Showing posts with label কাজী আনিছ. Show all posts
Showing posts with label কাজী আনিছ. Show all posts

Thursday, February 4, 2016

শিশু শান্তকে ফিরিয়ে দিতে চান মা! by কাজী আনিছ

মায়ের কোলে রবিউলl ফাইল ছবি
ধরে নিয়ে কেটে ফেলা হয়েছিল নয় বছরের শিশু রবিউল ইসলাম শান্তর দুই হাত। দেশে চিকিৎসা শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা রুকসানা কামার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। তার দুই হাতে সংযোজন করা হয় কৃত্রিম হাত। ওই কর্মকর্তা দেশে ফিরে তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু কিছুদিন পর পরিবার তাকে নিয়ে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করাতে থাকে। এ নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আদালত শিশুটির ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। এখন শান্তর মা সেই কর্মকর্তার কাছে শান্তকে ফিরিয়ে দিতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তা রুকসানা কামার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ৩১ জানুয়ারি রাতে ফোন করে নাসিমা বেগম তাঁর ছেলে শান্তকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শান্তর মা চান, তাঁর ছেলে আবার লেখাপড়া শুরু করুক।’
যোগাযোগ করা হলে নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমি বাসা বাড়িতে কাজ কইরা খাই। আমার তিন ছেলে এক মেয়ে। শান্তর লেখাপড়া হইতেছে না। তাই তার লেখাপড়ার জন্য ওনার (রুকসানা কামার) কাছে শান্তকে দিমু কইছি।’
পরিবারের সঙ্গে গুলশানের কড়াইল বস্তিতে থাকত শান্ত। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সে নিখোঁজ হয়। কয়েক দিন পর দুই হাত কাটা অবস্থায় কে বা কারা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পালিয়ে যায়। নাসিমা বেগমের অভিযোগ, শান্তর সৎ বাবা মো. জাহাঙ্গীর এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তখন পুলিশেরও ধারণা ছিল, ভিক্ষাবৃত্তি করানোর উদ্দেশ্যে বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে জাহাঙ্গীর এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি মামলা করেন নাসিমা। পুলিশ জাহাঙ্গীরসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে ২০১৩ সালের ২২ মার্চ ‘এ কেমন নির্মমতা’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়৷
দেশে কিছুদিন চিকিৎসার পর বেশ কয়েকজনের সহায়তায় কর্মকর্তা রুকসানা রবিউলকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে রবিউলের শরীরে কৃত্রিম দুটি হাত সংযোজন করা হয়। দেশে ফিরে ফরিদপুরের সদরের বাখুন্ডায় রুকসানার নিজ গ্রামে একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে রবিউলকে ভর্তি করা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ মে প্রথম আলোয় এ নিয়ে ‘আমি এখন লিখতে পারি’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। লেখাপড়ার একপর্যায়ে পরিবার শান্তকে নিয়ে যায়। তাকে দিয়ে পরিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি করাতে থাকে। এ নিয়ে গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণে ‘শিশু রবিউলের এ পরিণতি!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরদিন ‘শিশু রবিউলকে দিয়ে ভিক্ষা করাচ্ছে পরিবার’ শিরোনামে প্রথম আলোর প্রিন্ট সংস্করণে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং আদালতে শান্তর পরিবারকে হাজির করার নির্দেশ দেন। পরে আদালত শান্তকে দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি না করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করেন। এরপর থেকে শান্তকে দিয়ে ভিক্ষা করানো বন্ধ রাখে পরিবার।
ফরিদপুরের বাখুন্ডা গ্রামের ‘শরীফ আবদুল মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল শান্ত। জানতে চাইলে ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিতারা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘রুকসানা কামার শিশু শান্তকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও আমরা শান্তর লেখাপড়ার বিশেষ যত্ন নিয়েছিলাম। পড়ার দক্ষতাও আস্তে আস্তে বাড়ছিল। কৃত্রিম হাতে সে লেখাও রপ্ত করেছিল। পরীক্ষায়ও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম, পরিবার তাকে নিয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চাই, শান্ত লেখাপড়ার অন্তত সুযোগটা পাক।
শান্তকে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ বিষয়ে জানতে চাইলে মা নাসিমা কিছুক্ষণ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আবার কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এইখানে থাইক্কা শান্তর লেখাপড়া নষ্ট হইয়া গেছে। আমি চাই সে লেখাপড়া করে মাইনষের মতো মানুষ হোক। তয় আমি দশজনরে সাক্ষী রাইখা ছেলেরে দিতে চাই।’
জানতে চাইলে রুকসানা কামার বলেন, ‘আমি শান্তর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতে এখনো রাজি। তবে তার মাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি আদালতের মাধ্যমেই তাকে নিতে চাই। শান্ত অনেক মেধাবী। তার জীবনটা নষ্ট হোক তা চাই না। আমি তাকে সুশিক্ষিত করতে চাই। দীর্ঘদিন আমার কাছে থাকার কারণে তার প্রতি আমার বড্ড মায়াও পড়ে গেছে।’

Thursday, December 10, 2015

পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু: তথ্য দিচ্ছে না রেলওয়ে, থমকে আছে তদন্ত! by কাজী আনিছ ও আসাদুজ্জামান

জিহাদ
রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ের পানির পাম্পের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনার পুনঃতদন্ত কার্যত থমকে গেছে। হাইকোর্টের দেওয়া পুনঃতদন্তের নির্দেশের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ।
তদন্ত থমকে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন খোদ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, ওই নলকূপ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ কারণে তদন্ত আর এগোচ্ছে না।
২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনি এলাকায় গভীর পাইপে পড়ে যায় শিশু জিহাদ। পরদিন দুপুরে কয়েকজন সাধারণ যুবক চেষ্টা চালিয়ে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করে। গণমাধ্যমের কল্যাণে এ ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়।
শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে বাবা নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে ওই পানির পাম্প বসানোর প্রকল্প পরিচালক রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসআর-এর মালিক প্রকৌশলী আবদুস সালামের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। গত ৭ এপ্রিল এ দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। কিন্তু আরও কয়েকজন আসামির নাম বাদ পড়ায় জিহাদের বাবা নাসির অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেন। নারাজিতে আবু জাফর, সাইফুল ইসলাম, দীপক বাবু ও নাসির উদ্দিন নামের রেলওয়ের চার কর্মকর্তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়ার আবেদন করা হয়। শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনাস্থল ওই পানির পাম্প স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে এ চারজনেরও অবহেলা ছিল বলে নারাজিতে বলা হয়।
নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুন আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) নির্দেশ দেন। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।
জিহাদের বাবা নাসির বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আমি ছিলাম শোকাহত। থানা-পুলিশ একটা অভিযোগ লিখেছিল। সেখানে আমি শুধু সই করি। আর ওই অভিযোগটাই মামলা হয়। মামলায় দুজনের নাম ছিল। কিন্তু পরে আমি জানতে পারি, আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আরও কয়েকজনের অবহেলা আছে। তাদের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত না করায় আমি নারাজি দিয়েছি।’ নাসির বলেন, তিনি নারাজি আবেদনে নতুন চারজনের নাম দিয়েছেন। তাঁরা ওই পানির পাম্প স্থাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অথচ তারপরও কোনো তদন্ত হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জিহাদের  বাবা নাসির বলেন, মামলার তদন্ত এভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ায় সুযোগ পেয়ে বসছে জড়িতরা। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে ক্ষতি আছে বলেও হুমকি দিচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে আমি রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি দিয়েছি। ওই নলকূপ স্থাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারা, তাঁদের নাম-ঠিকানা, তাঁদের পদবিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে এ চিঠি দিয়েছি। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো উত্তর পাইনি।’ তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দিচ্ছে না বলেই মামলা নিয়ে এগোতে পারছেন না তিনি। তবে তিনি এবার নিজেই রেলওয়ে কার্যালয়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করব।’
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাত্র এক মাস হলো আমি এ পদে যোগ দিয়েছি। এ বিষয়টি আমি জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। আর তথ্য চাইলে অবশ্যই তথ্য দেব।’

এ কান্না যেন থামার নয়! by কাজী আনিছ

বছরও হয়নি। শিশু সন্তান জিহাদকে হারিয়েছিলেন
মা খাদিজা বেগম। গতকাল রাজধানীর শ্যামপুরে
শিশু সন্তান নিরবকে হারালেন আরেক মা নাজমা বেগম।
টেলিভিশনে নিরবের মৃত্যুর খবর দেখে জিহাদের কথা
মনে পড়ে কেঁদেছেন খাদিজাও। ফাইল ছবি
প্রায় এক বছর হতে চলল আদরের সন্তানকে হারিয়েছেন। বুকে কষ্ট চাপা দিয়ে কোনোমতে জীবনটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন মা। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার সেই শোক আর চেপে রাখতে পারেননি। গতকাল বিকেল থেকে টেলিভিশনে খবর দেখেছেন আর অঝোরে কেঁদেছেন তিনি। রাজধানীর শ্যামপুরে শিশু নিরবের মৃত্যুর খবর তাঁকে মনে করিয়ে দিল, এক বছর আগে সন্তান হারানোর সেই করুণ দৃশ্য।
এই মা খাদিজা বেগম। শিশু জিহাদের মা। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে পাম্পের গভীর পাইপে পড়ে জিহাদের মৃত্যু হয়।
ওই ঘটনার বছর পার না হতেই গতকাল রাজধানীর শ্যামপুরের খোলা ও গভীর নালায় পড়ে মারা যায় শিশু নিরব। এ ঘটনায় শুধু নিরবের বাসায় আহাজারি ছিল না, শোকের মাতম ছিল শিশু জিহাদের বাসায়ও। টেলিভিশনে নিরবের মৃত্যুর খবর দেখতে দেখতে জিহাদের কথা মনে করে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মা খাদিজা। ঠিক ঘটনার দিনের মতোই বিলাপ করেছেন।
জিহাদের বাবা নাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিহাদ মারা যাওয়ার পর কয়েক মাস ওর মা শুধুই কাঁদত। জিহাদের ছবি আর কাপড়চোপড় বুকে জড়াইয়া আহাজারি করত। কিন্তু আস্তে আস্তে আস্তে মনডা শক্ত করার চেষ্টা করতেছিল সে। কষ্ট ভুইল্যা সংসারে মনোযোগ দিছিল কিছুটা। কিন্তু কাইল টেলিভিশনে নিরবের ঘটনা দেখছে, আর কাঁদছে। মনে হইল, কালকেও সে আবার জিহাদরে হারাইছে।’
নাসির বলেন, সন্তান হারানোর কষ্টটা তাঁরা বোঝেন। এভাবে নালায় পড়ে, পাইপে পড়ে কারও সন্তান মারা যাক, তাঁরা তা চান না।

Tuesday, December 1, 2015

ডালা সাজিয়ে রমরমা মাদক–ব্যবসা by কাজী আনিছ

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের রেললাইনের
পাশে এভাবে ডালা সাজিয়ে মাদক বিক্রি
করছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। ছবিটি ভিডিওচিত্র
থেকে নেওয়া। ছবি: কাজী আনিছ
‘মামা, আসেন, নিয়া যান। ১০ টাকার না ২০ টাকার?’
এভাবে সুর করে ক্রেতাদের ডেকে চলেছেন তাঁরা। সংখ্যায় প্রায় ৩০-৪০ জন। রেল লাইনের বস্তির ঘরের সামনে ডালা সাজিয়ে বসেছেন তাঁরা। ক্রেতারাও যাচ্ছেন অনেকে। টাকা দিয়ে কিনে নিচ্ছেন ডালায় সাজিয়ে রাখা পণ্য। এগুলো গাঁজা। সোজা কথায় মাদক দ্রব্য।
প্রকাশ্যে ডালা গাজা সাজিয়ে এভাবে মাদক দ্রব্য বিক্রির রমরমা ব্যবসা চলছে রাজধানীর তেজগাঁও থানা এলাকার রেললাইন সংলগ্ন একটি বস্তিতে।
দূর থেকে মনে হবে, এটা কোনো সাধারণ হাট-বাজার। সাধারণ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করছেন তাঁরা। কাছে ভিড়লেও অনেকে টের পাবেন না। কেবল মাদকসেবী ক্রেতাদের কাছেই এর মাহাত্ম্য জানা।
আজ সোমবার বিকেলে ওই এলাকায় গেলে মাদক দ্রব্য বেচাকেনার এ দৃশ্য চোখে পড়ে। একটি ঘরের সামনে ডালাভর্তি গাঁজা নিয়ে লোকজনকে ডাকছিলেন এক নারী। পাশে তাঁর শিশু সন্তান। জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘আগে গার্মেন্টসে চাকরি করতাম। যা পাই পোষায় না। তাই গাঁজা বিক্রি করি।’ ছবি তুলতে গেলে এ নারী ডালা ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলেন। বলেন, ‘এমনি দেখেন, ছবি তুইলেন না।’
ওই ঘরের পাশে ডালা সাজিয়ে গাঁজা বিক্রি করছিলেন তিন-চারজন নারী। পাশে এক ব্যক্তি। কাছে গেলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাংবাদিক? ছবি তুইলা কোনো লাভ নাই। থানা-পুলিশ ম্যানেজ করা আছে।’
এ পেশায় কেন—জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আপনি আমারে চাকরি দিলে পাঁচ হাজার টাকার বেশি বেতন দিতে পারবেন না। কিন্তু আমি গাজা বেইচা মাসে ম্যালা টাকা কামাই।’
এখানেও ছবি তুলতে গেলে এক নারী তেড়ে এসে বলেন, ‘খবরদার ছবি তুলবেন না। এখান থেকে চলে যান। সবাই মিলে ধরলে বাঁচতে পারবেন না।’ কয়েকজনের নাম পরিচয় জানতে চাইলে এক নারী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘কী করবেন। পেপারে ছাপাইবেন। যান, ছাপান। কেউ কিছু করতে পারবে না।’
স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার বলেন, এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চলছে। তবে কিছুদিন থেকে এভাবে ডালা সাজিয়ে প্রকাশ্যে মাদক দ্রব্য বিক্রি শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে, কয়েক দিন পর মাদক ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে বসবেন।
এভাবে ডালা সাজিয়ে মাদক বিক্রির বিষয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘কী বলেন! এভাবে মাদক বিক্রি হচ্ছে!’
ওসি বলেন, ‘আমরা এ মাদক দ্রব্যের ব্যবসা বন্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গত এক মাসে মাদক দ্রব্য বিক্রির দায়ে ১৯৫ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। অর্ধ শতাধিক মামলাও হয়েছে।
ওসি বলেন, ‘আমরা এখন সাধারণ পোশাকে টহল দিতে পারি না। পুলিশ গেলে সবাই সবকিছু লুকিয়ে ফেলে। আমি এক্ষুণি পুলিশের একটি দল পাঠাচ্ছি।’

Saturday, November 7, 2015

‘নিরাপত্তাহীনতায়’ এলাকা ছাড়লেন লাবণ্য হিজড়া by কাজী আনিছ

লাবণ্য হিজড়া।
ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানের দুই হত্যাকারীকে ধরিয়ে দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। ‘সাহসিকা’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও হয়েছে অনেক। দেশ ও দেশের বাইরে তাঁর সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন অনেকে। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে ভয়ে শেষমেশ তিনি ঢাকা ছেড়েই চলে গেলেন। তিনি লাবণ্য হিজড়া।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ীতে প্রকাশ্যে ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর পালানোর সময় জিকরুল্লাহ ও আরিফুলকে ধরে ফেলেন লাবণ্য। পরে আশপাশের আরও কয়েকজন হিজড়া ও স্থানীয় লোকজন দৌড়ে গিয়ে দুই হত্যাকারীকে আটকে ফেলেন। পরে তাঁদের পুলিশে দেওয়া হয়। ঘটনার পরদিন ৩১ মার্চ ওয়াশিকুরের ভগ্নিপতি মনির হোসেন বাদী হয়ে জিকরুল্লাহ ও আরিফুলসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করেন। পরে মামলার তদন্তভার ডিবিকে দেওয়া হয়।
গত ১ সেপ্টেম্বর ডিবি পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। ওই পাঁচ আসামি হলেন জিকরুল্লাহ, আরিফুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, জুনায়েদ ওরফে তাহের ও হাসিব আবদুল্লাহ। এঁদের মধ্যে জিকরুল্লাহ, আরিফুল ও সাইফুল কারাগারে আছেন। অন্য দুজন পলাতক। মামলায় লাবণ্য ও আরেক হিজড়াসহ ১০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
রাজধানীর মগবাজার এলাকায় অন্য হিজড়াদের সঙ্গে থাকতেন লাবণ্য। আজ বিকেলে অনন্যা নামের তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অনন্যা বলেন, ‘ঘটনার কয়েকদিন পর সাংবাদিকসহ অনেকে লাবণ্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নিউজ করেছেন। তখন হত্যাকারী ধরিয়ে দেওয়া হলেও লাবণ্য এত বেশি ভয় পায়নি। কিন্তু পরে আর কেউ কোনো খোঁজ না নেওয়ায় লাবণ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন।’
অনন্যা বলেন, ‘কে কে জানি আমাদের ফোন করত। লাবণ্যকে ফোন করত। কথাবার্তা শুনে সন্দেহ লাগত। এতে লাবণ্য আরও বেশি ভয় পাইয়া যায়। এক পর্যায়ে ভয়ে সে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তবে সে এখন কোথায় আছে, তা আমি জানি না।’
লাবণ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অনন্যা হিজড়া স্বপ্না নামের আরেক হিজড়ার মুঠোফোন নম্বর দেন। যোগাযোগ করা হলে স্বপ্না বলেন, ‘এতদিন পর খোঁজ নিলেন। লাবণ্য তো ভয়ে পালিয়ে গেল। আর ঢাকায় আসবে না। শুধু লাবণ্য না, আমরা সবাই নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’
স্বপ্নার কাছ থেকে লাবণ্যের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করা হয়। অপর প্রান্ত থেকে হৃদয় পরিচয়ে একজন প্রথমে বলেন, ‘আমি লাবণ্য নামের কাউকে চিনি না।’ সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর এবার তিনি বলেন, ‘লাবণ্য আমার পরিচিত। মোবাইলের সিমটি লাবণ্যের। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগে লাবণ্য সিমটি আমাকে দিয়ে দিয়েছে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে লাবণ্যের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। অন্য কোনো মুঠোফোন নম্বরও লাবণ্য দেয়নি। সে কোথায় আছে জানি না।’
ওয়াশিকুর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার মশিউর রহমান বর্তমানে র‍্যাবে কর্মরত। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি মামলার সব কাগজপত্র ডিবিতে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। লাবণ্যের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।’

Saturday, October 31, 2015

‘ঘুম থেকে জেগে দেখি খুন হয়ে গেছি’ -আহমেদুর রশীদ টুটুল by কাজী আনিছ

আহমেদুর রশীদ টুটুল
‘ঘুম থেকে জেগে দেখি খুন হয়ে গেছি। কারা কারা যেন আমার কবজি দিয়ে বানানো কাবাবের দিকে তাকিয়ে কাটা চামচ খুঁজছে। কবজির পাশে ওয়াইনে ভিজিয়ে রেখেছে আমার স্বপ্নাকাতুর চোখ।...’
গত ৯ জুলাই ফেসবুকে এভাবেই আতঙ্ক আর বীভৎসতার কথা লিখেছিলেন শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুল। চার মাস পর আজ শনিবার তিনি প্রায় সেই বীভৎসতার মুখোমুখি। সত্যি সত্যিই আজ তাঁর হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাত। মাথা রক্তাক্ত। আজ লালমাটিয়ায় তাঁর কার্যালয়ে ঢুকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে তাঁকে আহত করেছে। আহত করেছে সঙ্গে থাকা আরও দুজনকে।
এ তিনজন যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখন খবর এল জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপনের খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনেরা। বিকেল পাঁচটার দিকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ফয়সালের এক আত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফয়সাল ফোন ধরছেন না। রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে তাঁর প্রতিষ্ঠানটিও বন্ধ। অথচ ভেতরে চলছে ফ্যান ও লাইট।’
খোঁজ নেওয়া হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হদিস মেলেনি। এরপর ফয়সালের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর জানা গেল, ফয়সাল আর নেই। প্রতিষ্ঠানে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। যাওয়ার সময় দোকানের দরজাও বন্ধ করে গেছে। রক্তাক্ত উদ্ধার করে ফয়সালকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
আহমেদুর ও ফয়সাল দুজনই বইয়ের প্রকাশক। তাঁরা দুজনই দুর্বৃত্তদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়া বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছেন। তাই আহমেদুরের ওপর হামলার পর ফয়সালের হদিস না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন স্বজনেরা। তাঁদের উদ্বেগ করুণভাবেই সত্য হয়ে গেল।
বই প্রকাশনা ছাড়াও ব্লগে লেখালেখি করেন আহমেদুর। তবে আতঙ্ক, প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও হতাশার সবকিছুই তিনি প্রকাশ করেছেন ফেসবুকে। ‘আতঙ্কিত’ হওয়ার পাশাপাশি ফেসবুকেই আহমেদুরকে দেখা গেছে প্রতিবাদী ভূমিকায়। তিনি লিখেছেন অভিজিৎকে নিয়ে, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড নিয়ে। দিয়েছেন বই মেলায় অভিজিতের সঙ্গে কাটানো শেষ মুহূর্তের বিভিন্ন ছবিও। অভিজিৎসহ বিভিন্ন ব্লগার খুনের ঘটনায় প্রকাশ করেছেন তীব্র ক্ষোভ।
১৫ অক্টোবর আহমেদুর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘লেখক খুন, ধর্মীয় উন্মাদনা ইত্যাদি ঘটনার প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের লেখকেরা তাদের অর্জিত পুরস্কার এবং সম্মাননা ফিরিয় দিয়ে, প্রত্যাখ্যান করে বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতার নজির স্থাপন করেছেন।...বাংলাদেশে গত তিন বছরে শুধু লেখার জন্য খুন হয়েছেন বেশ কয়েকজন লেখক। অনেক লেখক খুনের হুমকি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। গেল ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় প্রকাশ্যে অভিজিৎ রায় নিহত হওয়ার পর আমাদের বেশির ভাগ পরিচিত লেখকই মুখ খোলেননি, প্রতিবাদ জানাননি। রাজিব হায়দার, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি নীল: এদের কারওর জন্যই যাদের করার কথা, তারা কেউ এমন কিছু করেননি যাতে রাষ্ট্রের এবং সমাজের টনক নড়তে পারে। এ দীনতা লজ্জার, খুব আতঙ্কের...’
‘জিডি’র কথা জানে না পুলিশ!
জীবননাশের হুমকি-ধমকির কথা জানিয়ে শুদ্ধস্বরের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার। কিন্তু পুলিশ বলছে, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানে না।
আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে লালমাটিয়ায় প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে আহমেদুরসহ তিনজনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দুর্বৃত্তরা। তিনজনই এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন।
হাসপাতালের বিছানায় আহমেদুর সাংবাদিকদের বলেন, অনেক দিন ধরেই তিনি হুমকি-ধমকি পেয়ে আসছিলেন। এ কথা বলার কিছুক্ষণ পরই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
পরে হাসপাতালে আহমেদুরের স্ত্রী শামীম রুনা সাংবাদিকদের বলেন, অনেক দিন ধরে আহমেদুরকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল। এ কারণে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করেছিলেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডির কথা শুনেছি। তবে এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। থানার নথিপত্র ঘেঁটে দেখছি।’
পুলিশ সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় বিভিন্ন স্থান ভাগ করে (বিট) সেখানে নিয়মিত টহলসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার জন্য নির্দিষ্ট করে একেকজন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ওই কর্মকর্তার সঙ্গে থাকে আরও পাঁচ ছয়জন পুলিশ। ঘটনাস্থল এলাকাটি মোহাম্মদপুরের তিন নম্বর বিট।
ঘটনার পর এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ ওই এলাকায় ছিল বলে খবর পেয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে যেতে পেরেছে।

Sunday, October 25, 2015

শোকের মিছিলে আরেক শোক by কাজী আনিছ

তাজিয়া মিছিল। কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে গড়ে ওঠা এক শোকের মিছিল। মিছিলের পদচারণায় শোক বয়ে যায় পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে। আজ খোদ মিছিলটিই যেন শোকের কারণ। মিছিলের প্রস্তুতিপর্বে হানা দিল প্রাণঘাতী বোমা হামলা। লাশ আর রক্তে শোকের পাশাপাশি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা। আবহমান কাল ধরে চলে আসা এ আয়োজনে প্রথম এ ন্যক্কারজনক ঘটনায় দেখা দিয়েছে বিস্ময়, অবিশ্বাস।
এ হামলায় মারা গেছে কিশোর সাজ্জাদ হোসেন। কারবালার শোক প্রকাশ করতে যাওয়া এ কিশোরের কেরানীগঞ্জের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে গতকাল সে গিয়েছিল তাজিয়া মিছিলে, সেই পরিবারের সদস্যদের কাঁধে চড়ে সে বাড়ি ফিরেছে লাশ হয়ে। মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের এ ভয়াবহতায় আহত হয়েছে শতাধিক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁরা। শোক আর আতঙ্ক এখন পুরো হাসপাতাল জুড়েও।
কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে? কেন? তাৎক্ষণিকভাবে জানা না গেলেও ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে বিভিন্ন বক্তব্য। সম্প্রতি দুই বিদেশি হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় জঙ্গি সম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার মাঝে এ ঘটনাটি ঘটল। ফলে বাতাসে ভাসছে জঙ্গি সম্পৃক্ততার সন্দেহও। জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে এ সন্দেহ আরও ত্বরান্বিত করে।
কিন্তু এ সন্দেহ একেবারেই উড়িয়ে দিয়ে পুলিশ বলছে, এটি স্বাধীনতাবিরোধীদের কাজ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তাঁরা। আজ সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের বললেন, এটিকে জঙ্গি হামলা মনে করছে না পুলিশ। এটি পরিকল্পিত নাশকতা। তাঁর যুক্তি, দুই দিন আগে গাবতলী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কামরাঙ্গীরচর থেকে কিছু বোমা উদ্ধার করা হয়। হোসনি দালানে ব্যবহৃত বোমার সঙ্গে উদ্ধার বোমার হুবহু মিল আছে।
তবে র‍্যাবের পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে ‘গ্রেনেডের সাদৃশ্যের’ আরেক তথ্য। আজ সকালে র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান প্রথম আলোকে বললেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে চট্টগ্রামে হামজা ব্রিগেড বলে যে জঙ্গি সংগঠনটিকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছিল তাদের কাছ থেকেও একই ধরনের গ্রেনেড পাওয়া গিয়েছিল। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়ায় কমার্স ব্যাংকের ডাকাতির ঘটনাতেও জঙ্গিরা একই ধরনের গ্রেনেড ব্যবহার করে।
এ তথ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে আজ সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পিতভাবে ও গুছিয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলার ভিডিও ফুটেজ আছে। ফুটেজ দেখে দ্রুত দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা হবে। কোনো সন্দেহের কথা উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী গত শুক্রবার রাতে বললেন, জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে ঘটনাটি নিয়ে সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গনও। হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের মদদ বলে ধারণা করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আজ সকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, যারা সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চায়, যারা সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ঈর্ষাবোধ করে, যারা সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চায় তারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে মদদ দিতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলনের পরে আজ দুপুরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘হোসনি দালানের ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অবিলম্বে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি করছি।’
এদিকে ঘটনার ভয়াবহতা বাংলাদেশের সীমানা ছেড়ে ছুঁয়েছে বিশ্বগণমাধ্যমও। খবর প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি, রয়টার্স, বিবিসিসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। আতঙ্ক বয়ে চলছে দেশজুড়ে। কড়া পুলিশি নিরাপত্তা দেখা গেছে রাজধানী জুড়ে। ঘটনায় আতঙ্কিত দেশে থাকা বিদেশিরাও। ঘটনার পর বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন টুইটারে লিখেছেন, ‘আশুরা উপলক্ষে শিয়া সম্প্রদায়ের শোভাযাত্রায় এ হামলার ঘটনায় আমি আতঙ্কিত।’

লোহার টুকরাই সাজ্জাদের মৃত্যুর কারণ by কাজী আনিছ

সাজ্জাদ হোসেন
পুরান ঢাকার হোসনি দালানের সামনে বোমা হামলার ঘটনায় নিহত কিশোর সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সানজুর (১৫) শরীরে আটটি স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে একটি স্প্লিন্টার পিঠ দিয়ে ঢুকে ফুসফসে গিয়ে লাগে। এতে ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।
সাজ্জাদের লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান।
সোহেল মাহমুদের ভাষ্য, সাজ্জাদের শরীরে আটটি স্প্লিন্টার বিদ্ধ হলেও ময়নাতদন্তের সময় তার শরীরে লোহা ও প্লাস্টিকের দুটি ছোট টুকরা পাওয়া গেছে। আর ওই লোহার টুকরাটি তার মৃত্যুর কারণ। এটি পিঠ দিয়ে ঢুকে ফুসফুসে আঘাত করেছে।
মাহমুদ বলেন, লোহা ও প্লাস্টিকের টুকরো দুটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত করে তারা বের করবে, ওই দুটি টুকরো কোন ধরনের বিস্ফোরকের অংশ।
আজ শনিবার বিকেলে মুঠোফোনে সাজ্জাদের ভাই মো. রাশেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা। তবে ওই বাসা ভাড়া দিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কেরানীগঞ্জে শুভাঢ্যা উত্তরপাড়ায় বসবাস করছেন। পাঁচ ভাই আর দুই বোনের মধ্যে সাজ্জাদ সবার ছোট। কেরানীগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত সে। সাজ্জাদসহ পরিবারের সাত সদস্য গতকাল তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে গিয়েছিল।
রাশেদ বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা পরিবারের অনেকেই তাজিয়া মিছিলে যোগ দিতে হোসনি দালানে যাই। গতকাল রাত ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে আমরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। লাইন ধরছিলাম। সাজ্জাদ ছিল লাইনের শেষ প্রান্তে। হঠাৎ বিকট শব্দ। যে যার মতো দৌড়ে কিছু দূর চলে যাই। আবার ফিরে এসে দেখি, সাজ্জাদ পড়ে আছে, অজ্ঞান। শরীরে রক্ত। নিজেই তারে কোলে নেই। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসলে সেখানে উঠাইয়া হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

Wednesday, July 8, 2015

বুয়েট ক্যানটিনে ছাত্রলীগের চাঁদা দাবি! by কাজী আনিছ

বুয়েটের ক্যানটিন ব্যবস্থাপকের কাছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী চাঁদা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা না দিলে তাঁরা ক্যানটিন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
বুয়েট প্রশাসন ও ক্যানটিন সূত্রে জানা গেছে, দরপত্রের মাধ্যমে ইজারার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ক্যানটিন সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়া পরিচালিত হয়। বুয়েট প্রশাসন এই দরপত্র আহ্বান করে। এই ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে প্রায় তিন মাস আগে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক এম এ মাসুম ওই ক্যানটিনটি পরিচালনার দায়িত্ব নেন। মাসিক ভাড়া ধরা হয় ৫০ হাজার টাকা।
গত ১৪ জুন চাঁদা দাবির বিষয়ে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ও রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ক্যানটিনের ব্যবস্থাপক এম এ মাসুম। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত ১৩ জুন রাত দুইটার দিকে বুয়েটের কিছু ছাত্র ক্যানটিনের ঘুমন্ত কর্মচারীদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করেন। রাতেই কর্মচারীদের ক্যানটিন ছেড়ে চলে যেতে বলেন ওই ছাত্ররা। এর আগে গত ২ জুন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শুভ্রজ্যোতি টীকাদার ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ কনক ক্যানটিনের ব্যবস্থাপক এম এ মাসুমের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। অন্যথায় ক্যানটিন ছেড়ে দিতে বলেন। পরে ৬ জুন শুভ্রজ্যোতির নেতৃত্বে তানভীর, এহসান নামের কয়েকজনসহ আট-দশজন ওই ক্যাফেতে যান। চাঁদা না দেওয়ায় তাঁরা ১৩ জুন থেকে ক্যাফে বন্ধ রাখতে বলেন। এযাবৎ তাঁদের কাছে খাওয়া বাবদ ২৫ হাজার টাকা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাবদ ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা বকেয়া আছে। বকেয়া চাইতে গেলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে এম এ মাসুম লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন। তিনি এসব ঘটনা আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশে ক্যানটিন পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেন।
এত দিন পর কেন অভিযোগ করলেন—জানতে চাইলে ক্যানটিনের ব্যবস্থাপক এম এ মাসুম বলেন, ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’ এর বাইরে তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি।
বুয়েটের একটি সূত্রে জানা গেছে, শুভ্রজ্যোতিসহ অন্য নেতা-কর্মীরা ২ জুন এম এ মাসুমের কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলেন। এত টাকা চাঁদা দেওয়া সম্ভব নয় বলার পর শুভ্রজ্যোতিসহ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁকে মারতে উদ্যত হন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শুভ্রজ্যোতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওর (এম এ মাসুম) অনেক ভাড়া বাকি। ভাড়ার টাকা দিয়ে দেওয়ার জন্য তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। কোনো টাকা চাইনি।’
ভাড়ার বিষয়টি তো বুয়েটের প্রশাসন দেখভাল করে, আপনি চাইতে গেলেন কেন?—এই প্রশ্নের জবাবে শুভ্রজ্যোতি বলেন, ‘তা ঠিক আছে। কিন্তু সবাইকে তো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থটা দেখতে হবে।’
জানতে চাইলে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বুয়েট খুললেই এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে। তবে তিনি বলেন, এম এ মাসুমের কাছে ভাড়া বাকি আছে। তাঁকে আবার একটি পক্ষ সমর্থনও দিয়ে যাচ্ছে। তাই ছাত্রদের বলে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি বুয়েট প্রশাসনই দেখবে।

Sunday, May 31, 2015

অন্যের জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ধান্দা by কাজী আনিছ

মালিক সেজে আরেক জনের জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল একটি চক্র। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন জমির মালিক। সম্প্রতি ওই মামলায় ওই দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
আসামিরা হলেন মতিউর রহমান ও আলমাস। ঘটনার পর পুলিশ মতিউরকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠিয়েছিল। বর্তমানে তিনি জামিনে। আলমাস ঘটনার পর থেকেই পলাতক।
জমির মালিকপক্ষের দাবি, মতিউর ও আলমাস জমি বন্ধক রেখে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় প্রায় ৭০ শতাংশ জমির মালিক জনৈক শামসুল ইসলাম ও তাঁর দুই ভাই। তাঁরা ওই জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। খবর পেয়ে মতিউর রহমান ও মো. আলমাস নামের দুজন শামসুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা একটি কোম্পানির কাছে জমি বিক্রি করে দেবেন বলে জানান। তাঁরা শামসুলের কাছ থেকে জমির কাগজপত্রের ফটোকপি ও শামসুলের অপর দুই ভাইয়ের পাসপোর্টের ফটোকপি নেন। এরপর শামসুল হজ্ব করতে চলে যান। হজ্ব থেকে ফেরার পর গত ১ ডিসেম্বর সকালে শামসুল খিলগাঁওয়ের ওই জমি দেখতে গিয়ে দেখেন, সেখানে মতিউর ও আলমাসের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন তিনজন ভদ্রগোছের লোক। তিনি ওই ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের মতিঝিল প্রধান শাখা থেকে এসেছেন বলে জানান। তাঁরা আরও জানান, মতিউর ও আলমাস ওই জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। তাই তারা তদারকি করতে এসেছেন। এসব কথা শুনে শামসুল অবাক বলেন, তিনিই জমির মালিক। তখন ব্যাংক কর্মকর্তারাও আশ্চর্য হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে ব্যাংকের সঙ্গে কোন শামসুল ইসলাম কথা বললেন? ’ এসব কথাবার্তার মধ্যেই মতিউর ও আলমাস দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে শামসুল দৌড়ে মতিউরকে ধরে ফেলেন। তবে আলমাস পালিয়ে যান। পরে শামসুল মতিউরকে ধরে নিয়ে থানায় নিয়ে যান। ওই দিন তিনি মতিউর ও আলমাসের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় গিয়ে একটি মামলা করেন।
শামসুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আলমাস স্থানীয় লোক বলে তারে বিশ্বাস করে সব জমির কাগজপত্রের ফটোকপি দিয়ে দিছিলাম। কিন্তু সে যে এমন প্রতারণার করবে তা কোনোদিনই ভাবি নাই।’
সম্প্রতি মতিঝিলে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলে কর্মকর্তারা জানান, পুরান ঢাকার নারায়ন চন্দ্র সরকার নামের এক কাগজ ব্যবসায়ী ঋণের আবেদন করেছেন। পরে শামসুল ইসলাম পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁর তৃতীয় পক্ষ হয়ে ব্যাংকে যান। তিনি খিলগাঁওয়ের ওই জমির মালিক বলে নারায়নের ঋণ বাবদ ওই জমি বন্ধক রাখার কথা জানান। জমির কাগজপত্রের ফটোকপিও দেওয়া হয়। ওই জমি তদারকি করতে গিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়। ঋণ আবেদন বাতিল করার বিষয়টি নারায়নকে চিঠি দিয়ে জানানোও হয়েছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, নারায়ন এক কোটি টাকার জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে নিয়মানুযায়ী জমি তদারকির পর বাজারমূল্য অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করে ব্যাংক। কিন্তু প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ার পর অতদূর পর্যন্ত আর যেতে হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে নারায়ন বলেন, তিনি তাঁর জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে খিলগাঁওয়ের কারও জমি বন্ধক রাখার আবেদনের কথা তিনি জানেন না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ হোসেন প্রথম আলো কে বলেন, তদন্ত কার্যক্রম শেষে মতিউর ও আলমাসের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগপত্রে শুধু ব্যাংক ঋণ নেওয়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক থেকে কাগজপত্র না পাওয়ায় টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

Wednesday, May 20, 2015

সমঝোতার চেষ্টায় ছিলেন ওসি হেলাল! by কাজী আনিছ

হেলাল উদ্দিন, আব্দুল কাদের
পুলিশি নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আব্দুল কাদেরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন খিলগাঁও থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন। দেওয়া হয়েছিল মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণের আশ্বাসও। কিন্তু কাদের রাজি হননি।
আব্দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ের আগের দিনও লক্ষ্মীপুরে আমার কর্মস্থলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ওসি হেলালের কয়েকজন লোক। রায়ের দিনও প্রভাবশালীদের দিয়ে চাপ দেওয়া হতে পারে জেনে আমি আর আদালতে যাইনি। এ কারণে আপনারা আদালতে আমাকে দেখেননি।’
কাদেরকে নির্যাতনের ঘটনায় গত রোববার আদালত ওসি হেলালকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। আদালত হেলালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিরও আদেশ দেন।
২০১১ সালের ১৫ জুলাই রাতে ইস্কাটন গার্ডেনের খালার বাসা থেকে ফজলুল হক মুসলিম হলে ফিরছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞানের ছাত্র আব্দুল কাদের। সেগুনবাগিচা এলাকায় গেলে তাঁকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাঁকে খিলগাঁও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন থানার ওসি হেলাল তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেন। তাঁর বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগ ও অস্ত্র আইনে দুইটি মামলা করা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় হওয়া গাড়ি ছিনতাইয়ের মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করলে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে আইনসচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেন। তদন্তকালে ওসি হেলালসহ পুলি​শের তিনজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশও দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের তদন্ত কমিটি কাদেরকে নির্দোষ উল্লেখ করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে ওসি হেলালের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশ করা হয়। ২০১২ সালের ২৩ জানুয়ারি খিলগাঁও থানায় ওসি হেলালের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা আসত আমি সবাইকে বলে দিতাম, আমার ঘটনা নিয়ে অনেকেই সম্পৃক্ত। বিষয়টি এখন আমার একার না। আমি তো আর সমঝোতা করতে পারি না। আমি বলতাম, আমি ওই দিনের কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলতে পারি না, ভুলতে পারব না। সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে আসা কেউ আমার কষ্টটা বুঝে চলে যেতেন, কেউ বা মন খারাপ করতেন।’
কাদেরের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছেন এমন একজনের সঙ্গে সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, ওসি হেলালের পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। মানবিক বিবেচনায় তিনি কাদেরের কাছে গিয়েছিলেন। কাদেরকে চার-পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন। তবে কোনো কাজ হয়নি।
এদিকে গতকাল ওসি হেলালের এক স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব বিষয় নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন ওসি হেলাল দেশেই আছেন। ‘ওনার সিদ্ধান্ত কী?’—প্রশ্ন করলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বজন বলেন, ‘রায় হওয়ার পর কেউ পালিয়ে যায়, কেউ বা আত্মগোপনে থাকে, আবার কেউ আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু আমাদের পরিবারের যে ব্যাকগ্রাউন্ড তাতে আমরা পালিয়ে কিংবা আত্মগোপনে থাকার মতো লোক নই। তাই তার আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তবে এসব বিষয় নিয়ে তাঁর (ওসি হেলাল) সঙ্গে কথা বলাও বিব্রতকর।’ ওই স্বজন আরও বলেন, ‘যদি সে (ওসি হেলাল) কাদেরকে নিজ হাতে আঘাত করে থাকে, তাহলে অবশ্যই অপরাধ করেছে। কিন্তু তার পরও এ রায়ের পর তাই আমরা কিছুটা বিপর্যস্ত, হতাশ।’ ওসি হেলালকে ​যে মোবাইল ফোন নম্বরে পাওয়া যাবে, তা তিনি দিতে রাজি হননি।

Wednesday, April 29, 2015

সুইডেনের রাষ্ট্রদূত আটকা পড়লেন ভোটকেন্দ্রে by কাজী আনিছ

কবি নজরুল কলেজ কেন্দ্রে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত
ইয়োহান ফ্রিসেল l ছবি: প্রথম আলো
বাইরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে চলছিল সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। বোমার বিস্ফোরণও ঘটে। সংঘর্ষের পর কেন্দ্রের ভোটকক্ষে চলে জাল ভোট দেওয়া। সংঘর্ষ ও হামলায় আহত হন এক কাউন্সিলর প্রার্থী, সাংবাদিকসহ কয়েকজন। সংঘর্ষের কারণে কেন্দ্রে আটকা পড়েন পরিদর্শনে আসা সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ইয়োহান ফ্রিসেল।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজ কেন্দ্রের পরিস্থিতি ছিল এমনই। এই কলেজে ছিল তিনটি কেন্দ্র। তৃতীয় তলা ও দোতলায় ছিল বেশ কয়েকটি ভোটকক্ষ। সকাল থেকেই অবস্থান নেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁদের গলায় ঝোলানো ছিল আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী সাঈদ খোকনের ব্যাজ। ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী এয়ার মোহাম্মদ এয়ারুর (প্রতীক ঘুড়ি) পক্ষেও ছিলেন তাঁরা। বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কোনো পোলিং এজেন্ট সেখানে দেখা যায়নি।
দুপুর ১২টার দিকে সমর্থকদের নিয়ে ওই কেন্দ্রের ভোটকক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেন স্বতন্ত্র কাউন্সিলর পদপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম (প্রতীক টিফিন ক্যারিয়ার)। তাঁদের সঙ্গে এয়ারুর সমর্থকদের প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা, পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। দুই পক্ষেই লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহার করে। হামলা ও ইটের আঘাতে কাউন্সিলর প্রার্থী সেলিম, ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর ফটোসাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ কুমার ঘোষসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তখন কলেজের ভেতরে মহড়া দিতে থাকেন। অবস্থান নেন প্রধান ফটকে। কিছুক্ষণ পর কলেজের মাঠে বিকট শব্দে দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। আবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভয়ে কেন্দ্রে আসা ভোটাররা দৌড়াদৌড়ি শুরু করেন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে দৌড়ে যান একটি বাড়ির দিকে। তাঁদের অভিযোগ, ওই বাড়ি থেকেই বোমা মারা হয়েছে। ঘটনাস্থলে দুই গাড়ি বিজিবির সদস্য এলে পরিস্থিতি আবার শান্ত হয়।
ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ও ভোটাররা আটকা পড়েন সংঘর্ষের সময়। পরিস্থিতি শান্ত হলে রাষ্ট্রদূত বের হয়ে চলে যান।
সংঘর্ষের পর বেলা দুইটার দিকে কলেজের একটি কেন্দ্রের দোতলার একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ১০-১২ জন ব্যালট পেপারে সমানে সিল মারছেন। মেয়রের ব্যালটে ইলিশ ও সাধারণ কাউন্সিলরের ব্যালটে ঘুড়ি প্রতীকে সিল পড়ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রতিবেদকের গলায় ঝোলানো কার্ড দেখার পর একজন বললেন, ‘ও, সাংবাদিক। শুধু দেখেন, ছবি তুইলেন না।’ ওই যুবক নিজেকে মামুন উর রশিদ ও কবি নজরুল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বলে পরিচয় দেন। বলেন, ‘আমার নাম পেপারে লেখেন। সমস্যা নাই।’
ওই কক্ষের কয়েকটি কক্ষ পরে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের কক্ষ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাঁকে ঘিরে আছেন বেশ কয়েকজন। নিজেদের পরিচয় দিলেন পোলিং এজেন্ট বলে। তবে কার, তা বললেন না। তাঁদের একজন হাসতে হাসতে বলেন, ‘সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। এবার টাকাটা দিলেই চলে যাব।’
সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।’ পাশের কক্ষে গিয়ে জাল ভোট দেখার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আমার অনেক কাজ আছে।’
কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিমের বাসা কলেজের কাছেই। বাঁ হাতের আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়ে বাসার সামনে বসে ছিলেন তিনি। হাতটি ঝোলা ব্যাগে রাখা। তাঁকে ঘিরে শতাধিক সমর্থক। সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাল ভোটের কথা শুনে আমরা কলেজে গিয়েছিলাম। দেখেন, আমার হাতের অবস্থা। দেশটা শ্যাষ হইয়া গেছে।’
যোগাযোগের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী এয়ার মোহাম্মদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর সমর্থক ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার দাবি, সেলিম ও তাঁর সমর্থকেরাই কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছেন। কোনো জাল ভোট হচ্ছে না।

Wednesday, February 18, 2015

মামলা তুলে নিতে নানা প্রলোভন by কাজী আনিছ

(ছবি হাতে জিহাদের কথা বলছেন শোকাতুর মা খাদিজা বেগম। পাশে জিহাদের ভাই জিসান ও চোখ মুছতে থাকা বাবা নাসির ফকির। গতকাল শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির বাসা থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো ) রাজধানীর শাহজাহানপুরে পাইপে পড়ে শিশু মো. জিহাদের মৃত্যুর ঘটনার মামলা তুলে নিতে পরিবারকে অনবরত প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন আসামির পক্ষে কয়েকজন মামলা তুলে মীমাংসায় আসার জন্য পরিবারকে রাজি করাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। এ জন্য ভুক্তভোগী পরিবার যা দাবি করবে, তাও পূরণ করা হবে বলে আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনি এলাকায় বাসার পাশেই খেলতে গিয়ে রেলওয়ে পানির পাম্পের একটি গভীর নলকূপে পড়ে মারা যায় জিহাদ। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য পানির পাম্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসআর হাউসের মালিক আবদুস সালাম ওরফে শফিকুল ইসলাম ও রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ঘটনায় করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার হাইকোর্ট শিশু জিহাদের পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। জিহাদের মা খাদিজা বেগম হাইকোর্টের রুল শোনার পর বলেন, ‘আমাদের খোঁজ এখন কেউ আর রাখে না। ঘরভর্তি টাকা দিলেও আমার বাচ্চা তো আর আইব না।’
মীমাংসার প্রস্তাব: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলার এক নম্বর আসামির পক্ষে মোজাম্মেল হোসেন ওরফে হেলাল নামের তাঁর এক বন্ধু জিহাদের পরিবারের কাছে মামলা তুলে মীমাংসায় আসার জন্য অনবরত প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জিহাদের বাবার কাছে গিয়ে এ বিষয়ে কথাও বলেছেন। বেশ কয়েকবার ফোন করে জিহাদের মামা মনির মোল্লাকে দ্রুত মীমাংসায় আসার তাগাদা দিয়েছেন। বিনিময়ে যা দাবি করা হবে, তা দেওয়া হবে বলে পরিবারকে আশ্বাসও দেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে মোজাম্মেল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৩ সালে ওই পাইপ বসিয়েছিল আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০১৩ সালের দিকে ওই কাজটি পেয়েছেন আবদুস সালাম। তাই তিনি নির্দোষ। তাই নির্দোষের পক্ষে যেকোনো ধরনের সুরাহা আপনিও চাইবেন। তবে কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না।’
পুলিশের অবহেলার অভিযোগ: জিহাদের বাবা নাসির ফকির বলেন, আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশ শুরু থেকেই অবহেলা করেছে। আর এ সুযোগেই এক আসামি জামিন নিয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহানপুর থানার এসআই আবু জাফর বলেন, হরতাল-অবরোধের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলাটির জন্য সময় দিতে পারেননি।
জামিন স্থগিত: আদালত প্রতিবেদক জানান, ৯ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন পান মামলার আসামি আবদুস সালাম। তবে এর বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ একটি আবেদন করে। গতকাল সোমবার চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রাষ্ট্রপক্ষের করা এ আবেদনের শুনানি নিয়ে আবদুস সালামের জামিন তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। আবদুস সালামকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
কেউ খোঁজ রাখে না: জিহাদের মা খাদিজা বেগম এখনো অসুস্থ। তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই বলছিলেন, বাচ্চা পাইপে নাই। আমার স্বামীরে পুলিশ আটকাইল। আমার ভাইটারে পুলিশ মারল। বাচ্চার লাশ পাওয়ার পর মামলা করলাম। এখন শুনতেছি, আসামি জামিন নিছে। এখন এই ৩০ লাখ টাকা পামু কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নাই।’
খাদিজা বলেন, ‘আমার বাবা জিহাদ প্রায় সময় আইসক্রিম বা অন্য কিছু খাওয়ার জন্য ভাংতি টাকা চাইত। ভাংতি বলতে সে বুঝত পাঁচ টাকা। তাই আমি তার জন্য প্রতিদিন পাঁচ টাকাই রাখতাম। এখন লাখ লাখ টাকা পাইয়া হাজারবার ডাকলেও তো আমার বাবা আর আইব না।’ জিহাদের বাবা নাসির জানান, ‘ঘটনার পর অনেকেই অনেক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিল। রেলওয়েতে চাকরি দেবেও বলেছিল। ওই পাইপের জায়গায় জিহাদের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ করার আশা দিছিল। তাদের কেউ এখন আর ফোনও ধরে না।’

Saturday, February 14, 2015

পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ- ধরে এনে টাকা আদায় by নজরুল ইসলাম ও কাজী আনিছ

পুলিশি নির্যাতনের শিকার প্রথম আলোর তিন ফটোসাংবাদিক।
মেরে আবার গর্ব করে পুলিশ বলেছে সাংবাদিক পিটালে কিছু হয়না।
'বুবু আমারে বাঁচাও। পাঁচ লাখ টাকা না দিলে আমারে মাইরা ফালাইব।
বুবু আমারে বাঁচা।'-এই আর্তনাদ ২৩ বছরের যুবক নাহিদের।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা নাহিদ প্রাণে বাঁচতে পুলিশি বেষ্টনীর ভিতর
থেকে আকুতি জানিয়েছিল তার বোন শিলার কাছে। কিন্তু নাহিদকে বাঁচাতে
সেই পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারেনি শিলা। ৫০ হাজার টাকা নিয়ে
হাজির হয়েছিল পুলিশের কাছে। কিন্তু সেই টাকা মুখের ওপর ছুড়ে মেরে
পুলিশ বলে, হবে না। এক দাম পাঁচ লাখ! এক টাকা কম হলেও চলবে না।
চার দিন পর নাহিদকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবিত নয়।
গুলিবিদ্ধ লাশ হয়ে পড়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে।
রাজধানীর দারুসসালাম থানার দক্ষিণ বিশিলে রাস্তায় বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে গত ১১ জানুয়ারি সৌদিপ্রবাসী বাদল খানকে আটক করেন ওই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মশিউর রহমান। বাদল প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, আটকের পর এসআই মশিউর তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে ইয়াবা এবং মানি লন্ডারিং মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখান। পরে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সেখানে থাকা আড়াই হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেন। এসআই মশিউর প্রথমে এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও গতকাল রাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, তিনি এ বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রস্তুত আছেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে আটক করে টাকা আদায় এবং হয়রানির অভিযোগ পুরোনো। তবে ২০-দলীয় জোটের অবরোধ শুরুর পর আটক-বাণিজ্যের পাশাপাশি হয়রানির অভিযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। রাজধানীর নয়টি থানা এলাকা থেকে পাওয়া অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে এর সত্যতা মেলে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও এ ধরনের অভিযোগ আসছে।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন বিভিন্ন থানায় গিয়ে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিনা কারণে তাঁদের রাস্তা থেকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কাউকে কাউকে বলা হচ্ছে বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের কর্মী। হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। যাঁরা চাহিদামতো টাকা দিতে পারছেন না তাঁদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতে জামিন না পেলে যেতে হচ্ছে কারাগারে। দাবিমতো টাকা না পেয়ে আটক এক যুবককে হত্যার অভিযোগও উঠেছে পল্লবী থানার তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী অনেকে হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি।
গত ৬ জানুয়ারি অবরোধ শুরুর পর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৪২। এঁদের একটি অংশ এই আটক-বাণিজ্যের শিকার বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে আটক-বাণিজ্য ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তিনি পাননি। ঢালাও অভিযোগ তিনি মানতে চান না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ঘটনাস্থল, তারিখ-সময় ও অভিযুক্ত পুলিশের নাম উল্লেখ করে তাঁর কাছে অভিযোগ করতে বলেন তিনি। তিনি জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এএসএম শাহজাহান প্রথম আলোকে জানান, যখন এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন কর্মকর্তাদের উচিত পুলিশ প্রবিধান অনুসারে যেভাবে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে, সেটা কড়াকড়ি করা এবং কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো।
কয়েকটি ঘটনা: ৫ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা থেকে এক ব্যবসায়ীকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁর পরিবার ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে নির্দোষ দাবি করে ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানায়। ডিবির এক কর্মকর্তা ছাড়ার জন্য দুই লাখ টাকা দাবি করে বলেন, টাকা না দিলে নাশকতার মামলায় দেওয়া হবে। নিরুপায় হয়ে পরিবারটি একজনের মাধ্যমে ঘটনাটি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। ওই কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে টাকা দেওয়া থেকে বাঁচলেও ওই ব্যক্তি ছাড়া পাননি। দুই দিন আটক রাখার পর তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁর এক স্বজন বলেন, ‘আমরা ২০ হাজার টাকা দিতেও রাজি হয়েছিলাম।’
৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টায় বনশ্রীতে দুই যুবককে আটক করে খিলগাঁও থানার পুলিশ। তাঁদের পরিচিত সংবাদকর্মী মাহফুজুল্লাহ তখন পুলিশকে বলেন, ‘এঁরা ভালো ছেলে।’ এতে পুলিশ তাঁকেও গাড়িতে তোলে। পুলিশের এক সোর্স (তথ্যদাতা) মাহফুজুল্লাহকে জানান, ২০ হাজার টাকা না দিলে তাঁদের পেট্রলবোমাসহ আটক দেখানো হবে। সারা রাত তাঁদের গাড়িতে নিয়ে টহল দিয়ে ভোরে নেওয়া হয় থানায়। সোর্স থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে জানান, পেট্রলবোমাসহ তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তাকে মাহফুজুল্লাহ তাঁর পরিচয় দেন ও ঘটনা জানান। এরপর ওই কর্মকর্তা সোর্সকে থাপড় দিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেন।
পরে মাহফুজুল্লাহ ঘটনাটি প্রথম আলোকে জানান। ওই রাতে সেখানে দায়িত্বে থাকা খিলগাঁও থানার এসআই আবু জাফর হাওলাদার জানান, আসলে পুরস্কার ঘোষণার পর সোর্সরা বিভিন্ন ভুল তথ্য দিচ্ছেন। ওই তিনজন নির্দোষ হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুর থানার মণিপুরে সমাজকল্যাণ কমপ্লেক্সের পাঁচটি ভবনে অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরা কারাগারে আছেন। তাঁদের একজন শেওড়াপাড়ায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তাঁর বিষয়ে খোঁজ নিতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয় ওই থানার সামনে। তিনি প্রথম আলোকে জানান, ওই কর্মচারী নিরীহ, রাজনীতি করেন না।
৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ চারজন চালককে আটক করে ডিবি। তাঁদের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ছেড়ে দিতে প্রত্যেকের কাছে ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন এক কর্মকর্তা। দর-কষাকষির পর ২০ হাজার টাকায় রফা হয়। পরে ডিবির কনস্টেবল নজরুলকে টাকা নিয়ে একটি অটোরিকশা ছাড়া হলেও তিনটি আটকে রাখা হয়। চারজন চালককে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবারও হয়রানির আশঙ্কায় চালকেরা নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। যোগাযোগ করা হলে কনস্টেবল নজরুল প্রথম আলোকে জানান, এটা ভুল হয়ে গেছে। টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রায়েরবাগ থেকে হাবিবুর রহমান নামের একজনকে আটক করে কদমতলী থানার পুলিশ। স্বজনেরা জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখালে তাঁরা ৩০ হাজার টাকা দেন। পরে পুলিশ তাঁকে ডিএমপি আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। পরদিন তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৪ ফেব্রুয়ারি একই থানার পুলিশ কদমতলী থেকে তিনজনকে আটক করে। তাঁদেরও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ডিএমপি আইনে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁরাও জামিন পেয়েছেন।
৪ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানার কুতুবখালীতে ছাত্র পড়িয়ে ফেরার পথে আটক হন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা এক যুবক। তাঁকে পেট্রলবোমা হামলা মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ৩৫ হাজার টাকা নেন এসআই মোক্তার। তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি জামিন পান। অবশ্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই মোক্তার জানান, জনতা ওই যুবককে ধরে পুলিশে দিয়েছিল।
৭ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ তালতলা থেকে এক কলেজছাত্রকে আটক করে। তাঁকে ছাড়াতে মা ও বড় ভাই থানায় গেলে ভাইকেও আটক করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা এবং পরে মিরপুর থানার পুলিশ রিমান্ডে নেয়। বৃহস্পতিবার মিরপুর থানার সামনে তাঁদের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর ছেলেরা রাজনীতি করেন না। গ্রেপ্তারের খবরে তাঁদের বাবা এখন শয্যাশায়ী।
৬ জানুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে স্বামীবাগের মুন্সিরটেক থেকে এক মুদি দোকানিকে আটক করেন গেন্ডারিয়া থানার এসআই শাহজাহান ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সুজন। ওই মুদি দোকানি জানান, তাঁকে গাড়ি পোড়ানোর মামলার ভয় দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আধা ঘণ্টা পর রাস্তাতেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।
দয়াগঞ্জ, মীরহাজিরবাগ ও আশপাশের এলাকা, ধোলাইখালে টহল পুলিশের বিরুদ্ধে পথচলতি মানুষকে হয়রানির অভিযোগ প্রায় প্রতিদিনের। সন্ধ্যার পর এই হয়রানি বাড়ে।
পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, এমন দু-একটি ঘটনা ঘটলেও তা পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যাঁদের আটক করা হয়, যাচাই শেষে তাঁদের কাউকে কাউকে ছেড়েও দেওয়া হয়।
কারওয়ান বাজারে পথচলতি কিশোর ও যুবকদের তল্লাশির নামে হয়রানি এবং পুলিশের গাড়িতে তোলার দৃশ্য প্রতিদিনের। কখনো কখনো পণ্যবাহী ট্রাক এসে থামলে পুলিশ চালকের পকেটে হাত দিয়ে টাকা নিচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন ট্রাকচালকেরা।
আটকের পর দাবিমতো টাকা না পেয়ে পল্লবী থানার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জি এম নাহিদকে (২২) হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বরাবর তাঁর পরিবারের করা অভিযোগ অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের প্রশিকা ভবনের সামনে থেকে এসআই তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে নাহিদকে তুলে নেয় পুলিশ। পরে পরিবারকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরিবার থানায় গেলে তাঁকে ছাড়তে পুলিশ পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। প্রথমে ২০ হাজার ও পরে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তাঁর লাশ শনাক্ত করে পরিবার।
নাহিদের লাশ বেশ কয়েকটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ভাষানটেকের বালুর মাঠ থেকে উদ্ধারের পর পাঁচ দিন শনাক্তহীন অবস্থায় মর্গে পড়ে ছিল।
নাহিদকে পুলিশ আটক করেছে, এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার নিশারুল আরিফ। নাহিদের পরিবার তাঁকে তুলে নেওয়া গাড়ির নম্বরও দিয়েছে। ওই নম্বরের গাড়ি পল্লবী থানার সিভিল টিমের বলে উপকমিশনার জানান।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিচালক নূর খান প্রথম আলোকে জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিভিন্ন মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। এ ছাড়া থানায় তদন্তাধীন মামলাও থাকে। ফলে দেখা যায়, গ্রেপ্তার অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষ যখন ধরা পড়েন তখন তাঁদের ওসব মামলায় ফাঁসানো হয়। অথবা টাকায় রফা হয়। এ কারণে সাধারণ মানুষ শারীরিক-মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
আটক ও হয়রানির পাশাপাশি রাজধানীতে আবার শুরু হয়েছে ডিবি কিংবা পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই। ৪ ফেব্রুয়ারি আসাদগেটে একটি ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা তোলেন এজাজ আহমেদ। সঙ্গে তাঁর অফিসের এক কর্মচারী ছিলেন। টাকা নিয়ে কিছুদূর যেতেই ‘ডিবি’ লেখা কাগজ সাঁটানো একটি মাইক্রোবাসে থাকা কয়েকজন যুবক নিজেদের ডিবি পরিচয় দিয়ে তাঁদের মাইক্রোবাসে তোলে। ‘ক্রসফায়ারের’ ভয় দেখিয়ে ও মারধর করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের নামিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী এজাজ এ ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

Tuesday, December 30, 2014

জিহাদের জন্য ভালোবাসা by কাজী আনিছ ও একরামুল হুদা

(সেই পানির পাইপের ওপর গতকাল ফুল দিয়ে জিহাদের প্রতি ভালোবাসা জানায় স্থানীয় শিশুরা l প্রথম আলো) সাত-আটজন শিশুর হাতে ফুলের তোড়া। চোখে-মুখে বিষাদের ছায়া। পাইপের ওপর ফুলের তোড়া দেওয়ার পর এই শিশুদের বিষাদ ছুঁয়ে গেল আশেপাশের লোকজনকেও। গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনির মাঠের কাছে রেলওয়ে পানির পাম্পের একটি গভীর পাইপে পড়ে যায় চার বছরের জিহাদ। দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ উদ্ধার করে কয়েকজন যুবক। উদ্ধার অভিযান নিয়ে সেই দিন থেকেই সারা দেশের মানুষের ওপর ভর করে উৎকণ্ঠা। শোকাহত অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই যাচ্ছেন শাহজাহানপুরে, সেই পাইপটির কাছে। কেউ দোয়া করছেন, ভালোবাসা জানাচ্ছেন, কেউবা ফেলছেন চোখের জল। গতকাল সোমবার বিকেলে দেখা গেল জিহাদের জন্য ওই শিশুদের ফুলেল ভালোবাসা অর্পণের দৃশ্য। এ ফুলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন রওশন আরা নামের এক নারী। ওই শিশুদের দলে তাঁর সন্তানও ছিল। রওশন আরা বললেন, ‘আমার ছেলেটা কান্নাকাটি করে বলছিল, জিহাদের জন্য সে ফুল দিতে চায়। বাচ্চার এ আগ্রহ দেখে ফুলের তোড়া এনেছি।’ ফুল দেওয়া শিশুরা জানায়, জিহাদ তাদের বন্ধু ছিল। একসঙ্গে খেলাধুলা করত। তার কথা মনে পড়ছে তাদের।
ওই পাইপটি ঘিরে জিহাদের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার দাবি করেছিলেন অনেকেই। এ শিশুদের ফুল অর্পণের পরও একই দাবি তুললেন উপস্থিত কেউ কেউ। আবার ঘটনাটিকে গুজব বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং জিহাদের পরিবার ও চার শিশুকে হয়রানির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় পুলিশের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ তো ছিলই।
পাইপটির মুখ এখন ঢাকনা দিয়ে ঝালাই করা। তার চারপাশ রশি দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল সকালে দেখা গেল, পাইপটিকে ঘিরেই মানুষের ভিড়। কথা হয় চট্টগ্রাম থেকে আসা মোবারক ভূঁইয়া নামের একজনের সঙ্গে। বললেন, ‘টেলিভিশনে দেখেছি। একটি কাজের উদ্দেশ্যে সকালে ঢাকায় পৌঁছাই। কিন্তু প্রথমেই এখানে চলে এলাম। সামনাসামনি দেখে আরও খারাপ লাগছে।’ মোবারকের মতোই নিজের অনুভূতি জানালেন মানিকগঞ্জ থেকে আসা শহীদুল ইসলাম।
তবে কেবল জিহাদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে গাজীপুর থেকে এসেছেন ফাহিমা বেগম। বললেন জিহাদের জন্য তাঁর কষ্টের কথা।
ঘটনার দিন থেকেই পাইপটি ঘিরে ভিড়। তাই পাইপের কাছে ভিড়তে পারেননি বৃদ্ধা মনোয়ারা বেগম (৬০)। গতকাল সকালে কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ মিলেছে তাঁর। বললেন, ‘ছোট বাচ্চাটার জন্য কষ্ট লাগতেছে। জানি না, এখানে পইড়া সে কেমনটাই না করছিল।
ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবীর এত দিন ছিলেন ঢাকার বাইরে। তবে গতকাল ঢাকায় এসে আর দেরি করেননি। সকালেই চলে এসেছেন শাহজাহানপুর। তিনি বলেন, ‘জিহাদের বাবারে পুলিশ নিয়া গেল। ১২ ঘণ্টা আটকাইয়া রাখল। এ কোন জগতে আমরা বাস করি?’
এত দিন ওই পাইপটির পাশেই আরেকটি গভীর পাইপের ওপর রাখা ছিল শুধুই একখণ্ড পাথর। ঘটনার পরও পাথরটি দুই দিন ছিল। কিন্তু এলাকাবাসী ক্ষোভ জানানোর পর গত রোববার রাতে তাতে ঢাকনা দিয়ে ঝালাই করে দেওয়া হয়। এসব দেখে ঘটনাস্থলে যাওয়া রাইয়ান আল ইসলাম নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী বলল, ‘জিহাদের জীবনের বিনিময়েই কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল।’ এসব কথা বলতে বলতেই দেখা গেল ওই পাইপটির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন এক নারী। জানা গেল, তাঁর নাম লাভলী বেগম, শাহজাহানপুরের বাসিন্দা। জানতে চাইলে চোখ মুছতেই মুছতেই বললেন, ‘কালকেও নামাজ পড়ে কাঁদছি। মনে হইতেছে, জিহাদ আমার সন্তান, নিজের সন্তানকেই হারাইয়া ফেলছি।’ ­

Monday, December 29, 2014

চার শিশুকে থানায় জেরা by কাজী আনিছ

পরিত্যক্ত পানির পাইপ থেকে শিশু জিহাদ উদ্ধার হওয়ার আগে গত শনিবার চার শিশুকে থানায় কয়েক ঘণ্টা আটকে দফায় দফায় জেরা করেছে পুলিশ। পাইপের ভেতরে কোনো বাচ্চা নেই। তার পরও তারা কেন বলছে, কান্নার আওয়াজ শুনেছে—এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করে পুলিশ। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তারা। তাদের পরিবার জানিয়েছে, এখনো তাদের ভয় কাটছে না। ওই চার শিশু হলো মো. নাহিদ (৫), মো. তৌশিদ (৪), জাহিদা ইয়াসমিন পুষ্পিতা (৮) ও মোছাম্মৎ ফাতেমা (১৪)। জাহিদা শাহজাহানপুরের একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ফাতেমা একই স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ে। এর আগে জিহাদের বাবা নাসির ফকিরকেও থানায় ১২ ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে থানায় নিয়ে গেলে তার বাবা-মা কিংবা বৈধ অভিভাবককে জানাতে হবে। এরপর থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশবিষয়ক কর্মকর্তার হাতে তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রবেশন কর্মকর্তাকে অবহিত করে তার উপস্থিতিতেই শিশুবান্ধব পরিবেশে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। মানসিক পরিষেবা ও শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো তোয়াক্কা করেনি পুলিশ। তবে থানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনজনের পরিবারকে জানানো হয়। কয়েক ঘণ্টা জেরা করা হলেও খাবার দেওয়া হয়নি।
গতকাল সন্ধ্যায় থানায় যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয়, সেখানে দায়িত্বরত শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা কে। জবাবে শাহজাহানপুর থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ আলম বলেন, ‘আমিই থানার শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা। কিন্তু থানায় শিশুদের আনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।’
এ বিষয়ে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছি, জিজ্ঞাসাবাদ নয়। এরা কোনো মামলার আসামি হলে শিশু আইন প্রযোজ্য হতো।’
শিশুদের এভাবে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, শিশু আইন অনুযায়ী, এ ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ, বেআইনি। পুলিশ যে আইনকানুন না মানতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে এ আচরণেও তা ফুটে উঠেছে। পুলিশ আইন রক্ষার বদলে আইন ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে।
গত শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনি মাঠের কাছে রেলওয়ে পাম্পের একটি পানির পাইপে পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ। ওই দিন রাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাইপের ভেতরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা ফেলেন। এরপর ক্যামেরা উঠিয়ে বলেন, পাইপের ভেতরে শিশু জিহাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, গুজব। ফলে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তির। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতেই পুলিশ জিহাদের বাবা নাসিরকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। আর শনিবার বেলা ১১টার দিকে নেওয়া হয় চার শিশুকে।
জানা যায়, জাহিদা ও ফাতেমাকে টানা চার ঘণ্টা এবং নাহিদ ও তৌশিদকে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। থানায় নাহিদ ও তৌশিদের মা এবং জাহিদার বাবাও যান। কিন্তু ফাতেমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তার বাবা-মা কিংবা বৈধ অভিভাবককে পুলিশ কোনো কিছুই জানায়নি।
সরেজমিনে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে রেলওয়ে পাম্পের কাছে ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়েছিল জাহিদা ও ফাতেমা। তখন তারা পাইপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পায়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জিহাদের বাবা নাসির পুলিশকে জানিয়েছিলেন, জিহাদ পড়ে যাওয়ার কথা তিনি নাহিদ ও তৌশিদের কাছ থেকে শুনেছেন। এ কারণে মাসহ ওই দুই শিশুকেও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। শেষমেশ জিহাদ উদ্ধার হওয়ার পর চার শিশুর বাসায় ফেরার সুযোগ মেলে।
গতকাল দুপুরে বাসায় গেলে ফাতেমা ও জাহিদার পরিবার প্রথমে কথা বলতে রাজি হয়নি। পরে অনুরোধ করার পর জাহিদার বাবা মো. জাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, দুজন পোশাকধারী পুলিশ সদস্য বাসায় এসে জানান, জিহাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাহিদাকে থানায় নিয়ে যেতে এসেছেন তাঁরা। একজনের মাধ্যমে ফাতেমাকেও ডেকে পাঠানো হয়। পরে তাদের দুজনকেই থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে তিনিও থানায় যান।
ফাতেমার মা ফুলবানু বলেন, ‘আমার মেয়ে ফাতেমাকে পুলিশ কখন, কীভাবে থানায় নিয়ে গেল জানি না। পরে জানতে পাইরা দৌড়াইয়া থানায় যাই। সেখানে এক অফিসার জানায়, কাউকেই থানায় আনেননি তাঁরা। অথচ পরে জাহিদার বাবা জাহিদাকে ফোন করলে জানায়, ফাতেমাসহ তারা থানার ভেতরেই আছে। আমাকে বলল, কোনো দুশ্চিন্তা না করতে।’
ফাতেমা ও জাহিদা প্রথম আলোকে জানায়, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের একটি কক্ষে বসানো হয়। সেখানে জিহাদের বাবাকেও দেখে তারা। সেখানে একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের পাইপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানতে চান। তারা বারবারই ‘শুনতে পেয়েছি’ বলে জানায়। একপর্যায়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের বলেন, ‘তোমরা আবার মিথ্যা বলতাছ নাকি? আমরা তো কোনো বাচ্চা দেখি নাই। বাচ্চার আওয়াজ তো তোমাদের চিৎকারের প্রতিধ্বনিও হতে পারে।’
ফাতেমা জানায়, এর মধ্যে বাচ্চা উদ্ধারের খবর এলে তড়িঘড়ি করে সব পুলিশ সদস্য বের হয়ে যান। তখন সে পুলিশকে বলে, ‘আমরা তো মিথ্যা বলছি। এখন বাচ্চা আইলো কোত্থেকে।’ ওই কর্মকর্তা কোনো জবাব না দিয়ে চলে যান। এরপর তারা বাসায় ফিরে আসে। তবে এই চার ঘণ্টা তাদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।
শিশু নাহিদের মা খাদিজা বেগম ও তৌশিদের মা পারুল আক্তার জানান, এক পুলিশ সদস্য নাহিদ ও তৌশিদসহ তাদের হেঁটে থানায় নিয়ে যান। সেখানে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, জিহাদকে পড়তে তারা দেখেছিল কি না। তখন বাচ্চারা দেখেনি বলে জানায়।

Sunday, December 28, 2014

জিহাদের জন্য অন্য রকম যুদ্ধ by আশীষ-উর-রহমান ও কাজী আনিছ

ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত তার নিথর দেহ তুলে এনেছেন একদল স্বেচ্ছাসেবী।
তখনো আশা ছিল, জিহাদ হয়তো বেঁচে আছে। পাঠানো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর বালুর মাঠে কান্নায়-ক্ষোভে-বাঁধভাঙা আবেগে ফেটে পড়লেন কয়েক হাজার মানুষ। শিশুটিকে একনজর দেখার প্রবল হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। চিৎকার করে আল্লাহকে ডাকছিলেন অনেকেই।
ভিড় ঠেলে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন শিশুটিকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেলে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান, জিহাদ বেঁচে নেই।
একদিকে শিশুটির করুণ মৃত্যু, অপরদিকে তার বাবা নাসির ফকিরকে থানায় ১২ ঘণ্টা আটকে রাখা এবং মামা মনজুরকে নির্যাতনের ঘটনা সাধারণ মানুষকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পাইপে পড়া ছেলের জন্য কাঁদারও সুযোগ পাননি বাবা। এমনকি বাসায় স্ত্রী ও অন্য সন্তানেরা কে কেমন আছে, তা-ও জানতে পারেননি। পারেননি এই চরম বিপদের সময় তাদের পাশে থাকতে।
গতকাল শনিবার বিকেলে শাহজাহানপুর রেল কলোনির বাসায় গিয়ে দেখা গেল শত শত মানুষের ভিড়। দেড় কক্ষের বাসা। শয়নঘরে জানালা দিয়ে আসছে ম্লান বিকেলের মৃদু আলো। জিহাদের মা খাদিজা বেগম কেঁদে কেঁদে অবসন্ন হয়ে পড়ে আছেন বিছানায়। ভেতরে গণমাধ্যমকর্মী আর পাড়ার উৎসুক মানুষে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মায়ের কথা বলার মতো শক্তি নেই। থেমে থেমে বলেন, শুক্রবার দুপুরে খাওয়ার পর জিহাদকে নিয়ে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। কখন যেন জিহাদ বিছানা থেকে নেমে বাইরে চলে যায় খেলতে। ঘুম থেকে জেগে শোনেন ছেলে পাইপের গর্তে পড়ে গেছে।
খাদিজা বেগম বলেন, শুক্রবার বিকেলের পর থেকে জিহাদের বাবার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। রাতে বাড়ি ফেরেননি। শুনেছেন, জিহাদ পাইপে পড়ার গুজব ছড়ানো হয়েছে বলে তাঁকে থানায় আটক রাখা হয়েছে। জিহাদের মামা মনজুরকেও পুলিশ নির্যাতন করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
খাদিজাকে সান্ত্বনা দিতে আসা এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের জানান, গত শুক্রবার রাত আটটা থেকে তিনি ঘটনাস্থলে এসেছেন। আর যাননি। একটি বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে এমন রাজনীতির বিচার চান তিনি।
জাতীয় মহিলা পরিষদ থেকে আসা এক নারী বলেন, ‘এটি হত্যা। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যদি কোনো কথা না বলে উদ্ধার কার্যক্রম চালু রাখতেন, অন্তত অক্সিজেন দিয়ে হলেও শিশুটিকে বাঁচানো যেত। সরকারের যদি এ অবস্থা হয় তাহলে আমরা কোথায় যাব!’
জানতে চাইলে শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, জিহাদের বাবাকে সকালেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কাউকে মারধর করা হয়নি।
বিক্ষোভ: ক্ষুব্ধ লোকজন ও জিহাদের পরিবারের অভিযোগ, উদ্ধার অভিযানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসার আগে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য ছিল এক রকম। কিন্তু স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসার পর শিশুটি পাইপের ভেতর নেই বলে শুরু হয় উল্টো কথা। ক্ষুব্ধ লোকজন ও জিহাদের পরিবার তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিচার দাবি করেন। এলাকাবাসী মনে করেন, উদ্ধারকাজে গাফিলতির কারণেই শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি। ক্ষুব্ধ জনতা পাম্পের কাছে দুটি টিনের ঘর দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকে ইটপাটকেল। পুলিশ মৃদু লাঠি চালায়। প্রায় আধা ঘণ্টা এমন পরিস্থিতি চলে।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমদ খানের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান শিশুটিকে উদ্ধার করতে না পারা তাঁদের ব্যর্থতা কি না। উত্তরে তিনি বলেন, ‘না, আমরা অপারেশন সম্পূর্ণ স্থগিত করিনি। সীমিত করা হয়েছিল। আমরা জীবিত উদ্ধার করতে পারিনি। কিন্তু মৃত উদ্ধার করার কাজ তখনো চলছিল।’
আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ছিল কি না, জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রথম হওয়ায় এ রকম উদ্ধার অভিযানে যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।
অভিযানের আদ্যোপান্ত: তিন ভাইবোনের মধ্যে জিহাদ সবার ছোট। বয়স চার বছর। বাবা নাসির ফকির মতিঝিলের একটি স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী। শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে অন্য শিশুদের সঙ্গে বাসার পাশেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পানির পাম্পের কাছে খেলতে যায় সে। একপর্যায়ে পাম্পের একটি দেড় ফুট ব্যাসের পাইপে পড়ে যায় সে। চলে যায় গভীরে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই পাইপের গভীরতা ৫০০ ফুট। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ৪০০ ফুট। কেউ বলে ৬০০ ফুট।
পাইপের ভেতর শিশুটি পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। শুরু হয় উৎকণ্ঠা, প্রার্থনা। বালুর মাঠে চলছিল ওয়াজ মাহফিল। সেখান থেকেও মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, তার জন্য দোয়া করা হয়। ছুটে যান ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ কয়েক শ কর্মী। শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত, ভোর, সকাল, দুপুর—কিন্তু ছেলেটি উদ্ধার হয় না। পাইপে সরবরাহ করা হয় অক্সিজেন। রশি ফেলে আবার টানা হয়। একটু ভারী ভারী মনে হলেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আশপাশের শত শত মানুষ পড়তে থাকেন দোয়া-দরুদ। কিন্তু রশি কিছুক্ষণ ওপরে ওঠানোর পর আবার হালকা হয়ে যায়। হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে চলে দীর্ঘ অভিযান।
শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উদ্ধার অভিযানে থাকা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, পাইপের ভেতরে শিশুটির সাড়া পেয়েছেন তাঁরা। রশি ফেলার পর তাঁরা বেশ কিছুক্ষণ টেনে ভারী ভারী অনুভব করেছেন। তাঁদের ধারণা, শিশুটি রশি ধরতে পারলেও শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে না পারায় আবার ছেড়ে দিচ্ছে। জুস ও টর্চ লাইটও ফেরত এসেছে।
শুক্রবার রাত নয়টার দিকে উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে থাকা এক যুবক পাইপে মাথা ঢুকিয়ে ডাকতে থাকেন শিশুটিকে। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর এবার ওই যুবক মাথা উঠিয়ে বলেন, আর কোনো সাড়া পাচ্ছেন না তিনি। এরপর তড়িঘড়ি করে রশি দিয়ে তোলার কৌশল বাদ দেয় ফায়ার সার্ভিস। আনা হয় ক্রেন। ক্রেন দিয়ে কেটে কেটে তোলা হয় ওই পাইপের মধ্যে থাকা আরেকটি লম্বা লোহার দণ্ড। এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ ফুট। ওই দণ্ডটি তোলার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস তখন জানায়, লোহার দণ্ডটির শেষভাগের নিচে একটি যন্ত্র বাঁধা আছে। শিশুটি সম্ভবত ওই যন্ত্রের ওপর আছে। তাই ওই যন্ত্রসহ শিশুটিকে তোলার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কিন্তু রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে পুরো যন্ত্র তুলে দেখা গেল, সেখানে কোনো শিশু নেই।
এলেন মন্ত্রী-কর্মকর্তারা: ওই সময় ঘটনাস্থলে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমদ খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁদের উপস্থিতিতে এক যুবক স্বেচ্ছায় পাইপের ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু ঝুঁকি মনে হওয়ায় তাঁকে আর পাঠানো হয়নি। একে অপরের সঙ্গে কথা বলে চলছিল বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা। শেষমেশ ওয়াসার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি ভিডিও ক্যামেরা (বোরহোল ক্যামেরা) পাইপে ঢুকিয়ে প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নামানো হয়। ওপরে ল্যাপটপে ভিডিও ফুটেজ দেখছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থলে যায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দলও। সরাসরি সম্প্রচারের কারণে গণমাধ্যমেও দেখছিলেন সারা দেশের মানুষ।
ভিডিও ফুটেজে বস্তাসদৃশ বস্তু, টিকটিকি দেখা গেলেও কোনো মানবদেহ দেখা যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টা এভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলে ওঠেন, পাইপে শিশু পড়ার ঘটনা একটি গুজব। রাত পৌনে তিনটার দিকে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার যুগ্ম পরিচালক আবু সাইদ রায়হান সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিশু পড়ার ঘটনা গুজবও হতে পারে।’ প্রায় একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, কোনো শিশুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হবে না।
পরিত্যক্ত ঘোষণা না করা হলেও ওই সময় থেকেই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান। ওই সময় একটি বেসরকারি বিশেষজ্ঞ দলও পাইপের ভেতরে ক্যামেরা পাঠায়।
গতকাল থেকে: গতকাল সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে লোকজন আসতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে উৎসুক জনতার ভিড়। বেলা ১১টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক আবদুল হালিম সাংবাদিকদের জানান, পাইপে কোনো শিশুর সন্ধান মেলেনি। তাঁরা কোনো উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন না। বেলা পৌনে তিনটায় রেলওয়ে কলোনি মাঠে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে ফায়ার সার্ভিস।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমদ খান বলেন, দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও শিশুটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাই উদ্ধার কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করা হলো। এখন পাম্পটি রেলওয়ের দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। রেলওয়ে যদি পরে ওই পাইপ তোলা কিংবা নিচে পানি সরবরাহ করে কোনো ব্যবস্থা নেয়, সে ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস তাদের সহযোগিতা করবে।
পাইপে শিশুটির সাড়া পাওয়া, জুস পাঠানোসহ শুক্রবার দেওয়া ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আলী আহমদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা দেশে এই প্রথম। তাই অভিজ্ঞতার একটি ঘাটতি আছে। তা ছাড়া কোনো পাইপে কেউ শব্দ করলে তা প্রতিধ্বনিত হয়। তাই আগের ধারণা ভুল ছিল। কিন্তু এ ভুল ইচ্ছাকৃত নয়।
তবে মহাপরিচালক বলেন, তাঁদের ক্যামেরা প্রায় ২৮০ ফুট পর্যন্ত নিচে নামানো সম্ভব হয়েছিল। এরপর শক্ত কোনো কিছু থাকায় তা আর নিচে নামানো সম্ভব হচ্ছিল না। এখন নিচে শিশুটি আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণার পর সুযোগ দেওয়া হয় সাধারণ লোকদের।
পাওয়া গেছে পাওয়া গেছে চিৎকার: প্রেস ব্রিফিং শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পরই পাম্পের আশপাশে থাকা লোজজন একযোগে ‘পাওয়া গেছে’ ‘পাওয়া গেছে’ বলে চিৎকার শুরু করে। দেখা যায়, কয়েকজন সাধারণ যুবক তাঁদের তৈরি খাঁচা ব্যবহার করে পাইপ থেকে বের করে এনেছেন শিশুটিকে। শিশুটির পরনে ছিল হলুদ রঙের একটি হাফ প্যান্ট। খালি গা। চোখ বন্ধ। মুখের কিছু কিছু জায়গায় কাদামাটি মাখা। সাদা হয়ে আছে হাত-পা।
দৌড়ে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। এরপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীরা। অনেকে মাটিতে গড়াগড়ি করেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। জিহাদ আপাতত আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হিমঘরে। আর এক গভীর বিষাদে ডুবে আছে সারা দেশ।

Tuesday, October 28, 2014

উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় মামলা করেও হতাশ ভুক্তভোগী পরিবার by কাজী আনিছ

উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় থানায় মামলা করার পরও স্বস্তি পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবার। তদন্তে ধীরগতি, পুলিশের অবহেলা এবং আসামি গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসায় পরিবারগুলো হতাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বখাটেদের উৎপাতে আত্মহত্যা করেছে ১০ নারী। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে একজন, প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছে সাতজন, বখাটেদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে ১৩০ জন, উৎপাতকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৫৭ জন এবং বখাটেদের উৎপাতে পাঁচজনের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ঘটনার প্রতিটিতেই মামলা হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কিন্তু উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনায় মামলার বাদীপক্ষ বলছে, থানায় মামলা করে তারা স্বস্তিতে নেই। ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত কিংবা প্রচারিত হলেই পুলিশ তৎপর হয়। আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সব থেমে যায়। এই সুযোগে জামিনে বের হয়ে আসে আসামিরা।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণির ছাত্রী উম্মে কুলসুম ওরফে ঋতু। পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, স্থানীয় বখাটে শিমুলসহ কয়েক যুবকের উৎপাত সইতে না পেরে কুলসুমের এমন আত্মহনন। ঘটনার পর কুলসুমের মা সাথী আক্তার বাদী হয়ে শিমুলসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ শিমুলসহ এজাহারভুক্ত পাঁচজনের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। শুধু গত ৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে শেখ মো. নেওয়াজ ইবনে আকরাম ওরফে জিহাদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এক মাসের মাথায় জিহাদ জামিনে বেরিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া রফিক নামের আরেক সন্দেহভাজন এখন কারাবন্দী। এখন পুলিশসহ সবাই চুপ।
কুলসুমের স্কুলের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, এলাকাবাসী পুলিশকে তথ্য দিয়ে জিহাদকে গ্রেপ্তার করিয়েছে। অন্যদিকে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপ দিলে তারা রফিককেও পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। শুরু থেকেই এ ঘটনায় পুলিশকে পেশাগত জায়গা থেকে নিজেদের উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। কুলসুমের বাবা মো. আশিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ একদম ঠান্ডা। এখন পর্যন্ত মূল আসামিদেরই ধরতে পারেনি। জিগাইলে বলে, ধরতেছে। এ আশায় থাকতে থাকতে একজন জামিন পাইয়া গেল। আপনারা একটু লিখছিলেন বইলাই পুলিশ কিছু কাজ করছিল। এখন বন্ধ। মেয়ে হারাইছি, যন্ত্রণা ভুলতে পারি না। মামলা কইরা যে বিচার পামু, সে আশাও আর দেখতাছি না।’
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান বলেন, ‘আসামি জিহাদ গত ১২ অক্টোবর জামিনে বের হয়ে গেছে বলে শুনেছি। তবে এখনো কাগজপত্র হাতে পাইনি।’ এজাহারভুক্ত আসামিরা কোথায়? জবাবে এসআই বলেন, আসামিদের অবস্থান এখনো শনাক্ত হয়নি। ফোনের কল তালিকা নিয়ে দেখেছি, তাদের সর্বশেষ অবস্থান ছিল চট্টগ্রামে।
রাজধানীর ভাষানটেকের নাসির হোসেন হত্যার ঘটনায়ও মামলা করে নিরাপত্তাহীনতায় আছে ভুক্তভোগী পরিবার। কারণ, এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামাতো বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদের জের ধরে নাসির হোসেনকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করে ভাষানটেকের সন্ত্রাসীরা। ঘটনায় নাসিরের বড় ভাই মো. মোশারফ বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে আরও সাতজন আসামির নাম পুলিশের কাছে জমা দেন তিনি।
তবে এ ঘটনায় আসামি না ধরে বাদীপক্ষকে সামাল দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ভাষানটেক থানার পুলিশ। ঘটনাকে ‘উত্ত্যক্তের প্রতিবাদে হত্যা’ নয় বলে দাবি করে থানার পুলিশ। এ মর্মে নাসিরের মামাকে দিয়ে জোর করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করারও অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। আসামিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যেরও অভিযোগ ওঠে। এ কারণে নাসির হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ভাষানটেক পুলিশ ফাঁড়ির ১৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। প্রত্যাহার করা হয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও পরিদর্শককে (তদন্ত)।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) টাঙ্গাইল থেকে এজাহারভুক্ত আসামি মো. শরীফ ওরফে চোক্কা ও রাজধানীর গাবতলী থেকে এজাহারভুক্ত বাবুল ব্যাপারী ওরফে বাবলু ও সন্দেহভাজন আলতাফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এই তিনজন ছাড়া এখন পর্যন্ত ১১ জন এজাহারভুক্ত ও সন্দেহভাজন আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্ধেকেরও বেশি আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় আতঙ্কে আছে ভুক্তভোগী পরিবার। এরই মধ্যে ভয়ে ভাষানটেক এলাকা ছেড়েছেন নাসিরের দুই বোন। নাসিরের বড় ভাই মো. মোশারফ বলেন, এখন নাসিরের পরিবার বলতে তিনিই এলাকায় আছেন। আসামিরা এলাকার আশপাশেই আছে এবং তাঁকে হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে ডিবি। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

Saturday, December 14, 2013

গুলিবিদ্ধ শিশুটি রাস্তায় পড়ে ছিল ১৫ মিনিট! by কাজী আনিছ

উল্টো হয়ে পড়ে আছে প্লাস্টিকের বাটি। পাশে উপুড় হয়ে আছে ১১ বছরের শিশু শান্ত ইসলাম। পরনে লাল-খয়েরি রঙের প্যান্ট আর সাদা ফুল হাতা গেঞ্জি। গেঞ্জিতে ছোপ ছোপ রক্ত।

Monday, November 18, 2013

হরতালের আগুন: মারা গেলেন অগ্নিদগ্ধ আরও দুজন- পুড়ে গেছে তাঁদের সংসারও by কাজী আনিছ

পিকআপ ভ্যানে কফিন। কফিনের ভেতরে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন আসাদুল গাজী। সেদিকে তাকিয়ে ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকছিল সাত বছরের শিশু মাইনুল ইসলাম।
কিন্তু বাবা জাগলেন না। মাইনুলের প্রশ্ন, ‘বাবা কি উঠবে না?’

গতকাল শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগে এ দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে ভাসিয়েছে চোখের জলে। মাইনুল জানে না অভিশপ্ত হরতালের আগুন বাবা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আসাদুল গাজীর (৪০) প্রাণ নিভিয়ে দিয়েছে।

হরতালের আগের দিন, ৩ নভেম্বর রাতে সাভার সেনানিবাস এলাকায় আসাদুলের যাত্রীবাহী অটোরিকশায় হরতালকারীরা পেট্রলবোমা ছুড়লে অগ্নিদগ্ধ যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (৩৫) নিহত হন। এ সময়ই দগ্ধ হন আসাদুল ও মোস্তাফিজুরের সহকর্মী হাসু আহমেদ। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। টানা ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে মারা যান আসাদুল। এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা আগে শুক্রবার সকালে হাসপাতালেই  চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরেকজন অগ্নিদগ্ধ মন্টু পাল (৩৮)। ১০ নভেম্বর সূত্রাপুর থানার লক্ষ্মীবাজারে লেগুনায় পেট্রলবোমায় ঝলসে গিয়েছিল মন্টুসহ পাঁচজনের শরীর।

গত ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত হরতালের আগুন, পেট্রলবোমা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত নিহত হলেন ছয়জন। আসাদুল, মন্টু পাল ও মোস্তাফিজুর ছাড়া এই তালিকায় আছেন পোশাককর্মী নাসিমা আক্তার ও কিশোর মনির হোসেন। আর ‘বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে’ নিহত হন ফেনীর আবুল কাশেম। এঁরা সবাই হতদরিদ্র। আসাদুল, মন্টু ও মোস্তাফিজুর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আগুনে শুধু তাঁদের মৃত্যু হয়নি, পুড়িয়ে মারছে তাঁদের পরিবারকেও।

বার্ন ইউনিট ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে হতাহতের সংখ্যা ৭৬ জন। এর মধ্যে তিনজন প্রতিবন্ধী ও ১৩ জন শিশু-কিশোর। ১৮টি ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৩০ জন। তাঁদের মধ্যে তিন শিশু-কিশোরসহ ১৯ জন বর্তমানে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।


‘লেখাপড়া করমু কীভাবে?’: ভাগ্য বদলাতে প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকা এসেছিলেন আসাদুল। ছিলেন রিকশাচালক। সংসার গড়ার পর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চালনা শেখেন। পাঁচ-ছয় বছর ধরে চালাচ্ছিলেন অটোরিকশা। যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগে স্ত্রী মর্জিনা আক্তার এবং সন্তান তানজিলা আক্তার (১০) ও মাইনুলকে নিয়ে থাকতেন। কিন্তু খরচ সামাল দিতে না পারায় স্ত্রী-সন্তানদের পটুয়াখালীর বাউফলের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

স্বজনেরা জানান, প্রতি সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে হাজার দুয়েক টাকা পাঠাতেন আসাদুল। হরতাল ও অন্য রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে আয় কম থাকায় কয়েক সপ্তাহ টাকা পাঠাতে পারেননি। তাই ওই রাতে সাভারের নবীনগরে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলেন।

গতকাল মীর হাজীরবাগে গিয়ে দেখা যায়, একটি মাদ্রাসার সামনে পিকআপ ভ্যানে কফিনে আসাদুলের লাশ। মাদ্রাসার পাশেই একটি গ্যারেজ থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। ওই গ্যারেজেই সিএনজি রাখতেন আসাদুল। গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, এক স্বজনকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে তানজিলা বলছিল, ‘বাবা নাই। লেখাপড়া করমু কীভাবে। সামনে পরীক্ষা দিমু কীভাবে?’। ‘আমার সন্তানদের দেখব কে?’ বলে বিলাপ করেই চলেছেন স্ত্রী মর্জিনা।

 তানজিলা গ্রামের স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। একই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে মাইনুল। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ তো আছেই, আছে ঋণের বোঝাও। এখন কী করবেন, কী হবে—কিছুই বুঝতে পারছেন না মর্জিনা।


আমি আর বাঁচতে চাই না’: শোকের সাগরে ভাসছেন নিহত মন্টু পালের পরিবারও। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে একটি স্বর্ণের দোকানের কারিগর মন্টু পাল স্ত্রী সঞ্জু রানী পালকে নিয়ে ফতুল্লার কামালপুর পাগলায় থাকতেন। ১০ নভেম্বর লেগুনায় চড়ে বাসায় ফিরছিলেন। তার পরই পেট্রলবোমায় ঝলসে যায় শরীর। শুক্রবার সকালে মন্টুকে মৃত ঘোষণার পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে বার্ন ইউনিটের পরিবেশ। মেঝেতে গড়িয়ে স্ত্রী সঞ্জুর বিলাপ, ‘আমি আর বাঁচতে চাই না।’

তিন বছর আগে জন্মের সময় মন্টু দম্পতির সন্তান মারা যায়। এখন সঞ্জু রানীর আর কেউ রইল না। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ফতেহপুর ইউনিয়নে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে মন্টুর লাশ গোড়াকী শ্মশান ঘাটে দাহ করা হয়।


ছবির ফ্রেমে কান্নার জল: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বড় কাঞ্চনপুর গ্রাম। টিনশেড ঘরের উঠোনে একটি ছবির দিকে তাকিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মনোয়ারা বেগম। মনোয়ারা হতভাগা কিশোর মনির হোসেনের (১৫) মা। মনির স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ত। চিকিৎসা ও বেড়ানোর জন্য কাভার্ড ভ্যানচালক বাবা রমজান আলীর সঙ্গে বের হয়েছিল সে। ফিরল লাশ হয়ে। হরতালের দিন ৪ নভেম্বর গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তায় রমজান আলীর কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ হয় ঘুমন্ত মনির। ৭ নভেম্বর ভোর চারটার দিকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মারা যায় সে।

গতকাল বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মনিরের ছবি হাতে স্মৃতিচারণা করে চোখের জল ঝরাচ্ছেন মা মনোয়ারা। আর কেবলই বলছেন, ‘আমার ছেলেরে যারা আগুন দিয়া পুইড়া মারছে তাগো বিচার চাই।’


সংসারও পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেছে’: হরতালের আগুনে শুধু মোস্তাফিজুর রহমান নন, পুড়ে গেছে তাঁর সংসারও। তাঁর মৃত্যুতে দুই সন্তান নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন স্ত্রী বিনা সুলতানা। আছেন অজানা আশঙ্কায়। গতকাল সাভার নবীনগরের বাসায় গেলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আগুনে শুধু স্বামীকে হারাইনি, সংসারও পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে।’

৩ নভেম্বর পুরান ঢাকা থেকে মালামাল কিনে নিহত আসাদুল গাজীর অটোরিকশায় চড়ে নবীনগরের বাসায় ফিরছিলেন মোস্তাফিজুর ও সহকর্মী হাসু। পেট্রলবোমায় গুরুতর দগ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গ্রামের বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়।

স্বজনেরা জানান, মোস্তাফিজুর দম্পতির দুই মেয়ে মাহিম মোস্তাফিজ (৬) এবং মৌসুমী মোস্তাফিজ (৩)। মাহিম সাভার সেনানিবাস এলাকার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বালিকা বিদ্যালয়ের নার্সারির ছাত্রী। সন্তানের লেখাপড়া ও সংসার খরচ তো ছিলই, নিজের বাবা-মায়ের খরচও পাঠাতেন মোস্তাফিজুর। ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় ছিল না তাঁর। কাঁদতে কাঁদতে বিনা বলেন, ‘এখন দুই সন্তান নিয়ে আমি কী করব, কোথায় যাব জানি না।’


মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে শোকের ছায়া: সাত সন্তান নিয়ে অভাবের সংসার ছিল মুক্তিযোদ্ধা সফিজ উদ্দিনের। অভাবের কারণে ২০০৫ সালে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। অভাব-অনটনে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পরের বছরই ঢাকা এসেছিলেন সফিজের মেয়ে নাসিমা বেগম। কাজ নেন পোশাক কারখানায়। ২৬ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে বাসে হরতালকারীদের দেওয়া আগুন কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবন। ১৪ নভেম্বর মারা যান নাসিমা।


গতকাল বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আরজি কালিকাপুরে নাসিমার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। ৭০ বছর বয়সী নাসিমার মা জহুরা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘একটু সুখ দেয়ার লাইগ্যা ঢাকা যাইয়া মোর মায় লাশ অইয়া গ্রামে ফিইররা আইল। মোগো গরিবগো মাইররা যারা রাজনীতি করে ও আল্লাহ তুই তাগো বিচার করিস।’

২০০২ সালে পাশের উপজেলার মানিক সরদারের সঙ্গে নাসিমার বিয়ে হয়েছিল। মানিক দ্বিতীয় বিয়ে করায় বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন নাসিমা। কিন্তু নাসিমার আর জীবনই থাকল না।

নাসিমার বাবা সফিজের দুই ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। চাচা শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, স্বাধীনতার পর কিছুই পাইনি। বরং হারাতে হলো অনেক কিছু। জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানেরা নিরাপত্তাহীনতায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রতিহিংসার বলি হলো আমাদের মেয়ে নাসিমা।’


প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাভার প্রতিনিধি; বরিশাল গৌরনদী প্রতিনিধি; গাজীপুর প্রতিনিধি ও টাঙ্গাইল মির্জাপুর প্রতিনিধি।