Monday, January 12, 2026

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে আইন নয়, শক্তিই কি শেষ কথা by অ্যারন ব্লেক

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ভাষা ও আচরণ ক্রমে এমন এক রূপ নিচ্ছে, যাকে অনেকে রাজাসুলভ বলে মনে করছেন। দুই মাস আগে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা বিরোধীদের ‘নো কিংস’ আন্দোলনকে নাটকীয় বলে উপহাস করেছিলেন। তখন তাঁরা বলেছিলেন, ট্রাম্পকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতার বদলে রাজা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা বাড়াবাড়ি। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার, পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তারের তৎপরতা এবং ভেনেজুয়েলায় হামলার মতো ঘটনা ট্রাম্পকে রাজা হিসেবে দেখানোর চেষ্টাকে অনেকটা সার্থক বলে প্রমাণ করেছে।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, একমাত্র তিনি নিজে ছাড়া বাইরের কোনো কিছু তাঁকে থামাতে পারে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমার নিজের নৈতিকতা এবং নিজের মনই একমাত্র সীমারেখা।’

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চাপের মুখে আন্তর্জাতিক আইনের কথা স্বীকার করলেও শর্ত জুড়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় এই প্রেসিডেন্টের মতে, কোন আইন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, সেটি তিনি নিজে ঠিক করবেন। টাইমস এটাকে ট্রাম্পের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে স্পষ্ট স্বীকারোক্তি বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই মনোভাব শুধু ট্রাম্পের কথাতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর প্রশাসনের বক্তব্যেও একই সুর দেখা যাচ্ছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ভেনেজুয়েলার মতো একটি সার্বভৌম দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও ন্যায্যতা আছে। তাই সে দেশের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করে দেবে।

ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সিএনএনকে বলেন, বাস্তব পৃথিবী শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত হয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের ক্ষমা চাওয়া ছাড়া নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে।

ট্রাম্প ও ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠদের এসব দৃষ্টিভঙ্গি আইনের দিক থেকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মিলার একাধিকবার বলেছেন, ট্রাম্পের ক্ষমতা ‘প্লেনারি’, অর্থাৎ প্রায় সীমাহীন। ভেনেজুয়েলায় হামলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এ জন্য তাঁর কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তবে হামলার পর তাঁর প্রশাসন এটাকে সামরিক অভিযানের বদলে আইন প্রয়োগের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিচারিক পর্যালোচনা ছাড়া সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের হত্যা করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে।

সম্প্রতি কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে অবৈধ আদেশ দিতে পারেন। তাঁর প্রশাসন সেই বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বলে আখ্যা দেয়। অথচ ট্রাম্প অতীতে নিজেই প্রকাশ্যে নির্যাতন, সন্ত্রাসীদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার মতো অবৈধ আদেশ দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের মনোভাব—ট্রাম্পের আদেশ অবৈধ হতে পারে, এমন কোনো ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এ মানসিকতা যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেও লক্ষ করা যাচ্ছে। ট্রাম্প কিছুদিন আগে এমন এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যাতে বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শ কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইনের প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ও অ্যাটর্নি জেনারেলের মতোই চূড়ান্ত।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমে এমন এক পথে এগোচ্ছে, যেখানে আইন নয়, শক্তিই মূল নিয়ামক। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিনি ক্ষমতার সীমারেখা যেভাবে গায়ের জোরে ঠেলে বাড়াচ্ছেন, সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি তিনি বিশ্বমঞ্চেও প্রয়োগ করছেন। অনেকের চোখে, ঠিক এই জায়গাতে ট্রাম্পের রাজাসুলভ পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জ্বালানি তেল শিল্পের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জ্বালানি তেল শিল্পের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ৯ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্যুঘণ্টা ও জেন–জি মনস্তত্ত্ব by হেলাল মহিউদ্দীন

বাংলাদেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল কৌতূহলোদ্দীপক হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। যাঁরা ভোটার, তাঁরা বুঝতে পারছিলেন ফলাফল কী রকম হতে পারে।

ফেসবুকে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছি। প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর এ রকম ফলাফল কেন হয়েছে, জানতে চেয়ে তাঁদের কয়েকজনের কাছে নির্মোহ মতামত দেওয়ার অনুরোধ রেখেছি। উত্তরদাতাদের নির্বাচনের আগে তাঁদের প্রোফাইল ও পোস্টগুলো ভালোমতো পর্যালোচনা করেছি। যাঁদের চিহ্নিত করতে পেরেছি ছাত্রশিবির, ছাত্রদল বা বাম সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক হিসেবে, তাঁদের নির্বাচিতদের তালিকায় রাখিনি। আপাতনীরব, আপাতনিরপেক্ষ, ফেসবুকে তেমন সক্রিয় নন, খুব বেশি পোস্ট দেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেন, তাঁদের বেছে নিয়েছি।

আমার ইমেইল দিয়ে জানিয়েছি, ইচ্ছা করলে তাঁরা তাঁদের মতামত জানাতে পারেন। বেশির ভাগই মতামত দিয়েছেন। সবশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন বিষয়েও কয়েকটি মতামত পেয়ে গেছি।

বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে চমৎকার গবেষণা শুরু করতে পারেন। চমকপ্রদ ফলাফল পাবেন, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বুঝতেই গবেষণা দরকার।

আমার অনুরোধে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা সাড়া দিয়েছেন বেশি। তাঁদের বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পর্যালোচনার শক্তিও ছাত্রদের চেয়ে শক্তিশালী মনে হয়েছে। যা–ই হোক, উত্তরদাতাদের ভাষ্যগুলোর সংযোগ-সমন্বয় ও পুনঃপর্যালোচনা করার পর নিশ্চিত হলাম, ছাত্রশিবিরের জয়জয়কারকে শুধু সাময়িক বিস্ময়-ঘোরজাগানো ঝাঁকুনি ভাবলে বাংলাদেশের সামাজিক রাজনীতির নতুন গতিপথ ও বাঁক-সন্ধিগুলো চেনা যাবে না।

২.

বাংলাদেশে গ্রাম-সমাজ ও মফস্সলের নিম্নমধ্যবিত্তদের সন্তানেরা দ্রুত শহুরে মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। আমরা যাঁদের জেন-জি বলি, এঁরা তাঁরাই। বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির গতিপথও তাঁরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ, তাঁদের ভুবনদৃষ্টি তাঁদের আগের দুটি প্রজন্ম (মিলেনিয়াল ও জেনারেশন এক্স) থেকে আলাদা। আলাদা হওয়ার পরও জেন-জিদের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ, জানাশোনা ও বোঝার মিথস্ক্রিয়া এই দুই প্রজন্মের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। জেন-জিদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মানস গড়ে উঠেছে এই দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাব-ভাবনার ঠিক-বেঠিক, ভুলভ্রান্তি দেখেশুনেও পর্যালোচনা করে।

জেন-আলফারা এখনো বয়সে ছোট। মাত্র বারো-তেরো বছরে বা কৈশোরে পড়েছে জেন-আলফাদের প্রথম সারিটি। জেন-জিদের অন্য রকম শক্তির বড় উৎস জেন-আলফাদের সঙ্গেও জেন-জিদের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতাই থাকবে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ জেন-জিরাই একমাত্র প্রজন্ম, যারা চারটি জেনারেশনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সক্রিয়। জেন-আলফাদের ওপরও তাদের প্রভাব হবে অপরিসীম।

এ আলাপকে আপাতদৃষ্টে খাপছাড়া বা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হলেও পাঠক শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে বুঝবেন, কীভাবে বিষয়গুলো অঙ্গাঙ্গি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।

৩.

উত্তরদাতাদের একজনের মতামত ছিল দীর্ঘ। মতামত না বলে একটি চোখ খুলে দিতে পারা কেস স্টাডি বলাই ভালো। সেটিই সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখছি।

লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যাকে পছন্দ হবে, তাকেই ভোট দেব। কিন্তু মা বললেন—যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই। মাকে ভালোবাসি, তাঁর কথা ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তেমন সচ্ছল নই। বাবা মফস্সলে একটি ওষুধের দোকান চালান। একসময় জাসদ করতেন, পরে খানিকটা আওয়ামী লীগপন্থী। মা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। কখনোই শুনিনি জামায়াত-শিবির পছন্দ করতেন। বড় ভাই আমার চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়। ছাত্রদল করতেন সক্রিয়ভাবে। দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম—মা বলছেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিতে। তোমাদের কী মত? দুজনই বললেন—তোমার যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করো।

‘বাবা ও বড় ভাই স্বভাবে বেশ কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার পরও আমার বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন দেখে নিজেকে সম্মানিত লাগছিল। কিন্তু মার অনুরোধের কারণ জানার কৌতূহলটি গেল না। তাই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি আবার কবে জামায়াত-শিবির হলে?

‘মা জানালেন—কখনো হননি, এখনো না। কিন্তু ওনার স্কুলেরই আরেক সহকর্মী নারীর পরিবার জামায়াতের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনকালের কোনো এক সময় তাঁর পুরো পরিবার ও স্বজন যেভাবে নির্যাতিত-নিগৃহীত হয়েছে, ভাষায় প্রকাশের অতীত। সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা, ভদ্রমহিলার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেটিকে তার চার বন্ধুসহ ছাত্রলীগের পান্ডারা তুলে নিয়ে যায় এবং এমনই নির্যাতন চালায়, ছেলেটি এখনো ট্রমাগ্রস্ত। ছেলেটি ক্লাস টেনেও সেরা তিনজন ছাত্রের একজন ছিল। কিন্তু আর পরীক্ষাই দিতে পারেনি। সে এবং তার চার বন্ধুর চারজনই একসময় মার প্রাইমারি স্কুলেরই ছাত্র ছিল। মার ভাষায়, পাঁচজনই ছিল ভালো ছাত্র, ভদ্র, শান্তশিষ্ট ও অমায়িক। ছাত্রশিবিরও করত না। কিন্তু মাত্র একজনের পারিবারিক জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অপরাধে পাঁচটি ছেলের জীবন, ভবিষ্যৎ, পাঁচটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।

‘মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—তোমার কলিগ ভদ্রমহিলাই কি তোমাকে অনুরোধ করেছেন আমাকে বলতে যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই? মা জানালেন—না! ভদ্রমহিলাকে স্কুলে দেখামাত্রই তাঁর নিজ থেকে মনে হতো আমাকে বলবেন। কিন্তু বলতে ভুলে যান। সেদিন আর ভোলেননি। মার তীব্র অপরাধবোধ—ভদ্রমহিলার জন্য নামাজে বসে দোয়া করা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি। আমাকে অনুরোধ জানানোকে তিনি সামান্য হলেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হবে ভেবে নিয়েছেন।

‘আগে জানতাম ভোট দিতে পারলে বাবা-মা কোন দলকে ভোট দিতেন। এবার সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলছেন—কোনো দলকে নয়, ব্যক্তিকে—সত্যিকারের যোগ্যজনকেই ভোট দেবেন। আমিও সেভাবেই ভোট দিয়েছি।’

৪.

কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়? কোথাকার ভোট কোথায় এসে কীভাবে কোন প্রার্থীর বাক্সে জমা হয়! ঘটনাটি আবারও দেখায়, বাংলাদেশের সমাজ এখনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, নিকটজনের পারস্পরিক বিজড়নের একটি মানবিক সত্তা, একটি নেটওয়ার্ক। কান টানলে মাথা আসার মতো। ছাত্রীটি জেন-জি। তাঁর বড় ভাই মিলেনিয়াল বা জেন-ওয়াই। মা–বাবা জেন-এক্স। তিন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁর মানস গঠনও তাই অনেক পরিণত।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। প্রথম সংসদীয় সরকারটি জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে না পারলেও ভালো-মন্দ, ভুলত্রুটি মিলিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে খুব একটা হতাশ করেনি। সম্ভাবনা বাড়ছিল।

ছিয়ানব্বই হতেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতনের শুরু। তারপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড খারাপ থেকে খারাপতর এবং চব্বিশে এসে চূড়ান্ত খারাপতম হয়েছিল। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল দুর্নীতির বরপুত্র, পুঁজিপতি, বেনিয়া, লুটেরা, টাকা পাচারকারী ঋণখেলাপিদের হাতে।

মফস্‌সল থেকে উঠে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক শ্রেণি হয়ে ওঠা দূরে থাক, বড় অংশই ছিটকে দূরে সরে গেল। যারা রাজনীতিতে নামল, তারা সরাসরি উচ্চবিত্তের খাতায় নাম লেখাল। পদ্ধতি অবশ্যই লুটপাট, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর নিজ মুখে স্বীকারোক্তি তাঁর পিয়নের চার শ কোটি টাকার মালিকানা। রূপপুর প্রকল্পের এক বালিশের মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হওয়া। হাদির হত্যাকারী ফয়সালের মতো ওয়ার্ড পর্যায়ের সন্ত্রাসীর ঘরে পৌনে তিন শ কোটি টাকার ব্যাংক চেক মেলা। সম্রাটদের ঘরে সিন্দুকে, ফ্রিজে হাজার কোটি টাকা মেলা। ব্যাংক থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট। গুন্ডাতন্ত্রের ছোবল থেকে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নিস্তার না মেলা। আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড।

জেন-এক্স (ছাত্রীটির পিতার প্রজন্ম) তিনটি পর্বের প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। জেন-এক্স অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হওয়ার মতো কিছু করতে পারেনি। ফলে তাদের নৈতিক শক্তিও সামান্যই। তাই জেন-জিদের চোখে তারা ব্যর্থ। পুরোনো রাজনীতিতে তাদের বলিদান জেন-জিদের তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন সম্পর্কে ভাবনা গড়ে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শক্তি দিয়ে সবকিছু পদানত রাখার চেষ্টা বুমেরাং হয়েছে। অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতেও একই সুর পেলাম। প্রায় সবাই জানালেন, আত্মীয়স্বজন পরিমণ্ডলে একই রকম ঘটনা দেখেছেন, শুনেছেন, জেনেছেন।

৫.

ছাত্রশিবিরের জয় মানে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির জয় ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। বরং বিষয়টির বড়সড় বার্তা—‘ওল্ড স্কুল পলিটিকস’ বাংলাদেশে আর কাজ করবে না। মতামতদাতাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের পেছনে বিবেচনায় ছিল কোন প্রার্থী কতটা গোছানো, সুশৃঙ্খল এবং নির্ভরযোগ্য; কারা কতটা বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন। কোন দল কোন রাজনৈতিক আদর্শবাদ প্রতিষ্ঠা করবে বা না করবে, তাদের বিবেচনায় ছিল না। কারা ধর্মাশ্রয়ী কারা নয়, কারা জাতীয়তাবাদী কারা সমাজতন্ত্রী, বিষয়গুলো তাঁদের মধ্যে কোনো আবেদন তৈরি করেনি। কোন ব্যানারে ভোট করছেন, তা-ও নয়। তাঁদের যাপিত জীবনের সমস্যা সমাধানে কোন প্রার্থীকে সত্যিকার আন্তরিক, সৎ, নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে, সেটিই দেখেছেন বেশি।

আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলাপ পেয়েছি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ছাত্রসংগঠনের মূল পিতৃপ্রতিম রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা যেন ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়। ‘ঘরপোড়া গরুদের সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুন ভাবা’র মতো। আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য তাঁরা দেখেছেন। ভয়—এখানেও ক্ষমতা, সরকারেও ক্ষমতা; এত বেশি ক্ষমতার আঁচে তারাও যদি ছাত্রলীগের মতোই দানবীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। সেটি হতে না দেওয়াও শুদ্ধির একটি পথ।

একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংসদে এলে বরাদ্দ পেতে, সরকারি আনুকূল্য পেতে, উন্নয়ন ও ছাত্রকল্যাণের কাজগুলো করতে ঝক্কিঝামেলা কমবে। এ ভাবনা কখনোই সঠিক প্রমাণিত হয়নি। জেন-জিরা সেটি জেনেছে। জানার আলোকে নতুন পথ ধরতেও শিখেছে। ‘নিউ স্কুল পলিটিকস’ অনেকটা এ রকম শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিণত হয়ে উঠবে সম্ভবত।

৬.

জেন-জিদের চোখে বর্তমান সময়টি একটি ‘কারেকশন ফেজ’। আর ‘ভুল করা যাবে না’ প্রতিজ্ঞার সময়। তাই সক্রিয় রাজনীতির বাইরের আপাত-অরাজনৈতিক জেন-জিরাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুদ্ধি আনতে অবদান রাখছে। শুদ্ধি পর্বটি চলছে পাঁচটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। যাতে শেষমেশ একটা সময়ে গিয়ে মোটামুটি পরিশুদ্ধ একটি রাজনীতির পথ তৈরি হয়।

দেখা যাক প্রক্রিয়া পাঁচটি কী কী:

এক. নিরীক্ষণ (স্ক্রুটিনি) ও পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) : ‘গতানুগতিক পথে হেঁটে বাপ-দাদারা অনেক তো দেখেছে। এবার একটু ভিন্নভাবেই না হয় হেঁটে দেখি—কী হয় দেখা যাক’ ভাবনা। জেন-জিদের মধ্যে এই মনোভাব প্রবল। আমরা জেন-এক্সরা ভাবতাম—ওকে ভোট দেব? সে তো জিতবে না। মাঝে ভোটটিই নষ্ট হবে। জেন-জিরা ‘ভোট নষ্ট’ ধরনের সেকেলে তত্ত্বটির ধার ধারে না। কালোকে কালো, সাদাকে সাদাই দেখে!

দুই. মূল্যায়ন (ইভালুয়েশন): ‘দেখলাম তো কে কতটা কী করেছে না করেছে; আমাদের হিসাব-নিকাশ যথেষ্টই করা হয়ে গেছে’—এই ভাবনা। এরা অতীতের ক্ষমতাসীনদের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন দলান্ধ জেন-এক্সদের চেয়ে অনেক বেশি নির্মোহভাবে করতে পারে।

তিন. পর্যবেক্ষণ (অবজারভেশন) ও পরিবীক্ষণ (মনিটরিং): ‘সবকিছুতেই চোখ রাখছি, কোনো কিছুই নজর এড়াচ্ছে না’, ‘সবকিছু মনে রাখা হবে’ ভাবনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দখল থাকার সুবাদে প্রজন্মটির এক বড় অংশ নিত্যদিনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখে এবং বিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করে। দল-মত-পথ অন্ধভাবে মেনে নেয় না।

চার. বর্জন (রিজেকশন) : চিরাচরিত উত্তরাধিকারের রাজনীতি বর্জন বড় উদাহরণ। পুরোনো রাজনীতির একটি ধারাবাহিকতা ছিল বাবা যে দল করে, পুরো পরিবার সে দলই করে। তিনজন মতামত দানকারী জানিয়েছেন, তাঁদের বংশপরম্পরা আওয়ামী লীগ রাজনীতির। তবু তারা পরিবারকে অসন্তুষ্ট করেই লীগের রাজনীতিকে সজ্ঞানে বর্জন করেছে।

পাঁচ. শুদ্ধীকরণ (কারেকশন) : ‘রাজনীতিবিদেরা ভুল করলে ছাড় দেওয়া হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, লিখে-এঁকে, ট্রল করে যতভাবে সম্ভব তাদের শুদ্ধির পথে ঠেলে দিতে হবে’ মনোভাব। মতামত দানকারীদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের বিবেচনা ছিল—তাকেই ভোট দেব, যে চুরিদারি করবে না, টাকা মেরে খাবে না, লাইসেন্স-পারমিট নেবে না, নেতার পেছনে ছুটবে না, নেতার নামে স্লোগান দেবে না, কাউকে মিছিলে যেতে বাধ্য করবে না, গেস্টরুম আর সিট বরাদ্দের রাজনীতি করবে না, গুন্ডামি-মাস্তানি-দাদাগিরি ও ক্ষমতার দাপট দেখাবে না।

রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়ী ও কালোটাকার মালিকদের সংসদীয় আসনের সিট কেনাবেচা, টাকাপয়সায় দৌরাত্ম্য, রাজনীতির মাঠ দখল আবারও শুরু হয়েছে। জেন-জিদের ভোটিং বিহেভিয়ার এ বার্তাও দিচ্ছে—এই আয়োজনগুলো কিছুদিনের জন্য সাময়িক সাফল্য দিলেও জেন-জিরা তাদেরও বেশি দিন টিকতে দেবে না। কারণ, আগামী কয়েকটি বছর বাংলাদেশের রাজনীতি বিচিত্র ধরনের শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এই নতুন প্রক্রিয়া আমাদের চিরাচরিত রাজনীতির পূর্বানুমান ও হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করেই এগোবে।

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের।
৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের। ছবি: প্রথম আলো

ইরানে হামলা নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করল মার্কিন সামরিক বাহিনী

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেনা কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ধরনের হামলার জন্য এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি এবং আরও সময় প্রয়োজন। এর মধ্যেই ইরানে টানা আরেক রাত জুড়ে ভয়াবহ বিক্ষোভ হয়েছে। অনলাইন নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। তবে জানা গেছে, ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন। কোনো কোনো মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, তিনি পেন্টাগনকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, শিগগিরই কিছু করবেন। তাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকাও দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সেইসব নিরাপত্তা সংস্থার অংশ, যারা বিক্ষোভ দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযানের জন্য দায়ী বলে অভিযুক্ত। তবে অঞ্চলটিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধের ঝুঁকি মাথায় রেখে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ‘নিজেদের সামরিক অবস্থান সুসংহত করতে এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুত করতে হবে’।

ট্রাম্পের হুমকি ও সম্ভাব্য লক্ষ্য

রিপোর্টে আরও বলা হয়, ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হওয়ায় ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ‘হস্তক্ষেপ করবে’। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যদি নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘খুব, খুব কঠোরভাবে- যেখানে সবচেয়ে বেশি ব্যথা পায়, সেখানেই আঘাত করবে।’ হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্পকে যেসব বিকল্প জানানো হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- তেহরানে অবস্থিত অসামরিক কিন্তু কৌশলগত স্থাপনায় হামলা, অথবা শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দিষ্ট কাঠামোতে আঘাত।

ওদিকে রোববার দিবাগত রাতভর বিক্ষোভ চলতে থাকে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আন্দোলন এখন ২০২২ সালের হিজাববিরোধী আন্দোলনের চেয়েও বেশি তীব্র ও বিস্তৃত হয়েছে। রোববার সকাল পর্যন্ত প্রায় ১৯২ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রোববার সকালে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে আবিয়েক শহরে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হচ্ছে।

mzamin

বিক্ষোভের পর ইরানের পরিস্থিতি ‘পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে’: দাবি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির

ইরানজুড়ে চলমান অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পরিস্থিতি এখন ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আজ সোমবার তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ দাবি করেন।

বৈঠকে আরাগচি বলেন, গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভকে পরিকল্পিতভাবে ‘রক্তাক্ত ও সহিংস’ করা হয়েছে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি ‘অজুহাত’ খুঁজে পান।

আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে সংলাপের পথও খোলা রেখেছি।’ তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশে দ্রুত ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার কাজ চলছে। বিশেষ করে দূতাবাস ও সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোয় দ্রুত সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নাম উল্লেখ না করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতিহাসের ‘অহংকারী স্বৈরশাসকদের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। খামেনি লিখেছেন, ‘যিনি দম্ভের সঙ্গে বসে সারা বিশ্বকে বিচার করছেন, তিনি জেনে রাখুন—ফেরাউন, নমরুদ ও রেজা শাহর মতো অহংকারী শাসকেরা যখন ক্ষমতার চূড়ায় ছিলেন, তখনই তাঁদের পতন হয়েছিল। তাঁর (ট্রাম্প) পতনও অনিবার্য।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-08%2Fi54g8tqv%2Fprothomalo-Iran.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ফাইল ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে ইরানের হুঁশিয়ারি

ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব–নিকাশ’ না করার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটনের হামলার জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ–এর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিক্ষোভকারী। তবে রয়টার্স নিহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। ইরান সরকারিভাবে হতাহতের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে।

‘দাঙ্গাবাজদের’ সমাজ অস্থিতিশীল করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ‘প্রতিবাদ জনগণের অধিকার’ উল্লেখ করে গতকাল তিনি বলেছেন, ‘জনগণকে এটা বিশ্বাস করা উচিত যে আমরা (সরকার) ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পড়েছে ইরান। মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ এরই মধ্যে দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

চলমান এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে ‘হস্তক্ষেপের’ হুমকি দিয়েছেন। ইরানি নেতৃত্বকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। গত শনিবারও ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’।

এর পরদিন গতকাল ইরানের পার্লামেন্টে স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব’ না করার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এই কমান্ডার বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, ইরানে হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।’

ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে চলমান অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে।

বিক্ষোভ মোকাবিলার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে। এতে করে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস গতকাল জানিয়েছে, ইরানে ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ গতকাল জানায়, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী; নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন ৪৮ জন।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন পশ্চিমাঞ্চলের গাচসারান, ইয়াসুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও দাফনের দৃশ্য প্রচার করেছে।

গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতে রাজধানীর তেহরানের পুনাক এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে একটি সেতু বা ধাতব কাঠামোয় আঘাত করছেন। রয়টার্স ভিডিওটিতে দেখানো স্থানটি যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘জনগণের যদি কোনো উদ্বেগ থাকে, আমরা তা শুনব। এটি আমাদের কর্তব্য। কিন্তু সর্বোচ্চ কর্তব্য হলো দাঙ্গাবাজদের সমাজকে অস্থিতিশীল করতে না দেওয়া।’ তিনি ‘দাঙ্গাবাজদের’ বিরুদ্ধে জনগণকে এক হওয়ার আহ্বান জানান।

পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দোষারোপ করে বলেন, তারা অস্থিরতাকে আরও উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘তারা দেশ ও বিদেশের কিছু ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তারা বিদেশ থেকে সন্ত্রাসীদের দেশে (ইরান) নিয়ে এসেছে।’

‘যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত’

গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ইরান এখন বেশি করে স্বাধীনতা খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত!’

এদিকে ইসরায়েলি একটি সূত্র জানায়, শনিবার টেলিফোনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনায় উপস্থিত একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তাও নেতানিয়াহু এবং রুবিওর মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি আলোচনার বিষয়বস্তুর বিষয়ে কিছু জানাননি।

‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়’ ইসরায়েল

সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠকে উপস্থিত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তবে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

ইসরায়েল সরকারের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সেনাবাহিনীও তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানে বিমান হামলা চালায়। জবাবে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান।

ইসরায়েল এখনো সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। তবে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দেশ দুটির মধ্যে বরাবরই উত্তেজনা রয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-11%2F36tz92h4%2FSmoke-rises.png?rect=82%2C0%2C795%2C530&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ঠিক হবে কি না, সন্দিহান কোনো কোনো মার্কিন সিনেটর

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সঠিক পথ হবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা গতকাল রোববার প্রশ্ন তুলেছেন। ইরানে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সন্দিহান তাঁরা।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন। তবে গতকাল রোববার অন্তত দুজন সিনেটর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে সতর্ক করেছেন।

রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল এবিসি নিউজের দিস উইক অনুষ্ঠানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি জানি না, ইরানকে বোমা মারলে তা উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফল দেবে কি না।’

পল এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বলেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করার বদলে দেশটির ওপর সামরিক হামলা চালানো হলে তা মানুষকে বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলতে পারে।

ওয়ার্নার ফক্স নিউজ সানডেকে বলেন, ইরানের ওপর সামরিক হামলা হলে তা ইরানিদের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমনভাবে একত্র করে তুলতে পারে, যা আগে সেখানকার শাসকেরা করতে পারেননি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কতটা ঝুঁকি আছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর উল্লেখ করেন, ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানের সরকার উৎখাতের ঘটনা এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা ধীরে ধীরে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে দেশটিতে ধর্মীয় শাসনের উত্থানে পথ তৈরি করেছে।

গতকাল রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান নিয়ে কী করা যায়—সে বিষয়ে সাইবার হামলা, সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করবেন।

ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বরাবরই কড়া পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের উচিত ‘বিক্ষোভকারীদের সাহস জোগানো এবং [ইরানি] শাসকগোষ্ঠীকে ভীষণভাবে ভয় দেখানো।’

ফক্স নিউজের ‘সানডে মর্নিং ফিউচারস’ অনুষ্ঠানে গ্রাহাম বলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আমি যদি আপনার জায়গায় থাকতাম, তাহলে যারা মানুষ হত্যা করছে, সেই নেতৃত্বকেই হত্যা করতাম। আপনাকে এটার অবসান ঘটাতেই হবে।’

১৯৭৯ সালে ইরানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যাওয়া শাহর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া ছেলে রেজা পাহলভি গতকাল রোববার বলেছেন, তিনি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিতে ইরানে ফিরে যেতে প্রস্তুত।

সানডে মর্নিং ফিউচারসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যে এ নিয়ে পরিকল্পনা করছি।’

রেজা পাহলভি বলেন, ‘আমার কাজ হলো এই রূপান্তরে নেতৃত্ব দেওয়া—যেন কোনো কিছুই ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকে, যেন পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, যেন মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের নেতা নির্বাচন করার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা ঠিক করার সুযোগ পায়।’

ইরানে বিক্ষোভের সমর্থনে ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের বাইরে অধিকারকর্মীদের সমাবেশ। ১০ জানুয়ারি, ২০২৬
ইরানে বিক্ষোভের সমর্থনে ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট হাউসের বাইরে অধিকারকর্মীদের সমাবেশ। ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

ইরানে বিক্ষোভে নিহত পাঁচ শতাধিক: মানবাধিকার সংস্থা

ইরানে চলমান বিক্ষোভে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)। রোববার এমন এক সময়ে এ তথ্য সামনে এল, যখন বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে শক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানে ২০২২ সালের পর এবারই সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। এতে করে দেশটির শাসকগোষ্ঠী নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে তারা গত দুই সপ্তাহে ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতে পেরেছে। একই সময়ে ১০ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। অন্যদিকে রয়টার্সও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রোববারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার ট্রাম্পকে তাঁর কর্মকর্তারা ইরান-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ব্রিফ করার কথা ছিল। এতে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা আরও সম্প্রসারণ এবং সরকারবিরোধী অনলাইন সোর্সগুলোকে সহায়তা দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব-নিকাশ’ করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এ কমান্ডার বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইরানের ওপর হামলা হলে অধিকৃত ভূখণ্ডসহ (ইসরায়েল) যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ নিশানায় পরিণত হবে।’

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। কিন্তু দ্রুত তা সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়। ইরানের বর্তমান সরকারের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিক্ষোভে ইন্ধন জোগাচ্ছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরান প্রায় সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দেশটির পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-11%2F8k73ejfl%2FSmoke-rises.png?rect=90%2C0%2C972%2C648&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

ওয়াইসির ঘোষণা: একদিন হিজাব পরা মহিলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন

একদিন হিজাব পরা মহিলাই দেশের (ভারতের) প্রধানমন্ত্রী হবেন। মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় ভোটপ্রচারে গিয়ে একথা বলেন, আইএমআইএম সুপ্রিমো সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি বলেন, বাবা সাহেবের সংবিধানে বলা আছে যে ভারতের যেকোনো নাগরিক প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা মেয়র হতে পারেন। আমার স্বপ্ন, এমন একটি দিন আসবে যখন একজন হিজাব পরা নারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার মতে, বর্তমান সরকার সংখ্যালঘুদের ঘৃণা করে। মেয়েদের হিজাব পরাতেও নিষেধাজ্ঞা জারি করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই হিজাব পরা মহিলাই একদিন  ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ওয়াইসি আরও বলেন, আমরা হয়তো সেই দিনটি দেখতে আসব না, কিন্তু এমন একদিন আসবে যখন এটি সম্ভব হবে।

তার মতে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তোমরা যে ঘৃণা ছড়াচ্ছ, তা বেশিদিন টিকবে না। যারা ঘৃণা ছড়ায় তাদের শেষ হবে। যখন ভালোবাসা সাধারণ হয়ে উঠবে, তখন তারা বুঝতে পারবে মানুষের মন কীভাবে বিষাক্ত করা হয়েছিল।
ওয়াইসির এই মন্তব্যে শিবসেনা এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তীব্র প্রতিক্রিয়া  জানিয়েছে। ওয়াইসির মন্তব্যের পরপরই বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা  তাকে চ্যালেঞ্জ করেন যে তিনি একজন ‘পাসমান্দা’ মুসলিম বা হিজাব পরা মহিলাকে এআইএআইএম-এর সভাপতি করুন। তিনি বলেন, হিজাবওয়ালি প্রধানমন্ত্রী হবেন বলেছেন মিঞা ওয়াইসি।

তবে আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি যে প্রথমে একজন পাসমান্দা বা হিজাবওয়ালিকে নিজের দলের সভাপতি করুন। শিবসেনার মুখপাত্র শায়না এনসিও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আসাদুদ্দিন ওয়াইসি, প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য কোনও শূন্যপদ নেই। নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা সকলের জানা। প্রথমে আপনার সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত হতে দিন, তারপর একজন প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন দেখুন। হ্যাঁ, এক পর্যায়ে, আমরাও একজন মহিলা প্রধানমন্ত্রী চাইব, তবে তা জাত, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়। বরং তার ভালো কাজ এবং ভারতের জনগণের জনপ্রিয় ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে তা হবে বলে শায়না জানান।

mzamin

ঢাকা শহরে একজন ‘জোহরান মামদানি’ কোথায় পাব by কাজী আলিম-উজ-জামান

এ বছরের প্রথম দিনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানি শপথ নিয়েছেন। বৈচিত্র্যের কারণে নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘বিশ্বের রাজধানী’। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই শহরটির নতুন মেয়রের বয়স মাত্র ৩৪ বছর। আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করা মামদানি নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র, যিনি পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিয়েছেন।

২০২৫-এর নভেম্বরের নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় প্রমাণ করে, গ্রাসরুট ক্যাম্পেইন বা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণা বড় শক্তিকে রুখে দিতে পারে। মামদানি প্রমাণ করেছেন, সততা আর হাসিমুখ নিয়ে মানুষের কাছে গেলে মানুষ ফিরিয়ে দেয় না।

মামদানির প্রচারণা ছিল সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। রেন্ট ফ্রিজ অর্থাৎ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়ানো যাবে না। গণপরিবহন হবে ফ্রি। সরকারি মুদিদোকান থেকে মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য থাকবে নিখরচায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। শহর হবে সবুজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনা হবে বিপ্লব। আর ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’দের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। বিশেষ করে এটা ছিল জোহরান মামদানির হাউজিং পলিসির মূল স্তম্ভ।

নিউইয়র্কে ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’ বা ‘স্লামলর্ডস’ বলতে বোঝায়, যাঁরা ভাড়াটেদের অধিকার লঙ্ঘন করে বাড়ির জিনিসপত্র মেরামত করে না, হ্যাজার্ডাস পরিবেশ তৈরি করে রাখে, অবৈধ ফি আরোপ করে। মামদানি এদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি নিয়েছেন।

শপথের পরপরই মামদানি ‘মেয়রস অফিস অব মাস এনগেজমেন্ট’ গঠন করেছেন, যাতে নাগরিকেরা সরাসরি শহর পরিচালনায় অংশ নিতে পারেন। নিউইয়র্কবাসীর জন্য এটা একেবারেই নতুন ধারণা। অর্থাৎ সব মিলে পরিবর্তন আসছে।

২.

জোহরান মামদানির মেয়র হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ২৪ মিনিট ধরে বক্তৃতা দিলেন তিনি। বললেন বিস্তৃত ও সাহসিকতার সঙ্গে নিউইয়র্ক শাসন করার কথা।

নিশ্চয়ই মামদানির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তিনি যে বিনা পয়সায় অনেক কিছু দেওয়ার বা করার পরিকল্পনা করেছেন, এর জন্য চাই অর্থ। এই অর্থ তিনি আনবেন ধনীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করে। কিন্তু সেটা করলে ধনীরা নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে পারেন, এমন আলোচনাও আছে। আর যেকোনো কিছু করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ‘বিরোধী পক্ষ’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা।

মুখোমুখি অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনই সরে এসেছেন। মামদানির সামনে নিশ্চয় আরও অনেক বাধাবিপত্তি আছে, যেগুলো গণমাধ্যমে খুব করে আসেনি। আর কাজ করতে গেলে বাধা, চ্যালেঞ্জ আসবেই। যিনি জনগণের কাজে নামবেন, তাঁর কিছু ভুলও হবে। যিনি কোনো কাজ করবেন না, তাঁর ভুলও হবে না।

প্রায় এক বছর ধরে জোহরান মামদানির কথাবার্তা, আচরণ, ভাষণ, চিন্তা-বিশ্বাস—প্রায় সবকিছু অনুসরণ করছি। কখনো কখনো তাঁকে মনে হয়েছে যেন তরুণ বারাক ওবামা। ২০০৮ সালে ওবামা যখন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য লড়ছিলেন, পরে মনোনয়ন পেলেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করলেন, তাঁর তখনকার সেই ভাষণগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনে হলো, নিউইয়র্কে আরেকজন বারাক ওবামা উঠে এসেছেন।

বিষয়টি আলাপ করছিলাম সহকর্মী তাসনিম আলমের সঙ্গে। তাসনিম মত দিলেন, দুজনের ভাষণের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওবামা বক্তৃতাটা ভালো দিতেন নিঃসন্দেহে। তবে মামদানির বক্তৃতায় বাড়তি যেটা পাওয়া যায়, সেটা হলো বিশ্বাস। মনে হয় তিনি বিশ্বাস থেকেই কথা বলছেন।

এটা অবশ্য সারা দুনিয়ায় রাজনীতিবিদদের সমস্যা। ভোট বা জনসমর্থনের জন্য বক্তৃতা দিয়ে ফাটিয়ে দেন অনেকেই; কিন্তু সে কথা বিশ্বাস করেন কতজন? রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গল্প অহরহ দেখি বিশ্বজুড়ে। যার বিশ্বাস ও কথার মধ্যে মিল থেকে, তিনিই সঠিক মানুষ, সঠিক রাজনীতিবিদ। জোহরান মামদানিকে এখন পর্যন্ত এ রকম মানুষই মনে হচ্ছে।

শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিই কেন। আমাদের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী কী করছেন? অপরের মুখে ঝাল খাওয়া বুদ্ধিজীবী অন্তত আমাদের সমাজে কম নেই। আমরা যাঁরা সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট তাঁরাই–বা কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে লিখি? যাঁরা টক–শো করি, কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে বলি? কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখার মানুষ, বলার মানুষ কম নেই এই সমাজে।

৩.

আমাদের এই ঢাকা শহরে একজন মামদানির মতো সোচ্চার মানুষ দরকার। কারণ, এই শহরটা নির্জীব হয়ে পড়েছে। এতটা হতশ্রী ঢাকা শহর আমরা কোনো দিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এমনিতে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ এই শহরে নেই বা হচ্ছে না। প্রধান সড়ক থেকে একটু সরু সড়ক, গলির মধ্যে ঢুকলে দেখা যায় এই শহরের প্রকৃত চেহারা। ভাঙা সড়ক, ব্যস্ত সড়কের ওপর দোকান, হাজার রকম অন্যায় দেখেও নাগরিকেরা কোনো কথা বলে না। কারণ, এটা এখন ভয়ের শহর। নিজের গা বাঁচিয়ে চলাই এখন নিরাপদ পন্থা।

ধোঁয়া, ধুলাদূষণ, শব্দদূষণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা আর কী বলব?

কিন্তু এভাবে তো একটা শহর দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই নির্বাচিত মেয়র নেই। আছেন দুজন প্রশাসক। এর মধ্যে উত্তরে যিনি আছেন, কখনো কখনো তাঁর উপস্থিতি কিছুটা টের পাওয়া যায়। কাজে যতটা, তার চেয়ে কথায় কিছুটা উপস্থিতি তাঁর আছে। কিন্তু দক্ষিণে যিনি প্রশাসক আছেন, তিনি কী কাজ করেন, নাগরিকেরা জানতে পারেন বলে মনে হয় না।

জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, তার কিছুটা হলেও জবাবদিহি থাকে। তিনি জানেন, তাঁকে আবার জনগণের দরজায় দাঁড়াতে হবে। আর যিনি নির্বাচিত নন, তিনি দায়বদ্ধ থাকেন, তাঁকে যিনি বা যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁদের কাছে। অনির্বাচিত মেয়র বা প্রশাসক খুশি থাকেন তাঁর নিয়োগকর্তার ইচ্ছার দাস হয়ে। জনগণ বা মানুষের প্রতি তাঁর কোনো জবাবদিহি নেই।

ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৪৬৫ থেকে ৭,৫০০ টন ময়লা উৎপন্ন হয়, কিন্তু কালেকশন রেট মাত্র ৩৭-৫০ শতাংশ। মোট বর্জ্যের ১০ শতাংশ প্লাস্টিক হলেও এর মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইকেল হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের বাকি অংশ যায় ল্যান্ডফিলে, নদীতে, খালে। মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটোই ক্যাপাসিটি ছাড়িয়ে গেছে, ফলে রাস্তায় ময়লার স্তূপ, নালা বন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে জলজট—এসব আমাদের নিত্যসঙ্গী।

ঢাকায় বছরে বছরে বাড়িভাড়া বাড়ছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা রেন্ট কন্ট্রোল আইন চালু হলে লাখ লাখ ভাড়াটের জীবনযাত্রা সহজ হতো। ঢাকায় দৈনিক ৩-৪ ঘণ্টা জ্যামে নষ্ট হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার। কমিউনিটি এনগেজমেন্ট দিয়ে রুট অপটিমাইজ করলে শহরটা চলমান হতো। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে মানুষ একটু হাঁটতে পারত, আরেকটু সবুজায়ন হলে মানুষ বড় করে শ্বাস নিতে পারত।

৪.

এই শহরে আমরা চাই একজন জোহরান মামদানির মতো মেয়র, যিনি হবেন তরুণ, সাহসী, প্রোগ্রেসিভ। যিনি বলবেন, ঢাকাকে নোংরা শহর থেকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করব। কিন্তু তিনি কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো দূর কোনো আসমান থেকে আসবেন না। আমাদের ভেতর থেকে একজন মামদানিকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমরা যাঁরা সাংবাদিক, নাগরিক কিংবা তরুণ, তাঁদের চাপ সৃষ্টি করতে হবে জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য। কোনোভাবেই মাথানত করা যাবে না।

ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রস্তুত তাঁকে খুঁজে বের করতে বা তাঁর মতো নেতৃত্ব গড়ে তুলতে?

* কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক।
- ই–মেইল: alim.zaman@prothomalo.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’
‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’কোলাজ: প্রথম আলো

গ্রিনল্যান্ডে সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ ট্রাম্পের

ডেইলি মেইলের রিপোর্টঃ দ্য মেইল অন সানডে-এর তথ্যমতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য একটি সামরিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তার বিশেষ বাহিনীর কমান্ডারদের। তবে এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। সূত্রগুলো বলছে, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের ‘সাফল্য’ ট্রাম্পকে ঘিরে থাকা কট্টর নীতিনির্ধারক গোষ্ঠীকে আরও সাহসী করে তুলেছে। এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন রাজনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার। তাদের দাবি, রাশিয়া বা চীন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগেই দ্রুত গ্রিনল্যান্ড দখল করা উচিত। বৃটিশ কূটনীতিকদের ধারণা, ট্রাম্পের এই আগ্রহের পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে।

তাহলো এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া। ওই নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্রেটদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। তবে এমন একটি নাটকীয় পদক্ষেপ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পকে সরাসরি সংঘাতে ফেলবে এবং কার্যত ন্যাটোর ভাঙনের পথ খুলে দেবে। সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প যৌথ বিশেষ অভিযান কমান্ডকে আগ্রাসনের পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে বলেছেন। কিন্তু জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এই নির্দেশের বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, এ ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে এবং কংগ্রেসের সমর্থনও পাবে না। একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে তারা কম বিতর্কিত কিছু প্রস্তাব সামনে আনছেন।

যেমন রাশিয়ার তথাকথিত ‘ঘোস্ট শিপ’ আটকানো। এগুলো হচ্ছে মস্কোর পরিচালিত শত শত গোপন জাহাজের নেটওয়ার্ক, যেগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলে। অথবা ইরানে হামলার পরিকল্পনার কথাও তোলা হচ্ছে। কূটনীতিকরা একটি সম্ভাব্য ‘উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি’ নিয়ে যুদ্ধাভ্যাস চালিয়েছেন, যেখানে ট্রাম্প সামরিক শক্তি বা ‘রাজনৈতিক চাপ’ ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেন। একটি কূটনৈতিক বার্তায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘এর পরিণতি হতে পারে ন্যাটোর ভেতর থেকেই ধ্বংস।’ ওই বার্তায় আরও বলা হয়েছে, কিছু ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের আশপাশের কট্টর মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (এমএজিএ) গোষ্ঠীর প্রকৃত লক্ষ্যই এটি। যেহেতু কংগ্রেস ট্রাম্পকে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে দেবে না, তাই গ্রিনল্যান্ড দখল ইউরোপীয়দের বাধ্য করতে পারে ন্যাটো ছাড়তে। যদি ট্রাম্প ন্যাটোর অবসান চান, তবে এটাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ পথ।

একটি ‘সমঝোতা পরিস্থিতি’ অনুযায়ী, ডেনমার্ক ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডে পূর্ণ সামরিক প্রবেশাধিকার দেবে এবং রাশিয়া ও চীনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগেই সেখানে অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে, তবে সেটিকে আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হবে। কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছে, ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণে ট্রাম্প শুরুতে একটি উত্তেজনামূলক অবস্থান নেবেন, যা পরে সমঝোতায় রূপ নিতে পারে। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের সময়সীমা দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। তাই গ্রীষ্মের মধ্যেই কোনো পদক্ষেপ আসতে পারে। ৭ জুলাইয়ের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি একটি সমঝোতার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হতে পারে।

বার্তাটি উপসংহারে বলেছে, বর্তমান উদ্বেগের মূল উৎস স্টিফেন মিলারের কাছ থেকে আসা সবচেয়ে চরম মতামতগুলো। যুক্তরাজ্যের অবস্থান হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তারা ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে থাকবে, নাকি ট্রাম্পের পথে হাঁটবে।

একজন কূটনৈতিক সূত্র বলেন, জেনারেলরা মনে করেন ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড পরিকল্পনা পাগলামি এবং বেআইনি। তাই তারা অন্য বড় সামরিক অভিযানের কথা তুলে ধরে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষায়, এটা যেন পাঁচ বছরের একটি শিশুর সঙ্গে কাজ করার মতো।

mzamin

পলিটিক্যাল কদমবুসি কালচার যে কারণে ভয়ের by সারফুদ্দিন আহমেদ

রাজার পায়ের ধুলার বাজার বরাবরই চড়া। এ কারণে পদধূলি-লোভাতুর লোকের চোখ থাকে রাজার পায়ে।

জুতা আবিষ্কারের আগের আমলে খালি পায়ে বালি লাগায় হবু রাজা বিরক্ত হয়েছিলেন। পায়ে যাতে ধুলা না লাগে, সেই ব্যবস্থা করতে গবু মন্ত্রীকে কড়া হুকুম দিয়েছিলেন। গবু মন্ত্রী ‘হবুর পাদপদ্মে’ কদমবুসি করে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেছিলেন—‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে/ পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!’

তখন ‘শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি/ কহিল শেষে, “কথাটা বটে সত্য—।”’

মানে, পায়ের ধুলা মন্ত্রী-সান্ত্রি-চ্যালাব্যালারা নিয়মিত না নিলে তা যে এক পর্যায়ে রাজবশ্যতা-বিচ্যুতির মতো বড় বিড়ম্বনার ব্যাপার ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটি রাজা ঠাওর করতে পেরেছিলেন।

হবু রাজা-গবু মন্ত্রীর যুগ অস্ত গেছে। এখন নেতার যুগ। বড় নেতা, মেজ নেতা, সেজ নেতা, রোগা নেতা, মোটা নেতা, আধা নেতা, গোটা নেতা, পাতি নেতা, সিকি নেতার যুগ। হবু রাজার পায়ে আগে ধুলা লাগত। জুতার বদৌলতে নেতাদের পায়ে এখন তা লাগে না। কিন্তু জাতে উঠতে গেলে বড় নেতার পাদপদ্মের পদরেণু আধলা থেকে সিকি নেতার লাগবেই। এ কারণে রাজনীতিতে কদমবুসি কালচার আলসারের মতো বাসা বেঁধে আছে।

সারা জীবনে একবারও মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেননি—এমন লোকও রাজনীতিতে এসে নেতা থেকে শুরু করে নেতার নাতজামাইকে পর্যন্ত নতজানু হয়ে কদমবুসি করেন। কদমবুসি তাঁর কাছে সামাজিক মূলধন। চাটুকারিতা তাঁর কাছে চরিত্রের বিচ্যুতি নয়, পদোন্নতির পথ। পা ধরা যে দারুণ দরকারি, তা বহুলচর্চিত কদমবুসি কালচার তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে।

দিন কয়েক আগে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে।

আরেক অনুষ্ঠানে পরপর দুজন নেতা একইভাবে তারেক রহমানকে কদমবুসি করার চেষ্টা করেন। কদমবুসির সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য হলেও এই নেতাদের সবাইকেই তারেক রহমানের সমবয়সী বলে মনে হয়েছে।

ভাইরাল ভিডিও চিত্রে উভয় জায়গায় তারেক রহমানকে বিব্রত দেখা গেছে। পদরেণুপ্রার্থীদের হাত তাঁর পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পা সরিয়ে নিয়েছেন।

ঘটনা দুটোকে ‘বাদ দেন, তেমন কিছু না’ বলে কেউ উড়িয়ে দিতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা হলো, ভরা মজলিশে এই কিসিমের কদমবুসি কালচার যে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের জন্য কী ভয়ানক ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে, তা আমরা অতীতে দেখেছি।

রাজনৈতিক কদমবুসি সংক্রামক রোগবিশেষ। এ রোগ শরীর থেকে শরীরে ছড়ায় না, ছড়ায় মন থেকে মনে। ব্যক্তিগত চর্চা দিয়ে এর শুরু। তবে খুব দ্রুত এটি সমষ্টিগত আচরণে পরিণত হয়। কারণ, মানুষ কেবল যুক্তিবাদী প্রাণী নয়, সে গভীরভাবে অনুকরণপ্রবণ।

রাজনীতিতে অনুকরণ শিক্ষার বদলে বশ্যতা শেখায়। একজন জুনিয়র নেতা যখন সিনিয়র নেতার পা ধরেন, তিনি তখন শুধু নিজে নত হন না, তিনি অন্যদের সামনে একটি নতুন মানদণ্ড তুলে ধরেন।

কোনো নেতাকে যখন ভরা মঞ্চে তাঁর নিচের সারির কোনো একজন নেতা পা ছুঁয়ে সালাম করেন, তখন সেই নিচের সারির আরও কোনো নেতা তাঁকে একই কায়দায় কদমবুসি করতে পারেন। তাঁর দেখাদেখি আরেকজন করতে পারেন।

তখন ওই সারির যে নেতার কদমবুসি কালচারে বিশ্বাস নেই, তাঁকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। চক্ষুলজ্জায় পড়ে বা বাধ্য হয়ে তাঁকেও কদমবুসি করতে হয়।

তবে একাধিকবার সিনিয়র নেতাদের পা ছুঁয়ে সালাম করার পর তাঁর ভেতরে থাকা অস্বস্তি কেটে যায়।

এরপর নিজ এলাকার জুনিয়র নেতাদের কাছ থেকে একই কায়দার কদমবুসি তিনি আশা করতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ তা না করলে তখন তাঁকে যথার্থ অনুগত অনুসারী মনে করাটা তাঁর জন্য কঠিন হয়।

রাজনীতিতে তখন কদমবুসি আনুগত্যের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। অথচ এই ধরনের কদমবুসিতে সম্মান নেই, আছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

আসলে পা এবং ধামা—এই দুটোই ধরা প্রথম প্রথম অস্বস্তিকর থাকে। তারপর সহনীয় হয়। তারপর স্বাভাবিক হয়। তারপর প্রত্যাশিত হয়।

ধাপে ধাপে আত্মসম্মান ও নৈতিকতার এই ক্ষয়ই রাজনৈতিক কদমবুসিকে সংক্রামক করে তোলে।

পা ধরাটা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে অস্বীকার করাটাই হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। এভাবে পা ধরা আর আচরণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি।

রাজনীতিতে কুদমবুসির নামে পা ধরার সংস্কৃতি বিনয় দিয়ে শুরু হয়। বিনয় এখানে বীজ, বশ্যতা তার বৃক্ষ, আর ভীরুতা তার ফল।

এখানে ধীরে ধীরে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—যে প্রশ্ন করে, সে বেয়াদব; যে প্রতিবাদ করে, সে প্রগলভ; আর যে মাথা নুইয়ে পা ধরে, সে সংস্কৃতিমান ও ‘দলবান্ধব’। যে ধরতে চায় না, সে অচিরেই নিজেকে আবিষ্কার করে একা, অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তার সামনে তখন দুই পথ—‘হয় পা ধরো, নয় পথ ধরো।’

যাঁর পা ধরা হয়, তাঁর অবস্থাও ধীরে ধীরে বদলায়। প্রথমে লজ্জা, পরে নির্লজ্জতা। প্রথমে সংকোচ, পরে সংগতির খোঁজ।

একসময় তিনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, ‘ওরা যদি আমার পা ধরে, ও ধরছে না কেন?’ এ প্রশ্নের মধ্যেই জন্ম নেয় ক্ষমতার কর্কশতা আর নেতৃত্বের লজ্জাহীনতা।

এটি হলো সেই মুহূর্ত, যেখানে রাজনীতি হয়ে ওঠে পা–কেন্দ্রিক। নীতি তখন নুয়ে পড়ে। নৈতিকতা নীরব হয়। নজরদারি নষ্ট হয়। নেতা যত উঁচুতে বসেন, প্রশ্ন তত নিচে নামে।

যে রাজনীতিতে পা ধরাটা সবচেয়ে বড় গুণ হয়ে ওঠে, সেই রাজনীতিতে পায়ে হাঁটার শক্তি সবচেয়ে কম হয়। শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়, তা হলো পা ধরা আর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। ধামা ধরাটা আর সৌজন্য থাকে না, হয়ে ওঠে শর্ত।

রাজনীতিতে তখন নীতির বদলে নতি কাজ করে। আর যে রাজনীতিতে সবাই পা ধরে, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। দাঁড়ানোর মানুষ না থাকলে গণতন্ত্র দাঁড়ায় না।

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
- sarfuddin2003@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

দিন কয়েক আগে তারেক রহমানকে তাঁর দলের একাধিক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে।
দিন কয়েক আগে তারেক রহমানকে তাঁর দলের একাধিক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

‘কুকি-চিন’ নিয়ে আসলে কী ঘটছে by আলতাফ পারভেজ

প্রকাশ ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ঃ কুকি-চিন মানুষদের নিয়ে মিজোরামের রাজধানী আইজল খুব উত্তাল যাচ্ছে গত কয় দিন। মিছিল-মিটিং হচ্ছে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে স্থানীয় মিজোরা বাংলাদেশের কুকি-চিনদের উদারভাবে আশ্রয় দিতে বলছে। মিয়ানমারের পালিয়ে আসা চিনদের জন্যও তারা একই নীতি চায়। এ দাবির পেছনে রয়েছে বিস্তর ঘটনা—আর সামনে আছে সম্ভাব্য আরও কিছু অধ্যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের সেসব বিষয়ে কতটা অবহিত ও সতর্ক?

মিজোরামে যখন কুকি-চিন প্রসঙ্গ

মিজোরা যাদের কুকি-চিন বলছে, বাংলাদেশে তারা হলো বম, লুসাই, পাংখোয়া ইত্যাদি। সংখ্যায় খুব কম এসব জাতিগোষ্ঠী। বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল অঞ্চলে এদের বেশি বসবাস, যা মিয়ানমারভুক্ত চিন প্রদেশ এবং ভারতভুক্ত মিজোরাম-সংলগ্ন। বান্দরবানের কাছাকাছি মিজোরামের জিলার নাম লঙ্গৎলাই। আর চিনের অংশ পালেতওয়া টাউনশিপের মাটুপি। কাছেই আরাকানের মংডু।

চার ধরনের প্রশাসনিক পরিচয় নিয়েও এ অঞ্চলে রয়েছে বহু জাতিসত্তার মানুষ। বহুকাল ধরে এ রকম জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে নৃতাত্ত্বিক বন্ধন ঘিরে নানান ভাঙা-গড়া-সংঘাত-সংঘর্ষ ছিল এবং আছে। তার মধ্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মিশেলও যুক্ত হয় প্রতিনিয়ত। সে রকমই এক চলতি অধ্যায়ে আইজলে এক সপ্তাহ ধরে মিজোরা বাংলাদেশের কুকি-চিনদের ব্যাপারে সমব্যথী হয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছে। ঢাকায় সে খবর হয়তো সামান্যই এসে পৌঁছাল।

‘জো’দের পারস্পরিক বন্ধনকে বিবেচনায় রাখা দরকার

‘মি-জো’ কথার মানে ‘পাহাড়ের মানুষ’। এটা বেশ বিস্তৃত ধারণা। এতে অনেক জাতিসত্তা অন্তর্ভুক্ত। এসব জাতিসত্তা নিজেদের বলে ‘জো’। আইজলের মিজোদের বক্তব্য হলো কুকি-চিনরাও জো। সুতরাং তারা বিপদে পড়ে যদি মিজোরামে ঢুকে থাকে, তাহলে এদের তাড়ানো যাবে না। মিজোরামের এখনকার সরকার এ রকম মনোভাব সমর্থন করে। তবে সীমান্তরক্ষীরা কেন্দ্রীয় সরকার-নিয়ন্ত্রিত। ফলে সীমান্তে অন্য দেশের জোরা বাধা পাওয়ায় আইজল ক্ষুব্ধ। এর আগে অবশ্য মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে চিন থেকে প্রচুর জো মিজোরামে ঢুকে আছে।

যেহেতু চিন, বান্দরবান, মিজোরাম মিলে জোদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী বেশি, সে কারণে আইজলের রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষদের মধ্যে একটা ধর্মতাত্ত্বিক শক্ত বন্ধনও কাজ করছে। বম, পাংখোয়া, লুসাইরা ‘ব্রিটিশ খ্রিষ্টান’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১০০ বছর হলো প্রকৃতি পূজারি থেকে তাঁদের ধর্মান্তরের। কিন্তু ‘বম’ শব্দের অর্থ যে বন্ধন—তার সামাজিক চেহারা একই রকম আছে। আশপাশের দেশের অ-বমদের সেটা মনে না রাখলে ভুল করা হবে।

জটিল হচ্ছে জাতিগত সমীকরণ

ভারতবর্ষ এবং মিয়ানমারের দখল, কাটাছেঁড়া, ‘মুক্তি’—সবই ঘটেছে ব্রিটিশদের হাতে। শত শত বছরের পুরোনো নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা এসব কাটাছেঁড়ায় মুশকিলে পড়েছে। অনেক সময় প্রশাসনিক মুশকিলে ভৌগোলিক এসব ত্রিমোহনার মানুষকে সীমান্ত পেরোতেও হয় আইন-আদালতের কথা ভুলে।

এ রকম বিবিধ প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে মিজোরামে পাঁচ দশক আগে থিতু হওয়া প্রচুর চাকমাও আছেন। বৌদ্ধ চাকমাদের সঙ্গে ওদিকে আবার খ্রিষ্টান মিজোদের সম্পর্ক মধুর নয়। সেই অমধুর সম্পর্কের জের দেখা গেল আইজলে সাম্প্রতিক কুকি-চিনকেন্দ্রিক সমাবেশগুলোয়। ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশনের (ওয়াইএমএ) কর্মীরা বলছেন, অতীতে চাকমাদের বিষয়ে প্রশাসন যতটা উদার ছিল, কুকি-চিন বা জোদের বিষয়ে একই রকম হতে সমস্যা কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে একটা জো জাতীয়তাবাদ কাজ করছে।

এর প্রবল সমর্থন আছে আবার চিন প্রদেশের চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (সিএনএফ) দিক থেকে। সেখানে পালেটোয়া শহরটির ওপর অধিকার নিয়ে চিনদের সঙ্গে রাখাইনদের ব্যাপক বিরোধ যাচ্ছে। ওই রাখাইনদের সংগঠন আরাকান আর্মির নাম চলে এসেছে আবার সাম্প্রতিক কুকি-চিন সমস্যায়। এ কারণে জটিল এক জাতিগত সমীকরণে ঢুকছে এ পুরো অঞ্চল নতুন করে। তাতে ২০২২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর জো বনাম রাখাইন ইতিহাসে নিশ্চিতভাবে নতুন কিছু যোগ করল।

পাহাড়ে প্রজ্ঞার ঘাটতি যেন না হয়

জোদের একাংশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কেন ‘কুকি-চিন’ নাম পেল, তার কলোনিয়াল ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ঢাকা, নয়াদিল্লি কিংবা মিয়ানমারের নেপিডোতে এসব নিয়ে এখন খুব আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। তবে বাংলাদেশে হঠাৎ কুকি-চিনদের একটা সংগঠনের নাম শোনা যাচ্ছিল পত্রপত্রিকায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের খবরও শোনা যাচ্ছে।

কুকি-চিনরা কীভাবে ছোট জাতিসত্তা থেকে এ রকম বড় সংগঠনের জাতীয় ‘গল্প’ হয়ে উঠল, সেটার পেছনে ছুটলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা অনেক কিছু পাবেন। সেসব অনুসন্ধান হলে কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট) এর আকার-আকৃতি নিয়ে চালু গল্পের ফুলেফেঁপে থাকা মেদ কমতে পারে। কিন্তু সংখ্যায় যা–ই হোক, কেএনএফ দূরদূরান্তে থাকা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সহানুভূতি ও উৎসাহ পেয়ে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

কেএনএফ সদস্যরা মিয়ানমারের চিন রাজ্যের ভিক্টোরিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের সদর দপ্তরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে শোনা যায়। এরপর এই কুকি-চিন তরুণেরা আরও প্রশিক্ষণের জন্য মিয়ানমারের কাচিন পর্যন্ত গেছে—এমন কথাও চালু রয়েছে। এগুলো সবই যাচাই অযোগ্য দাবি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে চিন ও ‘কুকি’রা নৃবিজ্ঞানে একই অধ্যায়ে আছে। এশিয়ার এ অঞ্চলে এরা সবাই মিলে মোটেই ছোট কোনো জাতিশক্তি নয়। এটা খেয়াল না করলে সমস্যা বাড়তে পারে।

ইতিমধ্যে যা ঘটেছে, বম-পাংখোয়া-লুসাই পাড়াগুলো আর আগের মতো নেই। এ বছর ‘ফাথার বুহ তেম’ (নবান্ন) উৎসবও হলো না। উল্টো গ্রাম বা খোয়াগুলো এখন অনেক মাচাং বাসিন্দাদের অপেক্ষা করছে।

লক্ষণ হিসেবে এসব অশুভ। আইজলে কে কী বলছে—শোনা দরকার। বম, লুসাইসহ এ রকম সবার মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে। সংলাপ দরকার। পারস্পরিক দরদে হয়তো ঘাটতি পড়েছে।

পার্বত্য এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘু অনেকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের কাছে অনেক কিছু আশা করে থাকবে। কিন্তু ২৫ বছর পরও তাদের প্রান্তিকতা ঘোচেনি বলে দীর্ঘশ্বাস ছিল। সেই শ্বাস-প্রশ্বাসকে চাকমা থেকে বাঙালি অনেকের প্রয়োজনীয় মনোযোগ পেয়েছিল কি না, সে সন্দেহ উঠছে এখন।

ইতিমধ্যে হয়তো কিছু দেরিই হলো। অনেক বেশি দেরি হলো কি না, কে জানে! তবে সশস্ত্রতায় সমৃদ্ধি মেলে কি? বরং ‘পার্টি’র সংখ্যা বাড়তে থাকলে শান্তিতে টান পড়তে বাধ্য। ঠিক একই কারণে ঘরের কথা আইজল যায়। জাতিতে জাতিতে দূরত্ব বাড়ে। পাহাড় নিয়ে কোনো তরফ থেকেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতি না হওয়া কাম্য। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা-অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর যখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

* আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-01%2Fa442f99a-872f-4391-85c0-68851efb8e7e%2Fbandarban.gif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাহাড় নিয়ে কোনো তরফ থেকেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতি না হওয়া কাম্য। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা-অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর যখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংগৃহীত

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

ডনের সম্পাদকীয়ঃ দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হতে যাচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-করাচি রুটের প্রথম ফ্লাইট উড্ডয়ন করবে আগামী ২৯ জানুয়ারি। শুরুতে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। নতুন করে ফ্লাইটের এই যাত্রা শুরু হওয়াকে একদিকে যেমন স্বাগত জানাতে হয়, তেমনি এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং পর্যটন, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক সহযোগিতা ও বহুদিনের বঞ্চিত ‘পারিবারিক পুনর্মিলন’-এর পথও সুগম হবে।

গত বছর করাচি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হলেও, আকাশপথে যাত্রীরা এতদিন দুবাই ও দোহাসহ বিভিন্ন ট্রানজিট রুট ব্যবহার করতে বাধ্য ছিলেন। কারণ পাকিস্তানি বিমান ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা ফেরায় কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই নতুন যাতায়াতের সুবিধা এবং পাকিস্তান থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে ঢাকার আগের ঘোষণাগুলো উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। অনলাইন ডনে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, ইতিহাসের বিভাজনরেখা আমাদের বহু দশক ধরে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তাই নতুন করে পথচলা শুরু করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অঙ্গীকার এবং একে অপরের জীবনাচরণ ও বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেয়ার মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করেই তা গড়ে তুলতে হবে। পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে প্রবেশের বিস্তৃত সেতুবন্ধন। একইভাবে, বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তান হয়ে উঠতে পারে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রবেশদ্বার।

নিঃসন্দেহে, ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত সক্ষমতা দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শক্তিশালী ও বিকশিত ওষুধ শিল্প পাকিস্তানের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও ওষুধ সহায়তায় অবদান রাখতে সক্ষম।

অপরদিকে, পাকিস্তানের বিশ্বমানের ক্রীড়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, উভয় দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এই সংযোগ থেকে পারস্পরিক বিনিয়োগ, কৃষি সহযোগিতা এবং খাদ্য সংকট মোকাবিলার মতো নানা ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সর্বোপরি, এই যোগাযোগ পারস্পরিক সদ্ভাব ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংহতি জোরদার করতে সব অংশীজনের সম্মিলিতভাবে এসব উদ্যোগকে সমর্থন ও এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

mzamin

সোমালিল্যান্ডে ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল: সোমালিয়া

ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল’ সোমালিল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি এ অভিযোগ করেছেন। কথিত এই পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

গতকাল শনিবার আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিকি বলেন, ‘আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের একটি নীলনকশা তৈরি করেছে।’ তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সোমালিল্যান্ডের প্রতি দেওয়া কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান।

গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েল। সোমালিয়া এই পদক্ষেপকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর ‘সরাসরি আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহম্মাদ দাবি করেছেন, স্বীকৃতির বিনিময়ে সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলের তিনটি শর্ত মেনে নিয়েছে। এগুলো হলো—ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন, এডেন উপসাগরীয় উপকূলে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দেওয়া।

অবশ্য সোমালিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা তারা সরাসরি নাকচ করে দেয়নি।

সোমালিল্যান্ডের ক্ষমতাসীন ‘ওয়াদানি’ পার্টির চেয়ারম্যান হারসি আলী হাজি হাসান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কয়েক দশক ধরে অবহেলিত হওয়ার পর এখন আমাদের অস্তিত্বের জন্য যে দেশই স্বীকৃতি দেবে, আমরা তাদের স্বাগত জানাতে বাধ্য।’ 

সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি
সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি। ছবি: এএফপি

ইরানে হামলার নানা বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পকে ব্রিফিং

নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টঃ ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দেশটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত (ব্রিফিং) করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে মন্তব্য করার পর এই ট্রাম্পকে ব্রিফিং দেওয়া হয়।

যদিও এখনো ইরানে হামলার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে নিউইয়র্ক টাইমসকে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, বিক্ষোভ দমনে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কঠোর পদক্ষেপের জবাবে সীমিত আকারে হামলার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কর্মকর্তাদের মতে, তাকে যে বিকল্পগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে তেহরানের বেসামরিক স্থাপনায় লক্ষ্যভিত্তিক হামলার প্রস্তাবও রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হালকাভাবে নেবেন না। তিনি যা বলেন, তা বাস্তবায়ন করেন।
এরই মধ্যে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরাইল বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এ সময় সংসদ সদস্যরা ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ বলে স্লোগান দেন।

কালিবাফ বলেন, ইরানের ওপর হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ড (ইসরাইল) এবং এই অঞ্চলে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক কেন্দ্র, ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে। আমরা শুধু হামলার পর প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকব না, হুমকির যেকোনো লক্ষণ দেখলেই ব্যবস্থা নেব।
বর্তমানে ইরানে ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত বহু মানুষ নিহত এবং প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন আটক হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের বাহিনী, অংশীদার ও মিত্রদের সুরক্ষায় পূর্ণ যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। গত জুনে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। এ ছাড়া বাহরাইনে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর।

এদিকে ইসরাইলও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন দেশটির এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ইরান ইস্যুতে ফোনে আলোচনা করেছেন।

mzamin