Sunday, November 3, 2013

আদুরী আজ বাড়ি ফিরবে by মোশাররফ হোসেন মুসা

সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে আজ বাড়ি ফিরছে আদুরী। ৯-১০ বছরের কিশোরী গৃহকর্মী আদুরীকে বর্বরভাবে নির্যাতন করে বারিধারা-ডিওএইচএস এলাকায় একটি ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর এলাকার কিছু হৃদয়বান ব্যক্তি কংকালসার মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে নির্যাতনের অপরাধে গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় মহানগর আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ নূরু মিয়ার কাছে যে জবানবন্দি দেন, তা শুনে অনেকেই শিউরে উঠেছেন। তিনি তার জবানবন্দিতে কিভাবে আদুরীকে গরম খুন্তি ও ইস্ত্রি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন এবং সামান্য অপরাধে কিভাবে লাঠিপেটা করতেন তার বর্ণনা দেন। আদুরী তার জবানবন্দিতে বলেছে- ‘ক্রীতদাসীর মতো জীবন ছিল তার। কারণে-অকারণে হাতে দিত ইস্ত্রির ছ্যাঁকা। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লেড দিয়ে নির্মমভাবে ছিঁড়ে দেয়া হতো। এর সঙ্গে ছিল লাঠি দিয়ে পিটুনি। রাতে শুকনো মুড়ি জুটত আদুরীর ভাগ্যে। ঘুমানোর অনেক জায়গা থাকলেও তার ঠাঁই হতো বেলকুনিতে।
৩ অক্টোবর ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাবেক কূটনীতিক ও কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমদ ‘শিশু গৃহদাসী আদুরী ও নিলুফাদের ঠিকানা ঢাকা মহানগরীর ডাস্টবিন’ শিরোনামে এক মর্মস্পর্শী কলাম লিখেছেন। তিনি তার কলামে নিলুফা নামের আরও এক গৃহকর্মী নিষ্ঠুর নির্যাতনে কিভাবে মারা গিয়েছিল তা তুলে ধরেন। তিনি নিলুফার মাকে কিছু টাকা দেয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন, সে ঘটনাও উল্লেখ করেন (আমার জানা মতে, গৃহকর্মীদের নির্যাতনের ওপর তার একটি গবেষণা রয়েছে)। তিনি তার কলামে এসব গৃহকর্মীর বিপদে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ও সুশীল সমাজের লোকদের এগিয়ে না আসার জন্য তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি যাদের সমালোচনা করেছেন, তারা সবাই জাতীয় পর্যায়ের লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চাকরিজীবী। তারা সর্বক্ষণ ‘জাতীয়’ সমস্যা নিয়ে ভাবেন এবং সেই আলোকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গৃহকর্মী নির্যাতনের মতো ‘ক্ষুদ্র’ বিষয়ে তাদের চিন্তা করার সময় কোথায়! তাদের ৪২ বছরের লেখালেখিতে জাতীয় পর্যায়ে কতটুকু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সে প্রশ্ন করা যায়।
২.
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলো যদি বাংলাদেশ থেকে গৃহপরিচারিকা নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং একই সঙ্গে আরব দেশগুলোও গৃহপরিচারিকা নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশী মেয়েরা প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে পছন্দ করবে আগে। কারণ আরব দেশগুলোয় গৃহপরিচারিকাদের নির্যাতনসহ গৃহকর্তার লালসার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো তাদের জানা রয়েছে। অর্থাৎ একটি দেশে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা বা না থাকার পেছনে থাকে গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা থাকা বা না থাকার বিষয়টি। আমাদের প্রিয় দেশটি আরব দেশগুলোর মতো কর্তৃত্ববাদী শাসন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না, এখানে রয়েছে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য লিখিত সংবিধান। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশেও মাঝে মধ্যে আরব দেশগুলোর মতো গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। লক্ষণীয়, এদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আমাদের লেখক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের লোকেরা নানা রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কেউই গণতান্ত্রিক শাসন বিনির্মাণের জন্য দেশোপযোগী কার্যপদ্ধতি প্রতিস্থাপনের কথা বলেন না। সেই সঙ্গে সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য স্থানীয় সরকারের যে ব্যাপক ভূমিকা থাকে- এ কথাও কেউ বলেন না। সম্প্রতি গৃহকর্মী আদুরী নির্যাতনের ঘটনায় সেরকম প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল।
৩.
মহামতি অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘সব ভালো মানুষ ভালো নাগরিক নয়, কিন্তু সব ভালো নাগরিকই ভালো মানুষ’ (উদ্ধৃতিটি নবম-দশম শ্রেণীর পৌরনীতি বই থেকে নেয়া)। তার কথার সূত্র ধরে বলা যায়, যারা আদুরীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, তারাই ভালো নাগরিক। তবে অ্যারিস্টটলের আমলে নগররাষ্ট্র ছিল ক্ষুুদ্র প্রকৃতির। বর্তমানে রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ঘটে জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র শুধু স্থানীয় কাজই দেখে না, তাকে জাতীয় ও বৈশ্বিক কাজও দেখতে হয়। বাংলাদেশে কার্যত কোনো স্থানীয় সরকার নেই। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব কাজই কেন্দ্রীয় সরকার করে থাকে। নগর এলাকায় স্থানীয় সরকার না থাকায় এনজিও ও সুশীল সমাজের লোকরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ছোটখাটো স্থানীয় অপরাধ ও পারিবারিক কলহগুলো মীমাংসা করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকায় ‘জাগো নারী ফাউন্ডেশন’-এর কিছু কাজ উল্লেখ করা যেতে পারে। নারীনেত্রী নূরুন্নাহার মেরীর নেতৃত্বে সংগঠনটি গার্মেন্ট শ্রমিকদের পারিবারিক কলহের মীমাংসা ও গৃহপরিচারিকাদের সমস্যার সমাধান করছে। সে জন্য আমাদের বিবেচনায় এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আয়তন ও লোকসংখ্যার আলোকে দুই ধরনের সরকার থাকতে পারে- কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য জাতীয় ও বৈশ্বিক কাজগুলো নির্দিষ্ট থাকবে। আর বাকি সব স্থানীয় কাজ স্থানীয় সরকারগুলো বাস্তবায়ন করবে। তার আগে স্থানীয় সরকারগুলোকে সমন্বিত স্তরবিন্যাস করে প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটে ‘সরকার কাঠামো’ প্রতিস্থাপন করে স্বশাসন দিয়ে দিতে হবে (যেমন- ইউনিয়ন সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার ইত্যাদি)।
সংক্ষেপে প্রস্তাবিত নগর সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরা যেতে পারে। নগর প্রশাসন, নগর সংসদ ও নগর আদালত মিলে ‘নগর সরকার’ গঠিত হবে। মেয়রের নেতৃত্বে নগর প্রশাসন পরিচালিত হবে। কাউন্সিলররা নগর সংসদের সদস্য হবেন। নগর সংসদে নগরের সব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। নগর সংসদে পাসকৃত প্রস্তাবগুলো নগর প্রশাসন বাস্তবায়ন করবে। আলাদাভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা ‘নগর আদালত’ গঠিত হবে। নগরকেন্দ্রিক অপরাধগুলোর বিচার নগর আদালতে সম্পন্ন হবে। যেমন- গৃহপরিচারিকাদের নির্যাতন, ফুটপাত দখল, পার্ক দখল, নদী-খাল দখল ইত্যাদির বিচার নগর আদালতে সম্পন্ন হবে। তাছাড়া নগর সরকারের তিন বিভাগের বাইরে একজন নগর ন্যায়পাল (শেরিফ) থাকবেন। নগর ন্যায়পাল নগর সরকারের তিন বিভাগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ নিষ্পত্তি করবেন। এ ব্যবস্থা গৃহীত হলে নগরের অধিবাসীরাই প্রত্যক্ষভাবে নগর সরকার পরিচালনার সুযোগ পাবেন। তখন নগরের সমস্যাবলী দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করার কোনো সুযোগ থাকবে না। সেই সঙ্গে নগরের অধিবাসীরা প্রকৃত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হবেন। আদুরীর মতো নির্যাতনের ঘটনার যথাযথ বিচারও নিশ্চিত হবে।
মোশাররফ হোসেন মুসা : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক

জাতিকে নেতৃত্বহীন করতে চেয়েছিল ঘাতকরা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের জেল-হত্যাকাণ্ড ছিল ১৫ আগস্টের ঘটনাবলিরই ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধু ও জেলখানায় তার চার সহকর্মীর হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণকে নেতৃত্বহীন করার নীলনকশার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়। আগস্ট ট্রাজেডির তিন মাসের মধ্যেই যে ঘাতকদের আরও রক্তের প্রয়োজন হবে, তা বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। ঘাতকরা রক্ত চেয়েছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাদের। চার নেতাকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। চারটি বছর দেশের নানা অঞ্চলে আমি তাদের সঙ্গে ব্যাপক সফর করেছি। তারা অন্যরকম রাজনীতিবিদ ছিলেন। পাকিস্তান আমলে তারা এ দেশের মানুষের স্বাধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। সে জন্য নির্যাতন-নিপীড়ন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে তারা আপসহীনভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের প্রতি তাদের অন্যরকম দরদ ছিল। তাদের জীবনে ভুল-ভ্রান্তি, দোষ-ত্র“টি ছিল না তা নয়, কিন্তু তারা বেঁচে থাকলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিতেন না এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিছু করতেন না বলেই আমার বিশ্বাস। আমাদের মতো তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সেটা খুব ভালো জানতেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও জানত। তাই তাদের বাঁচিয়ে রাখা তারা নিরাপদ মনে করেনি।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা। তারা একই দলের নেতা ছিলেন, তবে তাদের প্রত্যেকেরই ছিল আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। যেমন, রাজনীতি না করলে তাজউদ্দীন আহমদ হতেন একজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী। একজন সৎ বুদ্ধিজীবীর সব বৈশিষ্ট্যই তার মধ্যে ছিল। যদিও বুদ্ধিজীবীরা সমাজে আলাদা কোনো প্রজাতি নয়। যে কোনো পেশা থেকেই একজন হতে পারেন বুদ্ধিজীবী, যদি তার থাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, যুক্তিবাদী মন, ন্যায়পরতা এবং মানুষের কল্যাণ করার অঙ্গীকার। এ বৈশিষ্ট্যগুলো তাজউদ্দীনের মধ্যে দেখেছি।
নিহত চার নেতার কোনো ব্যক্তিগত শত্র“ ছিল বলে আমাদের জানা নেই। থাকলেও তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকতে পারে। এমন কোনো শত্র“ তাদের ছিল না, যারা তাদের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য খুন করতে পারে। তাদের কেউ খুন করতে চাইলে জেলখানার বাইরেও তা করতে পারত। তাছাড়া তাদের সবার অভিন্ন শত্র“ থাকার কথা নয়- যে শত্র“ তাদের একই সঙ্গে হত্যা করে আনন্দ পাবে বা উপকৃত হবে। জেল হত্যাকাণ্ড একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা, যার পেছনে দেশী ও বিদেশী হাত ছিল এবং তারা শুধু ওই চার নেতার শত্র“ ছিল না, তারা ছিল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের শত্র“। চার জাতীয় নেতা যে সময়টিতে নিহত হন, সেটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সময়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংহত করার সময়। ওই সময়টিতে তাদের নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন ছিল এ জাতির। অনেকের মতো আমারও বিশ্বাস, একদলীয় শাসন বাংলাদেশে খুব বেশি দিন থাকত না। বঙ্গবন্ধু এবং এ চার নেতা বেঁচে থাকলে জনগণের আবেগ-অনুভূতি ও মনোভাব উপলব্ধি করে তারা আবার বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের পথেই ফিরে আসতেন।
শত্র“রা সেই সুযোগটি তাদের দেয়নি। তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ধারায় প্রবেশ করে। সেই রাজনীতির মধ্যেই এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আরও দীর্ঘ সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এ চার নেতার বিকল্প নেতৃত্ব গত ৩৮ বছরেও তৈরি হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ডের দুটি দিক আছে। একটি হল এটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। অন্য দিকটি রাজনৈতিক। ফৌজদারি অপরাধের বিচার হয় আদালতে। দোষীদের শাস্তি হয় আদালতের রায়ে। অপরাধীদের মানুষ এক সময় ভুলে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক দিকটির তাৎপর্য অনেক বেশি ও সুদূরপ্রসারী।
ঘাতকরা দুটি কাজ করেছে। শারীরিকভাবে চার নেতাকে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে হত্যা করেছে তাদের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে। বরং তাদের রাজনীতিকে হত্যা করাই ছিল ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করতে পারি, চার নেতার রাজনীতি তো অন্যভাবেও প্রতিহত করা যেত। ঘাতকরা মনে করেছে, ওই নেতাদের জীবিত রেখে তাদের রাজনীতি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই তাদের হত্যা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না ঘাতকদের সামনে।
হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য রাষ্ট্রের থানা, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, আদালত রয়েছে। সেখানে আইন-কানুনের নিরিখে সাক্ষী-সাবুদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি হয়। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের বলার কিছু নেই। কিন্তু জেলহত্যার ঘটনা একটি সাধারণ অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনাও বটে। বরং এর রাজনৈতিক দিকটিই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
হত্যাকাণ্ডের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দেশের রাজনীতিকরাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদের উচিত ছিল ব্যাপক অনুসন্ধান করা এবং সত্য খুঁজে বের করা। এটা করা উচিত ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থেই। সেই কাজটি তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও সহযোগীরা করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। গত কয়েক বছর যাবৎ লক্ষ্য করছি, মিডিয়ার চাপে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে জেলহত্যার বিচার নিয়ে সরকারের দিক থেকে কথাবার্তা শোনা যায়। ৩ নভেম্বর পার হওয়ার পরই আবার নীরবতা। এ প্রবণতাটি ক্ষমাহীন রাষ্ট্রীয় অবহেলার উদাহরণ।
জেলহত্যা নিয়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার যা তা হল, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকদের দিক থেকে বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি ট্রাজেডি শুধু নয়, অত্যন্ত বড় রাজনৈতিক অপঘটনা। ৭ নভেম্বর পরবর্তী সরকার এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা না করে এক ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে। মতাদর্শগত দিক থেকে জিয়াউর রহমানের সেনা সরকার ছিল এই চার নেতার বিপরীত বলয়ের। তা সত্ত্বেও সামান্য সদিচ্ছা থাকলে বিচারের ব্যবস্থা তারা করতে পারতেন এবং তাতে যে তারা রাজনৈতিকভাবে খুব ক্ষতিগ্রস্ত হতেন, তা মনে হয় না। কিন্তু এক অজ্ঞাত ভয় ও মানসিক দীনতা থেকে তারা ওই বিচারের ব্যবস্থা করেননি।
বাংলাদেশ থেকে যে একদিন আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার উঠে যাবে, তার সূচনা হয় জেলহত্যা মামলা থেকেই। ১৯৭৫-৭৬ সালেই যদি প্রচলিত আদালতে জেলহত্যার বিচার হতো, তাহলে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ কণ্টকিত হতো না। যে দেশে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীনের নির্মম হত্যার বিচার নিয়ে রাষ্ট্র গড়িমসি করে, সুষ্ঠু বিচারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, নষ্ট করে ফেলে আলামত, সে দেশের সাধারণ নাগরিক যে ন্যায়বিচার পাবে না, তা একজন নির্বোধও বোঝে।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শুধু বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন অসাধারণ ও চমৎকার মানুষ। তাদের হত্যার বিচার না হওয়ার ব্যথা শুধু তাদের পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনদের ব্যথা নয়, আমরা যারা তাদের সান্নিধ্যে এসেছিলাম, তাদের স্নে পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম, তাদেরও ব্যথা। দেরি যা হওয়ার তা হয়েছে, হত্যাকারীদের নিয়োগদাতাদের হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমাদের দাবি একটাই- চার জাতীয় নেতার হত্যাকারীদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক

সংবিধানের আওতায়ই নির্বাচন চাই by নুরুল ইসলাম বিএসসি

বিএনপির দাবি মেনে নির্দলীয় সরকার করলে জামায়াত-শিবির অস্ত্রের ভাষায় কথা বলে, ভোটকেন্দ্র দখল করে নির্বাচনে যদি জিতে যায়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আত্মহননের পথ প্রশস্ত হবে। খালেদা জিয়া এ মুহূর্তে সেটাই চান। বিএনপি নিজেরা এতই দুর্বল যে, জামায়াত, হেফাজত ছাড়া নির্বাচনে যেতে ভয় পায়। আর জামায়াত-শিবিরের এ দেশের প্রতি বিশ্বাস নেই, এ দেশের মানুষের প্রতি তাদের আস্থা নেই। যেনতেন প্রকারে তারা ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী, হিন্দু, বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ’৭১ সালের মতো পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করতে বদ্ধপরিকর। আগামী নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা বদলের রাজনীতি ভাবলে মহাদুর্যোগ নেমে আসবে। প্রকৃত অর্থে আমরা এখন ’৭১ সালের অবস্থানে ঘুরেফিরে ফেরত এসেছি। আমাদের সঠিক পথটি খুঁজে বের করতে হবে। বিএনপি, জামায়াতকে ভোট দিয়ে ’৭১ সালের পরাজিত শক্তিকে ক্ষমতায় বসাব, নাকি পরাজিত শক্তিকে চূড়ান্ত পরাজিত করে শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসাব। আগামীর নির্বাচনকে শুধু নির্বাচন ভাবলে মহাভুল হবে। এই নির্বাচন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার নির্বাচন। এখানে পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জঙ্গি উত্থানের বিপক্ষে সবাইকে এ মুহূর্তে অবস্থান নিতে হবে। একতরফা নির্বাচন করে ফেলতে হবে। বিএনপি যতই হুমকি-ধামকি দিক, নির্বাচন প্রতিহত করার শক্তি তাদের নেই।
যারা রাজনীতি করেন, যারা রাজনীতিকে পর্যালোচনা করেন, তারা নিশ্চয়ই এরই মধ্যে উপলব্ধি করেছেন, জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী দল। হেফাজত দল না হলেও ধ্যান-ধারণায় এরা এখন মধ্যযুগে বসবাস করছে। হেফাজতীরা এখন আবার মাথা তুলছে। ঢাকায় সমাবেশসহ সমগ্র দেশে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। কাণ্ডারিহীন জামায়াতের কাণ্ডারি এখন খালেদা জিয়া এবং হেফাজতের ১৩ দফা দাবির ঘোর সমর্থক। ভাবতে কষ্ট লাগে, বিএনপিতে যারা প্রগতিশীল বলে দাবি করেন, তারা কিসের ভরসায় হেফাজতকে সমর্থন করেন। হেফাজতের ফতোয়া হল- মহিলারা পঞ্চম শ্রেণীর ঊর্ধ্বে পড়তে পারবে না। আমি একটি বাস্তব ঘটনা দিয়ে হেফাজতীদের প্রশ্ন করতে চাই। আমার পুত্রবধূর সন্তান হবে, তাকে হাসপাতালে নেয়া হল। হাসপাতালে নেয়ার পর আমার প্রধান চয়েস থাকবে কোনো মহিলা ডাক্তার আমার পুত্রবধূর সন্তান প্রসবে সাহায্য করবে। যদি পঞ্চম শ্রেণীতে নারীদের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হয়, আমি মহিলা ডাক্তার পাব কোথায়? মোদ্দা কথা, হেফাজতীদের ১৩ দফা দাবিই সংবিধান ও সভ্যতাবিরোধী। আবার তাদের দাবিগুলোকে সমর্থন করছে বিএনপি। এই হেফাজতী যারা মূলত ওহাবি, ধর্মের দোহাই দিয়েই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
প্রকৃত অর্থে বিএনপি কোন দিকে যাবে, সঠিক সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। এদের ক্ষমতা চাই, প্রয়োজনে লাশের পাহাড় বিছিয়ে হলেও ক্ষমতায় যেতে হবেই এবং তারেক, কোকোর অপকর্ম উদ্ঘাটনকারীদের শায়েস্তা করতে হবে। এখনও মানুষ ২০০১ সালের ঘটনাগুলোর কথা ভুলেনি। পূর্ণিমাদের ওপর নির্যাতন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়িঘর পোড়ানো, লাঠিপেটা করে গ্রামছাড়া করা- এখনও এসব চোখের সামনে ভাসে। ওই ঘটনাগুলো ছিল সীমিত আকারে, এখন কিন্তু জামায়াত-শিবির আরও হিংস্র। একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে কী যে অঘটন তারা ঘটাবে, বাস্তবে এক্ষুনি আন্দাজ করা যায়। তারা কোনো আইন মানে না। বিচারপতিদের ঘরে বোমা মারে, চলন্ত গাড়িতে আগুন দিয়ে ড্রাইভারকে পুড়িয়ে মারে। সন্ত্রাস করে অরাজকতা সৃষ্টি করে। দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করাই এখন তাদের মুখ্য কাজ। খালেদা জিয়া ওই কসাই-জঙ্গিদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করতে চান। এখন মূল কথা হল, আমাদের সংবিধান কী বলে। সংবিধান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলে। তবুও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব রেখেছেন। তবে শর্ত থাকে যে, সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা হবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের থেকে। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা বহাল থাকবে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু ড্যান মজিনা নানা কৌশল করছেন। যাতে এ দেশটা আফগানিস্তানে পরিণত হয়, সে ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনি ভারতকে সঙ্গে পেতে চান। কিন্তু ভারত জানে, এ দেশে কারা এ ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। তাই মজিনার মিশন বিফলে গেছে। একটি দেশ চলে সংবিধানের আওতায়। সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু করতে গেলে সংশোধনীর প্রয়োজন হয়। এ মুহূর্তে যার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই এবং সময়ও নেই। সংসদ এখন শেষ পর্যায়ে। এখন নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করা যেতে পারে। ঘোষণা এলেই অনেকে অংশগ্রহণ করবেন। এমনকি বড় দলগুলো থেকে বেরিয়ে এসে অনেকে নির্বাচন করবেন। এমপি কে না হতে চান?
শেষ করার আগে বলতে চাই, নির্বাচনই হল ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ। ওই পথেই সবাইকে আসতে হবে। বিএনপিরও এ মুহূর্তে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। যে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করবে, যা আমরা কেউ চাই না।
খালেদা জিয়া চান শেখ হাসিনাবিহীন বাংলাদেশ। এর অর্থ হল, শেখ হাসিনাই এখন জঙ্গি উত্থানে মূল বাধা। শেখ হাসিনাবিহীন বাংলাদেশ এ দেশের মানুষ চায় না।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

বনের বাঘে খায় না লো সই খায় মনের বাঘে by মোকাম্মেল হোসেন

আকাশের মুখ ভার। লবণ বেগমের মুখও ভার। কে কার দুঃখে ব্যথিত হয়ে মুখ ভার করেছে- বুঝতে পারছি না। আকাশের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ নেই। সে কোনো জবাব দেবে না। দেখি, লবণ বেগম কী বলে! লবণ বেগমের কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলাম-
: তোমার কি শরীর খারাপ!
বিছানার পাশেই জানালা। জানালায় এক টুকরো আকাশ। লবণ বেগম জানালা থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে মাথা নেড়ে বলল-
: না।
- তাইলে সকালবেলাই মুখটা মলিন হইছে কীজন্য!
এ কথা শুনে লবণ বেগম আরও গম্ভীর হয়ে গেল। নরম গলায় বললাম-
: কথা না বললে বুঝব কেমনে- কী হইছে! কথা বল।
লবণ বেগম মুখ দিয়ে দম ছেড়ে বলল-
: তাসিনের আব্বা- আমার আত্মাটা মইরা গেছে!
আত্মা হচ্ছে জীবের প্রাণভোমরা। এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সমাপ্তি রেখার ওপারে অবস্থান করে লবণ বেগম তার অস্তিত্ব নিয়ে, মুখের ভাষা দিয়ে আমার সামনে বিরাজ করছে- এ এক অসম্ভব কল্পনা। এ ধরনের কল্পনার রূপায়ণ নাটক-সিনেমার জগতে দৃশ্যমান হয়। আমরা নাটক-সিনেমার পাত্র-পাত্রী নই। প্রতিদিনের মতো গতকালও আমাদের জীবনে রাত এসেছে। সেই রাতের কোলে আশ্রয় নিয়ে আমরা ঘুমের জগতে প্রবেশ করেছি। আবার ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগেও উঠেছি। কোথাও কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। তাহলে আত্মা মরে যাওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন? বিষয়টাকে হালকা করার জন্য লবণ বেগমের ডানহাতের কব্জিতে জোরে একটা চিমটি দিলাম। সে উঃ উঃ করে বলল-
: কী আশ্চর্য! চিমটি দিলা কীজন্য?
- জিন্দাজগৎ আর মৃত্যুজগতের মধ্যে ব্যবধান বোঝার জন্য।
: মানে?
- মানে দেখলাম, তুমি জিন্দাজগতে আছ, না মৃত্যুজগতে প্রবেশ করার পর মহিলা ভূতে পরিণত হইয়া আমার সামনে বিরাজ করতেছ!
উদাসীন ভঙ্গিতে লবণ বেগম বলল-
: ঠাট্টা না তাসিনের আব্বা! আমার আত্মাটা সত্যি সত্যি মইরা গেছে!
- কেন!
: ঘুমের মধ্যে একটা স্বপ্ন দেইখ্যা।
সব মানুষই ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে কেউ ভয় পায়। কেউ উজ্জীবিত হয়। স্বপ্নের মাধ্যমে কেউ কেউ তার ভবিষ্যতও দেখতে পায়। হজরত ইউসুফ (আ.) ছোটবেলায় একবার স্বপ্ন দেখলেন- আকাশের চাঁদ, সূর্য ও এগারটি নক্ষত্র মাটিতে নেমে এসে তাকে সেজদা করছে। হজরত ইউসুফ (আ.) পরবর্তীকালে মিসরের বাদশাহ হয়েছিলেন। বলা হয়, এ ঘটনা তার বাল্যকালীন স্বপ্নের তা’বির। হজরত ইউসুফের (আ.) নামের সঙ্গে বিবি জুলেখার নামটিও জড়িয়ে আছে। বিবি জুলেখা যৌবনে হজরত ইউসুফের (আ.) প্রেমে পড়েন। বিবি জুলেখার এ প্রেম সফলতা পায় ষাট বছর বয়সে। তখন তার শরীর মরে গেছে। শরীর মরে গেলেও হজরত ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি তার প্রেম ও প্রণয়াবেগের মৃত্যু হয়নি। বলা হয়, এ প্রেমের উছিলায় আল্লাহপাক বিবি জুলেখাকে ষোল বছরের যুবতীর রূপ-যৌবন দান করেন। আজকাল ঘরে-বাইরে প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপক সমারোহ। চারদিকে হাই হানি, হাই ডার্লিং, ওগো প্রিয়তমের নিনাদ। কিন্তু ষাট বছরের বৃদ্ধাকে ষোল বছরের যুবতীতে পরিণত করে যে প্রেম- সে প্রেম কোথায়? কোথাও নেই। না থাকার কারণ শরীর মরার আগেই আমাদের মন মরে যায়। ভোগবাদীর মোড়কে আবৃত মরা মন যে শরীর বয়ে বেড়ায় তাতে প্রেম জাগে না, কেবল পচা দুর্গন্ধ ছড়ায়।
বাজারে সোলায়মানি খাবনামা নামে একটা কিতাব পাওয়া যায়। এ কিতাবে ঘুমের মধ্যে দেখা কোন স্বপ্ন কীসের ইঙ্গিত বহন করে তার বর্ণনা রয়েছে। ছোটবেলায় এক-দুইবার এ কিতাব হাতে নেয়ার সুযোগ হয়েছে। সেই জ্ঞানের ওপর ভরসা রেখে লবণ বেগমকে বললাম-
: তোমার খাবের বিষয় বল তো, দেখি- এর তাৎপর্য বাইর করতে পারি কি না?
- তুমি তাৎপর্য খুঁইজ্যা কী করবা? এই পচা স্বপ্নটা তোমারে লইয়াই দেখছি!
মরছি! আমি কবিরাজ, আমিই রোগী? মুখে বললাম-
: পচা স্বপ্ন! কী দেখছ, কও!
- দেখছি, একজন নারী সাংবাদিকরে সঙ্গে লইয়া তুমি বাসায় আসছ। তারপরে তারে কী খাতির-কী যত্ন!
: বাসায় কোনো মেহমান আইলে তারে আদর-আপ্যায়ন করাটাই তো স্বাভাবিক।
: তাসিনের আব্বা- সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নেওন যায় না!
লবণ বেগমের কণ্ঠস্বর শুনে বুঝলাম সমস্যা কোথায়! তাকে আশ্বস্ত করার উদ্দেশ্যে বললাম-
: আরে পাগলি, নারী সাংবাদিক তো পরের কথা, কয়জন পুরুষ সাংবাদিক আমারে চিনে- সেইটা আঙুলের কড় গুইন্যা বইল্যা দেওয়া যায়। কাজেই এই ব্যাপারে তোমার চিন্তাযুক্ত হওয়ার কোনো কারণ নাই...
এ ঘটনার কয়েকদিন পরে ময়মনসিংহে গেছি। প্লাটফরমে পা রাখতেই লবণ বেগমের ফোন পেলাম-
: ট্রেন থেইক্যা নামছ?
- নামছি।
: কোনো সমস্যা হয় নাই তো!
- না, সমস্যা হয় নাই। খুবই আনন্দদায়ক ভ্রমণ হইছে। আমার পাশের সিটে একজন মহিলা যাত্রী ছিলেন। তার সঙ্গে গল্প-গুজব কইরা সময়টা ভালোই কাটছে।
: কী কইলা?
- কইলাম, সময়টা ভালো কাটছে।
: মহিলার বয়স কত?
- বয়স বেশি না। ২০১০ সালে মাস্টার্স শেষ করছে।
: কোন সালে, কত তারিখে বিএ-এমএ পাস করছে- সেইটাও জানা হইয়া গেছে? আর কী কী আলাপ করছ- কও!
- চলন্ত ট্রেনে আলাপ আর কী! এইটা-সেইটা, টুকটাক। আলাপের একপর্যায়ে তোমার প্রসঙ্গ উঠল। আমি তোমার অনেক প্রশংসা করলাম...
: থাম! যাদের খাসলত খারাপ- তারাই অন্য মহিলার কাছে নিজের বউয়ের প্রশংসা করে। কী জন্য করে জান? যাতে প্রশংসা শুইন্যা ওই মহিলার মনে ঈর্ষা জাগে। ঈর্ষা থেইক্যা মানুষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব তৈরি হয়।
- লে বাবা! এতকিছু তো জানতাম না!
: কেমনে জানবা! তুমি তো সাধুবাবা- এইমাত্র হিমালয়ের গুহা থেইক্যা মাটিতে পাও রাখলা! বুঝলা, স্বপ্ন আল্লাহ আমারে এমনি এমনি দেখায় নাই। এই স্বপ্নের মাধ্যমে আমারে সাবধান কইরা দেওয়া হইছে!
- দেখ, মনে কোনো দাগ থাকলে পাশের সিটে সাপ বসছে, না ব্যাঙ বসছে- সেইটা নিশ্চয়ই তোমারে বলতাম না! বরং সত্য গোপন কইরা বলতাম- উফ! তাসিনের আম্মা, পাশের সিটে গোফওয়ালা ইয়া মোটা এক খাটাস বসছিল। তার যন্ত্রণায় জান কয়লা হইয়া গেছে...
নানা যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে লবণ বেগমকে বোঝাতে গিয়ে মনে হল, আমি ভারতীয় টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়াল বা মেগা সিরিয়ালের কোনো অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা বলছি। এসব সিরিয়ালে পারিবারিক কাহিনীর নামে ষড়যন্ত্র-কূটচাল, হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা-পরশ্রীকাতরতা, অহংবোধ ইত্যাদি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা এক কথায় ভয়ংকর। লবণ বেগম এসবের দ্বারা প্রভাবিত হলে কঠিন বিপদ। আমার জীবনে শান্তি বলে আর কিছু থাকবে না!
চায়ের তৃষ্ণা নিয়ে একটি হোটেলে ঢুকেছি- আবার লবণ বেগমের ফোন পেলাম। সে উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল-
: তুমি ওই মেয়েটারে তোমার ফোন নম্বর দেও নাই তো!
- অপরিচিত কাউরে আমি আমার ফোন নম্বর দেই না।
: দাদারে আদাপড়া শিখাইও না! গলায়-গলায় ভাব কইরা ঢাকা থেইক্যা মমিসিং পর্যন্ত যাওয়ার পরও কেউ অপরিচিত থাকে?
- তুমি কি আমারে অবিশ্বাস করতেছ?
লবণ বেগম এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। দম ছেড়ে আমি বললাম-
: তাসিনের আম্মা, মনটারে স্থির কর! একটা কথা মনে রাখবা- বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘেই খায়। এই মনের বাঘ কী- জান তো? মনের বাঘ হইল সন্দেহ, অবিশ্বাস। এইগুলা খুবই মারাত্মক। সন্দেহ-অবিশ্বাস কেবল মানুষের পারিবারিক জীবনই ধ্বংস করে না, একটা রাষ্ট্রকেও ধ্বংস কইরা ফেলে। আইজ বাংলাদেশের অবস্থা কী দাঁড়াইছে- একবার চিন্তা কইরা দেখ। অথচ দুই নেত্রী যদি মনের সন্দেহ-অবিশ্বাস ঝাইড়া ফেইল্যা একসঙ্গে বসতেন- তাইলে পরিবেশ কী মধুর হইত, ভাব একবার!
- পরিবেশ স্বাভাবিক না হইলে তো মসিবত। নভেম্বরের ২০ তারিখ থেইক্যা তাসিনের সমাপনী পরীক্ষা।
: শুধু তোমার তাসিনের সমাপনী না, আরও অনেক পরীক্ষা আছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর হইল শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোতে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের মাস। এসব পরীক্ষার সঙ্গে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী জড়িত। এরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। স্রেফ সন্দেহ-অবিশ্বাস আর জেদাজেদির মাসুল দিতে গিয়া একটা প্রজন্ম ধ্বংস হইয়া যাইতেছে অথচ এই ব্যাপারে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই।
- ফোন কইরা তো আরও আউলা লাগছে!
: ফোনের কথা আর বইল্য না! জাতি হিসেবে আমরা কতটা দুর্ভাগা- দুই নেত্রীর ফোনালাপ তার অনন্য দলিল হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। কী আচানক কারবার! রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়া ফালতু কিছু বিষয় লইয়া ক্যাচাল করতে করতে তারা ৩৭ মিনিটি পার কইরা দিলেন!
ওপাশ থেকে লবণ বেগমের দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। সে বলল-
: ৩৭ মিনিট তো খুবই কম সময়। দেখ- এইভাবে আরও ৩৭ বছর পার হয় কিনা!
এ সময় হোটেলের ওয়েটার ইশারায় দেয়ালের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সেখানে লেখা রয়েছে-
: এখানে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে লবণ বেগম জিজ্ঞেস করল-
: কী ব্যাপার, কথা বলতেছ না কী জন্য?
আমি ফিসফিস করে বললাম-
: এইখানে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
লবণ বেগম অবাক হয়ে জানতে চাইল-
: কেন, নিষিদ্ধ কেন?
লবণ বেগমের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। দেশ ক্রমশ যে পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে- হোটেলের দেয়ালে লেখা কথাগুলো সমগ্র বাংলাদেশের জন্য সত্যি হয়ে দেখা দেবে না তো!
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

শাসকশ্রেণীর রাজনীতির বিরুদ্ধ স্রোত জনগণকেই সৃষ্টি করতে হবে by বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর রাজনীতি এখন আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চরকির মতো ঘুরছে। চরকি ঘোরার একটা সংকটজনক দিক হচ্ছে এর কোনো শেষ থাকে না। এটা অধিকতর সংকটজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে এ কারণে যে, নির্বাচনে দেশ ও জনগণের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এই চরকি ঘোরা হচ্ছে না। এটা হচ্ছে নির্বাচন কীভাবে হবে তার ধরন নিয়ে। সাধারণত যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হবে তার কতগুলো সুনির্দিষ্ট বিধিমালা থাকে, যা আবার লিপিবদ্ধ থাকে সর্বজনমান্য সংবিধানের মধ্যে। বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনকালীন সংকটের একটা দিক হচ্ছে, দেশে এখন এ ধরনের সর্বজনমান্য সংবিধান নেই। সংবিধানের দলীয়করণ করে, দলীয় স্বার্থে এতে নানা রকম সংশোধনী সংযোজন করে এমনভাবে এর দলীয়করণ হয়েছে যে, সরকারবিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হচ্ছে সংবিধানের উপরোক্ত সব সংশোধনী বাতিল করে তার অধীনে নিয়মকানুন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপযোগী করার। এক কথায় বলা চলে, বর্তমানে শাসকশ্রেণীর প্রধান দুই দলের নেতৃত্বে তাদের দলগুলোর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে, তার কোনো সহজ সমাধান সংবিধান সংশোধন ছাড়া হওয়ার মতো কোনো পথ আর খোলা নেই। এই পথ যদি শাসকশ্রেণী নিজেই বন্ধ রাখে, তাহলে তাদের শাসনব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদেরকে অন্য পথ ধরতে হবে, যার দৃষ্টান্ত এদেশে অপরিচিত নয়।
শাসকশ্রেণীর এই রাজনীতির সঙ্গে জনস্বার্থের যে কোনো সম্পর্ক নেই এটা বলাই বাহুল্য। এ জন্য আগামী নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে কোন দলকে জয়যুক্ত করবে সেটা দেখে শাসকশ্রেণীর প্রতি সাধারণভাবে জনগণের মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। তারা এক দলের পরিবর্তে অন্য দলকে ভোট দেন, কারণ যাকে তারা ভোট দেবেন তার একাধিক বিকল্প এখন জনগণের সামনে নেই। বাংলাদেশে এক ধরনের অপরিণত বুর্জুয়াদের শাসনই জারি আছে এবং এই বুর্জুয়া শ্রেণী নিজের রাজনীতিকে কঠোরভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। এখানে তাদের শ্রেণীর মধ্যে কোনো তৃতীয় বিকল্প দেখা দেয়ার মতো কোনো শর্ত নেই। এ অবস্থায় সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে সরকার পরিবর্তন ছাড়া অন্য কোনো ধরনের মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। জনগণ পরিবর্তন চান, তাদের জীবন বর্তমান শাসকশ্রেণীর শাসনে অতিষ্ঠ ও দুর্বিষহ। এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার লাভের একমাত্র উপায় এই শাসকশ্রেণী পরিবর্তন করা। কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা বর্তমানে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে না থাকায় ভোটের মাধ্যমে বিদ্যমান ক্ষমতাসীন সরকার পরিবর্তনই তারা পাঁচ বছর অন্তর করে থাকেন। এর ফলে তারা এক দলের শাসন থেকে মুক্তি পেলেও শাসকশ্রেণীর ক্ষমতার জাল ছিন্ন করে বাইরে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
পরিস্থিতির এ দিকটি কিন্তু আজ শাসকশ্রেণীর নয়, জনগণের জীবনে সব থেকে বড় রাজনৈতিক সংকট। জনগণের প্রয়োজন ১৯৭২ সাল থেকে বলবৎ লুণ্ঠনজীবীদের শাসন ব্যবস্থাকেই পরিবর্তন করে দেশে এমন এক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, যাতে ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রতারণার উদ্দেশ্যে যে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল, তার পরিবর্তে এক প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। রাজনৈতিক সংগ্রামের এই মৌলিক কর্মসূচির সূত্রায়ন, পরিকল্পনা ও সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শাসকশ্রেণীর কোনো অংশের দ্বারাই যে সম্ভব নয়, এটা বাংলাদেশের বিগত ৪২ বছরের শাসন আমলে প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বামপন্থী নামে পরিচিত যে রাজনৈতিক দল ও গ্র“পগুলো এখন পর্যন্ত শাসকশ্রেণীর প্রচার মাধ্যমে আনুকূল্য পেয়ে আসছে, তাদের দ্বারা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। কারণ এগুলো শাসকশ্রেণীরই বাম অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই বিদ্যমান দল ও সংগঠনগুলোকে হিসাবের বাইরে রেখে এবং শুধু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, এই তথাকথিত বামপন্থী সংগঠনগুলোর শ্রেণী-চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচিত করেই এই গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সচল করতে হবে।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, জনগণের নিজের স্বার্থেই এর প্রয়োজন হলেও এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো সাড়াশব্দ, এ নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের কোনো নড়াচড়া নেই। সামাজিক উন্নতি ও পরিবর্তনের পরিবর্তে আত্ম উন্নতির এক সর্বব্যাপী প্রক্রিয়া জনগণেরই বিভিন্ন অংশের মধ্যে এমন শক্তিশালীভাবে জারি আছে, যার ফলে শাসকশ্রেণীর রাজনীতির বিপরীতে কোনো প্রক্রিয়া এখনো দানা বাঁধছে না। বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে এর থেকে বড় আতংকজনক ব্যাপার জনগণের নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে আর নেই।
শোষক-শাসকশ্রেণী ও তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের কবল থেকে দেশের রাজনীতিকে বাইরে এনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে জনগণকেই সেখানে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে জনগণের এই নিশ্চেষ্ট অবস্থান যে এক অতি সংকটজনক ব্যাপার এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। এ বিতর্ক একমাত্র শাসকশ্রেণীর এবং তাদের উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবী ছাড়া অন্য কেউই করতে পারে না। কিন্তু এই প্রয়োজন যতই জরুরি হোক, এক্ষেত্রে সক্রিয়তা দেশের নতুন প্রজন্ম, তাদের শিক্ষিত অংশের মধ্যে আজ অনুপস্থিত। এ বিষয়টি উল্লেখ করায় তাদের কোনো কোনো অংশের মধ্যে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হতে পারে, হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটাই আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক। শাসকশ্রেণীর দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-বিবাদ ও সংঘর্ষ চলছে সেটাই প্রচার মাধ্যমের সমগ্র অংশজুড়ে থাকলেও জনগণের জীবনের এই সংকট নিয়ে কোনো আলোচনা, কোনো উদ্বেগ ও আতংকের দেখা প্রচার মাধ্যমে পাওয়া যায় না। পত্রপত্রিকায় এখন শাসকশ্রেণীর দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নিুশ্রেণীর কোন্দল নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। টেলিভিশনে এটাই টকশো নামক আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে সর্বক্ষেত্রেই দেখা যায়। কিন্তু দেশের পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের মধ্যে সংগ্রাম ও সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কিছুই শোনা যায় না। অবস্থা দেখে মনে হয়, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা এসব বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের আলোড়িত করে না। শুধু তাই নয়, এ বিষয়কে তারা সযত্ন সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলেন।
বর্তমানে নতুন প্রজন্মর শিক্ষিত নবীন ও যুবকদের মধ্যে, যৌবনোত্তর ব্যক্তিদের মধ্যে আগের থেকে পড়াশোনার চর্চা কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জনগণের জন্য কাজ করতেও অনেকভাবে নিযুক্ত। বিচ্ছিন্নভাবে এটা-ওটা নানা সমস্যা সমাধানের জন্য তারা ব্যক্তিগতভাবে বা ছোট ছোট সংগঠনের মাধ্যমে কিছু চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টার সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের মতো সংস্থার দারিদ্র্য দূরীকরণবিরোধী কাজকর্মের কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। গ্রামীণ ব্যাংকের ঢেঁড়ী পেটানো কর্মসূচির মাধ্যমে যেমন বাংলাদেশের জনগণের দারিদ্র্য দূরীকরণের কোনো সামাজিক সমাধান হয়নি এবং হওয়ার নয়, তেমনি নতুন প্রজন্মর কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের পরোপকারের উদ্দেশ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন কাজের দ্বারাও পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই, যদিও এই দ্বিতীয়োক্তদের উদ্যোগের আন্তরিকতা গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের থেকে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রয়োজন অনস্বীকার্য ও জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত উন্নতির চিন্তাকে সমাজের উন্নতির চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন না রেখে বৃহত্তর অর্থে নিজের উন্নতি, নিজের মুক্তিকে সমাজের উন্নতি এবং সমাজের মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা। তার জন্য নিজেদের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করা, দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা, গণতান্ত্রিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং তার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করা। এ কাজ শুরু হলে সেই সংগ্রামের পথে যে বাতাস লাগবে এবং তার গতি দ্রুত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের জন্য এই সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। এ সংগ্রামে জনগণ ও নতুন প্রজন্ম কীভাবে, কত শিগগির ও কত ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসবেন- তার ওপরই নির্ভর করছে যে সংকট আজ জনগণের জীবনকে শোষণ-নির্যাতনের কারাগারে আটকে রেখেছে, তার থেকে তাদের মুক্তির সম্ভাবনা।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

সিনেটে অনুমোদন হলেই ফিরবেন থাকসিন

থাইল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি আইন পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্টের নিুকক্ষ। এবার উচ্চকক্ষ সিনেটে পাস হলেই দেশে ফিরতে পারবেন সিনাওয়াত্রা। এদিকে থাইল্যান্ডের পার্লামেন্টের নিুকক্ষে শুক্রবার রাজনৈতিক সাধারণ ক্ষমা সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত বিল পাস হয়েছে। এর ফলে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শুক্রবার ৩১০-০ ভোটে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিলটি পাস হয়। চারজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। অবশ্য সমালোচকরা বিলটির বিরোধিতা করছেন। তারা মনে করছেন থাকসিন দেশে ফিরে এলে দেশটির রাজপথ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। ২০০৬ সালে দেশটিতে থাকসিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে দেশ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে দেখা দেয় সামরিক অভ্যুত্থান। আর এরই মাধ্যমে অবসান ঘটে থাকসিনযুগের। এরপর ২০০৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয় পায় থাকসিনের পিপল পাওয়ার পার্টি।
কিন্তু ২০০৮ সালে দুর্নীতি মামলায় ফেঁসে যান থাকসিন। এর মধ্যে পিপল পাওয়ার পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এতে থাকসিন সমর্থকরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ যায় কমপক্ষে ৯০ জনের। থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ ছিল। এখন পাস হওয়া আইনটির সমালোচকরা বলছেন, এর মাধ্যমে মানবাধিকার লংঘনকে বিচারের আওতার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডিরেক্টর ব্র্যাড অ্যাডামস জানিয়েছেন, এ আইনের মাধ্যমে যারা মানুষের রক্ত দিয়ে হাত রঞ্জিত করেছেন তাদেরকে বিচারের আওতা থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। বিরোধীরা বলছেন, আইনটি করার ফলে থাকসিনের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিচার হবে না। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দেশে ফিরতে পারবেন। উল্লেখ্য, থাকসিন সিনাওয়াত্রার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তথ্যসূত্র : বিবিসি।

সমতার লড়াই

সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি রুবানা হক
সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নে অবদান রাখা বিশ্বের ১০০ জন নারীর উপস্থিতিতে ২৫ অক্টোবর বিবিসি আয়োজন করেছিল একটি সম্মেলন। নাম: ১০০ নারী সম্মেলন। আমাদের দেশ থেকেও উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখা মোহাম্মদী গ্রুপের রুবানা হক অংশ নিয়েছিলেন। গত শতাব্দী থেকেই নারীরা তাঁদের অসাধারণ সব অর্জনের মাধ্যমে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। তবু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অবদানের জন্য যে শক্ত পদক্ষেপ নারীকে নিতে হচ্ছে, সেখানে জেন্ডার-বৈষম্যের কারণেই পুরুষদের তুলনায় তাঁদের প্রতিবন্ধকতা বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেসব বিষয় আলোচনায় এসেছিল তার মধ্যে— শিক্ষায় মেয়েশিশুর ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহ কি উন্নয়নের অন্তরায়?
রাজনীতি ও ব্যবসায়ে নারী কি আরও বেশি ভূমিকা রাখবেন?
মাতৃত্ব ও পারিবারিক বন্ধনই কি নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা?
নারীবাদের ভূমিকার কি এখনো প্রয়োজন আছে?
ধর্ম কি নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধক?
নারীর ঝুঁকি ও সম্ভাবনা, যৌন সন্ত্রাস, একক মাতৃত্ব নারীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা ইত্যাদি। নিজ নিজ বিশেষায়িত অবস্থান থেকে সবাই অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ তাঁদের দাবি ও প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করলেন। সিয়েরা লিওনের জায়নাব বাঙ্গুরার উত্থাপিত বিষয়টি আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থাকেও সমানভাবে ইঙ্গিত করে। তিনি বললেন, তাঁর বয়স যখন ১২ বছর, তখন তাঁর বাবা তাঁকে বিয়ে দিতে চান। তাঁর মা এর প্রতিবাদ করলে বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন সারা জীবনের মতো। জায়নাবের গ্রামের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার ছিল না। বাল্যবিবাহ সে দেশের মেয়েদেরও নিয়তি। আমাদের দেশেও এর ব্যত্যয় নেই। মেয়েশিশু শিক্ষার হার বাড়লেও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার হার সে অনুপাতে বাড়েনি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে মেয়েশিশু শিক্ষার (অনূর্ধ্ব-৭ বছর) হার ছিল শতকরা ৫৪ দশমিক ৮ ও ছেলেশিশুর ৬১ দশমিক ১২। এটা আবার গ্রাম ও শহরের হারে বিশাল ফারাক। ২০০১ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর ২৪ দশমিক ৩ ভাগ মেয়ে ও ৭৫ দশমিক ৭ ভাগ ছেলে। তো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আমাদের মেয়েশিশুদের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উত্তরণে পদে পদে অনেক বাধা। জায়নাব বলছিলেন, তাঁদের গ্রামের মেয়েশিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে আক্রমণের শিকার হয়। আমাদের দেশে ইদানীং ইভ টিজিং বেড়ে যাওয়ার কারণে অভিভাবকেরা মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেদিন আমাদের একটি টিভি চ্যানেলেও উত্তরাঞ্চলের কিছু মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েদের সঙ্গে কথোপকথন প্রচার করা হচ্ছিল, যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সী ছাত্রীদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। কেন? মেয়েরা বলছিল, বিয়ে হয়ে গেলে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে ছেলেরা আর উত্ত্যক্ত করে না, তাই। কিন্তু তাদের কেউই এ বয়সে বিয়ে হোক, তা চায়নি। তারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী। তারা আরও বলছিল, তাদের লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোনোর সুযোগ নেই। কারণ, তাদের শ্বশুরবাড়ির কেউ চান না, ঘরসংসার বাদ দিয়ে তারা লেখাপড়া করুক। এ মেয়েগুলোর মুখে ছিল না কোনো উচ্ছ্বাসের ঝলক, ছিল না কিশোরীর চপলতা। আনন্দহীনতা আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়ায় ভরা ছিল তাদের নির্লিপ্ত চোখ। ইউএনএফপিএর এক তথ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে নানা ধরনের উদ্যোগ থাকলেও এখনো গড়ে শতকরা ৬৬ ভাগ নারীকে ১৮ বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে’। ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি আর্থার আরকেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ধর্মীয় গোঁড়ামি, সম্পত্তিতে অনগ্রাধিকার, পরের ঘরে যাওয়ার নিয়তি, অনিরাপত্তা, অধস্তনতা, পুরুষের সঙ্গে অসমকক্ষতা ইত্যাদি বাল্যবিবাহের পূর্বশর্ত হিসেবে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জায়নাব বাঙ্গুরা বলছিলেন, একজন নারী সত্যিকার শিক্ষিত হলে প্রথমে তিনি তাঁর পরিবারকে রক্ষা করবেন এবং তারপর রাজনীতিতে এলে দেশকেও রক্ষা করতে পারবেন। জায়নাব আরও বলছিলেন, তাঁর মা লিখতে ও পড়তে জানেন না। কিন্তু তিনি বলেন, শিক্ষা হচ্ছে সোনার চাবি, যা দিয়ে পৃথিবীর সব সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া যায়।
 উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

কঠিন বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় ১৮ দলের জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ফোনালাপের পরের দিন অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর থেকেই বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে সংবিধানের ১২৩ (৩) (ক) অনুযায়ী নির্বাচনের পূর্ব সময়। মানে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ব ৯০ দিন। উল্লেখ্য, সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর পর এবং বর্তমান সংসদ কার্যকর মেয়াদের শেষ তারিখ ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪। কাজেই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য সাংবিধানিকভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই এই ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে।
এটাই নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ। আরও যে তিনটি সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া আছে, সেগুলোও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানে প্রদত্ত ৯০ দিনের মধ্য শুধু নির্বাচনই নয়, বরং নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সবার অংশগ্রহণে, বিশেষ করে সংসদের বিরোধী দলকে নিয়েই নির্বাচন করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা নিতে হবে। প্রয়োজনে তফসিল ঘোষণার পর রদবদল করতে হলে তা-ও করতে হবে। ২০০৮ সালে এমনই করা হয়েছিল। মনোনয়ন-প্রক্রিয়া, বাছাইয়ের পর, শেষ হলে যদি কোনো প্রার্থী সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন, তাঁকে আইনানুগভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করার যৌক্তিক সময় দিতে হবে। শুধু প্রার্থীকে সময় প্রদানই নয়, ন্যায্য শুনানি দিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও প্রয়োজনে যথেষ্ট সময় রাখতে হবে। বর্তমান আইন অনুযায়ী শুধু বাতিলের বিরুদ্ধেই নয়, বরং মনোনয়ন বৈধ হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এসব শুনানির জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সময় এবং ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন বাছাইয়ের সময় প্রাথমিকভাবে বাতিল হওয়া ৫৫৭ জনের মধ্যে ৩০৯ জন প্রার্থী আপিল করেছিলেন। ৮৯ জনের বৈধতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক, সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও অন্যান্য বিষয়ে আপিল হয়েছিল। সর্বমোট ৩৯৮টি আপিল গ্রহণ ও শুনানি করতে হয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীর বক্তব্য আইনজ্ঞদের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছিল। কাজেই এসব আপিল শুনানির জন্য পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন। এর পরে রয়েছে প্রত্যাহারের সময় এবং বৈধ প্রার্থীদের প্রচারণার সময়। সব মিলিয়ে তফসিল ঘোষণার যৌক্তিক সময় ভোট গ্রহণের ধার্যকৃত দিনের আগে ৪৫ থেকে ৫০ দিন। এই পূর্ণ সময় এবং ফলাফল সরকারি গেজেট প্রকাশের দিন পর্যন্ত ‘নির্বাচনকালীন’ বলে আখ্যায়িত। উল্লেখ্য, নির্বাচনকালীন ‘নির্বাচন-পূর্ব সময়ের’ একটি অংশ। ‘নির্বাচন-পূর্ব সময়’ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও ১৯৭২)-এর অধীন বিদ্যমান আচরণ বিধিমালায়, ‘সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে, সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ কিংবা সংসদ ভাঙিয়া যাওয়ার পর হইতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কাল’ এবং ‘উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদের কোনো আসন শূন্য ঘোষণা হইবার পর হইতে উক্ত আসনের জন্য অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কাল’ সংজ্ঞায়িত রয়েছে। বিদ্যমান বিধিমালার ৯০ দিনের পূর্ব সময় সংবিধানের আলোকেই নির্ণীত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর পর যেহেতু সংসদ বহাল অবস্থাতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেহেতু ‘সংসদ ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী’-এর বদলে ‘পূর্ববর্তী’ হিসেবে ১২(৩) (ক)তে উদ্ধৃত এবং সংবিধানের ধারা ১২৩(খ)তে এখনো ‘পরবর্তী’ বিদ্যমান রয়েছে।
কাজেই সংবিধানের উদ্ধৃত ধারার আলোকে ৯০ দিনের পূর্ববর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত করার কথা। এক কথায়, বর্তমানের সংশোধিত সংবিধানের আলোকে ২৭ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অথবা এরই মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে গেজেটে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত এ সময় নির্বাচন-পূর্ব সময় বলে আখ্যায়িত হবে। ওপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, এই সময়ে যে সরকার বিদ্যমান থাকবে, তাকে যে নামেই অভিহিত করা হোক, মূলত আর চরিত্র হবে নির্বাচনকালীন সরকারের। তবে এ বিষয়ে সংবিধানের সরল পাঠে তেমন কোনো উল্লেখ নেই বিধায় বিদ্যমান সরকারকেই সেই চরিত্রে রূপান্তরিত হওয়াই সংবিধানের ধারা ১২৩-এর আলোকে যৌক্তিক। আমি মনে করি, এই সময়ের মধ্যেই সংবিধানের ধারা ১২৬ অধিকতর প্রযোজ্য। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। তেমনি ধারা ১২৬-এর আওতায় সরকারের সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ও তফসিল ঘোষণার পরিবেশ তৈরি করবে। গণতান্ত্রিক রীতিতে পরিচালিত নির্বাচনকালীন সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার পরিবেশ সৃষ্টিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ ও চাহিদাক্রমে সর্বতো সহযোগিতা প্রদান করা।
নির্বাচনকালীন সরকার দৈনন্দিন কার্য সম্পাদন করা ছাড়া অন্য এমন কোনো কার্য সম্পাদন করবে না, যা নির্বাচনকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আচরণবিধির আইনগত ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও সর্বতোভাবে প্রয়োগ করা হয়। এমনকি মন্ত্রিপরিষদের রুটিন সিদ্ধান্তও নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ ছাড়া সম্পাদন করা হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর পরেও সরকারের কাঠামো ও কার্যপরিধি এমনি হওয়ার কথা। অথচ এখন পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রমে নির্বাচনকালীন সরকারের আদল দেখা যাচ্ছে না, যদিও প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক মতামত তেমনটিই ছিল। প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে ২৪ অক্টোবরের পর সংসদের কার্যক্রম রদ করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মত পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। মত পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে এক ঘোষণা মোতাবেক আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারের কার্যপরিধিতে এবং সরকারের আয়তনে কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত সূচিত হয়নি। যাই হোক, নির্বাচন-পূর্ব পরিবেশ যেমন হওয়ার কথা, বাস্তব চিত্রটি তেমন নয়। বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, তফসিল অথবা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারবহির্ভূত করা হয়েছে এবং এমনই থাকবে বলে মনে হয়।
অন্যদিকে সরকারের কার্যক্রমেও কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মাঠে-ময়দানে রাজনৈতিক সংঘাত বিদ্যমান। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়টির এখনো সুরাহা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে নির্বাচন কমিশন এখনো নিয়োগ করতে পারেনি বা নির্বাচন কমিশন সেই উদ্যোগও নেয়নি। সংশোধিত আচররণবিধির খসড়া হয়েছে মাত্র, চূড়ান্ত করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে উপেক্ষা করেই আরপিওর সংশোধনী পাস হয়েছে সংসদে। আরপিও থেকে ১২(১) জে বাদ দেওয়ায় মনোনয়ন বাণিজ্য এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। এ ধরনের বাস্তবতায় আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে না পারলে কমিশন কর্তৃক সংবিধান লঙ্ঘিত হবে, অবশ্য যদি সংবিধানের ধারাগুলো অপরিবর্তিত থাকে। সার্বিক আলোচনা ও পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশন নানা ধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার কারণে সে ধরনের প্রস্তুতির ঘাটতি তথ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এরই মধ্যে যোগ হয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার বাস্তবতা। নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের পরিস্থিতির সঠিক নিরূপণ করতে না পারায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণে ঘাটতি দৃশ্যমান। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন পরিচালনা করা এবং এ দায়িত্ব পালনের জন্য যে ধরনের ক্ষমতা প্রয়োজন, তা সংবিধান প্রদত্ত।
তবে সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যে তৈরি হবে না, তার কিছু আলামত হালের রাজনৈতিক পরিবেশেই প্রতীয়মান। তদুপরি রয়েছে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার মতো অনভিজ্ঞতা। এসব কারণেই কমিশনের উচিত ছিল প্রায় ছয় মাস আগেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, যার মধ্যে আরপিও সংশোধন, আচরণবিধি প্রণয়ন ও প্রচারণা সম্পন্ন করা এবং সব দল ও মতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া। এ কথা অনস্বীকার্য, যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশ বিদ্যমান, তার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের কাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কমিশন তার এখতিয়ার কায়েম করতে পারছে না। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতির পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং কঠিন বাস্তবতার আলোকে সব দলের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার বাধাবিপত্তিগুলো রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করতে পারে। এমন করাটা সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের নৈতিক দায়িত্বের পরিপন্থী হবে না। এই সময়ে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে না গিয়ে উচিত হবে নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সবার জন্য নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করা। অন্যথায় সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযেগ্য নির্বাচন না করতে পারার দায়িত্ব এককভাবে নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। কঠিন বাস্তবতার আলোকে দায়িত্ব সংকুচিত করা নয়, বরং সুচারুভাবে পরিপালন করাই নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
 এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

দেশ কোরবানির হাট নয়

গরু ও মানুষে বিস্তর তফাত। গরু ঘাস খায়, মানুষ খায় না। মানুষ কথা বলতে পারে, কথা বানাতেও পারে চমৎকার। গরু শুধুই ডাকতে পারে হাম্বা। কথার দিকে কম হলেও মানুষের তুলনায় অনেক কিছু বেশি আছে এই প্রাণীর; যেমন—লেজ ও শিং। আবার নেইও অনেক কিছু; যেমন—লোভ-লালসা, দম্ভ, ঘৃণা, ঈর্ষা ইত্যাদি। গরুর চারটি পা, মানুষের মাত্র দুটি। এই উপরি পাওনার বিচারে নিশ্চয়ই বলা যাবে না গরুই উন্নততর। মানুষ জানে, গরুরা বুদ্ধিহীন। এ বিষয়ে একপ্রকার নিশ্চিত বলে, বুদ্ধিহীন মানুষকে মানুষ গরু বলে সম্বোধন করে থাকে। মানুষের ক্রোধ সীমাহীন। গরুকুল ক্রোধবিবর্জিত নয়। হঠাৎ ফুঁসে উঠে পরস্পরকে গুঁতার উদাহরণ যথেষ্ট পাওয়া যাবে। তবু মানুষের হিসেবে, গরু নিরীহ প্রাণী। জোর যার মুল্লুক তার, মানুষ জানে। চতুষ্পদ প্রাণীদের অজ্ঞাত, তাই সামান্য এক লাঠি বা লেজে মোচড় মেরে মানুষ গরুকে নিজের মতে চালাতে পারে। শিং আছে যার, সেই প্রাণী শিংয়ের জোর ভুলে নিরীহ থাকতে পারে, অথচ শিংবিহীন দ্বিপদবিশিষ্টরা সর্বদা অদৃশ্য শিংয়ে শাণ দিয়ে প্রস্তুত, কাকে কখন গুঁতিয়ে ধরাশায়ী করা যায়। প্রচুর পরিমাণে বুদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে মানুষ যেন বেকায়দায়। কারণে-অকারণে অহরহ বুদ্ধি খরচের পথ খুঁজে বেড়ায়।
সামান্য পেছনের দিকে তাকালে গরুর ওপর বুদ্ধি খরচের খুবই নির্দয় উদাহরণ পাওয়া যাবে। কোরবানির হাটে দশাসই গরুকে ব্যাপারী মহাশয় পুঁচকে সাইজের পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। অসহ্য গরমে চারপেয়ের কষ্ট লাঘবের জন্য মানবসন্তানের অসাধারণত্বের প্রকাশ এটা নয়। যদি হতো, এই ভুবনে ‘কু’ মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পেত না। গরুকুলে ‘সু’ আর ‘কু’ আছে কি না, সে খবর তারাই জানবে, তবে মানুষ নিশ্চিত, এই গৃহপালিত চতুষ্পদ প্রাণীরা ভালো বা মন্দ মানুষের তফাত বুঝতে অক্ষম। গরুকে বাতাস করার আসল কারণ জানা হলে লজ্জা-শরমে মাথা হেঁট হয়ে যাবে। গরু যত বেশি মোটাতাজা, কোরবানির গরু হিসেবে তার দাম হবে ততটাই মোটা এবং তাজা। মোটাসোটা লাভের আশায় গরুর দেহে সিরিঞ্জের মাধ্যমে ওষুধ ঢোকানোর বুদ্ধি পেয়েছে মানুষ। শিউরে ওঠার মতো কথা, সেই মন্দ ওষুধে নিরীহ গরুর কিডনি আক্রান্ত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ফুলেফেঁপে বেশি দামে বিক্রির যোগ্য হয়ে ওঠে গরু। ভাষা হারিয়ে ফেলার মতো কারবার। ধর্ম এবং মানবধর্ম—দুটিকেই গোল্লায় পাঠাতে সামান্য বুক কাঁপে না অনেক মানুষের।
গোবেচারা শব্দটি মানুষের আবিষ্কার। আবিষ্কারকালে বিশ্লেষণে বোধ হয় বের হয়েছিল, মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হলেও পরিস্থিতি সেই শ্রেষ্ঠকে কখনো গো এবং কখনো বেচারায় পরিণত হতে বাধ্য করবে। এখন অবস্থাদৃষ্টে তেমনই মনে হচ্ছে। মনে হয়, সময় সবাইকে গো বানিয়ে ছেড়েছে, বেচারায় পরিণত করেছে। যেন সবাইকে ঠেলে গুঁতিয়ে তোলা হয়েছে বিরাট হাটে। গলায় দড়ি পরিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে খুঁটিতে। দুই বাঁশের ফাঁকে অতি কষ্টে দাঁড়িয়ে জাবর কেটে যেতে হচ্ছে। যেন রোদ-বৃষ্টি, ঠান্ডা-গরম যা-ই হোক, দিন-রাত অসহ্য যাতনা ও কোলাহলের মধ্যে বিনা বাক্যে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। হাটে ইজারাদার, তার একপাল জবরদস্তিকারীর হালুম-হুলুম আছে যখন-তখন। স্থানীয় খুচরা ষণ্ডাদের ষণ্ডামি, আছে বেয়াড়া ধরনের মাছিদের ফাজলামি। মহাজন, ব্যাপারী, ফড়িয়া, ক্রেতা—কত রকম পরিচয়ের মানুষের শত রকম অন্যায়-অনাচার মুখ বুজে সহ্য করতে হয় গরম হাটের ঠান্ডা গরুদের। টুঁ-শব্দ করে না তারা।
অমর্যাদা কাকে বলে গরুকুলের জানা নেই, অপদস্থ হওয়া বোঝে না। সম্মান পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে গো সম্প্রদায়ে সচেতনতা নেই। নেই বলে নিরীহের প্রতি অনিরীহের যাচ্ছেতাই আচরণ সগৌরবে চলে। মানুষের প্রতি মানুষের যেমন খুশি তেমন আচরণ শোভন নয় মোটেও। স্বনির্ভর কথাটা গরু বেচারাদের জন্য জুতসই নয়। গৃহপালিত হওয়ায় তাদের মুখে খাবার এগিয়ে দিতে হয়। তবে তারা পরিধানের ঝামেলামুক্ত। মানুষ নিজের খায়, নিজেরটা পরে। চলে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুযায়ী। মানুষকে গরু ভেবে গর্দভের মতো আচরণ করতে পারে বোকার স্বর্গে বাস করা মানুষই। গলায় দড়ি, ঠেলা-ধাক্কা, গুঁতা, ধমক-টমক বা যেকোনো প্রকার অসম্মান চারপেয়েরা টুঁ-শব্দ না করে হজম করে। দুপেয়েদের পাকস্থলী দুপেয়ে মার্কা, অত নির্বিকার স্বভাবের নয়। গরুর হাটের দুর্ভাগা গরুরা মোটাতাজা হওয়ার সাধে স্বেচ্ছায় সুই গ্রহণ করে না, নিজ স্বার্থে লোভী ব্যাপারীরা তাদের বাধ্য করে। সেই হাটের বাইরেও চলছে সুইয়ের ব্যবহার।
দেওয়া নয়, নেওয়া। কিসমত মোটাতাজা বানানোর লক্ষ্যে পক্ষ নিয়ে দক্ষ ব্যাপারী বাহিনী গড়ে উঠেছে। তারা সুই নিচ্ছে স্বেচ্ছায় ও সানন্দে। সে সুইয়ের রয়েছে পরোক্ষ ক্ষমতা। তাতে ভাগ্য ফেরে নিজের, কিডনি শেষ হয়ে যায় অন্যের। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন সম্মানীয় পরিচয়ে সোনার বাংলায় পাঠিয়ে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছেন, অনেকেই প্রাপ্ত পরিচয়ে সন্তুষ্ট নয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি নানা পরিচয়ের মানুষের মনের মণিকোঠায় পক্ষে দক্ষ হওয়ার তীব্র বাসনা। যিনি মানুষকে বুদ্ধি প্রদান করেন, তিনিও বোকা বনে যান যখন দেখেন, কোনো বুদ্ধিপ্রাপ্ত সাগ্রহে বোকাসোকা বনে যেতে উদ্গ্রীব। তিনি বিস্ময় সৃষ্টিকারী হয়েও হতবাক হন, দুই চোখে তীব্র দৃষ্টিশক্তি দান করা সত্ত্বেও একচোখা বনে জীবন সার্থক করতে চায় বহু মানুষ। দুই চোখ থাকতেও যারা দিবারাত্র এক চোখে দেখে সন্তুষ্ট, তাদের পক্ষে মানুষকে গরু বিবেচনা করা খুবই সম্ভব।
চারদিকে সমূহ সর্বনাশ কড়া নাড়ছে, উদ্বেগ-উত্তেজনা নেই। মানুষ বেঁচে থেকে মরছে, মরেও মরছে। দুঃখের দহন নেই, শোকহীন একচোখারা খাড়া করছে যুক্তির পাহাড়। মানুষ মরুক, মানবতা হেরে যাক, পক্ষ জেতাতে হবে। এটাই যেন পরম ধর্ম। দেশ কোরবানির হাট নয়। গরুতে ভর্তি নয় দেশ। দেশ মানুষের। মানুষের ভেতরে মানুষই পছন্দমতো নিজ নিজ পরিচয় তৈরি করে নিয়েছে, নেবে, নিক। দেশের সব মানুষ এ-ভাগ ও-ভাগে নাম লিখিয়ে বিভক্ত হতে চায় না। সিংহভাগ মানুষ সাধারণ পরিচয়েই খুশি। তাদের সাধারণত্ব দুর্বলতা নয়, বিশেষ গুণ হিসেবে বিবেচনা করা শ্রেয়তর। গুণ গায়ে না মাখলে কখন তা দোষে পরিণত হবে, জানবে না কেউ। তখন গোবেচারাদের দেখে একচোখাদের আক্কেল গুড়ুম হবে—আরে, এদের শিং গজাল কবে, কখন?
দুঃখের বিষয়, যখন এমন প্রশ্নের উদয় হবে, উত্তর পাওয়ার জন্য হাতে সময় থাকবে না।
 আফজাল হোসেন: লেখক, অভিনেতা, পরিচালক।
Afzalhossain1515@yahoo.com