Sunday, November 17, 2019

অন্ধ ভিক্ষুকদের পথ দেখানো অপহৃত শিশুর কাহিনী

শিল্পীর চোখে স্যামুয়েলের সাইকেল চালনা
স্যামুয়েল আব্দুল রহিমকে যেদিন অপহরণ করা হয়েছিল সেদিনের কোনো কিছুই তার মনে নেই। সেসময় তার বয়স ছিল সাত বছর। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় কানো শহরে তার নিজের বাড়ি থেকে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।
স্যামুয়েলের পরিবার ছিল অনেক বড়- তার পিতার চার স্ত্রীর ঘরে ছিল ১৭টি সন্তান। কিন্তু স্যামুয়েল সেদিন তাদের আয়ার সাথে ছিল একা। তার পরিবারকে বলা হয়েছিল যে, সে বাড়ির বাইরে গেছে সাইকেল চালাতে। কিন্তু তার পরের ছয় বছর সে আর বাড়িতে ফিরেনি। তার সাথে পরিবারের আর কারো দেখাও হয়নি।
শিশুর খোঁজে
"তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্যে হেন কিছু নেই যা আমরা করিনি," বলেন স্যামুয়েলের বড় বোন ফিরদৌসি ওকেজি। সে সময় ফিরদৌসির বয়স ছিল ২১। তার ভাই যখন নিখোঁজ হয়ে গেলো তখন তাকে এবিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে ফোন করতেন, তখন তার ভাই স্যামুয়েল দৌড়ে ফোনের কাছে চলে যেত। তার সাথে ফোনে কথা বলতে খুব পছন্দ করতো স্যামুয়েল।
কিন্তু দেখা গেল তিনি যখন বাড়িতে ফোন করছেন তখন আর তার ভাই ফোন ধরছে না। বাড়ির অন্যান্যরা ফোন ধরতে লাগলো। তখনই ফিরদৌসির সন্দেহ হয়েছিল যে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে সেটা জানতে ফিরদৌসি একদিন দুপুরবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে বাড়িতে গেলেন। সেসময় বাড়িতে ছিলেন তার পিতা যিনি একজন স্থপতি এবং হোটেল মালিক।
তিনি আর ঘটনাটি তার মেয়ের কাছে গোপন রাখতে পারলেন না। সবকিছু খুলে বলতে হলো তাকে: কয়েক মাস হলো তার প্রিয় ছোট ভাইটার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
"আমার পিতার অভিযোগের পর প্রথম দিকে বাড়ির আয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তদন্তের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়," বলেন ফিরদৌসি।
স্যামুয়েলের এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর যতদিন সম্ভব তার মায়ের কাছ থেকেও গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। স্যামুয়েলের পিতার সাথে তার মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তিনি থাকেন অন্য একটি শহরে। মা-ও তার খোঁজ নিতে বাড়িতে ফোন করতেন। স্যামুয়েলের বাড়িতে না থাকার ব্যাপারে প্রত্যেকবারই তাকে ভিন্ন অজুহাত দেয়া হয়েছে।
অন্ধ ভিক্ষুককে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্যামুয়েল, শিল্পীর তুলিতে
শেষ পর্যন্ত স্যামুয়েলের এক মামাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তার মাকে সবকিছু খুলে বলতে।
পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি স্যামুয়েলের খোঁজে তার পরিবার থেকেও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হলো। ছোট ছোট দল গঠন করা হলো - যাদের কাজ ছিল রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে স্যামুয়েলকে খুঁজে বের করা।
তারা এলাকার বন-জঙ্গল এমনকি খানাখন্দও খুঁজে দেখল, যদি সে ওখানে পড়ে গিয়ে থাকে, কিম্বা কেউ তাকে মেরে সেখানে ফেলে দিয়ে থাকতে পারে।
স্যামুয়েলের খোঁজে তারা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সাথেও আলোচনা করলো। তারপর একসময় তার পিতা সবাইকে অনুরোধ করলো 'তাদের ভাই মারা গেছে' এই সত্যটা মেনে নিতে। কারণ তাকে খুঁজে বের করার জন্য যা কিছু করার দরকার তার সবই তারা করেছে।
সেই চিৎকার
কিন্তু ফিরদৌসি তার ভাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা বাদ দিতে রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার থিসিস তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে উৎসর্গ করলেন। স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণ করার এক বছর পর কাজের সন্ধানে তিনি চলে যান দক্ষিণের লাগোস শহরে।
ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেন। নিয়মিত যেতে লাগলেন নাইজেরিয়ার ওগুন রাজ্যের গির্জা উইনারস চ্যাপেলে। এই গির্জায় প্রত্যেক ডিসেম্বর মাসে পাঁচদিনের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সারাবিশ্ব থেকে এর সদস্যরা সেখানে যোগ দিতেন।
এই অনুষ্ঠানটি পরিচিত শিলো নামে। এতে যারা যোগ দেন তারা চাইলে সেখানে তাদের পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফ্রি স্ট্যান্ড বসাতে পারেন।
ফিরদৌসির তখনও চাকরি হয়নি। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসের ওই অনুষ্ঠানে তিনিও একটি স্ট্যান্ড বসাতে চাইলেন। তাতে তার মায়ের তৈরি করা কিছু কাপড়ের বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেন তিনি।
ওরকম একটি ফ্রি স্ট্যান্ড বানাতে চেয়ারে বসে একজন কাঠমিস্ত্রির জন্যে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ঘুমে তার মাথাটা প্রায় ঢলে পড়েছিল তখন। কিছু একটার আওয়াজে জেগে উঠলেন তিনি। দেখলেন একজন ভিক্ষুক আল্লাহর নাম করে তার কাছে ভিক্ষা চাইছেন। ফিরদৌসি তখন চোখ তুলে তাকালেন।
বোন ফিরদৌসির সাথে স্যামুয়েল
তিনি দেখলেন ওই ভিক্ষুক একজন বালকের কাঁধ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বালকটির পরনে ছিন্ন বস্ত্র। তাকে দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠলেন ফিরদৌসি - মুখ বসে যাওয়া বালকটি আর কেউ নয়, তারই হারিয়ে যাওয়া ছোট ভাই।
অপহরণ
স্যামুয়েলের এখন বয়স ৩০ বছর। তাকে তার পরিবার থেকে কিভাবে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে তার কিছুই মনে নেই। "আমার শুধু ট্রেনে করে কোথাও যাওয়ার কথা মনে পড়ে।"
তাকে একজন মহিলার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার ছিল একটা হাত। লাগোসের এক শহরতলিতে থাকতেন ওই মহিলা। ওই এলাকাতে বহু প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক বসবাস করতো। ওই মহিলা স্যামুয়েলকে ভাড়া করেছিল অন্ধ ভিক্ষুকদের পথ-নির্দেশক হিসেবে। এজন্যে তাকে দেয়া হতো দিনে ৫০০ নাইরা বা পাঁচ ডলার।
একজন অন্ধ ভিক্ষুকের একটি বালকের কাঁধ বা হাত ধরে চলাফেরা করার দৃশ্য নাইজেরিয়ার রাস্তাঘাটে খুবই স্বাভাবিক একটি দৃশ্য। বিশেষ করে সেসব রাস্তায় যেখানে প্রচুর গাড়ি চলে। তারা গাড়ির জানালায় টোকা মেরে মেরে ভিক্ষে করে। অথবা তাদেরকে মসজিদ কিম্বা গির্জার আশেপাশে ভিক্ষা করতেও দেখা যায়।
স্যামুয়েল জানান পরে আরো পাঁচজন বালক ওই মহিলার সাথে যোগ দিয়েছিল যাদেরকেও ভাড়া দেয়া হতো অন্ধ ভিক্ষুকদের কাছে।
স্যামুয়েল হারিয়ে যাওয়ার আগে তার মায়ের সাথে।
স্যামুয়েলের মনে হতো তাকে এমন কিছু দেয়া হয়েছে বা এমন কিছু একটা করা হয়েছে যার ফলে ওই সময়ের কথা সে কিছুই মনে করতে পারছে না। সে সময় তার পরিবারের সদস্যদের কথাও তার মনে পড়েনি।
"আমি ঠিক জানি না সেসময় আমার মধ্যে আবেগ বলে কিছু ছিল কিনা। আমি শুধু জানতাম যে একজন ভিক্ষুককে সাথে নিয়ে আমাকে বাইরে বের হতে হবে। অর্থ জোগাড় করতে হবে, খাবার খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। তারপরের দিনও আমার ঠিক ওই একই কাজ ছিল," বলেন তিনি।
দাসত্বের জীবন
ভিন্ন ভিন্ন ভিক্ষুক তাকে ভাড়া করতো। কেউ ভাড়া করতো এক সপ্তাহের জন্যে আবার কেউ হয়তো এক মাসের জন্যেও। দিনের শেষে বালক স্যামুয়েল ভিক্ষুকের সাথেই রাস্তার কোনো একপাশে ঘুমিয়ে পড়তো। ওর কাজে খুশি হলে ভিক্ষুকরা তাকে হয়তো আরো কিছুদিনের জন্যে আবার ভাড়া করতো।
"আমার জীবন ছিল একজন দাসের মতো। আমি কোথাও যেতে পারতাম না। কিছু করতে পারতাম না। আমাকে থাকতো হতো তাদের আশেপাশেই।"
তাকে সবসময় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। ফলে তার কিছু বন্ধুও হয়েছিল, যারা ছিল ওই ভিক্ষুকদেরই ছেলে মেয়ে। কখনও কখনও তারা একসাথে খেলাধুলাও করতো। কখনও কখনও লোকেরা তাকে খাবার খেতে দিত। না হলে তারা রেস্তোরাঁর আশেপাশে ঘুরঘুর করতো এবং ফেলে দেয়া খাবার ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খেত।
"আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকতাম। কিন্তু দিনের বেলা যখন কাজে থাকতাম তখন খাওয়ার জন্য কোনো ফুসরত ছিল না। লোকেরা যেমন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যেত তেমনি ওই ভিক্ষুকরাও সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাকে নিয়ে ভিক্ষা করতে বের হয়ে পড়তো।"
দিনের পর দিন সে এই কাজটাই করেছে। লাগোসের এমন কোনো রাস্তা বাকি নেই যে রাস্তা ধরে সে হাঁটেনি। ভিক্ষুকদের ডান হাত কাঁধে নিয়ে সে চষে বেড়াত শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
কখনও কখনও তারা পাশের শহরেও চলে যেত। সীমান্ত পার হলেই আরেকটি দেশ বেনিন।
কখনও যদি ভিক্ষুকরা খবর পেতেন যে কোথাও বড় রকমের দান খয়রাতের ঘটনা আছে তখন তারা স্যামুয়েলকে বললে স্যামুয়েল তাদের নিয়ে বাসে করে অনেক দূরেও চলে যেত।
"অন্ধ মানুষ খুব স্পর্শকাতর হয়। তাদের শ্রবণশক্তি খুব প্রখর থাকে। কোনো শব্দ হলেই তারা টের পেয়ে যায়। কখনও কখনও তারা আমার কাঁধ টিপে বলতো: ওখানে তো একজন আছে। তুই কেন ওই লোকটার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছিস?"
"তারা চেষ্টা করতো যতটা সম্ভব অর্থ রোজগার করতে।"
অলৌকিক ঘটনা
ফিরদৌসি যখন তার হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজে পেলেন- শিল্পীর চোখে
২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। স্যামুয়েল সেসময় যে ভিক্ষুককে নিয়ে রাস্তায় বের হতো, তিনি উইনার চ্যাপেল গির্জার অনুষ্ঠানটির কথা শুনেছিলেন। ওখানেই তার বোনের সাথে দেখা হয়েছিল।
ফিরদৌসি তখন চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বোনকে দেখার পর একটা শব্দও করতে পারেনি স্যামুয়েল। এতদিন পর এভাবে হারিয়ে যাওয়া ভাইকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ফিরদৌসি।
"প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল তাকে আমি চিনি। কোন না কোনভাবে তিনি আমার পরিচিত," বলেন স্যামুয়েল।
কিন্তু এর মধ্যেই সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে গেল। গির্জার কর্মকর্তারাও এসে হাজির হলেন। জ্ঞান ফিরে এলো ফিরদৌসির। সব ঘটনা শুনে গির্জার লোকেরা একে এক অলৌকিক ঘটনা বলে ঘোষণা করলেন।
তারা সবাই মিলে স্যামুয়েলকে গির্জার এক কোণায় নিয়ে গেলেন। পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেন তার শরীর। নতুন কাপড় দিলেন পরার জন্য। তারপর তাকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো।
মঞ্চের সামনে তখন ৫০ হাজার মানুষ। ফিরদৌসির হাতে তখন একটা মাইক্রোফোন তুলে দেয়া হলো।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বর্ণনা করলেন এই কিছুক্ষণ আগে তিনি কীভাবে তার এতদিনের হারানো ভাইকে ফিরে পেয়েছেন। সেখানে উপস্থিত সবাই তখন আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠেছিল।
গির্জার প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ওয়েডেপো তখন স্যামুয়েলকে ধরে তার জন্যে প্রার্থনা করেন।
ওই রাতে তারা গির্জার সামনে রাখা একটি গাড়ির ভেতরেই ঘুমিয়েছিলেন। কারণ ফিরদৌসি যেখানে থাকেন সেই জায়গাটা গির্জা থেকে অনেক দূরে।
ফিরদৌসির মনে আছে ওই রাতে বারবার তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। এবং প্রতিবারই তিনি তার ভাইকে স্পর্শ করে নিশ্চিত হয়েছেন যে বালকটি আসলেই তার ভাই।
উদ্ধার
স্যামুয়েলের সাথে আরো যারা ছিল তাদেরকে উদ্ধার করার জন্যে সেদিন কিছু না করায় এখন অনুশোচনা হয় ফিরদৌসির। আসলে ছয় বছর পর ভাইকে পেয়ে তিনি আবেগে এতোটাই ভেসে গিয়েছিলেন যে তখন অন্যদের জন্যে কিছু করার কথা তার মনেই পড়েনি।
কিন্তু স্যামুয়েল জানান, তাকে উদ্ধার করার সামান্য আগে ওই মহিলার কাছে আরো একজন বালক হাজির হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে বাচ্চাটি শুধু কাঁদতো। কিছু খেতে দিলেও খেত না। তারপর কোনো এক সময় সে একেবারে বোবা হয়ে যায়। কোনো কথা বলতো না। স্যামুয়েলের ধারণা ওই ছেলেটিকে চুপ করিয়ে দেয়ার জন্যেও হয়তো কিছু একটা করা হয়েছিল।
"উন্নত দেশে এরকম ঘটনা ঘটলে আপনি পুলিশের কাছে যাবেন। কিন্তু এখানে পুলিশ আপনার কাছে অর্থ দাবি করবে। কিন্তু আমার তো কোনো চাকরি ছিল না," বলেন ফিরদৌসি।
কিন্তু এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। ছয় বছর নিখোঁজ থাকার পর উদ্ধার হওয়া ১৬ বছর বয়সী ভাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেও তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।
সে আর তার বাবার কাছে ফিরে যায়নি। বরং তারপর থেকে সে বড় হয়েছে তার বোনের কাছেই। তার সারা শরীরে ফুসকুড়ি পড়ে গিয়েছিল। গা থেকে আসতো দুর্গন্ধও। স্যামুয়েলের ডান কাঁধটা এক বছরেরও বেশি সময়ের জন্য একপাশে ঝুলে থাকতো।
তারপর এক্স-রে করা হলো, ফিজিওথেরাপি দেয়া হলো। ডাক্তাররা বললো, বছরের পর বছর ভিক্ষুকদের হাতের চাপের কারণে তার কাঁধটা একদিকে বাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
স্যামুয়েলকে যখন তার মা প্রথম দেখলেন তখন তিনিও তার ছেলেকে চিনতে পারেননি। তার একটি হাত উঠিয়ে একটা জন্মদাগ দেখার পরেই মা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে হ্যাঁ, সে তারই সন্তান স্যামুয়েল।
স্যামুয়েল আব্দুল রহিম
শিক্ষা
টানা ছয় বছর ধরে পড়াশোনা না করায় স্যামুয়েল কিছুই পড়তে পারতো না। ফলে বোন ফিরদৌসি তার জন্যে স্কুল খুঁজতে শুরু করলো। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন তিনি। সবাই বলতে লাগলেন প্রাইমারি স্কুলে যাওয়ার আর বয়স নেই স্যামুয়েলের।
ফিরদৌসি যখন আশা ছেড়ে দেবেন ঠিক তখনই তার সাথে একজন স্কুল মালিকের দেখা হলো। সেদিন গির্জার ওই অনুষ্ঠানে তিনিও উপস্থিত ছিলেন। ওই মহিলা তখন স্যামুয়েলকে স্কুলে ভর্তি করাতে রাজি হলেন। তার জন্যে স্কুলের বাইরে বাড়তি কিছু পড়াশোনারও ব্যবস্থার করলেন ফিরদৌসি।
মাত্র তিন মাসের মধ্যেই স্যামুয়েল ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোরে উঠে গেল। এক বছরের মধ্যে সে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ভর্তি পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হলো। এর মাত্র তিন বছর পর সে বসে পড়লো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি ভর্তি হয়ে গেলেন জারিয়ার আহমাদু বেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।
কিন্তু তার মেধাই তার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ালো। বন্ধ হয়ে গেল তার পড়াশোনা। কারণ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দেয়ার জন্যে ধরতো স্যামুয়েলকে। পরীক্ষায় আরেক ছাত্রের জন্য উত্তর লিখে দেয়ায় তাকে যখন বহিষ্কার করা হলো তখন তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।
ক্ষোভ নেই
বর্তমানে স্যামুয়েল একটি নির্মাণ কোম্পানির সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন।
"কোনদিন আমি যদি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে পারি তাহলে আমি আবার পড়ালেখা শুরু করবো," বলেন তিনি। তার ইচ্ছা তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করবেন।
স্যামুয়েলের জীবনে যা ঘটেছে তার জন্যে খারাপ কিছু মনে হয় না তার। তিনি মনে করেন তার ওই দিনগুলিই তার জীবন গড়ে তুলেছে, তাকে শিখিয়েছে অন্যদের প্রতি বিনয়ী হতে। ওই ছয় বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জেনেছেন ভিক্ষুক ও গাইডরা কতোটা ক্ষুধার্ত থাকেন। আর সেকারণে তিনি তাদেরকে কখনো অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন না।
"বরং আমি তাদেরকে খাবার কিনে দেই। কারণ তখনই আমি বুঝেছিলাম অর্থের চেয়ে আমাদের জন্যে খাবার কতোটা জরুরী ছিল। কারণ ভিক্ষুকদেরকে যে অর্থ দেয়া হতো সেটা কখনোই আমার কাছে এসে পৌঁছাতো না।"
স্যামুয়েল তার জীবনের এই গল্প এখন সবাইকে জানাতে চান কারণ তিনি মনে করেন এর ফলে লোকেরা হয়তো ভিক্ষুক ও তাদের শিশু গাইডদের প্রতি আরো বেশি সহানুভূতিশীল হবেন। সূত্র : বিবিসি।
অন্ধ ভিক্ষুককে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্যামুয়েল, শিল্পীর তুলিতে

ইয়েমেন যুদ্ধের চার বছরে যেখানে সৌদি ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী

দরিদ্র দেশ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আগ্রাসন চার বছর শেষ হয়ে পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সুইডেনের স্টকহোমে অর্জিত সমঝোতাসহ বেশ কয়েক দফা শান্তি আলোচনা সত্বেও যুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ইয়েমেনের অসহায় জনগণ প্রতিনিয়ত সৌদি নিষিদ্ধ অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। কিন্তু ইয়েমেনের জনগণ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় সৌদি আরব আজ পর্যন্ত তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আমেরিকার সমর্থন নিয়ে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট আব্দুল হাদিকে ফের ক্ষমতায় বসানোই যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য যদিও এখন পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। কিন্তু গত চার বছর ধরে ইয়েমেনে ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সৌদি আরব সেখানে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনের পেছনে আমেরিকা, ব্রিটেন ও দখলদার ইসরাইলের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে এবং রিয়াদ কেবল ওয়াশিংটনের লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের প্রতি আমেরিকার ব্যাপক সমর্থন থাকলেও ইয়েমেনের জনগণ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং সৌদি আরব ও তার সমর্থকদেরকে অচলাবস্থার সম্মুখীন করেছে। ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের মহাসচিব আব্দুল মালেক আল হুথি যুদ্ধের চার বছর পূর্তিতে গত ২৫ মার্চ বলেছেন, সৌদি আরবের পেছনে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইসরাইলের সমর্থন রয়েছে এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পাশ্চাত্যের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বৃহৎ শক্তিগুলোর সমর্থন নিয়ে সৌদি আরব ভয়াবহ বিপর্যয় ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেও ইয়েমেনের জনগণ এখনো সফলতার সঙ্গে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। চার বছর ধরে চলা অসম এ যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্বেও আনসারুল্লাহ আন্দোলন ও প্রতিরোধকামী জনগণ এখনো বিজয়ের ধারা অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। ইয়েমেনিরা যুদ্ধের ময়দানে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রমাণ করেছে তারা যুদ্ধ চায় না কিন্তু শত্রুর যেকোনো ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের ব্যাপারে তারা সতর্ক। বিভিন্ন শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়া থেকে যুদ্ধ অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আনসারুল্লাহ আন্দোলনের আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়। গত চার বছরের ঘটনাবলীতে প্রমাণিত হয়েছে সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে ইয়েমেন সংকটের অবসান ঘটবে না। চার বছরের যুদ্ধে সৌদি আরবের একমাত্র সাফল্য হচ্ছে, তারা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, কলেরার মতো মহামারি রোগের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং প্রতিদিন নিরীহ মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশু হত্যা করেছে।
স্টকহোম শান্তি চুক্তি মেনে নিয়ে আনসারুল্লাহ আন্দোলন পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত হুদাইদা শহর নিয়ন্ত্রণের ভার জাতিসংঘের তত্বাবধানে স্থানীয় বাহিনীর হাতে ছেড়ে দিতে সম্মত হয় যাতে রাজনৈতিক উপায়ে ইয়েমেন সংকটের অবসান ঘটে।
এমনকি স্টকহোম সমঝোতা অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য সানা ও রিয়াদ থেকে হুদায়দা শহরে প্রতিনিধি পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বাধার কারণে শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি। হুদায়দা শহরে যুদ্ধবিরতি শুরুর একই সময়ে সৌদি আরব ইয়েমেনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। প্রমাণ করে তারা আসলে যুদ্ধের অবসান চায় না বরং ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। ইয়েমেনের রাজনৈতিক উচ্চ পরিষদের প্রধান মাহদি আল মাশাত বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যদি শান্তির সব পথ বন্ধ করে দেয় তাহলে তাদের জন্য কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, "সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে আরো ভয়াবহ কঠিন পন্থা ব্যবহারের ক্ষমতা রাখে ইয়েমেনিরা  যা তারা এখনো ব্যবহার করেনি। তাই এখনো শান্তির সুযোগ রয়েছে।"  তিনি বলেন, আমেরিকা, ব্রিটেন ও সৌদি আরব ইয়েমেনকে খণ্ড-বিখণ্ড করার জন্য যুদ্ধ জিইয়ে রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
আন্তর্জাতিক সমাজের নীরবতার সুযোগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় কেবল ইয়েমেনের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গত চার বছরের যুদ্ধে দরিদ্র এ দেশটিতে সব ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় শুরু হয়েছে। গত ২৫ মার্চ ইয়েমেনের শিক্ষামন্ত্রী ইয়াহিয়া আল হুথি বলেছেন, সৌদি আগ্রাসনে ২২টি প্রদেশের তিন হাজার ৫২৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরো ৬৬০টি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও দেশটির স্বাস্থ্যখাতেও নেমে এসেছে মারাত্মক বিপর্যয়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘের ত্রাণ বিষয়ক সমন্বয়কারী দফতর থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ে সারা ইয়েমেনে কলেরাসহ অন্যান্য সন্দেহজনক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে দুইবার কলেরা রোগের বিস্তার ঘটেছে এবং এখন পর্যন্ত এক লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইউসুফ আল হাজেরি বলেছেন, গত চার বছরে সৌদি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ১২ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৬ হাজার আহত হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বাইরে যেতে না পারার কারণে কিংবা দেশের ভেতরেই চিকিৎসার অভাবে আরো ৩২ হাজার ইয়েমেনি প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ব্যক্তি নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৬৩৬১জন নারী ও শিশু রয়েছে।
ইয়েমেনের জনগণের বিরুদ্ধে চলমান ব্যর্থ যুদ্ধ এমন সময় পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে যখন জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের জন্য জরুরি সাহায্যে প্রয়োজন। এ ছাড়া, দেড় কোটি মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। শিশুসহ আরো লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন।
ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের পরও যুদ্ধ অব্যাহত রাখা থেকে বোঝা যায় ভূ-কৌশলগত দিক থেকে ইয়েমেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ  কারণেই রাজনৈতিক সমঝোতা সত্বেও সৌদি আরব ও তার মিত্রদের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের কোনো আগ্রহই দেখা যাচ্ছে না। আফ্রিকার শিং হিসেবে পরিচিত এলাকার কাছে ইয়েমেনের অবস্থান এবং এ দেশটি লোহিত সাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করায় এ দেশটির ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে, বাব আল মান্দাব প্রণালী হয়ে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বালানিসহ অন্যান্য পন্যসামগ্রী আনা নেয়ার কারণে এ দেশটির ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইয়েমেনের এ ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের কারণে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ওই দেশটিতে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী সাইফুল্লাহ আল শামি বলেছেন, তার দেশে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা শত্রুদের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু ইয়েমেনের সরকার, জনগণ ও সেনাবাহিনী শত্রুর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং তাদের সব অশুভ পরিকল্পনা নস্যাত করে দিয়েছে।

ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দলিতদের আইনগত ও সরকারি বৈধতা কেড়ে নিচ্ছে ভূমিহীনতা by সুজাত ইয়েঙ্গদে

দলিতরা ভারতে স্বাধীন নয়। তারা বাস্তুচ্যুত লোক, তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটামাটি থেকে নির্বাসিত, রাষ্ট্রহীন প্রজা হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই ভূমিহীনতা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তাদের আইনগত, সরকারি ও সাংবিধানিক বৈধতা কেড়ে নিচ্ছে। এই সম্প্রদায়ের প্রয়োজন দ্বিতীয় স্বাধীনতা, যা অবশ্যই হতে হবে বস্তুগত স্বাধীনতা, কাগজে-কলমের স্বাধীনতা নয়। ক্ষমতাধারী ভারতীয় নাগরিক হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো ভূমির মালিকানা লাভ।
নাগরিকত্বের প্রয়োজন সম্পদের অধিকার। আর ভূমি হলো মৌলিক সম্পদ। এটি মর্যাদা নিশ্চিত করে। ভূমি ছাড়া আপনি সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকবেন।
ভূমির অধিকারই নিম্নবর্গের মানুষকে তাদের সীমার বাইরে চিন্তা করার আত্মবিশ্বাস দেয়। যে দেশে বেশির ভাগ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভূমি ও ভূমি-সম্পর্কিত পেশা থেকে আসে, সেখানে ভূমিহীনতা একটি স্থায়ী অসুবিধা।
বস্তুত, বর্তমানে দলিতরা যেসব সমস্যায় ভুগছে, সেগুলোর বেশির ভাগই এসেছে তাদের ভূমিহীনতা থেকে। এটি ভূমির মালিকদেরকে সবসময় দলিত ও দলিতদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়ে আসছে। মালিকানা আসলে অস্তিত্বগত বিষয়। দলিতরা মালিকানার জন্য অব্যাহতভাবে লড়াই করে আসছে। কিন্তু ভূমির অধিকার লাভের দলিতদের প্রতিটি প্রয়াস সম্পদের মালিক তথা সুবিধাভোগী শ্রেণি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই সুবিধাভোগী শ্রেণিই শ্রেণি-রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২০১৫-১৬ সময়কালের কৃষি শুমারিতে দেখা যায়, ভারতের মোট কৃষি জমির মাত্র প্রায় ৯ ভাগের মালিক দলিতরা।
সেন্সাস অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক উপাত্তে দেখা যায়, ৭১ ভাগ দলিত ভূমিহীন শ্রমিক। তারা তাদের মালিকানায় না থাকা জমিতে কাজ করে। গ্রামীণ এলাকায় ৫৮.৪ ভাগ দলিত বাড়ি তাদের নিজেদের জমিতে নয়। হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও বিহারের মতো দলিত-প্রাধান্যপূর্ণ রাজ্যগুলোতে ৮৫ ভাগ দলিত ভূস্বামীদের দয়ায় থাকে। আর তামিল নাড়ু, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যায় এই সংখ্যাটি ৬০ ভাগ। বিহার, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিল নাড়ু, কেরালার অনেক জেলায় দলিত কৃষকদের ৯০ ভাগ কৃষি শ্রমিক।
মহারাষ্ট্রের ৬০ ভাগের বেশি ভূমিহীন দলিতদের মধ্যে একটি হলো ‘আমার’ পরিবার। তারা দুই দশক আগে তাদের মারাথওয়াড়া গ্রাম ত্যাগ করেছিল নানদেদের মিলশ্রমিক হিসেবে নিরাপত্তা ও অধিকতর ভালো ভবিষ্যতের আশায়। তাদের মালিকানায় কোনো জমি না থাকায় তারা নিঃস্ব আম জনতা হিসেবে একটি বড় নগরীতে পাড়ি জমিয়েছিল। আর এই প্রক্রিয়াতেই ভারতে বর্তমান সময়ের বস্তিগুলোর উদ্ভব হয়েছে।
নগরীতে অভিবাসন করা দলিতরা সবচেয়ে কম বেতনের চাকরি করে। তারা গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, নিরাপত্তা প্রহরী বা কায়িক শ্রমের কাজ করে। ২০১১ সালের সোসিও ইকোনমিক কাস্ট সেন্সাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮.৩৩ ভাগ ভূমিহীন দলিত পরিবার কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। তাদের অনেকে ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে।
তারা গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে থেকে কোনো সুবিধা পায় না। ফলে প্রায়ই তাদের সামনে একটি বিকল্পই থাকে তা হলো সেবা খাতে চাকরি পাওয়া, সেটাও অনেকাংশে সরকারি চাকরি। এ কারণেই দলিত গ্রাজুয়েটদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। কারণ দলিতদের জন্য একমাত্র এই রাস্তাটাই খোলা রয়েছে। অন্য সব খাত তাদের জন্য দরজা বন্ধ করে রেখেছে।
ভূমিহীনতার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন পরিচালক পা রানজিত। তিনি সম্প্রতি বলেছেন যে রাজা রাজা চোলা-১ দলিতদের কাছ থেকে জোরজবরদস্তিমূলকভাবে ভূমি কেড়ে নেয়ার জন্য দায়ী ছিলেন। রানজিত বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে চিন্তা করতে বলেছেন দলিত ও অদলিত সবাইকে। দলিতদের জন্য আইনগত ও আইন পরিষদের যুক্তি আছে অফুরন্ত। সাবেক পরিকল্পনা কমিশন ১৯৫০-এর দশকে ভূমি সংস্কারের কথা বলেছে। ১৯৬১ সাল থেকে বেশ কয়েকটি আইন পরিষদীয় প্রস্তাবে ভূমির সীমা ১০-৫৪ একর নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও বেশির ভাগ দলিত এখনো ভূমিহীন।
অবশ্য আধুনিক ভারতে ব্রাহ্মণ-বেনিয়া (নব্য ক্ষত্রিয় ও নব্য বেনিয়াসহ) বর্ণবাদী পুঁজিবাদে আদিবাসীদের ভূমির মালিকানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখন সময় এসেছে বর্ণ, ধর্ম, অঞ্চল, গোত্র, মতাদর্শ-নির্বিশেষে সবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশজুড়ে ৭২ লাখ একর উদ্বৃত্ত জমির মালিকানা লাভের জন্য বিপ্লবী আহ্বান জানানো। এ ছাড়া সরকারি নীতি কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা যাবে না।
সব ধর্মের সাত হাজারের বেশি বর্ণ ও উপবর্ণে বিভক্ত দেশে প্রস্তাবনাটি একটি অন্যায় সমাজে চরম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশ দমনের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা, বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তাই সাংবিধানিক মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে এখন।

সাগরের মাঝে স্বপ্নিল এক দ্বীপ by এহতেশাম ফেরদউস

হোবার্টের একটি দৃশ্য
প্রথম আলো, ০৩ জুলাই ২০১৯: বেশ কয়েক বছর থেকে ভাবছিলাম তাসমানিয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু নানা ব্যস্ততা আর কাজের মাঝে সময়টা ঠিক বের করা হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়ে গেল। উদ্দেশ্য কিছু ঘোরাঘুরি করা আর এত দিন ধরে শুনে আসা তাসমানিয়া নামের দীপটার সৌন্দর্য উপভোগ করা। কথা প্রচলন আছে, তাসমানিয়ায় বাতাসেও নাকি সৌন্দর্যের গন্ধ পাওয়া যায়।
যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে টিকিট, airbnb–তে ঘর ভাড়া ও গাড়ির ব্যবস্থা ইত্যাদি করলাম। তাসমানিয়ায় থাকবার জন্য মাত্র তিন দিন সময়। কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময়ও এর মধ্যেই বের করতে হবে। সবকিছু মিলে টাইট শিডিউল।
বিমান ছাড়ার কথা কথা খুব সকালে। ভোর ৬টার দিকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হবে আর ৭টার দিকে বিমান ছাড়বে। তাসমানিয়া পৌঁছাবে সাড়ে ৮টার দিকে। আমার বাসা থেকে বিমানবন্দরে যেতে সময় লাগে ৪০ মিনিটের মতো। আমাদের সঙ্গে শুধু হাতব্যাগ। বিমানবন্দরের কাছের একটা এলাকায় ছোট ভাই থাকে। তাকে ফোন করে বাসার সামনে অপেক্ষা করতে বললাম। যেন সে আমাদের বিমানবন্দরে নামিয়ে আসতে পারে। ভোরবেলায় বিমানবন্দরে যাওয়ার কিছু পাওয়া যাবে না চিন্তা থেকেই বেচারাকে কষ্ট দেওয়া।
আমাদের দেশের মতো সিডনি শহরেও সারা বছর চলে রাস্তার কাজ। কখনো রাস্তা চওড়া করা হচ্ছে। কখনো বা রাস্তা মেরামত করা হচ্ছে। এ ছাড়া আছে রাস্তার নিচের পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের কোনো কাজ। বেশির ভাগ কাজই এখানে রাতে করে। তখন রাস্তা বেশ ফাঁকা থাকে। তারপরও যে রাস্তায় কাজ হচ্ছে তা বন্ধ করে বিকল্প রাস্তা দিয়ে যেতে বলা হয়। সেখানেও বিড়ম্বনা। ছোট রাস্তাগুলোতে একসঙ্গে অনেক গাড়ি চলে। আর সেখানেও গাড়ি চলে বেশ ধীরে।
যা হোক, ছোট ভাইকে তার বাসার সামনে রাস্তায় অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলাম। তাকে বলতে সাহস হচ্ছিল না, যাও তুমি শুয়ে থাকো। আমরা গিয়ে ডেকে তুলব। তার ঘুম বেশ কড়া। একবার ঘুমালে আর ডেকে তোলা যাবে কিনা সন্দেহ। এমনিতেই রাস্তা বন্ধ। বিকল্প রাস্তা দিয়ে যেতে বেশ অনেকটা সময় চলে গেল। তার বাসার সামনে পৌঁছে আমাদের গাড়ি রাস্তার পাশে রেখে রওনা দিলাম অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের দিকে।
বিমানবন্দরে যখন পৌঁছলাম তখন আর মাত্র এক ঘণ্টা আছে বিমান ছাড়ার। ভোরবেলা আর সপ্তাহের মাঝে হওয়ার জন্য বিমানবন্দর বেশ ফাঁকা। অল্প কিছু মানুষ কফি হাতে ঘোরাঘুরি করছেন। সবার মধ্যে যেন কেমন গা ছাড়া ভাব। এ ব্যাপারটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পুরোপুরি আলাদা। যে দেশে যখনই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছি সব সময় ব্যস্ততা। মানুষেরের ব্যস্ততা নিজেকেও বেশ প্রভাবিত করে। না চাইলেও ব্যস্ত ভাব এসে যায়।
আমরা মানে আমি আর আমার বাবা দুজনে দেখলাম বেশ নতুন কিছু নিয়ম যোগ হয়েছে এই বিমানবন্দরে। চেক ইন করার জন্য কোনো লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমরা ছোটবেলাই যে রকম মেশিনে ভিডিও গেম খেলতাম, সে রকম মেশিন বসানো আছে। সেটায় গিয়ে নিজের নাম আর ফ্লাইট নম্বর দিলে নিজে থেকেই বোর্ডিং পাস বেরিয়ে আসে। লাগেজ কিছু থাকলে তা কাউন্টারে দিয়ে দিলেই হয়। আমাদের সঙ্গে যেহেতু শুধু ক্যারি অন ব্যাগ একটা করে, আমাদের কাজ এখানেই মোটামুটি শেষ হয়ে গেল।
এরপর নিরাপত্তা গেট পার হয়ে বিমানে ওঠার পালা। দারুণ উত্তেজনা কাজ করছে ভেতরে-ভেতরে। যেন পারলে এখনই বিমানে উঠে বলি ভাই আমাদের চোখের পলকে তাসমানিয়া নিয়ে চল তো। বিমানের সামনের দিকে যাঁরা বসেন তাঁরা বিমানবন্দরের ভেতর দিয়েই বিমানে প্রবেশ করেন। আর যাঁরা পেছনের দিকে বসেন তাঁদের বাইরে দিয়ে হেঁটে বিমানের পেছনের দরজা দিয়ে উঠতে হয়। আমাদের আসন পেছনের দিকে। ওঠার জন্য টার্মিনাল থেকে বের হতেই বসন্তের ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে গেল। আহা কী শান্তি, মনে মনে বলে উঠলাম। সবকিছুই যেন মন ভালো করার জন্য তৈরি।
বিমান যখন তাসমান সাগর পেরিয়ে তাসমানিয়া দ্বীপে পৌঁছাল জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিলাম। কী সুন্দর, অপূর্ব! যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজ পাহাড়ের সারি আর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা লেক। সরু সুতার মতো আঁকাবাঁকা লেক আর পাহাড়ের সারি। মেঘলা দিন দেখে মনে পড়ে গেল কানাডার ভ্যানকুভারে যখন গিয়েছিলাম ঠিক এ রকম দৃশ্য দেখেছিলাম। শুধু পার্থক্য একটা, কানাডাতে পাহাড়গুলো ছিল শুভ্র বরফে ঢাকা। সেটাও অপার্থিব সুন্দর এক দৃশ্য। পরে কোনো এক সময় সেই কাহিনি লেখা যাবে।
তাসমানিয়ায় বিমানবন্দরে নেমে বেশ অবাক হলাম। কোথাও কোনো ব্যস্ততা নেই। কিছু কাস্টম কর্মকর্তা তাদের কুকুর নিয়ে ঘোরাফেরা করছেন। কুকুরগুলো বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা দূর থেকে গন্ধ শুঁকে কারও কাছে সন্দেহজনক কিছু থাকলে তা বের করে ফেলে। অস্ট্রেলিয়ার সব বিমানবন্দরেই এই কড়াকড়ি। তাসমানিয়াতে দেখলাম তা একটু বেশি মাত্রাই। তারা বেশ সচেতন কোনো বীজ (সেই বীজ কোনো বিশেষ রোগ ছড়াতে পারে গাছপালার মধ্যে) বা কোনো কাঠের জিনিস নেওয়া যাবে না (কাঠে উইপোকা থাকতে পারে)। যেকোনো কারণে অস্ট্রেলিয়াতে এগুলো একবার আসতে পারলে খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করে। তাসমানিয়ায় কোনো উইপোকা নেই।
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে বেশ অবাক হলাম। সিডনির তুলনায় বেশ ঠান্ডা। ঠিক যেন সিডনির শীতকাল। সাটল বাসে করে আমাদের গাড়ি ভাড়া করবার জায়গায় গিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে নিলাম। আগে থেকে গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম। তাই খুব দ্রুত কাজগুলো শেষ হলো। বের হয়ে ছোট রাস্তা ধরে একটা শপিং মল খুঁজে নিলাম।
গাড়ি পার্ক করে দ্রুত কিছু খাবার কিনে বের হয়ে যে দৃশ্য দেখলাম তা সারা জীবন চোখে লেগে থাকবে। পার্কিংয়ের পাশে রাস্তা। তারপর হারবারের মতো একটা অংশ। সেখানে বেশ অনেকগুলো নৌকা রাখা। তার পাশে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে ছোট একটা শহর। ঠিক ভাষাতে বর্ণনা করা যাবে না। কোনো এক অপার্থিব সৌন্দর্য। আর সেই প্রথম মনে হলো আমি আসলেই বাতাসে সৌন্দর্যের গন্ধ পাচ্ছি।
সকাল ১০টায় একজনের সঙ্গে দেখা করবার কথা। জিপিএস ব্যবহার করছিলাম। গন্তব্যে যাওয়ার সময় যা দেখা যায় তাই ভালো লাগে। রাস্তায় কোনো ট্রাফিক জ্যামের বালাই নেই। যার সঙ্গে দেখা করার কথা তিনি থাকবেন বাসার সামনে। বাসায় পৌঁছে অবাক হওয়ার পালা। এখানে কী সব বাসায় এত সুন্দর! সব বাসা থেকেই কী এ রকম দৃশ্য দেখা যায়। বাসার পেছনে apricot ফলের গাছ। বাসায় ঢোকার মুখে অসম্ভব সুন্দর গোলাপ গাছে রং বেরঙের গোলাপ ফুটে আছে। বাসার সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে সামনে সবুজ পাহাড়ের সারির মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা লেক। দূরে কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘ আটকে। আহা কী অপরূপ দৃশ্য!
দুপুরে ঘুরতে গেলাম নিউ নরফল্ক নামের একটা জায়গাতে। যাওয়ার পথে একপাশে লেক। লেক ভরা পানকৌড়ি আর এক পাশে পাহাড়। কোথাও ওয়াইনারি আর কোথাও ছবির মতো সুন্দর কোনো বাসা পাহাড়ের গায়ে। নিউ নরফল্ক পৌঁছে এক অদ্ভুত জায়গায় ঘুরতে গেলাম। জায়গাটাকে বলে গাড়ির কবরস্থান! নষ্ট বাদ পড়া সব গাড়ি। শুনলাম এখানে কিছু গাড়ির বয়স ১০০ বছরের ওপরে। বাবার কাছে জানতে পারলাম তিনি যখন খুব ছোট ছিলেন ১৯৫০-৬০ সালের দিকে তখন এই গাড়িগুলো বাংলাদেশে দেখা যেত। ব্রিটিশ আমলের সেই গাড়িগুলো দেখে মজা লাগছিল। কেমন যেন টাইম মেশিনে চেপে ৬০-৭০ বছর আগের রাস্তা চোখে ভাসছিল।
চারপাশে বিভিন্ন রঙের গাছ, পাতা ফুল, একেকটা একেক রকম। আমি কবি হলে এ রকম দৃশ্য দেখে হয়তো মাথা খারাপ হয়ে যেত। সৃষ্টিকর্তা কত আদর আর যত্ন করে এগুলো সাজিয়েছেন! চারপাশে শুধু রং আর রং। মাথা খারাপ করে দেওয়ার মতো। একটা কফির দোকানে কফি নিয়ে দোকানের বাইরে বেঞ্চে বসলাম। বাবার অবাক দৃষ্টি, আমারও অবাক দৃষ্টি। যেন সৌন্দর্যগুলো চোখ, মন আর ক্যামেরা দিয়ে গিলে নিচ্ছি।
আমাদের থাকার জায়গায় ২টার দিকে যাওয়ার কথা। শহর পেরিয়ে যখন আমাদের থাকার জায়গায় পৌঁছলাম আরেকবার অবাক হওয়ার পালা। প্রায় ২-৩ একর জায়গার ওপর দুটি বাংলো। একটায় মালিক থাকেন আর অন্যটা আমরা ভাড়া করেছি। মালিকের আতিথেয়তাও অসাধারণ। তাঁর নিজের মুরগির খামার থেকে আমাদের ডিম দিতে চাইলেন আর কোনো কিছু লাগলে যেন তাঁকে জানাই তা–ও বিশেষভাবে বলে গেলেন।
ব্যাগ রেখে আমরা বের হলাম কিছু বাজার করার জন্য। অসাধারণ একটা সময়। পিকনিক পিকনিক ব্যাপার। আমি আর বাবা মিলে কিছু খাবার কিনে আনলাম। তার মধ্যে ডিম–রুটি, চাল–ডাল, মসলা ইত্যাদি। বাসায় এসে বাবা বানালেন ডিম ভাজা দিয়ে রুটি। এতই ক্ষুধার্ত ছিলাম মনে হলো এত মজার খাবার অনেক দিন খাইনি।
বাইরে বেশ হিম পড়তে শুরু করেছে। বিক্ষিপ্তভাবে অনেক খরগোশ আর তিতির পাখির মতো বন্য পাখিরা চারপাশে। বাবা বেশ ক্লান্ত ছিলেন। তিনি ঘরের হিটার ছেড়ে একটা ঘুম দিলেন। আমি বারান্দায় এসে বসলাম। বুক ভরে বাতাস থেকে সৌন্দর্যের গন্ধ নিতে থাকলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এখানে সন্ধ্যাটাও অদ্ভুত সুন্দর। দূরে পাহাড়ের গায়ে সূর্য ডুবে গেল। আর এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। পাহাড়ের পেছন থেকে বেরিয়ে এল অদ্ভুত সুন্দর এক চাঁদ। তাসমানিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চাঁদটা অনেক বড় দেখাচ্ছিল। বাবাকে ক্লান্ত ছিলেন। কিন্তু এই সুন্দর দৃশ্য দেখাবার লোভ সামলাতে পারলাম না। ডেকে তুললাম বাবাকে। দুজন নির্বাক। এ রকম সৌন্দর্যের প্রতিটা মুহূর্ত শুধু চোখ দিয়ে গিলে যেতে হয় আর মনে শক্ত করে গেঁথে নিতে হয়। কথা বলা বারণ।
পরদিন আমরা গেলাম Launcheston (হোবার্টের পর তাসমানিয়ার আর একটি বড় শহর)। ড্রাইভ করে যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে। শুরুতে যাওয়ার পথে ঢুকলাম হোবার্ট শহরের প্রাণকেন্দ্রে। দুটি মাত্র উঁচু দালান চোখে পড়ল। একটি ফোন কোম্পানির আরেকটি ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়ার। রাস্তার পাশের গাছগুলোতে রঙের বন্যা। ফুটপাত আর রাস্তার মাঝের আইল্যান্ডের চারপাশে অনেক রংবেরঙের ফুলের বাহার। চোখ সরানো যায় না। মনে হয় কেউ যেন অতি যত্নে হাতে এঁকে রেখেছেন। একদম শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোথাও কোনো ট্রাফিক জ্যাম নেই। তাসমানিয়া শহরে শুনেছিলাম ট্রাফিক জ্যাম কি তাঁরা জানেন না।
শহর থেকে বের হওয়ার পথে রাস্তার কাজ হচ্ছিল। সুতরাং শুরুর দিকের দেখার তেমন কিছু ছিল না। শুধু কিছু পুরোনো বাড়ি আর তার সামনে রংবেরঙের ফুলের আর গাছের বাহার।
তুলনাবিহীন সৌন্দর্য শুরু হলো একটু পরে। দুপাশে সবুজ পাহাড়ের সারি। কোথাও ভেড়া চড়ছে, কোথাও যত দূর চোখ যায় ভুট্টাখেত। গাড়ি চালাব না এই সৌন্দর্য উপভোগ করব? বাবার অবাক দৃষ্টি চারপাশে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কোথাও ছবি তুলছেন, কোথাও আমাকে বলছেন কোনটা কিসের খামার। দুপুরে Launcheston পৌঁছলাম। পাহাড়ের ওপর একটা শহর আর চারপাশে পাহাড়ের সারি, মাঝে মাঝে বয়ে চলা লেক। সব শহর মনে হলো একই দেখতে এখানে। বেশ কিছু নেপালি দেখলাম এই শহরে। বুঝলাম তাদের পাহাড়ে ঘেরা সৌন্দর্যের দেশ ছেড়ে ভালো জীবনের জন্য এখানে পাড়ি জমিয়েছে তারা। শহর থেকে বের হওয়ার পথে প্রথম ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম। যদিও তা খুব কম সময়ের জন্য।
দিনে দিনেই হোবার্ট ফিরে এলাম। প্রথমে গেলাম একটা লুক আউট পয়েন্টে। হোবার্ট শহরের অনেকটাই এখান থেকে দেখা যায়। শেষ সূর্যের আলোতে আরও এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সাক্ষী হলাম। পুরো শহরটা যেন পাহাড়ের গায়ে, দেয়ালে রাখা কোনো এক ছবির মতো।
আমাদের থাকার জায়গার পাশেই সুন্দর একটা সমুদ্রসৈকত। নামটাও সুন্দর। বাংলা করলে দাঁড়ায় সাত মাইল সৈকত। সন্ধ্যাটা সেখানে কাটিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে গেলাম স্থানীয় এক বাজারে। নাম সালামাঙ্কা মার্কেট। গাড়ি থেকে নামতেই শুরু হলো বৃষ্টি। সঙ্গে কোনো ছাতা ছিল না। তাই খুব দ্রুত গাড়িতে এসে বসলাম। মার্কেটটা একটা রাস্তার ওপর বসে। দুপাশ থেকে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় আর রাস্তার দুপাশে পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। বেশির ভাগ পুরোনো দিনের স্যুভেনির সেট, বাঁধানো ছবি আর খাবারের দোকান। সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম মনা জাদুঘরে। জাদুঘরটা মূলত একটা আর্ট মিউজিয়াম। কিছু ফারাও আমলের প্রতিকৃতি, ইউরোপিয়ান কিছু আবিষ্কারের নমুনা আছে। আমার বা বাবার কাছে আহামরি কিছু মনে হলো না। হয়তো আমরা আর্টের মর্ম বুঝতে পারলাম না। যদিও সবাই এই দুই জায়গাতে যাওয়ার কথা বলে দিয়েছিল। বাজার আর এই মিউজিয়াম, অল্প সময় থেকেই বেরিয়ে এলাম।
ফিরে গেলাম আমাদের থাকবার জায়গার কাছের সেই সৈকতে। বৃষ্টির কারণে চারপাশ এত ঠান্ডা যে, গাড়ি থেকে বের হওয়া হলো না তেমন। পাশে একটা পেট্রল স্টেশনে গিয়ে প্রথম কোনো বাঙালি ভাইয়ের দেখা পেলাম। তাঁর কাছে জানতে পারলাম তাসমানিয়ায় প্রায় দুই শ বা তার কিছু বেশি বাঙালি থাকেন। তিনি জানালেন আরও বেশ কিছু তথ্য। বেরিয়ে রেন্টের গাড়ি ফেরত দিয়ে বিমানবন্দরে ফিরে চললাম। বিমানবন্দরে পৌঁছে চেক ইন শেষ করলাম। বিমান ছাড়ার তখনো বেশ কিছু দেরি। আমরা বিমানবন্দরের দোকানগুলোতে ক্লান্ত সময় কাটাতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর বিমানে উঠে বসলাম। বিমান যখন ওপরে উঠে যেতে শুরু করল আমি নিচের দিকে তাকিয়ে ঠিক বিদাই জানাতে পারলাম না। মনে হলো এই অপার্থিব সৌন্দর্যের মাঝে আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে।
সিডনি নামলাম যখন, তখন চারপাশ অন্ধকার। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে কোলাহল আর ব্যস্ত জীবন আবার। গাড়ি ভাড়া করে আমাদের গাড়ির কাছে যাওয়ার পথে চালক গল্প করছিলেন, সিডনিতে তাঁর কয়টা বাড়ি, কীভাবে তিনি ইনভেস্টমেন্ট করেছেন। শুধু ভাড়ার গাড়ি চালিয়ে তাঁর কয়েক মিলিয়নের বাসা ইত্যাদি। কিন্তু আমার মাথাতে তখন ফেলে আসা শেষ বিকেলের আলোতে দূর সাগরের মাঝে এক স্বপ্নলোকের স্বপ্ন।
হোবার্টের একটি দৃশ্য

পাকিস্তানের ট্যাক্সি সার্ভিস “কারিম” এ নারী-চালক

সাউথ এশিয়ান মনিটর,  ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬: চালকের আসনে নারী। এমনই এক বিরল উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানে। এই মুসলিম প্রজাতন্ত্রের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২২ শতাংশ।
নারী-চালকদের এই ট্যাক্সি সার্ভিসের সূচনা করেছে কারিম নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ৩২টি দেশে এই সার্ভিস পরিচালনা করে কারিম। দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি আরেক ট্যাক্সি সার্ভিস উবার-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি। তবে পাকিস্তানের জন্য নারী ট্যাক্সি চালক একটি নতুন আইডিয়া। পুরুষ-নারী নির্বিশেষ সব ধরনের যাত্রী বহন করবে এসব নারী-চালিত ট্যাক্সি। লাহোর, ইসলামাবাদ ও করাচিতে প্রাথমিকভাবে এই সার্ভিস শুরু হয়েছে।
পাকিস্তান কারিম-এর মহাব্যাবস্থাপক আহমেদ উসমান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা নারীদেরও সমান সুযোগ ও সুবিধা দিতে চাই। আমাদের প্লাটফর্ম ব্যবহার করে পুরুষরা বেশ মোটা অংকের রোজগার করছে।’
উসমান জানান যে এ পর্যন্ত সাত জন নারি ট্যাক্সি-চালকের যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে আবেদন প্রক্রিয়া উন্মুক্ত রয়েছে, যে কেউ চাইলে এখানে আবেদন করতে পারেন।
ট্যাক্সি-চালকের চাকরি পাওয়া সাত নারীর মধ্যে দুইজন করাচি, তিনজন লাহোর এবং একজন ইসলামাবাদে কাজ করবেন।
এদেরই একজন জাহরা আলী। ত্রিশ বছর বয়সী এই দুই সন্তানের জননী বন্ধুদের কাছ থেকে কারিম-এর খবর পান। দু’বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের একাই লালন করছেন তিনি। অনেক জোগাড়যন্ত্র করে এ বছর তিনি একটি গাড়ি কিনেন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়েছেন এ বছরেই। কয়েক মাস আগে জাহরা যখন কারিম-এর ট্যাক্সি ড্রাইভার পদের জন্য আবেদন করেন তখন তাকে বলা হয়েছিল যে এখানে কোন নারী চালক নেয়া হয় না। এরপরই তিনি কারিমের কাছ থেকে সুখবরটি পান।
লাহোর থেকে আসা এই নারী বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘কাজের মধ্যে আমার কেবল গাড়ি চালানোর দক্ষতা আছে।’ ‘এখন আমি সম্মানের সঙ্গে আমার সন্তানদের লালন করতে পারবো। তাদেরকে ভালো শিক্ষা দিতে পারবো।’
৯০,০০০ ড্রাইভারের বিশাল বহর নিয়ে একটি বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে ২০১২ সালে দুবাইয়ে আত্মপ্রকাশ করে কারিম। মোবাইল এ্যাপের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ৮০ লাখের বেশি গ্রাহক।
উসমান বলেন, পাকিস্তানে কারিম-এর সবচেয়ে বড় বাজার করাচির নারীদের কাছে।
চালকের আসনে নারীদের নিয়ে আসা তাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে সুযোগই তৈরি করবে না অন্যদেরও এ পথে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
পাকিস্তানে নারী ট্যাক্সি-চালকদেরও অন্যান্য পুরুষ সহকর্মীর মতো কঠোর প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কোম্পানির প্রটোকল অনুযায়ী তাদের পরীক্ষা দিতে হবে উন্নতমানের সেবাদান নিশ্চিত করার জন্য। নারী চালকদের জন্য সাপোর্ট ডিপার্টমেন্টে আলাদা লাইনও তৈরি করেছে কারিম।

জানা তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করছে ভারত, কেন by আনন্দ ব্যানার্জি

ভারতের ৩৫টি আঞ্চলিক দূষণ বোর্ডের মাত্র ১৪টি ২০১৭-১৮ সময়কালের প্লাস্টিক বর্জ্য সম্পর্কে তথ্য জমা দিয়েছে বলে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (সিপিসিবি) তার সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে। ফলে সিপিসিবির ২০১৭-১৮ সময়কালের প্রতিবেদনে থাকা ৬৬০,৭৮৭.৮৫ টন বর্জ্য পরিষ্কারে ১০ টনি করে ৬৬,০৭৯টি ট্রাক যথেষ্ট বলে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, তা সত্যিকারের পরিস্থিতি প্রতিফলিত করে না।
২০১৬-১৭ সময়কালেও সিপিসিবি মাত্র ২৫টি আঞ্চলিক দূষণ বোর্ডের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিল। ওই সময় মোট সৃষ্ট প্লাস্টিক বর্জ্য দেখানো হয়েছিল ১.৬ মিলিয়ন টন।
সিপিসিপি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধি বাস্তবায়ন করার জন্য ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের (এনজিটি) কাছে আবেদন জানিয়েছে। গত ১২ মার্চ এনজিটি সব রাজ্যকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কোনো রাজ্য প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হলে তাদেরকে প্রতি মাসে এক কোটি রুপি করে জরিমানা দিতে হবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
ভারত বছরে প্রায় ১৬.৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক ব্যবহার করে বলে ২০১৮ সালের প্লাস্টইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের (প্লাস্টিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমিতি) দেয়া দেয়া তথ্যে জানা যায়। এর মধ্যে ৪৩ ভাগ প্লাস্টিক প্যাকেজিং পণ্য হিসেবে একবার মাত্র ব্যবহার হয়। এসব প্লাস্টিক ব্যবহারের পর ডাস্টবিনে জমা পড়ে। ভারতে ব্যবহৃত ৮০ ভাগ প্লাস্টিক পরিত্যক্ত হয়।
প্লাস্টিকের বেশির ভাগ জমি, নর্দমা, জলাশয়, নদী ও সাগরে জমা হয়। এতে করে সামুদ্রিক প্রাণির মারাত্মক ক্ষতি হয়, প্রকৃতির দূষণ ঘটায়।
ভারতে প্রতি দিন যত প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়, তার অন্তত ৪০ ভাগ তথা ২৫,৯৪০ টন সংগ্রহহীনভাবেই থাকে। পাতলা প্লাস্টিক ব্যাগ ও ফিল্মের তেমন রিসাইক্লিং মার্কেট ভ্যালু থাকে না। এগুলো প্রতি কেজি ৪ রুপি দরে টোকাইরা সংগ্রহ করে বিক্রি করে থাকে।
প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিত্যক্তবিষয়ক নির্ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য অংশ। ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি ২০১৯ সালের ইউনাইটেড নেশন্স এনভাইরনমেন্ট এসেম্বলি (ইউএনইএ)-এ সই করেছে। এতে প্লাস্টিকের একক ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে এবং অন্য কোনো দেশ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দুই বছর ধরে ১০ রাজ্যের তথ্য নেই
প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ওয়েস্ট রুলস, ২০১৬ (২০১৮ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি থাকা অপরিহার্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আওতায় এই বোর্ড ও কমিটিকে প্লাস্টিক বর্জ্যের ধরন, পরিমাণ, সংগ্রহ, শহর ও গ্রামে এসবের পরিমাণ ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দিতে হয়।
কিন্তু নিম্নোক্ত রাজ্যগুলো ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-২০১৮ সময়কালে তাদের তথ্য প্রদান করেনি।
১. দমন ও দিউ
২. গোয়া
৩. ঝাড়খণ্ড
৪. কেরালা
৫. লাক্ষাদ্বীপ
৬. মিজোরাম
৭. রাজস্থান
৮. তেলেঙ্গানা
৯. উত্তরখণ্ড
১০. পশ্চিমবঙ্গ।
সিপিইসির ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারত ২০১০-১২ সময়কালে দিনে ২৫,৯৪০ টন বর্জ্য উৎপাদন করে। এই হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয় ৯.৫ মিলিয়ন টন। এই তালিকায় থাকা শীর্ষ ৫ নগরী হচ্ছে দিল্লি (৬৮৯ টন), চেন্নাই (৩২৯ টন), কলকাতা (৪২৫ টন), মুম্বাই (৪০৮ টন), বেঙ্গালুরু (৩১৩ টন)। ভারত ২০১৮ সালের জুনে ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট ডেতে এই তথ্য উপস্থাপন করেছে।
কিন্তু দিল্লি, তামিল নাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো রাজ্যগুলোতে অবস্থিত নগরীর তথ্য ২০১৮ সালে পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি
ভারতের বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হওয়ার দুটি প্রধান কারণ হলো এখানে নিম্নমানের প্লাস্টিক উৎপাদিত হয় এবং স্টাইরোফোমের মতো সামগ্রীর উপস্থিতি।
বর্তমানে ভারতের সামর্থ্য রয়েছে মাত্র ৪ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক রিসাইকেল করার।
আমদানিকৃত প্লাস্টিক বর্জ্যের দাম অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় ২০১৯ সালের মার্চের কঠোর নিষেধাজ্ঞার আগে চীন, ইতালি, জাপান ও মালাবি থেকে বর্জ্য প্লাস্টিক আমদানি করত ভারত।
ভারতে প্লাস্টিক বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ হয়েছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০১৬-১৭ সালে ১২ হাজার টন থেকে চার গুণ বেড়ে ২০১৭-১৮ সালে হয়েছিল ৪৮ হাজার টন। স্পেশাল ইকোনমিক জোনের ফাঁক গলে এই আমদানি সম্ভব হয়েছিল। ২০১৯ সালের ৬ মার্চ সরকার এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
২০১৮ সালের ইউএন ওয়ার্ল্ড এনভাইরনমেন্ট ডেতে ভারত প্রতিশ্রুতি দেয় যে ২০২২ সাল নাগাদ প্লাস্টিকের একক ব্যবহার বন্ধ করে দেবে। বিশ্বে বর্তমানে উৎপাদনের তুলনায় সামান্য প্লাস্টিক বর্জ্যের রিসাইকেল হয়। বাকিটা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে।
নগর পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ কমিটির প্রধান এস কে নিগাম সিপিসিপিকে বলেন, উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ থেকে পরিবেশের ক্ষতি পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না।