Friday, November 1, 2019

রূপনগর বস্তিতে আহাজারি: সুরুতন বিবি বললেন রক্তবন্যা দেখেছি by পিয়াস সরকার

রূপনগর। ১১ নম্বর সড়কটির একপাশে উঁচু দালান। অন্যপাশে বস্তি। প্রায় ৪ থেকে ৫টি বস্তির মানুষ ব্যবহার করেন সড়কটি। ফলে কোলাহল লেগেই থাকতো সড়কজুড়ে। বস্তির টিনশেড ঘরে থাকতেন নিম্ন আয়ের মানুষজন। ঘরপ্রতি ভাড়া ৪ হাজার টাকা। ঘরগুলো যেন শুধুই মাথা গোজার ঠাঁই।
বস্তির রাস্তা দিয়ে দুজন মানুষ ঠিক মতো হাঁটতে পারেন না। তাই বস্তির ছেলে মেয়েরা এই সড়কটিই বেছে নেন খেলা ধুলা থেকে শুরু করে সব কাজে। অধিক জনসংখ্যার এই সড়কটিতে হঠাৎ দেখা মেলে এক বেলুন ওয়ালার। ফলে ছোট শিশুদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন খুব সহজেই। অনেকেই বলেছেন তিনি ১৫/২০ দিন পরপর আসতেন। বেলুনওয়ালা আবু সাঈদ নিজেই সিলিন্ডার ও গ্যাস বানিয়ে বেলুনে ভরে বিক্রি করতেন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন তার সিলিন্ডার থেকে ধুয়া বের হচ্ছিল। এই কারণে প্রথমে তিনি একটি মুদি দোকানের সামনে বসলেও উঠিয়ে দেয়া হয়। এই সময় অনেকের সঙ্গেই কথা হয় তার। কামাল মজুমদার স্কুলের ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বায়েজীদ মীর শুভর সঙ্গেও কথা হয় তার। শুভ বলেন, আমি বেলুন ওয়ালাকে বলি, কাকা এটা তো ব্লাস্ট হবে। বেলুন বিক্রেতা বলেন, হবে না বাবা, আল্লাহ ভরসা। সিলিন্ডারটা গরম হয়ে গেছে এই জন্য ধুয়া বের হচ্ছে।
জানা যায়, আবু সাঈদ বেলুনের জন্য নিজেই সিলিন্ডার বানিয়েছেন। প্রথমে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের মুখ কাটেন। সিলিন্ডারে কাচের টুকরা, ইটের টুকরা, বালু ও ২ ধরণের রাসায়নিক পদার্থ দিতেন। এরপর একটি রড দিয়ে নাড়া দিতেন। এরপর সেখান থেকে বের হতো ধুয়া। তার নিজের তৈরি একটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতেন। আর বেলুনে গ্যাস ভরতেন একটি নলের সাহায্যে। এই সময় সিলিন্ডার গরম হয়ে উঠতো।
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মিম আক্তার। মিম ও ফারজানা ছিলো বান্ধবী। মিম বেলুন কেনার জন্য মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যান। তার মায়ের নাম কাজল। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তার বাবার নাম মো. সাইফুদ্দিন। মিমের বাবা পঙ্গু। বাড়িতে বসে থাকেন। মিমের বড় বোনের নাম ট্রপি। পরিবারের অসহায়ত্বের কারণে ১৫ বছর বয়সেই মায়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরেছেন। অভাবের তাড়নায় গতবছর নেত্রকোণা থেকে রাজধানীতে এসেছেন।
মিম ও ফারজানা একসঙ্গে যান বেলুন কিনতে। মিম তার মায়ের কাছে দেয়া বর্ণনায় বলেন, সেখানে অনেক ভিড় ছিলো। তার গ্যাস সিলিন্ডার গরম হওয়ায় বেলুন দিতে দেরি হচ্ছিল। সেই কারণে ভিড় বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে যারা বেলুন কিনতে চায় তাদের কাছে টাকা নিয়ে রাখেন তিনি। এই টাকা নিয়ে রাখার কারণেই ভিড় বাড়তে থাকে। সেসময় তার গ্যাস সিলিন্ডার থেকে গ্যাস ও ছাই বের হতে থাকে। এসময় বেলুন বিক্রেতা বলেন, তোমরা একটু পাশে গিয়ে দাঁড়াও আমি সিলিন্ডার ঠিক করছি। বেলুন বিক্রেতা গ্যাস বের হওয়া স্থানে কাপড় দিয়ে পেচিয়ে ধরেন।
মিম ফারজানাকে বলে চলো দুরে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু ফারজানা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। মিম সেই বেলুনের দোকান থেকে খানিকটা দুরে এসে দাঁড়ায়। গ্যাস বের হওয়ার পরপরই বিস্ফোরন হয়। ফারজানা সেখানেই মারা যায়। আর মিম পড়ে যায়। তার ডান পা পুড়ে যায়। বাম চোখে আঘাত পায়। মিমকে কেউ একজন নিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। তার বাবা মা হাসপাতালে গিয়ে পায় মিমকে। এরপর গতকাল তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। তার বাবা বলেন, ৭ দিন পর আবার আসতে বলেছেন হাসপাতালে। তখন জানা যাবে চোখের কী অবস্থা।
ঠিক ঘটনাস্থলের তিন বাড়ি পড়ে থাকতেন সুরুতন বিবি। তিনি তার নাতিকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পেয়ে বাইরে এসে দেখেন এই বিসৎসতা। কারো হাত নেই করো পা নেই। তার ভাষায় ‘রক্ত বন্যা’ হয়ে গেছে।
আকাশ রহমান নামে এক বাসিন্দা বলেন, সেই সময় কাকে রেখে কাকে ধরবো। সবাই চিৎকার করছে। অনেকেই ছবি তুলছে ভিডিও করছে। আমি আহত একজনকে ফাঁকা স্থানে নিয়ে রাখি। সেখানে এত লোক ছিলো যে আর ঢুকতে পারছিলাম না। আমি চিৎকার করেছি ধরেন ধরেন। নিয়ে যাই হাসপাতালে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে না। সবাই ভিডিও আর ছবি তুলতে ব্যস্ত।
এই বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদকে আসামি করে বিস্ফোরক আইনে মামলা করেছে রূপনগর থানা পুলিশ। বুধবার দিবাগত রাতে এ মামলা করা হয়। গতকাল  সকালে রূপনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্ঘটনায় সাঈদের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বুধবার রাতে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
মিমের সঙ্গে থাকা ফারজানার মৃত্যু হয়েছে। আবার  সেই সঙ্গে ফারজানার বোন মরিয়মের (৯) ডান হাত বিছিন্ন হয়ে গেছে বিস্ফোরনে। ফরাজানা ও মরিয়মের বাবার নাম আবু তাহের। তিনি পেশায় রিকশাচালক। বয়সের ভারে ক্লান্ত তাহের এক মেয়েকে হারিয়ে এবং আরেক মেয়ের হাত হারিয়ে এখন দিশেহারা।
গতকাল দুপুর বেলা আবু তাহেরের ঘরে গিয়ে দেখা যায় বিছানায় শুয়ে বিলাপ করছেন। কথা বলার শক্তি না থাকলেও মেয়ের ছবি দেখতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তড়িঘরি করে খুঁজতে থাকেন মৃত মেয়ের ছবি। কিন্তু হায় মেয়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে কোন ছবিও মেলে না ঘরে। আবু তাহেরের ৫ মেয়ে ২ ছেলে। এক ছেলে ছোট। সবার বড় ছেলে বিয়ে করে আলাদা। দেখে না বাবা মা ভাই বোনকে। আর ২ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
এই ঘটনায় বুধবারই মৃত্যু হয় ৬ জনের। আর গতকাল মৃত্যু হয় নাহিদ নামে আরো এক শিশুর। এর আগে নিহত ৬ জন হলো- মিজানুর রহমান (৬), রুবেল (৭), রমজান (৮), নুপুর (৭), শাহীন (৯) ও ফারজানা (৬)। এছাড়াও জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি অন্যরা হলেন, বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ, জুয়েল (২৫), জান্নাত (২৫), জনি (১০), সিয়াম (১১) ও মোস্তাকিম (৯)। জুয়েল ও জান্নাতের হাত বিছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া লাইফ সার্পোটে রয়েছে মিজান।

শেষ ইচ্ছেও পূরণ হচ্ছে না খোকার!

শেষ ইচ্ছেটিও পূরণ হচ্ছে না বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার। প্রিয় স্বদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার প্রচণ্ড আঁকুতি নিয়েই দেশ থেকে বহুদূরে, সাতসমুদ্র তেরনদী পেরিয়ে হাসপাতালের বিছানায় এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তিনি। পাসপোর্ট না থাকায় এই মুহূর্তে তিনি অনেকটা দেশহীন। এ অবস্থায় যদি তিনি চলে যান না ফেরার দেশে তাহলে তার মৃতদেহটিও দেশে পাঠানোর বিষয়টি অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতিতে তার পরিবারের সদস্যরা প্রচণ্ড হতাশ। সাবেক এই মন্ত্রীর সুস্থ হয়ে ওঠার আর কোনো সম্ভাবনা না থাকায় চিকিৎসকরা এরই মধ্যে তার ক্যানসার চিকিৎসায় ক্ষান্ত দিয়েছেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন কেটেরিং ক্যানসার সেন্টারের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে তাকে।
নিউ ইয়র্কে খোকা পরিবারের ঘনিষ্ঠজন মাহমুদ হোসাইন বাদশা মানবজমিনকে জানান, ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ২০১৪ সালের মে মাসে একজন ভিজিটর হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র।
নিউ ইয়র্কের স্লোন কেটেরিং হসপিটালে চিকিৎসা শুরুর পর প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাকে চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়েছে। সে কারণে লম্বা সময়ের জন্য নিউ ইয়র্ক ছেড়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু ভিজিটর ভিসার নিয়মানুযায়ী প্রতি ছয় মাসের মধ্যে দু’চার দিনের জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যেতে হতো। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের শেষদিকে তার নিজের এবং সার্বক্ষণিক সঙ্গী স্ত্রী ইসমত হোসেনের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ওই অবস্থায় তারা নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে পাসপোর্ট নবায়ন বা নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তাদেরকে পাসপোর্ট না দেয়ায় এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে খোকা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। তার সেই আবেদন এখনো অনিষ্পন্ন। এরমধ্যে দফায় দফায় কনস্যুলেটে খোঁজ নিয়েও পাসপোর্টের কোনো হদিস মেলেনি। সর্বশেষ মাস ছয়েক আগে ইসমত হোসেন সশরীরে কনস্যুলেটে গিয়ে পাসপোর্টের দায়িত্বে থাকা প্রথম সচিব শামীম হোসেনের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু তিনি যথারীতিই পাসপোর্টের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দেননি। অগত্যা হতাশ হয়ে ফিরে আসেন।
বাদশা জানান, বিরতিহীন চিকিৎসার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক মাস ধরে সাদেক হোসেন খোকা দেশে ফেরার জন্য অনেকটা পাগলের মতো হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বলতেন, ঢাকায় যাওয়ার পর জেলে যেতে হলে যাবো, চিকিৎসার জন্য আর আসতে না দিলেও সমস্যা নাই। দেশে গিয়েই মরবো। কিন্তু পাসপোর্ট ছাড়া দেশে যাবো কি করে? মাহমুদ হোসাইন বাদশা বলেন, কাকতালীয়ভাবে খোকার রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদনের ওপর যেদিন আঙ্গুলের ছাপ দেয়ার তারিখ ছিল সেদিন ছিল ১৬ই ডিসেম্বর। গাড়িতে চড়ে ইমিগ্রেশন অফিসে যাওয়ার সময় পুরোটা পথ নীরবে চোখের পানি ঝরিয়েছেন। এক পর্যায়ে পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে বললেন, আজ বাংলাদেশের বিজয় দিবস। যুদ্ধ করে এইদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ সেই বিজয় দিবসেই যাচ্ছি অন্য দেশে আশ্রয় চাইতে!
তিনি বলেন, খোকা কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধাই নন, তিনি মেয়র হওয়ার পর রাজধানী ঢাকার অনেকগুলো সড়কের নাম মুক্তিযুদ্ধের সকল সেক্টর কমান্ডার ও খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম বিজয় দিবসে নগরভবনে মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলার আয়োজন করেছিলেন। অথচ তার মতো একজন নিখাঁদ দেশপ্রেমিক মানুষের জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় দেশে ফেরা অনিশ্চিত। এরচেয়ে পরিতাপের আর কি হতে পারে? মৃত্যুর পর কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় তার মরদেহ দেশে নেয়া সম্ভব হলেও পাসপোর্ট না থাকায় স্ত্রী ইসমত হোসেন সঙ্গে যেতে পারবেন না। সেটা হবে আরো মর্মান্তিক বিষয়।
সাদেক হোসেন খোকার সর্বশেষ অবস্থা এবং পরিবারের চিন্তা-ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে তার বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ফুসফুসে মারাত্মকভাবে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ায় তার জীবন এখন বিপন্নপ্রায়। অথচ তিনি চিকিৎসা নিচ্ছিলেন কিডনি ক্যানসারের। হঠাৎ করেই ফুসফুস আক্রান্ত হলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তবে এখনো পর্যন্ত অক্সিজেন-সাপোর্ট নিয়ে বেঁচে আছেন। চেতনাও অনেকটাই ঠিক আছে। সবাইকে চিনতে পারছেন। কিন্তু কথা বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। তারপরও সারাক্ষণ দেশের কথা জিজ্ঞেস করেন। কেউ দেখতে এলেই জানতে চান, দেশের খবর কি। আর সারাক্ষণই চোখ বেয়ে পানি গড়াতে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে জানতে চইলে তিনি বলেন, আমরা খুবই বিভ্রান্তি ও হতাশার মধ্যে আছি। আব্বু-আম্মু কারো পাসপোর্ট নেই। এখন কি করবো বুঝতে পারছি না।
প্রসঙ্গত, কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৪ সালের মে মাসে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আসেন সাদেক হোসেন খোকা। তারপর থেকে গত সাড়ে পাঁচ বছর যাবৎ থাকছেন নিউ ইয়র্ক সিটির ইস্ট এলমহার্স্ট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায়। সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ইসমত হোসেন। চিকিৎসার জন্য আসার চেষ্টায় ঢাকা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের বাধায় প্রথম দফা তিনি ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের আদেশে তার বিদেশ গমনে বাধা দূর হলে প্রায় তিন সপ্তাহ পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ওই তিন সপ্তাহ বিলম্বের কারণেও ক্যানসার তার শরীরে অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান বড় মেয়ে সারিকা হোসেন। তিনি বলেন, তারপরও নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা শুরুর পর গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে তার ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ফুসফুস আক্রান্ত হওয়ায় তিনি এখন সংকটাপন্ন। পিতার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন সারিকা হোসেন।

'শাফেয়ী জামে মসজিদ': ইরানের একটি দৃষ্টিনন্দন সুন্নি মসজিদ

ইরানের মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগ শিয়া এবং প্রায় ১০ ভাগ সুন্নি মুসলমান। সারা ইরানে সুন্নি মুসলমানদের পরিচালিত বা তাদের নিজস্ব ১৫ হাজার মসজিদ রয়েছে যা শিয়া মুসলমানদের মসজিদের সংখ্যার চেয়েও বেশি। বর্তমানে তেহরানে সুন্নি ভাইদের নিয়ন্ত্রিত ৯টি মসজিদ সক্রিয় রয়েছে।
শাফেয়ী জামে মসজিদের অভ্যন্তরের দৃশ্য
ইসলামী বিধান অনুযায়ী মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর যেখানে সব শ্রেণীর মুসলমানই প্রবেশ করতে ও ইবাদত করতে পারেন। শিয়া মুসলমানরা সুন্নি-প্রধান এলাকার মসজিদেও নামাজ আদায় ও ইবাদত করে থাকেন। অন্যদিকে সুন্নি মুসলমানরাও শিয়া প্রধান এলাকার মসজিদে নামাজ আদায় ও ইবাদত করে থাকেন।
শাফেয়ী মসজিদের চমৎকার কারুকাজ
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ হলো 'শাফেয়ী জামে মসজিদ'। তুর্কিদের মসজিদের ডিজাইনে ১৯৪৫ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদের বিশাল বিশাল মিনার পুরো শহরের সৌন্দর্য ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে। এটি একটি সুন্নি মসজিদ। মসজিদের এক প্রান্ত গিয়ে মিশেছে কেরমানশাহ বাজারের সঙ্গে।

পাকিস্তানের পশতু আন্দোলন পশতু স্বার্থে নয় by আতা রাসুল মালিক

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নৃশংস কাঁটা। ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার আশ্রয় নিয়ে টিটিপি মসজিদ ও চার্চে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। ২০১৪ সালে পেশোয়ার আর্মি পাবলিক স্কুলে ১৩২ শিশুকে হত্যা, লাক্কি মারওয়াতের কাছে একটি গ্রামে ১২৫ তরুণকে গলা কেটে হত্যা ছিল তাদের নৃশংসতার উদাহরণ।

গত বছর পাকিস্তান সেনাবাহিনী টিটিপিকে চূড়ান্তভাবে গুঁড়িয়ে দেয়। বর্তমানে এটি সংগঠিত সংগঠন হিসেবে পাকিস্তানে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তবে পশতু বেল্টে জাতিগত রাজনীতি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অনেকে মনে করে, পশতু তাহাফুজ মুভমেন্টের (পিটিএম) রাজনীতি আসলে অন্য একটি পন্থায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ধারাবাহিকতা। আবার অন্য কেউ কেউ পিটিএমকে টিটিপি সহিংসতার ব্যর্থতার পর রাজনৈতিক অধিকারের জন্য আনাড়ি সংগ্রাম হিসেবেও অভিহিত করে।

পিটিএম সাবেক ফেডারেলি অ্যাডমেনিস্ট্রেটেড ট্রাইবাল এরিয়াস (ফাটা)-এ পরিচিতির রাজনীতি করে। তারা পশতু গোত্রগত আবেদন জানিয়ে আরো রাজনৈতিক সুযোগ দাবি করছে। দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য সত্ত্বেও তাদের পরিচিতির রাজনীতি বেশ উদ্বেগেরই সৃষ্টি করেছে।

অনেকেই পিটিএমের বর্ণিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করে। পিটিএমকে প্রক্সি যুদ্ধরত পক্ষ অভিহিত করা বাড়াবাড়ি হলেও পাকিস্তান সরকার ও নাগরিকদের এই আন্দোলন নিয়ে সংশয়পূর্ণ হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় উপনিবেশ আমলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অত্যন্ত কার্যকরভাবে ভাগ করে শাসন করার কাজটি করেছিল। লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে উৎসাহিত করে ব্রিটিশ উপনিবেশ শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম কোনো সংস্থা গঠন থেকে লোকজনকে বিরত রাখা। দুঃখজনকভাবে এই কৌশল বর্তমান সরকারও জারি রেখেছে।

বিশ্বজুড়ে ত্বকের বর্ণ, জাতি/গোত্র, ধর্মীয় গ্রুপ এবং এমনকি লিঙ্গের মতো অভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে গ্রুপ বা জোট গঠনের প্রবণতা দেখা যায়। এটি পরিচিতি রাজনীতি নামে অভিহিত। অনেকে একে গোত্রবাদও বলে থাকে।

দুর্বল জাতীয় পরিচিতি মারাত্মক নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করে। কারণ দেশগুলো তখন অনেক বেশি নাজুক থাকে, অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতের প্রবণতায় ভোগে। রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশ সহজেই অন্যান্য শক্তিশালী দেশের প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়। আধিপত্যবাদী দেশগুলো প্রতিবেশী দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য উপ-জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করে, পরিচিতিগত বিভেদ উস্কে দিয়ে থাকে।

ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার বই ‘আইডেন্টিটি: দি ডিমান্ড ফর ডিগনিটি অ্যান্ড দি পলিটিক্স অব রেসেন্টমেন্ট (২০১৮)-এ বলেছেন, আমরা আমাদের পরিচিতি নিয়ে গর্ব করলেও এটিই আমাদের বিভক্ত করতে পারে।

বিশ শতকে বামপন্থী রাজনীতি শ্রেণি ইস্যুগুলোতে মনোনিবেশ করত, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক দলগুলো অপেক্ষাকৃত গরিবদের অর্থনৈতিক কল্যাণের দিকে নজর দিত। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দাবি ছিল আগে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচিতি রাজনীতি রাজনৈতিক বামধারাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সাম্যের দাবির বদলে সমাজের ছোট ছোট গ্রুপগুলো তাদের স্বীকৃতি ও অধিকার চাচ্ছে। আর তা করতে গিয়ে নির্যাতিত গ্রুপগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ ধরনের ছোট গ্রুপের পক্ষে সমাজের সর্বশক্তিশালী এলিটদের চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ হচ্ছে না।

এমন এক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিন আলাদা থাকার পর পাকিস্তান সরকার ফাটার লোকজনকে মূলধারায় নিয়ে আসছে। কিন্তু পশতুদেরকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে পিটিএম।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো ও গর্বিত পশতু সাইরা বানু ওরাকজাই সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে বলেছেন যে এখন সময় এসছে উপজাতীয় এলাকার লোকজনকে একটিকে বাছাই করে নেয়া: তারা অধিকার ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করবে না পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠান ও আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করলে তা স্থায়ী সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করবে। ফাটার জনগণ মূলধারায় একীভূত হওয়ার যে অর্জন হাসিল করতে যাচ্ছে, তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পিটিএম।

যেকোনো গ্রুপের জন্যই পরিচিতি একটি আবেগগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ আশা করে না যে পশতুরা তাদের পরিচিতি ত্যাগ করবে বা তারা যে সম্প্রদায়ের গর্বিত প্রতিনিধিত্বকারী, তা ছেড়ে দেবে। বরং খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী সমষ্টি নির্মাণে ব্যবহৃত হতে পারে।

পিটিএমের স্পষ্টতই বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। তারা অজ্ঞাত উৎস থেকে অর্থ পেয়ে তাকে, তাদের সাথে পাকিস্তান-বৈরী বিদেশী সংগঠনগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।

পিটিএমের যদি সত্যিই সবচেয়ে অভাবী পশতুদের কল্যাণ কামনা করে থাকে, তবে তাদেরকে অবশ্যই সংকীর্ণ পরিচিতির বলয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণকে বিভক্ত করা বন্ধ করতে হবে। এর বদলে তাদেরকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায় গঠন করতে হবে যার ভিত্তি হবে উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এ ধরনের কৌশল সার্বিকভাবে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বিশেষভাবে ফাটার জনগণের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করবে।

পিটিএমের উচিত হবে ফ্রন্টিয়ার ক্রাইম রেগুলেশন্স বাতিল করতে সহায়তা করা, পশতু উপজাতীয় এলাকার লোকজনকে পাকিস্তানের মূলধারার রাজনীতিতে যোগদানে সহযোগিতা করা। উপজাতীয় এলাকা মানেই বিশৃঙ্খল ভূমি- এই ধারণাকে অতীতে পরিণত হতে দিতে হবে।
লাহোরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছে পশতু তাহাফুজ মুভমেন্টের (পিটিএম) কর্মীরা