Thursday, December 11, 2014

মালালা ও কৈলাসের নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ

নরওয়ের রাজধানী আসলোয় বুধবার যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেছেন মালালা ইউসুফজাই ও কৈলাস সত্যার্থী। এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেয় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে নোবেল কমিটি বলে, মালালা ও কৈলাস উভয়ই ‘শান্তির চ্যাম্পিয়ন’।
মেয়ে শিশুদের শিক্ষা প্রচার, প্রসার ও তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কর্মী পাকিস্তানে কিশোরী মালাল ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থী। সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জনকারী মালালা এরই মধ্যে বহু বিরল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৫ বছর বয়সে পকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় মামালার মাথায় গুলি করে তালেবানরা। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য গুরুতর অবস্থায় তাকে ইংল্যান্ডে নেয়া হয়। বার্মিংহামের একটি হাসপাতালে তার মাথায় অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন মালালা। কৈলাসও শিশুদের জন্য কাজ করতে গিয়ে জীবনের হুমকি পেয়েছেন। তার দুই সহকর্মী খুনও হয়েছে। নোবেল পুরস্কার নেয়ার পর কৈলাস বলেন, এ পুরস্কার শিশু দাসত্বের বিরুদ্ধে আরও কাজ করার জন্য বিরাট একটি সুযোগ হিসেবেই দেখছেন তিনি। মালালা এবং কৈলাস দুজনকেই যৌথভাবে এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে নেবেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন মালালার : যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা শেষে পাকিস্তানে ফিরে জোর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন সবচেয়ে কম বয়সী নোবেল পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাই (১৭)। তিনি একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন- এমন স্বপ্নও রয়েছে তার। বুধবার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আগে হার্ডটক অনুষ্ঠানের সঞ্চালক স্টিফেন সাকুরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান মালালা।
নারী শিক্ষার প্রসারে সচেতনতা ক্যাম্পেইন করার দায়ে ২০১২ সালে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মালালার মাথায় গুলি করে পাকিস্তানের তালেবান যোদ্ধারা। এরপর বিশ্বে আলোচনার মধ্যমণিতে আসেন মালালা। সাক্ষাৎকারে মালালা বলেন, ‘আমি আমার দেশকে পরিচালনা করতে চাই। দেশকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তর করার স্বপ্ন আমার অনেক দিনের। আমি প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত হিসেবে দেখতে চাই।’ ২০০৭ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত বেনজির ভুট্টো (যিনি পাকিস্তানের দু’বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন) তাকে উৎসাহ জোগাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মালালা বলেন, ‘যদি আমি সবচেয়ে ভালো রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে পরিচালনা করতে পারি এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারি, তাহলে নিঃসন্দেহে বেনজির ভুট্টোর আদর্শকেই বেছে নেব।’ নোবেল পুরস্কার পাওয়া সবচেয়ে বড় সম্মানের বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কিশোরী মালালা বলেন, ‘প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল শিশুদের স্কুলে যেতে দেখার এবং শিক্ষার প্রতি সচেতনতা সমাবেশে অংশ নেয়ার। নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় সেই দায়িত্বটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাকে আরও বেশি আশা, উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছে। আগের চেয়ে আমি বেশি শক্তিশালী মনে করি, কারণ এখন আমার সঙ্গে অনেক লোক রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে আমাদের প্রচুর দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু আমার নিজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যটা একটু বেশি। কারণ, আমার দেশ ও সম্প্রদায়কে উন্নতি করতে আমাকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, যা কঠিন ও বিশাল একটি দায়িত্ব।’
আজ নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে পাকিস্তান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন মালালা। সূত্র : বিবিসি।

গানম্যান নিয়ে চলেন চট্টগ্রামের যুবলীগ ক্যাডার বাবর

তিনি মন্ত্রীও নন, এমপিও নন। নন কোনো ভিআইপি কিংবা সিআইপিও। তবুও তিনি চলেন গানম্যান নিয়ে। সব সময় দু’জন গানম্যান থাকে তার সঙ্গে। সকালে কিংবা বিকালে দিনে কিংবা রাতে যেখানেই যান সঙ্গে থাকেন গানম্যান। তবে এসব গানম্যান সরকারি নয়। বেসরকারি। ঢাকার একটি বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে রিক্যুইজিশনে নেয়া। ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এ ব্যক্তির নাম হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। এক সময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম থাকলেও এখন তিনি যুবলীগ নেতা। কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-অর্থ সম্পাদক তিনি। সাম্প্রতিক রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডারবাজি নিয়ে ডাবল মার্ডারের একটি ঘটনায় আসামি হওয়ার পর তিনি কেন্দ্রীয় সদস্যের পদ থেকে বহিষ্কার হন। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে আসার পর অনেকটা ‘প্রমোশন’ হিসেবেই তাকে দেয়া হয় সহ-অর্থ সম্পাদকের পদ। মূলত এ পদ পাওয়ার পর থেকে তিনি গানম্যান বা বডিগার্ড রিক্যুইজিশন নিয়ে চলাফেরা করেন। নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন নন্দনকাননে হেলাল আকবর বাবরের বাড়ি। কোতোয়ালি থানার ওসি মহিউদ্দিন সেলিম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বাবরের গানম্যান নিয়ে চলাফেরা করার বিষয়টি তিনিও শুনেছেন। তবে কোনো ভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি না হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে গানম্যান পেলেন বা কোন সিকিউরিটি কোম্পানি তাকে গানম্যান সরবরাহ করেছে তা জানার জন্য খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর নিজে সরাসরি গানম্যান নিয়ে চলাফেরা করার কথা স্বীকার না করলেও বুধবার বিকালে যুগান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। জামায়াত-শিবির সব সময় আমাকে টার্গেটে রাখে। তারা যেভাবে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালায়, কলেজ ও রাজনীতির মাঠ দখলে রাখতে চায়, খুন-রাহাজানি করে তাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে আমি তাদের টার্গেট। কে না চায় তার জীবনটা বাঁচাতে। নিরাপদ রাখতে। আমিও নিজের জীবনটা নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছি। কোনো গানম্যান-টানম্যান নয়। কয়েকজন ভাই-ব্রাদার আছে যারা আমাকে তাদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। পাহারা দিয়ে রাখে।’ বাবর আরও বলেন, আমাকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী বলা হয়’ কিন্তু আমার হাতে কোনো রক্তের দাগ নেই। যেসব মামলা আমার বিরুদ্ধে ছিল তা রাজনৈতিক। ওই মামলাগুলো থেকে আমি একে একে খালাস পাচ্ছি। সর্বশেষ রেলওয়েতে টেন্ডার নিয়ে যে ডাবল মার্ডার হয়েছে ওই ঘটনার সঙ্গেও আমি জড়িত না। তাছাড়া ওই ঘটনার পর আমি একবারের জন্যও সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) যাইনি। যারা আমার প্রতিপক্ষ তারাই আমার বিরুদ্ধে রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রক হিসেবে অপপ্রচার চালায়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর এমইএস কলেজ ভিত্তিক ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। তিনি এমইএস কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন। নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী বাবর ছাত্রলীগের গ্র“প-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে রাউজানের আকবর-মুরাদ হত্যা মামলা, বিএনপি নেতা ফরিদ হত্যা মামলা, বিএনপি কর্মী আজাদ হত্যা মামলা এবং সর্বশেষ রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে সংঘটিত ডাবল মার্ডার মামলা ছাড়াও এক ডজনেরও বেশি মামলা ছিল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হেলাল আকবর বাবর ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। ওই সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ও ক্রসফায়ার এড়াতে বাবর পাড়ি জমান থাইল্যান্ডে। সেখানে গড়ে তোলেন হোটেল ব্যবসা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছর পর আবারও দেশে ফেরেন। এক পর্যায়ে থাইল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দেশে ব্যবসা শুরু করেন। শুরু করেন বেনামে ঠিকাদারি। সূত্র জানায়, বিশেষ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের শত কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। দেড় কোটি টাকার একটি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সর্বশেষ ২৪ জুন দুপুরে সিআরবি এলাকায় যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুই গ্র“পে গোলাগুলি হয়। এতে আরমান নামে এক শিশু ও সাজু পালিত নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শামীমের নেতৃত্বাধীন একটি গ্র“পের সঙ্গে ওই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় নিহত সাজুর মায়ের দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় হেলাল আকবর বাবরকে। কোতোয়ালি থানা পুলিশ এ মামলায় ঢাকা থেকে বাবরকে গ্রেফতার করে। ডাবল মার্ডারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি হওয়ার পর যুবলীগের সদস্য পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয় বাবরকে। এর কয়েক মাস পরেই তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হন। জামিনে ছাড়া পেয়েই এবার তিনি অন্য বাবর রূপে আভির্ভূত হন। আগে প্রাইভেট কার চালালেও এবার নেন একটি কালো রঙের প্রাডো জিপ। নিয়োগ করেন অস্ত্রধারী দু’জন বেসরকারি সিকিউরিটি বা গানম্যান। সিকিউরিটি কোম্পানির দুই গানম্যান ছাড়াও আনোয়ার হোসেনসহ আরও দু’জন তার সঙ্গে ‘লাইসেন্সধারী’ অস্ত্র নিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকেন।
সরকারি বা বেরসকারি সিকিউরিটি বা গানম্যান পাওয়ার যোগ্য কে এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক পিপি তথা দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার পিপি অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত মন্ত্রী-এমপি তথা ভিআইপি-সিআইপিদের সরকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গানম্যান দিয়ে থাকে। এছাড়া কেউ যদি সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নেন সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন বা থানার সুপারিশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বেসরকারি সিকিউরিটি বা গানম্যান সরবরাহ করে থাকে।
তবে যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর বাবর বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে গানম্যান নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করলেও কোতোয়ালি থানার ওসি মহিউদ্দিন সেলিম যুগান্তরকে বলেন, হেলাল আকবর বাবরকে গানম্যান প্রদান করার সুপারিশ সংক্রান্ত কোনো রিপোর্ট তার থানা থেকে পাঠানো হয়নি।

ছড়িয়ে পড়ছে ফার্নেস অয়েল

সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর মৃগামারী এলাকায় ডুবে যাওয়া ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ ট্যাংকার থেকে ফার্নেস অয়েল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নদীসহ ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চরম হুমকির মুখে পড়েছে বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিন, মাছ ও গাছপালা। এদিকে এ ঘটনায় নিখোঁজ ট্যাংকারটির মাস্টার মোখলেছুর রহমানের এখনও সন্ধান মেলেনি।
এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি করেছে বনবিভাগ। এ ব্যাপারে একটি মামলা করা হয়েছে। তবে এ ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা বেলাল হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৭টা) ট্যাংকারটি উদ্ধার অভিযান শুরু হয়নি। যুগান্তরের খুলনা ব্যুরো, বাগেরহাট, মংলা ও শরণখোলা প্রতিনিধির পাঠানো খবর-
খুলনা ব্যুরো : খুলনা পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন দৈনিক যুগান্তরকে জানান, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা সমন্বয়ে যৌথভাবে ঘটনাস্থল পর্যাবেক্ষণ (সুপরভিশন) করেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে। তেল যাতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য নৌবাহিনী প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নদীতে ভাসমান শোলা দিয়ে তেল আটকিয়ে দিয়েছে। নদী থেকে তেল শুষে নেয়ার পদক্ষেপও নেয়া হবে। তবে নদীতে জোয়ারের কারণে তেল সুন্দরবনের ল্যান্ডে উঠে পড়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় নদীতে ও নদী তীরবর্তী ভূমিতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্যের ওপর সুদূরপ্রসারী মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে এবং এ অঞ্চলের নদ-নদীর জলজ প্রাণীর মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে এই তেল সুন্দরবন ছাড়িয়ে খুলনা শহর পর্যন্ত বিস্তার ঘটবে। ইতিমধ্যে নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রকিবুর রহমান, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বনবিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করছেন।
বাগেরহাট : বনের ভেতর বেশ কয়েকবার সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল কিংকারসহ ছোটবড় বেশ কয়েকটি নৌ দুর্ঘটনা ঘটলেও সুন্দরবনের অভ্যন্তরে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনা এটাই প্রথম।
এদিকে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ১০০ কোটি টাকার উপরে ক্ষতির আশংকার কথা উল্লেখ করে বুধবার দুপুরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের স্টেশন অফিসার আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে মংলা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মংলা থানায় দায়ের করা এ মামলায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ডুবে যাওয়া অয়েল ট্যাংকার ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ এর মালিকপক্ষকে আসামি করা হয়েছে।
ট্যাংকারে থাকা ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে সুন্দরবনের নদ-নদীতে। জরুরি অবস্থায়ও নদী থেকে ভাসমান তেল শোধনের ব্যবস্থা না থাকায় সুন্দরবনের প্রাণিকুলের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করছে বনবিভাগ। একই আশংকা প্রকাশ করেছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরাও। তাদের মতে সুন্দরবনের নদীতে ভাসমান তেল সেখানকার উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর জন্য বেশ ক্ষতির বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকারের পাশেই সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ডলফিনের জন্য ৩টি অভয়াশ্রম এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শ্যালা নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে ভাসমান তেল ছড়িয়ে পড়ার পর ১৫-২০ মিনিট পর পর পানির উপরিঅংশে জেগে ওঠা ডলফিনদের আর দেখা মিলছে না।
এ ব্যাপারে বাগেরহাট মাজেদা বেগম কৃষি ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়ের বর্তমান অধ্যক্ষ এবং সরকারি পিসি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ উদ্ভিদবিদ প্রফেসর শেখ বুলবুল কবির বলেন, সুন্দরবনের ব্যাপক এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়ায় (ডিও) পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়ায় ডলফিনসহ অন্য প্রাণিকুল ক্ষতিতে পড়বে।
এদিকে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় পানি দূষণ রোধে বিশেষ পাউডার ছিটানোর কথা জানিয়েছেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বিশেষ এ পাউডার নদীর পানিতে ভাসমান তেলকে নিচের দিকে তলিয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং অক্সিজেন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। চট্টগ্রাম থেকে কাণ্ডারি-১০ নামের এই জাহাজ থেকে তৈলাক্ত পানির ওপর দূর থেকে এক ধরনের পাউডার ছিটানো হবে বলে মন্ত্রী জানান।
এদিকে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটিতে চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেন, স্টেশন কর্মকর্তা আবুল কালাম, ঢাংমারী রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রলব চন্দ্র রায়কে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
শরণখোলা : ডুবন্ত ট্যাংকার থেকে বেড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল চাঁদপাই রেঞ্জের মৃগামারী, জয়মনি, আন্দারমানিক, নন্দবালা, হাড়বাড়িয়া, চাঁদপাই, শরণখোলা রেঞ্জের তাম্বুলবুনিয়া, হরিনটানাসহ বিস্তীর্ণ নদ-নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়েছে। জেলে-বাওয়ালী ও লোকালয়ের লোকজন যে যেভাবে পারছে তারা ড্রাম নিয়ে শ্যালা নদী থেকে তেল সংগ্রহ করছে। ট্যাংকারের মালিক আমির হোসেন ফরিদ ঘটনাস্থল থেকে বিকাল সাড়ে তিনটায় মোবাইল ফোনে জানান, নিখোঁজ মাস্টার মোখলেছুর রহমানকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জাহাজটি উদ্ধারে দুটি ট্যাংকার জাহাজ আনা হয়েছে। তাছাড়া, নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি উদ্ধারকারী জাহাজ আনার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। এসব কাজে বনবিভাগ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ অন্যদের সহযোগিতা তিনি পাচ্ছেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, ১১৯ ফুট দীর্ঘ, ২৪ ফুট প্রস্থ ও চারশ’ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংকারে ৬টি তেলের চেম্বার রয়েছে। এর প্রত্যেকটি থেকে এখন তেল বেরোচ্ছে। মংলা নৌবাহিনী সূত্রে জানা যায়, ট্যাংকারটি দ্রুত উদ্ধারের জন্য তাদের জাহাজ বিএনএস শাহ্ পরান দুপুর ১২টায় মংলা থেকে ঘটনাস্থলে রওনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফার্নেস অয়েল বনজ ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে যে ক্ষতি হবে, তা পূরণ হওয়ার নয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মো. আইয়াজ হোসেন চিশতি এ প্রসঙ্গে বলেন, সুন্দরবন শুধু ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট নয়। জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্রও বটে। এ ঘটনায় মাছ, কুমির, সাপ ও ডলফিনসহ সব প্রকার জলজ প্রাণীর যে ক্ষতি সাধন হবে, তা পূরণ হওয়ার নয়। ফরেস্টি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মাহামুদ হোসেন বলেন, যেহেতু তেলগুলো রিফাইন তেল। এতে ক্ষতি হয় বেশি। তবে, ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করছে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপকতার উপর। জোয়ার-ভাটায় এর বিস্তৃতি ঘটে বেশি। এভাবে বিস্তৃতি হয়ে বনের মাটির সঙ্গে গিয়ে এ তেল মিশে যায়। এতে গাছের শ্বাসমূলে তেলের আস্তরণ পড়ে। তাতে বনজ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, এ ফার্নেস অয়েলে পানিতে অক্সিজেন কমিয়ে দেবে এবং মাছসহ জলজ প্রাণী অক্সিজেন সংকটে ভুগবে। গাছপালার শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মারা যেতে পারে গাছপালা ও জলজ প্রাণী। এক কথায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে।
মংলা : নৌবাহিনীর জাহাজে ডুবুরি থাকলেও তেল সরানোর মতো আধুনিক সরঞ্জাম নেই বলে জানিয়েছেন নৌবাহিনীর ডুবুরি দল। জাহাজটির নিখোঁজ মাস্টার মোখলেছুরের কোনে সন্ধান বুধবার সকাল পর্যন্ত পাননি উদ্ধারকারীরা। ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ নামের ট্যাংকারটি গোপালগঞ্জের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য খুলনার পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে ‘টোটাল’ নামে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাউদার্ন স্টারের একপাশের খোল ফেটে যায় এবং সেটি ডুবতে শুরু করে। ট্যাংকারটির ৬টি হাউসে থাকা প্রায় সব ফার্নেস অয়েল বেরিয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে বন কর্মকর্তারা জানান।
সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার টানে এলাকা জুড়ে ভাসছে জ্বালানি তেল। জোয়ার-ভাটার টানে ভাসমান তেলের বিস্তার ঘটছে ক্রমেই। অর্ধ ডুবন্ত ট্যাংক উদ্ধার ও নিখোঁজ মাস্টারের উদ্ধারে বিরতিহীনভাবে স্থানীয় ডুবুরি দল, কোস্টগার্ড ও বনবিভাগ অভিযান চলছে। ডুবে যাওয়া কার্গো মালিক পক্ষের দাবি এ দুর্ঘটনায় প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতিপূরণ দাবি করে মংলা থানায় মামলা হয়েছে। ট্যাংকার মালিক গ্র“পের ম্যানেজার গিয়াস উদ্দিন বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন। এ দিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ মাছ ও জলজ প্রাণীর অপূরণীয় ক্ষতির আশংকা বনবিভাগের। সম্ভাব্য একশ’ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উল্লেখ করে মঙ্গলবার রাতে মংলা থানায় মামলা করেছে বনবিভাগ।
এ দিকে বুধবার সকালে ডুবন্ত ট্যাংকারটি উদ্ধারে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী নৌযান ‘প্রত্যয়’ এবং বরিশাল থেকে ‘নির্ভীক’ দুর্ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তবে এ দিন বিকাল নাগাদ উদ্ধারকারী নৌযান দুটি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারেনি। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র খুলনা বিভাগের উপ-পরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, উদ্ধারকারী ওই নৌযান দুটি পৌঁছলে প্রাথমিক সার্ভে এবং উদ্ধার কাজ শুরু হবে। তবে উদ্ধার কাজ শেষ করতে সম্ভাব্য কত দিন লাগবে তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি তিনি।

ক্ষোভ ও অসন্তোষ সংসদীয় কমিটির

বারবার তাগাদার পরও ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে এই কমিটি।
বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন সদস্যরা। এছাড়া অর্থ পাচার রোধ এবং বীমা কোম্পানিগুলোর অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বৈঠকে। কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, কমিটির বেশির ভাগ সদস্য বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার অতিরিক্ত হওয়ায় দেশে বিনিয়োগ থমকে আছে। অনেকের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত সুদের কারণে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। এ মুহূর্তে ব্যাংক সুদের হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তারা।
কমিটির একজন সদস্য জানান, ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে না আনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক বৈঠকে বলেন, ব্যাংক ঋণ নিতে গেলেই ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ সুদ দিতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে দেশে বিনিয়োগ হবে না। শিল্প-কলকারখানা হবে না। কর্মসংস্থান হবে না। তিনি বলেন, একটি-দুটি শাখা নিয়ে একটি ব্যাংক চালু করতে না করতেই, ব্যাঙের ছাতার মতো আরও শাখা গজিয়ে যায়। বছর শেষে দেখা যায় তাদের কোটি কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, এসব টাকা আসে কোত্থেকে? ব্যাংকগুলোর হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে?
বৈঠকে ড. আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। কমিটির আগের বৈঠকেও এ বিষয়ে বলা হয়েছিল। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। বিষয়টি দুঃখজনক। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বৈঠকে উপস্থিত না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এমনকি গভর্নর পর্যন্ত উপস্থিত নেই। তাহলে কমিটির বৈঠক করে লাভ কি? ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি নিজেও মন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না- এমন একটি নজিরও নেই।’
ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সফলতা ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এজন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। আগে রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত ছিল। এখন ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চ হার বিনিয়োগে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই দূর করতে হবে। কমিটির সদস্যরা তার এ বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেন, যে কোনো মূল্যে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে।
বৈঠকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা ছাড়াও অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং), বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম এবং সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক কেলেংকারি নিয়ে আলোচনা হয়। ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উপায় খুঁজে বের করার পাশাপাশি অর্থ পাচার রোধ এবং বীমা কোম্পানিগুলোর অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। টিপু মুন্শিকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির বাকি দু’জন হলেন- মো. শওকত চৌধুরী ও ফরহাদ হোসেন। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বৈঠকের শুরুতেই অর্থমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কমিটির সভাপতিসহ বাকি সদস্যরা। কমিটির সভাপতি বলেন, প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় পর এই বৈঠক। অর্থমন্ত্রী নিজে সময় দিয়েছেন। অথচ তিনি নেই। মন্ত্রী কেবিনেটের বৈঠক, একনেকের বৈঠকসহ অন্যসব বৈঠকে থাকেন। শুধু কমিটির বৈঠকে থাকেন না। দু’একটি বৈঠকে যাও ছিলেন তাও চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করেছেন। অথচ কমিটির বৈঠকে তার উপস্থিতি খুবই জরুরি। এতে জবাবদিহিতার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি আরও বাড়ে।
কমিটির সদস্যরা এ বক্তব্য সমর্থন করেন। কমিটির সদস্য টিপু মুন্শি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রলালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। কমিটির সদস্য শওকত চৌধুরী তার এ বক্তব্য সমর্থন করে বলেন. তারা আগের বৈঠকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেন। এরপর প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় চলে গেল। এই সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। কেন নেই? তার জবাব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেন না। তারা বৈঠকে উপস্থিত থাকলে ভালো হতো।
পরে কমিটির সদস্যরা আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিসহ নির্ধারিত আলোচ্যসূচি নিয়ে আলোচনা করেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠক ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার সুপারিশের বিষয়টি টেনে এনে কমিটির সভাপতি ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করব। মন্ত্রণালয় আমলে নেবে না। তাহলে সুপারিশ করে লাভ কি’? তিনি এ সময় টেবিল চাপড়িয়ে বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমাতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই’।
বৈঠকে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটি কে কোথায় কত টাকা পাচার করেছে তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এছাড়াও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের নামে কারা অর্থ পাঠিয়েছে তারও একটি পৃথক তালিকা তৈরি করতে বলেছে সংসদীয় কমিটি। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, কি পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তার সঠিক হিসাব সরকারের হাতে নেই। তার এ বক্তব্য নিয়ে কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। এ সময় কমিটির সভাপতি বলেন, ‘সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের এত তৎপরতার পরও মানি লন্ডারিং কেন রোধ করা যাচ্ছে না বুঝি না’। তিনি বলেন, ‘কে কোথায় কত টাকা পাচার করেছে তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সংসদীয় কমিটিকে জানাতে হবে। সরকারের কাছে তালিকা থাকবে না, তা হতে পারে না। ড. আবদুর রাজ্জাক এ সময় মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের নামে কতজন অর্থ পাচার করেছেন তারও একটি পৃথক তালিকা তৈরির জন্য নির্দেশ দেন। মানি লন্ডারিং বিষয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে কি পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে তার কোনো হিসাব দিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স সেল। এ নিয়ে কমিটিতে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে তারা ঘুমাচ্ছে।
বৈঠকে বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটি বীমা খাতকে সব ধরনের নেতিবাচক ধারণা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দ্রুত ‘ক্লেইম সেটেলমেন্ট’ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেয়। এছাড়াও বীমা খাতে বিদ্যমান বীমা এজেন্টদের কমিশনের হার কমানোর সুপারিশ করে কমিটি। এ প্রসঙ্গে ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোতে চলে কমিশন বাণিজ্য। এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ম্যানেজার, ইনস্যুরেন্স এজেন্টরা। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ গ্রাহক। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। তাই আমরা বলেছি, ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম কমাতে হবে। এছাড়া কমিশন প্রথা তুলে দিতে হবে।
এছাড়াও বৈঠকে চলমান প্রকল্পগুলোতে সঠিকভাবে অর্থায়ন নিশ্চিত করে নতুন প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের জন্য বেসরকারি ও সরকারি ব্যাংকগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে কমিটি। বৈঠকে কমিটির সদস্য নাজমুল হাসান, টিপু মুন্শি, মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী, ফরহাদ হোসেন, মো. শওকত চৌধুরী এবং আখতার জাহান অংশ নেন।

রেলপথ বিচ্ছিন্ন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস করেন তারা

ভৈরবের বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফখরুল আলম আক্কাছ। ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তখন হাজী আসমত কলেজ কেবিনেটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক সেনারা ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে। গণহত্যার প্রতিবাদে ভৈরবে ছাত্রদের নিয়ে প্রতিবাদ সভা ও মিছিল করেন তিনি। তখনকার টগবগে যুবক এই ছাত্রনেতা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে পরামর্শ করে ৩০ মার্চ ভৈরব থেকে ভারতের আগরতলায় চলে যান। তখন তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় ছাত্রনেতা মির্জা সুলায়মান, তারেক, হুমায়ুন কবির, রামদাশ সাহা, দয়াল সাহা। ভারতে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু না হওয়ায় দুদিন পর আবার ভৈরবে ফিরে আসেন। ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ পাক সেনারা ভৈরব শহরটি দখল করে নেয়। এদিন অস্ত্রধারী পাকসেনারা ভৈরবে চতুর্দিক থেকে গুলি করতে শহরে প্রবেশ করে। প্রবেশের সময় অনেক নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধাদের হত্যাসহ ঘরবাড়ি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ভৈরবের ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আলগড়া নামক এলাকায় খেয়া পারের জন্য অপেক্ষমাণ ৪-৫শ’ নারী, পুরুষ ও শিশুকে গুলি করে পাকসেনারা এদিন হত্যা করে।
ফখরুল আলম আক্কাছ এদিন এ খেয়াঘাটের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের আধা ঘণ্টা আগে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে তৎকালীন রায়পুরা থানার সররাবাদ গ্রামে তার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নেন বলে তিনি জানান। ওই গ্রামে কয়েকদিন থাকার পর তিনি মে মাসের দিকে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিতে পুনরায় ভারতে চলে যান।
দেড় মাস ট্রেনিং শেষে মুজিব বাহিনীর গ্রুপ কমান্ডার ভৈরবের ছাত্রনেতা ফয়সাল আলমের নেতৃত্বে তিনিসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে এদেশে প্রবেশ করেন। তিনি জানান, ভারত থেকে অস্ত্রশস্ত্র কাঁধে নিয়ে রাতের বেলায় ভৈরব আসার পথে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুর এলাকায় পৌঁছলে পাকসেনারা বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। তারা পাল্টা গুলি ছুড়ে পালাতে সক্ষম হলেও ভৈরবের মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জন পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
তিন বেলা খাবারসহ রাতে কোথায় কোন গ্রামে বা কার বাড়িতে ঘুমাবে তার কোনো ঠিক ছিল না। তিনি বলেন, কোনো কোনো দিন রাতে ঝোপজঙ্গলে বা খড়ের মধ্যে ঘুমিয়ে রাত কাটাতে হয়েছে।
এছাড়া তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে রামনগরে তিতাস গ্যাসলাইন ও সেতু ধ্বংস করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয় বলে তিনি জানান। ভৈরবের টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও ধ্বংস করে পাকসেনাদের যোগাযোগ মাধ্যম অচল করেছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতি তিনি এখনও করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল বলেই এদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। তার ডাকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি।
এ বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ভৈরব উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভৈরব পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এমপি রানাসহ ৪ জনকে গ্রেফতারে বাধা নেই

টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান ওরফে রানাসহ চারজনকে গ্রেফতার ও হয়রানি না করতে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ স্থগিত থাকছে। বুধবার স্থগিতাদেশ চলমান থাকার এ আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেন।
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, এর ফলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের গ্রেফতারে বাধা নেই। ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে এমপি আমানুর, তার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান ওরফে মুক্তি, টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহিদুর রহমান খান ওরফে কাঁকন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সানিয়াত খান ওরফে বাপ্পার পক্ষে একটি রিট আবেদন করা হয়। আদালত রিটের শুনানি না হওয়া পর্যন্ত এ চার জনকে গ্রেফতার ও হয়রানি না করার আদেশ দেন।
এ আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ১৯ নভেম্বর আবেদন করলে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের আদেশটি স্থগিত করেন। বুধবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন নিষ্পত্তি করে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
গত বছরের ১৮ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকায় নিজ বাসার কাছ থেকে ফারুকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ফারুকের স্ত্রী নাহার আহমেদ টাঙ্গাইল মডেল থানায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।
তদন্তের একপর্যায়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত আগস্টে আনিসুল ইসলাম ওরফে রাজা ও মোহাম্মদ আলী নামের দুজনকে গ্রেফতার করে। তারা এমপি আমানুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
২৭ আগস্ট আনিসুল ইসলাম ও ৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী টাঙ্গাইলের বিচারিক হাকিম আদালতে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
ওই জবানবন্দিতে এমপি রানা ও তার তিন ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান ওরফে মুক্তি, টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহিদুর রহমান খান ওরফে কাঁকন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সানিয়াত খান ওরফে বাপ্পার জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। জবানবন্দির পরপরই আÍগোপনে চলে যান জাহিদুর ও সানিয়াত।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম পরে সাংবাদিকদের বলেন, এই আদেশের ফলে সংসদ সদস্য আমানুর ও তার তিন ভাইকে গ্রেফতারে কোনো আইনি বাধা রইল না।

র‌্যাবের বিভাগীয় প্রতিবেদনে ২১ জনের নাম

ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে দায়ী করে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে র‌্যাব। প্রতিবেদনে সাবেক ঊর্ধ্বতন এ তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২১ জন জড়িত থাকার নাম এসেছে।
বিভাগীয় তদন্ত শেষে বুধবার প্রতিবেদনটি হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনটি নথিভুক্ত করে বিচারতি মো. রেজাউল হক ও বিচারতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ আগামী জানুয়ারি মাসে পরবর্তী আদেশের জন্য ধার্য করেছেন।
জড়িত অন্য যাদের নাম এ প্রতিবেদনে রয়েছে তারা হলেন- এসআই পুর্ণেন্দু বালা, এবি আরিফ হোসেন, নায়েক নাজিম, নায়েক দেলোয়ার, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক আলামিন, সিপাহী তৈয়ব, কনস্টেবল সিহাবুদ্দিন, কনস্টেবল আলামিন, হাবিলদার এমদাদ, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সৈনিক আসাদ, সার্জেন্ট এনামুল, এএসআই বজলু, হাবিলদার নাসির, সৈনিক তাজুল।
আদালত থেকে বের হয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম র‌্যাবের তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ঘটনার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ অপহরণ থেকে শুরু করে লাশ নদীতে ডুবানো পর্যন্ত লে. ক. (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কোম্পানী কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেন জড়িত ছিলেন বলে এ তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু লে. কমান্ডার (অব.) এএম রানা অপহরণ পর্যন্ত অংশ নিয়ে আংশিক জড়িত ছিলেন বলে এ তদন্তে প্রতীয়মান হয়। অন্যরা উপস্থিত থেকে সহায়তা করেছেন।
র‌্যাবের এ প্রতিবেদন তাদের অভ্যন্তরীণ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ প্রতিবেদন কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। বিচারের ক্ষেত্রে ডিবি তাদের তদন্ত, চার্জশিট, যেভাবে আদালতে তুলবে, তার ভিত্তিতে বিচার হবে। আদালত র‌্যাবকে সংস্থাটির কারা জড়িত, উদ্ধারে গাফিলতি ছিল কিনা, এ বিষয়গুলো দেখে প্রতিবেদন দিতে বলেছিলেন।
ঘটনা সম্পর্কে র‌্যাব সদরদফতর জানত কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি এটা দাখিল করেছি, সদরদফতর জানতেন কিনা, সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পড়ার পরই এটা বোঝা যাবে। পুরো প্রতিবেদন আমার পক্ষে পড়া সম্ভব হয়নি। র‌্যাব সদরদফতর জানত কিনা, সেটা দেখতে আদালতের নির্দেশনাও ছিল না।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালত মন্তব্য করেছেন, এটা যেদিন চূড়ান্ত হল তারপরও কাগজে এসেছে, অনেকে অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিচ্ছে। আমি বলেছি, এটা তো তদন্ত সংস্থা না। প্রাথমিকভাবে যারা জড়িত বলে প্রতীয়মান হয়েছে, তাদের নামই এখানে এসেছে। এর ভিত্তিতে বিচার হবে না। বিচার হবে ডিবির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।
এক সাংবাদিক বলেন, সাত খুনের পর র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, র‌্যাব এ ঘটনায় জড়িত নয়। এখন এসে বলছে, এরা জড়িত। এ বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, র‌্যাবের সেই সময়ের বক্তব্য সম্পর্কে আমি অবগত নই।
২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজন অপহরণের শিকার হন। এরপর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৩০ এপ্রিল ছয়জনের এবং পরদিন ১ মে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী একটি মামলা করে। এ মামলায় আরেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুর হোসেনসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্বে ছিল। নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাবের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন।
পরে এক স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে ৫ মে হাইকোর্টের উপরোক্ত বেঞ্চ সিআইডিকেও এ তদন্তের দায়িত্ব দেয়। বলা হয়, মূল তদন্ত ডিবিই করবে, সিআইডি করবে ছায়া তদন্ত। এছাড়া র‌্যাবের কোনো সদস্য জড়িত ছিল কিনা তার বিভাগীয় তদন্তের জন্য র‌্যাবকে নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ঘটনার সার্বিক তদন্ত করতে বলা হয়। এ আদেশের পর নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে আসছিল সংস্থাগুলো।
২৪ নভেম্বর র‌্যাব তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। বুধবার প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের মতামতের অংশ আদালতকে পড়ে শোনান অ্যাটর্নি জেনারেল। প্রতিবেদন তুলে ধরে আটর্নি জেনারেল বলেন, সাত জনকে অপহরণের পর র‌্যাব সদরদফতর থেকে তাদের জীবিত উদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু র‌্যাব-১১-এর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। ইচ্ছাকৃতভাবে বিরত থাকে।
এ অভিমত পড়ার পর আদালত বলেন, প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পরও পত্রিকায় দেখেছি ৫ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এগুলোর কি হবে? তাদের নামও এখানে নেই। প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ। কতখানি নিষ্ঠার সঙ্গে করেছে তাও ভাববার বিষয়। আদালত আরও বলেন, র‌্যাবের প্রতি অধিকাংশ মানুষের আস্থা আছে। কারো কারো ক্ষোভও আছে।
এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটা চূড়ান্ত বলে গণ্য করা যাবে না। শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলেন, এখনকার পরিস্থিতি ও তখনকার পরিস্থিতি এক নয়। হাইকোর্ট থেকে দুটি আদেশ না হলে মানুষ সাক্ষ্য দিতে আসত না। তখন সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছিল র‌্যাব জড়িত না। এরপর মানুষ সাক্ষ্য দিতে এসেছে। আদালত জানুয়ারি মাসে পরবর্তী আদেশ দেয়া হবে বলে জানান।
আগের প্রধানকে দিয়েই তদন্ত শেষ করার নির্দেশ : হাইকোর্টের আদেশে গঠিত নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনা তদন্ত কমিটির আগের প্রধান মো. শাহজাহান আলী মোল্লাকে দিয়েই তদন্ত শেষ করানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে মঙ্গলবার কমিটির প্রধান হিসেবে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুল হাকিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আর আগের প্রধান মো. শাহজাহান আলী মোল্লাকে পদোন্নতি দিয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়।
বুধবার শুনানিকালে আদালত বলেন, নিউজে দেখলাম তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। কমিটি পুনর্গঠনের আগে আদালতকে জানানো উচিত ছিল। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তাকে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ভারপ্রাপ্ত সচিব করা হয়েছে। আদালত বলেন, তাহলে নতুন চেয়ারম্যানকে তো প্রথম থেকেই শুরু করতে হবে। তাই আগে যিনি ছিলেন তিনিই দায়িত্ব পালন করবেন।
২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজন অপহরণের শিকার হন। এরপর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৩০ এপ্রিল ছয়জনের এবং ১ মে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী একটি মামলা করেন। এ মামলায় আরেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুর হোসেনসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্বে ছিল। নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাবের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন।
পরে এক স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে ৫ মে হাইকোর্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ঘটনার সার্বিক তদন্ত করতে নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের নির্দেশে ৭ মে শাহজাহান আলী মোল্লাকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দুই উপসচিব মো. আবদুল কাইয়ুম সরকার ও আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন, আইন মন্ত্রণালয়ের দুই উপসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ও মিজানুর রহমান খান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই উপসচিব শফিকুর রহমান ও সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার। এ কমিটির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে বেশ কয়েক দফায় অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। সর্বশেষ গত মাসে কমিটির পক্ষ থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে চার সপ্তাহের সময় চাওয়া হয়।
এ অবস্থায় কমিটির প্রধানকে পরিবর্তন করা হলেও আদালত আগের প্রধানকে দিয়ে তদন্ত শেষ করানোর আদেশ দিয়েছেন।

চাঁদার জন্য বাস আটকাল ছাত্রলীগ, ছাড়াল পুলিশ

(চাঁদা বৃদ্ধির দাবিতে গাবতলী-আবদুল্লাপুর রুটে চলাচলকারী নিউ পল্লবী এক্সপ্রেসের আটটি বাস রাস্তা থেকে কলেজে নিয়ে আটকে রেখেছিলেন মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা। পরে পুলিশ গিয়ে বাসগুলো ছাড়িয়ে আনে। ছবি: সংগৃহীত) গাবতলী-আবদুল্লাপুর রুটে চলাচলকারী নিউ পল্লবী এক্সপ্রেসের আটটি বাস রাস্তা থেকে কলেজে নিয়ে আটকে রেখেছিল মিরপুরের বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা। পরে পুলিশ গিয়ে বাসগুলো ছাড়িয়ে আনে। বাসের মালিকের অভিযোগ, চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বাসগুলো কলেজে নিয়ে আটকে রেখেছিলেন। নিউ পল্লবী এক্সপ্রেসের পরিচালক (অর্থ) সিরাজুল হক আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলো কার্যালয়ে এসে এই অভিযোগ করেন। সিরাজুল হক জানান, অক্টোবর মাসে তাঁরা গাবতলী-আবদুল্লাপুর রুটে ৩০টি বাস নামান। বাস চলাচল শুরুর কয়েক দিন পরই বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, এই রুটে বাস চলতে হলে কলেজ ছাত্রলীগের নেতাদের প্রতি বাসের জন্য ২০০ টাকা করে দিতে হবে। যেহেতু তাঁরা ৩০টি বাস নামিয়েছেন, কাজেই তাঁদের প্রতিদিন ছয় হাজার টাকা করে মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে। অন্যরা সবাই এভাবে দেয়। নয়তো বাস চলতে দেওয়া হবে না। অনেক বাদানুবাদের পর তাঁরা প্রতি বাসের জন্য ১০০ টাকা করে নিতে রাজি হন। এই হিসাবে প্রতিদিন ৩০টি বাসের জন্য তিন হাজার করে মাসে ৯০ হাজার টাকা দিতে হতো। দুই মাস ধরে এভাবেই চলছিল।
কিন্তু এখন ছাত্রলীগের নেতারা প্রতি বাসের জন্য ৩০০ টাকা করে চাইছেন, উল্লেখ করে সিরাজুল হক বলেন, এই টাকা দিতে রাজি না হলে কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা হুমকি দিয়ে বলেন, তাঁরা বাস চলতে দেবেন না। কিন্তু এর পরও বাস চালালে গতকাল বুধবার দুপুরে ছাত্রলীগের নেতারা কলেজের সামনের রাস্তা থেকে একে একে আটটি বাস থামিয়ে সেগুলো কলেজের মাঠে ঢুকিয়ে রাখেন। এরপর বাসমালিকপক্ষ মিরপুরের সহকারী পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বাসগুলো কলেজ থেকে বের করে আনার নির্দেশ দেন। এরপর দারুস সালাম থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা এমরানুল কবির বিপুলসংখ্যক পুলিশ নিয়ে বাসগুলো কলেজ থেকে ছাড়িয়ে আনেন।
এই ঘটনায় সন্ধ্যায় থানায় জিডি করতে গেলেও পুলিশ কোনো অভিযোগ না নিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে সমঝোতা করার নির্দেশ দেয় বলে দাবি করেন সিরাজুল। তিনি বলেন, ‘তারা (পুলিশ) বলে, ছাত্রলীগের সঙ্গে ঝামেলা করে পারবেন না। আমরা এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’
সেপ্টেম্বর মাসে এইচ এম জাহিদ মাহমুদকে সভাপতি ও মজিবুর রহমান ওরফে অনিককে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের বাংলা কলেজের কমিটি গঠন করা হয়। চাঁদাবাজির এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে জাহিদ মাহমুদ অভিযোগ অস্বীকার করেন। আজ দুপুরে তিনি প্রথম আলো কে বলেন, ‘আমরা তখন ক্যাম্পাসে ছিলাম না। খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। পরে আমরা জানতে পারি এই কোম্পানির কোন বাস নাকি কলেজের এক ছাত্রের মোটরসাইকেল ভেঙে দিয়েছিল। তাই ছাত্ররা ওই বাসগুলো কলেজে ঢুকিয়েছিল। কিন্তু আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসগুলো ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি।’ কোন ছাত্রের মোটরাসাইকেল ভেঙেছিল, জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কোনো নাম বলতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছিলাম কলেজের ছাত্ররা কয়েকটি বাস আটকে রেখেছে। পরে পুলিশ গিয়ে বাসগুলো ছাড়িয়ে এনেছে।’ বাসের মালিকপক্ষ মামলা করতে চাইলেও মামলা নেওয়া হয়নি, এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, কেউ তো মামলা করতে আসেনি।’
পুলিশের মিরপুর অঞ্চলের উপকমিশনার নিশারুল আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি থানাকে বলেছি চাঁদার মামলা নিতে। মামলা না নিলে কেন নেওয়া হলো না, সেটি আমি দেখব।’

দুদিন পর উদ্ধার হলো জাহাজ- ছড়িয়ে পড়া তেল ফোম দিয়ে তুলবে গ্রামবাসী

(সুন্দরবনের শ্যালা নদীর মৃগমারী এলাকা। পানিতে কালো তেলের স্তর। গতকাল দুপুর ১২টায় ছবিটি তুলেছেন এহসান উদ্‌দৌলা) সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল ফোমের সাহায্যে সংগ্রহ করবে স্থানীয় গ্রামবাসী। আগামী দুই থেকে তিন দিন সংগ্রহের এই কাজ চলবে। এ সময় পর্যন্ত কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হবে না। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সকাল ১০টার দিকে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি তেল নিয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজটি টেনে তীরে নিয়ে আসে মালিকপক্ষ। ডুবে যাওয়ার দুদিন পর জাহাজটিকে দেশীয় পদ্ধতিতে তীরে টেনে আনা হয়। গত মঙ্গলবার ভোরে ফার্নেস তেলবাহী ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ অপর একটি মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া তেলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সুন্দরবন। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পরে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মো. শামসুদ্দোহা খন্দকার সাংবাদিকদের জানান, ‘আমাদের একটা অভিজ্ঞতা আছে। দেড় বছর আগে বিষখালী নদীতে এ রকম একটি জাহাজডুবি হয়েছিল, যার মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ তেল ছিল। সেই তেলও বের হয়ে এসেছিল। সেই তেল গ্রামের লোকজন ফোম দিয়ে বের করে এনেছিল। আজকে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, গ্রামের লোকজন তেল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারবে। পদ্মা অয়েল দুটি পারচেজিং সেন্টার খুলছে। তারাই এই তেল কিনে নেবে। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্রামবাসী তেল সংগ্রহ করে নিতে পারবে।’
তেলের দূষণ নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম থেকে আসা জাহাজ কান্ডারি-১০ ব্যবহার করা হবে কি না, জানতে চাইলে শামসুদ্দোহা বলেন, তেল সংগ্রহের কাজ আগামী তিন দিন পর্যন্ত চলবে। এরপর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। আলোচনা চলাকালে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, কান্ডারি কাজ করার আগে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া দরকার। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি রাসায়নিক ব্যবহারে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তাহলে কী হবে? এ সময় শামসুদ্দোহা স্থানীয়ভাবে ফোমের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করার প্রস্তাব দেন। জাহাজটি যেখানে ডুবেছে সেই চ্যানেলের  ছোট খালগুলো জাল দিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমীর হোসাইন চৌধুরী।  
সকাল ১০টার দিকে ডুবে যাওয়া তেলবাহী জাহাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন জানান, তিনটি কার্গো জাহাজ ও স্থানীয় ডুবুরিদের সহায়তায় দেশীয় পদ্ধতিতে ডুবন্ত জাহাজটিকে তাঁরা তীরের দিকে টেনে নেন।
গত মঙ্গলবার ভোরে ফার্নেস তেলবাহী ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ অপর একটি মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। এ ঘটনায় সুন্দরবনের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা অনুসন্ধানে জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল শিগগিরই বাংলাদেশে আসতে পারে। গতকাল পর্যন্ত জাহাজটি উদ্ধার বা দূষণ নিয়ন্ত্রণে তেল অপসারণের তৎপরতা শুরু হয়নি। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রওনা হয় কান্ডারি-১০ নামের একটি জাহাজ। সেটি পৌঁছানোর আগেই দেশীয় পদ্ধতিতে জাহাজটি উদ্ধার করা সম্ভব হলো। তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকাটি সরকার ঘোষিত ডলফিনের অভয়ারণ্য। এ ছাড়া সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য এবং জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। জাতিসংঘের ওই দুই সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনের ভেতর এই এলাকা দিয়ে নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ। বন বিভাগ থেকে একাধিকবার এবং জাতিসংঘের জলাভূমিবিষয়ক সংস্থা রামসার কর্তৃপক্ষ, বিজ্ঞান-শিক্ষা ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে নৌপথটি নিয়ে আপত্তি তুলে তা বন্ধের আহ্বান জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন টেমেসিস গতকাল এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল বন্ধে সরকারের কাছে আবার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। এ ধরনের বনের ভেতর দিয়ে নৌযান চললে তা দীর্ঘ মেয়াদে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে।
পলিন টেমেসিস বলেন, সুন্দরবনের যে এলাকাটিতে তেল ছড়িয়ে পড়েছে, এটি বিশ্বের বিপদাপন্ন দুই প্রজাতি গাঙ্গেয় ও ইরাবতি ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র। এ ছাড়া অনেক সমৃদ্ধ জলজ প্রাণী রয়েছে সেখানে। সুন্দরবন ইউনেসকো ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্য। তাই সুন্দরবনের ভেতরে এই দুর্ঘটনায় জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সুন্দরবনের ভেতরে জাহাজডুবিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক বিবৃতিতে বলেন, সরকার সুন্দরবনের গুরুত্ব সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকে তার সুরক্ষার পরিবর্তে বনটির ভেতর দিয়ে বড় নৌযান চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্য যথেষ্ট যে, সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কতটা অরক্ষিত এবং এর নিকটবর্তী নদী দিয়ে তেল, কয়লা বা বিষাক্ত বর্জ্য পরিবহন কতটা বিপৎ​জনক হতে পারে।
এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌপথ এবং এর পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তার কিছুটা লক্ষণ এই দুর্ঘটনা থেকে দেখা গেল। সরকার এখনই যদি নৌপথ বন্ধ না করে এবং রামপাল প্রকল্প সুন্দরবনের পাশ থেকে সরিয়ে না নেয়, তাহলে আমরা সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান হারাব তো বটেই, একসময় বনটিই ধ্বংস হয়ে যাবে।’

অপমানিত, ক্ষুব্ধ সাবিনা ইয়াসমীন by মনজুর কাদের

বিটিভির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে নির্মিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা বলেও শেষ মুহূর্তে অংশ নেননি সেরাকণ্ঠখ্যাত গায়ক ইমরান। তাঁর এই আচরণে অপমানিত, ক্ষুব্ধ হয়েছেন কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন। এ প্রসঙ্গে সাবিনা ইয়াসমীন বলেন, ‘গান গাইতে এসেছে এখনো দুদিন হয়নি। তার মতো একটা বাচ্চা ছেলের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। আমি রীতিমতো অপমানিত ও ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে বিস্মিত তার এই আচরণে। ওর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সত্যিই ক্ষমার অযোগ্য। কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না। গান গাইতে এসে অল্প কদিনের মধ্যেই যদি এমন আচরণ হয়, তাহলে তো তার ভবিষ্যৎ​ অন্ধকার দেখছি।’
একজন শিল্পীকে কেবল ভালো গান গাইলেই চলে না, মানুষ হিসেবেও ভালো হতে হয়। এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন ও অপেশাদার আচরণ ইমরানের বড় শিল্পী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বললেন, ‘একজন শিল্পীর জীবনে কমিটমেন্ট রক্ষা করাটা অনেক বেশি জরুরি।’
বিটিভির সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে সাত দিনের অনুষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সাবিনা ইয়াসমীনের এই অনুষ্ঠান। ৬ ডিসেম্বর সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে নির্মিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ইমরান তাঁর সম্মতি জানিয়েছিলেন। কথা ছিল, সাবিনা ইয়াসমীনের একটি কালজয়ী দ্বৈত গানে কণ্ঠ দেবেন ঝিলিক ও ইমরান। ৯ তারিখ গানটি ধারণ করার তারিখও নির্ধারিত ছিল। যথাসময়ে ঝিলিক বিটিভির স্টুডিওতে হাজির হলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ইমরান সেখানে উপস্থিত হননি।
সাবিনা ইয়াসমীন বলেন, ‘ইমরানের এ আচরণ অপেশাদার। বিটিভির এই অনুষ্ঠানের জন্য আমিই ঝিলিক, কোনাল ও ইমরানের নাম প্রস্তাব করি। এর মধ্যে অসুস্থ সত্ত্বেও ঝিলিক ও কোনাল অনুষ্ঠানের কাজ খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছে। ইমরান অসুস্থতার কথা বললেও শুনেছি সে মোটেও অসুস্থ ছিল না।’
এদিকে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি ইমরান। তিনি বলেন, ‘গানটি ধারণের দেড়-দুই ঘণ্টা আগে আমি বুঝতে পারি আমার কণ্ঠ গান গাওয়ার অবস্থায় নেই। আমি আমার অপারগতার কথা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিই। আমি তাঁদের অন্য একজন শিল্পীকে খুঁজে নেওয়ারও অনুরোধ করি।’
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে ইমরান অবশ্য প্রথমে গান ধারণের এক দিন আগে অর্থাৎ ৮  ডিসেম্বর অপারগতা প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। পরে আবার নিজে থেকেই ৯ ডিসেম্বরের কথা বলেন।
এদিকে সাবিনা ইয়াসমীনকে নিয়ে নির্মিত এ অনুষ্ঠানটির সমন্বয়কারী আরিফ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইমরান কথা দিয়ে কথা রাখেনি। তার অপেশাদার আচরণের কথা অনেকের কাছ থেকেই শুনেছি। এবার নিজেই সেই আচরণের শিকার হলাম।’
এদিকে অনুষ্ঠানটির প্রযোজক মাহবুবা ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিটিভির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে আমরা সাত দিনের অনুষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে সাবিনা ইয়াসমীনের এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ইমরান অংশগ্রহণের ব্যাপারে সম্মতি জানায়। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে অপারগতার কথা জানানোয় একজন গুণী শিল্পীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে, পাশাপাশি বিষয়টি টেলিভিশনের জন্য দুঃখজনক।’
এদিকে অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিটিভির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি রেকর্ডিংয়ের দিন সন্ধ্যায় না হলেও ১০ বার ফোন করেছি। অথচ সে ফোন ওঠানোর প্রযোজন মনে করেনি। এমনকি পরে কলব্যাকও করেনি। তার এই আচরণ সত্যিই দুঃখজনক।’

গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানো হয়েছে: খালেদা জিয়া

গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে তিনি বলেছেন, বর্তমানে আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব চরম সংকটাপন্ন। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানো হয়েছে। আধিপত্যবাদ আজও ডানা বিস্তার করে রেখেছে। কারণ ৫ই জানুয়ারীর তামাশার নির্বাচন করে গণতন্ত্রবিনাশী আধিপত্যবাদের শিখন্ডি উৎপীড়ক শাসকশ্রেণী জনমতকে রক্তাক্ত পন্থায় দমন করে ক্ষমতা জবরদখল করে রেখেছে। আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার প্রথম তুর্যবাদক মওলানা ভাসানীর উদ্যোম ও সাহসিকতাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলেই আগ্রাসী শক্তিকে আমরা রুখতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ। খালেদা জিয়া বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সকল স্বৈরশাসকের অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা এবং দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশপ্রেমিক মজলুম জননেতা মরহুম মওলানা ভাসানীর অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। রাজনৈতিক জীবনে তিনি আজীবন শোষিতের পক্ষ নিয়ে শাসকগোষ্ঠীকে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তিনি নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সকল সময় থেকেছেন আপোষহীন নেতৃত্বের ভূমিকায়। দেশ ও জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রান মরহুম আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বলিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকা আমাদেরকে চিরদিন একটি শক্তিশালী এবং আত্মনির্ভশীল দেশ ও সমাজ বিনির্মানে প্রেরণা ও উৎসাহ যোগাবে। তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে চলতে পারলেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোন কঠিন বাধাই আমাদের পথ আগলাতে সক্ষম হবে না। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতির  প্রতি  গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

অ্যাডিলেড টেস্ট- সুসংহত অস্ট্রেলিয়া

ভারতের বিপক্ষে অ্যাডিলেড ভেন্যু স্বাগতিকদের কাছে পয়মন্ত সাব্যস্ত হচ্ছে আরও একবার। বৃষ্টির কারণে গতকাল  টেস্টের দ্বিতীয় দিন খেলা হলো মাত্র ৩০.৪ ওভার। তবে মেঘলা আকাশের ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে আলো ছড়ালেন মাইকেল ক্লার্ক ও স্টিভ স্মিথ। ডেভিড ওয়ার্নারের পর ভারতের বিপক্ষে অ্যাডিলেড টেস্টের প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি তুলে নিলেন অস্ট্রেলিয়ার এ দুই ব্যাটসম্যান । সপ্তম উইকেটে ১৬৭ রানের জুটি গড়েন ক্লার্ক-স্মিথ। এতে চার ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে মজবুত অবস্থায় স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া। ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ইনিংসে তিনজন পৃথক অসি ব্যাটসম্যানকে সেঞ্চুরি হাঁকাতে দেখা গেল এ নিয়ে ৬ বার।  এর তিনবারই অসিরা এমন কৃতিত্ব দেখালেন অ্যাডিলেডের মাঠে। এতে গতকাল ৫১৭/৭ সংগ্রহ নিয়ে অ্যাডিলেডে  দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ স্মিথ ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে গতকাল অপরাজিত থাকেন ১৬২ রানে। ২৩১ বলের ইনিংসে স্মিথ হাঁকান ২১টি বাউন্ডারি। আর অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের সেঞ্চুরিটা লড়াকু নৈপুণ্যের। ইনজুরি নিয়ে অনিশ্চয়তা শেষে অ্যাডিলেড টেস্টে খেলতে নামেন মাইকেল ক্লার্ক। আর প্রথম দিন ব্যক্তিগত ৬০ রানের মাথায় পিঠের চোট নিয়ে অবসরে যান অসি অধিনায়ক। গতকাল ভারত দলে অভিষিক্ত লেগ স্পিন তারকা করণ শর্মার ডেলিভারিতে চেতেশ্বর পুজারার হাতে ক্যাচ দেয়ার আগে মাইকেল ক্লার্ক ১৬৩ বলে করেন ১২৮ রান। ইনিংসের শেষ ভাগে অল্প বিরতিতে নাইটওয়াচম্যান নাথান লায়ন ও উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ব্র্যাড হ্যাডিন উইকেট হারালে আম্পায়াররা দিনের খেলা শেষ করেন ৪ বল বাকি রেখেই। তবে আগের দিনের ৩৫৪/৬ সংগ্রহ নিয়ে গতকাল সকালে ক্লার্ক শুরুটা করেন স্বাচ্ছন্দ্য ব্যাটিংয়েই। গতকাল শুরুর ৬ ওভারে ৬টি বাউন্ডারি হাঁকান অসি ব্যাটসম্যানরা। ক্লার্ক হাঁকান এর তিনটি। বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে অসি ব্যাটসম্যানরা দেখান মনোসংযোগের আলাদা উদাহরণ। বৃষ্টির বাগরায় গতকাল অ্যাডিলেডে খেলা বন্ধ হয় দু’দফা। প্রথমবার ৯৮ রানে অপরাজিত ছিলেন স্টিভ স্মিথ। বৃষ্টি শেষে ক্রিজে ফিরে যথারীতি সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন স্মিথ। দ্বিতীয় দফা বৃষ্টিতে অপরাজিত ৯৮ রানে মাঠ ছাড়তে হয় মাইকেল ক্লার্ককে। বৃষ্টি শেষে খেলায় ফিরে ক্লার্কও স্বাচ্ছন্দ্যে তুলে নেন সেঞ্চুরি। প্রয়াত ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজের স্মৃতি অসিরা তারকারা তাজা রাখেন অ্যাডিলেডের দ্বিতীয় দিনেও। সেঞ্চুরি শেষে মাঠের ‘৪০৮’ চিহ্ন আঁকা জায়গায় পৌঁছে প্রয়াত হিউজকে নিজের শতক উৎসর্গ করেন স্টিভ স্মিথ। ফিলিপ হিউজ অস্ট্রেলিয়া দলের ৪০৮তম টেস্ট ক্রিকেটার। আর গতকাল অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের আবেগ প্রকাশের ধরনটা ছিল ভিন্ন। সেঞ্চুরি শেষে ক্রিজে এক হাতে ব্যাট উঁঁচিয়ে অবনত মুখে মৌন দাঁড়িয়ে হিউজের প্রতি সম্মান দেখান মাইকেল ক্লার্ক। অ্যাডিলেডে দুই দিনে ১২০ ওভারে অসি ব্যাটসম্যানরা শূন্যে ভারতীয় ফিল্ডারদের সুযোগ দেন কমই। এতে অসি ব্যাটসম্যানরা বাউন্ডারি হাঁকান মোট ৬৭ বার। ছক্কার মার নেই একটিও।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
টস: অস্ট্রেলিয়া, ব্যাটিং
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১২০ ওভার; ৫১৭/৭ ব্যাটিং (স্মিথ ১৬২*, ক্লার্ক ১২৮, ওয়ার্নার ১৪৫, শামি ২/১২০, বরুন ২/১৩৬, করণ ২/১৪৩)।
তৃতীয় দিন শুরু: ভোর ৫:৩০ (স্টার স্পোর্টস)

ক্রিকেটাঙ্গনে থমথমে নীরবতা- দেশে নেই আজীবন নিষিদ্ধ বাদল

অনেক স্বপ্ন নিয়ে গড়া দল লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের টিকে থাকার খেলা দেখা গেল না লুৎফর রহমান বাদলকে। আগের রাতেই তিনি জেনে গিয়েছিলেন তাকে নিষিদ্ধের ফরমান। লাগাম ছাড়া কথার জের যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আগে আঁচ করতে পারেন নি ক্রিকেটে অন্তপ্রাণ এ সংগঠক। যখন বুঝতে পেরে বিবৃতি দিলেন তখন তা আর কাজে দেয় নি। ফলে ক্ষমতাসীনদের দাপটে তার ওপর নেমে আসে নিষেধাজ্ঞার খড়গ। বিসিবি সভাপতি ও কর্তাদের উদ্দেশে তার গালাগাল নিন্দনীয় ছিল, ছিল মাত্রা ছাড়া কিন্তু তার ওপর আরোপিত শাস্তিও কি মাত্রার বাইরে হলো না-এ বিতর্ক এখন ক্রীড়াঙ্গনে। যেখানে পাতানো ম্যাচ খেলার দায়ে কেউ আজীবন নিষিদ্ধ হন না সেখানে এ শাস্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া লুৎফরকে গালিগালাজ করে যারা মিছিল-মিটিং করলেন তারাই বা কেন শাস্তির উর্ধ্বে? পক্ষ বা প্রতিপক্ষ সংগঠকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারা এ সংগঠক আগে থেকেই অনেকের চক্ষুশূল। মোহমেডান, ভিক্টোরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত গত আসরে নিজেই কিনে নেন একটি ক্লাব। দলকে শিরোপা জেতান প্রথম আসরেই। এবারও ওই দল গড়েন শিরোপা জেতার লক্ষ্যে। নাম পরিবর্তন করেন বিশ্বসেরা ক্রিকেটার শচীনকে উড়িয়ে এনে। তার রাতারাতি আলোচনায় উঠে আসা অনেকের কাছে তাকে ঈর্ষার পাত্রে পরিণত করে। ফলে তাকে ঘায়েল করার জন্য ওৎ পেতে ছিলেন অনেকেই। অপেক্ষায় ছিলেন তার ভুলের। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন-এই সত্যের উদাহরণ রেখে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিলেন অনেকেরই প্রিয় এ সংগঠক। তিনি যাদের প্রিয়পাত্র, ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে তারাও এখন নীরব দর্শক। গতকাল ফতুল্লাহ স্টেডিয়ামে ছিল প্রিমিয়ার লীগে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের অস্তিত্বের লড়াই।
সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে মুশফিকুর রহীমের প্রাইম দোলেশ্বরকে হারিয়ে সুপার লীগে খেলার আশা দলটি বাঁচিয়ে রেখেছে সুপার লীগে খেলার আশা। কিন্তু দলের জয়ের পরও ক্লাবটির দুই-একজন কর্মকর্তাকে দেখা গেলেও তারা ছিলেন ভারাক্রান্ত। লুৎফর রহমান ছাড়াও মাঠে আসেননি ৫ বছরে জন্য নিষিদ্ধ যুগ্ম সম্পাদক ও ম্যানেজার তারিকুল ইসলাম টিটু ও ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ দলটির কর্মকর্তা সাব্বির রহমান রুবেলও। এই তিন জনের মুঠো ফোনও সারাদিনই বন্ধ ছিল। লুৎফর রহমান বাদলের কাওরান বাজারস্থ অফিস সূত্রে জানা যায় তিনি রয়েছেন দেশের বাইরে। আর এ বিষয়ে যেহেতু বিসিবি’র কাছ থেকে অনুষ্ঠানিক কোন চিঠি তারা পাননি তাই এখনই তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি নন। জানা গেছে, ফতুল্লা থানায় দায়ের করা মামলার জেরে গতকাল সকালে টিটুর বাসায় পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। তবে সংবাদটির সত্যতা জানেন না বলে জানিয়েছেন মামলার বাদি ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার বাবুল মিয়া। এমনকি টিটুর সঙ্গেও এই ঘটনার সত্যতা জানতে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে লুৎফর রহমান বাদল ও তার সহযোগীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কথা বলতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কেউই কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে বিসিবি’র সভাপতি ও পরিচালকদের সম্পর্কে বাদলের করা আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে সিসিডিএম ও আম্পায়ার্স কমিটির সুপারিশে বিসিবি’র ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাকে বিসিবি’র সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকান্ড থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করেন। এ সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ইমেইলের মাধ্যমে প্রেরিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় ‘সিসিডিএম ও আম্পায়ার্স কমিটির সুপারিশক্রমে বিসিবি’র ডিসিপ্লিনারি কমিটি এক জরুরি সভার আয়োজন করে। লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের চেয়ারম্যান জনাব লুৎফর রহমান বাদল কর্তৃক সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট সহ নির্বাচিত পর্ষদ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সম্পর্কে অশালীন, আপত্তিকর, শিষ্টাচার বর্হিভূত আচরণ এবং ক্রিকেটকে অবমাননা করে মিথ্যা ভিত্তিহীন বক্তব্যের উপর বিস্তারিত আলোচনা হয়। উল্লেখ্য যে, উক্ত মন্তব্য দেশ ও বিদেশে বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে।’ এ বিষয়ে সভায় তাকে বিসিবি’র অধিনস্ত সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সঙ্গে উদ্ধত আচরণের জন্য দলটির ম্যানেজার তারিকুল ইসলাম টিটুকে ৫ বছরে জন্য  ও কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদকে ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গতকাল শেষ বিকলে দলের জয়ের পর মাঠে আসেন দলের সেক্রেটারি রিচার্ডস। তবে তিনি এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি দলের ক্রিকেটারদেরও সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কোন রকম কথা বলতে দেয়া হয়নি। লুৎফর রহমান বাদল এর আগে নানা ঘটনায় তার নিজ ক্লাব মোহামেডান থেকে বেরিয়ে ভিক্টোরিয়া ক্লাব কিনে নিয়েছিলেন। সে বছরই সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালকে দলে টেনে তিনি দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। এরপর ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে তিনি গাজী ট্যাংক ক্লাব কিনে নিয়ে লীগে অংশ নেন। সেই দলেও ছিলেন সাকিব- তামিম। এবার তারই নাম বদলে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জ রাখেন নারায়ণগঞ্জে জন্ম নেয়া লুৎফর রহমান।

সরকার একটি মানুষকেই ভয় পায়, তিনি তারেক রহমান -মির্জা ফখরুল

সরকার কেবল তারেক রহমানকেই ভয় পায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বরেছেন, বর্তমান সরকার শুধু একটি মানুষকেই ভয় পায়, তিনি তারেক রহমান। এজন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। তাকে ভয় পাওয়ার একটিই কারণ, তারেক রহমান দেশের মানুষের নয়নমণি। তিনি দেশে ফিরলে লাখ লাখ মানুষের যে ঢল বয়ে যাবে তাতে সরকার ভেসে যাবে বানের জলের মতো। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মহিলা দল আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন। মির্জা আলমগীর বলেন, এই অবৈধ সরকার জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে আছে। এ পাথরকে সরাতে আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। এ জন্য ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান তিনি। নারী ইস্যুতে মহিলা দলকে আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার তাগিদ মির্জা আলমগীর বলেন, নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য দলের মধ্যেও আপনাদের সোচ্চার হতে হবে। পুলিশ যেদিন নারী শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালালো সেদিনই মহিলা দলের উচিত ছিল রাজপথে নেমে আসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপর পুরুষ পুলিশরা কি নির্মমভাবে পেছন থেকে লাথি মেরেছে, এর বিরুদ্ধেও মহিলা দলের রাস্তায় নামা উচিত ছিল। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, বিশ্ব মানবাধিকার দিবস গেল। ওইদিন মহিলা দল এই অবৈধ-অনৈতিক সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত ও গুমের শিকারে পরিণত হওয়া হতভাগ্যদের মা-বোন, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মহিলা দল একটি মিছিল করতে পারতো। যা অনেক আন্দোলনের চেয়ে বেশি কার্যকর হতো। মির্জা আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নারীস্থান বলে যা বোঝাতে চান তার সঙ্গে আমরা একমত নই। প্রধানমন্ত্রী নারী, সংসদ উপনেতা নারী, স্পিকার নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী। নারীর এই ক্ষমতায়নের জন্য যদি তিনি নারীস্থান বলে থাকেন তাহলে তার সঙ্গে আমরা একমত নই। একদিকে তারা নারীস্থান বলে অন্যদিকে নির্যাতন করে। আমরা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তার বক্তব্যে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. তুহিন মালিকের নামে মামলার প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বলেন- দেশে নাকি মিডিয়া অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে। আজকে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই মামলা হয়। হয়রানি করা হয়। এক তরুণ একটি প্যারোডি লেখার কারণে তাকে সাত বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। ফেসবুকে একটি লাইন লেখার জন্য একজন উচ্চ পদস্থ সামরিক অফিসারের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। আমরা কথা বললেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। এই হচ্ছে তার নমুনা।

‘মৃত্যুদণ্ডকে হত্যাকাণ্ড বলায় কাদেরের ছেলের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত’ -অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম

মানবতাবিরোধী অপরাধে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডকে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলায় তার ছেলের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, আমাদের সর্বোচ্চ আদালত যে বিচার করেছেন, সেই বিচারের পরে তাকে দ- প্রদান করা হয়েছে। এটাকে যদি কাদের মোল্লার পরিবার হত্যা বলে ধরে নেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার প্রসেডিং শুরু করা উচিত বলে আমি মনে করি। এর আগে আব্দুল কাদের মোল্লার ছেলে হাসান জামিল বলেছেন, ‘আমার বাবা দুনিয়া থেকে বিদায়ের আগে জানতেই পারল না, সংবিধান অনুসারে তার রিভিউ করার অধিকার আছে কি না। যখন আইনের পূর্ণাঙ্গ আশ্রয় নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন সেটা হত্যাকা- ছাড়া  আর কিছু নয়।’ আজ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, আমার পিতাকে হত্যার ৩৪৮ দিন পর আপিল বিভাগ থেকে আমার বাবার দায়ের করা রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এই রায়ে রিভিউ মেইনটেইনেবল বলে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়, রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করা যাবে। অথচ রায় প্রকাশের সাত দিনের মাথায় তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।’ কাদের মোল্লার ছেলে বলেন, ‘এই সরকার আমার পিতাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। এমনকি এই জালেম সরকার আমার পরিবারের সদস্যদের জানাজায় অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়নি। আমার বাবার মৃতদেহ শেষবারের মতো একবার দেখার সুযোগও দেয়া হয়নি। ওই রাতে আমাদের পরিবারের ওপর হামলা হল, জেলে নেওয়া হল। এটা এতোবড় জুলুম যা অবশ্যই দেশবাসী বিচার করবেন।’ সংবাদ সম্মেলনে কাদের মোল্লার স্ত্রী সানোয়ার জাহান, দুই আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খান ও সাইফুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

রোকেয়া কী নামে স্বাক্ষর করতেন by একেএম শাহনাওয়াজ

বাংলার নারী জাগরণের অগ্রপথিক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পার হল দু’দিন আগে। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে যে দুঃখ করেছিলাম প্রায় এক যুগ আগে, তার উপশম হল না এখনও। মহীয়সী রোকেয়া ইতিহাসচর্চাবিমুখ আমাদের সমাজ বাস্তবতায় খণ্ডিত হয়ে গেলেন। এতে কালের অলিন্দে রোকেয়ার কৃতিত্ব প্রজন্মের কাছে ধূসর হয়েছে। দিন দিন ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফিকে হয়ে যেতে পারে সহজেই। নারীবাদী চর্চা যারা করেন, নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বলয় থেকে বের করে আনতে চান, তাদের উপলব্ধিতে প্রথম আনতে হবে ‘বেগম’ শব্দ চয়ন ও প্রয়োগের ভ্রান্তি। আমরা যারা ইতিহাস গবেষণা পদ্ধতি মানার চেষ্টা করি, তারা জানি এক একটি বিশেষ শব্দ কীভাবে ইতিহাসের ঘটনা ও সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। এসব শব্দের ভুল ব্যবহার বিভ্রান্ত করতে পারে ইতিহাসের সত্যকে। এসব অসাবধানী শব্দ চয়ন যুগ যুগ ধরে বিনা বাধায় চলে; তবে ইতিহাসের শুদ্ধতার স্বার্থে দৃষ্টি আকর্ষণের প্রথম সুযোগেই এ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
মনে পড়ে, প্রায় এক যুগ আগে একই বিষয়ে ইতিহাসের সত্য বিকৃতির আশংকায় একটি জাতীয় দৈনিকে নিবন্ধ লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল ‘বেগমের খোলসে অবরোধবাসিনী রোকেয়া’। সেই লেখাটি সুধী মহলে খুব একটা নাড়া দিতে পারেনি। প্রশ্নটি নিয়ে কেউ নতুন করে ভাবতে চাননি। আমার স্বজন একজন বাংলার অধ্যাপিকা, একই সঙ্গে যিনি একজন কথাসাহিত্যিকও, লেখাটি পড়ে বরঞ্চ আমাকে মৃদু তিরস্কার করেছিলেন। বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘বেগম রোকেয়া’, এ নিয়ে আবার বিতর্ক তোলা কেন! আমি বুঝলাম এখানে নতুন করে যুক্তি দেয়া বৃথা। যেখানে ইতিহাসচর্চায় যুক্ত সুধীজন এসব নিয়ে ভাবতে চান না, সেখানে অধ্যাপিকা সরল দৃষ্টিতে বিচার করলে কতটুকুই বা দোষ দেয়া যায়! তবে ভালো লেগেছিল কলকাতার সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টেলিফোন পেয়ে। ঘটনাক্রমে লেখাটি তার নজরে এসেছিল। তিনি আমার অনুমতি নিয়ে লেখাটি কলকাতার দুটি কাগজে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা পশ্চিমবঙ্গে একটি বড় সংগঠন পরিচালনা করেন। নাম জওঠঊজ। সংগঠনটির প্রধান কাজ রোকেয়া চর্চা করা। অনেকটা আমার শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের বইপড়া আন্দোলনের মতো। তারা রোকেয়া চর্চা ছড়িয়ে দিচ্ছেন স্কুল-কলেজে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হল, তারা আমার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে সাংগঠনিকভাবে ‘বেগম রোকেয়া’ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন এ সংগঠনটি তাদের সব প্রকাশনায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নাম লেখেন। আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরছি।
এক. ‘বেগম’ শব্দটি রোকেয়ার নামের কোনো অংশ নয়। রোকেয়ার লেখা বইগুলোতে তিনি নিজ নাম লিখেছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। স্কুল যখন পরিচালনা করতেন তখন দাফতরিক প্রয়োজনে চিঠিপত্রে যে স্বাক্ষর দিতেন তাতে সাধারণত লিখতেন আর.এস. হোসেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠিপত্রে স্বাক্ষর করতেন রোকেয়া বা রুকু নামে। বোঝা যায়, একজন মুসলিম মহিলাকে সম্মান দেখিয়ে ‘বেগম’ বলা হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়’। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কি হতে পারে ‘জনাব কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’?
দুই. ‘বেগম’ শব্দটি যদি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলার পরিচিতির পরিপূরক হয়, তবে একসময় নারী প্রগতির পুরোধা হিসেবে রোকেয়ার ঔজ্জ্বল্য খণ্ডিত হতে পারে। কারণ তখন কৌতূহলী কারও মনে হতে পারে উনিশ শতকে রোকেয়া আর কতটা নারী প্রগতির পক্ষে সমাজকে এগিয়ে দিতে পেরেছিলেন, যিনি নারীত্বের প্রতীক ‘বেগম’ নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি! সেসময় তো জনে জনে বলা যাবে না এ অপকীর্তিটি পরবর্তীকালের অসতর্ক বাঙালির।
তিন. রোকেয়ার আত্মকথা পড়লে জানতে পারি, সেই সাধারণ রুকুর মহীয়সী রোকেয়া হওয়ার পেছনে দু’জন পুরুষের অবদানকে বড় করে দেখেছেন রোকেয়া। একজন তার ভাই ইব্রাহিম সাবের। তিনি সে যুগে সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে গভীর রাতে নিভৃতে প্রদীপ জ্বালিয়ে বোনকে ইংরেজি শেখাতেন। এভাবে রোকেয়াকে আধুনিকমনস্ক করে তুলেছিলেন তিনি। অন্যজন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন। যিনি স্ত্রীর নারী শিক্ষা বিস্তারের আগ্রহকে সম্মান জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর মেয়েদের জন্য স্কুল গড়ার আকাক্সক্ষা যাতে বাস্তবায়িত হয় সে জন্য রেখে গিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা। রোকেয়ার নারী অগ্রগতির আন্দোলনে পুরুষ বিদ্বেষ ছিল না। ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অচলায়তন ভাঙার লড়াই। তাই নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম যুক্ত করতে পেরেছিলেন অবলীলায়।
আমরা ইতিহাসচর্চাবিমুখ থাকায় বা গভীরভাবে সমকাল বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া ভুল শব্দ ব্যবহার করে ইতিহাসের সত্যে পৌঁছার পথে বাধা সৃষ্টি করি। ‘বেগম’কে নামের অংশ বানাতে গিয়ে এমন সংকট অনেক সৃষ্টি করেছি।
এ দেশে ইতিহাস গবেষকদের একটি বড় অংশ প্রচীন ও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস- বিশেষ করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিল্প ইতিহাসচর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। দুর্ভাগ্য এই যে, নিজ গবেষণা ক্ষেত্র না হওয়ায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের নতুন গবেষণালব্ধ তথ্য জানার আগ্রহও তেমন একটা দেখাতে পারেননি। এ কারণে এক যুগেরও আগে মুদ্রা-শিলালিপি ও স্থাপত্যের মতো আঁকর সূত্র বিশ্লেষণ করে ঢাকা নগরীর প্রাচীনত্ব নিয়ে সেমিনার হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জার্নালে প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে। প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় হাজার বছর আগেও ঢাকায় নাগরিক জীবনের অস্তিত্ব ছিল। লিপি প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে প্রায় ছয়শ’ বছর আগে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার একটি বড় অঞ্চলে স্বাধীন সুলতানরা প্রদেশ গড়ে তুলেছিলেন যার নাম ছিল মুবারকাবাদ। এ প্রদেশের রাজধানী ছিল ঢাকায়। তারপরও ঢাকার বয়স চারশ’ বছর বলে প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে সাধারণ মানুষকে চারশ’ বছরে আটকে ফেলা হয়েছে। এ রাজধানী ঢাকার প্রাচীনত্ব জানার একটি শিলালিপি এখনও সাঁটা রয়েছে নারিন্দা মসজিদের গায়ে। ‘মোসামাৎ বখত বিনত’ নামে একজন মুসলিম মহিলা এ মসজিদটি ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু বখত বিনতের দুর্ভাগ্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতোই। কারণ ইতিহাস গবেষক থেকে সাধারণ লেখক সবাই নারিন্দার এ মসজিদের নাম লিখেছেন ‘বিনত বিবির মসজিদ’। উল্লিখিত এ শিলালিপি ছাড়া বখত বিনতকে জানার আর কোনো সূত্র নেই। শিলালিপির কোথাও ‘বিবি’ কথাটির উল্লেখ নেই। ধারণা করা যায়, বখত বিনত একজন মুসলিম মহিলা হওয়ায় কোনো এক অসাবধান উচ্চারণে ‘বিনত বিবি’ হয়ে গেছেন। গবেষকরাও গবেষণার রীতি পদ্ধতি না মেনে গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে মসজিদের নির্মাতাকে ‘বিনত বিবি’ বলে ফেলেছেন। অগ্র পশ্চাতে আর কিছু না থাকায় আজ ঢাকার ইতিহাস পুনর্লিখনে গবেষকরা ইতিহাস-বিচ্যুতিতে ভুগতে পারেন। নারিন্দা মসজিদের এ শিলালিপিটি ছিল ফার্সি ভাষায় লেখা। লিপি সাক্ষ্য থেকে তথ্য নিলে বখত বিনতকে আরেকটু স্পষ্ট করা যেত। কারণ সেখানে নির্মাতাকে একটু বিস্তারিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মোসামাৎ বখত বিনত দোখতারে মারাহমাত’ অর্থাৎ জনৈক মারাহমাতের কন্যা মোসামাৎ বখত বিনত। এখন অসতর্ক লেখা ও বলায় ‘বখত বিনত’ পিতৃপরিচয় হারিয়ে ‘বিনত বিবি’ হয়ে ইতিহাসকে সূত্রচ্যুত করে ফেলেছেন। বখত বিনত নন, আমরাই মূর্খের মতো এ কর্মটি করেছি।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে একই দুর্ভাগ্য বরণ করছি আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়সহ রোকেয়া সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান- যেখানে এখনও রোকেয়া বা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামের আগে ‘বেগম’ ঝুলে আছে, সেখান থেকে ‘বেগম’ ছেঁটে দেয়া আশু জরুরি। যদি ইতিহাসে মহীয়সী রোকেয়ার কৃতিত্বকে উজ্জ্বল রাখতে চাই, তবে ‘বেগম’ রক্ষা করার মতো কোনো যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
আমি ধন্যবাদ জানাই ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে’র চারজন শিক্ষার্থীকে। যাদের কথা ছাপা হয়েছে গত ৮ ডিসেম্বরের যুগান্তরে সুরঞ্জনা পাতায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামের ভুল প্রয়োগ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রজন্মের এই সচেতনতা আমাদের আশাবাদী হতে শক্তি জোগায়। আমরা অমন পীড়াদায়ক ‘বেগম’ থেকে উপমহাদেশের নারী প্রগতির অগ্রনায়ক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে মুক্তি দিয়ে নিজেদের অজ্ঞানতার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কর্মচারীদের পেশাজীবী সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নের রাজনৈতিক আচরণ by মোঃ ফিরোজ মিয়া

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সমিতি ছাড়াও কর্মচারীদের বেশকিছু পেশাজীবী সংগঠন রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় এমন ব্যক্তিদের দ্বারা বা সমন্বয়ে গঠিত পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যুক্ত হতে এবং কর্মচারী পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় এমন পেশাজীবীদের যুক্ত হতে দেখা যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এরূপ পেশাজীবী সংগঠনের ফেডারেশনও রয়েছে, যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয়, প্রজাতন্ত্রের চাকরিজীবী এবং প্রজাতন্ত্রের চাকরিজীবী নয়, এমন পেশাজীবীদের সমন্বয়ে কোনো পেশাজীবী সংগঠন গঠন করা বা এরূপ সংগঠনের ফেডারেশন গঠন করা আচরণবিধি সমর্থন করে কি-না?
আইন-বিধি সর্বদাই আইনি ভাষায় (ল ল্যাংগুয়েজ) লেখা হয়। আইন ও বিধির কিছু বিষয় থাকে প্রকাশ্য এবং কিছু বিষয় থাকে অন্তর্নিহিত। যে কারণে আইন ও বিধিকে সাধারণ অর্থে ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না। আইন ও বিধিকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এর অন্তর্নিহিত অর্থকেও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে বিভিন্ন পেশাজীবী রয়েছেন। বিদ্যমান আচরণবিধির প্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যায় প্রতীয়মান হয় যে, প্রজাতন্ত্রের চাকরিরত পেশাজীবীদের সমন্বয়ে পেশাজীবী সংগঠন বা সমিতি গঠন আচরণবিধি দ্বারা সমর্থিত। কিন্তু ওই সংগঠনে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় এমন কোনো ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা আচরণবিধি সমর্থন করে না। এছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কোনো পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যও কোনো কর্মচারী হতে পারেন না বা থাকতে পারেন না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত পেশাজীবী সংগঠন বা সমিতি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দ্বারা গঠিত নয় এমন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে ফেডারেশনও করতে পারে না। এছাড়া প্রজাতন্ত্রের পেশাজীবী কর্মচারীদের এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় এমন পেশাজীবীদের সমন্বয়ে কোনো পেশাজীবী সংগঠন গঠন করা বা এরূপ কোনো ফেডারেশন গঠন করা আচরণবিধি দ্বারা সমর্থিত নয়।
তবে কোনো নির্দিষ্ট পেশার উন্নয়ন, উৎকর্ষ সাধন, সেবা, কল্যাণ ইত্যাদি এবং সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত সংগঠনে সরকারের অনুমোদনক্রমে যুক্ত হওয়া বা তার সদস্য বা কর্মকর্তা হওয়ার ক্ষেত্রে আচরণবিধি অন্তরায় নয়।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত পেশাজীবী সংগঠন কেবল তাদের চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকারের কাছে দাবি-দাওয়া পেশ করতে পারে। কিন্তু এজন্য কোনোরূপ মিছিল, মিটিং বা চাকরির শৃংখলার পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপ করতে পারে না। এছাড়া কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত কোনো পেশাজীবী সংগঠন বা সমিতি কোনোরূপ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবেই জড়িত হতে বা থাকতে পারে না। রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা, মৌন মিছিল, মানববন্ধন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতে বা তা সংগঠনে বা আয়োজনে কোনোরূপ সাহায্য বা সহযোগিতা করতে পারে না। তারা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো নির্বাচনে কোনোরূপ সমর্থন, সাহায্য বা সহযোগিতা করতে পারে না। যার কারণে কোনো কল্যাণমূলক সংগঠন বা তার কোনো অংশ যখনই কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে বা গোপনে যুক্ত হয় বা যুক্ত হয়েছে বলে ধারণা জন্মে, তখন প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী ওই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না। তাকে অবশ্যই ওই সংগঠনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়।
শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক, মজুরি নির্ধারণ ও পরিশোধ, দুর্ঘটনায় জখমের কারণে ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্পবিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং চাকরির অবস্থা ও পরিবেশ ইত্যাদি উদ্দেশ্যে শ্রম আইন, ২০০৬ জারি করা হয়। এই আইনানুযায়ী শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক অথবা শ্রমিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থাৎ শ্রমিকস্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার বিধান রয়েছে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বাধিক তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন করা যায় এবং প্রতিটি ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা মোট শ্রমিকের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হতে হয় এবং একই শ্রমিক একসঙ্গে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হতে পারে না। এছাড়া শ্রমিকদের নিজ পছন্দমতো যে কোনো ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানের অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ কোনো শ্রমিককে তার পছন্দ অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান করতে বাধ্য করা বা কোনো ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান থেকে বিরত রাখা যায় না। আইন অনুযায়ী প্রতিটি ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রিকৃত হতে হয়। অরেজিস্ট্রিকৃত কোনো ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য ভর্তি বা কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করলে এর জন্য আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। রেজিস্ট্রিকৃত ট্রেড ইউনিয়নের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচনের, সমিতির প্রশাসন ও কর্মতৎপরতা, সংগঠনের ও কর্মসূচি প্রণয়নের অধিকার রয়েছে।
রেল বিভাগ, ডাক, তার ও টেলিফোন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, গণস্বাস্থ্য বিভাগ, বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়- এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের এবং বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর শ্রমিকদেরও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের যাদের ওপর সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধি প্রযোজ্য, তারা ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য, কর্মকর্তা বা কর্মচারী হতে পারেন না।
ট্রেড ইউনিয়নের মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যই হল শ্রমিক ও মালিক সম্পর্ক বজায় রাখা, শ্রমিকস্বার্থ সংরক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি এবং এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটিমাত্র দরকষাকষি প্রতিনিধি (সিবিএ) থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠানে একাধিক ট্রেড ইউনিয়ন থাকার ক্ষেত্রে গোপন ভোটের মাধ্যমে সিবিএ প্রতিনিধি নির্বাচণের বিধান রয়েছে।
শ্রম আইন অনুযায়ী যৌথ দরকষাকষির প্রতিনিধির (সিবিএ) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কোনো কমিটি, আলাপ-আলোচনা, সালিশ, মধ্যস্থতা সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পর্কে মালিককে অবহিত করা ব্যতীত এবং অন্য কোনো শ্রমিক মালিকের বিনা অনুমতিতে তার কর্ম সময়ে কোনো ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকতে পারেন না। এছাড়া ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের এবং শ্রমিকদের অসৎ আচরণের জন্য জেল-জরিমানারও বিধান রয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, কীরূপ কার্যকলাপ অসৎ আচরণের আওতায় পড়ে? অনেক অসৎ আচরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসৎ আচরণগুলো হচ্ছে- কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক ইউনিয়ন বা ওই ইউনিয়নের পক্ষে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো শ্রমিককে কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য বা কর্মকর্তা হতে বা সদস্য বা কর্মকর্তা হওয়া থেকে বিরত থাকতে ভীতি প্রদর্শন বা প্রলুব্ধ করা; কোনোরূপ ভীতি প্রদর্শন, বল প্রয়োগ, চাপ প্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক, শারীরিক আঘাত, পানি, শক্তি বা টেলিফোন সুবিধা বিচ্ছিন্ন করা বা কোনো ট্রেড ইউনিয়নের তহবিলে চাঁদা প্রদান করার বা না করার জন্য বাধ্য করা; প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃংখলতা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ বা ভাংচুর করা; কর্তৃপক্ষের আইনসঙ্গত বা যুক্তিসঙ্গত আদেশ এককভাবে বা সংঘবদ্ধভাবে ইচ্ছাকৃতভাবে লংঘন; প্রতিষ্ঠানের আইন-বিধি অমান্য করা ইত্যাদি। এছাড়া যে কোনো অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় মালিক বা তার প্রতিনিধিকে কোনো দাবিনামায় দস্তখত করতে বা কোনো দাবি গ্রহণ করতে বা মেনে নিতে বাধ্য করা; বেআইনি ধর্মঘট, ঘেরাও, পরিবহন বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা কোনো সম্পত্তির ধ্বংস সাধন করা।
ট্রেড ইউনিয়নের উদ্দেশ্য ও তার সদস্য বা সিবিএ কর্মকর্তাদের আচরণ বিশ্লেষণে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, তারা শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমবিষয়ক কার্যক্রম ছাড়া অন্য কোনো কার্যক্রমে জড়িত হতে পারে না। এছাড়া রেজিস্ট্রিকৃত প্রতিটি ট্রেড ইউনিয়নেরই একটি বাধ্যতামূলক গঠনতন্ত্র থাকে, ওই গঠনতন্ত্রের বাইরে কোনো কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করা যায় না। সুতরাং ট্রেড ইউনিয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কোনোক্রমেই রাজনৈতিক কোনো কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে পারে না, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা দলকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য-সহায়তাও করতে পারে না।
সুতরাং প্রজাতন্ত্রের পেশাজীবী কর্মচারীদের সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো তাদের নিজেদের চাকরিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বা কোনো কল্যাণমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
মোঃ ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থের লেখক

সাড়ে সাত কোটির প্রত্যেকেরই স্ট্যাটাস নির্ধারণ করুন by মোঃ আলী হায়দার

মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে ১৫ সেপ্টেম্বর যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। মজার বিষয় হল, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ ছাড়াই শুধু মুক্তিযোদ্ধা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিদের পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের তুঘলকি কাণ্ড কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১১ ক্যাটাগরির ব্যক্তিদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। তারা হলেন- ১. যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। ২. যেসব পেশাজীবী বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ৩. যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ৪. সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার বাহিনীর যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ৫. মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের যথাক্রমে এমএনএ ও এমপিএরা। ৬. পাকবাহিনী ও তার সহযোগী বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত নারীরা। ৭. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী-কলাকুশলীরা। ৮. স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা। ৯. মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ডাক্তার, নার্স, সহকারীরা। ১০. মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের কর্মচারীরা। ১১. মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের জেলা, মহকুমা ও থানা পর্যায়ের নেতারা।
সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাড়া উল্লিখিত ১১ ক্যাটাগরির যেসব ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে তা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। মুক্তিযোদ্ধা একটি বিশাল ব্যঞ্জনা, একে এত সরলীকরণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ক্যাম্পে নাম লেখালেই কি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? মুজিব বাহিনীর সদস্যদের ট্রেনিং শেষ হওয়ার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তারা যুদ্ধ করারও সুযোগ পায়নি। যারা ভারতে গিয়ে নিরাপদে থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গেয়েছেন বা ফুটবল খেলেছেন বা মুজিবনগর সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; তাদের সঙ্গে রণাঙ্গনে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে বনে-জঙ্গলে খেয়ে না খেয়ে যারা পাকবাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করেছেন, তাদের একই কাতারে ফেলা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্তা বলা যায় না। মুক্তিযোদ্ধা কারা তা মুক্তিযোদ্ধা শব্দের মধ্যেই বলা আছে। মুক্তির জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা। যারা যুদ্ধ করেনি, তারা কখনও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হতে পারেন না। তাই যারা রণাঙ্গনে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন কেবল তাদেরই মুক্তিযোদ্ধা বলা যেতে পারে। এছাড়া অন্যান্য যারা গান গেয়ে, ফুটবল খেলে বা প্রবাসী সরকারের চাকরি করে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন; তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের ‘সহযোগী’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, তবে তারা কোনোভাবেই মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন না। মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হলে মুক্তিযোদ্ধাদের শৈর্য-বীর্য, গৌরব ও আত্মত্যাগকে খাটো করা হবে।
লক্ষণীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার বাহিনীর যারা ২৫ মার্চ রাতেই সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছেন, তাদের ৪নং ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে! আর যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতে গিয়ে ট্রেনিং ক্যাম্পে কেবল নাম লিপিবদ্ধ করেছেন, তাদের ১নং ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে! অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার প্রধান যোগ্যতাই ধরা হয়েছে সীমান্ত অতিক্রম করা। ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী সীমান্ত অতিক্রম না করে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সংগ্রাম কমিটির সদস্য না হয়ে ’৭১ সালে যারা দেশের অভ্যন্তরে থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তারা কেউই মুক্তিযোদ্ধা বলে গণ্য হবেন না! মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী টাঙ্গাইলের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী অথবা নরসিংদীর শিবপুরের বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধারা- যারা দেশের অভ্যন্তরে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারা কেউই মুক্তিযোদ্ধা বলে গণ্য হবেন না!!
১৯৭১ সালে যেসব নারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিতা (ধর্ষিতা) হয়েছেন তাদেরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হবে! স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসর দালাল-রাজাকারদের দ্বারা যেসব নারী ধর্ষিতা হয়েছিল, তাদের বীরঙ্গনা আখ্যায়িত করে সম্মানিত করেছিলেন। শেখ মুজিব যাদের বীরঙ্গনা আখ্যায়িত করেছিলেন তাদের সেই পদবি পরিবর্তন করা শেখ মুজিবের প্রতি চরম অবমাননার সামিল বলেই আমি মনে করি।
তাছাড়া ধর্ষিতারা মুক্তিযোদ্ধা হয় কীভাবে? ধর্ষণ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কোটি কোটি মানুষ পাকবাহিনী কর্তৃক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছে। তাহলে তাদেরও তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা উচিত।
আশ্চর্যের বিষয় হল, মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বেঁধে দিয়েছে। ১৫ বছরের নিচে কেউ মুক্তিযেদ্ধা হলেও তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে! মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বেঁধে দেয়ার ক্ষমতা কে দিয়েছে? মহান মুক্তিযুদ্ধ ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে কার্যকর করার মতো কোনো সরকারি আদেশ নয়। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য বয়সের কোনো শর্ত ছিল না, তাই ১৫ বছর বয়সের নিচে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে তাদের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার বিরল গৌরব হরণ করার কোনো অধিকার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের আছে বলে মনে করি না। এ ক্ষেত্রে ১৫ বছরের কম বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করার কাজটি কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের একটি দাড়ি, কমা সেমিকলন পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না; এটা ছিল একটা গণযুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুষ্টিমেয় দালাল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ছাড়া দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা, সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, সরকারি কর্মচারী এবং ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর মানুষ অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য কোনো শর্ত ছিল না, ছিল না কোনো নির্দিষ্ট বয়স। যে যেভাবে পেরেছে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর শর্ত আরোপ করে মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণের কোনো অবকাশ নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র এক কোটি মানুষ প্রাণের ভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সাড়ে ছয় কোটি মানুষ দেশের অভ্যন্তরে থেকে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আশংকা নিয়ে এক ভয়াবহ দুঃসহ-দুঃস্বপ্নের সময় অতিবাহিত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করেছে। তাদের জান-মাল-ইজ্জতের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। সেটা যে কী এক ভয়াবহ অবস্থা ছিল, তা এ মুক্ত স্বাধীন দেশে থেকে কোনোভাবেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কেবল ভুক্তভোগীরাই তা উপলব্ধি করতে পারে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও অবরুদ্ধ সাড়ে ছয় কোটি মানুষ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা করেছে। নিজেরা অভুক্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়েছে; ওষুধ, রসদ সরবরাহ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীনতার ৪৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ বাংলাদেশের সাড়ে ছয় কোটি মানুষের মর্যাদা কী, তা নির্ধারণ করা হয়নি। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদে থেকে গান গেয়ে, ফুটবল খেলে বা মুজিবনগর সরকারের অধীনে বেতন নিয়ে চাকরি করে এখন যদি কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হতে পারে; তবে যারা দেশের অভ্যন্তরে থেকে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আশংকা নিয়ে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা করেছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তারা কী হিসেবে গণ্য হবে? এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম এনায়েত উল্লাহ খানের সেই বিখ্যাত নিবন্ধ ‘সিক্সটি ফাইভ মিলিয়ন কোলেবারেটর’-এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণের যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে তাতে কেবল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত গমনকারীদের বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা সীমান্ত অতিক্রম করেনি- সেই সাড়ে ছয় কোটি মানুষের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে কি এ সাড়ে ছয় কোটি মানুষের কোনো ভূমিকা ছিল না? এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। তাই শুধু মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করলেই হবে না, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস দেশে অবরুদ্ধ সাড়ে ছয় কোটি জনগণের স্ট্যাটাস কী তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ, ৩০ লাখ মানুষ এদের মধ্য থেকেই শহীদ হয়েছে, এদের মধ্য থেকেই ৩ লাখ মা-বোন ইজ্জত দিয়েছে। এদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই পাক হায়েনাদের হিংস আক্রমণে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে এদের আত্মত্যাগ খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ কোনো কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি। কিন্তু এখন ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, বর্ধিত চাকরি, কোটা সুবিধা ইত্যাদি প্রদান করে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে খাটো করা হচ্ছে। চাকরির বর্ধিত সুবিধা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির কোটা সুবিধা ইত্যাদি অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাই ভোগ করতে পারছে না। কারণ অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা যে সুবিধা ভোগ করতে পারে না; সে সুবিধা না দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কেননা এতে সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া ঢালাওভাবে সুবিধা দেয়া ঠিক নয়। যেমন প্রয়োজন না থাকলেও অনেক সচ্ছল ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দেয়া হচ্ছে। এভাবে ঢালাওভাবে সুবিধা না দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। ঢালাওভাবে সুযোগ সুবিধা দেয়ার কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সনদ জাল হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া ঠিক আছে; তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতি-পুতিকে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কোনো যুক্তি নেই।
মোঃ আলী হায়দার : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পথে by তারেক শামসুর রেহমান

বাংলার নারী জাগরণের অগ্রপথিক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পার হল দু’দিন আগে। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে যে দুঃখ করেছিলাম প্রায় এক যুগ আগে, তার উপশম হল না এখনও। মহীয়সী রোকেয়া ইতিহাসচর্চাবিমুখ আমাদের সমাজ বাস্তবতায় খণ্ডিত হয়ে গেলেন। এতে কালের অলিন্দে রোকেয়ার কৃতিত্ব প্রজন্মের কাছে ধূসর হয়েছে। দিন দিন ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফিকে হয়ে যেতে পারে সহজেই। নারীবাদী চর্চা যারা করেন, নারীকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বলয় থেকে বের করে আনতে চান, তাদের উপলব্ধিতে প্রথম আনতে হবে ‘বেগম’ শব্দ চয়ন ও প্রয়োগের ভ্রান্তি। আমরা যারা ইতিহাস গবেষণা পদ্ধতি মানার চেষ্টা করি, তারা জানি এক একটি বিশেষ শব্দ কীভাবে ইতিহাসের ঘটনা ও সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। এসব শব্দের ভুল ব্যবহার বিভ্রান্ত করতে পারে ইতিহাসের সত্যকে। এসব অসাবধানী শব্দ চয়ন যুগ যুগ ধরে বিনা বাধায় চলে; তবে ইতিহাসের শুদ্ধতার স্বার্থে দৃষ্টি আকর্ষণের প্রথম সুযোগেই এ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
মনে পড়ে, প্রায় এক যুগ আগে একই বিষয়ে ইতিহাসের সত্য বিকৃতির আশংকায় একটি জাতীয় দৈনিকে নিবন্ধ লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল ‘বেগমের খোলসে অবরোধবাসিনী রোকেয়া’। সেই লেখাটি সুধী মহলে খুব একটা নাড়া দিতে পারেনি। প্রশ্নটি নিয়ে কেউ নতুন করে ভাবতে চাননি। আমার স্বজন একজন বাংলার অধ্যাপিকা, একই সঙ্গে যিনি একজন কথাসাহিত্যিকও, লেখাটি পড়ে বরঞ্চ আমাকে মৃদু তিরস্কার করেছিলেন। বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘বেগম রোকেয়া’, এ নিয়ে আবার বিতর্ক তোলা কেন! আমি বুঝলাম এখানে নতুন করে যুক্তি দেয়া বৃথা। যেখানে ইতিহাসচর্চায় যুক্ত সুধীজন এসব নিয়ে ভাবতে চান না, সেখানে অধ্যাপিকা সরল দৃষ্টিতে বিচার করলে কতটুকুই বা দোষ দেয়া যায়! তবে ভালো লেগেছিল কলকাতার সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টেলিফোন পেয়ে। ঘটনাক্রমে লেখাটি তার নজরে এসেছিল। তিনি আমার অনুমতি নিয়ে লেখাটি কলকাতার দুটি কাগজে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা পশ্চিমবঙ্গে একটি বড় সংগঠন পরিচালনা করেন। নাম জওঠঊজ। সংগঠনটির প্রধান কাজ রোকেয়া চর্চা করা। অনেকটা আমার শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের বইপড়া আন্দোলনের মতো। তারা রোকেয়া চর্চা ছড়িয়ে দিচ্ছেন স্কুল-কলেজে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হল, তারা আমার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে সাংগঠনিকভাবে ‘বেগম রোকেয়া’ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন এ সংগঠনটি তাদের সব প্রকাশনায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নাম লেখেন। আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরছি।
এক. ‘বেগম’ শব্দটি রোকেয়ার নামের কোনো অংশ নয়। রোকেয়ার লেখা বইগুলোতে তিনি নিজ নাম লিখেছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। স্কুল যখন পরিচালনা করতেন তখন দাফতরিক প্রয়োজনে চিঠিপত্রে যে স্বাক্ষর দিতেন তাতে সাধারণত লিখতেন আর.এস. হোসেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চিঠিপত্রে স্বাক্ষর করতেন রোকেয়া বা রুকু নামে। বোঝা যায়, একজন মুসলিম মহিলাকে সম্মান দেখিয়ে ‘বেগম’ বলা হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়’। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কি হতে পারে ‘জনাব কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়’?
দুই. ‘বেগম’ শব্দটি যদি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম মহিলার পরিচিতির পরিপূরক হয়, তবে একসময় নারী প্রগতির পুরোধা হিসেবে রোকেয়ার ঔজ্জ্বল্য খণ্ডিত হতে পারে। কারণ তখন কৌতূহলী কারও মনে হতে পারে উনিশ শতকে রোকেয়া আর কতটা নারী প্রগতির পক্ষে সমাজকে এগিয়ে দিতে পেরেছিলেন, যিনি নারীত্বের প্রতীক ‘বেগম’ নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি! সেসময় তো জনে জনে বলা যাবে না এ অপকীর্তিটি পরবর্তীকালের অসতর্ক বাঙালির।
তিন. রোকেয়ার আত্মকথা পড়লে জানতে পারি, সেই সাধারণ রুকুর মহীয়সী রোকেয়া হওয়ার পেছনে দু’জন পুরুষের অবদানকে বড় করে দেখেছেন রোকেয়া। একজন তার ভাই ইব্রাহিম সাবের। তিনি সে যুগে সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে গভীর রাতে নিভৃতে প্রদীপ জ্বালিয়ে বোনকে ইংরেজি শেখাতেন। এভাবে রোকেয়াকে আধুনিকমনস্ক করে তুলেছিলেন তিনি। অন্যজন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন। যিনি স্ত্রীর নারী শিক্ষা বিস্তারের আগ্রহকে সম্মান জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর মেয়েদের জন্য স্কুল গড়ার আকাক্সক্ষা যাতে বাস্তবায়িত হয় সে জন্য রেখে গিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা। রোকেয়ার নারী অগ্রগতির আন্দোলনে পুরুষ বিদ্বেষ ছিল না। ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অচলায়তন ভাঙার লড়াই। তাই নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম যুক্ত করতে পেরেছিলেন অবলীলায়।
আমরা ইতিহাসচর্চাবিমুখ থাকায় বা গভীরভাবে সমকাল বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া ভুল শব্দ ব্যবহার করে ইতিহাসের সত্যে পৌঁছার পথে বাধা সৃষ্টি করি। ‘বেগম’কে নামের অংশ বানাতে গিয়ে এমন সংকট অনেক সৃষ্টি করেছি।
এ দেশে ইতিহাস গবেষকদের একটি বড় অংশ প্রচীন ও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস- বিশেষ করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিল্প ইতিহাসচর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। দুর্ভাগ্য এই যে, নিজ গবেষণা ক্ষেত্র না হওয়ায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের নতুন গবেষণালব্ধ তথ্য জানার আগ্রহও তেমন একটা দেখাতে পারেননি। এ কারণে এক যুগেরও আগে মুদ্রা-শিলালিপি ও স্থাপত্যের মতো আঁকর সূত্র বিশ্লেষণ করে ঢাকা নগরীর প্রাচীনত্ব নিয়ে সেমিনার হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জার্নালে প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে। প্রামাণ্যভাবে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় হাজার বছর আগেও ঢাকায় নাগরিক জীবনের অস্তিত্ব ছিল। লিপি প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে প্রায় ছয়শ’ বছর আগে ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার একটি বড় অঞ্চলে স্বাধীন সুলতানরা প্রদেশ গড়ে তুলেছিলেন যার নাম ছিল মুবারকাবাদ। এ প্রদেশের রাজধানী ছিল ঢাকায়। তারপরও ঢাকার বয়স চারশ’ বছর বলে প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে সাধারণ মানুষকে চারশ’ বছরে আটকে ফেলা হয়েছে। এ রাজধানী ঢাকার প্রাচীনত্ব জানার একটি শিলালিপি এখনও সাঁটা রয়েছে নারিন্দা মসজিদের গায়ে। ‘মোসামাৎ বখত বিনত’ নামে একজন মুসলিম মহিলা এ মসজিদটি ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু বখত বিনতের দুর্ভাগ্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতোই। কারণ ইতিহাস গবেষক থেকে সাধারণ লেখক সবাই নারিন্দার এ মসজিদের নাম লিখেছেন ‘বিনত বিবির মসজিদ’। উল্লিখিত এ শিলালিপি ছাড়া বখত বিনতকে জানার আর কোনো সূত্র নেই। শিলালিপির কোথাও ‘বিবি’ কথাটির উল্লেখ নেই। ধারণা করা যায়, বখত বিনত একজন মুসলিম মহিলা হওয়ায় কোনো এক অসাবধান উচ্চারণে ‘বিনত বিবি’ হয়ে গেছেন। গবেষকরাও গবেষণার রীতি পদ্ধতি না মেনে গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে মসজিদের নির্মাতাকে ‘বিনত বিবি’ বলে ফেলেছেন। অগ্র পশ্চাতে আর কিছু না থাকায় আজ ঢাকার ইতিহাস পুনর্লিখনে গবেষকরা ইতিহাস-বিচ্যুতিতে ভুগতে পারেন। নারিন্দা মসজিদের এ শিলালিপিটি ছিল ফার্সি ভাষায় লেখা। লিপি সাক্ষ্য থেকে তথ্য নিলে বখত বিনতকে আরেকটু স্পষ্ট করা যেত। কারণ সেখানে নির্মাতাকে একটু বিস্তারিত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মোসামাৎ বখত বিনত দোখতারে মারাহমাত’ অর্থাৎ জনৈক মারাহমাতের কন্যা মোসামাৎ বখত বিনত। এখন অসতর্ক লেখা ও বলায় ‘বখত বিনত’ পিতৃপরিচয় হারিয়ে ‘বিনত বিবি’ হয়ে ইতিহাসকে সূত্রচ্যুত করে ফেলেছেন। বখত বিনত নন, আমরাই মূর্খের মতো এ কর্মটি করেছি।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে একই দুর্ভাগ্য বরণ করছি আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়সহ রোকেয়া সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান- যেখানে এখনও রোকেয়া বা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামের আগে ‘বেগম’ ঝুলে আছে, সেখান থেকে ‘বেগম’ ছেঁটে দেয়া আশু জরুরি। যদি ইতিহাসে মহীয়সী রোকেয়ার কৃতিত্বকে উজ্জ্বল রাখতে চাই, তবে ‘বেগম’ রক্ষা করার মতো কোনো যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
আমি ধন্যবাদ জানাই ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে’র চারজন শিক্ষার্থীকে। যাদের কথা ছাপা হয়েছে গত ৮ ডিসেম্বরের যুগান্তরে সুরঞ্জনা পাতায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামের ভুল প্রয়োগ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রজন্মের এই সচেতনতা আমাদের আশাবাদী হতে শক্তি জোগায়। আমরা অমন পীড়াদায়ক ‘বেগম’ থেকে উপমহাদেশের নারী প্রগতির অগ্রনায়ক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে মুক্তি দিয়ে নিজেদের অজ্ঞানতার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের সঙ্গে জলপথে যোগাযোগে আগ্রহী মমতা

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পপতিদের নিয়ে শিল্প সম্ভাবনার খোঁজে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লঞ্চবিহারে সুন্দরবন গিয়েছিলেন। শিল্পপতিরা ছাড়াও সঙ্গী হিসেবে ছিলেন আমলা ও সাংস্কৃতিক জগতের অনুগত কয়েকজন। এই সফরে মমতা বাংলাদেশের সঙ্গে জলপথে পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। সেইমতো তিনি সংশ্লিষ্ট আমলাদের নির্দেশও দিয়েছেন। অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের জলপথে যোগাযোগকে আরও প্রসারিত করতে দুই দেশের সরকারর মধ্যে ইতিমধ্যেই কথা শুরু হয়েছে। কলকাতা থেকে জলপথে আশুগঞ্জ বন্দর হয়ে ত্রিপুরায় চালও যাওয়াও শুরু হয়েছে। তেমনি কলকাতা থেকে জলপথে বিশাল বিশাল বার্জে করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই বাংলাদেশে যাচ্ছে নিয়মিত। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জলপথে যোগাযোগ আরও প্রসারিত করতে চান দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অন্যান্য যোগাযোগ বৃদ্ধির স্বার্থে। দুই দিনের সুন্দরবনে লঞ্চবিহারে শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে। শিল্পপতিরাও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে সামিল হবার  প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। গত বুধবারই মুখ্যমন্ত্রী সুন্দরবন সফর শেষে কলকাতায় ফিরে এসেছেন। তবে প্রবল কুয়াশা ও ভাটার টান থাকায় মুখ্যমন্ত্রীও অন্যান্যরা লঞ্চে ১১ ঘণ্টা আটকে চিলেন। তবে এতে কোন অসুবিধা হয় নি। বরং মুখ্যমন্ত্রীর আগ্রহে গান বাজনা চলেছে অনেকটা সময় ধরেই । মুখ্যমন্ত্রী নিজেও তাতে গলা মিলিয়েছেন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা

সৌদি আরবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এক বাংলাদেশীকে। তার নাম রফিক তাজুল ইসলাম (৩২)। তার বাড়ি শরীয়তপুর জেলার খোলাপাড়া। তাকে যে গুলি করেছে সে একজন মুয়াজ্জিন। তার অনুপস্থিতিতে আযান দিতেন রফিক। কিন্তু রোববার ওই মুয়াজ্জিন অনুপস্থিত ছিল। ফলে এদিন আযান দেন রফিক। কিন্তু যথাসময়ে তিনি আযান দিতে পারেন নি। বিলম্বে তিনি আযান দিয়েছেন- এ অপরাধে ক্ষিপ্ত হয়ে বাংলাদেশের রফিক ও ভারতের এক অভিবাসীর ওপর গুলি করে। এতে রফিক নিহত হন। আহত হন ভারতীয় ওই অভিবাসী। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মাজমাহ জেলার ওরটাবিয়াহ এলাকার একটি মসজিদে রোববার আসরের ওয়াক্তের সময় আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছুলে রক্তাক্ত অবস্থায় রফিকের মৃতদেহ উদ্ধার করে। আহত ভারতীয় কর্মী দুটি গুলির ক্ষত নিয়ে মাজমাহ জেলার কিং খালেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। পুলিশ তার নাম প্রকাশ না করলেও জানিয়েছে সে আশঙ্কামুক্ত। পুলিশ সন্দেহভাজন হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করেছে।

শেষ পর্যন্ত...

বলিউড তারকাদের প্রেমের খবর খুব বেশি দিন গোপন থাকে না। কয়েকদিন চুপিসারে প্রেম চললেও যথাশিগগির সেটা অকপটে স্বীকার করেন। এ যেমন বিরাট কোহলি ও আনুশকার প্রেমের খবর শুরুর দিকে গোপন থাকলেও এক সময় তারা বিভিন্নভাবে তা প্রকাশ করেছেন। আর তাদের দেখেই হয়তো অনুপ্রেরণা পেলেন বলিউডের আরেক তারকা শ্রদ্ধা কাপুর। গত এক বছর ধরেই আদিত্য রায় কাপুরের সঙ্গে চুপিসারে প্রেম করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলেও বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন শ্রদ্ধা। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সবাইকে জানান দিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী এ অভিনেত্রী। সম্প্রতি টুইটারে নিজের প্রেম নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন শ্রদ্ধা। আর তাতে তিনি লিখেছেন, মনে হচ্ছে আমি প্রেমে পড়েছি। এটি দেখে সবাই চমকে ওঠেন। চারদিকে এ নিয়ে শুরু হয় নানারকম গুঞ্জন। শ্রদ্ধা প্রেমে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন কিন্তু কার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন সেটা তিনি জানাননি। তবে নানা সূত্রে জানা গেছে, শক্তি কাপুর কন্যার এ প্রেমিক আর নতুন কেউ নন। সেই আদিত্য রায় কাপুরই তার প্রেমিক। কিছুদিন আগেই শ্রদ্ধা ও আদিত্য একটি হোটেলে গভীর রাত পর্যন্ত অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছেন বলে শোনা গেছে। এ নিয়ে ওই সময়টায় বলিউডপাড়ায় বেশ হৈ চৈ পড়ে যায়। অবশ্য এ বিষয়ে শ্রদ্ধা বা আদিত্য কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বিষয়টি বারবারই এড়িয়ে যান তারা। উল্লেখ্য, ‘আশিকি-টু’ ছবি থেকেই বলিউডের এ নয়া জুটি গোপনে প্রেম করে আসছেন বলে শোনা যায়। তবে এ বছর থেকে বিষয়টি চাউর হয়।

নতুন বছরে অন্য পূজা

চলতি বছর গানের জনপ্রিয়তার বিচারে এবারও এ প্রজন্মের নারী কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে বেশ এগিয়ে আছেন বাঁধন সরকার পূজা। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তার গাওয়া ‘কেন বারে বারে’, ‘কি জাদু’, ‘ফাগুনের বাতাসে’ গান তিনটি ভাল শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। এর মধ্যে পূজার কয়েকটি মিউজিক ভিডিও বেশ প্রশংসিত হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরজুড়েই গান দিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি। মাস দুই আগেই পূজার আশীর্বাদ সম্পন্ন হয়েছে কাজল দত্তের সঙ্গে। বেশ জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এই অনুষ্ঠান। আশীর্বাদ হলেও বিয়ের পিঁড়িতে বসতে আরও কয়েক বছর সময় নেবেন বলে জানিয়েছেন পূজা। পড়াশোনা শেষ করে তবেই সঠিক সময়ে বিয়ে করবেন। এদিকে পূজা বর্তমানে পড়াশোনা ও স্টেজ শো বেশি নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিজের একক অ্যালবামের তিনটি মিউজিক ভিডিওর পরে নতুন বছরের শুরুতে আরও একটি ভিডিও প্রকাশ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে নতুন বছর অন্য এক পূজাকেই আবিষ্কার করতে পারবেন শ্রোতারা। নতুন বছর থেকে প্লেব্যাক এবং একক অ্যালবামের বাইরে মিশ্র অ্যালবামে খুব কম গাইবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে পূজা বলেন, নতুন বছরে নতুনভাবে নিজেকে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন থেকে গান খুব কম গাইব। চলচ্চিত্রের বাইরে প্রচুর মিশ্র ও বিভিন্ন শিল্পীর এককে কাজ করার প্রস্তাব থাকে। কিন্তু বেশি গান করতে চাই না। নিজের অ্যালবাম, প্লেব্যাক ও মানসম্পন্ন মিশ্র অ্যালবামের কাজই এখন থেকে করবো। এদিকে চলতি বছরের পহেলা বৈশাকে প্রকাশিত হয়েছে পূজার তৃতীয় একক ‘পূজা রিটার্নস’। সে হিসেবে দুই বছর পর আবারও একক অ্যালবাম প্রকাশ করবেন তিনি। আগামী বছরই তার কাজ শুরু করবেন এই শিল্পী। অ্যালবামের কয়েকটি গানের বাইরেও সাম্প্রতিক সময়ে ‘কিস্তিমাত’ ছবিতে ইমরানের সঙ্গে পূজার গাওয়া ‘স্বপ্নেই ভেসে গেলে’ গানটি ভাল শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে।

বিমানেই জন্ম নবজাতকের

সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের একটি বিমান লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে একজন বেশি আরোহী নিয়ে জরুরি অবতরণ করেছে। গত মঙ্গলবার সকালে সান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দর থেকে ফিনিক্সের উদ্দেশে বিমানটি যখন আকাশে উড়েছিল, তখন ওই যাত্রীর কোন অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু,সান ফ্রান্সিসকো থেকে বিমানটি আকাশে ওড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর আলোর মুখ দেখে ফুটফুটে এক শিশু। ফলে, পাইলট বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন। নবজাতক ও তার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তারা উভয়ই সুস্থ রয়েছে বলে জানা গেছ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। ওই এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র এমিলি স্যামুয়েলস বলেন, ক্রুদের সঙ্গে বিমানটিতে থাকা একজন চিকিৎসক ও এক নার্স প্রসবের সময় ওই নারীকে সর্বাত্মক সেবা-সুশ্রƒষা দিয়ে সহযোগিতা করেন। লস অ্যাঞ্জেলেস দমকল বাহিনীর মুখপাত্র এরিক স্কট জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা দেয়ার জন্য দমকল বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা বিমানটিতে ছিলেন। এদিকে বিমানটি লস অ্যাঞ্জেলেসে জরুরি অবতরণ করার পর সেটি পরিষ্কার করার জন্য সেখানেই রাখা হয় এবং অপর একটি বিমানযোগে বাকি যাত্রীদের ফিনিক্সে পাঠানো হয়। ফলে, ফিনিক্সে নির্ধারিত সময়ের ২ ঘণ্টা পর বিমানটি অবতরণ করে। এদিকে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র এমিলি স্যামুয়েলস মজা করে বলছিলেন, তারা আশা করছেন সারা জীবনের জন্য তাদের এয়ারলাইনটি একজন নতুন খদ্দের পেলো।