Showing posts with label সুবীর ভৌমিক. Show all posts
Showing posts with label সুবীর ভৌমিক. Show all posts

Friday, September 20, 2019

ওবিওআর ভারতের জন্য একটি ‘লাভজনক প্রস্তাবনা’, ভারতীয় চীন-বিশেষজ্ঞের অভিমত by সুবীর ভৌমিক

ভারতের মিডিয়া ব্যারন এবং চীন-বিশেষজ্ঞ রাঘব বাহলের নতুন চমৎকার একটি বই ‘সুপার সেঞ্চুরি’তে সুপারিশ করা হয়েছে যাতে তার দেশ চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) পদক্ষেপের সাথে যুক্ত হয়।

‘সুপার সেঞ্চুরি’ ভারতের বিভিন্ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দীর্ঘ প্রেসক্রিপশানের একটি তালিকাই শুধু নয়, বরং সমসাময়িক এশিয়া ও বিশ্বে ভারতের অবস্থানকে সংহত করার একটা রোডম্যাপও বটে।

বাহল বলেন, “বেইজিংয়ের ওবিওআর ইনিশিয়েটিভের ডিজাইন করা হয়েছে ইউরেশিয়ায় চীনের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বাড়ানোর কথা মাথায় রেখে। এটা ভারতের জন্যও একটা অর্জন হতে পারে। অথচ দিল্লী চীনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে অনেক বেশি সন্দিহান ও উদ্বিগ্ন হয়ে আছে”।

তিনি স্বীকার করেন যে, ওবিওআরের অন্যতম প্রধান রুট চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় কারণ এটা পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেছে, যেটাকে ভারত নিজেদের দাবি করে।

কিন্তু বাহল যুক্তি দেন যে, এশিয়া ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) নীতিমালায় এ বিষয়টির সমাধান রয়েছে। এতে ওবিওআরের কোন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে, বিবাদমান এলাকাগুলোতে কোন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সেখানকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ওই প্রকল্পের ব্যাপারে অনুমোদন দিতে হবে।

বাহল বলেন, “তাছাড়া, বেইজিং নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভারতের অংশগ্রহণের বদলে তারা কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে, যেটা এই পদক্ষেপকে অনেকখানি চাঙ্গা করবে”। তিনি বলেন, ভারতের উচিত চীনকে ‘বন্ধুপ্রতীম শত্রু’ বিবেচনা করা: “যখনই সম্ভব তাদের আলীঙ্গন করা উচিত, প্রয়োজনে এড়িয়ে চলা উচিত এবং একান্ত বাধ্য হলেই কেবল পাল্টা আঘাত করা উচিত”।

বাহল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট করার অর্থ এই নয় যে, আমাদেরকে চীন থেকে দূরে থাকতে হবে। ঠিক তার উল্টা, বহুপাক্ষিকতার উদ্দেশ্যই হলো একপক্ষের সাথে গাঁটছাড়া না বেঁধে বিভিন্ন পক্ষের সাথে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে লেনদেন করা”। তিনি আরও বলেন, “তাছাড়া আমরা চাইলেও চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারবো না”।

বাহল তার আগের বইয়ে চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধির মধ্যে পারস্পরিক তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেন যে, এশিয়ার বৃহৎ এই দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কটা আরও ‘গভীর ও পরিপক্ক’ হয়েছে।

বাহল বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষ পর্যায়ে কূটনীতিক বিনিময় প্রায় নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই নেতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক রয়েছে। চীনের নেতা ভারতের নেতার প্রতি প্রশংসাসূচক আচরণ দেখিয়েছেন, কারণ পররাষ্ট্র নীতির ব্যাপারে মোদির নীতি কিছুটা আগ্রাসী হলেও সেটা স্বচ্ছ”।

তিনি যুক্তি দেখান যে, চীন ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের বেষ্টনি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায় কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক জোটের ব্যাপারে তারা উদ্বিগ্ন, তা সেটা যদি ন্যাটোর মতো না-ও হয়। তাছাড়া চীনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন অন্যান্য আসিয়ান দেশগুলোরও এই জোটে যোগ দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বাজার বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশের জন্য গভীরভাবে আগ্রহী চীন।

বাহল বলেন, বেশ কতগুলো ইস্যুতে ভারত আর চীন একই জায়গায় রয়েছে।

বাহল বলেন, “পশ্চিমা শক্তির কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে সাম্প্রতিককালে উদিত অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চীনের উভয়েরই ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে একটা অভিন্ন হতাশা রয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একটা রূপ দিয়েছে। এটার কারণে এআইআইবি এবং ব্রিকস নিউ ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে, যেগুলো উদীয়মান দেশগুলোর টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে”।

“আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন জায়গাটি হলো অর্থনীতি”।

বাহল বলেন, “চীনের ধীরগতি ভারতের সাথে সম্পর্ককে মজবুত করেছে এবং ভারত এখন শুধু স্টিল, সিমেন্ট আর এ ধরনের পণ্যের বিকল্প বাজারই হয়ে ওঠেনি বরং বিচলিত দেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের আকর্ষণীয় বিকল্পও হয়ে উঠেছে”। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, শুধু ২০১৫ সালেই ভারতে চীনের বিনিয়োগ ছয়গুণ বেড়েছে।

বাহল বলেন, “আর সেটা একটা শুরু মাত্র কারণ নতুন চুক্তির কারণে উচ্চগতির রেললাইন, স্মার্ট সিটি, যৌথ প্রযুক্তি পার্কসহ বড় ধরনের সহযোগিতামূলক প্রকল্পের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে”। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, সিপিইসির নাম পরিবর্তনে চীনের প্রস্তাবটি এবং জম্মু ও কাশ্মীর, নাথু লা পাস বা নেপালের ভেতর দিয়ে বিকল্প করিডোর নির্মাণের বিষয়টি ভারতের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যাতে ওবিওআরের ব্যাপারে নিজেদের উদ্বেগগুলোর মীমাংসা করা যায়।

বাহল লিখেছেন, “ওবিওআর ভারতের নেতৃত্বের জন্য আরেকটি সুযোগ, এবং চীনা মূলধনের বন্যার মধ্যে প্রবেশের আরেকটি পথ। ওবিওআর ছাড়া আমরা ক্রমশ সংযুক্ত হয়ে ওঠা এশিয়াতে আবদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো; এর মাধ্যমে ভারত তার ভয়াবহ অবকাঠামোকে মেরামত করে নিতে পারবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চীন ও দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ব্যাবসার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারবে”।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক চক্রবর্তীর সাথে একমত পোষণ করেন তিনি, যিনি বলেছেন যে, ভারতে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়লে এখানে চীনের স্বার্থ দ্বিগুণ বাড়বে এবং সে ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কখনও অস্থিতিশীল করতে চাইবে না চীন।

বাহল বলেন, “আমার কাছে এই কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত এবং অন্যান্য ভারতীয়ের মতো আমি চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও উদ্বিগ্ন নই”।

বাহলের যুক্তি হলো, সস্তা চীনা পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোক্তাদের সুবিধা হয়েছে কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এটা ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে সৃজনশীল হতে বাধ্য করেছে।

তিনি বলেন, “চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিটাকে ভারত নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগাতে পারে, এটাকে অর্থনৈতিক কূটনীতির অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতে পারে, যাতে আরও সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি করা যায়”।

পর্তুগিজ রাজনীতিবিদ ও চীনা বিশেষজ্ঞ ব্রুনো মাকায়েস তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড: অ্যা নিউ চাইনিজ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন যে, ওবিওআরের সাফল্যের জন্য এতে ভারতের অংশগ্রহণ জরুরি।

বহু ভারতীয় বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ইস্যুতে ভারত ও চীন একসাথে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মার্কিন বাণিজ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও তারা একত্র হতে পারে, যেটা তাদের উভয়েরই ক্ষতি করছে।

ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপের রনবীর সমাদার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে একটা বাজার হিসেবে দেখে, মূলত অস্ত্রের বাজার, এবং তারা চায় চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহার করতে অথচ ভারতের স্বার্থকে তারা গুরুত্বের সাথে দেখবে না। তাই, আমেরিকার হাতের পুতুল হওয়ার কোন দরকার নেই ভারতের। কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্পের যে দুরভিসন্ধী, সেটা আমেরিকার প্রতারণার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ”।

Saturday, September 7, 2019

অমিত শাহের ‘গোর্খাল্যান্ড’ উল্লেখে বিচলিত পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো by সুবীর ভৌমিক

কাশ্মীরের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্ত করা ও রাজ্যটিকে দুটি ইউনিয়নভুক্ত ভূখণ্ড হিসেবে খণ্ডিত করার পর থেকে মোদি-শাহ জুটির পরবর্তী রাজনৈতিক টার্গেট নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক গুঞ্জন চলছে। বেশির ভাগই মনে করছে যে পশ্চিমবঙ্গই হতে পারে পরবর্তী টার্গেট। কারণ তিক্ত নির্বাচনী প্রচারকাজের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার গদাধারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রায়ই পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলাকে ‘কাশ্মীরের চেয়েও খারাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
মোদি-শাহ ও পশ্চিমবঙ্গের রণংদেহী নারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মধ্যে কথার যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দার্জিলিংয়ের এমপি রাজু বিস্তার কাছে লেখা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের একটি চিঠিতে ‘গোর্খাল্যান্ড’ শব্দটি থাকায় জল্পনা শুরু হয়েছে যে নেপালি-সংখ্যাগরিষ্ঠতাপূর্ণ চা উৎপাদনশীল অঞ্চল দার্জিলিংকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেটে আলাদা করা হবে। আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবি সেই ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে। ওই সময় দার্জিলিং আলাদা রাজ্যের জন্য সহিংস বিক্ষোভ করেছিল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার তখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন বামদের একটা শিক্ষা দেয়ার জন্য আন্দোলটিকে উৎসাহিত করেছিল। পরে তারা কেন্দ্র, রাজ্য সরকার ও গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (জিএনএলএফ) মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করার ব্যবস্থা করে। চুক্তিটি দার্জিলিংয়ের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্বশাসনের ব্যবস্থা করলেও গোর্খাদের অন্যান্য দল প্রায়ই আলাদা রাজ্যের দাবি তুলে থাকে। তারা জিএনএলএফের বিরুদ্ধে স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়ার অভিযোগ এনে থাকে। পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় বিজেপি তার প্রার্থীদেরকে গোর্খাল্যান্ডের দাবির প্রতি সমর্থন দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে এই আগুনে ইন্ধন দিয়েছে। এর ফলে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে লোকসভার নির্বাচনে দার্জিলিঙের আসনে বিজেপির প্রার্থী জয়ী হয়। বিজেপি মমতার ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে গোর্খা আকাঙ্ক্ষার প্রতি উদাসিন বাঙালি দল হিসেবে চিত্রিত করে।
চলতি সপ্তাহে দিল্লি পুলিশ বিশেষ বাহিনী গোর্খাদের নিয়োগ করছে না মর্মে অভিযোগ-সংবলিত বিজেপির দার্জিলিং এমপি রাজা বিস্তার চিঠির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ‘গোর্খাল্যান্ড’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এটি বিস্তা ও তার সমর্থকদের বিস্মিত করে। কারণ গোর্খাল্যান্ডের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে অমিত শাহের জবাবটি সামাজিক মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৃণমূল কংগ্রেস, বাম দলগুলো ও কংগ্রেসের রাজনীতিবিদেরা দার্জিলিঙে নতুন করে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করার জন্য অমিত শাহকে আক্রমণ করেন। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক পার্থ চ্যাটার্জি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে গোর্খাল্যান্ড ভূত জাগিয়ে তোলার জন্য অমিত শাহকে দায়ী করেন। লাদাখকে আলাদা ইউনিয়ন অঞ্চল ঘোষণা করার পর গোর্খা জনমুক্তি মঞ্চের (বিমল গুরুঙের নেতৃত্বাধীন) মতো দার্জিলিংভিত্তিক কয়েকটি দল আবারো গোর্খাল্যান্ডের দাবি তুলেছে। পার্থ চ্যাটার্জি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্রেফ পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী হওয়ার জন্য আবারো সহিংসতা ও গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করবেন। তবে তিনি সফল হবেন না। কংগ্রেস ও বাম নেতারাও একইরকম সমালোচক। স্বায়ত্বশাসনপন্থী গোর্খা নেতা ব্লনয় তামাঙের মতো নেতারা এসএএমকে বলেন, অমিত শাহের গোর্খাল্যান্ডের উল্লেখ্য গোর্খা ভোট পাওয়ার কৌশল মাত্র। এতে সম্প্রদায়ের কোনো লাভ নেই।
বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের নেতারা অমিত শাহের পদক্ষেপে উদ্বিগ্ন। দুর্গাপুরে চিন্তন (কৌশলগত) সভায় বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ নেতারা বসেছিলেন রাজ্যে তাদের করণীয় নির্ধারণ করতে। এতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলিপ ঘোষ বা রাজ্য নির্বাহী পরিষদের অন্যান্য সদস্য দার্জিলিং, গোর্খাল্যান্ড বা অমিত শাহের চিঠির কোনো ধরনের উল্লেখ এড়িয়ে যান। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিজেপির এক সিনিয়র সদস্য বলেন, অমিত শাহ যদি গোর্খাল্যান্ড সমর্থন করে, তবে আমরা পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়ে যাব। মমতা ব্যানার্জি রাজ্যের আবার দ্বিখণ্ডিত করা নিয়ে বাঙালি ভাবাবেগ জাগিয়ে তুলবেন, ঠিক যেমন করেছিলেন জ্যোতি বসু ১৯৮০-এর দশকে। আন্দোলনটি বেগবান হওয়ার সময় কেন্দ্রকে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করে কংগ্রেসকে স্রেফ শেষ করে দিয়েছিলেন। মমতাও একই কাজ করবেন।
ওই নেতা বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপি অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো করেছে বাংলায়। তারা ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন পেয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সদস্য সংগ্রহের যে টার্গেট নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক কম হয়েছে, বিশেষ করে কলকাতার মতো বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়। বিজেপির ওই নেতা বলেন, গোর্খা, রাজবংশী ও ঝারখন্ডি উপজাতীয় লোকজনের অধ্যুষিত, হিন্দু ভাষাভাষী শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের এলাকাগুলোতে দলটি ভালো করেছে। কিন্তু বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভালো করেনি। বাঙলার সাত ধাপের নির্বাচনের শেষ পর্বে দলটি কলকাতার ৯টি আসনের সবগুলোতেই পরাজিত হয়। এর আগ দিয়ে ঊনিশ শতকের বাঙালি সমাজ সংস্কারক পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙ্গে দিয়েছিল গেরুয়া সমর্থকেরা।
বিজেপি নেতা বলেন, কলকাতার অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সদস্যপদ লাভের উদ্যোগে ভালো সাড়া পাওয়া গেলেও যাদবপুর, গড়িয়া, দমদম ও টালিগঞ্জের মতো বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় টার্গেট পূরণ অনেক কম হয়েছে। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ শাখা সভাপতি দিলিপ ঘোষ এখন সদস্য সংগ্রহের জন্য বাড়ি বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সদস্যপদ পূরণের টার্গেট ভয়াবহ রকমের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে দিল্লিতে আমাদের সরকার গোর্খাল্যান্ডের দাবি সমর্থন করছে, তবে আমরা বাকি বাংলায় খেলায় হেরে যাব। বাঙালিরা ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের বিরুদ্ধে এবং তারা ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর। মমতার অপঃশাসন আমাদের একটি সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু যেকোনো ভুল পদক্ষেপ হবে আত্মঘাতী। তিনি উদ্বিগ্ন যে মমতা ইতোমধ্যেই বাঙালি কার্ড খেলা শুরু করে দিয়েছেন বেশ ভালোভাবেই ও বেশ কার্যকরভাবেই। তিনি বলেন, বাঙলা থেকে কাশ্মীর ভিন্ন। লাদাখ আর জম্মুতে আছে তিন এমপি, কাশ্মীরে আছে একইসংখ্যক। আর দার্জিলিঙে আছে মাত্র একটি এমপি আসন। বাকি বাঙলায় আছে ৪১টি।
দার্জিলিং চা শিল্প (যদিও এর নিলাম নিয়ন্ত্রিত হয় কলকাতায়) থেকে পশ্চিমবঙ্গ কিছু রাজস্ব হারাবে, কিন্তু মাংস প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া, হাইটেক ও পর্যটন খাতে নতুন নতুন শিল্প থেকে অনেক বেশি আয় করতে পারবে। বর্তমান ফিন্যান্সিয়াল কোয়ার্টারে ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ জিএসডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, ১২.৫৮ ভাগ, যা জাতীয় জিডিপির ৫.৮ ভাগের চেয়ে অনেক বেশি। আর কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, কেবল জিএসডিপি প্রবৃদ্ধিতে নয়, শিল্প খাত ও জিএসটি সংগ্রহের দিক থেকেও পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে আছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি চুইয়ে পড়া থেকে রাজ্যটি লাভবান হচ্ছে।
তবে তৃণমূলের ভেতরের লোকজন আশঙ্কা করছে, পশ্চিমবঙ্গকে খণ্ডিত করে অমিত শাহ অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ সময় নির্বাচন না করার অজুহাত সৃষ্টি করতে গোর্খাল্যান্ড সৃষ্টি করে সেটিকে রাষ্ট্রপতির শাসনে নিয়ে আসতে পারেন। তৃণমূলের মুখপাত্র ও বাঙলা পক্ষ নেতা গর্গা চ্যাটার্জি বলেন মোদি ও অমিত শাহ প্রধান আদর্শগত শত্রু হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে টার্গেট করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কারণ মোদি ও অমিত শাহের রয়েছে স্বল্পমেয়াদি ভিশন, তারা দীর্ঘ মেয়াদি হিসাব না কষেই বিঘ্নকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

Wednesday, August 28, 2019

খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রী by সুবীর ভৌমিক

ছত্তিশগড় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল
ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল রোববার দ্ব্যর্থহীনভাবে তার রাজ্যের খনি থেকে ইউরোনিয়াম উত্তোলনের বিরোধিতা করেছেন। তার এই বিরোধিতা দেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে। দেশের উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও অস্ত্র কর্মসূচির জন্য এই ইউরেনিয়াম উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ দিতে কেন্দ্রের কাছ থেকে রাজ্যটি ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে।

উত্তরপূর্বাঞ্চলের আরো কয়েকটি রাজ্যে ছত্তিশগড়ের মতো ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধ মজুত রয়েছে বলে মনে করা হয়।

কিন্তু এই খনিজ উত্তোলন করতে গেলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করবে বলে স্থানীয় গ্রুপগুলো এর বিরুদ্ধে। তাদের কারণে প্রায় তিন দশক ধরে মেঘালয়ে ইউরেনিয়াম উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।

মেঘালয়ের ইউরেনিয়াম-বিরোধী গ্রুপগুলোর মতো একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাঘেল। নয়া দিল্লিতে রোববার দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ ও রায়পুরভিত্তিক গ্রুপ অব থিঙ্কার্স আয়োজিত ছত্তিশগড়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যকালে তিনি ওই উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সাউথ এশিয়ান মনিটর’র এক প্রশ্নের জবাবে বাঘেল বলেন, তিনি এমন কোন নতুন প্রকল্প নিতে আগ্রহী নন যাতে ইউরেনিয়ামসহ অন্যান্য খনিজের জন্য ব্যাপকভাবে খননের প্রয়োজন হবে।

খনিজ সমৃদ্ধ রাজ্যটিতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে দেখতে আগ্রহী অনেক বিদেশী কূটনীতিকের উপস্থিতিতে বাঘেল বলেন, ‘পুরা রাজ্যকো খোদ দিয়া হ্যায়, আওর কিতনা খোদেঙ্গে’ (তারা পুরো রাজ্যটিকেই খনন করে ফেলেছে, আর কত খনন করবে)।

তিনি কেন বিশেষ করে ইউরেনিয়াম খনিজ উত্তোলনের বিরুদ্ধে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাঘেল বলেন: আমি আমার রাজ্যের আদিম পরিবেশ বজায় রাখতে খুবই আগ্রহী। ব্যাপকভাবে খনি কার্যক্রম বিশেষ করে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা হলে তা পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন যে তার সরকার স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে দারিদ্রপীড়িত উপজাতীয়দের কল্যাণ হয় এমন প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহী।

বাঘেল বলেন, স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কাঁচামালের উপর ভিত্তি করে কৃষি প্রক্রিয়াজাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আমি আগ্রহী। কারণ এতে স্থানীয় জনগণের আয় বাড়বে।

‘দু:খজনক হলো, বড় আকারের খনিজ কার্যক্রম আমাদের জনগণের কোন উপকারে আসে না। এতে শুধু পরিবেশ দূষণ হয়।’

ঝাড়খণ্ডের যাদুগোদার কথা উল্লেখ না করে বাঘেল আরো বলেন যে ভারতের অন্যান্য অংশে ইউরেনিয়াম খনিগুলোর কারণে বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে তিনি অবগত। তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম বর্জে্যর কারণে যাদুগোগার গ্রামবাসীদের মারাত্মক ভুগতে হচ্ছে।

তবে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ হলো কেন্দ্রের বিষয় এবং কেন্দ্র শুধু ছত্তিশগড় নয় ভারতের যেকোন রাজ্যেই ইউরেনিয়াম খনি খননের আহ্বান জানাতে পারে।

বাঘেল বলেন, তবে রাজ্য সরকার ও স্থানীয় জনগণ নিজেদের অভিমত প্রকাশের অধিকারী।

ভারত তার পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও অস্ত্র কর্মসূচির জন্য খনি থেকে ইউরোনিয়াম উত্তোলন জোরদার করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া থেকে এই পদার্থ আমদানির পরিকল্পনা করেছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন যে পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে ভারত অনেক পিছিয়ে আছে। আর এটা এমন এক সময় ঘটছে যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হুংকার দিয়ে বেড়াচ্ছে দুই শত্রু মনোভাবাপন্ন প্রতিবেশী।

Friday, August 16, 2019

মোদির ফেডারেলবিরোধী এজেন্ডায় হুমকির মুখে ভারতের ঐক্য by সুবীর ভৌমিক

ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউনিয়ন অব স্টেটস’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে বিপুল ক্ষমতা। এ কারণে ভারতকে বলা হয়, ‘শক্তিশালী ইউনিটারি বায়াজ ফেডারেশন।’
অবশ্য, অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভাষার ভিত্তিতে গঠিত রাজ্যগুলোকে নিয়েই ভারত একটি ফেডারেশন। সুপ্রিম কোর্টের অনেক রায়ে ভারতীয় সংবিধানের অপরিবর্তনযোগ্য ‘মৌলিক কাঠামো’ নিয়ে গঠিত ‘ফেডারেল নীতিমালা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অধীনে বিজেপি এই মৌলিক কাঠামোটাই ধীরে ধীরে ওই পর্যায় পর্যন্ত ক্ষয় করার চেষ্টা করছে যাতে ‘হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুস্তান’ নিয়ে আরএসএসের ভিশনের পথ তৈরি হয়ে যায়।
মোদির ‘সহযোগিতামূলক ফেডারেলবাদ’ এমন প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত যেখানে রাজ্যগুলো নিঃশর্তভাবে কেন্দ্রকে সমর্থন করবে, কোনো আলোচনা বা বিতর্ক ছাড়াই এর নির্দেশনা অনুসরণ করবে।
নোট বাতিলকরণসহ কেন্দ্রের নেয়া অন্য সব সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া রাজ্যগুলোর আর কোনো উপায় ছিল না। এটা পরিণত হয়েছে একমুখী রাস্তা।
বিজেপির পরিচালিত রাজ্যগুলো সর্বোচ্চ নেতার সাথে কোনো ধরনের মতবিরোধে যাবে না বলেই প্রত্যাশা করা হয়ে থাকে এবং আঞ্চলিক দলগুলো শাসিত যেসব রাজ্য বহন-অসাধ্য মনোভাবের বিরোধিতা করবে, তাদেরকে দেশ ভাঙ্গার চক্র হিসেবে গালিগালাজ করা হবে কিংবা ‘মহামিলাওয়াতের’ অংশ হবে।
মোদি ও অন্যান্য বিজেপি নেতা ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময় বিরোধী জোট গড়ার চেষ্টাকারীদের ‘মহামিলাওয়াত’ হিসেবে আক্রমণ করে।
আঞ্চলিক দলগুলো অপরিহার্য
কিন্তু ভারতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আঞ্চলিক দলগুলো অপরিহার্য ও অবিভাজ্য। তামিল নাড়ুর দ্রাভিদা মুনেত্রা কাজগাম (ডিএমকে) স্থানীয় শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনগুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। কাশ্মিরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের মতো কিছু দল এমনকি ভারত বিভক্তিরও আগে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আবার তেলুগু দেশমের মতো অনেক দল দিল্লির বাড়াবাড়ি রকমের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করার সময় আবির্ভূত হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর আমল থেকে কংগ্রেসের ব্যক্তি পূজার ফলেও দলে ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে মহারাষ্ট্রে শরদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) ও পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়। কংগ্রেস থেকে বের হয়ে যাওয়া এসব গ্রুপের একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচিতি রয়েছে।
আঞ্চলিক দলগুলো মুছে ফেলা যায় না, কারণ এগুলো ভারতের বহুজাতিক পরিচিতির প্রতিফলন ঘটায়। এগুলোর মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অনিবার্য প্রকাশ ঘটেছে।
যারা বিশ্বাস করে যে ভারতকে কেন্দ্রীয়ভাবে শাসন করা যাবে, তারা মোগল বা দিল্লি সালতানাতের সময়ে যেসব ভুল করেছিল, সেই একই ভুল করছে। যারা প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করে, দিল্লি আসলেই অনেক দূরে।
মোদির ‘এক জাতি, এক নির্বাচন’ ফেডারেল ভারতের ধারণাকেই আঘাত করছে। বিজেপির এই উদ্যোগ গ্রহণ করার কারণ হলো, তারা মনে করছে, যুগপৎভাবে সব রাজ্য ও কেন্দ্রে নির্বাচন হলে শক্তিশালী মোদি ব্র্যান্ডের ফলে তাদের ক্ষমতা দখল সহজ হবে।
২০১৯ সালের লোকসভার নির্বাচনের সাথে যে রাজ্যটির নির্বাচন হয়েছে, তার ফলাফলে দেখা যায়, উড়িষ্যায় বিজু জনতা দলের (বিজেডি) মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলো কিভাবে ভোট দেয়।
মোদির ‘এক দেশ, এক ভোট’ নির্বাচনী খরচ হিসেবে ৫৫ হাজার মিলিয়ন রুপি বাঁচাবে বা বারবার নির্বাচন আয়োজনে ঝামেলা থেকে রক্ষা করবে বলে বিজেপি যে কথা বলছে, তা একেবারে আনাড়ি বক্তব্য।
তাহলে বিজেপি কেন গুজরাটের রাজ্য সভার দুটি আসনে একই তারিখে ভোট আয়োজনের বিরোধিতা করেছিল? বাস্তবতা হলো, বিজেপি-আরএসএস জুটি পেশীশক্তির জাতীয়তাবাদীর মোদি ব্র্যান্ডকে জাতীয় শক্তি কাঠামোতে (কেন্দ্র ও রাজ্য) অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করতে চায়।
সম্প্রতি একজন ভাষ্যকার দেখিয়ে দিয়েছেন, অর্থনীতিতে অন্তত ১০টি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে ৫০ হাজার মিলিয়ন রুপি বা তার চেয়ে বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব। এসবের মধ্যে বড় ধরনের একটি ব্যয় হ্রাস হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রচারণা বাজেটে। আরেকজন বিশ্লেষক বলেছেন, এক জাতি, এক ভোট ধারণাটি আসলে সেতুর কিছু কাঠামোগত সমস্যার কারণে নদীর ধারা বদলে দেয়ার মতো।
হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান
বিজেপির ফেডারেলবাদের ওপর আক্রমণের উৎস হলো আরএসএসের ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তানের’ ওপর ভিত্তি করে প্রণীত ‘এক ভারত’ দর্শন।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে তৃতীয় ভাষার মাধ্যমে হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা ওই মতাদর্শ প্রচারই প্রতিফলিত করে। তামিল নাড়ু ও আরো কয়েকটি রাজ্যে কঠোর প্রতিবাদের ফলে হিন্দিতে শিক্ষার প্রয়াস বাতিল করা হয়েছে। তবে আরএসএস জানিয়েছে, তারা চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
হিন্দির পরিচিতি জোরদার করা ও সুসংহত করার অনেক চেষ্টা চলছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে জোর দেয়া, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা, সন্ত্রাসে অভিযুক্ত প্রজ্ঞা ঠাকুরের মতো হিন্দু কট্টরপন্থীদের জন্য পার্লামেন্টে আসনের ব্যবস্থা করা, রাম মোহন রায়ের মতো বাংলার রেনেসাঁস ব্যক্তিত্বদের সুনাম হানি করা।
হিন্দি ও হিন্দুর বেলাও প্রায় একই কথা। তারপর আসে ‘এক হিন্দুস্তান।‘ আর তা প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হচ্ছে ‘এক জাতি, এক নির্বাচনের’ মাধ্যমে।
কলামিস্ট স্বামিনাথান আয়ার ‘এক জাতি, দুই নির্বাচনের’ পরামর্শ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনের দুই বা তিন বছর পর সব রাজ্যের নির্বাচন হতে পারে। তার মডেলটি মার্কিন মডেলের মতো। সেখানে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন হয় সাধারণত প্রেসিডেন্ট ও সিনেট নির্বাচনের অনেক পর।
কোনো রাজ্যে সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তখন কী হবে? যেসব রাজ্য কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় আসবে, সেগুলো কি অন্য রাজ্যগুলোর জন্য অপেক্ষা করবে? কেন্দ্রে সরকারের পতন হলে কী হবে? এটা কি ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে? এসব প্রশ্নের সমাধান দিতে হবে।
মিডিয়ার বিতর্কে ইতোমধ্যেই এই আইডিয়াটির অসম্ভব প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। তবে বিজেপি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবটি নিয়ে কথা বলেই যাবে। বর্তমানে লোকসভায় বিজেপির ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ২৪৫ আসনবিশিষ্ট রাজ্য সভায় রয়েছে তাদের ১০৬ জন।
ভারত আসলে কিভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে
ভারতীয় সেনাবাহিনীর বন্দুকের মাধ্যমে নয়, বরং ঐকমত্য ও ভদ্রোচিত মিলের মাধ্যমে ভারতীয় ইউনিয়ন একত্রিত হয়েছিল। আঞ্চলিত পরিচিতিগুলোর সহিষ্ণুতা এর অংশ। এখন এর কোনো ধরনের ক্ষতি ফেডারেল ব্যবস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
ধর্মভিত্তিক কেন্দ্রীয় রাজনীতি পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। ইসলাম ও একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে এক রাখতে পারেনি। এমনকি ১৯৭১ সালের পরও শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদ ও স্বায়ত্তশাসনবাদী আন্দোলন পাঞ্জাবের বাইরের সব প্রদেশে দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু আমাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করার বদলে মোদির বিজেপি ধর্ম চালিত জাতি-রাষ্ট্রের ব্যর্থ পাকিস্তানি মডেলকে ভারতে নিয়ে আসছে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার লোকজন জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব সমাহিত করে দিয়েছে। এখন হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় উন্মাদনা জিন্নাহর দ্বিজাতীয় তত্ত্বকে নতুন করে বৈধতা দিতে যাচ্ছে।
প্রতিবেশীদের ওপর প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমে বিজেপি একটি প্যান্ডোরা বাক্স খুলছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের পুরো পূর্বাঞ্চলে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য আসামের এনআরসির ফলে প্রায় ৩০ লাখ বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম বহিস্কৃত যদি নাও হয়, তবুও অন্তত ভোটাধিকার হারাতে চলেছে।
এনআরসির কোনো বিরূপ প্রভাব যদি বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়ে, তবে মোদির ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আর স্রেফ সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গকে ‘কাশ্মিরের চেয়েও খারাপ’ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে মোদি-শাহ জুটি আসলে ইন্দিরা গান্ধীর ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করছে। উল্লেখ্য, ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালে নির্বাচিত ফারুক আবদুল্লাহ সরকারকে হঠিয়ে দিয়ে জঙ্গিবাদের ভিত্তি প্রস্তুত করেছিলেন। ভারত এখনো এই সমস্যায় রয়েছে।
মোদি দৃশ্যত বুঝতে পারছেন না যে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ প্রজেক্টের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Tuesday, August 6, 2019

বাঙালি পরিচয় আন্দোলন জোরদার হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে by সুবীর ভৌমিক

নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের গেরুয়া ব্রিগেডের ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানের সাথে বাঙালি সংস্কৃতির যোগ নেই বলে সমালোচনা করার কয়েক দিনের মধ্যে তার মন্তব্য-সংবলিত বিলবোর্ড কলকাতায় রাস্তায় রাস্তায় আবির্ভূত হতে থাকে।

অমর্ত্য সেনের তীব্র সমালোচনাকে স্বাগত জানায় বাঙালি মানবাধিকার গ্রুপগুলো ও রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিবিদেরা।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি এখন গেরুয়া বাহিনীর প্রহারের মন্ত্র হয়ে পড়েছে। এর সাথে বাঙালি সংস্কৃতির কোনো যোগাযোগ নেই।

“‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান আগে কখনো শুনিনি। ইদানীং মানুষকে মারার জন্য এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমার মনে হয় না এই স্লোগানের সাথে বাংলার সংস্কৃতির কোনো যোগাযোগ আছে,” বিলবোর্ডে লেখা হয়েছে। গত ৫ জুলাই কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে মতবিনিময়ের সময় অমর্ত্য সেন এমন কথা বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

বিলবোর্ডে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে অমর্ত্য সেন তার চার বছরের নাতিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার পছন্দের ভগবান কে? তিনি বলেন, ‘তার উত্তর, মা দুর্গা। ‘অর্থাৎ এখানে দুর্গা পূজা যে মর্যাদা পায়, তার সাথে রাম নবমীর কোনো তুলনাই হতে পারে না।

কে এসব বিলবোর্ড লাগিয়েছে, তা জানানো হয়নি, তবে নীল-সাদা রং তৃণমূলের।

তৃণমূলের সুপ্রিমো ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত সবাইকে বাংলা শিখতে ও বাংলায় কথা বলার আহ্বান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর (এতে বিজেপি ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়ী হতে সক্ষম হয়েছে) মমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক জোরালোভাবে ‘বাঙালি পরিচিতি’ কার্ড ব্যবহার করছেন।

তার দল প্রকাশ্যে কখনো ‘হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ‘বাংলা পক্ষ’-এর মতো গ্রুপগুলোকে প্রকাশ্যে সমর্থন না করলেও এসব বাঙালি গ্রুপের নেতারা তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং এমনকি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রশ্নে সীমাহীন বিতর্কে তাদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করেন।

‘বাংলা পক্ষ’ অনুপ্রেরণা পাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ১৯৫০-১৯৬০-এর দশকের উর্দুবিরোধী আন্দোলন ও একইসময়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিল নাড়ুর হিন্দিবিরোধী আন্দোলন থেকে।

আন্দোলনের নেতা গর্গা চ্যাটার্জি বলেন, আমরা কোনো ভাষারই বিরোধী নই। আমরা অহিন্দি ভাষাভাষী লোকজনের ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে। চ্যাটার্জি মর্যাদাসম্পন্ন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের (আইএসআই) শিক্ষক।

এরই প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কেন্দ্রে মোদি সরকার সম্প্রতি সমগ্র ভারতে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে যে নতুন খসড়া জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন।

‘বাংলা পক্ষ’ তীব্রভাবে বিজেপির ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান’ ভিশনের বিরোধিতা করছে। এর সমর্থকেরা রেলওয়ে কোচগুলোতে থাকা উর্দু কবি মোহাম্মদ ইকবালের ‘হিন্দি হুঁ হাম, ওয়াতান হ্যায় হিন্দুস্তান হামারা’ বাণী ছিঁড়ে ফেলেছে।

চ্যাটার্জি বলেন, ‘আমরা হিন্দি নই। আমরা বাঙালি। আমাদের দেশ ইন্ডিয়া ও ভারত। আমাদের সংবিধানে কোথাও হিন্দুস্তান লেখা নেই। হিন্দুস্তান বলতে উত্তর ভারতকে বুঝায়। কিন্তু আমাদের তামিল, উড়িয়া, তেলেগু বা আসামীয় ভাইদের মতো আমরা বাঙালিরাও ভারতের অংশ, হিন্দুস্তানের নয়।

বিজেপি-আরএসএস ও তাদের ফ্রন্টগুলো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ২০১৭ সালে রাম নবমী ও হনুমান জয়ন্তী উৎসব শুরু করলে বাংলা পক্ষের আবির্ভাব ঘটে।

কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী ও বাংলা পক্ষের সমর্থক অনির্বাণ ব্যানার্জি বলেন, আমাদের আন্দোলনে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। গেরুয়া শিবিরের ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ স্লোগান বাংলার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি সৃষ্টি করেছে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ কেবল মুসলিমদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিই নয়, সেইসাথে বাঙালিদের মতো স্বতন্ত্র জাতিগত গ্রুপগুলোর প্রতিও হুমকি সৃষ্টি করেছে।

তৃণমূল এই গ্রুপটির পক্ষে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, হিন্দি ভাষাভাষী ভোটারদের মধ্যে যাতে ক্ষোভের সৃষ্টি না হয়, সেজন্যই তারা এই পথ অবলম্বন করেছে। তবে বাংলা পক্ষের একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠীই ক্ষমতাসীন দলের সদস্য।

গর্গা চ্যাটার্জি রাজ্যের নতুন নাম ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব কেন্দ্রের প্রত্যাখ্যান করার প্রেক্ষাপটে বলেন, তৃণমূল বাংলার। সিপিআই(এম) বাংলার। কিন্তু বিজেপি বাংলার নয়।

গত ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধান সভা সর্বসম্মতভাবে রাজ্যের নাম বাংলা করার একটি প্রস্তাব পাস করে তা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এছাড়া ২০১৬ সালে ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’, বাংলায় ‘বাংলা’ ও হিন্দিতে ‘বাঙ্গাল’ করার প্রস্তাবটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব দেয়া হয় ‘বাংলা’ করার।

আগেকার প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করার সময় কেন্দ্রীয় সরকার এই বলে আপত্তি জানিয়েছিল যে ‘বাংলা’ নামটি বাংলাদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলে আন্তর্জাতিক ফোরামে দুটির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হবে।

কিন্তু গর্গা চ্যাটার্জি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ একইসাথে সহাবস্থান করতে পারবে। কারণ তারা জাতীয় সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত একটি ভাষাকেন্দ্রিক গ্রুপের প্রতিফলন করে।

তিনি স্বীকার করেন যে এই মুহূর্তে তাদের আন্দোলন তৃণমূলকে সাহায্য করছে, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সিপিআই(এম) সমর্থকেরাও এই গ্রুপের অংশ।

গত বছর বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের বিরোধী অবস্থান জোরদার করে বিজেপি। তাদের দাবি, এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ চরিত্র বদলে যাচ্ছে। বাংলা পক্ষ এই দাবি চ্যালেঞ্জ করে বলছে যে ‘উত্তর ভারত থেকে অনুপ্রবেশই’ রাজ্যের ভাষাতাত্ত্বিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

গত কয়েক মাসে বাংলা পক্ষ রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে ১০টিতে শাখা খুলেছে। তারা ইতোমধ্যেই বাঙালিদের ও বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করার জন্য সরকারি বিভাগ ও সংস্থাকে বাধ্য করেছে।

এই গ্রুপের সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে গত এপ্রিলে কলকাতা মেট্রো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্মার্ট কার্ডে বাংলা প্রবর্তন করেছে। রাজ্য সভার স্বতন্ত্র সদস্য রিতাব্রত ব্যানার্জিও তাদের সমর্থন করেন।

এরপরপরই কলকাতা অবাঙালি ভাষাভাষী এলাকাগুলোতে উর্দু ও হিন্দিতে সাইনবোর্ড লেখার কলকাতা পুলিশ বিভাগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইমেইল ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। তারা জোর দিয়ে বলে যে রাজ্য সরকারের কোনো নোটিশ বা প্রচার কার্যক্রম থেকে বাংলাকে বাদ দেয়া যাবে না। পুলিশ পাল্টা জানায় যে তাদের যোগাযোগের যেকোনো কার্যক্রমে বাংলাই প্রধান ভাষা এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে।

সর্বশেষ সফলতা আসে জুনে। ওই সময় নদিয়া জেলায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সেস এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইআইএসইআর) শিক্ষা ও অশিক্ষা পদের জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রে হিন্দি বাধ্যতামূলক থাকার প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। বাংলা পক্ষ কর্মীরা সাইবার ক্যাম্পেইন শুরু করে, আইআইএসইআর অফিসের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

বাংলা পক্ষের কর্মী রেহান আমিন বলেন, অহিন্দি ভাষাভাষী রাজ্যগুলোতে হিন্দি চাপিয়ে দেয়া একটি স্পষ্ট অর্থনৈতিক এজেন্ডা। এতে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা ও সরকারি চাকরিগুলোতে যাতে হিন্দি ভাষাভাষীরা সুবিধা পায়, তার ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি বলেন, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানায় যদি বাংলা ভাষা ব্যবহার করা না হয়, তবে কেন বাংলায় হিন্দি ও উর্দু ব্যবহার করা হবে? আমিন হাওড়ার অধিবাসী, তিনি সেখানে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন।

আমরা বাঙালি

রাজ্যে এটিই প্রথম বাঙালি পরিচিতি আন্দোলন নয়। ১৯৮০-এর দশকে আনন্দ মার্গ গ্রুপের আমরা বাঙালি আন্দোলন কিছুটা প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন আবার শুরু হলে ২০০৮ সালে উত্তরবঙ্গে তার অবস্থান দেখা গিয়েছিল।

২০০০-এর প্রথম দিকে কবি-উপন্যাসিক সুনীল গাঙ্গুলি বাংলার প্রতিটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলা বাধ্যতামূলক করার একটি আন্দোলনে নেত্বত্ব দিয়েছিলেন।

বাংলা পক্ষ আন্দোলন সেক্যুলার, উদার, অন্তর্ভুক্তমূলক, ফেডারেল ও বিভিন্ন বৈচিত্র্যতে প্রতিফলিত করে এমন একটি ভারতীয় কাঠামোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে জোরালো বাঙালি পরিচিতি বিকাশ করার কথা বলছে।

গ্রুপটি ইতোমধ্যেই বাংলায় বিজ্ঞান লেখালেখি জনপ্রিয় করার জন্য একটি বিজ্ঞান শাখা খুলেছে, একটি আইন শাখা খোলার প্রক্রিয়াও চলছে। তারা ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তা শাখা খোলার পরিকল্পনাও করছে।

জুনে গ্রুপটির পশ্চিম বর্ধমান শাখা রাজ্যের জাতীয় মহাসড়কগুলোর সাইনবোর্ডগুলো থেকে বাংলা অদৃশ্য হয়ে যাওার প্রতিবাদ জানায় ন্যাশনাল হাইওয়েস অর্থোরিটি অব ইন্ডিয়া অফিসের সামনে। কয়েক মাসের মধ্যে মহাসড়কগুলোর সাইনবোর্ডে বাংলা পুনঃপ্রবর্তন না করা হলে তারা আন্দোলনে যাবেন বলে পরিকল্পনা করছে।

নয়া দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি হিন্দিতে বক্তৃতা করায়, ঈদ বার্তা উর্দুতে দেয়ায় গ্রুপটি তার সমালোচনা করেছে।

পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষায় হিন্দি ও উর্দু প্রবর্তন করার সিপিআইয়ের (এম) দাবিরও বিরোধিতা করে তারা। উচ্চতর মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হিন্দিতে ছাপানোর রাজ্য বোর্ডের সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করে তারা।

বিজেপির পাল্টা আঘাত

পাল্টা আঘাত হেনে হারানো রাজনৈতিক ভিত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাকে সমর্থন করছেন বলে মমতা ব্যানার্জির সমালোচনা করে বিজেপি।

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখা সভাপতি দিলিপ ঘোষ বলেন, মমতা পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা করছেন।

এর প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজনৈতিক ভাষ্যকার দিপঙ্কর দে বলেন, বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা অনুভব করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কারণ আমরা অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারী। এর জন্য সীমান্তের ওপারে আমাদের ভাইয়েরা রক্তসাগর ঝরিয়েছে। কেউই জাতীয় সীমানা পরিবর্তনের চেষ্টা করছে না।

তিনি বলেন, ভারতের স্বাধীনতার জন্য বাঙালিদের মতো অন্য কেউই আত্মত্যাগ করেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশপ্রেম নিয়ে কোনো বক্তৃতার প্রয়োজন নেই আমাদের।

দে বলেন, ভারত সরকারের তথ্যে দেখা যায়, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারের ঐতিহাসিক সেকুলার জেলে যে ৫৮৫ জন বন্দী যাবজ্জীবন সাজা খেটেছিল তার ৩৯৮ জনই ছিল অবিভক্ত বাংলার বাঙালি।

তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের সাহসী ছেলেদের কেউই ব্রিটিশদের কাছে অনুকম্পা চায়নি এবং হিন্দুত্ববাদী গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকারের মতো মুক্তি প্রার্থনা করেনি। তারা সবই নির্যাতিত হয়েছে, কিন্তু নত স্বীকার করেনি। অথচ আজ পোর্ট ব্লেয়ারের নামকরণ করা হয়েছে সাভারকারের নামে, ধর্ষণকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে যৌক্তিক করাও হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তৃণমূল সমর্থক মনোজিত মণ্ডল উল্লেখ করেছেন যে বাঙালিদের একটি বড় অংশ আগ্রাসী গেরুয়া আক্রমণের মুখে তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি হুমকির মুখে পড়েছে মনে করে।

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বাংলা একটি জোরালো সমন্বয়বাদী, আন্তঃধর্মীয় সংস্কৃতি হওয়ায় এর ওপর গেরুয়া হামলায় আমরা ক্ষুব্ধ। রামমোহন রায় ও অমর্ত্য সেনের মতো আমাদের আইকনদের যখন অপমান করা হয়, তখন আমরা কিভাবে তা বরদাস্ত করতে পারি। হিন্দির বিরুদ্ধে এই প্রতিক্রিয়া রাজনীতির চেয়ে সাংস্কৃতিক কারণই বেশি। কেন্দ্রীয় সরকার যদি পরিস্থিতিকে ভুল বুঝে থাকে, চাপ দিতে থাকে, তবে এই হালকা প্রতিক্রিয়া বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নেবে।

তিনি নির্বাচনের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বাংলার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাশ্মিরের চেয়ে খারাপ’ বলে দেয়া বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, সহজাত অসততাই এ ধরনের বক্তৃতা করার কারণ। এ ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করবে।

তিনি বলেন, আমাদের কাছে রামের চেয়ে রামমোহন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) আওতায় আনার বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির জবাবেও বাঙালি পরিচিতি আন্দোলনের জনপ্রিয়তা লাভের একটি কারণ।

আসামে এখন এনআরসি হালনাগাদ করা হচ্ছে। এনআরসির চূড়ান্ত খসড়ায় প্রায় ৪০ লাখ বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম বাদ পড়েছে। ভারতে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এটা।

এনআরসির চূড়ান্ত খসড়ায় নাম না থাকায় ৫১ জন বাঙালি (মুসলিমের চেয়ে হিন্দু বেশি) আত্মহত্যা করেছে। তারা ভারতীয় নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় শঙ্কিত।

Friday, July 26, 2019

সামাজিক বয়কট অবজ্ঞা করে মুসলিম পরিবারকে আশ্রয় দিলেন বাঙালি ব্রাহ্মণ পুরোহিত by সুবীর ভৌমিক

আমরা এখানে যার কথা বলছি, তিনি ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে ক্যারিশমেটিক নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু নন। এই সুভাষ এক গরিব বাঙারি ব্রাহ্মণ। তিনি স্বামী পরিত্যক্তা এক মুসলিম নারী ও তার দুই সন্তানকে আশ্রয় প্রদান করার জন্য তার জীবিকা হারিয়েছেন।

সাকিনা বিবি ও তার সন্তানদের তাড়িয়ে না দিয়ে সুভাষ রায়চৌধুরী এমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ভারতে যেখানে বিশেষ করে ২০১৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দেশজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ অপরাধ তীব্রভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

পেশায় হিন্দু পুরোহিত সুভাষের আয় আসে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় তার পৈত্রিক গ্রাম চোওয়ায় হিন্দুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে।

চলতি বছরের প্রথম দিকে তার মেয়ে কাকলী (তিনি তালাকপ্রাপ্তা) সুভাষকে অনুরোধ করেন সাকিনা বিবি ও তার সন্তানদের আশ্রয় দিতে। স্বামীর তাড়িয়ে দেয়া সাকিনা ও তার সন্তানেরা তখন আশপাশের এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সুভাষ ও তার স্ত্রী ইলা তৎক্ষণাতই তাতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু সাথে সাথেই অন্যান্য গ্রামবাসী ঝামেলা সৃষ্টি করেন।

সাউথ এশিয়ান মনিটরকে সুভাষ রায়চৌধুরী বলেন, তারা আমাকে বলল, ঠাকুরমশাই, আমাদের পূজায় আর আপনাকে ডাকব না। আমি জানতাম যে এক মুসলিম নারী ও তার সন্তানদের আশ্রয় দেয়ায় তারা কষ্ট পেয়েছে। এই সময়ে ধর্ম অনেক আবেগ উস্কে দেয়। কিন্তু আমার কাছে গৃহহীন, অরক্ষিত এক নারীই আসল ধর্ম। সে মুসলিম না হিন্দু তা আমার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়।

তিনি বলেন, তার স্ত্রী ও মেয়েও সাকিনা বিবি ও তার সন্তানদের তাদের বাড়িতে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইলা বলেন, তারা এখন আমার পরিবারের সদস্য। আমরা যা পারি তা ভাগাভাগি করে নেই। অবশ্য গ্রামবাসীরা পূজা করতে না চাওয়ায় আমার স্বামী কঠিন অবস্থায় পড়ে গেছে।

সাকিনার প্রতি সুভাষ ও ইলা প্রবল অনুরাগ থাকার কারণ তাদের মেয়ে কাকলীও বিয়ে ভাঙার পর একই ধরনের দুর্ভোগে পড়েছিল।

সুভাষ বলেন, বিয়ে ভাঙার পর একটা মেয়ে কত দুর্ভোগে পড়ে, তা আমরা জানি। এ কারণে সাকিনা যত দিন কোনো আশ্রয় ও জীবিকা না পাবে, তত দিন আমরা তাকে আশ্রয় দেব।

সাকিনা বলেন, রায়চৌধুরীরা তার ধর্মকর্ম পালনে কোনো বাধা দিচ্ছেন না।

তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসে আমি রোজা রেখেছি। তারা এমনকি তাদের সামান্য আয় থেকেই আমার জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এখন পর্যন্ত সাহায্য নিয়ে কোনো রাজনীতিবিদ রায়চৌধুরীর কাছে যায়নি। কেবল হরিহর্পার (গ্রামটি এর আওতায়) ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার পূর্ণেন্দু সান্যাল সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন।

সান্যাল বলেন, যে কাজ করেছে তারা তার জন্য আমি সব গ্রামবাসীকে সুভাষ ও তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে বলেছি। তাদেরকে সুভাষ যাতে পূজা করা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে সুযোগ দিতেও তাদের বলেছি। পরিবারটি বিরলভাবে ঈশ্বরের সেবা করছে।

স্থানীয় প্রশাসন এখন পর্যন্ত রায়চৌধুরীদের ২৫ কেজি চাল ও অন্যান্য সামগ্রী এবং স্থানীয় একটি কলেজ দিয়েছে ৫ হাজার রুপি।

কোনো কোনো নেতা এই ঘটনার উল্লেখ করে বলছেন যে বাঙালি সমাজে সেক্যুলার ও উদার মূল্যবোধ যে কতটা গভীর, এটিই তার প্রমাণ।

বাংলা পক্ষের নেতা গর্গা চ্যাটার্জি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গেরুয়া আক্রমণ শানালেও বাংলা এখনো সামাজিক আধুনিকতার দিকে থেকে বাকি ভারত থেকে এগিয়ে রয়েছে।

বাঙ্গালী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঘনঘন প্রাথমিক ব্রিটিশ শাসনের সময় সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াইকারী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে জনপ্রিয় সিরিয়াল প্রচার করছে।

বিশ্লেষক সুখোরঞ্জন দাসগুপ্ত বলেন, সিরিয়ালে যখন রাজা রামমোহন বা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে রক্ষণশীল পুরোহিতদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখা যায়, তখন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বাংলার মহান ঐতিহ্যের সংগ্রামের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তিনি এসএএমকে বলেন, এই লড়াইটি আবার এখন লড়তে হবে।

পায়েল রোহত্যাগির মতো গেরুয়া বা হিন্দুত্ববাদী সমর্থকেরা রাজা রামমোহনকে ব্রিটিশদের চামচা বলে গালি দিয়েছিলেন। এতে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।

কলকাতায় বিজেপির সভাপতি অমিত শাহের রোডশোয়ের সময় বিজেপি কর্মীদের কথিত বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটলে লোকসভার নির্বাচনের শেষ ধাপের ৯টি নগর আসনের সব কটিতেই বিজেপি হেরে যায়।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম এমপি নুসরাত জাহান হিন্দু ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রায় অংশ নিলে গেরুয়া সমর্থকেরা একদিকে যেমন স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক খেলা হিসেবেও অভিহিত করেছে। এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে বিয়ে করা নুসরাত জানিয়েছেন, তিনি শৈশব থেকেই তার বাবার সাথে রথযাত্রায় যেতেন, মেলা থেকে খেলনা কিনতেন, মিষ্টি কিনতেন।

পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, নুসরাতের রথযাত্রা যদি সেক্যুলার ঘটনা হয়ে থাকে, তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সমালোচনা কেন হয় ইফতার পার্টিতে যাওয়ার জন্য?

তিনি বলেন, আসল কথা হলো, বাংলার সংস্কৃতি হলো আন্তঃধর্মীয় ও সমন্বয়বাদী। বাকি দেশ যদি তা বুঝতে না পারে, তবে তা আমাদের সমস্যা নয়।

তিনি বলেন, বাংলার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা উদযাপনে গঠিত অনেক কমিটির প্রধান থাকেন মুসলিম সামাজিক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। আবার ঈদ অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন অনেক হিন্দু।

বিজেপি-আরএসএস পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ আনছে তীব্রভাবে। কিন্তু তিনি জোরালোভাবে তার কার্যক্রমকে সমর্থন করে যাচ্ছেন এই বলে যে তিনি বাংলার সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি বজায় রাখছেন।