Wednesday, November 9, 2016

ঐক্যের ডাক ট্রাম্পের

মুহুর্মুহু করতালি আর উল্লাস-উচ্ছ্বাসের মধ্যে হাত নাড়তে নাড়তে মঞ্চে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঐক্যের ডাক দিয়ে বললেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষের প্রেসিডেন্ট হবেন। নিউইয়র্কে এক বিজয় সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে হোয়াইট হাউসে যাচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। বক্তৃতার শুরুতে বিনয়ী কণ্ঠে সবাইকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, সবে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কাছ থেকে ফোন পেয়েছেন। তিনি নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তিনিও হিলারিকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ব্যবসায়ী ট্রাম্প বলেন, তাঁর জয় মোটেও সহজ ছিল না। এ জয় কষ্টার্জিত। নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে কঠোরভাবে সমালোচিত হন তিনি। সেই ট্রাম্প তাঁর বিজয় ভাষণে ঐক্যের ডাক দেন। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য ঐক্যের সময়।’ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হব। এটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ বিভক্তির ক্ষত সারাতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি আমেরিকাকে ঐক্যবদ্ধ করবেন। মার্কিন জনগণের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের কাছে অঙ্গীকার করছি, আমি আপনাদের নিচে নামতে দেব না। আমরা অসাধারণ কাজ করব।’

হিলারি যাদের টানতে পারেননি

লাতিন ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিনদের নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য সত্ত্বেও তাদের টানতে পারলেন না হিলারি। প্রায় ৮৮ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ হিলারিকে সমর্থন করেন। সেখানে ট্রাম্পের সমর্থন ছিল ৮ শতাংশ। যিনি বারবার বলেছেন, সব যুগে সবচেয়ে কদাকার এই কৃষ্ণাজ্ঞ সম্প্রদায়। সিএনএনের খবরে এ তথ্য জানানো হয়। এই পার্থক্যটা ২০১২ সালে ওবামা ও রমনির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তেমনটা নয়।
গত প্রেসিডেন্টে নির্বাচনে বারাক ওবামা ৯৩ শতাংশ ও রমনি পেয়েছিলেন ৭ শতাংশ ভোট। লাতিনদের কাছ থেকে পুরোপুরি সমর্থন আদায় করতে পারেননি হিলারি। ট্রাম্প লাতিনদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এ বক্তব্যের পরও রিপাবলিকান এই প্রার্থী ২৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর হিলারি পেয়েছেন ৬৫ শতাংশ ভোট। একই সঙ্গে হিলারি তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতেও ব্যর্থ হয়েছেন। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন হিলারি। ট্রাম্প পেয়েছেন ৩৭ শতাংশ। অথচ ওবামা পেয়েছিলেন ৬০ শতাংশ ভোট।

ট্রাম্পের জয়ে চমকালেন সমর্থকেরাও

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকেরা আনন্দে ভাসছেন। চিৎকার করে বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবার শ্রেষ্ঠ হোক।’ রাতভর উৎসবে মেতেছেন সমর্থকেরা। ‘যুক্তরাষ্ট্র’, ‘যুক্তরাষ্ট্র’ বলে চিৎকার করে যাচ্ছেন। বিজয়োৎসবে আসা অনেক সমর্থক স্বীকার করেন, তাঁরাও কল্পনা করেননি ট্রাম্প জিতবেন। এটি তাঁদের কাছেও চমক। সিএনএনের দেওয়া তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত পাওয়া ভোটের ফলাফলে ট্রাম্প পেয়েছেন ২৮৮ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। আর হিলারি পেলেন ২১৫টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। সর্বমোট ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজন ২৭০ ভোট। জয়ের আনন্দে সেজেছেন অ্যালিজা রোমানওফ। বললেন, তাঁরা খুবই রোমাঞ্চিত। ট্রাম্পের পরিবারকে তাঁরা অনেক দিন থেকেই চেনেন। সবার সঙ্গে তাঁরা এই জয় উদ্‌যাপন করছেন। এএফপির খবরে জানানো হয়, ম্যানহাটন হোটেলের বলরুমে রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা বিজয়োৎসব করছেন। তবে প্রথম দিকে তাঁরা কিছুটা হতাশার মধ্যে ছিলেন। একের পর অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প জিততে শুরু করলে তাঁরাও চাঙা হয়ে ওঠেন।
নির্বাচনের ফলাফল আসতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকদের ভিড় বাড়তে থাকে। উল্লসিত সমর্থকদের অনেকে স্বীকার করেন, তাঁরা কল্পনাও করেননি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি পিছিয়ে পড়বেন। নিউইয়র্কের টেলিকমিউনিকেশন কর্মকর্তা গ্লেন রুটি বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য! আমি ভাবতে পারিনি ট্রাম্প জিতে যাবেন।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সমর্থক ফোন করে জানান, তিনি ভাবতেও পারেননি ট্রাম্প জিতবেন। ট্রাম্পের জয়ে উল্লসিত সমর্থকদের একটা বড় অংশ শ্বেতাঙ্গ। তবে তাঁর সমর্থকদের আনন্দমিছিলে রয়েছেন এশীয় আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান ও হিস্পানিক আমেরিকানরা। বাল্টিমোর থেকে আসা জেস সিং বলেন, তাঁরা খুবই আনন্দিত। তাঁরা এমন উৎসব করবেন, যা আগে কেউ দেখেনি। লাল পোশাক, টুপি পরে ও মার্কিন পতাকা হাতে অনেক নারী যোগ দিয়েছেন ট্রাম্পের বিজয়মিছিলে। ফক্স নিউজে ট্রাম্পের বিজয় অনুষ্ঠান, হাততালি ও আনন্দের ছবি প্রচার করা হচ্ছে।

ধনকুবের থেকে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প

ধনকুবের থেকে হোয়াইট হাউসে জয়ের পর স্ত্রী মেলানিয়াসহ
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প। ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিতে আসা ট্রাম্প আগামী
চার বছর হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা থাকবেন। ছবি: রয়টার্স
সব হিসাব-নিকাশ আর জল্পনাকল্পনা উল্টে দিয়ে আগামী চার বছরের জন্য হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকাকে শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন তিনি ভোটারদের দেখিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নপূরণে তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন বেশির ভাগ ভোটার। দেশ শাসনের ভার তাই তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছেন তাঁরা। কীভাবে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই মার্কিন সমাজে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন ধনকুবের হিসেবে পরিচিত। মার্কিনরা তাঁকে চেনেন বর্ণাঢ্য ও জাঁকালো জীবনের অধিকারী ব্যবসায়ী হিসেবে। সেই ব্যবসায়ী যে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রে চলে যাবেন, সে কথা হয়তো তাঁর অনেক ঘনিষ্ঠরাও ভাবতে পারেননি। তবে তাঁরা যা ভাবতে পারেননি, তা তিনি করে দেখিয়েছেন।
ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন, কুইন্সে। তাঁর বাবা নিউইয়র্কের আবাসন ব্যবসায়ী ফ্রেড ট্রাম্প। মা মেরি ট্রাম্প ছিলেন স্কটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প চতুর্থ। বাবা ধনী হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠানে একেবারে ছোট পদের কাজ দিয়ে শুরু করতে হয়েছে ট্রাম্পকে। তবে তিনি দমে যাননি। ছোটবেলা থেকেই পরিচিতি পান উদ্যমী আর তেজস্বী হিসেবে। ছোটবেলায় পড়াশোনায় যত না আগ্রহী ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত ছিলেন দুরন্তপনায়। সামাল দিতে না পেরে মা-বাবা ট্রাম্পকে ১৩ বছর বয়সে সামরিক একাডেমিতে পাঠিয়ে দেন। ১৯৬৮ সালে ট্রাম্প পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করেন।
ট্রাম্প বাবার কাছ থেকে অর্থ ধার করে নিজেই আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। সফলও হন। পরে অবশ্য বাবার সঙ্গেই ব্যবসায় যোগ দেন এবং ব্যবসার প্রসার ঘটাতে থাকেন। লোকসানের মুখ যে দেখেননি, তা নয়। তবে দমে যাননি তিনি। ব্যর্থতার মুখে ট্রাম্প ১৯৭৫ সালে হায়াত হোটেল করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে নতুন হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ১৯৮০ সালে গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল খুলে দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দেওয়ায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি ক্যাসিনো ও হোটেল ব্যবসাতেও সফল হন তিনি। ১৯৯৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর ব্যবসার হাল ধরেন তিনি। ২০০৪ সালে এনবিসি টেলিভিশনে রিয়্যালিটি শো শুরু করেন ট্রাম্প। টানা ১৪টি সিজন ওই শো উপস্থাপনা করেন তিনি।
ট্রাম্প তিনবার বিয়ে করেছেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী চেক অ্যাথলেট ও মডেল ইভানা মেয়ার। এ দম্পতির তিন সন্তান। ১৯৯০ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী মডেল মার্লা ম্যাপলসকে ১৯৯৩ সালে বিয়ে করেন ট্রাম্প। ১৯৯৯ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। ২০০৫ সালে তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী মডেল মেলানিয়াকে তিনি বিয়ে করেন। বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন ও তাঁর স্বামী সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। এই ঘরে এক সন্তান। ব্যবসায়ী হিসেবেই চলছিল ট্রাম্পের দিনকাল। মাত্র ১৭ মাস আগে তিনি রাজনীতিতে আসেন। ১৬ প্রার্থীকে পরাজিত করে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত করেন ৭০ বছর বয়সী ট্রাম্প। বেশির ভাগ জনমত জরিপে তিনি পিছিয়ে ছিলেন। এমনকি তিনি তিনটি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কেও হেরে যান। অভিবাসী, মুসলমান ও নারীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে নিজ দল ও দেশে সমালোচিত হন তিনি। উঠেছিল একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগ। মার্কিন বুদ্ধিজীবী, অধিকারকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের বেশির ভাগই তাঁর প্রতি আস্থা দেখাননি। তবে সেসব এখন অতীত। চমক দেখিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেন ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রাতে কিছু বলবেন না হিলারি

ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন আজ রাতে (স্থানীয় সময় মঙ্গলবার) রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের প্রতিক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলবেন না। জনসম্মুখেও আসবেন না। এএফপি ও সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটিক দলের প্রচার শিবিরের প্রধান জন পোদেস্তা এ কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রতিক্রিয়ায় এখনই কিছু বলছেন না হিলারি। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে বলা হয়েছে, ৫৮ তম এই নির্বাচনে প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সারা দিন ভোট গ্রহণ শেষে চলছে গণনা।

হিলারির সমর্থকদের চোখে জল

নিউইয়র্কের জাভিটস কনভেনশন সেন্টারে কাঁদছেন
হিলারি ক্লিনটনের এক সমর্থক। ছবি: এএফপি
হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পথে তাৎপর্যপূর্ণভাবে এগিয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের এই প্রবণতায় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সমর্থকদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। অনেকের চোখে জল দেখা গেছে।
সিএনএন অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিউইয়র্কে হিলারির প্রচার সদর দপ্তরের পরিবেশ বদলে গেছে। তাঁর সমর্থকেরা কাঁদছেন। বিষণ্ন মনে অনেকে বাড়ি ফিরছেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর জয়ী হতে মোট ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে ২৭০টি পেতে হয়। ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের এই লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প।

ফুলকপিচাষিদের মুখে হাসি

আগাম জাতের ফুলকপিচাষিদের মুখে এবার হাসি ফুটেছে। চুয়াডাঙ্গায় এবার ফুলকপির ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি দামও বেশ ভালো পাচ্ছেন চাষিরা। স্থানীয় হাট-বাজারে গত বছর এই সময়ে ফুলকপি প্রতি মণ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও চলতি বছর তা ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় শীতকালীন আগাম সবজি হিসেবে ১ হাজার ৩৭১ হেক্টর জমিতে ফুলকপির চাষ হয়েছে। ফুলকপির বাজারজাতও শুরু হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে এই ফুলকপি। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খেত থেকেই পাইকারেরা ফুলকপি কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। সদর উপজেলার গাইদঘাট গ্রামে একটি ফুলকপিখেতে দাঁড়িয়ে কথা হয় কৃষক আনোয়ার জোয়ারদারের সঙ্গে। আনোয়ার বলেন, এবার ২০ বিঘা জমিতে ফুলকপির চাষ করা হয়েছে। ফলনও বেশ ভালো। বিঘাপ্রতি ১৫ হাজার হিসেবে তাঁর মোট খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ১৪ বিঘা জমির ফুলকপি ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে খরচ বাদে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা লাভ করেছেন তিনি। এখনো ছয় বিঘা জমির ফুলকপি বিক্রি বাকি আছে,
যা বিক্রি করে কমপক্ষে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। আনোয়ার জোয়ারদার বলেন, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় ফুলকপির ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে চাহিদা থাকায় দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। গাইদঘাট গ্রামে ফুলকপি কিনতে এসেছেন মুন্সিগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন সাগর। তিনি চুয়াডাঙ্গা থেকে সবজি কিনে ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তে বিক্রি করেন। আলাউদ্দিন বলেন, ‘২০ বছর ধরে সবজির ব্যবসা করছি। ঢাকার বাজারে চুয়াডাঙ্গার সবজির ভালো চাহিদা আছে। এখানকার সবজিচাষিরা প্রতিটি ফসল বেশ যত্ন করে ফলায়। এ কারণে অন্য এলাকার চেয়ে চুয়াডাঙ্গার সবজির দামও বেশি।’ সদর উপজেলার বেলগাছি গ্রামের ইসরাফিল হোসেন এবার পাঁচ বিঘা জমিতে ফুলকপির চাষ করেছেন। টানা দুই বছর লোকসানের পর এবার লাভের মুখ দেখেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘গ্যালো দুইবার ফুলকপির আবাদ কইরে খুপ লুকসান হয়েলো। এবেড্ডা লাব না হলি মাটে মারা যাতাম।’ চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারের সবজিপট্টির আড়তদার শাহ আলম বলেন, এ বছর চাষিরা ফুলকপিতে বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম পেয়েছেন। প্রথম দিকে ফুলকপি ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বর্তমানেও ভালো কপি ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চুয়াডাঙ্গার উপপরিচালক নির্মল কুমার দে বলেন, এবার আগাম জাতের ফুলকপির ফলন ভালো হওয়ায় ও দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।

চেয়ারম্যান আজাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি পারভেজ মান্নাকে (৩০) ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।  আজ বুধবার র‍্যাবের পক্ষ থেকে পাঠানো মোবাইল ফোনের এক খুদে বার্তায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় পারভেজ মান্নার কাছ থেকে গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বেলা তিনটায় র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে বলে ওই খুদে বার্তায় জানানো হয়েছে।
গত ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত ভাদসা ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ জয়ী হন। মে মাসে তিনি শপথ নেন। গত ৪ জুন রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে কুপিয়ে ও গুলি করে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ জুন তিনি মারা যান। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই এনামুল হক সদর থানায় মামলা করেন। এই হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সোহেল তাঁর এক সহযোগীসহ ১৩ জুন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।

কুষ্টিয়ায় শিক্ষক দম্পতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা

কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে ঘরের ভেতর ঢুকে এক শিক্ষক দম্পতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তাঁরা হলেন আলী ইসা (৫২) ও তাঁর স্ত্রী সামসুন্নাহার খানম (৪৬)। আলী ইসা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। তাঁর স্ত্রী কুষ্টিয়া পৌর এলাকার জগতি কেএসএম কলেজের প্রভাষক। রাতে তাঁদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাউজিং ই-৩৭১ নম্বর বাড়ির একতলা ভবনে সপরিবারে বাস করেন আলী ইসা। চিকিৎসকেরা বলছেন, দুজনের মাথা ও ডান হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। দুজনেরই হাতের অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় আলী ইসা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি তাঁর শয়নকক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। রাত তিনটার দিকে ঘুম থেকে জেগে শিয়রে দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তিনি লাফ দিয়ে ওঠেন। এ সময় একজন দুর্বৃত্তের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তিনি দৌড়ে ড্রয়িংরুমে চলে আসেন। সেখানে আরও দুজন দুর্বৃত্ত তাঁকে কোপ দেয়। দুর্বৃত্তদের কাছে এভাবে হামলা চালানোর কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো উত্তর দেয়নি। এ সময় তাঁর স্ত্রী দৌড়ে এসে তাঁকে বাঁচাতে চেষ্টা করলে তাঁকেও কোপ দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় রড দিয়ে তাঁর মাথায় বাড়ি দেওয়া হয়। আলী ইসা ও তাঁর স্ত্রীর ভাষ্য, ধারালো দা দিয়ে তাঁদের কোপানো হয়। দুর্বৃত্তরা সংখ্যায় চার থেকে পাঁচজন ছিল। বয়স ২৫ থেকে ৩০-এর মধ্যে। একজনের মুখ বাঁধা ছিল।
তারা সাত-আট মিনিট বাসায় অবস্থায় করে। আলী ইসার মেয়ে জারিন তাসমীম বলেন, তিনি পাশের রুমে ঘুমাচ্ছিলেন। জেগে দেখেন, মা-বাবা দুজনই পাশের মেঝেতে পড়ে আছেন। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক চিকিৎসক আনিসুর রহমান বলেন, শিক্ষকের ডান হাতের কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত রগ কেটে গেছে। তাঁর স্ত্রীর কবজি বরাবর আঘাত লেগেছে। শিক্ষকের কাঁধের পেছনে কোপের আঘাতও রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য দুজনকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাবুদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আহত দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই বাড়ির একটি ছোট দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে তাঁদের কোপানো হয়েছে। এটি ডাকাতির ঘটনা মনে হলেও বাড়ি থেকে কোনো কিছু খোয়া যায়নি। এই ব্যাপারকে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ঘটনায় মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

গণতন্ত্র কানাগলিতে আটকে গেছে

কয়েক মাস ধরে আমরা যেন স্লো মোশনে একটি ট্রেনের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখলাম। এ দৃশ্য দেখতে আমাদের মনে যেমন বিস্ময় জেগেছে, তেমনি ভীতি ও ঘৃণাও সৃষ্টি হয়েছে। আরেকটি ট্রেন যখন ওই ট্রেনকে ধাক্কা দিল, তার কিছু আগে যেন বোধগম্য কিছু ঘটে গেল। শুধু ট্রেন দুটিকে বেশি গুরুত্ব দিলে ভুল হবে। মূল ঘটনা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ খুবই গভীরভাবে বিভাজিত, যার মধ্যে স্নায়ুরোগের লক্ষণ আছে। এই দেশের গায়ে এত এত ধাক্কা লেগেছে যে মানুষের মনে ভয় ঢুকেছে। তাকে যেন আর চেনা যায় না। মূল ঘটনার কালপর্বের ব্যাপ্তি হচ্ছে গত ৩৫ বছর। সেই ১৯৮০ সালের রিগ্যান–বিপ্লবের পর একটি রক্ষণশীল মহল ধীরে ধীরে দেশটির উদার গণতন্ত্রের ভিত্তি ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। সর্বোপরি একধরনের সামাজিক ডারউইনবাদ চালু করেছে। এই প্রক্রিয়া গত ২৫ বছরে আরও সংহত হয়েছে। ১৯৯২ সালের নির্বাচনে বিল ক্লিনটন বিজয়ী হওয়ার পর ডেমোক্র্যাট, সমাজতন্ত্রী ও উদারনৈতিক শক্তিগুলো এমনভাবে বিশ্বায়নের কাছে আত্মসমর্পণ করল যে তাদের ভাবখানা এমন, এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
তারা প্রতি পদক্ষেপে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যম আয়ের ভোটারদের পরিত্যাগ করেছে। এখন গত আট বছরের কথা বলি, যে সময় বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অনেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ওবামার প্রেসিডেন্ট হওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অমর্যাদাকর। এর কারণ হচ্ছে, মার্কিন সমাজে বর্ণবাদ এত গভীরে প্রোথিত যে কখনো কখনো মনে হয়, এটা সাদাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে গেছে। মনে হয়, এটা ছাড়া তাদের আর কিছু নেই। এখন কথা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি জেতেন, তাহলে তা হবে বারাক ওবামার আট বছরের জমানার একদম সরাসরি প্রতিক্রিয়া। আগের প্রতিক্রিয়াশীলদের মতো ট্রাম্পও এক স্বপ্নালস অতীতের এস্তেমাল করেন, যেখানে ফিরে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। এমনকি সহিংসতার মাধ্যমেও নয়। নিউইয়র্ক টাইমস এ নির্বাচনকে ‘সাদা সংখ্যাগরিষ্ঠতার’ লড়াই হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন সমাজে সাদারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন সাদাদের কর্তৃত্বের লড়াই। কিন্তু একই সঙ্গে এই নির্বাচন পরাজিতদের লড়াইও বটে, অন্তত যাঁরা নিজেদের পরাজিত মনে করেন। এই লড়াই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে, যে বিশ্বায়নের পালে রিগ্যান থেকে ওবামা—সবাই হাওয়া দিয়েছেন। তাঁরা এটাকে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির চাবিকাঠি মনে করেছেন। কিন্তু এই বিশ্বায়ন জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে চিরতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সাধারণ বোধ–বুদ্ধিহীন করে ফেলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক এই শূন্যতায় ডুব দিয়েছেন। এমন নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তিনি এ কাজ করেছেন যে রিপাবলিকান পার্টির অভিজাতরা খাবি খাওয়া শুরু করেছিলেন। এমনকি এ কারণে দলটিও নিকট ভবিষ্যতে হোঁচট খাবে। এতে দেশটির উদার অভিজাতরা হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন। তঁারা আসলে বিশ্বাস করতে পারছেন না যে ট্রাম্পের মতো একজন অশ্লীল, স্থূল ও বেকুব বক্তৃতাবাগীশ লোক হিলারির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এত দূর আসতে পেরেছেন।
উদারনৈতিক সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের লেখকেরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে ট্রাম্পের জেতার সুযোগ নেই। বিশেষ করে তাঁর কর ফাঁকি দেওয়া ও যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর। এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত নিউইয়র্ক টাইমস একটি গ্রাফিকস ছাপাত, যেখানে তারা দেখিয়েছে, হিলারি ক্লিনটনের জেতার সম্ভাবনা ৯২ শতাংশ। কথা হচ্ছে, তথ্য সাংবাদিকতার মান খুব কম সময়েই এতটা নিচে নেমেছে। সবাই যে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছে তা হলো, হিলারি ক্লিনটনকে সমর্থন করার মতো তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু টিভি বিতর্কে দেখা গেল, ট্রাম্পকে ভয় করার মতো অনেক কারণ আছে। তিনি প্রকাশ্যে গর্বভরে অনেক অগণতান্ত্রিক কর্মসূচি হাজির করেছিলেন, যেগুলো একজন কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকের পক্ষেই সাজে, মানবিক মর্যাদা ও বিদ্যমান আইনের প্রতি যাঁর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। নানা কথা বলে ট্রাম্প জনমনে ভীতি সৃষ্টি করেছেন: হিলারিকে জেলে পোরা, পরিবেশের বারোটা বাজানো, মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল, বোমা মেরে আইএসকে হটানো ইত্যাদি। তিনি যে কর হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাতে রিগ্যানের ঘরানার পুঁজিবাদও লজ্জা পেয়ে যেত। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাতিল করে দেবেন। তিনি কালো, মুসলমান, হিস্পানিকসহ সব সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করবেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টে অতি ডানপন্থী বিচারক নিয়োগ দেবেন। এর মাধ্যমে তিনি বন্দুকের মালিকানা ও গর্ভপাত-সংক্রান্ত সামাজিক পরিবেশ বদলে দেবেন। এই অবস্থানের পেছনে তিনি যে লোম খাড়া করা যুক্তি দেন সেটা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের কারণে ভুগছে। ট্রাম্পকে যাঁরা ভোট দেবেন, তাঁদের যুক্তি অনেকটা এমন: কোনো ব্যক্তির গাড়ি–বাড়ি চুরি হয়ে গেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি চোরকে রাতের খাবার খেতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, যাতে সে চেয়ার ও টেবিল চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এরা কোনো না কোনোভাবে এটা করে যাচ্ছে।
আর কী হচ্ছে, তা বুঝতে অভিজাত মতামত সৃষ্টিকারীদের অনেক সময় লেগে গেছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারণা গণতন্ত্রের চর্চা ও সৌন্দর্য—উভয়ের জন্যই হানিকর। এটা আসলে বড় কোনো কিছুর লক্ষণ। এতে বোঝা যায়, বড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে, যেটা অনেক বেশি অর্থবহ, আর যার প্রভাবও অনেক দীর্ঘস্থায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় পার্টির কূটচাল ও অভিসন্ধির মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এক কানাগলির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না হলে এখান থেকে বেরিয়ে আসাও সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই বড় ক্ষতির জন্য মূলত রিপাবলিকানরাই দায়ী, যার কারণে ট্রাম্পের মতো এক প্রচারকের পক্ষে এত দূর আসা সম্ভব হয়েছে। সেই ২০০৯ সাল থেকে বারাক ওবামা যা-ই করেছেন, রিপাবলিকানরা তার তীব্র বিরোধিতা করেছে। প্রতি পদে তারা ওবামাকে আটকানোর চেষ্টা করেছে। এর ফল হচ্ছে, গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, রিপাবলিকান পার্টি এতটা চরমপন্থী হয়ে গেছে যে জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো মানুষও এখন দলটির বামপন্থী ঘরানার লোক হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এমনকি হাউসের রিপাবলিকান স্পিকার পল রায়ান নিজেকে ‘রক্ষণশীল আন্দোলনের রক্ষণশীল ঘরানার রক্ষণশীল’ হিসেবে নিজেকে আখ্যা দিয়েছেন।
হিলারির প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কথা হচ্ছে, তাঁর বিরোধিতা করারও যথেষ্ট কারণ আছে। তিনি আসলে এক ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছেন। এক অন্যায্য যুগ থেকে এমন এক যুগে তিনি প্রবেশ করছেন, যেখানে নতুন প্রজন্মই সব নির্ধারণ করবে। তাঁর সমস্যা হচ্ছে, তিনি নিজের দোষত্রুটি কাটাতে পারেন না। সম্ভবত তিনি আফ্রিকান-মার্কিন ভোটারদের একটি অংশকে উজ্জীবিত করতে পারবেন না, ওবামা যাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। হিলারি যদি হারেন, তাহলে এ কারণেই হারবেন। তবে নির্বাচনে শেষমেশ ব্যাপক লড়াই হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিভক্ত ও পুনর্বিন্যাস করছে। গ্রামীণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় শহর, অন্যদের বিপক্ষে সাদারা, সবার বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত, অতীতের যুদ্ধ, যার ছায়া নির্বাচনী প্রচারণায় পড়েছে। এ জন্যই অনেক বর্ষীয়ান নাগরিক ট্রাম্পকে ভোট দেবেন, যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টরাই হামলা করেছিলেন। ট্রাম্প যেন ঘৃণার এক অনিঃশেষ আধার। এ পরিপ্রেক্ষিতে বারাক ওবামার প্রচারণার মূলমন্ত্র স্মরণ করা যেতে পারে: আশা। যা-ই হোক, সম্প্রতি মনে হয়েছে, মিশেল ওবামা যেন ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দের স্পিগল ইন্টারন্যাশনালঅনলাইন থেকে নেওয়া।
গেয়র্গ ডিয়াজ: জার্মান সাংবাদিক।

আর কত দিকে আগুন জ্বলতে দেখব?

সাঁওতাল বস​ি​ততে পুলিশের উপস্থিতিত
 অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে
নাসিরনগরের আগুনের ধোঁয়া সরতে না সরতে আগুন জ্বলে উঠল গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লিতে। নাসিরনগরে আগুনবাজদের দেখে পুলিশ সরে গিয়েছিল। গোবিন্দগঞ্জের পুলিশ অতটা দায়িত্বহীন হতে পারেনি। তারা সরেজমিন খাড়া থেকে আগুন লাগানো নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন করেছে। দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে গুলি করেছে। তাতে তিনজন আহত এবং একজন নিহত বলে জানা গিয়েছিল। নিহত ব্যক্তির নাম শ্যামল হেমব্রম। নিখোঁজ রয়েছে অন্তত ১৫ জন। তাদের একজনের লাশ সোমবার ধানখেতে পাওয়া গেছে। ওই ধানখেতটাও ওই লাশ হওয়া মানুষটার পূর্বপুরুষের। সেই জমিতে তারা যেসব ঘর তুলেছিল, গাছ লাগিয়েছিল, সব পুড়ে ছাই। খড়ের চাল পোড়ে, দরজা-জানালা পোড়ে, জামাকাপড়, চৌকি-বিছানা পোড়ে। মাটি তো আর পোড়ে না। তাই ট্রাক্টর এনে ভাঙা ঘরের পোড়া মাটিও গুঁড়িয়ে সমান করা হয়েছে। পোড়াপুড়ি, হামলা, গুলি সব রোববার সন্ধ্যার মধ্যে শেষ। হামলাকারী ও পুলিশেরাও তো মানুষ। তাদের বিশ্রাম দরকার হয়। তাই রোববার রাতে তারা ফিরে যায়। আর সাঁওতালেরা সম্ভবত ঠিক মানুষ নয়। ঘরপোড়ার দল সে রাতে কোথায় ঘুমিয়েছে, তাদের শিশুরা খেতে পেয়েছে কি না, এসব কোনো প্রশ্ন নয়।
আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়টিও কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয় সারা রাত। চেষ্টা করা হয় গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধায় নিয়ে যাওয়ার। পরে গণমাধ্যমে খবর রটে গেলে চিকিৎসা শুরু হয় বটে, কিন্তু হাতকড়া আর খোলে না। সোমবার সকালে আবার শুরু হয় হামলা। এবার পাশের মাদারপুর গ্রামে। ঘরে যা ছিল সব নিয়ে গেছে, গোয়ালের গরু-ছাগল, ঘরের টিনের চাল, জমি চাষের পাওয়ার টিলার—সব। নাসিরনগরের ইউএনওর মতো গোবিন্দগঞ্জের ইউএনও মো. আবদুল হান্নানও খুবই দায়িত্বশীল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো বিষয়ে কথা বলতে পারব না। খুব ব্যস্ত।’ ফোন কেটে দেন। আর গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার দেখেশুনে অজ্ঞ হয়ে গেছেন। তাঁর সাফ কথা, ‘হামলা নিয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি আমাদের কাছে। এমন ঘটনা জানা নেই।’ (প্রথম আলো, ৭ নভেম্বর, অনলাইন সংস্করণ) সাঁওতাল গ্রাম পোড়ানো কোনো নতুন ঘটনা নয়। শতবর্ষজুড়েই ঘটছে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে পার্বতীপুরের চিড়াকুটার সাঁওতাল কৃষকেরা তাদের জমি দখল ঠেকাতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সেবার সাঁওতালি তিরে এক বাঙালির প্রাণ যায়।
যথারীতি পুলিশ এসে ২৩ সাঁওতালকে আটক করে। পুলিশ যাওয়ামাত্রই চারপাশের হাজার হাজার বাঙালি নামধারী ‘পিঁপড়ার মতো আসি’ ঘরদোর লুট করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, ছিনিয়ে নেয় গবাদিপশুসহ অস্থাবর সব সম্পদ। প্রতিকার হয়নি কোনো। এখন সাঁওতালদের সবই কম। তাদের জমি কম, রক্ত কম লাল, চোখের পানি কম নোনা, অত্যাচার-নির্যাতনও যেন তাদের গা সওয়া। কমই যদি না হবে, তাহলে এত সহ্য করে কীভাবে? বাঙালির পক্ষে বাঙালি থাকে, মুসলমানের ডাক আরেক মুসলমানে শোনে, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদেরও সহায়-শক্তি আছে দেশে-বিদেশে। কিন্তু সাঁওতালদের কিছুই নেই। এক গ্রামের সাঁওতাল উচ্ছেদ হলে আরেক গ্রামের সাঁওতালেরা তাদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। যদি আশ্রয় দেওয়ার দায়ে তাদের ওপরও হামলা-গ্রেপ্তার নেমে আসে? এত ‘নেই’-এর মধ্যেও খুব করে ‘আছে’ তাদের গায়ের রং, চেহারার ধাঁচ আর সাঁওতালি ভাষার বুলি। এই থাকাতেই মস্ত বিপদ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তাদের পাতে কেউ খায় না। তাদের কোনো যুবকের স্বজাতির বাইরের কাউকে ভালোবাসা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। তাদের মর্যাদা ও সম্পত্তি দুটোই যেন লুটপাটের বিষয়। যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের জমি কেড়েছিল, একাত্তর সালের ২৮ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়ে তাদের হাতেই শয়ে শয়ে জীবন দিয়েছিল সাঁওতালেরা।
দুই. সাঁওতালেরা এই ভূখণ্ডের প্রাচীনতম অধিবাসী। বাঙালির ইতিহাসে সাঁওতালের উত্তরাধিকার মিশে আছে। উত্তরবঙ্গে একসময় তাদের বিপুল জমি ছিল। কিন্তু শিক্ষা-দীক্ষা না থাকায়, ব্যক্তিগত সম্পত্তির কায়দাকানুন না বোঝায় ধীরে ধীরে সব চলে গেছে। দিনাজপুর, রংপুরের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিনিকল ইত্যাদি সেই পাকিস্তান আমল থেকেই সাঁওতালদের জমি অধিগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফুলবাড়ীর বুকচিতে দেখেছি, দিনাজপুরে সরেজমিনে দেখেছি জমি দখল নিয়ে অজস্র সাঁওতাল কৃষকের অভিযোগ। গত বছর ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বছর পূর্তি উপলক্ষে দিনাজপুর শহরের সাঁওতাল সমাবেশে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করলেন, ৮০ শতাংশ সাঁওতালি জমি নিয়েই গন্ডগোল চলছে। গোবিন্দগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট একসময় সাঁওতাল ও পাহাড়িয়া জাতি-অধ্যুষিত এলাকা ছিল। বাগদা সরেন নামে এক সাঁওতাল জমিদারও ছিলেন। জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের পর ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের ১৫টি সাঁওতাল আর ৫টি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ করে ১৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। জমির মালিকদের ভাষ্য, সরকার জমির কোনো মূল্য দেয়নি। কেবল জমির শস্য, বসতবাড়ির গাছপালা, কুয়া ও ঘরবাড়ির একটা মূল্য ধরে দেয়। তা-ও মাত্র ৮ লাখ ৭ হাজার ৩১৮ টাকা! এর ছয় বছর পর ভূমিহারাদের সঙ্গে সরকারের একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয় অধিগ্রহণকৃত জমি আখ চাষের বদলে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সরকার ওই জমি পূর্বতন মালিকদের ফেরত দেবে। চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দরুন ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন সময় চালু ও বন্ধ হওয়ার মধ্যে থাকছে এই রাষ্ট্রীয় চিনিকল। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ জমি তামাক, ধান ও ভুট্টা চাষের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া আছে। জমির আদি মালিক সাঁওতাল ও বাঙালিদের আপত্তি এখানেই। যেহেতু চিনিকল ঠিকঠাক চলছে না এবং আখের বদলে অন্য শস্য চাষ হচ্ছে, সেহেতু তাঁরা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জমি ফেরত চান।
এদিকে সংসদীয় কমিটি বলেছে বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা। কিন্তু গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন জমি ফেরত দেওয়ার বদলে ওই এলাকায় ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকারের কাছে। অথচ প্রস্তাবিত কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৬ অনুযায়ী কোনোভাবেই কৃষিজমিতে শিল্পাঞ্চল করা যাবে না। এমনকি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইনেও অনুরূপ কথা আছে। সুতরাং গোবিন্দগঞ্জের আদিবাসী সাঁওতালেরা আইনের পথেই ছিল। তাদের উচ্ছেদ, গুলি, ঘরবাড়ি পোড়ানো ও বিতাড়নের অধিকার তাই সরাসরি জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ভূমি দখল ও অধিগ্রহণের বিরাট আয়োজন চলছে। সরকার করছে যত, ভূমিদস্যুরা করছে তার চেয়েও বেশি। দরিদ্র আদিবাসী কৃষকদের উদ্বাস্তু করে, জীবিকা কেড়ে নিয়ে দরিদ্র বাড়ানো এবং কৃষিজমি নষ্ট করে খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টি কেমনতর উন্নয়ন? এক কূল ভেঙে আরেক কূল গড়ার এই উন্নয়ন ভারসাম্যহীন। আমেরিকায় একসময় স্বর্ণশিকারিরা সোনার সন্ধানে দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটি ও গোলাগুলি করত। এর নাম হয়েছিল গোল্ড রাশ। বাংলাদেশে এখন চলছে ল্যান্ড রাশ তথা ভূমিগ্রাসের ছিনিমিনি খেলা। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা নিরসনে একটা ভূমি কমিশন সরকার গঠন করেছে। সমতলের আদিবাসীদের জমির ব্যাপারে অনুরূপ কমিশন গঠনের অঙ্গীকার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। পাকিস্তান সরকার করেছিল চুক্তি, আওয়ামী লীগ সরকার করেছে অঙ্গীকার; কিন্তু কথা রাখার দায় নেয়নি কেউই। তার বদলে আগুন জ্বালানো হয়েছে। আর কত দিকে আগুন জ্বলে উঠতে দেখব আমরা?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

দেশ থেকে দূরে থাকা দেশকন্যারা!

দশের বোঝা একের লাঠি গল্প শুনে বড় হওয়া আমাদের দেশকন্যারা কেমন থাকেন দেশের বাইরে? মায়ার অন্দর থেকে জগৎ জানার বন্দরে যারা নোঙর ফেলেন, হয়ে যান দেশ থেকে দেশান্তর। কেমন করে তাদের অন্তর? যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নেপাল, আয়ারল্যান্ড—কোথায় নেই তারা! কেমন থাকেন তারা দশ থেকে যখন এক হয়ে যান? একা, কখনো হয়তো সঙ্গী থাকে। মায়ের বুকের বারান্দায় চাঁদ মামা গান শোনা চেনা মুখটি মা কিংবা মাতৃভূমিকে ছেড়ে অচেনা আকাশে তারা কিংবা নক্ষত্র হওয়ার চেষ্টায় কি করে? দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তাদের ভাবনায় কেমন করে। যেমন করেই হোক, আমার বাংলাদেশকে মুখর করে তুলব আমি আমার কর্মে, আমার অর্জনে। সেই ভাবনায় ভোর এসে স্নান করায় জীবনের। একটা নতুন দেশ। একটা ভিন্ন মহাদেশ। তবু এক নেশা। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা। নাহ, বাবার আদুরে মেয়েটির জন্য এখানে কোনো বিশেষ কাজের সহকারী নেই। করেই খেতে হয়। আশ্চর্য এক দিন, দুই দিন, তিন দিন পর তারা চা করা থেকে শুরু করে ড্রাইয়ারে শুকানো চাদরের ভাঁজ সবই করতে শিখে যায়। জেনে যায় নিজের কাজ নিজে করায় আছে ভিন্ন এক আনন্দ। মাঝে মধ্যে দেশে থাকা আদুরে বোনটিকে তাই বলতে ভোলে না, বুয়া নেইতো কী হলো, কিসের কান্নাকাটি এত? নিজের কাজ নিজে করাতে যে সুখ আছে, এটা কখন বুঝবেন নন্দ ঘোষ। সেই ঘোষণা দিতে না দিতেই রেফ্রিজারেটরে চোখ। আয় হায় বাজার তো করতেই হবে। বহুদিন হয় দেশে বাজার করে দেওয়া তাজুল কাকাদের কথা মনে পড়ে না আর। ছুট ছুট এখনই। নাহ এখানে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাস্তায় বসে নেই কোনো ড্রাইভার। নিজেই ধরে গাড়ির স্টিয়ারিং। কি পারে না আমাদের দেশকন্যারা। কিন্তু গাড়িটা কী আর ভাত খায়?
তার খাবার ভিন্ন। তার জন্য লাগে তেল। এই তেল সেই তোষামোদের তেল নয়। এই তেলের জন্য দেশকন্যাদের পার্টটাইম কাজ করতে হয়। উপার্জন করতে হয়। এই করতে করতে তারা বেমালুম ভুলে যান পরনির্ভরশীলতা। অন্যদিকে কন্যারা সংসার নামের বিনি সুতোর মালায় জড়ানো থাকলে তাদেরও সন্তান থাকে। থাকতে পারে। জীবনসঙ্গীসহ দুয়ে মিলে সামলাতে হয় সন্তানদের। কখনো বা একা। একান্নবর্তী পরিবারের সকলে মিলে দেখভাল করবার সুযোগ যে নেই। নেই যে প্রাইভেট টিউটর। সন্ধ্যা নামলেই সন্তানদের হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হয় তাদের। অতপর কবেকার কথা। বেগম রোকেয়া বলে গিয়েছিলেন, জাগো গো ভগিনী। ছুট ছুট এখনই। পড়াশোনা করতেই হবে। নতুন ভাষা। নতুন কলেজের করিডর। তবু সব ডর ডিঙিয়ে অন্য এক যুদ্ধ। আয়ত্ত করতে হবে সব। দেশের বাইরে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা খুব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু পড়াশোনার মাধ্যমেই যে ভিন দেশের মানুষদের জানিয়ে দিতে হবে, ধনী না হতে পারি, শিক্ষার দৈন্যতা আমাদের নেই। আমরা উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের মাঝেই তবু আছে রবীন্দ্রনাথ–ইউনূসদের আবেশ। আবেশের সেই ছোঁয়ায় কেউ কেউ ছুঁয়ে যায় বিশ্বময় অন্য দিকেও। পৃথিবীর সব সৌন্দর্যকে হারিয়ে বিশ্বকে দেখায় নিজস্ব রূপ। কেউ কেউ হন মিস আয়ারল্যান্ড। কেউবা বাঁচিয়ে রাখেন দেশীয় সংস্কৃতি। নিজেদের গ্র্যাজুয়েশনের দিনে শত বিদেশির মাঝে শনাক্ত করা যায়। ওই, ওইতো আমার দেশের কন্যা। তার অঙ্গে যে জড়ানো দেশীয় শাড়ি। কখনোবা বুকে জড়ানো থাকে লাল সবুজ পতাকা। বুকের উনুনে মাতৃভাষায় কথা বলতে না পারার জন্য কারও জাগে ব্যাকুলতা। তাই কেউবা ভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করবার প্রতিকূল অবস্থানে থেকেও, সময়ের অনুকূলে ধরে রাখে কলম। যে কলম অবিরল লিখে যায় আমার ভাষা। বাংলা ভাষা। আশা এই, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শিক্ষণীয় নাও, গ্রহণ করো। আমার কথা শোনো। হোক ভিন্ন দেশের ভিন্ন চিন্তা। ভিন্নভাবে ভালোর কাজের প্রয়োগ দেখে তা নিজেদের মাঝে আত্মস্থ করতে অহম করতে নেই। এমন অচিন্তনীয় সব কর্মে কেটে যায় তাদের এক একটা ব্যস্ততম দিন। দিন শেষে ঘুম যখন দুয়ারে ঠিক তখনই মন বলে, এই ভোর হলো। না, না। এখানে নয়, আমার দেশে। তারপর ভীষণ কর্মব্যস্ত দিনের সব ক্লান্তি কোমল হয়ে যায় দেশে রেখে আসা প্রিয় স্বজনের স্বরে। ওতেই এই একলা চলতে হয়, জীবনে আরেকটি ভোর নিয়ে আসে জীবনের স্নান! এই জল, এই পুকুর ভিন্ন। তবু কোথায় যেন এক হয়ে রয়, জলের একই রং।

শীত আসছে...

এই সময়ে শিশুদের প্রতি বাড়তি যত্ন নিতে
হবে। মডেল: শাহবাজ। ​ছবি: অধুনা
দিনে গরম, সন্ধ্যায় শীতের আমেজ। এই মৌসুমের মিশ্র আবহাওয়ায় বড়দেরই খাপ খাওয়াতে সমস্যায় পড়তে হয়। সেখানে ছোটদের তো আরও বেশি সমস্যা। একটু একটু করে শীত পড়তে শুরু করেছে। আর শীতে শিশুরা একটু বেশিই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে দুশ্চিন্তা না করে এ সময়টায় শিশুদের বিশেষ যত্ন নিলে শীতেও আপনার সোনামণি থাকবে সুস্থ। এ সময় শিশুর বিশেষ যত্ন সম্পর্কে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল আমিন মৃধা বলেন, শিশুরা সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আবহাওয়া শুষ্ক ও ধুলাবালি থাকার কারণেই মূলত শিশুরা এসব রোগে আক্রান্ত হয়। তাই এ সময় অভিভাবকদের কিছুটা সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের ঠান্ডা বাতাস এবং ধুলাবালি থেকে দূরে রাখতে হবে। যেহেতু শীতে এ রোগগুলো সংক্রমিত হয় তাই যতটা সম্ভব শিশুদের জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় কম নেওয়া ভালো। শিশুদের গামছা, রুমাল, তোয়ালে প্রভৃতি আলাদা হওয়া উচিত এবং আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সময় শিশুদের দূরে রাখা উচিত।
দিনে গরম, শেষ রাতে ঠান্ডা?
এ সময়টা খুব খারাপ। দেখা যায়, শোয়ার সময় ফ্যান জোরে দিয়ে ঘুমিয়েছেন কিন্তু শেষ রাতে খুব ঠান্ডা লেগে গেছে। তাই শোয়ার সময় কাঁথা, লেপ বা গরম কাপড় পাশে নিয়ে ঘুমান এবং ফ্যান একেবারে জোরে না দিয়ে আস্তে চালিয়ে দিন। তাই রাতের বেলায় শিশুদের ক্ষেত্রে একটু বাড়তি নজর দিন।
১ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর যত্ন
*শিশুকে প্রয়োজন অনুযায়ী উষ্ণ রাখুন। ঠান্ডা পরিবেশে রাখা যাবে না। স্যাঁতসেঁতে ঘরেও তাকে রাখা ঠিক হবে না।
*বাচ্চাকে বুকের দুধ নিয়মিত খাওয়ান। ফিডারে খাওয়ালে অল্প গরম দুধ দিন। ঘুমের মধ্যে ঠান্ডা দুধ দেবেন না।
*ছয় মাসের বেশি হলে বাচ্চাকে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবার দিন। খিচুড়িতে ডিমের সাদা অংশ, লালশাক, পালংশাক অল্প করে দিতে পারেন। লেবুর রস দেবেন, কমলার রস খাওয়াবেন। এতে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
*যেসব শিশু হামাগুড়ি দেয়, দেখবেন তারা যেন ঠান্ডা মেঝেতে হামাগুড়ি না দেয়। তবে কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ কার্পেটের রোয়া বা ধুলা থেকে অ্যালার্জি হয়। তাই মাদুর বা ম্যাট ব্যবহার করা ভালো।
*ঈষদুষ্ণ পানি দিয়ে এক দিন অন্তর গোসল করান। গোসলের পর বেবি লোশন লাগাবেন। তেলজাতীয় কিছু লাগাবেন না। অনেকে নবজাতককে নিয়মিত গোসল করান না। ফলে বাচ্চার গায়ে ফুসকুড়ি ওঠে এবং এর মধ্যে পুঁজ জমে যায়।
*এ সময় খুব গরম কাপড় পরানোর দরকার নেই। তবে মোটা সুতি কাপড় পরানো যেতে পারে। আঁটসাঁট বা উলের কাপড় পরালে শিশুর শরীর ঘেমে ঘামাচি উঠতে পারে।
*বাচ্চাকে নরম কাপড়ের জুতা পরানোর অভ্যাস করুন। শোয়ানোর সময় মোজা পরিয়ে শোয়ান। তবে উলের মোজা পরানোর প্রয়োজন নেই।
*এ বয়সী বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই সর্দি-কাশি সহজেই লেগে যায়। বাচ্চাকে খুব জনবহুল জায়গায় (মেলা, পিকনিক) না নিয়ে যাওয়াই ভালো।
১ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুর যত্ন
*এই বয়সে শিশুরা অনেক খেলাধুলা ও দৌড়াদৌড়ি করে থাকে। তাই খুব বেশি গরম ও ভারী কাপড় পরার প্রয়োজন হয় না। তবে সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ও বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত উষ্ণতা নিশ্চিত করুন।
*স্কুলে পরস্পরের মাধ্যমে শীতকালে কিছু ছোঁয়াচে চর্মরোগ হতে পারে। তাই বাচ্চার ত্বকের প্রতি খেয়াল রাখুন। নিয়মিত লোশন লাগান যেন ত্বক শুষ্ক হয়ে না যায়।
*গোসলের আগে সরষের তেল ব্যবহার না করে জলপাই তেল ব্যবহার করাই ভালো। গোসলের পর বেবি লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সাবান এবং এক দিন শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে।
*শীতকালীন শাকসবজি এবং ফল যেমন কমলা, বরই বেশি করে খেতে দিন।
*ত্বকের যত্নে শিশুর গায়ে বেবি অয়েল বা ভ্যাসলিন ব্যবহার করুন।
সতর্কতা
শীতের শুরুতে এবং রোদ উঠলে মাঝেমধ্যেই শিশুর লেপ, তোশক, কম্বল, চাদর ইত্যাদি রোদে দিতে হবে। রোদ থেকে তোলার পর তা ঝেড়ে ঘরে রাখতে হবে। আর ধুলাবালি থেকে রক্ষার জন্য এসবের ওপর কাপড়ের কভার ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।
যা করবেন না
*অযথা শিশুকে অতিরিক্ত সোয়েটার পরিয়ে রাখবেন না। এতে ঘাম জমে সেই ঘাম শীতকালীন ঠান্ডা বাতাসে শুকিয়ে শিশুর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
*শীতকালে নবজাতকের মাথা কামানো যাবে না।
*শিশুর নাক বা মুখের ওপর কাপড়, লেপ, কম্বল ইত্যাদি দেবেন না।
*জ্বর হলে শিশুকে অতিরিক্ত জামাকাপড় পরাবেন না। এতে শরীরের তাপ আরও বেড়ে যায়।
লেখক: চিকিৎসক