Saturday, March 1, 2025

জেলেনস্কিকে দেউলিয়া করার নীলনকশা ট্রাম্প-পুতিনের by অমিত হাসান রবিন

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আর যেন সহ্য করতে পারছিলেন না। তার দেশকে নিয়ে যে ছেলেখেলা খেলছে যুক্তরাষ্ট্র তা হারে হারে টের পাচ্ছেন তিনি। তাইতো মেজাজ হারিয়ে ফেললেন ট্রাম্পের সামনেই। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে বসে চোখে চোখ রেখে এভাবে কথা বলার সাহস দেখায়নি কেউ। শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টই নয়, স্মরণকালে সামনাসামনি দুই বিশ্বনেতার এমন বাগ্‌বিতণ্ডা বিরলই বটে।

বাইডেন প্রশাসন যে ইউক্রেনকে পুতিনের মতো বাঘের সামনে ঠেলে দিয়ে কত বড় বিপদে ফেলেছে তা এখন হারে হারে টের পাচ্ছেন ‘কমেডিয়ান’ জেলেনস্কি। কারণ ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ক্ষমতায় এসে উদ্যোগও নেন কিন্তু সেই আলোচনার কোথাও নেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। অর্থাৎ তাকে ছাড়াই চলছে যুদ্ধবিরতি আর শান্তি আলোচনা।

এতেই যেন মাথা খারাপ অবস্থা কিয়েভের। হয়তো মাথা চুলকিয়ে জেলেনস্কি পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখেন- হাজার হাজার সেনা, বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি আর শত শত স্থাপনা ধ্বংসের চিত্র। সেই সঙ্গে ভূখণ্ড হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা-তো রয়েছেই। যুদ্ধের এমন পরিস্থিতিতে উল্টো ইউক্রেনের কাছে খনিজ সম্পদ চেয়ে বসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সবকিছু মিলিয়ে দেউলিয়া হওয়ার অবস্থা তার।

ট্রাম্প এখন বলছেন, বাইডেন যা পাগলামি করার করে গেছেন সেই সব হিসাব বাদ। ইউক্রেনে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালার এখন আর কোনো যুক্তিই খুঁজে পাচ্ছেন না । ফলে এই ‘লস প্রোজেক্টে’ ট্রাম্প নেই। কিন্তু ঠিক এই আমেরিকাই তাকে ন্যাটোতে নেওয়ার মুলা ঝুলিয়ে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিল পুতিনের বিরুদ্ধে।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির তুমুল তর্ক-বিতর্কের চিত্র দেখে মুচকি হাসছে রাশিয়া। বাহবা দিচ্ছে ট্রাম্পকে। বাধ্য হয়ে ইউক্রেন এখন ইউরোপের সহায়তা চাচ্ছে। প্রস্তাব দিয়েছে ন্যাটোকে পাশ কাটিয়ে পৃথক বাহিনী গঠন করার। কিন্তু জেলেনস্কিকে ফ্যান্স-জার্মানির মতো দাপুটে দেশ গোনায় ধরবে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন। 

পুতিন, জেলেনস্কি ও ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
পুতিন, জেলেনস্কি ও ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

ক্ষোভে-দুঃখে আমেরিকা ছাড়ছেন প্রখ্যাত হলিউড পরিচালক জেমস ক্যামেরন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করেছেন ডনাল্ড  ট্রাম্প। এদিকে প্রখ্যাত হলিউড পরিচালক তথা কালজয়ী সিনেমা টাইটানিক-এর স্রষ্টা জেমস ক্যামেরন ক্ষোভে-দুঃখে আমেরিকা ছাড়ছেন। তিনি নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কারণ, ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়া মেনে নিতে পারছেন না এই অস্কারজয়ী পরিচালক। ক্যামেরন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা যা কিছু শালীন ছিল তার থেকে বিপরীতগামী হয়ে গিয়েছে। টাইটানিক ছবির পরিচালক ২০১২ সাল থেকেই নিউজিল্যান্ডের সাউথ ওয়াইরারাপা-য় একটি বিরাট ডেয়ারি ফার্ম চালান। অবতার ছবির সময় তিনি নিউজিল্যান্ডের বিখ্যাত ওয়েলিংটন্স ওয়েটা ডিজিটালের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। যে ছবিটি ভিজুয়াল এফেক্টসে অস্কার জেতে। সেই ক্যামেরন অনেকদিন ধরেই পাকাপাকিভাবে নিউজিল্যান্ডের নাগরিক হয়ে আমেরিকা-ত্যাগের কথা বলে আসছিলেন।

নিউজিল্যান্ডের একটি সংবাদমাধ্যমে ৭০ বছর বয়সী ক্যামেরনকে সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়, ট্রাম্পের দ্বিতীবার নির্বাচন নিয়ে তিনি কীরকম আতঙ্কে ছিলেন? ক্যামেরন জবাবে বলেন, আমি মনে করি এটা ভয়ঙ্কর। ঐতিহাসিক দিক থেকে আমেরিকা যুগ যুগ ধরে যে আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে আছে, এখন তা উল্টোদিকে মোড় নিচ্ছে। পুরোটাই ফাঁপা একটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে। আমি মনে করি, ওরা ( ট্রাম্প প্রশাসন ) যত দ্রুত সম্ভব ওদের লাভের জন্য দেশটাকেও ফোঁপড়া করে দেবে।

তিনি বলেন, তার নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ক্যামেরনের কথায়, এটি এমন একটি বিষয় যা আমি অর্জনের জন্য কাজ করেছি, যার জন্য আমাকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যদি আপনি আপনার পরিবারকে উপড়ে ফেলে কোথাও চলে যেতে চান, তাহলে আপনাকে বিনিয়োগ করতে হবে, আপনাকে এর অংশ হতে হবে, আপনাকে মর্যাদা অর্জন করতে হবে।

ক্যামেরন নিউজিল্যান্ডকে তার জন্মভূমি কানাডার সাথে তুলনা করে বলেন, 'আমি কানাডায় বড় হয়েছি এবং এখানকার মানুষের আচরণের মধ্যে অনেক মিল দেখতে পাই। আসলে এখানে আমার একটু বেশি ভালো লাগে। এখানকার মানুষ সহজাত শ্রদ্ধার দাবি রাখে। আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তানেরাও এটাই অনুভব করুক।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

mzamin


চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘অলআউট অ্যাকশনে’ যাবে ডিবি

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘অলআউট অ্যাকশনে’ যাচ্ছে ডিবি। তাছাড়া ছোট-বড় যেকোনো অপরাধ ও অপরাধীর ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

মহানগর ডিবি প্রধান রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আজ থেকে আমরা ডিবির চলমান কার্যক্রমের পাশাপাশি রমজানকে সামনে রেখে বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছি। এটা হচ্ছে এক ধরনের বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান। যেটাতে ছদ্মবেশে আমাদের সদস্যরা মানুষের মধ্যে থেকে অপরাধীদের সনাক্ত করবে। তিনি বলেন, রোজার সময় মানুষের কর্মযজ্ঞ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন বেশি হয়। শপিংমল, ব্যাংক, বীমাগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়ে। রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও সদরঘাটসহ অন্যান্য জায়গাতে মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। এসব জায়গায় কেউ যাতে নাশকতা করতে না পারে, সেজন্য আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি দূরের যাত্রা পথ বিশেষ করে বাসে কোন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সে লক্ষে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে আমরা আগে থেকেই ডিবির তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। আমাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, চুরি ছিনতাই ডাকাতির সাথে যারা যুক্ত হচ্ছে তাদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। এদের অনেকেই কিশোর গ্যাং। তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আবার কিছু ফ্যাসিস্ট পতিত রাজনৈতিক শক্তি তাদের ইন্ধন দিয়ে অপরাধ কার্যক্রমে জড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যৌথ বাহিনী সারাদেশে তৎপরতা বাড়িয়েছে। অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীও মাঠে আছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আমরা বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তাদের সহায়তা করছি। যা ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। মহানগরীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। আমাদের কাজ হচ্ছে গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী করা। আমরা সে বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছি। আশা করি কিছুদিনের মধ্যে আপনারা আরো ভালো অবস্থা দেখতে পাবেন।

জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ডিবি পরিচয়ে কেউ গোপনে তুলে নেয়া বা সিভিল পোশাকে তল্লাশি এই ধরনের কাজ কেউ করলে আমাদেরকে জানান। পাশাপাশি নাশকতা করতে পারে এমন কোন তথ্য থাকলে ডিবিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন। আপনাদের পরিচয় গোপন রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডিবি প্রধান বলেন, পবিত্র মাহে রমজানে নগরবাসী যেন নিরাপদে ইবাদত বন্দেগী করতে পারেন সেজন্য ডিবির কার্যক্রম আরো বেগবান করা হয়েছে। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি নগরবাসী এসময় অধিকতর নিরাপদ ও স্বস্তির পরিবেশে থাকবেন। যেকোনো প্রয়োজনে ডিবি আপনাদের পাশে রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মোতাবেক নগরবাসীর শান্তি শৃংখলা রক্ষায় আত্মনিয়োগ করবো। এ দেশ আপনার আমার সকলের। দেশে শান্তি থাকলে শান্তি থাকবে জনমনে। দেশকে নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনসাধারণকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএমপি’র যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (এ্যাডমিন অ্যান্ড গোয়েন্দা-দক্ষিণ)  মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা-উত্তর) মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া,  যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণ)  সৈয়দ হারুন অর রশীদ, উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস্ বিভাগ) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান প্রমুখ।

mzamin

ট্রাম্প–জেলেনস্কি বৈঠকে বাগ্‌বিতণ্ডা-উত্তেজনা, হয়নি চুুক্তি, যৌথ সংবাদ সম্মেলন বাতিল

এত দিন ছিল পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই; কিন্ত এবার মুখোমুখি বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বৈঠকে তাঁদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার চুক্তি সইয়ের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

রাশিয়ার সঙ্গে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে ট্রাম্পের পূর্বসূরি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি ডলারের অস্ত্র ও অর্থসহায়তা পেয়েছে ইউক্রেন; কিন্তু গত ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পরে পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের জন্য জেলেনস্কিকে দোষারোপ করে আসছিলেন তিনি। তাই সবার চোখ ছিল গতকালের বৈঠকে।

সাংবাদিকদের সামনে এই বৈঠকে জেলেনস্কিকে একের পর আক্রমণ করে বক্তব্য দেন ট্রাম্প। জেলেনস্কি ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন’ বলে অভিযোগ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আপনার দেশের মানুষ খুবই সাহসী; কিন্ত আপনাকে হয় (রাশিয়ার সঙ্গে) একটি চুক্তি করতে হবে নইলে আমরা আর আপনাদের সঙ্গে নেই। আর আমরা যদি না থাকি তাহলে আপনাকে একা লড়তে হবে।’

ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে মতপার্থক্য একসময় চিৎকার-চ্যাঁচামেচির পর্যায়ে চলে যায়। ‘জেলেনস্কি যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন’ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, ‘মানুষ মারা পড়ছে। যুদ্ধের জন্য সেনার সংখ্যাও কমছে ক্রমশ। আপনার হাতে কার্ড (বিকল্প) নেই। একবার আমরা চুক্তি সই করলে আপনি ভালো অবস্থানে চলে যাবেন। কিন্ত আপনাকে আদৌ কৃতজ্ঞ মনে হচ্ছে না। সত্যি কথা বলতে কি এটা ভালো কোনো বিষয় নয়।’

‘যুক্তরাষ্ট্র ও ওভাল অফিসকে অসম্মান’

ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেন, যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করতে চাইলে ইউক্রেনকে ছাড় দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘ছাড় দেওয়া ছাড়া আপনি কোনো চুক্তি করতে পারবেন না। তাই এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তাঁকে (জেলেনস্কি) কিছু ছাড় দিতে হবে। কিন্তু আশা করি, বড় কোনো ছাড় দিতে হবে না যেমনটা লোকে বলে বেড়াচ্ছে।’

ট্রাম্পের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম উল্লেখ করে বলেন, একজন খুনিকে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। পুতিনের বিষয়ে ট্রাম্পের নমনীয় অবস্থানের সমালোচনা করেন জেলেনস্কি। একজন খুনির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা না করার জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শুধু ট্রাম্প নয়, জেলেনস্কির সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও। ওভাল অফিসে বসে বিতণ্ডায় জড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জেলেনস্কি অসম্মান করেছেন মন্তব্য করে ভ্যান্স বলেন, ‘আপনি একবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন না।’ মাথা নেড়ে ভ্যান্সের কথায় সায় দেন ট্রাম্প।এ সময় গলার স্বর উঁচু করে জেলেনস্কি উত্তর দেন, ‘বহুবার বলেছি, আমেরিকার জনগণকে ধন্যবাদ।’

হোয়াইট হাউসে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জেলেনস্কির উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পরও হোয়াইট হাউস জানায়, দুই রাষ্ট্রনেতা কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি সংবাদ সম্মেলনে আসবেন। সেখানে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ নিয়ে একটি চুক্তিতেও সই করবেন তাঁরা।
কিন্ত এর কিছুক্ষণ পর হোয়াইট হাউস এই সংবাদ সম্মেলন বাতিল করার কথা জানায়। এরপর জেলেনস্কি ও তাঁর সঙ্গে থাকা ইউক্রেনের অন্য কর্মকর্তাদের হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক শেষে ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একে পোস্টে লিখেছেন, জেলেনস্কি ‘যুক্তরাষ্ট্র ও এ দেশের শ্রদ্ধার জায়গা ওভাল অফিসকে (হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়) অসম্মান’ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেদিন তিনি (জেলেনস্কি) শান্তির জন্য প্রস্তুত হবেন, আবার (হোয়াইট হাউসে) ফিরে আসতে পারেন।’

ট্রাম্প ‘বদমাশ’ জেলেনস্কিকে সংযম দেখিয়েছেন: রাশিয়া

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে শুক্রবারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নজিরবিহীন বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বৈঠকে ট্রাম্প ‘বদমাশ’ জেলেনস্কিকে যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা টেলিগ্রাম পোস্টে লেখেন, ‘আমি মনে করি, জেলেনস্কির একগাদা মিথ্যা কথার মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি ছিল, হোয়াইট হাউসে তিনি দাবি করেছেন, ২০২২ সালে কিয়েভ সরকার একা ছিল। কোনো সমর্থন পায়নি।’

মারিয়া জাখারোভা আরও লেখেন, ‘ট্রাম্প ও ভ্যান্স (যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) কীভাবে সেই বদমাশকে আঘাত করা থেকে বিরত ছিলেন; সেটা সংযম প্রদর্শনের এক অলৌকিক ঘটনা।’

ট্রাম্প–জেলেনস্কির বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। এক্স পোস্টে তিনি জেলেনস্কিকে একজন ‘উদ্ধত শূকর’ বলে মন্তব্য করেন।

বর্তমানে রাশিয়ার  নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা মেদভেদেভ বলেন, ‘অবশেষে উদ্ধত শূকরটি ওভাল অফিসে একটি উপযুক্ত থাপ্পড় খেয়েছে।’

মেদভেদেভ আরও যোগ করেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক বলেছেন, কিয়েভের শাসনকাঠামো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছে।’

এত দিন ছিল পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই, কিন্তু এবার মুখোমুখি বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বৈঠকে তাঁদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার চুক্তি সইয়ের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বাতিল করা হয় দুই নেতার যৌথ সংবাদ সম্মেলন। এর পরপরই হোয়াইট হাউস থেকে জেলেনস্কিকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না করেই বেরিয়ে গেছেন জেলেনস্কি। শুক্রবার ওয়াশিংটনে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এই বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না করেই বেরিয়ে গেছেন জেলেনস্কি। শুক্রবার ওয়াশিংটনে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। শুক্রবার, ওয়াশিংটনে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। শুক্রবার, ওয়াশিংটনে। ছবি: এএফপি

৬০,০০০ বছরের জন্য সীমাহীন জ্বালানির সন্ধান পেয়েছে চীন

সীমাহীন এক জ্বালানির উৎসের সন্ধান পেয়েছে চীন। এই জ্বালানি দিয়ে তারা ৬০ হাজার বছর চলতে পারবে। বেইজিংয়ে ভূবিজ্ঞানীরা এমন দাবি করেছেন।  এ খবর দিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল বলছে, ইনার মঙ্গোলিয়ায় বায়ান ওবো খনিজ কমপ্লেক্সে পাওয়া গেছে পর্যাপ্ত পরিমাণ থোরিয়াম। এটা এতটা বেশি যে, তা দিয়ে চীনাদের প্রতিটি বাড়িতে ‘চিরদিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

উল্লেখ্য, থোরিয়াম হালকা মাত্রার একটি তেজষ্ক্রিয় পদার্থ। এটা দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। এর নাম হবে মল্টেন-সল্ড রিঅ্যাকটর। তা থেকে আসবে অসীম পরিমাণ বিদ্যুৎ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যদি ওই খনি থেকে পুরোটা থোরিয়াম উত্তোলন করা যায় তাহলে তার পরিমাণ হবে ১০ লাখ টন। দ্য সাউথ চায়না পোস্ট প্রকাশিত হয়ে পড়া একটি রিপোর্ট উল্লেখ করে এ তথ্য দিয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ওই খনিতে থোরিয়ামের উৎস এখন পর্যন্ত অস্পৃশ্য অবস্থায় আছে। এটা যথাযথভাবে উত্তোলন করা গেলে তা সারাবিশ্বের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার ইতি ঘটাবে। গবেষকরা আরো দাবি করেছেন যে, ইনার মঙ্গোলিয়ার একটি লোহার আকরিকের খনি থেকে ৫ বছরে যে বর্জ্য হিসেবে খনিজ পাওয়া যাবে, তাতে যে পরিমাণ থোরিয়াম থাকবে, তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে এক হাজার বছরের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। উল্লেখ্য, এই খবরটি এমন এক সময়ে এলো যখন চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার সোর্স সন্ধান করছে। গবেষণায় পুরো চীনে ২৩৩ টি থোরিয়াম সমৃদ্ধ অঞ্চলের সন্ধান মিলেছে। যদি এ কথা সত্য হয়, তাহলে চীনে যে পরিমাণ থোরিয়াম জমা আছে, তা আগের হিসাবকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যাবে। প্রচলিত পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত হয় ইউরেনিয়াম-২৩২। তার চেয়ে কমপক্ষে ৫০০ গুণ বেশি থোরিয়াম জমা আছে। ফলে চীনের মুখে হাসির রেখা দেখা দিয়েছে।

পারমাণবিক চুল্লি তেজষ্ক্রিয় পদার্থকে ফিশন বা বিগলন নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াকালে ওই তেজষ্ক্রিয় পদার্থ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়, অধিক স্থিতিশীল পদার্থে পরিণত হয়। তার সঙ্গে প্রচুর তাপশক্তি সৃষ্টি করে। এই তাপশক্তিকে ব্যবহার করে স্টিম টার্বাইন চালানো যায়। নিজে থেকে থোরিয়াম বিগলনযোগ্য নয়। এর অর্থ হলো ফিশন প্রক্রিয়ায় একে ব্যবহার করা যায় না। তবে ফিশন বিক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে তা ব্যবহার হয়। এর কারণ হলো থোরিয়াম হলো ‘উর্বর’। এর অর্থ হলো যখন নিউট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষে বোমার মতো আচরণ করে তখন থেরিয়াম পরিবর্তিত হয়ে ইউরেনিয়াম- ২৩৩’তে পরিণত হতে পারে। মল্টেন-সল্ড রিঅ্যাকটরে থোরিয়াম মিশ্রিত হয় আরেকটি রাসায়নিক লিথিয়াম ফ্লোরাইডের সঙ্গে এবং তা প্রায় ১৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়। এই মিশ্রণ তারপর নিউট্রনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায় যতক্ষণ না কিছু থোরিয়াম পরিবর্তন হয়ে ইউরেনিয়াম-২৩২’তে পরিণত হওয়া শুরু করে। এটা একটি ফিশন বিক্রিয়া। ক্ষয় প্রক্রিয়ায় এই ইউরেনিয়াম তখন অধিক পরিমাণে নিউট্রন তৈরি করে। তা অতিরিক্ত থোরিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়ার মাধ্যমে জ্বালানিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া চলাকালে পারমাণবিক চুল্লি অসীম পর্যন্ত শক্তি উৎপন্ন করে। 

mzamin

ওভাল অফিসে জেলেনস্কি-ট্রাম্প উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে তীব্র বাক -বিতণ্ডা হয়। যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এক্সে জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া  
‘ধন্যবাদ আমেরিকা, আপনাদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। এই সফরের জন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ @POTUS, কংগ্রেস এবং আমেরিকান জনগণ। ইউক্রেনের ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্তি প্রয়োজন এবং আমরা ঠিক সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।’

এক্সে কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর প্রতিক্রিয়া
রাশিয়া অবৈধভাবে এবং অন্যায্যভাবে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। তিন বছর ধরে ইউক্রেনীয়রা সাহসের সাথে লড়াই করেছে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য তাদের লড়াই আমাদের সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডা ন্যায়সঙ্গত এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনে ইউক্রেন এবং ইউক্রেনীয়দের পাশে থাকবে।

জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজের প্রতিক্রিয়া
‘ইউক্রেনের নাগরিকদের চেয়ে বেশি শান্তি আর কেউ চায় না! সেই কারণেই আমরা যৌথভাবে একটি স্থায়ী এবং ন্যায়সঙ্গত শান্তির পথ খুঁজছি। ইউক্রেন জার্মানির উপর এবং ইউরোপের উপর নির্ভর করতে পারে।’

ফরাসি প্রেসিডেন্ট  ইমানুয়েল ম্যাক্রনের প্রতিক্রিয়া
রাশিয়া হলো আগ্রাসক। ইউক্রেনের জনগণও দমবার পাত্র নন। তিন বছর আগে আমরা ইউক্রেনকে সাহায্য করেছিলাম এবং রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলাম এবং সেই সমর্থন আমরা অব্যাহত রেখেছি। আমরা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা, জাপানসহ আরও অনেকে। আমাদের অবশ্যই তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাতে হবে যারা শুরু থেকেই লড়াই করে আসছেন। তাদের সম্মান জানাতে হবে। কারণ তারা তাদের মর্যাদা, স্বাধীনতা, সন্তান এবং ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছেন। এগুলো হয়তো ক্ষুদ্র  জিনিস, কিন্তু এই সময়ে এগুলো ভুলে গেলে চলবে না।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিও মেলোনির প্রতিক্রিয়া  
পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিটি বিভাজন আমাদের সকলকে দুর্বল করে তোলে এবং কেউই  সভ্যতার পতন দেখতে চায় না। একটি বিভাজন কারও উপকার করবে না। আজকের বড় চ্যালেঞ্জ ইউক্রেনকে রক্ষা করা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় রাষ্ট্র এবং মিত্রদের মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক শীর্ষ সম্মেলন প্রয়োজন। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইতালি তার অংশীদারদের কাছে এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করতে চায়।

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের মুখপাত্রর প্রতিক্রিয়া  
তিনি (কিয়ের স্টারমার ) ইউক্রেনের প্রতি তার অটল সমর্থন বজায় রেখেছেন এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার উপর ভিত্তি করে একটি স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজে বের করার জন্য তার ভূমিকা পালন করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিসের প্রতিক্রিয়া  
যতদিন সময় লাগে আমরা ইউক্রেনের পাশে থাকব, কারণ এটি একটি গণতান্ত্রিক জাতির বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের লড়াই যার স্পষ্টতই সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য রয়েছে।  কেবল ইউক্রেনের উপর নয়, বরং সমগ্র অঞ্চল জুড়ে।

কানাডিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানি জোলি এক্সে লিখেছেন
ইউক্রেনের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে কানাডা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোককে রাসমুসেন ফেসবুকে লিখেছেন,
এটা ইউক্রেনের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। ... দৃঢ় কথোপকথনের জন্য অবশ্যই জায়গা রাখতে  হবে - এমনকি বন্ধুদের মধ্যেও। কিন্তু যখন এটি ক্যামেরার সামনে ঘটে, তখন কেবল একজনই বিজয়ী হন। আর তিনি এখন ক্রেমলিনে বসে আছেন।

রাশিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান, দিমিত্রি মেদভেদেভ টেলিগ্রামে লিখেছেন,
‘ওভাল অফিসে এক নৃশংস অধ্যায়’।

ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন এক্সে লিখেছেন,
ইউক্রেনীয় জনগণের সাহসিকতাকে আমরা সম্মান জানাই। শক্তিশালী হোন, সাহসী হোন, নির্ভীক হোন। আপনি কখনই একা নন। প্রিয় প্রেসিডেন্ট, একটি ন্যায়সঙ্গত এবং স্থায়ী শান্তির জন্য আমরা আপনার সাথে কাজ চালিয়ে যাব।

মোলদোভানের প্রেসিডেন্ট মাইয়া সান্দু এক্সে লিখেছেন,
সত্যটা সহজ। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। রাশিয়াই আক্রমণকারী। ইউক্রেন তার স্বাধীনতা রক্ষা করছে এবং আমাদেরও। আমরা ইউক্রেনের পাশে আছি।

স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে লিখেছেন,
ইউক্রেন, স্পেন তোমার সঙ্গে আছে।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এক্সে লিখেছেন,  
শক্তিশালী মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, দুর্বল মানুষ যুদ্ধ করে। আজ প্রেসিডেন্ট  @realDonaldTrump শান্তির পক্ষে সাহসের সাথে দাঁড়িয়েছেন। যদিও অনেকের পক্ষে এটি হজম করা কঠিন ছিল। ধন্যবাদ, মিঃ প্রেসিডেন্ট!

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর টিভি ২ এর কাছে জানিয়েছেন,
আজ হোয়াইট হাউসে আমরা যা দেখলাম তা গুরুতর এবং হতাশাজনক। ইউক্রেনের এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ইউক্রেনে ইউরোপের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। তিনি রাশিয়ার আক্রমণের মুখে অত্যন্ত কঠিন সময়ে তার জনগণকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্প জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলার অভিযোগ করেছেন, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং আমি এই বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখি। নরওয়ে ইউক্রেনের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা আশা করি ট্রাম্প প্রশাসনও ইউক্রেনে ন্যায়সঙ্গত এবং স্থায়ী শান্তির গুরুত্ব বুঝতে পারবে।

চেক প্রেসিডেন্ট পিটার পাভেল এক্সে লিখেছেন, আমরা আগের চেয়েও এখন আরো বেশি ইউক্রেনের পাশে আছি। ইউরোপের প্রচেষ্টা জোরদার করার সময় এসেছে।

ডাচ প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কফের প্রতিক্রিয়া
নেদারল্যান্ড ইউক্রেনকে সমর্থন করে চলেছে। বিশেষ করে এখন। আমরা স্থায়ী শান্তি এবং রাশিয়া যে আগ্রাসন শুরু করেছে তার অবসান চাই। ইউক্রেন, তার সমস্ত বাসিন্দা এবং ইউরোপের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ।

এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গাস তাশাকনা এক্সে লিখেছেন,
শান্তির পথে একমাত্র বাধা হলো পুতিনের আগ্রাসন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। রাশিয়া যদি যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কোনও যুদ্ধ হবে না। ইউক্রেন যদি যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইউক্রেনই থাকবে না। ইউক্রেনের প্রতি এস্তোনিয়ার সমর্থন অটল। ইউরোপের এগিয়ে আসার সময় এসেছে।

পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এক্সে লিখেছেন,
প্রিয় ইউক্রেনীয় বন্ধুরা, তোমরা একা নও।

ইতালীয় উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এক্সে লিখেছেন,

শান্তির লক্ষ্যে কাজ করুন, এই যুদ্ধ বন্ধ করুন! ডনাল্ড ট্রাম্প এগিয়ে আসুন।

সূত্র : রয়টার্স

mzamin

ভারতে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশের ইচ্ছামতো খরচ করার সামর্থ্য আছে

ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে নিজের ইচ্ছামতো খরচ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ব্লুম ভেঞ্চার্স যারা নতুন ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করে, তারা তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ভারত সম্পর্কে এ তথ্য জানিয়েছে।  অর্থাৎ বাড়তি পণ্য বা পরিষেবা কেনার ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে নেই।

ভারতের ভোক্তা বাজার
সমীক্ষায় অনুমান, ভারতের ‘গ্রাহক শ্রেণি’ মাত্র ১৩০-১৪০ মিলিয়ন (১৩-১৪ কোটি) মানুষ। এই ব্যক্তিদের মৌলিক চাহিদার বাইরেও ব্যয়যোগ্য আয় রয়েছে। তারা স্টার্টআপ এবং ভোক্তা-চালিত ব্যবসার জন্য প্রাথমিক বাজার হিসেবে কাজ করে। আরও ৩০ কোটি মানুষকে ‘উদীয়মান’ বা ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ ভোক্তা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। যদিও এই গোষ্ঠীটি ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধার কারণে আরও বেশি ব্যয় করতে শুরু করেছে, তবুও তারা সতর্ক ক্রেতা হিসেবে রয়ে গেছে।

‘ভারী ভোক্তা, অনিচ্ছুক অর্থপ্রদানকারী’
ব্লুম ভেঞ্চার্স -এর প্রতিবেদনে উচ্চাকাঙ্ক্ষী গ্রাহকদের ‘ভারী ভোক্তা এবং অনিচ্ছুক অর্থপ্রদানকারী’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। OTT/মিডিয়া, গেমিং, এডটেক এবং ঋণদানের মতো শিল্পগুলো এই বিভাগের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। UPI এবং অটোপে প্রবর্তনের ফলে ছোট-টিকিটের লেনদেন সহজতর হয়েছে, যা অর্থনীতিতে এই গোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেছে।

‘প্রিমিয়ামাইজেশন’-এর উত্থান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভোক্তা বাজার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে আরও গভীর হচ্ছে, যার অর্থ সম্পদ আরও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। কোম্পানিগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে প্রিমিয়ামাইজেশনের উপর মনোযোগ দিচ্ছে, এটি একটি কৌশল যা ধনী গ্রাহকদের জন্য তৈরি উচ্চমানের, ব্যয়বহুল পণ্যের উপর জোর দেয়। বাজেট-বান্ধব বিকল্পগুলো পরেও বিলাসবহুল বাড়ি এবং প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের ক্রমবর্ধমান বিক্রয়ে এই প্রবণতা স্পষ্ট।  অর্থাৎ যিনি সস্তার ফোন বা পণ্য কেনেন, তিনি দ্বিতীয় ফোন বা জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাইরে বাড়তি আর কিছুই কিনতে পারছেন না।

মহামারী-পরবর্তী বাজার পুনরুদ্ধার
এই ফলাফলগুলো K-আকৃতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে, যেখানে ধনীরা সমৃদ্ধ হতে থাকে এবং দরিদ্ররা ক্রয় ক্ষমতা হ্রাসের সম্মুখীন হয়।

সম্পদের ঘনত্ব  
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুসারে, ভারতীয়দের শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে এখন জাতীয় আয়ের ৫৭.৭ শতাংশ রয়েছে, যা ১৯৯০ সালে ৩৪ শতাংশ ছিল। জনসংখ্যার নিচের দিকের মানুষের সম্পদ ২২ দশমিক ২ থেকে কমে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, অর্থাৎ মধ্য ও নিম্নবিত্তের মানুষের সম্পদ এ সময়ে কমে গিয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে ভোক্তা ব্যয়ের উপর
ভারতের জিডিপি কনজিউমারদের খরচ করার ক্ষমতার ওপরে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আয়ের সুষম বণ্টনব্যবস্থার উন্নতি না হলে ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে ক্রমবর্ধমানভাবে শুধু উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর জন্য পণ্য বানাবে এবং পরিষেবা দেবে। ফলে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রান্তিক থেকে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

সূত্র: লাইভমিন্ট

mzamin

রমজানের আগে অস্থির সিলেট by ওয়েছ খছরু

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে একটি ছবি। গোটা মুখই রক্তাক্ত এক যুবকের। কয়েকজন ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছেন হাসপাতালে। ঘটনাটি নগরের আম্বরখানার। দুপুরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এ এলাকার বিকাশের দোকান থেকে ১০ হাজার টাকা তুলেছিলেন ওই ব্যক্তি। টাকা তুলে যাওয়ার পথে তার ওপর হামলে  পড়ে ছিনতাইকারীরা। মুখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে টাকা ছিনিয়ে নেয়। ঘটনাটি প্রকাশ্য দিবালোকেই ঘটেছে। ওই যুবকদের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকায় ভয়ে কেউ কাছে ভিড়েননি। আম্বরখানার এ ঘটনা নাড়া দিয়েছে সবাইকে। পুলিশের খাতায় ছিনতাইয়ের সংখ্যা তেমনটি নেই বললেই চলে। আলোচিত ঘটনায় কেউ কেউ মামলা করেন। তবে বেশির ভাগই মামলা করেন না। নগরবাসীর মতে; ছিনতাইকারীদের কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে সিলেট। নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায়ও হচ্ছে ছিনতাই। সময়ে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণে অস্থিরতা বিরাজ করছে। রমজানের বাজারে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাইকারীরা মোবাইল ফোন, টাকা ও মহিলাদের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১২টি ছিনতাই হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবস্থায় ক’দিন আগেই উদ্বেগ জানিয়েছিলেন সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট ইইউ শহীদুল ইসলাম শাহীন। তার মতে, ৫ই আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতার ব্যানারে নগরের প্রতিটি থানা ও ফাঁড়িতে আক্রমণ করা হয়েছিল। এরপর দ্রুততম সময়ে থানার কার্যক্রম শুরু করা হলে পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। যত দ্রুত ফাঁড়ির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হবে, ততই নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। একইসঙ্গে তিনি পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনার ওপরও তাগিদ দেন। তার বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। নগরের বেশির ভাগ ফাঁড়ির কার্যক্রম এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হলেও ফোর্স দেয়া হয়নি। ফাঁড়িগুলোকে নতুন করে মেরামত করা হয়নি। লুট করা বেশির ভাগ আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। আর এই সুযোগে নগরে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। বুধবার রাতে জিন্দাবাজারে এক ছিনতাইকারীকে ধরে গণধোলাই দেয় স্থানীয়রা। নগরের বন্দরবাজারে প্রতিদিন গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বনকলাপাড়ায় মঙ্গলবার রাতে এক ছিনতাইকারীকে ধরে গণধোলাই দেয়া হয়। ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে আইন নিজেরাই নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। নগরের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, যখন ঘটনা ঘটছে তখন পুলিশ আসে না। যদি আসে তাও দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর। এই সুযোগে নগরের বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ছিনতাইকারীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

সিলেটের সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী মানবজমিনকে জানায়, সিলেটে অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে কাজ করার কথা সেভাবে কাজ করতে পারছে না। এজন্য পুলিশের মনোবল বাড়ানো সহ তাদের গতিশীল করার উপর জোর দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি। এদিকে, এই অবস্থার লাগাম টেনে ধরার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেও কাজ হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার এক রাতের অভিযানেই নগরের কোতোয়ালি থানা পুলিশ আট ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তরফে তাদের আটকের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. রেজাউল করিম ও রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান রমজানের আগে এ নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নগরের ফুটপাথ দখলে নিয়েছে হকাররা। আর তাদের সঙ্গে মিশে গেছে ছিনতাইকারীরা। ফলে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। এ কারণে তারা রমজানের শুরুতেই হকার উচ্ছেদ করার দাবি জানান। বলেন, সড়কের জঞ্জাল কমে গেলে ছিনতাইকারীরা আর অবস্থান করতে পারবে না।

 বৈঠকে পাড়াভিত্তিক কিশোর গ্যাং সহ নানা বিষয়ের উৎপাত সম্পর্কে পুলিশ কমিশনার ও ডিআইজিকে অবহিত করা হয়। তবে বৈঠকে পুলিশ কমিশনার মো. রেজাউল করিম জানান, রমজান মাসে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির অপতৎপরতা রোধে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। হকার উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ ব্যাপারে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। শপিং মলগুলোর সামনে এবং আশপাশে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এদিকে, গতকাল বিকালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে জানান, সিলেট নগরের ছিনতাই রোধ করা এখন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ছিনতাই রোধে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি থানা ও ফাঁড়ি পুলিশ ছিনতাই রোধে অভিযানে রয়েছে। তিনি বলেন, একইসঙ্গে সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ দল চেকপোস্ট বসিয়ে নগরের প্রবেশমুখে তল্লাশি চালাচ্ছে। অপরাধীরা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে ব্যাপারে নগর পুলিশ সক্রিয় বলে জানান তিনি।

mzamin

বইপত্র- মধুসূদনের ‘রিজিয়া’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদ্বিশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে প্রথমা প্রকাশন লেখকের ইংরেজিতে লেখা রিজিয়া: এমপ্রেস অব ইনডি নামের একটি অসমাপ্ত কাব্যনাট্য প্রকাশ করেছে। একটি দীর্ঘ, শ্রমসাধ্য, গবেষণাধর্মী ও সুলিখিত ভূমিকা রচনাসহ বইটির সম্পাদনা করেছেন লেখক ও গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান। ১৯৬৫ সালে প্রথমে প্রকাশিত মধুসূদন রচনাবলিতে রচনাটি স্থান পেলেও প্রথমা প্রকাশনই প্রথম এটি পুস্তকাকারে প্রকাশ করল। মধুসূদন মাদ্রাজে অবস্থানকালে (১৮৪৮–৫৬) এটি রচনা করেন এবং তাঁর নিজের সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইউরেশিয়ান-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। ১০ নভেম্বর ১৮৪৯ থেকে সাত সপ্তাহব্যাপী মুদ্রণের পর এটির রচনা ও প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধের কারণ জানা যায় না। কাব্যনাটকটির নবম দৃশ্য পর্যন্ত তিনি লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতায় তিনি এটি সমাপ্ত করার কিংবা ‘রিজিয়া’ নামে আরেকটি নতুন নাটক রচনার উদ্যোগ নিয়ে কোনোটিতেই সফল হতে পারেননি।

এই কাব্যনাট্যের বিষয় ঐতিহাসিক চরিত্র ভারতের প্রথম নারী সম্রাট সুলতানা রাজিয়া (১২০৫-৪০)। ১২৩৬ সালে পিতা সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তাঁর মনোনয়ন অনুযায়ী রাজিয়ার ক্ষমতাসীন হওয়ার কথা থাকলেও পারিবারিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন তিনি। সম্রাটের পদে আসীন হন বৈমাত্রেয় ভ্রাতা রুকুনুদ্দিন ফিরোজ। কিন্তু বিলাসিতা, পানাসক্তি ও শাসনকার্যে অদক্ষতা তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসন ও জনমনে যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, তার সুযোগ নিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁকে হটিয়ে সুলতানা রাজিয়া ক্ষমতাসীন হন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাকাল মোটেই নির্বিঘ্ন হয়নি। প্রাসাদ ও আমলাতান্ত্রিক নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও অসন্তোষের কারণ হয়ে কয়েক বছরের মধ্যে হত্যার শিকার হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি।

সুলতানা রাজিয়া যত দিন ক্ষমতায় ছিলেন, প্রবল ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। বিদ্রোহ দমনে সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। দরবারে প্রথম দিকে পর্দার আড়াল থেকে শাসন পরিচালনা করলেও বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে গিয়ে পুরুষবেশী সেনাপতি রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। মাথায় টুপি ও গায়ে চাদর জড়িয়ে তিনি প্রজাদের মুখোমুখিও হতেন। সবচেয়ে বেশি যে বিরূপতাকে তাঁর মোকাবিলা করতে হয়, তার নাম পুরুষতন্ত্র। দিল্লি কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রাদেশিক নানা কেন্দ্র থেকে ক্ষমতালোভী শাসনকার্য–সংশ্লিষ্ট পুরুষেরা এই নারী সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জোট বাঁধে। তিনি পুরুষতন্ত্রের কাছে হার মানতে চাননি, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে আগ্রহী হননি। তবে শেষ দিকে এক শক্তিমান ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, এটা ঠিক। কিন্তু তাতে তাঁর শেষরক্ষা হয় না। হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম পরিণতিই ভারতবর্ষের প্রথম নারী সম্রাটকে বরণ করতে হয়। কিন্তু তাতে তাঁর তেজস্বিতা, দার্ঢ্য ও গৌরব বরং বৃদ্ধিই পায়।

ভারতের প্রথম নারী সম্রাটের এই গৌরবান্বিত রূপই মধুসূদনকে আকৃষ্ট করেছিল। এরপর ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে ভারতসম্রাজ্ঞীর পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন রানি ভিক্টোরিয়া (১৮১৯-১৯০১) উনিশ শতকের শেষার্ধে। ব্যবধান ছয় শ বছরের বেশি। মাঝখানে পুরো ভারতবর্ষের নয়, বিজাপুর ও আহমদনগরের শাসক হন চাঁদ সুলতানা (১৫৫০-৯৯), রাজিয়ার সাড়ে ৩০০ বছর পর। সুতরাং প্রথম নারী সম্রাট হিসেবে রাজিয়ার গৌরবময় জীবনসংগ্রাম মধুসূদনের শিল্পভাবনা ও সাহিত্যপ্রকল্পে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হওয়ার মতো গুরুত্ব লাভ করেছিল। মধুসূদনের সাহিত্যদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কিছু বিষয় ‘রিজিয়া’ কাব্যনাট্য রচনার অনুপ্রেরণা-উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এর স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারও অসম্ভব হবে না।

মধুসূদনের গ্রন্থতালিকাটির দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে সেখানে নারীজীবনের প্রাধান্য অবশ্যই লক্ষ করব। প্রথম বইটির নামই ক্যাপটিভ লেডি (১৮৪৯)। অসমাপ্ত কাব্যনাট্য হলেও দ্বিতীয় গ্রন্থ-পরিকল্পনা ‘রিজিয়া’কে নিয়ে। বাংলায় লেখা প্রথম নাটক শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯)। তারপর পদ্মাবতী নাটক (১৮৬০), তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), কৃষ্ণকুমারী নাটক (১৮৬১) ও বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২)। ক্যাপটিভ লেডি কাব্যের প্রধান অংশজুড়ে আছে কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী দেবীগণ, দৈত্যরাজকন্যা শর্মিষ্ঠা; গ্রিক পুরাণের কাহিনি নিয়ে পদ্মাবতী, তিলোত্তমা ও দানবনিধনের দেবতা-ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা, ব্রজাঙ্গনা তো রাধা, আর বীরাঙ্গনায় পৌরাণিক ১১ নারীর প্রেমমহিমা। ব্যতিক্রম শুধু কৃষ্ণকুমারী আর রিজিয়া। পার্থক্য দুটি। কৃষ্ণকুমারী ১৮-১৯ শতকের রাজপুতকন্যা দুই বিরুদ্ধ রাজশক্তির লোভের শিকার। আর রিজিয়া ১৩ শতকের বীরত্বমণ্ডিত নারী সম্রাট। আরও ব্যতিক্রম ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা। মধুসূদন কলকাতায় আসার পর রিজিয়ার কাহিনি নিয়ে নাটক লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু ক্ষেত্র গুপ্ত জানাচ্ছেন, বেলগাছিয়া থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ মুসলমানি বিষয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করলে তিনি রাজপুত ইতিহাস থেকে উপাদান নিয়ে কৃষ্ণকুমারী লেখেন।

তাঁর পরিকল্পনা থেকেই বোঝা যায়, সমকালীন উপনিবেশশাসিত কলকাতার সাম্প্রদায়িক মনোভাব দ্বারা মধুসূদন প্রভাবিত ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, তাঁর রেনেসাঁস-পরিস্রুত মনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল নারীর বীরত্বব্যঞ্জকতা, সংগ্রামশীল ব্যক্তিত্ব, সম–অধিকারবোধ, প্রণয়াগ্রহ ও সর্বোপরি সামগ্রিক মুক্তিচেতনা। উনিশ শতকের ইউরোপীয় সমাজতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিকেরা নারীর অধিকারবোধ ও ব্যক্তিত্ববোধ নিয়ে যেভাবে সোচ্চার ছিলেন, মধুসূদনকে তা নিশ্চিতভাবে আকৃষ্ট করেছিল। নারীবাদী তত্ত্ব তখনো অতটা গভীর আলোচনা-বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে ওঠেনি। তবু নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে মধুসূদনকে পাঠ করলে আমরা নতুনভাবে তাঁকে আবিষ্কার করতে পারব বলে আশা করি। সেদিক থেকে রিজিয়া কাব্যনাট্যটিও (অসমাপ্ত হলেও) একটি নতুন মাত্রা অর্জন করতে পারবে।

সৈয়দ আজিজুল হক

রিজিয়া: এমপ্রেস অব ইনডি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

ভূমিকা ও সম্পাদনা

মোরশেদ শফিউল হাসান

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা; প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৪; প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল; ৭২ পৃষ্ঠা; দাম: ২২০ টাকা।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে

prothoma.com এবং বইমেলায় বইটি পাবেন প্রথমা প্রকাশনের প্যাভিলিয়নে (প্যাভিলিয়ন: ৬)।

নতুন বাংলাদেশ গড়ার ডাক

কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন, আর সেই আন্দোলনেই কর্তৃত্ববাদী সরকারের দমন-পীড়ন। সহস্র মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে আন্দোলন রূপ নেয় শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে। নাহিদ ইসলামের চ্যালেঞ্জ শুরু গেল বছরের জুন থেকেই। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নামা নাহিদ হয়তো চিন্তাও করেননি এক সময় তার ঘাড়েই বর্তাবে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এদেশের মানুষের ওপর চেপে বসা স্বৈরাচারী শাসকের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার। ৩রা আগস্ট ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত শহীদ বেদি থেকে যেই চ্যালেঞ্জ নাহিদ নিয়েছিলেন সেটি সফলতা লাভ করে দুইদিনের মাথায়। ২৬ বছর বয়সী নাহিদ ৫ই আগস্টের পর দেশের স্বার্থে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে গিয়েছিলেন। সাড়ে ৬ মাস দায়িত্ব পালন শেষে প্রজন্মের স্বার্থে আবারো ফিরে এসেছেন রাজপথে। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তিনি ও তার সহযোদ্ধারা। বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়া রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে তাদের নেতৃত্বে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি- এনসিপি) নামে এ নতুন রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে এদেশের গণতন্ত্রের তীর্থস্থান মহান জাতীয় সংসদের সামনে থেকে। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটা রাজনৈতিক দল এনসিপিও নাহিদদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।

রাজনীতির নতুন যাত্রায় নাহিদ ইসলাম ও তার সহযোদ্ধারা কতোটুকু সফল হবেন সেটি সময়ই বলে দেবে। কিন্তু গতকালের বিশাল সমাবেশ থেকে অন্তত জনতার রায় ছিল নাহিদদের প্রতি। যেই জনতা নাহিদকে ইমাম মানেন। সেই জনতাকেই নাহিদ বললেন বৈধতা। নবযাত্রায় নাহিদ বলেছেন, এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল সামনের কথা বলতে চাই। পেছনের ইতিহাস অতিক্রম করে বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা বলতে চাই। জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগান ‘তুমি কে আমি কে, বিকল্প বিকল্প’, সেই স্লোগান থেকেই আজ বিকল্প তৈরির সুযোগ এসেছে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে বিভাজনের রাজনীতি করে জনগণ ও রাষ্ট্রকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে সেই রাজনীতি ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশকে আর কখনো বিভাজিত করা যাবে না। এদেশে আর ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই হবে না। আমরা বাংলাদেশকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করবো। এদিন নাহিদ যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সেটির প্রমাণও মেলে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানেও। যেখানে হাজির ছিলেন- বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকিসহ বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার হয়ে রাজপথে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি। উপস্থিত ছিলেন, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা। মঞ্চ থেকে বারবার ঐক্যের ধ্বনি তুলেছেন নেতারা। রাজনৈতিক দলগুলোকে সামনে রেখে দাবি তুলেছেন, নতুন সংবিধান ও গণপরিষদ নির্বাচনের। নাহিদ বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়েছে।

এদিন নতুন দলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণায়ও ছিল চমক। যেটি ঘোষণা করেন ৫ই আগস্ট পুলিশের গুলিতে শহীদ ইসমাইল হোসেন রাব্বীর লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করা তার দুই বোনের একজন মীম আক্তার। সেদিন শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে মীমরা ভাই হত্যার যে বিচার চেয়েছিল সেটি নাড়া দিয়েছে বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে। মীম আক্তার গতকালকের মঞ্চ থেকে বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক হিসেবে আমি গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেনের নাম ঘোষণা করছি। আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের নাম ঘোষণার পর দলের আংশিক অর্গ্যানোগ্রাম পড়ে শোনান সদস্য সচিব আখতার হোসেন। কমিটিতে মোট ১৫১টি পদ রয়েছে। আখতার হোসেন বলেন, নতুন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদে রয়েছেন ডা. তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার নিভা। মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) পদে রয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ এবং মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) পদে রয়েছেন সারজিস আলম। মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসুদ। এরপর তিনি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক, যুগ্ম সদস্য সচিব ও যুগ্ম মুখ্য সংগঠকদের নাম ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ৬ বছর বয়সী জাবির ইব্রাহীমের বাবাও এনসিপি’র প্রতি আকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। মঞ্চ থেকে বারবার নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসে এদেশে আর পরিবারতন্ত্র চলবে না। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমারের ছেলেও একদিন দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। তারা বলেন, আজকের দল ঘোষণাও কোনো এলিট শ্রেণির কথায় হয়নি।

বাংলাদেশের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা থেকে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা বলেন, বাংলাদেশ বদলাবে। শিগগিরই বদলাবে। আপনাদের হাত ধরেই বদলাবে। নাহিদ বলেছেন, জনগণের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি। হাজার বছরের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় বঙ্গীয় বদ্বীপের জনগোষ্ঠী হিসেবে এক সমৃদ্ধ ও স্বকীয় সংস্কৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রায় ২০০ বছরের বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে। তবে শোষণ ও বৈষম্য থেকে এ দেশের গণমানুষের মুক্তি মেলেনি। ফলে দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের জনগণকে বার বার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে হটিয়েছে। তথাপি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত  তৈরি করতে পারিনি; বরং বিগত ১৫ বছর দেশে একটি নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে বেপরোয়া ব্যবহার করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিরোধী মতের কণ্ঠরোধ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে একটি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করা হয়েছে।

এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র-জনতা বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা কেবল একটি সরকার পতন করে আরেকটি সরকার বসানোর জন্যই ঘটেনি। জনগণ বরং রাষ্ট্রের আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই অভ্যুত্থানে সাড়া দিয়েছিল, যেন জনগণের অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠিত হয়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিচ্ছি। এটি হবে একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল।

হাজার হাজার জনতাকে সামনে রেখে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্যদিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবো।
তিনি তার বক্তব্যে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ চাইলেন যেখানে সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিভেদের বদলে ঐক্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। রাজনীতিতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান হবে না। নাহিদের মতে সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা হবে। বলেন, আমাদের রিপাবলিকে সাধারণ মানুষ, একমাত্র সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময় উৎস। তাদের সকল ধরনের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র। আমরা রাষ্ট্রে বিদ্যমান জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একটি বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের রিপাবলিক সকল নাগরিককে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকেই অপরায়ন করা হবে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব প্রদান ও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে, আমরা কৃষি-সেবা-উৎপাদন খাতের যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই যেটি হবে স্বনির্ভর, আয়-বৈষম্যহীন ও প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল। আমাদের অর্থনীতিতে সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত হবে না, বরং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টন হবে আমাদের অর্থনীতির মূলমন্ত্র। আমরা বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেট ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ভোক্তা ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ করবো। অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে এই অঞ্চলের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবো এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে জোর দিয়ে উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি টেকসই, আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলবো। বক্তব্যের শেষেও ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন নাহিদ। বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধেই বিজয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও শপথ। তিনি ডাক দেন- একসঙ্গে, হাতে হাত রেখে, এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকারের সংগ্রামই হবে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। যেখানে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। তিনি বলেন, এখনই সময় নতুন স্বপ্ন দেখার, নতুন পথচলার এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার। এনসিপি’র অন্যতম সংগঠক তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন- নতুন দলের মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, মুখ্য সমন্বয়ক নারীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ।

mzamin

বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি রাজনীতিবিদের সম্পদের সাম্রাজ্য: ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন

এবার বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিশাল গোপন সম্পদের খবর প্রকাশ করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। সেখানে ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে সাইফুজ্জামান এবং তার পরিবার কীভাবে গোপন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। খবরের শিরোনাম দেয়া হয়েছে- ‘দ্য বাংলাদেশি পলিটিশিয়ান হু বিল্ট আ শ্যাডো গ্লোবাল প্রোপার্টি এম্পায়ার’। এতে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডার ওকালা ন্যাশনাল বনের পশ্চিম সীমান্ত। অরল্যান্ডো থেকে উত্তরে মাত্র এক ঘণ্টার গাড়ি চালানোর রাস্তা। সেখানে এক খণ্ড আধা একর জমি রয়েছে যা শিগগিরই আন্তর্জাতিক মামলার বিষয়বস্তু হতে পারে। জমিটি এখনো অব্যবহৃত। এটি পুনরুদ্ধার করেছে বনবিভাগ। তবে জমিটির মালিকানার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মামলার বিষয়বস্তু হতে পারে। ম্যারিয়ন কাউন্টির সম্পদ মূল্যায়নকারীর রেকর্ড থেকে জানা যায়, ওই জমিটি প্রায় দুই দশক আগে ক্রয় করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী।

শেখ হাসিনার সরকারের সংসদ সদস্য থাকাকালীন সাইফুজ্জামান ৪৮ হাজার ডলারের যে রিয়েল এস্টেট সম্পদ ক্রয় করেছিলেন তার একটি হচ্ছে ফ্লোরিডার ওই জমি। ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৯৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৮২টি সম্পদের খোঁজ পেয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে। তার অর্জিত এসব সম্পদের একটি অংশ ফেরত চায় বাংলাদেশ। কেননা, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের সন্দেহের মধ্যে সাইফুজ্জামানও একজন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান টার্গেটও তিনি। গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন এক বিক্ষোভের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। আরব আমিরাতের জমকালো শহর দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা এবং পাম জুমেইরা নামক কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে লন্ডনের কমিউটার শহরগুলোতে রয়েছে সাইফুজ্জামানের বিশাল সম্পদের পাহাড়। সেখানে রয়েছে দামি দামি অ্যাপার্টমেন্ট। যেগুলো সব নবনির্মিত এবং দুই শয়নকক্ষবিশিষ্ট।
ভূমিমন্ত্রী হওয়ার আগে পাঁচ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন সাইফুজ্জামান। ২০২৩ সালে সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন তার মোট সম্পদের পরিমাণ মাত্র ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার বা ২৩ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে আয়করের নথিতে তিনি উল্লেখ করেন দেশের বাইরে তার কোনো সম্পদ নেই। শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের অন্যান্য এলিটদের সঙ্গে তিনি এবং তার কিছু আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।
দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তার অনুমান শেখ হাসিনার আমলে দেশ থেকে কমপক্ষে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, পাচারকৃত ওই টাকা জনগণের। যা তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে প্রকাশ্য দিবালকে কেড়ে নিয়েছে।

সাইফুজ্জামান হলেন দেশের পুরনো ধারার একজন ধনকুবের- যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের নজরদারিতে আছেন। আহসান এইচ মনসুর বলেন, তিনি এর আগে ভূমিমন্ত্রী ছিলেন এবং মনে হচ্ছে তিনি ভূমি ভালোবাসেন। ফাঁস হওয়া নথি এবং সরকারি বিভিন্ন সূত্রের বরাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানতে পেরেছে, সাইফুজ্জামান এবং তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ জনেরাই ওই সকল সম্পত্তির মালিক। যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩১৫টি, দুবাইতে ১৪২টি, নিউ ইয়র্কে ১৬টি, ফ্লোরিডায় ছয়টি এবং নিউ জার্সিতে তিনটি সম্পদ রয়েছে। গণমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর এবং কানাডাতেও বাংলাদেশি এলিটদের দ্বারা অধিগ্রহণ করা প্রায় ৫৭৮ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির খোঁজ পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশ থেকে এলিট শ্রেণির এভাবে অর্থ পাচারকে ‘হাইওয়ে ডাকাতি’ বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। এসব অর্থ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। হাসিনার পতনের পর যখন বাংলাদেশ পুনর্গঠিত হচ্ছে তখন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার দিকে ঝুঁকছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা বলেছে যে, দেশের উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই তহবিল ফিরিয়ে আনা জরুরি। এই প্রচেষ্টা আমলাতন্ত্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হলেও ইউনূস সরকার মনে করছে হাসিনার অনুগতরা এ বিষয়ে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ এই প্রচেষ্টা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রথম পদক্ষেপ হবে অভিযুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশীয় আইনে মামলা করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন এবং অন্যত্র আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার অনুরোধ প্রস্তুত করা যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মামলার পথ প্রশস্ত করবে। ড. ইউনূস বলেছেন, যদি আমরা বিশ্বাস করি পুরো বিশ্ব একটি সম্প্রদায়, আর আমার অর্থ যদি চুরি হয়ে আপনার দেশে জমা হয়। তাহলে আমি মনে করি তা ফিরিয়ে আনতে আমাদের সাহায্য করার একটি বাধ্যবাধকতা আছে। ন্যাশনাল ক্রাইম সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বৃটেনের আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র বলেছে, তারা আগের সরকারের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং এ বিষয়ে আইনি সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলে এতে সাড়া দেননি সাইফুজ্জামান। তবে তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত সকল সম্পদ তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। তিনি আরও বলেন, তার পরিবারকে আগের শাসনের অংশ থাকায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে লক্ষবস্তু করা হয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অন্যান্য এলিটদের মধ্যে সাইফুজ্জামানের পরিবারের গল্পটি বেশ পুরনো। তারা আওয়ামী শাসনামলে এই সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। শেখ হাসিনার দল এবং ব্যবসায়ী পরিবারের মধ্যে জোট তার দলের শাসনকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে- হাসিনার ১৫ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান দমনমূলক পীড়নকে সমর্থন করেছিলেন তারা।

সাইফুজ্জামানের বাবার নাম আখতারুজ্জামান চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগের একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজনও ছিলেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। ইউসিবি’র সঙ্গে জড়িত দুটি সহিংস ঘটনার জন্য বেশ কুখ্যাত হয়ে ওঠেন সাইফুজ্জামানের বাবা। ওই ঘটনাগুলোকে শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষ বছরগুলোতে অন্যান্য ব্যাংক জোরপূর্বক দখলের নজির হিসেবে দেখে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ১৯৯৩ সালের ৮ই এপ্রিলের একটি ঘটনা। যখন ঢাকায় ইউসিবি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুমায়ুন জহিরকে নিজ বাড়ির বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়। ব্যাংকের পরিচালকদের মতবিরোধের মধ্যে আখতারুজ্জামানকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম ক্ষমতায় আসার পর দেশে আসেন আখতারুজ্জামান। তিনি জামিনে থাকলেও সেসময় ওই আইনি প্রক্রিয়া পুরো থমকে যায়। পরের ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের। তখন বন্দুকের মুখে জিম্মি করে ইউসিবি ব্যাংক দখলের চেষ্টা করেন আখতারুজ্জামান। ফলে তাকে বোর্ড থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ওই ঘটনার দুই বছর পর ক্ষমতা হারান হাসিনা। তবে তিনি ২০০৯ সালে ফিরে আসলে পুনরায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন আখতারুজ্জামান। ২০১২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর সাইফুজ্জামানের পুরো পরিবার ইউসিবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বলবৎ থাকেন। হাসিনার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত ইউসিবিতে পুরো আধিপত্য ধরে রাখেন সাইফুজ্জামান ও তার পরিবার।
হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে, আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ী এলিটরা নিজেদের সম্পদের প্রবাহ বৃদ্ধি করেছিল। যার ফলে বিরোধী দলকে দমনের সুযোগ তৈরি হয়। গত গ্রীষ্মের রাজপথে বিক্ষোভের ফলে ক্ষমতা থেকে হাসিনাকে সরিয়ে দেয়ার আগ পর্যন্ত ওই নারী (হাসিনা)কে কার্যত চ্যালেঞ্জহীন রেখেছিলেন এলিটরা।

বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের হয়ে কাজ করা ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মুশফিক মোবারক বলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে হাসিনার রাজনৈতিক নেতারা ব্যাংকগুলো জোরপূর্বক দখল করেছিল। তারা ঋণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যা পরিশোধ করেনি। এগুলো তাদের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখানো হতো।

আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ এবং বিচার বিভাগসহ আওয়ামী লীগ কর্তৃক দখলকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে কাজ শুরু করেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। গত ডিসেম্বরে ইউনূস সরকার গঠিত অর্থনৈতিক কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থ পাচারের কারণে বার্ষিকভাবে বাংলাদেশ ১৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বৃহৎ সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, কর ছাড় এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কমিশন। বড় বড় অপরাধীদের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা। আনিসুজ্জামান চৌধুরীর দাবি ইউসিবি ব্যাংকের বেশির ভাগ অংশীদার ছিল তার পরিবার। তাই ‘ব্যাংকটি দখল করার প্রয়োজন ছিল না’। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের বোর্ডে থাকাকালীন সকল ঋণ দেশের আইন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা অনুমোদিত ছিল। কোনো ব্যক্তিগত লাভ নেয়া হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিপুল ওই সম্পদের সাম্রাজ্য উদ্ধারের আশায় তদন্তকারীদের ভৌগোলিকভাবে বেশ জটিলতায় পড়তে হবে। অপরাধীরা কী পরিমাণ সম্পদ ক্রয় করেছে তা গোপন করার প্রচেষ্টার সঙ্গে লড়াই করতে হবে তাদের। তবে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস নিশ্চিত হয়েছে যে, সাইফুজ্জামান যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন সেগুলো স্পষ্টতই তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কেননা, নথিপত্রে সরাসরি তার নাম রয়েছে। যদিও এগুলো বিভিন্ন কায়দায় নিজের দখলে এনেছেন সাইফুজ্জামান। গত বছর সাইফুজ্জামানের গোপন সম্পদের তথ্য ফাঁস করে দেয় আল জাজিরার অনুসন্ধানী টিম। সেখানে চৌধুরীর এস্টেট এজেন্ট রিপন মাহমুদ বলেছেন, তারা সরাসরি কেনাকাটা এড়িয়ে চলেন। কেননা, বড় অঙ্কের অর্থ সকলকে সতর্ক করে দেয়। তিনি বলেছিলেন, তার ক্লায়েন্টরা বন্ধক ব্যবহার করেন যাতে তিনি বলতে পারেন যে, তারা নগদে ক্রয় করেননি। তারা ব্যাংকের ঋণ দিয়ে কিনেছেন। ২০১৯ সালে ভূমিমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার পর চৌধুরীর বাড়ি কেনার আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে একটি ঋণদাতা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কোম্পানিজ হাউসের নথি অনুসারে, বৃটিশ বন্ধকগুলোর সিংহভাগই এসেছে মার্কেট ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনস নামে একটি ঋণদাতা সংস্থার মাধ্যমে, যার মালিক বৃটিশ ব্যবসায়ী পরেশ রাজা। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে চৌধুরীর কোম্পানিকে ঋণ দেয়া শুরু করে ওই সকল সংস্থা। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ৪৯৫টি অভিযোগের মধ্যে ২৯১টির সঙ্গে ওই সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টতা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে চৌধুরী এবং তার পরিবারের সঙ্গে যুক্ত  কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে ৩৫২টি বন্ধকের মধ্যে ২৫৯টি পরিশোধ করে। যার মধ্যে মার্কেট ফিন্যান্সিয়াল সলিউশনসের একটি বন্ধকও রয়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, সম্ভবত কিছু সম্পদ অন্যদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। গণমাধ্যমটির অনুসন্ধানে বের হয়েছে দুবাইয়ে থাকা সাইফুজ্জামানের বেশ কিছু সম্পদ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। বৃটেনের ব্যবসায়ীদের কাছে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সাইফুজ্জামান। এ ছাড়া ১২টি সম্পদের হিসাব পুনরুদ্ধারের জন্য সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংকে নথিপত্র দাখিল করেছেন তিনি। পরেশ রাজা এবং ডিবিএসের কাছে বৃটেনে চৌধুরীর অর্থ পাচার সম্পর্কে জানতে চায় ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। কেননা চৌধুরী তার নথিপত্রে সম্পদের পরিমাণ মাত্র ২.৩ মিলিয়ন ডলার বা ২৩ লাখ টাকা উল্লেখ করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে ডিবিএস কোনো মন্তব্য করেনি।

পরেশ রাজার আইনজীবী বলেছেন, মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনসের একটি বৃহৎ আন্ডাররাইটিং টিম রয়েছে যারা প্রতিটি ঋণ যাচাই-বাছাই করে। তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই পরেশ রাজার। এস্টেট এজেন্ট মাহমুদ তাদের ক্লায়েন্টের কাছে মিথ্যা দাবি করার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং দাবিগুলো প্রত্যাহার করেছেন। মাহমুদের আইনজীবীদের দাবি আল জাজিরার ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মাতৃভাষা ইংরেজি না থাকায় ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকিতে ছিলেন মাহমুদ। তাদের দাবি, মাহমুদ একজন রিয়েল এস্টেট হিসেবে যথাসাধ্য পরিশ্রম স্বীকার করেছেন। বৃটেনে বাংলাদেশি এলিটদের সম্পদের তদন্তকারী ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বেন কাউডক বলেছেন, ক্লায়েন্টের অর্থ পাচার ঠেকাতে তার সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্লায়েন্টদের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি চালাতে বা কর্তৃপক্ষকে সন্দেহজনক কার্যকলাপের প্রতিবেদন তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় তারা বৃটেনে অসৎ অর্থকে স্বাগত জানাচ্ছে।

বাংলাদেশ ও বিদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, সম্পদ পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর প্রচেষ্টার জন্য লুট হওয়া ব্যাংকগুলোর ফরেনসিক অডিট এবং সন্দেহজনক লেনদেনের অনুসন্ধানের প্রয়োজন। পাচার করার সময় অর্থ একাধিক চ্যানেলে বের করা হতে পারে। যার মধ্যে মূল হোতাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাও জড়িত থাকতে পারেন। যারা নগদ অর্থ বয়ে নিয়ে দেশের বাইরে পাচার করেছেন।  দেশের ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনার জন্য ঢাকা ডেলয়েট, ইওয়াই এবং কেপিএমজিকের মতো তদন্তকারী সংস্থা নিযুক্ত করেছে। এ ছাড়া হাসিনার পরিবারের পাশাপাশি ১০টি শীর্ষস্থানীয় পরিবারের সম্পদের হিসাব বের করতে ১০টি যৌথ তদন্ত টিম গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে কোন কোন পরিবারকে টার্গেট করা হয়েছে তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের পরিবার রয়েছে। উভয়ের বিরুদ্ধেই নিয়মবহির্ভূত ব্যাংক ঋণ থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কোম্পানির রেকর্ড থেকে জানা যায়, সিঙ্গাপুরে আলমের স্থায়ী বাসস্থানের মূল্য ২ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। যেখানে তিনি হোটেলসহ বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট ক্রয় করেছেন। যার মূল্য আনুমানিক ৪৬৯ মিলিয়ন ডলার। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলম এবং তার পরিবারের আইনজীবীরা। তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। যোগ করেছেন, এস আলমের স্বার্থ বহু বছর ধরে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছে। আলম ও তার পরিবারের বিনিয়োগ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার কথাও জানিয়েছেন তারা।
বসুন্ধরার সোবহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুরোধে সাড়া দেয়া হয়নি। বৃটেনে সোবহান ও তার পরিবারের ৬৫ মিলিয়ন ডলারের ২৬টি সম্পদ চিহ্নিত করেছে গণমাধ্যমটি। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোবহান ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদসহ ব্যাখ্যাতীত সম্পদের অভিযোগে তদন্ত করছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়টি কেবল দেশের এলিট পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আওয়ামী লীগ এবং দেশের শক্তিশালী পোশাক-রপ্তানি শিল্পের অন্যান্য মালিকরাও বিদেশে সম্পদ অর্জন করেছেন বলে খবর রয়েছে। যেমন, কানাডার টরন্টো ধনী বাংলাদেশিদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় যে, এটি বেগম পাড়ার একটি প্রধান উদাহরণ হয়ে উঠেছে। যার অর্থ ‘স্ত্রীদের উপনিবেশ’। এমন মানুষদের বোঝাতে এই বেগম পাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যাদের পরিবারের সদস্যরা বিদেশের ধনী এলাকায় আরামে বসবাস করছেন। অন্টারিও ল্যান্ড রেজিস্ট্রি নথি ঘেঁটে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে যে, চিহ্নিত ১২টি সম্পদের মধ্যে সাবেক এক আওয়ামী এমপি’র স্ত্রীর নামে ১০ লাখ ডলারের একটি বাড়ি রয়েছে। যার মূল্য প্রায় ১৩ লাখ ডলার।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে কানাডার সম্পদের কথা জানালেও ড. ইউনূস বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন অবৈধভাবে পাচার করা সম্পদ এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে যা উদ্ধার করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জের হবে। যেমন দুবাইতে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি পোর্টফোলিও সংগ্রহ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যা বছরখানেক আগে আর্থিক অপরাধের জন্য বিশ্বব্যাপী নজরদারি সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের বর্ধিত তদারকির অধীনে ছিল।

ওয়াশিংটনের একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের (সি৪এডিএস) সংগৃহীত সম্পদের মালিকানার রেকর্ডের একটি ডাটাবেজ ব্যবহার করে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস চৌধুরীর পরিবারের সম্পদের বিশ্লেষণ করেছে। যেখানে ২০২২ সাল থেকে ৯৮টি সম্পূর্ণ সম্পদের রেকর্ড রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ২৮ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া অসম্পূর্ণ সম্পদ রয়েছে আরও ৩৯টি। এর মধ্যে পাঁচটির মালিক সাইফুজ্জামানের ভাই আনিসুজ্জামান। সি৪এডিএস-এর প্রপার্টি ডাটাবেজে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অ্যান্থনি আবু জাউদের নাম পাওয়া গেছে। যিনি চৌধুরীর সম্পদের পোর্টফোলিও নিয়ে কাজ করেছেন। বলেছেন, তিনি দুবাইতে চৌধুরীকে ভূমিমন্ত্রী ও ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানকার সকল ডেভেলপার কোম্পানির মালিকরা সাইফুজ্জামানকে স্বাগত জানিয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে আবু জাউদের দাবি তিনি ব্রোকারেজের সঙ্গে কাজ করতেন। আর গত বছর আল জাজিরাতে সাইফুজ্জামানের গোপন সম্পদের নথি ফাঁস হলে তার সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেয় কোম্পানিটি।

বিশ্বব্যাপী মেট্রোপলিটন এলাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় ট্র্যাককারী পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান মার্সারের মতে, দুবাই শহরে গত দুই বছরে ভাড়ার হার ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলত সাইফুজ্জামান সেখানে ভালো লাভ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুবাইয়ের কোলাহলমুক্ত শান্ত এক এলাকায় পোলো রেসিডেন্সেস-এর প্রায় গোটা একটি ভবন ক্রয় করেছিলেন সাইফুজ্জামান। ওই ভবনটির ফ্ল্যাটগুলো ছিল বেশ সাজানো গোছানো এবং বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের সংসদ সদস্য থাকাকালীন ওই ভবনটি ক্রয় করেন তিনি। দুবাইয়ের ওই ভবনটিতে মোট ৩১টি অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেছিলেন সাইফুজ্জামান। তবে সম্পদের রেকর্ডে তার বাসস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সামোয়াতে দেখানো হয়েছে।

mzamin