Showing posts with label মোহাম্মদ কায়কোবাদ. Show all posts
Showing posts with label মোহাম্মদ কায়কোবাদ. Show all posts

Sunday, January 17, 2016

মৌলিক পর্যায়ে নজর দিতে হবে by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীদের বেতনে একটি বড় উল্লম্ফন হওয়ায় তাঁরা স্বস্তিবোধ করছেন। তবে এবার বেতন কমিশনের রিপোর্টে যেসব বেতনভুক্ত গোষ্ঠী আপেক্ষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা আন্দোলনে নামছেন। এই গোষ্ঠী আকারে ছোট হলে এবং ক্ষমতাহীন হলে দাবি যতই ন্যায্য হোক না কেন, তা উদ্বেগের কারণ হয় না। অন্যথায় তার জন্য বেতন স্কেলে পরিবর্তন আনতে হয়। দাবির যৌক্তিকতা বড় কথা নয়, সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠী কতটা শক্তিশালী, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তবে সংক্ষুব্ধ চাকরিজীবীদের বিষয়টি সুরাহা করতে মৌলিক পর্যায়ে তার সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সরকারের ক্যাডারভুক্ত কিছু কর্মকর্তা সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ বিষয়ে অনেক দিন ধরেই এঁরা তাঁদের অসন্তোষ জানিয়ে এলেও সম্ভবত যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক। শিক্ষকেরা মনে করছেন, সীমিত সম্পদে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে, যার চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। এই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একসময় আমাদের সমকাতারে দাঁড়িয়ে থাকা কোরিয়া, মালয়েশিয়া উন্নয়নের মাপকাঠিতে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। সুতরাং দেশ ও জাতির অগ্রগতিতে শিক্ষকদের ভূমিকা হবে অগ্রপথিকের।
মেধাবী ও দক্ষ স্নাতক শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে নানা প্রণোদনা দিতে হবে। সুবিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এমআইটিতে চাকরি করা একজন ভারতীয় দিব্যি সেই লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে আইআইটিতে যোগদান করছেন। নিশ্চয়ই শুধু দেশপ্রেম নয়, নানা ধরনের প্রণোদনাও তাঁকে উৎসাহিত করে। আমাদের দেশে এমনটি হয় না। একইভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলতে পারেন, সীমিত সম্পদের দেশে সম্পদের সুষম ও শ্রেয়তর বিনিয়োগ দেশের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে, তাই দেশের উন্নয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে চিকিৎসকেরা দেখাবেন দেশের ভগ্ন স্বাস্থ্য ও অপ্রতুল স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদিতে তাঁদের ভূমিকার গুরুত্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখাবে অসীম চাহিদার দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখা দেশের উন্নয়নে কত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পেশার কর্মকর্তারা দেশের উন্নয়নে তাঁদের গুরুত্বের কথা অকাট্য যুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষেই প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর একান্ত অংশগ্রহণেই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এর মধ্যেও বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তাদের দক্ষতার অনুপাতে সুযোগ-সুবিধার বণ্টন হলে নিশ্চয়ই নাগরিকেরা নিজেদের দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলবেন এবং আমরা সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হব।
নিশ্চয়ই ব্যবস্থাপনা কিংবা শিল্প ও উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির পড়ালেখায়/গবেষণায় বিভিন্ন কাজে মানুষের দক্ষতাকে পরিমাপ করার পদ্ধতি রয়েছে। আমরা যদি মনে করি, আমাদের কর্মকাণ্ডের কোনো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জিত হয়নি অথবা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য অধিকতর দক্ষ ও মেধাবী স্নাতকদের যোগদানে উৎসাহিত করা উচিত, তাহলে সেই পেশায় প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দেশের উন্নয়নে সব নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তারপরেও দক্ষতা ও মেধা অনুসারে বেতনকাঠামো নির্ধারণ করলে মানুষ অধিকতর দক্ষ হতে উৎসাহিত হবে এবং দেশ অগ্রগতির পথে ধাবিত হবে। তাই একটি বেতনকাঠামোতে সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর বিক্ষোভের মাত্রা দেখে কাঠামোতে পরিবর্তন আনা সমস্যা সমাধানের উপায় হতে পারে না।
দেশ ও সমাজের উন্নয়নে একটি নির্দিষ্ট পেশার অবদান কতটুকু, তা পরিমাপের নিশ্চয়ই একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করা যেতে পারে। পদ্ধতি যতটা নৈর্ব্যক্তিক হবে, তার গ্রহণযোগ্যতা ততটা বেশি হবে। তবে আমরা চাইব, সাধারণ মানুষের করের পয়সায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক শিক্ষার্থী তঁার অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে দেশের সেবা করুক। একজন সুদক্ষ মেধাবী প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্রে পটু স্নাতক যদি এমন চাকরিতে আগ্রহী হন যে তাঁর তরুণ বয়সের চার-পাঁচ বছরের অর্জিত জ্ঞান কোনো কাজে আসবে না, তাহলে তা আমাদের সিস্টেমের গলদ হিসেবেই বিবেচিত হবে, তাঁর শিক্ষাজীবনের পেছনে করা বিনিয়োগ থেকে যথাযথ রিটার্ন দেশ ও জাতি পাবে না।
দেশসেবার এমন ক্ষেত্র নেই, যেখানে আমরা সবিশেষ দক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তেমন কাঙ্ক্ষিত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সফল হয়নি, যদিও আমরা বলব শিক্ষায় বিনিয়োগের বড়ই অভাব। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ কিংবা সামরিক–শাসিত পাকিস্তানেও শিক্ষার পেছনে যে বরাদ্দ, আমাদের তা নেই। গবেষণা করার সুযোগ মহাসীমিত। একইভাবে আমাদের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক কোনো গোষ্ঠীই প্রশংসনীয় অবদান রাখতে পারেনি। ব্যতিক্রম হলো পোশাকশিল্পের অশিক্ষিত–অর্ধশিক্ষিত মহিলারা, মধ্যপ্রাচ্যে নিগৃহীত হওয়া অর্ধদক্ষ মানুষেরা আর আমাদের দেশের কৃষিবিদেরা, যাঁরা সংকুচিত আবাদযোগ্য ভূমিতে দুই গুণ মানুষের অন্নের ব্যবস্থা করছেন।
আমি যখন স্কুল-কলেজের ছাত্র ছিলাম তখন সব মেধাবী ছাত্রেরই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার স্বপ্ন ছিল। অবশ্য এর ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়, তবে তা ব্যতিক্রমই। এগুলো সম্ভবত চাকরির সুযোগ-সুবিধা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই ব্যবহারিক শিক্ষা ছাত্রদের এবং তাদের অভিভাবকদের কাছে অধিকতর লোভনীয়। চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে একজন অভিভাবক ২০ লাখ টাকা ব্যয় করতে প্রস্তুত, তাই বলে এক গাদা বিষয়ের নাম করা যেতে পারে তা টাকা দিয়ে পড়া তো দূরে থাক, একজন ভর্তি-ইচ্ছুক শ্রেয়তর কোনো বিষয় না পেয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। আমাদের ছেলেমেয়ে ও তাদের অভিভাবকেরা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রতি বাতিকগ্রস্ত। আমি নিশ্চিত, এ বিষয়গুলো পড়তে না পারাটা অনেকের জন্যই শাপেবর। আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলেকে চিনি, অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এক বছর পড়ে সে যখন বুঝতে পারে এ বিষয়ে তার ভালো ফল করার কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন সে তার পরেরবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকায় ওপরের দিকে জায়গা পেয়ে তুলনামূলকভাবে কম চাহিদার একটি বিষয় পড়ে শিক্ষক হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে গিয়ে সেখানে শিক্ষকতা করছে।
দেশের সুষম উন্নয়নে প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ক বিষয়ের শ্রেষ্ঠ ছাত্র এবং খ বিষয়ের শ্রেষ্ঠ ছাত্রের মধ্যে তুলনা করতে নেই। কিন্তু তারপরও আমরা জানি, অন্তত একাডেমিক অনুশীলনীর জন্য আমাদের যথেষ্ট তথ্য রয়েছে, যা দিয়ে তুলনা করা সম্ভব। অন্তত গড়ে তো বলা যাবে সাধারণ ছাত্রদের কাছে কোন বিষয় আকর্ষণীয় এবং কোন বিষয়ে অধিকতর মেধাবী ছাত্ররা ভর্তি হয়ে থাকেন। এখন আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যাবুলেশনের কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে প্রতি বিষয়ের, প্রতি বিষয়ের চাকরিজীবীর, তিনি প্রকৌশলী হোন, ব্যবস্থাপক হোন, চিকিৎসক হোন আর সচিব হোন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান বের করতে পারি, তা বিশ্লেষণ করতে পারি, তাঁর থেকে জ্ঞান উদ্ধার করতে পারি এবং জাতীয় পরিকল্পনায় তা ব্যবহার করতে পারি, এমনকি পে–স্কেল তৈরিতে তা কাজে লাগাতে পারি। তবে এ কাজটি করতে চাইলে এখনই করতে হবে। কারণ, কিছুদিনের মধ্যেই কেরানি থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত সবাই জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হবেন।
আমাদের পড়ালেখার নানা স্তরে মেধাবী স্নাতকদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা সুকঠিন। এর মধ্যেও কেন জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেন, অনেক সময় অনেক গুণ বেশি বেতনের চাকরি বাদ দিয়ে হলেও। মেধাবী স্নাতকদের ধন্যবাদ। এখন অবশ্য চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের কেউ কেউ পাঁচ-ছয় বছরের পড়ালেখাকে শূন্য ধরে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিচ্ছেন। সরকার যে তাঁর পেছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসক হিসেবে শিক্ষা দিল, দেশ তাঁর ওই সেবা থেকে বঞ্চিত হলো।
যিনি পদার্থবিজ্ঞানের সৌন্দর্য উপলব্ধি করেছেন, কিংবা রসায়নের তত্ত্ব, প্রকৌশলের কঠিন বিষয় যিনি আয়ত্ত করতে পেরেছেন, অথবা মানবদেহের জটিল রহস্য, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে এসব জ্ঞান–বুদ্ধিকে বিকশিত করা দূরে থাক, তা ভুলে গিয়ে শুধু শ্রেয়তর জীবনযাপনের জন্য অন্য পেশায় চলে যাবেন, তা ভাবতেও কষ্ট হয়। যদিও আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশে এটাই কঠিন বাস্তবতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা খুবই তাত্ত্বিক এবং আনাড়ি বলেই সম্ভবত এই পেশায় নাম লেখান। আমার বিভাগে সবাই ভালো ছাত্র। এদের মধ্যে যারা পড়ালেখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে, কেউই এখন পর্যন্ত নিজের ক্ষেত্র ছেড়ে অন্য ক্ষেত্রে চাকরি করছে বলে শুনিনি। নানা বিষয়ে চাকরির প্রণোদনা এমন হওয়া উচিত, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত জ্ঞান জনকল্যাণে ব্যবহার করা যায়। বিশ্বায়নের যুগে এবং আমাদের বিদেশপীড়িতের প্রেক্ষাপটে একজন স্নাতকের বহির্বিশ্বে মূল্যও আমরা বিবেচনায় আনতে পারি।
দেশের সিংহভাগ মানুষ কোনো বেতন স্কেলে উপার্জন করেন না। বেতন বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের সম্ভাব্য ঊর্ধ্বমুখী মূল্যে তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তবে জাতীয় পে–স্কেলে বেতন না পাওয়া মানুষের সংখ্যা বেতনভুকদের থেকে অনেক বেশি। এদের সিংহভাগ যথেষ্ট শক্তিহীন আর অন্য অংশের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যবসায়ীরা অধিকতর হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে বেতন বৃদ্ধির ফায়দা লোটেন, যার ফলে বেতন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে কোনো সংগ্রাম, আন্দোলন নেই; পে–স্কেল নির্ধারণে এই বিষয়টিও আমলে নেওয়া উচিত।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

Thursday, January 14, 2016

ধনীর কৃচ্ছ্রসাধন আর নির্ধনের ভোগবিলাস by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

কৃচ্ছ্রসাধনের ভাঙা রেকর্ড দীর্ঘদিন ধরে বাজিয়েই চলেছি। আমাদের ভোগেও ভাটার লক্ষণ নেই, বাজানোর আগ্রহেও কমতি নেই। তবে পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমির ওপর ২৪ সহস্রাংশ মানুষের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার দায়ভার যে দেশটি পালন করে যাচ্ছে, সেই বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। এর ৮৭ গুণ বেশি ভূমিতে ৭ গুণ কম মানুষের বাসস্থান অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় এটুকু সান্ত্বনা। কোনো সন্দেহ নেই এত মানুষের জীবন এত ক্ষুদ্র আবাসস্থলে নিশ্চিত করে মানবসভ্যতার সবচেয়ে দামি পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। এই দায়িত্ব আরও সুচারুরূপে, আরও দক্ষতার সঙ্গে পালনের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভোগের অপসংস্কৃতি আমাদের মধ্যে জেঁকে বসেছে। তাই বিশ্বের বুকে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, উন্নয়ন অনুকূল সংস্কৃতির চর্চার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি উন্নয়ন প্রতিকূল সংস্কৃতির চর্চা থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন। এই সংস্কৃতি নিয়েই আজকের লেখা।
১.... লন্ডনে যানজটে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে যানবাহনকে টোল বেশি দিতে হয়। তাই যানবাহন ওই এলাকা এড়িয়ে চলার ফলে যানজট সহনীয় পর্যায়ে থাকে। আমাদের এমন ব্যবস্থা নেই। বিআরটিএ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এসব নিয়ম চালু করলে ঢাকাসহ অন্যান্য যানজটপিষ্ট শহরের যাত্রীদের রেহাই দিতে পারে। শ্রেয়তর যাতায়াত–জীবন উপহার দেওয়ার পাশাপাশি এতে করে কর্মসময়, উদ্বেগ, গ্যাস, তেলের শ্রাদ্ধ থেকে দেশও বাঁচতে পারে। তা ছাড়া, গোটা ইউরোপ যেখানে রেলের মতো গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে, সেখানে এক যাত্রী নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো যানজটকে অসহনীয় মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। অপ্রতুল সড়ক কাঠামোতে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন কঠোর করা তেমন কঠিন কাজ না। টানেল কিংবা রাস্তাঘাট নির্মাণে আমাদের দেশের ব্যয় নাকি উন্নত দেশের থেকেও বেশি। যখন-তখন রাস্তার ডিভাইডার ভাঙা ও গড়ার প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ। একইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ফ্লাইওভার তৈরি করে নিচের রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী করে রাখা। অর্থ ও ভৌত অবকাঠামোর এমন অপচয়ের কারণ খুঁজে বের করা উচিত।
২.... সাংহাই থেকে তাইপেই যাচ্ছি। বিমানবালার কাছে পানি চাইলে আগে দেওয়া এককালীন ব্যবহারোপযোগী গ্লাসটি কোথায় জিজ্ঞাসা করল। কৃচ্ছ্রসাধনের মাত্রা দর্শনীয় এবং তা আসছে মাথাপিছু আয় ৩৮ হাজার আমেরিকান ডলারের নাগরিকদের থেকে।
৩. বিশাল জনঘনত্বের দেশে অধিকতর ঘনত্বের রাজধানীতে প্রতিটি বাসায় ওয়াশিং মেশিন, যা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনে আনতে হয় এবং যা সপ্তাহে কেবল আধঘণ্টার জন্য সচল হয়। মূল্যবান সম্পদের এমন অপব্যবহার এবং তা কেবল নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ (তাও আবার নানা ঋণ-সুবিধাদি নিয়ে) জাতির পক্ষে একেবারেই বেমানান। মাথাপিছু ৪৮ হাজার আমেরিকান ডলার আয়ের সুইজারল্যান্ডে যদি একাধিক ভবনের বাসিন্দারা যৌথভাবে ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করতে পারে, তাহলে অন্তত ঢাকা শহরের ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষিত মানুষেরা এই কাজটি করতে পারছে না কেন?
৪.... রাশিয়ার ইকেটেরিনবার্গ শহরে এক রাত নিজের পয়সায় হোটেলে থাকতে হবে। জানতে পারলাম আয়োজকেরা আমাদের যে দামি হোটেলে রাখবে, তারই কাছে সাশ্রয়ী হোটেল আছে। দেখতে গেলাম। রুমের দরজা খুলে দিতেই চারটি খাট সারি করে বসানো আছে। ওপরের দিকে তাকাতেই আরও চারটি দোতলার মতো করে। সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া, যা পৃথিবীর ১১ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে আছে এবং যার প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে মাত্র ৮ দশমিক ৪ জন মানুষ। পক্ষান্তরে আমরা পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করি ১ হাজার ২২২ মানুষ। তাদের যদি এ রকম হোটেল থাকে, তাহলে আমাদের হোটেলগুলো কী রকম হওয়া উচিত? আমাদের বাসস্থানগুলোতেও কি আমাদের ভূমিশূন্যতার প্রভাব পড়া উচিত না? জানতে পারলাম বিলাতেও নাকি প্রতিটি বাসায় আমাদের মতো ৩/৪/৫টি করে বাথরুম নেই। ভূমির এমন অপব্যবহার আর কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ। একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যতই ধনী হোক না কেন, সর্বোচ্চ জনঘনত্বের দেশে দেশের স্বার্থে কি তার ভূমিসাশ্রয়ী হওয়া উচিত নয়? অবশ্য উচ্চ করের বিনিময়ে কোনো ধনী ব্যক্তিকে অতিরিক্ত ভোগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আমাদের থেকে গণতন্ত্রচর্চায় যারা এগিয়ে, সেখানেও দেশের স্বার্থে ব্যক্তি অধিকারকে সমাজের উপযোগী করে সীমিত করা হয়।
প্রতিবছরই এতগুলো বই ছাপানো হবে এবং তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা হবে না, কাগজের জন্য বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাবে, তাও কাঙ্ক্ষিত নয়।
৫.... সারা দেশের সড়কব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যমুনা নদীতে ইতিমধ্যে সেতু স্থাপিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর অনধিকার চর্চাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত আমাদের হৃত সম্মান ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে সহায়ক। তবে এই দামি সেতুগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশপাশের ভূমি যে পতিত রাখতে হচ্ছে এবং সেই জমির মালিকদের পুনর্বাসনের জন্য আবাদযোগ্য ভূমিতে বন্যা ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া কুঁড়েঘর তৈরি করে নাগরিকদেরই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার মুখে ফেলা হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগে যৌথ আবাসনের ব্যবস্থা করে মূল্যবান ও অপর্যাপ্ত ভূমির শ্রেয়তর ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত, যে সংস্কৃতি দেশব্যাপী সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
৬. অতি সম্প্রতি পটুয়াখালী গিয়েছিলাম। কুয়াকাটার পথে তিনটি নদীতে বড় বড় সেতু তৈরি হয়েছে। সম্ভবত আমাদের প্রাযুক্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে। তারপরও ফেরি সার্ভিস চালু আছে। উদ্বোধন না হওয়া পর্যন্ত সেতু ব্যবহার করা যাবে না। সেতু তৈরিতে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকলে ব্যবহার না করলে দৈনিক কম করে হলেও তিন লাখ টাকার সুবিধা গ্রহণ করছি না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের চেন্নাই শহরে ১৩ ফ্লোরসমৃদ্ধ ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন বর্গফুট আয়তনের তথ্যপ্রযুক্তির টাইডেল পার্ক ১৪ মাসে তৈরি হওয়ার পর নামীদামি ২৫-৩০টি কোম্পানি উদ্বোধনের অপেক্ষা না করে কাজ শুরু করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি উদ্বোধন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সীমিত ভৌত অবকাঠামোর দেশে সুযোগ-সুবিধা অব্যবহৃত রাখা উন্নয়ন অনুকূল কোনো সংস্কৃতি নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেশের ক্ষতি অনুধাবন করে যথাসময়ে উদ্বোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
৭.... একসময়ে ভারত সরকারের অর্থে বিমানভ্রমণ ভারতীয় জাতীয় পতাকাবাহী বিমানে করতে হতো। আমাদের দেশেও তা বাধ্যতামূলক করা উচিত, এমনকি আমাদের বাংলাদেশ বিমানের সেবার মান গ্রহণযোগ্য না হলেও। কয়েক দিন আগে গোটা পলাশীবাজার তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাংলাদেশের তৈরি একটি শেভিং রেজর পাইনি, ভারত কিংবা পাকিস্তানের তৈরি আছে। আমাদের প্রদত্ত সেবা কিংবা তৈরি পণ্যের মান ভালো না হলে বিদেশিরা তা ব্যবহার নাও করতে পারে কিন্তু আমরাই হব যোগ্য সেবাগ্রহণকারী কিংবা পণ্য ব্যবহারকারী।
৮.... আমাদের সরকার প্রতিবছর ৩০-৪০ কোটি পাঠ্যবই বিনা মূল্যে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে একই বই আমরা বছরের পর বছর পালাক্রমে পড়তাম। পাঠ্যপুস্তক দিবস নিয়ে আমাদের জাতি গর্ববোধ করতেই পারে। তবে প্রতিবছরই এতগুলো বই ছাপানো হবে এবং তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা হবে না, কাগজের জন্য বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাবে, তাও কাঙ্ক্ষিত নয়। এই বিলাসিতা করা আমাদের ঠিক নয়। কারণ, এখনো আমরা বৈদেশিক ঋণের দিকেও তাকিয়ে থাকি।
শ্রেয়তর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি, অপচয় রোধ, স্বদেশি পণ্যের ব্যবহারে গর্ব এবং দেশাত্মবোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসংখ্যার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিশ্বদরবারে আমাদের অবস্থান সুসংহত হবে, এটা আমাদের নতুন বছরের কামনা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

Saturday, November 15, 2014

গাঁয়ের যোগী ভিখ পায় না! by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

কবি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন, এই দুর্ভাগা জাতি দেশের ঠাকুর রেখে বিদেশী কুকুর বরণ করতে কুণ্ঠা করবে না। তাই নিজের স্বপ্নের কথা বলেছেন- ‘কতরূপে স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ত্যাজিয়া’। আমরা মধ্য আয়ের দেশ হতে চাই। আমরা অচিরেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমরা স্বাবলম্বী হতে চাই। তবে সব ক্ষেত্রেই বিদেশী পরামর্শক প্রয়োজন। যদিও বিদেশী পরামর্শক আর বিশেষজ্ঞ যে শুধু কাড়ি কাড়ি টাকা নিতে পারে এবং যুগ যুগ ধরে সমস্যা জিইয়ে রাখে, তার ভূরিভূরি উদাহরণ রয়েছে। এই তো সেদিন বাংলাদেশ বিমানকে লাভের মুখ দেখানোর জন্য এক বিদেশী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা হয়েছিল। পত্রিকান্তরে জানা গেল, বিমানকে বেহাল রেখেই তিনি সরে পড়েছেন। যমুনা সেতু তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই ফাটল ধরেছে। বিদেশী বিশেষজ্ঞরা নির্বাচন কমিশনে একই কাজ করার জন্য একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকেও মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে সম্ভবত বিএ পাস বিশেষজ্ঞ আকাশ স্পর্শ করা বেতনে চাকরি করেছেন, সঙ্গে তার স্ত্রীও চড়া বেতনে।
আমরা শুধু ভারত থেকে নয়, এখন শ্রীলংকা থেকেও কম্পিউটারের পরামর্শক আনা শুরু করেছি। মিয়ানমার আর নেপাল শুধু সময়ের ব্যাপার। অন্তত সেই প্রকল্পগুলো যে সফলতার মুখ দেখেনি, তা না জেনেও বলা যায়। কারণ, সফল হলে শুধু তারা নয়, তাদের উত্তরাধিকারীরাও আমাদের দেশের সস্তা রোজগার থেকে নিজেদের বঞ্চিত করত না। রাজনৈতিক হানাহানির দেশে যখন বিদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ অনিশ্চিত পরিবেশে পরামর্শক হিসেবে আসে, তখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, নিজের দেশে তাদের কাজের অভাব, উপরন্তু আমাদের দেশে আকাশচুম্বী বেতন।
একবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর চাকরির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। অনেক টাকা বেতন। কিন্তু যখন তার সার্টিফিকেট দেখতে চাচ্ছিলাম, তা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। যাও একটা পাওয়া গেল তার চল্লিশ ভাগ লেখা মুছে গেছে। আমি ভালো একটি কপি দাবি করে চলে এলাম। পরদিন সকালে একজন এসে আমার বিভাগে মাস্টার্স করার সম্ভাবনা যাচাই করছিল। তার সার্টিফিকেট আর ওই দামি প্রবাসী বিশেষজ্ঞের শিক্ষা জীবনের শেষ সার্টিফিকেট এক হওয়ায় আমি ধারণা পেলাম, নিজের দেশে নিজেদের কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেই না আমরা চলেছি। অথচ আমাদের স্নাতকেরা বিদেশে সুনামের সঙ্গে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নয়, ইন্ডাস্ট্রিতেও কাজ করছে এবং অনেকেই শুধু আমাদের ডিগ্রি নিয়েই। স্বদেশী পণ্য এবং উৎপাদনমুখী নীতি অনুসরণ করে মানসম্পন্ন ব্লেড তৈরিতে অপারগ ভারত প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠিয়েছে। এর আগে তাদের রকেট চাঁদে পানির অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেছে। আমরা আগেও বিদেশী পণ্য, বিশেষজ্ঞ ও সেবায় ধন্য হয়েছি, এখনও তাই। ব্যবধান এটুকু যে, আগে বিদেশ বলতে জাপান, জার্মানি, আমেরিকা বোঝাত; আর এখন বিদেশ আমাদের অনেক কাছে- মালয়েশিয়া, ভারত, শ্রীলংকা কিংবা থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ।
কয়েকদিন আগে যে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটল, তার সমাধান নাকি বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ! টিভিতে তাই দেখতে পেলাম। ২০০৭ সালেও এমন বিপর্যয় ঘটেছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা সমস্যা চিহ্নিত করে সুপারিশও করেছিলেন, যার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বাঙালরা কি আর এ সবকিছু বোঝে? বিদেশী হলে অবশ্য যে কোনো রঙের হলেও পারে! অথচ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গর্ব করার মতো মেধাবী শিক্ষকে সমৃদ্ধ। এই বিভাগের স্নাতকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আইইই-এর ফেলো, বার্কলেসহ নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আবার আমেরিকার বিখ্যাত ইলেকট্রিক পাওয়ার রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আরশাদ মনসুর হলেন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নামকরা গবেষক। এবারের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পরপরই জনপ্রিয় সাহিত্যিক-কলামিস্ট আনিসুল হক এ সমস্যায় তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আমাদের দেশেও প্রয়োজনে তার সহযোগিতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
আমরা দেশটি ঠিকঠাকই চালাতে পারছি, তবে শুধু গর্বের প্রতীক আদমজী জুট মিল চালাতে না পেরে বন্ধ করে দেই, কখনওবা বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো একেবারেই গৃহস্থালির কাজও বিদেশীদের দিয়ে করানোর উদ্যোগ নেই, অথবা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা থাইদের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। এ কাজগুলো বিদেশীদের দিলে কখনও নিজেরা শিখতে পারব না। কোনো দেশই আমাদের সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাদের কাজ ছেড়ে দেবে না। নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে, তা যত আনাড়িভাবেই আমরা পারি না কেন। এক প্রজন্মের ত্যাগ ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গোড়াপত্তন করবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা না থাকলে জন্মজন্মান্তর আমাদের উত্তরসূরিরা উন্নয়নশীল দেশের ছাপ কপালে নিয়ে নিগৃহীত হবে।
স্বাধীনতার পর ৪০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে পরমুখাপেক্ষী থাকায় কোনো গৌরব নেই, বরং বিস্তর গ্লানি আছে। জাতি হিসেবে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আমাদের মেরুদণ্ড যতই দুর্বল হোক না কেন, এর ওপর ভর করেই শির উন্নত করে আমরা দাঁড়াতে চাই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে অনাত্মীয় পরিবেশে, এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য শুধু নিজেরা নয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতাদেরও মরতে দিতে চাই না। নিজের দেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে মরতে মরতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাঁচাতে ও বাঁচতে শিখে যাবে।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

Sunday, August 31, 2014

কৃচ্ছ্রসাধন এবং আমরা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

পৃথিবীর এক-সহস্রাংশেরও কম ভূমিতে আমাদের ২৪ সহস্রাংশ মানুষের বাস। অর্থাৎ পৃথিবীর একটি শিশু গড়ে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে বড় হয়, বাংলাদেশে একটি শিশু পায় তার ২৪ গুণ কম। স্বভাবতই সম্পদের ব্যবহারে আমাদের অবশ্যই মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। একজন মানুষের জন্য সাকল্যে বরাদ্দ ৭৮৩ বর্গমিটার, যা শহর-দেশগুলো বাদ দিলে প্রায় সর্বোচ্চ শুধু মালদ্বীপের জন্য সংখ্যাটি ৭৫৭। যেসব দেশ আমাদের থেকে শ্রেয়তর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, যেসব দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রকৌশলের শক্তিতে আমাদের থেকে অনেক বেশি বলীয়ান, তাদের দিকে একবার তাকাই।
১. ২০১৪ সালের প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের আগে ও পরে রাশিয়ার ইকেটেরেনবুর্গ শহরের কোনো ছোট হোটেলে থাকতে হবে। খুঁজতে গিয়ে একটি বড় হোটেলের পাঁচ মিনিট দূরত্বে পেয়েও গেলাম। ভেতরে ঢুকতেই হতবাক। দেশের চতুর্থ বৃহত্তম শহরে ১০ X ২০ ফুট মাপের একটি বাসায় চারটি খাটের ওপর আরও চারটি খাট বসিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তাতে থাকে সেই দেশের নাগরিকেরা, যে দেশ আয়তনে পৃথিবীর বৃহত্তম, যে দেশের মাথাপিছু জায়গা বরাদ্দ ১ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার। পক্ষান্তরে আমাদের মাথাপিছু বরাদ্দ কেবল ১৫০ গুণ কম! আমাদের নিশ্চয়ই তাহলে এক খাটের ওপর চার-পাঁচটি খাট বসিয়ে বড় বড় হোটেলে থাকা উচিত!
২. ভারতে ট্রেনে শুধু সাধারণ কামরায়ই নয়, এমনকি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় একটি বেঞ্চাকার সিটের ওপর আরও দুটি বসিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ভারতের থেকে আমাদের জনঘনত্ব কমপক্ষে তিন গুণ, তাহলে আমাদের কয়টি বসানো উচিত? এমনকি ভারতের মতো তিনখানাও তো দেখলাম না। ভারতে এমনকি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় আরও সাশ্রয়ীভাবে যাওয়ার সুযোগ আছে, যাকে বলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (সাশ্রয়ী)। ভারতের মাথাপিছু আয় এখন আমাদের দুই গুণ, জনঘনত্ব তিন গুণ কম। একবার আমাদের একজন সম্পাদকের কাছে শুনেছিলাম যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকসাইটে এক সচিব অবসরে যাওয়ার পর দুই কামরার বাসায় থাকছেন। আমরা নিশ্চয়ই তাঁকে কঞ্জুস বলে নিজেদের ভোগের মাহাত্ম্যে গর্বের ঢেকুর তুলব।
৩. চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনে কুনমিং থেকে তাইপেই প্রায় ১০ হাজার ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশের থেকে ৪০ হাজার ডলার আয়ের দেশের ঘটনা। দ্বিতীয়বার ফলের রস খাওয়ার জন্য আগে দেওয়া ফেলনাযোগ্য গ্লাসটি চাইতে আমি তো রীতিমতো অবাক। যতক্ষণ পারো ব্যবহার করো, তারপর তার রিসাইক্লিং করো, তাও ফেলে দেবে না। তাইওয়ানে তারা আরেক কাঠি সরেস। পানি খেতে যেতে দেখি কোনাকৃতি হালকা কাগজের পাত্র। ফেলেই যখন দিতে হবে তা তৈরিতে এত কাঠখড়ি পোড়াব কেন? আকারেও যেন ছোট হয়, দামেও যাতে সস্তা হয়। কৃচ্ছ্রসাধন সর্বত্র, যদিও মাথাপিছু আয় আমাদের থেকে ২০ গুণ বেশি।
৪. এসিএম আইসিপিসির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় কানপুর গিয়েছি। আগের বছর ঢাকা সাইটের পুরস্কার বিতরণী এবং সান্ধ্যভোজ আমরা হোটেল শেরাটনে করেছিলাম। গিয়ে দেখি হলগুলোর পাশে শামিয়ানা টানিয়ে সেখানেই সান্ধ্যভোজের ব্যবস্থা, যদিও মাথাপিছু আয় আমাদের দ্বিগুণ! কলকাতা শহরে একটি দোকান খুঁজছিলাম, যেখান থেকে দেশে একটি ই-মেইল করতে পারি। আলো-আঁধারিতে এক দোকান, ভেতরে কয়েকটি মান্ধাতার আমলের কম্পিউটার, কি–বোর্ডের বর্ণগুলো দেখা যায় না, মাউস নাড়ালে কোনো উত্তর নেই। সেই কম্পিউটার বাসায় নয়, ব্যবসার জন্য ব্যবহার করছে। প্রতি ১৫ মিনিট কিংবা তার অংশবিশেষের জন্য ১০ রুপি।
৫. পার্শ্ববর্তী দেশে তথ্যপ্রযুক্তির জয়জয়কার দেখে দেশে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কত উচ্চবাচ্য করছি কিন্তু কাজের কাজটি সম্ভবত এখনো হচ্ছে না। কোনোভাবেই সরকারি কোনো বাহিনীর সঙ্গে বিদেশে গিয়ে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি সতেজ করার উপায় নেই। ঠিক করলাম নিজেই ভারতে গিয়ে দেখে আসব। গেলাম চেন্নাই শহরে। এক ভদ্রলোক খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাবেন বলে একটি পুরোনো যুগের খসে পড়া দেয়ালের ভবনের দোতলায় নিয়ে একটি তেল-চিটচিটে টেবিলের সামনে দাঁড় করালেন। টেবিলের ওপরে বসানো কম্পিউটারকে আরও মান্ধাতার আমলের মনে হলো। আইআইটি মাদ্রাজের টিনএজার ছাত্রজীবনের প্রথম কম্পিউটার দিয়ে এমন সব সফটওয়্যার তৈরি করছে যে মাইক্রোসফট তাকে ইন্ডাস্ট্রি প্রোডাক্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং মাত্র ২২ বছর বয়সে ৩৬ জন আইআইটি স্নাতক তার সঙ্গে কাজ করছে। কি–বোর্ডের বর্ণ না হয় দেখা না-ই গেল, মাথায় তো আর বুদ্ধি কম নয়, তাই পুরোনো কম্পিউটার দিয়ে যতক্ষণ কাজ করানো যায় করিয়ে নিচ্ছে। গিগাহার্টজ মেশিন নয়, আসল সম্পদ হলো মাথা। মেশিনে কাজ হলে কুয়েত, কাতার আর সৌদি আরব হতো সবচেয়ে উন্নত দেশ। তা কিন্তু নয়, তেল-গ্যাস সম্পদহীন জাপান হলো সবচেয়ে ঐশ্বর্যশালী আর তাদের সম্পদ হলো তাদের মাথা, জ্ঞান, প্রাযুক্তিক দক্ষতা। আমাদেরও যদি কোনো সম্পদ থেকে থাকে তা হলো মানুষ, যাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। প্রাকৃতিক কিংবা ভৌত অবকাঠামোতে তো আমাদের এখনই সমৃদ্ধ হওয়ার কথা নয়।
৬. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শুরুতে যিনি অবদান রেখেছিলেন, আইআইটি কানপুরের সেই অধ্যাপক ফাল্গুনী গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রীকে বাসায় দাওয়াত করেছি। বড় বড় ফার্মের মুরগি কিনেছি। রোস্ট করার পর দেখতে খাসির পায়ের মতো লাগছে। ছয়-ফুটি ফাল্গুনী অতিকষ্টে নিজের প্লেটেরটা শেষ করে স্ত্রী এবং তনয়ার প্লেটের প্রায় অক্ষত ড্রামস্টিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দুজন মিলে তো একটা খাওয়ার চেষ্টা করতে পারতে। এত মূল্যবান খাবার নষ্ট হয়ে যেতে তাঁর যে কষ্ট হচ্ছিল, তাতে আমারই খারাপ লাগছিল। অবশ্য দুর্বল অর্থনীতির দেশের নাগরিক হিসেবে বেহিসাবে খরচ করার জন্য নয়।
৭. আমার এক বন্ধু নামকরা বিদেশি দাতা সংস্থায় কর্মরত। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা কৃচ্ছ্রসাধনে মনোনিবেশ করেছে। নোটিশ দিয়ে সব কর্মকর্তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে এই কৃচ্ছ্র সত্ত্বেও সভাগুলোতে গরম পানি সরবরাহে কার্পণ্য করা হবে না। আবার তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধানও নাকি ইকোনমি ক্লাসে বিমান ভ্রমণ করে থাকেন। দাতা সংস্থার কৃচ্ছ্রসাধন যদি এমন হয়, তাহলে যাদের দান করে, তাদের থেকে এই সংস্থার প্রত্যাশা কী হওয়া উচিত?
সীমিত সম্পদের দেশে আমরা যেন সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করে দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাই, এটাই প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

Tuesday, July 22, 2014

আবার আমার দেশ by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যখনই বিদেশ ভ্রমণ করি, সদাই সতর্ক থাকি কতটা উপেক্ষিত হচ্ছি। সেই ছোটবেলায় যখন তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়ার সময়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে ইউরোপে বেড়াতে যেতাম, তখন কুটিল ইউরোপের জটিল সীমানার কারণে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ট্রেনে ঘুমন্ত আমাদের জাগিয়ে সবুজ পাসপোর্ট এ পাশ-ও পাশ করে দেখে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় মনে করিয়ে দিত আমরা সম্ভবত অনাকাঙ্ক্ষিত দেশের নাগরিক। এই অনাকাঙ্ক্ষার কতটুকু স্বোপার্জিত আর কতটা আন্তর্জাতিক সমাজের চাপিয়ে দেওয়া, এটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। আমি যখন উর্দি-পরা মূর্ত ত্রাস সীমান্ত প্রহরীদের বৈধ পাসপোর্ট আর বৈধ ভিসা নিয়ে অবৈধ উৎপীড়ন মোকাবিলা করার জন্য ভয়ার্ত মনে অপেক্ষমাণ, তখন ১৬ বছরি এক মার্কিন মেয়ে পাসপোর্টের অংশটি পকেটের বাইরে দৃশ্যমান রেখে নিতান্তই অবহেলায় তার চরণযুগল পাদুকাসমেত আরেকটি সিটে উপস্থাপন করে পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রমমান সীমান্ত প্রহরীকে অবলীলায় উপেক্ষা করে চলেছে এবং তাতে যখন সীমান্ত প্রহরী তার ন্যায্য জিজ্ঞাসাটিও করছে না তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সভ্যতার সূতিকাগার ইউরোপও পাশবিক শক্তির পূজারি—এই দোষটি শুধু অশিক্ষিত পুরোনো যুগের জাতিদের মধ্যে নয়।
১। একসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন ছিল তাইপেই ১০১। দর্শনের জন্য নিচের দিকের কোনো ফ্লোরে দেখলাম ঘড়ির মতো বৃত্তাকার জায়গায় পৃথিবীর শ খানেকের ওপর শহরের নাম রয়েছে, শুধু নেই বাংলাদেশের কোনো শহরের নাম, যে দেশটি সভ্যতার মুখ্য উপাদান সারা পৃথিবীর মানুষের ২ দশমিক ৪ শতাংশকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা দিচ্ছে এক-সহস্রাংশ ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। এমনকি কলম্বোর নামও রয়েছে। এমন নয় যে আমাদের অক্ষাংশে আরও গুরুত্বপূর্ণ শহর রয়েছে।
২। সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক থেকে উড়ে এলে বিমানের সিংহভাগ যাত্রী থাকবে বাংলাদেশের সরবরাহকৃত খবরের কাগজে, যা অবশ্যই কোনোভাবে বাংলাদেশি নয়, সব দেশের আবহাওয়ার তথ্য দেবে কিন্তু কোনো অদৃশ্য কারণে বাংলাদেশে যেহেতু আবহাওয়াই নেই আর তথ্য দেবে কীভাবে। সিঙ্গাপুরের আছে, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, দিল্লি আছে। এমনকি কলম্বো আর কাঠমান্ডুও বাদ যায়নি, কোনো কারণে পাকিস্তানও অবহেলার যোগ্য নয়, তবে সিংহভাগ বাংলাদেশের যাত্রীরা যেহেতু নিজেদের আবহাওয়া জানে, তাই অন্য দেশের তথ্য দিয়ে তাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা হয়। এটা কিন্তু শুধু আবহাওয়া নয়, এত বড় দেশের শেয়ারবাজারও কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ নয়, যেমনটি আমাদের খেলাধুলা এবং অন্যান্য বিষয়। একবার আমাদের গলফ খেলোয়াড় সিদ্দিকুর রহমানের খবর পড়ে কী-ই না গর্বিত মনে হয়েছিল নিজেকে।
৩। আরবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলো আমাদের দেশের যাত্রী পরিবহনে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে আর আমাদের নিজেদের বিমান শুধু লোকসানি খাত। আমাদের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলো শ্রম দিয়ে যে পয়সাটি উপার্জন করে, তার সম্ভবত সিংহভাগ চলে যায় বিমানভ্রমণের খরচে। অথচ সেই যাতায়াতেও তারা সেবা, ভাষা এবং আপ্যায়নে আন্তরিকতার পরশ নেই। ৯০ শতাংশ বাংলাদেশি যাত্রীর জন্য পথনির্দেশক হয়তো অনর্গল হিন্দি বলে যাচ্ছে আর আমাদের সহজ-সরল খেটে খাওয়া মানুষগুলো ভাবছে যে আদর-আপ্যায়ন পেতে হলে অন্য ভাষা জানতে হবে। অনেক দিন আগের কথা, একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে পড়েছিলাম বিমান হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আয় করা খাত। কেন আমরা সেই বিমানকে ক্ষতিতে নুইয়ে পড়া অবস্থায় দেখছি। আমাদের নেতাদের মধ্যে এমন কেউ সাহসী ও যোগ্য নেই, যিনি দেখিয়ে দিতে পারেন আমরাও পারি। এর জন্য বিদেশি যাত্রীদের ডাকতে হবে না, নিজের দেশের যাত্রীদের দেশের পতাকাবাহী বিমানে উঠতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশের অর্থে আকাশভ্রমণে ভারতে নিজেদের পতাকাবাহী বিমান ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা ছিল, এতে আমাদের গণতান্ত্রিক (স্বেচ্ছাচারিক!) অধিকার কিছুটা ক্ষুণ্ন হলে অসুবিধা কী? এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেমেয়েকে যেকোনো স্কুলে ভর্তি করা যায় না, এলাকার স্কুলে ভর্তি করতে হয় তাতে তো আর তারা গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছে না। এটা কারও ব্যক্তিগত সংগতির ওপর নির্ভর করে না দেশের কল্যাণই এখানে মুখ্য।
৪। শুধু বাইরে বলি কেন দেশেও কিন্তু আমাদের এই সহজ-সরল খেটে খাওয়া জীবনের আনন্দ পরিত্যাগ করা মানুষগুলো যাদের রেমিট্যান্সের সুবাদে বিশ্বের অর্থনৈতিক চরম মন্দার দিনগুলোতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল ছিল রাজনীতির শাখের করাতে পিষ্ঠ হয়েও এই মানুষগুলো বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে রীতিমতো নিগৃহীত, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা চলছে তাদের বোর্ডিং কার্ডটি পূর্ণ করে দেওয়ার জন্য বিমানবন্দরে পর্যাপ্তসংখ্যক লোক নিয়োগ করা যেতে পারে, তাদের ভিসা পাসপোর্টে ভুল এই কথা বলে হয়রানির জন্য বড়সড় সাজার ব্যবস্থা করে এই হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের দূতাবাসে কর্মরত সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে এই খেটে-খাওয়া মানুষের পাঠানো রেমিট্যান্সেই তাঁদের বেতন হয়। সুতরাং তাঁদের যেকোনো কাজ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত করে ফেলা উচিত। দূতাবাসের অবহেলায় যদি এই মানুষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে বাংলাদেশও ওই পরিমাণে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
৫। ১৯৯৮ সালের কথা। আমাদের ছেলেরা ভ্যালাডলিদ বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত অনলাইন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় খুব ভালো করার জন্য তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করেছিলেন। তখনো ওই সাইটের পুল ডাউন মেনুতে অনুল্লেখ্য কিছু দেশের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম ছিল না। এখনো প্রয়োজনীয় নানা সাইটের পুলডাউন মেনুতে বাংলাদেশের নাম নেই। অস্ট্রেলিয়া তাদের ভিসার কার্যক্রম বাংলাদেশ থেকে তুলে নিয়েছে, কানাডার কথাও একই। ভিসা করতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যাংকক কিংবা দিল্লি যেতে হয়, কখনো বা কলম্বো, জিআরই পরীক্ষাও নাকি দেওয়া যায় না।
নানা সীমাবদ্ধতায়, আইনকানুনে বাধা হয়ে যাচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের। এটা নিয়ে ভুক্তভোগীরা উচ্চারণ করতে পারছে না, সরকারও বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিমানের অবতরণেও নাকি নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। আন্তদেশীয় সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, শক্তির তারতম্য দিয়ে নয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাভাবে আমরা জাতি হিসেবে যে বিব্রত, এটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আত্মসম্মানবোধকে বিশ্বদরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নানা দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আমাদের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হতে হবে, যা ছাড়া জাতীয় প্রতিষ্ঠা হবে কেবলই মরীচিকা।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

Friday, November 22, 2013

দেশ ও সমাজ- অসংগতি আর অসংগতি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমির প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মানুষ এর ২৪-সহস্রাংশের থাকা-খাওয়া,

Thursday, October 24, 2013

কিভাবে গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

সরকারি দল ও বিরোধী দল যখন ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন সাধারণ মানুষ শংকিত দেশের আইন-শৃংখলা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। এর মধ্যেও মানুষ আশা করছে, শেষ মুহূর্তে একটি আপসরফা হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পৃথকভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন হল, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে একবিন্দু আস্থা নেই, সেখানে উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কিভাবে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে? ইতিপূর্বে যতগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে, সেগুলোর উপদেষ্টাদের কীভাবে উভয়ের সম্মতিতে বাছাই করা হয়েছে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই। খুব ভালো হতো যদি গোটা প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের সামনে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হতো, তাদের সম্পৃক্ততা থাকত। তাহলে কোনো দলই নির্বাচনকালীন সরকার তথা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারত না। আমার এরকম একটি প্রস্তাব একাধিকবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তা সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়নি। দেশের এই সন্ধিক্ষণে আবার বিষয়গুলো বলার সাধ জাগল। এ নিয়ে আলোচনা করলে হয়তো অনেক বেশি সুচিন্তিত ও গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
১.
বিগত চারটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ সব সময় সরকারি দলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। নিশ্চয়ই আমাদের দেশের রাজনীতিকরা বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন এবং এর থেকে আমাদের দলগুলো এখনও যে শিক্ষা গ্রহণ করেনি তার বড় প্রমাণ এই ধারা বেশ কিছুদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। বিগত নির্বাচনে ৭-৮ বছর ক্ষমতায় না থাকা, কোনরকম উন্নয়নমূলক কাজ করতে না পারা, টেন্ডার দিতে না পারা আওয়ামী লীগকে মানুষ জয়যুক্ত করেছিল। এবার আবার পাঁচ বছর এমনকি সংসদ অধিবেশনে না যাওয়া, ক্ষমতায় না থাকা বিএনপিকে নির্বাচিত করলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। সুতরাং নির্বাচনে জেতার জন্য ভালো মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই, স্রোতের অনুকূলে থাকতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় দুটি দলে গণতন্ত্রের চর্চাও লক্ষণীয় নয়। এর ফলে নতুন নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না। তাই বড় দুটি দলে গণতন্ত্রের চর্চা আবশ্যক। দেশের সাধারণ মানুষের যারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেই সংসদ সদস্যরা যদি ভাবেন তারা তো কিছুই নন- দলই সব, তাহলে প্রতিনিধিত্ব যোগ্য হবে না। আবার গত কয়েকটি নির্বাচনে এ-ও দেখা গেছে, এই বড় দল দুটি যত ভোট পেয়েছে, সেই অনুপাতে সংসদে তারা আসন পায়নি। ভোটের ব্যবধান ৫-৬ শতাংশ হলেও আসনের ব্যবধান ৮-৯ গুণ, যা কিনা একটি নির্বাচন ব্যবস্থার অগ্রহণযোগ্য ত্র“টি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আজ সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যা যদি ১৩০-১৪০ হতো, নিশ্চয়ই তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যেত না। তাই আমার প্রস্তাব হল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ তৈরি করা। একজন ভোটার দুটি ভোট দেবে- একটি দলকে আরেকটি স্থানীয় সংসদ আসনের প্রার্থীকে। সংসদ নির্বাচনে যারা দাঁড়াবে, তারা দলের প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না, তবে আমাদের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো নানা দল তাদের পক্ষ নিতে পারবে। দলের প্রতীক না নিয়ে যদি কেউ নির্বাচনে জয়ী হতে পারে, তাহলে তার নিজের প্রতি আস্থা ও আত্মমর্যাদাবোধ বেশি হবে। এই সংসদ সদস্যরা ইচ্ছা করলেই ফ্লোরক্রসও করতে পারবেন। এর ফলে তারা দলের অন্ধ আজ্ঞাবহে পরিণত হবেন না। দলের সিদ্ধান্তে তারা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এর ফলে দলের সিদ্ধান্তের গুণগত মানও বাড়বে। আর প্রতিটি রাজনৈতিক দল যে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পারবে। আমরা যদি ধরি, আমাদের ৩০০ জন সংসদ সদস্য ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন, আর ৩০০ জন দলীয়ভাবে। তাহলে ৩০০ আসন রাজনৈতিক দলগুলোকে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে। আমরা জানি, অনেক ছোট দলের সারা দেশভিত্তিক ভোট থাকা সত্ত্বেও কোনো আসন থেকেই তারা বিজয়ী হতে পারে না, যদিও তাদের মোট প্রাপ্ত ভোট একাধিক সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি হতে পারে। সুতরাং তাদের এই জনপ্রিয়তা দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে যৌক্তিক মাত্রায় অংশগ্রহণ করবেন। সংসদ সদস্যরা একাধারে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ার ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনে স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় বলে সংসদ এ বিষয়ে পরিষ্কার নীতি গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও বিগত কয়েকটি সরকারে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন অথচ সংসদ সদস্য হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা কড়ায়গণ্ডায় ভোগ করা থেকে সাধারণ মানুষের ধারণা জšে§ছে যে, আমাদের প্রতিনিধি নেতারা চিন্তা-চেতনা-ত্যাগে আমাদের প্রত্যাশাকে কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারছেন না। সুতরাং তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য ‘না ভোট’ দানের সুযোগ থাকা উচিত।
২.
বর্তমানে প্রধান দুটি দলের মধ্যে পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা দেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও লজ্জাজনক। এ অবস্থায় সমঝোতার মাধ্যমে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া তত সহজ হওয়ার কথা নয়। নির্বাচনকালীন সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে দুটি দল একমত হবে এটা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে বিষয়েই সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়েই নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ও অন্য সদস্যদের নির্বাচনে উভয় দলকে সমঝোতায় আসতে হবে। নির্বাচন কমিশন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উভয় দলকে আমন্ত্রণ জানাবে। জনসাধারণও জানবে এ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হবে। সারাদেশের মানুষ ওই অনুষ্ঠান উপভোগ করবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা পেনড্রাইভে নিয়ে উভয় দলের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন। এর ফলে তালিকাগুলোর গোপনীয়তা বজায় রাখাও সহজ হবে। এবার প্রতিটি তালিকার প্রথম ১০টি নামের মধ্যে (সংখ্যাটি ১০-এর পরিবর্তে অন্য কিছুও হতে পারে) প্রথম মিল খোঁজা হবে (প্রথম মিলকেও আমরা প্রয়োজন অনুসারে সংজ্ঞায়িত করতে পারি)। না পেলে প্রথম ২০, প্রথম ৪০- এভাবে মিল খোঁজা হবে। তালিকার নামগুলোতে যাতে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে সেজন্য তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে। এক বা একাধিক সুযোগ্য উপস্থাপকের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি যেমন হতে পারে চিত্তাকর্ষক, তেমনি বিশ্বাসযোগ্য। সাধারণ মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া এই সমঝোতা নিয়ে সন্দেহ কিংবা অনাস্থা জ্ঞাপন করা কোনো দলের জন্যই সহজ হবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা যাতে খুব বড় না হয়, সেজন্য উভয় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্ত দিয়ে এর দৈর্ঘ্য সীমিত রাখাও সম্ভব। তাছাড়া যেহেতু উভয় দলই জানছে যে নামটি অন্য তালিকায় থাকতে হবে, সুতরাং তাদের পছন্দের তালিকা যৌক্তিক হবে। যতক্ষণ উভয় তালিকায় একই নাম পাওয়া না যায়, ততক্ষণ টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি চলতে থাকবে।
শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও অন্যান্য সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়, অন্য যে কোনো বিষয়েই সমঝোতায় পৌঁছতে এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক, স্বচ্ছ পদ্ধতি সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে তাদেরও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদের স্পিকার যেমন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন, এক্ষেত্রেও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলগুলো তাদের পছন্দের মানুষ নির্বাচন করবে। তাই অনির্বাচিতদের দিয়ে সরকার চালানোর সমালোচনা এখানে প্রযোজ্য হবে না। উল্লেখ করা যেতে পারে, তত্ত্বাবধায়ক, নির্দলীয়, সর্বদলীয়, নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নির্বাচনসহ যে কোনো বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যদি সমঝোতার প্রয়োজন হয়, তা এ পদ্ধতির মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের সামনে করা যাবে।
৩.
আরেকটি বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। একসময় আমরা কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডের তুলনায় পিছিয়ে ছিলাম না। উন্নতির মাপকাঠিতে এখন আমরা অনেক পেছনে। এ উদাহরণগুলো বিবেচনায় নিলে মনে হয়, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি আমাদের দেশে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অন্যান্য দেশে যে নানারকম শর্ত রয়েছে, তা আমাদের দেশেও আরোপ করা উচিত। এর ফলে যারা প্রধানমন্ত্রী হবেন, তারা যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করবেন, যাতে করে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও তারা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দেশেই বসবাস করতে পারেন। শুধু তাই নয়, দেশের জ্যেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ, দেশ চালনায় অভিজ্ঞ, সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তারা পরবর্তী নেতাদের মূল্যবান উপদেশ দিয়ে দেশ পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন। এই পদে সর্বোচ্চ এক মেয়াদ থাকার নিয়ম করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কোনো নেতা যদি যোগ্য নেতা তৈরি করতে ব্যর্থ হন, তাকে নেতা হিসেবে সফল ভাবা যায় না। ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র দু-একজন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য হলে আমাদের দেশে গণতন্ত্র সফলভাবে বিকশিত হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
আমি আশা করি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা এবং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে গবেষণা করে আমাদের দেশকে যথাসম্ভব ত্র“টিমুক্ত একটি ব্যবস্থা উপহার দিয়ে দেশবাসীকে অনিশ্চয়তা ও শংকা থেকে রক্ষা করবেন।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

Monday, July 29, 2013

অস্ট্রেলিয়ার মেধাবী বাঙালিরা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিদ্যাশিক্ষা উপলক্ষে সেই ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। তারপর নানা দেশে ভ্রমণের সুযোগ এলেও এই দ্বীপ মহাদেশে আসার সুযোগ হয়নি, যতক্ষণ না আমাদের সুযোগ্য ছাত্র সহকর্মী এবং সে সময় মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিপসল্যান্ড ক্যাম্পাসের কম্পিউটার বিভাগের প্রধান ড. মঞ্জুর মুর্শেদ সুযোগ সৃষ্টি করল। যা হোক, এবার আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে অনুষ্ঠিত হবে বিধায় আবার সুযোগ হল। কুয়ালালামপুর থেকে উঠেছি ঘণ্টা সাতেকের পথ। সাধারণত খাবার যা দেয়া হয়, তা খেতে না পারলেও ফেলে দিই না।
ব্রিসবেন পৌঁছার পর কাস্টম ডিক্লারেশনের যে ফরম দেয়া হয়, তাতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর বুঝে না বুঝে লিখতে হয়। আমিও তাই করলাম। তারপর ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর যেহেতু মালামাল সবই আমার সঙ্গে নেয়া ৬ কিলোগ্রাম ওজনের ব্যাগে, সেহেতু কাস্টমসে দৈব চয়নে আমাকে যে পরীক্ষা করা হবে, তা ধরেই নিয়েছিলাম। যেহেতু কোনো ফটকেই আমার ভাগ্য নেই। অতি সম্প্রতি আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য নামকরা একটি হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। কত মানুষ প্রবেশ করছে, কিন্তু আমার আর প্রবেশ করা হয় না। পরিশেষে দীর্ঘক্ষণ আমার এতিম অবস্থা দেখে আমাকে একজন পাহারাদার দয়াপরবশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। যা হোক, এত বড় বড় মালামাল রেখে শিকারি ক্ষুদ্র কুকুরটি যখন আমার ব্যাগের কাছে বসে পড়ল, আমি তখনও বুঝতে পারিনি যে, শক্ত কাগজের মোড়কের ভেতরে বিমানবালা আমাকে যে খাবারটি দিয়েছিল, তার মধ্যে এক খণ্ড মাংসও ছিল। যা হোক, ওই মাংসের টুকরা রেখে তার পরিবর্তে আমাকে একটি রিসিপ্ট ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের সময় কোনো রকম প্রাণিজাত কিংবা উদ্ভিদজাত খাবার নেয়া যাবে না- এরকম একটি লিফলেট দিয়ে আমাকে বিদায় করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ছাত্র ও সহকর্মী ড. নিউটন এসে গেল। নাম দেখে তাকে বিদেশী ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের বাংলাদেশেরই সন্তান। নিউটনের বিচক্ষণ পিতা তার ছেলেমেয়েদের নাম রেখেছে নিউটন, মিল্টন ও লিঙ্কন। সন্তানেরা কিছুটা হলেও নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে। নামের জন্য কোনো না কোনো সময়ে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়নি তা বলা যাবে না, তবে সুস্থির যুক্তিবাদী নিউটন যে যথেষ্ট সফলতার সঙ্গেই তার মোকাবেলা করেছে, এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বগুড়ার ছেলে নিউটন কোনোদিন ক্ষুদ্র চিন্তা করেনি। পিএইচডি করে ফিরে যখন বিভাগে যোগদান করল, তখন আমরা বিভাগে কোনো একটি বাইরের কাজ করছিলাম। যেখানে ছোটখাটো নানা কাজ আমরা বড় বড় অধ্যাপক ঠাণ্ডা মাথায় বসে করছিলাম, নিউটন তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এই বলে যে, যথেষ্ট বুদ্ধির কাজ না হলে সে করবে না।
নিউটনের ছাত্রজীবনে নানা সময়ে আমি গবেষণা প্রবন্ধ এবং তার সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতাম, যা নিউটন কখনও পাত্তা দেয়নি। এবার দেশে এসে খুঁজে দেখলাম অত্যন্ত হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নাল বিএমসি বায়োইনফরমেটিক্সের ভলিউম ১৪তে এ বছর তার দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য, নিউটনের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ Wizard ও Kangaroo ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানী মহলের নজর কেড়েছে। নিউটনের পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুপারভাইজার অধ্যাপক সাত্তার নিউটনের কাজ, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। ৬০ বছর বয়সী যশস্বী অধ্যাপক যখন অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী গবেষকের সঙ্গে আলাপে অনেক কিছু শেখা যায় বলে মন্তব্য করেন, তখন উভয়েই যথেষ্ট প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষক হিসেবে নিউটনের নজর কাড়তে না পারলেও তার অর্জন আমাকে রীতিমতো গর্বিত করে তুলল। অধ্যাপক সাত্তার আমাদের একাধিক ছাত্রের মেন্টর হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশে আয়োজিত সবচেয়ে নিয়মিত কনফারেন্স আইসিসিআইটিতে মূলবক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করে আমাদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় আমার উভয় ভ্রমণে আতিথ্যকর্তা হিসেবে অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনার দেয়ার পর একটি তুর্কি রেস্টুরেন্টে অধ্যাপক সাত্তারের দেয়া সান্ধ্যভোজ ও আলাপচারিতা অত্যন্ত সুখকর ছিল। এরপর অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্কুলের তরুণ পরিচালক বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করার সম্ভাবনা এবং তাতে তার সহায়তার কথা আন্তরিকভাবে জানালেন। আমাদের স্নাতক এবং সেখানে ফ্যাকাল্টি ড. শাহাদাত উদ্দিন একটি সেমিনারের আয়োজন করল এবং তার বাসার আতিথেয়তাও উপভোগ করলাম। আমার সহপাঠী- এক সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামাল ভাই- সারাদিন সিডনির একাংশ পরিভ্রমণ করে দেখালেন। পরিশেষে অস্ট্রেলিয়ার আরেক রাজ্যের রাজধানী পার্থের উদ্দেশে রওনা হলাম। ৫ ঘণ্টার বিমানপথ। ৭ ঘণ্টা ঘুমিয়ে ঘোষণা শুনে জেগে উঠলাম। বিরূপ আবহাওয়ার জন্য পার্থে নামা সম্ভব হয়নি বলে মেলবোর্নে অবতরণ করতে হয়েছে। যা হোক, পরিশেষে আরেকটি বিমানযোগে পার্থ পৌঁছানো সম্ভব হল।
বিমানবন্দরের বাইরে এসে ব্যাগটি নামিয়ে দু’একটি ছবি তুলছি। এরই মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী এসে আমার ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাগটি যে আমারই তা বুঝতে পেরে তার সুপারভাইজারকে ওয়াকিটকি ব্যবহার করে আসতে বলল। কোনো মালামাল অরক্ষিত রাখা যাবে না। যা হোক, সুপারভাইজার এসে আমাকে গোবেচারা ভেবে ব্যাগটি দিয়ে দিল। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক ড. ফেরদৌস সোহেলের আতিথেয়তায় আমাদের স্নাতক ও অন্যান্য বাংলাদেশীর প্রশংসনীয় আন্তরিকতায় সিক্ত হয়ে আরেকখানি সেমিনারে বক্তব্য রেখে দেশের পথে পা বাড়ালাম।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

Wednesday, November 7, 2012

স্বেচ্ছাশ্রম- বৃত্তাকার পথ-নৌপথ উন্নয়নের কল্পকাহিনি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিখ্যাত সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর অতি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী অকার্যকর রাজনীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। এমন খবরের পর আমাদের নেতা-নেত্রীরা নিশ্চয়ই আনন্দে আটখানা হবেন, গর্বে তাঁদের পা দুটি মাটিতে পড়বে না।

Wednesday, August 8, 2012

উচ্চশিক্ষা- রেকর্ডসংখ্যক জিপিএ-৫ ও ভর্তির চ্যালেঞ্জ by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

আরেকটি এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল হয়ে গেল। প্রায় নয় লাখ ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, পাস করে প্রায় সাত লাখ ২২ হাজার। পাসের হার ৭৮.৬৭। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১ হাজার ১৬২ জন শিক্ষার্থী, গত বছর পেয়েছিল ৩৯ হাজার ৭৬৯ জন। জিপিএ-৫-এর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

Tuesday, June 19, 2012

সমাজ-বিত্তবানের ভোগসংকোচন আর ঋণগ্রস্তের ভোগবিলাস by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

আমার এক বন্ধুবর চলমান ক্ষুদ্র-বৃহৎ নানা ঘটনার মাধ্যমে আমাদের ও সমাজের বৈষম্য আর অসুস্থ উন্নয়ন প্রতিকূল সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে আমার সঙ্গে দূরালাপনিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে মাঝেমধ্যেই হূদয়গ্রাহী আলাপ করেন। একসময় লিখতেনও ভালো।

Monday, June 18, 2012

দেশ-বিদেশ-ঘুরে এলাম ইবনে বতুতার দেশ মরক্কো by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের প্রোগ্রামিং-নৈপুণ্যের ওপর ভর করে বিদেশে আর কম বেড়ানো হলো না। এমনকি ৯/১১-পরবর্তী বছরগুলোতেও আমেরিকা ভ্রমণ হয়েছে বহুবার। তারপর ইউরোপের নানা দেশ, জাপান, চীন—প্রতিবছরই একবার করে, গত ১৫ বছর।

Thursday, June 14, 2012

উন্নয়ন-দিনবদল বনাম দিনের ধারাবাহিকতা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিগত জাতীয় নির্বাচনে দিনবদলের অঙ্গীকার করে আশাতীত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে যে ভাগ্যবিতাড়িত জাতির ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠী, সামরিক শাসন এবং অতীব দুর্বল, রুগ্ণ গণতন্ত্রের সংস্কৃতি যাকে বিশ্বসভায়

Sunday, June 10, 2012

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় বুয়েট by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রয়োদশতম অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; বিশেষ করে, যখন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ। এই প্রতিযোগিতা দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

Saturday, June 2, 2012

ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়-এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, যা হবে উন্নয়নের সহযোগী by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

পৃথিবীর স্থলভাগের মাত্র এক সহস্রাংশ বাংলাদেশে হলেও তার জনসংখ্যার ২৪ সহস্রাংশ ধারণ করে আছে আমাদের দেশটি। প্রাকৃতিক সম্পদেরও দারুণ কোনো ছড়াছড়ি নেই। যাও বা আছে, দক্ষতার অভাবে মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় তা বিদেশিদের কারিগরি অদক্ষতায় কিংবা গাফিলতিতে অনিষ্ট হচ্ছে, যার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবির ক্ষমতাও আমাদের নেই।

Thursday, May 31, 2012

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫ বাংলাদেশি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বাংলাদেশের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্ররা ১৫ বছর ধরে প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মতো মর্যাদাকর প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ১৯৯৮ সালে ২২তম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা শহরের প্রায় ৫০তলা হোটেল ম্যারিয়ট মার্কিসে অনুষ্ঠিত ৫৪ দলের সেই প্রতিযোগিতায় সুমন, সৈকত, সুষমের দল তিনটি সমস্যার সমাধান করে ২৪তম স্থান দখল করেছিল।

Monday, May 28, 2012

বিশ্বকাপ ফুটবল-উত্তেজনা ও উন্মাদনা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের দেশে যে উত্তেজনা, প্রতিটি খেলা দেখার জন্য যে মহা-আয়োজন, এমনটি আর মনে হয় না অন্য কোনো দেশে হয়। ইংলিশ লিগ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে লাঠালাঠি, মারামারি, গোলাগুলির ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। এমনকি এই কর্মকাণ্ডগুলো বিদেশের মাটিতেও তারা করে থাকে।

Sunday, May 20, 2012

ডিজিটাল বাংলাদেশ-প্রকৃত দিনবদলের সংস্কৃতি চাই by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

বর্তমান সরকারের দিনবদল আর ডিজিটাল বাংলাদেশের ইশতেহার যুগ যুগ ধরে সুবিধাবঞ্চিত এবং আশ্বাসে প্রতারিত মানুষকেও নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে, বিপুল ভোটে ক্ষমতাসীন করেছে বর্তমান সরকারকে। বর্তমান সরকার এক বছরের অধিক ক্ষমতায়। আশ্বাস আর অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

Sunday, May 6, 2012

মেধা-বিকাশ-এবার বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

এই প্রথমবারের মতো সারা দেশে স্কুলের ছাত্রদের জন্য বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজন করল বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি। পৃথিবীর এক সহস্রাংশ ভূখণ্ড বাংলাদেশ ঠাঁই দিচ্ছে বিশ্বের দুই দশমিক চার শতাংশ অধিবাসীকে। একমাত্র অতিরিক্ত সম্পদ বলতে জনসংখ্যা, যা উন্নয়নের অভাবে জনসম্পদে রূপান্তরিত হয়ে দেশের অগ্রগতির চাকায় ত্বরণ জোগাড় করতে পারছে না।

Thursday, April 26, 2012

সমাপনী পরীক্ষা-মানোন্নয়নে যা করা দরকার by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

এই দ্বিতীয়বারের মতো খুদে ছাত্রছাত্রীরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে পারছে। আর করবেই বা না কেন, প্রায় ৪৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী সর্বোচ্চ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে পাবলিক পরীক্ষায় শতকরা ১০ ভাগ পরীক্ষার্থী প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হতো কি না সন্দেহ। অবশ্য আগে প্রাথমিক কিংবা জুনিয়র শ্রেণীর জন্য পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না।