Sunday, February 17, 2019

হলোগ্রামে দেখা মুখ by রায়হান রাইন


সাইকেল
তাহমিনা বেগম স্বপ্নে দেখেন, লিজার বাবা একটা নতুন সাইকেল নিয়ে ঢুকছেন উঠানে। তাঁকে খুব হাস্যোজ্জ্বল আর সুখী দেখাচ্ছে। লিজার মাকে দেখতে পেয়েই বললেন, ‘লিজার জন্য কিনে আনলাম। কত দিন ধরে আবদার করছে মেয়েটা।’
‘কিন্তু লিজা তো নেই। তুমি যেন কিছুই জানো না!’
লিজার বাবাকে খানিকটা বিচলিত দেখাল। তিনি লিজার মায়ের ভুল ভাঙাতে চাইলেন, ‘তুমি যেটা বলতেছ, সেটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।’
‘কিন্তু এখন কি আমি স্বপ্ন দেখতেছি না?’
‘ওই যে, দেখো লিজা আসতেছে।’
স্কুলের পোশাক পরা লিজা বেরোল ঘর থেকে। সে উঠানে এসে সাইকেলসহ বাবাকে দেখে খুশি হলো এবং সাইকেলটা নিয়ে উঠানের আয়তাকার জায়গাটাতে চালাতে চেষ্টা করল।
তাহমিনা বেগম লক্ষ করলেন মেয়ের মাথার চুল এলোমেলোভাবে কাটা। হাত ও মুখে আঘাতের চিহ্ন। জঙ্গলে ওর মৃতদেহ পাওয়ার আগে কাটা চুলগুলো পাওয়া গিয়েছিল খালের পাড়ে। তাহমিনা বেগম মেয়ের এই হাল দেখে উদ্বিগ্ন হলেন।
‘তাহলে সেটা কি সত্যিই দুঃস্বপ্ন ছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী দেখছিলা তুমি?’
‘ঠিক তোমার দুঃস্বপ্নটার মতো। সব ঘটনাই এক।’
‘কিন্তু স্বপ্ন দুটো একই রকম ছিল কি না, আমরা তো মিলায়া দেখি নাই।’
‘আমি জানি, সবকিছুই ছিল এক। আমাদের উদ্বেগ, লিজাকে খুঁজতে বেরোনো, জঙ্গলে মৃতদেহ পাওয়া, থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা-পুলিশ তারপর অপরাধ তদন্ত বিভাগ, প্রচুর জেরা, ডিএনএ টেস্ট, মৃতদেহ কবর থেকে তোলা, কয়েকবার পোস্টমর্টেম, কিন্তু ফরেনসিক বিভাগের কোনো রিপোর্টেই মৃত্যুর কারণ লেখা না থাকা...। তখন কেউ একজন বলবে, “লিজা মরেনি। মৃত্যুর কারণ না থাকলে সে মরতে যাবে কেন?” আবার কেউ বলবে, “জীবন্ত মেয়েকে কবর দেওয়া ঠিক হয় নাই।”... এসব নিয়া হুলুস্থুল কাণ্ড, তারপর হুমকি-ধমকি...।’
‘হ্যাঁ, একদম তাই।’
‘কিন্তু দুঃস্বপ্নটা কি আমরা একসঙ্গে দেখতেছিলাম?’
‘হ্যাঁ।’
‘এখন?’
লিজার বাবাকে আনমনা দেখায়। তাহমিনা বেগম জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন কি স্বপ্নটা তুমি দেখতেছ না আমি?’
লিজার বাবা কী যেন খুঁজতে ঘরের ভেতর গেলেন। তাহমিনা বেগম দেখলেন, মেয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি কিছু একটা আঁচ করলেন আর মেয়েকে পেছন থেকে অনুসরণ করে গেলেন। লিজা আঙিনার পাশে কাঁঠালগাছের গোড়ায় সাইকেল ঠেস দিয়ে রেখে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই মায়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি সত্যিই আমাকে কবর দিয়েছ?’
সাধু
আজমত মাঝেমধ্যে সাধু-সঙ্গ করতে যেত।
একবার পরীক্ষা চলছে, ওই সময়ে উধাও হয়ে গেল। হলে ফিরল দীর্ঘদিন পর। জানা গেল, এত দিন ভারতবর্ষের নানা জায়গায়, নানা তীর্থে আর আস্তানায় সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ঘুরেছে সে।
ড্রপ-আউট এড়াতে তাকে অনেক দিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হলো। তাই দীর্ঘদিন ধরে হলে থাকতে সে বাধ্য হলো।
ক্যাম্পাসে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠল সে। বলল, নাগরিক মানুষ তাকে ক্লান্ত করে। বাসনাতাড়িত, লোভী আর কুটিল মানুষগুলোর মধ্যে থাকতে তার দমবন্ধ লাগে।
একদিন দেখা গেল কাঠের বাক্সে করে একটা সাপ নিয়ে এসেছে। সাপটাকে সে টিকটিকি কিংবা পোকা ধরে খাওয়ায়। শীতল রক্তের এই মৌনী প্রাণীটির সঙ্গে এক দুর্বোধ্য যোগাযোগ গড়ে তোলে সে।
মাঝেমধ্য তাকে জিমনেসিয়ামের পেছনের জঙ্গলে একা একা হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। কখনো শণে ঢাকা হাঁটাপথের ধারে বসে থাকে একা। কেউ কেউ বলল, জঙ্গলে থাকা শিয়ালগুলোকে সে ডেকে আনতে পারে।
প্রাণিজগতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা থেকে কিংবা মৌনী প্রাণীটির অত্যধিক নীরবতায় কিছুটা ক্লান্ত হয়েই সে একদিন একটি পাখির খাঁচা নিয়ে হলে ঢোকে। খাঁচার ভেতর দুটি নীল-সাদা বাজরিগার। কিচিরমিচির শব্দে ঘরের নীরবতা খান খান। পাখি দুটিকে সে তিল-তিসি খাওয়ায় আর তাদের দুর্বোধ্য ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা করে।
কিছুদিনের মাথায় দুটি ঘটনা ঘটল। একদিন ক্লাস থেকে ফিরে সে দেখল, সাপটা বাক্সের বাইরে আর সেটা বাজরিগার দুটিকে হত্যা করেছে। দ্বিতীয় ঘটনাটি একই রকম মর্মান্তিক—একদল পিঁপড়ের আক্রমণে সাপটির মৃত্যু হয়েছে।
এরপর থেকে একেবারে চুপচাপ হয়ে গেল সে। ক্লাসে নেই, চায়ের দোকানগুলোতে নেই, জিমনেসিয়ামের পেছনের জঙ্গলেও তাকে ঘুরতে দেখা যায় না। জানা গেল, সে আবার উধাও হয়েছে।
বহুদিন পর এক সন্ধ্যাবেলা সে ফিরে এল। তার দৃষ্টি অত্যধিক শান্ত আর অন্তর্ভেদী। মুখে অদ্ভুত রকম দীপ্তি। আমি বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি আর তার দৃষ্টির হেঁয়ালি আমাকে বিদ্ধ করছে। মৃদু হেসে সে গুনগুন করে গাইল—ভাব আছে যার গায়, দেখলে তারে চেনা যায়, সর্ব অঙ্গ তাহার পোড়া রে!

কেউ কি আরেকটি সোনালী কাবিন লিখতে পেরেছে?

কবি আল মাহমুদ শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মারা গেছেন। বেসরকারি হাসপাতাল ইবনে সিনা কর্তৃপক্ষ কবির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তিনি বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আল মাহমুদের জন্ম। লেখালেখি শুরু করেন ৫০'র দশকে। কবি হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে তাঁর খুব একটা সময় লাগেনি।
'সোনালী কাবিন' শব্দ দুটো উচ্চারণ করলেই যার নাম সামনে আসে, তিনি হচ্ছেন কবি আল মাহমুদ। গত ৫০ বছর ধরে বাংলা কবিতার জগতে আলোড়ন তুলেছেন এই কবি।
'সোনালী কাবিন' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে সাহিত্যানুরাগীদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এই কবি।
কবিতা, গল্প এবং উপন্যাস - সব শাখাতেই তাঁর বিচরণ থাকলেও, আল মাহমুদ কবি হিসেবেই ব্যাপক পরিচিত।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'লোক লোকান্তর' প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। কিন্তু কাব্যগ্রন্থ 'সোনালী কাবিন' আল মাহমুদকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায়।
আল মাহমুদের কবিতা বাংলাদেশের অনেক কবিকে প্রভাবিত করেছিল। এদের মধ্যে কবি আসাদ চৌধুরী অন্যতম।
আল মাহমুদের কবিতা শুধু তাকেই নয়, বহু পাঠককে প্রভাবিত করেছে।
বিবিসিকে আসাদ চৌধুরী বলেন " আমি অজস্র মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি সোনালী কাবিন তাদের মুখস্থ"। আল মাহমুদের কবিতার বিষয়বস্তুতে প্রথম দিকে গ্রামের জীবন, বামপন্থী চিন্তা-ধারা এবং নারী মুখ্য হয়ে উঠলেও পরবর্তীতে ইসলামী ভাবধারাও প্রবল হয়ে উঠে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে - এ সময়ের মাঝে তাঁর মতাদর্শে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের আগে বাম ধারা দেখা গেলেও ১৯৭৪ সালের পর থেকে তাঁর কবিতায় ইসলামী ভাবধারাও লক্ষ্য করা যায়।
১৯৭২ সালে আল মাহমুদ তৎকালীন গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। যে পত্রিকাটির মালিকানা ছিল জাসদের এবং সেটি সরকার বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল।
আল মাহমুদের সম্পাদনায় তখন গণকন্ঠ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ।
তিনি মনে করেন, আল মাহমুদ গণকন্ঠের সম্পাদক থাকলেও তার দলীয় কোন পরিচয় ছিলনা। রাজনৈতিক দল জাসদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও আল মাহমুদ কখনো সরাসরি রাজনীতিতে জড়াননি।
১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনে জাসদের উদ্যোগে ঘেরাও কর্মসূচীর ডাক দেয়া হয়। সেদিন রাতেই তৎকালীন গণকন্ঠের সম্পাদক আল মাহমুদকে গ্রেফতার করা হয়।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, " জাসদ গণকন্ঠের মালিক ছিল বলে আল মাহমুদ ভিকটিম হলেন। এবং তিনি অনেকদিন বিনা বিচারে কারাগারে ছিলেন"।
মহিউদ্দিন আহমেদের বর্ণনায় জেল থেকে মুক্তি পাবার পর 'অন্যরকম এক আল মাহমুদের' দেখা মিলল। তখন আল মাহমুদের মধ্যে ইসলামী ধ্যান-ধারণা প্রবল হয়ে উঠে বলে উল্লেখ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ।
আল মাহমুদ কবি হলেও তিনি নিজেকে রাজনৈতিক দর্শন থেকে দূরে রাখেননি। এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, কবি আসাদ চৌধুরী আল মাহমুদকে বিচার করেন তাঁর লেখা এবং শিল্পের বিচারে। শুরুর দিকে বামপন্থী চিন্তাধারার হলেও, সেখান থেকে সরে এসে আল মাহমুদ কেন ইসলামী ভাবধারার দিকে ঝুঁকলেন? ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
আল মাহমুদ বলেছিলেন তিনি কখনো মার্কসবাদী ছিলেন না বরং তাঁর চরিত্রে এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল।
তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, " আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক। কিভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো"।
আসাদ চৌধুরী বলেন, " বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতো তাঁরও ক্ষোভ বেশি ছিল। এবং ক্ষোভের প্রকাশটা রাজনৈতিক আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যেটা অনেকে পছন্দ করেননি। কিন্তু শিল্পীকে বিচার করতে হয় শিল্পের মাপকাঠিতে। আল মাহমুদকে বিচার করতে হবে তাঁর কবিতা দিয়ে"।
কবি হলেও আল মাহমুদ বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে কাজ করেছেন। কিন্তু বরাবরই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর কবিতাকে। লোক-লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন - একের পর এক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, " আল মাহমুদ সবসময় দাবী করতেন তিনি একজন কবি। তিনি কখনোই বলেননি যে তিনি একজন সম্পাদক"।
মি: আহমেদ বলেন, আল মাহমুদ সব সময় চাইতেন তাকে তাঁর কবিতা দিয়েই মূল্যায়ন করা হোক।
মি: আহমেদ বলেন, " একবার মাহমুদ ভাই একটা কথা বলেছিলেন , যেটা এখনো আমার কানে ভাসে। সেটা হলো যে - আর কেউ কি আরেকটি সোনালী কাবিন লিখতে পেরেছে?"
আল মাহমুদের কবিতা বহু সাহিত্যানুরাগীর মনে আলোড়ন তুলেছিল।
১৯৫০ সালের পর বাংলা সাহিত্যে যত কবির আবির্ভাব হয়েছে, শিল্পমান এবং লেখার বিচারে বিশ্লেষকরা আল মাহমুদকে সন্দেহাতীতভাবে প্রথম সারিতেই রাখছেন।
সূত্রঃ বিবিসি

নতুন মাদক খাতের বিস্তার by শুভ্র দেব

নিউ সাইকো-অ্যাক্টিভ সাবসটেনসেস (এনপিএস) মাদক ‘খাতের’ কারবারে বৈশ্বিক সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে গোয়েন্দারা। এই সিন্ডিকেট দেশীয় মাদক কারবারিদের সঙ্গে আঁতাত করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। তবে বাংলাদেশকে তারা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। খাত নিয়ে তদন্ত করছেন এমন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার মাদক কারবারিরা খাতের কারবার করতে বাংলাদেশে বড় ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। আর গ্রিন টি আমদানি-রপ্তানির নামে এই মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েছে অন্তত অর্ধশত সিন্ডিকেট। মূলত গ্রিন টির আড়ালেই তারা এই খাত বেচাকেনা করছেন। তাদের মধ্যে ৩৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে খাতের চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসছেন তারা।
ফলে এই কারবারে জড়িত দেশি হোতাদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও কাস্টম হাউজে তারা নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বেশিরভাগ সময় খাতের চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়েই আনা হয়। সময়-সুযোগ মতো পাঠিয়ে দেয়া হয় অন্য দেশে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এখন পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও কাস্টম হাউজের তৎপরতায় খাতের বড় ধরনের ১৪টি চালান ধরা পড়েছে। জব্দ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কেজি খাত। চালানের সঙ্গে জব্দ কাগজপত্র থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ছয় জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। খাতের কারবারে জড়িত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, এশা এন্টারপ্রাইজ, সেনিন করপোরেশন, আলমগীর এন্টারপ্রাইজ, মতি এন্টারপ্রাইজ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯ কেজি খাতসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেনিন করপোরেশনের মালিক এস এম বাবুল আহমেদকে। তিনি খাত কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, ইথিওপিয়া থেকে ‘চালা নুরি’ নামের এক কারবারি তার কাছে খাত পাঠান। ওই নুরি দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। গ্রেপ্তার হওয়ার আগেও নুরি তার কাছে ১৯৬ কেজি খাত পঠিয়েছিলেন। ওই খাত বাবুল যুক্তরাজ্য পাঠিয়েছেন। বাবুল তার মালিকাধীন সেনিন করপোরেশনের নামে গ্রিন টির আড়ালে এসব খাত এনে মজুত করে রাখতেন। চালা নুরি ছাড়াও জিয়াদ মুহাম্মদ ইউসুফসহ আরো কয়েকজন দেশে খাতের চালান পাঠাচ্ছেন। গত ৩০শে আগস্ট ৮৬০ কেজি খাতসহ নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজের মালিক নাজিমকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দারা। নাজিম খাত কারবারের অনেক গোপন তথ্য জানিয়েছিলেন গোয়েন্দাদের। তিনি জানিয়েছিলেন, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা এলাকার কারবারি জিয়াদ মোহাম্মদ ইউসুফ তার কাছে খাতের চালান পাঠাতেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও তার নামে ১ হাজার কেজি খাতের চালান এসেছে। তবে ইউসুফকে তিন হাজার কেজি খাত পাঠানোর অর্ডার করেছিলেন নাজিম। খাতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অভিযানের বিষয়টি ইউসুফ টের পেয়ে পরবর্তীতে আর খাত পাঠাননি।  
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার মানবজমিনকে বলেন, মূলত সিন্ডিকেট বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যববহার করত। দেশে যারা কারবারি ছিল তাদের আলাদা আলাদা নেটওয়ার্ক ছিল। আমরা খাতের বড় মাপের কারবারি নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজের মালিক নাজিমকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। তার কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে সতর্ক হয়েছি। এখন আর কোনো খাতের চালান আসতে পারছে না। কারণ বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রত্যেক কর্মকর্তা সতর্ক রয়েছেন। যদি কোনো খাতের চালান কেউ নিয়ে আসে তবে সেটা ধরা পড়বে। তিনি বলেন, নতুন মাদক আইন-২০১৯ এ খাতকে মাদকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খাতের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। তবে এখন পর্যন্ত দেশে খাতের ব্যবহারকারীকে পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গত কয়েক বছর ধরে এনপিএস বা খাতের চালান গ্রিন টির নামে বাংলাদেশে পাঠানো হলেও এ সম্পর্কে কারো ধারণা ছিল না। মূলত বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন ওইসব সিন্ডিকেট। বাংলাদেশে আসা এসব খাতের চালান ইউরোপ বা আমেরিকা পাঠানো হয়। কারণ এসব দেশে খাতের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশের মধ্যে যারা খাতের কারবারের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারবারি মাহবুবুল আলম হাওলাদার। নামে বেনামে, ভুয়া ঠিকানায় তিনি খাত আমদানি করেন। পোশাক কারখানার আড়ালে তিনি খাতের মজুত করেন। সময়-সুযোগ মতো চালান করেন বিদেশে। সূত্র বলছে, খাতের কারবার করতে দুই বছর আগে তার ভাই কামাল হাওলাদার ইথিওপিয়ায় পাড়ি জমান। সেখান থেকে কামালই দেশে খাতের চালান পাঠাতেন। গত বছর ৩৯৫ কেজি খাতসহ উত্তরার একটি বাড়ি থেকে নাজমুল ইসলাম তালুকদার ও মাহবুবুর রহমান পলাশ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যে গুদাম থেকে এই খাত জব্দ করা হয়েছে, এটি এশা এন্টারপ্রাইজের। এর আগেও এই প্রতিষ্ঠানের নামে আসা তিনটি চালান জব্দ করা হয়েছিল। সিআইডি সূত্র জানায়, খাতের সবচেয়ে বড় চালানটি জব্দ করা হয় ৯ই সেপ্টেম্বর। এ ঘটনায় পল্টন থানায় অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় শাহ আলম, একরামুল, মতি মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, আলমগীর হোসেন, সাইফুল ইসলাম, লতিফ, ওবায়দুর, জয়, বাদল, আতিকুল্লাহ, আমিন রুহুল আমিন, মুশফিক, মিজানুর, এস এম সাইফুলকে আসামি করা হয়েছে। পরে ওই সপ্তাহে মতিঝিলের ব্যবসায়ী মুন্না ও দক্ষিণ খানের রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে তিন কার্টন খাত জব্দ করা হয়।
ডিএনসি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন সময় আসা চালানের কাগজপত্র থেকে ১৯টি ঠিকানা পান গোয়েন্দারা। তবে এসব ঠিকানায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই খাতের কারবারে জড়িত বড় ব্যবসায়ীদের আটক করা সম্ভব হচ্ছে না। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ছাড়াও কেনিয়া থেকে খাতের চালান আসে। এ ছাড়া জিবুতি, উগান্ডা, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে খাতের চাষ করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা চা পাতার গুঁড়ার মতো। সেবনে আসক্তিটা ইয়াবার কাছাকাছি। অনিদ্রা, অবসাদ, ক্ষুধামন্দাসহ মানবদেহে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। গত বছরের ৩১শে আগস্ট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম খাতের চালান আটক করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ওইদিন বিমানবন্দর ও শান্তিনগর প্লাজা থেকে ৮৬০ কেজি খাতসহ নাজিম নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেন গোয়েন্দারা। উদ্ধারকৃত খাত সায়েন্স ল্যাবে পরীক্ষা করে এতে মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এরপর ৫ই সেপ্টেম্বর আবার বিমানবন্দর থেকে ২০ কেজি খাত উদ্ধার করা হয়। ৮ই সেপ্টেম্বর ১৬০ কেজি এবং ১০ই সেপ্টেম্বর ১৪৫ কেজি উদ্ধার করা হয়। ৯ই সেপ্টেম্বর বৈদেশিক পার্সেল শাখা থেকে দেশের সবচেয়ে বড় খাতের চালান উদ্ধার করা হয়। ১ হাজার ৫৮৬ কেজি খাত জব্দ করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। এরপর ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯৩ কেজি, ১৪ই সেপ্টেম্বর ১২০ কেজি ও ১৮ সেপ্টেম্বর ১০৭ কেজি জব্দ করে সিআইডি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, খাতের কারবারে জড়িত অনেককেই আটক করা হয়েছে। ইদানীং আর খাতের চালান আসছে না। তাই মনে করছি খাত আসা বন্ধ হয়ে গেছে।

নতুন দল গড়ার চেষ্টায় জামায়াত: সেক্রেটারির নেতৃত্বে কমিটি by নূর মোহাম্মদ

২০০১ সাল। চারদলীয় জোটের ভূমিধস জয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ আসে জামায়াতের সামনে। সরকারে যাওয়া উচিত হবে কি-না, গেলে মন্ত্রিসভায় যাবেন কারা, তা নিয়ে সেসময় দলটির ভেতরে বিতর্ক দেখা দেয়।
শেষ পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দলের অনেকের আপত্তি উপেক্ষা করে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। জরুরি জমানায় যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটি নতুন করে সামনে আসে। এরপর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবারই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা আজও তাড়া করছে দলটিকে। এটিসহ আরো কয়েকটি ইস্যুতে জামায়াতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। এর সর্বশেষ সংযোজন হিসেবেই দলটির সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে।
সেখানে নতুন দল গঠনে দলের সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। এজন্য সেক্রেটারির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ই জানুয়ারি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একটি অধিবেশনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ওই প্রস্তাব  কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বিবেচনা জন্য পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেখানে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের জন্য দলের সেক্রেটারির নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। চিঠিতে বলা হয়, সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত দলের আমীর, সেত্রেুটারি, অঞ্চল দায়িত্বশীল, জেলা ও মহানগর আমীরের মাধ্যমে যথা সময়ে সরাসরি জানানো হবে। এর বাইরে কারও আবেদন-নিবেদন ও অনুরোধে নেতা-কর্মীরা যাতে সাড়া না দেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয় দলের পক্ষ থেকে।
তৃণমূলে জামায়াতের চিঠি
দলের সহকারি সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকে নিয়ে সারা দেশে দৃষ্টি আকর্ষণী মর্মে একটি চিঠি পাঠিয়েছে জামায়াত। সেখানে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগে আমরা মর্মাহত। সংগঠনের এক কঠিন সময় এটা আমাদের বাড়তি কষ্টের কারণ। দীর্ঘদিন তিনি আমাদের সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে আইন অঙ্গনে সংগঠনের কঠিন সময়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অতীতের সব অবদানকে সম্মানের চোখে দেখি। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ব্যাপারে আমাদের সব কর্মীর প্রতি অনুরোধ, তার ব্যাপারে কেউ কোনো বিরূপ মন্তব্য করবেন না।
তার পদত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উনার পদত্যাগের বিষয়ে অবহিত করলে আমরা তাকে আন্তরিক অনুরোধ করেছিলাম পদত্যাগ না করার জন্য। তিনি তাতে সম্মত হননি। তিনি গণমাধ্যমে তার এ পদত্যাগের ব্যাপারে অবহিত করবেন বলে আমাদের জানালে, আমরা বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলাম মিডিয়ায় না দেয়ার জন্য। দুঃখজনক হলেও সত্য তিনি আমাদের অনুরোধটিও রক্ষা করেননি। 
এরপর শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুর ব্যাপারে চিঠিতে বলা হয়েছে, বিগত কয়েক বছর থেকে তিনি সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যে ভিন্নমত প্রকাশ করে আসছিলেন। যা সংগঠনের জন্য খুবই বিব্রতকর। গোড়ার দিকেই ঢাকা মহানগর ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা একাধিকবার তার সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলেন এবং তার সমস্ত কর্মকাণ্ড সংগঠনের শৃঙ্খলা পরিপন্থি হওয়ায় তাকে এসব পরিহার করার জন্য সর্তক করা হয়। এমনকি সে সময়ে তিনি একটি ভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এ বিষয়ে দলের আমীরের নেতৃত্ব্বে ও মহানগরীর নেতারা বসে এরকম কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য তাকে সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার প্রতি এ দরদ ও উদারতার কোনো মূল্যই তিনি দেননি।
সম্প্রতি তিনি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সফর করে জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ে লোকদের নিয়ে বিভিন্ন বৈঠক করেন যা সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে। তিনি নিজ দায়িত্বে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলার বিষয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা করেন, যা সংগঠনের রীতিনীতি ও নিয়ম-শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। যদিও তার এ উদ্যোগে সংগঠনের কঠিন দিনের সহকর্মীরা তেমন সাড়া দেননি। তার পরও একজন লোক এ সংগঠন থেকে দূরে চলে যাক সংগঠন তা চায় না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা মহানগরীর উত্তর শাখা তার সঙ্গে কথা বলে। এ ক্ষেত্রে তার বক্তব্য সন্তোষজনক ছিল না। এমনকি তার এরূপ কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে মোটেই অনুতপ্ত মনে হয়নি। তাকে দেয়া সংশোধনের সুযোগ তিনি কাজে লাগাতে পারেননি এবং বর্তমানও অনুরূপ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় তাকে ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থে তার সদস্য পদ মুলতবি করে বাতিলের জন্য দলের আমীরের কাছে সুপারিশ করা হয়। এক্ষেত্রে আমীরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে।
জামায়াত রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে: শাহ আবদুল হান্নান
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে করেন দলটির মতাদর্শের চিন্তাবিদ ও সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। তিনি মনে করেন, নতুন করে একটি দল আসতে পারে যারা সরাসরি ইসলামের কথা বলবে না, কিন্তু ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। তার মতে, দলটি এখন রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাবে এবং তারা ইসলামের প্রচার কাজ ও সমাজসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবে। অন্য একটি দল হয়তো তারা করবে, যে দলটির লক্ষ্য হবে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। দলের সংস্কার ও গতকাল জামায়াতে ইসলামী থেকে সহকারি সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগের পর মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এসব মতামত ব্যক্ত করেন এ অর্থনীতিবিদ। তার মতে, আজকে যে জামায়াত তারা ইসলামের কথা সরাসরি খুব বেশি বলেছে। পরবর্তী যে জামায়াত আসবে তারা হয়তো সরাসরি এত ইসলামের কথা বলবে না। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগকে তার ব্যক্তিগত অধিকার বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, রাজ্জাক আমার বন্ধু ও ছোট ভাই, তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং জামায়াত রাজ্জাকের অবদানের কথা স্বীকার করে যে বিবৃতি দিয়েছেন তা খুবই ভালো দিক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গোলাম আযম নিজে অনেক বছর আগে ক্ষমা চেয়েছেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর বিশাল জনসভায় তিনি ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, আমি যদি কোনো ভুল-ত্রুটি করে থাকি তবে ক্ষমা চাচ্ছি।
দুই ইস্যুতে মতভেদ
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং নতুন নামে দল গঠন নিয়েই মূলত জামায়াতে মতভেদ দেখা দিয়েছে। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক গতকাল পদত্যাগপত্রে দাবি করেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে তিনি জামায়াতকে একাধিকবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তার সেই পরামর্শ উপেক্ষা করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াতের নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানও কারাগার থেকে লেখা এক চিঠিতে দলে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ওই চিঠিতে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে কামারুজ্জামান লিখেছিলেন, প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ কী? এক. যা হবার হবে। আমরা যেমন আছি তেমনি থাকবো (বতমানে এই কৌশলই অবলম্বন করা হয়েছে)।
দুই. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত সিদ্ধান্ত নিয়ে পেছন থেকে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে। এই সংগঠন প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ধর্মহীন শক্তির মোকাবিলা করবে। তিন. আমাদের যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে তারা জামায়াতের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো এবং সম্পূর্ন নতুন লোকদের হাতে জামায়াতকে ছেড়ে দেবো। মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী ‘বিবেচনায় আনতে হবে সবকিছু’ শিরোনামে কামারুজ্জামানের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। সংস্কার ইস্যু নিয়ে জামায়াতে তখন বিতর্ক শুরু হলে ‘ইসলামী আন্দোলনে হীনম্মন্যতাবোধের সুযোগ নেই’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় একটি জাতীয় দৈনিকে। ধারণা করা হয়, আবু নকীব ছদ্মনামে কারাগার থেকে লেখাটি লিখেছেন মতিউর রহমান নিজামী।

অভিনব ব্ল্যাকমেইল by রুদ্র মিজান

রাত প্রায় দেড়টা। মেসেঞ্জারে ক্ষুদেবার্তার আগমনী শব্দ। মোবাইলফোন হাতে নিতেই দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যায় সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার। তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছিল। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এমনটি ঘটবে। নিজের উলঙ্গ ছবি দেখতে পাচ্ছেন তিনি। সারা শরীরে কোনো পোশাক নেই। ছবিটি ব্যবহার করে অনেক কিছুই বোঝানো যেতে পারে।
তিনি একজন সচিব। তার পারিবারিক, সামাজিক একটা মর্যাদার ব্যাপার আছে। ছবি দেখছিলেন আর হাত কাঁপছিল। চোখে জল জমাট হচ্ছিল। নিজেকে রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। মাইশা মাদিহা নামে যে আইডি থেকে তাকে এটি পাঠানো হয়েছে ওই আইডি ব্যবহারকারীর কাছে জানতে চান, এই ছবি দিয়ে তিনি কি করতে চান। সচিবকে জানানো হয়, এক লাখ টাকা চান তিনি। টাকা না দিলে ছবিটি ফেসবুকে, ইউটিউবে ভাইরাল করে দেয়া হবে। সচিব অনুরোধ করেন এটি ভাইরাল না করতে।
সেইসঙ্গে এত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি চ্যাটে লিখেন, আমি এত টাকা যোগাড় করতে পারব না। আমি একজন সৎ অফিসার। তার পর ওই আইডি থেকে লেখা হয়, বুঝলাম না কথা। আপনার কত টাকা,  কী করেন, না করেন, তা আমি জানি। এভাবে চ্যাট করার একপর্যায়ে এক লাখ থেকে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ নেমে আসে ৫০ হাজারে। তাতেও অপারগতা জানালে হুমকি দেয়া হয়, সচিবের মেয়ের বন্ধুদের গ্রুপে এই ছবি ছড়িয়ে দেয়া হবে। তারপরই টাকা দিতে সম্মতি জানান তিনি। টাকা দিতে প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তিনি। যদি কোনোভাবে ছবিটি প্রকাশ পায়। পরিচিত জনরা দেখতে পান- কী ব্যাখা দেবেন তিনি। কত জনকে বোঝাবেন প্রকৃত ঘটনাটি। তার মান-সম্মানের কী হবে। এ রকম নানা দুশ্চিন্তা ছিল তার মাথায়।
বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের পরামর্শে গত বছরের ১লা ডিসেম্বর রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। একইভাবে লিখিত অভিযোগ করেন সিটিটিসি’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগে। মাঠে নামেন সিটিটিসি’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের সদস্যরা। শুরু হয় তদন্ত। প্রাথমিক তদন্তেই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। পুলিশের পরামর্শে সরকারি ওই কর্মকর্তা বিকাশ নম্বর চান মাইশা মাদিহা নামের ফেসবুক আইডি ব্যবহারকারীর কাছে। দুটি বিকাশ নম্বর দেয়া হয় তাকে। প্রথমেই পাঁচ হাজার টাকা পাঠানো হয় বিকাশে। ৫০ হাজার টাকা দেয়ার কথা সেখানে মাত্র পাঁচ হাজার- এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয় মাইশা মাদিহা আইডি থেকে। দ্রুত বাকি টাকা পাঠাতে বলা হয়। ততক্ষণে বিকাশ নম্বরের অবস্থান নিশ্চিত হয় পুলিশ। সেটি বরগুনার আমতলী। গত বছরের ৩রা ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছে যায় পুলিশ। বিকাশে পাঠানো হয় আরও পাঁচ হাজার টাকা। টাকা উত্তোলন করতে যায় এক যুবক। তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এই যুবকের নাম মহিবুল্লাহ। বরগুনা জেলার আমতলী থানার ঘোপখালী মুন্সিবাড়ির তৈয়বুর রহমানের পুত্র।
গ্রেপ্তারের পর তার পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে গত বছরের ৫ই ডিসেম্বর একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে মহিবুল্লাহ। নিজেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পরিচয় দিয়ে মহিবুল্লাহ জানিয়েছে, চায়না যেতে চাচ্ছিলো সে। চীনা ভাষা শিখতে ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেভাবেই। প্রয়োজন ছিল টাকার। সহজ পথে বেশি টাকা আয় করার জন্য বেছে নেয় ভিন্ন পথ। টার্গেট করে সমাজের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের। তাদের কাছ থেকে লাখ-লাখ টাকা আদায় করা কোনো বিষয় না বলে মনে করে মহিবুল্লাহ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আইডি খুলে মাইশা মাদিহা নামে। এই আইডি থেকেই বন্ধুতা গড়ে তুলে ওই সচিবের সঙ্গে।
নিয়মিত চ্যাট করে ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করে। নানা কৌশলে ওই সচিবকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে চেষ্টা করছিল মহিবুল্লাহ। গত বছরের ২০শে নভেম্বর রাত সাড়ে ১২টা। সারা দিনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি শেষে ওই সচিব সবেমাত্র বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। এরমধ্যেই ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ভিডিও কল। কলটি রিসিভ করেন তিনি। কিন্তু কোনো কথা নেই। এরমধ্যেই ঘটে ঘটনা। ভিডিও কলের মাধমে সচিবের খালি গায়ের ছবি নেয় মহিবুল্লাহ। পরবর্তীতে ওই ছবি এডিট করা হয়। এতে উলঙ্গ এক পুরুষের কোমড়ের নিচের অংশ সংযোজন করা হয়। পুরো উলঙ্গ একটি ছবি তৈরি করে ওই সচিবকে পাঠিয়ে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করে মহিবুল্লাহ।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ওই সচিব জানান, তখন গরমের দিন। লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এরমধ্যেই ভিডিও কল। তিনি বুঝতে পারেননি ঘটনাটি এভাবে ঘটবে। 
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিটিটিসি’র সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক নাজমুল নিশাত বলেন, মহিবুল্লাহ আরও অনেককে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছে। তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে হয়তো আরও অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর মহিবুল্লাহ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বর্তমানে সে কারাগারে রয়েছে বলে জানান তিনি।

জামায়াত থেকে আমাকে বহিস্কার করা হয়েছে -মঞ্জুর আবেগময় স্ট্যাটাস

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে দলটির ঢাকা মহানগরীর নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জুকে। ফেসবুকের ব্যক্তিগত টাইমলাইনে দেয়া এক স্ট্যাটাসে শিবিরের এই সাবেক সভাপতি নিজেই এ কথা জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মঞ্জু তার দীর্ঘ স্ট্যাটাসে দলে তার ভূমিকা, বহিস্কারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান, নেতৃত্বে আসা এবং সংগঠনটির কার্যপরিচালনায় আবেগময় স্মৃতিচারণ করেছেন। এছাড়া স্ট্যাটাসে তিনি শিবির থেকে জামায়াত যোগদানের পর তার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। সর্বোপরি, তিনি দীর্ঘদিনের চলার সাথীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।
নিচে তার স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেয়া হলো--
গতকাল ১৫ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার, আনুমানিক রাত সাড়ে সাতটার দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর জনাব মকবুল আহমদের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিষদের একজন সম্মানিত সদস্য আমাকে জানান যে আমার দলীয় সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।
বেশ কয়েক বছর যাবত সংগঠনের কিছু বিষয়ে আমি দ্বিমত করে আসছিলাম। মৌখিক ও লিখিতভাবে বৈঠকসমূহে আমি প্রায়ই আমার দ্বিমত ও পরামর্শের কথা সম্মানিত দায়িত্বশীলদের জানিয়েছি।
আভ্যন্তরীণ ফোরামের পাশাপাশি আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ্যেও আমি আমার ভিন্নমত প্রকাশ করে এসেছি।
আমি যেহেতু সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করি এবং প্রকৃতিগত কারণে আমাকে নানা ধরনের আড্ডা, ঘরোয়া আলোচনা, সেমিনার এ অংশ নিতে হয়। সেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন-পরিবর্তন প্রসঙ্গে আমি অনেক জায়গায় খোলামেলা মত প্রকাশ করে থাকি। এসব আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে মিসর, মালোয়েশিয়া, তুরস্ক, তিউনিশিয়ার ইসলামী ধারার রাজনীতির উত্থান পতন ও বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো উঠে আসে। জামায়াতে রাজনৈতিক সংস্কারের যৌক্তিকতা, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা প্রসঙ্গে আমার সুস্পষ্ট মত ছিল যে, জামায়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমার এরূপ খোলামেলা মত নিয়ে জামায়াতের সম্মানিত নেতৃবৃন্দের মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরী হয়।
বছর কয়েক আগে শিবিরের সাবেক সেক্রেটারী জেনারেল শিশির মুহাম্মদ মনিরের মোবাইল ফোন হ্যাক করে পুলিশ তুরস্কের গুলেন মুভমেন্ট সংক্রান্ত একটি মতামত জাতীয় মেসেজ পায়। যার ভিত্তিতে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তার বাসায় অভিযান চালায়। শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুর রহমান ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের কৌশলী আসাদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন সংবাদপত্রে এ নিয়ে একটি বানোয়াট রিপোর্ট ছাপা হয়। রিপোর্টে গুলেন মুভমেন্টের আদলে বাংলাদেশে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রকারী ও পরিকল্পপনাকারী হিসেবে আমিসহ ১১ জনের একটি কল্পিত বৈঠকের বর্ণনা করা হয়। এর ভিত্তিতে আমাদের সকলের বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রবিরোধী  (সেডিশন) মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তখন আমি গ্রেপ্তার ও পুলিশি নির্যাতন এড়ানোর জন্য আত্মগোপনে চলে যাই। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আমি জানতে পারি যে, সংগঠনের উর্ধতন দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জেলা ও অধস্তন শাখাগুলোতে আমিসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মৌখিক সার্কুলার জারি করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আমি গুলেন মুভমেন্টের আদলে একটি ভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলার জন্য কাজ করছি, অতএব আমার কথাবার্তা ও কার্যকলাপে জনশক্তি যাতে বিভ্রান্ত না হয়। তারা যাতে আমাকে এড়িয়ে চলে।
আমি জামায়াতের একজন সদস্য অথচ আমার কাছ থেকে কিছু জানতে না চেয়ে, আমাকে জবাবদিহির আওতায় না এনে বা আমি যদি দোষ করে থাকি সে বিষয়ে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে আমার বিরুদ্ধে সার্কূলার জারি করায় আমি এর প্রতিকার চেয়ে আমীর বরাবর আবেদন জানাই। তথ্য প্রমাণসহ আমার স্পষ্ট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের সম্মানিত আমীর, সেক্রেটারী জেনারেল, এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারী জেনারেল, মহানগরী আমীরসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে আমাকে নিয়ে বসেন। তারা আমাকে জানান যে, বিষয়টা নিয়ে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে আমি যেরকম সার্কুলারের কথা শুনেছি বিষয়টা তা নয়। তারা আমাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যে, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা বা ঘরোয়া সেমিনারে কিংবা ফেসবুকে আমি পরোক্ষ পন্থায় যে ধরনের খোলামেলা মত প্রকাশ করি তা শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্র বিরোধী। আমি লিখিতভাবে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করি ও তাদের অভিযোগ খন্ডণ করি। বিনয়ের সঙ্গে জানাই যে, আমি সংগঠনের আভ্যন্তরীন নানা অনিয়ম ও সংস্কার প্রসঙ্গে সংগঠনের ফোরামে আমার সুস্পষ্ট মত-দ্বিমত উল্লেখ করি। কিন্তু জনসম্মুখে আমার সকল মত পরোক্ষ। তাতে শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্রের কোন লঙ্ঘন হয় না। তাছাড়া আমি সংগঠনের পদস্থ কোন দায়িত্বশীলও নই।
তারা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি আয়োজিত ‘চলমান রাজনীতি ও আগামীদিনের বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে আমার উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধ সেখানে প্রমান হিসেবে হাজির করেন। যাতে আমি বলেছি, বাংলাদেশে সেকুলার, গণতন্ত্রী ও ইসলামী সব রাজনৈতিক দল ব্যর্থ হতে চলেছে। তৃতীয় শক্তি নামে যারা এসেছে তাদের প্রতিও জনগণের কোন আস্থা নেই। ফলে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের উন্মেষ অপরিহার্য যারা মানবাধিকার, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশ উপহার দিতে পারে। যারা হবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধে অনুপ্রাণিত কিন্তু ধর্মীয় দল নয়। যে দল হবে গণমুখী ও আপাত: উদারনৈতিক। এই প্রবন্ধে ইসলামী রাজনৈতিক দল ব্যর্থ হতে চলেছে মর্মে আমি যে, বিশ্লেষণ দিয়েছি সে ব্যপারে তারা আপত্তি তোলেন।
জামায়াতে ইসলামীর সদস্য হয়ে একটি প্রকাশ্য সভায় ইসলামী দল ব্যার্থ হতে চলেছে এরকম মত দিতে পারি কিনা তারা সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলি যে, এখানে আমি সামগ্রিকভাবে ইসলামী দলগুলোর কথা বলেছি, জামায়াতের নাম সুস্পষ্টভাবে বলিনি। তাছাড়া এটা একটা ঘরোয়া সেমিনার এবং এতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি বক্তব্য দিয়েছি। জামায়াতের নেতা বা কর্মী হিসেবে মত প্রকাশ করিনি। আমি শুধু জামায়াতের সদস্য নই, রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিকও বটে। আমি যখন জাতীয় রাজনীতির কথা বলবো তখন সব মত পথ ও মতাদর্শের রাজনৈতিক কথাই বলতে হবে। আমি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ বিএনপির সমলোচনা করতে পারবো, কিন্তু নিজেদের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাব তা কীভাবে সম্ভব। আমিতো ইসলামী রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে অনেক ইতিবাচক কথা বলেছি। কিন্তু আত্মসমলোচনামূলক বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে আমার মতটাতো একপেশে হিসেবে গণ্য হবে। অতএব আমি মনে করি এ জাতীয় মতপ্রকাশে কোন সমস্যা নেই।ৎ
যাই হোক, নেতৃবৃন্দ আমার সব কথা শোনার পর স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, জামায়াতের একজন সদস্য হিসেবে এরকম মত প্রকাশ করার সুযোগ নেই। এটা শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কাজ। তারা আমাকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করি এবং আমার অবস্থানে অটল থাকি।
আমি ভেবেছিলাম এই স্পর্ধা ও মতামতের পর নেতৃবৃন্দ আমার ওপর চরমভাবে অসন্তুষ্ট হবেন এবং সাংগঠনিক ব্যবস্থা স্বরুপ আমার সদস্যপদ বাতিল করবেন। কিন্তু তারা আমার প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল, উদার ও দরদী আচরণ করেন। তারা আমাকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিশ্বস্ত কাজে সংযুক্তও করেন। সদ্য সমাপ্ত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামায়াতের অংশগ্রহণ নিয়ে আমার দ্বিমত ছিল। তারপরও নির্বাচনের পূর্বে আমি সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জাতীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়, সংলাপ, বৈঠকসহ একটি নির্বাচনী আসনে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেছি।
নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমি কিছু স্বাধীন মত প্রকাশ করি। যাতে আমি সরকারের নির্লজ্জ ভোট ডাকাতি ও বিরোধী জোট এবং দলগুলোর সমলোচনা করি। রাজনৈতিক দলের নেতাদের দায় স্বীকার করে পদত্যাগের আহবান জানাই। শুধু তাই নয়, আমি নিজের দায় থেকেও অক্ষমতা অপারগতার জন্য ক্ষমা চাই।
সম্প্রতি গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি’২০১৯ তারিখে আমি ফেসবুকে ‘তরুণ ও তরুণোর্ধদের নতুন রাজনীতি’ নামে একটি স্ট্যটাস দিই। যাতে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাবনাময় তরুণদের তাদের দলমতের গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সংগঠিত করার আহবান জানাই। এ আহবানে অনেকেই উৎসাহ বোধ করেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন দলীয়, নির্দলীয়, আমার পরিচিত বন্ধু স্বজনদের কৌতুহ তৈরী হয়। ফেসবুকে নামে বেনামে বিভিন্ন আইডি থেকে আমি জামায়াত ভেঙ্গে নতুন দল করছি বলে প্রচারণা চলতে থাকে।
গত কয়েক সপ্তায় আমি ব্যক্তিগত বা পেশাগত কাজে যেখানেই গিয়েছি আমার বন্ধু স্বজনদের অনেকেই এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে কথা বলেন। কেউ কেউ তাদের নিজস্ব বন্ধু সার্কেলে আমাকে দাওয়াত দেন। আমি সিলেট ও ঢাকার উত্তরায় এ রকম দুটি সার্কেলে যোগদান করি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলি। সেসব আলোচনায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, ঐক্যফ্রন্ট সকল বিষয়েই আলোচনা হয়। আমি আমার মত ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করি। আমি জানতে পারি যে, ফেসবুকের নানা প্রচারণা ও আমার এসব মত প্রকাশে জামায়াতের দায়িত্বশীলগণ পূণরায় অসন্তোষ বোধ করছেন এবং আমার গতিবিধি চলাচল মনিটরিং করছেন। তারা আবারও অধস্তন শাখা ও জেলাসমূহে আমার বিরুদ্ধে মৌখিক সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন।
গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি জামায়াতের একজন নির্বাহী পরিষদ সদস্যের নেতৃত্বে ৩ জন সম্মানিত দায়িত্বশীল আমার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। তারা আবারও আমার বিরুদ্ধে গঠণতন্ত্র লঙ্ঘন ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বিনয়ের সঙ্গে আমি তাদের জানাই যে, আমি জামায়াতের একজন নগণ্য সদস্য এবং দেশের নাগরিক। স্বাধীন মত প্রকাশ আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাষ্ট্রীয় অধিকার। আমার মত প্রকাশে জামায়াতের গঠণতন্ত্র বা শৃঙ্খলার কোন লঙ্ঘন হয় না বলে আমি মনে করি। আমি যা করি তা স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য। এখানে ষড়যন্ত্র বা গোপনীয়তার কিছু নেই। আমি তাদের মাধ্যমে জামায়াতের আমীর বরাবর একটি লিখিত বক্তব্য ও ব্যখ্যা প্রদান করি। আমার বিরুদ্ধে জামায়াত ভেঙ্গে নতুন দল গঠণের যে অপপ্রচার তার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানাই। তারা অসন্তুষ্টচিত্তে আমার আবেদন গ্রহণ করেন এবং জামায়াতের আমীরের নিকট তা উপস্থাপণের আশ্বাস দেন।
আমার আবেদনের বিষয়ে কোন তদন্ত না করে গতকাল রাতে আমাকে টেলিফোনে জানানো হয় আমার সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। মনে ভীষণ ব্যথা ও কষ্ট অনুভব করলেও আমি সন্তুষ্টচিত্তে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।
১৯৮৮ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদানের মাধ্যমে আমি ইসলামী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। যাদের দাওয়াতে আমি এই আন্দোলনের সন্ধান পাই আমার বিবেচনায় তারা তৎকালীন সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৯টি খ্যাতনামা ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম স্বশরীরে পর্যবেক্ষণের সুযোগ আমার হয়েছে। আমার মনে হয়েছে এগুলোর চাইতে ইসলামী ছাত্রশিবির সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। আমার শিবিরে যোগদান ছিল আমার পরিবারের সঙ্গে একটা বিদ্রোহ। শিবিরের কর্মী হওয়ার অপরাধে আমাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও গৃহবিতাড়িত হতে হয়েছে। সেই থেকে সংগঠনই আমার পরিবার।
৮৮ থেকে ২০০৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি শিবিরে ছিলাম। এই ১৫ বছরের সংগ্রামী জীবন আমার শ্রেষ্ঠ সময়। আমার জ্ঞান, দৃষ্টি ও সাহসের বিকাশ এই সংগঠনেই হয়েছে। আমি সত্য বলতে, ন্যায়ের পক্ষে থাকতে, নিঃসঙ্কোচে মতপ্রকাশ করতে এবং জেল জুলুম ও গুলি বোমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদ্রোহ করতে শিখেছি এই আন্দোলনে এসে। আমার কাছে শিবিরের অনুষ্ঠান গুলোতে সবচাইতে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল ‘সাধারণ প্রশ্নোত্তর’। যা খুশি তা প্রশ্ন করা যেতো। আহ্ কী অপরিসীম স্বাধীনতা। কী অদ্ভুত পরিচ্ছন্নতা, স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা! আমি এখনো মনেকরি ‘চির উন্নত মম শির আমার প্রাণের ছাত্রশিবির’।
সত্যি কথা বলতে, ২০০৪ সালে জামায়াতে যোগদানের পর আমি কিছুটা থমকে যাই। জামায়াত বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন ও প্রচলিত পূঁতি গন্ধময় রাজনীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পথ চলার এক চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী তাদের কর্মসূচি ও কর্মনীতিতে গতিশীলতা নেই। আমি মনে করি প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইসলামী রাজনীতির পথে পা বাড়াতে জামায়াত প্রস্তুতির আগে ময়দানে নেমে পড়েছে। ফলে সময় আসার আগেই তারা কঠিন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে। যে বাঁধা তারা মোকাবিলা করেছে তা অবিস্মরণীয়।
রাসূল (স.) এর আন্দোলন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে যখন ওপেন হয় তা আর আন্ডারগ্রাউন্ডে ফিরে যায়নি। তা বিজয় পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়েছে। বাংলাদেশে জামায়াত একাধিকবার ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে আবার কয়েকবার আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে হয়েছে। জামায়াতের কারণে এখানে ইসলাম সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমাজে জামায়াতের লোক মানেই সৎ, আদর্শবান, বিবেকবান, ভাল মানুষ। এই স্বীকৃতি বিশাল একটা অর্জন।
জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু দায়িত্বশীল ও উল্লেখযোগ্য সাবেক শিবির সভাপতিদের উপস্থিতিতে ২০০৭ সালে মীর কাসেম আলীর ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে জামায়াতের জন্য যে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছিল তা ছিল একটি অসাধারণ কৌশলপত্র। যদি তখন থেকে তার বাস্তবায়ন শুরু হতো তাহলে বাংলাদেশেও আজ তুরস্ক বা মালোয়েশিয়ার মত ইসলাম ও ন্যায়পরায়ন শাসনবান্ধব সরকার ক্ষমতায় আসীন হতো বলে আমার বিশ্বাস। পরবর্তীতে মু. কামারুজ্জামান আরও প্রাগম্যটিক ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেসব কোনটাই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। জামায়াতে ভেতরকার নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি বা আলোচনা সম্পর্কে বাইরের কারও জানার সুযোগ নেই। এমনকি সর্বোচ্চমানের সদস্যরাও তা জানতে পারে না। এসব আলোচনা বাইরে এলে তা হয় গঠণতন্ত্র ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী। তাহলে তো জামায়াত কেবল পরিবেশ পরিস্থিতিতে বাধ্য হওয়া ছাড়া কোন পরিবর্তন করবে না।
যেমন আছে তেমনই থাকবে। সাধারণ মানুষের চিন্তা, সাধারণ সদস্য বা কর্মীর চিন্তার সঙ্গে দলের নীতি নির্ধারকদের সংযোগ কীভাবে ঘটবে তাহলে?
আমি সামান্য কিছু আলোচনাকে নিজ দায়িত্বে ওপেন করেছি। দেশের শীর্ষস্থানীয় চিন্তক ও বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে জামায়াতের ভাল দিক দূর্বলতার দিক নিয়ে খোলাখুলি মতবিনিময় করেছি। জামায়াতকে নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে জামায়াতের কী কী বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন তারা তা বলেছে। আমি গুরুত্বপূর্ণ লোকদের সঙ্গে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সাক্ষাত ও মতবিনিময়ের সংযোজক হিসেবে কাজ করেছি। হয়তো এজন্য তাদের দৃষ্টিতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে। সংগঠনের অনেক ক্ষতি হয়েছে, সেজন্য তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তবুও আমার প্রিয় দায়িত্বশীলদের কাছে আমি আজ ঋণী। মেনে নিচ্ছি তাদের বিবেচনায় তারা সঠিক। আমার আবেগ বোধ শক্তি সবই ভুল। তাই আমার আজ কোন আফসোস নেই। তারা আজ আমাকে মুক্ত করে দিয়েছেন। আমার ৩০ বছরের সাংগঠনিক জীবন শেষ। আমি এখন থেকে ইচ্ছেমত আমার কথা লিখতে পারব, বলতে পারব। রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে আমার স্মৃতি-অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারব। আমি যে স্বপ্ন দেখি তার জন্য এখন নি:শঙ্কচিত্তে কাজ করবো। যার জন্য আমাকে শত শত হাজার হাজার ভাই বোনেরা ভালবাসেন, উৎসাহ দেন, দেশের আনাচে কানাচে দূর দুরান্ত থেকে ফোন করেন, ডাকেন তাদের কাছে ছুটে যাব- কাজ করবো।
আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু এই বিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি যে, এই আন্দোলন আবার ঘুরে দাঁড়াবে। এই সংগঠন কামারুজ্জান, মীর কাসেম আলী ও ব্যরিস্টার আব্দুর রাজ্জাকদের প্রস্তাব একদিন গ্রহণ করবে। শহীদ নিজামী ভাই নেই, মুজাহিদ ভাই, কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, মোল্লা ভাইসহ শত শত শহীদের রক্ত একদিন কথা বলবে।
বিদায় হে প্রিয় কাফেলার সাথীরা।
যারা আমাকে ভালবাসেন তারা দোয়া করবেন। যারা ঘৃণা করেন তারা ক্ষমা করে দেবেন। বিদায় বেলায় সেই স্মৃতি বিজড়িত গানটি হৃদয়ে বাজছে-
আমি আর নেই সেই মিছিলে,, ভাবতেই বন্ধু বুক ভেঙ্গে যায়....।

যে কারণ দেখিয়ে দল ছাড়লেন রাজ্জাক

জামায়াত ছাড়লেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। বৃটেন থেকে দলের আমীর মকবুল আহমদের    কাছে গতকাল সকালে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। দুটি কারণ উল্লেখ করে পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি এবং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে বৃটেনে অবস্থান করছেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং সংস্কার ইস্যুতে দলের মধ্যে টানাপড়েন চলার মধ্যেই পদত্যাগ করলেন তিনি।
পদত্যাগপত্রের শুরুতেই, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দলীয় প্রধানকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, পরম শ্রদ্ধেয় মকবুল ভাই, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আজ এই মুহূর্তে আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করছি। এটি আমার জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত। ১৯৮৬ সালে যোগদানের পর থেকে আজ অবধি আমি সততা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করেছি।
বিগত তিন দশক ধরে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সাধ্যমতো পালন করতে সচেষ্ট থেকেছি। প্রধান কৌশলী হিসাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মামলা আস্থা, সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে পরিচালনা করেছি। আমার বিশ্বাস, জামায়াতের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শুধু ইসলাম নির্দেশিত কর্তব্যই নয়, দেশের প্রতিও দায়িত্ব পালন সম্পন্ন হয়।
জামায়াতে ইসলামী দুর্নীতি মুক্ত রাজনীতি, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও দলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মাধ্যমে দেশের জন্য অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ নাগরিক তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এতদসত্ত্বেও জামায়াত একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ হয়ে পড়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে, জামায়াত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছে। এই দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জামায়াত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নয়। অধিকন্তু জামায়াত গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সকল সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে; যেমন, কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ), পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) এবং ডেমোক্রেটিক একশন কমিটি (ডাক)। একইভাবে গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে ৮-দল, ৭-দল ও ৫-দলের সঙ্গে জামায়াত যুগপৎভাবে রাজপথে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। দলটির এ সকল অসামান্য অবদান ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে স্বীকৃতি পায়নি। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সকল সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে।
এসব কারণে আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি এবং এখনো করি যে, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয় বরং তৎপরবর্তী প্রজন্মকে দায়মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি কর্তব্য।
আমি বিশ্বাস করি, ইসলাম ও স্বাধীনতা সংগ্রাম বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তি। এ দুটি কোনো অবস্থাতেই আপসযোগ্য নয়, জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এই দুটি উপাদানকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করার সুযোগ নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপলব্ধি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জুলুম, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিস্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেনি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর আজও দলের নেতৃবৃন্দ ৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি।
এমনকি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেনি। তাই অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে, জাতির কাছে নিজেদের সেই সময়কার নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক দল, ইতিহাসের কোনো এক পর্বে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি-বিচ্যুতির শিকার হতে পারে। কিন্তু তাকে ক্রমাগত অস্বীকার করে, সেই সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান বজায় রাখা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং আত্মঘাতী রাজনীতি। তা কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
আমি বিগত প্রায় দুই দশক নিরবচ্ছিন্নভাবে জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, ’৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। সুনির্দিষ্ট কারণসমূহ উল্লেখ করে যে যে সময় আমি বিষয়টি দলের শীর্ষ সংস্থা ও নেতৃত্বের কাছে উত্থাপন করেছি তার কয়েকটির বিবরণ দিতে চাই-
ক) ২০০১ এর অক্টোবর মাসে জামায়াতের তৎকালীন আমীর ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। বিজয় দিবস উদযাপনের আগেই ৭১-এর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য আমি জোরালো পরামর্শ দিয়েছিলাম। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বক্তব্যের খসড়াও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। খ) ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে আবারো ৭১ নিয়ে বক্তব্য প্রদানের পক্ষে আমি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করি। আমার সেদিনের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। গ) ২০০৭-২০০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময় জামায়াতের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ভিন্ন মাত্রা পায়। তখনও ’৭১ প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদানের জন্য জামায়াতকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। ঘ) আমি ২০১১ সালে মজলিসে শূরার সর্বশেষ প্রকাশ্য অধিবেশনে বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করি। দলের নেতৃত্ব প্রদানে এগিয়ে আসার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতি আমি বিশেষ আহ্বান জানাই। আমার সেই প্রস্তাব শীর্ষ নেতৃবৃন্দের একাংশের অবহেলার নিকট পরাজিত হয়। ঙ) ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ আপনাকে পাঠানো ১৯ পৃষ্ঠার চিঠিতে ৭১ প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদানের জন্য আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম। তাতে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে নতুন আঙ্গিকে রাজনীতি শুরু করার আহ্বানও জানিয়েছিলাম।
চ) ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে আপনি আমীর নির্বাচিত হওয়ার অব্যবহিত পর এ বিষয়ে আমার মতামত চাওয়া হয়েছিল। আমি জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া সংক্রান্ত একটি খসড়া বক্তব্য পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। ছ) সবশেষে,  ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জানুয়ারি মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেই। অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্তি করে দিন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমার তিন দশকের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
’৭১ প্রসঙ্গে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য প্রদানের ব্যর্থতা এবং ক্ষমা না চাওয়ার দায়ভার আজ তাদেরও নিতে হচ্ছে যারা তখন এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জিড়িত ছিল না, এমনকি যারা ৭১-এ জন্ম গ্রহণও করেনি। অধিকন্তু, অনাগত প্রজন্ম যারা ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জড়িত হতে পারে তেমন সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদেরও এই দায়ভার বহন করতে হবে। এই ক্রমাগত ব্যর্থতা জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসাবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে জামায়াত জনগণ, গণরাজনীতি এবং দেশ বিমুখ দলে পরিণত হয়েছে।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, জামায়াতে যোগদান করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ভেতর থেকেই সংস্কারের চেষ্টা করবো। বিগত ৩০ বছর আমি সেই চেষ্টাই করেছি। আমি কাঠামোগত সংস্কার ও নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলাম। আমার সংস্কার বিষয়ক ভাবনাগুলো মৌখিক ও লিখিতভাবে দলের সামনে একাধিকবার উপস্থাপন করেছি। এ ব্যাপারে কমবেশি সকলেই অবহিত আছেন। ২০১৬ সালে আপনার কাছে লিখা চিঠিতে আমি অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সংস্কারের উদাহরণ দিয়েছি। সবশেষে, বিশ্ব পরিস্থিতি ও মুসলিম দেশগুলোর উত্থান পতনের আলোকে জামায়াতের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে আমূল পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিবারের ন্যায় কোনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি।
বাংলাদেশের যুবসমাজ সচেতন, শিক্ষিত এবং আলোকিত। তারা চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল। সর্বোপরি তারা দেশপ্রেমিক এবং দেশের পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ও সক্ষম। এই সচেতন যুবসমাজের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে থাকলেও বৃহত্তর যুবসমাজকে নেতৃত্ব দিতে জামায়াত সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সময়ের সে দাবি অনুযায়ী জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি।
তিনি পদত্যাগপত্রে আরো বলেন, অতীতে আমি অনেকবার পদত্যাগের কথা চিন্তা করেছি। কিন্তু এই ভেবে নিজেকে বিরত রেখেছি যে, যদি আমি অভ্যন্তরীণ সংস্কার করতে পারি এবং ’৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তা হবে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই। সেই সঙ্গে ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। পরিশেষে, জামায়াত থেকে পদত্যাগের পূর্বমুহূর্তে একটি বিষয় বলা আমার দায়িত্ব মনে করছি। গত দশ বছরে জামায়াত নেতৃবৃন্দ অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছেন। তা এখনো অব্যাহত। এটি প্রশংসনীয় যে, এই কঠিন ও বৈরী সময়েও ব্যাপক কষ্ট এবং অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে জামায়াত নেতৃবৃন্দ দলের ঐক্য বজায় রেখেছেন। দলের প্রতি তাদের নিষ্ঠা এবং একাগ্রতা অনস্বীকার্য। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আপনার বিশ্বস্ত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, বারকিং, এসেক্স, যুক্তরাজ্য।

সি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক স্বপ্নে বাধা by বেন ওয়েস্টকট

২০১৭ সালের জানুয়ারি। ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পোডিয়ামে দাঁড়ানো চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং। তখন আন্তর্জাতিক নেতাদের মধ্যে একরকম প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেখানে সি জিনপিং বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাণিজ্যের পক্ষে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তখন তাকে বিশ্বজুড়ে সরকার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভূয়সী প্রশংসা করে। এরপর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শওয়াব বলেছিলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য।
এর দুই বছর পরে আন্তর্জাতিক সেই প্রত্যাশা ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রমশ ঠান্ডা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে থাকে বেইজিং। বিগত মাত্র দুই মাসে সিনজিয়াং প্রদেশে গণহারে (উইঘুর মুসলিমদের) আটক করে রাখার নিন্দা জানায় তুরস্ক।
ব্যাপকহারে হ্যাকিংয়ের জন্য চীন সরকারকে অভিযুক্ত করে বৃটেন। ওদিকে বিশ্বজুড়ে চীনাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে খর্ব করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে বহু দেশ চীনের জায়ান্ট প্রযুুক্তি বিষয়ক কোম্পানি হুয়াওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই কোম্পানিটি তাদের ৫জি  নেটওয়ার্ক সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।
এসওএসএস চায়না ইন্সটিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেছেন, প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে যে অনাকাঙ্খিত আগ্রাসী পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতি নেয়া হয়েছে তারই প্রেক্ষিতে এসব আঘাত আসছে। তবে এক্ষেত্রে বেইজিং তার অবস্থানের পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না বলে তিনি সতর্ক করেছেন।  তিনি বলেন, সি জিনপিং চীনের রাজনীতি পাল্টে ফেলেছেন। তিনি কোনো দুর্বলতা দেখানোর সক্ষমতা রাখেন না, দেখাতে পারেন না।
চীনের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা গত এক দশকে বেড়েছে বেশ। যুক্তরাষ্ট্র এ সময়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স অগ্নিঝরা এক বক্তব্য রাখেন। তাতে ইঙ্গিত মেলে যে ওয়াশিংটনের নীতিতে পরিবর্তন আসা শুরু হয়েছে। কারণ, মাইক পেন্স বেইজিংকে একেবারে খোলামেলাভাবে প্রযুক্তি চোর, অর্থনৈতিক ‘প্রিডেটর’ ও সামরিক আগ্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বেইজিং যে দক্ষিণ চীন সাগারে একটি বিতর্কিত কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টি করার উচ্চাকাঙ্খা দেখিয়ে যাচ্ছে এবং চীন দাবি করছে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে হবে- এসবের ভিত্তিতেই ওই বক্তব্য দেন মাইক পেন্স।  এখানেই শেষ নয়, ওয়াশিংটন বিশ্বাস করতে লাগলো যে, চীনা সরকারের কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকে যে শত শত কোটি ডলারের ঋণ দিচ্ছে এটা হলো অর্থনৈতিক এক ব্লাকমেইল। এর মধ্য দিয়ে তারা রাজনৈতিক অর্জন করতে চাইছে। কারণ, যখন ঋণ গ্রহীতা ঋণ ফেরত দিতে না পারবে তখন তারা চীনের ওপর ধরনা দিয়ে থাকবে। তাদেরকে মোড়ল ভাববে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব অভিযোগ বার বারই উদ্ভট ও অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয় চীন। অন্য দেশের রাজনীতি নিযন্ত্রণ করার মতো কোনো আগ্রহই নেই চীনের। এ বিষয়ে বৈশ্বিক সম্প্রদায় একেবারে পরিষ্কার।
কিন্তু মাইক পেন্সের বক্তব্যের কয়েক মাস পরে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত চীনা অনেক ‘অ্যাক্টরের’ বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অভিযোগ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক উচু স্তরের কর্মকর্তাদের লাইন পড়ে গেল। তারা সতর্ক করলেন চীন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই হুমকি। ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডার এডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে বলেছেন, আন্তর্জাতিক শৃংখলার ভিত্তিতে বিদ্যমান যেসব আদর্শ আছে চীনের, তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে নীতি বিস্তৃত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বেইজিং।
ইতিমধ্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে রীতিমতো এক বাণিজ্যিক যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ডনাল্ড ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শত শত কোটি ডলারের শুল্ক আরোপ করেছেন। এ বিষয়ে চুক্তির সময়সীমা শেষ হয়ে আসছে ১লা মার্চ। ইউসি সান ডিয়েগোতে ২১তম সেঞ্চুরি চায়না সেন্টারের চেয়ার সুসান শিরক বলেছেন, গত বছরে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে দ্বিপক্ষীয় অবস্থান কঠোর ছিল ওয়াশিংটনের। চীনের হুমকি নিয়ে একটি পীড়া আছে
যুক্তরাষ্ট্র বনাম হুয়াওয়ে
এ বছরের শুরু থেকে, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও তাদের উদ্দেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে পশ্চিমারা। আর এর কেন্দ্রে রয়েছে একটিমাত্র কোম্পানি। তা হলো হুয়াওয়ে। চীনের এই প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানটি হলো দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে মাত্র ৩০ বছরে। এরই মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় ৫জি নেটওয়ার প্রোভাইডারের অন্যতম হয়ে উঠেছে তারা। প্রতিটি মহাদেশেই বড় বড় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। এ অবস্থায় হুয়াওয়ের প্রযুক্তি ব্যবহার বাতিল করতে মিত্রদের অব্যাহতভাবে চাপ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ওই কোম্পানিটি বেইজিংয়ের নিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। এর মাধ্যমে তারা গোয়েন্দাগিরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল পম্পেও সোমবার ইউরোপ সফরে এসে বিভিন্ন দেশকে একটি আলটিমেটাম দিয়েছেন। তা হলো: হয়তো যুক্তরাষ্ট্র না হয় হুয়াওয়ে। যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। যেসব স্থানে হুয়াওয়ে থাকবে সেখানে আমাদের অংশীদারিত্ব বজায় রাখা কছিন হয়ে পড়বে।
এ বছরের শুরু থেকে জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, লিথুয়ানিয়া, বৃটেন সবাই হুয়াওয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নভেম্বরে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছে নিউজিল্যান্ড। সেখানকার বড় বড় সব টেলিযোগাযোগ কেম্পানিকে হুয়াওয়ের প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপে বৃটেনের টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ভোডাফোন গত মাসে হুয়াওয়ে প্রযুক্তির ব্যবকার স্থগিত করেছে।
এ অবস্থায় হুয়াওয়ে পরিষ্কার করে তার ক্রেতাদের নিশ্চিত করছে যে, তাদের ডাটা চীন সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হবে না। জানুয়ারিতে রেন ঝেংফাই বলেছেন, তার কোম্পানি কখনোই কাস্টমারদের স্বার্থের ক্ষতি করবে না। কিন্তু তাতে কি আস্থা রাখতে পারছেন কাস্টমাররা। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মনে করছেন, গোয়েন্দাবৃত্তিতে চীনের ডিজিটাল এই প্রক্রিয়া খুবই সুপ্রতিষ্ঠিত।
গত ডিসেম্বরে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, ইউরোপ, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা ও স্পর্শকাতর বাণিজ্যিক ডাটা টার্গেট করে এপিটি-১০ নামে একটি গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই উদ্যোগ অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো। বৃটেন ও তার মিত্রদের ডাটা অবমুক্ত করার জন্য এটা একটি বিস্তৃত সাইবার আগ্রাসন।
ডিসেম্বরে হুয়াওয়ের অর্থ বিষয়ক প্রধান নির্বাহী মেং ওয়ানঝোকে গ্রেপ্তার করা হয় কানাডায়। তাতে কড়া ক্ষোভ প্রকাশ করে চীন। কিন্তু তাতে কোম্পানিটির সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কে কোনো ঘাতটি ঘটাতে পারে নি। ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ লঙ্ঘন করার অভিযোগ আনা হয়েছে মেং-এর বিরুদ্ধে। তারপর থেকে বেশ কিছু কানাডিয় নাগরিককে আটক করা হয়েছে চীনে। এর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে মাদকের অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। সাং চীনের বিষয়ে বলেন, তারা অতিরিক্ত শক্তিশালী, অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করছে যে, হুয়াওয়ে কোনো সাধারণ কোম্পানি নয়। চীনা সরকারের দৃষ্টিতে হুয়াওয়ে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। এ জন্যই পশ্চিমা সরকারগুলো হুয়াওয়ে ও চীনের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এ কী বললেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান!

আবারও রোহিঙ্গাদের ওপর পর্যায়ক্রমিক নৃশংসতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেন মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য এই সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে বিচারের জোরালো দাবি উঠেছে। কিন্তু তিনি আগের মতোই সুর উল্টো করে কথা বলছেন। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ হলো মিয়ানমারের সম্মানের প্রতি অবমাননা। পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা, যা জাতিসংঘ বলছে কমপক্ষে ৭ লাখ ৩০ হাজার, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করেই বলেন, কি বলতে হবে তা শিখিয়ে দেয়া হয়েছে শরণার্থীদের।  এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। শুক্রবার সেনাপ্রধান হ্লাইংয়ের একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করে জাপানের দৈনিক পত্রিকা আশাহি শিমবুন। এতে জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এমন সমালোচনা তার দেশের মর্যাদায় আঘাত করছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নৃশংস অভিযান শুরু করে। এ সময় অসংখ্য নারী, যুবতীকে গণধর্ষণ করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম। নিকটজনদের সামনে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় মানুষ। এমন নৃশংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে সেই থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গত বছর সেনাবাহিনীর ওই নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের রিপোর্টে এ নৃশংসতার জন্য মিন অং হ্লাইয় সহ আরো ৫ জন জেনারেলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনে ভয়াবহ অপরাধের জন্য বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে।
সেনাপ্রধানের ওই সাক্ষাতকার  নিয়ে জেনেভাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি। তিনি বলেছেন, মিন অং হ্লাইংয়ের ওই সাক্ষাতকার তিনি দেখেন নি। তবে গত বছর জাতিসংঘের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে মিয়ানমার সরকার। তাতে মেনে নেয়া হয়েছে যে, সহিংসতা হয়েছে। মানুষ পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। সেই সব মানুষের দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি আরো বলেন, যদি আমাদের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকেও তাহলে আমরা স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্বারকের দিকেই দৃষ্টি দেবো, যাতে এসব সমস্যাকে মেনেনেয়া হয়েছে। সমাধান করার কথা বলা হয়েছে।
গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক একজন তদন্তকারী বলেছেন, জেনারেল মিন অং হ্লাইং ও অন্যদের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে বিচার হওয়া উচিত। রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যাওয়ার আগেই তা হওয়া আবশ্যক।
ওদিকে অব্যাহতভাবে হত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। এর প্রেক্ষিতে মিন অং হ্লাইংয়ের ওই সাক্ষাতকারটি নেয়া হয় মিয়ানমারের রাজধানী ন্যাপিডতে। এতে তিনি পালিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়েই শুধু প্রশ্ন তোলেন নি। একই সঙ্গে তিনি তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, তারা (রোহিঙ্গারা) বাংলাদেশে গেছে সম্ভত কিছু কারণে। তার মধ্যে রয়েছে, তারা হয়তো আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে বসবাস করতে চায় অথবা তৃতীয় কোনো দেশে যেতে চায় পালিয়ে। এখানে উল্লেখ্য, তারা হয়তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বসবাস করতে চায় বলতে তিনি বাংলাদেশকে বুঝিয়ে থাকতে পারেন। কারণ, মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর দাবি, রোহিঙ্গারা বাঙালি। তারা বাংলাদেশ থেকে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করছেন মিয়ানমারে। মিন অং হ্লাইং বলেন, তারা (রোহিঙ্গা) সবাই একই কথা বলছেন। আমার তো মনে হয় তাদেরকে এসব কথা কেউ শিখিয়ে দিয়েছে।

ছবিতে বৃটেনে ভালবাসা দিবস

ভ্যালেন্টাইস ডে বা বিশ্ব ভালবাসা দিবসে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল বৃটেন। অনেকটা ঠান্ডা উপেক্ষা করে স্বল্প পোশাকে বেরিয়ে পড়েন ললনারা। কখনো প্রেমিকের হাত ধরে। কখনো বান্ধবীর সঙ্গে। রাতের রাস্তায় তারা ভালবাসাকে উদযাপন করেছেন। পান করেছেন অকাতরে। তারপর বেসামাল। এসব নিয়ে একটি ফটোফিচার প্রকাশ করেছে বৃটিশ একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ। এখানে সেই ছবিগুলো তুলে ধরা হলো:

আইএসে যোগ দেয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুই নারীর ভিন্ন কাহিনী

জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসে যোগ দেয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শামিমা বেগমকে নিয়ে বৃটেনজুড়ে তো বটেই, সারা বিশ্বে এখন আলোচনা। বৃটিশ নাগরিক শামিমা সিরিয়া থেকে বৃটেনে ফিরতে চেয়েছেন। এ নিয়েই এই বিতর্ক। বৃটেন থেকে যে শুধুই শামিমা আইএসে যোগ দিয়েছেন এমন না। আরো বেশ কয়েকজন কিশোরী বয়সে বা যুবতী অবস্থায় আইএসে যোগ দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। তার দু’একজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তেমনই একজন আরেক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তানিয়া জয়া (৩৫)। বাংলাদেশী নূরাল চৌধুরী ও জাহারানার মেয়ে তিনি। বড় হয়েছেন বৃটেনের মিডলসেক্স-এর হ্যারো’তে।
তার পিতা নূরাল চৌধুরী একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। মা ক্যাটারিং ব্যবসা করতেন। আইএসের যোদ্ধা এক যুবককে বিয়ে করেছিলেন তানিয়া। তার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। সেখানে তিনি ধর্ষিত হন। তারপর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পালিয়ে যান। এরপর তিনি ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। বিয়ে করেছেন। স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। সুখী দাম্পত্য তাদের এখন। শামিমা বেগমের কাহিনীর সঙ্গে এসব তথ্যে সয়লাব বৃটিশ মিডিয়া। তানিয়া জয়াকে নিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের কাছে প্লানো এলাকায় উগ্রপন্থি জন জর্জলাস বসবাস করতেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন পরবর্তী ‘ওসামা বিন লাদেন’। তিনি আইএসের যোদ্ধা। তাকে বিয়ে করেন তানিয়া জয়া। তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে পালান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের এক শহরের উপকণ্ঠে নতুন বিয়ে করেছেন।
ডেইলি মেইল লিখেছে, তানিয়া জয়া চার সন্তানের মা। তিনি বড় হয়েছেন মিডলসেক্সের হ্যারোতে। তার বসবাস এখন টেক্সাসের প্লানোতে একটি স্বস্তিকর এপার্টমেন্টে। সেখানেই দ্বিতীয় স্বামী আইটি বিষয়ক নির্বাহীর সঙ্গে তার সংসার। তিনি শামিমার কাহিনী পড়েছেন অনলাইনে। এরপর তিনি বলেছেন, তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। একবার তিনিও শামিমার মতো ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন আইএসের সবচেয়ে সিনিয়র কমান্ডারদের অন্যতম জন জর্জলাসকে। এ জন্য তাকে ডাকা হতো ‘দ্য ফার্স্টলেডি অব আইসিস’। এখন তিনি উগ্রবাদের নিন্দা করেন। ডেইলি মেইলকে সাক্ষাতকারে তিনি শামিমা বেগমকে তার সন্তানের জন্য একটি দ্বিতীয় সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তানিয়া জয়া বলেন, যখন শামিমাকে জিহাদি আদর্শে উজ্জীবিত করা হয়েছে তখন তিনি ছিলেন একজন শিশু। তার বয়স ছিল ১৫ বছর। তিনি এখনও একজন শিশু। যদি তিনি স্বেচ্ছায় তার ভুল স্বীকার করে নেন, তাহলে তাকে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। শামিমা ও তার গর্ভস্থ শিশুকে একটি সুযোগ দিন বেঁচে থাকার জন্য। আমার যেমন ব্রেনওয়াশ করা হয়েছিল, তারও তাই। তাই তিনি আমার মতো সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন।
ওদিকে এমন উগ্রবাদের জন্য অনেকে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার চেয়ে ইসলামকে দায়ী করে মন্তব্য করছেন। এর জবাবে তানিয়া জয়া বলেন, আমি মনে করি ইংল্যান্ডে আইন আছে। সেই আইন শিশুদেরকে সুরক্ষা দেবে। আমি যদি একজন অজ্ঞানবাদী হই, একজন নাস্তিক হই, এমন কি একজন খ্রিস্টান বা ইহুদি হই তাহলেও একজন নারীর বিষয়ে এই নিষ্পেষণমূলক ধারণা প্রকাশ করবো না।
তিনি বলেন, শামিমার জন্য আমার খুব দুঃখ হয়। তিনি একজন তরুণী। এতগুলো বছর তিনি ওই বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে অবস্থান করছেন। সেখানে আইএসের বাইরে তাকে ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে দেয়া হয় নি। এখনও তিনি সেই অবস্থায় আছেন। তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। আমি তো এই বয়সে উগ্রবাদে ঝুঁকেছিলাম। যদি আমরা তাকে ও তার অনাগত সন্তানকে সহায়তা না করি তাহলে তারা মারা যাবেন। তবে এখানে স্বীকার করে নিতেই হবে যে, তিনি যা করেছেন এটা তার অন্যায়। শতভাগ অন্যায়। তবে মানবিক কারণে আমাদের উচিত তার শিশুটিকে সহায়তা করা। যদি তিনি সহায়তা চান তাহলে তার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তবে তিনি এখনও কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেন না, এটা জেনে আমার কাছে নিজেকে পাগলের মতো মনে হচ্ছে। যদি তার গর্ভস্থ সন্তানটি মারা যায় তাহলে তার জন্য দায়ী থাকবেন তিনি। যদি বাচ্চাটি মারা যায় তাহলে তা হবে তার কর্মকান্ডের জন্য।
তানিয়া জয়া এক সময় আইএসের কট্টরপন্থি ছিলেন। এক সময় তিনি বলতেন তিনি আইএসের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলেন। তার যে সন্তান জন্ম নেবে তারা মুজাহিদিনদের জন্য সেবা দেবে। কিন্তু সেই তানিয়া জয়া নাটকীয়ভাবে জীবনকে পাল্টে ফেলেছেন।
‘দ্য ওয়ে অব স্ট্রেঞ্জারস: এনকাউন্টারস উইথ ইসলামিক স্টেট’ বইয়ের লেখক, আইএস বিশেষজ্ঞ গ্রায়েম উড দাবি করেছেন, তানিয়া জয়া ভিক্টিম ছিলেন না। তিনি তার স্বামী জন জজলাসের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের দাম্পত্যকে পিছনে ফেলে এসেছেন। সিরিয়ায় ‘জিহাদী কনে’ হিসেবে ১৫০ জন নারী ও যুবতী গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। তার মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন তানিয়া জয়া। তিনিই নিজে বুঝতে পেরেছেন কিভাবে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে উঠতে হবে। তারও জন্ম উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যারোতে। তিনিও শামিমা বেগমের মতো বাংলাদেশী পিতামাতার সন্তান। জন্ম হয়েছিল জয়া চৌধুরী হিসেবে। তার পিতা নূরাল চৌধুরী। তিনি ব্যাংকে চাকরি করতেন। মা জাহানারা একটি ক্যাটারিয় ব্যবসা চালাতেন। তাদের ৫ সন্তানের একজন জয়া। তার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন তার পরিবার চলে যায় পূর্ব লন্ডনের বার্কিংয়ে। সেখানেই তানিয়াকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে বলে তার দাবি। সহসাই তিনি পুরো শরীর ঢেকে থাকে এমন পোশাক পরা শুরু করেন। তার এক বন্ধু বলেছেন, ২০০১ সালে যখন বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলা হয় তখন তানিয়া জয়া তা উদযাপন করেছিলেন। তানিয়ার নিজের স্বীকারোক্তিতে তিনি কট্টর জিহাদি হয়ে উঠেছিলেন।

ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা তুঙ্গে, যুদ্ধের আশঙ্কা

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে তুঙ্গে পৌঁছেছে। আবারও পারমাণবিক শক্তিধর এ দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার পালওয়ামায় হামলায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর ৪৪ সদস্য নিহত হওয়ার পর এমন অবস্থা বিরাজ করছে। ভারত এর প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিয়েছে। এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ রেখা ও ওয়ার্কিং বাউন্ডারি বরাবর সেনাবাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছে পাকিস্তান। পাশাপাশি তারা কূটনৈতিক উপায়েও অগ্রসর হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ওই হামলার দায় স্বীকার করে পাকিস্তান ভিত্তিক জৈশ ই মোহাম্মদী। এ হামলার কয়েক ঘন্টার মধ্যে পাকিস্তানের দিকে আঙ্গুল তুলেছে ভারত।
এমন অবস্থায় ভারতীয় প্রচারণার প্রতিবাদ জানাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্য দেশের কাছে গিয়েছে পাকিস্তান। ভারতে বিরাজ করছে উত্তপ্ত ক্ষোভ। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে এ বিষয়ে ব্রেকিং খবর প্রচার করা হচ্ছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাকিস্তানি সংস্করণ এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের আমন্ত্রণ জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এ সময়ে তাদেরকে অবনতিশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেন সচিব। তেহমিনা  জানজুয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করছে ভারত তা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। পাকিস্তানের পররাাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পরে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। কোনো তদন্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানকে দায়ী করার বিষয় ওই রাষ্ট্রদূতদের কাছে তুলে ধরেন তেহমিনা জানজুয়া। এ সময় তিনি বলেন, ভারতের প্রতি গঠনমূলক অবস্থান পাকিস্তানের। এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে কর্তারপুর সীমান্ত খোলা নিয়ে সংলাপ ও উদ্যোগের বিষয়ে খোলমেলা কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলে তার বিপরীত ফল আসতে পারে।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বৃহস্পতিবার ওই ভয়াবহ হামলার পর সীমান্ত অতিক্রম করে যাতে কোনো ‘মিস অ্যাডভেঞ্চার’ চালাতে না পারে কেউ সে জন্য নিয়ন্ত্রণ রেখা ও ওয়ার্কিং বর্ডারে সেনাবাহিনীকে উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে পাকিস্তান।
বৃহস্পতিবার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে প্রধান মহাসড়কে ওই হামলা হয়। তিন দশকের মধ্যে এটাই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। ওই হামলার পর দ্রুততার সঙ্গে পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত। ঘটনার পর পরই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানি হাই কমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে ভারত। তবে ভারতের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ বলেছে, কাশ্মিরে বড় কোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে সব সময়ই তারা নিন্দা জানিয়ে আসছে। ভারত সরকার মনে করে পালওয়ামা হামলায় জড়িত ইসলামাবাদ। ভারত সরকারের এ ধরণের মানসিকতার কড়া প্রতিবাদ দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয় পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে।
সূত্রগুলো বলেছেন, অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পাকিস্তানি পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়ার সঙ্গে তার অফিসে সাক্ষাত করেছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত। আগেই পালাওয়ামা হামলার নিন্দা জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। পাশাপাশি অবিলম্বে পাকিস্তানের মাটিতে কর্মকান্ড চালানো সব সন্ত্রাসী গ্রুপকে সমর্থন ও নিরাপদ আশ্রয় বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে পাকিস্তানের প্রতি।
পাকিস্তানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, পরিস্থিতির দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে পাকিস্তান। সীমান্তের অন্যপাড় থেকে যদি কোনো রকম প্ররোচনা দেয়া হয় তাহলে কি করা হবে তা নিয়ে সামরিক ও বেসামরিক নেতারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পাকিস্তান সফরের পর আগামী সপ্তাহে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। 
ওদিকে শুক্রবার উচ্চ পর্যায়ের একটি নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় পালওয়ামা হামলার নেপথ্যে যারা তাদেরকে শাস্তি ভোগ করার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ভারতের মিডিয়ায় এ নিয়ে বিভিন্ন অপশন নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। তার মধ্যে গোয়েন্দাভিত্তিক অপারেশনের কথা বলা হয়েছে। সামরিক অভিযান বাদে মোদি প্রশাসন পাকিস্তানকে সারাবিশ্বে নিঃসঙ্গ করে দেয়ার কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা বলেছে। মোস্ট ফেভারড নেশন টু পাকিস্তান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

হলগুলোতে বিন্দুমাত্র সহাবস্থান নেই by ওমর ফারুক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আগামী ১১ই মার্চ। ছাত্রলীগ চাচ্ছে এই নির্বাচন হলগুলোর ভেতরে ভোট কেন্দ্র হোক। ইতিমধ্যে হলে ভোট কেন্দ্র রেখে নির্বাচনের     তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাকি ১৩টি ছাত্র সংগঠনের দাবি হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে যেন ভোট কেন্দ্র হয়। আর এ দাবি যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে ছাত্র সংগঠনগুলো এক হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর। ঢাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনাকালে মানবজমিনকে তিনি এ হুঁশিয়ারির কথা বলেন।
আন্দোলনের মাধ্যমে সম্ভব কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য এ ডাকসু নির্বাচন। শিক্ষার্থীরা জোরালো দাবি করলে তারা মানতে বাধ্য।
তিনি বলেন, আমরা জাতীয় নির্বাচন দেখেছি। নিজের ভোট অন্য জন দিয়ে দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এমন কারচুপি হলে, ডাকসু তো কোনো ব্যাপারই না। বিশ্ববিদ্যালয়ও ক্ষমতাসীনদের দখলে। যার কারণে প্রার্থীদের মধ্যেই এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। এই জন্যই আমরা বলছি, প্রশাসন যদি আমাদের বলেন, হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে ভোট কেন্দ্র করবো এবং ডাকসুকে কার্যকর করো, তাহলে সবার মাঝে একধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকতো। কিন্তু সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা ভোটার বা প্রার্থীদের মধ্যে নেই। যার কারণে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে আগ্রহের জায়গাটা অনেক কম।
তফসিল নিয়ে কোটা আন্দোলনের এ ছাত্রনেতা বলেন, তফসিল ঘোষণা হয়েছে। আমরা বাকি ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি নির্বাচনটা হওয়ার দরকার। প্রশাসনের অনেক দুর্বলতার সত্ত্বেও তফসিলকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। আমরা চাচ্ছি সকল ছাত্রসংগঠন যেন ক্যাম্পাসে সহাবস্থান করার নিশ্চয়তা গ্রহণ করে প্রশাসন। অবাদে প্রচার-প্রচারণাও যেন চালাতে পারে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন আসছে, প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে তেমন খুশি হওয়ার কারণ নেই। বিষয়টা অনেকটা লোক দেখানো। দুই দিন দেখে সহাবস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলার কোনো কারণ নাই। দেখতে হবে এই অবস্থানটা কত দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এর বিপরীত হলগুলোতে বিন্দুমাত্রও সহাবস্থান আছে বলে আমার মনে হয় না। বিজয়-৭১ হল ছাড়া সবগুলো হলেই ছাত্রলীগের দখলে।
হলে ভোটকেন্দ্র না চাওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ দশ বছর ধরে ক্ষমতা থাকার সুবাধে হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ও দখলদারিত্ব কায়েম হয়েছে। ফলে অনেকে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে চাইবেও না, কারণ ভোট দিতে গেলে ঝামেলা হতে পারে। তবে শিক্ষার্থীরা যে হলেই থাকুক না কেন তারা একাডেমিক ভবনে আসবেই। সেই জন্য আমরা বলেছি, ভোট কেন্দ্র যেন একাডেমিক ভবনে করা হয়। তাছাড়া হলগুলোতে এখনো অনেক বহিরাগত থাকে। অছাত্র আছে। তারা নির্বাচনের সময় পরিবেশটাকে নষ্ট করার চেষ্টা করবে। কিছুদিন আগে অছাত্রদের বের করতে গিয়ে ছাত্রলীগের ধাওয়া খেয়েছে প্রশাসন। সুতরাং এখনই এই অবস্থা, যদি হলে ভোট কেন্দ্র হয় তাহলে তো তারা টেবিল ছেড়ে দৌড়াবে।
এসব বিষয় নিয়ে নূরু বলেন, আমরা লিখিত দাবি জানিয়েছিলাম, দুঃখজনক হলেও সত্য এর কোনো সাড়া পাইনি। কিন্তু প্রশাসন যদি ছাত্রদের দাবি-দাওয়া একেবারই উড়িয়ে দেয়, তাহলে তো ছাত্রসংগঠনগুলো পাতানো নির্বাচনে অংশ নেবে না। আমরা বলেছিলাম দল নিরপেক্ষ এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য কিছু শিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রত্যেকটি টিমকে অত্যন্ত পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হোক। সেটাও তারা এখন পর্যন্ত করেনি।
প্রচারণা নিয়ে তিনি জানান, বর্তমান গঠনতন্ত্রে বলা আছে ক্লাসে কোনো ধরনের প্রচারণা করা যাবে না। কিন্তু হল তো ছাত্রলীগের দখলে আছে, সেখানে আমরা কীভাবে গিয়ে প্রচারণা করবো। যার কারণে ক্লাসে না যাওয়া ছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা খুব মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। সেটি নিয়েও প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে নূরুল হক নূর জানান, আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। যদি সন্তোষজনক না হয়, পাতানো নির্বাচনে ছাত্রসংগঠনগুলো অংশগ্রহণ করবে না। ডাকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একটি প্ল্যাটফর্ম, সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বতঃফূর্তভাবে যদি নিজেরা অংশগ্রহণ না করতে পারে। তাহলে তো এ নির্বাচনের কোনো দরকার নেই।