নয়।’
আটকের পরদিন আওয়ামী লীগে: ৫ জুলাই বিকেলে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছালামত আলীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ৬ জুলাই সকালে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর বিকেলেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ছালামত আলী রাউজানের যুবলীগের কর্মী মোবারক হোসেন হত্যা মামলার আসামি।
আসামিকে আদালতে পাঠানোর পরিবর্তে দলে যোগদান করানো আইনসিদ্ধ কি না, জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকলে আইন নিজস্ব গতিতে চলবে।’ রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমারের মতে, স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হওয়ায় তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রয়োজন হয়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দলীয় ব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত। তবে জামায়াতের কেউ যদি আদর্শিক কারণে দলবদল করতে চায়, তাহলে আমি দোষের কিছু দেখি না। কিন্তু অবস্থাটা এখন পর্যন্ত ঘোলাটে। কারণ, এসব দলবদল হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে একেক ধরনের বাস্তবতার ওপর ভর করে।’
তাঁর মতে, বিএনপি-জামায়াত এখন কোণঠাসা অবস্থায় আছে, রাজনৈতিক মাঠে খেলতে পারছে না। সেই সুযোগ হয়তো সরকারি দল স্থানীয় পর্যায়ে নিচ্ছে। কিন্তু এটা সরকারি দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত নয়, আবার কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত ছাড়া মাঠপর্যায়ে এটা হতে পারে কি না, সেটিও একটি প্রশ্ন।

একটি ছেলের ১০ বন্ধু থাকলে মেয়েদের কেন নয়? by হোসেন মাহবুব কামাল

সিঁথি ক্ষুব্ধ। বাজিতপুরের নিজ বাড়িতেই এক প্রকার বন্দি দিন কাটছে তার। সাংবাদিক মুকুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তার স্ত্রীর করা মামলায় জেলখাটার পর এখন জামিনে মুক্ত। সিঁথি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সোজা চলে আসেন বাজিতপুরের নিজ বাড়িতে। গতকাল বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরের বাড়িতে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বলেন, একটি ছেলের যদি ১০ জন বন্ধু থাকতে পারে তাহলে মেয়েদের ক্ষেত্রে থাকলে দোষ কি? কেন মেয়েদের ১০ বন্ধু থাকতে পারবে না? মুকুলও আমার ভাল বন্ধু। সিঁথি বলেন, আমি কি কোন সেলিব্রিটি? আমাকে নিয়ে পত্রিকায় এভাবে লিখতে হবে? আমি কী ড্রেস পরলাম, কী করলাম তাতে অন্যদের কি? আমি প্যান্ট-শার্ট কিংবা গেঞ্জি পরলাম, সেটা কি ওয়েস্টার্ন ড্রেস হয়ে গেল?  সেটা যদি হয়, নাজনীন আক্তার তন্বীও তো একমাস আগে দিল্লিতে গিয়ে ওই রকম ড্রেস পরে পোজ দিয়েছে। তার তো কোন দোষ হয়নি। আমার কেন হবে? কেন আমার অনুমতি ছাড়া আমার ছবি ছাপানো হলো? মুকুলের প্রসঙ্গ আনতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মেহরুন বিনতে সিঁথি। বলেন, মুকুলের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল এটা কি আমার অপরাধ? এ সময় সিঁথির মা রুবিনা আলম বলেন, আমার বড় মেয়ে মিলির ১৮ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে এক ব্যক্তি। সে টাকা উদ্ধারে আরেক বন্ধুর মাধ্যমে মুকুলের দ্বারস্থ হয় সিঁথি। এভাবে মুকুল সিঁথির ভাল বন্ধু হয়ে যায়। সিঁথি বলেন, পত্রিকায় বেপরোয়া জীবন উল্লেখ করার বিষয়ে মুকুল জেল থেকে বের হয়ে এলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মেহেরুন বিনতে সিঁথির পিতা ছিলেন একজন ব্যাংকার। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত আফতাব উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে লেখাপড়া করেন সিঁথি। ২০০০ সালে এসএসসি পাস করেন বেগম রহিমা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। বাজিতপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে  ঢাকা লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে অনার্স সহ মাস্টার্স করেন। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয় ২০০৯ সালে একজন ব্যাংকারের সঙ্গে। ৫ বছর ধরে সন্তান না হওয়ায় স্বামীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া বিবাদ হতো। সিঁথি জানান, গত ২রা জুলাই বৃহস্পতিবার তন্বীর মামলায় আত্মসমর্পণ করলে তার স্বামীকে আদালতে ডেকে আনা হয়। তার জিম্মায় জামিনের নথিতে স্বাক্ষর দিতে বললে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করলেও পরে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ৬ই জুলাই জামিন হলে সে তার জিম্মায় নিতে অস্বীকার করে। পরে তার মা’র জিম্মায় জামিন নিয়ে বের হয়ে আসেন।

কাফনে ঢাকা সভ্যতার মুখ by সাজেদুল হক

মানুষের জীবনে নানা গল্প থাকে। এ যেন এক আনন্দ-বেদনার কাব্য। সুপ্ত নামের ছেলেটির গল্পে অবশ্য কোন আনন্দ নেই। মুহূর্তের মধ্যেই মাটি হয়ে গেল তার সারা জীবনের আনন্দ। নিজের চোখের সামনে মা, বোন আর নানীকে পিষ্ট হয়ে মরতে দেখলো ছেলেটি। আচ্ছা ওদের জীবনে কি আসলেই কোন আনন্দ আছে? আনন্দ থাকলে মানুষ কি ‘জাকাতের কাপড়’ আনতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা যায়।
সত্যি এও বাংলাদেশেরই অংশ, যে দেশে কান পাতলেই উন্নয়নের গল্প শোনা যায়। নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের সার্টিফিকেট পেয়ে ধন্য হই আমরা। চারদিকে খুশির ঝিলিক। কিন্তু ময়মনসিংহে পদদলিত হয়ে মারা যাওয়া ২৭ বঙ্গসন্তানের জন্য এ সার্টিফিকেট কোন আনন্দই বয়ে আনেনি। কেন মানুষ ‘জাকাতের কাপড়’ আনতে গিয়ে মারা যায় সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় বোধহয় চলে এসেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এত বড় নিষ্ঠুরতার পরও কোথাও কোন শোকের মাতম দেখা যায় না। যেন আমরা মেনেই নিয়েছি, এভাবে মরার জন্যই ওদের জন্ম হয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নের গল্প যা শোনা যায় তা একেবারে মিথ্যা নয়। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। গড় বয়স বেড়েছে। এসবই মুদ্রার একটি পিঠ। মুদ্রার উল্টো পিঠে দৈত্যের মতো সমাজে যে বৈষম্য বাড়ছে সে গল্প তেমন শোনা যায় না। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে ধর্মের নামে প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা। বহু আগে কবি লিখে গেছেন, ‘মসজিদগুলো ক্রমশ পাকা হয়েছে, বিপরীতে মুসল্লিরা হয়েছেন কাঁচা। মসজিদে মসজিদে আজান হচ্ছে, কিন্তু হযরত বেলালের (রা.) মতো মুয়াজ্জিন আর পাওয়া যাচ্ছে না।’ ধর্ম পালনের নামে প্রদর্শনীর অংশ হিসেবেই অনেকে জাকাত প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এ যেন তাদের ব্যবসা- প্রচারেই প্রসার।
শুধু প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয়েই উন্নয়ন লেখা থাকে না। বৈষম্যের ভিত্তিতে নির্মিত সমাজে উন্ন্নয়ন শেষ পর্যন্ত ফাঁকা বুলিই থেকে যায়। আর সভ্যতার মুখ ঢেকে যায় কাফনে।

গ্রিসের গণভোট: গ্রিকদের এই ‘না’র মানে কী by মেরি দেইয়েভস্কি

গ্রিসের গণভোটে বিজয়ী ‘না’ ভোটদাতাদের উল্লাস
সরকার যা বলেছে তা আপনি অগ্রাহ্য করতে পারেন, কিন্তু জাতির দাবি অগ্রাহ্য করতে পারেন না। ৫ জুলাই গ্রিসের গণভোটে ভোট দেওয়ার সময় গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস এ কথা বলেছেন। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রীর মুখেই এ কথা মানায়, যে দেশটি পৃথিবীকে গণতন্ত্র উপহার দিয়েছে। তবে ভোটাররা ‘না’ ভোটের মধ্য দিয়ে আসলে কী জানিয়েছেন, তা হয়তো ঠিক পরিষ্কার নয়, অন্তত তিনি যতটা পরিষ্কারভাবে তা চাচ্ছিলেন।
ভোটের দিন বিকেল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, ‘না’ জিততে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গত এক সপ্তাহজুড়ে ইউরোপকে যে একরকম ভীতি পেয়ে বসেছিল, সেটাও যে বাড়ছে, তা-ও তখন বোঝা যাচ্ছিল। এই ‘না’ ভোট আসলে গ্রিসের এই বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিপ্রাসের অবস্থানের প্রতি গ্রিকদের ‘হ্যাঁ’ ভোট। ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও জার্মান চ্যান্সেলর ঘোষণা দেন, তাঁরা সোমবার প্যারিসে বৈঠক করবেন। ভেন্যু নির্বাচন দেখেই বোঝা যায়, তাঁরা খুবই কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, গ্রিকদের সংবেদনশীলতার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা তা করেছেন বলেই মনে হয়। অন্যদিকে গ্রিসের এই সংকট নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে মনে হলেও ব্রিটিশ ফাস্ট সেক্রেটারি অব স্টেট জর্জ অসবর্ন এর আগেই উদ্বেগের বীজ বপন করেন, যখন তিনি বিবিসিকে বলেন, গ্রিসের মতো ঋণসংকটে যেকোনো দেশই পড়তে পারে, এমনকি যুক্তরাজ্যও এই আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়।
কিন্তু আলোচনার ক্ষেত্রে আরও কঠিন হওয়ার মতো ম্যান্ডেট কি গ্রিক প্রধানমন্ত্রীর হাতে আছে? ভোটের ফলাফল তো মতামত জরিপের চেয়েও বেশি সুস্পষ্ট হয়েছে। ৫ জুলাই গ্রিসের সময় রাত নয়টার মধ্যে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, গ্রিসের নির্বাচনী এলাকাগুলোর প্রতিটাতেই ‘না’ ভোট পড়েছে। যদিও অধিকাংশ মতামত জরিপের পূর্বাভাস ছিল, ব্যবধান হয়তো সুস্পষ্ট হবে না। কথা হচ্ছে, গ্রিকরা তো সর্বসম্মত মতৈক্যে এসেছে, এখন এর কারণে প্রকৃত অর্থে কী পরিবর্তন আসতে পারে? নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। এতে জনগণের সম্পৃক্ততার মাত্রা খুব একটা স্পষ্ট হয় না, যদিও ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, ব্যবধান বেশ বড়ই।
স্বল্প মেয়াদের জন্য এ ভোট গ্রিসের সরকারকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, সুস্থিতির উপাদান যুক্ত করেছে। গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস বলেছিলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। ‘হ্যাঁ’ জিতলে সিপ্রাসের নিজের অবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে যেত। কিন্তু নির্বাচনের এই রায়ের ফলে কি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সিপ্রাসের অবস্থান শক্তিশালী হলো?
দৃশ্যত যা হবে এই নির্বাচন তাতেই জোর দিচ্ছে। কিন্তু এটা ছিল ইউরোপীয় বিষয়ে গ্রিক ভোট। সিপ্রাস সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন—এই অবস্থান থেকেই তিনি আলোচনা করছিলেন। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দর-কষাকষি করে ভালো কিছু পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট থাকলে তাঁর অবস্থান আরও জোরালো হবে। কিন্তু তিনি যদি সেটা মনে করে থাকেন, তাহলে শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে তিনি বড়সড় ভুল করেছেন।
গ্রিসের ভোটের আগে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা তর্ক করছিলেন যে, গণভোটের প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কারণ, আগের সপ্তাহে শেষ মুহূর্তের আলোচনায় দেওয়া প্রস্তাবের মেয়াদ আলোচনা ভেঙে যাওয়ার সময়েই শেষ হয়ে গেছে। সেই একই প্রস্তাব যে এখন কোনো না কোনো রূপে পুনর্জীবিত করা হবে না, তা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু সেটা অর্জন করার জন্য সিপ্রাসকে অনেক খাটতে হতে পারে। প্রস্তাবটিকে গ্রিসের দৃষ্টিকোণ থেকে আরও উন্নত করা যায় কি না, সেটা হয়তো আলাদা কথা।
কিন্তু সিপ্রাসের জন্য জার্মানরা যতটা না সমস্যা করতে পারে, তার চেয়ে বেশি করতে পারে অন্য দেশগুলো, যারা প্রস্তাবের শর্ত শিথিল করার ব্যাপারে নিজেদের অনাগ্রহ গোপন রাখেনি। এমন একটা অনুভূতি কাজ করছে যে গ্রিসকে দেখা হচ্ছে একটা ‘স্পেশাল কেস’ হিসেবে। এ রকম অনুভূতির পেছনে রয়েছে দেশটির বর্ণাঢ্য প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর একগুঁয়ে মনোভাব, সেই সঙ্গে জার্মানি ও অন্যদের ‘ইউরো’ রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা। গ্রিসকে আরও ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক দেশই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। শুধু আয়ারল্যান্ডের মতো দেশই নয়, যারা যন্ত্রণাদায়ক বেইলআউট থেকে সফলভাবে উঠে দাঁড়াতে পেরেছে। স্লোভাকিয়া ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর মতো ‘নতুন’ ইউরোপীয়রা ইউরোয় যোগ দেওয়ার শর্ত পূরণ করতে অনেক ছাড় দিয়েছে, বিশেষ করে লাটভিয়া। ফলে গ্রিসের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা হলে তারা অসন্তুষ্ট হতে পারে।
গণভোটের মধ্য দিয়ে প্রকৃত পক্ষে একটি মাত্র প্রশ্নের ফয়সালা হয়েছে। সেটি হচ্ছে, গ্রিক সরকার বেঁচে গেছে, আর ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এখন গ্রিসকে গ্রিসের মতোই গ্রহণ করতে হবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজের পছন্দমতো নয়। অর্থাৎ গ্রিসের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি: গ্রিস কি ইউরো ও এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে পারবে? আর গ্রিকদের কাছে এখন তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হচ্ছে, কখন ব্যাংকগুলো খুলবে, আর কত ইউরো তারা তুলতে পারবে।
এসব বলার পর আরেকটি কথা বলেতেই হবে। যে দেশ এক সপ্তাহের মধ্যে গণভোট আয়োজন করে দক্ষতার সঙ্গে তা শেষ করে মধ্যরাতের মধ্যে সেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করতে পারে, সেই দেশের নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আছে। আর অন্যরা সে ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত হতেই পারে। যেভাবে নির্বাচন হয়েছে ও যে ফলাফল এসেছে, তাতে গ্রিকদের আশান্বিত হতেই হবে।
(গ্রিসের অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস সমঝোতার পথ সুগম করতে পদত্যাগ করেছেন)
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।
মেরি দেইয়েভস্কি: লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক।

লাচ্ছা সেমাই তৈরি হচ্ছে যেভাবে by শাহ্‌ আলম শাহী

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দিনাজপুরে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানা। বিএসটিআই’র অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই। ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত তেল ও রং ছাড়া মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালিয়েও প্রতিকার হচ্ছে না তাতে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দিনাজপুর জেলা বেকারি মালিক সমিতি। তাদের দাবি, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে যারা লাচ্ছা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হোক। তা না হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আকর্ষণীয় মোড়কে মোড়ানো, দেখতে সুন্দর এসব লাচ্ছা দেখে বোঝার উপায় নাই, এসবে ব্যবহার হচ্ছে বিষাক্ত তেল এবং রং ছাড়া মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান। এসব লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানাগুলোতে লাচ্ছা উৎপাদনের নামে চলছে, জনস্বাস্থ্য ধ্বংসের তৎপরতা। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে দিনাজপুর জেলা বেকারি মালিক সমিতি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা বৈধ ও অবৈধ  লাচ্ছা সেমাই তৈরি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও দিয়েছেন জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। দিনাজপুর জেলা বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, দিনাজপুরে ট্রেড লাইসেন্স বিএসটিআই আয়কর প্রদানকারী লাচ্ছা সেমাই তৈরির বৈধ প্রতিষ্ঠান ২৭টি। আর ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই লাইসেন্স না নিয়ে আয়কর প্রদান না করে অনুমতিবিহীন নিম্নমানের লাচ্ছাসহ পণ্য উৎপাদনকারী অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯টি। তিনি বলেন, এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, দিনাজপুর শহরের নিমনগর ফুলবাড়ী বাস স্ট্যান্ডের পূর্ব পাশ্বে উৎসব ফুড অ্যান্ড বেকারি, দিনাজপুর শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠ কাঞ্চন ঘাট হঠাৎ পাড়ার আলী চানাচুর, কাঞ্চনঘাট এলাকার গফফার চানাচুর, ৪নং উপশহরে মধু চানাচুর, ৪নং উপশহরে মুন্না চানাচুর, সুইহারী এলাকার গাজী চানাচুর, দক্ষিণ কোতোয়ালির ফুলতলা বাজার এলাকার  রোস্তম ফুড লাচ্ছা, ফুলতলা স-মিলের পেছনে জাফর ফুড লাচ্ছা, কমলপুর বাজার এলাকায় হাকিম মৌলভী ফুড লাচ্ছা, ফুলবাড়ী উপজেলার জলাপাড়ায় মোস্তাকিম লাচ্ছা, জলাপাড়ায় চিকা বাবু লাচ্ছা, কাজীপাড়া রোডে বজলী বেকারি লাচ্ছা, কাজীপাড়া রোডে খোকন লাচ্ছা, কানাহার রোডে নরশেদ লাচ্ছা, চকচকা রোডে বেবাল লাচ্ছা, মহেশপুর রোডে হিটু লাচ্ছা, মাদিলা হাট এলাকায় মাদিলা বেকারি লাচ্ছা, কাজী পাড়া রোডে খতিবর লাচ্ছা, গড় ইসলামপুর জলপাড়া এলাকায় বাশার ফুড লাচ্ছা, বিরল উপজেলার ধুকুরঝাড়িতে ভাই-বোন বেকারি লাচ্ছা, বীরগঞ্জ উপজেলায় ইত্যাদি বেকারি লাচ্ছা, পার্বতীপুর উপজেলার ভাগলপুরে ফয়সল ফুড লাচ্ছা, নবাবগঞ্জ উপজেলায় কচুয়া এলাকায় বেলালা শাহ্‌ লাচ্ছা, চিরিরবন্দর উপজেলার ঘুঘরাতলী এলাকায় আজাদ বেকারি লাচ্ছা, বিরামপুর উপজেলা চণ্ডীপুর এলাকায় সাত ভাই বেকারী লাচ্ছা, কাটলা এলাকায় স্বাধীন বেকারি লাচ্ছা এবং হাকিমপুর (হিলি) উপজেলায়  হাকিমপুর বাজারে পাবনা বেকারি লাচ্ছা ও ডাঙ্গা পাড়া এলাকায় রজনী বেকারি লাচ্ছা। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানাগুলোতে লাচ্ছা উৎপাদনের নামে চলছে, জনস্বাস্থ্য ধ্বংসের তৎপরতা। সেমাই তৈরীতে যে ময়দা, তেল, রং মেশানো হচ্ছে, তা সব কিছুতেই বিষাক্ত উপাদান। ময়দা মাখানো খমিড়ের কাজ চলছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পা দিয়ে মাড়িয়ে। এসব কারখার অধিকাংশই নেই বিএসটিআই’র অনুমোদন। কারখানার বাইরে থেকে প্রবেশ নিষেধ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অথবা গেটে তালা ঝুলিয়ে বা গেট বন্ধ করে চলছে লাচ্ছা সেমাই তৈরির কাজ।
এ ব্যাপারে বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, আমরা সনাতন পদ্ধতিতে পা দিয়ে মাড়িয়ে লাচ্ছা তৈরি বর্জন করেছি। তাই অনেকে এখন মেশিন দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত লাচ্ছা সেমাই তৈরি করছে। যারা বিএসটিআই’র অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহণ করুক, এটা আমরা চাই। এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।
অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ফাঁকি দিতে অধিকাংশ লাচ্ছা তৈরির কারখানায় রাতের আঁধারে ময়দা খামিরের কাজ করছে শ্রমিকরা। আর সারাদিন চলছে লাচ্ছা তৈরি ও ভাজার কাজ। তবে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা বাঁচতে চাই। তাই চাই, বিষমুক্ত খাবার। এজন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। প্রতিরোধ গড়তে হবে বিষযুক্ত খাবারের বিরুদ্ধে। তাই, স্থানীয় প্রশাসন প্রতিনিয়ত লাচ্ছা সেমাই তৈরীর কারখানাগুলোতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান মেশানো বা অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে লাচ্ছা তৈরি করা হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে

পেশাদার ভিসায় অদক্ষ শ্রমিক মালয়েশিয়া যাচ্ছেন by শরিফুল হাসান

মালয়েশিয়ার সেলানগরের বিশাল এক বিপণিবিতান মাইনস। গত শুক্রবার সকালে এই বিপণিবিতানে গিয়ে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চেহারা দেখে তাঁকে বাংলাদেশি মনে হলো। আলাপে তিনি বললেন, তাঁর নাম মুহাম্মদ মোফাজ্জল। বাড়ি ময়মনসিংহে। সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে দক্ষ পেশাদার ভিসায় এসেছেন। এখন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
মোফাজ্জল অভিযোগ করলেন, তাঁকে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আনা হয়েছে। এখন বুঝছেন, তিনি প্রতারিত হয়েছেন। তাঁর মতো আরও অনেকে দক্ষ পেশাদার ভিসায় এসে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। অনেকে আবার যে কোম্পানির ভিসায় এসেছেন, সেখানে কাজ করতে না পেরে অবৈধ হয়ে পড়ছেন। কারণ, দক্ষ ভিসায় আনা হলেও তাঁরা সাধারণ শ্রমিক বা অদক্ষ শ্রমিক।
মালয়েশিয়ায় গত দুই দিনে তমিজউদ্দিন গাজী, সাইদুর রহমান, মিরাজুল ইসলামসহ আরও ২৫ থেকে ৩০ জন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সবাই এমন ভিসায় এসেছেন।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র বলেছে, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা কোনো বিষয়ের বিশেষজ্ঞরাই সাধারণত দক্ষÿ ভিসায় মালয়েশিয়ায় চাকরি করতে আসেন, এর নাম ডিপি-১০ ভিসা। এখন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে পরিচ্ছন্ন বিশেষজ্ঞ, নির্মাণশ্রমিককে নির্মাণ বিশেষজ্ঞ বানিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের আনা হচ্ছে।
সাধারণ শ্রমিকেরা এই ভিসায় কেন আসছেন—জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণ শ্রমিক আসার জন্য দূতাবাসের সত্যায়ন লাগলেও ডিপি-১০ বা প্রফেশনাল ভিসার ক্ষেত্রে হাইকমিশন কিংবা মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমতি লাগে না। সরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হওয়ার পর সাধারণ শ্রমিক আসা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন দালাল ও কিছু জনশক্তি রপ্তানিকারক এই ব্যবসা শুরু করেন। মালয়েশিয়ার কিছু নিয়োগকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত। তাঁরা এখানকার শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে এটা করেন। এ ক্ষেত্রে ভিসা হয়ে যাওয়ার পর বিমানবন্দরে ঘুষ দিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা চলে আসেন।
তবে সাগরপথে মানব পাচার নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ÿব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে চলে এসেছেন।
অবশ্য ডিপি-১০ ভিসায় কত বাংলাদেশি এসেছেন, সেই পরিসংখ্যান নেই বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে। তবে এই সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজারের কম নয় বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়াপ্রবাসীরা।
প্রবাসী শ্রমিকেরা বলেছেন, তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে সাধারণ শ্রমিকদের এই ভিসায় আনা হলেও তাঁরা এখানে এসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। অনেকে আবার এমন কাজও পাচ্ছেন না। অনেকে এই ভিসায় কাজ করতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হচ্ছেন।
এমন ভিসায় আসা বাংলাদেশিদের একজন নজরুল ইসলাম। বাড়ি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে ডিপি-১০ ভিসায় চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি মালয়েশিয়া এসে জহুর বারুতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ শুরু করেন। কিন্তু মালিক তাঁর কাজের অনুমতি বা পারমিট লাগাননি। গত ২২ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এক মাসের কারাদণ্ড হয় তাঁর।
নজরুলের এক আত্মীয় গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, নজরুলকে দেশে পাঠানোর জন্য বর্তমানে একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম শাখার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। শ্রমিকের অভাবে অনেক কোম্পানির কাজ বন্ধ আছে। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনায় (জি টু জি) কর্মী না আসায় দালালেরা লোক আনতে এই প্রক্রিয়া বেছে নিয়েছেন। তবে ডিপি-১০ বা দক্ষ ভিসায় যাঁরা আসছেন তাঁরা একেবারেই অদক্ষ। অনেকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই। ফলে মালয়েশিয়ায় এসে তাঁরা প্রতারিত হচ্ছেন। যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কথা সেখানে কাজ করতে না পেরে পালিয়ে যাচ্ছেন অন্য জায়গায়। ফলে তাঁরা অবৈধ হয়ে পড়ছেন। এসব কারণে অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছেই। বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি মালয়েশিয়াকে জানানো হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
সমস্যার সমাধান যে হয়নি তা বাংলাদেশে থাকতেই জানা ছিল। ৭ জুলাই ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মালয়েশিয়ায় আসার সময় একই বিমানে ছিলেন মাগুরার মাহবুবুর রহমান। একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন ডিপি-১০ ভিসায়। খরচ হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। কী কাজ করবেন—জানতে চাইলে মাহবুব বলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। মাহবুবের সঙ্গেই ছিলেন শামসুল আলম। তিনিও একই ভিসায় যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো কাজ জানেন না। জমিজমা বিক্রি করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। দুজনেই বললেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন মালয়েশিয়ায় কাজ করে তাঁরা ভাগ্য ফেরাতে পারবেন।
তবে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রথম সচিব (শ্রম) মুসাররাত জেবিন বলেন, এভাবে আসা লোকজন কেবল যে প্রতারিতই হচ্ছেন তা-ই নয়, বরং অবৈধও হয়ে পড়ছেন। তবে এই অবৈধদের সংখ্যা কত তা তিনি জানাতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ বিশেষজ্ঞদেরই ডিপি-১০ ভিসায় আসার কথা। সেখানে যদি সাধারণ শ্রমিক চলে আসে তাহলে সমস্যা। এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। বাংলাদেশিদের কাছে অনুরোধ, কে কেন কী কাজে আসছেন সেটা যেন জেনে আসেন।’

কেরানীগঞ্জের লুঙ্গি

কেরানীগঞ্জের রামেরকান্দা ও রুহিতপুরের বাড়িতে বাড়িতে বংশানুক্রমে চলছে লুঙ্গি তৈরির কাজ। আগে মাকু দিয়ে সুতা থেকে তৈরি হতো ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গি। সেটি এখন বিলুপ্তপ্রায়। পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয় লুঙ্গির থান। ২২ হাত লম্বা এক একেকটি থানে চারটি লুঙ্গি থাকে। এই থান কাপড়গুলো ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপরে ধোয়া, মাড় দেওয়া, আয়রন করার পর কেটে আলাদা করেই বিক্রি করা হয়। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
রং মেশানো পানিতে লুঙ্গি ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
আছড়ে রং মেশানো লুঙ্গি থেকে পানি সরানো হচ্ছে। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
ভেজানো লুঙ্গি বাঁশে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
কেরানীগঞ্জের আফজাল হোসেন নিজ বাড়িতে লুঙ্গি শুকাচ্ছেন। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
বাড়ির নারীরা শুকনো লুঙ্গিতে মাড় দিচ্ছেন। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
লুঙ্গি কেটে ভাঁজ করা হচ্ছে। এক একটি লুঙ্গি বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
ভাঁজে ভাঁজে রাখা হয়েছে আয়রন করা লুঙ্গি। 
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন
বাজারে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে লুঙ্গি।

সিঁথির বেপরোয়া জীবন by রুদ্র মিজান

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মেহেরুন বিনতে সিঁথি। ছোটবেলা থেকেই তার উচ্চবিলাসী মনমানসিকতা। একপর্যায়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন বেপরোয়া জীবনযাপনে। ব্যাংকার স্বামীকে ছেড়ে পরকীয়ায় মজে এখন সারা দেশে আলোচিত। সাংবাদিক রকিবুল ইসলাম মুকুলের সঙ্গে তার পরকীয়ার কারণে ভাঙনের মুখে দুটি সংসার। স্ত্রী নাজনীন আক্তারের দায়ের করা মামলায় এখন কারাভোগ করছেন মুকুল। একই মামলায় কারাগার থেকে সম্প্রতি জামিনে বের হয়েছেন সিঁথি।
সিঁথি সম্পর্কে অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতো সিঁথি। সৌন্দর্য ও কণ্ঠের গুণে সহজেই মানুষকে আকর্ষণ তৈরি করতো সে। একসময় ঢাকায় এসে ভর্তি হন লালমাটিয়া মহিলা কলেজে। এর মধ্যেই ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে তার। খ্যাতিমান ও ধনাঢ্য পরিবারের ওই ছেলেকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে থাকেন সিঁথি। চুটিয়ে প্রেম করেন তারা। ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত শপিং মল, কফি শপ, রেস্টুরেন্ট বরাবরই প্রিয় ছিল সিঁথির।
সূত্রমতে, ওই সময়ে বেসরকারি একটি ব্যাংকে যোগ দেন ছেলেটি। এরপরেই ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তার সঙ্গে বিয়ে হয় সিঁথির। বিয়ের পর সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা ভ্রমণের তীব্র ইচ্ছার কথা বারবার প্রকাশ করতেন সিঁথি। কিন্তু সাধ্য ও সুযোগের অভাবে তা সম্ভব হতো না তার স্বামীর। সকাল ৯টা থেকে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত তাকে একাই থাকতে হতো ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামীর মগবাজারের বাসায়। ওই সময়ে ফেসবুক ও টেলিভিশন দেখে সময় কাটাতেন সিঁথি। সুযোগ পেলেই বাইরে বের হতেন বন্ধুদের সঙ্গে। সিঁথির ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধু রয়েছে বলে তার স্বামী স্বীকার করেছেন। ওয়েস্টার্ন পোশাক প্রিয় ছিলো তার।
ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, ২০১২ সালে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে স্বামীর এক বন্ধুর মাধ্যমে এক আমেরিকা প্রবাসীর সঙ্গে পরিচয় হয় সিঁথির। ওই পরিচয়ের পর ফোন নম্বর বিনিময় হয়। ওই দিন রাতেই ফেসবুকে ওই প্রবাসীর বন্ধু তালিকায় যোগ হন সিঁথি। স্বামীর অজান্তে তার সঙ্গে চ্যাট ও ফোনে কথা হতো সমানতালে। বিষয়টি ওই প্রবাসীর স্ত্রী অবগত হওয়ার পর তা আর বেশিদূর এগোয়নি। তবে ওই সময়ে প্রাক্তন আরেক প্রেমিকের সঙ্গে আবার সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটান সিঁথি।
২০১৩ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় শিশুকন্যা চন্দ্রমুখীর মৃত্যু ও তার মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টার সংবাদে। চন্দ্রমুখীকে হারিয়ে বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন সাংবাদিক নাজনীন আক্তার তন্বি। ওই সংবাদে অনেকের মতোই মর্মাহত হন সিঁথি। চন্দ্রমুখীর মা তন্বির চেয়েও তার বাবা রকিবুল ইসলাম মুকুলকে জানার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন তিনি। সিঁথির ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, ওই সময়ে মুকুল যে টিভি চ্যানেলে কাজ করতেন সে টিভি চ্যানেলের নিয়মিত দর্শক ছিলেন সিঁথি। ফেসবুকে সার্চ করে মুকুলকে বন্ধু হওয়ার অনুরোধ প্রেরণ করেন তিনি। শুরু হয় হাই-হ্যালো। ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত তন্বি তখন হাসপাতালের শয্যায়। ওই সময়েই মুকুলের সঙ্গে ফেসবুকে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে সিঁথির। গত বছরের জানুয়ারিতে মুকুলের সঙ্গে দেখা করতে ওই টিভি চ্যানেলের অফিসে যান সিঁথি। রকিবুল ইসলাম মুকুল তখন ওই টিভি চ্যানেলের বার্তা সম্পাদক। সেদিন ওই টিভি অফিসে ছবি তোলে তা ফেসবুকে আপলোড করেন সিঁথি। অফিসে দীর্ঘ সময় মুকুলের সঙ্গে কথা হয় সিঁথির। অন্তরঙ্গ আলাপনের এক পর্যায়ে ওই দিনই দুজনের মধ্যে তুমি সম্বোধনের শুরু হয়। মুকুল ওই সময় তাকে জানান, স্ত্রী তন্বি হাসপাতালে থাকায় খাওয়া-দাওয়ায় কষ্টে হচ্ছে তার। এরপর প্রায়ই বাসায় রান্না করে মুকুলের জন্য অফিসে নিয়ে যেতেন সিঁথি। ওই সময়ে মুকুলের সঙ্গে ঘনঘন দেখা করার সুযোগ সৃষ্টির জন্য একটা চাকরি খুঁজছিলেন তিনি। গণমাধ্যমের রিপোর্টার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন সিঁথি। মুকুলও তাকে আশ্বস্ত করেন। এরমধ্যেই ওয়ারীতে ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সিঁথি। স্কুলের নাম করে মুকুলের সঙ্গে সময় কাটানোই তার প্রিয় হয়ে উঠে। পাশাপাশি ছায়ানটে গান শিখতেন সিঁথি। রবীন্দ্র সংগীতে ভালো হাতেখড়ি তার।
সিঁথির ঘনিষ্ঠরা জানান, একান্তে সময় কাটানোর জন্য বনশ্রীতে একটি বাসা ভাড়া নেন মুকুল-সিঁথি। স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই বাসায় দিনের প্রায় পুরো সময় কাটাতেন তারা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বনশ্রীর এফ ব্লকের সাত নম্বর সড়কের ২৮ নম্বর বাড়িটি তারা ভাড়া নিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাড়িতে মুকুলের ঘনিষ্ঠরাও যেতেন। প্রায়ই রাতে সেখানে আড্ডা হতো। দিনে ওই বাসায় অন্তরঙ্গ সময় কাটাতেন সিঁথি ও মুকুল। ওই বাসায় তোলা তাদের অনেক আলোকচিত্র পাওয়া গেছে। সূত্রমতে, দেশের বাইরে ভ্রমণের শখ সিঁথির। এ জন্য মুকুলের সঙ্গে আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মুকুলের সহযোগিতায় তার পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। আমেরিকার ভিসার জন্য আবেদনও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিসা পাননি তিনি।
স্ত্রীর আড়ালে মুকুল ও স্বামীর আড়ালে সিঁথি এই পরকীয়া প্রেম চালিয়ে যান। সাংবাদিক নাজনীন আক্তার তন্বি জানান, গত বছরের জুন মাস থেকে অসংলগ্ন কথা বলতেন রকিবুল ইসলাম মুকুল। এসব কথা শুরুতে বুঝতে পারেননি তন্বি। মুকুল প্রায়ই বলতেন, তোমাকে ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে দূরে চলে যাবো। জমি বিক্রি করে সব টাকা তোমাকে দিয়ে দেব। এই টাকা দিয়েই তুমি চলতে পারবে। আবার কখনো বলতেন, আমার অনেক স্বপ্ন। স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। কিন্তু মুকুলের অসংলগ্ন এসব কথায় তেমন কিছু মনে করতেন না তন্বি। তার কাছে মনে হতো আদরের কন্যা চন্দ্রমুখীকে হারিয়ে কষ্ট-হতাশা থেকেই এসব বলছেন মুকুল। কিন্তু মূল রহস্যটি বুঝতে পারেন কিছু দিনের মধ্যেই। তন্বি বলেন, একদিন ক্ষুব্ধ হয়ে মুকুল বললো তুমি আমার কাছে বোঝা। মনে করেছো বাচ্চা হলে আটকাতে পারবে আমাকে। মোটেও না। কথা শুনে বুকটা ভেঙে যায় তন্বির। সন্দেহটা ওই সময়ে জাগে। মুকুলের ফেসবুক সার্চ করে সিঁথিকে খুঁজে পান। মুকুলের প্রতিটি স্ট্যাটাসে তার মন্তব্য। কিন্তু তরুণী বিবাহিতা-এই তথ্য দেখে সন্দেহটা তার দিকে এগোয়নি। অবশ্য তন্বির বন্ধুরা জানিয়ে দেন আসল তথ্য। জানাজানির পর বেপরোয়া হয়ে উঠেন মুকুল। কলহ বাড়তে থাকে। সংসারে ভাঙনের শব্দ স্পষ্ট হয়। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তন্বি। তার আগেই নিজের নামে রাখা পূর্বাচলের সাত কাঠা জমি দুই কোটি টাকায় বিক্রি করে দেন মুকুল। সূত্রমতে, ওই টাকা থেকে গত ২রা এপ্রিল প্রেমিকা সিঁথিকে ১০ লাখ টাকা পে-অর্ডার করেন তিনি। মুকুলকে ফেরাতে কম চেষ্টা করেননি তন্বি। ফোন নম্বর সংগ্রহ করে সিঁথিকে অনুরোধ করেছিলেন, আমার সংসার ভাঙবেন না। জবাবে সিঁথি বলেছিলেন, আপনার স্বামীকে ধরে রাখতে পারেন না কেন। কেন সে আমার কাছে আসে? একইভাবে গত মে মাসে মুকুলের সঙ্গে সিঁথির পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়ে নিশ্চিত হন তার স্বামী। অনেক চেষ্টা করেও ফেরাতে পারেননি নিজ স্ত্রীকে। তিনি জানান, সিঁথির প্রতি অনেক বিশ্বাস ছিলো। ভালোবেসে তাকে বিয়ে করেছিলাম। কল্পনাও করিনি সে কখনো এরকম করতে পারে!
সর্বশেষ মুকুল ও সিঁথিকে আসামি করে যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন তন্বি। মামলা দায়েরের পর গত ২৬শে জুন রাতে মুকুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ওই রাতে শপিং করতে বসুন্ধরা সিটিতে গিয়েছিলেন সিঁথি ও মুকুল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসময় মুকুলের হাত ধরে, পায়ে পায়ে হাঁটছিলেন সিঁথি। অন্য হাতে ছিলো কয়েকটি শপিং ব্যাগ।
মেহেরুণ বিনতে সিঁথির সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। তবে তার মা রুবিনা আক্তার বলেন, সিঁথির বন্ধু মুকুল। এছাড়া কিছুই না। মুকুল-সিঁথির অন্তরঙ্গ ছবিগুলো বানানো। অযথা তার নিষ্পাপ মেয়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মেহেরুন বিনতে সিঁথির বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর থানার ভাগলপুরে। তার পিতা মৃত ফেরদৌস আলম একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। দুই বোনের মধ্যে সিঁথি ছোট। তার বড় বোন ও ভগ্নিপতি এবং মা বাড়িতে থাকেন। বর্তমানে সিঁথিও সেখানে আছেন বলে জানিয়েছেন তার মা।

সিরিয়ায় যেমন আছে বাংলাদেশী বৃটিশ পরিবার by হাসান চৌধুরী

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ১২  সদস্যের বৃটিশ পরিবারটি ১২ই মে কাঁটাতারের বেড়া পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে। তুরস্ক বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোবাস যোগে তারা প্রায় ২৪ ঘণ্টার জার্নি শেষে সিরিয়া পৌঁছে। সিরিয়া সীমান্ত থেকে আইএস সদস্যরা তাদেরকে রিসিভ করে। প্রথমে তাদেরকে একটি হোটেলে নেয়া হয়। সেখানে সবার পাসপোর্ট ও মোবাইল রেখে দেয়া হয়। এক সপ্তাহ পর তাদেরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে মহিলা এবং বৃদ্ধদের গ্রুপটিকে একটি বাসায় নেয়া হয়।  যুব পুরুষদের পাঠিয়ে দেয়া হয় অন্যত্র। সিরিয়ায় পাড়ি জমানো ওই পরিবারের সদস্যরা  সম্প্রতি বাংলাদেশ ও বৃটেনে থাকা তাদের নিকট আত্মীয়দের ফোনে  উপরোক্ত বিষয়গুলো  অবগত করেন। কোন রূপ চিন্তা না করতেও তারা তাদের আশ্বস্ত করেন। স্বজনদের নির্ভরযোগ্য সূত্রটি  জানায়, যুব সদস্যরা ইতিমধ্যে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ইবনে বতুতা স্ট্রিট,আল বীরুনি স্ট্রিট এবং আলী ইবনে আবু তালেব মহাসড়ক হয়ে বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণ করেছেন। যুব মহিলাদের শিখানো হচ্ছে সিরিয়ান ভাষা। সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে তাদেরকে ধারণা দেয়া হচ্ছে। সিরিয়ায় পাড়ি জমানো ওই পরিবারের কর্তা আবদুল মান্নান, তার স্ত্রী মিনারা খাতুন, ২ মেয়ে ও পুত্র বধূরা আছেন এক সঙ্গে। তাদের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন আইএস সদস্য যুদ্ধাহত আরেক বৃটিশ নাগরিক। বাজার করা থেকে শুরু করে  বর্তমানে তাদের সব দেখভাল করছেন ওই ব্যক্তি। কেয়ারটেকার ওই ব্যক্তির ফোন থেকেই তারা বাংলাদেশ ও লন্ডনে সম্প্রতি যোগাযোগ করেন। গত কয়েকদিন পূর্বে তাদের নামে একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয়েছে। আইএস প্রদত্ত ওই ব্যাংক একাউন্ট থেকে প্রয়োজন মতো টাকা তুলতে পারেন বলেও জানা যায়।  ৮০ বছর বয়স্ক আবদুল মান্নান তার এক নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। এ পার থেকে চলে আসার আহ্বান জানালে তিনি বলেন, পাসপোর্ট নেই কিভাবে যাব। তাছাড়া ছেলে-মেয়েদের এখানে রেখে  কিভাবে যাই বলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। মেয়েরা তার কাছে থাকলেও ছেলেরা কোথায় আছে তা তিনি জানেন না বলে জানান। আসন্ন ঈদুল ফিতরে পরিবারের সবাই একত্রিত হবে এবং ওই সময় তারা বাংলাদেশ ও লন্ডনে যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে আবদুল মান্নান জানান।
গত সপ্তাহে রাজিয়া খানম তার দুই বান্ধবীকে ফোনে তাদের বর্তমান অবস্থা অবগত করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৃটেনের লুটন ও বার্মিংহামের  ওই দুই বান্ধবীর বরাত দিয়ে একটি  সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে। রাজিয়া তাদেরকে বলে ‘আমরা ভালা আছি তুমিতাইন ছিন্তা খরিওনা’ তুমিতাইন আইওউ আমার ওনো, আইলে আমি ব্যবস্থা খরমু। ( আমরা ভাল আছি তোমরা চিন্তা করবে না, তোমরা চলে এসো আমার এখানে, রাজি থাকলে আমি তোমাদের সব ব্যবস্থা করবো)।  বান্ধবীদের নেতিবাচক জবাবে রাজিয়া বলে, আমার লাগি তোমরা দোয়া খরিও আর ফোন দিতামনায়, তুমাতান সমস্যা ওইতো ফারে। ( আমার জন্য দোয়া করিও আর ফোন দেবো না কারণ এতে তোমাদের সমস্যা হতে পারে)।
আইএসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমানো ওই বৃটিশ পরিবারটির লন্ডন ও বাংলাদেশে থাকা নিকট আত্মীয়রা তাদের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। সিরিয়ায় তারা কেমন আছে, কোথায় আছে, কিভাবে আছে তা জানার জন্য অস্থির হয়ে ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই ফোনের নাগাল পাওয়া হয় না। হঠাৎ অল্প সময়ের জন্য পেলে তাদের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন স্বজনরা। কিন্তু অনেক সময় কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই লাইনটি কেটে যায়।
জানা গেছে, ১২ সদস্যের বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ওই পরিবারটি আইএস নিয়ন্ত্রিত  সিরিয়ার ‘তেল আবিয়াদ শহরে অবস্থান করছে। সহসাই তারা ফেরতে পারবেন কিনা তা নিয়ে স্বজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ এই পর্যন্ত যারাই সেখানে পাড়ি জমিয়েছে তারা আর ফেরেনি। বৃদ্ধ আবদুল মান্নান যে মসজিদে নামাজ আদায় করেন সেখানে আরও ৬ জন বৃটিশ নাগরিক নিয়মিত নামাজ আদায় করেন, যারা আইএসের সক্রিয় সদস্য। তাদের সান্নিধ্যে আবদুল মান্নান বেশির ভাগ সময় কাটান বলেও জানা যায়।
দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে বৃটেন থাকা ৮০ বছর বয়স্ক আবদুল মান্নান  স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে,পুত্র বধূ ও নাতি-নাতনি নিয়ে এক মাস ছুটি কাটিয়ে  সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও গ্রাম থেকে গত ১১ই মে যুক্তরাজ্য ফেরার পথে তুরস্ক থেকে কাউকে না জানিয়ে সিরিয়া পাড়ি জমান। সিরিয়ার জেহাদি সংগঠন আইএসে যোগ দিতেই তাদের এই পলায়ন বলে  জানা যায়। বিমানের টিকিট থেকে শুরু করে দেশান্তর হওয়ার এই কাজটি  সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে আবদুল মান্নানের একুশ বছর বয়সী মেয়ে রাজিয়া খানম ও ছেলে তৌফিক হুসাইন। প্রায় দেড় মাস পর বিষয়টি বিবিসির কল্যাণে জানাজানি হলে সিলেট, ফেঞ্চুগঞ্জ ও যুক্তরাজ্য জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় লন্ডন পুলিশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। দেশীয় স্বজনদের পরামর্শে একপর্যায়ে আবদুল মান্নানের প্রথম স্ত্রীর  ছেলে লন্ডনে অবস্থানকারী সেলিম আহমদ গংরা বৃটেনের লুটন শহরের মেট্রো পুলিশকে বিষয়টি অবগত করে। এ ঘটনায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাঙালি কমিউনিটিতে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যের কেন্ট শহরের বাসিন্দা মো. মুজিবুর রহমান জানান, এসব ঘটনায় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। এমনিতেই বর্তমানে মসজিদগুলোতে পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জুম্মার নামাজে ইমাম সাহেবরা আরবী ও বাংলাতে যে ওয়াজ এবং খুৎবা দেন তা সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদেও বলতে হয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে বৃটেন এই উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব দু একটি বিচ্ছিন্ন  ঘটনায় যে বাঙালিদের ওপর বৃটিশ সরকারের নেতিবাচক দৃষ্টি পড়বে তা অনেকে মানতে নারাজ। তারা বলেন,  বৃটেনে বাঙালিরা যে শুধু অবস্থান করছে তা নয়। তারা এখন সেখানকার জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে বৃটিশ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি টমি মিয়াদের কল্যাণে বাঙালিরা রাজপ্রাসাদে ছুটে যাচ্ছে রন্ধন বিশারদ হিসেবে। তাই বৃটেনের সঙ্গে বাঙালিদের সম্পর্ক সহজেই ফাটল ধরার নয়। দেশে আসা কয়েকজন যুক্তরাজ্য প্রবাসী সেখানকার একটি পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, জেহাদি সংগঠন আইএস বা ইসলামিক স্টেটের উত্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তৎপর আইএস জেহাদিরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র পাচ্ছে। তিনি সম্প্রতি মার্কিন ফক্স নিউজকে বলেছেন, আইএসকে অস্ত্র দেয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। তবে ওই সাবেক মন্ত্রী দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র উদ্দেশ্যমূলক প্রক্রিয়ায় আইএসকে এসব অস্ত্র দিচ্ছে না। গত মার্চ মাসে ইরাকের বদর সংস্থার প্রধান কাসিম আল আরাজি জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, তার কাছে প্রমাণ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র  ইচ্ছাকৃতভাবে  জেহাদি গোষ্ঠীকে অস্ত্র দিচ্ছে। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে মার্কিন সামরিক বিমান থেকে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বোমা ফেলার পাশাপাশি সমরাস্ত্রও ফেলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জার বলেন, এখানে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্র শুধু তাদের কাছেই পাঠাচ্ছে যারা পেন্টাগনকে সহায়তা করছে। আর এর মাধ্যমে এই ইঙ্গিত পরিষ্কার যে আইএসকে অস্ত্র দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটা ভূমিকা পালন করছে। লন্ডন ভিত্তিক অর্গানাইজেশন কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ বলেছিল, আইএস উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করছে, যার মধ্যে এম ১৬ অ্যাসাল্ট রাইফেলও রয়েছে। এসব রাইফেলের গায়ে খোদাই করে  লেখা রয়েছে ‘ প্রপার্টি অব দ্যা ইউএস গভর্মেন্ট’।