Saturday, October 31, 2009

মুক্তিযুদ্ধের নিভৃত এক সহযাত্রী by প্রশান্ত কর্মকার

শরীফ ইমাম ছিলেন পেশাগত দিক থেকে একজন প্রকৌশলী। দেশপ্রেমিক এই ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধের সময় মারা যান। এই স্বল্পবাক মানুষটি সব সময় ছিলেন মঞ্চের আড়ালে। তাঁর নির্দেশনায় স্ত্রী ও সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময় তাঁরা জাতির কাছে পরিচিত হয়েছেন শহীদ শাফি ইমাম রুমী বীর বিক্রম ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।
শরীফ ইমামের জন্ম ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর। তাঁর আদিনিবাস নীলফামারী জেলায় ডোমার উপজেলার খাটুরিয়া গ্রামে। রংপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় ছিল তাঁর বাবার বাড়ি। বাবার নাম মোহাম্মদ আলী। তিনি পেশায় উকিল ছিলেন।
শরীফ ইমামের দুই বোন, এক ভাই। সবার ছোট শরীফ ইমাম। তাঁর পুরো নাম শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ। শরীফ ইমামের জন্মের দুই বছর পর তাঁর মা মারা যান। মাতৃহারা চারটি সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছিলেন তাঁর বাবা।
শরীফ ইমাম রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর রংপুর কারমাইকেল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং কলেজে পড়ার সময় জাহানারা বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়।
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে নিপুণ ম্যাগাজিনের ১৫ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যার প্রকাশিত শরীফ ইমামের ওপর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জাহানারা ইমাম বলেছিলেন, “দেখা হয়েছিল সেই কিশোর বেলা। লালগোলাপের পাঁপড়িতে লিখে পাঠিয়েছিল, ‘আমি তোমায় ভালোবাসাসি’। তুমিও কি...। হ্যাঁ আমিও। সেই কবেকার, চার দশকেরও ওই প্রান্তের ১৯৪৩ সালের কথা। দুজনেই তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে পড়ি। পড়ার সুবাদে মুখচেনা ছিল। প্রথম সামনাসামনি দেখি কলেজের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানে। ...সেই প্রথম ভালো করে দেখা। তারপর সেও দেখেছে আমায়। স্মৃতির ছবিরা সার বেঁধে চোখের সামনে ভেসে ভেসে চলে আসছে। ধুতি, শার্ট পরা শরীফ সাইকেল চেপে কলেজে যাচ্ছে, আমাদের ঘোড়ায় গাড়ি তাকে পার হয়ে চলে গেল।...কলেজের বার্ষিক নাট্যনুষ্ঠানে একলব্য অভিনীত হচ্ছে—তাতে গুরু দ্রোনাচার্য সেজেছে শরীফ। সে যা লাজুক, মুখচোরা ছেলে, তাতে প্রবল প্রতাপান্বিত, রাগী দ্রোনাচার্যের অভিনয়টাও ওই রকমই হয়েছে।...
পরবর্তী সময় রক্ত গোলাপের পাঁপড়ি। সোনালী ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে দুচোখের মুগ্ধতা। তারপর প্রায় তিন দশক ধরে সে মুগ্ধতার আর শেষ ছিল না। শেষ হলো একেবারে ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, তখন চিরতরে মুদিত হলো সেই চোখ দুটি।”
রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি ও কলকাতার শিরপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পাস করেন। ডিজাইনে বিভাগে তিনি সোনার মেডেল পান। ১৯৪৮ সালে ৯ আগস্ট তিনি জাহানারা ইমামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই পুত্রসন্তান শাফী ইমাম রুমী ও সাইফ ইমাম জামী। ১৯৫০ সালে শরীফ ইমাম ঢাকায় সিএন্ডবিতে ডিজাইন বিভাগে যোগদান করেছিলেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে দি ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডে যোগদান করেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র, বিনয়ী ও মিতভাষী। সময়ের মূল্যের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব সচেতন। শরীফ ইমাম বাড়িতে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা প্রচলন করেছিলেন। দুই ছেলেকে তিনি নিজে পড়াতেন। তাঁর উদার মনোভাব ও সহযোগিতার কারণে জাহানারা ইমাম শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পটভূমি—সব দিক দিয়ে নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন।
শরীফ ইমাম ছিলেন রাজনীতি-সচেতন ও দেশপ্রেমিক মানুষ। ভাষা আন্দোলনের সময় যেদিন হরতাল পালিত হতো, সেদিন তিনি কোনো না কোনো অজুহাতে অফিসে যাওয়া বন্ধ করে হরতাল সমর্থন করতেন। ১৯৭১ সালে রুমী যুদ্ধে চলে গেলে ইমাম পরিবারের ভূমিকাও হয়ে পড়ে আরও সক্রিয়। শরীফ ইমাম ও তাঁর বন্ধু সাজেদুর রহমান খান টাকা সংগ্রহ করে অল্প অল্প করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠাতেন। বিভিন্ন প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধারা শরীফ ইমামের ‘কণিকা’ বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। জুন মাসের শেষের দিকে দুই নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের একটি চিঠি নিয়ে শাহাদাত চৌধুরী ও হাবিবুল আলম আসেন শরীফ ইমামের বাড়িতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চলাচল ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে খালেদ মোশাররফ তাঁর কাছে বাংলাদেশের ব্রিজ ও কালভার্টের ব্যাপারে তথ্য চেয়ে পাঠান।
শরীফ ইমাম ঘোর অমানিশার মধ্যেও দেশ স্বাধীন হওয়ার ব্যাপারে ছিলেন প্রচণ্ড আশাবাদী। তিনি এতটাই দেশপ্রেমিক ছিলেন যে স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চিন্তা করে ব্রিজের ঠিক কোন কোন পয়েন্টে এক্সপ্লসিভ বেঁধে ওড়ালে ব্রিজ ভাঙবে অথচ কম ক্ষতি হবে অর্থাত্ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সহজে মেরামত করা যাবে, সেভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট রুমী ও পরিবারের অন্য সদস্যে সঙ্গে শরীফ ইমামকেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শরীফ ইমামকে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আহত অবস্থায় ছেড়ে দেয়।
রুমীকে উদ্ধার করার জন্য শরীফ ইমামের বন্ধু বাকা ও ফকির সাহেব মার্সি পিটিশন করার কথা বললেও প্রখর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন শরীফ ইমাম তাতে রাজি হননি। পরিণতিতে হয়েছেন পুত্রহারা।
স্তব্ধ ও পাষাণের মতো চেহরায় শরীফ ইমাম প্রাণপ্রিয় পুত্রের কথা চিন্তা করতে করতে এবং চরম অপমানের যন্ত্রণা সহ্য করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করে গিয়েছিলেন। তাঁর একরোখা মনোভাব পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গোপনে সাহায্য প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। দিনে দিনে তাঁর জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তানি আর্মির বন্দিশিবিরে তিন দিন তিন রাতের অমানুষিক নির্যাতনের জের ধরে। তাই যে স্বাধীনতা দেখার জন্য তিনি এত উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলেন, সেই স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলেন না। স্বাধীনতার মাত্র তিন দিন আগে তাঁর হূত্স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল। এভাবেই এই নীরব কর্মী, যথার্থ মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, সবার আড়ালে নিঃশব্দে চলে গেলেন। আমরা তাঁদের কথা কখনোই ভুলতে পারি না।

স্বাধীন সংবাদপত্রকেই দুর্নীতিবাজেরা ভয় পায় by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এ রকম জঘন্য বিজ্ঞাপন এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল কি না আমার জানা নেই। প্রবীণ সাংবাদিক ও পাঠকেরা এর সাক্ষ্য দিতে পারবেন। একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রাজধানীর চার-পাঁচটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় আকারের বিজ্ঞাপন দিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত (সম্ভবত প্রচারসংখ্যায় শীর্ষে) দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রকাশ সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার নীতিমালা সমর্থন করে না বলেই জানি। তবু ১৩ অক্টোবর থেকে এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত (২৬ অক্টোবর) এই বিজ্ঞাপন অন্তত কয়েকবার করে বিভিন্ন পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিজ্ঞাপন প্রকাশ বাবদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটির যত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে অনেক ছোট দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকদের এক মাসের বেতন দেওয়া যেত। কালো টাকা থাকলে কত অপচয় যে সম্ভব, তা এই বিজ্ঞাপন আরেকবার প্রমাণ করেছে।
২৬ অক্টোবরের খবর হলো: প্রথম আলোর পক্ষে একটি আইনি প্রতিষ্ঠান ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বিজ্ঞাপনগুলো প্রত্যাহার ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশ্যে প্রথম আলোর প্রকাশক ও সম্পাদকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার উকিল নোটিশ দিয়েছে। আমরা এর আইনি পরিসমাপ্তি কী হয়, তা জানার অপেক্ষায় থাকলাম।
প্রথম আলো একটি বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় পত্রিকা। সম্প্রতি পত্রিকা প্রকাশনায় এটি একটি সফল বেসরকারি উদ্যোগ। বেসরকারি খাতে এত বড় ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আর দেখা যায়নি, বিশেষ করে মিডিয়া সেক্টরে। প্রথম আলো তার নিজস্ব একটা সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে থাকে। সেটা সবার মনঃপূত হবে, এমন আশা করা উচিত নয়। যাদের মনঃপূত হয় না, তারা প্রথম আলো পড়ে না। অন্য পত্রিকা পড়ে। ঢাকার আরও কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে। এমনকি নিয়মিত ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ করে যাচ্ছে, এমন একটি সস্তা দৈনিকের পাঠকও কম নয়। কাজেই প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি কারও পছন্দ না হলে পত্রিকাটি না পড়াই হচ্ছে সহজ বিকল্প।
একটি সংবাদপত্র তার স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করে প্রকাশিত হচ্ছে। এখন পাঠকের মর্জি, পত্রিকাটি সে পড়তেও পারে, নাও পারে। পত্রিকাটি যদি নিম্নমানের সাংবাদিকতা করে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, বিনিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে দেশের সচেতন নানা গোষ্ঠী ও ফোরাম ইতিমধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিত। সে রকম কোনো উদ্যোগ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি। আমাদের পাঠকসমাজও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতেন। উল্লিখিত অভিযোগগুলো যদি সত্য হতো, তাহলে পাঠকেরা বহু আগেই এ পত্রিকা পড়া ছেড়ে দিত। পাঠকেরা কোনো পত্রিকার কাছে জিম্মি নয়। যেমন দর্শকেরা কোনো টিভি চ্যানেলের কাছে জিম্মি নয় (শুধু গ্রামের দর্শকেরা ‘বিটিভির’ কাছে জিম্মি)। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটি বহু অভিযোগ করেছে, অথচ প্রথম আলোর প্রচারসংখ্যা তাতে কমেনি। এতে কি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটি পাঠকের বিচার-বুদ্ধি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছে? দেশের সংবাদপত্র পাঠকেরা এতই নির্বোধ? তারা প্রথম আলোর ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা বুঝতেই পারছে না? পাঠককে এতটা বোকা, অশিক্ষিত বা নির্বোধ ভাবা ঠিক নয়। ব্যবাসয়ী প্রতিষ্ঠানটি প্রথম আলো সম্পর্কে যত অভিযোগ করেছে, তার যদি ২৫ শতাংশও সত্য হতো, তাহলেও আমার ধারণা প্রথম আলোর সার্কুলেশনে বিরাট ধস নামত। প্রথম আলো আজকের প্রচারসংখ্যা কিছুতেই ধরে রাখতে পারত না।
বিজ্ঞাপনটিতে অভিযোগ করা হয়েছে: ‘প্রথম আলো দেশের রাজনৈতিক নেতারা, প্রথা প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, দেশের সশস্ত্র বাহিনী, মোটকথা রাষ্ট্রের সব ইনস্টিটিউশনের ওপর আঘাত করে চলেছে।’ এ অভিযোগ খুবই মারাত্মক। প্রথম আলো সামান্য একটি দৈনিক পত্রিকা। এক কলমের খোঁচায় সরকার এর ডিক্লারেশন বাতিল করে দিতে পারে। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রথম আলো আঘাত করে চলেছে, অথচ তারা সবাই নিশ্চুপ? ম্যাজিকটা কী? আর সোচ্চার হয়েছে শুধু এমন একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, যাদের নামে দুর্নীতির নানা মামলা ও অভিযোগ রয়েছে। একটি নিষ্কলুষ প্রতিষ্ঠান এসব অভিযোগ করলে তবু অভিযোগকে কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া যেত।
ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনটি পরোক্ষভাবে সরকারকেও হেয় করেছে, সরকারের ক্ষমতা সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করেছে। এটা সরকারের দেখা উচিত। একটি দৈনিক পত্রিকা একসঙ্গে এত রকম ষড়যন্ত্র করে চলেছে, অথচ সরকারের কোনো বিভাগের তা দৃষ্টিগোচর হয়নি, এটা অবিশ্বাস্য। যা সরকারের এত বিভাগের দৃষ্টিগোচর হয়নি, তা একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিতেই শুধু ধরা পড়েছে, যে প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত।
বিজ্ঞাপনটিতে বলা হয়েছে: ‘প্রথম আলো পত্রিকায় প্রচুর সাবজুডিস ও অসত্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।’ যাদের সম্পর্কে অসত্য ও সাবজুডিস রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তারা আদালত বা প্রেস কাউন্সিলে মামলা করছে না কেন? প্রেস কাউন্সিল যদিও একটি অকার্যকর সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আদালতের দরজা তো খোলাই ছিল। কোনো সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান আদালতের আশ্রয় নিল না কেন?
বিজ্ঞাপনটিতে এমন আরও কিছু অভিযোগ করা হয়েছে, যেগুলো ফৌজদারি বিষয়। এগুলো আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, দেশে বর্তমানে আইনের শাসন অনেকটা রয়েছে। যদিও সরকারদলীয় রাজনীতিবিদদের প্রতি আইনের প্রয়োগ কিছুটা নমনীয়। প্রথম আলো সরকারদলীয় পত্রিকা নয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে আইন তার পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিজ্ঞাপনটিতে উল্লিখিত অনেক অভিযোগ নিয়ে বিজ্ঞাপনদাতা বিজ্ঞাপনের বদলে আইনের শরণাপন্ন হতে পারত।
আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রথম আলোর সব কাজ বা সব নীতি সমর্থন করি না। তাতে পত্রিকাটির কিছু আসে-যায় না। প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি যদি আমার একেবারেই পছন্দ না হয়, তাহলে আমি পত্রিকাটি পড়া ছেড়ে দিতে পারি। এর বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো সংবাদপত্র বা সাংবাদিক কারও বিরুদ্ধে অসত্য প্রতিবেদন লিখে পার পেয়ে যাবে, তা আমি মেনে নিতে পারি না। হলুদ সাংবাদিকতা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষতি করছে। হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়ার জন্য প্রেস কাউন্সিলকে ঢেলে সাজাতে হবে। বর্তমান প্রেস কাউন্সিল দিয়ে তা সম্ভব হবে না।
সংবাদপত্র বা সাংবাদিকেরা ধোয়া তুলসীর পাতা নয়। তাদের নানা অপকর্ম থাকতে পারে। কিন্তু তা আইনিভাবে বিচার করতে হবে। পত্রিকার প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পত্রিকা ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ প্রকাশ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তেমনি প্রত্যেকটি সংবাদপত্রেরও সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। নীতিমালা অনুসরণ করলে হলুদ সাংবাদিকতার সুযোগ কমে আসবে।
হলুদ সাংবাদিকতার মতোই দেশের আরেকটি বড় উপদ্রব হলো দুর্নীতি। বাংলাদেশের রাজনীতি ও ব্যবসার একটা বড় অংশ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ১/১১-এর সরকার সেই দুর্নীতির শিকড় ধরে টান দিলেও পরিকল্পনা ও কৌশল ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় দুর্নীতির সেই অভিযান সফল হয়নি। সাজাপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজেরা আইনের ফাঁক দিয়ে একে একে বেরিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার বটে, কিন্তু সরকারের কাজে সেই দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। দুদকও এখন নতুন বিধিমালার প্যাঁচে পড়ে দুর্বল। ফলে সমাজের দুর্নীতিবাজেরা এখন আবার মাথা তুলছে। কালো টাকা দিয়ে কিনে নিচ্ছে অনেক কিছু। এর মধ্যে মিডিয়াও বাদ যাচ্ছে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার দৃঢ় অবস্থান (কথায় ও কাজে) না নিলে আমরা আবার ১/১১-এর পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারি, সে আশঙ্কা অনেকের। সরকার যদি দুর্নীতির সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। দেশে যদি দুর্নীতিবাজেরা প্রশ্রয় পায়, আইন যদি তাদের স্পর্শ করতে না পারে, তাহলে স্বাধীন সংবাদপত্র বিকশিত হতে পারবে না। একমাত্র স্বাধীন ও দক্ষ সংবাদপত্রকেই দুর্নীতিবাজেরা ভয় পায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শক্ত অবস্থানের ওপর দেশের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। স্বাধীন সংবাদপত্রের বিকাশও এর অন্তর্ভুক্ত।
২৬ অক্টোবর ২০০৯
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাল্যবিবাহ অত্যন্ত ভয়াবহ একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সমাজে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের কারণে যেসব ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো বাল্যবিবাহ। ১৮ বছরের কম বয়সের মেয়ে অথবা ২১ বছরের কম বয়সের ছেলেদের বিবাহকে বাল্যবিবাহ বলা হয়। ১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুসারে বাল্যবিবাহ বলতে বাল্যকাল বা নাবালক বয়সে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিবাহকে বোঝায়। এ ছাড়া বর-কনে উভয়ের বা একজনের বয়স বিয়ের দ্বারা নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হলে তা আইনত বাল্যবিবাহ বলে চিহ্নিত হবে। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মা ও সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে। বিদ্যমান আইনে বিয়ের বৈধ বয়সসীমা ছেলেদের ২১ এবং মেয়েদের জন্য ১৮ বেঁধে দেওয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের কারণে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ মেয়ে ১৫ বছর বয়সের আগে গর্ভবতী হওয়ার ফলে মা এবং শিশু যেসব মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন তা হচ্ছে—নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া ও কম ওজনের শিশু জন্মদান। অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের সময় মা ও সন্তান দুজনেরই মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
জনসংখ্যা তত্ত্বের দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত অধিক বয়সে বিবাহ সুবিধাজনক। ভবিষ্যতে সন্তানের মা যিনি হবেন, তাঁকে অবশ্যই পরিপক্ব হতে হবে। কম বয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পাদিত হলে পবিত্র কোরআনে যে শান্তি ও সুষমার কথা বলা হয়েছে, তা বিপর্যস্ত হতে পারে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই তোমাদেরকে এক প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনীর সৃষ্টি করেন যেন তার কাছ থেকে পায় শান্তি ও সুখময় বসবাস।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮৯)
ইসলাম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নারী বা পুরুষকে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক ও পরিপক্ব হওয়া অত্যাবশ্যকীয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। তবে বিবাহ সম্পর্কিত পবিত্র কোরআনের আয়াত ও হাদিসকে সামনে রেখে জীবনের কঠিন বাস্তবতার আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করলে ক্ষেত্রবিশেষে এটি একেবারে নাজায়েজও বটে। পিতা-মাতা, অভিভাবক বা সামাজিক ও ধর্মীয় নেতারা যদি বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন না হন, তাহলে এর অনুশীলন চলতেই থাকবে। ইলমে ফিকেহর একটি সূত্র হচ্ছে, ‘মুকাদ্দিমাতুল হারামে হারাম’ অর্থাত্ ‘যা হারামের দিকে নিয়ে যায় সেই কাজটিও হারাম’। যে বাল্যবিবাহ ভগ্নস্বাস্থ্য, অপরিকল্পিত পরিবার, দাম্পত্য কলহ, প্রসবকালীন মৃত্যু এবং শিশুর অকাল মৃত্যুসহ অনেক বিপদ ডেকে আনে, সে বিবাহ কখনো ইসলাম অনুমোদিত হতে পারে না।
শারীরিক গঠন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই বিয়ে, অতঃপর সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে বাল্যবধূরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। অপুষ্টির মধ্যে শারীরিক নানা উপসর্গ দেখা দেওয়া সত্ত্বেও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে আবারও গর্ভবতী হয় সে। তা ছাড়া গর্ভধারণের বয়সে উন্নীত হওয়ার আগেই অল্পবয়সী বালিকাদের বিয়ে দিলে পরবর্তী সময়ে যে গর্ভসঞ্চার হয়, তা নবজাত শিশু ও মা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকারক হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের সামর্থ্য বলতে কেবল দৈহিক সক্ষমতা নয়, আর্থিক সামর্থ্যও থাকতে হবে। ফকিহেদর মতে, ‘কোন্ বয়সে বিবাহ সম্পাদিত হবে, তা শারীরিক ও জৈবিক প্রয়োজন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যা দিয়ে বিবেচিত হয়।’
বাল্যবিবাহের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আজ সমাজের সর্বস্তরে প্রতিফলিত। একটি মেয়ে তার স্কুলজীবন পেরোনোর আগেই বউ হচ্ছে, মা হচ্ছে। জীবন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার আগেই সে সংসার জীবনে প্রবেশ করেছে। অথচ সমাজের অন্য মেয়েদের মতো শিক্ষিত, স্বাবলম্বী কিংবা সুন্দর জীবনযাপনের ন্যূনতম ধারণার অধিকারী সে হতে পারত। বাল্যবিবাহের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো অপরিণত গর্ভধারণ এবং মাতৃত্ব। প্রতিবছর গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবকালীন সমস্যার কারণে কমপক্ষে ৬০ হাজার বাল্যবধূ মারাও যায়। বাল্যবিবাহের পরিণতিতে শুধু শিশু, অল্পবয়সী নারী বা তার পরিবারই আক্রান্ত হয় না, এতে দেশ হয় অপুষ্টি ও দুর্বল ভবিষ্যত্ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী।
বাল্যবিবাহ নিরোধে জন্মনিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে বিয়ের সময় জন্মসনদ প্রদর্শন অতি বাধ্যতামূলক আবশ্যক। বাল্যবিবাহে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে তার মধ্যে নিরাপদ মাতৃত্ব অন্যতম। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য সঠিক বয়সকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের উন্নয়নের জন্য যেখানে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাল্যবিবাহ ও এর পরিণতিসংক্রান্ত বিষয়ে নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গি কোনো ধর্মপ্রাণ সচেতন নাগরিকের কাম্য হতে পারে না।
বাল্যবিবাহ সংকুচিত করে দেয় নারীর পৃথিবী। পিতা-মাতা বা অভিভাবক অথবা সামাজিক নেতারা যদি বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন না হন, তাহলে এর অনুশীলন চলতেই থাকবে। সামাজিক সচেতনতা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই কেবল বাল্যবিবাহ রোধ করে একটি কন্যাশিশুকে অধিকার সচেতন নারী কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নারী নিজেই সচেতন হয়ে উঠেছেন। নারী নিজেই যখন বাল্যবিবাহ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন, তখন এ ঘৃণ্য অভিশাপ থেকে নিশ্চিতভাবে নারীরা মুক্তি লাভ করবেন। যখন সমাজ, রাষ্ট্র এ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে, তখন বাল্যবিবাহের আড়ষ্টতা থেকে নারীরা বেরিয়ে আসবে—এ প্রত্যাশায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

ফি বণ্টন নীতিমালা

আধুনিক চিকিত্সাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। তাঁরা প্রতিনিয়ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেডিয়েশনের মধ্যে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাম, ক্যানসার চিকিত্সায় রেডিওথেরাপি দেন।
১৯৮৪ সাল থেকে সরকারি হাসপাতালের নিজ নিজ বিভাগ থেকে আদায় করা ইউজার ফির ৫০ ভাগ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিত্সক ও কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন হয়ে আসছে। এর মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা হাসপাতালভেদে ১৪-১৬ ভাগ পেয়ে থাকেন।
সরকার সম্প্রতি ইউজার ফির হার পুনর্নির্ধারণ করে তা হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বণ্টন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিভাজনের হার নির্ধারিত হবে। প্রস্তাবিত খসড়া হার বণ্টন নীতিমালায় উপজেলা হাসপাতালে আদায় করা ইউজার ফির ১৫ ভাগ মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা সমভাবে পাবেন বলে উল্লেখ করা হলেও জেলা সদর হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালগুলোয় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য আলাদা কোনো বণ্টন হার না রেখে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের সমভাবে ১৫ ভাগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনে অবস্থিত বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় বণ্টনের কোনো হার উল্লেখ করা হয়নি। প্রস্তাবিত খসড়া বণ্টন হার নীতিমালায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য আলাদা বণ্টন হার না থাকায় তাঁদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। চিকিত্সাসেবা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা ও কাজের ধরন কর্মচারীদের থেকে ভিন্নতর। ইউজার ফি বণ্টনের হারের ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের সঙ্গে একত্রীভূত করার প্রস্তাব অযৌক্তিক ও বাস্তবতাবর্জিত।
এ অবস্থায় ইউজার ফি বণ্টন হারের নীতিমালায় নিজ নিজ বিভাগ থেকে আদায় করা ফির ১৫ ভাগ সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা রেখে ওই বণ্টনের নীতিমালা তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
সেলিম মোল্লা
মহাসচিব, বাংলাদেশ ডিপ্লোমা হেলথ টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা।

পশ্চিমবঙ্গে ফের রাষ্ট্রপতি শাসন জারির দাবি জানালেন মমতা

তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি জানিয়েছেন।
কিছুদিন ধরেই মমতা পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএমের সন্ত্রাসের মোকাবিলায় সংবিধানের ৩৫৬ ধারানুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারির দাবি জানিয়ে আসছেন। গত মঙ্গলবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি রাজ্যে গণতন্ত্র বাঁচাতে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা ছাড়া কোনো পথ নেই বলে মন্তব্য করেন।
বৈঠক শেষে মমতা সাংবাদিকদের জানান, পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত, সংবিধানের ৩৫৬ ও ৩৫৫ ধারা প্রয়োগ করা।

পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী সমর্থকদের হাতে আটক ট্রেন মুক্ত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম শহরের কাছে গত মঙ্গলবার ভুবনেশ্বর থেকে দিল্লিগামী রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনটি আটকে রেখেছিল মাওবাদী-সমর্থিত পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী জনগণের কমিটির (পিএসবিজেসি) সমর্থকেরা। অবশেষে সব ধরনের উত্কণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর জিম্মিদশা থেকে মুক্তি মিলেছে ট্রেন ও ট্রেনের যাত্রীদের।
ট্রেনটি আটক করে পিএসবিজেসি নেতা ছত্রধর মাহাতোসহ মাওবাদী সন্দেহে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় আটক লোকজনের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানায় পিএসবিজেসি সমর্থকেরা। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রেনটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং পুনরায় যাত্রা শুরুর ব্যবস্থা নেন।
প্রথমে বলা হয়েছিল, ট্রেনের চালক এবং সহ-চালককে অপহরণ করা হয়েছে। কিন্তু চালক ও সহ-চালক জানান, তাঁদের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল।
সহ-চালক কে গোবিন্দ রাও বলেন, একদল লোক রেললাইনের ওপর উঠে লাল পতাকা নাড়ছিল। তখন জরুরি ব্রেক কষে ট্রেন থামাতে বাধ্য হন তিনি। ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গেই চালক ও যাত্রীদের ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার এবং মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় পিএসবিজেসি সমর্থকেরা। তিনি আরও জানান, তাঁদের কারও সঙ্গেই খারাপ আচরণ করেনি তারা।
কলকাতা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা দিলিপ মিত্র জানান, পুলিশের দুটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের কাছ থেকে ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেন, সুসংবাদ হচ্ছে, ট্রেন ও ট্রেনের যাত্রীরা নিরাপদে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আফগান নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান রাশিয়ার

আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের দুই সপ্তাহ আগে এ আহ্বান জানাল সাবেক এ বিশ্ব পরাশক্তি।
গত মঙ্গলবার ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বেঙ্গালুরুতে রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিদেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, ‘মিত্র প্রতিবেশী দেশ ও সীমান্তবর্তী দেশগুলোতে যা ঘটছে, তা আমরা চুপচাপ বসে দেখতে পারি না। তাই আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমাদের যৌথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এ সংবাদ সম্মেলনের আগে স্থানীয় একটি হোটেলে লাভরভ, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জাইচি দুই ঘণ্টার একটি বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আফগানিস্তানের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন এবং সেখানে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুত সহায়তা বাস্তবায়নের জন্য উন্নত বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।
আফগান যুদ্ধে সেনা পাঠাতে মস্কো আগেই অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিল। তবে চলতি মাসের শুরুতে আফগান সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য রাশিয়ার কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছে ন্যাটো। লাভরভের মতে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সময় এসেছে।
লাভরভের এ মন্তব্যের বিশ্লেষণে ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেন, এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে তিনি এ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে পাক-আফগান পরিস্থিতি সামাল দিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া তাঁদের ঠিক হবে না। এদিকে ত্রিপক্ষীয় এ বৈঠকের আগে চীনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থাও ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের কার্যকর ভূমিকা নেওয়া উচিত। তবে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের স্বার্থ-বিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেবেন না তাঁরা। পাকিস্তানও আফগান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। ওদিকে আফগান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো পুরোনো মিত্র পাকিস্তানের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী।
লাভরভের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আফগানিস্তানে ভারতের স্বার্থ সমুন্নত রাখা এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর সেখানে অবস্থানের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ ত্রিপক্ষীয় এ বৈঠকে ইরানের পরমাণু সংকট নিয়ে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও স্থান পায়। আগামী ৭ নভেম্বর আফগানিস্তানে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তাঁরা।

বিমান দুর্ঘটনার স্মৃতি জাদুঘর!

পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া বিমানের ধ্বংসাবশেষ, দুমড়ানো-মোচড়ানো ব্ল্যাক বক্স এবং দুর্ঘটনায় নিহত মা-বাবার কফিন আঁকড়ে সন্তানের কান্না—ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার বেদনাবহ এসব স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে জাপানের বিমান সংস্থা। তারা এ স্মৃতি মুছে ফেলতে চায় না। বিমানকর্মী ও সাধারণের প্রদর্শনের জন্য তা ধরে রেখেছে জাদুঘরে।
বিমান দুর্ঘটনার এসব স্মারক টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত দুটো জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিমানভীতি আছে—এমন লোকজন হয়তো ওই জাদুঘরের ছায়া মাড়াতে চাইবে না। কিন্তু প্রদর্শনীর আয়োজকেরা বলছেন, বিমানকর্মীদের সামান্য অবহেলার কারণে কত ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সামান্য ভুলে হারিয়ে যেতে পারে কত মানুষের প্রাণ—বিমানকর্মীরা যাতে এটা উপলব্ধি করতে পারেন, সেটা তুলে ধরতেই এ আয়োজন।
জাদুঘরে স্থান পেয়েছে দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিমানের নানা যন্ত্রাংশ। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে স্ত্রীকে লেখা এক যাত্রীর শেষ চিঠিও ঠাঁই পেয়েছে সেখানে। অনিবার্য মৃত্যুর মুখে থাকা ওই যাত্রীর চিঠিতে ছিল স্ত্রীর প্রতি সন্তানকে দেখেশুনে রাখার আকুতি। জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে আরও একটি মর্মভেদী চিঠি। বাঁচার জন্য মরিয়া এক নারীর আর্তনাদ। মাঝ আকাশে বিমানে আগুন ধরে যাওয়ার পর জরুরি নির্গমন লিফলেটে চিঠিটি লিখে যান তিনি।
জাদুঘর দুটি পরিচালনা করছে জাপানের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা জাপান এয়ারলাইনস (জেএএল) ও জেএলএর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ (এএনএ)। বিমান সংস্থা এএনএর কর্মীদের জাদুঘর পরিদর্শন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য জেএএল তার কর্মীদের উত্সাহিত করে থাকে।
জেএএলের সেফটি প্রমোশন সেন্টারের প্রধান ইউতাকা কানাসাকি বলেন, জেএএলের সর্বশেষ বিমানটি যখন দুর্ঘটনায় পড়েছিল, তখন তাদের ৫০ হাজার কর্মীর ৯০ শতাংশই চাকরিতে ছিলেন না। তাই বিমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
তিনি বলেন, ‘কর্মীদের অবহেলার কারণে যাতে আর কোনো বিমান দুর্ঘটনা না ঘটে, সেটা প্রতিরোধ করতে চাই আমরা। বিমান চলাচলের ঝুঁকিবিষয়ক জ্ঞানও পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে চাই।’
বিমানের বেঁকে যাওয়া আসনসহ বিমানের ধ্বংসাবশেষের বিভিন্ন নমুনা প্রদর্শিত হচ্ছে জাদুঘরে। কলম, চশমা, গাড়ির চাবিসহ যাত্রীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে।
১৯৮৫ সালের ১২ আগস্টের বিমান দুর্ঘটনাকে জেএলএর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে সংস্থাটি। সেদিন জেএএলের ফ্লাইট ১২৩ সাগরে বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৫২০ জন যাত্রী। এ দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান চারজন। বিমান চলাচলের ইতিহাসে একক বিমান দুর্ঘটনায় এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা। ওই দুর্ঘটনার নানা স্মারক স্থান পেয়েছে জাদুঘরে।
সাগর থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ টেনে তোলার ভিডিও ও স্থিরচিত্র স্থান পেয়েছে সেখানে। স্থানীয় একটি শরীরচর্চা কেন্দ্রে সারি করে রাখা কফিন এবং নিহত এক যাত্রীর স্ত্রী সজল চোখে বিমান সংস্থার প্রধানের সঙ্গে তর্ক করছেন—এ রকম ছবিও স্থান পেয়েছে জাদুঘরে।
জাদুঘরে এসে দর্শনার্থীরা জানতে পারবেন ৫৫ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটেছে মানুষের ভুলের কারণে। অন্য বিমান সংস্থার কর্মীদের ভুলের কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
একটি ঘটনায়, তাইওয়ানি বিমান সংস্থার একটি বিমানের কো-পাইলট জানতে পারেন, বিমান উড্ডয়নের জন্য ভুল রানওয়ের দিকে যাচ্ছেন পাইলট। কিন্তু ওই কো-পাইলট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে ব্যর্থ হন। মেরামতের জন্য রানওয়েটি তখন বন্ধ ছিল। ফলে উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে দুর্ঘটনায় পড়ে বিমানটি। নিহত হয় এর ৮৩ জন যাত্রী।
অন্য এক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানের একজন ক্রু অন্য এক কাজে ব্যস্ত থাকায় ওই বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি যথাসময়ে তাঁর চোখে ধরা পড়েনি। ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ওই বিমানের ১০৩ জন আরোহীর।
এভাবে বিমানকর্মীদের অসতর্কতার কথা তুলে ধরা হয়েছে জাদুঘরে, যাতে বিমানকর্মীরা এ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।

ভারত ব্রিটেনের অকৃত্রিম বন্ধু -লন্ডনে প্রতিভা পাতিল

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল বলেছেন, ব্রিটেন ও ভারত পরস্পর অকৃত্রিম বন্ধু। ঐতিহ্যের বহুমুখিতা আর অনুসৃত গণতান্ত্রিক ধারা দুটি দেশের সম্পর্ককে নিবিড় করেছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। ভারত এ সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষেত্রে সচেতন।
গত মঙ্গলবার ব্রিটেনের উইন্ডসর ক্যাসলে এক ভোজসভায় প্রতিভা পাতিল এ কথা বলেন। ব্রিটেন সরকার তাঁর সম্মানে এই বিশেষ ভোজসভার আয়োজন করে। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ব্রিটেনে যান। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন স্বামী দেবীসিং রামসিংশেখাওয়াত।
প্রতিভা পাতিল বলেন, ব্রিটেন ও ভারতের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। দুই দেশের দুই রাজধানী বহু ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলনে ‘ক্ষুদ্র বিশ্বে’ পরিণত হয়েছে। এই দুই দেশ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং একবিংশ শতাব্দীর রূপ পরিগ্রহের চেষ্টা করছে।
ভোজসভায় রানি এলিজাবেথ দুই দেশের মধ্যকার সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, ব্রিটেন ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্কই নতুন শতাব্দীতে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, ব্রিটেনের প্রায় ২০ লাখ লোক বংশানুক্রমে ভারতীয়দের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতের সঙ্গে এসব ব্রিটিশ নাগরিকের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে।
ভোজসভায় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ড, লন্ডনে নিযুক্ত পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের হাইকমিশনার, হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে কে রাউলিং, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্পিকার ও ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা অংশ নেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে ২০১০ সালে দিল্লি কমনওয়েলথ গেমস উপলক্ষে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রতিভা পাতিল।
ব্রিটেনে পৌঁছালে প্রতিভা পাতিলকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেন রানি। ভারতের রাষ্ট্রপতিকে লন্ডনের হোটেল থেকে প্রিন্স চার্লস ও ডাচেস অব কর্নওয়াল রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। উইন্ডসর প্রাসাদে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় তাঁকে। সেখানে ২১ বার তোপধ্বনি করে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী ডিউক অব এডিনবরা। এরপর রাজপরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁকে ঘোড়ার গাড়িতে করে উইন্ডসর পার্কের ‘লং ওয়াক’ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় প্রাসাদে। ওই প্রাসাদেই প্রতিভা পাতিল তিন দিন অবস্থান করবেন।
ভারতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া আজ বৃহস্পতিবার রানি এলিজাবেথ ও প্রতিভা পাতিল দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসের মশাল উদ্বোধন করবেন। লন্ডনের বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে এই মশালদৌড় শুরু হবে। দিল্লিতে পৌঁছানোর আগে এটি ঘুরবে ৭০টি দেশ। আগামী শনিবার দেশে ফেরার আগে প্রতিভা পাতিল সাইপ্রাস সফরে যাবেন।
ব্রিটেনে আসা ভারতীয় রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে প্রতিভা পাতিল হলেন তৃতীয়। এর আগে ১৯৬৩ সালে এস রাধাকৃষ্ণন ও ১৯৯০ সালে আর ভেঙ্কটরমণ ব্রিটেন সফর করেন। ২০০৪ সালে কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করার পর এটাই হলো কোনো ভারতীয় রাষ্ট্রপতির প্রথম ব্রিটেন সফর।
লন্ডনে পৌঁছানোর পর প্রতিভা পাতিল একটি পাঁচতারা হোটেলে ওঠেন। সেখানে এক অনুষ্ঠানে তিনি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী রামকৃষ্ণকে অভিনন্দন জানান। প্রবাসী ভারতীয় বিজ্ঞানী, চিকিত্সক ও শিল্পপতিদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। ওই অনুষ্ঠানে কয়েক শ ভারতীয় প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিটেনে ১৩ লাখ ভারতীয় বসবাস করছেন, যা ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ।

নটর ডেমের প্রকৃতি উত্সবে -চারদিক by শেখর রায়

২৫ অক্টোবর নটর ডেম কলেজে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ন্যাচার ফেস্টিভ্যাল বা প্রকৃতি উত্সব। নটর ডেম ন্যাচার স্টাডি ক্লাবের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নটর ডেম কলেজ ক্যাম্পাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল এ উত্সব। সকাল নয়টায় কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা, সিএসসি ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে উত্সবের উদ্বোধন করেন। সকাল নয়টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রাকৃতিক তথ্য ও জলবায়ুর পরিবর্তনবিষয়ক ন্যাচার অলিম্পিয়াড-২০০৯ (জুুনিয়র গ্রুপ: অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণী এবং সিনিয়র গ্রুপ: একাদশ, দ্বাদশ ও উচ্চতর শ্রেণী) এবং সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত উপস্থিত বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। নটর ডেম কলেজসহ বনানী বিদ্যানিকেতন, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, মুগদাপাড়া কাজী জাফর আহমদ উচ্চবিদ্যালয়, শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রায় ৩০০ জন ছাত্রছাত্রী ন্যাচার অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। একই সঙ্গে চলে দেয়ালিকা প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী। কলেজ অডিটরিয়ামে সকাল নয়টা থেকে ন্যাচার স্লাইড শোর আয়োজন করা হয়। স্লাইড শোতে তোলা বাংলাদেশের ভেষজ উদ্ভিদ, পাখি ও প্রাণী এবং এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ববিষয়ক ৪৭টি ফটোগ্রাফিক স্লাইড প্রদর্শিত হয়।
বেলা ১১টায় কলেজ অডিটরিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত বরেণ্য লেখক ও পরিবেশবিদ নটর ডেম কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা, বিশেষ অতিথি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ফাদার জে এস পিশোতো, সিএসসি এবং সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা, সিএসসি। দুপুর ১২টায় ছিল ‘নটর ডেম ন্যাচার স্টাডি ক্লাবের স্মরণীয় ২৫ বছর’ শীর্ষক ন্যাচার সেমিনার। এতে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে আলোচনা করেন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া। বেলা সাড়ে তিনটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ক্লাব সদস্যদের স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠান। বিকেল পাঁচটায় কলেজ অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ন্যাচার অলিম্পিয়াড-২০০৯-এর পুরস্কার বিতরণী ও ন্যাচার ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরেণ্য প্রাণিবিজ্ঞানী ও নটর ডেম কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম, সিএসসি, পিএচডি, বিশেষ অতিথি অভ্যাপক কাজী জাকের হোসেন, প্রোফেসর ইমেরিটাস, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ ফাদার বেঞ্জামিন কস্তা, সিএসসি।
রাজনীতিমুক্ত নটর ডেম কলেজে ছাত্রদের সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোর ধারক ও বাহক হিসেবে রয়েছে ১৯টি ক্লাব। এর মধ্যে নটর ডেম ন্যাচার স্টাডি ক্লাব স্বীয় বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রমে সূচনালগ্ন থেকেই অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। কলেজের জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ১৯৮৪ সালের ২৯ অক্টোবর ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ক্লাবের লক্ষ্য প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ এবং প্রচার, ছাত্রদের প্রকৃতিপ্রেমিক ও পরিবেশ সংরক্ষক হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে প্রকৃতি সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্য সামনে রেখে মাত্র ২০ জন ছাত্র নিয়ে এ ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়। ক্লাবটির বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে দৈনিক সংবাদ সংগ্রহ, সাপ্তাহিক ন্যাচার স্টাডি ক্লাস ও সভা, পাক্ষিক ন্যাচার স্টাডি ট্যুর, মাসিক দেয়ালিকা পরিবেশ ও Nature প্রকাশ, বার্ষিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং প্রকৃতিবিষয়ক বার্ষিক প্রকাশনা নিসর্গ প্রকাশ করা। এ ছাড়া ক্লাবটি ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী করে তোলার জন্য প্রায়ই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করে থাকে। যেমন—গ্রাউন্ড ট্রেনিং প্রোগ্রাম (GTP), ফটোগ্রাফি ট্রেনিং প্রোগ্রাম (PTP), অফিস ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং প্রোগ্রাম (OMTP), ফিল্ড ওয়ার্ক ট্রেনিং প্রোগ্রাম (FWTP), নিউজলেটার পাবলিকেশন ট্রেনিং প্রোগ্রাম (NPTP), ন্যাচার জার্নালিজম ট্রেনিং প্রোগ্রাম (NJTP), কম্পিউটার ট্রেনিং প্রোগ্রাম (CTP), ক্লাব ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং প্রোগ্রাম (CMTP), সায়েন্টিফিক রিসার্চ প্রিপেয়ার্ডনেস ট্রেনিং প্রোগ্রাম (SRPTP) ইত্যাদি। প্রকৃতি সংরক্ষণে নটর ডেম ন্যাচার স্টাডি শুধু নটর ডেম কলেজ ক্যাম্পাসেই নয়, এ ক্লাবের চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। তাই তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, টি অ্যান্ড টি কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, ইডেন গার্লস কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, ঢাকা কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, তিতুমীর কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব, বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নেচার স্টাডি ক্লাব। এ ছাড়া ক্লাবের আজীবন ও সাবেক সদস্যদের উদ্যোগে ১৯৯৬ সালের ৩০ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যাচার স্টাডি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (NSSB)। এ সোসাইটির লক্ষ্য দেশের সব জেলায় একটি করে ইউনিট স্থাপন করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুরূপ ন্যাচার স্টাডি ক্লাব খোলা। কারণ, ছাত্রছাত্রীরাই দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধার এবং আগামী দিনের নাগরিক। তারা সচেতন হলেই তাদের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণ প্রকৃতি সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে।

কাবুলে জাতিসংঘের অতিথিশালায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা, নিহত ১০

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গতকাল বুধবার জাতিসংঘের একটি অতিথিশালায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা হয়েছে। হামলায় জাতিসংঘের ছয় কর্মী, তিন হামলাকারীসহ নিহত হয়েছে ১০ জন। গতকাল সকালের ওই হামলার পরপর একই সময় বিদেশি মালিকানাধীন বিলাসবহুল একটি হোটেলেও হামলা হয়। ওই সময় হোটেলের এক শরও বেশি অতিথি মাটির নিচের বাংকারে আশ্রয় নেয়। তালেবানের পক্ষ থেকে ওই হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। সামনের মাসের ৭ তারিখে দেশটিতে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জঙ্গিরা ওই হামলা চালাল।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের মুখপাত্র আদ্রিয়ান এডওয়ার্ডস বলেন, এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ছয় কর্মীর নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও নয়জন। নিহত ব্যক্তিদের জাতীয়তা তাত্ক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই অতিথিশালায় ২০ জন কর্মী কাজ করেন। হামলার সময় তাঁরা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা জানা যায়নি।
হামলার পর জঙ্গিরা কমপক্ষে ২০-২৫ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে খবর বেরিয়েছে। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। হামলার ঘটনার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর লোকজন সেখানে ছুটে যান। এর পরপরই আন্তর্জাতিক বাহিনীর সেনা এবং আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গোটা এলাকা ঘিরে ফেলেন। ঘটনাস্থল থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আফগান নিরাপত্তা বাহিনী বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীদের সঙ্গে গুলিবিনিময় করেছে। গোলাগুলি শেষ হলে ঘটনাস্থলে তিন হামলাকারীর লাশ পাওয়া যায়। কম্পাউন্ডের ভেতরেই লাশগুলো পড়েছিল। ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য আবদুল গাইম বলেন, ‘হামলাকারীদের পাকিস্তানি বলেই আমাদের মনে হয়েছে। অতিথিশালার দুই ভারতীয় পরামর্শক নিরাপদ রয়েছেন।’
ভোরে ওই হামলার পরপরই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে বিদেশি মালিকানাধীন বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলে রকেট হামলা হয়। তবে রকেটটি বিস্ফোরিত হয়নি। ওই সময় হোটেলের নিচতলার বারান্দা ও সিঁড়ি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। হোটেলের এক শরও বেশি অতিথি এ সময় বাংকারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তারা এখন নিরাপদে আছে।
তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ টেলিফোনে বার্তা সংস্থার কাছে দুটি হামলার ঘটনারই দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের তিন জঙ্গি আত্মঘাতী পোশাক পরে মেশিনগান নিয়ে ওই হামলা চালায়। ৭ নভেম্বরের নির্বাচন নস্যাত্ করতে এটা আমাদের প্রথম হামলা।’
উল্লেখ্য, আফগানদের নির্বাচন থেকে বিরত থাকতে তালেবানেরা তিন দিন আগে সবাইকে সতর্ক করে বিবৃতি দেয়। তারা নির্বাচন নস্যাত্ করতে ভয়াবহ হামলা চালানোরও হুঁশিয়ারি দেয়।

পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে সই করুন- পাকিস্তানের প্রতি হিলারি ক্লিনটন

পাকিস্তান সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন পরমাণু অস্ত্রধর দেশটিকে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে সই করার ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিন দিনের সফরে গতকাল বুধবার রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান তিনি। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে যেতে পারে, এমন আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে হিলারি বলেন, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রাগার অত্যন্ত সুরক্ষিত রয়েছে বলে পূর্ণ আস্থা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। পাকিস্তানে পরমাণু কর্মসূচির জনক বিজ্ঞানী আবদুল কাদির খানের প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে চিন্তিত। এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আসন্ন পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির পর্যালোচনা-বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও পাকিস্তানকে আহ্বান জানাচ্ছি আমরা।’ আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে তত্পর রয়েছে উল্লেখ করে হিলারি বলেন, জঙ্গিরা পরমাণু অস্ত্র হাতে পেলে শুধু ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের ঘটনাই ঘটবে না, পাশাপাশি মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ও দেখা দেবে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এ হুমকি সম্পর্কে সচেতন। ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে নয়, আমরা আশা করছি, একটি পরমাণু অস্ত্রধর জঙ্গিগোষ্ঠী নিজেদের দেশে তত্পর থাকলে তার ভয়াবহতা কতটুকু হতে পারে, সেটাও তারা কল্পনা করতে পারবে।’
পাকিস্তানে এ সফরের সময় হিলারির বেশ কয়েকটি বেসামরিক বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু ভুল-বোঝাবুঝির কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনগণের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
আগামী ২০১০ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ-সংক্রান্ত পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র পাকিস্তান ছাড়াও ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া এখনো এ চুক্তিতে সই করেনি।

দুদককে ব্যুরো বানানো চলবে না -দুর্নীতি দমন by মশিউল আলম

প্রথম আলোয় ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সাক্ষাত্কারটির সুবাদে এ লেখা। কয়েক দিন আগে সাংবাদিকদের সামনে দুদক চেয়ারম্যান রূপকের ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন, দুদক বর্তমানে একটি দন্তহীন প্রতিষ্ঠান; তবে এর যে থাবা আছে, তাতে নখও আছে। এখন নাকি এ নখগুলো কেটে নেওয়ার উদযোগ চলছে। প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাত্কারে দুদক চেয়ারম্যান অন্য অনেক কথার মধ্যে এ কথাগুলো আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন। বলা বাহুল্য, দুদকের নখগুলো কেটে নেওয়ার বা প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একে দুর্বল করার এ উদযোগ চালাচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার, যাদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দুদককে আরও শক্তিশালী করা। এখনো সরকারের নেতারা বিভিন্ন উপলক্ষে বক্তৃতার সময় তাঁদের সেই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি করছেন।
সাক্ষাত্কারটিতে দুদক চেয়ারম্যান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি মনে করেন, দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে, তাঁর আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। তাই দুদক আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়ন করলে দুদকের ক্ষমতা হ্রাস পাবে, শেখ হাসিনা যত দিন প্রধানমন্ত্রী আছেন, তত দিন সেগুলো অনুমোদন পাবে না—এ রকম প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান।
মনে প্রশ্ন জাগল, যে দেশে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিপরীতে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ ছাড়া আর কেউ কিছু করার বা বলার সাহস রাখে না, সে দেশে সরকার দুদককে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আইন সংশোধনের সুপারিশ করার জন্য যে কমিটি গঠন করেছে, সে কমিটির কাছে কি প্রধানমন্ত্রীর দুদককে শক্তিশালী করার বার্তাটি পৌঁছায়নি? কমিটি কেন এমন কিছু সুপারিশ করেছে, যেগুলো বাস্তবায়ন করলে একটি নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে দুদকের রূপান্তর সম্পূর্ণ হবে? কমিটি কি এই বুঝেছে যে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের নীতিনির্ধারকেরা দুর্নীতি দমন কমিশনকে আবার দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে পরিণত করতে চাচ্ছেন?
ওই কমিটি দুদক আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে কতগুলো সুপারিশ পেশ করেছে এবং সেগুলো কী কী, তা বিশদ জানি না। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত খবর থেকে যে দুটি বিষয় জানা গেল তার একটি হচ্ছে: সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে হলে দুদককে সরকারের পূর্বানুমতি নিতে হবে। সরকার অনুমতি না দিলে দুদকের ক্ষমতা থাকবে না কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে কিছু করার—না তদন্ত, না মামলা দায়ের। যত দূর জানি, এ রকম বিধান চালু ছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরোর সময়, যখন ওই সংস্থাটি পরিচালিত হতো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে। অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দুর্নীতি দমন ব্যুরো বস্তুত দুর্নীতি বিষয়ে কিছুই করার ক্ষমতা রাখত না। ফলে ব্যুরো ছিল কার্যত একটি অকার্যকর সংস্থা। কমিটির আরেকটি সুপারিশ এ রকম যে বর্তমান আইনের বলে দুদক তদন্তের স্বার্থে সরকারের গোপনীয় নথিপত্র দেখার যে ক্ষমতা রাখে, আইন সংশোধনের পর দুদকের সে ক্ষমতা আর থাকবে না। বলা হচ্ছে দুদককে আরও শক্তিশালী করা হবে, কিন্তু সুপারিশ করা হচ্ছে এমন, যাতে তার উল্টোটা ঘটে। দুদককে আরও ক্ষমতাশালী করতে হবে—এই যদি হয় সরকারের ইচ্ছা, তাহলে প্রথমেই খতিয়ে দেখা দরকার, বিদ্যমান দুদক আইনে কী কী দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা আছে। সংশোধনী আনা উচিত সেই দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করার লক্ষ্যে, আরও ক্ষমতা প্রদানের জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দুদকের বর্তমানে যেটুকু ক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোও যেন আর না থাকে, সেই মর্মে আইন সংশোধনের সুপারিশ করা হচ্ছে।
দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহার (দুদকের সংজ্ঞা অনুযায়ী মূলত এটাই দুর্নীতি) ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া, দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের বছরের পর বছর চ্যাম্পিয়ন হওয়া ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে এ দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে ওঠে। নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভূমিকা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ক্রমাগত চাপ, সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী ব্যাপক প্রচারণার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোও বক্তৃতায়-ভাষণে, নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অঙ্গীকার করতে বাধ্য হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত ঠুঁটো জগন্নাথ দুর্নীতি দমন ব্যুরো ভেঙে দিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মনে পড়ে, দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান নিয়োগ লাভের পর পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম আলোয় এক বড়সড় নিবন্ধ লিখেছিলেন। ‘যদি হতে পারতেম দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান!’ শিরোনামের তাঁর সে নিবন্ধে থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি: ‘ইস, বাংলাদেশের সবচেয়ে সোজা কাজের দায়িত্বটা বিচারপতি সুলতান হোসেন খান পেয়ে গেলেন! কী ভাগ্যবান তিনি। মনে মনে এমনও ভাবলাম—আহা, এ কাজটা যদি আমি পেতাম, কী মজাটাই না হতো। এমন এক দায়িত্ব, যেখানে গাছে না চড়তেই কাঁদি কাঁদি ফল পাওয়া খুবই সোজা। এটা যে একেবারে সহজ কাজ, এ ব্যাপারে আশা করি দেশের সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন।’(প্রথম আলো, ৩০ মে ২০০৫)
মুহাম্মদ ইউনূসের এ কথাগুলো পরিহাসের মতো মনে হতে পারে। বাস্তবে তো দেখা যাচ্ছে দুর্নীতি দমন করা, দুর্নীতিবাজদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো এ দেশে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি—দণ্ড দিয়ে সেই দণ্ড পূর্ণ মেয়াদে ভোগ করানো তো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু যে অনৈতিক বাস্তবতাকে আমরা মেনে নিয়েছি, তা যদি এমন সর্বগ্রাসী না হতো, যদি নির্বাহী ক্ষমতাই সর্বময় না হতো, যদি দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত, তাহলে দুর্নীতি দমন করা এতটা কঠিন হতো না। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের শেষের দিকে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হয়েছে ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে ব্যুরো থেকে কমিশনের কোনো পার্থক্যই দৃশ্যমান হয়নি। দুর্নীতি বন্ধ হওয়া দূরে থাক, বরং আরও বেড়েছে। জোট সরকারের বাকি মেয়াদে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার কী লাগামহীন হয়ে উঠেছিল, তা দেশবাসী দেখেছে। বিচারপতি সুলতান হোসেন খান তত্কালীন সরকারের অনুগ্রহভাজন ছিলেন বলে নির্বাহী ক্ষমতা দুদকের আইনি (কাগুজে) স্বাধীনতাকে অর্থহীন করে দিতে পেরেছিল।
দুদকের স্বাধীনতার কিছু স্বাক্ষর দেখা গিয়েছিল জরুরি অবস্থাকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে: দুদক, সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের ব্যাপারে অভিন্ন নৈতিক অবস্থানের কারণেই মূলত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলতে পেরেছিল; প্রক্রিয়াগত ভুলত্রুটি হলেও অনেক মামলা হয়েছিল অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এক হাজার ১০০-এর বেশি মামলা করেছিল দুদক। বসেছিল বিশেষ আদালত, অনেককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, অনেকে পালিয়ে ছিলেন। অন্তত ৮০ জন ব্যক্তি দণ্ড পেয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রীসহ অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ছিলেন। তখন দুদকের ওপর নির্বাহী বিভাগের চাপের প্রসঙ্গ শোনা যায়নি। সে কারণে দুদকের স্বাধীনতার চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ছিল সরকারের সমন্বয় ও সহযোগিতার বিষয়গুলো। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, নির্বাচিত দলীয় সরকারের সময়ে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গ ও সাংবিধানিক/স্বতন্ত্র/স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক যতটা না সমন্বয়-সহযোগিতামূলক, তার চেয়ে বেশি কর্তৃত্বমূলক হয়। নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কর্তৃত্বের প্রবণতা কাজ করে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যে দুদক চেয়ারম্যানের পদ থেকে হাসান মশহুদ চৌধুরীর ইস্তফা প্রথম এই সংশয় বয়ে এনেছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদক যতটা স্বাধীনভাবে কর্ম সম্পাদন করতে পেরেছে, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তেমনটি আর সম্ভব হবে কি না। হবে না আঁচ করতে পেরেই সম্ভবত তিনি অব্যাহতি নিয়েছেন। হাসান মশহুদ চৌধুরী অবশ্য তাঁর পদত্যাগের কারণ হিসেবে সে রকম কিছু বলেননি; ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন গোলাম রহমান, যিনি একজন সজ্জন বলে পরিচিত এবং যাঁর কথাবার্তায় মনে হচ্ছে দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে তাঁর আন্তরিক অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু দুদক আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সামনে সত্যিই এক বিপদ এসে হাজির হয়েছে। এই বিপদ এসেছে নির্বাহী ক্ষমতার পক্ষ থেকে। কেবল দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছার ওপর ভরসা রেখেই এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন হবে। দুদককে দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মতো নির্বাহী ক্ষমতার অধীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে গোটা আমলাতন্ত্র এবং যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, যারা সে ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করতে চায় জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থেকে, তারা সবাই। প্রধানমন্ত্রীকেও তারা প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। সরকারি দলের দুর্নীতিবাজদের চাপও কম নয়। দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রতিদিন দুদকের কাছে তালিকা পাঠানো হচ্ছে; ইতিমধ্যে মধ্যে ১০০-এর বেশি মামলা রাজনৈতিক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহারের আবেদন জমা হয়েছে এবং তালিকা আসা অব্যাহত আছে। শুধু বিচারাধীন মামলা নয়, নিম্ন আদালতে সাজা হয়েছে, এমন মামলাও প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী কি অবগত নন, কী অভিযোগে, কাদের বিরুদ্ধে এসব মামলা? সবই কি মিথ্যা, ভিত্তিহীন অভিযোগের মামলা? তা যদি হয়ও, আদালতেই সেটা প্রমাণিত হোক। মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের মধ্যে কি আইনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটে? আর, যাদের মামলা প্রত্যাহরের জন্য বলা হচ্ছে, তাঁরা কি কেবলই ক্ষমতাবলয় ও তার চারপাশের ঘনিষ্ঠ লোকজন নন? কাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য দুদককে বলা হচ্ছে, তার একটা তালিকা যদি দুদকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, তাহলে জনগণ তা দেখে ধারণা করতে পারবে, এই সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের স্বরূপ কেমন।
দুদক দুর্নীতি দমন করবে কী, নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব ও বিদ্যমান ক্ষমতাগুলো (দাঁত-নখ) রক্ষা করার জন্যই তাকে এখন প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে হবে। এই চেষ্টায় দুদকের সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও শামিল হওয়া কর্তব্য। সে জন্য দুদক আইন সংশোধনের লক্ষ্যে সরকারের গঠিত কমিটির সুপারিশগুলো দুদকের ওয়েবসাইটসহ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হোক; এগুলো সম্পর্কে জনগণের মতামত চাওয়া হোক, খোলা ফোরামে, সভা-সেমিনার-গোলটেবিল বৈঠকে, বেতার-টিভিতে আলোচনা-পর্যালোচনা হোক। দুদককে আরও শক্তিশালী করার জন্য বিদ্যমান আইনের যদি সংশোধন, সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন হয়, তবে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সেভাবে সংশোধনীর উদ্যোগ নিতে হবে। দুদককে দুর্বল করতে পারে, এমন কোনো সুপারিশ কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা চলবে না।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের ভাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত -নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন by ইব্রাহীম চৌধুরী,

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের ভাই আহমেদ ওয়ালি কারজাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ওয়ালি কারজাইকে নিয়মিত ভাতা দিয়ে আসছে। এ ছাড়া আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট কারচুপির অন্যতম নায়ক ছিলেন প্রেসিডেন্টের এ সহোদর। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস গতকাল বুধবার এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ওয়ালি কারজাইকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দিয়ে আসছে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার অঞ্চলে জঙ্গি দমনের জন্য আধাসামরিক বাহিনী গঠন করা হয়। এ আধাসামরিক বাহিনী গঠনের জন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়েছে ওয়ালি কারজাইকে।
আফগানিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ওয়ালি কারজাইয়ের। বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি আফিম উত্পাদিত হচ্ছে আফগানিস্তানে। এসব আফিম আফগানিস্তান থেকে পাচার হয় সারা বিশ্বে। বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী কোটি কোটি ডলারের এ অপরাধমূলক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকার থেকে শুরু করে প্রশাসনের লোকজন পর্যন্ত এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আফিম পাচার থেকেই তালেবানসহ জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের অর্থের জোগান পেয়ে আসছে। বিশ্বের সবচেয়ে সংগঠিত এ মাদক পাচার বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী। দক্ষিণ আফগানিস্তানে আফিম পাচার থেকে টোল আদায় হয় ওয়ালি কারজাইয়ের নামে।
বিতাড়িত তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের বাড়িটিও এখন ওয়ালি কারজাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। মার্কিন সমর্থিত যৌথ বাহিনী জঙ্গি দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য বাড়িটি ভাড়া নিয়েছে ওয়ালি কারজাইয়ের কাছ থেকে।
নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সাম্প্রতিক বিতর্কিত নির্বাচনে ওয়ালি কারজাই ভুয়া ব্যালট পেপার তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন স্থানে তাঁবু খাটিয়ে ওয়ালি কারজাই বলেছেন, তাঁবুগুলো ভোটকেন্দ্র ছিল। জনমানবহীন এসব তাঁবু, ভোটকেন্দ্র আর ব্যালট পেপার ছিল হামিদ কারজাইকে নির্বাচন করার জন্য সাজানো নাটক।
তবে ওয়ালি কারজাই তাঁর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে কোনো অর্থ পাওয়ার কথাও তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন বাহিনীকে তিনি যথাসাধ্য সহযোগিতা করে আসছেন। খরচপাতির জন্য নিজের ভাই প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ পাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এ অর্থের উেসর কথা তাঁর অজানা।
আফগান বিষয়ে অভিজ্ঞ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
আফগানিস্তান প্রশ্নে ইতিমধ্যেই ওবামা প্রশাসন বিভক্ত। মার্কিন সেনা উপস্থিতিতেই ওই দেশে জঙ্গিবাদের নতুন করে উত্থান ঘটছে। আফিম পাচারের অঢেল অর্থে পুষ্ট তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী। সাধারণ আফগানদের কাছে ‘মার্কিন দালাল’ হিসেবে পরিচিত হামিদ কারজাইয়ের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায়। গত আগস্টের নির্বাচনে ভোট কারচুপি করে পশ্চিমাদের কাছে তাঁর সর্বশেষ গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন হামিদ কারজাই। তার ওপর ওয়ালি কারজাইকে নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন ওয়াশিংটনকে বিব্রত করে তুলেছে। আফগান বিষয়ে মার্কিন জনমত ইতিমধ্যেই চরমভাবে নেতিবাচক।
আফগানিস্তানে নতুন করে সেনা বাড়াবেন কি না এ নিয়ে ধীরলয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের শুরু করা যুদ্ধজট থেকে সরে আসার কৌশল নিয়েও ভাবতে হচ্ছে বর্তমান ওয়াশিংটন প্রশাসনকে।

মূল পরিকল্পনাকারী জঙ্গি নেতা ইশতিয়াক গ্রেপ্তার -পাকিস্তানে সেনা দপ্তরে হামলা

পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে এ মাসের শুরুতে ঘটা জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার পুলিশ লাহোর থেকে কারি ইশতিয়াক নামের ওই জঙ্গি নেতাকে গ্রেপ্তার করে। ইশতিয়াক পাঞ্জাব প্রদেশের তেহরিক-ই-তালেবানের নেতা। জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, পুলিশ পরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁর আরও সাত সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
১০ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির সেনা সদর দপ্তরে জঙ্গিরা হামলা চালায়। দুই দিনব্যাপী ওই হামলার সময় টেলিফোনে অনুসারীদের হামলা সম্পর্কে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন ইশতিয়াক। ওই হামলায় আট সেনা সদস্যসহ মোট ১৯ জন নিহত হন।
পুলিশ ইশতিয়াকের কাছ থেকে চারটি কালাশনিকভ বন্দুক, ১০টি গ্রেনেড, একটি রকেট লঞ্চার ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত জারদারির

পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ দেওয়া-সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি।
কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী কামার জামান কায়রা একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী গিলানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট জারদারি। বৈঠকে দেশের বর্তমান নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, বেশ কিছু দায়দায়িত্ব পার্লামেন্টের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জারদারি। এক প্রশ্নের জবাবে কায়রা বলেন, চার্টার অব ডেমোক্রেসির (সিওডি) আলোকে সংবিধান সংশোধনীর খসড়া প্রস্তুত করার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জারদারি এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) প্রধান নওয়াজ শরিফ মতৈক্যে পৌঁছেছেন।
সূত্রমতে, সংবিধান সংস্কারের খসড়া প্রণয়নের কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত পার্লামেন্টারি কমিটিকে তাগাদা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী গিলানিকে অনুরোধ করেছেন জারদারি।
পার্লামেন্টের আসন্ন অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হতে পারে। আগামী মাসের ২ তারিখে পার্লামেন্টে অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা।

যানজট দূরীকরণ বনাম শিশুবান্ধব সময়সূচি -শিক্ষকের কথা by মো. সিদ্দিকুর রহমান

‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি’—এই তো হওয়া উচিত শিশুর প্রতিজ্ঞা। প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে স্কুলে যাবে, বেলা গড়ানোর আগেই বাসায় ফিরে খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেবে, বিকেলে খেলাধুলা করবে—শিশুর সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশের জন্য এই তো চাই। শিশুরাও তাই চায়। কিন্তু আমরা চাই পরিবর্তন। শুভ, অশুভ যা-ই হোক না কেন, পরিবর্তন হতেই হবে। তা না হলে দিন যে বদল হচ্ছে, তা তো বোঝা যাবে না। আর তাই পরিবর্তনের জন্য শিশুদেরও বলি দিতে ছাড়ি না।
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি সকাল নয়টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল চারটা ১৫ মিনিট করা হয়েছে। তা সত্যিই চিন্তাসাপেক্ষ। বিগত সময়ে সর্বস্তরের প্রতিনিধি যেমন—শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের থানা/উপজেলা, জেলা, উপ-পরিচালকসহ প্রায় সর্বস্তরের কর্মকর্তা, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, সাংবাদিক, পেশাজীবীদের সমন্বয়ে তত্কালীন সচিব তাহমিনা বেগমের সভাপতিত্বে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী (মোট চারটি) মহানগরের জন্য শিশুবান্ধব সময়সূচি ঘোষিত হয়েছিল। এ সময়ে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক নিয়মে পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন কাজ সারতে পারত। কিন্তু বর্তমান সময়সূচি অনুসারে একই সময়-কাল বিদ্যালয়ে অবস্থান করলেও বেলা যত গড়াতে থাকে, শিক্ষার্থীরা তত ক্লান্ত বোধ করে। দিনের দ্বিতীয় ভাগে (টিফিনের পর) তাদের পাঠে মনোযোগ ধরে রাখা সত্যিই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ সময়টাকে তাদের কাছে বড্ড বেশি দীর্ঘ মনে হয়। পরিশ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর তারা কোনো কাজেই আর উত্সাহ বোধ করে না। বাড়িতে পরের দিনের পাঠ-প্রস্তুতি নেওয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয় না।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ অভিভাবক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়ে যান। বেশির ভাগ অভিভাবকই কর্মজীবী। দেখা যায়, মা-বাবা অফিসে যাওয়ার পথে তাঁদের ছেলেমেয়েকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়ে যান। বর্তমানে বিদ্যালয়ের সময় ও অফিস সময় একই হওয়ায় কোনো অবস্থাতেই তাঁদের সন্তানদের পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক শিশুর পক্ষে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। আগের সময়সূচি অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা দুপুরে ছুটির পর আহারাদি সেরে ঘুমের পর খেলাধুলা বা অন্যান্য বিনোদনের সুযোগ পেত। আর এখন ক্লান্ত শরীর চায় বিছানায় যেতে, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা জানিয়ে দেয় কখন খেলার লগ্ন বয়ে যাবে। তারা না পারছে শরীরের ক্লান্তি অগ্রাহ্য করতে, না পারছে মনের ইচ্ছাকে অবদমিত করতে। তাদের মধ্যে কাজ করছে এক সীমাহীন অস্থিরতা। বর্তমানে টিফিনের সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যাহ্নভোজের জন্য বাড়িতে যেতে হচ্ছে। খাবারের পর যে ক্লান্তি আসে, তা অগ্রাহ্য করে শিক্ষার্থীদের একাংশের পক্ষে বিদ্যালয়ে আবার উপস্থিত হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উপস্থিতি ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাবা-মাকে শুধু পরিবারের কাজে নয়, আয় রোজগারমূলক কাজেও সাহায্য করে। দারিদ্র্যের কারণে সে তা করতে বাধ্য। বর্তমান সময়সূচি তাকে এই কাজ থেকে দূরে তো সরাতে পারবেই না, বরং এর অবশ্যম্ভাবী ফল হলো ঝরে পড়া। আর কেউ যদি মোটামুটি সামর্থ্যবান হয়, তবে সে বেসরকারি বিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকবে। কারণ, সেসব বিদ্যালয়ের সময়সূচি অপরিবর্তিত আছে।
বর্তমান অফিস সময়সূচি ও বিদ্যালয়ের সময়সূচি একই হওয়ায় ঢাকা শহরের যানজট পরিস্থিতির অবনতি নিশ্চিত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে আসতে হয় দূর-দূরান্ত থেকে, যাদের এই যানজট মোকাবিলা করে তবেই পৌঁছাতে হবে। যানজট নিরসনে সরকারের এই অবাস্তব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শিক্ষার যেকোনো পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িত কোমলমতি শিশুরা। তাই এর যেকোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের আগে নিশ্চিত করতে হবে শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষা। তাই শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে দেওয়ার স্বার্থেই আগের বিদ্যালয় সময়সূচি অবিলম্বে বহাল করা উচিত। শিশু শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক সুস্থতাসহ আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে যানজট নিরসনে আগের সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা দুইটা ১৫ মিনিট সময়সূচি বহাল হোক—এ প্রত্যাশা রইল।
মো. সিদ্দিকুর রহমান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি।

মুক্তি পেল পপসম্রাটকে নিয়ে তথ্যচিত্র ‘দিস ইজ ইট’

মৃত্যুর চার মাস পর পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের আলোচিত সেই তথ্যচিত্র দিস ইজ ইট-এর শুভমুক্তি হলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৮টি শহরে গত মঙ্গলবার ওই তথ্যচিত্র একযোগে মুক্তি পায়। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার লস অ্যাঞ্জেলেসে এক জমকালো প্রদর্শনীতে উপস্থিত হয়েছিলেন হলিউডের নামীদামি তারকাদের পাশাপাশি পপসম্রাটের পরিবারের সদস্যরা। লন্ডনে ওটু অ্যারেনায় পপসম্রাটের প্রত্যাবর্তন কনসার্টের মহড়ার দীর্ঘ ১০০ ঘণ্টার ভিডিও থেকে ওই তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্রের নির্মাতা কেনি ওরতেগা বলেন, ‘এটি হলো আমাদের নায়ক ও বন্ধুর (পপসম্রাট) সর্বশেষ অজানা প্রামাণ্যচিত্র।’ স্টেপলস সেন্টারের নইকা থিয়েটারে ওই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন উইল স্মিথ, জেনিফার লোপেজ, প্যারিস হিল্টন, কেটি পেরি, জেনিফার লাভ হিউইট এবং মোটাউন রেকর্ডের প্রতিষ্ঠাতা বেরি গর্ডি জুনিয়রের মতো তারকারা। লাল গালিচার ওই অনুষ্ঠানে সবাই উপস্থিত ছিলেন, শুধু ছিলেন না যাঁকে নিয়ে ওই আয়োজন, সেই পপসম্রাট।
তবে ওই প্রদর্শনীর বাইরে পপসম্রাটের কিছু ভক্ত এ সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তারা দাবি করেছে, ওই তথ্যচিত্রে জ্যাকসনের নাজুক স্বাস্থ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তারা ওই তথ্যচিত্রকে ‘দিস ইজ নট ইট’ বলেও আখ্যা দেয়। লন্ডনের কনসার্টের আয়োজক এইজি কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করে তারা জানায়, ওই কোম্পানি জ্যাকসনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ দিয়েছিল, যার কারণে পপসম্রাট মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এরই মধ্যে তিনি ২৫ জুন মারা যান।
এ ছাড়া বেলজিয়াম, বলিভিয়া, ব্রাজিল, ডেনমার্ক, জার্মানি, হাঙ্গেরি, কোরিয়া, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পেরু, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইজারল্যান্ড, উরুগুয়ে, যুক্তরাজ্য ও নিউইয়র্কে এই তথ্যচিত্রের প্রদর্শনী হয়েছে। শিগগিরই আরও ১১০টি দেশে তথ্যচিত্রটি মুক্তি পাবে। ছবির পরিবেশক সনি ইতিমধ্যে ১৫ হাজার প্রিন্ট তৈরি করে রেখেছে।

জঙ্গিদের ঘাঁটি ধ্বংস করা পাকিস্তান সরকারের প্রধান দায়িত্ব

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাকিস্তানের প্রতি জঙ্গি দমনের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার কাশ্মীরে এক সফরকালে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জঙ্গিদের ঘাঁটি ধ্বংস এবং তাদের সব অবকাঠামো উচ্ছেদ করা পাকিস্তান সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের মানুষই চায়। কিন্তু এই শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনার আগে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অবশ্যই সন্ত্রাসবাদকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা অনন্তনাগে একটি রেলপথের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মনমোহন সিং বলেন, জঙ্গিরা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, পাকিস্তান সরকারের উচিত তাদের নিশ্চিহ্ন করা।
মনমোহন সিং বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষ প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বন্ধুসুলভ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়। তারা স্থায়ী শান্তি চায়। এটা আমাদের দেশের মানুষও চায়।’ তিনি জানান, মানবিক ও অন্যান্য বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ভারত প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গতকাল কাশ্মীর উপত্যকায় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিতর্কিত কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এখন পর্যন্ত দুটি যুদ্ধ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মনমোহন সিং বলেন, দুই দেশের মধ্যকার শান্তিপ্রক্রিয়া নস্যাত্কারী জঙ্গিগোষ্ঠীকে দমন করার এটাই হচ্ছে পাকিস্তানের জন্য মোক্ষম সময়।
কাশ্মীরে দুই দশক ধরে ভারতবিরোধী জঙ্গি তত্পরতা চলছে। ভারত বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তান এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং উসকানি দিচ্ছে। তবে পাকিস্তান সব সময়ই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। জঙ্গি হামলার ঘটনায় কাশ্মীরে এ পর্যন্ত ৪৭ হাজার মানুষ মারা গেছে। তবে ২০০৪ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে কাশ্মীরের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় জঙ্গি তত্পরতা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সর্বশেষ মুম্বাই হামলার পর ভারত এই শান্তি আলোচনার পথ থেকে সরে আসে। ভারত মুম্বাই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের দায়ী করেছে।
মনমোহন সিং কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। কাশ্মীরে সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিন শেষ হয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাশ্মীরের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাঁর সরকার প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরে শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার পক্ষে যাঁরা কাজ করতে চান, আমরা তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি।’
প্রধানমন্ত্রীর কাশ্মীর সফরের প্রতিবাদে সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো ধর্মঘটের ডাক দেয়। অনন্তনাগ ও কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। শ্রীনগরে গতকাল সন্ধ্যায় নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে মনমোহন সিং এক বৈঠক করেন।
এ মাসের শুরুর দিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেছিলেন, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে আলোচনায় বসা যেতে পারে। সরকারের এই ঘোষণাকে মধ্যপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্বাগত জানালেও কট্টরপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো এর বিরোধিতা করে। তারা দাবি করেছে, এ ধরনের আলোচনায় বসার আগে ভারত সরকারকে কাশ্মীর থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। ২০০৬ সালে সর্বশেষ দিল্লি সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়।
গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কাশ্মীর সফরকালে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীও উপস্থিত ছিলেন।

রাজ্য নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিপর্যস্ত by জগলুল আহেমদ চৌধূরী

ভারতের সদ্যসমাপ্ত রাজ্য নির্বাচন দেশের শাসক দল কংগ্রেসকে উত্ফুল্ল করেছে, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) হতাশ করেছে। তিনটি রাজ্য—মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও অরুণাচল প্রদেশের বিধানসভার নির্বাচন ছিল এ বছরের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় নির্বাচনের পর বড় ও আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দলগুলোর জনপ্রিয়তার একটি কঠিন পরীক্ষা। কংগ্রেস লোকসভার নির্বাচনে জয়ী হয়ে ভারতে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং বিজেপির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা অন্তত আরও প্রায় পাঁচ বছরের জন্য তিরোহিত হয়েছে। এ পটভূমিকায় তিনটি রাজ্য নির্বাচন ছিল বেশ তাত্পর্যপূর্ণ এবং সে কারণে এ ভোটপর্বের ফলাফলের দিকে দেশ-বিদেশের অনেকেরই দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। বিশ্লেষকেরা ফলাফল নিয়ে বেশ দ্বিধাবিভক্তই ছিলেন, বলা যেতে পারে এ কারণে যে, রাজ্যগুলোতে ক্ষমতায় থাকার কারণে কংগ্রেস ও তার মিত্ররা জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সমর্থ হবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোটগুলো আবারও এসব রাজ্যে সরকার গঠন করতে সক্ষম হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের পর বিজেপির হতাশা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে এবং এতে সংগঠনে মতভেদ ও কোন্দল আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এ তিনটি রাজ্যের নির্বাচনের মধ্যে পশ্চিমের মহারাষ্ট্রই ছিল সবার আগ্রহ ও কৌতূহলের কেন্দ্রে। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে পরিচিত মহারাষ্ট্রে এবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারণা করা হয়েছিল কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের শাসক মোর্চার সঙ্গে বিজেপি ও শিবসেনা আঁতাতের। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দল কেন্দ্রীয় নেতা শারদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস আশাতীত সাফল্য অর্জন করেই জয়ী হয়েছে। সাম্প্রদায়িক বলে বিবেচিত বিজেপি ও তার মিত্র প্রচণ্ডভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বাল থ্যাকারের শিবসেনার বিপর্যয় সাম্প্রদায়িক শক্তির জন্য আরও একটি আঘাত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে এবং ফলাফলে তাদের হতাশাও ফুটে উঠেছে।
মহারাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবেও ভারতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত লোকসভার ভোট নিয়ে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মোর্চার মধ্যে যে ভালো লড়াই হয়নি, তা নয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে মুম্বাইয়ে শাসরুদ্ধকর সন্ত্রাসী হামলা রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে একটি নতুন বিতর্কিত মাত্রা যোগ করেছিল। শহরের আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসীদের আক্রমণে প্রায় দেড় শ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং কয়েক শ আহত হয়। পাকিস্তান প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করে যে সন্ত্রাসীরা সেই দেশ থেকেই ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল। একজন সন্ত্রাসী ছাড়া বাকি পাঁচজন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়। একমাত্র জীবিত হামলাকারী আজমল কাসাব ধরা পড়ে এবং ভারতে বিচারাধীন। অন্যদিকে নয়াদিল্লি এ হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে ইসলামাবাদের কাছে এবং বিষয়টি তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দারুণভাবে বিঘ্নিত করেছে। পাকিস্তান বলেছে, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না; তবে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছে। কিন্তু ভারত এ বিচারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মুম্বাই হামলা লোকসভা ও মহারাষ্ট্রের রাজ্য নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিজেপি ও শিবসেনা অভিযোগ করেছে, ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীতে এমন চাঞ্চল্যকর হামলা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা পাকিস্তানকে ‘যথাযথ শিক্ষা’ দিতে এমনকি দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধেরও পক্ষপাতী। কিন্তু মনমোহন সরকার এ হামলার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করা সত্ত্বেও কূটনীতি ও সংযমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েনস (ইউপিএ) সরকারের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতাই প্রতিফলিত হয়েছে। জাতীয় ও রাজ্য নির্বাচনে জনগণ সেই অবস্থানকেই সমর্থন করেছে; তবে মহারাষ্ট্র নির্বাচনে একটি নতুন দল বেশ সফলতা পেয়েছে অনেকটা অভাবিতভাবে। এ দলের নেতা রাজ থ্যাকারে আগে শিবসেনা নেতা বাল থ্যাকারেরই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নীতি ও ব্যক্তিগত কারণে তিনি মহারাষ্ট্র নাভারিমান সেনা (এমএনএস) গঠন করে শিবসেনা থেকে সরে আসেন। অবশ্য, এ দলের উদ্ভব ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কংগ্রেস ও মিত্রদের নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক শক্তিতে ভোটবিভক্তির মাধ্যমে জয়লাভে কার্যকরভাবে সহায়তা করেছে সন্দেহাতীতভাবে। হরিয়ানা রাজ্য ছোট হলেও হিন্দিভাষী প্রভাবশালী অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। এখানে কংগ্রেস কোনোভাবে জয় পেতে সক্ষম হয়েছে, যদিও আসনসংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। রাজ্যের বিধানসভায় এবার আর কংগ্রেস সরাসরি জয় পায়নি; তবে স্বতন্ত্র সদস্যদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করার মতো শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং এতেই কংগ্রেস সন্তুষ্ট। বিজেপির শক্তি এখানে তেমন ছিল না এবং যতটুকু ছিল, সেটাও কমেছে। তবে রাজ্যের আঞ্চলিক দল হরিয়ানা লোকদল, যা কিনা সাবেক ভারতীয় উপপ্রধানমন্ত্রী দেবীলালের ছেলে ওম প্রকাশ চৌতালার নেতৃত্বে পরিচালিত, বেশ সাফল্য পেয়েছে এবং কংগ্রেসের পরই দ্বিতীয় স্থান পেতে সক্ষম হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব অরুণাচলের নির্বাচন সেভাবে ততটা তাত্পর্যপূর্ণ ছিল না; তবে গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিকভাবে এ রাজ্যের নাম উঠে এসেছিল অন্য কারণে। সেটা হলো, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন নিজ দলের জন্য নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সেখানে সফরে যান, প্রতিবেশী দেশ চীন সে সফর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। বেইজিং এ রাজ্যকে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল মনে করে এবং এর বিস্তীর্ণ এলাকাকে নিজেদের অঞ্চল বলে দাবি করে আসছে। এটা চীন-ভারত সীমান্ত সমস্যা। নির্বাচনে কংগ্রেসই ভালো করেছে।
তিনটি রাজ্যের নির্বাচনে, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় বিজেপি ও মিত্রদের পরাজয় নিঃসন্দেহে ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরও দুর্বল করে দেবে। বিজেপিই এ শক্তির প্রধান অবয়ব এবং জাতীয় নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর রাজ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটি মানসিক ও সাংগঠনিক শক্তি ফিরে পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনের পর এ দলের মধ্যে বিভাজনও পরিলক্ষিত হচ্ছে। কট্টরপন্থী সভাপতি রাজনাথ সিং, সাবেক সংগঠনপ্রধান ও পার্লামেন্টে দলীয় নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি আর সাবেক তথ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজরা মনে করছেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি গ্রহণ করেই দলকে আবার চাঙা করা সম্ভব। তাঁদের সঙ্গে আছেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিতর্কিত নরেন্দ্র মোদী, যাঁর উগ্র সাম্প্রদায়িকতা সবারই জানা। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও উদারপন্থী হিসেবে বিবেচিত অটল বিহারি বাজপেয়ি ও অন্যরা উগ্র হিন্দুত্ববাদের সমর্থক নন। অবশ্য বাজপেয়ি শারীরিক কারণে আর আগের মতো সক্রিয় নন। তাঁর ঘনিষ্ঠজন সাবেক অর্থ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিংকে বিজেপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহকে প্রশংসা করে বই লেখার জন্য। কট্টরপন্থীরা সুযোগ বুঝে উদারপন্থী এ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এখন দলে কট্টরপন্থীদের প্রাধান্য হলেও জাতীয় ও সদ্যসমাপ্ত রাজ্য নির্বাচন প্রমাণ করে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ভারতীয় রাজনীতিতে সুবিধা করতে পারছে না। এবং এটা শুভ লক্ষণ।
জগলুল আহেমদ চৌধূরী: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।

‘কালো মঙ্গলবার’-এর ৮০তম বার্ষিকী আজ

আজ ‘কালো মঙ্গলবার’-এর ৮০তম বার্ষিকী। ১৯২৯ সালের এই দিনে আমেরিকায় শেয়ারবাজারে বিরাট ধস নামে। দিনটি ছিল ২৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার। এদিন এক ধাক্কায় এক কোটি ৬০ লাখ শেয়ার বিক্রি করে দেয় বিনিয়োগকারীরা। ফলে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারসূচক পড়ে যায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। চারদিকে আতঙ্ক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
বিশের দশকের শুরু থেকেই আমেরিকার শেয়ারবাজার ক্রমেই ফুলে-ফেঁপে উঠতে থাকে। লোকজন ব্যাংক থেকে সঞ্চিত অর্থ তুলে নিয়ে শেয়ার কেনা শুরু করে। সম্পত্তি বন্ধক দিয়েও টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে ছুটে আসে মানুষ। একপর্যায়ে ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের ডাও জোনস সূচক ৩৮১ পয়েন্টে উন্নীত হয়। তার পরই শুরু হয় দর পতন। কারণ, বাজার তখন অস্বাভাবিক উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল।
দর পতনের কারণে অনেকেই শেয়ার বিক্রির জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এই চাপ আরও দর পতন ঘটায়। ২৪ অক্টোবর, বুধবার এক কোটি ২৯ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়, যার বড় অংশই ছিল বিক্রি। তবে সূচক মাত্র ছয় পয়েন্ট পড়ে। কারণ, ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে ছুটে আসে শেয়ার কিনে নিয়ে আতঙ্ক ঠেকাতে। তাতে কাজ হয়নি। ২৮ অক্টোবর, সোমবার আবারও দর পতন। বাজারে সূচক কমে যায় ১২ পয়েন্ট। এর পরের দিন মঙ্গলবার বাজার শেষ হয় ১৯৮ পয়েন্টে—এক মাসের ব্যবধানে ১৮৩ পয়েন্ট পতন।
এক সপ্তাহে ওয়ালস্ট্রিটে এই বিরাট ধসের দিনগুলোকে ‘কালো বুধবার’, ‘কালো শুক্রবার’, ‘কালো সোমবার’ ও ‘কালো মঙ্গলবার’ বলে অভিহিত করা হয়। আমেরিকার ইতিহাসে বৃহত্তম এই শেয়ারবাজার বিপর্যয় হাজার হাজার মানুষকে পথে বসায়। লালবাতি জ্বলে যায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের।

ঢেউটিনের ছোট কারখানাগুলো সহায়তা চায়

দেশীয় ঢেউটিন প্রস্তুতকারী ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দাবি জানিয়েছে এই খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ করোগেশন অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে সমিতি দেশের মানুষকে কম মূল্যে ঢেউটিন সরবরাহের জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েছে।
সমিতির নেতারা ছোট ও মাঝারি আকারের ঢেউটিন উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার না চালানোর এবং প্রমাণ ছাড়া কারখানার মালিকদের কোনো ধরনের হয়রানি না করার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ করোগেশন অ্যাসোসিয়েশন এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানায়। এতে মূল বক্তব্য দেন সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ সামসুল হক। এ সময় সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ কামাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খাজা নিহাল, অর্থ সম্পাদক আফজাল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মুহাম্মদ সামসুল হক বলেন, বাংলাদেশ করোগেশন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ঢেউটিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম মূল্যে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষদের উন্নতমানের ঢেউটিন সরবরাহ করছে। ঢেউটিন প্রস্তুতকারক বড় কারখানাগুলোর পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়।
সমিতির সভাপতি অভিযোগ করেন, এ কারণে এই কাজ বন্ধ করতে একটি চক্র ইতিমধ্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা সমিতির সদস্যদের বিরুদ্ধে নকল টিন বাজারজাত করার অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সামসুল হক আরও বলেন, দেশের বড় মিলগুলো টিন তৈরির কাঁচামাল হিসেবে প্রতিটন শিট আমদানিতে তিন হাজার ৮৯২ টাকা কর ও শুল্ক পরিশোধ করে। অন্যদিকে ছোট ঢেউটিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনে, ওই আমদানিকারকেরা প্রতিটন শিটে ১৫ হাজার ৬৩৭ টাকা কর ও শুল্ক পরিশোধ করে।
সমিতির সভাপতি জানান, কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা পেয়েও বড় বড় কারখানার মালিকেরা ৩৫ মিলিমিটার মানের প্রতি বান টিন পাঁচ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করেন। অথচ ছোট কারখানাগুলো একই মানের প্রতি বান টিন চার হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করে।
তা ছাড়া বড় বড় কারখানার ২৮ মিলিমিটার এক বান ঢেউটিনের ওজন প্রায় ৩৮ কেজি হলেও ছোট কারখানার তৈরি একই মানের এক বান টিনের ওজন প্রায় ৪৫ কেজি। বড় কারখানার তৈরি টিন পাঁচ বছর টেকসই হলে ছোট কারখানার টিন ৫০ থেকে ১০০ বছরেও কিছু হয় না।
মুহাম্মদ সামসুল হক বলেন, বিশ্বব্যাপী ঢেউটিন টন হিসেবে বিক্রি হয়। অথচ বড় প্রস্তুকারকেরা কেবল পিস হিসেবে বিক্রি করে।
এক প্রশ্নের জবাবে সমিতির সভাপতি জানান, দেশে ছোট ও মাঝারি আকারের প্রায় ৫০টি ঢেউটিন প্রস্তুতকারী কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ১৮টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার উত্পাদিত টিন নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। আর এসব কারখানায় উত্পাদিত টিনের বাজার অংশীদারিত্ব ৭০ শতাংশের বেশি।

৪৭ জন সিআইপি হলেন -এফবিসিসিআইয়ের ৯ পরিচালক বাদ পড়েছেন

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য সরকার ২০০৮ সালের জন্য ১৮ জনকে বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (রপ্তানি) হিসেবে নির্বাচন করেছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমিতি থেকে মোট ৩০ জনকে পদাধিকারবলে সিআইপি (ট্রেড) নির্বাচন করা হয়েছে।
তবে এফবিসিসিআইয়ের সহভাপতি আবু আলম চৌধুরী পদাধিকারবলে এবং হস্তশিল্প রপ্তানির জন্য সিআইপি নির্বাচিত হওয়ায় প্রকৃত সিআইপির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ জন।
অন্যদিকে পদাধিকারবলে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) পরিচালনা পর্ষদের ৩৮ জন সদস্যেরই সিআইপি নির্বাচিত হওয়ার কথা। কিন্তু ঋণখেলাপি, করখেলাপিসহ নানা কারণে নয়জনকে সিআইপি করা হয়নি।
তাঁরা হলেন এফবিসিসিআইয়ের প্রথম সহসভাপতি আবুল কাশেম আহমেদ, পরিচালক কামালউদ্দিন আহমেদ, আবদুল হক, মাতলুব আহমাদ, বেলায়েত হোসেন, জালালউদ্দিন আহমেদ, গোলাম দস্তগীর গাজী, সাহারুজ্জামান মোর্তজা ও এবায়দুল হক চান।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কাঁচা পাট রপ্তানিতে অবদান রাখার জন্য খুলনার দৌলতপুরের এফ আর জুট ট্রেডিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ মো. ফজলুর রহমান, দৌলতপুরের উত্তরা জুট ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সুজিত কুমার ভট্টাচার্য্য ও দৌলতপুরের রেজা জুট ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম রেজা; পাটজাত পণ্য রপ্তানির জন্য জনতা জুট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হক ও আকিজ জুট মিলের চেয়ারম্যান শেখ নাসির উদ্দিন; চামড়াজাত পণ্যের জন্য পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সায়ফুল ইসলাম; ওভেন পোশাকের জন্য ওপেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান সিনহা ও ইসলাম ড্রেসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম সিআইপি হয়েছেন।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতসহ খাদ্যের জন্য এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ খান চৌধুরী; কৃষিজাত দ্রব্যের জন্য গ্রিন ট্রেড হাউজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন; ওষুধ পণ্যের জন্য স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী; হস্তশিল্পজাত পণ্যের জন্য কনেক্সপোর স্বত্বাধিকারী আবু আলম চৌধুরী ও সানট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম এহছান; নিট পোশাকে (একক) স্কয়ার ফ্যাশনসের অঞ্জন চৌধুরী ও ফোর এইচ ফ্যাশনসের গাওহার সিরাজ জামিল; নিট পোশাকে (গ্রুপ) কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান; সিরামিকসের জন্য আর্টিজান সিরামিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ মাহমুদ এবং বিবিধ খাতের জন্য জয়পুরহাটের মো. আনোয়ারুল হক সিআইপি হয়েছেন।
পদাধিকারবলে যাঁরা সিআইপি হয়েছেন তাঁরা হলেন: এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আনিসুল হক, সহসভাপতি আবু আলম চৌধুরী, পরিচালক আফতাব-উল ইসলাম, আমিরুল হক, মো. হাসেন আলী, জুন্নুুন মাহমুদ খান, এ কে এম রফিকুল ইসলাম, মো. আবদুল হাই সরকার, কামরান টি রহমান, এস এম শফিউজ্জামান, কাজী বেলায়েত হোসেন, এ কে এম নূরুল ফজল বুলবুল, মো. রজ্জব শরীফ, মো. বজলুর রহমান, মো. কহিনুর ইসলাম, মো. শামসুল আলম, বিজয় কুমার কেজরিওয়াল, মো. সিরাজুল হক, মো. আমিনুল বারী, সামছুল হক, মাহবুব ইসলাম রুনু, আবু আলম চৌধুরী, ওবায়দুর রহমান, সাফকাত হায়দার, মো. ফারুকুল ইসলাম, মো. জসিম উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, দিলদার আহমেদ সেলিম, এম এ রউফ চৌধুরী, মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া বিকেএমইএর সভাপতি মো. ফজলুল হক সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন।
২০০৮ সালের জন্য যাঁরা সিআইপি নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা ২০০৬ সালের সিআইপি রপ্তানি নীতিমালায় বর্ণিত সুযোগ-সুবিধা পাবেন। তা ছাড়া ২০০৯ সালের সিআইপি নির্বাচন ও ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ওই সব সুবিধা ভোগ করবেন। তবে সিআইপি (ট্রেড) হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পদে আসীন থাকা পর্যন্ত সিআইপি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

সাংবাদিকতার জন্য অশনি সংকেত -সময়ের প্রতিবিম্ব by এবিএম মূসা

তথ্যমন্ত্রী সম্প্রতি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম সম্পর্কীয় দুটি বক্তব্য দিয়েছেন। এক. বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ সম্প্রচার ও অনুষ্ঠান পরিবেশনা একটি নীতিমালার আওতায় আনা হবে। দুই. সরকার সংবাদপত্র তথা সাংবাদিকদের আচরণবিধি প্রণয়ন করবে। তাপসের প্রাণনাশের জন্য বোমা হামলা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার, তেল-গ্যাস নিয়ে আন্দোলনের হুমকি, জঙ্গিবাদের বিস্তার, প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের একটু-আধটু নড়াচড়া ইত্যাকার চাঞ্চল্যকর ও আকর্ষণীয় সংবাদের মধ্যে তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যটি পত্রিকার পাতায় তেমন গুরুত্ব পায়নি। আমি কিন্তু একই চরিত্রের দুটি খবরের মধ্যে স্বাধীন সাংবাদিকতাচর্চার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বা মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণের খাঁড়া নেমে আসছে, এমন আভাস পাচ্ছি। এর বিপরীতে সাংবাদিকসমাজ, মানবাধিকার সংগঠন ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের যাঁরা অহর্নিশ বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তাঁদের কোনো প্রতিক্রিয়ার আভাস পাইনি। তাঁরা বোধহয় তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মাজেজা অথবা অন্তর্নিহিত সত্যটি অনুধাবন করতে পারেননি।
আমি পেরেছি, মানে তথ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণের ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দোহাই দিয়ে কী করতে চান, আমি তার আভাস পাচ্ছি। আমি ঘর পোড়া গরুদের অন্যতম, দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল সাংবাদিকতার অঙ্গনে বিচরণকালে আমি বহুবার স্বৈরাচারী ও নির্বাচিত প্রায় সব কটি শাসনামলে শাসকদের মুখে সংবাদপত্রের নীতিমালা, আচরণবিধি প্রয়োজনীয়তার কথা শুনেছি। সাংবাদিকদের শুধু ‘বস্তুনিষ্ঠ’ হওয়ার উপদেশবর্ষণ নয়, কীভাবে ভাতে মেরে, হাতে মেরে শেখানোর প্রচেষ্টা হয়, তাও বোঝার ও জানার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে প্রচেষ্টা কী রূপের ও কী চরিত্রের ছিল, তা নিয়ে প্রথমে সে আলোচনা করব, স্মৃতির ইতিহাস ঘাঁটব। পঞ্চাশের দশকে ভারত বিভক্তির অব্যবহিতপরের সময় থেকে আজ পর্যন্ত সরকারের ‘নসিহতের’ বর্ণনা দিয়ে সেসবের মাজেজা ব্যাখ্যা করব। আগের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সুদীর্ঘকালটি নিয়েও আলোচনা শুরু করতে পারতাম। কিন্তু সে সময়ে গণমাধ্যম বা সংবাদপত্র দেশে আর্থসামাজিক ও বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক জগতে তেমন প্রভাব ফেলত না। তাই সেই যুগ আলোচনা করে এই প্রতিবেদন দীর্ঘায়িত করতে চাই না। আপাতত দেশ বিভাগের পর ও ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান শেষে ‘স্বাধীন’ দেশে সাংবাদিকতার ও সাংবাদিকদের শাসকেরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন, স্বল্পাকারে তা-ই স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে তুলে আনব। বলা বাহুল্য, সেসব নিয়ন্ত্রণ এসেছে বাহ্যত আচরণবিধি নির্ধারণ ও বস্তুনিষ্ঠতা শেখানোর অছিলায়।
প্রসঙ্গত, স্বৈরতান্ত্রিক আমল থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের নিশ্চয়তা প্রদানকারী সরকারের শাসনকালে সাংবাদিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা কীভাবে চলমান রয়েছে, তা স্মরণ করতে হবে। একই সঙ্গে নীতি ও আচরণ নির্ধারণের অজুহাতে শৃঙ্খলিত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অতীতের সাংবাদিকসমাজ, পাঠকেরা ও সংবাদপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতিহত ও প্রতিরোধ করার ইতিবৃত্ত আলোচনায় আসবে। প্রথমে জানাই আদি পর্বে শুধু এ অঞ্চলে তথা পূর্ব পাকিস্তানে মোসলেম লীগ সরকারের আমলে সংবাদপত্র দলনের ইতিবৃত্ত। সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে দেশে কোনো দৈনিক পত্রিকা ছিল না। ঢাকা ও কয়েকটি জেলা সদরে ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা। সেসবের মিলিত প্রচারসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। পূর্ব পাকিস্তানে যখন প্রথম অসন্তোষের আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, তখন সাপ্তাহিকগুলোই সীমিত পরিধিতে সেই আগুন একটু-আধটু উসকে দিচ্ছিল। প্রচারসংখ্যা সীমিত হলেও এসব সাপ্তাহিক পত্রিকার শিক্ষিত ও রাজনীতিসচেতন জনগণের মধ্যে প্রভাব ছিল অপরিসীম। শাসকগোষ্ঠী সেই প্রভাবের প্রভা অনুধাবন করল প্রথম ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে। সীমিত প্রভাব বিস্তারকারী সাপ্তাহিকগুলোর ওপর খড়গ নেমে এল। নিষিদ্ধ করা হলো ঢাকায় ইনসাফ, সিলেটের নওবেলাল, ফেনীর সংগ্রাম, চট্টগ্রামের সীমান্ত। পরবর্তীকালে যখন দু-চারটি দৈনিকের আত্মপ্রকাশ ঘটল, তখনো সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা অব্যাহত রইল। বন্ধ করা হলো সদ্যপ্রকাশিত ইংরাজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার ও চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান। সম্পাদকদের কয়েকজন জেলে গেলেন।
প্রথম দিকে সাংবাদিকতার ওপর আদিতে যেসব আঘাত এসেছিল, তার প্রতিবাদ ও প্রতিহত করার জন্য কোনো সংঘবদ্ধ সাংবাদিকসমাজ তখনো গড়ে ওঠেনি। তবে ক্রমান্বয়ে এ অঞ্চলের জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ-সচেতনতার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে কারণে সংবাদপত্রের এবং সাংবাদিকতার ওপর আঘাত ও স্বাধীনচেতা সাংবাদিকদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমনে অসন্তোষের সঞ্চার হয়েছিল। স্বাধীন মত প্রকাশের পথে ক্ষমতাধরদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণও তাদের কাছে সুস্পষ্ট হতে থাকে। তারপর এল সামরিক শাসনের যুগ। জেনারেল-পরবর্তী সময়ে ফিল্ড মার্শাল উপাধিধারী আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিলেন। সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে প্রথমে সেন্সরশিপ এবং সংবাদ প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেন। সেই নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকরের মধ্যেও সংবাদপত্র, সাময়িকী এবং সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা অতি কৌশলে একটু-আধটু স্বাধীন জনমত গঠনের ভূমিকা রাখছিলেন। গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে থাকলেন। সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার চার বছর পর সামরিক শাসক সেসব ফাঁকফোকর বন্ধ করার জন্য নতুন একটি কালাকানুন করল, ‘সংবাদপত্র প্রকাশ ও প্রকাশনা অর্ডিন্যান্স’। সেই প্রথম সংবাদপত্রজগতের সবাই একসঙ্গে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলেন। মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করলেন। সেটিকে সাংবাদিকদের ও সাংবাদিকজগতের একটি নবজাগরণ বলে আখ্যায়িত করতে পারি। সেই জাগরণের ঢেউয়ে, ব্যাপক আন্দোলনের চাপে সামরিক শাসক অধ্যাদেশটি পুরোপুরি বাতিল না করলেও অনেকাংশে সংশোধন ও পরিমার্জন করল। কিন্তু সাংবাদিকদের ও সাংবাদিকতার প্রতি হুমকি অব্যাহত রইল।
কী ছিল সংবাদপত্র প্রকাশনা ও মুদ্রণ অধ্যাদেশে? স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক সরকারের আইন তথা অধ্যাদেশের মুখবন্ধে ছিল সেই কথাগুলো, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে যার পুনরুক্তি শুনছি। অধ্যাদেশের মুখবন্ধের কথা ছিল, সংবাদপত্রের সংবাদ প্রকাশ নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে না। আইয়ুব সরকার কী ছাপা যাবে আর যাবে না, তা কতিপয় বিধিমালা আর নীতিমালা বাস্তবে নির্দেশনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে দিল। পরবর্তী সময়ে বিধিমালা তৈরির জন্য একটি প্রচ্ছন্ন সরকারি সংস্থা গঠন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘প্রেস কাউন্সিল’, যাকে দেওয়া হয় সংবাদপত্রের ওপর নজরদারি করার অধিকার। উল্লেখযোগ্য, সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সেই কাউন্সিল বিলুপ্ত হয়। অধ্যাদেশটির ধার কমলেও বর্তমানের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আদলে বিদ্যমান ‘জননিরাপত্তা আইনে’ আর সামরিক অধ্যাদেশে সাংবাদিক গ্রেপ্তার ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। তবে এত সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকসমাজ যতটুক সম্ভব সব ঝুঁকি নিয়ে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। সংবাদপত্র ভাষা আন্দোলনে যেমন সীমিত আকারে জনমত গঠন করেছিল, তার চেয়েও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে ইন্ধন জোগাল। সাংবাদিকেরা নিজস্ব পেশার সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন আন্দোলনেও সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন।
অতঃপর স্বাধীনতার অব্যবহিতপরের অধ্যায়। বস্তুত, তখনই সাংবাদিকেরা নিজেদের স্বকীয়তা ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার সাহসিকতা ও প্রতিবাদী মনোভাব হারালেন। বাস্তবে সাংবাদিকতার এক ধরনের অবক্ষয়ের সূচনা হলো। সাংবাদিকসমাজের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিল। ক্ষমতাসীনদের প্রতি অদ্ভুত বশ্যতা, ক্ষমতাসীন সরকারের কৌশল ও ফাঁদে পড়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ করে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। তার পরও একটু-আধটু স্বকীয়তা ও স্বাধীন মনোভাবের পরিচয় দেওয়ার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিপাকে পড়েছিল। স্বাধীন দেশে নিরবচ্ছিন্ন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল সরকারের তৈরি, বহুলাংশে ছিল স্ব-আরোপিত, যাকে বলা হলো সেলফ সেন্সরশিপ। সেই প্রতিবন্ধকতার বাধা দু-একটি সংবাদপত্র অতিক্রম করার চেষ্টা করায় স্বাধীন দেশে ঔপনিবেশিক আমলের মতোই তাদের ওপর খাঁড়া নেমে এসেছিল। সম্ভাব্য প্রতিবাদী কণ্ঠ চিরতরে বন্ধ করে দিতে সরকার চারটি সংবাদপত্র নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে এনে বাকিগুলো বন্ধই করে দিল। এর সবই পুরোনো কাহিনী, বহুবার বলা হয়েছে। তাই বিস্তৃত পুনরাবৃত্তি করলাম না, আলোচনার ধারাবাহিকতায় শুধু স্বল্পাকারে উল্লেখ করলাম। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতসবের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না সংগ্রামী ঐতিহ্যধারী সাংবাদিকসমাজের মধ্যে। বিনা প্রতিবাদে টুঁ শব্দটি না করে তাঁরা সব মেনে নিলেন। এই মেনে নেওয়াই কাল হলো, তাঁদের নিজেদের ও ব্যাপকাকারে সাংবাদিকতার জন্য। তাই প্রতিরোধশক্তি হারিয়ে পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনামলে দীর্ঘদিন উভয়ই নিস্তেজ হয়ে রইল।
পরবর্তী অধ্যায় সামরিক শক্তি স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করল। এক. সাংবাদিকদের প্রলোভিত করা; দুই. হুঁশিয়ার করা; তিন; শারীরিক লাঞ্ছনা, জীবননাশের হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন। রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলের পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘প্রেস অ্যাডভাইস’। এই অ্যাডভাইস তথা ‘উপদেশ’ ছিল, ঠিক পথে চলো, না হলে খবর আছে। মিছেমিছি নিজেদের ওপর বিপদ টেনে আনবে না। আবার অতীতের সেলফ সেন্সরশিপ, সংযত ও সাবধানী সাংবাদিকতা যা ছিল প্রকারান্তরে কাপুরুষতা। জেনারেল এরশাদের আমলে একই অবস্থা ও পরিস্থিতির মধ্যে কাটল সাংবাদিকতার একটি দশক। কালক্রমে সাংবাদিকসমাজ তখন একটু-আধটু প্রতিরোধশক্তিতে জেগে উঠল। অবশ্য স্বৈরাচারবিরোধী গণজাগরণের কারণে তাঁরা সাহসী হয়ে উঠলেন। সেই আইয়ুব মহলে যেমন, ঠিক তেমনভাবে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ও একাট্টা হলেন হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য।
স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটল, বহুদিন পর জনগণ যেমন গণতন্ত্রের স্বাদ পেল, সাংবাদিকতাও পেল মুক্ত পরিবেশ। এদিকে বিধাতা অলক্ষে হাসলেন। সংবাদপত্র স্বাধীন, সাংবাদিকতার ওপর প্রকাশ্য বিধিনিষেধ নেই, কিন্তু সাংবাদিকেরা রয়ে গেলেন ঝুঁকিপর্ণ ও বিপত্সংকুল। সাংবাদিক প্রাণ হারাতে লাগলেন, নির্যাতিত হতে থাকলেন, পঙ্গু হয়ে গেলেন। এসবের বিবরণ সবার জানা, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনে যে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর প্রচ্ছন্ন মদদ ছিল, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তবে সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার পাশাপাশি এসবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের শক্তি হরণেরও ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাধীন স্বাধীনতার কণ্ঠরোধকারী শক্তি। সাংবাদিকদের বিভক্ত করা হয়েছে এবং অদ্ভুতভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধে পুরোনো কালাকানুনগুলোও প্রয়োগ অব্যাহত রইল।
এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গণমাধ্যম জনগণের সব অধিকার আদায়ে স্বীয় কর্তব্য পালন থেকে বিচ্যুত হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে, গণমাধ্যমের মালিকানায় অপশক্তির অভ্যুদয়। সাংবাদিকেরা যদিও বা সরকারের ভ্রূকুটি, বিভিন্ন মহলের নির্যাতন ও হত্যার ঝুঁকি সাহসিকতার সঙ্গে অগ্রাহ্য অথবা মোকাবিলা করেছেন, গণমাধ্যমে অর্থশক্তির অনুপ্রবেশ স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে অভূতপূর্ব অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। জানি না, বিদ্যমান বিরূপ পরিস্থিতিতেও যেসব সাংবাদিক স্বাধীন মত প্রকাশের, জনগণের স্বার্থ রক্ষায়, রাষ্ট্রীয় ও সরকারব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে চান, তাঁরা কত দিন টিকে থাকতে পারবেন। সাহসী সাংবাদিকসমাজ স্বার্থপরতার ও ক্ষমতাসীন রাজনীতির কূটচক্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে কবে সাংবাদিকতায় অতীতের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে?
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আয়কর বিবরণী দাখিলের সময় আর বাড়ছে না- শেষ দিন আগামী ১ নভেম্বর

ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর বিবরণী দাখিলের সময়সীমা আর বাড়ছে না। আগামী ১ নভেম্বর রোববার আয়কর বিবরণী দাখিলের শেষ দিন।
গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ এ কথা বলেছেন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান জানান, আয়কর বিবরণী দাখিলের শেষ দিন ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর। ঈদ ও পূজার ছুটির কারণে অনেকে বিবরণী দাখিল করতে পারেননি বলে বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবর পর্যন্ত তা বাড়ানো হয়। অক্টোবরের শেষ দিন যেহেতু শনিবার, তাই ১ নভেম্বর রোববার পর্যন্ত বিবরণী দাখিলের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সময় আর বাড়ানো হবে না।
গত মঙ্গলবার পর্যন্ত খুবই কম বিবরণী দাখিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এনবিআরের চেয়ারম্যান। তবে তিনি জানান, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগের পাঁচ দিন গতবার যে পরিমাণ আয়কর বিবরণী জমা পড়েছিল, এবার জমা পড়েছে তার অর্ধেক। তবে মোট আয়কর বিবরণীর ৭০ শতাংশ শেষ সপ্তাহেই দাখিল হয় বলে জানান নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে শেষ দিকে জমা দেওয়ার প্রবণতাই বেশি। এ প্রবণতা রোধ হওয়া দরকার।’
করদাতাদের সুবিধার্থে ৩১ অক্টোবর শনিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা থাকবে বলে জানান এনবিআরের চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে এনবিআরের আলোচনা হয়েছে। খোলা রাখার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে সোনালী ব্যাংক।
আয়কর বিবরণী যথাসময়ে জমা না দেওয়ার জরিমানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এতে এককালীন জরিমানা এক হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতিদিনের দেরির জন্য জরিমানা ৫০ টাকা করে।’
গত বছর সাত লাখ ৪০ হাজার ৯০৬ জন ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা আয়কর বিবরণী দাখিল করেন।

চট্টগ্রাম চেম্বার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে by হাসান ইমাম,

পুঁজিবাজার থেকে শিল্পায়নের জন্য মূলধন সংগ্রহের আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁরা বলেছেন, পুঁজিবাজার থেকে সহজে মূলধন সংগ্রহ করা গেলে ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে শিল্প স্থাপনের প্রবণতা কমবে। তবে এ জন্য বিধিবিধান আরও সহজ ও শিল্পবান্ধব করতে হবে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) আয়োজিত দুই দিনের পুঁজিবাজার মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার চট্টগ্রামের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তাঁরা এসব কথা বলেন।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘পুঁজিবাজার থেকে সহজে মূলধন সংগ্রহ করা গেলে উদ্যোক্তারা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও অনেক বাড়বে। এ জন্য শেয়ারবাজারকে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প বাজার হিসেবে গড়ে তুলতে আইন-কানুন সহজ করা জরুরি।’
আবদুস সালাম বলেন, এখন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে গেলে ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। তাই উত্পাদন শুরুর আগেই শিল্পমালিকদের নিয়মিত ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয়।
নিজেকে একজন শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করে আবদুস সালাম আরও বলেন, ‘শেয়ারবাজার থেকে যদি আমি সহজে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারি, তাহলে ১৮ শতাংশ সুুদে ব্যাংক থেকে কেন টাকা নিতে যাব?’ চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে মূলধন সংগ্রহের ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে চেম্বারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম বলেন, ‘আমি মনে করি এসইসির আহ্বানে শিল্পপতিরা উদ্বুদ্ধ হবেন। এতে চট্টগ্রামে বড় বড় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নতুন করে চিন্তা করতে শুরু করবে। আর এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে তা পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করবে।’
উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এস আলম কোল্ড রোল স্টিল মিলস লিমিটেড বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
চট্টগ্রামের অন্য বৃহত্ শিল্পগোষ্ঠী পিএইচপির পরিচালক মোহাম্মদ আকতার পারভেজ জানান, তাঁরা শিগগিরই পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করবেন। এ জন্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ শিল্পগোষ্ঠীর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা হবে। এ ছাড়া তাঁরা একটি মিউচুয়াল ফান্ড গঠনেরও চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানান আকতার পারভেজ।
মেলায় আগ্রহীদের ভিড়: সিএসই আয়োজিত পুঁজিবাজার মেলার দ্বিতীয় ও শেষ দিনে গতকাল বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের মেলা প্রাঙ্গণে ছিল ব্যাপক ভিড়।
মেলায় আসা মানুষের বেশির ভাগই তরুণ-তরুণী। তাঁরা মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে গিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পদ্ধতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন।
মেলায় আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের কর্মকর্তা সেহেলী শমসের বলেন, ‘অনেক তরুণ-তরুণী বিও হিসাব খোলার নিয়ম-কানুন জানতে চেয়েছেন। অনেকে হিসাব খোলারও আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে মেলায় কোনো বিও হিসাব খোলার ব্যবস্থা না থাকায় আমরা তাঁদের মেলা শেষে অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছি।’
মেলার সার্বিক দায়িত্বে থাকা সিএসইর পরিচালক বিজন চক্রবর্তী বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে আগ্রহী করে তোলাই মেলা আয়োজনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তাঁরা যাতে বুঝে-শুনে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন, সেটিও আমাদের উদ্দেশ্য।’
মেলার সমাপনী দিনে গতকাল দেশের জ্বালানি খাত, ওষুধশিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে আলাদা আলাদা তিনটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
জ্বালানি খাতবিষয়ক সেমিনারে আলোচকেরা বলেন, জ্বালানি খাতের উন্নয়নে শেয়ারবাজার থেকে টাকা সংগ্রহের এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ, তারল্যের দিক থেকে বাজার এখন বেশ শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।
তিনটি সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসইর পরিচালক ও সিটি ব্যাংক এনএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন রশিদ, সামিট গ্রুপের পরিচালক আয়েশা আজিজ খান এবং বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান।
এসব সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন যথাক্রমে সিএসইর সাবেক সভাপতি এম কে এম মহিউদ্দিন ও বর্তমান সহসভাপতি এ কিউ আই চৌধুরী। সেমিনারে অতিথি ছিলেন এসইসির সদস্য ইয়াছিন আলী ও নির্বাহী পরিচালক এ টি এম তারেকুজ্জামান।
সমাপনী: চট্টগ্রামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ঐতিহ্যবাহী মেজবান আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের এ মেলার। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আ হ ম মোস্তফা কামাল।

আর কত পৈশাচিকতা -অগ্নিদগ্ধ ফাতেমা

আক্ষরিক অর্থেই গৃহবধূ ফাতেমা বেগম (২৫) মানুষের নীচতা, নৃশংসতা আর পৈশাচিকতার জ্বলন্ত নজির হয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগছেন। শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে তাঁর বুক থেকে কোমর পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছে তাঁর স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মর্যাদাপুর গ্রামে গত ৫ সেপ্টেম্বর এ ঘটনা ঘটেছে। যৌতুক দিতে না পারার জন্যই তাঁর জীবনে নেমে এল এমন অভিশাপ। যৌতুক আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই যৌতুকের জন্যই কিনা তাঁকে পুড়তে হলো লোভের আগুনে। আবারও প্রমাণিত হলো, কেবল আইন করলেই হয় না, সেই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মানুষের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ছাড়া নারীর জন্য নিরাপদ পারিবারিক জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সমাজে অপরাধ কম-বেশি একটা মাত্রায় থাকবেই। কিন্তু নারীকে বীভত্স নির্যাতন করা এবং আগুনে বা এসিডে পোড়ানোর মতো পাশবিক অপরাধ কোনোভাবেই চলতে পারে না। অথচ কিছুদিন পরপর সেটাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। আগুনে পোড়ানো কিংবা এসিড ছুড়ে মারার মতো জঘন্য উপায়ই হয় এসব পাষণ্ডের অবলম্বন। এবং চিন্তার কথা যে, এ ধরনের কার্যকলাপের বেশির ভাগই হয় পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে। অথচ পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যেই মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে অভ্যস্ত। কিন্তু সেখানে যদি এই মাত্রায় সহিংসতার বীজ লুকিয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে একজন তার নিকটজনদের বিশ্বাস করবে? অবশ্য এ কথা ঠিক যে অধিকাংশ পরিবারের সঙ্গে ফাতেমার স্বামীর পরিবারের কোনো তুলনা চলে না।
ফাতেমা বাঁচতে চেয়েছেন। আমাদের আশা, চিকিত্সকেরা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ যা করা দরকার তা করবেন। কিন্তু কোন সমাজে তিনি বেঁচে থাকতে চাইছেন? এখনো বেশির ভাগ পরিবার পুরুষপ্রধান এবং নারী সেখানে তুচ্ছ হিসেবে চিহ্নিত হয়। মানুষ হিসেবে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এখনো সুদূরপরাহত। নইলে যৌতুকের মতো অমানবিক অসভ্য প্রথার জন্য এখনো অজস্র নারীকে নিপীড়ন সইতে হতো না। একদিকে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো যখন নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি স্লোগান নিয়ে অঢেল অর্থ খরচ করে উদ্যোগ নিয়ে চলছে, অন্যদিকে চোখের সামনে ঘটে চলছে নারীর ওপর অনাচার। পরিস্থিতি বদলের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রয়োজন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে নারীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন। এর জন্য শিক্ষাসহ সর্বস্তরে নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার প্রণোদনা থাকতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত বিচার ও কঠিনতম শাস্তির ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা বিনা শর্তে পালিত হতে হবে।

কোচ-সতীর্থদের প্রতি মেসির কৃতজ্ঞতা

পুরস্কার তো এই জীবনে অনেক পেয়েছেন। আরও নিশ্চয়ই পাবেন। কিন্তু সদ্যই জেতা ২০০৮-০৯ স্প্যানিশ লিগের সেরা স্ট্রাইকার ও খেলোয়াড়ের পুরস্কারটা লিওনেল মেসির জন্য অন্য রকম তাত্পর্য নিয়েই থাকবে। এই পুরস্কার থেকেই যে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা খুঁজে পাচ্ছেন তিনি।
দুঃসময়টার শুরু জাতীয় দলে। গত মার্চের পর থেকে আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে গোলের দেখা পাননি। জাতীয় দলের চাপের কারণেই কিনা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শেষে ক্লাবে ফিরে চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা স্প্যানিশ লিগ কোথাও সেই জাদুর ঝলক খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
তবে গত রোববার রিয়াল জারাগোজার বিপক্ষে ম্যাচ থেকে আবারও স্বরূপে ফেরার আভাস দিয়েছেন। ৬-১ গোলে জেতা ওই ম্যাচে একটি গোল করেছেন, অবদান ছিল আরেকটি গোলেও। আর্জেন্টিনার ২২ বছর বয়সী এই তারকার বিশ্বাস, দুঃসময়টা তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন। আর দুঃসময় কাটিয়ে উঠতে সতীর্থ ও কোচদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের জন্য জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা। আলাদা করে ধন্যবাদ দিয়েছেন বার্সা কোচ পেপ গার্দিওলাকে, যিনি বলেছিলেন, ম্যাচের পর ম্যাচ খারাপ খেলে গেলেও মেসিকে কিছু বলবেন না।
স্পেনের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হাতে উঠল এই সেদিন। শুধু স্পেন নয়, মেসির হাতেই এবার সব সেরার পুরস্কার উঠবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন উয়েফা সভাপতি মিশেল প্লাতিনি।
তবে বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত এই আর্জেন্টাইন জানাচ্ছেন, ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তি নয়, তিনি খেলেন দলীয় অর্জনের জন্য। ‘গতবার আমরা একটা দারুণ মৌসুম কাটিয়েছি বলেই আজ হাতে পুরস্কার নিতে পারছি। আমাদের দলের যে কারও হাতে এই পুরস্কার উঠলেই আমি খুশি। আমি বরাবরই বলে এসেছি, আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দল।’
মেসির এই দর্শনই তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা এক খেলোয়াড় বানাবে বলে অনেকের ধারণা। বার্সেলোনারই সাবেক তারকা মিডফিল্ডার রিভালদো যেমন বলছেন, কিংবদন্তি হয়ে ওঠার সব উপাদানই মেসির মধ্যে আছে। ফিফা বর্ষসেরা ও ব্যালন ডি’অর জেতা এই ব্রাজিলিয়ান বলেছেন, ‘ও খুবই তরুণ এবং এরই মধ্যে সে প্রায় সবকিছু অর্জন করে ফেলেছে। ওর যে প্রতিভা আর তারুণ্য—সব মিলিয়ে নিয়তিই নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে কিংবদন্তি খেলোয়াড় হয়ে উঠবে।’
মেসির হাতে বিশ্বকাপ শিরোপা দেখার জন্য রিভালদো উন্মুখ হয়ে আছেন। না জিতলেও মেসির কিংবদন্তি হয়ে ওঠার পথে কোনো বাধা দেখছেন না তিনি, ‘ডি স্টেফানো আর ক্রুইফ কখনো বিশ্বকাপ জেতেননি। তার পরও এই দুজনকে সর্বকালের সেরা হিসেবেই ধরা হয়।’

আবারও ইতালিকে হারাল বাংলাদেশ

সেই ১৯৯৬ সালে ইতালিতে গিয়ে বিশ্বকাপ হকির বাছাইপর্বে ইতালিকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। ইউরোপ সফররত বাংলাদেশ হকি দল সেই পুরোনো স্মৃতিকে আরও উজ্জ্বল করে ফিরিয়ে আনছে। দু দিন আগে ইতালিকে প্রথম ম্যাচে হারানোর পর পরশু দ্বিতীয় ম্যাচেও বাংলাদেশ জিতেছে ৫-৩ গোলে। তবে বাংলাদেশ খেলেছে জাতীয় দলের বদলে হকি ফেডারেশন সভাপতি একাদশ নামে।
আগের ম্যাচে বাংলাদেশের পক্ষে সবগুলো গোল করা (৪) মামুনুর রহমান চয়ন এ দিনও করেছেন ২টি গোল। বাকি গোল তিনটি করেছেন শেখ মোহাম্মদ নান্নু, মশিউর রহমান বিপ্লব ও কৃষ্ণ কুমার।

স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প নেই -বিটিভি নিয়ে অসন্তোষ

তথ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা গত মঙ্গলবার এক সভায় বিটিভির সংবাদের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিযোগ তুলেছেন যে বিটিভি এখনো সরকারি প্রচারযন্ত্রের বদনাম ঘোচাতে পারেনি। কমিটি মন্তব্য করেছে, খবরজুড়ে শুধু সরকারের প্রচার থাকলে তা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। এ কথাগুলো নতুন নয়; বিটিভির ব্যাপারে আসল কথাই বলা হলো না। বিটিভি শুধু যে সংবাদ বা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা ও আকর্ষণ হারিয়েছে তা-ই নয়, বিটিভির নাটকসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের গুণগত মানের ক্ষেত্রেও ভীষণ অবনতি ঘটেছে। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দলবাজির অন্যতম সেরা নিদর্শন বাংলাদেশ টেলিভিশন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল, নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে তারা রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেবে। দলটি সেবার নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছিল, কিন্তু সেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। বিটিভির স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল, সে কমিটি বেশ কিছু সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন সরকারকে দিয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করেনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে ২০০১ সালের জুলাই মাসে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার নামে ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন অথরিটি অ্যাক্ট ২০০১’ আইন পাস করে। কিন্তু আইনটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কারণ, সেটি করা হয়েছিল সরকার-গঠিত এক কমিশনের সুপারিশমালা উপেক্ষা করে, যাতে বেতার-টিভির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আইনটি কার্যকর করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে খবর বেরিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সরকারি দলেরই একজন সাংসদ, ওবায়দুল কাদের। মঙ্গলবারের সভায় তিনি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদসহ কমিটির অন্য সদস্যরা এবং তথ্যসচিবও। অর্থাত্ বিটিভি সম্পর্কে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই সব পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কোনো বিরুদ্ধবাদী রাজনৈতিক শিবিরের নয়। তাই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এগুলোর গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কিন্তু বিটিভির এই দুরবস্থা দূর করতে কী করা প্রয়োজন, স্থায়ী কমিটির সভা থেকে তেমন কোনো দিকনির্দেশনা মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজে বিটিভিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আর তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিটিভির সংবাদ আরও আধুনিক করার চেষ্টা চলছে। আসলে বিটিভিকে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে এর দুরবস্থা কাটানো সম্ভব হবে না। সরকার ও সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সংবাদ পরিবেশন করলেই বিটিভির সাংবাদিকতায় পেশাদারি ও নিরপেক্ষতা সৃষ্টি হবে না, অন্যান্য অনুষ্ঠানের গুণগত মানও বর্তমান নীতি ও ব্যবস্থাপনায় বাড়ানো সম্ভব হবে না। প্রতিষ্ঠানটির আমূল সংস্কার প্রয়োজন; এর স্বায়ত্তশাসনের কোনো বিকল্প নেই।
বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন কমিশনের প্রতিবেদনটি সরকারের কাছেই আছে। সেটির সুপারিশমালা অনুযায়ী ২০০১ সালের আইনটি সংশোধন করে বা প্রয়োজনে নতুন আইন করে বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেওয়া উচিত। এ ছাড়া বিটিভিকে রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।

ধোনির সেঞ্চুরিতে সিরিজে সমতা

ভারতের ইনিংস কাল দুটো ‘প্রথম’ দেখল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মহেন্দ্র সিং ধোনির প্রথম সেঞ্চুরি। আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের প্রথম ৩৫০ ছাড়ানো ইনিংস। এই দুই ‘প্রথম’ মিলে ৯৯ রানের বড় জয় দিয়ে সিরিজে ফিরে এল ভারত। সাত ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ এখন ১-১।
নাগপুরের বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে এই প্রথম ওয়ানডে খেলেছে ভারত-অস্ট্রেলিয়া। ২০০৬ সালে এই মাঠে একটা টেস্ট হয়েছিল, ভারত জিতেছিল ১৭২ রানের বড় ব্যবধানে। কাল ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করে ৩৫৪ রান তুলে ফেলার পরই ম্যাচটা হেলে যায় ভারতের দিকে। এর আগে ২৯১৪টি ওয়ানডেতে ৩৫০-এর বেশি রান তুলে হেরে যাওয়ার নজির যে মাত্র একটাই।
তার পরও অস্ট্রেলিয়া বলে কথা! সামনে যতই রানের পাহাড় থাকুক, হারের আগে কি এই দল হার মানে? কিন্তু কাল যেন অন্য অস্ট্রেলিয়া। ৪৮.৩ ওভারে ২৫৫ রানে অলআউট রিকি পন্টিংয়ের দল।
কুয়াশার কথা ভেবে ব্যাটিং উইকেটে ফিল্ডিং নিয়েছিলেন পন্টিং। কিন্তু সিদ্ধান্তটা যে ভুল ছিল, ভারত ৩৫৪ করার পর একদফা সেটা প্রমাণও হয়েছে। ব্যাটিংয়ে নেমে ৪৫ রানে তিন উইকেট হারিয়ে ধুকতে শুরু করা অস্ট্রেলিয়া পরে সেটি আরও ভালো করে বুঝেছে। মাইক হাসি লড়ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত ৫৩ রানে তিনি বিদায় নিলে (১৪০/৫) অস্ট্রেলিয়ার সামনে পরাজয়টা সময়ের ব্যাপার হয়ে যায়।
ম্যাচের প্রথম ভাগটা দর্শকদের জন্য উপভোগ্য করে তুলেছিলেন ধোনি। ১০৭ বলে ১২৪ রান, যাতে ছিল ৯টি চার ও ৩টি ছক্কা। শেন ওয়াটসনকে লং অফের ওপর দিয়ে মারা ছক্কাটা ধোনিকে পৌঁছে দিয়েছে ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরিতে। পরে ম্যাচ-সেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে সেঞ্চুরির আনন্দটা আরও বেশি উপভোগ করছিলেন ভারতের অধিনায়ক।
ভারতের ইনিংসটা অবশ্য ‘ওয়ানম্যান শো’ ছিল না। গৌতম গম্ভীরের ৭৬ আর সুরেশ রায়নার ৫০ বলে ৬২ রানের ইনিংসটার যথেষ্ট অবদান আছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেদের নতুন রেকর্ড গড়ায়।
বীরেন্দর শেবাগের স্বভাবসুলভ ৪০ রানের ইনিংসে ৩০-ই এসেছে চার-ছক্কা থেকে। দলীয় ২১ রানে শচীন টেন্ডুলকারের উইকেটটি হারানোর ধাক্কা ভুলিয়ে দিয়েছেন তিনিই। তবে ৩০ রানের ভেতর শেবাগ আর যুবরাজ সিংকে তুলে নিয়ে ভারতের স্কোরটাকে ৯৭/৩ বানিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। যদিও তাদের দুর্ভোগের শুরু এর পর থেকে, এর পরই পর পর দুটো শতরানের জুটি।
প্রথমটা চতুর্থ উইকেটে গম্ভীরের সঙ্গে ধোনির ১১৯ রানের। ওভারপ্রতি ৬.৩১ রান করে তোলা এই জুটি ভারতকে ৩০০ ছাড়ানো স্কোরের ভিত্তি এনে দিয়েছে। পঞ্চম উইকেট জুটিতে ধোনি-রায়নার ১৩৬। এর মধ্যে আছে ব্যাটিং পাওয়ার প্লের ৫ ওভারে তোলা ৪৭। আছে জনসনের এক ওভার থেকে তোলা ১৮ রানও। এই ঝোড়োগতির কারণেই ৪৯ ওভার শেষে ভারতের সম্ভাব্য ইনিংসটাকে ৩৬০-এর মতোই দেখাচ্ছিল।
সেটি হয়নি জনসনেরই করা ইনিংসে শেষ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ভারত মাত্র ৫ রান তোলায়। কিন্তু যা হয়েছে, সেটাই যথেষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৯৯ রানের বিশাল জয়—ম্যাচের আগে কি ভাবতে পেরেছিল ভারত!

প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ আজ শুরু

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজের ডামাডোলের মধ্যেই আজ মাঠে নামছে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ। প্রথম দিনে ম্যাচ হবে তিনটি। বিকেএসপিতে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আবাহনী মুখোমুখি হবে কলাবাগানের। বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে সূর্যতরুণ-খেলাঘর ম্যাচ। আর ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠে মোহামেডান খেলবে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে। প্রিমিয়ার লিগের পুরোটা এবারই প্রথম খেলা হবে সাদা বল-রঙিন পোশাকে। এর আগে শুধু সুপার লিগেই এটি দেখা গেছে।
জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা শুরুর দিকের ম্যাচগুলোতে খেলতে পারছেন না বলে প্রিমিয়ার লিগ রং হারাবে স্বাভাবিক। তবে সেটিকে একেবারেই বিবর্ণ হতে দিচ্ছে না বিদেশি খেলোয়াড়দের আগমন। মোহামেডানে খেলতে কালই শ্রীলঙ্কা থেকে সস্ত্রীক উড়ে এসেছেন ফারভিজ মাহারুফ। বিমানে খেলতে আজ আসছেন আরেক শ্রীলঙ্কান জিহান মুবারক।

গেম প্ল্যান, চাপ এবং একটি প্রত্যয়

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য থাকে ৪০ থেকে ৪৫ রানের মধ্যে একটার বেশি উইকেট না হারানো। পরশু জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ হারাল ৪১ রানে ৩ উইকেট!
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক সাকিব আল হাসান যেটা বলেছিলেন, কাল অন্যরাও বললেন সেটাই। প্রথম ম্যাচে হারের কারণ সবার চোখেই এক—গেম প্ল্যানের ব্যাটিং অধ্যায়টা হয়ে গিয়েছিল এলোমেলো। ওপেনার তামিম ইকবাল সব দায় টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের কাঁধে তুলে নিয়ে বললেন, ‘আমরা ভালো শুরু করতে পারিনি। দ্রুত উইকেট হারিয়েছি। ওপেনারদের মধ্যে কেউই রান না করলে তো সংগ্রাম করতেই হবে।’ আজ একই মাঠে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে তামিমদের প্রত্যয় একটাই—আগের ম্যাচের ভুলগুলো আর করা যাবে না।
কী সেই ভুল? ড্রেসিংরুম থেকে এঁকে দেওয়া গেম প্ল্যানকে ব্যাটসম্যানদের বাস্তবায়ন করতে না পারা। দ্বিতীয় ভুল: আবদুর রাজ্জাকের অমন একটা ওভারের পরও বোলিংয়ে রাশ ধরে রাখায় ব্যর্থতা। দ্বিতীয়টা খুব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে না বাংলাদেশ মাত্র ১৮৬ রান করেছে বলে।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের মধ্যে সফল বলতে পারেন মুশফিকুর রহিম আর ডলার মাহমুদকে। মুশফিকুরের ৫৬ আর ডলারের ৩২ বলে ৪১-ই ব্যাটিংয়ে যা একটু বলার মতো। নিজের কথা না বলে মুশফিকুর তামিমের মতোই ব্যর্থতার দায়টা পুরো দলের ওপরই নিলেন। অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে তিনি, ‘জিম্বাবুয়ে তিনটা বিভাগেই খুব ভালো খেলেছে, আর আমরা খেলেছি খুব বাজে। সামনে এখন চারটা ম্যাচ—এই চারটা ম্যাচই আমাদের জিততে হবে।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচকে অনেকে চাপ মনে করলেও বাংলাদেশ সহ-অধিনায়ক সেটা মনে করেন না। তবে বলছেন, এই ম্যাচে ভালো খেলার অতিরিক্ত একটা দায়িত্ব থাকে তাঁদের ওপর, ‘আমরা যখন জিম্বাবুয়েতে খেলতে যাই, সবাই ভাবে জিম্বাবুয়ের মাটিতে জিম্বাবুয়েই জিতবে। আমাদের তখন হারানোর কিছু থাকে না। ওদের জন্যও একই ব্যাপার। ওরা আমাদের মাটিতে খেলতে আসছে। ওদের এখানে হারানোর কিছু নেই। সবাই ভাবছে আমরাই জিতব। এটাকে ঠিক চাপ বলব না, তবে অতিরিক্ত একটা দায়িত্ব চলে আসে এই ম্যাচে।’
কোচ জেমি সিডন্সের কাছে ব্যাপারটা চাপই। তবে সেই চাপ যতটা না জিম্বাবুয়ে দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি নাকি দিচ্ছে তৃতীয়-চতুর্থ পক্ষরা, ‘ছেলেদের ওপর অনন্ত চাপ। আমি নিজেও সংবাদমাধ্যম, জনগণ আর ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে চাপ বোধ করি। গত দুটি সিরিজও হয়তো এর কারণ—সবাই ভাবছে আমরা বুঝি ভারতের মতো কোনো দল হয়ে গেছি। কিন্তু আমরা আসলে বাংলাদেশই আছি। উন্নতির পথে থাকা একটা দলই আছি।’ সিডন্স মনে করেন, বাইরের এই চাপ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে দলের ওপর, ‘এটা সব দেশেই আছে। তবে আমাদের দলটা তো এখনো তরুণ।’
তবে পরাজয়ের দায় এই ‘চাপের’ ওপর চাপাচ্ছেন না সিডন্স। এ প্রশ্নে তিনিও আর সবার সঙ্গে একমত। পরাজয়টা এসেছে বাজে ব্যাটিংয়ের অব্যর্থ পরিণতি হয়ে, ‘অনেক বাজে শট হয়েছে... বিশেষ করে দুই ওপেনারের আউট। তারা কিছু করতে না পারায় অন্যদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।’
কিন্তু এই চাপের পরও ডলার মাহমুদ ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তাঁর নির্ভীক ব্যাটিংয়ে লজ্জাই পাওয়ার কথা অন্যদের। তবে পরাজয়ের ময়নাতদন্তে গিয়ে ডলার আর ব্যাটসম্যান নন, একজন বোলার, ‘আমাদের বোলিং ভালো হয়েছে। কিন্তু স্কোরটা ডিফেন্ড করার মতো ছিল না। ২৩০-৪০ রান হলে হয়তো সেটা সম্ভব হতো।’
জেমি সিডন্স জিম্বাবুয়ে দলে উন্নতির ছাপও দেখছেন, ‘খুব ভালো, সুসংগঠিত এবং পেশাদার একটা ক্রিকেট দলের কাছে হেরে গেছি আমরা। এ ম্যাচে তারা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছে। আমি আগেও ছেলেদের সতর্ক করেছি, সংবাদমাধ্যমেও বলেছি—সমানে সমান লড়াই হবে। নিজেদের সেরা ক্রিকেট না খেললে জেতা সম্ভব নয়।’
সেই খেলাটা কি আজ খেলতে পারবে বাংলাদেশ?