Saturday, February 18, 2017

সরকার গঠনে আবারও ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় আবারও ধাক্কা খেলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিতর্কের জেরে ক্ষমতা গ্রহণের ২৪ দিনের মাথায় হারাতে হয়েছে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইকেল ফ্লিনকে। এবার তাঁর জায়গায় মনোনয়ন দিতে গিয়ে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল রবার্ট হারওয়ার্ডের কাছে প্রত্যাখ্যাত হতে হলো ট্রাম্পকে।
এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেছেন, বিদেশিদের ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি আবারও নির্বাহী আদেশ জারি করবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নিয়েছেন প্রায় এক মাস হতে চলল। এখনো সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় তেমন এগোতে পারেননি। একের পর এক বিতর্কের ধাক্কা এর অন্যতম কারণ। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে আইনবহির্ভূতভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কথা বলে বিদায় নিতে হয় ফ্লিনকে। তাঁর শূন্যস্থান পূর্ণ করতে রবার্ট হারওয়ার্ডকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হারওয়ার্ডের এই প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পকে আপাতত অসহায় করে দিয়েছে। কারণ, এই মুহূর্তে ফ্লিনের কোনো বিকল্প তাঁর কাছে নেই। তবে এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল কিথ কেলগকে নিজের চার সদস্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদের একজন করার কথা ভাবছেন। ট্রাম্পকে প্রত্যাখ্যান করার ব্যাখ্যায় হারওয়ার্ড মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, তিনি পারিবারিক ও আর্থিক দায়দায়িত্ব-সংক্রান্ত কারণে নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ পদটি নিতে পারছেন না। তবে বেশ কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে থাকবে—এ মর্মে কোনো নিশ্চয়তা না পাওয়াতেই পিছিয়ে গেছেন হারওয়ার্ড। হারওয়ার্ডের এক বন্ধু অবশ্য সিএনএনের কাছে দাবি করেন,
হোয়াইট হাউসের বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থা হারওয়ার্ডের পছন্দ নয়। আর এ কারণেই তিনি প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। ফ্লিনের পদত্যাগের পর ট্রাম্পের বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে আমার কিছু করার নেই। পুরো রাশিয়াই চাতুরীতে পূর্ণ।’ ফ্লিনের কথোপকথনের রেকর্ড ফাঁসের জন্য এ সময় উল্টো মার্কিন গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধেই আইন ভাঙার অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাত দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জারি করা এর আগের নির্বাহী আদেশটিকে প্রতিস্থাপিত করতে নতুন আদেশ দেবেন তিনি। ট্রাম্পের আগের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চলমান মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আপিল বিভাগের নবম সার্কিট আদালত। এক আদেশে আদালত বলেন, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যক্রমটি স্থগিত করা হয়েছে। এই হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে ট্রাম্পের মনোনীত পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রধান স্কট প্রুইট গতকাল সিনেটে ৫২-৪৬ ভোটে অনুমোদন পেয়েছেন।

পাকিস্তানে সাঁড়াশি অভিযান, নিহত ৩১

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের এক সুফি সাধকের মাজারে বোমা হামলায় ২০ শিশুসহ অন্তত ৮০ জন নিহত হওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযানে গতকাল পর্যন্ত শতাধিক ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কর্তৃপক্ষ গতকাল শুক্রবার জানায়, জঙ্গিবিরোধী এ অভিযানে সিন্ধু প্রদেশে প্রায় ১৮ জন এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আরও ১৩ জন নিহত হয়েছে। অন্য হতাহত ব্যক্তিদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হয়নি। সেহওয়ানে ত্রয়োদশ শতকের সুফি সাধক লাল শাহবাজ কালান্দারের মাজারে বৃহস্পতিবার আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করেছে। সংগঠনটি পাকিস্তানে সম্প্রতি বেশ কয়েকবার রক্তাক্ত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। কালান্দারের অনুসারীরা গতকালও ওই মাজারে ভিড় করেন।
সর্বশেষ হামলায় নিহত লোকজনের দাফন গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। সিন্ধুর প্রাদেশিক সরকার তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং এতে জড়িত অপরাধীদের খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছেন। সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রতি ফোঁটা রক্তপাতের শোধ নেওয়া হবে। আধা সামরিক বাহিনী রেঞ্জার্স বলেছে, সিন্ধু প্রদেশে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে টানা অভিযান চালানো হয়েছে। আর পুলিশ জানায়, তারা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। দুই জায়গার অভিযানেই বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আফগান সীমান্তপথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পরপর নিরাপত্তা বাহিনী এ রকম অভিযান চালিয়ে থাকে। এবারের ঘটনার পর ইসলামাবাদের কর্তৃপক্ষ আফগান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের তলব করেছে।
আফগান কূটনীতিকদের তলব
জঙ্গিরা পাকিস্তানে হামলা চালানোর জন্য ঘাঁটি হিসেবে আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে দাবি করে পাকিস্তানের সরকার দেশটিতে অবস্থিত আফগান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের তলব করেছে। এ সময় আফগান কর্তৃপক্ষকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিয়ে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ৭৬ জন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসীর তালিকা হস্তান্তর করেন। পাকিস্তানের একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, তাঁরা বোমা হামলার ঘটনায় কয়েক শ সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছেন। পাকিস্তানের মাজারে বোমা হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে গতকাল আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি বলেন, ‘সন্ত্রসীরা আরও একবার প্রমাণ করল যে তাদের কোনো ইসলামি মূল্যবোধ নেই।’
মাজারে অনড় ভক্তরা
এদিকে, সুফি লাল শাহবাজ কালান্দারের মাজারে হামলার পর ভক্তরা মাজারটিতে গতকাল আবারও ভিড় করতে শুরু করেছেন। তাঁরা প্রতিরোধী ভঙ্গিতে দিনের বিরতি নিয়ে তাঁদের নিয়মিত অনুষ্ঠান নাকাড়া (ঢোল বাজানো) চালিয়ে গেছেন।

সাগরতলে অষ্টম মহাদেশ!

পৃথিবীতে মহাদেশ সাতটি—এই তথ্য সবার জানা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, আরেকটি মহাদেশ লুকিয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে। নিউজিল্যান্ড এই মহাদেশের পানির ওপরে থাকা একমাত্র অংশ। বাকি সবটুকু পানির নিচে। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এই ‘মহাদেশ’টির নাম দিয়েছেন জিল্যান্ডিয়া। আকারে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সমান। বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, জিল্যান্ডিয়া দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই এই মহাদেশের নাম দেওয়া হয়েছে নিউজিল্যান্ড ও ইন্ডিয়া দুই দেশ মিলিয়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিউজিল্যান্ড আসলে এই মহাদেশেরই জেগে থাকা অংশ।
বলা যেতে পারে, এই মহাদেশের পর্বতচূড়া। জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকায় প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা বলেন, জিল্যান্ডিয়ার আয়তন ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার, যা পার্শ্ববর্তী অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান। কিন্তু এই মহাদেশের প্রায় ৯৪ শতাংশই তলিয়ে আছে সাগরের পানিতে। মাত্র অল্প কিছু অঞ্চল পানির ওপর মাথা তুলে আছে, যেমন নিউজিল্যান্ডের নর্থ ও সাউথ আইল্যান্ড এবং নিউ ক্যালেডোনিয়া। আর মহাদেশের স্বীকৃতি পেতে যা যা দরকার, জিল্যান্ডিয়া তার সব কটিই পূরণ করেছে বলেও দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন তাঁরা চেষ্টা করছেন নব আবিষ্কৃত তলিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের জন্য মহাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের।

বিশ্বায়নবিরোধী প্রবণতায় উদ্বেগ জাকারবার্গের

দেশে দেশে বিশ্বায়নবিরোধী প্রবণতার জোয়ারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে মানুষ নিজেদেরই পিছিয়ে ফেলছে ও যুক্ত বিশ্বব্যবস্থা (কানেকটেড ওয়ার্ল্ড) থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ক্রমবর্ধমান দাবি তুলছে।
এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জাকারবার্গ বলেন, ‘আমি যখন ফেসবুক চালু করি তখন গোটা বিশ্বকে যুক্ত করার মিশন নিয়ে বিতর্ক ছিল না। এটা এমন ধারণা ছিল যে মানুষ যেন যুক্ত বিশ্বব্যবস্থাই চাইছে। প্রতিবছর বিশ্ব আরও বেশি যুক্তও হয়েছে। তাতে মনে হচ্ছিল, সবকিছু সেদিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু এখন এ দৃষ্টিভঙ্গি বেশি করে বিতর্কিত হয়ে উঠছে।’

ইলিশের পোনাসহ ৫০ জন আটক

বরগুনার পাথরঘাটার বলেশ্বর নদসংলগ্ন রূহিতার খাল এলাকা থেকে ১৩টি ট্রলারে বিপুল পরিমাণ ইলিশের পোনা, অবৈধ জালসহ ৫০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাতে ওই ৫০ জনকে আটক করা হয়।
তাঁরা সবাই জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী। পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম জিয়াউল হক আজ শনিবার সকালে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, আটক ব্যক্তিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে। জব্দ করা অবৈধ জাল ও ইলিশের পোনার পরিমাণ নির্ধারণেরও প্রক্রিয়া চলছে।

নতুন ইসির অধীনে বাঘাইছড়িতে ভোট চলছে

নতুন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি পৌরসভা নির্বাচনে ভোট চলছে। আজ শনিবার সকাল আটটা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। চলবে বিকেল চারটা পর্যন্ত। সকাল ১০টা পর্যন্ত কিশলয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবুপাড়া কমিউনিটি সেন্টার ও বাঘাইছড়ি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। এসব কেন্দ্রে নারী ও পুরুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে র‍্যাব, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ (বিজিবি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটার নীলবরণ চাকমা বলেন, তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।
ভোটের পরিবেশ ভালো বলে তিনি জানান। বাবুপাড়া কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রাঙামাটির সহকারী পুলিশ সুপার মো. শরীফ বলেন, কড়া নিরাপত্তায় ভোট চলছে। নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিসহ আঞ্চলিক কোনো রাজনৈতিক দল মেয়র পদে প্রার্থী দেয়নি। বাঘাইছড়ি পৌরসভা নির্বাচনে ভোটার ১০ হাজার ১৭৭ জন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. জাফর আলী খান, বিএনপির প্রার্থী মো. ওমর আলী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আজিজুর রহমান।

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে বাস ধর্মঘট প্রত্যাহার

বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে বাস ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। দুই দিন বন্ধ থাকার পর আজ শনিবার সকাল থেকে এই মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। মহাসড়কে মাহেন্দ্র, ইজিবাইক ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের অবৈধ চলাচল বন্ধসহ আটক বাসশ্রমিকদের মুক্তির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস ধর্মঘটের ডাক দেয় বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ। সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক মো. রিয়াজউদ্দিন মৃধা জানান, বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার রাত নয়টার দিকে বরগুনা সার্কিট হাউসে বরগুনার জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় পরিষদের নেতাদের বৈঠক হয়েছে। সভায় এই মহাসড়কের সমস্যা স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস পাওয়ায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। ওই বৈঠকে বরগুনার জেলা প্রশাসক বশিরুল আলম, পুলিশ সুপার বিজয় বসাকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই মহাসড়কে মাহেন্দ্র, ইজিবাইক, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ে ওই শ্রমিকদের সঙ্গে বাসমালিক ও শ্রমিকদের বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে গত সোমবার দুই পক্ষের শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘণ্টাব্যাপী ওই সংঘর্ষে আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশের সাত সদস্য এবং দুই পক্ষের কমপক্ষে ২২ জন শ্রমিক আহত হন। এ ঘটনায় পুলিশ ৫৪ জনকে আসামি করে মামলা করে এবং ১৭ জনকে আটক করে। ওই রাতেই বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মহাসড়কে মাহেন্দ্র, ইজিবাইক ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের অবৈধ চলাচল বন্ধসহ পুলিশের হাতে আটক বাসমালিক ও শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানায়। বুধবারের মধ্যে দাবি মানা না হলে বৃহস্পতিবার থেকে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

ছয় জেলায় ১১ জন নিহত

ঢাকাসহ ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বগুড়ার শেরপুরে ট্রাক ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন এবং নোয়াখালীতে দুটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুজন নিহত হন। এ নিয়ে গত শুক্রবার রাত থেকে এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৬ জনের প্রাণ গেল। প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
বগুড়ার শেরপুরের গাড়িদহ এলাকায় একটি পেট্রলপাম্পের সামনে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে গতকাল দুপুরে ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। হতাহত ব্যক্তিরা সবাই বাসের যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনায় বাস ও ট্রাকের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে গেছে। নিহত দুজনের একজন দুলাল হোসেন (৪০)। অপরজন অজ্ঞাতনামা (৩২)। পুলিশ বলেছে, আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর দুলাল মারা যান। তাঁর বাড়ি নওগাঁয়। অপরজন মারা যান শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে। উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, বাসটির চাকা ফেটে গেলে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন বলেছে, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের সেতুভাঙ্গা এলাকায় ফেনী-নোয়াখালী সড়কে সকাল নয়টার দিকে দ্রুতগতির একটি বাসের ধাক্কায় রিকশাচালক মো. লোকমান (৩৪) সড়কের পাশে ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। বেলা ১১টার দিকে কোম্পানীগঞ্জের চরএলাহী এলাকায় দুটি মোটরসাইকেল পাল্লা দিয়ে চালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে ওই দুই মোটরসাইকেলে থাকা চার বন্ধু গুরুতর আহত হন। চারজনকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক লোকমান হোসেন ওরফে সোহাগকে (২৮) মৃত ঘোষণা করেন। বাকি তিনজনের মধ্যে মো. সমিরকে (২৫) আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। আহত বাকি দুজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। নিহত দুজনের বাড়ি কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কাওলায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন শারীরিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক মকবুল হোসেন (৪৫)। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বিমানবন্দর থানার ওসি নূরে আজম মিয়া বলেন, মকবুলের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। গতকাল বিকেলে শনির আখড়ায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান গৃহবধূ আলো বেগম (২০)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বাসা গেন্ডারিয়ার শহীদনগরে। ঢাকা মেডিকেলে আলোর স্বামী রনি বলেন, কাঁচপুরে স্ত্রীকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে মোটরসাইকেলে বাসায় ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁদের একমাত্র ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ঢাকার আশুলিয়ার বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কে সকালে ট্রাকের চাপায় রেজাউল (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি আশুলিয়ায় একটি পরিবহন কোম্পানির বাসের চেকার ছিলেন। পুলিশ ট্রাক জব্দ করলেও চালক পালিয়েছেন। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বরিশালের গৌরনদীতে এক পীরের মাজারের সামনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন উষা রানী শীল (৭৫) নামে এক বৃদ্ধা। তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি মারা যান। পুলিশ মোটরসাইকেলটি আটক করলেও চালক পালিয়েছেন। উষার বাড়ি উপজেলার রামসিদ্ধি গ্রামে। নীলফামারীর জলঢাকার কাঁঠালী ইউনিয়নের কাঁঠালী বাজার নামক স্থানে গতকাল বিকেলে বালু পরিবহনকালে ট্রাক্টরসহ একটি ট্রলি উল্টে গিয়ে প্রকাশ চন্দ্র রায় (২৩) নামে এক শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। প্রকাশের বাড়ি বালাগ্রাম ইউনিয়নের ছিট মীরগঞ্জ গ্রামে। নাটোরের গুরুদাসপুরের নাজিরপুর ইউনিয়নের বীরবাজার এলাকায় সকালে শ্যালোচালিত অবৈধ পাওয়ার ট্রলির সঙ্গে সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে আবদুল আলিম (২৮) নামে এক মোটরসাইকেলচালক নিহত হয়েছেন। তিনি নাটোর সদর থানার বাগরোম এলাকার ওয়াজেদ আলীর ছেলে। পুলিশ ট্রলিটি আটক করলেও চালক পলাতক।

৯৬% বিপণিবিতান ঝুঁকিপূর্ণ

আবু তৈয়বের বয়স যখন চার, তখন তার শরীরে ধরা পড়ল নেফ্রোটিক সিনড্রোম রোগ। এর কারণে তার কিডনি শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ধরে রাখার সক্ষমতা হারায়। ফলে শরীরে প্রচুর পানি জমে। চিকিৎসায় একটু হেরফের হলেই তৈয়বের শরীরও অস্বাভাবিক ফুলে বিবর্ণ হয়ে যায়। তাকে সুস্থ রাখতে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। তৈয়বের মা তাসলিমা আক্তার চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কাজীর তালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবা জিয়াউর রহমান একজন পল্লিচিকিৎসক। তাঁদের আরেক ছেলে মমতাহিন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। টানা সাত বছর তৈয়বের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক টানাটানিতে পড়ে যায় পরিবারটি। কিন্তু বছরখানেক আগে ক্যানসার ধরা পড়ে তাসলিমা আক্তারের শরীরে।
ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ায় তাঁর ডান হাতে পচন ধরেছে। তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে রাজধানীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় তাঁকে ছয়টি কেমো দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর রেডিওথেরাপির প্রস্তুতি চলছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাসলিমা আক্তারকে ১৭টি হার্ট সেপটিল ইনজেকশন দিতে হবে। প্রতিটি ইনজেকশনের দাম ৮০ হাজার টাকা। এত টাকার ওষুধ কেনা আর সম্ভব হচ্ছে না জিয়াউর রহমানের পক্ষে। একদিকে ছেলে তৈয়বের চিকিৎসা, অন্যদিকে স্ত্রীর ক্যানসার। ছেলে, না স্ত্রীকে বাঁচাবেন দিশেহারা জিয়াউর রহমান। পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে পারেন যে কেউ। তাসলিমা আক্তার। শিক্ষক হিসাব নং ১৪২০০১১০০৬৭২৮, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, আবুতোরাব বাজার শাখা, মিরসরাই, চট্টগ্রাম। বিজ্ঞপ্তি

একুশের দুপুরে পুলিশের গুলিতে আন্দোলনের দাবানল

ভাষা আন্দোলনের বাঁকবদলের মুহূর্তগুলো নিয়ে বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন
একুশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুতীব্র প্রকাশ ঘটাতে দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা ছিল মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ও তাঁর শীর্ষ প্রশাসনের অপরিণামদর্শিতার নমুনা। তাঁরা ভাষাবিষয়ক ছাত্র-জনমতের আবেগ যথাযথ পরিমাপ করতে পারেননি। তাই আন্দোলনের তথা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি বন্ধ করতে ঢাকা প্রশাসন ২০ ফেব্রুয়ারি এক ঘোষণায় পরবর্তী এক মাসের জন্য শহরে ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অর্থাৎ ২১ তারিখ থেকে শহরে কোনো সভা-সমাবেশ-মিছিল চলবে না। জেলা হাকিমের অনুমতিতেই শুধু সভা-সমাবেশ হতে পারবে।
ছাত্রসমাজে এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এখনো মনে পড়ে, ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে পুব দিক থেকে সেক্রেটারিয়েট রোড ধরে একটি ঘোড়ার গাড়ি এগিয়ে আসছে। মেডিকেল কলেজ হোস্টেল বরাবর আসতেই শোনা গেল মাইকে ঘোষণা, ‘ঢাকায় এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি, সভা-সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ।’ ঘোষণা দিতে দিতে ঘোড়ার গাড়ি সলিমুল্লাহ হলের দিকে চলে যায়।এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক বলা চলে। মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছাত্র-জটলার মধ্য থেকে চিৎকার ওঠে: ১৪৪ ধারা মানি না, মানি না। এ বিষয়ে প্রধান ছাত্রাবাসগুলোর অবস্থানও ছিল একই রকম। সেটা প্রকাশ পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের বিশিষ্ট ছাত্রদের প্রতিক্রিয়ায়। গাজীউল হক, আনোয়ারুল হক খান, কমরুদ্দীন শহুদ, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, দেবপ্রিয় বড়ুয়া, মোশারফ হোসেন, মৃণাল দস্তিদার প্রমুখ ছাত্র নেতা-কর্মীর বক্তব্যে এই প্রতিরোধস্পৃহাই ধ্বনিত হয়েছে। জগন্নাথ কলেজের বামপন্থী কর্মী মৃণাল বাড়ড়ির কণ্ঠেও ছিল একই কথা। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের ভিন্ন মতামতের পেছনে কারণ ছিল আসন্ন প্রাদেশিক নির্বাচন। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে সংঘাতে গেলে নির্বাচন স্থগিত হতে পারে এ আশঙ্কায় নেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
যেমন আতাউর রহমান খান, খন্দকার মোশতাক, কামরুদ্দিন আহমদ, খয়রাত হোসেন প্রমুখ। তাঁদের অনুসারী জনাকয় ছাত্র যুবনেতারও ছিল একই রকম অভিমত। কিন্তু মূলত বামচিন্তার ছাত্রযুবা নেতৃত্ব ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, সাধারণ ছাত্ররা এ আপস মানবে না। তাই একুশের কর্মসূচি যেকোনো মূল্যে পালন করতেই হবে। সেদিন সন্ধ্যার পর ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রশ্নে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক। সেখানে ছিল রাজনৈতিক নেতাদের প্রাধান্য, ছিল প্রবল তর্কবিতর্কের উত্তাপ। নানা যুক্তিতর্কে রাজনৈতিক নেতারা বলতে চেয়েছিলেন সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা, প্রদেশব্যাপী আন্দোলনে ঢাকার বাইরে অন্যদের মতামতের প্রয়োজনীয়তার কথা ইত্যাদি, যা অজুহাতের মতোই হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি শামসুল হক সাহেব এমন মন্তব্যও করেন যে আওয়ামী মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তা ছাড়া ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি ও সুযোগসন্ধানীরা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হতে পারে। কাজী গোলাম মাহবুব অবশ্য ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। বৈঠকের সভাপতি আবুল হাশিমসহ কামরুদ্দীন, খয়রাত হোসেন প্রমুখ রাজনৈতিক নেতা ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ছিলেন। আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও গোলাম মাওলা প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
তাঁদের মন্তব্য, সাধারণ ছাত্ররা এ সিদ্ধান্ত মানবে না। অগত্যা একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে আর্টস বিল্ডিং প্রাঙ্গণে আমতলায় ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত এবং দশ জন করে মিছিলের মাধ্যমে ১৪৪ ধারা ভেঙে সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস অগ্রাহ্য করে দুপুর বারোটা নাগাদ মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়। পরে এখানে ছাত্র-জনতার সমাবেশে দুপুরে পুলিশের গুলিতে রফিক-জব্বার-বরকত প্রমুখের শাহাদাতবরণ গোটা পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। প্রথমত ১৪৪ ধারা ভাঙার সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে একুশের ছাত্র-আন্দোলন পরদিন থেকে গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, পুলিশের গুলিবর্ষণের কারণে যে প্রতিবাদী আবেগের প্রকাশ তার টানে প্রদেশের সর্বত্র শহরগুলোতে শিক্ষায়তনকেন্দ্রিক আন্দোলন ব্যাপক চরিত্র অর্জন করে। সেই সঙ্গে তাতে যোগ দেয় শিক্ষিত শ্রেণির অধিকাংশ এবং শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ। আন্দোলন ছড়িয়ে যায় গ্রামের শিক্ষায়তন পর্যন্ত। উল্লিখিত দুটো ঘটনা অর্থাৎ ১৪৪ ধারা ভাঙা এবং পুলিশের গুলি ঢাকাসহ প্রদেশের সর্বত্র একুশেকে বিস্ফোরক আন্দোলনে পরিণত করে। পরদিন ঢাকার রাজপথে গুলিতে আরও কয়েকজনের শাহাদাতবরণের ফলে দেশজুড়ে সাময়িক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক খ্যাতি অর্জন করে শহীদ দিবস ও প্রতিবাদ দিবস হিসেবে।
আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক

‘প্রমাণ হলে শাস্তি হবেই খালেদার’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আদালতের কাছে যদি প্রমাণ থাকে, তাহলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবশ্যই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় শাস্তি হবে। গতকাল শুক্রবার মিউনিখে ম্যারিয়ট হোটেলে জার্মান আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘যদি আদালতের কাছে প্রমাণাদি থাকে তবে তাঁর (খালেদা জিয়া) শাস্তি হবেই।’ খালেদা জিয়ার এই মামলায় সাজা হলে আগামী সংসদ নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না বলে বিএনপি যে হুমকি দিয়েছে, তার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,
একজন চোরকে বাঁচানোর জন্য তারা (বিএনপি) নির্বাচন প্রতিহত করতে চাচ্ছে। এটা কী ধরনের আচরণ! খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি নির্দোষই হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কেন আদালতের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন! কেন তিনি বারবার সময় চাচ্ছেন? একটি মামলায় তিনি এ পর্যন্ত ৫৩/৫৪ বার সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। মিথ্যা মামলা হলে পালানোর কী দরকার? এটা পরিষ্কার যে, তিনি (খালেদা) এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
খবর ইউএনবি’র।

ইতিহাস আমাকে আনুকূল্য করেছে

পরিচিত পোশাকে বসে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। পাজামা-পাঞ্জাবি। পবিত্র সরকার এসেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তাঁদের মধ্যে মৃদু কথাবার্তাও হচ্ছে। বিপরীত দিকের একটা সোফায় বসে আছেন সিদ্দিকা জামান—আনিসুজ্জামানের সঙ্গে যিনি পার করেছেন জীবনের অনেক বড় পথটি। তাঁর কাছে গিয়ে বসি। শুক্রবার বেলা ১১টার মৃদু আলো তখন ঢুকছে জানালা দিয়ে। আজ শনিবার আনিসুজ্জামান ৮০ বছর পূর্ণ করলেন। ‘এই মানুষটার সঙ্গে থেকে গেলেন এত দিন। কেমন মানুষ তিনি?’ ‘অসাধারণ।’ বললেন সিদ্দিকা জামান। ‘এতটা পথ কেমন কেটেছে আপনাদের?’ ‘আমার মনে হয় আমাদের জীবনটা খুব সহজ-স্বাভাবিকভাবে চলে গেছে। খুব দ্রুত গেছে, ঝরনার মতো বয়ে গেছে। আমার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, ও বাড়ি নিয়ে আমাকে কখনো যন্ত্রণা দেয়নি। আমি যেভাবে চালিয়েছি, ও সেটা মেনে নিয়েছে। আমি যেভাবে জানি, ওর কী পছন্দ; বাচ্চাদের সেভাবেই মানুষ করার চেষ্টা করেছি।’ একই প্রশ্ন থাকে আনিসুজ্জামানের কাছে। সাবলীলভাবে সিদ্দিকা জামান সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘বেবী (সিদ্দিকা জামানের ডাকনাম) পারিবারিক সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে আমাকে কাজের সুবিধা করে দিয়েছে।
তবে সে পরিমাণ কাজ আমার দ্বারা হয়নি। আমি মূলে যেটা করতে চেয়েছিলাম সেটা হচ্ছে, আঠারো শতকের আগের বাংলা গদ্য নিয়ে। বইটা লিখলাম, কিন্তু নমুনাগুলো সংকলন আকারে—ওটা আর এখনো করা হলো না। ওটা হওয়া উচিত ছিল।’ আমাদের ইতিহাসের বাঁকগুলোয় আমরা আনিসুজ্জামানকে পাই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ-আদালত পর্যন্ত প্রতিটি বাঁকেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিষয়টি মনে করিয়ে দিতেই বললেন, ‘কীভাবে এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকলাম, বলা আসলে কঠিন। তবে আমাদের সময়টাই এমন ছিল, যখন ছাত্র ও যুবকেরা নানা রকম সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আমি তাদের মধ্যে পড়ে গেছি। প্রথমে তো ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দিই। সে সময়কার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক সংগঠন। সেই অসাম্প্রদায়িকতার টানেই ওখানে যাওয়া। তারপর তো ভাষা আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের কথা যদি বলো, ১৯৬০-এর দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আমরা সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকেও করেছি, পথেঘাটে নেমেও করেছি। এরই চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া। খুব পরিকল্পিতভাবে যে গিয়েছিলাম, তা বলতে পারি না। প্রথমে তো পালানো। জীবনরক্ষা। তারপর আগরতলা, কলকাতা। ইতিহাস আমাকে আনুকূল্য করেছে।’ ‘আর গণ-আদালত?’ ‘ওখানেও আমার ভূমিকাটা বড় নয়। জাহানারা ইমাম বয়সে আমার বড় হলেও উনি আমার ছাত্রী ছিলেন। তিনি যখন বললেন, আপনি আসুন, তখন গেলাম। তারপর কথা হলো, কারা অভিযোগকারী হবে। ঠিক হলো সৈয়দ শামসুল হক, বোরহান (বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর) আর আমি। আমি বললাম, আমি তো দেশে ছিলাম না,
তাই গোলাম আযম সম্পর্কে আমার কিছু বলতে হলে বলতে হবে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যা যা করেছেন। বোরহান বলল বাঙালি সংস্কৃতিবিধ্বংসী কী কাজ করেছে। আর সৈয়দ শামসুল হকের অভিযোগ ছিল সামগ্রিকভাবে বাঙালি নিধন। এই তিনটি অভিযোগ নিয়েই গণ-আদালত।’ ‘আপনার ভালো লাগা উপন্যাস, ভালো লাগা সিনেমা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলবেন?’ ‘আসলে এত কিছুই ভালোবাসি যে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা মুশকিল। বুদ্ধদেব বসুর একটি প্রেমের কবিতা আছে, যেখানে বলছেন, আমরা কত কিছুই ভালোবাসি, তাহলে প্রেমটা কী? আমারও সে রকম বলতে হয়, অনেক কিছুই ভালোবাসি। আলাদা করে বলা মুশকিল। নিশ্চয়ই একটা সময়, উদাহরণ হিসেবে বলছি, রবীন্দ্রনাথের গোরা পড়েছি। মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি। তেমনি আমার খুব প্রিয় লেখক এরিক মারিয়া রেমার্ক, জার্মান ভাষায় যিনি প্রথম মহাযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন, তাঁর একাধিক বই আমার প্রিয়। ফিল্ম যদি বলো, তাহলে প্রথমেই বলব রোমান হলিডে। সেটা বোধ হয় আমাদের কালের সবার পছন্দের ফিল্ম। তারপর হয়তো ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই। বাংলা ছবির একটা তো সুসময় গেছে, তখনো বোধ হয় আমরা সাবালক হইনি। তবে কিছু দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে, তখনকার যারা শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ছিলেন—ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী স্যান্যাল—তাঁদের দেখেছি। এ রকম নানা কিছুই আছে।’ একটানা বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল আনিসুজ্জামানের। শরীর খুব সুস্থ নয়। চিকিৎসা চলছে।
তাঁকে রেহাই দিয়ে আমরা আবার ফিরি সিদ্দিকা জামানের কাছে। জিজ্ঞেস করি, আনিসুজ্জামানের পছন্দের খাবার কী? ‘সবচেয়ে পছন্দ করে চিংড়ি মাছের মালাইকারি। তারপর তার দ্বিতীয় পছন্দের খাবার হচ্ছে গরুর গোশত, আলু দিয়ে রান্না করা। মাছের মধ্যে ইলিশ মাছ খুব পছন্দ, সরষে ইলিশ বিশেষ করে। ভাজা মাছ পছন্দ করে, তেলের মধ্যে পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে।’ ‘কোথাও পড়েছিলাম, বাজার করতে তিনি পছন্দ করেন না।’ ‘বাজার করা পছন্দ করে না। তবে চট্টগ্রামে থাকতে বাজার করত।’ যাঁরা তাঁকে চেনেন, তাঁরা জানেন সিদ্দিকা জামানের সারল্য অতুলনীয়। বিদায়ের সময় তিনি যা বললেন, তাতে সে কথাই মনে হলো আরেকবার, ‘আমি এতটুকু বুঝে নিয়েছিলাম, ও একজন শিক্ষক। আমাকে সেটা মনে রেখেই চলতে হবে। আমাদের সীমিত রোজগার। ছেলেমেয়েদেরও আমি সেভাবে বুঝিয়েছি। আমাদের ছেলেমেয়েরাও কোনো দিন আমাদের কাছে কোনো কিছু চেয়ে বিব্রত করেনি। তারা সব সময় বুঝেশুনে চলেছে। সেদিক দিয়ে ভাবলে, আমরা খুব শান্তিপূর্ণ জীবন কাটিয়েছি।’ আরও অনেক দিন শান্তিতে থাকুন আপনারা। আনিসুজ্জামান, আপনি শতায়ু হোন।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জার্মানিতে গতকাল শুক্রবার শুরু হওয়া ৫৩তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারকদের মতবিনিময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ সম্মেলন শুরু হয়েছে মিউনিখের বায়েরিশার হোফ হোটেলে। এ বছর আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক, ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, ইইউ ও ন্যাটো সংকট ইত্যাদি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরসুলা ভন দের লায়েন ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসের উদ্বোধনী বক্তব্য শেষে সম্মেলনের চেয়ারম্যান ওলফগ্যাং সিঙ্গার এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। জার্মানির চ্যান্সেলর, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, পোল্যান্ড ও আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এবং রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শনিবার উচ্চপর্যায়ের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন, পানি, খাদ্য ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে ভাষণ দেবেন। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে আসা অতিথিদের সম্মানে মিউনিখ নগরীর মেয়রের দেওয়া এক সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী আজ চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ছয়টি ভাষার বর্ণ নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ

চাকমা, মারমা, ম্রো, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, সাঁওতাল—ছয়টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষার বর্ণ নিয়ে চট্টগ্রামে মিছিল ও সমাবেশ করেছে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)। গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, পাঁচটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষায় প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়েছে।
এখনো সব জায়গায় ঠিকমতো বই পৌঁছায়নি। পর্যাপ্ত পরিমাণ বইও ছাপা হয়নি। শিক্ষকদের প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। সরকার দায়সারাভাবে এ কাজটা করেছে বলে বক্তারা অভিযোগ করেন। সব জাতিসত্তার মানুষদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু এবং দেশের সব ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান তাঁরা। সমাবেশে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. আমির উদ্দিন, পিসিপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা, সহসভাপতি বিপুল চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক সুনয়ন চাকমা, ছাত্র ফেডারেশনের (গণসংহতি আন্দোলন) নগর সভাপতি শওকত আলী, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সদস্য মন্টি চাকমা, ছাত্র ফেডারেশনের (গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট) চট্টগ্রাম নগর কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক কাজী আরমান প্রমুখ। সমাবেশের আগে নগরের চেরাগি পাহাড় মোড় থেকে ছয়টি ভাষার বর্ণ নিয়ে মিছিল বের করা হয়। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে শহীদ মিনারের সামনে এসে শেষ হয় মিছিল।

সড়কে বাজার বসিয়ে চাঁদাবাজি

মিরপুর ১৫ নম্বর সেকশনের পূর্ব বাইশটেকি এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার। বাজারে কয়েক শ দোকান। প্রতিটি দোকান থেকে স্থানীয় যুবলীগের নামে দৈনিক ১৫০-১৬০ টাকা চাঁদা তোলা হয় বলে দোকানদারেরা অভিযোগ করেছেন। তবে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বলছেন, সিটি করপোরেশনের স্থায়ী বাজার না থাকায় বাজারটি বসতে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেখা যায়, মিরপুর ১৫ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কে ওজিএসবি হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকেই সড়কে বাজার বসেছে। সেখান থেকে পূর্ব বাইশটেকি বালুর মাঠ পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে এই বাজার।
পরিচিতি পেয়েছে ‘১৩ নম্বর নতুন বাজার’ নামে। ফুটপাত ও সড়কে গড়ে ওঠা স্থায়ী দোকানে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা সবজি, আছে মাছ ও মুরগির দোকান। ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তায় চলে আসা ভাসমান দোকানে বিক্রি হচ্ছে মাছ, ফলমূল। দেখে মনে হয়, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা কোনো গ্রামীণ হাট। ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারী ও যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁশ-কাঠ দিয়ে ফুটপাতে এসব দোকান তোলা হয়েছে। ওপরে ত্রিপলের ছাউনি। কাঁচা সবজি, ফলমূল, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মুরগি বিক্রি হচ্ছে। কয়েকজন ফুটপাতে বসে মাছ কাটছেন। লোকজন বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে ফুটপাতে মাছ কাটাচ্ছেন। বাজারটির শেষ মাথায় বাঁশ-টিন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে কাফরুল থানার পূর্ব বাইশটেকি ইউনিট যুবলীগের কার্যালয়। দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে ফুটপাতের ওপরে কয়েকটি মাত্র দোকান ছিল। ক্রেতাদের ভিড় বাড়ায় কেনাবেচাও বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে দোকানের সংখ্যা। এখন এখানে স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ মিলিয়ে তিন শর মতো দোকান। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকালে ভ্রাম্যমাণ দোকান আরও বেড়ে যায়। তাতে প্রায় পুরো সড়ক দখল হয়ে যায়। দোকানদারেরা অভিযোগ করেন, প্রতিদিন তাঁদের দোকানের জন্য ৯০ টাকা, পানির খরচ ৩০ টাকা, বাতিপ্রতি ১৫ টাকা বিদ্যুৎ ও জেনারেটর খরচ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য ১০ টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন একটি দোকানের জন্য ১৫০-১৬০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,
প্রতিদিন দোকান থেকে টাকা তোলেন মুকুল নামের এক ব্যক্তি। তবে বাজারটি বসিয়েছেন পূর্ব বাইশটেকি ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা কাশেম হাওলাদার। গতকাল বেলা ১১টার দিকে লুঙ্গি ও শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে দোকান থেকে টাকা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। দোকানদারেরা বলেন, ওই ব্যক্তির নামই মুকুল। টাকা তোলা শেষে মুকুল বাজারের শেষ মাথার যুবলীগের ইউনিট কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর কার্যালয় থেকে বেরিয়ে এলে কথা হয় মুকুলের সঙ্গে। বাজার বসানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দোকান বসানোর ক্ষমতা আমার নাই। আমি দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে টাকা তোলার কাজ করি। বাজার কারা বসায় তা কাউন্সিলরকে জিজ্ঞেস করেন।’ রাতে কাশেম হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল মোস্তফার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। যোগাযোগ করা হলে জামাল মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, বাজারটি আগে কলোনির ভেতরে ছিল। এখন যেখানে বাজার বসছে সেটির সামনে আর সড়ক নেই। পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সমিতির মাধ্যমে কিছু টাকা তোলা হয়। চাঁদা তোলার বিষয়টি সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। কাউন্সিলর বলেন, ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের কাঁচাবাজার নেই। তাই কোথাও থেকে দোকানপাট তুলে দিলে বাসিন্দারা আপত্তি করেন। একটি কাঁচাবাজারের দাবি দীর্ঘদিনের। বাজারের জন্য ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

ভেতরে আবর্জনায় ভরা, হকারদের দৌরাত্ম্য

ব্যানার টানিয়ে স্কুলের শিক্ষাসফর। ঘাসের ওপর চাদর বিছিয়ে পরিবারের বনভোজন। পারিবারিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টও চলছে। সঙ্গে বসন্তের ফুলের সমারোহের শোভা তো আছেই। মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে (বোটানিক্যাল গার্ডেন) দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ লাগানো হয়নি দীর্ঘদিন।
হকারদের দৌরাত্ম্য ও নোংরা আবর্জনাময় পরিবেশ নিয়ে দর্শনার্থীদের অসন্তোষ। গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে ঝরা পাতার স্তূপ। একটু দমকা হাওয়ার ঝাপটা লাগলেই ঝরে পড়ছে মলিন পুরোনো পাতার রাশি। পা বাড়ালেই মর্মর শব্দ। তবে গাছের ন্যাড়া ভাব কেটে গেছে। বেশির ভাগ শাখাতেই উঁকি দিচ্ছে কচি সবুজ পাতা। গতকাল শুক্রবার দেখা যায়, উদ্যানের ভেতরে দুটি স্কুল এসেছে শিক্ষা সফরের জন্য। আর পুরো উদ্যানেই খোলা জায়গাতে চাদর বিছিয়ে চলছে পারিবারিক আয়োজনে ছোটখাটো বনভোজন। রান্না করা নিষেধ বলে খাবার বাইরে থেকেই নিয়ে এসেছে সবাই। আনিস আহমেদ এসেছেন সপরিবার। সঙ্গে ব্যাট-বল। ছেলে ব্যাট করছে, মেয়ে বোলার। তিনি ফিল্ডিং করছেন, স্ত্রী আম্পায়ার। আনিস বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য তো শহরে খেলার জায়গা কম। খেলবে কোথায় ওরা? আজকে ছুটির দিনে ভাবলাম ব্যাট-বল নিয়ে যাই। বাচ্চারাও মজা পাচ্ছে।’ উদ্যানে ঢুকতে শুরুতেই হাতের বাঁয়ে আছে একটি গোলাপ বাগান। বাগানে বাহারি রঙের ছোট-বড় গোলাপ। এখানে বেড়াতে আসা মানুষের ছবি তোলার হিড়িক। ডান দিকে কৃত্রিম লেক ও দ্বীপ। উদ্যানজুড়ে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির গাছ। প্রতিটি গাছেই ছোট করে পরিচিতি দেওয়া আছে। মূল রাস্তা ধরে খানিকটা এগোলে সেকশন-৭-এ একটি সাইনবোর্ড, লেখা—দর্শনার্থী কেন্দ্র। কিন্তু তালাবদ্ধ। উদ্যানের একজন ফরেস্টার মজিবর রহমান বলেন, কেন্দ্রটি এখনো চালু হয়নি। এটাকে জাদুঘরের মতো করা হবে। নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়াও উদ্ভিদ উদ্যানটির যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলা।
এ নিয়ে কয়েকজন দর্শনার্থীও অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। পদ্মপুকুরে পদ্ম ফোটার সময় বলা আছে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর। কিন্তু পুকুরটি আবর্জনায় ভরা। উদ্যানের ভেতরে নানা বয়সী হকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ করলেন দর্শনার্থীরা। মাদিয়া নামের আট বছর বয়সী এক হকার পানি ও টিস্যু পেপার বিক্রি করে। এখানে ঢোকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সে বলে, ‘দারোয়ানরে ৫০-৬০ টাকা দিলেই ঢুকতে দেয়।’এখানে প্রতিটি টয়লেটের পাশেই খাবারের পসরা সাজানো। উদ্যানের পক্ষ থেকে খাবারের কোনো ক্যানটিন নেই। ক্যানটিন যেটি ছিল তা অনিয়মের অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আয়েশা খাতুন নামের এক দর্শনার্থী বলেন, হকাররা খাবারের দাম বেশি রাখে। অনেক সময় জোর জবরদস্তি করে। কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যবস্থা থাকলে সুবিধা হতো। ১৯৬২-১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ২০৮ একরের এ উদ্যানে এখন ১ হাজার ১০ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। তবে বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান নিয়ে ২০১৪ সালের একটি পরিচিতিতেও প্রজাতির সংখ্যা একই। তিন বছরে সংখ্যা বাড়া-কমার ব্যাপারে উদ্যানের পরিচালক ছায়ীদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন করে জরিপ করা হয়নি। এ ছাড়া সম্প্রতি নতুন প্রজাতির কোনো গাছ লাগানো হয়নি। আবর্জনা প্রসঙ্গে বলেন, নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। দর্শনার্থীদের সচেতনতা দরকার। হকারদের বিষয়টি তিনি দেখবেন।

দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্কিংয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ

ছুটির দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হয়। অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঘুরতে আসেন। কিন্তু পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা যেখানে-সেখানে গাড়ি রাখেন। এ অবস্থায় ভোগান্তি থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা পার্কিং ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাপ্তাহিকসহ নানা ছুটির দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীসহ অনেকে ক্যাম্পাসে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে আসেন। রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ব্যক্তিদের একটা বড় অংশ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ও মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে এসব গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি। এর ফলে যে যাঁর ইচ্ছামতো গাড়ি রাখেন। এতে শিক্ষার্থী, পথচারী সবারই অসুবিধা হয়। সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হয় ক্যাম্পাসের বটতলায়। এখানে অর্ধশতাধিক খাবারের দোকান আছে। ক্যাম্পাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখানে খান। কিন্তু ছুটির দিনগুলোতে দোকানগুলোর সামনে অপরিকল্পিতভাবে গাড়ি রাখায় খাবারে ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বটতলা-সংলগ্ন আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের শিক্ষার্থীরা দর্শনার্থীদের গাড়ি পার্কিংয়ে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরের আগে থেকেই শিক্ষার্থীরা বটতলাগামী রাস্তার ওপর ‘দয়া করে এখানেই থামুন’ শীর্ষক বোর্ড রেখে দেন। এতে আরও লেখা ছিল, ‘ধুলাবালিমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন, আপনিও খান,
আমরাও খাই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে কামালউদ্দিন হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রশাসন উদ্যোগ না নেওয়ায় আমরাই এ উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি, প্রশাসন দ্রুত এ বিষয়ে কাজ শুরু করবে।’ শিক্ষার্থীদের এ উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল খাবার দোকানগুলোর সামনে কাউকে গাড়ি রাখতে দেখা যায়নি। কামালউদ্দিন হলের সামনে ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রেখে আসা দর্শনার্থীরা বটতলায় খাবার খেয়েছেন। এ বিষয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার (ভূসম্পত্তি) আবদুর রহমান বলেন, ‘পার্কিংয়ের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অবগত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে গাড়ি রাখার জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। শিগগিরই সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।’

রাজশাহীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরস্কার পেল ১০৮২ জন শিক্ষার্থী

‘আমার সামনে বসা তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ। আর পেছনে টেবিলভরা পুরস্কার। এই পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তোমাদের দেশের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হলো। তোমরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনা করবে। তোমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের দিনটা তোমাদের নতুন জীবনের ডাক দিয়ে গেল।’ বছরজুড়ে বইপড়া কর্মসূচিতে নিজের উৎকর্ষের পরিচয় দেওয়ার জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও গ্রামীণফোন আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কথাগুলো বলেছেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। গতকাল শুক্রবার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠান হয়। তিনি আরও বলেন, ‘বই সব সময়ই মানবিকতার কথা বলে। আমরা সবাই যদি মানবিক হই, দেখব, বাংলাদেশ একদিন পরিবর্তন হয়ে গেছে।’ সকাল সাড়ে আটটায় আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন উপসচিব ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পরিচালক শরিফ মো. মাসুদ। অনুষ্ঠানে ১ হাজার ৮২ জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়া হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রমের আওতায় ২০১৬ সালে রাজশাহী নগরের ৩৪টি স্কুলের ৪ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মূল্যায়ন পর্বে যারা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে, তাদের পুরস্কার দেওয়ার জন্য গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনির হোসেন, নাট্যব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা রাজশাহী অঞ্চলের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবদুল মান্নান সরকার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নাটোর শাখার সংগঠক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অলক মৈত্র, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. তাইফুর রহমান ও গ্রামীণফোনের রাজশাহী অঞ্চলের হেড অব সার্কেল মার্কেটিং সোহেল মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে প্রায় ২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বইপড়া কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী বইপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ইতিমধ্যে ঢাকা ও বরিশালের স্কুলগুলোর বিজয়ী শিক্ষার্থীদের উৎসবমুখর পরিবেশে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে চট্টগ্রাম ও খুলনা নগরের শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণী উৎসব হবে।

সিলেট উইমেন্স চেম্বারের বসন্ত উৎসব উদ্যাপন

শীত শেষে এল বসন্ত। তাই পিঠার পসরায়ও বসন্তের ছাপ। ডাল, খেজুর, সন্দেশ, নারকেল দিয়ে নানা স্বাদের নানা পিঠার সঙ্গে ছিল মাছের পিঠাও। রুই মাছ দিয়ে তৈরি নতুন এ পিঠায় যেন বসন্তের আমেজ। এভাবে শুধু পিঠা বা খাবারদাবার নয়, বসন্তের আবাহন নিয়ে প্রকৃতিনির্ভর নৃত্য, নারী উদ্যোক্তাদের সম্মাননা জানানোসহ দিনভর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল শুক্রবার সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বসন্ত উৎসব উদ্যাপন হয়। নগরের কেন্দ্রস্থলে পুলিশ লাইনস উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সকাল ১০টায় মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এস এম নুনু মিয়া, সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক শামীম আহমদ, সিলেট ক্লাবের সভাপতি শোয়েব চৌধুরী ও সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ওয়েছ খছরু উপস্থিত ছিলেন।
বাঙালির হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে শহুরে জীবনে এ ধরনের আয়োজন বিরল অভিহিত করে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য পিঠাপুলি আজ হারাতে বসেছে। এ আয়োজন আমাদের আবার সেই ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিল। শহুরে জীবনে যেন ফিরে এল গ্রামবাংলার পিঠাপুলির সেই বর্ণিল উৎসব।’ সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় জানালেন এই উৎসব আয়োজনের আরেকটি উদ্দেশ্যের কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা এ উৎসবের মাধ্যমে সিলেট বিভাগের নারী উদ্যোক্তাদের একত্র করতে পেরেছি। নারী উদ্যোক্তারা সব সময়ই নতুনত্ব নিয়ে এগোচ্ছেন। পিঠাপুলিতেও এর ছাপ পড়েছে। বাঙালির ঐতিহ্য ধরে রাখতে নারীদের বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতেও তাঁদের অবদান থাকবে।’ উদ্বোধনী পর্বে উইমেন্স চেম্বারের পক্ষ থেকে রন্ধনশিল্পী সাবরিনা খানকে ‘তারুণ্য’, সিলেটের নারী ফটোসাংবাদিক বিলকিস আক্তার সুমিকে ‘নির্ভীক’ ও কণ্ঠশিল্পী লাবলী দেবকে ‘সৃজনশীল’ সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়। উৎসব উদ্বোধনের পরই বসন্তের প্রকৃতি উপজীব্য করে চলে সাংস্কৃতিক আয়োজন। নৃত্যের ঝংকারে পুরো আয়োজনে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবমুখরতা। সেই সঙ্গে শিশু–কিশোরদের নিয়ে চলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠান হয়। এ পর্বে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. রোকন উদ্দিন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও সেরা পিঠা প্রদর্শনকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

কুমিল্লা বিভাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত

গতকাল শুক্রবার কুমিল্লা নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। বিকেল চারটায় নগরের কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে এ সমাবেশ হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সফিকুল ইসলাম শিকদার, সোনার বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা, কালিকাপুর আবদুল মতিন খসরু কলেজের অধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম, কুমিল্লার কাগজ-এর সম্পাদক আবুল কাশেম, কুমিল্লা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি প্রহলাদ দেবনাথ, কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. আবদুল খালেক, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী এনামুল হক,
ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান ভূঁইয়া ও নওয়াব ফয়জুন্নেছা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আজাদ সরকার। গত মঙ্গলবার এক সভায় কুমিল্লার নাম বাদ দিয়ে ময়নামতি নামে এই অঞ্চলে বিভাগ করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ কথা গণমাধ্যমকে জানান। এরপর কুমিল্লায় আন্দোলন শুরু হয়। গতকাল টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ করেন নগরবাসী। এতে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন।

ক্ষতিগ্রস্তরা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন: প্রধানমন্ত্রী

পদ্মা সেতু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তরা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এই প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল এবং কানাডীয় আদালতে মামলা করার কারণে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করতে পারবেন। বাসসের খবরে জানা যায়, মিউনিখের একটি হোটেলে জার্মান আওয়ামী লীগের সংবর্ধনায় বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রবাসী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করায় ক্ষতিগ্রস্তরা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা করতে পারেন।’ এ সময় কানাডীয় আদালতের রায়ে ন্যায়বিচার পাওয়ায় তিনি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অনীল দাসগুপ্ত, এম এ গনি চৌধুরী, জার্মান আওয়ামী লীগ সভাপতি বশিরুল হক প্রমুখ।

ভাষার মর্যাদা রক্ষা করার দাবি

ভাষাসংগ্রামীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে গতকাল শুক্রবার নওগাঁয় সাইকেল শোভাযাত্রা হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার কিশোর-তরুণ অংশ নেন। শোভাযাত্রায় অংশ নেন দুবারের এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশি এম এ মুহিত ও এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার। স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁ ওই শোভাযাত্রার আয়োজন করে। পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক সকাল সাড়ে ১০টায় নওগাঁ পুলিশ লাইনস মাঠে এর উদ্বোধন করেন। সেখানে বক্তব্য দেন একুশে পদক পাওয়া নৃত্য গবেষক ও নৃত্য পরিচালক আমানূল হক, ভাষাশহীদ ডা. মনজুর আলমের ছেলে হাসান ইমাম, নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খান প্রমুখ। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে নওগাঁ সরকারি কেডি স্কুল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এখানে আমানূল হক, এম এ মুহিত ও নিশাত মজুমদারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একুশে পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁদের ক্রেস্ট দেওয়া হয় এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী সভাপতিত্ব করেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক আমিনুর রহমান।
বেলা তিনটায় নৃত্য গবেষক আমানূল হক কেডি স্কুল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পাঁচ দিনব্যাপী অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেন। মেলায় প্রথমা প্রকাশনসহ বিভিন্ন প্রকাশনীর ২৬টি স্টল রয়েছে। সন্ধ্যায় একই মঞ্চে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে শতকণ্ঠে জাতীয় সংগীত ও ভাষার গান গাওয়া হয়। এ ছাড়া নৃত্যানুষ্ঠান ও নওগাঁ জেলা শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় মঞ্চনাটক পরিবেশিত হয়। একুশের চেতনা ছড়িয়ে দিতে ‘একুশে পরিষদ নওগাঁ’ এ বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়। ১ ফেব্রুয়ারি ভাষাসংগ্রামীদের তালিকা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়। ২ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে ছাত্রসমাবেশ করে। ভাষাশহীদ ডা. মনজুর আলমের ছেলে হাসান ইমাম বলেন, ‘আমার বাবা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা অনেক শহীদের সঙ্গে রক্ত দিয়েছেন। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপরও মনে হয়, নতুন প্রজন্ম তাঁর নামটি তেমন জানে না। একুশে পরিষদের কল্যাণে তিনিসহ অন্যান্য ভাষাসংগ্রামীর বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে।’ নৃত্য গবেষক আমানূল হক বলেন, একুশে পরিষদের মতো দেশের সব সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিলে শুভ চেতনার কোনো দিন মৃত্যু হবে না। যত দিন বাংলা রবে, বাঙালি জাতি রবে, তত দিন একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জিইয়ে রবে।

কক্সবাজার উপকূলে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম লেগেছে

সমুদ্র থেকে ধরে আনা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম পড়েছে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত সময় কাটাবেন জেলার বিভিন্ন শুঁটকিমহালের শ্রমিকেরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কক্সবাজারে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের খাবারের তালিকায় থাকে শুঁটকির ভর্তা। এ ছাড়া পর্যটকদের বড় একটি অংশ বাড়ি ফেরার সময় এখান থেকে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান।
পর্যটন মৌসুমের পাঁচ মাসে (নভেম্বর-মার্চ) শহরের শুঁটকির দোকানগুলোতে ২০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয় বলে জানান কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, শুঁটকির চাহিদা পূরণ করতে অনেকে ভারত ও মিয়ানমার থেকে শুঁটকি আমদানি করে সৈকত এলাকায় বিক্রি করেন। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় ৬ হাজার ট্রলার সাগরে গিয়ে ইলিশ, কোরাল, লাক্ষা, চাপা, কামিলা, রুপচাঁদা, পোপাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে আনছে। এসব মাছের বড় একটা অংশ যাচ্ছে শুঁটকিমহালে। গত বৃহস্পতিবার সকালে শহরের নাজিরারটেক উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ৫০-৬০টি মহালে (শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র) উৎপাদিত হচ্ছে শত শত মণ শুঁটকি। ছুরি, লইট্যা, কোরাল, লাক্ষা, চাপা, মাইট্যা, ফাইস্যা, চিংড়ি, পোপা, রাঙাচকি, গুইজ্যাসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা মহাল থেকে শুঁটকি কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নাজিরারটেক এলাকার একটি মহালে দেখা গেছে, ৩০ জনের বেশি নারী কাঁচা মাছ ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। এরপর লবণ মিশিয়ে সেই মাছ বাঁশের মাচায় তুলে রোদে শোকাচ্ছেন। আকলিমা বেগম (৪৫) নামে একজন শুঁটকিশ্রমিক বলেন, সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কাজ করে তিনি পান ২০০ টাকা। অথচ সমান কাজ করে পুরুষ শ্রমিকেরা মজুরি পান ৪০০ টাকা। এই শুঁটকিমহালে নারী-পুরুষের শ্রমিকদের পাশাপাশি ১০-১২টি শিশু-কিশোরকেও শুঁটকি উৎপাদন করতে দেখা যায়। শিশুরা মজুরি হিসেবে পায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। শুঁটকিশ্রমিক আমান উল্লাহ ও কুলসুম আরা বলেন, নাজিরারটেক এলাকার প্রায় ৬০টি মতো মহালে শ্রমিক আছে প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ৫ হাজার নারী ও ১ হাজার শিশুশ্রমিক। কম টাকায় কাজ আদায়ের জন্য মহালের মালিকেরা নারী ও শিশুদের নিয়োগ নেন। সোহেল নামে এক শিশুশ্রমিক জানায়, গত বছর ট্রলার নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তার বাবা নিখোঁজ হয়। এরপর সংসারের হাল ধরতে তাকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে শুঁটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে। তার মা-ও কাজ করন। নাজিরারটেক এলাকার পাশের ফদনারডেইল, নুনিয়াছটা, কুতুবদিয়াপাড়া, মগচিতাপাড়া উপকূলেও অসংখ্য মহালে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম পড়েছে। রোদ যত বেশি শুঁটকি উৎপাদনও তত বেশি হচ্ছে। নাজিরারটেক এলাকার একটি মহালের মালিক সব্বির আহমদ বলেন, শুঁটকি উৎপাদনের ভরা মৌসুম হলেও কয়েক দিন ধরে মাছের সংকট চলছে। জেলেদের ধরে আনা বড় মাছগুলো (রুপচাঁদা, কোরাল, গুইজ্যা, চাপা, মাইট্যা, কালোচান্দা) পর্যটকদের জন্য শহরের হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা হচ্ছে। আর ছোট মাছ (ছুরি, লইট্যা, ফাইস্যা,
ছিটকিরি, চিংড়ি) শুঁটকির জন্য মহালে আনা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, রুপচাঁদা ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, মাইট্যা ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, লইট্যা ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, কোরাল ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, পোপা ৪০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। শহরের নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়া উপকূল নিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড। ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, প্রতি সপ্তাহে এই উপকূল থেকে অন্তত ৫ কোটি টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত আছে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক। শুঁটকি ব্যবসায়ীরা বলেন, মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া, ধলঘাটা, কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডি, খুরুশকুল, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, বাহারছড়া, কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশিখালী, কৈয়ারবিল, আলী আকবরডেইল উপকূলে শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে। নুনিয়াছটার শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. আলম বলেন, প্রতি সপ্তাহে তিনি নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, ফিশারিঘাট, মগচিতাপাড়া থেকে ৫০০ মণের বেশি শুঁটকি কিনে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সরবরাহ দিচ্ছেন। এখান থেকে শুঁটকি যাচ্ছে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায়। বাংলাদেশ সল্টেড অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, নুনিয়াছটা, সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফে পোপা শুঁটকির ৩৭টি মহাল রয়েছে। গত বছর এসব মহালে উৎপাদিত পোপা শুঁটকি হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এ বছর শুঁটকি রপ্তানি থেকে পাওয়া যাবে ৩০০ কোটি টাকা। পোপা শুঁটকি দিয়ে সুস্বাদু স্যুপ তৈরি হয়।

সৌহার্দ্যপূর্ণ আয়োজনে স্কয়ার পরিবারের মিলনোৎসব

বসন্তের শুভ্র সকাল। রঙিন সাজে সজ্জিত চারপাশ। বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষে পূর্ণ পাবনার শহীদ আমিন উদ্দিন স্টেডিয়াম। শব্দযন্ত্রে বেজে উঠল জাতীয় সংগীত। জাতীয় ও প্রতিষ্ঠানের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো দিনব্যাপী আয়োজন। মালিক থেকে শ্রমিক—সবাই আছেন। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা। খেলাধুলা, গল্প, খাওয়া-দাওয়া, হাসি-আনন্দ।
এ যেন মহামিলনোৎসব। এমন বর্ণাঢ্য ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আয়োজনে গতকাল শুক্রবার হয়ে গেল দেশের খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্কয়ার গ্রুপের ফ্যামিলি স্পোর্টস ডে। অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন পাবনায় কর্মরত স্কয়ার পরিবারের ২৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মিলিয়ে ৪৫ হাজার মানুষ। সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজন শুরু। স্কয়ারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শোভাযাত্রা এসে মিলিত হয় শহীদ আমিন উদ্দিন স্টেডিয়ামে। সেখানে জাতীয় ও স্কয়ার গ্রুপের পতাকা উত্তোলন করেন স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের আবাসিক উপদেষ্টা দবির উদ্দিন আহমেদ। এ সময় স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন স্কয়ার পরিবারের প্রবীণতম সদস্য নির্মল কুমার সাহা। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো, পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির, পাবনা পৌরসভার মেয়র কামরুল হাসান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সাইফুল আলম চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল পাবনা জেলা ইউনিটের কমান্ডার হাবিবুর রহমান,
পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি শিবজিত নাগসহ স্থানীয় সুধীজনেরা। পায়রা উড়িয়ে ও মশাল প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ফ্যামিলি স্পোর্টস। দিনব্যাপী এই আয়োজনে দৌড়, লং জাম্প, গোলক নিক্ষেপ, সাইক্লিং, মিউজিক পিলো, যেমন খুশি তেমন সাজোসহ ৩৪ ধরনের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় স্কয়ার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মিলে প্রায় ৫০০ জন অংশ নেন। বিকেলে উপস্থিত অতিথিরা বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরী বিশাল এই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্কের সেতুবন্ধ রচনার লক্ষ্যে ২০০১ সাল থেকে ফ্যামিলি স্পোর্টস ডে আয়োজন শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি উদ্‌যাপিত হচ্ছে।

এবার ভোটযন্ত্র নিয়ে বিএনপির ভয়!

পৃথিবীতে যত আশ্চর্য ঘটনা আছে, তার মধ্যে প্রায় সব বিষয়ে বাংলাদেশে সরকার ও বিরোধী দলের বিপরীতমুখী অবস্থান অন্যতম। আওয়ামী লীগ যদি বলে সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়, বিএনপি তাতে সন্দেহ করবে। আর বিএনপি যদি বলে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, আওয়ামী লীগ তার মধ্যেও ষড়যন্ত্র খুঁজবে। নির্বাচনে এত দিন বিতর্কের বিষয় ছিল মানুষ তথা নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনকালীন সরকার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ। এবার যুক্ত হয়েছে ভোটযন্ত্র। আগামী নির্বাচনে ভোটযন্ত্র ব্যবহার করা হবে কি হবে না,
সে নিয়ে প্রধান দুই দলের মধ্যে বাহাস শুরু হয়েছে। এর আগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহার নিয়েও আমাদের বিজ্ঞ সরকারি দল ও প্রাজ্ঞ বিরোধী দলের মধ্যে বিস্তর বাদানুবাদ চলছিল। লোহার ব্যালট বাক্সটি থাকবে, না তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স আনা হবে, তা ছিল বিতর্কের বিষয়। বিএনপি মনে করত, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স হলেই সরকারি দলের জন্য ভোট কারচুপি সহজ হবে (বরং উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি)। তারা এই অজুহাতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত বর্জন করেছিল। যদিও বিএনপির নেতা মনিরুল হক সাক্কু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হন এবং বিএনপি পরে তাঁকে সাদরে গ্রহণও করে। এখন আর স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স বিতর্কের বিষয় নয়। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব না নিতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে ভোটযন্ত্র নিয়ে। আগামী নির্বাচন মামুলি ধারায় চলবে না যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হবে? এ ব্যাপারে দুই পক্ষ পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। আওয়ামী লীগ নীতিগতভাবে যান্ত্রিক পদ্ধতি তথা ভোটযন্ত্র ব্যবহারের পক্ষে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী নির্বাচনে ই-ভোটিং প্রবর্তন করার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে চায় নির্বাচন কমিশন।
কাগুজে ব্যালটের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। যন্ত্র তৈরির কাজও অনেকটা এগিয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমের নতুন রূপ হলো ডিভিএম বা ডিজিটাল ভোটিং মেশিন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের যোগসূত্র নেই। বিএনপি ভোটযন্ত্রের মধ্যে ‘সরকারের ভোটারবিহীন নির্বাচন করার আরেকটি ডিজিটাল প্রতারণার’ দুরভিসন্ধি খুঁজে পেয়েছে। ভোটযন্ত্র চালুর বিরোধিতা করতে গিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যে ভাষায় নতুন সিইসি নুরুল হুদার সমালোচনা করেছেন, সেটি রুচির সীমা ও সৌজন্যের মাত্রা ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করি। নতুন সিইসি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘উনি কে? বিসিএস ৭৩ ব্যাচের অফিসার। ৭৩ ব্যাচের ডাকনাম হচ্ছে তোফায়েল সার্ভিস। অর্থাৎ কোনো পরীক্ষা-টরীক্ষা নাই, জাস্ট সুপারিশ দিয়ে এটা করা হয়েছে। এঁরা চাকরিজীবনে কোনো যোগ্যতাই দেখাতে পারেন নাই। সেই ব্যক্তিকে সিইসি করা হয়েছে, তাদের (আওয়ামী লীগ) কথা অনুযায়ী চলবে বলে।’ সিইসি পদে নুরুল হুদা নিয়োগ পাওয়ার আগে বিএনপি তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি। বিএনপি সরকারই তাঁকে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দিলে তিনি প্রশাসনিক আদালতে মামলা করে চাকরি ফিরে পান।
এটাই তঁার বিরুদ্ধে বিএনপির প্রধান অভিযোগ। তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া যদি অন্যায় না হয়ে থাকে তাহলে বর্তমান সরকারের আমলে যত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেসবও সঠিক বলে মেনে নিতে হবে। জনপ্রশাসনকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহারের কাজটি দুই পক্ষই করেছে। কিন্তু কেউ আয়নায় নিজের মুখ দেখতে চায় না। বিএনপি যদি নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখার কৌশল নিয়ে থাকে, তাহলেও তাদের এমন কিছু বলা ঠিক হবে না, যাতে সিইসি বা কমিশনের অন্য সদস্যদের কারও সঙ্গে বিএনপি নেতাদের মুখোমুখি বসা কঠিন হয়ে পড়ে। সিইসি নুরুল হুদা সরকারের অনুগত হবেন, না নিরপেক্ষ থাকবেন, সেটি দেখার জন্য বিএনপি অন্তত আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় ১৮টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। নুরুল হুদা বলেছেন, শপথ নেওয়ার পর থেকে তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং বিএনপিসহ সব দলের আস্থা অর্জনে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাবেন। তাই হাওয়ায় ছড়ি না ঘুরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই সিইসির নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা পরীক্ষা করা বিএনপির জন্য সমীচীন হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা না বলা ছিল রকিব কমিশনের বড় ভুল। সে কারণে নতুন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে, তাদের অভিযোগ–আপত্তির কথ শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিএনপির দলীয় অবস্থান দেখে মনে হয়েছিল, আপত্তি সত্ত্বেও তারা নতুন নির্বাচন কমিশনকে মেনে নিয়েছে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা যাচাই করতে আগ্রহী।
কিন্তু রিজভীর কথায় চূড়ান্ত নাকচের মনোভাবই প্রকাশ পেল। বিএনপির নেতা যে ভোটযন্ত্রের মধ্যে দুরভিসন্ধি খুঁজে পেলেন, সেই কাজটি কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। প্রথম আলোয় সহকর্মী তানভীর সোহেলের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শামসুল হুদা কমিশন ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আর রকিব কমিশন চালু করতে চেয়েছিল ডিভিএম পদ্ধতি, যা আগেরটির চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। এখানে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) পদ্ধতিতে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। প্রথমে একজন ভোটার ওই যন্ত্রে আঙুলের ছাপ দেবেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ডেটাবেইসের সঙ্গে ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। আঙুলের ছাপ মিললে ভোটার ভোট দিতে পারবেন। ওই ভোটার একটি ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যন্ত্রটি বন্ধ (লক) হয়ে যাবে। এরপর ওই ভোটার আর কোনোভাবেই আরেকটি ভোট দিতে পারবেন না। তা ছাড়া ডিভিএমে স্মার্ট কার্ড প্রবেশ করিয়েও ভোটারের পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। নির্ধারিত ভোটার ভোটকেন্দ্রে না গেলে বা কেন্দ্র দখল করে কোনো ভোটারের ভোট অন্য কারও পক্ষে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।’ এটাই যদি প্রকৃত অবস্থা হয়, তাহলে রিজভী সাহেবরা ভয় পাচ্ছেন কেন? তঁারা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে যে কারচুপির আশঙ্কা করছেন, ভোটযন্ত্র তার বিপরীতে রক্ষাকবচ হতে পারে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনও বলেছেন, যন্ত্রে আগে থেকে কারসাজি করার কোনো সুযোগ নেই। একটি ভোটের জন্য একবারই প্রোগ্রামিং (ওটিপি) করা হয়। ভোট শুরুর আগে কোনো যন্ত্রে কারসাজি করা হলে সেটা তো আর কাজই করবে না। একেকটি যন্ত্র তৈরিতে তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল সম্ভবত ২৪ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যেত। ফলে ব্যালট ছাপানো, কালি, কলম, ব্যালট বাক্স কেনার খরচ বাঁচত। সময় তো বাঁচতই। তিনি বলেন, যন্ত্রে কাগজের ব্যবহার রাখা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে ভিভিপিএটি বা ভোটার ভেরিফিকেশন পেপার অডিট ট্রেইল বলা হয়। এতে অভিযোগ উঠলে মেশিন থেকে ভোটের তথ্য নেওয়া যাবে।
শামসুল হুদা কমিশনের আমলে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে প্রথমবারের মতো ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ওই কমিশন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৯টি ওয়ার্ডে ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব ওয়ার্ডে ইভিএম ব্যবহার করে। সদ্য বিদায়ী রকিব কমিশন কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করে। গত মঙ্গলবার বিদায় নেওয়া নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ডিভিএমে ভোট নেওয়ার বিষয়টি এখন কারিগরি কমিটির মতামতের অপেক্ষায় আছে। তাঁরা কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছেন। এই মেশিন নিয়ে যাতে কোনো বিতর্কের সুযোগ না থাকে, সে জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা কমিটি দেখবে। নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. আবদুল্লাহর মতে, ডিভিএম এমন একটি যন্ত্র, সেখানে কারচুপির কোনো সুযোগ থাকবে না। ভোটের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত হবে। রুহুল কবির রিজভী যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার বিপক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন, সেটি যেমন দল হিসেবে বিএনপির জন্য লজ্জাকর, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ নিরক্ষর। এত টেকনিক্যাল বিষয় বোঝা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য।
এই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের সার্ভার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সুতরাং, সরকারের জন্য ভোট ম্যানিপুলেট (কারসাজি) করা খুবই সহজ হবে।’ (প্রথম আলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)। বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ নিরক্ষর থাকার দায় রাজনীতিক হিসেবে তিনি বা দল হিসেবে বিএনপি এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর। এর মধ্যে বিএনপি তিনবারে ক্ষমতায় ছিল ১৬ বছর (প্রথমবার ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, দ্বিতীয়বার ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ এবং তৃতীয়বার ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর)। বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরক্ষতা দূর করতে তঁারা এই দীর্ঘ সময়ে কী করেছেন, সেটি জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনগণের আছে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি নেতা যেই যুক্তি দিচ্ছেন, সেই যুক্তিতে নিরক্ষর মানুষকে পরিচয়পত্রও দেওয়া যায় না। যারা পড়তে পারবেন না তাঁরা কী করে নিজের পরিচয়পত্র বুঝে নেবেন? পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক আইয়ুব খানও এই উদ্ভট যুক্তি দেখিয়ে মৌলিক গণতন্ত্র বা বেসিক ডেমোক্রেসি চালু করেছিলেন। স্বাধীনতার এত বছর পরও যে দেশের ৪০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ নিরক্ষর,
এই লজ্জা যারা নিরক্ষর তাঁদের নয়। বরং যঁারা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে তঁাদের নামে রাজনীতি করছেন, যাঁরা বর্তমানে বা অতীতে দেশ শাসন করেছেন, তাঁদের সবার জন্য এটি লজ্জার। ভোটযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে বিরোধী দলের সবাই যে রিজভীর সঙ্গে একমত, তা বলা যাবে না। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ বলেছেন, ইভিএম পদ্ধতির অনেক ত্রুটি আছে। ত্রুটিগুলো দূর করে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী বলেছেন, এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে পারে। আর ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুছ আহমাদ বলেছেন, ‘ইভিএম বিষয়টি ভালো। তবে এখানে চাতুরতার সুযোগ আছে। এ জন্য এ পদ্ধতিকে অ-বিতর্কিত বলা যায় না।’ ইসলািম দলগুলোও যখন যন্ত্রনির্ভর ভোট পদ্ধতিকে গ্রহণ করতে রাজি তখন ‘আধুনিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবিদার’ বিএনপির নেতারা কেন গররাজি, সেটি বুঝতে অক্ষম। মেশিনের দোষ না দেখে, সেই মেশিনটি যিনি বা যাঁরা পরিচালনা করবেন, তঁাদের ব্যাপারে সজাগ থাকুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

অনেক শ্রদ্ধা, অনেক ভালোবাসা

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যারের জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭। তাঁর ৮০তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক ও অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তাঁর সঙ্গে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনা স্মৃতিপটে বারবার দোল খায়। খুব সম্ভবত ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাধীনতা লাভের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মালিক, সৈয়দ আলী আহসান, ড. শামসুল হকসহ অনেকেই। অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন। একসময় আনিসুজ্জামান স্যারের বক্তব্যের পালা।
ছিমছাম পোশাক পরা (আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, পরনে কালো প্যান্ট, গায়ে ধবধবে সাদা হাফহাতা টি-শার্ট) উজ্জ্বল চেহারার তরুণ ভদ্রলোকের বিনয়ী বাচনভঙ্গি, আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধুর বক্তব্য এতটাই ভালো লেগেছিল যে ক্যাম্পাসে স্যারের বক্তব্য থাকবে অমন অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেছি বলে মনে পড়ে না। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। এ এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র। আর এই হলের প্রভোস্ট আনিসুজ্জামান স্যার। প্রভোস্ট হিসেবে ছাত্রদের কল্যাণে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত। ছাত্রদের খাওয়াদাওয়ার মান ঠিক আছে কি না, তারও তত্ত্ব-তালাশ করতেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর ছিল অতুলনীয় স্নেহ। আর্থিক সংকটের কারণে হল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দিনে হাউস টিউটরের (বড়ুয়া স্যার) কাছে হলের পাওনা পরিশোধ করে মালামাল রিকশায় ওঠানো হচ্ছে। হৃদয়ের কোথায় যেন রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ যে কত কষ্টের তা বলার নয়। এ এফ রহমান হল থেকে চলাচলের পাকা সড়কটি সোজাসুজি আলাওল হলের সামনে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ চওড়া সড়কে মিলিত হয়েছে। সেখানে পৌঁছানোর অল্প আগে বিপরীত দিক থেকে প্রভোস্টের গাড়ি সড়কপথে ঢুকে পড়ে। তাড়াতাড়ি রিকশাটি পাকা পথের পাশে নামিয়ে রাখা হয়। গাড়িটি ঠিক রিকশার পাশে এসে দাঁড়ায়। কাচ নামিয়ে স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
খোলার দিনে এত কিছু নিয়ে কোথায় যাচ্ছি। উত্তরে জানালাম, ‘আমার পড়াশোনা চালানো সম্ভব হচ্ছে না, সে জন্য চলে যাচ্ছি স্যার।’ তিনি পুনরায় বললেন, ‘প্রভোস্টকে না বলে চলে যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘হাউস টিউটরের কাছে পাওনা মিটিয়ে এসেছি।’ ‘রিকশা ঘুরিয়ে প্রভোস্টের কক্ষে এসো’ বলেই স্যার হলের দিকে চলে গেলেন। ঠাসাঠাসি মালামালসমেত রিকশা ঘুরিয়ে সেখানে হাজির হলাম। দেখি, স্যার টেলিফোনে ব্যস্ত। টেলিফোন রেখে আমাকে মালামাল কক্ষে রেখে এসে কথা শুনতে বললেন। ভাবলাম, প্রভোস্টের অনুমতি ছাড়া কক্ষ ছেড়ে হয়তো-বা নিয়ম ভেঙেছি। আগে নিয়ম রক্ষা করি, তারপর স্যারকে বুঝিয়ে বলব। মালামাল রেখে এসে স্যারের সামনে দাঁড়াই। তিনি জানতে চাইলেন, বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শামসুল হকের সুপারিশে স্টাইপেন্ড পেয়েছি কি না। বিনয়ের সঙ্গে জানালাম, ওই স্টাইপেন্ডে কিছুতেই চলতে পারছি না। তিনি ড. এখলাসউদ্দীন স্যারের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ শেষে আমাকে বললেন, ‘একটি ব্যবস্থা হবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা কোরো না, মন দিয়ে পড়াশোনা করো।’ এ কথা শুনে কী যে খুশি লেগেছিল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ওই মুহূর্তে আমার আনন্দের অশ্রুবিন্দু দেখে হয়তো-বা স্যার কিছুটা অনুভব করেছিলেন। মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করায় স্যারের কী যে আনন্দ! আজও তা মনে পড়ে। ১৯৮৩ সালের ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানেও জানান দিই যে স্যারের কারণে আজ আমি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে পদার্থবিদ্যার প্রভাষক।
সেদিনও স্যার কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি। এটি তাঁর দায়িত্বের অংশ বলে উপদেশ দিলেন নিষ্ঠাবান ও নিবেদিত শিক্ষক হতে। তাহলেই নাকি স্যারের মনে হবে তিনি একটি সেরা কাজ করেছেন। স্যারের অনুপ্রেরণায় ৩৩ বছরের চাকরিজীবনে বহুমাত্রিক বিড়ম্বনা সত্ত্বেও স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও আদর্শের বোধশক্তি কখনো হারাইনি। আজ অবসরে এসে বারবার মনে হচ্ছে, স্যার সত্যিই মহৎ কাজটিই করেছিলেন। পদোন্নতির প্রতিটি ধাপে, কোটবাড়ী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক হয়ে, লাকসামের নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনে মনে হয়েছে সব কৃতিত্ব স্যারের, যাঁকে অনুকরণ-অনুসরণ করেছি, যাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছি, তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। মনবসু বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় জাপানে যেতে প্রথম প্লেনে চড়ে মনে পড়ে ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই দৈব ঘটনা। দু-চার মিনিট আগে-পিছে হলে দেখা হতো না। পরম করুণাময় আল্লাহর রহমতে প্রভোস্টের আচমকা সাক্ষাৎটি ছিল আমার জীবনের এক দুর্লভ মুহূর্ত। সে সময় জ্ঞানী ও ধীশক্তির ব্যক্তিরা নানা ছন্দে, নানা বর্ণে ও নানারূপে আদর্শ শিক্ষকের গুণ ও গৌরব দুটিই রক্ষা করতেন। তাঁরা কখনো কিছু চাননি, প্রত্যাশাও করেননি, কিন্তু দিয়েছেন হৃদয়-মন উজাড় করে। দেশবরেণ্য অনন্য প্রতিভাবান, গুণে-মানে কীর্তিমান, প্রবন্ধকার, গবেষক, অনুবাদক, লেখক, সাহিত্যিক আনিসুজ্জামান স্যারকে প্রভোস্ট হিসেবে ও অভিভাবক হিসেবে পেয়ে আজ অবসরে তাঁকে নিয়ে গর্ববোধ করি। সেই সঙ্গে সব স্যারের স্মৃতি রোমন্থন করি। জন্মদিনে স্যারকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এবং সেই সঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
মো. হারুনুর রশীদ: সাবেক অধ্যক্ষ, নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ এবং সাবেক পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, কোটবাড়ী, কুমিল্লা।

জিপিএ-৫, নাকি পরিপূর্ণ মানুষ

ছেলেবেলায় ১৯৮০-এর দশকে পাড়া-মহল্লায় দেখতাম, এক দঙ্গল ডানপিটে ছেলে একত্রে ঘোরাফেরা করত। এরা নানা রকম সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিল। পাড়ার হেন কাজ নেই, যেখানে তাদের দেখা পাওয়া যেত না। আবার তাদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াত। আজকের উত্তরার গ্যাং সংস্কৃতির সঙ্গে ওই আমলের গ্যাং বা দলের পার্থক্য এখানেই যে আজকের এই গ্যাং কিশোরেরা সমাজের ভালো কাজ থেকে দূরে থাকে। সহিংসতা ও মস্তানির দিকে ঝোঁক। যার বলি তাদেরই বন্ধু আদনান কবির। এই কিশোরেরা এতটাই বেপরোয়া যে, ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তারা খুন করতে যায়। অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ—সবাই যেন তাদের কাছে অসহায়।
এ অবস্থায় ঢাকা মহানগর পুলিশ ঘোষণা দিয়েছে, উত্তরায় স্কুলের পোশাক পরে কিশোরেরা ঘোরাঘুরি করলে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছেই কেবল তাদের হস্তান্তর করা হবে। এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার এই সুযোগে পুলিশও যে হয়রানি করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? কারণ, পুলিশের বিরুদ্ধে তো অভিযোগের শেষ নেই। তখন আবার প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যেতে পারে! এই সমস্যা সমাধানে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই শ্রেয়, যদিও তার সঙ্গে কিছু সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ারও অবকাশ রয়েছে। স্থায়ী পদক্ষেপের প্রসঙ্গে বলা যায়, স্কুলগুলোতে পাঠাতিরিক্ত কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে, যেগুলো একসময় থাকলেও এখন নেই বললেই চলে। ক্লাসের পর ছাত্রছাত্রীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ নানা রকম সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা যায়। তবে সবাই যে এসব করবে তা নয়, তাদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করা যায়। আজকের ঢাকা নগরের অভিভাবকেরা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এতে স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি ছাত্রদের এসব কাজে নিয়োজিত রাখতে পারে, তাহলে তাঁরাও একটু স্বস্তি পাবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা যেভাবে জিপি-৫-এর পেছনে ছুটছি, তাতে অভিভাবকদের অনেকেই এই ব্যবস্থায় রাজি হবেন কি না, সন্দেহ! কিন্তু তাঁদেরও ভেবে দেখা উচিত, এই ইঁদুরদৌড় থেকে আমরা কী অর্জন করছি। তবে এখানে সরকারের ভূমিকাই প্রধান। কারণ, সরকার না চাইলে তো স্কুলের পক্ষে এককভাবে এটা করা সম্ভব নয়। এর জন্য অনেক আয়োজনের ব্যাপার আছে। অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আছে।
ভয় দেখিয়ে উত্তরার এই কিশোরদের সাময়িকভাবে হয়তো নিবৃত্ত করা যাবে, কিন্তু ওদের তৎপরতা একেবারে বন্ধ করা যাবে না। সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন না এলে বা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না করলে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের উচিত, সন্তানদের সময় দেওয়া, শুধু টাকা দিলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মানুষের সামাজিকায়ন বা শিক্ষার প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিবার। তাই এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর চলে আসে স্কুলের কথা। জিপিএ-৫ পাওয়ার বিদ্যার সঙ্গে যদি শিশু-কিশোরেরা সামাজিকতা, নৈতিকতা, বিবেকের শিক্ষা না পায়, তাহলে হয়তো আরও অনেক আদনানের মৃত্যু আমাদের দেখতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও থাকা উচিত, কারণ কিশোর বয়সে মানুষের চিন্তার জগতে বড় পরিবর্তন আসতে শুরু করে, যেটা তাকে এলোমেলো করে দেয়। কথা হচ্ছে, আদনানের খুনি কিশোরদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জিপি-৫ পেত, কিন্তু এই জিপিএ-৫ লইয়া আমরা কী করিব! ফলে আমরা কি জিপিএ-৫
উৎপাদন করব, নাকি পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই!