Tuesday, June 24, 2025

যুক্তরাষ্ট্র নেই, ইউরোপ কি একা পুতিনকে রুখতে পারবে by সের্হেই মাইডুকোভ

ট্রাম্প ইউক্রেন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ইউরোপকে এখনই ঠিক করতে হবে, সে কি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবে, না রাশিয়ার জয়ের মূল্য দেবে।

কিছুদিন আগেও ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা অস্ত্র, অর্থ ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করত। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ট্রাম্পকে আর তেমন ভাবায় না। তিনি রাশিয়ার কথাই বারবার বলছেন। ন্যাটোকে তুচ্ছ করেছেন। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা নিয়ে রসিকতা করেছেন। যদিও পুতিন সম্প্রতি বলেছেন ‘পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে’।

ট্রাম্প আর ইউক্রেনের সমর্থক নন। তিনি কোনো গ্রহণযোগ্য শান্তি-উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেননি। সব মিলিয়ে ইউক্রেন বিষয়ে তাঁর কথার এখন তেমন মূল্য নেই। তবে এসবের খেসারত দিচ্ছে ইউক্রেন। দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেন শুরু করেছে ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’। রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন হামলার মাধ্যমে ডজনখানেক বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। হোয়াইট হাউস দ্রুতই জানায় যে এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ট্রাম্প আবার বললেন, তিনি যুদ্ধ থেকে ‘সরে যাবেন’।

এই ঘটনার পর ইস্তাম্বুলে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা ভেঙে পড়ে। একমাত্র চুক্তি হয়, ছয় হাজার মৃত সেনার মরদেহ বিনিময়। এর মধ্যেই ট্রাম্পের তরফে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানালেন, তিনি চান জেলেনস্কি ও পুতিন সরাসরি কথা বলুন। তবে তখন সময় পেরিয়ে গেছে।

২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরও বহুবার দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছে, রাশিয়াকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে। ইউরোপীয় নেতারা কিছুটা প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু ইউরোপের নিরাপত্তার পুরো দায় কাঁধে তোলেননি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমছে। ট্রাম্প নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। ইউরোপ পড়েছে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে। ইউরোপ এখন একা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হওয়া ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। রুশ আগ্রাসন ঠেকাতে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি ইউরোপের প্রতিশ্রুতি।

প্রশ্ন হলো, এই সময়ের দাবি কি ইউরোপ পূরণ করতে পারবে? ইউরোপের দেশগুলো কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াই একটি কার্যকর নিরাপত্তা জোট গড়তে পারবে? তা কি সম্ভব?

২০২৫ সালের শুরুতে ইউক্রেন নিজে প্রায় ৪০ শতাংশ সামরিক চাহিদা পূরণ করছিল। বাকি ৩০ শতাংশ দিচ্ছিল ইউরোপ, ৩০ শতাংশ আসছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আগে ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ যুক্তরাষ্ট্র জোগাত। ইউরোপ মরিয়া হয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউরোপের অস্ত্রশিল্প অনেক দিন ধরে পিছিয়ে আছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ২০ লাখ কামান গোলা তৈরি করবে ইউরোপ; যা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বনিম্ন চাহিদা মাত্র। রাশিয়া যদি ইউক্রেন দখল করে, তবে কেবল জার্মানিরই খরচ হবে বর্তমান সহায়তার ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি। কারণ হবে শরণার্থী স্রোত, জ্বালানিসংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা হুমকি। একটি বড় উদ্যোগ নিচ্ছে চেক প্রজাতন্ত্র।

২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তারা ইউক্রেনকে ১৮ লাখ কামান গোলা সরবরাহ করবে। এই প্রকল্পে কানাডা, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্কসহ বেশ কিছু দেশ অংশ নিচ্ছে। এটি সময়মতো পৌঁছালে যুদ্ধের গতিপথে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে। মে মাসের শেষ দিকে জার্মানি আর ইউক্রেন এক চুক্তি করেছে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনেই দীর্ঘ পাল্লার অস্ত্র তৈরি করা হবে স্থানীয় শিল্প ও প্রকৌশল দক্ষতা কাজে লাগিয়ে। ইউক্রেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র ব্রিটেন ঘোষণা করেছে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন ড্রোন প্যাকেজ। এই প্যাকেজ ২০২৬ সালের মধ্যে ১ লাখ ড্রোন সরবরাহ করবে।

সম্প্রতি ট্রাম্প ফক্স নিউজে বলেন, ইউক্রেনে আমেরিকানদের করের টাকা ‘অপচয়’ হচ্ছে। মন্তব্যটা বিভ্রান্তিকর। যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনকে প্রায় ১২৮ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। এর মধ্যে ৬৬.৫ বিলিয়ন সামরিক সহায়তা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সদস্যদেশগুলো ১৩৫ বিলিয়ন ইউরো দিয়েছে—৫০ বিলিয়ন সামরিক, ৬৭ বিলিয়ন আর্থিক ও মানবিক, ১৭ বিলিয়ন ইউরো শরণার্থী সহায়তা। যুক্তরাজ্য দিয়েছে আরও ১২.৮ বিলিয়ন পাউন্ড। এসব কোনো দান নয়। এগুলো কৌশলগত বিনিয়োগ। রাশিয়া যুদ্ধে জিতলে এই দেশগুলোর লোকসান হবে আরও বেশি।

ইউরোপ নেতৃত্ব দিচ্ছে নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও। ২০১৪ সাল থেকে, বিশেষ করে ২০২২-এর পর রাশিয়ার অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে ১৭ দফা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে যুদ্ধ না থামলেও রাশিয়ার ওপর চাপ বেড়েছে। ২০ মে ট্রাম্প ও পুতিনের ফোনালাপের পরদিনই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ঘোষণা করে।

বিশ্লেষণ বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা যদি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে রাশিয়ার বার্ষিক ক্ষতি হবে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি এর আংশিক প্রয়োগেও যুদ্ধের অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।

ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাইজা কাল্লাস বলেছেন, ‘যত দিন রাশিয়া যুদ্ধ চালাবে, তত কঠিন হবে আমাদের জবাব।’ এখন ইউরোপকে শুধু কথায় নয়, কাজে তা প্রমাণ করতে হবে। ড্রোন থেকে কামান, নিষেধাজ্ঞা থেকে অস্ত্র উৎপাদন—ইউরোপ এখন ধীরে ধীরে বক্তব্য থেকে কৌশলে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এই গতি থামা চলবে না। এটি আর শুধু ইউক্রেনের যুদ্ধ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র সরে গেছে। ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নয়। সেই এখন শেষ প্রতিরক্ষা। যদি ইউরোপ ব্যর্থ হয়, ইউক্রেনও ব্যর্থ হবে। আর সেই সঙ্গে ধূলিসাৎ হবে স্বাধীন ও নিরাপদ ইউরোপের স্বপ্ন।

সের্হেই মাইডুকোভ, ইউক্রেনীয় লেখক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: বাংলাদেশের করণীয় কী হবে by মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি এক ভয়ংকর ও অস্থির সময় পার করছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সংঘাত এবং পাল্টা হামলার রাজনীতি গড়ে উঠেছে, তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং এই উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত।

আজকের দুনিয়ায় কোনো দেশ একা নয়, এক দেশের সংকট বা যুদ্ধের প্রভাব অন্য দেশের ওপরও পড়ে, বিশেষ করে যেসব দেশ ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ তাদেরই একটি। অথচ এই সংকটপূর্ণ সময়েও বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটাই নীরব এবং দুর্বলভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। আমরা কোনো বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছি না, কোনো জাতীয় সংলাপ হচ্ছে না, এমনকি সাধারণ মানুষকেও আমরা জানাচ্ছি না এই যুদ্ধ আমাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে।

এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাতের কারণে এ অঞ্চলটি চরম উত্তেজনায় রয়েছে। এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। সেখানে যদি যুদ্ধ হয় বা নৌপরিবহনে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা সরাসরি বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

আমাদের দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্প খাতের বেশির ভাগই তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যদি তেলের দাম বাড়ে, তাহলে দেশে বিদ্যুৎ ও পরিবহনের খরচ বাড়বে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে যাবে। সেই সঙ্গে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে, রপ্তানি খরচ বাড়বে, আমদানি সংকুচিত হবে। ফলে অর্থনীতির এক জটিল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি এসব চিন্তা করছি? আমরা কী ভাবছি, এই যুদ্ধ কীভাবে আমাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে? আমরা কি কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছি?

দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, বাংলাদেশ এখনো কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই নীরব। কোনো ধরনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার খবর আসছে না, রাজনীতিবিদদের মধ্যে কোনো আলোচনা দেখা যাচ্ছে না এবং জাতীয়ভাবে এই আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে কোনো মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি আমাদের চোখে পড়ছে না। অথচ আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা গ্লোবাল পাওয়ার পলিটিকস এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ‘চুপ থাকা’ একধরনের দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হয়।

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী হ্যান্স জে মরগেনথাউ তাঁর ‘পলিটিকস এমং নেশনস’ গ্রন্থে বলেছেন, রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না, বরং প্রকৃতি, জনসংখ্যা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব—এসব মিলে গঠিত হয় একটি জাতির প্রকৃত শক্তি। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করি, তাহলে দেখা যাবে, আমাদের শক্তির অনেক জায়গায় ফাঁক রয়েছে। আমরা কেবল জিডিপি বাড়ানো বা অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। অথচ আমাদের সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং জনমতের প্রতিফলনহীন রাষ্ট্রযন্ত্র আজও টিকে আছে।

বর্তমানে ইরান একসঙ্গে দুটি যুদ্ধ করছে। একটি হচ্ছে বাহ্যিক—ইসরায়েল ও আমেরিকার মতো শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে। আরেকটি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ—যেখানে ইরানের ভেতরে বিভিন্ন গুপ্তচর, ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী এবং পশ্চিমা প্রভাবিত রাজনৈতিক চক্র কাজ করছে। কিন্তু তারপরও ইরান এখনো টিকে আছে, কারণ তারা কৌশলগতভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাধর্মী, তাদের সামরিক বাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর এবং তাদের কূটনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত সক্রিয়। তারা শুধু আবেগ দিয়ে যুদ্ধ করছে না, বরং জ্ঞান ও দূরদর্শিতা দিয়ে যুদ্ধ করছে।

বাংলাদেশ কি সেই রকম কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা করেছে? আমাদের কি কোনো ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডকট্রিন’ আছে, যেটা এ ধরনের সংকটের সময়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দেবে? আমাদের কি কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি আছে, যারা এই সংঘাত বিশ্লেষণ করে সরকারের কাছে পরামর্শ দেয়? আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সামরিক বিশ্লেষক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো সমন্বয় তৈরি করতে পেরেছি? যদি না করে থাকি, তাহলে আমরা জাতি হিসেবে খুবই দুর্বল অবস্থানে আছি।

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান খুবই স্পর্শকাতর। আমাদের চারপাশে ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্র, সীমান্ত সমস্যা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আর সামুদ্রিক সম্পদের ওপর আন্তর্জাতিক আগ্রহ—এই সবকিছু মিলিয়ে আমরা একধরনের ‘স্ট্র্যাটেজিক প্রেশার জোন’-এর মধ্যে অবস্থান করছি। বিশেষত, ভারতের ‘নর্থ-ইস্ট’ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত করিডর ইস্যু, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ঘিরে চীন-আমেরিকা-জাপান-ভারতের আগ্রহ এখন স্পষ্ট। এ কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, এখন তা আন্তর্জাতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি এখনো আপডেট হয়নি। আমরা এখনো পুরোনো চিন্তা ও দলীয় রাজনীতির চশমা পরে দেশ চালাচ্ছি।

এই বাস্তবতায় আমাদের সামরিক বাজেট ও প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়। আমরা কি কেবল বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করব, নাকি নিজস্ব প্রযুক্তি, গবেষণা এবং নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তুলব? ইরান, উত্তর কোরিয়া বা এমনকি তুরস্ক পর্যন্তও স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা কৌশলে বিনিয়োগ করছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি গবেষণাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো কার্যকর বিভাগ চালু করেছে? আমরা কি আমাদের শিশু-কিশোরদের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং জাতীয় নিরাপত্তাবোধের বীজ বুনে দিতে পেরেছি? তাদের জন্য কি আমরা কোনো স্কুল ক্যাম্প, বিজ্ঞান উৎসব বা সামরিক সচেতনতা কর্মসূচি তৈরি করেছি? ভবিষ্যতের লড়াই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়—মানসিকতা, মেধা ও কৌশলে।

আমরা কি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছি এই ইস্যুতে? এমন বৈঠক রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলে এবং জাতীয় কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করে। ভারতের উদাহরণ দেখলেই বোঝা যায়—তারা কৌশলগত ইস্যুতে দল-মতনির্বিশেষে আলোচনায় বসে। তারা ইতিমধ্যেই এ ধরনের সংকটে কীভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা যায়, তা নিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে যাচ্ছে। তারা তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি করছে।

চীন ও ভারত উভয়েই তাদের রিজার্ভ ও ডিপ্লোমেটিক কৌশলকে আরও সক্রিয় করেছে। তুরস্ক ও মালয়েশিয়া এই ইস্যুতে জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে মুসলিম বিশ্বে ঐক্য গড়ার আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধ থেকে শিখেছে যে ভবিষ্যতের লড়াই শুধু সামরিক শক্তির নয়—তথ্য, প্রভাব এবং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের। তাই তারা নতুন বিশ্বব্যবস্থা গঠনের কৌশলে মনোযোগী হয়েছে।

এ ছাড়া আমাদের এখনই চিন্তা করা উচিত যে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এটি এক দিকে উন্নত ইন্টারনেট–সেবা দিলেও অন্যদিকে এটি আমাদের জাতীয় তথ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আমাদের সব সরকারি–বেসরকারি তথ্য যদি ভবিষ্যতে বিদেশি সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা বিপজ্জনক হতে পারে। আমরা কি এই বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় আলোচনায় বসেছি? আমরা কি জানি, আমাদের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কে তা নিয়ন্ত্রণ করছে? প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, যদি তার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে সেটি একসময় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
আমাদেরও উচিত ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি গ্রহণ করা—যেখানে কোনো দলীয় বা আদর্শিক বিবেচনার চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়। এই নীতি মানে, যেকোনো সিদ্ধান্তে আগে দেখা হবে—তা দেশের নিরাপত্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের জন্য উপকারী কি না।

এখন অনেক তরুণ শুধু টিকটক, ইউটিউব বা ইন্টারনেট সেলিব্রিটির পেছনে সময় দিচ্ছে, কিন্তু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা কৌশলগত চিন্তায় পিছিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া মতো দেশগুলো তরুণদের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির শিক্ষায় যুক্ত করছে। তাদের পাঠ্যক্রমে জাতীয় নিরাপত্তা, বিজ্ঞান গবেষণা ও কৌশলগত সচেতনতাবিষয়ক শিক্ষা রয়েছে। ফলে তাদের তরুণ প্রজন্ম কেবল বিনোদন নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গেও যুক্ত হয়। আমাদেরও সেই রকম পরিকল্পনা দরকার, যেখানে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ চিন্তাধারা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ববোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

একটি ছোট রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে কেবল তখনই, যখন তার অভ্যন্তরে ঐক্য থাকে, কৌশল থাকে এবং সে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বুঝে আগেভাগেই পদক্ষেপ নেয়। ইতিহাস আমাদের এ বিষয়ে অনেক কিছু শিখিয়েছে। খিলাফতে ওমর (রা.) যখন পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন, তখন পারস্য একটি সাংস্কৃতিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু সেই সময়ে পারস্যের ভেতরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, উত্তরসূরি–সংকট এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ছিল। সেই দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়েই মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন।

বাংলার ইতিহাসও এ বিষয়ে পিছিয়ে নেই। মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন—এসব শাসক সব সময় তাদের প্রকৃতি, জনশক্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বাইরের আক্রমণ ঠেকিয়েছেন। মুসলিম সুলতানরাও দুর্গ নির্মাণ, নদীকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত বন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ কি এই ঐতিহাসিক শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছে?

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ জন মিয়ারশেইমার ‘টি ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিকস’ বইয়ে বলেছেন, একটি ছোট দেশ তখনই টিকে থাকে, যখন সে কৌশলগত বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য রক্ষা করে। বাংলাদেশের এখন সেই দুটি জিনিসই দরকার। আমরা শুধু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে বিদেশনীতি চালাতে পারি না। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল যেখানে সামরিক, বেসামরিক, একাডেমিক ও রাজনৈতিক স্তরে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে।

ফরিদ জাকারিয়া, একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক । তিনি সিএনএনে ‘ফরিদ জাকারিয়া জিপিএস’ নামে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি বারবার বলেছেন, আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর আগের মতো ‘জিরো-সাম’ খেলা নয়, অর্থাৎ যেখানে এক পক্ষ জিতলে অপর পক্ষ হারবেই—এমন নয়। বরং এখনকার বিশ্বে সম্পর্ক তৈরি হয় পারস্পরিক বিশ্বাস, কৌশল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার মাধ্যমে। অর্থাৎ, এখন যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে দেশগুলো তাদের শক্তি ও প্রভাব বাড়ায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের উচিত হবে নিজের ছোট ভূখণ্ডকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা। যেমন সিঙ্গাপুর একটি ছোট দেশ হয়েও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশলে অনেক শক্তিশালী। বাংলাদেশও তার সমুদ্রপথ, ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে কৌশল নির্ধারণ করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

অতএব আজকের বাংলাদেশে একটি সর্বদলীয় সংলাপ খুব জরুরি, যেখানে রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজ একত্রে বসে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করবে। এ আলোচনার ভিত্তিতে একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা রূপরেখা’ তৈরি করতে হবে, যেটা শুধু সরকারের নয়, বরং জাতির রূপরেখা হবে। এই রূপরেখার ভিত্তিতে আমরা সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে পারব, আমাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান জোরদার করতে পারব এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র উপহার দিতে পারব।

* মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার, শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিরসেবা শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিদর্শনে দুই ইসরায়েলি সেনা। ২০ জুন
বিরসেবা শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিদর্শনে দুই ইসরায়েলি সেনা। ২০ জুন। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প যেভাবে যুদ্ধবাজদের জন্য পথ খুলে দিলেন by বেলেন ফার্নান্দেজ

মনে হচ্ছে যেন এই তো গতকালও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের অবৈধ ইরান-আক্রমণে সরাসরি যোগ দিয়েছে। শনিবার তারা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প এই হামলাকে ‘খুব সফল একটি আক্রমণ’ বলে দম্ভোক্তিভরা দাবি করেছেন।

সিএনএন এ ঘটনাকে নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছে: ‘এটি ২০২৫ সালের জুন মাসের একটি অবিস্মরণীয় গ্রীষ্মকালীন রাত। এটিকে হয়তো একদিন এমন এক মুহূর্ত হিসেবে মনে রাখা হবে, যখন মধ্যপ্রাচ্য চিরতরে বদলে গেল, যখন ইসরায়েলের ওপর পারমাণবিক ধ্বংসের ভয় দূর হলো, যখন ইরানের শক্তি ধ্বংস হলো, আর আমেরিকার শক্তি আরও বেড়ে গেল।’

তবে বাস্তবতা হলো ইরানের ওপর এসব আক্রমণের পেছনে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়’ আসলে কোনো কারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে, এই হামলা কেবল ইরানের সেনাবাহিনী ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো, এতে শত শত সাধারণ মানুষ মারা গেছে।

যাঁরা ইসরায়েলের এসব আগ্রাসনকে সমর্থন করার ‘চাকরি’ করেন না, তাঁদের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার। তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারছেন, ইরানের ওপর এই হামলা কেবল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য একটি সুবিধাজনক যুদ্ধ, যার মাধ্যমে তিনি একসঙ্গে অনেকগুলো উদ্দেশ্য পূরণ করছেন। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্যবস্তু করে যে অভিযান হয়েছে, তা আসলে অনেক গভীর রাজনৈতিক লাভের হিসাব করে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিরা খাবার বা সাহায্য নিতে গিয়ে প্রতিদিনই হত্যার শিকার হচ্ছেন। এই বাস্তবতা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশলও এই ইরান-আক্রমণ। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজ দেশে যে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে আছেন, সেখান থেকেও তিনি জনগণের দৃষ্টি সরাতে পেরেছেন।

এমনিতেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইসরায়েলিদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ধারণা। তাই দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার মুখে থাকা একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর জন্য এটি বড় রকমের রাজনৈতিক লাভ এনে দিচ্ছে।

শুরুতে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন। এতে নেতানিয়াহু প্রবল বিরক্ত হয়েছিলেন। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। কারণ, আমেরিকার বোমা হামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো একেবারে ‘ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে’।

আসলে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছে। অনেক মার্কিন নীতিনির্ধারক বহু আগে থেকেই ইরানে বোমা ফেলার সুযোগ খুঁজে আসছেন। কারও কারও মুখে তা বিভিন্ন সময় খুব খোলাখুলিভাবে উঠে এসেছে।

যেমন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের একসময়কার রাষ্ট্রদূত এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সাময়িক সময়ের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদে থাকা জন বোল্টন ২০১৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে একটি মতামত কলামে লিখেছিলেন: ‘ইরানের বোমা থামাতে হলে, ইরানেই বোমা ফেলতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংবাদপত্র যখন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের পক্ষে এমন একটি প্রকাশ্য আহ্বান ছাপায়, তখন তা স্পষ্ট করে দেয়, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে ও তাদের গণমাধ্যমে কতটা ভয়ংকর ও শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মনে রাখতে হবে, ২০০২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ বা ‘অশুভ শক্তির অক্ষ’ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ইরানকে ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে একই কাতারে নামিয়েছিলেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে থাকে, তারপরও তার কর্মকাণ্ড বহু ক্ষেত্রে তাকে তথাকথিত ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে দেখা কিছু দেশের তুলনায় অনেকটাই কম ভয়াবহ। বর্তমানে ইরান এমন একটি গণহত্যার জন্য দায়ী নয়, যেটিতে যুক্তরাষ্ট্র ১০-২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রত্যক্ষভাবে অর্থায়ন করছে।

আর ইরান তো সেই দেশ নয়, যে কয়েক দশক ধরে (লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী সন্ত্রাসী শাসনকে সমর্থন করা থেকে শুরু করে ভিয়েতনামে গণহত্যা চালানো পর্যন্ত) বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে বোমা বর্ষণ করে মানুষ হত্যা করছে।

তার চেয়েও বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র গোপন পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ইরান নয়, বরং ইসরায়েল। ইসরায়েল পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি (এনপিটি) সই করেনি এবং কখনোই জাতিসংঘকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নজরদারির অনুমতি দেয়নি।

অনেকে বলেন, ইরান সরকার ‘দমনমূলক’ বলে তাদের ওপর হামলা চালানোটা ন্যায্য। কিন্তু তারা যদি সত্যিই দমননীতি নিয়ে চিন্তিত হন, তাহলে তাদের একবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কীভাবে দমননীতি জোরদার করেছে, তা ভেবে দেখা উচিত। যেমন ১৯৫৩ সালে সিআইএ ইরানের জনপ্রিয় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান ঘটায়, যার ফলে একনায়ক শাহ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। এই শাহই ছিলেন সেই নেতা, যিনি মার্কিন অস্ত্রের ওপর ভর করে এক ভীতিকর ও নির্যাতননির্ভর রাজত্ব চালিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ এরভান্দ আব্রাহামিয়ান তাঁর ‘আ হিস্ট্রি অব মডার্ন আর্ট’ বইয়ে লিখেছেন: ‘অস্ত্র ব্যবসায়ীরা মজা করে বলত, উঠতি যুবকেরা যেভাবে প্লেবয় ম্যাগাজিন পড়ে, তেমনভাবে শাহ অস্ত্রের ম্যানুয়াল পড়তেন।’ এই শাহ ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন, যা কিনা ট্রাম্প এখন বোমা মেরে ধ্বংস করছেন।

এখন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের হয়তো ২০২৫ সালের এই গ্রীষ্মের রাতের হামলা নিয়ে খুব একটা আপত্তি নেই। বরং এই হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট আরও গভীর হয়েছে, তা তাদের জন্য ব্যবসার নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম এই অবৈধ হামলার পক্ষে এখন যুক্তি দাঁড় করাতে ব্যস্ত আছে। অথচ বাস্তবতা হলো, নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করে রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন অন্যদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে হুমকি হিসেবে দেখে এবং তাদের ওপর ‘পুলিশিং’ করে, তখন এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কিছু হতে পারে না।

ট্রাম্প কী করবেন, তা বলা কঠিন—কারণ, তিনি নিজেকে অপ্রত্যাশিত ও উদ্ভট সিদ্ধান্ত নেওয়া নেতা হিসেবেই পরিচিত করে তুলেছেন। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, যুদ্ধ যতই চলুক, অস্ত্রশিল্পের খিদে কখনোই মিটবে না।

* বেলন ফার্নান্দেজ, আল–জাজিরার নিয়মিত কলাম লেখক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার পর ভাষণ দিচ্ছেন ট্রাম্প
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার পর ভাষণ দিচ্ছেন ট্রাম্প। ছবি : এএফপি

তুরস্ক কেন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিন্দা জানায়নি by রাগিপ সয়লু

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনায় তুরস্ক সরাসরি নিন্দা জানায়নি। অথচ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রধান মিত্রদেশগুলোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক রাষ্ট্র এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এ হামলার সমালোচনা করে দেশগুলো বলেছে, এ ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে। তারা এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া বলেছে।

গত শনিবার গভীর রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বের কাছে জানাতে পারি যে হামলাটি দুর্দান্ত এক সামরিক সাফল্য। ইরানের প্রধান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ এ সময় তিনি তেহরানকে ‘শান্তির পথে আসার’ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেন, সেটা না করলে ইরানে আরও জোরালো হামলা করা হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এখন হয় শান্তি আসবে; না হলে ইরানের জন্য সামনে এমন এক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে, যেটা গত আট দিনের চেয়েও ভয়াবহ হবে।’

এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সতর্ক করে যে এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করবে।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে, তার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তুরস্ক গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। চলমান পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক স্তরে নিয়ে যেতে পারে। আমরা চাই না এ রকম বিপর্যয়কর দৃশ্যপট বাস্তবে রূপ নিক।’

তুরস্ক সরকারের এই হিসাবি প্রতিক্রিয়া দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আগের মন্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি বিপরীত। ইরানে চলা ইসরায়েলি হামলাকে এরদোয়ান ‘দসুত্য’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এলেও সব সময়ই এ সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বলেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, ২০১০ সালে উত্তেজনা প্রশমনে তুরস্ক ও ব্রাজিল পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময় চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক পরিষদের সদস্য ও সেতা থিঙ্কট্যাংকের নিরাপত্তা–বিশ্লেষক মুরাত ইয়েশিলতাশ গতকাল রোববার লিখেছেন, ‘ইরানের কথিত পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা, যা দেশটির নেতারা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে যুক্তি দেন, তুরস্কের দৃষ্টিতে সেটি একটি বিপজ্জনক জুয়া। এটি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিস্তার ঘটাতে পারে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতি তুরস্কের বিরোধিতা মানেই এটি নয় যে তারা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করছে।’

ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলাকে তুরস্কে ‘উসকানি ছাড়াই হামলা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রতিবেদনের আলোকে আঙ্কারা এটা বলেছে।

কেননা তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে সক্রিয়ভাবে অগ্রসর হচ্ছে, এমন দাবি দুটি পক্ষের কেউই বিশ্বাস করে না।

এ কারণেই ইরানে ইসরায়েলের হামলায় তুরস্কের কর্মকর্তারা দ্রুত নিন্দা জানিয়েছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, ইসরায়েলের এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বিভাজন ডেকে আনছে এবং বিস্তৃত পরিসরে যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের পূর্ববর্তী হামলাগুলো বিবেচনায় নিয়েছিল তুরস্ক।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নূর নিউজ, দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ১৩ জুন জানিয়েছিল, ইসরায়েলের হামলায় তখন পর্যন্ত ৪৩০ জন নিহত হন ও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক শ মানুষ।

এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনে উদ্যোগ নেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি কয়েকজন মূল নেতার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ছিলেন।

এই ফোনালাপের মধ্য দিয়ে এরদোয়ান নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু আলোচনার জন্য ইস্তাম্বুলকে ভেন্যু হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।

ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার বদলে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই আগ্রহী। এই সুসম্পর্কের জোরেই তিনি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার প্রশাসনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ট্রাম্পকে রাজি করাতে পেরেছিলেন।

তুরস্কের কর্মকর্তারা অ্যাক্সিওসের সপ্তাহান্তের প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে মিডল ইস্ট আইকে জানান, গত সপ্তাহে এরদোয়ান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ইস্তাম্বুলে একটি ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের জন্য পাঠাতে ট্রাম্পকে রাজি করান। ওই ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। ট্রাম্প নিজেও আলোচনায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম আক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তুরস্কের কর্মকর্তারা এটা নিশ্চিত করেছেন যে গত সপ্তাহে এরদোয়ান ট্রাম্পকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ইস্তাম্বুলে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের জন্য রাজি করান। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির। এমনকি ট্রাম্প নিজেও আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

যা–ই হোক, শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি আর হয়নি। তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজক হতে এরদোয়ানের আগ্রহ এখনো অটুট।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি–সংক্রান্ত সংঘর্ষের একমাত্র সমাধান হলো আলোচনা। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক তার দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি প্রস্তুত এবং গঠনমূলক অবদান রাখতে চায়।

তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে বিদ্ধ করা সত্ত্বেও এরদোয়ান প্রায়ই আঞ্চলিক সংঘাতে একটি মসৃণ পথ বেছে নেন। কোনো একটি পক্ষে ঝুঁকে পড়ার বদলে তিনি তুরস্কের জন্য যেটা সুবিধাজনক, সেই পথটি বেছে নেন।

ন্যাটো সদস্যপদ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে প্রতিপক্ষ ও মিত্র—দুইয়ের সঙ্গে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে তুরস্ক একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।

ইয়েসিলতাস যেমনটা বলেছেন, ‘ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষে তুরস্কের অবস্থান স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করে না।’

* রাগিপ সয়লু, মিডল ইস্ট আইয়ের তুরস্কের ব্যুরো প্রধান
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই আগ্রহী।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই আগ্রহী। ছবি : রয়টার্স

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার: তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি, তাহলে ইরানের ইউরেনিয়াম গেল কোথায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের প্রধান প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলার পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর চারপাশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তাহলে তেহরানের ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হলো? যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষতি আদতে কতটা করতে পেরেছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত শনিবার দিবাগত রাতে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সুপরিকল্পিত ওই অভিযানের মাধ্যমে দেশটি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের ফলে এমন এক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যখন গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলা অব্যাহত রয়েছে।

গতকাল রোববার ভোরে টেলিভিশনে এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের হুমকি ঠেকানোর লক্ষ্যে এই হামলা চালানো হয়েছে।

হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল দেশটির নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনা—যেখানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বা মজুত রাখা হয় বলে ইসরায়েলসহ পশ্চিমা বিশ্ব দাবি করছে।

পাল্টা হামলার বিরুদ্ধে তেহরানকে সতর্ক করে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আজ রাতেই আমি বিশ্বকে জানাতে পারি, এই হামলা ছিল ‘অসাধারণ এক সামরিক সাফল্য’। ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’

ইসরায়েল ও ট্রাম্পের দাবি, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে।

যদিও ইরান বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা নিয়ে ইসরায়েলের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েল অনেক দিন ধরেই বলছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

এ দাবির পক্ষে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, কূটনীতির সময় পেরিয়ে গেছে এবং তাঁর দেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এক সংবাদ সম্মেলনে আরাগচি আরও বলেন, ‘এই আগ্রাসনের যে বিপজ্জনক পরিণতি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে, তার জন্য একমাত্র এবং সম্পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজ ও আইনের তোয়াক্কা না করা প্রশাসনের।’

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। হয়তো তাঁরা হামলার প্রভাব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন।

টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তৃতায় ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার উপরাজনৈতিক পরিচালক হাসান আবেদিনি বলেন, ‘আগেই তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা খালি করে ফেলা হয়েছিল। সেখানে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কারণ, উপকরণগুলো আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।’

তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ক্ষেত্রে হামলা ইরানের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা দেখে নেওয়া যাক।

কোন কোন পারমাণবিক ক্ষেত্রে হামলা হয়েছে

গতকাল ট্রাম্প বলেছেন, পূর্ণমাত্রার বোমা বহর দিয়ে ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ইরানি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে ওই তিনটি স্থাপনাই হামলার শিকার হয়েছে।

১. ফর্দো পারমাণবিক ক্ষেত্রে

ফর্দো একটি ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যা ২০০৬ সাল থেকে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। রাজধানী তেহরানের উত্তরের কোম শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার (৩০ মাইল) দূরে পাহাড়ের গভীরে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রাকৃতিকভাবে আড়ালে অবস্থান করছে। গতকালের হামলার প্রধান লক্ষ্যস্থল ছিল এই ফর্দো পারমাণবিক ক্ষেত্র।

হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কাইন গতকাল এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ফর্দোতে বিস্তৃত ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন এমওপিএস বা বাংকারবিধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। বোমাগুলো বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

১৩ হাজার কেজি (২৮ হাজার ৭০০ পাউন্ড) ওজনের জিবিইউ-৫৭ হলো সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকারবিধ্বংসী বোমা, যা মাটির নিচে ৬০ মিটার (২০০ ফুট) পর্যন্ত প্রবেশ করতে সক্ষম এবং সেগুলোতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ কেজি (৫ হাজার ৩০০ পাউন্ড) বিস্ফোরক উপাদান থাকে। পাশাপাশি, এই বোমারু বিমানগুলো রাডারে ধরা পড়া খুবই কঠিন।

কাইন আরও বলেন, কমপক্ষে দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় মোট ১৪টি এমওপি বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

এর আগে ১৩ জুন ইসরায়েল ফর্দোতে হামলা চালিয়ে পারমাণবিক ক্ষেত্রটির ওপরের অংশের ক্ষতি করেছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, শুধু মার্কিন বাংকারবিধ্বংসী বোমাগুলোই ওই স্থাপনাটির ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম।

২. নাতাঞ্জ পারমাণবিক ক্ষেত্র

নাতাঞ্জ পারমাণবিক ক্ষেত্র ইরানের সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এটি তেহরান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার (১৮৬ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত। দুটি পারমাণবিক ক্ষেত্রের সমন্বয়ে এটি গঠিত বলে ধারণা করা হয়।

এর মধ্যে একটি হলো পাইলট ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট (পিএফইপি), যা মাটির ওপর অবস্থিত একটি পরীক্ষাগার ও গবেষণাকেন্দ্র। এখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত দ্রুত ঘূর্ণমান সেন্ট্রিফিউজার যন্ত্রগুলো সংযোজন করা আছে।

অলাভজনক সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের তথ্যানুযায়ী, ওই স্থাপনায় হাজারো সেন্ট্রিফিউজার রয়েছে।

মাটির গভীরে অবস্থিত অন্য স্থাপনাটি হলো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট (এফইপি)। নাতাঞ্জে হামলায় কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তা কাইন গতকাল নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।

৩. ইসফাহান পারমাণবিক ক্ষেত্র

ইসফাহান হলো একটি পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্র, যা মধ্য ইরানের ইসফাহান শহরে অবস্থিত। এটি ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল এবং ইউরেনিয়াম রূপান্তরের কাজে ব্যবহার করা হতো।

সূত্রমতে, শনিবার দিবাগত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার সর্বশেষ লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসফাহান পারমাণবিক ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২৫টি বিমান ইরানে এই হামলায় অংশ নিয়েছে।

কাইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন থেকে ইসফাহান লক্ষ্য করে দুই ডজনের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান শনাক্ত করতে পারেনি এবং পরে তাদের জানানো হয় বলেও জানান কাইন।

পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলো কি ধ্বংস হয়ে গেছে

স্বাধীনভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ফর্দোতে কী প্রভাব পড়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

গতকাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমাদের সব অস্ত্র সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঠিকভাবে আঘাত হেনেছে এবং প্রত্যাশিত ফলাফল দিয়েছে।’ তিনি বিশেষ করে ফর্দোতে সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

ইরানের একজন আইনপ্রণেতা এ বিষয়ে আল–জাজিরাকে বলেছেন, হামলায় ফর্দোতে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, গত সপ্তাহে ইসরায়েলের হামলায় ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় যদি কোনো ক্ষতি হয়েও থাকে, তা সীমিত মাত্রায় হয়েছে।

গতকাল আইএইএ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইসফাহানে ছয়টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি ভবনে ছিল দূষিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওয়ার্কশপ।

এর আগে সংস্থাটি থেকে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের হামলায় ওই স্থাপনার চারটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারও রয়েছে।

ইরান ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশ যেমন কুয়েত থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর কোনো স্থাপনা থেকেই উল্লেখযোগ্য মাত্রার তেজস্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা এই ইঙ্গিত দেয় যে ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা করা স্থাপনাগুলো থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আগেই সরিয়ে ফেলেছিলেন।

ইরানের সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর খবরে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার উপপরিচালক ও দেশের জাতীয় পারমাণবিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রধান রেজা কারদান গতকাল নিশ্চিত করে বলেছেন, স্থাপনাগুলোর বাইরে কোনো তেজস্ক্রিয় দূষণ বা পারমাণবিক বিকিরণ দেখা যায়নি।

কারদান আরও বলেন, ‘দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। আগেই এই প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আজ সকালে পারমাণবিক স্থাপনায় সন্ত্রাসী হামলা সত্ত্বেও এসব স্থাপনার বাইরে কোনো তেজস্ক্রিয় দূষণ বা পারমাণবিক বিকিরণ দেখা যায়নি।’

আইএইএ থেকেও বলা হয়েছে, হামলার শিকার স্থাপনাগুলোর আশপাশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাড়েনি।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলা হয়েছে, ফর্দোসহ ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর এখন পর্যন্ত কোনো স্থাপনার চারপাশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধির কোনো খবর পাওয়া যায়নি বলে আইএইএ নিশ্চিত করছে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রিটা পার্সি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগেই ইরান সম্ভবত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল।

পার্সি আল–জাজিরাকে বলেন, দেখে মনে হচ্ছে, তারা আগেই একটি পূর্বসতর্কতা পেয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, ‘তিনি (ট্রাম্প) প্রকৃতপক্ষে হামলা চালাতে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর করতে সময় নিচ্ছেন। তাই আমার ধারণা, ইরান কিছুদিন আগেই সেসব সম্পদ সরিয়ে ফেলেছিল। তবে বর্তমানে সেগুলো কোথায় আছে, তা স্পষ্ট নয়।’

এতে কি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাহত হবে

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সামগ্রিক পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর প্রভাব এখনো অজানা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আদতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অগ্রসর হচ্ছে, এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

পার্সি বলেন, ইরানের সবচেয়ে মূল্যবান পারমাণবিক সম্পদ হলো এর সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। যতক্ষণ তাদের কাছে সেগুলো রয়েছে, ততক্ষণ তাদের কাছে প্রকৃতপক্ষে একটি পরমাণু কর্মসূচি রয়েছে, যা অস্ত্রে রূপান্তরিত হতে পারে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে নিজেদের সফলতা বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তাদের বোমারু বিমানগুলো সাফল্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালিয়ে নিরাপদে ফিরে এসেছে।

খুব বেশি দিন তাদের মুখে এই সাফল্যের গল্প শোনা যাবে না বলেও মত ট্রিটা পার্সির। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, খুব শিগগিরই আমরা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে শুনতে পাব, ট্রাম্প যে সফল হামলার দাবি করেছেন, তা আসলে সে রকম হয়নি। ইরানের বিরুদ্ধে আরও দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে তারা নিজেদের যুক্তি তুলে ধরতে শুরু করবে।’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আগে কোনো বাধার মুখে পড়েছে কি

এ প্রশ্নের উত্তর, হ্যাঁ হয়েছিল। ইরানের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। যে সময়ে দেশটির শাসক ছিলেন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।

শাহের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলা—প্রধানত জ্বালানি উৎপাদনের জন্য এবং আংশিকভাবে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির জন্য।

সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং ফ্রান্স—সবাই ইরানকে প্রযুক্তি সরবরাহ করে সহায়তা করেছিল।

তবে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানের নতুন সরকার পরমাণু কর্মসূচির কিছু অংশ স্থগিত বা বন্ধ করে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল, এটি ব্যয়বহুল এবং এটি ইরানের পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতার প্রতিফলন।

বাতিল বা স্থগিত রাখা কর্মসূচিগুলো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সময়। যখন ইরাকের আগ্রাসনে ইরান সরকারকে যুদ্ধ ব্যয় খাতে সম্পদের স্থানান্তর করতে বাধ্য হতে হয়েছিল।

শিল্পোৎপাদনের বৃহৎ কোম্পানি সিমেন্সের অংশীদারত্বে সে সময়ে বুশেহর পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর সাইটের নির্মাণকাজ চলছিল। ইরাকের বোমাবর্ষণে সাইটটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। সিমেন্স ওই নির্মাণ প্রকল্প প্রত্যাহার করে চলে যায়।

পরবর্তী সময়ে ইরান সরকার বুশেহর পারমাণবিক কর্মসূচি আবার চালু করে বলে খবর পাওয়া যায়। ইরান সরকার সব সময় জোর দিয়ে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তির ব্যবহার করা।

স্টাক্সনেট

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি কম্পিউটার ভাইরাস স্টাক্সনেট, যা সম্ভবত ২০০৫ সালে ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু আবিষ্কৃত হয় ২০১০ সালে। একটি কৌশলগত কম্পিউটার ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার, যা বিশেষভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্ট্রিফিউজারগুলো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট করতে ডিজাইন করা হয়েছিল। এই ভাইরাস ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

ম্যালওয়্যারটি ‘অলিম্পিক গেমস’ নামে খ্যাত, এই কর্মসূচি ইরানের নেটওয়ার্কে ভীতি সৃষ্টি করে সেন্ট্রিফিউজারগুলোকে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করে ভেঙে ফেলতে বাধ্য করেছিল।

এটির সম্পর্কে পাওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে এটি দ্রুত ছড়ালেও এর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরেক সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে।

ইরান পরমাণু চুক্তি

২০১৫ সালের ইরান পরমাণু চুক্তির অধীনে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা সীমিত করে করেছিল।

এই চুক্তিটি ইরান, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখা হয়।

চুক্তির পর ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের সময় থেকে আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাসহ মোট নিষেধাজ্ঞাগুলো ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হয়। আইএইএর মতে, তেহরান চুক্তির শর্ত মেনে চলেছিল। দেশটির সরকার আইএইএকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছিল।

কিন্তু ট্রাম্প ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে ইরানের ওপর আবার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে তেহরানও চুক্তির শর্ত মানা বাদ দেয়, যদিও তারা আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছিল।

ইরানের ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনা
ইরানের ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনা। ফাইল ছবি: এএফপি

ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে by কলিন পি ক্লার্ক

প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ইরানের ওপর বোমা হামলা চালানোর পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে। তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়া খুব শিগগির আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন হামলার পর ইরানি টেলিভিশনের এক উপস্থাপক মন্তব্য করেছেন, ‘মি. ট্রাম্প, আপনি শুরু করেছেন, শেষ করবে আমরা।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে? সবচেয়ে সম্ভাব্য যে জবাবটি আসতে পারে, তা হলো অসামরিক যুদ্ধ কৌশল। এর মধ্যে থাকতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ বা ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোতে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও সন্ত্রাসী হামলা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়ে একটি ‘খুব বড় লাল সীমা’ অতিক্রম করেছে। এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যদি কোনো প্রতিক্রিয়া না জানান, তাহলে তিনি কট্টরপন্থী মহলের সমর্থন হারাতে পারেন। তাই ইরান যে পাল্টা আঘাত হানবে, সেটি অনেকটাই নিশ্চিত। তবে তা কখন হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।

সবচেয়ে সহজ ও প্রত্যাশিত লক্ষ্য হবে মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে।

এ ছাড়া দূতাবাস, কূটনৈতিক ভবন ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্বার্থও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী বা ইরাকের শিয়া–মিলিশিয়ার মতো ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোও সেসব জায়গায় হামলা চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইসরায়েলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে। ইরাক ও লেবাননের দূতাবাসগুলো বাড়তি মার্কিন কর্মীদের দেশ ছাড়তে বলেছে।

সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে ইরাকে ইরান–সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহ। এই শিয়া–মিলিশিয়া গোষ্ঠী এর আগে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তারা আবারও তাই করতে পারে। কাতাইব হিজবুল্লাহর নেতা আবু হুসেইন আল-হামিদাওয়ি এক সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, ‘আমেরিকা যদি এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে, আমরা তাদের স্বার্থ ও ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানব।’

পারস্য উপসাগরের অন্যান্য দেশগুলোও ইরানের নিশানায় থাকতে পারে। যেমন ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সময় হুতিরা সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। এর কিছু আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তেল ট্যাংকারে হামলা হয়েছিল। এবারও ইরান ও তার মিত্ররা উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে হামলা করতে পারে। সমুদ্র মাইন বসানো, তেল ট্যাংকার বা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলা হতে পারে তাদের কৌশল।

গত ২০ মাসে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত। তবে তাদের সামরিক ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়ানোয় এখন ইরান এই নেটওয়ার্ক সক্রিয় করতে পারে।

অতীতে হিজবুল্লাহ লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপে ইসরায়েলি ও ইহুদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে আর্জেন্টিনায় ইসরায়েলি ও ইহুদি কেন্দ্রগুলোতে হামলায় শতাধিক মানুষ মারা যান। ২০১২ সালে বুলগেরিয়ার বুরগাসে এক বাস বোমা হামলায় পাঁচজন ইসরায়েলি পর্যটক নিহত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রেও হামলার পরিকল্পনা করেছে। ২০১৭ সালে নিউইয়র্কে দুটি সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা স্থাপনায় নজরদারির অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালে নিউ জার্সির এক বাসিন্দা ১২ বছরের কারাদণ্ড পান।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের কোনো হামলা ঘটেনি, তবু ইরান বেশ কয়েকটি গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে ছিল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, মাইক পম্পেও এবং এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল সম্প্রতি হিজবুল্লাহর স্লিপিং সেলগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছেন।

সামরিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের ভেতরে ঢুকে ইরানি পরমাণুবিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে নিয়মিত টার্গেট কিলিং করছে, যা থেকে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়।

তবে অসামরিক বা সন্ত্রাসী হামলাই ইরানের প্রকৃত শক্তি। ১৯৮৩ সালে লেবাননে ইউএস মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলায় ২৪১ মার্কিন সেনা নিহত হন। ১৯৯৬ সালে খোবার টাওয়ার বোমা হামলায় ১৯ জন মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্য নিহত হন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগের মেয়াদে তিনি কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইরান তখন প্রতিশোধ হিসেবে কয়েক মাস ধরে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। আমেরিকার বোমা হামলার পর ইরান এবারও তীব্র ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

* কলিন পি  ক্লার্ক, নিউইয়র্ক সিটির গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য সউফান গ্রুপের গবেষণা পরিচালক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।

হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ পরীক্ষা
হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপণ পরীক্ষা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কড়া নিন্দা না জানিয়ে কী অর্জন করতে চাইছেন এরদোয়ান

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলার বিষয়ে তুরস্ক এখন পর্যন্ত সরাসরি নিন্দা জানায়নি। অথচ ইরানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এই হামলাকে বিপজ্জনক উসকানি হিসেবে দেখছে। ইরানে ইসরায়েলি হামলার কড়া সমালোচনাও করেছে এসব দেশ।

গত শনিবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়াটাই এর উদ্দেশ্য ছিল।

ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বিশ্ববাসীকে বলতে চাই, এই হামলাগুলোর মধ্য দিয়ে অসাধারণ রকমের সামরিক সাফল্য এসেছে। ইরানের প্রধান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি এবং চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, তেহরানের উচিত এখন শান্তি স্থাপন করা। ইরান শান্তিপূর্ণ অবস্থানে না এলে হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দেন তিনি।

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এখন হয় শান্তি আসবে, না হয় ইরানের জন্য এমন এক ট্র্যাজেডি তৈরি হবে, যা গত আট দিনে দেখা ঘটনাগুলোর চেয়েও ভয়ংকর হবে।’

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টা পর তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, এসব হামলা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ‘আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এভাবে চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বৈশ্বিক রূপ নিতে পারে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতির আশঙ্কা বাস্তব হোক, তা আমরা চাই না।’

অথচ তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মেপে মেপে বলা কথাগুলো এক দিন আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের করা মন্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরানে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে ওই মন্তব্য করেছিলেন এরদোয়ান। ইরানে ইসরায়েলের হামলাকে ‘দস্যুবৃত্তি’ আখ্যা দিয়েছিলেন তিনি।

আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা করে এলেও তারা সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখজনক হলো, ২০১০ সালে তুরস্ক ও ব্রাজিল যৌথভাবে একটি পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময় চুক্তির মধ্যস্থতা করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানো।

গতকাল রোববার তুরস্কের চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেটা-এর নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ এবং দেশটির সরকারের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক পরিষদের সদস্য মুরাত ইয়েসিলতাস বলেন, ‘ইরানের কথিত পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের চেষ্টাকে দেশটির নেতারা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন বলে যুক্তি দেখাচ্ছেন। তুরস্কের দৃষ্টিতে এ এক বিপজ্জনক বাজি, যা পুরো অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে পারে। ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরোধিতা মানে এই নয় যে তুরস্ক ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি নীরব সমর্থন দিচ্ছে।’

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ

তুরস্ক বলছে, ইসরায়েল যে সম্প্রতি ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে, তার পেছনে তেহরানের কোনো উসকানি ছিল না। কারণ, অনেক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থার কেউই মনে করে না যে ইরান এখন পারমাণবিক বোমা বানাতে যাচ্ছে।

এতেই বোঝা যায়, তুরস্কের কর্মকর্তারা কেন এত দ্রুত ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। এমনকি বড় আকারে যুদ্ধও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে গাজা, লেবানন আর সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের ওপর এ হামলাকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, ১৩ জুন থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৩০ জন নিহত এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন। আর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের হামলায় তাঁদের দেশে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছেন।

এরদোয়ান উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

যদিও এই ফোনালাপের মাধ্যমে এরদোয়ান একজন সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার স্থান হিসেবে ইস্তাম্বুলের নাম প্রস্তাব করেছেন তিনি। ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা না করে এরদোয়ান তাঁর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছেন। এর আগে এই সম্পর্কের বদৌলতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশাসনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ট্রাম্পকে রাজি করাতে পেরেছিলেন তিনি।

অ্যাক্সিওসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে তুরস্কের কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, গত সপ্তাহে এরদোয়ান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ইস্তাম্বুলে পাঠানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রাজি করিয়েছিলেন। সেখানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভ্যান্স ও উইটকফের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এমনকি ট্রাম্প নিজেও আলোচনায় অংশ নিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠক হয়নি। তুর্কি কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ বিবৃতিটিতে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ইচ্ছার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করতে তুরস্ক আগ্রহী।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ সমাধানের একমাত্র পথ হলো আলোচনা। তুরস্ক এ বিষয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত এবং গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়।’

যদিও এরদোয়ান কখনো কখনো উত্তেজনাপূর্ণ ভাষায় কথা বলেন, তবে বাস্তবে তিনি আঞ্চলিক সংকটগুলোতে অনেকটাই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেন। তিনি সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে তুরস্ককে এমন এক অবস্থানে রাখতে চান, যাতে দেশটি কৌশলগতভাবে লাভবান হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান বিরোধের একমাত্র সমাধান হচ্ছে আলোচনা। তুরস্ক এ বিষয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত এবং গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়।’

তবে এরদোয়ান মাঝেমধ্যে কঠোর বক্তব্য দিলেও বাস্তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত পরিস্থিতিতে হিসাব–নিকাশ করে পদক্ষেপ নেন। সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে তুরস্ককে কীভাবে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখা যায়, সে চেষ্টা করেন তিনি।

ন্যাটোতে তুরস্কের সদস্যপদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় মিত্র ও প্রতিপক্ষ—দুই পক্ষের সঙ্গেই আলোচনার মাধ্যমে কৌশলগত লক্ষ্যপূরণের সুযোগ পায় আঙ্কারা।

তুর্কি বিশ্লেষক মুরাত ইয়েসিলতাস মনে করেন, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে তুরস্ক যে অবস্থান নিয়েছে, তা শুধু স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়নি।

মুরাত বলেন, ‘ঝুঁকিগুলো কাল্পনিক নয়। এসব ঝুঁকির মধ্যে আছে তুরস্কের ভূখণ্ডগত নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা এবং জনমিতিগত স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরাসরি হুমকি।’

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

গুম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই ক্ষতির মুখে পড়তেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে যেসব সদস্য গুম, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কিংবা প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহিতার মতো বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন, তাদের প্রায়শই ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। এমনই ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে গুম কমিশনের রিপোর্টে। এতে বলা হয়, বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকীকরণের পাশাপাশি আরও দুটি বিষয় এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তা হচ্ছে- দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ভেতরে একটি নীরব সহমতের সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নামে গড়ে ওঠা এমন একটি ঐকমত্য, যা ‘স্থিতিশীলতা রক্ষার’ অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করেছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয় বা কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার ফল নয়। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে এসব অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে, স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয়পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পরিবর্তনের পরও এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বহাল আছে এবং পূর্ববর্তী কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে আগের মতোই কাজ করছে।

কমিশনকে বয়স চল্লিশের কোঠায় একজন অফিসার জানিয়েছেন গুম বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশ করা এবং তৎকালীন সরকার নির্ধারিত অবস্থান মেনে না চলার কারণে কীভাবে সহকর্মীদের কাছ থেকে তাকে পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। প্রতিটি নতুন পোস্টিংয়ের আগেই তার সহকর্মীদের সতর্ক করে দেয়া হতো যাতে তাকে বিশ্বাস না করে। তার পরিবারিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি করা হতো এবং তার বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ আনা হতো। যদিও তিনি কখনো কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ করেননি, তথাকথিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিলকরণের মতো প্রশাসনিক অস্ত্র ব্যবহার করে তার পেশাগত অগ্রগতি নষ্ট করে দেয়া হয়। ২০০৭-২০০৮ সময়কালে এক আওয়ামী লীগ নেতার দুর্নীতি তদন্তকারী টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেয়া কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বরখাস্ত, জোরপূর্বক গুম, এবং পরে মনগড়া অভিযোগে কারারুদ্ধ করে। কমিশন জানায়, ডিজিএফআই-এর এক সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল, যিনি ঘটনার সাক্ষী, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা সদিচ্ছা থেকে নেয়া পদক্ষেপের জন্যও শাস্তির মুখোমুখি হন। ফলে, অনেক কর্মকর্তা দায়িত্বের অংশ হিসেবেও নীতিনিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে ভয় পান, কারণ তারা বিশ্বাস করেন সঠিক কাজ করলেও ভবিষ্যতে তাদের শাস্তি পেতে হতে পারে। অন্যদিকে এক তরুণ গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত তার ভাই কীভাবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সে অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তার ভাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার সক্রিয় রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে। পরে তিনি জানতে পারেন তিনি যে তালিকা জমা দিয়েছিলেন তাদের প্রত্যেককে এলিমিনেট করা হয়। তার অপরাধবোধ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত তাকে চরম মানসিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে, বয়স পঁচিশের কাছাকাছি একজন তরুণ সৈনিককে যখন এক গোপন বন্দিশালায় পোস্টিং দেয়া হয়, তিনি সেখানকার পরিস্থিতি দেখে চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন (বন্দিশালাটি বন্দিদের প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য বিশেষভাবে কুখ্যাত)। প্রাথমিক প্রশিক্ষণের সময়েই তাকে একটি স্থায়ী আদেশ দেয়া হয়, যা সেখানকার কর্মরত সবাই মেনে চলতো। সেটি হচ্ছে- ‘বন্দিদের সঙ্গে কখনো স্বাভাবিক আচরণ করা যাবে না, যেটা স্বাভাবিক মানুষের সঙ্গে করা হয়। তাদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত রাখতে হবে, সব অধিকার থেকে। যাতে সে কষ্ট অনুভব করতে পারে।’ এমনকি, প্রহরীরা নির্দেশিত ছিল যেন তারা বন্দিদের আশেপাশে কথা পর্যন্ত না বলে। পরিবর্তে, তাদের বলা হয়েছিল ইশারা ও শিষ ব্যবহার করতে। যখন তিনি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলেন, তখন তাকে সরাসরি হুমকি দেয়া হয় যে পিছু হটলে প্রাণ হারাতে হতে পারে। তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ কথাটি অতিশয়োক্তি বলে ধরে নেয়া যায়, কারণ আমাদের কাছে এখনো এমন কোনো প্রমাণ নেই যে কেউ কেবল এ ধরনের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে নিহত হয়েছে; বরং এমন পোস্টিংয়ে সৈনিক ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি করা হতো। তবুও এই ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে: নিঃশব্দে এবং নিঃশর্তে মেনে চলাকেই শুধুমাত্র আনুগত্য বোঝানো হতো। কমিশনের তদন্তে এও উঠে আসে যে, ভেতরে ভেতরে ভিন্নমত টিকে ছিল। যেমন, সেই একই সৈনিক, যিনি দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারেননি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে নিজের অবস্থানকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বন্দিদের জন্য যেহেতু প্রহরীদের অর্ধেক রেশন বরাদ্দ ছিল, তিনি নিয়মিত নিজের খাবার বন্দিদের দিয়ে দিতেন। সৈনিকটির দেয়া খাবার পেয়েছিলেন এমন ভুক্তভোগীর কাছ থেকেও কমিশন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অবশেষে পেট পুরে খেতে পেরে, এক বন্দি কান্নাভেজা চোখে একবার তাকে ধন্যবাদ জানায়। সৈনিকটি পাশে সরে গিয়ে নিঃশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার চোখে জলের কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি বাড়ির কথা মনে পড়ছে বলে পাশ কাটিয়ে যান। এই যন্ত্রণা তিনি একা অনুভব করেননি। এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকাটা অনেক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের ওপর মানসিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলেও কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে।

গুম কমিশনের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বিস্ময়কর আরও একটি ঘটনা উঠে আসে। যেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক সহকর্মী ৫ই আগস্টের পর গণভবনে পরিত্যক্ত কিছু নথিপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে দুটি হাতে লেখা চিঠি আবিষ্কার করেন যা র‌্যাবের দু’জন কর্মকর্তা বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইন্টিলিজেন্সের পরিচালক বরাবর লিখেছিলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি না, বরং ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র ছিল; তবুও স্পষ্টতই এগুলো শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। তিনি এগুলো ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের ফাইলে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। 

mzamin

ইরানে আক্রমণ করে ট্রাম্প বড় জুয়া খেললেন by মাইকেল বার্নবাউম ও নাতালি অ্যালিসন

ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বড় ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেন। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল ইরানের এই কর্মসূচি। এই আক্রমণের পর যা ঘটবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ভবিষ্যৎ।

যদি ইরান অর্থবহ প্রতিশোধ নিতে না পারে, তাহলে ট্রাম্প দুই দিক দিয়ে লাভবান হবেন। দীর্ঘদিনের শত্রুর ওপর আঘাত হানা তো হবেই, সেই সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হবে যে প্রয়োজনে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না। কিন্তু ইরান যদি ট্রাম্পের শর্তে শান্তিচুক্তিতে না আসে? দীর্ঘ যুদ্ধের এক দরজা খুলে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা ইতিমধ্যে ট্রাম্পের সমর্থকদের কিছু অংশকে ক্ষুব্ধ করছে।

ট্রাম্প এক দশক আগে ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজের রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলেছিলেন। সেই অবস্থান থেকে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটলেন। সে সময় তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ও নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগ তুলেছিলেন। সবকিছু বদলে যায় রোববার।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাহাড়ের নিচে লুকানো পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোয় দূরপাল্লার স্টিলথ বোমারু বিমানে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে। হোয়াইট হাউস থেকে তিন মিনিটের এক ভাষণে ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘অসাধারণ সামরিক সাফল্য’ বলে ঘোষণা করেন।

তিনি বলেন, ‘ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ ট্রাম্প স্পষ্ট হুমকি দেন, ‘আমরা শান্তি চাই। নয়তো গত আট দিনে যা ঘটেছে, ইরানের জন্য তার চেয়ে অনেক বড় এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখনো অনেক টার্গেট বাকি। শান্তি দ্রুত না এলে আমরা সেই টার্গেটগুলোয়ও নিখুঁতভাবে, দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে হামলা চালাব।’

কিন্তু ইরানের জনসংখ্যা ইরাকের দ্বিগুণ। বহু দশক ধরে সীমান্ত পেরিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে তারা। যদি ইরান মার্কিন নাগরিক বা সেনাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়, তাহলে সংঘাত দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে।

এই ঝুঁকির কারণেই ট্রাম্পের আগের কোনো প্রেসিডেন্ট ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলার পথে হাঁটেননি। মার্কিন সিনেটে সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট শীর্ষ নেতা জ্যাক রিড বলেন, ‘ট্রাম্প এক বিশাল জুয়া খেলেছেন। এর ফল কী হবে, তা এখনো কেউ জানে না।’

বারাক ওবামা ও জো বাইডেনও একই সংকটে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা হামলার পথে না গিয়ে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজেছিলেন। যদিও সেই সময়ের ইরান এখনকার মতো দুর্বল ছিল না। সিরিয়া, লেবানন ও গাজায় ইরানের মিত্রদের পতনে তারা এখন অনেকটাই দুর্বল। ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলার উদ্দেশ্য ইরানকে মার্কিন শর্তে চুক্তিতে বাধ্য করা।

কিন্তু বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, জবরদস্তিতে ইরান সহজে মাথা নোয়াবে না। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি শাসন পরিবর্তন যুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে। হয়তো আরও বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে থাকতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত না নিলেও এই হামলা তাদের সেই পথে ঠেলে দেবে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধবাজির বিরুদ্ধে জনমতই একসময় ট্রাম্পকে ক্ষমতায় এনেছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন ইরাক যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। সেই একই ধরনের যুদ্ধে আগবাড়িয়ে জড়ালেন ট্রাম্প, যার নিন্দা করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এখন তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর বেছে নেওয়া পথ তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে ভালো।

এই বসন্তে ট্রাম্প তাঁর বন্ধু ও দূত স্টিভ উইটকফকে ইরানের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করতে পাঠিয়েছিলেন। এতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু খুব অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে হামলার আগে জানিয়েছিল। হামলার পর ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু কথা বলেন। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি ‘দল’। নেতানিয়াহু খুশি হয়ে বলেন, ‘আজ তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ তৈরি করবে।’

সমর্থকদের মধ্যে কেউ কেউ ট্রাম্পকে সময় দিতে বলছেন ইরানকে। আবার কেউ খোলাখুলি বলছেন যে তিনি ভুল করেছেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ডানপন্থী মিত্র স্টিফেন ব্যানন ও চার্লি কার্ক ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ না করার জন্য ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন। তাঁরা সরাসরি ট্রাম্পকে সমালোচনা করেছেন আক্রমণের বিরোধিতা করে। ব্যানন বলেন, ‘অনেক মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) সমর্থক খুশি নন।’

অনেকে বলছেন, ‘আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুদ্ধ করবেন না।’ কার্ক বলেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অতীতে ভালো ফল দিয়েছে, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কার্ক বলেন, ‘এটা কি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছে? আমরা জানি না।...এখন কত মার্কিন এর পাল্টা আঘাতের শিকার হবে?’ যুব সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। একজন ট্রাম্প সমর্থক বলেছেন, ‘আমাদের নিজেদের সমস্যা না মিটিয়ে কেন অন্য দেশের জন্য এত কিছু করা হচ্ছে?’

ট্রাম্প বরাবরই যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার বাসনাও তাঁর খুব প্রবল। সেসবের কোনো পরোয়া না করে তিনি শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছেন। নিজে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেন, নিজেই তার উল্টো পথে হাঁটছেন তিনি।  

* মাইকেল বার্নবাউম, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি
* নাতালি অ্যালিসন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হোয়াইট হাউস প্রতিবেদক
- দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণ করছেন ট্রাম্প
হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণ করছেন ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

তৎপর রাশিয়া শেষ দেখবে ইরান

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কেউ জানে না এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? উভয় পক্ষের হামলাই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। সোমবার দিনভর ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে দেশটির একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বেশ কয়েকটি এলাকা। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে তেল আবিবের বহু ভবন ও সড়কে আছড়ে পড়ছে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র। পক্ষান্তরে ইরানের একাধিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ইসরাইলি হামলার খবর পাওয়া গেছে। তেল আবিব দাবি করেছে তারা ইরানের ৬টি বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এ লড়াই সহসাই থামবে এমন লক্ষণ নেই। ইরান জানিয়েছে, তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শেষ দেখে ছাড়বে তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে বলেছেন, যত সময় লাগুক এ লড়াই চালিয়ে যাবে ইরান। এদিকে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের জনগণকে সরাসরি সহায়তা দেয়ার কথা জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। রুশ প্রেসিডেন্টের কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। চিঠিতে রাশিয়া যেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেয় সে বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা। বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি বলেছে, ইরানকে  কোনোভাবেই পারমাণবিক কার্যক্রম চালাতে দেয়া হবে না। ইরান জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া তাদের অধিকার। এ ছাড়া তেহরানে পরমাণুকেন্দ্রগুলোতে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণের জন্য জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্থগিতের কথা বিবেচনা করছে ইরান। এ বিষয়ে দেশটির পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলছেন, একতরফাভাবে এমন হামলার ফলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ন্যায্যতা  পেয়েছে ইরান। এদিকে হরমুজ প্রণালিতেও শুরু হয়েছে উত্তেজনা। তেল ও গ্যাসবাহী একাধিক জাহাজ রুট পরিবর্তন করে গন্তব্যে গিয়েছে বলে খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। বিশ্ব জুড়ে নিজ নাগরিকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। বিশেষ করে কাতারে অবস্থিত মার্কিন নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে দেশটি। এদিকে সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের একটি এলাকায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও কারা বা কোথা থেকে এই হামলা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুতিন-আরাঘচি বৈঠক, ইরানের জনগণকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রাশিয়া: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশ ইরানের জনগণকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসন ভিত্তিহীন ও অন্যায্য। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে এক বৈঠকে এ মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের পক্ষে রাশিয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন পুতিন। বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের অবস্থান সকলেরই জানা আছে। যা রাশিয়ার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার ব্যক্ত করেছে। এর আগে এক বিবৃতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কঠোর নিন্দা জানায় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবিলম্বে যুদ্ধ ও শত্রুতা বন্ধ করে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানায় তারা। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানানোর জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। আরাঘচি বলেন, ইতিহাসের সঠিক অবস্থানের পক্ষে রয়েছে রাশিয়া। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের শুভেচ্ছা পুতিনকে পৌঁছে দেন আরাঘচি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পুতিনকে খামেনির চিঠি: যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চিঠিটি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এটি পুতিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কিনা তা এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে- সূত্র জানিয়েছে, এখনো মুগ্ধ হওয়ার মতো রুশ সমর্থন পায়নি ইরান। তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এতে ইরান চায় ইসরাইল ও মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে আরও কিছু করুক পুতিন। যদিও খামেনি কেমন সহায়তার কথা জানিয়েছেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সূত্রটি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে ইরান ও রাশিয়া একে অপরকে সহযোগিতা করছে।

জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্থগিত করতে পারে ইরান: জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)-এর সঙ্গে চুক্তি স্থগিত করতে পারে ইরান। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে দেশটির পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। সংস্থার অপেশাদার আচরণের প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করতে পার্লামেন্টে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, রোববার পার্লামেন্ট অধিবেশন চলার সময় আইএইএ-এর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত একটি বিল তৈরির প্রস্তাব দেন এমপিরা। সেই প্রস্তাবে সায় দিয়ে কালিবাফ বলেন, এই আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যত দিন আমরা পেশাদার আচরণের নিশ্চয়তা না পাবো, ততদিন সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত রাখা উচিত।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হতে পারে: ইরানের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, সে সিদ্ধান্ত ইরান নিজের মতো করেই নেবে। আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে খাতিবজাদে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তিনি বলেন, কখন, কীভাবে এবং কোন মাত্রায় আমেরিকানদের জবাব দেয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত ইরান নেবে। ফরদোর মতো পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন ও ভয়াবহ ভুল বলে অভিহিত করেন।

সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা: সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে রুশ বার্তা সংস্থা আরআইএ। এতে বলা হয়, সিরিয়ার আল-হাসাকাহ প্রদেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে কোথা থেকে কারা এই হামলা চালিয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি বার্তা সংস্থাটি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা জারি: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর বিশ্বব্যাপী মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা নির্দেশনা জারি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে-  মার্কিন নাগরিক ও স্বার্থের বিরুদ্ধে বিদেশে বিক্ষোভের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিশ্ব জুড়ে মার্কিন নাগরিকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই সতর্কতা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জারি করা হয়েছে, যেখানে ইসরাইল-ইরান সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে তারা যেন ভ্রমণের আগে পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রাসঙ্গিক ভ্রমণ পরামর্শ, নিরাপত্তা সতর্কতা এবং দেশভিত্তিক তথ্য ভালোভাবে পর্যালোচনা করেন। বিশেষ করে কাতারে অবস্থিত মার্কিন নাগরিকদের পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে দেশটি। তবে কেন এমন জরুরি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। প্রসঙ্গত, উপসাগরীয় এই দেশটিতে অবস্থিত বিশাল আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এই ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম না বাড়াতে ট্রাম্পের হুমকি: বিশ্ববাজারে তেলের দাম না বাড়াতে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোশ্যাল ট্রুথে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, সকলে তেলের দাম নিম্নমুখী রাখুন। আমি সব খেয়াল করছি। আপনারা শত্রুর হয়ে খেলা শুরু করেছেন, এটা করবেন না। এদিকে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে করে বাড়ছে। ইরানের পার্লামেন্টে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহের মূল রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়ায় সোমবার ভোরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকস্মিকভাবে বেড়ে যায়। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বাজার খোলার পরপরই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেলচুক্তি ডব্লিউটিআই- উভয়ের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়। তবে কিছু সময় পর এই প্রবণতা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। ব্রেন্ট তেলের দাম দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৭৯.২০ ডলার (+২.২%), ডব্লিউটিআই তেলের দাম হয় ৭৫.৯৮ ডলার (+২.১%)। বিশ্বে ইরান নবম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। প্রতিদিন প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে দেশটি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক রপ্তানি করে এবং বাকি অংশ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে। জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি জানিয়েছে, এই যুদ্ধ কতোদিন চলবে ও এর ফল কী হবে তা অনিশ্চিত। এর ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ১০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ইরানের সঙ্গে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করছে ইসরাইল: ইরানের সঙ্গে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করছে ইসরাইল। তেহরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালালেও শিগগিরই তা শেষ করতে চাইছে দেশটি। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলার পর কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এ বিষয়ে ইরানকে বার্তা পাঠিয়েছে তেল আবিব। এ খবর দিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল। টাইমস অব ইসরাইলও এ খবর নিশ্চিত করেছে। গণমাধ্যমটি বলছে, এ সংক্রান্ত একটি বার্তা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তেহরানের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলায় যোগ দেয়ার পর ওই বার্তা দেয়া হয়েছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের ওই প্রতিবেদনে ইসরাইল ও আরব কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাতানজ, ফরদো ও ইস্ফাহানে চালানো সফল হামলার কূটনৈতিক ফলাফল কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে ইসরাইল। আরব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরব মিত্রদের মাধ্যমে ইরানকে জানাতে বলেছে যে, ইসরাইল খুব শিগগিরই ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ শেষ করতে চায়। তবে, ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন হামলার জবাব দেয়া প্রয়োজন মনে করে তারা।

মার্কিন হামলার নিন্দা জানালো উত্তর কোরিয়া: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিন্দা জানিয়েছে পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে, যা সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে জাতিসংঘ সনদকে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছে। পাশাপাশি ইরানে হামলার পর বিশ্ব জুড়ে নেতাদের প্রতিক্রিয়া অব্যাহত আছে। এরমধ্যে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যাতে আর না বাড়ে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এক্সে দেয়া এক পোস্টে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহামেদ হাসান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের শক্তিগুলো এই যুদ্ধে জড়িত হওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তা হবে এক বিরাট সমস্যা। ওদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার জন্য ইসরাইলের ‘অবিবেচক সাহসিকতাকে’ দায়ী করেছে উত্তর কোরিয়া। বিবৃতি পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ’কে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ‘ইসরাইলের অবিবেচক সাহসিকতার অনিবার্য ফল’। তিনি ইসরাইলকে অভিযুক্ত করে বলেন, ইহুদি রাষ্ট্রটি নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধমূলক তৎপরতা ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে একতরফাভাবে নিজেদের স্বার্থকে এগিয়ে নিচ্ছে। উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি রয়েছে। তারা ডজনখানেক পারমাণবিক অস্ত্র ও বিভিন্ন মিসাইল বাহন ব্যবস্থার মালিক বলে বিশ্বাস করা হয়। দেশটি এখনো দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যত যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। কারণ ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ একটি অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে শেষ হলেও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।

mzamin

ইনফান্তিনো-ট্রাম্প ‘ব্রোমান্স’–এর ভেতরে কী আছে

প্রায় সাত বছর আগের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো হোয়াইট হাউসে তাঁর ওভাল অফিসে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ফুটবলের লাল ও হলুদ কার্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

ইনফান্তিনো তত দিনে ফিফা সভাপতি হলেও বৈশ্বিকভাবে তেমন পরিচিতি পাননি। কয়েক সপ্তাহ আগে ২০১৮ বিশ্বকাপের আয়োজন শেষ করেছেন। ২০১৫ সালে ফিফায় সংকটের পরের বছর ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দায়িত্ব পান।

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়ার পেছনে ইনফান্তিনোর প্রচেষ্টার জন্য তখন এই সুইস-ইতালিয়ানের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে এই বলে অনুযোগও করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ যখন আয়োজিত হবে, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট অফিসে থাকবেন না। আর না থাকলে তাঁর ভাষায়, ‘সংবাদমাধ্যম হবে খুব বিরক্তিকর।’ তিনি না থাকলে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের লগ্নে হোয়াইট হাউসকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম কেমন হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘খুব বিরক্তিকর হবে। ওদের হয়তো কোনো কাজই থাকবে না।’

ট্রাম্পের এ কথাগুলোর ফাঁকেই ইনফান্তিনো তাঁর কাজ সেরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসা লাল ও হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘হলুদ কার্ড হলো সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। আর যখন আপনি কাউকে বের করে দিতে চাইবেন...এভাবে’—বলে লাল কার্ড উঁচিয়ে ধরেন ইনফান্তিনো। ট্রাম্পকে দেখে বেশ উৎফুল্ল মনে হয়েছিল। ইনফান্তিনোর কাছ থেকে লাল কার্ডটি নিয়ে তিনি সেটা উপস্থিত সংবাদকর্মীদের দেখান।

সুইস আইনজীবী ইনফান্তিনোর বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বেসর্বা হিসেবে উত্থান অসাধারণ এক গল্প। ফিফা সভাপতির ভিত তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তরাষ্ট্রে দুটি বিশ্বকাপ আয়োজন এবং সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার পথটা ট্রাম্পই সুগম করে দিয়েছেন বলে গুঞ্জন আছে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই বৈঠক থেকে একটি বিষয় শিখে নিয়েছিলেন ইনফান্তিনো—ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে এবং জনসমক্ষে কীভাবে সামলাতে হবে। সে বিদ্যাটা এখনো কাজে লাগাচ্ছেন ফিফা সভাপতি। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার জুভেন্টাসের খেলোয়াড় ও ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। ট্রাম্প জুভেন্টাসের দুই যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ওয়েস্টন ম্যাকেনি ও টিমোথি উইয়াহর সঙ্গে হাত মেলান। এরপর ট্রাম্পের চারপাশে দাঁড়ান জুভেন্টাসের খেলোয়াড়, ম্যানেজমেন্ট ও ইনফান্তিনো। ট্রাম্প তখন ক্লাব বিশ্বকাপের প্রসঙ্গে আর যাননি, এর চেয়ে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কথা বলতেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।

তবে কিছুক্ষণ পরপরই বিভিন্ন বিষয় জানতে মুখ ফিরিয়েছেন তাঁর বন্ধু ইনফান্তিনোর প্রতি। জুভেন্টাসের ম্যাচে টিকিট অপ্রতুলতা নিয়ে কথা বলেছেন। মজাও করেছেন। ট্রাম্প যতবার মজা করেছেন, ইনফান্তিনো ততবারই জানতেন কী করতে হবে। ফিফার দুটি টুর্নামেন্ট সেখানে আয়োজনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর বারবার গুরুত্ব আরোপ করেছেন ইনফান্তিনো।

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনে ট্রাম্পের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাহায্য পেয়েছেন ইনফান্তিনো। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত প্রজেক্টেও—৩২ দলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ—যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তিনি পেয়েছেন। এই ক্লাব বিশ্বকাপ আসলে উয়েফা ও ইউরোপিয়ান লিগগুলোর সূচির বিরুদ্ধাচরণ করে আয়োজিত টুর্নামেন্ট। এটা বলাই যায়, ফিফা সভাপতির আদেশে এটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী টুর্নামেন্ট।

এই টুর্নামেন্ট কতজন দেখছেন, কতজন স্ট্রিম করছেন, সেসব অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইনফান্তিনো বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দুজন মানুষের সঙ্গে নিজের ক্ষমতা একীভূত করতে পেরেছেন, তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বকাপ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বসেছেন। টিফানি অ্যান্ড কোম্পানির ডিজাইন করা ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে পোজ দিয়েছেন। ইনফান্তিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন আর ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান করেছেন আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি পুরো আয়োজনের খরচ মিটিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইনফান্তিনো এ পর্যন্ত আসতে পারলেন কীভাবে? মানে ট্রাম্পের কাছাকাছি।

ফিফায় দুর্নীতির পর ইনফান্তিনোর উত্থান

১০ বছর আগে ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের দুর্নীতির জঞ্জাল থেকে উত্থান ইনফান্তিনোর। উয়েফার সাবেক সভাপতি মিশেল প্লাতিনিও তাঁর সাবেক ‘বস’। তিনি ফিফার সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হন বিখ্যাত ‘ফিফা ২.০’ টিকিট দিয়ে—ফিফাকে অতীতের সব দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত হয়েছিল ২০১০ সালের ভোটাভুটিতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রার্থী হলেও তাদের স্বপ্নপূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং জুরিখের সেই ভোটাভুটিতে তিনিও ছিলেন, যেখানে প্রথম রাউন্ডে ফিফার নির্বাহী কমিটির মাত্র তিনটি ভোট পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচ বছর পর কি দেখা গেল?

২০১৫ সালের ২৭ মে জুরিখের এক হোটেল থেকে ফিফার নির্বাহীদের গ্রেপ্তার করে সুইস পুলিশ। এফবিআইয়ের ফিফা বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযানের অংশ ছিল সে গ্রেপ্তার কার্যক্রম। এর মাধ্যমে ফিফায় ব্লাটারের প্রশাসনিক কার্যক্রমও ভেঙে পড়ে।
২০১৫ সালের মে মাসের সেই ঘটনার পর ফিফা ক্লিনটনের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং ‘ফিফা ২.০’ কার্যক্রম শুরু করে। এর অংশ ছিলেন ক্লিনটনের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা যাঁরা তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২২ বিশ্বকাপের প্রার্থিতায় কাজ করেছেন।

সে বছরই পরবর্তী সময়ে ভোটের মাধ্যমে ফিফার সংস্কার কমিটিতে জায়গা পান ইনফান্তিনো এবং পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ফিফার সভাপতি হন। আট মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ক্ষমতাসীন হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণ করেন ইনফান্তিনো

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশকে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম যে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দেওয়া হয়, সেটাও ২০২৬ বিশ্বকাপ। বড় বড় বাণিজ্যিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোকে ফিফায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেরও প্রয়োজন ছিল ফিফার। ট্রাম্প নিজেও এটা পছন্দ করেছেন, যেমনটা তিনি পছন্দ করেন ইনফান্তিনোকে। এর পেছনে আরেকটি কারণ হতে পারে ট্রাম্পের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ১৯ বছর বয়সী ব্যারন ফুটবলভক্ত। সে হয়তো বাবাকে বলেছে ইনফান্তিনো ফুটবলে কত বড় মানুষ!

২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার ব্যাপারটি ট্রাম্প খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। এ কারণে পারিবারিক সদস্যকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সকার ফেডারেশন এর যোগাযোগের মাঝে সেতুবন্ধ ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এই বিশ্বকাপ আয়োজনে ট্রাম্প বাকি দুটি সহ–আয়োজক দেশের নাম সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব কমই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু গত মাসে হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ইনফান্তিনো সুযোগটি নিয়ে দুটি সহ–আয়োজক দেশের নামও উল্লেখ করেন, পরে যার প্রশংসাও করেন ট্রাম্প।

২০১৯ সালে দাভোস সম্মেলনে ট্রাম্পকে অতিথি করেছিলেন ইনফান্তিনো। সে বছর যুক্তরাষ্ট্র নারী ফুটবল দলের একাংশ হোয়াইট হাউসে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সেটাও সামাল দেয় ইনফান্তিনো প্রশাসন। ফিফা কংগ্রেসে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে মরক্কোর দ্বিগুণ ভোট পায় যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণ করেন ইনফান্তিনো।

ইনফান্তিনোর ঝুঁকিও আছে

২০১৮ সালে ট্রাম্প অনুযোগ করেছিলেন, ফিফা বিশ্বকাপ আসতে আসতে তিনি হয়তো হোয়াইট হাউসে থাকবেন না। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জিতে তিনি ক্ষমতায় আসার পর ফের চাঙা হয় দুজনের সম্পর্ক। ট্রাম্পের আরও কাছে যাওয়া এবং তাঁর ব্যক্তিগত বলয়ে ঢোকার কোনো সুযোগ নষ্ট করেননি ইনফান্তিনো। এমনকি ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সফরে বেশি সময় কাটানোর কারণে গত মে মাসে প্যারাগুয়েতে তিনি নিজের অনুষ্ঠান ফিফা কংগ্রেসেও সময়মতো উপস্থিত হতে পারেননি।

ইনফান্তিনো হয়তো বলতে পারেন, তাঁকে ট্রাম্পের নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়েছে। আগামী ১৩ মাসের জন্য ফিফা আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘বিবাহবন্ধনে’ আবদ্ধ। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সাফল্য ইনফান্তিনোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফিফা সভাপতির ক্ষমতা ধরে রাখতে ২১১টি সদস্যদেশকে রাজস্ব এনে দেওয়া ইনফান্তিনোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প তাঁর শক্তিশালী মিত্র। তবে প্রয়োজনে ট্রাম্প যে ইনফান্তিনোর পাশ থেকে সরে যেতে কার্পণ্য করবেন না, সেটাও সত্যি। ইনফান্তিনোর তাই ঝুঁকিও আছে।

তবে ইনফান্তিনোও ট্রাম্পকে খুব ভালোভাবে জানেন। পর্দার আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা নীতি শিথিল ও কর মওকুফ করতে হবে ফিফাকে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার বিকল্প নেই ইনফান্তিনোর। এই ব্যবসায়িক সম্পর্ক তাঁর বিন সালমানের সঙ্গেও আছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে কোনো স্থানীয় আয়োজক কমিটি নেই, যেটা ’৯৪ বিশ্বকাপে ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বকাপ আয়োজনে ফিফা মায়ামিতে অফিস নিয়ে নিজেরাই পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সকার ফেডারেশনও এই পরিকল্পনায় খুব একটা নেই। গত মাসে ট্রাম্পের ঘোষিত টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানির—তিনি আবার ট্রাম্পের বন্ধুর ছেলে—সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ফিফার। সব মিলিয়ে আগামী ১৩ মাসে ফিফা কোন পথে এগোবে যুক্তরাষ্ট্রে, সেটা আসলে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে—যেটা এরই মধ্যে অনেকের কাছে ‘ব্রোমান্স’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁদের সম্পর্কের শুরু অবশ্য আরও আগে
ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁদের সম্পর্কের শুরু অবশ্য আরও আগে। রয়টার্স

বিশ্বের নজরে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ ‘বি-২ বোম্বার’ by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

মার্কিন সেনাবাহিনীর বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান শনিবার ইরানের তিনটি পরমাণুকেন্দ্র নাতানজ, ফরদো এবং ইস্ফাহানে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মুকুটমণি ফরদো বিপর্যস্ত।  এই বি-২ বোমারু বিমান মার্কিনি সেনাবাহিনীর সব থেকে উন্নত কৌশলগত অস্ত্রগুলোর মধ্যে একটি। অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে এটি ইরানের গোপন পরমাণুকেন্দ্রের মতো কঠিন লক্ষ্যবস্তুতেও নির্ভুল আঘাত হেনেছে। এই হামলা চালাতে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ এবং ‘বি-২ বোম্বার’ কাজে লাগানো হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইরানের ফরদো পরমাণুকেন্দ্রে ছ’টি ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ফেলা হয়েছে। জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) নামেও পরিচিত এই বোমা। তা ফেলার জন্য বি-২ স্পিরিট বোমারু বিমান ব্যবহার করেছে আমেরিকা। এটিকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি শত্রুর রাডার ব্যবস্থায় সহজে ধরা না পড়ে। এর একটি বিশেষত্ব এর ‘ফ্লাইং উইং’  ডিজাইন, এর কোনো প্রচলিত ফুসেলেজ বা লেজ নেই, এবং এর পৃষ্ঠে বিশেষ ধরনের রাডার-শোষণকারী পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাডার সিগন্যালকে শোষণ করে বা অন্যদিকে প্রতিফলিত করে কিংবা বিভ্রান্ত করতে পারে। এটি প্রচলিত এবং পারমাণবিক উভয় ধরনের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম এবং বিশ্বের যেকোনো স্থানে হামলা চালাতে পারে। জ্বালানি ছাড়াই এই বোমারু বিমানটি ৬০০০ নটিক্যাল মাইলেরও বেশি দূরত্ব থেকে অর্থাৎ ১১,১১২ কি.মি.র বেশি দূরত্ব থেকে হামলা চালাতে পারে। বি-২ বোমারু বিমানে মাত্র ২ জন পাইলট বসতে পারেন। ফলে কম পরিচালন ব্যবস্থাতেও এর দক্ষতা ও নির্ভুলতা অনেক বেশি।

বি-২ বোম্বারের নকশা ও উন্নয়নের কাজ শুরু হয় কার্টার প্রশাসনের অধীনে ‘অ্যাডভান্সড টেকনোলজি বোম্বার (ATB)’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে। রেগান প্রশাসনের অধীনেও এর নকশার কাজ চলতে থাকে। মার্কিন কংগ্রেস এবং পেন্টাগনে এই প্রকল্পের উচ্চ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। বি-২ স্পিরিট প্রাথমিকভাবে ডিজাইন করেছে নর্থরপ করপোরেশন, যা পরবর্তীতে নর্থরপ গ্রুম্যান হয়ে যায়। বোয়িং, হিউজেস এবং ভট-এর মতো কোম্পানিগুলো এটি নির্মাণে কাজ করেছে। ১৯৮৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এর উৎপাদন চলে এবং ১৯৯৭ সালে এটি মার্কিন বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়। মোট ২১টি বি-২ বোম্বার নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে ২০টি বর্তমানে সচল আছে।

এর ব্যয় ছিল আকাশচুম্বী। বি-২ স্পিরিট বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিটি বি-২ বোম্বার নির্মাণ খরচ ২.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও অত্যন্ত বেশি, কারণ এর স্টেলথ প্রলেপ এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক সিস্টেমের নিয়মিত যত্ন নিতে হয়। মূলত স্নায়ুযুদ্ধের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণে এর উৎপাদন পরিকল্পনা ছেঁটে ফেলা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৩২টি বিমান তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত মাত্র ২১টি তৈরি করা হয়। বি-২ বোমারু বিমানের দৈর্ঘ্য ৬৯ ফুট, উচ্চতা ১৭ ফুট এবং এর ডানার বিস্তার ১৭২ ফুট। ওজনের দিক থেকে এটি ৭১ হাজার ৭০০ কেজি, তবে বিভিন্ন ধরনের মিসাইল ও বোমা বহন করে এটি সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭০ হাজার কেজি পর্যন্ত ওজনসহ উড়তে পারে। জিপিএস প্রযুক্তির সাহায্যে এটি স্থির লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলার পাশাপাশি একাধিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে সক্ষম। তবে বি-২ বোমারুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অস্ত্র হলো এর বাঙ্কার বাস্টার বা জিবিইউ-৫৭ বোমা। এর ওজন প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি। বিশাল এই বোমাটি মাটির প্রায় ৬১ মিটার গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এই বোমাটি শক্তিশালী এবং অতি-সহনশীল ইস্পাতের আবরণে মোড়া। ফলে পাথর বা কংক্রিটের তৈরি ভূগর্ভস্থ কোনো পরিকাঠামোকে অনায়াসে ধ্বংস করতে পারে। ২৪০০ কেজি বিস্ফোরকে ঠাসা পেলোড বহন করতে সক্ষম এই বোমা। সামরিক অভিযানের জন্য একবারে একটি বা দু’টি এই বোমা বহন করতে পারে বি-২ বোম্বার। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, ইরানে চালানো হামলায় বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। টানা প্রায় ৩৭ ঘণ্টা উড়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত করেছে বিমানটি।
তবে ইরান দাবি করেছে, তারা আগেই পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান
যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান. ফাইল ছবি: রয়টার্স