Friday, December 13, 2024

শহীদের বাবাকে হাসপাতালের মেঝেতে দেখে ডা. তাসনিম জারার ক্ষোভ

শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান শুধু কথায় নয়, কাজে দেখাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আলোচিত চিকিৎসক ও জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা।

বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে এক পোস্টে তিনি জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আহত ও শীহদ পরিবারের সেবা নিয়ে বিস্তারিত লেখেন।

পোস্টে তাসনিম জারা বলেন, গতকাল একটা নিউজ দেখলাম, ‘আবু সাঈদের বাবাকে হেলিকপ্টারে আনা হলো ঢাকা সিএমএইচে’। অনেকেই এই খবরে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছেন শহীদের পরিবার রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছে। কিন্তু একই দিনে আরেকটি অভিজ্ঞতা আমাকে বাস্তবতার আরেকটি রূঢ় চেহারা দেখালো।

দুপুর ১২টায় একজন শহীদের বোন ফোন দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, তার বাবা গুরুতর অসুস্থ। ডাক্তার আইসিইউতে ভর্তি করতে বলেছেন, কিন্তু আইসিইউ সাহায্য করছে না। অসহায়ভাবে দুই বোন হাসপাতালের এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছেন।

তিনি বলেন, আমি ওনাকে জানাই যে দ্রুত আসছি। গিয়ে দেখি, ওনার বাবা মাটিতে শুয়ে আছেন। হাসপাতালের সহকারী ডিরেক্টরকে খুঁজে কথা বলার পর অবশেষে একটা সিট ম্যানেজ হয়। কিন্তু দেরিতে চিকিৎসা পাওয়ায় তার কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়।

হাসপাতালের বাস্তব চিত্র নিয়ে ডা. তাসনিম বলেন, কিছুদিন আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল শহীদ পরিবার এবং আহতদের ফাস্ট ট্র্যাক সেবা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখছি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, হাসপাতালের নাম বলছি না, কারণ সমস্যাটা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো সিস্টেমের। শহীদ পরিবারের জন্য ঘোষিত বিশেষ সুবিধা কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটার কোনো মনিটরিং কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করছে? যদি পরিবারগুলোর অভিযোগ থাকে, সেটা কীভাবে, কোথায় জানাবে? এই সুবিধা নিশ্চিত করতে কি নির্দিষ্ট হেল্পলাইন বা পোর্টাল আছে?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। শুধু ঘোষণা দিয়ে দায় শেষ হলে চলবে না। এটা তো প্রমাণিত হলো যে শহীদের বাবা হাসপাতালের মেঝেতে দিন কাটাচ্ছে।

এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট তিনটি দাবি জানান ডা. তাসনিম জারা। দাবিগুলো হলো౼

১. হাসপাতালের প্রবেশপথ এবং প্রধান অংশগুলোতে সাইনবোর্ড বা পোস্টার বসান, যেখানে লেখা থাকবে, ‘আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানে আহত বা শহীদ পরিবারের সদস্য? আমাদের জানান, যেন আমরা আপনাকে দ্রুত সাহায্য করতে পারি।’ এই পোস্টারে কোথায়, কাকে, এবং কীভাবে জানাতে হবে, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য যুক্ত করুন, যাতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের বিভ্রান্তি না হয়।

২. একটি ২৪/৭ হেল্পলাইন চালু করুন, যেখানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধান পাবেন। হেল্পলাইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল তৈরি করুন। হেল্পলাইন অপারেটরদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করুন, যেন তারা শুধু তথ্য সরবরাহ নয়, বরং সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম হন। সেবার মান এবং অপেক্ষার সময় মনিটর করুন। প্রতি সপ্তাহে বা মাসে রিপোর্ট প্রকাশ করুন।

৩. সেবার মান তদারকির জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করুন। প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ (corrective action) নেওয়ার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করুন। প্রতিটি অভিযোগের ফলাফল অভিযোগকারীকে লিখিতভাবে জানানোর ব্যবস্থা রাখুন, যেন ভুক্তভোগীরা আশ্বস্ত হতে পারেন যে তাদের কথা শোনা হচ্ছে।

‘এখানে আকাশকুসুম কোনো দাবি করিনি’, এমন মন্তব্য করে জাতীয় নাগরিক কমিটির এই যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, শুধু আপনাদের পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে বলছি। আমি যেভাবে প্রস্তাব করেছি এভাবেই করতে হবে, তা না। আপনাদের নিজেদের মত করেই করুন। তবে যেভাবেই করেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান করুন। কথার চেয়ে কাজ দিয়ে শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান দেখান। আমরা কিছু এখান থেকে সরে যাচ্ছি না, কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিলেন হাসপাতালে যেয়ে যেয়ে দেখবো।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহির বিষয়ে ডা. তাসনিম শহীদ পরিবারগুলো যেন নিজেদের বোঝা না মনে করে, বরং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে—এটাই আমাদের দায়িত্ব। আবু সাঈদের বাবার মতো প্রতিটি শহীদ পরিবারের সদস্যের প্রাপ্য সম্মান ও যত্ন নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও জবাবদিহি করতে হবে। কারণ, এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া আর শহীদের আত্মত্যাগকে অপমান করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

হাসপাতালে শহীদ পরিবারের খোঁজ নেন ডা. তাসনিম জারা। ছবি : সংগৃহীত
হাসপাতালে শহীদ পরিবারের খোঁজ নেন ডা. তাসনিম জারা। ছবি : সংগৃহীত



মিয়ানমারের মংডুতে শত শত সেনাসহ জেনারেল আটক

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের মংডু শহর দখল করেছে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এরপর এ শহর থেকে শত শত সেনাসহ এক জেনারেলকে আটক করেছে তারা।

বুধবার (১১ ডিসেম্বর) মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর এক প্রতিবেদেনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আরাকান আর্মি জানিয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের শেষ জান্তা ঘাঁটি রোববার দখলে নিয়েছে তারা। এ সময় কুখ্যাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরেইন তুনসহ শত শত সেনাকে বন্দি করা হয়েছে।

গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা গত ১৪ অক্টোবর মংডু শহরের বাইরে টাউনশিপের শেষ ইউনিট বর্ডার গার্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ওপর হামলা শুরু করে। সুরক্ষিত এ ঘাঁটিটি আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশনের (আরএসও) সশস্ত্র সেনাসহ ৭০০ জনের বেশি সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

আরাকান আর্মি জানিয়েছে, জান্তার বিমান হামলার মধ্যে ৫৫ দিন সংঘর্ষের পর তারা রোববার এটির দখল নিয়েছে। এ সময় সংঘর্ষে ৪৫০ জনের বেশি সেনা নিহত হয়েছে। এ ছাড়া বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করেছে তারা।

গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সেনাসহ জান্তার মিলিটারি অপারেশন কমান্ড (এমওসি)১৫-এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরেইন তুনকে আটক করেছে বিদ্রোহীরা। আটককৃতদের মধ্যে ৮০ জন বিদ্রোহী রোহিঙ্গা সেনা রয়েছেন।

এর আগে ইরাবতী জানায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় পৌনে তিনশ কিলোমিটার সীমান্তের পুরোটাই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সীমান্ত শহরের পতন হওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে মিয়নামারের জান্তা সরকার।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, রোববার মংডু শহর দখল করে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আরাকান আর্মি (এএ)। সশস্ত্র এ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা জান্তার শেষ অবশিষ্ট সীমান্ত ঘাঁটি মংডু শহরের বাইরে অবস্থিত বর্ডার গার্ড পুলিশ ৫ নং ব্যাটালিয়ন বেশ কয়েক মাস লড়াইয়ের পর রোববার সকালে দখল করে।

এর আগে রোববার আরাকান আর্মি জানায়, ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) এবং রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সরকার এবং সহযোগী রোহিঙ্গা মিলিশিয়াদের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে।

আরাকান আর্মি মে মাসের শেষের দিকে মংডু আক্রমণ শুরু করে। আর সীমান্তবর্তী এ শহরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে ছয় মাস সময় লাগল গোষ্ঠীটির। ইরাবতি বলছে, আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের তিনটি শহরেরই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করছে। এগুলো হচ্ছে—রাখাইন প্রদেশের মংডু ও বুথিডাং এবং চিন প্রদেশের পালেতোয়া। পালেতোয়ার সঙ্গে ভারতের সীমান্তও রয়েছে।

রাখাইনে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী একজন সামরিক বিশ্লেষক বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পুনঃস্থাপন পশ্চিমাঞ্চলীয় এ প্রদেশে বসবাসকারী মানুষের দুর্দশা কমাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে রাখাইনে ২০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন বলে জাতিসংঘ গত মাসে জানিয়েছে। জান্তা বাহিনী এ প্রদেশের দিকে যাওয়ার রাস্তা ও নৌপথ অবরোধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাসহ খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহেও বাধা দিয়েছে।

ওই বিশ্লেষক আরও বলেছেন, বাংলাদেশ সরকার রাখাইন প্রদেশের জটিল রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে চাইলে জাতিগত সেনাবাহিনীর (আরাকান আর্মি) সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংলাপে যুক্ত হতে হবে। আরাকান আর্মি এখন দক্ষিণ রাখাইনের গয়া, তাউনগুপ এবং আন শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য লড়াই করছে বলেও জানিয়েছে ইরাবতি।

বিদ্রোহীদের হাতে আটক জেনারেলসহ সেনারা। ছবি : সংগৃহীত
বিদ্রোহীদের হাতে আটক জেনারেলসহ সেনারা। ছবি : সংগৃহীত



সিরিয়ার বিদ্রোহীরা ভেঙে দেবে নিরাপত্তা সংস্থা, পলাতকদের ফেরত দেয়ার আহ্বান

ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ পরিচালিত কুখ্যাত সাদেনিয়া কারাগার বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে সিরিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী। একই সঙ্গে সেখানে বন্দিদের হত্যা অথবা নির্যাতনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজছে তারা। বাশার আল আসাদ সরকারের যে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল, তা ভেঙে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল-শারা। তিনি আবু মোহাম্মদ আল জোলানি নামেই বেশি পরিচিত। বার্তা সংস্থা দেখতে পেয়েছে এমন এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেছেন। বাশার পালিয়ে যাওয়ার পর রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কয়েক হাজার বন্দিকে ওই কারাগার থেকে মুক্ত করতে দেখা যায়। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, এই কারাগারটি ছিল মানুষ হত্যার একটি ঘাঁটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে আরও বলা হয়, বৃটেন ভিত্তিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলছে, বাশার আল আসাদ পরিচালিত কারাগারে কমপক্ষে ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়েছে। জোলানির ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গ্রুপ হায়াত তাহরীর আল-শাম (এইচটিএস) অন্য বিদ্রোহীদের নিয়ে সম্প্রতি কঠোর আক্রমণ চালায় বাশারের বিরুদ্ধে। এতেই আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের উত্তরাধিকারের রাজনীতির পতন হয়।

রোববার দিনের শুরুতে পালিয়ে রাশিয়া চলে যান বাশার আল আসাদ। সেখানে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদেরকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হয়েছে। জোলানি আলাদা একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, কারাগারে হত্যা ও নির্যাতনে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের কোনো ক্ষমা নেই। তার ভাষায়, আমরা তাদেরকে সিরিয়ায় ধরবোই। যারা পালিয়ে গেছে, তাদেরকে যাতে বিচার করা যায়- এ জন্য তাদেরকে যেন দেশে ফেরত পাঠায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়ানরা দ্রুত ছুটে যান কুখ্যাত ওই কারাগারে। হন্যে হয়ে তাদের প্রিয়জনকে খুঁজতে থাকেন। তুর্কিভিত্তিক এসোসিয়েশন অব ডিটেইনিজ অ্যান্ড দ্য মিসিং ইন সেদনিয়া প্রিজনস (এডিএমএসপি) ২০২২ সালে এক রিপোর্টে বলে যে, ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত সেদনিয়া একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

ওদিকে বাশার আল আসাদ সরকারের সময়কার সব নিরাপত্তা সংস্থাকে ভেঙে দেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়েছেন জোলানি। তবে তা কবে নাগাদ সংস্কার করা হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওদিকে দেশের ভেতরে সামরিক স্থাপনাগুলোতে অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে সিরিয়াকে পঙ্গু করে দিচ্ছে ইসরাইল। এক বিবৃতিতে জোলানি বলেছেন, তার গ্রুপ তাদের রাসায়নিক অস্ত্রের স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পেন্টাগনের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সাব্রিনা সিং বলেছেন, জোলানির বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তারা কাজ দেখতে চায়। তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টি হলো ওইখানে যে, এসব রাসায়নিক অস্ত্র যাতে ভুল হাতে না যায়। সিরিয়া জুড়ে শত শত হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। জব্দ করেছে বহু সামরিক সম্পদ। স্থানীয় মিডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে সন্দেহজনক সম্পর্ক আছে এমন একটি গবেষণা কেন্দ্রকে টার্গেট করেছে সিরিয়া। তবে ইসরাইলের দাবি, ‘উগ্রপন্থিদের’ হাতে অস্ত্র যাওয়া থামাতে তারা পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসংঘের রাসায়নিক পর্যবেক্ষক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রোহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস রাসায়নিক অস্ত্রকে মানুষের মৃত্যু ও ক্ষতির কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এসব অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সিরিয়ায় কমপক্ষে ৮৫ বার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার প্রামাণ্য আকারে উপস্থাপন করেছেন। এর বেশির ভাগের জন্য দায়ী করা হয় ক্ষমতাচ্যুত বাশার সরকারকে। তবে তার সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ একেবারে অস্বীকার করেছে।

mzamin

সিরিয়ায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় হায়াত তাহরির আল-শাম

সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) যে ঝোড়ো গতিতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে, সেই একই গতিতে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, পুলিশ বাহিনী মোতায়েন এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শুরু করেছে তারা। দেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে। এইচটিএসের এই তৎপরতার মধ্যেই সিরিয়াজুড়ে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ইসরায়েল।

এইচটিএসের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের মাত্র ১২ দিনের অভিযানের মুখে গত রোববার দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান বাশার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন এইচটিএসঘনিষ্ঠ আমলারা। প্রধানমন্ত্রী হন মোহাম্মদ আল-বশির। গত সপ্তাহেও তাঁরা সিরিয়ার প্রত্যন্ত ইদলিব প্রদেশে এইচটিএসের সরকার পরিচালনা করতেন। এই ইদলিব থেকেই ২৭ নভেম্বর বিদ্রোহীদের অভিযান শুরু হয়।

২০১৬ সালের আগে আল-কায়েদার অংশ ছিল এইচটিএস। দামেস্ক অভিমুখে অভিযানের সময় উপজাতি নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ সিরীয়দের তারা নিশ্চয়তা দিয়েছিল, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। এইচটিএসপ্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জুলানিও একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বড় পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং বাশারের পতনে কাজে এসেছে।

বাশারের আমলের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে ফেরাতেও তৎপর অন্তর্বর্তী সরকার। দামেস্কের নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ইদলিবের সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্টের মোহাম্মদ গাজাল। সরকারি কর্মচারীদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ১ মার্চের মধ্যে গাজালের লক্ষ্য সরকারি সেবাগুলো চালু করা। কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তাঁরা মাসে গড়ে ২৫ ডলার বেতন পান। গাজালের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, স্যালভেশন গভর্নমেন্টের সঙ্গে মিল রেখে তা ন্যূনতম ১০০ ডলার করা হবে।

বাশারের পতনের পর দামেস্কে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অবস্থান দেখা গিয়েছিল। পরে তাদের শহরের বাইরে অবস্থান করার নির্দেশ দেয় এইচটিএস। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইদলিব থেকে পুলিশ সদস্যদের আনা হয়েছে। তাঁরা ট্রাফিক ব্যবস্থা দেখভাল করছেন। পরিচয় গোপন করে তাঁদের একজন বলেন, ইদলিবে তাঁরা টহল দেওয়ার কাজ করতেন।

তবে সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্ক ও জর্ডানের সীমান্ত এলাকায় এখনো বিদ্রোহীরা সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্তের’ সময় ২০১১ সালে বাশারবিরোধী লড়াই শুরুর পর থেকে নিজেদের মধ্যেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়েছিলেন এই বিদ্রোহীরা। সংঘাতের সেই ইতিহাস বাশার-পরবর্তী সিরিয়ায় অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েজিদ সেইগের মতে, সিরিয়ার সমাজ ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো পক্ষের একক প্রভাব থাকাটা কঠিন হবে।

সরকারে যে একক প্রভাবের কথা ইয়েজিদ সেইগে বলেছেন, তা বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে। সরকার গঠন থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এইচটিএসের কর্তৃত্ববাদী আচরণ ফুটে উঠছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দামেস্কের দুজন কূটনীতিক বলেছেন, বিদেশি দূতাবাসগুলোয় শুধু এইচটিএস সদস্যরাই দেখা করতে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে অন্য বিরোধীদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি দেখা যাচ্ছে না; এটা হতাশাজনক।

এ বিষয়ে সিরিয়া বিশেষজ্ঞ এবং ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের প্রধান জোশুয়া ল্যান্ডিস বলেন, সিরিয়ায় বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আল-জুলানিকে অবশ্যই নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে একই সঙ্গে তাঁকে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

সিরিয়ার হোমস শহরে সাঁজোয়া যানের ওপর অপেক্ষমাণ বিদ্রোহী যোদ্ধারা
সিরিয়ার হোমস শহরে সাঁজোয়া যানের ওপর অপেক্ষমাণ বিদ্রোহী যোদ্ধারা। ছবি: রয়টার্স

কানাডায় প্রতি ২০টিতে একটি স্বেচ্ছামৃত্যু, বাড়তে পারে আরও

কানাডায় প্রতি ২০টি মৃত্যুর মধ্যে একটি মৃত্যু ঘটে স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ মেডিকেল সহায়তা দেয়া হয়। কিন্তু টানা পঞ্চম বছরের মতো সেখানে এমন মৃত্যু বৃদ্ধির হার বেড়েছে। এ প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ইউথানাসিয়া’। ২০১৬ সালে এমন মৃত্যুকে বৈধতা দেয়া হয়। তারপর থেকে পঞ্চমবারের মতো বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে দেশটি। যারা এই প্রক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করতে চাইছেন প্রথমবারের মতো তাদের জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত বছর এই প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছামৃত্যুবরণ করছেন প্রায় ১৫,৩০০ মানুষ। কানাডায় ওই বছর মোট যে পরিমাণ মানুষ মারা গেছেন তার মধ্যে শতকরা ৪.৭ ভাগ তারা। যেসব মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ তাদেরকে এই সুবিধা নেয়ার জন্য ইউথানাসিয়া’কে ২০২৭ সালের মধ্যে বিস্তৃত করতে চাইছেন আইনপ্রণেতারা। বিশ্বে গত এক দশকে মেডিকেল সহযোগিতায় মৃত্যুর আইনকে বৈধতা দিয়েছে অল্প কয়েকটি দেশ। তার মধ্যে অন্যতম কানাডা। অন্যদের মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, স্পেন ও অস্ট্রিয়া। বুধবার হেলথ কানাডা যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে মেডিকেল সহযোগিতায় মৃত্যুর হার কানাডায় বেড়েছে শতকরা প্রায় ১৬ ভাগ। তবে এর আগের বছর এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল শতকরা ৩১ ভাগ। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে কেন এই সংখ্যা কমেছে, তার কারণ এত অল্প সময়ের মধ্যে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, যারা মেডিকেল সহযোগিতায় মৃত্যুর জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন তার মধ্যে শতকরা ৯৬ ভাগেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বাকি শতকরা ৪ ভাগকে ইউথানাসিয়া পদ্ধতিতে মৃত্যুবরণ করতে সহযোগিতা করা হয়েছে। কারণ, তারা দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে ভুগছিলেন। দৃশ্যত এসব মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু অত্যাসন্ন বলেও মনে হচ্ছিল না। যারা মেডিকেল সহযোগিতা চেয়ে মৃত্যুর আবেদন করেছেন তাদের গড় বয়স প্রায় ৭৭ বছর। তাদের বেশির ভাগের ক্যান্সার। যেসব ব্যক্তি এই পদ্ধতিতে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেছেন তার মধ্যে শতকরা ৯৬ ভাগই শ্বেতাঙ্গ। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই কানাডার নাগরিক। দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ গোষ্ঠী হলেন পূর্ব এশিয়ার। তারা শতকরা ১.৮ ভাগ। 
mzamin

সাক্ষাৎকার: ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ সম্ভব না -ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন by কিরণ শেখ

দেশে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ‘৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র গুঞ্জন উঠেছে’- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ ১/১১তে ছিল। বিরাজনীতিকরণের ঘোষিত নীতি ছিল। এটা কিন্তু হয়নি। এগুলো যারা কল্পনা করে, সেটা কল্পনার মধ্যেই থাকবে। সেটা সম্ভব হবে না। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আমরা প্রথম থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন দিয়েছি। এই সরকার হচ্ছে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফসল। স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে ছাত্ররা এই সরকারকে এনেছে। আমরা মনে করি, এসময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বটা তারা নিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এই সরকার সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র মেরামত করবে। আমরা বলেছি, অতি দ্রুত সংস্কার কাজগুলো শেষ করে নির্বাচনের রোডম্যাপ দেয়া প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ যদি জানতে পারে- অমুক তারিখের মধ্যে নির্বাচন ও ভোটার তালিকা হবে, তাহলে এদেশের জনগণ নির্বাচনমুখী হয়ে যাবে। আর নির্বাচনমুখী হলে আজকে যে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তখন সেই ষড়যন্ত্র জনগণের কাছে পাত্তা পাবে না।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ষড়যন্ত্র হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। কারণ পতিত সরকার স্বৈরাচার ছিল। গায়ের জোরে তারা ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। তারা তো এদেশে একটা বিশৃঙ্খলা এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। এগুলো তারা করছে। এটা আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আর প্রমাণিত হয়েছে, এদেশের ছাত্র-জনতা ভোট দিয়েও সরকার পরিবর্তন করতে পারে, আর ভোট যারা দিতে বাধা সৃষ্টি করে তাদের পতন ছাত্র-জনতার বিপ্লবে হয়। অতএব আমরা আমাদের দেশের জনগণের ওপর আস্থাশীল।

ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননাসহ সম্প্রতি ঘটে যাওয়ার বিষয়কে অনভিপ্রেত বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, পতিত সরকার পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গেছে। তার এই পালিয়ে যাওয়ার এবং সেখানে অবৈধভাবে থাকা এটা পার্শ্ববর্তী দেশের কাছ থেকে আমরা প্রত্যাশা করি না। পতিত সরকারের যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তারা নানা ষড়যন্ত্র করছেন। এখানে তারা বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ সৃষ্টি করতে চান। তারা নানাভাবে উস্কানি দিচ্ছে এবং ভারতের একটি অংশ- বিশেষ করে মিডিয়ায় একতরফাভাবে সংবাদ দিয়ে তারা বিভ্রান্ত করছে। ফলে কিছু ঘটনা ঘটেছে। কলকাতা ও আগরতলায় ঘটেছে। এটা অনভিপ্রেত।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, ভারত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ। আমাদের ঘোষিত নীতি যে, আমাদের বন্ধু থাকবে, শত্রু থাকবে না। আবার আমাদের এখানে কেউ দাদা হিসেবেও থাকবে না। আমাদের বন্ধু থাকবে। আমরা এখনো এটা বিশ্বাস করি। ভারত এখানে মিসগাইড হচ্ছে। যেমন চট্টগ্রামে ১ হাজার মন্দির পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে ভারতে অপপ্রচার করা হচ্ছে। যেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা তাদের সাংবাদিক পাঠাক, দেখাক যে, কোথায় মন্দির ভাঙা হয়েছে। কোথায় হিন্দুদের ওপর দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা কোথাও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে না। এটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বাংলাদেশের পতিত ও স্বৈরাচারী সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একটা শ্রেণির লোক এধরনের অপপ্রচার করছে। আমরা বিশ্বাস করি, সারা বিশ্ব এটা বুঝতে পারছে, এজন্য আস্তে আস্তে এর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে।

বিএনপি’র এই স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব। সেটা ভারত হোক, কিংবা অন্যান্য দেশ হোক। কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়। এখন শেখ হাসিনার সরকারের সময় তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং তার স্বার্থে যদি এমন কিছু চুক্তি ভারতের সঙ্গে হয়ে থাকে, যেটা বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের জনগণের বিপক্ষে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অবশ্যই পুনর্বিবেচনা ও পর্যালোচনা হওয়ার দরকার। আমরা আশা করি, ভারত খারাপ চায় না। হয়তো শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতকে একতরফাভাবে অনেক সুবিধা দিয়েছেন। আমরা আশা করি, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ভবিষ্যতে যে নির্বাচিত সরকার আসবে, তারা অবশ্যই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং যাতে আমরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে পারি, এব্যাপারে গভীরভাবে পর্যালোচনা করবেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রসঙ্গে খন্দকার মোশাররফ বলেন, দিন ও তারিখ বলতে পারবো না। এখানে আমাদের যে চিকিৎসকরা রয়েছেন তাদের ওপর নির্ভর করছে। উনি যে বিদেশে চিকিৎসা নেবেন, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছে। তাদেরও মতামত দরকার হবে। চিকিৎসাকে প্রাধান্য দিয়েই সিদ্ধান্তটা হবে। অন্যদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি আইনজীবীদের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি। বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা আছে, তারমধ্যে অনেক মামলা থেকে অব্যাহিত পাচ্ছেন। মামলাগুলো যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার সম্ভাবনা তত দ্রুত হবে।

নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সুনির্দিষ্ট করে দিন ও তারিখ বিএনপি বলবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও দেশের জনগণের স্বার্থে প্রয়োজন। এটা হলেই ষড়যন্ত্র ব্যাহত হয়ে যাবে। এই সরকার নির্বাচন কমিশন করেছে, আমরা আশা করি- নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা নতুন করে তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কাজগুলো অতি দ্রুত করে নির্বাচনের একটা তারিখ ঘোষণা করবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐক্যের ডাক প্রসঙ্গে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এই সরকার যেহেতু নির্দলীয়, তারা কিন্তু কোনো দলের সদস্য না। এখানে একটা জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে নির্বাচনের দিকে দেশ চলে গেলে নির্বাচিত সরকারের কাছে তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করে শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় নিতে পারবে। এজন্য প্রথম থেকেই আমরা জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছি। তিন মাস দেশ শাসন করার পরে সরকার এটা উপলব্ধি করেছে। আমাদের বিশ্বাস, নিজেদের জন্য এটা করতে বাধ্য হবে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত ও স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর আগামীর বাংলাদেশ ভালো দিকেই যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন খন্দকার মোশাররফ। 

mzamin

হাসিনার বক্তব্য ভারত সমর্থন করে না: বিক্রম মিশ্রি

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত। কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বে ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ নিয়ে এ কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তিনি মনে করেন এটা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে একটি ছোটখাটো ক্ষত (পিনপ্রিক)। একই সঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একক কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের জনগণের বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে ভারত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য হিন্দু। উল্লেখ্য, সোমবার ঢাকা সফর করেন বিক্রম মিশ্রি। এদিনই দেশে ফিরে যান তিনি। বুধবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। বৈঠকে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। সেখানে বিক্রম মিশ্রি বলেন- নিজের বক্তব্য প্রচারের জন্য ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগ বিষয়ক প্রযুক্তি (ডিভাইস)’ ব্যবহার করছেন শেখ হাসিনা। ভারত সরকার তাকে এমন কোনো প্ল্যাটফরম বা সুবিধা দেয়নি যা দিয়ে তিনি ভারতের মাটিতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। মিশ্রি বলেন, তৃতীয় কোনো দেশে হস্তক্ষেপ এড়াতে ভারত প্রচলিত যে রীতি অনুশীলন করে এটা তারই অংশ। দ্য হিন্দু লিখেছে- শেখ হাসিনা যখন ভারতে বসে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে ভিডিও বার্তা তৈরি করছেন, তখন বিক্রম মিশ্রির এই মন্তব্য বড় রকম তাৎপর্য বহন করে। সোমবার ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তুলে ধরেন বিক্রম মিশ্রি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন যে,  বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একক কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়েও বেশি। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয় ভারত। একই সঙ্গে যে সরকার থাকবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে। বাংলাদেশে ‘দুঃখজনক কিছু’ ঘটনায় ভারতের ‘উদ্বেগের’ কথা ঢাকার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বলে বৈঠকে কমিটিকে জানান। দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক এবং কানেক্টিভিটিতে অংশীদার বলে বর্ণনা করেন। বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয়পক্ষ রেল সংযোগ, বাস যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে। দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী রেল সার্ভিস ‘সাময়িক’ বন্ধ রয়েছে। বিক্রম মিশ্রি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কথিত সহিংসতার অভিযোগের স্বীকৃতি না দেয়ায় উদ্বিগ্ন ভারত। তবে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় ভারত। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়েই তাদের উদ্বেগের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন, সেইসব অভিযুক্ত ‘সন্ত্রাসীর’ অনেককে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। এতে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় যে ‘অপপ্রচার’ চলছে সে বিষয়টি তুলে ধরেছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। রিপোর্টে বলা হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে কমিটির অনেক সদস্য বাংলাদেশে ‘ইসকন মঙ্ক’কে গ্রেপ্তারের ইস্যু তুলে ধরেন। তবে বিক্রম মিশ্রি তার কোনো জবাব দেননি। সূত্র বলেছেন, তিনি পরে এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন।  তিনি কমিটির সদস্যদের কাছে বলেছেন, তার ঢাকা সফরের সময় কর্তৃপক্ষকে বলেছেন- মন্দিরে ও ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে হামলার সঙ্গে জড়িত ঘটনাগুলোর বিষয়ে ‘স্বীকৃতি’ দেয়া উচিত- এটা তিনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে প্রকাশিত রিপোর্টকে অতিরঞ্জিত বা মিডিয়ার সৃষ্টি বলে দেখানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ‘বিশ্বাসযোগ্য’ সংগঠনগুলো কিছু ঘটনাকে প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। এগুলোর সমাধান দাবি করে। এরপর বিক্রম মিশ্রি বলেন, এসব বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাতে তিনি গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের সংখ্যা জানিয়েছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলার কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যেসব হামলা হয়েছে তার অনেকটা হয়েছে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর। বিক্রম মিশ্রি বলেন, এই ধরনের হামলার বিষয়কে এমন যুক্তি দিয়ে বৈধতা (জাস্টিফাই) দেয়া যায় না। কমিটিকে তিনি আরও বলেন, সোমবারের সফরে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। এ সময়ে তিনি ‘গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং অংশগ্রহণমূলক’ বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। বিক্রম মিশ্রি আরও বলেন, গত বছর বাংলাদেশিদেরকে ১৬ লাখ ভিসা ইস্যু করেছে ভারত। ওই সময়ে যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশকে দেয়া ভিসা সবচেয়ে বেশি। তিনি আরও বলেন, একক ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে দেখে না ভারত। এই সম্পর্ককে ‘ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক’ হিসেবে দেখে। কমিটিকে বিক্রম মিশ্রি জানান যে, ড. ইউনূসের সঙ্গে কথোপকথনের সময় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রিভিউ করার ইস্যু তুলে ধরা হয়নি। 
mzamin

পোশাক খাতে অস্থিরতা থামছেই না

রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধে সরকার ও মালিকপক্ষ থেকে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও অস্থিরতা থামছেই না। মাসের পর মাস চেষ্টার পরও কেন থামানো যাচ্ছে না বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান এই খাতে শ্রমিক অসন্তোষ? অনেকে বলছেন, পরিকল্পিতভাবে পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করতে কাজ করছে শ্রমিকদের পাশাপাশি কিছু কারখানা মালিকও। বেশকিছু মালিক ব্যবসা করলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে গড়িমসি করছেন। আবার ঝুট ব্যবসা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাঝেও রয়েছে কোন্দল। ফলে অস্থিরতা লেগেই আছে।

সূত্র মতে সরকার পরিবর্তনের পর আগস্টের শেষ দিকে সাভার ও আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পে শুরু হয় শ্রমিক অসন্তোষ। এরপর দফায় দফায় বৈঠকে বসে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ নানাপক্ষ। বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যাংক থেকেও দেয়া হয়েছে বিশেষ ঋণ সুবিধা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেনে নেয়া হয়েছে শ্রমিকদের ১৮ দফা। তারপরও মেলেনি সুফল। বিজয়ের মাসেও শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পোশাক কারখানা।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল ইসলাম আমিন বলেন, কম মজুরি হওয়ায় শ্রমিকরা অতি কষ্টে জীবনযাপন করছেন। ফলে তাদের বেতন বাড়ানো দরকার।

পোশাক মালিকদের মতে, বিগত সরকারের সময়েও প্রায় ৪ হাজার কারখানার মধ্যে দুয়েকটি কারখানায় সবসময়ই সমস্যা ছিল, কিন্তু শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করেনি। এখন সমস্যা সৃষ্টি করে বা সামান্য সমস্যা হলেই একটি পক্ষ শ্রমিকদের মহাসড়কে নিয়ে যায়। একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, বিগত সরকারের আমলে সুবিধা পাওয়াদের একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যেকোনো একটি বা দুটি কারখানায় সমস্যা দেখা দিলেই শ্রমিকদের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, অভ্যন্তরীণভাবেই মিটমাট সম্ভব এমন ঘটনাকেও বড় ইস্যু বানানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে শুধু শ্রমিকরা জড়িত নয়। এর পেছনে অনেক ইন্ধনদাতা আছে। শ্রমিক অসন্তোষের সঙ্গে বহিরাগতরা জড়িত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, পোশাক খাতে অধিকাংশ শ্রমিকই নিরীহ। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে হাতে গোনা কিছু শ্রমিক। এদের মধ্যে কিছু দুষ্কৃতিকারী, কিছু এনজিও’র লোক এই নিরীহ শ্রমিকদের অপকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলের হয়ে শ্রমিকদের একটি পক্ষ পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করছে।

এদিকে সাধারণত পোশাক খাতে যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে যে সমন্বয় থাকা জরুরি ছিল, তা নেই বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকটি কারখানার মালিক।

এদিকে সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের যৌক্তিক সমাধান করা হবে।

দুইদিনে ১৯ কারখানা বন্ধ ঘোষণা: ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় বৃহস্পতিবারও শ্রমিকেরা নানা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন। সরকার ঘোষিত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি ৯ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে তারা বার্ষিক মজুরি ১৫ শতাংশ ও ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বৃহস্পতিবার আরও ৮টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার বন্ধ করা হয় ১১টি কারখানা। দুইদিনে মোট ১৯টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে।

সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান: আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের টানা কর্মবিরতিতে আবারো অশান্ত হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়া। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ (১) ধারায় ৬টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরও ৮টিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। এদিকে যেকোনো ধরনের সহিংসতা  রোধে পুরো যৌথবাহিনী সতর্ক অবস্থানের পাশাপাশি টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরিসহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে সাঁজোয়া যান ও জল কামান।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নাসা গ্রুপ, ট্রাউজার লাইন ও আল মুসলিম। সাধারণ ছুটিতে থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিউ এইজ গার্মেন্টস, নিউ এইজ অ্যাপারেলস, মেডলার অ্যাপারেলা এবং ব্যান্ডো ডিজাইন। এ ছাড়া, শ্রমিকরা কারখানায় এলেও কাজ না করে বেরিয়ে গেছে এমন কারখানার মধ্যে রয়েছে- নিট এশিয়া লিমিটেড, নেক্সট কালেকশন লিমিটেড, ডেকো ডিজাইন লিমিটেড, শারমিন ফ্যাশন, শারমিন অ্যাপারেলস, ইথিকাল গার্মেন্টস, আগামী ফ্যাশন, ক্রসওয়্যার, ফ্যাশন ফোরাম এবং মুন রেডিওয়্যার লিমিটেডসহ আরও কয়েকটি কারখানা।

নিউ এইজ গ্রুপের একটি কারখানার নারী শ্রমিক বলেন, গত শনিবার থেকেই সমস্যা হচ্ছিল। আজ মুঠোফোনে বার্তা পেয়েছেন কারখানা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করলেও অন্তত ২৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকরা শুরু করেন কর্মবিরতি। হাজিরা নিশ্চিত করে বিভিন্ন কারখানায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা অবস্থান করে তারা বেরিয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে নিউ এইজের তিনটা কারখানা, বান্দু ডিজাইন, মেডলার  অ্যাপারেলস ও শারমিন গ্রুপের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও চলমান অস্থিরতার কারণে নাসা গ্রুপের একাধিক কারখানাসহ ছয়টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় চলতি বেতনে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাৎসরিক বেতন ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি, প্রতি মাসে অর্জিত ছুটির টাকা পরিশোধ, ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে কর্মবিরতিসহ আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিকরা ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলেও, কর্মবিরতি পালন ছাড়া কোনো বিশৃঙ্খলা করছেন না। সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

mzamin

কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট কমেছে ১৬৫৭

গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংক খাতে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণ কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে কোটি টাকার বেশি ডিপোজিট থাকা অ্যাকাউন্ট সংখ্যা কমেছে ১ হাজার ৬৫৭টি। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার অ্যাকাউন্টে। জুন প্রান্তিক শেষে এমন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থাৎ জুন প্রান্তিকে ব্যাংকে কোটিপতির অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছিল প্রায় ৩ হাজারের মতো। একইসঙ্গে এসব অ্যাকাউন্টে আমানত কমেছে ২৬ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা।

তথ্য বলছে, জুন প্রান্তিক শেষে কোটি টাকার ওপর এসব অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেকেই তাদের অ্যাকাউন্টের টাকা তুলে নিয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট কমার আরেকটি কারণ বলে মন্তব্য করেন তারা।

গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর অন্যান্য খাতের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও সংস্কার শুরু হয়। কয়েকটি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয় গ্রাহকরা। প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ীর ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তথ্য বলছে, একক ব্যক্তিদের পাশাপাশি করপোরেটে কোটি টাকার বেশি ডিপোজিট থাকা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কমে এসেছে।

চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যাংকখাতে একক ব্যক্তি কোটিপতিদের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা কমেছে ৬২০টি। এ ছাড়া এসব অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ কমেছে ৮ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। একক ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট হিসাবে চলতি বছর সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৬১টিতে। জুন প্রান্তিক শেষে এসব অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ৪৮১টি। সেপ্টেম্বর শেষে এসব অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। জুন শেষে আমানতের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।

একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর অনেকেই তাদের অ্যাকাউন্টের টাকা তুলে নিয়েছে। কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট কমার এটি একটি বড় কারণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই-সেপ্টেম্বরে ঢাকাসহ ছয় বিভাগে আমানত কমলেও রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে বেড়েছে। সার্বিকভাবে এই প্রান্তিকে আমানত কমেছে ১৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। এর আগে টানা চার প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছিল। এর মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে আমানতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪.৩৪ শতাংশ; যা জানুয়ারি-মার্চে ছিল ০.৭৫ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনের শেষে চট্টগ্রাম বিভাগে আমানত ছিল ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগে আমানত ৭৪ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ হাজার ২৭৬ কোটি টাকায় ওঠে।

সর্বশেষ জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি আমানত ছিল ঢাকা বিভাগে আর সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে। এ সময় দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৬১ শতাংশই ছিল ঢাকা বিভাগে। আবার শহরাঞ্চলে যত আমানত আছে, তার ৫৫.৭৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগের। সেপ্টেম্বরের শেষে ঢাকা বিভাগের আমানত কমে হয় ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৯ কোটি টাকা; যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ বিভাগেই আমানত কমেছে ১২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। দেশের মোট আমানতের ২১.২৪ শতাংশ রয়েছে এই বিভাগে। অর্থাৎ, দেশের মোট আমানতের প্রায় ৮২ শতাংশই এখন আছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। বাকি ১৮ শতাংশ রয়েছে বাকি ছয় বিভাগে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশের মোট আমানতের সর্বনিম্ন ১.৬৩ শতাংশ ছিল ময়মনসিংহ বিভাগে, যা পরিমাণে ২৯ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর আগের চার প্রান্তিকের মধ্যে তিনটিতে এই বিভাগের হিস্যা ছিল ১.৬২ শতাংশ, অন্য প্রান্তিকে ছিল ১.৬০ শতাংশ। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে দেশের মোট আমানতের মধ্যে ৪.২৩ শতাংশ খুলনা বিভাগের; ৪.১২ শতাংশ রাজশাহী বিভাগের; ৩.৮৯ শতাংশ সিলেট বিভাগের, ১.৯৫ শতাংশ রংপুর বিভাগের এবং ১.৯৫ শতাংশ বরিশাল বিভাগের।

mzamin

মালেক-পলক আজমের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে মঙ্গলবার। বুধবার শুধু দুই ঘণ্টা অফিস করেছেন তারা। তবে বৃহস্পতিবার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনেই সাবেক তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত দিয়েছে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন নয়া কমিশন। ক্ষমতা অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়বর্হিভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম ও তাদের পরিবারের সদস্যদের  বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি।

দুদক সূত্র জানায়, মামলায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিরুদ্ধে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, তার ছেলে রাহাত মালেকের বিরুদ্ধে ১১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ  ও তার স্ত্রী আরিফা জেসমিনের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে প্রায় ১৯ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। আর সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজম ও তার স্ত্রী দেওয়ান আলেয়ার বিরুদ্ধে দুই মামলায় ৭২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ  সরকার পতনের পর তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছিল। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দেশ-বিদেশে তাদের আরও সম্পদ রয়েছে কিনা মামলার তদন্তকালে তা খতিয়ে দেখা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাহিদ মালেক নিজ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে ৩৪টি ব্যাংক হিসাব খুলে পরস্পর যোগসাজশে ১৪৩ কোটি ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৬৯৭ টাকা জমা ও ১১৫ কোটি ৮৫ লাখ ৬ হাজার ৪৬৫ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে হস্তান্তর, রূপান্তর, স্থানান্তর করেছেন। তিনি নিজের অবৈধ অর্জিত ১১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৪ হাজার ১৬১ টাকা তার পুত্র রাহাত মালিকের নামে অর্জন দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া জাহিদ মালেকের স্ত্রী শাবানা মালেক, মেয়ে সাদিয়া মালেক ও সিনথিয়া মালেক এবং পুত্রবধূ সাকিবা মালেক জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পদের সম্পদ বিবরণীর নোটিশ জারি করা হয়েছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৪টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ঘুষ, দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৩১৪ টাকা জমা ও ২৯ কোটি ৮৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৫ টাকা তুলে নিয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজমের ৬০টি ব্যাংক হিসাবে ৭২৫ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার ২৩২ টাকা জমা ও ৭২৪ কোটি ৮৯ লাখ ৯৩ হাজার ৭১৫ টাকা তুলে নিয়েছেন।

এদিকে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম,  ভোলা-৩ আসনের সাবেক সদস্য নূর নবী চৌধুরী শাওন, হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু জাহির, নোয়াখালী-১ আসনের সাবেক সদস্য এইচ এম ইব্রাহিম ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনের নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিদেশযাত্রার নিষেধাজ্ঞার  দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। 

mzamin

ক্ষমা চাইলো র‌্যাব

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেছেন, গুম-খুন এবং অপহরণসহ র‌্যাবের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ রয়েছে। আজ পর্যন্ত যারা র‌্যাবের হাতে নির্যাতিত বা অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের কাছে এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ র‌্যাবের দ্বারা অতীতে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তাদের পরিবারের কাছে আমরা দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করছি। গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

র‌্যাব ডিজি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গুম-খুন কমিশন গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও এসব বিষয় নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আমরা দায়মুক্ত হতে চাই। আমি যতদিন দায়িত্ব পালন করবো, কারও নির্দেশে এসব অপরাধে র‌্যাব আর জড়িত হবে না সেটি আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আমার অফিসার যারা আছেন, র‌্যাব কখনো কারও নির্দেশে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ গুম-খুন করবে না। যদি কোনো সদস্য নিজ দায়িত্বে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত হয়, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেবো যেটা ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা নিয়ে আসছি। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, হেলিকপ্টারের বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আছে, ফৌজদারি মামলাও রুজু হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও এটা অনুসন্ধান করছে। আমরা আশা করবো এসব অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্প্রতি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল র‌্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে দাবি তুলেছে- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই মেনে নেয়া হবে। তবে যতদিন দায়িত্বে থাকবো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাবো। র‌্যাবের পোশাক পরিবর্তন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পোশাকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যিনি পোশাকটি পরবেন তারা। আমরা প্রতিদিন ইউনিফর্ম পরি, আপনারা প্রতিদিন প্যান্ট শার্ট, স্যুট, পায়জামা-পাঞ্জাবিসহ বিভিন্ন পোশাক পরেন। একজন ভালো ব্যক্তি যে পোশাকই পরেন না কেন, তার কাছে আমরা ভালো জিনিসই পাবো। কিন্তু একজন খারাপ ব্যক্তি যে পোশাকই পরেন না কেন, আমরা ভালো জিনিস কিন্তু পাবো না। এখানে পোশাকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যক্তির মানসিকতা। তারপরও আমরা র‌্যাবের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি।

সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, সাংবাদিকতা মহান পেশা। সাংবাদিকরা যদি ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ না করতে পারেন তাহলে গণতান্ত্রিক দেশে প্রশ্ন থেকে যায়। সাংবাদিক বন্ধুরা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন। আপনাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সর্বাত্মক অগ্রাধিকার দেবো। সাংবাদিক সাগর-রুনী হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এই মামলার তদন্তে আশানুরূপ ফল না হওয়ার বিষয়টি আদালতকে অবহিত করেছি। আদালত এই মামলা তদন্তের জন্য একটি উচ্চতর কমিটি গঠন করে দিয়েছে। এখানে আমরা সফলতা পাবো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালত এবং আইনের নির্দেশ মানতে সবাই বাধ্য। আমরা নিজেরাও চাইবো এই ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং বিচার হোক।

বিভিন্ন জঙ্গি অভিযানকে নাটক বলা হচ্ছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাব ডিজি বলেন, আমাদের দেশে জঙ্গির তৎপরতা ছিল, আমরা দেখেছি। র‌্যাবও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যতেও কোনোরূপ জঙ্গি তৎপরতা যেন দেশে বিস্তার লাভ না করে সেজন্য আমরা সচেষ্ট আছি কাজ করে যাচ্ছি। র‌্যাব ডিজি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, র‌্যাবের নিজস্ব কোনো আইন নেই। পুলিশ আইনে র‌্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। র‌্যাবের জন্য আমরা আলাদা একটি আইন করার চিন্তা-ভাবনা করছি। এ ছাড়া আর কোন কোন বিষয় সংস্কার করা যায় সেজন্য গণমাধ্যম ও জনসাধারণের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। বর্তমানে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে, তবে প্রত্যাশিত জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি। ডিজি বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব তার দায়িত্ব আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে।

তিনি বলেন, গত ৫ই আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটে। পরে র‌্যাবের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করে। একাজ করতে গিয়ে র‌্যাবের ১৬ জন সদস্য বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার সম্পৃক্ততা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অপরাধে এই ১৬ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে র‌্যাবের ৫৮ জন কর্মকর্তা ও ৪ হাজার ২৩৫ জন সদস্যকে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। আনসার বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহ, গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিতিশীলতা, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে কর্মবিরতিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে র‌্যাব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫০০ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। পাশাপাশি ২০ হাজার অস্ত্রও উদ্ধার করেছে সংস্থাটি। এসময় উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব এডিজি (অপারেশন্স) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ, পরিচালক কর্নেল মুনীম ফেরদৌস।

mzamin

বাংলাদেশে বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী আদর্শের উত্থান by স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরদিন অর্থাৎ ৯ই আগস্ট বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৮ শতাংশ হিন্দু সংখ্যালঘু ঢাকার শাহবাগ চত্বরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় নেমে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ৫ থেকে ৮ই আগস্টের মধ্যে হিন্দুদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আক্রমণের প্রতিবাদ জানাচ্ছিলো তারা। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের মতো ঐতিহ্যবাহী সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ সেদিন রাস্তায় জড়ো হয়েছিল। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে স্লোগান দেয়ার সময় সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিতর্কিত ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে থাকেন।

১১ই আগস্ট বিক্ষোভের তৃতীয় দিনে একটি নতুন প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ (বিএইচজেএম) গঠিত হয়। নীহার হালদার, জুয়েল আইচ আরকো, জয় রাজবংশী, রনি রাজবংশী ও প্রদীপ কান্তি দে-এর সমন্বয়কারী এবং মূল মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। একই দিনে বিএইচজেএম-এর ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ (বিএইচজেএম) নামটির সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক-সাংগঠনিক মাথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সহযোগী হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মিল রয়েছে। অনেক বিএইচজেএম নেতাও বিজেপিতে কাজ করেছেন। বিএইচজেএমই ছিল প্রথম ভারতীয় সংগঠন, যারা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ড. ইউনূসের শপথ নেয়ার আগে তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতাতেও একটি সমাবেশ করেছিল।

বাংলাদেশে পরের সপ্তাহগুলোতে ঐতিহ্যগত সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো পেছনে পড়ে যায়। জন্ম নেয় নতুন প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ বা বিএইচজেএম। এর মূল সংগঠকরা সকলেই যথাক্রমে বাংলাদেশ হিন্দু ছাত্র মহাজোট এবং হিন্দু যুব মহাজোটের সঙ্গে জড়িত ছিল, যা বাংলাদেশ জয়তো হিন্দু মহাজোটের (বিজেএইচএম) ছাত্র ও যুব শাখা। বিজেএইচএম হলো একটি হিন্দু অধিকার সংগঠন যা ঢাকায় ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অনেকে হিন্দুত্বের শিকড় খুঁজে বেড়িয়েছেন।

বিজেপি ও বিএইচজেএম সহ আরএসএস এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে একত্রে সংঘ পরিবার বা আরএসএস পরিবার বলা হয়। তাদের স্বঘোষিত মতাদর্শ হলো হিন্দুত্ব, যাকে তারা ‘হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করে। তারা একে জাতীয়তাবাদ বললেও তা ভারতের বর্তমান ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার, নেপাল ও তিব্বত থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত বিস্তৃত কাল্পনিক একটি অখণ্ড ভারত বা অবিভক্ত ভারতকে পুনরুদ্ধার করার ধারণাকে প্রচার করে এই সংঘ পরিবার। এর আগে নেপালেও হিন্দুত্বের প্রভাব পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে বিজেএইচএম নেতারা অখণ্ড ভারতকে চিত্রিত করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একটি বিতর্কিত ভারত সফর: গত ১২ই আগস্ট ৩৪ হাজার অনুসারীসহ পূজাপার্বণ নামে একটি ফেসবুক পেজ নীহার হালদার ও প্রাক্তন ইসকন সন্ন্যাসী চিন্ময় দাশকে হিন্দুদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আহ্বান জানায়। পরের কয়েক সপ্তাহে হালদার ও দাশ হিন্দু বিক্ষোভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। নীহার হালদার বিএইচজেএম-এ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তার নেতৃত্বে ৮ই সেপ্টেম্বর, ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০শে সেপ্টেম্বর ও ২৭শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক প্রতিবাদ সংঘটিত হয়। ২৭ শে সেপ্টেম্বর বিএইচজেএম সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ ঘোষণা করে। এদিকে চিন্ময় দাশ চট্টগ্রামে প্রতিবাদের মূল মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন, যেখানে সম্মিলিত সনাতনী ছাত্র সমাজের ব্যানারে বিক্ষোভ সংগঠিত হচ্ছিল।

আন্দোলনে হাসিনার আওয়ামী লীগ বা বিজেপিকে প্রভাব ফেলতে দেয়ার জন্য ৩০শে সেপ্টেম্বর দৃশ্যত বিএইচজেএম বিভক্ত হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারতে যান নীহার হালদার। তিনি তার একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠকের ছবি শেয়ার করেছেন, যা পরে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। ছবিগুলোতে নীহার হালদারকে দেখা গেছে, ২১শে সেপ্টেম্বর বিজেপি’র ত্রিপুরার সাংসদ প্রতিমা ভৌমিকের সঙ্গে, ২৭শে সেপ্টেম্বর কলকাতায় ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ের সঙ্গে, ১লা অক্টোবর বেঙ্গল বিজেপি’র সাংস্কৃতিক সেলের আহ্বায়ক রুদ্রনীল ঘোষের সঙ্গে এবং কলকাতায় বিজেপি’র দলীয় কার্যালয়ে বঙ্গীয় বিজেপি বিধায়ক অসীম সরকারের সঙ্গে। ২৮শে অক্টোবর বিজেপি’র বাংলা শাখার প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ ৭ই নভেম্বর ও অবশেষে ৯ই নভেম্বর আবার ভৌমিকের সঙ্গে বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে দেখা করেন। বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে বিজেপি’র পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে ৭ই নভেম্বর এবং সাংসদ প্রতিমা ভৌমিকের সঙ্গে ৯ই নভেম্বর দেখা করেন হালদার।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বিজেপি’র দায়িত্ব নেয়ার আগে দিলীপ ঘোষ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। ঢাকায় বিএইচজেএম ১লা অক্টোবর একটি বিবৃতি জারি করে বলেছে যে, হালদার দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাকে সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে এবং বিদেশে অবস্থানকালে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তার জন্য সংগঠন দায়ী থাকবে না। শিগগিরই এর অন্য দলটি একটি বিবৃতি জারি করে জানিয়েছিল যে বিএইচজেএম-এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ সনাতনী জাগরণ মঞ্চ (বিএসজেএম) রাখা হয়েছে। তারা হালদারকে সমন্বয়ক ও চিন্ময় দাশকে মুখপাত্র ঘোষণা করেন। অক্টোবর জুড়ে বিএইচজেএম ও বিএসজেএম উভয়ই পৃথকভাবে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছিল, যদিও বিএসজেএম বেশি প্রাধান্য লাভ করেছিল। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর হালদারের প্রথম জনসাধারণের উপস্থিতি ছিল চিন্ময় দাশের সঙ্গে, যিনি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট নামে একটি নতুন প্ল্যাটফরম চালু করার জন্য ১৭ই নভেম্বর বিএসজেএম ঘোষণা করে যে, তারা বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোটের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সংগঠনের একটি ছাতা সংগঠন। নতুন দলের  মুখপাত্র ঘোষণা করা হয় চিন্ময় দাশকে। ততদিনে, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দসহ বাংলাদেশে অনেকেই জয় শ্রীরাম স্লোগান তুলে সরব হয়েছেন। তারা ভারতে মুসলিমবিরোধী হামলার উস্কানিতে স্লোগানের ভূমিকা তুলে ধরেন। ২২শে নভেম্বর দাশ এই স্লোগানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো দ্বারা উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও যদি আল্লাহ হু আকবর একটি সন্ত্রাসী স্লোগান না হয়, তবে জয় শ্রী রাম ধ্বনি বিজেপি-আরএসএসের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হতে পারে না।
১৯৯২ সালে উত্তর ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিকে পরিচালিত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি এই স্লোগানটি মানুষকে, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি ও লাঞ্ছিত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এটি শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারতে বিজেপি’র সমালোচকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, জয় সিয়া রাম, হে রাম, রাম রাম, হরে কৃষ্ণ হরে রাম ধ্বনি ধর্মীয় হিন্দুরা ঐতিহ্যগতভাবে রামের প্রশংসা করে উচ্চারণ করে, কিন্তু জয় শ্রী রাম একটি রাজনৈতিক স্লোগান।

বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ২০০৬ সালে বিজেএইচএম বা হিন্দু মহাজোটের ভিত্তির মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুত্ব মতাদর্শের শিকড়ের সন্ধান করেন। এটি সেই নেতাদের একটি অংশ যারা জয় শ্রী রামের মতো স্লোগান ব্যবহার করা শুরু করেছিল। পরের বছর তারা রাম নবমীর মতো উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করা শুরু করে, যদিও ছোট পরিসরে। এটি এমন একটি উৎসব যা ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা পেশিশক্তির আস্ফালন দেখানোর জন্য ব্যবহার করে এসেছে। হিন্দু মহাজোট বিদেশে শাখা খুলেছে এবং আরএসএস-এর আরেকটি সহযোগী বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

২০১৬ সালে বিজেএইচএম বিভক্ত হয়। মাঝখানে জোড়া লাগলেও ২০২০ সালের শুরুতে দলটি আবার বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রভাস চন্দ্র রায় ও পলাশ কান্তি দে-এর নেতৃত্বে একটি দল মহাসচিব গোবিন্দ প্রামাণিককে পুনরায় বহিষ্কার করে। বিভক্তির কারণ ছিল প্রামাণিকের রাজনৈতিক অবস্থান তিনি আওয়ামী লীগকে ‘নিঃশর্ত সমর্থন’ করার ক্ষেত্রে হিন্দু কৌশলে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিভক্তির পরে প্রভাস চন্দ্র রায় ও পলাশ কান্তি দে উভয়ই হিন্দুত্বকে তাদের আদর্শ হিসেবে দাবি করতে থাকেন, অন্যদিকে গোবিন্দ প্রামাণিক হাসিনার বিরোধীদের, প্রধানত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী’র সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের যোগসাজশ গ্রহণযোগ্য নয় বলে দাবি করে রায় দে।

২০২১ সালে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের ভূমিকার সমালোচক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, আরএসএস, বিজেপি ও ভিএইচপি’র বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের বিষয়টি তুলে ধরা সত্ত্বেও মোদি সরকার হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে নরম মনোভাব দেখাচ্ছে। অন্য উপদলগুলো আওয়ামীপন্থি ও ভারতপন্থি ছিল। হাসিনার পতনের পরে বিক্ষোভে বিজেএইচএম-এর প্রভাস চন্দ্র রায় ও পলাশ কান্তি দে-এর উপদলের ছাত্র ও যুবকর্মীরা হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং পরবর্তীকালে সনাতনী জাগরণ মঞ্চ গঠনসহ হিন্দু দলগুলোর মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিপ্লোম্যাটকে একজন বিজেএইচএম সদস্য বলেছেন যে, জয় শ্রী রাম স্লোগান, ক্রুদ্ধ হনুমানের চিত্র, রাম নবমীর মতো উৎসব এবং লাভ জিহাদের মতো ইস্যুতে প্রচারণার মতো ভারতের হিন্দুত্ব প্রতীকের ব্যবহার ২০২২ সালে বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ২০২১ সালের শেষের দিকে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ অনেককে কট্টরপন্থি হিন্দুত্ব গ্রহণ করতে প্ররোচিত করেছিল, যেমনটি ভারতে আরএসএস দ্বারা অনুশীলন করা হয়েছিল। তারা জয় শ্রী রামকে ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। লোকেরা, বিশেষ করে যুবকরা, আরএসএস-সংযুক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আউটলেটগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করতে শুরু করেছে বলে জানাচ্ছেন ওই বিজেএইচএম নেতা।
২০২২ সালে বিজেএইচএম-এর উভয় দলই রাম নবমী উদ্‌যাপনের আয়োজন করেছিল। ২০২২ সালের আগস্টে জন্মাষ্টমীর সময় শ্রী কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত একটি হিন্দু উৎসবে তাদের স্লোগান ছিল ‘জিনি-ই কৃষ্ণ তিন-ই রাম/জয় শ্রী রাম, জয় শ্রী রাম’ (কৃষ্ণ এবং রাম একই/রামের বিজয়)। তারা ‘জয় হিন্দুত্ব’ (হিন্দুত্বের জয়) মতো স্লোগানও তুলেছিল। শুধুমাত্র কৃষ্ণের নামই সমস্ত হিন্দুদের একত্রিত করতে পারে তা নির্দেশ করে, তারা একই যুক্তি পুনরাবৃত্তি করেছিল যে, যেহেতু কৃষ্ণ ও রাম একই, তাই তাদের সকলের জয় শ্রী রাম ধ্বনি তোলা উচিত। ২০২৩ সালে জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোট নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম হিন্দুত্ববাদী (হিন্দুত্ব-অনুসরণকারী) ছাত্র সংগঠন হিসেবে উত্থাপন করে, যারা হিন্দু ও হিন্দুত্ব রক্ষায় নিবেদিত। একটি অনুষ্ঠানে এর নেতারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তাদের ভারতের বিজেপি’র সঙ্গে সংযুক্ত করা ঠিক নয়, কারণ বিজেপি’র আদর্শ হিন্দুত্ব ও জয় শ্রী রাম স্লোগান। তারা আন্তর্জাতিক পরিচয়সহ একটি বাংলাদেশি সংস্থা বলে নিজেদের দাবি করে।
একজন বিএইচজেএম নেতা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ব্যক্তিগত ক্ষতি অনেক হিন্দুকে কট্টরপন্থি হতে বাধ্য করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন,  নীহার হালদারের পরিবার মুসলমানদের কাছে তাদের সম্পত্তি হারিয়েছে। তারা তাদের সম্পত্তি উদ্ধার করতে পারেনি। প্রশাসন সাহায্য করেনি। আমি তাকে কট্টরপন্থি হিন্দু কর্মীতে পরিণত করার জন্য দোষ দিতে পারি না। তার হতাশা তাকে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সাহায্য চাইতে বাধ্য করেছিল। বার বার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। রনি রাজবংশী বিএইচজেএম-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ২০২৩ সালে মহাকাল স্বয়ংসেবক ফাউন্ডেশন (এএসএফ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বয়ংসেবক শব্দটি আবার আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত। আরএসএস তার সদস্যদের ‘স্বয়ংসেবক’ বলে। স্বেচ্ছাসেবকদের বোঝাতে শুধুমাত্র আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত লোকেরা ভারতে এই শব্দটি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে এমএসএফও তাদের স্বেচ্ছাসেবকদের স্বয়ংসেবক বলে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য বলেছেন, হিন্দুত্ব একটি হিন্দু ধর্মীয় আদর্শ। এর সীমানা থাকতে পারে না। আরএসএস বা বিজেপি’র সঙ্গে আমাদের কোনো সাংগঠনিক সংযোগ নেই। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ-উদারবাদী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং জামায়াত-উল-মুজাহিদীনের মধ্যে পার্থক্য করে, তারা প্রথমটিকে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং পরবর্তীটিকে একটি সন্ত্রাসী দল বলে উল্লেখ করে। কিন্তু একই লোকেরা আমাদের আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
লেখক: IndiaÕs ultra-Left ও  the Hindu right দু’টি নন-ফিকশন বইয়ের লেখক। ভারতের রাজনীতি, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি সেখানে লিখেছেন।

mzamin

হেলমেট বাহিনীর যুগের অবসান হয়েছে

অতীতে সাংবাদিকদের ওপর হেলমেট বাহিনীর হামলার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, গত ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সেই যুগেরও অবসান ঘটেছে। হেলমেট বাহিনীরও অবসান ঘটেছে। বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) সদস্য সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের খারাপ আচরণ, মারধর ও গুলির বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন,  আমরা তো সেবা করতে চাই। সাংবাদিকদের ওপর হামলা কেন করবো? শুধু সাংবাদিক কেন- কোনো মানুষকেই তো পুলিশ নির্যাতন বা হামলা করতে পারে না। আমার পুলিশ সদস্যরা সব সময় ডিসিপ্লিনে থাকবে, হামলা-মামলা বা কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ বা অপেশাদার আচরণ কেন করবে? এরকম কোনো ঘটনা যদি ঘটে তাহলে আমার নজরে আনবেন- আমি তদন্ত করবো, ব্যবস্থা নেবো। ডিএমপি ও ক্র্যাবের পারস্পরিক সহায়তা ছাড়া কেউ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাই আমরা ক্র্যাবের সহায়তা চাই। গত জুলাই-আগস্টে ধ্বংসযজ্ঞ, নানা ধরনের ক্ষতিকর কার্যাবলীর জন্য ডিএমপি কমিশনার হিসেবে ঢাকাবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, আমরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যবৃন্দ নতুন করে ঢাকাবাসীকে সেবা দেয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি। জুলাই-আগস্টের ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় ঢাকাবাসীর জীবন ও সম্পদ অনিরাপদ হয়ে যায়। আমি ঢাকাবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমার সহকর্মীদের নিয়ে সবার সহযোগিতায় ঢাকাবাসীর জান-মালের হেফাজত করে যাবো। ইতিমধ্যে আমি আমার সহকর্মীদের মেসেজ দিতে সক্ষম হয়েছি যে, আগের মতো আর ঢাকাবাসী সেবা প্রদানে কার্পণ্য করবে না। তিনি বলেন, আগামী ১৬ই ডিসেম্বর, ২৫শে ডিসেম্বর ও ইংরেজি নববর্ষকে কেন্দ্র করে অনেক জায়গায় বহু মানুষের সমাগম হবে। আমি আশা করি, অনেক আনন্দের সঙ্গে নিরাপদভাবে এ দিনগুলো উদ্‌যাপন করবেন। এখন পর্যন্ত এসব দিনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই, কোনো আশঙ্কা নেই। আয়োজিত অনুষ্ঠানে ক্র্যাব পরিবারের ছয় সদস্যের সন্তানকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ায় বৃত্তি দেয়া হয়। এ ছাড়া ক্র্যাবের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০টি ইভেন্টে ৩২ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। এ সময় ব্যক্তিগত খাত থেকে ৩০ হাজার টাকা ক্র্যাব সদস্যদের সন্তানের বৃত্তির জন্য দেন ডিএমপি কমিশনার। ক্র্যাবের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম মানিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি’র সিনিয়র নির্বাহী পরিচালক এফএম ইকবাল বিন আনোয়ার ডন, ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন। আরও উপস্থিত ছিলেন, ক্র্যাব সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক দিপন দেওয়ান  প্রমুখ।

mzamin

মামলা শেষ হলে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান -লন্ডন থেকে ফিরে মির্জা ফখরুল

সব মামলা শেষ হলে দেশে ফিরবেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন সফর শেষে দেশে ফিরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এই তথ্য জানিয়েছেন। এই সফর ফলপ্রসূ জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা জানেন- উনার (বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান) বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যা প্রতিহিংসামূলক মামলা রয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার হলে বা আদালতের মাধ্যমে শেষ হলেই তিনি ফিরবেন। বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহ্‌জালাল বিমান বন্দরে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গত ৩০শে নভেম্বর স্ত্রী রাহাত আরা বেগমকে নিয়ে বিএনপি মহাসচিব লন্ডন যান। লন্ডন অবস্থানকালে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, কয়েকটি স্থানীয় দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন। এছাড়া স্ত্রী রাহাত আরা বেগম লন্ডনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দেখান।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমি যে উদ্দেশ্যে লন্ডনে গিয়েছিলাম, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিএনপি’র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের সভায় যোগ দিয়েছি। সেখানে প্রেসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তারেক রহমানের কাছ থেকে কী বার্তা এনেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন, আপনারা (দেশবাসী) ধৈর্য ধরবেন। একটা বিশাল বিজয় এসেছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে, এই বিজয়কে ফলপ্রসূ ও সার্থক করতে হলে অবশ্যই সকলকে ধৈর্য ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্রের যে প্রথম পদক্ষেপ, সেই নির্বাচনের জন্য সকলকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

নির্বাচন ও সংস্কারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা প্রায় দু’বছর আগে সংস্কারের কথা বলেছি। ৩১ দফা সংস্কার দিয়েছি। তারও আগে ২০১৬ সালে ভিশন- ২০৩০ দিয়েছিলাম। আমরা এখনো বলছি, ন্যূনতম সংস্কারগুলো করে নির্বাচন দেয়ার জন্য। এজন্য দেশে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে, এই সমস্যাগুলো নির্বাচিত সরকার ছাড়া সমাধান করা খুব চ্যালেঞ্জিং।

রাজনৈতিক দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছেন- তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, কোন প্রেক্ষিতে বলেছেন এবং কী বলেছেন-তা আমি জানি না। কিন্তু উনার এই বক্তব্য রাজনীতিবিরোধী বক্তব্য। আমি আশা করি না, উনারা এ ধরনের বক্তব্য রাখবেন। রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সমর্থন করেছে। সমর্থন করার মূল উদ্দেশ্য একটা আছে, সেটা হচ্ছে- গণতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সেটার জন্যই ১৫ বছর ধরে আমরা কাজ করছি। আমরা সংগ্রাম ও লড়াই করেছি। এটা উনি কী উদ্দেশ্যে, কীভাবে বলেছেন, আমি জানি না।

সমপ্রতি ভারতের সঙ্গে সামপ্রতিক ঘটনাগুলো সমাধানের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আলোচনার মধ্য দিয়েই তো সমাধান হবে, এগোচ্ছে তো।

বিমানবন্দরে মির্জা ফখরুলকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা ফরহাদ হোসেন আজাদ, আবু মোহাম্মদ আহসান ফিরোজ, সাদী আহমেদ ও মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।

mzamin

চাপে জেরবার জীবন, স্বস্তি আসবে কবে?

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসঙ্গতি মিলাতে পারছেন না মানুষ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিত্যপণ্যের দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে- এমনটা আশা করেছিলেন। তবে এ পর্যন্ত খুব একটা স্বস্তি মিলেনি। নিত্যপণ্যের দাম সহসা কমে আসবে- এমন ভরসাও মিলছে না। উল্টো দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের কারও কারও কথায় হতাশ ক্রেতারা। সরকারি হিসাবেই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। গতকাল এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আসতে আরও বছর খানেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। আসছে জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। বাজারে অস্থিরতার মধ্যে সর্বশেষ ভোজ্য তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর আগের কয়েক দিন আগে থেকে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় বোতলজাত ভোজ্য তেল। খোলা তেল বিক্রি হয় বাড়তি দামে। নতুন আলু বাজারে আসা শুরু হলেও এখনও বাজারে ৮০ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে পিয়াজ।

বিগত সরকারের সময়ে বাজারে সিন্ডিকেট গড়ে যে লুটপাট করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন কিছু থাকবে না বলেও মানুষ মনে করছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছেই এখনো জিম্মি বাজার।

চাল, ডাল, চিনিসহ প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বছরজুড়েই ভুগিয়েছে ক্রেতাদের। নতুন সরকার আসার পর এসব পণ্যের দামে খুব একটা হেরফের হয়নি। দাম কমাতে সরকারের তরফে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। কমানো হয় কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক। শুল্ক কমালেও এসব পণ্যের আমদানি বাড়েনি। কমেনি দামও।

সোমবার বাণিজ্য উপদেষ্টার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। দাম বাড়ানোর পরেই বাজারে স্বাভাবিক হতে শুরু করে সয়াবিনের সরবরাহ। সমানতালে মিলছে নতুন ও পুরাতন বোতলজাত তেল। এত দ্রুত কীভাবে স্বাভাবিক হলো- তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই ক্রেতাদের। তাদের মতে, পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করতে পারলেও ক্রেতারা পড়ছেন বিপদে।

ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন অবশ্য বলেছেন, বাস্তবতা মেনে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ানোর আগে বাজার থেকে তেল উধাও হওয়া এবং পরে তা ফিরে আসার বিষয়ে আসলে কারও কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা মিলেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের উপদেষ্টাদের কথার মধ্যেও কোনো আশার ইঙ্গিত পাচ্ছেন না সাধারণ ভোক্তারা। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় হতাশ তারা।

রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন আকিল উদ্দিন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই বছর ধরে একই বেতন পাচ্ছি। কিন্তু এই সময়ে খরচ বেড়েছে অন্তত ৫০ শতাংশ। এখন প্রয়োজনীয় অনেক কিছু বাদ দিয়ে চলতে হচ্ছে। ছয় মাস আগে বাসা বদল করেছি ভাড়া কমানোর জন্য। নিত্যপণ্যের দামের কারণে পরিবারের সবার সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
মো. ফুরকান কচু ক্ষেতের একটি গার্মেন্টে চাকরি করেন। তিনি বলেন, বেতনের সঙ্গে খরচের হিসাব মিলছে না। যে হারে বেতন বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ খরচ বাড়ছে। এতে জীবন-যাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে স্ত্রী সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজে এখন একটি মেসে থেকে চাকরি করেন।

বুধবার সরকারি ক্রয় কমিটির বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজারে আলুর দাম বাড়লেও, অন্য জিনিস সাশ্রয়ী হয়েছে। দাম বাড়ার বিষয়টি সবাই বলে, কিন্তু দাম কমারটা বলে না। বাজারে প্রত্যেকটার দাম কমানো সম্ভব না। বাজার এমন একটা জিনিস একটার দাম কমবে, একটার দাম বাড়বে। সরকার তাড়াতাড়ি প্রসেস করে, যৌক্তিক যে জিনিসগুলো ক্রয় করা প্রয়োজন সেগুলো অনুমোদন দিচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃত সংকট তৈরি করে ভোজ্য তেলের দাম বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। তারা প্রথমে সংকট তৈরি করলো। এরপর বাণিজ্য উপদেষ্টার উপস্থিতিতে দাম বাড়ানো হলো। স্বাভাবিক হলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের বাজার। ক্রেতাদের জিম্মি করে এ ধরনের অদ্ভুত পরিস্থিতি বলে দেয় বাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন দরের পাশাপাশি মিলছে পুরনো দামের তেলও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিন্ডিকেট যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। ডিলারদের দাবি, দাম বাড়ার পর বাড়ছে সরবরাহ।

সরকার যেভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তার প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রভাব যে একেবারে নাই তা নয়। আপনারা খালি দেখেন আলুর দাম বেড়ে গেছে, অন্যগুলোতো সাশ্রয়ী হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল আছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেয়া পদক্ষেপের প্রভাব পড়ছে এখন। তবে, সব পণ্যের দাম একসঙ্গে কমানো সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো সরবরাহ ও ঘাটতির বিপরীতে যে জোগান দরকার, সেটা ঠিক রাখা। যে কারণে সম্প্র্রতি আমরা সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছি। তবে সেটা সাধারণ ক্রেতার জন্য কষ্টসাধ্য হলেও বাস্তবতার জন্য দরকার ছিল। এটা না করলে বাজারে ব্যাপক সংকট তৈরি হতো, ঘাটতি বেড়ে যেতো। এখন আমরা অন্য কোনো পণ্যের দাম কমিয়ে সেটা সমন্বয়ের চিন্তা করছি। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এখনো বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে কথা হচ্ছে। তেল-চিনির সর্ববৃহৎ সরবরাহকারী দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। তারা বাজারের একটা বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। পালিয়ে যাওয়ার কারণে সরবরাহে ঘাটতি হয়েছে।

বাজারে পণ্যের ঘাটতি পুরনো সরকার আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কমানো হয়েছিল শুল্ক ও কর। তবে আমদানি খুব একটা বাড়েনি। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির অনুমতি দেয়া ও শুল্ককর কমানোর কারণে বাজার স্থিতিশীল আছে। নতুন করে কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে না। তবে দাম কমছে না কেন এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না কারও কাছ থেকে। সরকার শুল্ককর তুলে নিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু আমদানি হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টন চাল।

সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে দুই দফায় শুল্ককর কমানো হয়েছে। প্রথম দফায় ১৭ই অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯শে নভেম্বর শুল্ককর কমিয়ে তা নামানো হয়েছে ৫ শতাংশে। তাতে প্রতি কেজি অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলে শুল্ককর ১৮ টাকা থেকে কমে ৭ টাকায় নেমেছে। কিন্তু দাম কমেনি।  চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী গত এক মাসে এক লাখ টন ভোজ্য তেল এসেছে। সাধারণত দেশে মাসে দুই লাখ টন তেলের চাহিদা রয়েছে। একইভাবে আলু, পিয়াজের আমদানি শুল্ক কমালেও দাম কমেনি। 

mzamin