Sunday, June 22, 2014

‘উন্নয়নের জোয়ার’ তবু পানিবন্দী চট্টগ্রামবাসী by শরিফুজ্জামান ও সুজন ঘোষ

যে শহরে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ বইছে, সেই শহরের মানুষ পানিবন্দী কেন?
চট্টগ্রাম শহরের নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধা যাঁদের দেখার দায়িত্ব, তাঁদের কেউ এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারছেন না৷ তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই শহরের উন্নয়নে চার হাজার ৪০০ কোটি টাকার ৩৫টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে৷ তবে ১ নম্বর সমস্যা জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো প্রকল্প নেই৷
উন্নয়নের বিবরণ লেখা বিলবোর্ড ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে শহর৷ ওপরে তাকালেই উন্নয়নের তথ্য, নিচে তাকালে দুর্গন্ধময় কাদাপানি৷ এ পরিস্থিতিতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ শহরবাসী৷

নগর পরিকল্পনাবিদেরা জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে না পারার জন্য সিটি করপোরেশন ও মেয়রের ভূমিকাকে দায়ী করেছেন। তাঁরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি ১৯৯৫ সালে প্রণীত ২০ বছরের নগর মহাপরিকল্পনায় ছিল। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে বা অর্থ সংগ্রহে বর্তমান মেয়রের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের ইস্ট-ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ সিকান্দর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণ ধারণা হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি সরকার। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে মেয়রকে এই প্রকল্পের অনুমোদন পেতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে দেখিনি। তিনি উৎসাহী কিন্তু আশাবাদী নন।’
নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল সংস্থা সিটি করপোরেশন সরকারের কাছে টাকা চায়নি বা নিতে পারেনি৷ এটি একধরনের ব্যর্থতা৷
গতকাল যোগাযোগ করা হলেও মেয়র মন্জুর আলমের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি৷ তবে ১০ মে প্রথম আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব নয়।’ এটা বাস্তবািয়ত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে মেয়র কাউকে দায়ী না করলেও অর্থের অভাবের কথা উল্লেখ করেন৷
সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, নগরবাসীর ভোট পাওয়ার জন্য মেয়র যেসব অঙ্গীকার করেছিলেন, তার প্রথমটিই ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন করা। অথচ মেয়াদের চার বছর পার হলেও ১ নম্বর অঙ্গীকার পূরণে তাঁর কোনো উদ্যোগ নেই৷
মেয়রের এই উদ্যোগহীনতার শিকার হয়ে নগরবাসী গত শুক্রবার ও গতকাল ছিলেন পানিবন্দী। মেয়র আর এক বছর মেয়াদের মধ্যে এ সমস্যা সমাধান করে ফেলবেন, এটা কেউ বিশ্বাস করেন না। মেয়র বিরোধী দল বিএনপির নেতা হওয়ায় সরকারের সহায়তা পাননি—এমন কথা কেউ কেউ বলে থাকেন৷ তবে মেয়র নিজের মুখে এ কথা বলেন না৷
চট্টগ্রামের উন্নয়নে যে ৩৫টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ৩১টির কাজ শেষ পর্যায়ে৷ এগুলোর একটিও সিটি করপোরেশনের নয়, জলাবদ্ধতা নিরসনের সঙ্গেও এসবের কোনো সম্পর্ক নেই৷ সরকার এসব কাজ করাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মাধ্যমে৷ এই সিডিএর চেয়ারম্যান অবশ্য মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম৷
গতকাল যোগাযোগ করা হলে আবদুচ ছালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনগতভাবে ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সিটি করপোরেশন। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে করপোরেশন আমাদের কিছুই জানায়নি। তার পরও সিডিএর পক্ষ থেকে জলাবদ্ধতার কারণ চিহ্নিত করতে এবং সমাধান খঁুজে বের করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে।’
তবে ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সিডিএ, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন। এগুলোকে সম্পৃক্ত করতে সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নেয়নি বলে মন্তব্য করেন সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার৷
সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, বহদ্দারহাটের বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত নতুন খাল খননে ২৯৭ কোটি টাকায় একটি প্রকল্প নেওয়ার কথা৷ কিন্তু গত দুই বছরেও মেয়র সরকারের কাছ থেকে এটি অনুমোদন নিতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, মেয়র দুই বছর আগে নতুন খাল খননের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠালেও অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি। তাঁর প্রশ্ন, তার আগের দুই বছর মেয়র কী করেছেন?
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, করপোরেশন গত চার বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪৭ কোটি টাকা খরচ করেছে৷ নালা-নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলন ও অপসারণ, নালা-নর্দমা নির্মাণ, বিভিন্ন খালে ৩২ কিলোমিটার অংশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও খননযন্ত্র কিনতে এই টাকা খরচ হয়েছে৷ বহদ্দারহাট থেকে ডোম খাল পর্যন্ত সাড়ে আট কোটি টাকায় সংযোগ খাল তৈরির কাজ চলছে। এগুলো অবশ্য নিয়মিত কাজের অংশ৷
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জলাবদ্ধতা নিরসনবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যসচিব আনোয়ার হোছাইন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কিছুতেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছি না। নালা-নর্দমা ও খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণ হচ্ছে না।’
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক স্বপন কুমার পালিত বলেন, বেপরোয়া দখলের ফলে চট্টগ্রাম নগরে খালের পরিমাণ কমেছে। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ভবন নির্মাণের কারণে বিদ্যমান খালগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে খালগুলো দিয়ে ১০ ভাগের এক ভাগও পানি প্রবাহিত হতে পারে না।

মোদির ভিসা বিতর্ক এখন অতীত

হিলারি ক্লিনটন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফর দুই দেশের মধ্যে অতীতের বিভিন্ন ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটাবে বলে মনে করছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন৷ মোদির ভিসা বিতর্ক এখন অতীত বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি৷ ভারতের টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া বিশেষ এক সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন৷ সাক্ষাৎকারে হিলারি ২০০৫ সালে মোদিকে ভিসা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি জানানো নিয়ে বিতর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন৷
তিনি তাঁর স্মৃতি কথা হার্ড চয়েসেস-এ উল্লেখ করা নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ওঠা বিতর্কের পাশাপাশি ২০১৬ সালে নিজের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন৷ ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল৷ ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গায় রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ওঠার প্রেক্ষাপটে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷ ওই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হিলারি বলেন, ‘আমি মনে করি, সেটা অতীত বিষয়৷ আমি জানি, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ফোন করেছেন৷ আশা করছি, অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা একসঙ্গে বসার সুযোগ পাবেন৷ সেই বৈঠকে অতীতের ওই সব ঘটনা নিয়ে যেকোনো প্রলম্বিত প্রশ্নের ইতি ঘটবে৷’

ইউপিএর পথে হাঁটছেন মোদি

দুই বছর আগে যে কারণে মনমোহন সিং সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঠিক সেই পথেই হাঁটলেন নরেন্দ্র মোদি। পার্লামেন্টকে এড়িয়ে বাজেট অধিবেশনের আগেই বাড়িয়ে দিলেন ট্রেনের যাত্রীভাড়া ও পণ্যমাশুল। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রেল মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল শনিবার দেশজুড়ে চলে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। সব ধরনের ট্রেনে সব শ্রেণিতে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ হারে যাত্রীভাড়া বাড়ানো হয়েছে। পণ্যমাশুল বাড়ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে। শুধু যাত্রীভাড়া বাবদই ভারতীয় রেলের বার্ষিক আয় বাড়বে ছয় হাজার কোটি রুপি। এই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দূরপাল্লার ট্রেনের তাপানুকূল প্রথম শ্রেণির টিকিটের দাম সংশ্লিষ্ট রুটে বিমানভাড়ার চেয়ে মাত্র কিছু টাকা কম হবে। ফলে ভাড়া বৃদ্ধিতে আদৌ লাভ হবে কি না, এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দুই বছর আগে ২০১২ সালে বাজেট অধিবেশনের আগে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ২০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। ৭ মার্চ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি টুইট করে ‘পার্লামেন্টকে এড়িয়ে পেছনের দরজা দিয়ে ভাড়া বাড়ানোর’ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন। গত শুক্রবার সেই একই পথে হাঁটা মোদি সরকার অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। রেলমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়া বলেন, ইউপিএ সরকারই এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল। কিন্তু ভোট এসে যাওয়ায় তা ঘোষণা করেনি। তৎকালীন রেলমন্ত্রী মল্লিকার্জুন খাড়গে সেই সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারা সেটাই ঘোষণা করল। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি শনিবার বলেন, সিদ্ধান্তটা কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয়। মুখতার আব্বাস নাকভি বলেন, এখন খারাপ লাগতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতে মানুষ বুঝবে, সিদ্ধান্তটা অর্থনীতির পক্ষে কতটা দরকারি ছিল।
দলের আরেক নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিং বলেন, সরকারের সামনে দুটো রাস্তা ছিল। ভাড়া না বাড়িয়ে ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা অথবা প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ভর্তুকি কমানো। সরকার যাই বলুক, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রাজধানীতে রেল ভবনের সামনে কংগ্রেস বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভ হয় অন্যত্রও। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ছোড়ে। কলকাতায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে বামপন্থীরা। প্রতিবাদ জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসও। বারানসিতে বিক্ষোভ দেখায় সমাজবাদী পার্টি। ডিএমকে নেতা এম করুণানিধি বলেন, কংগ্রেস যেভাবে দেশ চালাত, বিজেপিও সেভাবেই দেশ চালাচ্ছে। আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদ কটাক্ষ করে বলেন, ভালো দিন কেমন এসেছে, মানুষ তা বুঝতে পারছে। দিন যত এগোবে আরও বুঝবে। ভর্তুকি কমানোর যে রাস্তায় হেঁটেছিল কংগ্রেস সরকার, মোদিও সেই পথের পথিক হয়েছেন। রেলের ভাড়া ও পণ্যমাশুল বাড়ানো ছাড়াও ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। গ্যাসের দাম প্রতি মাসে সিলিন্ডারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। ইরাকে অশান্তির দরুন পেট্রল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি অবধারিত। এই সিদ্ধান্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও অবধারিতভাবে বাড়িয়ে দেবে। অনাবৃষ্টির কারণে শস্য উৎপাদন এবার মার খাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ফলে প্রবৃদ্ধির হার কমতে বাধ্য। এই আশঙ্কা করেই মোদি সম্প্রতি গোয়ায় দলীয় বৈঠকে কঠিন ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বিপুল সমর্থনে জয়ী সরকারের কাছে অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও এটাই। রেলের ভাড়া ও মাশুল বৃদ্ধির পর তাই এখন মনে করা হচ্ছে, বাজেটও সাধারণ মানুষকে বিশেষ খুশি করতে পারবে না।

বাগদাদে সশস্ত্র শক্তির মহড়া শিয়াদের

সুিন্ন জঙ্গিরা ইরাকের রাজধানী বাগদাদের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে৷ এখন তারা বাগদাদ থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে৷ এ অবস্থায় প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুকতাদা আল-সদরের আহ্বানে তাঁর অনুগত হাজার হাজার যোদ্ধা গতকাল শনিবার বাগদাদের সদর সিটির বিভিন্ন সড়কে সশস্ত্র মহড়া দিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে৷ এতে দেশটিতে জাতিগত সহিংসতার আশঙ্কা বেড়েছে৷ খবর রয়টার্স, এএফপি ও সিএনএনের৷ সর্বশেষ খবরে বলা হয়, সুন্নি জঙ্গিরা গতকাল শনিবার দিনভর লড়াইয়ের পর ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ চৌকি দখল করে নিয়েছে৷ লড়াইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৩০ জন সদস্য নিহত হয়েছে বলে জঙ্গিরা দাবি করেছে৷ এর আগে শুক্রবার সীমান্তবর্তী আল-কাইম শহরের কাছে ওই এলাকায় ঢোকে জঙ্গিরা৷ আল-কাইম শহরের পতন হয়েছে শুনে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনেক সদস্য চৌকি ছেড়ে পালিয়ে যায়৷ তবে ইরাকের সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের অধিনায়কের গণমাধ্যম উপদেষ্টা সামির আল শওইয়ালি দাবি করেন, আল-কাইম এখনো ইরাকি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে৷ এর আগে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) সুন্নি জঙ্গিরা ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি এলাকার দখল নিয়েছে৷ তারা মসুলের বিভিন্ন ব্যাংক লুট করে এবং পলায়নপর সেনাদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেয়৷ এদিকে দেশটির বৃহত্তম তেল শোধনাগার বাইজি এবং উত্তরাঞ্চলীয় তাল আফার বিমানবন্দরের দখল নিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর এখনো ব্যাপক লড়াই চলছে বলে খবর পাওয়া গেছে৷ চলমান লড়াইয়ের ফলে ইরাকে জাতিগত বিভক্তি প্রকট হয়েছে৷ কুর্দি সম্প্রদায়ের লোকজন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কিরকুক শহরসহ নিজেদের দখলসীমা সম্প্রসারণ করেছে৷ আর সুন্নিরা পশ্চিমে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে৷
শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিতে যোদ্ধা ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাঠাচ্ছে৷ প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুকতাদা আল-সদরের পাশাপাশি ইরাকে শিয়া সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ গ্রান্ড আয়াতুল্লাহ আল-সিসতানি আইএসআইএলের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান৷ ওবামার হুঁশিয়ারি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় কোনো কাজ হবে না৷ ইরাকের রাজনৈতিক নেতাদের জাতিগত বিবাদ বর্জন করে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে৷ ওবামা বলেন, ‘মার্কিন সামরিক সহায়তা যত বেশিই দেওয়া হোক না কেন, তাতে ইরাকের ঐক্য অটুট থাকবে না৷ এ কথা আমি ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকিসহ দেশটির নেতৃত্বকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি৷ আমরা দেশটিকে সবার অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছিলাম৷ জাতিগত বিভেদ ভুলে কাজ করলে দেশটির শিশুদের জন্য একটি উন্নততর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল৷ কিন্তু আমরা আস্থার ভাঙন দেখতে পেলাম৷’ মার্কিন সেনারা ইরাক ছেড়ে যাওয়ার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্য মালিকির নেতৃত্বাধীন সরকার সেখানে সুন্নি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমঝোতায় ব্যর্থ হয়েছে৷ এ জন্য মালিকিকে দায়ী করে দেশটির ক্ষমতা থেকে তাঁর আসন্ন বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র৷ মালিকি যুক্তরাষ্ট্রকে জঙ্গিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ জানালেও ওবামা প্রশাসন সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে৷ ইরাকি বাহিনীর সহায়তায় কেবল ৩০০ মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা৷ এদিকে জাতিসংঘ বলেছে, চলতি বছরের সহিংসতায় ইরাকে অন্তত ১০ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে৷ গত সপ্তাহে জঙ্গিরা মসুল দখলের পর অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে৷

চরমপন্থায় না, আত্মঘাতী বোমায় হ্যাঁ

২০০৫ সালে জেএমবির আত্মঘাতী গাড়িবোমা
হামলায় নিহত হন দুই বিচারক
সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আওয়ামী লীগের আরও অনেকেই এখনো বাংলাদেশের সংকটের জন্য প্রধানত বিএনপি-জামায়াতকেই দুষে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রিয় স্লোগান জয় বাংলার অবমাননার জন্য প্রধানত পঁচাত্তর-পরবর্তী কুশীলবেরাই দায়ী। কিন্তু জয় বাংলা বলে টেন্ডার বাক্স ছিনতাই-সংস্কৃতি বন্ধ না করলে একে আর স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা কষ্টসাধ্য থেকে যাবে। যারা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে, তারা পাকিস্তানের এজেন্ট—এ ধরনের বাতচিত দিয়ে শত্রু ও শত্রুতার বিষয় ভুলভাবে চিত্রিত হচ্ছে। যেখানে আঘাত হানার বিষয়, যেখানে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়, তা আড়ালে চাপা পড়ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার শর্তে বিএনপি ও জামায়াতের দফারফা করতে গিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের দফারফা ঘটছে। ৯৯টি দেশের মধ্যে আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের দুর্দশাগ্রস্ত ৯২তম র্যাংকিং নিয়ে এর আগে আলোচনা করেছি। এবার আরও একটি বিপর্যয় বা উৎকণ্ঠার খবর। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জরিপ সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের যাত্রা শুরু ২০০২ সালে। তারা নানা বিষয়ে গ্লোবাল অ্যাটিচুড পর্যবেক্ষণ করে থাকে। ১৪টি দেশের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখানো হয়েছে, যে রাষ্ট্রে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য, সেখানে উগ্রপন্থার প্রতি মনোভাবটা কেমন। এই সংস্থার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অ্যালান মুরে জাঁদরেল সাংবাদিক। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর ওয়াশিংটন ব্যুরো চিফ হিসেবে তাঁর এক দশকের দায়িত্ব পালনকালে ব্যুরো তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছে। পিউর সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইসলামি চরমপন্থার উত্থান বাংলাদেশের জনগণ চায় না। বরং তাদের কোনো সম্ভাব্য শাসনে তারা বিচলিত। আবার এই জরিপেই ইঙ্গিত পাচ্ছি যে, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাবের কারণে বাংলাদেশ সমাজ নতুন করে কোনো রেডিক্যালাইজেশনের গহ্বরে প্রবেশ করছে কি না। ইসলামের পক্ষে আত্মঘাতী বোমা হামলা কি সমর্থনযোগ্য? এর উত্তরে বাংলাদেশের মানুষ যা বলেছে, তাতে আমি হতভম্ব। সাধারণ বিবেচনায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
৩৩ ভাগ বলেছে, মাঝেমধ্যে এর দরকার আছে। ১৪ ভাগ বলেছে, প্রায়ই এটা দরকার। আরও ১৪ ভাগ বলেছে, বিরল ক্ষেত্রে এটা দরকার। আবার ৩৩ ভাগ বলেছে, কখনো এটা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে মোটামুটি ৪৭ ভাগ মানুষ কমবেশি আত্মঘাতী বোমা হামলার পক্ষে মতামত দিয়েছে। অথচ পাকিস্তানে এটা মাত্র ৩ ভাগ। সে দেশের ৮৩ ভাগই বলেছে, এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে কি পাকিস্তানিরা আত্মঘাতী বোমা হামলায় রক্তাক্ত হওয়ার পরে একে না বলতে শিখেছে, আর বাংলাদেশের মানুষ এখনো এই দানবীয় সন্ত্রাসের ভুক্তভোগী নয় বলে এত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ একে সমর্থন দিতে পেরেছে? তালেবান, যাদের কারণে পাকিস্তানে এখনো রক্তগঙ্গা বইছে, পিউ প্রতিবেদন বলেছে, তালেবানের প্রতি পাকিস্তানিদের কোনো ভালোবাসা নেই। ফ্যাক্ট ট্যাংক হিসেবে পরিচিত পিউ ২০০২ থেকে আত্মঘাতী বোমা হামলার বিষয়ে জরিপ করছে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশকে এবারই প্রথম তারা জরিপভুক্ত করেছে। কেন করল এবং কেন এমন ফল এল দুটোই চিন্তার বিষয়। পাকিস্তানকে ২০০২ থেকেই তারা নিয়মিত জরিপভুক্ত রেখেছে। আর এর ফলাফলটা চমকপ্রদ, যা থেকে আমরা পাঠ নিতে পারি। ইসলাম রক্ষায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর পক্ষে পাকিস্তানিরা ২০০৪ সালে সর্বোচ্চ ৪১ ভাগ মত দিয়েছিল। বাংলাদেশে তখন তালেবান-দরদি বিএনপি-জামায়াতের শাসন চলছে। তবে পাকিস্তানিদের ক্রমাগত মোহভঙ্গ ঘটেছে। এখন যেটা আতঙ্কজনক সেটা হলো, বাংলাদেশিরা এ ক্ষেত্রে কেবল পাকিস্তানই নয়, ১৩টি মুসলিম দেশের মধ্যেই শীর্ষে। এমনকি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের চেয়ে বাংলাদেশ ১ ভাগ বেশি। পশ্চিম তীরের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ‘কিছু লোক মনে করে যে ইসলামকে তার শত্রুদের কাছ থেকে রক্ষার জন্য বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আত্মঘাতী বোমা ও অন্যান্য ধরনের সহিংসতার দরকার রয়েছে।
অন্যরা বিশ্বাস করেন কারণ যা-ই হোক না কেন, এ ধরনের সহিংসতা কখনোই জায়েজ নয়। আপনি কি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন যে ইসলাম রক্ষায় এ ধরনের সহিংসতা প্রায়ই জায়েজ, মাঝেমধ্যে জায়েজ, প্রকৃতপক্ষেই জায়েজ কিংবা কখনোই জায়েজ নয়?’ এটা আশার বিষয় যে, ৬৬ ভাগ আল-কায়েদার বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে ২৩ ভাগ অনুকূলেও মত দিয়েছে। ৫৬ ভাগ লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে, আবার ২৮ ভাগ তাদের অনুকূলে এবং ১৬ ভাগের কাছে সংগঠনটি অজানা বলে প্রকাশ পেয়েছে। সংসদ নির্বাচনে জিতে হামাস ২০০৭ থেকে গাজা উপত্যকা শাসন করছে। ২০ জুলাই নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৫০০ ছাড়ানোর পরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটা অনিশ্চিত অস্ত্রবিরতিও কার্যকর করা অসম্ভব মেন হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আমাদের জনগণের মনোভাবে বড় পরিবর্তন এল কি না, সেটাও ভাবার বিষয়। কারণ, পিউ জরিপে ফিলিস্তিনিদের ৬২ ভাগ যখন ‘উগ্রপন্থীদের’ পক্ষে, তখন ৫৬ ভাগ বাংলাদেশি হামাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ২৯ ভাগ অনুকূলে। আর ১৫ ভাগের কাছে হামাস অজানা। আমাদের ৮৫ ভাগ উত্তরদাতা হামাস সম্পর্কেও মন্তব্য করতে সক্ষম, এটা ইঙ্গিত দেয় জরিপটা গড়পড়তা উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে করা হয়েছে। ১ জুলাই প্রকাশিত ওই জরিপে বলা হয়েছে, ইসলামি চরমপন্থার বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের উদ্বেগ অনেক বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় লেবাননে চলতি বছরে ৮১ থেকে ৯২ ভাগ, তিউনিসিয়ায় ৭১ থেকে ৮০, মিসর ৬৯ থেকে ৭৫, জর্ডান ৫৪ থেকে ৬২ ভাগ, এবং তুরস্কের মানুষের মধ্যে ইসলামি উগ্রপন্থার প্রতি ৩৭ থেকে ৫০ ভাগ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। এশিয়ার চারটি মুসলিম দেশকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা আশার বিষয়, ইসলামি চরমপন্থার প্রতি অনাস্থা প্রকাশে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। এমনকি আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশিরা এ বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ২৫ ভাগ অসচেতন, কিন্তু ৬৯ ভাগই উদ্বিগ্ন। পাকিস্তানে অসচেতন ১৪ ভাগ, উদ্বিগ্ন ৬৬ ভাগ, মালয়েশিয়ায় ২৪ ভাগ অসচেতন, ৬৩ ভাগ উদ্বিগ্ন এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৫৫ ভাগ অসচেতন ও ৩৯ ভাগ উদ্বিগ্ন। পিউ প্রতিবেদনও বাংলাদেশিদের আত্মঘাতী বোমাপ্রীতি অবাক করেছে। পিউ তার ২৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলেছে, ‘টুইন টাওয়ার ধ্বংসের (৯/১১) এক দশকের বেশি সময়ের পরে আত্মঘাতী বোমা হামলার ওপর মুসলিম দেশগুলোতে সমর্থন অনেক কমেছে।
তবে মালয়েশিয়ায় যেখানে ১৮ ভাগ আত্মঘাতী বোমা হামলাকে জায়েজ মনে করে, সেখানে বাংলাদেশ অনেক ওপরে। ২০০৫ সালে লেবাননি প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির হত্যাকাণ্ডের পরই কেবল এর প্রতি সমর্থন এখন সে দেশে ২৯-এ নেমেছে। ২০০২ সালে ৭৪ ভাগ লেবাননি বোমা-সমর্থক ছিল। একই বছরে আম্মানে তিনটি হোটেলে হামলার পর ৫৭ ভাগ জর্ডানির সমর্থনটা আজ ১৫ ভাগে নেমেছে। পাকিস্তানে বেনজির হত্যার আগেই তা হ্রাস পাচ্ছিল। তবে এক দশক আগে ৪১ ভাগ পাকিস্তানি বলেছিল, তারা আত্মঘাতী বোমাকে জায়েজ মনে করে। পিউ প্রতিবেদন যেটি বলেনি, সেটা হলো বাংলাদেশে কেন এটা বেড়ে গেল? এক দশক আগের পাকিস্তানকেও অতিক্রম করার একটা অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের ৪৭ ভাগ মানুষ এক দশক আগের পাকিস্তানি মানসিকতাকে ধারণ করছে। এই পরিহাস সহ্য করা আরও কঠিন যে গত বছরেও ফিলিস্তিনিদের ৬২ ভাগ, যারা এর সমর্থক ছিল এবং এই মুহূর্তেও ইসরায়েলি তাণ্ডবের শিকার, তারাও এর ওপর সমর্থন তুলে নিজেদের বাংলাদেশিদের নিচে নামিয়েছে। তাই সার্বিক বিচারে এটা একটা বিরাট প্রশ্ন যে আমাদের হলোটা কী। বাংলাদেশ তো বাংলা ভাই ও ইসলামি জঙ্গিদের হাতে কম রক্ত ঝরতে দেখেনি। যাচাই না করে এমন বিপজ্জনক ফলাফলকে ধ্রুব সত্য মনে করার যুক্তি নেই। আবার অভ্যাসগত উন্মাদনায় নাকচ করারও সুযোগ নেই। মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারে বিমুখ অথবা অসমর্থ সরকার এবং নাগরিক সমাজকে এই ভয়ংকর পূর্বাভাস নিয়ে নিশ্চয় ভাবতে হবে। বিএনপি ও জামায়াতকে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন করে ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। এটা কারও কারও বা কতিপয়ের কাছে মসনদ বিলাসের রক্ষাকবচ। কিন্তু এই জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে পারলেই নিশ্চিন্ত ঘুম দেওয়া যায় না। আরও অনেক ভয়ংকর সমস্যা সমাজের দেহে ছড়িয়ে পড়াটা ক্ষমতাসীনদের টিকে থাকার কৌশলগত হিম্মতের ওপর নির্ভর করে না। আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের নিকৃষ্ট ৯২তম অবস্থানে অধঃপতিত হওয়া এবং এই পিউ জরিপের ফলাফলের যে বিপদ, তার মধ্যে একটা পরিষ্কার যোগসূত্র দেখতে পাই। ২০১৪ সালের ১৪ এপিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের এক হাজার ব্যক্তির মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পিউর পক্ষে ওই জরিপ পরিচালনা করেছে প্রিন্সটন রিসার্চ।স্বনামধন্য জরিপ সংস্থা গ্যালাপের সাবেক প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু কোহাট প্রিন্সটন রিসার্চ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। এই পিউ জরিপের তিনিই পরিচালক। তাঁর কাছে উত্তরদাতাদের শিক্ষা ও তাদের পেশা-সংক্রান্ত প্রশ্ন জানতে চেয়ে গত সপ্তাহে ই-মেইল করেছিলাম।উত্তর পাইনি। তবে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে মার্কিন চোখে উদারনৈতিক মুসলিম দেশের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়টা এই জরিপ চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

মৃত-অর্ধমৃতের ভিড়ে পা রাখার জায়গা নেই

গাজাবাসীর প্রাণের কেন্দ্র আল শিফা হাসপাতাল। জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছে এই চিকিৎসা কেন্দ্র। ইসরাইলের নৃশংস বোমা হামলায় আহতদের সার্বক্ষণিক পাশে থাকছে এই হাসপাতাল। কর্মকর্তা, ডাক্তার, পুলিশ, নার্স ও কর্মীদের বিরাম নেই কর্তব্যে। কিন্তু এই প্রাণ কেন্দ্রই এখন রূপ নিয়েছে মরদেহ রাখার হিমাগারে! লাশে গিজ গিজ করছে হাসপাতাল কমপাউন্ড। মৃত আর অর্ধমৃতের ভিড়ে পা রাখার জায়গা নেই।
অসহায় শিফা হাসাপাতালের চালচিত্র তুলে ধরলেন চিকিৎসকরা। ইসরাইলের গাজা আক্রমণে মুহুর্মুহু বিমান হামলা ও স্থল হামলায় প্রতিদিনই বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। তবু মেডিকেল টিম তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে রোগীর জীবন বাঁচাতে। বর্তমানে এই হাসপাতালটি মেডিকেল সরঞ্জামাদি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই টিকে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ডা. আশলাফ আল কিদরা বলেন, ‘কম বেতন ও জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও আমাদের মেডিকেল টিম গাজার সব জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।’ সবচেয়ে করুণ ও বেদনার ব্যাপার হচ্ছে চোখের সামনে নিহত হচ্ছে ডাক্তরদের প্রিয়জন স্বজনরাই। ডা. কিদরা বলেন, ‘আমাদের হাসাপাতালের একজন ডাক্তার মাজদি নাইম দেখেন ইসরাইলের হামলায় তার ছেলে আবেদ আল রহমান নিহত হয়েছে।’ আল শিফা হাসপাতালে এখন নিদারুণ ওষুধ সংকট। প্রয়োজনীয় জরুরি মেডিকেল সরঞ্জামাদির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাই নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অত্যন্ত মৌলিক ওষুধগুলোর ৩০ শতাংশ সরবরাহ নেই। অন্যান্য মেডিকেল উপকরণের ৫৫ শতাংশই সংগ্রহে নেই। এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ জেনারেশনের অসুবিধায় জরুরি চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিঘিœত হচ্ছে। টেলিগ্রাফ।

বাঙালির নামে, মুসলমানের নামে আগ্রাসন!

কালশীতে আগুনে পোড়া বিহারি বস্তি
বাংলাদেশে উর্দু ভাষায় সাহিত্যচর্চা হচ্ছে, গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখা হচ্ছে, এটি আমার বহুদিন জানা ছিল না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উদ্যোগেই নব্বই দশকের প্রথম দিকে যোগাযোগ ও কথাবার্তা হয়। যত দূর মনে পড়ে, কবি আসাদ চৌধুরী ছিলেন যোগাযোগমাধ্যম। তাঁর সঙ্গে উর্দু ভাষার লেখকদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, আশা করি এখনো আছে। আমরা বসেছিলাম ইলিয়াস ভাইয়ের বাসায়, তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে। উর্দু ভাষার লেখক-কবিদের সবার পুরো নাম সঠিকভাবে মনে পড়ছে না। একজনের নাম মনে আছে, আহমদ ইলিয়াস। তাঁরা নিজেদের লেখালেখির অভিজ্ঞতা বলছিলেন, আলোচনায় এসেছিল ১৯৭১ সালে তাঁদের ভূমিকার প্রসঙ্গও। তাঁরা সবাই নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অনেকে নির্যাতিতও হয়েছেন। বাঙালি মানেই যেমন মুক্তিযোদ্ধা নন, উর্দুভাষী বা বিহারি এমনকি চাকমা মানেই রাজাকার নয়। পাকিস্তানের লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও আমরা এখন অনেকের নাম জানি, যাঁরা পাকিস্তান সামরিক জান্তার গণহত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। বর্তমান সরকার তাঁদের সম্মাননাও দিয়েছে। কাজেই পাকিস্তানের নাগরিক মানেই গণহত্যার সহযোগী নন। যা-ই হোক, উর্দু ভাষার লেখকদের রচিত গল্প-উপন্যাস-কবিতার কথা শুনেছিলাম সেদিন। জানলাম, বাংলাদেশে এগুলো ছাপার ব্যবস্থা নেই। সুতরাং এগুলো ছাপা হয় মুম্বাই, দিল্লি ও লাহোরে। তবে এসব লেখার বিষয়বস্তু অবশ্যই বাংলাদেশ, তার সমাজ রাজনীতি জীবন আবহাওয়া ফল ফসল। একটা উদাহরণ দিলেন একজন কবি।
তাঁর একটি প্রেমের কবিতায় তিনি প্রেমিকার উদ্দেশে যা বলছেন, তার সারকথা হলো, ‘তোমাকে যখন দেখি, তখন আমার হৃদয়ে কালবোশেখির ঝড় বয়ে যায়।’ কবি বললেন, ভারত-পাকিস্তানের উর্দু পাঠকেরা প্রেমের কথা বুঝলেন কিন্তু কালবোশেখির মানে বুঝতে না পেরে চিঠিপত্র পাঠাতে লাগলেন, বহু চিঠি। কালবোশেখি ব্যাপারটা তো একেবারেই বাংলার। বললেন, উর্দু সাহিত্যে বাংলাদেশ এভাবে আগে কখনো আসেনি। বাংলা ভাষার ওপর উর্দু ভাষা জোর করে চাপানোর পাকিস্তানি নীতির কারণে আমাদের অনেকের মধ্যে এই ভাষার প্রতি প্রচ্ছন্ন বিরাগ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। মাতৃভাষার অধিকার হরণ করার চক্রােন্তর সঙ্গে উর্দু ভাষা এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে এই ভাষা আমাদের কাছে শুধুই ভাষা ছিল না, আমাদের জাতিগত অস্বস্তি বিলীন করার অস্ত্র মনে হতো। সে জন্য এই ভাষা শেখা হয়ে ওঠেনি কখনোই। অথচ জানি, উর্দু ভাষায় কত সমৃদ্ধ সাহিত্য তৈরি হয়েছে। নির্মম পরিহাসের বিষয়, উর্দু ভাষা জোর করে চাপানোর জন্য পাকিস্তানিরা এত চক্রান্ত করল, মানুষ হত্যা করল; সেই পাকিস্তানে খুব কমসংখ্যক মানুষেরই মাতৃভাষা উর্দু। ১৯৭১ সালে যে সামরিক বাহিনী এখানে নৃশংসতার ভয়াবহতা তৈরি করেছে, তাদেরও মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। আজ যাদের আমরা ‘বিহারি’ নামে জানি, তারা পাকিস্তান থেকে আসেনি, এসেছে ভারত থেকে, শুধু বিহার থেকে নয়, উত্তর প্রদেশসহ অন্যান্য প্রদেশ থেকেও। ভারত ভাগের সেই রক্তনদীর মধ্যে, সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার কালে তারা এখানে আসে মোহাজির হিসেবে। পাকিস্তান তাদের কখনোই নিজের মধ্যে গ্রহণ করেনি, কিন্তু তাদের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করেছে। অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদের লেখা থেকে দেখি, ১৯৬৮ সালেও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির চিকনছড়া থেকে এই মোহাজিরদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। পুরো পাকিস্তান আমলেই তাদের সবার স্থিতি হয়নি।
এখনো পাকিস্তানে উর্দুভাষী মোহাজিররা মূলধারা থেকে আলাদা। বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) মানুষের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার কারণে মোহাজিরদের অনেকে বাঙালি সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছেন। ঈশ্বরদী, রংপুর, সৈয়দপুর, ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুরে তাঁদের অধিক মানুষের আবাস দেখা যায়। রেলওয়ে, কারখানায় এঁদের দক্ষতা-কর্মকুশলতার প্রশংসা অনেক শুনেছি। ষাটের দশকে শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনে বাঙালি বিহারি একসঙ্গেই পাকিস্তানিদের শোষণ–নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠন করেছেন। সে জন্যই বৃহৎ পঁুজিপতি ও পাকিস্তানি শাসকদের জন্য বাঙালি বিহারি দাঙ্গা লাগানো ছিল এক ভয়ংকর কূটকৌশল। আদমজীসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এই দাঙ্গা উসকে দিয়ে শ্রমিক স্বার্থের আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করা হয়। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের লড়াইকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়। বাঙালি বিহারি মুখোমুখি হলে ফায়দা নেয় পাকিস্তানি শাসকেরা। ‘বিহারি’দের মধ্যে বাঙালি ভীতি তৈরি করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়, বিদ্বেষ বাড়ে, দূরত্ব বাড়ে। ১৯৭১ সালে এরই ভয়াবহ পর্ব দেখেছি আমরা। স্বাধীনতার পর, এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন—তাঁরা, সেই সঙ্গে সচ্ছল পরিবারের অনেকে ঝুঁকি বুঝে পাকিস্তানে চলে যেতে সক্ষম হন। প্রধানত রয়ে যায় তুলনামূলকভাবে দরিদ্ররা। আর মধ্যবিত্তদের মধ্যেও কেউ কেউ, যাঁরা এ দেশকেই নিজের দেশ মনে করেন, তাঁরা থেকে যান অনিশ্চয়তা নিয়েই। ‘বিহাির’দের অবস্থা তখন এখানে স্বচ্ছন্দ বা নিরাপদ ছিল না। যারা পাকিস্তানে যেতে চাচ্ছিল, তাদের নাম হয় ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’।
তাদের পাকিস্তানে নেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তানের কোনো সরকারেরই কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। কালক্রমে পাকিস্তানে ফেরত যেতে চাওয়া মানুষেরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। এখন কথিত বিহারি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোট নিলে দেখা যাবে, তাদের অধিকাংশ বাংলাদেশেই থাকতে চায়। ১৯৭১ সালের পর জন্ম অনেকের, বাংলাদেশই তাদের জন্মস্থান, এখানেই তারা মরতে চায়। কিন্তু আইিন জটিলতায় এখনো দূরত্ব থেকে গেছে। হাইকোর্ট তাদের নাগরিকত্ব দিতে বলেছেন। পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো ঝুলে আছে। বাঙালি সমাজের মতো এই কোণঠাসা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠই দরিদ্র। সুতরাং মোহাম্মদপুর ক্যাম্প হোক আর যেখানেই হোক, তাদের প্রধান অংশের জীবন বিস্তর জীবন। গত শবে বরাতের রাতে রাজধানীর কালশীতে এ রকম একটা বিস্ততেই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো তারা। আক্রান্ত মানুষদের বক্তব্য ও আলোকচিত্রসহ প্রমাণাদি থেকে এটা স্পষ্ট যে পুলিশের সামনেই সন্ত্রাসীরা ঘরের বাইরে তালা লাগিয়ে গানপাউডার ছড়িয়ে আগুন দিয়েছে। আটকে পুড়িয়ে যাদের হত্যা করা হলো, তাদের অধিকাংশ একই পরিবারের। নারী ও শিশুই অধিকাংশ। আক্রান্ত মানুষেরা সবাই স্থানীয় সাংসদ ও পুলিশের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছেন। সাংসদের সহযোগী কে কে হামলায় ছিল, তার নামও বলেছেন। দুই দিন আগে সাংসদের সঙ্গে বিস্তবাসীর বাগ্বিতণ্ডা হয়, নারীরাই প্রতিবাদ করেছিলেন সাংসদের জোরজবরদিস্ত করে বিদ্যুৎ নেওয়ার বিরুদ্ধে। সে জন্যই হয়তো নারীর ওপরই নৃশংস আক্রমণের প্রধান ধাক্কা গেছে! কালশীর অধিবাসীরা জমি গ্রাসের চক্রান্তের কথাও বলেছেন। জমি গ্রাসের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি বিহারি চাকমা-মারমা কিংবা হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কোনো তফাত পাওয়া যাবে না।
কিন্তু যারা এই জমি গ্রাস করে, তারা কখনো বাঙালি, কখনো মুসলমান উত্তেজনা তৈরি করেই এই অপকর্ম সমাধা করে। প্রশাসনের কোনো না কোনো অংশের সমর্থন ছাড়া জমি-নদী-বিল-পাহাড় দখল সম্ভব নয়। গত কয়েক দশকে ঢাকা মহানগরে গরিব মানুষের বসতি বা বিস্ততে আগুন লাগা, সন্ত্রাস ও তার আগে পরের ঘটনাবলির মধ্যে বিস্ময়কর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। দরিদ্র মানুষ বাঙালি মুসলমান হলেও কি ছাড় পায়? একটুকুও না। জমি দখলে রাখার জন্য প্রথমে বিস্ত করা হয়। তারপর যেসব বিস্ততে বারবার আগুন লাগে বা অশািন্ত চলতে থাকে, সেখানে সবকিছু স্থিত হয় বহুতল ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে। জমির ওপর দখল নিশ্চিত না হলে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের মতো ‘উন্নয়ন’কাজ কীভাবে সম্ভব? ঢাকা মহানগরের অনেকগুলো বহুতল ভবনের পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে তাই মানুষের কান্না আর রক্ত পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের বাঙালিদের দুর্ভাগ্য যে এ দেশে অবাঙালিদের শতকরা হার মাত্র ১ ভাগ। আমাদের সুযোগই হয়নি অন্য জাতি ও ভাষাভাষীদের জানার-বোঝার মতো তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি। ধর্মীয় দিক থেকেও শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মুসলমান। নির্দিষ্ট ভাষা ও ধর্মের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা বহুজনকে অন্যজন সম্পর্কে অজ্ঞ রাখে। আর এই অজ্ঞতার সুযোগ নেয় সমাজের বৈষম্য-নিপীড়নের রাজনীতি। বাঙালি উন্মাদনা সৃষ্টি করে পাহাড়ের পর পাহাড় ব্যক্তির সম্পত্তিতে পরিণত করা, উত্তরবঙ্গে সাঁওতাল, ময়মনসিংহে গারোদের জমি গ্রাস আর কালশীর মতো বিস্তর জমি দখলের পাঁয়তারা। আবার মুসলিম উন্মাদনা তৈরি করে হিন্দু–বৌদ্ধের জমি আর সম্পত্তি দখল।
আক্রান্তদের কপালে কখনো পাকিস্তানের দালাল, কখনো ভারতের দালাল দাগ লাগিয়ে এই দখল, লুণ্ঠন বা সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফেসবুকেও বাঙালি আর মুসলমানের নামে এই উন্মাদনার সুর শোনা যায়। অন্যদিকে, এই জনপদে আবার হাজার বছরের বৌদ্ধ দর্শন, সুফি দর্শন, লালনের মতো সাধকদের প্রভাব, জাতিগত নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখবার এবং উন্মাদনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরও শক্তি দেয়। বস্তুত লুটেরা দখলদারদের চিহ্নিত করতে পারলে ভাষা-জাতি–ধর্মনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ যে খুবই সম্ভব, তা এ দেশেই বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষ। কালশীর এই নৃশংসতার বিচারে কোনো শৈথিল্য তাই আমরা মেনে নিতে পারি না। সাংসদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—যারই দায় থাকুক, তার বিচার হতে হবে। কথিত বিহারিদের মধ্যে এখনো যারা পাকিস্তানে যেতে চায়, তাদের সেখানে পাঠানোর জোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অধিকাংশ—যাদের শ্রম-ঘাম, জীবন-মরণ এ দেশের সঙ্গে বাঁধা—তাদের এ দেশে বৈধ নাগরিকত্ব এবং সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বাঙালি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এ দেশ শুধু বাঙালির নয়। এখানে উর্দুভাষী, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারোসহ অনেক ভাষা ও জাতির মানুষ বাস করে। সংবিধান তাদের অিস্তত্ব স্বীকার করে না, এটা আমাদের সবার জন্য লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয়। বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু এ দেশ শুধু মুসলমানের নয়, এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ বহু ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ বাস করে। এই বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

ভাঙা জানালায় প্রবৃদ্ধির সুবাস

বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিদায়ী অর্থবছরের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির একটি আশ্চর্য ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছিল, যা প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যানগত নির্ভরযোগ্যতার বিতর্ক আরেকবার উসকে দিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটিই দেশের জাতীয় আয় নিরূপণের ‘একমাত্র’ কর্তৃপক্ষ৷ কেননা এটাই মাঠপর্যায় থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। সবাই অবশ্য গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে বলেই ধরে নিয়েছিলেন। এমনকি বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এটা হয়েছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। হঠাৎ করেই এ রকম একটি অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা বিবিএস দিয়েছে এভাবে: সেবা খাতের মূল্য রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থাৎ একই পরিমাণে সেবা প্রদানের জন্য ভোক্তা কয়েক গুণ খরচ করেছেন, যা কিনা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করেছে। এটা আমাদের সেই গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তাদের মধ্য থেকে কেউ পাশের বাড়িতে ঢিল ছুড়ে জানালার কাচ ভেঙে ফেলল। আপনি হয়তো বলবেন, বিমা কোম্পানি এটা ঠিক করে দেবে। এরপর অনেক রক্ত ঝরল; বাড়িঘর-দোকানপাট জ্বালানো হলো, সম্পদ ধ্বংস হলো। এবার আপনি আবার বলবেন, এটা খুব একটা খারাপ নয়৷ কেননা মানুষ জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য বেশি খরচ করেছে, এতে লোকের আয় বেড়েছে। অর্থনীতিও লাভবান হয়েছে।
ব্যয়বহুল প্রবৃদ্ধির এই গল্প ১৮৫০ সালে ফেদেরিক বাস্তিয়াতের দেওয়া ‘ব্রোকেন উইন্ডো ফ্যালাসি’ বা ভাঙা জানালার ভ্রান্ত যুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি দেখিয়েছেন যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য অতিরিক্ত অর্থব্যয় সমাজের জন্য আসলে লাভজনক নয়। বিবিএস সেবা খাতের জিডিপি নির্ণয় করে সেবার আর্থিক মূল্যের অনুমানের ভিত্তিতে, সেবার নিরূপিত পরিমাণের সঙ্গে প্রত্যেকের বাজারমূল্যের গুণফলের ভিত্তিতে নয়। অবশ্য এই আপাতদৃষ্টিতে ‘বোনাস’ প্রবৃদ্ধি, যা কিনা এসেছে লাখ লাখ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট থেকে, তাকে একই বা কম পরিমাণ সেবার সঙ্গে সমন্বয় করে এর প্রকৃত মূল্য নিরূপণ করা যেত। বিবিএস সম্ভবত চলতি বাজারমূল্যে সেবা খাতের খরচকে হিসাব করে তাকে ভিত্তিবছরের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করছে। এটা প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান সম্পর্কে সবার কাছে সম্পূর্ণ ভুল বার্তা দিচ্ছে। বরং মোটামুটি সঠিক হিসাব পেতে গত অর্থবছরের সেবার মূল্যের সাপেক্ষে এ বছরের মূল্যস্ফীতির সমন্বয় করে এরপর আবার ভিত্তিবছরের মূল্যের সঙ্গে হিসাবটি সমন্বয় করা যেত। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জীবনযাত্রার সাময়িক অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়টি পরিসংখ্যানিকভাবে সামাল দেওয়া যেত। বোঝাই যায়, বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে প্রবৃদ্ধির ৬ শতাংশের অন্তরায় কাটিয়ে উঠতে পেরে সরকার বেশ স্বস্তিতেই আছে৷ কেননা, বিবিএসের পরিসংখ্যান চ্যালেঞ্জ করার যথাযথ ‘কর্তৃত্ব’ কারও নেই। অবশ্য ৬ শতাংশকে আজকাল অনেকটা ‘ঘুমন্ত প্রবৃদ্ধি’ মনে করা হয়৷ কেননা, এটি মূলত নিউটনের গতির প্রথম সূত্রের মতো।
আর গত বছরের এ রকম ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের পরও যেহেতু প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ পেরিয়েছে, তাই অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতার সময় আগামী অর্থবছরের স্বাভাবিক সময়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ‘সুবাস’ পেয়েছেন বলেই মনে হয়। কিন্তু ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইলে রাজস্ব কার্যক্রম ও সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগে একটি ব্যাপকভিত্তিক প্রণোদনা দিতে হবে। বিদায়ী অর্থবছরে এত সংকটের পরেও বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সহজাত শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে অবশ্য দ্বৈত সম্প্রসারণ দরকার। বর্তমানে এটি ‘একক’ সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে, যেখানে রাজস্ব সম্প্রসারণ আশাব্যঞ্জক হলেও মুদ্রানীতি এখনো অনেকটা সতর্ক। আশা করা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে মিল রেখে আগামী মুদ্রানীতিও খানিকটা সম্প্রসারণমূলক হবে। তাহলে ৭ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য খুব একটা বড় হবে না। অনেকে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মনে করলেও আসলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেটে কিছু প্রণোদনা ও পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থা থাকলেও এটি আসলে অর্থনীতিতে শুধু গতির সূচনা করবে। বেসরকারি বিনিয়োগের মূল দুটো সমস্যা অবকাঠামো আর জ্বালানি-সংকটের টেকসই সমাধানের ব্যাপারে ৮০ হাজার কোটি টাকার এডিপিতে দৃঢ় পদক্ষেপের ইঙ্গিত নেই। এর প্রধান কারণ হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) আগামী অর্থবছরেও মূলত গতানুগতিক থাকবে—এখানে নিম্ন অভিঘাতসম্পন্ন প্রকল্প থেকে উচ্চ মানসম্পন্ন মধ্যমেয়াদি সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিতে উত্তরণের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। তাই টাকা অনেক বিশাল দেখালেও এডিপি মূলত একটি সম্প্রসারণশীল গহ্বরে বিলীন হবে বলে আশঙ্কা হয়। এডিপি বরাদ্দের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে এবং ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেওয়া হলেও তা মরুর বুকে কয়েক ফোঁটা পানির মতোই হয়তো সাময়িক কাজ করবে। আগামী অর্থবছরে অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে না বলে ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর থেকে জিডিপির অর্ধেকের মতো হলেও এ মহাসড়কটি এ পর্যন্ত ছয় লেনে উন্নীত করার কথা চিন্তাই করা হচ্ছে না। অতি লোভে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের অকালপ্রয়াণ হয়েছে বলে চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চল গ্যাস-সংকটে ধুঁকছে। এসব সংকট সমাধানের উদ্যোগ বাজেটে নেই। অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী অবশ্য দেরিতে হলেও যথাযথই বলেছেন যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে আয়করই আমাদের ভবিষ্যৎ। অনেক দিন ধরেই আমাদের আয়বৈষম্যের মাত্রাটি অনেক উঁচু এবং বেশ চেষ্টা-তদবির সত্ত্বেও খুব একটা নিচে নামছে না। তাই আয়ের এই বিরাট অসমতা এবং অল্পসংখ্যক লোকের হাতে ব্যাপক সম্পদ জমা হওয়ার প্রবণতা হ্রাস করতে ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যক্তিগত আয়ের ওপর একটি অতি-আয়কর ধার্য করেছেন তিনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো আসে মূলত আমাদের ‘ধারণা’ ও জনপ্রিয় দাবিগুলো থেকে—করের অভিঘাত ও নিট সামাজিক উপকারের বিশ্লেষণ থেকে নয়। এতে উঁচু আয়-অসমতা ও অর্থনীতিতে অন্যান্য ব্যাধি স্থায়ী হচ্ছে। আমাদের আয়কর কাঠামো অনেক দিন ধরেই অধোগতিশীল। প্রস্তাবিত নতুন আয়কর কাঠামোও একে বদলে দেবে না। এতে মধ্যম আয়ের নাগরিকেরা বেশি হারে কর দেবেন এবং উঁচু আয়ের মানুষ আয়কর দেবেন কম হারে। অন্যদিকে, বেশির ভাগ উচ্চমধ্যবিত্ত ব্যক্তি মোট কর দেবেন প্রগতিশীল করের চেয়ে অনেক কম। কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দের কার্যকর প্রবাহ আঞ্চলিক অসমতা দূর করার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আদায়ে একটি পূর্বশর্ত। এটি উঁচু প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হিসেবেও কাজ করে। মধ্যমেয়াদি বাজেটকাঠামো ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮-তে স্থানীয় সরকার বিভাগের বাজেটের সিংহভাগ আগামী অর্থছরের বাজেট থেকে স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোয় যাওয়ার কথা ছিল, যাতে তারা যে উন্নয়ন ব্যয় করবে, তা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়।
প্রস্তাবিত বাজেট এ প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোপুরি সরে গেছে। এতে বিকেন্দ্রায়ণ ও স্থানীয় সরকার শুধু নিরুৎসাহিতই হবে না, বরং স্থানীয় উৎস থেকে আয় এবং টেকসই স্থানীয় উন্নয়ন অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়বে।  দেশের উত্তর-দক্ষিণ ব্যবধান আরও প্রকট হবে। স্বপ্নের প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য তাই দরকার বেসরকারি বিনিয়োগে একটি দৃশ্যমান উল্লম্ফন, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে টেকসই ও উঁচু মানের সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক অসমতা হ্রাস। অবশ্য প্রথমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁুজিবাজারের জন্য কিছু সুবিধা ঘোষণা করার তাৎক্ষণিক ফল আমরা দেখতে পেয়েছি। আগামী অর্থবছরে প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থার বিষয়টি অবশ্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও অনেকখানি নির্ভর করবে। তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচনের পরবর্তী অর্থবছরের সুবিধাগুলো নেওয়ার বার্তাটি দেওয়ার দরকার ছিল। আমাদের দেশে অতীতে সব সময়ই এ বছরটি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ–সহায়ক ছিল। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এ বিষয়ে বাজেট পাস হওয়ার আগেই অতিরিক্ত আরও কিছু ঘোষণা দিতে পারেন। সবাইকে অবশ্য মনে রাখতে হবে যে ধ্বংস কখনো অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ভালো ফল বয়ে আনে না। আর এটি অর্থনীতির সহজাত অন্তর্নিহিত শক্তিকে ধ্বংস করলে তার পরিণাম সবাইকে ভোগ করতে হয়।
ড. মাহফুজ কবীর: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক।
mahfuzkabir@yahoo.com