Wednesday, May 14, 2025

নেতানিয়াহু গাজায় সেনাদের যুদ্ধাপরাধে পাঠাচ্ছেন, দাবি সাবেক সেনাপ্রধানের

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান মোশে ইয়ালোন।

তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সেনাপ্রধান এয়াল জামিরের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইয়ালোন দাবি করেছেন, বর্তমান ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ‘তার সেনাদের গাজায় যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন’, আর সরকার ‘ইহুদি নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত’ হয়ে গেছে।

গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়ানেটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোশে ইয়ালোন বলেন, ইসরায়েলি সরকার এখন তার সেনাদের এমন নির্দেশ দিচ্ছে যা আন্তর্জাতিক আইনের সস্পূর্ণ লঙ্ঘন।

তিনি এই মন্তব্যে গাজার পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং বলেন, ইসরায়েল এখন হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নাম করে বর্বরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথে হাঁটছে।

মোশে ইয়ালোন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেন, আপনি সেনাদের যুদ্ধাপরাধ করতে পাঠাচ্ছেন। তিনি ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানে সেনাদের কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে দায়ী করেছেন। ইয়ালোনের মতে, ইসরায়েল গাজার জনগণের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ অভিযান চালাচ্ছে, যা কোনোভাবেই বৈধ নয়।

ইয়ালোন আরও বলেন, গাজার যেসব ঘটনা ঘটছে, তা শুধু যুদ্ধ নয়, এটি একটি পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘন। ইসরায়েলের সরকার আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি কাজ করছে এবং এটি একটি শঙ্কার বিষয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এই ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে, তবে এটি শুধু ইসরায়েলের অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করবে না, বরং তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

মোশে ইয়ালোন দেশটির বর্তমান সেনাপ্রধান এয়াল জামিরকে অভিযুক্ত করেন এবং তাকে নিয়ে বলেন, তিনি সেনাপ্রধান হিসেবে ‘স্পষ্টভাবে কোনো অবৈধ আদেশ’ প্রতিহত করছেন না। বরং, বর্তমান সেনাপ্রধান তার অধীনে ‘সেনাদের যুদ্ধাপরাধ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।’

ইয়ালোন বলেন, যুদ্ধের সময় একজন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব হচ্ছে, সৈন্যদের অবৈধ আদেশ থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এই সেনাপ্রধান তা করছেন না।

এছাড়া, তিনি মন্তব্য করেন, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জন্য বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের নীতি ও তাদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত দায়ী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এটা একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিস্থিতি যেখানে সেনাদের এমন কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা শুধু ইসরায়েলকে নয়, গোটা বিশ্বকেই বিপদগ্রস্ত করতে পারে।

ইয়ালোন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গাভিরের গাজা পুরোপুরি দখল এবং ফিলিস্তিনি জনগণকে সেখান থেকে সরিয়ে ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি তাদের এই পরিকল্পনাকে ‘জাতিগত নিধন’, ‘স্থানান্তর’ এবং ‘নির্বাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশনের বিরোধী।

ইয়ালোন বলেন, এই ধরনের পরিকল্পনা যুদ্ধাপরাধের শামিল। ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ করে ইহুদি বসতি স্থাপন করা কেবলই অপরাধমূলক কাজ হবে। এটি কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয়।

তিনি আরও বলেন, স্মোট্রিচ ও বেন গাভির গাজায় সামরিক শাসন ও ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন, যা তার মতে কেবল ‘অত্যাচার’ এবং ‘অবৈধ’।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন ইয়ালোন, যেখানে তিনি বলেন, এই যুদ্ধটি ১৯ মাস ধরে চলছে, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহু এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার দায়ী, তিনি কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

তিনি আরও বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলা ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতানিয়াহুরই দায় ; যদিও তিনি এখনো নিজের দায় স্বীকার করেননি।

ইয়ালোন বলেন, যুদ্ধটি যখন একে একে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রী কেন এখনো নিজের দায়িত্ব স্বীকার করছেন না? যুদ্ধের দায় কার? আপনি কি সত্যিই নির্ভার হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন, যখন আপনার সৈন্যরা যুদ্ধাপরাধ করছে?

ইয়ালোন ইসরায়েলি সরকারকে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, এ সরকার আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর পরিবর্তন সময়ের দাবি। তিনি ইসরায়েলের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি এই সরকারের কার্যকলাপ চলতে থাকে, তবে ইসরায়েল ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।

এখনো পর্যন্ত, মোশে ইয়ালোনের এই মন্তব্যগুলি ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিসরে এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাবেক সেনাপ্রধানের অভিযোগ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের অঙ্গীকার এবং মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞার সংকেত দিতে পারে।

সাক্ষাৎকারে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ইয়ালোনের মন্তব্যের পর, ইসরায়েলি সমাজের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান মোশে ইয়ালোন। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান মোশে ইয়ালোন। ছবি : সংগৃহীত


ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে কেন বিজেপি সমর্থকদের বুকে জ্বালা ধরেছে

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গত শুক্রবার নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে লিখেছে, ‘যাচনা ন্যাহি, আব রণ হোগ্যা’। এর আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়, ‘অনুরোধ নয়, এবার যুদ্ধ হবে’। এই পঙ্‌ক্তির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিমানবাহিনীর জাম্পস্যুট পরা একটি ছবিও যুক্ত করা হয়েছে।

উল্লিখিত পঙ্‌ক্তিটি বিখ্যাত হিন্দি কবি রামধারী সিং দিনকরের একটি কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি যখন পোস্ট করা হয়, তখন উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে মনে হচ্ছিল, ভারত-পাকিস্তান একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

বিজেপির ওই পোস্টের ২৪ ঘণ্টার একটু বেশি সময় পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির অন্যান্য কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। ফলে সংঘাত হঠাৎ থেমে যায়।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর দুই দেশের বেশির ভাগ মানুষ, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু উগ্রবাদী হিন্দুরা যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় খুশি হতে পারেননি। এই ঘোষণায় তাঁরা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

হিন্দুত্ববাদী কর্মী, সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, এমনকি বিজেপি নেতারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, শক্তিমত্তার দিকে এগিয়ে থেকেও যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ভারত আত্মসমর্পণ করেছে।

বিজেপির সমর্থক শেফালি বৈদ্য এক্সে লেখেন, ‘স্পষ্টতই এগিয়ে থাকার পরও যখন আপনি সরে দাঁড়ান, তা কিছুটা হতাশাজনক মনে হয়।’ তবে দেশের নেতারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটার ওপর নিজের ভরসা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

যুদ্ধবিরতির কারণে বিজেপির অন্য সমর্থকেরা আরও কঠোরভাবে মোদি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চেয়েছেন। বিজেপির ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শক্তি সিং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ট্যাগ করে এক্সে লিখেছেন, পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যা করেছিল, দাউদ ইব্রাহিম ও হাফিজ সাঈদের বিরুদ্ধে ভারত সেই ধরনের কিছু করতে পারেনি। তাঁর মতে, ‘যতক্ষণ পর্যস্ত এসব জঙ্গি জীবিত আছে, ততক্ষণ যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থ হয় না।’

গুয়াহাটিভিত্তিক ব্যবসায়ী ও বিজেপির সদস্য মুন তালুকদার বলেন, ‘হঠাৎ যুদ্ধবিরতি ভারতের ভূখণ্ডে জঙ্গি পাঠানো থেকে পাকিস্তানকে থামাতে পারবে না।’ মুন একসময় অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা ছিলেন।

৩০ বছর বয়সী মুন বলেন, ‘ভারতের উচিত ছিল পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর দখল করে নেওয়া। যতক্ষণ না আমরা সেই কাশ্মীর দখল করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চলতেই থাকবে। যদি যুদ্ধবিরতি না হতো এবং পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর দখল করা যেত, তাহলে ভারত প্রমাণ করতে পারত যে আমরা দুর্বল দেশ নই। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমরাও বিশ্বশক্তিগুলোর সমতুল্য।’

আমেরিকার ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’

যুদ্ধবিরতির পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণাই দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বিষয়টি বিজেপির সমর্থকদের প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে।

সাংবাদিক থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া স্বপন দাশগুপ্ত এক্সে লিখেছেন, ‘এই যুদ্ধবিরতি/ “সমঝোতা” ভারতে ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কারণ…ট্রাম্প হঠাৎ করেই এই ঘোষণা দিয়েছেন। মনে হলো যেন, তিনি ধুম করে কোনো জায়গা থেকে আবির্ভূত হয়ে নিজের রায় জানিয়ে দিলেন।’ স্বপন বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী সদস্য।

যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা স্বীকার করেনি ভারত।

তা সত্ত্বেও ট্রাম্প আরেক ধাপ এগিয়ে গেছেন। গত রোববার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘আমার পরবর্তী কাজ হলো ভারত ও পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাশ্মীর বিষয়ে একটি “সমাধান” বের করার চেষ্টা করা।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্য অনেক ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছে। তাঁরা মনে করে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপ ক্রমে বাড়াচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।

রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্কের প্রধান সম্পাদক অর্ণব গোস্বামী ট্রাম্পের ‘অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ’ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। রাগান্বিত কণ্ঠে এক প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘তাঁর (ট্রাম্পের) মাঠের বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এখানে কী ঘটছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।’

অর্ণব গোস্বামী আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা (কাশ্মীর বিষয়) তাঁর আয়ত্তের বাইরে। এটা ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ। আমি এটা মানি না। আমরা এটা মিটমাট করব।’

মোদি সরকার আগের আগ্রাসী অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে যাঁরা মনে করছেন, তাঁদের অনেকে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির ওপরও ক্ষোভ ঝাড়তে ভুল করেননি না। তিনি ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে আসছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা মিশ্রির পুরোনো পারিবারিক ছবি এবং তাঁর মেয়ের পেশাগত জীবনের বিবরণ ছড়িয়ে দেন। তাঁর মেয়ের সম্ভাব্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিদ্রূপ (ট্রলিং) ও কটাক্ষ শুরু করেন। এসব আচরণ একটা সময় খুব ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে মিশ্রি তাঁর এক্স প্রোফাইলের গোপনীয়তা সেটিংস পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।

‘পাকিস্তানকে বিশ্বমানচিত্র থেকে মুছে দাও’

একটি বিশেষ ধরনের প্রত্যাশার পরাজয়ই ছিল হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের ক্ষোভের মূল কারণ। তাঁরা মনে করতেন, নরেন্দ্র মোদির ‘বলিষ্ঠ’ সরকার ‘পাকিস্তান সমস্যার’ একটি ‘চূড়ান্ত সমাধান’ এনে দিতে সক্ষম।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ ছাত্রসংগঠন পশ্চিমবঙ্গ ছাত্রসমাজের আহ্বায়ক সায়ন লাহিড়ী গত শনিবার স্ক্রল ডট ইনকে বলেন, ‘আমি একেবারেই অসন্তুষ্ট। কারণ, সাধারণ হিন্দুসমাজ একটা সহজ জিনিস চেয়েছিল, তারা জিহাদবাদ নির্মূলের জন্য একটি চূড়ান্ত সমাধান প্রত্যাশা করেছিল।’

পশ্চিমবঙ্গ ছাত্রসমাজ গত আগস্টে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে এক জুনিয়র চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সচিবালয়ের দিকে একটি সহিংস প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিল। বিজেপি ও আরএসএস তাদের সহযোগিতা করেছিল।

৩১ বছর বয়সী সায়ন লাহিড়ী বিজেপির বিরুদ্ধে ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে মাথা নোয়ানোর’ অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানকে বিশ্বমানচিত্র থেকে মুছে ফেলাই ছিল দেশপ্রেমী সনাতনী হিন্দুদের দাবি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখনো পেহেলগাম হত্যাযজ্ঞের দায়ীদের খুঁজে বের করতে পারিনি।’

গুয়াহাটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের এক সদস্য স্ক্রল ডট ইনকে বলেন, মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মীই হতাশ। তাঁর মতে, ‘আমরা আমাদের পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে শক্তি দেখাতে পারতাম।’

আরএসএসের এই কর্মী বলেন, ‘ইয়েহ দিল মাঙ্গে মোর।’ মানে, এই হৃদয় আরও চায়।

বিজেপি সমর্থকদের হতাশার প্রতীকী দৃশ্য
বিজেপি সমর্থকদের হতাশার প্রতীকী দৃশ্য। ছবি: এএফপি

ভারত–পাকিস্তান সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা

ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় শহর শ্রীনগরের ঝিলাম নদীর তীরবর্তী একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ফতেহ কদলে। ৬২ বছর বয়সী নারী হাজিরা সেখানকার বাসিন্দা। গত শনিবার একটি সরকারি চালের দোকানের সিমেন্টের মেঝেতে তাঁকে বসে থাকতে দেখা গেল। তিনি তাঁর কাঁধে বাদামি রঙের একটি সুতির স্কার্ফ জড়িয়ে নিচ্ছিলেন। হাজিরার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ, তাঁর ঠোঁটের ওপরের অংশে ঘাম জমে ছিল। হঠাৎই তিনি দোকানের কর্মীকে বলে ওঠেন ‘আপনি কি একটু তাড়াতাড়ি করতে পারেন?’

হাজিরা প্রতি মাসে নিজের বায়োমেট্রিক তথ্য জমা দিতে এখানে আসেন। সরকারি বরাদ্দের শস্য পেতে হলে এ তথ্য দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। তাঁর চার সদস্যের পরিবার এ খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভরশীল।

তবে এবারের পরিস্থিতি ছিল একেবারেই আলাদা। কারণ, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের জন্য আগের কয়েকটি দিন ছিল নজিরবিহীন। আকাশে ড্রোন ওড়াউড়ি করছিল, বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, সীমান্তে গোলাগুলিতে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছিলেন এবং সম্ভাব্য পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের জন্য পুরো এলাকা যেন প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

হাঁটুর ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠা হাজিরা দোকানকর্মীকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তিনি আমাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন; কিন্তু চারপাশে অনিশ্চয়তা। আমি শুধু আমার চালের ভাগটা নিতে চাই, যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারি। যুদ্ধ আসন্ন।’

তবে ওই দিন সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় সফল হয়েছেন। আর সে ঘোষণাটি শোনার পর স্বস্তিতে শ্বাস নেন হাজিরা।

লাজুক হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।’ সম্ভবত তিনি বুঝেছেন, যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর হতো না।

গত রোববার সকালে ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করবেন। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই আংশিকভাবে অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তারা এককভাবে এর সম্পূর্ণ মালিকানা দাবি করে আসছে।

দক্ষিণ কাশ্মীরের জম্মু শহরভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাফর চৌধুরী আল–জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে নয়াদিল্লি খুশি হতে পারবে না। কারণ, ভারত দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনার মূল কারণ হলো পাকিস্তান-সমর্থিত ‘সন্ত্রাসবাদ’।

তবে জাফর চৌধুরীর মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাব এটাই প্রমাণ করে যে কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে গেছে।

ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় কাশ্মীরিরা ক্ষীণ আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। তবে কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তাঁরা। শান্তির জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে তাঁদের মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

‘এতটা ভয় আগে কখনো লাগেনি’

গত কয়েক দিনে কাশ্মীরের হাজারো মানুষ ভারত ও পাকিস্তানের গোলাগুলিতে আতঙ্কে ছিলেন। প্রতিবেশী দুই দেশ যখন একে অপরের দিকে ড্রোন পাঠাচ্ছিল, ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছিল, তখন নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি বসবাসরত কাশ্মীরি জনগণ দুই দেশের পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন। এমন মাত্রায় গোলাগুলির ঘটনা তাঁরা দেখেছেন, যা কয়েক দশকে সেখানে দেখা যায়নি। গোলাগুলিকে কেন্দ্র করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বহু মানুষ নিজ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।

১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে চার দশক ধরে সংঘাত যেন কাশ্মীরের জনগণের জীবনের সঙ্গে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে। এরপর ২০১৯ সালে কাশ্মীরের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে দেয় নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার। সে সময় ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে হাজারো মানুষকে কারাবন্দী করা হয়।

গত ২২ এপ্রিল পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এরপর ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। পাশাপাশি কাশ্মীরে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ধরপাকড় আরও জোরদার করে ভারত সরকার।

পেহেলগাম হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিদ্রোহীদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারত সরকার। পাশাপাশি পুরো কাশ্মীরে বিভিন্ন বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। এসব অভিযানে ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ৯০ জনকে জননিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বহু সাংবাদিককে তলব করেছে পুলিশ এবং অন্তত একজনকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শ প্রচারের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত রোববার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পুরো অঞ্চলে স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করলেও ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতা আদৌ স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে অনেকে চিন্তিত ও সন্দিহান ছিলেন।

দুই দেশ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কাশ্মীরের প্রধান শহরগুলোতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পাকিস্তান থেকে উড়ে আসা ড্রোনের ঝাঁক কাশ্মীরের আকাশসীমা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করার পর এমন শব্দ শোনা যায়।

ভারতের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন ভূপাতিত করার ভিডিও ধারণ করতে বেশ কিছু বাসিন্দা তাঁদের অ্যাপার্টমেন্ট ও বাড়ির ছাদে ছুটে যান। রাতের আকাশে ড্রোনগুলোকে উজ্জ্বল অনেকগুলো লাল বিন্দু দিয়ে তৈরি একটি রেখার মতো দেখা যাচ্ছিল। পরে মাঝ আকাশে এগুলো বিস্ফোরিত হয়।

জরুরি অবস্থার অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ নিজেদের গায়ের ওপর পড়ার আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান। রাতের আকাশে ড্রোনের উপস্থিতি দেখে সাইরেন বাজতে শুরু করলে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়।

শ্রীনগরে বসবাসরত ২৪ বছর বয়সী স্নাতক হাসনাইন শাবির বলেন, ‘আমার মনে হয় না, আমি আগে কখনো এতটা ভীত হয়েছি। রাস্তাগুলো যেন একেবারে নির্জীব হয়ে গেছে। যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থা যদি এমন হয়, আমি জানি না যুদ্ধটা কেমন হবে।’

একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি

গত শনিবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে ভারত। তারা অভিযোগ করে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোলাবর্ষণ করেছে পাকিস্তান। আবারও আকাশে ড্রোন দেখা গেলে কাশ্মীরের প্রধান শহরগুলোর বাসিন্দারা সতর্ক হয়ে ওঠেন।

এবার সংঘাতে কাশ্মীরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর একটি হলো উরি। এ এলাকাটি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। এটি একটি মনোরম শহর, যেখানে নাশপাতি এবং আখরোটের বাগান রয়েছে।

গ্রামটি ঐশ্বর্যপূর্ণ পাহাড় দিয়ে ঘেরা, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ঝিলাম নদী। এটা ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শেষ সীমান্ত, যেখানে পাহাড়গুলো পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়।

উরির কিছু অংশে তীব্র গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হন। আল–জাজিরাকে এক কর্মকর্তা বলেন, গত ৮ মে নার্গিস বশির নামের এক নারী তাঁর পরিবারসহ সীমান্ত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় উড়ন্ত ধারালো একটি বিস্ফোরক খণ্ড তাঁর গাড়িতে এসে পড়ে। এতে তিনি নিহত হন এবং তাঁর পরিবারের তিন সদস্য আহত হন।

৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মুহাম্মদ নাসির খানের বাড়ির কাছাকাছি একটি সামরিক পোস্টে পাকিস্তানি দূরপাল্লার গোলা এসে আঘাত হানে। এতে বিস্ফোরকের ধাতব খণ্ড তাঁর বাড়ির দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তিনি তখন ঘরের ভেতরেই ছিলেন। নাসির বলেন, ‘বিস্ফোরণে আমার বাড়ির এক পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি জানি না, এই জায়গায় আদৌ বসবাস করা যাবে কি না।’ এ সময় তাঁর উজ্জ্বল নীল চোখে ভয় ফুটে উঠছিল।

যুদ্ধবিরতির পরও বিরোধপূর্ণ সীমান্ত থেকে দূরে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া তাঁর দুই মেয়েসহ পরিবারের অনেকেই বাড়িতে ফিরে আসতে চাইছেন না। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানেরা ফিরতে চাইছে না। এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই যে আবার গোলাগুলি শুরু হবে না।’

উরির ২৮ বছর বয়সী বাসিন্দা সুলেমান শেখ তাঁর শৈশবের কথা স্মরণ করেন। তখন তাঁর দাদা পাশের মোহরা গ্রামের একটি সেনাছাউনিতে মোতায়েন থাকা ‘বোফোর্স’ কামান নিয়ে গল্প করতেন।

সুলেমান বলেন, ‘দাদা আমাদের বলেছিলেন, এই কামান শেষবার গর্জেছিল ১৯৯৯ সালে। সেবার ভারত ও পাকিস্তান কারগিলের বরফে আচ্ছাদিত পর্বতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। এখানকার প্রচলিত বিশ্বাসমতে, এই বন্দুক যদি আবার গর্জে ওঠে তাহলে পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়ে পড়বে।’

আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল ৮ মে রাত ২টায়। মোহরার সামরিক ঘাঁটিতে বসানো বোফোর্স কামান পাকিস্তানের দিকে গোলাবর্ষণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তখন সুলেমান অনুভব করেন, তাঁর পায়ের নিচের মাটি যেন কেঁপে উঠছে। দেড় ঘণ্টা পর, ওপার থেকে ছোড়া একটি গোলা কাছাকাছি এক ভারতীয় আধা সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানে। একটানা শাঁ শাঁ শব্দ করে এসে তা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।

সুলেমান আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পরই আরেকটি গোলা তাঁর বাড়িতে পড়েছে। পরে আল–জাজিরাকে সুলেমানের দেওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁর বাড়ির কক্ষ ও বারান্দা ধসে পড়েছে।

সুলেমান বলেন, পরিবারের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তাঁদের সঙ্গে বাড়ি ছাড়তে রাজি হননি। গবাদিপশুগুলোকে দেখাশোনা করার জন্য থেকে গেছেন।

কাশ্মীর উপত্যকার অন্য অঞ্চলের তুলনায় উরি অনেকটাই দরিদ্র। এখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে খণ্ডকালীন কাজ করেন। কেউ কেউ আবার আখরোট ও নাশপাতি চাষ করেন। গবাদিপশু পালনও এই শহরের অনেক মানুষের জন্য একটি জনপ্রিয় জীবিকা হয়ে উঠেছে।

সুলেমান বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, সেটা কতটা ভয়াবহ। যুদ্ধবিরতি হয়েছে, এটা অবশ্যই ভালো; কিন্তু এটা টিকবে কি না, আমি নিশ্চিত না। আমি প্রার্থনা করি, টিকে যাক।’

‘এমন অবস্থা কত দিন চলবে’

শ্রীনগরের বাসিন্দারা ধীরে ধীরে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দে ফিরছেন। স্কুল–কলেজ বন্ধ রয়েছে এবং মানুষ অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলছেন।

আকাশে ড্রোনের ঝাঁক আর তার সঙ্গে বিস্ফোরণের দৃশ্য মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। শ্রীনগরের সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মুসকান ওয়ানি গত রোববার বলেন, ‘শুধু সন্ধ্যায় আমরা জানতে পারব, এই যুদ্ধবিরতি টিকেছে কি না।’

রাত পেরোনোর পর এটি ঠিকই কার্যকর হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো অস্থিরতা থেকে গেছে।

এ যুদ্ধবিরতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কাশ্মীরের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে দায়ী করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য একটি ‘সমাধান’–এর কথা বলেছেন।

কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নূর আহমদ বলেন, কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে আসল সমস্যার শুরু।

অধ্যাপক নূর বলেন, ‘গত কয়েক বছরে কাশ্মীরিদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তাতে তারা অপমানিত বোধ করে। তাদের আস্থা ফেরানোর জন্য কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। যেখানে অপমান আছে, সেখানে সন্দেহ থাকাটা স্বাভাবিক।’

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অন্য নাগরিকেরাও দুই দেশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, এই দুই রাষ্ট্র তাঁদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।

শ্রীনগরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ফুরকান বলেন, ‘আমরা কাশ্মীরিরা কী ভাবছি, সেটা আদৌ কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যুদ্ধ করল, সীমান্তে প্রাণহানি ও ধ্বংস ডেকে আনল, নিজ নিজ দেশের জনগণকে একরকম প্রদর্শনী উপহার দিল, তাদের লক্ষ্য পূরণ হলো আর তারপর তারা যুদ্ধ থামিয়ে দিল। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো কে? আমরাই। সারা দুনিয়ার কাছে আমরা কেবলই আনুষঙ্গিক ক্ষতি।’

ফুরকান বলেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ১০ মে সন্ধ্যায় যখন আবার গোলাবর্ষণ শুরু হয়, তখন তার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত ছিলেন, এ যুদ্ধবিরতি টিকবে না।

‘আমরা তখনই বলছিলাম, এটা কিছুতেই স্থায়ী হবে না। আর তারপরই আবার বিস্ফোরণের শব্দ পেলাম’—বলেন ফুরকান।

শ্রীনগরের বাসিন্দা ও পাঞ্জাবে অধ্যয়নরত ২৬ বছর বয়সী মুনীব মেহরাজও ফুরকানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

মুনীব বলেন, ‘অন্যদের কাছে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে; কিন্তু আবারও মূল্যটা কাশ্মীরিদেরই দিতে হয়েছে—প্রাণ গেছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, শান্তি নষ্ট হয়েছে। এই চক্র আর কত দিন চলবে?’

এসব দেখতে দেখতে মেহরাজরা এখন ক্লান্ত। তিনি বলেন, ‘কোনো অস্থায়ী বিরতি নয়, আমরা চাই স্থায়ী, টেকসই একটি সমাধান।’

সীমান্তে গোলাবর্ষণের পর একটি পরিবার জম্মুর উপকণ্ঠে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছায়। ৮ মে, ২০২৫
সীমান্তে গোলাবর্ষণের পর একটি পরিবার জম্মুর উপকণ্ঠে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছায়। ৮ মে, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

শক্তি দেখাতে গিয়ে ভারতের দুর্বলতা বেরিয়ে এল কি? by ইউসুফ নজর

১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ‘পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক’ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে সংঘাতের তীব্রতা বাড়বে। এরপর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ স্যুজি ওয়াইলস জরুরি ভিত্তিতে মধ্যস্থতায় এগিয়ে যান।

ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং ভারত-পাকিস্তানের সরাসরি আলোচনার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।

এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিশ্বাস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের মধ্য পারমাণবিক যুদ্ধ হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ মারা যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অঞ্চলজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে, যুক্তরাষ্ট্র তার কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে।

ট্রাম্পের ঘোষণা ভারতে কারও কারও দিক থেকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ভেদ প্রকাশ মালিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘১০ মে ২০২৫-এর যুদ্ধবিরতি: ভারতের ভবিষ্যৎ ইতিহাস একদিন সেই প্রশ্ন তুলবে, আমাদের সামরিক ও বেসামরিক পদক্ষেপের পর কোন রাজনৈতিক কৌশলগত সুবিধা অর্জিত হয়েছিল।’

এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, ‘বিদেশি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নয়, আমি আশা করেছিলাম, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেবেন। সিমলা চুক্তির (১৯৭২) পর থেকে আমরা সব সময় তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছি। তাহলে এবার কেন তা গ্রহণ করলাম? আমি আশা করি, কাশ্মীর ইস্যু আন্তর্জাতিক হয়ে উঠবে না। কারণ, এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’

ওয়াইসির পরের মন্তব্যটি সম্ভবত ট্রাম্পের একটি বিবৃতিকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার হাজার বছরের সংঘাতের সমাধানের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধবিরিতির ঘোষণাকে ভারতের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে মোদির পিছু হটার ঘটনা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাবকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের যে বিরোধিতা করে আসছিল, সেই অবস্থানকে খাটো করবে বলেও তাঁরা মনে করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাস্তবতা যতক্ষণ পর্যন্ত এসে কামড় না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্যানধারণা বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। অর্থনৈতিক বিকাশ ও পারমাণবিক শক্তির জোরে ভারতকে দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু ২২ এপ্রিল পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর দেশটি যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বরং তার দুর্বলতাই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ভারত শক্তি প্রদর্শন করতে চাইলেই সেটি লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়, পাকিস্তানের আঞ্চলিক অবস্থান জোরালো হয়। কূটনৈতিকভাবে মোদি সরকারকে দুর্বল অবস্থানে ফেলে দেয়।

৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল টিআরএফের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়। ভারতের অভিযোগ হলো এই গোষ্ঠীগুলোকে পাকিস্তান পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।

এই অভিযানে ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দেশের ভেতরে যে চরম ক্ষোভের আবহ, সেটিকে ব্যবহার করে মোদি নিজের শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তিটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু এই অভিযানের সফলতার বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ভারত দাবি করেছে, কেবল সন্ত্রাসীদের অবস্থানেই আক্রমণ করা হয়েছে।

পাকিস্তান নিজেদের যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে হামলা প্রতিহত করে। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে তিনটি রাফাল বিমানও রয়েছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান অন্তত দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এতে  চীন গোয়েন্দা ও নজরদারি সমর্থন দেয়। ভারত যদিও এখন পর্যন্ত স্বীকার করেনি তাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না।

ভারতের সংবাদমাধ্যম প্রথমে করাচির সমুদ্রবন্দরসহ পাকিস্তানের শহরগুলোতে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালিয়েছে; কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়, এসব প্রতিবেদন পরিপূর্ণভাবে প্রোপাগান্ডা প্রচেষ্টার অংশ।

৯ মে পাকিস্তান দাবি করে, ভারত তাদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামাবাদের কাছে একটি ঘাঁটিও ছিল। এর পাল্টা জবাবে পাকিস্তান স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ভারতের উদমপুর, পাঠানকোট, আদমপুর ও ভুজ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে। ভারতীয় কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পাকিস্তানি ড্রোন ও গোলা বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

এবারের সংঘাতে আঞ্চলিক অধিপতি হিসেবে ভারতের ভাবমূর্তিতে চিড় ধরে। ভারত রাফাল যুদ্ধবিমানের ক্ষমতা নিয়ে অতি ভাবনা ভেবেছিল আর চীনের যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা বুঝতে ভুল করেছিল।

গত কয়েক বছরে পাকিস্তানের প্রতি চীনের সামরিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২০ সালের পর সামরিক খাতে পাকিস্তানের মোট আমদানির ৮১ শতাংশই এসেছে চীন থেকে।

বহু বছর ধরে কিছু ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা বলে আসছিলনে, চীনের সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ভারত যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। কেউ কেউ আবার চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতার জন্য ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করেন।

গত কয়েক দিনের ঘটনায় ভারতের কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকে খোলাসা করে দিয়েছে।

* ইউসুফ নজর পাকিস্তানের বিশ্লেষক ও লেখক

- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

রাফাল যুদ্ধবিমানের সামনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্যরা, বেঙ্গালুরু, ফেব্রুয়ারি ২০২৫
রাফাল যুদ্ধবিমানের সামনে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্যরা, বেঙ্গালুরু, ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: এএফপি

সৌদি আরবের সঙ্গে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির চুক্তি’ যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রায় ১৪২ বিলিয়ন (১৪ হাজার ২০০ কোটি) ডলারের অস্ত্র চুক্তি হয়েছে। আজ মঙ্গলবার রিয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সৌদি-মার্কিন বিনিয়োগ ফোরামে এসব চুক্তি হয়। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার এই চুক্তি ছাড়াও দেশটিতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের চুক্তি করেছে সৌদি আরব।

সৌদি-মার্কিন বিনিয়োগ ফোরামে এসব চুক্তি সইয়ের পর সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ দুই দেশ সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৃঢ় বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। আজ ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী মাসগুলোতে তা বেড়ে ১ ট্রিলিয়ন (এক হাজার বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে তিন দিনের সফরের প্রথম দিনে আজ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পৌঁছান ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তাঁকে স্বাগত জানান মোহাম্মদ বিন সালমান। এরপর দুজন প্রাথমিক বৈঠক করেন। পরে সৌদি-মার্কিন বিনিয়োগ ফোরামে দুই দেশের মধ্যে চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। হোয়াইট হাউস বলছে, এদিন সৌদি আরবের সঙ্গে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি’ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি চুক্তির আওতায় মোট পাঁচটি খাত রয়েছে। সেগুলো হলো বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও মহাকাশ সক্ষমতা, আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সমুদ্র ও উপকূলীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থলবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দেশটির সেনাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া সৌদি আরবের সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামরিক চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে কাজ করা হবে। অস্ত্র চুক্তি ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্যাস টারবাইন, উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর মোহাম্মদ বিন সালমানকে ‘অসাধারণ একজন মানুষ’ অভিহিত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, সৌদি আরব একটি ‘চমৎকার জায়গা’। এখানে ‘চমৎকার মানুষ’ বসবাস করেন।

সৌদি আরব সফর শেষে আগামীকাল বুধবার কাতার যাওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের। সেখান থেকে বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) যাবেন তিনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে এ সফরের সময় ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ইসরায়েল ভ্রমণের কোনো পরিকল্পনা নেই ট্রাম্পের। এমন সিদ্ধান্তের কারণে ট্রাম্পের অগ্রাধিকার তালিকায় ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসরায়েলে না গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ সফরের সময় বৃহস্পতিবার তুরস্কে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে দেশটির ইস্তাম্বুল শহরে অনুষ্ঠিত মস্কো ও কিয়েভের বৈঠকে অংশ নিতে পারেন তিনি। গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই এই যুদ্ধ থামাতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প নিয়েও আলোচনার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের। গত শনিবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। কূটনৈতিক এই আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি আগে থেকেই দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আজ মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আজ মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: এএফপি

‘ডক্টর লইয়া’ আবারও তেলেসমাতি! by মো. সিরাজুল ইসলাম

‘এইসব “ডক্টর” লইয়া আমরা কী করিব’ শিরোনামে ২০২৪ সালের ২৮ জুন প্রথম আলোয় একটি লেখা লিখেছিলাম তৎকালীন কুখ্যাত তিন ব্যক্তিত্বের—সেনাপ্রধান আজিজ, পুলিশপ্রধান বেনজীর আর ছাগল-কাণ্ডের মতিউর—তথাকথিত ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি নিয়ে।

সে লেখার একটি অংশ ‘দোর্দণ্ড প্রতাপ, ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় পদক ও অর্থবিত্তের বিপুল সম্ভারের পরও যেন তাঁদের বুকে একটা শূন্যতা রয়ে যায়। আর তা হচ্ছে একটা ডক্টরেট ডিগ্রি! নামের আগে ড. যোগ।

এত প্রাপ্তিযোগের পর এ খায়েশটি তাহলে কেন অপূর্ণ থাকবে? এটাও খেতে হবে। লুৎফর রহমান রিটনের সেই বিখ্যাত “খিদে” কবিতার মতো।’ সংগত কারণেই তাঁরা সবাই সাবেক স্বৈরাচারী শাসকের খুব কাছের লোক ছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পেল তাঁদের আরেক ঘনিষ্ঠজন তুরিন আফরোজের পিএইচডি তথা ডক্টরেট ডিগ্রি জালিয়াতি। পিএইচডি শেষই করেননি, তবু নামের আগে ড. লিখতেন বা নিজেকে ড. পরিচয় দিতেন।

এ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ খুঁজে পাওয়ার মতো। তুরিন আফরোজ তাঁর মাকে স্বীকার করেন না। আর সেই মামলায় আইনজীবী সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় তিনি মায়ের নাম কী লিখেছেন, তা খুঁজতে গিয়ে জানা গেল যে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি ভুয়া, অর্জনই করেননি।

দিনক্ষণসহ তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজর ই-মেইল করে জানান, তাঁর অধীন পিএইচডি শুরু করলেও তিনি শেষ করেননি, বাংলাদেশে ফিরে গেছেন।

তুরিনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ এখনো আসেনি বিধায় ধরে নিতে পারি, এটাই সত্য। তা ছাড়া সুপারভাইজারের ভুল হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও নিশ্চিত করেছে, এ নামে কাউকে তারা পিএইচডি দেয়নি।

মজার কথা হচ্ছে, স্বৈরাচারের দোসরদের এই পিএইচডি-প্রীতির আগে, স্বয়ং স্বৈরাচার, অর্থাৎ তাদের নেত্রী কি কম গিয়েছিলেন?

হাসিনার প্রথম মেয়াদকাল, অর্থাৎ ১৯৯৬-২০০১ সালে তিনি এক ডজনের মতো ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট’ ডিগ্রি নিয়েছিলেন তথা কিনেছিলেন।

তখন কূটনীতিপাড়ায় একটি কৌতুক প্রচারিত ছিল, বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর তখনকার অন্যতম দায়িত্বের মধ্যে একটা ছিল হাসিনার জন্য সেই দেশ থেকে একটি  ‘সম্মানসূচক ডক্টরেট’ ডিগ্রির ব্যবস্থা করা।

আর তা করতে পারলে সেই রাষ্ট্রদূতের উন্নতি শনৈঃশনৈঃ! ভারত থেকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ডিগ্রি নিয়েছিলেন তিনি।

একনায়ক কিংবা স্বৈরাচারদের এই পিএইচডি-প্রীতি কিন্তু নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে মুক্তি পায় বিশ্বখ্যাত হলিউড চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিক্টেটর’।

নায়ক অ্যাডমিরাল আলাদিন ওয়াদিয়া রাজ্যের তথাকথিত অবিসংবাদিত নেতা, কিন্তু আসলে একজন ‘ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক’। ছবির ভাষ্যমতে, রাজ্যজুড়ে তাঁর এতটাই কর্তৃত্ব যে একাধারে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, রাজ্যের প্রধান চিকিৎসক এবং সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড়। তিনি তাঁর রাজ্যে নিজেই একটি মিথ্যা অলিম্পিকের আয়োজন করে নিজেই ১৪টি সোনা জেতেন।

ছবিতে দেখা যায়, আগে দৌড় শুরু করাসহ প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়দের গুলি করে আহত করার মধ্য দিয়ে একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনি সোনা জেতা নিশ্চিত করছেন। সব রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠান তাঁর নামে—মূর্তি সর্বত্র।

এমনকি দেশের ভাষা পরিবর্তন করে প্রায় অধিকাংশ শব্দের আগে-পরে তিনি ‘আলাদিন’ যোগের নির্দেশ দেন। যেমন আপনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলতে চান বা ‘না’ বলতে চান, এ দুই ক্ষেত্রেই আপনাকে ‘আলাদিন’ বলতে হবে, তবে মুখের ভাব দুই ক্ষেত্রে দুই রকম হবে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি রাজ্যের সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও বটে, যিনি ১১৮টি পিএইচডি ডিগ্রি ও ৩০টি পোস্টডক্টরাল সম্পন্ন করেছেন। রাজ্যের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে তাঁকে ডিগ্রি দিয়ে থাকে।

সে তুলনায় হাসিনার পিএইচডির সংখ্যা কিছুটা কমই ছিল। তবে ২০০৮-২০২৪ মেয়াদে তাঁর নজর পিএইচডি নয়, বরং এর চেয়েও বড় কিছুতে পড়েছিল, আর তা হচ্ছে ‘নোবেল প্রাইজ’।

ওয়াদিয়া রাজ্যের আলাদিনও যে চেষ্টা করেননি, শেখ হাসিনাকে সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে শোনা যায়। ‘লবিস্ট’ থেকে আরম্ভ করে চামচা সাংবাদিক—সবাই এই অসিলায় তাঁর কাছ থেকে টাকা বাগিয়েছেন।

২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার দিন তিনি নাকি সারা দিন ফোনের কাছে বসে ছিলেন এই আশায় যে নোবেল প্রাপ্তির খবর দেওয়ার জন্য আসা ফোনকলটা না আবার মিস করেন।

তাঁর বদলে ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তিতে তিনি ব্যাপকভাবে আহত ও রাগান্বিত হয়েছিলেন, যে গোস্‌সা দিন দিন বাড়তেই থাকে। তবে ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’-এর মতো তাঁকে এ চেষ্টা দ্বিতীয়বারও করতে দেখা যায়।

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করে আবারও বুক বাঁধতে দেখা যায় একটি ‘নোবেল’-এর আশায়। সেই লক্ষ্যে ভাসানচরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বানিয়েছেন সুদৃশ্য স্থাপনা। কিন্তু আবারও বিফল! কারণ, নকল কিংবা ভুয়া ‘নোবেল’-এর প্রচলন এখনো শুরু হয়নি।

ফলে, ২০০৮-২০২৪ মেয়াদে নেত্রীর ‘নোবেল’-চেষ্টার বিপরীতে ছোট মাপে পিএইচডি ডিগ্রি প্রাপ্তির চেষ্টাটি তাঁর চামচা বা ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়—আজিজ, বেনজীর, তুরিন কিংবা মতিউর।

তবে স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে প্রায় সব সরকারের আমলেই আমাদের মতো দুর্নীতিপীড়িত দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের অপরিসীম লোভ-লালসার অংশ হিসেবে পিএইচডি-প্রীতি বরাবরই ছিল।

‘গাছেরটা খাওয়া আর তলারটাও কুড়নো’-র মতো শেষ জীবনে এসে তাঁদের আধ্যাত্মিকতা তথা জ্ঞানচর্চার ব্যাপক আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। শুধু তা-ই নয়, শেষ জীবনে নামীদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক হওয়ার জন্যও তাঁরা উঠেপড়ে লাগেন।

তাঁদের ডিগ্রি দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, ঠিক ওয়াদিয়া রাজ্যের মতো। নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আগের সরকারটি আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এর পরের পিএইচডি ডিগ্রিটি পেত পুলিশের বিখ্যাত সেই ‘হারুন’। ডিগ্রিটি দিতেন অধ্যাপক ‘মিজান’ কিংবা ‘ছলিমুল্লাহ’ (কল্পিত নাম)।

আফসোসের বিষয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের একজন জাঁদরেল সচিব নামের আগে ড. লেখেন, কিন্তু সবাই জানে যে তাঁর ডিগ্রিটি ভুয়া।

অথচ তাঁর হার্ভার্ড থেকে একটি মাস্টার্স ডিগ্রি আছে এবং এটাই তাঁর বিদ্যার দৌড় প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। ভুয়া পিএইচডিটি লিখে নিজেকে আরও ছোট করলেন।

এ ধরনের ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি নিয়ে আমার এক বন্ধু তাঁর একটি অভিজ্ঞতার গল্প করলেন এরূপ: ‘বনানীতে একবার “ইউনিভার্সিটি অব হনলুলু (ইউএসএ)” লেখা একটি বিলবোর্ড দেখলাম। কৌতূহলবশত আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম যে তারা খুব কম খরচে মাস্টার্স ও পিএইচডি অফার করছে! আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এটি জাল! এক বছর পর এটি অদৃশ্য হয়ে গেল!

‘কয়েক বছর পর আমি একটি বিখ্যাত এনজিওর এক নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে দেখা করি এবং তিনি যখন তাঁর ভিজিটিং কার্ডটি আমাকে দেন, তখন আমি দেখতে পাই যে তাঁর নামের আগে ডক্টর লেখা এবং সেই পিএইচডি ডিগ্রি করেছেন হনলুলু বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসএ) থেকে।’

উল্লেখ্য, হনলুলু নামে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আছে ‘হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়, হনলুলু, ইউএসএ’। শুধু অনলাইনে দৃশ্যমান, বাস্তবে অস্তিত্বহীন—এ ধরনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাবেন নেট দুনিয়ায়। শুধু পিএইচডি ডিগ্রি নয়, নেট দুনিয়ায় নকল জার্নাল, যা ‘প্রিডেটরি জার্নাল’ হিসেবে পরিচিত, এর সংখ্যা আসল জার্নালের চেয়ে বেশি।

আছে ভুয়া পাবলিশার, যেখানে আপনি যেকোনো লেখাই বই আকারে প্রকাশ করতে পারেন ইত্যাদি।      

এসব ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। তাঁরা মূলত সেই ব্রিটিশরাজের আমল থেকেই রাজা। জনগণকে ভাবেন প্রজা, যদিও জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তাঁদের বেতন হয়।

ফলে আলাদিনের মতো ‘খায়েশ’-এর তাঁদের কমতি নেই। একটি সরকারি মিটিংয়ে একবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে চার মাসব্যাপী পরিচালিত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন মূল্যায়ন করতে গিয়ে বারবার তাঁর পিএইচডি গবেষণার জের টানতে দেখলাম।

পরে শুনেছি, তিনিও ছয় মাসে পিএইচডিধারী সেই সরকারি কর্মকর্তাদেরই একজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের পিএইচডি নেওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, এখানে সবাই জানেন কোনটি ভুয়া আর কোনটি আসল বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে তাঁদের ক্ষেত্রে যা হয়—নিম্নমানের ডিগ্রি কিংবা নকল করা অভিসন্দর্ভ। ৯৮ শতাংশ নকল করা এক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ধরা পরেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এ ধরনের নিম্নমানের ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

ঢাকায় অবস্থিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিই। স্মরণাতীতকালের ইতিহাসে সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে নিয়োগ পেয়েছিলেন ভারত থেকে ডিগ্রি নেওয়া তিনজন।

বুয়েটের ইতিহাসে সম্ভবত হাতে গোনা দু-একজন ভারত থেকে ডিগ্রি নেওয়া বা বাংলাদেশি পিএইচডিধারী পাবেন। ৯৯ শতাংশই বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী।

অথচ হাসিনা আমলে সেখানে প্রথমবারের মতো উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন ভারত থেকে নেওয়া একজন পিএইচডিধারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দুজন ভারত থেকে নেওয়া ডিগ্রিধারী প্রায় পনেরো বছর ধরে উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন।

একজন মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আরেকজন আলীগড়ের পিএইচডি। অথচ অক্সফোর্ড-কেমব্রিজসহ বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডিধারীদের ছড়াছড়ি সেখানে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বহুদিন ছিলেন বাংলাদেশি পিএইচডিধারী বিখ্যাত এক টক শোবিদ, যিনি কিনা যুবলীগের প্রধান হওয়ার খায়েশও প্রকাশ করেছিলেন।

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডির মান নিয়ে বরাবরই ব্যাপক বিতর্ক আছে। আবার শুনেছি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

ভয় হয়, এর অপব্যবহার আরও বাড়বে কি না! প্রথম সারির দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যোগ্যতা আছে বলে মনে হয় না।

ভুয়া পিএইচডি নিয়ে এই তেলেসমাতি যুগ যুগ ধরে চলমান। আর সে জন্যই, বিখ্যাত সে গল্প—ঘোড়া আর গাধার পিএইচডি লোকের মুখে মুখে। ক্ষমতাধরদের এই ভুয়া পিএইচডি-প্রীতিকে নেহাতই একটি নিষ্পাপ ‘খায়েশ’ হিসেবে হেসে উড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

এটি উচ্চশিক্ষাকে প্রহসনে পরিণত করে, প্রকৃত পিএইচডিধারীরা বিব্রত হন এবং গবেষণার পরিবেশ নষ্ট হয়। সরকার চাইলে খুব সহজেই এই হাস্যকর প্রবণতা বন্ধ করতে পারে।

ইউজিসি বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে পিএইচডি গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের আগে কাউকে নামের সঙ্গে পিএইচডি টাইটেল যোগ করা যাবে না মর্মে একটি পরিপত্র জারি করলেই কিন্তু হয়ে যায়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিএইচডি ডিগ্রির মান নিয়ন্ত্রণেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ভালো মানের জার্নালে প্রকাশনা ছাড়া কাউকেই পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া উচিত নয়।

* ড. মো. সিরাজুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা
ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ে থাকেন সরকারি কর্মকর্তারা। প্রতীকী ছবি: এআই/প্রথম আলো

চীন কেন চায় না ইউক্রেন যুদ্ধ থামুক by থমাস গ্রাহাম ও ঝোংইউয়ান জো লিউ

অনেকেই ভেবেছিল রাশিয়ার ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয় দিবস’–এর কুচকাওয়াজে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যোগ দেওয়ায় হয়তো তিনি এবার পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলবেন। এতে অনেকের মনে আশা জেগেছিল, সম্ভবত চীন এবার শান্তির পক্ষে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে তিন বছর পার করেছে, তখনো চীনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি যে তারা সত্যি যুদ্ধ থামাতে চায় বা শান্তি আলোচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চায়।

এর বদলে চীন বরং রাশিয়াকে রাজনৈতিক (কূটনৈতিক), অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। চীন কখনোই এই যুদ্ধকে ‘আগ্রাসন’ বলে স্বীকার করেনি, অর্থাৎ তারা কখনো বলেনি যে রাশিয়া অন্য দেশের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা চালিয়েছে।

এমনকি রাশিয়া ইউক্রেনের কিছু অংশ দখল করে নেওয়ার পরও চীন তা সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘে যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব উঠেছে, তখন চীন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। মানে তারা রাশিয়ার বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেয়নি।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এখন পর্যন্ত একবারও বলেননি বা কোনো ইঙ্গিত দেননি যে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে চান বা যুদ্ধ নিয়ে চিন্তিত। বরং তাঁর ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও গভীর হয়েছে। গত তিন বছরে তাঁরা নয়বার মুখোমুখি দেখা করেছেন।

২০২৫ সালে যখন ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন সি ও পুতিন একসঙ্গে জানিয়ে দেন, তাঁরা একে অন্যকে আরও জোরালোভাবে সমর্থন করবেন, একসঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবেন এবং কৌশলগতভাবে আরও ঘনিষ্ঠ হবেন।

অর্থনৈতিকভাবে চীন রাশিয়াকে টিকিয়ে রেখেছে। যখন পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তখন চীন রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা আরও বাড়িয়েছে। ২০২১ সালে যেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ছিল ১৪৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে।

যখন পশ্চিমা কোম্পানিগুলো রাশিয়া থেকে চলে যাচ্ছে, তখন চীনা কোম্পানির গাড়ি, মুঠোফোন ইত্যাদি রাশিয়ার বাজার দখল করছে। ২০২৩ সালের শুরুতেই দেখা যায়, রাশিয়ার বাজারে ৭০ শতাংশ মুঠোফোন ছিল চীনের তৈরি।

চীন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল-গ্যাসও বেশি করে কিনছে, (যদিও অনেক ছাড়ে) যাতে পুতিন সেই টাকায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন। ২০২৩ সাল থেকে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা হয়ে উঠেছে। অনেক ব্যাংক নিষেধাজ্ঞার ভয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দিলেও চীনের ছোট আঞ্চলিক ব্যাংকগুলো এখনো রাশিয়ার জন্য লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও চীন সরাসরি যুদ্ধের জন্য কোনো মারাত্মক অস্ত্র দেয়নি, তারা মাইক্রোচিপের মতো এমন সব যন্ত্রাংশ বা যন্ত্রপাতি দিয়েছে, যেগুলো অস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগে।

এ অবস্থায় চীন আবার নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দেখাতে চায়। ২০২৩ সালে তারা একটি শান্তির পরিকল্পনা দেয়, আর ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সঙ্গে মিলে ছয়টি প্রস্তাব দেয় যুদ্ধ থামানোর জন্য। এরপর চীনের এক বিশেষ দূত ইউক্রেন ও রাশিয়া সফর করেছেন। কিন্তু এসব পরিকল্পনা শুধু কাগজে–কলমে।

মুখে অনেক সুন্দর কথা থাকলেও বাস্তবে চীনের কোনো পদক্ষেপ নেই। চীনের মূল উদ্দেশ্য আসলে যুদ্ধ থামানো নয়; তারা শুধু চায় গ্লোবাল সাউথ (বৈশ্বিক দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলো) এবং ইউরোপে তাদের ভাবমূর্তি ভালো দেখাক। অর্থাৎ তারা যেন শান্তিপ্রিয় ও দায়িত্বশীল শক্তি বলে পরিচিত হয়।

চীন চায় না ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক। এটি একেবারে অস্বাভাবিক নয়। কারণ, যুদ্ধ যতক্ষণ ইউক্রেনের সীমার মধ্যে থাকে, পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি না থাকে, আর রাশিয়া যতক্ষণ পুরোপুরি হার না মানে, ততক্ষণ চীনের জন্য এটি কৌশলগতভাবে লাভজনক।

যুদ্ধ চলায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ নিয়ে বেশি ব্যস্ত। ফলে এশিয়ায়, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। একই সঙ্গে রাশিয়া এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে চীন রাশিয়ার সম্পদ আরও সহজে এবং এমন রুট দিয়ে পাচ্ছে, যেগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই।

চীনের কিছু বড় ড্রোন নির্মাতা কোম্পানি (যেমন ডিজেআই, ইহ্যাং, অটেল) এই যুদ্ধ থেকে সরাসরি আর্থিক লাভ করছে। তারা ড্রোন ইউক্রেন ও রাশিয়া—উভয়ের কাছে বিক্রি করেছে। ২০২৩ সালে চীনের কাছ থেকে ইউক্রেন দুই লাখ ডলারের ড্রোন কিনেছে, আর রাশিয়া কিনেছে প্রায় দেড় কোটি ডলারের ড্রোন। এই ড্রোনগুলো সরাসরি না পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও ছোট ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চীন ফাঁক গলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এখন যদি ধরেও নিই যে চীন সত্যিই যুদ্ধ থামাতে চায়, তবু ইউক্রেন কখনোই চীনকে নিরপেক্ষ মনে করবে না। কারণ, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অনেকবার অনুরোধ করলেও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি।

২০২২ সালে ইউক্রেন নিজে একটি ১০ দফা শান্তি–পরিকল্পনা দিয়েছিল। কিন্তু চীন এতে আগ্রহ দেখায়নি। ২০২৪ সালে শান্তি নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে ৯২টি দেশ অংশ নেয়, কিন্তু চীন সেখানে যায়নি; বরং তারা ব্রাজিলকে সঙ্গে মিলে আলাদা একটি প্রস্তাব দেয়। ইউক্রেন মনে করছে, তাদের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবেই চীন এই প্রস্তাব দিয়েছে।

* থমাস গ্রাহাম কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ডিস্টিংগুইশড ফেলো

* ঝোংইউয়ান জো লিউ কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের চীনবিষয়ক সিনিয়র ফেলো

- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তিন বছরে নয়বার মুখোমুখি হয়েছেন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তিন বছরে নয়বার মুখোমুখি হয়েছেন

কর রেয়াত যে কারণে বাতিল করতে হবে by জসীম উদ্দিন রাসেল

বর্তমান করব্যবস্থায় আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে কর রেয়াত এবং ন্যূনতম করব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আয়কর আইনে কর রেয়াতের মাধ্যমে একজন সাধারণ ব্যক্তি করদাতার করের বোঝা হ্রাস করার উপায় থাকলেও অন্যায়ভাবে ন্যূনতম কর আরোপের কারণে নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের করদাতা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কর রেয়াত এবং ন্যূনতম কর; উভয়ই নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের মানুষ এবং উচ্চ আয়ের মানুষের সঙ্গে কর প্রদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। কর প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভর করে কর প্রয়োগ করা উচিত, যাতে করে কর প্রদানের ক্ষেত্রে করদাতাদের মধ্যে কোনো অসম সুবিধা না থাকে। এ জন্য কর রেয়াত এবং ন্যূনতম কর উভয়ই বাতিল করা উচিত।

কর রেয়াত বাতিল করতে হবে কেন

আয়কর হিসাব করে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বাসকারী একজন বেসরকারি চাকরিজীবী করদাতার বছরে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন খাতে আয় হলে করদায় আসে ৫ হাজার টাকা।

যাঁদের আয় ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বা তার বেশি, তাঁরা কর রেয়াত-সুবিধা সম্পূর্ণ ভোগ করে করদায় লাঘব করতে পারেন। বিপরীতে যাঁদের আয় এই সীমার নিচে তাঁরা কর রেয়াত-সুবিধা ভোগ করতে ব্যর্থ হন। এবং এর অন্যতম কারণ হলো অন্যায্য ন্যূনতম করব্যবস্থা।

এখানে কর রেয়াত বাদ দেওয়া হলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠবে। এক. করদায় বেড়ে যাবে এবং দুই. করদাতার মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ কমে যাবে।

যেহেতু আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর প্রদান করতে হবে, তাই আয়ের পরিমাণ যত বাড়তে থাকবে, করের পরিমাণও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে। এ জন্য নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের করদাতার জন্য কর ধাপ অনুযায়ী করহারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করযোগ্য আয় অতিক্রম করার পর প্রথম ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ কর প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে এই ধাপটা বৃদ্ধি করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করা করা হলে নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের করদাতার করের পরিমাণ কিছুটা কম থাকবে। এর সঙ্গে ট্যাক্স অফসেট ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে করের পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।

ন্যূনতম কর বাতিল করে ট্যাক্স অফসেট চালু করুন

ন্যূনতম করের আওতা ব্যাপক। একজন সাধারণ গৃহিণী প্রতি মাসে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করেও যদি সঞ্চয়পত্র কেনেন বা ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন, তাহলে সেখান থেকে যে মুনাফা প্রদান করা হয়, তা থেকে উৎসে ১০ শতাংশ কর কর্তন করা হয়। এই কর তিনি আর ফেরত পান না। এভাবে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছ থেকে করের নামে টাকা কেড়ে নিচ্ছে।

তাই ন্যূনতম করব্যবস্থা বাতিল হলে একদিকে যাঁরা আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাইরে আছেন, তাঁরাও যেমন বাধ্যতামূলক আয়কর প্রদান থেকে মুক্ত হবেন, আবার তেমনি যাঁরা রিটার্ন দাখিল করেন, তাঁদের কর প্রদানের ক্ষেত্রেও আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আসবে।

তবে কর রেয়াত-সুবিধা বাতিল হলে যাঁদের করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করবে, তাঁরা সবাই যেহেতু তাঁদের আয় অনুপাতে কর প্রদান করবেন, তাই নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য ট্যাক্স অফসেট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

এই ট্যাক্স অফসেট সুবিধা পাবেন দুই শ্রেণির করদাতা। এক. যাঁরা নিম্ন এবং নিম্নমধ্যম আয়ের করদাতা তাঁরা আয় অনুপাতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ট্যাক্স অফসেট পাবেন, যা তাঁদের মোট করদায় থেকে বাদ যাবে। দুই. যাঁরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাস করবেন, তাঁরাও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ট্যাক্স অফসেট পাবেন। এই কর-সুবিধা অস্ট্রেলিয়ায় করদাতাদের জন্য রয়েছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কর প্রদানের ক্ষেত্রে সমতা আসলেও কর রেয়াত বাদ দিলে করদাতার সঞ্চয়ের কী হবে?

সর্বজনীন পেনশন তহবিল বাধ্যতামূলক করুন

বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালু হয়েছে। এটাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশে খুবই অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্যৎ তহবিল আছে যেখানে চাকরিজীবী এবং চাকরিদাতা উভয়ে চাঁদা প্রদান করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধা নেই। তাই দীর্ঘ সময় চাকরি করলেও অবসরে যাওয়ার সময় তাঁরা শূন্য হাতে বাড়ি ফেরেন।

যেসব প্রতিষ্ঠানে ভবিষ্যৎ তহবিল আছে, সেখানে সর্বনিম্ন ছয় মাস বা এক বছর চাকরি না করলে চাকরিদাতার অংশ চাকরিজীবী পান না। শুধু চাকরিজীবী যেটুকু চাঁদা দিয়েছেন, ওইটুকুই পান। এবং এই অংশটুকু পরিমাণে নগণ্য হওয়ায় অনেক সময় দেখা যায় খরচ হয়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে মোট বেতনের ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ সুপারঅ্যানুয়েশন ফান্ডে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করতে হয়। ১ জুলাই ২০২৫ থেকে এই হার ১২ শতাংশে উন্নীত হবে।

যখনই কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যান, তখন তাঁকে তিনটি তথ্য প্রদান করতে হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ট্যাক্স ফাইল নম্বর (যেটা বাংলাদেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর হিসেবে পরিচিত) এবং সুপার ফান্ডের নম্বর। একজন ব্যক্তি যেমন যেকোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, ঠিক তেমনি অসংখ্য সুপার কোম্পানি আছে, যেখানে সুপার অ্যাকাউন্ট খোলা যায়।

কোনো চাকরিজীবী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে এক দিনও কাজ করেন, তাহলে তাঁর ব্যাংকে যে বেতন দেওয়া হয়, তার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ সুপার অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়। এবং এই সুপার ফান্ডে যে ডলার জমা হচ্ছে, তা অবসরে যাওয়ার আগে উত্তোলন করা যায় না। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় ৬৭ বছর হলো পেনশনের জন্য নির্ধারিত বয়স এবং এই বয়সের আগে এই ফান্ড থেকে ডলার উত্তোলন করা যায় না। চাইলে এক সুপার ফান্ড কোম্পানি থেকে জমা করা অর্থ অন্য সুপার ফান্ড কোম্পানিতে নেওয়া যাবে, কিন্তু উত্তোলন করা যাবে পেনশনের বয়স হলে।

এই ব্যবস্থার ফলে যাঁরা চাকরি করছেন, তাঁদের দীর্ঘ সময় ধরে ডলার জমতে থাকে এবং অবসরে যাওয়ার পর তাঁরা ভালো একটা অঙ্ক পান, যা দিয়ে শেষ বয়সে চলতে পারেন।

বাংলাদেশেও যদি মোট বেতনের একটা অংশ এভাবে জমতে থাকে তাহলে অবসরে যাওয়ার পর শেষ বয়সে আর্থিক দুর্দশার মধ্যে পড়তে হবে না।

তাই কর রেয়াত না থাকলেও বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে না। বরং যাঁদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করার প্রয়োজন নেই, তাঁদেরও মোট আয়ের একটা অংশ পেনশন ফান্ডে জমতে থাকবে।

* জসীম উদ্দিন রাসেল অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

ju_rasel@yahoo.com

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

কর রেয়াত যে কারণে বাতিল করতে হবে

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা: ইসরাইলি হামলা, সাংবাদিকসহ নিহত ২

গাজা উপত্যকায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। জাতিসংঘ-সমর্থিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইসরাইলি অবরোধে বিপর্যস্ত গাজায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বর্তমানে অনাহারের ঝুঁকিতে। এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এই তথ্য উঠে এসেছে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনে (আইপিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, গাজার মোট জনসংখ্যা ২৩ লাখের মধ্যে প্রায় সবাই এখন চরম খাদ্যসংকটে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ মানুষ ‘দুর্ভিক্ষ-সমতুল্য’ বিপর্যয়ের পর্যায়ে রয়েছে- যা খাদ্য নিরাপত্তার সর্বোচ্চ সতর্ক স্তর। অক্টোবর মাসের তুলনায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে। তখন এই ‘দুর্ভিক্ষ’ স্তরে ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার মানুষ। গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের অবরোধ মার্চের শুরু থেকে কঠোরভাবে জারি রয়েছে। এই সময়ে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ইসরাইল আবার সামরিক অভিযান শুরু করে।

আইপিসির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সামরিক পরিকল্পনা এবং মানবিক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কারণে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় পণ্য গাজায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ১১ই মে থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুর্ভিক্ষের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, প্রাণহানি, অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ, দুর্ভিক্ষ ঘোষণার জন্য যে শর্তগুলো পূরণ হওয়া দরকার- যেমন ২০ শতাংশ জনগণের কাছে খাবার না থাকা, শিশুদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টি এবং অপুষ্টিজনিত মৃত্যুহার বৃদ্ধি- তা এখন অনেকটাই পূরণ হওয়ার পথে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৭১ হাজার জন অপুষ্টিতে ভুগবে। এর মধ্যে ১৪,১০০ জনের অবস্থা হবে চরম সংকটজনক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উপপরিচালক বেথ বেচডল বলেন, কয়েক মাসে গাজায় পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়েছে। মার্চ থেকে কঠোর অবরোধ শুরু হওয়ার পর মানবিক এবং এমনকি বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইসরাইল সরকারের মুখপাত্র ডেভিড মেনসার দাবি করেন, আমরা যতটা সম্ভব বেশি ত্রাণ ঢোকানোর চেষ্টা করেছি, তাই দুর্ভিক্ষ ঘটেনি। তবে তিনি হামাসকে দায়ী করেছেন সাহায্যপণ্য চুরির জন্য। হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ইসরাইলই ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে’ ব্যবহার করছে। আইপিসি রিপোর্টটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, গাজা এখন মানবিক বিপর্যয়ের চরম প্রান্তে। অবরোধ, সংঘাত, এবং ত্রাণ বিতরণের ব্যর্থতা মিলিয়ে একটি গোটা জনগোষ্ঠী আজ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এই সংকট আরও গভীরতর হবে এবং হাজার হাজার প্রাণের ঝুঁকি দেখা দেবে।

গাজার হাসপাতালে ইসরাইলি হামলা, সাংবাদিকসহ নিহত ২

গাজার খান ইউনিস শহরের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে এক সাংবাদিকসহ আরও একজন নিহত হয়েছেন। ওই সাংবাদিকের নাম হাসান এসলাইহ। মঙ্গলবার তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। হাসান ওই হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। বার্তা সংস্থা এএফপির ফুটেজে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে ধোঁয়া উঠছে। উদ্ধারকর্মীরা টর্চের আলোয় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। এতে বলা হয়, আবু ঘালি নামের এক হাসপাতাল কর্মী বলেন, এখানে বেসামরিক নাগরিকদের সেবা দেয়া হয়। হাসান ‘আলম ২৪ নিউজ এজেন্সির ’ পরিচালক ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোতেও তার অবদান ছিলো। ইসরাইল অবশ্য দাবি করেছে, হাসান ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সদস্য। আরও দাবি করে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে চালানো হামাসের হামলায় অংশগ্রহণ করেন হাসান। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিন, গাজা ও লেবাননে কমপক্ষে ১৭৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এদিকে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস ওই সংখ্যা ২১৫ বলে জানিয়েছে। টেলিগ্রামে এক পোস্টে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য ওই হাসপাতালটি ব্যবহার করছিলো হামাস। এদিকে বার বার হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় নিন্দা জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্রমাগত হাসপাতালগুলোকে লক্ষ্য করে আসছে ইসরাইল। যদিও ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনের অধীনে স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাকর্মী ও রোগীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো অবৈধ। গাজার কর্মকর্তাদের মতে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে কমপক্ষে ৩৬টি হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে তেল আবিব। 

mzamin

কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নবদিগন্তের অন্বেষণ by রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

দোহায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপমাত্রায় মোহাম্মদ রহিম বাংলাদেশ দূতাবাসের বাইরে অন্তহীন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কপাল থেকে শ্রান্তির স্বেদবিন্দু ঝরছে। তৃষ্ণায় কণ্ঠনালি শুকিয়ে কাঠ। তবু তাঁকে প্রতীক্ষার কঠিন বাস্তবতা থেকে একচুলও নড়ানো যায়নি। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) লাগবে। এটি শেষ সুযোগ। শত শত প্রবাসী শ্রমিক সূর্যের প্রখর তেজ উপেক্ষা করে ধীরলয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে দিচ্ছেন না।

ঘর ছেড়ে আসা এই খেটে খাওয়া মানুষেরা মাতৃভূমির রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের স্বপ্নে স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে অকুণ্ঠচিত্তে কারাবাসের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। তাঁদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারই পতিত স্বৈরাচারের খাদের কিনারে রেখে যাওয়া অর্থনীতি ফেরানোর চালিকা শক্তি। রহিম ও তাঁর মতো কোটি বাংলাদেশি উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছেন, এই পরিবর্তনের ঢেউ তাঁদের প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না।

বিংশ শতাব্দীর ডিজাইন দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রয়োজন কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। কীভাবে এই রাষ্ট্র তার অগণিত প্রবাসী নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব জোরালোভাবে বিস্তার করবে? চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি ভূরাজনৈতিক খেলার মঞ্চে কীভাবে শান্তি, সমৃদ্ধির বঙ্গোপসাগর অঞ্চল গড়ে তুলবে? এমনই অনেক প্রশ্ন নিয়ে তর্ক–বিতর্ক জরুরি।

উপাত্তভিত্তিক পুনর্বিন্যাস

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক স্থায়ী রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল ও পারস্পরিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি আবশ্যক। একইভাবে কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণও জরুরি। কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব নির্ধারণে অন্যান্য বিবেচনার সঙ্গে সুস্পষ্ট ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচটি প্রধান সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক সম্পর্ক—মোট গুরুত্বের ৩০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্যের গভীরতা বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য (২৫ শতাংশ)—বর্তমান অর্থনৈতিক লেনদেন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তৃতীয়ত, প্রবাসীর আকার (২০ শতাংশ)—বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা ও গুরুত্ব। চতুর্থত, নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্টতা (১৫ শতাংশ)—সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। এবং পঞ্চমত, বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা (১০ শতাংশ)—আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরামে সক্রিয়তার গুরুত্ব।

এই পাঁচ সূচকের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক মিশন শূন্য থেকে ১–এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মান লাভ করবে। যেসব অবস্থানের মান শূন্য দশমিক ৭ বা তার বেশি হবে, ওই স্থান পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপনের জন্য বিবেচিত হবে। শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৭ মানযুক্ত স্থানে কনস্যুলেট স্থাপন যুক্তিযুক্ত এবং শূন্য দশমিক ৪-এর চেয়ে কম মানযুক্ত স্থানে নিকটবর্তী দূতাবাস থেকে অনাবাসী রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

কৌশলগত পুনর্গঠন

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে তীব্র উত্তেজনায় লিপ্ত থাকলেও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে। বৈশ্বিক শক্তিদ্বয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ও জাতিগত সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কার্যকরভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের উন্নত পরিষেবা প্রদানের জন্য রিয়াদ, দুবাই, মাসকাট ও দোহার কূটনৈতিক কার্যক্রমকে জরুরি ভিত্তিতে সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে ওই উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কূটনৈতিক পোস্টগুলোকে একত্র করে কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। দুর্নীতিগ্রস্ত অভিবাসনপ্রক্রিয়া, ভিসার নামে হয়রানি, ভুল চাকরি ও বেতনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগের সূত্রপাত। এই সমস্যার সমাধান ঢাকায় শুরু হওয়া উচিত। অ্যাপভিত্তিক কনস্যুলার সেবা সময়ের দাবি।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক দৃশ্যপটও বিবেচনায় আনতে হবে। বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করেন। মনে রাখা জরুরি, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান বিধায় ১৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঊর্ধ্বে বাণিজ্যে সক্ষমতায় পৌঁছাতে হবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সুচিন্তিত নীতির প্রয়োজন। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসের এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র তথা বার্লিন মিশন সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অন্যান্য মিশন একত্র করা যেতে পারে। ডি-৮–ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কার্যকর করতে তুরস্কের দূতাবাসকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সব প্রতিবেশীই সর্বাধিক গুরুত্ব দাবি করে। দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর পাশাপাশি আসিয়ানও প্রতিবেশী। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ উন্মোচনে আসিয়ান সদস্যপদ প্রাপ্তি অতীব জরুরি।

বাংলাদেশ ১৭ কোটি ভোক্তার বাজার। আসিয়ান তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ব্লক। বিপুল পরিমাণে অভিবাসী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত। আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়ায় বয়সী মানুষ দ্রুতগতিতে বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাড়ে ৪ কোটির বেশি ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। সদস্যপদ উভয়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মিশনগুলোর জন্য আলাদা কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আফ্রিকায় গুরুত্ব বিবেচনা করে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। আফ্রিকান ইউনিয়ন হাব, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বার এবং ফ্রাঙ্কোফোন আফ্রিকার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের দিকেই মনোযোগ দেওয়া যায়।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো

প্রয়োজন সমন্বিত কাঠামো, ‘সমগ্র সরকার’ভিত্তিক কৌশল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্য অন্য মন্ত্রণালয়েরও ওপর নির্ভরশীল। ‘এক দেশ, এক কৌশল’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা নয়; বরং অর্থ, বাণিজ্য, প্রবাসীকল্যাণ, প্রতিরক্ষা, শিল্প, পরিকল্পনা, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়ে সমন্বিত কূটনৈতিক কাঠামো জরুরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় কূটনৈতিক সমন্বয় পরিষদ’-এর মাসিক সভায় অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ এবং আন্তমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্বের সমাধান করা হবে।

সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত বিধানাবলি প্রণয়ন ছাড়াও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও মিশনভিত্তিক সীমিত কূটনৈতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উইংগুলোর ব্যাপক পুনর্গঠন এবং শক্তিশালী ‘কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ প্রবর্তন জরুরি। প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রধান সূচকগুলোর ভিত্তিতে স্কোরিং অনুযায়ী সব কার্যক্রমের মূল্যায়ন হতে পারে। মূল্যায়নের আলোকে ‘ট্যালেন্ট অপটিমাইজেশন’–পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। কৌশলগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন উইং, যেমন ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক গতি বৃদ্ধির প্রয়োজন। একই কারণে মিশনগুলোর বাজেট বরাদ্দকাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। কৌশলগত মিশনে জনবল ও ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দূতাবাস রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মিশন পর্যায়ে রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে ‘সমন্বিত কান্ট্রি টিম’ গঠনের পাশাপাশি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য ‘ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালু করা যেতে পারে। কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর, সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী করতে গুণগত সংস্কার আবশ্যক।

* রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। প্রতীকী ছবি: এআই/প্রথম আলো

স্থবির স্বাস্থ্য বিভাগ ক্ষুব্ধ উপদেষ্টা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এখনো চলছে অস্থিরতা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই খাত অনিয়ম ও লুটপাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগে। হাসপাতাল পর্যায়েও চলছে নানা অরাজকতা। স্বাস্থ্য বিভাগ গত নয় মাস স্বাভাবিকভাবে তার কাজ করতে পারছে না, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোও বন্ধ, ছন্দপতন হয়েছে তার মূলকাজে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চিকিৎসাসেবায় অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষুব্ধ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নিজেও। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে উপদেষ্টার তৎপরতাও দৃশ্যমান নয়।

ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর  অধিদপ্তর জুড়ে নানান দাবি আদায় আর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার কারণে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মুখে পড়ে প্রশাসনিক কাজও।

স্বাস্থ্য খাতে বিশৃঙ্খলা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো নেই। এমন উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। সম্প্রতি সিভিল সার্জনদের সমাবেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক, জনস্বাস্থ্যবিদ, অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, স্বাস্থ্য খাত স্থবির পরিস্থিতি দেখছি। মুখ থুবড়ে পড়েছে এ খাতে। স্বাস্থ্যে যেটা হচ্ছে সেটা কাঙ্ক্ষিত নয়। নতুন কোনো উদ্যোগ দেখছি না। জসস্বাস্থ্য সম্পৃক্ত কর্মসূচিগুলো চলছে না। জলাতঙ্ক, যক্ষ্মা ও কালা জ্বরের মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন তিনি। এখানে হোঁচট খেয়েছে। তিন শনির দশায় পেয়ে বসেছে স্বাস্থ্য খাতকে। বিশ্ব সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ রয়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাতের অপূরণীয় ক্ষতি দেখছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, আগামী ১০-১৫ বছরেও এর থেকে উদ্বার করা যাবে না। স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই সরকারের নিকট প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। উল্টো স্বাস্থ্য খাত কঠিন হয়ে পড়ছে। সংক্রমণ-অসংক্রমণ ব্যাধি ঝুঁকিতে রয়েছে। আমার মনে হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। এই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে। স্থবিরতা দূর করতে হবে দ্রুত।

এদিকে, চিকিৎসাসেবায় অব্যবস্থাপনা ও জনভোগান্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির (ওএসবি) এক অনুষ্ঠানে তিনি গতকাল এই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোগী ভর্তি থেকে শুরু করে অন্যান্য সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। চিকিৎসকরা সময়মতো হাসপাতালে যান না। তারা যদি নিয়মিত নিজেদের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না। তিনি চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানান। সংস্কার নিজের ভেতরে হতে হবে, তারপর যেখানে দরকার সেখানে। না হলে শুধু রাজা বদল হবে, কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। চিকিৎসকদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, দ্রুত কার্যকর হবে বলে আশা করছি। কিন্তু বেতন না বাড়া পর্যন্ত কি চিকিৎসা বন্ধ থাকবে? স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, ৭ হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আন্দোলন আন্দোলন খেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে: সরকারিভাবে দেশের স্বাস্থ্য খাত পরিচালনা ও তদারকির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। হাসপাতাল নিবন্ধন, চিকিৎসক পদায়ন ও বদলির মতো প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় এই অধিদপ্তর থেকেই। আওয়ামী লীগের আমলে এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় ছিলেন সরকার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। সরকার পতনের পর থেকে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত এসব কর্মকর্তা কর্মস্থলেই আসেনি। এদিকে শুরু থেকেই শীর্ষস্থানীয় এসব কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত ও ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দাবি ও আন্দোলনের চাপে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রম অনেকটাই অচল হয়ে পড়ে। মাসখানেক ধরে বন্ধ ছিল যাবতীয় কার্যক্রমও। কিন্তু এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুরোপুরি গতি নিয়ে কাজ করছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানান, স্বাস্থ্য খাতে আগামী ৫ বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনা (অপারেশনাল প্ল্যান) প্রণয়ন করা হলেও চলমান পরিস্থিতিতে সেটি অনুমোদন করার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। গত জুলাই মাসেই এটি অনুমোদনের কথা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন সরকার গঠনের পর বিভিন্ন দাবি আদায়ে নানা কর্মসূচি এবং নিজেদের বঞ্চিত দাবি করা চিকিৎসক ও কর্মচারীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এসব কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে চিকিৎসা কার্যক্রমেও।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, স্বাস্থ্য খাতে শীর্ষ পদগুলোতে দলীয় লোকজন বসানোর চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যারা দলীয় রাজনীতি করে তাদেরই সরকার পদে বসায়, উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত যাই হোক। এ কারণে নতুন সরকার আসলে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়। যারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে তারা চায় সেখানে তাদের বসানো হোক। বিষয়টির সমাধান না করলে ধারাবাহিকভাবে চলতেই থাকবে। মাঝখানে রোগীদের ভোগান্তি হয়।

হাসপাতালে সেবা নিশ্চিত করার চেয়ে চিকিৎসকরা ব্যস্ত পদায়ন, পদোন্নতি ও দাবিদাওয়া নিয়ে। বিভিন্ন ব্যানারে একের পর এক দাবি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বেশ চাপেই রেখেছেন তারা। কখনো কর্মবিরতির ডাক দিচ্ছে ‘বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরাম’ কখনো আন্দোলনে নামছে ‘ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস’। আবার কখনো সামনে আসছেন মেডিকেলের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নরা।

এসব আন্দোলনের পেছনে নানান মহল নানাভাবে মদত দিচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এসব বিষয়ে মুখোমুখি অবস্থানে না গিয়ে সবার সমস্যা সমাধানে নজর দিচ্ছেন তারা। যাতে চিকিৎসা খাতে সেবাটা স্বাভাবিক থাকে। সমপ্রতি বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরামের আন্দোলন ঠেকাতে তাদের সঙ্গে বসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান। এতে উভয়পক্ষ সম্মত হয় যে, ১. ঈদের আগে/পরে প্রায় চার হাজার চিকিৎসকের প্রথম ধাপে প্রমোশন হবে। ২. পছন্দক্রম থাকুক বা না থাকুক মাদার পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারীদের সাব-স্পেশালিটিতে (যে বিষয়গুলোতে ডিগ্রি নেই) প্রমোশন দেয়া হবে। আগে পছন্দের বাইরে কোনো প্রমোশন না দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল এবং প্রার্থী পদ পরিবর্তনেরও সুযোগ ছিল না। ৩. ওয়ান স্টেপ প্রমোশন হবে। অর্থাৎ সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক হবেন আপাতত একবার। ৪. প্রমোশনের পর কেস টু কেস ধরে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা দেয়া হবে। ৫. ১৫ বছর ধরে অন্যায় সুবিধাভোগী চিকিৎসকদের যদি আবারো প্রমোশন হয় সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সোসাইটির আপত্তির ভিত্তিতে প্রমোশন স্থগিত থাকবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমের সামনে ৮ই মার্চ ঘোষণা দেন যে, আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে ৭ হাজার ৫০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক পদে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হবে। পিএসসির মাধ্যমে নতুন দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান।
সার্বিক বিষয়ে জানতে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোনে কথা বলতে রাজি হননি। 

mzamin

মোদির আল্টিমেটাম জবাব দিয়েছে পাকিস্তান

পাকিস্তানকে কঠোর আল্টিমেটাম দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বলেছেন, পাকিস্তান যদি একটি দেশ হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তাহলে তাদেরকে সন্ত্রাসীদের অবকাঠামো ধ্বংস করতে হবে। সোমবার জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে দেয়া ২২ মিনিটের ভাষণে তিনি পাকিস্তানকে আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। বলেন, অপারেশন সিঁদুর বর্তমানে স্থগিত অবস্থায় আছে। এটা স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায়নি। এর জবাব দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। বলেছেন, এই স্বল্পস্থায়ী সংঘাতেও পাকিস্তান কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সোমবার জিও নিউজের জনপ্রিয় টকশো ‘আজ শাহজেব খানজাদা কে সাথ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন। জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তান জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে মোদি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সেখানে মোদি বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই জেনে রাখতে হবে যে, হামলা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসীদের স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান। এরপরই হামলা স্থগিত করা হয়েছে। পাকিস্তান সামনে কী ধরনের মনোভাব পোষণ করে তার প্রতিটি পদক্ষেপ আমরা পরিমাপ করে ব্যবস্থা নেবো। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান যদি আবারো একই কাজ করে অথবা ভুল করে, ‘তাহলে আবারো আমি বলছি- আমরা শুধু আমাদের প্রতিশোধ স্থগিত করেছি।

এ সময় তিনি পাকিস্তানে চালানো অপারেশন সিঁদুর কীভাবে অভিযান চালিয়েছে তার বর্ণনা দেন। বলেন, ভারতের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে আঘাত করেছে তা পাকিস্তান কল্পনাও করতে পারেনি। এ সময় মোদি দাবি করেন পাকিস্তান হতাশ হয়ে পড়েছিল। আঘাতে তারা পীড়িত হয়ে বিশ্ব জুড়ে ফোন করেছে। তাদের হস্তক্ষেপ চেয়েছে যুদ্ধবিরতির জন্য। কিন্তু ‘পাকিস্তান শুধু যখন ভারতের প্রতি আবেদন করেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা কোনো রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে না, অগ্রসরমান সামরিক তৎপরতা দেখাবে না, তখনই ভারত যুদ্ধবিরতি বিবেচনা করেছে’।  মোদি দাবি করেন ভারতের সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী হামলায় পাকিস্তান গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়ে। ভারতের সীমান্তে তারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু আমরা তাদের হার্টের  ভেতর আঘাত করেছি। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ভাওয়ালপুর এবং মুরিদকে’র মতো স্থানকে তিনি ‘টেরর ইউনিভার্সিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সব বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা, হোক সেটা ৯/১১, লন্ডন টিউব বোমা হামলা অথবা বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলা- যেসব হামলা কয়েক দশকে ভারতে চালানো হয়েছে- এর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এসব সন্ত্রাসীর যোগসূত্র আছে। সুনির্দিষ্ট হামলায় ভারত শুধু পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের অবকাঠামোই গুঁড়িয়ে দিয়েছে এমনটা নয়, তাদের নৈতিকতাও গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

ইসলামাবাদ এবং রাওয়ালপিন্ডিকে (সেনা সদরদপ্তর) সতর্ক করে দিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, অপারেশন সিঁদুর শুধু একটি অপারেশন নয়। একই সঙ্গে এটা হলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয় নীতির পরিবর্তন। অপারেশন সিঁদুর নতুন এক পরিস্থিতি উল্লেখ করে মোদি বলেন, যেখানেই সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি থাকবে সেখানেই হামলা করবে ভারত। যদি আমাদের দেশ আক্রান্ত হয় তাহলেও অবশ্যই একই কাজ করবে। পাকিস্তানের পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলের উল্লেখ করে মোদি বলেন, এটা ভারতকে বিরত করতে পারবে না। তিনি বলেন পারমাণবিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করা কোনোভাবে সহ্য করবে না ভারত। এমন হলে ভারত সুনির্দিষ্ট হামলা করবে। এক্ষেত্রে ভারত সন্ত্রাসে মদতদাতা সরকার এবং সন্ত্রাসী হামলার মূল হোতাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টেলিভিশন ভাষণের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে আসিফ বলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অথচ ভারতই বারবার নিষ্ক্রিয় ঘোষিত সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে শান্তি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একজন পরাজিত নেতার মরিয়া আকুতি স্পষ্ট হয়েছে মোদির বক্তব্যে। তবে তিনি একে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেও দেখছেন। কারণ, মোদি নিজেই স্বীকার করেছেন- কাশ্মীর ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আলোচনা এখনো উন্মুক্ত রয়েছে। খাজা আসিফ এই মন্তব্যকে দুই দেশের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও এক ধরনের ‘আশার আলো’ হিসেবে দেখছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ভারতের অভ্যন্তরেই মোদির জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে এবং জনগণ ধীরে ধীরে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের অবস্থান পরিষ্কার করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে যেকোনো সংলাপেই কাশ্মীরসহ সব মূল ইস্যু উত্থাপন করা হবে। খাজা আসিফ ভারতকে শুধু পাকিস্তানে নয়, কানাডার মতো অন্য দেশেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ভারত শুধু পূর্ব সীমান্তেই সরাসরি লড়াই করছে না, বরং পশ্চিম সীমান্তেও তেহরিকে তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর মতো গোষ্ঠীগুলোকে মদত দিয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় লিপ্ত। তিনি জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে ভারতের এই প্ররোচনামূলক ভূমিকার কারণে পাকিস্তানকে এখন পশ্চিম সীমান্তেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করতে হচ্ছে, যা আগে প্রয়োজন পড়তো না।

১০ই মে থেকে শুরু হওয়া প্রতিরোধমূলক অভিযানের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান এখন উচ্চমূল্যসম্পন্ন ভারতীয় লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করে বলে জানান আসিফ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত ইতিমধ্যে পাঁচটি দেশের কাছে মধ্যস্থতার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়। এই বক্তব্যগুলো এমন সময়ে এসেছে যখন দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আবারো উত্তেজনার নতুন ধারা  তৈরি হয়েছে। খাজা আসিফের বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তান আর আগের মতো আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে নেই; বরং তারা এখন সক্রিয় কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। মোদির বক্তব্যে আলোচনার দরজা খোলা থাকার স্বীকারোক্তিকে পাকিস্তান এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছে। তবু দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক অনেকটাই নির্ভর করছে পারস্পরিক কূটনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় চাপের ওপর।

mzamin

নাম ঠিকানাসহ চিরকুট ফেলে রেখে যায় রেস্টুরেন্টে: ২০ দিন পর মায়ের কোলে শিশু তানিশা by ফাহিমা আক্তার সুমি

দেড় বছরের শিশু তানিশা আক্তার। নিখোঁজের ২০ দিন পর সন্ধান মিলেছে তার। গত রোববার মিরপুরের দারুস সালাম থানা এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে তাকে ফেলে রেখে যায় এক নারী। এ সময় শিশুটির পাশে রাখা ছিল নাম-ঠিকানাসহ দুটি চিরকুট। ওই নারী ফিরে না আসায় রেস্টুরেন্টের কর্মীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করেন। তানিশা সৌদি প্রবাসী তাইজুল ইসলাম ও কহিনুর দম্পতির সন্তান। তিন ছেলে সন্তানের পরে তাদের কোলজুড়ে এসেছে মেয়ে তানিশা। শিশুটির বাবার সঙ্গে এখনো দেখা মেলেনি তার। চার সন্তানকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরে মধ্য পাইকপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন কহিনুর। ২২শে এপ্রিল রাতে বাসা থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। তাকে খুঁজে না পেয়ে ভেঙে পড়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তবে ২০ দিন পর শিশুটিকে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারটি। পুলিশ বলছে, শিশুটি সুস্থ আছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওই নারীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

শিশুটির মা কহিনুর মানবজমিনকে বলেন, অনেক কষ্টে কেটেছে এতদিন। তানিশাকে পেয়ে আজ আমরা সবাই খুশি। ওর বাবা সবসময় কান্না করতো। রাত-দিন বিভিন্ন অলি-গলিতে খুঁজেছি। আমার তিন ছেলে সন্তানের পরে মেয়েটি আমার কোল জুড়ে এসেছে। কে বা কারা, কেনইবা আমার সন্তানটিকে নিয়েছিল কিছুই বুঝতে পারছি না।

ঘটনার দিন সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে বাসার সামনে রাস্তায় তানিশা তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলছিল। ৯-১০ মিনিট পরে সেখান থেকে ভাইয়ের সঙ্গে বাসায় চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘটে এই ঘটনা।
তানিশার ফুপাতো ভাই মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমরা শুরু থেকে খুঁজছি। র‌্যাব-পুলিশ আমাদের সবসময় সহযোগিতা করেছিল। তানিশা সুস্থ আছে। তার মায়ের কাছে আছে। মেয়েকে কাছে পেয়ে অনেক খুশি তার মা। তানিশাকে নেয়ার পরে তার চুলগুলো কেটে ছোট করে দেয়া হয়েছিল। রোববার মিরপুর-১ নম্বরের একটি রেস্টুরেন্টে বোরকা পরিহিত এক নারী আসে তানিশাকে নিয়ে। সেখানে দ্বিতীয়তলায় গিয়ে বসে। তিন-চার মিনিট পর রেস্টুরেন্টের একজন স্টাফকে বলে ভাই বাচ্চাটিকে একটু দেখিয়েন আমার একজন গেস্ট আনতে যাচ্ছি। তখন তানিশা কান্নাকাটি করছিল। যাওয়ার আধাঘণ্টা পরে ওই নারী ফিরে না আসায় রেস্টুরেন্টের কর্মীরা আলোচনা করে ঘটনাটি নিয়ে। পরে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এ কল করে। এরপর দারুস সালাম থানায় খবরটি জানায় তারা। পরে তানিশাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে। তানিশার পাশে রাখা ছিল নাম-ঠিকানাসহ দুটি চিরকুট।

দারুস সালাম থানা থেকে মিরপুর মডেল থানায় খবরটি জানায়। তিনি বলেন, এখনো জড়িত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে পারছি না। পুলিশ তাকে খুঁজছে। যেই ঘটনাটি ঘটিয়েছে সে মনে হচ্ছে বাসার আশেপাশেই আছে। পুলিশের তৎপরতা দেখে অপরাধী নিজে বাঁচতে হয়তো তানিশাকে রেখে গিয়েছে। তানিশার বাবা-মা বিগত ১৪-১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তানিশা তাদের একমাত্র মেয়ে সন্তান।

মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, তানিশা নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকে তাকে খুঁজে পেতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। গত রোববার মিরপুর-১ নম্বর দারুস সালাম থানা এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। একটি রেস্টুরেন্টে এক নারী ফেলে রেখে যায় শিশুটিকে। ধারণা করছি শিশুটিকে কেউ লালন-পালনের জন্য চুরি করেছিল।
উল্লেখ্য, ২২শে এপ্রিল রাত ৮টা ৪০-৫৫ মিনিটের দিকে তানিশা বাসা থেকে নিখোঁজ হয়। তানিশাকে ঘরে রেখে তার মা রান্না ঘরে গিয়েছিলেন। তখন তানিশার সঙ্গে ওর ছোট ভাই ছিল সে মোবাইল দেখছিল। সেখান থেকে শিশুটি তার মায়ের কাছে আসে। এ সময় তার মা তাকে ঘরে যেতে বলে। কিছুক্ষণ পরেই শিশুটির মা ঘরে গিয়ে দেখে তানিশা নেই।

mzamin

কাশ্মীর ইস্যুতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে কঠিন চাপে ভারত

দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রতি কঠোর বিরোধিতা করে আসছে ভারত। বিষয়টি যেন নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে আছে দিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই কৌশলে ফাটল ধরালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ঘোষণায় তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চার দিনব্যাপী সীমান্ত উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। পরবর্তী এক পোস্টে কাশ্মীর সংকট সমাধানে দুই দেশের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। এই প্রস্তাবে বড় বিপাকে পড়েছে দিল্লি। কারণ, বহুদিন ধরেই ভারত কাশ্মীরকে নিজেদের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে দাবি করে আসছে এবং দ্বিপাক্ষিক নীতির বাইরে তৃতীয় কারো হস্তক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ফলে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাব ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, অবশ্যই ভারতীয় পক্ষ এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাবে না। এটি আমাদের বহু বছরের স্থায়ী অবস্থানের পরিপন্থি।

অন্যদিকে, ইসলামাবাদ ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘জম্মু ও কাশ্মীর সংকট সমাধানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রহকে আমরা স্বাগত জানাই। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

উল্লেখ্য, কাশ্মীর সংকটের সূচনা ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর থেকেই। দুটি দেশই কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে এবং একাধিকবার এই ইস্যুতে সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। সম্প্রতি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর নতুন করে চড়েছে উত্তেজনার পারদ। ভারত এই হামলার জন্য একতরফাভাবে পাকিস্তানকে দায়ী করলেও, পাকিস্তান তা জোরালোভাবে অস্বীকার করে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। উভয় দেশই সীমান্তে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছে। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে অস্বস্তিতে পড়েছে ভারত। মার্কিন প্রশাসনের আগের বিভিন্ন উদ্যোগে সীমিত সফলতা থাকলেও, কাশ্মীর ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইতিবাচকভাবে নিতে পারছে না দিল্লি।

mzamin

নগদের ২৩০০ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না by জুলকারনাইন সায়ের ও শরিফ রুবেল

এক অদৃশ্য কোম্পানি। যেখানে চেয়ারম্যান চিনেন না এমডিকে। আবার এমডি চেনেন না চেয়ারম্যানকে। অফিসের ঠিকানাও ভুয়া। কাগজে-কলমে থাকলেও আদতে প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব নেই। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের নামে দেশি-বিদেশি ডজন খানেক ছদ্মবেশী কোম্পানিতে বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদ। তবে বিনিয়োগের টাকার কানাকড়িও আর দেশে ফেরেনি। চলে গেছে তৃতীয় কোনো দেশে। এভাবেই গেল ৮ বছরে দেশের লাখ লাখ গ্রাহকের আমানতের শত শত কোটি টাকা  কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছেন নগদ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের র্শীষ নেতা ও তাদের অনুসারীরা। এমনকি নগদ অপকর্মে জড়িয়ে গিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের সরকারি কর্মকর্তারাও। জড়িত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপ প্রেস সচিবও। অর্থ লুটপাটে জড়িত কেউ কেউ এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। পড়েনি কোনো আইনের গ্যাঁড়াকলেও। অভিযুক্তদের অনেকে আবার নগদকে ঢেলে সাজানোর চবক দিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগদের মালিকানা সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের নাকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের, এ নিয়ে দীর্ঘদিন কৌতূহল ছিল। সহসা এই সমস্যার জট খোলা যায়নি। কিন্তু ২০২১ সালের ১৬ই আগস্ট আন্তঃসংস্থার বৈঠকে নগদের মালিকানা বিরোধের অবসান হয়। তাও ছিল অস্পষ্ট। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরই বেরিয়ে আসে নগদের আসল চিত্র। বেরিয়ে আসে নানা অনিয়মের তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক অর্থ বা ই-মানি তৈরি করা হয়। এই কারণে নগদের অন্তত ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ পরিচালনায় যে প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি বসিয়েছে। তাদের পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। বেরিয়ে এসেছে নগদের শেয়ার লেনদেনে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগদের অনিয়মের শুরুটা ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে। মূলত এটি একটি সফ্‌টওয়্যার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। যা আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ডিজিটাল পরিষেবা, পরামর্শ ও আউটসোর্সিং’র সেবা প্রদান করে। এই ফিনটেকে নগদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে। যা প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের ৩.২ শতাংশ বা ৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং ফার্মের নিবন্ধক (আরজেএসসি) দেয়া তথ্য অনুযায়ী বনানীর ৩৬ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এর ডেল্টা ডালিয়া টাওয়ারে এই ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড ঠিকানা  দেখানো হয়েছে। কিন্তু  ঠিকানা অনুযায়ী ১০ই মে ওই বহুতল ভবনে সরজমিন গিয়ে ফিনটেক নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে এই ভবনেই নগদের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)এর প্রধান কার্যালয়। জানতে চাওয়া হলে ভবনের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি সাত বছর ধরে এই ভবনে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করছি। তবে ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠান এখানে ছিল না। আমি আগে কখনো এমন নামও শুনিনি। এই ভবনে কোন তলার কী অফিস আছে, তা আমার মুখস্থ। কিন্তু এই কোম্পানির নাম জানা নেই। মূলত এই অস্তিত্বহীন কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করে নগদের টাকা ডিজিটাল গেটওয়ে ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করা হয়।

বাংলাদেশ যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি)’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৫শে জুলাই নিবন্ধন পায় ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড। নিবন্ধন পাওয়ার সময়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন মো. নাসির উদ্দিন। যদিও ২০২৩ সালের ৩০শে অক্টোবর কোম্পানির পুরো শেয়ার অন্য জনের নামে হস্তান্তরের কারণে তার চেয়ারম্যান পদ থাকার কথা নয়। পরবর্তীতে অ্যাডন কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ড্রেজিং লিমিটেড এর পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন সেলিনা আক্তার। সেলিনা আক্তারের সঙ্গে  যোগাযোগ করা হয়। এবং জানতে চাওয়া হয় তিনি কবে ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হয়েছেন। জবাবে তিনি নিশ্চিত করেছেন এই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তিনিই। তবে ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড কিসের বিজনেস করে- তা জানতে চাইলে তিনি বলতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানটির এমডি এসএম কামালকে চিনেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি বসেন এক জায়গায় আমি আরেক জায়গায়। একই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হিসেবে আছেন সারোয়ার রহমান দিপু তাকে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এত ডিটেইলস জানি না। কোনটার ডিরেক্টর আমি। এরপর তিনি কল কেটে দেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগদের ৬ শতাংশ শেয়ার ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস লিমিটেডের। তবে আরজেএসসিতে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেয়া রয়েছে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ গুলশান-২। যদিও কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ হচ্ছে বনানীর একটি জায়গা। গুলশান-২ এ এমন কোনো ঠিকানা নেই। এই কোম্পানির চেয়ারম্যান দেখানো হয়েছে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সাবেক এমপি নাহিম রাজ্জাক। কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবেও তার নাম রয়েছে। নগদের আরেকজন শেয়ারহোল্ডার তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের পরিমাণ ২.৪ শতাংশ। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান সাবেক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের বন্ধু তানভির আহমেদ মিশুক। তার শেয়ারের পরিমাণ ৪৭ হাজার ৫০০টি। এ ছাড়া ডিরেক্টর হিসেবে রয়েছে রোকসানা কাশেম টুম্পা। তিনি ডিরেক্টর হিসেবে ২৫০০ শেয়ারের মালিক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেডের হেড অফিস ডেলটা ডালিয়া টাওয়ার। এবং এখানেই নগদ এমএফএস-এর হেড অফিস। ভবনটির দুই তলায় গিয়ে তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেডের একটি অফিস কক্ষ পাওয়া যায়। আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ স্কয়ার ফিটের অফিস। গত ১০ই মে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি রুমে মাত্র দু’জন ব্যক্তি বসে আছেন। বাকি ৩০ থেকে ৪০টি চেয়ার খালি পড়ে আছে। ভবনটির দাড়োয়ানের কাছে তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আওয়ামী সরকারের আমলে অফিসটি ব্যাপক জমজমাট ছিল। দলটির বড় বড় নেতারা এখানে আসতেন। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিল শেখ হাসিনার ছেলে জয়ের খুবই কাছের লোক। এখন নামমাত্র চলে। কোনো কোনোদিন কেউই আসে না।  নগদ এমএফএস-এর বর্তমান শেয়ার: নগদ লিমিটেডের বর্তমানে সাধারণ শেয়ারের পরিমাণ ১৬ কোটি ৭৯ লাখ। টাকায় এর পরিমাণ ১৬৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। যার প্রতি শেয়ারের মূল্য ১০ টাকা। এরমধ্যে দশটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ রয়েছে, যার মধ্যে দেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। দেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ারের পরিমাণ ২৯.১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেড ২.৪ শতাংশ, ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড ৩.২ শতাংশ, ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস লিমিটেড ৬ শতাংশ, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ১৫.৩ শতাংশ এবং ইএসওপি হোল্ডিংস লিমিটেড ২.২ শতাংশ। এ ছাড়া বিদেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ৭০.৯ শতাংশ শেয়ার। এরমধ্যে মিয়েরেশ হোল্ডিংস লিমিটেড (বৃটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ) এর একাই ৭০.৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার পরিমাণ সব মিলে ১ শতাংশের কম। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র), সেঞ্চুরি অনলাইন লিমিটেড (হংকং), চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার হোল্ডিংস এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র), চৌধুরী বাংলা ফিনটেক এলএলসি (যুক্তরাষ্ট্র)। এ ছাড়া নগদ লিমিটেডের পছন্দের শেয়ারহোল্ডার রয়েছে ছয়টি। তাদের ১০ টাকা দরে প্রতি শেয়ারে মোট বিনিয়োগ রয়েছে ৮৮ লাখ টাকা। যার মধ্যে তাসিয়া হোল্ডিংস লিমিটেডের ৩০.৮ শতাংশ, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের ৪২.৮ শতাংশ ও মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেডের ২২.৬ শতাংশ। বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ার ৪.২ শতাংশ। ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শেয়ার, যা একটি সাধারণ শেয়ার নামেও পরিচিত। একটি কোম্পানিতে মালিকানার একটি মৌলিক একককে প্রতিনিধিত্ব করে। যখন আপনি সাধারণ শেয়ার কিনবেন। তখন আপনি কোম্পানির একজন অংশীদার হয়ে যাবেন। আপনার কিছু অধিকার থাকবে। একটি অগ্রাধিকার শেয়ার হলো এক ধরনের স্টক। যা তার ধারককে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের তুলনায় নির্দিষ্ট সুবিধা দেয়। এগুলো সাধারণত লভ্যাংশ পছন্দ, লিকুইডেশন পছন্দ।

শেয়ার মালিকানায় সন্দেহজনক লেনেদেন: ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস পার্টনার লিমিটেড। একটি বাংলাদেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি। ২০২১ সালের ৭ই জুলাই থেকে ২০২২ সালের সেপ্টম্বর পর্যন্ত সময়ে সর্বমোট ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আকারে নগদ লিমিটেডের সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকের হিসাবে জমা করা হয়। এর বিপরীতে বিভিন্ন তারিখে ৪৫০ কোটি টাকার কমার্শিয়াল পেপার ইস্যুকরা হয়। যার সুদের হার ৬ শতাংশ। অবশিষ্ট ৫০ কোটি টাকার বিপরীতে ৬২,১২,২৫,১৬০ টাকার অভিহিতমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করা হয়। পরবর্তীতে ২৭শে অক্টোবর ২০২২ সম্পূর্ণ শেয়ার সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের অনুকূলে স্থানান্তর করা হয়। নগদের প্রশাসক টিমের তদন্তে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৫০০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগের তথ্য উঠে আসে। স্বল্প সময়ের মধ্যে কমার্শিয়াল পেপার ইস্যু ও তা শেয়ারে রূপান্তর এবং এক মাসের ব্যবধানে পুরো শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টি সন্দেহজনক মর্মে প্রতীয়মান হয়।

যেভাবে ক্যান্ডেলস্টোনের শেয়ার সিগমার অনূকূলে চলে যায়: ২০২০ সালের ৪ঠা জুন সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের ১ লাখ ২৫ হাজার পছন্দের শেয়ার, সৈয়দ আরশাদ রেজার ১ লাখ ২৫ হাজার শেয়ার ও মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ১ লাখ ২৫ হাজার শেয়ার। মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার শেয়ার বাংলাদেশি কোম্পানি সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। ২০২২ সালের ১০ই মার্চ  শেয়ার প্রিমিয়ামের বিপরীতে বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয় এবং সিগমা বোনাস শেয়ার হিসাবে ৫৭,৫০,৯৩০টি সাধারণ শেয়ারের মালিকানা লাভ করে। ২০২২ সালের ২৭শে অক্টোবর ক্যান্ডেলস্টোনের ৬,২১,২২,৫১৬টি সাধারণ শেয়ার সিগামর অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি নগদ লিমিটেড সিগমা থেকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের একটি চুক্তি সম্পাদন করে। মাত্র ছয়দিন পরে ২২শে জানুয়ারি উক্ত চুক্তি সংশোধিত হয়ে ২৫ কোটি টাকার পরিবর্তে ৪০০ কোটি টাকার ঋণ সীমা পুনঃনির্ধারিত হয়। যা উভয় ঋণের সুদের। এভাবেই নগদের জামানতের টাকা কারসাজির মাধ্যমে বেহাত হয়ে যায়। অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নগদের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

নগদের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, নগদ নিয়ে আগে থেকেই সমস্যা ছিল। ৫ই আগস্টের আগে ওখানে আমাদের (বাংলাদেশ ব্যাংক) ঢোকার মতো পরিস্থিতি ছিল না। কিন্তু ৫ই আগস্টের পরে তাদের ঊর্ধ্বতন সবাই পালিয়ে যান। তখন লাখ লাখ সাধারণ মানুষের আমানত ঝুঁকিতে পড়ে যায়। ওই মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে যায়। এবং নগদ পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেয়। কিন্তু তারা পালিয়ে গিয়েও নগদের সবকিছু দখলের রাখার চেষ্টা করছেন। আমাদের প্রশাসক নিয়োগে আপত্তি জানিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করেছেন। কিন্তু আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষেই রায় দিয়েছে। নিয়োগ করা প্রশাসক অনিয়ম অনুসন্ধানে কাজ করছেন। দ্রুতই অডিট রিপোর্ট হাতে পাওয়া যাবে। তখন বলা যাবে সেখানে কি পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে।

mzamin

হ-য-ব-র-ল সেগুনবাগিচা, বিদায়ের মুডে পররাষ্ট্র সচিব by মিজানুর রহমান

পররাষ্ট্র সচিব পদে পরিবর্তন আসছে। অস্বাভাবিক বিদায় পাচ্ছেন বর্তমান সচিব মো. জসীম উদ্দিন। সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অত্যাসন্ন পরিবর্তনের বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। জানিয়েছেন, ৮ মাসে তালগোল পাকিয়ে ফেলা পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দীনকে পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় চলতি মাসের শুরুতে। গুরুত্বপূর্ণ ওই রদবদল বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মৌখিক নির্দেশনা বজ্রপাতের মতো এসে পড়ে সেগুনবাগিচায়। মুহূর্তেই তা ছড়ায় এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ে। যার প্রভাব পড়ে অধস্তনদের সেটআপে। অন্তর্বর্তী সরকারের আচমকা এমন সিদ্ধান্ত স্বভাবতই ব্যথিত করে মিস্টার জসীম উদ্দিনকে। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি এমন প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেন। পেশাগত জীবনের একেবারে শেষ লগ্নে তিনি বিষয়টির সম্মানজনক সুরাহা চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন- পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানাজানির পর থেকে ‘মনমরা’ অবস্থায় রয়েছেন জসীম উদ্দিন। তিনি মন্ত্রণালয়ে অফিস করছেন অনেকটা ‘না করার’ মতো। গত সপ্তাহে এবং চলতি সপ্তাহের খোলা দুইদিন সোম ও মঙ্গলবার কারও সঙ্গে তিনি তেমন দেখা-সাক্ষাৎ করেননি। বৈঠকাদিতেও খুব একটা অংশ নেননি বরং তিনি উপযুক্ত প্রতিনিধি পাঠাচ্ছেন। সচিবের নির্লিপ্ততার প্রভাব পড়ছে মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য রুটিন কার্যক্রমে। যা রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা দিয়েছে গোটা সেগুনবাগিচায়। উদাহরণ হিসেবে এক কর্মকর্তা বলেন, চারদিনের সফরে আগামী ২৮শে মে জাপানে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের। সেই সফরের প্রস্তুতিমূলক আলোচনা ও দ্বিপক্ষীয় অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী ১৫ই মে টোকিওতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক (ফরেন অফিস কনসালটেশন বা এফওসি) নির্ধারিত ছিল। এর নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের। কিন্তু সচিব নিজে যেতে পারছেন না বলে এফওসিই স্থগিত করে দেন! যা নিয়ে দুই সরকারের সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের হস্তক্ষেপে স্থগিতের চিঠি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সেই বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নজরুল ইসলামকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবশ্য তাৎক্ষণিক পররাষ্ট্র সচিবের পরিবর্তে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীকে সেই বৈঠকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল বৈঠকটি পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে না হয়ে প্রধান উপদেষ্টার সফরের প্রস্তুতিমূলক সভা হবে।

ওয়াকিবহাল সূত্রের দাবি উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়া অর্থাৎ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্র সচিবের মর্যাদা এবং কূটনীতিক জসীম উদ্দিনের ক্যারিয়ার- সব কিছুর মধ্যে একটি সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। এ নিয়ে ৩টি বিকল্প প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে রয়েছে। এক পররাষ্ট্র সচিব নিজের সম্মান রক্ষায় ছুটিতে যাবেন। দুই. তাকে একটি দেশে রাষ্ট্রদূত পদে পদায়ন করা হবে। ৩. রাষ্ট্রদূত পদে পদায়নের আগ পর্যন্ত তিনি ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টরের দায়িত্ব পালন করবেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বর্তমানে বার্লিনে রয়েছেন। আগামী ১৬ই মে দেশে ফিরবেন তিনি। তারপর সরকারের অ্যাকশন দৃশ্যমান হবে বলে ধারণা মিলেছে। উল্লেখ্য, অনেক সিনিয়রকে ডিঙ্গিয়ে মো. জসীম উদ্দিনকে গত সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র সচিব পদে নিয়োগ দেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাকে অনেকটা নীরবেই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর প্রদেয় ওই নিয়োগে বিএনপি কানেকশনকে কাজে লাগিয়েছিল তার সুহৃদরা। অনেকটা নিঃশব্দে গত বছরের ৮ই সেপ্টেম্বর মো. জসীম উদ্দিনের নাম নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে জুড়ে দেয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে। তখনো সাইটে তার নিয়োগ সংক্রান্ত অফিস আদেশের কপি যুক্ত হয়নি। স্মরণ করা যায়, আগামী বছরের ১২ই ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার আগে তিনি চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তার আগে কাতার এবং গ্রিসে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পাালন করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ত্রয়োদশ ব্যাচের কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন নয়াদিল্লি, টোকিও, ওয়াশিংটন ডিসি এবং ইসলামাবাদে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুবিভাগের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কনস্যুলার পরিষেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় রাষ্ট্রদূত জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে এথেন্সের বাংলাদেশ দূতাবাস ২০১৮ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে জনপ্রশাসন পুরস্কারও পায়। পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের অ্যাপয়েনমেন্ট চাওয়া হয়। সন্ধ্যায় তার দপ্তরে দীর্ঘ অপেক্ষা করেন ওই প্রতিবেদক। কিন্তু বিদায়ের প্রস্তুতিতে থাকার কারণে সচিব কথা বলতে রাজি নয় বলে জানান তার দপ্তরের পরিচালক।

mzamin

আমরা ভারত পাকিস্তান পারমাণবিক যুদ্ধ বন্ধ করেছি

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর শুরু হয়েছে এতে কে জিতলো আর কে হারলো তা নিয়ে বাকযুদ্ধ। সোমবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ইসলামাবাদকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান যদি নিউক্লিয়ার অস্ত্র দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে তাহলে তা তার দেশ সহ্য করবে না। তিনি আরও বলেন, এখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি। স্থগিত অবস্থায় আছে। তার অর্থ তিনি কি যুদ্ধবিরতি মেনে নেননি! অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে আলোচনার ইস্যু হবে কাশ্মীর, সন্ত্রাস ও পানি ইস্যু। এ নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ থামিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডন বলছে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে এই দু’টি দেশের মধ্যে খুব ‘খারাপ একটি পারমাণবিক যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ভারত একথা উল্লেখ না করে বার বার বলছে, পাকিস্তানের অনুরোধে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। এমন অবস্থায় হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলেন ট্রাম্প।

তিনি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় উল্লেখ করেন দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী এই দুই দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরল এক কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের কথা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের কথা উল্লেখ করেন।  ট্রাম্প বলেন, আমরা একটি পারমাণবিক যুদ্ধ বন্ধ করেছি। আমি মনে করি এটা হতো খারাপ একটি পারমাণবিক যুদ্ধ। তাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যেতো। এটা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতার পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তা। তিনি বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে এমনিতেই খুব একটা কথা বলেন না। এর মধ্যদিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভঙ্গুর শান্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকে তুলে ধরেন। ট্রাম্প এই সমস্যার সমাধান করতে বলেন, যদি দুই দেশ আলোচনা অব্যাহত রাখে তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই বাণিজ্য বৃদ্ধিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।

 তিনি বলেন, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য করতে যাচ্ছি। ভারতের সঙ্গেও বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য করতে যাচ্ছি। ঠিক এই মুহূর্তে আমরা ভারতের সঙ্গে আলোচনা করছি। খুব শিগগিরই আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করবো। এর মধ্যদিয়ে তিনি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ব্যবহার করে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা অব্যাহত রাখতে চান। ট্রাম্প প্রশাসন শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যত জোর দিয়েছে। তিনি বলেছেন, গত শনিবার অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি করতে সহায়তা করেছে আমার প্রশাসন। এই দুই দেশের কাছে প্রচুর পারমাণবিক অস্ত্র আছে। আমি আশা করবো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্থায়ী একটি যুদ্ধবিরতি হবে।  তার এই বর্ণনাকে নাটকীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এই সংঘাত সমাধানে তিনি বিশ্বাস করছেন বাণিজ্য হতে পারে কূটনীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। উত্তেজনা নিরসনে উভয় দেশের ভূমিকার জন্য নেতৃত্বের প্রশংসা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমি খুব গর্বিত যে, ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্ব দ্ব্যর্থহীন এবং শক্তিশালী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারো যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে জোর দেন। তিনি বলেন, আমরা একটি পারমাণবিক যুদ্ধ বন্ধ করেছি। আমি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে তাদের কাজের জন্য ধন্যবাদ দিই। এর মধ্যদিয়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের সহায়ক ভূমিকার জন্য কৃিতত্ব দেন ট্রাম্প।

mzamin