Thursday, December 17, 2015

একজন বীরপ্রতীকের উপহার by ডক্টর তুহিন মালিক

এক. বিজয় দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়েও বঙ্গভবনে ঢুকতে দেয়া হয়নি একজন বীরপ্রতীককে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বিগত ৩৫ বছর ধরে প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই এই দিনটিতে বঙ্গভবনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। এমনকি কল্যাণ পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেও গত আটবছরে যথারীতি বঙ্গভবনের দাওয়াতি থেকে কখনও তাকে কোন বাধার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু এবারের বিজয় দিবসের সংবর্ধনায় বঙ্গভবনের গেটে দন্ডায়মান পুলিশ কর্মকর্তা জেনারেল ইবরাহিমকে জানায়, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের তালিকা অনুযায়ী বঙ্গভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষিত ব্যক্তিদের মধ্যে তার নাম নাকি এক নম্বরে রয়েছে। অর্থাৎ বঙ্গভবনের নিরাপত্তার জন্য তিনি নাকি নাম্বার ওয়ান হুমকি! কল্যাণ পার্টির মতো দলের প্রধানও যদি নাম্বার ওয়ান বিপজ্জনক হয়, তাহলে বাকিরা তো দেখি মহা-ভয়াবহ! অথচ এই ঘটনায় দেশমাতার জন্য যুদ্ধ করা এই বীরপ্রতীক কতটা লজ্জিত বোধ করলে বলতে পারেন, ‘‘একজন বীরপ্রতীকের জন্য বিজয় দিবসের উপহার। বিজয় দিবসে একজন বীরপ্রতীককে অপমান করা কী জরুরি?” প্রচ- ক্ষোভে তিনি বলেন, ‘‘আমার তিনটি পরিচয়। প্রথমত, আমি একজন বীরপ্রতীক। দ্বিতীয়ত, একজন  অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল। তৃতীয়ত, আমি একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রধান। জানি না, এই তিন পরিচয় বা বৈশিষ্ট্যের কোনটিকে আক্রমণ করতে গিয়ে তারা কোনটিকে অপমান করলো।” আসলে জেনারেল ইবরাহিম তার তিনটি পরিচয়ের কথা বললেও চতুর্থ পরিচয়ের কথাটি কিন্তু বলেননি। তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। সরকারের কাছে এটাই হচ্ছে তার বড় পরিচয়। আর এটাই তাদের কাছে বড় অপমানের, বড় যন্ত্রণার!
দুই. আসলে শুধুমাত্র জেনারেল ইবরাহিম একাই নন, কী মুক্তিযোদ্ধা, কী বীরপ্রতীক, আওয়ামী লীগ না করলে বাকি সবাই যেন আজ রাজাকার আর স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা বাণিজ্য চালায়, তাদের কাছে বীরপ্রতীকের সম্মানহানি তো ফ্যাসিবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশমাত্র। ঠিক আছে, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে বঙ্গভবনে নিষিদ্ধ করলেন, কিন্তু দাওয়াত দিয়ে এভাবে অপমানটা করলেন কেন? ইবরাহিম সাহেব দাবি করলেন, তার দলটি নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু তিনি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে, শুধু দল নিবন্ধিত হলেই চলবে না, দাওয়াতটিও নিবন্ধিত হতে হবে। একটা ভুল তিনি করেছেন বটে, আওয়ামী লীগের ভজন ও গুণকীর্তনে পারদর্শিতা অর্জন না করেই উনি বঙ্গভবনে গেলেনই বা কেন? অথচ বঙ্গভবনের সেই সংবর্ধনায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের সুবিধা ভোগ করা লোকজনের কোন কমতি ছিল না। বঙ্গভবনের বিজয় দিবসের সংবর্ধনায় ছিলেন অনেক মুখচেনা স্বাধীনতাবিরোধীরাও। তাই একজন বীরপ্রতীককে ঢুকতে না দিয়ে বিজয়ের উৎসবটি কী গৌরবগাঁথার জন্ম দিলো তা বোধগম্য নয়। আমরা চাইলেও তো এখন আর নতুন করে কোন বীরপ্রতীকের জন্ম দিতে পারবো না। যে দু’একজন ক্ষণজন্মা এখনও বেঁচে আছেন তাদেরকে এভাবে অসম্মান করাটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করার নামান্তর নয় কী? বঙ্গভবনের বিজয় দিবসের সংবর্ধনায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের তালিকা প্রস্তুত করে নিমন্ত্রণ দেয়ার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই তালিকায় কখনই থাকে না কৃষকের কোন ক্যাটাগরি। নিমন্ত্রণপত্র পৌঁছায় না কোন কৃষকের ঘরে। অথচ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ বিসর্জনকারী, যুদ্ধাহত এবং যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় সবাই ছিলেন কৃষক পরিবারের। কৃষকের আত্মত্যাগে যে স্বাধীনতা তার বিজয় উৎসবে কৃষকের কোন জায়গা হয় না কেন?
তিন. গত পরশু বিজয় দিবসের একই সময়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে অনশন পালন করেন সাংবাদিক প্রবীর সিকদার। প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে গত ১৬ই আগস্ট ফরিদপুরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করা হয়। এর আগে পুলিশ কোন অভিযোগ ছাড়াই তাকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। যুদ্ধাহত এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নিয়ে তাই বিজয় দিবসে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে অনশন পালন করেন। সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন বলে বহু অভিযোগ রয়েছে। স্বয়ং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত এইসব মন্ত্রী-নেতাদের তালিকা পর্যন্ত তুলে ধরেছেন বহুবার। কিন্তু শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ করার সুবাদে তারাই আজ কিনা বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা সেজে রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ- সুবিধা ভোগ করছে। উল্টা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের হতে হচ্ছে তাদেরই হাতে চরমভাবে নিগৃহীত। সচিবের হাতে অপমানিত হয়ে আত্মহত্যার পথকে পর্যন্ত বেছে নিতে হচ্ছে এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। অথচ দলীয় আশীর্বাদের কারণে মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান ও হত্যার কোন বিচারই হয় না।
চার. এখন অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যে কেহ আওয়ামী লীগের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে তাকেই রাজাকারের খেতাব দিয়ে দেয়া হবে। সঙ্গে মামলা-হামলা, জেল-জুলুম তো আছেই। অথচ তাদেরই বিগত শাসনামলের পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি একে খন্দকারকে পর্যন্ত রাজাকার উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে স্বয়ং আওয়ামী লীগ থেকেই। এমনকি সত্য ইতিহাস তুলে ধরার অপরাধে তাকে কুলাঙ্গার ও আইএসআই’র এজেন্ট বলেও গালাগাল করেছে নিজ দলের নেতারা। আওয়ামী দেউলিয়া রাজনীতির হিংস্র শিকারে নিষ্কৃতি পাননি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের মহানায়করা পর্যন্ত। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু যাকে বীরউত্তম খেতাব দিলেন সেই জিয়াউর রহমানকে পর্যন্ত তারা কি করে আইএসআই’র এজেন্ট বলতে পারে? অথচ নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও নিজের জীবনকে বাজি রেখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া জিয়াউর রহমানকে যারা আজকে পাকিস্তানের চর বলে তিরস্কার করছে তাদের কেউ সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশই নেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে তারা পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তায় সুরক্ষিত ছিল। কেউ আবার কলকাতায় বসে নিশ্চিন্তে বিলাসী জীবনে মগ্ন ছিল। তবে আমাদের জাতীয় নেতারাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন ঠিকই চরম আত্মত্যাগের মহিমায় স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেন। আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের অবদান কোন অংশেই কম নয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ও জয়বাংলা সেøাগানেই আমরা হানাদারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। কিন্তু তাই বলে মুক্তিযুদ্ধ কোন একক দলের অর্জন হতে পারে না। আওয়ামী লীগ ছাড়াও দেশের আপামর সাধারণ মানুষ সেদিন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও নেতা মেনেই আমরা সবাই দলমত নির্বিশেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি-উপসেনাপতি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আর স্বাধীনতার ঘোষকের কি কোনোই অবদান নাই?
পাঁচ. প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যেদিন মারা যান, সেদিন তার মৃত্যুতে বঙ্গভবনে ছুটে যান সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। চলমান সংঘাতময় রাজনীতির ভিড় ঠেলে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর একাত্মতা সেদিন আমাদেরকে মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল ও তার নেত্রী যে অভূতপূর্ব সহমর্র্মিতা প্রদর্শন করেছিলেন তা সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল ঘটনাই ছিল। প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সম্মানে সেদিন তিনি শুধু হরতাল প্রত্যাহারই করেননি, বরং বগুড়া ও জয়পুরহাটের সফরও স্থগিত করেছিলেন। বিএনপি অফিসে সেদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী কোন প্রটোকল, অভ্যর্থনা বা সৌজন্যতাকে বাহানা না করেই বঙ্গভবনে ছুটে গিয়েছিলেন। নিত্যদিনের সরকারি দলন-পীড়নে আক্রান্ত মীর্জা ফখরুলসহ দলের নেতারা এক কাতারবন্দি হয়েছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির জানাজার নামাজে। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাহেব একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে জনপ্রিয় হয়েও তার বঙ্গভবনের দুয়ার একজন বীরপ্রতীকের জন্য বন্ধ করে দেয়া হলো কার ইঙ্গিতে? এটা নিশ্চয়ই পূর্বপরিকল্পিত কিছু ছিল না। কারণ পূর্বপরিকল্পিত হলে ইবরাহিম সাহেবকে দাওয়াতই দেয়া হতো না। সরকারের মধ্যে অতি উৎসাহী কোন অপশক্তির ইশারায় এহেন লজ্জাজনক ঘটনা কোনোভাবেই সরকারের পক্ষে লাভজনক হয়েছে বলে কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। আসলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়তে না পারলেও জাতির জন্য অনেক বড় প্রত্যাশার জন্ম দিতে পারে নিঃসন্দেহে। কী সরকারি দল, কী বিরোধী দল, দলমত নির্বিশেষে সকল দলের রংধনুতেই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য লুকায়িত। আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিরা কেন রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হবেন? আমাদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সকল দলের পারস্পরিক সহাবস্থান কবে নিশ্চিত করা যাবে? এই তো ক’দিন আগে ভারতে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাড়িতে চায়ের আমন্ত্রণে গেলেন। আর আমরা একদল আরেক দলকে চিরতরে নির্মূল করার শপথ নিয়েই যেন রাজনীতি করছি।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

বৃটেনের সেক্স ক্যাপিটাল নটিংহ্যাম

বৃটেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাধ্য হয়ে দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। বাড়তি খরচ সামাল দিতে অসমর্থ তাদের পরিবার। সেক্ষেত্রে এ ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প সহজ কোন উপায় নেই। সেই বৃটেনে শিক্ষার্থীদের ‘সেক্স ক্যাপিটাল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে নটিংহ্যাম। নতুন এক তথ্য বিশ্লেষণে এমনটাই বলা হয়েছে। অনলাইন মিরির এ খবর দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেখানকার শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছে সবচেয়ে যৌন আবেদনময়ী। এক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। একটি ওয়েবসাইট এ নিয়ে তথ্য যাচাই করেছে। তারপর তারা কোন শহর সবচেয়ে বেশি যৌন আবেদন সৃষ্টি করে তার পর্যায়ক্রমিক তালিকা করেছে। তাতে শীর্ষ ২০টি শহরকে সবচেয়ে আবেদনময়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এক নম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে এ শহরগুলো হলোÑ নটিংহ্যাম, লিডস, অক্সফোর্ড, এডিনবার্গ, লিভারপুল, গ্লাসগো, শেফিল্ড, ম্যানচেস্টার, বেলফাস্ট, ব্রিস্টল, নিউক্যাসল, বারমিংহাম, সাউদাম্পটন, প্লেমাউথ, লিসেন্টার, কেমব্রিজ, ব্রাইটন, এক্সেটার, কার্ডিফ ও প্রেসটন। যে ওয়েবসাইট এই তালিকা করেছে সেটা প্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য। তাতে প্রতিদিন কতজন শিক্ষার্থী ঢুঁ মেরেছেন তার ভিত্তিতে ওই তালিকা করা হয়েছে। তারা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এতে যোগ দেয়া এক লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর ওপর এই পর্যালোচনা করেছে। তাতে দেখা গেছে। এতে দেখা গেছে দিনে সর্বোচ্চ ১৪৭৭ জন শিক্ষার্থী ওই সাইটটিতে যোগ দিয়েছে তার সঙ্গী খুঁজে পেতে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা লিডসে এ সংখ্যা ১৪১০। তৃতয়ি অবস্থানে থাকা অক্সফোর্ডে এ সংখ্যা ১৩৮৯। ওই ওয়েবসাইটের এক পোস্টে বলা হয়েছে, আমাদের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের তার শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য সঙ্গী পাইয়ে দেয়া। এটা শুধু শিক্ষার্থীদের একটি ডেটিং ওয়েব সাইটই নয়। যেকোন রাতে শিক্ষার্থীকে তার সঙ্গী পেতে সহায়তা করা হয়।

‘ইসলামের সমালোচনা অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা হুমকি হতে পারে’

ইসলাম নিয়ে সমালোচনা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই বলে রাজনীতিবিদদের সতর্ক করেছেন অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এএসআইও) প্রধান ডানকান লুইস। ক্ষমতাসীন রক্ষণসীল দল থেকে রাজনীতিকদের কেউ কেউ সম্প্রতি ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবস গত সপ্তাহে ইসলাম নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা বলেন। এরপরই ডানকান লুইস ওই সতর্কবার্তা দিলেন রাজনীতিকদের। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এতে বলা হয়, গত সপ্তাহে টনি অ্যাবট একটি পত্রিকার কলামে লিখেছেনÑ ইসলামের বিরাট সমস্যগুলোর বিষয় আমরা আর অস্বীকার করতে পারি না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা বলার পর পরই এমন মন্তব্য করেন টনি অ্যাবট। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে তার দলের অনেক নেতা, ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেট, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, প্রেসিডেন্ট পদে দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ। ট্রাম্পের সঙ্গে টনি অ্যাবট সুর মেলানোয় অস্ট্রেলিয়ার লিবারেল-ন্যাশনাল জোটের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও’র প্রধান ডানকান। তিনি তাদেরকে অনুরোধ করেছেন, ইসলাম নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা না করে সুর নরম করুন। তার আহ্বানের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়া বিশপ। তিনি বলেছেন, এএসআইও’র মহাপরিচালক যদি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকেন যে, প্রকাশ্যে কথা বলার জন্য তা তার প্রতিষ্ঠানের সন্ত্রাস বিরোধী কাজে ব্যাঘাত ঘটায় তাহলে তিনি সে বিষয়ে কথা বলতেই পারেন। উল্লেখ্য, টনি অ্যাবট নিয়মিতভাবে কট্টরপন্থি গ্রুপ ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় কথা বলছেন। ওদিকে সম্প্রতি সিডনির ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকাকে একটি সাক্ষাতকার দেন ডানকান লুইস। এতে তিনি বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে উত্তেজনা উস্কে দিলে তাতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন হয়ে পড়বে। আমি বিশ্বাস করি কাউকে এভাবে কোন কিছু দিয়ে আঘাত করলে তা হবে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। মুসলিমদের কাছ থেকে আমরা অনেক তথ্য পাই এবং তার ওপর আমাদেরকে অনেক বেশি নির্ভর করতে হয়। তাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমুলক কথা বললে আমাদের কর্মকা-ে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাই যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানযোগ্য। তবে সেক্ষেত্রে আমাদেরকে স্মার্ট হতে হবে। উল্লেখ্য, জিহাদি গ্রুপে যোগ দিতে ইরাক ও সিরিয়া যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কট্টরপন্থি ও নাগরিকরা এমন উদ্বেগের মুখে গত এক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে। ইসলাম নিয়ে বিরোধিতার কারণে এই ধারা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কট্টরপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছেই। এক্ষেত্রে এখনই বিজয় ঘোষণা করতে চান না ডানকান লুইস।

ইসলামিক সামরিক জোট নিয়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিস্ময়

সৌদি আরবের নেতৃত্বে নতুন সন্ত্রাস বিরোধী ইসলামিক সামরিক জোট গঠনের ঘোষণায় পাকিস্তানের পর বিস্ময় প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। মঙ্গলবার সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স, দ্বিতীয় উপ প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এই জোট গঠনের ঘোষণা দেন। এ নিয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বলেছে তারা এখনও এ জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয় নি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ওদিকে এ জোট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কোন খবরে বলা হয়েছে, জোটের সদস্যরা এমন ঘোষণা শুনে প্রশ্ন করছেন- এই জোট কি? ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এ জোটে যোগ দেবে কিনা সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেয় নি। জাকার্তা পোস্টকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরমানাথা নাসির বলেছেন, সৌদি আরব যে সামরিক জোট গঠন করেছে তার ধরন কি হয় তা পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। অপেক্ষা করছে। মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিশামুুদ্দিন হোসেন বলেছেন, তারা এ জোটকে সমর্থন করেন। তবে কুয়ালালামপুর থেকে কোন সামিরিক বিষয়ে জড়িত হওয়ার বিষয় প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের এ উদ্যোগে কোন সামরিক প্রতিশ্রুতি নেই। মঙ্গলবার এই জোট ঘোষণা দিয়ে প্রেন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, তারা ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর ও আফগানিস্তানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। তিনি বিরল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বর্তমানে প্রতিটি মুসলিম দেশই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাই এক্ষেত্রে সমন্বয় করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিকভাবে তিনি ঘোষণা দেন, এ জোটে রয়েছে ৩৪টি দেশ। আরও কিছু দেশ আছে যারা পরে যুক্ত হতে পারে।

ওয়াজ-নসিহতও নজরদারিতে! by মাসুদ মজুমদার

মাসুদ মজুমদার
বাউল ও লোকশিল্পী শাহ আবদুল করিমের সাথে এ জাতিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন কিংবদন্তিতুল্য লেখক মরহুম হুমায়ূন আহমেদ। ‘এক দিন কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’; ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’সহ অনেক কালজয়ী লোকগান হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার লেখায় ও নাটকে ব্যবহার করেছেন। সত্যিই এই তল্লাটের মানুষ একসময় সুন্দর দিন কাটাত। ‘গ্রামের হিন্দু-মুসলমান’ মিলেমিশে বসবাস করত। পূজা-পার্বণ যেমন নির্বিঘ্নে হতো, তেমনি কবিগান, জারি, সারি, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির কমতি হতো না। মুর্শিদি ও গজলের আসর বসত নিয়মিত। সোনাভান আর গাজিকালু চম্পাবতির পুঁথি পাঠের সাথে একসময় ‘বিশ্বনবী’ ও ‘বিষাদসিন্ধু’ শোনার জন্য লোকসমাগম হতো প্রচুর। গ্রামগঞ্জে ওয়াজ মাহফিল হতো নিয়মিত। পুরো শীত মওসুমজুড়ে যাত্রাপালা যেমন হতো, তেমনি ওয়াজ মাহফিলের জোয়ার বইত। ওয়াজ মানেই শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম ইসলামের দাওয়াত। জনগণ ইসলাম সম্পর্কে যা জানে ও মানে তা ওয়াজ-নসিহত থেকেই শোনা। নয়তো পীর-আউলিয়ার মাধ্যমে পাওয়া। নতুন ধানের ম-ম গন্ধ আর পিঠা-পায়েসের সাথে শীতকালজুড়ে ওয়াজ-নসিহতের নৈতিক চাষ আবহমান বাংলার অতি চেনা পরিচয়। এখন অন্য সব হয়, ওয়াজ হয় না। অভিযোগ, ওয়াজ মাহফিল করতে দেয়া হয় না। এর মাধ্যমে মৌলবাদ ছড়ায়, জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে- এমন উদ্ভট ও জাতিঘাতী বক্তব্য শুনতে পাই। এ ধরনের অনুযোগ ও অভিযোগ কতটা সত্য, তা সাদা মনে বিশ্বাস করা কঠিন। তবে ওয়াজ-নছিহতের সাথে চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদের সংশ্রব কখনো দেখিনি। এখন অলি আল্লাহর বাংলাদেশ, শহীদ গাজীর বাংলাদেশে মসজিদে খুতবা পাঠ এবং ওয়াজ মাহফিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও তোলা হয়। আগের মতো গ্রামে গ্রামে কুরআনি মক্তব বসে না। মসজিদ ও লাগোয়া মক্তবগুলোসহ গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাদরাসা-মক্তবগুলোর বেহাল দশা। কওমি মাদরাসাগুলো কার্যত ধর্মীয় নেতৃত্বের অভাব ঘুচায়। এখন কওমি মাদরাসাগুলোকে দরবারি ও তথাকথিত কবরপূজারীদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে। মসজিদের ইমামরাও নাকি নজরদারিতে। কারা যেন কথা ছড়ায়- মাদরাসাগুলো জঙ্গি প্রজননকেন্দ্র। বাংলাদেশের সবচেয়ে অসংবদ্ধ কিন্তু সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য প্রভাবকশ্রেণী হচ্ছেন আলেম-ওলামা, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। তাদের ওপরও নাকি কারা নজর দারি করে। ইমাম-খতিব খুতবায় কী বলবেন, কী বলবেন না তাও নাকি মসজিদ কমিটি শিখিয়ে-পড়িয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে বলা হচ্ছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না। অথচ মসজিদ, মক্তব, মাদরাসা কখনো রাজনীতির জন্য ব্যবহৃত হয় না। কখনো হতো না, এখনো হয় না। ঈমান, আমল ও ফজিলত নিয়েই মসজিদ-মাদরাসায় কথা হয়- যা সওয়াব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। হাকিকতের কথা তারা প্রায়ই এড়িয়ে যান।
আলেম-ওলামারা অভিযোগ তুলছেন, এখন যেভাবে তৃণমূল পর্যন্ত ডিইসলামাইজেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, সন্দেহ হয়- একসময় সন্তান জন্মের পর কানে আজান দেয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব তোলা হবে। মুসলমান নাম রাখার ওপর কর আরোপ করা হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারেরা একসময় দাড়ি রাখার ওপর কর বসিয়েছিল। বাংলায় প্রজা আন্দোলনের নেতা তিতুমীর সেই অপকর্ম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ, মুন্সী মেহেরুল্লাহ্, ইসলমাইল হোসেন শিরাজী, মাওলানা ইসলামাবাদী, হজরত শামসুল হক ফরিদপুরী, হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদিসসহ অসংখ্য আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ বাংলার জমিনকে নৈতিক শিক্ষা ও দ্বীনের জন্য আবাদ করেছেন।
স্বাধীনতার পর অতিবাম ও ধর্মবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী কিছু মানুষ মাদরাসা-মক্তব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। মুক্তচিন্তার মানুষ আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, মাওলানা তর্কবাগীশসহ অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে এর ভয়াবহ পরিণাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে দেননি। বরং ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওআইসির সদস্য হয়ে নিজেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের স্থপতির মর্যাদায় উন্নীত করার এক কালজয়ী ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সবার জেনে রাখা ভালো, ওয়াজ মাহফিলে কী বলা হয়, সাধারণত বিবি তালাকের মাসয়ালা থেকে শুরু করে অজু-গোসল, পাঞ্জেগানা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দান, সদকা, বেহেশত-দোজখ, হালাল-হারাম, সওয়াব-গুনাহ, বেহেশতের বর্ণনা, দোজখের আজাবের ভীতিকর মাসয়ালা-মাসায়েল বর্ণনা করা হয়। নবী-রাসূলের জীবন আর সাহাবা চরিত দিয়ে শ্রোতাদের উজ্জীবিত করা হয়। এতে না থাকে সরকার প্রসঙ্গ, না থাকে রাজনীতির সংশ্রব। দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের বর্ণনা দিয়ে বয়ান হয় বেশি। এতে নজরদারি বাড়াবাড়ি কি না, ভেবে দেখা দরকার। কারণ, তারা সরকার পাল্টানোর কথা ভাবেন না। এ ধরনের কোনো কর্মসূচিও তাদের কখনো ছিল না। এখনো নজরে পড়ে না। উত্ত্যক্ত না করলে, উসকানি না দিলে তারা নীরবে জুলুমও সহ্য করেন। বাধ্য হলে প্রতিবাদ জানান। সেটাও নিয়ম ভেঙে নয়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সৃষ্টির সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ধর্মের ব্যাপারে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি আছে; বাড়াবাড়িমূলক কোনো উক্তি নেই। বরং ইসলামের নামে পাকিস্তানি শাসকদের ভণ্ডামিকে তিনিও চিহ্নিত করেছেন। ৭ মার্চের কালোত্তীর্ণ ভাষণটি শেষ হয়েছে ইনশাআল্লাহ দিয়ে। ছয় দফায় কার্যত ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্পর্শ নেই। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণায় ধর্মবিদ্বেষের কোনো ঠাঁই নেই। আজ ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ ঠেকানোর নামে এই দেশের মানুষের চিরায়ত ধর্মবিশ্বাস ও চর্চাকে কটাক্ষ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের মুখোমুখি ও সাংঘর্ষিকভাবে উপস্থাপনের ধৃষ্টতা দেখতে পাই। অথচ আওয়ামী লীগের কাগজপত্রে অনূদিত হলেও বিসমিল্লাহ ও আল্লাহর নাম রয়েছে। রাষ্ট্রধর্মের ধারণা উপড়ে ফেলা হয়নি। তাহলে কারা আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মচর্চায় আদি ও অকৃত্রিম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে উদ্যত? কারা আমাদের জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয় মুছে ফেলতে মরিয়া? আওয়ামী লীগ সরকার ও এর নেতৃত্ব এ দিকটায় অবহেলা করলে জাতির কী ক্ষতি হবে ভবিষ্যৎই বলবে, তবে নগদ ক্ষতির মধ্যে পড়বে আওয়ামী লীগই। কারণ আওয়ামী লীগ ধর্মভীরু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী। ধর্মবিদ্বেষী নয়, ধর্মহীনও নয়।
আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একটি প্রতিবাদী দল। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এই দলের চিন্তক ভাবা হয়। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। টাঙ্গাইলের বনেদি নেতা শামসুল হক প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু দলটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং এটিকে কার্যকর রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল সংগঠনের স্তরে উন্নীত করেন। শেখ হাসিনা এখন দলটির কাণ্ডারি। কথিত আছে, শেখ পরিবার ইসলামের দাওয়াত দিতে এই দেশে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক, প্রথমে মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নেতা। পরে পূর্ববাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হন। এতে তিনি কোনো সাংঘর্ষিকতা পাননি। তা ছাড়া তিনি ছিলেন ধর্মভীরু মানুষ। টুপি-তসবিহ জায়নামাজ তার শোয়ার ঘরেই থাকত। শেখ হাসিনা নিজেও ধার্মিক মানুষ। জানি না আজ ধর্মপন্থী কোনো বিশেষ দল ঠেকানোর নামে এ দেশের মানুষের ধর্মচর্চা, ওয়াজ মাহফিল ও মসজিদ-মক্তব-মাদরাসাগুলোকে কেন এতটা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। মাদরাসাগুলো এ দেশের মানুষের দান, সদকা, জাকাত-ফিতরা ও মুষ্টিচালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মাদরাসাগুলো গণশিক্ষার হার বাড়াচ্ছে। নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছে। অনৈতিকতার সয়লাব ও অনাচার ঠেকাচ্ছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের অভাব ঘুচাচ্ছে। এই দেশে যতবার ধর্মের নামে চরমপন্থা উত্থানের আলামত দেখা দিয়েছে, ততবারই সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, ইমাম-মুয়াজ্জিনরাই রুখে দিয়েছেন। জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হকের চরমপন্থাবিরোধী জুমার খুৎবা কি কারো মনে পড়ে না!
দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবশ্যই উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছে। সাথে রাজনৈতিক টাউট, শিক্ষিত ডাকাত, ঘুষখোর ও অসংখ্য পদলেহী চাকরেরও জন্ম দিচ্ছে। তাই বলে কি আমরা সেগুলো বন্ধ করার কথা ভাবছি? মাদরাসায় পড়ে দু-চারজন চরমপন্থী বিভিন্ন নামে বাড়াবাড়ি করলে তাদের জন্য ব্যবস্থা নেয়া এক কথা; ইসলামি শিক্ষা ও আলেম-ওলামার নির্বিরোধ জীবন ভিন্ন কথা! কাদের কাছে এরা এতটা অসহ্য? কেন? তারা কি আমাদের চিরায়ত ধর্মবিশ্বাস ও জীবনাচার থেকে ইসলামকে নির্বাসনে দিতে চান? এ দেশের মানুষ কোনো বিশেষ ধর্মভিত্তিক দলকে ইসলামের সোল এজেন্সি দেয়নি। তেমনি কোনো দলকে মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চাকে উপড়ে ফেলার ম্যান্ডেটও দেয়নি। সরকারকেই ভেবে দেখতে হবে- কারা, কেন সরকারের আনুকূল্য নিয়ে দেশ ও জাতির শেকড় কাটছে। স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার আবুল মনসুর আহমদ জীবিত থাকলে একাই এই শেকড় কাটা ভুঁইফোড়দের মুখোশ উন্মোচন করে দিতেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের রূপময়তা তুলে ধরতে কার্পণ্য করতেন না। আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে বাঙালি মুসলমানের মন নিয়ে দ্বিতীয় কিস্তি লিখে সবাইকে অবাক করে দিতেন। আর আমরা শুধু অবাক হয়ে দেখছি। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে অজানা ভবিষ্যতের দাসখতের পাতা উল্টাচ্ছি।
masud2151@gmail.com

স্ত্রী হারিয়ে পরের জন্য সেবা ‘ক্যানসার দাদু’র

তিনি ডাক্তার নন। স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকী, রোগীর বাড়ির লোকও নন। তবু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় নিত্য ওই বৃদ্ধের দেখা মেলে। নানান ভূমিকায়।
যেমন কোনও দিন হয়তো আরজিকর বা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রেডিওথেরাপিতে ডাক্তারের ঘরে ঢুকলেন এক হতদরিদ্রের হাত ধরে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা মানুষটি হয়তো মহানগরের হাল-হকিকত বোঝেন না। তাঁকে ডাক্তার দেখিয়ে ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করলেন। কখনও দেখা যায়, বাইপাসের বেসরকারি হাসপাতালের ফার্মাসিতে দাঁড়িয়ে কোনও মুমূর্ষুর জন্য ওষুধ কিনছেন। কখনও আবার জমায়েতে বিলি করছেন লিফলেট। যাতে লেখা, কী কী উপসর্গ দেখলে গোড়াতেই ক্যানসারের আঁচ পাওয়া যায়।
মানে, অনাত্মীয় অসহায়দের জন্য টাকা, সময়, সবই খরচ করছেন অকাতরে, নির্দ্বিধায়। ঘরের খেয়ে বাইরের লোকের পাশে দাঁড়ানো মানুষটি কে?
উনি সুবল বসু। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা, পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নিজের কনসালট্যান্সি ফার্ম রয়েছে। অশীতিপর সুবলবাবু এই মুহূর্তে নিজেও মূত্রথলির ক্যানসারে আক্রান্ত। যদিও এগুলোর কোনওটাই তাঁর পরিচয় বোঝাতে যথেষ্ট নয়। উনি আদতে বহু ক্যানসার-রোগীর কাছে মস্ত ভরসা। তাঁরা ওঁকে চেনেন ‘ক্যানসার দাদু’ নামে। যিনি কি না গত সতেরো বছর ক্যানসারের সঙ্গে ‘ঘর’ করছেন।
কী রকম?
উত্তর পেতে গেলে বেশ কিছু বছর পিছিয়ে যেতে হবে। অকৃতদার সুবলবাবুর কনসালট্যান্সি ফার্মে ১৯৯৮-এ যোগ দিয়েছিলেন সাঁইত্রিশ বছরের সুভদ্রা। ভাল কর্মী। কিন্তু আচমকা ঘন ঘন অফিস কামাই। কারণ জানতে চাইলে মহিলা শুধু বলতেন, শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। শেষে অফিস আসা পুরোপুরি বন্ধ। খোঁজ নিতে সুভদ্রার বাগবাজারের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুবলবাবু। একচিলতে ঘরে মা-বাবা আর মেয়ের সংসার। জানা গেল, বাড়ির একমাত্র রোজগেরে মেয়ের স্তন ক্যানসার ধরা পড়েছে। মা-বাবা বললেন, চোখের সামনে সন্তানের মৃত্যু দেখাটাই তাঁদের ভবিতব্য, কেননা, চিকিৎসার সামর্থ নেই। সুবলবাবু সাহায্যের হাত বাড়াতে চাইলে দৃঢ়চেতা সুভদ্রা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অনাত্মীয় কারও টাকা নিতে পারবেন না।
তার মানে, আত্মীয়তাই একমাত্র শর্ত?
কালক্ষেপ না-করে সরাসরি সুভদ্রাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন তিরিশ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ সুবল। ক’দিনের মধ্যে বিয়ে। আর তার পর দিনই মুম্বইয়ের টাটা ক্যানসার হাসপাতালে রওনা। সুবলবাবুর কথায়, ‘‘ওটাই ছিল আমাদের মধুচন্দ্রিমা!’’
মুম্বইয়ে বড় বড় ডাক্তার দেখিয়ে কলকাতা ফিরে অস্ত্রোপচার। সুভদ্রার স্তন বাদ দেওয়া হল। তত দিনে রোগ ফুসফুসে ছড়িয়েছে। টানা ক’বছর চলল কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি। ২০০৫-এ সুভদ্রা মারা গেলেন। সুবলবাবুর জীবনও অন্য দিকে বাঁক নিল। জমানো টাকা ঢালতে থাকলেন দুঃস্থ ক্যানসার-রোগীদের চিকিৎসায় ও সচেতনতার প্রচারে। যে জন্য ২০০৮-এ গড়ে ওঠে সুভদ্রা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। ‘‘রোগটা গোড়ায় ধরা পড়লে সুভদ্রাকে অকালে চলে যেতে হতো না। উপসর্গগুলো সম্পর্কে আমজনতাকে হুঁশিয়ার করতে নানা জায়গায় নানা অনুষ্ঠান করেছি। লিফলেট, আলোচনা, পদযাত্রা— কিছু বাদ নেই।’’— বলছেন সুবলবাবু। এ-ও জানাচ্ছেন, সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা যথেষ্ট সাহায্য করেছেন।
তবে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যাপারে এ শহরের কয়েক জন ক্যানসার-চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগও ওঁর কাছে মজুত। এমনকী শ্রাদ্ধের কার্ডে তাঁদের নাম দিয়ে সেই অভিযোগের উল্লেখ করতেও ছাড়েননি, যার জেরে বিস্তর সমস্যা পোহাতে হয়েছে। তবু দমেননি। প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘যার মৃত্যু নিশ্চিত, তারও তো চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আগেই তাকে খরচের খাতায় ফেলে দেওয়া হবে কেন ?’’সুভদ্রার ক্ষেত্রে তেমনই হয়েছিল বলে সুবলবাবুর আক্ষেপ। মূলত সেই যন্ত্রণা থেকে ক্যানসার-রোগীদের ‘মানবিক’ চিকিৎসা দিতে একটি হাসপাতাল খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অনুমতি চেয়ে রাজ্য সরকারকে আবেদনপত্র জমা দেন। অনুদানের বিষয়ে খোঁজ-খবর শুরু হয়। প্রথম প্রস্তাব স্বাস্থ্যভবন নাকচ করে দেওয়ায় সুবলবাবু ফের আবেদন করেছেন। স্বাস্থ্য-সূত্রের খবর, এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কর্তাদের কাছে প্রস্তাবটা বিশেষ গ্রহণযোগ্য ঠেকছে না। ‘‘আমরা বুঝতে পারছি না, উনি কী ভাবে এত বড় একটা জিনিস সামলাবেন।’’— পর্যবেক্ষণ এক কর্তার।
সুবলবাবু অবশ্য দমছেন না। তাড়া-তাড়া কাগজ নিয়ে এক বার ছুটছেন স্বাস্থ্যভবনে, এক বার ব্যাঙ্কে, এক বার উকিলের চেম্বারে। ছ’মাস আগে নিজের ইউরিনারি ব্লাডারে ক্যানসার ধরা পড়েছে। অপারেশন হয়েছে, এখন পরবর্তী চিকিৎসার পর্ব। তাতেও লড়াইয়ের অদম্য ইচ্ছেটা মরেনি। যে রোগ স্ত্রীকে কেড়েছে, নিজের শরীরে থাবা বসিয়েছে, তার বিরুদ্ধে শেষ শক্তি দিয়ে লড়তে তিনি মরিয়া। বলছেন, ‘‘নিজেকে একা ভাবলে এটা পারব না। বিশ্বাস করি, মানসিক ভাবে অনেকেই আমার সঙ্গে আছেন। তাই খানিকটা এগোতে পেরেছি। সরকার কিছুটা সাহায্য করলে হয়তো স্বপ্নটা অধরা থাকবে না।’’ ক্যানসার-আক্রান্ত বৃদ্ধের এ হেন উদ্যম দেখে পোড়-খাওয়া ডাক্তারেরাও অবাক। আরজিকরের রেডিওথেরাপি’র প্রধান চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য, ‘‘ওঁর জীবনীশক্তি অতুলনীয়। এমন মানুষ চারপাশে আরও কিছু থাকলে দুনিয়াটা অন্য রকম হতো।’’ সুবলবাবুরও প্রত্যয়ী ঘোষণা, ‘‘চলে যাওয়ার আগে সুভদ্রার স্মৃতিতে হাসপাতালটা গড়ে তুলতেই হবে।’’
যেন আর এক তাজমহলের কাহিনি!
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

বিজয় দিবস নিয়ে বিজেপির স্ট্যাটাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসের দিন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির ফেসবুক পেইজে দেয়া একটি স্ট্যাটাস এবং ছবি তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিজয় দিবস স্মরণে উল্লেখ করে ওই স্ট্যাটাসে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে গৌরবময় বিজয়য়ের জন্য আমরা আমাদের সাহসী যোদ্ধাদের স্যালুট জানাই।
ওই স্ট্যাটাসে অনেক বাংলাদেশিই মন্তব্য করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সাজিয়া আফরিন নামে একজন লিখেছেন, এটা বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ভারতের বিজয় দিবস নয়। তোমরা ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারো না। মুবতাসিম ফুয়াদ লিখেছেন, রক্ত দিয়ে এনেছি এই স্বাধীনতা, কারও দানে নয়। সাগর লিখেছেন, শেম অন ইন্ডিয়া। জাহাঙ্গীর হোসেন লিখেছেন, ১৬ই ডিসেম্বরের পেছনে সব কৃতিত্ব বাংলাদেশের জনগনের। ভারতের নয়। ওয়ালিদ হোসাইন লিখেছেন, তোমরা আমাদের সহযোগিতা করেছো। কিন্তু আমরাই আমাদের বিজয় অর্জন করেছি। হাসান আলী সরকার লিখেছেন, বিজয় আমাদের অর্জন। তোমরা শুধু আমাদের সহযোগিতা করেছো। সৈয়দ ফারহানুল হক লিখেছেন, এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ জানে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর একটাই দেশ স্বাধীন হয়েছে আর সেটা হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর মোকাবেলা চলবেই।
আরিফ মাহমুদ লিখেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলা ভাষায় ট্যুইট করে সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। উনার এই স্মারক স্মরণ করে উনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরাও প্রতিট্যুইট করেছিলাম দুদেশের মাঝে সম্প্রীতি, সোহার্দ্য আর সুসম্পর্ক কামনা করে। সুসম্পর্কের প্রতিদানে উনি আমাদের বিজয়ে দিবসটিকে আজ নিজেদের বলেই উদযাপন করলেন। নয়মাস গর্ভে ধারণ করে সন্তান জন্মদিলো মা। পৃথিবীর নতুন সূর্য দেখার ঠিক আগমনী মুহুর্তে দাই এসে মাকে একটু পরিচর্যা করেই বললো- না, না এই সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানটি তোমার না। আমি পাশে না থাকলে সূর্যকিরণে উদ্ভাসিত এ সন্তানের কোনোভাবেই জন্ম হতোনা। সুতরাং সন্তান আমার। দাই সুদীর্ঘ কাল মাতৃত্বের প্রসব বেদনার যন্ত্রণা বুঝলোনা। একটু হাতের স্পর্শ দিয়েই মা হয়ে গেলো। এতোই সহজ।
এ যেন সেই কাজলরেখা গল্পের চতুর দাসীর মতো। রক্ত দিয়ে কেনা বাংলা জলের দামে লুঠ হয়ে যাবে- এতো সহজ না। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান অস্বীকার করা যেমন ঠিক না, ঠিক তেমনি এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পুরো কৃতিত্ব ভারতের , এই বিজয়টা ওদের-এটা দেখে চুপ করে থাকাটাও মূর্খতা। আপনাদের এই উদযাপনকে তীব্র ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করলাম। যে যেখান থেকে পারুন জোরালো কন্ঠে প্রতিবাদ করুন।রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু দেশপ্রেমে সবাইকে একই সাথে যুথবদ্ধ হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন by এমাজউদ্দীন আহমদ

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের জন্য যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে তাহলে বিচার বিভাগ হলো এর যথার্থতার মাপকাঠি। ব্রিটেনের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ড ব্রাইস (Bryce) বলেছেন, ‘কোনো জাতি রাজনৈতিক অগ্রগতির কোন স্তরে রয়েছে, তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নাগরিকদের পরস্পরের মধ্যে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা কতটুকু ন্যায়ানুগ ও আইনানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তা বিচার করে দেখা। বলা হয়, আইন পরিষদ না থাকলেও রাষ্ট্র চলতে পারে, কেননা আইন পরিষদ ছাড়া আইনের অন্যান্য উৎস রয়েছে। আইন প্রথাভিত্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো সুসংগঠিত সমাজ হতে পারে না। বিচার বিভাগ ছাড়া রাষ্ট্র অনেকটা ‘মাৎস্যন্যায়ের’ মতো, যেখানে বলপ্রয়োগই একমাত্র আইন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিশারদ রউল (Rawle) বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ অপরিহার্য, কেননা তার মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যায়ের শাস্তি বিধান করা হয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। নির্দোষ ব্যক্তিগণকে অন্যের হস্তক্ষেপ ও অন্যায় থেকে রক্ষা করা যায়।’
এসব যুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংগঠিত হয়েছে আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে এবং প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারের শ্রেণিবিভাগে ‘আইনভিত্তিক সরকার’ (The Government of Laws) এবং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকার’ (The Government of Men)-এর মধ্যে যে পার্থক্য অ্যারিস্টটল তার Politics গ্রন্থের তৃতীয় বিভাগে উল্লেখ করেছেন, তা-ও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিচার বিভাগ হচ্ছে সরকারের এক অপরিহার্য অঙ্গ।
কিন্তু বিচার বিভাগকে তার ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে সরকারের জন্য দু’টি বিভাগ- আইন পরিষদ ও নির্বাহী কর্তৃত্ব থেকে শুধু স্বতন্ত্র হলেই চলবে না, স্বাধীনও হতে হবে; যেন তা আইন প্রণেতা এবং নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধু আইনের নিরিখে বিচারকেরা বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আইন হলো অ্যারিস্টটলের কথায় ‘এক আবেগমুক্ত যুক্তি’। এই আবেগহীন যুক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে হলে বিচারকদের শুধু নির্মোহ হলেই চলবে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তারা যেন কারো ওপর নির্ভরশীল না হন, কারো অনুরাগ অথবা বিরাগের পাত্র হিসেবে পিচ্ছিল পথে চলতে বাধ্য না হন তা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে। তাই যুগে যুগে সরকারের তিনটি বিভাগ পৃথক করা এবং তাদের স্বতন্ত্র কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে হাজার হাজার মঞ্চ থেকে।
ফেডারালিস্ট পেপার ৫১ (Federalist 51)-তে জেমস ম্যাডিসেন যা লিখেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য। তার মতে, জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হতে হবে এবং সরকার যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে তারও রক্ষাকবচ থাকতে হবে। মানুষ যে স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, সুযোগ পেলেই যে একজন অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এবং এ কারণেই যে সরকারের উৎপত্তি হয়েছে তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে সরকারও সুযোগ পেলে নাগরিকদের অধিকারে অবলীলাক্রমে হস্তক্ষেপ করবে। তার নিজের কথায়, ‘মানুষ যদি দেবদূত হতো তাহলে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না। যদি দেবদূতরা শাসনকাজে নিয়োজিত থাকতেন, তাহলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ওপর মানুষের শাসন পরিচালনার জন্য গঠিত সরকারব্যবস্থার এই হলো সবচেয়ে বড় অসুবিধা। শাসিতদের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সবার আগে করতে হবে এবং এর পরপরই সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা ফাউন্ডিং ফাদার আলেকজান্ডার হ্যামিলটন জেমস ম্যাডিসন থেকে আরো জোরেশোরে ফেডারালিস্ট পেপার-৭৮-এ (Federalist 78) লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের দুষ্কর্ম অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রভাবশালীদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের মুখে সংবিধান এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারকদের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃষ্ট রক্ষাকবচ।’
শুধু তখন কেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে চলেছেন। ১৯৫৫ সালে American Political Science Review-APSR(49)-এ প্রকাশিত ‘Judicial Self Restraint’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে জন রচে (John P. Roche) লিখেছেন- ‘জনগণকে জনগণের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার অভিভাবকত্ব ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উপযোগী নয়, কেননা এটি দেশে আইনের শাসনের অঙ্গীকারে নিবেদিতপ্রাণ’। তিনি এখানেই থামেননি। তার কথায় ‘রাষ্ট্রদেহে সত্যের রস সঞ্চারের প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা।’
উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে ব্রিটেনের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞ এভি ডাইসি (AV Dicey) তার খধি Law of the Constitution (1885) গ্রন্থে যেভাবে তিনি ব্রিটেনে আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দিলেন তাতে বিচার বিভাগের শ্র্রেষ্ঠত্বকে প্রায় আকাশচুম্বী করে তোলেন। তার মতে, জনগণের অধিকার কোনো সাংবিধানিক আইন থেকে উদ্ভূত নয়; বরং গণ-অধিকারের ভিত্তিতেই সাংবিধানিক আইন রচিত হয়েছে। অন্য কথায়, ডাইসির কথায়, অন্যান্য দেশে জনগণের অধিকারের রক্ষাকবচ যেমন সংবিধানে বিধিবদ্ধ আইন, ব্রিটেনে কিন্তু বিভিন্ন আদালতের রায়ে সুনির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোই সাংবিধানিক আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটেনের সাধারণ আদালতের সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অধিকারের সনদ রচিত হয়েছে। সুতরাং ব্রিটেনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তিতেই নাগরিকদের অধিকারমালা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই এখানে অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো দাবি নেই। দাবি করার আগেই তা প্রতিষ্ঠিত, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধের মতোই। অনেকটা সুসভ্য জীবনব্যবস্থার মৌল উপাদান রূপেই, উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফল হিসেবে।
সংবিধান গণ-অধিকারের মূল নয়, বরং গণ-অধিকারই সংবিধানের মূল এবং তা সাধারণ আদালতেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগের এই দুরবস্থা কেন? স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরও কেন বাংলাদেশের জনগণকে আজো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মিটিং-মিছিল করতে হয়? কেন এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে হয়? এ দেশে বুদ্ধিজীবীরা জানেন, পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সার্থক যেকোনো গণ-আন্দোলনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সব সময় উত্থাপিত হয়েছে। প্রত্যেকের মনে রয়েছে, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দাবিনামার ১৫তম দাবিটি ছিল প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়, এর নবম ও ১১তম দফায় ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি। এরও আগে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সাল ও ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রস্তাব স্থান পায়।
এক রক্তের নদী সাঁতরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা চিনিয়ে আনলে নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সময়ও তিনদলীয় জোটের যে ক’টি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বক্তব্য। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধন আইনেও এই প্রস্তাবটি স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জনপদে যে ক’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্ভুলভাবে এ দাবিটি স্থান পেয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হবে। এর পরও এই এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল না এখনো। এর পরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোনো অবসান হলো না। বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক করা হলো না।
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রচুর হতাশা। বার্লিন-ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের বিচার প্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে বিচার কিনতে হয়। অর্থ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহের প্রকাশ ঘটে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই বক্তব্য অবশ্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নি¤œ পর্যায় সম্পর্কে। এত ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট জ্বালিয়ে রেখেছে গণমনে আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল এক দীপশিখা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট’গুলোতে রয়েছে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৯৯ সালের কান্ট্রি রিপোর্টে লিখিত হয়েছে, ‘বিচার বিভাগের উচ্চতর পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও এবং এই পর্যায় থেকে ফৌজদারি, সিভিল, এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেও নি¤œপর্যায়ের আদালতগুলো এখনো রয়েছে নির্বাহী বিভাগের চাপের মুখে। আইনগত প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ, বিশেষ করে নি¤œপর্যায়ে।’
এ দেশের বড় দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যে শীর্ষ পর্যায় হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে রয়েছে তার বিরুদ্ধেও রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কালো কুণ্ডলি। বিষধর সর্প যেন নতুনভাবে ফণা উদ্যত করেছে বিচার বিভাগের শীর্ষের বিরুদ্ধে। নি¤œস্তর তো এরই মধ্যে দুর্নীতি ও নির্বাহী কর্তৃত্বের করালগ্রাসের মধ্যে এসে গেছে, যা এখনো দেশের বিচার প্রার্থীদের শেষ ভরসাস্থল তাও বুঝি নিঃশেষ হয়। ক’বছর আগে, সাধারণ উত্তেজিত জনতা কর্তৃক নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের বেশ ক’জন মন্ত্রী ও দলীয় নেতার নেতৃত্বে পল্টন ময়দান থেকে লাঠি উঁচিয়ে, মাথায় ও গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে যে মিছিলের আয়োজন হয়, তা কি কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফল? প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরে এসে ওই মিছিলের পক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দেন, তা কি কোনো অশনিসঙ্কেত? এই নিবন্ধে তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
দুই.
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস মোটেই উজ্জ্বল নয়। অনল কুণ্ড থেকে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত পতাকা ছিনিয়ে আনে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে প্রবর্তিত হবে আইনের শাসন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে কারণে-অকারণে সরকার যেভাবে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, বাংলাদেশে তার অবসান ঘটবে। তাই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যা কার্যকর হয়, সেই সংবিধান জনগণের ২২টি মৌলিক অধিকার স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার ক্ষমতা দিয়ে এবং সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা না রেখে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মনে হয়েছিল, জনগণের প্রত্যাশা এত দিন পরে বুঝি পূর্ণ হলো। কিন্তু না, সে অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র ৯ মাস সাত দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদ সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকারপরিপন্থী ক্ষমতা অর্পণ করে। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদকে বিনা বিচারে আটক রাখা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা দেয়া হয় এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে এই সংশোধনী আইন সংযোজিত হওয়ার মাত্র চার মাস ১০ দিনের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণীত হয়, যা এখনো বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কুখ্যাত কালাকানুন রূপে। সংবিধানের (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকদের ছয়টি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ছয়টি মৌলিক অধিকার হলো চলাফেলার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এসব অধিকার। জরুরি অবস্থায় যেকোনো মৌলিক অধিকার বলবৎ করার লক্ষ্যে আদালতে মামলা করার অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতাও দেয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার এক বছর তিন মাস পরে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, এই অজুহাতে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাসন দিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর যেকোনো একটিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে একটি মাত্র ‘জাতীয় দল’ গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং বিধান থাকে যে, জাতীয় দল গঠিত হলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থা অব্যাহত তাকে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। ২৮ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশের ফলে সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে এখতিয়ার কেড়ে নেয়া হয়, তা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং এর পাঁচ মাস পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের কুপ্রভাব সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছিলেন সেই রায়ে তখনকার অন্যতম বিচারপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) বাংলাদেশ সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন আনে, যা তার মৌল কাঠামো পর্যন্ত পাল্টে দেয়। বহুদল-ভিত্তিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার রাতারাতি পাল্টে সৃষ্টি করা হয় একদল-ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংগঠনের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারি দল ছাড়া অন্যান্য সব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জনগণের নির্বাচিত সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের যেসব সদস্য এই সরকারি দলে যোগ দেননি তাদের আসন শূন্য হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করা হয়।’
এই সংশোধনী আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে ক্ষুণ করা হয় তার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান নির্বাহীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বিচারপতিদের অপসারণ নির্ভরশীল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কমানো হয়।’ অধস্তন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটিয়ে, তা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় সরকারের ওপর। এসব পরিবর্তন এত মারাত্মক এবং তাৎক্ষণিক ছিল যে, স্বাধীনতার বন্ধুরা হন বিভক্ত। স্বাধীনতার শত্রুরা প্রতিশোধ নিলেন। সমালোচকেরা উচ্ছ্বাস ভরে বললেন, ‘গণতন্ত্রের এই বিনাশ সাধনের প্রক্রিয়া একই, তা সে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়েই হোক আর সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পদ্ধতিতেই হোক।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার পূর্বতন অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দু-চারটি পদক্ষেপ নেয়া হয় মাত্র। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে রাষ্ট্রপতি সায়েম তার দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশে চতুর্থ সংশোধনী আইনে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তা পুনঃস্থাপিত হয়। তা ছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে যেখানে বলা হয়েছিলÑ ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরীকরণসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ব্যস্ত থাকিবে’, সে ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে গৃহীত সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘ন্যস্ত থাকিবে’ শব্দ দু’টির পরে সংযোজিত হয় ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে কিন্তু ব্যবস্থা ছিল সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় পদে অথবা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তারা নিযুক্ত হবেন। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বিষক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর এতই মারাত্মক ছিল যে, আজো এতগুলো সংশোধনীর পরও বিচার বিভাগ তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে জোরেশোরে বিঘোষিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৫ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হাজার হাজার যোজন দূরে ঠেলে ফেলে বরং নির্বাহী বিভাগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থার আংশিক পরিবর্তন এসেছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতার কাছাকাছি তা আসেনি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফেনী: আধিপত্যের নতুন যুগ by জসিম উদ্দিন

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ সিসিলিতে একধরনের সংগঠিত অপরাধ বিস্তৃতি লাভ করে। পরে সেটি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। এ ধরনের সংগঠিত অপরাধকে চিহ্নিত করতে প্রথম ‘মাফিয়া’ শব্দটি সেখানে ব্যবহার করা হয়। একধরনের মাফিয়া নেতাকে বলে ডন। এই মাফিয়া চক্রের এক দিকে থাকে নেতা, অন্য দিকে থাকে তার অনুসারীরা। মাঝে আর কেউ থাকে না। ডনদের থাকে একচেটিয়া আধিপত্য। অর্থ ও প্রভাব তৈরির করার পথে যারাই তাদের প্রতিবন্ধক, তাদেরই নিষ্ঠুর কায়দায় হত্যা করা হয়। অন্য একধরনের মাফিয়া সম্রাজ্য রয়েছে, যেখানে মাফিয়াপ্রধান ও তার অধীনে বিভিন্ন মান ও মাত্রার কর্মীবাহিনী থাকে। মর্যাদা অনুযায়ী নেতৃত্বে অন্যদেরও শরিক করা হয়। ফেনী নিয়ন্ত্রণের যে দুষ্টচক্র জয়নাল হাজারী কায়েম করেছিলেন সেটা প্রথম ক্যাটাগরির। সিসিলির মাফিয়া সাম্রাজ্যে গড়ে ওঠার পটভূমিতে ছিল ঐশ্বর্যশালী ইতালি এবং বিস্তৃত ভূমধ্যসাগরে মাদক চোরাচালান ও চাঁদাবাজি।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে ফেনীর চেয়ে জয়নাল হাজারীর ‘হাজারী’ নামটি দেশব্যাপী অনেক বেশি প্রচারণা পায়। পুরো জেলায় তার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার সৃষ্ট ক্লাস কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির নামে জেলার মানুষেরা তটস্থ ছিল। উল্লেখ্য, সিসিলি থেকে মাফিয়া নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়ে আমেরিকা, জাপান ও ব্রিটেনে। বিপ্লবী চে গুয়েভারার আজেন্টিনা, চিলি ও ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশে দেশে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে মাফিয়া চক্র। এদের কর্মকাণ্ডকে উপজীব্য করে আমেরিকান লেখক মারিও পুজো ১৯৬৯ সালে লেখেন ‘গডফাদার’। ১৯৭২ সালে পুজোর বই অবলম্বনে হলিউডে নির্মিত হয় একই নামের বিখ্যাত ছবি। ছবিটি তিনটি ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পায়। এরপর ফিল্ম জগতে ‘গডফাদার’ নামের অসংখ্য ছবি নির্মিত হয়েছে। মুম্বাই ফিল্ম জগতও নাড়িয়ে দেয় মাফিয়াচেতনা। মাস্তান, গুণ্ডা শব্দগুলো তখন বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রধান উপজীব্য হতে শুরু করে। দাউদ ইবরাহিম নামের নেতিবাচক হিরোদের চক্র হয়ে ওঠে। এতে সরাসরি বলিউডের কারো কারো সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ডন, মাফিয়া কিংবা গডফাদার- এ শব্দগুলো বাংলাদেশে অনেক তরুণের মধ্যে হিরোইজমের চেতনা উসকে দেয়।
এর একটা ভালো দিক ছিল- জোর খাটিয়ে খারাপ ও অনিষ্টকে পরাজিত করার প্রবণতা। পশ্চিমের চরিত্র রবিনহুড বা বাংলাদেশের দস্যু বনহুরও একই ধারার চেতনাকে জাগ্রত করে। এগুলোতে দেখানো হয়েছে, ভালো কাজকে অন্যায় পন্থায় হলেও মোকাবেলা করার সাহসিকতা শৌর্য বীর্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসবের শেষ পরিণতি এসে ঠেকে মাস্তানি আর গুণ্ডামিতে। বস্তি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, চোরাচালান এ ধরনের অপকর্মের দিকে মোড় নেয় তরুণদের একটি অংশের উত্তেজনা। এই ধরনের নেতিবাচক হিরোইজমের একটা সময়ে হাজারীর উত্থান ঘটতে থাকে ফেনীতে। সিসিলির ওই সব মাফিয়া বুদ্ধি খাটিয়ে সরকারি বাহিনীকে মোকাবেলা করে চোরাচালান ও মাদকের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তারা দাঁড়িয়ে যায় রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। প্রথাগত অস্ত্রের পাশাপাশি কূটবুদ্ধি ধূর্ততা হিংস্রতা তার প্রধান অস্ত্র। অপর দিকে, একটা সময় ফেনীর পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হাজারীর কাছে। তার জন্য এটা অনেকটা সহজ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে তার প্রতি প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রশাসনের কোনো কোনো অংশের সাথে তাদের উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাকি অংশকে ভয় দেখিয়ে বশে রাখা হয়। গডফাদার বলতে বাংলাদেশে যে ‘মাফিয়া’ তৈরি হয় এরা অনেকটাই থাকে ছত্রছায়ায়। প্রশাসনের আনুকূল্য যখন স¤পূর্ণ প্রতাহার করা হয়, মাস্তানি করার কোনো ক্যারিশমা এরা আর দেখাতে পারে না।
এ ধরনের আনুকূল্য তুলে নেয়ার পরপর মধ্যমস্তরের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সামান্য দৃঢ়তার সামনে নতি স্বীকার করে জয়নাল হাজারী সহজ গন্তব্য হিসেবে ভারতে পালিয়ে গেলেন। অবশ্য গণতন্ত্রের একটা দুর্বল দিক তার পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে উন্মোচিত হলো। সবাই যখন একচেটিয়া তার সমালোচনায় মুখর, তখন এই বাংলাদেশী খুদে ‘মাফিয়া’ ও তার ক্লাস কমিটির অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত, ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে পঞ্চাশ হাজারের বেশি ভোট পান হাজারী। গডফাদার তকমা পাওয়ায় হাজারীকে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আর গ্রহণ করেনি। সম্ভবত তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেলা প্রশাসক সোলায়মান চৗধুরীর কাছে এমনভাবে পরাজিত না হলে এখনো দলটি তাকে ফেনীতে গ্রহণ করত। কারণ আবার ফেনী একই জিম্মি অবস্থায় রয়েছে বলে মিডিয়ায় বহু খবর ছাপা হয়েছে। দলটি তাকে একেবারে পরিত্যক্ত করে ফেলেও দেয়নি। ফেনীতে প্রবেশ করতে না পারলেও তিনি পালিয়ে ভারতে থাকেননি। জেলের বাইরে এখন তিনি নির্ঝঞ্ঝাট দিন যাপন করছেন। নিজেদের নেতাকর্মীদের প্রতি দলটির এমন নমনীয় আচরণ লক্ষণীয়।
এরপর ফেনী কেমন চলছে, এটা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান একরামুল হকের নৃশংস হত্যার ঘটনার বেশ কিছু দিন পর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার ‘দি সেইম ওল্ড ফেনী’ শিরোনামে এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে যে পরিস্থিতি তুলে ধরেছে তাতে এটা বোঝা গিয়েছেÑ এই ছোট জেলাটি এখন নতুন সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। ওই প্রতিবেদক লিখেছেন, ফেনীর মানুষ আবারো নব্বইয়ের দশকের অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনলেন। লালপুরে তিনটি গাড়ি থেকে র‌্যাব ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। এটি হিমশৈলীর সামান্য এক নমুনা; স্থানীয়রা জানান, নিজাম হাজারীর নির্দেশ ছাড়া কিছুই ঘটে না।’
ওই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ডেইলি স্টার ফেনীতে একটি জরিপ চালায়। ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিক মিলে ৫০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা। জেলার পরিস্থিতি নিয়ে এদের কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। সবাই একবাক্যে বলেছেন, ২০১০ সালের পর ফেনীতে হাজারী যুগ ফিরে এসেছে। ৫ জানুয়ারি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর এমপি এই জেলাকে ‘নিজের সম্পত্তি’ বানিয়ে নিয়েছেন। ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদক বলেন, ‘নিজাম ফেনীতে সর্বেসর্বা; সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।’ আগের সাথে কোনো পার্থক্য আছে কি না? জবাবে তিনি বলেন- ‘জয়নালের সময় অন্তত কিছু ভিন্নমত গ্রহণযোগ্য হতো; বর্তমানে কারো সাহস এমন নেই যে নিজামকে চ্যালেঞ্জ করে।’ কেন এতটা ভয়- এই প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় এক সাংবাদিক প্রতিবেদককে জানান, ‘ আক্রান্ত হওয়ার সময় একরামুল হকের সাথীরা সশস্ত্র ছিল; কিন্তু তারা তাকে রক্ষা করতে পারেনি। এখন কিভাবে আশা করা যায় মানুষ নিজামের সমালোচনা করবে।’
স্টার প্রতিবেদক যখন জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফেনী সফর করছিলেন বিলবোর্ড, বৈদ্যুতিক খাম্বাসহ দৃশ্যমান এমন কম স্থাপনাই তিনি পেয়েছেন যেখানে নিজামের ছবি ও পোট্রেট সংবলিত ব্যানার-পোস্টার সাঁটানো ছিল না। পৌরসভার কর্মকর্তারা তার কাছে অভিযোগ করেন, সম্মেলনকে সামনে রেখে ছাত্রলীগ, বেশির ভাগ বিলবোর্ড দখল করে নিয়েছে। অনুমোদন নেয়ার কোনো প্রয়োজন তারা মনে করেনি।’ জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রত্যেকটি বিলবোর্ডে নিজাম হাজারিকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছেন। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে পুলিশ রেকর্ড থেকে জানানো হয় যে, বছরের প্রথম ছয় মসে জেলায় ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বেশির ভাগই রাজনৈতিক। জয়নাল হাজারির সময় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ১২০টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। তারা সবাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিক।
জেদ্দা আওয়ামী লীগের সভাপতি, ফেনী-৩-এর সংসদ সদস্য রহিমুল্লাহ সম্ভবত ফেনীর এমন একচেটিয়া আধিপত্যকে মেনে নিতে চান না। ক্ষমতাচর্চার একটা অংশ তিনি নিতে চেয়েও ছিটেকে পড়েছেন। তাকে দেখা গেল সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় কিছু বলতে। তার মতে, টেন্ডারবাণিজ্য ও ছিনতাইয়ের কারণে ফেনীর মানুষ তটস্থ। সবজি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে জুয়েলারি- সবাইকে চাঁদা দিতে হয়। প্রতিদিন এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয় ফেনীতে।
ফেনী কতটা নিয়ন্ত্রিত, একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেল এবার পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে। একই পত্রিকা সম্প্রতি রিপোর্ট করেছে, জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে থেকেও আবুল কায়েস রিপন নগরীর মেয়র পদে প্রার্থী হতে পারেননি। দলের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন, এমন সুযোগও রাখা হয়নি। নগরীর ১৮ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ১৬ জনই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হচ্ছেন। যে দু’জন ‘দুঃসাহস দেখিয়ে’ নমিনেশন পেপার সাবমিট করেছেন তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ফেনীর ওপর দিয়ে পার্বত্য জেলা সফর। সেই সময় ফেনী আওয়ামী লীগ তোরণ নির্মাণের এক বিরল রেকর্ড স্থাপন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বরণ করতে ২৭ কিলোমিটার রাস্তায় ২৩৭টি তোরণ স্থাপন করেছেন তারা। প্রত্যেকটি তোরণের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৯ হাজার টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা চলাচল করলেও ফেনী আওয়ামী লীগ সম্ভবত এর আগে কাউকে বরণ করতে এত বেশি তোরণ স্থাপন করেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আগ্রহের সাথে ফেনী আওয়ামী লীগের এমন উষ্ণ অভিবাদন গ্রহণ করেছেন।
ডেইলি স্টার ফেনী দুই আসনের সংসদ সদস্যের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছে, নিজাম ছিলেন জয়নালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এর আগে তিনি চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র আজম নাসিরের ক্যাডার ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে তিনি নাসিরের পক্ষে আগ্রাবাদ নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯৯৭ সালের পর তিনি জয়নাল হাজারীর গ্রুপে যোগ দেন। একটি মামলায় তিনি পুরোপুরি সাজা না খেটে বেরিয়ে আসেন। আইন অনুযায়ী তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। এমন একটি মামলার বিচারে উচ্চ আদালতের বিচারকেরা বিব্রতবোধ করেছেন।
ফেনীর অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে ডেইলি স্টার চলতি বছরে কয়েকটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদন স্থানীয় প্রতিনিধির বরাতে প্রকাশিত হয়েছে- এমন দেখা যায়নি। নিজস্ব প্রতিবেদক পার্থ প্রতিম আচার্য ও রাশেদুল হাসান দু’জনই ফেনী ঘুরে ঢাকা থেকে ওই সব প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। জয়নাল হাজারির যুগে ইউএনবির প্রতিবেদক টিপু সুলতানের দশা সবার মনে আছে। তাকে হাত-পা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। হাজারী বাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচার টিপুর পেশাগত জীবনে নতুন সুযোগ তৈরি করে দেয়। তার ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছিল। তিনি ঢাকার সাংবাদিকতায় নিজেকে প্রথম সারিতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। ডেইলি স্টার সম্ভবত এমন ঝুঁকি নিতে চায় না। স্বাভাবিকভাবেই, নিজেদের সাংবাদিকদের নিরাপদ রেখেই ফেনীর অপরাধের খবরাখবর দিতে চায়। এসব প্রতিবেদনে এই বিষয় স্পষ্ট যে, ফেনীতে জয়নাল যুগের অবসান হয়েছে। তবে রয়ে গেছে ‘হাজারী যুগ’।
নির্বাচন কমিশনের নারীবৈষম্য
চুড়ি, চকোলেট, পুতুল, ফ্রক, কাঁচি, ভ্যানিটি ব্যাগ, মৌমাছি, আঙ্গুর, গ্যাসের চুলা ও হারমোনিয়াম পৌরসভা নির্বাচনী প্রতীক। তবে পুরুষ নয়, সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য এসব প্রতীক বরাদ্দ করেছে নির্বাচন কমিশন। একটি পত্রিকাকে নারী কাউন্সিলরদের কেউ কেউ এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন নির্বাচনের প্রতীক দেখলে মনে হবে, নারীরা কেবল রান্নাঘরে কাজ করেন আর সন্তান লালন-পালন করেন। কেউ কেউ এসব প্রতীক পরিবর্তনের দাবিতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এমন প্রতিবাদ যথাবিহিত। কিন্তু নির্বাচন যেখানে সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শুন্যের কোটায়। ফেনীর অবস্থা বিবেচনা করলে তো সেটা ভালোভাবে বোঝা যায়। প্রথমে তো সেটা একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা হতে হবে। তারপরেই না লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদের প্রশ্ন আসে। তবে এটা ঠিক যে, এই নির্বাচন কমিশনের চেতনা শতভাগ পুরুষতান্ত্রিক।
jjshim146@yahoo.com

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন

পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন স্থানে আচরণবিধি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। অথচ রিটার্নিং কর্মকর্তারা এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে শৈথিল্য দেখিয়ে চলেছেন। যে দেশে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা হরহামেশা বিধিবিধান লঙ্ঘন করে থাকেন, সে দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এহেন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। বলতে গেলে কোনো নির্বাচনেই কমিশনকে সাহসী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তারা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরনের নীতি নেওয়ায় অর্থ ও ক্ষমতার জোরই নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে। খবর ছাপা হয়েছে যে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি ১৭ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। অথচ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমরা অব্যাহতভাবে প্রতিটি জেলায় নির্বাচনী দপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলাম এবং তা পর্যায়ক্রমে অর্জিত হয়েছে। দেশের সর্বত্র ইসির নিজস্ব প্রশাসন বিস্তৃত রয়েছে।
কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে জনপ্রশাসনের সদস্যদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এখন আবার দেখা যাচ্ছে ইসি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরেজমিন প্রতিবেদন বাদ দিয়ে গণমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ। দেশবাসী দেখতে চায় যে, নির্বাচন কমিশন প্রার্থী বা নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্বিশেষে যাঁরাই নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী যথাবিহিত পদক্ষেপ নেবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটাও জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। নিয়ম রক্ষার চিঠি দিয়েই ইসি দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের স্মরণ রাখা উচিত, তাদের সামর্থ্যহীনতার বিষয়টি দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপকভাবে আলোচিত। সম্প্রতি ডিএফআইডির প্রতিবেদনেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন

পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন স্থানে আচরণবিধি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। অথচ রিটার্নিং কর্মকর্তারা এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে শৈথিল্য দেখিয়ে চলেছেন। যে দেশে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা হরহামেশা বিধিবিধান লঙ্ঘন করে থাকেন, সে দেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এহেন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। বলতে গেলে কোনো নির্বাচনেই কমিশনকে সাহসী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। তারা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরনের নীতি নেওয়ায় অর্থ ও ক্ষমতার জোরই নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে। খবর ছাপা হয়েছে যে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি ১৭ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। অথচ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমরা অব্যাহতভাবে প্রতিটি জেলায় নির্বাচনী দপ্তর প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলাম এবং তা পর্যায়ক্রমে অর্জিত হয়েছে। দেশের সর্বত্র ইসির নিজস্ব প্রশাসন বিস্তৃত রয়েছে। 
কিন্তু তাদের বাদ দিয়ে জনপ্রশাসনের সদস্যদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এখন আবার দেখা যাচ্ছে ইসি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরেজমিন প্রতিবেদন বাদ দিয়ে গণমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ। দেশবাসী দেখতে চায় যে, নির্বাচন কমিশন প্রার্থী বা নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্বিশেষে যাঁরাই নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী যথাবিহিত পদক্ষেপ নেবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য কতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইসি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটাও জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। নিয়ম রক্ষার চিঠি দিয়েই ইসি দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের স্মরণ রাখা উচিত, তাদের সামর্থ্যহীনতার বিষয়টি দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপকভাবে আলোচিত। সম্প্রতি ডিএফআইডির প্রতিবেদনেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসির প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মির্জা ফখরুলের সদিচ্ছা

গত মঙ্গলবার দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে পৌর নির্বাচন তদারকির জন্য গঠিত দলের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ সেলের সভা শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৌরসভা নির্বাচনে মাঝপথ থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে যে মন্তব্য করেছেন এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত মাঠে সক্রিয় থাকার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে নির্বাচন নিয়ে দলের সদিচ্ছাই প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে সরকারি মহল থেকে কেউ কেউ এমন বক্তব্যও দিয়েছিলেন যে বিএনপি শেষ পর্যন্ত পৌর নির্বাচনে থাকবে না এবং যেকোনো অজুহাতে তারা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরকারের ওপর দোষ চাপাবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সর্বশেষ বক্তব্যে যদি তাঁর দল স্থির থাকে, তাহলে দেশবাসী একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পৌর নির্বাচন পাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটাই কি যথেষ্ট? এটি স্থানীয় সরকার সংস্থার একটি নির্বাচন হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ চায় নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে।
নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে যেমন বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব আছে, তেমনি সেই নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি না, সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দল, জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সাংসদেরা জড়িত বলে অভিযোগ এসেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক নয়। দীর্ঘ সাত বছর পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে মুখোমুখি হচ্ছে। এটি দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছে। সবার প্রত্যাশা, এই নির্বাচনে ভোটাররা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এবং পছন্দসই প্রার্থী বেছে নিতে পারবেন। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় পৌর নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হলে সেটি দেশের চলমান রাজনীতিতেই কেবল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথও উন্মুক্ত করবে আশা করি।

যতবেশি বিভেদ থাকে ততবেশি সন্ত্রাসবাদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন দেশে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণেই ব্লগার, প্রকাশক ও বিদেশি হত্যা, শিয়া মসজিদে হামলাসহ সন্ত্রাসী কর্মকা- বেড়ে গেছে। এই রাজনৈতিক বিভাজন কমছে না বরং দিন দিন বাড়ছে। যতক্ষণ  না রাজনৈতিক সমাধান হচ্ছে ততক্ষণ এ ধরনের  সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা জানে যে, এক দল আরেক দলকে দোষারোপ করে। আর এতে করে তারা পার পেয়ে যায়। মানবজমিনকে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশে যতবেশি বিভেদ থাকে ততবেশি সন্ত্রাসবাদের জন্য সুযোগ  তৈরি হয়। যে সব হত্যা বা হামলা হচ্ছে এসবের জন্য সরকার একবার বলছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত। আবার বলছে তারা জড়িত নয়। আসলে কোনটা সঠিক। সরকারকেই এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত থাকলে এক ধরনের চিন্তা। না থাকলে আরেক ধরনের চিন্তা। যদি অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী জড়িত থাকে তাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকার যতক্ষণ প্রমাণ করতে পারছে না অপরাধী কারা? ততক্ষণ দেশের মানুষ ও বিদেশিরা চিন্তায় থাকবে। প্যারিসে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে হামলার  ঘটনা ঘটেছে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণেই ঘটেছে। যতবেশি বিভাজন থাকবে ততবেশি এধরনের সমস্যা হবে। বর্তমান বিরোধী দল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদে যে বিরোধী দল আছে তারা আসল বিরোধী দল নয়। কারণ বিরোধী দলের একটা অংশ আবার সরকারের মধ্যেই রয়েছে। আসল বিরোধী দল রয়েছে সংসদের বাইরে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যতদিন শক্তিশালী না হবে ততদিন এই ধরনের সন্ত্রাসবাদের  সমস্যাগুলো  থামানো কঠিন বলে মনে করেন ইমতিয়াজ আহমেদ।

বাইবেলের পরিবর্তে কুরআন ছুঁয়ে শপথ নেয়ায়...

নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রথমবারের মতো একজন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নারী একটি ফৌজদারি আদালতের বিচারক হিসেবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু তিনি বাইবেলের পরিবর্তে পবিত্র কুরআনে হাত রেখে শপথ নিয়েছেন। এ জন্য তীব্র সমালোচনা শুনতে হচ্ছে তাকে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার শপথ নেয়ার সময় বাইবেলের ওপর হাত রাখতে হয়। ক্যারোলিন ওয়াকার-ডিয়ালো নামের ওই বিচারক তা করেন নি। তিনি তার পরিবর্তে পবিত্র কুরআনে হাত রেখেছিলেন। এ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পরই তীব্র সমালোচনা হচ্ছে তার। কেউ কেউ বলছেন, তিনি এর মাধ্যমে সব মার্কিনির মুখে চপেটাঘাত করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এতে বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে হাত রেখে ক্যারোলিন ওয়াকার বলেন, আমি ক্যারোলিন ওয়াকার-ডিয়ালো, শপথ করছি যে, যুক্তরাষ্ট্রের ও নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সংবিধান মেনে চলব। নিউ ইয়র্ক শহরের ফৌজদারি আদালতের বিচারক হিসেবে বিশ্বস্ততারসে ঙ্গ আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাবো।
ব্রুকলিন বরো হলে ৭ম মিউনিসিপাল ডিস্ট্রিক্টে তিনি এই শপথ নেন। এর ভিডিও কেউ একজন ফেসবুকে পোস্ট করে দেন। তার পর থেকেই তাকে সমালোচনা শুনতে হচ্ছে। সমালোচনকরা বলছেন, তিনি বাইবেলের পরিবতর্তে পবিত্র কুরআনে হাত রেখে শপথ নেয়ার মাধ্যমে সব মার্কিনির মুখে চপেটাঘাত করেছেন। একজন তো সামাজিক মিডিয়ায় লিখেই দিয়েছেন হোপ সি গেটস হিট বাই এ ট্রেন অর সামথিং। অর্থাৎ তাকে যেন ট্রেন বা অন্য কোন কিছু আঘাত করে।

খুলনায় ৭৫ বছরের স্কুল: সেন্ট জোসেফস by কামাল আহমেদ

যত দূর মনে পড়ে, সেবার যশোর শিক্ষা বোর্ডে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে কোনো একটি সংখ্যায়। তখন বরিশালে আলাদা শিক্ষা বোর্ড হয়নি। সুতরাং, যেসব স্কুল যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছিল, তার ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ছিল দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল কঠিন। ফলে পাসের হার ঢাকা, কুমিল্লা ও রাজশাহীর তুলনায় অনেক কম ছিল—সম্ভবত ২১ শতাংশের মতো। যশোর বোর্ডে সেবার প্রথম শ্রেণি পেল মাত্র পাঁচ শর কিছু বেশি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে একটি স্কুলের পরীক্ষার্থীর ৯৫ শতাংশই পেল প্রথম শ্রেণি। সালটা ১৯৭৬। স্কুলটির বয়স তখন ৩৬ বছর। আজ তার ৭৫। খুলনার সেন্ট জোসেফস হাই স্কুলের অনেক অর্জনের মধ্যে ১৯৭৬ মাত্র একটি। এ রকম অনন্য রেকর্ড নিশ্চয় আরও আছে, যেগুলোর খোঁজ আমি আর করিনি। কিন্তু আজ স্কুলটির প্লাটিনাম জুবিলিতে শুধু একটাই প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে যেন এমন আরও অনেক ভালো রেকর্ডের জন্ম দেয় আমার প্রিয় সেন্ট জোসেফস। অবশ্য, যাঁরা ঢাকার সেন্ট যোসেফের কথা জানেন কিন্তু দেশের প্রায় একটি প্রান্তে সুন্দরবনের কোলে অবস্থিত খুলনার সেন্ট জোসেফস স্কুলের কথা জানেন না, তাঁদের জানিয়ে রাখি, ঢাকারও ১৪ বছর আগে ১৯৪০ সালে সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায় ১৯৪৩ সালে।
একাত্তরে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর সদ্য স্বাধীন দেশটির প্রথম কয়েক বছরে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। প্রথম বছর—১৯৭২ সালে হলো অটো পাস, অর্থাৎ পরীক্ষা না দিয়েই সেবার ছাত্রছাত্রীরা পরের ধাপে উঠতে পেরেছিল। ’৭৩-৭৪-এ নকলের ছড়াছড়ি। কিন্তু তারপরই হঠাৎ করে পাবলিক পরীক্ষা বা জাতীয় পরিসরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে কড়াকড়ি। ’৭৬-এ আমরা সেই কড়াকড়ির মধ্যে পড়ে যাই। কিন্তু পুরো শিক্ষা বোর্ডে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ছাড়া আর হাতে গোনা যে কয়েকটি স্কুল লেখাপড়ার মানে উন্নতি ঘটাতে পেরেছিল, তার মধ্যে সেন্ট জোসেফস বা কথ্যভাষায় যোসেফ স্কুল বলা চলে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল। তখন আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত অমিয় গ্যাব্রিয়েল মল্লিক। কিন্তু স্কুলে তাঁর আগের কয়েক বছরে মাঝেমধ্যেই পদচারণ ঘটত স্কুলের আরেক পৃষ্ঠপোষক ও সাবেক প্রধান শিক্ষক ফাদার এজি ব্রুনোর।
বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে আমাকে কম করে হলেও পাঁচবার স্কুল বদলাতে হয়েছে। এগুলোর মধ্যে তখনকার অজপাড়াগাঁয়ের স্কুলও ছিল। প্রায় তিন মাইল মেঠো পথ হেঁটে, কখনো ধানখেতের আইল ধরে স্কুলে যেতাম। তবে, অষ্টম শ্রেণি থেকে আমার জায়গা হয় জোসেফস স্কুলে। আমার স্কুলজীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিও ওই স্কুলকে ঘিরে। আমার ইংরেজির ভিত্তিটা ধরিয়ে দিয়েছেন আজহার স্যার, অঙ্ক ও পদার্থবিজ্ঞান নিত্যলাল গোলদার, বাংলা ব্যাকরণ হাবিব স্যার। কবিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন হিমাংশু স্যার। স্কাউটিংয়ে অনুপ্রাণিত করেছিলেন মরহুম সাখাওয়াত স্যার। খুলনায় যতগুলো স্কুল আছে, তার মধ্যে আমাদের সময়ে একমাত্র বাস্কেটবল খেলার ব্যবস্থা ছিল আমাদের সেন্ট জোসেফসেই। তবে, আমার বন্ধুরা যারা ভালো খেলত, তাদের অনেককে দেখে আমার ঈর্ষাই হতো। কেননা, খেলাধুলাটা আমার ঠিক হয়ে ওঠেনি। সেসব বন্ধুর অনেকেই এখন প্রবাসে। সংস্কৃতিচর্চা কিংবা লেখালেখি যতটুকু করেছি বা করি, তার সবটার জন্যই আমি ঋণী আমার এই স্কুলের কাছে।
যশোর বোর্ডে সেবার প্রথম শ্রেণি পেল মাত্র পাঁচ শর কিছু বেশি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে একটি স্কুলের পরীক্ষার্থীর ৯৫ শতাংশই পেল প্রথম শ্রেণি। সালটা ১৯৭৬। স্কুলটির বয়স তখন ৩৬ বছর। আজ তার ৭৫। খুলনার সেন্ট জোসেফস হাই স্কুলের অনেক অর্জনের মধ্যে ১৯৭৬ মাত্র একটি ইংল্যান্ডে দীর্ঘ দেড় যুগ জীবনযাপনের কারণে সেখানকার স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর শিক্ষকদের একটা সর্বব্যাপী প্রভাব দেখা যায়। ভালোকে ভালো বলতে পারা, নৈতিকতার মূল্য বুঝতে শেখা, মানুষকে তার অর্থ-বিত্ত বা পেশার মানদণ্ডে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখা, এমনকি জীবজন্তুর প্রাণের মূল্য বুঝতে পারা—এসব কিছুর মৌলিক শিক্ষাটা ছাত্রছাত্রীরা সেখানে পরিবারের কাছ থেকে যতটা না পায়, তার চেয়ে অনেক গুণে বেশি পায় শিক্ষকদের কাছ থেকে। মা-বাবার পর সেখানকার বাচ্চারা যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারে, সেই ব্যক্তিটি হন তার শিক্ষক। আমাদের সময়েও আমরা শিক্ষকদের ওপর অনেক আস্থাবান ছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে এখন শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের এই আস্থায় অনেকটাই চিড় ধরেছে। তার কারণ হয়তো অনেক—কিছু আর্থসামাজিক বাস্তবতা আর কিছুটা রাজনৈতিক পরিবেশ। এখন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্কটা অনেকটা ভোক্তা ও বিক্রেতার সম্পর্ক—শিক্ষক নোট দেবেন, তা মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়া যাবে। যত ভালো নোট, তা তত দামি। এর পাশাপাশি আছে শিক্ষক রাজনীতি বা রাজনীতিতে শিক্ষকদের সরাসরি জড়িত হওয়ার প্রভাব।
সৌভাগ্যক্রমে, আমাদের সময়ে এ দুটির কোনোটিই আমাদের নজরে পড়েনি। আমার পরের প্রজন্মের যারা সেন্ট জোসেফসে পড়াশোনা করেছে, তাদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছিল বলে শুনিনি। তবে, যেহেতু কোনো স্কুলই সমাজবিচ্ছিন্ন নয়, সেহেতু এসব সংকীর্ণ দলাদলি ও রাজনীতির প্রভাব থেকে দীর্ঘ সময় মুক্ত থাকতে পারার চ্যালেঞ্জটা জোসেফস স্কুলের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমার বিশ্বাস, এত দিনের ঐতিহ্য নিশ্চয়ই কেউ হারাতে চাইবেন না এবং শতবর্ষপূর্তিতেও তা সগৌরবে সমুন্নত থাকবে।
আমার স্কুলের বার্ষিক প্রকাশনা ‘জ্যোতি’র গোড়ার দিকের একটি সংস্করণের কপি বছর কয়েক আগে ইন্টারনেটে আমার নজরে আসে। সেটি পড়ে চল্লিশের দশকের গোড়ায় খুলনার যে বিবরণ পাই, তার সঙ্গে আজকের খুলনার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভৌগোলিক অনুষঙ্গগুলোর কিছু মিল হয়তো এখনো আছে, যেমন ভৈরব আর রূপসা নদী। কিন্তু জনপদ বদলে গেছে। গত সাড়ে সাত দশকে প্রতিষ্ঠা হয়েছে নানা ধরনের শিল্প এবং তার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সে সময়ে যোগাযোগের ঘনিষ্ঠতা ছিল কলকাতার সঙ্গে। আর এখন ঢাকা এবং তারপর যদি বিদেশের কোথাও ভাবি, সেটা হতে পারে নিউইয়র্ক অথবা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো শহর। আবার এদের অনেকেই জোসেফস স্কুলের ছাত্র। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জোসেফিয়ানরা (প্রাক্তন ছাত্ররা যে নামে পরিচিত) নিজ নিজ পেশায় সমুজ্জ্বল। সেন্ট জোসেফসের প্লাটিনাম জয়ন্তীতে তাঁরা নিশ্চয়ই নিজেদের এই গৌরবের অংশীদার ভাবছেন।
সারা বিশ্বেই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের (অ্যালামনাস) নিয়ে অ্যালামনি সংগঠিত করে থাকে। সেটির কোনো সাংগঠনিক রূপ থাকুক আর না থাকুক। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান অন্বেষণের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ। এ জন্য প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা দিতে উৎসাহিতও করা হয়। নতুন নতুন শিক্ষা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেন্ট জোসেফসও তার অ্যালামনিদের নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে শামিল করতে পারে। ৭৫ বছর পূর্ণ করা জোসেফস স্কুলের এখনো অনেক কাজ বাকি। তার জন্য তাই শুভকামনা।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

বঙ্গভবনে দাওয়াত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করার কোনো প্রয়োজন ছিল কি?

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীককে বঙ্গভবনে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বঙ্গভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে তিনি গেটে উপস্থিত হলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে গেট থেকে। প্রবেশ করতে না দেয়ার কারণ হিসেবে গেট থেকে তাকে জানানো হয়েছে এসএসএফের (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) পক্ষ থেকে তার বঙ্গভবনে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ বিষয়ে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম নয়া দিগন্তকে জানান, আমি ২টা ৪০ মিনিটে বঙ্গভবনের উত্তর গেটে যাই। তখন একজন ক্যাপ্টেন আমাকে জানায়, স্যার আপনার প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করার কথা। আমি তাকে বললাম, না আমাকে উত্তর গেট থেকে ঢোকার জন্যই গাড়ির স্টিকার দেয়া হয়েছে। তখন ক্যাপ্টেন আমাকে বলল, হয়তো আমাদের ভুলের কারণে আপনাকে প্রধান গেটের পরিবর্তে উত্তর গেটের স্টিকার দেয়া হয়েছে। আপনি স্যার দয়া করে প্রধান গেটে যান।
আমি তখন প্রধান গেটে গেলে সেখানে দায়িত্বরত সার্জেন্ট আমাকে জানাল, সরি স্যার। আপনার বঙ্গভবনে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আপনাকে স্যার দয়া করে ফেরত যেতে হবে। আমার কাছে এসএসএফের একটি স্লিপ আছে। বঙ্গভবনে প্রবেশের বিষয়ে যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেই তালিকায় আপনার নাম রয়েছে।
সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ১৯৮০ সাল থেকে আমাকে বঙ্গভবনে বছরে চারটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া হয়। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং দুই ঈদের দিন। শারীরিক অসুস্থতা ছাড়া আমি কখনো কোনো অনুষ্ঠানে আজ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকিনি। ৯৫ ভাগ দাওয়াত আমি কবুল করেছি। আর প্রতিবার আমাকে প্রধান গেট দিয়েই প্রবেশেরই স্টিকার দেয়া হয়। তবে এবার উত্তর গেটের স্টিকার দেয়া হয়েছে।
সৈয়দ ইব্রাহীম বলেন, আমার তিনটি প্রধান পরিচয় আছে। আমি একজন বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধা। আমি একজন সাবেক মেজর জেনারেল এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্মলগ্ন থেকে এর সাথে আমি যুক্ত ছিলাম। আমার আরেকটি পরিচয় হল আমি একটি রাজনৈতিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। আমাকে বঙ্গভবনে প্রবেশ করতে না দিয়ে আমার কোন পরিচয় বা বৈশিষ্ট্যকে অপমান করা হল তার বিচারের ভার দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিলাম।
সৈয়দ ইব্রাহীম দুঃখের সাথে বলেন, কাউকে দাওয়াত দেয়া বা না দেয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে কর্তৃপক্ষের। আমাকে দাওয়াত না দিলে আমি কিছুই মনে করতাম না। আমি ধরে নিতাম হয়তো রাজনীতিবিদ সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীমের বিষয়ে এসএসএফের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার সমস্যা রয়েছে। কিন্তু দাওয়াত দেয়ার পর অপমান কেন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম তার ফেসবুকে বঙ্গভবনের দাওয়াতপত্র, স্টিকারের ছবি দিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি এ ঘটনা বিষয়ে লিখেছেন, একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় একটি চলমান অথবা সাময়িক বিষয় হতে পারে। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধার অবদান অপরির্তনীয়, অনস্বীকার্য এবং অনাপসযোগ্য। ১৯৭১ সালের বীরেরা আজো বীরই। কেউ যদি তাকে বীর হিসেবে সম্মান জানাতে না পারে তাতে কোনো সমস্যা নেই। তার হয়তো কোনো সমস্যা থাকতে পারে। এটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু বিজয় দিবসে একজন বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করার কোনো প্রয়োজন ছিল কি?

দাড়ি রাখার অনুমতি পেলেন মার্কিন সেনা

মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন শিখ ক্যাপ্টেন দায়িত্বরত অবস্থায় দাড়ি রাখা ও পাগড়ি পরার অনুমতি পেলেন। যদিও এ অনুমতি সাময়িক সময়ের জন্য, তবুও এমন ঘটনা বেশ বিরল। সোমবার ক্যাপ্টেন সিম্রাটপাল সিং নামে ওই শিখ সেনা কর্মকর্তার প্রতিনিধি এ তথ্য জানিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন সেনাদের ‘ক্লিন-কাট’ হওয়ার শর্তে শিথিলতা আনার দুই বছর পর সিম্রাটপাল এ অনুমতি পেলেন। ধর্মপ্রাণ শিখ ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের চুল কাটে না, শেভও করে না। এ ছাড়া দীর্ঘ চুল মুড়ে রাখার জন্য প্রায়ই পাগড়ি পরে। ১৯৮০’র পর ধর্মীয় কারণে এ ধরনের সুবিধা প্রদানের ঘটনা মার্কিন সেনাবাহিনীতে এ নিয়ে মাত্র চারটি। দ্য শিখ কোয়ালিশন নামে একটি সংগঠনের দাবি, ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমিতে প্রবেশের পর সিম্রাটপাল সিং-এর চুল জোর করে কেটে দেয়া হয়। তাকে শেভ করতেও বাধ্য করা হয়। প্রায় এক দশক ধরে নিজের দাড়ি ও চুল রাখা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছিলেন তিনি। অবশেষে এক মাসের জন্য তার আবেদন মঞ্জুর হলো। তার আইনজীবী সবসময়ের জন্য এ সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। সিম্রাটপাল বলেন, আমার শিখ পরিচয় ও দেশের প্রতি সেবা নিয়ে অনেক গর্ব আছে। সামরিক ক্যারিয়ার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতাও চালিয়ে যাওয়াটা ছিল আমার জন্য স্বপ্নের মতো।
এক বিবৃতিতে তার আইনজীবী আমান্দিপ সিধু বলেন, দেয়ালের লেখাটা পরিষ্কার। ক্যাপ্টেন সিম্রাটপাল সিং-কে দেয়া সুবিধা স্থায়ী করা উচিত। এ সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের সময় এখনই। গত মাসে অবসরপ্রাপ্ত ২৭ জন মার্কিন জেনারেল দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টারের প্রতি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। কার্টার বেশ কয়েকবার মার্কিন সমাজের সব দিক থেকে সেনাসদস্য নিয়োগের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এ মাসে কমব্যাট ইউনিটে নারীদের যোগদানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন তিনি। তবে বৃটেন, কানাডা ও ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের সেনাবাহিনীতে শিখ ধর্মাবলম্বীদের দাড়ি ও চুল রাখার অনুমতি দেয়া হয়।

স্বীকৃতির অপেক্ষায় হুমায়রা আমিন by মিজানুর রহমান খান

নুরুল আমিন খান
আমার তিন অবিবাহিত বোন, দুই ছোট শিশুসহ আমার মা ও জ্যেষ্ঠ বোন ছাড়া আমরা স্বামী-স্ত্রী অপহৃত হলাম। এর নেতৃত্ব দেন মেজর গোলাম আহমেদ। কিছু কাপড়চোপড় নেওয়ার কথা বললে এই মেজরটি বলেছিলেন, “তোমরা কি ভেবেছ বিয়ের পার্টিতে যাচ্ছো?’”
এভাবেই একাত্তরের ২৩ এপ্রিলের বিভীষিকা স্মরণ করেন মিসেস হুমায়রা আমিন। তাঁর বাবা বিচারপতি আবদুস সোবহান চৌধুরী। বিচারপতি চৌধুরীর ধানমন্ডির ১৯ নম্বর রোডের ৮৪৯ নম্বর বাড়িতেই অবস্থান করছিল নুরুল আমিন খানের পরিবার। সে যাত্রায় মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল কলেজের ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে লাঞ্ছনা-গঞ্জনায় ১৫ দিন আটকে রেখে নুরুল আমিন খানকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে আসতে দেওয়া হয়। হুমায়রা বাসায় ফিরে দেখেন তাঁর রেখে যাওয়া গয়না, টাকা, আসবাব এমনকি ঘরের ফ্যান পর্যন্ত লুট হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তাঁদের নতুন গাড়িটিও। তাঁদের লাইসেন্স করা পিস্তল ও বন্দুক জব্দ করা হয়েছিল আগেই।
উল্লেখ্য, ওই তিন বোনসহ বাদবাকিদের আটকে রাখা হয়েছিল পরের ৪ মাস ১০ দিন।
অবশেষে সেই দিনটি এল, ২০ মে ১৯৭১। নুরুল আমিন খান সকাল আটটায় অফিসে গেলেন কিন্তু আর ফিরলেন না। পিস্তল ফেরত নেওয়ার কথা বলে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল সেনানিবাসে। ২৩ মে তাঁকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। সেনানিবাসের একটি সেলের দেয়ালে তাঁর শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আরও অনেক বিশিষ্ট নামের সঙ্গে তাঁর নামটিও উৎকীর্ণ ছিল। ওই সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কৃষি বিভাগে একজন উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নুরুল আমিন খান সিএসপি অফিসার ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি বরিশালের ডিসি থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান শাসকগোষ্ঠীর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সামরিক শাসনে তাঁর সমর্থন নেই। এক পিকনিক পার্টিতে তাঁর মত প্রকাশ পেয়েছিল। বরিশালে অশ্বিনীকুমার হলের নাম পাল্টে আইয়ুবের নামে করার উদ্যোগকে তিনি সুনজরে দেখেননি। সত্তরের নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছিল এই বিবেচনায় যে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে তিনি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি আনুকূল্য দেখাতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর পক্ষপাতও লুকোছাপা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মুচলেকা দিয়ে মুক্তি প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে আরও কয়েক মাস কারাবাসে থাকতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে পাঠ শেষে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালে সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লাহোরে প্রশিক্ষণ শেষে সাতক্ষীরায় এসডিও নিযুক্ত হন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার শিকারপুর গ্রামে তার পৈতৃক নিবাস হলেও ১৯৩৫ সালে তিনি ভারতের আসামের তিনসুকিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ছেলে সাহেজ আমিন খান আমাকে লিখেছেন, ‘আমি আমার শহীদ পিতার যথাযোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছি।’ নুরুল আমিন খানের ভাই সাবেক রাষ্ট্রদূত সাইফুল আমিন খান ২৩ নভেম্বর লন্ডন থেকে আমাকে লিখেছেন, ‘আমরা জানি না, আমাদের ভাবি, নুরুল আমিন খানের বিধবা পত্নী আর কত দিন বেঁচে থাকবেন?’ ১৬ ডিসেম্বরের পরে এক বুক আশা নিয়ে সাইফুল আমিন খানরা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছুটে গিয়েছিলেন। হুমায়রা স্বাধীনতার পর অনেকগুলো বছর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছেন। তাঁর লেখার পৌনঃপুনিক চিঠির উত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান লিখেছিলেন, একাত্তরের অক্টোবরে আপনি যে আপনার স্বামীর খোঁজ জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর বিষয়ে সেনা কর্তৃপক্ষের কিছু জানা নেই।
নুরুল আমিন খান তাঁর শিশুসন্তান ও পরিবারের আরও অনেক সদস্যকে ফেলে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেননি। কিন্তু স্ত্রীর ভাইয়ের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র শাস্তি পেয়েছিলেন তিনি। স্ত্রীর ভাই ছিলেন মেজর জেনারেল হারুন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় তিনি ক্যাপ্টেন ছিলেন।
শুধু বিয়ামের নিচতলায় তাঁর নামে একটি হল ও বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিটে নুরুল আমিন খানের স্মৃতি ধরে রাখা আছে। শহীদপত্নী হুমায়রা ও তাঁর ছেলেমেয়েরা একটি উপযুক্ত ‘স্বীকৃতি’ আশা করেন এবং সেটা তাঁদের প্রাপ্য। নুরুল আমিন খান জুনিয়র লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি এখন ক্ষমতাসীন, এখন আমার মেয়ের প্রশ্ন আমাকে কেবলই ক্ষতবিক্ষত ও বিদ্রোহী করে তোলে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজে ডেকে হুমায়রাকে সমাজকল্যাণ দপ্তরের একটি প্রকল্পে চাকরি দেন। কিন্তু পরে সেখানে বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়লে তিনি চাকরিটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। শুনেছি, ইস্কাটন ও মোহাম্মদপুরে অন্তত দুবার সরকারিভাবে তাঁর নামে বাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু দুবারই তিনি উঠতে গিয়ে দেখেন সেখানে আগে থেকেই অন্য শহীদ পরিবার বসবাস করছে!
বুদ্ধিজীবী নুরুল আমিন খানের মতো চিরতরে হারিয়ে যাওয়া শহীদদের জন্য কি আমাদের আর কিছুই করণীয় নেই? পরিবারগুলো হয়তো আর অপেক্ষায় নেই। কিন্তু তাঁরা কে কীভাবে মারা গেছেন, তার একটা অনুসন্ধান চলমান রাখতে কি রাষ্ট্রের দায় নেই? আরও অনেক শহীদের মতো নুরুল আমিন খানকে ঠিক কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সরকারি নথি নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভাষ্য নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ শুনেছেন যে তাঁকে নির্যাতন করে পরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। হুমায়রা বিউটি সিনেমা হলের মালিকের কাছে একটি বিবরণ শুনেছিলেন, সেটাই সত্য বলে মানছেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নেই।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর। ১ হাজার ৬০০ নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজতে আমেরিকার প্রশাসন আজও ফাইল ও খোঁজাখুঁজি চলমান রেখেছে। ১৯৬৮ সালের ২১ জানুয়ারি ভিয়েতনামে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছিল। নিখোঁজ হয়েছিলেন মার্কিন সার্জেন্ট বিল ডি হিল। তাঁর ভগ্ন দেহাবশেষ আমেরিকায় আনা হয়েছে। আজ ১৭ ডিসেম্বর টেক্সাসে তাঁকে সমাহিত করা হবে। একাত্তরের এমনতর শহীদরা সংখ্যায় কত? তাঁদের কি একটি তালিকা হতে পারে না। হুমায়রা স্বামীর জন্য আর অপেক্ষায় থাকেন না; স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছেন।
সত্যিই কি তাঁর কোনো দিন অপেক্ষা শেষ হবে?
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

আমেরিকায় ভয়াবহ সাইবার সন্ত্রাসের ছক সিরীয় ইলেকট্রনিক আর্মির

সাইবার সন্ত্রাসের ভয়ে থরথর করে কাঁপছে আমেরিকা! থরকম্প গোটা বিশ্বের! আর কয়েকটা দিন। ২০১৬ শুরু হলেই আমেরিকাকে তছনছ করে দেওয়ার ছক কষেছে সাইবার জঙ্গিরা। যাতে রীতিমতো টলে যেতে পারে মার্কিন আসন। সামনের বছরেই মার্কিন মুলুকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাই ২০১৬-ই সাইবার জঙ্গিদের ‘প্রাইম টার্গেট’। বড় বড় বহুজাতিক ব্যাঙ্ক ও বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাল ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’ করে দিতে চায় সাইবার জঙ্গিরা। তার জন্য এখনও পর্যন্ত যত হাতিয়ার রয়েছে, তার সব ক’টির ব্যবহার করতে তারা তৈরি। নিরাপত্তার জন্য আমজনতা, বড় বড় শিল্পপতি, বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাতে তথ্যপ্রযুক্তির গবেষণা যে নিত্য-নতুন অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, সেগুলিকে ভোঁতা করে দেওয়ার ‘পাল্টা প্রযুক্তি-বুদ্ধি’তে সাইবার জঙ্গিরা ইতিমধ্যেই শান দিয়ে নিয়েছে। সাইবার ক্রাইমের সেই সব অভিনব পন্থাকে হাতিয়ার করে সামনের বছরে গোটা বিশ্বেই ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে সাইবার জঙ্গিরা। বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প ও গবেষণার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘গার্টনার ইন্টারন্যাশনাল’ ও পুরোধা মার্কিন অস্ত্র নির্মাণ সংস্থা ‘রেথিওন ইন্টারন্যাশনাল’-এর সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে সবিস্তারে ওই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। ‘টু থাউজ্যান্ড সিক্সটিন- সিকিওরিটি প্রেডিকশান’ শীর্ষক ‘রেথিওনে’র ওই ‘কনফিডেন্সিয়াল’ রিপোর্টে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ‘‘সাইবার জঙ্গিদের জন্য ২০১৬ সালটি আমেরিকা ও গোটা বিশ্বের পক্ষেই অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে চলেছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকার, স্প্যামাররা এবার গোটা বিশ্বে বড় ধরনের সাইবার সন্ত্রাস চালাবে।’’ সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমেরিকা ও ইউরোপের ‘প্রধান শত্রু’ ছিল মুসলিম মৌলবাদ। যার প্রেক্ষিতে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির ‘টার্গেট’ হয়ে উঠেছে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলি। কিন্তু সন্ত্রাসবাদী ও নাশকতামুলক কার্যকলাপ চালানো, তার জন্য প্রস্তুতি-প্রশিক্ষণ, অস্ত্র কেনা এবং নিয়োগের জন্য যে প্রচুর পরিমাণে অর্থ প্রয়োজন, সেই চাহিদা মেটানোটাও অন্যতম প্রধান লক্ষ্য তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী হ্যাকার, স্প্যামারদের। সরাসরি না হলেও, গোটা বিশ্বে হানাদারির জন্য যারা আগামী বছরটিকে বেছে নিয়েছে, সেই হ্যাকার, স্প্যামারদের পরোক্ষে ব্যবহার করছে আল-কায়েদা ও আইএসের মতো সংগঠনগুলি।’’ ওই সাইবার জঙ্গিদের মূল সংগঠনটির নাম কী জানেন? সিরিয়ান ইলেকট্রনিক আর্মি (এসইএ) বা ‘সি’। যাদের সদর দফতরও সেই রাকায়, যেখানে আইএসের অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে বলে সদ্যই রুশ উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে। কোন কোন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে ওই রিপোর্টে? এক, রিপোর্টে ‘দ্য ইউএস ইলেকশানস সাইক্ল উইল ড্রাইভ সিগনিফিকেন্ট থিম্ড অ্যাটাকস’ শীর্ষক অধ্যায়ে বলছে, আগামী বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া যে ভাবে অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করতে চলেছে, এর আগে ততটা ব্যাপক ভাবে তার ব্যবহার হয়নি মার্কিন মুলুকে। ভোটপ্রার্থীরা তাদের ব্যাক্তিগত প্রোফাইল, তার আপডেশন, তাদের প্রচারের কর্মসূচি, নির্ঘণ্ট, ইস্যুভিত্তিক বিতর্কের জন্য আলাদা আলাদা ওয়েবসাইট খুলতে শুরু করেছেন। এ ছাড়াও তারা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো হাতিয়ারকেও। ২০১৪-র সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ৭৪ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক রয়েছেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলিতে। কিন্তু ‘পিউ রিসার্চ সেন্টারে’র একেবারে হালের সমীক্ষা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সংখ্যাটা বেড়ে এ বার প্রায় ৯২ শতাংশ হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ সাবালক মার্কিন নাগরিক সোশ্যাল সাইটগুলিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংক্রান্ত খবরখবরই বেশি আগ্রহ নিয়ে পড়েন। সংবাদপত্র, টেলিভিশনের ওপর তাদের ভরসা অনেক কমে গিয়েছে। প্রার্থীরাও তাদের প্রচারে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটা হ্যাকার, স্প্যামারদের কাজটা সহজতর করে দেবে। তারা কিছু লোভনীয় কথা বলে বা টোপ দিয়ে, কোনও দল বা প্রার্থীর হয়ে প্রচারের ভনিতা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা মানুষকে ফাঁদে ফেলবে, প্রতারিত করবে। ম্যালওয়্যার, স্প্যাম তাদের ই-মেল অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে দেবে। দুই, টপসি ডট কম, গুগ্ল, বিং ডট কমে হানাদারি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে। আপনার ফেসবুক, টুইটারের ‘ফ্রেন্ডস’ অপশন দিয়েই আরও বেশি ঢুকবে। চালানো হবে ‘হাইলি ট্রানজিয়েন্ট ওয়েব-থ্রেটস’(এইচটিডব্লিউটি) ও ‘Captcha’-এর মতো ভয়াবহ হানাদারি। তিন, ওই রিপোর্টের ‘দ্য অ্যাডিশন অফ দ্য জিটিএলডি সিস্টেম উইল প্রোভাইড নিউ অপারচুনিটিস ফর অ্যাটাকার্স’ শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘Cutwell’, ‘Rustock’, ‘Mega-D’-র মতো বিশ্বের দশটি হেভিওয়েট ‘Botnet’ চক্রী প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এখনও পর্যন্ত ‘Botnet’ চক্রীরা বিশ্বের দশ কোটি কম্পিউটারে ফুলঝুরির মতো স্প্যাম পাঠিয়ে চলেছে। যা বিশ্বে মোট এক সক্ষ সাতশো কোটি স্প্যাম মেসেজের ৮৮ শতাংশ। আগামী বছরে তা কম করে পনেরো গুণ বাড়বে। যেহেতু বহুজাতিক বাণিজ্যিক ও বিপণন সংস্থাগুলি উত্তরোত্তর অনলাইন সার্ভিস ও ওয়েব বেস্ড প্রোগ্রামগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তাই গোটা বিশ্বেই এখন ‘Cloud Computing’-এর রমরমা। সাইবার জঙ্গিরা এ বার ওই ‘Cloud Computing’ ব্যবস্থাকে তাদের অন্যতম প্রধান ‘টার্গেট’ করেছে। চার, সাইবার ব্যাঙ্কিংয়ের ‘অথেনটিকেশনে’ আমাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাপিশ করে দিতে ‘ট্র্যাডিশনাল কাস্টমার অথেনটিকেশন মেথড’-এর ওপরেও হানাদারি চালাবে সাইবার ক্রিমিনালরা। ভয়াবহ ভাবে বেড়ে যাবে ‘ম্যান ইন দ্য-ব্রাউজার ট্রোজান অ্যাটাক’ (MITB)-এর ঘটনাও। পাঁচ, ই-মেলে বা অ্যাটাচমেন্টে লোভনীয় ‘অফারে’র ছদ্মবেশে হানা দেবে ‘ট্রোজান’ সাইবার জঙ্গিরা। তাতে থাকবে নজরকাড়া বিষয়বস্তু, ছবি ও আমন্ত্রণ পত্র। পাঠানো হবে ভুয়ো ওয়েব লিঙ্ক। যাতে আপনি তার ফাঁদে পা দিয়ে জানিয়ে দেন আপনার যাবতীয় গোপন তথ্যাদি। ছয়, সার্চ ইঞ্জিনে আসল ওয়েবসাইটগুলোকে ঢাকা-চাপা রেখে ভুয়ো সাইট বা লিঙ্কগুলোকে চালিয়ে দেবে সাইবার জঙ্গিরা। এই পদ্ধতিটির নাম-‘BlackHat SEO’। সাত, নামীদামি মিডিয়ায় নামীদামি সংস্থার নামে দেওয়া ভুয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ওই সব সংস্থার বহু পরিচিত ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে ‘ভাইরাস’। এ ব্যাপারে কার্যত বাতিল হয়ে যাওয়া পুরনো তথ্যপ্রযুক্তিকেই কাজে লাগাবে হ্যাকার, স্প্যামাররা। আট, ফেসবুক-টুইটারে ফোটো শেয়ারিংয়ের জন্য যে সব ছোট ছোট ‘ইউআরএল’ আমার-আপনার খুবই পছন্দের, সহজেই সে গুলি দিয়ে তাদের কাজ হাসিল হয়ে যায় বলে ওই ছোট ছোট ‘ইউআরএল’গুলোকেই টার্গেট করেছে সাইবার জঙ্গিরা। পাঠানো হবে ম্যালওয়্যারে ভরা ভুয়া লক্ষ লক্ষ ওয়েবসাইটও। নয়, ডাকসাইটে বহুজাতিক ব্যাঙ্ক, বাণিজ্যিক ও বিপণন সংস্থাগুলির তথ্য চুরি করার (ডেটা থেফ্ট) জন্য সাইবার জঙ্গিরা এ বার ‘SQL Injection’ হানাদারি চালাবে আমেরিকা সহ গোটা বিশ্বে। তার সঙ্গে চালানো হবে ‘ফিশিং’, ‘ভিশিং’ ও ‘স্মিশিং’-এর মতো সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর হানাদারিও। দশ, সাইবার জঙ্গিদের ‘ফরেন ল্যাঙ্গোয়েজেস স্প্যাম’ বা আমার-আপনার সই-সাবুদ নকল করার জন্য ‘আইডেন্টিটি থেফ্ট’-এর হানাদারির ঝাপটাও এ বার সইতে হবে আমাদের।– সংবাদমাধ্যম