Saturday, August 15, 2020

অগাস্ট ১৯৭৫-এর পর শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রচার মাধ্যম থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা যেভাবে করা হয়েছিল by সানজানা চৌধুরী

শেখ মুজিবুর রহমান
১৫ অগাস্ট ২০১৯ বিবিসি বাংলা:: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা-রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের কোন প্রচার মাধ্যম এমনকি চলচ্চিত্রেও তাঁর নাম বা ছবি প্রকাশ হতে দেখা যায়নি।
তৎকালীন সরকারি প্রচার মাধ্যমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ মুজিবকে হত্যার পর এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা নানাভাবে ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

বেতারে শেষবারের মতো শেখ মুজিবের নাম

শেখ মুজিবকে হত্যার পর পর ভোর বেলায় শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের ব্রডকাস্ট শাখা থেকে হত্যাকাণ্ড সেই সঙ্গে সামরিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল।
ঘটনার দিন বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ ব্রডকাস্ট শাখার শিফট ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছিলেন প্রণব চন্দ্র রায়।
''সেদিনই শেষবারের মতো উচ্চারিত হয় শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি। এরপর থেকে বেতারে কখনও তার নাম শোনা যায়নি'', মি. রায় বিবিসিকে বলেন ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান যে, ভোরবেলা সেনাবাহিনী বেতার অফিসের ভেতরে ট্রান্সমিশন কক্ষে প্রবেশ করে এবং তার মাথার ওপর বন্দুক ঠেকিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার ঘোষণাটি প্রচারের ব্যবস্থা করে দিতে বলে।
"মেজর ডালিম আমার মাথায় বন্দুক ঠেকায়, তারা পুরো শরীর তখন রক্তে ভরা। আমি তখনও জানতাম না কি হয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বলেন, শেখ মুজিব অ্যান্ড হিজ গ্যাং অল হ্যাজ বিন কিল্ড। আর্মি হ্যাজ টেকেন পাওয়ার। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে যাই। তখন বুঝলাম যে ক্যু হয়েছে।" বলেন মিঃ রায়।
তারপর তিনি সেনাবাহিনীর নির্দেশ মতো রেডিওর সব ইকুইপমেন্টগুলো খুলে দেন এবং মিরপুরের ট্রান্সমিশন স্টুডিওকে বলেন ঘোষণাটি প্রচার করার জন্য।
মেজর শরীফুল হক ডালিম একটা লগ বুকের কাগজে বিবৃতি লিখেন এবং সেটাই প্রচার করেন।
যেখানে বলা হয়েছিল, "শেখ মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে এবং খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। দেশবাসী সবাই শান্ত থাকুন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।"
পর পর কয়েকবার এই ঘোষণা দেয়া হয়। পরবর্তী রেকর্ডিংয়ে শেখ মুজিবকে "হত্যা করা হয়েছে" বলার পরিবর্তে "উৎখাত করা হয়েছে" বলে ঘোষণা দেয়া হয়।
জানুয়ারি ৮, ১৯৭২: লন্ডনের ক্ল্যারিজ'স হোটেলে গণমাধ্যমের মুখোমুখি শেখ মুজিব
ওই মুহূর্তে মেজর শাহরিয়ার রশিদ কড়া নির্দেশনা দেন যেন শেখ মুজিবুর রহমান বা তার দলের নাম, রবীন্দ্র সংগীত, জয় বাংলা স্লোগান কিছুই প্রচার করা না হয়।
পরে খন্দকার মুশতাক তার মৌখিক নির্দেশে বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও বাংলাদেশ রাখেন।

বাংলাাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হয়নি শেখ মুজিবের নাম ও ছবি

এই সময়ের মধ্যে বিটিভিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারিত হতে শোনেননি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ।
তিনি সে সময় বিটিভির প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
সেখানে থাকাকালীন তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন, যেখানে শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রামাণ্য চিত্রটি প্রচারের আগ মুহূর্তে নামটি কেটে দেয়া হয়।
২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বরের মতো বিশেষ দিনগুলোয় হাতে গোনা দুই একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গটি জোড়াতালি দিয়ে কোন রকম দাঁড় করানো হতো বলে উল্লেখ করেন মিঃ হামিদ।
এমনকি পাঠ্যবইতে শেখ মুজিবের নাম মুছে খণ্ডিত ইতিহাস পড়ানো হতো বলে তিনি জানান।
১৫ আগস্টে পালন করা হতো জাতীয় নাজাত (মুক্তি) দিবস। ওই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস বা তাকে হত্যার ঘটনা কিছুই প্রচার করা হতো না।
মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৭৪ সালে ধারণ করা একটি ছবিতে শেখ মুজিব
উল্টো বিটিভিতে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তৃতা এবং আলোচনায় শেখ মুজিবকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো বলে জানা যায়।
"বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এসেছিল তারা বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে পুরোপুরি বিপরীত ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ আসলেই তারা ভয় পেতো, মানুষ যদি আবার তাঁর ব্যাপারে জানতে শুরু করে। এজন্য প্রচার প্রোপাগান্ডার মধ্যে দিয়ে তার নাম ও আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার সার্বিক প্রয়াস চালানো হয়েছিল,'' বলেন ম হামিদ।

চলচ্চিত্রে সেন্সর বোর্ডের কাটছাট

পঁচাত্তর পরবর্তী চলচ্চিত্রেও শেখ মুজিবের নাম ছবি এমনকি জয় বাংলা স্লোগান ব্যবহার হতে দেখা যায়নি।
সেসময় বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সারাহ বেগম কবরী।
তার অভিনীত রক্তাক্ত বাংলা এবং আমার জন্মভূমি চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটি অংশ এবং সংলাপ সেন্সর বোর্ড থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল।
যার মধ্যে ছিল শেখ মুজিবের নাম, তাঁর ছবিযুক্ত শট, তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ এবং জয় বাংলা স্লোগান।
"সে সময় যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা ইচ্ছামত রাজনৈতিকভাবে চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তাদের কথা ছিল যে বঙ্গবন্ধুর নাম বা তার দলের কোন চিহ্ন যেন কোথাও না থাকে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক ছবিতেও এই বিষয়গুলো বাদ দেয়া হয়েছিল,'' সারাহ বেগম কবরী বিবিসিকে বলেন।

পুনরায় বাংলাদেশ বেতার, তথ্য পুনরুদ্ধার

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আবু সাঈদ।
সে সময় তিনি 'রেডিও বাংলাদেশ'-এর নাম, মৌখিক নির্দেশে পুনরায় 'বাংলাদেশ বেতার' রাখেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবের ইতিহাস তুলে ধরতে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
"আমি বেতারের ডিজি সাহেবকে ডেকে প্রশ্ন করেছিলাম দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম বাংলাদেশ বেতার রাখা হয়েছিল। এটা রেডিও পাকিস্তানের আদলে রেডিও বাংলাদেশ কিভাবে হল? ডিজি সাহেব এ নিয়ে আমাকে লিখিত কোন নথি বা আদেশনামা দেখাতে পারেননি। কেবল একটি মৌখিক নির্দেশে এই নাম পরিবর্তন হয়েছিল। তারপর আমি পাল্টা নির্দেশ দিলাম এটাকে আবার বাংলাদেশ বেতার করতে,'' বলেন মি. সাঈদ।
মি. সাঈদ সে সময় ডিএফপি এর আর্কাইভ থেকে শেখ মুজিবের সব রেকর্ডগুলো কয়েক বছর ধরে পুনরুদ্ধার করেন এবং রেডিও টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রচার করা শুরু করেন।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাষণ।
"আমি আর্কাইভে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের রিলগুলো অযত্ন অবহেলায় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে। তখন আমি সেগুলো বের করে ওয়াশ করার জন্য ভারতের পুনেতে পাঠাই। কারণ বাংলাদেশে ওই প্রযুক্তি ছিলনা। এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যতো ভিজুয়াল দেখেন, বেশিরভাগ সেই সময়ের উদ্ধার করা,'' তিনি বলেন।
পরিবারসহ শেখ মুজিবুর রহমান

শেখ মুজিব সপরিবারে হত্যার পর ৩২নং রোডের বাড়ীর ভেতরের দৃশ্য কেমন ছিল? by ফারহানা পারভীন

পরিবারসহ শেখ মুজিবুর রহমান
সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সাথে জড়িত ছিল সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা।
তাদের কয়েকজন এবং কিছু সৈনিক বাড়ীটির সামনে এবং ভিতরে ছিলেন কিন্তু অফিসিয়ালি আদেশপ্রাপ্ত হয়ে বাড়িটির মধ্যে প্রথমবারের মত যান লে:কর্নেল এম এ হামিদ পিএসসি।
সে সময়ে তিনি ঢাকা স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর লেখা 'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান এবং না বলা কিছু কথা' বইটিতে লিখে রেখে গেছেন সেই সময়ের কিছু তথ্য।
তিনি সেখানে দেখতে পান বাড়ির মূল দরজায় মেজর পাশা এবং মেজর বজলুল হুদা দাড়িয়ে ছিলেন।
হুদা প্রথমেই তাকে নিয়ে গেলেন নিচতলার রিসিপশন রুমে।
সেখানে শেখ কামালের মৃতদেহ টেবিলের পাশে একগাদা রক্তের মাঝে উপুড় হয়ে পড়ে আছে।
একটা টেলিফোনের রিসিভার টেবিল থেকে ঝুলছিল।
লে:কর্নেল হামিদের মনে হয়েছিল শেষ মুহূর্তে কাউকে ফোন করতে চাইছিলেন শেখ কামাল। একটা হাত তার ওদিকেই চিল। টেবিলের পাশে আর একটি মৃতদেহ।
একজন পুলিশ অফিসার। প্রচুর রক্তক্ষরণেই দুজন মারা গেছেন। কামালের ভাঙ্গা চশমা পাশে পড়েছিল।
সিঁড়ির উপর শেখ মুজিব:
"এরপর আমরা দু-তলায় উঠতে পা বাড়ালাম। সিঁড়ির মুখেই চমকে উঠলাম" বলছিলেন তিনি।
"সিঁড়িতেই দেখি পড়ে আছেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি এবং চেক লুঙ্গি। পাশে পড়ে আছে তাঁর ভাঙ্গা চশমা। তাঁর দেহ সিঁড়ির ওপরে এমনভাবে পড়েছিল যেন মনে হচ্ছিল সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেছেন। কারণ তাঁর মুখে কোনো রকমের আঘাতের চিহ্ন ছিল না। চেহারা ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তাঁর বুকের অংশটুকু ছিল ভীষণভাবে রক্তাক্ত। মনে হলো ব্রাস লেগেছে"।
লে:কর্নেল হামিদের বই থেকে নেয়া ছবি
"তার বাম হাতটা ছিল বুকের উপর ভাঁজ করা, তবে তর্জনী আঙ্গুলটা ছিঁড়ে গিয়ে চামড়ার টুকরার সাথে ঝুলেছিল। তার দেহের অন্য কোনো অঙ্গে তেমন কোনো আঘাত দেখিনি। সারা সিঁড়ি বেয়ে রক্তের বন্যা" লিখেছেন তিনি।
পরিবারের বাকি সদস্যদের মরদেহ কোথায়, কীভাবে ছিল?
সিঁড়ির মুখেই ঘরটাতে বেগম মুজিবের দেহ দেউড়ির উপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। তার গলার হারটা ঢুকে ছিল মুখের মধ্যে।
তিনি লিখেছেন "মনে হলো স্বামীর উপর গুলির শব্দ শুনে তিনি ছুটে আসছিলেন। কিন্তু দরজার মুখেই গুলিবিদ্ধ হয়ে দেউড়িতে লুটিয়ে পড়েন। তার দেহ অর্ধেক বারান্দায় অর্ধেক ঘরের ভেতরে"।
এক ঘরের মধ্যেই সবার মরদেহ:
লে:কর্নেল হামিদ লিখেছেন "তাকে পাশ কাটিয়ে কামরার ভেতরে প্রবেশ করলাম। কামরার মেঝেতে এক সাগর রক্ত থপথপ করছিল। আমার বুটের সোল প্রায় অর্ধেক ডুবে যাচ্ছিল। বিধ্বস্ত পরিবেশ। রক্তাক্ত কামরার মধ্যে পড়ে আছে কয়েকটি লাশ। বাম পাশেরটি শেখ জামাল। তার দেহের ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখে মনে হলো কামরার ভেতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। মিসেস রোজী জামাল সদ্য বিবাহিতা হাতে তাজা মেহেদীর রং। ব্রাস অথবা গ্রেনেডের আঘাত সরাসরি তার মুখে লেগেছিল"।
"পাশে মিসেস সুলতানা কামাল। প্রচুর রক্তক্ষরণে এখন তার চেহারা সম্পূর্ণ বিবর্ণ ,শুকনো। তার কোল ঘেঁষে ছোট রাসেলের মৃতদেহ। তার মাথার পিছনদিক একেবারে থেঁতলে গিয়েছিল"।
সবগুলো ঘর ছিল খোলা। প্রতিটি ঘরেই দামি দামি জিনিসপত্র।
রাষ্ট্রপতির পরিবার। মাত্র কদিন আগেই দু'দুটি বিয়ে হয়ে গেছে ঐ বাড়িতে শেখ কামাল এবং শেখ জামালের। আনন্দ মুখর আনন্দ ভবনটি এখন নীরব নিথর।
নিচের তলার একটি বাথরুমে পড়েছিল শেখ মুজিবের ভাই শেখ নাসেরের রক্তাপ্লুত মৃতদেহ, চেনাই যাচ্ছিল না। বাড়ির পিছনে আঙ্গিনায় একটি লাল গাড়ির পেছনের ইটে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা ছিল কর্নেল জামিলের প্রাণহীন দেহ।
১৫ অগাস্ট দুপুর পেরিয়ে বিকেল। কিন্তু তখনো ক্ষমতার পালাবদলের হিসাব-নিকাস চলছে। মাথা ব্যথা নেই ৩২ নং রোডের বাড়ির দিকে।
রাতের অন্ধকারে দাফনের সিদ্ধান্ত:
বঙ্গভবন থেকে রাত তিনটার দিকে ফোন এলো লে:কর্নেল হামিদের কাছে।
৩২নং বাড়ি, শেখ মনি , আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ অন্যান্য যারা ঐ ঘটনায় মারা গিয়েছেন তাদের বাসা থেকে মৃতদেহ কালেক্ট করে বনানী গোরস্থানে দাফন করতে হবে।
বনানী কবরস্থানের মরদেহের বর্ণনা
তবে শেখ সাহেবের লাশ শুধু বাড়িতে থাকবে , স্থান পরে জানানো হবে।
লে:কর্নেল এম এ হামিদ বলছেন "আমার পৌছানোর আগেই শেখ সাহেবের পরিবারের সবগুলো লাশ কফিন বন্দি করে সাপ্লাই ব্যাটালিয়নের ট্রাকে তুলে আমার আগমনের অপেক্ষা করছিল। শুধু শেখ সাহেবের লাশ কফিন বন্দি করে বারান্দার এক কোনে ফেলে রাখা হয়েছে"।
লে:কর্নেল হামিদের মনে সন্দেহ হয়। তিনি সুবেদারকে কফিনটি খুলতে বলেন তখন দেখেন সেটা তাঁর ভাই শেখ নাসেরের মরদেহ। সুবেদার এর ব্যাখ্যা দিয়েছিল দুজনেই দেখতে অনেকটা একরকম তাছাড়া রাতের অন্ধকারের কারণে এই ভুল।
মরদেহ দাফন:
সাপ্লাই ব্যাটালিয়নের সৈনিকরা একটানা কাজ করে ১৮টি কবর খুঁড়ে রেখেছিল। ভোর হওয়ার আগেই লাশগুলা দাফন করা হয়।
তিনি লিখেছেন "লাশগুলো দাফনের পর আমি আমার অফিসে ফিরে এক এক করে নামগুলো আমার অফিস প্যাডে লিপিবদ্ধ করি। এছাড়া আর কোথাও এই সামধিগুলোর রেকর্ড নেই"।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতির দাফন:
বঙ্গভবন থেকে আবার মেসেজ পাঠানো হল।
শেখ সাহেবের ডেডবডি টুঙ্গিপাড়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একটি এয়ারফোর্স হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৬ই অগাস্ট সন্ধ্যার আগে আগে তাঁর দাফন কাজ সম্পন্ন হয়।
তাঁর শরীরে ১৮ টি বুলেটের দাগ দেখতে পাওয়া যায়।
তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয় অতি নীরবে,নি:শব্দে টুঙ্গিপাড়ার একটি গ্রামে।

মুজিব হত্যার প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা 'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র' মামলার কী হয়েছিল?

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট যখন সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন কেন সে রকম সরব প্রতিবাদ হয়নি, এ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে গবেষণা করেছেন গবেষক এবং লেখক মোহাম্মদ শামসুল হক।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক প্রতিবাদ এবং সংগঠিত প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকে তৎকালীন সরকার 'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
'ইতিহাসের খসড়া' নামের একটি সাময়িকীর সম্পাদক ও লেখক-গবেষক শামসুল হক বিবিসি বাংলাকে জানান, অগাস্ট মাসেই চট্টগ্রামে সিটি কলেজের কিছু শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করে মিছিল করার চেষ্টা করে।
শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পুরো পরিবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা
"সিটি কলেজ থেকে ছাত্ররা একটি মিছিল বের করে, যা পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়।"
"পরে শিল্পী সদরুল পাশার বাড়িতে একটি বৈঠক হয়, যেখানে সে সময়কার আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।"
তবে ঐ আক্রমণ সফলতা নিয়ে সন্দেহ থাকায় সে সময় তাদের প্রতিহত করেছিলেন বয়োজেষ্ঠ্যরা।
মি. হক বলেন, পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মৌলভী সৈয়দ, তৎকালীন ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন আহমেদ (পরবর্তীতে চট্টগ্রামের মেয়র) এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়া এস.এম. ইউসুফ তাদের অনুসারীদের নিয়ে প্রতিরোধ প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
প্রতিরোধ প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের দুই ধরণের চিন্তা ছিল বলে মন্তব্য করেন গবেষক শামসুল হক।
"সারাদেশের সাংসদদের একটি বড় অংশ সংগঠিত করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকার বিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনা করে সরকারের কার্যক্রমে বড় বাধা তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।"
"আর দ্বিতীয়ত, ভারতে গিয়ে সেখানকার সরকারের সহযোগিতায় বাংলাদেশের সাংসদদের নিয়ে বিকল্প সরকার তৈরি করার বিষয়েও চিন্তা করেছিলেন তারা।"
মামলায় কী অভিযোগ করেছিল তৎকালীন সরকার?
'চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা'র আওতায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের আট থেকে নয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন শামসুল হক।
"মামলাটির নাম চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা হলেও তাদের মূলত জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা অস্ত্র কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল এবং মুজিব হত্যার প্রতিবাদে কী কী নাশকতা করার পরিকল্পনা ছিল তাদের?"
পরিবারসহ শেখ মুজিবুর রহমান
"আরেকটি বিষয় জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্ব পায়, সেটি হলো তারা ভারতের সহায়তায় কী করার পরিকল্পনা করছিলেন।"

কেন সফল হলো না পরিকল্পনা?

শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার প্রতিবাদে ভারতের সহায়তায় সরকার বিরোধীরা যে আন্দোলন তৈরি করতে চেয়েছিলেন তা পরবর্তীতে সফল হয়নি।
"মৌলভি সৈয়দ যখন ভারতে ছিলেন তখন তার সাথে কাদের সিদ্দিকী এবং মহিউদ্দিন আহমেদের যোগাযোগ হয়।"
"কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সরকারের যখন পতন হয় তখন ভারতে এক ধরণের থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল", বলেন মি. হক।
এরপর মোরারজি দেসাইয়ের নেতৃত্বে ভারতে সরকার গঠন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সরকারের সাথে তাদের এক ধরণের সমঝোতা হয় বলে মন্তব্য করেন শামসুল হক।
"ঐ সমঝোতার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলার শীর্ষ আসামীদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত।"
তাদের বলা হয়, ১৯৭৫ পূর্ববর্তী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আর ঐ সময়ের আন্ত:রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে পার্থক্য রয়েছে।
ঐ কারণে ভারতে আশ্রয় নেয়া বিদ্রোহকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায় ভারত।
মি. হক জানান, "মৌলভি সৈয়দকে তার আরো কয়েকজন সহকারীসহ ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করানো হয়।"
"পরবর্তীতে মৌলভি সৈয়দকে সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয় এবং তাকে সেনাবাহিনীর ইন্টারোগেশন সেল- এ নিয়ে প্রচন্ড নির্যাতন করা হয়।"
এরপর চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে মৌলভি সৈয়দের বাবাকে নিয়ে এসে তাকে সনাক্ত করে সেনাবাহিনী।
লেখক মি: হক বলেন, "সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখেই মৌলভি সৈয়দের মৃত্যু হয়। এসব কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন শেষপর্যন্ত সফলতা লাভ করেনি।"
জিয়াউর রহমান

অনুকরণীয় তারুণ্য: বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন শেখ জামাল by সাদ্দিফ অভি

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেঝ ছেলে শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান ছিল ঘটনাবহুল। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের বাকী সদস্যদের মতই গৃহবন্দী ছিলেন। মধ্য আগস্টের একদিন সকালে তার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব দেখতে পান ছেলে ঘরে নেই। বেগম মুজিব তার সন্তানকে অপহরণের অভিযোগ তুললেন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে। সারাবিশ্বে আলোড়ন, বিদেশি পত্রপত্রিকায় ছাপা হলো পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবের ছেলেকে গায়েব করেছে।

গৃহবন্দি দশা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর মুজিব বাহিনীর হয়ে ৫ নং সেক্টরে তিনি যুদ্ধ করলেও কোন এক কৌশলগত কারণে এ কথা চেপে রেখেছিল তৎকালীন প্রবাসী সরকার।

শেখ জামাল অত্যন্ত চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন, মনের কথা মনেই রাখতেন সহজে বের করতেন না। ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ থেকে ম্যাট্রিক ও ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি অত্যন্ত পড়ুয়া প্রকৃতির ছিলেন, দিনের বেশিরভাগ সময়ই পড়াশোনায় ডুবে থাকতেন।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে পালিয়ে শেখ জামাল সরাসরি চলে গিয়েছিলেন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। তারপর ট্রেনিং শেষ করবার পর তাকে মুজিব বাহিনীতে নেওয়া হয়। সেখানেই যুদ্ধের বাকি সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন জামাল। কিন্তু জামালের এই খবরটা সঙ্গত কারণেই একেবারে চেপে যায় স্বাধীন বাঙলা প্রবাসী সরকার, কারণ এই ইস্যুতে প্রবাস সরকার এবং ভারত সরকারের তীব্র চাপে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচণ্ড বেকায়দায় পড়েছিল পাকিস্তান সরকার।

২ ডিসেম্বর লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের যেসব আলোকচিত্র আসে তার একটিতে সীমান্তের ১০ মাইল ভেতরে একটি রণাঙ্গনে সাবমেশিনগানধারীদের একজন হিসেবে ছবি ওঠে জামালের।

যুদ্ধশেষে সদ্য কমিশন পেয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। শেখ জামাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লংকোর্সের প্রথম ব্যাচের কমিশন্ড অফিসার। পরিবারের সকলকেই সুখবরটি দিতে বাড়িতে এসেছিল। ১৪ আগস্ট রাতেই ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। বেগম মুজিব নাকি স্নেহভরে তাকে বলেছিলেন, ‘আজ রাতটুকু থেকে ভোরে যাস।’ জামালের ক্যান্টনমেন্টে আর যাওয়া হয়নি।

পরদিন রাত ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের শিকার শেখ জামালসহ তার পরিবার। এভাবেই থেমে যায় এই টগবগে তরুণের আলো।

অগাস্ট ১৫: খুশি, অখুশি কিংবা নির্বিকার - শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে কেমন ছিল ভারতের প্রতিক্রিয়া by শুভজ্যোতি ঘোষ

আপডেট- ১৫ অগাস্ট ২০১৮: ঠিক ৪৩ বছর আগে অগাস্টের সেই বৃষ্টিভেজা সকালে ঢাকা থেকে সংবাদটা এসেছিল বজ্রপাতের মতো। ভারতে সবেমাত্র ঘোষিত হওয়া জরুরী অবস্থাকে ঘিরে দেশের পরিস্থিতি এমনিতেই টালমাটাল, তখনই খবর এল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় নিজের বাসভবনেই আততায়ীদের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছেন।
ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সেদিন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদের দেওয়া রিসেপশনে যোগ দিতে দেশের কয়েকশো নেতা-মন্ত্রী ও সাংসদ তখন রাষ্ট্রপতি ভবনেই। কর্নাটকের কংগ্রেস নেত্রী মার্গারেট আলভা তখন রাজ্যসভার এমপি, সে দিনের তরুণী সেই রাজনীতিকও ছিলেন সেই দলে।
"রাষ্ট্রপতি ভবনে বসেই আমরা খবরটা পেলাম। মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, সে খবর ততক্ষণে দাবানলের মতো দিল্লি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু লোকে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।"
"আমার খুব ভাল মনে আছে রাষ্ট্রপতি ভবনের ভেতর তখনই বলাবলি শুরু হল ঠিকমতো পদক্ষেপ না-নিলে ভারতেও কিন্তু যে কোনও দিন একই জিনিস ঘটতে পারে। বিশ্বাস করবেন কি-না জানি না, ওটাই ছিল আমাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া", এত বছর বাদে সে দিনের স্মৃতিচারণ করতে বসে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মিস আলভা।
বন্ধুত্ব: প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ২৫-বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতে সই করেন, মার্চ ১৯, ১৯৭২।
একাত্তরের যুদ্ধজয়ের স্মৃতি তখনও ম্লান হয়নি - মার্গারেট আলভার কথায় 'শেখসাহেব তখনও উপমহাদেশের গগনস্পর্শী নায়কদের একজন'। কিন্তু তাঁর যে এ ধরনের পরিণতি হতে পারে, সেটা ভারত একেবারেই ভাবতে পারেননি বলে জানাচ্ছেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ এই রাজনীতিক।

বিনা মেঘে বজ্রপাত, না কি আশঙ্কা ছিলই?

কিন্তু শেখ মুজিবের প্রাণনাশের চেষ্টা হতে পারে, ভারত কি তার একেবারেই কোনও আঁচ পায়নি? মানে এই খবরটা কি দিল্লির কাছে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল বলা যায়?
"না, একেবারেই আন্দাজ করা যায়নি সেটা বলা যাবে না। খবরও ছিল যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা অংশ মুজিবের বিরুদ্ধে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে,'' বলছেন দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের কর্ণধার ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষক, মেজর জেনারেল (অব) দীপঙ্কর ব্যানার্জি।
''রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং ('র')-এর প্রধান আর এন কাও ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় গিয়ে খোদ মুজিবকে বলেও ছিলেন যে তাঁর জীবনের ওপর হামলা হতে পারে, '' জেনারেল ব্যানার্জি বিবিসিকে বলেন।
"কিন্তু মুজিব তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে বলে ওঠেন, ওসব হতেই পারে না। গোটা বাংলাদেশ আমাকে ভালবাসে, ওরা সবাই আমার ছেলেমেয়ের মতো - কে আমাকে মারতে যাবে? আপনার এসব জল্পনায় কান দেওয়ার কোনও দরকার নেই," তিনি জানান।
বস্তুত শেখ মুজিব চেয়েছিলেন বলেই ভারত তাঁর বিরোধী শিবিরের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো বন্ধ করে দিয়েছিল বলে জানাচ্ছেন এই বিশ্লেষক।
ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে বসেই মুজিব হত্যার খবর পেয়েছিলেন সেদিনের নবীন এমপি মার্গারেট আলভা।
কিন্তু ঢাকায় তো এমন ধারণাও কারও কারও আছে যে শেখ মুজিবের করুণ মৃত্যুতে দিল্লি হয়তো তেমন একটা অখুশি হয়নি?
বস্তুত মুজিবের হত্যার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই যেভাবে ভারত খন্দকার মোশতাক আহমেদের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, তাতেও অনেকের মধ্যে এই সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।
কিন্তু মুজিবের মৃত্যুর মাত্র মাসকয়েক আগেও ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করে আসা সাবেক রাষ্ট্রদূত অরুণ কুমার ব্যানার্জি এটাকে 'সম্পূর্ণ বাজে কথা' বলে অভিহিত করেন।
''আমি বলব ভারতের একমাত্র রিঅ্যাকশন ছিল শিয়ার হরর অ্যান্ড শক। কীভাবে এমন মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল, সেটাই দিল্লি ভেবে কূল করতে পারছিল না," বিবিসিকে বলছিলেন মিঃ ব্যানার্জি।
"আসলে শেখ সাহেব নিজে যা-ই বলুন, আমরাই তো তাঁর দেখাশুনো করব বলে কথা দিয়েছিলাম। ফলে ইনটেলিজেন্স গ্যাদারিং বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কোথাও তো একটা খামতি ছিলই।
''যদিও এটা মূলত বাংলাদেশেরই কাজ - আমাদের গোয়েন্দা অ্যাপারেটাসেও কেউ কোথাও একটা ভুলচুক করে ফেলেছিল সেটা তো অস্বীকার করতে পারি না," তিনি বলেন।
দীপঙ্কর ব্যানার্জি আবার বলছিলেন, "ভারতের কাছে মুজিবের ইমেজটা ছিল একটা স্বাধীন দেশের ফাউন্ডার-লিবারেটরের। দেশটা জন্মানোর চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আর্মির একটা অংশ তাকে নির্মমভাবে নিকেশ করে দিতে পারে - ভারত তাতে সত্যিই প্রচন্ড অবাক হয়েছিল।"

কতটা ফাটল ধরেছিল ইন্দিরা-মুজিব সম্পর্কে?

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজেও যে এই ঘটনায় খুব বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন এমনও তো বিশেষ প্রমাণ নেই?
"না, দেখুন - তখনকার সময়টার কথাও আপনাকে ভাবতে হবে,'' মিঃ ব্যানার্জি বলেন।
যুদ্ধ শেষে মুজিবনগরের পত্রিকা, ডিসেম্বর ২৩, ১৯৭১: বন্ধু তালিকার শীর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
মিসেস গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা চালু করেছেন মাস দেড়েক আগে। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তখন একটা অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দীপঙ্কর ব্যানার্জির মতে, মিসেস গান্ধী তখন হাজারটা সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন।
''সত্যি বলতে কী, তখন বাংলাদেশের দিকে বা বাইরের দুনিয়ার দিকে তাঁর তেমন নজর দেওয়া সম্ভবও ছিল না", মনে করেন দীপঙ্কর ব্যানার্জি।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতা নিশ্চয় ছিল - কিন্তু শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর সম্পর্কে যে অস্বস্তির ছায়া পড়তে শুরু করেছিল, সেটাও কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যি।
ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্রসচিব মুচকুন্দ দুবে মুজিব-হত্যার ঠিক চার বছরের মাথায় ভারতীয় হাই কমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন। কোনও রাখঢাক না-করেই তিনি যেমন বলছেন, "আসলে কী, শেখ মুজিবের কিছু কিছু পদক্ষেপে দিল্লির কপালে যে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল সেটা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না।"
স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষক ও সাবেক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি।
"যেমন ধরুন, তার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বা বাকশাল চালু করার উদ্যোগ। ভারত মনে করেছিল সেটা গণতন্ত্রের রাস্তা থেকে বিচ্যুতি বা অ্যাবারেশন। তাঁর প্রশাসনে যে বেশ কিছু আরবিট্রারিনেস বা স্বেচ্ছাচার শেকড় বিছিয়েছিল, সেটা নিয়েও আমরা চিন্তিত ছিলাম।"
"কিন্তু এই উদ্বেগ কখনওই এমন পর্যায়ে পৌঁছয়নি যে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হলে ভারতে খুশির লহর বয়ে যাবে। বড়জোর একটা অসন্তুষ্টি ছিল বলা যেতে পারে, এবং হয়তো এই ফিলিংসটাও ছিল মুজিবের ওই রকম কোনও পরিণতি অনিবার্য!" বলছিলেন মিঃ দুবে।
ঢাকায় তখনকার ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনও অবসর নেওয়ার পর ১৯৯৮ সালে ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, "আরও নানা কারণের সঙ্গে যখন দেখা গেল চুয়াত্তরের অগাস্ট মাসে জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশ সফরে এলেন, তখন শত্রুতা না হোক - ভারতের দিক থেকে একটা হতাশা অবশ্যই তৈরি হয়েছিল।"
আজীবন কংগ্রেসী রাজনীতি করা মার্গারেট আলভার বর্ণনায়, "হ্যাঁ, ততদিনে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে বেশ কয়েকটা ইস্যু তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। যেমন, ফারাক্কা ব্যারাজ তৈরি করা কিংবা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছিলেন, তাদের অনেকের ভারতে থেকে যাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘাত অবশ্যই ছিল।"
"কিন্তু আমি বিশ্বাস করি দুটো দেশের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্থা আর মর্যাদার সম্পর্ক ছিল, সেটাকে কোনও কিছুই ছাপিয়ে যেতে পারেনি। মুজিবের মৃত্যুর পর সে দেশের ইতিহাস অন্য মোড় নিল, দেশটাকে 'মুসলিম বাংলাদেশ' বানানোর চেষ্টা শুরু হল - সেটা অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ!"
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন দেশে জরুরি অবস্থা নিয়ে ব্যস্ত।
মেজর জেনারেল (অব) দীপঙ্কর ব্যানার্জিও মনে করেন, "একাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশ খুব কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে পার হয়েছে সবাই জানে। দুর্ভিক্ষ-অনশন-সাইক্লোনের বহু ঝড়ঝাপটা গেছে। যুদ্ধের পর ভারতেরও তেমন সামর্থ্য ছিল না যে তাদের সব চাহিদা পূরণ করতে পারবে।"
"ভারতীয় গণতন্ত্রেও হয়তো বাংলাদেশকে নিয়ে নানা ধরনের মতামত ছিল - সেটাই তো গণতন্ত্রের বেশিষ্ট্য। কিন্তু তাই বলে শেখ সাহেবের জন্য গুডউইল বা শ্রদ্ধায় কিন্তু কখনওই কোনও ভাঁটা পড়েনি। তার অনিষ্ট হোক এটা ভারত কখনও চায়নি, চাইতে পারেই না", রীতিমতো জোর দিয়ে বলেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল ১৫ই অগাস্ট তারিখটা?

যে কোনও দেশের জাতীয় নায়কদের মতোই শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ড নিয়েও নানা ধরনের 'কনস্পিরেসি থিওরি' বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব চালু আছে। তার কোনও কোনওটায় ভারতের দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক অরুণ ব্যানার্জি অবশ্য এই সব জল্পনা-কল্পনা হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছেন।
চুয়াত্তরে জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরকে ভারত ভালভাবে নেয়নি।
"দেখুন, নির্দিষ্ট করে এই ১৫ই অগাস্ট তারিখটা বেছেই নেওয়া হয়েছিল খুব সচেতনভাবে। ভারতের স্বাধীনতা দিবস ওটা - আর ক্যু-র ষড়যন্ত্রকারীরা ভারতকেই একটা মেসেজ দিতে চেয়েছিল। বার্তাটা ছিল, তোমাদের এত খাতিরের লোক - আর তোমাদের বিশেষ দিনে দ্যাখো এই তার অবস্থা", বলছিলেন তিনি।
"ওই অভ্যুত্থানের কিছুদিনের মধ্যেই যেভাবে বাংলাদেশের টপ ইনটেলেজিন্সিয়া বা বুদ্ধিজীবীদের শেষ করে দেওয়া হল, তাজুদ্দিন আহমেদ-সহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দ্বিতীয় সারিটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল, তাতে বোঝাই যায় এর মাধ্যমে কারা লাভবান হতে চেয়েছিল", বলছিলেন ওই টালমাটাল সময়ে ঢাকায় কাটানো এই প্রাক্তন কূটনীতিক।

কেন ভারত দোষারোপ করেছিল সিআইএ-কে?

যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তাতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলেই বরং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃঢ় বিশ্বাস। অরুণ ব্যানার্জি নিজেও এই মতের শরিক।
কলকাতায় কংগ্রেসী ঘরানার সংবাদপত্র যুগান্তরে তো সে সময় সরাসরি লেখা হয়েছিল ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস বোস্টার এই ক্যু-তে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অরুণ কুমার ব্যানার্জি।
বর্তমানে মার্কিন-প্রবাসী ভারতীয় গবেষক বি জেড খসরু লিখেছেন, "কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল নিজে যুগান্তর অফিসে গিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এই খবর প্রত্যাহার করে যুগান্তরকে প্রথম পাতায় ক্ষমা চাইতে হবে বলেও তিনি জেদ ধরে ছিলেন।"
ভারতের বিভিন্ন খবরের কাগজেও সিআইএ-র দিকে আঙুল তুলে সে সময় নানা সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছিল।
দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশনস ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমেরিকা বিভাগের প্রধান জে এস তেজার সঙ্গে দেখা করে রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে এসেছিলেন, এ রকম চলতে থাকলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার ফল ভাল হবে না।
ভারতে তখন ইমার্জেন্সি চলছে, সব খবরের কাগজে প্রথম পাতায় কী খবর বেরোবে সরকারই তা সেন্সর করত। বেশির ভাগ কাগজেই সেটারই প্রতিফলন ঘটত, সরকার যা চাইছে।

ব্যর্থতার দায়ভার কতটুকু ভারতের?

কিন্তু শেখ মুজিবকে যে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি, সেই ব্যর্থতার দায়ভার বহু দিন পর্যন্ত ভারতকেও অনেকটাই বয়ে বেড়াতে হয়েছে।
মুজিবের মৃত্যুর চার বছরের মাথায়, ১৯৭৯-র অক্টোবরে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে গেলেন মুচকুন্দ দুবে। তাকেও তখন অহরহ এই বিষয়টা নিয়ে অনুযোগ শুনতে হয়েছে।
ঢাকায় সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার ও ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব মুচকুন্দ দুবে
"অনেকেই আমাকে তখন বলতেন এত বড় ঘটনাটা আপনারা জানতেই পারলেন না? ঠেকাতেই পারলেন না? তাদের কথায় প্রচ্ছন্নভাবে এই সুরটাই থাকত, যেন মুজিবের হত্যাকান্ড দিল্লিরই কূটনৈতিক ব্যর্থতা।"
"তারা কিন্তু এই জিনিসটা বুঝতেন না যে একটা সার্বভৌম দেশ আর একটা সার্বভৌম দেশের সব কিছু করে দিতে পারে না। যেমন ধরুন, আপনি আপনার ইনটেলিজেন্স নেটওয়ার্ক অন্য দেশের সব জায়গায় রাখতে পারেন না - রাখলে সেটাকেই তখন সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো বলা হবে", কিছুটা বিষণ্ণ সুরেই বলেন মুচকুন্দ দুবে।
অরুণ ব্যানার্জিও এ প্রসঙ্গে যোগ করেন, "বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই এই ডিবেটটা আগাগোড়া ছিল যে ভারত তাদের কতটা গাইড করবে, আর কতটা একলা ছেড়ে দেবে? যতই হোক, বাংলাদেশ তাদের নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে - একটা সময় পর ভারত তো সেখানে ব্যাকসিট নিতেই বেশি পছন্দ করবে।"
কিন্তু ভারত ঠিক কতটা পেছনে সরে গিয়েছিল - আর সেই দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ নিয়েই শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছিল কি-না, সেই বিতর্কের মীমাংসা আজও হয়নি।

১৫ই অগাস্ট, ১৯৭৫-র পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

সে যাই হোক, শেখ মুজিবের হত্যার অব্যবহিত পর ভারত ঠিক কী কী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিল?
একাত্তরের যুদ্ধের পর শেখ মুজিবের ছবি নিয়ে ভারতীয় সেনাদের উল্লাস
তখনকার ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনের (যিনি এখন আর বেঁচে নেই) লেখা থেকেই আবার উদ্ধৃত করা যাক, "আমার মত ছিল অপেক্ষা করা ও নজর রাখা - কিন্তু সেই সঙ্গেই আমি মনে করেছিলাম, বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। যদিও ভারত সরকারের কারও কারও সেই ভাবনাটা পছন্দ হয়নি।"
"শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে নিশ্চয় একটা বড় আঘাত ছিল - কিন্তু বিপর্যয় ছিল না। বস্তুত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সম্পর্কের মধ্যে একটা আপাত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।"
শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হওয়ার ঠিক পাঁচদিনের মাথায়, ২০শে অগাস্ট ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত সমর সেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলেন বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে। হাসিমুখে দুজনের করমর্দনের ছবিও বেরোল ভারতের 'দ্য হিন্দু' পত্রিকার প্রথম পাতায়।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও এক অভাবিত নতুন মোড় নিল ১৯৭৫-র সেই ঘটনাবহুল আগস্ট থেকেই।
ঢাকার সংবাদপত্রে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের সাজার খবর

বঙ্গবন্ধুর একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজ ১৫ই আগস্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী। এই মহান নেতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিশিষ্ট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়—বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শৈশব কিংবা কৈশোরের স্মৃতি।
১৯৬৬ সালের পর আমি প্রথম বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি যখন উনি ছয় দফা’র সমর্থনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ কিংবা মিটিং করেছেন, ঠিক সেই সময়েই। তিনি গিয়েছিলেন সিলেটে। সিলেটে সেই রেজিস্ট্রি—রেজিস্ট্রি বলতে যেখানে আইনের কিছু বিষয় থাকে। সেই রেজিস্ট্রার মাঠে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই প্রথম তাঁর বাগ্মিতার সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হলো। আমরা মাঠ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধু চাইতেন না যে, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা, বিশেষ করে ছাত্ররা এতে অংশগ্রহণ করুক। এখন যে রকম পাড়ায় পাড়ায় মন্ত্রিরা গেলে স্কুল-কলেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, বঙ্গবন্ধু তা একেবারেই পছন্দ করতেন না। ছাত্ররা গেলে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। তাঁর কথা ছিল যে, এ বয়সে ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে থাকবে, পড়ালেখা করবে। আর যারা ছাত্র রাজনীতি করে তারা কিছুটা বয়স হলে তারপর আসতে পারে। এজন্য একটু ভয়ে ভয়ে আমরা একটু দূরেই ছিলাম এবং আমাদের বলেই দেয়া হয়েছিল যে, আমরা যেন একেবারে সামনে না যাই। তাই আমরা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তখন এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছি। তখন আমার মনে হয়েছিল, অসাধারণ একটি বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি হাস্য-রসেরও কিছু জোগান দিয়েছিলেন। কিছুটা কৌতুক, সরস কথাবার্তা কিন্তু মূল বক্তব্যটা খুবই প্রায়োগিক ছিল। তাঁর একটি কথা এখনও আমার কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন—‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে, আঙ্গুল ত্যাড়া করতে হয়’। এই কথায় আমরা খুবই আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন। আমার মনে আছে, জোরে জোরে হাততালিও দিয়েছিলাম। তারপর বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি কয়েকটি। কিন্তু আমার কানে লেগে থাকা এবং আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ শোনা ভাষণ হলো ৭ই মার্চের ভাষণ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসেই সেই ভাষণ শুনেছিলাম। বিদেশি এক রেডিওর সাংবাদিক এসেছিল। তিনি একজন দো-ভাষী খুঁজছিলেন। তার সঙ্গেই আমি গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সাংবাদিকদের যেহেতু আলাদা একটা বসার জায়গা ছিলো, আমাকে তাই সেখানে নিয়েই তিনি বসালেন। বলতে গেলে অনেকটা সামনেই ছিলাম। সেখান থেকেই আমি শুনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সেই কাব্যিক ভাষণ। সেই সাংবাদিক একটা রেডিও বোধহয় মঞ্চে রেখে এসেছিলেন রেকর্ড করার জন্য। খাতা ছিল আমার কাছে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি শুধু অনুবাদটা করো আমার জন্য। দুই মিনিট পর বললেন, ‘তুমি শুধু ‘কি ওয়ার্ড’ লিখে রাখো’। আমি শুধু ওই ‘কি ওয়ার্ডগুলো’ লিখে রেখেছি। প্রত্যেকটি কথা মন দিয়ে শুনেছি। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছিলো এমন একটি ভাষণ আমি সারা পৃথিবীতে শুনিনি। আসলে ওই সময়টায় একটা জাদু ছিল বাতাসে। আমরা যা চাচ্ছিলাম তাই তিনি বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, আমরা যা আশা করছিলাম আর প্রতিফলন ছিল সেই ভাষণে। এবং আমরা পরে বুঝেছি, কেন তিনি সেদিন একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। এতো বড় দায়িত্ব নিয়ে এতো বড় বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন। যা হোক, তারপর আবার যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে এলেন। ওইদিনও আমি ঢাকাতেই ছিলাম। কিন্তু একটু দেরি করে যাওয়ার ফলে পুরো বক্তৃতাটি শুনতে পারি নি। তবে যেটুকু শুনেছিলাম, তাতে মনে হয়েছে, ভাষণটি ৭ই মার্চের ভাষণ এর ধারে কাছে আসতে পারে। এটি মূলত তাঁর একটি দিক নির্দেশনামূলক বক্তৃতা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আর উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা তো আলাদা জিনিস। তারপর বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর দালানের উপর। আবার, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে যখন আলোচনা চলছে তখন আমরা শেরাটন হোটেলের আশেপাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। কারণ তিনি মূলত এই রাস্তা ধরেই তাঁকে চলাফেরা করতে দেখতাম—৭২, ৭৩ কিংবা ৭০ সালের আগেও দেখতাম। বঙ্গবন্ধু যখন জননেতা ছিলেন, যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বহাল ছিলেন না তখন তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়াটা সহজ ছিল। তাঁর ৩২ নম্বর বাসার সামনে গেলে এবং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে তাঁকে দেখা যেতো। কারণ তিনি বাসায় থাকলে বারান্দায় আসতেন অথবা যখন তিনি বের হতেন তখন মানুষের মাথায় হাত দিতেন। এক কথায় ভয়ানকভাবে মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর চেহারার মধ্যেই একটি অন্য রকমের আকর্ষণ ছিল—গম্ভীর একজন গলার মানুষ এবং যাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। মানুষের জন্য তাঁর অসীম ভালোবাসা ছিলো। অনেকের নাম মনে রাখতেন। আমার খুব কষ্ট লাগে যে, আমার সমবয়সী অনেকের নাম বঙ্গবন্ধু জানতেন। কিন্তু আমি তো কখনো সামনে যাইনি তাই হয়তো আমার নাম তিনি জানতেন না। সেই অর্থে বঙ্গবন্ধুর সাথে সামনে থেকে কথাবার্তা বলার সুযোগ আমার হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাঁর সামনে গিয়েছি, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে কিন্তু আমার সঙ্গে হয়নি। এখন ঐ বন্ধুরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের স্মৃতিকথা লেখেন তখন আমার খুবই মন খারাপ হয়। মনে মনে আক্ষেপ করে বলি, বঙ্গবন্ধু’র একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম!

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা দুইই বেড়ে গেল। সুতরাং আগের মতো সহজেই তাঁকে পাওয়া বা দেখা যেতো না। বাড়ির সামনে গেলেই পুলিশ সরিয়ে দিতো। আর তখন মানুষের মধ্যে উৎসাহও অনেকটা কমে গিয়েছিল। কারণ স্বাধীন তো হয়েই গেছি আর বঙ্গবন্ধু তো আছেন-ই। ১০ই জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো বক্তৃতা আমার শোনা হয়নি। এর আগে যখন ’৬৯-এ তিনি আগরতলা মামলা থেকে বেরিয়ে আসলেন  তখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছিলাম। অনেক ভিড় ছিল। আর আমি একটু ভিড়-টিড় এড়িয়ে চলি তো! ঠ্যেলে ঠ্যেলে সামনে যাওয়ার মানুষ আমি না। যারা সামনে গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে এবং তারা যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছে এবং হাত মিলিয়েছে সে কথাও আমি শুনেছি পরে। এই তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার স্মৃতি। বঙ্গবন্ধু সবসময় আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। এটাই ছিলো আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিশাল একটা পাওয়া বা প্রেরণা। এমনকি ’৭১ সালে তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, তখনও আমি দেখেছি মুক্তিযোদ্ধরা তাঁর নামে যুদ্ধ করেছেন, আমাদের সবারই মনে হয়েছে তিনি আমাদের মাঝে আছেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব অনুপ্রেরণাদায়ী একজন মানুষ; যাঁর গলার স্বর থেকে হাতের আঙ্গুল বা হাত উত্তোলনের ভঙ্গি সবই তাঁর নিজস্ব। এসব কিছুই খুবই আকর্ষণীয় ছিল। আমি এ জীবনে যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেখছি, তারা কেউই তার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী নন। তিনি একেবারে সবার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। এসব কারণে তাঁর জন্য আমাদের হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। আমি মনে করি তিনি একজন ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ নেতা ছিলেন, মানুষ ছিলেন। সব সময় মাথাটা উঁচু করে চলতেন। যখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছি—বিশেষ করে ’৭০-এর শেষের দিকে কিংবা ’৭১-এর মার্চে, তিনি মানুষের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছেন। প্রায় সবসময়ই মানুষ তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো তাঁকে দেখার জন্য। আর সবার আশা ছিল বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে পারলে হয়তো কিছু দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে। তখন তো এই মোবাইল একেবারেই ছিল না। বলতে গেলে এই রেডিও, টেলিভিশন সবই ছিল পাকিস্তানিদের দখলে। আর পত্র-পত্রিকায় যেগুলো বের হতো, এই ব্রেকিং নিউজ বলতে কিছুই ছিল না। খবর জোগাড় করতে হতো। আর আমাদের সুবিধা ছিল, হলে থাকার ফলে অনেকের কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যেত। বঙ্গবন্ধু কোথায় যাচ্ছেন, যখন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে মিটিং তখন আমরা হল থেকে বের হতাম। মনে হয় পনেরো-কুড়ি মিনিট হাঁটলেই সেখানে চলে যেতে পারতাম। সেইজন্য সুযোগগুলো আমরা বাদ দেইনি। যখন বঙ্গবন্ধু ভিতরে আলোচনা করছেন, আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছি— মনে হচ্ছে আমরা আছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। এই অনুভূতিটা ঠিক বোঝানো মুশকিল। এখন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে ছাত্ররা এভাবে থাকে, এরকম দাবি করতে পারবেন বলে মনে হয় না আমার।

যা হোক, এই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার স্মৃতি।

তবে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে আমার কিছুটা দূরের মানুষ মনে হয়েছে। সেটা সবসময়ই হয়। কারণ একজন মাঠের মানুষ যখন ঘরের মধ্যে (গণভবনে) চলে গেলেন তখন মনে হলো যে, এখন তো আর সেই বঙ্গবন্ধুকে পাবো না, কারণ তিনি এখন সরকার পরিচালনা করছেন, তবে তখন দেশ নিয়ে আমাদের বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা ছিলো না, কারণ দেশের ভার তিনি গ্রহণ করেছেন। এরপর যখন তাঁকে হত্যা করা হলো তখন যে শূন্যতা অনুভব করেছিলাম তার কোনো তুলনা নেই। একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো, বিমূঢ় হয়ে যাওয়ার মতো। ওইদিনটা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। যা হোক, আনন্দ এখানে যে, তাঁকে যে একসময় অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার যে চেষ্টা করা হচ্ছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। আমি আগে থেকেই জানতাম যে, সেটা কখনই সম্ভব নয়। এখন তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে চিনছে, তাঁর আদর্শকে ধারণ করার চেষ্টা করছে, আমার কাছে এগুলো খুবই ভালো লাগছে। আর আরেকটা আনন্দের ব্যাপার হলো, তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বেরিয়েছে, আমি মনে করি এটা জাতিকে বিভিন্ন অপ্রকাশিত ঘটনা জানাবে এবং দিক নির্দেশনা দেবে। পুনর্মুদ্রণ

>>>শ্রুতিগ্রহণ ও শ্রুতিলিখন : আমিনুল ইসলাম
>>বাংলা ট্রিবিউন, আগস্ট ১৫ , ২০১৯ থেকে