Saturday, February 24, 2018

‘জেরুসালেম জনগণের সম্পদ, এটিই হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী’

মার্কিন সরকার আগামী মে মাসে তেল আবিব থেকে জেরুসালেম শহরে নিজের দূতাবাস স্থানান্তরের যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের হামাস ও পিএলও। হামাসের মুখপাত্র আব্দুল লতিফ আল-কানু শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে গোটা অঞ্চল ইসরাইলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
তিনি আরো বলেন, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করা হলেও বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন ঘটবে না অর্থাৎ জেরুসালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবেই থেকে যাবে; ইসরাইলের রাজধানী হতে পারবে না। হামাসের মুখপাত্র তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের ঘটনাকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। এদিকে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা- পিএলও’র নির্বাহী কমিটির সচিব সায়েব এরিকাত মার্কিন সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপ আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনুভূতিতে প্রচণ্ড আঘাত হানবে। তিনি বলেন, জেরুসালেম ফিলিস্তিনি জনগণের সম্পদ এবং এটি হবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী; ইসরাইলের নয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বের কঠোর বিরোধিতা উপেক্ষা করে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার ঘোষণা করেছে, আগামী মে মাসে তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেম শহরে স্থানান্তর করা হবে। গত ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুসালেম শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এরপর তিনি ঘোষণা করেন, তেল আবিব থেকে জেরুসালেম শহরে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়া হবে। ট্রাম্পের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে এ নিয়ে ভোটাভুটি হয় এবং আমেরিকা তাতে ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়।

ভারতীয় অংশে বন্দরের অবস্থা যা–তা

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলো ভারত। ভারত থেকেই আমদানি বেশি হয়। এই আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ চালানই আসে স্থলপথে। মূলত দেশের বড় বড় স্থলবন্দর দিয়ে হরেক পণ্যের চালান এ দেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের এসব স্থলবন্দরের অপর অংশের ভারতীয় শুল্ক স্টেশনগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক।
কোনো কোনো স্থলবন্দরের অবকাঠামো বলতে কিছু নেই। চালা ঘর বা কাঁচা বেড়ার ঘরে বসেই শুল্কায়নের কাজ চলে। শুল্ক স্টেশন পর্যন্ত যাওয়ার সড়কও ভাঙাচোরা। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলোর অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভালো। বেশির ভাগ স্থলবন্দরেই অবকাঠামো আছে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ দুই দেশের স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশনগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে এসে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও তৈরি করেছেন। ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশে ২২টি স্থলবন্দর আছে। এই স্থলবন্দরগুলোর বিপরীত অংশে ভারতীয় শুল্ক স্টেশন আছে। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের তুলনামূলক ওই চিত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ২২টি স্থলবন্দরের অপর অংশে ভারতীয় ১৮টি স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশনের অবকাঠামো বেশ দুর্বল। কয়েকটিতে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবন থাকলেও ওজন সেতু, গুদামঘরসহ অন্যান্য ন্যূনতম আধুনিক সুবিধা নেই। রাস্তাঘাটও ভালো নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তাদের শুল্ক স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এসব শুল্ক স্টেশনের অবকাঠামো হলে বাণিজ্য আরও সহজ হবে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত যে দেশ বেশি আমদানি করে, সেই দেশের স্থলবন্দর বা শুল্ক স্টেশনে আধুনিক অবকাঠামো প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ওজন সেতু, গুদাম, পণ্য মাপার যন্ত্র ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ আমদানি বেশি করে। তাই ভারতের সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাককে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না, সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তাই শুল্ক স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের আগ্রহ কম থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক ভালো অবকাঠামো আছে যশোরের বেনাপোলের অপর অংশে পেট্রাপোল, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধার অপর অংশ ফুলবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার বিপরীতে আগরতলা এবং সিলেটের শেওলার অপর অংশে সুতারকান্দি শুল্ক স্টেশনে।
কোথায় খারাপ অবস্থা
ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি হয়ে বাংলাদেশের দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্যের ট্রাক আসে। বাংলাদেশের অংশে তিনটি গুদামঘর, পার্কিং ইয়ার্ড, ওজনযন্ত্র—এসব থাকলেও ভারতীয় অংশে কোনো অবকাঠামো নেই। ভারতের প্রায় দুই কিলোমিটার সরু রাস্তা পার হয়ে সীমান্তে আসতে হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদের বিপরীতে ভারতের মালদার মাহাদীপুর শুল্ক স্টেশন। এই শুল্ক স্টেশনের তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। কোনো গোডাউন নেই। মাহাদীপুর থেকে ভারতের মহাসড়ক পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা বেশ নাজুক। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা স্থলবন্দরের ভারতের গেদে শুল্ক স্টেশন দিয়ে রেলপথে আমদানি-রপ্তানি হয়। কিন্তু শুল্ক স্টেশন শুধু নামেই। কোনো অবকাঠামো নেই। দেশের অন্যতম ব্যস্ত স্থলবন্দর হলো লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর। গোডাউন, পণ্য খালাসের ইয়ার্ড, ওজনযন্ত্রসহ সবই আছে। কিন্তু ভারতের মেখলীগঞ্জের চেংড়াবান্ধা শুল্কস্টেশনে সেমিপাকা ভবনেই শুল্কায়ন ও অভিবাসন কার্যক্রম চলে। বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের দৌলতগঞ্জকে স্থলবন্দর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। কিন্তু ভারতীয় অংশে নদীয়ার মাঝদিয়ায় শুল্ক স্টেশনই নেই।
বাংলাদেশের ভোমরা স্থলবন্দরের বিপরীতে আছে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গোজাডাঙ্গা। সেখানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবন থাকলেও অন্য কোনো অবকাঠামো নেই। একইভাবে বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতীয় অংশের অন্য শুল্ক স্টেশনগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। বেশির ভাগেরই শুধু কাস্টমস কার্যালয় আছে, অন্য কোনো অবকাঠামো নেই। বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলোর কিছু অবকাঠামো আছে এবং নতুন করে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে। ভারতের যেসব শুল্কস্টেশনের তেমন অবকাঠামো নেই, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নীলফামারীর চিলাহাটির ভারতীয় অংশের কোচবিহারের হলদীবাড়ি, ফেনীর বিলোনিয়ার বিপরীতে ত্রিপুরার বিলোনিয়া, খাগড়াছড়ির রামগড় স্থলবন্দরের ভারতের সাবরুম, কুমিল্লার বিবিরবাজারের অপর অংশ ত্রিপুরার সোনামুড়ার শ্রীমন্তপুর, হবিগঞ্জের বাল্লা স্থলবন্দরের বিপরীতে ত্রিপুরার পাহাড়মুড়া, শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দরের অপর অংশ মেঘালয়ের ডালু, সিলেটের তামাবিলের অপর অংশ শিলংয়ের ডাউকি। দুই দেশের  বৈঠকে স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ by সোহরাব হাসান

যখন বাংলাদেশে লেখক-কবি-সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রীয় পদক, পুরস্কার ও সম্মান লাভের জন্য উন্মুখ, তখন ভারতের তামিলনাড়ুর এক কবিকে দেখেছি রাষ্ট্রীয় পদক প্রত্যাখ্যান করতে। জীবিত অবস্থায় তিনি রাজ্য সরকারের সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন। মৃত্যুর পর ভারতীয় সাহিত্যে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার সাহিত্য আকাদেমি সম্মাননা নিতেও অপারগতা জানিয়ে তাঁর স্বজনেরা বলেছেন, এই পুরস্কার নেওয়া হবে কবির প্রতি অসম্মান। কবির নাম ইনকিলাব। এটি তাঁর ছদ্মনাম। পৈতৃক নাম এস এইচ এস সহুল হামিদ। জন্ম ১৯৪৪ সালে, তামিলনাড়ুর রামানাথন জেলার কিলাকারিতে।
কৈশোর থেকে এই কবি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তিনি প্রথম কবিতা লেখেন মাত্র ১২ বছর বয়সে, দরগা থেকে মানসিকভাবে অসুস্থ এক বালিকাকে বের করে দেওয়ার প্রতিবাদে। আজীবন তাঁর এই প্রতিবাদী ভূমিকা জাগরূক ছিল। ইনকিলাব পড়াশোনা করেন ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। পরবর্তী সময়ে তিনি চেন্নাইয়ের নিউ কলেজে তামিল ভাষা পড়াতেন। কবি প্রথমে দ্রাবিড় জাতীয়তাবাদ থেকে তামিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেন এবং পরে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদে দীক্ষা নেন। ইনকিলাব একবার লিখেছিলেন, ‘পুরস্কার আমাকে সম্মানিত করবে, যদি আমি লাশের মতো বেঁচে থাকি।’ তিনি ছিলেন তাঁদের কবি, যাঁরা নিজেদের অধিকারের কথা বলতে পারেন না, যাঁরা নির্যাতিত, বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ। ইনকিলাব ‘জনগণের কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তিনি সব সময় সরকারি পুরস্কার-স্বীকৃতির বিরোধিতা করতেন। তাঁর কথা ছিল, ‘আমি পুরস্কার পাওয়ার জন্য লিখি না। বরং তার বিপরীত-অন্যায়ের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর জন্য লিখি।’ ১৯৬৮ সালে যখন তামিলনাড়ুর কিলাবেনমনির গণহত্যার বিষয়ে দ্রাবিড় নেতারা নিশ্চুপ থাকলেন, তখন এই কবি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ত্যাগ করে সাম্যবাদে ঝুঁকে পড়েন। ওই গণহত্যায় ৪৪ জন দলিত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্য খুন হয়েছিলেন। এরপর ইনকিলাব যে কবিতা লিখলেন, তা দলিতদের জাতীয় সংগীত হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছে। কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি ছিল, ‘মানুষ, আমরাও মানুষ’। শ্রীলঙ্কায় তামিল বিদ্রোহী এলটিটিইর (লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম) ওপর থেকে তামিলনাড়ু সরকার সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে ইনকিলাব প্রতিবাদ করেন। তামিলনাড়ুর রাজা রাজা চোলার ১০০০ তম জন্মজয়ন্তী পালনেরও বিরোধিতা করেন এই কবি। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই রাজা ছিলেন জনগণের শোষণকারী।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকার তাঁর কবিতা পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়। কিন্তু ইনকিলাব তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, সরকারগুলোর চেহারা বদল হলেও একই ছদ্মবেশ থেকে যায়। সামাজিক অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইনকিলাবের কবিতা ছিল শাণিত তরবারি। ১৯৮০-এর দশকে কোলাপাত্তির ঝরা থেকে পানি খেতে গেলে চার দলিত শিশুকে হত্যা করে উচ্চবর্ণের লোকজন। প্রতিবাদে ইনকিলাব লিখলেন: ‘কোলাপাত্তির পানি পুড়িয়ে মারল শিশুকে/পানিও আগুনের মতো পোড়ায়/যাঁরা আইনের রক্ষক হয়ে আছেন, এসব কি কখনো তাঁদের স্পর্শ করে?/এই আগুনে দগ্ধ মাংস ও হাড়ে সরকার ও আদালত তেলের জোগান দেয়।’ ইনকিলাব বিশ্বাস করতেন, তাঁর কবিতা একদিন সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। তামিল লেখক ও প্রগতিশীল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিকুমার লিখেছেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও অনেকে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু তাঁর (ইনকিলাব) মতো আর কেউ কি কবিতাকে আগুনের টুকরোয় পরিণত করতে পেরেছেন? ইনকিলাব তাঁর কবিতায় মানবতার জয়গান গেয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে ও জাতিগত বৈষম্যের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ছিলেন তামিল কবিতার অন্যতম আধুনিক রূপকার। ইনকিলাব বলতেন, ‘যত দিন না পর্যন্ত জাতিভেদহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, তত দিন আমার লেখনী চলবে।’ ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর এই বিপ্লবী কবির মৃত্যু হয়। এরপর ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি তাঁকে সম্মাননা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে কবির মেয়ে ড. আমিনা পারভিন তা গ্রহণ করতে অপারগতা জানান।
সাহিত্য আকাদেমির সাধারণ সম্পাদককে লেখা তাঁর চিঠির ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ: স্যার/ম্যাডাম
ইনকিলাব ছিলেন কণ্ঠহীনের, নির্যাতিতের, সুবিধাবঞ্চিতের এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ফলে তাঁর নাম আরও বৃহত্তর জাতীয় স্তরে পৌঁছাবে এ কথা সত্য। কিন্তু ইনকিলাব স্বীকৃতি ও পুরস্কার সম্পর্কে বলে গেছেন, ‘আমি পুরস্কার ও স্বীকৃতির আশা করে লিখি না। আমি লিখি তার বিপরীত-অন্যায়ের নিন্দা ও প্রতিবাদের জন্য। সরকার আমাকে তখনই দেবে, যখন আমার কলম তা দাবি করবে।’ আমিনা তাঁর চিঠিতে আরও লিখেছেন, ‘দেশে আজ সহিংসতা, শ্রেণিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়ন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব ব্যক্তি ক্ষমতার সমালোচনা করেন এবং প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান, দিনের আলোয় তাঁদের খুন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় পুরস্কার নেওয়া হবে ইনকিলাবের লেখা এবং তিনি যে জীবনাদর্শ ধারণ করতেন তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।...আমরা মনে করি, ইনকিলাবের রচনাবলি আমজনতার কাছে পৌঁছেছে, সেটাই তাঁর প্রতি বৃহত্তম স্বীকৃতি। এ কারণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমরা পুরস্কার গ্রহণ করছি না।
ইনকিলাব পরিবার ও ইনকিলাব ট্রাস্টের পক্ষ থেকে
আমিনা ইনকিলাব নিজেকে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী বলে দাবি করতেন। তিনি তাঁর মরদেহ চেংগালু পাটু হাসপাতালে দান করে যান। ইনকিলাব সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষা নিলেও কমিউনিস্ট পার্টির সংকীর্ণ ও গোঁড়া ধ্যানধারণা কখনো গ্রহণ করেননি। ‘সদর দপ্তর’ উড়িয়ে দেওয়ার মতো তত্ত্বের কড়া সমালোচক ছিলেন এই কবি। তিনি বলতেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অর্থ এই নয় যে লেখকদের নিজস্ব চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে না। কবি হিসেবে অধিক খ্যাতি পেলেও ইনকিলাবের নাটকগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেক কলেজে তাঁর নাটক পাঠ্য হয়েছে। ভারতে এ রকম দ্রোহী ও প্রতিবাদী লেখক-কবি আরও আছেন। ২০১৫ সালে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কলাম ধরার কারণে প্রগতিশীল চিন্তাবিদ এম এম কালবুর্গি হত্যার পরও সাহিত্য আকাদেমি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিভিন্ন ভাষার লেখক-কবিরা। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক নয়নতারা সেহগল, অশোক বাজপেয়ি, মালয়ালম লেখক সারাহ্ জোসেফ, গুজরাটের গণেশ দেবী, দিল্লির আমন শেঠি, কর্ণাটকের কুম বীরভদ্রাপ্পা, পাঞ্জাবের গুরবচন সিং ভুল্লার, আজমের সিং আওলাখ, আত্মজিৎ সিং, ওয়ারিয়াম সাধু ও কাশ্মীরি লেখক গুলাম নবি খেয়াল প্রমুখ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লেখক-কবিদের তেমন প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখা যায় না। বরং আমাদের প্রগতিশীল লেখক-কবিদের কেউ কেউ অতীতে স্বৈরাচারী শাসকের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছেন, তাঁর কবিসভার সদস্য হতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দু-একজনের নাম করা যায়। সত্তরের দশকে বদরুদ্দীন উমর বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এরশাদের হাত থেকে একুশে পদক নেননি। আর প্রবীণ রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ স্বাধীনতা পুরস্কার নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। যিনি আজীবন বামপন্থী রাজনীতি করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন, তিনি সম্ভবত স্বাধীনতা পদক বা পুরস্কার পাওয়াকে বড় করে দেখেননি। এটি তাঁর চরিত্রের দার্ঢ্য দিক। কিন্তু বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করে কেউ পদক প্রত্যাহার করেছেন এ রকম নজির নেই। আমরা চাই আমাদের সাহিত্যে ও সমাজে ইনকিলাবদের জন্ম হোক। দুঃসময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেউ না কেউ সাহস করে বলুক, ‘পথিক,
তুমি পথ হারাইয়াছ।’
সোহরাব হাসান : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan 55 @gmail. com

চিলমারীর বাঁধবাসী: উচ্ছেদই যখন আইন by গওহার নঈম ওয়ারা

১৯৮৮ সালের মহাপ্লাবনের পরেও যাঁরা জন্মেছেন, তাঁরাও বিলক্ষণ জানেন কী ভয়াবহ বন্যা ছিল সেটা। কমবেশি প্রায় ছয় সপ্তাহ ডুবেছিল সারা দেশ। বিমানবন্দর সেনানিবাস—কিছুই শুকনো ছিল না সেবার। তারপর অনেকগুলো দশক পেরিয়ে গেছে। ৮৮’র বন্যাকে স্মরণ করে রাখার জন্য সে সময় জন্ম নেওয়া শিশুর নাম অনেকেই বন্যা বা প্লাবন রেখেছিলেন। সেসব বন্যা আর প্লাবন নামের অনেকেই বড় বড় পাস দিয়ে এখন দেশে-বিদেশে কাজ করছেন। পরিবর্তন এসেছে জীবনযাপন, ব্যয়, ভোগ, উদ্‌যাপনের রীতিনীতিতে। এককথায় ৮৮’র বাংলাদেশ হারিয়ে গেছে। আমাদের উন্নয়ন আর উন্নতির জলে বদলেছে অনেক কিছু, শুধু বদলায়নি কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন নদীসংলগ্ন জনপদের প্রান্তিক মানুষদের ভাগ্য। এঁদের অনেকেই সেই ভয়াবহ বন্যায় আর এর পরের নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভাসতে ভাসতে বিভিন্ন বাঁধে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। খেটে খাওয়া নিঃস্ব এসব মানুষের ঢাকায় চলে আসারও সাহস হয়নি। গ্রামগঞ্জে-চরে খেটে, এনজিওদের কিস্তি টেনে কোনোমতে বেঁচে আছে তারা। এবার উন্নয়নের ঝাপটা তাদের এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাঁধের ওপর সাজানো সংসার, মাচাভরা শিম, লাউ, গরু-ছাগল আর মুরগির বাক্স নিয়ে তাদের চলে যেতে বলেছে প্রশাসন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তারা নোটিশও ঝুলিয়ে দিয়েছে। উচ্ছেদে কোথায় যাবে তারা? উন্নয়নের ছোবলে ছোবলে নীল হয়ে যাওয়া এসব মানুষের কাছে কোনো উত্তর নেই। এর মধ্যেই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ আরও চওড়া করার দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে এলজিইডি। তিস্তা নদীর হরিপুর চিলমারী অংশে তৈরি গার্ডার সেতুর সংযোগ সড়ক হবে বেড়িবাঁধ। তাই এই বেড়িবাঁধকে চওড়া করা দরকার। উন্নয়নের বাবুদের এই চিন্তার বলি হচ্ছে কালু দাস, গোপাল দাস, সুশীলা রাণী ও অনিল বর্মণদের দল। ছিন্নমূল এই জলদাসদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। দেশের আইনকানুন, ন্যায়-রীতিনীতি কোনোটাই এ রকম উচ্ছেদকে সমর্থন করে না। বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কোনো মানুষকেই তার ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যায় না। রাজধানীর জন্য এক আইন আর দূর গ্রামের নদীর বাঁকে কিংবা পরিত্যক্ত বাঁধের ওপর বসবাসকারীদের জন্য ভিন্ন আইন কিন্তু আমাদের সংবিধান অনুমোদন করে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উলিপুর অফিস গত ৭ জানুয়ারি প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারের নামে এক গণ-উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে। চিলমারী উলিপুর এলাকার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরহাট থেকে রমনা ইউনিয়নের পাত্রখাতা এলাকা পর্যন্ত বিস্তর এলাকায় গত ৩০-৩৫ বছর যাবৎ এঁরা বসবাস করে আসছেন।
উচ্ছেদ নোটিশে উচ্ছেদের কারণকে ‘যুক্তিপূর্ণ’ করার জন্য বসবাসকারীদের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, ‘আপনি/আপনারা বাঁধের উপরিতল/স্লোপ কেটেছেন, যা অবৈধ/নিয়মবহির্ভূত। আপনার অবস্থানের কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইত্যাদি ইত্যাদি...’ বাস্তব অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। যেখানে মানুষের বসবাস, সেখানেই বাঁধ বেশি মজবুত। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই ভূমি রক্ষা সহায়ক নানা গাছগাছড়া, ঘাস, ঢোলকলমি ইত্যাদি লাগিয়ে থাকে ও বাঁধের যত্ন নেয়। ইঁদুরকে গর্ত খুঁড়তে দেয় না। ছোটখাটো বর্ষানালি বা রেনকাট নিজেদের গরজেই মেরামত করে। গত বছরের বন্যায় (২০১৭) বিভিন্ন জায়গার বাঁধের ভাঙনের জন্য ইঁদুরকে দায়ী করা হয়েছিল; দায়ী করা হয়েছিল বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে লোকবলের অভাবকে। আদতে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেমন অর্থ বরাদ্দ থাকে না আজকাল। বসবাসকারী মানুষ বিনা পয়সায় এ কাজটা করতে পারে। বানভাসি মানুষদের সঙ্গে বাঁধের দায়িত্ব ও ভোগদখলের একটা নিয়মনীতি তৈরির সময় এসেছে। প্রায় দশক দুই আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ভোলার চরফ্যাশনের জনগণ ও স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করে এ রকমের একটি বাঁধ তৈরি করেছিল। মানুষ বাঁধের ওপর বসতের অধিকার আর বাঁধ রক্ষার দায়িত্ব নেওয়ায় সে বাঁধ আজও টিকে আছে। বাঁধের ওপর ফলবান গাছগাছালি আর কলা-পেঁপে চাষ মানুষকে যেমন আয়ের পথ দেখিয়েছে, তেমনি শূন্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচে সে বাঁধ দাঁড়িয়ে আছে। এ উদাহরণ অন্যত্র অনুসরণে বাধা কোথায়? মানুষের সম্পদ মানুষকে দিয়েই পাহারা দিতে হবে। এটা কোটালদের কাজ নয়। কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় যে চোর-পুলিশ খেলা চলছে, তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। পুনর্বাসন বা বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এসব অসহায় নারী-পুরুষ-শিশুকেľসমূলে উচ্ছেদ অন্যায়। এ রকম অন্যায্য, অবিবেচনাপ্রসূত ও বিবেকহীন উদ্যোগের বিরুদ্ধে কম‌পক্ষে পাঁচটি রায় আছে আদালতের। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বনাম সরকার (১৯ বিএলডি পৃ: ৪৮৮), মধুমালা বনাম সরকার (৫৩ ডিএলআর পৃ: ৫৪০), ব্লাস্ট বনাম সরকার (বিএলসি পৃ: ৩৮৪) এবং কামাল বনাম সরকার (২১ বিএলডি পৃ: ৪৪৬)—এগুলোর বয়ান পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে আদালতের কড়া নাড়াতে হবে। উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের আওয়াজ তুলতে হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকর্মী। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিদ্যালয়ে যাওয়া মানেই শেখা নয় by খায়েম সাভেদ্রা

ড. খায়েম সাভেদ্রা পেরুর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী। পেরুর ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক। পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১০ বছর বিশ্বব্যাংকে কাজ করেছেন। বর্তমানে সংস্থাটির এডুকেশন গ্লোবাল প্র্যাকটিসের সঙ্গে যুক্ত। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এলে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আয়েশা কবির
প্রথম আলো: বাংলাদেশ সফর থেকে আপনি কী অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন?
খায়েম সাভেদ্রা: এটা সংক্ষিপ্ত, তবে অর্থবহ সফর। মৌলিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে অনেক কথা বলার আছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্টতা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করার লক্ষ্যে আমাদের ২০০টি প্রকল্প আছে। এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি। বাংলাদেশ গত বছর অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন অনুমোদন করে। এটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখানে অনেকগুলো ভালো ও খারাপ মানের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার খারাপ মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে চলতে পারে না। একজন তরুণ যদি মানসম্পন্ন শিক্ষা না পায়, সে তার জীবনে ওই বছরগুলো আর কখনো ফিরে পাবে না। কোনগুলো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তা জানার জন্য অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা উচিত। নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আরেকটা বিষয় হলো কারিগরি শিক্ষা। কয়েক বছর আগেও কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর ১ শতাংশের মতো পড়ত। এখন এটা বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। আমি ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। মুগ্ধ হওয়ার মতো। কারিগরি শিক্ষায় বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। যারা কারিগরি শিক্ষা নিতে চায়, তাদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা খুবই ভালো উদ্যোগ। সব মেয়ের জন্য এই বৃত্তির ব্যবস্থা। কারিগরি বিষয়ে পড়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই, এমন ছেলেরা এই বৃত্তি পেতে পারে। কারিগরি শিক্ষায় নারী-পুরুষের অনুপাত ২৫ শতাংশ। এটা ৫০ শতাংশ হওয়া উচিত। তবে বর্তমানের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ভর্তিতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি হয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এখন ৯৮ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনের অন্যতম মূল বার্তা ছিল বিদ্যালয়ে যাওয়া মানেই শেখা নয়। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে যায়, তবে সবাই শিখতে পারে না। বাংলাদেশে আমরা জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়ন থেকে জানতে পেরেছি, শেখার ব্যাপারে এখনো সমস্যা আছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছে। তাই আমরা গুণগত মান নিশ্চিত করার সমস্যার বিষয়টি বুঝতে পেরেছি।
প্রথম আলো: বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে শিক্ষার সংকটের কথা আছে। বাংলাদেশ কীভাবে এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে?
খায়েম সাভেদ্রা: শিক্ষাদানের মান বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকতা পেশার ওপর নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। শিক্ষকদের ভালো বেতন, সামাজিক স্বীকৃতি ও তাঁদের দেখে যেন ভালো ছাত্ররা এ পেশায় আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রধান শিক্ষক। অন্য শিক্ষকদের উদ্দীপ্ত করা ও তাঁদের কাজগুলোকে সংগঠিত করার সক্ষমতা প্রধান শিক্ষকদের থাকতে হবে। অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি তাঁদের বিদ্যালয় কমিউনিটির অংশ করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মেধার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবস্থাপনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি মন্ত্রণালয়কে কত কাজ সামলাতে হয়। ৯০ হাজার বিদ্যালয়, ৫০ লাখ শিক্ষক ও লাখ লাখ শিক্ষার্থী সামলাতে হতে পারে। তাই আমলাতন্ত্রকে দক্ষ হতে হবে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় এটা বেশ বেশি। আদর্শ পরিমাণটা কী হওয়া উচিত?
খায়েম সাভেদ্রা: এই হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে অনেক কম। আরও অনেক দেশের তুলনায়ও বেশ কম। এটা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ সত্তরের দশকে জিডিপির ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এখন সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা উচিত। তবে এটা আদর্শ হিসাবকে বোঝায় না। প্রতিবছর শিক্ষার্থীপ্রতি কত টাকা ব্যয় করা হয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় প্রায় ১৬ হাজার টাকা। এটা খুবই কম এবং এটা বাড়ানো উচিত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে-বিষয়টা এমন নয়। বড় বিনিয়োগটা দেশের ভেতর থেকেই করতে হবে। শিক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা এবং ভালোভাবে করা বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকেরা ভালোভাবে তাঁদের কাজ করছেন, অর্থ ভালোভাবে ব্যয় হচ্ছে-এটা নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুধু কম্পিউটার-ল্যাপটপে বিনিয়োগ করলেই হবে না, শিক্ষকেরা যেন এসব যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নইলে টাকাটা নষ্ট হবে।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ১৭ লাখ ডলার দিচ্ছে। আপনারা কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করেন?
খায়েম সাভেদ্রা: এটা বাংলাদেশ সরকারের ও আমাদের-উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জ। ব্যাংক থেকে আপনি ঋণ নিতে পারেন, কিন্তু এটা জনগণের
টাকা। আমরা দুর্নীতির কথা বলছি না, টাকাটা যথাযথভাবে ব্যয় করার কথা বলছি। নিশ্চিত করতে হবে যে যতটুকু অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন, সেটা যেন শিক্ষার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগটা কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে কি না, দেশের সেই পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থাকতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো: বাস্তবে কিন্তু দুর্নীতির সমস্যাও আছে।
খায়েম সাভেদ্রা: আমি যেহেতু মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছি, আমি জানি এটা সব সময় চ্যালেঞ্জের। আপনাদের হয়তো সঠিক নীতিমালা আছে, কিন্তু দেখতে হবে সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না। সব সময়ই দুর্নীতির আশঙ্কা থাকে। তাই বিরামহীনভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হবে।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাপী দক্ষ শ্রমশক্তির চাহিদা পূরণের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কী বলবেন?
খায়েম সাভেদ্রা: বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এটা চ্যালেঞ্জ। এখানে শিক্ষকদের কাজ আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। আগের চ্যালেঞ্জ ছিল জ্ঞানের বিষয়ে। কিন্তু সৃজনশীল চিন্তার যোগ্যতা, সমস্যার সমাধান, দলগত কাজ ও সামাজিক-আবেগীয় দক্ষতা অর্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও ভালো যোগাযোগদক্ষতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় সহায়তা করে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত যুগে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক চাকরি আর থাকবে না। নতুন ধরনের পেশা আসবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সেইভাবে উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। পরিবর্তনই একমাত্র সত্য। ১০ বছর আগে কম্পিউটারের অ্যাপ ডেভেলপারদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এখন এটা লাভজনক পেশা। এটা হয়তো ১০ বছর পর না-ও থাকতে পারে এবং এই পেশার জায়গায় নতুন কিছু আসতে পারে। সেটার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী? সেগুলো মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার উপায় কী?
খায়েম সাভেদ্রা: শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কঠিন। এই দেশে অনেক ভালো ভালো উদ্ভাবন আছে। এর একটা হলো কারিগরি শিক্ষায় নারীদের বৃত্তি দেওয়া। আমি একটা শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম, যেখানে যারা কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি, দ্বিতীয় শ্রেণির পর বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে কিংবা আবার পড়াশোনা করতে চায়, তাদের দ্বিতীয়বারের মতো একটা সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ঝরে পড়ার সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু শূন্য নয়। মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার সংখ্যাটা বেশ বড়, বিশেষ করে ছাত্রীদের। আরও বেশিসংখ্যক শিশুর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করা উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের সমতা একটি ভালো বিষয়। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয়-উভয় পর্যায়ে ছেলে ও মেয়ের পড়াশোনা শেষ করার সমান সুযোগ থাকতে হবে। সমতাই মূল চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকদের ক্যারিয়ার ও বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে। এগুলো শিক্ষাকে দেশের উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
খায়েম সাভেদ্রা: ধন্যবাদ।

দাসত্ব প্রথা আজও চালু রয়েছে by তৈমূর আলম খন্দকার

নৈতিকতা, আদর্শ, বিবেক, মানবতা সবই যেন নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। সব কিছুর পেছনে আইনের দোহাই। ‘প্রকৃতি’ মানুষকে যে অধিকার দিয়েছে, সে অধিকার প্রাপ্তিতেও বাধা; সাংবিধানিক অধিকার প্রাপ্তিতেও বাধা। এ ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার ‘আইন’। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য যুগে যুগে সংস্কারকের অবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু বাহুবল, তলোয়ারের তেজ এবং বুদ্ধির কূটকৌশলে মানুষ মানুষকে দাস বানিয়েছে, গরু ছাগলের হাটের মতো মানুষ কেনা বেচার জন্য ‘দাস বাজার’ বসতো এবং সেটাও চলেছে প্রায় যুগের পর যুগ মানুষ মানুষকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের সময় থেকে শাসন করেছে ‘শক্তি’ দিয়ে, এখনো শাসন-শোষণ করছে ‘শক্তি’ ব্যবহার করেই। শক্তির শুরু ‘বাহুবল’ দিয়ে, অতপর অস্ত্র। এখন চলছে ‘কলমে’ অর্থাৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। পানি নিচের দিকে গড়ায় এবং বাঘ-সিংহ মাংসভোজী, হাতি-হরিণ তৃণভোজী প্রভৃতি প্রাকৃতিক নিয়ম, কিন্তু আইন নয়। আইন বলতে কী বুঝায় তা নিয়ে বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চ আদালত নানা মতামত দিয়েছেন। কিন্তু সবাই একটি বিষয়ে একমত, যা ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান রয়েছে এবং সে বিধান কার্যকর করার জন্য কোনো শক্তি (Authority) রয়েছে, সেটাই ‘আইন’। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট Sant Ram Versus Labh Singh (AIR 1965 SC 314) মোকদ্দমায় একটি রায়ে আইনের ব্যাখ্যায় LAWS IN FORCE কথাটি সংযোজন করেছেন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ‘আইন’ সম্পর্কে যে মতামত দিয়েছেন, আমার ধারণা- সেটাই সঠিক। কারণ যে নদীতে চর পড়ে, অর্থাৎ নদীতে নাব্য থাকে না, কালের স্রোতে সে নদী ধু ধু বালুর চরে পরিণত হয়। ‘আইন’ নিজে গতি হারিয়ে ফেলে যদি তা কার্যকর না থাকে। যে যত কথাই বলুন না কেন, একমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন ব্যতীত রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রজাদের (নাগরিক) নিয়ন্ত্রণসহ সব কিছুর মূলেই রয়েছে শক্তি অর্থাৎ MIGHT IS RIGHT। শক্তির বলে রাজ্য জয় করে রাজা যে নিয়ম-পদ্ধতি নির্ধারণ করতেন সেটাই সে সময়ের আইন। এক হাজার ৫০০ বছর আগে চিন্তা চেতনায় বিপ্লব ঘটিয়ে শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সা: রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পর আল্লাহ প্রদত্ত কুরআনি আইন কার্যকর করা শুরু হয়। ঘটনা প্রবাহে পরবর্তীকালে মুসলিম শাসক কুরআনি আইনের কোথাও কোথাও ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিজস্ব মতবাদ চালু করেছেন শুধু নিজেদের ভোগ-বিলাসিতার জন্য। হজরত মুহাম্মদ সা: বিদায় হজের ভাষণটি অনন্য দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য এবং স্পষ্টভাবেই ওই ভাষণে তিনি দাসপ্রথা বাতিলে উদ্বুদ্ধ করলেও বিলাসী মুসলিম শাসকেরা দাস প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু না রাখলেও তাদের সময়েও এই প্রথা কার্যকর ছিল। দাস প্রথা বর্তমান বিশ্বেও চালু এখনো রয়েছে। তবে অবস্থা ও পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ তথা লাখ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এক একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের নেতাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের। সংবিধানে নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা হলেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার জন্য নাগরিক অধিকার হরণ করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা অনুযায়ী নিত্যনতুন আইন পাস করা হয় তা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দাপটে ছাপা অক্ষরের সংবিধান LAWS IN FORCE-এর কাছে স্তব্ধ ও অসহায় হয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মতে, প্রতিটি স্বাধীন দেশের সংবিধানই সে দেশের সর্বোচ্চ আইন হলেও সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চয়তা প্রদান করতে সে রাষ্ট্রের সংবিধান বিশেষ করে, বাংলাদেশের সংবিধান ব্যর্থ হচ্ছে। ০১. আইন কি জনগণের কল্যাণের জন্য প্রণীত? ০২. আইন কি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার জন্য প্রণীত? এ দুটো প্রশ্নে যদি গণভোট দেয়া হয়, তবে গণমানুষের রায় কী হবে? গণতন্ত্রের ঘাড়ে চেপে ক্ষমতায় বসে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে নিত্যনতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়ে নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করেছিল।
সে একই পার্লামেন্ট ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষসহ তৎকালীন রাজনীতি মোকাবেলার জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইন’ ১৯৭৪ প্রণয়ন করেছে, যা কালো আইন হিসেবে হলেও এখনো চালু আছে। বিরোধী রাজনীতিকে দমনের জন্য বর্তমান সরকার গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে দেশব্যাপী প্রতিটি থানায় ব্যাপকহারে ওই আইনে মামলা করেছে, প্রতিটি মামলার বাদি পুলিশ অফিসার। নিজ ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার জন্য ছলে-বলে-কৌশলে অনেক ক্ষমতাসীন অহরহ অনেক আইন করে যাচ্ছেন, যা দ্বারা মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা এ ধরনের আইন পাশ করানোর বুদ্ধি, পরামর্শ দিচ্ছেন এবং সহযোগিতা করছেন, তারা গোলামির (দাস প্রথা) বশবর্তী হয়েই এগুলো করছেন। দাস প্রথা এখনো চালু আছে। কোথাও স্বনামে, আবার কোথাও বেনামে। সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘গণিকাবৃত্তি ও জুয়া খেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’। কিন্তু অন্যান্য রাষ্ট্রের মতোই বাংলাদেশে জুয়া ও গণিকাবৃত্তি চালু আছে। তা বন্ধের জন্য রাষ্ট্র বা সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। গণিকা পেশায়ও নারী কেনা-বেচা হয়। সেখানে গণিকার স্বাধীন কোনো চিন্তা করার অধিকার থাকে না বরং ক্রেতার ইচ্ছা অনুযায়ীই গণিকাকে বিলীন হতে হয়। অভাব-অনটন, সামাজিকভাবে নিগৃহীত মহিলা, যারা যৌনদাসীর ভূমিকা পালন করেন; তারাও সমাজব্যবস্থার কারণে দাসী। তারা আধুনিক বিত্তশালী পতিতাদের মতো মহানগরীতে বাড়ি-গাড়ি করতে পারেন না বিধায় গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ান। যেখানে চিন্তা-চেতনার স্বাধীনতা নেই, নির্বিচারে শুধু হুকুম পালন করতে হয় শুধু কোনো শক্তির মনোরঞ্জনের জন্য, তা-ই দাসত্ব। চাকরি ও দাসত্ব এক কথা নয়। জনগণের অর্থে লালিত অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকর্তারা জনগণের অধিকার যখন হরণ করেন; তখন তারা বলেন, ‘ওপরের নির্দেশে করছি’। ব্রিটিশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের উচ্চ আদালত এ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে যে, Superior illegal order is no order অর্থাৎ উপরস্থ কর্মকর্তার অবৈধ আদেশ বৈধ বলে গণ্য হবে না।’ এরপরও পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিরোধী দলসহ সাধারণ মানুষকে নির্যাতন-নিপীড়ন করছে কিংবা তাদের অধিকার হরণ করছে একই কথা বলে যে, ‘ওপরের নির্দেশ’। ওপরের বেআইনি নির্দেশ পালন করাই এক ধরনের ‘দাসত্ব’। কারণ মানুষের বিবেক যখন বিক্রি হয়ে যায়, তখন মানুষ তার নিজস্ব চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে দাসে পরিণত হয়। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে চলছে একই অবস্থা।
লেখক : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

তাহলে সরকার কী করবে? by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

আমরা যখনই ‘সরকার’ শব্দটি উচ্চারণ করি, তখন রাষ্ট্রের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনাব্যবস্থাকেই বুঝি। ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এতই ব্যাপক যে, তা পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ব্যবস্থাপনার দায়দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়, তাদেরকে সফলতা ও ব্যর্থতার জন্য দায়ী হতে হয়। ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর গুণপনা একটি সংসার, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারে। অনুরূপভাবে ব্যক্তির অলসতা, অসততা, অকর্মণ্যতা, অযোগ্যতা, অনভিজ্ঞতা কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বনাশের কারণ হতে পারে।
রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনাকেও আমরা গুণ আর দোষ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। এভাবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দল বা গোষ্ঠী পৃথিবীর ইতিহাসে ভালোমন্দের জন্য খ্যাত বা কুখ্যাত হয়ে আছে। জওয়াহের লাল নেহরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যখন শপথ গ্রহণ করেন, তখন মহাত্মা গান্ধী তাকে এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন, ‘তুমি অশোক এবং উমরের মতো সুশাসক হও।’ তাহলে বোঝা যায় মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করাই শাসকদের কর্তব্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, ‘সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি সরকার দিয়ে শাসিত। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ সময়ন্তরে একটি গণতান্ত্রিক প্রথা পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার সংবিধানের ওই লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করবে- এটাই প্রত্যাশিত। যেকোনো সরকার বা রাষ্ট্রের দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তি শপথগ্রহণ করে তখন সে প্রতিজ্ঞা করে- ‘অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হইয়া কোনো কাজ করিব না।’ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও শপথের অঙ্গীকার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের কর্ণধারদের জন্য করণীয় নির্ধারণ করেছে। সরকারের করণীয় নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। একজন প্রধানমন্ত্রী যখন শপথগ্রহণ করেন, তখন এসব দায়-দায়িত্ব তিনি এবং তার সরকারের ওপর সমর্পিত হয়। বিগত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশ সফর সম্পর্কে জানাতে আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত এ রকম কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের অবতারণা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার সাজা, তাকে ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন মানুষের অধিকার। তার গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার, সে প্রয়োগ করবে। এখন তাকে (বেগম খালেদা জিয়া) ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। তিনি আরো বলেন, ‘রায়টাতো আমি দেইনি। রায়টা দিয়েছেন কোর্ট। আর মামলা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দুদক।’ খালেদা জিয়ার সাজা বা বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে তার করণীয় নেই জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ যদি না করে কারো কিছু করার নাই।’ প্রধানমন্ত্রী আরো স্পষ্ট করে বলেন, ‘আর যদি বলেন আমি শাস্তি দিয়েছি, আমি তুলে নেবো- তাতেও আমি পারব না। এটা কোর্ট দিয়েছে, মামলা করেছে দুদক।’
নির্বাচন করা দলগুলোর নিজস্ব ব্যাপার মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোন দল নির্বাচন করবে আর কোন দল করবে না এটা সম্পূর্ণ তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কিন্তু নির্বাচন সময় মতো হবে। জনগণও ভোট দেবে।’ সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রী কী নিজে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে গেছেন বা সচিব গেছেন বা যারা শিক্ষক তারা কি গেছেন?... এটা নিয়ে একবার সুর তুলে একবার মন্ত্রীকে দায়ী, একবার সচিবকে দায়ী, একবার সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস সব সময় যুগ যুগ ধরে চলে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কখনো প্রচারিত হয় কখনো হয় না।’ পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা বা ২০ মিনিট আগে প্রশ্ন দেখার পর ওই প্রশ্নানুযায়ী বই খুলে সেই প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে তা স্মরণ করে খাতায় লেখার মতো মেধাবী (ট্যালেন্টেড) ছাত্র আছে কিনা, তা প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্নফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে সাংবাদিকদের সহায়তা চান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিক, আপনাদের কাছে অনুরোধ করি, আপনারা দয়া করে অন্তত একজনকে বের করে দেন, সাথে সাথে শাস্তি দেবো। কারণ, আমরাও চাই না এভাবে প্রশ্নফাঁস হোক বা এই বদনামটা হোক।’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ২০ মিনিট, আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র হলে চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তখন বিতরণ করার জন্য প্রতিটি কক্ষে দেয়া হয়... এখন সবার হাতে মোবাইল, কেউ ছবি তুলে নিতে পারে। এ ছাড়াও নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে ওই সংবাদ সম্মেলনে। এ দুটো বিষয় নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সম্ভবত এই কারণে- যে একটি বিষয় প্রকারান্তরে নির্বাচনকেন্দ্রিক, অপরটি শিক্ষা সংবেদনশীল। আমরা সবাই জানি বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রচলিত। আর রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা হচ্ছে সংসদীয় নির্বাচনের অপরিহার্য অংশ। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেননি। নিশ্চিত করেছেন যে আগামী ডিসেম্বরে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচন যেমন আইনে, সমাজে এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় তেমনি একটি খেলা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন সম্ভব নয়। অসম্ভবকে সম্ভব করে যখন এ ধরনের খেলা হয় তখন তাকে বলা হয় পাতানো খেলা। এরকম ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হল তা যেকোনো বিবেচনায় ছিল- প্রতিদ্বন্দ্বীহীন। খোলা মাঠে যারা গোল দিয়ে জিততে যায় সে বিজয় কোনো বিজয় নয়। পৃথিবীর তাবৎ সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য রীতিনীতি, প্রথা ও পদ্ধতি- কোথাও ওই নির্বাচনের নমুনা পাওয়া যাবে না। আগামী সংসদীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। এ দেশের একজন নাবালকও বোঝে যে, খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে নির্বাসন দিলে কার লাভ? বিচারের রায় নিয়ে প্রশ্ন করা সঙ্গত নয়। কিন্তু সাধারণ ধারণা কেন বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে- সে প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবে উত্থাপন করা যায়। স্থান কাল পাত্র বলে যে ধারণাটি আছে তা কিভাবে অগ্রহ্য করা যাবে? সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী সংসদীয় বিরোধী দলকে সরকারের অঙ্গ মনে করা হয়। সে ধারণানুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা সংসদীয় সরকারেরই দায়িত্ব। ইলেকশন কমিশন নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের দায়িত্ব পালন করবে। সরকার নির্বাচন পর্যন্ত দলকে এগিয়ে দেবে- এটাই সংসদীয় সংস্কৃতি। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনকে অগ্রাহ্য করে ছলে বলে কলে কৌশলে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ বিএনপির ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত না করে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ সবার জন্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে সংসদীয় নির্বাচনটি করেছিলেন সেটি ছিল এ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ। অথচ সে সময় নির্বাচনের জন্য কোনো আন্দোলন ও আবেদন ছিল না। এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি। আর বাংলাদেশ তৃতীয় বিশে^র একটি মধ্যম আয়ের দিকে ধাবিত উন্নয়নশীল দেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়কালে কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু কাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে গণতন্ত্রের উন্নয়ন না ঘটে বরং অনুন্নয়ন ঘটেছে- এটা বিদ্ব্যজনদের মন্তব্য। বাংলাদেশে রাজনৈতিক উন্নয়ন যে উন্নত দেশের মতো নয় সে কথা সবাই স্বীকার করেন। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের মানদণ্ডে যদি বিচার করা হয় তাহলে রাজনৈতিক হিংসা প্রতিহিংসা, অসহিঞ্চুতা, অরাজকতা ও ষড়যন্ত্র রাজনীতিরই অংশ।
সুতরাং খালেদা জিয়ার মামলা, কারাবাস এবং বিএনপির প্রতি দমনপীড়ন- এসব থেকে সরকার তার স্বাতন্ত্র্যের কথা বলে পার পাবে না। একই মামলায় দুই আমলে দুই ধরনের রায় দেয়ার নজির বাংলাদেশে রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া যদি ন্যায়বিচার না পান তাহলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। যে দেশে ভিন্ন মত পোষণের জন্য দেশত্যাগ করতে হয়, সে দেশে কী না হতে পারে? এবার আসা যাক প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। সে দায়িত্ব সুসম্পন্ন করার জন্য যারা দায়িত্বশীল তারা যদি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য, অকর্মণ্য ও অনভিজ্ঞ প্রমাণিত হন তাহলে তারা কি দায়িত্বহীনতার জন্য অভিযুক্ত হবেন না? পৃথিবীর সর্বত্র নীতিগত ব্যর্থতার কারণে উচ্চ মর্যাদাধারীদের অনেকের পদত্যাগের উদাহরণ রয়েছে। পদত্যাগ করা না করা ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার সাথে সংশ্লিষ্ট। সংসদীয় রীতিনীতিতে সামষ্টিক দায়িত্বের কথা আছে। সুতরাং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারেও কি আমাদের তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখতে হবে? এর আগেও নাগরিক সাধারণ সোনার মেডেলে ভেজালের পর তার পক্ষে সাফাই মন্তব্য শুনেছে। গডফাদারদের আনুকূল্যে মন্তব্য শুনেছে। এ দেশের দুর্নীতিবাজ বলে অভিযুক্ত ব্যক্তি গুড ক্যারেক্টারের সার্টিফিকেট পেয়েছেন। নির্বাচন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অবাধ লুটপাট, সন্ত্রাস, দুর্নীতি- কোনো কিছুরই বিরুদ্ধে সরকার যদি কোনো পদক্ষেপই নিতে না পারে তাহলে তারা কি করবে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ফেইলড স্টেট বা ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে একটি টার্ম রয়েছে। ব্যর্থ রাষ্ট্র তাকেই বলা হয় যেটি রাষ্ট্র পদবাচ্য অথচ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে যথার্থ কর্তৃত্ব প্রয়োগে ক্ষমতা রাখে না। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার জন্য বাংলাদেশের শত্রুরা নানা ধরনের ফাঁক ফোকর, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছে। বাংলাদেশ সরকারের কোনো কার্যক্রম ও মন্তব্য ব্যর্থ রাষ্ট্রের অনুগামী হোক এটা আশা করা যায় না। তবে সরকারের দায়-দায়িত্ব নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাকে কি ব্যর্থ সরকার বলা যাবে না?
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

আইনের সার্বভৌমত্ব বনাম রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব by এবনে গোলাম সামাদ

একটা দেশে আইন আদালতের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু আইন আদালত রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে না। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে হয় রাজনৈতিকভাবে। যারা রাজনৈতিক বিষয়ে বই লিখে খ্যাতিমান হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে একজন হলেন বিলাতের A V Dicey। তিনি তার বিখ্যাত The Law of the Constitution (1915) নামক বইতে বলেন, বিলাতে গণতন্ত্র স্থায়িত্ব পেতে পেরেছে, তার কারণ বিলাতের গণতন্ত্র হলো জনমতভিত্তিক। কেবলই আইনভিত্তিক নয়। তার নিজের কথায়,Behind the sovereign which the lawyer recognizes, there is another sovereign to whom the legal sovereign must bow.  আইন বিশারদরা আইনের সার্বভৌমত্বকে বড় করে দেখেন। কিন্তু আইনের শেষ ভিত্তি হলো জনসম্মতি। জনগণের ইচ্ছার প্রতিকূলে আইনের সার্বভৌমত্ব তাই টিকতে পারে না। যেহেতু বিলাতে জনমতের স্বীকৃতি আছে, তাই হয় না গণঅভ্যুত্থান। খালেদা জিয়াকে আদালত কারাগারে পাঠাল। আমরা আদালতের বিচারের সমালোচনা করতে চাই না। কিন্তু আমরা মনে করি, বিষয়টির সাথে রাজনীতি এমনভাবেই জড়িয়ে পড়েছে যে, জনমতের সাথে আদালতের রায় খাপ না খেতেও পারে। বিজ্ঞ বিচারকেরা বলছেন, খালেদা জিয়া যা করেছেন তা হলো আর্থিক অপরাধ। কিন্তু আর্থিক অপরাধ কিভাবে করা হয়েছে তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে সংশয়। কেননা এতিমখানার নামে পাঠানো টাকাটা দিয়েছে একটি বিদেশী রাষ্ট্র। টাকাটা এসেছে খালেদা জিয়ার নামে। ঠিক প্রধানমন্ত্রীর নামে নয়। টাকাটা নয়ছয় হয়ে থাকলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু মামলাটা হতে পারল রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। রাষ্ট্র যদি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মামলা দায়ের করতে পারল কিভাবে? রাষ্ট্রের টাকা বাংলাদেশে অনেকভাবেই নয়ছয় হচ্ছে। যেমন মন্ত্রীরা সরকারি টাকায় নানা দেশের জায়গায় সফর করছেন। কিন্তু সফরে গিয়ে আবার দিয়ে ফেলছেন দলের নির্বাচনী বক্তৃতা। সরকারি টাকায় যেটা তারা করতে পারেন না। এটাও সরকারি অর্থের অপচয় বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সেটা হচ্ছে না। রাষ্ট্র ও সরকার সমার্থক নয়। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তব ক্ষেত্রে তাকে তোলা হচ্ছে সমার্থক করে। যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনিই আবার বক্তৃতা করছেন একই সভায় একই সময়ে আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসেবে। আমার মনে পড়ে ভারতে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একবার সরকারি হেলিকপ্টারে করে গিয়ে কোনো জায়গায় দিয়ে ফেলেছিলেন নির্বাচনী বক্তৃতা। এক ব্যক্তি এ জন্য এলাহাবাদ হাইকোর্টে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগ তোলেন নির্বাচনে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অপরাধের। এহালাবাদ হাইকোর্ট রায় দেন যে, ইন্দিরা গান্ধী পাঁচ বছর কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী এহালাবাদ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটি দ্ব্যর্থক রায়সহ এলাহাবাদের সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখেন। বাংলাদেশ একটা পৃথক দেশ। কিন্তু নির্বাচনী আইন প্রায় ভারতেরই মতো। এ দেশেও তাই আদালতে মামলা হতে পারত বিষয়টিকে নিয়ে। কিন্তু দুদক এ বিষয়ে দেখাচ্ছে না কোনো তৎপরতা। কোনো ব্যক্তিও করছেন না এ বিষয়ে কোনো মামলা। কেবল খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই হতে পারল আর্থিক অপরাধজনিত কারণে মামলা এবং তাকে পেতে হলো সাজা। নিম্ন আদালতের রায় অবশ্য উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যেতেও পারে। আমরা এ বিষয়ে কোনো কিছু আন্দাজ করতে চাই না। তবে আমাদের ধারণা, খালেদা জিয়া আর বিএনপি দল হিসেবে সমার্থক নয়। দল হিসেবে বিএনপির আছে বিরাট সমর্থন। খালেদা জিয়ার ভাবমর্যাদা কোনো কারণে বিবর্ণ হওয়ার অর্থ দাঁড়াবে না বিএনপির জনপ্রিয়তা উবে যাওয়া। অথবা ভোটের বাক্সে বিএনপির ভোট কম পড়া। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ দু’টি আলাদা দল। কিন্তু এই দলীয় পার্থক্যের মূলে কাজ করছে না কেবল ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত। খালেদা জিয়ার সাথে শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত আছে। সেটা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু দু’টি দলের পার্থক্য ঘটেছে নীতিগত কারণেও। আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে চেয়েছে দেশে একদলের রাজত্ব স্থাপন করতে। বলেছে, আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র। কিন্তু বিএনপি আগাগোড়াই চেয়েছে বহুদলীয় উদার গণতন্ত্র। সে কখনোই মনে করেনি একমাত্র রাষ্ট্রই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। সে আস্থা রেখেছে ব্যক্তি উদ্যোগে। সে দেশে সমাজতন্ত্র গড়ার নামে ব্যক্তি উদ্যোগকে কখনো বন্ধ করে দিতে চায়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময় আরম্ভ হয় শ্রমশক্তি রফতানি, তৈরী পোশাক রফতানি, চিংড়ি মাছ রফতানি, যা দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্টি করে বিশেষ গতি। এই গতি আনে দেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। ঘোচে বাংলাদেশের তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ। আওয়ামী লীগ ঝুঁকে পড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি। গ্রহণ করতে চেয়েছিল সোভিয়েত অর্থনীতির আদর্শকে অনুসরণ করতে। আর এক কথায় রাষ্ট্রিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন সাধন করতে। কিন্তু এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। তার পদ্ধতি আর বিশ্বের কোনো দেশেই আদ্রিত নয়। বরং হচ্ছে বহুলভাবেই নিন্দিত। কিন্তু আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা এখনো যেন চাচ্ছেন এই নিন্দিত আদর্শকেই শ্রেষ্ঠ ভাবতে। বাংলাদেশে মানুষ চাচ্ছে উদার গণতন্ত্র। কারণ, এই ব্যবস্থাতেই মানুষ পেতে পারে সর্বাধিক ব্যক্তিস্বাধীনতা। গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়। বাস্তবে তা হলো একটি উন্নত জীবনবিধান। একটি বড় রকমের অর্জন। আওয়ামী লীগের মতো দল একটি দেশে ক্ষমতায় থাকা মানে হলো, দেশে রাষ্ট্র-দাসত্ব (State-slavery) প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বাংলাদেশের মানুষ চায় প্রকৃত স্বাধীনতা। তারা চায় না রাষ্ট্র-দাসত্ব।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের থাকবে মানব সমতা ও তারা ভোগ করবে সামাজিক ন্যায়বিচার। পরে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় যোগ করা হয়, বাংলাদেশ হবে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু মুজিবনগরের ঘোষণাপত্রে সমাজতন্ত্র কথাটা ছিল না। যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র কথাটা সংযুক্ত হয়। তথাপি বলা হয়েছে যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে। গণতন্ত্রকে বাতিল করে বলা হয়নি, একদলের রাজত্বকে প্রতিষ্ঠা করবার কথা। আওয়ামী লীগের আদর্শ বাংলাদেশের সংবিধানের পরিপন্থী। শেখ হাসিনা বলছেন, আমাদের মধ্যে নাকি ফিরে আসছে পাকিস্তানের প্রেতাত্মা (বাংলাদেশে প্রতিদিন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। কিন্তু ২০১২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের যে অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তিনি বলেছেন, দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল সঠিক। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল ন্যায্য। কেবল তাই নয়, বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলমানেরা কেবল বাঙালি নয়, তাদের মধ্যে কাজ করে চলেছে একটা মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ (পৃষ্ঠা ৪৭ দ্রষ্টব্য)। এর পরে কি বলা যায়, আমাদের অনেকের মধ্যে পাকিস্তানের প্রভুদের প্রভাব বিরাজ করছে? শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চিন্তা-ভাবনার। এখন আর বলা যাচ্ছে না, হাজার বছরের বাঙালি কথাটা। আওয়ামী লীগের জাতিসত্তার ধারণাটাও মনে হচ্ছে হওয়া উচিত হাল নাগাদ। অনেক কিছুই ঘটছে, কিছু দিন আগেও যার কথা ভাবা যায়নি। যেমন, আমরা সাবেক পাকিস্তানের মধ্যে আন্দোলন করেছিলাম বাংলাকে উর্দুর সাথে রাষ্ট্রভাষা করতে। আমরা সেই ইতিহাস নিয়ে এখনো করছি নানাভাবেই কান্নাকাটি। যদিও রাষ্ট্রভাষা বাংলা কোনো অসফল আন্দোলন ছিল না। বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে লাভ করতে পেরেছিল স্বীকৃতি। কিন্তু বর্তমানে দেখছি এখনকার পাকিস্তানে উর্দুর সাথে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে চীনা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। কী বিরাট এই পরিবর্তন? চীনে অনেক ভাষা আছে। তার মধ্যে কুয়ান হয়া হলো চীনের রাষ্ট্রভাষা। এই ভাষাটা বাইরের দুনিয়ায় ম্যান্ডারিন নামেও পরিচিত। ম্যান্ডারিন নামটা পর্তুগিজদের দেয়া। চীন বিশেষভাবেই ঢুকে পড়তে পারছে ভারত উপমহাদেশের মধ্যে। এর জন্য তাকে করতে হচ্ছে না কোনো যুদ্ধ। কিন্তু ভারত এভাবে ঢুকতে পারছে না চীনের মধ্যে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়াবে খুবই জটিল। শেখ হাসিনা হয়তো ভাবছেন, ভারত-চীন যুদ্ধে ভারত জিতবে। কিন্তু অতটা নিশ্চয়তাবোধ বাস্তবভিত্তিক হচ্ছে বলে মনে হয় না। অন্তত রণনীতির দিক থেকে। কারণ, চীনা সৈন্যরা ঢুকে পড়ছে এমন এক দেশে, যেখান থেকে দিল্লি দূরে নয়। পানিপথের মধ্য দিয়ে তারা অনেক সহজে দিল্লি অভিমুখী হতে পারবে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

সবজির দাম কমেছে বেড়েছে তেল চিনির

শীতের শেষ দিকে এসে ঢাকার বাজারে শীতকালীন সবজির দাম কমেছে। বিশেষ করে আলু, টমেটো এবং বিভিন্ন ধরনের শাকের দাম এখন অনেক কম। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজিদরে। আলুর দাম নেমে এসেছে ১৫ টাকায়। ফুলকপি, পাতাকপি, মুলা, গাজর, বেগুন, শিমসহ বেশির ভাগ সবজিও পাওয়া যাচ্ছে সহনীয় দামে। যদিও ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, বরবটি, কচুরলতি, পটোল প্রভৃতির দাম এখনো বেশি। নতুন করে দাম বেড়েছে আদা, রসুন, ভোজ্যতেল, মাছ ও চিনির। গতকাল রাজধানী ঢাকার কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দ্রব্যমূল্যের এ চিত্র পাওয়া যায়। খুচরা বাজারে গতকাল পাকা টমেটো মানভেদে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হতে দেখা যায়। এক সপ্তাহ আগেও টমটোর কেজি ছিল ৩০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন টমেটোর ভরা মওসুম। আড়তেও পর্যাপ্ত টমেটো কোনো সঙ্কট নেই। তাই দাম কম। একই অবস্থা আলুর ক্ষেত্রেও। অবশ্য পরিবহন সঙ্কটে এবং দাম না পাওয়ায় দেশের কোথাও কোথাও টমেটো ফেলে দেয়ার কিংবা গরুকে খাওয়ানোর সংবাদও গণমাধ্যমে আসছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা কমিয়ে ডায়মন্ড আলু ১৫ থেকে ১৬ টাকা ও গ্রানুলা ১২ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। খুচরা বাজারে গতকাল প্রতিটি ফুলকপি ও পাতাকপি আকারভেদে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৪০ টাকা, পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকা, শিম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বেগুন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, ঝিঙ্গা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং মটরশুঁটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। লাউ বিক্রি হয় প্রতিটি ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। লালশাক, পালংশাক, লাউশাকসহ অন্যান্য সবজিও গত সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা কম দামে বিক্রি করতে দেখা যায়। তবে মাছ ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব জাতের মাছের দামই কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। বাজারে গতকাল প্রতি কেজি রুই মাছ ২৩০ থেকে ২৮০, কাতল ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙ্গাশ ১২০ থেকে ১৫০, সিলভারকার্প ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, তেলাপিয়া ১৬০ থেকে ১৮০, শিং ও মাগুর মাছ বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে।
তবে দেশী মাছের দাম অনেক বেশি। বিক্রেতারা জানান, বাজারে দেশী মাছের চাহিদা বেশি, তাই এর দামও বেশি। প্রতি কেজি টেংরা বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকায়। শোল মাছের কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। বাটা মাছ কেজিপ্রতি ৩২০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। এ ছাড়া সাগরের মাছের মধ্যে ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের প্রতি কেজি ইলিশ ৮০০ টাকা, কোরাল প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০, রূপচান্দা আকারভেদে ৫৫০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে লিটারে ২ থেকে ৩ টাকা। তীর ও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল প্রতি পাঁচ লিটারের বোতলে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫১০ টাকা। আগেও এই দর লেখা থাকলেও খুচরায় বিক্রি হয় ৪৯০ টাকায়, যা এখন ৫১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্য সব ব্র্যান্ডের প্রতি লিটার আগে ১০৩ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন তা বেড়ে ১০৫ থেকে ১০৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, কোম্পানিগুলো আগে প্রতি লিটারে দুই টাকা ছাড় দিতো। কিন্তু এখন ছাড় তুলে নিয়েছে। এ কারণে বোতলের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে। চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে দুই টাকা। বর্তমানে খুচরায় প্রতি কেজি চিনি ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা। এ ছাড়া প্যাকেটজাত আখের চিনি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বেড়েছে চালেরও। প্রতি কেজি মিনিকেট গতকাল ৬০ থেকে ৬৩ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝারি মানের চাল বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫১ থেকে ৫৩ টাকায়। অন্যান্য চালের মধ্যে নাজিরশাইল এখনো ৬৪ থেকে ৬৮ টাকা। ভালো মানের নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চাল স্বর্ণা ৪২ থেকে ৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে গতকাল পেঁয়াজের দর কিছুটা কমেছে। দেশী পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও গত বছরে এই সময়ে ছিল দেশী পেঁয়াজ ২২ থেকে ২৮ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৪ টাকা। দুই সপ্তাহ ধরে বাড়ছে রসুন ও আদার দাম। এখন প্রতি কেজি দেশী রসুন ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং আমদানি করা রসুন ৯০ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে। আর আদা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। এখন লবণের মওসুম থাকলেও দাম কমছে না। সুপার লবণ ৩৮ থেকে ৪০ ও সাধারণ লবণ ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের 'দিন চলছে বিভিন্ন সংস্থা আর মানুষের সাহায্যে, যেটা আমি কোন দিন কল্পনা করিনি'

মিয়ানমারের কুমারখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন জাফর ইসলাম। নিজের এলাকায় ৩০ বিঘা জমি, বাড়ি ঘর সব মিলিয়ে বেশ নাম ডাক ছিল মি. ইসলামের। কয়েক গ্রামের মানুষ তাকে এক নামে চিনতো। কিন্তু সেই ব্যক্তি, জীবন বাঁচাতে একেবারে এক কাপড়ে পালিয়ে এসেছেন পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে। আর এখন পলিথিনের শেড দেয়া ঘরে দিনের পর দিন পার করছেন তিনি এবং তার পরিবার। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার টেংখালি ক্যাম্পে এখন বাস জাফর ইসলামের। স্ত্রী হাসিনা বেগম এবং ছয় সন্তান নিয়ে এখানে রয়েছেন তিনি ছয় মাস ধরে। ওপরে পলিথিন এবং চারপাশে বেড়া দিয়ে ঘেরা ছাপড়ার মত দুটি ঘর। ঘরের মধ্যে ঢুকে আমি দেখতে পেলাম কোনমতে জীবন ধারণ করার জন্য যে কাপড় দরকার সেগুলোই আছে। আসবাব বলতে কিছু নেই। মাটিতে বিছানা পেতে শোবার স্থান করা। আমি যখন সেখানে গেলাম তখন দুপুর একটার কাছাকাছি। তবে দুপুরের রান্না-বান্নার কোন আয়োজন আমর চোখে পড়লো না। নেই কাজ কর্মের কোন তাড়া। হাসিনা বেগম মেঝেতে শুয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে উঠে বসলেন। ছেলে মেয়েরাও অলস বসে ছিল। মায়ের পাশে এসে বসলো তারাও। সেখানেই বলছিলেন মিয়ানমারে তাদের ফেলা আসা সহায়-সম্পত্তি, প্রভাব প্রতিপত্তি আর এখনকার দীনহীন অবস্থার কথা। এই জাফর ইসলামের বাড়ী ছিল কাঠের তৈরি দোতলা বাড়ী। যেটা মিয়ানমারের গ্রাম-অঞ্চলে শুধুমাত্র বিত্তবানদের থাকে। ঐতিহ্যবাহী এসব বাড়ী অনেক পুরনো, এবং বংশের ঐতিহ্য ধারণ করে।
সেই বাড়ী ছেড়ে পলিথিনের ছাপড়ায় দিন কাটছে তাদের এখন। হাসিনা বেগম এবং জাফর ইসলামের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। হাসিনা বেগম বলছিলেন "এক কাপড়ে রাতের অন্ধকারে নৌকায় করে পালিয়ে এসেছি। ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা সব বন্ধ। কবে আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারবে তার কোন ঠিক নেই।" মি. ইসলাম পুরো সময়টা মাথা নীচু করে কথা বলছিলেন। বলছিলেন, এভাবে জীবন যাপন করা তার জন্য অসম্মানের। "শুধু সন্তান আর পরিবারের কথা চিন্তা করে পালিয়ে এসেছি," বলছিলেন তিনি। "যখন আসি তখন এক মাস চলার মত অর্থ আমার হাতে ছিল। কিন্তু আট জনের খরচ চালাতে কিছু দিনের মধ্যেই সেই অর্থ শেষ হয়ে যায়। এখন দিন চলছে বিভিন্ন সংস্থা আর মানুষের সাহায্যে, যেটা আমি কোন দিন কল্পনা করিনি।" হাসিনা বেগম বলছিলেন তাদের জমি-জমাতে অনেক কৃষক কাজ করতো। প্রতিদিন অনেক মানুষের খাবার ব্যবস্থা তারা করতেন কিন্তু এখন তাদেরকে অন্যের ওপর ভরসা করে চলতে হচ্ছে। এই পরিবারটির কাছে জানতে চাইলাম এখনকার জীবন নিয়ে তাদের কী ভাবনা? স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই একই উত্তর দিলেন। তারা বললেন, সেখানে অনেক সমস্যা কিন্তু জীবনের নিশ্চয়তা আছে। কিন্তু মিয়ানমারে তাদের সবকিছু ছিল কিন্তু জীবনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না। জাফর ইসলাম বলছিলেন, তিনি শুনেছেন যে তার জমি মিয়ানমারের আর্মি দখল করে ফ্যাক্টরি বানানোর কাজ করছে। জানতে চাইলাম মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা? অনেক ক্ষণ চুপ থেকে বললেন "ইচ্ছা আছে। কিন্তু ফিরে যাবো কোন ভরসায়?"

সিরিয়ায় যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থ জাতিসংঘ

সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি আনতে জাতিসংঘে যে প্রস্তাব আনা হয়েছিল তা বাস্তবায়নে রীতিমতো সংগ্রাম করছে নিরাপত্তা পরিষদ। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি। সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের প্রস্তাবে ভোটে দিয়েছে রাশিয়া। স্থানীয় সময় শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানেও রাশিয়া ভেটো দিতে পারে। খবর এএফপির। সিরিয়ার পূর্ব ঘৌটায় টানা ছয় দিনের সহিসংতায় ৪২৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই সহস্রাধিক মানুষ। ২০১৩ সালের পর সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর এটি সর্বোচ্চ প্রাণঘাতীর বিমান হামলা। ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে ঘৌটায় ৩০ দিনের অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব আনা হয়। অস্ত্রবিরতি নিয়ে বৃহস্পতিবারের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে কোনো ঐকমত্য হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিয়েছে, বৃষ্টির মতো করে সেখানে বোমা পড়ছে এখনও। বেসামরিক মানুষ তীব্রতর মানসিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘৌটার এ ভয়াবহ বিপর্যয় রুখতে দেশটিতে মানবিক সহায়তা ও জরুরি ওষুধপত্র সরবরাহের জন্য বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলা হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য সুইডেন ও কুয়েত এ প্রস্তাব উত্থাপন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেই চুক্তির ব্যাপারে ঐকমত্য হয়নি। রাশিয়াই বাকিদের সঙ্গে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বিবিসির খবরে বলা হয়, ৩০ দিনের জন্য প্রস্তাবিত অস্ত্রবিরতির খসড়ায় বলা ছিল, চুক্তির ৭২ ঘণ্টা থেকে এটি কার্যকর হবে। ১২৪৪ সম্প্রদায়ের ৬৫ লাখ মানুষের মানবিক প্রয়োজনের বিবেচনার কথা বলা হয়েছিল ওই প্রস্তাবে। আইএস, আল কায়দা ও নুসরা ফ্রন্ট অস্ত্রবিরতির আওতায় পড়বে না বলে উল্লেখ ছিল ওই প্রস্তাবে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ঘৌটায় সক্রিয় হায়াত তাহরির আল শামস নামের এক গোষ্ঠীকে আল কায়দা সংশ্লিষ্ট দাবি করেন। তাদেরকেও অস্ত্রবিরতির আওতায় না নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। তবুও এ নিয়ে সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের প্রবল আগ্রহ সত্ত্বেও এ প্রস্তাব পাস করা যায়নি রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতার কারণে। শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ভোটাভুটি হবে। ২০১৩ সাল থেকে এলাকাটি বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। রাজধানী দামেস্কের কাছে অবস্থিত এটিই সর্বশেষ এলাকা, যেটি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকাটির পুনর্দখল নিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে অভিযান জোরালো করে সরকারি বাহিনী। এতে শত শত মানুষ হতাহত হয়। পরে বেসামরিকদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে এক বিরল অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয় দুই পক্ষ।

বুলডোজারে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গা গ্রাম

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে, সেনাবাহিনীর দমন অভিযানে জনশূন্য হয়ে পড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা নিধনের আলামতগুলোও ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে দেশটি। নতুন স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে মানবাধিকার সংস্থাটি এ অভিযোগ করেছে। তারা বলছে, গত বছরের শেষদিক থেকে রাখাইনের উত্তর অংশের অন্তত ৫৫টি রোহিঙ্গা গ্রামের সব স্থাপনা ও ক্ষেতখামার ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সমান করে ফেলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ মুছে ফেলার ব্যবস্থা করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এইচআরডব্লিউ বলছে, গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৬২টি রোহিঙ্গা গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার চিহ্ন দেখা গেছে তাদের হাতে আসা স্যাটেলাইট ছবিতে। এর আগে পুড়িয়ে দেয়া বেশ কিছু গ্রামের সঙ্গে অন্তত দুটি জনশূন্য অক্ষত গ্রাম বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলছে মানবাধিকার সংস্থাটি। সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস এক বিবৃতিতে বলেন, এসব গ্রাম ছিল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের ভয়াবহতার প্রমাণ। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা যাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার আলামত সংগ্রহ করতে পারেন এবং দোষীদের যাতে যথাযথভাবে শনাক্ত করা যায়, সেজন্যই এসব গ্রাম ওই অবস্থায় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘এক সময় সেখানে যে রোহিঙ্গাদের বসবাস ছিল, তাদের স্মৃতি এবং সেই সঙ্গে তাদের আইনি অধিকারের চিহ্নও বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলা হচ্ছে।’ এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর রাখাইনের মিন হল্ট এলাকার দুটি গ্রামের স্যাটেলাইট ছবি তারা পেয়েছে, যেগুলো গত বছর পর্যন্ত আগুনে পোড়ানো হয়নি এবং খুব সম্ভবত আবারও বসবাসের উপযোগী অবস্থায় ছিল। কিন্তু সেই গ্রাম দুটিও ৯ জানুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্র“য়ারির মধ্যে বুলডোজার দিয়ে সমান করে দেয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্স দুই সময়ের চিত্র তুলে ধরে লিখেছে, এমন এক সময়ে এইচআরডব্লিউ এসব ছবি প্রকাশ করল যখন রাখাইনের ওই অঞ্চলে ত্রাণ তৎপরতা চালানোর বিষয়ে জাতিসংঘ ও জাপানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে মিয়ানমার সরকার। রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনাক্যাম্পে সমন্বিত হামলার পর ২৫ আগস্ট থেকে সেনাবাহিনীর এই দমন অভিযান শুরু হয়, যাকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার ওই হামলার জন্য রোহিঙ্গা গেরিলাদের একটি দলকে দায়ী করে আসছে।
সেনাবাহিনীর অভিযানকে তারা বলছে, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’। সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে গত ছয় মাসে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। গ্রামে গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওযের ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে তাদের ভাষ্যে। পশ্চিমা সরকারগুলোর চাপ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি উপেক্ষা করেই নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির সরকার রাখাইনে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পরিচালনার পথ বন্ধ করে রেখেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ তাইয়ের কোনো মন্তব্য তারা পায়নি। মিয়ানমারের কর্মকর্তারা এর আগে বলেছিলেন, গত নভেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে করা প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে তারা বিভিন্ন এলাকা প্রস্তুত করছে। আর গত জানুয়ারিতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল, আটটি এক্সক্যাভেটর ও চারটি বুলডোজার ওই এলাকায় কাজ করছে। মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে, বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ফেরানোর পর আপাতত দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হবে এবং পরে তাদের নিজেদের ঠিকানায় ফেরার সুযোগ দেয়া হবে। তবে সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উইন মিয়াত আই গত সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, রাখাইনে পুড়ে যাওয়া ভূমি নিয়ম অনুযায়ী সরকারের দখলে চলে যাবে এবং সরকার সেসব ভূমির পুনঃউন্নয়ন করবে।

‘পাগলিটা মা হলেন, বাবা হলেন না কেউ’

মাদারীপুরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানসিক ভারসাম্য হারানো এক নারীর কোলে জন্ম নেয়া নবজাতকের লালন-পালন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেউ ওই নারীর পরিচয় জানে না। ধাত্রী ছাড়াই এক বালুর মাঠে মঙ্গলবার কন্যা সন্তান প্রসব করেন সালমা বেগম (৩৫) নামের ওই নারী। এ নিয়ে গত দুই দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এদিকে বাবাহীন এই সন্তানের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। তার ভরন-পোষণের দায়িত্ব কে নেবে এ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বছরখানেক ধরে শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় ময়লা ছেঁড়া কাপড়ে এলামেলো চুলে ঘুরে বেড়ান সালমা বেগম। কখনও মানুষের কাছে হাত পাততেন না। কেউ কিছু দিলে তা খান। আবারও না খেয়েও থাকেন অনেক সময়। ফুটপাত, স্কুলের বারান্দা বা গাছতলায় ঘুমিয়েই রাত কাটান তিনি। শিশু-কিশোরসহ বয়স্ক সবার কাছেই তিনি ‘পাগলি’ বলেই পরিচিত। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে স্থানীয় হাতিরবাগান এলাকার বালুর মাঠে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন ‘পাগলি’। এসময় মাঠে স্থানীয় যুবক অমি, সাগরসহ কয়েক বন্ধু আড্ডা দিচ্ছিলেন। শিশুর কান্নার শব্দ পেয়ে এগিয়ে যান তারা। মোবাইলের আলোয় দেখতে পান এক ফুটফুটে নবজাতক। পাশে সেই নারী অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন। তারা আশপাশের বাড়ির মহিলাদের ডেকে আনলে তারা বাচ্চাটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন।
এরপর দু’জনকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে নবজাতক সুস্থ আছে। খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের কর্তকর্তারা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নের্তৃবৃন্দ ও উৎসুক জনতা হাসপাতালে ছুটে যান। অনেকে মা-সন্তানকে আর্থিকভাবে সহযোগিতাও করেন। শিশুটির নাম রাখা হয়েছে জান্নাতুল হাবিবা হুমাইরা। নবজাতক ও মাকে বালুর মাঠ থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জাহিদ হাসান অমি বৃহস্পতিবার ফেসবুকে লিখেন- “প্রিয় মামা অবশেষে তোমার নাম ঠিক করলাম আমি ও লিটু। এই রাত ২টা ৩৫- এ। ভাবতে ভাবতে খুব সুন্দর একটি নাম তৈরি করলাম। জান্নাতুল হাবিবা নূরে (হুমায়রা)।” ফেসবুকে মাধ্যমে অমি এবং তার বন্ধু ইব্রাহীম ও সাগরের প্রশংসা করছেন অনেকেই। আবার অনেকেই মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করা ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিও জানিয়েছেন। একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী নবজাতক ও মায়ের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘পাগলিটা মা হলেন, বাবা হলেন না কেউ’। এদিকে স্থানীয়রা মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর কাছে শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে শিশুটির ভবিষ্যত নিশ্চিত করা ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দত্তক প্রদানের ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ।

সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শিশু হুমকির মুখে

মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বসবাসরত সাত লাখ ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশু হুমকির মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফের বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেগবেডার। তিনি শুক্রবার জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। তিনি বলেন, এর মধ্যে বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর আশ্রয় শিবিরগুলোতে বাস করছে পাঁচ লাখ ৩৪ হাজার এবং সহিংসপূর্ণ রাখাইন রাজ্যে রয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা শিশু। প্রতিবেদনে ইউনিসেফ বলেছে, আসন্ন ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে সৃষ্ট বন্যায় জরাজীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো প্লাবিত হতে পারে। আর তেমনটা হলে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে। এতে ক্লিনিক, শিক্ষাকেন্দ্র ও শিশুদের জন্য চালু করা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের শিশু ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের জরুরি কর্মসূচির পরিচালক ম্যানুয়েল ফন্টেইন বলেন, ‘প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু মূলত আটকে পড়েছে! হয় তারা সহিংসতার মধ্যেই মিয়ানমারের ভেতরে বাসস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে অথবা দেশে ফিরতে না পারার কারণে বাংলাদেশের জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে অসহায়ের মতো ঘুরছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা এমন এক সংকট,
যার কোনো ত্বরিত সমাধান নেই এবং এই সংকট নিরসনে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে, যদি এ সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা না নেয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করা হলে তা শরণার্থীদের জন্য মিয়ানমারে তাদের আগের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা, নাগরিকত্ব, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর সুযোগসহ একটি সুন্দর ভবিষ্যতের সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা বাড়ি ফিরে যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ম্যানুয়েল ফন্টেইন। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যের অনেক অংশে প্রবেশাধিকার না থাকায় ইউনিসেফ ও অন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। ইউনিসেফ বলছে, অবিলম্বে এবং নির্বিঘ্নে এসব শিশুর পৌঁছানোর সুযোগ দেয়া দরকার। একই সঙ্গে আন্তঃসাম্প্রদায়িক উদ্বেগ চিহ্নিত করতে এবং সামাজিক সহাবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরতে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টাও অপরিহার্য। এডুয়ার্ড আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টিতে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

একুশের চেতনা শিক্ষাক্ষেত্রে বেদনা by মো. সিদ্দিকুর রহমান

একুশের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতি নিজেকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে প্রাপ্ত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জনের মূলে ছিল একুশের চেতনা। একুশ মানে মাথা নত না করে শির উন্নত করে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল এ দেশের শিক্ষাসহ মৌলিক সব অধিকার ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে নিশ্চিত করা। দুর্ভাগ্যজনক, একুশ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল এ দেশের মানুষের জন্য সোনার বাংলা গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে উপলব্ধি করেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে দুঃস্বপ্ন। সেদিন রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন তিনি। প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা পান। সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং পোস্ট অফিসের পিয়নদের মাধ্যমে অসহায় প্রাথমিক শিক্ষকদের সামান্য বেতনপ্রাপ্তি তার নজর কেড়ে নেয়। সাধারণ মানুষ ও প্রাথমিক শিক্ষকদের সেই প্রিয় ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবরণের পর প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর ১৯৮০-৮১ সালে বেসরকারীকরণের ঝড় নেমে আসে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে শিক্ষকদের বেসরকারীকরণের এ দুর্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনামূল্যে বইসহ অসংখ্য অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে প্রশাসনের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের কর্মকাণ্ড। তারা একুশের অহংকারকে উজ্জীবিত করার পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তোষণ নীতিতে ব্যস্ত। শিক্ষার মধ্য দিয়ে আগামী প্রজন্ম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক, সংশ্লিষ্ট অনেকের মাঝেই এ ভাবনা দৃশ্যমান নয়। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও পথভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
যার অন্যতম চ্যালেঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সময়সূচি। এ সময়সূচি বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীশূন্য করে ফেলছে। উপবৃত্তি টিফিন সহায়ক হলেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এসব ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতে সক্ষম হচ্ছে না। খোদ রাজধানী ঢাকায় পরিদর্শন করে দেখা যায়, এক শিফটের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির করুণ দৃশ্য। সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত শিশু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় নামক ‘হাজতখানায়’ থেকে শুধু বিস্কুটজাতীয় হালকা খাবার বা উপবৃত্তির ১০০ টাকা প্রতি মাসে পায়। এ সামান্য প্রাপ্তি শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করার জন্য পুরোপুরি সহায়ক নয়। এই সময়সূচি শিশু নির্যাতনের সমতুল্য। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ প্রাথমিকে যেন ‘জম্ম থেকে জ্বলছি’ প্রবাদের মতো। নদীর একূল গড়ে ওকূল ভাঙার মতো। অহরহ অবসর গ্রহণ, অন্যত্র চলে যাওয়া এবং অন্যান্য কারণে বছর না ঘুরতেই বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ সৃষ্টি হয়। নিয়মিত নতুন শিক্ষক নিয়োগ না করে বছরের পর বছর শিক্ষকশূন্য রেখে প্রাথমিকের শিক্ষকদের অনেকেটা জোড়াতালি দিয়ে ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষার্থীদের যথাযথ সময় না দেয়ার বিষয়ে শিক্ষকের কোনো জবাবদিহি নেই। কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগের সামান্য ত্রুটি হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মহাবিপদ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাদানবহির্ভূত কাজের ব্যাপকতায় শিক্ষকের ইচ্ছা থাকলেও ঠিকমতো পড়াতে পারেন না। ফলে আগামী প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার অধিকার থেকে। প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ সমস্বরে নিন্দা জানায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণে অভিভাবকরা ছুটছে নোট-গাইড, কোচিং সেন্টারের দিকে। ৩৭ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিরাজ করছে নানা অব্যবস্থাপনা ও সংকট। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর আজও কোথাও কোথাও খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। খোদ রাজধানীতে অনেক বিদ্যালয় বেদখল হয়ে আছে। এক বা দু’জন শিক্ষক দ্বারা পাঠদান চলছে দেশের অসংখ্য বিদ্যালয়ে। এক-দুই কক্ষের বিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম নয়। প্রাথমিক শিক্ষা আজ শিক্ষার্থীনির্ভর না হয়ে কর্মকর্তামুখী। এর থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে মেধাবী ও অভিজ্ঞদের এ পেশায় ধরে রাখতে প্রাথমিক ক্যাডার সৃষ্টির বিকল্প নেই। গ্রেডমুখী পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে জ্ঞানমুখী শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ব্যাধি নির্মূল করতে হবে। সব দোষই যে শিক্ষকদের, তা বলা যথার্থ হবে না। শুধু শিক্ষকদের নয়, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবার অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই সময়ের প্রত্যাশা। সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষকদের অপবাদ দেয়ার বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াতে হবে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীই বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা করে না। তারা বাংলা বানান লিখতে ভুল করে, শুদ্ধভাবে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না। এটি কি একুশের চেতনাবিরোধী নয়? নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা করবে, স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই একুশের প্রত্যাশা ছিল। শিক্ষার এ বেহাল দশা দেখে একুশের চেতনা আজ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। এসব অব্যবস্থা দূর করার মাধ্যমে একুশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, এটাই প্রত্যাশা।
মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম
siddiqsir54@gmail.com

উসকানি প্রদান নয়, সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে by আবদুল লতিফ মন্ডল

সম্প্রতি ফেনী মহিপাল সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি জোরালো আন্দোলন করার সক্ষমতা হারিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে আদালতের রায়ে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।
এটি তাদের সময়ের মামলা নয়। এটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা। ২০ ফেব্রুয়ারি গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা রুজু এবং মামলার রায় প্রদান প্রসঙ্গে একই কথা বলেন। তিনি বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় তিনি দেননি, দিয়েছেন আদালত। আর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দুদক। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে, তাহলে কিছু করার নেই। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী সময়মতোই হবে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছরে (২০০৭ ও ২০০৮) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা ছিল, আর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল ১৫টি মামলা। কিন্তু ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা ছিল, সেগুলো নির্বাহী আদেশে কোয়াশ করা হয়। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার ৬টি মামলার সঙ্গে নতুন করে আরও মামলা যুক্ত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রুজু করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আদালত সম্প্রতি তাকে সাজা দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে হয়তো বিশ্বাস জন্মেছে যে, বিএনপিকে ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে তারা যেভাবে সক্ষম হয়েছিলেন, তেমনিভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দলটির নেতাকর্মীদের সহিংস আন্দোলনে যেতে উসকে দিয়ে নতুন করে তাদের কারাগারে পাঠাতে পারলে বিএনপিকে আগামী একাদশ নির্বাচন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হতেও পারে। এতে বিএনপি আইনগতভাবে নিবন্ধন হারিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হয়ে পড়বে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজার পর তার মুক্তির জন্য সহিংস আন্দোলনে যাওয়ার উসকানি উপেক্ষা করে বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি এ পর্যন্ত যেসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতীকী অনশন, রাজধানীসহ সারা দেশে মানববন্ধন,গণস্বাক্ষর সংগ্রহ এবং সব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান। বিএনপির এসব শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সরকারকে অনেকটা হতাশ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। তাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনেকে চেয়েছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হলে তার মুক্তির জন্য বিএনপি হিংসাত্মক আন্দোলনের পথ বেছে নেবে, যা দলটিকে আদালতের রায় অবমাননাকারী এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবে প্রচারে সরকারকে সুযোগ এনে দেবে। বিএনপি সহিংস আন্দোলনের পথে গিয়ে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, যানবাহনের ক্ষতিসাধন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিনষ্ট, অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির মতো অপরাধে লিপ্ত হলে দলটির নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনের আওতায় এনে দীর্ঘ সাজা ভোগের ব্যবস্থা নেয়া সরকারের জন্য সহজ হবে। উল্লেখ্য, ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ওই আইনটির সংশোধনী পাস হয়। এতে উপর্যুক্ত অপরাধগুলোসহ আইনটির আওতাভুক্ত অন্যান্য অপরাধের জন্য সাজার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করা হয়েছে। আসলে দাবি আদায়ে বড় দু’দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নজির নেই বললেই চলে। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সরকার পদত্যাগ করলে ১৯৮১ সালে নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ১৯৯১ সালে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের আমলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ১৯৯৪ সালে তারা মাগুরার একটি আসনে উপনির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এ দাবিতে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি সময়কালে আওয়ামী লীগ প্রথমে সংসদ বর্জন ও পরে সংসদ থেকে পদত্যাগ ছাড়াও ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সহিংস আন্দোলনে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জনগণ চরম বিপদের সম্মুখীন হয়, শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় লাখ লাখ শিক্ষার্থী, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য। সে সময় এমনকি অনেক অফিসগামী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অপদস্ত পর্যন্ত হতে হয়। দীর্ঘ সহিংস আন্দোলনে দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। তাছাড়া আওয়ামী লীগের জাতীয় সংসদ বর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি শুরু হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ অধিবেশনে ঘন ঘন অনুপস্থিত থাকে, অবরোধ কর্মসূচি পালনসহ ১৩০ দিন হরতাল করে। ২০০৬ সালের শেষদিকে ইয়াজউদ্দীন আহম্মদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ পরবর্তী বছরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পর সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় রাজপথে ঝরে পড়ে একাধিক তাজা প্রাণ।
সহিংস আন্দোলনে বিএনপিও পিছিয়ে থাকেনি। ১৯৯৬ সালের ২ জুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৭ম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২৩ জুন সরকার গঠন করে। বিএনপি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে এবং আওয়ামী লীগ সৃষ্ট সংসদ বর্জনের ‘সংস্কৃতি’ অনুসরণ করে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ শাসনের এ মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) বিরোধী দল বিএনপি জাতীয়ভাবে ৪৫ দিন হরতাল পালন করে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তারা বিএনপির শাসনামলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল, ক্ষমতায় এসে তারাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী ১৯টি দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনেকটা একতরফাভাবে সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আবারও ক্ষমতায় আসে। নবম সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানাতে থাকলেও তারা জোরদার আন্দোলনে যায়নি। তবে সরকারের কাছ থেকে এসব দাবি পূরণে কোনো সাড়া না পেয়ে বিএনপি ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি লাগাতার হরতাল ও অবরোধের ডাক দেয়। তিন মাসব্যাপী এ সহিংস আন্দোলনে কয়েক ডজন তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহুসংখ্যক যানবাহন, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, রাজধানীর সঙ্গে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক-ভ্যানের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, সময়মতো কৃষিপণ্যের চালান মোকামে, গুদামে পাঠাতে বা বাজারজাত করতে না পারায় কৃষককে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে হয়। রেল চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, সমুদ্রবন্দরে মালামাল ওঠানো ও নামানো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমদানি-রফতানি। দেশের শহরাঞ্চলে বেসরকারি খাতে সেবামূলক সার্ভিসগুলোর চাহিদা ভীষণভাবে কমে যাওয়ায় এসবের সঙ্গে জড়িত ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এককথায়, দেশে অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বিএনপি এসব হিংসাত্মক কজের দায়ভার অস্বীকার করলেও তা জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। ২০১৫ সালের সহিংস আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সহিংস আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়নি। দলটির নেতারাও কেউ কোথাও কোনো হঠকারী বক্তব্য দেননি। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তার মুক্তির জন্য দলটির নেতৃত্ব সম্মিলিতভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও আইনি পথে হাঁটছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবীরা ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে আপিল দায়ের করেছেন। আজ আপিলের শুনানি হওয়ার কথা এবং খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। সবশেষে যা বলতে চাই তা হল, অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়ার মতো শক্তি বিএনপির নেই- শাসক দল আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার এরূপ ধারণা ঠিক নয়। তাছাড়া এরূপ বক্তব্য দিয়ে তারা বিএনপিকে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার জন্য উসকানি দিচ্ছে, যা কোনোক্রমে কাম্য নয়। আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই বিএনপি আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেয়ায় বিএনপি দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হল, দেশের দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

মাতৃভূমির মতোই মা ও ভাষা by মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ

ভাষা হচ্ছে ভাবের বাহন, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, আত্মপ্রকাশ ও উজ্জীবনের সেতু। মানুষের অস্তিত্বের প্রধান তিনটি অবলম্বনই হচ্ছে মা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি। মানুষের জীবন হচ্ছে তার মাতৃভাষা, দেশের ভাষা, জাতির ভাষা। ভাষা সমাজ গড়ে, আবার সমাজও ভাষা গড়ে। তাই কোনো জাতির ভাষা তার সভ্যতা ও সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। সুতরাং মানব সমাজে ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আর এ কারণেই রাব্বুল আলামিন মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন ভাষার মাধ্যমে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’ (সূরা আর রহমান : ৩-৪)। পৃথিবীতে মানব বংশের বিচিত্রতা এবং মানুষের বৈচিত্র্যময় রং, রূপ, দেহ-সৌষ্ঠবের পার্থক্য যেমন মেনে নিতে হয়, তেমনি তাদের ভাষার পার্থক্যও মেনে নিতে হয়। ভাষাকে আল্লাহতায়ালার মহান সত্তাকে চেনা, জানা ও তার বিশাল কুদরতকে বোঝার নিদর্শন বলা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। অবশ্যই এতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন।’ (সূরা রুম : ২২)। মাতৃভাষা যে আল্লাহ প্রদত্ত জন্মগত অধিকার এ আয়াতটি তার প্রমাণ বহন করে। এ জন্য কোনো বিশেষ এলাকার মানুষদের ভাষা-বর্ণের বিচিত্রতার কারণে তাদের অনিষ্ট করার পরিকল্পনাকারীদের ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো এলাকার ভাষাভাষী মানুষদের ধর্ম নয়; বরং গোত্র-বর্ণ নির্বিশেষে সব ভাষাভাষী মানুষের ধর্ম। হজরত আদম (আ.)-এর ভাষা কী ছিল এ বিষয়ে মতদ্বৈধতা ও অস্পষ্টতা থাকলেও তার ভাষা ছিল এক, কিন্তু স্থান-কাল পাত্রভেদে পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে। যেমন পরস্পর দুটি জাতি বসবাস করলে তাদের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান ও চেনাজানা হয়। আর সাধারণত নিম্ন জাতি প্রভাবশালী জাতির ভাষা কৃষ্টি, কালচারে প্রভাবিত হয়। পরাভূত জাতি যেমন বিজয়ী-জাতির ভাষা গ্রহণ করে, তেমনি বিজয়ী-জাতিও বিজিতের ভাষা গ্রহণ করে। এতে ভাষার সংমিশ্রণ ঘটে এবং নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষায়ও বিভিন্ন জাতির ভাষার শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আর এভাবেই যুগে যুগে বিভিন্ন জনপদে-ভূখণ্ডে অজস ভাষার উদ্ভব ঘটেছে। মায়ের সঙ্গে যেমন সন্তানের সম্পর্ক গভীর, মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও তেমনি গভীর। মাতৃভাষার সঙ্গে মানুষের স্বভাবগত এবং তা একটি জন্মগত চাহিদা বটে। ইসলাম মানুষের এ স্বভাবগত ও জন্মগত চাহিদার যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছে। প্রত্যেক জাতির জন্য আল্লাহতায়ালা পয়গাম বান্দাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নবী ও রাসূলের এক ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর নানা দেশে নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক বা দুই লাখ চব্বিশ হাজার নবী-রাসূলের এক মহাসমারোহ ঘটেছে। আর প্রত্যেক নবী ও রাসূলের ওপর ওহি প্রেরিত হয়েছে তার স্বগোত্রীয় ভাষার মাধ্যমে। যুগে যুগে বিভিন্ন জাতির কাছে প্রেরিত সব নবী-রাসূল নিজ নিজ উম্মতকে যে ওহির বাণী শুনিয়েছেন তা ছিল তাদের মাতৃভাষা। কোনো একজন নবীও ভিন্ন কোনো ভাষায় মানুষকে ধর্মের প্রতি আহ্বান জানাননি।
এ কারণেই প্রত্যেক নবী-রাসূলের ভাষা ছিল তাদের কওমের তাদের অঞ্চলের মাতৃভাষা। মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যেন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।’ (সূরা ইবরাহিম : ০৪)। নবী ও রাসূলরা যদি সুকৌশলে মানুষকে আল্লাহর পথে নিজ মাতৃভাষায় আহ্বান না করতেন তা হলে জনসাধারণ তা পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করতে পারত না। কেননা আহ্বানকারী যদি এক ভাষার হন, আর তার জাতি হয় ভিন্ন ভাষাভাষী, তবে তার ডাকে কেউই সাড়া দেবে না। আমাদের আদর্শ ও মানবজাতির পথ নির্দেশক মহানবী (সা.) ছিলেন স্বীয় মাতৃভাষায় অতুলনীয়। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে দান করা হয়েছে সর্বমর্মী বচন।’ (মুসলিম : ৫২৩)। কাব্যানুরাগী আরব সমাজে আবির্ভূত রাসূল (সা.) ছিলেন আরবদের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী। তিনি মাতৃভাষা শুদ্ধ এবং সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন। তাই মাতৃভাষা শুদ্ধভাবে বলা আমাদের নবীর সুন্নত। সুতরাং যে কোনো জাতির মাতৃভাষা অশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা সুন্নতের পরিপন্থী। হয়তো কেউ কেউ বলবেন রাসূল (সা.) যেহেতু আরবি ভাষী এবং কোরআনের ভাষা আরবি, তাই ভাষা অশুদ্ধ বলা সুন্নতের বরখেলাফ, অন্য ভাষাগুলো অশুদ্ধ বলা সুন্নতের পরিপন্থী নয়, এটা একদম সঠিক নয়। কেননা, প্রিয়নবী (সা.) ডান হাত দিয়ে আরবের ফল খেজুর খেয়েছেন। এখন কেউ যদি বলে বাম হাত দিয়ে খেজুর খাওয়া সুন্নতের পরিপন্থী, কিন্তু আম, জাম, লিচু কাঁঠাল ইত্যাদি বাম হাত দিয়ে খেলে সুন্নতের বরখেলাপ নয়, তবে তা ভুল হবে। মহানবী (সা.) হলেন আরবি। মাতৃভাষাকে তিনি এত বেশি ভালোবাসতেন যে, তিনি নিজেই বলেছেন, আমি তিনটি কারণে আরবিকে ভালোবাসি। এর একটি হল, মাতৃভাষার কারণে। রাসূল (সা.)-এর মাতৃভাষা আরবি বলেই রাব্বুল আলামিন কোরআনের ভাষা হিসেবে মনোনীত করেছেন আরবিকে। যেন আরব সমাজের প্রতিটি মানুষ কোরআনের বাণী অতি গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবী! কোরআনকে আমি তোমার নিজের ভাষায় সহজ করে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (আদ দোখান : ৫৮)। প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন, ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষার মাধ্যম তার মাতৃভাষা হওয়া উচিত। অপর ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ শিক্ষারই নামান্তর।’ সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, ‘কোনো দেশে দ্বীনি খেদমত করতে অগ্রহী ব্যক্তিকে সে দেশের মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বোধ পূর্ণ মাত্রায় আয়ত্ত করতে হবে।’ হজরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) তার এক ছাত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘যদি হিন্দুস্তানে দ্বীনি খেদমত করতে চাও, তবে উর্দু ভাষায় যোগ্যতা অর্জন কর।’ এমনি আরও অসংখ্য উক্তি পাওয়া যায় মাতৃভাষার সপক্ষে। সুতরাং মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রেম ও ভালোবাসা থাকতে হবে একান্ত করে।
লেখক : শিক্ষক, বাইতুন নূর মাদ্রাসা ঢাকা
ahmadabdullah7860@gmail.com

মালদ্বীপ ঘিরে গরম হচ্ছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল

ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটার অথবা ১১৫ বর্গমাইল আয়তনের এ রাষ্ট্রটির জনসংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৬ (২০১৭), যার একটা বড় অংশ আবার বিদেশি। সাম্প্রতিক সময়ে মালদ্বীপ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন, যা আরও ৩০ দিন বাড়ানো হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ ভারতকে সামরিক হস্তক্ষেপের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১ ফেব্রুয়ারি আদালত-সরকার দ্বন্দ্বে দেশটির রাজনীতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ভারত ও চীন এই ছোট্ট দেশটিতে একধরনের প্রভাববলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক সংকটের মুখে চীন ২১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সমুদ্রসীমায় ১১টি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি দিল্লির উদ্দেশে শক্তি প্রদর্শনের নামান্তর মাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত মহাসাগরে চীন ও ভারত তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করছে। ১৯৮৮ সালের নভেম্বরে ভারত মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। ‘অপারেশন ক্যাকটাস’ নামের ওই সামরিক অভিযান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের সরকারকে রক্ষা করেছিল। এর আগে শ্রীলংকার তামিল বিদ্রোহীদের একটি অংশ, যারা ‘পিপলস লিবারেশন অর্গানাইজেশন অব তালিম এলাম’ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা গাইয়ুম সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্যোগ নেয়। বিদ্রোহীরা গাইয়ুমকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ফলে গাইয়ুম পালিয়ে গিয়ে ভারতের সামরিক সাহায্য চান। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী গাইয়ুমের ডাকে সাড়া দিয়ে সেখানে ১৬০০ সৈন্য পাঠান। বিদ্রোহের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মালদ্বীপ একটি চীনপন্থী নীতি অনুসরণ করছে। চীনের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে মালদ্বীপ। মালদ্বীপ চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ (ওবিওআর) কর্মসূচিকে সমর্থন করেছে এবং তাতে যোগ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, মালদ্বীপ তার সংবিধান সংশোধন করে বিদেশিদের জমি কেনার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে সুযোগটি নিয়েছে চীনারা।
বলা হচ্ছে, এখানে বিনিয়োগের পাশাপাশি চীন একটি নৌঘাঁটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে, যা ভারতের অন্যতম চিন্তার কারণ। ১৯৮৮ সালে ভারত মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো নয়। মালদ্বীপ কিছুটা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত চার বছরে একবারও মালদ্বীপ সফর করেননি। ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের প্রভাব ভারতের অন্যতম চিন্তার কারণ। এটা বিবেচনায় নিয়েই ভারত এসব অঞ্চলে তার সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। ফলে স্পষ্টতই একধরনের চীন-ভারত দ্বন্দ্বে এ অঞ্চলের দেশগুলো জড়িয়ে পড়ছে। মালদ্বীপের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা কী হবে তা বলা না গেলেও দেশটির ব্যাপারে যে তার আগ্রহ রয়েছে তা বলা যায়। আগামীতে মালদ্বীপে ভারতের ‘ভূমিকা’ চীনা স্বার্থকে আঘাত করবে। ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, তারা এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ‘সহ্য’ করবেন না। ভুবনেশ্বর আইওআর সম্মেলনে (মার্চ ২০১৫) এই মেসেজটিই তারা দিয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এটা একটা নতুন দিক। সিসিলি ও মরিশাসের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ও দেশ দুটিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত, শ্রীলংকায় ভারতীয় প্রভাব বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে ‘জাফনা কার্ড’ ব্যবহার করা প্রমাণ করে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে দিল্লি তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে চায়। ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন, ভারত প্রাচীনকালের তার ‘কটন রুট’ ব্যবহার করে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় প্রাচীন যুগে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতা বিকাশে ভারতীয় পণ্ডিতরা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। হাজার বছর আগে দক্ষিণের চোল বংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলের আমলে নৌ-বাণিজ্যে ভারত শক্তিশালী ছিল। ওই সময় ভারত মহাসাগরকে চোল হ্রদ বলা হতো। ভারতীয় নৌ-বাণিজ্যের যে প্রাচীন রুট, তাতে দেখা যায় ভারত, পাকিস্তান, কুয়েত, মিসর, আফ্রিকার মাদাগাস্কার, অন্যদিকে শ্রীলংকা হয়ে সুমাত্রা, জাভা (মাল্লাকা প্রণালি), হংকং, জাপান পর্যন্ত ভারতীয় বাণিজ্য রুট সম্প্রসারিত ছিল।
মোদি সরকার এই ‘কটন রুট’কেই নতুন আঙ্গিকে সাজাতে চায়। প্রাচীনকালে ভারতীয় তুলা ও সুতা এই সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। কাজেই দেখা যাচ্ছে, একদিকে চীনা নেতা শি জিনপিং তার ‘সিল্ক রুটের’ ধারণা নিয়ে ভারত মহাসাগরভুক্ত অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, অন্যদিকে ভারত তার পুরনো ‘কটন রুটের’ ধারণা প্রমোট করছে। দ্বন্দ্বটা তৈরি হবে সেখানেই। বাণিজ্যনির্ভর এই দ্বন্দ্ব শেষ অব্দি পরিণত হবে সামরিক দ্বন্দ্বে। চীন তার নৌবহরে বিমানবাহী জাহাজ আরও বাড়াচ্ছে। ভারতও ভারত মহাসাগরে তার নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। আন্দামানে নৌঘাঁটি নির্মাণ করছে। বলা হয়, একুশ শতক হবে এশিয়ার। তিনটি বৃহৎ শক্তি- চীন, জাপান ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বৈকি। জাপানের নিরাপত্তার গ্যারান্টার যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। জাপানেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও। ফলে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে যে বিবাদ (জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে) তাতে যুক্তরাষ্ট্র একটি পক্ষ নিয়েছে, যা চীনের স্বার্থবিরোধী। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে নয়া সিল্ক রুটের কথা বলেছেন, তা অন্য চোখে দেখছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এতে করে বিশাল এক এলাকাজুড়ে চীনা কর্তৃত্ব, প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের ছাত্ররা অনেকেই জানেন, ২১০০ বছর আগে চীনের হ্যান রাজবংশ এই ‘সিল্ক রোড’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই রুটের মাধ্যমে চীনের পণ্য (সিল্ক) সুদূর পারস্য অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এর মধ্য দিয়ে আজকের যে মধ্যপ্রাচ্য, সেখানেও চীনের প্রভাব বেড়েছিল।
চীনের প্রেসিডেন্ট এর নামকরণ করেছেন ‘নিউ সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’। এটা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত। একই সঙ্গে একটি ‘মেরিটাইম সিল্ক রুটের’ কথাও আমরা জানি, যা কিনা চীনের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটা যোগসূত্র ঘটিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীন থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতে চীনারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, ব্র“নাই, মালয়েশিয়ায় এসেছিল। পরে তারা স্থায়ী হয়ে যায়। এমন কথাও বলা হয়, ব্র“নাইয়ে ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে চীনাদের অবদান ছিল বেশি। ২০১২ সালে আমি তুরস্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে চীনাদের এই সিল্ক রুটের প্রতি আগ্রহের কথা জানতে পারি। এই সিল্ক রুটের যে অংশ তুরস্কে পড়েছে, আমি সেই পথ ধরেও বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দিয়েছি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার প্রথম সফরে কাজাখস্তানে গিয়ে তার ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছিলেন। এর পরের মাসে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে তিনি দ্বিতীয় ‘মেরিটাইম সিল্ক রুটের’ কথাও বলেন। এতে করে একটা ধারণার জন্ম হয় যে, চীন শুধু মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিশাল এক অর্থনৈতিক সংযোগ কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। ইরানে যে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে, এটা নিশ্চয়ই অনেক পাঠক জানেন। এখন যে প্রশ্নটি অনেক পর্যবেক্ষকই করেন তা হচ্ছে, ‘চীনের এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের’ নীতি ভারতের স্বার্থের সঙ্গে কতটুকু সাংঘর্ষিক? কেননা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার নিজস্ব মডেলে ‘ভারতীয় মনরো ডকট্রিনের’ কাঠামো গড়ে তুলছে। অর্থনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দ্বন্দ্ব তাই অনিবার্য। আর আটলান্টিক ও প্যাসিফিকের ওপার থেকে যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ‘ফায়দা’ ওঠাতে চাইবে। আগামী দিনগুলো তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এখন চীন-ভারত দ্বন্দ্ব যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে এ অঞ্চলের দেশগুলোও এতে করে ‘প্রভাবিত’ হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ঝুঁকির মুখে পড়বে ব্রিকস ব্যাংক। ভারত অন্যতম উঠতি শক্তি। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী আমলাতন্ত্র আছে ভারতের। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা পৃথিবীর শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি। এরা ভারতের স্বার্থকে সবসময় ‘বড়’ করে দেখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এরই মধ্যে ভারতের একধরনের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের স্ট্র্যাটেজিস্টদের চোখ এখন ভারত মহাসাগরের দিকে।
ভারত মহাসাগরে শুধু যে বিশাল সম্পদই রয়েছে তা নয়, বিশ্বের কার্গো শিপমেন্টের অর্ধেক পরিবাহিত হয় এ মহাসাগর দিয়ে। একই সঙ্গে ৩ ভাগের ১ ভাগ কার্গো, ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৩ ভাগের ২ ভাগ এবং ৪ ভাগের ৩ ভাগ ট্রাফিক পৃথিবীর অন্যত্র যেতে ব্যবহার করা হয় ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথ। পৃথিবীর আমদানি পণ্যের (তেলসহ) শতকরা ৯০ ভাগ পরিবাহিত হয় এই সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে। এ সমুদ্রপথের নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি করে। মালদ্বীপে ভারত ও চীনের স্বার্থ রয়েছে। মালেতে একটি বিশাল বন্দর নির্মাণের জন্য ভারতের একটি কোম্পানি কনট্রাক্ট পেয়েছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন সেই চুক্তি বাতিল করে একটি চীনা কোম্পানিকে কাজ দেন। চীন সেখানে বিশাল বিনিয়োগ করছে। গেল ডিসেম্বরে (২০১৭) চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। চীন যে ‘মুক্তার মালা’ নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে মালদ্বীপের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ‘মুক্তার মালা’ নীতির মাধ্যমে চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে চায়। এতে করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ ক’টি সমুদ্রবন্দর ‘কানেকটেড’ থাকবে এবং চীন তা তার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে। পাঠক স্মরণ করতে পারেন, পাকিস্তানের গাওদারে (বেলুচিস্তান) ও শ্রীলংকার হামবানতোতায় চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। এর ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা চীনের হাতে। ভারত এ বিষয়টিকে তার নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলেই মনে করে। হামবানতোতায় চীনা সাবমেরিনের উপস্থিতির জের ধরে শ্রীলংকায় সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘চীনাঘেঁষা’ নেতা রাজাপাকসে পরাজিত হয়েছিলেন (২০১৬)। কিন্তু সম্প্রতি রাজাপাকসে আবার পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন। তিনি আগাম সংসদ নির্বাচন দাবি করেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনাকে ভারতঘেঁষা বলে মনে করা হয়। মালদ্বীপের পরিস্থিতি এখন কোনদিকে যাবে, বলা মুশকিল। দেশটির চলমান রাজনৈতিক সংকট আরও খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন। মালদ্বীপের পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প-মোদি ফোনালাপ হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ আল হুসেন বলেছেন, ‘মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সব ধরনের সাংবিধানিক অবমাননার ফলে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোই ভেঙে পড়েছে।’ সুতরাং বোঝাই যায়, মালদ্বীপের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ উদ্বিগ্ন। এখন দেখার পালা এ পরিস্থিতি মালদ্বীপকে কোথায় নিয়ে যায়।
তবে একটা কথা বোধহয় বলাই যায়- মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি, চীনের ১১টি যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ ইত্যাদি ঘটনাকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ভালো চোখে দেখছে না। এরই মধ্যে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব সংকুচিত করতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার একটি উদ্যোগের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ‘ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ’ এ ধরনের একটি সংবাদ দিয়েছে। এ উদ্যোগের নাম কী হবে, তা এখন অবধি প্রকাশ করা হয়নি। পাঠক স্মরণ করতে পারেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের একটি পরিকল্পনার কথা, যা চতুর্ভুজ উদ্যোগ বা Quadrilateral Initiative নামে পরিচিত। এই চতুর্ভুজ উদ্যোগের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। প্রতিবছরই এ চার দেশ ভারত মহাসাগরভুক্ত মালাবার প্রণালিতে নিয়মিত নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়ে আসছে। এটাই সম্ভবত চীনের ওবিওআরের ‘বিকল্প’ রূপ। জাপানের একটা স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে, তার ‘অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসট্যান্সের’ (ওডিএ) আওতায় বৃহত্তর ‘স্বাধীন ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ বাস্তবায়ন করা। পরিবহন ও যোগাযোগ তথা বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে তোলার রূপরেখা রয়েছে এ কৌশলে। ২০১৭ সালে জাপান যে ওডিএ সংক্রান্ত শ্বেতপত্র তৈরি করেছে, তাতে এ রূপরেখা আছে। ভারত মহাসাগর এবং এশিয়া-প্যাসিফিকে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির এই জাপানি উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন রয়েছে বলেও জানা গেছে। ফলে স্পষ্টতই ভারত মহাসাগরে উত্তেজনা বাড়ছে। মালদ্বীপের পরিস্থিতি এবং দ্রুত চীনের ১১টি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত এ উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
tsrahman09@gmail.com

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৭-১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১৫৯টি দেশের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত প্রতিবেদনটির বাংলাদেশ অংশে বলা হয়েছে- এখানে বিরোধী দলের সমর্থকদের টার্গেট করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত গুমের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেলেও অনেকের হদিস মিলছে না। মানবাধিকার সংস্থাটি আরও বলেছে, বাংলাদেশ সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এবং মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের হেনস্তা করার লক্ষ্যে নিপীড়নমূলক আইন ব্যবহার করে যাচ্ছে। সাংবাদিক নির্যাতনেরও অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি। কারাগারে পুলিশি নির্যাতন বেড়ে চলেছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আইনপ্রণেতাদের অনীহা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ২০১৩ সালের নির্র্যাতন ও বন্দিমৃত্যু প্রতিরোধ আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে গত এক দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দারিদ্র্যবিমোচনের অভূতপূর্ব সাফল্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরছে। এ সংস্থার আন্তর্জাতিক খ্যাতিও রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশে গত বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সংস্থাটি যেসব কথা বলেছে, তা হেলাফেলার নয়।
বস্তুত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যে ভালো নয়, তা জোর দিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, গুম-অপহরণ-খুন ইত্যাদি ঘটনা কেন ঘটছে এবং প্রকৃতপক্ষে কারা এসব ঘটাচ্ছে, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অপহরণের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে থাকে প্রায়ই। এটা ঠিক, গুম ও অপহরণের ঘটনাগুলোর প্রতিটি যে রাজনৈতিক কারণে ঘটছে তা নয়, নানা ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের কারণেও গুম-খুন হচ্ছে ধরে নেয়া যায়। আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই- গুম-খুনের এই ধারাবাহিকতার ইতি টানতে হবে এবং তা যে কোনো উপায়ে। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে নিপীড়নমূলক আইনের যে কথা বলা হয়েছে, সেটাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। প্রস্তাবিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়েও রয়েছে নানা কথা। সাংবাদিক মহল ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়াটির সমালোচনা করে এর সংশোধন দাবি করেছে। আমরা মনে করি, সংসদে পাস হওয়ার আগে খসড়া আইনটির পুনর্বিবেচনা করা হবে। অ্যামনেস্টি দারিদ্র্যবিমোচনে বর্তমান সরকারের সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সাফল্যের সঙ্গে যদি দেশে একটা নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে তা হবে বর্তমান সরকারের জন্য এক বড় মাপের সাফল্য। জনগণের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রেখে উন্নয়নের ওপর জোর দেয়াটা কাজের কথা নয়। উন্নয়ন ও জননিরাপত্তা দুটোই থাকতে হবে দেশে। জননিরাপত্তার প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা যে সবচেয়ে বড় শর্ত সেটাও বুঝতে হবে।