Showing posts with label ড. সাজিদ হক. Show all posts
Showing posts with label ড. সাজিদ হক. Show all posts

Tuesday, May 5, 2020

উইগনারস ফ্রেন্ড by ড. সাজিদ হক

শ্রডিঙ্গারের বিড়ালের গল্প আমরা অনেকেই জানি। পুরো বিষয়টা না বুঝলেও এই ধরনের যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা অনেকেই জানেন। গল্পটা অনেকটা এমন—একটা বিড়াল একটা বাক্সের ভেতর বন্দী আছে। বাক্সের ভেতর কিছু একটা কায়দা করা আছে, যাতে বিড়ালটি বেঁচেও থাকতে পারে আবার মরেও যেতে পারে। ধরা যেতে পারে বাক্সের ভেতর একটা তেজস্ক্রিয় বস্তু রাখা আছে, যা অ্যাকটিভ হলে বিড়ালটা মারা যাবে, আর না হলে বিড়ালটা বেঁচে থাকবে। ধরা যাক এই তেজস্ক্রিয় বস্তুটার অ্যাকটিভ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। এখন প্রশ্ন হলো বিড়ালটা জীবিত না মৃত?
কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বলে, বাক্স না খুললে আমরা বলতে পারি, বিড়ালটা জীবিত ও মৃতের এক ধরনের মিশ্র বা সমন্বিত অবস্থায় আছে। কেবল বাক্স খুললেই অর্থাৎ পরিমাপ (measurement) করলে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে বিড়ালটা জীবিত না মৃত কোন অবস্থায় আছে। আর বিষয়টা নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। আসলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় পরিমাপ করা কী, তা নিয়ে বেশ কিছু জটিলতা আছে। ‘ঈশ্বর জুয়া খেলেন না’—আইনস্টাইনের বিখ্যাত এই উক্তির জন্মও এই জটিলতা থেকেই। তবে শ্রডিঙ্গারের এই বিড়ালের গল্পের একটা এক্সটেনশন বা বর্ধিত অংশ আছে, যেটা হয়তো অনেকেই জানেন না। অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত এই বর্ধিত অংশটি ‘উইগনারস ফ্রেন্ড’ নামে পরিচিত। আমাদের আজকের আলোচনা বিষয়টি নিয়ে।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যা (Quantum Mechanics) পদার্থবিজ্ঞানে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সমস্যার জন্ম দিয়েছে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গাণিতিক কাঠামোটা ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের মতো সোজাসাপ্টা না। বিষয়টি শিখতে শিক্ষার্থীদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। আমার পিএইচডি পাঠ্যসূচিতে দুইটা আবশ্যকীয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোর্স ছিল। যে শিক্ষক আমাদের পড়াতেন তিনি আমাদের যে সাপ্তাহিক হোমওয়ার্ক দিতেন, তার সমস্যাগুলো হতো বেশ জটিল এবং দীর্ঘ, করতে ৭০/৮০ পাতা লেগে যেত। সপ্তাহজুড়ে খাওয়া-ঘুম বাদ দিয়ে তা শেষ করতে হতো। যেটুকু সময় ঘুমাতাম, দুঃস্বপ্ন দেখতাম ভয়ংকর সব ম্যাট্রিক্স ডায়াগোনালইজ করতে চেষ্টা করছি। কী যে ভয়ংকর পরিশ্রম!
মূল বিষয়ে ফেরা যাক। ‘উইগনারস ফ্রেন্ড’ নামটি এসেছে বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ ইউজিন উইগনারের নাম থেকে। পদার্থবিজ্ঞানে গ্রুপ থিওরি প্রবর্তন করার পেছনে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। গ্রুপ থিওরি হলো গণিতের একটা শাখা, যা সিমেট্রি নিয়ে কাজ করে। তা ছাড়া ম্যানহাটন প্রজেক্টেও তার বেশ ভালো ভূমিকা ছিল। একটা মজার তথ্য হলো, উইগনারের ছোট বোন মারগিত (Margit) ছিলেন আরেক ভুবনবিখ্যাত পদার্থবিদ পল ডিরাকের স্ত্রী। ইউজিন উইগনার প্রিন্সটনসহ বহু নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ন্যাশনাল ল্যাবে কাজ করেছেন। তিনি অল্প কিছুদিন আমার পিএইচডি ইনস্টিটিউশন ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনেরও শিক্ষক ছিলেন। উইগনার ১৯৬১ সালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পরিমাপসংক্রান্ত একটা চিন্তা পরীক্ষার রূপরেখা দেন, সেটাই ‘উইগনারস ফ্রেন্ড’ নামে পরিচিত। এখন প্রশ্ন হলো, উইগনারস ফ্রেন্ড নামের এই চিন্তা পরীক্ষা ব্যাপারটা আসলে কী?

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে এক ধরনের কাল্পনিক পরীক্ষা চিন্তা করার চল আছে। একে বলা হয় গেডাঙ্কেন পরীক্ষা বা চিন্তা পরীক্ষা। শ্রডিঙ্গারের বিড়াল বা উইগনারস ফ্রেন্ডও এই ধরনেরই চিন্তা পরীক্ষা। খুব গভীর কোনো ধারণার অবতারণা করার জন্য এই ধরনের কল্পিত পরীক্ষা সাজানো হয়। চলুন উইগনারস ফ্রেন্ড পরীক্ষাটি কী, তা জেনে নেওয়া যাক। তবে ব্যাপারটি সামান্য পরিবর্তন করে অনেকটা গল্পের মতো করে বলার চেষ্টা করছি।
ধরুন পদার্থবিদ উইগনারের বন্ধু শ্রডিঙ্গারের বিড়ালের পরীক্ষাটা করতে চাচ্ছেন। পরীক্ষাটা করতে হলে তাঁর একটা বিড়াল দরকার। বন্ধুর নিজের কোনো বিড়াল নেই। তবে উইগনারের একটা বিড়াল আছে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই পরীক্ষার পর বিড়ালটার মারা যাওয়ার একটা বড় আশঙ্কা আছে। তবে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগের কারণে মরার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও উইগনার বিড়ালটি পরীক্ষার জন্য দিতে রাজি হলেন। কিন্তু নিজের প্রিয় বিড়ালকে নিয়ে এই বিপজ্জনক পরীক্ষার সময় পরীক্ষাগারে উপস্থিত থাকা উইগনারের পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি বন্ধুকে বললেন, পরীক্ষাটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর ফিরবেন। যা-ই হোক, উইগনার চলে গেলেন এবং বন্ধু পরীক্ষাটি শেষ করলেন। একটু পর উইগনার ফিরে দরজায় নক করলেন। বন্ধু দরজা খোলার পর জানতে চাইলেন কী ঘটেছে এবং বন্ধু বলার পর তিনি জানতে পারলেন বিড়ালের ভাগ্য।
এখন প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কোথায়? আসলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ভৌত অবস্থার পরিমাপসংক্রান্ত সমস্যা বলে একটা সমস্যা আছে। আর উইগনার পরীক্ষাটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সেই পরিমাপসংক্রান্ত জটিলতারই একটা প্রকাশ। জটিলতার মূল কারণ, এ ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় দুজন পর্যবেক্ষক বা অবজারভার কোনো একটা ভৌত অবস্থা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য আবার শ্রডিঙ্গারের বিড়ালের গল্পে ফিরে যাওয়া যাক। আগেই বলা হয়েছে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুযায়ী বাক্স খোলার আগে বিড়ালটা জীবিত ও মৃতের একটা মিশ্র বা সমন্বিত অবস্থায় আছে। শুধু বাক্সটা খুললে, অর্থাৎ যখন পরিমাপ করা হবে, তখন এই মিশ্র অবস্থা থেকে জীবিত অথবা মৃত একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় বিড়ালটিকে পাওয়া যাবে।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় এভাবেই বস্তুর অবস্থা এবং পরিমাপকে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং পরিমাপের ফলে একটা সমন্বিত অবস্থা থেকে সুনির্দিষ্ট অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়াকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স বা তরঙ্গ ফাংশনের পতন বলা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় এই ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স ঠিক কীভাবে হয়, সেটা পরিষ্কার না। আর এটাই পরিমাপসংক্রান্ত সমস্যা নামে পরিচিত। এখানে বলে রাখি, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এই যে গাণিতিক কাঠামো তার সফলতা নিয়ে বিন্দুমাত্র কোনো সংশয় নেই এখন পর্যন্ত। যা-ই হোক, এখন উইগনারের বন্ধুর পরীক্ষাটিতে ফিরে আসা যাক। বন্ধুটি যখন বাক্স খুলে দেখবেন বিড়ালটা জীবিত (অথবা মৃত) ঠিক সেই সময় উইগনারের (যিনি পরীক্ষাগারের বাইরে বেড়াতে গেছেন) দিক থেকে চিন্তা করলে বিড়ালটা কিন্তু একটা বেশ জটিল মিশ্র অবস্থায় আছে। লক্ষ করুন, নতুন এই মিশ্র অবস্থাও দুটি অংশের একটা সমন্বিত রূপ। তবে এই মিশ্র অবস্থা আগের মিশ্র অবস্থা থেকে একটু ভিন্ন, কারণ এখন এর সঙ্গে উইগনারের বন্ধুর অবস্থাও জড়িয়ে আছে। চিন্তার সুবিধার্থে ভাবা যেতে পারে বিড়ালটা মরে গেলে বন্ধু হয়তো বিষণ্ন থাকবেন আর বিড়ালটা বেঁচে থাকলে বন্ধু হয়তো প্রসন্ন থাকবেন। এরপর বেশ খানিকক্ষণ পরে যখন উইগনার ফিরে এসে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছেন, তখন তাঁর ক্ষেত্রে ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স হয়েছে। তবে বন্ধুর দিক থেকে ভাবলে ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স অনেক আগেই হয়ে গেছে, যা কিনা উইগনারের দিক থেকে চিন্তা করলে হচ্ছে আরও পরে। তাহলে ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স আসলে হলো কখন? মনে করিয়ে দিচ্ছি, ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স হওয়ার অর্থ হচ্ছে বিড়াল জীবিত না মৃত, তা নির্ধারিত হয়ে যাওয়া। তা ছাড়া বন্ধুর ক্ষেত্রে ঠিক যে অবস্থায় ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স করছে অর্থাৎ যে ফলাফল দেখা গেছে, উইগনারের ক্ষেত্রেও কি সব সময় তা-ই?

সমস্যাটার আরেকটা দিক হচ্ছে, যদি অন্য কোনো পর্যবেক্ষকের অস্তিত্ব আছে ধরা হয়, যেমন বাক্সের ভেতরকার কোনো একটা অণুকে যদি পর্যবেক্ষক ধরে নেওয়া হয়, তাহলে তার পরিপ্রেক্ষিতে বিড়ালটার অবস্থা আবার ভিন্ন। এভাবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের জন্য অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা থাকতে পারে। অন্যভাবে বললে, ভিন্ন ভিন্ন কোয়ান্টাম বিশ্ব কি তাহলে একই সঙ্গে বিরাজমান? বাস্তবতা তাহলে কী? এই জটিলতা থেকে বের হওয়ার জন্য উইগনার সচেতন পর্যবেক্ষক (conscious observer) বলে একটা ধারণার প্রস্তাব করেন। তাঁর বক্তব্য হলো, একজন সচেতন পর্যবেক্ষক বা অবজারভারের উপস্থিতিতেই কেবল ওয়েভ ফাংশন কোলাপ্স করবে। সচেতনতা কোয়ান্টাম পরিমাপের ক্ষেত্রে একটা অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। অন্যভাবে বললে, সচেতনতাই হলো বাস্তবতা। অনেকটা দর্শনের মতো শোনাচ্ছে তাই না? অনেকটা যেন, I think, therefore I am--রেনে দেকার্টের বিখ্যাত এই দার্শনিক উক্তির প্রতিধ্বনি মনে হচ্ছে। আধুনিক দর্শনের জনক দেকার্টেও কিন্তু একজন গণিতজ্ঞ এবং পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন।
মূলত সচেতনতার গুরুত্ব বোঝাতেই উইগনার এই চিন্তা পরীক্ষার অবতারণা করেন। আসলে উইগনার বিশ্বাস করতেন, কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় পরিমাপের ক্ষেত্রে সচেতন পর্যবেক্ষক একটা প্রয়োজনীয় ব্যাপার। বন্ধুর দিক থেকে শুরু করা যাক। উইগনারের ব্যাখ্যা বলে, বন্ধু যখন বাক্সটা খুলবেন, তখন তার সচেতনতা পরিমাপ (অর্থাৎ বাক্সটি খোলা) দিয়ে প্রভাবিত হবে এবং তা বিড়ালের মিশ্র/সমন্বিত অবস্থা থেকে একটা সুনির্দিষ্ট অবস্থা নির্ণয় করবে। কিন্তু গল্পের উইগনারের যেহেতু এই সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়ার উপায় নেই, তার দিক থেকে বিড়াল ও বন্ধু মিলিয়ে এক ধরনের মিশ্র/সমন্বিত অবস্থা আছে। কিন্তু যখন তিনি বন্ধুকে পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন, তখন পর্যবেক্ষক হিসেবে তার সচেতনতা বন্ধুর উত্তর থেকে প্রভাবিত হবে এবং এর ফলে উইগনারও একই উপসংহারে পৌঁছাবেন।
এই ব্যাখ্যায় এখন পর্যন্ত মোটামুটি সব ঠিকঠাক আছে। কিন্তু ধরা যাক, উইগনার তাঁর বন্ধুকে আবার জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে এই পরীক্ষার ফলাফল অর্থাৎ বিড়ালের সত্যিকার অবস্থা তাঁর বন্ধু বেশ আগে থেকেই জানেন। মানে উইগনার জিজ্ঞেস করার আগেই। কাজেই উইগনার দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে মিশ্র ও সমন্বিত অবস্থার দুটি অংশের ভেতর যেকোনো একটি অংশ (বিড়াল জীবিত+বন্ধু প্রসন্ন অথবা মৃত+বন্ধু বিষণ্ন) আছে। কিন্তু তাতে এখনো বন্ধুর অংশটা আছে। কাজেই আবার একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু উইগনার বলতে চাচ্ছেন, একটা সচেতন পর্যবেক্ষক এবং একটা inanimate পর্যবেক্ষকেরা পরীক্ষা পদ্ধতি (বাক্সের ভেতরের অণু যেমন) কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ব্যাপার। কাজেই উইগনারের দৃষ্টিকোণ থেকে বন্ধুকে বিড়ালের সঙ্গে যোগ করে একটা মিশ্র অবস্থা তৈরি করা যাবে না। উইগনারের বক্তব্য হলো, একটা সচেতন পর্যবেক্ষকের জন্য পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো খানিকটা ভিন্ন।
পদার্থবিদ উইগনারের এই সচেতন পর্যবেক্ষকের ধারণা যে সবাই গ্রহণ করেছেন, তা না। অনেক প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন হলো, সচেতন পর্যবেক্ষক কাকে বলা হবে? শুধু মানুষকে? বাস্তবতা তাহলে কী? বহু বিশ্বের একটা ধারণা আছে যাতে সচেতন পর্যবেক্ষকের প্রয়োজন পড়ে না। মোট কথা, অনেক পাল্টা যুক্তি আছে। উইগনারস ফ্রেন্ডের কোনো সর্বজনসম্মত বোধ (understanding) এখনো নেই। অন্য ধারণাগুলো নিয়ে অন্য কোনো সময় আলোচনা করা যাবে। আজকে এখানে শেষ করা যাক।
>>>ড. সাজিদ হক: শিক্ষক ও গবেষক, স্ট্রিং থিওরি অ্যান্ড কসমোলজি, ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসর, কানাডা
ই-মেইল: shajidhaque@gmail.com

Monday, March 19, 2018

‘কৃষ্ণবিবর পুরোপুরি কৃষ্ণ নয়’ by ড. সাজিদ হক

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান অধিকাংশ সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে। এ বিষয় নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা ঠিক সেভাবে পরিচিতি পান না। অল্প দু-একজন গবেষক বা বিজ্ঞানী এই ব্যাপারে সফলতা পান। প্রায় ১০০ বছর আগে আইনস্টাইন পেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর সাম্প্রতিক কালে পেয়েছেন বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তার মাত্রা সারা বিশ্ব দেখতে পেল। একই মানের সমসাময়িক অন্য তাত্ত্বিক পদার্থবিদেরা মানুষের এত কাছে পৌঁছাতে পারেননি। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি পৃথিবীর বহু দেশে অনেক সম্মেলন ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে কোথাও দেখা হয়নি। আমার গবেষণা সহকর্মী ও বন্ধু ড. তীব্র আলীর কাছে বেশ কিছু গল্প শুনেছি, কিন্তু নিজে কখনো কথা বলতে পারিনি। সে জন্য এই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো গল্প নেই। আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর গবেষণার মূল বিষয়টি নিয়ে মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে মোটামুটি ধারণা পেয়েছে। সেদিক থেকে এ বিষয়েও নতুন তেমন কিছু যোগ করার নেই। কাকতালীয়ভাবে আমার সর্বশেষ গবেষণাপত্র, যেটি মাত্র গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে, স্টিফেন হকিংয়ের একটি বিখ্যাত কাজ ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’-এর (Singularity Theorem) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা এই ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’কে এখনকার সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব ‘স্ট্রিং থিওরি’ (String Theory) থেকে পর্যালোচনা করেছি। পদার্থবিজ্ঞানে প্ল্যাঙ্ক স্কেল বা একক বলে একটা ব্যাপার আছে। খুব বেশি শক্তি বা খুব ছোট দৈর্ঘ্যের জন্য এই এককটি ব্যবহার করা হয়। যেমন: এক প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১ সেন্টিমিটার/১০...০ সমান (৩৩টি শূন্য)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃতি সব সময় এই প্রচণ্ড শক্তির স্কেলে কী হচ্ছে, সেটা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এই স্কেলের খুব সহজ উপস্থিতি দেখা যায় দুটো ক্ষেত্রে—
১. কৃষ্ণবিবরের ইভেন্ট হরাইজনের (Event Horizon) ভেতর।
২. বৃহৎ বিস্ফোরণ (BIG Bang) সিঙ্গুলারিটিতে (বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও সৃষ্টির শুরু অবস্থা)।
কৃষ্ণবিবরের ইভেন্ট হরাইজনের ভেতর কী হচ্ছে, প্রকৃতি তা আমাদের জানতে দেয় না। একইভাবে মনে হয় যেন, এই মহাবিশ্বের শুরুতে কী হয়েছে, প্রকৃতি সেটা গোপন করার জন্য সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্বকে অবিশ্বাস্য গতিতে সম্প্রসারণ করেছে। এই ব্যাপারকে আমরা পদার্থবিজ্ঞানে ইনফ্লেশন বলি। এই জটিল বিষয়গুলো নিয়েই স্টিফেন হকিং তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রগুলো লিখেছেন। আর একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, কৃষ্ণবিবরের ভেতরের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে স্টিফেন হকিং আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে যে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেটি পৃথিবীর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা চিন্তা কৃষ্ণবিবরের ভেতর ফেলে রেখেছে ৫০ বছর ধরে। তাঁর ‘কৃষ্ণবিবর পুরোপুরি কৃষ্ণও না’—এই আবিষ্কার জন্ম দিয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত ‘ইনফরমেশন প্যারাডক্স’-এর (information Paradox ) (ড. তীব্র আলী যেটাকে কূটাভাস বলেছেন)। ভবিষ্যতের মানুষ ও পদার্থবিজ্ঞান স্টিফেন হকিংকে ঠিক কোন আসনে রাখবে, সেটা বলা মুশকিল। তাঁর অসাধারণ গবেষণা জটিল পদার্থবিজ্ঞানকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং সর্বোপরি তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করার গল্প তাঁকে যে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই।
>>>ড. সাজিদ হক, শিক্ষক, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসর, কানাডা।