Monday, September 2, 2019

ফের টার্গেট পুলিশ, আসামি অজ্ঞাত by শুভ্র দেব

আবারো পুলিশের ওপর হামলা। এবার বিস্ফোরক ছোড়া হয়েছে ফুটওভার ব্রিজের ওপর থেকে। এর আগে গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে বোমা পেতে বিস্ফোরণ ঘটনানো হয়। জাতীয় সংসদের পাশে খেজুর বাগান এলাকায় পুলিশ বক্সের কাছে বোমা রাখা হয়। এসব ঘটনার দায় স্বীকার করে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট। যদিও তাদের এ দাবি নাকচ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় জঙ্গিরা জড়িত। তারা এসব  ঘটনার মাধ্যমে তাদের অস্থিত্ব জানান দিতে চাইছে।
জঙ্গি সংগঠনগুলো আগে থেকে পুলিশের ওপর হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলো। হুমকি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করা হয়। কিন্ত সতর্কতার মধ্যে দিয়ে বারবার পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে। চলতি বছরের ৫ মাসে তিন বার পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ছয় পুলিশ সদস্য। এছাড়া একজন রিকশা চালকও আহত হয়েছেন। প্রত্যেকটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। তবে এসব মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি নাই। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এসব হামলার রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি। এমনকি এসব ঘটনায় কাউকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের তথ্যও মিলেনি। 

সর্বশেষ শনিবার রাত ৯টার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে দুর্বৃত্তরা ককটেল ছুঁড়ে মারে। এর একটু দূরেই যানজটে আটকে ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের গাড়ি বহর। এতে মন্ত্রীর প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা এএসআই শাহাবুদ্দিন (৩৫) ও ট্রাফিক কনস্টেবল আমিনুল (৪০) আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ভর্তি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যানজটে আটকা পড়া মন্ত্রীর প্রটোকলে থাকা এএসআই শাহাবুদ্দিন গাড়ি থেকে নেমে সেখানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাকে সিগন্যাল ছাড়ার কথা বলেন। কথা শেষ করে তিনি পুলিশ বক্স ও ফুটওভার ব্রিজের মাঝামাঝি স্থানে আসা মাত্র হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। পরে সেখানকার পুলিশ সদস্যরা এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে নিউ মার্কেট থানায় মামলা করা হয়েছে। গতকাল বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করেন সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পুলিশ বক্সের ইনচার্জ উপ পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম।

এর আগে চলতি বছরের ২৯শে এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানের ডন প্লাজার সামনে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়া হয়। এতে ট্রাফিক কনস্টেবল নজরুল ইসলাম (৩৭), লিটন (৪২) ও কমিউনিটি পুলিশ মো. আশিক (২৮) আহত হন। ওই দিন ডন প্লাজার সামনে তারা দায়িত্ব পালন করছিলেন। এসময় হঠাৎ বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরিত হয়। এর পরে ২৬ মে মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ের সামনে পুলিশের গাড়িতে বোমা হামলা করা হয়। এ ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের সহকারি উপপরিদর্শক রাশেদা আক্তার বাবলী (২৮) ও রিকশা চালক লাল মিয়া (৫৫)  আহত হন।  এছাড়া ২৩শে জুলাই রাতে খামারবাড়ি পুলিশ বক্সের কাছ থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকটি ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ আইএসের দায় স্বীকারের তথ্য প্রকাশ করে।

পুলিশের ওপর এসব হামলা নিয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। সবকটি হামলার ধরণ একই। পুলিশকে লক্ষ্য করেই তারা হামলা করেছে। গুলশানে সিজার হত্যা ও হলি আর্টিজানে হামলাসহ রাজধানীতে যে কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে তার প্রত্যেকটি তদন্ত করে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের যেভাবে দমন করা হয়েছে তাতে পুলিশের ওপর ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক। এছাড়া রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা ২০১৩ সালের পর যেভাবে পুলিশের ওপর আক্রমণ ও দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির তৈরি করেছিল, সেসব ঘটনাতেও পুলিশ সন্ত্রাসীদের দমন করেছে। একারণে ওইসব সন্ত্রাসীদেরও পুলিশের ওপর ক্ষোভ থাকতে পারে। গুলিস্তান-মালিবাগের হামলা নিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনার বিষয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। নানা ভাবে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। দুটি ঘটনারই তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে ও আসামীদের শনাক্তের জন্য এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

বোমা হামলার ঘটনায় পুলিশের আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারি বলেছেন, কারা হামলা করছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বোমা হামলার ঘটনায় সারাদেশে বাড়তি সকর্ত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে ১৫ই মে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) কার্যনির্বাহি কমিটির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে আইজিপি বলেছিলেন, জঙ্গিগোষ্ঠী এখন পুলিশের ওপর হামলার টার্গেট করছে। তাই পুলিশ বাহিনীকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। ওই দিন আইজিপি আরও বলেছিলেন, পুরো বিশ্বে জঙ্গিরা এখন দলবদ্ধ হয়ে হামলার প্রবণতা থেকে বের হয়ে এসেছে। তারা একাকী হামলা মানে ‘লোন উলফ’ পদ্ধতিতে হামলা চালাচ্ছে। এই প্রবণতা রোধ করা প্রায় অসম্ভব।

এদিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পুলিশের ওপর বোমা হামলার পর ঢাকাসহ সারা দেশের পুলিশের সব ইউনিটকে সতর্ককতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে। পুলিশের সকল এসপি, ডিআইজি ও ইউনিট প্রধানদের মৌখিকভাবে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যেকোনো গাড়ি আন-অ্যাটেন্ডেড না রাখাসহ পুলিশের যেকোনো স্থাপনায় প্রবেশকালে সবাইকে বিধি মোতাবেক সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে তল্লাশি করা। ব্লক রেইড ও চেকপোস্টে তল্লাশি করতে বলা হয়েছে। এসব ব্যাপারে পুলিশের সব ইউনিটকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশের ওপর হামলার দায় আইএস স্বীকার করলেও এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের ভিন্ন ধরনের মতামত রয়েছে। হামলার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে একটা মহল সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা তৈরি করতে চায়। যেখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে হামলাকারী কারা তাদের খোঁজে বের করতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখায়াত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, জঙ্গিদের তৎপরতা শেষ হয়ে যায় না। হয়তো বড় কোনো হামলার শক্তি তাদের নাই ছোটোখাটো হামলা করে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে তারা শেষ হয়ে যায়নি। জঙ্গিরা ফের ছোট ছোট গ্রুপ আকারে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাই তাদের সহজ শনাক্ত করা অসম্ভব। এমনকি তারা যে একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে তার কোনো আলামত নাই। প্রতিনিয়তই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জঙ্গিদের বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা আটক হচ্ছে।

মোদিকে আমিরাতের পুরস্কার: পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার পুনঃমূল্যায়ন করা দরকার পাকিস্তানের?

সাহসী পদক্ষেপে পাকিস্তান সিনেটের চেয়ারম্যান সাদিক সাঞ্জরানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার পূর্ব-নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন। প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আরব আমিরাতের সরকারের পুরস্কার দেয়ার প্রতিবাদে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জানা গেছে, পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিদল নিয়ে চার দিনের সফরে রোববার আমিরাত যাওয়ার কথা ছিল সাঞ্জরানির। কিন্তু তিনি কাশ্মীরী জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশ ও মোদিকে সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব দেয়ার প্রতিবাদে সফরটি বাতিল করেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চেয়ারম্যান সিনেট বলেছেন, পাকিস্তান কাশ্মীরীদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দেয়। তিনি বলেন, মোদি সরকার কাশ্মীরীদের ওপর নজিরবিহীন নৃশংসতা চালিয়েছে, অধিকৃত ভূখণ্ডে কারফিউ জারি করে রেখেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে যেকোনো সফর হতো পাকিস্তান ও কাশ্মীরী ভাইদের ভাবাবেগের জন্য ক্ষতিকর।

পাকিস্তানে কেবল সরকার নয় জনসাধারণের একটি বড় অংশই আরব আমিরাত সরকারের সিদ্ধান্তে খুশি নয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আমিরাত সরকারের মোদিকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করার সিদ্ধান্তে খুশি নয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য এই সম্মান মোদিকে না দেয়ার জন্য আমিরাতের প্রতি আহ্বান জানায়। লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য নাজ শাহ বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মানবাতাবিরোধী অপরাধে জড়িত। তিনি সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত নন।

মুসলিম উম্মাহ: একটি আকাশকুসুম কথা?

পাকিস্তানে অনেকে বিশ শতকে জামাল উদ্দিন আফগানি ও আল্লামা ইকবালের উল্লেখিত মুসলিম উম্মাহর ইসলামি ধারণায় বিশ্বাস করে। তাত্ত্বিকভাবে মুসলিম উম্মাহ একটি বিমূর্ত ধারণা। এতে সারা দুনিয়ার মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রচার ও তাদেরকে ‘ভাই’ হতে উৎসাহিত করা হয়।

অন্য কথায়, এটি এমন এক আইডিয়া, যাতে বলা হয় যে একই বিশ্বাসে বিশ্বাসীরা ভাই। কিন্তু আমিরাত সরকার যখন মোদিকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করল, তখন তারা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীর উপত্যকায় নজিরবিহনী নৃশংসতা চালানো সত্ত্বেও আমিরাত সরকার তাকে এমন মর্যাদা দেয়াটা তারা মেনে নিতে পারছে না।

এখন ব্যাপকভাবে মনে করা হচ্ছে যে পাকিস্তানের মুসলিমদের উচিত হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির দিকে জোর দেয়া। কারণ সীমান্তের বাইরের কেউ তাদের পাশে থাকবে না।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

লাহোরভিত্তিক শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সৈয়দা আমিনা গিলানি বিশ্বাস করেন যে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখা পাকিস্তানের জন্য ভালো। তবে এর মূল্যও আছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের কথাটি দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে এই মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ কাজে আসেনি। আরব বিশ্ব ভারতের অধিকৃত কাশ্মীরের ওপর পরিচালিত নৃশংসতার নিন্দা করেনি বরং নরেন্দ্র মোদিকেই পুরস্কৃত করেছে।

তিনি বলেন, এক দিক থেকে এটি ভালোই হয়েছে। আদর্শগত মুখোশ খুলে যাওয়ায় বাস্তব অবস্থা সবার সামনে চলে এসেছে। এতে খারাপ লাগলেও পাকিস্তান তার অবস্থান পুনঃনির্ধারণ করার সুযোগ পাবে। পাকিস্তান এখন বাস্তবতার আলোকে আরো ভালোভাবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে।

এখন পাকিস্তানের কী করা উচিত, এমন প্রশ্নের জবাবে গিলানি বলেন, পাকিস্তানের উচিত হবে বিচক্ষণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে তার পররাষ্ট্রবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে বিন্যস্ত করতে হবে। তাকে তার সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির আলোকে আরব বিশ্বের সাথে তার অবস্থান পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, কাশ্মীরী স্বার্থের প্রতি আরব বিশ্বাসঘাতকতা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি যথার্থভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ এন দিয়েছে।

পার্লামেন্ট স্থগিতের বিরুদ্ধে বৃটেনজুড়ে বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পার্লামেন্ট স্থগিত করার প্রতিবাদে বৃটেনজুড়ে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচেষ্টাকে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করে স্লোগান দিয়েছেন ‘স্টপ দ্য ক্যু’। শনিবার দুপুরে এমন বিক্ষোভে যেন মানুষের ঢল নেমেছিল মধ্য লন্ডনে। আয়োজনকারীরা বলছেন, এতে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় এক লাখ মানুষ। এ সময় তাদের হাতে ছিল নানা রকম স্লোগান সম্বলিত প্লাকার্ড। সরকারের হৃদপিন্ড বলে পরিচিত হোয়াইট হলের দিকে নেমেছিল জনতার ঢল। তারা সমবেত হন ডাউনিং স্ট্রিটে। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।
এ খবর দিয়েছে লন্ডনের প্রভাবশালী অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

এ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী জনসন ঘোষণা দেন তিনি এই শরতে ৫ সপ্তাহের জন্য পার্লামেন্ট স্থগিত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তার এ পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছেন রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তবে সমালোচকরা বিষয়টিকে ভালভাবে দেখেননি। তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেমন অবস্থান নিয়েছে বিরোধী লেবার পার্টি, ঠিক তেমনি বেঁকে বসেছেন নিজের ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ দলের অনেক এমপি। তারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী জনসন চুক্তিবিহিন ব্রেক্সিট সম্পাদন করবেন। তার এই প্রচেষ্টা যাতে বিরোধী এমপিরা আটকাতে না পারেন সে জন্য তিনি পার্লামেন্ট স্থগিত করেছেন। তবে জনসন বলছেন, তাদের এমন দাবি পুরোপুরি অসত্য।

পার্লামেন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ওয়েস্টমিনস্টারে। শনিবারের বিক্ষোভে তাই যোগ দিয়েছিলেন বিরোধী দলের রাজনীতিকরাও। এর মধ্যে ছিলেন ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডায়ানে অ্যাবোট এবং ছায়া চ্যান্সেলর জন ম্যাকডোনেল। হোয়াইট হলের সমাবেশে তারা বক্তব্য রেখেছেন। সেখানে ম্যাকডোনেল বলেছেন, আমাদের লড়াই হলো গণতন্ত্রকে রক্ষা করা। তিনি আরো বলেন, পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলো লড়াই করে গেছেন। তারা বিরাট ত্যাগ স্বীকার করেছেন। অনেকে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। ফলে নীতি ও দেশের ভবিষ্যতের বিষয়ে তাদেরও কথা বলার আছে। সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, বরিস জনসন বিষয়টি পার্লামেন্ট বনাম জনগণ নয়। এ লড়াইটা হলো আপনি বনাম জনগণ।

পরে বিক্ষোভকারীরা ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজে যান চলাচল আটকে দেন। এ সময় তারা স্লোগান দিতে থাকেন এই বলে যে, আপনি যদি আমাদের পার্লামেন্ট অচল করে দেন। আমরা আপনাদের ব্রিজ অচল করে দেবো। বিক্ষোভকারীদের অন্য একটি গ্রুপ তাফালগড় স্কয়ারের কাছে ও ওয়াটারলু ব্রিজ অবরুদ্ধ করে দেয়। এসব বিক্ষোভ থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গ্রিন পার্টির সহ-নেতা সিয়ান বেরি বলেছেন, যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার মধ্যে লন্ডন এসেম্বলির একজন সদস্য রয়েছেন। তিনি হলেন ক্যারোলাইন রাসেল।

ওদিকে লন্ডন থেকে দূরে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। আয়োজকরা বলেছেন, ব্রিস্টলে বিক্ষোভ করেছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। আর ম্যানচেস্টারে সমবেত হয়েছিলেন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। বিক্ষোভ হয়েছে মধ্য গ্লাসগোর জর্জ স্কয়ারে। সেখানে বিরোধী নেতা জেরেমি করবিন সহ সরকারি বিভিন্ন নেতার বক্তব্য শুনতে বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হন। সেখানে জেরেমি করবিন বলেন, এখানে আপনারা সবাই সমবেত হয়েছেন বরিস জনসনকে এটা বলতে যে, এটা আমাদের পার্লামেন্ট। এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। তাই আপনাদের সমর্থন দিতে এখানে আসতে পেরে আমি গর্বিত। চুক্তিবিহিন ব্রেক্সিটের জন্য কোনো পথ খোলা নেই। এমনটা করতে গেলে আমরা আপনাকে থামিয়ে দেবো। জনগণকে তাদের অধিকার দিন। তাদের ভবিষ্যত কি হবে এটা তাদেরকে নির্ধারণ করতে দিন।

শনিবার বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আগে জেরেমি করবিন সতর্কতা দেন। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে যখন হাউজ অব কমন্সের অধিবেশন বসছে তখন সেটাই হচ্ছে চুক্তিবিহিন ব্রেক্সিট সম্পাদন বন্ধের জন্য সর্বশেষ সুযোগ। তার ভাষায়, এটাই হলো শেষ সুযোগ। চুক্তিবিহিন ব্রেক্সিট, প্রধানমন্ত্রীর আমাদেরকে ডনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দিতে চাওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি বন্ধ করার জন্য আমরা সবকিছুই করবো। এটা হলো প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ‘রিয়েল এজেন্ডা’। আগামী মঙ্গলবারের জন্য প্রস্তুতি নিতে প্রচুর কাজ করতে হবে।

ওদিকে পার্লামেন্ট স্থগিত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে ইয়র্ক, ম্যানচেস্টার, নিউক্যাসল ও ব্রিস্টলে। এসব বিক্ষোভেও যোগ দেন বিপুল সংখ্যক বৃটিশ। তবে সবচেয়ে ছোট বিক্ষোভ হয়েছে ওরকনিতে। সেখানে বৃষ্টি উপেক্ষা করে যোগ দিয়েছিলেন প্রায় ১০০ মানুষ। উল্লেখ্য, এখানকার জনসংখ্যা মাত্র ২২ হাজার।

অধীর রঞ্জনের ক্ষোভ: আমার পিতাও বাংলাদেশী, আমাকেও বের করে দিন

আসামে নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ ও দিল্লিতে নাগরিকপঞ্জি করার ঘোষণায় ভীষণ ক্ষিপ্ত কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। ৩১ শে আগস্ট আসামে নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি প্রকাশের পর এক প্রতিক্রিয়ায় দিল্লি বিজেপির প্রধান মনোজ তিওয়ারি দিল্লিতেও নাগরিকপঞ্জি করার আহ্বান জানান। এর জবাবে ক্ষিপ্ত হয়ে অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেছেন, আমার পিতা বাংলাদেশে বসবাস করতেন। তাহলে তো আমিও বহিরাগত। তারা যদি এভাবে নাগরিকপঞ্জি করতে চান তাহলে তো পার্লামেন্টেও তা করা উচিত।  এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডিএনএ।
দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন বলেছেন, কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়া এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি করা উচিত সরকারের। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখা উচিত, কোনো খাঁটি নাগরিক যেন ওই তালিকা থেকে বাদ না পড়েন। ৩১ শে আগস্ট প্রকাশিত আসামের চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে মোট বৈধ নাগরিক দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জনকে। আর এর বাইরে রয়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনকে।
এদেরকে এখন ‘বিদেশী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শনিবার এ তালিকা প্রকাশের পর দিল্লিতে ১০ জনপথে কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, আসামে এনআরসি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এ সময় তিনি বিজেপির এমপি মনোজ তিওয়ারির করা মন্তব্যেরও জবাব দেন। শনিবার মনোজ তিওয়ারি বলেন, দিল্লিতেও এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি করা উচিত। কারণ, সেখানে অবৈধ অভিবাসীরা ভয়ানক হয়ে উঠেছে। দিল্লিতে নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোজ তিওয়ারি বলেন, দিল্লিতে এনআরসির মতো ঘটনা হবে দলের নির্বাচনী মেনিফেস্টো।
তার এসব বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তিনি লোকসভায় কংগ্রেস দলের নেতাও। মনোজ তিওয়ারিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন, দেশের মালিক তারা। তারা যেখানে চাইবেন সেখানেই নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি করতে পারেন। তারা তো আসামেই এনআরসি ঠিকমতো করতে সক্ষম হননি। আর তারা অন্য রাজ্যগুলোতে যেতে চাইছেন। পার্লামেন্টেও তাদের এনআরসি করা উচিত।  তিনি আরো বলেন, আমার পিতা তো বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। তাহলে আমিও বহিরাগত। আমাকেও বের করে দিন।
এর আগে এনআরসি ইস্যুতে কংগ্রেসের অন্তর্বর্তী সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে তার বাসভবনে বৈঠক করেন কংগ্রেসের সিনিয়র নেতারা। এতে উপস্থিত ছিলেন একে অ্যান্থনি, গৌরব গগৈ, গুলাম নবী আজাদ ও সিনিয়র নেতারা। বৈঠকের পরে অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেছেন, যেকোনো অবস্থার প্রেক্ষিতে  কোনোও প্রকৃত নাগরিককে তালিকার বাইরে রাখা উচিত হবে না। সব প্রকৃত নাগরিককে সুরক্ষা দিতেই হবে।

মোবাইল কোর্টে শিশুদের বিচার হয়! by উদিসা ইসলাম

আটক কিশোর অপরাধী
অপরাধের জড়িয়ে পড়া শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বনের কথা আইনে থাকলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হচ্ছে, এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। মোবাইল কোর্টে শিশুদের বিচার করা যায় কিনা তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ কারণেই শিশু আদালতের ব্যবস্থা আছে। সেখানে না নিয়ে মোবাইল কোর্টে শিশুদের দণ্ড দিয়ে এবং তাদের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করলে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। তবে ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে মোবাইল কোর্টকে শিশু আদালত ঘোষণা দিয়ে বিচার করতে পারেন। সেক্ষেত্রেও শিশু আইনের অন্যান্য সুরক্ষাগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।

গত ২৬ আগস্ট সোমবার রাতে রাজধানীর মান্ডা থেকে বিভিন্ন অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের ২৩ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তাদের মধ্যে ২০ জনকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাকি তিনজনকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে, রাজধানীর রায়েরবাজারে গত ২৩ আগস্ট শুক্রবার ‘স্টার বন্ড’ নামে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা র‌্যাব সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। শনিবার (২৪ আগস্ট) স্টার বন্ডের ১৭ সদস্যকে আটকের পর একবছরের সাজা দিয়ে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

আইন বলছে, ‘বিদ্যমান অন্য কোনও আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন,এই আইনের উদ্দেশ্যপূরণকল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে।’

রায়েরবাজারে আটক হওয়া ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। তাদের বিচার হয়েছে প্রকাশ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে। অথচ এমন বয়সীদের বিচারের জন্য বেশ কিছু বিষয়ে বাড়তি যত্ন নিতে বলা হয়েছে শিশু আইন-২০১৩ তে। সুরক্ষা দিতে শিশুর সঙ্গে প্রবেশন কর্মকর্তা যুক্ত হবেন, তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিশুর মাতা-পিতার সন্ধান করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পুলিশকে সহায়তা করতে হবে। শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে শিশুর জামিনের সম্ভাব্যতা যাচাই ও তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন করে বিকল্পপন্থা গ্রহণ করতে পারে।

শিশু-আদালতের কার্যক্রমের গোপনীয়তা প্রসঙ্গে বলা আছে,শিশু-আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় জড়িত বা সাক্ষ্য প্রদানকারী কোনও শিশুর ছবি বা এমন কোনও বর্ণনা,সংবাদ বা রিপোর্ট প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম অথবা ইন্টারনেটে প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না যা সংশ্লিষ্ট শিশুকে শনাক্তকরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। এমনকি শিশুর ছবি, বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রকাশ করা শিশুর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে না মর্মে শিশু-আদালতের নিকট প্রতীয়মান হলে কেবল উক্ত আদালত সংশ্লিষ্ট শিশুর ছবি, বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রকাশের অনুমতি প্রদান করতে পারবে। কিন্তু শিশু কিশোরদের প্রায়শই আটক করে সংশোধনাগারে পাঠানোর সময় গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা হয়।

অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া শিশুর আটক করার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে তদন্ত এবং পরবর্তীতে বিচার পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি সতর্কতা ও ভিন্ন নিয়ম তৈরি করে দেওয়া আছে। এর বাইরে গিয়ে মোবাইল কোর্ট দণ্ড দিতে পারে কিনা প্রশ্নে সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লা আল মামুন বলেন, আইন ২০১৩ অনুসারে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো এই শিশু-কিশোরদের শিশু আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের যে অধিকার ছিল, তা কতটুকু মানা হয়েছে তা নিশ্চিত হতে হবে। এই ঘটনায় গণমাধ্যমে এই শিশুদের ছবি প্রকাশ, বিচার চলাকালীন কোনও সংস্থার ইউনিফর্ম পরে অংশগ্রহণ করা ইত্যাদি শিশু আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে। আমরা আশা করছি, এই কিশোরদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত ও মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে শিশু আইনের যথাযথ প্রয়োগ শিশু অধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। আর তাতেই সংরক্ষিত হবে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ।

কিশোর আদালতের বাইরে তাদের বিচার করা যায় কিনা প্রশ্নে ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর সওকত আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পরিচালনা করেছেন তিনি আদালত ভাল জানেন নিশ্চয়। শিশু কিশোরদের মামলা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় মানার কথা বলা আছে। তার সেই সুরক্ষাটুকু দেওয়া আমাদের সকলের কর্তব্য।

পরিচালনাকারী র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা ছবি তোলা ও প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক থাকি। আমি নিজে ছবি সরবরাহ করি না কোথাও। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে সবার হাতে স্মার্ট ফোন অভিযানের সময়েই অনেকে ছবি তুলে থাকে। মোবাইল কোর্ট শিশু কিশোরদের বিচার করতে পারে কিনা প্রশ্নে তিনি বলতে পারেন। আটককৃতদের একজনের বয়স ১৮ এর বেশি হওয়ায় তাকে কারাগারে ও বাকিদের সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

আমেরিকার সামরিক কৌশল প্রতিহত করতে সক্ষম ইরান' -সাক্ষাৎকারে কমরেড খালেকুজ্জামান

ইরান ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা টানটান অবস্থায়। আমেরিকা নতুন করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এদিকে ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের দায়ে আমেরিকার শক্তিশালী ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। সেই টানটান উত্তেজনা প্রসঙ্গে আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামানের সাথে।
রেডিও তেহরানকে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের ওপর আমেরিকার গোপন কৌশল ব্যর্থ করে দিয়েছে তেহরান।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ
  • ইরানের আকাশসীমায় আমেরিকার ড্রোন পাঠানোর সমর কৌশল ব্যর্থ করে দিয়েছে ইরান।
  • আমেরিকা নানা খোঁড়া অজুহাতে ইরানের ওপর হামলার পাঁয়তারা করছে।
  • আমেরিকার অর্থনৈতিক সংকট কাটানো ও অস্ত্র ব্যবসার সম্প্রসারণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করছে।
  • আমেরিকার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ দখল করা।
  • ইরানের ওপর একদিকে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে আমেরিকা অন্যদিকে আলোচনার প্রস্তাবও দিচ্ছে। তাদের এই দ্বিচারিতার কারণে গোটা বিশ্বে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে আমেরিকা।
রেডিও তেহরান: জনাব কমরেড খালেকুজ্জামান, সম্প্রতি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করে আসছিলেন, এ ড্রোন কেউ শণাক্ত ও ভূপাতিত করতে পারবে না। কিন্তু ইরান সে বক্তব্য ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। ঘটনাটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, এটা আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের একটি উসকানিমূলক কাজ। তাছাড়া এসব কাজের মাধ্যমে তারা বুঝতে চায়  যাকে তারা এই মুহূর্তে আঘাত করতে চায় তারা কতখানি সক্ষমতা অর্জন করেছে।  আর আমেরিকার সেই পরীক্ষায় তেহরান একদিকে মার্কিনিদের নতুন সমর কৌশল চিহ্নিত করতে পেরেছে বা সে ব্যাপারে সচেতন হওয়ার ক্ষমতা ইরানের আছে। এ বিষয়টি ইরান প্রমাণ করেছে।
আমেরিকা নতুনভাবে তাদের আধিপত্য বিস্তার করা এবং ইসরাইলকে কেন্দ্র করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনিদের পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে ফলে তারা নতুন করে কৌশল অবলম্বন করার চেষ্টা করছে। তারা আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে এসব করে তাদের জনসমর্থন হারিয়েছে। এসব দেশে তাদের আগের মতো সেই অবস্থাটা আর নেই। আমেরিকা তাদের সেই অবস্থানকে পুনরুদ্ধার করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের এখন প্রধান শক্তি ইরানকে কাবু করতে চায়। তারই অংশ হিসেবে তারা ইরানের সীমায় ড্রোন পাঠিয়েছে।
তবে এ ঘটনায় ইরান তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনার মধ্য দিয়ে। আমেরিকার সামরিক কৌশলকে ধরার ক্ষেত্রে ইরান দেখিয়েছে তারা কতটা সক্ষম। আর পৃথিবীর সামনে ইরান এ বিষয়টি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে যে আমেরিকা ইরানের ওপর তাদের সামরিক কৌশল নতুনভাবে প্রয়োগ করতে চাচ্ছে এবং ইরান তা প্রতিহত করতেও সক্ষম।
দুনিয়ার মানুষ এটি দেখছে যে, একদিকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার সরকারকে উৎখাত করার জন্য মার্কিনিরা উসকানি দিচ্ছে এবং সামরিক অভিযানের কথা বলছে। আবার জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থাপন করার বিষয়টি দিয়ে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। এরমধ্য দিয়ে নতুনভাবে একটা অভিযান চালানোর চেষ্টা করছে। আর সবশেষ ইরানের ওপর হামলা বা আক্রমণ করার একটা পাঁয়তারা করছে। বলা চলে হামলা করার একটা ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
এ প্রসঙ্গে আমি বলব, আমেরিকা নতুনভাবে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। অস্ত্র ব্যবসা হচ্ছে আমেরিকার প্রধান ব্যবসা। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে বিশ্বের বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানী ক্ষেত্র দখল করা। আর অস্ত্র ব্যবসার জন্য যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করা এবং যুদ্ধ করা ছাড়া তো অন্য কোনো উপায় নেই। আবার মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতকে দখল করতে গিয়ে এ অঞ্চলের জনরোষ ও আর্থিক সংকটে পড়েছে সেখান থেকে তারা উত্তরণ ঘটাতে চায়। কিন্তু এটি তাদের আরও বড় সংকটের দিকে নিয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। 
রেডিও তেহরান: জ্বি কমরেড খালেকুজ্জামান আপনি আমেরিকার উসকানির বিষয়টি তুলে আনলেন। তো  ইরানি আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানোর ঘটনাকে অনেকেও কিন্তু উসকানিমূলক বলে আখ্যা দিয়েছেন, যেকথাটি আপনিও বললেন। তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার মাধ্যমে আমেরিকা ইরানকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে চাই। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
কমরেড খালেকুজ্জামান:  আসলে ইরানের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানোর বিষয়টি শুধু উসকানিমূলক নয় একইসাথে পরীক্ষামূলক। ইরান এটাকে কিভাবে অ্যাড্রেস করবে এবং কিভাবে মোকাবেল করবে বা মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে কি না? এর প্রতিক্রিয়া কিরকম হবে। ভবিষ্যতে যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে যায় তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি কিরকম হবে, রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য বড় শক্তিগুলোর অবস্থান কি হবে এসব নিয়ে তারা পরীক্ষা নিরিক্ষা চালাচ্ছে। সুতরাং ইরানের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানোর ক্ষেত্রে আমেরিকার যে গোপন উদ্দেশ্য ছিল সেটিকে ইরান ব্যর্থ করে দিয়েছে। 
রেডিও তেহরান:  ইরান-আমেরিকা সংকট ও উত্তেজনায় অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন- ইরান কী আমেরিকার মোকাবেলায় টিকতে পারবে? এ প্রশ্নের জবাবে আপনি কী বলবেন?
কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ভালে একটি প্রশ্ন করেছেন। তবে শুধুমাত্র শক্তি কত বড় আর কত কম এটা দিয়ে পারিমাপ করা যায় না। যদি এভাবে পরিমাপ করা যেত তাহলে ভিয়েতনামের পরিস্থিতি ভিন্ন হতো, কিউবার পরিস্থিতিও ভিন্ন হতো।
দেখুন, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি, আমেরিকার আভ্যন্তরীণ অবস্থা, তাদের অর্থনৈতিক সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছু মিলে বিবেচনা করতে হবে। শুধুমাত্র আমেরিকার যে সামরিক শক্তি আছে সেই শক্তির বিবেচনায় তারা যেকোনো সময় ইরানের মোকাবেল করতে পারে। তবে সামরিক শক্তি দিয়েই সব প্রশ্নের সমাধান করা যায় না। এমনকি সামরিক সাফল্যও নিশ্চিত করা যায় না। ফলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে শুধুমাত্র আমেরিকার শক্তি ও ইরানের শক্তি- এই সমীকরণ দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা যাবে না।
রেডিও তেহরান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন আর অন্যদিকে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছেন। মার্কিন এই পলিসিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
কমরেড খালেকুজ্জামান: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পলিসি একদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে অন্যদিকে সারাবিশ্বে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি সাধারণ মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। তাছাড়া বিশ্বে তিনি একটি হাস্যকর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। আমেরিকা বাস্তবে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাধ্যমে বিশ্ববাসী বুঝতে পারছে। এখন নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বা তার অভ্যন্তরীণ শক্তির ভিত্তিতে দেশটির সংকট মোকাবেলার কোনো উপায় যেহেতু তাদের নেই সেজন্য সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে কথিত ইসলামি ওয়ার্ল্ডকে বিভক্ত করা, অস্ত্র বিক্রির বাজার সম্প্রসারিত  করা, যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি করা এবং এসবের মাধ্যমে তাদের সংকট উত্তরণের একটা রাস্তা তৈরি করার উদ্দেশ্য তাদের রয়েছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একদিকে আপোশের  কথাও বলে আবার নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেও আমরা দেখলাম একদিকে সামরিক ভীতি  ও চাপ প্রদর্শন করা অন্যদিকে আপোশ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। আবার তাদের হিসাব নিকাষে দেখছে আগের মতো কোনো দেশে একটি সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের সংকটের উত্তরণ ঘটাতে পারবে সেই পরিস্থিতি বর্তমান বিশ্বে নেই। এটি আমেরিকার অভ্যন্তরেও নেই বিশ্বেও নেই।
রেডিও তেহরান:  ইরান ইস্যুতে আঞ্চলিক দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরবের অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কমরেড খালেকুজ্জামান: দেখুন, সৌদি আরব অবস্থান সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমে যে বিষয়টি বলব সেটি হচ্ছে-দেশটি জটিলতর আভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে। সৌদি আরব তার রাজতন্ত্রকে ধরে রাখতে এবং আভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংশা করতে গিয়ে আমেরিকার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর আমেরিকা সেই সুযোগটি গ্রহণ করেছে। এছাড়া সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের জায়গায় থাকতে চায়। আর তাদের এ কাজে আমেরিকা মদদ জোগাবে এ ধরনের একটা ধারনা দিয়ে বিভক্ত করতে চায়। তাছাড়া কাতারের সঙ্গেও একটা বিরোধ তৈরি হয়েছে। 
এসবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতিটা এমন- মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে পরস্পরকে বিভক্ত করো এবং একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দাওয়ার কাজটি আমেরিকা করছে। সৌদি আরব তার নিজের স্বার্থে আমেরিকার ওপর নির্ভর করছে। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি কোনো এক সময় কোনো একটি রাষ্ট্রকে আক্রমণ করার প্রয়োজন হয় সেটিও তারা করতে পারবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে আমেরিকার আভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে। এটি রয়েছে সৌদি আরবের মধ্যেও। এসব সংকট মেটাতে দুটি দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যে ধরনের আত্মসচেতনা তৈরি হচ্ছে সে বিষয়টি আমেরিকা ও সৌদি আরব উপলব্ধি করতে পারছে। সেটি তাদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমেরিকা এবং সৌদি আরবের কারণে তাদের মদদে মধ্যপ্রাচ্যে বিভক্তি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। আর সেই আতঙ্কের মধ্যে ইসরাইলের আধিপত্য আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য তাদের রয়েছে। আর আমেরিকার এই পরিকল্পনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এবং আমেরিকার নিজের ভেতরেও তাদের জনসমর্থন কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমেরিকার আভ্যন্তরীণ বিষয়েও এটি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আর সৌদি আরবকে নিয়ে মুসলিম বিশ্বে নতুনভাবে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মার্কিন ড্রোন গ্লোবাল হক


চীনকে চিন্তায় ফেলতে চায় জাপান

জাপানের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আসছে
‘এক দশক ধরে জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তিনটি গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। প্রথমত চীন, দ্বিতীয়ত চীন, আর তৃতীয়ত চীন।’
কথাগুলো বলছিলেন জাপানের এক কূটনীতিক। চীনকে নিয়ে জাপানের মধ্যে থাকা উদ্বেগ ঘিরে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে টোকিও। দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাপান তাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ‘দ্য ইজুমো’ উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নেয়। বিষয়টি দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি আমেরিকা থেকে ১৪৭টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার আদেশ দিয়েছে জাপান। এই যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে অন্তত এক ডজন ‘দ্য ইজুমো’ ও তার সহযোগী কাগা যুদ্ধজাহাজে স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে জাপান।
জাপানের প্রতিরক্ষানীতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ‘দ্য ইজুমো’ যুদ্ধজাহাজ সংস্কারের উদ্যোগে। পরিবর্তনটি হয়তো ছোট, কিন্তু তা গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ ও সামরিকায়নের ক্ষেত্রে জাপানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। এই বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও ‘সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস’ (এসডিএফ) নামে জাপানের সামরিক বাহিনী রয়েছে। সুদক্ষ এই বাহিনী মূলত দেশের প্রতিরক্ষার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেয়। আর এই কাজে নিয়ম মেনে তারা মার্কিন সেনাদের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ধীরে ধীরে জাপানের কৌশল বদলে যাচ্ছে।
বিশেষ করে ২০১২ সালে সিনজো আবে দ্বিতীয় দফায় জাপানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি এসডিএফকে একটা সাদামাটা সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেশি কিছু বানাতে উদ্যোগী হন। বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার অংশ হিসেবে জাপানের ‘সামরিক ভূমিকা’ বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনি আইন পাস করেন।
২০১৩ সালে আবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) গঠন করেন। এই পরিষদ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তানীতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সমন্বয় করে। পাঁচ বছর পরপর নির্দেশনা (গাইডলাইন) দেয়। এনএসসি গত ডিসেম্বরে সবশেষ নির্দেশনা জারি করে। এই নির্দেশনাকে সত্যিকার অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন একজন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ।
জাপানের সামরিকনীতিতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের হুমকি মাথায় রেখে জাপান সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এনএসসির নতুন গাইডলাইনে মহাকাশ, সাইবার স্পেস ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম যুদ্ধের বিষয়টি প্রথমবারের মতো স্থান পেয়েছে। আর এসব যুদ্ধের ব্যাপারে জাপানের প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার কথা আছে এনএসসির গাইডলাইনে। এসব ব্যাপারে জাপান এর মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে।
চীন ও উত্তর কোরিয়া আগ্রাসীভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলছে। এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকাকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য ভাবতে পারছে না জাপান। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে জাপান তাদের সামরিকনীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে বলে দেশটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য।
চীন কিছু করতে গেলে দ্বিতীয়বার যাতে ভাবে, এমনটাই লক্ষ্য জাপানের। কিন্তু জাপানের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য ব্যাপারটা এত সহজ নয়। কারণ, দেশটির অধিকাংশ জনগণই সংবিধান সংশোধন, তথা সামরিক শক্তি জোরদার করার পক্ষে।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের হিসেব রাখতে চায়, সাহায্য করতে চায় না by আজিম ইব্রাহিম

শরণার্থীদের জন্য কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সীমানা পেরুতে সাহায্য করে, নিজ দেশে ফিরতে পারবেন কি না, সেটা নিশ্চিত করে, এবং এই কাগজগুলোর ভিত্তিতে নিখোঁজ ও নিহতদের হিসাব ঠিক করা হয়।

কিন্তু দলিলপত্র আসলে দুধারী তলোয়ার। রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার যে দীর্ঘ গণহত্যার চেষ্টা চালিয়ে আসছে, সেই প্রচেষ্টার একটা অংশ হলো এই কাগজপত্র, যেখানে জন্মের রেকর্ড থাকে, সত্যায়নের তথ্য থাকে, এবং আবাসস্থলের ঠিকানা থাকে। মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর থেকে বহু বছর ধরে পুরো সামরিক আমলটাতে রোহিঙ্গাদের কাগজপত্রের বিষয়টি জোর করে নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে তাদের আবাসস্থলের হদিস রয়েছে, কিন্তু কখনও তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি। এই কাগজগুলোকে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদেরকে তাদের জন্মভূমিতে অধিকার থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করা হয়েছে। কুখ্যাত এই হোয়াইট কার্ডের মাধ্যমেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা সম্পর্কে হিসেব রেখেছে এবং সে অনুযায়ী গণহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

এটা নতুন কিছু নয়। ইউরোপে হলোকাস্টের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় ব্যক্তির জন্য কাগজপত্র জরুরি হতে পারে। একদিকে এই কাগজের ভিত্তিতে ভুক্তভোগি নিজের অধিকার দাবি করতে পারে। অন্যদিকে, এগুলিকে ব্যবহার করে একটা সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠির বিরুদ্ধে বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাতে পারে রাষ্ট্র। কোন এলাকায় কতজন মানুষ বাস করছে, সেটা জানা গেলে তাদের জন্য হিসেব করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায়, আবার তাদের হত্যা করার জন্য একত্র করাও সহজ হয়।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জন্য যে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশান কার্ডের প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা সম্প্রতি মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিযুক্ত বিশেষ দূত ক্রিস্টিন বার্গেনারের মনোযোগ কেড়েছে। রাখাইন রাজ্যের মন্ত্রীর এই ধরনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে তিনি বলেছেন যে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার পথে এটা প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। বার্গেনার হিসেবে একটা ভুল করছেন, যেটার সম্ভাব্য পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

মিয়ানমারের দিক থেকে রোহিঙ্গারা যেটা চায়, সেটা খুব সাদাসিধে: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের যে অধিকার প্রাপ্য এবং যে অধিকার থেকে তাদের এতদিন বঞ্চিত করা হয়েছে, সেই অধিকার চায় তারা। এবং সেই সাথে যেখানে তারা ও তাদের পূর্বপুরুষরা জন্মগ্রহণ করেছে, সেখান আর সবার মতো সমান অধিকার এবং রাজনৈতিক সুবিধা চায় তারা।

রোহিঙ্গাদের একমাত্র দাবি হলো মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের অধিকার পূরণ করবে এবং তাদেরকে মিয়ানমারের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। ওই দেশে জন্মগ্রহণকারী অন্যান্য নাগরিকের মতো একই মর্যাদা দেবে তারা।

জাতিসংঘ এই দাবিকে সমর্থন করে। কিন্তু এই কার্ডকে হয়তো এক ধাপ অগ্রগতি মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়।

বার্গেনার হয়তো মনে করেছেন তিনি বাস্তবসম্মত কাজ করছেন এবং রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত করে কিছুটা পেপারওয়ার্ক করা গেলে সেটা মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থী হিসেবে তাদের স্ট্যাটাসকে মজবুত করবে এবং এটা একেবারে কোন কাগজপত্র না থাকার চেয়ে ভালো, তাই কি?

যে কোন চিন্তাশীল পর্যবেক্ষক বুঝতে পারবেন যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশান কার্ডের মাধ্যমে যে অন্তর্বর্তীকালীন স্ট্যাটাস দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে, এটা বিগত সামরিক জান্তা সরকারগুলোর দেয়া হোয়াইট কার্ডের মতো হুবহু একই জিনিস। কোন অন্তর্বর্তীকালীন স্ট্যাটাস তাদেরকে দেয়া হবে না, এবং কোন ধরনের নাগরিকত্বের প্রক্রিয়ার কাছাকাছিও তারা যাবে না। বরং এটা হলো জনসংখ্যার হিসেব রাখার একটা জরুরি সিস্টেম, যেটা ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেয়া আরও সহজ হবে।

মেগা প্রকল্প কি ঢাকার সড়কে বিড়ম্বনার অন্যতম কারণ? by শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একসঙ্গে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। শহরের বিশাল অংশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তাঘাট খুঁড়ে ফেলা হয়েছে।
সরু হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়ক। কোন ধরনের আগাম বার্তা অথবা বিকল্প পথ সম্পর্কে পরামর্শ না দিয়েই বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
যার জন্য ভুগতে হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের।
ঢাকার বনানী এলাকায় একটি বিপনিবিতানে কাজ করেন মিরপুরের বাসিন্দা সিনথিয়া খান।
যানজটের কারণে দিনের একটা বড় অংশ তার বাসে বসেই কেটে যায় বলে বলছিলেন।
তিনি বলছেন, "রাস্তা ব্লক থাকে। সড়কের যায়গা কমে গেছে। গাড়িগুলো ঠিকমতো যেতে পারে না। যার কারণে যানজট লেগেই থাকে। যেমন অফিসে আসতে আমার সময় লাগার কথা বড়জোর আধাঘণ্টা। কিন্তু আমাকে অন্তত বাড়তি আরও দেড় ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। এমনও সময় আছে, বাসেই দুই ঘণ্টা হয়ে যায়।"
এরকম ট্রাফিক জ্যাম ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের নিত্য দিনের সঙ্গী।
তবে ইদানিং ঢাকার চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে অনেক এলাকায় প্রায়শই হাঁটার গতি আর গাড়ির গতি এক হয়ে যায়।
চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচাইতে বেশি চোখে পড়ছে বিমানবন্দর থেকে আগারগাঁও, ফার্মগেট, শাহবাগ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার লম্বা মেট্রোরেল।
সরকার বলছে, মেট্রোরেল চালু হলে ঢাকার উত্তরা থেকে ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল পর্যন্ত পৌছাতে নাকি ৩৮ মিনিটের মতো লাগবে।
এই প্রকল্প নির্মাণে পুরো ঢাকা শহরে চলছে খোঁড়াখুঁড়ির মহাযজ্ঞ।
দূরপাল্লার গাড়িগুলোকে যাতে ঢাকা শহরে ঢুকতে না হয়, সেজন্যে তৈরি হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়াল সড়ক। তৈরি হচ্ছে নতুন ফ্লাইওভার।
যানবাহন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এস এম সালেহউদ্দিন বলছেন ঢাকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর কাজ প্রায় একই সাথে চলমান, যা এখন সড়কে বিড়ম্বনার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করছেন মি. সালেহউদ্দিন।
তিনি বলছেন, "এই কাজগুলোতে রয়েছে সমন্বয়হীনতা আর বিলম্বে শুরু করা। অন্যদিকে আবার মানুষের চলাচলের ডিমান্ড বেড়ে গেছে। সেই পরিমাণ জায়গা শহরে নেই। যখন সরকার দেখল যে আর উপায় নাই তখন যেটা করলো সরকার বড় মেগা স্ট্রাকচারগুলোতে হাত দিলো। যদি সময়মত এগুলোকে পর্যায়ক্রমে করা হতো, সেটা করা হয়নি বিধায় আজ আমাদের এই দুরবস্থা।"
মি. সালেহউদ্দিন আরও বলছেন, এতগুলো প্রকল্প একসাথে শুরু করার কারণে একসঙ্গে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সরু হয়ে গেছে।
কিন্তু উল্টো গাড়ির সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিদিন। তিনি বলছেন, ঢাকা শহরে আর কোন জায়গা অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু একই সাথে বিকল্প পথ সম্পর্কে পরামর্শ অথবা কোন ধরনের আগাম সতর্কবার্তা না দিয়ে রাস্তাঘাট-অলিগলি বন্ধ করে দেয়ার ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে ঢাকা শহরের বহু বাসিন্দাকে।
এরকম ট্রাফিক জ্যাম ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের নিত্য দিনের
যেমনটা বলছেন ঢাকার বেসরকারি একটি ক্লিনিকের নার্স রেবেকা রায়।
তিনি নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন, "যেমন ধরুন আমাদের অফিসের গাড়িটা হয়ত এক রাস্তায় ঢুকল তারপর দেখা গেলো রাস্তা কাটা। তখন অন্য অলি গলি ঘুরে তারপর হয়ত মেইন রোডে আসতে হয়। রাস্তায় নেমে আমাদের প্রায়ই এরকম বোকা হতে হয়।"
ঢাকা শহরকে যানজট মুক্ত রাখার পরিকল্পনা নিয়েই এসব প্রকল্পের শুরু। এর প্রতিটিই কারিগরি দিক থেকে খুবই জটিল।
যা তাড়াহুড়ো করে শেষ করা খু্ব বিপজ্জনক। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ চলাকালীন একই সঙ্গে নগরবাসীর দুর্ভোগ কি কিছুটা কমানো সম্ভব?
এ প্রসঙ্গে বুয়েটের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসানা হক পশ্চিমা বিশ্বে মেট্রো রেলের সংস্কার কাজের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন।
"যেমন আমি ইউকে'র কথা জানি। (মেট্রো রেলে) কোন কনস্ট্রাকশনের বা সংস্কারের কারণে কাজ করতে হবে। তখন দেখা যায় যারা এই বাহনের ব্যবহারকারী তাদেরকে আগে থেকে নোটিফিকেশন পাঠায়। কাজ শুরুর সাত দিন বা দশ দিন আগে যে স্টেশনগুলো আছে সেখানে বড় বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে জানাতে চেষ্টা করে যে এখানে সার্ভিসটা কখন বন্ধ থাকবে এবং এই সময়টাতে বিকল্প ব্যবস্থা কী আছে সেটিও তারা বলে দিতে থাকেন।"
ড. আফসানা বলছেন, মোবাইল ফোনে মেসেজ বা অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য দেয়া যেতে পারে।
অধ্যাপক আফসানা হক বলছেন, মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়ে সরকারিভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিকদের ইতিমধ্যেই জানানো হয়। সেই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। কোন অ্যাপের মাধ্যমেও সেটি করা যেতে পারে।
সরকারি মালিকানাধীন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক বলছেন, একবার শহর পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর এমন নির্মাণ কাজ খুব চ্যালেঞ্জিং।
"হুট করে কোন মেগা প্রজেক্টের কাজ করা হয় না। আমরা প্রধান সার্ভে করেছি ২০টা। তার একটা হল ট্রাফিক সার্ভে। তার ভিত্তিতে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট আমরা তৈরি করেছি। এবং কখন কি কাজ হবে সেটা আমরা স্টেক হোল্ডারদের, অর্থাৎ যারা এই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে, এই রাস্তার পাশে যাদের অফিস আছে, দোকানপাট করে যারা ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের যথেষ্ট আগেই জানিয়ে দেয়া হয়। আমরা কোন রাস্তা হুট করে বন্ধ করি না," তিনি বলছেন।
বর্তমান সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো শেষ করতে চায় অথবা এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
উন্নয়নের জন্য কিছুটা ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে ঢাকার বাসিন্দাদের।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা

নতুনভাবে কাজী নওশাবা

দুই পর্দার অভিনেত্রী কাজী নওশাবা। অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পিছনেও কাজ করতে চান বলে জানান তিনি। এরইমধ্যে ‘আলোর খোঁজে’- শিরোনামের একটি শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছেন। নওশাবার ভাষ্য, মাঝে আমার কিছুটা সময় অনেক খারাপ ছিল। এই সময়ে আমি কি করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সেই সময়ে আমার বন্ধুদের নিয়ে এই শর্টফিল্মটি নির্মাণ করেছি। ক্যামেরার পিছনে আমার কাজ করার আগ্রহ আছে। আমার পড়াশোনা চারুকলার।
ফ্রেম আমার খুব ভালো লাগে। যখন সিনেমার শুটিং করি, তখন নিজেকে একটা ফ্রেমে দেখতে ভালো লাগে। সামনে আরো কিছু কাজ হাতে আছে। আশা করি, পরিচালনার মধ্য দিয়ে নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পাবো। এজন্য নিজেকে শিল্পের কাছে সমর্পণ করছি। এই অভিনেত্রী অভিনয়েও ফিরেছেন। আগস্ট এর প্রথম দিকে ‘স্মারক’ শিরোনামের একটি নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া তার হাতে ‘সোনালি দিন’ ও ‘টক্কর’ শিরোনামের দু’টি ধারাবাহিক আছে বলেও জানান। এদিকে মুক্তির অপেক্ষায় আছে তার অভিনীত তিনটি চলচ্চিত্র। ছবিগুলো হলো- এন রাশেদ চৌধুরীর ‘চন্দ্রাবতী’, মিজানুর রহমান লাবুর ‘৯৯ ম্যানশন’ ও  ওয়াহিদ তারেকের ‘আলগা নোঙর’। অভিনয়ের বাইরে এই গ্ল্যামারকন্যা মঞ্চে পাপেট শো নিয়েও কাজ করছেন।

দুদক হটলাইনে ২ বছরে অভিযোগ ৩১,০০০০০ by মারুফ কিবরিয়া

দেশের সর্বস্তরে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে জানাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে অবহিত করতে দুই বছর আগে হটলাইন (১০৬) সার্ভিস চালু করে সংস্থাটি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত দুই বছরে দুদকের হটলাইন নম্বরে ৩১ লাখ ফোনকল এসেছে। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৫শ’টি ফোন আসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারি বেসরকারি সব দপ্তরের দুর্নীতির তথ্য এই ফোনকলে দুদককে অবহিত করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফোন কলে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাইবাছাই করে দুই বছরে বেশকিছু অভিযানও পরিচালনা করেছে সংস্থাটি। দুদক জানায়, এনফোর্সমেন্ট টিম ২০১৭ সালের ৩০শে জুলাই থেকে ফোনকলে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে ৬২৬টি অভিযান পরিচালনা করে। গত সাত মাসে এ অভিযানের সংখ্যা ছিল ৪৭০টি।
দুদক সূত্র আরো জানায়, বেশিরভাগ অভিযোগই সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে। দুই বছরে ৩১ লাখ অভিযোগের মধ্যে ৬২৬টি অভিযান পরিচালনার বিষয়ে সংস্থাটির উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য মানবজমিনকে বলেন, দুদক সব অভিযোগই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। ফোন কলে আসা অভিযোগগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর স্ব স্ব স্থানে যাচাই বাছাই চলে। তারপর সেগুলো আমলে নিয়ে দুদক অভিযানে যায়। অভিযানের সংখ্যা কম ঠিক। তবে এরমধ্যে অনেক অভিযোগের ভিত্তিতে স্ব স্ব দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয় কমিশন থেকে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে কিনা তাও মনিটরিংয়ে রাখে দুদক। দুদক জানায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন এখন পর্যন্ত ৪৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করেছে।

এনফোর্সমেন্ট টিমের সুপারিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বেশকিছু  কর্মকতা-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে, ২২ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে। অভিযান চলাকালে স্থানীয় প্রশাসন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১৯ জনকে বিভিন্নভাবে দণ্ড দিয়েছে। আবার অনেককে জরিমানাও করেছে। নিম্নমাণের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এমন প্রায় ২৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ বন্ধ করেছে এনফোর্সমেন্ট ইউনিট। একই সময়ে ২১৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২৬টি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। দুদক জানায়, এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানে ৫০টিরও বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ৭৩ শতাংশ খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে। এমনকি অভিযোগকেন্দ্রের হটলাইনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বেশকিছু ফাঁদ মামলা পরিচালনা  করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন ঘুষগ্রহণকারীকে ঘুষের টাকাসহ হাতে-নাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত যেসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে তার বেশিরভাগই সরকারি দপ্তরে। এর মধ্যে রয়েছে. ডিসি অফিসের এল,এ শাখা, ডিসি অফিসের রেকর্ড রুম, এসি (ল্যান্ড) অফিস, সাব রেজিস্ট্রারের কার্যালয়, ইউনিয়ন ভূমি/তহসিল অফিস, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, রাজউক, খাস জমি উদ্ধার,  জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, সিভিল সার্জন অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি), প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিটিসিএল,  প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ওয়াসা (ঢাকা, চট্টগ্রাম), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ঢাকা পাওয়ার সাপ্লাই এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিঃ (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিঃ (ডেসকো),  বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড,  প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহ, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো  (ব্যানবেইস), বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও সনদ কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ), বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই), উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, এল.এস.ডি খাদ্য গুদাম, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন(বিআরটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি),বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাসপোর্ট অধিদপ্তর/ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস,মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর/জেলা কারাগার, সিটি কর্পোরেশন,  পৌরসভা, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো, উপজেলা সমাজসেবা, ত্রাণ ও  উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়,পরিবার পরিকল্পনা অফিস, ডাক বিভাগ, জেলা/ উপজেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়, আঞ্চলিক আয়কর অফিস, অডিট অফিস,  কাস্টমস অফিস, বন অধিদপ্তর/জেলা কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর যার মধ্যে রয়েছে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ/বন্ধ, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ,  বৃক্ষ সমপদ রক্ষা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ,  নদী দখল প্রতিরোধ, নদী দূষণ প্রতিরোধ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ইত্যাদি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানীজ (আরজেএসসি), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, বাংলাদেশ এ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি), প্যাটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি), সরকারি আবাসন পরিদপ্তর,একটি বাড়ী একটি খামার, পর্যটন কর্পোরেশন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বেতার, জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি), স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ,অবৈধ টোল আদায় বন্ধ, সরকারি বাসায়অবৈধভাবে বসবাসকৃতদের উচ্ছেদ, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, (টিসিবি)আশ্রয়ণ প্রকল্প, পেট্রোবাংলা, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি, চিড়িয়াখানা, যমুনা ওয়েল, বিসিক  সমবায় অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ওয়াকফ্‌ প্রশাসকসহ প্রায় শতাধিক দপ্তর।

হটলাইনের অভিযোগ, অভিযান  এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ প্রসঙ্গে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনের অভিযোগে কেন্দ্রের হটলাইন ১০৬ চালু করা হয়। জনগণ যেভাবে অভিযোগ জানাচ্ছে তাতে কমিশনের দায়িত্ববোধ আরও বেড়ে যাচ্ছে। সব অভিযোগের ব্যাপারে হয়তো কমিশনের পক্ষে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কমিশন আইনের তফসিল বহির্ভূত অভিযোগের ব্যাপারে কমিশনের পক্ষে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ নেই। তবে ১০৬ মানুষের অভিযোগ জানানোর প্লাটফরম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এছাড়া তিনি দুদক আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধের বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা। হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই অভিযান অব্যাহ রাখা হচ্ছে। সেবাপ্রত্যাশী নাগরিক হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হয়ে কমিশনের হটলাইন ১০৬ এ অভিযোগ জানালেই এসকল দপ্তরে অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অনেক সেবাপ্রত্যাশীকে দুদকের হস্তক্ষেপে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধনও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত সেবাপ্রাপ্তি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। তাই দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্তভাবে সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করুন। জনগণ দুদক অভিযোগকেন্দ্রের হটলাইন ১০৬ এ যতক্ষণ অভিযোগ জানানো বন্ধ না করবেন ততক্ষণ এ অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।

পাকিস্তানকে বশ মানানোর বিজেপির অলীক কল্পনা ফুটে ওঠেছে ‘কাশ্মীরিস্তানে’ by অর্জুন আপ্পাদুরাই

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ ও জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা বাতিল করার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে বহুল আলোচিত ঘটনা। অনেক ভাষ্যকার এসব ভীতিকর ঘটনাকে ভারতের অন্যত্র ঘটতে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের মহড়া হিসেবে অভিহিত করছেন, আবার অনেকে মনে করছেন ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতাসীন দলগুলো কাশ্মীর ও অন্যান্য স্থানে যে দমননীতি পরিচালনা করে আসছেন, এটি তারই ধারাবাহিকতা। সাধারণ কাশ্মীরীদের ভাগ্য গুরুতর এবং গণতন্ত্রের ভারতের দাবিটি সবচেয়ে মারাত্মক পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

মোদি সরকার অতি সম্প্রতি কাশ্মীরে যা করেছে সেটাকে নিশ্চিতভাবেই বিদেশীভীতি, মুসলিমবিরোধী নীতি, রাজনৈতিক মঞ্চ ও হতাশাবাদী রাজনৈতিক পদক্ষেপের মিশ্রণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই সময় ও কেন এমন বিধ্বংসী উপায়ে কাশ্মীরের মর্যাদা বাতিল করা হলো তা নিয়ে দুটি মন্তব্য এখানে করা হচ্ছে।

প্রথমত, হিন্দু ডানপন্থীদের মতে, নিয়ন্ত্রণ রেখার উভয় পাড়ে পুরো কাশ্মীর পাকিস্তানের পক্ষে রয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘ সংগ্রামে এটি সাধারণভাবেই দেখা গেছে। আর ভারত প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে কাশ্মীরীদের সব অসন্তোষের মূলে রয়েছে পাকিস্তান।

কিন্তু তা সত্ত্বেও অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের সময়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ও ভারত পুরো মাত্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ফিরে এসেছিল। ভারতের জন্য এটি ছিল বিজেপির একটি লজ্জাজনক পরাজয়। তাদের সামরিক বাহিনী যে অযোগ্য, অদক্ষ তা প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছিল। পাকিস্তানকে পায়ের তলায় ফেলে দিতে তারা পারেনি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও মে মাসের নির্বাচনে মোদি দারুণ জয় পায়। সেটা হয় তার প্রবল প্রপাগান্ডা মেশিনের মাধ্যমে, হিন্দুত্ববাদী নির্বাচনী ঘাঁটি, পুঁজিবাদীদের সহায়তা। নির্বাচনের এই জয় তার ভোটারদের মধ্যে মুসলিমবিরোধী, পাকিস্তানবিরোধী প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়। এটা উচ্চ পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়নি।

সময়টার দিকে লক্ষ্য করা যেতে পারে: নভেম্বরে জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য বিধান সভা ভেঙে দিয়ে বিজেপি বিপুল বিজয় লাভ করে। এরপর লজ্জাজনক কূটনীতির রেশ ধরে মার্চ ও এপ্রিলে পাকিস্তানের সাথে শান্তি স্থাপন করে। তারপর আগস্টে সামরিকভাবে নিরাপদ করে কেন্দ্রীয় ভূখণ্ড হিসেবে কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল আসলে ছিল একটি আইনগত অভ্যুত্থান। গত ফেব্রুয়ারিতে বালাকোটে পরাজয়ের পর বড় কিছু করার প্রয়োজন ছিল বিজেপির। এ কারণেই এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছে তারা।

অর্থাৎ কাশ্মীর ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি প্রক্সি। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের জন্য কয়েক মাস, এমনকি হয়তো কয়েক বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিজেপি। ফলে এটি ঘটা ছিল অনিবার্য। কিন্তু যেভাবে তা করা হয়েছে, সেটিই সবাইকে আতঙ্কিত করছে।

কাশ্মীরে আরেক ধরনের দীর্ঘ মেয়াদি প্রক্সি চলছে। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেটা পরীক্ষা করা হয়েছিল। গোধরা ট্রেনে হামলার রেশ ধরে ওই সময়ের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মুসলিমদের টার্গেট করেন। তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গাবাজদের লেলিয়ে দেন। এরপর শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে গুজরাটে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে রাখা হয়।

গুজরাটে ওই সময় যেসব সহিংস পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে আমলাতন্ত্র ও সশস্ত্র বাহিনী সহায়তা করেছিল। কাশ্মীরে কাশ্মীরীদের সন্ত্রস্ত্র করার জন্য সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীর কোনো দাঙ্গাবাজের দরকার পড়েনি। তারা নিজেরাই ওই কাজটি করছে।

গুজরাট ছিল মোদির রাজনৈতিক গবেষণাগার। এখান থেকেই তিনি জাতীয় ক্ষমতায় ওঠেছিলেন। সেখানকার গবেষণাই কাশ্মীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এখন পাকিস্তানকে ধীরে ধীরে কাশ্মীরিস্তানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এটা এখন একদিকে অলীক কল্পনা, অন্যদিকে গবেষণাগার। অলীক কল্পনায় কাশ্মীর পরিণত হয়েছে বশ্যতা স্বীকার করা পাকিস্তান এবং ভারতবর্ষ ভাগ আংশিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। অধিকন্তু এই অলীক কল্পনায় কাশ্মীর হলো বলিউড সিনেমার ভালোবাসার জায়গা। এখানকার লেক আর পাহাড়গুলো হলো পাকিস্তানের নারীকৃত সংস্করণ, এখানকার সুন্দরী নারীরা লুফে নেয়ার জন্য তৈরি।

কাশ্মীরিস্তানে গবেষণা চালানো হবে ভারতের সংবিধানকে ধীরে ধীরে নির্বাহী শক্তি ও সামরিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে পরিণত করা।

এই পরীক্ষায় ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও অন্যান্য উদীয়মান স্বৈরতন্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতা করবে ভারত। এতে গণতান্ত্রিক আইনের স্থলাভিষিক্ত হবে বিদেশীভীতি। পেশীবহুল কেন্দ্র ও নারীতে পরিণত রাজ্যগুলোর যুগে স্বাগতম। কাশ্মীরিস্তান আমাদের। আমরা সবাই এখন বিজেপির ভারতের জন্য অপেক্ষা করছি।

>>>লেখক: শিক্ষক, নিউ ইয়র্ক ও বার্লিন, বিশ্বায়ন ও দক্ষিণ এশিয়ার ওপর নিয়মিত লেখালেখি করেন।

বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রাশিয়া-ভারত-চীন গ্রুপিং by প্রিচাপক তেকাসুক

জাপানের ওসাকায় জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা ছাড়াও আরেকটি নজরকাড়া ঘটনা ছিল। তা হলো উদীয়মান তিন প্রধান আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ে রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না গ্রুপিংয়ের (আরআইসি) আত্মপ্রকাশ।

ভারত ও চীনকে নিয়ে রাশিয়া নিজের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে এই অঞ্চলের নেতৃত্বে দিতে চাইছে, মার্কিন-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে আরো বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করার স্বপ্ন দেখছে।

বহুপক্ষীয়বাদ, অবাধ ও উন্মুক্ত বাজার ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে সরিয়ে বহু মেরুর এশিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আরআইসি আঞ্চলিক গ্রুপিংকে এগিয়ে নিতে চাইছে রাশিয়া ও ভারত উভয়েই।

চীন ও রাশিয়া বিশেষভাবে মনে করছে যে যুক্তরাষ্ট্র হলো আঞ্চলিক ও বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতি একটি হুমকি।

এক মাসের মধ্যে এটি হলো দ্বিতীয় আরআইসি সভা। প্রথমটি হয়েছিল কিরগিজিস্থানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের সময়।

গত দুটি শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দৃশ্যত আরআইসি উদ্যোগের প্রতি সমর্থনসূচক ছিলেন, তিনি পরবর্তী সভাকে স্বাগতও জানান।

শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে তার বক্তৃতা ছিল বেশ ইতিবাচক। তিনি ইঙ্গিত দেন যে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে আরআইসি হতে পারে উন্নয়ন, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চালক।

আরআইসিরি আত্মপ্রকাশ বিশ্ব রাজনীতির একটি মাইলফলক।

বিশ্ব ভূরাজনীতির দৃশ্যপটে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের লড়াই চালাচ্ছে। আর এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

এটা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে সব পক্ষ ভারতের সমর্থন কামনা করছে। কারণ দেশটির প্রভাব বিস্তারের এলাকা। অধিকন্তু উভয় শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের ভিশন এই প্রশ্ন তুলেছে ভারত কি আরো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে নাকি নিজেকে একমাত্র আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। ভারতের কৌশলগত পরিবর্তনের ব্যাপারে কিছু দেশের যে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন তা বোধগম্য।

ভবিষ্যতের সাথে তাল মিলিয়ে ভারতের কৌশলগত চিন্তাভাবনা ও পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন হচ্ছে।

মোদি কেবলমাত্র আরআইসি সভাতেই উপস্থিত ছিলেন না, তিনি আরেকটি তিন জাতি গ্রুপিংয়ের সাথেও তথা জেআইএ (জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-ইন্ডিয়া)-এর সাথেও ছিলেন। এটি হলো জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের ইন্দো-প্যাসিফিক আঞ্চলিক গ্রুপিংয়ের অংশবিশেষ।

ত্রিপক্ষীয় জোট জেএআই সৃষ্টি করা হয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও চীনের প্রভাব সংযত রাখার জন্য।

ফলে জেএআই মূলত নিরাপত্তা ও চীনকেন্দ্রিক গ্রুপিং। আবার এটি অস্ট্রেলিয়াসহ চার জাতির ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিওয়নের (এফওআআইপি) অংশবিশেষ।

জেএআই ও আরআইসি পরস্পর বিরোধী গ্রুপ। কিন্তু ভারত উভয়টিতেই আছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে ভারতীয় কৌশলগত চিন্তাভাবনায় দোটানা বিরাজ করছে, পাশ্চাত্য না স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি- কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছে না।

তবে আঞ্চলিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশকারী দেশগুলোর মধ্যে ভারতেরই বেশি দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে। আর এটাই বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে ভারতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। সবাই ভারতকে কাছে টানার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুই গ্রুপ যখন একে অপরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হবে, তখন ভারত কোন পক্ষে থাকবে। এতে ভারতের কৌশলগত ও পররাষ্ট্রনীতির ভাবনায় দুটি মানদণ্ড প্রকাশ করছে।

প্রথমত, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার, পাকিস্তান নীতি, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ঋণ ফাঁদ নীতি প্রয়োগ নিয়ে দিল্লি অস্বস্তিতে আছে।

চীনের এসব কার্যক্রম নিজের এলাকাতেই ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এ কারণেই সে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জেএআইয়ের দিকে ঝুঁকেছে।

অন্যদিকে শুল্ক যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও ইরানের সাথে ভারতের বাণিজ্য করার ওপর মার্কিন বিধিনিষেধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক স্থিতিশীল নয়।

ভারত তার নিজের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, এমন কৌশলগত ভারসাম্য খুঁজে পেতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আবার আরআইসি ভারতকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করায় এই ভূরাজনৈতিক সুবিধাটি ভারত কাজে লাগাতে পারে, একে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের সাথে দরকষাকষি করতে পারে।

আর একটি স্বাধীন ফ্যাক্টর ও ওয়াইল্ড কার্ড হিসেবে ভারত আরআইসিকে বিরূপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকতে পারে।

গণতান্ত্রিক ভারতের সিদ্ধান্ত হয়তো তার একনায়কতান্ত্রিক শক্তির প্রতি ঝুঁকে থাকার প্রমাণ নয়, তবে এতে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত তার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে চায়।

মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু এখনো ভরসা by প্রণব বল

কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট রেলসেতুটি নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয় ১৯১৪ সালে। সে সময় ব্রিটিশরা  বার্মায় সৈন্য আনা-নেওয়ার কাজে এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩০ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭১-এ সেতুটির উত্তর ও পশ্চিম পাশে ঘাঁটি করে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিবাহিনী। ৯০ বছর বয়সী মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটির এখন মরণদশা। তবু ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে দিনে প্রায় ১ লাখ লোক এই সেতু ব্যবহার করে যাচ্ছে।

একমুখী কালুরঘাট সেতুর স্থানে নতুন করে একটি দ্বিমুখী সড়ক ও রেলসেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা। সর্বশেষ গত মাসে অনশন করেন বোয়ালখালীর মুক্তিযোদ্ধারা। ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন সেতুর বিষয়ে সুরাহা না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন স্থানীয় সাংসদ মইন উদ্দীন খান বাদল। সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আবদুল মোমিন বলেন, ‘রেলসেতু হলে আমাদের কোনো লাভ হবে না।’

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পূর্ব পটিয়া, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, শহরের চান্দগাঁও ও মোহরা এলাকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। কালুরঘাট সেতুর পশ্চিম পাশ (শহর এলাকা) থেকে বোয়ালখালী সদর গোমদন্ডির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। কিন্তু ১০ মিনিটের এই পথ যেতে এখন সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। সেতুতে ওঠার জন্য সব সময় দুদিকে গাড়ির দীর্ঘ সারি থাকে।

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়ে সেতুটিকে ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল গবেষকও এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেয়। সেতুর পূর্বপাশে দুটি সাইনবোর্ড দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একটিতে লেখা ‘১০ টনের অধিক মালামাল পরিবহন নিষেধ।’ অপরটিতে লেখা, ‘এই সেতুর ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষেধ। আদেশ অমান্যকারীকে ফৌজদারিতে সোপর্দ করা হবে।’

এসব বিধিনিষেধ কিছুই মানা হচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন পারাপার করে তেমনি অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাকও চলছে। সেতুর মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়।

গত সোমবার দুপুর পৌনে ১২টার ঘটনা। পশ্চিম পাশ (শহরের দিক) থেকে গাড়ি সেতুতে উঠে গেছে। সেতুর মাঝামাঝি গিয়ে একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে। সেতুর ওপর বাস, ট্রাক, টেম্পো, অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ঠাঁইয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে দোহাজারীগামী ট্রেন এসে সেতুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

তীব্র গরমে অতিষ্ঠ যাত্রীদের কয়েকজন গেটকিপার নূর হোসেনের সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়। কেন ভারী ট্রাক সেতুতে উঠতে দিল এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি। এক যাত্রী বলেন, ‘ন ফাইল্লে ছঁরি ছাড়ি দে। তোরে হনে হইয়ে ওভারলোড ট্রেরাক তুলিবারল্লে। (কে বলেছে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাক তুলবার জন্য। না পারলে চাকরি ছেড়ে দে।)’

এভাবে আধঘণ্টা পর ট্রাকটি সচল করলে গাড়ি চলাচল পুনরায় শুরু হয়। এবার সেতুর ওপরের গাড়ি পার হওয়ার পর ট্রেন ছোটে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আধঘণ্টার অচলাবস্থার প্রভাব তখন সেতুর দুপাশে। এক পাশের গাড়ি শেষ হতেই আধঘণ্টা সময় পার।

৭৩ গর্ত

সরেজমিনে দেখা যায়, রেল সেতুটির স্থানে স্থানে ছোট–বড় গর্ত। কোথাও হাড়গোড় উঠে গেছে। পশ্চিম থেকে পূর্ব পাশ পর্যন্ত গুনে ৭১টি গর্ত পাওয়া যায়। গর্তে ট্রাক পড়লে ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে পুরো সেতু।

সেতুতে ক্ষত এত ভয়াবহ যে গর্তের ভেতর থেকে নদীর পানি দেখা যায়। আর রেলিংয়ের নিচের কাঠ ভেঙে গেছে অন্তত ১০ স্থানে।

সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে পার হচ্ছিলেন পশ্চিম পাশের দোকানি বোয়ালখালীর বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘ও ভাই ফরান আতত লইয়ারে চলির দে। হঁত্তে ভাঙি ফরে আল্লা জানে।’

নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘সেতুটির বয়স হয়েছে। ট্রেন চলাচলে সমস্যা নেই। যত সমস্যা বড় গাড়িতে। আমরা ১০ টন বেঁধে দিয়েছি। কিন্তু ৩০ থেকে ৪০ টন নিয়ে গাড়ি চলছে।’

এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত দুবার করে যাওয়া–আসা করে। এ ছাড়া দোহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেল পরিবহন করে অপর একটি মালবাহী ট্রেন। তবে ফার্নেস তেলের ওজনে সমস্যা হয় না বলে দাবি প্রধান প্রকৌশলীর।

জোড়াতালিতে চলছে

এ সেতু বারবার সংস্কার-মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ২০০৪ সালের ১৩ আগস্ট ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুতে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ১১ মাস সেতুর ওপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। গত বছর জাহাজের ধাক্কায় একটি স্প্যান সরে যায়। ওই সময় দুদিন বন্ধ রেখে তা ৫০ লাখ টাকায় মেরামত করা হয়। এর আগে একাধিক দফায় সেতুর সংস্কার করা হয়।

প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘লোহার সেতু ৬০ বছরে বেশি ব্যবহার করা ঠিক নয়। তারপরও আমরা এখনো ব্যবহার করছি। এখন মেরামতের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নতুন একটি দ্বিমুখী রেল সেতুর জন্য সমীক্ষা চলছে।’

সেতুর গুরুত্ব

বোয়ালখালী ও পটিয়ার তিন ইউনিয়নের প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এ ছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটের গাড়িও এই সেতু দিয়ে বিভিন্ন সময় চলাচল করে। সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে। সেতু নড়বড়ে হওয়ায় এসব কারখানা পণ্য পরিবহন করতে পারে না। তারা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু (শাহ আমানত সেতু) ব্যবহার করে। এতে খরচ বাড়ে।

স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বলেন, এখন রেল সেতু করার কথা হচ্ছে, যেটিতে সড়ক সংযোগ নেই। এটা হলে জনগণের উপকার হবে না।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতুতে তীব্র যানজট। একমুখী এ সেতুতে যানজটের এ ভোগান্তি নিত্যদিনের। সেতুর পশ্চিম পাশের প্রান্তে, গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টায়। ছবি: সৌরভ দাশ

যানজটে পুড়ছে হাজার কোটি টাকার শ্রম-সময়

প্রাইভেটকার, পাবলিক বাস সবই যেন ঝিমুচ্ছে  গোটা শহরে।  থেমে থেমে চলছে এসব যানবাহন। সম্প্রতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠা মোটরসাইকেল আরোহীদের যেন একটু বেশিই তাড়া। তাই কোনো সিগন্যাল বা সামান্য যানজটে পড়লেই তারা ফুটপাথকেই  বেছে নেন বিকল্প রাস্তা হিসেবে। অনেকে আবার ফুটপাথকে দোকানপাট হিসেবে ব্যবহার করছেন। এসবের ফলে ঢাকা তার সুন্দর উপমাগুলোকে ছাপিয়ে বহির্বিশ্বের কাছে এখন পরিচিতি পাচ্ছে যানজটের শহর হিসেবে। আর এই যানজটের কারণে রাজধানীবাসীর সময় অপচয় হচ্ছে, পুড়ছে শ্রমঘণ্টা আর জ্বালানি। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সমীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে বিশ্বের সর্বাধিক যানজটের শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা। এর আগের দুই বছর ঢাকার স্থান ছিল দ্বিতীয়, ২০১৬ সালে ছিল তৃতীয়।
২০১৫ সালের সংশোধিত  কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ যাত্রা (ট্রিপ) হয়। একজন মানুষ  কোনো একটি বাহনে উঠে নির্ধারিত গন্তব্যে নামলে একটি যাত্রা বা ট্রিপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে যানজটে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যানজটের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে একাধিক গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০ হাজার  থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ক্ষতি হচ্ছে যানজটে। যা গড়ে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। তবে সড়ক খাতে বিনিয়োগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই ক্ষতির অন্তত ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। ২০১৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘নগর পরিস্থিতি-২০১৬: ঢাকা মহানগরে যানজট, শাসন ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০০৪ সালে ঢাকার রাস্তায় প্রতি ঘণ্টায় গাড়ির গতিসীমা ছিল গড়ে ২১ দশমিক ২ কিলোমিটার। যানবাহনের পরিমাণ যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের  কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয়, তাহলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। রাজধানীর যানজট নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, যানজটের কারণে রাজধানীতে একটি যানবাহন ঘণ্টায় যেতে পারে গড়ে ৫ কিলোমিটার। ১২ বছর আগেও এই গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। প্রতিনিয়ত রাজধানীবাসী এমন পরিস্থতি থেকে উত্তরণ চান। বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহীন আলতাফ বলেন, ধানমন্ডি থেকে অফিস টাইমে মতিঝিল যেতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। তাই অনেক সকালেই বের হই। কোনো দিন নিজের গাড়ি নিয়ে বের হই আবার কোনো দিন সিএনজি নিয়ে বের হই। কিন্তু কোনোটাই দ্রুত যাওয়া সম্ভব না। যানজটে আটকে শুধু সময়ই অপচয় হচ্ছে না, এসব কারণে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মারা যাওয়ার ঘটনাও আছে অনেক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ঝুনু শামসুন নাহার  বলেন,  যানজটের কারণে মানসিক অশান্তি  তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে নিজের কর্ম ও কাজে। তাছাড়া একজন চালক বা যাত্রী যখন যানজটের কারণে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়, স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মন-মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায়।

২৩ বছর জেলখাটার পর নির্দোষ ৫ ভারতীয় মুসলিম

সালটা ১৯৯৬। জয়পুর–আগ্রা হাইওয়েতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হয়েছিলেন আবদুল গনি, আলী ভাট, লতিফ আহমেদ সহ মোট পাঁচজন। তাদের মধ্যে চারজন কাশ্মিরি। অন্য আরেকজন আগ্রার বাসিন্দা। হাইওয়েতে হামলার পাশাপাশি দিল্লির একটি বিস্ফোরণের ঘটনায়ও তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়। গত সপ্তাহে দীর্ঘ ২৩ বছর পর শেষমেশ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন তারা রাজস্থান হাইকোর্টে। তাদেরকে ছেড়ে দিতে বাধ‍্য হয়েছে পুলিশ; কিন্তু এর মধ্যে লম্বা একটা সময় কেটে গেছে।

২৩ বছরের দীর্ঘ সময়ে পাল্টে গেছে অনেককিছুই। তাদের কাছে যৌবনকাল শেষ হয়ে বার্ধক্য এসে হাজির হয়েছে। বদলে গিয়েছে আশেপাশের লোকজনও। অনেক স্রোত গড়িয়েছে সময়ের নদীতে। জেল থেকে বেরিয়ে জম্মু–কাশ্মিরে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে এরকম ই হয়ত অনেককিছু ভাবছিলেন আবদুল গনি, আলী ভাট, লতিফ আহমেদ বাজা এবং নিসার বাগ। এই চারজনকেই সামলেটি বিস্ফোরণ কাণ্ডে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের অভাবে নির্দোষ ঘোষণা করেছে রাজস্থান হাইকোর্ট। এছাড়া আগ্রার বাসিন্দা রইস বাগকেও নির্দোষ ঘোষণা করেছে আদালত। এই পাঁচ জনের মধ্যে ৩ জনকে আবার গ্রেফতার করে আনা হয়েছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে।

তবে মূল অভিযুক্ত আবদুল হামিদের ফাঁসির সাজা এবং পাপ্পু ওরফে সালিমের যাবজ্জীবন কারদণ্ডের সাজা বহাল রেখে দিয়েছে আদালত। তবে ছাড়া পাওয়ার পর এই পাঁচ ব্যক্তির এখন একটাই যেন প্রশ্ন, ‘‌বিনা দোষে দীর্ঘ ২৩ বছর জেলে বন্দী ছিলাম। কে এই ২৩ বছর ফিরিয়ে দেবে?‌’‌

গনি বলেন, তিনি সেখানে আল্লাহওয়ালা নামের একটি সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। যারা বিভিন্ন এলাকায় সফল করে ধর্ম প্রচারের কাজ করতো। সে বছর তিনি দিল্লির একটি মসজিদে গিয়েছিলেন দলের সাথে। সেখান থেকে যান বিশাখাপত্তম। সেখানে ৪০ দিন কাটিয়ে আবার দিল্লি যাওয়ার সময় তাকে ট্রেন থেকে তাদের আটক করা হয়। ট্রেনে একদল লোক উঠে সবার নাম ও ঠিকানা জানতে চায়। কাশ্মিরি মুসলিম বুঝতে পারার পর তাকে আটক করা হয়।

গনি বলেন, পরদিন আহমেদবাবাদের পুলিশ স্টেশনে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরই তারা বুঝতে পারে যে, আমি নির্দোষ। এত তরুণ পুলিশ অফিসার আমাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশও দেন। কিন্তু ডেপুটি পুলিশ সুপার আমাকে রেখে দিতে বলেন একদিনের জন্য।’ সেই একদিন শেষ হয়েছে গনির জীবনের মূল্যবান ২৩টি বছর হারিয়ে যাওয়ার পর। সে সময় দিল্লিতেও আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। তারা একজন কাশ্মিরিকে খুঁজছিলো ঘটনার সাথে জড়িত দেখানোর জন্য। যদিও আমি কিছুই জানতামন সে সম্পর্কে।3

জম্মু ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েট আবদুল গনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গনি বলেন, আমার ছাত্ররা এখন অনেকেই পুলিশ কর্মকর্ত, কেউ বিচারক। কিন্তু আমার জীবনটি হারিয়ে গেল এই ঘটনায়।

এদিকে, গনি–আলীরা বাড়ি ফেরায় খুশি তাদের আত্মীয়-স্বজনরা। ফেরার পর বাড়িতে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। কেউ তাদের জড়িয়ে ধরলেন, কেউ গালে চুমু খেলেন। সবার চোখেই তখন পানি। ২৩ বছর পর শ্রীনগরে নিজের বাড়িতে ফিরে যেন নির্বাক হয়ে যান ৪৮ বছরের আলী। ১৯ বছর বয়সে যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখনও তার মা–বাবা বেঁচেছিলেন; কিন্তু এখন আর তারা নেই। কবরে শুয়ে থাকা মা–বাবা কাছে যেতেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন আলী। মা-বাবার কবরের উপর পড়ে আলী কাঁদছেন এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে টুইটারে।

১৯৯৬ সালে জয়পুর–আগ্রা হাইওয়েতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হয়েছিলেন আলী। যে ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল প্রায় ১৪ জনের। আহত হয়েছিলেন ৩৭ জন। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদ আলীর ওপর অভিযোগ উঠেছিল দিল্লির লাজপত নগরের বোমা বিস্ফোরণেরও। যা কিনা প্রাণ কেড়েছিল ১৩ জনের৷ এই ঘটনার পরই কারাদণ্ড হয় পাঁচ জনের। তবে জীবন নতুন মোড় নিল ২৩ বছর পর। এতদিন কারাদণ্ডের পর রাজস্থান আদালতে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ খারিজ করল।

জানা গেছে, কার্পেটের ব্যবসা করতেন মুহাম্মদ আলী। ব্যবসার জন্য টাকা আনতে নেপালে পাড়ি দেন তিনি। কয়েক মাস যেতেই আলির মনে হয় নেপাল খুবই সুন্দর জায়গা, এখানেই না হোক ব্যবসা শুরু করা যাক। যেমন ভাবা তেমনি কাজ।

অন্যদিকে, তখন কাশ্মির উপত্যকায় হামলার ঘটনায় আগুন জ্বলছে। সেই সময় আলির কাছে সব নিরাপদ আশ্রয় হল নেপালের কাঠমাণ্ডুই। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় ১৯৯৬ সালে। জোহরের নামাজের সময়ই গ্রেপ্তার হন আলী। সঙ্গে আরও দুই কাশ্মিরি যুবক। ৯ দিন ধরে জেলা হেফাজতে পুলিশি অত্যাচার চলে ওপর। তারপর সেখান থেকে সোজা তিহার জেলে।

আলী জানান, ‘আমরা বার বার বলেছিলাম, আমরা কিছুই করিনি। আমরা নির্দোষ; কিন্তু দিল্লি পুলিশ আমাদের কথা শুনতে চায়নি। শুধুই কী কাশ্মিরি হওয়ার কারণেই এই অত্যাচার?‌ প্রশ্ন উঠেছিল আমাদের মনেও; কিন্তু কেউ আমাদের কথা গুরুত্ব দেয়নি। দেশের নানা কারাগারে আমাদের নিয়ে যেত। বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছে চলে গিয়েছিল৷’

২৩ বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরে আলী যেন মুখের ভাষা হারিয়েছেন। আলির কথায়, ‘আমি যখন নেপালে যাই, তখন আমার বয়স ১৯। আর এত বছর পর গোটা পৃথিবীটাই তো বদলে গিয়েছে, জেলের ভিতর থেকে তো কিছুই বুঝতে পারেনি। মা–বাবাও এখন আর আমার কাছে নেই। কাউকেই পেলাম না!’

ডেঙ্গু বিস্তারে নির্মাণাধীন ভবন, উন্নয়ন প্রকল্প দায়ী কতটা? by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে নাগরিক সচেতনতার কথা।
কিন্তু ঢাকার বেশ কিছু নির্মাণাধীন ভবন এবং যে উন্নয়ন প্রকল্প এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে সেখানে জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে। যেখানে কিনা এডিস মশা জন্মানোর আশঙ্কা থাকে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে এই নির্মাণাধীন ভবন বা প্রকল্পগুলো তদারকির দায়িত্ব কাদের? এ নিয়ে কী সরকার আসলেও কিছু ভাবছে? ঘাটতিগুলো কোথায় রয়ে গেছে?
কারণ খতিয়ে দেখতে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় মেট্রোরেল সংলগ্ন একটি বাড়ির বাসিন্দা সাবিহা সুলতানার সঙ্গে কথা হয়।
তীব্র গরমের মধ্যেও তিনি তার বাড়ির সব দরজা জানালা বন্ধ রাখেন। কারণ একটাই, "মশা"।
নিজ পরিবারকে এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচাতে তিনি সব দিকে সতর্ক হলেও মশার উপদ্রব ঠেকাতে পারছেন না।
কারণ বাড়ির পাশেই চলছে নির্মাণাধীন ভবন আর মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমি তো ডেঙ্গুর অবস্থা দেখে টবের গাছগুলো আর রাখিনি। কোথাও পানি জমতে দিচ্ছিনা। যতোটা পরিষ্কার থাকা যায়। আমার বাড়িওয়ালাও লোক দিয়ে বাসার আশপাশ পরিষ্কার করিয়েছে।"
"কিন্তু এই যে মেট্রোরেলের গর্তগুলোয় পানি জমেছে, পাশের যে নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় জমা পানি আছে। এগুলো কারা পরিষ্কার করবে। এটা তো আর আমার দ্বারা সম্ভব না। কিন্তু ঘুরেফিরে ওই আমাদেরকেই সাফার (ভুগতে) করতে হচ্ছে।"

মশার উৎপত্তিস্থল একেকটি নির্মাণাধীন এলাকা

মিসেস সুলতানার বাসার কাছেই দুটি নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে দেখা যায় ভবনের ছাদে এবং বেজমেন্টে জায়গায় পানি জমে রয়েছে।
এছাড়া মিরপুর সংলগ্ন মেট্রোরেলের পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে বেশ কয়েকটি জায়গায় জমে আছে বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি।
এই স্থানগুলোতে এডিস মশার লার্ভা নির্বিঘ্নে আবাস গড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ড. চন্দ্রিমা ইমতিয়া।
"যে কোন কনস্ট্রাকশন এরিয়ায় পানি জমবেই। আর ওই পানিতে এই এডিস মশা ডিম দিতে পারে। আর তার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ডিম থেকে লার্ভা বেরিয়ে আসে। এভাবেই কিন্তু মশাগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টিকে যাচ্ছে আর দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।"
এখনই কোন ব্যবস্থা নেয়া না হলে পরবর্তী বর্ষার মৌসুমে মশার উপদ্রব আরও ভয়াবহ আকারে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মিজ ইমতিয়া।
একে ভবিষ্যতের জন্য বিপদজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এই কনস্ট্রাকশন কখনোই পরিকল্পিত হবেনা। এভাবেই পানি জমতে থাকবে আর মশাও জন্মাতেই থাকবে। এখন যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা যাবেনা।"
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় আনা যায়নি কেন?
সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় অভিযান চালিয়ে অর্ধশতাধিক ভবনে এডিস মশার লার্ভা সনাক্ত করে।
এক দিনে বেশ কয়েকটি ভবনের মালিক ও ডেভেলপারকে জরিমানাও করা হয়।
সেই সঙ্গে ঢাকা জুড়ে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো যে মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে সেখানকার কৃত্রিম জলাধার বা গর্তে এডিস মশা বিস্তারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই ধরণের স্থানগুলো তদারকি ও মশার বিস্তার ঠেকানোর দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সিটি কর্পোরেশনসহ একাধিক পক্ষ।
তাদের মধ্যে আজও সমন্বয় আনা যায়নি কেন?
এ বিষয়ে জানতে কথা বলেছিলাম গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে।
"এটার মূল দায়িত্ব মূলত সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভার। তার সঙ্গে কিছু উন্নয়নমূলক সংস্থারও দায়িত্ব আছে। যেমন পিডব্লিউডি, ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি, ঠিকাদার, প্রকৌশলী, বাড়ির মালিক বা প্রাইভেট ডেভেলপার সবারই আসলে এখানে ভূমিকা আছে। এখন এতোগুলো সংস্থা এই একটা বিষয়ের সাথে জড়িত, এজন্য আন্ত:মন্ত্রণালয় বা আন্ত:দপ্তরের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমন্বয় আনা দরকার। যেখানে প্রত্যেকের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হবে।"
এ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে এই সমন্বয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মিস্টার মনিরুজ্জামান।
তার মতে, ধীর গতিতে হলেও কাজ হচ্ছে।

"বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ইস্যুটি সবচেয়ে উপেক্ষিত"

তবে তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি নগর পরিকল্পনাবিদ ড. মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন হাসান।
তিনি মনে করেন বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভবন নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কোন ধরণের সমন্বয় দেখা যায়না।
মিস্টার হাসান বলেন, "কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্টের এক্সপার্টিজ ও তদারকিতে এখনও আমাদের অনেক ঘাটতি আছে। এখন পাবলিক হেলথের ইস্যুটা যখন এটার সাথে যোগ হল, তখন ঘাটতিটা আরও স্পষ্ট হয়েছে।"
বাংলাদেশে যেকোনো ধরণের নির্মাণের ক্ষেত্রে সেটা হোক ভবন বা সড়ক অথবা যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বিষয় নজরে আনা হয়না, তার মধ্যে জনস্বাস্থ্য ইস্যুটি সবচেয়ে উপেক্ষিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
"যেকোনো নির্মাণের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য ইস্যুটি যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেটা আমরা ভুলে যাই। এই যে মেগা প্রজেক্টগুলো হচ্ছে এগুলোর সাথে অনেক বিদেশি সংস্থা জড়িত। আপনি ওই দেশগুলোতে গিয়ে দেখবেন তারা যখন এ ধরণের প্রকল্প হাতে নেয় তখন পাবলিক হেলথ ইস্যুটা তদারকি করে। ধুলাবালি, শব্দ দূষণ থেকে শুরু মশার উপদ্রব ঠেকানো সবকিছু নিয়ে তারা ভাবে। কিন্তু এখানে এটা ওই বিদেশিরাও ভাবেনা। আমাদের সরকারের লোকজনও ভাবেনা।"
বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে রূপ নিয়েছে সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন ড. মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন হাসান।

প্রবাসী শ্রমিকরা কোথায় থাকে, কী খায় জানে কি পরিবার! by মো. মুখলেছুর রহমান (মুকুল)

‘অনেক বড় স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাব, বিদেশে কতই না সুখ। কতই না টাকা। হুট করেই চলে আসলাম মালয়েশিয়া। এখন বুঝি প্রবাস জীবন কত সুখের। সুখ নামের সোনার হরিণটা কেমন। মায়ের সেই আদরমাখা ডাক নেই- বাবা খেতে আয় সেই সকালে খেয়েছিস, এখনও না খেয়ে কীভাবে আছিস বলার কেউ নেই। এরই নাম হয়তোবা প্রবাস জীবন।’
হৃদয়বিদারক কথাগুলো বলছিলেন সদ্য মালয়েশিয়ায় যাওয়া কামরুল নামে এক রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
পরবাসীর পরিবারকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার ছেলে; স্বামী; বা ভাই প্রবাসে কি করে? উত্তর আসবে, বিদেশে থাকে কিন্তু কি কাজ করে জানি না। কিংবা অত কিছু জানতেও চায় না অনেকেই। এ কথাটাই অপ্রিয় সত্য। পরিবারের সদস্যরা কিংবা আত্মীয়-স্বজন মনে করেন বিদেশ মানেই রোপন করা টাকার গাছ যা ঝাঁকি দিলেই কেবল টাকা আর টাকা।
প্রবাসে একা থাকা, নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, খারাপ পরিবেশে কাজ করা ইত্যাদি কারণে হৃদরোগ বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বয়স ৩৫ হওয়ার আগেই অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে।
কোনো প্রবাসী যদি ঘরে টাকা কম দেয় পরিবারের সদস্যরা ধরে নেয় যে, তাদের ছেলে টাকা জমা করছে। আর যদি বিবাহিত হয় তাহলে তো কথাই নেই। সবাই এক বাক্যে বিশ্বাস করে ছেলে যা কামাই করছে সব শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে।
কিন্তু আসলে যে তার বেতন কত; কোথায় থাকে; কিভাবে থাকে; কি খাচ্ছে; কি কাজ করে; যা আয় করে তা হালাল না কি হারাম তা জানার কোনো প্রয়োজন মনে করে না।
শুধুমাত্র মাস শেষে টাকা পেলেই হয়। প্রবাসীরা যে কতটা অবহেলিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। খুব কম প্রবাসী আছে যারা পরিবারের সমর্থন পেয়ে থাকবে। গড়ে প্রতিদিন ৫৫-৬২ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আসে। যাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেখানো হয় স্ট্রোক।
৪ বছর ৮ মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেও প্রায় শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে এক প্রবাসী নারীকে। জানতে চায়লে তিনি বলেন, ‘ভোর চারটায় উঠে শুরু করতাম থালাবাসন ধোয়া। তারপর বিশাল বাড়ির সব মেঝে ধোয়া-মোছা শেষে শুরু হতো একে একে আটটি টয়লেট সাফ করার কাজ। একটু বিশ্রাম নেবেন সেই সুযোগ নেই’।
বলেন, ‘কাপড় শুকাতে দিয়েই যেতে হতো মালিকের মেয়ের বাড়িতে। সেখানেও রাজ্যের কাজ। মেয়ের বাড়ির কাজ শেষে মালিকের নতুন নির্দেশ- এবার যেতে হবে ভাইয়ের বাড়ির ছাগলের ঘর পরিষ্কারের চুক্তি। চুক্তির বাইরে এত অতিরিক্ত কাজের জন্য বাড়তি পারিশ্রমিক চাইলেও বিপদ। মালিক তখন রেগেমেগে বলত, ‘মেরে লাশ ফেলে দেব পাহাড়ে।’
কোনো সরকার কি ঘাম, রক্ত, এমনকি জীবন দিয়েও পরিবার ও দেশের সুন্দর আগামী নির্মাণে ভূমিকা রেখে যাওয়া এই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিয়েছে?
যার জন্য দায়ী মানসিক চাপ, তাই, প্রবাসীদের পরিবারের প্রতি অনুরোধ রইল যে আপনার ঘরের প্রবাসী সন্তানকে মানসিক চাপ থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করুন। প্রবাসীরা এভাবেই খায় তাদের পাঠানো টাকায় পরিবারের লোকেরা ডাইনিং টেবিলে বসে খায়।
ঘাম, রক্ত, এমনকি জীবন দিয়েও পরিবার ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেনছেন প্রবাসীরা। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বাংলাদেশিদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে৷ এর পাশাপাশি প্রবাসে নির্যাতনও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রায় নিয়মিতই আসছে মৃত্যুর খবর। পরিবারে সুদিন ফেরানোর আশায় বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন অনেকে।
প্রবাস নামের এই জেলখানায় মৃত্যু হয়েছে অনেক স্বপ্নচারীর। সৌভাগ্য হয়নি নীড়ে ফিরে যাওয়ার। শেষ বিদায় সেটিই যখন দেশ ছেড়ে আসছে।৫০-৬০ বছরের ক্ষণস্থায়ী জীবনে ৩০ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেয়া মানুষের সংখ্যা কম হবে না।
এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা বলেন, ‘প্রবাসে কেউ সাবলম্বী, কেউ অপরাধী, কেউবা আজও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনি। এভাবেই চলছে জীবন; নিয়তির এ খেলা কখনই শেষ হওয়ার নয়। মহাকাল ধরে চলছে, চলবে। আমরা এর পথযাত্রী। স্বপ্ন দেখাটা তো দোষের কিছু না এজন্য দেখছি। অনেক রাত হয়ে গেছে একটু পর ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতে হবে। এভাবেই চলছে প্রবাস জীবন।’