Friday, December 31, 2010

কলমানি বাজারের প্রবণতা by ফারুক মঈনউদ্দীন

তারল্য নিয়ে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকলেও সম্প্রতি বহুল আলোচিত সেই তারল্য নিঃশেষ হয়ে ঠিক উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করেছিল আমাদের মুদ্রাবাজার। প্রয়োজনীয় তারল্য-সংকট ঘোচানোর জন্য দেশের প্রধান কয়েকটি ব্যাংককে অবিশ্বাস্য চড়া সুদে তহবিল ধার করতে হয়েছে অন্য ব্যাংক থেকে। সেই সুদের হার এমন এক উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংককে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ফলে মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এখানে সাধারণ পাঠকদের অবগতির জন্য জানানো প্রয়োজন যে কলমানি হচ্ছে স্বল্প মেয়াদের জন্য ব্যাংকগুলোর গৃহীত ঋণ। এই বাজার গঠিত হয় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে। তাৎক্ষণিক জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য কোনো ব্যাংকের প্রয়োজনীয় তহবিল তারল্য না থাকলে, সেই ব্যাংক অতিরিক্ত তারল্যসমৃদ্ধ কোনো ব্যাংক থেকে ধার নিতে পারে। স্বল্পমেয়াদি এই ঋণের মেয়াদ হয় সাধারণত এক দিন থেকে এক সপ্তাহ। এই আন্তব্যাংক ঋণবাজারের সুদের হার নির্ধারিত হয় তহবিলের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। বাজারের স্বাভাবিক নিয়মানুসারে বাজারে তারল্যসংকট থাকলে সুদের হার বেশি হয় এবং এর বিপরীত অবস্থায় সুদের হার থাকে খুবই নগণ্য। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থ-বাণিজ্য কেন্দ্রে কলমানি বাজার একটা অপরিহার্য উপাদান। শুধু তরল উদ্বৃত্ত সাময়িকভাবে খাটানোর জন্য নয়, একটা সুস্থ বিনিয়োগ-পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্যও সচল কলমানি বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম।
বাজারে অর্থের সরবরাহ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা কৌতূহল থাকতে পারে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বাজারে মোট অর্থের পরিমাণকে অর্থের জোগান বলা যায় আর এই জোগানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হচ্ছে ব্যাংক নোট। অর্থনীতির ভাষায়, কোনো পণ্যের জোগান বা সরবরাহ বলতে নির্দিষ্ট দামে সেই পণ্য যে পরিমাণ বিক্রয়ের জন্য বিক্রেতা ইচ্ছুক থাকে, তাকে বোঝায়। কিন্তু টাকা-পয়সা আর সব পণ্যের মতো ভোগ করে নিঃশেষ করা যায় না, বরং হাতবদল হয়ে মূল্য সমুন্নত রেখে ব্যবহূত হতে থাকে, তাই কোনো অর্থনীতিতে অর্থের সামগ্রিক পরিমাণকেই সরবরাহ বলে গণ্য করা হয়। আর এই সরবরাহ গড়ে ওঠে ধাতব মুদ্রা, ব্যাংক নোট এবং ব্যাংকের আমানতের সমন্বয়ে। এসব উপাদানের প্রাপ্তি বাড়লে বা কমলে অর্থের সরবরাহও বাড়ে বা কমে। প্রাচীনকালে কেবল ধাতব মুদ্রা এবং ব্যাংক নোটই ছিল অর্থের মূল সরবরাহ সূত্র। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্ভব এবং উন্নয়নের সঙ্গে অর্থ সরবরাহের মূল উপাদান হয়ে পড়ে ব্যাংকের আমানত। কারণ, এই আমানত থেকে ঋণ সৃষ্টি করে বাজারে বিস্তৃত হয় অর্থের জোগান। ঋণ সৃষ্টির ফলে কীভাবে অর্থ সরবরাহ বাড়ে, সেটা সাধারণ পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য উদাহরণসহকারে বর্ণনা করা যেতে পারে।
ধরা যাক, একটি দেশে কেবল দুটি ব্যাংক আছে, ‘ক’ ব্যাংক এবং ‘খ’ ব্যাংক। ‘ক’ ব্যাংকের আমানত আছে ১০০০ টাকা। এই আমানতের ২০ শতাংশ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিবদ্ধ জামানত হিসেবে গচ্ছিত রাখার পর ব্যাংকটি ৮০০ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারে। ব্যাংকটির ঋণগ্রহীতা(রা) ৮০০ টাকা দিয়ে যে পণ্য বা সেবা কিনবে, সেই টাকা গিয়ে জমা হবে ‘খ’ ব্যাংকে। তাহলে ‘খ’ ব্যাংকের আমানত হয় ৮০০ টাকা; সে আমানত থেকে ২০ শতাংশ বিধিবদ্ধ জামানত রক্ষা করার পর ব্যাংকটি ঋণ দিতে পারে ৬৪০ টাকা। সেই টাকা যদি আবার অন্য কারও মাধ্যমে ‘ক’ ব্যাংকে বা ‘খ’ ব্যাংকে জমা হয়, সেই টাকা থেকে ঋণ বিতরণ করা যাবে ৫১২ টাকা। এই ঋণ থেকে সৃষ্ট আমানত থেকে আবার ঋণ বিতরণ করা যাবে ৪০৯ টাকা। তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক আমানত ১০০০ টাকা থেকে চারবার হাত বদলানোর ভেতর দিয়ে মোট ঋণ সৃষ্টি হয়েছে ২৩৬২ টাকা, অর্থাৎ এভাবে সৃষ্ট ঋণের মাধ্যমে অর্থের সরবরাহ বেড়ে গেছে দ্বিগুণেরও বেশি। বিধিবদ্ধ জামানত সংরক্ষণের হার যদি ২০ শতাংশ না হয়ে আরও কম হতো, তাহলে আরও বেশি ঋণ বিতরণ করা যেত এবং তাতে আমানত সৃষ্টি তথা অর্থের জোগান হতো অনেক বেশি।
অর্থনীতিতে এই ঋণ সৃষ্টির ফলে সাময়িক কিছু প্রভাব পড়ে। যেমন—উৎপাদনের মূল উপাদান তথা ভূমি, শ্রম ইত্যাদির মূল্য বেড়ে যায়। কারণ ব্যাংক-সৃষ্ট ঋণের ফলে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে উপকরণের বর্ধিত চাহিদা এসব উপাদানের মূল্যস্ফীতি ঘটায়। ঋণ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে যদি মানুষের সঞ্চয় না বাড়ে, তাতে করে ভোগই শুধু বাড়ে। এ কারণে উৎপাদনের মূল উপাদানগুলো সহজে মানুষের ব্যবহারমুক্ত হয় না। পরবর্তী প্রভাব পড়ে ভোগ্যপণ্যের মূল্যের ওপর। সম্প্রসারিত ঋণের কারণে অর্থ সরবরাহ বেড়ে গেলে মানুষের আয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ভোগ্যপণ্যের চাহিদা যেভাবে বাড়ে, সেভাবে বাড়ে না উৎপাদন; যেহেতু উৎপাদনের মূল উপাদানগুলো ভোগ্যপণ্যের মতো ততটা সহজপ্রাপ্য হয় না। উৎপাদনের মূল উপকরণগুলোর মূল্যবৃদ্ধির কারণে সহজ ঋণপ্রাপ্তি সত্ত্বেও উদ্যোক্তাদের অনুমিত আয় তথা মুনাফা হ্রাস পায়, কিংবা প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষ তথা ভোক্তাদের আয় বেড়ে গেলেও তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। কারণ, একই পরিমাণ অর্থের ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে যায়। উপরিউক্ত সব কটি প্রভাবের পর ব্যাংকিং খাতে ঋণ সম্প্রসারণের যে প্রভাব পড়ে, সেটা উল্লেখযোগ্য। ঋণবাজারে ক্রমেই বাড়তে থাকে সুদের হার। ঋণ সম্প্রসারণ যদি মানুষের সঞ্চয় বৃদ্ধির তুলনায় বেশি হারে বাড়ে, তাহলে ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যায়, কারণ ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ বৃদ্ধি পায়। ব্যাংকের আমানত যেহেতু আমানতকারীদের কাছে ব্যাংকের ঋণ, সেহেতু সেই ঋণ সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলোকে বেশি হারে সুদ গুনতে হয়।
আমরা জানি, ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মূলত নির্ভর করে মানুষের আমানতের ওপর। এই আমানত স্বাভাবিক পন্থায় বৃদ্ধি পেলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কর্মসূচি নির্বিঘ্ন হয়। বাজারে আমানতের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের ঋণ বিতরণ অব্যাহত থাকলে তহবিল সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন বিকল্প পন্থা গ্রহণ করতে হয়। এর একটি হচ্ছে, ট্রেজারি বিল বা বন্ড ইত্যাদির বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এটা ‘রেপো’ (রিপারচেজ) নামে পরিচিত। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে ট্রেজারি বিল কেনে, সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনঃক্রয় করে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সুদে ঋণ দিতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ধরনের ঋণের সুযোগ পুরোপুরি ব্যবহূত হয়ে গেলে ব্যাংকগুলো আন্তব্যাংক বাজার থেকে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ গ্রহণ করতে পারে। অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ মেয়াদে গৃহীত ঋণের সুদের হার নির্দিষ্ট থাকে বিধায় গ্রহীতা ব্যাংক পূর্বানুমিত সুদের হিসাবে পরিকল্পনা মোতাবেক মেয়াদি ঋণ নিতে পারে আন্তব্যাংক বাজার থেকে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ঋণ অথবা কলমানি বলে পরিচিত ঋণের সুদের হার যথেষ্ট স্পর্শকাতর বলে এ ধরনের ঋণ গ্রহণ সাময়িক জরুরি প্রয়োজন মেটায় বটে, কিন্তু তারল্যের ঘাটতির বাজারে ব্যাংকগুলোকে মুখোমুখি করে চরম সংকটের। কারণ মেয়াদি ঋণের মতো সুদের হার নির্দিষ্ট থাকে না বলে কলমানি বাজারের সুদের হার দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। হঠাৎ করে এই বাজারের সুদের হার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে ঋণ সম্প্রসারণমুখী ব্যাংকগুলোকে আচমকা বিপাকে পড়তে হয়। আর্থিক খাতে একাধিক ব্যাংক যদি কলমানি বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করতে উদ্যত হয়, তখন সুদের হার বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঠিক এমনই একটা সংকট দেখা দিয়েছিল।
কয়েক বছর ধরে আমাদের ব্যাংকিং খাতে স্বাভাবিক কিংবা অতি তারল্য পরিস্থিতি বিরাজ করছিল বলে দেশের কলমানি বাজার ছিল স্থিতিশীল। আমাদের ব্যাংকিং খাতে কলমানির বাজার কিছুটা চাঙা হয় ঈদুল আজহার সময়। কারণ, তখন বহু ব্যাংক কোরবানির পশুর চামড়া কেনার জন্য চামড়ার ব্যবসায়ীদের নগদ ঋণ বিতরণ করে। সে সময় কলমানির সুদের হার কিছুটা বাড়লেও চলতি বছরের এই মৌসুমে সে হার ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত ছিল। এমনকি চলতি (ডিসেম্বর) মাসের প্রথম দিকেও কলমানির সুদের হার ২০ শতাংশ অতিক্রম করেনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ভেতর সুদের হার ১৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে তো বটেই, সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাসে স্থান পাওয়ার যোগ্য। তবে স্বস্তির বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংক সফলভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হওয়ায় সুদের হার দ্রুত নেমে আসে—যদিও বর্তমানে বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও উন্নতি ঘটাতে হবে।
ব্যাংকগুলোকে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে হয় তখনই, যখন ব্যাংকের ঋণদানযোগ্য আমানত বা তহবিলের অপ্রতুলতা দেখা দেয় এবং ব্যাংকিং খাতে এটা খুবই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু কলমানি বাজারে সুদের হার যখন অস্বাভাবিক হারে বেশি হয়ে যায়, অর্থাৎ কোনো ব্যাংককে যদি সেই পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস্য চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়, তখন তাকে আর বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা বলা যায় না। যে ব্যাংক কলমানির জন্য অবিশ্বাস্য চড়া সুদ হাঁকে, তাদের স্মরণ রাখা উচিত, কোনো একদিন তাদেরও এ রকম চড়া সুদে ধার নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। কলমানি বাজার ব্যাংকের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর প্রতিষ্ঠান, এটি কোনো ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের বাজার নয়। কেবল নিউইয়র্ক ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো প্রধান কলমানি বাজার ফাটকাবাজারি মুনাফা এবং সিকিউরিটি মার্কেটের সঙ্গে এতটা সম্পৃক্ত নয়।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে হঠাৎ তারল্যের ঘাটতির একটা প্রধান কারণ হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ এবং ক্ষমতাতিরিক্ত ঋণ সম্প্রসারণ। বেশির ভাগ গ্রহীতার স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ না করে সে অর্থ ভিন্ন খাতে (যেমন—জমি ক্রয়ের জন্য, এমনকি শেয়ারবাজারে) বিনিয়োগ করা। ফলে ব্যাংকগুলোর পূর্বাভাস বেশির ভাগ সময় সঠিক থাকে না। অথচ ঋণ সম্প্রসারণ না করলে অর্থনীতিতে দেখা দেয় স্থবিরতা, আবার উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিনিয়োগ না করলে দেখা দেয় মুদ্রাস্ফীতি। কিন্তু ঋণ সম্প্রসারণ বা সংকোচনের মূল চাবিকাঠিটি থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। তাই দেশের আর্থিক বাজার চলমান ও সুস্থ রাখার জন্য এই উভয় সংকটের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যেমন সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় ব্যাংকিং খাতের ওপর, তেমনই ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা, ঋণ বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রমেও থাকতে হয় পেশাদারি ও দক্ষতার ছাপ। এটুকু নিশ্চিত করা গেলে দেশের মুদ্রাবাজার সচল থাকবে স্বাভাবিক গতিতে।
>>>ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

ক্ষমতা বড়, না জনতা বড় by আই এ রেহমান

বেশ কিছুদিন হলো পাকিস্তানের রাজনীতিবিদেরা এমন কিছু কাজ করে চলেছেন, যার মূল্য দিতে হবে দেশকে। এতে কেবল রাষ্ট্রের শক্তি ও সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, জনস্বার্থের বিষয়ে উদাসীনতার মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের বিশ্বাসেরই ক্ষতি করছে।
চলতি হাঙ্গামার শুরু হলো তখনই, যখন ফেডারেল ক্যাবিনেটে জামাতে উলামায়ে ইসলামের (জেইউই) একজন সদস্য প্রকাশ্যে পিপিপির (ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি) এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে হজযাত্রার আয়োজন নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুললেন এবং মন্ত্রীও একই সুরে পাল্টা জবাব দিলেন। সম্ভবত তাঁরা দুজনই তাঁদের মতপ্রকাশের অধিকারের সীমাটা ভুলে গিয়েছিলেন। অথবা হজের মতো পবিত্র বিষয়ের চেয়ে এ নিয়ে ব্যবসাটাই তাঁদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে বিষয়টাকে তেমন পাত্তা দেননি। তিনি দুজনকেই থামতে বলেন, কিন্তু তাঁরা কথা না শুনলে দুজনকেই বরখাস্ত করেন। এই বরখাস্ত যতটা না ছিল তাঁদের দুর্নীতির জন্য, তার চেয়ে বেশি হলো তাঁর কথা অমান্য করার জন্য। এ ঘটনায় এটাও বোঝা গেল, পিপিপি জোটের শরিকদের তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। এটা সম্ভব যে তাঁরা ভেবেছেন, জোটের নেতারা ক্ষমতার মোহে আটকে থাকলে পিপিপির পক্ষে এককভাবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। বিচার বিভাগীয় নিয়োগের বেলায় সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সেটা দেখা গেছে। কিন্তু এবার সেটা কাজে লাগেনি। পিপিপির নেতৃত্ব বুঝতে পারেনি মাওলানা ফজলুর রহমান নিজের মূল্য কতটা বাড়িয়ে তুলতে পারবেন। পিপিপির নেতারা যখন জেইউইর প্রধানের রাগ কমাতে ব্যস্ত, তখন আরেকটা ঘটনা ঘটল। মন্ত্রীদের কেবল একটি বা দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই পালন করতে হয় না, রাজনৈতিক কোন্দলেও ভূমিকা রাখতে হয়। এটা করতে গিয়েই সিন্ধুর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমকিউএমকে খেপিয়ে তুলল। সরকারি জোটের মধ্যেও পড়ল এ ঘটনার চাপ।
গুজব রয়েছে, সরকার নিজেই নিজের ক্ষতি করে বসেছে। এদিকে মুসলিম লীগের নেতা মিয়া নওয়াজ শরিফ সরদার মুমতাজ ভুট্টোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে হাওয়া কোন দিকে বয়, তার দিকে নজর রাখছেন। ওদিকে জারদারিও অবশেষে নওয়াজ শরিফের চিঠির উত্তর দিয়েছেন। এবং এই চিঠি-বোমা নওয়াজের কাছে পৌঁছানোর আগেই মিডিয়ায় প্রকাশ করে বিরাট আরেকটা ভুল করে বসলেন। এতে মিয়া সাহেবের দক্ষ আক্রমণকারীরা সুযোগ পেয়ে গেল জারদারির দিকে পাল্টা আক্রমণ চালানোর। সবই ঘটে গেল, চিঠিতে আসলেই কী লেখা আছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগেই।
এখন এই রাজনৈতিক মূকাভিনয়ের সব পাত্রপাত্রীকে দেখা যাচ্ছে হঠাৎ করে জনগণের মঙ্গল করা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতে। পরের নির্বাচনের আগে এখন কারোরই আর ক্ষমতা নিয়ে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ নেই। তাঁরা সরকারের ক্ষতিও করতে চান না। সরকারের সমালোচকেরাও এতই দরদি হয়ে উঠেছেন, কোনো বাস্তব প্রস্তাব তুলতেও তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন। বিরোধী দলও দুঃখে আছে, কারণ সরকারি দল নিজের ধ্বংসের গতি কোনোভাবেই থামাতে পারছে না।
কিন্তু পুরোনো দিনের কতিপয় গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছামতো চলাকে পছন্দ করছেন না। তাঁরা পিপিপি ও পিএমএলের (এন) মধ্যে স্বাক্ষরিত গণতন্ত্র সনদের ২৫ নম্বর দফাটি মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাতে বলা হয়েছিল, ‘দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে জাতীয় গণতন্ত্র কমিশন গঠন করা হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাদের সহযোগিতাও দেওয়া হবে। এটা করা হবে সংসদে তাদের আসনের সংখ্যানুপাতে এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে।’
পরামর্শ রয়েছে যে এই কমিশনের প্রথম কাজ হবে মন্ত্রীদের নীরবতার মহত্ত্ব শেখানো এবং অ্যারোপ্লেনে সময় কাটানোর চেয়ে দায়িত্ব পালন কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝানো। আরেকটি কাজ হবে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যাতে তাঁদের নিজেদের ঘোষিত নীতিগুলোকে ক্ষমতায় এসেই ধ্বংস করতে না নামেন। একই সঙ্গে তাঁদের এটাও জানা দরকার যে যখন ক্ষমতা ছাড়ার প্রয়োজন হয়, তখন তা আঁকড়ে থাকা আত্মঘাতী।
পিপিপি যদি মনে করে, আগামী নির্বাচনে তারা নির্বাচিত হওয়ার জন্য দাঁড়াবে, তাহলে শরিক দলগুলোর অসম্ভব দাবিগুলো সামলানোর বিষয়ে তাদের আরও মনোযোগী হতে হবে।
সরকারের স্বাভাবিক মেয়াদের অর্ধেকটা পার হয়েছে। যত বেদনাদায়কই তা হোক, এখনই তাদের আত্মমূল্যায়ন করা উচিত। তা করায় যতই দেরি হবে, ততই তারা নিজেরাই তাদের সমস্যা বাড়াবে। তা করতে গিয়ে কেবল সরকারের টিকে থাকা বা পরেরবার ক্ষমতায় আসার প্রশ্ন বিবেচনা করলেই হবে না, জনগণের কতটা ভালো করা যায়, সে বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
জনগণের অবস্থান থেকে দেখলে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং মজুরি ও জীবনযাপনের খরচের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাক, বিচারব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে যাওয়া, পানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি, দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলার ক্রমাবনতিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
কোনো দক্ষ প্রশাসনেরই এসব ইস্যুকে হেলাফেলা করা উচিত নয়। জনগণ যেসব সমস্যায় দিনাতিপাত করছে, তা নিয়ে সরকার যদি কোনো দিনবদল ঘটাতে চায়, তাহলে তাদের উচিত যারা এসব বোঝে এবং যাদের সমাধানের আন্তরিকতা আছে, তাদের কাছেই দায়িত্ব অর্পণ করা।
আই এ রেহমান: পাকিস্তানের সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী।

তিনটি বছর হোক গঠনমূলক কাজের by সৈয়দ আবুল মকসুদ

সাধারণ মানুষ কোনো সরকারের কাছেই অসম্ভব কিছু আশা করে না। তারা শুধু সেটুকুই চায়, যা সরকারের সম্পূর্ণ সাধ্যের মধ্যে। কিন্তু সেটুকুও যখন পায় না, তখন তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়।
পাকিস্তানি আধা সামরিক শাসনের মধ্যেও ষাটের দশকটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য সম্ভাবনার দশক। আমরা কেউ স্বপ্ন দেখছিলাম সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার, কেউ স্বপ্ন দেখছিলাম পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের, যা প্রায় স্বাধীনতার মতোই। দুই রকমের প্রস্তুতিই চলছিল আমাদের মধ্যে: সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি ও স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রস্তুতি। নিজস্ব এক সংস্কৃতি নির্মাণের প্রস্তুতিও ছিল। আমাদের একটি প্রবল ও দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ থাকায় বেশ শক্ত প্রস্তুতিই ছিল এবং তা ছিল বলেই যেদিন দুশমন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হিংস্র দাঁত-নখ নিয়ে, আমরা তা প্রতিহত করি এবং সফল হই। সেই সাফল্যের নাম মুক্তিযুদ্ধ।
সফলতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। সফল হওয়ার পর কেউ হয় সফলতর—নতুন সফলতার দিকে এগিয়ে যায়; কেউ ব্যর্থতার গ্লানিতে ডোবে। আমরা আমাদের একাত্তরের সফলতাকে সংহত করতে পারিনি। আমাদের সবকিছু কেমন গন্ডগোল হয়ে গেল—মানুষের যেমন হঠাৎ মাথা খারাপ হয়, সে রকম। নতুন জাতিরাষ্ট্র একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হলো। ফলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নতুন প্রাণ পেল না। একটি নতুন খাঁচায় পুরোনো সব জিনিসপত্র কোনো রকমে টিকে রইল। আমরা একটি প্রাণহীন বস্তুসর্বস্ব ভূখণ্ডের নাগরিক হয়ে রইলাম।
একাত্তরে সাধারণ মানুষ চেয়েছিল সুস্থ সংসদীয় রাজনীতি, মোটামুটি একটি কৃষিনির্ভর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কম বৈষম্য, জাতীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা এবং একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আমাদের সমৃদ্ধই ছিল, প্রয়োজন ছিল তাকে আরও সমৃদ্ধ, উজ্জ্বল ও পরিশীলিত করা। পুরোনো ভূখণ্ডে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা-ই করা হয়। যেমন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও স্বাধীনতার পর মাও ঝেদোঙ গুরুত্ব দিয়েছিলেন ‘নতুন চীন’ নির্মাণের ওপর। তিনি জোর দিয়েছিলেন পল্লি উন্নয়ন, সামাজিক সমতা, গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর। ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রাম শেষ হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর। তারাও চীনের পথই অনুসরণ করে। আমরা কোনো নতুন পথ তৈরি করতে পারিনি। একটি সংবিধান রচনা করেছিলাম। কিন্তু প্রস্তুতকারীদের কাছেই সেই সংবিধানের কোনো মূল্য ছিল না। সংবিধানে লেখা ছিল ‘গণতন্ত্র’—আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক ছিলাম না। সংবিধানে খোদাই ছিল ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি—আমরা তার ধারেকাছে যাইনি। সংবিধানে অবলীলায় বসিয়ে দিয়েছিলাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলে একটি কথা—আমরা তার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি। নিষ্প্রয়োজনে সংবিধানে লিখেছিলাম ‘জাতীয়তাবাদ’—আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার লেশমাত্র ছিল না। আমরা সবকিছু বাদ দিয়ে মেঠো বক্তৃতায় বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত করতে লাগলাম। মানুষের মুখের কথার যদি শিমুল তুলার সমানও ওজন থাকত, তাহলে গত ৩৯ বছরে নেতারা যত কথা বলেছেন, তার পরিমাণ হতো হাজার হাজার কোটি টন। মানুষের মুখনিঃসৃত বাণীতে যদি তৈরি হতো কোনো চিত্র, তাহলে বাংলাদেশের নেতাদের কথায় তৈরি চিত্রগুলো হতো সবচেয়ে কুৎসিত। ভয়ংকর, বীভৎস!
একাত্তরের স্বপ্নের পরিধি ছিল অনেক ব্যাপক। বাহাত্তরে সে স্বপ্ন ভেঙে কাচের পাত্রের মতো খান খান হয়ে গেল। জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ পেল না, সে স্বাদ পেল একটি ভুঁইফোড় ক্ষুদ্র শ্রেণী। গণতন্ত্র কী জিনিস, তা বোঝা গেল না। কারণ, জনগণের মতামত ও বিরোধী দলের কথার কোনো দাম দেওয়া হলো না। কৃষক-শ্রমিকের কানের পাশ দিয়ে সমাজতন্ত্র শব্দটি শাঁ করে চলে গেল, তারা তা ধরতে পারল না। স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত ভারী মিল-কারখানায় চলতে থাকল ‘সমাজতান্ত্রিক’ লুণ্ঠন। ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু মুসলমানরাই উপভোগ করল, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসীরা বুঝতেই পারল না ধর্মনিরপেক্ষতা কাকে বলে। স্থানীয় নেতার জমির লাগোয়া হিন্দু কৈবর্তর একচিলতে জমিটি নেতার জমির সঙ্গে সেক্যুলার ভঙ্গিতে মিশে গেল। মানুষ ও সমাজ নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বাদ পেল শুধু হিন্দুর সম্পত্তি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিজাতীয় বিশ্বজাতীয়তাবাদে বিলীন হয়ে গেল। মানুষ মনে করেছিল ৫০ পয়সা সের চাল কিনবে। কিন্তু দেখা গেল, ৫০ পয়সায় চাল পাওয়া যায় আড়াই ছটাক।
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের স্বপ্নটি তেমন বড় ছিল না। ওই সময়টি জনগণ খুব সামান্যই চেয়েছিল। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তাদের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। এক কথায় বলতে গেলে তারা চেয়েছিল শতাব্দীর প্রথম আট বছরের অসুন্দর গণতন্ত্র ও অপশাসন থেকে মুক্তি। বড় দলের নেতাদের ট্যান্ডল ও মাস্তানদের চাহিদার তালিকা বিরাট। তা পরিপূর্ণভাবে বা সন্তোষজনকভাবে পূরণ করা যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের পক্ষেই কঠিন। কিন্তু জনগণের চাহিদা পূরণ করা খুবই সহজ। জনগণ বাসমতি ও কালিজিরা চালের ভাত খেতে চায় না, তারা চায় মোটা ইরি চালের ভাত। যশোরের কই মাছের ভুনা বা দোপেয়াজা কিংবা গুঁজি আইড় মাখা মাখা করে রেঁধেও তারা খেতে চায় না। বিলুপ্তপ্রায় খইলসা বা পুঁটি মাছের চচ্চড়িই তাদের জন্য যথেষ্ট। লেহেঙ্গা তো নয়ই, কাতান-কাঞ্জিভরমও নয়, বাবুরহাটি মোটা কাপড় পেলেই কৃষক-শ্রমিকের বউ বেজায় খুশি। শহুরে নিম্ন ও মধ্যশ্রেণী মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউতে চড়তে চায় না। তারা বিআরটিসির বাসে একটু ওঠার সুযোগ চায়। শার্ল দ্য গল বা হিথ্রোর মতো কোনো বিমানবন্দর তারা চায় না; তারা চায় ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যানজট কম হোক। সাধারণ মানুষ চায় গ্রামীণ দারিদ্র্য ও শহরের দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন এবং বিদেশি প্রভুদের আশীর্বাদ নিয়ে ২০০৮ সালে যাঁরা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পান, তাঁদের সামনে কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জই ছিল না। জনগণের সহযোগিতা ও বিদেশি বন্ধুদের মদদ থাকায় তাঁদের খুব সহজেই জনগণের স্বার্থে কিছু ভালো কাজ করা সম্ভব ছিল। প্রতিবছর নির্বাচনী অঙ্গীকার ১৫ শতাংশ করে পূরণ করা হলে পাঁচ বছরে তিন-চতুর্থাংশ ওয়াদা পূরণ করা সম্ভব। সেটাই যথেষ্ট। তার বেশি আশা করা অনুচিত। ওই হিসাবে দুই বছরে ৩০ শতাংশ ওয়াদা পূরণ করা সম্ভব ছিল।
ভোটারদের কাছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চয়ই রয়েছে। কোনো জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন ও চাল-ডালের দাম ঠিক রাখার ব্যাপার নয়। তার বাইরে শাসনব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তনের ব্যাপার রয়েছে এবং বলতে গেলে সেটাই প্রধান। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চেয়েছিল দেশের শাসনব্যবস্থায় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন। একটি অসুন্দর রাজনৈতিক অবস্থার বিপরীতে ও একটি শ্বাসরুদ্ধকর ধর্মান্ধ সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তে একটি মোটের ওপর ভালো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বিদেশি বন্ধুদের পাঁচ বছরে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয় তাঁরাও প্রত্যাশা করেছিলেন তা-ই।
বর্তমান সরকারের দুই বছরে যে কাজটি আমার কাছে প্রশংসনীয় বলে মনে হয়েছে তা হলো, মুসলিম মৌলবাদীদের তারা দমন করতে পেরেছে। তবে মৌলবাদী রাজনীতি ও ধর্মান্ধতা প্রতিরোধ করতে গিয়ে যে কায়দা বা নেগেটিভ পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেছে, তা শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে কি না, বিবেচনা করা দরকার। যেহেতু বাংলাদেশ একটি ধর্মভীরু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ এবং সমাজের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে, তাই ধর্মব্যবসা এখানে নানাভাবে থাকবে। সরকারের ভুল ও অপরিণামদর্শী নীতির কারণে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীরা এখানে ভিন্নভাবে মাথাচাড়া দিতে পারে। মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় আবেগ একটি পুঁজি। সেই পুঁজি যে গোত্রের সম্পদ, তারা তা খোয়াতে চাইবে না; বরং বাড়াতে চাইবে।
২০০৮ সালে বাংলার মানুষ আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার দেখতে চেয়েছিল। আইন ও আদালতকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হোক, তা জনগণ চাইত না। সে জন্যই তারা পরিবর্তন চেয়েছিল। গত দুই বছরে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কয়েকটি অনষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আইন একভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, বিরোধী দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আইন বড়ই কঠোর ও নির্মম। এটা সভ্য জগতের নিয়ম নয়। কমনওয়েলথ দেশগুলোরও নিয়ম নয়। বিদেশিদের চোখে সেটা ধরা পড়েছে। সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে তাদের কানমলা দিয়ে পরিতৃপ্ত হচ্ছে। অপরাধী যত ঘৃণ্যই হোক, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ হবে সভ্য ও সৌজন্যমূলক। আদালত তাকে কঠোরতম ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্র তার সঙ্গে অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারে না। তা করলে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে অপরাধীর কাঠগড়ায়। বিশেষ বিশেষ অপরাধীকে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা আগেও ছিল। কিন্তু নেওয়া হতো না। মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, তোফায়েল আহমেদ কারাভোগ করেছেন; কিন্তু কত দিন করে পাকিস্তানি পুলিশের রিমান্ডে ছিলেন, তা তাঁরাই বলতে পারবেন। কোনো কোনো দলীয় মুখপাত্র ও মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর কথাবার্তা এতটাই অসুন্দর যে সাধারণ মানুষ শুধু নয়, সরকারি দলের অনেক ব্যক্তিই তাতে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। অবস্থা দেখে মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বাস করে একজন দাস। দাস খোঁজে একজন প্রভু। প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্য দাস পারে না হেন হাস্যকর কাজ নেই।
আজকাল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে জনমত জরিপ করছে। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েও পাঠকের মতামত জরিপ হচ্ছে। ওই সব জরিপের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিখুঁত ও শক্ত নয়। ষোলো আনা সত্য বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু তাতে জনগণের বা পাঠকের হূৎস্পন্দন বা মনের ভাব বোঝা যায়। জনগণের প্রতিক্রিয়াটা পাওয়া যায়। গত দুই বছরে পত্রপত্রিকায় যত জনমত জরিপ হয়েছে, তাতে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ সরকারের বিপক্ষে গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে কি ওই মতামতের কোনো মূল্যই নেই? তাঁরা কি জানেন না, ওই জরিপ কোনো বিএনপি-জামায়াতপন্থী কাগজ করেনি। সব কটিই মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতার পক্ষের পত্রপত্রিকা। জনমত অগ্রাহ্য করার প্রবণতা সুখকর নয়—গণতন্ত্রসম্মত তো নয়ই।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও দলের লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো অন্যায় নয়। তবে তাঁদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকতে হবে। যদি অন্য দলের সমর্থক কেউ যোগ্যতর থাকেন, পদটি তাঁরই প্রাপ্য। কারণ, বেতন-ভাতা, বাড়ি-গাড়ি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্র দেয়, দলীয় তহবিল থেকে দেওয়া হয় না। দুর্নীতি দমনের কথা কিছু বলতে চাই না। কারণ, ওটা দলীয় ব্যাপার নয়, সর্বদলীয় সমবায়ী ব্যবস্থা। একেবারে সেক্যুলার ব্যবস্থা। ধর্ম-বর্ণ-মতনির্বিশেষে সবাই ওই কাজে পারদর্শী। দুর্নীতি দূর করা কোনো এক সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। তবে যে সরকার দুর্নীতি কমাতে চেষ্টা করবে, সে সরকার প্রশংসা পাবে। বাংলাদেশের দুর্নীতি সম্পর্কে টিআইবির সার্টিফিকেটেরও কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থা শিশু ও উন্মাদ ছাড়া প্রত্যেকেই জানে।
কোনো প্রকাণ্ড রাজনৈতিক দলের গঠিত সরকারকে পরামর্শ বা বুদ্ধি দিই, তেমন বিদ্যা-বুদ্ধি আমার মতো নগণ্য মানুষের নেই। সে ধৃষ্টতাও নেই। আমাদের দেশে বহু লেখক, শিক্ষক ও কলাম লেখক আছেন তা করার জন্য। সরকার হলো তাঁদের পুত্রকন্যার মতো প্রিয়। আদর করে তাঁরা সরকারকে অনেক বুদ্ধি দেন, উপদেশ দেন। সরকারও কৃতার্থ হয়। তাঁরা হন পুরস্কৃত। কিন্তু দেশের মানুষের তাতে এক পয়সা লাভ হয় না। তারা হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
পৃথিবীতে আজ যতগুলো এয়ারলাইনস আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় বিমানের অবস্থা যেমনটি ছিল, গত ১৫ বছরে তার চেয়ে ১৫ গুণ অধঃপতন ঘটেছে। ওই সংস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের, বিরোধী দলের নয়। তিন বছরের মধ্যে অনুমান করি এই সংস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার এ কথায় কেউ ‘সংক্ষুব্ধ’ হয়ে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা মানিকগঞ্জে মামলা ঠুকে দিতে পারেন। বিজ্ঞ বিচারক আমার বিরুদ্ধে ‘সমন’ জারি না করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করতে পারেন। তবুও আমি বলব, দুর্নীতি ও অদক্ষতায় বিমান আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু সেই ধ্বংস রোধ করার কোনো আয়োজন নেই সরকারের পক্ষ থেকে। ঢাকা বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কাউকে বোঝানো যাবে না। ওটার নামকরণ যেহেতু কোনো আওয়ামী লীগ নেতার নামে নয়, তাই তার অব্যবস্থা দূর করার কোনো চেষ্টাও নেই।
আমাদের বিমান ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্য দেশের বিমান ওঠানামার জন্য আমাদের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে—একটি ঢাকায়, অন্যটি চট্টগ্রামে। কিন্তু মহাজোটের হাসিনা-এরশাদ-মেনন-ইনু-দিলীপ সরকার আর একটি প্রকাণ্ড বিমানবন্দর বানানোর জন্য বিস্ময়করভাবে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দর-বিষয়ক এই ব্যাকুলতার পরিণাম কী, তা বিধাতা ছাড়া আর কেউ বলতে পারেন না।
যে দেশে মানুষ বেশি, সে দেশে এক ইঞ্চি জমির মূল্য সোনার চেয়ে দামি। আর সে জমি যদি হয় ফসলি জমি, তার মূল্য হীরা বা প্লাটিনামের চেয়ে বেশি। ত্রিশাল, ভাঙ্গা বেঁচে গেছে, সরকারের থাবা পড়েছে এখন বিক্রমপুরের মানুষের ওপর। যে বিক্রমপুর ছিল গোটা ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এলাকা, সেই বিক্রমপুরের আড়িয়ল বিলে হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিমানবন্দর। যেখানে ৫০০-৬০০ যাত্রী নিয়ে ভারতীয়, আমেরিকান ও ইউরোপীয় জাম্বো জেট ও এয়ারবাস মিনিটে মিনিটে ওঠানামা করবে। যৎসামান্য কাপড় পরে ট্যুরিস্ট মেম সাহেবরা এসে নামবেন। কিন্তু তাঁরা কোনো দিনই জানবেন না ওই বিমানবন্দর বানাতে গিয়ে জাতির সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ ধ্বংস করা হয়েছে। উর্বর ফসলের মাঠ ধ্বংস হয়েছে। বিমানে যাঁরা চড়বেন, তাঁরা জানবেন না ভিটায় ঘুঘু চড়েছে কত কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে ও অন্যান্য পেশার মানুষের। পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটা হারানোর হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠবে জাম্বো জেটের ডানা। বাংলার আকাশের বাতাস হয়ে উঠবে ভারী।
অত্যন্ত কষ্ট থেকে একটি কথা বলতে চাই। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ভোটাররা সব দল নিষিদ্ধ করে একটি জাতীয় দল গঠনের ম্যান্ডেট দেয়নি। নির্বাচনী ম্যান্ডেটের বাইরে বাড়তি কাজ করতে গেলে দলের সাধারণ সমর্থকেরাও তা অনুমোদন করেন না। তারপর যেদিন বিপর্যয় ঘটে, সেদিন পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না। মানুষ মাত্রেই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সময় থাকতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন বিমানবন্দর বানানোর চেয়ে বাস টার্মিনালগুলো সংস্কার করলে দেশবাসী উপকৃত হবে। জমিজমা, মাঠঘাট ধ্বংস করে আত্মবিধ্বংসী কাজ করবেন না।
শুরুতে যা বলেছি। বাংলার মানুষের চাহিদা খুব সামান্য। তা পূরণ করা কঠিন কিছু নয়। দুটি বছর মামলা-মোকদ্দমা এবং অসুন্দর ও অর্থহীন কাজে অপচয় হয়েছে। আগামী তিনটি বছর গঠনমূলক ও গণমুখী কাজে ব্যয় হলে সাধারণ মানুষ শুধু উপকৃত হবে তা-ই নয়, পরবর্তী নির্বাচনে কোনো কৌশল ছাড়াই বিজয়ী হওয়া যাবে। এমনকি তার পরের নির্বাচনেও বিজয়ী হওয়া সম্ভব। তা না হলে ২০২১ সালের পরিকল্পনা শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকবে।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

এরশাদের বিচার -ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না’

সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের বেঞ্চ গত ২৬ আগস্ট যে রায় দিয়েছিলেন, বুধবার তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এই রায়ে বলা হয়েছে, অবৈধ ক্ষমতা দখল, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে সাবেক সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ আছে কি না, তাও সরকারকে তলিয়ে দেখতে বলেছেন আদালত। এরশাদের সামরিক আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের সিদ্দিক আহমেদ নামের এক ব্যক্তির রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কেউ সামরিক শাসন জারির চেষ্টা না চালান, সে জন্য অতীতের সামরিক শাসকদের বিচার করা এবং ভবিষ্যতে সামরিক শাসন এড়াতে নির্ভুল আইন প্রণয়নেরও তাগিদ দিয়েছেন আদালত।
এর আগে ২০০৫ সালে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনীই বাতিল করে দেন। দুটি রায়েই সামরিক শাসক খন্দকার মোশতাক আহমদ, জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের কঠোর সমালোচনা করা হয়। সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায়ে মন্তব্য করা হয়, ‘জিয়া সংবিধানের মূল স্তম্ভ ভেঙে দিয়েছেন এবং এরশাদ তাঁর পথ অনুসরণ করে দেশ চালিয়ে গেছেন।’ তবে রায়ে সম্ভাব্য অচলাবস্থা পরিহার করার উদ্দেশ্যে এর আগে সম্পন্ন হওয়া কিছু ঘটনা মার্জনা করার কথাও বলা হয়েছে। অবৈধ সামরিক শাসক সুহার্ত, পিনোশে, ইদি আমিন, আইয়ুব, ইয়াহিয়া, জিয়াউল হক ও পারভেজ মোশাররফের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় এই রায়ে।
বাংলাদেশে যাঁরা অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখল করেছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র এরশাদই বেঁচে আছেন। তাঁর পূর্ববর্তী সামরিক শাসকেরা অনেক আগেই মারা গেছেন। অতএব, তাঁদের বিচারের প্রশ্ন ওঠে না। দুর্ভাগ্যজনক যে, সাবেক এই স্বৈরশাসক এখনো সদম্ভে তাঁর অবৈধ কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন এবং তাঁর মধ্যে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাঁরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করতেও তাঁর বাধে না। জিয়া ও এরশাদ—দুজনই অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় এলেও তাঁদের প্রতি ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন নয়। তারা জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে কঠোর সমালোচনা করলেও এরশাদের সপ্তম সংশোধনীর ব্যাপারে অনেকটাই নীরব। এরশাদ কেবল দেশের রাজনীতিকেই কলুষিত করেননি, ক্ষমতায় থাকতে তিনি দুঃশাসন ও দুর্নীতিরও প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। এরশাদ এখন মহাজোটের শরিক। সে কারণে তিনি বিচারের আওতামুক্ত হতে পারেন না। কেননা, বর্তমান নয়, বরং অতীতের অপকর্মের জন্যই তাঁর বিচার হতে হবে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় শীর্ষ দুই নেত্রীও স্বৈরাচারী শাসকের বিচারের জন্য জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক যে তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তাঁদের সেই প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছেন। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না, যাতে বলা হয়েছিল, ‘স্বৈরশাসকদের ক্ষমা করা হলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’

যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করলে কিছু আসে যায় না: শাভেজ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে করতে পারে। এতে তাঁদের কিছু যায় আসে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনোনয়ন দেওয়া নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ভেনেজুয়েলা প্রত্যাখ্যান করার পর যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার শাভেজ এ কথা বলেন।
সম্প্রতি কারাকাসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওবামা মার্কিন কূটনীতিক ল্যারি পালমারের নাম ঘোষণা করেন। তবে ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, পালমার ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকারের একজন কট্টর সমালোচক। এ অবস্থায় তারা তাঁকে কারাকাসে দায়িত্ব পালন করতে দিতে পারে না। এর পরই ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ভেনেজুয়েলার এ ঘোষণা দুই দেশের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট শাভেজ পালমারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘পালমারকে প্রত্যাখ্যান করায় যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করতে চায়, করতে পারে। তারা যদি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করতে চায়, তা-ও করতে পারে।’
শাভেজ বলেন. ‘আমরা পালমারকে স্বীকৃতি জানাতে অস্বীকার করেছি। এতে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। ভালো কথা, তারা যা পারে করুক। তবে পালমার আসছেন না, এটাই চূড়ান্ত।’
শাভেজ আরও বলেন, ‘এখানে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁকে অবশ্যই এখানকার সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পালমারকে মেনে নিলে সেটা আমাদের জন্য অপমানজনক হবে।

কুয়েতের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসহযোগিতা প্রস্তাব

কুয়েতের বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতারা গতকাল বুধবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ নাসের মোহাম্মাদ আল-আহমাদ আল সাবাহ্র বিরুদ্ধে ‘অসহযোগিতা প্রস্তাব’ এনেছেন। আগামী ৫ জানুয়ারি পার্লামেন্টে এ প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হবে। পার্লামেন্টের স্পিকার এ তথ্য জানিয়েছেন।
সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতারা মঙ্গলবার এক গোপন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপরই তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার প্রস্তাব আনেন।
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা অসহযোগিতার প্রস্তাবটি তাঁকে অপসারণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ প্রস্তাব অনুমোদন হতে হলে বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতাদের ৫০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পরে তা বাদশাহর কাছে পাঠানো হবে। বাদশাহ-ই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হবে নাকি পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন এবং নতুন নির্বাচনের ডাক দেবেন কি না?
গত ৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি শোভাযাত্রা বের করেন। এ সময় কুয়েতের এলিট ফোর্সের সদস্যরা তাঁদের লাঠিপেটা করে। এতে কমপক্ষে চারজন আইনপ্রণেতা ও ১২ জন ছাত্র আহত হন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ তোলা হয়। তবে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই শোভাযাত্রাটি বেরা করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ নাসের আল-সাবাহ কুয়েতের বাদশাহ শেখ সাবাহ্ আল-আহমাদ আল-সাবাহ্র ভাতিজা। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সেই থেকে নানামুখী রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন তিনি।

ভারতে এসিড ছুড়ে মারার শাস্তি কঠোর হচ্ছে

এসিড ছুড়ে মারার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ লাখ রুপি জরিমানা এবং সর্বনিম্ন শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে ভারতে নতুন আইন হচ্ছে। আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে দণ্ডবিধি এবং কার্যবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
নতুন আইনের লক্ষ্যে একটি খসড়া বিল প্রণয়ন করা হয়েছে। ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেনডমেন্ট বিল নামের এই খসড়া বিলে সংশোধনীর প্রস্তাবে বলা হয়, এসিড ছুড়ে মারার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ রুপি জরিমানা। সর্বনিম্ন শাস্তি হবে ১০ বছর কারাদণ্ড।
এ জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাইয়ের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে ২০০৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলার শুনানির সময় এসিড নিক্ষেপ-সংক্রান্ত আইনটি প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরামর্শ দেন।
এ ছাড়া এসিড ছোড়া বন্ধের জন্য ভারতের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন করার দাবি জানানো হচ্ছিল।

সামরিক অভিযানের হুমকি সত্ত্বেও ক্ষমতা ছাড়ছেন না বাগবো

সামরিক অভিযানের হুমকি সত্ত্বেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট লঅন্ত বাগবো। পাল্টা হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, কোনো দেশ আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আলাসেন ওয়েতাহাকে সমর্থন দিলে, সেই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবেন তিনি।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট ইসিওডব্লিউএএসের পক্ষ থেকে বেনিনের প্রেসিডেন্ট থমাস ইউয়েয়ি বোনি, সিয়েরা লিয়নের প্রেসিডেন্ট আর্নেস্ট বাই করোমা ও কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট পেদ্রো ভেরোনা রদ্রিগেজ পিরেস গত মঙ্গলবার আইভরি কোস্টের প্রধান শহর আবিদজান পৌঁছান। সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে বাগবোর সঙ্গে বৈঠক করেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বীকৃতি পাওয়া প্রেসিডেন্ট ওয়েতাহার সঙ্গেও বৈঠক করেন তিন প্রেসিডেন্ট। এসব পৃথক বৈঠকের ব্যাপারে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি।
বেনিনের প্রেসিডেন্ট ইউয়েয়ি বোনি বৈঠকের পর সাংবাদিককের বলেন, ‘সবকিছু ঠিকমতো হয়েছে।’ কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ পিরেস বলেন, ‘আমাদের সফর সফল বা ব্যর্থ বলে বিচার করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আমরা এখানে ইতিবাচক একটি কাজ করতে এসেছি, এর বেশি কিছু নয়।’ আবিদজান থেকে নাইজেরিয়া ফিরবেন তিন প্রেসিডেন্ট। তাঁরা আবিদজান সফর নিয়ে ইসিওডব্লিউএএসের চেয়ারম্যান ও নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট গুডলাক জনাথনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
সামরিক অভিযানের হুমকি সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাগবো। তাঁর একজন উপদেষ্টা বলেন, প্রেসিডেন্ট বাগবো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ও বৈধ প্রেসিডেন্ট। আইভরি কোস্টের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইসিওডব্লিউএএসের হস্তক্ষেপ তাঁর বিরুদ্ধে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের’ অংশ।
প্রেসিডেন্ট বাগবোর সরকারের পক্ষে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়েতাহাকে সমর্থন দিলে সেই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করবেন তিনি। এ ছাড়া আইভরি কোস্টে নিযুক্ত ওই দেশের দূতকেও বহিষ্কার করা হবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, আইভরি কোস্টে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক বাস করে। সামরিক অভিযান চালানো হলে সবাই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
আবিদজানের একটি হোটেলে কার্যালয় বানিয়ে অবস্থান করছেন ওয়েতাহা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ৮০০ সদস্য তাঁর নিরাপত্তা দিচ্ছেন। ওই হোটেলে প্রায় তিন ঘণ্টা ওয়েতাহার সঙ্গে বৈঠক করেন তিন প্রেসিডেন্ট। বৈঠকের পর তাঁরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।
তবে ওয়েতাহার মুখপাত্র প্যাট্রিক আসি জানান, তিন প্রেসিডেন্ট ওয়েতাহাকে জানিয়েছেন, তাঁরা বাগবোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পদত্যাগ করতে বলেছেন। আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওয়েতাহার পদ নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনাও হবে না বলে বাগবোকে জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আইভরি কোস্টের ১৯ হাজার ১২০ জন নাগরিক পাশের দেশ লাইবেরিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ নভেম্বর আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ হয়। দেশটির স্বাধীন নির্বাচন কমিশন বিরোধীদলীয় প্রার্থী আলাসেন ওয়েতাহাকে জয়ী ঘোষণা করে। কিন্তু ওই ফল প্রত্যাখ্যান করে সাংবিধানিক পরিষদের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বাগবো। ওয়েতাহাও পৃথকভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ওয়েতাহার প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বাগবোকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া খুবই কঠিন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। গত মঙ্গলবার কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি এক ভিডিও কনফারেন্সে এ কথা বলেন ১০১তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের থার্ড ব্রিগেড কমব্যাট টিমের অধিনায়ক কর্নেল ভিয়েত লুয়ং।
সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানের আদিবাসী-অধ্যুষিত সীমান্ত এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে সেখান থেকে আফগানিস্তানে তৎপরতা চালাচ্ছে উল্লেখ করে কর্নেল ভিয়েত লুয়ং বলেন, সীমান্তের কথা বলতে গেলে স্বীকার করতেই হবে, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন ব্যাপার। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সাহায্য দরকার।
এক প্রশ্নের জবাবে পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে, এতে ওই সন্ত্রাসীদের পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে এসে হামলা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো সীমান্তে আমরা যে ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পেরেছি, সে ধরনের উদ্যোগ কিন্তু আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে নেওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য প্রচুর অর্থ ও লোকবল দরকার।’
ভিয়েত লুয়ং আরও বলেন, ‘রক্ষণাত্মক রণকৌশলের ক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘাতে না গিয়ে একটু পিছিয়ে এসে যুদ্ধ পরিচালনা করাটা বেশি কার্যকর। আমরা সীমান্তের সবচেয়ে ভালো এলাকাটুকুর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলে, সেখান থেকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে অভিযান চালানো সহজ হবে। সাফল্য পেতে এই বিষয়টি সবচেয়ে আগে বিবেচনায় আনা উচিত বলে আমার মনে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়ে শক্তি বাড়িয়েছে পাকিস্তান

ভারতের ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত নতুন এক বইয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তান হচ্ছে ভারতের চিরশত্রু, যারা কি না আফগানিস্তানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। কংগ্রেস অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য ইন্ডিয়ান নেশন শীর্ষক বইটিতে বেইজিং সম্পর্কে কংগ্রেসের মন্তব্য হচ্ছে, ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বিষয়ে তাদের আপসকামী মনোভাব নেই।
ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বইটির প্রধান সম্পাদক। সম্পাদনা বোর্ডের আহ্বায়ক হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা। ভারতের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আদিত্য মুখার্জি, মৃদুলা মুখার্জি, সুচেতা মহাজন, রিজওয়ান কায়সার ও ভাশ্যাম কস্তুরি।
বইটিতে সোনিয়া গান্ধীর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ নিতে প্রত্যাখ্যান করায় তাঁর এই গুণগান করা হয়। এই ত্যাগের জন্য তাঁকে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তাঁর এই ত্যাগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ও দলের মধ্যে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। সোনিয়া গান্ধীর এই ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করার ঘটনা জনগণকে মহাত্মা গান্ধীর কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।’
বইটির বর্ণনায় রয়েছে, ‘সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর সরকারি পদ না নেওয়া এই বিষয়টিকে তুলে ধরেছে, নেতারা এখন দলকে নতুনভাবে গড়ার দিকে ঝুঁকেছেন। নিজেদের তাঁরা এখন জনগণের শাসক নয়, সেবক হিসেবে দেখছেন।’
সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়েছে বইয়ে। এ ব্যাপারে চীনের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, এটি সুস্পষ্ট যে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আদর্শ চালিত হয় বিদেশি পুঁজিতে, আর ভারতের এই আদর্শ মূলত দেশীয় পুঁজির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদার করছে ভারত। আত্মনির্ভরশীলতা, সার্বভৌমত্ব, সমতা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নেহরু যুগের মূল্যবোধের ব্যাপারে কোনো আপস না করে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে তারা।
বইটির ‘রাজীব ইয়ার্স’ শীর্ষক অধ্যায়ে ১৯৮৮ সালে এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর সম্পর্কে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এই সফরের লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যের উন্নয়ন ও যোগাযোগ বাড়ানো। একই সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করা।’ চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে ভারত ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণহত্যার ঘটনায় নিন্দা জানায়নি।
গত ২০ ডিসেম্বর কংগ্রেসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুমোদিত হয়, তাতে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কৌশলগত সহযোগিতার মনোভাব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের সময় দলীয় ও সরকারি পর্যায়ে এই সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টিকে স্বাগত জানায় সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি (এআইসিসি)।

অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ বন্যা ত্রাণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুইন্সল্যান্ড রাজ্যে বন্যা-পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড গতকাল বুধবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বন্যার কারণে এরই মধ্যে এ অঞ্চলের শহরগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভারী বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড় টাসার প্রভাবে এই বন্যা দেখা দিয়েছে। কুইন্সল্যান্ডের রাজধানী ব্রিসবেনে প্রায় দেড় শ বছরের মধ্যে চলতি ডিসেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত শনিবার ঘূর্ণিঝড় টাসা কুইন্সল্যান্ডে আঘাত হানে।
মৌসুমি ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট এ বন্যায় কুইন্সল্যান্ডের বেশির ভাগ রাস্তা ডুবে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে এক হাজার লোককে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের ৩৮টি অঞ্চলকে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী গিলার্ড বন্যাকবলিত লোকজনকে সহায়তায় ত্রাণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সরকারি কোষাগার থেকে দুর্দশাগ্রস্ত লোকজনকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কিছু অঞ্চলের বন্যা-পরিস্থিতি কয়েক দশকের মধ্যে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। আর কিছু অঞ্চলের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অতীতে কখনো ঘটেনি।’ বড়দিনের ছুটি শেষে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করবেন বলে জানিয়েছেন।
ব্রিসবেনের উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর বান্দাবার্গের শত শত বাসিন্দা ঘর ছেড়ে চলে গেছে। অন্যদিকে সম্পূর্ণ প্লাবিত থিওদর শহরের সব বাসিন্দাকে হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় আইনপ্রণেতা ভন জনসন এবিসি রেডিওকে বলেছেন, ভারী বর্ষণের কারণে এখানকার কয়েক শ কোটি ডলারের ফসল ও কৃষিজমি ডুবে গেছে। তিনি বলেন, ‘আলফা থেকে বারকালডিন পর্যন্ত আমি হেলিকপ্টারে করে ঘুরেছি। এর আগে কখনো এত পানি এখানে দেখা যায়নি।’
বান্দাবার্গের বাসিন্দা ড্যানিয়েল বেলের পুরো বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কোথাও যাওয়ার নেই। এখানে আর কোনো পরিবার নেই। আমরা একেবারে বিপদগ্রস্ত। প্রার্থনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
এমারল্যান্ডে কাল শুক্রবার বন্যা-পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৮ সালের শুরুতে সেখানে যে বন্যা হয়েছিল, তার চেয়েও এবারের অবস্থা খারাপের দিকে যেতে পারে। ওই বছর এ অঞ্চলের দুই হাজার ৭০০ লোক বাড়িছাড়া হয়েছিল। রকাম্পটন শহরের মেয়র ব্রাড কার্টার বলেছেন, বন্যা-পরিস্থিতির অবনতি হলে এখানকার প্রধান বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ৪০০টি পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ডালবি শহরের পানি শোধনাগার স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী দুই দিনের মধ্যে সেখানে পানযোগ্য পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, ভয়াবহ এ বন্যার ফলে কৃষি খাতে ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতে মন্দা, বাড়ির দাম কমছেই

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসনশিল্প খাতে ব্যাপক মন্দা চলছে। গত এক মাসে দেশটির প্রধান প্রধান নগরে বাড়ির দাম আরও কমেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আগামী বছর বাড়ির দাম আরও কমে যাবে। নিলামে তোলা বাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ও গৃহঋণ নীতি কঠোর হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার এসঅ্যান্ডপি (স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০টি প্রধান নগরে বাড়ির বিক্রয়মূল্য গত এক মাসে ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি দাম কমেছে আটলান্টা নগরে। ওয়াশিংটনে টানা পাঁচ মাস ধরে অব্যাহতভাবে বাড়ির দাম কমছে। ডালাস, পোর্টল্যান্ড, অরেগন ও ডেনভারেও বাড়ির দাম কমছে।
তবে ২০টি নগরে বাড়ির দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু তা ২০০৬ সালের মূল্যের কাছাকাছিও পৌঁছেনি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সময়কে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন-বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে মনে করা হয়। গোটা দেশে ২০০৬ সালের চেয়ে বাড়ির দাম গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রায় ৪০ লাখ বাড়ি নিলামে বিক্রির তালিকায় রয়েছে। ব্যাংকঋণ শোধ করতে না পারা কিংবা ঋণ কিস্তিতে খেলাপি হওয়ায় এসব বাড়ি নিলামে উঠেছে। নিলামেও বাড়ি বিক্রি করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ফলে গৃহঋণ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠান সেঞ্চুরি টোয়েন্টি ওয়ানের কর্মকর্তা ন্যান্সি গ্রেডি এ প্রতিবেদককে জানান, ২০১০ সাল ছিল যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন-বাণিজ্যের দুঃসময়। নতুন নির্মাণকাজ কম হচ্ছে, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ কার্যত বন্ধ রয়েছে, তাই নির্মাণসামগ্রী, গৃহ উন্নয়ন সরঞ্জামের বাণিজ্যেও মন্দা অবস্থা কাটছে না।
নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের গৃহনির্মাণ ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু জাস্টকো বলেন, কাজ না থাকায় লোকজনের হাতে বাড়ি কেনার মতো অর্থ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতায় ব্যাংকগুলোও এখন গৃহ ক্রয় ঋণ প্রদানে খুব কঠোর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাড়ি ক্রেতাদের জন্য কর প্রণোদনা ঘোষণা করা হলে আবাসনশিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের দিক থেকে শীর্ষে মহারাষ্ট্র

ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের দিক থেকে মহারাষ্ট্র রাজ্য এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আর পশ্চিমবঙ্গের স্থান একাদশে। চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) হিসাবেও শীর্ষে রয়েছে মহারাষ্ট্র। আলোচ্য সময়ে মহারাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৭৫ কোটি রুপি, যা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৩৪ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে এ সময় বিদেশি বিনিয়োগ হয় মাত্র ১১২ কোটি রুপি। উল্লিখিত সময় ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৫০ হাজার ৫৭০ কোটি রুপি।
ভারতের শিল্পমন্ত্রক প্রকাশিত তথ্যে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে দিল্লি ও কর্ণাটক। এসব রাজ্যে বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ যথাক্রমে আট হাজার ৯৬১ কোটি ও চার হাজার ৮২২ কোটি রুপি। এরপরের স্থানগুলোতে রয়েছে অন্ধ্র প্রদেশ (দুই হাজার ২৭৯ কোটি), মধ্যপ্রদেশ (এক হাজার ৮৫৩ কোটি), তামিলনাড়ু (এক হাজার ৫২২ কোটি), পাঞ্জাব-হরিয়ানা (এক হাজার ৩৫৮ কোটি), গোয়া (এক হাজার ৩৩১ কোটি), গুজরাট (এক হাজার ৩১৭ কোটি) ও উত্তর প্রদেশ (৩৬৯ কোটি)।
পশ্চিমবঙ্গের পরে রয়েছে রাজস্থান। সেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৫৯ কোটি রুপি। তবে এর থেকেও খারাপ অবস্থা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্য এবং বিহার ও ঝাড়খন্ড রাজ্য। কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যে ২০০৯-১০ আর্থিক বছরে মাত্র ৫১ কোটি রুপির বিনিয়োগ এলেও চলতি বছরের এই ছয় মাসে কোনো বিনিয়োগ আসেনি।
জানা গেছে, সাধারণত প্রত্যক্ষ এই বৈদেশিক বিনিয়োগের অর্থ রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ, তথ্যপ্রযুক্তি, ইমারত শিল্প, টেলিযোগাযোগ শিল্প খাতে বেশি ব্যবহূত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০০০ সালের এপ্রিল থেকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহারাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এসেছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৬ কোটি রুপি, যা দেশে সর্বোচ্চ। আর এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছে ছয় হাজার ৫৪ কোটি রুপি। আর ১৯৯১ আগস্ট থেকে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে ছয় লাখ ১২ হাজার ৮৭৩ কোটি রুপি। ২০১০-১১ আর্থিক বছরে ভারতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে মরিশাস থেকে, যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৭২০ কোটি রুপি। মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৪২ শতাংশ। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর (পাঁচ হাজার ১৮২ কোটি), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (তিন হাজার ৩৪৯ কোটি) এবং ব্রিটেন (এক হাজার ৫০৮ কোটি)।

বস্ত্র রপ্তানিতে এলডিসির মতো বাজারসুবিধা চাইছে পাকিস্তান

বস্ত্র খাতের কিছু পণ্য রপ্তানিতে পাকিস্তানকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ, ভারত ও পেরু।
এই প্রস্তাবে স্বল্পোন্নত দেশগুলো (এলডিসি) পণ্য রপ্তানিতে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে, সে রকম সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এলডিসির বাইরের দেশ অর্থাৎ উন্নয়নশীল পাকিস্তানের জন্য।
পাকিস্তানেরই আবেদনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) গত ৩০ নভেম্বর প্রস্তাবটি দিয়েছিল ইইউ। পাকিস্তানের ইতিহাসে ভয়াবহতম বন্যার ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পাকিস্তানের পক্ষে ইইউ এমন প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ডব্লিউটিওর কাউন্সিল ফর ট্রেড অ্যান্ড গুডসে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও গতকাল বুধবার পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পাকিস্তান বিষয়টিকে নিজের পক্ষে নিতে বিভিন্ন দেশের কাছে ধরনা দিচ্ছে বলে জানা গেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে এ বিষয়ে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ইইউ বলেছিল, গত জুলাই ও আগস্টে পাকিস্তানে ভয়াবহতম বন্যা হয়। এতে পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সিন্ধু ইত্যাদি অঞ্চলের দুই কোটি মানুষের জীবনমানের ওপর আঘাত আসে। সুতরাং পাকিস্তানকে শূন্য শুল্কে বস্ত্র খাতের কিছু পণ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ইইউর প্রস্তাবে ৭৫টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৪টিই বস্ত্রজাতীয় পণ্য।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের হিসাবে বন্যায় এক লাখ ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয় এবং এক কোটি ২০ লাখ মানুষ জরুরি মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও পেরু সম্প্রতি ডব্লিউটিওকে জানিয়েছে, সহযোগিতা করতে চাইলে বাজারসুবিধা ভালো কোনো বিকল্প নয়। বরং নগদ সহায়তাসহ অন্য অনেক ধরনের সহযোগিতাই করা যায়। এককভাবে একটি দেশকে বাণিজ্য বা বাজারসুবিধা দেওয়া হলে একই জাতীয় পণ্য রপ্তানিতে বরং প্রতিযোগী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জানা গেছে, ইইউর প্রস্তাবটি তখনই গ্রাহ্য হতে পারে যদি ডব্লিউটিও পাকিস্তানকে ১৯৯৪ সালের গ্যাট চুক্তি অনুযায়ী মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন) শর্তটি শিথিল করে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের বন্যার ক্ষয়ক্ষতিতে বাংলাদেশ যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। পাকিস্তানের বন্যার্তদের জন্য ত্রাণও পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাণিজ্যসুবিধার বিষয়টি ভিন্ন। এতে এক দেশকে সহযোগিতা করতে গিয়ে অন্য দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ তার নিজের অস্তিত্বের কারণেই ইইউর এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ডব্লিউটিওকে ভারতও জানিয়েছে যে পাকিস্তানকে নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যেতে পারে, কিন্তু বাজারসুবিধা দিয়ে নয়। এতে ভারতসহ অন্য অনেক দেশেরই রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
যোগাযোগ করা হলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাকিস্তান যেহেতু এলডিসির বাইরে, সুতরাং দেশটিকে শূন্য শুল্কে রপ্তানিসুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণীয় নয়। এতে বাংলাদেশসহ এলডিসির কিছু সদস্য সংগত কারণেই বিরোধিতা করছে ।’
যুক্তি হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পাকিস্তানও যদি এলডিসির মতোই সুবিধা পায়, তাহলে বস্ত্র খাতের পণ্য রপ্তানিতে এলডিসিগুলো অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, এলডিসিগুলো বর্তমানে বিশেষ বিবেচনায় শূন্য শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিও সম্মেলনে তা মেনে নিয়েছে ইইউ। এখন যদি ইইউ এলডিসি ধারণার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব করতে চায়, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তা মেনে নেওয়া কঠিন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশ্ববাণিজ্যে এলডিসির জন্য বিভিন্ন মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিয়েছে ডব্লিউটিও নিজেই। সে অনুযায়ী উন্নয়নের স্বার্থে দেশগুলো কিছু সুবিধা পাচ্ছে। ডব্লিউটিওকে এর ব্যত্যয় ঘটানো উচিত হবে না।
এদিকে ইইউর এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির মতো উন্নত দেশগুলোও। তারা ইইউর প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ডব্লিউটিওর কাছে মতামত ব্যক্ত করেছে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ডব্লিউটিওর হংকং সম্মেলনে এলডিসিগুলোকে শতভাগ বাজারসুবিধা দেওয়ার অন্যতম বিরোধিতাকারী ছিল পাকিস্তান। ওই সম্মেলনে শেষ পর্যন্ত এলডিসিগুলোকে ৯৭ শতাংশ পণ্যে বাজারসুবিধা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

মিউচুয়াল ফান্ডে ঋণ দেওয়ার শর্ত শিথিল

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটে বিনিয়োগের জন্য ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সব ধরনের আইনি জটিলতা দূর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। ফলে এখন থেকে মিউচুয়াল ফান্ডের বিপরীতে ঋণ দিতে সংশ্লিষ্ট ফান্ডের প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) হিসাব করার প্রয়োজন পড়বে না।
তার মানে, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো চাইলে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের জন্য সাধারণ নিয়ম মেনেই তাদের গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারবে। তবে ঋণ প্রদানের হার বিনিয়োগকারীর নিজস্ব মূলধনের দেড় গুণের (১:১.৫) বেশি হতে পারবে না।
এসইসির মুলতবি সভায় গতকাল বুধবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ২ জানুয়ারি রোববার থেকে এ সুবিধা কার্যকর হবে।
এ ছাড়া সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন থেকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে দরপ্রস্তাবের (বিডিং) মাধ্যমে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনাধীন প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের নামে আলাদা আলাদাভাবে দরপ্রস্তাব করা যাবে। এর আগে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারত না।
এর বাইরে ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মিউচুয়াল ফান্ডের প্লেসমেন্ট বরাদ্দের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর আগে ব্যক্তিশ্রেণীর একজন বিনিয়োগকারীকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার প্লেসমেন্ট বরাদ্দ দেওয়ার বিধান ছিল।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্লেসমেন্ট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকম সর্বোচ্চ সীমা থাকছে না। অর্থাৎ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের যেকোনো পরিমাণ ইউনিট বরাদ্দ দিতে পারবে। এতদিন এর সীমা ছিল এক কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে এসইসির নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এবং মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের বিকাশের স্বার্থে এসইসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া বলেন, এর আগে মিউচুয়াল ফান্ডের ঋণসুবিধার ওপর যখন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তখন বাজারে একটা ভিন্ন পরিস্থিতি ছিল। বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ সেই সময় অনেকটা হুজুগে অতি মূল্যে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে। এ সুযোগে মিউচুয়াল ফান্ডের প্লেসমেন্ট বাণিজ্য শুরু করে একটি গোষ্ঠী যা সামগ্রিকভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এসব কারণে এসইসি প্লেসমেন্ট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ-ঝুঁকি কমাতে মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে বলে এসইসির নির্বাহী পরিচালক জানান। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মিউচুয়াল ফান্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় এসইসি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
মিউচুয়াল ফান্ডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির (এএএমসি) একটি প্রতিনিধিদল এসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
ওই বৈঠকে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে এনএভি সূত্র শর্ত তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের অনীহা দূর করতে এসইসির হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
এর আগে মিউচুয়াল ফান্ডের বাজারমূল্য সংশ্লিষ্ট ফান্ডের এনএভির দেড় গুণের মধ্যে থাকলেই কেবল ঋণ পাওয়া যেত। অর্থাৎ, ফান্ডের এনএভি যদি ১০ টাকা হয়, তাহলে বাজারমূল্য ১৫ টাকা পর্যন্ত হলে তা ঋণযোগ্য বলে বিবেচিত হতো।
এ হিসেবে অনেক ফান্ড ঋণসুবিধার আওতায় থাকলেও অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস ঋণ প্রদানে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। জটিল হিসাবের কারণে তারা এ বিষয়টি নানাভাবে এড়িয়ে গেছে। তবে নতুন নিয়মে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী হবে বলে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন।
কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর এসইসি প্রথমবারের মতো ঋণসীমা বেঁধে দেয়। ওই সময়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের বাজারমূল্য এনএভির ১০৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেই কেবল ঋণসুবিধা পেত।

চালের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন

বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং চালের মূল্য ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে চাল ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকদের ঋণ সুবিধা কঠোর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয় ঋণ বিতরনের ৩০ দিনের মধ্যে সকল চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের দেয় পরিশোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সব ব্যাংকগুলোতে নির্দেশনাও পৌঁছে গেছে। বর্তমানে চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা এই দেয় ক্যাশ ক্রেডিট ও ওভার ড্রাফট আকারে ৪৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ করেন।
নতুন এই নির্দেশনায় চালকল মালিকেরা ঋণ পরিশোধের জন্য দ্রুত চাল বিক্রি করতে বাধ্য হবেন যা বাজারে চালের সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

জাতীয় তায়কোয়ান্দোতে আনসারের শিরোপা

ট্রাস্ট ব্যাংক জাতীয় সিনিয়র ও জুনিয়র তায়কোয়ান্দোতে আনসারই চ্যাম্পিয়ন—৮ সোনা, ৪ রুপা ও ৬ ব্রোঞ্জ। ৬ সোনা, ১ রুপা ও ১ ব্রোঞ্জ পেয়ে সেনাবাহিনী রানার্সআপ। পুরুষ বিভাগে সিনিয়র গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন সেনাবাহিনী, জুনিয়র গ্রুপে রাজশাহী। মহিলা বিভাগের সিনিয়র গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন আনসার, জুনিয়র বিভাগে সেরা কে বি তায়কোয়ান্দো দোজাং দল।
কাল শেষ দিনে পুরুষ সিনিয়র বিভাগে অনূর্ধ্ব-৫৪ কেজিতে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিবি) তানজিল, ৫৪-৫৮ কেজিতে সেনাবাহিনীর ওয়াহিদ, ৫৮-৬৩ কেজিতে আনসারের কোরবান, ৬৩-৬৮ কেজিতে সেনাবাহিনীর আনোয়ার, ৬৮-৭৪ কেজিতে আরমান, ৭৪-৮০ কেজিতে শরিফুল, ৮০-৮৭ কেজিতে ২০০৬ এসএ গেমসে সোনাজয়ী মিজানুর রহমান ও ৮৭ কেজিতে সোনা জিতেছেন রাসিউল কবির।

নিয়মিত হবে তো স্কুল ফুটবল

পাঁচ বছর পর শুরু হলো ঢাকা মহানগরী স্কুল ফুটবল। কাল কমলাপুর স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এল প্রায় ৫০০ স্কুলছাত্র। ৪১টি স্কুলের প্রতিনিধিত্ব করা এই কিশোরদের একটাই কৌতূহল ছিল—টুর্নামেন্টটা কি নিয়মিত হবে?
কিশোরদের উৎসাহ ছিল দেখার মতো। বুট-জার্সি পরে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা, দলবেঁধে আনন্দ করা—সবই আজকের কিশোরদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার টান। টিভিতে মেসি-রোনালদোদের খেলা দেখে এরা বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন লালন করে বুকে। স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রটা যাদের করে দেওয়ার দায়িত্ব, সেই বাফুফের উদাসীনতায় দীর্ঘদিন স্কুল ফুটবল বন্ধ থাকায় হতাশ এরা সবাই।
হাজী আশরাফ আলী স্কুলের মিঠু বলল, ‘এখন ক্রিকেট খেলাটা নিয়মিত হয়। কিন্তু আমরা ফুটবল খেলতে চাই। আমরা চাইলে কী হবে, ফুটবল তো হয় না। কাজেই আমাদের অন্য খেলার কথা ভাবতে হয়। স্কুল ফুটবল নিয়মিত হলে আমরা ফুটবলই খেলব।’
টাইটেল স্পনসর আশিয়ান সিটি, কো-স্পনসর প্রাণ গ্রুপের কর্মকর্তা ও বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করলেন বাফুফের স্কুল কমিটির প্রধান এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন দলকে এক লাখ এবং রানার্সআপ দলকে ৬০ হাজার টাকা পুরস্কার দেবেন তিনি। উদ্বোধনী ম্যাচে সেনাপল্লী হাইস্কুলকে টাইব্রেকারে হারিয়েছে সেন্ট যোসেফ স্কুল। নির্ধারিত সময় ছিল ১-১।

জাতীয় কাবাডিতে সেরা বিজিবি-ই

সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি...ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি’—স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক জাতীয় কাবাডির ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষে দেশাত্মবোধক গানের সঙ্গে নাচল একদল কিশোরী। ফাইনাল শেষে আনন্দে নাচলেন বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিবি) খেলোয়াড়েরা। কাল পল্টন কাবাডি স্টেডিয়ামে বিজিবি (সাবেক বিডিআর) ১৯-১৬ পয়েন্টে হারাল বাংলাদেশ পুলিশকে। জাতীয় কাবাডিতে এবার নিয়ে ২৯ বারের মধ্যে ২১ বার চ্যাম্পিয়ন হলো বিজিবি। ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত টানা নয়বার।
ফাইনাল দেখতে কাবাডি স্টেডিয়ামে দর্শকের ভিড় ছিল। ম্যাচও হয়েছে জমজমাট। একবার বিজিবি এগিয়ে যায় তো আরেকবার পুলিশ। প্রায় দুই বছর ইনজুরিতে ভোগা একসময়ের বিশ্বসেরা রেইডার জিয়াউর রহমান এই টুর্নামেন্টে দিয়ে আবার খেলায় ফিরেছেন। খেলার পর বলছিলেন, ‘জাতীয় দলে ফিরতে চাই।’
যদিও জিয়ার ফিটনেস নিয়ে এখনো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুনীর হোসেন, ‘জিয়া আগের মতো ফিট না। ইনজুরির পর থেকে ও একটু মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে সেভাবে খেলতে পারছে না।’ কোচ আবদুল জলিল অবশ্য জিয়ার পারফরম্যান্সে খুশি, ‘ও এই টুর্নামেন্টে খুবই ভালো খেলেছে।’ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় বিজিবি দলের আল মামুন।

পিছিয়ে পড়েও জিতল চট্টগ্রাম মোহামেডান

ঢাকার বড় দলগুলোর পর গত পেশাদার লিগে সবচেয়ে ভালো করেছে ফেনী সকার। ১৩ দলের মধ্যে তাদের অবস্থান ছিল চতুর্থ। কিন্তু এবার কতটা কী করতে পারবে, শুরুতেই জাগল সেই শঙ্কা। চতুর্থ বাংলাদেশ লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই হেরে গেছে ফেনী সকার।
তা-ও কোথায়? কার কাছে? গতবার যারা লিগজুড়ে ধুঁকেছে, সেই চট্টগ্রাম মোহামেডান কাল ফেনী ভাষাশহীদ সালাম স্টেডিয়ামে সকারকে হারিয়ে গেল ২-১ গোলে। ঘরের মাঠে সকারের এই পরাজয়ে হতাশ স্থানীয় দর্শকেরা। তারা বড় আশা নিয়ে মাঠে এসেছিল। ব্যবসায়ী মামুন বললেন, ‘নিজের মাঠে দর্শকের উৎসাহ এবং সমর্থনের পরও সকারের হেরে যাওয়ায় খুব খারাপ লাগছে।’
খেলার শুরুটা ছিল ভিন্ন। দ্বিতীয় মিনিটেই মাসুদুল আলম বুলবুলের দর্শনীয় গোলে এগিয়ে যায় সকার। এর পরই খেলা জমে ওঠে। ৪২ মিনিটে জেরির গোলে ১-১। ৫১ মিনিটে চট্টগ্রাম মোহামেডানকে এগিয়ে নেন ইকবাল। সকার খেলায় ফিরতে মরিয়া লড়াই করলেও ফল আসেনি।
আজকের খেলা: শেখ রাসেল-ফরাশগঞ্জ (কমলাপুর স্টেডিয়াম, বিকেল ৪টা)

সিডন্সের চিন্তায় মাশরাফি

ব্রিসবেনে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ছুটির মধ্যেও তাই অস্ট্রেলিয়ায় বেশির ভাগ সময় ঘরেই কাটছে জেমি সিডন্সের। সময় কাটানোর সঙ্গী অ্যাশেজ আর দুই সন্তান স্টেলা-টোবি। ব্যস্ত বাবাকে এতটা সময় কাছে পেয়ে স্টেলা-টোবির সময় ভালো কাটলেও সিডন্স কিছুটা বিচলিত। বিশ্বকাপের আগে মাশরাফি বিন মুর্তজার ইনজুরি চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ কোচকে।
‘অ্যাঙ্কেলের ইনজুরি থেকে মাত্রই ফিরেছিল সে। জিম্বাবুয়ে সিরিজের কয়েকটা ম্যাচে দুর্দান্ত বল করে বোলিং আক্রমণের নেতৃত্বও দিল। দলের কথা ভেবে তাই আমি কিছুটা হতাশই’—অস্ট্রেলিয়া থেকে বলেছেন সিডন্স। স্পিন বোলারদের দলের মূল বোলিং অস্ত্র মানলেও দলে মাশরাফির প্রয়োজনটা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছেন কোচ, ‘আমাদের মূল বোলিং অস্ত্র স্পিনাররা। তবে প্রথম ১০ ওভারে ম্যাশই (মাশরাফি) আমাদের এগিয়ে দিতে পারে এবং পরে স্পিনারদের ভালো বোলিংয়ের জন্যও সেটা জরুরি। তখন সাকিবকেও খুব বেশি আগে আনতে হয় না বোলিংয়ে।’
তবে ইনজুরির দুর্ভাগ্যের সঙ্গে যেহেতু পেরে ওঠার উপায় নেই, অদৃষ্টকেই মেনে নিচ্ছেন কোচ, ‘দলটা এখন যেকোনো পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত। আমরা এখন কারও একার ওপর নির্ভরশীল নই।’
অস্ট্রেলিয়ায় বসেই মাশরাফির এমআরআই রিপোর্ট দেখেছেন সিডন্স, যোগাযোগ হয়েছে মাশরাফির চিকিৎসক অস্ট্রেলিয়ান বিশেষজ্ঞ ডেভিড ইয়াংয়ের সঙ্গেও। আশার কথা, মাশরাফির এবারের ইনজুরিটাকে খুব গুরুতর কিছু মনে করছেন না ইয়াংও। সিডন্সও তাই বলছেন, ‘মাশরাফিকে না দেখলেও তিনি (ডেভিড ইয়াং) মোটামুটি নিশ্চিত, এই ইনজুরি অন্তত ওর ক্যারিয়ার থামিয়ে দেবে না। তবে তার বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে এটা বড় একটা ধাক্কা তো অবশ্যই। দল নির্বাচনে এখন আমাদের খুব বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, চূড়ান্ত দল নির্বাচনের আগে ওর ইনজুরিটা সম্পর্কে আমাদের আরও ভালোভাবে জানতে হবে।’
মাশরাফি অবশ্য সুসংবাদই শোনাচ্ছেন কোচকে। হাঁটুর ইনজুরির অবস্থা প্রতিদিনই একটু একটু করে উন্নতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে আরও নিশ্চিত হতে আজ আবার দেখাবেন অ্যাপোলো হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী এর মধ্যেই হালকা ব্যায়াম এবং সাইক্লিং শুরু করে দিয়েছেন। জাতীয় দলের এই পেসার আশাবাদী, একবার বোলিং শুরু করতে পারলে বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হতে সমস্যা হবে না, ‘ফোলা একটু থাকবেই, তবে ব্যথা অনেক কমে গেছে। চার-পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে বোলিং শুরু করতে পারলে আশা করি বিশ্বকাপের আগেই প্রস্তুত হয়ে যাব।’
মাশরাফির ইনজুরির পর বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসানের অধিনায়ক হওয়া একরকম নিশ্চিত। সাকিব ভোট পাচ্ছেন কোচের কাছ থেকেও, ‘অধিনায়ক হিসেবে সাকিব অসাধারণ। আমাদের কাজের সমন্বয়টাও খুব ভালো। সে আক্রমণাত্মক মানসিকতার, ফিল্ডিং সাজানো আর বোলিং পরিবর্তনেও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। বিশ্বকাপে আমাদের এটাই দরকার।’
ছুটি কাটিয়ে ৭ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরবেন সিডন্স। প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণোদ্যমে শুরু করে দেবেন বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। তবে সিডন্সই জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি বলে আলাদা কিছু থাকবে না সেখানে, ‘নতুন কিছু নয়, আমরা নির্দিষ্ট বিষয় ধরে ধরে কাজ করব। যেমন নতুন বলের ব্যাটিং-বোলিং, পাওয়ার প্লের পরিকল্পনা, বোলিং বৈচিত্র্য। এ ছাড়া প্রতিপক্ষদের নিয়ে আগামী এক-দেড় মাসে প্রচুর হোমওয়ার্ক করা হবে। ফিল্ডিংটাও প্রস্তুতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে, তবে এর কোনোটাই নতুন নয়। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভালো ক্রিকেট খেলার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে, এটাই হলো শেষ কথা।’

তবুও কিছু প্রাপ্তি

আরেকটি বছর বিদায় জানাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। কেমন গেল বছরটা? ব্যর্থতার পাশে বলার মতো কিছু সাফল্যও আছে—একবাক্যে এটিই হতে পারে সহজ উত্তর।
এসএ গেমসে ১৮টি সোনা জয়, এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটের কল্যাণে প্রথমবারের মতো সোনা, গলফার সিদ্দিকুর রহমানের উত্থান, এসএ গেমস ফুটবলে সোনা ফিরে পাওয়া...। খুব কি কম?
ক্রিকেটের সাফল্যের সঙ্গে এগুলো হয়তো তুলনীয় নয়। কিন্তু বরাবর সালতামামিতে গুরুত্ব পেয়ে আসা ক্রিকেটের পাশে এবার অন্য খেলাগুলোর ওপরও আলো পড়েছে কিছুটা।
তবে আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি। অন্ধকার মানে, ক্রীড়াঙ্গনের বরাবরের সেই ব্যর্থতা। সেই জরাজীর্ণ ছবির বদল নেই। একই ধাঁচে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হয়েছে ২০১০ সালেও; বরং ক্ষেত্রবিশেষে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। একটা উদাহরণ—ক্রীড়া ফেডারেশনে নির্বাচন নির্বাসিত ছিল এ বছর। থেমে গেছে ক্রীড়াঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চা!
গতিশীলও কি হয়েছে? গেমসে অংশ নেওয়াই গতিশীলতার মানদণ্ড হলে উত্তর হ্যাঁ-বোধক হওয়া উচিত। বছরে তিনটি ভিন্ন গেমসে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে এসএ গেমসে প্রত্যাশিত সাফল্য এসেছে ঠিকই, কিন্তু কোন খেলায়? উশু, তায়কোয়ান্দো, মার্শাল আর্ট জাতীয় খেলাগুলোর কল্যাণে সোনাপ্রাপ্তি বেশি ছিল। অ্যাথলেটিকস, সাঁতারের মতো খেলায় সোনার সাফল্য নেই। অ্যাথলেটিকসের অবস্থাও আগের চেয়ে আরও রুগ্ণ হয়ে পড়েছে এ বছর।
শ্যুটিং তো একটা বার্তাই পেয়ে গেছে এবার। স্কোর ভালো না করতে পারলে ভবিষ্যতে আর কোথাও গিয়ে দাঁড়ানো যাবে না। এসএ গেমস ও কমনওয়েলথ শ্যুটিংয়ে সোনা এলেও বছরটা শেষ হয়েছে ব্যর্থতায়। কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসে শ্যুটারদের স্কোর পাতে তোলার মতো ছিল না। এককথায় ভরাডুবি! গর্বের কাবাডি পড়ে গেছে এক শ হাত গভীর খাদে। এশিয়াডে এবারই প্রথম পদকবঞ্চিত দলের জন্য এটাই যথার্থ বিশেষণ।
হকি নিয়ে কথা কম বলাই ভালো। ওটা তো এখন আর খেলা নয়, নিছকই কৌতুক! হকি ফেডারেশন বছরজুড়েই নানা হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। জার্মান কোচ পিটার গেরহার্ড ছিলেন অন্যতম বড় চরিত্র, যাঁকে ঘিরে চলেছে এসব কৌতুক।
এসএ গেমসের সোনা জয় এ বছর ফুটবলের বলার মতো অর্জন। হতে পারে বাংলাদেশের ফুটবল এমন জায়গায় যায়নি যে, বড় কিছু আশা করে ফেলবে। তাই বলে ফেব্রুয়ারিতে এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপে শ্রীলঙ্কার কাছে ৩ গোলে হারবে বাংলাদেশ! এশিয়ান গেমসের তিন ম্যাচেই হার, একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হংকংয়ের কাছে ৩ গোলে উড়ে যাওয়া—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ব্যর্থতা বড় বেশি চোখে লাগে।
ঘরোয়া ফুটবল ভালোভাবে চললেই তো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফল আসবে। সেই ঘরোয়া ফুটবলের জীর্ণ ছবি তো এতটুকু বদলায়নি। পেশাদার ফুটবল লিগ জুনে শেষ হয়ে দুই দিন আগে আবার শুরু হয়েছে, এটার ধারাবাহিকতাই সব নয়। ধারাবাহিকতা থাকলেও অবকাঠামোগত পরিবর্তন নেই। সেটির প্রতিশ্রুতি ক্লাব-বাফুফে কেউই রাখেনি।
সুপার কাপ তো থমকেই দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর কোটি টাকার এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এ বছর টুর্নামেন্টটি হয়নি। প্রতিবছর একটি করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করার অঙ্গীকার আছে বাফুফের, তা-ও হয়নি। পরিবর্তন তাহলে কোথায় হলো? ফুটবলে কথার তুবড়ি ছুটেছে, কাজ হয়েছে কম!
সবচেয়ে বড় কথা, তৃণমূল ফুটবল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। দুই বছর পর প্রথম বিভাগ হয়েও দ্বিতীয়-তৃতীয় বিভাগের খবর নেই। অনেক ঠেলে-ধাক্কিয়ে বাফুফেকে কিছুটা নড়ানো গেছে বছরের শেষ দিকে। আড়াই বছর পর এই সেদিন শুরু হয়েছে পাইওনিয়ার লিগ। গতকাল ঢাকা মহানগরী স্কুল ফুটবলও আলোর মুখ দেখল। তা-ও পাঁচ বছর পর!
কর্মকর্তাদের ভাষায় সমস্যার নাম মাঠ। কিন্তু এ বছরও মাঠ খোঁজার ব্যাপারে বাফুফের উদ্যোগী ভূমিকা দেখা যায়নি। ঢাকার তৃণমূল ফুটবলেই যখন এ অবস্থা, সারা দেশে তৃণমূল ফুটবল যে হচ্ছে না, তা বললেও চলছে। ঘরোয়া ফুটবলে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের ছিটেফোঁটাও নেই বরং আরও খারাপ হয়েছে!
বাফুফের দৃষ্টি বেশি আন্তর্জাতিক ফুটবলের দিকে। ঘরোয়া ফুটবলের ব্যাপারে তারা উদাসীন এবং কর্মকর্তা-কর্মী সবাইকেই ওই রোগে পেয়ে বসেছে। কর্তারা মাঠে যান খুব কম, এসি রুমে বসেই বাফুফে চালানোর প্রবণতা বেশি। তবে কর্মকর্তাদের সম্মান বৃদ্ধি হয়েছে। পাঁচ কর্মকর্তা পেয়েছেন এএফসির পুরস্কার।
চমকও কি নেই? সবচেয়ে বড় বাজেটের দল গড়ে চমক হয়ে এসেছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব। ছিল নাটকীয়তাও। এসএ গেমসে বাংলাদেশ দলকে সোনা এনে দিয়েই নিজের উচ্চ মূল্য হাঁকিয়েছেন কোচ জোরান জর্জেভিচ। পরে বহু নাটক করে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক কোচদের তালিকায়!
জর্জেভিচের উত্তরসূরী হিসেবে এসেছেন রবার্ট রুবচিচ। ২০১১ সালে ফুটবলের সালতামামিটা তাঁর হাত ধরে যদি একটু ভিন্ন হয়!

বালোতেল্লির হ্যাটট্রিক, ম্যানইউর ড্র

লিগে অপরাজিত থাকার রেকর্ডটিকে ১৮ ম্যাচে টেনে নিয়ে গেল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। কিন্তু পরশু বার্মিংহামের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে হাসিমুখে মাঠ ছাড়তে পারেনি ‘রেড ডেভিল’রা। ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা ম্যানইউকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে বার্মিংহামের সঙ্গে নাটকীয় ড্র (১-১) নিয়ে।
এর পরও অবশ্য পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থানটি তাদেরই। তবে সেটা গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কারণে। ১৮ ম্যাচে ৩৮ পয়েন্ট ম্যানইউর। বালোতেল্লির হ্যাটট্রিকে ৪-০ গোলে অ্যাস্টন ভিলাকে হারিয়ে পয়েন্টে ম্যানইউকে ছুঁয়ে ফেলেছে ম্যান সিটি। ২০ ম্যাচ খেলা সিটির পয়েন্টও ৩৮। পরশু নিউক্যাসলকে হারিয়ে (১-০) ৩৩ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার পাঁচে উঠে এসেছে টটেনহাম হটস্পার। ১৮ ম্যাচে ৩৫ পয়েন্ট নিয়ে চারে আর্সেনাল।
লিগে ফুলহাম ও এভারটনের বিপক্ষেও শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ম্যাচ ড্র করতে হয়েছিল ম্যানইউকে। পরশু দিমিতার বারবেতভের ৫৮ মিনিটের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও বাইয়ারের ৮৯ মিনিটের গোলে সমতা ফেরে ম্যাচে। বারবার একই ঘটনা ঘটছে বলে ম্যানইউ কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসন রাগতেই পারেন। তবে ক্ষোভ তাঁর খেলোয়াড়দের ওপর নয়, রেফারিং নিয়ে। ফার্গির দাবি, লি বাউয়ারের সমতাসূচক গোলের আগে তাঁদের বদলি স্ট্রাইকার নিকোলা জিগিচের হাতে বল লেগেছিল। সেটা ধরতে পারেননি রেফারি।
গোলটি করার সময় বাউয়ার অফসাইডে ছিলেন, ফার্গুসন বলেছেন এটাও। ম্যাচ শেষে ক্ষোভটা আর চেপে রাখতে পারেননি ম্যানইউ কোচ, ‘দ্বিতীয়ার্ধে তাদের কোণঠাসা করে রেখেছিলাম আমরা। কিন্তু যা ঘটল সেটা আমাদের প্রাপ্য ছিল না।’
ম্যানইউ-বার্মিংহামের মতো বিতর্ক ছিল না ম্যান সিটি-অ্যাস্টন ভিলার ম্যাচে। বরং হ্যাটট্রিক করে ‘আবার সিরি ‘আ’তে ফিরে যাচ্ছেন’ এমন একটা গুজবেই জল ঢেলে দিয়েছেন ইন্টার ছেড়ে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে প্রিমিয়ারে আসা মারিও বালোতেল্লি। ‘মুখে হাসি না থাকলেও আমি সব সময়ই আনন্দে থাকি’—বলেছেন তিনি। তবে বালোতেল্লির গম্ভীর মুখের কারণ আবিষ্কার করেছেন কোচ মানচিনি, ‘সম্ভবত ও গৃহকাতর। ২০ বছর বয়সেই পরিবার ছেড়ে বাইরে এসেছে ও। পরিবারকে মিস করা ওর জন্য স্বাভাবিকই।’
শুধু স্বাভাবিক ছিল না লিগে গোল না-পাওয়া। আগের সাত ম্যাচে করেছেন মাত্র ২ গোল। সেই গোল-খরা কাটালেন হ্যাটট্রিক করে। প্রথম ও শেষ গোলটি এসেছে পেনাল্টি থেকে (৮ ও ৫৫ মিনিটে, দ্বিতীয় গোল ২৭ মিনিটে)। সিটির চতুর্থ গোলটি লেসকটের। বালোতেল্লির হ্যাটট্রিকে গোল-খরা কাটল ম্যান সিটিরও। এই বড় জয়ের আগের পাঁচ ম্যাচে তারা গোল করতে পারে মাত্র দুটি। এদিন ক্যাম্পবেলের জোড়া গোলে ব্ল্যাকপুল ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছে সান্ডারল্যান্ডকে।

লিওনার্দো বিশ্বাসঘাতক

একই শহরের দুই ক্লাব। একই স্টেডিয়ামও ব্যবহার করে দুই দলই। তাই বলে ধরে নেবেন না, দুই দলের মধ্যে কী দারুণ সম্পর্ক! আদতে ব্যাপারটি ঠিক উল্টো। বলতে গেলে ‘রোজোনেরি’ নামে পরিচিত এসি মিলান আর ‘নেরাজ্জুরি’ নামে পরিচিত ইন্টার মিলান—একে অপরের শত্রু।
সম্পর্কের এই ফাটলটা আবার দেখা গেল লিওনার্দো ইন্টার মিলানের কোচ হওয়ায়। এসি মিলানেরই একজন হয়ে যাওয়া এই ব্রাজিলিয়ানের ‘শত্রুশিবিরে’ যাওয়াটা সহজভাবে নিচ্ছে না মিলান।
মিলানের সাবেক তারকা মার্কো ফন বাস্তেন যেমন লিওনার্দোকে একরকম বিশ্বাসঘাতকই বলে বসলেন, ‘আমি ইন্টারের বিপক্ষে নই। কিন্তু রোজোনেরি পরিবারের একজনের নেরাজ্জুরি পরিবারে যাওয়াটা আমার কাছে সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। এটা আমার কাছে একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।’
বছর পাঁচেক এই ক্লাবে খেলার পর কার্লো আনচেলত্তির সহকারী কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন লিওনার্দো। আনচেলত্তি চেলসিতে চলে গেলে প্রধান কোচ হিসেবেও অভিষেক হয় তাঁর। মিলান অবশ্য লিওনার্দোকে ছাঁটাই করেছে। এই ব্রাজিলিয়ান তাই উল্টো প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাঁকে ছাঁটাইয়ের সময় কোথায় লুকিয়ে ছিল এই ভালোবাসা?
এমন কথাও রটেছে, ইন্টার প্রেসিডেন্ট মাসিমো মোরাত্তি নাকি ইচ্ছে করেই মিলান শিবিরকে চটানোর জন্য এই কাজ করেছেন। মোরাত্তি অবশ্য দিব্যি-টিব্যি দিয়ে বলছেন, ‘আমি মিলানকে চটানোর জন্য ওকে নিয়োগ দিইনি। আমি ওকে বেছে নিয়েছি প্রতিভার কারণে। লিওনার্দোর ওপর আমার আস্থা আছে। ও আমাদের এখানে আসায় আমি খুশি।’

অবশেষে জয় পেল চেলসি, ড্র করল আর্সেনাল

প্রিমিয়ার লিগে টানা ছয় ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেনি চেলসি। দুই দিন আগে আর্সেনালের সঙ্গে ৩-১ গোলে হেরে শিরোপা জয়ের লড়াই থেকে প্রায় ছিটকে পড়ার দশাই হয়েছিল গতবারের শিরোপা জয়ীদের। তাই বোল্টনের বিপক্ষে গতকালের ম্যাচটি তাদের কাছে ছিল অনেকটাই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো। শেষ পর্যন্ত ছয় ম্যাচ পর নিজেদের মাঠে ১-০ গোলের জয় পেয়ে শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে টিকে থাকল চেলসি। প্রিমিয়ার লিগের অপর খেলায় উইগান অ্যাথলেটিকের বিপক্ষে দুর্ভাগ্যবশত ২-২ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে আর্সেনালকে। উলভসের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে গেছে লিভারপুল।
বোল্টনের বিপক্ষে জয় পেলেও মৌসুম শুরুর সেই দুর্দান্ত চেলসিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এই ম্যাচেও। প্রথমার্ধে খুব বেশি আক্রমণ শানাতে পারেননি দ্রগবা, ল্যাম্পার্ড ও আনেলকারা। দ্রগবার একটা ফ্রি-কিই শুধু গোলের কিছুটা সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেখান থেকে গোল পায়নি তারা। প্রথমার্ধ গোল-শূন্যভাবে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে চেলসি। শেষ পর্যন্ত ৬১ মিনিটের মাথায় মৌসুমের প্রথম গোলটি করে চেলসিকে ভারমুক্ত করেন ফরাসি মিডফিল্ডার ফ্লোরেন্ত মালুদা। জয় পেলেও এই ম্যাচে চেলসির পারফরমেন্স খুব একটা ভালো বলতে নিশ্চিত রাজি হবেন না অনেকেই। কিন্তু অত কিছু নিয়ে ভাবছেন না চেলসি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। অনেক দিন জয়-বঞ্চিত থাকার পর চাকরিটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাওয়ার পর আনচেলত্তি এই জয়টাকেই অনেক বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন। গতকাল এ জয়টার পর তিনি বলেছেন, ‘জয়টা খুবই স্বস্তিদায়ক। আমার মতে, এ মুহূর্তে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ইতিবাচক ভাবনা ফিরিয়ে আনা এবং আবার জয়ের ধারায় ফেরার জন্য এ জয়টা খুবই দরকার ছিল।’
উইগান অ্যাথলেটিকের বিপক্ষে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে পারত আর্সেনাল। প্রথমার্ধের ১৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে একটি গোল হজম করে পিছিয়ে গিয়েছিল গানাররা। কিন্তু ৩৯ ও ৪৪ মিনিটে দুটি গোল করে আর্সেনালকে এগিয়ে দিয়েছিলেন আন্দ্রে আরশাভিন ও নিকলাস বেন্টনার। দ্বিতীয়ার্ধে আর গোল শোধ করার কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেননি উইগান স্ট্রাইকাররা। কিন্তু ৮১ মিনিটে আর্সেনাল ডিফেন্ডার সাবেস্টাইন স্কুইলাচি দুর্ভাগ্যবশত নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দিলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়তে হয় আর্সেনালকে।

শুভ নববর্ষ ২০১১- দিনে দিনে বর্ষ হলো গত by আশীষ-উর-রহমান

দিনপঞ্জিকার শেষ পাতাটি উল্টে যাবে আজ। নানা কাজের ফিরিস্তি লেখা নিত্যসঙ্গী হাতখাতাটি হয়ে পড়বে সাবেক। পরমায়ুর বৃক্ষ থেকে ঝরে যাবে একটি পাতা। সময় হলো খ্রিষ্টীয় ২০১০ সালকে বিদায় বলার। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।/ তারি রথ নিত্যই উধাও...’। সেই চিরচলিষ্ণু রথ এগিয়ে চলছে তার নির্দিষ্ট গতিবেগে। অপেক্ষার অবকাশ নেই কোনো প্রয়োজনে। চূড়ান্ত রকমের নিরাসক্ত, ভাবাবেগহীন একমুখী যাত্রা তার।

এরশাদের বিচারে দুই দলেরই আগ্রহ কম ___প্রথম আলো থেকে

বৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিচার হবে কি না, সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে তা বলা হয়নি। বরং তাঁর বিচার করা সরকারের জন্য বিব্রতকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন মহাজোটের নেতারা। আর এ বিষয়ে বিরোধী দল বিএনপির অবস্থানও অনেকটা একই। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, দেশে সামরিক শাসন জারির জন্য এরশাদ ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহ কর্মকাণ্ড করেছেন। এ জন্য তাঁর বিচার হওয়া উচিত।

খবর, কালের কণ্ঠের- কিশোরদের সাদামাটা ফলঃ জেএসসিতে পাসের হার ৭১.৩৪

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর রেকর্ড সৃষ্টিকারী ফল প্রকাশের দুদিনের মাথায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হলো জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার ফল। দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৭১.৩৪ শতাংশ। গড়ে প্রতি বিষয়েই কমপক্ষে ৮০ নম্বর করে পাওয়ার সুবাদে জিপিএ ৫ পেয়েছে আট হাজার ৫২ শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে প্রথমবারের মতো

খবর, প্রথম আলোর- জিপিএ-৫ পেয়েছে আট হাজার ৫২ জনঃ প্রথম পরীক্ষায় ৭১% পাস

প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত অষ্টম শ্রেণীর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় সারা দেশে গড়ে ৭১ দশমিক ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। সর্বোচ্চ সাফল্য জিপিএ-৫ পেয়েছে আট হাজার ৫২ জন। পাস করা শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ পেয়েছে ‘সি’ গ্রেড (জিপিএ-২ থেকে ৩-এর মধ্যে)। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের আটটি শিক্ষা বোর্ডের ফল একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়।

Thursday, December 30, 2010

গণমাধ্যমকে কে রেগুলেট করবে? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

সংবাদপত্র, টিভি বা বেতার অর্থাৎ সার্বিকভাবে গণমাধ্যম যদি স্বেচ্ছাচারী হয়, তাহলে তার চেয়ে বিপজ্জনক আর কিছু হতে পারে না। কারণ গণমাধ্যমকে রেগুলেট করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান আমরা স্বাধীনতার ৪০ বছরেও তৈরি করতে পারিনি। সরকার ও সমাজের হয়তো প্রত্যাশা ছিল, গণমাধ্যম চলতি আর দশটি ব্যবসার মতো হবে না; এটা হবে সমাজসেবার ব্যবসা, আদর্শ প্রচারের বাহন। একসময় এটাই ছিল বাস্তবতা। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, পাকিস্তান আমল (১৯৭০) পর্যন্ত এ দেশে সংবাদপত্র প্রকাশনা আলু-পটোলের ব্যবসার মতো ছিল না। পূর্ব বাংলার অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের কথা প্রচারের লক্ষ্যে বা শ্রমিক-কৃষক তথা মেহনতি মানুষের দাবি তুলে ধরার জন্য অনেকে সংবাদপত্র প্রকাশ করেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মওলানা আকরম খাঁ, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বা খায়রুল কবীররা সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন এ রকম নানা আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন এই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের পর যখন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অবাধে সংবাদপত্র প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তখন সংবাদপত্র প্রকাশনা আদর্শের জায়গা থেকে আস্তে আস্তে সরে যেতে থাকে। নব্বইয়ের পর থেকে এ দেশের রাজনীতিও দূষিত হতে থাকে। জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির এক বিরাট অংশ সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সংবাদপত্র প্রকাশনায় ও টিভি চ্যানেলের ব্যবসায়। ব্যতিক্রম কয়েকটি ছাড়া বেশির ভাগ গণমাধ্যম নানা বাণিজ্যিক স্বার্থ, কালো টাকার পাহারাদার, ভূমিদস্যুতার স্বার্থ রক্ষা, দূষিত রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানো ইত্যাদি লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুধু তা-ই নয়, সামরিক-বেসামরিক নানা গোয়েন্দা সংস্থার অর্থ-সহায়তায়ও সংবাদপত্র প্রকাশনার অভিযোগ শোনা যায়।
আমার এই পর্যবেক্ষণ পাঠকের জন্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অফিসে, ক্লাবে, পারিবারিক আড্ডায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কথা অনেক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। আমি সৌজন্যবশত কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের নাম লিখিনি। কিন্তু আড্ডার আলোচনায় অনেকে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম নিয়েই অভিযোগ তোলেন। অনেক পাঠক এসব কথা জানেন।
আদর্শভিত্তিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এ দেশে একদা সংবাদপত্র প্রকাশনা শুরু হয়েছিল। সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকেরা ছিলেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। আর আজ? আজ ঋণখেলাপি, ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে গোয়েন্দা বিভাগের এজেন্ট অনেকেই সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদক। নানা কারণে এখনো সম্পাদক বা প্রকাশকের একটা সরকারি বা সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান রয়েছে। এই সম্মানের আড়ালে তাঁরা কার কী স্বার্থ উদ্ধার করছেন, তা খুব কম পাঠকেরই জানার সুযোগ হয়। অনেক সরলমনা পাঠক এখনো সংবাদপত্রের সব খবর বা নিবন্ধকে খুব আস্থার সঙ্গে পড়েন। কিন্তু সব সংবাদপত্র যে ‘সাংবাদিকতা’ করার লক্ষ্যে সংবাদপত্র প্রকাশ করে না, তা অনেকেই জানেন না। তবে কিছু সংবাদপত্র নিয়মিত পাঠ করে অনেক পাঠক ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন, কয়েকটি সংবাদপত্রের বিশেষ অ্যাজেন্ডা কী? একটা পুরোনো প্রবাদ আছে, কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়। অনেক মানুষকে বেশি সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।
সাংবাদিকতার কিছু আন্তর্জাতিক নিয়মরীতি আছে। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদক যদি তা মানতে না চান, তাহলে তাঁকে বাধ্য করবে কে? কারণ তাঁর হাতে রয়েছে সংবাদপত্র, রিপোর্ট, ছবি, কলাম ও আরও কত কী। টিভি চ্যানেলের মালিকের রয়েছে ক্যামেরা, ক্যাসেট, এডিটিং টেবিল ও সম্প্রচারের যন্ত্র। আর কী চাই? তিনি যা চান, তা-ই প্রচার করতে পারেন। ইচ্ছেমতো বক্তৃতা কাটতে পারেন। এক কথার সঙ্গে সুবিধামতো আরেক কথা জোড়া দিতে পারেন। বক্তার একটা কথার দুটি শব্দ বাদ দিয়েও প্রচার করতে পারেন। একই কথা দুবার প্রচার করতে পারেন। এক ছবি ১০ বার দেখাতে পারেন। দেখানোর উপযুক্ত হলেও তা না দেখানোর স্বাধীনতাও তাঁর রয়েছে। টিভি চ্যানেলের স্বাধীনতার (পড়ুন স্বেচ্ছাচারিতা) কোনো শেষ নেই। টিভি চ্যানেলও যদি নিয়মরীতি মানতে না চায়, কে তাকে বাধ্য করবে? সমাজে এমন কোনো শক্তি আছে কি, গণমাধ্যমকে রীতিনীতি মানতে বাধ্য করতে পারে? হ্যাঁ, একমাত্র সরকারই পারে। কিন্তু সরকারের প্রশ্রয়ে যদি এ রকম স্বেচ্ছাচারিতা ঘটে, তাহলে কে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করবে?
আমার মাঝেমধ্যে সন্দেহ হয়, এর পেছনে কি কোনো সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করছে? আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের শিকার। দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান পরিবারতন্ত্রের ওপর দল দুটি নির্ভরশীল। দলের প্রধানের একনায়কত্ব এবং কিছু পেটুয়া নেতার নিয়ন্ত্রণে প্রধান দুটি দলের নীতিনির্ধারণ হয়ে থাকে। দলের সম্মেলন, নানা কমিটি ও নানা সভা অনেকটাই লোক দেখানো। দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অন্যত্র নেওয়া হয়। দল দুটির ঐতিহ্যবাহী ছাত্র শাখাও টেন্ডারবাজি ও দুর্বৃত্তায়নের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে বড় দুটি দলের ছাত্র শাখার কোনো সম্পর্কই নেই। বড় দুটি দল তাদের দলের সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থাকে কলুষিত করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক টিআইবি রিপোর্ট তা আরও ভালোভাবে তুলে ধরেছে। গণতন্ত্রচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ‘জাতীয় সংসদ’ পর পর দুই মেয়াদ প্রায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই চলছে। বিরোধী দল ছাড়া ‘জাতীয় সংসদ’ এক প্রকার প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। সেই প্রহসন আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।
দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে দূষিত, অকার্যকর ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ঠিক সে রকম অবস্থায় সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের মতো শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুপরিকল্পিতভাবে কিছু লোক তাদের নানা অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গণমাধ্যমকেও জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর করে তুলছে। ভূমিদস্যু, ঋণখেলাপি বা গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা প্রকাশক ও সম্পাদকের ছদ্মবেশে গণমাধ্যমের ইতিবাচক শক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে নেমেছে বলে আমার সন্দেহ হয়। কারণ সংবাদপত্র যদি প্রায়ই ভুল খবর ছাপিয়ে পরদিন ভুল স্বীকার করে, তাহলে পাঠক সংবাদপত্রের ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? গুজবই যদি সংবাদপত্রের শীর্ষ খবর হয় এবং পরদিন তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে পাঠক সেই সংবাদপত্রকে বিশ্বাস করবে কেন? এভাবে চলতে থাকলে সংবাদপত্র, টিভি বা সাংবাদিকতা পেশার প্রতিই মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা, ভুল ও অর্ধসত্য তথ্য দিয়ে যদি প্রতিদিন সংবাদপত্র প্রকাশ করতে হয়, সেই সংবাদপত্রকে পাঠক গুরুত্ব দেবে কেন?
‘রাজনীতি’ ছিল সমাজসেবার এক মহান পেশা। রাজনীতিবিদেরা ছিলেন ত্যাগী মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত। সেই রাজনীতিকদের এখন কী ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে, পাঠক তা ভালোভাবে জানেন। একটি ক্ষুদ্র মহল সুপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকতা পেশাকেও এভাবে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে আমার সন্দেহ হয়। পেশাদার সংবাদপত্র বা সৎ সাংবাদিকতাকে ছাপিয়ে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ সমাজে বেশি আলোচিত হয়। মানুষ নেতিবাচক খবর নিয়ে গল্প করতে পছন্দ করে। এটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এর ব্যাখ্যা মনস্তত্ত্ববিদেরা ভালো দিতে পারবেন।
সমাজ কি সাংবাদিকতা পেশাকে এভাবে কলুষিত হতে দেবে? মতলববাজ রাজনীতিবিদ, ভূমিদস্যু, ঋণখেলাপি ও গোয়েন্দা দপ্তরের এজেন্টদের তথাকথিত ‘মিশন’ থেকে সৎ ও নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে উদ্ধার করার উপায় কী? এখনো উদ্ধার করার সময় আছে। জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির মতো সাংবাদিকতা পেশা এখনো একেবারে কলুষিত হয়নি। এখনো ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ সংখ্যায় কম। কিন্তু ব্যবসা, বিজ্ঞাপন, নানা রাজনৈতিক প্রলোভন বা ব্ল্যাকমেইলিং করে পেশাদার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলকে ‘হলুদ’ করে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। সেটা আরও ভয়ের। পুলিশ বিভাগ বা বিচার বিভাগের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তার পেছনে স্বাধীন সংবাদপত্রের অবদান অনেকখানি। সে জন্য স্বাধীন সংবাদপত্র তথা পেশাদারি সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করার জন্য আজ অনেকে তৎপর। স্বাধীন সংবাদপত্র দেশে আছে বলেই আজ দূষিত রাজনীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির অনেক খবর জনসমক্ষে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে। পাঠককে সংবাদপত্রের এই ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
হলুদ সাংবাদিকতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত ‘প্রেস কাউন্সিলের’ মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের তথ্যমন্ত্রীর নির্লিপ্ততার কারণে প্রেস কাউন্সিল আজ একটি প্রায়মৃত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আজ যদি প্রেস কাউন্সিল সত্যিকার অর্থে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হতো, তাহলে হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগ প্রমাণের পর অনেক প্রকাশক বা সম্পাদককে নানা শাস্তি পেতে হতো। প্রেস কাউন্সিলকে আমি তখনই কার্যকর প্রতিষ্ঠান বলব, যখন সংবাদপত্রে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই সংবাদপত্রের রিপোর্টার, প্রকাশক ও সম্পাদকের অর্থদণ্ড হতো; সম্পাদক ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হতেন। এক বছরে তিনবার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রেস কাউন্সিল যদি সাংবাদিকতার মান রক্ষার জন্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই সেটা একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানের দাবিদার হতে পারবে। তা সম্ভব না হলে আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী পেশাদারি সাংবাদিকতা একদিন হলুদ সাংবাদিকতার গহ্বরে ঢুকে পড়লে আমি অবাক হব না।
সাংবাদিকেরা সংবাদপত্রে বা টিভিতে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন। সেটা তাঁদের দায়িত্ব। কখনো ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ মাধ্যমে অনেককে আগাম শাস্তিও দিয়ে থাকেন। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে তাঁরা যে অপকর্মটি করছেন, সে জন্য তাঁদের শাস্তি দেবে কে?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক।

জেলে কার্ড জেলেদের জন্যই by নেয়ামত উল্যাহ

নভেম্বর থেকে মে। টানা সাত মাস মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে ‘জাটকা সংরক্ষণ অভিযান’ চালানো হয়। এরই মধ্যে দুই মাসে (মার্চ-এপ্রিল) দুটি নদীতে কোনো প্রকার জাল না ফেলার ‘নিষেধাজ্ঞা’ আছে। মোট ৩৩০ কিলোমিটার জলাশয়ের ওপর ২০০৭ সাল থেকে এ নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। ইলিশ বাঁচানোর জন্য পুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, মৎস্য অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন একসঙ্গে দৌড়াচ্ছে। সঙ্গে আছেন ইউনিয়ন পরিষদের নেতারা। বেকার জেলেরা এ সময় কী খাবেন, কী করবেন, তা কিন্তু ঠিক হয়নি। অনির্ধারিতভাবে জেলেদের ঘরে বসে খাবারের ব্যবস্থা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ আসে। কিন্তু সেগুলোর কোনো খোঁজ থাকে না। এখন আবার প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, জেলেদের জন্য ‘জেলে কার্ড’ করবেন। এটা জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। কিন্তু এ জেলে কার্ড যাবে কোথায়?
বয়স্ক জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় জেলেরাই অনেক নিয়মকানুন মান্য করে নদীতে মাছ ধরতেন। তাঁরা ছোট মাছ ধরতেন না, ডিমওয়ালা মাছ ধরতেন না, ছোট ফাঁকার জাল ব্যবহার করতেন না। কিন্তু এখন সরকার আইনকানুন করেও আইন মানাতে পারছে না। বয়স্ক জেলেরা বলেন, ‘মারু হাপ্পু প্যান্ট পরোইন্যারা অইছে জাইল্যা, খিদা লাগজে খাইল আড়ি (পাত্র) হুদা করি। পরের বেলা কী খাবি, দরকার কী চিন্তা করি। মাছ থাইকপো কুডেত্তেন?’ কারা ধরেছে এ মাছ? অবশ্যই সাধারণ জেলেরা। তবে তাঁদের দিয়ে ধরানো হচ্ছে। ধরাচ্ছেন প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, নয়তো নেতাকে বখরা দিয়ে তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় মৎস্য ব্যবসা করেন। এঁদের সঙ্গে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন। দেখা গেছে, গত দুই বছর এই প্রভাবশালী মহল নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের দিয়ে ঠিকই মাছ ধরিয়েছে। আর সেটা মাছের রেণু পোনা বংশসহ।
গত মার্চে ভোলা সদর উপজেলার ‘ভোলা খালের মাথা’ নামের মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দিনদুপুরে জেলেরা ঝুড়ি ভরে ছোট ছোট মাছের পোনা ধরে আনছেন। একেকটি ঝুড়িতে কমপক্ষে ১৫ কেজি মাছ হবে, যা মাছঘাটে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ১১৫ টাকায়। ওই ১৫ কেজিতে কয়েক লাখ মাছ হবে। এ মাছ কোন জাল দিয়ে ধরা হয়—জানতে চাইলে জেলেরা জানালেন, বেহুন্দি, খরচি-মশারি, ঘুন্ডি জাল দিয়ে—যে জালগুলো সারা বছরই সরকার নিষিদ্ধ করেছে। দৌলতখান মাঝিরহাট ও পাতার খাল মৎস্যঘাট থেকে লালমোহন বাত্তিরখাল মাছঘাটের দৃশ্যও একই। নিষিদ্ধ সময়ে কোনো অভিযানের বালাই ছিল না। ফলে নিষিদ্ধ সময়ে রাত-দিন এসব জালে মাছ ধরা হয়েছে। সঙ্গে আছে কারেন্ট জাল, যে জাল দোকানে বিক্রি নিষেধ নয়, কিন্তু তা দিয়ে মাছ ধরা নিষেধ। ফলে চুরি করে ঠিকই মাছ ধরা হচ্ছে। ৮-১০ প্রকার জাল দিয়ে মাছ ধরা সারা বছর নিষিদ্ধ, কিন্তু প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শুধু কারেন্ট জাল নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
নদীতে জাল ফেলা নিষিদ্ধ সময়ে দাঁড়ের নৌকার জেলেরা মাছ ধরেন না। কারণ, তাঁরা যে আড়তে মাছ বিক্রি করেন, তারা শক্তিশালী নয়, নয়তো নিজের শেষ সম্বল জালটি হারানোর ভয় থাকে। ওই জেলেরাই প্রকৃতভাবে বেকার থাকেন, তাঁদের সংসারে অভাব থাকে। সন্তানদের দুবেলা খেতে দিতে পারেন না। এরপর আছে এনজিওর কিস্তি। দাদন ও এনজিওর কিস্তি মিলিয়ে এঁরা ১৫-২০ হাজার টাকায় একটি জেলে নৌকা তৈরি করেন। আর ১২ মাসই এ ঋণের কিস্তি টানতে হচ্ছে। তাই যেসব জেলে চুরি করে মাছ না ধরতে পারেন, বেকার থাকা দুই মাসে তাঁর সব খোয়া যায়। গরিব জেলেদের নালিশ কখনো তাঁরা প্রশাসনকে বলতে পারেন না।
নিষিদ্ধ সময়ে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছের জাটকা, রেণু পোনা ধরা হলো। কিন্তু ওই মাছ কিনল কে? বেচল কোথায়? জানা গেল, আড়তদারেরা সারা দিন মাছ কিনে বরফ দিয়ে রাখেন। ভোররাতে ইঞ্জিনের নৌকায় চাঁদপুর অথবা লক্ষ্মীপুরে পাঠিয়ে দেন। কারণ, নিষিদ্ধ জলসীমা পার হলেই অবৈধ মাছ বৈধ হয়ে যায়। মাছ ক্রেতার ব্যাগে ঢোকার পর ‘দাঁতে রোদ’ লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন নদীতে অভিযানে বের হন। অন্যদিকে এসব বাহিনী নদীতে অভিযান না চালিয়ে ওপরে অভিযান চালাতে ভালোবাসে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন প্রভাবশালীরা। জেলেরা জানান, দাদনভুক্ত জেলেরা মাছ ধরে আড়তদারের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু আড়তদার যদি মাছ কেনা বন্ধ করে দেন, তবে জেলেরা আর মাছ ধরবেন না। কিন্তু মৎস্য বিভাগ সেটা করে না। অন্যদিকে ভোলায় কী পরিমাণ মৎস্য ব্যবসায়ী রয়েছেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তাঁদের কতটি নৌকা, কতটি জাল ও কতজন দাদনভুক্ত জেলে রয়েছেন, মৎস্য বিভাগের কাছে তারও কোনো হিসাব নেই। নেই জবাবদিহি। ক্ষমতা আর টাকা থাকলেই একজন ‘প্যান্ট পরা’ লোক মৎস্য ব্যবসায় নামছেন।
দুই মাস বেকার জেলেদের পুনর্বাসনে এ বছর সরকার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। এ বছর ৪৪ হাজার ৩৭২টি জেলে-পরিবারকে চার মাসে ১২০ কেজি চাল দেওয়া হয়। এবং এক হাজার ৪০০ জেলেকে তাঁদের দারিদ্র্যের ধরন অনুযায়ী অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে পুনর্বাসনের জন্য। কিন্তু ওই চাল আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসেও অনেক ইউনিয়নে বিতরণ করা হয়নি। মৎস্য বিভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদ প্রতিবছর তালিকা করে। মৎস্য বিভাগ, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা প্রতিবছর তাঁদের কে কী সুবিধা দিলেন, তার ওপর নির্ভর করে তালিকা করেন। এ বছর প্রথম তিন-চার মাস লেগেছে জেলেদের তালিকা করতে।
গত দুই বছর তালিকা নিয়ে জটিলতা বেশি হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দ্বন্দ্ব সংঘাতের কারণে। এ চাল বিতরণ নিয়ে অন্তত ১০টি ইউনিয়নে বিক্ষোভ, হাতাহাতি, সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে। যেসব ইউনিয়নে চাল বিতরণ করা হয়েছে, সেখানেও সঠিক নিয়মে বিতরণ করা হয়নি। প্রতি মাসে ৩০ কেজির স্থলে ২০-২৬ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। যদি প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা করে কার্ড দেওয়া হয় এবং নিষিদ্ধ সময়ে সংসার চালানোর মতো চাল দেওয়া হয়, তবে জেলেরা সে সময়ে নদীতে মাছ ধরতে যাবেন না। কথায় আছে, পেটে দিলে পিঠে সয়। প্রধানমন্ত্রী জেলে কার্ড করবেন। সে কার্ড বিতরণের আগে একটি নিরপেক্ষ জরিপ দরকার। জরিপকাজটি পরিসংখ্যান বিভাগ করতে পারে। তারপর প্রকৃত জেলেদের মধ্যে রেশনিং পদ্ধতিতে নদীতে জাল ফেলা নিষিদ্ধ দুই মাস চাল-ডাল-তেল বিতরণ করা উচিত। নইলে দলীয় কর্মী আর ভুয়া জেলেরা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া জেলে কার্ডের মালিক হবেন।
নেয়ামত উল্যাহ: প্রথম আলোর ভোলা প্রতিনিধি।

পৌরসভা নির্বাচন

ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম মাসটি নির্বাচনী তৎপরতায় মুখর থাকবে। ২৬২টি পৌরসভায় নির্বাচন ও দুটি আসনে জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন হবে। পৌরসভা নির্বাচন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা চলে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পৌরসভার উন্নয়নে কাজ করবেন, স্থানীয় জনগণের কাছে তাঁদের জবাবদিহি হবে। গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করার জন্য এ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া জরুরি। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের দুটি আসনে যে উপনির্বাচন হচ্ছে, সেগুলোও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর আগে নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। এবার হচ্ছে দলীয় সরকারের সময়। তাই এ নির্বাচনগুলো সরকারের প্রভাবমুক্তভাবে সুসম্পন্ন হয় কি না, সেদিকে সবার নজর থাকবে।
সম্প্রতি বিভিন্ন পৌরসভার ৩০ জন মেয়র পদপ্রার্থী নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের এলাকায় সরকারি দলের সমর্থিত প্রার্থীরা প্রশাসনকে প্রভাবিত করছেন। তাঁরা ইসির কাছে প্রতিকার হিসেবে সেনা মোতায়েনের আবেদন জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে ইসি। সেনা মোতায়েন মূল কথা নয়। আসল কথা হচ্ছে, সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীরা যেন প্রশাসনকে ব্যবহার করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট সচেতন ও সক্রিয় রয়েছে, তা বলা চলে। তবে সরকারকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
পরশুরামে সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীর বাসভবনে বেশির ভাগ নির্বাচনী কর্মকর্তাকে দাওয়াত করে খাওয়ানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তা অবিলম্বে তদন্ত করে দেখা দরকার। কোনো প্রার্থীর বাসভবনে যদি নির্বাচনী কর্মকর্তা দাওয়াত খেতে যান, তাহলে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নির্বাচনের এ মাসটি সরকারের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা। দুই বছর আগে জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এ সরকারকে ক্ষমতায় এনেছিল। কালের আবর্তে সরকারের জনপ্রিয়তার হ্রাস-বৃদ্ধি কতটা হয়েছে, তার একটা পরিমাপ এ নির্বাচনের ফলাফল থেকে পাওয়া যাবে। পৌরসভা নির্বাচনগুলো যদিও দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ে হবে না, তা সত্ত্বেও এসব নির্বাচনের ফলাফলকে সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থকদের জয়-পরাজয় হিসেবেই দেখা হয়। তাই উভয় পক্ষই নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে।
সরকারের মনোভাব এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সরকার যদি প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার না করে, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। মানুষের কাছেও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না। যদি এটা সম্ভব হয়, তাহলেই কেবল বলা যাবে যে সরকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কোন দলের সমর্থিত প্রার্থী কতটি পদে নির্বাচিত হয়েছেন, সে বিষয়টি তখন গৌণ হয়ে পড়বে।
নির্বাচন কমিশন এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এটা গণতন্ত্রের অগ্রগতিরই সুফল। এখন আর কোনো প্রার্থী আগের মতো লোকলশকর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যেতে পারেন না। নির্বাচনী ‘শোডাউন’ এখন আর চলে না। আমরা আশা করব, এই ধারাটি অব্যাহত রাখার জন্য সব দল ও প্রার্থী সচেষ্ট থাকবেন। তাহলে আসন্ন নির্বাচনগুলো আমাদের গণতন্ত্রকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।

পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় ১৫ জঙ্গি নিহত

পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন মানববিহীন বিমান ড্রোন থেকে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৫ জঙ্গি নিহত হয়েছে। স্থানীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের মিরানশাহ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত গুলাম খান গ্রামে এ হামলা চালানো হয়। গ্রামটিতে তালেবান জঙ্গিদের দুটি আস্তানা লক্ষ্য করে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। এতে ওই ১৫ জঙ্গি নিহত হয়। তবে তাদের পরিচয় জানানো হয়নি।
গত ২৪ ঘণ্টায় এটি ওই এলাকায় এ ধরনের দ্বিতীয় হামলা। এলাকাটিতে হাক্কানি সমর্থকদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। ধারণা করা হয়, সেখান থেকে জঙ্গিরা সীমানা পার হয়ে আফগানিস্তানে বিদেশি সেনাদের ওপর হামলা চালায়।

সিয়াওবোর জন্মদিন উদ্যাপিত

এ বছর শান্তিতে নোবেলজয়ী চীনের ভিন্নমতাবলম্বী নেতা লিউ সিয়াওবো গতকাল মঙ্গলবার কারাগারে তাঁর ৫৫তম জন্মদিন উদ্যাপন করেছেন।
গত বছরের বড়দিনে সরকারবিরোধী তৎপরতার দায়ে তাঁকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত অক্টোবরে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নোবেল কমিটির এ সিদ্ধান্ত অপরাধকে উৎসাহিত করার শামিল বলে মন্তব্য করে।

ব্রিটেনে গ্রেপ্তার নয়জন রিমান্ডে

ব্রিটেনে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া নয়জনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা ব্রিটেনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে, বিগবেন ও সে দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ ছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জ, বরিস জনসনস, লন্ডন আই অ্যান্ড দ্য চার্চ অব সায়েন্টলোজি এ হামলার তালিকায় ছিল। লন্ডনের পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে।
২০ ডিসেম্বর পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের মধ্যে নয়জনের বিরুদ্ধে বোমা ও সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। অপর তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের তথ্যমতে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সবাই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তাঁরা হলেন গুরুকান্ত দেশাই (২৮), ওমর শরীফ লতিফ (২৬), আবদুল মালিক মিয়া (২৪), মুহাম্মদ মকসুদুর রহমান চৌধুরী (২০), শাহ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান (২৮), নাজাম হোসেন (২৫), উসমান খান (১৯), মহিবুর রহমান (২৬) ও আবুল বশির মুহাম্মদ শাহজাহান (২৬)।
তাঁদের গত সোমবার লন্ডনের সিটি অব ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৪ জানুয়ারি তাঁদের আবার ওল্ড বেইলি আদালতে হাজির করা হবে।

নাইজেরিয়ায় সহিংসতার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৮০

নাইজেরিয়ায় বড়দিনের উৎসবে বোমা হামলা এবং খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৮০ জনে পৌঁছেছে। দেশটির জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থা গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, বোমা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহতদের পাঁচটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এসব হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ৮০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮৯ জন।
গত শুক্রবার নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলীয় জস শহরে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের একটি গির্জায় বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে গত রোববার খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর সবচেয়ে প্রশংসিত ওবামা ও হিলারি

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে ২০১০ সালের সবচেয়ে প্রশংসিত পুরুষ নির্বাচিত হয়েছেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ তালিকায় নারীদের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। ইউএসএ টুডে ও গ্যালাপের বার্ষিক জরিপের ফলাফলে এ কথা জানানো হয়েছে।
ফলাফল অনুযায়ী, পুরুষদের মধ্যে ওবামাকে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করেন ২২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। পাঁচ শতাংশ লোকের ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তিনি পেয়েছেন চার শতাংশ ভোট।
অন্যদিকে ১৭ শতাংশ লোকের ভোট পেয়ে হিলারি ক্লিনটন নবমবারের মতো সবচেয়ে প্রশংসিত নারী নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে আছেন আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর সারাহ পেলিন। তিনি পেয়েছেন ১২ শতাংশ ভোট। ১১ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক অপরাহ উইনফ্রে।

মুক্তিপণ নিয়ে একটি জাহাজ ছেড়েছে সোমালীয় জলদস্যুরা

সোমালীয় জলদস্যুরা ৫৫ লাখ ডলার মুক্তিপণের বিনিময়ে জার্মানির পরিচালিত একটি জাহাজ গত সোমবার ছেড়ে দিয়েছে। জাহাজটিতে দুজন বাংলাদেশিসহ ২২ জন ক্রু ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।
গত মে মাসে ওমানের ১২০ মাইল দক্ষিণে ভারত মহাসাগর থেকে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমটি ম্যারিডা মারগুয়েরাইট নামের ওই জাহাজটি সোমালীয় জলদস্যুরা ছিনতাই করে। রাসায়নিক পদার্থবাহী জাহাজটি ভারতের গুজরাট থেকে বেলজিয়ামে যাচ্ছিল। জাহাজে ১৯ জন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি ও একজন ইউক্রেনীয় ক্রু ছিলেন।
কেনিয়াভিত্তিক ইস্ট আফ্রিকান সিফেয়ারারস অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম জানায়, গত রোববার মুক্তিপণের অর্থ হস্তান্তর করা হয়। পরে গত সোমবার জাহাজটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। জাহাজটি সম্ভাবত বেলজিয়ামের দিকে রওনা দিয়েছে।

মস্কোর বিমানবন্দরে যাত্রী বিক্ষোভ নিয়ে তদন্ত

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় গত তিন দিন বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দুটি প্রধান বিমানবন্দরে আটকে পড়া হাজার হাজার যাত্রীকে বিদ্যুৎ ও পানির জন্য অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর প্রতিবাদে যাত্রীরা বিক্ষোভ করে। গতকাল মঙ্গলবার সে দেশের সরকারি কৌঁসুলিরা বিষয়টির তদন্তে নামেন।
প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়া ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মস্কোর দোমোদেদোভো ও শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে দুই শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এতে এসব ফ্লাইটের হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে দুর্ভোগ পোহান।
সরকারি কৌঁসুলি ইয়েভজেনি পসপেলভ সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে গতকাল জানান, বিমানের ফ্লাইট বাতিল, বিদ্যুৎব্যবস্থা ভেঙে পড়া ও যাত্রীদের দুর্ভোগের এ ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। যাত্রী অধিকার রক্ষার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দোমোদেদোভোর একাধিক যাত্রী জানান, গত সোমবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটিতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। শৌচাগারে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, গতকাল বিমানবন্দরটির বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার চালু করা হয়।
শীত মৌসুমের শুরু থেকেই রাশিয়ার অনেক স্থানে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। গত শনিবার মস্কোয় প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়।

ইরানে চরবৃত্তির দায়ে দুজনের ফাঁসি

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা এবং জাতীয় বিপ্লববিরোধী তৎপরতায় জড়িত থাকার দায়ে ইরানে দুই ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার তেহরানের এভিন কারাগারে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এদিকে গত সোমবার রাতে ইরানে আটক থাকা দুই জার্মান সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁদের স্বজনদের দেখা করতে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, যে দুজনের ফাঁসি হয়েছে, তাঁরা হলেন, আলি আকবর সিদাত ও আলি সারেমি। ইরান সরকার বলেছে, সিদাত মোসাদের কাছে ছয় বছর ধরে ইরানের পরমাণুসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর তথ্য পাচার করে আসছিলেন। চরবৃত্তির জন্য তিনি এ পর্যন্ত ইসরায়েলের কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ডলার নিয়েছিলেন—এটা স্বীকার করেছেন বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন।
আলি সারেমির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইরানের জাতীয় বিপ্লববিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন অব ইরানের (পিএমওআই) সদস্য ছিলেন। তিনি সরকারের অতি গোপনীয় তথ্য পিএমওআইয়ের কাছে পাচার করছিলেন।

কুয়েতের প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ

কুয়েতের বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতারা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ নাসের মোহাম্মাদ আল-আহমাদ আল সাবাহেক এক রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার অধিবেশন উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী এসব আইনপ্রণেতার প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হন। পরে স্পিকারের নির্দেশে আলাদা গোপন অধিবেশনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা শোভাযাত্রা করার সময় কুয়েতের ‘এলিট ফোর্স’ তাঁদের লাঠিপেটা করে। এতে কমপক্ষে চারজন আইনপ্রণেতা ও ১২ জন ছাত্র আহত হন। এ ঘটনায় আইনপ্রণেতারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ তোলেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব তোলারও পরিকল্পনা নেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে আলাদা গোপন অধিবেশনে ওই জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদন জানানো হয়। সে অনুযায়ী তাঁকে প্রধান তিনটি বিরোধী দলের তিনজন প্রতিনিধি জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় পার্লামেন্ট ভবনের চারপাশে কড়া নিরাপত্তাচৌকি বসানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ নাসের আল সাবাহ্ কুয়েতের বাদশাহ শেখ সাবাহ্ আল আহমাদ আল সাবাহ্র ভাতিজা। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে দুর্নীতির অভিযোগে আইনপ্রণেতারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন।

সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়া ঘুষের বিনিময়ে মানুষ ও মাদক পাচারে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে দেশের সামরিক বাহিনীর সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সিউল-ভিত্তিক উত্তর কোরিয়ার ভিন্নমতাবলম্বীরা এই দাবি করেছে।
উত্তর কোরিয়ার সংগঠন ইন্টিলেচুয়াল সলিডারিটির বরাত দিয়ে ওই সূত্র জানায়, গত রোববার চীনের সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলীয় হেইসান ও হোয়েরইয়ং শহরে ওই রক্ষীদের তল্লাশি করতে পিয়ংইয়ং একটি জরুরি আদেশ জারি করে। অভিযানের খবর পাওয়ার পর ছুটিতে থাকা ও হাসপাতালে বিশ্রাম নেওয়া অনেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারাকে ছুটে যান বলে ভিন্নমতাবলম্বী ওই সূত্র জানায়।
সূত্র আরও জানায়, সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সীমান্তরক্ষীদের অনেকের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে মানুষ ও মাদক পাচারে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে শরণার্থীদের চীনে পালানোর সুযোগ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন কর্মকর্তা মাসের পর মাস ছুটি কাটাতে পরিদর্শককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে সূত্র জানায়।
সিউল-ভিত্তিক পত্রিকা ডেইলি এনকে জানায়, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং ইলের উত্তরাধিকারী কিম জং উন সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করার জন্য অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।
নতুন ইউনিফর্ম
উত্তর কোরিয়ার কিছু সেনা দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের অনুরূপ ইউনিফর্ম পরে সীমান্তের কাছে অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানান, উত্তর কোরিয়ার সম্মুখভাগের কিছু সেনার ওই নতুন ইউনিফর্ম পরার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুপ্রবেশের অংশ হিসেবে তারা এই অনুশীলন করেছে।

সরে না দাঁড়ালে বাগবোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান হতে পারে

আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট লঅন্ত বাগবোকে পদত্যাগের সময় বেঁধে দিতে প্রতিবেশী তিনটি দেশের প্রেসিডেন্ট গতকাল মঙ্গলবার দেশটির প্রধান শহর আবিদজানে পৌঁছেছেন। পদত্যাগ করতে না চাইলে আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে বলে প্রেসিডেন্ট বাগবোকে বার্তা দেবেন তাঁরা।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পাওয়া আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট আলাসেন ওয়েতাহার সমর্থকেরা ফ্রান্সে দেশটির দূতাবাস গত সোমবার দখল করে নিয়েছে। আইভরি কোস্টের রাজনৈতিক অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) কেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রায়লা ওডিঙ্গাকে বিশেষ দূত মনোনীত করা হয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট ইসিওডব্লিউএএসের পক্ষে বার্তা নিয়ে বেনিনের প্রেসিডেন্ট থমাস ইউয়েয়ি বোনি, সিয়েরা লিয়নের প্রেসিডেন্ট আর্নেস্ট বাই করোমা ও কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট পেদ্রো ভেরোনা রদ্রিগেজ পিরেস গতকাল আবিদজান পৌঁছান।
গত ২৮ নভেম্বর আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির স্বাধীন নির্বাচন কমিশন বিরোধীদলীয় প্রার্থী আলাসেন ওয়েতাহাকে জয়ী ঘোষণা করে। কিন্তু ওই ফল প্রত্যাখ্যান করে সাংবিধানিক পরিষদের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন লঅন্ত বাগবো। আলাসেন ওয়াতেহাও পৃথকভাবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আলাসেন ওয়াতেহার প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বাগবোকে পদত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়ে আসছে।
সামরিক অভিযানের হুমকি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বাগবোর পদত্যাগের সম্ভাবনা খুব কম। বাগবোর দাবি, তিনিই দেশটির বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এর আগে ইসিওডব্লিউএএসের সামরিক অভিযানের হুমকির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলে এ অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। তবে প্রেসিডেন্ট বাগবোর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসিওডব্লিউএএসের পক্ষে যাঁরা আসছেন, সবাইকে আমরা স্বাগত জানাই। তাঁরা কী বার্তা নিয়ে এসেছেন, আমরা তাও শুনব।’
দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকি ও আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের প্রধান জেন পিংয়ের মধ্যস্থতায় আইভরি কোস্টের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট বাগবোকে পদত্যাগে চাপ সৃষ্টি করতে তিন প্রেসিডেন্ট আইভরি কোস্টে গেলেন।
আলাসেন ওয়াতেহার সমর্থকেরা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আইভরি কোস্টের দূতাবাস দখল করে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাগবোর নিযুক্ত আইভরি কোস্টের দূত পিয়ার কিপরে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই দূতাবাস ছেড়ে চলে যান। গতকাল মঙ্গলবার কোনো দূত ছাড়াই দূতাবাস খুলে দেওয়া হয়েছে। দূতাবাসের কর্মীরা আলাসেন ওয়াতেহার নিয়োগ দেওয়া দূতের জন্য অপেক্ষা করছেন।
প্রেসিডেন্ট বাগবো পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ওয়াতেহা। গত সোমবার এই ধর্মঘট শুরু করেছে ওয়াতেহার সমর্থকেরা। গতকাল আবিদজান শহরে স্বাভাবিকের চেয়ে কম যানবাহন চলাচল করে। শহরের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। তবে অনেক জেলা শহরে দোকানপাট বন্ধ ছিল।
ওয়েতাহা দেশটির আবিদজান শহরে একটি হোটেলে কার্যালয় বানিয়ে অবস্থান করছেন। দেশটিতে মোতায়েন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী তাঁর নিরাপত্তা দিচ্ছে। দেশটির সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে অবস্থান করছেন বাগবো।

পাকিস্তানে এমকিউএমের দুই মন্ত্রী প্রত্যাহারের ঘোষণা

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অন্যতম প্রধান শরিক দল মুত্তাহিদা কাওমি মুভমেন্ট তাদের (এমকিউএম) দুজন মন্ত্রীকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। গত সোমবার এমকিউএমের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। গতকাল মঙ্গলবার ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ করার কথা।
বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে তারা এ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতাসীন পিপিপির সঙ্গে তাদের মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছে। এর জের ধরে দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করছেন। ক্ষমতাসীন জোট সরকারে এমকিউএম থাকবে কি না, এ ব্যাপারেও শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এমকিউএমের জ্যেষ্ঠ নেতা হায়দার আব্বাস রিজভি গত সোমবার জানান, ‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদে আমাদের দলের দুজন মন্ত্রী রয়েছেন। তাঁরা হলেন বন্দর ও জাহাজমন্ত্রী বাবর ঘাউরি ও প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী ফারুক সাত্তার। তাঁরা আগামীকাল (গতকাল মঙ্গলবার) পদত্যাগ করবেন।’ তিনি বলেন, ‘তাঁদের প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তবে আমরা বিরোধী শিবিরে যাব না।’
এমকিউএম জোট থেকে বেরিয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সরকার পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। সে দেশের ৩৪২ আসনের পার্লামেন্টে জোট সরকারের বর্তমানে ১৮১টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে এমকিউএমের রয়েছে ২৫টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার মোট ১৭২টি আসন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে জোটের আরেক শরিক দল জামায়াত-ই-ইসলাম (জেইউআই) বেরিয়ে আসে। দলটির এক মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে জেইউআই এ সিদ্ধান্ত নেয়।