Wednesday, August 14, 2024

‘পুলিশের সাঁজোয়া যান থেকে একজন জীবন্ত মানুষকে এভাবে কোনো মানুষ ফেলে দিতে পারে না’ by মানসুরা হোসাইন

পুলিশের একটি সাঁজোয়া যানের ওপর থেকে একজনকে টেনে নিচে ফেলা হলো। তিনি সাঁজোয়া যানের চাকার কাছে সড়কে পড়ে থাকেন। এরপর পুলিশের এক সদস্য সাঁজোয়া যান থেকে নিচে নামেন। এক হাত ধরে তাঁকে টেনে আরেকটু দূরে সড়কে ফেলে রাখেন। এখানেই শেষ নয়, পরে কয়েকজন পুলিশ মিলে তাঁকে টেনে সড়ক বিভাজকের ওপর দিয়ে ঠেলে অপর পাশে ফেলে দেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাভারের পাকিজা মডেল মসজিদের কাছে গত ১৮ জুলাই ঘটনাটি ঘটে।

যাঁকে ফেলে দেওয়া হয়, তাঁর নাম শাইখ আশহাবুল ইয়ামিন। তিনি রাজধানীর মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন, থাকতেন এমআইএসটির ওসমানী হলে। বাসা সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায়। তাঁকে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা ইয়ামিন নামেই ডাকতেন।

গতকাল মঙ্গলবার সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকার বাসায় বসে কথা হয় ইয়ামিনের বাবা মো. মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একজন জীবন্ত মানুষকে এভাবে কোনো মানুষ নিচে ফেলে দিতে পারে না। আমি কারও কাছে বিচার চাই না। জিডি করিনি। ছেলের লাশের পোস্টমর্টেম করাইনি। শুধু আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। সবাই দোয়া করবেন, আমরা যেন ধৈর্য ধরতে পারি।’

ইয়ামিনকে এভাবে ফেলে দেওয়ার ভিডিও তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। মহিউদ্দিন ভিডিওটি দেখেন ঘটনার দুই দিন পরে। অবশ্য বর্তমানে ফেসবুকে ভিডিওটি দেখা যাচ্ছে না। তবে অনেকেই ভিডিওটি ডাউনলোড করে রেখেছেন।

মহিউদ্দিন বলেন, তাঁর ছেলে ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে ফেসবুকে একেকজন একেকভাবে মনগড়া কথা বলেছেন। তিনি চান, তাঁর ছেলে সম্পর্কে সবাই সঠিক তথ্য জানুক।

ইয়ামিনের জন্ম ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। এই দুই পরীক্ষাসহ বাংলাদেশ কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড–গণিত অলিম্পিয়াডে পাওয়া সনদ ও বিভিন্ন কাগজপত্র গুছিয়ে রেখেছিলেন ইয়ামিন। বাবা মহিউদ্দিন ছেলের একেকটা সনদ দেখাচ্ছিলেন আর স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছিলেন।

ইয়ামিনের মা নাসরিন সুলতানা, তিনি গৃহিণী। বোন শাইখ আশহাবুল জান্নাত, তিনি পড়ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মা ও বোন ইয়ামিনকে নিয়ে কোনো কথা বলতে চাইলেন না।

সাভারের ব্যাংক টাউন আবাসিক এলাকায় ইয়ামিনকে কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁর কবরে একটি তুলসীগাছ ও একটি ফুলের চারা লাগিয়েছেন মা নাসরিন সুলতানা।

আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা শহীদ মিনারে ইয়ামিনের ছবি দিয়ে একটি ব্যানার টানানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ অন্যরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফুল দিচ্ছেন।

মহিউদ্দিন একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার মানে হলো আমৃত্যু কষ্ট। ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করার ভিডিও দেখাটা আরও কষ্টের।

ইয়ামিনের বাবার অভিযোগ, তাঁর ছেলে পুলিশের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ রাজনৈতিক দলের দাবার ঘুঁটি বানাক, তা আমরা চাই না। আমার ছেলে রাজনীতিসচেতন ছিল। আমিও রাজনীতিসচেতন। তবে কোনো দল করি না। ছেলে বুয়েট ও রংপুর মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েও পড়েনি। ছোটবেলায় পড়েছে সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে ভর্তি হয় এমআইএসটিতে। এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই রাজনীতি করার সুযোগ নেই।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘তবে আমরা ধার্মিক পরিবার। ছেলে নামাজ পড়ত। তার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছিল। এটা দেখে কেউ যদি আমার ছেলেকে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, জামায়াত-শিবির বা জামায়াত বানানোর চেষ্টা করে, তা তো আমরা হতে দেব না।’
সেদিন কী ঘটেছিল

মহিউদ্দিন বলেন, ফেসবুকে ভিডিওটি অনেকেই দেখেছেন। পরিবারের সদস্যরাও ভিডিওটি দেখেছেন। এর বাইরে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, তা এখন পর্যন্ত তাঁরা সুনির্দিষ্ঠভাবে জানেন না। ইয়ামিনের বন্ধুসহ অন্যদের মুখ থেকে ঘটনার টুকরো টুকরো খবর জানতে পারছেন।

১৭ জুলাই সকালে ইয়ামিন এমআইএসটির হল থেকে বাসায় ফেরেন। হল ছাড়ার নির্দেশনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইয়ামিনদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছিল। ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর তাঁর একটি লেখা থেকে এ কথা জানতে পারেন বাবা মহিউদ্দিন।

মহিউদ্দিন জানান, ইয়ামিন তাঁর মা ও বোনকে সব কথা বলতেন। তবে তাঁর সঙ্গে ছেলের সম্পর্কটা বন্ধুর মতো ছিল না। হল থেকে ছেলে বাসায় ফেরার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।

মহিউদ্দিন বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর ফেসবুকে কেউ কেউ বলেছেন, মারা যাওয়ার দিন ইয়ামিন রোজা রেখেছিলেন। এ কথাটা সত্য নয়।

ছেলের কবরের পাশে একটি বিড়াল বসে আছে, এমন একটি ছবি মহিউদ্দিন ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। এই ছবি দেখে অনেকে প্রচার করছেন, বিড়ালটি ইয়ামিনের ছিল। ইয়ামিন মারা যাওয়ায় তাঁর কবরের পাশে গিয়ে বসে আছে বিড়ালটি, এটিও সত্য নয়। বিড়ালটি আশপাশের কারও হতে পারে। সেদিন ইয়ামিনের কবরের পাশে বিড়ালটি বসে ছিল। এই দৃশ্য দেখে তাঁর এক ভাগনে ছবিটি তুলেছিলেন।

১৮ জুলাই মহিউদ্দিন বাইরে যাচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইয়ামিন দৌড়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, তাঁর কয়েকজন বন্ধু আন্দোলনে আহত হয়েছেন। মিরপুরের দিকে তাঁর পরিচিত কোনো হাসপাতাল আছে কি না, যেখানে বন্ধুদের ভর্তি করা যাবে।

মহিউদ্দিন ছেলেকে বলেছিলেন, মিরপুরে কোনো হাসপাতালে তাঁর পরিচিত কেউ নেই। তবে টেকনিক্যাল মোড়ের একটি হাসপাতালে আহত বন্ধুদের নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, এ কথা বলার পর ছেলে রাগ দেখান। সেটাই ছিল ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা।

১৮ জুলাই আন্দোলনে উত্তাল ছিল সাভার এলাকা। মহিউদ্দিন বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘরে ফিরে ছেলেকে বলি, শুধু ঢাকা নয়, সাভারেও তো গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। ছেলে এ কথা শোনার পর কোনো কথা বলেনি। বুঝতে পারি, পরিচিত হাসপাতালের ঠিকানা দিতে পারিনি বলে ছেলে রাগ করেছে। তবে ছেলেকে দেখে বুঝতে পারি, সে তার বন্ধুদের নিয়ে চিন্তা করছিল।’

এদিন মহিউদ্দিন জোহরের নামাজ পড়তে মসজিদে যান। ইয়ামিনও নামাজে যান। রোজা রাখায় মহিউদ্দিন মসজিদ থেকে কিছুটা দেরিতে বেলা ২টার দিকে বের হন। বের হয়ে দেখেন, মোবাইলে তাঁর স্ত্রীর দুটো মিসড কল। স্ত্রীকে ফোন দিলে তিনি জানান, ইয়ামিন বন্ধুদের দেখতে যাবে বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। তারপর ছেলেকে বাসার সবাই ফোন দিতে থাকেন। কিন্তু ফোন ধরেননি ইয়ামিন।

ইয়ামিনের বন্ধুরা সাভার ও মিরপুর এলাকায় থাকেন। সেদিন রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল। তাই মহিউদ্দিন বুঝতে পারছিলেন না, ছেলেকে খুঁজতে কোথায় যাবেন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাসায় টেলিভিশন নেই। তাই বাইরের কোনো খবর দেখতে পাচ্ছিলাম না। ইন্টারনেট কাজ করছিল না। তাই ফেসবুকেও কোনো খবর জানতে পারছিলাম না। অথচ ততক্ষণে অনেক কিছুই ঘটে গেছে।’

বেলা ৩টার দিকে ইয়ামিনের মাকে একজন ফোন করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে যেতে বলেন। মহিউদ্দিন বলেন, ‘তখন মনে করেছি, ছেলে হয়তো আহত হয়েছে। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন পথ ঘুরে হাসপাতালে যাই। ছেলের নাম শুনে একজন বলেন, ওটিতে (অস্ত্রপচারকক্ষ) যান। সেখানে যাওয়ার পর আরেকজন নিচতলায় যেতে বলেন। এক নারী চিকিৎসক এসে ইয়ামিনের মাকে জড়িয়ে ধরেন। তখনো ছেলের মৃত্যুর কথা চিন্তা করিনি।’

মহিউদ্দিন জানান, ওই নারী চিকিৎসক তাঁদের একটি তালা দেওয়া রুমের সামনে নিয়ে যান। সেখানে শিক্ষার্থীদের অনেক জটলা ছিল। তালা খুললে দেখা গেল, একটি স্ট্রেচারে ইয়ামিন শুয়ে আছেন। তখন জানা গেল, এই হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর ছেলে মারা গেছেন। এখানে কোনো চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগই পাননি চিকিৎসকেরা। ছেলের বন্ধুরা জানান, ইয়ামিনকে প্রথমে বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ক্লিনিক ভর্তি করতে রাজি হয়নি।

এই বাবা বলেন, ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, ইয়ামিনকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় কেউ কেউ তাঁকে চোখ খোলা রাখতে বলছিলেন। ছেলে তখনো জীবিত ছিলেন।
‘ইয়ামিন সাহসী ছিল’

পারিবারিক সিদ্ধান্তে ইয়ামিনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়নি বলে জানান মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, তাঁরা ছেলের লাশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের করতে চাইছিলেন। তখন বাইরে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে বলে হাসপাতালের কেউ কেউ লাশ দিতে ভয় পাচ্ছিলেন। কেউ কেউ লাশ বের করতে বাধাও দেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ইয়ামিনের লাশ নিয়ে মিছিল করতে চাচ্ছিলেন। তখন ছেলের এক বন্ধুর সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স এনে দ্রুত লাশ বাসায় আনা হয়।

মহিউদ্দিন বলেন, ছেলেকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কুষ্টিয়া থেকে এক আত্মীয় ফোন করে জানান, স্থানীয় থানা থেকে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া লাশ দাফন করা যাবে না। দেশের পরিস্থিতিও এমন ছিল যে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া বা কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় যাওয়া-আসার মতো অবস্থা ছিল না। সাভারে লাশ দাফনের ক্ষেত্রেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন লাগবে বলে থানা থেকে জানানো হয়। পরে এক পুলিশ বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করলে তিনি জানান, পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করলে কোনো সমস্যা হবে না। তাই সাভারের এই আবাসিক কলোনির কবরস্থানেই ছেলেকে দাফন করা হয়।

মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগপর্যন্ত তাঁর কাছে আওয়ামী লীগের নেতাসহ বিভিন্নজন ফোন করে ছেলের সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে চান। কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পুলিশ যায়। খোঁজখবর নেয়।

মহিউদ্দিন গর্ব করে বলেন, তাঁর ছেলে সাহসী ছিলেন। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করতেন। ক্লাসে এক শিক্ষককে ইয়ামিন সরাসরি বলেছিলেন, তাঁর পড়ানো হচ্ছে না। দুই দিন পরে সেই শিক্ষক স্বীকার করেছিলেন, তিনি যেভাবে পড়াচ্ছিলেন, তা ঠিক ছিল না।

ইয়ামিন মেধাবী ছিলেন বলে জানান তাঁর বাবা। তিনি বলেন, বন্ধুরা কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে ইয়ামিন বুঝিয়ে দিতেন। ইয়ামিন বিতর্ক করতেন। এমআইএসটিতে বিতর্ক ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়ামিন। ছেলে বড় হলেও অবসরে ছোট বাচ্চাদের মতো ‘টম অ্যান্ড জেরি’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কার্টুন দেখতেন বলে জানান বাবা।

মহিউদ্দিন জানান, অনেক আগে থেকেই তিনি তাঁর বাবার নামে একটি ফাউন্ডেশন করার কথা চিন্তা করছিলেন। ইয়ামিন মারা যাওয়ার পর ঠিক করেছেন, ছেলের নামে একটি ফাউন্ডেশন করবেন। এই ফাউন্ডেশনে কেউ সহায়তা করলে তা ছাত্র আন্দোলনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবার বা আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে।

কথা শেষে ফিরে আসার সময় মুঠোফোনে ছেলের লাশের ছবি দেখিয়ে এই প্রতিবেদককে মহিউদ্দিন বলেন, ‘একদম কাছ থেকে টার্গেট করে ইয়ামিনকে রাবার বুলেট মারা হয়েছে। এই যে দেখেন, বুকের বাঁ পাশে এক জায়গায় অনেকগুলো বুলেটের আঘাত। তারপর তাকে সাজোয়া যান থেকে ফেলে দেওয়া হয়।’

{প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সাভারে কর্মরত প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান}

হাসিনার গোপন কারাগার ‘আয়নাঘরের’ বর্ণনা দিলেন গুম হওয়া ব্যারিস্টার

নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে ভিন্ন মতালম্বীদের কঠোরভাবে দমন করেছিলেন বাংলাদেশের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত নেতা শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে গুম, খুন অনেকটাই স্বাভাবিক রীতি নীতিতে পরিণত হয়েছিল। ২০১৬ সালে জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাসেমকে গুম করা হয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত হাসিনার গোপন কারাগারে। যেখানে তিনি দীর্ঘ ৮ বছর বন্দী ছিলেন। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে লুক্সেমবার্গভিত্তিক গণমাধ্যম আরটিএল আহমদ বিন কাসেমের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়েছে, চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে ব্যারিস্টার আহমদকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল হাসিনার ওই গোপন কারাগার থেকে। বের হওয়ার সময় তিনি গুলির আওয়াজ শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমনভাবে আহমদকে বের করা হয়েছিল যেন তিনি শ্বাস রোধ হয়ে মারা যাচ্ছিলেন। পরে তিনি টের পেলেন কর্দমাক্ত একটি ময়লা খাদে তাকে ফেলে দেয়া হয়েছে। তখনও তিনি জানতে পারেননি এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা এবং আহমদ সম্পূর্ণরূপে মুক্তি পেয়েছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে ৪০ বছর বয়সী আহমদ বলেছেন, আট বছরের মধ্যে তিনি কোনো প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ছোঁয়া পাননি। তিনি ভেবেছিলেন তারা তাকে হত্যা করবে। তিনি এটাও জানতেন না তাকে হাত, চোখ বেঁধে নিয়ে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। ৫ আগস্ট ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এই দিনও গুম হওয়া আহমদ অন্ধকার সেই আয়নাঘরেই ছিলেন। সেনাবাহিনীর গোয়েন্দারা ছাড়া ওই গোপন কারাগারের খবর কেউই জানতেন না। বন্দী ছাড়া কারো সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় সেখানে ছিল না বলে জানিয়েছেন আহমদ। দীর্ঘ ৮ আট বছর তিনি সেখানে একটি কক্ষে আটক ছিলেন। আয়নাঘর সম্পর্কে যেন কেউ কোনো তথ্য না পায় সে বিষয়ে গোয়েন্দারা কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন।
আহমদ বলেছেন, তিনি আয়নাঘর থেকে বাহিরের আযান শুনতে পেতেন। সেখানে উচ্চ আওয়াজে মিউজিক বাজানো হতো। মূলত আজান শুনে শুনে দিন রাতের পার্থক্য করতেন আহমদ। তবে সেখানে তিনি ঠিক কত দিন অতিবাহিত করেছেন সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা তার ছিলনা। মিউজিক বন্ধ হলেই তিনি অন্য বন্দীদের চিৎকার শুনতে পেতেন। আহমদ বলেছেন, ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারি সেখানে আমি একা নই। আমি সেখানে প্রতিনিয়ত অন্য বন্দীদের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতাম। সম্ভবত সেখানে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বন্দীরা চিৎকার করত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর হাসিনা ছয় শতাধিক লোককে জোরপূর্বকভাবে গুম করেছে। ২০২২ সালে একটি গণমাধ্যমে আয়নাঘর সম্পর্কে খবর প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত হাসিনার ওই গোপন কারাগার সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই ছিলনা। আয়নাঘর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর হাসিনা সরকার তা অস্বীকার করেছিল। এছাড়া তারা গুমের বিষয়টিও অস্বীকার করে আসছিল। সেসময় বলা হয়েছিল যারা নিখোঁজ হয়েছে তারা অবৈধ উপায়ে ইউরোপে পারি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন।

আহমদের বাবা জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। যে বছর মীর কাসেম আলীকে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর করে হাসিনা প্রশাসন সেবছরই আহমদকে গুম করা হয়েছিল। সরকার জামায়াতের ওই নেতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির কথা বললেও এ নিয়ে বেশ মতবিরোধ রয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেছেন হাসিনা বিরোধী মতকে দমন করতে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মীর কাসেম আলী সহ জামায়াতের অন্যান্য নেতাদের ফাঁসি কার্যকর করেছে। কাসেম আলী দোষী কিনা এ বিষয় পর্যবেক্ষণের জন্য সেসময় আদালতের বিচারিক কার্যে কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল জড়িত ছিলনা। আহমদ তার বাবার বিচারিক কার্যক্রমে আইনি লড়াই করতে লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ৩২ বছর। সেসময় ট্রইব্যুনালের বিভিন্ন পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং বিচারিক পক্ষপাতের বিষয়ে গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে উঠে আসে।
এক রাতে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন আহমদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তার পরিবারের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাকে সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে একটি গাড়িতে তোলা হয়। আহমদ বলেছেন, আমি কখন স্বপ্নেও আমার এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারিনি। আমি বুঝতে পারিনি বাবার ফাঁসির কয়েক দিন আগে আমাকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। ‘আমি তখন বারবার তাদের বলছিলাম আপনারা কি জানেন আমি কে? মামলা পরিচালনার জন্য আমাকে বাবার ওখানে থাকতে হবে।’ আহমদকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চার সপ্তাহ পর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
আহমদকে কর্দমাক্ত নর্দমায় ফেলে যাওয়ার পর তিনি তার বাড়ির পথ খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। পরে তিনি তার বাবার প্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতালের খোঁজ পান এবং সেখানে যেয়ে তিনি তার পরিচয় দেন। হাসপাতালটির এক স্টাফ তার পরিচয় শনাক্ত করতে পেরে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। হাসপাতালে উপস্থিত লোকজনের কথা শুনে আহমদ জানতে পারেন সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনের কথা। যার ফলে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। আহমদ বলেছেন, দেশের তরুণদের কারণে আমি মুক্তি পেয়েছি। আমি যখন এই তরুণদের দেখি যে তারা দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তখন আমি বাংলাদেশের সঠিক গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি। আহমদ পরিবারের কাছে ফিরে আসলেও তার মানসিক অবস্থা এখনও খারাপ বলে জানিয়েছে তার পরিবার।


বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে বেইজিংকে চাপ দিচ্ছে চাইনিজ মিডিয়া -ডেকান হেরাল্ডের নিবন্ধ by গুঞ্জন সিং

মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য প্রস্তাবিত চাকরির কোটার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। যার শেষটা হয় শেখ হাসিনার পতন এবং নির্বাসনের মাধ্যমে । দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হতে শুরু করে। বর্তমানে  নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে । অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক  লক্ষ্য  দেশে  আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা । বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ তৌহিদ হোসেন বলেছেন, “আমরা সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাই। বড় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।”

বাংলাদেশের অস্থির পরিস্থিতি গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে সজাগ করে দিয়েছে  । এটি ভারত ও চীনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের চাপ সামলাতে পেরেছিলো। বেইজিংয়ের নিরন্তর চাপের মধ্যে তিস্তা নদী প্রকল্পর সম্প্রসারণ এবং ভারতের সাথে মংলা বন্দর প্রকল্প ছিল  হাসিনার  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং ঢাকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির উদাহরণ।

হাসিনা নির্বাসনের পর  'সেফ প্যাসেজ'   হিসাবে ভারতকে বেছে নিয়েছেন  এবং এটি নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে। হাসিনা যত বেশি সময় ভারতে থাকবেন, নয়াদিল্লির জন্য তত বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর রায় যেমন বলেছেন,'বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক  থাকা উচিত বলে মনে করে বিএনপি। ভারত সরকারকে এই মানসিকতা  বুঝতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে।  আমাদের প্রতিপক্ষকে সমর্থন করা সেই সহযোগিতার পথকে  জটিল করে তুলতে পারে। '

বাংলাদেশে চীনের বড় অংশীদারিত্ব থাকায় বিক্ষোভ ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বেইজিংয়ের অবস্থান কী  তাও দেখতে হবে।বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) শরিক হবার পর বেইজিংয়ের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। হাসিনা ভারত ও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু তার মেয়াদে চীনা বিনিয়োগে বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। ভারতে  থেকে হাসিনা চীনকে তার নিরপেক্ষতা জাহির করতে এবং নতুন সরকার ও বিএনপির দরজায় পা রাখার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ করে দিতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর  এক বিবৃতিতে বেইজিং জোর দিয়ে বলেছে, “চীন কঠোরভাবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে।আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব , আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং বাংলাদেশি জনগণের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত উন্নয়নের পথকে সম্মান করি। আমরা বাংলাদেশের সকল জনগণের সাথে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ  এবং বন্ধুত্বের নীতিতে অটল আছি। '

অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে চীনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি হলো  'দেখা এবং অপেক্ষা করা'। চীনা গণমাধ্যম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আশা প্রকাশ করেছে যে, "বাংলাদেশের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং   কৌশলগত অংশীদার হিসাবে, চীন আন্তরিকভাবে আশা করে যে দেশে শীঘ্রই সামাজিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব  হবে।"চীনের মিডিয়া নিবন্ধগুলি প্রকাশ্যে যুক্তি দিয়েছে যে বেইজিংয়ের সাথে কাজ করা ঢাকার পক্ষে উপযোগী  হবে। ফুদান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ডেপুটি ডিরেক্টর লিন মিনওয়াংকে উদ্ধৃত করে গ্লোবাল টাইমসের একটি প্রতিবেদনে  যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে -' চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, বিশেষ করে যে দেশের  অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্র  বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছে নেই , তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার কথা সবাই জানে। '

চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ২৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এর মধ্যেই  বিক্ষোভের জেরে  চীনা কোম্পানিগুলো শ্রমিক এবং  সরঞ্জামের নিরাপত্তার কথা ভেবে  উদ্বিগ্ন।  স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে  যে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চীনের জন্যও  কতটা গুরুত্বপূর্ণ।গ্লোবাল টাইমস এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছে যে বিক্ষোভের পিছনে সম্ভাব্য পশ্চিমা প্রভাব থাকতে পারে। বেইজিং তার মিডিয়াকে  ব্যবহার করে বাংলাদেশ ইস্যুতে  পশ্চিমা এবং ভারতীয় সম্পৃক্ততার প্রতিবেদন তুলে ধরে  বেইজিংয়ের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে চাইছে , তাদের দাবি এই কারণে ঢাকার উচিত বেইজিংকে স্বাগত জানানো ।

ভারতে হাসিনার উপস্থিতি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অব্যাহত সুসম্পর্কের মধ্যে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে । এটি এমন একটি বিষয় যা চীন  তার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে কাজে লাগাচ্ছে। এটি বেইজিংকে বাংলাদেশে  পদচারণার বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে  নয়াদিল্লি এখনো নিজের প্রচেষ্টা জারি রেখেছে।

লেখক  গুঞ্জন সিং ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে -সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভের নিবন্ধ by জন ড্যানিলোভিজ

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে এবং তার মন্ত্রিসভাকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমেই ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার করতে গিয়ে যে ভুলগুলো করেছিল সেগুলো মনে রাখতে হবে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতারা সেইসময়ে ভুলগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। আর তাই অতীতকে মনে রেখে, অধ্যাপক ইউনূস এবং তার সরকারকে বাংলাদেশকে আরও প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যতের পথে নিয়ে যাবার সুযোগটিকে সম্পূর্ণরূপে কাজে লাগাতে হবে।

প্রথম এবং সর্বাগ্রে বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পরামর্শ হলো, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর উপর তাদের আধিপত্য জাহির করা। যদি এটি সম্ভব না হয়, তাহলে সামরিক বাহিনী আবার দেশ শাসন করার চেষ্টা করতে পারে। ২০০৭-০৮ সালে বাংলাদেশে বা বিদেশে কেউ আসলে বিশ্বাস করেনি যে, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমেদ বা তার সহকর্মীরা গুলি চালাতে পারেন। যদিও কিছু উপদেষ্টা সেই প্রশাসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান এবং ইউনিফর্ম পরা অধস্তনদের একটি ছোট বৃত্ত (যারা প্রায়শই তাকে পরস্পরবিরোধী পরামর্শ প্রদান করে এসেছেন)  সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর কোনো ভূমিকা নেই। বরং সামরিক বাহিনীকে অবশ্যই বেসামরিক সরকারের অধীনস্থ হয়ে কাজ করতে হবে। ২০০৭-০৮ সালে হাইব্রিড সরকারের অংশ হিসাবে, সংস্কারের মূল (দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং রাজনৈতিক দলের সংস্কার সহ) দায়িত্ব সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন ব্রিগেডিয়ারকে দেয়া হয়েছিল। এর ফলে কুখ্যাত ‘মাইনাস টু’ নীতি তৈরি হয়েছিল যা ব্যর্থ হওয়ায় যারা সংস্কারে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল তাদের দুর্বল করে দেয়া হয়। আত্মবিশ্বাসের সাথে কাজে যোগ দিলেও শেষপর্যন্ত  ব্রিগেডিয়াররা অনেক ধূর্ত রাজনীতিবিদদের দ্বারা চালিত হয়েছিলেন ।

আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিদেশি কর্মকর্তাদের সাথে তার নিজের নাগরিকদের সম্পৃক্ত  করতে অনিচ্ছুক ছিলেন অন্তর্মুখী প্রধান উপদেষ্টা। যদিও ২০০৭-০৮ সরকারের হাতে পররাষ্ট্র বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, তবুও খুব শীর্ষস্তরে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভাব (কখনও কখনও প্রোটোকল উদ্বেগের কারণে) তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বোঝার বা সহায়তা করার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। বিপরীতে সেনাপ্রধান অনেক বেশি অ্যাক্সেসযোগ্য ছিলেন এবং এই ধারণাটি আরও শক্তিশালী করেছিলেন যে তিনি একজন ‘সাধারণ মানুষ’।

সবশেষে বলতে হয়, ২০০৭-০৮ সালের সরকার খুব দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন সময়সীমার সমাপ্তি নির্ধারণ করে গুরুতর ভুল করেছিল। একটি শর্ত-ভিত্তিক সময়সূচীর উপর ফোকাস করার পরিবর্তে সেই সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উৎসাহে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ঘোষণা করেছিল। একবার এটি ঘটলে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণি জানতো কী করতে হবে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, লিভারেজ সরকার থেকে  সংস্কারহীন রাজনৈতিক শ্রেণির কাছে দায়িত্ব  হস্তান্তর করা হয়েছে, যারা জানে যে পরিবর্তনের দাবি মানে শুধু মুখের কথা।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।শেখ হাসিনা যেমন তার শাসনের অবসান ঘটতে পারে এমন পূর্বাভাস পাননি, তেমনি সব সরকারকে অবশ্যই জরুরি অবস্থা মোকাবেলা করতে হবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলেও ২০০৭-০৮ সালের সরকার এটি শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে পারেনি।  পৃথিবীর বুকে আজ এমন কিছু ঘটছে যা ইঙ্গিত দেয় যে আগামী মাস এবং বছরগুলো সাম্প্রতিক অতীতের চেয়ে  স্থিতিশীল হবার সম্ভাবনা কম।

-লেখক জন ড্যানিলোভিজ সাউথ এশিয়া পার্সপেক্টিভের সম্পাদক এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তৃত অভিজ্ঞতাসহ  স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক সিনিয়র ফরেন সার্ভিস অফিসার।

নারী স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দাবিতে আজ কলকাতায় 'রাত দখলের ডাক' by সেবন্তী ভট্টচার্য

পেছনে গাঢ় কালো অন্ধকার। সামনে রক্ত-রাঙা হাতে জ্বলজ্বল করছে একটা কাস্তে। যেন রাতের অন্ধকার চিড়ে জেগে উঠছে শানিত হাতিয়ার। এবার রাতের দখল নিচ্ছে মেয়েরা। আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদে পথে নেমেছে চিকিৎসক থেকে সাধারণ মানুষ। একইসঙ্গে দাবি উঠেছে নারী স্বাধীনতারও। প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে গোটা দেশ। দোষীদের কঠিন-কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে সর্বত্র।  আহ্বানকারীদের স্লোগান একটাই 'জাস্টিস ফর আর জি কর।' প্রাক-স্বাধীনতার রাতে, রাজ্যজুড়ে বিশাল অরাজনৈতিক জমায়েতের ডাক দেওয়া হয়েছে। যে রাতে ভারত স্বাধীন হয়েছিল, এবার সেই রাতেই নারী স্বাধীনতার ডাক। বুধবার ঠিক রাত ১১.৫৫ মিনিটে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে এই কর্মসূচি ডাকা হয়েছে। তবে শুধু রাজ্যেই নয়, নির্যাতিতার  বিচার ও নারীর স্বাধীনতার দাবিতে ভারতের  বিভিন্ন প্রান্তেও উঠল রাত দখলের ডাক। মুম্বই ও বেঙ্গালুরুতেও আজ রাত দখল হবে।

রাত দখলের ডাক ছিল প্রথমে কলকাতার কয়েকটি অংশে। কিন্তু সমর্থন বাড়তেই তার বিস্তারও বাড়ে। জমায়েতের তালিকায় আরও জায়গা সংযোজন হয়। বিভিন্ন জেলাতেও রাত দখলের ডাক দেওয়া হয়েছে। এবার রাজ্যের গণ্ডি পার করেও পৌঁছল রাত দখলের ডাক।  

গত  বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আরজি কর হাসপাতালে ঘটে যায় নারকীয় সেই ঘটনা। তরুণী চিকিৎসকের ওপর পাশবিক অত্যাচারের ঘটনা সামনে আসার পর ফের একবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে নারী নিরাপত্তা। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ডাক দেওয়া হয়েছে, 'মেয়েরা রাত দখল করো...The Night Is Ours।  সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের বেগে ভাইরাল হয় এই আহ্বান। তাতে সাড়া দেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। পুরুষ-নারী, নবীন-প্রবীণ নির্বিশেষে। তাতে সাড়া দেন তারকারাও। রিপোস্ট করেন। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।  জমায়েতের ক্ষেত্রে যেমন রাজনৈতিক সংগঠনের পতাকা ‘নিষিদ্ধ’। আবার কোথাও বলা হয়েছে ‘রাজনৈতিক স্লোগান’ দেয়া যাবে না। শুধুমাত্র আরজি কর-কাণ্ডে নিহত চিকিৎসকের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি এবং নারীদের  নিরাপত্তার দাবিতেই স্লোগান সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কোথাও  বলা হয়েছে  মেয়েরাই শুধু   জমায়েতে আসুন। পুরুষদের আসার প্রয়োজন নেই।

এক ভুক্তভোগীর বিবরণে গোপন বন্দিশালায় ৯৪ দিন -প্রথম আলো

প্রথম আলোঃ উত্তর-দক্ষিণে ছয় কদম। আর পূর্ব-পশ্চিমে চার কদম। এই হলো একটি কক্ষের আকার। ছাদ অনেক উঁচুতে। সেখানে সারাক্ষণ জ্বলে থাকে একটি বাতি। একটি ছোট খাটে বিছানা পাতা। পাশেই প্রস্রাব করার জন্য প্লাস্টিকের দুটি পাত্র রাখা। দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করে নানা লেখা। কেউ লিখেছে পরিবারের ফোন নম্বর। খোঁজ জানানোর আকুতি। কেউ দাগ দিয়ে দিয়ে হিসাব করেছে বন্দিদশার দিনপঞ্জি।

এমন একটি ঘরেই ৯৪ দিন কাটানোর কথা জানিয়েছেন সাবেক সেনাসদস্য মো. মুকুল হোসেন। তিনি বলেছেন, কেন তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, কেন রাখা হয়েছিল অমন ঘরে, তা আজও তিনি জানেন না। সরকার পরিবর্তনের পর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে তিনি এসেছেন প্রথম আলোয়।

১৩ আগস্ট কথা হয় মুকুল হোসেনের সঙ্গে। বেশ কিছু কাগজপত্রও নিয়ে এসেছেন তিনি। এতে দেখা যায়, স্বামীকে ফিরে পেতে ২০১৯ সালের ৫ মার্চ ডিবি কার্যালয় ও ১০ মার্চ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর আবেদন করেছিলেন মুকুলের স্ত্রী জিয়াসমিন আরা। এ বিষয়ে ‘ডিবি পরিচয়ে সাবেক সেনাসদস্যকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ’ শিরোনামে প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ১০ মার্চ। ওই বছরের ১৮ মার্চ র‍্যাব সদর দপ্তরেও আবেদন করেন জিয়াসমিন। ‘নিখোঁজের তিন মাস পর থানায় দিল র‍্যাব’ শিরোনামে প্রথম আলোয় আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ওই বছরের ১৫ মে। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন মুকুল। তাঁর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয় ওই ডায়েরিতে। ওই ডায়েরিতে উল্লিখিত বিবরণ ও মুকুল হোসেনের কথায় এ ঘটনার আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।
মধ্যরাতে তুলে নিয়ে নির্যাতন

২০০৩ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর করপোরাল পদে থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন মুকুল। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন আশুলিয়ায়। ভারতে বেড়াতে যাওয়ার ভিসা নিয়ে পরামর্শ করতে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কলাবাগানে যান এক বন্ধুর বাসায়। বন্ধু আশিস বিশ্বাসের ওই বাসা মূলত ছাত্রদের মেস। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে চার থেকে পাঁচজন জন লোক এসে অস্ত্রের মুখে তুলে নেয় মুকুলকে। হাতকড়া লাগিয়ে, মাথায় কালো কাপড় মুড়িয়ে, চোখ বেঁধে ছয়তলা থেকে নিচে নামানো হয় তাঁকে। এরপর একটি মাইক্রোবাসে তুলে বেদম মারধর করা হয়। মাথায়, মুখে ও চোখে ঘুষি মারতে থাকে অনবরত। গাড়িটি চলতে শুরু করার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর থামে। গাড়ি থেকে নামিয়ে তিন থেকে পাঁচ কদম পার করে একটি কক্ষের মধ্যে নিয়ে বসানো হয় মুকুলকে।

মুকুলের বর্ণনায়, কক্ষটিতে অ্যারোসল ও এয়ারফ্রেশনারের গন্ধ ছিল। চোখ শক্ত করে বাঁধা। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আসেন। কী করেন, কয়টা মোবাইল, মোবাইলে কার ছবি, ভাই-বোন কী করে, মানিব্যাগে ব্যাংকের তিনটা কার্ড (ডেবিট) কেন, কোন ব্যাংক হিসাবে কত টাকা, এমন নানা প্রশ্ন করতে থাকেন ওই কর্মকর্তা। প্রশ্নের মধ্যেই লোহা–জাতীয় শক্ত কিছু দিয়ে দুই পায়ের ঊরুর ওপর ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে কেউ একজন। মুকুল প্রথম আলোকে বলেছেন, সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, কোনো মিথ্যা বলেননি। প্রায় ৩০ মিনিট পর থামে সেই নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ।
‘বাইরে লোকজনের চলাফেরা দেখা যেত, কারও চেহারা দেখা যেত না’

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুজন দুই পাশ থেকে ধরে আরেকটি কক্ষে নিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেন। সব পোশাক খুলে নিয়ে একটি লুঙ্গি ও লাল রঙের সোয়েটার পরতে দেওয়া হয়। নিজে নিজে পোশাক পরার মতো অবস্থা ছিল না। কক্ষটিতে একটি চৌকি (খাট), বালিশ, বিছানার চাদর ও দুটি কম্বল। পূর্ব-পশ্চিম কোনায় প্রস্রাবের দুটি পাত্র। তার ওপরের দিকে একটি ভেন্টিলেশন ফ্যান। বিকট শব্দে সারাক্ষণ চালু থাকত এটি। রুমের মাঝ বরাবর ওপরের ছাদে একটি এনার্জি বাল্ব ২৪ ঘণ্টা জ্বলত। কক্ষটির ভেতরে এক কোনায় ছিল একটি সিসিটিভি ক্যামেরা।

কক্ষটির দুটি দরজা; একটি লোহার ও অন্যটি কাঠের। কাঠের দরজার ওপরের দিকে গোল করে বড় ছিদ্র করা ছিল, যা একটি কাঠ দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। ইচ্ছা হলে কাঠ সরিয়ে কক্ষের ভেতরের অবস্থা দেখত বাইরে থেকে। লোহার দরজা থাকত সব সময় তালাবন্ধ। বাইরে লোকজনের চলাফেরা দেখা যেত। তবে কারও চেহারা দেখা যেত না, সব সময় মুখোশ পরে থাকতেন তাঁরা। ফজর, জোহর, আসর ও এশার নামাজের সময়; টয়লেট, অজু ও গোসলের জন্য চারবার বের করা হতো। এর বাইরে জরুরি টয়লেটে যেতে চাইলে লোহার দরজায় শব্দ করলে লোক এসে নিয়ে যেত। চোখ বেঁধে হাতে হাতকড়া লাগিয়ে টয়লেটে নেওয়া হতো। টয়লেটে নিয়ে হাত ও চোখ খুলে দেওয়া হতো। দরজার নিচ দিয়ে তিন বেলা খাবার দিত। সকালে শক্ত রুটি আর সবজি। দুপুরে ও রাতে ভাত, ডাল মিশ্রিত সবজি, মাছ বা ডিম। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে বিশেষ খাবার দেওয়া হতো।

মুকুল হোসেন বলেন, এক সারিতে আনুমানিক পাঁচটি কক্ষ ছিল। প্রতিটি কক্ষেই তাঁর মতো একজন করে গুম হওয়া মানুষ ছিলেন। মাঝেমধ্যে দরজায় শব্দ করে ডাকাডাকি করত, উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটি করত। খাবার খুবই জঘন্য ধরনের ছিল। শুরুতে খাওয়া যেত না। এক সপ্তাহ পর এতেই অভ্যস্ত হয়ে যান।

র‍্যাবে হস্তান্তর ও মাদকের মামলা

২০১৯ সালের ৮ মে ইফতারের পর মুকুলকে প্রথম দিন পরে আসা কাপড় ফেরত দিয়ে দ্রুত তৈরি হতে বলা হয়। চোখে তিন পরতের কাপড় বেঁধে বের করে নিয়ে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ মিনিট গাড়িটা চলার পর থামে। সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলার একটি কক্ষে নিয়ে হাতকড়া ও চোখ খুলে দেওয়া হয়। ওই কক্ষে হাতকড়া পরা আরও তিনটি ছেলে ছিল। দরজার কাছে রাখা স্ট্যান্ড ফ্যানে লেখা ছিল র‍্যাব-১ এমটি পুল। পরদিন জোহরের নামাজের আগে চোখ বেঁধে, হাতকড়া লাগিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বিমানবন্দর–সংলগ্ন মনোলোভা কাবাবের সামনে। গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তা পার করে একটি নির্মাণাধীন ভবনের সামনে লোকজনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর একটি মাইক্রো এসে দাঁড়ালে ধাক্কা দিয়ে ওই গাড়িতে তোলা হয়। ১০ মিনিট পর আবার র‍্যাব কার্যালয়ে আনা হয়। একটি টেবিলের ওপর ছোট ছোট প্যাকেটে ইয়াবা, পাশে মুকুলের দুটি মোবাইল ও পাসপোর্ট রেখে তাঁর ছবি তোলা হয়। ৯ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয় তাঁকে। ৭০০টি ইয়াবাসহ আটকের মামলা দেওয়া হয় তাঁর নামে। তিন দিনের রিমান্ডে এনে অত্যাচার চালানো হয় থানায়। এরপর কারাগারে গিয়ে জামিনে মুক্তি পান সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে।

গত ৯ এপ্রিল তাঁর মামলার শুনানি ছিল। আদালতে গিয়ে জানতে পারেন, মার্চে তাঁর মামলার রায় হয়ে গেছে; পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। এর পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। দেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর তিনি এখন তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার চাচ্ছেন।

মুকুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুরগির হাড় দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে দিন হিসাব করতাম। আগেও কেউ কেউ করে গেছে ওই কক্ষের দেয়ালে। ৯৪ দিনের প্রতিটি দিন কাঁদতাম, প্রার্থনা করতাম। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি।’

কথা বলতে বলতে কেঁদে দেন মুকল। তিনি আরও বলেন, ‘এখন নতুন সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই। আমার মামলা প্রত্যাহার করে আমাকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দিতে পারে তারা। আমার মতো যাঁরা গুমের শিকার হয়েছেন, তাঁদের সবার পাশে নিশ্চয়ই দাঁড়াবে সরকার।’

জিহাদ বলেছিল আর একদিনই আন্দোলনে যাবো মা by পিন্টু আনোয়ার

কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল কলেজ শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান মাহিম। আন্দোলন যখন একদফায় গড়ায় তখন যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিল টানা সংঘাত সহিংসতা। ভয় থেকে মাহিমের মা কোহিনুর বেগম ছেলেকে বারণ করেছিলেন আর আন্দোলনে না যেতে। মাহিম বলেছিল মা আর একদিন মাত্র আন্দোলনে যাবো। ৫ই আগস্ট মাকে লুকিয়ে আন্দোলনে যায় সে। এরপর আর ঘরে ফিরতে পারেনি। ঘরে ফিরে মাহিমের গুলিবিদ্ধ লাশ। গত ৫ই আগস্ট দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জিহাদ হাসান মাহিম। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী মাহিমের বাবা মোহাম্মদ আলম মিয়া ছেলের শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে তিনি গর্বও বোধ করেন ছেলের আত্মত্যাগে।

যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনির আখড়া এলাকায় তাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় শোকবিহ্বল পরিস্থিতি। তার বই খাতা, খেলার সরঞ্জাম বুকে আঁকড়ে ধরে যেন ছেলের স্পর্শ অনুভব করতে চাইছেন শোকার্ত পিতামাতা। কান্নায় ভেঙে পড়ে পিতা মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, ‘গত ১৯শে জুলাই আন্দোলনে গিয়ে সে ছররা গুলিতে আহত হয়েছিল। আমি তাকে বলি, আন্দোলনে গিয়ে তোর কিছু হলে আমাদের কী হবে? ছেলে উত্তর দিলো, আমরা ঘরে বসে থাকলেই বা তোমাদের কী হবে! দেশটাকে পরিষ্কার করতে হবে। সেটা আমরা ঘরে বসে থাকলে হবে না। আমি বলি, তাহলে তুই একা যাবি না। আমি আর তোর ছোট ভাইও সঙ্গে যাবো।

মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আমি স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী মানুষ। কষ্ট হলেও আমার সীমিত সামর্থ্যে ছেলের স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করে গেছি, নিজে স্বপ্ন দেখেছি। ছেলে হারিয়ে এখন আমার চারদিক অন্ধকার!’ জিহাদ হাসান মাহিমের বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। রাজধানীর ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন জিহাদ। অঝোর কান্নায় মাহিমের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘সবাই বলছিল ৫ই আগস্ট পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে। আগের দিন ছেলেকে বলি, তুই আন্দোলনে আর যাবি না। আমার খুব ভয় লাগছে। ছেলে বললো, আর এক দিনই যাবো মা। সেদিন সকাল থেকেই ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করছিলাম। সে বাসায় ছিল। আমাকে ডিম সেদ্ধ করতে বললো। কিন্তু আমি যেন বুঝতে না পারি সে বাইরে যাবে, এজন্য হয়তো এক ফাঁকে মোবাইল বাসায় রেখে এবং নাস্তা না খেয়েই বেরিয়ে যায়। দুপুরের পর থেকে বাড়ির সামনে রাস্তায় দলে দলে মানুষের আনন্দ-হৈ হুল্লোর টের পাই। আমার ছেলেটা  মোবাইল ফোন বাসায় রেখে যাওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল না। আমি ভাবলাম, বন্ধুদের সঙ্গে সেও হয়তো আনন্দ-উল্লাসে মেতেছে। হয়তো কোথাও ঘোরাঘুরি করছে।

জিহাদের ভগ্নিপতি তানভীর আহমেদ হিমু জানান, যাত্রাবাড়ী থানার কাছে গুলিবিদ্ধ জিহাদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান শান্ত, নোমান, মনিরসহ তরুণ বয়সের কয়েকজন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় ময়নাতদন্ত চাননি তারা। জিহাদের মরদেহ হাসপাতাল থেকে তারা নিয়ে যান দনিয়া জামে মসজিদে। তখনো তার পরিচয় অজ্ঞাত। পরে জিহাদের মরদেহের ছবি তুলে রাত ১০টার দিকে এক ফেসবুক পেজে পোস্ট দেয়া হয়, কেউ চেনে কিনা। পরে একজন চিনতে পেরে কল দিয়ে জিহাদের পরিবারকে জানায় সেই পোস্টের ব্যাপারে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নে জিহাদ হাসানের গ্রামের বাড়ি। সেখানে দাদার কবরের পাশে শায়িত করা হয়েছে তাকে। জিহাদকে নিয়ে এখন গর্বিত পরিবারের সদস্যরা। তিন ভাই বোনের মধ্যে জিহাদ দ্বিতীয়। ছোট ভাই তাহমিম হাসান যাত্রাবাড়ী এলাকার বর্ণমালা আদর্শ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বড় বোন রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফরিন বিনতে আলম মিম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মনটা ছিল অনেক বড়। যেকোনোভাবে সমাজসেবা করতে চাইতো সে। জিহাদ ছিল সদাচারী এবং অত্যন্ত মেধাবী। কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হয়ে জিহাদ বলেছিল, ভবিষ্যতে সে চাকরি করবে না, ব্যবসা করবে। অনেক কর্মসংস্থান করবে। বন্ধুদের কাছে সে বলতো, আব্বুর বয়স হচ্ছে তাকে বেশিদিন চাকরি করতে দেবো না। শিগগিরই আমার কিছু করতে হবে।’

জিহাদের বাবা মোহাম্মদ আলম জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে শুরু থেকেই জিহাদ সোচ্চার ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যেক কর্মসূচিতে ছিল তার সরব অংশগ্রহণ। মৃত্যুর ২ দিন আগে তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জিহাদ লিখেছিলেন, ‘গন্তব্য একটাই। হয় দেশের কাফনের কাপড় শেষ হবে, অথবা মিষ্টির দোকান খালি হবে।’

মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলাম জিহাদ। কে জানতো ছেলে আমার বিপ্লবী হবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ দেবে! আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিশু-কিশোরদের জন্য সবসময়ই দোয়া করেছি। আমার সন্তানও চলে যাবে ভাবিনি। আমাদের সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে এখন শুধু সুন্দর একটা দেশ চাই।’

আইন একটা, কার সাধ্য এখানে বিভেদ করে

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, বিভেদ সৃষ্টি করার কোনো সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য।

মঙ্গলবার দুপুরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জাতীয় উপাসনালয় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তার সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সবাইকে ধৈর্য ধরে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, বড় রকমের একটা বিভেদের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, এমন বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি, যেটা একটা পরিবার, এটাই হচ্ছে মূল জিনিস। এই পরিবারের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা, বিভেদ করার প্রশ্নই আসে না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশি।

ন্যায়বিচার হলে সবাই বিচার পাবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘ন্যায়বিচার হলে কে বিচার পাবে না, এটা আমাকে বলেন? এটা কি দেখার সুযোগ আছে? কে কোন ধর্মের, কোন জাতের, কোন সমপ্রদায়ের। এটা কি আইনে বলা আছে যে, এই ধর্মের, এই সমপ্রদায়গুলো এই আদালতে যাবে, ওই সমপ্রদায়গুলো অন্য আদালতে যাবে? আইন একটা, কার সাধ্য আছে এখানে বিভেদ করে?’
সবাইকে ধৈর্য ধরে সরকারকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আপনারা বলবেন যে “আমরা মানুষ, আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আমার সাংবিধানিক অধিকার এই, এটা আমাকে দিতে হবে। সব সরকারের কাছে এটাই চাইবেন আর কিছুই চাইবেন না। আমরা এসেছি, আমরা এক মানুষ, এক অধিকার, এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। আমাদের একটু সাহায্য করুন আপনারা, ধৈর্য ধরেন। কী করতে পারলাম, কী পারলাম না, সেটা পরে বিবেচনা করবেন।’

এ সময় ৫৩ বছরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন ও বৈষম্যের বিচারে একটি কমিশন গঠনের দাবি জানান সমপ্রদায়ের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
যমুনায় সংখ্যালঘু নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়: ওদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশের ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, সংবিধানে যে অধিকার দেয়া আছে তা ধর্ম সমপ্রদায় নির্বিশেষে সব নাগরিকেরই প্রাপ্য।

আজকের প্রেক্ষিতে এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে নাগরিকদের মধ্যে কোনো বিভেদ ও বৈষম্য থাকবে না। আমাদের সংবিধানে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবিক অর্থে অতীতে কেউ-ই এর আলোকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। বর্তমান নির্দলীয় সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণে বদ্ধপরিকর। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত তার বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন।
মতবিনিময় সভায় উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আদিলুর রহমান খান, এ.এফ. হাসান আরিফ, ড. আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন, ফরিদা আখতার, মো. নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।