Friday, April 10, 2015

ভোটযুদ্ধে ১১৬৭ প্রার্থী by কাজী জেবেল ও মতিন আব্দুল্লাহ

আগারগাঁওয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র
প্রত্যাহার করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন এক কাউন্সিলর প্রার্থী
তিন সিটিতে ৫৩১ জনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার : জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগ : নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৫৩১ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর মধ্যে মেয়র ৭, সংরক্ষিত কাউন্সিলর ৮৭ ও সাধারণ কাউন্সিলর ৪৩৭ জন রয়েছেন। প্রত্যাহারের পর চূড়ান্তভাবে ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন ১ হাজার ১৬৭ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে মেয়র পদে ৪৮, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৪৪ ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮৭৫ জন রয়েছেন। দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল একক প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণেই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তিন সিটিতেই মেয়র পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আজ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। ২৮ এপ্রিল এই প্রতীকেই ভোট গ্রহণ করা হবে। বৃহস্পতিবার ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
বিধান অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ‘নির্দলীয়’ হওয়ার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে কেউ কেউ তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দল থেকে বহিষ্কার অথবা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে পারেন- এমন আশংকায় অনেকেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ‘চাপের মুখে’ জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। এ ছাড়া ‘জোরপূর্বক’ প্রত্যাহারের চেষ্টা করা হয়েছে- এমন অভিযোগ এনে প্রার্থিতা বহাল রাখতে অনুরোধ জানিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছেন কেউ কেউ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা। যা ভোটের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশংকা দলীয় নেতাকর্মীদের। তবে অনেকে আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বিএনপির বিরুদ্ধেও। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে একক প্রার্থী সমর্থন দেয়ায় অন্য নেতারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। দলের হাইকমান্ড থেকে প্রার্থীদের বলা হয়েছে, এ মুহূর্তে রাজনীতিতে বিএনপি একরকম কোণঠাসা। একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দলের পরাজয় নিশ্চিত। এমন আশংকার কথা জানিয়ে আরও বলা হয়, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেসব প্রার্থী মাঠে থাকবেন তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। ওই খড়গ থেকে বাঁচতে বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।
সরেজমিনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেখা গেছে, দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়টি মনিটরিং করেছেন। প্রার্থীরা সরে দাঁড়িয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত করেছেন। ইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, একসঙ্গে অনেক প্রার্থীর প্রত্যাহারের আবেদন নেয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কর্মকর্তারা তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, প্রার্থী নিজে কিংবা তার মনোনীত কেউ সশরীরে এসে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হবে। এ নিয়ম মেনেই প্রত্যাহারপত্র গ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব কর্মকাণ্ডে অনেকটাই নীরব ছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সবকিছুই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। জোর করে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়টি ইসি কীভাবে দেখছে- তা জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বৃহস্পতিবার বলেন, ‘এটা মোটেও ইসির বিষয় নয়, এ বিষয়ে একক ক্ষমতা রিটার্নিং কর্মকর্তার। রিটার্নিং কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলবেন। আইনেও তাই-ই বলা আছে।’
বৃহস্পতিবার রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে ৩ জনসহ মোট ২২২ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এ সিটিতে লড়ছেন মোট ৩৮১ জন প্রার্থী। মেয়র পদে রয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হক, জাতীয় পার্টি সমর্থিত বাহাউদ্দিন আহম্মেদ বাবুল, বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরী, বিএনপি সমর্থিত তাবিথ আউয়ালসহ ১৬ জন প্রার্থী। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন তিনজন প্রার্থী। তারা হলেন- সারাহ বেগম কবরী, ববি হাজ্জাজ ও মোস্তফা কামাল আজাদী। ঢাকা উত্তরের সাধারণ ৩৬ ওয়ার্ডে ১৮২ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থীর সংখ্যা ২৭৭ জন। এ সিটির সংরক্ষিত ১২ ওয়ার্ডে ৩৭ জন প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ৮৮ জনে।
সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রার্থী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। এ সিটিতে মেয়র পদে ২০ জনসহ মোট ৫০১ জন প্রার্থী রয়েছেন। মেয়র পদে ৪ জনসহ মোট ২৫৪ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন বলে জানা গেছে। মেয়র পদে চূড়ান্ত লড়াইয়ে আছেন ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাঈদ খোকন, বিএনপি সমর্থিত মির্জা আব্বাস, জাতীয় পার্টি সমর্থিত হাজী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মিলনসহ ২০ জন। এ ছাড়া বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা এসএম আসাদুজ্জামান রিপন ও আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যে চারজন মেয়র প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে গেছেন তারা হলেন- বিএনপির অর্থ সম্পাদক আবদুস সালাম, সাবেক কাউন্সিলর ও ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা আলহাজ কাজী আবুল বাশার, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইমতিয়াজ আলম ও মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে সাধারণ ৫৭টি ওয়ার্ডে ২০১ জন ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৪৯ জন কাউন্সিলর পদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর পদে ৩৮৬ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৯৫ জন রয়েছেন।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোট ৫৫ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এর মধ্যে সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১ জন ও সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের ৫৪ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য আছেন ১২, সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৬১ এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১২ জন প্রার্থী। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন ব্রিফিংয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের এ তথ্য তুলে ধরেন। চসিকে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির, বিএনপি সমর্থিত মোহাম্মদ মনজুর আলম ও জাতীয় পার্টি সমর্থিত মো. সোলায়মান আলম শেঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা : ঢাকায় দলীয় চাপে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রার্থী। জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্টে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। সরেজমিনে দেখা গেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাউন্সিলর পদে দলের ত্যাগী নেতারা সমর্থন পাননি। সুবিধাভোগীদের সমর্থন দিয়ে আমাদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর পরিণাম ভালো হবে না। আবার কেউ কেউ রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবস্থানকালে মুঠোফোনে নেতাকর্মীদের বলেন, ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন নেই। কেউ কেউ এর জন্য নির্বাচনে চড়া দাম দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল গাফফার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে এসে বলেন, আমার ওয়ার্ডে দল (আওয়ামী লীগ) একজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। দলীয় বাকি প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশ মেনেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আমির হোসেন মোল্লা বলেন, দলের সমর্থন চেয়েও পাইনি। দলের সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। একই সিটি কর্পোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী ও ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. হেদায়েত উল্ল্যাহ ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোজাফফর হোসেন দু’জনই একসঙ্গে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার পর বলেন, দলীয় হাইকমান্ডের ইচ্ছায় প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি। প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ালে দলীয় পদ দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। আমরা দলীয় পদেই থাকতে চাই। ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গুলশান থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুসিবুর রহমান মুকুল যুগান্তরকে বলেন, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে দল সমর্থিত প্রার্থী বাদে সবার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার জন্য নিয়ে এসেছি। দলীয় সিদ্ধান্তে আমরা এসেছি।
মহানগর নাট্যমঞ্চে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে বেলা ১১টার দিকে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহিম প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে আসেন। ওই সময়ে তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহার সম্পর্কে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এলাকাবাসী আমাকে চায়। তবুও বিভিন্ন চাপে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছি না। তবে কী ধরনের চাপে তিনি কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালেন তা জানাতে অস্বীকার করেছেন ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের এই যোদ্ধা।
প্রার্থিতা বজায় রাখার চেষ্টা : প্রার্থিতা প্রত্যাহারে দলীয়ভাবে চাপ প্রয়োগ ও আগেভাগে প্রত্যাহারপত্রে স্বাক্ষর নেয়ায় অনেক প্রার্থী বিচলিত হয়ে পড়েন। দল সমর্থিত প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। তারা প্রার্থিতা বজায় রাখতে বৃহস্পতিবার দিনভর দৌড়ঝাঁপ করেন। তাদের একজন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার ইসলাম (আনোয়ার)। তিনি প্রার্থিতা রক্ষায় রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলমের কাছে একটি আবেদন জমা দেন। ওই আবেদনপত্রে আনোয়ার উল্লেখ করেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের কিছু ব্যক্তি অপকৌশলে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি কাগজে আমার স্বাক্ষর করিয়ে নেয়, যা আমাকে পড়তে দেয়া হয়নি। আমার ধারণা ওটা একটি প্রত্যাহারপত্র হতে পারে। আমি আশংকা করছি যে, আমাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য তারা হয়তো আমার নামে ওই প্রত্যাহারপত্র রিটার্নিং অফিসে জমা দেবে। এতে আরও বলা হয়, আমার নামে যদি কেউ মনোনয়ন প্রত্যাহারপত্র জমা দেয় তা গ্রহণ না করে আমার প্রার্থিতা বহাল রেখে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেয়া হয়।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘আমার প্রার্থিতা বাতিলের চেষ্টা করা হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে তা বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।’
বেলা সাড়ে ১১টায় মহানগর নাট্যমঞ্চে রিটার্নিং অফিসারের রুমের সামনে দেখা হয় সাবেক যুবলীগ নেতা ও ডিএসসিসির ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী শেখ মো. আলমগীরের সঙ্গে। তিনি রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে ভেতরে ঢুকতে চাইছেন কিন্তু রিটার্নিং অফিসারের নিজস্ব কর্মকর্তা নোয়াবুল ইসলাম ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না। কেন এসেছেন জানতে চাইলে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর প্রার্থী বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ করি। আমার দল থেকে আমাদের ওয়ার্ডে একজনকে কাউন্সিলর পদের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে। সে দলীয় প্রার্থী। কিন্তু আমি স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করতে চাই।’ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নির্দলীয় নির্বাচন। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল দলীয় প্রার্থী এলাকায় গুজব রটিয়েছেন আমি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছি। ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে এসেছি। পরে সাবেক এই যুবলীগ নেতা রিটার্নিং অফিসারের সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি বলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের রিটার্নিং অফিসকে লিখিতভাবে জানান।
রিটার্নিং অফিস সূত্রে জানা গেছে, জোরপূর্বক বা কেউ স্বাক্ষর জাল করে কারোর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করলেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থী সাধারণ ডায়েরি করে রিটার্নিং কার্যালয়কে অভিযোগ দিলে এ সংক্রান্ত মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে না। ডিএসসিসির ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. আবু সাঈদের সঙ্গে বৃস্পতিবার দুপুরে কথা হয় ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে। তিনি বলেন, দল থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের স্বাক্ষর নিয়েছেন। দলের নেতাদের চাপে আমি স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু আমি এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই।

‘ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ’ -নিউ ইয়র্ক টাইমস

বাংলাদেশে কেউ নিখোঁজ হলে তার দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউ। মানুষ ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমনটাই লিখেছে আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। গতকাল ৯ এপ্রিল অ্যালেন ব্যারি লিখিত ‘Amid Political Confrontations in Bangladesh, a Search for a Missing Opposition Official’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। প্রায় এক মাস আগে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে দৃশ্যত অপহরণ করার পর সেই রাস্তায় এখন এক ভয়ার্ত নীরবতা নেমে এসেছে। সেই বাসভবনের কম্পাউন্ডের এক কেয়ারটেকার একদল লোককে দরজা খুলে দিয়েছিলেন এবং অনেক সাংবাদিককেই বলেছিলেন যে তারা নিজেদের পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই রাস্তায় তার বন্ধুরা জানাচ্ছেন, তাকে (কেয়ারটেকারকে) আর পাওয়া যাচ্ছে না। সেই বাসভবনের দরজা খুলেছিলেন যে গৃহপরিচারিকা তারও হদিস নেই। ওই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক একটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপক, তারও নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। পাশের ভবনের প্রহরী মোজাম্মেল বলেন, ‘অবশ্যই কিছু একটা ঘটেছে কিন্তু সবাই মুখ বুঝে থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করছে।’ এ সময় সেই ভবন থেকে একজন এসে সালাহ উদ্দিন সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করার জন্য সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন এবং বলে এ ঘটনায় প্রতিবেশীরাও বিপদে আছে। আধো ইংরেজিতে তিনি বলছিলেন, “সবাই ভয়ে আছে।আপনি নিজেও এখন এটা দেখতে পাচ্ছেন।” তিনি তার নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতময় অবস্থা থেকে বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলই গত সপ্তাহে সরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নতুন নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া অবরোধ ও হরতালের ডাক দেন। এরপর থেকে বোমা হামলায় শতাধিক লোক নিহত এবং বিএনপির বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে রোবার থেকে উত্তেজনা হ্রাস পেয়েছে। এদিন দুটি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে না পাঠিয়ে জামিন দেয় আদালত। খালেদা জিয়া এপ্রিলের শেষে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য তার দলীয় প্রার্থীদের নির্দেশ দিয়েছেন। দৃশ্যত এর মাধ্যমে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে আন্দোলন শেষ হয়েছে। তবে এ সংকট থেকে সোজাসুজি বের হওয়া সহজ হবে না। এর একটি কারণ গত ১০ মার্চ সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়া। তার পরিবার এবং দলের নেতারা বলছেন যে তারা নিশ্চিত যে নিরাপত্তা বাহিনীই এ কাজ করেছে। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপহরণ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ উপস্থাপন করছে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সন্ত্রাসবিরোধী এলিট ফোর্স র্যাবের বিরুদ্ধেও এ অভিযোগ রয়েছে যারা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশিক্ষণ পেয়েছে। সালাহ উদ্দিন ছিলেন বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের দলীয় মুখপাত্র। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, তার  নিখোঁজের ঘটনায় অনেকে শঙ্কিত। “অবস্থাটা হচ্ছে তিনি নিখোঁজ এবং কেউ তার দায় নিচ্ছে না। আমার কাছে এটা অত্যন্ত ভীতিকর অবস্থা। যে কাউকে মধ্যরাত তুলে নেয়া যায় এবং তারপর সরকার বলবে যে আমাদের কাছে কোনো ধারণা নেই,” বলছিলেন মাহফুজ আনাম। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকেদের জানিয়েছেন যে সালাহ উদ্দিন যেখানে ছিলেন সেই রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী কেয়ারটেকার আখতার আলির সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না অথবা তিনি স্ববিরোধী কথা বলছেন। সেই রাতে রাস্তায় উপস্থিত দুজন নাম গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন যে তারা সেই ভবনের সামনে র্যা বের একটি গাড়িসহ তারা তিন-চারটি গাড়ি দেখেছেন। সালাহ উদ্দিনের গাড়ির ড্রাইভারের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা  জানান, সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজের দুদিন আগে তার স্বামীকে প্রত্যুষে সশস্ত্র ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার করেন। তারপর তাকে পাশের থানায় সোপর্দ করা হয়। তিনি এখনো জেলেই আছেন। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত শুনানিতে সরকারি আইনজীবী বলেছন, রাষ্ট্রীয় কোনো নিরাপত্তা বাহিনী সালাহ উদ্দিনকে গ্রেফতার করেনি। পুলিশ বলছে, ২০টি মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে অথবা দলকে সংগঠিত করার জন্য তিনি তিনি আত্মগোপনে থাকতে পারেন। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ তাকে নিয়েছে কিনা তা আমরা নিশ্চিত নই। তাকে যখন নিয়ে যাওয়া হয় অথবা তিনি যখন সেই জায়গা ছেড়ে যান তখন কেউ কোনো শব্দ শোনেনি। কেউ জানে না যে সালাহ উদ্দিন সেখানে ছিলেন।’ তিনি বলেন, যখন প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে চান তখন তারা অস্বীকার করে বসেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিরোধী দল ভীতি প্রদর্শন করতে পারে ইঙ্গিত করে মনিরুল বলেন, ‘তারা হয়তো পেট্রলবোমার ভয়ে শঙ্কিত।’ সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ বলেন, তিনি প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলেছেন এবং তার কোনো সন্দেহ নেই যে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীই গ্রেফতার করেছে। বৃহস্পতিবারের শুনানিতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা বলতে চাই যে  তিনি জীবিত আছেন, তিনি অবশ্যই জীবিত আছেন।’ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যেই সালাহ উদ্দিন  নিখোঁজ হন। বহু সাধারণ মানুষ বোমা হামলায় মারা গেছেন যা বিরোধী নেতাদের নির্দেশে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপির অনেক সিনিয়র এবং মাঝারি পর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে বোমা হামলা এবং গাড়ি ভাঙচুরের জন ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দলটির দুজন যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, একজন ভাইস চেয়ারম্যান  এবং স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যসহ বহু নেতাকর্মী এখন কারাবন্দি। সালাহ উদ্দিন আহমেদ যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি জানুয়ারিতে হরতাল ও অবরোধ ঘোষণার মত স্পর্শকাতর দায়িত্বের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছিলেন। তার আগে তার একই দায়িত্বে থাকা দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হাসিনা আহমেদ জানান, সালাহ উদ্দিন পালিয়ে ছিলেন এবং এক বাসা থেকে অন্য বাসায় থাকতেন। পরিবারের সাথে তার মাঝে মাঝে সাক্ষাত হতো। তাদের ১৭ বছর বয়সী মেয়ে ফারিবা জানায়, কয়েক মাস যাবৎ সে তার বাবাকে দেখেনি। এর আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে বিএনপির আরেক নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত বছর জানায় যে তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে ১১টি ঘটনার অনুসন্ধান করে দেখেছেন এসব ঘটনায় র্যা বসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের পর সন্দেহজনকভাবে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণঞ্জে দৃশ্যত চুক্তিভিত্তিক খুনের ঘটনায় (সাত খুন) গত সপ্তাহেই তিন র্যা ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে সরকারি কৌঁসুলিরা। মূল প্রতিবেদনটি এখানে তুলে ধরা হলো: Amid Political Confrontations in Bangladesh, a Search for a Missing Opposition Official By ELLEN BARRY APRIL 9, 2015 DHAKA, Bangladesh -A jittery silence has fallen over the street where Salahuddin Ahmed, a top official of the opposition Bangladesh Nationalist Party, is believed to have been abducted a month ago. The caretaker who opened the compound gate to a group of men, and told several journalists they identified themselves as police detectives, can no longer be found, friends on the street say. Neither can the maid who opened the door to the apartment. The owner of the apartment, the deputy managing director of a bank, is also unreachable. “Of course something happened, but each and every one prefers to be silent,” said Mozammel, a guard at the building next door. A man who emerged from the building urged reporters to stop asking about Mr. Ahmed, which he said put the neighbors in danger. “Everyone is fear,” he said in broken English, refusing to give his name. “You, also, are being observed at this moment.” Over the last week, Bangladesh’s two main political leaders have edged back from the confrontation that paralyzed the country starting in January, when the opposition leader Khaleda Zia began a campaign of political strikes and transport blockades, hoping to force her rival, Prime Minister Sheikh Hasina, to call new national elections. Since then, more than 100 people have been killed in firebombings, and dozens of B.N.P. officials and activists arrested. The tension seemed to abate Sunday, when Mrs. Zia, the head of the B.N.P., surrendered to a court in two graft cases, something she had refused to do. The court then granted Mrs. Zia bail rather than ordering her arrest. Mrs. Zia has instructed candidates from her party to compete in city elections in late April, evidently acknowledging that the protest has run its course. But it will not be easy or straightforward to exit the crisis. One reason is Mr. Ahmed’s disappearance on March 10, which his family members, and party leaders, say they are certain was carried out by security forces. For years, domestic and international rights organizations have documented abductions and extrajudicial killings and torture by Bangladeshi security forces, including the Rapid Action Battalion, an elite counterterrorism squad that receives training in internal disciplinary protocol from the United States. The disappearance of Mr. Ahmed, who had a high-profile role as party spokesman, has been unsettling for many, said Mahfuz Anam, the editor of The Daily Star, a newspaper based here. “The state of the matter is that he has disappeared, and nobody is taking responsibility,” he said. “To me, this is a very fearful situation. Anybody can be picked up in the dead of night, and then the government can say, ‘We have no idea.’ ” Several witnesses told journalists that law enforcement officers were present on the street where Mr. Ahmed was staying, but the most important witnesses - including the caretaker, Akhter Ali - subsequently fell out of contact or gave contradictory evidence. Two people present on the street that night, speaking on the condition of anonymity, said that they had seen three or four vehicles, including one from the Rapid Action Battalion, parked in front of the house. Rebeka Sultana, whose husband was Mr. Ahmed’s driver, said her husband was detained in the predawn hours by armed men in civilian clothes two days before Mr. Ahmed disappeared, then jailed in a nearby police station. The driver remains in custody. At a court hearing that ended Thursday, a government lawyer testified that Mr. Ahmed had not been detained by any state security forces and that efforts to find him had failed. The police have suggested he may have voluntarily gone into hiding to avoid arrest in 20 pending criminal cases, or possibly to mobilize support for the party. “We are not sure he was taken by anybody,” said Monirul Islam, joint commissioner in Dhaka’s detective and criminal intelligence division. “Nobody heard any noise when he was taken, or left that place. Nobody knows that Salahuddin was there.” When police officers have approached witnesses for information about Mr. Ahmed, he said, “they just decline.” “Maybe they are afraid of petrol bombs,” he added, suggesting that opposition forces had intimidated witnesses. Mr. Ahmed’s wife, Hasina Ahmed, a former member of Parliament, said she had questioned the witnesses and was left with no doubt that he had been detained by security forces. “We want to say he is alive, he is very much alive,” said Moudud Ahmed, another lawyer for the family, at the hearing on Thursday. Mr. Ahmed’s disappearance took place amid mounting political violence, as dozens of ordinary Bangladeshis were being killed in firebombings, presumably ordered by opposition leaders. Most of the B.N.P.’s senior and midlevel leaders face criminal charges for violations like throwing bombs or vandalizing vehicles. Many — two joint secretaries general, an acting secretary general, a vice chairman and a member of the party’s standing committee, among others — are in jail, according to The Daily Star. Mr. Ahmed, who served as the deputy communications minister when his party was in power, was a party joint general secretary and took on a sensitive role in January, as spokesman responsible for announcing strikes and blockades. His two immediate predecessors had been arrested, and he went into hiding, moving from house to house and arranging occasional meetings with family, his wife said. His 17-year-old-daughter, Fariba, said she had not seen him for “a few months.” In April 2013, Elias Ali, a regional secretary of the B.N.P., was reported missing. Hasina Ahmed called for an inquiry, but also suggested that he might have been hiding on party orders. He has never been located. Last year, Human Rights Watch documented 11 cases that took place around the 2014 election in which opposition leaders or activists were killed under suspicious circumstances after being detained by law enforcement, in many cases by the Rapid Action Battalion. This week, state prosecutors charged three former battalion officials and more than two dozen other former battalion personnel in connection with the April 2014 deaths of seven men in what were apparently contract killings.

নাম বলা নিষেধ by সাজেদুল হক

বৃষ্টি অথবা প্রখর রোদ। ওরা ছুটছে নিরন্তর। জীর্ণ পোশাক। চেহারায় দারিদ্র্যের চাপ। তবুও হাসিখুশি ওরা। ওরাই এ বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। বহু বছর আগে হুমায়ুন আজাদ এদের নাম দিয়েছিলেন বস্ত্রবালিকা। দৃষ্টি দিন দেশের বাইরে। কোথায় নেই তারা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ওরা বাংলাদেশী। বেশির ভাগই শ্রমজীবী। নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রিয় স্বদেশে। শ্রমিকের ঘামে দাঁড়িয়ে রয়েছে এ বাংলাদেশ। কিন্তু কেমন আছেন তাঁরা?
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন থেকে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বুলবুল নামে এক বাংলাদেশীর লেখা চিঠিতেই স্পষ্ট তা। ১লা এপ্রিল নির্মাতা মোস্তফা সারয়ার ফারুকীকে ফেসবুকে তিনি চিঠিটি পাঠান প্রকাশের জন্য। তিনি লিখেছেন,
প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম, আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে, আমরা বাংলাদেশী নাগরিক দুই হাজারের চেয়েও বেশি সানা ইয়েমেনে বসবাস করছি, এবং আদেন, তাইয, হুদাইদাহ, ইব্ব, মারেব, সাদা, ধামার, সবমিলে দশ হাজারের কাছাকাছি বসবাস করছি গোটা ইয়েমেনে। বর্তমানে ইয়েমেন সম্পর্কে সবাই অবগত আছে যে, সৌদি আরব এবং তার মিত্রবাহিনীসহ উপসাগরীয় দেশসমূহ সবাই মিলে ইয়েমেনে ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে, এমনকি আমরা এও শুনতে পাচ্ছি, তারা স্থলপথের দিকে এগোচ্ছে, এমতাবস্থায় আমাদের ইয়েমেন বসবাস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, গত এক সপ্তাহে প্রতিটি রাতে মুহুর্মুহু বিমান হামলা চলছে, সারারাত এক মিনিটের নিস্তার নেই, এক একটি রাত যেন মনে হয়, আজকের রাতই জীবনের শেষ রাত, চারপাশে শুধু বোমা আর গুলির আওয়াজ, প্রতিটি রাতই মনে হচ্ছে আজই জীবনের শেষ রাত।
আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে, সকল দেশের সকল দূতাবাস এরই মধ্যে ইয়েমেন থেকে চলে গেছে এবং সকল দেশের সকল দূতাবাস তাদের সকল লোকজনকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, গত দুই দিন ভারত, পাকিস্তান ও তাদের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যারা অবশিষ্ট আশে তাদেরও সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা চলছে, আমাদের ইয়েমেনে কোন দূতাবাস না থাকার কারণে আমরা গত দুই দিন ভারত, পাকিস্তান দূতাবাসে যোগাযোগ করেছিলাম, কিন্তু তারা আমাদের স্রেফ জানায় তাদের নাগরিক ছাড়া অন্য কোন নাগরিকদের সহযোগিতা করতে অপারগ, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ হলেও। এখন আমরা বাংলাদেশীরা বর্তমানে খেয়ে না খেয়ে গত তিন দিন খুবই মানবেতর দিনযাপন করছি। এ মুহূর্তে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের আর বাঁচার কোন উপায় নেই, একমাত্র সরকারের সহযোগিতাই পারে আমাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে। সব দেশের সরকারেরা তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের যে কোন উপায়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের ভুল কি, আমরা কি বাংলাদেশী বলে? আমাদের জাতীয়তার কি কোন দাম নেই? আমরা প্রবাসীরা কি বাংলাদেশের একটি অংশ না??? আর কিছুই বলার নেই। যদি আমাদের দেশ মনে করে যে আমরা বাংলাদেশেরই একটা অংশ, দয়া করে আমাদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। ইয়েমেন থেকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যত দ্রুত সম্ভব। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
কয়দিন আগে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন লিবিয়ায় দুই বাংলাদেশী শ্রমিক মিলিশিয়াদের হাতে বন্দি ছিল ১৮ দিন। তারা সৌভাগ্যবান। পরবর্তী সময়ে বন্দিদশা থেকে নিস্তার মিলে তাদের। যদিও এ ব্যাপারে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। নিরাপত্তা বিবেচনায় লিবিয়া থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা দেশে ফিরে গেলেও স্পষ্টত বাংলাদেশের শ্রমিকরা দেশে ফিরতে চাচ্ছেন না। জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও শুধু পরিবারের জীবিকার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তারা সেখানে থেকে যাচ্ছেন। যারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে প্রতিদিন কথার খই ফোটান তারা হয়তো এই মানুষদের জীবন সম্পর্কে অবগত নন।
২...
তিন মাসের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি শেষে বাংলাদেশ আপাতত কিছুটা শান্ত। যদিও অস্বস্তি রয়ে গেছে। বিরোধী জোট অবরোধ কর্মসূচি বহাল রাখলেও তা কার্যকারিতা হারিয়েছে। তিন মাসে পেট্রলবোমা আর ক্রসফায়ারে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। বার্ন ইউনিটে মানুষের আর্তনাদ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে যোগ করেছে নতুন অধ্যায়। ক্রসফায়ার আর গুম-খুনের মাত্রাও বেড়েছে বহু গুণ। নিখোঁজ হয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদসহ কমপক্ষে ২১ জন। এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের জীবনের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার বয়ান উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর এক লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘সরকারের অস্বীকার করাই হচ্ছে বলপূর্বক গুমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। প্রিয়জন হয়তো বহু বছর ধরে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচে, আশা আর নিরাশার দোলাচলে। মায়েরা চিন্তিত থাকেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফেরেও, তাহলে তাকে চেনা যাবে কিনা। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যেসব নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায় আছেন, তাদের বলা হয় ‘অর্ধ-বিধবা’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার জানিয়েছে, তারা শোকও প্রকাশ করতে পারেন না ঠিকঠাকভাবে। তারা অস্থির থাকেন এই ভেবে যে, তাদের প্রিয়জন কি এখন নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদা কি সে পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে, বহু পরিবার এমন প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছে।’ এ পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে কমই। যদিও মাইনাসের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনরা সফল হলে এমন একটি নির্বাচন হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
৩...
স্বাধীনতার পর চার দশকে বাংলাদেশের অর্জন একেবারে কম নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন বিদেশনির্ভরতা ঝেড়ে ফেলতে পেরেছি আমরা। আর এ সাফল্যের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন গার্মেন্ট, অভিবাসী এবং কৃষি খাতের শ্রমজীবী মানুষেরা। বহু নতুন আর তরুণ উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছেন। রাষ্ট্র থেমে থাকলেও জনগণ এগিয়ে গেছে। অনেক রাজনীতিবিদ বুক ফুলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বললেও তা যথেষ্ট কিনা এবং এতে তাদের অবদান কতটা সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে বাংলাদেশের অর্থনীতির কাছাকাছি আকার ছিল ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির। কিন্তু চার দশক পর এসব দেশ অর্থনীতির অগ্রগতিতে যে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ তার তুলনায় তেমন কোন সাফল্যই পায়নি। সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও চিকিৎসা এবং শিক্ষার জন্য ক্ষমতাবানরা এখনও বিদেশেই ছুটছেন।
৪...
চার দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন খুব সম্ভবত ‘মুসলিম মেজরিটি ডেমোক্রেটিক’ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি। নানা চড়াই-উতরাই ছিল, নিষ্ঠুরতা ছিল, তার পরও ’৯০-এর পর থেকে গণতন্ত্রের পথে অবিচল ছিল বাংলাদেশ। যদিও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সে গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ ছিল না। তবে যা ছিলও তাও যেন আজ নেই। একদিনের বাদশরা সর্বশেষ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। শিগগিরই পারবেন তেমন কোন লক্ষণও নেই। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক পদক্ষেপের পর গত দুই যুগে বাংলাদেশের মানুষ অন্তত মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হয়নি। কিন্তু এখন সে স্বাধীনতাও হারানোর পথে। তার পরও আপনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করবেন এক শ্রেণীর সাংবাদিক টিভি টক শোতে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করছেন। প্রার্থী সন্ত্রাসী হলে জনগণ কেন তাকে ভোট দেবে তার পক্ষেও যুক্তি দেখাচ্ছিলেন এক সাংবাদিক। তবুও তার নাম লেখায় বলা যাবে না। এটাই বোধ হয় ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের’ সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

ইরান চুক্তির নিশ্চয়তা নেই

ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তির নিশ্চয়তা নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুাল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের উন্নয়নের পরমাণু শিল্প টিকিয়ে রাখতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বৃহস্পতিবার দেশটির ‘পরমাণু প্রযুক্তি দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক টেলিভিশন বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খবর এএফপি ও বিবিসির। ইরানের পরমাণু চুক্তি সম্পর্কে প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। রাষ্ট্রীয় যে কোনো ব্যাপারে তার কথাই শেষ কথা। খামেনি বলেন, ‘বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তা চূড়ান্ত চুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না।’ তিনি বলেন, ‘অবিশ্বস্ত পক্ষ (যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়জাতি) আমাদের দেশকে সীমাবদ্ধতায় আটকে দিতে চায়। এটা অন্যায্য।’
খামেনি এটাও জানান যে, তিনি এই চুক্তি সম্পর্কে কোনো অবস্থান নিচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘এখানও পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার মতো কিছু হয়নি। আমি এ চুক্তির পক্ষেও নই, আবার বিপক্ষেও নই। তবে ইরানের সমঝোতাকারী দলকে আমি সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছি। এই চুক্তি যদি জাতির স্বার্থ ও মর্যাদা সংরক্ষণ করে তবেই আমি স্বাগত জানাব। খামেনি আরও বলেন, পরমাণু শিল্প ইরানের উন্নতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পানি নিষ্কাশন, ওষুধ প্রস্তুত, কৃষিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য পরমাণু শিল্প টিকিয়ে রাখতে হবে। উল্লেখ্য, ২ এপ্রিল সুইজারল্যান্ডের রাজধানী লুজানে ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তি একটি প্রাথমিক চুক্তিতে উপনীত হয়। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করার কথা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা না তুললে চুক্তি নয় : রুহানি
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, পরমাণু প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলেই কেবল ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে ইরান। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। রুহানি বলেছেন, ‘ওই একই দিনে সব নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে না নিলে আমরা কোনো চুক্তিতে সই করব না। পরমাণু আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ সন্তুষ্টবোধ করবে, এমন একটি চুক্তি চাই আমরা।’ অপরদিকে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কার করে জানিয়েছে, চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তির পর ধাপে ধাপে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। ইরান কখনোই পরমাণু বোমা তৈরি করবে না উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, পরমাণু প্রযুক্তি উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবে তেহরান।
পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে বিশ্বের যে কোনো দেশের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য ইরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। পরমাণু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে তেহরানের সাফল্যের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, বলদর্পী শক্তিগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো তোয়াক্কা না করেই ইরানি তরুণ এবং বিজ্ঞানীরা জাতীয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সাফল্য অর্জন করেছে। জাতীয় পরমাণু প্রযুক্তি দিবসের অনুষ্ঠানে ইরানের তৈরি তিনটি রেডিও মেডিসিন এবং পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি তৈরির ব্যবস্থা উন্মোচন করেন প্রেসিডেন্ট রুহানি। ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সমঝোতার ক্ষেত্রে তেহরানের বিজয় তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয় হল, বিশ্বের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরাক্রমশালী দেশ অর্থাৎ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ইরানের মানুষ কখনোই চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা বলদর্পিতার কাছে মাথা নত করবেন না।

মাস্টার মশাইয়ের ১২ হাজার শয্যাসঙ্গী

অর্থের বিনিময়ে ১২ হাজার তরুণীর শয্যাসঙ্গী হয়েছেন জাপানের এক সাবেক প্রধান শিক্ষক। ৬৪ বছরের উহেই তাকাশিমাকে সম্প্রতি পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বুধবার ফিলিপাইনে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পর্নো ছবি তৈরি করছিলেন তিনি। পুলিশের কাছে উহেই জানিয়েছেন, স্কুলের শিক্ষক থাকার সময় ১৯৮৮ সাল থেকে তিনি অর্থের বিনিময়ে যৌনসঙ্গী গ্রহণ করতেন। এ পর্যন্ত ১২ হাজার নারীর সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছেন। এ জন্য বছরে তিনবার তিনি ভ্রমণে বের হতেন। ২৭ বছরে তিনি মোট ৬৫ বার ভ্রমণ করেন।
তার বেশিরভাগ শয্যাসঙ্গীর বয়স ১৮’র নিচে। তবে ১৪ থেকে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত নারীর সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছেন। উহেই তাকাশিমা যাদের সঙ্গে মিলিত হন তাদের ছবি তুলে সেগুলো অ্যালবামে বাঁধাই করে রাখেন। তার সংগ্রহে এ পর্যন্ত ৪শ’ অ্যালবাম জমা পড়েছে। তিনি স্মৃতি রোমন্থনের জন্য শয্যাসঙ্গীদের ছবি সংগ্রহ করে থাকেন। পুলিশ তার কাছ থেকে ১ লাখ ৪৭ হাজার ছবি উদ্ধার করেছে। জাপানের পুলিশ কর্মকর্তা আকিমোতো বলেন, ২০১৩ সাল থেকে তাকাশিমার অপকর্মের তদন্ত চলছে। সর্বশেষ তিনি যে কিশোরীর (১৩) সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, সেটা এ বছরের জানুয়ারির ঘটনা। ৩৬ বছরের শিক্ষক জীবনে তিনি এ অপকর্ম চালিয়ে গেছেন। সিএনএন।

ভাইয়ের জন্য ভাই

ভাইয়ের জন্য ভাই, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং, ছোট ভাই উমর আকমলের পক্ষে ব্যাট করবেন বড় ভাই কামরান আকমল, এতে অবাক হওয়ার কী আছে। আসন্ন বাংলাদেশ সফরে শৃংখলাজনিত কারণে পাকিস্তান দলে রাখা হয়নি উমর আকমলকে। এজন্য টিম ম্যানেজম্যান্টের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কামরান আকমল। যিনি আগেই বাদ পড়েছেন পাকিস্তান দল থেকে। তার কথায়, ‘বিশ্বকাপে ফ্লপ হয়েছে গোটা দল। আর বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে আমার ভাইকে।’ আসন্ন বাংলাদেশ সফরে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি ২০ কোনো দলেই রাখা হয়নি উমর আকমলকে।
কামরানের অভিযোগ, অক্রিকেটীয় কারণে তার ভাইয়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস করা হচ্ছে। বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে ২৭.৩৩ গড়ে মাত্র ১৬৪ রান করেন উমর। পাকপ্যাশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৩৩ বছর বয়সী উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান কামরান আকমল বলেন, ‘হুট করে কাউকে বাদ দেয়া ভালো সিদ্ধান্ত নয়। খেলোয়াড়দের ঠিকঠাকমতো সামলেই কেবল ভালো দল গড়ে তোলা যায়। উমরকে বলির পাঁঠা বানানো মোটেও উচিত হয়নি।’ উমর আকমল ও আহমেদ শেহজাদ শৃংখলাজনিত কারণে দল থেকে বাদ পড়েছেন বলে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) জানিয়েছে। উমরকে তিন ফরম্যাটের দল থেকেই ছেঁটে ফেলা হলেও, শেহজাদ টি ২০ দলে রয়েছেন। ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কামরান বলেন, ‘উমর দলের স্বার্থে কোনো অভিযোগ ছাড়াই স্বেচ্ছায় আপোষ করতে প্রস্তুত ছিল। এভাবে ভালো খোলোয়াড় তৈরি করা যায় না। এভাবে ভালো খেলোয়াড় শুধু ধ্বংস করা যায়।’ ২০১০ সালে পাকিস্তানের হয়ে শেষবার টেস্ট ম্যাচ খেলা কামরান মনে করেন, ১০/১৫ বছর উমর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিচরণ করবেন। এ নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। একেই বলে ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের দরদ। ওয়েবসাইট।

গুঞ্জন শুনি

বিয়ের পর বলিউডে অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন বিদ্যা বালান। এর অবশ্য কারণও আছে। কাজ ছাড়া কখনও অযথা খবরের শিরোনামও হতে দেখা যায়নি। নিজের অনাগ্রহের কারণেই নাকি এমনটি ঘটেছে এতদিন। বিদ্যার এই চুপিসারে থাকাটাকে মোটেও সাপোর্ট করতে পারেন না তারই ঘনিষ্ঠ পরিচালক সুভাষ ঘাই। অনেকদিন এ পরিচালককেও কোনো ছবি পরিচালনা করতে দেখা যায়নি। ‘কাঞ্চি’র পর থেকে শোম্যানের শো বন্ধ রয়েছে বললেই চলে। নিজের স্কুল ‘হুইসলিং উডস’-এর কাজেই তার শত ব্যস্ততা। এর মধ্যে আবার মেডিটেশন সেন্টারও চালু করছেন তিনি।
নাম দিয়েছেন ‘গুরুকুল’। এই গুরুকুলের প্রচারের দায়িত্বের ভার অর্পণ করেছেন তার প্রিয় অভিনেত্রী বিদ্যা বালানের ওপর। অনেক আগে থেকেই অভিনেত্রী হিসেবে বিদ্যা বালানকে খুবই পছন্দ করেন বলিউডের এই বিখ্যাত পরিচালক। একমাত্র বিদ্যাকেই বলিউডের অভিনেত্রীদের মধ্যে ‘নন কসমেটিক’ বলে মনে করেন সুভাষ ঘাই। জানা গেছে তার প্রস্তাব শোনা মাত্রই নাকি রাজি হয়েছিলেন বিদ্যা। কারণ মেডিটেশনের প্রতি তারও বেশ আগ্রহ রয়েছে। এ গুরুকুলে ভর্তির ব্যাপারে বলিউড তারকাদের প্রাধান্য থাকবে বেশি। কোনো ধর্মীয় ব্যাপার নেই এতে। অভিনয়ের ক্লান্তি দূর করতে এখানে এসে খানিকটা মানসিক প্রশান্তি পেতে পারবেন সবাই। এমনটাই জানিয়েছেন বিদ্যা।

ও পাখিরে! by তৌহিদী হাসান

‘একই গর্তে হাজার হাজার পাখি চাপা দিয়েছি। মৃত পাখি। চাপা দিয়েছি আর কেঁদেছি। শুধু আমি না, আরও অনেকের মন কেঁদেছে।’ বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কুশলীবাসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস।
আবদুল কুদ্দুসের বাগানে কয়েক হাজার পাখি গত রোববার রাতের ঝড়ে মারা যায়। আহত হয় সহস্রাধিক পাখি। পাখিদের প্রতি মায়া শুধু আবদুল কুদ্দুসের নয়, এ গ্রামের প্রায়ই সবার মনেই দাগ কেটেছে মর্মান্তিক এই ঘটনা। যুবক, কিশোর, শিশু—সবাই যেন বেদনায় কাতর। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেছে। এখনো আহত অনেক পাখি ছড়িয়ে আছে বাগানের নানা জায়গায়। ভালোবাসা আর মমতায় তাদের উদ্ধার করে সেবা দিচ্ছে এলাকার যুবক-কিশোরেরা।
গত বুধবারও জেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েকটি আহত পাখি উদ্ধার করেছেন। প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে কাঁঠাল, মেহগনির গাছ। শতাধিক গাছে তেমন কোনো পাতা নেই। ঝরে পড়ে আছে বাগানের মাটিতে। ভেজা, পচা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পড়ে আছে পাখির পালক, অঙ্গ। একটু দূরে কয়েকটি মৃত পাখিরও দেখা মিলল।
রোববার গভীর রাতে কালবৈশাখী আর শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে পাখিদের এই অভয়াশ্রম পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। কারও কারও মতে, প্রায় ২৫ হাজার পাখি শিলের আঘাতে মারা যায়। সোমবার বিকেলে সেগুলো সড়কের পাশেই মাটি চাপা দেওয়া হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বাগানে গিয়ে দেখা গেল কয়েকটি মৃত পাখি। স্থানীয় কিশোর আলামিন সেগুলো হাতে ধরে তুলে দেখাল। একটা কানাকুয়ো পাখির দেখা পেলাম। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সহজে ধরাও দিল। তার বাঁ চোখে শিলের আঘাতের চিহ্ন। একটু উড়ে গিয়ে আবার মাটিতে পড়ে গেল। কুদ্দুস জানালেন, বাগানে গাছের পাতাও নেই, পাখিদের কিচিরমিচিরও নেই। এখনো অনেক পাখি আহত অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। হয়তো মারা যাবে শিগগিরই।
পাখিদের এমন মৃত্যুর খবর শুনে গত বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে ছুটে গেছেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন। খবর পেয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আসাদুল হকের নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে হাজির হন। মৃত পাখিদের দুর্গন্ধ দূর করতে বাগানে ওষুধ ছিটানো হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পাখিদের ক্ষতি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে তাৎক্ষণিক আটটি পাখি উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পাখিদের এই অভয়াশ্রমকে নিরাপদ করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাখিদের বিচরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।
পাখিরা কি ফিরে পাবে কুশলীবাসার এই অভয়াশ্রম?

ঘাতক গ্রেফতার : লাশ উদ্ধার হয়নি by হাবিব সরোয়ার আজাদ

সুনামগঞ্জের ছাতকে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর শিশু ইমন হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা মসজিদের সেই ইমামকে অবশেষে পুলিশ নানা নাটকিয়তার পর গ্রেফতার করেছে। বুধবার সিলেট নগরীর কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ইমামের নাম সুয়েবুর রহমান সুজন। সে উপজেলার ছৈলা আফজালাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। সুয়েবুর জামায়াতের একজন সক্রিয় সদস্য বলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আহমদ মঞ্জুর মোর্শেদ নিশ্চিত করেছেন। এর আগে এ হত্যকাণ্ড ও অপহরণের ঘটনায় উপজেলার বাতিরকান্দি গ্রামের আবদুল বাহার, নুরুল মিয়া, আবু জাহেদকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এদিকে হত্যকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও পুলিশ ১৩ দিনেও ইমনের লাশ উদ্ধার করতে পারেনি। এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি স্থানীয় জনতার মধ্যে বেশ কিছুটা চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তবে পুলিশি গাফলতির বিষয়টি মানতে নারাজ পুলিশ সুপার।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার পুলিশ ও নিহতের পরিবারসহ স্থানীয় এলাকাবসীর সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের বাতিরকান্দি গ্রামের জহুর আলীর ৬ বছর বয়সী শিশু ইমনকে ২৭ মার্চ অপহরণ করে নিয়ে যায় স্থানীয় মসজিদের ইমাম সুয়েবুর রহমান সুজন ও তার সহযোগীরা। গ্রেফারকৃত সুয়েবুরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ৩০ মার্চ সোমবার রাতেই ইমনকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ তৎপর হলে শূন্য হতো না এক মায়ের কোল।
এদিকে শিশু ইমনের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার হয়নি। তবে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো ছুুুরিসহ হত্যকাণ্ডের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেলাজুড়ে বইছে শোকের মাতম আর নিন্দার ঝড়। দু’লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য নাকি অন্য কোনো গোপন বিষয় ইমন জেনে গিয়েছিল যা ফাঁস হয়ে গেলে মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যেত। মূলত এ দু’টি বিষয়ই তদন্তে প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে পুলিশ জনরোষ ঠেকাতে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। ইমনের মা বৃহস্পতিবার আহাজারী করে বলেন, পুলিশ যদি শুরু থেকেই তৎপর হতো তবে আমার বুকের মানিক এমন অকালে হত্যকাণ্ডের শিকার হতো না।
পুলিশ সুপার মো. হারুন অর রশীদ বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফলতি ছিল না। ১৩ দিনেও ইমনের লাশ উদ্ধার না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি যুগান্তরকে বললেন, পুলিশ চেষ্টা করছে, লাশ পেলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পায়ে স্ক্রু রেখে অস্ত্রোপচার শেষ

ভুল চিকিৎসার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায়
ভেঙে পড়েন শাহিনা বেগম l প্রথম আলো
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে মাস খানেক আগে শাহিনা বেগম (৪৫) নামের এক রোগীর পায়ের ভেতর আলগা স্ক্রু রেখেই অস্ত্রোপচার শেষ করা হয়। গত বুধবার তাঁর পায়ে পুনরায় অস্ত্রোপচার করে স্ক্রুটি বের করা হয়।
কুমুদিনী হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ মার্চ অসুস্থ মা সুফিয়া বেগমকে দেখে কুমুদিনী হাসপাতালের তৃতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ভাওমান টালাবহ গ্রামের মো. সোলায়মানের স্ত্রী শাহিনা। নিচতলার সিঁড়িতে এসে তিনি হোঁচট খান। এতে বাঁ পায়ের গোড়ালির পাশে প্রচণ্ড আঘাত লাগে। ওই দিনই তাঁকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রথমে তাঁর পায়ে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে পায়ে অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের চিকিৎসক সমরজিৎ বড়ুয়া। অস্ত্রোপচার শেষ হলেও তাঁর পায়ে একটি স্ক্রু রয়ে যায়। এর দুদিন পর থেকে তাঁর পায়ের ব্যথা আরও বাড়তে থাকে। গত মঙ্গলবার তাঁর পায়ের এক্স-রে করা হয়। এতে দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের স্থানে একটি আলগা স্ক্রু রয়ে গেছে। গতকাল তাঁর পায়ে আবার অস্ত্রোপচার করে স্ক্রুটি বের করে আনা হয়।
চিকিৎসাধীন শাহিনা ঘটনার বর্ণনা দিতে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, সামান্য অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসক পায়ের এক্স-রে করানো ছাড়াই প্লাস্টার করেন। কিন্তু ব্যথা বেশি হওয়ার কথা জানালে চিকিৎসক পা ভেঙেছে বলে জানান। এরপর অস্ত্রোপচার করতে ১৪ হাজার টাকা লাগবে বলে হাসপাতাল থেকে জানানো হয়। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় তিনি ধার করে ১২ হাজার টাকা জমা দেন। এরপর চিকিৎসক সমরজিৎ বড়ুয়া তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করেন। এক্স-রে করানোর পর বুধবার পুনরায় অস্ত্রোপচার করতে আরও এক হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছে। আগে টাকা কম দেওয়ায় কাজ ভালো হয়নি বলে গতকাল অস্ত্রোপচারের সময় সমরজিৎ বড়ুয়া তাঁকে (শাহিনা) জানান।
সমরজিৎ বড়ুয়া মুঠোফোনে বলেন, ওটা (স্ক্রু) বের করে দিয়ে সেখানে নতুন একটা স্ক্রু লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর সুস্থতা ফিরে আসতে আরও ছয় থেকে আট সপ্তাহ লাগবে।
হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান শামীম আদম বলেন, রোগীর পায়ের যে স্থানে আঘাত পেয়েছেন, তা খুবই নরম জায়গা। সেখানে স্ক্রু লাগানোর পর খুলে আসার বিষয়টি ধর্তব্য নয়।

তিস্তায় বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা by মো. আরফান উজ্জামান ও কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে যে কয়টি বিষয় নিয়ে খুব বেশি টানাপোড়েন চলছে, তার মধ্যে তিস্তা ইস্যু একটি। উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন তিস্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাই তিস্তার পানির প্রবাহ কমে যাওয়া আমাদের জীবন ও জীবিকায় আঘাতস্বরূপ। তিস্তা অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকার পরিমাণ ৪ হাজার ১০৮ বর্গ কিলোমিটার, যার প্রায় অর্ধেক অংশ পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। দুই দেশই তিস্তার পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ভারত এই মুহূর্তে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রমের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ তিস্তার পানি ব্যবহার করছে শুধু পরিকল্পিত সেচ দেওয়ার কাজে।
এক সময়ের প্রমত্তা তিস্তা আজ মরা নদীতে পরিণত হয়েছে
কিন্তু গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানি ক্রমাগত কমে গেছে। এর দরুন তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলা যেমন: ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচরা, পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর ও খানসামা, যারা তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি জমিতে সেচসুবিধা পেয়ে থাকে, তাদের কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখানে বলা প্রয়োজন, আউশ ও আমন মৌসুমে ভারতের পানি প্রত্যাহারের পরও তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে, যার ফলে সেচ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় না। তিস্তায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ শুধু শুষ্ক মৌসুমে বোরো উৎপাদনের ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে অন্যান্য সময়ের তুলনায় তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ কম থাকে। ভারত তার ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমির সেচের চাহিদা মিটিয়ে যে পরিমাণ পানি ছাড়ে, তা দিয়ে বোরো মৌসুমে আমাদের সেচ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করা যায় না। ১৯৯৭ সালে বাংলদেশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক, যা ২০০৬ সালে নেমে আসে ১ হাজার ৩৪৮ কিউসেকে এবং ২০১৪ সালে পানির প্রবাহ এসে দাঁড়ায় মাত্র ৭০০ কিউসেক, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মরে গেছে তিস্তা, নৌকা চলার মতো পানিটুকুও নেই তিস্তায়
এখন আসা যাক শুষ্ক মৌসুমে পানি কম পাওয়ার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটুকু হচ্ছে তার পরিমাণের ওপর। ১৯৯৩-৯৪ শস্যবছর থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি উপজেলায় ব্যাপকভাবে আউশ ও আমন উৎপাদনের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিস্তার পানি দিয়ে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০০৬-০৭ শস্যবছর থেকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বোরো মৌসুমেও সেচ কার্যক্রম প্রসারিত করা হয়। আমন মৌসুমে মোট সেচযোগ্য ৭৯ হাজার ৩৭৯ হেক্টর এলাকার প্রায় সম্পূর্ণটাই সেচের আওতায় আনা সম্ভব হলেও বোরোর ক্ষেত্রে পানির দুষ্প্রাপ্যতায় সেচ-সাফল্যের চিত্র একেবারেই হতাশাজনক। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৬-০৭, ২০০৮-০৯ ও ২০১৩-১৪ শস্যবছরে সর্বমোট সেচযোগ্য ৭৯ হাজার ৩৭৯ হেক্টর জমির মধ্যে যথাক্রমে মাত্র ১১ হাজার ৩২৩, ২৯ হাজার ৪২৫ ও ২৭ হাজার ৪৮৬ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা মোট সেচযোগ্য জমির মাত্র ১৪ শতাংশ, ৩৭ শতাংশ ও ৩৫ শতাংশ। যেহেতু তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় নদীর পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা নেই, তাই প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে পানির অভাবে সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ধানগাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে, এতে করে বীজতলা তৈরি ও উন্নতমানের বীজ ক্রয়ে কৃষকের করা বিনিয়োগ নষ্ট হচ্ছে। ফলে ওই অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষক প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে তাঁদের জীবনমানে।
প্রমত্তা তিস্তা যেন মরুভূমি, নেই পানি, কৃষকের হাহাকার
আমাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তিস্তা নদীতে পানির সংকটের কারণে সর্বমোট ৪২ লাখ ৫৪ হাজার ২১৮ মেট্রিক টন বোরো ধান আমরা উৎপাদন করতে পারিনি। চলতি বাজারমূল্যে এর পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকার ওপরে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারত, শক্তিশালী করতে পারত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা বলয় এবং একইভাবে বাড়াতে পারত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থকা ওই অঞ্চলের কৃষকদের আয়। তিস্তায় পানির দুষ্প্রাপ্যতার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও আরেক ধরেনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি আমরা, যা সচরাচর বলা হয় না, আর হলেও যে ব্যাপকতায় বলা দরকার, সেভাবে বলা হচ্ছে না, আর তা হচ্ছে পরিবেশগত ক্ষতি।
তিস্তা এখন আর নদী নয়, একটি মরা খাল
২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছরের মধ্যে পাঁচ বছরই শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদীতে কার্যত কোনো পানি ছিল না। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, শুকনো সময়ে যে সামান্য পরিমাণ পানি ভারতের প্রত্যাহারের পর তিস্তা নদীতে পাওয়া যায়, তার সবটুকুই সেচ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েক শ সেচ খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর দরুন ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের পর থেকে ৯৭ কিলোমিটার বিস্তৃত তিস্তা নদীতে এক কিউসেক পানিও থাকছে না। এ কারণে তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশ অংশের এই বিশাল পরিমাণ নদীগর্ভ পরিণত হচ্ছে বালুচরে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকার পর শুকনো মৌসুমে এভাবেই নদী মারা যাচ্ছে। যেহেতু তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, তাই যমুনা নদীর পানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিস্তা নদী থেকেও বাহিত হয়। তিস্তা নদী যখন শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন যমুনা নদীতেও পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর যে প্রাকৃতিক কার্যাবলি আছে, শুকনো মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে তা বিঘ্নিত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে নদী অববাহিকায় প্রতিবেশগত ভারসাম্য এবং সর্বোপরি তিস্তা হারাচ্ছে তার অতীত পরিবেশগত সক্ষমতা।
অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে তিস্তা নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও প্রবল হুমকির সম্মুখীন হয়। এই তিস্তা নদীতে একসময় ইলিশ মাছ পর্যন্ত অহরহ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন ইলিশ মাছ তো নয়ই, অন্য প্রজাতির বড় মাছও দুর্লভ হয়ে গেছে। অপর দিকে নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, রংপুর ও ডালিয়ার আশপাশে যেসব এলাকায় আগে মাটির ৩৫-৪০ ফুট গভীরে ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত, তা এখন ৬০-৬৫ ফুট বা জায়গাভেদে তার চেয়েও নিচে নেমে গেছে। এর দরুন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার কৃষক, যাঁরা সরাসরি তিস্তার পানি পান না এবং সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেন, তাঁদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজে পানির জন্য হাহাকার
আরেকটি কথা না বললেই নয়, যেহেতু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তিস্তার মতো এত বড় নদী আর নেই, তাই ওই অঞ্চলের জলবায়ুর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তিস্তা নদীর ওপর নির্ভর করে। তাই তিস্তা নদী যদি এভাবে প্রায় প্রতিবছরই পানির অভাবে শুকিয়ে যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ুও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই পরিবেশগত কারণেও তিস্তা নদীর অসীম মূল্য রয়েছে, যা নিয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন। তিস্তা অববাহিকায় শুষ্ক মৌসুমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় নদীতে সব সময় ৫৫০ থেকে ৭০০ কিউসেক এবং বোরোর চাহিদা পূরণে আমাদের অন্তত চার হাজার কিউসেক পানি দরকার।
পরিশেষে যেটা বলতে চাইছি তা হলো, আমাদের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি প্রশমনের জন্য অবিলম্বে স্বচ্ছতা ও সমতার ভিত্তিতে তিস্তার পানি চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। তিস্তা চুক্তি যতই প্রলম্বিত হবে, আমাদের ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়বে এবং বাংলাদেশের ক্ষতির বিপরীতে ভারতই লাভবান হতে থাকবে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে যতটুকু অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার পরিমাণ নিরূপণ করে ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা অপরিহার্য। আমরা যদি আমাদের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ না চাই, তাহলে ভারত ও তার জনগণ প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবে না। আলোচনার টেবিলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার তথ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরাটা আরও বেশি যুক্তিসংগত ও ফলপ্রসূ হবে। তিস্তায় পানির দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণাটি পরিচালিত হওয়ার আগে আমাদের হাতে তিস্তার পানির অভাবে আঞ্চলিক কৃষিতে প্রভাব কতটুকু পড়ছে, তার ক্ষতির প্রকৃত কোনো পরিসংখ্যান ছিল না। এখন আশা করা যাচ্ছে যে এই ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে জোরালো বক্তব্য রাখতে সমর্থ হবে এবং তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সক্ষম হবে।
মো. আরফান উজ্জামান: গবেষক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিস।
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ: অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস।

ভয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছে না কেউ -সালাহ উদ্দিনকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। যে বাড়ি থেকে সালাহ উদ্দিনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই বাড়ির আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
‘অ্যামিড পলিটিক্যাল কনফ্রন্টেশনস ইন বাংলাদেশ, এ সার্চ ফর এ মিসিং অপজিশন অফিশিয়াল’‍ (রাজনৈতিক সংঘাতে বাংলাদেশ, বিরোধী দলের এক নেতার খোঁজে)-শিরোনামের ওই প্রতিবেদনটি করেছেন সাংবাদিক এলেন ব্যারি।
প্রতিবেদনে এলেন ব্যারি বলেছেন, সালাহ উদ্দিনকে যে বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে তিনি (এলেন ব্যারি) সেই বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি সুনসান নীরব পরিস্থিতি দেখেছেন। চেষ্টা করেও ওই বাড়ির কারও সঙ্গে তিনি কথা বলতে পারেননি। সালাহ উদ্দিনের পরিবারের ভাষ্যমতে, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসার পর যে দারোয়ান ফটক খুলে দিয়েছিলেন তাঁকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে দাবি করা হয়, ওই ভবনের মালিক একটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক। তাঁকেও সেখানে পাওয়া যায়নি।
সালাহ উদ্দিন যে বাসা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন তার পাশের বাসার নিরাপত্তাকর্মী মোজাম্মেল বলেন, ‘কিছু একটা তো ঘটেছেই। কিন্তু মুখ বুঝে থাকাটাকেই সবাই নিরাপদ মনে করছে।’ এ সময় আশপাশের কোনো এক বাসা থেকে এক ব্যক্তি এসে সালাহ উদ্দিন সম্পর্কে খোঁজ বা প্রশ্ন না করার জন্য প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন। ওই ব্যক্তি বলেন, এ নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রতিবেশীরাও বিপদে পড়তে পারেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, ‘সবাই ভয়ের মধ্যে আছে। আপনি যে কথা বলছেন, এই মুহূর্তে আপনার ওপরও নজরদারি করা হচ্ছে।’
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারিতে একতরফা নির্বাচন করে। এই নির্বাচনের বছরপূর্তিতে ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতময় অবস্থা থেকে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধান দুটি দলই সরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে নতুন নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া টানা অবরোধ ও হরতালের ডাক দেন। এরপর থেকে অবরোধে পেট্রলবোমা হামলায় শতাধিক লোক নিহত হয়েছেন। এ সময় বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
গত রোববার দুটি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া হাজিরা দেওয়ায় কারাগারে না পাঠিয়ে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর থেকে উত্তেজনা কমে এসেছে। খালেদা জিয়া ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। দৃশ্যত এর মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন শেষ হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ সংকট থেকে এত সহজে বের হওয়া যাচ্ছে না। এর একটি অন্যতম কারণ গত ১০ মার্চ সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়া।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রথম সারির ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন, সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজের ঘটনায় অনেকে শঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘তাঁর নিখোঁজের দায় কেউ নিচ্ছে না। আমার কাছে এটা অত্যন্ত ভীতিকর অবস্থা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে চাইলেই কাউকে মধ্যরাত তুলে নেওয়া যায় এবং তারপর সরকার বলবে, আমাদের এ ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই।’
অনেক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সালাহ উদ্দিন যেখানে ছিলেন সেই রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে এ ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী বাসার তত্ত্বাবধায়ক আখতার আলির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তিনি স্ববিরোধী কথা বলছেন। সেই রাতে রাস্তায় উপস্থিত দুই ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, তাঁরা সেই বাসার সামনে র‍্যাবের একটি গাড়িসহ তিন-চারটি গাড়ি দেখেছেন।
গত ১০ মার্চ সালাহ উদ্দিন নিখোঁজ হন। এর আগে ২০১২ সালের এপ্রিলে বিএনপির অপর নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন।

তিন মাসের রাজনীতির লাভ-ক্ষতি by কামাল আহমেদ

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়ে নিজের বাসায় ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। কেননা, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে। তবে, তা রাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। সরকার এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মধ্যে তিন মাস ধরে যে টানাপোড়েন চলেছে, সেটি ছিল মূলত ক্ষমতার লড়াই। একদিকে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায়ের দাবি, অন্যদিকে, ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচনকে জায়েজ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে সাধ্যমতো দুর্বল ও বশীভূত করার চেষ্টা। স্পষ্টতই, কোনো পক্ষ তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি। তবে, তাদের এই ঠেলাঠেলির বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ নাগরিকদের।
৫ জানুয়ারির বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে ঢাকায় সমাবেশ করতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারের তরফ থেকে আরোপিত অবরোধ কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই লুফে নেন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া। বাস্তবে অবরোধ ও হরতালের কোনো কার্যকারিতা না থাকলেও দিনের পর দিন ওই সব কর্মসূচি অব্যাহত রেখে দলটি প্রায় এক হাস্যকর করুণার রাজনীতি অনুশীলনে নিয়োজিত ছিল।
পেট্রলবোমা ও ককটেলের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং কথিত সন্দেহভাজন নাশকতাকারীদের দমন অভিযানে সারা দেশে প্রাণ দিয়েছেন ১৩১ জন। এঁদের মধ্যে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ৭৫ জন, আর প্রায় তার অর্ধেক ৩৩ জন শিকার হয়েছেন কথিত বন্দুকযুদ্ধের। গুম বা অন্তর্ধানের সংখ্যা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। আহত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভোগান্তিতে পড়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ এবং তাঁদের পরিবারগুলো। ১৫ লাখ এসএসসি ও সমমােনর পরীক্ষার্থী একটি পরীক্ষাও তাদের পূর্বঘোষিত রুটিন অনুযায়ী দিতে পারেনি। রাজনীতিকদের প্রতি এসব পরীক্ষার্থীর যে বিতৃষ্ণা তৈরি হবে, তা তঁারা কখনো কাটিয়ে উঠতে পারবেন কি না বলা মুশকিল। ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ শীর্ষ বণিক সভা এফবিসিসিআইয়ের দাবিমতে ন্যূনতম ৬০ হাজার কোটি টাকা। তবে, শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে (মধ্য মার্চ পর্যন্ত সময়ে, আড়াই মাসে) মোট জাতীয় উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ বলেছেন, সরকারের দমন–পীড়ন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাঁরা স্বীকার করেছেন যে সরকার তাঁদের দলের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে দমন–পীড়ন চালাবে, এমনটি তাঁরা অনুমান করলেও যে মাত্রায় তা করা হয়েছে, সেটি তাঁরা কল্পনাও করেননি। কথাটি সম্ভবত অনেকাংশেই সত্য। তাঁদের খুব কমসংখ্যকই গত তিন মাসে নিজেদের বাড়িতে ঘুমাতে পেরেছেন। সালাহ উদ্দিন আহমদের মতো পরিচিত নেতাও গুম হয়েছেন এবং জেলে রয়েছেন হাজার হাজার নেতা–কর্মী।
ওই নেতারা অবশ্য এটিও স্বীকার করে নিয়েছেন যে তাঁদের দলের সাংগঠনিক কাঠামো মোটেও নির্ভরযোগ্য নয় এবং সে কারণে দলের নেতা–কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে ধরে রাখার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। পেট্রলবোমা বা নাশকতায় বিএনপির কেউ জড়িত নয় বলে খালেদা জিয়া তাঁর একমাত্র সংবাদ সম্মেলনে যে দাবি করেছিলেন, সেই দাবিটি বিশ্বাস করানোর কাজটিতেও যে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন, সেই বাস্তবতাও তাঁরা উপলব্ধি করছেন। অর্থাৎ, নাশকতায় জড়িত না থাকলেও তাঁদের কর্মসূচির কারণে তার দায় যে তাঁদেরকেই বহন করতে হবে, সেটি হয়তো ভবিষ্যতের যেকোনো পদক্ষেপের সময় তাঁরা মনে রাখবেন। যদিও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আমাদের রাজনীতিকেরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না।
বিপরীতে, আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করতে পারেন যে সরকার নাশকতা দমনের প্রশ্নে এক বিন্দুও ছাড় দেয়নি এবং সরকারের কঠোর নীতির কাছে বিএনপি হার মানতে বাধ্য হয়েছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রীর বক্তব্যে ইতিমধ্যেই এই দাবি করা হয়েছে। এমনকি, বিএনপির ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কৌশল হিসেবে নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের নামে সরকার–সমর্থকেরা ঢাকায় গণমিছিলও করেছেন। বাস্তবতা অবশ্য তা সমর্থন করে না।
সরকারের কঠোর নীতির কথিত সাফল্য যে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীও সংসদে বলেছিলেন যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হবে। কিন্তু, ৪০ দিনেও আদালতের পরোয়ানা কার্যকর হয়নি। শুধু গ্রেপ্তারই বা কেন, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি চালানোর জন্যও পুলিশ আদালত থেকে পরোয়ানা নিয়েছিল। কিন্তু সেটিও শুধু ভয় দেখানোর কৌশল বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে, আইনের সমান প্রয়োগ এবং আদালতের স্বাধীনতার বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক দূষণের কুদৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যে কোনো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, সেটা জানার পরও দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক সমাধান না খুঁজে দমন নীতির কৌশল নিয়ে যে নজির স্থাপন করেছেন, সেটিও সুখকর নয়। প্রথমে ‘কয়েক দিন’ এবং পরে ‘সপ্তাহ খানেকের মধ্যে’ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করে তিন মাসেও সরকার সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। রাতের বেলা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থেকেছে কয়েক সপ্তাহ। এমনকি, যখন পেট্রলবোমার ব্যবহার কিছুটা কমে এসেছে, তখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগের ছাপ লক্ষ করা গেছে। আর এই আতঙ্ক ও উদ্বেগের প্রভাব ঢাকায় যতটা দৃশ্যমান হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকট ছিল ঢাকার বাইরে ছোট ছোট শহর ও গ্রামে। সম্ভবত, এ কারণেই সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদও একপর্যায়ে দাবি করে বসেছেন যে ‘তিনিই ছিলেন সবচেয়ে গণতান্ত্রিক শাসক’। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী—বিজিবি এবং পুলিশ ও র্যাব—এই তিনটি বাহিনীর প্রধানেরা থেকে শুরু করে মধ্যম সারির অধিকর্তারাও যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে করে ওই সব বাহিনীর জন্য যে উদাহরণ তৈরি হলো, সেগুলো ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। এমন কথাও উঠেছে যে সরকারের কাছ থেকে বাড়তি আনুকূল্য পাওয়ার উদ্দেশ্যেই এঁরা অযাচিতভাবে এসব কথার্বাতা বলেছেন।
এসবের পাশাপাশি বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টাতেও কোনো ফল হয়নি। প্রথমে আসল বিএনপি নামে কতিপয় অচেনা মুখের আবির্ভাব। আর, তারপর বিএনপির সাবেক দুই সাংসদের (শহীদুল হক জামাল ও আবু হেনা) নেতৃত্বে বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা। বলা হয় যে খালেদা জিয়া তাঁর ছোট ছেলের মৃত্যুর পরও কথিত ‘অবরুদ্ধ অবস্থা’ থেকে বের হননি কিংবা প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের জন্মদিনে তাঁর কবরে যাননি, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনার এবং ছাব্বিশে মার্চে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন শুধু এই আশঙ্কায় যে তিনি নিজের কার্যালয় থেকে উচ্ছেদ হবেন। দল ভাঙার ভয় দেখিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পণ ভাঙার কৌশল যে কতটা বালখিল্য ছিল, তা উপলব্ধির পর নিশ্চয়ই তাঁদের অনেকে এখন মাথার চুল ছিঁড়ছেন।
দীর্ঘায়িত সংকটকালে বিদেশি বন্ধু ও উন্নয়ন–সহযোগীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং সংলাপ-সমঝোতার আহ্বান যেভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, তাও নজিরবিহীন। সরকার বিদেশিদের উদ্বেগের মুখে অব্যাহতভাবে নির্বিকার উপেক্ষার নীতি অনুসরণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং, অনেক দায়িত্বশীল মন্ত্রীও প্রকাশ্যে সংলাপের প্রস্তাবকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। অবশ্য বিদেশে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সমর্থনলাভের আশায় প্রচার-প্রচারণায় সরকার একটুও পিছিয়ে থাকেনি। বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মোড়কে উপস্থাপনের চেষ্টা চলেছে নিরন্তর। সে ক্ষেত্রেও যে সরকারের তেমন কোনো সাফল্য রয়েছে তা নয়; বরং, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের সুযোগ সংকোচন এবং দমন–পীড়নের বিষয়ে অব্যাহতভাবে তাদের উদ্বেগ জানিয়ে এসেছে। বিএনপির প্রতি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার আহ্বান, যা গত ২০১৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক প্রস্তাবে প্রথম বলা হয়েছিল, বিদেশিরা শুধু সেটারই পুনরুচ্চারণ করেছেন।
ইতিমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অছিলায় রাজনীতির ধারায় কিছুটা হলেও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। অনেকের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে একধরনের সীমিত সমঝোতা। নেপথ্যের এই সমঝোতায় বিদেশিদের অথবা নাগরিক সমাজের কারও কারও কিছু একটা ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। এর ফলে, নাগরিককুল সাময়িক স্বস্তি পেলেও পেতে পারে। কিন্তু, একটা টেকসই সমাধান ছাড়া উদ্বেগ দূর হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা, রাজনৈতিক বিরোধ ও রেষারেষির সবচেয়ে বেশি মূল্য গুনেছেন সাধারণ মানুষ।
কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

‘জোরপূর্বক’ প্রার্থিতা প্রত্যাহার by উৎপল রায় ও সিরাজুস সালেকিন

প্রতিপক্ষের লোকজন জোরপূর্বক প্রত্যাহারপত্রে স্বাক্ষর নেয়ায় রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রার্থিতা বহাল রাখতে আবেদন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলাম। রিটার্নিং অফিসারের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, আমার প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের কতিপয় ব্যক্তি অপকৌশলে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি কাগজে আমার স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। যা আমাকে পড়তে দেয়া হয় নাই। আমার ধারণা উহা একটি প্রত্যাহারপত্র হইতে পারে। আমি আশঙ্কা করছি যে আমাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য তারা আমার নামে উক্ত প্রত্যাহারপত্র রিটার্নিং অফিসে জমা দিবে। সিটি নির্বাচনের মনোনয়পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে এভাবে জোরপূর্বক মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে আরও কয়েকটি। দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন রামপুরা থানা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি কোহিনুর আক্তার বীথি। পল্লবী থানা যুব মহিলা লীগের সেক্রেটারি বিলকিস বেগম মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন একই কারণে। দলের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করলে তাদের দলীয় পদ কেড়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়।
স্বাক্ষর করা প্রত্যাহারকৃত আবেদন ফেরত নিতে এসেছিলেন ঢাকা দক্ষিণের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর কয়েকজন প্রার্থী।  আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন তারা। দুপুরে রাজধানীর শ্যামপুর থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী উম্মে কুলসুম ফরিদুন্নেসা ঝর্না মহানগর নাট্য মঞ্চের দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কার্যালয় থেকে তার প্রত্যাহারকৃত আবেদনপত্র ফেরত নিতে আসেন। দক্ষিণের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সংরক্ষিত ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দিনভর অপেক্ষার পরও দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তা দিতে অপারগতা জানান। একপর্যায়ে প্রার্থীকে মামলা করার পরামর্শ দেন তিনি। মিহির সারওয়ার জানান, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলে আবার নির্বাচন করার কোন সুযোগ নেই। পরে উম্মে কুলসুম ঝর্না এ প্রতিবেদককে বলেন, দক্ষিণের ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আমি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও তা দাখিল করেছিলাম। কিন্তু ৬ই এপ্রিল আওয়ামী লীগের দপ্তরের কথা বলে আমাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়। এরপর আমার কাছ থেকে প্রত্যাহার পত্রে স্বাক্ষর নেয়া হয়। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিই। আজ নির্বাচন কমিশন অফিসে এসে জানতে পারলাম আমার দেয়া স্বাক্ষর অনুযায়ী আমি নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তাই আমার নির্বাচন করার আর কোন সুযোগ নেই। তিনি বলেন, শুধু আমি নই এ রকম আরও অনেকের কাছ থেকে দলের দপ্তরের কথা বলে স্বাক্ষর নিয়ে সবার স্বাক্ষর করা প্রত্যাহার পত্র গতকাল জমা দেয়া হয়েছে। গতকাল দক্ষিণে মহানগর নাট্যমঞ্চে এ রকম কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হবে এমন কারণ দেখিয়ে তারা কিছু বলতে অস্বীকার করেন। এদের কয়েকজন প্রায় অভিন্ন সূরে বলেন, খুব আশা নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলাম। কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা প্রত্যাহার পত্রে স্বাক্ষর করেছি। তবে আমরা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করলেও আমাদের বদলে যাদেরকে সমর্থন দেয়া হয়েছে তাদের বেশিরভাগ নির্বাচনের অযোগ্য। দলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও দলীয় কার্যক্রমে তাদের তেমন একটা দেখা যায় না।
দক্ষিণের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা রুখসানা বেগম পারভিন বলেন, নির্বাচনের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরেতো যাওয়া যাবে না। তাই নিজেকে নির্বাচন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি। একটু কষ্ট হলেও দলের সিদ্ধান্ততো মেনে নিতে হবে। ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাবের হোসেন পাপন বলেন, নির্বাচন করে এলাকাবাসীর সেবা করার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দল ও নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) সম্মান জানিয়ে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।    
জোরপূর্বক মনোনয়ন প্রত্যাহারের বিষয়টি অবগত নন বলে জানান ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহ আলম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার কাছে কোন চিঠি আসেনি। সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গতকাল ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র পদ থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন ৭ প্রার্থী। ঢাকা উত্তরে মোট ২১৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক চাপে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন। জোরপূর্বক মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘটনা নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। তাদের এসব ক্ষেত্রে ইসির নীরবতা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ভবিষ্যতে মানুষ কমিশনের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
সিটি নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েলের উনবিংশ অনুচ্ছেদে ‘নির্বাচনী অপরাধ ও দণ্ড প্রয়োগবিধির অবৈধ প্রভাব বিস্তার এক ধরনের নির্বাচনী অপরাধ। এই অংশে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবেন, যদি তিনি- কোন ব্যক্তিকে কোন নির্বাচনে ভোট প্রদান করিতে বা উহা হইতে বিরত থাকিতে অথবা নির্বাচনের প্রার্থী হইতে বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করিতে প্ররোচিত বা বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে , তিনি নিজে বা তাহার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তির মাধ্যমে (ক) কোন প্রকার শক্তি, ত্রাস বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন বা ভীতি প্রদর্শন করেন। (আ) কোন আঘাত, ক্ষতি বা সম্মানহানি বা লোকসান ঘটান বা ঘটাইবার উদ্দেশ্যে ভীতি প্রদর্শন করেন। (ই) কোন সাধু বা পীরের দৈব অভিশাপ কামনা করেন বা করিবার ভীতি প্রদর্শন করেন। (ঈ) কোন ধর্মীয় দণ্ড প্রদর্শন করেন বা করিবার ভীতি প্রদর্শন করেন; বা (উ) কোন সরকারি প্রভাব বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ব্যবহার করেন। উল্লিখিত কার্যকলাপের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হইলে তিনি  অন্যূন ৬ মাস ও অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ডে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিষয়টা এমন হয়ে গেছে যে দল প্রার্থীর হয়ে নির্বাচন করছে। জোরপূর্বক প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানোর ঘটনা নির্বাচন কমিশনকে অকার্যকর প্রমাণ করছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে দেশের মানুষের আগ্রহ চলে যাবে। তখন নির্বাচন কমিশন তাদের সুবিধামত সাজানো নির্বাচন করতে থাকবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করছে তা নির্বাচনী অপরাধ। নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েলে এটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, বড় দলগুলো নির্বাচনে জড়িয়ে পড়েছে। যদিও আমাদের কাছে তারা আসেন না। তবে বাইরে থেকে বিভিন্ন প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন। আমার মতে এটা দলীয়ভাবে হলে খারাপ হয় না বরং ভালই হয়।
তিনি আরও বলেন, পাশের দেশেই এই ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে। আমাদের আইনে নেই দলীয়ভাবে নির্বাচন করার। তবে প্রার্থীদের পেছন থেকে বিভিন্ন দল সমর্থন করছে। এর চেয়ে ভাল হয় যদি সরাসরি সমর্থন করার জন্য যদি আইন হয়। প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার পরামর্শ দিয়েছেন-এ বিষয়ে কমিশন কোন উদ্যোগ নেবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংসদে কমিশনের কোন প্রতিনিধি নেই। আইনগত নির্দেশনা আসলে আমরা বিষয়টি ভেবে দেখবো।

খালেদা জিয়ার ঘর ও বাহির by ফারুক ওয়াসিফ

রাজনীতিকেরা মারামারি করেন প্রকাশ্যে, আপস করেন গোপনে। খালেদা জিয়া ৯২ দিন পর বাড়ি ফিরলেন কী প্রকারে, সেই প্রশ্ন তাই উঠবে। সরকারও তাঁকে গ্রেপ্তারের হম্বিতম্বি ছাড়ল কোন জাদুবলে, সেটাও ভাবার বিষয়। খালেদা জিয়া অবশ্য খালি হাতে ফেরেননি, দু-দুইটি দুর্নীতির মামলার জামিন পুনরায় আদায় করে ফিরেছেন। এ ছাড়া তাঁর আর কী করার ছিল? এদিকে সরকার পেল সাময়িক যুদ্ধবিরতি। গদিনশিন সরকারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবিলা দমের পরীক্ষা। দমন-পীড়নের জন্যও দমের দরকার। গত তিন মাসের রাজনৈতিক দুর্যোগে সরকারের দম কিঞ্চিৎ কমে গেছে। অতএব, খালেদা জিয়াকে জেলের ভাত খাওয়ানোয় মন্ত্রী বাহাদুর হাসানুল হক ইনু ও শাজাহান খানের স্বপ্ন আপাতত সফল হওয়ার নয়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরে তা তামিল না করার অর্থ একটাই: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপাতত খালেদা জিয়াকে জেলে দেখতে চান না। সে পথে গেলে পরিস্থিতি আরও ফেটে পড়ত; বিদেশিরাও ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নিত না।
এমনকি কেউ কেউ এমন আশঙ্কাও করেছিলেন, খালেদাকে ‘মাইনাস’ করা হবে মাইনাস টু’র প্রথম ধাপ। গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ‘ম্যাপিং বাংলাদেশ’স পলিটিক্যাল ক্রাইসিস’ নামের প্রতিবেদনেও এমন ইঙ্গিত ছিল। যা হোক, এখন সরকার বলতে পারবে: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। এতই নিয়ন্ত্রণে যে পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে তালাবদ্ধ করে রাখার আর দরকার হচ্ছে না। এ ছাড়া আর কী করতে পারত সরকার?
এর মধ্যে দেড় বছর আগে করা এক কৌতুককর প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে গেছি। খালেদা জিয়া বিএনপিকে নিয়ে যে ‘মারি না হয় মরি’ লাইন নিলেন, সেখান থেকে ফিরবেন কী করে? সরকার পতন ছাড়া ঘরে ফিরবেন না বলে পণ করেছিলেন, তার কী হবে? এ বিষয়ে পুরোনো ওই কৌতুকটি আবার বলা যায়। এক বেকার যুবক সার্কাস তাঁবুর সামনে একটা নোটিশ ঝোলানো দেখতে পেল: যে ব্যক্তি ১০০ ফুট খুঁটির ওপর উঠে নিচের জালে লাফিয়ে পড়তে পারবে, তাকে দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। বেপরোয়া যুবক ভাবল, এ আর এমন কী? খুঁটিটায় তেল মাখানো ছিল না, তাই উঠতে বেগ বা আবেগ কিছুই পোহাতে হলো না। কিন্তু সমস্যা বাধল ওঠার পরে। অত ওপরে উঠে নিচে তাকিয়ে তার যে মাথা ঘোরায়! কিছুতেই তার সাহস হয় না। ওদিকে রিংমাস্টার চেঁচাচ্ছেন, ‘লাফ দে ব্যাটা, লাফ দে।’ কিসের লাফ আর কিসের টাকা! যুবকটির থরথর উত্তর, ‘আমি লাফ দিতাম চাই না, আমারে এহন নামাইব ক্যাডা?’ যেখানেই উঠে বসুন, নামার ব্যবস্থাটা করে রাখুন।
খালেদা জিয়া ঘর ছেড়ে দলীয় দপ্তরে ঘাঁটি গেড়ে আপসহীনতার যে তুঙ্গে উঠেছিলেন, সেখান থেকে নামা আসলেই কঠিন ছিল। অবশেষে সেই সুযোগ সরকারই করে দিল। সরকারের কৌশল হলো দুই পা এগিয়ে এক পা পেছনে আসা। আর বিএনপি নিল দুই পা পিছিয়ে এক পা এগোনোর কৌশল। ধরপাকড়-বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদির পথে দুই পা এগিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেওয়া হলো এক পা পেছানোর কৌশল। আর বিরোধী দল সংঘাতের পথ থেকে দুই পা পিছিয়ে এক পা এগোল নির্বাচনে অংশ নিয়ে।
এতে লাভ দুই পক্ষেরই। বিরোধীদের চাপ কমে গেলে সরকারও পুলিশ এবং প্রশাসননির্ভরতা কমিয়ে রাজনৈতিক পথে এগোনোর সুযোগ পাবে। বিএনপির পিছু ধাওয়া করতে করতে আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে কতটা দূরে সরে গেছে, সেটাও তাদের খতিয়ে দেখতে হবে। খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী গত তিন মাসের দুঃসময়ে পাশে থাকার জন্য প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। বিএনপির পাশে তেমন কেউ ছিল না, তাই ধন্যবাদ দেবার বালাই তাদের নেই। তবে, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল, সবচেয়ে বেশি গণভিত্তিসম্পন্ন দলকে জনসমর্থনের বদলে প্রশাসনিক শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এটা তাদের জন্য মোটেই কৃতিত্বের বিষয় নয়। ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা একসঙ্গে ধরে রাখা শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।
বিএনপিরও ভাবা দরকার, হরতাল-অবরোধ দিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে রাখার চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সে কোনো অজানা শক্তি ‘দম মওলা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারকে উৎখাত করে তাদের গদিতে বসাবে না। ডাব পেকে ঝুনা না হলে আপনাআপনি গাছ থেকে পড়ে না; তার জন্য যে কালবৈশাখীর দরকার, ঈশান কোণে আপাতত তার কোনো লক্ষণ নেই। মানুষকে না জাগিয়ে নিজে অতিজাগ্রত হওয়ার ফল তো অনেক প্রাণের মূল্যে শোধ করতে হলো। বিএনপির নেতৃত্ব জনগণের থেকে বেশি ছুটতে গিয়ে একা হয়ে পড়েছেন, এটা আর অস্বীকার করার জো নেই।
তাই জামিনপ্রাপ্ত হয়ে ঘরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার দিনটাকে খালেদা জিয়া তাঁর বাদবাকি রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিন ভাবতে পারেন। ভাবতে পারেন, পরবর্তী নির্বাচনের পথে এটাই তাঁর প্রথম পদক্ষেপ। ঘরে থাকার এই অবকাশে নিজের ভুল শুধরে নিতে পারেন। বুঝে নিতে পারেন, দলের ভেতর কে ঘরের শত্রু বিভীষণ আর কে দুর্গতির গতি। রাজনীতি ও জীবন—দুখানেই ঘর সামলাতে পারাই সাফল্যের চাবি।
দৃশ্যত, খালেদা জিয়া একটি লড়াইয়ে হারলেন, কিন্তু যুদ্ধে হেরেছেন তা বলা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের হাতে অধিকৃত ফরাসিদের উদ্দেশে তাদের নেতা জেনারেল দ্য গল বিবিসির ভাষণের শুরুতেই বলেছিলেন: ফ্রান্স হ্যাজ লস্ট আ ব্যাটল, বাট ফ্রান্স হ্যাজ নট লস্ট দ্য ওয়ার (ফ্রান্স একটি সংগ্রামে হেরেছে বটে, কিন্তু যুদ্ধে পরাস্ত হয়নি)। খালেদা জিয়াও এটা বলে তাঁর সমর্থকদের সান্ত্বনা দিতে পারেন। অন্যদিকে, সরকার বর্তমান সংগ্রামে জয়ী হলেও, রাজনৈতিক যুদ্ধে জিতেছে, তা বলা যাবে না। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা অনেকের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট। এর দায় রাজনৈতিকভাবেই তাদের শুধতে হবে।
যুদ্ধের মধ্যে অনেক অনেক খণ্ড লড়াই হয়, কিন্তু জয়-পরাজয়ের ফয়সালা হয় শেষ লড়াইয়ে। যুদ্ধজয়ী বলা হয় তাকেই, প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধরাশায়ী করে ময়দানে যে দাঁড়িয়ে থাকে। বাস্তবে দুই নেত্রীর দ্বন্দ্বে দুজনের কেউই নিঃশেষিত হননি কিন্তু উভয়ই মানুষের আস্থায় চিড় ধরিয়েছেন। ব্যাপারটা সাম্প্রতিক ইরান-আমেরিকার সমঝোতার মতো: তোমারও লাভ নেই, আমারও ক্ষতি নেই। কেবল চূড়ান্ত সংঘাতটা পিছিয়ে নেওয়া হলো মাত্র।
এখনকার কাজ হলো, রাজনীতিকে চলতে দেওয়া। রাজনীতি চলতে না পারলে বন্দুক-বোমা চলতেই থাকবে। রাজনৈতিক সমস্যাকে বলপ্রয়োগ দিয়ে সমাধান করতে গেলে রাজনীতি পরিত্যক্ত হবে; তার জায়গায় আসবে এমন কিছু, যাকে নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য দুই দলের কারোরই থাকবে না।
ইতিহাসে ও রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ইতিহাস বিদায় বলে চলে যায় না, ইতিহাস বলে ‘আবার দেখা হবে’।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

ইরানের পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ by রিচার্ড এন হাস

পুরোনো এক ইংরেজি প্রবাদ আছে এ রকম: ‘ফলাফল নিশ্চিত হলেও ঘটনাপ্রবাহ ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে’।
মনে হচ্ছে, ফয়সালা হয়ে গেছে বা ব্যাপারটা নিশ্চিত, কিন্তু বস্তুত তার কোনোটিই নয়। ফারসি ভাষায় এমন প্রবাদ না থাকলেও আমার মনে হয়, তেমন প্রবাদ সেই ভাষাতেও শিগগিরই দেখা যাবে। উল্লিখিত কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, ‘প্যারামিটারস ফর আ জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন রিগার্ডিং দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানস নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম’। যে কাঠামোটি ইরান ও পি৫+১ গ্রহণ করেছে (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বাইরে জার্মানি)। এই ঐকমত্যটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে যে খুঁটিনাটি বিষয় বিধৃত হয়েছে, তা আমাদের প্রত্যাশারও অধিক, এর ব্যাপ্তিও একইভাবে আমাদের সব প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও এই ঐকমত্যে যত প্রশ্নের উত্তর রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নের উত্তর অধরাই রয়ে গেছে। বাস্তবে আগামী দিনগুলোতে দেখা যাবে, প্রধান বিষয়গুলো এখনো ফয়সালা হয়নি। এটা বলাটা সত্যের অন্তত কাছাকাছি হবে যে ইরানের পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে প্রকৃত বিতর্ক কেবল শুরু হচ্ছে।
এই ঐকমত্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বেশ ভালো রকম সীমাবদ্ধতা আরোপ করা করেছে: সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা ও ধরন, রিঅ্যাক্টরের প্রকৃতি, দেশটি যে পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধারণ করতে পারবে ও এর বৈশিষ্ট্য। পরীক্ষণের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ইরানের এই আত্মবিশ্বাস থাকে যে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছে। আর ইরান তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে, এটা নিশ্চিত হলে তার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে—এমন বিধানও এতে রাখা হয়েছে।
এই ঐকমত্যের মূল কথা হচ্ছে, ইরান যে মুহূর্তে তার লক্ষ্য অর্জনে এক বা একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেবে, তখন তাকে এক বছরের সতর্কবার্তা দেওয়া হবে। এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, ঐকমত্যে যে ধরনের মনিটরিংয়ের কথা বলা হয়েছে, তাতে ইরান কোনোভাবে এর শর্ত লঙ্ঘনের চেষ্টা করলে তা আগেই ধরা যাবে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি অনুসারে কাজ করতে পারবে। তারা মনে করলে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর আগেই নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে।
এই ঐকমত্যটি কার্যকর হবে বা তার কাঙ্ক্ষিত প্রভাব অনুভূত হবে, তা অনুমান করার পাঁচটি কারণ আছে। প্রথমটি হচ্ছে আগামী ৯০ দিন। যা ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা আসলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো; আর আগামী জুনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও সমন্বিত চুক্তি হওয়ার কথা। আবার এর মধ্যে স্বাক্ষরকারীদের মনও বদলে যেতে পারে, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও জনগণ যদি এর শর্ত নিয়ে সমালোচনা শুরু করে, তাহলে তা হতেও পারে। যে আলোচনা হয়েছে, তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে উপস্থাপন করছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতান্তর সৃষ্টি হয়েছে।
সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো কীভাবে ফয়সালা করা হবে, সেটাই হচ্ছে দ্বিতীয় উদ্বেগের কারণ। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কখন তুলে নেওয়া হবে, তার দিনক্ষণ ঠিক করাই হবে সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার। ইরানের জন্য এটাই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়। ইরানি জনগণের কাছে এই নিষেধাজ্ঞাই প্রধান ব্যাপার, তাদের প্রতিক্রিয়াও নির্ধারণ করবে এই নিষেধাজ্ঞা। তার মানে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেকেই চাইবে যে ইরান তার গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা পুরোপুরি পূরণ না করা পর্যন্ত এসব নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাক।
সন্দেহের তৃতীয় উৎস হচ্ছে, বিভিন্ন পক্ষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুমোদন করবে কি না, এমন আশঙ্কা। প্রধান দুটি অনিশ্চয়তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে। ইরানের তথাকথিত কট্টরপন্থীরা ‘মহা শয়তানের’ সঙ্গে যেকোনো রকম চুক্তির বিরোধিতা করবে, যেটা তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাশ টেনে ধরবে। আবার ইরানি জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত প্রবল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অনুমোদন দিলেই ইরান এই চুক্তি অনুমোদন করবে, তিনি সেটা করবেন বলেও অনুমান করা যায়।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জটিলতা আরও বেশি। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আরও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে হবে, যে লড়াই শুরু হবে মার্কিন কংগ্রেসেই। ইরান নিয়ে বোধগম্যভাবেই বিস্তর উদ্বেগের অবকাশ আছে, ১০, ১৫ বা ২৫ বছর পর ইরানের ওপর থেকে নানা সীমাবদ্ধতা উঠে গেলে কী হবে, তা নিয়ে। কংগ্রেস যে চূড়ান্ত চুক্তিতে অনুমোদন দেবে বা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, সেটা মোটেও নিশ্চিত নয়।
রাজনৈতিক অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারটা উদ্বেগের চতুর্থ ক্ষেত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত: চূড়ান্ত ঐকমত্য কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস ঘাঁটলে মনে হয়, এমন সময় আসবে, যখন ইরান চুক্তির শর্তাবলি পালন করবে না। যে চেতনার বলে চুক্তিটি হয়েছিল, সেটা ধারণ করার ক্ষেত্রে সে আরও পিছিয়ে। কারণ, ইতিপূর্বে জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের কাছে সে তথ্য লুকিয়েছে। ইরানের আচরণ মূল্যায়নের প্রক্রিয়া নির্ধারণে ঐকমত্য দরকার, আর সে কীভাবে সাড়া দেবে, তা নির্ধারণেও ঐকমত্য দরকার।
পঞ্চম উদ্বেগের কারণ যতটা না এই ঐকমত্য, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ইরানের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি। ঐকমত্যটি শুধু ইরানের পারমাণবিক তৎপরতাবিষয়ক। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সন্ত্রাসীদের সহায়তা, প্রক্সি এবং সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যে দেশটি কী করছে, সে বিষয়ে একটি কথাও নেই। আবার নিজ দেশে ইরানের মানবাধিকারবিষয়ক কোনো কথাও এই ঐকমত্যে নেই।
ইরান এক সম্ভাব্য সাম্রাজ্যিক শক্তি, যে তার এলাকায় আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এমনকি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত ও বাস্তবায়িত হয়ে গেলেও এ অবস্থা পাল্টাবে না, এমনকি পরিস্থিতি আরও খারাপও হতে পারে।
রিচার্ড এন হাস
ওবামা সঠিক: এমন এক পারমাণবিক চুক্তি ইরান প্রত্যাশা করে। এ চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থপূর্ণভাবেই লাগাম টানবে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে অবশ্যই এমন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে। আর কোনো প্রতারণা হলে তা দ্রুত বের করে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা যাবে। কাজটা সহজ হবে না। এটা বলা অতিরঞ্জন হবে না যে এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হলে বহুকিছু করতে হবে, আলোচনা ফলপ্রসূ করতেও ঠিক যেমন অনেক কিছু করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
রিচার্ড এন হাস: যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের প্রেসিডেন্ট।

ডিবির গোপন ডিএনএ পরীক্ষা! by নেসারুল হক খোকন ও ওবায়েদ অংশুমান

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। এদিন সকালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিয়মানুযায়ী ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সব ধরনের আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করাসহ ডিএনএ পরীক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রাসায়নিক গুরুত্বপূর্ণ এ পরীক্ষা করানো নিয়ে প্রথম থেকেই পদে পদে দায়িত্বহীনতার ছাপ রয়েছে। এমনকি যুগান্তরের অনুসন্ধান তথ্য অনুযায়ী, মহলবিশেষ মামলাটির মোটিভ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে নিজেদের ইচ্ছামতো ডিএনএ রিপোর্ট নেয়ার গোপন চেষ্টাও করেছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দেয়া চাঞ্চল্যকর বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ যুগান্তরের হাতে রয়েছে।
সূত্র বলছে, সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চোর জড়িত ছিল কিনা তা যাচাই করতে গোপনে ডিএনএ পরীক্ষা করায় ডিবি পুলিশ। ফলস্বরূপ রিপোর্টে প্রমাণ মেলে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চোরদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। পরে নিজেদের ব্যর্থতার বিষয়টি তুলে ধরে তদন্ত সংস্থাটি উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই সংস্থার এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চোর কিংবা ডাকাত জড়িত ছিল না। একই সঙ্গে আদালতের অনুমতি ছাড়া আনঅফিসিয়ালি ডিএনএ পরীক্ষা করানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।
এদিকে এভাবে গোপনে ডিএনএ পরীক্ষা করে দেয়ার কথা সরাসরি অস্বীকার করেন ঢাকা মেডেকিল কলেজ হাসপাতালের ডিএনএ ল্যাবের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। বরং তার দাবি, তদন্ত সংস্থাটি নিজেদের মতো করে ডিএনএ পরীক্ষা করানোর জন্য তাকে নানাভাবে চাপ দেয়।
এ বিষয়ে আইনজ্ঞদের অভিমত, আদালতের অনুমতি ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা করানো বেআইনি। ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ প্রোবিধান অনুযায়ী, মামলার তদন্তের স্বার্থে আলামত কিংবা রাসায়নিক যে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে বাধ্য তদন্ত সংস্থা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘আনঅফিসিয়ালি যদি পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষা করেও থাকে তাতে তদন্তের কী কোনো ক্ষতি হয়েছে? কোর্টে আসা-যাওয়া, প্রেয়ার দেয়া অনেক ঝামেলা। দেরি হয়। আর এসব ক্ষেত্রে সবকিছু কোর্টের পারমিশন নিয়ে করতে হবে এমন নয়। কারণ এগুলো ম্যান্ডাটরি না। এতে তদন্তের কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয়।’ তবে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান আইন কর্মকর্তা (পিপি) আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, ‘ডিএনএ টেস্ট করতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। এটাই নিয়ম। র‌্যাব আদালতের অনুমতি নিয়েই সাগর-রুনী হত্যা মামলায় ডিএনএ টেস্ট করে। তবে ডিবি পুলিশ আদালতের অনুমতি না নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে থাকলে সে ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করি।’
চোর প্রমাণের চেষ্টা ব্যর্থ : হত্যাকাণ্ডের পর শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ ছয় দিন মামলাটি তদন্ত করে। পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তরিত হয়। যদিও ঘটনার পরপরই ছায়া তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক শীর্ষস্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, ঘটনার রহস্য উন্মোচনে তখন ডিবির সব ইউনিট কাজ শুরু করে। তাদের তদন্তে গ্রিল কাটা চোরের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এমনকি সংস্থাটি তিন-চার জন গ্রিল কাটা চোরকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদও করে। এর মধ্যে এক চোরের কাছ থেকে গ্রিল কাটার যন্ত্রপাতিসহ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ (সারের বস্তা) জব্দ করে তারা। আর ওই ব্যাগের গায়ে রক্তের দাগ ছিল। ডিবির কর্মকর্তারা আরও জানান, আটক চোররা জানিয়েছিল, ঘটনার দিন রাতে তারাও পশ্চিম রাজাবারের এলাকায় চুরি করতে গিয়েছিল। তাদের কাছ থেকে এমন তথ্য জানার পর ডিবির টিম ধারণা করেছিল, সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চোরদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে তারা সাগরদের বাসার গ্রিল দিয়ে এক চোরকে ঢুকিয়ে পরীক্ষাও করেছিল। জব্দ করা চটের ব্যাগের গায়ে থাকা রক্তের সঙ্গে রুনীদের বাসা থেকে উদ্ধার করা রক্তমাখা জামা, স্যান্ডেলে লেগে থাকা রক্তের ডিএনএ মিল আছে কিনা তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে ব্যাগের গায়ে থাকা রক্ত পরীক্ষা করে সিআইডি। তারা রিপোর্ট দেয়, ওই ব্যাগের থাকা রক্ত মানুষের। পরে রক্তমাখা জামাসহ জব্দ করা ৭টি আলামত ও চোরদের ব্যাগসহ গ্রিল কাটার যন্ত্রপাতি ঢাকা মেডিকেলের ডিএনএ ল্যাবে পাঠানো হয়। ল্যাব পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়, ব্যাগের গায়ে লেগে থাকা রক্ত মানুষের নয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতের ডিএনএ’র সঙ্গে ব্যাগের রক্তের ডিএনএ’র কোনো মিলও নেই। এ রিপোর্টের মধ্য দিয়ে ঘটনার পেছনের চোরকে জড়িত করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
এদিকে ডিএনএ পরীক্ষা করানোর পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন একজন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন ‘আটক করা এক চোরের কাছ থেকে ব্যাগ পেয়েছিলাম। মানে প্লাস্টিকের ব্যাগ, বাজারের ব্যাগ। ওইটার ভেতরে পাওয়া গিয়েছিল গ্রিল কাটার যন্ত্রপাতি। ব্যাগের গায়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগও ছিল। গ্রিল কাটার জিনিসের গায়েও রক্ত ছিল। এটা আমরা সিআইডিকে যখন দেখালাম, তারা রিপোর্ট দিল, এটা হিউম্যান ব্লাড। আমরা এটা তখন ঢাকা মেডিকেলের ডিএনএ ল্যাবে নিয়ে গেলাম। খুব গোপনে, আনঅফিসিয়াল পরীক্ষা করানোর জন্য। আবার বাসা (ঘটনাস্থল) থেকে পাওয়া স্যান্ডেলসহ বেশ কিছু আলামত দিলাম। কিন্তু পরীক্ষা করে ডিএনএ ল্যাব আমাদের রিপোর্ট দিল, নো করেসপন্ডেস ডিএনএ (কোনো ডিএনএ পাওয়া যায়নি)। এতে করে আমরা চরম হতাশ হলাম।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চোরের কাছ থেকে জব্দ করা ব্যাগের গায়ে ব্লাড ছিল। সেখানে তো ডিএনএ পাওয়া যাবেই, তা মানুষের থাকুক আর গরুর থাকুক। আমারও তো প্রশ্ন, ব্যাগের গায়ে রক্ত থাকলেও তারা বলল কোনো ডিএনএ পাওয়া যায়নি। কিন্তু সিআইডি বলে দিয়েছে এটি হিউম্যান ব্ল্যাড। আমাদের প্ল্যান ছিল যদি ব্লাড ম্যাচ করে, তখন অফিসিয়ালি ডিএনএ টেস্ট করানোর। টাকা দিয়েই করেছিলাম। ৪০ হাজার টাকা লেগেছিল। ৬টা বা ৭টা সেম্পল করিয়েছিলাম।’ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চোর জড়িত ছিল কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সত্য কথা বলতে কী, ডিবির সব টিম কাজ করেছে আন্তরিকতার সঙ্গে। কিন্তু আমরা ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারিনি। তবে আশাবাদী ছিলাম, চোররা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু ডিএনএ টেস্ট করানোর পর চোরের বিষয়টি আমরা কনভিন্স হতে পারিনি।
ওপর মহলের চাপ : অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিবিতে মামলা থাকাকালীন তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ডিবির তৎকালীন দু’জন সহকারী কমিশনার (এসি) ডিএনএ টেস্ট করানোর জন্য ঢাকা মেডিকেলের ডিএনএ ল্যাবে যান। আর ল্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যেয়ে প্রস্তাব দেন, ডিবি যেভাবে বলবে সেভাবে ডিএনএ রিপোর্ট দিতে হবে। যদি তাদের মতো করে রিপোর্ট আসে তাহলে তারা পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে সরকারিভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করাবে। এমনকি ওই দু’জন সহকারী কমিশনার ল্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এও বলেন, ‘তাদের ওপরে অনেক চাপ রয়েছে। যে কোনো মূল্যে তাদের মতো করে ডিএনএ পরীক্ষা করে দিতে হবে।’ পরে তাদের (ডিবির কর্মকর্তা) ডিএনএ ল্যাব কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো ডিএনএ পরীক্ষা তারা করতে পারবে না।
এদিকে ডিএনএ ল্যাবের যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে ডিবি পরীক্ষা করানোর প্রস্তাব দিয়েছিল তার মুখোমুখি হয় যুগান্তরের অনুসন্ধানী টিম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ডিবির দু’জন কর্মকর্তা আমার কাছে ডিএনএ পরীক্ষা করানোর জন্য এসেছিল। এটা সত্য। তারা দু’জনই ডিবির এসি ছিলেন। এসে আমাকে বললেন, ‘স্যার, আমাদের ওপর মহলের চাপ রয়েছে। আনঅফিসিয়ালি ডিএনএ টেস্ট করে দিতে হবে। আমরা যেভাবে চাইব সেভাবে রিপোর্ট দিতে হবে।’ এ কথা শোনার পর তাদের বললাম, ‘আমার পক্ষে কোনোভাবে তা করা সম্ভব না। আদালতের অনুমতি ছাড়া ডিএনএ টেস্ট করানো অসম্ভব।’ ডিএনএ ল্যাবের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিবির ওই কর্মকর্তাদের বলেন, ‘সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডটি বড় ধরনের ক্রাইম। তাই আপনারা যদি ল্যাবরেটরির সুবিধা নিতে চান তাহলে অফিসিয়ালি আসতে হবে। অর্থাৎ কী কী আলামত দিচ্ছেন, কোন মামলার আলামত বিস্তারিতভাবে বলতে হবে। তাহলেই আমি এর রিপোর্টটি করে দেব।’
অস্বীকার ল্যাব কর্তৃপক্ষের : ডিবির শীর্ষ কর্মকর্তা ডিএনএ ল্যাব থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করানোর কথা স্বেচ্ছায় যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেন। এ বিষয়টি জানানো হয় ন্যাশনাল ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের প্রধান শরীফ আক্তারুজ্জামানের কাছে। তিনি গত মঙ্গলবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার ল্যাব থেকে সাগর-রুনী হত্যা মামলার কোনো আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি। যদি কেউ দাবি করেন তা সত্য নয়।’ এখন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, ডিবি কোথা থেকে ডিএনএ রিপোর্ট করেছিল।
সাত দিনেই ডিএনএ রিপোর্ট দিতাম : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত বাংলাদেশের একমাত্র ডিএনএ (আইনি কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে) গবেষণাগার ন্যাশনাল ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব। ২০০৬ সাল থেকে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। সব মামলার আলামতের ডিএনএ টেস্ট করানোর জন্য দেশের আদালতগুলো এখানে পাঠিয়ে দেন। সফলতার সঙ্গে হাজার হাজার মামলার ডিএনএ রিপোর্ট দিতে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সাগর-রুনী হত্যা মামলার আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করানোর জন্য কোনো তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে এ ল্যাবে আসেনি। বরং ডিএনএ টেস্ট করানোর জন্য সুদূর আমেরিকায় আলামত পাঠিয়েছে র‌্যাব। এর বেশ কিছু রিপোর্টও তারা হাতে পেয়েছে। এসব রিপোর্ট পেতে তাদের সময় লেগেছে গড়ে এক থেকে ২ বছর। অথচ ল্যাবের প্রধান শরীফ আক্তারুজ্জামানের দাবি, সাগর-রুনী হত্যা মামলায় যে কয়টি আলামত আছে তার ডিএনএ পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে বড়জোর সাত দিন সময় লাগত। খরচও কম। কারণ ঢামেক ডিএনএ ল্যাব একটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব। আমাদের ডিএনএ ল্যাবে পৃথিবীর নামিদামি এবং পাওয়ারফুল সফটওয়ার ব্যবহার করা হয়, যা আমেরিকার এফবিআই ল্যাবরেটরি থেকে আমাদের দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের ডিএনএ পরীক্ষা করতে যা যা প্রয়োজন সবই এখানে আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনএ ল্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিবির কাছ থেকে মামলা যখন র‌্যাবের হাতে যায় তখন ল্যাবের বিষয়ে সব (আনঅফিসিয়ালি আসায় ডিবিকে ফেরত দেয়া) জানতে পারে। এ জন্য তারা আর ডিএনএ ল্যাবে আসেনি।’ তবে ল্যাবের ওই কর্মকর্তার এমন তথ্য তুলে ধরা হয় র‌্যাবের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে। যিনি পুরো মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া মনিটরিং করেছেন। তিনি যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, হত্যা মামলার আলামত পরীক্ষা করার মতো আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা দক্ষ জনবল ঢামেক ডিএনএ ল্যাবের নেই। এ জন্য সেখান থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়নি।
অনেক আগে রহস্য উন্মোচন হতো : ডিএনএ ল্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে তদন্ত সংস্থাগুলো সাগর-রুনী হত্যা মামলার আলামত সংরক্ষণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তদন্ত সংস্থা যদি দক্ষতার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংরক্ষণ করে ডিএনএ টেস্ট করাত তাহলে এর রহস্য অনেক আগেই উন্মোচিত হতো। এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা ঘটনাস্থল থেকে আলামত জব্দ করে ঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারেনি। বিশেষ করে ক্রাইম সিন থেকে আলামতগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে মামলার রহস্য উন্মোচন হতো সহজেই। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি কিংবা বঁটি থেকে অস্পষ্ট ফিঙ্গার প্রিন্ট এসেছে। আর ডিএনএ ল্যাবের শরীফ আক্তারুজ্জামান বলেন, রুনীর মোবাইল থেকে মেঘ কল দিয়েছে কিনা কিংবা অন্য কেউ কল দিয়ে থাকলে তাও বের করা সম্ভব হতো, যদি মোবাইলটি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হতো। পুরো ক্রাইমসিন থেকে এমন অনেক আলামত সংরক্ষণ করে পরীক্ষা করলে হত্যারহস্য অনেক আগেই উন্মোচন করা যেত। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাস্থলে থাকা সাগরের মানিব্যাগ, সিগারেটের প্যাকেট, রুনীর ব্যবহৃত দুটি ব্যাগ, গয়নার বাক্সের ব্যাগ, পড়ে থাকা ব্যবহৃত টিস্যু, মাথার কিছু চুল, একটি আপেল ও বিছানার ওপরে থাকা কাগজের টুকরাসহ অনেকগুলো আলামত সংগ্রহ করেনি পুলিশ। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এসব আলামত সংরক্ষণ করে দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষা করলে অনেক সহজে ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা যেত।
(রিপোর্টে প্রকাশিত সব সাক্ষাৎকারের অডিও, ভিডিও যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত)