Saturday, April 3, 2010

অটিজম: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ by আহমেদ হেলাল

২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম হচ্ছে শিশুর বিকাশজনিত এমন একটি সমস্যা যেখানে তার ভাবের আদান-প্রদান ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের আচরণে সমস্যা থাকে, তারা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকে আর কখনো বা একই আচরণ বারবার করতে থাকে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি হাজারে এক থেকে ১৫ জন শিশু অটিজমে ভুগছে। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের কোনো জরিপ না হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত ঢাকা বিভাগে শিশু-কিশোরদের মানসিক রোগবিষয়ক এক গবেষণায় দেখা যায়, এতে অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে ০.৮৪ শতাংশ শিশুর অটিজম আছে। শিশুর বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। মেয়েশিশুদের তুলনায় ছেলেশিশুদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় চার গুণ বেশি।
সচেতনতা দিবস এই জন্য যে বিশ্বব্যাপী অটিজম নিয়ে রয়েছে নানা বিভ্রান্তি, অসচেতনতা ও অপপ্রচার—‘অটিজম সমস্যার কোনো চিকিত্সা নেই’, ‘অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী’, ‘অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের কোনো চিকিত্সকের কাছে নেওয়ার দরকার নেই’, ‘টিকার কারণে অটিজম হয়’, ‘অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অঙ্কের জ্ঞান খুব ভালো’ ইত্যাদি। এগুলোর কোনোটাই সত্য নয়। একসময় অটিজম কী, তা-ই আমাদের দেশে অজানা ছিল। প্রচারমাধ্যমগুলোর ইতিবাচক ভূমিকা, কিছু উদ্যোগী মানুষের উদ্যম আর ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের দেশে এখন অটিজম নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তার পরও বাকি রয়ে গেছে অনেক কিছু। অটিজম নিয়ে সচেতনতার প্রথম ধাপটি শুরু করতে হবে পরিবারের মধ্য থেকে। পরিবারের একজন শিশুর মধ্যে যখন প্রথম অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে তখন বেশির ভাগ মা-বাবা প্রথমে বিষয়টি আমলে নেন না। এরপর একপর্যায়ে চিকিত্সকের কাছে নিয়ে গেলে কয়েকটি বিষয় ঘটতে পারে—চিকিত্সক যথাযথভাবে অটিজম নির্ণয় ও তার পরিচর্যা ব্যাখা করেন; অথবা চিকিত্সক অটিজম নির্ণয় করেন ঠিকই কিন্তু এর পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেন না; অথবা চিকিত্সক অটিজম নির্ণয়ই করতে পারেন না। প্রতি ক্ষেত্রেই মা-বাবারা বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। প্রথম ক্ষেত্রে অটিজমের সঠিক ব্যাখ্যা শোনার পর বেশির ভাগ সময়ই তাঁরা মেনে নিতে চান না যে তাঁদের সন্তানের এমন একটি সমস্যা রয়েছে। এরপর তাঁরা চিকিত্সকের পর চিকিত্সক পাল্টান কিন্তু সন্তানের তাতে কোনো মঙ্গল হয় না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অটিজম নিয়ে ব্যাখ্যা না জানায় তাঁরা ভুলপথে সন্তানের পরিচর্যা করেন, আর তৃতীয় ক্ষেত্রে মা-বাবাসহ অটিজমে আক্রান্ত শিশুর যে প্রভূত হয়রানি হবে তা বলাই বাহুল্য। এখন মা-বাবারা কী করবেন? তাঁরা অটিজম নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের মতামত জানবেন এবং তাঁরা জানবেন যে অটিজম কোনো একক চিকিত্সকের বিষয় নয়। অটিজম আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার, সাইকোলজিস্ট, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মা-বাবা সবার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অটিজম আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত স্কুল। অনেক সময় সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে অটিজম আছে এমন শিশুর মা-বাবা তাদের সন্তানকে বিশেষায়িত স্কুলে ভর্তি করাতে চান না। সন্তানকে প্রায় লুকিয়ে রাখেন সব সামাজিকতা পরিহার করে। অথচ অটিজম আছে এমন শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক মিথস্ক্রিয়া করানো, তাকে মনের ভাব প্রকাশের নানাবিধ উপায় শেখানো।
অটিজম নিয়ে লেখালেখি, টিভি অনুষ্ঠান নেহাত কম হয় না। প্রতিবছর ২ এপ্রিলকে ঘিরে তো বটেই, এমনকি অন্যান্য সময়েও অটিজম নিয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়ে থাকে। কখনো বা বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও অংশ নেন নানা কর্মশালায়। কিন্তু অটিজমের ক্ষেত্রে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে অটিজম কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা, ধর্ম, জাতি, অর্থনৈতিক অবস্থা মানে না। অর্থাত্ শহরে-গ্রামে যেকোনো জায়গায় অটিজম হওয়ার আশঙ্কা প্রায় সমান। কিন্তু আমাদের দেশের সচেতনতামূলক সব কর্মকাণ্ড এবং অটিজমের পরিচর্যা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধাগুলো শহরকেন্দ্রিক, নির্দিষ্ট করে বললে কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামাঞ্চলের বৃহত্ জনগোষ্ঠী রয়ে যায় পুরোপুরি সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের আওতার বাইরে।
আমাদের সব কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করলে ঘুরে-ফিরে যে বিষয়টি চলে আসে তা হলো—অটিজম নিয়ে আমাদের তাবত্ কর্মকাণ্ড, পত্রিকায় লেখা, বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান, অটিজম নিয়ে কাজ করছেন এমন বেসরকারি সংগঠনের কার্যক্রম—কোনোটাই তেমনভাবে গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে না। অটিজম আছে এমন শিশুদের জন্য কেবল সহানুভূতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেই আমরা যেন আমাদের দায় না সারি। অটিজম-বিষয়ক প্রকৃত তথ্য শহরে-গ্রামে, ধনী-দরিদ্র সবার কাছে নিয়ে যেতে হবে আমাদের সবাইকে। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে (বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার) কেবল এই ২ এপ্রিলকে ঘিরে নয়, বরং নিয়মিতভাবে অটিজম-বিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য বিভাগের আওতাধীন সব জেলা শহর ও উপজেলায় অটিজম-বিষয়ক বিলবোর্ড থাকা উচিত। অটিজমের সাধারণ পরিচর্যার দিকে এবং এ বিষয়ে বিভ্রান্তিমূলক কোনো তথ্য যাতে কেউ প্রচার করতে না পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নজর দিতে হবে। প্রতিটি গ্রাম এবং শহরের প্রাথমিক স্কুলসহ সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অটিজম আছে এমন শিশুদের মা-বাবারা প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রয়োজনে নিজ এলাকায় এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি ও অন্যান্য মা-বাবাকেও প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, অটিজমের পরিচর্যা ও অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে সমাজের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত রাখার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে দ্রুততম সময়ে তার অটিজম শনাক্তকরণ। এরপর সঠিকভাবে, বিশেষায়িত শিক্ষায়তনের মাধ্যমে তাকে সমাজে টিকে থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা। আমরা জানি, আমাদের সম্পদ সীমিত। উন্নত দেশের মতো করে অটিজমের পরিচর্যা এ মুহূর্তে হয়তো আমরা করতে পারব না, কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতের। আমরা বিশ্বাস করি, এ মুহূর্তে আমরা যদি দেশব্যাপী কেবল সচেতনতা তৈরি করতে পারি তবে ভবিষ্যতে অবশ্যই অন্যান্য দেশের মতো আমরাও এই একটু পিছিয়ে থাকা অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আসতে পারব সামনের সারিতে। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ এবং তা এখনই।
আহমেদ হেলাল: চিকিত্সক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে আইনি দর্শন by মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

প্রত্যাশিত ঘোষণাটি পাওয়া গেল ৩৮তম স্বাধীনতা দিবসের পূর্ববর্তী দিনটিতে। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধগুলো (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৬, ৭ ও ৮ ধারায় দেওয়া যথাক্রমে ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক ট্রাইব্যুনাল, অভিযোক্তা বা সরকারি আইনজীবী দল ও তদন্ত এজেন্সি গঠিত হয়েছে। আইন তার নিরপেক্ষ নিজস্ব গতিতে চলবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত ও পূরণ হবে।
ন্যায়বিচার কত দিন দ্বীপান্তরে? শোনা যাচ্ছিল ক্রন্দন ৩৮ বছর ধরে। আর ক্রন্দন নয়, আশা করা যায় বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদার ফ্যাসিবাদী অশুভ সময়ের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, তার মরণকামড় টের পাওয়া যাচ্ছে নানা কৌশলী ঢঙের অযুক্তি-কুযুক্তিতে। আপাতত সরল অথচ চাতুরী অযুক্তি কিংবা খোঁড়া যুক্তি যেটাকে বলা যায় সেটা হচ্ছে, ১৯৭৩ সালের আইনটি পুরোনো হয়ে গেছে এবং ২০০২ সালের ১ জুলাই প্রণীত ‘আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত’ আইন—রোম আইন নামে পরিচিত—সেটার আদলে ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধন করা হোক। এটা খণ্ডনের সাধারণ যুক্তিটি হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব আইনই সংশোধন করার প্রয়োজন হয় না। সব গণতান্ত্রিক দেশেই কালোত্তীর্ণ এমন আইন আছে, যা সে দেশের বিজ্ঞ আইনবিদেরা তাঁদের বুদ্ধি দিয়ে যত্ন করে প্রণয়ন করে গেছেন ও সেটা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁদের উত্তর-পুরুষেরা মেনে চলছেন বহুকাল ধরে।
তবে সব কটি বিরুদ্ধ যুক্তি বাতিল করার হাতিয়ার যে আইনি দর্শন, আজ তা বলার জন্য কাগজ-কলম নিয়ে বসেছি। একাত্তরের ২৫ মার্চের মধ্যরাতে ২৬ মার্চের আগমনের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের জন্ম হলো। বস্তুত একাত্তরের ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আদেশে প্রচারিত ৩৫টি প্রশাসনিক নির্দেশনামার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং সেগুলোর ভিত্তিতে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার অধিকার অর্জন করেন। সুতরাং ২৬ মার্চ থেকে যে যুদ্ধ শুরু হয়, তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যুদ্ধ।
বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধে আক্রান্ত রাষ্ট্র ও পাকিস্তান ছিল বেআইনি দখলদার আগ্রাসী রাষ্ট্র এবং এই যুদ্ধের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনা করা যায়। সে যুদ্ধে জার্মানি ও ইতালি ছিল আক্রমণকারী রাষ্ট্র এবং ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্র ছিল আক্রান্ত রাষ্ট্র। এই যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রণীত হয়েছিল ‘চার্টার অব নুরেমবার্গ ট্রায়াল’ বা নুরেমবার্গ বিচারের সনদপত্র। ১৯৭৩ সালের আইনটিও ওই চার্টারের অনুসরণে প্রণীত হয়। যেমন—১৯৭৩ সালের আইনটির ৩(২)(খ) ধারার উদ্ধৃতি এই: ‘শান্তিবিরুদ্ধ অপরাধ, যথা— আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ, মতৈক্যসমূহ কিংবা প্রতিশ্রুতিসমূহ ভঙ্গ করিয়া যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।’ এটা নুরেমবার্গ বিচারের সনদপত্রের ৬ ধরার ১ দফার হুবহু একই। এ রকম একাধিক উদাহরণ দেওয়া যায়। উল্লেখ্য, এ আইনটির খসড়া প্রস্তুত হলে সেটা আন্তর্জাতিক দুজন আইনবিশেষজ্ঞ খুঁটিয়ে দেখেন। তাঁদের একজন আয়ান ম্যাকভরমটি, যিনি তত্কালে জেনেভাস্থিত ‘আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ কমিশন’-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। অপরজন অধ্যাপক অটো ভন ট্রিফটারার, যিনি নুরেমবার্গ আন্তর্জাতিক আদালতে একজন প্রসিকিউটর ছিলেন।
১৯৭৩ সালের আইনটি জুলাই মাসে কার্যকর হয়। ইতিপূর্বে মার্চ মাসে জেনেভা শহরে জাতিসংঘের ‘মানবাধিকার কমিশন’-এর ২৯তম অধিবেশন হয়। এই অধিবেশনে ঘোষণা দেওয়া হয়: (১) যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ যখন যেখানে সংঘটিত হবে, তার তদন্ত করতে হবে এবং সে অপরাধে কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হলে তাকে গ্রেপ্তার, আটক ও বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া যাবে। (২) উপরিউক্ত অপরাধীদের বিচার যে দেশে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সে দেশে সে দেশের বিধানমতো হবে। (৩) উপরিউক্ত নীতিদ্বয়ের পরিপ্রেক্ষিতে যেসব ব্যক্তি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, সুপরিকল্পিত হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মারাত্মক অপরাধ করেছে বলে প্রমাণ আছে, তাদের বিচার করার অধিকার ও কর্তব্য বাংলাদেশের আছে।
উপরোল্লিখিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, কোনো দেশের ফৌজদারি আদালতের সম্পূরক হিসেবে আইনটি কার্যকর হবে, যার সরল অর্থ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত তখনই কার্যকর করা যাবে, যখন কোনো দেশ তার এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য অপরাধের বিচার করতে সমর্থ কিংবা সম্মত নয়। উগান্ডা, কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র—এই তিনটি রাষ্ট্র তাদের দেশে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে উত্থাপন করেছে এবং সুদান রাষ্ট্রের দারফুর এলাকায় সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য সুদান সম্মত না হওয়ায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে উত্থাপিত হয়েছে।
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, নিশ্চয়ই এতক্ষণে আপনাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশের ১৯৭৩ সালের আইনটির প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপট এবং ২০০৪ সালের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনটির প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপট এক নয়, বরং পুরোপুরি ভিন্ন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশে যে অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো নির্ভেজাল যুদ্ধাপরাধ। এটি সমতুল্য যুদ্ধাপরাধ নয়, যা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত কর্তৃক বিচার্য। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধটি সংঘটিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দখলদার সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের যুদ্ধ চলাকালে। সে কারণে বিচারের কার্যক্রম ও পদ্ধতিও ভিন্ন এবং সেটা আইনি দর্শনে সঠিক ও স্বাভাবিক।
বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী: অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট।

ইসলামে চরমপন্থার স্থান নেই by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ, শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান, সম্প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার, পরম সহনশীল মনোভাব ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন মুসলমানদের চরিত্রের অনুপম বৈশিষ্ট্য। আর চরমপন্থা হলো দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করা, কঠোরতা অবলম্বন করা, সীমা অতিক্রম করা, প্রবৃদ্ধি ঘটানো প্রভৃতি। তাই ইসলামে চরমপন্থা, ফেতনা-ফাসাদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এগুলোকে ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম বলেই জানতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থায় মানুষ যখন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, তখন গোঁড়ামির মতো এক ধরনের মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তখন মানুষ সাধারণত অন্যের মত ও পন্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে না, বরং নিজের মত ও পন্থাকে সঠিক বলে মনে করে এবং সেটাই প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কঠোরতা অবলম্বন ও শক্তি প্রয়োগ করতে চায়। এসব শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড ইসলাম কর্তৃক সমর্থন লাভের তো প্রশ্নই আসে না। এই মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধর্মে কোনো জোর-জবরদস্তি ও কঠোরতা নেই।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-২৫৬)
শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম হচ্ছে ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বা কুসুমাস্তীর্ণ পথ। এ পথের পথিক হবে শান্তিকামী, সুস্থ-সুন্দর ও সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মানুষের প্রতি দয়া-মায়া-মমতা ও শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হওয়াই তো ইসলামের সুমহান শিক্ষা। ইসলাম প্রচারের নামে মানবসমাজে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা, বাড়াবাড়ি করা, কঠোরতা প্রদর্শন, চরমপন্থা অবলম্বন মূলত শয়তানের কারসাজি। বোমাবাজি ও আত্মঘাতী হামলা করে নিরপরাধ মানুষ হত্যার মাধ্যমে দ্বীন কায়েম বা ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করার অপচেষ্টা কোনো পুণ্যকর্ম নয়। বরং যে ব্যক্তি, দল বা সংগঠন দ্বীন কায়েমের নামে একজন মানুষ হত্যা করবে, তার আমলনামায় সব মানুষ হত্যার গুনাহ বা পাপ লেখা হবে। মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আল্লাহর কালামে পাকে ঘোষিত হয়েছে, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৩২)
চরমপন্থা অবলম্বন ইসলামি আকিদা, বিশ্বাস ও চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম হলো মধ্যমপন্থার ধর্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে, দেশময় বোমা-আতঙ্ক ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কল্পিত এবং মনগড়া ব্যাখ্যার সঙ্গে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই। ইসলামের অভ্যুদয় থেকে ১৪০০ বছরের ইতিহাসে ইসলামের মূলধারার কোনো আন্দোলন অসি শক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়নি। বরং ইসলামের আদর্শিক মহানুভবতা, ক্ষমা, উদারতা ও নৈতিক শক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। ইসলাম প্রচার ও প্রসারে কোমল ব্যবহারের দাবি রাখে। কঠোরতা বা জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণের প্রচেষ্টা দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যকে বিনষ্ট করে দেয়। আংশিক বা খণ্ডিত ইসলাম এবং ইসলামের বিকৃত অপব্যাখ্যা থেকে মুসলমানদের সজাগ ও সচেতন থাকা দরকার। যে ব্যক্তি বা দল-মত চরমপন্থা অবলম্বন করে, সে ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী কখনোই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোমল ব্যবহার থেকে বঞ্চিত (কঠোরতা বা চরমপন্থা অবলম্বন করার কারণে), সে কল্যাণ থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। কোমলতার ফলে আল্লাহ পাক এমন কিছু দান করেন যা চরমপন্থা অবলম্বনকারীকে দান করেন না।’ (মুসলিম)
ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। তাই সন্ত্রাস, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সংঘাতমুক্ত পৃথিবীর প্রয়োজনে ইসলামের শান্তিপ্রিয় ও কল্যাণধর্মী জীবনাদর্শ এখন সময়ের দাবি। ইসলামের স্বভাব সম্পর্কে জানতে হলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত অধ্যয়ন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো একজন মানুষকে গুপ্তহত্যা করেননি; কারও বিরুদ্ধে কঠোরতা, বাড়াবাড়ি বা চরমপন্থার আশ্রয় নেননি। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘তোমরা আগে অস্ত্র উত্তোলন করো না বা অস্ত্রের ভয়ভীতিও প্রদর্শন করো না।’ পারস্পরিক দয়া, কোমলতা, সরলতা, প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার, উত্তম আদর্শ, সুমধুর বাক্যালাপ ছিল নবীজির ইসলাম প্রচারের মূল হাতিয়ার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে সরলপন্থা অবলম্বন করার জন্য পাঠানো হয়েছে, চরমপন্থা অবলম্বনের জন্য নয়।’ (বুখারি) হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘সহজ, সরলপন্থা অবলম্বন করবে, কঠোরতা প্রদর্শন করবে না। সুসংবাদ দাও, ঘৃণা ছড়িও না।’ (বুখারি)
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন পর্যায়ে সভ্য সমাজে যেভাবে ফেতনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসবাদ চলছে, সর্বস্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, এতে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ব্যাঘাত হয়, তেমনি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে দারুণভাবে ব্যাঘাত ঘটছে। ইসলাম ও মুসলমানের নামে যারা সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাচ্ছে, সেসব শত্রু দেখাতে চায় ইসলাম হত্যা, সন্ত্রাস, ধ্বংস ও বিভীষিকার ধর্ম! মূলত ইসলাম যে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের ধর্ম তা তাদের জানা নেই। এতে বিশেষ করে মুসলমান ও ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করা হচ্ছে। যেসব উগ্রবাদী, বিপ্লবী ও চরমপন্থীরা বিভিন্ন দেশে নানা পর্যায়ে সন্ত্রাস, বোমাবাজি, আত্মঘাতী হামলাসহ ইসলামবিরোধী মানবতাবিবর্জিত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবিকই তারা ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কহীনই বটে। চরমপন্থা অবলম্বন বা কঠোরতা প্রদর্শন ইসলামের জন্য শুধু ক্ষতিকারক নয়, বরং এটা মানুষের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে ইসলামের সংস্কারের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। এ জন্য জবরদস্তি, চরমপন্থাকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা এবং ফেতনা-ফাসাদ প্রতিরোধে সাধ্যমতো সংস্কার প্রচেষ্টা তথা কথা ও কলমের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ফেতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৯১)
নবী করিম (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি এবং ইসলামের তিনজন বিশিষ্ট খলিফাকে কাউকে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত অবস্থায়, কাউকে মসজিদের মধ্যে চরমপন্থী আততায়ীরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। ইসলামের শত্রুদের প্রদত্ত আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমানেও কিছু চরমপন্থী এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যারা যুবসমাজকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করছে, তাদের সংখ্যা বেশি নয়। দেশের আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতা, মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও খতিবদের উদ্ভূত সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার প্রতিবাদ ও বলিষ্ঠ অবস্থান রেখে জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সমাধানের একটি সহজ পথ। তাই আসুন, আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চরমপন্থা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং বোমাবাজদের নির্মূল করার লক্ষ্যে আল্লাহর মনোনীত মানবতার কল্যাণের ধর্ম ইসলামের পরম শান্তির বাণীকে ব্যাপক হারে প্রচার ও প্রসার করার চেষ্টায় ব্রতী হই।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।

বাঘার পদ্মাগর্ভে ডুবো-স্থাপত্যকীর্তি by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

রাজশাহীর বাঘায় পদ্মাগর্ভে নিমজ্জিত পুরাকীর্তি—একটি বিশালকায় স্থাপনার সন্ধান পাওয়া গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রতিদিনই নদীপাড়ে উত্সুক দর্শনার্থীদের ঢল নামছে। সংবাদপত্রে ও টিভি চ্যানেলগুলোতে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত-প্রচারিত হওয়ায় জনমনে আগ্রহ যেন বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের পুরাবস্তু রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিরা সরেজমিনে জায়গাটি দেখে গেছেন। লাল নিশান টাঙিয়ে সংরক্ষিত সরকারি এলাকা বলে ঘোষণাও দিয়েছেন তাঁরা। আকস্মিকভাবেই স্থাপনাটির প্রতি সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। স্থানীয় লোকজনই এর সন্ধান লাভ করে। অতিদ্রুতই সুযোগসন্ধানী লোকজন এখান থেকে ইট, কাঠ কিছু নিয়েও গেছে নিজেদের বাড়িতে।
স্থাপনাটি কোন সময়ের? বিষয়টি এখনো সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছে না। ‘আন্ডার ওয়াটার ফটোগ্রাফ’ পেলে অবশ্য অনেকটা সহজ হবে এর সময়কাল নিয়ে কথা বলা। তবে স্থাপনাটির সঙ্গে যে ইতিহাসের গভীর যোগসূত্র রয়েছে, তা খানিকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
এই বাঘার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। মুসলিম শাসকদের গৌড়-বঙ্গ বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে না হলেও কিছুকাল পরে বাঘা মুসলিম শাসনের একটি প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হয় কসবে বাঘা নামে। স্থাপিত হয় মসজিদ, মাদ্রাসা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। গৌড়ের স্বাধীন সুলতান নাসিরুদ্দীন নুসরত শাহর (১৫২৩-২৪) আমলে অপূর্ব কারুকার্যখচিত মসজিদ এখানে নির্মিত হয়। বাঘা মাদ্রাসায় তর্কবিদ্যা, গণিত, চিকিত্সাবিজ্ঞান, আলকেমি (রসায়নবিদ্যা), হিনদাসা (জ্যামিতি), ফিকহ, তারিখ (ইতিহাস), জ্যোতিষশাস্ত্র প্রভৃতি প্রাগ্রসর বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব তথ্য সংগ্রহের জন্যই ব্রিটিশ সরকারের পরামর্শে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম এডাম বাঘায় আসেন এবং তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যান। তবে উইলিয়াম এডাম মূল মাদ্রাসা কোথায় ছিল, সে তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। এখনো আমরা জানি না, বাঘার সেই মাদ্রাসাটি কোথায় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। একটি নির্ভরযোগ্য ইতিহাস থেকে জানা যায়, বারবাকাবাদের অন্তর্গত একটি পরগনা ছিল লস্করপুর পরগনা নামে। লস্কর খাঁ নামের এক পাঠান জায়গিরদার এই পরগনার প্রতিষ্ঠাতা। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতে এই লস্করপুরের উল্লেখ আছে। এই লস্করপুর পরগনার প্রধান কেন্দ্র ছিল আলাইপুর, এখানে সেনাছাউনিও ছিল। মোগল সুবাদার ইসলাম খানের শাসনামলে বাংলার সামন্ত জমিদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। শঙ্কিত সুবাদার এদের প্রতিপত্তি স্তব্ধ করার উদ্যোগ নেন। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য ও তাঁর পুত্রকে বন্দী করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় এনে নজরবন্দী করা হয় বাকলার রামচন্দ্রকে। লস্করপুর পরগনার জমিদার আলাবশখ বরখুরদার লস্করির অধস্তন পুরুষ বরখুরদারের বিরুদ্ধেও মোগল প্রশাসন সোচ্চার হয়। বরখুরদার বাধা দিলে মোগল সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়, যুদ্ধে বরখুরদার পরাস্ত হন। ইসলাম খান লস্করপুর পরগনার জমিদারি মোগলদের আশীর্বাদপুষ্ট জমিদার পুঠিয়ার পিতাম্বরকে দিয়ে দেন। শক্তি সঞ্চয় করে বরখুরদারের পুত্র পরবর্তী সময়ে পিতৃ-জমিদারি উদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনিও সম্রাট জাহাঙ্গীরের অমাত্য মির্জা নাথানের হাতে পরাস্ত হন। আলাইপুরেই তিনি জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। বাঘার আরেক খ্যাতি, ষোলো শতকের শুরুতে এখানে পদ্মা নদীপথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে এসেছিলেন হজরত শাহদ্দৌলা—প্রকৃত নাম শাহ মুয়াজ্জিম দানিশমন্দ। তিনি ছিলেন বাগদাদের খলিফা হারুনুর রশীদের বংশধর। এই সাধক আলা বখশ বরখুরদারের কন্যা জেবুন্নেসার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর জে এস কার্সটেইনস এই শাহ মুয়াজ্জিম দানিশমন্দ সম্পর্কে একটি আখ্যান তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন: গৌড়ের একজন সুলতান ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন, এখানে এক দিনের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। রাতে আগুনের প্রয়োজন হলে লোকজন আগুনের সন্ধান করতে বেরোয়। লোকজন দেখতে পায়, জঙ্গলের মধ্যে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, পাশে ধ্যানমগ্ন এক ফকির, তাঁকে চারদিকে পাহারা দিচ্ছে বাঘের দল। লোকজন সুলতানকে বিষয়টি অবহিত করলে, সুলতান স্বয়ং গিয়ে ঘটনাটি দেখেন। বিস্মিত সুলতান ফকিরের কাছে জানতে চান, এখন তাঁর ঢাকা অভিযানে যাওয়া সমীচীন হবে কি না। ফকির তাঁকে এক দিন অপেক্ষা করতে বলেন। পরদিন ঢাকা থেকে দূত এসে সুলতানকে যুদ্ধ বিজয়ের সংবাদ জানায়। সুলতান ফকিরের কামালিয়াতে অভিভূত হন এবং কিছু নিষ্কর জমি গ্রহণের অনুরোধ জানান। পার্থিব সম্পদের প্রতি নিরাসক্ত ফকির পুত্র হামিদ দানিশমান্দকে তা প্রদানের ইঙ্গিত করেন। সুলতান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪২ মৌজার লাখেরাজ ভূমি দান করেন। অনুমান করা হয়, ইনিই সুলতান নাসিরুদ্দীন নুসরাত শাহ, যাঁর শাসনকালে বাঘায় অপূর্ব শিল্পসুষমামণ্ডিত মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, মহান সাধক হজরত শাহদ্দৌলার নামানুসারে লস্করপুর পরগনা এ সময় মখদুমপুর নামে পরিচিত হয়।
পদ্মাগর্ভে নিমজ্জিত স্থাপনাটি লস্করপুর পরগনার জমিদারির কোনো স্থাপনা নয় তো? নদীপথে আলাইপুরের সেই বর্ধিষ্ণু আর অভিজাত স্থাপনা কোথায় ছিল? দিল্লির আর গৌড়ের শাসকেরা পদ্মা নদীপথে যেতে যেখানে যাত্রাবিরতি করতেন। মিরজা নাথানের বাহারীস্তান-ই গয়বীর বিবরণমতে, সম্রাট শাহজাহান ঢাকা থেকে রাজমহল যেতে কালবৈশাখীর কবলে পড়ে এই আলাইপুরে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে পরে রাজমহল হয়ে পাটনা ফিরে গিয়েছিলেন। সুবাদার ইসলাম খাঁ ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজমহল থেকে পদ্মার নদীপথে ঘোড়াঘাট যাত্রা করেন। এই আলাইপুরেই সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন বলে সহযাত্রী আবদুল লতিফ, ফারসি ভাষায় লেখা তাঁর দিনলিপিতে উল্লেখ করেছেন। দিল্লি-গৌড়ের সেই রাজকীয় অতিথিদের সাময়িক অবস্থানের নিবাসই বা কোথায় ছিল?
আদতেই ইতিহাসের অনেক গৌরবের সাক্ষ্য বাঘা, মখদুমপুর, লস্করপুর ও আলাইপুর। নিমজ্জিত স্থাপনা তারই অংশ সন্দেহ নেই। ভূমিধসে অথবা ১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে তখনকার পদ্মাতীরের সেই স্থাপনাই কি এখন এ অবস্থায়?
আমাদের ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত উদ্ধার ও সংরক্ষণের স্বার্থে পদ্মাগর্ভে নিমজ্জিত স্থাপত্যকীর্তি রক্ষায় উদ্যোগী হওয়া জরুরি। এবং সে কাজ করতে হবে খুব দ্রুত; বর্তমানের ক্ষীণতোয়া পদ্মা প্রমত্তা হয়ে ওঠার আগেই। বর্ষা মৌসুম শুরু হতে খুব একটা দেরি নেই। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ইউনেসকোর এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার। ২০০৩ সালে ইউনেসকো জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিকদের সহায়তায় দক্ষিণ ফ্রান্সের রেন নদীর গর্ভ থেকে আরলস নগরের অনেক প্রাচীন কীর্তি উদ্ধার করে দিয়েছে। গভীর সমুদ্র ও অরণ্যের সংস্কৃতিচর্চায় বিশ্বব্যাপী কাজ করছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি চ্যানেল—ইউনেসকোর মাধ্যমে তাদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা আমাদের সরকারের।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ওবামা-১, রিপাবলিকান পার্টি-০ -by হাসান ফেরদৌস

বারাক ওবামাকে আমরা সবাই বড় ‘মিস-আন্ডার ইস্টিমেট’ করে ফেলেছিলাম। এই লোকটিকে নিয়ে গোড়াতে যে রকম আশান্বিত হয়েছিলাম, তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত—এমন একটি কথা আমরা অনেকেই বলা শুরু করেছিলাম। কেউ কেউ খোলামেলাভাবেই বলছিলাম, নেতা হওয়ার জন্য যে সাহস ও একাগ্রতা লাগে, এঁর তা নেই। কেউ কেউ দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট ওবামা নয়, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ওবামাকে চাই।’ এই লেখকও সেই সব হতাশাবাদীর একজন। কিন্তু আমাদের সবাইকে ভুল প্রমাণিত করে একটি আশ্চর্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন ওবামা।
আমি মার্কিন কংগ্রেসে গত সপ্তাহে পাস হওয়া স্বাস্থ্যবিমা আইনের কথা বলছি। ঠিক এক মাস আগে হলেও কেউ বুকে হাতে দিয়ে বলতে পারত না, এই বিল পাস হবে। পুরো রিপাবলিকান দল এক সুরে ‘না’ বলেছে। দেশজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থীদের প্রবল রোষের আগুনে ভর করে রিপাবলিকান দল ধরেই নিয়েছিল যে এই বিলের পতনের ভেতর দিয়েই সূচিত হবে ওবামার পতন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও অনেকে ছিলেন, যাঁরা শুধু দ্বিধাগ্রস্তই নন, রীতিমতো বিরোধিতা করাও শুরু করেছিলেন। এসব দ্বিধাগ্রস্তের অধিকাংশই রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্য থেকে আসা। সবচেয়ে বড় আঘাত আসে মাস দুই আগে ম্যাসাচুসেটসে এডওয়ার্ড কেনেডির মৃত্যুর পর সেই শূন্য আসনে নির্বাচনে। ম্যাসাচুসেটস আমেরিকার সবচেয়ে উদারনৈতিক রাজ্য, কেনেডির পরিবার সেই উদারনৈকিতার প্রতীক। এডওয়ার্ড কেনেডি নিজে সারা জীবন যুদ্ধ করে গেছেন একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে। সেই আসনে ডেমোক্র্যাটরা হেরে বসল, মূলত কংগ্রেসে উত্থাপিত স্বাস্থ্যবিমা বিলের প্রতিবাদে ‘না’ ভোটের কারণে। শুধু রিপাবলিকানরা নয়, এই রাজ্যের ডেমোক্র্যাটরাও এই বিমা-প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল, এই রাজ্যে তাদের সংখ্যাই বেশি। কেনেডির আসনে পরাজয়ের কারণে সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা যে কেবল একটি আসন হারাল তাই নয়; সিনেটে এই আসন ও দুজন স্বতন্ত্র সদস্য মিলে ডেমোক্র্যাটদের মোট ভোট ছিল ৬০টি। বড় যেকোনো বিল পাস করাতে হলে কম করে হলেও ৬০টি ভোট চাই। তা না হলে বিরোধী পক্ষ একের পর এক সংশোধনী দিয়ে যেকোনো বিল পাস করা ঠেকাতে পারে। ম্যাসাচুসেটসে পরাজয়ের কারণে ডেমোক্র্যাটরা তাদের সেই ৬০ নম্বর ভোটটি হারাল। অমনি চারদিক থেকে আওয়াজ উঠল ‘গেল গেল’!
মজার কথা হলো, স্বাস্থ্যবিমা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এ দেশে কোনো ভিন্নমত নেই। প্রায় সবাই মানে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় যে হারে বেড়ে চলেছে, লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সমূহ বিপদ। কিন্তু কোন পথে আগানো উচিত, মতভেদটা সেখানেই। রিপাবলিকানরা বরাবর বলে এসেছে—সংস্কার-টংস্কার যা-ই হোক, তা পুঁজিবাদী বাজারের নিয়ম মেনেই করতে হবে। সরকারিভাবে কোনো রকম নাক গলানো যাবে না। ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করে। তাদের বক্তব্য, সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে যারা সবচেয়ে কম সুবিধাভোগী, বিশেষত নিম্ন আয়ের মহিলা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিপদে পড়বে। বর্তমানে যে প্রায় পাঁচ-সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের কোনো বীমা নেই, তাদের অধিকাংশই হয় মহিলা ও শিশু, অথবা সংখ্যালঘু ও বহিরাগত। দলের সবচেয়ে প্রগতিশীল অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সবচেয়ে দুর্বল জনসংখ্যার জন্য একটি সরকার-পরিচালিত স্বাস্থ্য খাত থাকা দরকার। বারাক ওবামা নিজেও একসময় এই তথাকথিত ‘পাবলিক অপশন’-এর পক্ষে জোর আওয়াজ তুলেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিকানরা বলা শুরু করল, পাবলিক অপশন মানেই হলো স্বাস্থ্য খাত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া। রোগীর ভালোমন্দ দেখভাল করার কথা ডাক্তারের, তাঁর জায়গায় সেই কাজ করবেন ওয়াশিংটনের আমলারা। আমেরিকায় এ রকম ‘বলশেভিক’ কাজ-কারবার সহ্য করা হবে না! বিমা কোম্পানিগুলোও এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে। ব্যাপারটা এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যে ডেমোক্র্যাটরা নিজেরাই ক্রমশ তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বাস্থ্যবিমা প্রস্তাব কাটছাঁট করা শুরু করে। কার্যত বিনা যুদ্ধেই বাদ হয়ে যায় ‘পাবলিক অপশন’।
ব্যাপারটায় সবচেয়ে দুঃখিত হয় ডেমোক্রেটিক পার্টির উদারবাদী অংশ, ওবামার বিজয়ের পেছনে যাদের সরব ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকানরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে সে তো জানা কথা। কিন্তু ওবামা কেন সেই বিরোধিতা পাত্তা দেবেন? বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন, এই সংস্কারের পক্ষে তো তাঁর ম্যান্ডেট রয়েছেই। তিনি কেন লড়াই ছাড়াই রণে ভঙ্গ দেবেন? নেতা তো তাঁকেই বলব, বিপদ ও বিরোধিতার মুখে যিনি নীতি ও আদর্শ ত্যাগ করেন না। সহজ সমাধান ভেবে যিনি সমঝোতার পথ বেছে নেন না। ওবামাকে নিয়ে অধিকাংশের মনভঙ্গের সেটাই আসল কারণ।
ম্যাসাচুসেটসে তাদের ৬০ নম্বর সিনেট আসন হারাবার পর আমরা ধরেই নিয়েছিলাম—গেল, সব গেল। সত্যি বলছি, আমি এমন কোনো লোক পাইনি যিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, এমন এক বিপর্যয়ের পরেও ডেমোক্র্যাটরা তাদের স্বাস্থ্যবিমা পাস করতে সক্ষম হবে। ওবামার নিজের দলের লোকেরাই ‘হবে না, হবে না’ বলা শুরু করেছিলেন। দক্ষিণের রক্ষণশীল রাজ্য থেকে গত নির্বাচনে যাঁরা জিতে এসেছিলেন, তাঁরা তো একদম গেড়ে বসলেন—এই স্বাস্থ্যবিমা প্রস্তাব নিয়ে আগানোর মানে হলো তাঁদের নিজেদের নির্বাচনী ভবিষ্যত্ জলে ভাসিয়ে দেওয়া। প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও পরামর্শদাতাদের মধ্যেও ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর চিফ অব স্টাফ রাহম ইম্যানুয়েল এসব ভীতসন্ত্রস্ত সহকর্মীদের একজন। তাঁর যুক্তি ছিল, এই এক স্বাস্থ্যবিমার জন্য ওবামার উচিত হবে না তাঁর পুরো রাজনৈতিক কর্মসূচি বিপদগ্রস্ত করা। রাহমের প্রস্তাব ছিল, অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বাস্থ্যবিমার বদলে ছোটা আকারের, যেসব ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা করা সম্ভব হবে, এমন একাধিক প্রস্তাব নিয়ে আগানো যাক।
শেষ পর্যন্ত ওবামা এবং আমেরিকা যে এই ‘পর্যায়ক্রমিক’ পথ বেছে নেয়নি, তার কারণ দুজন মানুষ একদম নাছোড়বান্দার মতো প্রতিবাদ জানালেন। তাঁদের একজন মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলসি। অন্যজন খোদ বারাক ওবামা।
ঠিক কখন, কীভাবে এই পালাবদল ঘটল, তা এখনো পরিষ্কার হয়ে ওঠেনি। তবে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা স্বনামে-বেনামে যে চিত্রটি এঁকেছেন তা থেকে বোঝা যায়, ম্যাসাচুসেটসে সম্পূর্ণ আকস্মিকভাবে এডওয়ার্ড কেনেডির আসনটি হারিয়ে ওবামা ঘুরে দাঁড়ান। স্বাস্থ্যবিমার প্রশ্নটি তাঁর প্রেসিডেন্সির কেন্দ্রীয় বিষয় সেন্টারপিস হিসেবে উপস্থিত করেছিলেন ওবামা। কেনেডি ছিলেন এই কাজে তাঁর বন্ধু, সহযোগী ও পথপ্রদর্শক। একশ বছর ধরে এই স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে, বিশেষ করে অভাবীদের জন্য স্বাস্থ্যসুযোগ সৃষ্টি করতে অনেক প্রেসিডেন্টই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। এ কথা বোঝা ওবামার পক্ষে কঠিন হয়নি, যে স্বাস্থ্যবিমা প্রস্তাব নিয়ে নির্বাচনী লড়াই তিনি করেছিলেন, সেই প্রস্তাব যদি বিনা যুদ্ধে বাতিল বলে গণ্য হয়, তাহলে তাঁর এজেন্ডার অধিকাংশ বিষয়ই রিপাবলিকানদের হাতে পরাস্ত হবে। ফলে কেবল ওবামার প্রেসিডেন্সিই ব্যর্থ বলে পরিচিত হবে না, পুরো ডেমোক্রেটিক দলই দেউলিয়া হয়ে ধরা দেবে। পোকার খেলায় বাজি ধরার মতো মরিয়া হয়ে বাজি ধরলেন ওবামা। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাবের সর্বনিম্ন বিভাজক (লোয়েস্ট ডিনমিনেটর) নয়, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বিভাজককেই তিনি লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে এগোবেন। এই কাজে তাঁকে সমর্থন জানালেন পেলসি। সদ্য সত্তরে পড়া এই মহিলা উদারনৈতিক হিসেবে সুপরিচিত, রিপাবলিকানদের চোখে আমেরিকার বর্তমান অসুখের এক অন্যতম কারণ তিনি। পেলসি নিজেও জানতেন, ওবামার মতো স্বাস্থ্যবিমার টুপিতে সব ডিম তিনিও রেখেছেন। এই বিল পরাস্ত হলে ২০১২ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সম্ভবত কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। তার অর্থ পেলসির স্পিকারের দায়িত্বটি ফসকে যাওয়া।
পর্দার অন্তরালে নিজের দলের কংগ্রেস সদস্যদের সামলালেন পেলসি। আর পর্দার বাইরে স্বাস্থ্যবিমার সবচেয়ে বড় প্রবক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন ওবামা। হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকানদের ডেকে এনে চালু টিভি ক্যামেরার সামনে পাক্কা ছয় ঘণ্টা তুমুল বিতর্ক করলেন। তাতে খুব একটা কাজ হলো না, একজন রিপাবলিকানকেও পাওয়া গেল না তাঁর পক্ষে। তখন একের পর এক টিভি সাক্ষাত্কার দেওয়া শুরু করলেন ওবামা, বিভিন্ন শহরে সভাও ডাকলেন। এ যেন সেই আগের প্রার্থী ওবামা। নিজের দলের যেসব সদস্য গররাজি ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকও করলেন তিনি। তাঁদের সোজাসুজি বললেন, ‘দেখো, এই বিল ব্যর্থ হলে আমার প্রেসিডেন্সি ব্যর্থ প্রমাণিত হবে। আমি ব্যর্থ হলে তোমরাও খুব সুখে থাকবে না। এই ব্যর্থতার দাগ এক প্রজন্মেও ডেমোক্র্যাটরা মুছতে পারবে না।
শেষ পর্যন্ত ওবামাই বিজয়ী হলেন। শুধু যে পার্লামেন্টারি অর্থে এই বিজয়, তা মোটেই নয়। মাস দেড়েক আগেও ওবামার দল ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থা ছিল নড়বড়ে। তাঁর বিরুদ্ধ পক্ষ—অর্থাত্ রিপাবলিকানরা যেখানে দেশজুড়ে তুমুল প্রতিবাদ-হট্টগোল করে বেড়াচ্ছিল, সেখানে ডেমোক্র্যাটরা ছিল দারুণ মনমরা। জনমত জরিপকারীরা বলছিলেন, ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের মনোবলের মাত্রা দ্বিগুণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে শাসকদল বরাবরই বেধড়ক মার খায়। কিন্তু নিজের দলের সদস্যদের অর্থাত্ দলের ‘কোর’ সমর্থকদের মধ্যে যদি উত্সাহ না থাকে, তাঁরা যদি ভোট দিতে না যান, তাহলে কারও বাপেরও সাধ্য নেই ডেমোক্র্যাটদের ভরাডুবি ঠেকায়। স্বাস্থ্যবিমা পাস হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ঘুঁটি উলটে গেল। এখন দেশের বৃহদাংশ মানুষ কেবল এই আইনের সমর্থকই নয়, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে দলের ব্যাপারে আগ্রহও নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, তাদের হাতের একমাত্র তাস হারিয়ে বিব্রত, বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে রিপাবলিকান পার্টি।
এই আইন গৃহীত হওয়ার ফলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমার পথে আমেরিকা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অন্ততপক্ষে সোয়া তিন কোটি মানুষ, এত দিন যাদের স্বাস্থ্যবিমা ছিল না, এখন তারা সরকারি খরচে স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ পাবে। এত দিন বিমা কোম্পানিগুলো ‘বিমাভুক্ত হওয়ার আগে থেকে সমস্যা আছে’—এই যুক্তিতে অথবা খরচের অজুহাতে যখন-তখন বিমাব্যবস্থা বাতিল করে দিতে পারত। এই নতুন আইনে সেই পথ বন্ধ হলো। বিমাহীনদের সাহায্য করার লক্ষ্যে সরকার বিশাল ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যে ভর্তুকির একাংশ উঠে আসবে অধিকতর আয় করে এমন আমেরিকানদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে। বাকিটা আসবে অপচয় বন্ধ করে।
আমি জেনে অবাক হয়েছি, অপচয় বন্ধের নতুন যে আইন হলো, এর বুদ্ধিটা এসেছে অতুল গাওয়ান্ডে এক ভারতীয় আমেরিকানের কাছ থেকে। এই দেশে স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানিগুলো প্রতিটি রুগী যতবার ডাক্তারের কাছে যাবে, যত ল্যাব টেস্ট করা হবে, এর প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা করে খরচ ধরে। চিকিত্সকেরাও সেই মোতাবেক বিমা কোম্পানি থেকে ফি পেয়ে থাকেন। যতবার রুগী তাঁর কাছে আসবে, যত টেস্ট সে করাবে, এর প্রতিটির জন্য ফি। অতুল গাওয়ান্ডে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ৪২ বছর বয়স্ক চিকিত্সক মাস কয়েক আগে নিউইয়র্কার পত্রিকায় হিসাব করে দেখালেন, প্রতি ভিজিট বা টেস্ট বাবদ ফি দেওয়ার ফলে আমেরিকায় কী অসম্ভব অপচয় হচ্ছে। রোগী এলেই যদি ফি মেলে, তাহলে চিকিত্সক বা ক্লিনিকের কোনো প্রয়োজন নেই, তবু চৌদ্দ রকম টেস্ট করাতে চাইবে। এর বদলে যদি যে অসুখের জন্য রোগী এসেছে, তার একটি মোদ্দা খরচ ধরা হয়, তাহলে চিকিত্সক বা হাসপাতাল কেউই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ে আগ্রহী হবে না। ঘটনাক্রমে ওবামা নিজে লেখাটি পড়েন। সেখান থেকেই প্রস্তাব ওঠে, প্রতি সার্ভিস বাবদ ফি দেওয়ার বদলে ‘মোট’ খরচের একটা অঙ্ক ধরে দেওয়া হবে। ডাক্তার বা হাসপাতাল কোনো বিমা কোম্পানির চাপে পড়ে রোগীর পরিচর্যা সংকুচিত না করে তার জন্যও পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা রাখা হবে। হিসাব করে দেখা গেছে, এই নতুন ব্যবস্থা, যার আইনি নাম হয়েছে ‘বান্ডলিং’, এর ফলে কোটি কোটি ডলারের অপচয় ঠেকানো সম্ভব হবে।
মজার কথা হলো, অপচয় রোধের এই প্রস্তাব প্রথম করেছিল রিপাবলিকানরাই। আরও নানা রকম ব্যয়-সংকোচনমূলক প্রস্তাব তারা আগে থেকেই করে আসছে। কিন্তু ‘ওবামা যা বলবেন, তাতেই না বলো’—রিপাবলিকানদের এই নীতির ফল দাঁড়াল এই যে, ভালো বুদ্ধি দিয়েও তারা এখন সেই বুদ্ধির জন্য কোনো প্রশংসা পাচ্ছে না। রিপাবলিকানরা বাজি ধরে বসেছিল, এই স্বাস্থ্যবিমা হবে ওবামার ‘ওয়াটারলু’। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ব্যাপারটা ঘটছে উলটো। রিপাবলিকানদের মধ্যে বুদ্ধিমান কৌশলবিদ হিসেবে নাম রয়েছে ডেভিড ফ্রামের। সপ্তাহখানেক আগে তিনি লিখেছেন, আগাগোড়া ‘না’ বলার ফলে এই স্বাস্থ্যবিমার প্রশ্নটি ডেমোক্র্যাটদের নয়, রিপাবলিকানদের ‘ওয়াটারলু’ হয়ে উঠতে পারে। গত চল্লিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা আইন হলো এই স্বাস্থ্যবিমা। ওবামা ও ডেমোক্র্যাটরা একা সেই আইন বাস্তবায়নের সব কৃতিত্ব নিয়ে নিল। এখন নিজেদের ফোলা বুড়ো আঙুল চোষা ছাড়া আর কী করার আছে রিপাবলিকানদের? ফ্রাম লিখেছেন, ওবামা খুব আন্তরিকভাবেই চেয়েছিলেন রিপাবলিকানদের সঙ্গে নিয়ে এই আইন লিখতে। তাতে সাড়া না দিয়ে নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারল রিপাবলিকান দল।
গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামাজিক নিরাপত্তামূলক আইন হলো এই স্বাস্থ্যবিমা। এই আইন যদি টিকে যায়, তাহলে ইতিহাসে ওবামার স্থান, তাঁর ‘লিগেসি’ হবে রুজভেল্ট ও লিন্ডন জনসনের মতোই চিরস্থায়ী। এই আইন বাস্তবায়িত হলে আমেরিকার সামাজিক ব্যবস্থাপনায় যে বড় ধরনের অসাম্য চালু রয়েছে, তার অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। অধিকতর ন্যায়সংগত সমাজের কথা বলে নির্বাচিত হয়েছিলেন ওবামা। সে পথেই এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।
নিউইয়র্ক, ৩০ মার্চ ২০১০
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

যৌন নিপীড়নের ব্যাপকতা -আমাদের সমাজ কি নারীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে

যৌন নিপীড়নের ব্যাপকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়—কোথাও ছাত্রীরা নিরাপদ নয়। বরিশালের নিশিকান্ত গাইল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিপীড়নের শিকার হয়ে ছাত্রীনিবাস ছাড়ছে মেয়েরা। গত বুধবারের প্রথম আলোয় দেখা যাচ্ছে, কলেজের অফিস সহকারী কাম নৈশপ্রহরী দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীনিবাসের অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করে আসছেন। কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই রকম অভিযোগ। অথচ তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তি তো দূরের কথা, স্বয়ং অধ্যক্ষ উল্টো সেই নৈশপ্রহরীর বাড়ি গিয়ে তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। সর্বোচ্চ পদের অধ্যক্ষ এবং সর্বনিম্ন পদের নৈশপ্রহরীর এই ঐক্য দুর্বলের বিরুদ্ধে সবলেরই ঐক্য। এর সামনে ছাত্রীদের ও তাদের অভিভাবকের অসহায়ত্ব সমগ্র সমাজের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক।
সম্প্রতি যেভাবে সর্বত্র যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে, তাতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার আছে। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের একটি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অবিরত এমন ঘটনা ঘটার ফলে প্রশ্ন ওঠে, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কি নারীদের জন্য চূড়ান্ত অনিরাপদ হয়ে উঠছে? এসব ঘটনার আলোকেই গত কয়েক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ কর্মস্থলে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ও অভিযোগ সেল গঠনের দাবিটি উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল। উচ্চ আদালতও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে এটি কেন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না, সে ব্যাপারে রুল জারি করেছিলেন। কিন্তু কার্যত প্রতিকারের ব্যবস্থা নয়, বরং নির্যাতনই ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরিভাবে সর্বস্তরে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ও অভিযোগকেন্দ্র স্থাপন করা দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির পাশাপাশি এসব ঘটনার বিচার যাতে আদালতে হয়, সে জন্য সবার আগে প্রয়োজন পুলিশ ও প্রশাসনের উদ্যোগ। দেখা যায়, সরকারি দল এবং প্রশাসনের প্রশ্রয়েই নিপীড়কেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই সবার আগে এদের ক্ষমতার শেকড় কেটে দিতে হবে।
সত্য যে পুরুষ মাত্রই নারীর যৌন নিপীড়ক নন। তাহলেও প্রায়ই অনেক স্বামী, অনেক শিক্ষক, অনেক ছাত্র, অনেক কর্মকর্তা, অনেক সন্ত্রাসী, অনেক প্রশাসক, অনেক অভিভাবক তথা অনেক পুরুষ সীমা লঙ্ঘন করেন। সীমা লঙ্ঘনের বিহিত একমাত্র কঠোর শাস্তি। বরিশালের ঘটনাই কেবল নয়, যৌন নির্যাতকেরা কোথাও যাতে রেহাই না পায়, সেটাকে জাতীয়ভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সরকারের।

পিএসসির পরীক্ষাজট -ফল প্রকাশ করতে হবে দ্রুততম সময়ে

ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে পরীক্ষা নিতে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) আড়াই বছর সময় লাগানোয় কেবল হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন না, সরকারি কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সরকারি খালি পদের বিপরীতে লোক নিয়োগ দিয়ে থাকে পিএসসি। তারা প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর অনুষ্ঠিত বিসিএসসহ মোট ৮৮টি পরীক্ষার মধ্যে ১৯টির ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পিএসসিতে লোকবলের অভাব নেই, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কমিশনের শূন্যপদগুলোও পূরণ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আড়াই বছর ধরে ২৮তম বিসিএসের নিয়োগ-প্রক্রিয়া চলা দুর্ভাগ্যজনক। এতে কমিশনের অদক্ষতা ও অযোগ্যতাই প্রমাণিত হয়। ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি যে পরীক্ষার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, সেই পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়া দুঃখজনক। এক বছর ধরে ২৯তম বিসিএসের নিয়োগ-প্রক্রিয়া চলাও স্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে ২৭তম বিসিএসের জটিলতা কাটেনি গত তিন বছরেও। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পিএসসিতে ব্যাপক দলীয়করণ করা হয়েছিল। সে সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি দারুণভাবে নষ্ট করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে পিএসসির খোলনলচে পাল্টে ফেললেও পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমেনি। জোট আমলে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নিলে অনেকে বাদ পড়েন। এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামও কম হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাদ পড়া বেশ কিছু পরীক্ষার্থী নিয়োগ পান। অন্যদের ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে।
নিয়োগ-প্রক্রিয়া তথা পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্বের পেছনে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব কাজ করছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি সংস্থা সক্রিয় থাকে নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপে। সেখানে একদিকে চেয়ারম্যান এবং অন্যদিকে সদস্যরা থাকলে কাজকর্মে স্থবিরতা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। পিএসসির কাজকর্মে স্বচ্ছতার পাশাপাশি নিয়োগ-প্রক্রিয়াও যথাসময়ে শেষ করতে হবে। যেখানে এসএসসি পরীক্ষার ১০-১২ লাখ পরীক্ষার্থীর ফল প্রকাশ করা হয় তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, সেখানে পিএসসিতে অংশ নেওয়া কয়েক হাজার পরীক্ষার্থীর ফল প্রকাশে দেড়-দুই বছর লাগার কী যুক্তি থাকতে পারে? ফল প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় অনেক প্রার্থীর চাকরির বয়সসীমাও পার হয়ে যায়। বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নন-ক্যাডার পদের সংখ্যা অনেক কম। এসব পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশ স্বল্পতম সময়েই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
পিএসসির চেয়ারম্যানের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর জানুয়ারিতে বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রজ্ঞাপন জারির আগেই পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও নিয়োগ-প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করে নতুন পরীক্ষা নেওয়া যাবে না, আবার পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে জানুয়ারির সময়সীমাও লঙ্ঘন করা যাবে না। বিলম্বিত পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের কারণে জনপ্রশাসনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সেটি নিশ্চয়ই পিএসসির কর্মকর্তাদের অজানা নয়। এর ফলে মেধাবীরা সরকারি চাকরি গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে জনপ্রশাসন মেধাশূন্য হতে বাধ্য। অবিলম্বে পিএসসির পূর্ববর্তী সব পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ কাম্য নয়।

মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে হিলারির দেহভস্ম নিয়ে যাবেন আপা শেরপা

এডমুন্ড হিলারির মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের পর অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। হিলারি এখন বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি এখনো অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে বাকিদের জন্য। হিলারির পদাঙ্ক অনুসরণ করে এখন পর্যন্ত রেকর্ড ১৯ বার এভারেস্টের শীর্ষে আরোহণ করেছেন আরেক সাহসী অভিযাত্রী নেপালের আপা শেরপা। এবার তিনি রেকর্ড ২০তম বারের জন্য যাত্রা করবেন। আর এই অভিযাত্রায় সঙ্গে নেবেন হিলারির দেহভস্ম। গতকাল বৃহস্পতিবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান আপা শেরপা।
সংবাদ সম্মেলনে আপা বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার হিলারির সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। স্থানীয়দের অনেক সাহায্য করেছেন। এভারেস্টের শীর্ষে তাঁর দেহভস্ম নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই খুশি।’
১৯৫৩ সালের ২৯ মে এডমুন্ড হিলারি ও শেরপা তেনজিং প্রথম মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ২০০৮ সালে হিলারি (৮৮) নিউজিল্যান্ডে মারা যাওয়ার পর তাঁর দেহভস্মের বেশির ভাগ অংশ সাগরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে আপা জানিয়েছেন, সামান্য কিছু অংশ নেপালের কুন্দে গ্রামের একটি বৌদ্ধ মঠে রক্ষিত আছে।
৬ এপ্রিল আপা শেরপার নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের একটি অভিযাত্রী দল কাঠমান্ডু থেকে যাত্রা শুরু করবে। এভারেস্ট থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার জন্য এ অভিযান চালানো হচ্ছে। এভারেস্ট তৃতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান এটা।

ফিলিপাইনের ক্ষমতাসীন জোটে বিশৃঙ্খলা

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া অ্যারোইয়োর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে ক্ষমতাসীন লাকাস কাম্পি সিএমডি জোটের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আরোইয়োর মনোনীত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী গিলবার্তো তিওদোরো। আরও অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাও জোট ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ফিলিপাইনের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও জোটের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা প্রসপেরো নোগরালেস বলেন, ‘গিলবার্তো তিওদোরোর পদত্যাগের খবর আমাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা এবং আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।’ এই পদত্যাগের খবর আগে থেকে জানতেন না বলেও উল্লেখ করেন নোগরালেস। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটল।
গত মঙ্গলবার তিওদোরো জোট থেকে পদত্যাগ করার কথা ঘোষণা করেন। তাঁর সঙ্গে পদত্যাগ করেন জোটের ভাইস চেয়ারম্যান এদু মানজানো। লাকাস কাম্পি সিএমডি জোটের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা জোট ছেড়ে তাঁদের সমর্থন নির্বাচনে ওই জোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ম্যানি ভিলারের প্রতি জানানোর পর এ পদত্যাগের ঘোষণা আসে। নাসিওনালিস্তা পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ম্যানি ভিলার।
কানাঘুষা চলছে, অ্যারোইয়োর প্রভাবাধীন ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যমগুলোর সমর্থনের ঘাটতির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন তিওদোরো। আর ভিলারের দলের কর্মীরা বলে বেড়াচ্ছেন, অ্যারোইয়ো ও তাঁর মিত্ররা তাঁদের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। তবে তিওদোরোর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, তিনি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, যাতে নির্বাচনী প্রচারে আরও বেশি সময় দিতে পারেন।
অভিযোগ উঠেছে, অ্যারোইয়ো ও তাঁর পরিবার গোপনে ম্যানি ভিলারকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে অ্যারোইয়োর জনপ্রিয়তা এখন এতটাই তলানিতে যে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা স্বীকার করলে ভিলারের ভোটে টান পড়তে পারে। ভিলার সব সময়ই অ্যারোইয়োর সঙ্গে কোনো যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে আসছেন।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ফিলিপাইনের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী কোরাজন অ্যাকুইনোর ছেলে বেনিগনো অ্যাকুইনো। দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছেন ম্যানি ভিলার। আর গিলবার্তো তিওদোরোর অবস্থান চার নম্বরে।

মস্কোয় হামলার দায় নিল চেচেন বিদ্রোহীরা

চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও ওয়াশিংটনে আসন্ন পরমাণু নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দেবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ তথ্য জানান। ১২ ও ১৩ এপ্রিল এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টের ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা জানানো হলো।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিন গাং জানান, পরমাণু নিরাপত্তা সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের মুখোমুখি হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। চলতি বছরের গোড়ার দিকে তাইওয়ান ও তিব্বত নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পর প্রথমবারের মতো এই দুই নেতা মুখোমুখি হচ্ছেন।
ওয়াশিংটনে দুই দিনব্যাপী ওই সম্মেলনে পরমাণু-সন্ত্রাসবাদ দমন আইন ও পরমাণু সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হবে। গত বছরের এপ্রিলে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে এক বক্তৃতায় পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে কাজ করার অঙ্গীকার করেন বারাক ওবামা। এ জন্য তিনি এ ধরনের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সম্প্রতি তাইওয়ান ও তিব্বত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারি মাসে তাইওয়ানের কাছে ৬৪০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে। এ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি চীন। কারণ, দেশটি তাইওয়ানকে নিজের অংশ মনে করে। এ ছাড়া পরের মাসে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। এসব বিষয় চীনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

ওয়াশিংটনে পরমাণু নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দেবেন হু জিনতাও

রাশিয়ার রাজধানীমস্কোয় পাতালরেলে গত সোমবারের আত্মঘাতীহামলার দায় স্বীকার করেছে চেচেন বিদ্রোহীরা। চেচেন বিদ্রোহী নেতা ডকু উমারভ এক ভিডিও বার্তায় এ দায়স্বীকার করেন।
এদিকে রাশিয়ার গোলযোগপূর্ণ উত্তর ককেশাসের দাগেস্তানে গতকাল বৃহস্পতিবার আবারও গাড়িবোমা হামলায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এ নিয়ে গত চার দিনে দেশটির পাতালরেলসহ পৃথক তিনটি সন্ত্রাসী হামলায় মোট ৫৩ জন নিহত হলো।
চেচেন বিদ্রোহীনেতা ডকু উমারভ বলেন, ‘পাতালরেলে হামলা চালানোর জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দিয়েছি।’ কাবকাজসেন্টার ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইটে দেওয়া ভিডিও বার্তায় উমারভ আরও বলেন, ককেশাসের বেসামরিক জনগণকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, একটি মাঠে বসা অবস্থায় ৪৫ বছর বয়সী উমারভ বলছেন, ‘রাশিয়ার অধিবাসীরা শুধু টেলিভিশনে এ যুদ্ধ দেখবে এবং রেডিওতে যুদ্ধের কথা শুনবে।’
উমারভ ইমিরেট অব ককেশাস নামের একটি জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান। গোষ্ঠীটি উত্তর ককেশাসে শরিয়াহ আইনভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

হাইতির পুনর্গঠনে ৯৯০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি

জানুয়ারির ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হাইতির পুনর্গঠনে বিশ্বের দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ৯৯০ কোটি মার্কিন ডলার সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে হাইতি পুনর্গঠন নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো এ প্রতিশ্রুতি দেয়। এ প্রতিশ্রুতি যাবতীয় প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে বলে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন জানিয়েছেন।
হাইতির পুনর্গঠনের জন্য দাতাদের কাছে আগামী দুই বছরের মধ্যে ৪০০ কোটি ডলার অর্থসাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন বান কি মুন। কিন্তু আন্তর্জাতিক দাতারা দুই বছরের মধ্যে ৫৩০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়।
বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বান কি মুন বলেন, সদস্যরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগীরা আগামী দুই বছরের মধ্যে ৫৩০ কোটি ডলার সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পুরো ৯৯০ কোটি ডলার তিন বছরের মধ্যে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘হাইতির বন্ধুদের প্রতিশ্রুতি আমাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।’
গত ১২ জানুয়ারি হাইতিতে ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে দুই লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়। গৃহহীন হয় ১৩ লাখ মানুষ। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাইতির অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার। এক দিনের ওই বৈঠকে ১৩৮টি সদস্যরাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন—বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং হাইতিতে প্রবাসীরা অংশ নেয়।
বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা সাহায্য দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে বান কি মুন বলেন, কে কত অর্থ দিচ্ছে বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা প্রকাশ করা হবে। এ জন্য ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করবে জাতিসংঘ ও হাইতি।
বান কি মুনের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ১১৫ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এই অর্থ কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় হাইতির পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ক্যাথরিন অ্যাশটন বৈঠকে বলেন, হাইতির সহায়তায় ইইউ অতিরিক্ত ১৬০ কোটি ডলার দেবে। বুধবারের ওই ঘোষণার ফলে ইইউর সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছাল।
হাইতিতে সাহায্য দিতে গিয়ে অতীতের মতো যাতে ভুলত্রুটি না হয়, সে ব্যাপারে জোর দেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যর্থ কৌশলে ফিরে যাব না। হাইতিকে সফল করা প্রয়োজন।’
হিলারির স্বামী, হাইতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেন, হাইতির পুনর্গঠন কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের জন্য তিনি ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ-ম্যাক্স ব্যালারিভ ইনটেরিম হাইতি রিকভারি কমিশনে (আইএইচআরসি) নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০১১ সাল পর্যন্ত হাইতিতে তারা ৪৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার সহায়তা দেবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক হাইতির ত্রাণ তত্পরতার অগ্রগতি নিয়ে ছয় মাসের মধ্যে আরেকটি বৈঠক করার আহ্বান জানান।
হাইতির পুনর্গঠনে কানাডা ৩৯ কোটি ও ব্রাজিল ১৭ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া জাপান অতিরিক্ত আরও তিন কোটি মার্কিন ডলার সাহায্য দেবে বলে জানিয়েছে। এর আগে তারা সাত কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এক দিনে ২০ হাজার কর্মী অবসরে

ভারতের কেরালা রাজ্যের ২০ হাজার সরকারি কর্মচারী গত বুধবারঅবসর নিয়েছেন। এক সরকারি আদেশে এসব কর্মচারী অবসর নেন।
এসব কর্মচারীর অবসর গ্রহণের সময়সীমা ছিল ২০০৯ সালের ১ এপ্রিলের পর যেকোনো দিন। সেই মেয়াদ বাড়িয়ে তাঁদের নিয়োগ এ বছর ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
অবসরে যাওয়া এসব কর্মচারীর মধ্যে সর্বাধিক ১২ হাজার কর্মচারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এ ছাড়া তিন হাজার কর্মচারী রাজ্যের পুলিশ বাহিনী থেকে, ১৮০ জন সচিবালয় থেকে এবং অন্যরা স্বাস্থ্য, রাজস্ব ও পর্যটন বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে অবসরে যাওয়া মোট কর্মচারীর সংখ্যা সরকারিভাবে এখনো জানানো হয়নি। রাজ্যের মোট সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা তিন লাখের মতো।
বেসরকারি এক হিসাব অনুযায়ী, এই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অবসরভাতা ও অন্যান্য দেনা-পাওনা মেটাতে রাজ্যের কোষাগার থেকে ব্যয় হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি রুপি।

বেত্রাঘাত থেকে অব্যাহতি পেলেন মালয়েশীয় নারী

বিয়ার পানের অপরাধে বেত্রাঘাতের সাজাপ্রাপ্ত একজন মালয়েশীয় নারীর ওই সাজা পরিবর্তন করা হয়েছে। কার্তিকা সারি দেবী সুকর্ণ নামের ওই মুসলিম নারীকে এখন তিন সপ্তাহ সমাজসেবামূলক কাজ করে দিতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার কার্তিকার বাবা মুতালিব সুকর্ণ জানান, কর্তৃপক্ষের পাঠানো এক চিঠিতে তাঁদের জানানো হয়েছে, পাহাং প্রদেশের সুলতান এ সাজা পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কার্তিকা মধ্য-মালয়েশিয়ার ওই প্রদেশেই বিয়ার পান করতে গিয়ে ধরা পড়েন।
এ অপরাধের জন্য কার্তিকাকে ছয়টি বেত্রাঘাত করার শাস্তি ঘোষণা করার পর মানবাধিকার কর্মীরা এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানায়।
মুতালিব সুকর্ণ জানান, শুক্রবার থেকে কার্তিকার নতুন শাস্তির মেয়াদ শুরু হবে। ওই দিনই তিনি মেয়েকে পেহাংয়ের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করবেন।
সুকর্ণ বলেন, ‘সুলতানের আদেশ অনুযায়ী পেহাংয়ের একটি শিশুসদনে তিন সপ্তাহের সেবামূলক কাজ করতে হবে কার্তিকাকে। সুলতানের আদেশকে সম্মান করি আমি।’
মালয়েশিয়ায় অ্যালকোহল বা নেশাজাতীয় পানীয় সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু দেশটির মুসলিম নাগরিকদের জন্য এ পানীয় গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে জেল, বেত্রাঘাত, জরিমানা ইত্যাদি শাস্তির বিধান রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যুয়ার্ক নগরে গত মাসে হত্যাকাণ্ড হয়নি

এক মাসের মধ্যে কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না হওয়ায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের ন্যুয়ার্ক নগর। হাডসন নদীর পশ্চিম পাশের এ নগরটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। খুন, রাহাজানি, ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা এখানকার নিত্যদিনের খবর।
তবে গত মার্চ মাসে এখানে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। গত ৪০ বছরের মধ্যে এমনটি আর হয়নি।
বাণিজ্যিক নগর নিউইয়র্কের পাশেই নিউজার্সির ন্যুয়ার্ক নগর। এ বছরের প্রথম দুই মাসেই ন্যুয়ার্কে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালের প্রথম দুই মাসেও মোট খুনের সংখ্যা একই ছিল। ১৯৪১ সালের পর দুই মাসে ১০ ব্যক্তি খুন হওয়ার ঘটনাটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন রেকর্ড। নগরের পুলিশ বিভাগের পরিচালক গেরি ম্যাকগার্লি বলেছেন, ১৯৬৬ সালের পর এমন কোনো মাস নেই যে মাসে ন্যুয়ার্কে খুনের ঘটনা ঘটেনি।
তবে ন্যুয়ার্কের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের মে মাসটিও ছিল খুনবিহীন মাস। পুলিশ বিভাগ থেকে আরও জানানো হয়েছে, ন্যুয়ার্কে সহিংস অপরাধমূলক ঘটনাও আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কমেছে। হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা কমেছে আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ।
সম্প্রতি ন্যুয়ার্কে ব্যাপক পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাপক পুলিশি তত্পরতার কারণেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে বলে পুলিশ বিভাগের পরিচালকের অভিমত।

ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা এখন মৌলিক অধিকার

প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির আট বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ভারতে এ আইন বাস্তবায়িত হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা এখন মৌলিক অধিকার অর্থাত্ প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারের জন্য অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব হিসেবে ধরা হয়েছে।
২০০২ সালে ভারতের সংসদে সংবিধানের ৮৬তম সংশোধনী হিসেবে এ আইন পাস হয়। ওই আইনে ভারতের প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত বছর লোকসভায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিকার অধ্যাদেশ নামে আরও একটি আইন পাস হয়। গতকাল থেকে ওই দুটি আইন কার্যকর হয়েছে।
এ আইনে ভারতের প্রতিটি রাজ্য সরকারকে প্রতিটি শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে ভারতে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রায় এক কোটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হলো। এ এক কোটি শিশু এর আগে কোনো না কোনোভাবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। দারিদ্র্য ও অন্যান্য কারণে ভারতে বিপুলসংখ্যক শিশু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। এ শিশুদের একটা অংশ কোনোদিনই প্রাথমিক শিক্ষা নিতে স্কুলে যায় না।
এ আইন পাসকে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর আগে ইউপিএ সরকার ভারতে তথ্য অধিকার আইন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইন বাস্তবয়ন করে প্রশংসিত হয়েছে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইনে গ্রামের বেকার লোকদের ১০০ দিনের কাজ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।
বর্তমানে ভারতে জনসংখ্যার প্রায় ২২ কোটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী। এ বয়সী প্রায় ৯২ লাখ শিশু দারিদ্র্য ও অন্যান্য কারণে প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, এ আইন বাস্তবায়ন করতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার কোটি রুপির প্রয়োজন হবে। মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকার ইতিমধ্যেই এ আইন বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে।
এ অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যালয় যদি কোনো শিশুকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে ওই বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়েই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষকমণ্ডলী থাকতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়কেই আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। এ শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষিত শিক্ষকমণ্ডলী, পর্যাপ্ত খেলার জায়গা এবং উপযোগী অবকাঠামো। তবে বিদ্যালয়গুলোকে এসব শর্ত পূরণের জন্য সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে সরকার।

অবরোধ আরোপের আলোচনা ফাঁকা হুমকি: ইরান

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে বিশ্বশক্তি তাদের ওপর অবরোধ আরোপ নিয়ে যে আলোচনা করছে, তা ফাঁকা হুমকি বলে মন্তব্য করেছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রামিন মেহমানপারাস্ত এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। অবরোধ আরোপের আলোচনা একটি ফাঁকা হুমকি।
ইরানের ওপর জাতিসংঘের তিন দফা অবরোধ আরোপের পরও ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। ইরান জানিয়েছে, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার নিয়ন্ত্রণ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হওয়ায় পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের তাদের অধিকার রয়েছে।
ইরানের মেহর বার্তা সংস্থা মেহমানপারাস্তের বরাত দিয়ে জানায়, ‘অবরোধ ও চাপ প্রয়োগের মতো খারাপ পদ্ধতির পরিবর্তে এনপিটির অধীনে ইরানের আইনগত অধিকারকে মেনে নিতে সব দেশকে অনুরোধ করছি আমরা।’
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে জাতিসংঘ যাতে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে, সে ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ পশ্চিমা দেশগুলো। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার অধিকারী দেশ চীন সংকট উত্তরণে এখনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।
জাতিসংঘ যাতে অবরোধ আরোপ করতে না পারে, সে জন্য চীনের সমর্থন পেতে গতকাল বেইজিংয়ে যান ইরানের পরমাণুবিষয়ক প্রধান মধ্যস্থতাকারী সাইদ জলিলি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চীনের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিং গ্যাং গতকাল সাংবাদিকদের জানান, ইরানের পরমাণু ইস্যুতে চীন শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত সুসান রাইস গত বুধবার সিএনএনকে জানান, ইরানের ওপর অবরোধ আরোপের ব্যাপারে নিউইয়র্কে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে চীন। আলোচনায় বসার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও জার্মানি মিলে চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি অগ্রগতি। তবে আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অবরোধ আরোপের প্রস্তাবে কোন কোন বিষয় থাকা দরকার, সে সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনাগুলো জানিয়েছি আমরা।’
পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) একটি নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ইরান। সংস্থার সাম্প্রতিক ওই প্রতিবেদনে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। এসব প্রযুক্তি পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাজে প্রয়োজনীয়। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণও অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি পরমাণু চুল্লির ভারী পানি নিয়েও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বানের পরও তেহরান এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সিআইয়ের নতুন এ প্রতিবেদন ২০০৭ সালের জাতীয় গোয়েন্দা পর্যালোচনা প্রতিবেদনের বিপরীত চিত্র দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান ২০০৩ সাল থেকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা বন্ধ রেখেছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, তিনি কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করতে আগ্রহী। দ্রুত এ অবরোধ আরোপ করার ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়েছেন তিনি।

সাকিবের ৯৬

সাকিব আল হাসানের জন্য ‘৯৬’ সংখ্যাটা ট্র্যাজেডির। টেস্ট ক্রিকেটে এখনো মাত্র একটাই সেঞ্চুরি তাঁর, অথচ ৯৬ রানে আটকে গেছেন তিন-তিনবার! দুবার আউট, একবার অপরাজিত। ওয়ানডেতে এই ‘ট্র্যাজেডি’ আছে শচীন টেন্ডুলকারের। সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে নব্বইয়ের ইনিংসের রেকর্ডও তাঁর। নব্বইয়ের ঘরে ১৮ বার আটকে গেছেন ওয়ানডেতে ৪৬ সেঞ্চুরির মালিক। ১৭ বারই আউট হয়েছেন, নব্বইয়ের ঘরে অপরাজিত ছিলেন মাত্র একবার। সাকিবের মতোই ৯৬ রানে! গত ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কটকের সে ম্যাচটা খুব ভালো মনে থাকার কথা টেন্ডুলকারের। টেস্ট-ওয়ানডে মিলে ২৪ বার নার্ভাস নাইনটিজে আউট হয়েছেন যিনি, তার তো একবারই অপরাজিত থাকার সেই ঘটনা ডায়েরিতে লিখে রাখার কথা!

সারওয়ান-টেলরকে নিয়ে উইন্ডিজ দল

জেরম টেলর, রামনরেশ সারওয়ান—দুজনই পড়েছিলেন ইনজুরিতে। গত বছর ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের পর থেকে তাই মাঠের বাইরেই সময় কাটছিল তাঁদের। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দিয়ে আবার দলে ফিরেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দুই ক্রিকেটার।
ব্রিসবেনে শেষ টেস্ট খেলার সময় নিতম্বের ইনজুরিতে পড়েন টেলর। সিরিজের শেষ দিকে পিঠের ব্যথায় ভুগতে থাকেন সারওয়ানও। গত মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে তাই দুজনই ছিলেন দলের বাইরে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ১৫ সদস্যের এই দল নিয়ে যথেষ্টই আশাবাদী প্রধান নির্বাচক ক্লাইড বাটস, ‘টপ-অর্ডারে ক্রিস গেইল আছে এবং সে ম্যাচ উইনার। মিডল-অর্ডারে শিবনারায়ণ চন্দরপল, রামনরেশ সারওয়ানের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা ব্যাটিংটাকে শক্তিশালী করবে। আর ওয়াভেল হাইন্ডসের অন্তর্ভুক্তিও দলের অভিজ্ঞতা বাড়াবে।’
বিশ্বকাপের ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল: ক্রিস গেইল (অধিনায়ক), সুলিমান বেন, ডোয়াইন ব্রাভো, শিবনারায়ণ চন্দরপল, নারসিং দেওনারাইন, আন্দ্রে ফ্লেচার, ওয়াভেল হাইন্ডস, নিকিতা মিলার, কিয়েরন পোলার্ড, দিনেশ রামদিন, রবি রামপল, কেমার রোচ, ড্যারেন স্যামি, রামনরেশ সারওয়ান, জেরম টেলর।

আজ স্কুল ক্রিকেটের ফাইনাল

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ইয়াং টাইগার্স জাতীয় স্কুল ক্রিকেটের ফাইনালে উঠেছে বিকেএসপি ও অঙ্কুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ। পরশু সিটি ক্লাব মাঠে সেমিফাইনালে রাকিবুলের হাফ সেঞ্চুরিতে (৬৫) অঙ্কুর স্কুল (২০৫) ৭১ রানে হারিয়েছে অরুণ চন্দ্র হাইস্কুলকে (১৩৪)। ম্যান অব দ্য ম্যাচ অঙ্কুরের তৌকির ইসলাম। বিকেএসপিতে অন্য সেমিফাইনালে বিকেএসপি (২৬১) ১৬৭ রানে হারিয়েছে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলকে (৯৪)। জয়ী দলের সালেহীন রিফাত হয়েছেন ম্যাচসেরা।

আফ্রিদিদের শাস্তি তুলে নিচ্ছে পিসিবি

এত ঢাকঢোল পিটিয়ে খেলোয়াড়দের শাস্তি দেওয়ার শেষ ফলাফল বোধহয় শূন্যই হতে যাচ্ছে। অবসর ঘোষণার পর মোহাম্মদ ইউসুফের ব্যাপারে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড নমনীয় অবস্থানে। এদিকে পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচক মহসিন খান বলেছেন, ক্ষমা চাইলে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিসহ অভিযুক্ত সব ক্রিকেটারের শাস্তিই তুলে নেওয়া হতে পারে।
‘খেলোয়াড়েরা যদি লিখিতভাবে ক্ষমা চায় তাহলে হয়তো বোর্ড বহিষ্কারাদেশ ও জরিমানার শাস্তি তুলে নেবে এবং তাদের ক্ষমা করে দেবে’—লাহোরে সাংবাদিকদের বলেছেন মহসিন। অস্ট্রেলিয়া সফরে বাজে ফলাফল ও আচরণবিধি অমান্য করায় মোহাম্মদ ইউসুফ ও ইউনুস খানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিষ্কার করে পিসিবি। শোয়েব মালিক ও রানা নাভেদ-উল হাসানের বহিষ্কারাদেশ এক বছরের, সঙ্গে ২০ লাখ রুপি করে জরিমানা। এ ছাড়া আফ্রিদি ও কামরান আকমলকে ৩০ লাখ রুপি করে জরিমানা এবং ছয় মাসের বহিষ্কারাদেশ, উমর আকমলকে করা হয় ২০ লাখ রুপি জরিমানা।
পিসিবির শাস্তি ঘোষণার পর রাগে-অভিমানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছেন ইউসুফ। সিদ্ধান্তটাকে ‘ব্যক্তিগত’ বললেও মহসিন খান ইউসুফকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন আবারও, ‘আগেও বলেছি, সে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বহিষ্কারাদেশে হতাশ না হয়ে সে এর বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে।’ পিসিবি চেয়ারম্যানকে একটা চিঠি এর মধ্যেই দিয়েছেন আফ্রিদি। তাঁর যুক্তি, ‘একই অপরাধে দুবার শাস্তি দেওয়া যায় না। আমি পিসিবি চেয়ারম্যান ইজাজ বাটের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানিয়েছি, জরিমানা যেন তুলে নেওয়া হয়। তবে আমি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো চ্যালেঞ্জ করব না।’ বোর্ডকে চিঠি দিয়ে শাস্তির ব্যাপারে আপত্তির কথা জানিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক ইউনুস খানও। তবে পিসিবির আইনি উপদেষ্টা তফাজ্জল রিজভি বলেছেন, কোনো ক্রিকেটারই নাকি সঠিক নিয়মে শাস্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেননি। ‘ইউনুস আর আফ্রিদির কাছ থেকে আমরা যে দুটি চিঠি পেয়েছি তাতে তারা শাস্তির বিরুদ্ধে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন এবং শাস্তির কারণ জানতে চেয়েছেন’—বলেছেন রিজভি। অলরাউন্ডার রানা নাভেদ-উল হাসানও উকিল নোটিশের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তির কারণ জানতে চেয়েছেন পিসিবির কাছে।

স্বাগতিকদের কাপও

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা; স্পেন-দক্ষিণ আফ্রিকা। কী এটা? ২০১০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের লাইনআপ! ব্রাজিল ঠিক আছে। আর্জেন্টিনা, স্পেনও। কিন্তু সেরা চারের লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা! অবাক হওয়ারই কথা।
এমন ‘দুঃসাহসিক’ ভবিষ্যদ্বাণী করতে সাহস জোগাচ্ছে আসলে বিশ্বকাপের স্বাগতিক দলপ্রীতি। ১৯৮২ আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ব্যতিক্রম মানলে বিশ্বকাপের স্বাগতিক দলগুলো কমপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গেছে। ১৯৮২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক স্পেন বিদায় নিয়েছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে। গত ১৮টি আসরে এটাই স্বাগতিকদের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। কোনো স্বাগতিকেরই প্রথম রাউন্ডে বিদায় নেওয়ার নজির নেই।
স্বাগতিকদের হাতেই বিশ্বকাপের শিরোপা উঠেছে ছয়বার। ১৯৩০ আর ১৯৩৪ প্রথম দুটো আসরের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল দুই স্বাগতিক উরুগুয়ে আর ইতালি। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড। ১৯৭৪ সালে জার্মানি আর ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা। স্বাগতিকদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সর্বশেষ নজির ১৯৯৮ বিশ্বকাপ, স্টাডে ডি ফ্রান্সে সোনালি ট্রফি নিয়ে উত্সবে মেতেছিল ফরাসিরাই। যেটি স্বাগতিকদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ষষ্ঠ নজির।
ছয়ের জায়গায় সংখ্যাটি সাত-ই হতো। হয়নি ব্রাজিলের কারণে। ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের প্রথম শিরোপা জয়ের সাক্ষী হতে মারাকানা স্টেডিয়ামে ভিড় জমিয়েছিল লাখ দুয়েক দর্শক। গ্যালারির বাইরেও দর্শক ছিল এন্তার। কিন্তু ৭৯ মিনিটে অ্যালসিডেস ঘিগিয়ার গোল-কান্নায় ভাসাল পুরো ব্রাজিলকে। সেই দুঃখ আজও ভুলতে পারেনি ব্রাজিলের মানুষ।
স্বাগতিকদেরই ফাইনালে হারিয়ে আবার প্রথম শিরোপা জিতে অন্য রকম প্রতিশোধ নিয়েছে ব্রাজিল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সুইডেনকে ২-৫ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল। ১৭ বছর বয়সী পেলে করেছিলেন জোড়া গোল। স্বাগতিকদের রানার্সআপ হওয়ার নজির এই দুটোই।
স্বাগতিকদের কমপক্ষে সেরা চারে থাকার নজিরও কিন্তু আছে চারটি। চিলির দুর্ভাগ্য, ১৯৬২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তাদের পড়তে হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যেতে না পারলেও সেবার টুর্নামেন্টের স্বাগতিকেরা হয়েছিল তৃতীয়। ১৯৯০ বিশ্বকাপে তো স্বাগতিক ইতালির কপাল পুড়ল টাইব্রেকে। আর্জেন্টিনার কাছে হেরে শেষ হয়ে গেল ফাইনালে খেলার স্বপ্ন। তৃতীয় হওয়াটাই শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনা তাদের কাছে।
স্বাগতিকদের অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার উদাহরণ আছে চারটি। বিশ্বকাপের তৃতীয় আসরেই ফ্রান্স উঠে এসেছিল সেরা আটে। সেখানে ইতালির কাছে পরাজয়, যে ইতালি পরে জেতে তাদের টানা দ্বিতীয় শিরোপা। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে সুইজারল্যান্ডের। সেমিফাইনালটা হাত দিয়ে ছোঁয়ার দূরত্বেই চলে এসেছিল তাদের। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ১৯ মিনিটেই এগিয়ে গিয়েছিল ৩-০ গোলে। শেষ পর্যন্ত ৭-৫ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়া।
১৯৭০ বিশ্বকাপের স্বাগতিক মেক্সিকো অবশ্য ভাগ্যকে দুষতে পারবে না। ইতালির কাছে তারা হেরেছে ৪-১ গোলের ব্যবধানে। যদিও এই মেক্সিকো আসলেই ভাগ্যের কাছে হেরেছিল ১৯৬৮-তে। জার্মানির বিপক্ষে তাদের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছিল টাইব্রেকের ‘লটারি’তে।
ছয়বার চ্যাম্পিয়ন, দুবার রানার্সআপ, চারবার করে সেমিফাইনাল আর কোয়ার্টার ফাইনাল—স্বাগতিকদের প্রতি বিশ্বকাপের বাড়তি আনুকূল্যের আর কী প্রমাণ চান আপনি!

মহানগর স্কুল ফুটবল

মাইশার হ্যাটট্রিকে মেয়েদের মহানগর স্কুল ফুটবলে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেও জিতল স্যার জন উইলসন স্কুল। ধানমন্ডি সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সে কাল তারা ৪-০ গোলে হারিয়েছে ডন গ্রামার স্কুলকে। উইলসনের পক্ষে অন্য গোলটি করেছে আফিয়া। একই ভেন্যুতে দিনের অন্য দুটি ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়েছে। আগারগাঁও আদর্শ হাইস্কুল ধানমন্ডি কামরুননেসা গভ. গার্লস হাইস্কুলের সঙ্গে এবং মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি এইচ এস গার্লস হাইস্কুল মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সঙ্গে ড্র করেছে।
আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে রহমতউল্লাহ মডেল হাইস্কুল ২-০ গোলে জমিলা খাতুন লালবাগ গার্লস হাইস্কুলকে হারিয়েছে। রহমতউল্লাহর দুটি গোলই ইয়াসমিনের। দোলাইরপাড় হাইস্কুল ও ধানমন্ডি গভ. গার্লস হাইস্কুলের ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়েছে।

সৌরভের ব্যাটে কেকেআরের জয়

নিজে রান পাচ্ছিলেন না। দলও হারছিল। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের মাঝপথে এসে বেশ সমালোচনার মুখেই পড়তে হচ্ছিল সৌরভ গাঙ্গুলীকে। তবে কাল তিনি রানের দেখা পেলেন, ডেকান চার্জার্সকে ২৪ রানে হারাল কলকাতা নাইট রাইডার্স। এই জয়ে ৮ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পঞ্চম স্থানে উঠে এল তারা। ওয়েবসাইট।
প্রথমে ব্যাট করে ৬ উইকেটে কলকাতা করে ১৮১ রান। যার মধ্যে সৌরভ একাই করেছেন ৫৪ বলে ৮৮ (৯টি চার ও ৫টি ছক্কা)।
জবাবে খেলতে নেমে ৫ উইকেটে ১৫৭ রান তুলতে পারে ডেকান। হার্শেল গিবস ডেকানকে জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু ৫০ রানে শেন বন্ডের বলে হাসির হাতে গিবস ক্যাচ তুলে দিলে ডেকানের জয়ের আশা দুরূহই হয়ে পড়ে। অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস শেষ চেষ্টা করেছিলেন, ৩৭ বলে ৪৫ রান করে। কিন্তু দলকে জেতাতে পারেননি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: কলকাতা: ১৮১/৬ (সৌরভ ৮৮, হাসি ৩১; জাসকারান ২/১৮, সাইমন্ডস ২/২৬, ওঝা ২/৩৮)। ডেকান: ১৫৭/৫ (গিবস ৫০, সাইমন্ডস ৪৫, মনিশ ২৯; বন্ড ১/২৮, আগারকার ১/৩১, কার্তিক ১/২৯, ম্যাথুস ১/২৫, গেইল ১/৯)। ফল: কলকাতা ২৪ রানে জয়ী।

যেন ফিরে এল আইসিএল!

হাবিবুল বাশারদের আইসিএলে যাওয়া নিয়ে যতই বিতর্ক হোক, ঢাকা ওয়ারিয়র্সের ম্যাচের দিন ঠিকই টেলিভিশনের সামনে বসত সবাই। কখনো কখনো অনেকে হয়তো অবচেতনে গর্বিতও হয়েছে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে।
পিসিএলে কাল পাইরেটস অব চিটাগাং মনে করিয়ে দিল ক্রিকেটের বিদ্রোহী আসর আইসিএলের দল ঢাকা ওয়ারিয়র্সকে। ওয়ারিয়র্সেরই দুই ব্যাটসম্যান অলক কাপালি আর আফতাব আহমেদের ব্যাট কাল পাইরেটসের হয়ে ঝড় তুলল মরূদ্যান শারজায়, ঠিক যেন আইসিএলের মতোই! কিন্তু কজন দর্শকই আর তাঁদের এই জোড়া ফিফটি দেখেছেন? দর্শক বলতে তো পরবর্তী ম্যাচের খেলোয়াড়-কর্মকর্তা, আয়োজক, সাংবাদিক আর এটিএন বাংলার কলাকুশলীরাই! পিসিএল উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসা চার শতাধিক মানুষইবা গেল কোথায়?
তবে কাল ফাইনালে এই দর্শক-খরা থাকবে না বলেই মনে করছেন আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান আ জ ম নাছির উদ্দিন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসতে না পারলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরের মূর্ছনায় ভাসাতে ফাইনালের দিন মাঠে আসবেন শিল্পী মমতাজ, এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।
ফাইনালের আগে পিসিএলের দুটি সেমিফাইনালই আজ। আফতাব-অলকের জোড়া ফিফটিতে কাল কলকাতার দল বেঙ্গল টাইগার্সের বিপক্ষে ৩ রানে জিতে ‘বি’ গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছে পাইরেটস অব চিটাগাং। হেরেও বেঙ্গল টাইগার্স গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। আর গ্রুপপর্যায় থেকে ছিটকেই গেছে ঢাকা স্পোর্টস ক্লাব।
টসজয়ী পাইরেটস উদ্বোধনী জুটিতেই তুলে নেয় ৭৮ রান। ওপেনার হিসেবে নেমে আফতাব মাত্র ৩৫ বলে করেন ৫৭ রান। পাঁচ ছক্কার সঙ্গে তাঁর এই ইনিংসে ছিল তিনটি বাউন্ডারি। আর অলক কাপালির ৩৪ বলে করা ৫১ রানের ইনিংসে বাউন্ডারি ছয়টি ও ছক্কা দুটি। এই দুই ফিফটিতে পাইরেটসের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১৮৫। বেঙ্গল টাইগার্সের রাজেশ, সুজয় ও ইন্দোর রেড্ডি দুটি করে উইকেট নেন।
১৮৬ রানের জয়ের লক্ষ্যে প্রায় পৌঁছেই গিয়েছিল বেঙ্গল টাইগার্স অব ইন্ডিয়া। ১৯তম ওভারে পাইরেটসের রাশেদ হানিফকে শচীন রানা চারটি ছক্কা মারলে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ম্যাচে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৬ রান। কিন্তু বেঙ্গল টাইগার্সের ইনিংস থেমে যায় ১৮২ রানেই। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন আফতাব।
টপ স্পোর্টসকে ১৭ রানে হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপ থেকে পরশু রাতেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল চিটাগাং টাইগার্স।
‘বি’ গ্রুপে কাল মোহামেডানকে ৮ উইকেটে হারিয়ে সেমির টিকিট নিশ্চিত করেছে ব্রাদার্স। তারা সেমিতে মুখোমুখি হবে ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ পাইরেটস অব চিটাগংয়ের। অপর সেমিফাইনাল হবে বেঙ্গল টাইগার্স ইন্ডিয়া ও চিটাগং টাইগার্সের মধ্যে।
ব্রাদার্সের আজহার মাহমুদ এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ৫ উইকেট নেন। ম্যাচসেরা হন তিনিই। এ ছাড়া ব্রাদার্সের ইমরান নাজির অপরাজিত ৬৩ রান করেন।
স্কোরকার্ড
পাইরেটস অব চিটাগাং: ২০ ওভারে ১৮৫/৮ (আফতাব ৫৭, অলক ৫১, রনি তালুকদার ৩৭; সুজয় ২/১৪, ইন্দর ২/২৫, রাজেশ ২/৩২)। বেঙ্গল টাইগার্স: ১৮২/৫ (দেবেন্দ্র ৪৬*, শচীন রানা ৩৩*; ফরহাদ ১/৩০, শুভাশিস ১/৪০)। ফল: পাইরেটস অব চিটাগাং ৩ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: আফতাব আহমেদ।
মোহামেডান: ১৮.৪ ওভারে ১০৮ (শোয়েব ২২, ফয়সাল ২১, ব্লিজার্ড ১৬; আজহার ৫/১৮, রফিক ২/৯)। ব্রাদার্স: ১৫.৫ ওভারে ১১১/২ (ইমরান নাজির ৬৩*, নাজিমউদ্দিন ২২; ডলার ১/১৩, শোয়েব মালিক ১/১৫)। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: আজহার মাহমুদ।

সানিয়াকে নিয়ে টানাটানি

বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই মেয়েদের আসল ঠিকানা...। হঠাত্ এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক গবেষণা কেন? কারণ দিলওয়ার আব্বাসের একটি মন্তব্য। পাকিস্তান টেনিস ফেডারেশনের প্রধান মন্তব্য করেছেন, শোয়েব মালিকের সঙ্গে বিয়ের পর সানিয়ার উচিত পাকিস্তানের হয়ে টেনিস খেলা, ‘আমাদের টেনিসের জন্য এটা তো সুখবর। আমরা ওকে স্বাগত জানাই। এবং আশা করি, ভবিষ্যতে ও আমাদের হয়েই খেলবে। এশিয়ায় ঐতিহ্য অনুযায়ী মেয়েরা স্বামীর কথা শোনে। এ কারণেই আমি আশাবাদী, শোয়েব ওকে পাকিস্তানের হয়ে খেলতে অনুপ্রাণিত করবে।’
এদিকে এমন খবর চাউর হওয়ার পর একটু যেন উষ্মাই প্রকাশ করেছে সর্বভারতীয় টেনিস সংস্থা (এআইটিএ)। ‘সানিয়া এবং ওর অভিভাবক আমাদের নিশ্চিত করেছে, ও ভারতের হয়েই খেলবে’—বলেছেন এআইটিএর প্রধান।

মোহামেডান শূন্য আবাহনী এক

পেশাদার ফুটবল লিগের প্রথম পর্ব শেষে নতুন একজন খেলোয়াড় দলে নিয়েছে আবাহনী। মোহামেডান অবশ্য একজনও যোগ করেনি। আবাহনীর নতুন খেলোয়াড়টির নাম গিলবার্তো ফেলিক্স বেন। নাইজেরিয়ান এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার সোমবার ঢাকায় আসবেন।
প্রথম পর্ব শেষে দলবদলের বিশেষ ‘উইন্ডো’ চালু হয়েছে প্রথম পেশাদার লিগ থেকেই। কিন্তু এতে সাড়া পড়েছে সামান্য। খেলোয়াড় কেনাবেচায় অনভ্যস্ত ক্লাবগুলোর এটা নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনাও দেখা যাচ্ছে না।
তবে নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধনে কিছুটা সাড়া আছে। কাল শেষ হওয়া দলবদলে প্রায় ৩০ জন নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধিত হয়েছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ জন খেলোয়াড় নিয়েছে সিলেট বিয়ানীবাজার। প্রথম পর্বে নানা সমস্যায় জর্জরিত দলটি দ্বিতীয় পর্বে মাঠে নামছে নতুন রূপে। টাকা নিয়ে কয়েকজন খেলোয়াড় ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন বলে দলটি অভিযোগ তুলেছে বাফুফের কাছে এবং সেই খেলোয়াড়দের আর ফিরিয়ে আনতে না পেরে নতুন খেলোয়াড়দের ওপরই ভরসা রাখতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তবে একেবারেই অনভিজ্ঞ তরুণদের নিয়ে দলটি টিকে থাকতে পারবে কি না, সংশয় আছে।
একজন বিদেশিসহ চট্টগ্রাম মোহামেডান ৪ জন, ব্রাদার্সও ১ জন বিদেশিসহ ৪ জন, শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র ২ জন বিদেশি, রহমতগঞ্জ ১ জন বিদেশিসহ ৪ জন, চট্টগ্রাম আবাহনী ২ জন, আরামবাগ ২ জন, ১ জন বিদেশিসহ ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা, শুকতারা ৩ জন বিদেশি, ফেনী সকার ক্লাব ৩ জন স্থানীয় খেলোয়াড় নিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা দল

পাঠকদের ভোটে নির্বাচিত একাদশে শ্রীলঙ্কার বর্তমান এবং সাম্প্রতিক সময়ে অবসর নেওয়া ক্রিকেটারের সংখ্যাই বেশি। তবে সাবেক ক্রিকেটার ও সাংবাদিকদের ভোটে নির্বাচিত শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা একাদশে অভিষেক টেস্ট দলের অর্জুনা রানাতুঙ্গা বা অশান্ত ডি মেল যেমন আছেন, আছেন বর্তমান দলের মুত্তিয়া মুরালিধরন, লাসিথ মালিঙ্গারাও।
সর্বকালের সেরা একাদশ নির্বাচনের এই আয়োজনটা ক্রিকইনফোর। সাবেক খেলোয়াড় এবং সাংবাদিকদের ভোটে শীর্ষস্থানীয় টেস্ট দলগুলোর সেরা একাদশ নির্বাচন করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার আগেই নির্বাচন হয়ে গেছে আরও চারটি দেশের সর্বকালের সেরা একাদশ। শ্রীলঙ্কার দলটি নির্বাচনে সাংবাদিকেরা ছাড়াও জুরির দায়িত্ব পালন করেছেন সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমানে আইসিসির ম্যাচ রেফারি রঞ্জন মাদুগালে, সিদাথ ওয়েতিমুনি, রণজিত্ ফার্নান্ডো, রাসেল আরনল্ড ও রানিল আবেনায়েকে। জুরিদের নির্বাচিত সর্বকালের সেরা দল অরবিন্দ ডি সিলভা, মুত্তিয়া মুরালিধরন, কুমার সাঙ্গাকারা আর মাহেলা জয়াবর্ধনেকে রাখা নিয়ে কোনো দ্বিমতই ছিল না। তবে দলে দ্বিতীয় স্পিনার নিতে গিয়ে স্পষ্টই বিভক্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। সোমাচন্দ্র ডি সিলভা ও অজিত ডি সিলভা দুজনই পান ৩ ভোট করে। টেস্ট রেকর্ডটা অপেক্ষাকৃত ভালো বলে শেষ পর্যন্ত সোমাচন্দ্রই থেকেছেন দলে। ওপেনিং ব্যাটসম্যান নির্বাচনে এক জুরি সনাত্ জয়াসুরিয়ার প্রতিপক্ষ হিসেবে রোশন মহানামাকে দাঁড় করিয়ে দিলেও জয় জয়াসুরিয়ারই হয়েছে।
জুরি বোর্ডের দল ছাড়া পাঠকদের ভোটেও নির্বাচিত হয়েছে আরেকটি সেরা একাদশ। ওয়েবসাইট।
জুরিদের নির্বাচিত একাদশ: মারভান আতাপাত্তু, সনাত্ জয়াসুরিয়া, কুমার সাঙ্গাকারা, অরবিন্দ ডি সিলভা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, চামিন্ডা ভাস, রুমেশ রত্নায়েকে, অশান্ত ডি মেল, সোমাচন্দ্র ডি সিলভা, মুত্তিয়া মুরালিধরন।
পাঠকদের নির্বাচিত একাদশ: সনাত্ জয়াসুরিয়া, মারভান আতাপাত্তু, কুমার সাঙ্গাকারা, অরবিন্দ ডি সিলভা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, চামিন্ডা ভাস, লাসিথ মালিঙ্গা, রুমেশ রত্নায়েকে, মুত্তিয়া মুরালিধরন, অজন্তা মেন্ডিস।

এসএ গেমসের হিসাব কোথায়

দক্ষিণ এশীয় গেমস আয়োজনে ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। এর ফলে গেমসের জন্য বরাদ্দ টাকা নিয়ে ‘হরির লুট’ হয়েছে বলে গুঞ্জন চলছে জনমনে।
গত ২৯ জানুয়ারি শুরু হয়ে একাদশ দক্ষিণ এশীয় (এসএ) গেমস শেষ হয়েছে ৯ ফেব্রুয়ারি। পরপরই বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) সংশ্লিষ্ট উপকমিটিগুলোকে চিঠি দিয়ে সাত দিনের মধ্যে খরচের হিসাব চায়। ৫০ দিন পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব পায়নি বিওএ।
জানা গেছে, ২০টি উপকমিটির মধ্যে মাত্র তিনটি কমিটি তাদের হিসাব দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে—উত্সব (সেরিমনিজ) কমিটি, খাদ্য ও বাসস্থান কমিটি এবং ভেন্যু ব্যবস্থাপনা কমিটি। স্টিয়ারিং, সমন্বয়, বাজেট এবং বিপণন কমিটির খরচ তত্ত্বাবধান করেছে বিওএ অফিস। বাকি কমিটিগুলোর হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সেই কাজটি তাদের কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না।
উত্সব কমিটির দেওয়া হিসাব: ব্যান্ডদল লক্ষ্মীটেরা, অফিস এবং বিবিধ খরচ হয়েছে ৪১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, এই খাতে এখনো বকেয়া আছে ৩০ লাখ টাকা। এর মানে এই খাতে মোট খরচ ৭১ লাখ টাকা। আলোচিত অ্যাকুয়াটিক শো বাবদ খরচ হয়েছে ১১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বকেয়া আছে এক কোটি ৩০ লাখ। গ্যালারি ও মাঠ ডিসপ্লের জন্য খরচ ১০ কোটি ২৯ লাখ (বকেয়া ৩৬ লাখ), স্টেডিয়াম সংস্কার বাবদ খরচ তিন কোটি ৫২ লাখ (বকেয়া ৫৯ লাখ), আর্টস গ্রাফিকস, সংগীতায়োজন এবং নাচোলের রানী কাহিনির জন্য এক কোটি ৯৮ লাখ (বকেয়া ২২ লাখ) এবং স্টেডিয়াম সজ্জা ছয় লাখ, এলসিডি পর্দা দুই কোটি সাত লাখ (এখনো বকেয়া ২৫ লাখ), ক্যাম্পিং ও পরিবহন এক কোটি ২৯ লাখ, লজিস্টিক ৩১ লাখ টাকা।
মোট ৩৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা খরচের হিসাব দেখিয়েছে উত্সব কমিটি। পেয়েছে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ভেন্যু ব্যবস্থাপনা কমিটি খরচ দেখিয়েছে ২২ লাখ ১২ হাজার, পেয়েছে ২০ লাখ টাকা। খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা কমিটি খরচ দেখিয়েছে ১৬ কোটি ৭৫ লাখ, যার মধ্যে হোটেল বিলই ১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কমিটির সদস্যসচিব কাজী রাজীবউদ্দিন আহমেদ অবশ্য জানিয়েছেন, ‘আমরা তত্ত্বাবধান করেছি মাত্র। টাকাটা খরচ করেছে বিওএ।’
বিওএর দেওয়া তথ্য—১৬টি উপকমিটিকে ৪১ কোটি ৯২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বিনোদন উপকমিটি ৯৫ লাখ, টিকিট প্রিন্টিং ও গেট ম্যানেজমেন্ট ১৫ লাখ, পরিসংখ্যান-তথ্য কমিটি সাড়ে ছয় লাখ, টেকনিক্যাল উপকমিটি ২২ লাখ, মিডিয়া উপকমিটি ৪৭ লাখ (বিজ্ঞাপন বাবদ ২৯ লাখ), স্বেচ্ছাসেবক এক কোটি, মেডিকেল ৬০ লাখ ৬৮ হাজার, অভ্যর্থনা প্রটোকল-লিয়াজোঁ ৮৫ লাখ, নিরাপত্তা ২৫ লাখ, পরিবহন-ভ্রমণ-নিয়ন্ত্রণে ৩২ লাখ, স্মারক-মার্চেন্ডাইজিং-পুস্তিকা প্রকাশনায় এক লাখ, আমন্ত্রণ উপকমিটি ১৩ লাখ টাকা। ২৩টি ফেডারেশনকে দেওয়া হয়েছে চার কোটি ৩৭ লাখ টাকারও বেশি।
অনেক উপকমিটি এখনো তাদের সব খরচ পরিশোধ করেনি বলে জানা গেছে। অনেকে অবশ্য বলেছেন, বাজেটের চেয়ে কম খরচ হয়েছে। অনেকের দাবি, খরচ বেশি হয়েছে। অভ্যর্থনা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুর রহমান বাবুল যেমন কাল রাতে বললেন, ‘ট্রান্সপোর্টের কিছু খরচ এসে পড়ায় বিওএর দেওয়া টাকার চেয়ে খরচ আরও বেশি হয়েছে আমাদের।’
প্রশ্ন হচ্ছে, টাকা খরচের হিসাব কোথায়? কয়েকটি উপকমিটির কর্মকর্তারা বলছেন, হিসাব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রায় সবগুলো কমিটির প্রধান পদে ছিলেন সরকারি দলের সাংসদেরা, খুব ব্যস্ত বলে তাদের অনেকে সময় করে উঠতে পারছেন না। অন্য দায়িত্বশীলদেরও পাওয়া যাচ্ছে না সময়মতো। পাশাপাশি ‘দেব আর কি’ মানসিকতাও পেয়ে বসেছে অনেককে!
১৭২ কোটি টাকার গেমসে আয়োজন বাবদ ৪৯ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। পৃষ্ঠপোষকেরা দিয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। টাকা খরচের স্বচ্ছতা কতটা? বিওএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) ওয়ালিউল্লাহ জানিয়েছেন, ‘সেরিমনিজ (উত্সব) কমিটির দেওয়া হিসাব অডিট করতে দেওয়া হয়েছে। অডিটের আগে কিছু বলা যাবে না।’
বিওএর সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দলের শেফ ডি মিশন মিজানুর রহমান মানু বলেছেন, ‘দ্রুতই হিসাব দেওয়া উচিত কমিটিগুলোর। কোথায় কী খরচ হলো, সবার জানার অধিকার আছে। আশা করি, শিগগির সংবাদ সম্মেলন করে খরচের হিসাব দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা যাবে।’