Saturday, June 2, 2018

রাশিয়ায় সরাসরি পোশাক রপ্তানি করতে চায় বিজিএমইএ by এম এম মাসুদ

রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদে তৈরিপোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। দেশটিতে সরাসরি পোশাক রপ্তানির পরিকল্পনা নিয়েছে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তৈরি পোশাকের রাশিয়ার বাজার ধরতে ও বাজার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অ্যাপারেল কূটনীতিকে আরো জেরালোভাবে কাজে লাগানোর অব্যাহত চেষ্টা চলছে।
সূত্রমতে, রাশিয়ায় বাংলাদেশের তৈরিপোশাক বিক্রি হলেও এর বেশিরভাগই আসছে তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে। তাই বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় সরাসরি তৈরিপোশাক রপ্তানির লক্ষ্য বিজিএমইএর। রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কেউ কেউ বাংলাদেশ থেকে তৈরিপোশাক এনে বিক্রি করছেন। তবে মেলায় অংশ নেয়া রপ্তানিকারকদের অনেকেই ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার পেয়েছেন।
বিজিএমএইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রাশিয়ায় তৈরিপোশাক রপ্তানি করা গেলে ১৬ কোটি মানুষের বাজার পাওয়া সম্ভব। শুল্ক ও ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানে অ্যাপারেল কূটনীতিকে আরো সক্রিয় করার আহ্বান জানান তিনি।
এক সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর র‌্যাডিসন হোটেলে আয়োজিত তিন দিনের একক মেলার পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন ব্র্যান্ড আউটলেট ঘুরে দেখেছেন বিজিএমইএ প্রতিনিধি দল। এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির বলেন, রাশিয়ায় তৈরিপোশাকের বাজার প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলারের। বাজারটি বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশাল সম্ভাবনাময়। কিন্তু এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) এবং দেশটির শুল্ক কর-এর কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি পোশাক রপ্তানিতে বেশ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এতে করে রাশিয়ার বাজার ধরার ইচ্ছা থাকলেও কষ্টকর হয়। তবে এবার আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি বাজারটি ধরার জন্য। কারণ, ২০২১ সালে দেশের পোশাক রপ্তানরি লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে।
এদিকে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভালো ক্রয়াদেশ আছে। গত বছরের নভেম্বর থেকে ক্রয়াদেশের চাপ শুরু হয়। আগামী তিন মাসে কারখানাগুলোতে অর্ডার নেয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। এজন্য অনেক ব্র্যান্ডের পোশাকের ক্রয়াদেশ নেয়া যাচ্ছে না। উন্নত কর্মপরিবেশ বা কমপ্লায়েন্ট পোশাক কারখানার কারণে ক্রয়াদেশ প্রাপ্তিতে এই সফলতা এসেছে বলে মনে করেন পোশাক উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, গত বছরের মে মাসের সময়ের তুলনায় এবার পোশাকের ক্রয়াদেশ কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশের বাড়তি চাপের কারণ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসা বাড়াচ্ছে। ফলে এবার ক্রয়াদেশ বেশি দিচ্ছে বলে জানান তারা।
রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানেও উদ্যোক্তাদের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, দেশের পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে। সামনের মাসগুলোতে এর প্রতিফলন আরো বেশি দেখা যাবে।
ইপিবি তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ২৮৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে রপ্তানি হয় যথাক্রমে ২৬০ ও ২৫৭ কোটি ডলারের পোশাক। এ সময় ফেব্রুয়ারিতে ১৬.৮৬ ও মার্চে ১২.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত এপ্রিলে ২৪৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির বিপরীতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.৮৯ শতাংশ। ফলে সামগ্রিকভাবে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পোশাক রপ্তানিতে ৯.৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাড়তি ক্রয়াদেশ আসছে। অনেক ব্র্যান্ড ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। সব মিলিয়ে ক্রয়াদেশ বেশি আসছে বলে জানান তিনি।
তৈরিপোশাকের ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সুতা, কার্টন, পলিব্যাগ, ব্যাক বোর্ড, বাটারফ্লাই, হ্যাঙ্গার, গামটেপসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরির কারখানায় চাপ বেড়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান বলেন, বছরের শুরু থেকেই কাজের চাপ বেড়েছে। প্রতিটি কারখানাই বেশি করে কাজ পাচ্ছে। প্রতিদিনই ক্রেতাদের অফার আসছে।
এদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, সমালোচনা ও নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তৈরিপোশাক খাতে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ২০২১ স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে তৈরিপোশাক খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আমরা ব্যবসায়ীদের যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, সেটা দেব। আশা করি তৈরিপোশাক খাতে ২০২১ সালের মধ্যেই ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পৌঁছাবে। তবে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করে, যে গতিতে আমরা এগুচ্ছি তাতে এ লক্ষ্য পূরণ নাও হতে পারে। কিন্তু যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়নের যে টার্গেট সেখানে পৌঁছাতে পারব।
ওদিকে ২০১৭ সালে ইউরোপের দেশগুলোর পোশাক আমদানি আগের বছরের চেয়ে প্রায় সোয়া তিন শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশের পোশাক আমদানির তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ইউরোস্ট্যাট এ তথ্য দিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী একই সময়ে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে ০.৪৯ শতাংশ (০.৪৯%)।
ইউরোস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপের ২৮টি দেশ সব মিলিয়ে নয় হাজার ২৮১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ পোশাক আমদানি করেছে। এর আগের বছর আমদানির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৯৮৯ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পোশাক আমদানি বেড়েছে ২৯১ কোটি ডলারের।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য আমদানি করেছিল ৮ হাজার ২৯ কোটি ডলারের। আর ২০১৬ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল আট হাজার ৬৮ কোটি ডলারের। অর্থাৎ এক বছরে দেশটির তৈরিপোশাক ও টেক্সটাইল আমদানি কমেছে ৩৯ কোটি ডলারের।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় না। সেখানে বাংলাদেশি পোশাক পণ্যকে প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক-কর পরিশোধ করে প্রবেশ করতে হয়। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় সব পণ্যই শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এর ফলে গত কয়েক বছরে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে রপ্তানি বাড়ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের (জুলাই-জানুয়ারি) হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এখন ইউরোপের দেশ জার্মানি।

দেশের সাড়ে ৪ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত

দেশের সাড়ে ৪ কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত; যা সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের অন্যতম কারণ। দেশে আশঙ্কাজনক হারে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরনের পরিবর্তনের কারণে দিন দিন ফ্যাটি লিভার রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে হেপাটোলজি সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা গবেষণায় পাওয়া তথ্য তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ লিভারে চর্বি রোগে আক্রান্ত। দেশের সাড়ে ৪ কোটি মানুষ এ রোগে ভুগছে।
গ্রামের স্থূলকায় নারীরা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন (৭৩ দশমিক ২১ শতাংশ)। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৭১ শতাংশ এবং উচ্চ রক্তচাপ আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ লিভারে চর্বি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। যাদের আয় কম তাদের তুলনায় উচ্চ আয়ের ব্যক্তিগণের আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় দেড় গুণ বেশি। স্থূলতায় আক্রান্ত হলে ১০ দশমিক ৭১ গুণ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ঝুঁকি প্রায় ২ দশশিক ৭১ গুণ বেশি। বিবাহিতদের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা গেছে। গবেষক দলটি সারা দেশে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা লিভারের চর্বি রোগের প্রাদুর্ভাব নির্ণয় করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা এবং দেশের বৃহত্তম চার বিভাগের অন্তর্গত চারটি জেলা শহর ও চারটি উপজেলা শহরে এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এ গবেষণা কর্ম ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরু হয় এবং ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সর্ব মোট ২৭৮২ জন সুস্থ ও স্বাভাবিক কর্মক্ষম ব্যক্তি এই গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ১৬৯৪ জন পুরুষ এবং ১০৮৮ জন নারী। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৮৫ বছর। তাদের গড় বয়স ছিল ৩৪ বছর। সেমিনারে বক্তারা জানান, সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে লিভারে চর্বি জমার কারণে প্রদাহ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে স্টিয়াটোহেপাটাইটিস। অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়ার কারণে লিভার বা যকৃতে যে প্রদাহ সৃষ্টি হয় তাকেই স্টিয়াটোহেপাটাইটিস বা লিভারে চর্বি জমাজনিত প্রদাহ বলে। এই রোগের আগের স্তরের নাম হচ্ছে ফ্যাটি লিভার বা লিভারে চর্বি রোগ।
এ রোগ ডায়াবেটিস এবং শরীরে ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বক্তারা জানান, এ রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন করতে হবে। দৈনন্দিন এক্সারসাইজ করতে হবে, তাহলে ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মবিন খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়াররম্যান অধ্যাপক নূরুদ্দিন আহমদ প্রমুখ।

এক বাগানে আম, লিচু, পেয়ারা, খেজুর, ড্রাগন ফল by নয়ন খন্দকার

সুরত আলীর বাগানে পেয়ারা গাছ
গুটি কয়েক ফসলের বদলে ফল চাষ করা কৃষকদের মধ্যে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের সুরত আলী একজন। আম, লিচু, পেয়ারা, খেজুর, ড্রাগন, নারকেলসহ নানা ফলের গাছ নিয়ে গড়ে তুলেছেন বাগান। আবহাওয়া ও মাটির কারণে বিদেশি ফল ফলতে দেরি হওয়ায় প্রথমে লোকসানের আশঙ্কা করেছিলেন তিনি। পরে দেরিতে হলেও গাছে ফল আসতে শুরু করায় লাভের আশা করছেন ফল চাষি সুরত আলী। এরই মধ্যে চারা বিক্রি করে আয় শুরু হয়েছে। ফল বিক্রি করে এ বছরেই লগ্নি করা টাকার অর্ধেক টাকা উঠে আসবে বলে ধারণা করছেন তিনি।
কালীগঞ্জের শিবনগর দাসপাড়ার এই ফার্মে  ড্রাগন, আম, লিচু, পেয়ারা, খেজুর, লটকন, নারিকেল, রামবুটান প্রভৃতি ফলের বিভিন্ন জাতের গাছ রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ৫ প্রকারের ড্রাগন,  আম্রপালি, হিমসাগর, ল্যাংরা আমের গাছ, মোজাফ্ফর লিচু, ভারত থেকে আনা খোরমা খেজুর, থাইল্যান্ডের বিভিন্ন প্রকার পেয়ারা ও নারিকেল গাছ।
বিদেশি নারকেল গাছবিদেশি নারকেল গাছ
সুরত আলী জানান, প্রায় ১২ একর জমিতে বিদেশি বিভিন্ন ফলের চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৩ একর জমি নিজের এবং বাকি জমি লিজ নেওয়া। বিঘা (৩৩ শতাংশ) প্রতি বছরে ১০ হাজার টাকা করে ৯ একর জমি ১০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে এ কৃষি ফার্মটি গড়ে তুলেছেন।
তিনি জানান, দেশি ফসল চাষে খরচ কম এবং স্বল্প সময়ে খরচের টাকা উঠে লাভের মুখ দেখা যায়। কিন্তু বিদেশি ফল চাষে সময় লাগে বেশি এবং খরচ হয় বেশি। গাছে ফল আসতে শুরু করায় এখন তিনি আশাবাদী। ভিন্ন ধরনের এ জাতীয় ফলের চাষ শুরু করতে তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তারই ভাগ্নে কৃষিবিদ ড. রুস্তম আলী।
খোরমার গাছখোরমার গাছ
২০১৬ সালের শেষের দিকে নিজের বাড়ির পতিত জমি, শিবনগর ভাটা সংলগ্ন মাঠ ও দাসপাড়ার মাঠের ৪ একর জমিতে পেয়ারা, ৫ একর জমিতে ড্রাগন, দেড় একর জমিতে আম, প্রায় ২ বিঘা জমিতে লিচু এবং বাকি জমিতে রামবুটান, লটকন, খেজুর, নারিকেল ও কলার চাষ করেন। এ ফল চাষে তার প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফার্মে এখন প্রতিদিন ৭/৮ জন শ্রমিক প্রতিনিয়ত কাজ করেন।
গাছে ড্রাগর ফল ধরেছেগাছে ড্রাগর ফল ধরেছে
ড্রাগন চাষ নিয়ে তিনি জানান, দেড় বছর বয়সে তার লাগানো গাছে ফল আসতে শুরু করেছে। জুলাই-আগস্টের মধ্যে ফল পাকতে শুরু করে। সাধরণত ফুল আসার ৪০-৪৫ দিনের মাথায় ফল পেকে যায়। একটি পরিপুষ্ট পাকা ফলের ওজন প্রায় ৩০০-৪০০ গ্রাম হয়। বছরে প্রায় ৩-৪ মাস ফল সংগ্রহ করা যায়। ড্রাগন গাছ একবার লাগালে ওই গাছ থেকে কমপক্ষে ১০ বছর ফল পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজারে ড্রাগন কেজিপ্রতি ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি করা যায়। ঢাকার বাজারে এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
সুরত আলী আরও জানান, ড্রাগন চাষ করে এরই মধ্যে উপজেলার বোরহান ও স্বপন নামের দুই চাষি ভালো মুনাফা পেয়েছেন। 
এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম জানান, বাংলাদেশে ড্রাগন ফলের চাষ এখনও সেভাবে শুরু হয়নি। কালীগঞ্জ উপজেলায় কয়েকজন চাষি ক্যাকটাস প্রজাতির এ ফলের চাষ শুরু করেছেন। উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১২ একর জমিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। ড্রাগন ফলে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন (ভিটামিন এ) ও আয়রন আছে।
তিনি জানান, কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস ড্রাগন চাষিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে এবং নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে শীতের সময়ও এ  ফল পাওয়া সম্ভব। আগামী বছর উপজেলার ড্রাগন চাষিদের প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দিয়ে অফসিজনেও এ ফল পাওয়া যাবে। লাভজনক এ ফল চাষে কৃষকেরা আগ্রহী হলে কৃষি অফিস তাদের সব ধরনের সহায়তা দেবে।

কী দোষ করেছিল আমাদের বাবা, প্রশ্ন তাহিয়াত-নাহিয়ানের by আবদুল আজিজ

কক্সবাজারের টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’নিহত কাউন্সিলর একরামুল হকের দুই মেয়ে তাহিয়াত হক (১৪) ও নাহিয়ান হক (১১)। তারা দুই বোন টেকনাফ বিজিবি পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থী। তাহিয়াত অষ্টম ও নাহিয়ান ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলে যাওয়া-আসার একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তাদের বাবা একরাম। মোটরসাইকেলে করে সকালে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতেন বাবা। স্কুল ছুটির পর আবার তাদের বাড়ি নিয়ে আসতেন। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে বাবাকে ঘিরে দু’বোনের কত শত স্মৃতি। বাবাই তাদের একমাত্র বন্ধু, একমাত্র অভিভাবক। সেই বাবা আজ নেই। বাবাকে হারিয়ে দুই বোনের কান্না থামছেই না। তারা জানে না, এই কান্নার শেষ কোথায়। তাদের একটাই প্রশ্ন—কী দোষ করেছিল আমাদের বাবা? কেন তাকে মেরে ফেলা হলো?
স্বজন হারানোর শোকে পাগল প্রায় পরিবারটি। বিশেষ করে দুই মেয়ে, বাবাকে হারানোর বিষয়টি মানতেই পারছে না। ঘটনার পর খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে তারা। একটু পর পরই কান্না করছে তারা। মাঝে মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। এরই মধ্যে তারা অসুস্থ হয়েও পড়েছে। বৃহস্পতিবার (৩১ মে) তাদের দুবোনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জানান একরামের ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘জানি না, তাহিয়াত ও নাহিয়ানের কান্নার শেষ কোথায়? ছোটবেলা থেকেই বাবার আদর-স্নেহে বড় হয়েছে ওরা। সব সময় ছায়ার মতো তাদের পাশে পেয়েছে বাবাকে। এজন্য তাদের নিয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছি। ওদের কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না। কথায় কথায় বলছে, বাবাকে এনে দাও।’
একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী নিরপরাধ। সে কোনোদিন ইয়াবা তো দূরের কথা, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পর্যন্ত চলাফেরা করেনি। র‌্যাবের সঙ্গে কোনও বন্দুকযুদ্ধ হয়নি। বন্দুকযুদ্ধের নামে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে যে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিভাগীয় বিচার এবং দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করছি। যাতে আর কোনও নারী এভাবে স্বামীহারা না হয়।’
তিনি বলেন, ‘কদিন আগেও আমার একটি সাজানো সংসার ছিল। হাসি-আনন্দ ছিল। অভাব অনটন থাকলেও আমাদের কোনও দুঃখ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ সব তছনছ হয়ে গেলো। আজ পিতৃহারা হয়েছে আমার দুই মেয়ে। প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আবার নিয়ে আসতো। আজ কে আমার মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাবে? আমার মেয়েরা কাকে বাবা বলে ডাকবে? আমাদের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার। কী নিয়ে বাঁচবো আমরা?’
নিহত একরামের মেজ ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাই ১২ বছর টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনবার পৌর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। টেকনাফ স্টেশনে ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন। টেকনাফ বর্ডার গার্ড পরিচালিত পাবলিক স্কুল পরিচালনা কমিটির দীর্ঘদিন সদস্য ছিলেন। থানায় তার নামে কোনও মামলা ছিল না। তার নিজের কোনও বাড়ি নেই। এখনও পৈত্রিক বাড়ির একটি কক্ষে থাকেন। কেন তাকে এত নির্মমভাবে মারা হলো? আমি আমার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের বিভাগীয় বিচার দাবি করছি।’
টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, ‘একরাম আমার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। দীর্ঘদিন একসঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এ কারণে আমি একরামকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ। কেন তাকে এভাবে মরতে হরৈা জানি না। আমরা উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। ’
প্রসঙ্গত, গত ২৬ মে রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ রোডে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’টেকনাফ পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরাম নিহত হন। র‌্যাবের দাবি—‘একরাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। ওই দিন ইয়াবা নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধেএকরাম নিহত হয়। এসময় ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।’ এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নিজ এলাকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সৌদি ফেরত নারীদের কান্না

কাজের কথা বলে নিয়ে গেছে। কিন্তু যাওয়ার পর নির্যাতন (যৌন নিপীড়ন) করতে চেয়েছে। তাতে রাজি না হওয়ায় ছাদে নিয়ে গেছে। বেধড়ক মারধর করেছে। একপর্যায়ে ছাদ থেকে ফেলে দিছে। এতে পা ভেঙে গেছে। এই অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সুস্থ হলে আবারো তাকে নির্যাতন করা হবে। ফেরত না আনলে মেয়েকে মেরেই ফেলবে তারা। এসব কথা বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন সম্প্রতি সৌদি আরবে নিপীড়নের শিকার এক নারীর মা। ষাটোর্ধ্ব এই মা আকুতি জানিয়ে বলেন, আপনারা আমার মেয়েকে এনে দেন। গতকাল দুপুর ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আকুতি জানান। বলেন, তার তিন বছরের সন্তান বাড়িতে। তার অবস্থাও ভালো না। তিনি বলেন, আজকে কতদিন ধরে মেয়েটা বিপদে। বিভিন্ন অফিসে যাচ্ছি কিন্তু কাজ হচ্ছে না। উল্টো মেয়ের জামাইকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেশন (বিএসএসএম) আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ওয়ারবি ফাউন্ডেশন, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট ফর রিসার্চ ইউনিট (রামরু), বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা), অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকুপ), মানুষের জন্য ফাইন্ডেশন, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ অভিবাসী অধিকার ফোরাম (বোয়াফ) সহ ১১ বেসরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন সম্মেলনে অংশ নেয়। এর আগে বেলা ১১টার দিকে একই ইস্যুতে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে তারা। এ সময় নেতৃবৃন্দ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দেশটিতে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসা বেশ কয়েকজন নারীকর্মী তাদের ওপর চালানো অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করেন। নির্যাতিত নারীরা অভিযোগ করেন, যেসব এজেন্সি তাদেরকে সৌদি আরবে পাঠায়, তারা পরবর্তীতে সমস্যার কথা জানালে পাত্তা দেয় না। বলে, বিমানবন্দর পার করে দেয়ার পরই তাদের দায় শেষ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক রিনা রায়। তিনি জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় হাজার খানেক নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরেছেন। দেশে ফেরার অপেক্ষায় সেখানে সেউফ হাউজ ও জেলে আছেন আরো অনেকে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশে ফিরে আসা নারীরা তাদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিচ্ছেন। তাতে অধিক সময় ধরে কাজ করানো, সময় মতো ঘুমাতে না দেয়া, ঠিকমতো খাবার না দেয়, মাস শেষে নির্ধারিত বেতন না দেয়া, গৃহকর্তা এবং বাড়ির অন্যদের দ্বারা ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ যৌন নির্যাতনের ফলে গর্ভবতী হয়ে দেশে ফিরে আসার মতো ঘটনাও আছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছে, এসব প্রতিবাদ করলে মধ্যযোগীয়পন্থায় নির্যাতন চলে। গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া, মাথায় গরম পানি ঢেলে দেয়া, চুল টেনে তুলে ফেলা, গরম আয়রন দিয়ে সেঁকা দেয়া, খুন্তি গরম করে শরীর পুড়িয়ে দেয়াসহ খাবার ও পানি ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি করে রাখার মতো ভয়াবহ নির্যাতনও তাদের ওপর চালানো হয়েছে। ফলে অনেকেই ফিরেছেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে। আবার নির্যাতিতদের অনেকের পরিবার তাদেরকে গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ। নারী কর্মীদের নির্যাতনের ঘটনা খুব কম, সরকারের এমন বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়, একটি মেয়েও যদি নির্যাতিত হয় তার জন্য ব্যবস্থা নেয়াও জরুরি। কিন্তু সেই ধরনের ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, প্রবাসী বা নারী কর্মীরা শুধু টাকা পাঠানোর মেশিন নয়। সবার আগে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি। সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো- সৌদি আরবসহ বিদেশে কাজ করতে যাওয়া প্রত্যেক নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, ফেরত আসা গৃহকর্মীর ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্য সেবা ও প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত, গৃহকর্মী বা গন্তব্য দেশের এজেন্সি কর্তৃক গর্ভবতী নারী শ্রমিক ও তার শিশুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহন, দোষী গৃহকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দূতাবাসের কার্যকরী ভূমিকাসহ যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক, ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান, রামরু’র মেরিনা সুলতানা, ওকুপ-এর নির্বাহী পরিচালক ওমর ফারুক চৌধুরীসহ মানবাধিকার সংস্থার নেতৃবৃন্দ। শরিফুল হাসান বলেন, ২০১৫ সালে যখন নারী কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয় তখনই আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছিলাম, তারা আশ্বাসও দিয়েছিলো, কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেখানে আল্লাহ ছাড়া তাদের দেখার কেউ নেই। ওমর ফারুক চৌধুরী সম্প্রতি করা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তার মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী বলেছেন, ২-৩ শতাংশ এমন ঘটনার শিকার হতে পারেন। ওমর ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি এমন স্টেটমেন্ট কিভাবে দিতে পারেন? তার এই কথার মাধ্যমে বোঝা যায় কারা দালালদের পৃষ্টপোষকতা করছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধের দাবি জানান। সুমাইয়া ইসলাম বলেন, নারী কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে যে সমঝোতা স্মারক হয়েছে তার কোনোটিই সৌদি মানেনি।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনের আগে বেলা ১১টার দিকে একই ইস্যুতে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করা হয়। এতে সৌদি আরবে নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ব্রাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ফরহাদ আল করিম, আওয়াজ ফাউন্ডেশনের আনিচুর রহমান, ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক, মহাসচিব ফারুক আহমেদ, রামরুর মেরিনা সুলতানা প্রমুখ। বক্তারা অবিলম্বে নির্যাতন বন্ধে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি দাবি জানান।

গ্রাহক অসন্তুষ্টির জের: এক বছরে ১৬ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ

গত এক বছরে দেশীয় ব্যাংকগুলোর গ্রাহক কমেছে ১৬ লাখ। যা আগের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও গ্রাহক অসন্তুষ্টিই এর বড় কারণ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং সেবায় গ্রাহকের অসন্তুষ্টি বেড়েছে। এ কারণে ২০১৭ সালে ১৬ লাখ ৫২ হাজার ৮৮১টি ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়। এর পেছনে অসন্তুষ্টিই মূল কারণ। বন্ধ হওয়া হিসাব দেশের মোট ব্যাংক হিসাবের সাড়ে ১২ শতাংশ। এর আগে ২০১৪ সালে ৮.৬০ শতাংশ গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়ে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করেন। ২০১৫ সালে এ ধরনের গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৪২ শতাংশ। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৬৪ শতাংশে।
এই গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক হিসাব বন্ধের প্রবণতা বাড়ছে। দেশের ব্যাংক খাতে চলমান অস্থিরতাও হিসাব বন্ধের কারণ বলে মনে করছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটরিয়ামে ‘সাসটেইনেবিলিটি ইন সার্ভিস কোয়ালিটি অ্যান্ড কাস্টমার্স কনফর্মিটি : ড্রাইভার্স অব কাস্টমার্স লয়েলিটি টু ব্যাংকস’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে গ্রাহকদের হিসাব বন্ধের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গবেষণা দলে আরো ছিলেন- বিআইবিএমের সহকারী অধ্যাপক রেক্সোনা ইয়াসমিন, বিআইবিএমের প্রভাষক লামিয়া রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং অ্যাক্টিং হেড অব রিটেইল এম খোরশেদ আনোয়ার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি এবং কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জহির হোসেন। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতি বছর গ্রাহকরা ব্যাংক হিসাব বন্ধ করলেও ৫৬ শতাংশ ব্যাংকে এ বিষয়ে গ্রাহকদের কোনো সাক্ষাৎকার নেয়ার ব্যবস্থা নেই। এমনকি বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব ব্যাংক হিসাবধারীর কোনো রেকর্ডও সংরক্ষণ করা হয় না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ব্যাংকিং সেবায় গ্রাহকদের আরো ভালো সেবা দিতে হবে। একই সঙ্গে কেন ব্যাংক হিসাব বন্ধ হচ্ছে তা জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, অর্থনীতিতে গ্রাহক সন্তুষ্টি সাফল্য অর্জনের অন্যতম নিয়ামক। ব্যাংকিং খাতেও ভালো পণ্যের সঙ্গে ভালো সেবা প্রদান করতে হবে।
সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএমের সাবেক চেয়ার প্রফেসর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণেই ব্যাংকিং খাতে কর্মীদের কিছু সৌজন্যতা শিখিয়ে দিতে হবে। সমপ্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ গ্রাহকদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেন না। ব্যাংকারদের গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। একজন ভালো ব্যাংকার হবেন একজন ভালো জনসংযোগ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, ব্যাংকিং খাতের গ্রাহকদের চাহিদার পরিবর্তন হয়েছে। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকের কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। গ্রাহকদের মধ্যে ক্যাটাগরি করে পরিকল্পনা করলে সেটি ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্রাহকদের সন্তুষ্টি এবং দ্রুত সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, যে ব্যাংকের কৌশল যত উন্নত তারা বেশি মুনাফা করে। গ্রাহককে উত্তম সেবা দিয়েই কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিআইবিএম-এর গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ গ্রাহক ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলো ছোট গ্রাহকদের তেমন মূল্যায়ন করে না। এসব কারণে গ্রাহকরা হিসাব বন্ধ করে দিচ্ছেন।

আইনের সীমাবদ্ধতায় অধরা মাদকের গডফাদাররা by শেখ জাহাঙ্গীর আলম

আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের সহজে গ্রেফতার করা যায় না। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মাদক বেচাকেনার স্পটগুলোতে অভিযান চালালেও ধরা পড়ে না মাদকের গডফাদাররা। এর কারণ হিসেবে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের সীমাবদ্ধতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়েই মাদক ব্যবসার অনেক গডফাদারকে শনাক্ত করা হয়। তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা আছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী, সঙ্গে মাদক না পাওয়ায় তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না।
মাদকের বিরুদ্ধে গত ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অধিদফতরের রিজার্ভ ফোর্স (পুলিশ) নিয়ে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ অভিযানে তালিকা অনুযায়ী মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সঙ্গে মাদক থাকুক বা না থাকুক, গ্রেফতার করা হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা। তবে স্পটগুলোতে বড় মাদক কারবারিদের পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, গত ১৪ মে র‌্যাব-পুলিশের পৃথক মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে সারাদেশে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৯৯ জনের বেশি মাদক বহনকারী ও খুচরা বিক্রেতা নিহত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে কয়েকশ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী। তবে নিহত বা গ্রেফতারদের মধ্যে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের কেউই নেই।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উত্তরের সহকারী পরিচালক (এডি) খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০ এ আসামি গ্রেফতারে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মূলত এই কারণে ইতোপূর্বে মাদকের অনেক গডফাদারকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে যদি কাউকে গ্রেফতার করতে হয়, তবে তার সঙ্গে মাদক (রিকভারি বা উদ্ধার) থাকতে হবে; অন্যথায় তাকে গ্রেফতার করা যায় না।’
আইনে যা আছে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০-এ প্রকাশ্য স্থান ইত্যাদিতে আটক বা গ্রেফতারের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে– ‘যদি ধারা ৩৬ এ উল্লিখিত কোনও কর্মকর্তার এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনও প্রকাশ্য স্থানে বা কোনও চলমান যানবাহনে- (ক) এই আইনের পরিপন্থী কোনও মাদকদ্রব্য বা বাজেয়াপ্তযোগ্য কোনও বস্তু বা এই আইনের অধীন কোনও অপরাধ প্রমাণের সহায়ক কোনও দলিল দস্তাবেজ রক্ষিত আছে, তাহা হইলে, তাহার অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া, তিনি উক্ত মাদকদ্রব্য, বস্তু বা দলিল দস্তাবেজ তল্লাশি করিয়া আটক করিতে পারিবেন; (খ) এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনকারী বা সংঘটনে উদ্যত কোনও ব্যক্তি আছেন, তাহা হইলে তাহার অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া, তিনি তাহাকে আটক করিয়া তল্লাশি করিতে পারিবেন এবং তাহার নিকট দফা (ক) এ উল্লিখিত মাদকদ্রব্য বা বস্তু বা দলিল দস্তাবেজ পাওয়া গেলে তাহাকে গ্রেফতার করিতে পারিবেন।’
খোরশেদ আলম আরও বলেন, ‘নতুন মানি লন্ডারিং আইনের ক্ষমতাবলে তদন্তসাপেক্ষে একজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা যাবে। যদি বাংলাদেশ ফাইন্যানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কার্যকর হয়, তবে মানির থ্রো (অর্থের উৎস তদন্ত) দিয়ে এটি করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘রিকভারিসহ মাদক ব্যবসায়ীকে না পাওয়া গেলেও মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় ওই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা যাবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তৈরি তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৫০০ স্পট নিয়ন্ত্রণ করছে মাদকের চিহ্নিত ৩৭ গডফাদার। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। রাজধানী ঢাকার তালিকাভুক্ত ৩৭ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় ইশতিয়াক ওরফে কামরুল হাসান, জেনেভা ক্যাম্পে নাদিম ওরফে পঁচিশ, উত্তরায় ফজলুল করিম, গোলাম সামদানি, বাড্ডায় সাব্বির হোসেন, রিয়াদ উল্লাহ, ভাটারায় ইতি বেগম, গুলশান ও বনানীতে এনায়েত করিম, শরিফ ভুইয়া, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, নার্গিস ওরফে মামি, শাহবাগে শহিদুজ্জামান, চাঁনখারপুলে পারভিন আক্তার, আসমা, কামাল হোসেন, বংশালে নাসির উদ্দিন, চকবাজারে ওমর ফারুক, লাল মিয়া, মুগদায় পারভীন, শফিকুল ইসলাম মলাই, রাজু আহমেদ ও আলম হোসেন, কমলাপুরে লিটন, কলাবাগানে নাজমুস সাকিব ভুইয়া, শামীম, কামরাঙ্গীরচরে খুরশিদা ওরফে খুশি, যাত্রাবাড়ীতে মোবারক, গেণ্ডারিয়া এলাকায় রহিম, মিরপুরে নজরুল, রাজীব ও রুস্তম। তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের কারবার রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর বড় মাদক স্পটগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালিয়ে মাদকের এই গডফাদারদের পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন স্পট থেকে মাদকসহ অনেক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক (ডিডি) মুকুল জ্যোতি চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী সে ছোট বা বড় হোক, তালিকা অনুযায়ী সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আমাদের তালিকা ধরে ঢাকার বিভিন্ন স্পটে হানা দিচ্ছি, তবে ব্যবসায়ীদের পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযানের ফলে তালিকাভুক্ত অনেক মাদক ব্যবসায়ী পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’

মোড় ঘোরাতে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের বাণিজ্য by আশিষ বিশ্বাস

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হয়তো বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। কিন্তু যদি কোনও রাজ্যের সাথে তুলনা করা হয় তখন নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে। ত্রিপুরা কিংবা মেঘালয়ার মতো ভারতীয় রাজ্যের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি তেমন গুরুত্ব সহকারে না নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের বৈষম্য নিয়েই হতাশা প্রকাশ করেন তারা। অথচ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যগুলোর সঙ্গেই সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। কিন্তু এমনটা হয়নি। ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশ এই রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত করেছে।
বাংলাদেশ এমন বাণিজ্যে সুবিধা পাওয়ার কারণ আসাম, মেঘালয়া ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলোই ব্যবসা করতে আগ্রহী। এই অঞ্চলের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবেই সংযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। অতীতে সবাই অবিভক্ত বাংলার অংশ ছিল।
এক্ষেত্রে দুটি উদাহরণের কথা উল্লেখ করা যায়। আসামের মুখ্যমন্ত্রী সরবন্দা সোনোয়াল এই অঞ্চলে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। আশিয়ানের সাম্প্রতিক সম্মেলনেও ‍গুয়াহাটিতে বাংলাদেশি কনস্যুলেট তৈরির প্রশংসা করেন তিনি। এই কনস্যুলেটের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের কর্মকর্তারা সহজেই বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে।
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ৩০৫ কোটি রুপির বাণিজ্য সম্পর্কে মাত্র ৪ কোটি ৬০ লাখের অংশীদারিত্ব ছিল ত্রিপুরার। এই পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বিপ্লব দেব প্রস্তাব দেন যেন ২৭টি পণ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যেন তুলে নেওয়া হয়। তাহলে এগুলো বাংলাদেশে বিক্রি করতে পারবে তারা। বিপ্লব দেব হতাশা প্রকাশ করেন যে, আগে ত্রিপুরা থেকে আনারস আমদানি করলেও এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে করছে বাংলাদেশ।
কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে মেঘালয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে অনেক সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের দাবি,  বাংলাদেশ এসব রাজ্যের সঙ্গে ব্যবসা কেন সম্প্রসারণ করছে না সেটা ভেবে পাচ্ছেন না তারা। এর ফলাফল ইতিবাচক নয়।
ভারতীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৯-১০ সালে ইন্দো-বাংলা বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬৯২ কোটি ৭১ লাখ রুপি। আর ২০১৩-১৪ সালে তা দাঁড়ায় ৭৯১ কোটি ৪৯ লাখ ৩৮ হাজারে। ফলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় ৪.৬০ শতাংশ।
তবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর তুলনায় ইন্দো-বাংলা বাণিজ্য কিছুটা কমে গেছে। ২০০৯-১০ সালে যেই বাণিজ্য ভারতের ৯১ শতাংশ অংশ ‍জুড়ে ছিল। ২০১৩-১৪ সালে সেটা হয় ৪১. ৮৬ শতাংশ। তখন মিয়ানমার, ভূটান ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়তে থাকে ভারতের।
কলকাতায় বসবাস করা বিশেষজ্ঞ চৌব্রত রায় বলেন, বিগত বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার এই দৃষ্টান্তগুলোর মাঝে এমন খবর চমকে ওঠার মতোই।
ভারতে সীমান্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদার করতে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তকে সমস্যা মনে না করে, সুযোগ হিসেবে দেখার কথা তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেই আরও ‘হাট’ বৃদ্ধি করে বাণিজ্যের সম্ভাবনা প্রশস্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিমসটেক ও ভারতের অ্যাকটিস্ট প্রকল্পের আওতায় চলমান রাজপথ/রেলপথ যুক্তকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবর্তন আসবে। থাইল্যান্ডের লুকওয়েস্ট প্রকল্পের সঙ্গে বিবিআইএন ও বিসিআইএম ভেনচারের মাধ্যমে চীন ও উন্নত আশিয়ান দেশগুলোকে একত্রিত করবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে সবাই।
ভারতের বড় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‍গুয়াহাটি বিমানবন্দরের ধারণ ক্ষমতা ১৫০ থেকে বাড়িয়ে ৪০৫০ বর্গমিটার করা। এছাড়া আসাম ও অরুণাচল প্রদেশ সংযোগে ৯ কিলোমিটার সেতু স্থাপনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অঞ্চলে একটি এভিয়েশন হাবও তৈরি করা হবে।
নতুন বাণিজ্য রুট তৈরি করতে ঢাকার সঙ্গে সিচার ও আগরতলা রাজপথের সংযোগ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চারটি সীমান্ত হাট রয়েছে। এগুলো আরও বাড়ানো যেতে পারে। সেই পয়েন্টগুলো থেকে বাণিজ্য সম্পর্কও বর্ধিত করা যেতে পারে। ২০১৫-১৬ সালে ত্রিপুরা-বাংলাদেশ সীমান্ত মার্কেটে সীমাবদ্ধ সুবিধা ও যোগাযোগের সমস্যা থাকার পরও ১৮ কোটি রুপির ব্যবসা হয়। বাংলাদেশের চিলমারি থেকে নদীপথ ব্যবহার করে কিভাবে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যায় সেই বিষয়টিও দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় প্রস্তাব তোলা হয়েছিল।
অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কৃষিখাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় বলা হয়, ইন্দো-বাংলা বাণিজ্যে কৃষিখাতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ২০০৯-১০ সালের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে দুই দেশ ৪৫ কোটি ৮০ লাখ রুপি থেকে ২০১৩-১৪ সালে ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৬০৩ কোটি ৪০ লাখ রুপির ব্যবসা করে। আর দুই দেশের এই বাণিজ্যে অনকটা অংশই চাল, গম, সবচি, বাদাম, মসলার মতো পণ্য কেনা-বেচা করে এসেছে। এছাড়া অটোপার্টস, ওষুধ ও ইলেক্ট্রনিক দ্রব্যেরও চাহিদা ছিল।

হিজড়া সেজে বেপরোয়া চাঁদাবাজি by শুভ্র দেব

ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবজিতে মেতে উঠেছে হিজড়ারা। বাসা বাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, পার্ক, খেলার মাঠ, বাস, ট্রেন, লঞ্চ সর্বত্রই হিজড়াদের উৎপাত। তাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে রীতিমত অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছেন মানুষ। নিয়মিত চাঁদাবাজির পাশাপাশি শুরু হয়েছে ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি। চাঁদার হার করা হয়েছে কয়েকগুণ বেশি। আগে যেখানে ১০/২০ টাকা দিয়ে পার পাওয়া যেত সেখানে এখন ৫০/১০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে অনেকটা হেনস্থা করা শুরু করে। মান সম্মানের ভয়ে অনেকেই টাকা দিতে বাধ্য হন। তারপরও যারা টাকা দেন না তাদের সঙ্গে করা হয় অসভ্য আচরণ। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে হিজড়ারা এমন আচরণ করে চাঁদা তুলে। কিন্তু তারা শুধুমাত্র দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এর চেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো আসল হিজড়াদের ভিড়ে নকল হিজড়াদের উৎপাত বেড়েছে আশংকাজনকভাবে। আসল হিজড়াদের চেয়ে বেপরোয়া আচরণ করে নকল হিজড়ারা।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। রাজধানীর বিজয়সরণী মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে আছে শতশত যানবাহন। সেখানে হঠাৎ করেই একদল হিজড়ার আগমন। দল বেঁধে একেক গাড়িতে যাচ্ছে আর টাকা নিয়ে আসছে। এভাবে অন্তত ২০/৩০টি যানবাহন থেকে তারা টাকা তুলে। বাগড়া বাঁধে এক প্রাইভেট কারে টাকা চাইতে গিয়ে। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে যান ওই হিজড়ার দল। প্রাইভেট কারে বসা যাত্রীর কাছে হিজড়ারা বার বার টাকা চাইছিলেন। কিন্তু ওই যাত্রী টাকা না দিয়ে বলছিলেন। তোমরা নকল হিজড়া। তোমাদের দেখেই বুঝা যাচ্ছে। তোমাদের কোন টাকা দেব না। এরকম কথা শুনে ওই হিজড়ারা কারের বিভিন্ন অংশে লাথি, ঘুষি দেয়া শুরু করে দেয়। ঠিক তখনই সিগন্যাল ছেড়ে দিলে প্রাইভেট কারের যাত্রী রেহাই পায়।  কথা হয় হিজড়াদের ওই দলের সদস্য নবাবীর সঙ্গে। নবাবী বলে আমাদের গুরু সব বলতে পারে। আমরা কিছুই জানি না। আমাদেরকে শুধু বলা হয়েছে ঈদ সামনে। এখন সবার পকেটেই টাকা আছে। বেশি বেশি করে টাকা তুলবা।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খামার বাড়ি সিগন্যালে গিয়ে দেখা যায় একই দৃশ্য। সেখানেও টাকা তুলছে হিজড়ারা। মিরপুর-মোহাম্মদপুর থেকে আসা একাধিক বাসে উঠে যাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করে হেনস্থা করছিল। একেক করে সব যাত্রীদের কাছ থেকে ঈদ বকশিশ নামে চাঁদা তুলছিল। তবে তাদের হেনস্থায় স্বাধীন বাসের মিথিলা নামের এক যাত্রী রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দেন। কারণ মিথিলা হিজড়াদের টাকা না দিয়ে বাসে এভাবে চাঁদাবাজির ছবি তুলে ফেসবুকে দিতে চায়। এজন্য সে মোবাইল দিয়ে ছবি উঠানোর সময় টান দিয়ে মোবাইল নিয়ে যায় হিজড়ারা। পরে তুলি-শায়লা নামের দুই হিজড়া মিথিলার কোলে বসে পড়েন। ভয়ে কান্না শুরু করে মিথিলা। এসময় অন্য যাত্রীরা এগিয়ে এলে বিষয়টি মিটমাট হয়। 
শুধু রাজধানী ঢাকার এই দুই স্পট নয়। পুরো রাজধানী জুড়েই চলছে হিজড়াদের এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজি। এর বাইরে লঞ্চ, ট্রেন, দূর পাল্লার বাসসহ দেশের সর্বত্রই হিজড়ারা বেপরোয়া। আর পাড়া মহল্লার হিজড়ারা কোন অনুষ্ঠানের খবর ও কারো ঘরে সন্তান জন্ম নেয়ার খবর পেলে আর কোন কথাই নাই। দল বেঁধে গিয়ে বসে থাকে তারা। তাদের দাবিকৃত টাকা না দেয়া পর্যন্ত এক পা নড়বে না। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কাজে ঘরের বাইরে যারা চলাফেরা করেন তাদের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। ফার্মগেটে নিউ ভিশন বাসের যাত্রী আলি হোসেন বলেন, কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিনই এই সড়ক দিয়ে চলতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন আসা যাওয়ার সময় হিজড়াদের টাকা দিতে হয়। মাস শেষে হিসাব করলে অনেক টাকা হয়ে যায়। কখনও কখনও আবার মিরপুর থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে ২/৩টি স্পটে টাকা টাকা দিয়ে পার পেতে হয়। বাংলামোটরে সাফিয়া হোসেন নামের একযাত্রী বলেন, আমরা যারা ছোট বাবু নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করি তাদের জন্য হিজড়ারা অনেক আতঙ্ক। অনেক সময় কোল থেকে বাবুদের নিয়ে চলে যায়। তখন আর কিছু করার থাকে না। দৈনিক বাংলা মোড়ে রাহাত নামে এক যাত্রী বলেন, কিছু করার নাই। হিজড়ারা যে ধরনের আচরণ করে তার চেয়ে টাকা দিয়ে দূরে রাখাই ভালো। হেনস্থার শিকার হয়ে অনেকেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। গতকাল দুপুরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব তার ফেসবুকে লিখেছেন, অফিসের কাজে সহকর্মীকে নিয়ে বের হয়েছি। চলছে রমজান মাস। প্রচণ্ড রোদ-গরম। দুজনেই বেশ ক্লান্ত। কাজ শেষে ফেরার পালা। একটা রিকশায় উঠলাম। রিকশা চলতে শুরু করলো। মাঝপথে এসে পড়লাম এক বিড়ম্বনায়। তার নাম হিজড়া বিড়ম্বনা। জ্যামে বসে আছি। হঠাৎ আবির্ভাব হলো এক হিজড়ার। পোশাকে আভিজাত্য, মাথায় লাগানো চুলের বাহার, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিকের প্রলেপ এবং মুখে ময়দা সদৃশ ম্যাকাপ। দেখে যে কেউ আতংকিত না হয়ে পারবে না। তো হঠাৎ হিজড়াটা এসে সহকর্মী সাইদকে অ্যাটাক করলো। বললো, ভাইয়া টাকা দাও। সাইদ ও আমি হাসতে শুরু করলাম। সাইদ বললো, আমার কাছে টাকা নেই, অন্যদিন দিব। হিজড়া: এই ভাইয়া দাওনা। সাইদ: চাকরি করি আগে তারপর। হিজড়া: তুমি চাকরি করো না নাহ। আমারে মিথ্যা বলছ। সাইদ: মিথ্যা বলতে যাব ক্যান। হিজড়া: যাই বলো টাকা দিতে হবে। না দিলে ...(প্রকাশ অযোগ্য) ধরে টানবো। সাইদ: নেই টাকা নেই। হিজড়া: এদিকে আসবা যাবা টাকা দিবা না এটা হতে পারে না। আমরা হিজড়ারা তোমাদের টাকায় চলি। দাও টাকা দাও। অল্প সময়ের মধ্যেই হিজড়া মহাশয় হিট পয়েন্টে চলে গেলো। বললো, টাকা না দিলে তোকে আজ যেতে দেব না। রিকশাওয়ালা মামা বললো, স্যার পাঁচ টাকা দেন। তা নাহলে বিপদে পড়বেন। ঘটনা তাই ঘটলো। সিগন্যাল ছেড়ে দেয়ার কারণে সব রিকশা চলতে শুরু করলো। কিন্তু আমাদের রিকশা সে আটকিয়ে  রেখেছে। অবশেষে সাইদের হয়ে রিকশাওয়ালা টাকা দিলো। যা পরে ভাড়া সহ মিটিয়ে দিয়েছি। দেশের আনাচে কানাচে হিজড়ারা বড় ধরনের একটা আতংক। তারা সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে টাকা আদায় করে। না দিলে, টাই ধরে টানে, দাড়ি ধরে টানে, শার্টে ময়লা লাগিয়ে দেয়, শরীরের কাপড় সরিয়ে ফেলে, অনেক সময় উলঙ্গ হয়ে যায়। খারাপ ভাষায় কথা বলাটা তাদের নিত্য  নৈমিত্তিক কাজ। তাদের ভাষা এতটায় খারাপ যা বলতেও রুচিতে বাধে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শুধুমাত্র রাজধানীতে হিজড়াদের ৬৫ জন গুরু রয়েছে। যাদের রয়েছে আলাদা আলাদা হিজড়া সদস্য। এলাকাভিত্তিক এই হিজড়ারা চাঁদাবাজি করে থাকে। চাঁদাবাজি করে অনেক গুরু কোটিপতি হয়ে গেছে। এরবাইরে রয়েছে এদের মধ্যে আরো ৪০জন গুরু। যারা স্বাভাবিক মানুষকে হিজড়া তৈরি করে রাস্তায় নামায়। দেখতে হুবহু আসল হিজড়া। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদেরকে হিজড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে তৈরি করা এসব হিজড়াদের রেটও বেশি। তারা মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণও বেশি করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বেপরোয়া ও নকল হিজড়া তৈরির পেছনে কাজ করছেন, দয়াগঞ্জের মুচকি আনরি ও কেচকি আনরি। উত্তরার সারিকা, কচি, পিংকি, রাহেলা, নাজমা অঞ্জনা, কাকলি, আল্‌হাদি, সোনিয়া। মগবাজারে স্বপ্না, সজিব। মানিকনগরে আবুল, বাসাবোর অরুণা। শাখারিবাজারে কাল্লু, মেজবাহ, মায়া। লালবাগের কালা, হাকিম, রিয়া। রায়েরবাজারে সুমী, পিকুলি, মিরপুরে মাস্টার রনি, আনরি, শাহজাদি, রাখি। মোহাম্মদপুরে হামিদ। ফকিরাপুলে সুইটি। শাহজানপুরে জয়নাল। উত্তর বাড্ডার পলি। মেরুল বাড্ডার শামীমা। কুড়িলের পিংকি, রামপুরার রনি হাজি অন্যতম। এদের গ্রুপের অনেকেই দিনে হিজড়া, রাতে পতিতা ও ছিনতাই করে বেড়ায়। তাদের বেপরোয়া কাজে অনেক সময় আসল হিজড়ারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে।
সূত্র বলছে, রমজান মাস শুরু হলেই অন্যান্য সময়ের তুলনায় হিজড়ারা একটু বেপরোয়া হয়ে পড়ে। ইদানীং অনেক হিজড়ারা জড়িয়ে গেছে মাদক ব্যবসায়। মাদক ব্যবসা করে রাতারাতি কোটি টাকা মালিক হচ্ছে। এছাড়াও আরো অনেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে খুনখারাবির মত ঘটনা ঘটছে অহরহ।
হিজড়াদের স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করে বন্ধু সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ফসিউল আহসান মানবজমিনকে বলেন, আমরা মূলত আসল হিজড়াদের স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করি। যখন তারা আমাদের আওতাধীন থাকে তখন এ বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়। এর বাইরে আমার অনেক সময় নকল হিজড়াদের কথা শুনি। তারা রাস্তায়ঘাটে মানুষের সঙ্গে অনেক অশোভন আচরণ করে। যা মোটেও আমাদের জন্য কাম্য নয়। তিনি বলেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি দ্রুত লাভবান হওয়ার জন্য স্বাভাবিক মানুষকে হিজড়া সাজিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। কারণ তাদের ধারণা হিজড়াদের প্রতি মানুষের অন্যরকম এক মানসিকতা কাজ করে। টাকা চাইতে এলে টাকা দিয়ে যত তাড়াতাড়ি বিদায় করা যায় সেটাই ভাবে। এছাড়া হিজড়াদের ক্ষেত্রে আইনের অনেক ফাঁকফোকড় রয়েছে। তাই তারা অপরাধ করতে ভয় পায় না। ফসিউল বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই নকল হিজড়াদের রুখতে হবে এটা এনজিও সংস্থার কাজ নয়।