Friday, August 9, 2019

কাশ্মীর সঙ্কট সমাধানে গণভোটের পরামর্শ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

কাশ্মীর ও এর সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি মনে করেছিলেন, গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণকে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে বহু বছর পর তার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি আলোচনায় আসলো।

রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ এবং অন্যান্য সচেতন মহল কাশ্মীরের সঙ্কট সমাধানের জন্য নিজেদের মতামত দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জনক শেখ মুজিবুর রহমানও কাশ্মীর সঙ্কট সমাধানে তার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ কারাগারের রোজনামচাতে এ বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে।

কাশ্মীর নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন:  ‘অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারো চেয়ে কম পারদর্শী নয়। গুলি করে বা গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুদেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করে নেয়া।’

তিনি পরামর্শ দেন, ‘পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারত। দুদেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারি বলে নিজকে মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে? এতে একদিন দুটি দেশই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।’

ভারত যেভাবে অব্যাহতভাবে কাশ্মীরীতের মতামতকে অবজ্ঞা করে এসেছে, সেটার ব্যাপারে সমালোচনামুখর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি লিখেছিলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ভারত, গণতন্ত্রের পথে যেতে রাজি হয় না কেন? কারণ তারা জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দেবে না। তাই জুলুম করেই দখল রাখতে হবে।’

তিনি আরও লিখেন, ‘দুদেশের সরকার কাশ্মীরের একটি শান্তিপূর্ণ ফয়সালা না করে দুই দেশের জনগণের ক্ষতিই করছেন। দুদেশের মধ্যে শান্তি কায়েম হলে, সামরিক বিভাগে বেশি টাকা খরচ না করে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। তাতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতো। আমার মনে হয়, ভারতের একগুঁয়েমিই দায়ী শান্তি না হওয়ার জন্য।’

শেখ মুজিবের কন্যা এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক কাশ্মীর সঙ্কট নিয়ে কি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, সেটাও এখন অনেকের আগ্রহের বিষয়।

সঙ্কট নিয়ে তিনি কি তার বাবার বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত পোষণ করেন না কি তিনি মোদি সরকারকে প্রতিবেশীসুলভ প্রশংসার মধ্যেই রাখবেন?

কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ ৫ আগস্ট সোমবার পার্লামেন্টে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রেসিডেন্ট এর পর প্রস্তাবটি অনুমোদন দেন। ফলে, ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য ৭০ বছর ধরে যে বিশেষ মর্যাদা বহাল ছিল সংবিধানে, সেটি এর মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হলো। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে।

৩৭০ অনুচ্ছেদে জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলিমদের এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন দেয়া হয়েছিল। তাদের নিজস্ব সংবিধান, স্বতন্ত্র পতাকা এবং স্বাধীন আইন ছিল। কিন্তু ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর জম্মু ও কাশ্মীর এখন পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে নাকচ করে দিয়েছে কাশ্মীরের জনগণ।

কাশ্মীরের সঙ্কট এবং কাশ্মীরের সংগ্রম বহু দশক ধরে চলে আসছে। ১৯৪৭ সাল থেকে এই সমস্যার শুরু যখন ভারত ও পাকিস্তান দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়।

দুই নতুন প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ দাবি করে। পাকিস্তান একাংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর ভারত আরেক অংশের দখল নেয়, যেটা জম্মু ও কাশ্মীর নামে পরিচিত।

যে অংশটি পাকিস্তানের মধ্যে পড়েছে, সেটি আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। দুই দেশের মধ্যে যেটি বিবাদের প্রধান কারণ, সেটা হলো জম্মু ও কাশ্মীর।

‘বাতাসে উদ্বেগ’: বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন কাশ্মীরে অবস্থানের অনুভূতি কেমন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘নয়া কাশ্মীরে’ প্রথম যে শিশুদের জন্ম হলো, তাদের একজন ইমাদ তারিক। তার জন্ম হয় সোমবার ভোরে। কিন্তু তার পরিবারের কেউই জানে না যে তার জন্ম হয়েছে। তার বাবা ৪০ বছর বয়সী তারিক আহমেদ শেখ হাসপাতাল চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে জানালেন, “কেউই জানে না যে, আমার স্ত্রী সন্তানের জন্ম দিয়েছে। পরিবারের কাউকে জানাতে পারিনি আমরা, তারাও কেউ এখানে আসতে পারেনি”।

রোববার থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট, ল্যান্ডফোন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে দিল্লী। ফলে সাত মিলিয়ন মানুষ এক ধরণের বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে এবং তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সাক্ষাতের কোন সুযোগ নেই। ভারত সরকার এখান স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং কাশ্মীর উপত্যকার বৃহত্তম শহর শ্রীনগরের সড়ক ও যোগাযোগের পথগুলোতে ব্যরিকেড দিয়ে রেখেছে।

গত সপ্তাহে কাশ্মীরে যে ৩৮,০০০ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, তাদের সহযোগিতায় কর্তৃপক্ষ শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করেছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন। এদিকে বুধবার পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, শ্রীনগরে কারফিউ চলাকালে পুলিশের ধাওয়া থেকে পালাতে গিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে।

কিন্তু খুব অল্প কাশ্মীরীরাই এই খবরটা জানতে পারবে। তাদের অনেকেই জানবে না যে, সোমবার সকালে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভারত সরকার কাশ্মীরীদের বিশেষ স্ট্যাটাস বাতিল করেছে, সংবিধানের অধীনে ৭০ বছর ধরে যেটা বলবৎ ছিল।

শেখ জানান, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের খবর শোনার কয়েক মিনিট পরেই আমার ছেলের জন্ম হয়েছে। শেখ শ্রীনগরে অটোরিকশা চালান। তিনি আর তার স্ত্রী আরও আগেই হাসপাতালে এসেছিলেন। কারফিউয়ের গুজব শুনে আগে আগে চলে এসেছিলেন তারা। অন্য সব কাশ্মীরীদের মতো তারাও প্রশাসনের যুদ্ধ প্রস্তুতি দেখে বিস্মিত হয়েছে। সেই সাথে বিভিন্ন জরুরি আদেশও জারি করে প্রশাসন।

কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন বাতিল করার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে কাশ্মীরীরা ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে রাজ্যের ইন্টারনেট চলতি বছরে ৫৩তম বারের মতো বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সকল মোবাইল ও ল্যান্ডফোন সার্ভিসও বিচ্ছিন্ন। জনগণ তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, এবং সাংবাদিকরা তাদের রিপোর্ট পাঠানোর কোন মাধ্যম পাচ্ছেন না। কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় স্থানীয় পত্রিকার ওয়েবসাইটের প্রথম পাতাটি সাদা এবং আমাদের নিজেদের ওয়েবসাইটটিও সোমবার থেকে অফলাইনে আছে। আমার মতো অনেক সাংবাদিকই বিমানে কাশ্মীর ছাড়ছেন, এ ধরণের যাত্রীদের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করছেন। খুব অল্প সংখ্যাক মানুষের স্যাটেলাইট ডিশ সংযোগ রয়েছে এবং তারা টিভি চ্যানেল দেখতে পাচ্ছেন। যানবাহনে মাইক লাগিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে যাতে কেউ বের হওয়ার চেষ্টা না করে। বোঝার কোন উপায় নেই যে, পরিস্থিতি শান্তি রয়েছে কি না। কোন যোগাযোগ না থাকায়, উপত্যকার বাতাস এখন উদ্বেগে পরিপূর্ণ।

পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখা। দিনের বেলা শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হারি সিং (এসএমএইচএস) হাসপাতালটিতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে মঙ্গলবার মধ্যরাতে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। চোখের চিকিৎসা বিভাগে ঢোকার সাথে সাথেই পাঁচ তরুণকে দেখলাম যারা ছড়ড়া গুলির আঘাতে আহত। হাসপাতালের সহকারীরা তাদের ব্যান্ডেজ বাঁধা চেহারায় বাতাস করছিল। সরকারের কর্মকর্তারা এই সপ্তাহে ছড়ড়া গুলি ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছে, কিন্তু ছড়ড়া গুলি কাশ্মীরে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

১৭ বছর বয়সী তরুণের সাথে থাকা ত্রিশোর্ধো লোকটি জানালেন, “আমি ওর প্রতিবেশী। বাড়ির বাইরে থেকে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করি আমি। দুই চোখেই ছড়ড়া গুলি লেগেছে ওর। অপারেশানের আগে ডাক্তার এখন তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। বাম চোখেও এখন দেখতে পাচ্ছে না সে”। হাসপাতালের কর্মীরা জানালেন, ওই দিনেই এক ডজনের বেশি আহত তরুণ এসেছিল হাসপাতালে।

আরেকটি দিনের সূর্যোদয় হচ্ছে এবং আধাসামরিক বাহিনী তাদের বিধিনিষেধ আরোপ করে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বহু কাশ্মীরীরাই মনে করছে, তাদের পরিচয় হুমকির মুখে পড়ে গেছে। অন্যেরা তাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। সহিংস সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আতঙ্কে আছে তারা। আমাদের মতো অনেকেই আছি চরম অসহায়ত্বের মধ্যে – যেন আমাদের একটা অঙ্গ ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ, বাঁশি ও বাংলার সুর by সেলিনা হোসেন

কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত।

বাঁশি বাংলার সংস্কৃতিতে নিজস্ব সুর। বাঁশির সুর আমাদের জীবনে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। আমার বিবেচনায় তার কারণ মূলত তিনটি। এক. আমাদের বাঁশির গঠনের বিশিষ্টতা। সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি এ বাঁশি একদিকে জীবিকার উপকরণ, অন্যদিকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ। আমাদেরই মাটিতে জন্মানো বাঁশ দিয়ে তৈরি, কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে ধরনের বাঁশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মতো নয়। দুই. আমাদের লোকসঙ্গীতে দুটি যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়- বাঁশি ও একতারা। আমাদের লোকসঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারায় বাঁশি প্রাধান্য লাভ করে। সে ধারাটি ভাটিয়ালি গানের ধারা। তিন. আমাদের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঁশির যোগ আছে। এর প্রমাণ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে রাধা আকুল হন। সে বাঁশির সুরে নারী-পুরুষের সম্পর্কের অনুষঙ্গ থাকে, আধ্যাত্মিকতার গভীরতা থাকে এবং সে বাঁশির সুর যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে এখনো আমাদের মনোজগতে ধ্বনিত হয়।
বাঁশি-সংক্রান্ত যে ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সে ঐতিহ্যকে তিনি তাঁর নিজস্ব দর্শন, অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেন। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতার সমান্তরালে স্থাপন করে আমাদের। কবির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে এসব কবিতার সত্য মানুষকে জীবন-উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি লৌকিক এবং অলৌকিক অনুভবের আলোছায়ায় সম্পৃক্ত করে আমাদের। আমরা তাঁর রচনায় কখনো দৃশ্যমান বাঁশির সুর শুনি, কখনো অনুক্ত উচ্চারণে সে সুর আমাদের মাঝে জেগে থাকে। তার বাঁশির সুর শুধু ব্যক্তি জীবনকে নয়, ভেঙে দেয় ব্যক্তি জীবনের গণ্ডিকে। সে বাঁশি সমষ্টির হয়। কখনো দিকনির্দেশনারও কাজ করে।
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি কাব্যগ্রন্থের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বোম্বাইয়ে মেজদাদার কাছে যখন গিয়েছিলুম তখন আমার বয়স ষোলোর কাছাকাছি, বিলাতে যখন গিয়েছি তখন আমার বয়স সতেরো। নতুন-প্রকাশিত পদাবলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, সে আরো কিছুকাল পূর্বের কথা। ধরে নেয়া যাক, তখন আমি চোদ্দোয় পা দিয়েছি।’
কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। প্রেমের প্রতীক, জীবনের আর্তি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত। সেই সীমানার মধ্যে আমার মন স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারে না। তাই ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই। এই জন্য ভানুসিংহের পদাবলী বহুকাল সংকোচের সঙ্গে বহন করে এসেছি। একে সাহিত্যের একটা অনধিকার প্রবেশের দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করি।’
প্রথম গানটি লিখেছিলুম একটা স্লেটের উপরে, অন্তঃপুরের কোণের ঘরে-
‘গহনকুসমকুঞ্জমাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে।’
‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি উপস্থাপিত হয়েছে সরাসরি- তার সুর এবং সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে।
যেমন :

ছয় সংখ্যক পদাবলী : ইতি ছিল নীরব বংশীবটতট,
কথি ছিল ও তব বাঁশি?
সাত সংখ্যক পদাবলী : শুন সখি, বাজত বাঁশি
গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ
চন্দ্রম ডারত হাসি।

এমনকি উনিশ সংখ্যক পদাবলী, যার শুরু : মরণ রে,/ তুহুঁ মম শ্যাম সমান- এই পদাবলীতে বাঁশি এসেছে এভাবে :
দূর সঙে তুহুঁ বাঁশি বজাওসি,
অনুখন ডাকসি, অনুখন ডাকসি
রাধা রাধা রাধা!

আগেই বলেছি শ্রীকৃষ্ণের এই বাঁশি রবীন্দ্রনাথকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অন্তঃপুরের কোণের ঘরে বসে স্লেটের উপর লেখা দুটি পঙ্ক্তির মধ্যে যে বাঁশি তিনি বাজিয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে সে বাঁশিকে আরও বিচিত্রতর করেছেন।

‘পুনশ্চ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আছে, তার নাম ‘বাঁশি’। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সুরকে নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহার কখনো সরাসরি, কখনো অনুচ্চারিত। তিনি আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাননি। কেননা মৃত্যু নামক সত্যের কাছে বাদশা কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। মৃত্যুর বাস্তবতা অভিন্ন। এক বৈকুণ্ঠের দিকে সবাইকেই যেতে হয়। তিনি বলেন : ‘আকবর বাদশার সঙ্গে/হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই/বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে/ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে।’
মৃত্যুর সঙ্গে বাঁশির এই যোগ আমাদেরকে অর্ফিয়াসের বাঁশির কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে অর্ফিয়াস পাতালের দেবতাকে খুশি করেছিলেন বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ দেবতা অর্ফিয়াসের স্ত্রীকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। শর্ত ছিল পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। কিন্তু পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে নিজেকে সামলাতে পারেনি অর্ফিয়াস। ভাবে, পিছে পিছে আসছে তো ইউরিডাইস? মুহূর্তে ঘুরে তাকালে শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অদৃশ্য হয়ে যায় ইউরিডাইস। বুক-ভাঙা আর্তনাদ নিয়ে ফিরে আসে অর্ফিয়াস। বেদনার এক অদৃশ্য বাঁশির সুর ঘিরে থাকে অর্ফিয়াসকে। ‘বাঁশি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথও বেদনার এক হিম-শীতল অনুভব ছড়িয়ে দিয়ে শেষ করলেন এভাবে :

‘এ গান যেখানে সত্য/অনন্ত গোধূলিলগ্নে/সেইখানে/বহি চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘনছায়া; আঙিনাতে/ যে আছে অপেক্ষা করে, তার/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
এই পঙ্ক্তির মধ্যেও অদৃশ্য বাঁশির করুণ সুর আছে, সেটা অলৌকিক বাঁশি- এ বাঁশি অনন্ত গোধূলিলগ্নে বাজে, যার কাল পরিসীমা নেই, যে বেদনা মানুষের জীবনের চিরসত্য, রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সঙ্গে তার যোগ সবচেয়ে বেশি নিবিড় দেখেছেন। ‘ঘরেতো এলো না সে তো, মনে নিত্য আসা যাওয়া/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
কেন ‘বাঁশি’ কবিতায় এমন গভীর কষ্ট? বাঁশি ছাড়া কি অন্য নাম হতে পারতো না কবিতাটির? ‘কিনু গোয়ালার গলি’ দিয়ে যে কবিতার শুরু সেটা শেষ হয়েছে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি গ্রামে একজন অপেক্ষারত নারীর ছবির মধ্যে। বাঁশির সুর যে রূঢ় বাস্তব ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে তার উত্তরণ ঘটাতে পারে, এই বোধই এই কবিতাকে পাঠকের মনের কাছে নিয়ে যায়। এই ‘বাঁশি’ রবীন্দ্রনাথের নিজের।
‘পলাতকা’ কবিতায় একটি পোষা হরিণ এবং পাহাড় থেকে আনা একটি কুকুরছানা এক সঙ্গে খেলে বেড়ায় এবং বড় হতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ করে একদিন ফাল্গুন মাসে দক্ষিণের পাগল হাওয়া বইতে শুরু করে এবং হরিণ যেন কার উদাস করা বাণী হঠাৎ শুনতে পায়। তারপর একদিন বিকেলবেলায় হরিণ মাঠের পর মাঠ পার হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
‘সম্মুখে তার জীবনমরণ সকল একাকার/অজানিতের ভয় কিছু নেই আর।’
হরিণের বুকে বহু যুগের ফাল্গুন দিনের সুরে বাঁশি বেজে ওঠে এবং কোথায় কোনদূরে তার আপনজন আছে তার খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ে এবং কখনো আর ফেরে না। এই কবিতায় বসন্তের সঙ্গে বাঁশি এক হয়ে যায় এবং বসন্তের ডাক প্রেমের যে অনুভব সৃষ্টি করে তা এই কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এখানে প্রকৃতির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। বসন্তের বাঁশি যখন প্রকৃতিতে বেজে ওঠে তখন তা কেবল মানুষকে আকুল করে না, সমস্ত প্রকৃতিকেই বিহ্বল করে দেয়। এই বিহ্বল করে দেয়ার মধ্য দিয়ে বাঁশি এই কবিতায় একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথের একটি গান এমন : ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে/ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা/কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে।’
বাঁশি এখানে মানুষ, তার ওপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ বাঁশির কান আছে। বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না, তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ঘন যামিনীর মাঝে ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আর একটি ভাবনায় প্রবেশ করা যায়, যেখানে বাঁশি অদৃশ্য। কিন্তু আপাত সরল অর্থের অন্তরালে মনে হয় বাঁশিকে যে ব্যক্তি ভেবে নিজের কথা বলে সে নারী। বাঁশি এ গানে নারী-জীবনের প্রতীক। যেন বাঁশি নিজেই এখানে বাঁশিওয়ালার ভূমিকা পালন করছে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার নাম ‘বাঁশিওয়ালা’। একে যদি আমি নারীবাদী কবিতা বলি তাহলে কি ভুল বলা হবে? এই কবিতায় বাঁশির সুর শুনে একটি নারীর জেগে ওঠার কথা তিনি জানিয়েছেন। বলছেন : ‘তোমার ডাক শুনে একদিন/ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে/অন্ধকার কোণ থেকে/বেরিয়ে এল ঘোমটা খসা নারী।’
এ নারী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দেখা মানুষ। তার পরিচয় এমন : ‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে। সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেননি/আমাকে মানুষ করে গড়তে/রেখেছেন আধাআধি করে।’
যখন বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজায় তখন এই মেয়ে শুনতে পায় তার নতুন নাম। তার বেলা কাটে না। জোয়ার-জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। মুক্তিপারের খেয়া তার সামনে দিয়ে ভেসে যায়, ভেসে যায় ধনপতির ডিঙা। তার সামনে দিয়ে চলতি বেলার আলোছায়াও ভেসে যায়। তখন সে শুনতে পায় বাঁশির ডাক। বলে, ‘এমন সময় বাজে তোমার বাঁশি/ভরা জীবনের সুরে/মরা দিনের নাড়ির মধ্যে/দবদবিয়ে ফিরে আসে প্রাণের বেগ।’
বাঁশিওয়ালাকে তার প্রশ্ন, ‘কী বাজাও তুমি।’ তার ধারণা সেই সুর অন্যের মনে হয়তো কোনো ব্যথা জাগায়, কিন্তু ও নিজে শুনতে পায় দক্ষিণা হাওয়ার নবযৌবনের গান। শুনতে শুনতে ওর মনে হয়- ‘যে ছিল পাহাড়তলির ঝিরঝিরে নদী/তার বুকে হঠাৎ উঠেছে ঘনিয়ে/শ্রাবণের বাদলরাত্রি।’
বাঁশির সুর এভাবে তাকে সাহসী নারী করে তোলে। সকালে উঠে সে নিজের ভেতর দেখতে পায় ঝিরঝিরে নদীর পরিবর্তন। যে নদীর প্রবল স্রোত পাড় ভেঙে ফেলছে এবং পাথরগুলো ঠেলে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। সে বাঁধভাঙা জোয়ারের তাড়নায় অনুভব করে :
‘আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর।/ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক/ আগুনের ডাক/পাঁজরের উপরে আছাড় খাওয়া/মরণসাগরের ডাক/ঘরের শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক।’

পর মুহূর্তে পাল্টে যায় বাঁশির প্রতীক- কবি বলেন ‘বজ্রে, তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান/সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান’- একদম ভিন্ন চিত্রকল্প। এ বাঁশি জীবনের ভিন্ন একটি দিককে উদ্ভাসিত করে। ‘অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান’- সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বাঁশি প্রতিবাদী সুরে বেজে ওঠে।
গীতবিতানে অসংখ্য গানে রবীন্দ্রনাথ বাঁশির প্রতীক, বাঁশির চিত্রকল্প নানা ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে জাতি, জাতি থেকে দেশ সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের বাঁশির সুর প্রবাহিত হয়ে গেছে। এ বাঁশি বাংলার, এ বাঁশি বাঙালির।
যখন বলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’- তখন জগৎ-সংসার তোলপাড় করে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে চলে যায় অনুভবের তীব্রতা। মাটি থেকে, প্রকৃতি থেকে, লোকালয় থেকে প্রতিটি মানুষের হৃদয় মথিত হয়ে যে শব্দ বেরিয়ে আসে তার নাম দেশপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি দেশপ্রেমের প্রতীক।
বাঁশিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা, এমন কি বাঁশির উল্লেখ পর্যন্ত করা, কোনো কবির অবশ্য কর্তব্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এটি অবশ্য কর্তব্য ছিল না। তবু রবীন্দ্রনাথ বাঁশিকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন, বাঁশিকে প্রতীক করে তুলেছেন এবং বাঁশির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়ের গভীর অনুভব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় অন্য যাঁরা কবিতা রচনা করেছেন, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সমকালে কিংবা তাঁর পরবর্তীকালে, তাঁদের মধ্যে খুব বেশি সংখ্যক কবি বাঁশির এ ধরনের ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নেই।
রবীন্দ্রনাথ একান্তভাবেই বাংলার ও বাঙালির কবি। বিশ্বের নানা বিষয় অনুভবে ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি বিশেষভাবে বাংলারই কবি। অন্যদিকে, বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে বিশেষভাবে ধারণ করে, এটিই সম্ভবত প্রধান কারণ। যার জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছে। অন্য কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে ধরে রাখে।
বাংলার জীবন বাঁশির চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায়, গদ্য রচনায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। বাঁশিকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের একটি মূল বিষয় এখানে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি আবহমানতাকে, ঐতিহ্যকে, আশপাশের পরিচিত জগতকে আত্মস্থ করে নেন এবং তাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজের কণ্ঠস্বরকে স্থাপন করেন। এ কারণে বাংলার প্রতিদিনের সুর রবীন্দ্রনাথের নিজের সুর হয়েও বাংলার চিরায়ত সুর হয়, আবার রবীন্দ্রনাথের সুর হয়েও স্রোতস্বিনীর মতো বাংলার সুরই থেকে যায়। এজন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে সব সময়ের মতো নতুন হয়ে থাকেন।

সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের ছবি ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’

আজহা উপলক্ষে দেশের সর্বাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে শাকিব খান ও শবনম বুবলী জুটির নবম ছবি ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’। দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়ার ব্যানারে ছবিটি নির্মাণ করেছেন জাকির হোসেন রাজু। মুক্তি উপলক্ষে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার সংবাদের সঙ্গে কথা বলেছেন শবনম বুবলী
নতুন ছবি প্রসঙ্গে—
‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ খুব সুন্দর গল্পের ছবি। গুণী নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু এটি নির্মাণ করেছেন। গত ঈদে আমাদের ‘পাসওয়ার্ড’ যেমন ধাঁচের ছিল তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের ছবি ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’। আমাদের বর্তমান অনেক সমসাময়িক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে গল্পে। আমার মনে হয়, এ ছবির গল্প আমাদের প্রত্যেকের মনের কথা। সত্যিকার অর্থেই ছবিটি দর্শকের ভালো লাগবে বলে আশা করছি।
আপনার চরিত্রটি নিয়ে বলুন—
চরিত্রের ধরন নিয়ে এখন আর কিছু বলতে চাইছি না। এখন তো অল্প সময় বাকি আছে। আমি আশা করব দর্শক হলে গিয়েই ছবিটি উপভোগ করবেন। এরমধ্যে ছবির গান এবং ট্রেলার প্রকাশ হয়েছে। এ ছবিটি দেশপ্রেমের গল্প, পারিবারিক বন্ধনের গল্প, সবকিছু মিলিয়ে অনেক এ ছবিতে অনেক উপাদান পাবেন। আর শাকিব-ববুলী জুটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবেই দেখবেন দর্শক।
শাকিব-বুবলী জুটির নবম ছবি এটি—
খুব ভিন্ন গল্পের ছবিতে শাকিব খানের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। সহশিল্পী হিসেবে উনি অনেক হেল্পফুল এটা আমি বরাবরই বলে আসছি। শুধুমাত্র সহকর্মী না, উনি সেটে থাকলে খুটিনাটি অনেক বিষয় দেখাশোনা করেন। যেটা একজন অভিনয় শিল্পীর জন্য বড় কিছু। এখন পর্যন্ত উনার সঙ্গে কাজ করে খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছে। কারণ, প্রতিটি ছবিতে ভিন্ন চরিত্র, ভিন্ন গল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে জার্নিটা চমৎকার।
এবার পশুর নাম কি?
গতবারের আগেরবার আমাদের কোরবানির গরুর নাম ছিল ‘পঙ্খীরাজ’। গতবার ছিল ‘যুবরাজ’। এবারের নাম এখনো ঠিক করা হয়নি। দুই একদিনের মধ্যে হয়ে যাবে আশা করি। কোরবানির পশু কিন্তু এক সময় আমাদের আপন হয়ে যায়, তাই কোরবানির সময় আমাদের কষ্ট লাগে। আর পশু যখন হাট থেকে নিয়ে আসা হয় তখন কিন্তু একধরনের মায়া কাজ করে। সেই মায়া থেকেই আমরা আমাদের পশু নামকরণ করি। সবাই খুব আনন্দ করেই ঈদটা কাটাব আশা করি।
অন্যান্য ব্যস্ততা—
এখন আপাতত ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম’ ছবিটি নিয়েই আছি। ঈদের পর থেকে ‘বীর’ ছবির শুটিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আর শাহীন সুমন পরিচালিত ‘একটু প্রেম দরকার’ ছবির কাজও প্রায় শেষের দিকে। শিগগিরই ডাবিং ও বাকি শুটিং হয়ে যাবে বলে আশা করছি।
দর্শকের উদ্দেশ্যে বলুন—
সবাইকে অগ্রিম ঈদে শুভেচ্ছা। ঈদে আনন্দ করার পাশাপাশি সবাই হলে গিয়ে ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ ছবিটি দেখুন। আমার মনে হয় এ ছবিটি দর্শকদের প্রশান্তি দিবে। বাকিটা দর্শক ছবিটি দেখেই বলবেন।

নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উদ্বোধন করবে ইরান

ইরানের বাবর-৩৭৩ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আগামী ২২ আগস্ট দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উদ্বোধন করবে। একথা জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির হাতামি।
গত ৭ অগাস্ট বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের অবকাশে জেনারেল হাতামি বলেন, বাবর-৩৭৩ নামের এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২২ আগস্ট জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবস উপলক্ষে উদ্বোধন করা হবে।
জেনারেল হাতামি বলেন, নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলবে। এছাড়া, আগামী সপ্তাহে ইরান একটি সাঁজোয়া যান উদ্বোধন করবে। তিনি জানান, জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবস উপলক্ষে ইরান নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন করবে।
বাবর-৩৭৩ হচ্ছে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়। এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ এর প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হয়। বাবর-৩৭৩ থেকে একই সময়ে বিভিন্ন উচ্চতায় ও বিভিন্ন দূরত্বের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা যায়।

শ্রীনগর থেকে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা: 'মনে হচ্ছে যেন মৃত্যু উপত্যকায় এসে পৌঁছেছি'

পুরো ভারত এবং পুরো বিশ্ব থেকে যখন কাশ্মীরকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে, তখন সেখানকার পরিস্থিতি জানতে বুধবার শ্রীনগরে পৌঁছেছেন বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। কিন্তু প্রথম ২৪ ঘন্টায় অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার অল্প সময়ের জন্য তিনি কথা বলতে পেরেছিলেন লণ্ডনে সহকর্মীদের সঙ্গে। সেই কথোপকথনে কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন তিনি:
শ্রীনগরে পা রাখার পর ২৪ ঘন্টারও বেশি পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন মৃত্যু উপত্যকায় এসে পৌঁছেছি।
রাস্তাঘাটে একশো গজ পরপরই সেনা চৌকি আর কাঁটাতারের ব্যারিকেড। রাস্তায় যত না সাধারণ মানুষ, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সেনা আর আধা সেনা।
মানুষের ছোট ছোট কিছু জটলা। আমার হাতে বিবিসির মাইক দেখেই তারা এগিয়ে আসছেন কথা বলতে।
৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রাতারাতি বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা কতটা বিক্ষুব্ধ, সেটা তাদের চেহারাতেই স্পষ্ট।
কেউ কেউ তো বলছেন, দশ মিনিটের জন্য কাশ্মীরে জারি করা কারফিউ তুলে নেয়ার হিম্মত দেখাক সরকার, তারপরই তারা দেখবে দলে দলে কত মানুষ রাস্তায় নামে এর প্রতিবাদ জানাতে।
কাশ্মীর উপত্যাকা জুড়ে এখন মোতায়েন হাজার হাজার ভারতীয় সেনা
সরকারও সেটা নিশ্চয়ই জানে, তাই তো গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে দেয়া হয়েছে।
ঝিলমের তীরে এখন যে স্তব্ধতা, সেটা যে ঝড়ের আগের, সেটা স্পষ্ট।
কাশ্মীরে আমার এর আগেও আসা হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনা-বিক্ষোভ-সংঘাতের খবর সংগ্রহ করতে।
কিন্তু এরকম অবস্থা আমি এর আগে কখনো দেখিনি। এর সঙ্গে যেন আগের কোন কিছুর তুলনা চলে না।
কাশ্মীর এখন যেন এক মৃত্যুপুরী। রাস্তাঘাটে কোন লোকজন নেই।
পুরো রাজ্য জুড়ে আছে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় সেনা। টানা কারফিউ জারি রয়েছে। দোকানপাট বন্ধ।
অনেকের বাড়িতেই খাবার ফুরিয়ে গেছে, রেশন ফুরিয়ে গেছে। কেনাকাটার জন্য তারা সাহস করে কেউ কেউ বেরুচ্ছেন, কিন্তু কিছু কেনার মতো কোন দোকান খোলা নেই।
ব্যাপক ধরপাকড়
শ্রীনগরের যেসব জায়গায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে পুরো শহর জুড়ে একটা থমথমে পরিবেশ। চারিদিকে আতংক, ক্ষোভ।
রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাই কারাগারে কিংবা গৃহবন্দী।
গুপকার রোড, যেখানে থাকেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বা মেহবুবা মুফতির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকরা, সেখানে কাউকে ঢুকতেই দেয়া হচ্ছে না।
ফাঁকা রাস্তায় সাইকেলে এক বালক।
বৃহস্পতিবার সকালে আমরা বার বার চেষ্টা করেও সেদিকে যেতে পারিনি।
ডাল লেকের ধারে গভর্নর হাউস, সেদিকেও যেতে দেয়া হচ্ছে না।
গুজবের শহর হয়ে উঠেছে শ্রীনগর। নানা জায়গায় বিক্ষোভ চলছে বলে শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু শ্রীনগরের কোথাও বিক্ষোভ আমাদের চোখে পড়েনি।
একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে অনেক ট্যাক্সি চালক বসে ছিলেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তারা বললেন, এখানে কি করছেন। বেরামিতে যান। ওখানে দশ হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। লোকজন পথে নেমে বিক্ষোভ করছে।
কিন্তু এগুলো সব শোনা কথা, সত্যিই এরকম কিছু ঘটছে কীনা, তা যাচাই করার কোন উপায় নেই।
বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ
কাল যখন আমি এয়ারপোর্টে নামার পর গাড়ির দিকে যাচ্ছি, তখন কিছু লোক বোধহয় আমার বিবিসির পরিচয়পত্র দেখেছেন। তারা কথা বলতে এগিয়ে আসেন।
৩৭০ ধারা এবং কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘটনায় এরা যেভাবে তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তারা আমাকে বললেন, পার্লামেন্টে অমিত শাহ দাবি করেছেন যে কাশ্মীরের আশি শতাংশ মানুষ নাকি এটি সমর্থন করে। যদি তাই হবে, সরকার কেন মাত্র আট মিনিটের জন্য কারফিউ তুলে দিচ্ছে না। কারফিউ তুলে নিক, তারপর তারা দেখতে পাবে কীভাবে মানুষ রাস্তায় নামে প্রতিবাদ জানাতে।
মানুষ এখানে ভীষণ ক্ষুব্ধ, ভীষণ হতাশ।
তারা হাসপাতালে যেতে পারছে না। অন্তসত্ত্বা মায়েরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী কিনতে পারছে না। সব জায়গায় গিজ গিজ করছে সেনা।
দোকানপাট বন্ধ, পথে পথে সৈনিকদের তল্লাশি, জেরা।
মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ। ইন্টারনেট বন্ধ। ল্যান্ডলাইনও কাজ করছে না।
এদের কেউ কেউ আমাদের আর্জি জানালেন, দয়া করে কাশ্মীরের এই ছবিটা গোটা পৃথিবীকে জানান।
একটা বিষয় পরিস্কার। যেরকম বিপুল সংখ্যায় কাশ্মীর জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, তার কারণে কেউ এখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে পারছে না। কিন্তু পরে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে, সেটা বলা মুশকিল।
অঘোষিত জরুরি অবস্থা
কাশ্মীরে এখন কার্যত একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে।
এখানকার কোন নিউজ পোর্টাল রোববারের পর আর আপডেট করা হয়নি, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ।
আমি কয়েকটি সংবাদপত্র অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে কেউ নেই। কোন পত্রিকা বেরুতে পারছে না।
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বিরুদ্ধে দিল্লিতে বামপন্থীদের বিক্ষোভ
দিল্লি বা জম্মু থেকে প্রকাশিত কিছু সংবাদপত্র এখানে এসেছিল আজ সকালে। নিমেষে সেগুলো উড়ে গেল।
এগুলো কিন্তু তিন দিনের বাসি সংবাদপত্র। বলা হচ্ছে, এগুলোতে নাকি সেন্সরের কাঁচি পড়েছে জোরেশোরে।
তারপরও মানুষ এগুলো পড়ছে, যেহেতু আর কোন জানার সূত্র নেই।
বলা যেতে পারে কাশ্মীরে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের কন্ঠ একরকম রোধ করেই রাখা হয়েছে।
নিরানন্দ ঈদ
কদিন পরেই মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব, ঈদ উল আজহা।
ভেড়ার পাল নিয়ে এসেছিলেন বহু ব্যবসায়ী, বিক্রির জন্য।
হতাশ ব্যবসায়ীরা তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
ভেড়া কেনার মতো কেউ নেই। কিনবেই বা কেন, বলছেন তারা।
এরকম একটা পরিবেশে কে কোরবানি দেবেন, কার কাছে মাংস বিতরণ করবেন।
কাশ্মীরের মানুষের ঈদের আনন্দ এবার মাটি, এক নিরানন্দ ঈদের অপেক্ষায় তারা।
শোনা যাচ্ছে, ঈদের সময় হয়তো কারফিউ শিথিল করা হতে পারে। কারও ধারণা ১৫ই আগষ্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের পর হয়তো কারফিউ উঠতে পারে।
কিন্তু কাশ্মীর এখন যে ভয়-ভীতি-আতংকের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে, কোন কিছুতেই কারও কোন আশা নেই, কারও কোন ভরসা নেই।
ভেড়ার পাল নিয়ে আসা ব্যবসায়ীরা হতাশ।

ট্রেনের সিডিউলে চরম বিপর্যয়

কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনেই ছিল প্রচণ্ড ভিড়
রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো সিডিউল বিপর্যয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ ট্রেনই নির্ধারিত সময়ের পরে ছেড়ে গেছে। উত্তর বঙ্গের ট্রেনগুলো তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে ছেড়েছে। এতে করে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। গত দুই দিনে কমবেশি বিলম্ব হলেও ঈদ যাত্রার তৃতীয় দিন আজ  (শুক্রবার, ৯ আগস্ট) এ চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু সেতু ডাবল লেন না হওয়া পর্যন্ত এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি মিলবে না।
উত্তরের সব ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয়
কমলাপুর স্টেশন থেকে রাজশাহীগামী ধুমকেতু এক্সপ্রেস শুক্রবার সকাল ছয়টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি স্টেশনে এসে পৌঁছায় সকাল সোয়া ১০টার পরে। এরপর ট্রেনটি ছাড়ার সম্ভাব্য সময় ১০টা ৪০ মিনিটে বলা হলেও ছেড়ে যায় সকাল ১১টায়।
কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের ভিড়
কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের ভিড়
চিলাহাটীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৮টায় স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে ছাড়ার নির্ধারিত সময় দেওয়া হয়েছে বেলা ১২টা ৫ মিনিটে।  
রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ১২টা পর্যন্ত স্টেশনে এসে পৌঁছায়নি। দিনাজপুর-পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি কমলাপুর ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ১০টায়। পরে সেটি স্টেশন ছেড়েছে সকাল সাড়ে ১১টায়।
বিপজ্জনক হলেও ছাদই যেন ভরসা
বিপজ্জনক হলেও ছাদই যেন ভরসা
রাজশাহীগামী ধুমকেতু এক্সপ্রেসের ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৬টা। কিন্তু  ট্রেনটি রাজশাহী থেকে ১০টা ১৫ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছায়। এসময় প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল।  মুহূর্তে হুরোহুরি করে যাত্রীরা সবাই একসঙ্গে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রেন ভরে যায়। যাত্রীদের চাপ এত বেশি যে, ট্রেনজুড়ে পা ফেলারও জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট ছিল না।
দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করলেও অনেক যাত্রীই আসনে বসতে পারেননি। ভিড়ের কারণে আসন খুঁজে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একই অবস্থা দেখা গেছে, ট্রেনের ছাদেও। প্রতিটি ট্রেনের ছাদজুড়ে মানুষ আর মানুষ।
কমলাপুরে স্টেশনে রেলমন্ত্রী
কমলাপুরে স্টেশনে রেলমন্ত্রী
রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী সাবানা আক্তার বলেন, ‘সকাল ৯টার আগেই স্টেশনে এসে পৌঁছেছি। এখন বেলা ১২টা।  সম্ভাব্য সময়ও দেওয়া হয়নি। দুপুর দুটায়ও ট্রেনে উঠতে পারবো কিনা জানি না। বাচ্চাদের নিয়ে সমস্যায় পড়েছি।’
এদিকে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শনে আসেন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেতু ডাবল লেন না হওয়া পর্যন্ত এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি সম্ভব না। এজন্য আগামী ২০২৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেতুর লেন না বাড়িয়ে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ালে গতি আরও  কমে আসবে। ফলে বিপর্যয় আরও বাড়বে।’

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম কি ও প্রতিরোধের উপায়

বর্তমানে ডেঙ্গুজ্বর মহামারী আকার ধারণ করেছে। যদিও ডেঙ্গু প্রাণঘাতি রোগ নয় তার পরও সম্প্রতি বেশ কিছু রোগী ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, যার কারণে সারাদেশজুড়ে ডেঙ্গু এখন আতঙ্কের এক নাম। তবে আশার কথা হলো সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মমাফিক চললে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আসুন আমরা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও এর প্রতিরোধের উপায় জেনে নিই ও সচেতন হই।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম

ডেঙ্গুজ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হল-
-রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
-নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়।
-শরীরের হাত-পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
-প্রস্রাব কমে যায়।
-হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বর কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের  মন্ত্রই হল এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালান-কোঠায় তারা বাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

-বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
-যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে, যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহƒত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক, ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
-ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি ৫ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে।
-এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে।
-দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে।
-বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোনো মশা কামড়াতে না পারে। মশক নিধনের জন্য স্প্রে, কয়েল, ম্যাট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু জ্বর হয়তো বা নির্মূল করা যাবে না। এর কোনো ভ্যাক্সিনও বের হয় নাই, কোনো কার্যকরী ওষুধও আবিস্কৃত হয় নাই। ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনও আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গুজ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

‘কণ্ঠস্বর ছিনিয়ে নেওয়ার পর আমাদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে’

৫ আগস্ট সোমবার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে ভারত সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার পর চাপা ক্ষোভ আর কষ্ট বুকে চেপে কারফিউ যাপন করছে। নজিরবিহীন ধরপাকড় চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বন্ধ রাখা হয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ। চলাফেরায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। গৃহবন্দি কিংবা আটকাবস্থায় স্থানীন নেতৃত্ব। এমন অবস্থায় ক্ষোভ আর কান্না আরও পুঞ্জিভূত হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে। কাশ্মিরবাসী মনে করছে, কারফিউ আর নিরাপত্তা চাদরে জড়িয়ে তাদের কণ্ঠস্বর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের ভূমি।
কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, অঞ্চলটিকে ভেঙে দুই ভাগ করা এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত কার্যকরের আগেই সেখানে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তারও আগে থেকে সেখানে ৫ লাখ সেনা মোতায়েন ছিল। ৪ আগস্ট রবিবার রাত থেকে কাশ্মিরকে অচলাবস্থায় রাখা হয়েছে। সব ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিল্লিভিত্তিক একটি সাময়িকীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আল জাজিরাকে বলেন, ‘এ অচলাবস্থা নজিরবিহীন ঘটনা। আমাদেরকে ভিডিও এবং ছবি পেন ড্রাইভে সংরক্ষণ করে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা উপত্যকা থেকে বের হয়ে নয়াদিল্লি ফিরে যাচ্ছেন তারাই কেবল যার যার সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে সেগুলো প্রকাশ করতে পারছেন। অন্য সাংবাদিকরা জরুরি ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত সরকারি কার্যালয় ও হাসপাতালগুলোতে ব্যান্ডউইথ চেয়ে আবেদন করছে।’
কাশ্মিরের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে শীর্ষ পত্রিকাগুলোর ওয়েবসাইটে কেবল ৪ ও ৫ আগস্টের সংবাদ দেখাচ্ছে।
ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে ওঠার আতঙ্কে ‘জঙ্গি হামলার হুমকি’র কথা বলে হিন্দু পুণ্যার্থী ও পর্যটকদেরকে কাশ্মির ছাড়তে বলেছে মোদি সরকার। হোটেল ও ভাসমান বাড়িগুলোতে (হাউস বোট) তল্লাশি চালিয়ে পর্যটকদের এলাকা ছাড়তে বলছে পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে কাশ্মিরে ছুটি কাটাতে না যাওয়ার জন্য নিজস্ব নাগরিকদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইসরায়েল ও অস্ট্রেলিয়া।
দল গেট এলাকার কাছে অবস্থিত একটি গেস্ট হাউসের মালিক জাহাঙ্গীর আহমদ (৩৩) আক্ষেপ করে আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা কিছু ভালো ব্যবসা করছিলাম। তা এখন আর করা যাচ্ছে না। পুলিশ ও সেনা সদস্যরা আমাদের অতিথিদেরকে ভীত করে তুলেছে। ভারত আমাদের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে শুনে আমি যখন মর্মাহত, তখন কিছু ভারতীয় পর্যটক আমার গেস্ট হাউসে বসে উল্লাস করেছে। তবে আমি তাদের প্রতি আমার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারিনি। আমি মনে মনে বলছিলাম, ‘তোমরা শুরুতে আমাদের কন্ঠস্বর ছিনিয়ে নিয়েছো, আর এখন আমাদের জমি কেড়ে নিচ্ছো’।”
শ্রীনগরে কারফিউ চলাকালীন একটি অস্থায়ী তল্লাশি চৌকি পার হচ্ছে শিশুরা

সরজমিন: মুগদা হাসপাতাল, সিরিয়াল পেতেই পাঁচ দিন by পিয়াস সরকার

দুপুর ২টা। রাজধানীর ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতাল। যেটি মুগদা হাসপাতাল নামেই পরিচিত। হাসপাতালটির দোতলায় রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছিলেন হযরত আলী। তার স্ত্রীর নাম শেফালি বেগম। বয়স ২৪। গত ৭ দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন তিনি। রোববার স্ত্রীকে নিয়ে আসেন এই হাসপাতালে।
কিন্তু রোগীর এত চাপ যে পরীক্ষা করার জো নেই। ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাকে। হযরত আলী পেশায় রিকশাচালক।

তার স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তাদের ঘরে রয়েছে আড়াই বছর বয়সের একটি কন্যা সন্তান। হযরত আলী প্রতিদিন সিরিয়ালের জন্য আসতেন হাসপাতালে। অবশেষে বুধবার পান সিরিয়াল। সকাল ৯টায় রক্ত দেবার পর ফলাফল দেবার কথা ছিলো দুপুর ১২টায়। দুপুর ২টার সময়ে সেই ফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তখন এক এক করে ডাকা হচ্ছিল নাম। আর প্রায় কয়েকশ’ লোকের অপেক্ষা সেই ডাকের।

হযরত আলীর কাছে থাকা রশিদে চারটি পরীক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। Dengue NS-1। এই পরীক্ষার জন্য রাখা হয়নি কোন টাকা। এছাড়াও রয়েছে CBS (১৫০ টাকা), Widal (৮০), Urine for R/ M/E (২০ টাকা)। সর্বমোট ২৫০ টাকা। তাকে এই রশিদের বাইরে বাড়তি কোন টাকা গুণতে হয়নি।

আমেনা বেগম। চেহারায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। থাকেন জামালপুরে। ছেলের অসুস্থতার কথা শুনে এসেছেন ঢাকায়। ছেলের নাম হাফিজুল ইসলাম। বয়স ৩২। রক্ত পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দুই নাতীর সঙ্গে। তিনি জানান, তার ছেলে ৩ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তারও সিরিয়াল পেতে সময় লেগেছে ৪দিন। তার ছেলে থাকেন কমলাপুর রেলওয়ে কলোনীতে।

একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলেন হাসান আলী। তিনি থাকেন মানিকনগরে। ৭ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাকে ৫দিন অপেক্ষা করে ভর্তি হতে হয়েছে হাসপাতালে। কারণ একটাই সিরিয়াল মেলেনি। তিনি প্রায় সুস্থ। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আজকেই ছেড়ে দেয়া হবে তাকে।

এই সিরিয়াল পাওয়ার ভোগান্তির কথা বলেন আরো অনেকে। প্রত্যেকেরই সময় লেগেছে ৪ থেকে ৫ দিন করে। এর কারণ হিসেবে হাসপাতালটির ল্যাবের দায়িত্বে থাকা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন দুই থেকে তিন গুণ রক্ত পরীক্ষা করতে হচ্ছে। আমরা কোন বিশ্রাম ছাড়া কাজ করে যাচ্ছি।

হাসপাতাল জুড়েই ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়। মেডিসিন ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। বুধবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তি হয়েছে ১৩৯ জন। মারা গেছেন ২ জন। এর মধ্যে মোছা. নাছিমা আক্তার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৫ই আগস্ট। ৪২ বছর বয়সী মো. হানিফ হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২রা আগস্ট থেকে।

হাসপাতালটিতে ঘুরে দখো যায়- সর্বত্রই ডেঙ্গু রোগীদের আনাগোনা। স্বজনদের চোখে শঙ্কা। মেডিসিন ওয়ার্ড হাসপাতালের ৯ তলায়। ১ বছর বয়সী সন্তানকে কোলে করে নিচে পানি আনতে যাচ্ছিলেন নাসরিন আক্তার। হঠাৎ ৩ তলা আসতেই মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন। সিঁড়িতে অন্যরা তাকে ধরে সেখানে বসিয়েই মাথায় পানি ঢালেন। কথা বলে জানা যায়, চারদিন ধরে তার স্বামী হাসপাতালে ভর্তি। ঢাকায় থাকেন তারা একাই। তিনি ছাড়া আর কেউ নেই দেখাশুনা করার। আবার ছোট বাচ্চা। ঘুমানোর কোন অবকাশ পান না। সন্তান ও স্বামীকে দেখে রাখতে হয় দিন রাত এক করে।

মেডিসিন ওয়ার্ডে যেতেই শোনা যায় কান্নার রোল। একজন রোগীকে ঘিরে রয়েছেন স্বজনরা ও সেই সঙ্গে দেখা মেলে দুইজন সেবিকাকে। সেখানেও একই ঘটনা মাথা ঘুরে পরে গেছেন। তবে এবার পড়ে গেছেন রোগী মারিয়া আক্তার। তিনি গিয়েছিলেন টয়লেটে। সেখানে পড়ে যান। হাতে লাগানো ক্যানোলা দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। আর ব্যাথা পান মাথাতেও। তার চার বছর বয়সী ছেলে ও মায়ের কান্নায় স্তব্ধ চারপাশ। মারিয়ার স্বামী, সেবিকা ও আশেপাশের লোকজনও থামাতে পারছিলেন না কান্না।
এই হাসপাতালে ৫শ’ শয্যা হলেও বাড়তি ১শ’ শয্যা বাড়ানো হয়েছে। মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবিকাও বেশ কয়েকজন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বদলায়, থেকে যায় বিড়াল

ল্যারি দ্য ক্যাট
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সময় নিয়োগ পেয়েছিল ‘ল্যারি দ্য ক্যাট’। ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ) ইস্যুর জের ধরে এরপর দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদে তিনবার পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিসভায়ও কম-বেশি পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন আসেনি কেবল ল্যারির পদে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের এই কর্মীর একমাত্র কাজ ইঁদুর শিকার।

‘ল্যারি দ্য ক্যাট’ যুক্তরাজ্য সরকারের ‘চিফ মাউসার’। অর্থাৎ ইঁদুর ধরার জন্য নিযুক্ত প্রধান বিড়াল।

যুক্তরাজ্যের সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে পদত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বরিস জনসন। সম্প্রতি গুঞ্জন ওঠে, বরিস ক্ষমতায় এসেই থেরেসা মের আমলের অনেককে বরখাস্ত করছেন। এ দলে ল্যারিও রয়েছে। তবে সব জল্পনা উড়িয়ে বরিস ঘোষণা দিয়েছেন, ল্যারি স্বপদেই থাকছে।

সরকারপ্রধানের বাসভবনে ইঁদুর ধরতে বিড়াল নিয়োগ ব্রিটেনের শত শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিফ মাউসার’ পদ সৃষ্টি করে বিড়াল নিয়োগের ঘটনা ল্যারির ক্ষেত্রেই প্রথম ঘটেছে। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সিঁড়ি ও শোবার ঘরে ইঁদুরের উৎপাতে ক্লান্ত হয়ে ল্যারিকে নিয়োগ দেন।

যুক্তরাজ্যের চিফ মাউসারের প্রধান দায়িত্ব ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ইঁদুর মেরে সাফ করা। তবে এ কাজে ল্যারির অদক্ষতা নিয়ে কম রসিকতা হয়নি। ২০১২ সালে ক্যামেরন একবার ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে প্রায় বরখাস্তই করেছিলেন। সেবার ক্যামেরনের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুর ধরতে অনীহা দেখিয়েছিল ল্যারি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম তাই তার নাম দিয়েছে ‘লেজি ল্যারি’ (অলস ল্যারি)।

ঘরমুখো মানুষের ঢল

ঈদের আনন্দ পরিবারের সবাইকে নিয়ে উদযাপনে পথেঘাটের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাড়ি ফিরছে দেশের নানা প্রান্তে থাকা কর্মজীবী মানুষ। সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীরা বাড়ি ফিরছেন। ভিড় করছেন বিভিন্ন টার্মিনাল ও স্টেশনে। লঞ্চ, স্টিমার, বাস ও ট্রেনগুলো যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।

বাড়তি সতর্কতার কারণে সড়কে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও ঈদে যাত্রী সেবা শুরুর প্রথম দিনই শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ে রেলওয়ে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়েছে বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রেন।

প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের দের ছুটি কাটাতে বৃহস্পতিবার থেকেই পরিবার নিয়ে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ। এই যাত্রা ছিল মূলত বাস, লঞ্চে ও ট্রেনে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে পরিবহনের চাপ বৃদ্ধি পেলেও যানজট ছিল না। ফলে মানুষ স্বস্তিতে ফিরতে পেরেছেন গন্তব্যে। তবে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলঘরে আগের রাতে উত্তরবঙ্গগামী বাসগুলোকে প্রায় দুই ঘন্টা ধরে যানজটে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবে সকাল ১১ টা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানী ত্যাগ করতে বিভিন্ন স্টেশন ও বন্দরে ব্যাপক ভিড় দেখা যাচ্ছে। ঈদের বাকি আর মাত্র তিনদিন। তাই সবারই তাড়া বাড়ি ফেরার। গাবতলী বাস টার্মিনালে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাসের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলছিল। কারণ তুমুল বৃষ্টিতে বাইপাইল, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজটে ফিরতি বাস আটকে ছিল। শুক্রবার সকালেও দেখা গেছে ব্যাপক ভিড়।

বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং রেলস্টেশনে যেতে বাসা থেকে রওনা হয়ে মিরপুর-১, মিরপুর-১২, পল্লবী, কালশী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রচণ্ড যানজটে আটকা পড়ে যাত্রীরা। অনেকে গণপরিবহন না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যে ছুটতে থাকে। গতকাল দুপুর আড়াইটায় টেকনিক্যাল মোড়ে বৃষ্টিতে ভিজেই গন্তব্যে ছুটছিলেন নাবিল আহমেদ। তিনি জানালেন, পটুয়াখালী যাওয়ার বাস ছাড়বে ৩টায়। এর আগেই পৌঁছতে হবে টার্মিনালে। মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় ক্রমে বাড়তে থাকে। এসব টার্মিনালে পৌঁছতে যাত্রীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে।

ঈদে কত লোক ঢাকা ছাড়ছে-এর সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়। তবে নগরীর বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ এবং মহানগর পুলিশের মতে, এবার ৬০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বেন। এরমধ্যে ৭ হাজার বাসে যাচ্ছে ৩০ লাখ। এছাড়া ট্রেনে ২০ লাখ এবং নৌ ও আকাশ পথে যাচ্ছে ১৫ লাখ মানুষ।

মিনায় পৌঁছেছেন হাজিরা, শনিবার পবিত্র হজ

মিনায় অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে এবারের পবিত্র হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা। শনিবার পালিত হবে পবিত্র হজ। লাখ লাখ হাজির কণ্ঠে ধ্বনিত হবে ‘লাব্বাইক, আল্লা-হুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইক লা- শারিকা লাকা লাব্বাইক।’

হাজিরা এখন মিনায় অবস্থান করছেন। তারা পবিত্র মক্কা থেকে মিনায় পৌঁছেছেন। কেউ গেছেন গাড়িতে চড়ে, কেউবা পায়ে হেঁটে। সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য ও পাপমুক্তির আশায় শুক্রবার সারাদিন তাঁবুর নগরী মিনায় অবস্থান করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন আল্লাহর মেহমানরা।

মিনা থেকে শনিবার ভোরে হাজিরা পৌঁছবেন হজ্বের মূল অনুষ্ঠানস্থল আরাফাতের ময়দানে।সেলাইবিহীন শুভ্র কাপড়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সারাবিশ্ব থেকে সমবেত মুসলমানরা হাজিরা দিবেন।আরাফাতের ময়দানে হজের মুল খুতবা এবং জোহর ও আসর নামাজ একসাথে আদায় করবেন। সন্ধ্যায় মুজদালিফায় গিয়ে আবারো মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন এবং পাথর সংগ্রহ করবেন। রাতে মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করবেন হাজিরা।

ওইদিন ফজরের নামাজ শেষে বড় জামারায় (প্রতীকী বড় শয়তান) পাথর নিক্ষেপ করতে মিনায় যাবেন তারা। পাথর নিক্ষেপ শেষে পশু কোরবানি দেবেন তারা। এরপর মাথা মুড়িয়ে বা চুল ছেঁটে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন।

হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যারা আগে মদিনায় যাননি তারা মদিনায় যাবেন। সেখানে হাজিরা সাধারণত ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। পরে শুরু হবে হাজিদের দেশে ফেরার পালা।

এদিকে হাজিদের সেবায় মিনায় কিছুদূর পরপরই রয়েছে হাসপাতাল। সেখানে চলছে সার্বক্ষণিক সেবাদান। হাজিদের যেন কষ্ট না হয় সে জন্য মিনায় যাওয়ার সব রাস্তা যানজটমুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া হাজিরা চৌচালা ঘরের মতো যে তাঁবুগুলোয় থাকছেন তার ভেতর রয়েছে পর্যাপ্ত আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। এসব তাবুতে রয়েছে শৌচাগার, পানির কল, এমনকি টেলিফোন সংযোগও।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ২২ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবার হজ পালন করছেন।

আরাকান আর্মির সাথে সংঘর্ষে মিয়ানমার সেনা ব্যাটালিয়নের উপ-কমান্ডার নিহত by মো মিয়ন্ত

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর লাইট ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়নের (এলআইবি) নম্বর ১০৫-এর উপ-কমান্ডার গত সপ্তাহে চিন রাজ্যের প্রত্যন্ত পেলেতওয়া টাউনশিপে আরাকান আর্মির সাথে সংঘর্ষের সময় নিহত হয়েছেন। তার ভাই ও বন্ধুরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত সপ্তাহে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কারেন রাজ্যের কাউকারেকে ডেপুটি কমান্ডারের বাড়িতে গিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তার ছোট ভাই কো জিয়ের আঙ ফোনে ইরাবতীকে এ কথা জানান।
কো জিয়ের আঙ বলেন, তার ভাই এপ্রিল থেকে উত্তর রাখাইনের রনাঙ্গনে কাজ করছিল। গত শুক্রবার একজন সিনিয়র কমান্ডার মেজর উইন মিয়ো আঙের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মেজর উইন আঙ, ৩৭, ২০১৮ সাল থেকে ওই ব্যাটালিয়নে ছিলেন।
তিনি বলেন, তার পরিবারের সদস্যরা এখনো তার লাশটি রাখাইন থেকে কারেন রাজ্যে আনতে পারেনি। ফলে তাদের মা রাখাইনে গেছেন সামরিক বাহিনীর আয়োজনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।
আরাকান আর্মি জানিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা লড়াই করছে। তারা অন্তত চার সৈন্যকে হত্যা ও আরো কয়েকজনকে আহত করার দাবি করেছে।
আর তারা জানিয়েছে, সংঘর্ষে তাদের তিন সৈন্য আহত হয়েছে।
কমান্ডার-ইন-চিফের অফিসের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাও মিন তুন মেজর উইন আঙের মৃত্যুর খবর অস্বীকার করেছেন। তবে পেলেটওয়ায় কয়েকজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
জুলাই মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আরেক পদস্থ সদস্য নিহত হয়েছিল। তার নাম ক্যাপ্টেন জাও পিং। তবে তার মৃত্যুর বিষয়টি ইরাবতী নিশ্চিত করতে পারেনি।

‘দারুণ কাজ করেছেন’, কাশ্মীরে জওয়ানদের পিঠ চাপড়ে বললেন অজিত ডোভাল

কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল পাশ নিয়ে চর্চা গোটা দেশে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল থমথমে কাশ্মীরেই ঘাঁটি গেড়ে রয়েছেন অবস্থা খতিয়ে দেখতে। গোটা পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়ার জন্যে এবার কাশ্মীরের সেনাকর্মীদের পিঠ চাপড়ে দিলেন অজিত ডোভাল।
মঙ্গলবার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল শোপিয়ানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের ডিজিপি দিলবাগ সিংহ। এক দিকে রাজৌরিতে নজরদারি, অন্য দিকে উপত্যকায় শান্তি বজায় রাখার জন্য সেনা জওয়ানদের তৎপরতার প্রশংসা করেন ডোভাল। শোপিয়ানে একটি সিআরপিএফ ক্যাম্পে সেনাকর্মীদের উৎসাহ দিয়ে তিনি বলেন,‘আপনারা ভাল কাজ করেছেন।’
সংবাদসংস্থা এএনআইয়ের একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন ডোভাল। তিনি তাঁদের বলেন, ‘‘উপত্যকায় প্রতিদিনের অশান্তি কাম্য নয়। উপত্যকার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যেই পদক্ষেপ করেছে সরকার। কাশ্মীরিদের সুখ, শান্তি সমৃদ্ধির জন্যেই এই সিদ্ধান্ত।’’ ভিডিওতে দেখা যায়, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাবারও খাচ্ছেন ডোভাল। তবে শোপিয়ানে ডোভালের এই জনসংযোগ, শান্তির বার্তা কাশ্মীরের একটি দিক। পাশাপাশি লোকসভায় বিল পাশ হওয়ার পরের দিন অশান্তি নতুন করে দানা বেঁধেছে কাশ্মীরে। শ্রীনগরের রাস্তায় ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করেই বিক্ষোভ শামিল হয়েছে সাধারণ মানুষ।
মঙ্গলবারই কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রকে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। রিপোর্টে তিনি জানান, কাশ্মীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক।সাধারণ মানুষ ৩৭০ ধারা রদের পক্ষেই রয়েছেন। জম্মু কাশ্মীরের অবস্থা স্বাভাবিক হলে তাকে যে আবার রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে এই ‘অভয়বাণী’ও কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ডোভাল।

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে ধরপাকড়: পাকিস্তানের দাবি, নিহত ১২

টানা চতুর্থ দিনের মতো বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগহীন অবস্থা পার করেছে কাশ্মীরের জনগণ। বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা। জারি রয়েছে কারফিউ। এর মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা। বিক্ষোভ প্রবল হচ্ছে সেখানে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ৬০০ মানুষকে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সোমবার থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ কাশ্মীরির মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক।
তবে ভারতের পক্ষ থেকে এমন দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।

গত সোমবার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদের ঘোষণা দেয় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। ধারা রদের ফলে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার সহ বিশেষ সুবিধা হারায় কাশ্মীর। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে দেয়া এক ঘোষণায় এই ধারা রদের কথা জানান। তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে আলাদা দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হবে। এ ঘোষণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানসহ একাধিক দেশ এ ঘোষণার সমালোচনা করেছে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সমপর্ক অবনমন করেছে পাকিস্তান।

১২ কাশ্মীরির মৃত্যুর দাবি পাকিস্তানের: বৃহসপতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড. মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, আমার শেষ ব্রিফিং থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন কাশ্মীরি শাহাদাতবরণ করেছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শত। তিনি বলেন, দখলীকৃত কাশ্মীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত। তারা সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এটা হলো নির্যাতন। এখন মানবিক সংকটে রয়েছে ওই এলাকা। দখলীকৃত ওই উপত্যকায় যে ভয়াবহ নির্যাতন চলছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, দখলীকৃত কাশ্মীর ইস্যুতে সব পক্ষই অভিন্ন অবস্থানে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টের জরুরি যৌথ অধিবেশন এ অবস্থানকেই অনুমোদন দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কাশ্মীরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত জাতিসংঘের।

কাশ্মীর ইস্যুতে আগে থেকেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে ভারত-পাকিস্তান। ভারত সরকারের সামপ্রতিক পদক্ষেপে ফের ওই উত্তেজনা ফুঁসে উঠেছে। বুধবার এক জরুরি বৈঠক শেষে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এনএসসি) জানিয়েছে, তারা ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সমপর্ক সীমিত করবে ও সকল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থগিত করে দেবে। জাতিসংঘে এ ঘোষণার বিপক্ষে প্রস্তাব উত্থাপনের কথা জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া, ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার ও নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত তাদের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। এর প্রভাব দেখা গেছে বৃহসপতিবারই। পাকিস্তানের লাহোর এবং ভারতের দিল্লি ও আত্তারির মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনটি সাময়িক সময়ের জন্য দুই দেশের মধ্যবর্তী ওয়াগা সীমান্তে আটকে দেয় পাকিস্তান।

কাশ্মীর ইস্যুতে উঠে এসেছে কর্তারপুর করিডোরও। ভারতের শিখ সম্প্রদায়ের জন্য ওই করিডোর খুলে দিয়েছে পাকিস্তান। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও সেই প্রতিশ্রুতিতে অটুট থাকবে পাকিস্তান- এমন কথা পুনর্বার তুলে ধরেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই মুখপাত্র।

এদিকে, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সমপর্ক ছিন্ন করা নিয়ে নয়াদিল্লি বলেছে, বিশ্বের কাছে বিপজ্জনক ছবি তুলে ধরার জন্যই পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছিন্ন করছে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে উল্লেখ করে পাকিস্তানকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বলেছে, পাকিস্তানের সমপর্ক ছিন্নের এই সিদ্ধান্ত ‘একতরফা’। পাকিস্তানকে তাদের সিদ্ধান্ত ফের পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগার: এদিকে, বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাশ্মীরের হাজার হাজার মানুষ রীতিমতো বন্দি তাদের বাড়িতে। তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত। টানা চতুর্থ দিনের মতো কারফিউ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেখানে। কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের বাসিন্দা রশিদ আলী জানান, পুরো উপত্যকা এখন একটি কারাগারের মতো। বাধা নিষেধ উঠে গেলেই মানুষ রাস্তায় নামবে।

কাশ্মীরে বর্তমানে অবস্থান করছে কেন্দ্রীয় সরকারের মোতায়েন করা প্রায় ৪০ হাজার সেনা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক অঞ্চলগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে পৃথিবীর ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত কাশ্মীর। বন্ধ রয়েছে মার্কেট, স্কুল-কলেজ। বিক্ষোভের আশংকায় কোথাও চারজনের বেশি লোকের জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে কয়েকশ’ স্থানীয় নেতাকে। পাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে জানান, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কারাগারে পরিণত হয়েছে ভারতশাসিত কাশ্মীরের জনগণ।

বাড়ছে বিক্ষোভ, ধৃত ৫ শতাধিক: কাশ্মীরের অবরুদ্ধ অবস্থা অঞ্চলটির বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ভারত সরকারের এমন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার হচ্ছে। বুধবার বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভের খবর মিললেও বৃহসপতিবার তা প্রবল আকার ধারণ করেছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো অঞ্চল থেকেই ভারত সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে আওয়াজ তুলছেন কাশ্মীরিরা। অসিম আব্বাস নামের এক কাশ্মীরি বলেন, আমাদের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার পরিণতি হবে বিপজ্জনক। এটা আমাদের পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বকেই মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে পাথরের যুগে ফিরে গেছি। বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে আমাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন বলেন, কাশ্মীর তার স্বাধীনতা হারিয়েছে ও ভারতের দাসত্বে চলে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। বারামুলার অধিবাসী আব্দুল খালিক নজর বলেন, এটা তারা পনের আগস্টের পরই করতে পারতো। সামনে আমাদের ঈদ।

কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রাস্তাঘাট এখনো আটকে রাখা হয়েছে। চেকপয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও সশস্ত্র আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রয়েছে কড়া পাহারায়। চলাচল খুবই সীমিত। অবশ্য পুলিশের একজন কর্মকর্তা কয়েকদিনের মধ্যে বিধিনিষেধ কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবাও চালু হবে। 

এদিকে, বার্তা সংস্থা পিটিআইকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানিয়েছে, বুধবার মধ্যরাতে শ্রীনগর, বারমুল্লা ও গারেজ শহরে ঘেরাও অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কমপক্ষে ৫৬০ জনকে। রাজনীতিক ছাড়াও এর মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, ব্যবসায়ী নেতা ও অধিকার কর্মীরা। তাদেরকে অস্থায়ী বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে।
ভারতের সিদ্ধান্তে লাদাখেও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অবরুদ্ধ অবস্থায় কাশ্মীরে কাজের উদ্দেশে যাওয়া শত শত শ্রমিক পালানো শুরু করেছে। তারা উত্তর প্রদেশ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যগুলো থেকে সেখানে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকে বুধবার অভিযোগ করেছেন, জম্মু-কাশ্মীর সফরে বিধিনিষেধ আরোপ করার পর কাশ্মীরে তাদের যারা কাজে নিয়েছিলেন তারা তাদের মজুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের কাজ বন্ধ করে বাড়ি চলে যেতে বলেছেন। এদিন জম্মুর বিভিন্ন রেল স্টেশনে এমন শ্রমিকের ভিড় দেখা গেছে। তারা বাড়ি ফেরার জন্য ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন। এমন এক শ্রমিক সুতার সুরজিৎ সিং এনডিটিভিকে জানান, কাশ্মীর নিরাপত্তার কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাই তিনি বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

কাশ্মিরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রবেশাধিকার চায় ওআইসি

সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এদিকে জম্মু-কাশ্মিরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে একটি বিলও পাস করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা। গ্রেফতার করা হয়েছে সেখানকার শতাধিক স্থানীয় নেতাকে। ইন্টারনেট-মোবাইল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি।
ভারতের পদক্ষেপকে ‘অবৈধ ও একতরফা’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে ওআইসি। জম্মু-কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যাছাই করতে স্বাধীন স্থায়ী মানবাধিকার কমিশন (আইপিএইচআরসি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাকে সেখানে প্রবেশাধিকার দিতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
সৌদি আরবের জেদ্দায় জরুরি বৈঠক শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওআইসি মহাসচিব ইউসুফ বিন আহমেদ আল-ওতাইমিন বলেন, জম্মু-কাশ্মিরের জনগণের আইনসম্মত অধিকার সুরক্ষা, বিশেষত জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে ওআইসির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে কবে? সরকারি হিসাবেই আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪,৬৬৬

প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। রাজধানীতে এর প্রকোপ শুরু হলেও এখন ঢাকার বাইরে রোগী বেড়ে গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আক্রান্তের যে তথ্য দেয়া হয়েছে তাতে এ চিত্রই পাওয়া গেছে। এদিকে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-আতঙ্কও বাড়ছে। মানুষের মুখে মুখে প্রশ্ন কবে নাগাদ ডেঙ্গুর প্রকোপ কমবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর মওসুম। অক্টোবরের আগে পরিস্থিতি একেবারে স্বাভাবিক হচ্ছে না। ঢাকার দুই মেয়রের বক্তব্যেও এমন আভাস মিলেছে।
বিশেষ করে এখন পর্যন্ত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোন ওষুধ মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ অবস্থায় নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন খুব দ্রুতই ডেঙ্গু পরিস্থিতি একেবারে নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তবে ভারি বৃষ্টিপাতে উন্মুক্ত স্থানে থাকা ডেঙ্গুর লার্ভা কিছু কমলে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে পারে।

সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৪ হাজার ৬৬৬ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। মৃতের সংখ্যা এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৯ জন বললেও বেসরকারি হিসাবে শতাধিক। প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গতকালও দুই জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরমধ্যে রাজধানীতে একজন এবং ঢাকার বাইরে অন্য একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৩২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪২৮ জন। একদিনে রাজধানী ঢাকাতেই এক হাজার ১৫৯ জন রোগী এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার ১৬৭ জন ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে রাজধানীতে এক হাজার ২৭৫জন রোগী এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার ১১৫৩ জন। ৬ই আগস্ট একদিনের হিসাবে ভর্তি ছিল ২ হাজার ৩৪৮ জন। গত দুই দিনের তুলনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি একটু কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবে ঘণ্টায় ভর্তি হচ্ছেন ৯৭ জন। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১০১ জনের উপরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৪ হাজার ৬৬৬ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ১০ হাজার ৩০ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, রাজধানী ছাড়া ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৬১৮ জন, চট্ট্রগাম বিভাগে এক হাজার ৯৭৫ জন, খুলনা বিভাগে এক হাজার ৪৮৯ জন, রংপুর বিভাগে ৬১৯ জন, রাজশাহী বিভাগে এক হাজার ১৩৭ জন, বরিশাল বিভাগে এক হাজার ২৬ জন, সিলেট বিভাগে ৩৭৬ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯০জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত্যুও বাড়ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাসপাতাল থেকে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। মৃতের সংখ্যা এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৯ জন বললেও বেসরকারি হিসাবে শতাধিক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকেও মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় বলে সরকারি তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। গত ৭ই আগস্ট এক সেমিনারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, বিভ্রান্তিকর তথ্যে ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের বিশ্বাস করুন। ডেঙ্গুতে নয়জন চিকিৎসকও মারা গেছেন।

অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুসারে, আগস্ট মাসের ৮দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৬ হাজার ২০৫ জন। গত জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ১৬ হাজার ২৫৩ জন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে আগস্ট মাসের আট দিনেই জুলাই মাসের রেকর্ডকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। আক্রান্ত হয়ে জুন মাসে ভর্তি ছিল এক  হাজার ৮৮৪ জন। মে মাসে ১৯৩ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ হাজার ৮৭২ জন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৮ হাজার ৭৬৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এপ্রিলে দুইজন, জুনে তিনজন, জুলাই মাসে ১৭ জন এবং আগস্টে ৭ জন মারা গেছে।

সরকারি হিসাবে মৃতদের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে চারজন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একজন এবং অবশিষ্ট ২৪ জন কোন কোন হাসপাতালে মারা গেছে তা উল্লেখ করা হয়নি। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে তারা মারা গেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে খালেদা আক্তার (২০) নামের এক কলেজছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ডেঙ্গুর দায় কার? by হাসান মাহমুদ রিপন

‘ডেঙ্গু কেড়েছে বাবার প্রাণ, আইসিইউতে মা এবং ভাইয়ের ছেলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ভারাক্রান্ত মনে এমনটাই জানালেন সাবেক প্রধান শিক্ষক মৃত আবদুল ওয়াহেদের ছেলে বদলগাছীর সিনিয়র উদ্যানতত্ত¡বিদ আ ন ম আনোয়ারুল হাসান। তিনি জানান, ডেঙ্গুজ্বরে প্রথমে আমার ভাইয়ের ছেলে আক্রান্ত হয় জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে। ঢাকায় তাকে দেখে নওগাঁর আত্রাইয়ের সাহেবগঞ্জ গ্রামের বাড়ি ফিরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২৫ জুলাই মারা গেলেন বাবা আব্দুল ওয়াহেদ (৭৫)। এরপর মা আকিকুন্নাহার (৬৫) আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন এখনো। সব মিলিয়ে গত একটা মাস ধরে আমাদের চলছে বিভীষিকাময় এক জীবন।

ডেঙ্গুর ভয়াবহতার জন্য ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করছেন নগরবাসী। সময়মতো মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কেউ কেউ বলছেন এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও তাদের দায় এড়াতে পারে না। অপরদিকে রাজধানীর মশা দমনের মূল লক্ষ্য নিয়ে ‘মশক নিবারণ দফতর’ প্রতিষ্ঠা করা হলে মশা নিধনের কাজে না লাগিয়ে এটিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশার প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য নগরবাসী একচেটিয়াভাবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকেই দায়ী করলেও আসলে কার্যক্রমটি সমন্বিত। পরিবেশ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে। নগরীতে এডিস মশা যাতে না জন্মাতে পারে সে ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের প্রধান ভ‚মিকা রয়েছে। এ ছাড়া কমিউনিটি ভিত্তিক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে স্বাস্থ্য অধিদফতরেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা। পাশাপাশি মশক নিধনের ভ‚মিকা সিটি কর্পোরেশনের। আবার সিটি কর্পোরেশনকে যাবতীয় তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। এভাবে এটি হচ্ছে সমন্বিত একটি কার্যক্রম। আর তাই এককভাবে এ ব্যাপারে কোনো সংস্থা বা কাউকে দায়ী করা সঠিক নয়।

রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যেন কোনো কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে পরিস্থিতি। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেছেন। তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত রাজধানীসহ দেশবাসী। আতঙ্কের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগও। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করলেও সংশ্লিষ্ট মহলের টনক নড়েনি। ডেঙ্গু দ্রæত বিস্তার লাভ করা একটি সংক্রামক রোগ হলেও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা না নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কিছু অপ্রয়োজনীয় বুলি আওড়াচ্ছেন আর জনসচেতনতা কার্যক্রমের নামে লোক দেখানো ফটোসেশন করছেন বলে অভিযোগ নগরবাসীর। অপরদিকে রাজধানীর মশা দমনের মূল লক্ষ্য নিয়ে ‘মশক নিবারণ দফতর’ প্রতিষ্ঠা করা হলেও মশা দমনের কাজে নাই এই দফতরটি। নগরবাসীর জিজ্ঞাসা রাজধানী ছাড়িয়ে এখন ডেঙ্গুর ভয়াবহতা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার দায় কার!

দেশজুড়ে এখন এক আতঙ্কের নাম মশা আর ডেঙ্গু। চলতি আগস্ট মাসের ১ থেকে ৬ তারিখ পর্যন্ত ৬ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৪৫১ জন। সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা ঢাকতে জনসচেতনতাকে প্রধান সমস্যা হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই রোগে ইতোমধ্যে বেসরকারি হিসেবে প্রায় অর্ধশত মানুষ মারা গেছেন। অথচ বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বশীলদের অসংলগ্ন কথা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে নানা সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, মশার ওষুধের মান নিয়ে অপপ্রচার করা হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশনের ছিটানো ওষুধ কার্যকর। অথচ একই মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং খোদ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাই উচ্চ আদালতে মশা নিধনের ওষুধ মানহীন বলে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে ছেলেধরার মতো বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, মশক নিধনে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। সবকিছু মিলিয়ে দায়িত্বশীলদের কিছু বিভ্রান্তিকর কথায় মানুষের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে রাজধানীর মশা নিবারণের জন্য একটি ‘মশক নিবারণ দফতর’ থাকলেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন যখন মশা মারতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই দফতর করে যাচ্ছে শুধুই প্রশাসনিক কাজ।

যদিও মশা দমনের মূল লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এক সময় এই দফতরের কাজে প্রাণচাঞ্চল্য থাকলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে সুনসান নীরবতা। এখন শহরের মশা দমনের কাজে নয়, সিটি কর্পোরেশনের মশার ওষুধের খালি ড্রাম সংরক্ষণের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার হয় এই দফতরটি। সরেজমিন ঘুরে এবং সেখানকার কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, মশা নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো কর্মসূচি বা গবেষণা কার্যক্রম নেই। কর্মীদের মধ্যে ক্রু, সুপারভাইজার, কয়েকজন ইনসেক্ট কালেক্টর (আইসি) রয়েছে। তাদের অধিকাংশই দফতরের অধীন কাজ করেন না, দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। তবে সিটি কর্পোরেশনের অধীন কাজ করলেও কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে এ দফতর।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব অ. ন. ম ফয়জুল হক দফতরের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, ‘দফতরের প্রশাসনিক কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেয়া ছাড়া, দফতরের কর্মসূচি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। দফতরের কাজ নিয়ে বলতে পারবেন দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

ঢাকা মশক নিবারণী দফতর সরকারি কর্মচারী সমিতির সেক্রেটারি গিয়াসউদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠার সময় ম্যালেরিয়া মোকাবিলা করতে ঢাকায় সব ধরনের মশা নিধনে কাজ করত এ প্রতিষ্ঠানটি। তখন সংস্থাটি বেশ জমজমাট ছিল। অনেক লোক কাজ করতেন। মশা নিয়ন্ত্রণে বেশ ভালো ভ‚মিকা পালন করত এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কখন কীভাবে এই অবস্থা হলো জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটির কাজই ছিল মশা নিধন করা। তবে এখন সেই ক্ষমতা নেই। আমরা শুধু ঢাকা-উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মশা মারার ওষুধ বিভিন্ন জোনে বিতরণ করি।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে গতকাল মঙ্গলবার ভারত থেকে আনা নতুন ওষুধের কার্যকারিতা নগর ভবনে পরীক্ষা করা হয়। এ সময় নয়টি করে খাঁচার প্রতিটিতে ৫০টি করে মশা সারিবদ্ধভাবে রেখে তিন ফুট দূর থেকে মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ স্প্রে করা হয়। ম্যালাথিয়ন আর ডেল্টামেথ্রিন ওষুধ স্প্রে করে দেখা হয় কতটি মশা মারা যায়। স্প্রে করার ২০ মিনিট পর মরা মশা গোনা হয়। ওষুধের মধ্যে ম্যালাথিউন ৫% এবং ডেল্টামিথারিন ১.২৫% স্প্রে করা হয়। মশার নিধনের নতুন ওষুধ এডিস মশা নিধনে কার্যকর কিনা তা জানতে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রায় ৮০ ভাগ মশা অজ্ঞান হচ্ছে বলে মনে করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান।

এদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারাদেশে বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা। গতকাল মঙ্গলবারও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে প্রবাসী হাফসা লিপি (৩৪) এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) তিনজনসহ সারাদেশে মারা গেছেন আটজন। এদের মধ্যে ঢামেকে মনোয়ারা বেগম (৭৫), আমজাদ মণ্ডল (৫২) ও হাবিবুর রহমান (২১)। রংপুর ও চাঁদপুরে একজন করে শিশু এবং দিনাজপুরে এক কিশোর ও মানিকগঞ্জে এক যুবক রয়েছে।

এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে রাজধানীর মুগদা হাসপাতালের অষ্টম তলায় শিশু ওয়ার্ডের সিঁড়ির গোড়ায় অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু রোগী ৪৭৩ জন, মুগদা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. খাইরুল আলমের দেয়া তথ্যমতে, ৫০০ শয্যার মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪৮৪ জন। এদের মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ৩৭৩, শিশু ওয়ার্ডে ৭৯ এবং কেবিনে ভর্তি ৩২ জন। আর টোটাল রোগীর সংখ্যা ৭৯০ জন। অর্থাৎ এই মুহূর্তে মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর ৬১ শতাংশ হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত। হাসপাতালটিতে গত এক মাসে ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন মোট ৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডাক্তার আয়েশা আক্তার জানান, ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩৪৮ জন। এর মধ্যে রাজধানীতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৪ জন এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে এ সংখ্যা ১ হাজার ৬৪।

হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রতিবেদনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮৩ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ১০৪ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩৮ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৮৬ জন, বারডেম হাসপাতালে ২০ জন, বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ৪৩ জন, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ২৬ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২১ জন, বিজিবি হাসপাতালে ৭ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসাপাতালে ৪৮ জন ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছে ৪৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী। আর ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর হাসপাতালগুলোতে মোট ২৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩১ জন, খুলনা বিভাগে ১৬৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০৬ জন, বরিশাল বিভাগে ১২৪ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৮ জন, রংপুর বিভাগে ৬৬ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

এদিকে বছরের শুরুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নগরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সতর্কতা জারি করা হলেও তা আমলে নেয়নি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, শুরুতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই সিটি কর্পোরেশন যদি বিষয়টি আমলে নিত তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। মেয়রদের মাঠে দেখা গেলেও এ ইস্যুতে কাউন্সিলরদের তৎপরতা এখনো প্রত্যাশিত নয় বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। এসব অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু ভয়াবহতা পেয়েছে। এখন প্রতি মুহূর্তে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এখন দুই সিটি প্রতিদিনই সচেতনতামূলক কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করলেও মশা বা লার্ভা নিধনে তেমন কার্যকর ভ‚মিকা রাখছে না। অনেকে এসব কাজকে লোক দেখানো মশক নিধন কার্যক্রম বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও প্রখ্যাত ভাইরালজিস্ট অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে দেশে ডেঙ্গুর এমন অবস্থা সৃষ্টি হতো না। তিনি দেশবাসীকে নির্দেশ দিলে সবাই কোদাল হাতে চারপাশ পরিষ্কার করত।’ অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হচ্ছে লার্ভা ও মশা নিধন করা। যার যা করা দরকার, তাকে সেটা করতে হবে।

ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা আগস্ট মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু মশার প্রজনন বাড়তে পারে। জরুরি ভিত্তিতে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্বাস্থ্য অধিদফতর।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মাহমুদ খান বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতর যেসব প্রতিবেদন দিয়েছে সেটি যদি দুই সিটি কর্পোরেশন আমলে নিত তাহলে আজকে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তিনি বলেন, মশা মারার বাজেট বাড়ানো হলেও নাগরিকরা সেবা পাচ্ছেন না। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছেÑ এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাতে মশা মরছে না। অকার্যকর মশার ওষুধের কারণে যতই বাজেট বাড়ানো হোক, কোনো কাজে আসবে না। এর মধ্যে দুর্নীতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।’

দুই সিটি কর্পোরেশন ও নগরীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবিব বলেন, ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না, এটা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। রোগতত্ত¡, কীটতত্ত¡ বিভাগ ও আইসিডিডিআরবিসহ কিছু সংস্থা গত ৩ বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। দুই মেয়রের কাছে তারা তুলে ধরেছে, মশক নিধনের ওষুধ এখন আর কার্যকর নয়। তারপরও তিন বছরে বিকল্প ওষুধ বা বিদ্যমান ওষুধ কার্যকর আছে কিনা, তা অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নগরবাসীকে রক্ষার বাস্তবিক প্রয়াস দুই মেয়র নেননি। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হলে মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে আরো সক্রিয় হতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদফতর, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কাযর্ক্রম আরো জোরদার করা দরকার। ব্যক্তি সচেতন হলে মশাবাহিত এই রোগ হ্রাস পেতে পারে, এমনটি মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কাযর্ক্রমও ব্যাপকহারে বাড়ানো দরকার।

মানুষের কর্মকাণ্ডে বিপন্ন ১০ লাখ প্রজাতির অস্তিত্ব

আকাশ, পাতাল কিংবা সাগর- সবখানেই প্রকৃতির ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের বিধ্বংসী প্রভাব ১০ লাখ প্রজাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন এমন কথাই বলছে।
সোমবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। সবখানেই এমন দ্রুতগতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনতি ঘটছে যেমনটি আগে কখনো দেখা যায়নি।

এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে মানুষের খাবার ও জ্বালানির চাহিদা। যদিও চাইলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তবে এর জন্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আন্তসম্পর্কের প্রতিটি পরতে পরতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রয়োজন।

১৫ হাজার তথ্যসূত্র নিয়ে ৩ বছরের গবেষণা শেষে ১৮০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করেছে জাতিসংঘের 'ইন্টারগভার্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিস' । এরই ৪০ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ ‘সামারি ফর দ্য পলিসিমেকার’ সোমবার প্রকাশিত হয়েছে প্যারিসে।

এতেই বলা হয়েছে, যে মৌমাছি পরাগায়ন করে সেই ক্ষুদ্র প্রাণীটি থেকে শুরু করে বন্যার পানি ধরে রাখতে সহায়ক বনাঞ্চল পর্যন্ত মানুষের কর্মকাণ্ডে কিভাবে ধ্বংস হয়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রকৃতি সবসময়ই মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে দুর্ভোগ পোহিয়েছে। গত ৫০ বছরে তা আরো প্রকট হয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির পরিসর বেড়েছে চারগুণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে ১০ গুণ।

বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে উদ্বেগজনক হারে ধ্বংস করা হচ্ছে বন,বিশেষ করে ক্রান্তীয় অঞ্চলগুলোতে। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে ১০ কোটি হেক্টর ক্রান্তীয় বন। মূলত দক্ষিণ আমেরিকায় গবাদি পশু চরানো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাম তেল উৎপাদনের কারণে এমনটি হয়েছে।

বিশ্বে এখন দ্রুতই নগরায়ণ হচ্ছে। ১৯৯২ সালের পর থেকে এখন নগরায়ণের হার দ্বিগুণ। মানুষের এমন কর্মকাণ্ডে আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হারে বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতি।

বৈশ্বিক হিসেব অনুযায়ী, গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি এখন ঝুঁকির মুখে আছে। পতঙ্গের ক্ষেত্রে সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে বেশ কিছু এলাকায় তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি ভালোভাবেই নজরে এসেছে এবং তা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

এসব নথিই প্রমাণ করছে যে, কয়েক দশকের মধ্যেই প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। আর এই বিলুপ্ত হওয়ার হার গত ১ কোটি বছরের গড় বিলুপ্তির হারের চেয়ে শত থেকে হাজার গুন বেশি।

পরাক্রমশালী হবে তুরস্ক by এরদোগান

নয়া দিগন্ত, ১১ জুলাই ২০১৮: তুরস্ককে নতুন করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। দেশটির নতুন শাসনব্যবস্থার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর দেয়া ভাষণে এ অঙ্গীকার করেন তিনি। শপথ নেয়ার পর তিনি তার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করেছেন। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানী আঙ্কারার গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে পার্লামেন্টের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার দুরমাস ইলমিজের সভাপতিত্বে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
শপথ গ্রহণের পর উদ্বোধনী ভাষণে এরদোগান বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যমে তুরস্ক তার অগ্রযাত্রা নতুন করে শুরু করেছে।’ তিনি ‘শক্তিশালী সরকার ও শক্তিশালী তুরস্ক’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আঙ্কারায় প্রেসিডেন্ট কমপ্লেক্সে দেশী-বিদেশী বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে দেয়া বক্তৃতায় এরদোগান বলেন, ‘আমরা একটি নতুন শাসনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছি; যেটি আমাদের ১৫০ বছর ধরে গণতন্ত্র অনুসন্ধান থেকে অনেক দূরে এবং আমাদের ৯৫ বছর বয়সী গণপ্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে আমরা এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে চেষ্টা করব। আমাদের যারা ভোট দিয়েছেন, আমি কেবল তাদের প্রেসিডেন্ট হবো না, তুরস্কের ৮ কোটি ১০ লাখ নাগরিকের প্রেসিডেন্ট হতে চাই।’
তিনি বলেন, নতুন এই ব্যবস্থা অতীতের প্রান্তিকীকরণ, নিপীড়ন এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটাবে। তিনি আরো বলেন, নুতন ব্যবস্থায় গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা, অর্থনীতি এবং বৃহৎ বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে তুরস্ক আরো এগিয়ে যাবে। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তুরস্ককে শক্তিশালী করতে কাজ চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার করেন এরদোগান। এরদোগানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশের প্রায় ১০ হাজার বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অতিথিরা অংশগ্রহণ করেন।
এরদোগান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে সিরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে তুরস্ককে রক্ষার জন্য নির্বাহী ক্ষমতার দিক দিয়ে প্রেসিডেন্টের অনেক বেশি ক্ষমতাশালী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ভাষণে তিনি ‘শক্তিশালী সরকার ও শক্তিশালী তুরস্ক’ গড়ার প্রতিশ্রুুতি দেন।
বিদেশী নেতাদের মধ্যে কাতারের আমিরসহ ২১টি দেশের প্রেসিডেন্টরা উপস্থিত ছিলেন। দেশগুলো হচ্ছে- বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, কসোভো, পাকিস্তান, কিরগিজস্তান, সুদান, গিনি, জাম্বিয়া, গিনি বিসাউ, নিরক্ষীয় গিনি, সোমালিয়া, মৌরিতানিয়া, গ্যাবন, শাদ, জিবুতি, ভেনেজুয়েলা, তুর্কি প্রজাতন্ত্রের উত্তর সাইপ্রাস। এ ছাড়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন। নতুন নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণা করেছেন রজব তাইয়েব এরদোগান। প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর ১৬ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন তিনি।
এরদোগান বলেন, নতুন এই প্রশাসনব্যবস্থা নির্বাহী শাখাকে আরো দক্ষ করে তুলবে। তিনি তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফুয়াত ওকাতায়’র নাম ঘোষণা করেন। পূর্ববর্তী সরকারে তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওলুদ কাভুসোগলু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোলায়মান সোয়োলুকে তাদের আগের পদেই বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন মন্ত্রিসভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এই যে, সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী ও এদোগানের জামাতা বেরাত আলবায়েরাক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এবং সেনাপ্রধান হুলুসি আকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছেন।
নতুন ব্যবস্থায় প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদে সদস্যের সংখ্যা ২৫ থেকে কমিয়ে ১৬ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতটি মন্ত্রণালয় এই ১৬টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন সরকারের অধীনে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক আগামী শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে।
নতুন ব্যবস্থায় ৬৪ বছর বয়সী এরদোগান রাষ্ট্রীয় নির্বাহী শাখার নেতৃত্ব দেবেন এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন বিচারপতিদের নিয়োগ কিংবা বরখাস্ত করার ক্ষমতার অধিকারী হবেন। এ ছাড়া, পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার ক্ষমতাসহ কার্যনির্বাহী আদেশ জারি করা এবং জরুরি অবস্থা আরোপ করার ক্ষমতাও পাবেন প্রেসিডেন্ট। উল্লেখ্য, নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদের বিলুপ্তি ঘটেছে।
এরদোগানের সমর্থকেরা তুরস্কের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে এমন এক নেতার জন্য উপহার হিসেবে বিবেচনা করছেন, যিনি জনজীবনে ইসলামি মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মভীরু শ্রমজীবী শ্রেণীর পাশে থেকেছেন এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।