Friday, February 6, 2015

রোববার থেকে ২০ দলের ৭২ ঘণ্টা হরতাল

দেশব্যাপী ক্রসফায়ারের মাধ্যমে অসংখ্য নেতা-কর্মীকে হত্যা, গুলি করে অসংখ্য নেতা-কর্মীকে পঙ্গু ও আহত করা এবং বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীসহ নিরীহ জনগণকে গণগ্রেফতারের প্রতিবাদসহ বেশ কিছু কারণে আগামী রোববার ভোর ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত দেশব্যাপী লাগাতার ৭২ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছে ২০ দলীয় জোট।
আজ শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে দলের যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে, বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ও কুক্ষিগতকরণের প্রতিবাদে, সাংবাদিক নির্যাতন ও সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে, জনগণের মৌলিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে আগামী রোববার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চলমান অব্যাহত অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি ৭২ ঘণ্টার সর্বাত্মক হরতাল পালিত হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সব নেতা-কর্মী ও গণতন্ত্রকামী সংগ্রামী জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে এই কর্মসূচি পালনের জন্য ২০ দলীয় জোট নেতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে উদ্বাত্ত আহবান জানাচ্ছি।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বিবৃতিতে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৫-৯৬ সালে এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন করে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, রাস্তায় সরকারি কর্মকর্তাদের দিগম্বর করে, রাষ্ট্রীয় এবং জনগণের সহায়-সম্পদ বিনষ্ট করে তারা সহিংস আন্দোলন করেছিল। তাদের আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের কারণে তখন এসএসসি পরীক্ষা প্রায় তিন মাস পেছাতে হয়েছিল, সেই ইতিহাস দেশের জনগণ এখনো ভুলেনি।
তিনি বলেন, নতুন বাকশাল কায়েমের জন্য শেখ হাসিনাই সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিলেন। একতরফা প্রহসনের নির্বাচন করলেন। নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপিসহ এদেশের ৩৭টি গণতান্ত্রিক দল সেই নির্বাচন বর্জন করলো। আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত কয়েকটি এতিম সংগঠন মিলেমিশে বিনা ভোটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৫ শতাংশ ভোটের সরকার গঠন করলো। যেই সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল এক ও অভিন্ন। মূলত দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট এখানেই। আইনশৃঙ্খলা সংকটের নামে তাকে পাশ কাটানোর অপচেষ্টা জাতিকে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিপতিত করবে।
বিএনপির এ যুগ্ম-মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশকে বর্তমান খুনি সরকার একটি বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের প্রতিদিন ক্রসফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। স্বজন হারানোদের আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠছে দেশের বাতাস। গুলিবিদ্ধ করে চিরতরে পঙ্গু বানানোর অমানবিক নিষ্ঠুরতা গাণিতিক হারে বাড়ছে। বেওয়ারিশ লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বেওয়ারিশ নামে বিরোধী দলীয় অসংখ্য নেতাকর্মীদের লাশ দাফন করা হচ্ছে, যাদের স্বজনরা কোনোদিনই তাদের কবরের ঠিকানা খুঁজে পাবে না। গণগ্রেফতারের কারনে উপচে পড়া অবস্থা দেশের কারাগারগুলোর।
শুক্রবার ক্রফায়ারে হত্যা করা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের তথ্য সম্পাদক শাহাবুদ্দিন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা জামায়াত নেতা শহীদুল ইসলাম এবং চৌদ্দগ্রাম শিবির সভাপতি শাহাব উদ্দিন পাটোয়ারীকে। গুলিবিদ্ধ করে চিরতরে পঙ্গু করা হয়েছে সাতক্ষীরা পৌর ছাত্রদল সভাপতি আবদুল মজিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা হাবিবুর রহমান, মফিজুর রহমানসহ বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতাকর্মীকে।
অথচ আমার দেখতে পাচ্ছি চৌদ্দগ্রাম ট্র্যজেডির মূল হোতা এবং পেট্রোল বোমাসহ আটক যুবলীগ নেতা মানিক ও বাবুলকে রেলমন্ত্রীর নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ-নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে বোমা বানাতে গিয়ে আহত হয়েছে ছাত্রলীগের চার কর্মী যথাক্রমে রহমত উল্লাহ, শাহীন মিয়া, কবির ও রাসেল। তাদেরকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পেট্রলবোমা ও ককটেল নিক্ষেপের সাথে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরাই দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সালাহ উদ্দিন বলেন, আমরা এই জঘন্য অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য তাদেরকে আহবান জানাই। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

বিএনপি-জামায়াত ও আইএসে কোনো পার্থক্য নেই : প্রধানমন্ত্রী

হরতাল ও অবরোধের নামে নাশকতা সৃষ্টি এবং মানুষকে পুড়িয়ে মারার জন্য আবারও বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যা করছে বিএনপি-জামায়াতও সেই একই ধরনের অপরাধ করছে।
তিনি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস যা করছে, বিএনপি- জামায়াতও সেই রকম অপরাধ করছে। তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।' আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শুক্রবার গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে এ কথা বলেন। খবর বাসসের।
বিএপি-জামায়াত জোটের হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জনগণকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'প্রবল প্রতিরোধের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।'
শেখ হাসিনা এসএসসি পরীক্ষার প্রথমদিন শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ১৫ লাখ পরীক্ষার্থীর জীবনের কথা বিবেচনা করে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে হরতাল না দেয়ার জন্য খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'যদি আপনার প্রয়োজন হয়, তাহলে এসএসসি পরীক্ষার পরে হরতাল আহবান করেন।'
ছোট ছেলের (কোকো) অসুস্থতার সময় তাকে দেখতে না যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এমনকি তিনি (খালেদা জিয়া) তার কবর জিয়ারতের তাগিদও অনুভব করেননি।'
তিনি প্রশ্ন করেন, 'যেখানে একজন মায়ের তার নিজের মারা যাওয়া সন্তানের জন্য কোনো শোক নেই, সেখানে অন্য মানুষদের জন্য তার কিভারে দুঃখ ও সমবেদনা থাকে?'

যারা সংলাপ চান তারা পাগল : জয়

চলমান সঙ্কট নিরসনে যারা সংলাপের কথা বলেন তাদের পাগল বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের ‘সন্ত্রাস বনাম রাজনীতি’ বিষয়ক সেমিনারে তিনি একথা বলেন।
জয় বলেন, সংলাপে সংঘর্ষ কোনো দিন থামবে না। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে খালেদা জিয়া ঘরে প্রবেশ করতে দেননি। দরজা থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। তাদের সাথে আবার সংলাপ হবে! একজন পাগল ছাড়া কি কেউ বলতে পারেন যে খালেদার সাথে সংলাপে বসতে। যারা পাগল তারাই সংলাপে বসতে বলছেন।
তিনি আরো বলেন, কোনো যুক্তি দিয়েই বলা যায় না যে, সংলাপ করলে চলমান সহিংসতা থেমে যাবে। তারা বর্তমানে সহিংসতার পথে রয়েছে। মানুষ পুড়িয়ে মারছে। তারা যখন সহিংসতার পথেই নামেছে তবে তাদের সঙ্গে কিসের সংলাপ।
আইএস’র মত যারা বোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে তাদের সাথে কোনো সংলাপ নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় বলেন, যারা সহিংসতা করছো তাদের বলছি, এগুলো বন্ধ করো তা না হলে জ্যান্ত হোক বা যেভাবেই হোক তোমাদের ধরা হবে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি- কানাগলি থেকে রাজনীতিকে রাজপথে আনাই কাজ by আবুল মোমেন

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে। বাস্তবে যেমন দেখা যায়, দুই মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বী একে অন্যকে শেষ করে দেওয়ার জেদ ধরলে শেষ পর্যন্ত কানাগলিতে এসে ঠেকে, এ-ও যেন তেমনই। আমরা কি একটা চূড়ান্ত চরম শেষ দৃশ্যের অপেক্ষায় থাকব? দৃশ্যটা কেমন হবে; কতটা বর্বর, নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত হতে পারে?
চরম শেষ দৃশ্যের আগেই অনেক রক্ত ঝরছে, নিষ্ঠুরতা চলছে, ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে। তার পরও উভয় জোট, অন্তত দুই জোটের প্রধান দুই নেত্রী পরস্পরের বিরোধিতা করে চলেছেন। ফলে অবিশ্বাস্য হলেও মনে হচ্ছে, চরম কোনো পরিণতি ঘটে যাবে যেকোনো সময়। কেমন হবে তা, সেটাই ভীতসন্ত্রস্ত জনগণ ভাবছে।
জনগণই যদি দেশের মালিক হয়ে থাকে, যদি সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয় তারাই এবং শেষ বিচারের অধিকার থাকে তাদের ওপরই, তাহলে এই পরিণতির দায় কি তারাও এড়াতে পারে? অন্তত চরম ও শেষ দৃশ্য ঠেকানোয় তাদের কি কিছুই করণীয় নেই?
এ দেশের জনগণ কোনোকালে, অন্তত রাজনীতির ক্ষেত্রে, ঠুঁটো জগন্নাথ ছিল না। তারা সুযোগ পেলে কেবল সঠিক রায়ই দেয়নি, যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়ে ইতিহাসের বাঁক ফিরিয়েছে। তাহলে এ ক্ষেত্রে কেন তারা পড়ে পড়ে মার খাবে?
বলা যায়, রাজনীতিবিদেরা ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরাই ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়ে রাজনীতিকে জনবিচ্ছিন্ন করেছেন, নিজেদের দৈন্য ঢাকতে স্বার্থমগ্ন হয়েছেন এবং দুর্বল রিক্ত মানুষে পরিণত হয়ে সতর্ক পাহারায় রাজনীতিকে টেনে এনেছেন কানাগলিতে। এ-ও বলে দেওয়া যায়, তাঁদের আর সাধ্য নেই রাজনীতিকে আবার কানাগলি থেকে রাজপথে ফিরিয়ে আনার। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের আচরণ হতে পারে দুই রকম। প্রথমত তারা নিষ্ঠুরতার পথ ধরে, যা উভয় দিক থেকেই এখন চলছে। অথবা, ভিতুর দল আপাতত ক্ষান্তি দেওয়া বা যতি টানার জন্য সম্মানজনক নিষ্ক্রমণ পথ খুঁজবে। আপাতত এই দ্বিতীয় পথটি তারা ধরলে সাধারণ মানুষ হাঁপ ছাড়বে বলে মনে হয়।
কিন্তু এ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি হবে না, এ হবে মুষ্টিযুদ্ধ বা কুস্তির একটি রাউন্ডের বিরতির মতো। যেকোনো সময় ঘণ্টা বাজবে, এই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়বে এবং আবারও রাজনীতির অস্থিরতা সংঘাতের দিকে গড়িয়ে রাজনীতিকে টেনে নেবে কানাগলিতে।
রাজনীতিকে কানাগলি থেকে বের করে রাজপথে ফিরিয়ে আনার পথ হতে পারে দুটি। রাজনীতির জগৎ থেকেই কোনো নেতৃত্ব—তা দুই জোটের যে কারও কাছ থেকেও হতে পারে, পারে এর বাইরে থেকেও আসতে—যদি জনমানুষের মনের কথাগুলো তুলে ধরে তার ভিত্তিতে রাজনৈতিক ভাষ্য ও কর্মসূচি দিতে পারে, তবে মানুষ তা শুনবে। দ্বিতীয় পথটিও খোলা আছে। নাগরিক সমাজ থেকেই জনগণকে জাগিয়ে তুলে রাজনৈতিক ভাষ্য ও কর্মসূচি হাজির করা যায়, যেমনটা ঘটেছিল ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে।
আমরা জানি, ক্ষমতার লড়াইয়ে সর্বস্ব বাজি ধরে দুই জোট এতটাই মগ্ন ও লিপ্ত যে লড়াইয়ের রিঙের বাইরের সম্ভাবনাগুলো নিয়ে নিরীক্ষা চালানোর সাহস পায় না তারা। বরং বিকল্প শক্তিকেন্দ্রের উত্থান গণ্য করে গণজাগরণ মঞ্চকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালিয়ে সেটিকে প্রায় অকেজো করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
লড়াই জারি থাকলে তা চলবে, পরিণামে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ বাড়বে, তাতে হানাহানিও চলতে থাকবে। আমরা বুঝতে পারি সংগঠন-কর্মীর জোরে তারতম্য থাকলেও দুই জোটের ভোটার ও সমর্থকের মধ্যে তেমন ফারাক নেই। তারা এতটাই কাছাকাছি যে কোনো নির্বাচনেই কেউই জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে না। ফলে উভয় জোটের মধ্যে নির্বাচনভীতি কাজ করে, এবং ক্ষমতায় থাকলে তারা তা ছাড়তে ভয় পায়, অগত্যা ছাড়তে হলে ছাড়ার আগে জয়ের জন্য ক্ষমতার অপপ্রয়োগের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। ফলে গত দুই যুগে অনেক নির্বাচন, বলা যায় সুষ্ঠুভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও, কোনো জোটকে দিয়েই পরাজয় স্বীকার করানো যায়নি। জয়ী দল তো জয় নিয়ে মাতোয়ারা হবেই, কিন্তু গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার সংস্কৃতি সচল রাখা। সেটা চালুই হয়নি আমাদের দেশে।
সোজাসাপ্টা বিচারে বলা যায়, বাংলাদেশের দুই বড় দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। এ দলই পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকে ধারণ ও লালন করেছে, এবং দেশকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। বিপরীতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও নৃশংস জেলহত্যার বিচার বন্ধ রাখা এবং খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কাজে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ভূমিকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ২৪টি খুন ও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা এবং তার বিচার–প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বের ভূমিকাও তর্কাতীত নয়। পাশাপাশি গণজাগরণ মঞ্চের মতো দেশপ্রেমিক গণজাগরণের স্বাভাবিক রাজনৈতিক সুফল তো বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের পাতে আসার সুযোগই বেশি থেকে যাবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, কেবল ক্ষমতার লড়াইয়ে দৃষ্টি ও শক্তি নিবদ্ধ থাকায় নেতৃত্ব এই সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহারে ব্যর্থ হচ্ছেন। কেবল ব্যর্থ হচ্ছেন তা নয়, তাঁরা প্রতিপক্ষের কৌশলগুলোকে নিজেরাই আত্মস্থ করে নিচ্ছেন, যেমন রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, র্যাব-পুলিশের অতিরিক্ত ব্যবহার, গোয়েন্দানির্ভরতা, সংগঠন ও কর্মীদের উপেক্ষা করে আমলানির্ভরতা ইত্যাদি।
এতে আখেরে তাঁদেরই ক্ষতি হয়েছে। মানুষ দুই দলের মধ্যে পার্থক্য তেমন দেখতে পায় না, দুই নেত্রীকে এক কাতারে রেখে বিচারে অভ্যস্ত হচ্ছে, এমনকি বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার মধ্যকার অসমতা-অসামঞ্জস্য বুঝেও ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছে না। সামাজিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈসাদৃশ্য অনেক স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ আওয়ামী লীগের পার্থক্য কেবল পরিমাণগত নয়, গুণগতই।
কিন্তু ঘুরেফিরে প্রশ্ন তো উঠবে দুটো—রাজনীতিকে কানাগলি থেকে রাজপথে আনার উপায় কী? এবং আনবে কে বা কারা? কানাগলির রাজনীতি ভাড়াটে খুনি-মাস্তান-বোমাবাজদের হাতেই থাকবে।
খালেদা জিয়া ও বিএনপির জন্য এ কাজ যে অসম্ভব, তা বলব না। তবে হ্যাঁ, তাদের জন্য কাজটা বেশ কঠিন, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয় ছাড়া এটা সম্ভব নয়। দলকে প্রায় নবায়ন, প্রায় খোলনলচে বদলানোর মতো মহাযজ্ঞ সারতে হবে তাঁকে। এ ছাড়া শর্টকাট কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না।
আওয়ামী লীগ সরকার কি তাদের ক্রমাগত পুলিশ-র্যাব-বিজিবি-আনসারনির্ভরতা বেড়ে চলার পরিণতিটা বুঝতে পারছে? কারণ, গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের পথ ওটা। মনের ভয় ঝেড়ে আমলা-এজেন্সিনির্ভরতা ক্রমে বাদ দিয়ে দলের সৎ, দক্ষ নেতা-কর্মী এবং দলবহির্ভূত সম–আদর্শের দক্ষ, সৎ মানুষের মৈত্রীর পথ ক্রমেই উন্মুক্ত করে ষাটের দশকের মতো গণজাগরণের পথ তৈরি করেই জাতীয় ঐক্যের পথ রচনা করতে হবে। তাতে আপনা-আপনিই দুর্বল হয়ে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনায় অবিশ্বাসী দল। তাতে কর্তৃত্ববাদী পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের অপবাদের কলঙ্ক গায়ে না মেখেই বহুকালের জন্য বিজয়ী হওয়া সম্ভব।
সরকারকে সময় থাকতেই বুঝতে হবে প্রকৃত বিজয়ের এটাই পথ। আর প্রকৃত বিজয় ঘটলে ৬০ বছর আগে এ দেশে যেভাবে মুসলিম লীগ নামের অপশক্তির ভরাডুবি ঘটেছিল, চিরতরে তার পুনরাবৃত্তি হওয়া অসম্ভব নয়। বরং সেটাই বেশি সম্ভাব্য পরিণতি বলে মনে হয়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

সহিংসতার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ-হরতালে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বীগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ওই উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেন, 'বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক একটি দেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাসে আগুন দিয়ে, বোমা মেরে ও ট্রেন লাইনচ্যুত করে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ জানাই।'
মেরি হার্ফ বলেন, 'শান্তিপূর্ণভাবে নিজের মত প্রকাশের অধিকার ও সামর্থ্য সব বাংলাদেশিরই থাকা উচিত। তাই শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।'
একই সঙ্গে বিবৃতিতে সহিংসতা বন্ধ করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিতে সব দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন ৫ জানুয়ারিকে 'গণতন্ত্রের বিজয় ও সংবিধান রক্ষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রাজধানীসহ দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে 'গণতন্ত্র হত্যা দিবস' পালনে যে কোনো মূল্যে ঢাকাসহ সারাদেশে সমাবেশ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। তবে ওই দিন সমাবেশ করতে না দেওয়ায় সারাদেশে টানা অবরোধের কর্মসূচির ঘোষণা দেন 'অবরুদ্ধ' বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
একইসঙ্গে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি সফল করতে দলের নেতাকর্মীসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অবরোধ চলাকালীন অবস্থায় মাঝে মাঝে হরতালও ডাকা হয় জোটের পক্ষ থেকে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ জনে। এদের মধ্যে ৩৯ জনের মৃত্যু পেট্রোল বোমা ও ককটেলের আগুনে। বাকিরা মারা গেছেন সংঘর্ষে।
এদিকে দু'দফা পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে কড়া নিরাপত্তায় আজ শুক্রবার দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হরতালের কারণে চার দিন পিছিয়ে আজ শুরু হয়েছে এ পরীক্ষা।

চাই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি by মো. শহীদুল আলম

১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার পরাধীনতা, যা ১০০ বছর ধরে নির্বিঘ্নে চলমান, শক্তিশালী এবং অনেকটা বাধাহীন। যার বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশ বেনিয়াদের কাছে ছিল অবজ্ঞার। হোক অবজ্ঞা তবুও বিদ্রোহ, যা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম ধাক্কা হৃদকম্পন। দার্শনিক কার্ল মার্কস বলেছিলেন, সিপাহি বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। এরপর সমাজ চলেছে, ভেতরে ভেতরে জমেছে বিদ্রোহ। হয়েছে আন্দোলন, হয়েছে দমন। উলেল্গখযোগ্য সূর্য সেন ও প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীদের দেশাত্মবোধ ও আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। এরপর এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তথাকথিত দেশ বিভাগ এবং মহান স্বাধীনতা। পাশাপাশি অযৌক্তিক জাতিভেদ, ধর্মভেদ ও জাতিগত সংঘাত সৃষ্টির অন্যায় সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৭৫৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনা, ইতিহাস, আন্দোলন ও আত্মাহুতির কোনোটিরই পুনঃ পুনঃ স্মরণ, পালন কিংবা প্রতিপালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। নেতৃত্ব ও গণমানুষ কেউই বড় ব্যর্থতা ও অর্জনকে স্মরণীয় কিংবা বরণীয় করে রাখার ক্ষেত্রে অবিরত কিংবা নিত্য প্রতিপালনীয় করতে পারেননি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ত্যাগের মহিমা দ্যুতি ছড়িয়েছে প্রতিবছর, প্রতিমাস, প্রতিদিন। ত্যাগের মহিমা হিলেল্গাল তুলেছে প্রতিটি পরাধীন নর-নারীর হৃদয়ে ও অঙ্গে। পরাধীন বাংলার মানুষের স্মৃতির মিনার গড়ে উঠেছিল খুবই অল্প সময়ের মধ্যে, যা আগে কোনো আন্দোলনে দেখা যায়নি।
ঐতিহাসিক এ আন্দোলন ঘনীভূত হয়েছে ১৯৬৯ সালে ছাত্র আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত। শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ ১৯৬৯-এর অভ্যুত্থানকে দিয়েছে গুণগত পরিবর্তন। অতঃপর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু এবং বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ১৯৫২-এর অর্জনই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। আজ অবধি ভাষার জন্য লড়াই এবং সে লড়াইকে ঘিরে শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা, বইমেলা, বই ছাপানো, বই বিক্রি, কথামালা রচনা এবং বক্তৃতা আকারে প্রচার ও প্রকাশ চলেছে অবিরাম। অনেক আয়োজনের মধ্যেও বইমেলার অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে সৃষ্টিশীল এবং একুশ উদযাপনের সমন্বয়ক। শুধু তাই নয়, একুশকে ঘিরে সেই রচিত হয়েছিল যে গান, কবিতা ও নাটক আজও তা থামেনি। ভাষাশহীদ রফিক, শফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার যেমন অমর, তেমনি মানুষের মন থেকে মুছে যায় না শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, আবদুল লতিফ, স্থপতি হামিদুর রহমান, গীতিকার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এবং নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর মতো বরেণ্য মানুষরা। আজ অবধি বাংলা ভাষার বিকাশে ও প্রকাশে খরস্রোত না এলেও এমনকি বাংলার উচ্চারণ প্রতিরূপ, শুদ্ধতা এবং সম্পূর্ণতা না পেলেও মহান একুশের যাত্রা থামেনি। খরস্রোতা নদীর মতো মহান একুশে বয়ে চলেছে আমাদের কথা, আমাদের গান, নাটক, নৃত্য ও কবিতা নিয়ে। শহীদ দিবস বয়ে চলেছে ফুলের শ্রদ্ধা, বিশেষ পোশাক, পাঞ্জাবি-চপ্পল এবং বঙ্গ নারীর লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে মিশে।
'একুশ মানে মাথা নত না করা
একুশ মানে_ হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিল করা।
একুশ মানেই শ্রদ্ধাঞ্জলি, পুষ্পে পুষ্পে মিনার ভরা।' যা সৃষ্টিশীল ও শোভন তাই সংস্কৃতি। আর যা অনুসরণীয় তাই শিক্ষা। সৃষ্টিশীল নয়, পালনীয় নয়, অনুসরণযোগ্য নয় এমন কোনো কিছুই সংস্কৃতি হতে পারে না। মহান ভাষা আন্দোলনের অর্জন অনবদ্য, অবিরাম, অজর-অমর-অক্ষয়। এর মধ্য দিয়ে সৃষ্ট, শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারা বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের একান্ত আপনার সংস্কৃতি। যার মধ্যে পরিস্ফুট দেশজ কালচারের সুসমন্বয় এবং অপরূপ ব্যঞ্জন্যময় সামগ্রিকতা বিশ্ববাসীর কাছে যা একাধারে ঈর্ষণীয় ও অন্যধারে শ্রদ্ধাস্পদ, সম্মানীয়, মোহনীয়।
একুশ আসে বসন্তে, ঝিরঝিরে হাওয়ায় ডানা মেলে। তাই প্রকৃতি সাজে বাসন্তীর সাজে। বদলে যায় রঙ-পাতা। শহীদ সালাম-বরকতের রক্তে লাল হয় ভোরের সূর্য। শহীদ রফিক-শফিকের রক্তেই যেন টকটকে লাল হয় বসন্তে ফোটা শিমুল-কৃষ্ণচূড়া। বরকতের রক্তে লাল হয়ে যায় ময়না, টিয়া, বৌ কথা কও সুরের হলুদ পাখির ঠেঁৗট। ১৮৫৮ সালের শহীদ মঙ্গলপাণ্ডে, অগি্নযুগের সূর্য সেন, প্রীতিলতা, প্রফুল্ল চাকী আর ক্ষুদিরামের রক্তের রঙ নিয়ে আজও ফোটে লাল গোলাপ, লাজ-রক্তিম অবগুণ্ঠিত বধূর কপালেও শোভা পায় লাল বৃত্ত। আবালবৃদ্ধ সবার মন হয় একাধারে সিক্ত, অন্যধারে রঙিন। লাখো শহীদের রক্তে লাল হয়ে আকাশে উড়ছে জাতীয় পতাকা।
সব অসত্য, অসৌজন্য, অপকর্ম, অসভ্যতা ও অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে মহান একুশের চেতনা সোচ্চার। অজ্ঞতা, অনাচার, অসুরবৃত্তি, দলন ইচ্ছা এবং সব অসুন্দর অস্তমিত হয়ে উদিত হোক সভ্যতার আবির রঙা সূর্য। ঘটুক আমাদের মোহ মুক্তি, বাড়ুক ন্যায্যতা। গড়ে উঠুক জাতিগত ঐক্য, যা আমাদের মনোজগতের উন্নতিকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির মোহনায় নিয়ে যাবে।
জেলা প্রশাসক, বরিশাল

আদালত কি এই হরতালকেই বৈধতা দিয়েছিলেন? by আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

জীবনটা ফের হরতালময় হয়ে উঠেছে। ২০১৫-এর যাত্রাই হরতাল দিয়ে। এর পর প্রায় প্রতি দিনই হরতাল বা অবরোধ_ কখনও দেশব্যাপী, কখনও আঞ্চলিকভাবে। এক সময় হরতাল ছিল আন্দোলন বা দাবি আদায়ের শেষ অস্ত্র। আর এখন 'ডেইলি সোপ'_ চুন থেকে পান খসলেই হরতাল। ২০১৩ সালেই ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১৫ দিন হরতালে কেটেছে। তার কোনোটা দেশব্যাপী, কোনোটা নির্দিষ্ট অঞ্চলজুড়ে (সূত্র :'অধিকার')। ২০০৫ সালে পরিচালিত ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত এই ৫৫ বছরে বাংলাদেশে সর্বমোট ১,১৭২ দিন হরতাল হয়েছে। তন্মধ্যে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরবর্তী ১১ বছরেই (১৯৯১-২০০২) হরতাল হয়েছে ৮২৭ দিন। সেখানে ১৯৯১-১৯৯৪ সালে ২১৬ দিন, ১৯৯৫-১৯৯৮ সালে ২৭৯ দিন এবং ১৯৯৯-২০০২ সালে ৩৩২ দিন। অথচ হরতাল-অবরোধে দৈনিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা, যা দৈনিক জিডিপির ৬১ দশমিক ৫৪ শতাংশ (সমকাল, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৫)। সঙ্গে জ্বালাও-পোড়াও, আহত-নিহতসহ ১৬ কোটি মানুষের অন্তহীন ক্ষয়ক্ষতি আর ভোগান্তি তো আছেই। তারপরও দুর্বার গতিতে 'হরতাল-গাড়ি' চলছেই।
এটা ঠিক, আমাদের উচ্চ আদালতের চোখে হরতাল 'গণতান্ত্রিক অধিকার'। তবে কি হরতালের নামে চলমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও মানুষ হত্যাও অধিকার? ঘটনা কিন্তু ভিন্ন।
১৯৯৯ সাল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির হরতাল, ঘেরাও আর অবরোধে দেশ তখন কার্যত অচল। পত্রিকায় হররোজ সহিংসতার ছবি ও সংবাদ। এরূপ কিছু সংবাদকে আমলে নিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি মো. লতিফুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) রুল জারি করেন। রুলে হরতালের পক্ষে-বিপক্ষের কার্যক্রমকে আমলযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফৌজদারি আদালত ও পুলিশকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না_ জানতে চাওয়া হয়। রুলে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জিল্লুুর রহমান ও বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে বিবাদী করা হয়।
কাজ হলো না রুলে। ১৮ এপ্রিল ফের হরতাল ডাকল বিএনপি। ওই হরতালকে 'বেআইনি' ও 'অসাংবিধানিক' ঘোষণার দাবি নিয়ে খন্দকার মোদারেস ইলাহী নামে এক আইনজীবী তখন হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটে আদালত পৃথক রুল দেন। আর রায় হয় ২৫ অক্টোবর, ২০০০ তারিখে। খন্দকার মোদারেস ইলাহী বনাম বাংলাদেশ [২১ বিএলডি (হাইকোর্ট বিভাগ) ২০০১, পাতা-৩৫২] নামে পরিচিত ওই মামলার রায়ে হরতালের বৈধতা প্রসঙ্গে বিচারপতি মাইনুুর রেজা চৌধুরী বলেন, কেবল হরতাল ডাকাটা অবৈধ নয়। তবে তা হবে হুমকি-ধমকি বা ভয়-ভীতিমুক্ত। কিন্তু হরতালটা যদি জোরপূর্বক কার্যকরের চেষ্টা হয় বা পালনে বাধ্য করা হয়, তাহলে ওই হরতাল ডাকাটা হবে অবৈধ। একই সঙ্গে জনগণের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ (প্যারা-১৬)।
হরতাল ডাকার পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হয়, একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সর্বসাধারণকে বা একটি নির্দিষ্ট দল বা শ্রেণীকে উদাত্তভাবে আহ্বান বা দাওয়াত দিয়ে হরতালের ডাক দিতে পারে। সংবিধান এক্ষেত্রে কাউকে সহিংসতা বা অপরাধ সংঘটনে উস্কানি বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেয়নি (প্যারা-২৬)।
হরতাল পালনের ধরন সম্পর্কে ওই রায়ে বলা হয়, হরতাল ডাকাটাই কেবল গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু তার পালন হবে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ। তাতে কোনো বেআইনি কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে হরতালবিরোধীরাও এক্ষেত্রে কোনোরূপ উস্কানি, প্ররোচনা, হামলা বা আগ্রাসন চালাবে না। হরতালকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালনের সুযোগ দিতে হবে (প্যারা-৩০)।
হরতাল মতপ্রকাশের একটা মাধ্যম। যার সাংবিধানিক ভিত সংবিধানের ৩৯(২)(ক)। হরতালের সঙ্গে এই অনুচ্ছেদের সীমারেখা টেনে রায়ে বলা হয়, এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। তবে তার উপভোগ আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে। তা ছাড়া বল প্রয়োগ বা হুমকি-ধমকি দিয়ে কাউকে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে বিরত রাখা প্রচলিত ফৌজদারি আইনে অপরাধজনক কাজ (প্যারা-৪৯)।
এবার সুয়োমোটো রুল পর্বে ফেরা যাক। হরতাল বিষয়ে প্রচলিত ধারণার মূল ভিত কিন্তু এই মামলার রায়। ১৯৯৯ সালের ১৩ মে হাইকোর্ট ওই রায় দেন। রায়ে আদালত হরতালকারী ও হরতালবিরোধীদের অপতৎপরতাকে 'আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ' ঘোষণা করেন। আদালতের যুক্তি ছিল, হরতালকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে বিচিত্র সহিংস কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাতে জনগণের সাধারণ নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবন প্রচণ্ডভাবে বিঘি্নত হয়। তাই ওই সব কাজকে অপরাধ গণ্য করে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। রায়ে আদালত ওই সব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে ওই দিনই বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া আপিল করেন। পরে আরেকটি আপিলও করা হয়। প্রায় আট বছর পর শুনানি শেষে ২৭ নভেম্বর ২০০৭ সালে আপিল বিভাগ ওই দুই আপিল বিষয়ে রায় দেন। রায়ে প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়টি বাতিল করেন। এবার আদালতের যুক্তি, জোর করে কাউকে হরতাল পালনে বাধ্য করা বা হরতালে বাধা সৃষ্টি করা, ভাংচুর করা, মারামারি করা ইত্যাদি প্রচলিত আইনেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য রয়েছে। দণ্ডবিধিসহ অন্যান্য আইনে ওইসব অপরাধের শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তাই এরূপ কাজকে নতুনভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নতুনভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দানের প্রয়োজন নেই। ২৮ বিএলডি (আপিল বিভাগ) ২০০৮, পাতা ৫৪-৬০-এ রায়টি সনি্নবেশিত আছে। হরতালের বৈধতা বিষয়ে আপিল বিভাগের ওই রায়ের ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়_ 'বল প্রয়োগে পালিত যে হরতাল সহিংসতা ছড়ায়, মৃত্যু ঘটায় এবং নাগরিকের জানমালের ক্ষতিসাধন করে, সে হরতাল কেবল অবৈধই নয়, তা ঘৃণিত এবং প্রচলিত আইনে দণ্ডযোগ্য। ৪৫ অনুচ্ছেদে বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট_ বল প্রয়োগ বা বল প্রয়োগের ভয় কিংবা সহিংসতা বা সহিংসতার ভয় দেখিয়ে কার্যকর হরতাল কেবল অবৈধ নয়, দণ্ডবিধিসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য ফৌজদারি আইনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এক্ষেত্রে জনগণের সুরক্ষায় ওই অপরাধীদের_ তা সে যে দলেরই হোক না কেন, শাস্তি দিতে সরকার বাধ্য।
এই রায়ও হরতালকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বটে। কিন্তু সেটা বেশ কিছু পূর্বশর্ত পূরণসাপেক্ষে। যেমন হরতালে যোগ দিতে কাউকে কোনোরূপ জোর-জবরদস্তি বা বাধ্য করা যাবে না। হরতাল পালনে কাউকে ভয় দেখানো বা কোথাও ত্রাস সৃষ্টি করা যাবে না। হরতাল হবে অহিংস। এ কাজে শুধু উদ্বুদ্ধ বা প্রলুব্ধকরণ (persuasion) চলবে। বুঝিয়ে-সুজিয়ে যাদের নেওয়া যাবে, কেবল তাদের নিয়েই চুকাতে হবে হরতালের পাট। (But Hartal or strike per se enforced through persuasion unaccompanied by threat, intimidation, force or violence is a democratically recognized right of citizens guaranteed under the constitution, para-35)| । দেখুন কেবল persuasion প্রসূত হরতালকেই আদালত 'গণতান্ত্রিক অধিকার'-এর সনদ দিচ্ছে।
আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে চলাফেরার স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, যোগাযোগের স্বাধীনতাসহ ১৮টি মৌলিক অধিকারের (শিরোনাম হিসেবে) কথা বলা আছে। তার মধ্যে এক হরতালের অধিকার চর্চায় জনজীবন যেভাবে পঙ্গু হয় তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় সব মৌলিক অধিকারই কমবেশি লঙ্ঘিত হয়। এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীবিশেষের মৌলিক অধিকারের দাবির কাছে সর্বসাধারণের মৌলিক অধিকার নতজানু হতে পারে না [এআইআর ১৯৯৮, সুপ্রিম কোর্ট ১৮৪]।
অন্যদিকে সংবিধানে বর্ণিত সমাবেশের স্বাধীনতা (অনু :৩৭) এবং সংগঠনের স্বাধীনতাও (অনু : ৩৮) নিয়ন্ত্রিত ও সীমাবদ্ধ প্রকৃতির অধিকার, যার আইনানুগ উপভোগের সঙ্গে হরতালের অনাচার কোনোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার, চলমান সহিংস ও আরোপিত হরতালকে আমাদের সর্বোচ্চ আদালত বৈধতা দেননি। বৈধতার এ মুকুট কেবল 'অহিংস, শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্টম্ফূর্ত হরতালে'র জন্য প্রযোজ্য। প্রয়োজনে 'হরতাল ডাকা'কে আদালত অধিকার বলেছেন বটে; অধিকারটা এখানে 'ডাকা' পর্যন্ত। কিন্তু ওই অধিকার উপভোগে সহিংসতা বা আইন-অনুমোদিত কোনো কিছুর প্রবেশ মাত্রই তা অধিকারের পরিবর্তে 'শাস্তিযোগ্য অপরাধ'-এর মুকুট পরবে। অতএব, গণতান্ত্রিক অধিকারের মুখোশে যে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যময় হরতাল পালনের সংস্কৃতি এ দেশে বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে চলছে, তা সংবিধান বা উচ্চ আদালতের রায়ের সঙ্গে কোনোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
আইনমন্ত্রী সম্প্র্রতি হরতাল বন্ধে 'জনগণ চাইলে আলাদা আইন' প্রণয়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্ত কি আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? কারণ আপিল বিভাগ তার রায়ে প্রচলিত আইনেই 'হরতালের সহিংসতা রোধ' সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন।
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
aftabragib@yahoo.com

অভয় দিলে বলতে পারি- কতো সহিব নিত্য by মাকিদ হায়দার

মহাত্মা গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালে, ভারতে। তিনি তার কর্মক্ষেত্র শুরু করেছিলেন কালো মানুষের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায়। পেশায় ছিলেন ব্যারিস্টার। দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই সময় ছিল ব্রিটিশদের শাসন, শোষণ এবং অমানবিক অত্যাচার। সেই একই অত্যাচারের শাসন-শোষণ ছিল তারই জন্মভূমি ভারতে। ইংরেজ শাসনের প্রতি বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল তার জন্মের ১২ বছর আগে; ১৮৫৭ সালে। সিপাহি বিদ্রোহের নায়কদের ইংরেজরা কাউকে কাউকে দিয়েছিল ফাঁসি এবং দ্বীপান্তর আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে। এমনকি দিলি্লর বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরকে নির্বাসিত করেছিল ব্রহ্মদেশ বা বার্মাতে। সবকিছুই ঘটেছিল করমচাঁদ গান্ধীর জন্মের এক যুগ আগে।
করমচাঁদ গান্ধীর জন্মের ৭ বছর পর বোম্বে শহরে জন্মেছিলেন মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর। পরবর্তী সময়ে দু'জনই হয়েছিলেন ব্যারিস্টার। করমচাঁদ তার আইন ব্যবসা শুরুর আগে স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলেন ব্রিটিশ শাসিত আফ্রিকান জনগণের ওপর ব্রিটিশদের অকথ্য নির্যাতন। অন্যদিকে ভারতবর্ষেও শুরু হয়েছিল এদেশীয় জমিদারদের সাহায্য-সহযোগিতায় নির্যাতন এবং ইংরেজদের পদলেহনকারী এক দল অভিজাত, সুবিধাবাদী ধনিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় লর্ড কর্নওয়ালিস এ দেশে সূত্রপাত করেছিলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের।
কোনো শাসন ব্যবস্থা যে চিরস্থায়ী নয়_ ইংরেজ শাসকরা হয়তো সেটি জেনেও না জানার ভান করেছিল। কেননা তাদের শাসন ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করার পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল, তারা সবাই ছিলেন এ দেশেরই রাজা-মহারাজা, জমিদার, মুৎসুদ্দি শ্রেণীর মানুষ। সেই রাজা-মহারাজা এবং জমিদার শ্রেণীভুক্তদের ভেতরে ছিলেন যশোর নিবাসী দ্বারকানাথ ঠাকুর। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রভূত অর্থের মালিক হওয়ার সুবাদে শাসক ইংরেজদের সাহচর্য পেতে, এমনকি সুনজরে আসতে দ্বারকানাথের বেশি সময় ব্যয় করতে হয়নি। শাসক শ্রেণীর সঙ্গে হৃদ্য যখন তুঙ্গে, তখন দ্বারকানাথকে ইংরেজ শাসকরা সম্মানিত করেছিলেন 'প্রিন্স' উপাধি দিয়ে। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ, বিংশ শতাব্দীতে ইংরেজরা তাদের শাসন ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করার মানসে স্থানীয় সামন্ত প্রভুদের সম্মানিত করেছিল রায়বাহাদুর, রায়সাহেব, খানবাহাদুর, খানসাহেব উপাধি দিয়ে। ওই উপাধিপ্রাপ্তরা স্বদেশ উদ্ধারের চেষ্টা না করে করেছিলেন বিদেশি প্রভুদের গুণকীর্তন এবং সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চালিয়ে যেতেন অত্যাচার, নিপীড়ন। বিশেষত কৃষক শ্রেণীই ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু। বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে রাজা-মহারাজা, জমিদার শ্রেণীর বেতনভুকরা শুধু জমিদার বা সামন্তশ্রেণীর লোকদেরই উপকার করেনি; কৃষকের খাজনার টাকা দিয়ে যেমন কলকাতার প্রাণকেন্দ্র, আশপাশে যেসব এলিট শ্রেণীর বসবাস ছিল, তাদেরই পাশাপাশি কিংবা খালি জায়গায় পূর্ববঙ্গের কৃষকদের শোষিত অর্থে নির্মাণ করে দিয়েছিল দোতলা, তিনতলা বাড়ি, পুকুর, বাগান। এবং কলকাতার উপকণ্ঠেই সেই সময়ে অনেক জমিদারের ছিল নিজস্ব বাগানবাড়ি। নাচঘর।
সেই দোতলা, তিনতলা বাড়ি নির্মাণের সময়ই নায়েব, তালুকদার, মুৎসুদ্দিরাও গোপনে বানিয়ে নিয়েছিল তাদের বাসস্থান। পূর্ববঙ্গের শ্রমলব্ধ কৃষকের টাকায় কলকাতার ভবানীপুর কিংবা জোড়াসাঁকোতে যেসব পুরনো বাড়িঘর এখনও দুই-একটি দাঁড়িয়ে আছে, সেই বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় তা ভগ্নদশায় জীর্ণশীর্ণ। এই জীর্ণশীর্ণ ভগ্নদশার বাড়িগুলোর একাধিক শরিক, ভাগীদার, যার ফলে ভবনগুলোর ওই মরণদশা। সেদিক থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, জমিদার বাড়িটি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একান্ত প্রচেষ্টায়। ভবনটির পেছনের অংশের কিছু জায়গা, পুকুর নাকি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে ঠাকুর পরিবারের কারও কারও বিক্রি করার পাঁয়তারার খবরটি যখন প্রচারিত হয়েছিল, তখনই পশ্চিমবঙ্গ সরকার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে ভবনটি রক্ষা পেয়েছিল ডেভেলপারদের হাত থেকে। কিন্তু ঠাকুর পরিবারের আরও একটি বাড়ি নিউমার্কেটের কাছে সদর স্ট্রিটে, সেটি বেহাত হয়ে গেছে অনেক আগে। সে ভবনটিতে বসে কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা 'আজি এ প্রভাতে রবির কর...'।
সেই রবির কর মাথায় নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন পেশার সঙ্গে সঙ্গে করমচাঁদ ভেবেছিলেন তার স্বদেশের মুক্তির কথা। ইংরেজ শাসনের পরাজয়। অন্যদিকে বোম্বে নিবাসী মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ হয়তো ভাবেননি স্বদেশের মুক্তির কথা। যেহেতু জিন্নাহ ছিলেন মনেপ্রাণে ইংরেজ কালচারের একজন নবীন ব্যারিস্টার। কথাবার্তা, চলনে-বলনে কেউ জানতেই পারেননি এই জিন্নাহ নামক লোকটির অঙ্গুলি হেলনে এবং করমচাঁদের শত চেষ্টাতেও ভারতবর্ষ যেন দ্বিখণ্ডিত না হয়, কিন্তু অঙ্গুলি যিনি হেলালেন, তারই অদূরদর্শিতার কারণে হিন্দু-মুসলিমদের হাজার বছরের ঐক্যে ছেদ পড়ল ১৯৪০-এর পর থেকে। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ; অন্যদিকে, ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার তাগিদ_ সবকিছু মিলিয়ে ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করতে গিয়ে বিহার, পাঞ্জাব, নোয়াখালী, জব্বলপুর, আহমেদাবাদসহ বিভিন্ন জায়গায় নিরীহ মানুষ নিহত হলো দুই সম্প্রদায়ের। এত হাঙ্গামা, খুন হওয়ার পরও মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ হয়ে গেলেন পাকিস্তান নামক দেশটির জাতির পিতা। অন্যদিকে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হলেন ভারতীয়দের জাতির জনক। সেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী একদিন বলেছিলেন, 'চোখের বদলে চোখ_ এমন নীতি পুরো জগৎটাকে অন্ধকার করে দেবে।'
করমচাঁদের সেই বাণীরই প্রতিফলন ঘটেছিল তারই জন্মভূমি ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ অবধি 'চোখের বদলে চোখ' নীতিটি পুরো জগৎটিকে তো বটেই মানবজাতির ভেতরে যে বিভাজনের সৃষ্টি, সেটি আরও প্রত্যক্ষ করেছিল সমগ্র পৃথিবীর মানবজাতি। ধ্বংস, হত্যা, গুম, দেশ দখল, কমিউনিজমের যাত্রা শুরু। ইউরোপের অনেক দেশকে বাঁধা হয়েছিল কমিউনিজমের শিকলে। উদ্যোগটা প্রথমেই নিয়েছিলেন তৎকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক সেই অ্যাডল্ফ হিটলার এবং তার সাঙ্গাতদের পরাজিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল নিয়েছিল জার্মানির অর্ধেক, ইতালি, হাঙ্গেরি। অপরদিকে বিজয়ী আমেরিকা দখলে নিয়েছিল জাপান ও কোরিয়া। যেহেতু ব্রিটিশদের অধীনে আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ বিশেষত দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ফরাসিদের কলোনি আফ্রিকা মহাদেশেরই আলজেরিয়াসহ অনেক দেশেই বিস্তার করেছিল তাদের সাম্রাজ্য। সেদিক থেকে অষ্টাদশ, ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতেই ব্রিটিশদের দখলকৃত দেশ শুধু ভারতবর্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই তারা উড়িয়েছিল ব্রিটিশদের জাতীয় পতাকা। গত শতকের শেষদিকে সর্বশেষ পতাকাটি নামাতে হয়েছিল হংকং থেকে, যা ১০০ বছরের জন্য ব্রিটিশরা লিজ নিয়েছিল চীনের কাছ থেকে। অথচ ভারতবর্ষকে কেউ লিজ না দিলেও কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ব্রিটিশ বণিক এবং এদেশীয় সুবিধাবাদী জমিদার, মুৎসুদ্দি, রাজা-মহারাজাদের কূটচালে বাংলাকে চলে যেতে হয়েছিল ব্রিটিশদের পদতলে, যেখানে বণিকের মানদণ্ড দেখা দিয়েছিল রাজদণ্ডরূপে।
সেই রাজদণ্ডকে উচ্ছেদের প্রত্যক্ষ সূচনা সম্ভবত ১৮৫৭ সালে এবং সর্বশেষ উচ্ছেদ সম্ভব হলো ১৯৪৭ সালে। ১৭৫৭ সালে যেদিনটিতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজ্যহারা হলেন তারই নিকটাত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায়, সেদিনটি ছিল বুধবার, ২৩ জুন। কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ইংরেজদের হটাতে এ দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে যেতে হয়েছে জেলে, দ্বীপান্তরে এবং ঝুলতে হয়েছে ফাঁসিকাষ্ঠে। ১৯০ বছর পর ভারতবর্ষকে দুই ভাগ করলেও অসম্পূর্ণ করে রেখেছিল পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক ছিটমহল। ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের অনেক অঞ্চলসহ কাশ্মীর নামক দেশটিকে ভাগ সম্পূর্ণ না করেই ব্রিটিশরা পাড়ি জমাল তাদের পৈতৃক দেশে, ভিটেমাটির সন্ধানে। সেই ভিটেমাটির সন্ধানে যাওয়ার আগে হিন্দু-মুসলমানদের ভেতরে যে সংঘাতের সৃষ্টি করে দিয়ে গেল, সেই সংঘাতের ক্ষত বিগত ৬৭ বছরেও প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষ্যই প্রতীয়মান নয়।
তবে সংঘাত ও দেশভাগের এমনি করুণ চিত্র আমরা দেখতে পাই 'ট্রেন টু পাকিস্তান' নামক গ্রন্থে। গ্রন্থটির লেখক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক খুশবন্ত সিং (জন্ম ১৯১৫, মৃত্যু ২০১৪)। ট্রেন টু পাকিস্তান গ্রন্থে মোট ৪টি গল্প আছে_ ১. ভাগাতি; ২. কলিযুগ; ৩. মানো মাজরা; ৪. কর্ম। সহৃদয় পাঠকরা যখন বইটি পড়বেন, তখন যেন স্পষ্ট দেখতে পাবেন পাকিস্তান-ভারতের ভাগাভাগি, খুন, ধর্ষণ, রক্তাক্ত প্রান্তর। সেখানে দেশান্তরী হওয়ার এক করুণ বিবরণ দিয়েছেন খুশবন্ত সিং। যেহেতু তার স্বদেশ পাঞ্জাবের পশ্চিম প্রান্তে। তাদের একদিন সবকিছু ফেলে রেখে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হলো পূর্ব পাঞ্জাবে, ভারতে। অনুরূপভাবে বোম্বে থেকে একদিন চলে যেতে হলো জিন্নাহ পরিবারকে পাকিস্তানে এবং পূর্ব বাংলার শান্তিপ্রিয় হিন্দু সম্প্রদায় এবং ভারতের বিহার, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা থেকে যারা এ দেশে উদ্বাস্তু হয়ে এলেন, তারা শান্তিপ্রিয় থাকতে পারলেন না বিহারের বিহারিদের যন্ত্রণায়।
ট্রেন টু পাকিস্তান একটি অসাধারণ দলিল, যে দলিলে দেশ ভাগ, যে দলিলে গন্ধক, নাইট্রিক এসিড ও রক্তের সংমিশ্রণে যেন একটি কামানের তপ্তগোলা, যেটি মি. সিং ১৯৪৭ সালে প্রত্যক্ষ করেছিলেন ভারতের উত্তর-পশ্চিমের নারকীয় বিভীষিকা; সেই বিভীষিকার প্রচণ্ড ঝড় বইয়ে দিয়ে গেছেন জনগণের জীবনের ওপর দিয়ে করমচাঁদ গান্ধী ও মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ। মাঝখানে ছিল শ্বেত বর্ণের একদল মানুষরূপী জানোয়ার। এবং ১৯৪৮ সালে সেই গান্ধীর প্রাণসংহার করেছিল নাথুরাম গডসে নামক এক তরুণ। নাথুরাম হয়তোবা রক্তারক্তি, ভাগাভাগি চায়নি। আমার মনে হয়, যে হত্যাকাণ্ডটি সে গান্ধীর ওপর দিয়ে চালিয়েছিল, সেটি হয়তো হতে পারত মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর ওপরও। জিন্নাহ ভাগ্যবান; যক্ষ্মা রোগে ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরপারে। নয়তো তাকেও একদিন গান্ধীর ভাগ্য বরণ করতে হতো বলে আমার বিশ্বাস। যেহেতু দু'জনের অপরাধই ক্ষমার অযোগ্য। বিশেষত, জিন্নাহর 'চোখের বদলে চোখ'_ এ নীতির শুরুতেই ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলি খান নিহত হয়েছিলেন অক্টোবরের ১৬ তারিখে। ত্রিপুরা, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এমনকি আসাম_ সবারই যুক্ত হওয়ার কথা ছিল পূর্ববঙ্গে; হতে দেননি ঢাকার নবাব এবং লিয়াকত আলি খান। তিনিও একদিন গুলিতে নিহত হলেন, হয়তোবা নাথুরাম গডসের মতো কোনো তরুণের ক্ষোভে।
গান্ধীর জন্মের ৭ বছর পর যেমন জন্মেছিলেন জিন্নাহ সাহেব, সেই জিন্নাহর জন্মের ৪৪ বছর পর শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালে, ফরিদপুর জেলায়। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৭ মার্চে। কৈশোরকাল থেকেই তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী যারা পাঠ করেছেন তারা নিশ্চয় জেনেছেন শেখ মুজিবের আত্মপ্রত্যয়ের কথা। তিনি শত বাধা শত ঝড়ঝঞ্ঝা পাড়ি দিয়ে একাকী দেশকে স্বাধীনতা এনে দিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই বাঙালি জাতির পিতাকে একদিন সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে এলো সামরিক শাসন। ১৯৭৫-এর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলেন একজন মেজর জেনারেল, নাম জিয়াউর রহমান। জন্ম বগুড়ার গাবতলীতে ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি।
জেনারেল জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্ম সম্ভবত ষাটের দশকের শেষদিকে, যিনি জাতির পিতার চেয়ে কমপক্ষে ৪৫-৪৮ বছর পরে জন্মেছিলেন সম্ভবত পাকিস্তানের করাচি শহরে। সেই তারেক রহমান ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর বাস্তুচ্যুত হয়ে পাড়ি জমালেন লন্ডন শহরে। তার নৈতিক স্খলনের দায়ে। অথচ গান্ধী কিংবা জিন্নাহ, তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন দেশ বিভাগের মাধ্যমে। আমাদের জাতির জনক বাস্তুচ্যুত হননি, বরং তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফিরে এসেছিলেন পাকিস্তানিদের কারাগার থেকে। অন্য অর্থে বলা যায়, তারেক রহমান স্বদেশ ছেড়ে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন অন্য কারাগারে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের এই তরুণ নেতা যদি গান্ধী কিংবা জিন্নাহর মতো ব্যারিস্টার হতেন, লেখাপড়া জানতেন এবং রাজনীতিতে পরিপকস্ফ হতেন, তাহলে অর্বাচীন বালকের মতো কখনোই, কোনোদিনই বলতে পারতেন না 'পাকবন্ধু শেখ মুজিব'। এবং অর্বাচীন কোনোদিন বলতে পারতেন না 'রাজাকার শেখ মুজিব'। ধৃষ্টতার একটি সীমা থাকে! সেই সীমাকে যারা লঙ্ঘন করেন, স্বয়ং আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না।
জিয়াউর রহমান তার জীবিত অবস্থায় জাতির জনক শেখ মুজিবকে নিয়ে কোনো কটূক্তি করেননি। জিয়া জানতেন শ্রদ্ধেয়দের শ্রদ্ধা করতে হয়, অথচ তদীয় পুত্র যে কথা বলছেন সেটি মূর্খ এবং অশিক্ষিতদের মুখেই শোভা পায়। যেহেতু তিনি অশিক্ষিত, তাই কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, রোমান দার্শনিক গিসেরো (খ্রিস্টপূর্ব ১০৬-৪৩) বলেছেন, যে ঘরে বিদ্যা (বই) নেই, সে ঘর আত্মাহীন দেহের মতো। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের 'পুরাতন ভৃত্য' কবিতার একটি চরণের সামান্য উদৃব্দতি_ কতো সহিব নিত্য। বাংলা প্রবাদে আছে_ গাছ বেশি বাড় বেড়ো না ঝড়ে ভাংবে, বেশি ছোট হয়ো না ছাগলে মুড়বে।
কবি

খুনি ও গণবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম-ঠিকানা লিখে রাখুন: ২০ দল

খুনি, নির্যাতনকারী ও গণবিরোধী ভূমিকা পালনকারী আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ও পরিচয় লিখে রাখতে বিরোধী নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ২০ দল। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা ২০ দলের নেতা-কর্মী ও জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছিÑ কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রতিটি এলাকা পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কার্যকলাপ সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখুন। খুনী, নির্যাতনকারী ও গণবিরোধী ভূমিকা পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপকর্ম ও নাম-পরিচয় আপনারা তালিকাভূক্ত করে রাখবেন। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমান সংগ্রহ করে রাখবেন। আগামীতে এদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের এ আহ্বানের পরেও আর যদি একটি বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটে, অন্যায়ভাবে জুলুম-নির্যাতন, গুম-অপহরণ বন্ধ না হয়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের আমরা আগামীতে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলবো। খুনী ও অত্যাচারী এবং তাদের দোসরদের ভবিষ্যতে আর কোনো ছাড় দেয়া হবে না। সেই সঙ্গে এ বিষয়ের দিকে আমরা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেলিমা রহমান বলেন, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক নির্বাচনী প্রহসনে ক্ষমতাসীন বর্তমান অবৈধ সরকার গণতন্ত্র হত্যা করেছে। তারা এখন মানুষের সমস্ত অধিকার কেড়ে নিয়ে দমন-পীড়ন ও হত্যা-রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গণবিচ্ছিন্ন শাসকগোষ্ঠী এ ব্যাপারে আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে অবৈধ ক্ষমতা রক্ষার পাহারাদার বা লাঠিয়াল হিসেবে অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনেরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণের ভার দলবাজ, বিতর্কিত, স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তার হাতে তুলে দিয়েছে। পক্ষপাতদুষ্ট কতিপয় অতি উৎসাহী কর্মকর্তা এখন আইন, নিরপেক্ষতা ও মানবাধিকার ভঙ্গ করে আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুনাম, ঐতিহ্য ও নিরপেক্ষতা নষ্ট করছে এবং দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে এই বাহিনীগুলোর সদস্যদের গৌরবময় অংশগ্রহণের ধারাবাহিতকতাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। এই পটভূমিতে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার বাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমূহের সর্বস্তরের সদস্যদের প্রতি আমরা পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সচেতন হবার আহ্বান জানাচ্ছি। নিজ নিজ বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে সুবিবেচনা অনুযায়ী কাজ করার অনুরোধ করছি। সেলিমা রহমান বলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ভোটের অধিকারসহ জনগণের সমস্ত অধিকার ফিরিয়ে আনা এবং আইনের শাসন ও মানবাধিকার পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এটি। এই আন্দোলন জনগণের আন্দোলন। এই আন্দোলন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে। পুলিশ-বিজিবি-আনসার-র‌্যাব হচ্ছে রাষ্ট্রের তথা জনগণের বাহিনী। কোনো দলকে রক্ষা করা নয়, দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজকের সমস্যা শুধুমাত্র আইন-শৃংখলার সমস্যা নয়। এটি রাজনৈতিক সংকট, কাজেই রাজনৈতিক পন্থায় এর নিরসন করতে হবে। তা না করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ক্ষমতাসীনেরা কূটকৌশলে ঠেলে দিচ্ছে জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধে। এটা সকলকে অনুধাবন করতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বারবার বলছিÑ ২০ দলের আন্দোলন মানুষের জীবন নাশের আন্দোলন নয়। যানবাহনে বোমা হামলা চালিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে এ সবের দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে বিরোধী দলকে নিষ্ঠুর পন্থায় দমন করাই ক্ষমতাসীনদের ঘৃণ্য অপকৌশল। আমাদের আহ্বান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ভাই-বোনেরা, আপনারা এই অপকৌশল বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবেন না। আমাদের আহ্বান, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করুন। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতন, গুলি করে আহত করা, পাইকারী গ্রেফতার, বাড়িঘরে হানা দেয়া বন্ধ করুন। শাসকদের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীদের নিরাপত্তা না দিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করুন। বিবৃতিতে বলা হয়, আপনারা নিজেরাই জানেন এবং নিয়ন্ত্রিত সংবাদ-মাধ্যমে ছিঁটেফোঁটা যেসব তথ্য আসছে তা থেকেও দেখছেন যে, বোমা হামলার ঘটনাস্থল থেকে আওয়ামী গোষ্ঠীর লোকেরা বোমা-অস্ত্র-গুলিসহ আটক হলেও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। বোমা বানাতে গিয়ে বিষ্ফোরণে তাদের দলের লোকদের ঝলসে যাবার ঘটনাও সংবাদপত্রে প্রায়শই প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের কারো বিরুদ্ধেই আপনারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। অথচ পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী, এমন কি আটক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পর্যন্ত বিনা তথ্য-প্রমানে মামলা করা হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে সাজানো বন্দুকযুদ্ধে মেরে ফেলা হচ্ছে। পায়ে ও শরীরে গুলি করে গুরুতর জখম ও পঙ্গু করা হচ্ছে। যেখানে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে বিরোধী দল সমর্থকদের এবং অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের অসংখ্য লাশ। গুম-অপহরণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ১৭ হাজারের বেশী গ্রেফতার করা হয়েছে। আটক করে  ও রিমান্ডে নিয়ে অবর্ননীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও হেনস্তা করা হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হানা দিয়ে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ ও পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। সেলিমা রহমান বলেন, শাসক দলের সন্ত্রাসীরা আপনাদের পাহারায় নানা জায়গায় মহড়া দিচ্ছে। অথচ বিরোধী দলের অফিসে তালা। আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে পথে নামলেই গুলি, টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ। মিডিয়ার সামনে কথা বললেও গ্রেফতার। এ কোন সমাজ? আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার এমন আচরণ কোনো মানদ-েই গ্রহণযোগ্য নয়। আপনারা চাকরি ও উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কথা বলতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আইন ও বিধিতে পরিষ্কার বলা আছে যে, আপনারা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ-নির্দেশই কেবল মানতে বাধ্য, কোনো অবৈধ নির্দেশ নয়। আপনারা মানবাধিকার রক্ষা করে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইনসম্মতভাবে কাজ করুন। কতিপয় সুবিধাভোগী কর্মকর্তার জন্য আপনারা কেন নিজেদের সুনাম ও বাহিনীর ঐতিহ্য ক্ষুন্ন করবেন? মনে রাখবেন, জনগণের আশা-আকাংখার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ কখনো সফল হতে পারেনি। ন্যায়ের পথে থাকার কারনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যকে এখন যদি বেআইনিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় তবে ভবিষ্যতে তাকে যথাযথ মর্যাদায় পুনর্বাসিত করা হবে।

জ্বলছে বাংলাদেশ -দি ইকোনমিস্ট

৪৫ বছর বয়সী অমূল্য চন্দ্র বর্মন। পেশায় রিকশাচালক। গত মাসে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নিজের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে বাসে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু, এখন তার ঠাঁই হয়েছে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। তিনি যে বাসে উঠেছিলেন, তাতে ছুঁড়ে মারা হয় পেট্রলবোমা। তার কোলের ওপর থাকা ব্যাগে গিয়ে পড়ে বোমাটি। বোমায় তার মুখ ও হাত জ্বলে যায়। ব্যাগে ছিল এক মাসের জমানো টাকা। সব পরিণত হয় ছাইয়ে। তবে সান্ত¡না একটাই অন্তত অমূল্য বেঁচে আছেন। এ সপ্তাহে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ডাকা এক মাসব্যাপী চলা অবরোধে প্রায় ৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যিনি দুই মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, তাকে ঢাকার দলীয় কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এদিকে সড়ক, রেলপথ ও পানিপথে অবরোধ দেশকে অচল করে দিয়েছে। অবরোধে অচলাবস্থার ওপর দেশব্যাপী হরতালও পালন করেছে বিএনপি। গত ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের বর্ষপূর্তি ঘিরে এ অস্থিরতার সূত্রপাত। বিক্ষোভ আন্দোলন শুরুর পর থেকে বিরোধী দলের ১০ হাজারেরও বেশি কর্মীকে আটক করা হয়েছে। বিএনপি’র অধিকাংশ নেতা জেলে, নির্বাসনে বা পলাতক রয়েছেন। এ সপ্তাহে সরকার সাময়িকভাবে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অবরোধ প্রত্যাহারে বাধ্য করাতে এ চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে অনুমেয়। কিন্তু, খালেদা জিয়া এর শেষ দেখার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ অকার্যকর দুই দলীয় ব্যবস্থায় ভুগছে, যেখানে দুই নেত্রী যাদের ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তারা দেশের মূল্যে নিজেদের বংশানুক্রমিক প্রতিহিংসায় লিপ্ত। ২০০৯ সালের শুরু থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। দলটি অধিকাংশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে এবং বিএনপির জন্য ক্ষমতায় যাওয়া অসম্ভব করে তুলেছে। সেটা করতে আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়েছে, যাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন সম্পন্ন হতো। দলটি বিএনপির নেতাদের হয়রানি করেছে ও প্রধান বিরোধী দলের জোটভুক্ত সর্ববৃহৎ দল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এখন সরকার দাবি করছে বিএনপির অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় লিপ্ত। উভয় দলেরই যুক্তি রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খালেদা জিয়া এখন দেশকে এমন এক অবস্থায় দাঁড় করাতে চান, যেখানে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপে বাধ্য হয়। এটা তারা নাও করতে চাইতে পারে। তারা তাদের সুনাম এবং জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশনে লোভনীয় চাকরির ব্যাপারে সজাগ। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের কর্মকা-ে ক্ষুব্ধ হয় তবে জাতিসংঘে তাদের চাকরির ব্যাপারে সংকট তৈরি হতে পারে। ২০০৭ সালে জেনারেলদের সমর্থনে দু’ বছরের জন্য টেকনোক্রেট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে পরে রাজনীতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। বিএনপির সড়ক অবরোধ ও সহিংসতা এবং সরকারের দমন-পীড়ন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী আগে বা পরে হস্তক্ষেপে বাধ্য হতে পারে। সরকার মানতে চাইছে না যে তারা কোন রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলা করছে। বরং, এটাকে আইন-শৃঙ্খলাজনিত সাধারণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে তারা। নির্বাচনের ডাক দিতে তারা একেবারেই চাইবে না। রাজনীতি ভেঙে পড়েছে। অমূল্য চন্দ্র বলছিলেন, আমাদের মতো গরীবরা কোন রাজনৈতিক দলের নয়। তা সত্ত্বেও, আমরা দুই দলের সহিংসতার ভয়াবহ শিকার।
লন্ডনের ‘দি ইকোনমিস্ট’ থেকে অনূদিত

অনন্য আত্মজীবনীর অপূর্ব পর্যবেক্ষণ' by ড. ফজলুল হক সৈকত

এমনটা হবে ভাবেনি শৈবাল। তবুও তাই ঘটল। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। সে ভেবেছে এক। হয়েছে আরেক। আগের রাতে শৈবালের মা ফোন করে শৈবালকে বলেছে, ‘ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে ফোনে। আমি বলেছি, ‘সামনের সপ্তাহে ঢাকায় আসব। এসে সমস্যার সমাধান করব। আপাতত বিষয়টার মীমাংসা করে দিতে বলেছি ওদেরকে। ওরা তোকে ডাকলে, তুই যাস।’
শৈবালের মা ফোন রাখার ঘণ্টাখানেক পর তাপসীর বাবা ফোন করলেন শৈবালকে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আগামীকাল ফ্রি আছ’?
আগামীকাল কখন?
সকালে...
হুম, আছি। ফ্রি আছি।
তাহলে সকাল দশটার দিকে আমাদের বাসায় চলে এসো।
ঠিক আছে- বলে ফোন রেখে মনে মনে একটু আশান্বিত হল শৈবাল। হয়তো কাল একটা সমাধান পাওয়া যাবে সমস্যার। যেহেতু শৈবালের মা ও তাপসীর আম্মুর ফোনালাপ হয়েছে সেহেতু বিষয়টা এখন মীসাংসার পর্যায়ে চলে এসেছে বলে ভাবা যায়।
আশায় বুক বাঁধে শৈবাল। চোখে নতুন স্বপ্ন ঝলমল করে যায়। পরদিন কিছুটা খুশি মনে তাপসীদের বাসায় হাজির হয় শৈবাল। কলিং বেল বাজার পর কাজের মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। ড্রইয়িংরুমে গিয়ে সোফায় বসল শৈবাল। টিভি চলছিল। একাকীত্ব ও টেলিভিশনের মাঝে একটা নিরেট জোগসাজশ রয়েছে। খালি রুমে একা একজন মানুষের সামনে টিভি চলতে থাকলে তাদের মাঝে একটা ভালো লাগা জন্মায়। যে কারণে তখন টিভিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না দেখালেও তাকিয়ে দেখে থাকার অনাগ্রহ জন্মায় না একা মানুষটির।
শৈবালও তাই তাকিয়ে রয়েছে টিভির দিকে। একটু পর তাপসীর বাবা এলেন এখানে। শৈবাল সালাম দিয়ে কুশলাদী জানতে চাইল। এক কথা, দুই কথা হল তাদের। দু’জনেই কাছাকাছি সোফায় বসেছে এখন। দু’জনেরই নজর এখন টিভির দিকে।
টেলিভিশনের পর্দায় নজর রেখেও ভেতরে একটা শংকা কাজ করছে শৈবালের। একটু পরে কি ঘটবে এখানে? কবকিছু কি স্বাভাবিক থাকবে? নাকি ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হবে?
একটু পরেই তাপসীর ছোট ফুপু এলেন। শৈবালের সঙ্গে সৌজন্য আলাপ করে পাশেই বসলেন। এর মাঝে কাজের মেয়ে ট্রেতে করে চা-বিস্কুট নিয়ে এলো।
সবাই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকিয়ে রয়েছে টিভির দিকে। কার মনে কী ঘুরপাক খাচ্ছে জানে না শৈবাল। সে শুধু নিজেরটা জানে। একটা চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। কী হবে কে জানে? নিজেকে শান্ত রাখার প্রতিজ্ঞা শৈবালের।
চা পান শেষ করে ফুপুই মুখ খুললেন। বললেন, আমরা তাহলে আসল বিষয়ে আলাপে আসি। কি বলেন বড় ভাইয়া?
এ কথা শুনে শৈবাল মুখ তুলে তাকাল তাপসীর ফুপুর দিকে। তাপসীর বাবা একবার শৈবালের চোখে চোখ রাখল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ... শুরু কর।
তাপসীর ফুপু এবার শুরু করলেন। শৈবালের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত আছ। তারপরও তোমার কিছু বলার থাকলে বল। মানে, তাপসীর ব্যাপারে তোমার কি কি অভিযোগ আছে শুনি আগে?
শৈবাল বলল, আমার কোনো অভিযোগ নেই। তাছাড়া যাকে আমি ভালোবাসি। যাকে নিয়ে আমার সংসার করার বাসনা রয়েছে তার নামে অভিযোগ করব কেন? আমি এসেছি আমার স্ত্রীকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে।
কিন্তু তোমার স্ত্রী যদি ফিরতে না চায় তখন তো আর কিছু করার নেই, বলল তাপসীর ফুপু।
কেন? তাপসী কি আমার সঙ্গে সংসার করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? প্রশ্ন করল শৈবাল।
তাপসীর বাবা কোনো কথা না বলে চুপ করে আছেন। কথা চলছে শৈবাল ও তাপসীর ছোট ফুপুর সঙ্গে। ফুপু বললেন, তাপসী আর ফিরতে চায় না তোমার সংসারে।
তাহলে সে কি চায়?
সে ডিভোর্স চায়।
ডিভোর্স! শৈবালের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কী এমন ঘটনা ঘটেছে যার কারণে ডিভোর্সের মতো এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাপসী?
ঘটনা তোমার কাছে হয়তো বড় কিছু নয়। তাপসীর কাছে হয়তো অনেক বড় ব্যাপার। তুমি প্রায়শ তার গায়ে হাত তোলো...
ফুপুর কথা থামিয়ে দিয়ে শৈবাল বলল, প্রায়শ এ ঘটনা ঘটেনি। গত সাত বছরে সর্বোচ্চ সাত বার ঘটেছে হয়তো। এখন সে ব্যাপারে কথা উঠছে কেন? ওর সঙ্গে আমার শেষ ঝগড়া হয়েছে তিন মাস আগে। তখন তো আমাদের মারামারি হয়নি। আমাদের ঝগড়া হয়েছে অন্য এক প্রসঙ্গে। আমাকে অযথাই অপমান করেছিলেন তাপসীর মা।
তোমার শেষ ঝগড়া যা নিয়েই হোক না কেন, এখন তাপসীর কাছে বড় ইস্যু হল- তুমি তার গায়ে হাত তোলো।
শৈবাল বুঝে গেছে, এরা আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে বিষয়টাকে অন্যদিকে মোড় নেওয়ানোর ফন্দি করেছে। ভেতরে ভেতরে অনেক রাগ জন্মাচ্ছে শেবালের। তবুও সে নিজেকে আয়ত্তে রাখছে বারবার।
না, আজকে ঝগড়ার দিন নয়। আজকে মীমাংসার দিন। গত রাতে মায়ের ফোনালাপে শৈবাল ভেবেছিল, বিষয়টা পজেটিভ হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ওরা গায়ের জোরে নেগেটিভ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে হয়তো। যা হওয়ার হবে। ভাগ্যকে মেনে নেবে। এ ভেবে শৈবাল বলল, আপনারা আমার শ্রদ্ধেয়। আপনাদের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব। তবে আপনাদের জানানো ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি তাপসীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
এমন সময় তাপসীর মা এখানে এলেন।
ফুপু তখন তাকে বললেন, ভাবী... তাপসীকে একটু ডেকে আনবেন প্লিজ?
এ কথা শুনে তাপসীর মা ড্রইয়িংরুম ছেড়ে ভেতরে গেলেন। এ সময়টায় সবাই চুপ করে রইল। একটু পর তাপসীকে সঙ্গে নিয়ে এলো তার মা। ওরা মা-মেয়ে ড্রইয়িংরুমের ডিভানে বসল। তাপসী তার ফুপুকে জিজ্ঞেস করল, আমাকে এখানে ডেকেছ কেন?
ফুপু বললেন, তোর সিদ্ধান্ত জানতে। তাপসী বলল, তোমরা আমার অভিভাবক। তোমরা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই আমার সিদ্ধান্ত।
ফুপু বললেন, আমরা তো ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি শৈবালকে। তবুও সে তোর মুখে শুনতে চায় ডিভোর্সের ব্যাপারে।
তোমরা যা সিদ্ধান্ত দিয়েছ সেটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বলল তাপসী।
তখন তাপসীর দিকে তাকিয়ে শৈবাল প্রশ্ন করল, তুমি কি ডিভোর্স চাও?
হ্যাঁ। এটাই ফাইনাল।
কিন্তু কেন?
কারণ তুমি প্রতিদিন আমার গায়ে হাত তোলো মদ্যপ হয়ে। অনেক মেয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে। এসব আমি আর মেনে নিতে পারছি না।
বেশ অবাক হয়ে শৈবাল প্রশ্ন করল, আমি প্রতিদিন কি তোমার গায়ে হাত তুলি? আমি কি প্রতিদিন মদ খাই?
শৈবালের চোখে তাকিয়ে জ্বলজ্বলে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল তাপসী, হ্যাঁ... তুমি প্রতিদিন তাই কর।
ঠিক আছে, আমি ধরে নিলাম তোমার কথাই সত্য। এ জন্য আমি তোমার কাছে মাফ চাই। তোমার পরিবারের কাছেও ক্ষমা প্রার্থী। ক্ষমা পাওয়ার জন্য তুমি যা যা শর্ত দেবে আমি মাথা পেতে নেব, বলল শৈবাল।
তাপসী বলল, এখন এসব করে কোনো লাভ হবে না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।
আর তুমি যে আমার ব্যাপারে নারীঘটিত মিথ্যে স্ক্যান্ডাল দিচ্ছ তার একটা প্রমাণ দাও। একটা প্রমাণ দিতে পারলে আমি তোমার সব কথা মেনে নেব।
তাপসী প্রমাণ দিতে পারেনি। তবে শৈবালের চোখে চোখ রেখে সে আরও অনেক মিথ্যে অপবাদ দিল। শৈবাল চুপচাপ শুনল। সে বুঝে গেছে, আর কোনো কথায় কোনো লাভ হবে না। ওরা ডিভোর্সের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে।
কথাবার্তার এক পর্যায়ে এসে তাপসীর ছোট ফুপু বললেন, আর তো কথা বাকি নেই। তাহলে ডিভোর্সের বিষয়টা চূড়ান্ত। কাগজপত্র রেডি করা হোক। একটা দিন ঠিক করে তোমরা স্বাক্ষর করে ফেল। কি বল শৈবাল?
শৈবাল বলল, আমার তো আর কিছু বলার নেই। আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা যদি উভয়ের জন্য মঙ্গল হয়, তবে তাই হোক।
তাপসীর বাবা বললেন, আমি আজকে অ্যাডভোকেটের সঙ্গে কথা বলব। ডিভোর্সের কাগজপত্র রেডি করে তোমাকে খবর দেব। তুমি তখন এসো।
শৈবাল আবারও তাপসীকে জিজ্ঞেস করল, তাহলে ডিভোর্সটাই ফাইনাল?
তাপসী বলল, হুম, ফাইনাল।
শৈবাল এবার তাপসীর বাবা ও ছোট ফুপুর দিকে তাকাল। আবার প্রশ্ন করল, এটাই তাহলে ফাইনাল?
তাপসীর বাবা বললেন, ফাইনাল ডিসিশান তো হয়ে গেল।
তাপসীর ছোট ফুপুও তার ভাইয়ের কথার সঙ্গে সম্মতি জ্ঞাপন করল। ফুপুর দিকে তাকিয়ে শৈবাল বলল, ডিভোর্স যখন চূড়ান্ত তখন আমার একটা কথা না বললেই নয়।
এ কথা শুনে তাপসী ভেতরে ভেতরে একটু আঁতকে উঠল। তার বাবা মুখ তুলে তাকাল শৈবালের দিকে। ছোট ফুপু বললেন শৈবালকে, বল... কি বলতে চাও?
শৈবাল পকেট থেকে মোবাইল বের করল। মোবাইলের ভিডিও অপশনে গিয়ে একটা ফুটেজ চালু করে তাপসীর ছোট ফুপুর হাতে দিল। তাপসীর বাবা গলা বাড়িয়ে ভিডিও ফুটেজ দেখলেন কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে তিনি লজ্জা পেয়ে উঠে চলে যান। ছোট ফুপু এবার ভিডিও ফুটেজটা তাপসীকে দেখিয়ে বললেন, এসব কী?
তাপসী ফুটেজটা দেখেই বুঝে ফেলেছে এটা কবেকার ঘটনা। এ দৃশ্য যে গোপন ক্যামেরায় ধারণ হতে পারে তা কল্পনাও করেনি তাপসী। সে অপমান বোধে কেঁদে উঠল।
ছোট ফুপু মোবাইলটা শৈবালের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আমার আর দেখার দরকার নেই। আমি যা বোঝার বুঝে গেছি।
তাপসীর মা মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। একটু আগে তিনিও ওই ভিডিও ফুটেজের যৎসামান্য দেখেছিলেন। তাপসীর মার দিকে তাকিয়ে ছোট ফুপু বললেন, এখন তো দেখছি সব দোষ শৈবালের নয়। তাপসীও কম অপকর্ম করেনি। আমি বুঝতে পারি না, আমাদের পরিবারের একটা মেয়ে কি করে এত নীচে নামতে পারে! ছিঃ
তাপসী অঝোর ধারায় কাঁদছে। তার কান্না দেখে শৈবালেরও খারাপ লাগছে। কিন্তু শৈবালের আর কিছু করার ছিল না। তাপসী সব সময় শৈবালের নামে মিথ্যে অপবাদ দিত। নানা অভিযোগ করত বাপের বাড়িতে। এসব কারণে শ্বশুড়বাড়িতে অনেক হেনস্থা হয়েছে শৈবাল। তবুও সে কোনোদিন তাপসীর বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি। কারও কাছে তাপসীর বদনাম করেনি। স্ত্রীকে কখনও ছোট করতে চায়নি শৈবাল। সে সব সময় চাইত, সংসারটা টিকে থাকুক। শৈবাল তার স্ত্রীকে শুধরাতে চাইত। এ নিয়েই সংসারে অশান্তি করত তাপসী। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিলকে তাল করত তাপসীর বাবা-মাও। বাবা-মা হিসেবে তারা কখনও সঠিক ঘটনার খোঁজ করেনি। তারা মেয়ের কথাতেই পরিচালিত হয়েছে। আজ ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত না হলে, শৈবাল প্রমাণ উপস্থাপন না করলে হয়তো তারা আজীবনই তাপসীর এসব কর্মকাণ্ডের কথা জানত না। বা বুঝত না।
আমাদের সমাজে কিছু অভিবাবক আছেন যারা নিজের সন্তানকে ভাবেন পুতপবিত্র। আর অন্যের সন্তানকে খারাপ বানাতে পারলেই খুশি হন।
যাই হোক, সেদিন নিজের বাসায় ফিরে এসে একটুও মন খারাপ করেনি শৈবাল। বরং তার ভেতরটা হাল্কা হয়ে গেছে অনেকাংশে। এতগুলো বছর সে স্ত্রীর এসব কাজকর্ম হজম করে গেছে নীরবে। কাউকে বলতে পারেনি। তবুও সে স্ত্রীকে মনে-প্রাণে ভালোবাসত বলে সংসারটা ধরে রাখতে চেয়েছিল। সেটাও আর হল না।
দুইদিন পর শৈবাল ফোন দিল তাপসীকে। জিজ্ঞেস করল, আমার বাসা থেকে তোমার জিনিসপত্র কবে নিয়ে যাবে?
তাপসী বলল, বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে জানাব।
আরও দুইদিন পার হয়ে গেল। তাপসী কিছু জানায়নি। এর মাঝে শৈবাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বাসা পরিবর্তন করে ফেলবে। বাড়িওয়ালাকে বলে দিয়েছে। আগামী মাসে নতুন বাসায় উঠবে। পুরনো স্মৃতি আগলে রাখার পক্ষপাতি নয় শৈবাল। এখন সে চায়, তাপসীর জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাক তাপসী। বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজও দ্রুত স্বাক্ষর হয়ে যাক। শৈবালের মাও তাই চান। কিন্তু তাপসী কিংবা তার পরিবার একদম চুপ হয়ে গেছে। কারণটা বুঝতে পারছে না শৈবাল। তাই সে এক সন্ধ্যায় তাপসীর বাবাকে ফোন দিল। প্রথমে জানতে চাইল, তাপসীর জিনিসপত্রগুলো কবে নিয়ে যাওয়া হবে? তারপর জানতে চাইল, বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজে স্বাক্ষর হবে কবে?
তাপসীর বাবা জানালেন, তাপসীর সঙ্গে আলাপ করে তোমাকে সব জানানো হবে।
কিছুদিন পার হল। শৈবালকে কিছুই জানায় না তাপসী কিংবা তার পরিবার। শৈবাল অস্থিরতায় পড়ে গেল। এ মানসিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তি চায় সে। তাই তাপসীকে আবারও ফোন দিল শৈবাল।
ফোনে তাপসী সুন্দর করে কথা বলল শৈবালের সঙ্গে। দেখা করে বিস্তারিত আলাপের আগ্রহ প্রকাশ করল তাপসী। শৈবাল প্রথমে অনাগ্রহ দেখালেও পরবর্তীতে রাজি হল।
পরদিন বিকালে তারা দেখা করল। তাপসীর আলাপে মায়াবী টান। শৈবাল কোনো মায়া দেখাচ্ছে না। শৈবাল জানে, ডিভোর্স যখন হয়ে যাচ্ছে তখন আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?
কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাপসী ‘স্যরি’ চাইল। দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ধারা ঝড়ছে তার। ধীরে ধীরে আকাশ গুমোট মেঘে কালো হয়ে গেল। সেদিকে খেয়াল নেই কারও। তারা তাদের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ কিংবা যুক্তি খণ্ডনে ব্যস্ত। লোকজনের জেনে যাওয়ার আশংকায় তারা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসে আলাপ করছে না। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাদের আলাপচারিতা চলছে। হঠাৎ আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। শৈবাল তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছাতা বের করল। বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে পাশাপাশি পথ চলতে লাগল শৈবাল ও তাপসী। কথায় কথায় তারা একটা মীমাংসায় এলো। ভাঙন নয়, তারা অতীতের ভুল-ভ্রান্তি শুধরে আরও শক্ত-পোক্ত করে গড়ে তুলবে নিজেদের সংসার।

মীমাংসা by অনুরূপ আইচ

এমনটা হবে ভাবেনি শৈবাল। তবুও তাই ঘটল। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। সে ভেবেছে এক। হয়েছে আরেক।
আগের রাতে শৈবালের মা ফোন করে শৈবালকে বলেছে, ‘ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে ফোনে। আমি বলেছি, ‘সামনের সপ্তাহে ঢাকায় আসব। এসে সমস্যার সমাধান করব। আপাতত বিষয়টার মীমাংসা করে দিতে বলেছি ওদেরকে। ওরা তোকে ডাকলে, তুই যাস।’
শৈবালের মা ফোন রাখার ঘণ্টাখানেক পর তাপসীর বাবা ফোন করলেন শৈবালকে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আগামীকাল ফ্রি আছ’?
আগামীকাল কখন?
সকালে...
হুম, আছি। ফ্রি আছি।
তাহলে সকাল দশটার দিকে আমাদের বাসায় চলে এসো।
ঠিক আছে- বলে ফোন রেখে মনে মনে একটু আশান্বিত হল শৈবাল। হয়তো কাল একটা সমাধান পাওয়া যাবে সমস্যার। যেহেতু শৈবালের মা ও তাপসীর আম্মুর ফোনালাপ হয়েছে সেহেতু বিষয়টা এখন মীসাংসার পর্যায়ে চলে এসেছে বলে ভাবা যায়।
আশায় বুক বাঁধে শৈবাল। চোখে নতুন স্বপ্ন ঝলমল করে যায়। পরদিন কিছুটা খুশি মনে তাপসীদের বাসায় হাজির হয় শৈবাল। কলিং বেল বাজার পর কাজের মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। ড্রইয়িংরুমে গিয়ে সোফায় বসল শৈবাল। টিভি চলছিল। একাকীত্ব ও টেলিভিশনের মাঝে একটা নিরেট জোগসাজশ রয়েছে। খালি রুমে একা একজন মানুষের সামনে টিভি চলতে থাকলে তাদের মাঝে একটা ভালো লাগা জন্মায়। যে কারণে তখন টিভিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না দেখালেও তাকিয়ে দেখে থাকার অনাগ্রহ জন্মায় না একা মানুষটির।
শৈবালও তাই তাকিয়ে রয়েছে টিভির দিকে। একটু পর তাপসীর বাবা এলেন এখানে। শৈবাল সালাম দিয়ে কুশলাদী জানতে চাইল। এক কথা, দুই কথা হল তাদের। দু’জনেই কাছাকাছি সোফায় বসেছে এখন। দু’জনেরই নজর এখন টিভির দিকে।
টেলিভিশনের পর্দায় নজর রেখেও ভেতরে একটা শংকা কাজ করছে শৈবালের। একটু পরে কি ঘটবে এখানে? কবকিছু কি স্বাভাবিক থাকবে? নাকি ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হবে?
একটু পরেই তাপসীর ছোট ফুপু এলেন। শৈবালের সঙ্গে সৌজন্য আলাপ করে পাশেই বসলেন। এর মাঝে কাজের মেয়ে ট্রেতে করে চা-বিস্কুট নিয়ে এলো।
সবাই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকিয়ে রয়েছে টিভির দিকে। কার মনে কী ঘুরপাক খাচ্ছে জানে না শৈবাল। সে শুধু নিজেরটা জানে। একটা চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। কী হবে কে জানে? নিজেকে শান্ত রাখার প্রতিজ্ঞা শৈবালের।
চা পান শেষ করে ফুপুই মুখ খুললেন। বললেন, আমরা তাহলে আসল বিষয়ে আলাপে আসি। কি বলেন বড় ভাইয়া?
এ কথা শুনে শৈবাল মুখ তুলে তাকাল তাপসীর ফুপুর দিকে। তাপসীর বাবা একবার শৈবালের চোখে চোখ রাখল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ... শুরু কর।
তাপসীর ফুপু এবার শুরু করলেন। শৈবালের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত আছ। তারপরও তোমার কিছু বলার থাকলে বল। মানে, তাপসীর ব্যাপারে তোমার কি কি অভিযোগ আছে শুনি আগে?
শৈবাল বলল, আমার কোনো অভিযোগ নেই। তাছাড়া যাকে আমি ভালোবাসি। যাকে নিয়ে আমার সংসার করার বাসনা রয়েছে তার নামে অভিযোগ করব কেন? আমি এসেছি আমার স্ত্রীকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে।
কিন্তু তোমার স্ত্রী যদি ফিরতে না চায় তখন তো আর কিছু করার নেই, বলল তাপসীর ফুপু।
কেন? তাপসী কি আমার সঙ্গে সংসার করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে? প্রশ্ন করল শৈবাল।
তাপসীর বাবা কোনো কথা না বলে চুপ করে আছেন। কথা চলছে শৈবাল ও তাপসীর ছোট ফুপুর সঙ্গে। ফুপু বললেন, তাপসী আর ফিরতে চায় না তোমার সংসারে।
তাহলে সে কি চায়?
সে ডিভোর্স চায়।
ডিভোর্স! শৈবালের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কী এমন ঘটনা ঘটেছে যার কারণে ডিভোর্সের মতো এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাপসী?
ঘটনা তোমার কাছে হয়তো বড় কিছু নয়। তাপসীর কাছে হয়তো অনেক বড় ব্যাপার। তুমি প্রায়শ তার গায়ে হাত তোলো...
ফুপুর কথা থামিয়ে দিয়ে শৈবাল বলল, প্রায়শ এ ঘটনা ঘটেনি। গত সাত বছরে সর্বোচ্চ সাত বার ঘটেছে হয়তো। এখন সে ব্যাপারে কথা উঠছে কেন? ওর সঙ্গে আমার শেষ ঝগড়া হয়েছে তিন মাস আগে। তখন তো আমাদের মারামারি হয়নি। আমাদের ঝগড়া হয়েছে অন্য এক প্রসঙ্গে। আমাকে অযথাই অপমান করেছিলেন তাপসীর মা।
তোমার শেষ ঝগড়া যা নিয়েই হোক না কেন, এখন তাপসীর কাছে বড় ইস্যু হল- তুমি তার গায়ে হাত তোলো।
শৈবাল বুঝে গেছে, এরা আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে বিষয়টাকে অন্যদিকে মোড় নেওয়ানোর ফন্দি করেছে। ভেতরে ভেতরে অনেক রাগ জন্মাচ্ছে শেবালের। তবুও সে নিজেকে আয়ত্তে রাখছে বারবার।
না, আজকে ঝগড়ার দিন নয়। আজকে মীমাংসার দিন। গত রাতে মায়ের ফোনালাপে শৈবাল ভেবেছিল, বিষয়টা পজেটিভ হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ওরা গায়ের জোরে নেগেটিভ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে হয়তো। যা হওয়ার হবে। ভাগ্যকে মেনে নেবে। এ ভেবে শৈবাল বলল, আপনারা আমার শ্রদ্ধেয়। আপনাদের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নেব। তবে আপনাদের জানানো ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমি তাপসীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
এমন সময় তাপসীর মা এখানে এলেন।
ফুপু তখন তাকে বললেন, ভাবী... তাপসীকে একটু ডেকে আনবেন প্লিজ?
এ কথা শুনে তাপসীর মা ড্রইয়িংরুম ছেড়ে ভেতরে গেলেন। এ সময়টায় সবাই চুপ করে রইল। একটু পর তাপসীকে সঙ্গে নিয়ে এলো তার মা। ওরা মা-মেয়ে ড্রইয়িংরুমের ডিভানে বসল। তাপসী তার ফুপুকে জিজ্ঞেস করল, আমাকে এখানে ডেকেছ কেন?
ফুপু বললেন, তোর সিদ্ধান্ত জানতে। তাপসী বলল, তোমরা আমার অভিভাবক। তোমরা যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটাই আমার সিদ্ধান্ত।
ফুপু বললেন, আমরা তো ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি শৈবালকে। তবুও সে তোর মুখে শুনতে চায় ডিভোর্সের ব্যাপারে।
তোমরা যা সিদ্ধান্ত দিয়েছ সেটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বলল তাপসী।
তখন তাপসীর দিকে তাকিয়ে শৈবাল প্রশ্ন করল, তুমি কি ডিভোর্স চাও?
হ্যাঁ। এটাই ফাইনাল।
কিন্তু কেন?
কারণ তুমি প্রতিদিন আমার গায়ে হাত তোলো মদ্যপ হয়ে। অনেক মেয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে। এসব আমি আর মেনে নিতে পারছি না।
বেশ অবাক হয়ে শৈবাল প্রশ্ন করল, আমি প্রতিদিন কি তোমার গায়ে হাত তুলি? আমি কি প্রতিদিন মদ খাই?
শৈবালের চোখে তাকিয়ে জ্বলজ্বলে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল তাপসী, হ্যাঁ... তুমি প্রতিদিন তাই কর।
ঠিক আছে, আমি ধরে নিলাম তোমার কথাই সত্য। এ জন্য আমি তোমার কাছে মাফ চাই। তোমার পরিবারের কাছেও ক্ষমা প্রার্থী। ক্ষমা পাওয়ার জন্য তুমি যা যা শর্ত দেবে আমি মাথা পেতে নেব, বলল শৈবাল।
তাপসী বলল, এখন এসব করে কোনো লাভ হবে না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।
আর তুমি যে আমার ব্যাপারে নারীঘটিত মিথ্যে স্ক্যান্ডাল দিচ্ছ তার একটা প্রমাণ দাও। একটা প্রমাণ দিতে পারলে আমি তোমার সব কথা মেনে নেব।
তাপসী প্রমাণ দিতে পারেনি। তবে শৈবালের চোখে চোখ রেখে সে আরও অনেক মিথ্যে অপবাদ দিল। শৈবাল চুপচাপ শুনল। সে বুঝে গেছে, আর কোনো কথায় কোনো লাভ হবে না। ওরা ডিভোর্সের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে।
কথাবার্তার এক পর্যায়ে এসে তাপসীর ছোট ফুপু বললেন, আর তো কথা বাকি নেই। তাহলে ডিভোর্সের বিষয়টা চূড়ান্ত। কাগজপত্র রেডি করা হোক। একটা দিন ঠিক করে তোমরা স্বাক্ষর করে ফেল। কি বল শৈবাল?
শৈবাল বলল, আমার তো আর কিছু বলার নেই। আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা যদি উভয়ের জন্য মঙ্গল হয়, তবে তাই হোক।
তাপসীর বাবা বললেন, আমি আজকে অ্যাডভোকেটের সঙ্গে কথা বলব। ডিভোর্সের কাগজপত্র রেডি করে তোমাকে খবর দেব। তুমি তখন এসো।
শৈবাল আবারও তাপসীকে জিজ্ঞেস করল, তাহলে ডিভোর্সটাই ফাইনাল?
তাপসী বলল, হুম, ফাইনাল।
শৈবাল এবার তাপসীর বাবা ও ছোট ফুপুর দিকে তাকাল। আবার প্রশ্ন করল, এটাই তাহলে ফাইনাল?
তাপসীর বাবা বললেন, ফাইনাল ডিসিশান তো হয়ে গেল।
তাপসীর ছোট ফুপুও তার ভাইয়ের কথার সঙ্গে সম্মতি জ্ঞাপন করল। ফুপুর দিকে তাকিয়ে শৈবাল বলল, ডিভোর্স যখন চূড়ান্ত তখন আমার একটা কথা না বললেই নয়।
এ কথা শুনে তাপসী ভেতরে ভেতরে একটু আঁতকে উঠল। তার বাবা মুখ তুলে তাকাল শৈবালের দিকে। ছোট ফুপু বললেন শৈবালকে, বল... কি বলতে চাও?
শৈবাল পকেট থেকে মোবাইল বের করল। মোবাইলের ভিডিও অপশনে গিয়ে একটা ফুটেজ চালু করে তাপসীর ছোট ফুপুর হাতে দিল। তাপসীর বাবা গলা বাড়িয়ে ভিডিও ফুটেজ দেখলেন কিছুক্ষণ। এক পর্যায়ে তিনি লজ্জা পেয়ে উঠে চলে যান। ছোট ফুপু এবার ভিডিও ফুটেজটা তাপসীকে দেখিয়ে বললেন, এসব কী?
তাপসী ফুটেজটা দেখেই বুঝে ফেলেছে এটা কবেকার ঘটনা। এ দৃশ্য যে গোপন ক্যামেরায় ধারণ হতে পারে তা কল্পনাও করেনি তাপসী। সে অপমান বোধে কেঁদে উঠল।
ছোট ফুপু মোবাইলটা শৈবালের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আমার আর দেখার দরকার নেই। আমি যা বোঝার বুঝে গেছি।
তাপসীর মা মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। একটু আগে তিনিও ওই ভিডিও ফুটেজের যৎসামান্য দেখেছিলেন। তাপসীর মার দিকে তাকিয়ে ছোট ফুপু বললেন, এখন তো দেখছি সব দোষ শৈবালের নয়। তাপসীও কম অপকর্ম করেনি। আমি বুঝতে পারি না, আমাদের পরিবারের একটা মেয়ে কি করে এত নীচে নামতে পারে! ছিঃ
তাপসী অঝোর ধারায় কাঁদছে। তার কান্না দেখে শৈবালেরও খারাপ লাগছে। কিন্তু শৈবালের আর কিছু করার ছিল না। তাপসী সব সময় শৈবালের নামে মিথ্যে অপবাদ দিত। নানা অভিযোগ করত বাপের বাড়িতে। এসব কারণে শ্বশুড়বাড়িতে অনেক হেনস্থা হয়েছে শৈবাল। তবুও সে কোনোদিন তাপসীর বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি। কারও কাছে তাপসীর বদনাম করেনি। স্ত্রীকে কখনও ছোট করতে চায়নি শৈবাল। সে সব সময় চাইত, সংসারটা টিকে থাকুক। শৈবাল তার স্ত্রীকে শুধরাতে চাইত। এ নিয়েই সংসারে অশান্তি করত তাপসী। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিলকে তাল করত তাপসীর বাবা-মাও। বাবা-মা হিসেবে তারা কখনও সঠিক ঘটনার খোঁজ করেনি। তারা মেয়ের কথাতেই পরিচালিত হয়েছে। আজ ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত না হলে, শৈবাল প্রমাণ উপস্থাপন না করলে হয়তো তারা আজীবনই তাপসীর এসব কর্মকাণ্ডের কথা জানত না। বা বুঝত না।
আমাদের সমাজে কিছু অভিবাবক আছেন যারা নিজের সন্তানকে ভাবেন পুতপবিত্র। আর অন্যের সন্তানকে খারাপ বানাতে পারলেই খুশি হন।
যাই হোক, সেদিন নিজের বাসায় ফিরে এসে একটুও মন খারাপ করেনি শৈবাল। বরং তার ভেতরটা হাল্কা হয়ে গেছে অনেকাংশে। এতগুলো বছর সে স্ত্রীর এসব কাজকর্ম হজম করে গেছে নীরবে। কাউকে বলতে পারেনি। তবুও সে স্ত্রীকে মনে-প্রাণে ভালোবাসত বলে সংসারটা ধরে রাখতে চেয়েছিল। সেটাও আর হল না।
দুইদিন পর শৈবাল ফোন দিল তাপসীকে। জিজ্ঞেস করল, আমার বাসা থেকে তোমার জিনিসপত্র কবে নিয়ে যাবে?
তাপসী বলল, বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে জানাব।
আরও দুইদিন পার হয়ে গেল। তাপসী কিছু জানায়নি। এর মাঝে শৈবাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ বাসা পরিবর্তন করে ফেলবে। বাড়িওয়ালাকে বলে দিয়েছে। আগামী মাসে নতুন বাসায় উঠবে। পুরনো স্মৃতি আগলে রাখার পক্ষপাতি নয় শৈবাল। এখন সে চায়, তাপসীর জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যাক তাপসী। বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজও দ্রুত স্বাক্ষর হয়ে যাক। শৈবালের মাও তাই চান। কিন্তু তাপসী কিংবা তার পরিবার একদম চুপ হয়ে গেছে। কারণটা বুঝতে পারছে না শৈবাল। তাই সে এক সন্ধ্যায় তাপসীর বাবাকে ফোন দিল। প্রথমে জানতে চাইল, তাপসীর জিনিসপত্রগুলো কবে নিয়ে যাওয়া হবে? তারপর জানতে চাইল, বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজে স্বাক্ষর হবে কবে?
তাপসীর বাবা জানালেন, তাপসীর সঙ্গে আলাপ করে তোমাকে সব জানানো হবে।
কিছুদিন পার হল। শৈবালকে কিছুই জানায় না তাপসী কিংবা তার পরিবার। শৈবাল অস্থিরতায় পড়ে গেল। এ মানসিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তি চায় সে। তাই তাপসীকে আবারও ফোন দিল শৈবাল।
ফোনে তাপসী সুন্দর করে কথা বলল শৈবালের সঙ্গে। দেখা করে বিস্তারিত আলাপের আগ্রহ প্রকাশ করল তাপসী। শৈবাল প্রথমে অনাগ্রহ দেখালেও পরবর্তীতে রাজি হল।
পরদিন বিকালে তারা দেখা করল। তাপসীর আলাপে মায়াবী টান। শৈবাল কোনো মায়া দেখাচ্ছে না। শৈবাল জানে, ডিভোর্স যখন হয়ে যাচ্ছে তখন আর মায়া বাড়িয়ে লাভ কী?
কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাপসী ‘স্যরি’ চাইল। দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ধারা ঝড়ছে তার। ধীরে ধীরে আকাশ গুমোট মেঘে কালো হয়ে গেল। সেদিকে খেয়াল নেই কারও। তারা তাদের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ কিংবা যুক্তি খণ্ডনে ব্যস্ত। লোকজনের জেনে যাওয়ার আশংকায় তারা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসে আলাপ করছে না। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তাদের আলাপচারিতা চলছে। হঠাৎ আকাশ ভেঙে ঝুম বৃষ্টি নামল। শৈবাল তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে ছাতা বের করল। বৃষ্টিতে এক ছাতার নিচে পাশাপাশি পথ চলতে লাগল শৈবাল ও তাপসী। কথায় কথায় তারা একটা মীমাংসায় এলো। ভাঙন নয়, তারা অতীতের ভুল-ভ্রান্তি শুধরে আরও শক্ত-পোক্ত করে গড়ে তুলবে নিজেদের সংসার।

১৫০ কোটি টাকার শুঁটকি পড়ে আছে কক্সবাজারে- টানা অবরোধ-হরতালের প্রভাব

কক্সবাজার উপকূল এলাকায় শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ l প্রথম আলো
ক্রেতার অভাবে ও পরিবহন-সংকটে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড় শ কোটি টাকার শুঁটকি মাছ পড়ে আছে। সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা দেশব্যাপী টানা অবরোধ-হরতালের কারণে এক মাস ধরে শুঁটকি উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রির কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে। সমুদ্রসৈকত ও শহর এলাকার চার শতাধিক শুঁটকির দোকানের মধ্যে তিন শর বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে এ খাতে প্রায় তিন লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে রয়েছে।
শুঁটকি মাছ কেনাবেচার প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক গ্রামসহ জেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সম্প্রতি দেখা যায়, মহালসহ দোকানে, গুদামে, বাড়ির আঙিনায় ও বেড়িবাঁধের ওপর প্রচুর পরিমাণ লইট্যা, ছুরি, পোপা, মাইট্যা, ফাইস্যা, রুপচাঁদা প্রভৃতি মাছের শুঁটকি পড়ে আছে। শ্রমিকেরা এখানে-ওখানে বসে গল্পগুজব করে সময় কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ী-শ্রমিক সবাই বলছেন, হরতাল-অবরোধের কারণে পর্যটক আসতে না পারায় স্থানীয়ভাবে যেমন শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে না, তেমনি পরিবহনের ঝুঁকির কারণে ঠিকমতো জেলার বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না।
একটি শুঁটকি মহালের মালিক সলিম উল্লাহ প্রথম আলোকে জানান, গত বছর জানুয়ারি মাসে যেখানে ৩৮ ট্রাক শুঁটকি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে এবার একই মাসে ১৫ ট্রাকও সরবরাহ করতে পারেননি।
আরেকটি মহালের ব্যবস্থাপক শাহজাহান বলেন, শুঁটকি বিক্রি বন্ধ থাকায় তাঁদের ইতিমধ্যে ২৩ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করতে হয়েছে।
কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে জেলার পাঁচ হাজারের বেশি ট্রলার সাগরে মাছ ধরছে। এসব ট্রলারের আহরণ করা বেশির ভাগ মাছ উপকূলে শুঁটকি করা হয়। কিন্তু টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে শুঁটকির ব্যবসায়ে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডি, মাঝিরঘাট, হাঙরপাড়া, পেশকারপাড়া, ফদনারডেইল, নুনিয়াছটা; মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোন, ধলঘাটা, মাতারবাড়ি এবং টেকনাফের জালিয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ শতাধিক গ্রামে শুঁটকি উৎপাদন হয়। সদর উপজেলা ও পৌরসভায় তিন শসহ জেলায় মোট চার শতাধিক শুঁটকিমহাল আছে।
নাজিরারটেক মৎস্য বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি শাহাদাত উল্লাহ জানান, গত ডিসেম্বর মাসে প্রতি সপ্তাহে নাজিরারটেক এলাকার শতাধিক মহাল থেকে ৪০০-৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি বিক্রি হয়েছে। আর জানুয়ারিতে পাঁচ ট্রাক করেও হয়নি। গত বছর এই উপকূলে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন হয়। হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে এ বছর শুঁটকি উৎপাদনে ধস নামবে।
শহরের বার্মিজ মার্কেট এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী শাহেদুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার ভ্রমণে আসা পর্যটকের উল্লেখযোগ্য অংশ বাড়ি ফেরার সময় কয়েক কেজি করে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। আর শহরের ছোট-বড় ছয় শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁতেও পর্যটকের জন্য খাবারের সঙ্গে শুঁটকি ভর্তা রাখা হয়।
বাংলাদেশ শুঁটকি মাছ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল শুক্কুর জানান, কক্সবাজার থেকে গত বছর হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় শুঁটকি রপ্তানি করে আয় হয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে রপ্তানি কমে যাচ্ছে।

পুরস্কার পেলেও লিখব না পেলেও লিখে যাব -জাকির তালুকদার by জুননু রাইন

(বিভিন্ন শাখায় এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে ৭ জনকে। কবিতায় শিহাব সরকার, কথাসাহিত্যে জাকির তালুকদার, শিশুসাহিত্যে খালেক বিন জয়েনউদদীন, প্রবন্ধে শান্তনু কায়সার, গবেষণায় ভূঁইয়া ইকবাল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাহিত্যে আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এবং ভ্রমণ সাহিত্যে মঈনুস সুলতানকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এদের মধ্যে থেকে সৃজনশীল শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত তিনজনের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার পাঠকদের জন্য পত্রস্থ হল) পুরস্কার দেয়া এবং পুরস্কারপ্রাপ্তি এ দুটো বিষয় আপনাকে কীভাবে নাড়া দেয়? আপনার মতে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার কখন কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে?
: এ বিষয়ে কোনো স্বতঃসিদ্ধ সূত্র আমার জানা নেই। আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি যে কোনো পুরস্কারপ্রাপ্তিই আমার ওপর বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। পুরস্কার পেলেও লিখব, না পেলেও লিখে যাব। তবে অপ্রত্যক্ষ একটি ভালো প্রভাব রয়েছে পুরস্কার পাওয়ার। আমার লেখালেখির কারণে পরিবার এবং স্বজনরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছে। তারা এই পুরস্কারটাকে নিজেদের প্রাপ্য বলে মনে করে খুশি হয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী কথাসাহিত্যে মৌলিক পার্থক্য বা বৈচিত্র্য যদি ভাবা হয়, আপনি কোন বিষয়টি বেশি প্রাধান্য দেবেন এবং কেন?
: বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই বাণী পৌঁছে দিয়েছে যে, বাংলা সম্পর্কিত সবকিছুর দায়দায়িত্ব এই ভূখণ্ডের মানুষদেরই নিতে হবে। কারণ হাজার বছর পরে বাঙালি প্রথম নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বাংলাদেশ নামে। কাজেই বাঙালির মানসিকতাতে পরিবর্তন আসতেই হবে। পরিবর্তন আসবে উপন্যাসেও। তবে মনে রাখতে হবে যে রাতারাতি কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসে না। চোখে পড়ার মতো যে পরিবর্তনটা হয়েছে, তা হচ্ছে একরৈখিক উপন্যাসের ছক থেকে বেরিয়ে আসছেন আমাদের অনেক লেখক। লিখছেন নন-ফিকশক ফিকশন, লিখছেন মধ্যযুগের কথকতা এবং পাঁচালির আঙ্গিকের উপন্যাস।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। লেখা হচ্ছে এই বিষয়ে অনেক সাহিত্য দরকার বলে, নাকি এই বিষয়ে প্রকৃত সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠছে না বলে?
: অনেক লেখা হচ্ছে বটে, তবে তা কেবল সংখ্যাতেই। গুণগতমানে শিখর স্পর্শী লেখার সংখ্যা খুবই কম। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অনেক সাহিত্য সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন অবশ্যই। কিন্তু যেভাবে লেখা হচ্ছে তার পেছনের প্রবণতা খুবই বিরক্তিকর। যে না, আমারও এই বিষয়ে একটা লেখা থাকা দরকার। বিষয়টি বাজারচলতি। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পাঠকের কাছে কোনো মহৎ বার্তা এসব লেখা পৌঁছে দিতে পারে না।
সাইফাই’-এর এই সময়ে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের অবস্থান কোন পর্যায়ে?
: সাহিত্যকে চিরকালই অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পথ চলতে হয়েছে। এখন আপনার ভাষায় ‘সাইফাই’ নতুন আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তবে এর ফলে বেকায়দায় পড়েছেন মূলত বিনোদন লেখকরা। কারণ বিনোদনের নানা উপায় বেরিয়ে যাওয়ায় এখন আর সাহিত্য থেকে বিনোদন কেউ খোঁজে না। তার জন্য নানা মাধ্যম তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু সিরিয়াস সাহিত্য বা প্রকৃত সাহিত্য খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত এখন পর্যন্ত হয়নি।
মানবিক সাহিত্যের তুলনায় নান্দনিক সাহিত্যের পরিমাণ কি পর্যাপ্ত? এর চাহিদা মেটানোর সম্ভাবনা কি দেখছেন?
: নান্দনিক সাহিত্য চাহিদার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে লেখকের যোগ্যতা, মানসিকতা, শিল্পবোধ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ইত্যাদির ওপর। তেমন লেখক যত আবির্ভূত হবেন, নান্দনিক সাহিত্যের সৃষ্টি তত বাড়বে। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া পথ নেই।
সাহিত্যে আপনার অনুজদের জন্য কিছু বলার আছে?
: অনুজদের জন্য আমার বলার কথা হচ্ছে সাহিত্যে কোনো শর্টকাট পথ নেই। সবাইকে বুকে হেঁটে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েই এগোতে হবে। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করার জন্য কোনো ভিন্ন নেশা ধরার দরকার নেই। বরং সুস্থ শরীর এবং মন দরকার।
কোনো সৃষ্টিই পুরস্কারের মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়
খালেক বিন জয়েনউদদীন
পুরস্কার দেয়া এবং পুরস্কার প্রাপ্তি এ দুটো বিষয় আপনাকে কিভাবে নাড়া দেয়? আপনার মতে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার কখন কতোটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে?
: আমি শিশু সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পুরস্কার পেয়েছি। কোনো সৃষ্টিই এই পুরস্কারের মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়। পাঠকের কাছে লেখা আদৃত হলেই লেখকের খুশি হওয়ার কথা। ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়টি এখানে গৌণ।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে আপনার মুগ্ধতা উদ্বেগ বা নতুন চিন্তা থাকলে তা জানতে চাই।
: দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটি স্বল্প পরিসরে দেয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শিশু সাহিত্য গত ৪০ বছরে অনেক বাঁক পেরিয়ে বর্তমান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যা এবং বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামের বিষয়টি শিশু সাহিত্য রচনায় প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণেই আমাদের শিশু সাহিত্যের বড় অংশটি মুক্তিযুদ্ধের।
কল্পকাহিনীর বদলে জীবন কাহিনী এখানে বারবার বিধৃত করা হয়েছে। গত ৪ দশকের ছড়া কবিতা আপন বৈভবে সমুজ্জ্বল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিভ্রান্তি গত কয়েক বছরে অনেকটা সুধরেছে। আমাদের শিশুসাহিত্যে এই বিষয়টি অনেকেই তুলে ধরেছেন।
আপনি তো বর্তমানে কচিকাঁচার আসর সম্পাদনা করেন। এই পাতাটি আমৃত্যু সম্পাদনা করেছেন প্রখ্যাত শিশু সংগঠক ও সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত শিশু পাতাগুলো কি বাগবান ভাই,দাদাভাই, দাদুভাই, আফলাতুন ভাই অথবা ভাইয়ার সম্পাদনায় প্রকাশিত সে সময়কার শিশুপাতাগুলোর মান, ঐতিহ্য ও আন্তরিকতা ধরে রাখতে পেরেছে?
এর সাফল্য অথবা ব্যর্থতার কথা বলুন।
: না, বাগবান ভাই, দাদাভাই, হাবীব ভাই, এখলাস ভাই, আফলাতুন, বজলু ভাই ও সেলিনা হোসেন কিংবা দাদুভাই ছোটদের যেসব পাতা সম্পাদনা করতেন, তার চেয়ে অনেক নিুমানের পাতা আমরা সম্পাদনা করছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও আমরা সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারিনি। সাফল্য নেই, ব্যর্থতা হল যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অভাব। আজকাল বেশিরভাগ দৈনিকের শিশু বিভাগের সম্পাদককে চেনাই যায় না, তাদের কোন সাহিত্যিক পরিচয় নেই।
সাহিত্যে রাজনীতি বা বর্তমান সময়ের অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান কতটা প্রখর? যদি প্রখর না হয় তবে এর কারণ এবং উপায় কি?
: এটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। অবশ্য জীবন ও সাহিত্য রাজনীতির বাইরে নয়। আমাদের সমাজ বিভক্ত। যারা অনিয়ম করছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সৃষ্টিশীল মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত বলে মনে করি। কারণ ও উপায় খুঁজতে গেলে নীতির প্রশ্ন আসবে। আমাদের সমাজে ক’জন নীতিবান মানুষ মেলে।
সাহিত্যে আপনার অনুজদের জন্য কিছু বলার আছে?
: অগ্রজ ও অনুজ বিষয়টি আমি বিশ্বাস করি না। একজন কনিষ্ঠ লেখকও আমার চেয়ে ভালো লিখতে পারে, আবার বেশি জানতেও পারে। আমি বলব লেখার আগে জানা এবং পড়াশোনা করা উচিত, সাহিত্য বাণিজ্য নয়, সাধনার পাশাপাশি এক্ষেত্রে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা উচিত। আমি লেখালেখির ৪৯ বছর পর আপনাদের দেয়া সম্মান লাভ করেছি।
দেশপ্রেম হচ্ছে চারপাশের বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত থাকা
শিহাব সরকার
পুরস্কার দেয়া এবং পুরস্কার প্রাপ্তি এ দুটো বিষয় আপনাকে কিভাবে নাড়া দেয়? আপনার মতে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার কখন কতোটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে?
: পুরস্কার দেয়ার রীতি বহুকাল থেকেই চলে আসছে। আমি সদ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি- ফলে আমার অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি তরতাজা। পুরস্কার পেলে ভালো লাগে, সবাই যেরকম আনন্দিত হয় আমিও তাই। পুরস্কার কোনো লেখকের জন্য অবশ্যই উদ্দীপনামূলক। আমি এতে নেতিবাচক কিছু দেখি না। তবে অনেক লেখক যেমন- আমি এসব ব্যাপারে এক ধরনের নিস্পৃহই বরাবর। তবুও যেহেতু বাংলা একাডেমি পুরস্কার, দেশের সবচেয়ে বড় পুরস্কার এটা আমার জন্য, আমার লেখার জন্য ইতিবাচক, আমি তাই মনে করি।
এক অর্থে বাংলাদেশের প্রথম সময়ের কবি আপনি। ৭১-এর পরের বাংলাদেশের সাহিত্য আর বাংলা সাহিত্যের মধ্যকার কোন কোন প্রধান পার্থক্য বা বৈচিত্র্য আপনার মতে আলোচ্য হতে পারে? এবং কেন?
: বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্য এত দ্রুত পার্থক্য শনাক্ত করা যাবে না বলেই মনে হয়। এটার জন্যও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তবে যেহেতু একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর পর স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণ কবিদের নিয়ে কথা হচ্ছে- আমার মনে হয় ওই সময়ের সাহিত্যে কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য ছিল। ওই সময়ে একসঙ্গে বহু কবি আবির্ভূত হয়েছিলেন। অনেকে হয়তো পরে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেনুং। এরপরও বেশ ক’জন সত্তরের কবি নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। গুণগত বিচার করবেন সৎ সমালোচক। তবে একসঙ্গে এত কবি সক্রিয় থাকা। এ ব্যাপারটি অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আপনার কবিতা লেখার শুরুর দিকে সাহিত্যে দেশপ্রেম যেভাবে এসেছিলো আপনার পরবর্তীদের মধ্যে সেটা কী পরিমাণে দেখতে পান? যদি কম বা ভিন্নতা থাকে- তবে এর কারণ কী বলে আপনার মনে হয়?
: সাহিত্যে দেশপ্রেম যেভাবে বুদ্ধদেব বসু দেখেছেন, তাতে খুব ভালো মানের লেখা জন্ম দেয় না। এটা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দীজেন্দ্রনাথ রায় এ বিষয়ে প্রচুর লিখেছেন। ওই সময়ের কবিতার ধরনটাই ছিল ওরকম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ-আমেরিকা অঞ্চলের কবিতায় দেশপ্রেম আক্ষরিক অর্থে ছিল না। যুদ্ধ নিয়ে লেখা হয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য আবেগময় কবিতা খুব একটা লেখা হয়নি। তার মানে এই নয় যে, আমি সাহিত্যে দেশপ্রেম থাকার বিরোধী। আসলে এখন দেশপ্রেম হচ্ছে দেশ, সচেতনতা, সময় সচেতনতা অর্থাৎ চারপাশের বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত থাকা।
সাহিত্যে রাজনীতি বা বর্তমান সময়ের অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান কতটা প্রখর? যদি প্রখর না হয় তবে এর কারণ এবং উপায় কী?
: সাহিত্যে রাজনীতির প্রতিফলন তো বাংলাদেশে আছেই, বিশেষ করে আমাদের সবার কবিতাতেই। কারও লেখায় এটা প্রত্যক্ষ অতি সরাসরি। কারও লেখায় পরোক্ষ। আমি এ পরোক্ষ ভঙ্গিটাতেই স্বচ্ছন্দবোধ করি। স্লোগান কিন্তু কবিতা নয়, জীবনানন্দ দাশের কবিতা বিশ্ব প্রেক্ষাপটের রাজনীতির উল্লেখ আছে। সেগুলো কিন্তু পড়তে গিয়ে মানুষ মুহূর্তে উত্তেজিত হয়ে পড়ে না। আসলে এরকমই হওয়া উচিত।
সাহিত্যে আপনার অনুজদের জন্য কিছু বলার আছে?
: অনেক তরুণ কবি লিখছেন। অনেকেই আমার সন্তানের বয়সী। এরা সারাক্ষণ কিছু করার জন্য টগবগ করছে। এক সময় আমরাও তাই করেছি। তবে সময় পাল্টেছে। কাগজের পাশাপাশি এসেছে ই-পোয়েট্রি বা ফেসবুক কবিতা। আমি পক্ষে-বিপক্ষে বলছি না কিছুই। তবে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সাহিত্য নিয়ে মাতামাতি শেষ পর্যন্ত কি ফল বয়ে আনবে এটা নিয়ে ভাববার ব্যাপার আছে।

বঙ্গবীর নামাজে, মঞ্চ তুলে নিয়ে গেলো পুলিশ

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর অবস্থান কর্মসূচির জন্য তৈরি মঞ্চ তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। আজ দুপুরে কাদের সিদ্দিকী জুমার নামাজ আদায় করতে গেলে এ সুযোগে পুলিশ মঞ্চ তুলে নেয়। লাগাতার অবরোধ প্রত্যাহার ও দুই নেত্রীকে আলোচনায় বসার দাবিতে কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম গত ২৮শে জানুয়ারি থেকে মতিঝিলে নিজ দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে মতিঝিল থানা থেকে একদল পুলিশ সদস্য কাদের সিদ্দিকীর অবস্থান মঞ্চের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। পরে তারা মঞ্চ ভেঙে দিয়ে তা নিজেদের পিকআপ ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যায়। এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কাদের সিদ্দিকীর অবস্থান কর্মসূচি থেকে ৬  নেতাকর্মীকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশ নিয়ে গেল কাদের সিদ্দিকীর মঞ্চ
নয়া দিগন্তঃ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর অবস্থান মঞ্চ তুলে দিয়েছে পুলিশ। এসময় বিছানাপত্রসহ সব সরঞ্জাম নিয়ে গেছে তারা। আজ দুপুরে বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ কাদের সিদ্দিকীর অবস্থানস্থলে মঞ্চ ও বিছানাপত্রসহ সব কিছু নিয়ে যায়। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, সরকার অহিংস আন্দোলনও করতে দিচ্ছে না। বর্তমানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ফুটপাতেই অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।
ইকবাল সিদ্দিকী আরো বলেন, ‘এমন একটি অহিংস সুশৃঙ্খল আন্দোলনে বারবার পুলিশি হয়রানি এবং নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি।’
এদিকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সংকটের শান্তিপূর্ণ নিরসনের দাবিতে  নিরবিচ্ছিন্ন অবস্থান কর্মসূচি পালনরত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে অবস্থানরত ৬ নেতাকর্মীকে বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীররাতে মতিঝিল থানা পুলিশ আটক করেছে। রাত দেড়টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে সাদা পোশাকের পুলিশ কৃষক শ্রমিক কার্যালয়ের সামনে থেকে বঙ্গবীরের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ আহমেদ, ছাত্রনেতা কাওসার জামান খান, আলমগীর হোসেন, যুবনেতা আবদুর রাজ্জাক, টিপু সুলতান ও রোকনকে আটক করে। গত সোমবারও পুলিশ লাল মিয়া (৬০) নামে এক প্রবীণ কর্মীকে আটক করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠালে  গত বুধবার তিনি জামিনে মুক্ত হন।

রাজনৈতিক সংকট- এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ভূমিকা কী? by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশের রাজনীতি যে এক দিকনির্দেশনাহীন পথে যাত্রা শুরু করেছে, তা আমাদের স্বীকার করে নেওয়া দরকার। এক মাস ধরে বিরাজমান পরিস্থিতির শেষ কোথায়, এই প্রশ্ন সবাই প্রতিনিয়তই করছেন। কিন্তু এর উত্তর যে কার কাছে আছে, সেটা কেউ জানেন বলে মনে হয় না। সমস্যা সমাধানে কমবেশি সবাই তাঁদের মতামত দেন, পথ নির্দেশ করেন। কিন্তু সমাধানের চাবিকাঠি কার বা কাদের হাতে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। গত এক মাসে সরকার ও বিরোধীদের কথাবার্তায় এটা স্পষ্ট যে কেউ আর কাউকে সামান্য ছাড় দিতে রাজি নয়। উভয় পক্ষের ধারণা, তাদের অনুসৃত পথেই এই পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এবং তাতে যে তাদের বিজয় ঘটবেই, এই বিষয়েও তারা নিশ্চিত। বিজয় কেবল সময়ের ব্যাপার বলেই উভয় পক্ষের ধারণা, যে কারণে আর কোনো রকম বিকল্প তাদের বিবেচনায় নেই, বিবেচনায় নেওয়াকেও তারা পরাজয়ের অংশ বলেই ধরে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের একাংশ এবং তার মিত্ররা মনে করছে যে এই দফায় পরাজিত করা গেলে দল হিসেবে বিএনপির অবসান ঘটবে। সেই কারণে তারা আর পিছপা হতে রাজি নয়। তাদের আচরণে এটা স্পষ্ট যে তারা মনে করে, এই ধরনের চাপের মুখে যেকোনো ধরনের বিকল্প খোঁজার অর্থ হলো রাজনৈতিক পরাজয়, যার ফলে সংগঠন ও কর্মীদের মনোবলের ওপরে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে।
অন্যদিকে, সম্ভবত বিএনপির নেতা খালেদা জিয়া এবং তাঁর দলের নেতাদের একাংশ মনে করে যে এই মুহূর্তে কোনো রকম অর্জন ছাড়া পিছিয়ে এলে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যা শিগগিরই পুষিয়ে তোলা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া, ক্ষমতাসীন দলের সাফল্যের পরিণতিতে ভিন্নমত এবং বিরোধী রাজনীতির জায়গা আর থাকবে না। তারা ধারণা করে যে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখলে তারাই বিজয়ী হবে। দুই পক্ষের বিবেচনাতেই রয়েছে ‘পরাজয়ের মূল্য’; আর সেই মূল্য এত বেশি যে তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই বলেই তাদের ধারণা।
তাদের আচরণে স্পষ্ট যে উভয় পক্ষই দল, নেতা ও কর্মী—এই তিন বিবেচনার বাইরে আর কিছু বিবেচনায় নিচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে স্পষ্ট যে দেশের সাধারণ নাগরিকদের স্বার্থ, জীবনের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যৎ—এগুলো বিবেচনার বাইরে চলে গেছে। সাম্প্রতিক কালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কথাবার্তা লক্ষ করলেই দেখা যায় যে সাধারণ মানুষের কাছে তা কীভাবে প্রতিভাত হবে, সেটা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত নন। এসএসসি পরীক্ষার সময় বিএনপির হরতাল-অবরোধ বিষয়ে বিএনপির নেতা মেজর হাফিজউদ্দিন আহম্মদ যখন বলেন যে ‘কিসের পরীক্ষা, কিসের কী?’—তখন তিনি এই নিয়ে চিন্তিত নন যে তাঁর এই বক্তব্য দেশের পৌনে ১৫ লাখ পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ওপরে কি প্রতিক্রিয়া ফেলবে। খালেদা জিয়ার সদ্যপ্রয়াত পুত্র আরাফাত রহমানের পরিবারের মালয়েশিয়ায় ফিরে যাওয়ার কারণ হিসেবে তাঁর শিশুকন্যাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার কথা যখন বিএনপি বলে, তখন তারা বিবেচনায় নেয় না যে একই সময়ে দেশের শিশুদের শিক্ষাজীবন কীভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কিন্তু এই বিষয়ে কথা বলার সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা, সমর্থক বা কর্মীরা ১৯৯৬ সালে পরীক্ষা পেছানোর ঘটনা, ২০০৫ সালে হরতালের ঘটনা বিস্মৃত হন এবং তার জন্য কোনো দায়িত্ব নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন না। প্রধানমন্ত্রী যখন আইন রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যত দায়মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন, তা সাধারণ মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবে, তার পরিণতি সাধারণ মানুষকে কীভাবে বইতে হবে, সে বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের কথাবার্তা, আচরণ ও নির্দেশনা আইনের শাসনের অনুপস্থিতির স্মারক ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারি জোটের একজন সাংসদ যখন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় বিএনপি নেতাকে গ্যাংগ্রিন বর্ণনা করে ‘কেটে ফেলার’ আহ্বান জানান, তখন তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের লক্ষণ দেখি না।
এগুলো শুধু কথার বিষয় নয়। এক মাস ধরে চলমান সহিংসতার একটি প্রধান দিক হচ্ছে ‘পেট্রলবোমা’ নিক্ষেপ করে মানুষকে হত্যা করা—এগুলোর নিন্দায়, প্রতিরোধের প্রশ্নে বিএনপির নেতাদের কণ্ঠস্বরে যে দৃঢ়তার অভাব, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব, তা সহজেই লক্ষণীয়। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের মনোভাব দলের নেতারা বুঝতে চান বলে মনে হয় না। নিহত ব্যক্তিদের পরিজনদের আহাজারি, আহত ব্যক্তিদের আর্তনাদ তাঁদের এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী করে না। তাঁদের কাছ থেকে আমরা এমন কিছু শুনি না, যা আমাদের আশাবাদী করতে পারে।
অন্য পক্ষে এসব আক্রমণকারীকে চিহ্নিত করা, আটক করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার দায় কী করে সরকার এড়িয়ে চলে? তাতে এই সন্দেহ ঘনীভূত হয় যে এই থেকে সরকারি দল রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণে পিছপা নয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণার বাইরে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাসীন জোটের অন্য দলগুলো এই নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রদান করেছে, যাতে সাধারণ মানুষ যুক্ত হতে পারবে? তারা কি সম্মিলিতভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে? এসব প্রশ্ন অপ্রীতিকর, কিন্তু এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আর সুযোগ নেই। এগুলো থেকে এই উপসংহারে পৌঁছানো কি ভুল যে দলের জন্য যা লাভজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে, দলের কট্টর সমর্থকদের যা উদ্দীপিত করছে, তার বাইরে সাধারণ মানুষ নিয়ে ভাবনার সময় দলগুলোর নেই?
প্রাসঙ্গিকভাবে মনে রাখা দরকার যে এই সময়ে যারা মারা গেছে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে কিংবা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে; আইনবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে যারা, তাদের সিংহভাগই সাধারণ মানুষ। তাদের জন্য গত কয়েক দশকের রাজনীতি কোনো প্রত্যক্ষ ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই তাঁদের জীবনহানির কারণ হয়েছে। সরকার ও বিরোধীদের অনমনীয় মনোভাবের ফলে নাগরিকদের দুর্ভোগ বাড়ছে প্রতিদিন, তাদের রুটি-রুজি উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তারা জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সে ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের, নাগরিকদের ভূমিকা কী? খুব সহজ করে এই কথাটি কমবেশি সবাই বলেন যে যা ঘটছে তা হচ্ছে এক দলের ক্ষমতায় থাকার এবং এক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই। কথাটি অংশত সত্য। ১৯৯১ সাল থেকে আমরা তা-ই দেখে আসছি। কিন্তু একে নিয়তি-নির্ধারিত বলে মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। এই পরিস্থিতি কেউ চাপিয়ে দেয়নি। বাংলাদেশের মানুষ ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই এই চক্র তৈরি করেছে। ফলে আজ যারা এই চক্রের কুফল দেখতে পাচ্ছে, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা উপলব্ধি করতে পারছে, মানুষের মৌলিক মানবাধিকার লুণ্ঠিত হচ্ছে বলে মনে করছে, তাদের ওপরেই দায়িত্ব বর্তায় এই চক্র ভাঙার পথ তৈরি করা। তা করতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই। সে জন্যই তাদের এগিয়ে আসতে হবে এই পরিস্থিতির অবসানে। একই সঙ্গে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য তাদের সক্রিয়তা ছাড়া এই বৃত্তচক্র ভাঙা সম্ভব হবে না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

সংলাপ না হলে দেশে গৃহযুদ্ধ হবে : বি. চৌধুরী

দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তা অব্যাহত থাকলে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। বাসে পেট্রোলবোমা হামলার বিষয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে তদন্ত করারও আহবান জানান তিনি।
আজ শুক্রবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেশপ্রেমিক নাগরিক পার্টি  আয়োজিত চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জাতীয় সংলাপ সময়ের দাবি শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ আহবান জানান।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, প্রধান দুই দলের মধ্যে সংলাপই বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। এর কোনো বিকল্প নেই। সংলাপ যদি না হয়, তাহলে কিছুদিন পরে আর কোনো পক্ষের পিছু হটার সুযোগ থাকবে না। এর পরিণাম হবে দেশে গৃহযুদ্ধ; যা দেশের কোনো মানুষ চায় না।
পেট্রলবোমা নিক্ষেপসহ সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, অনেক ঘটনার সাথে সরকার ও আওয়ামী লীগও জড়িত। কে বা কারা এ মানুষ মারার কাজে জড়িত তা খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, সংলাপের আহ্বান জানানোর প্রথম দায়িত্ব সরকারের। খালেদা জিয়াকেও প্রস্তুত থাকতে হবে এবং ঘোষণা দিতে হবে যে, তিনিও সংলাপ চান।
১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার চলমান রাজনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানানোর জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি।
দেশপ্রেমিক নাগরিক পার্টির চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহ শামীমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি নুরুল হক মজুমদার।

সহিংসতায় উদ্বেগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একই সাথে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সুযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
পরারাষ্ট্র বিভাগের একজন মুখপাত্র মেরি হারফ বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
আমরা বাস পুড়িয়ে, বোমা নিক্ষেপ এবং ট্রেন লাইনচ্যুত করে নিরপরাধ মানুষকে হতাহতের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অধিকার ও ক্ষমতা প্রত্যেক বাংলাদেশীর অবশ্যই থাকতে হবে। সেজন্য শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ দিতে আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। একই সাথে সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে নিজেদের সদস্যদের নির্দেশনা দিতে সব দলের প্রতিও আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।

অর্থনীতি- নতুনভাবে শুরু করতে দিতে হবে by জোসেফ ই স্টিগলিৎজ

বছর পাঁচেক আগে ইউরোসংকট যখন শুরু হলো, তখন কেইনসীয় অর্থনীতিবিদেরা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, গ্রিস ও অন্য যেসব দেশে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি আরোপ করা হয়েছে, তারা শেষমেশ ব্যর্থ হবে। এটা প্রবৃদ্ধির টুঁটি চেপে ধরবে, বেকারত্ব বাড়াবে। এমনকি তা ঋণ-জিডিপি অনুপাতও কমাতে ব্যর্থ হবে। ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণশীল সংকোচনের কথা বলেছে। কিন্তু এমনকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভিন্নমত পোষণ করে বলেছে, সরকারি ব্যয় হ্রাসের ব্যাপারটিও ঠিক ও রকম—সংকোচনমুখী।
আমাদের আর কোনো পরীক্ষার দরকার ছিল না বললেই চলে। কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি বারবার ব্যর্থ হয়েছে। সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের আমলে স্টক বাজারের ধস শেষমেশ মহামন্দায় মোড় নেয়। আবার আইএমএফ যে পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে যে ‘কর্মসূচি’ আরোপ করেছিল, সেটাও যথারীতি ব্যর্থ হয়েছে। আর এরপর যখন গ্রিসও সেই সংকটে পড়ল, তখন আবারও এর পরীক্ষা হয়ে গেল।
গ্রিস ‘ট্রয়কার’ (ইউরোপীয় কমিশন, ইসিবি ও আইএমএফ) নীতি অনুসরণ করে অনেকাংশে সফল হয়েছে। এর ফলে প্রাথমিক বাজেট-ঘাটতি প্রাথমিক উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সরকারি ব্যয় হ্রাসের পরিণতি হয়েছে বিপর্যয়কর, যেটা আগেই ধারণা করা হয়েছিল: ২৫ শতাংশ বেকারত্ব, ২০০৯ সাল থেকে ২২ শতাংশ জিডিপি হ্রাস, ঋণ-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি। আর এখন কৃচ্ছ্রসাধনবিরোধী সিরিজা পার্টির ব্যাপক বিজয়ের সঙ্গে গ্রিকরা ঘোষণা দিয়েছে, তারা অনেক দেখে ফেলেছে।
তাহলে কী করতে হবে? প্রথমত, এটা পরিষ্কার করা দরকার: ট্রয়কার ওষুধ যদি শুধু গ্রিসেই চরমভাবে ব্যর্থ হতো, তাহলে এই গোলমালের জন্য গ্রিসকে দোষ দেওয়া যেত। কিন্তু সংকটের আগে স্পেনের উদ্বৃত্ত ছিল, তার ঋণের অনুপাতও ছিল কম। সেই স্পেনও এখন সংকটে পড়েছে। গ্রিস ও স্পেনের কাঠামোগত সংস্কারের দরকার নেই। ইউরোজোনের ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের যতটা দরকার, সে তুলনায়। নীতিকাঠামো সম্পর্কেও মৌলিকভাবে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। যে কারণে মুদ্রা ইউনিয়ন এ রকম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
গ্রিস আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে ঋণব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জন্য নতুন কাঠামো কতটা দরকার। অতিরিক্ত ঋণের জন্য শুধু ২০০৮ সালের সৃষ্টি হয়নি, ১৯৯০ সালে পূর্ব এশিয়া সংকটও এর কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকের লাতিন আমেরিকা সংকটও এ কারণেই সৃষ্টি হয়। এর কারণে এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সৃষ্টি করছে, যেখানে লাখ লাখ বাড়িওয়ালা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। আর যাঁরা পোল্যান্ডসহ অন্যান্য স্থানে সুইস ফ্রাঁয় ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁরাও হুমকির মুখে পড়ে গেছেন।
অতিরিক্ত ঋণের কারণে যে পরিমাণে ভুগতে হয়েছে, তাতে কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারেন, এত এত মানুষ ও দেশ কেন এই পরিস্থিতিতে বারবার নিপতিত হয়েছে। যাহোক, এসব ঋণ তো আসলে একধরনের চুক্তি। অর্থাৎ স্বেচ্ছাকৃত মতৈক্য। ফলে ঋণদাতারাও ঋণগ্রহীতাদের মতো সমান অপরাধী। বস্তুত, ঋণদাতারা আরও বেশি দায়ী। এগুলো অত্যন্ত আধুনিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে ঋণগ্রহীতারা বাজারের উত্থান-পতন ও ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু বাস্তবে মার্কিন ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আর্থিক খাতসংক্রান্ত জ্ঞানের অভাবকে কাজে লাগিয়ে তাদের বোকা বানিয়েছে।
প্রত্যেক অগ্রগামী দেশই অনুধাবন করেছে, পুঁজিবাদকে কার্যকর করতে হলে সব দেশকে নতুন করে শুরু করতে দিতে হবে। ১৯ শতকের ঋণদাতারা যে কারাগার বানাতেন, তা ব্যর্থ হয়েছে, এটা অমানবিক ছিল। সেটা ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করতে পারত না। ভালো ঋণের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হলে তা বরং কার্যকর হতো। ঋণদাতাদের তাদের সিদ্ধান্তের জন্য আরও দায়িত্বশীল করা গেলে তা কাজের হতো।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো একটি দেশকে নতুন করে শুরু করতে দেওয়ার মতো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালের সংকটের আগে থেকেই জাতিসংঘ উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর সহযোগিতায় তেমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে খুব জোরেশোরে বাগড়া দিয়েছে। সম্ভবত সে চায়, বেশি ঋণে জর্জরিত দেশগুলোর কর্মকর্তাদের ঋণগ্রহীতা কারাগার আবার নতুন করে বানানোর চেষ্টা করছে (সেটা হলে গুয়ানতানামো কারাগারে হয়তো জায়গা খালি করা হচ্ছে)।
ঋণগ্রহীতা কারাগারের ব্যাপারটি হয়তো সদূরপরাহত। কিন্তু সম্প্রতি যে নৈতিক ঝুঁকি ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে কথা হচ্ছে, তার সঙ্গে এর কোথায় যেন মিল রয়েছে। বাজারে ভয় রয়েছে, গ্রিস যদি তার ঋণ পুনর্গঠন করে, তাহলে সে আবারও সংকটে পড়বে। একইভাবে তা অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এটা একদম বাজে কথা। কেউ কি সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বেচ্ছায় নিজেদের গ্রিসের অবস্থায় ফেলতে চাইবে, শুধু ঋণদাতাদের কাছ থেকে বাঁচার জন্য? কোনো নৈতিক ঝুঁকি থাকলে, তা ঋণদাতাদের ঘাড়েই বর্তায়—বিশেষ করে বেসরকারি খাতে। যাঁদের বারবার বেইল আউট করা হয়েছে। ইউরোপ যদি এসব ঋণকে বেসরকারি খাত থেকে সরকারি খাতে স্থানান্তর করে, তাহলে তাকেই এর পরিণতি সইতে হবে, গ্রিসকে নয়। এটা গত অর্ধ শতাব্দীর রীতিতে পরিণত হয়েছে। গ্রিসের এই বিরাজমান বেহাল দশার কারণ হচ্ছে ট্রয়কা কর্মসূচি, যেটা তার ওপর আসলে গছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মানে এটা ঋণ পুনর্গঠন নয়, বরং সেটা না থাকাটাই ‘অনৈতিক’। গ্রিস যে উভয় সংকটে পড়েছে, তা কোনো বিশেষ ব্যাপার নয়। অনেক দেশই এ অবস্থায় নিপতিত হয়েছে। ইউরোজোনের কাঠামোর কারণে গ্রিসের সমস্যা মোকাবিলা করা আরও কঠিন পড়েছে। তার পরও এই নীতিগত স্থিতিস্থাপকতা হানির সঙ্গে যে ন্যূনতম ইউরোপীয় সংহতি থাকা উচিত ছিল, তার ছিটেফোঁটাও নেই।
আজ থেকে ৭০ বছর আগে, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্র শক্তি ঠিক করেছিল, জার্মানিকে নতুন করে শুরু করতে দিতে হবে। তারা বুঝতে পারে, হিটলারের উত্থানের সঙ্গে সে দেশের বেকারত্বের (মূল্যস্ফীতি নয়) সম্পর্ক আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর অধিক হারে ঋণ আরোপ করার কারণে এটা ঘটেছিল। কিন্তু এই ঋণ যে কী বোকামির সঙ্গে জড়ো হয়েছিল, তা তারা কখনো আমলে নেয়নি। বা জার্মানি অন্যদের ওপর যে মূল্য চাপিয়ে দিয়েছিল, সেটাও খতিয়ে দেখেনি। সেটা না করে তারা শুধু ঋণই মওকুফ করেনি, তারা আদতে তাদের সহযোগিতা করেছে। জার্মানিতে যে মিত্র সেনারা অবস্থান করছিল, তারা আর্থিক প্রণোদনাও দিয়েছে।
কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে ঋণ ও ইকুইটিসমেত তা বিক্রি করে দেওয়াই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ও দক্ষ সমাধান। গ্রিসের যে সমধর্মী অ্যাপ্রোচ নেওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে, তার বর্তমান বন্ডকে জিডিপি-সংযুক্ত বন্ডে রূপান্তরিত করা। গ্রিস ভালো করলে তার ঋণদাতারা তাদের বেশির ভাগ অর্থ ফেরত পাবে। তা না হলে কম পাবে। তখন দুই পক্ষই প্রবৃদ্ধিমুখিন নীতি গ্রহণে শক্তিশালী প্রণোদনা লাভ করবে।
গণতান্ত্রিক নির্বাচন সাধারণত এত পরিষ্কার বার্তা দেয় না, গ্রিসের নির্বাচন যা দিয়েছে। ইউরোপ যদি গ্রিক ভোটারদের পরিবর্তনের দাবিকে না বলে, তাহলে তারা গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে, অন্তত অর্থনীতির ক্ষেত্রে। কেন গণতন্ত্রকেই বন্ধ করে দেওয়া হয় না? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নিউফাউন্ডল্যান্ড গ্রহীতার ভূমিকায় গেলে যেটা তারা করেছিল।
মানুষ আশা করে, যারা ঋণ ও কৃচ্ছ্র অর্থনীতি বোঝে এবং গণতন্ত্র ও মানবীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, তারাই টিকে থাকবে। সেটা হয় কি না, তা-ই দেখার বিষয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডকেট
জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ।