Sunday, October 30, 2016

ট্রাম্প-সমর্থকের ভোট জালিয়াতি

ডোনাল্ড ট্রাম্প। এএফপি
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কারচুপি হবে। তাঁর এ রকম অভিযোগের মধ্যেই জাল ভোট দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন ট্রাম্পের সমর্থক টেরি লিন রোট। তাঁর দাবি, কারচুপি হবে মনে করেই তিনি জাল ভোট দিতে গিয়েছিলেন। গতকাল শনিবার থেকেই আইওয়া অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। পল্ক কাউন্টির তালিকাভুক্ত রিপাবলিকান-সমর্থক টেরি লিন রোট ভোট জালিয়াতির জন্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। আগাম ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়ে টেরি রোট প্রথম দফা কাউন্টি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। এরপর দ্বিতীয় দফা ভোট দিতে হাজির হন কাউন্টির ভ্রাম্যমাণ একটি ভোটকেন্দ্রে। টেরিকে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পাঁচ হাজার ডলারের বিনিময়ে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আগামী ৭ নভেম্বর তাঁকে আবার আদালতে হাজিরা দিতে হবে।
জামিন পাওয়ার পর টেরি বলেন, প্রথম দফা ভোট দিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, সেটি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে চলে যাবে। এ কারণে দ্বিতীয় দফা ভোট দিতে গেছেন, যাতে সেটি ট্রাম্পের ঘরেই যায়। নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই নিজেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক বলে জানিয়েছেন টেরি। টেরির ভোট জালিয়াতির খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮ নভেম্বর নির্বাচনের দিনেই তাঁকে ভোট দিতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কলোরাডোয় দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, আগাম ব্যালট পেপার নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ আছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নির্বাচনে কারচুপি হবে বলে মাঠ গরম করেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার মার্কিন তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) পরিচালক জেমস কমি জানান, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের আরও গোপন ই-মেইলের সন্ধান পাওয়া গেছে। তা নিয়ে তদন্ত শুরু হবে। এরপর ট্রাম্প সুর নরম করেছেন। গতকাল রাতে তিনি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে, আগে যতটা মনে করেছিলাম, নির্বাচন ততটা জালিয়াতিপূর্ণ হবে না।’

নোবেল পেয়ে ‘ভাষা হারান’ বব ডিলান

অবশেষে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে রহস্যময় দীর্ঘ নীরবতা ভাঙলেন খ্যাতিমান মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলান। তিনি জানিয়েছেন, আসলে নোবেল পাওয়ার খবরে তিনি ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। সে কারণেই এত দিন নীরব ছিলেন। নোবেল ফাউন্ডেশন গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউসকে টেলিফোন করে বব ডিলান বলেছেন, ‘নোবেল পুরস্কার বিজয়ের খবর আমাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। এতে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি।’ সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আগামী ১০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নোবেল পুরস্কার হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট এই শিল্পী উপস্থিত থাকবেন কি না, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিবৃতিতে। তবে যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ এক খবরে বলেছে, ডিলান তাদের জানিয়েছেন, ‘যদি সম্ভব হয়, তাহলে আমি অবশ্যই যাব।’ পত্রিকাটিকে এক সাক্ষাৎকারে ডিলান নোবেল পুরস্কার বিজয়কে ‘বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এমন স্বপ্ন কজনইবা দেখতে পারে?’
সর্বশেষ গতকাল শনিবার সুইডিশ একাডেমি বলেছে, স্টকহোমের অনুষ্ঠানে বব ডিলানকে থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে তিনি চাইলে যেকোনো উপায়ে নিজের কোনো বক্তব্য কিংবা গান সম্প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারেন সেখানে। সুইডেনের একটি রেডিওকে সারা দানিউস বলেন, ডিলান চাইলে যেকোনো কিছুর ব্যবস্থা করতে পারেন। সেটা হতে পারে কোনো সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, ভিডিও সম্প্রচার, এমনকি কোনো গান। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, যেটা ইচ্ছা হয়, তিনি তা করবেন। অনুষ্ঠান সার্থক করতে ডিলানের ইচ্ছাপূরণে যা প্রয়োজন, সুইডিশ একাডেমি তা করবে।’ মার্কিন সংগীতে নতুন কাব্যিক ধারা সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে ১৩ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে বব ডিলানের নাম ঘোষণা করে নোবেল কমিটি। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে তহবিল সংগ্রহের কাজে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ডিলানের নাম। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় বাংলাদেশেও অনুরাগীদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার পর থেকেই তিনি ছিলেন নীরব। এই নীরবতা অনেকের মনেই প্রশ্নের জন্ম দেয়, ডিলান কি পুরস্কার নিতে স্টকহোমে যাচ্ছেন? নাকি পুরস্কার বর্জন করতে চলেছেন?
সুইডিশ লেখক ও সুইডিশ একাডেমির সদস্য পার ওয়াস্টবার্গ গত সপ্তাহে বলেন, ডিলানের এই নীরবতা ‘অভদ্র এবং অহংকারী’ আচরণ। তাঁর এ মন্তব্যের পর শিল্পীর নোবেল পুরস্কার গ্রহণ নিয়ে ওঠা সংশয় আরও গাঢ় হয়। তবে সারা দানিউস জানান, গত মঙ্গলবার তাঁকে ফোন করেন বব ডিলান। ১৫ মিনিট কথা বলেন তাঁরা। সুইডিশ বার্তা সংস্থা টিটিকে সারা দানিউস বলেন, টেলিফোনের আলাপচারিতায় ডিলান ছিলেন ‘নম্র, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মজার’।

ব্যর্থতা কাটাতে পারবে সোমালিয়া?

মোগাদিসুতে নাসাহাব্লাড হোটেলের বাইরে আত্মঘাতী হামলার
পর বন্দুকযুদ্ধের সময় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোমালি সরকারি
বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন। ছবিটি ২৫ জুন তোলা। রয়টার্স
বিশৃঙ্খল দেশটিতে কার্যত কোনো সরকার নেই। লেগেই আছে দাঙ্গা-হাঙ্গামা। উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুদের উৎপাত। আর রাজধানী মোগাদিসুর রাস্তায় ইসলামপন্থী মিলিশিয়াদের দৌরাত্ম্য। এটি আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। এমন পরিস্থিতি কয়েক দশক ধরেই। এ থেকে উত্তরণে বাইরের দেশগুলো বছরের পর বছর তৎপরতা চালালেও কোনো হেরফের নেই। এখনো আফ্রিকার একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র সোমালিয়া।  দেশটির অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১০ সেপ্টেম্বর। দেশটিকে পুনর্গঠনে জাতিসংঘের চেষ্টার অংশ হিসেবে এ বছর জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এ নির্বাচন দেশটির ললাট থেকে ব্যর্থতার তকমা মুছতে পারে কি না, তাই এখন দেখার বিষয়। সোমালিয়ায় কীভাবে নতুন সরকার গঠন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা করতেই বিদেশি প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আসছেন দেশটিতে। উঠছেন রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে। বসছেন আলোচনায়। কিন্তু হোটেল কক্ষে যখন আলোচনা চলে, বাইরে চলে যুদ্ধ। কারণ, হোটেলগুলোই জঙ্গিদের মূল টার্গেট। ১৯৯১ সালে বিদ্রোহীরা সিয়াদ বেরে সরকারকে উৎখাত করে। এরপর থেকে দেশটিতে নামমাত্র সরকার বিরাজ করছে। নেই তেমন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। এমনই অবস্থা যে সরকারি কর্মকর্তারা চাইলে নিরাপদে দেশের যেকোনো জায়গায় যেতেও পারেন না। দেশটিতে ক্রমাগত যুদ্ধ, ক্ষুধা ও সন্ত্রাসের কারণে অনেকে পালিয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বলা হয়, এখন দেশটির ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ২০ লাখই দেশের বাইরে। ২০০৬ সালে প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়া সোমালিয়া থেকে কট্টর ইসলামপন্থী সরকারকে উৎখাতে হামলা চালায়। পরের বছর প্রতিবেশী দেশগুলোর সেনাবাহিনী দেশটিতে দখল নেয়। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে পশ্চিমা-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের জন্ম হয়, বিপরীতে জন্ম নেয় ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাব। গেরিলা যুদ্ধকারী এই জঙ্গিসংগঠনকে ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলো আফ্রিকান ইউনিয়ন শান্তিরক্ষা মিশনে ২২ হাজার বিদেশি সেনা পাঠায়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মোগাদিসুর লিদো সৈকতে সমুদ্রমুখী
বিচ ভিউ ​ক্যাফের বাইরে গাড়ি বোমা হামলার ঘটে। রয়টার্স
বর্তমানে শহরগুলোর পথে জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে এলেও এখনো সোমালিয়া নিরাপত্তার বেশ অভাব। অপহরণ বা এর চেয়ে খারাপ কিছু হওয়ার আতঙ্কে বিদেশিরা নিজেদের অনেকটা বিমানবন্দরেই বন্দী করে রাখেন। তাঁদের জন্য ট্যাক্সি বা সাঁজোয়া যানে করে বেড়াতে যাওয়াও মানে বিপদ ডেকে আনা। রাজধানীর যখন এই অবস্থা, তখন দেশটির অন্যান্য প্রান্তে কী ঘটতে পারে, তা অনুমেয়। বিশেষ করে দক্ষিণে। সেখানে শান্তিরক্ষী মিশনের ঘাঁটি থাকার পরও গ্রামগুলোতে আল-শাবাবের সদস্যরা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায়, যা খুশি তা-ই করে। তবে সোমালিয়ায় যে আগের চেয়ে অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তা মনে করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শেখ হাসান হামুদ। বলেন, কয়েক বছর আগে যেখানে প্রতিদিন অন্তত একজন হলেও পুলিশ সদস্য নিহত হতেন, সেখানে এখন ৫ থেকে ১০ মাসে এমন ঘটনা ঘটে। হামলার কবল থেকে ব্যবসায়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার। বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারি ভবনের নিরাপত্তায় তাঁর বাহিনীর লোকজনকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই ব্যর্থতা মেনে নিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের (ব্যবসায়ী) নিজস্ব নিরাপত্তা থাকা উচিত। পুলিশ কমিশনারের এমনটা বলার কারণ হলো বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলার ঝুঁকি এড়াতে আল-শাবাবকে অর্থ দেওয়া শ্রেয় মনে করে। আর এর মধ্য দিয়ে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে সংগঠনটি। দেশটিতে কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা থাকলেও রাজধানীর বাইরে নেই তেমন নিয়ন্ত্রণ। দেশটির ছোট রাজ্যগুলো কমবেশি স্বাধীনভাবেই নিজেদের শাসনভার পরিচালনা করেন। যেমন উত্তরে পুন্টল্যান্ড ভালোই সংগঠিত। তাদের রয়েছে নিজস্ব পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশ বছরে ২০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করে। আর এর বেশির ভাগ ব্যয় হয় পার্লামেন্ট মেম্বার ও প্রেসিডেন্সির পেছনে। দেশটির নিজস্ব সেনাবাহিনী সোমালি ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ)।
দুর্ভিক্ষের কারণে মার্কা লোয়ান সেবেলি অঞ্চল থেকে
মোগাদিসুর দিকে সন্তানকে নিয়ে ছুটছেন এক মা।
ছবিটি ২০১৪ সালের তোলা: রয়টার্স
বাহিনীর কাজ হলো লোকজনকে নিরাপদে রাখা ও পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। তবে নামেই তারা রয়েছে। মূল কাজটি করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা। এসএনএ সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্রিটিশ প্রশিক্ষক আনা হলেও মূলত তারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এএমআইএসওএম-কে। কেননা, এসএনএ কমান্ডাররা নিজেরাই জানেন না তাঁদের লোকজন কে কোথায় আছে। অনেক সময় সেনারা পালিয়ে যায় এবং মোগাদিসু নয়, বরং গোত্রীয় প্রধানদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কারণ, কেন্দ্রের বাইরে গোত্রীয় প্রধানদের রয়েছে বেশ প্রভাব। এ অবস্থায় এবারের নির্বাচন আবশ্যক হয়ে উঠেছে। তবে সরকার টাকা দিয়েও নয়, সেনাবাহিনী দিয়ে নয়, কেবল আঞ্চলিক নেতাদের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। তাই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত দেশের বিভিন্ন জায়গার লোকজন ও প্রধান প্রধান গোত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ২০১২ সালে হাসান শেখ মোহাম্মদ পার্লামেন্ট সদস্যদের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আর এসব পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রায় ১৩৫টি গোত্রের প্রধানদের মাধ্যমে। আর নির্বাচনের তরি ভালোভাবে উতরে গেলেও যে তারা যে আইনগত বৈধতা পাবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কেননা, প্রধান সমস্যা হলো এখানে অভিবাসী সোমালিয়রা অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় ৫৫ শতাংশ সাংসদের রয়েছে বিদেশি পাসপোর্ট। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নিজে কখনো দেশের বাইরে না গেলে তাঁর বেশির ভাগ উপদেষ্টাই ব্রিটিশ বা মার্কিন সোমালীয়। অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে এএমআইএসওএমের প্রধান দাতাগোষ্ঠী ইউরোপীয় ইউনিয়ন সোমালিয়ায় শান্তিরক্ষী বাহিনীর জন্য বরাদ্দ ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এরপর এই বাহিনীর ওপর হামলা বাড়ছে। আগের দশকের তুলনায় যদিও সোমালিয়ার সমস্যাগুলোর অনেকটাই উন্নতি হয়েছে, তবু এ অবস্থায় বিদেশি সৈন্যদের পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হলে দেশটি আবারও পুরোনো রূপে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

ট্রাম্প আমার সঙ্গে ভালো আচরণই করেছেন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাবেক মিস
ইউনিভার্স জেনিফার হকিন্স। ফাইল ছবি
রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে ‘অশিষ্ট আচরণ’ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে যেসব খবর বেরিয়েছে তা ঠিক নয়। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হকিন্সের ভাষ্য, ট্রাম্প সব সময়ই তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেছেন এবং তিনি নিজেও সব সময় ট্রাম্পকে সম্মান করে এসেছেন। হাফিংটন পোস্ট ট্রাম্প ও হকিন্সের ২০১১ সালের একটি ভিডিওচিত্র প্রকাশের পর আলোচনা শুরু হয়। জেনিফার হকিন্স গতকাল শনিবার এ বিষয়ে নিজের তরফ থেকে ব্যাখ্যা দেন। ২০০৪ সালের মিস ইউনিভার্স শিরোপা জয় করেন জেনিফার হকিন্স।  সে বছর ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন ট্রাম্প।
হাফিংটন পোস্টের প্রকাশ করা ভিডিওতে সিডনিতে আয়োজিত ২০১১ সালের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও হকিন্সকে দেখা যায়। সেখানে মঞ্চের ওপর ট্রাম্পকে দুই হাত দিয়ে হকিন্সের কোমর জড়িয়ে ধরতে এবং চুমু খেতে দেখা যায়। ট্রাম্প সে সময় দর্শকদের উদ্দেশে হাসতে হাসতে বলেন, হকিন্স প্রথমে তাঁকে (ট্রাম্পকে) মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিতে অস্বীকার করেছিলেন। হকিন্স মঞ্চ ছাড়ার সময় বলতে থাকেন, ট্রাম্প তাঁকে বিব্রত করেছেন। তবে গতকাল জেনিফার হকিন্স বলেন, ওই অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটা হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে ট্রাম্প সব সময়ই তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করে এসেছেন। তিনিও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

হ্যালোইন উৎসবেও হিলারি-ট্রাম্প!

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর রাতে উদ্যাপিত হয় ঐতিহ্যবাহী হ্যালোইন উৎসব। এ সময় লোকজন ‘ভৌতিক’ পোশাক পরে একে অন্যকে ভয় দেখানোর খেলায় মেতে ওঠে। শিশুরাও বাড়ি বাড়ি যায় দুষ্টুমির ভয় দেখিয়ে চকলেট গোছের উপহারের জন্য।
এ উপলক্ষে বড় আকারের কুমড়া খোদাই করে তৈরি করা হয় ‘জ্যাক ও’ ল্যান্টার্ন’। এর ভেতরে রাখা হয় মোমবাতি বা অন্য কোনো আলোর উৎস। এবারের হ্যালোইন উৎসবে যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন নির্বাচনের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেকেই মজা করে কুমড়ার গায়ে হিলারি ক্লিনটন কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ ফুটিয়ে তুলছেন।

কে এই হুমা আবেদিন?

সাবেক স্বামী অ্যান্থনি উইনারের সঙ্গে হুমা আবেদিন l ফাইল ছবি
হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল কেলেঙ্কারির সঙ্গে নাম জড়িয়ে হঠাৎ করেই খবরের কেন্দ্রে চলে এসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত হুমা আবেদিন। ১৯৯৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে তিনি হোয়াইট হাউসে একজন ‘ইন্টার্ন’ হিসেবে কিছু সময় কাজ করেছিলেন। সেই সময়েই তিনি হিলারির নজর কাড়েন। ২০০০ সালে হিলারি নিউইয়র্ক থেকে সিনেট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি হুমাকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। গত ১৬ বছর তাঁর সঙ্গেই আছেন হুমা।
হিলারির পক্ষে কাজ করার সময়ই তিনি ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসম্যান অ্যান্থনি উইনারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং ২০১০ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। বিয়ের এক বছরের মাথায় উইনার অপরিচিত তরুণীদের সঙ্গে নোংরা খুদেবার্তা চালাচালির অভিযোগে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। উইনারের এই নোংরা স্বভাবের কথা জানা থাকলেও হুমা তাঁকে ত্যাগ করেননি, নীরবে তাঁর পাশে থেকেছেন। কিন্তু এ বছরের মাঝামাঝি উইনারের বিরুদ্ধে নতুন করে একই ধরনের অভিযোগ উঠলে হুমা তাঁর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেন। এই উইনারের সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে তদন্তের সময় এফবিআই এজেন্টরা তাঁর ল্যাপটপে হুমার অসংখ্য ই-মেইলের খোঁজ পান। সেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ থাকতে পারে সন্দেহে এখন এফবিআই হিলারির ই-মেইলের ব্যাপারে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে।

শিকাগোয় বিমানে আগুন, আতঙ্কে ছোটাছুটি

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত শুক্রবার যাত্রা শুরুর ঠিক আগে একটি উড়োজাহাজে আগুন ধরে যায়। পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে উড্ডয়ন বাতিল করে যাত্রীদের জরুরি ভিত্তিতে বের করে নেন। এ সময় প্রায় ২০ জন আরোহী ছোটখাটো আঘাত পেয়েছেন। আমেরিকান এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বোয়িং বিমানটির ১৬১ যাত্রী ও নয় জন ক্রু সদস্য নিয়ে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো থেকে মায়ামিতে যাওয়ার কথা ছিল।
ও’হেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা আড়াইটার দিকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগে বিমানটির ডান পাশের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। যাত্রীদের কয়েকজন বলেন, প্রথমে তাঁরা একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন। তারপর আগুন ও কালো ধোঁয়া দেখতে পান। বিমানের ভেতরে ডান পাশের আসনগুলোর যাত্রীরা সবাই ছুটে বাঁ দিকে চলে আসেন। একজন বলেন, আগুনের তাপে জানালার কাচ গলে যাচ্ছিল। আতঙ্কিত অনেক যাত্রী ‘দরজা!’, ‘দরজা!’ বলে চিৎকার করে একে অন্যের ওপর দিয়ে লাফিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। একই দিনে ফ্লোরিডায় ফেডএক্সের একটি উড়োজাহাজ অবতরণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হঠাৎ বিদেশ সফরে থাইল্যান্ডের যুবরাজ

থাইল্যান্ডের রাজা ভুমিবল আদুলিয়াদেজের মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পর যুবরাজ মহা ভাজিরালংকর্ন বিদেশ সফরে গেলেন। তিনি গত শুক্রবার রাতে ব্যাংকক ত্যাগ করেন এবং আগামী মাসে দেশে ফিরে আসবেন বলে জানা গেছে। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত হওয়ার আগে যুবরাজের হঠাৎ দেশের বাইরে যাওয়া মানুষের মনে নানা আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র বলেছে, ‘যুবরাজ শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত কাজে থাইল্যান্ডের বাইরে গিয়েছেন। আগামী মাসে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তিনি ফিরে আসবেন এবং আনুষ্ঠানিক কাজে যোগ দেবেন।’ থাইল্যান্ডের ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার নতুন রাজার সিংহাসনে অভিষেকের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। গত সপ্তাহে দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্রাইয়ুথ চান-ওচা বলেছিলেন, রাজা ভুমিবলের মৃত্যুর ৭ থেকে ১৫ দিন বা এর কিছু পরই নতুন রাজার অভিষেক হবে।

হঠাৎ কেন ই–মেইল তদন্ত, ব্যাখ্যা চান হিলারি

হঠাৎ ফাটানো এফবিআইয়ের বোমায় কিছুটা হলেও বেকায়দায় পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। সংস্থাটি তাঁর ই-মেইল বিতর্ক নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আত্মবিশ্বাসী হিলারি জানিয়েছেন, যতই তদন্ত করা হোক, খারাপ কিছুই পাওয়া যাবে না। বরং ভোটের মাত্র ১০ দিন আগে এমন একটি সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন এফবিআইয়ের কাছে। হিলারির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভারে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদান করেন। ভোটের প্রচারে নামার পর এ পর্যন্ত হিলারিকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে তাঁর একসময়কার এই ভুল।
প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে সব দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও এফবিআইয়ের এই ঘোষণা হিলারিকে আবার বেশ বিপাকে ফেলবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। যদিও তিনি বলেছেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি, সেটা দেশের মানুষ জানে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে কাকে ভোট দেবে। তবে একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগের মুখে ডুবতে থাকা ট্রাম্প এফবিআইয়ের সরবরাহ করা নতুন রসদ লুফে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগে না পারলেও এবার সাহস করে ঠিক কাজটিই করেছে এফবিআই। মার্কিন কেন্দ্রেীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কোমি গত শুক্রবার বলেন, হিলারি সরকারি সার্ভারের বদলে ব্যক্তিগত সার্ভার ব্যবহারের সময় কোনো ‘গোপনীয়’ তথ্য চালাচালি করেছিলেন কি না, তা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছেন। এ বছরের জুলাই মাসে তিনি কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, এ নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে কোনো বেআইনি কাজের প্রমাণ মেলেনি, সে কারণে তিনি তদন্ত শেষের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন মার্কিন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তদন্তকাজ পরিচালনার সময় তাঁরা এমন তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন, যা ক্লিনটনের ই-মেইল তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সে কারণে এই তদন্ত নতুন করে শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গণামধ্যমের খবর অনুযায়ী,
যৌন কেলেঙ্কারির জন্য অভিযুক্ত সাবেক কংগ্রেসম্যান এন্থনি উইনারের ঘরে কম্পিউটারে তল্লাশি চালানোর সময় এফবিআই এসব সন্দেহজনক ই-মেইলের খোঁজ পায়। উইনারের সাবেক স্ত্রী হুমা আবেদিন হিলারি ক্লিনটনের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী। মাস খানেক আগে তদন্তের সময় এফবিআই উইনারের কম্পিউটারে হুমা আবেদিনের কয়েক হাজার ই-মেইলের সন্ধান পায়। এফবিআইয়ের অনুসন্ধান এখন এসব ই-মেইলের ওপরেই নিবদ্ধ। এসব ই-মেইলে ‘গোপনীয়’ কোনো তথ্য রয়েছে, কোমির চিঠিতে সে কথা বলা হয়নি। নতুন ই-মেইল পাওয়া গেছে, সে কথা তিনি না জানালে তথ্যমাধ্যম তা ফাঁস করে দেবে, তখন অভিযোগ উঠবে তিনি সত্য গোপন করছেন। এই অভিযোগ এড়াতেই তিনি কংগ্রেসের সদস্যদের কাছে তাঁর তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে এফবিআই প্রধানের এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—হিলারির প্রচার শিবির থেকে এ অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারা বলেছে, অধিকাংশ জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা হিলারিকে ঠেকানোর জন্য এবং ট্রাম্পকে সাহায্য করার লক্ষ্যেই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোমি। হিলারি নিজেও কঠোর ভাষায় এফবিআইয়ের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। আইওয়াতে নির্বাচনী সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ কথা জানানো হলো এমন এক সময়ে, যখন সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আগাম ভোট গ্রহণ চলছে। এফবিআইয়ের তাই উচিত হবে অবিলম্বে এ-সংক্রান্ত সব তথ্য দেশবাসীকে জানানো। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো সব তথ্য জানতে পারিনি। এফবিআইয়ের প্রধান নিজেও বলেছেন, এসব তথ্য অর্থপূর্ণ হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। সে জন্য আমরা দাবি করছি, সব তথ্য পরিষ্কার করে জানানো হোক।’ হিলারি অবশ্য এ আস্থা ব্যক্ত করেন যে অধিকাংশ মানুষ ই-মেইলের বিষয়টি পুরোপুরি জানে,
সে বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা ইতিমধ্যে কাকে ভোট দেবে, সে সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে। হিলারির প্রচার ব্যবস্থাপক জন পডেস্টা বলেছেন, নির্বাচনের এত কাছে এসে হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঠিক স্বাভাবিক মনে হয় না। সব তথ্য অবিলম্বে প্রকাশের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাই মাসে এফবিআই তার তদন্ত শেষে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, এবারও তা থেকে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে না, সে ব্যাপারে তাঁরা সম্পূর্ণ আস্থাবান। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব কোমির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। হিলারির বিরুদ্ধে এই তদন্ত জুলাইতে বন্ধ ঘোষণার পর ট্রাম্প কঠোর ভাষায় এফবিআইয়ের সমালোচনা করেছিলেন। তবে কোমির নতুন ঘোষণার পর ট্রাম্পের সুর বদলে গেছে। শুক্রবার নিউ হ্যাম্পশায়ারে এক নির্বাচনী সভার আগে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এফবিআই একসময় যে ভুল করেছিল, এখন তা শোধরানোর সুযোগ পেয়েছে। এবার তারা যথাযথভাবে তদন্ত পরিচালনা করবে, এ ব্যাপারে তাঁর আস্থা আছে। ট্রাম্প এ ঘটনাকে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চেয়েও বড় বলে বর্ণনা করেন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জন্য অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন। সন্দেহ নেই, তদন্ত নতুন করে শুরুর ঘোষণা ক্লিনটন শিবিরে বিস্ময় ও উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। মার্কিন ভোটারদের চোখে হিলারির বিশ্বাসযোগ্যতা এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ। উইকিলিকস যেভাবে প্রায় প্রতিদিন ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের ব্যাপারে একের পর এক এ-মেইল ফাঁস করছে, তাতে হিলারির প্রতি মানুষের আস্থায় আরও চিড় ধরেছে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হলো এফবিআইয়ের নতুন তদন্তের ঘোষণা। তবে হিলারি শিবির আশা করছে, জাতীয় পর্যায়ে ও ‘ব্যাটেল গ্রাউন্ড’ অঙ্গরাজ্যগুলোতে যেখানে দুই দলের কারোরই একচেটিয়া সমর্থন নেই,
সেই সব জায়গায় জনমতে তারা এতটা এগিয়ে রয়েছে যে ট্রাম্পের পক্ষে তাদের ধরে ফেলা অসম্ভব হবে। অবশ্য এই মূল্যায়নের সঙ্গে সবাই একমত নয়। রাজনীতিবিষয়ক পত্রিকা পলিটিকো মনে করে, রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে থেকে ইতিবাচক সুরে প্রচারণা শেষ করার যে আশা হিলারি করেছিলেন, এখন তা অলীক মনে হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস এক বিশেষ সম্পাদকীয়তে ই-মেইল নিয়ে লুকোচুরির জন্য হিলারিকেই দায়ী করেছে। ব্যক্তিগত সার্ভারে সরকারি ই-মেইল চালাচালির বিষয়ে সব কথা খোলামেলাভাবে প্রকাশ না করার দায়ভার এখন তাঁকেই বহন করতে হবে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা অনিশ্চিত। তবে অধিকাংশ ভাষ্যকার মনে করেন, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে এর প্রভাব অনিবার্য। কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য রিপাবলিকান নেতৃত্ব ইতিমধ্যে ট্রাম্পের ওপর থেকে নজর সরিয়ে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে তাঁদের সব পুঁজি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ই-মেইল তদন্ত শুরু হওয়ায় তাঁরা হিলারির ওপর আক্রমণ হানার নতুন রসদ পেয়ে গেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ই-মেইল নিয়ে কেলেঙ্কারির সব দায়-দায়িত্ব হিলারির একার। তিনি দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে হিলারি যে উচ্চপর্যায়ের গোপনীয় ‘ব্রিফিং’ পেয়ে থাকেন, তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।

কতটা ক্ষতি হলো হিলারির?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ বলে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার যে আশঙ্কার কথা বলা হয়ে থাকে, তা সাধারণত হয় একটি ঘটনা এবং তা ঘটে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে। অতীতে কোনো কোনো নির্বাচনে কোনো একজন প্রার্থীর বিষয়ে অক্টোবর মাসে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে বললে সামান্যই বলা হয়। এবারের নির্বাচনে মনে হচ্ছে, অক্টোবর এক দীর্ঘ সময় এবং ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’কে বর্ণনা করতে হবে বহুবচনে। মাসের গোড়াতেই রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যসংবলিত ২০০৫ সালের ভিডিও প্রকাশ এবং তারপর প্রায় ১০ জন নারী কর্তৃক ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপনের সময় মনে হয়েছিল, এবারের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ হচ্ছে সেটিই। এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় জনমত জরিপগুলোতে। ট্রাম্প ক্রমাগতভাবে জনসমর্থন হারাতে থাকেন। কিন্তু তারপর ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ই-মেইল হ্যাক করে উইকিলিকস প্রকাশ করতে থাকে অসংখ্য ই-মেইল,
যাতে হিলারি ক্লিনটন, ক্লিনটন ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু অজানা তথ্য প্রকাশিত হয়। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের সমর্থকেরা বলতে শুরু করেন, এই হচ্ছে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’। এগুলো হিলারি ক্লিনটনের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে না আনলেও, তাঁকে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়, সেটা অনস্বীকার্য। এসব ঘটনা সত্ত্বেও কোনো প্রার্থীই যে একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছেন তা নয়; নির্বাচনী প্রচারাভিযান অব্যাহত থাকে। শুক্রবার ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’-এর তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি ঘটনা। অকস্মাৎ এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কমি কংগ্রেসের কাছে এক চিঠিতে জানান, এফবিআই অন্য একটি বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে হিলারি ক্লিনটনের কিছু ই-মেইল তারা আবিষ্কার করেছে, যা হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইলসংক্রান্ত জুলাই মাসে সমাপ্ত তদন্তের সঙ্গে ‘যুক্ত হতেও পারে’। এই সংবাদকেই এখন অনেকে তৃতীয় ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ বলে বর্ণনা করছেন। অবশ্যই এটা বিস্ময়কর। কিন্তু সেই বিস্ময় এ কারণে নয় যে হিলারি ক্লিনটন বা তাঁর বহুল আলোচিত ই-মেইল বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে শুরুতে এমনভাবে বলা হচ্ছিল, যেন এফবিআই হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিষয়ে আবার তদন্ত শুরু করবে বলে জেমস কমি জানিয়েছেন। কিন্তু এফবিআইয়ের প্রধানের চিঠিতে যা বলা হয়েছে তা ভালো করে পড়লেই বোঝা যায়, তিনি তা জানাননি। ফলে কোনো কোনো গণমাধ্যম তাদের শিরোনাম থেকে শুরু করে সংবাদের সুর বদলায় কিছুক্ষণ পরই। কিন্তু তাতে অবশ্য বিস্ময়ের অবসান হয় না। কেননা, বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে,
এফবিআইয়ের প্রধান কেন নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে এমন এক চিঠি পাঠালেন, যা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং যেখানে তিনি নিজেই বলেছেন, এসব ই-মেইল আদৌ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কি না, এফবিআই এখনো সেটা নির্ধারণ করতে পারেনি এবং সেটা মূল্যায়ন করতে কতটা সময় লাগবে, এফবিআই তা জানে না। উল্লেখ করা দরকার যে এসব ই-মেইল হিলারি ক্লিনটনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি, তিনি আগে যেসব ই-মেইল সরবরাহ করেছিলেন, সে সময় এগুলো লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল, তা-ও নয় এবং এখনো কেউই জানেন না এসব ই-মেইলে কী আছে। এগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সাবেক কংগ্রেস সদস্য এন্থনি উইনারের আচরণসংক্রান্ত তদন্তের সূত্রে এবং যেহেতু তাঁর স্ত্রী হুমা আবেদিন হিলারির সহকারী, সেহেতু সেখানে এসব ই-মেইল পাওয়া গেছে। এ পটভূমিকায় গত শুক্রবার বিকেল থেকেই যে তিনটি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তা হলো, জেমস কমি কেন এই চিঠি লিখেছেন? তিনি আইন মন্ত্রণালয় ও এফবিআইয়ের দীর্ঘদিনের অনুসৃত ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছেন কি না? এই চিঠি এবং একে কেন্দ্র করে যে বিরূপ সমালোচনা ও প্রচার হবে, তা হিলারির জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে? নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে এ ঘটনা ঘটার কারণে এবং হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিষয়ে আগের তদন্তের কারণে সবার কাছে তৃতীয় প্রশ্নটিই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আগের দুই প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। জেমস কমি জুলাই মাসে হিলারির ই-মেইলবিষয়ক প্রাথমিক তদন্ত শেষে হিলারির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কেননা, হিলারি কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন বলে এফবিআই তাদের তদন্তে পায়নি।
আইন মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ গ্রহণ করে। কিন্তু রিপাবলিকান দলের নেতারা কমির এই অবস্থানে খুশি হননি বলে কংগ্রেস তাঁকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকে এবং সেখানে চার ঘণ্টা দীর্ঘ সাক্ষ্যের সময় তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে কিছু পান, তবে তা তিনি কংগ্রেসকে জানাবেন। তাই কমির জন্য একধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ওই তদন্তের পর, বিশেষত তাঁর সুপারিশের জন্য কমি রক্ষণশীলদের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। কিন্তু সেই সময় জেমস কমির আচরণ, বিশেষ করে সংবাদ সম্মেলন করে হিলারি ক্লিনটনের তীব্র সমালোচনা অনেক আইনজ্ঞের চোখেই অসমীচীন কাজ বলে বিবেচিত হয়েছিল। তার কারণ হচ্ছে, এফবিআই এ বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করলেও এই ফাইল বন্ধ (ক্লোজ) করা হয়নি, অর্থাৎ কমি চলমান একটি তদন্তের বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, যা এফবিআই অতীতে করেনি এবং না করাই হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম। আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অনেক কর্মকর্তাই একে ‘অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু মনে হচ্ছে যে কমি রক্ষণশীলদের সমালোচনার কারণে একধরনের চাপ বোধ করেছেন যে এখন যদি এই ই-মেইলের বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, তবে তিনি শপথ নিয়ে কংগ্রেসকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, যা আইনের বরখেলাপ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব বাধ্যবাধকতার বিষয় বিবেচনায় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যেহেতু তাঁর হাতে সুস্পষ্ট কোনো কিছুই নেই এবং যেহেতু তিনি চিঠিতেও বলেছেন যে তিনি গতকাল জেনেছেন এবং এসব ই-মেইলে গোপনীয় কিছু আছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য তদন্তকারী ব্যক্তিদের নিরীক্ষার লক্ষ্যে এফবিআইয়ের যথাযথ তদন্তের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তাতে এটা স্পষ্ট যে এ ই-মেইলগুলো আদৌ সংশ্লিষ্ট কি না, এমন প্রমাণও হাতে নেই। এই অস্পষ্টতার কারণেই এখন প্রশ্ন উঠছে, কমির এই চিঠি রাজনৈতিক প্রভাবের চেষ্টা কি না। সিএনএনের আইনবিষয়ক বিশ্লেষক জেফরি টুবিন,
যিনি একজন বিশিষ্ট সাংবিধানিক আইনবিষয়ক গবেষক বলেও পরিচিত, স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এফবিআইয়ের একটি অলিখিত নীতি রয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনের ৬০ দিন আগে থেকে এমন কিছু না করা, যা নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। টুবিনের এই বক্তব্য ছাড়াও অনেকে একটি আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তা হলো ১৯৩৯ সালে প্রণীত এবং ২০১২ সালে সংশোধিত ‘হ্যাচ অ্যাক্ট’। এ আইনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের কেউ কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক একটি সংগঠন শুক্রবারই আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগ দাখিল করেছে। যদিও যতক্ষণ পর্যন্ত এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না যে, জেমস কমির আচরণ রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত; ততক্ষণ পর্যন্ত এটি কেবল একটি অভিযোগ বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু এই অভিযোগ যে উঠেছে, সেটিও আলোচনায় আসবে এবং ই-মেইল বিতর্কের পাশাপাশি কমির ভূমিকাও বিতর্কের বাইরে থাকবে না। কিন্তু এসবের পাশাপাশি যে বিষয়ে সবার চোখ থাকবে এবং যে আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তা হলো, কমির এই চিঠি হিলারির জন্য কতটা ক্ষতি বয়ে আনবে। ইতিমধ্যে হিলারি ক্লিনটন যেহেতু স্পষ্ট করেই দাবি করেছেন, এফবিআইয়ের কাছে যে তথ্য আছে, সব তথ্যই প্রকাশ করা হোক। সেহেতু তাঁর প্রতিপক্ষ এই অভিযোগ করতে পারবেন না যে তিনি কিছু লুকাতে চাইছেন। তার অর্থ এই নয় যে তিনি সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত; অতীতে ই-মেইল বিষয়ে অস্বচ্ছতার কারণে হিলারি অবশ্যই প্রশ্নের মুখে থাকবেন। কিন্তু কমির এই চিঠির উত্তরে হিলারি শিবির যদি এটা তুলে ধরতে পারে যে এখন পর্যন্ত আসলে কেউ কিছুই জানেন না এবং হিলারি চাইছেন সব প্রকাশ করা হোক, তবে তাঁর পক্ষে এর ক্ষতি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

শুভবুদ্ধির জাগরণ ঘটলে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ থাকবে না

প্রথম আলো: ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার এক বছর পূর্ণ হতে চলল। হত্যাকাণ্ডের আগের ও পরের ঘটনাগুলো কীভাবে দেখছেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর দীপনের নিরাপত্তার অভাব সম্পর্কে আমার কিংবা দীপনের মায়ের কোনো সচেতনতা ছিল না। দীপন নিজে কিছুই জানায়নি। এ জন্য আক্ষেপ হয়। দীপনের ৪৩ বছরের জীবনের নানা ঘটনা স্মরণ হয়। স্মৃতি কষ্ট দেয়। নীরবে অশ্রুপাত হয়। মনকে শান্ত করার চেষ্টা করি।
প্রথম আলো: দীপন কোনো চাকরি না করে জ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নিতে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। বাবা হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমাদের পরিবারের যে ক্ষতি হলো, তা তো কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। দীপনের ছেলের ও মেয়ের জন্যই সবচেয়ে বেশি কষ্ট। জাগৃতি প্রকাশনীর ‘জাগৃতি’ কথাটা ‘রেনেসাঁ’ অর্থে গ্রহণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশে নতুন রেনেসাঁ সৃষ্টি আমার ও দীপনের কাম্য ছিল। রেনেসাঁর লক্ষ্য যুগের অনাচার ও নির্যাতন থেকে মুক্তি ও নতুন সৃষ্টি। রেনেসাঁর ধারায় গণজাগরণও সৃষ্টি হয়। এসব নিয়ে দীপনেরও উপলব্ধি ছিল। মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে বাংলাদেশ সামনে না গিয়ে পেছন দিকে ফিরে যাচ্ছে। ইতিহাসের এই পশ্চাৎগতি দেখে আমার সঙ্গে দীপনও উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হতো। বাংলাদেশের লেখকসমাজে, কোনো কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও নতুন রেনেসাঁর চেতনা দেখা দিলে আবার সম্মুখগতি শুরু হবে।
প্রথম আলো: দীপন হত্যাকাণ্ড তো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নৃশংস আঘাত। এই আঘাতের বিরুদ্ধে সমাজ কতটা জাগ্রত হয়েছে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: কোনো সন্দেহ নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নৃশংসতম আঘাত। এ সম্পর্কে সমাজে স্থূল উপলব্ধি আছে। কিন্তু আত্মরক্ষামূলক মনোভাবই প্রবল। কথা বলতে, লিখতে সবাই ভয় পাচ্ছেন। সরকার পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনীকে সক্রিয় করেছে, ক্রমাগত বন্দুকযুদ্ধ ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার গতি মন্থর। যে সমাজে বৌদ্ধিক চরিত্র দুর্লভ, সে সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপলব্ধিও দুর্বল থাকে। মত থাকলে এবং মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকলে মত প্রকাশের স্বাধীনতার তাগিদ থাকে। প্রগতিশীল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির তাগিদ দেয় এমন মত প্রকাশের চেষ্টা দখি না।
প্রথম আলো: দীপন হত্যার বিচারের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা ও তদন্তকাজে কি আপনি সন্তুষ্ট?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: সমাজে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসনের জন্য বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি অপরিহার্য। যারা হত্যাকারী, জল্লাদ, অপরাধী কি কেবল তারা? হত্যাকারীদের যারা সৃষ্টি করেছে, তারা তো তদন্তের আওতায় আসছে না। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমকে বুঝতে হবে। ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা পর্যন্ত চলমান রাজনীতিকে বোঝার চেষ্টা করলে অনেক কিছু উপলব্ধি করা যায়। আবার বোঝাটাই শেষ কথা নয়, কাজের দ্বারা অপশক্তিকে পরাজিত করে শুভশক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক হাতে তালি বাজে না। দেশে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার দরকার। নতুন রেনেসাঁ ও গণজাগরণ লাগবে। সরকার চেষ্টা করছে কেবল পুলিশ, র‌্যাব, বন্দুকযুদ্ধ আর আইন-আদালত দিয়েসমস্যার সমাধান করতে।যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ন্যাটোকে দিয়ে ১৫ বছর ধরে সশস্ত্র ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর লাখো মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আছে এই যুদ্ধে থাকার জন্য। বাংলাদেশ তো মনে হয় কালচারাল অবক্ষয় থেকে এথনিক অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে।
প্রথম আলো: দীপন হত্যার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আপনি যা বলেছিলেন, তা কেবল একজন শোকাহত বাবার বক্তব্য ছিল না, ছিল বিবেকের কণ্ঠস্বর। কিন্তু হত্যার বিচারও তো হতে হবে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: হত্যার বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। তাতে আমাদের পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতা আছে। দীপনের স্ত্রী একটি মামলাও করেছে। সমাজেরও এ ব্যাপারে দায়িত্ব আছে। দীপন ছাড়াও যারা প্রাণ হারিয়েছে, সব হত্যারই বিচার হওয়া উচিত। সমাজ, সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপর তদবিরের দায়িত্ব চাপায়, তাহলে সেটা অন্যায়। রাজীব, অভিজিৎ, অনন্ত, দীপন, নাজিম—মানুষ হিসেবে এরা প্রত্যেকেই অসাধারণ ভালো ছিল। যোগ্য ছিল। ভুল করে থাকলে ভুলের সংশোধন ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সরকারের ও সমাজের কর্তব্য। সমাজ দায়িত্বশীল হলেই সমাজে শান্তি থাকে। আমি হিংসা-প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। যে বিচার দ্বারা হিংসা-প্রতিহিংসা সৃষ্টি হয়, সেই বিচার ত্রুটিপূর্ণ। তাতে আইনের শাসন বিপর্যস্ত হয়। বাংলাদেশে আইন ও বিচারব্যবস্থা দুর্বল, ত্রুটিপূর্ণ। এ দিয়ে কল্যাণ অল্পই আশা করা যায়। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে আমূল পুনর্গঠিত করতে হবে। এ কারণেই আমি শুভবুদ্ধির জাগরণের কথা বলে থাকি। সেটাও হঠাৎ হয় না। সমাজে অশুভ বুদ্ধির সঙ্গে শুভবুদ্ধির, অশুভ শক্তির সঙ্গে শুভশক্তির নিরন্তর সংগ্রাম দরকার। চিত্তশুদ্ধি, চিত্তোৎকর্ষ আকস্মিকভাবে হয়ে যাওয়ার ব্যাপার নয়; জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে চেষ্টার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।
প্রথম আলো: আপনি সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও ধর্মপন্থী—এ দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং বলেছেন, উভয় পক্ষকেই সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে। কিন্তু ধর্মবাদী বা জঙ্গিবাদীরা তো সরাসরি মানুষ হত্যা করছে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: যারা মানুষ হত্যা করছে, তারা মানুষের কাতারে নেই। তাদের জন্য কঠোরতাই দরকার। মানুষের সমাজে বাঘ-সিংহ ঢুকে গেলে যা করতে হয়, তা-ই করতে হবে। কিন্তু বৃহত্তর সমাজের দিকেও তাকাতে হবে। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের ফল কী হচ্ছে? নারীবাদী আন্দোলনের ফলে নারী নির্যাতন কমেছে? গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে ব্যর্থ করে, দুর্নীতি ও জুলুম-জবরদস্তি সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করে, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ অনুসারী হয়ে, আমরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যেসব কাজ করে চলছি, সেগুলোর ফল কী হচ্ছে! তাবলিগ জামাত, সুফি সম্মেলন, মসজিদ, মাদ্রাসা, দরগা, খানকা ইত্যাদির দিকেও তাকাতে হবে। গণতন্ত্রের অবস্থা কী? ৩৫ বছর ধরে যাঁরা ক্রমাগত ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন, তাঁদের প্রচারের ফল কী হয়েছে? সভ্যতার বিকাশে ধর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা বুঝতে হবে। ওয়াশিংটন ও লন্ডন থেকে ঢাকা পর্যন্ত আমরা যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, তাঁদের ভূমিকা সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা ভুল। কেবল মৌলবাদীদের, জঙ্গিবাদীদের ও যুদ্ধাপরাধীদের পরাজিত করে, শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। নিজেদের চরিত্রও উন্নত করতে হবে।
প্রথম আলো: আপনি একসময় সক্রিয় বাম রাজনীতি করতেন। বাংলাদেশে বামদের ব্যর্থতার কারণ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে আমি মার্ক্সবাদের প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলাম। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা চাইতাম। কিন্তু কখনো আমি মার্ক্সবাদকে অন্ধভাবে গ্রহণ করিনি। সব সময় মূল্যবোধ ও স্বাধীন বিচার-বিবেচনাকে মূল্য দিয়েছি। মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে-তুংয়ের লেখা আমি যেমন মনোযোগ দিয়ে পড়েছি, তেমনি পড়েছি অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, ত্রিবেদী, জগদীশচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র, জসীমউদ্‌দীন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথের লেখা। বার্ট্রান্ড রাসেল, তলস্তয়, এরিখ ফ্রোম ও আবু সয়ীদ আইয়ুবের লেখা মুগ্ধ বিস্ময়ে পড়েছি। নীহার রায়ের বাঙালির ইতিহাস সব সময় আমার প্রিয় বই। জাতীয় ঐতিহ্য ছেড়ে আমি মার্ক্সবাদ কিংবা অন্য কোনো চিন্তাধারা গ্রহণ করিনি। আমার রচনাবলিতে তার পরিচয় রয়েছে। বাংলাদেশের মার্ক্সবাদী ধারায় থেকেও মার্ক্সবাদী কোনো সংগঠনের সঙ্গে আমি একাত্ম হতে পারিনি। দল ভাঙাভাঙির প্রক্রিয়ায় আমি কেবল কষ্ট পেয়েছি। নির্বুদ্ধিতা ও ভণ্ডামি দেখে ব্যথিত হয়েছি। মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে-তুংয়ের চিন্তাধারা দ্বারা আমি আলোকিত ও অনুপ্রাণিত। কিন্তু কোনো অযৌক্তিক চিন্তা গ্রহণ করিনি। আমি চিন্তার জগতে আছি। কাজ করতে চাই। দল চাই। ডিকটেটরশিপ অব দ্য প্রলেতারিয়েতে কখনো আমার আস্থা হয়নি।এ দেশের মার্ক্সবাদীদের শ্রেণিসংগ্রামের ধারণাকেও আমার কাছে যান্ত্রিক মনে হয়েছে। বরং শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কে মাও সে-তুংয়ের ধারণাকে আমার কাছে কিছুটা অন্য রকম মনে হয়েছে। মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে-তুং—কারও চিন্তা ও কর্মেই গুপ্তহত্যার রাজনীতির প্রতি সমর্থন কিংবা অনুমোদন আছে বলে মনে হয়নি।গুপ্তহত্যার প্রতি ইসলামেরও কোনো সমর্থন বা অনুমোদন আছে বলে আমি মনে করি না। আমার চলায় ভুলত্রুটি থাকতে পারে, অস্বীকার করি না। ভুল হলে ভুল সংশোধন করি। ভুলটাই ধরে থাকি না।
প্রথম আলো: মুক্তিযুদ্ধের যে অঙ্গীকার ছিল গণতন্ত্র, সমতা, ন্যায় ও মানবতা; আজকের বাংলাদেশ সেসব থেকে কত দূরে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: ছয় দফা আন্দোলন মহান আবেগ দ্বারা পরিচালিত ছিল। কিন্তু তাতে ভবিষ্যৎ দৃষ্টি পর্যাপ্ত ছিল না। দল গঠন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে গভীর ধারণা, রাষ্ট্র গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্যা ইত্যাদি বিবেচনা পায়নি। সেই আবেগ-উত্তেজনার কালে দলীয় আত্মগঠনের কিছুই ছিল না। ফলে নতুন রাষ্ট্র নতুন সংবিধান নিয়ে ভালো চলছে না ১৯৭২ সাল থেকেই। তারপর সামরিক শাসন, এনজিও, সিভিল সোসাইটি, সংস্থা ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি। আট বছর ধরে আওয়ামী লীগ একটানা ক্ষমতায় আছে। প্রকৃতপক্ষে এখন বাংলাদেশে কার্যকর আর কোনো দলই নেই। বাংলাদেশ এখন চলছে মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতাবাদ, বন্ধুত্ববাদ ইত্যাদি নিয়ে। গণতন্ত্রকে পর্যবসিত করা হয়েছে নির্বাচনতন্ত্রে। গণজাগরণ আর হুজুগ এক নয়।
প্রথম আলো: দীপন হত্যার বিচার হবে, অপরাধীরা শাস্তি পাবে বলে সরকার থেকে বলা হচ্ছে। আপনি কতটা আশাবাদী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: এ প্রশ্ন অনেকেই করেন। প্রচারমাধ্যমেও বারবার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়। হয়তো আশার কারণ যথেষ্ট পাওয়া যায় না বলেই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়।
প্রথম আলো: দীপন হত্যার পরে সমাজে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল, আমরা কি সেটি ধরে রাখতে পেরেছি?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়াই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কালস্রোতে সবই ভেসে যায়। সমস্যাবলির সমাধানের জন্য সদর্থক আন্দোলন আমাদের কর্তব্য। এর জন্য চিন্তাভাবনার ও কার্যধারার আমূল সংস্কার দরকার। দীপনের আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত নতুন রেনেসাঁকামী কোনো কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করলে তার আরদ্ধ কাজ চলমান থাকবে।
প্রথম আলো: জাগৃতি প্রকাশনী কীভাবে চলছে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: জাগৃতি প্রকাশনীকে রক্ষা করার ও উন্নত করার প্রচেষ্টা আছে। দীপনের স্ত্রী দেখাশোনা করে। প্রয়োজনে আমার পরামর্শ নেয়। এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে লেখক-পাঠকদের সচেতনতা ও সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রথম আলো: যে দর্শন বা রাজনীতি মানুষ হত্যাকে প্ররোচিত করে, সেই দর্শনকে পরাস্ত করতে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এমনকি বুদ্ধিজীবীরা কি যথেষ্ট সক্রিয়?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমি মনে করি, ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় থেকে আমাদের রাজনীতি ও বিশিষ্ট নাগরিকদের কর্মকাণ্ড ভুলপথগামী। সময়ের দাবি ছিল গণতন্ত্রকে সফল করা। তা না করে আরম্ভ করা হলো মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন ও নারীবাদী আন্দোলন। সাধারণ মানুষের ধর্মবোধকে ক্রমাগত আঘাত করা হলো। রাজনীতি পরিচালিত হলো বিবিসি রেডিওর উসকানিমূলক প্রচার দ্বারা। নাগরিক কমিটি (১৯৮১), ৩১ বুদ্ধিজীবী গ্রুপ (১৯৮২), দ্বিতীয় নাগরিক কমিটি (এরশাদ আমল), নাগরিক কমিটি ২০০৬ (যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন) ইত্যাদির মধ্যে বাংলাদেশের ডানপন্থী, বামপন্থী সব দল খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের নির্দেশনার বাইরে কোনো চিন্তাভাবনা দেখা গেল না। লেখক-শিল্পীরা নিজেদের সত্তা হারিয়ে দলাদলিতে বিভক্ত হয়ে গেলেন।
প্রথম আলো: মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের উত্থানের কারণ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আদর্শগত কারণ হচ্ছে গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা ও ভুলপথগামিতা। কেবল মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের পরাজিত ও নির্মূল করার আয়োজন দিয়ে আমরা অবস্থার উন্নতি করতে পারব না। আমাদের আদর্শসন্ধিৎসা, আদর্শনিষ্ঠা, সততা ও চরিত্রবল লাগবে। আমাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির জাগরণ ও সক্রিয়তা লাগবে। আমাদের আদর্শবোধ ও আদর্শনিষ্ঠা সুদৃঢ় হলে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ টিকবে না। গোটা জাতির মধ্যে যে মনোবলহারা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তার গভীরতাও বুঝতে হবে। চিন্তা লাগবে, চিন্তার সঙ্গে কাজ লাগবে, কাজের জন্য দল লাগবে। যেসব দল আছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি নবায়িত হতে পারে, নতুন দলও গঠিত হতে পারে। সংগঠনগত ও আদর্শগত পুনর্গঠনের বিকল্প নেই।
প্রথম আলো: বই প্রকাশের কারণে জীবন দেওয়ার ঘটনা বিরল। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সমাজের পক্ষ থেকে দীপনের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কি?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমার বিবেচনায় জনসাধারণ ঘুমন্ত। ফেসবুক,ব্লগ ও অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের প্রভাব আছে। জনমনে তাতে গভীর চিন্তাভাবনা নেই। প্রগতিতে আস্থার প্রকাশ নেই। বইপত্রে গভীর চিন্তা কিছু আছে; কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নেই। রাজনীতি দারুণভাবে অবক্ষয়ক্লিষ্ট। পশ্চিমা সভ্যতায় সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই অবক্ষয় আছে। নতুন সভ্যতা সৃষ্টিতে মার্ক্সবাদ বেশি দূর এগোতে পারেনি। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ কী করবে? সরকার তাদের চরিত্র অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। দীপনের মতো একজন সামান্য মানুষের জীবনের মূল্য স্বীকার করার মানসিকতা সরকারের কাছ থেকে আশা করা যায় না। তবে আমার প্রতি, আমাদের পরিবার-পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানাতে আমার পরিচিত ও অপরিচিত বহুজন—সাধারণ মানুষ, অসাধারণ মানুষও—কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি, সচিব, বিচারপতি, ছাত্র-শিক্ষক, সম্পাদক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের সংখ্যা বিশাল। দীপনের অনেক বন্ধু পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে সহানুভূতি জানিয়েছে। সবার প্রতি আমি ও আমার পরিবার আজীবন কৃতজ্ঞ। দুঃসময়ে যাঁরা সমবেদনা জানান, তাঁরা মহান। তাঁদের কথা মনে এলে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়। মনে বল-ভরসাও হয়। মনে হয় আমি একা নই। আমরা নিঃসঙ্গ নই। মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব ফয়সল আরেফিন দীপন নামটি শুদ্ধ করে লিখে শোক প্রকাশ করেছেন। প্রকাশক হত্যায় শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের সাংবাদিকেরা ছুটে এসেছেন আমার কাছে। টেলিভিশন চ্যানেলে ও সংবাদপত্রে তাঁরা আমারও সাক্ষাৎকার প্রচার করেছেন। শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই—আমার এ কথাটা দেশে-বিদেশে বারবার প্রচারিত হয়েছে। অনেক রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রকাশক দীপন হত্যার বিচার দাবি করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিবও ভিন্ন বিবৃতিতে তা করেছেন। মনে হয়েছিল যেন গোটা দুনিয়া নড়ে উঠেছে।
প্রথম আলো: দীপন হত্যার পর হলি আর্টিজানের ঘটনা ঘটল। দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: আমার মনে হয়েছে ব্লগারদের হত্যা ও দীপন হত্যা গণজাগরণ মঞ্চের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধাপরাধীদের প্রাণদণ্ডেরও প্রতিক্রিয়া। আন্তর্জাতিক কোনো পরিকল্পনা না-ও হতে পারে। হলি আর্টিজানের অপারেশন অবশ্যই কোনো বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহ্‌রীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম, তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস—এগুলোকে বৈশ্বিক পরিকল্পনার অংশ বলে মনে হয়। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ন্যাটো যে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় দুনিয়াব্যাপী অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। মানবজাতির নৈতিক চেতনার অভাবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আক্রমণ, সৈন্য সমাবেশ ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই।
প্রথম আলো: জঙ্গিবাদীদের মোকাবিলায় সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা কি যথেষ্ট মনে করেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: সরকার কেবল উপরিতলটা দেখছে, গভীরে দৃষ্টি দিচ্ছে না। সরকার অবলম্বন করছে কঠোর দমননীতি। আদর্শগত প্রশ্নে, মনোজগতের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। সভ্যতার সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য দরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। সভ্যতার বিকাশে ধর্মের অবদান স্বীকার করতে হবে। আদর্শগত চিন্তার মৌলিক পুনর্গঠন লাগবে।
প্রথম আলো: যুক্তির সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র কায়েমের কোনো লক্ষণ দেখছেন কি?
আবুল কাসেম ফজলুল হক: সরকারি, বেসরকারি ও সরকারবিরোধী কোনো মহলেই তা এখন দেখা যাচ্ছে না। বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের মধ্যে সৃষ্টিশক্তির কোনো লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না। কেবল সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করে আর পরীক্ষার সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে শিশু-কিশোরদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। যাঁরা সাম্রাজ্যবাদের অনুসরণে সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতির পক্ষে ওকালতি করছেন, তাঁরা কেউ কি অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক ও কেব্রিজ হ্যান্ডবুক অব ক্রিয়েটিভিটি-জাতীয় কোনো বই ছুঁয়ে দেখেছেন? সারা দেশে সব ছেলেমেয়েকে ক্রিয়েটিভ বানানো যাবে?
প্রথম আলো: এই মুহূর্তে রাজনীতির প্রধান সংকট কী? সব ক্ষেত্রেই তো অবক্ষয় ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: কোনো সন্দেহ নেই, দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের মধ্যে আমরা পড়ে গেছি। অশুভ প্রতিযোগিতা সর্বত্র। সর্বজনীন কল্যাণের চিন্তা দুর্লভ। গোটা মানবজাতিই অবক্ষয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতার সংকট চলছে। স্পেংলার ডিক্লাইন অব দ্য ওয়েস্ট গ্রন্থে, সুইটজার দ্য ডিকে অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব সিভিলাইজেশন গ্রন্থে,ক্লাইভ বেল সিভিলাইজেশন গ্রন্থে, রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে মানবজাতির যে দুর্দশার কথা বলেছিলেন, তা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মার্ক্স, অ্যাঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রকাশ করে যে প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন, নানা কর্মকাণ্ডের পর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর তা-ও বন্ধ হয়ে গেছে।সংকট ও অবক্ষয় দ্রুতগতিতে চলছে।
বাংলা ভাষার দেশে বুদ্ধদেব বসুদের অবক্ষয়বাদী সাহিত্যান্দোলনের মধ্য দিয়ে যে চিন্তা-চেতনার সূচনা ও বিকাশ, মাস্টার ডিসকোর্স ও গ্র্যান্ড ন্যারেটিভস বাতিল করে দিয়ে চলার মধ্য দিয়ে সেই চিন্তা-চেতনারই আরওপ্রবল গতি চলছে। নজরুল, জসীম, সুকান্ত, সুভাষ, সিকানদার আবু জাফরদের ধারা তো বিকাশহীন। চিন্তা-চেতনায়, দর্শন-বিজ্ঞানে রেনেসাঁর ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। ফজলুল হক, ভাসানী, শেখ মুজিবেরকালের রাজনৈতিক চেতনা থেকে আমরা বিচ্যুত। তবে সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শুভবুদ্ধির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রথম আলো: আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে কিছু বলুন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: রাজনীতির বিপথগামিতা দেখে ২০০৪ সালে আমি ‘২৮ দফা’ লিখেছিলাম। ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে স্বদেশ চিন্তা সংঘ এবং আরও দু-একটি সংগঠন সেটি প্রচার করে চলেছে। এতে বাংলাদেশকে শতভাগ মানুষের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলার প্রস্তাব ও পরিকল্পনা আছে। আন্তর্জাতিক ফেডারেল বিশ্বসরকার গঠনের দ্বারা বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনেরও প্রস্তাব আছে। আমাদের জাতির জন্য এবং দুনিয়ার প্রতিটি জাতির জন্য প্রগতির সুষ্ঠু ধারায় উত্তীর্ণ হওয়ার পথনির্দেশ তাতে আছে। ২৮ দফা আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচি। বিশিষ্ট নাগরিক, প্রতিপত্তিশালী বুদ্ধিজীবী, শক্তিশালী রাজনীতিবিদ আর কায়েমি স্বার্থবাদীরা আমার বক্তব্যকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেছেন। কিন্তু তাঁদের বাইরে ‘২৮ দফা আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচি’ যিনিই পড়েছেন, তিনিই আশান্বিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আমি লিখি অন্তরের তাগিদে। মনে হয় আমার লেখা আমাদের জাতীয় জীবনে একদিন না একদিন কার্যকারিতা পাবে। নতুন রেনেসাঁ ও নতুন জাগরণ দেখা দেবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আবুল কাসেম ফজলুল হক: ধন্যবাদ। শুভবুদ্ধির জয় হোক।

Saturday, October 29, 2016

এ কী বললেন এফবিআই পরিচালক!

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সব বিতর্ক ছাপিয়ে এবার তোপের মুখে মার্কিন তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) পরিচালক জেমস কমি। নির্বাচনের জন্য বাকি মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়। এর মধ্যে তিনি কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে বলেছেন, অন্য একটি তদন্ত করতে গিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের গোপন ই-মেইলের সন্ধান পাওয়া গেছে। তদন্তে অপরাধমূলক কিছু পাওয়ার আগেই তাঁর এমন বক্তব্যে অনেকেই অবাক। স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার কংগ্রেসের সব কমিটি চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে এমন তথ্য জানান জেমস কমি। এরপরই শুরু হয়েছে হইচই। বিষয়টি দ্রুত সংবাদমাধ্যমে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারকালে এফবিআই পরিচালকের এমন পদক্ষেপকে হিলারি ক্লিনটনের জন্য অমঙ্গলের বার্তা বলে মনে করছেন তাঁর সমর্থকেরা। পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকেরা মনে করছেন, এবারে হিলারি ঠিকই ধরা খাবেন। 
পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে হিলারি ক্লিনটন ব্যক্তিগত ই-মেইলে রাষ্ট্রীয় বিষয়ের লেনদেন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্পর্শকাতর তথ্য অন্যদের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ ছিল। প্রায় এক বছর ধরে তদন্তের পর গত জুলাই মাসে এফবিআই কংগ্রেসে প্রতিবেদন দাখিল করে। সে সময় এফবিআই-প্রধান জেমস কমি বলেন, হিলারির বিরুদ্ধে তদন্তে কিছু পাওয়া যায়নি। সাবেক কংগ্রেসম্যান অ্যান্থনি উইনারের বিরুদ্ধে তদন্তের সূত্র ধরে গতকাল শুক্রবার এফবিআই পরিচালকের কাছে নতুন তথ্য আসে। তড়িঘড়ি করে ওই দিন সকালেই তিনি কংগ্রেসের সব কমিটি-প্রধানের কাছে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানান। চিঠিতে বলা হয়েছে, অ্যান্থনি উইনারের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে হিলারির ওই ই-মেইলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব ই-মেইলের মধ্যে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য আছে কি না বা কোনো আইনের লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা বলা হয়নি। প্রভাবশালী দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভাগীয় প্রধানের পদক্ষেপ নিয়ে এফবিআইতেই অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এফবিআই মনে করছে, তদন্তে অপরাধমূলক কিছু পাওয়ার আগেই কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে হিলারির নির্বাচনী প্রচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন জেমস কমি। সাধারণত,
নির্বাচনের ঠিক আগে আগে এমন পদক্ষেপ নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, তদন্ত করার আগেই হিলারির ই-মেইল নিয়ে এফবিআই পরিচালকের এমন মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে (জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট) তোলপাড় চলছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডায়ান ফেইন্সটাইন বলেছেন, নির্বাচনের প্রভাব বিবেচনা করেই এফবিআই এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আরও সতর্কতা দরকার ছিল। তবে রিপাবলিকানরা এফবিআই পরিচালকের পদক্ষেপের প্রশংসা করছেন। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ ফুরফুরে মেজাজে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ওয়াটারগেটের মতোই হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল কেলেঙ্কারি। শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা করেন। শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী উত্তেজনার মধ্যে ই-মেইল নিয়ে হিলারির প্রচারশিবিরকে দিনভর বিব্রত থাকতে হয়েছে। হিলারি বলেছেন, ই-মেইলে কী পাওয়া গেছে, সব খোলাসা করে বলা হোক।

ট্রেনে সাজতে মানা!

‘সব নারীই সুন্দর। তবে কখনো কখনো তাঁদের বিশ্রী দেখায়।’—গানের কথাগুলো এ রকম। চলন্ত ট্রেনে এ গান যখন বাজছে, তখন দেখা গেল যে দুই তরুণী লিপস্টিক আর মাশকারা নিয়ে নিজেদের সাজাতে ব্যস্ত। পরের দৃশ্যে হাজির অভিনেত্রী সাওয়া নিমুরা। তিনি ওই দুজনকে বলেন, ‘চলন্ত ট্রেনে এমন আচরণ থেকে দয়া করে বিরত থাকুন।’ জাপানের রেলওয়ে কোম্পানি তোকু করপোরেশন এমনই একটি মিউজিক ভিডিও বানিয়েছে। গত মাসে প্রকাশ করা ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওটি নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। কেউ কেউ বলছেন, এই ভিডিও প্রচার করা উচিত। রেলগাড়িতে বিরক্তিকর সাজগোজ এবার যদি বন্ধ হয়! আবার আরেক দল বলছে, বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগ মেনে নেওয়া যায় না। টুইটারে একজন লিখেছেন, ‘ট্রেনে সাজতে গেলে পাউডার বা প্রসাধনসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে পারে। এতে অন্য যাত্রীদের পোশাক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রসাধনের তীব্র গন্ধও হয়তো কারও বিরক্তির উদ্রেক করবে।
তাই বলে রেলওয়ে কোম্পানি তো আমাকে বলতে পারে না—আমি সুন্দর নাকি অসুন্দর।’ আরেকজনের মতে, ‘এই সমাজ নানাভাবে নারীবিদ্বেষকে ঠিক বলে দেখাতে চায়। আর এভাবেই তারা নারীর প্রতি নিপীড়ন চালিয়ে যেতে চায়। ট্রেনে সাজগোজে মানা করলে তো কেউ খেপছে না। বরং তারা এ ধরনের অবমাননাকর মিউজিক ভিডিওর প্রতিবাদ করছে।’ যাঁরা পক্ষে আছেন তাঁরা বলছেন, ট্রেনে লোকের সামনে সাজগোজের মতো আচরণ সুরুচির প্রকাশ নয়। বিরোধীরাও পাল্টা জবাব দিচ্ছেন। একজন বলেছেন, পশ্চিমা দেশে জনসমক্ষে কোনো নারী সাজগোজ করলে তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক ধারণা করা হয়। কিন্তু ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথকে তো প্রায়ই দেখা যায় যে সবার সামনে লিপস্টিক বের করে ঠোঁটে দিচ্ছেন। তখন লোকে তো কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে না! বরং তিনি কোন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক মাখছেন, সেটাই আলোচনা করে। দুই পক্ষে যখন এমন পাল্টাপাল্টি চলছে, তখন তোকু করপোরেশন জানিয়েছে, তারা এ রকম আরও কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করতে যাচ্ছে। রেলযাত্রীদের আদবকায়দা শেখানোই তাদের উদ্দেশ্য। বাকি ভিডিওগুলোয় আছে, ট্রেনে স্মার্টফোন ব্যবহার করলে কীভাবে অন্য যাত্রীরা বিরক্ত হন অথবা ভিড়ের মধ্যে ভারী ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করলে সহযাত্রীদের কতটা কষ্ট হয়—সেসব বিষয়ে লোকজনকে সচেতন করা। জাপানের বেসরকারি রেলওয়ে সমিতির জরিপ ও যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতেই ভিডিওগুলোর বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারের নির্বাচন ভিন্ন রকম তাই মাঠে নেমেছি: মিশেল

নর্থ ক্যারোলাইনায় এক মঞ্চে হিলারি
ক্লিনটন ও মিশেল ওবামা। এএফপি
ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রচার মঞ্চে উঠে তাঁর জন্য ভোট চেয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। মিশেল এতে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর আগে কোনো ফার্স্ট লেডি এতটা জড়িয়ে পড়েননি। কিন্তু এবারের নির্বাচন ‘একেবারে ভিন্ন ধরনের হওয়ায়’ তিনি মাঠে নেমেছেন। নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ওয়েক ফরেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত যৌথ প্রচারণায় মিশেল ওবামা এ কথা বলেন। মিশেল ওবামা ও হিলারির এই যৌথ প্রচারণা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এটি ছিল মিশেল ওবামা ও হিলারির প্রথম যৌথ নির্বাচনী সভা। ফার্স্ট লেডি হিসাবে মিশেল ওবামা এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জনসমর্থনের পরিমাণ ৬২ শতাংশ (ওবামার ৫৭ শতাংশ)। হিলারির নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে ওবামা ও মিশেল উভয়েই নির্বাচনী অভিযানে জড়িয়ে পড়েছেন। সে জন্য অবশ্য তাঁরা দুজনেই রিপাবলিকানদের কাছে সমালোচিত হয়েছেন। নর্থ ক্যারোলাইনার ভাষণে মিশেল ওবামা স্বীকার করেন, আগের কোনো ফার্স্ট লেডি প্রচারণায় এতটা জড়িয়ে পড়েননি। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এবারের নির্বাচন আগের অন্য কোনো নির্বাচনের সঙ্গে তুলনীয় নয়, আর সে কারণেই আমি মাঠে নেমেছি।’ ফার্স্টলেডি ও হিলারি ক্লিনটনের এ যৌথ প্রচারণার জন্য নর্থ ক্যারোলাইনাকে বিশেষভাবে বেছে নেওয়ার কারণ এই অঙ্গরাজ্যের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার কৃষ্ণকায় ও নারী। এখানে এই মুহূর্তে ট্রাম্পের তুলনায় হিলারি আড়াই পয়েন্টে এগিয়ে, তিনি এই সুবিধাজনক অবস্থা ধরে রাখতে চান। মিশেলের উপস্থিতি আফ্রিকান-আমেরিকান অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ ও নারী ভোটারদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করবে, হিলারি পক্ষ সেই আশা করছে।
 কোনো কোনো গ্রুপকে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করতে ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবিরের তৎপরতার নিন্দা করেন মিশেল ওবামা। ব্লুমবার্গ বিজনেস উইক অজ্ঞাতনামা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ভোট দেওয়া ঠেকাতে ট্রাম্প প্রচারণা শিবির নারী, কৃষ্ণাঙ্গ ও উদারপন্থী শ্বেতকায় ভোটারদের মধ্যে বিশেষ প্রচারণা শুরু করেছে। হিলারি কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে যে কটু কথা বলেছেন, বিল ক্লিনটন ক্ষমতায় থাকার সময় নারীঘটিত যেসব কেলেঙ্কারি করেছেন এবং হিলারি উদারনৈতিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে পরাস্ত করতে যে সব ‘আপত্তিকর পথ’ অনুসরণ করেছেন, এই প্রচারণায় তার সবিস্তার বিবরণ থাকছে। নর্থ ক্যারোলাইনায় ফার্স্টলেডি ভোট ঠেকানোর এই তৎপরতার তীব্র নিন্দা করেন। ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘হিলারির প্রতিপক্ষ চায় আমরা যেন ভোট কেন্দ্র না যাই, সেটাই তাদের নির্বাচনী কৌশল। তাঁরা নোংরা ও কদর্য উপায়ে হিলারির বিজয় ঠেকাতে চায়।’ মিশেল বলেন, ‘এই দেশে ভোটাররাই ঠিক করে কে জিতবে, কে হারবে।’

শীতল যুদ্ধে ফিরতে চায় না ন্যাটো

জেনস স্টোলটেনবার্গ
রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, ন্যাটো জোট আরেকটি শীতল যুদ্ধ চায় না। তারা রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধে জড়াতে চায় না। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন স্টোলটেনবার্গ। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টোলটেনবার্গ বিবিসিকে বলেন, সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক অভিযান চালানো এবং সেখানে রণতরি পাঠানো নিয়ে পাশ্চাত্যের সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা বাড়লেও তাঁরা দেশটিকে হুমকি হিসেবে দেখছেন না।
স্টোলটেনবার্গ বলেন, সংঘাতের উসকানি দেওয়ার জন্য নয়, বরং সংঘাত ঠেকানোর জন্যই ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে অতিরিক্ত চার হাজার সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে। ন্যাটোর মহাসচিব বুধবারই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা তাদের জোটকে পূর্ব ইউরোপে সেনা সমাগম বাড়াতে বাধ্য করছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে শীতল যুদ্ধ অবসানের পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নেমে এসেছে। যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা মিত্রদেশগুলো পূর্ব ইউরোপে সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতির আয়োজন করেছে। এমন পটভূমিতে ন্যাটোর পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এল। রাশিয়া ২০১৪ সালে প্রতিবেশী ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মস্কোর ওপর অবরোধ আরোপ করে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষ নিয়ে দেশটির বিদ্রোহীদের ওপর রাশিয়া সামরিক অভিযান শুরু করলে দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়। সিরীয় বিদ্রোহীদের অনেককে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে।
সম্প্রতি রাশিয়া তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র সিরিয়ার উপকূলে স্থায়ী নৌঘাঁটি গড়ার ঘোষণা দেয়। রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রণতরি ন্যাটো দেশ যুক্তরাজ্যের গা-ঘেঁষে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে সিরিয়ার দিকে রওনা হয়েছে। দিন কয়েক আগে রণতরিটি জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য ন্যাটো সদস্য স্পেনে ভিড়তে চেয়েছিল। তবে ওই রণতরি থেকে হামলা চালিয়ে সিরিয়ার বেসামরিক মানুষ মারা হতে পারে বলে ন্যাটো উদ্বেগ জানালে রাশিয়া জাহাজটি স্পেনে ভেড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বিবিসির প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদদাতা জনথন মার্কাসের মূল্যায়ন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া মনে করছে, পশ্চিমারা তাদের দমিয়ে রাখতে চায়। সে কারণেই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছেন। এ কারণেই ন্যাটো উদ্বিগ্ন হয়ে রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে পোল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলের তিন দেশ এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়ায় আগামী বছরের শুরুতে এক হাজার করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়ার আশঙ্কা,
ক্রিমিয়ার মতো তাদেরও রাশিয়া আবার দখল করে নিতে পারে। আর পোল্যান্ডের মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে কালিনিনগ্রাদে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা স্থাপন করায় সে দেশটিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ন্যাটোর প্রধান স্টোলটেনবার্গ বিবিসিকে বলেন, ন্যাটোর তৎপরতা রাশিয়ার সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর জন্য নয়। ন্যাটোকে সমন্বিত প্রতিরক্ষার স্বার্থেই এটি করতে হবে। তিনি বলেন, ন্যাটো রাশিয়ার সঙ্গে আরও ‘সহযোগিতা ও গঠনমূলক সম্পর্ক’ গড়তে চায়। ন্যাটোর পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে, তাদের ধারণা রাশিয়া তার পশ্চিম সীমান্তে ৩ লাখ ৩০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে। এদিকে সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধের পর থেকে পূর্ব ইউরোপে সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতির আয়োজন করছে পশ্চিমা দেশগুলো। যুক্তরাজ্য বলেছে, আগামী বছরের প্রথম চার মাসের মধ্যেই রোমানিয়ায় বিমানবাহিনীর টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠানো হবে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল ফ্যালোন বলেছেন, এস্তোনিয়ায় তাঁরা ৮০০ সেনা পাঠাচ্ছেন।

আর মুখ খারাপ করব না: দুতার্তে

বেফাঁস কথাবার্তার জন্য সুপরিচিত ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বলেছেন, তিনি ‘ঈশ্বরকে কথা দিয়েছেন’ আর কাউকে গালিগালাজ করবেন না বা অশিষ্ট ভাষায় কথা বলবেন না। জাপান সফর শেষে গতকাল শুক্রবার নিজ শহর দাভাওতে ফিরে দুতার্তে বলেন, ঈশ্বর এ বিষয়ে ‘চরমপত্র’ দেওয়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশের বিমানবন্দরে নেমে দুতার্তে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিমানে হঠাৎ একটি কণ্ঠ শুনলাম, কণ্ঠটি আমাকে বলল, “গালিগালাজ বন্ধ কর, নইলে বিমান মাঝ আকাশেই ভেঙে পড়বে”;
এরপরই আমি গালমন্দ করব না বলে কসম করেছি।’ প্রেসিডেন্ট দুতার্তে বলেন, তিনি মনে করেন ঈশ্বরকে কথা দেওয়া মানে দেশের জনগণকেও কথা দেওয়া। তবে দুতার্তে এ-ও বলেন, কিছু বিষয়ে তাঁর এই প্রতিশ্রুতির সীমাবদ্ধতা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী লেইলা ডি লিমার বিষয়ে কথা বলার সময় এ প্রতিশ্রুতি রাখবেন কি না তা সেই সময়ের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। পশ্চিমা নেতাদের ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে প্রায়ই গালি দেওয়ায় দুতার্তে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তাঁর গালমন্দ ও কটুক্তির দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস ও একাধিক কূটনীতিক; যাঁদের তিনি ‘...ছেলে’ বলে গালি দিয়েছেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ ও বিদেশি ব্যবসায়ীদের ফিলিপাইন ছাড়ার আহ্বান, ইইউকে ‘ভণ্ড’ আখ্যা দেওয়া ও হিটলারের ইহুদি নিধনকে সমর্থন করেছেন তিনি। ফিলিপাইনের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনে সম্পর্ক ছিন্ন করারও হুমকি তিনি দিয়েছেন। দুতার্তের লাগামহীন বাক্যবাণ নিয়ে জোর সমালোচনা হলেও সর্বশেষ এক জরিপে দেখা গেছে, তিনি নিজ দেশে জনপ্রিয়তার তুঙ্গেই রয়েছেন।

হলিউডের পদপথে ট্রাম্পের ‘তারকা’ হামলার শিকার

হলিউডের বিখ্যাত ‘ওয়াক অব ফেম’-এ প্রায় আড়াই হাজার বিখ্যাত ব্যক্তির নামে তারকা খচিত আছে। এঁদের একজন হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প চলচ্চিত্রের কেউ না হলেও তাঁর জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘অ্যাপ্রেন্টিস’-এর জন্য সোনালি রং মাখা তারকাটি অর্জন করেন। গত বুধবার কে বা কারা সেই তারকাটি হাতুড়িজাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
পরে সিসি টিভির ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে জানা গেছে, জেইমি অটিস নামের এক যুবকের কাজ এটি। জেইমি পুলিশকে বলেছেন, তিনিই কাজটি করেছেন এবং এর জন্য জেলে যেতেও প্রস্তুত। জেইমি একটি সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, তাঁর ইচ্ছা ছিল তারকাটি কেটে তুলে নিয়ে তা নিলামে তোলা। এ থেকে যে অর্থ উঠবে, তা ট্রাম্পের যৌন আগ্রাসনের শিকার নারীদের সাহায্যে ব্যবহার করা হবে। এই পদপথটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা লস অ্যাঞ্জেলেসের চেম্বার অব কমার্স এক দিনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত তারকাটি মেরামত করে ফেলে। এর জন্য তাদের গচ্চা দিতে হয়েছে ২ হাজার ৫০০ ডলার।

র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৩

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার নিজামপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। র‍্যাবের ভাষ্য, নিহত তিনজন ডাকাত দলের সদস্য ​ছিল। তবে তাদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি র‍্যাব। র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) চন্দন দেবনাথ আজ শনিবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন,
পাঁচ থেকে সাতজনের একটি ডাকাত দল ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবর পেয়ে র‍্যাবের টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাকাতদের ধাওয়া করে। এ সময় ডাকাতেরা গুলি ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে র‍্যাবও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে ডাকাত দলের তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। অন্যরা পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ তিনজনকে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। চন্দন দেবনাথ বলেন, ওই ঘটনায় র‍্যাবের দুই সদস্যও আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

কী বার্তা দিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নতুন ও সাবেক সাধারণ
সম্পাদক হাতে হাত ধরে অভিনন্দনের জবাব দেন
একটি সুশৃঙ্খল, সফল ও আলোকসজ্জা–শোভিত সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এখন ফুরফুরে মেজাজে আছেন। আরও ফুরফুরে আছেন দলের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি প্রায় প্রতিদিনই দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, সংবাদ সম্মেলন করছেন। বৃহস্পতিবার দুটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীেগর সাধারণ সম্পাদক দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নির্বাচন, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির ওপর আলোকপাত করেছেন।
চলমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু না বললেও ওবায়দুল কাদের দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার কথা বলেছেন। দলের হাইব্রিড নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা বললেও কীভাবে হাইব্রিড নেতারা দলে এলেন, তাঁদের বের করে দেওয়া হবে কি না, তা বলেননি তিনি। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগকে আরও গতিশীল করা এবং চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় জানানোর পাশাপাশি দলে যে কিছু সমস্যা আছে, তা–ও স্বীকার করেছেন। বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘বিএনপি কি আসলেই সংলাপ চায়? সংলাপ চাইলে তো তারা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিত। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করে আমন্ত্রণ জানালেও বিএনপির চেয়ারপারসন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিএনপি এখনো গত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার খেসারত দিচ্ছে। ৫০০ লোকের মিছিলও করতে পারছে না। তারা বিরোধী দলের সম্মানও হারিয়েছে। আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে ভুলের চোরাবালিতেই আটকে থাকবে বিএনপি।’ (সমকাল, ২৭ অক্টোবর ২০১৬) যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই যে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে এ কথাও বলতে হবে যে বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নির্বাচন, সংসদ ও গণতন্ত্র। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশের মানুষ যে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা কীভাবে অপহৃত হলো? ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি আসেনি মানলাম। কিন্তু পরবর্তী উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে হওয়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো তারা অংশ নিয়েছে। সেসব নির্বাচন কেন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলো না? কেন মানুষ পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারল না?
আওয়ামী লীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক কি সেসবও বিএনপির ভুলের খেসারত বলে চালিয়ে দেবেন? ওবায়দুল কাদের ওই সাক্ষাৎকারে একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনও সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হবে। যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে, ঠিক সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।’ আগামী নির্বাচন কমিশন সবার প্রত্যাশা পূরণ করে গ্রহণযোগ্য অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করবে বলে তিনি মনে করেন। (সাক্ষাৎকার, ওই)। বিএনপির দাবিও তো তা–ই। গত বুধবার এক সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নির্বাচন যেই সরকারের অধীনে হোক না কেন, নির্বাচন কমিশন হতে হবে সব দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা ও জাতীয় পরিষদের সদস্য রানা আফজল খান বলেছেন, তাঁদের দেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। সরকারি ও বিরোধী দল থেকে তিনটি করে নাম দেওয়া হয়। এর মধ্যে যে নামটি মিলে যায়, তাঁকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। পাকিস্তানের উদাহরণে অনেকে ভ্রু কুঁচকাতে পারেন। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, ওখানে সব দল মিলে একটি নির্বাচন করতে পেরেছে। আমরা পারিনি। অপর সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট আগামী নির্বাচন। পরবর্তী টার্গেট রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন। অর্থাৎ উন্নত ও মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা। ...এই মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ আমাদের প্রধান বিপদ। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে তারা ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি যে নিচ্ছে না, এ কথা বলার উপায় নেই।
এ বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ অক্টোবর ২০১৬) তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবেন না। জঙ্গিবাদ যে দেশের প্রধান বিপদ, সে সম্পর্কে মানুষ সজাগ। বরং সরকারের ঘুমটা ভেঙেছে হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির পর। আগে ভাঙলে হয়তো আরও অনেক অঘটন থেকে দেশ রেহাই পেত। তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের কাছে বিএনপি প্রত্যাশা করছে, তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবে এবং নতুন নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে; আপনি কী বলবেন? জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গণতন্ত্র ও নির্বাচন সবই আছে। একটা গণতান্ত্রিক দল দীর্ঘদিন সরকারের বাইরে আছে। সরকারের বাইরে থেকে বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা যদি যথাযথভাবে পালন করে এবং গত নির্বাচনের মতো নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি যদি তারা না ঘটায়, তাহলে দেশে স্বস্তি আসবে। ...যেসব ঘটনা দেশকে পিছিয়ে দেয়, গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত করে, দেশের স্থিতিকে রক্তাক্ত করে, সেসব ঘটনা না ঘটিয়ে তারা জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন করুক। জনমত গড়ে তুলুক। বিরোধী দল বা বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী হলে সরকার আরও শক্তিশালী হয়।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমরা একমত। গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত করা কিংবা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা কোনো দায়িত্বশীল দলের কাজ হতে পারে না। অতীতে বিএনপি আন্দোলনের নামে জ্বালাও–পোড়াও করলেও এখন তাদের একমাত্র দাবি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। এমনকি সরাসরি না বললেও আওয়ামী লীগের নেতারা যে হরদম বলে বেড়াচ্ছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগেও নির্বাচন দেবেন না,
সেটিও তাঁরা মেনে নিয়েছেন। পরের প্রশ্ন ছিল, বিএনপি আপনাদের স্বাগত জানিয়েছে—বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের মতের বিভেদ থাকতে পারে। তবে রাজনীতিতে সৌজন্য হারিয়ে যাবে, এটা ঠিক না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা কাজের পরিবেশ থাকা ভালো। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোরও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে, আমিও তাদের শুভেচ্ছা জানাই।’ কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করলাম, তাঁর এই উপলব্ধিই এক দিন পরই পাল্টে যায়। পরদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিলেন। এর মাধ্যমে কী বার্তা দিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক? তিনি অরাজকতার পুরো দায় যেমন বিএনপির ওপর চাপালেন, আবার বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগের ওপরও চাপাতে পারেন। কিন্তু সংকট উত্তরণের উপায়টা কী? ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির কাজ এখন প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে’ কিংবা ‘তারা ৫০০ লোককে নিয়ে মিছিলও করতে পারে না’। সত্যিই কি বিএনপি ৫০০ লোককে নিয়ে মিছিল করার সামর্থ্য হারিয়েছে? সেটা হলে তো আওয়ামী লীগের উচিত বিএনপির মনোনীত ব্যক্তিদের দিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন করে জনপ্রিয়তা যাচাই করা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে বোমাসন্ত্রাস যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি বাঞ্ছিত নয় কোনো দলকে ঘরে আটকে রাখাও। বিএনপির কোনো নেতা বা কর্মী যদি অতীতে বা বর্তমানে সন্ত্রাসী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে থাকেন, সরকারের দায়িত্ব তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা; উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া। কিন্তু সব শীর্ষ নেতাকে হুকুমের আসামি করে দৌড়ের ওপর রেখে ক্ষমতার বাহাদুরি দেখানো যেতে পারে, তাতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
এতে বরং আন্দোলনের নামে যাঁরা জ্বালাও-পোড়াও করেছেন, তাঁদের ছাড় পাওয়ার আশঙ্কা থাকবে; ইতিমধ্যে অনেকে ছাড় পেয়েও গেছেন। সম্প্রতি সিলেটে ছাত্রলীগের এক নেতার হাতে খাদিজা নামের এক কলেজশিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতারা জোরেশোরে বলতে থাকলেন, ‘অপরাধীদের কোনো দল নেই। অপরাধ যে–ই করুক না কেন, তাকে শাস্তি পেতে হবে।’ একই যুক্তি কেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের বেলায় প্রযোজ্য হবে না। তবে ওই সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের দলের নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে যে আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য রেখেছেন, সে জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। কেননা, আমাদের কোনো দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাই দলীয় কর্মীদের দোষ স্বীকার করেন না। সবকিছুর জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেন। তাঁর মতে, ‘দলকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা আমাদের অন্যতম কাজ। উন্নয়ন আর আচরণকে একই ধারায় বহমান করা দরকার। উন্নয়ন যতই হোক না কেন, আচরণ খারাপ করলে উন্নয়ন ম্লান হয়ে যায়। আবার ভোটের রাজনীতিতেও এর প্রভাব আছে। এখন থেকেই এ কাজটি আমাদের করতে হবে।’ এর মাধ্যমে তিনি অন্তত দলীয় শৃঙ্খলা ও কর্মীদের আচরণগত সমস্যাটি অনুধাবন করেছেন বলে ধারণা করি; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা গণমাধ্যমের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেননি। সম্প্রতি দলের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদকও ব্যক্তিগত আলাপে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আচরণগত সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেছেন, কেবল উন্নয়ন দিয়ে নির্বাচনে জেতা যায় না; নির্বাচনে জিততে হলে আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নেতাদের আচরণ ও ভাষাভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। আর নেতারা পরিবর্তন না হলে কর্মীদের কাছে সেটি আশা করাও অবান্তর। আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই দল ও দেশের পার্থক্যটি বোঝেন না। তাঁরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ মানেই দেশ। অর্থাৎ, দেশকে ভালোবাসলে সবাইকে আওয়ামী লীগারই হতে হবে। তাঁরা ভুলে যান যে দেশের কোনো জনগোষ্ঠী বা শ্রেণির মানুষকে বাদ দিয়েও একটি দল গঠিত হতে পারে, কিন্তু দেশটি হয় সবাইকে নিয়ে। যদি কোনো দল ধরেই নেয় যে তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক এবং তাদের বাইরে যারা আছে, তারা সব দেশবিরোধী; তাহলে দেশ, সমাজ ও গণতন্ত্র এক অনিরামেয় ব্যাধির শিকার হতে বাধ্য।
আমরা কি সেদিকেই যাচ্ছি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে কী হবে?

এবারের মার্কিন নির্বাচন দুটি কারণে বিশিষ্ট। প্রথম কারণটি হচ্ছে, এর প্রচারণায় ভব্যতা-সভ্যতার অভাব দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, দুই প্রার্থীর মধ্যকার পার্থক্য: একদিকে ক্ষমতাকাঠামোর বিরোধী ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্যদিকে আছেন মার্জিত হিলারি ক্লিনটন। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় মার্কিন সমাজের এক গভীর ত্রুটি বেরিয়ে এসেছে। এতে দেশটির বৈশ্বিক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। মার্কিনরা এ ব্যাপারে একমত, প্রচারণা-পর্ব অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। মার্কিন নাগরিকেরা সাধারণত কোনো বিষয়ে একমত হন না, তার মধ্যে এই একটি বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন। কিন্তু শিগগিরই এটা শেষ হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে: এরপর কী হবে?
জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাবেক সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বিতর্কিত প্রার্থী ট্রাম্পকে পরাজিত করবেন। কিন্তু জরিপকে বাস্তবতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কারণ, জুনে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট গণভোটের আগেও মানুষ ধারণা করেছিল, ব্রিটেন ‘থেকে যাওয়ার’ পক্ষেই ভোট দেবে। আরও সম্প্রতি কলম্বিয়ার ভোটাররা দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের এক শান্তিচুক্তির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। অথচ ধারণা ছিল, এই শান্তিচুক্তি জনপ্রিয়তা পাবে। এত কিছু বলার লক্ষ্য হলো, হিলারি ক্লিনটনের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যাপারটা নিশ্চিত নয়। শুধু ৮ নভেম্বরের ভোটেই জানা যাবে, কে জয়ী। তার আগ পর্যন্ত আমরা শুধু সন্দেহ করতে পারি। তা সত্ত্বেও মানুষ কিছু ভবিষ্যদ্বাণী অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারে। এ ব্যাপারে তেমন সন্দেহ নেই যে এই নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র বিভক্ত হয়ে যাবে, যার সরকারেরও পরিণতি একই হবে, তা সে যেই প্রেসিডেন্ট হোক বা যে পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাক না কেন। কথা হচ্ছে, ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিক কেউই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না, যদি না তারা একে অপরকে কিছু সাহায্য করে। কিন্তু কারও এটা ভাবা ঠিক নয়, মার্কিন রাজনীতি শুধু ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান শিবিরেই বিভক্ত। বস্তুত, এই দুই দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও দ্বিদলীয় বিবাদের মতোই গভীর। দুই দলের মধ্যেই বড় ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ একটি গোষ্ঠী আছে, যারা দলকে একটি চরম জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার চরমপন্থী অংশটি দলকে বামপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, আর রিপাবলিকানদের চরমপন্থী অংশটি দলকে চরম ডানপন্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে তাদের পক্ষে একটা মধ্যপন্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে ওঠে। এদিকে নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনীতি দ্রুত শুরু হয়ে গেলে আপস-মীমাংসা করা কঠিন হয়ে যাবে। যদি হিলারি ক্লিনটন জেতেন, তাহলে হয়তো দেখা যাবে, রিপাবলিকানরা মনে করবে, শুধু ট্রাম্পের ভুলের কারণেই এমনটা হয়েছে। তারা ভাববে, হিলারি সম্ভবত একবারের জন্যই প্রেসিডেন্ট হবেন। তারা ভাববে, যে দেশটি পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে, সে দেশ পরপর চারবার ডেমোক্র্যাটদের প্রেসিডেন্ট রাখবে না। অনেক রিপাবলিকান (বিশেষ করে, যাঁরা তাঁর বিজয়ের বৈধতা মানতে চাইবেন না) হয়তো তাঁর প্রশাসনকে হতাশ করার চেষ্টা করবেন, যাতে তিনি ২০২০ সালে সফলতাপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবারও নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারেন। একইভাবে যদি ট্রাম্প জিততে পারেন, তাহলে অধিকাংশ ডেমোক্র্যাটই (সঙ্গে অনেক রিপাবলিকানও থাকবেন) এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন, যাতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না পান। তখন এটাই হবে তাঁদের প্রধান কাজ। কথা হচ্ছে, ট্রাম্পের নীতিপ্রণেতাদের কাছে তাঁর অনেক অ্যাজেন্ডাই আপত্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁর আমলে শাসন পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে যাবে। উভয় ক্ষেত্রেই আবার কিছু বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে। দেশটির আগামী সরকার হয়তো আইন করে সেখানকার পুরোনো অবকাঠামোগত নবায়নে অর্থায়ন করতে পারে। উভয় প্রার্থী ও কংগ্রেসের অনেক সদস্যই এটা পছন্দ করবেন। আবার দেশটির রাজস্ব–ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পক্ষেও হয়তো কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যেতে পারে: করপোরেশনের উচ্চ কর হার কমিয়ে সম্পদশালী ব্যক্তিদের কর বাড়ানো। এমনকি স্বাস্থ্য খাতেও কিছু সংস্কার আনা যেতে পারে, যেটা ছিল বারাক ওবামার মূল অর্জন।
যদিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর বাস্তবায়ন কঠিন ছিল। আর অন্য যেসব বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, সেগুলো শিগগিরই আমলে নেওয়া হচ্ছে না, সম্ভবত এর একটি হচ্ছে অভিবাসন–ব্যবস্থার সংস্কার। এটা যেমন যুক্তরাষ্ট্রে খুবই বিতর্কিত ব্যাপার, তেমনি ইউরোপেও। আরেকটি হচ্ছে বাণিজ্য। কারণ, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে নীতিপ্রণেতারা এমন অবস্থান নিতে ভয় পান, যার কট্টর বিরোধী গোষ্ঠী সৃষ্টি হতে পারে। কথা হচ্ছে, ট্রাম্প ও হিলারি উভয়েই ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপের বিরোধী, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অনুসমর্থন করলে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা হবে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি ও ঋণ উভয়ই বাড়তে পারে, কারণ তার অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় কমানোর তেমন ইচ্ছা নেই। তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন নির্বাচনের প্রভাব কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। কারণ, মার্কিন সংবিধান অনুসারে তাদের প্রেসিডেন্টের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি অনুসমর্থন করা বা যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার কংগ্রেসের। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়াও সামরিক বলপ্রয়োগ করতে পারেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট চুক্তি ব্যতীত আন্তর্জাতিক মতৈক্য, হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাধর কর্মী নিয়োগ ও নির্বাহী ক্ষমতার বলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বদলে দিতে পারেন। সম্প্রতি কিউবার বেলায় ওবামা যেটা করেছেন। হিলারি ক্লিনটন নির্বাচিত হলে এই বিশেষাধিকার প্রয়োগের ফলাফল এমন হতে পারে: সিরিয়ায় এক বা একাধিক নিরাপদ এলাকা প্রতিষ্ঠা করা, ইউক্রেনকে আরও আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ। তবে নির্বাচিত হলে ট্রাম্প কী করতে পারেন, তা ধারণা করা আরও কঠিন। তারপরও ধারণা করা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু প্রথাগত মিত্রের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনবে, আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে থাকবে। নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রে কী হবে, প্রশ্ন হিসেবে তা উন্মুক্ত প্রকৃতির, যদিও কিছু ধারণা করা যায়। কিন্তু একটি কথাই শুধু নিশ্চিত করে বলা যায়: বিশ্বের ৯৬ শতাংশ মানুষ এ নির্বাচনে ভোট না দিলেও মার্কিন নাগরিকদের মতো তারাও এর প্রভাব অনুভব করবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
রিচার্ড এন হাস: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট।

Thursday, October 27, 2016

বখাটে দমনের দাওয়াই by শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

খাদিজা ‘আব্বু’ ডেকেছেন। গত মঙ্গলবার তাঁর বাবা মাশুক মিয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘খাদিজা আমাকে আজ আব্বু বলে ডেকেছে। খুব আস্তে। আমি নিজে শুনেছি।’ সিলেটে ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের নৃশংস হামলার শিকার খাদিজা ৩ অক্টোবর থেকে হাসপাতালে অচেতন পড়ে ছিলেন। কাজেই তাঁর মুখে এই ‘আব্বু’ ডাকে মেয়ের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় থাকা বাবার প্রাণটা যেমন জুড়িয়েছে, তেমনি তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষী দেশের হাজারো মানুষ খুশি। সবাই চায়, মেয়েটি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাক। আরও চায়, হামলাকারী বদরুলের শিগগিরই শাস্তি হোক। এদিকে রাজধানীর মিরপুরের বিসিআইসি কলেজের ছাত্রী দুই যমজ বোনকে উত্ত্যক্ত ও মারধর করা বখাটে যুবক জীবন করিমকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাই বলে বখাটের ছুরি কিন্তু থেমে নেই। গত সোমবার ঝিনাইদহ শহরে পূজা বিশ্বাস নামের এক স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত করেছে লিটু নামের এক বখাটে। তাকে অবশ্য এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঝিনাইদহে কিছুদিন আগেও বখাটের উৎপাত সইতে না পেরে এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল। আজকাল পত্রিকার পাতা ওলটালেই বখাটেদের এমন অলক্ষুনে দু-চারটা খবর চোখে পড়েই।
এই উৎপাত যেন ক্রমে বাড়ছে। বখাটে সে এক প্রাণী বটে! শরীরটা মানুষের, প্রাণটা হায়েনার। কর্মকাণ্ড সংক্রামক ব্যাধির মতো। একটি মেয়ের পেছনে লেগে তার পুরো পরিবারের আরাম হারাম করে দেয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বখাটেদের এই উত্ত্যক্ত করার বিষয় সেভাবে নজরে আসে গত শতকের আশির দশকে। বখাটের মূল কাজ প্রকাশ্যে মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা। নারীকে স্রেফ পণ্য আর ভোগের বস্তু মনে করে তারা। আগে তাদের দৌরাত্ম্য ছিল সীমিত। শিস দিত, অশ্লীল মন্তব্য ছুড়ত, কয়েকজন মিলে উপহাস করত, ভুল বানান ও ভুল অশালীন বাক্যে প্রেমপত্র লিখে ছুড়ে দিত। চোরা-চোরা একটা ভাব নিয়ে এসব করত তারা। মেয়ের অভিভাবক বা স্বজন কিংবা পাড়ার ভাইদের দেখলে শিয়ালের মতো লেজ গুটিয়ে পালাত তারা। হালে তারা বুক ফুলিয়ে উত্ত্যক্ত করে। সঙ্গে কেবল সহযোগীই নয়, থাকে ধারালো অস্ত্রও। অপকর্মে প্রযুক্তিও কাজে লাগাচ্ছে তারা। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে, পথে কিশোরী বা তরুণীকে নাজেহাল করার ভিডিও ধারণ করে তা ফেসবুকে পাঠিয়ে পান্ডাগিরি দেখাচ্ছে। নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে উত্ত্যক্তের শিকার মেয়েটিকে তারা দমিয়ে তো রাখেই, এর সঙ্গে মেয়েটির পুরো পরিবারকে ফেলে দেয় নির্ঘুম দুশ্চিন্তায়। মেয়ের অভিভাবকেরা ধনে–মানে দুর্বল হলে তো কথাই নেই। পদে পদে হেনস্তা হয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাদের দৌরাত্ম্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কিশোরী বা তরুণীকে প্রাণটা পর্যন্ত দিতে হয়। যেমন দিয়েছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিসা। মাদারীপুরের কালকিনিতে স্কুলছাত্রী নিতুর বেলায়ও ঘটেছে একই ঘটনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্ত্যক্তের শিকার কিশোরী-তরুণীর স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষী বখাটের হামলার শিকার হন। প্রাণ খোয়ান। বিড়াল উৎপাত করলে তাকে তাড়ানো যায়। কুকুরের উপদ্রব দমনে পৌর কর্তৃপক্ষের লোকজন সুচ নিয়ে নামে। আর মশা-মাছির ওষুধ তো আছেই।
কিন্তু বখাটের বেয়াড়াপনা দমানোর দাওয়াই কী? এ প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে জেনে নিই বখাটে আসলে কারা? দেখা যাবে, অঢেল বিত্তের ভেলায় ভাসা কোনো ব্যক্তি আদুরে সন্তান, যে এসএসসি বা এইচএসসিতে সগৌরবে ডাব্বা মেরে মেয়েদের পেছনে ঘোরাটাকেই একমাত্র কাজ বলে বেছে নিয়েছে। আবার সে হতে পারে কোনো পরিবারে অনাদরে বেড়ে ওঠা তরুণ, যার মায়া-মমতাহীন জীবন অন্যের সুখ কেড়ে নেওয়ায় উদ্বুদ্ধ করেছে। আর এ ক্ষেত্রে পীড়ন করার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছে আত্মরক্ষায় তুলনামূলকভাবে নাজুক কিশোরী বা তরুণীকে। বখাটে হতে পারে দিনের পর দিন বেকার থাকা কোনো তরুণ বা মাদকসেবী। সে হতে পারে বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন কেউ। বখাটে হতে পারে পথে-প্রান্তরে বেড়ে ওঠা এমন তরুণ, যার কোনো চালচুলোই নেই। অভিজ্ঞজনদের মতে, মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রকৃত শিক্ষার অভাব, সামাজিক অবক্ষয় ও বৈষম্য, বেকারত্ব ও হতাশা, সুস্থ সংস্কৃতির অভাব, মাদকদ্রব্যের অবাধ ব্যবহার, আইনগত ব্যবস্থা যথাযথ ও জোরালো না থাকা, রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যমূলক সম্পর্কের কারণে বখাটেদের উত্ত্যক্ত করার মতো পরিবেশে সৃষ্টি হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বখাটেরা আইনের ফাঁকফোকর গলে জামিন পেয়ে যায়। এরপর থাকে পলাতক। আড়াল থেকে মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি দেখায় মেয়ের পরিবারের সদস্যদের। ফাঁসের মতো আটকে থাকা ঝামেলা খসাতে অনেক অভিভাবক আপস করে ফেলেন। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক বাদীপক্ষ মামলা চালানোর ম্যারাথনে ক্ষান্ত দেয়। এভাবে অনেক মামলা শেষ পরিণতি পর্যন্ত গড়ায় না। এতে সাজাও হয় না বখাটের। এসব দেখে অন্য বখাটেরা উসকানি পায়। কাজেই বখাটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর হওয়াটা জরুরি। বখাটে যেহেতু এখন জ্বলন্ত সমস্যা, কাজেই আইনগত ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। উত্ত্যক্তকারীর বিচার হতে পারে দ্রুত বিচার আদালতে। সাজা দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি, যা-ই হোক না কেন, অপরাধটি অজামিনযোগ্য বলে আইন চালু হলে এ ধরনের অপতৎপরতা কমে যাবে। আমাদের দেশে সামাজিক বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আস্থাভাজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বখাটেপনা দমনে কোনো কমিটি করা যেতে পারে।
ওই এলাকায় বখাটেদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে তৎপর থাকবে এই কমিটি। প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। উত্ত্যক্তকারীর উৎপীড়ন বা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চালাতে হবে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা। এর সঙ্গে সভা-সমাবেশ হতে পারে। বখাটে যদি উপলব্ধি করতে পারে, কিশোরী বা তরুণীকে উত্ত্যক্ত করার বিষয় কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। এ জন্য কঠিন সাজাও পেতে হবে, তাহলে অবশ্যই হতোদ্যম হবে। বখাটে দমনের আরেকটি মোক্ষম দাওয়াই হতে পারে আত্মরক্ষার কৌশল জানা। আমাদের দেশের মেয়েরা এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা উদ্যমী ও সাহসী। সে ক্ষেত্রে বখাটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে এসব মেয়েকে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ কাজে লাগতে পারে। এ প্রশিক্ষণ হতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক। আত্মরক্ষার জন্য আজকাল নানা রকম মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক কৌশল প্রয়োগ করা হয়। মেয়েদের এসব জানা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্রে গত আগস্টে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নতুন শিক্ষার্থীদের এমন প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মূলত ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি ঠেকাতেই এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়টি চালু করা হয়েছে। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ হাজার ৭০০ নতুন শিক্ষার্থী এই প্রশিক্ষণ নেন। আমাদের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের কোর্স চালু করা যেতে পারে; বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। এতে সরকারের যে খুব বেশি ব্যয় হবে, তা নয়।
শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: সাংবাদিক, সাহিত্যিক
sharifrari@gmail.com

বর্ণিল আলোয় হারিয়ে যাওয়া রাজনীতি

আওয়ামী লীগের সম্মেলন উপলক্ষে
নগরজুড়ে ছিল আলোকসজ্জা
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের আগের দিন মানে ১৪ অক্টোবর ঢাকা শহর রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। তারপর সেই আলো ঝলমলে শহরে পরের ১০ দিন রঙের খেলা আরও গাঢ় হয়েছে বৈ কমেনি। কারণ, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের কাউন্সিল। কাউন্সিলটি যেহেতু দেশের অন্যতম পুরোনো এবং বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের, সেহেতু সেই জৌলুশ ঢাকার বাইরেও ছড়িয়েছে।
জেলা শহরগুলোতেও আওয়ামী লীগের উৎসাহী সংগঠকেরা আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলাদেশে আর কখনো এভাবে একটানা ১০ দিন আলোকসজ্জার কোনো রেকর্ড আছে বলে আমার জানা নেই। সুতরাং, সংবাদপত্রের বর্ণিল আয়োজন কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন শিরোনাম অথবা বিবরণকে যথার্থই বলতে হবে। এই আলোকসজ্জার জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ কতটা খরচ হলো অথবা সম্মেলনের অন্যান্য খরচের পরিমাণ কত বা সেগুলোর উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য দলের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। সুতরাং, অজানা বিষয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এখন আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের তুলনা চলে না। বিএনপির সঙ্গে আগে তুলনা চললেও এখন তা আর বাস্তবসম্মত নয়। আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায়, তা সে নির্বাচন নিয়ে যত প্রশ্নই থাকুক না কেন। রাষ্ট্রকাঠামোতে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দল হিসেবে তাদের অবস্থান সুসংহত নয়। সংসদে তারাই সব—বিরোধী দলের অনুপস্থিতি যে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উপলব্ধি করেন, সে কথা এই সেদিনই আমরা ভারতে দ্য হিন্দু পত্রিকার সাক্ষাৎকারে জানলাম। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, অন্যান্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভা,
জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদগুলো সব জায়গাতেই আওয়ামী লীগ। হাতে গোনা যে কটিতে বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছিলেন, তাঁরা হয় কারাগারে এবং অপসারিত, নয়তো পলাতক। এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যেখানে উপাচার্য এবং শিক্ষক সমিতিগুলো আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই। আর সেসব জায়গায় ছাত্রলীগ ছাড়া আর কেউ কখনো ছিল কি না, সেটাই বোঝা মুশকিল। আইনজীবী সমিতি, শ্রমিক সংগঠন কিংবা কৃষক সংগঠনেও এখন আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাড়া অন্য কারও অস্তিত্ব তেমন একটা অনুভূত হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের একটা সর্বব্যাপী প্রভাব পড়া মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। ঢাকার সহৃদয় নাগরিককুল তাই পরিস্থিতির সঙ্গে ভালোই তাল মিলিয়ে চলেছে। ২২ ও ২৩ অক্টোবর শহরে না ছিল যানজট, না ছিল কোনো হাঙ্গামা। অনেকেই তাই বলেছেন যে আহা, প্রতিদিনই সবকিছু এমন গোছানো হয় না কেন? আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে ৩৫ বছর তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন তরুণ নেতৃত্ব বাছাই করা দরকার। এরপর কাউন্সিলেও তিনি একই কথার পুনরুচ্চারণ করে বলেন যে তিনি দেখতে চান তাঁর জীবদ্দশাতেই দলে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। তাঁর এই বক্তব্যের রেশ ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা জন্মায় যে দলের নেতৃত্বে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী কে, তা এবারে স্পষ্ট হবে। জল্পনার কেন্দ্রে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।
দলের নেতা-কর্মীরাও জয়কে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখতে চাওয়ার আওয়াজ তোলেন। একই সঙ্গে তাঁরা স্পষ্ট করে দেন যে তাঁরা শেখ হাসিনাকেই আজীবন সভানেত্রী হিসেবে দেখতে চান। আর সজীব ওয়াজেদ জয় দলের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ঘোষণা করলেও বিদেশে থাকার কারণে দলের কোনো পদ গ্রহণ ঠিক হবে না বলে জানিয়ে দেন। ফলে সম্মেলন থেকে নতুন নেতৃত্ব পাওয়ার আওয়াজ বাতাসেই মিলিয়ে গেল। এ পর্যন্ত ঘোষিত কমিটির যে আংশিক চিত্র তাতে দলের পুরোনো এবং নানা কারণে আলোচিত নেতাদের মধ্যেই শুধু দু-চারটি চেয়ার রদবদল ঘটল। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল যেদিন শুরু হয়, তার তিন দিন আগে ১৯ অক্টোবর প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংবাদমাধ্যমে বেশ ফলাও করে একটি খবর প্রচারিত হয়। খবরটি হচ্ছে তামিলনাড়ু রাজ্যের। রাজ্যটিতে কয়েক দশক ধরে দুটি দল পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে। দুটি দলই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে দলীয় প্রধানদের প্রতি ভক্ত-অনুসারীদের আনুগত্য হচ্ছে অবিশ্বাস্য রকম। একজন হলেন জয়ললিতা, ভক্তরা যাঁকে আম্মা সম্বোধন করেন। আর অপরজন করুণানিধি। এখন ক্ষমতায় জয়ললিতার দল। গত ২২ সেপ্টেম্বর জয়ললিতা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কেউ জানে না তিনি কবে সুস্থ হবেন বা তাঁর রোগটা আদৌ নিরাময়যোগ্য কি না। প্রায় এক মাস ধরে রাজ্য কে চালাচ্ছিলেন কেউ জানে না এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অবশেষে রাজ্যপাল অর্থমন্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরগুলোর দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি যে খবরটির কথা বলছিলাম তাতে দেখা যাচ্ছে, তিন মাস পর ১৯ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর আসন খালি রেখে এবং টেবিলের ওপর তাঁর একটি ছবি রেখে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সভাপতিত্ব করলেও ‘আম্মা’র অনুপস্থিতি এবং তাঁর স্বাস্থ্যগত অনিশ্চয়তার ছায়াই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে (জয়ললিতা’স ফটো অ্যান্ড অ্যান এম্পটি চেয়ার প্রিজাইডস ওভার তামিলনাড়ু কেবিনেট মিটিং, এনডিটিভি, ১৯ অক্টোবর, ২০১৬)। ৬৭ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক দল, যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেই দলের সম্মেলন ঘিরে আগ্রহ-কৌতূহলের কমতি থাকার কথা নয়। নতুন নেতৃত্বের আওয়াজ, নেত্রীর ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার দাবি, সব গুঞ্জন ‘ভুয়া’ কিংবা আকাশে ‘চাঁদ’ উঠলেই সব জানা যাবে ধরনের মন্তব্য আমাদের এই কৌতূহল অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে সংবাদমাধ্যম দলীয় প্রধান কাকে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সিপাহসালার করে নেন, সেই দিকটিতেই নজর দিয়েছে। সম্মেলনে দলটির রাজনৈতিক আত্মানুসন্ধান, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন, সাংগঠনিক পর্যালোচনা এগুলোর সবই উপেক্ষা করেছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সদ্য বিদায় নেওয়া সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ যে আবেগঘন অলিখিত বক্তৃতা দিয়েছেন, তার তাৎপর্য নিয়ে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে। তাঁর স্বপদে বহাল থাকার কোনো আলামত মেলে কি না, সেটাই সবাই সন্ধান করেছেন। কিন্তু তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের যে ত্রিবার্ষিক রিপোর্টের কপিটা দেখিয়ে কাউন্সিলর-ডেলিগেটদের তা সংগ্রহ করতে বলেছিলেন, তার বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। রাজনৈতিক প্রচারপত্র এবং প্রকাশনা সাধারণ মানুষের হাতে গেলে তাঁরা তা পড়ুন অথবা না-ই পড়ুন,
সেগুলোর শেষ আশ্রয় সাধারণত ফেলে দেওয়া কাগজপত্রের স্তূপের মধ্যেই হয়। এ ক্ষেত্রে কী ঘটেছে সে প্রশ্ন না হয় না-ই করলাম! ২৪ ঘণ্টা টেলিভিশনের যুগে রাজনীতিতে এখন সারবস্তুর চেয়ে তার প্রলেপ বা খোলসটিই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে সবার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে দেশি-বিদেশি অতিথিদের কারা এলেন অথবা এলেন না, দলের পদ-পদবিতে কার উন্নতি বা অবনতি হয় ইত্যাদি বিষয়। রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন হলে নিশ্চয়ই গরিবের জন্য বরাদ্দ চাল কেলেঙ্কারি, সরকারি খাদ্য সংগ্রহ অভিযান ঘিরে দুর্নীতি, গম কেলেঙ্কারি, নেতাদের জনবিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো আলোচিত হতো। সে রকম কোনো কথা কেউ কি শুনেছেন? আওয়ামী লীগের ১৯তম জাতীয় সম্মেলনটি হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ওই একই জায়গায়। কিন্তু দেশের রাজনীতি গত চার বছরে মোটেও এক জায়গায় স্থির ছিল না। স্বৈরশাসক এরশাদের সামরিক শাসনের পর একটানা দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা দলটি গত চার বছরে যেসব গুরুতর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তার কোনো মূল্যায়ন বা আত্মসমালোচনার লেশমাত্র এই সম্মেলনে দেখা গেল না। একনজরে যদি ওই সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়, তাহলেই বোঝা যাবে জাতীয় জীবনে সেগুলোর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কতটা ব্যাপক।
—আওয়ামী লীগের ১৯তম জাতীয় সম্মেলনের পর মাত্র দুই মাস যেতে না–যেতেই যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম। ওই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষও ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার লাভ করে। শুরুতে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিলেও তারপর থেকে গণজাগরণ মঞ্চ সরকারের জন্য কমবেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে আছে।
—হেফাজতে ইসলামের উত্থান এবং ২০১৩-এর ৫ মে তাদের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি। সরকার কঠোর নীতি অনুসরণ করে তা দমন করলেও হেফাজতে ইসলাম একটি ধর্মীয় জোট হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসাগুলোর পাঠক্রম ঠিক করার লক্ষ্যে গঠিত কমিশনে হেফাজত প্রধানের চেয়ারম্যান পদের মেয়াদ আবারও বাড়িয়েছে সরকার।
—২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, যা বিদায়ী সংসদের প্রধান বিরোধী দলসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে এবং অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী ঘোষিত হন। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের বিষয়টি দলটির রাজনৈতিক কৃতিত্ব হিসেবে উদ্‌যাপনযোগ্য কোনো বিষয় হয়ে থাকলে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে তার কোনো উল্লেখ না থাকার ব্যাখ্যা কী হতে পারে, তা রীতিমতো একটি রহস্য।
—দেশের তৃতীয় প্রধান দল জাতীয় পার্টি চরম নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। বিতর্কিত ওই নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন নজির তৈরি করে জাতীয় পার্টি সরকারেও অংশ নেয় আবার একই সঙ্গে বিরোধী দলের আসনেও আসীন হয়।
—ইসলামের নামে সহিংস উগ্রপন্থার বৈশ্বিক প্রভাবে দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর ধারাবাহিক নৃশংস হামলা ও সংগঠিত হুমকি। সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে এর উল্লেখ অনেকটাই দায়সারা গোছের এবং তা-ও বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে। তবে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে দলের গত চার বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার কোনো মূল্যায়ন না থাকলেও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বক্তব্যে তার সামান্য ইঙ্গিত আছে। তিনি দলের সবাইকে আগামী নির্বাচনের জন্য এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন এবং ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে জন্য সবার কাছে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিতে বলেছেন। আর দলের যে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছেন তা করা হয়েছে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে। সভানেত্রীর কাছ থেকে দলের নতুন সাধারণ সম্পাদকের আশীর্বাদ নেওয়ার যে ছবি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, তাতে এটি সুস্পষ্ট যে দলের অভিমুখ নির্ধারণের মূলকেন্দ্র একেবারেই অপরিবর্তিত আছে। আর যেহেতু দলীয় প্রধানই একটি প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন প্রত্যাশা করেন, সেহেতু তাঁর সরকার এখন সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হবে বলেই আশা করি।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।