Thursday, October 8, 2015

বাংলাদেশকে ‘ছেড়ে দেয়ার’ পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের! by মো: ইখতিয়ার উদ্দিন রিবা

১৯৪৭ সালে ভাগের পরেও ভারতের যে রাজনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশে রয়ে গেছে, তা পাকিস্তানে না থাকার কথাটি পাকিস্তানের। অন্য দিকে ভারতের ঘিরে থাকা বাংলাদেশে পাকিস্তানি নীতি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা বলে ’৭১-এ ভারতীয়দের ভাষ্যের তথ্য রয়েছে। এই প্রত্যক্ষ কথার পরোক্ষ স্বীকৃতির পর্যালোচিত ইতিহাস অনেক আগেই পাকিস্তানের এমন পরিকল্পনার কারণ বৈকি।
১৮৮৮ সালে সর্বপ্রথম দ্বিজাতিতত্ত্বের উপস্থাপক বলে স্যার সৈয়দ আহাম্মদকে বলা হয়। কিন্তু ভারতীয় ইতিহাসের বিচারে এর উদ্ভাবনা প্রায় হাজার বছরের পুরনো এবং ছিল প্রবহমান। অবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রতিদানস্বরূপ স্যার সৈয়দ শুধু এর প্রতিধ্বনি করেছেন মাত্র। দ্বিতীয় উপস্থাপনটি হয় ১৯৩০ সালে। লক্ণেৌ অধিবেশনে মুসলিম লীগ সভাপতি স্যার মোহাম্মদ ইকবালের উত্তর-পশ্চিম ভারতে মুসলিম অধ্যুষিত চারটি প্রদেশ একত্র করে আলাদা রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম দাবির কারণে। তৃতীয়টি ’৩৩ সালে। ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাঞ্জাবের চৌধুরী রহমত আলী এবং তার সহপাঠী ও সহযোগী মোহাম্মদ আসলাম খান, শেখ মোহাম্মদ সাদিক এবং এনায়েত উল্লাহ খান। তবে তারা ওই অঞ্চলেই পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশসহ পাঞ্জাবের P, কাশ্মিরের K, সিন্ধুর S এবং বেলুচিস্তানের TAN নিয়ে পাকিস্তান নামকরণটি তারাই করে সর্বপ্রথম প্রচারপত্রে উল্লেখ করেন। ’৪০ সালে চতুর্থ দাবিটি হয় আমাদের পক্ষ থেকে। সেটা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সব মুসলিম প্রদেশের স্বাতন্ত্র্যের। এর অসাধ্যতার প্রমাণ বিভাজ্য পাঞ্জাব ও বাংলার অংশগ্রহণ।
The Penguin Atlas of World History, Vol-23, page-220 মতে, ভারতবর্ষ ভাগের ফলে আমাদের এখান থেকে ভারতে যায় ৩৩ লাখ, আসে ১০ লাখ মানুষ। পাকিস্তান থেকে ভারতে যায় ৫৫ লাখ, আসে ৭৫ লাখ। বিবিধ তথ্য মতে, ব্রিটিশ-ভারতে মোট আইসিএস এবং আইপিএস ছিলেন ১১৫৭ জন। এর মধ্যে ৬০৮ জন ব্রিটিশ এবং ৪৪৮ জন হিন্দু। অবশিষ্ট ১০১ জন মুসলমানের মধ্যে পাকিস্তানে আসা ৯৫ জনের মাত্র একজন আইসিএস এবং ১৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বাঙালি। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ জেনারেল লকহার্ট-এর তথ্য মতে, ’৪১ সালে ভারতীয় সেনাসংখ্যা ছিল ৪,১৮,০০০। এর মধ্যে ২,০১,০০০ পাঞ্জাবির ৯৬ হাজার ছিল মুসলমান। ভাগে পাকিস্তানের পাওয়া প্রায় দুই লাখের মধ্যে কর্নেল থেকে মেজর জেনারেল পদমর্যাদার মোট ৫৬ জনই অবাঙালি এবং অফিসার পদমর্যাদার ১৫৫ জন ছিলেন বাঙালি।
প্রফেসর গোলাম কবিরের ‘মাইনোরিটি পলিটিকস ইন বাংলাদেশ’ বইয়ের তথ্য মতে, ৬৯ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি অব পাকিস্তান তথা পাকিস্তান শাসনতন্ত্র পরিষদ। এর ৪৯ জন মুসলমান, ১৬ জন সংখ্যালঘু এবং চারজন স্বতন্ত্র। আনুপাতিক অংশে আমাদের সংরক্ষিত ১৩ জন সংখ্যালঘু ও ৪৪সহ মোট ৫৭ জন। মোহাম্মদ রফিক আফজালের ‘পাকিস্তান : হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’, পৃষ্ঠা ৪৭, নোট ২৪ মতে- লিয়াকত আলী খান এবং কাইউম খান ছাড়া আরো চারজন ছিলেন আমাদের কোটায় মনোনীত। পূর্বোল্লিখিত গোলাম কবিরের বই মতে, আমাদের সংখ্যালঘু সদস্যের ছয়জন অনেক আগে থেকেই কলকাতায় থাকতেন। তাদের একজন ছাড়া সবাই ছিলেন জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস নেতা, যারা বাংলার স্বাধীনতা ও ভারত ভাগের বিরোধী ছিলেন। রাজশাহীর বাবু প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী ছিলেন প্রভাবশালী নেতা। বাবু সতীশ দাস গুপ্তের খাদি প্রতিষ্ঠান এবং কুমিল্লায় ড. পি সি ঘোষের অভয় আশ্রম ছিল কংগ্রেস সমর্থিত শক্তিশালী দু’টি প্রতিষ্ঠান। এখানের কংগ্রেসের প্রস্তাব মতে, ড. পি সি ঘোষ হন পশ্চিম বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। বাবু কিরণ শঙ্কর রায় ৬ মাস পরই মন্ত্রিত্ব নিতে দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। এখানে কংগ্রেসের তুলনায় দুর্বল মুসলিম লীগের হাতেগোনা নেতাদের নির্ভর করতে হয়েছে স্বল্প শিক্ষিত কিছু মধ্যবিত্ত, ছাত্র, কৃষক এবং পশ্চিম বাংলা ছাড়াও অবাঙালি মুসলিম নেতাদের ওপর।
প্রথম অধিবেশনে কলকাতা থেকে অংশ নেয়া সদস্য প্রফেসর রাজকুমার চক্রবর্তী ’৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংশোধনী প্রস্তাবে বছরে অন্তত একবার ঢাকায় অধিবেশনের দাবি করেন। পরের দিন আর এক সদস্য বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত (’৭১ সালে পুত্রসহ পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিহত) অধিবেশনে বাংলাকেও একটি সরকারি ভাষায় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করলে আপত্তি তোলা হয়। উল্লেখ্য, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মাতৃভাষা গুজরাটি, লিয়াকত আলী খানের পাঞ্জাবি এবং পাকিস্তানে শতকরা ৭.২ ভাগ উর্দুভাষীর প্রায় শতভাগ হলেন ভারত থেকে আসা মোহাজির। ওই বছরই ১৩ জুলাই ঢাকায় পুলিশ বিদ্রোহ দমনের সময় গুলিতে দুইজন নিহত ও ১২ জন আহত হয়। ১৮ জুলাই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে কুমিল্লায় এক রাজনৈতিক সম্মেলনে কংগ্রেসের পরিবর্তে গণসমিতি নামে একটি দল প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবিতে তিনি দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করেন। এই দলটিই পরে ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ পার্টি তথা ইউপিপি নামে রূপান্তরিত হয়। ’৪৯ সালের ১২ মার্চ অধিবেশনে সংখ্যালঘু সদস্যরা কার্যবিধির সিদ্ধান্তে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দাবি জানান।
ওই বছর ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৫ সালের ২৪ অক্টোবর মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। (তথ্যে বলা হয় যে ১৯৫৪-এর নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু ৭২ সদস্যের সমর্থন লাভ এর কারণ)। প্রফেসর লরেন্স জিরিংয়ের ‘বাংলাদেশ ফ্রম মুজিব টু এরশাদ’ বইয়ের ২০ পৃষ্ঠা মতে, ’৪৯ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় হিন্দু মহাসভার জনসভায় বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান ও পাকিস্তানকে পুনঃ যুক্ত করে অখণ্ড ভারতের দাবি করা হয়। ’৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীতে জেল পুলিশের গুলিতে ৭ জন কমিউনিস্ট নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। ’৫২ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলন। ’৫৪ সালের ২৩ মার্চ চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা হয়। শুধু এ পর্যন্ত বর্ণিত তথ্যের নিরিখে, পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তিকে অদূরদর্শিতা না আত্মসমর্পণ মনে করা কতটা অযৌক্তিক? দুঃখিত- যৌক্তিক ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু পাকিস্তান তার স্বার্থে এতে বাধ্য করার আদৌ কোনো তথ্য পাওয়া ভার।
আলতাফ গওহরের ‘আইয়ুব খান’ নামের বইয়ের ’৫৯ পৃষ্ঠা মতে ইস্কানদার মীর্জা, আইয়ুব খান ও তার একান্ত সহযোগী এই লেখক বাগদাদ প্যাক্টের অধিবেশনে আঙ্কারা যান ১৯৫৮ সালের ১৪ জুলাই। পরের দিন ইরানের শাহ আলতাফ গওহরকে জিজ্ঞেস করেন, ইরান-পাকিস্তান কনফেডারেশন করে বাংলাদেশের বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে কাশ্মির নেয়ার পরিকল্পনার কথা সে জানে কি না। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফখরুদ্দীন আহমদ তার ‘ক্রিটিক্যাল টাইমস’ বইয়ের ৩৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ১৯৬০-৬১ সালে আইয়ুব খান ভারতের হাইকমিশনার রাজেশ্বর দয়ালকে বলেছিলেন, কাশ্মির দিলে ভারতকে বাংলাদেশ ছেড়ে দেয়া হবে। রোয়েদাদ খানের ‘দ্য অ্যামেরিকান পেপারস’ (পৃষ্ঠা ২৮২) মতে, খান আব্দুল কাইউম খান ’৭০ সালে পেশোয়ার নির্বাচনী জনসভায় ডুরান্ড লাইনকে কৃত্রিম বলে আফগানিস্তান ও ইরানের সাথে পাকিস্তানের কনফেডারেশন সমর্থন করেন। ২৫ জুন ওয়ালী খান এর ব্যাখ্যায় বলেন, পাকিস্তানের নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থে অনেকেই বাংলাদেশের সাথে কমই জাতিত্বের সম্পর্ক মনে করেন। কাইউম খান তার বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সামরিক ও অন্যান্য জাতীয় ক্ষেত্রে তাদের একে অন্যের সাহায্য করা উচিত বলে বোঝাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতায় তখনই অনেকে সমর্থন এবং পেশোয়ারে কারো কারো সন্তোষ প্রকাশের কথা এই বইটিতেই আছে। ১৯৮০-৮১’র দিকে বাংলাদেশের সাথে কনফেডারেশনের পক্ষে করাচিতে জনমত প্রকাশ পায়। যত দূর মনে পড়ে জনৈক কোরেশী বা রাশেদি নামের এক রাজনীতিবিদ তখন দৈনিক জং পত্রিকায় লেখা দীর্ঘ কলামে উল্লেখ করেন, আইউব খান বাংলাদেশ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। ‘যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, খোদা হাফেজ’ বলে লেখাটির তিনি ইতি টানেন।

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই বর্বর নির্যাতন!

মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউপি’র বিছরাবন্দ গ্রামের দরিদ্র মনসুর আলীর মেয়ে কিশোরী গৃহকর্মী নাজমা বেগমের ওপর বর্বর নির্যাতনের নেপথ্য কারণ কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়া। খারাপ কাজে রাজি না হওয়ায় ওই গৃহকর্মীকে প্রায় তিন মাস গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিলো। এর আগে প্রায় এক বছর ধরে চলে বর্বরোচিত নির্যাতন। তারপর বিনা চিকিৎসায় ঘরে বন্দী করে রাখা হয়। প্রতিদিন রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে পেটানো হতো তাকে। এছাড়া গরম পানি ও খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েও নির্যাতন চালানো হতো।
পরিবারের সদস্যরা এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বন্দী অবস্থা থেকে উদ্ধার করে গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে হাসপাতালের ৪র্থ তলার ৬নং ওয়ার্ডের ৭নং বেডে চিকিৎসাধীন। নাজমার অবস্থা এখনো শংকামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন তার বড় বোন আলেয়া বেগম।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাজমার বরাত দিয়ে বোন আলেয়া বেগম জানান, গুরুতর অসুস্থ নাজমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বর্বর এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। সে জানায়, ঘটনার শুরু হয় রমজান মাস থেকে। প্রায় এক বছর আগে তাকে বাড়ি থেকে রাবেয়া বেগমের বাড়িতে কাজের কথা বলে নেওয়া হয়। কিছুদিন পর রাবেয়া বেগম আমাকে নিয়ে তার মেয়ে লুৎফা বেগমের শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার লাকসামে নিয়ে সেখানে কাজ করার কথা বলেন। রমজান মাসের একদিন লুৎফা অপরিচিত চার যুবককে নিয়ে আসেন বাসায়। লুৎফা বেগম যুবকদের সাথে নাজমাকে খারাপ কাজ করার প্রস্তাব দেয়। নাজমা রাজি না হয়ে বাসা থেকে দৌঁড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ওই যুবকদের সহযোগিতায় লুৎফা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালায়। নির্যাতন চালানোর সময় লুৎফা বেগমের মা রাবেয়া বেগমও উপস্থিত থাকলেও তিনি বাধা দেননি। অনেক কান্নাকাটি করেও রেহাই পায়নি নাজমা। তাকে তার পিতার কাছে দিয়ে আসার জন্য অনেক অনুনয়-বিনয় করেও লাভ হয়নি। ঘটনার পরদিন সকালে রাবেয়া বেগম তাকে ঘুমে রেখে বড়লেখায় ফিরে যান। এরপর গৃহবন্দী করে নাজমার ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। বিনা চিকিৎসায় এভাবে চলতে থাকে নির্যাতন। এমন অবস্থায় প্রায় ২ মাস আগে লাকসামের বাসার পার্শ¦বর্তী লোকজন ঘটনা বুঝতে পারায় নাজমাকে গোপনে বড়লেখায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পরও তাকে একটি কক্ষে বন্দী রেখে নির্যাতন চলতে থাকে।
নির্যাতনের শিকার নাজমার পিতা মনসুর আলী গত ০৬ অক্টোবর বড়লেখা থানায় ৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার আসামিরা হচ্ছেন পাঁচপাড়া গ্রামের আজির উদ্দিনের স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৬০), মেয়ে লুৎফা বেগম (৩০), রাবেয়ার জা রুবি বেগম (৪০)। মামলার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গৃহকর্ত্রী রাবেয়া বেগমকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়।
বড়লেখা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: মনিরুজ্জামান জানান, আসামি রাবেয়া বেগম পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউপি’র বিছরাবন্দ গ্রামের হতদরিদ্র মনসুর আলী অভাবের তাড়নায় মেয়ে নাজমাকে ২ হাজার টাকা মাসিক বেতনে গৃহকর্মীর কাজে দেন পাঁচপাড়া গ্রামের আজির উদ্দিনের বাড়িতে। প্রায় এক বছর আগে নাজমাকে ঝিয়ের কাজের জন্য আজির উদ্দিনের স্ত্রী রাবেয়া বেগম নিজ জিম্মায় তার বাড়িতে নিয়ে যান। এর প্রায় ৩ মাস পর নাজমার পরিবারের অনুমতি ছাড়াই তাকে নিজের মেয়ে লুৎফার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার লাকসামে পাঠিয়ে দেন রাবেয়া বেগম। সেখানে রাবেয়ার মেয়ে লুৎফা বেগম নাজমাকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু নাজমা রাজি না হওয়ায় তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন।

লজ্জার কথা by হামিদ মীর

এটা ওই পাকিস্তান নয়, যা ১৯৪৭ সালে মুসলমানেরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা ওই পাকিস্তান, যা ১৯৪৭ সালে হিন্দুরা বানিয়েছে। আপনারা ভাবছেন, হিন্দুরা পাকিস্তান বানাল কেমন করে? আপনাদের বিস্মিত হওয়া দোষের কিছুই নয়। তবে বাস্তবতা হলো, ১৯৪৭ সালে হিন্দুরাও একটি পাকিস্তান বানিয়েছিল, যা আজো ভারতে টিকে রয়েছে। এটি একটি ছোট্ট গ্রাম, যা ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তে অবস্থিত। ১৯৪৭ সালের আগেও এই গ্রামে অনেক মুসলমান বাস করতেন। পাকিস্তান যখন সৃষ্টি হলো, তখন এই গ্রামের মুসলমানেরা পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রামের হিন্দুরা তাদের বেশ বাধা দেয়। এর পরও মুসলমানেরা পাকিস্তানে থাকতে চায়। এরা নিজেদের স্থাবর সম্পত্তি হিন্দুদের কাছে সমর্পণ করে পূর্ব পাকিস্তান পাড়ি জমায়। গ্রামের হিন্দুরা ওই মুসলমানদের স্মরণে তাদের গ্রামের নাম ‘পাকিস্তান’ রেখে দেয়। গ্রামের নাম পরিবর্তনের জন্য ওই হিন্দুদের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করা হয়, তা সত্ত্বেও তারা পাকিস্তান নাম পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরা পাকিস্তান টিকিয়ে রেখেছে, তবে গ্রামের মুসলমানেরা যে পাকিস্তানে গিয়েছিল, সে পাকিস্তান টিকে থাকেনি। তাদের পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে গেছে। ওই মুসলমানেরা নিজেদের পুরনো গ্রামে ফিরে যেতে পারবে না। বাংলাদেশ তাদের বারবার নাগরিকত্ব পেশ করেছে। অনেক বিহারি যুবক বাংলাদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে, কিন্তু প্রবীণ বিহারিদের বড় একটা অংশ আজো নিজেদের পাকিস্তানি বলে পরিচয় দেন। ওই পাকিস্তানিরা তাদের মূল ভূখণ্ড ইসলামি জমহুরিয়া পাকিস্তান আসতে চায়, কিন্তু পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর ওই দরিদ্র ও অসহায় পাকিস্তানিদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নজরে আসে না। এটা ছোট্ট একটি গ্রামের কয়েক শ’ বিহারি মুসলমান নয়, বরং কমপক্ষে তিন লক্ষাধিক বিহারি মুসলমানদের হৃদয়বিদারক দুঃখগাথা, যারা কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন মুহাজির ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। পাকিস্তানের জনগণ ওইসব বিহারিকে নিজেদের আনন্দে শামিল করুক আর না করুক, তারা কিন্তু ঠিকই পাকিস্তানিদের আনন্দ-খুশিতে আনন্দোৎসব পালন করে এবং পাকিস্তানিদের দুঃখ-শোককে নিজেদের দুঃখ-শোক মনে করে অশ্রু ঝরায়।
আপনারা ওইসব বিহারিকে ভালো মনে করুন বা খারাপ মনে করুন, বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে মানবেতর জীবনযাপনকারী ওই তিন লাখ মানুষ পাকিস্তানের ইসলামের প্রতি ভালোবাসা এবং পাকিস্তান ভূমির জন্য প্রাণ দেয়ার দাবির সামনে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি জানি, ওইসব হতদরিদ্র বিহারি পাকিস্তানিদের জন্য সোচ্চার হওয়ার প্রচলন এখন আর নেই। পাকিস্তানি ইসলামি দলগুলোও তাদের নিয়ে আলোচনা ছেড়ে দিয়েছে। আজকাল এরা মিয়ানমার, কাশ্মির ও ফিলিস্তিনের মুসলমানদের নামে অর্থ সংগ্রহ করে নিজেদের ঈমান তাজা করছে। বিহারি পাকিস্তানিদের কথা এখন তাদের মনে নেই। যদি বিহারিরা পাকিস্তান চলে আসে, তাহলে তাদের নামে সংগ্রহ করা অর্থ তাদের জন্য ব্যয় করতে হবে। সুতরাং কোনো দলই এই ঘাটের কারবারে হাত দিতে প্রস্তুত নয়। আমি জানি, আমার এই ঔদ্ধত্যিক মতামত পড়ে অনেক শক্তিশালী ও বদমেজাজি পাকিস্তানি আমাকে ভালোমন্দ বলবেন এবং এ ফতওয়া জারি করতে বিন্দুমাত্র দেরি হবে না যে, হামিদ মীর অসময়ের রাগিণী ছড়িয়ে পাকিস্তানের স্বার্থের ক্ষতি করার নিন্দনীয় চেষ্টা করছেন। ওই ফতোয়া দিয়ে আমার কিছুই আসে-যায় না। আমি একজন গুনাহগার মানুষ। গাদ্দারি আর কুফরের ফতোয়া বিক্রেতাদের কাছে নয়, বরং আমাদের জবাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে। আমি যখন কোরবানির ঈদে কোরবানির দর্শনপূর্ণ ভাষণ শুনি, তখন লজ্জা-অনুতাপ আমার অন্তর ও স্নায়ুকে ঘিরে নেয়। আমি ভাবতে থাকি, আমরা কেমন পাকিস্তানি, যারা পাকিস্তানের জন্য মুহাজিরদের ভুলে বসে আছি এবং তাদের জন্য বিন্দুমাত্র কোরবানি দিতে আমাদের মন চায় না।
আপনার অন্তরে যদি সামান্যতম আল্লাহর ভয় থাকে, তাহলে অন্তরে হাত রেখে ভেবে বলুন তো, বাংলাদেশে মানবেতর জীবনযাপনকারী তিন লাখ বিহারি পাকিস্তানির আসল অপরাধ কী? এ প্রশ্ন নিয়ে ভাবুন। যদি আপনার ভেতর কিছু মানবতা অবশিষ্ট থাকে, তাহলে আপনি নিজে নিজেই লজ্জা পাবেন। ইতিহাসের সত্যতা হচ্ছে, পাকিস্তান সৃষ্টিকারী দল মুসলিম লীগ আজকের পাকিস্তানে জন্ম নেয়নি, বরং পাকিস্তানের স্রষ্টা মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছে ঢাকায়। মুসলিম লীগ তার প্রথম ক্ষমতা লাভ করেছিল অখণ্ড বাংলায়, পাঞ্জাবে নয়। বিহার, ইউপি, সিপি, গুজরাট ও মাদ্রাজের মুসলমান নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের আন্দোলনে সবার আগে ছিল। আল্লামা ইকবালের এলাহাবাদ ভাষণের পর ওই আন্দোলন সিন্ধু, পাঞ্জাব ও সীমান্ত প্রদেশের (খায়বার পাখতুনখাওয়া) দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৪৬ সালে বিহারের মুসলমানদের সংখ্যা প্রদেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ ছিল। অথচ প্রাদেশিক নির্বাচনে এরা কংগ্রেসের ১৫২ আসনের বিপরীতে মুসলিম লীগকে ৩৪ আসনের ব্যবস্থা করে দেয়। এরা জানত, বিহার পাকিস্তানের অংশ হবে না। এর পরও এরা পাকিস্তানকে ভোট দিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসার কারণে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় হাজার হাজার বিহারি মুসলমানদের প্রাণ দিতে হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদবী ও মাওলানা মানাজের আহসান গিলানির মতো বিহারি ওলামায়ে কেরামের ভূমিকা পাকিস্তানিদের স্মরণে আছে; কিন্তু ওই ওলামায়ে কেরামের খান্দানকে এরা ভুলে গেছে। ওই খান্দানের মধ্যে অল্প কিছুসংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানে এসেছে, আর বেশির ভাগই পাড়ি জমিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে। তাদের ভাষা ছিল উর্দু। বাঙালিরা পাকিস্তানকে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষাকেও ভালোবাসত। উর্দুকে যখন পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ঘোষণা করা হলো এবং প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা উপেক্ষিত হলো, তখন ভাষা আন্দোলন শুরু হলো। ওই আন্দোলন বিহারি পাকিস্তানি আর বাঙালিদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। ১৯৬৪ সালে বাঙালি আর বিহারিরা এক হয়ে জেনারেল আইউব খানের মোকাবেলায় ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষ নেয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রভাব ও ষড়যন্ত্র ফাতেমা জিন্নাহকে পরাজিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিহারিরা আওয়ামী লীগের পরিবর্তে জামায়াতে ইসলামী ও কনভেনশন লীগকে সমর্থন করে। আওয়ামী লীগ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ও পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহইয়া খান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সেনা অপারেশন শুরু করে দেন। বিহারিদের বেশির ভাগ ওই সেনা অপারেশনে সহায়তা করে। অনেক বিহারি পাকবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যায়। পাাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়- যার অধীনে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নিতে দায়বদ্ধ হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার এক লাখেরও বেশি বিহারি পাকিস্তানে ফেরত নিয়ে যায়। কিন্তু এরপর এ ধারা বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর মানবেতর জীবন যাপন করার পর অনেক বিহারি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করে। বাংলাদেশ সরকার তাদের ভোটাধিকারও দিয়েছে। কিন্তু পাঁচ লাখ ৩৯ হাজার পাকিস্তানি বাংলাদেশের নাগিরকত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা পাকিস্তান আসতে চায়। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে একটি দরখাস্ত পেশ করে দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনা হোক। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতে বলেছে, ওই পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে আনা আমাদের দায়িত্ব নয়। এই দরখাস্ত ২০১৫ সালে প্রত্যাখ্যাত হয়। এখন এই লাখ লাখ পাকিস্তানি বাংলাদেশে কীটস্য কীট হয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। জেনেভা ক্যাম্পের একেকটি কামরায় দশজন লোক বাস করে। ৯০ পরিবার মিলে একটি টয়লেট ব্যবহার করে। পাকিস্তানের কোনো বড় রাজনৈতিক দল ওই নিপীড়িত মানুষদের কথা আলোচনা করে না। কেননা সিন্ধু জাতীয়তাবাদ এতে নারাজ হয়ে যাবে। পাখতুন ও বেলুচ দলগুলোর জন্য এটা কোনো জাতীয় সমস্যা বা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। মুত্তাহেদা কওমি মুভমেন্টও এখন বিহারিদের কথা বলে না।
পাকিস্তানের প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি দাবিদার পাঞ্জাবিরা। এই নিপীড়িত আটকেপড়া পাকিস্তানিরা পাঞ্জাবিদেরও নজরে আসে না। ১৯৭১ সালে ওই বিহারি পাকিস্তানিরা মুক্তিবাহিনীর মোকাবেলায় পাকবাহিনীকে সহায়তা করেছিল। জেনারেল জিয়া ও জেনারেল মোশাররফের সময় ওই নিপীড়িত আকটেপড়া পাকিস্তানিদের পাকিস্তানে নিয়ে এসে শুধু একটি ডিফেন্স হাউজিং স্কিমে তাদের আত্তীকরণ করা যেত। কিন্তু পাকিস্তানের ডিফেন্সের যোদ্ধাদের কারো ওই পাকিস্তানিদের ডিফেন্সের কথা মনে নেই। আটকেপড়া পাকিস্তানিদের সবচেয়ে বড় অপরাধ পাকিস্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও আনুগত্য। তারা পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ করেছেন, অথচ পাকিস্তানের সরকারগুলো তাদের ভুলে গেছে। কোরবানির ঈদে বাংলাদেশে লাখ লাখ আকটেপড়া পাকিস্তানির দুঃখগাথা আমাদের জন্য বড় লজ্জার ব্যাপার।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ থেকে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

মানবজাতির কুল রক্ষার কৌশল

ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) যা জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের জিনগত নির্দেশ ধারণ করে। সব জীবের ডিএনএ জিনোম থাকে। মানুষের ডিএনএ’র এমন একটি অংশ বা জিন নকশা তার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, যা শত শত কিংবা হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় অব্যাহত থাকে। চার পাশের পরিবেশগত পরিবর্তন ওই জিনের ওপর নানাভাবে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করলেও তা অটুট থেকে কুল রক্ষা করে। দেহকোষ কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ মেরামত করে সারিয়ে তোলে এবং বংশকুলের তথ্য রক্ষা করে, সেই কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন এবারের নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী- থমাস লিন্ডাল, পল মোদরিচ ও আজিজ সাংকার। এ বিজ্ঞানীদের গবেষণা জীবন্ত কোষের ভেতরে কী ঘটে সে বিষয়ে আমাদের মৌলিক ধারণা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তাদের পদ্ধতিগত কাজের মাধ্যমে কীভাবে জীবন্ত কোষ কাজ করে, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে কোষের বেশকিছু বংশানুক্রমিক রোগের কারণ সম্পর্কে ধারণাকে বিস্তৃত করবে। ফ্রান্সিস ক্রিক ইন্সটিটিউটের গবেষক লিন্ডালের গবেষণা নিয়ে কমিটি জানিয়েছে, ‘তিনি দেখিয়েছেন ডিএনএ-র ক্ষয়ের হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তার মেরামতি চলতে থাকে। না হলে পৃথিবী থেকে প্রাণের অস্তিত্ব মুছে যেত।’ মোদরিচ দেখিয়েছেন, ‘কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ’র প্রতিরূপ তৈরি হয়। সে সময় ডিএনএ’র কিছু ক্ষতি হয়। সেই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেয়, তাই জানা যায় মোদরিচের গবেষণায়।’ প্রকৃতিতে রয়েছে অতি বেগুনি রশ্মি। তার সংস্পর্শে আসে প্রাণিজগৎ। ক্ষতি হয় শরীরের। বিশেষ করে ডিএনএ’র। ডিএনএ’র সেই ক্ষতি কিভাবে কোষ মেরামত করে তা দেখিয়েছেন নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাংকার।

মেধাবী বনাম নকলবাজ by আসিফ নজরুল

মেয়েটি প্রতিবন্ধী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। একটু বড় হওয়ার পর থেকে তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। এসএসসি আর এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ ছিল। সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য কঠোর প্রস্তুতি ছিল। পরীক্ষার প্রশ্নও তার জন্য সহজ ছিল। কিন্তু সে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেই বুঝে যায় হবে না তার। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে—এই গুঞ্জন তার কানে আগেই পৌঁছেছিল। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল গুঞ্জন নয়, এটিই সম্ভবত সত্যি। তার কেন্দ্রেই কেউ কেউ আনন্দে উদ্বেল হয়ে আছে ১০০টির মধ্যে ১০০টি অবজেকটিভ প্রশ্ন কমন পড়েছে বলে। কীভাবে সম্ভব এটি? পরীক্ষাকেন্দ্রেই নির্দ্বিধায় বলাবলি হয়েছে যে প্রশ্ন পেয়েছিল কেউ কেউ পরীক্ষার আগে। ফেসবুকে সেই প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল। এবার আগেই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে উল্লসিত কারও কারও ফেসবুকের কথোপকথনের স্ক্রিনশট এল মেয়েটির প্রোফাইলে।
মেয়েটি আমার স্ত্রীর নিকটাত্মীয়। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার স্বপ্নভঙ্গের পর সে কারও সঙ্গে কথা বলেনি। নিজের ফেসবুকে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাস দিয়ে সে তার হাহাকারের কথা জানিয়েছে। তার প্রশ্ন: আগে প্রশ্ন পেয়ে নকলভাবে যারা পাস করেছে, তাদের কী অধিকার আছে ডাক্তারি পড়ার? মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। এবারও এটি হওয়ার পর সে লিখেছে, এ দেশে পড়াশোনা করার ইচ্ছাই চলে গেছে তার!
এই মেয়েটির মতো লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন হরণ করা হয়েছে এসএসসি, এইচএসসি, ভর্তি, নিয়োগের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অজস্র ঘটনায়। বহুবার এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে, বহু প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, বহু ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিছুতেই সরকারের টনক নড়েনি। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এবার যা হলো—এত প্রমাণ, এত প্রতিবাদ আর এত লেখালেখি—তারপরও কি কিছুই হবে না?
আমরা কি তাহলে আমাদের সন্তানদের এই বার্তাই দিচ্ছি যে পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই, নিজের ভাগ্য গড়তে হলে জালিয়াতি করা শিখতে হবে? যারা জালিয়াতি করতে পারবে, তারাই ভালো জায়গায় পড়বে, ভালো চাকরি পাবে? যাদের জালিয়াতি করার বা অসৎ হওয়ার মানসিকতা বা রুচি নেই, তাদের বুকে রক্তক্ষরণ নিয়ে বাঁচতে হবে, হয়তো সারা জীবন এর মাশুল দিতে হবে নানাভাবে?
আর যারা বিভিন্ন পরীক্ষায় জালিয়াতি করেছে বা করবে, তাদের পাপের মাশুল দিতে হবে গোটা জাতিকে। যদি ১০০ জনের মধ্যে অর্ধেকও হয় এমন, তাহলে এরা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে করতে নিজেরাই বড় জালিয়াত আর দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠবে। অন্তত তা হওয়ার প্রণোদনা পাবে। মেধা নয়, জালিয়াতি আর চৌর্যবৃত্তিকে এভাবে পুরস্কৃত করে আমরা এ কোন অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি আমাদের তরুণ সমাজ আর দেশকে?
২.
আমাদের প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। আবার তিনিই বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন কি না, তা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে খতিয়ে দেখা হয়নি। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, খতিয়ে দেখার আগে উনি প্রশ্ন ফাঁস হয়নি এই দাবি করেন কীভাবে? প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে—এমন অভিযোগকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের জন্য এত দক্ষতা সরকারের যেসব এজেন্সি দেখাতে পারে, তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের নমুনা পাচ্ছে না, তা তো হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অবশ্যই সরকারের জানার কথা। প্রশ্নপত্র ফাঁস তাই বলে শিক্ষামন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রীর নির্দেশে হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও হতে পারে না। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বেপরোয়া অন্যায় করতে হলে সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কারও কারও সঙ্গে যোগসাজশ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
আমাদের মনে আছে, ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দপ্তর থেকে কমিশনের সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজ, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ভান্ডাররক্ষক রেজাউল করিম ও তাঁদের সহযোগী ঈশান ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যা ব। তখন র্যা ব জানিয়েছিল যে এই চক্রটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে ১৫ লাখ টাকা, জুডিশিয়াল সার্ভিসে নিয়োগ দিতে ১০ লাখ টাকা এবং কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ছয় লাখ টাকা করে নিত।
র্যা ব তখন দাবি করেছিল, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই চক্রটির মূল হোতা ওমর সিরাজ। র্যা বের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ৩ অক্টোবর তিনি মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠছে, এটি কেন ঘটল? ওমর সিরাজের বিচারকাজ সম্পন্ন হলে ভুয়া প্রশ্নপত্র তৈরি বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো সম্পর্কে অনেক প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যেত। এমন একজন ব্যক্তি র্যা বের রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অন্যদের নাম জানার সুযোগ থাকল না। এই মৃত্যু স্বাভাবিক কারণেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্মমতাও বিস্ময়কর। এই প্রতিবাদকারীরা সরকারের পতন চায়নি, সরকারবিরোধী কোনো স্লোগান দেয়নি। তারা শুধু তদন্ত আর পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। এই দাবির উত্তর কি রাইফেলের বাঁট দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো আর মেয়েদের চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া হওয়া উচিত? তাহলে কি এমন কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তি এতে জড়িত যে কোনো সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠলে যেভাবেই হোক তার কণ্ঠরোধ করতে হবে?
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একবার বলেছিলেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস সরকারের জীবন-মরণ সমস্যা। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো অভিযোগ উঠেছে এমন একটি পরীক্ষাও বাতিল করা হয়নি কেন? কেন বছরের পর বছর ধরে এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না? কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বহু প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি? জামিলুর রেজা চৌধুরী, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালসহ বহু বরেণ্য ব্যক্তি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নানা প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব পরীক্ষা করে দেখা দূরের কথা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে আন্তরিক ও অর্থবহ কোনো পরামর্শসভাও সরকারকে আমরা আহ্বান করতে দেখিনি।
৩.
প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপাশি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নানা বৈষম্যের অভিযোগ আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছি। বিএনপি-জামায়াত আমলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌখিক পরীক্ষাকালে বৈষম্যের শিকার হতেন বলে অভিযোগ ছিল। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এমন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ শোনা যায়। এ ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের প্রতি অবিচারের অভিযোগও বহু পুরোনো। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এসব বৈষম্যের সংস্কৃতি এখন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে ছাড়িয়ে প্রায় সর্বজনীন হতে চলেছে। অন্ধ দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রকোপে সাধারণ নির্বিরোধী তরুণ সমাজও এখন নানা অনিশ্চয়তার বলি হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলছি, কিছুদিন আগে বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছিল। এই পরীক্ষার জন্য প্রায় আড়াই বছর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। নানা ধাপের পরীক্ষা শেষে লিখিত পরীক্ষার ফল যখন বের হলো, দেখা গেল মেধা আর কোটায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের আলাদা করার কোনো উপায় নেই। কোটাধারীদের উৎপাতে এমনি সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের ঢোকার সুযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। মেধা আর কোটার আলাদা তালিকা না থাকার কারণে এবার আর বোঝারই উপায় রইল না যে আসলে মেধাবীদের ঠিক কতটুকু সুযোগ দেওয়া হলো, আর কতটুকু কোটার নামে পছন্দের প্রার্থীদের চাকরিতে ঢোকানোর জন্য রাখা হলো। পিএসসিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানাল যে তাড়াহুড়া করে রেজাল্ট প্রস্তুত করার কারণে আলাদা কোনো তালিকা তৈরি করা যায়নি!
এত বড় খামখেয়ালিপনা নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হলো না দেশে। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নন-ক্যাডার নামের যে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তার অস্বচ্ছতা নিয়েও কথা বলি না আমরা। অথচ ভুক্তভোগীরা জানেন এসবের কত যন্ত্রণা। আমাকে একজন মেইল করেছেন। তাঁর কথাই তুলে ধরছি: ‘কত নির্ঘুম রাত, কষ্ট, পরিশ্রম আর সাধনার ছিল ৩৪তম বিসিএস। ২৯ আগস্ট রাত ৯টায় আমাদের সেই সাধনা, কষ্ট আর অমানুষিক পরিশ্রম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা হলো। নন-ক্যাডার নামক প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করা হলো ৬১৮৫ জন মেধাবীর সঙ্গে। প্রিলি, রিটেন, ভাইভা পাস, কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে চাকরি নেই। তাহলে ২.৫ বছর আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিল কেনো? পদ স্বল্পতা বলছে অথচ রেজাল্ট নিয়ে কি কারচুপি হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মেধা আর কোটা আলাদা না করে মনগড়া রেজাল্ট দিয়েছে!’
হতে পারে এসব অভিযোগে অতিশয়োক্তি রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বা নিয়োগ দুর্নীতির কিছু অভিযোগ সত্যি না–ও হতে পারে। কিন্তু ১০টি পরীক্ষার মধ্যে সাত–আটটিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে বাকিগুলোতেও ফাঁস হয়েছে—এই আশঙ্কা জাগাই স্বাভাবিক বঞ্চনাবোধ রয়েছে এমন তরুণদের মধ্যে।
এমন বঞ্চনাবোধ দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের মধ্যে হতাশাবোধ জাগাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানা অনিয়মের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের মধ্যে নৈতিকতাবোধের মারাত্মক সংকট তৈরি করছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটানো অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য পদক্ষেপের সূচনা হতে পারে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করা এবং অন্তত উত্তীর্ণ ও অপেক্ষমাণ তালিকাভুক্তদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
মূল কথা হচ্ছে, একটা কিছু সরকারকে করতেই হবে। ভর্তি, নিয়োগ আর স্কুল সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও নানা দুর্নীতির অভিযোগ একটি জাতি অনাদিকাল বহন করতে পারে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাসিনা-খালেদার মেরূকরণের কারণেই বাংলাদেশে হুমকি দানা বেঁধে উঠছে by ভয়েস অব আমেরিকা

ওয়াশিংটনে গবেষণা সংস্থা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লিসা কার্টিজ বলেছেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদীরা রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। বাংলাদেশে সমপ্রতি দুজন বিদেশী নাগরিককে গুলি করে হত্যা, তার আগে ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে সাক্ষাৎকারটি নেন রোকেয়া হায়দার।
বাংলাদেশে চলতি বছরের শুরুতে এবং গত বছর ব্লগার লেখকদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। গত সপ্তাহেই দেশের দুই প্রান্তে দুজন বিদেশী নাগরিক- ঢাকায় একজন ইতালিয়ান ও রংপুরে একজন জাপানিকে উগ্রপন্থিরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। এবং আইসিস এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি করছে। বর্তমান ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে তার বিশ্লেষণ কি? এই প্রশ্নের জবাবে লিসা কার্টিজ বলেন- বাংলাদেশে একটা হুমকি দানা বেঁধে উঠছে। এবং আমি মনে করি যে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বর্তমানে যে ধরনের মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে সেটাই এর মূল কারণ। এবং উগ্রবাদীরা সেই পরিস্থিতির এবং রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে।
আইসিসের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সে বিষয়ে তার ধারণা কি?
তিনি বলেন, আমি মনে করি এই মুহূর্তে সঠিকভাবে এটা বলা সম্ভব নয় যে আইসিসের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কি নেই। স্থানীয় মানুষজন আইসিসের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করছে কিনা, অথবা আইসিস সে দেশে কোনভাবে কাজ শুরু করেছে কিনা তাও বলা যায় না। তবে এই আশঙ্কা রয়েছে যে বাংলাদেশে উগ্রবাদ বেড়ে চলেছে এবং সরকারকে অবশ্যই তার মোকাবিলা করতে হবে। এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এই তদন্ত কাজে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে, এবং এক্ষেত্রে বাইরের একটা যোগাযোগ থাকতে পারে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত।
শুধু কি রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলেই উগ্রবাদ বেড়ে চলেছে, নাকি বাইরের কোন প্রভাব এর কারণ?  হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো কার্টিজের বক্তব্য, আমি মনে করি ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা এবং আইসিস উভয়েই হয়তো  শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি রক্ষণশীলদের ক্ষোভের মধ্যে একটা সুযোগ দেখতে পাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামির মতো দলের ক্ষুব্ধ মনোভাব তাদের মতো বাইরের দলকে বাংলাদেশে প্রবেশে   সম্ভবত একটা সুযোগ করে দিচ্ছে। এই হামলা দক্ষিণ এশিয়ায় আল-কায়েদা ও আইসিসের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতারও প্রতিফলন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, উগ্রবাদ দমনে যে কোন যৌথ প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে। তিনি সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে  যৌথ উদ্যোগের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানিয়েছেন যে ইসলামিক স্টেটকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে তাদের কাছে সকল ব্যবস্থা রয়েছে। লিসা কার্টিজ মনে করেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানের এই হামলা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। বাংলাদেশ অবশ্যই সেই ২০০৫ সালে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের জেএমবির মতো উগ্রবাদী গ্রুপ যারা একই সঙ্গে পরপর কয়েক শ’ বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, তার মোকাবিলা করতে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তবে আমি মনে করি কোন  রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া পূর্ণ তদন্ত করতে হবে। কারা এর সঙ্গে জড়িত। কারা তাদের উৎসাহ যোগাচ্ছে। কার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। কারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে। সুষ্ঠুভাবে সবকিছু অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ জানতে পারবে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, কি করতে হবে।
লিসা কার্টিজ আরও বলেন, ‘আমি অবশ্যই উল্লেখ করবো যে বাংলাদেশ একটি মধ্যপন্থি মুসলিম গণতান্ত্রিক দেশ। অন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে অধিক সংখ্যায় মহিলারা যোগ দিচ্ছেন। তাই আমি অবশ্যই মনে করি যে বাংলাদেশ তার চলতি সমস্যা, হুমকি কাটিয়ে উঠতে পারবে, তার সেই সঙ্গতি আছে। তবে সরকারকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রেখে অনুসন্ধান কাজ চালাতে হবে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে এসব হামলার কারণ তদন্ত করে দেখতে হবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না by মো. তৌহিদ হোসেন

দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনাটি দেশে-বিদেশে আলোচিত। নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করা হলো সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ দুটি হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, পরিকল্পিত হত্যা। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুটি দেশের কিংবা সার্বিকভাবে পশ্চিমা কূটনীতিকেরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সেটি অস্বাভাবিক নয়। যেকোনো দেশ তার নাগরিকদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হবে, নিরাপত্তা চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো ঘটনার পরপরই যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাদের নাগরিকদের চলাফেরার ওপর যে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে, সেটা একটু বেশি বলেই মনে হয়।
এমনকি অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত করেছে ইতালির নাগরিক হত্যার আগেই। তাদের কাছে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে সেটি বাংলাদেশকে জানাতে পারত। বরং আমরা দেখলাম, তাদের নিরাপত্তা দল এসে এখানে সরেজমিনে সবকিছু দেখে গেছে, তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। এরপরই অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ড তাদের ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত করার কথা জানিয়ে দেয়।
যেকোনো রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশি-বিদেশি সব নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া। সেই সঙ্গে এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা কেবল বাংলাদেশে ঘটছে না, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ঘটে থাকে। অস্ট্রেলিয়া যেদিন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত করল, সেদিনই সে দেশের পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে দুই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কলেজে ১০ জন নিহত হয় সন্ত্রাসীদের হাতে। তাই বলতে হবে যে সন্ত্রাসের সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা।
এ ধরনের ঘটনার দুটি দিক আছে। একটি কূটনৈতিক, আরেকটি নিরাপত্তাবিষয়ক। নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটি নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা ভালো বলতে পারবেন।
তবে একজন কূটনীতিক হিসেবে বলতে পারি, দুই বিদেশি নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যতই বেদনাদায়ক হোক, তা সংশ্লিষ্ট দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে বলেই আমার বিশ্বাস। এ দুটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও সতর্কতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করবে আশা করা যায়। ইতিমধ্যে কূটনৈতিক এলাকাসহ যেসব জায়গায় বিদেশিরা কাজ করছেন, সেসব এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এরপরও গুলশান-বারিধারা এলাকায়, যেখানে অধিকাংশ কূটনৈতিক স্থাপনা ও কূটনীতিকের বাস, নিরাপত্তা আরও জোরদার করা যেতে পারে। সেখানে সাধারণের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ জারি করা যাবে না সত্য, তবে নজরদারি বাড়ানো উচিত। নিরাপত্তার দুটি দিক: প্রকৃত বা দৃশ্যমান নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা পারসেপশন বা ধারণা। সেই ধারণার উন্নয়নে সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বলি। বিদেশে আমি সবশেষ দায়িত্ব পালন করি দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে। সেখানে আমার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। তাই বলে কি বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক খারাপ হয়েছে? এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখতে হবে।
আর নিরাপত্তার ধারণা বা পারসেপশনের কথা বললাম, এর উন্নয়নে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেসব পদক্ষেপ দিয়েছে বা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, সেগুলো সম্পর্কে তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাবে। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেগুলো নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করবে।
ঘটনাবলির সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সচিব দেশের বাইরে ছিলেন। তাঁরা দেশে ফিরেছেন। প্রধানমন্ত্রীও বিদেশ থেকে এসে সংবাদ সম্মেলন করে এ ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই বক্তব্যের আলোকে বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিং করতে পারে; যার উদ্দেশ্য হবে বিদেশি কূটনীতিকদের আশ্বস্ত করা। নিরাপত্তার ব্যাপারে তাঁদের কোনো বাড়তি চাহিদা থাকলে সেটিও পূরণ করা। আমার ধারণা, গত কয়েক দিনে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং না হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কূটনীতিকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলেছেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিলও করেছে।
নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব প্রধানত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আমাদের প্রত্যাশা, তারা এ ব্যাপারে আরও সক্রিয় হবে, বিভিন্ন বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে। অপরাধীরা যাতে দ্রুত গ্রেপ্তার হয়, সে ব্যাপারে তাদের সর্বাত্মক
প্রয়াস নিতে হবে। এর আগে সৌদি কূটনীতিক হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হয়েছিল। এ ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হবে না আশা করি।
মো. তৌহিদ হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব।

রাজনৈতিক আপস অর্থনৈতিক উন্নতিরও সোপান by সুজিত চৌধুরী

জার্মানিকে বিভক্তকারী বার্লিন দেয়ালের
পতনের ক্ষণে জার্মান সংহতি
রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যর্থতা কত বড় বিপর্যয় নিয়ে আসে, জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্র ছিল তার উদাহরণ। ওই বিপত্তির জেরেই হিটলারের ফ্যাসিবাদ জার্মানির ঘাড়ে চেপে বসেছিল। ১৯১৯-এর জার্মানির প্রথম রিপাবলিক অর্থবহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করেও শেষ করতে পারেনি। দলীয় স্বার্থদ্বন্দ্ব প্রাতিষ্ঠানিক উপরিকাঠামো তৈরি করতে দেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভাইমারের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক রিপাবলিকের যাত্রা শুরু করে জার্মানি। অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত বিভক্ত দেশটি যে পুনর্গঠনের রাজনীতি দাঁড় করিয়েছিল, তা অভূতপূর্ব। আগে পূর্ব জার্মানিতে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির একদলীয় শাসন এবং পশ্চিম জার্মানিতে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক রিপাবলিকের গণতন্ত্রের মহড়া। পশ্চিম জার্মানির দলীয় রাজনীতি ১৯৪৫ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার যে ভিত্তি তৈরিতে সমর্থ হয়েছিল, তা আজ ২৫ বছরের ঐক্যবদ্ধ জার্মানিকেও সরাসরি প্রভাবিত ও পরিচালিত করছে।
পশ্চিম জার্মানিতে কোনো দিন কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত জার্মানিতে কোয়ালিশন সরকারব্যবস্থা চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রথম চ্যান্সেলর কনরাড আভেনাওয়ার কোয়ালিশন সরকার গঠনে বাধ্য হয়েছিলেন। বৃহৎ খ্রিষ্টান ডেমোক্র্যাটরা লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কোয়ালিশন করেছিলেন। এই কোয়ালিশন রাজনীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিশ্চয়ই ছিল। জনসাধারণ ফ্যাসিবাদী একদলীয় স্বেচ্ছাচারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এরপর আর কোনো দলকে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি। জার্মান ভোটারদের ব্যতিক্রমধর্মী এই আচরণ গণতন্ত্রের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। জাতিগত ও আন্তর্জাতিক সব সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে আপস দরকার। একমাত্র কোয়ালিশন প্রয়োজনবোধে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হয়।
বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল গ্র্যান্ড কোয়ালিশন পরিচালনা করছেন। মেরকেলের খ্রিষ্টান ডেমোক্রেটিক পার্টি কোয়ালিশন করেছে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে। তাই এটা গ্র্যান্ড কোয়ালিশন। এটাই সেখানে জাতীয় ঐকমত্যের বৃহত্তর ভিত্তি। মেরকেল শরণার্থী সমস্যার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন ব্যাপক জনমতের সমর্থনেই। এতে মেরকেলের রক্ষণশীল দলের বাভারীয় অংশীদাররা কিছুটা জটিলতা বাড়ালেও সোশ্যাল ডেমোক্রেসির পূর্ণ সহযোগিতা তিনি পেয়ে যাবেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে জার্মান সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে বিশেষভাবে এই গ্র্যান্ড কোয়ালিশনের কারণে।
মেরকেলের সহযোগী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি জার্মানির প্রাচীনতম দল, বয়স ১৫০-এর বেশি। ১৮৮৫ সালে জার্মান প্রথম চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্ক জার্মানিতে সামাজিক বিমা-ব্যবস্থা প্রচলনে বাধ্য হন এই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির চাপেই। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির শ্রমিক নেতা ড. ফার্ডিনান্ড লাসাল লাইপজিগ শহরে পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক সংগঠন করেন। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে বিখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক স্টেফান হাইমের একটি ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাসও আছে। লাসালের সঙ্গে বিসমার্ক দেখা করতেন, দাবা খেলতেন এবং বন্ধুত্ব রাখতেন। বিসমার্কের ওপর লাসালের প্রভাব উপেক্ষা করার নয়। অন্যদিকে মার্ক্স ও লাসাল তাত্ত্বিক বিষয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের বন্ধুত্বও রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই সহযোগ ও বন্ধুত্বও একধরনের কোয়ালিশন বা সমঝোতামূলক আপসের নিদর্শন।
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ট ছিলেন যুদ্ধোত্তর জার্মানির প্রথম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির চ্যান্সেলর। তিনি তখন বিশাল আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছিলেন। একদিকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জার্মান জাতির অপরাধের ভার কমানো, অন্যদিকে ঠান্ডা যুদ্ধে বিভক্ত পৃথিবীতে সহযোগিতার সেতু তৈরি করা। ব্রান্ট জার্মান সামাজিক বিতর্ককে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পোল্যান্ডের ওয়ারশতে শহীদ মিনারে হাঁটু গেড়ে বসে জার্মান জাতির পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। বার্লিনের ১৯৬৮-৬৯ সালের ছাত্র-যুব আন্দোলনেও ছিল জাতীয় আত্মশুদ্ধি ও পুনর্গঠনের চেতনা। এই সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই উইলি ব্রান্ট ১৯৬৯ সালে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। তাঁরও ছিল জার্মান লিবারেল পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন।
সময়ের ব্যবধানে ব্রান্ট ও মেরকেলের চ্যালেঞ্জে কিছুটা অমিল থাকতে পারে, তবে মিল অনেক। শরণার্থী সমস্যা পরিচিত আন্তর্জাতিক সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। সিরিয়া গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। ইরাক যুদ্ধবিধ্বস্ত। লিবিয়ার সমাজও যুদ্ধবিধ্বস্ত। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দায় প্রশ্নাতীত। বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর ইউরোপ অভিমুখে আশ্রয়যাত্রা ওই যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের রপ্তানি করা যুদ্ধের ফসল। অ্যাঙ্গেলা মেরকেল অবশ্যই ইউরোপীয় স্বার্থ রক্ষা করছেন। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা এখন বিশ্বায়িত সমস্যা। রাজনৈতিক বা মানবিক যে কারণেই হোক, শরণার্থী সমস্যার মুখোমুখি সবাইকে দাঁড়াতে হবে। মেরকেল তাই সামনে দাঁড়াচ্ছেন। যেমন ১৯৬০-৭০ দশকে উইলি ব্রান্ট দাঁড়িয়েছিলেন। তখনো জার্মানিতে অনেকেই ব্রান্টের পক্ষে ছিলেন না। ব্রান্ট আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু না করলে জার্মানির প্রতি প্রতিবেশী দেশগুলোর আস্থা ফিরে আসত না। সোভিয়েত ইউনিয়নের দুই কোটি মানুষ হিটলারের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। ব্রান্ট পূর্ব ইউরোপের হিটলার কর্তৃক অত্যাচারিত সমাজগুলোর প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
ব্রান্টের পূর্বমুখী আত্মশুদ্ধির রাজনীতির প্রেক্ষাপট ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ও সমাজগুলো জার্মান রাষ্ট্রীয় ঐক্য মেনে নিত না। গরবাচেভ দেয়াল খুলে দিলেও নতুন নতুন দেয়াল তৈরি হতো। মেরকেলের বর্তমান ভূমিকার হিসাব-নিকাশ হবে অনেক পরে। এমনও তো হতে পারে, শরণার্থী সমস্যার ব্যাপকতা ও অর্থনৈতিক চাপে জনমত উল্টে গেল। মেরকেল পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু ইউরোপীয় বিশ্বে এবং বিশ্বের কাছে ইউরোপের দায়বদ্ধতা নিয়ে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ একদিন হবে, তাতে অবশ্যই শরণার্থী বিষয়ে মেরকেলের ভূমিকা আলোচিত হবে। তা ব্রান্টের ওই পূর্বমুখী ও আত্মশুদ্ধির রাজনীতির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রাজনীতির এই জার্মান পথ বহুমুখী ও বিচিত্র। মোদ্দাকথা, জার্মানির যুদ্ধোত্তর সমাজ কোয়ালিশন ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান করেনি। সবুজ দলের উৎপত্তি হলো ১৯৮০-র দশকে। জার্মানি ছাড়া ইউরোপের অন্য কোনো দেশে পরিবেশবাদী সবুজ দল এত শক্তিশালী ছিল না। সবুজ দল তো পুরো জার্মান সমাজ পাল্টে দিল। জার্মানিতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ে যুক্তিতর্ক সামাজিকীকরণ হয়ে গেছে। এই আলোচনায় উত্তেজনা আর নেই। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে সবুজ দল কোয়ালিশন করেছিল ১৯৯৮ সালে। তারপর জার্মানি ক্রমান্বয়ে পরমাণু শক্তি থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কয়লা ছাড়া জার্মানির বিশেষ কোনো খনিজ সম্পদ নেই। তেল নেই, গ্যাস নেই। সব আমদানি করতে হয়। এখন বিশাল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে সৌর ও বায়ুশক্তির জন্য। এখন ট্রেনে চড়ে জার্মানি ঘুরলে অনেক জায়গায় বায়ু এনার্জির সাদা বড় খুঁটিগুলো দেখা যায়। ওই সব বিবর্তনের কারণ সবুজ দলের উত্থান। সবুজ দল পরিবেশ প্রশ্নকে ক্লাসরুম থেকে ফেডারেল সরকারের কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছে। তা–ও সম্ভব হয়েছে কোয়ালিশন রাজনীতির কারণে।
সারমর্মে একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানির ব্যর্থ ও ভয়ংকর কাজগুলো সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর আপসহীনতা ও একচেটিয়াপনার জন্য। জার্মানির যা কিছু অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সব সম্ভব হয়েছে সামাজিক আপসে। জার্মান অর্থনৈতিক মডেলকে বলা হয় রাইন নদীর মডেল। এই পৃথিবীকে চমকিত করা রাইন মডেলে মালিক-শ্রমিক সহযোগিতার মাধ্যমে জার্মানি অর্থনৈতিক উন্নয়নের শীর্ষে উঠতে পেরেছে। এটাও একধরনের অর্থনৈতিক কোয়ালিশন। আপস উন্নয়নের পথকে সুগম করে। জার্মানি তার প্রমাণ। জার্মান ঐক্যের ২৫ বছর পূর্তিতে জার্মানির ঐক্য-উৎসবেও সেই সত্য প্রতিফলিত।
সুজিত চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশে জার্মান দূতাবাসের সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা। এখন জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার উপকূলীয় পরিবেশ প্রকল্পের উপদেষ্টা।

ক্ষমাপ্রার্থী ওবামা

আফগানিস্তানের কুনদুজ শহরে হাসপাতালে বিমান হামলার ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা এমএসএফের প্রেসিডেন্ট জোয়ান লিউয়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ওবামা।
এমএসএফ পরিচালিত ওই হাসপাতালে গত শনিবার মার্কিন বিমান হামলায় ২২ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এতে হাসপাতালটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন এ হামলার ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে এমএসএফ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, এটা একটা ভুল ছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জোশ আর্নেস্ট বলেন, এমএসএফের প্রেসিডেন্টের কাছে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন ওবামা। মুখপাত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আমরা যখন ভুল করি, আমরা সে বিষয়ে সৎ। আমরা তা স্বীকার করি।’
ওই হামলায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়েও ইঙ্গিত দিয়েছেন আর্নেস্ট।
এমএসএফ এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি বলেছে, তারা এখনো ওই হামলার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করছে।

মুখের কথায় চিড়া ভেজে না by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যিশুখ্রিষ্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে চৈনিক রণকৌশল বিশেষজ্ঞ বলে গেছেন, একজনকে এমনভাবে হত্যা করো যেন ১০ হাজার মানুষ আতঙ্কে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তাঁর সেই শেখানো বিদ্যা ২ হাজার ৩০০ বছর পরে আজ পৃথিবীর কোনো কোনো গোত্র দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক মাস আগে বিশ্বত্রাস আইএস-এর শিরশ্ছেদ কর্মসূচি। পৃথিবীতে একদিন প্রযুক্তি কোন পর্যায়ে যাবে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না ওই চীনা পণ্ডিতের। বহু মানুষকে গোপনে শিরশ্ছেদ করলে কোনো কথা ছিল না, তেমনটি অতীতে বহু জায়গায় হয়েছে। আইএস রণকুশলীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শত্রুপক্ষের হতভাগ্য মানুষটিকে, যিনি কোনো অপরাধ করেননি, হাঁটু গেড়ে বসিয়ে ধড় থেকে মাথাকে বিচ্ছিন্ন করে। সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচারমাধ্যমের হাতে দিয়ে দেয়। সেই চিত্র শত্রুপক্ষ দেখে যত ক্রুদ্ধই হোক না কেন, ভয়ে বুক যে একেবারে কাঁপেনি তা নয়।
নরহত্যায় মানবজাতির ইতিহাসে আমেরিকার রেকর্ড সর্বোচ্চ। যার যখন খুশি, যাকে খুশি, চেনা হোক, অচেনা হোক, ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে ফেলে দিতে পারে। হাজার হাজার স্কুল-কলেজের নিষ্পাপ ছেলেমেয়েকে ওভাবে দিনদুপুরে হত্যা করা হয়েছে। শুধু বর্তমান বছরেই আমেরিকায় ৪৫টি স্কুলে হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছে শতাধিক, আহত বহু। গত সপ্তাহে সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ওরেগনের এক কমিউনিটি কলেজে। নিহত হয়েছে ১০ জন শিক্ষার্থী। আততায়ীর কাছ থেকে ১৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে ছয়টি কলেজ থেকে এবং সাতটি তার বাড়ি থেকে। সব কটি অস্ত্রই বৈধভাবে কেনা। আমেরিকায় যার যত খুশি আগ্নেয়াস্ত্র কিনে ঘর ভরে রাখতে পারে। যেমন আমাদের কোনো কোনো এমপির ঘরে আছে অবৈধ ‘অস্ত্রভান্ডার’।
আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ওভাবে হত্যাকাণ্ড হওয়ার কথা জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত মাতা–পিতা তাঁদের সন্তানদের আকিকা ও অন্নপ্রাশনের সময়ই ঠিক করে ফেলেন কোথায় পাঠাবেন—নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, মিশিগান না লস অ্যাঞ্জেলেস। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে দেশে প্রতি তিন ঘণ্টায় একজন খুন হয়, সেখানে ‘নিরাপত্তার কারণে সফর স্থগিত’ করছে না কোনো দেশই। আমেরিকান যুদ্ধজোটের সহযোগী অস্ট্রেলিয়া তো নয়ই। বিস্মিত হয়েছি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) বাংলাদেশ সফর স্থগিত করার ঘোষণায়। তার প্রধান নির্বাহীর ঘোষণাটি বেদনাদায়ক, ‘ছয় দিনের ব্যাপক সন্ধান ও গবেষণার পর আমরা এ উপসংহারে পৌঁছেছি যে বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।’ বাংলাদেশের অবস্থা এতই ভয়াবহ যে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে ফুটবল টিমও আসতে চাইছে না।
এই প্রসঙ্গে একটি ইংরেজি প্রবচনের কথাই শুধু স্মরণ করতে পারি: গিভ আ ডগ আ ব্যাড নেম অ্যান্ড হ্যাং হিম—কুকুরটাকে হত্যা করার আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নাম রটাও। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে কোনো দেশকে বেকায়দায় ফেলার বাসনা থাকলে বড় দেশগুলো থেকে রটিয়ে দিলেই হলো যে দেশটিতে প্রচণ্ড সন্ত্রাস, সুতরাং জীবনের নিরাপত্তা নেই। সাধারণ সব নাগরিককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা দিতে না পারলেও বিদেশি ক্রিকেট টিমকে সরকার ভিভিআইপি নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এ অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের নেতাদের ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা কিরোর মতো আগাম অমঙ্গল দেখতে পাওয়াটা বিস্ময়কর শুধু নয়, রহস্যজনকই বটে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়নি। তাদের আশঙ্কার অব্যবহিত পরে ঢাকার কূটনৈতিকপাড়ার কড়া নজরদারির মধ্যেও প্রকাশ্য রাস্তায় নিহত হন এক ইতালীয় এনজিও কর্মকর্তা। ওই ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার আত্মতৃপ্তি লাভ করা স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের সন্তুষ্টির রেশ মিলিয়ে যেতে না-যেতেই বিধাতার কী খেয়াল, সিডনিতে পুলিশের সদর দপ্তরের বাইরে দিনদুপুরে গুলিতে দুজন নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের কথা যখন গাড়ির ভেতরে রেডিওর খবরে শুনি, তখন একজন বলল, অস্ট্রেলিয়াতেও তো নিরাপত্তা নেই। আমি বললাম, তা বটে, তবে শোনোনি কি সেই প্রবাদ যে রাজার পা... গন্ধ নেই?
কূটনৈতিকপাড়ায় একজন বিদেশি উন্নয়নকর্মী গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন—বিষয়টি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য খুবই ক্ষতিকর। ঘটনাটি সভা-সমাবেশে নেতাদের বাহাস করার বিষয় নয়। সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিবিদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বসে যৌথভাবে ও পৃথকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারতেন। তার পরিবর্তে আমরা দেখলাম, কর্মকর্তারা মিডিয়ার সামনে হড়হড় করে বক্তব্য দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের মুখনিঃসৃত যেসব বাণী টিভির পর্দায় ধ্বনিত হলো, তা আরও মাধুর্যমণ্ডিত। অনেকে আভাসে-ইঙ্গিতে নয়, সুস্পষ্ট ভাষায় রায় দিয়ে দিলেন: এটা মা ও ছেলের কাজ এবং বিদেশে বসেই তা করা হয়েছে। বাংলাদেশে কে মা আর কে তাঁর ছেলে, তা মানুষের বোঝার মতো আক্কেল যথেষ্ট। এবং কোন মা ও তাঁর ছেলে বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন, তা দুগ্ধপোষ্য শিশু ছাড়া সবাই জানে।
ইতালীয় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো কূলকিনারা না হতেই রংপুর শহরের উপকণ্ঠে কুনিও হোশি নামের এক জাপানি নাগরিক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনিও একজন উন্নয়নকর্মী, যিনি পশুখাদ্য নিয়ে গবেষণা করছিলেন স্বপ্রণোদিত হয়ে। পৃথিবীর কল্যাণে এ ধরনের মানুষের অত্যন্ত প্রয়োজন। তাঁর ওই মর্মান্তিক মৃত্যুর পরেও সরকারি দলের নেতারা মনে যা আসে তা-ই ভাষায় প্রকাশ করে যেতে থাকেন। তাঁদের কথাবার্তায় বিদেশিদের মধ্যে যেমন আস্থার সৃষ্টি হয়নি, তেমনি তাদের শঙ্কাও কাটেনি। যেদিন জাপানি নিহত হন, সেই দিনই এক অনুষ্ঠানে বিদেশি মিশনের কোনো কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্বেগ লক্ষ করি।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিরোধী দলের বাইরে বেসরকারি বিরোধী দলও রয়েছে। তারা সরকারে নেই তা জানি, কিন্তু জনগণের সঙ্গেও আছে কি না, তা বোঝা যায় না। ওই দলের যেহেতু আর কোনো কাজকাম নেই, তাই তারা প্রতিদিন আসরের নামাজের আগে মিডিয়াকে কিছু বাণী উপহার দেয়। সে বাণী মাগরিবের নামাজের পরপর প্রচারিত হয়। তারা পাঁচ দুগুণে দশ বছর ক্ষমতায় ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বা আইজেনহাওয়ার কিংবা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল বা মার্গারেট থ্যাচারের চেয়ে কম নয়। কিন্তু তারা সরকারের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়েই খালাস। সব ব্যাপারে তাদের কথা বলার দরকার কী এবং কে তাদের কথা শুনতে চায়। মনে হয়, তাদের আমলে একজন মানুষও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়নি। তাদের দ্বিতীয় মেয়াদে যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তিনি ছিলেন স্মরণকালের সবচেয়ে সুযোগ্য মন্ত্রী। বিএনপিতে বহু দক্ষ সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁদের কাউকে নিয়োগ না দিয়ে খালেদা জিয়া প্রথমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বসান এক বিধ্বস্ত মুসলিম লীগ নেতাকে এবং পরেরবার তাঁর পুত্রের অভিন্নহৃদয় বন্ধুকে, শারীরিক কারণে যাঁকে ঘন ঘন চিকিৎসা নিতে ব্যাংককে যেতে হতো। তাঁর মন্ত্রিত্বকালে স্মরণকালের বীভৎস ঘটনা ঘটে একুশে আগস্ট। বিস্ফোরণের দুই ঘণ্টা পরে আমি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গিয়ে দূর থেকে দেখতে পাই রক্ত ও শত শত স্যান্ডেল-জুতা। ঢাকা মেডিকেল ও প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে দেখি আহত ব্যক্তিদের যন্ত্রণায় কাতরানি।
সরকারি দল ও বিরোধী দল যা-ই বলুক, মানুষ দেখতে চায় সত্য উদ্ঘাটিত হোক এবং প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ুক। কিন্তু বাংলার মাটিতে তা যে হবে, সে ভরসা নেই। পাবলিক পারসেপশন বা সাধারণ মানুষের যে ধারণা, তার বাইরে মনগড়া কোনো তত্ত্ব খাড়া করতে চাইলে খুব শক্ত যুক্তি-প্রমাণ থাকা চাই। তা না হলে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। যাঁরা রাষ্ট্র চালান, তাঁরা যদি জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারান, তা খুব বড় ক্ষতি।
দুই বিদেশির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গেই গাইবান্ধায় এক শিশু গুলিতে নিহত হতে হতেও প্রাণে বেঁচে গেছে। লিমনের মতো তাকেও পা খোয়াতে হয় কি না বলা যায় না। শিশু রাজনকে হত্যা করেছিল উচ্ছৃঙ্খল জনতা। কিন্তু গাইবান্ধার সৌরভকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন সরকারি দলের সাংসদ। ‘তুই জামায়াত-শিবির করিস, তোরে মারি ফেলব’—এ কথা বলে গুলি চালান অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা আমাদের মাননীয়। পুলিশ হয়তো মাননীয়কে গা–ঢাকা দিতে বা পালিয়ে যেতে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে থাকবে। জনগণ দেখতে চায় যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ড থেকে যে প্রক্রিয়ায় এক মাননীয়কে পুলিশ বাঁচিয়ে দিয়েছে, সৌরভকে যিনি গুলি করেছেন, তিনি যেন সেভাবে দায়মুক্তি না পান।
আমরা যতই বলি বাংলাদেশ একটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ দেশ, ততই কয়েকজন নেতা প্রচার করেন বিরোধী দলের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জঙ্গি গিজগিজ করছে। শত্রুর মুখে শুধু কালি মাখাতে গিয়ে নিজের মুখে চুন ও কালি দুটোই মাখাতে পছন্দ করে বাঙালি। আমাদের যে আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে, তাতে বিদেশিদের ভূমিকা বিরাট। আজ খুনখারাবির কারণে তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হলে উন্নয়ন ব্যাহত হবে। ভুলে গেলে চলবে না, সোয়া কোটি বাংলাদেশি বাস করে বিভিন্ন দেশে। দেশের বিরুদ্ধে বা সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হতেই পারে। তবে কোথায়, কারা, কী ধরনের ষড়যন্ত্র করছে, তা সভা-সমাবেশে বলাবলি না করে তথ্য-প্রমাণসহ জনগণকে জানানোই সরকারের দায়িত্ব। মুখের কথায় চিড়া ভেজে না। দেশবাসী ও বিদেশিরা সরকারের যথাযথ ভূমিকা দেখতে চায়, শুধু মুখের কথা শুনতে চায় না।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

চট্টগ্রামে জেএমবির ‘সামরিক প্রধান’ নিহত : পরিবার বলছে পরিকল্পিত হত্যা

পুলিশের হাতে আটক অবস্থায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদিন (জেএমবি) এর চট্টগ্রামের ‘সামরিক শাখার প্রধাণ’ এর নাম জাবেদ নয়। তার নাম রানা। পুরো নাম তৌফিকুল ইসলাম রানা। সরেজমিনে বুধবার নিহতের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের বেথইর গ্রামে গেলে এ তথ্য পাওয়া যায়। বিকেলে গিয়ে দেখা যায় পুরো গ্রাম জুড়েই নিস্তব্ধতা। সদ্য কৈশোর পেরেনো ন¤্র ভদ্র গ্রামের এ ছেলেটি একটি জঙ্গী সংগঠনের একটা অঞ্চলের ‘সামরিক প্রধান’ এ খবরে হতবাক গ্রামবাসী। আত্মীয় স্বজন ও পরিবারের লোকজন দাবি করছে ‘মেধাবী ছাত্র’ রানাকে জেএমবি সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামে ঢুকার সময় প্রথমেই দেখা হয় এলাকার পৌর কাউন্সিলর মুর্শিদ উদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, আমি সাড়ে তেরো বছর ধরে এ এলাকার কাউন্সিলর। রানাকে আমি ভালোকরেই চিনি। তার মতো নম্র ভদ্র ছেলে আমাদের এলাকায় কমই আছে। সে কোনো রকমের উশৃংখল ছিলো না। ছোট সময় থেকেই সে কোনো ঝুঁট-ঝামেলায় যায়নি। এখন বলা হচ্ছে সে জেএমবি’র ‘সামরিক শাখার প্রধাণ’ এটা বিশ্বাসযোগ্য না।
ঈদ উপলক্ষে গত ২৪ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ রানা গ্রামের বাড়িতে আসে। ৬ দিন কাটিয়ে সে আবার চট্টগ্রাম চলে যায়। ওখানেই সে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা করতো। কলেজে ছুটি পেলেই সে বাড়ি চলে আসতো। মাসে এক দুইবার সে বাড়িতে আসতো। বেথইর গ্রামের কলেজছাত্র আনোয়ার হোসেন (১৮) জানান, বাড়িতে আসলে তার সাথেই মূলত আড্ডা দিতো রানা। আনোয়ার বলেন, গত ঈদের ছুটিতেও বাড়িতে এসে সে আমার সাথেই বেশি আড্ডা দিয়েছে। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, কিন্তু কোনো দিন জেএমবির কথা আমাদের কাছে বলেনি। তার মনোভাবও এরকম ছিলো বলে মনে হয়নি। এলাকার সেলুন মালিক শীতল বর্মণ জানান, বাড়িতে এলে রানা মাঝে-মধ্যে তার সেলুনে এসে বসতো। গত ঈদেও তার সাথে দেখা হয়েছে, সেলুনে এসেছে। শীতল রানাকে ভালো ছেলে বলে দাবি করেন। গতকাল রানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার বৃদ্ধ বাবা জজ মিয়া, মা ফাতেমা বেগম, বড়বোন শিরিন ইয়াসমিনসহ বাড়ির সবাই নির্বাক। পারিবারিক সুত্রে জানা গেছে, সাত ভাই বোনের মধ্যে রানা ছিলো ষষ্ঠ। সবার বড় বোন শিরিন ইয়াসমিন কটিয়াদীর ডা. আব্দুল মান্নান মহিলা কলেজের লাইব্রেরিয়ান। দ্বিতীয় বোন পারভীন গৃহিনী। তৃতীয় বোন জেসমিনও গৃহিনী। এর পরে ভাই সাজ্জাদ হোসেন ঢাকায় একটি প্রিন্টিং কারখানায় চাকরি করেন। আরেক ভাই কনক মিয়া দুবাই প্রবাসী। রানার ছোট জেমিল আক্তার এ বছর এইচএসসি পাশ করেছে। বাবা মো: জজ মিয়া (৬৭) বাড়ির সামনে একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন। কৃষি জমিও আছে। মা গৃহিনী। মধ্যবিত্ত পরিবার। তাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে জানা গেছে।
বড়বোন শিরিন ইয়াসমিনের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। শিরিন বলেন, আমাদের সাত ভাই বোনের মধ্যে রানা ছিলো ছোট সময় থেকেই মেধাবী। তাই আমার ইচ্ছাতেই রানাকে আমি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি করাই। রানা এলাকার রইছ মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে। পরে কটিয়াদী ভোকেশনাল ইনাস্টটিটিউটে ভর্তি করানো হয় তাকে। ২০০৯ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাশ করলে চট্টগ্রামের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তাকে ভর্তি করাই। রানা সেখান থেকে আই এসসি শেষে নারায়নগঞ্জে একটি টেক্সটাইল মিলে ইন্টার্নি করে। বিএসসিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে সে কোচিং করছিলো। সেই সাথে টিউশনিও করতো। শিরিন ইয়াসমিন বলেন, প্রতি মাসে তাকে পড়ালেখার খরচ হিসেবে আমরা বাড়ি থেকে টাকা পয়সা পাঠাতাম। বেশিরভাগ আমিই দিতাম টাকা। আমাদের স্বপ্ন ছিলো রানা পড়ালেখা শেষে চাকরি করে সংসারের হাল ধরবে। শিরিন ইয়াসমিন বলেন, আমার ভাই আমার ভাই জেএমবির সাথে কোনোভাবেই জড়িত না। তাকে পরিকল্পিতভাবে পুলিশ হত্যা করেছে। সে যদি জেএমবি হতো, পুলিশ এটা প্রমাণ করতে পারতো। কিন্তু তাকে সামরিক শাখার প্রধাণ সাজিয়ে পুলিশ তাকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে। আমরা শেখ হাসিনার কাছে এর বিচাই চাই। রানা দুই একদিন পরপরই বাড়িতে ফোন দিয়ে বৃদ্ধ মা বাবাসহ বাড়ির লোকজনের খোঁজ খবর নিতো। সর্বশেষ তার ছোট বোন জেমিল আক্তারের সাখে কথা হয় রানার। জেমিল বলেন, ভাইয়ার শেষ কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজছে। সে বলেছিলো, এই আমাকে ভাই নয় ইঞ্জিনিয়ার সাব ডাকবি। আমি বিএসসি পাশ করেই বড়সড় চাকরি করবো। তখন তো আমাকে স্যার স্যার করতে হবে।

সিরিয়ায় হামলা নিয়ে দোলাচলে রুশ মুসলিম

রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা রাশিয়ার মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। বিবিসি রাশিয়ান সার্ভিসের এক বিশ্লেষণে এমনটাই বলা হয়েছে।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করে রাশিয়া। মস্কোর ভাষ্য, সিরিয়ায় সক্রিয় ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও অন্য উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর অবস্থান লক্ষ্য করেই তারা বিমান হামলা চালাচ্ছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধী মধ্যপন্থী সরকারবিরোধী এবং বেসামরিক লোকজন রুশ বিমান হামলার শিকার হচ্ছে।
সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা নিয়ে রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় তিন ভাগে বিভক্ত। একদল ক্রেমলিনকে সমর্থন করে, একদল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মিত্রদের নিন্দা করলেও আইএসের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সমর্থন করে, আরেকটি দল আইএসকে সমর্থন করে।
২০১১ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মুসলমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা দুই কোটির মতো হতে পারে, যা রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ।
রাশিয়ায় ৮০ জনের বেশি মুফতি আছেন, যাঁরা দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু তাঁদের প্রভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিতে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
রাশিয়ার সাত হাজার মসজিদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৪০০টি মসজিদ এমন সব মুফতি নিয়ন্ত্রণ করেন, যাঁরা কমবেশি সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি অনুগত। তাঁরা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। এ কারণে ক্রেমলিনপন্থী মুফতিরা তাঁদের বিবৃতিতে সিরিয়ায় রুশ হামলার বিষয়ে পশ্চিমা অভিযোগের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি।
রাশিয়ার কিছু ধর্মীয় নেতা পুতিনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের একজন মুফতি নাফিগুল্লা আসহিরভ। সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা প্রসঙ্গে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা জানি না, ঠিক কোথায় বোমাগুলো পড়ছে। তাই আমরা কোনো কিছুর ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না।’
নাফিগুল্লা আসহিরভ বলেন, রুশ বিমান যদি আইএসের অবস্থানের পরিবর্তে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কোনো একটি পক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাশিয়ার এই মুফতির ভাষ্য, আইএসের সদস্যরা বিদেশ থেকে সিরিয়ায় এসেছে। সিরিয়ার মানুষের উচিত আইএসকে প্রতিহত করা। কিন্তু সিরিয়ার সরকারপন্থী ও বিরোধীপক্ষের মধ্যকার গৃহযুদ্ধে অন্যদের নাক গলানো উচিত নয়। এটা সিরিয়ার জনগণের অভ্যন্তরীণ একটা বিষয়। এই সংঘাতকে আইএস দমনের সঙ্গে মেলানো উচিত নয়।
সিরিয়ার অধিকাংশ সরকারবিরোধী যোদ্ধা সুন্নি মুসলমান। রাশিয়ায় বসবাসকারী অধিকাংশ মুসলমানও সুন্নি। অন্যদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ আলাবি শিয়া গোষ্ঠীর মানুষ। এই সব সমীকরণ রাশিয়ার মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছুসংখ্যক সদস্যের কাছে একটা অস্বস্তির বিষয়।
বাশারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিপক্ষ মুসলমানের ওপর দমন-পীড়ন ও চরম পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ তুলে রাশিয়ার মুসলিম অধিকারকর্মী আলী চারিনস্কি, ‘সব মুসলমান একটি সম্প্রদায়, একটি দেহের মতো। এ কারণে রাশিয়ার সিদ্ধান্তে (সিরিয়ায় হামলা) আমরা খুশি হতে পারি না। আমার কোনো বন্ধু বা পরিচিত মুসলমান এতে খুশি নন।’
ধর্মীয় আন্দোলনকর্মী আয়রাত ভাখিতভের ভাষ্য, রাশিয়ার পদক্ষেপের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কিছু বলা প্রায় অসম্ভব। কারণ এতে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্যমতে, প্রায় আড়াই হাজার রুশ নাগরিক বর্তমানে আইএসের পক্ষে লড়ছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্য রাষ্ট্র থেকে হাজারো মানুষ আইএসে যোগ দিতে গেছে।
তবে ভাখিতভের ভাষ্য, খুব কমসংখ্যক রুশ মুসলিমই আইএসকে সমর্থন করে। আর এই সংখ্যা কমছে। সার্বিকভাবে রাশিয়ায় সমর্থন হারাচ্ছে আইএস।

নির্যাতিত কিশোরীরা জানাল ক্ষোভ ও স্বপ্নের কথা

মাঝে মাঝে টুকটাক ইংরেজি, বাংলাদেশ এবং ভারতের মিশ্র বাংলা উচ্চারণে একজন কিশোরী বলল, ‘আমার আপন কেউ আছে তা মনে হতো না। ভারতেও কাউকে বিশ্বাস করতে পারতাম না। এখানেও পারি না। ভগবান, আল্লাহ, মানুষ কেউ নেই আমার পাশে। যারা আমার ক্ষতি করেছে তাদের সম্পর্কে কেন চুপ করে থাকব? বিচার চাই।’
ওই কিশোরী জানাল, তার বাবা মা ছোট বয়সে তাকে অন্য এক পরিবারের কাছে দিয়ে দেন। তারপর ছোট বেলায় ভারতে পাচারের শিকার হয়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি (বিএডব্লিউএলএ) তাকে উদ্ধার করে সমিতির আশ্রয় কেন্দ্রে জায়গা দেয়।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনডব্লিউএলএ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উদযাপন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে আয়োজন করে। সেখানেই কিশোরীরা তাদের জীবনের কথা বলে। ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানায়। রাষ্ট্র ও পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন অধিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের কাছে তারা বিভিন্ন দাবিও জানায়।
শুধু ওই কিশোরীই নয়, আরও অনেকেই জানাল, কীভাবে তারা বিএনডব্লিউএলএর সহায়তায় পাচার, বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। অনেকে বাবা মায়ের কাছেও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এক সময়। এখন বিএনডব্লিউএলএ’র আশ্রয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে। প্রতিবাদ করতে শিখেছে। নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারছে। ভবিষ্যৎ সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। নিজেদের জীবনের কথাগুলো বলতে গিয়ে একেকজন আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। একজনের চোখের পানি পাশে বসা অপর কিশোরীর চোখও ভিজিয়ে দেয়।
একজন কিশোরী বলে, ‘যাদের ক্ষমতা আছে তারাই কন্যাশিশুদের নির্যাতন করে। ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন তাঁর গৃহকর্মীকে নির্যাতন করেছেন। তিনি যদি নির্যাতন করেন তাহলে শিশুরা টিকে থাকবে কেমনে?’
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য পড়ে শোনায় সমিতির আশ্রয়ে থাকা তাহমিনা আক্তার ও সুমি আক্তার।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কথা সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান সেলিনা হোসেন বলেন, ‘তোমরা মাথা তুলে দাঁড়াবে। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির দায়িত্ব নিতে হবে প্রশাসনকে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সমাবেশ করে বলবে-আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’
সেলিনা হোসেন বিশ্বের আলোচিত কিশোরী মালালা এবং জাতিসংঘের ৭০ তম অধিবেশনে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ বিষয়ে ভাষণ দেওয়া বাংলাদেশের কিশোরী মণি বেগমের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সমাজকে মোকাবিলা করে তোমরা তৈরি হলে পরবর্তী প্রজন্মও তৈরি হবে।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি নাট্যব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচী বলেন, ‘তোমাদের জীবনে এর আগে যা কিছু ঘটেছে তা ছিল দুঃস্বপ্ন। আর আজ থেকে যা ঘটবে তা স্বপ্ন। তোমাদের চোখের পানি ফেলার সুযোগ নেই।’
বক্তব্যে বিএনডব্লিউএলএর নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, সমিতির আশ্রয়ে থাকা কিশোরীরা মানব পাচার, বাল্য বিয়েসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়। সাক্ষীর সুরক্ষা না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে এদের অনেকের মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
সালমা আলী এই কিশোরীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিশু আইনের বাস্তবায়ন, মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের বিধিমালা তৈরি, পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে গুরুত্ব দেন।

এক বিমানবালার কাণ্ড

ফাইল ছবি
তিনি এক নারী। বিমানবালা। বিমানে বিমানে ঘুরে বেড়ান দেশের পর দেশ। জানাশোনা হয় কতজনের সঙ্গে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন ওই বিমানবালা। নিজের শরীরকে পুঁজি করে দুবছরে  বেতন বাদেই কামিয়েছেন ৬ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড। বিমানের টয়লেটে তিনি পছন্দের পুরুষের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন শারীরিক সম্পর্ক। এ ঘটনাটি এতদিন কেউ টেরই পান নি। যখন ধরা পড়লেন তিনি তখন অভিযোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোন পথ আর তার কাছে অবশিষ্ট নেই। একই সঙ্গে কপালে জুটেছে নিন্দা, অপমান। সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছেন চাকরিও। ওই বিমানবালার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা হয় নি। তবে এ ঘটনাটি ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি এয়ারলাইন্সে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, তিনি মনোরঞ্জনের জন্য এক একবার বেছে নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষকে। বিমানের ভেতরে যখন যাত্রীরা খোশগল্পে মগ্ন অথবা টেলিভিশন দেখছেন তখন তিনি ওই পুরুষকে ডেকে নিয়ে যেতেন টয়লেটে। সেখানেই আদিম নেশায় মেতে উঠতেন। আরবি ভাষার দৈনিক পত্রিকা ‘ছাদা’র কাছে একটি সূত্র বলেছেন, ওই বিমানবালা তার এ অনৈতিক কাজের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি যাত্রীদের ভেতর থেকে অনেক জন পুরুষকে এভাবে শিকারে পরিণত করেছেন। তবে সব ফ্লাইটে তিনি এমনটা করেন নি। যেসব ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরের পথ যেমন যুক্তরাষ্ট্র যায় সেসব ফ্লাইটে তিনি এ সুযোগ নিতেন। এ ঘটনায় ওই বিমানবালাকে ১৫০০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছে প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য। ওই ফ্লাইটে যত অ্যাটেন্ডেন্ট ছিলেন তাদেরকে বরখাস্ত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

হঠাৎ মারমুখী পুলিশ- মেডিক্যাল ভর্তিচ্ছুদের বিক্ষোভ, লাঠিচার্জ, ফাঁকা গুলি

ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আবারও লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে পিপার স্প্রে নিক্ষেপেরও। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলিও ছুড়েছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে শাহবাগে সড়ক অবরোধের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মুখে মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে কাওরানবাজারে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পুলিশের বাধায় কাওরানবাজার থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফিরে এসে দিনের কর্মসূচি শেষ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এদিকে আজ থেকে সারা দেশে সকল মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা।
গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ভর্তিচ্ছু ও ঢাকা মেডিক্যালের শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা মিছিল করে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে সার্ক ফোয়ারার পাশে প্রথমে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। বাধা টপকে কিছুদূর সামনে এগোবার পর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের ব্যারিকেডে পড়েন আন্দোলনকারীরা। এসময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গলির মধ্যে ঢুকে পড়েন। কিছু শিক্ষার্থী সড়কেই বসে পড়েন। এ সময় রুম্মান নামে এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক অভিযোগ করেন পুলিশ ওই শিক্ষার্থীর মুখে পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করায় তিনি আহত হয়েছেন। কোহিনূর বেগম নামে একজন অভিভাবক বলেন, তাদের ছেলেমেয়েরা শান্তিপূর্ণভাবে মহাখালী অভিমুখে যাওয়ার পথে পুলিশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মুখে পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করে তাদের আহত করেছে। বেশ কয়েকজনকে লাঠিচার্জ করে আহত করেছে। কিন্তু এভাবে আমাদের ছেলেমেয়েদের আন্দোলন থেকে নিবৃত করা যাবে না। বাবুল বিশ্বাস নামে একজন শিক্ষার্থী বলেন, অত্যাচার-নির্যাতন করে তাদের দাবি আদায়ের পথ থেকে সরানো যাবে না। তাদের আন্দোলন চলছে চলবে। তবে উপস্থিত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা লাঠিচার্জ ও পিপার স্প্রে নিক্ষেপের কথা অস্বীকার করেন। প্রায় বিশ মিনিট রাস্তায় অবস্থান করার পর পুলিশ হঠাৎই মারমুখী হয়ে উঠে। ফার্মগেট থেকে আসা একদল পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ। এ সময় ভয়ে আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থী কান্না জুড়ে দেন। সাধারণ পথচারীরাও পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হন। একসময় পিছু হটেন শিক্ষার্থীরা। পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে তারা শাহবাগের দিকে যেতে থাকেন।
এর আগে বেলা সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় তাদের সঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা, অভিভাবক ও বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক আন্দোলনকারীর এই মিছিল শাহবাগ থানার সামনে আসলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের বাধা দেয়। কিন্তু আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। এতে শাহবাগের সব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। তবে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা দেয়নি আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রতিটি রাস্তার মুখে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। বেলা ১টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল)-এর শিক্ষার্থীরা শাহবাগে এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এসময় শিক্ষার্থীরা তাদের করতালি দিয়ে স্বাগত জানান। বিএসএমএমইউ’র শিক্ষার্থী ডা. মীরা রাবেয়া সাংবাদিকদের বলেন, ডাক্তারি পেশা মহান পেশা। এই সৎ পেশায় যোগ্যতা সম্পন্নদেরই আসা উচিত। কিন্তু সমপ্রতি যারা মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়েছে তারা অসৎ ডাক্তার হবে। ভবিষ্যতে এসব ডাক্তাররা সৎ মানুষ হিসেবে সেবা করতে পারবে না। তিনি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান। এদিকে বিকালে শহীদ মিনারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা আজ থেকে সকল মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। কর্মসূচি ঘোষণা করেন সলিমুল্লাহ মুসলিম মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজ্জাকুল ইসলাম। একই সঙ্গে আরেক সংবাদ সম্মেলন থেকে আন্দোলরত শিক্ষার্থীদের আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, আজ সকাল ১১টায় শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবেন তারা। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। আমরা তাকে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ দেখাতে চাই। এরপর শহীদ মিনারে এসে নতুন কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা করেন তিনি।
প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্যের সংবাদ সম্মেলন: অন্যদিকে মেডিক্যালে পুনঃপরীক্ষার দাবিসহ চার দফা দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র ঐক্যের ডাকা ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়েছে। গতকাল দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধর্মঘট পালিত হয়। দেশব্যাপী এই ধর্মঘটের সামগ্রিক অবস্থা জানিয়ে বেলা দেড়টায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন জোট দুটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাবিব রুমন বলেন, আমাদের ডাকা ধর্মঘট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে নওগাঁ, কুষ্টিয়া এবং বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রলীগের বাধার সম্মুখীন হয়েছে নেতাকর্মীরা। তারপরও সেসব স্থানেও ধর্মঘট পালিত হয়েছে। তিনি পুনরায় মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আগামী ১২ই অক্টোবর সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদিও আর কোন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয় তাহলে পরীক্ষার পরের দিন থেকে ওই প্রতিষ্ঠান অচল করে দেয়া হবে।

জননিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই by ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনাটি দেশে-বিদেশে আলোচিত। নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করা হলো নিরাপত্তা বিশ্লেষক আশফাক ইলাহী চৌধুরীর বিশ্লেষণ বাংলাদেশে সম্প্রতি দুজন বিদেশি নাগরিক খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় জনমনে যথেষ্ট উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেনি। এখানে রাজনৈতিক সহিংসতা হয়েছে, পেট্রলবোমায় পুড়ে মানুষ মারা গেছে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বিদেশিরা আক্রান্ত হয়েছে। প্রথম ঘটনার পর মনে হয়েছিল, সেটা হয়তো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার, ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে এ খুন হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় খুনের পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। আমরা বুঝতে পারি, ঘটনা দুটির মধ্যে যোগসূত্র আছে। হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস দুটি হত্যাকাণ্ডেরই দায় স্বীকার করেছে। তবে আসল ব্যাপার কী, সেটা আমরা এখনো জানি না। কিন্তু এখন পর্যন্ত আইএসের দাবির ভিত্তি পাওয়া যায়নি। আবার অনেক বাংলাদেশি তরুণ আইএসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সংগঠনটিতে যোগ দিয়েছে, এমন খবরও আমরা পেয়েছি।
আবার বছরের শুরুর দিকে যারা রাজনৈতিক সহিংসতা করেছে, তাদের মধ্যকার একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীও এ কাজ করে থাকতে পারে। যেহেতু দেশে এখন রাজনৈতিক উত্তেজনা নেই বা তারা কিছু করতে পারছে না, সে কারণে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতেও তারা এ কাজ করে থাকতে পারে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, যাদের সাধারণভাবে নিশানা হওয়ার কথা নয়, তারাই কিন্তু নিশানা হচ্ছে। এতে যেমন হত্যাকারীরা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তেমনি নির্বিঘ্ন থাকতে পারছে। কারণ, হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের নিরাপত্তা থাকে, তাদের খুন করতে গেলে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার তেমন কাউকে হত্যা করা সম্ভব হলেও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতায় অপরাধীদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা অতটা তৎপর হবে না, যেমনটা তারা হবে হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।
এ দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উন্নয়ন সংস্থাগুলো রাতারাতি এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যাবে, তা নয়। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এ কারণে দেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে, আন্তর্জাতিক পরিসরে নেতিবাচক প্রভাব অনুভূত হবে। সে কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের তদন্ত করা উচিত। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন মানুষ হত্যার দৃষ্টান্ত দেখা যায়—এ কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। আমাদের নিজেদের ঘর গোছাতে হবে, তা না হলে আমরা মুখ দেখাতে পারব না।
একটি ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন হয়েছি। দুটি হত্যাকাণ্ডের পরই দেখা গেল, জনসাধারণ এ ব্যাপারে তেমন এগিয়ে আসছে না। প্রত্যক্ষদর্শীরাও তেমন একটা তথ্য দিচ্ছে না, অন্যরাও কিছু বলছে না।
কিন্তু এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, স্রেফ গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জনগণকে যুক্ত করার জন্য সরকার ও গণমাধ্যমকে উদ্যোগ নিতে হবে, তারা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। পাড়া-মহল্লায় নতুন বা সন্দেহজনক কেউ এল কি না বা কেউ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে যাচ্ছে কি না, সে খবর মানুষ যদি আগেভাগেই পুলিশকে দেয়, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধ করাও সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে অতীতের সব সন্ত্রাসী হামলার বিচার করতে হবে। বিচার না হলে অপরাধীরা ভরসা পায়, অপরাধ করে নির্বিঘ্নে থাকা যায়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। কারণ বিরোধী দলেরও দায়িত্ব আছে, শুধু সমালোচনা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। একইভাবে এখন তথ্যপ্রযুক্তির যে উন্নতি ঘটেছে, তাতে সরকার এ কথা বলে পার পেতে পারে না যে তারা তদন্তের কূলকিনারা করতে পারছে না। সে কথা বললে বিশ্ব সম্প্রদায় মেনে নেবে না। যেমন: থাইল্যান্ডে বোমা হামলার পর আমরা দেখলাম, তারা সিসিটিভির ফুটেজ থেকে সন্দেহভাজন হামলাকারীকে শনাক্ত করার পর তার গতিবিধি নজরদারি করে শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তারও করে ফেলল। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব।
বড় কথা হলো, এ দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হলো। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কাজই হলো জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়া বা রক্ষা করা, সেটা যেমন বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে, তেমনি অভ্যন্তরীণ শত্রুর আক্রমণ থেকেও। হিসাব করলে দেখা যাবে, রাষ্ট্রের বাজেটের বড় অংশই যাচ্ছে জননিরাপত্তায়। ফলে এত টাকা ব্যয় করার পরও জনগণের নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যাবে না, সে প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে।
ইশফাক ইলাহী চৌধুরী: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর।

খুনিরা শনাক্ত হয়নি লাশ পড়ে আছে মর্গে

দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের কথা বলা হলেও তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। রাজধানী ঢাকায় ইতালিয়ান নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারও হয়নি কেউ। তবে রংপুরের জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যায় দু’জনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকেও খুনিদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য আদায় করা যায়নি। অপরদিকে গত ৯ দিন ধরে ইতালিয়ান ওই নাগরিকের লাশ পড়ে আছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে। ৫ দিন ধরে রংপুর মেডিক্যালের হিমঘরে পড়ে আছে জাপানি নাগরিকের লাশ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতালিয়ান নাগরিকের লাশ সেদেশের দূতাবাস গ্রহণ করার কথা। তারা গতকাল পর্যন্ত লাশ গ্রহণ করেনি। বিষয়টি নিয়ে ইতালিয়ান দূতাবাসের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে। জাপানি নাগরিকের লাশও জাপান দূতাবাস গ্রহণ করবে বলে জানা গেছে। ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে। অনেক বিষয় মাথায় রেখে অনুসন্ধান চলছে। যে কোন মূল্যে আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হবে।
পুলিশ জানায়, ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ড ও জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যা নিয়ে পুলিশ ভীষণ চাপে রয়েছে। এই দুই হত্যাকাণ্ডের যে কোন একটির রহস্য উদঘাটনের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চলছে। কারণ একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারলে অন্যটির রহস্য উদঘাটন অনেক সহজ হয়ে যাবে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, দুটি হত্যাকাণ্ডে যোগসূত্র রয়েছে। দুই বিদেশী নাগরিককে পৃথক কিলার গ্রুপ হত্যা করলেও দুই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য মদতদাতারা একই। পুলিশ তাদের শনাক্তের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজনৈতিক কারণ ও জঙ্গি সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছেন। এর বাইরে অন্য কোন কারণ রয়েছে বলে তারা মনে করছেন না। দুই বিদেশী নাগরিক হত্যায় যারা লাভবান হয়েছেন তারা এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছে বলে গোয়েন্দারা মনে করছে।
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর সিজার তাভেলার লাশ হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, ইতালিয়ান দূতাবাসের প্রতিনিধির কাছে লাশ হস্তান্তরের কথা রয়েছে। তারা যেদিন লাশ নিতে চাইবেন সেদিনই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যাকাণ্ডের ৫ দিন পরও তার লাশ বুঝে নেয়নি জাপানি প্রতিনিধি দল। কি কারণে লাশ বুঝে নেয়নি এ সম্পর্কে প্রশাসন মুখ খুলছে না। এদিকে কুনিও হত্যা মামলার অগ্রগতি জানতে গতকাল আদালতপাড়ায় গিয়েছে জাপানি প্রতিনিধি দল। সেই সঙ্গে  রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে কুনিও’র মরদেহ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করেছে জাপানের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। তারা লাশ বুঝে নেয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা না করে পর্যবেক্ষণ করেই ফিরেছেন। পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবদুল মালেক জানান,   গতকাল আদালতে একজন জাপানি ও একজন বাংলাদেশী দোভাষী লোক এসে মামলার বিষয়বস্তু, অগ্রগতি, আইন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তিনি জানান, কিছুটা সময় লাগবে তবেই ক্লু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। এদিকে কুনিও’র মৃতদেহ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করতে গণমাধ্যমকর্মীদের পাশ কাটিয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রবেশ করেন ৪ সদস্যের  জাপানি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। পুলিশি পাহারায় মর্গে প্রবেশ করে দীর্ঘ দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়ে সেখানে অবস্থান করে লাশ পর্যবেক্ষণ করেন তারা। হোশি কুনিও’র মৃতদেহ বুঝে নেয়ার কথা থাকলেও তা না করে অজ্ঞাত কারণে এই প্রতিনিধি দল সেখান থেকে ফিরে যান। এনিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের কারও কাছে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্‌ আল ফারুক বলেন, জাপানি সদস্যরা লাশ পর্যবেক্ষণ করেছে। লাশ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি, কিছু সময় বিলম্ব হবে। লাশ হস্তান্তরের বিষয় পরে জানানো হবে। এদিকে ঢাকায় ইতালি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রংপুরে হোশি কুনিও’র হত্যাকাণ্ডের অনেকটা মিল থাকায় বিষয়টি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এনিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গুলশান ২ এর ৯০ নম্বর সড়কে ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত সিজার আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এর ৫ দিনের মাথায় গত ৩রা অক্টোবর রংপুুরের মাহিগঞ্জের আলুটারি এলাকায় প্রেস লেখা নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলযোগে কয়েকজন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। বুকে হাতে ও ডান কাঁধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। এ ঘটনায়  তাৎক্ষণিকভাবে ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। এর আগে কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ে ৩ ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করে।
কুনিও হত্যাকাণ্ডের ৫ দিন পরও লাশ বুঝে নেয়নি
জাভেদ ইকবাল রংপুর থেকে জানান, জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যাকাণ্ডের ৫ দিন পরও তার লাশ বুঝে নেয়নি জাপানি প্রতিনিধি দল। এদিকে কুনিও হত্যা  মামলার অগ্রগতি জানতে গতকাল আদালতপাড়ায় গিয়েছে জাপানি প্রতিনিধি দল। সেই সঙ্গে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে কুনিও’র মরদেহ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করেছে জাপানের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবদুল মালেক জানান, গতকাল আদালতে একজন জাপানি ও একজন বাংলাদেশী দোভাষী এসে মামলার বিষয়বস্তু, অগ্রগতি, আইন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তিনি জানান, কিছুটা সময় লাগবে তবেই ক্লু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হবে। আমাদের ল অ্যান্ড ফ্লুসিং এজেন্সি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। এদিকে কুনিও’র মৃতদেহ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করতে মনের মধ্যে অনেকটা আতঙ্ক নিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের পাশ কাটিয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রবেশ করেন ৪ সদস্যের  জাপানি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। পুলিশি পাহারায় মর্গে প্রবেশ করে দীর্ঘ দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়ে সেখানে অবস্থান করেন। হোশি কুনিও’র মৃতদেহ বুঝে নেয়ার কথা থাকলেও তা না করে অজ্ঞাত কারণে এই প্রতিনিধি দল সেখান থেকে ফিরে যান। এ নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের কেউ এ ব্যাপারে তথ্য দিতে নারাজ। রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্‌ আল ফারুক বলেন, জাপানি সদস্যরা লাশ পর্যবেক্ষণ করেছে। লাশ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি, কিছু সময় বিলম্ব হবে।