Friday, September 5, 2014

কবিতা ও ইলিশ গবেষণা by অমিতাভ অপু

কবিতা ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছুই নির্ভরযোগ্য নয়। কবিতাতেই মেলবে সারা বিশ্ব। এ যুগে এমন বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেছেন দু’বাংলার কবিতার স্বপ্নে বিভোর কবি-গবেষক উত্তম দাশ। এক শতাব্দীর কবিতার গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে হয়ে ওঠেন সিদ্ধপুরুষ। গত বছর বিশ্ব বাংলা কবিতার প্রকাশনা ছিল আরও এক অনন্য সংযোজন। বাংলা কবিতার অন্তঃপ্রকৃতির সঙ্গে আধুনিকতার মিল খুঁজে ফেরা এ কবির এভাবে সাড়ে চুয়াত্তর বছর বয়সে চলে যাওয়া কাম্য ছিল না। সুস্থ্য জীবনযাপন করলেও গত ১২ জুন রাতে কয়েক মিনিটের বুক ব্যথা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পশ্চিম বাংলার পদ্ম-পুকুরে নিজ বাড়িতেই ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি। কিশোর বয়স থেকে আমৃত্যু ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ বিশ্বের বহু দেশ ঘুরে বেড়ালেও শৈশবের জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি তার অন্তর্টান ছিল বরাবর। গত ১০ বছরে একাধিকবার সস্ত্রীক ছুটে এসেছিলেন এ দেশে। প্রকৃতি আর শৈশবকে খুঁজে ফিরেছেন।
উত্তম দাশ এ দেশে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চর-সেন্দর গ্রামে দাদু (নানা) শচিন্দ লাল রায়ের মোক্তার বাড়িতে ১৯৩৯ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। নিজেদের বাড়িও ছিল ওই গ্রামেই। পিতা কুমুদবন্ধু দাশের সরকারি চাকরির সুবাদে যুক্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। মূলত ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় মাত্র ৮ বছর বয়সে উত্তম দাশ মা ছবি দাশের সঙ্গে এ দেশ ত্যাগ করে বাবার কর্মস্থল ভারতে চলে যান। পশ্চিম বাংলার বারইপুরে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্যে এমএ ও ১৯৭১ সালে বাংলাসাহিত্যে সনেট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি কবিতা লেখা ও সাহিত্য গবেষণা ছিল তার নেশা ও পেশা। তার সম্পাদিত সাহিত্যপত্র মহাদিগন্তে বহু বাঙালি কবির প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮টি কবিতার বই’র মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রুনুকে, ভারতবর্ষের একজন, নির্মাণে এসেছে, রাত্রির স্থাপত্য, ভ্রমণের দাগ, কাব্য নাট্য ও কবিতা, ভারতীয় কবির ডাইরী, প্রবন্ধের মধ্যে বাংলাসাহিত্যে সনেট, কবিতার সেতুবন্ধ, হাংরি শ্র“তি, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, বাংলা ছন্দের কূটস্থান, বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি, ক্ষুধিত প্রজন্ম, শতবর্ষের আলোকে জীবনানন্দ দাশ ২০০০, শতবর্ষের আলোকে বুদ্ধদেব বসু ২০০৮। সম্পাদিত কবিতার বই ‘শতাব্দীর বাংলা কবিতা’, বিশ্ব বাংলা কবিতা এতে ৩শ’ কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা ও জীবনবৃত্তান্ত প্রকাশ পায়। বইটি আলোড়িত হয়ে ছিল ব্যাপক। শেষ বয়সে শৈশবের টানে উত্তম দাশ এ দেশে যতবার ছুটে আসেন তাকে সঙ্গ দেন বড় মামা লক্ষ্মীপুর জেলার ক্রীড়া সংগঠক, যোগব্যায়াম গবেষক, প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার আলো বিকাশ রায়। এই বড় মামাই ছিলেন তার ছাত্র জীবনে আদর্শ বন্ধু, আর বহু স্মৃতির নস্টালিজায় আবদ্ধ। তার লেখার বহু স্থানে বিকাশ মামার কথা উল্লেখ রয়েছে। উত্তম দাশের মৃত্যু সংবাদ ওই বড় মামাকে জানান হয় ৮ দিন পর। ৮৩ বছর বয়সী মামা আলো বিকাশ ভাগ্নের মৃত্যু সংবাদে স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। লক্ষ্মীপুর অফিসার্স ক্লাবে আড্ডা দেয়ার সময় কলকাতা থেকে ছোট মামা শম্ভু ফোন করে উত্তম দাশের শ্রাদ্ধাদি বিষয় জানান। এতেই ভেঙে পড়েন বিকাশ মামা। লক্ষ্মীপুর জেলার সন্তান হিসেবে উত্তম দাশকে দু’বার সংবর্ধনা জানান স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকরা।
উত্তম দাশের মা ছবি দাশ, ৯৩ বছর বছর বয়সে এখনও জীবিত। বারইপুরের বাড়িতে মেঝ ছেলে তন্ময় ও বাভি দাশের সঙ্গে থাকেন। পুত্রের (উত্তম) মৃত্যু সংবাদ তাকে জানান হয়নি। এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যাবে না। দীর্ঘ জীবনের জন্য উত্তম দাশ নিয়মিত যোগব্যায়াম, করতেন। তার পরও মৃত্যু চিরন্তন। স্ত্রী মালবিকা দাশ, পুত্র কবি ময়ুখ দাশ, কন্যা মালিনী (মৌসুমী) দাশ, ছেলের বউ, নাতি, নাতনিসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন।
উত্তম দাশ শুধু কবিতা বা বাংলাসাহিত্য নিয়েই গবেষণা করেননি। তিনি বাংলাদেশের ইলিশ মাছ নিয়েও গবেষণা করেছেন। ২০০২ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার সদর আলেকজান্ডারের মেঘনা পড়ে গিয়ে নদীর গতিপথ দেখেন। ওই সময় তাকে জেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ইলিশের প্রজনন, ইলিশের বেড়ে ওঠা, কোন পানিতে ইলিশের স্বাদ কেমন- এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ইলিশের স্বাদের সঙ্গে সাহিত্যের মিল খোঁজেন। সাগরের নোনা পানির ইলিশ, ডিম ছাড়ে মিঠা পানিতে। এ কারণে ইলিশকে মিঠা পানির মাছ বলা হয়। একজন কবি-সাহিত্যিককে কত বিষয় জানতে হয় তারও উদাহরণ উত্তম দাশ ।

মাটি, মানুষ ও জীবন চেতনার কথাশিল্পী by খুরশীদ আলম বাবু

নাজিব ওয়াদুদ (জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬১) সাধনাসিক্ত তরুণ কথাকারদের একজন। বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকে তার আবির্ভাব, তবে নব্বই দশকে তার প্রতিভার আসল ব্যাপ্তি ঘটেছে। প্রথমে একথা কবুল করা ভালো, নাজিব ওয়াদুদের একেবারে প্রথম দিককার গল্প তেমন হৃদয়গ্রাহ্য না হলেও পরবর্তীকালে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, তিনি উত্তরণের মাত্রা দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিলেন। গল্পকারদের মধ্যে উজ্জ্বলতম বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা থাকছে না। অন্তত অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বরেন্দ্রবাংলার গল্প’ গ্রন্থের গল্পগুলো তার সামর্থের পরিচয় আরও উজ্জ্বলতর করেছে। ‘বরেন্দ্রবাংলার গল্প’র পরিবেশ মূলত বরেন্দ্র অঞ্চল; এখানকার মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশ খুব রুক্ষ। এই পরিমণ্ডলের মধ্যে বসবাসরত মধ্যবিত্ত থেকে নিুবিত্ত পরিবারের মানব-মানবীদের প্রেম-ব্যর্থতা কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক অসাম্যতার দিকেই আলোকপাত করে। ‘বরেন্দ্রবাংলার গল্প’-তে মানুষ, জমি-জমা, হাট-বাজার, যাত্রা-পালার এমন জীবন্ত বর্ণনা এসেছে যা অন্য কোনো গল্পকারের লেখায় সচরাচর দেখি না। সেজন্য আমাদের এ গল্পকারকে নিয়ে বিস্তর আলোচনার অবকাশ আছে।
এ গ্রন্থে মোট ১১টি গল্প সংকলিত হয়েছে, এগুলোর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর গল্প রয়েছে অর্ধেকের বেশি; উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির শিরোনাম উল্লেখ করা যায় : আবাদ, কান্না-হাসির উপাখ্যান, দখল, পিছুটান, মেঘ ভাঙা রোদ ও পদ্মাবতী। খুব রক্ষণশীলভাবে এ হিসাব দেয়া হল।
এ গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পের পরিমণ্ডল হল বরেন্দ্র অঞ্চল। প্রতিটি গল্পেই তার নানা রকম চিত্রায়ন লক্ষ্য করা যায়। ‘আবাদ’ গল্পটি এক মহাকাব্যিক পটভূমিতে সৃজিত হয়েছে। গল্পের নায়ক জগলু নিুবিত্ত নির্ঝঞ্ঝাট কৃষক, রূপাকে ভালোবাসে। রূপাও জানে জগলু তাকে ভালোবাসে। তার বন্ধু সিরাজ নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হয়। সেই রাজনৈতিক ঝামেলায় সন্দেহের বশবর্তী হয়ে পুলিশ জগলুকে গ্রেফতার করে। বেশকিছু কাল কারাভোগের পর কোনোভাবে জেল থেকে ছাড়া পায়। ফিরে আসে গ্রামে এক নতুন মানুষ হয়ে। তার মধ্যে জন্ম নেয় এক নতুন জীবনচেতনা? বাঁচতে হবে, বাঁচার জন্য লড়তে হবে, আর কোনো সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় না। সে নিষ্ফলা জমি চাষ করতে মন-প্রাণ ঢেলে দেয়। জগলু জেলে থাকার সময় রূপার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু ‘বাঞ্জা’ বলে তাকে পরিত্যাগ করে তার স্বামী। তখন ফিরে আসে গ্রামে, বাপের বাড়ি। আবার দেখা হয় জগলুর সঙ্গে। রূপাকে বিয়ে করতে চায় জগলু। রূপা কোনো দিনই কল্পনা করতে পারেনি যে জগলু তাকে বিয়ে করতে চাইবে। জগলুর একটাই কথা? প্রতিজ্ঞা ও অধ্যবসায় থাকলে সব হয়। জগলুর সিদ্ধান্তে অবাক হয় রূপার বাপও। কিন্তু গল্পকার আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন এক অদৃশ্য কারসাজির কথা? ‘পৃথিবীর গোপন কোণে কোণে বুঝি কিসের আবাদের প্রস্তুতি চলতে থাকে।’ বড় অদ্ভুত গল্প। আমার বিবেচনায় বাংলা কথাসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প।
‘দখল’ গল্পে একজন প্রেমিকার হৃদয় পাওয়ার জন্য দুই যুবকের প্রতিযোগিতা, পড়তে ভালো লাগেই। গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতার পাশাপাশি প্রকৃতির চিত্রায়ন এবং হাস্যময় পরিবেশ সৃষ্টিতে লেখকের দক্ষতা পুরোপুরি বজায় থেকেছে। পাশাপাশি ‘পিছুটান’ গল্পে গল্পকার নাজিব ওয়াদুদ দেখিয়েছেন বেকারত্ব একটি পরিবারে কত সমস্যার সৃষ্টি করে, আর সেই বেকার ছেলে প্রত্যাশিত চাকরি পেলে কী বিপরীত দৃশ্যের অবতারণা হয়। জীবনের বাস্তবতা এবং মানবচরিত্রের বৈচিত্র্যময়তার কী যে এক অসামান্য কোলাজ সৃষ্টি করেছেন গল্পকার তার সহজ-সরল ভাষায় লেখা স্বল্পায়তনের এ গল্পে, তা না পড়লে বোঝা যায় না।
‘কাক’ গল্পে নাজিব ওয়াদুদ এক ধরনের মানবিক রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস, অনেক পাঠকের কাছে তা অতিরিক্ত পাওনা বলেই মনে হবে। গল্পকার গল্প বলে গিয়েছেন স্বচ্ছ ও সহজাত দক্ষতায়। ‘মেঘ ভাঙা রোদ’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাস্তব জীবনের লড়াই সমার্থক হয়ে উঠেছে। মাটি, মানুষ ও মানবীয় সম্পর্ক এখানে একাকার।
পদ্মা তীরের এক গ্রাম্য বিধবার অপরূপ জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে ‘পদ্মাবতী’ গল্পে। ভাষা, কথনকৌশল, উল্লম্ফন, সব মিলিয়ে একটি অসাধারণ গল্প ‘পদ্মাবতী’। ‘কান্না-হাসির উপাখ্যান’ একটি সাধারণ কৃষক পরিবারের দৈনন্দিনতার গল্প।
মাটি, মানুষ এবং জীবনযুদ্ধের বিষয় আশয় ‘বরেন্দ্রবাংলার গল্প’ গ্রন্থের গল্পগুলোতে অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় অবলীলাক্রমে উঠে এসেছে। গল্পের ভাষা তার বিষয়বস্তুর অনুগামী হয়েছে। বাস্তববাদের বিষয়বস্তু কফি হাউসের ভাষায় আবর্তিত হয়ে যায়নি। নাজিব ওয়াদুদ আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের মূলধারার অনুবর্তী হলেও তার প্রত্যেকটি গল্পই তার নিজস্ব ক্র্যাফটসম্যানশিপের উদাহরণ। বাহুল্যবর্জিত, ইঙ্গিতময়, উপভোগ্য গতিশীল বর্ণনা, অসাধারণ জীবন্ত সংলাপ এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও ভাষার ব্যবহার এ ক্র্যাফটসম্যানশিপ মূল উপাদান। গল্পকার হিসেবে নাজিব ওয়াদুদের এটাই বড় সাফল্য।

জন্মশতবর্ষ উদযাপন ও একটি প্রতিকৃতি by রাজু আলাউদ্দিন

রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী ভারতে যেমন, তেমনি আর্জেন্টিনায়ও বিশেষ মর্যাদায় এবং নানা রকম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উদযাপিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনায় যে ঘটা করে উদযাপিত হতে পেরেছিল তার পেছনে একটা বড় ভূমিকা ছিল মূলত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোরই। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কয়েক দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত সুর (Sur) পত্রিকার বিশেষসংখ্যা প্রকাশ এবং সরকারি পর্যায়েও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেরিয়েছিল ২ পেসোর মুদ্রামানের একটি ডাকটিকিট আর সঙ্গে ছিল একটি স্মরণিকা। স্মরণিকাটি বের করেছিল আর্জেন্তিনার যোগাযোগ মন্ত্রণালয় (Secretaria de comunicaciones) আর এ স্মরণিকায় রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের পরিচয়জ্ঞাপক চুম্বকধর্মী দুই পৃষ্ঠার একটি লেখা লিখেছিলেন জন্মশতবর্ষে ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপক পরিষদের সভাপতি’ (Presidente comision de homenaje a Rabindranath Tagore) ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ওকাম্পো এতে লিখেছিলেন :
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দারাকানাথ ঠাকুর লেনের যে বাসাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঠিক সেখানেই ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রিন্স দারাকানাথ ঠাকুরের নাতি বা মহর্ষি (Gran Santo) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে। দেবেন্দ্রনাথ পিতার উল্লেখযোগ্য বিষয়-সম্পদের উত্তরাধিকার অর্জন করলেও আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তার বিরাট অংশ হারিয়ে ফেলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক মহৎ চরিত্রের অধিকারী যার উত্তরাধিকার বর্তেছিল রবীন্দ্রনাথে, রবীন্দ্রনাথ তার বিষয়-সম্পদ এমনকি নোবেল পুরস্কারের অর্থ ও লেখকস্বত্বও দান করেছিলেন নিজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শান্তিনিকেতনকে।
ঠাকুর পরিবারের সবাই ছিলেন প্রতিভাদীপ্ত এবং শিল্পানুরাগী। মহর্ষির চতুর্দশ সন্তানদের মধ্যে কনিষ্ঠতম রবীন্দ্রনাথের বিপুল খ্যাতির সূচনা হয় যখন ইংরেজ কবি ইয়েটস কবিকৃত গীতাজ্ঞলির কিছু অনুবাদ পাঠ করেন। গীতাঞ্জলির প্রকাশ এবং ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সে (আঁদ্রে) জিদ, স্পানঞায় সেনোবিয়া ও হুয়ান রামোন হিমেনেথ সত্যিকারের আবেগ নিয়ে তার লেখা অনুবাদ করেছেন, ফরাসি এবং স্পানঞল, দুই অনুবাদকই পরে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। এটা বললে পুনরুক্তি হবে না যে রবীন্দ্রনাথ শুধু মহান কবিই ছিলেন না (যদিও এটাই হতে পারে তার সর্বোচ্চ অভিধা), নেহেরুর ভাষায় ‘তিনি ছিলেন স্বাপ্নিক ও কর্মযোগী, গীতিকার ও দার্শনিক, নাট্যকার, অভিনেতা, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, মানবতাবাদী, জাতীয়তাবাদী বা আন্তর্জাতিকতাবাদী। যদিও তার জীবনের এ সংক্ষিপ্ত রূপরেখা, তিনি যা ছিলেন সে সম্পর্কে আমাদের কেবল সামান্য ধারণা দেয় মাত্র।’
রবীন্দ্রনাথের কাছে কেবল শিল্পীর সমস্যাবলীই আগ্রহের বিষয় ছিল না।
তার সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তার একটা বিষয় ছিল দ্রুত যোগাযোগে সক্ষম আধুনিক পৃথিবীতে সহিংস সংঘাতের সূচনাকারী মানুষের আবির্ভাব।
১৯১৩ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতিবিদ্বেষের সমস্যাটি আমাদের যুগে এক জলন্ত প্রশ্ন এবং মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের বিজয় সম্পন্ন হওয়ার আগে দুর্ভোগের জন্য আমাদের প্রস্তুত হওয়া দরকার।’
রবীন্দ্রনাথ গোটা পৃথিবী সফর করেছেন। তিনি আমন্ত্রিত হয়ে সফর করেছেন ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি, রাশিয়া, চীন, জাপান, ইরান, থাইল্যান্ড, আমেরিকা, পেরু। লিমার (১৯২৪) উদ্দেশে সর্বশেষ ভ্রমণটি সম্পন্ন করতে পারেননি, কারণ বুয়েনোস আইরেসে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ডাক্তার তাকে পার্বত্য এলাকা অতিক্রম না করার পরামর্শ দেন। ওই কারণে তিনি আর্জেন্টিনায় অবস্থান করেন এবং মাস দুয়েক তিনি সান ইসিদ্রোতে কাটান। লেখক ও জ্ঞানীগুণী, রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা তিনি অভ্যর্থিত হয়েছিলেন।
তার নাট্যকর্ম, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাসগুলো স্পানঞা এবং আর্জেন্টিনায় প্রকাশিত হয়েছে। যদিও তার বহু লেখাই অনুবাদের অপেক্ষায় আছে (অন্যান্য লেখার মধ্যে সান ইসিদ্রোতে অবস্থানকালে লেখা তার কবিতাগুলোও রয়েছে, গ্রন্থাকারে যার শিরোনাম পুরবী।) এখনও পর্যন্ত। পাঠকরা সহজেই নিজেদের কৌতূহলকে তৃপ্ত করতে পারবেন এ কারণে যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম সুলভ সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে।
তার বন্ধু গান্ধী ও নেহেরুর পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে তিন ব্যক্তিত্বের একজন। তার ব্যক্তিত্বের অভিঘাত কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। গোটা পৃথিবী তার প্রতি যে সম্মান ও ভালোবাসা দেখিয়েছে তা কেবল মহৎ কবিদের মতো ব্যক্তিত্বরই অর্জন করতে পারেন যারা একই সঙ্গে মহৎ মানুষও।
এ ছিল স্মরণিকায় ওকাম্পোর লেখাটির পূর্ণাঙ্গ রূপ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার একাধিক লেখা রয়েছে এবং সেসব লেখা গ্রন্থাকারেও বেরিয়েছে, কিন্তু এটি এখনও পর্যন্ত কোনো গ্রন্থে তো নয়ই, এমনকি সম্ভবত তার রচনাবলীর কোনো খণ্ডেও অন্তর্ভুক্ত হয়নি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এটিই সম্ভবত তার সংক্ষিপ্ততম রচনা। হয়তো এ স্মরণিকার কারণেই এটি লেখা এবং সে কারণেই এ হ্রস্ব আয়তন। রবীন্দ্র স্মরণিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালের ১৩ মেতে। স্মরণিকাটিতে ছাপা হয়েছিল আর্জেন্টিনার শিল্পী ওরাসিও আলবারেস বোয়েরোর আঁকা রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি। এটি খুব সম্ভবত ওরাসিও এঁকেছিলেন রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত রবীন্দ্র-স্মারক ডাকটিকিটের জন্য। এ একই প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছে এ স্মরণিকাটিতেও। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিসহ ডাকটিকিটের মুদ্রণসংখ্যা ছিল ৩০ লাখ। এবং তা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল আর্জেন্টিনার সব প্রদেশে।
আর্জেন্টিনায় সম্ভবত রবীন্দ্রনাথই একমাত্র বিদেশী লেখক যার সম্মানে এ আয়োজন এবং ডাকটিকিট প্রকাশ। আর সবটাই সম্ভব হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘বিজয়া’র কারণে। আর্জেন্টিনা সফরকালে জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি মৃত্যুর পরও রবীন্দ্রনাথের প্রতি এত সম্মান আর অন্য কোনো দেশে ঘটেছে কিনা সন্দেহ।

মনের আড়ালে by আনোয়ারুল হক

গতরাতে শেষ করা গল্পের কপিটা পকেটে ভরে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে রাস্তায় নেমে এলো জাহিদ। শীতের সকালের নরম রোদে মন গুনগুনিয়ে ওঠে ওর। মনের ওপর চেপে থাকা গল্পটা শেষ করতে পারার একটা তৃপ্তি তো আছেই, উপরি পাওনা হিসেবে আজকের সকাল তাকে আরও চাঙ্গা করে দিল।
সামনে খালি রিকশা পেয়ে তাতে উঠে বসেই ভাবল, কোথায় যাবে সে?
এ সময়ে রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে দিল, লালমাটিয়া যাও।
বলেই ভাবল, লালমাটিয়া! ওখানে তো মিতুদের বাসা।
রিকশাওয়ারার পিঠে হাত দিয়ে তাকে থামাতে গিয়েও হাতটা ফিরিয়ে নিল জাহিদ। কিছু বলল না। চাকা ঘুরতে লাগল কালো পিচ রাস্তায়। বাধা দেয়া গেল না। সেই সঙ্গে ঘুরতে লাগল জাহিদের মনের চাকা।
প্রায় এক বছর হতে চলল জাহিদ মিতুদের বাসায় যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ও শুনেছে, তার নাম শুনলে নাকি এখন মিতু মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর সেই মিতুকেই সে তার ভালোবাসার গল্পটা পড়ে শুনাতে চায়! অদ্ভুত তো! তার নিজের মনের গতি নিজেকেই যেন অবাক করে দেয়! তবুও জাহিদ টের পায় রিকশাটাকে ফিরানোর চেয়ে না ফিরানোর পাল্লাটাই বেশি ভারী।
কিন্তু ও যতই লালমাটিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততই ভালোলাগার বদলে তার মনটা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। আগের ভাবনাটাই ফিরে এলো মনের চৌকাঠে। যাওয়াটা কি ঠিক হবে? এত দিন পরে হঠাৎ বাসায় হাজির হয়ে ‘তোকে একটা গল্প পড়ে শোনাতে এলাম’ বললে মিতু কি বিষয়টা সহজভাবে নেবে? যদি অপমান করে! কেননা তাদের বর্তমান সম্পর্ক তো আর আগের মতো নেই!
সেদিন ছিল ২৩ সেপ্টেম্বও, চাঁদের হিসাবে কৃষ্ণপক্ষ। তারিখটা মনে থাকবে ওর আজীবন। সেদিনের পর থেকে মিতুর সঙ্গে জাহিদের আর দেখা হয়নি। যখনই মনে হয়েছে, যাই! তখনই মনটাকে জোর করে ফিরিয়ে এনেছে সে। রূপকের কাছে শুনেছে, মিতু নাকি বলেছে, ওর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টা নাকি এখন নিছক অতীতই। ওই সব ম্মৃতি সে আর মনে রাখে না। ভুলে গেছে! আর এই মিতুই তাকে একদিন বলেছিল, সে তাকে কোনোদিন ভুলে যাবে না! ছেড়ে যাবে না! ওদের বন্ধন চিরদিন অটুট থাকবে।
মিতুর বর্তমান ভাষ্য শুনে জাহিদ মনে মনে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আজ সে মিশ্চিত মিতালিকেও ভুলে যেতে পারেনি। অবচেতনের টানে তা না হলে সে লালমাটিয়া যাচ্ছে কেন!
জাহিদ আবার ভাবল, এখনও সে ইচ্ছা করলে ফিরে যেতে পারে। বলতে পারে, ‘এই রিকশা,সোজা যাবেন, মোহাম্মদপুর যাব’। রিকশা শংকর পার হয়ে এসে ডানে মোড় নিল। জাহিদ ফিরল না।
লালমাটিয়া ব্লক-ডি। এই রোডের শেষ মাথায় মিতুদের বাসা। দশতলা ফ্লাট বাড়ির ন’তলায় থাকে মিতুরা। লিফট আছে। উঠতে নামতে কোনো সমস্যা নেই। মিতুর বাবা রশিদ হায়দার সাহেব সরকারি আমলা। তাকে খুব কমই দেখেছে জাহিদ। সদা ব্যস্ত। ওর মাও কম এসেছে ওদের সামনে। আসলে মিতুদের পরিবারে মেয়ের ছেলে বন্ধুদের সম্পর্কে তার বাবা-মায়ের কোনো মাথাব্যথা নেই। জাহিদ জানত, ও ছাড়াও মিতুর অনেক ছেলে বন্ধু আছে। কিন্তু জাহিদ তো শুধু মিতুর ছেলে বন্ধুই ছিল না, ছিল তার চেয়ে আরও একটু বেশি কিছু। কে না জানত! আর মিতু তো জানত আরও বেশি এবং সাবার কাছে বলতও সে।
কথাটা মনে করে বড় করে নেয়া শ্বাসটা চেপে গেল না, ছেড়ে দিল জাহিদ। তারপর রিকশাওয়ালার পিঠে হাত ছোঁয়াল। জাহিদ আকাশমুখী বাড়িটার ওপরের দিকে তাকাল। ভাবল, মিতু কি বাসায় আছে? সে তো জানিয়ে আসছে না!
ওকে দেখে মিতু যদি কথা না বলে উপেক্ষা করে?
এখনও সময় আছে ফিরে যাওয়ার, তবুও কেন জানি ফিরতে মন চাইল না। বুক পকেটে রাখা গল্পের কপিটা ডান হাতের মুঠোয় তালুবন্দি করে লিফটের বোতামে তর্জনী রাখল জাহিদ।
লিফটের দরজা খুলতেই সোজা দরজার সামনে দাঁড়ানো মিতু। দু’জনেই অবাক! মিতুর চোখে অপ্রত্যাশিতের ছায়া। কিন্তু শান্ত নির্লিপ্ততায় স্থির। কাকচক্ষুজলের মতো মিতুর চোখ জাহিদের মুখের ওপর থমকে আছে। শুধু ঠোঁট নড়ল,- তুই!
-আমি তোর কাছেই এসেছিলাম।
-আমার কাছে!
মিতুর অবাক হওয়া গোপন থাকে না। জাহিদ মনে মনে লজ্জ্বা পেল। সত্যিই তাহলে মিতু তাকে আর প্রত্যাশা করে না! জাহিদ প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে গেল। মিতু সামনে, ও পেছনে।
-থাক্ তাহলে, আমি আজ যাই। অন্য আর একদিন আসব।
চলে যেতে উদ্যত জাহিদকে দাঁড়াতে হল মিতুর ডাকে। আহ্বানে কোনো আন্তরিকতা নেই, তবে অগত্যা আছে।
-এসেই যখন পড়েছিস্, ঘরে আয়।
-বাইরে যাবি না? তুই নিশ্চয়ই কোনো কাজে বের হচ্ছিলি?
মিতু স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিল,
-আমি বাইরে যাচ্ছিলাম তুই বুঝলি কিসে? আমি বাইরে কোথাও যাচ্ছিলাম না। যাচ্ছিলাম ছাদে।
আহ্ ছাদ! জাহিদের নীলাকাশ। কতদিন হয়ে গেল সে আসে না বলে তো নীলাকাশও দেখে না! এই ঢাকা শহরে মিতুদের ছাদ ছাড়া আর এমন উন্মুক্ত আকাশ কোথায়!
বসতে বসতে মিতু গ্রীবা বাঁকিয়ে জাহিদকে দেখল। কোনো কথা হল না।
অনতি দূরে সোফায় বসা নতমুখী মিতুর চুলের সিঁথিতে জাহিদের চোখ। মিতু এমন মেয়ে তাকে যে কোনো পোশাকেই মানিয়ে যায়। গ্রামীণ চেক সুতির সালোয়ার কামিজে ওকে উজ্জ্বল মনে হলেও বিষণœ দেখায়। মিতু কোনো কথা বলে না। ডান হাতের তালুতে বাম হাত রেখে উৎকর্ণ সে। ভাবছে, কেন এসেছে জাহিদ?
জাহিদ কী বলে কথা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। অন্ধকার ঘরের কোণে তার চোখ। এসব বাড়িগুলো এমনই যে দিনের বেলাতেও আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। মাথার ওপর সুদৃশ্য ঝারবাতি। তথাপি আঁধার সরেনি। বড় নিরিবিলি মিতুদের ঘর। বোঝা যায় ওর বাবা-মা কেউই বাসায় নেই। এতদিন বাদে এলো সে, কই মিতু তো তেমন আরও ছড়াল না! এ অবস্থায় গল্পটা পড়ে শোনানোর ইচ্ছাটা প্রকাশ করা কি ঠিক হবে ওর!
ভালোবাসা তাহলে মরে যায়! কথাটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে জাহিদের।
মিতু কথা বলল যেন অনেক দূর থেকে।
-তারপর, কী মনে করে? চা খাবি? বস, আমি নিয়ে আসি।
বেল টিপলেই যেখানে একাধিক কাজের লোক হাজির হয় সেখানে মিতু চা আনতে গেল! ফাঁকা ঘরে একা বসে থেকে জাহিদের নিজেকে খাপ্পর মারতে ইচ্ছা হল। মুখের ভেতরটা তেঁতো তেঁতো লাগছে। মিতু কি অযথাই দেরি করছে না? চা হাতে মিতু এলো ধীর পায়ে। যত্ন করে বানানো চা নিজেই জাহিদের হাতে তুলে দিল। আগের মতোই। জাহিদ ভাবল, তবু যেন আগের মতো নয়।
চা খেতে খেতে আবারও দু’জনের কোনো কথা হয় না। মিতুই আবার শুরু করল,
-তা কী জন্য এসেছিস বললি না তো?
- এমনিই। তবে যা ভেবে এসেছিলাম সে ইচ্ছাটা এখন আর নেই। এখন ইচ্ছা হচ্ছে অন্যরকম।
মিতু জাহিদের কথা শুনে রাঙা হল।
জাহিদ উঠে দাঁড়াতেই সোফায় বসা যুবতীর শরীরে বাঁকানো ধনুকের ভঙ্গিমা। মিতু ভয় পেয়েছে! ত্রস্তে উঠে দাঁড়াল। জাহিদ বলল,
-মিতু, আমি কি ভুল করেছিলাম তোকে ভলোবেসে? তুই না বলেছিলি আমাকে কোনোদিন ভুলে যাবি না? কেন এমন করলি মিতু?
মিতু কোনো জবাব দেয় না। ড্রইংরুমের কার্পেটে ওর চোখ। পাথর শরীর তার নড়ে না।
আর কিছু না বলে দরজার দিকে পা বাড়ায় জাহিদ।
বুক পকেটের গল্পের কপিটা খচখচ করে ওঠল।
খোলা দরজা দিয়ে দেখা যায় ঘরের ভেতরে এখনও আগের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মিতু। এবার তার চোখে চোখ পড়ল। অপলক। জাহিদের চোখ জলে ভরে ওঠে। সিঁড়ি ভাঙল জাহিদ। মিতু চোখের আড়াল হল ঢেউ ভাঙা জলের মতো।
না, সিনেমায় দেখা কোনো নায়িকার মতো মিতু দৌড়ে এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল না তো!
সে কি এমনটা আশা করেছিল! তা হয়তো নয়। তবে মিতুই যেন তাকে শিখিয়ে দিল,
জীবনের পথ বড় কঠিন। একা চলার।
পেছনে মিতু। সামনে ভেঙে ভেঙে নিচের দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ি। পা হড়কালেই মৃত্যু অথবা ভঙ্গুর জীবন।
জাহিদ দীর্ঘ সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো একা।
কিন্তু কিছুতেই মনের আড়াল করা যাবে না মিতুকে। কেউ জানবে না। জানবে শুধু সে। একা।

কেন লিখি বুদ্ধদেব বসু ও আবু সয়ীদ আইয়ুবের দর্শন by রাজীব সরকার

কেন লিখি? এ প্রশ্নের উত্তর দেশে-বিদেশে বরেণ্য লেখকরা নানাভাবে দিয়েছেন। তাদের মতবৈচিত্র্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে তাদের বক্তব্যকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; প্রথমত সমাজের কল্যাণ সাধন তথা কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সাধনের উপায় হিসেবে সাহিত্যচর্চা, দ্বিতীয়ত আপন মনের আনন্দে তথা সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য সাহিত্যচর্চা। দ্বিতীয়োক্ত ধারার অনুসারীরা বাংলা সাহিত্যে ‘কলাকৈবল্যবাদী’ বলে পরিচিত। 'Art for life's sake' I 'Art for art's sake' -এই দুই ঘরানার মধ্যে সীমাবদ্ধ সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য। এর বাইরে আরেকটি ধারা ইদানীং জাঁকিয়ে বসেছে। এর মূলে রয়েছে সাহিত্যের পণ্যায়ন। পণ্য-ভোগবাদের স্থুল জগতে এখন সাহিত্যেরও প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছে। এ ঘরানার লেখকদের দায়বদ্ধতা সাহিত্যের বাজারের কাছে। বইমেলার বাজার, শারদীয়া সংখ্যার বাজার, ঈদসংখ্যার বাজার- নানা উপলক্ষে এ লেখকরা সরব হয়ে ওঠেন। পাঠক-পাঠিকার মনোরঞ্জন যেহেতু এ লেখকদের একমাত্র উদ্দেশ্য তাই সমাজের কল্যাণ সাধন সম্ভব না হলেও আত্মহিত সাধনে তারা পুরোপুরি সফল, অন্তত বৈষয়িক প্রাপ্তিযোগের দিক থেকে।
বর্তমান আলোচনায় যৌক্তিক কারণেই স্মরণ করতে হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের দুই কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব বসু ও আবু সয়ীদ আইয়ুবকে। সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের বক্তব্য এযুগেও প্রাসঙ্গিক। তাদের বক্তব্য তথা জীবনদর্শন গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে এ দুই লেখকের সমকক্ষতা কেউ অর্জন করতে পারেননি।
কলাকৈবল্যবাদের পক্ষে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বুদ্ধদেব বসু। তিনি মনে করেন সাহিত্য-শিল্পকলার কোনো সামাজিক উপযোগিতা থাকতে পারে না। সমাজের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে আধুনিককালের শিল্পীর। যে কোনো মহৎ শিল্পীর অন্তিম পরিণতি স্বেচ্ছা নির্বাসন। শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতার ভূীমকায় বুদ্ধদেব লেখেন :
‘যে মধ্য-উনিশ শতকে ইংল্যান্ডে উপযোগবাদের অভ্যুদয় হল, সেই সময়ে বোদলেয়ার ঘোষণা করেন যে, কবি কোনো ‘কাজে লাগেন’ না, যে বায়রনি বিদ্রোহের দিন গত হয়েছে, পূর্ণ হয়েছে সমাজের সঙ্গে কবির বিচ্ছেদ, প্রতিবাদ করলেও প্রতিবাদের পাত্রকে স্বীকার করে নিতে হয়, অতএব, একমাত্র যা সহনীয় ও সম্ভব তা উপেক্ষা ও স্বেচ্ছাবৃত্ত নির্বাসন।
গত শতকের তিরিশের দশক থেকে মার্কসবাদী চেতনা প্রবল হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যে। প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক এ লেখক-সমালোচকদের দৃষ্টিতে কলাকৈবল্যবাদ জীবন থেকে পলায়নের নামান্তর। এ বক্তব্যের জবাবে বুদ্ধদেব রচনা করেন ‘পলায়ন’ নামে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি জানান যে, তার বক্তব্য প্রতিপক্ষের প্রগতিশীল বন্ধুদের কাছে ‘পলায়নী মনোবৃত্তি’র পরিচায়ক। রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু কবিতা লিখলেই যদি পলায়নবাদীর কলংক ঘুচে যায় তবে সে চেষ্টা তার পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি ভরসা পান না কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ওপরও এ অপবাদ বর্ষিত হয় যিনি রাজনৈতিক রচনার অতুলনীয় ভাণ্ডার।
যারা বুদ্ধদেব ও তার সাহিত্যিক সহযাত্রীদের পলায়নবাদী বলেছেন, তাদের বুদ্ধদেব অশ্রদ্ধা করেননি। তার মতে তারা বিদ্বান ও কৃতী ব্যক্তি হতে পারেন, কিন্তু সাহিত্যবিচার তাদের এলাকা নয়। তাদের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে তারা সাহিত্যের বিষয়বস্তু মাত্র বিবেচনা করেন, শিল্পকর্ম হিসেবে তাকে দেখেন না। তাদের লক্ষ্য মহৎ হতে পারে কিন্তু সাহিত্য বা শিল্পকর্ম দ্বারা সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে এমন ধারণা ভুল। বোঝা শক্ত নয় যে, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও লেখকদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন বুদ্ধদেব বসু। তাদের বিরুদ্ধে তার অভিযোগ :
‘তারা চান আমাদের দিয়ে তাদের কথা বলাতে, সাহিত্যকে প্রত্যক্ষভাবে সামাজিক লক্ষ্য সাধনের অস্ত্র করে তুলতে; কিন্তু এ উপায়ে তাদের উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার কোনো আশা নেই, অথচ সাহিত্যের ক্ষতির আশঙ্কা আছে। সেসব লেখারই তারা খুব বেশি তারিফ করেন, যেগুলো গল্পচ্ছলে প্রপাগাণ্ডা কিংবা কবিতার আকারে তত্ত্বকথা, তার মূল্য নেই বলি না, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়েরও মূল্য আছে, তবে সে মূল্য সাহিত্যিক নয়। এসব যারা লেখেন আশা করি তারা সামাজিক লক্ষ্য সাধনের আগ্রহে দিন রাত জ্বলছেন, কিন্তু তাই যদি হয়, গল্প কবিতা লিখে যে কিছুই হবে না তা তারা নিশ্চয়ই জানেন, কী করলে হতে পারে তাও জানেন, তবে সে কাজ না করে খামখা কালি-কাগজ খরচ করেন কেন? তাহলে বলতে হয় যে, কর্মক্ষেত্রে নামার শক্তি কি ইচ্ছা তাদের নেই, সেজন্য অতি কঠোর ভীষণ কর্মছাড়া যা কখনোই সাধিত হতে পারে না, গরম গরম কিছু লিখলেই তা যেন হয়ে যাবে, এ রকম একটা ভালো তারা সর্বদাই করে থাকেন। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়ে তারা আশ্রয় নেন সাহিত্যের নিরাপদ প্রঙ্গণে- সে হিসেবে এস্কেপিস্ট যদি কোনো কিছুকে বলা যায় তো তাদের প্রপাগাণ্ডিক রচনাকেই। অন্তত শিল্প রচনায় কলাকৌশলের কঠিন সংযম থেকে তারা যে প্রায়ই পলাতক তাতে সন্দেহ নেই।’
বুদ্ধদেবের তীক্ষ্ণ যুক্তি ও আকর্ষণীয় গদ্যশৈলী প্রতিপক্ষকে সহজেই কাবু করতে সক্ষম এমন উদাহরণ অগণিত। এ ক্ষেত্রেও তিনি ব্যতিক্রম নন।
‘রাজনীতিবিমুখ বলে বুদ্ধদেবের পরিচিতি রয়েছে। একাধিক লেখায় তিনি বলেছেন যে, রাজনীতি কখনোই তার আগ্রহের বিষয় ছিল না। এর মানে এই নয় যে, তিনি জীবনবিমুখ। ‘সভ্যতা ও ফ্যাসিজম’ নামে একটি অবিস্মরণীয় ও মানবতাবাদী প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, অসুন্দর ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবি-শিল্পীরা সহজাত গুণেই রুখে দাঁড়াবে। এর মধ্যে রাজনীতির কোনো দৃঢ়তত্ত্ব নেই। মনুষ্যত্বের, কবি চরিত্রের এটি ন্যূনতম দাবি। এটি বর্বরতার বিরুদ্ধাচরণ মাত্র, এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগাযোগ নেই। সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর চূড়ান্ত অবস্থান বোঝা যায় ‘পলায়ন’ প্রবন্ধের শেষাংশে :
‘আমি যদি আমার রচনায় ধনতন্ত্রের কালান্তক মূর্তির বর্ণনা করি তাহলেই যেমন লাফিয়ে উঠবার কিছু নেই, তেমনি যদি প্রিয়ার আঁখির বন্দনা করি তাতেও হতাশ হওয়ার কারণ দেখি না। যে কোনো অবস্থায়, যে কোনো দুরবস্থায়, উভয় বস্তুই কাব্যের বিষয় হতে পারে এবং উভয়ক্ষেত্রেই শুধু এটুকু বিচার করতে হবে যে, রচনাটা যথার্থ সাহিত্য হয়েছে কি না। শিল্পকলার মূল্য তার নিজেরই মধ্যে, অন্য কোনো উপলক্ষ কি উদ্দেশ্য থেকে ধার করা নয়, এ কথা ভুলে যাওয়া আর মূলগত মূল্যবোধ হারানো একই কথা।’
আবু সয়ীদ আইয়ুবের দৃষ্টিভঙ্গি বুদ্ধদেব বসুর মতো অনমনীয় নয়। সাহিত্যের চরম ও উপকরণ মূল্য প্রবন্ধে তিনি স্বীকার করেছেন :
‘নির্জনতা-বিলাসী শিল্পীর দিন গিয়েছে। পুণ্যোদক নির্ঝরিণীর তীরে স্নিগ্ধছায় তরুতলে বসে মন্দাক্রান্তা ছন্দে বিরহগাথা রচনা করে আধিক্ষামা বলিব্যাকুলা দয়িতার উদ্দেশে পাঠানো এ যুগের কবির কাজ নয়। পুরাতন সমাজের পাড় ভাঙছে একদিকে, নতুন সমাজের পলি জমছে আর একদিকে। এই ভাঙাগড়ার মহাযজ্ঞশালায় ডাক পড়েছে সমস্ত শিল্পীর।... সমাজ জীবনের ভাঙাগড়ার মাঝখান দিয়ে চলেছে ইতিহাসের যে ধারা, কোনো শিল্পী যদি তার সৃষ্টিক্ষেত্রকে তার তরঙ্গাঘাত থেকে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখেন তবে তার উর্বরতা যাবে নষ্ট হয়ে, তা আর শস্যশ্যামল থাকবে না, হবে ধূসর ভূমি- আধুনিক কৃষ্টিতে যে মরুভূীম দেখতে পেয়ে বিলাপ করেছেন এলিয়ট তার ক্ষুদ্রকায় মহাকাব্যে।’
নিজের এ বক্তব্যে বেশিদিন আস্থাবান থাকতে পারেননি তিনি। কারণ এক প্রবল রাজনৈতিক ধারা সাহিত্যকে আপন ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে টেনে আত্মসাৎ করতে উদ্যত, যেভাবে মধ্যযুগে ধর্ম আত্মসাৎ করেছিল শিল্প-সাহিত্য-দর্শন ও বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র বিকাশকে। যে কোনো বিবেকবান শিল্পীর মতো আইয়ুব এ আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন। সেই প্রচল রাজনৈতিক ধারা বা মার্কসবাদী চেতনাকে তিনি তাচ্ছিল্য করেননি। সেই চেতনা যদি বলে, সমাজের চরম সংকটকালে লেখক নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না, ধনী-নির্ধনের চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের সময় লেখককেও নির্ধনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে হবে তবে সেই চেতনার আহ্বানে সাড়া দিতে আইয়ুব প্রস্তুত। কিন্তু সেই চেতনার প্রবক্তারা মনে করেন, সেই চেতনাপুষ্ট সাহিত্যই শ্রেষ্ঠ সাহিত্য। তার অভিযোগ সাহিত্যিকের সমাজচেতনা প্রবন্ধে :
‘আমাদের বিপ্লবী নেতারা সরাসরিভাবে বলে বসলেন যে, এই সাহিত্যই সেরা সাহিত্য, একমাত্র সাহিত্য, অন্য যে কোনো প্রকারের সাহিত্য অগ্রাহ্য, অসহ্য। যদি তারা এ যুগের সবচেয়ে প্রাগ্রসর রাজনৈতিক আদর্শ ও ভাবধারার সঙ্গে সাহিত্যিকের পরিচয় ঘটিয়ে এবং তার প্রতি তাদের সহানুভূতি আকর্ষণ করেই ক্ষান্ত হতেন, এই নতুন মতাদর্শকে শিল্পকর্মে রূপায়িত করার ভার শিল্পীদের ওপরই ছেড়ে দিতেন, তা হলেও নালিশের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু শিল্পী-সাহিত্যের কাছে তারা দাবি করলেন সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং আত্মবিলোপ।
স্বভাবতই শিল্পীর এ আত্মবিলোপের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন আইয়ুব। আত্মবিলোপ আত্মহত্যারই নামান্তর। তিনি এক্ষেত্রে সচেতন যে কোনো সাহিত্যিক যদি প্রগতির প্রকৃত আদর্শ গ্রহণ করে থাকেন এবং সেই আদর্শ যদি তার মনের ভেতর সাড়া জাগায়, তবে সেই আদর্শে তার সাহিত্যসম্ভার সমৃদ্ধ হবে। সাহিত্যিকের পক্ষে সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার স্পর্শ বাঁচিয়ে চলার পরিণাম আপন সাহিত্যি সৃষ্টিকে ক্ষীণ শৌখিন করে তোলা। কারণ শিল্পী সাহিত্যিকের মন হচ্ছে সমাজের সূক্ষœতম বীণাতন্ত্র। সমাজের সংকটের আওয়াজ সর্বাগ্রে ধ্বনিত হবে সেই বীণার তারে এবং তার ঝংকার সাড়া জাগবে দেশজোড়া মানুষের চিত্তে। আইয়ুব মনে করেন দুঃখ থেকে পরিত্রাণের পথ শিল্পীকেই সবার আগে দেখাতে হবে। সমাজসেবী ও সাহিত্যসেবীর সহযোগ অবাঞ্ছিত নয়। তবে তা যেন রাষ্ট্রনেতার কাছে সাহিত্যিকের আÍবিলোপ না হয়। শিল্পীর স্বাধীন মনকে উপেক্ষা করে সামষ্টিক কল্যাণের জন্য বহিরাগত নির্দেশ, সাহিত্য সমালোচনাকে দলীয় অনুজ্ঞায় পরিণত করার প্রয়াস অবশ্যই নিন্দনীয়।
আইয়ুব বিশ্বাস করেন যে, শিল্পসৃষ্টি বা সত্যসন্ধানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বরূপের উন্মোচন একান্ত অপরিহার্য। এটি মোটেও ব্যক্তিসর্বস্বতা নয়। এদের বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্রই সমষ্টির জীবনকে সমৃদ্ধ করবে, সে জীবনপ্রবাহে বেগ সঞ্জার করবে। এ বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শুনি রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’তে। কবিগুরুর উপলব্ধি :
‘সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টির প্রতি পীড়নে এরা কোনো বাধাই মানতে চায় না। ভুলে যায় ব্যষ্টিকে দুর্বল করে সমষ্টিকে সবল করা যায় না; ব্যষ্টি যদি শৃঙ্খলিত হয় তবে সমষ্টি স্বাধীন হতে পারে না।’
বুদ্ধদেব বসুর মতো আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘মার্কসবাদবিরোধী’ পরিচিতি নেই। বুদ্ধদেবের বাক্যবাণে মার্কসবাদী চেনতা যেভাবে আহত হয়েছে এর নজির আইয়ুবের রচনায় নেই। বুদ্ধদেবের মতো সমকালীন সাহিত্য আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠাদানের কোনো দায় আইয়ুবের ছিল না। তাই বুদ্ধদেবের তুলনায় আইয়ুবের বক্তব্য অধিকতর নির্মোহ ও যুক্তিপ্রভাবিত। মার্কসবাদী সাহিত্য আন্দোলন যে সাহিত্য বিষয়ের সীমানা প্রসারিত করেছে এ বিষয়ে আইয়ুব সচেতন ছিলেন। তাই মার্কসবাদী সাহিত্যবীক্ষাকে প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে তিনি কুণ্ঠিত নন :
‘সমাজের বৃহত্তর অংশ- যাদের ছোটোলোক বলে এতদিন উপেক্ষা করা হয়েছে- আজ তারা সাহিত্যে যেটুকু স্থান পাচ্ছে তার জন্য প্রধানত মার্কসবাদী প্রচেষ্টাই দায়ী। মার্কসবাদীদের আর একটি করণীয় কৃতিত্ব ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের নিবিড় সম্পর্ককে সাহিত্যিকের চোখে প্রত্যক্ষ করে তোলা। এর ফলে আমাদের সাহিত্যের, বিশেষত কথাসাহিত্যের মেরুদণ্ড শক্ত হয়েছে। মার্কসবাদী সাহিত্যনীতির সঙ্গে আমাদের অনেকের অল্পবিস্তর মতভেদ আছে। মতভেদ আছে বলে আমরা যেন ভুলে না যাই যে তারা সাহিত্যে এক নূতন সমাজচেতনা এনেছেন এবং প্রর্বতন সমাজচেতনাকে দৃঢ় ও প্রশস্ত করেছেন। এই সমাজচেতনার সাহিত্যিক ও সামাজিক মূল্য স্থায়ী।’
মার্কসবাদী সাহিত্যচেতনা তথা সাহিত্যিকের রাজনৈতিক চেতনার প্রতি আইয়ুবের মতো সমর্থন বুদ্ধদেব বসুর কোনো রচনায় পাওয়া যায় না। লেখালেখির দায় সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যের প্রতি যে দু’জনই দায়িত্ববান ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সমাজের প্রতি তারা কতটুকু দায়বদ্ধ ছিলেন সেই বিতর্কে না গিয়ে সাহিত্যের প্রতি যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় তারা দিয়েছেন তা স্মরণ করা লেখক মাত্রেরই অবশ্য কর্তব্য।

রাশিয়াকে ক্রিমিয়া ছাড়তে বলল ন্যাটো

যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে গতকাল ন্যাটো সম্মেলন শুরু হওয়ার
আগে নিজ দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জোটের নেতাদের
সামনে তুলে ধরেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো।
আলোচনার টেবিলে (ডান থেকে) ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও
রেনজি, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী
ডেভিড ক্যামেরন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইউক্রেনের
প্রেসিডেন্ট পোরোশেঙ্কো ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ। এএফপি
ক্রিমিয়া অঞ্চল ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ন্যাটো। ক্রিমিয়া মস্কোর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ছয় মাস পর এই আহ্বান জানানো হলো। যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর দুই দিনের সম্মেলন। সম্মেলন শুরুর পর ন্যাটোর মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউক্রেন থেকে সেনা ফিরিয়ে নিতে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা না করার জন্য আমরা রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। তাদের বলেছি ক্রিমিয়ায় অবৈধ ও স্বঘোষিত সম্প্রসারণ থেকে সরে আসতে।’
খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের। রাসমুসেন জানান, সংঘাত ছেড়ে শান্তির পথে আসার জন্য রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ন্যাটো মহাসচিবের ওই মন্তব্যের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাশিয়ার ওপর আরও অবরোধ আরোপের বিষয়ে একমত হয়েছেন ন্যাটোর নেতারা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, নতুন অবরোধ আরোপের ব্যপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জোর সম্মতি আছে। ন্যাটোর সম্মেলনে ইউক্রেন ও ইরাক পরিস্থিতিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনসহ ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রের নেতারা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। গতকাল সম্মেলন শুরুর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি তুলে ধরেন। সম্মেলনের শুরুতে পশ্চিমা নেতারা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ‘অস্থিতিশীলতা’ সৃষ্টির জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অস্ত্র সরবরাহ করছে রাশিয়া। এই দাবির পক্ষে পশ্চিমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণও আছে। সম্মেলন শুরুর কিছুক্ষণ আগে ন্যাটোর মহাসচিব রাসমুসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের’ মধ্যে ন্যাটোর বর্তমান সম্মেলন হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘রাশিয়া যে অগ্রহণযোগ্য কাজ করছে, রুশ জনগণকে তা জানিয়ে দেওয়ার সবেচেয়ে ভালো উপায় হলো মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করা।’ গত ফেব্রুয়ারিতে ক্রিমিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা দেয় রাশিয়া। এর পর থেকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর লড়াইয়ে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ৬০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এদিকে ইরাকের কট্টরপন্থী সুন্নি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াইয়ের ব্যাপারে একমত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। আইএসের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এ দুই নেতা বলেন, বর্বর হত্যাকারীদের ভয়ে তাঁদের দেশ ভীত নয়। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ গতকাল বলেন, ইউক্রেনে অস্থিতিশীলতা কমিয়ে আনতে ‘বাস্তব পদক্ষেপ’ নিতে প্রস্তুত রাশিয়া। তবে তা হবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রস্তাব অনুযায়ীই। অস্থিতিশীলতা কমিয়ে আনতে ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সহযোগিতাবিষয়ক জোট অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতা প্রস্তাবও দেন লাভরভ।

আইএসের হত্যাযজ্ঞ থেকে যেভাবে বাঁচলেন তিনি

আলী হুসেইন কাদিম
ফায়ারিং স্কোয়াডের লাইনে আলী হুসেইন কাদিমের নম্বর ছিল ৪। প্রথমজনকে গুলি করা হলো। তাঁর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে ছোটা গরম রক্ত এসে লাগল কাদিমের মুখে। কাদিমের তখন মনে পড়ছিল তাঁর শিশু মেয়েটির মুখ। হঠাৎ মনে হলো একটি গুলি তাঁর মাথার পাশ দিয়ে চলে গেল। তারপরই পাশে খোঁড়া গর্তে পড়ে গেলেন কাদিম। ২৩ বছরের টগবগে যুবক শিয়া মুসলিম আলী হুসেইন কাদিম ইরাকি সেনাবাহিনীর এক সদস্য। ইসলামিক স্টেট (আইএস) বাহিনীর সুন্নি জঙ্গিরা গত জুন মাসে অন্য কয়েক শ সেনার সঙ্গে তাঁকেও আটক করে।
আটক সেনাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে ফেলে সুন্নি জঙ্গিরা। শিয়া সেনাদের মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। তারপরই ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তাদের। কাদিম বলেন, ‘হত্যাকারী আইএস যোদ্ধাদের একজন মৃতদেহগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বুঝতে পারেন একজন সেনার শ্বাস-প্রশ্বাস তখনো চলছে। তখন আরেক যোদ্ধা বলেন, ‘ওকে কষ্ট পেতে দাও... ও একজন নাস্তিক।’ মরার ভান করে গুলিবিদ্ধ লাশের মধ্যে প্রায় চার ঘণ্টা পড়ে থেকে বেঁচে যান কাদিম। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

জাওয়াহিরি: আল কায়েদার পুরোনো তাত্ত্বিক গুরু

জাওয়াহিরি: আল কায়েদার পুরোনো তাত্ত্বিক গুরু
মার্কিন কমান্ডো অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর ২০১১ সালের ১৬ জুন আয়মান আল-জাওয়াহিরিকে আল-কায়েদার নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। জাতীয়তায় মিসরীয় জাওয়াহিরি মিসরের জঙ্গি ইসলামি সংগঠন ইসলামিক জিহাদ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছিলেন। পেশায় চোখের শল্যচিকিৎসক ছিলেন আয়মান আল-জাওয়াহিরি। অনেক আগে থেকেই তিনি আল-কায়েদার তাত্ত্বিক গুরু বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার তিনিই ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০০১ সালে বিশ্বের ‘২২ শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ যে তালিকা ঘোষণা করে, তাতে বিন লাদেনের পরেই জাওয়াহিরির অবস্থান ছিল। মার্কিন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এখনো তাঁর মাথার দাম আড়াই কোটি মার্কিন ডলার। ২০০১ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় জাওয়াহিরির এক স্ত্রী ও দুই সন্তান নিহত হন। তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযান শুরুর পর আত্মগোপনে চলে যান জাওয়াহিরি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তিনি সম্ভবত পাক-আফগান সীমান্ত অঞ্চলের কোথাও আছেন। কয়েকবার তাঁকে পাকড়াওয়ের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে হামলায় আল-কায়েদার এই নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তা ছাড়া ইসলামিক জিহাদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ১৯৯০ সালে মিসরে জাওয়াহিরির অনুপস্থিতিতেই তাঁকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। সূত্র: বিবিসি।

পাকিস্তানে ভারি বর্ষণ আন্দোলনে ঢিমেতাল

পাকিস্তানে ভারি বর্ষণে বিপাকে পড়েছেন বিক্ষোভকারীরা। প্লাস্টিকের চাদরে নিজেদের ঢেকে রেখেছেন তাহিরুল কাদরির এসব সমর্থক। অন্যদলগুলোর সমর্থনহীন নিঃসঙ্গ ইমরান-তাহিরের সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন চলছে ঢিমেতালে।
ভেতর বাহিরের আক্রমণে ইমেজ সংকটে পড়ছেন ইমরান নিজেও। রাজনৈতিক দুর্যোগ সৃষ্টি করা আন্দোলনকারীদের হয়ত এখন ঘরে ফিরতে হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায়। লাহোর ও শিয়ালকোটসহ পাঞ্জাবে ১২ ঘণ্টার টানা ভারি বর্ষণে কমপক্ষে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবারের এই বৃষ্টি-দুর্যোগে আহত হয়েছে আরও অনেকে। ছবিটি বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে থেকে তোলা এএফপি

ন্যাটো ঐক্যবদ্ধ, রাশিয়া একা

ইউক্রেন সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য দু’দিনের এক সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাজ্যের ওয়েলেস শহরে জড়ো হয়েছেন ন্যাটো নেতারা। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া ওই সম্মেলনে তারা রাশিয়াকে মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়েলসের নিউপোর্টে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো বৈঠকে রাশিয়া ছাড়াও ইরাক ও সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামী স্টেটের হুমকি মোকাবেলার বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হবে। ইতিমধ্যে আইএসকে ধ্বংস করার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মার্কিন নাগরিকদের শিরশ্ছেদ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় দেখানো যাবে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের শক্তি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র লড়ে যাবে। মঙ্গলবার দ্বিতীয় মার্কিন সাংবাদিকের শিরোñেদের ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন। এদিকে ন্যাটো প্রধান অ্যান্দ্রেস রাসমুসেন ফগ হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পর ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন হচ্ছে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। রুশ আগ্রাসন মোকাবেলায় ইউক্রেনকে সহায়তা করতে একসঙ্গে কাজ করার শপথ নিয়েছেন প্রেসডেন্ট ওবামা এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বৃহস্পতিবার এই দুই নেতার একটি যৌথ বিবৃতি ‘টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বলে আলজাজিরা জানিয়েছে। এই সম্মেলনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার নোটিশে কয়েক হাজার সেনা মোতায়েনের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করা হতে পারে। এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন ইউক্রেনে ২০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি মাসের শেষে অনুষ্ঠেয় সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে এসব সেনা মোতায়েন করা হবে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশপন্থী স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে চলতি বছর কিয়েভের সেনারা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার পর এটাই হবে দেশটিতে প্রথম মার্কিন পদাতিক সেনাদল মোতায়েন।
বুুধবার পেন্টাগনের মুখপাত্র কর্নেল স্টিভেন ওয়ারেন মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খবর এএফপির। তিনি বলেন, সামরিক মহড়ায় যোগ দেয়ার জন্য প্রায় ২০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে, আগামী সপ্তাহে কৃষ্ণসাগরে আলাদা নৌমহড়ায় প্রায় ২৮০ মার্কিন নৌসেনা যোগ দেবে। এ মহড়ায় ইউক্রেন, তুরস্ক, জর্জিয়া এবং রোমানিয়ার সেনাদের যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। সি-ব্রিজ নামের এ মহড়ায় গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রবাহী মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস রস এবং ন্যাটো নৌগোষ্ঠীর দুটি রণতরীও অংশ নেবে। ওদিকে, ফ্রান্স বুধবার রাশিয়ায় দুটি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ ‘নভেম্বর পর্যন্ত’ স্থগিত করেছে। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে মিত্র দেশগুলো রাশিয়াকে কড়া সমালোচনা করায় এ সিদ্ধান্ত নিল প্যারিস। ২০১১ সালে ফ্রান্স ১২০ কোটি ইউরোর (১৬০ কোটি মার্কিন ডলার) বিনিময়ে রাশিয়ার কাছে দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ বিক্রি করতে সম্মত হয়। প্রথম জাহাজটি অক্টোবর বা নভেম্বর এবং দ্বিতীয়টি ২০১৫ সালে সরবরাহ করার কথা ছিল। খবর এএফপির। যুদ্ধজাহাজ কেনার ব্যাপারে রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের ১৬০ কোটি ডলারের চুক্তির বিষয়ে ব্যাপক আপত্তি ছিল ইউরোপীয় দেশগুলোর। ফ্রান্স সেই আপত্তি এতদিন উপেক্ষা করেছে। এএফপি।

মাঝ সাগরে দীপিকা-রণবীরের চুমো

বলিউডে হালের সবচেয়ে সফল অভিনেত্রী ধরা হয় দীপিকা পাড়–কোনকে। সর্বশেষ প্রায় ৬টি ছবি ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা সফলতার মুখ দেখেছে দীপিকার। কাটরিনা, কারিনা, প্রিয়াংকাদের ছাপিয়ে অনেকে বলিউডের এক নম্বর নায়িকাও বলছেন দীপিকাকে। তবে জনপ্রিয়তা কিংবা সফলতার মোহ একদমই কাজ করে না এ অভিনেত্রীর মধ্যে। বরং অন্যদের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করে কাজ করেন তিনি। শুটিংয়ে নিজের মনঃপূত না হওয়া পর্যন্ত পরিচালককে দিয়ে বার বার টেক করিয়ে থাকেন। আর এ কারণেই পরিচালকদের কাছেও দীপিকা বেশ সমাদৃত। তবে নতুন খবর হচ্ছে, দীপিকা আবার সাবেক প্রেমিকা রণবীর কাপুরের সঙ্গে আসছেন দর্শকদের সামনে। ‘ইয়ে জাওয়ানি হে দিওয়ানি’র শুটিংয়ের পর দু’জনই ঘোষণা দিয়েছিলেন আর একসঙ্গে কাজ করবেন না। তবে বর্তমানে দুটি ছবিতে জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন তারা। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ইয়ে জাওয়ানি হে দিওয়ানি-২’। প্রথমটির সফলতার পর এর সিকুয়্যাল নির্মাণের ঘোষণা আগে থেকেই এসেছিলো পরিচালকের কাছ থেকে। এবার সেটির বাস্তব রূপ দিচ্ছেন তিনি। সপ্তাহখানেক হলো এ ছবির শুটিং করছেন দীপিকা-রণবীর। আর এক্ষেত্রে নতুন খবর হলো, এই ছবির জন্য সম্প্রতি একটি দীর্ঘ চুমোদৃশ্যে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তারা। তাও চুমোদৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে মাঝ সাগরে ভাসতে থাকা একটি জাহাজের ছাদের ওপর। প্রায় ৩০ সেকেন্ডের এই চুমোদৃশ্যটি ওকে করতে দশবারের মতো টেক নিতে হয়েছে রণবীর-দীপিকাকে। তবে এ সময় তাদের বিব্রত মনে হয়নি। বরং হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। জানা গেছে, ছবিতে আরও কিছু ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে কাজ করেছেন এই জনপ্রিয় দুই তারকা। ছবিটি আগামী বছর মুক্তি পাবে। কিন্তু দীপিকা-রণবীরের চুমু দৃশ্যের কারণে এখনই এটি ব্যাপক আলোচনায় চলে এসেছে। এ বিষয়ে রণবীর কাপুরের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আর দীপিকাকে রণবীরের সঙ্গে চুমোদৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা শুধুমাত্র গল্পের প্রয়োজনে করা হয়েছে। আর কিছু নয়।

সাইকেলে ফরাজীর হজে যাত্রা by মাসুদ আহমেদ

মুক্তিযোদ্ধা জাফর ফরাজী। বয়স ৬৩ চলছে। কিন্তু বাইসাইকেল চালিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরছেন। তার অভিযোগ তিনি মুক্তিযোদ্ধা বলে পাকিস্তান তাকে ভিসা দেয়নি। এখন জেলায় জেলায় মানববন্ধন করছেন তিনি। ইচ্ছা সাইকেল চালিয়ে ভারত-চীন-আফগানিস্তান-ইরান-ইরাক হয়ে সৌদি আরব পৌঁছে হজ পালন করবেন। দেশে সাইকেল চালিয়ে ওয়ার্মআপ করছেন। ইতিমধ্যে ইরান ও ভারতের ভিসা সংগ্রহ করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা জাফর ফরাজির প্রাথমিক ইচ্ছা ছিল বাইসাইকেল চড়ে পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব পৌঁছা। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে দু’বার ডিও লেটার নিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসে জমা দিলেও ভিসা হয়নি তার। তার অভিযোগ, ডিও লেটারে লেখা ছিল ফ্রিডম ফাইটার। এখন প্রতিবাদ হিসেবে বাইসাইকেল চালিয়ে বাংলাদেশের সব জেলা ঘুরছেন আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রেস ক্লাবের সামনে একা দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছেন।
মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার পূর্ব কমলাপুর গ্রামে জাফর ফরাজীর মূল বাড়ি। সাইকেলে চড়ে সিলেট হয়ে মৌলভীবাজারে আসেন গত রোববার ৩১শে আগস্ট রাতে। তিনি জানান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর নিজে দর্জি পেশায় আবার নিয়োজিত হন। ছেলেমেয়ে সংসার নিয়ে ভালই ছিলেন। ২০০৮ সালে তার মধ্যে সমাজ সেবার ইচ্ছা জাগে। এরপর থেকে এলাকায় সেবামূলক নানা কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজের জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে সমাজ সেবায় ব্যয় করেন। জাফর ফরাজীর ৫ সন্তান। ২ কন্যা ৩ পুত্র। কন্যাদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন ২ ছেলে গার্মেন্ট শ্রমিক। থাকেন নারায়ণগঞ্জে। এই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সমাজসেবা করে নিঃস্ব হলে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভাল চোখে দেখেনি তার কর্মকাণ্ড। তারপরও এই পথ ছাড়তে পারেননি। তাই রানা প্লাজা ধসের সংবাদ পেয়ে ছুটে যান সেখানে। অংশগ্রহণ করেন উদ্ধার কাজে। ওই সময় বিভিন্ন পত্রিকার শিরোনামও হন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা জাফর ফরাজী জানালেন, ইতিমধ্যে তিনি ৪২টি জেলা সাইকেলে চড়ে ভ্রমণ করেছেন। জেলার প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে পাকিস্তানবিরোধী প্রচারণা চালিয়েছেন। মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাবের সামনে অনুরূপ কর্মসূচি পালন করেছেন। কথা বলা সময় ফরাজী আরও জানান, ’৭১ সালে তিনি ছিলেন একজন রিকশচালক। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং কুমিল্লার মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার মোহাম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে ৪নং সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে নিজের এলাকায় দর্জির দোকান করেন। কিন্তু সমাজসেবার ভূত মাথায় চাপায় সব বিক্রি করে হন নিঃস্ব। গতকাল এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে দুঃখ করে বলেন, দোকান বিক্রি করে বোকামি হয়েছে। তারপর ছেলেমেয়েরা এখন নিজেদের মতো দাঁড়িয়েছে। পেছনে তাকাতে চান না। জানালেন ২০১৩ সালে সিদ্ধান্ত নেন সাইকেলে ভ্রমণ করে পাকিস্তান হয়ে ইরাকে যাবেন বড় পীর আবদুল কাদির জিলানীর (রহ:) মাজার জেয়ারত করতে। এরপর সৌদি আরব যাবেন হজ পালন করতে। এর আগে তিনি একবার ভারতে আজমির শরিফ খাজা মঈন উদ্দিন চিশতির (রহ:) মাজারে যান। বর্তমানে পাকিস্তান দূতাবাস তাকে ভিসা না দেয়ায় নিজ দেশে ভ্রমণ
শুরু করেছেন। দেশ ভ্রমণ শেষ করে ভারত-চীন-আফগানিস্তান-ইরান-ইরাক হয়ে সৌদি আরব পৌঁছে হজ পালন করারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জানান, পাকিস্তান হয়ে যেতে পারলে সহজ
হতো। এখন কষ্ট বেশি হবে। ইতিমধ্যে ভারত ও ইরানের ভিসা মিলেছে। বাকি ভিসা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। নিজের সঙ্গে সব সময় কাপনের কাপড় রাখেন পথে মৃত্যু হলে যেন সেই কাপনে মুড়িয়ে দাফন করা যায় তাকে। তিনি জানালেন, প্রথমে তার এই কাজে পরিবারের সাড়া না থাকলেও এখন ছেলেরা টাকা পাঠায়, সাইকেল কিনে দেয়। বাকি জীবন এই বাইসাইকেলে চড়েই পার করে দিতে চান তিনি।

বিশ্বে ১০ জনে একজন তরুণী যৌন নির্যাতনের শিকার

বিশ্বের ১২ কোটি তরুণী অর্থাৎ, গড়ে ১০ জনে ১ জনের কিছু বেশি ২০ বছর বয়সেই হয় ধর্ষিত নয়তো যৌন হামলার শিকার হচ্ছেন। জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যানে ভয়াবহ এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের কল্যাণে নিয়োজিত জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, শুধু ২০১২ সালেই ৯৫ হাজার শিশু ও টিএনএজার হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে। এর অধিকাংশই ঘটেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোতে। বিশ্বে ২-১৪ বছর বয়সী ১০টির মধ্যে ৬টি শিশুকেই প্রায়ই মারধর করা হয়। তাদের গালিগালাজও করা হয়। ১৯০টি দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ডকুমেন্টটি তৈরি করেছে ইউনিসেফ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সারা বিশ্বে শিশুরা নিয়মিত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বয়স, জলবায়ু, ধর্মমত, সম্প্রদায় ও আয়ের গ-ি অতিক্রম করে নির্বিশেষেই শিশুদের ওপর চলছে এ সহিংসতা। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যানথনি লেইক এ তথ্য দেন। তিনি বলেন, এটা ঘটছে বাড়িতে, স্কুলে এবং সম্প্রদায়ের ভেতরে যেখানে শিশুদের নিরাপদ থাকার কথা। এর আগে কখনও এতোগুলো দেশের পরিসংখ্যান একত্রিত করে ডকুমেন্ট তৈরি করা হয়নি।

এ কে খন্দকারের বই নিয়ে সংসদে হইচই শাস্তি দাবি

‘১৯৭১: ভেতরে-বাইরে’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অভিযোগ এনে বইটির লেখক সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এ কে খন্দকারের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এমপিরা। সরকার, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র এমপিদের পক্ষ থেকে সংসদে এ দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তার লেখা বইটি বাজেয়াপ্তের দাবি জানান তারা। তারা বলেন, জাতিকে বিভ্রান্ত করতেই পরিকল্পিতভাবে এ কে খন্দকার বিকৃত ইতিহাস সংবলিত বইটি লিখেছেন। কারও প্ররোচনায় কিংবা পরাজিত শক্তির দোসর কোন এজেন্সির টাকা খেয়ে বঙ্গবঙ্গু হত্যার পর খুনি মোশ্‌তাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী এ কে খন্দকার এ ধরনের বই লিখে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। কারও প্ররোচনায় কিংবা অন্য কোন নির্দেশে এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার চেষ্টা করেছেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তারা অবিলম্বে বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি এ ধরনের বিকৃত ইতিহাস সংবলিত বইটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ সময় স্পিকারের আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের সময় আমারও কিছুটা সম্পৃক্ততা ছিল। জাতির জনককে হত্যার পর খুনি মোশ্‌তাককে সমর্থনকারী তার বইতে কি লিখলো, তাতে জাতির কোন যায় আসে না। ৭ই মার্চ ভাষণ সম্পর্কে উনি যা লিখেছেন তা অবশ্যই জাতির সামনে অবমূল্যায়িত হবে। কেননা বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে মাগরিবের নামাজের পর সংসদ অধিবেশন শুরু হলে এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারের লেখা ‘১৯৭১: ভেতর বাইরে’ বই নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ।  প্রায় দু’ঘণ্টাব্যাপী অনির্ধারিত এই আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক এ কে খন্দকারের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল ও জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ।

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসনে আমু বিতর্কে অংশ নিয়ে বলেন, একাত্তর নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়। ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন এবং একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। এ কে খন্দকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কাউকে ছোট করে কেউ বড় হতে পারে না। তারা বঙ্গবন্ধুকে টানাটানি করছেন না, তারা স্বাধীনতা ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি করছেন। জাতির ওপর আঘাত করার জন্যই পরিকল্পিত এ ধরনের মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রগুলো কোন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। এই অপশক্তিই ১৫ই আগস্ট ঘটিয়েছিল, ২১শে আগস্ট ঘটিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে বারবার হত্যার চেষ্টা করছে। এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ বলেই শেষ করেছিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণের দিন আমরা মঞ্চেই ছিলাম। আমরা মঞ্চে থেকে জানলাম না, অথচ একে খন্দকার সাহেব তার লেখায় বললেন বঙ্গবন্ধু বক্তব্য শেষে নাকি ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন! এটা উনি কোথায় পেলেন? ’৫২ সাল থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত এ কে খন্দকার পাকিস্তানে ছিলেন। এ দেশে কি হয়েছে তা তিনি জানতেন না। এই এ কে খন্দকারই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রেডিও স্টেশনে গিয়ে খুনি মোশ্‌তাককে সমর্থন দিয়েছিলেন। উনার (এ কে খন্দকার) লেখায় রয়েছে,  আমাদের যুদ্ধের নাকি প্রস্তুতি ছিল না! তবে কি হাওয়ার ওপর দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে? বাস্তবতা হচ্ছে ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিকে পরিণত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। যুদ্ধের সব নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় কোথায় থেকে অস্ত্র আসবে, নেতারা কোথায় থাকবেন- সেটিও আগেই বলে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু ৬ দফা না দিলে আগরতলা মামলা হতো না, মামলা না হলে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেতেন না, ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতো না, বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। মেজর সিদ্দিক সালেকের ‘উইটনেস অব সারেন্ডার’ বইটি পড়ার জন্য এ কে খন্দকারকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এসব লিখে অন্যদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়। এ কে খন্দকার কেন বইটি লিখেছেন, কোন সময়টা বেছে নিয়েছেন- তা আমি জানি। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সবারই সতর্কতার সঙ্গে কথা বলা উচিত।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, কে কি লিখলো সেটা বাংলাদেশের ইতিহাস নয়। ২৫শে মার্চের পর বাঙালি জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য কারও ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করেনি। ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ‘জয় পাকিস্তান’ কোথায় পেয়েছেন এ কে খন্দকারকে প্রমাণ করতে হবে। বিকৃত ইতিহাস কার স্বার্থে করা হচ্ছে? এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কোন প্রতিবাদ না করে খুনি মোশ্‌তাকের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করেছেন। এরশাদেরও মন্ত্রী হয়েছিলেন। এবার মন্ত্রী চলে যাওয়ায় ‘ব্যর্থ প্রেমিকের আর্তনাদ’ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বইয়ে। তিনি বলেন, একাত্তরে দু’ধরনের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এক পক্ষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে, অপর পক্ষ পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে। এই ধরনের বিকৃত লেখা লিখে এ কে খন্দকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। আইএসআই-এর টাকা খেয়ে লিখেছেন কিনা জানি না, কিন্তু কারও প্ররোচনায় কিংবা কোন এজেন্সির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে এ ধরনের লেখা তিনি লিখেছেন। অবিলম্বে এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিকৃত ইতিহাস সংবলিত তার লেখা বইটি বাজেয়াপ্ত করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম বলেন, কোন মহলের প্ররোচনায় ইতিহাসের তথ্যগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা হচ্ছে। আমি একাত্তরের ২৪শে মার্চ চট্টগ্রামে যুদ্ধ শুরু করেছি। সেদিন জিয়াউর রহমান সেই যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশকে ১০ সেক্টরে ভাগ করা হয় ১০ই এপ্রিলে, তার আগে নয়। এ কে খন্দকার সাহেব বলেছেন, পাকিস্তানিরা নাকি তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কখনওই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। তিনি সব সরকারের আমলে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।
তিনিও প্রশ্ন রেখে বলেন, হঠাৎ করেই কিভাবে এ কে খন্দকার ৭ই মার্চের ভাষণে কোথায় পেলেন ‘জয় পাকিস্তান’? এতদিন না বলে এখন কেন বলছেন, এর পেছনে রহস্য রয়েছে। আমি তাঁর এই লেখার নিন্দা করি। আমরা সবার আগে যুদ্ধ করেছি রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে। কোন সামরিক অফিসারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়নি, হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। পৃথিবীর কোন দেশ জনগণের সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া স্বাধীন হয়নি, বাংলাদেশও নয়। কারও প্ররোচনায় কিংবা অন্য কোন নির্দেশে এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার চেষ্টা করেছেন। আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই, এ ধরনের বিকৃত ইতিহাস সংবলিত বইটি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করুন।
জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, যিনি জাতীয় পার্টির মন্ত্রী ছিলেন, মাত্র ক’দিন আগে আওয়ামী লীগেরও মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা খুনি মোশ্‌তাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, তাদের একজন এ কে খন্দকার সাহেব। স্বাধীনতার এত বছর পর তিনি মিথ্যা ইতিহাস লিখে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। ‘জয় পাকিস্তান’ উনি কোথায় পেলেন? এ সমস্ত কুলাঙ্গাররা বিকৃত বই লিখে জাতিকে বিভ্রান্ত করছে।
এ কে খন্দকারের কঠোর সমালোচনা করে জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, বাংলাদেশে প্রবাদ আছে বাংলাদেশে উপকার করলে গালি খেতে হয়। উনি সমস্ত সুবিধা নিলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রী থাকাকালে কোন ফোরামে এ ব্যাপারে সামান্য কথা বলেননি কেন? সংবিধান লংঘন করা যদি অপরাধ হয়, তবে সেই অপরাধ করেছেন এ কে খন্দকার। এ ধরনের অপরাধ তার পক্ষ থেকে বাঞ্ছনীয় নয়। তিন হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি কখনওই স্বাধীন ছিল না। অতিরিক্ত বয়সে মানুষের সমস্যা হয়। যারা বই লেখেন কেউই সংবিধান লঙ্ঘন করবেন না, করলে জাতি ক্ষমা করবে না।
আলোচনার সূত্রপাত করে সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এ কে খন্দকার যে তথ্য দিয়েছেন তার বেশির ভাগই সঠিক হলেও বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যও রয়েছে। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান জয় বাংলা বলেই বক্তৃতা শেষ করেছিলেন। এটা সবাই জানে। এই ইতিহাস যারা বিকৃত করতে চায়, তাদের ধিক্কার জানাই।

‘ইকবাল’-এর বোন মধুচক্রে, হতবাক ফিল্মি দুনিয়া

জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে ছোট্ট মেয়েটি। ২০০২ সালে ‘মাকড়ি’ ছবিতে যমজ বোন চুন্নি ও মুন্নির চরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য।

কাট... ২০১৪। হায়দরাবাদের বানজারা হিলসের একটি নামিদামি হোটেলের মধুচক্রের আসর থেকে পুলিশ টেনে বার করছে সেই মেয়েটিকেই!

‘মর্দানি’ ছবিতে শিবানী শিবাজী রায়-রূপী রানি মুখোপাধ্যায় যখন নারীপাচারকারীদের ধোলাই দিয়ে নিষিদ্ধপল্লি থেকে মেয়েদের উদ্ধার করে সারা দেশের প্রশংসা কুড়োচ্ছেন, তখন রবিবার মধুচক্রের আসর থেকে বছর তেইশের শ্বেতা বসু প্রসাদের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় হতবাক চলচ্চিত্র মহল।

যেমন ‘মাকড়ি’র সহ-প্রযোজক সঞ্জয় রৌত্রে। তিনি বলেন, “খবরটা শুনে আমি সারা দিন অফিসে কাজ করতে পারিনি। মনে পড়ছে বিশাল ভরদ্বাজের ‘বরফ’ বলে একটা ছবিতে অডিশন দিয়েছিল ও। ছবিটা তখন হয়নি। কিন্তু কী প্রতিভা ছিল ওর মধ্যে! সেই দেখেই তো আমরা মাকড়ি ছবিতে ওকে নিয়েছিলাম।”

খবরটা শুনে বিশ্বাস করতে পারছেন না টলিউডের পরিচালক সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর পরিচালিত ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ ছবিতে অভিনয় করার কথা ছিল শ্বেতার। তবে শেষ পর্যন্ত শ্বেতার বদলে চরিত্রটি করেন শ্রাবন্তী। সৌমিক বলেন, “এত ভাল অভিনয় করেছিল ‘মাকড়ি’তে। শুনেছিলাম জামশেদপুরের মেয়ে। আমার ছবিটার জন্য দু’-এক দিন ওয়র্কশপও করেছিল। খবরটা পেয়ে আমি স্তম্ভিত!”

কিন্তু ‘ইকবাল’ (২০০৫) ছবিতে মূক ও বধির দাদা ইকবালকে ক্রিকেটার হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল যে খাদিজা (শ্বেতা অভিনীত চরিত্র), তার এমন পরিণতি কেন? পয়সার জন্য কবুল করছেন বড় ও ছোট পর্দার এই পরিচিত মুখ। আদালতের নির্দেশে সোমবার থেকে যাঁর ঠিকানা নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের হোম। বাঙালি মায়ের মেয়ে শ্বেতা বলেন, “পরিবারকে সাহায্য করার জন্য এবং আরও নানা কারণে আমার টাকার দরকার ছিল।  আর কোনও রাস্তা খোলা ছিল না। বেশ কিছু মানুষ টাকা রোজগারের জন্য দেহব্যবসায় নামতে উৎসাহ জুগিয়েছিল। আর কোনও উপায় না দেখে আমি এই পেশায় জড়িয়ে পড়ি।”

শ্বেতা টাকার প্রয়োজনের কথা বললেও সঞ্জয়ের দাবি, দু’বছর আগে তাঁর সঙ্গে মুম্বইয়ের এক মল-এ দেখা হয় শ্বেতার। “ওর মা ছিল সঙ্গে। আমাকে বলেছিল যে, তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ভাল কাজ করেছে। অনেক টাকাও রোজগার করছে,” বলছেন সঞ্জয়।

তা হলে কী এমন ঘটল যে, এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হলেন ইকবালের বোন! সঞ্জয়  জানাচ্ছেন,  শেষ বার যখন তাঁর সঙ্গে শ্বেতার দেখা হয়, তখন ওর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করেন তিনি। বলেন, “আমি তো ওকে বাচ্চা বয়সে দেখেছি। নিজের মেয়ের মতো। হঠাৎ এমন খোলামেলা পোশাক পরে ওকে দেখে একটু অদ্ভুত লেগেছিল। তবে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, যে ও এ রকম কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে!”

গ্রেফতারের পরে শ্বেতা দাবি করেছেন, অন্য অনেক অভিনেত্রীই নাকি এই রকম চক্রের সঙ্গে জড়িত। তথ্যও বলছে, শুধু তেলুগু ইন্ডাস্ট্রি থেকেই এর আগে আরও সাত অভিনেত্রীর নামে একই অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টি অবশ্য মানতে নারাজ পরিচালক অশোক পণ্ডিত। তিনি বলেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ কাউকে কোনও কিছুর জন্য চাপ দিতে পারে না। কেউ কেউ বিখ্যাত হওয়ার জন্য এবং চটজলদি টাকা রোজগারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এই মরিয়া ভাবটা এখন আমি অনেকের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। শুধু চলচ্চিত্র নয় অন্যান্য জগতেও এটা আছে।”

শ্বেতার পাশাপাশি ওই হোটেল থেকে মধুচক্রের আয়োজক আনজানেইয়েলু ওরফে বালু এবং কিছু ব্যবসায়ীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, প্রত্যেক খরিদ্দারের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা করে নিয়েছিলেন বালু। তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

হোমে পাঠানোর আগে শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে শ্বেতার। হোমের অন্য আবাসিকরাই অভিনেত্রীকে খাবার, কাপড় দিয়ে সাহায্য করছেন। কারিগরি শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে শ্বেতাকে। মাস তিনেক হোমে থাকতে হতে পারে তাঁকে।

এখন শ্বেতার বাড়ি সরকারি হোম হলেও এক সময় তিনি ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন শিশু চরিত্র হিসেবে ‘কহানি ঘর ঘর কি’ ধারাবাহিকে ‘পার্বতী’ ও ‘ওম’-এর মেয়ে ‘শ্রুতি’র ভূমিকায় অভিনয় করে। ‘ইকবাল’ ছবির জন্য পঞ্চম করাচি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পান সেরা সহ অভিনেত্রীর পুরস্কার। এ ছাড়াও তিনি কাজ করেছেন ‘ওয়াহ! লাইফ হো তো অ্যায়সি’, ‘ডরনা জরুরি হ্যায়’ নামে দু’টি হিন্দি এবং একটি তেলুগু ছবিতেও। ২০০৯ সালে বাংলা ছবি ‘একটি নদীর গল্প’-তেও কাজ করেন তিনি। ছবিটা মুক্তি পায়নি।

শিশুশিল্পীদের অনেকেই বড় বয়সে তারকা হয়ে উঠতে পারেন না। তার চাপ না-নিতে পেরেই কি এই পথে চলে গিয়েছিলেন শ্বেতা? আপাতত ১৫টি ছবি করেছেন ‘চিনি কম’-এর সুইনি খেরা। সঙ্গে ২০টি বিজ্ঞাপন। শ্বেতার খবরটি শুনে সুইনির বাবা নিমেষ খেরা বলেছেন, “মেয়ের ওপর সে রকম কোনও চাপ আমরা দিইনি। তবে, অনেক বাবা-মা খুব চাপ দেন। জনপ্রিয় হতে হবে, রোজগার করতে হবে বাচ্চারাও সেই মোহে ছুটতে থাকে।” এই মোহই কি শ্বেতাকে ঠেলে দিল এই অন্ধকার গলিতে?

ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নটা।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

সামরিক হুমকির মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছেন ওবামা

সিরিয়া ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের জল স্থল ও আকাশে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। এখন না তখন অথবা অমুক দিন সামরিক হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র একাই অথবা মিত্রদের নিয়ে। হঠাৎ পিছুহটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার। আরও বাজিয়ে-ঝাঁজিয়ে নিচ্ছেন যুদ্ধের মন্ত্র। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রোহিত হয়েছে। এখন অপেক্ষা মার্কিন কংগ্রেসের। সেখানে যাই ঘটুকÑ বিশ্বের কূটনীতির কেন্দ্র এখন সিরিয়া। রাশিয়া, চীন ও ইরানের কঠোর বিরোধিতার মুখে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে কি হবে তার ভবিষ্যৎ? মধ্যপ্রাচ্যে কি আদৌ শান্তি ফিরবে? নাকি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসীর রাজত্ব কায়েম হবে? সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এরকম অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মুখোমুখি হয়েছেন জনপ্রিয় ফরাসি দৈনিক ‘লা ফিগারো’ এর প্রখ্যাত সাংবাদিক মালব্র“নট। সোমবার প্রেসিডেন্ট আল আসাদের দেয়া এ ঝড়তোলা
সাক্ষাৎকারটি যুগান্তরের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল। অনুবাদ : রাসেল পারভেজ
মালব্র“নট : মি. প্রেসিডেন্ট, মার্কিন ও ফরাসিরা অভিযোগ করছে- আপনার নির্দেশে ২১ আগস্টে ঘৌটায় রাসায়নিক হামলা হয়েছে যাতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আপনার কাছে এমন কি তথ্য আছে যা প্রমাণ করে আপনার সামরিক বাহিনীÑ এ হামলা চালায়নি?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : প্রথমত, যারা এ ধরনের অভিযোগ করছে তাদের ওপরই দায়িত্ব বর্তায় অভিযোগ প্রমাণের তথ্য-উপাত্ত হাজির করা। আমরা চ্যালেঞ্জ করেছি তাদের এ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ও বৈধ প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। এরপর যখন থেকে তারা তাদের জনগণের স্বার্থের দোহাই দেয়া শুরু করেছে তখন আমরা তাদের জনমত যাচাইয়ের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছি এবং এক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হামলা চালানোর যৌক্তিকতা কোথায়? আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি দুই বছরের সংকটের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক এক বছর আগের তুলনায় অনেক ভালো। তাহলে কেন সামরিক বাহিনী ঢাকঢোল পিটিয়ে গণহত্যা চালাতে যাবে?
আমি নিশ্চিত ও করছি না আবারও উড়িয়েও দিচ্ছি না যে, আমাদের এ ধরনের অস্ত্র আছে কি না। এটি আলোচনার বিষয় নয়। যুক্তির খাতিরে বলছি, সামরিক বাহিনীর যদি এ ধরনের অস্ত্র থেকেই থাকে এবং তারা যদি তা প্রয়োগ করতে চাই তাহলে এটা কি বিশ্বাসযোগ্য সেখানে তাদের অসংখ্য সেনা মোতায়েন রয়েছে ঠিক সে এলাকায় তারা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে? এর মধ্যে কোনো যুক্তি আছে কি? অধিকন্তু এও কি গ্রহণযোগ্য। জনবহুল এলাকায় এ ধরনের অস্ত্র প্রয়োগ করা হল কিন্তু হাজার হাজার মানুষ মরল না, বাতাসে ছড়িয়ে, যা ঘটার কথা ছিল?
মালব্র“নট : সিরীয় সেনারা কোথায় অস্ত্রের মুখে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : ও হ্যাঁ, দামেস্কের উপকণ্ঠে ‘বাহারিয়া’ এলাকায়। জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দল তাদের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করেছে।
মালব্র“নট : অনেকেই বলছে, ওই এলাকায় সামরিক বাহিনী অগ্রসর হয়েছিল এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিদ্রোহীরা দখল নেয়ার চেষ্টা করছিল। আপনি তাদের হটানোর উপায় খুঁজছিলেন।
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : আবারও বলছি, ওই এলাকাটি আবাসিক এলাকা। সেখানে রাসায়নিক হামলা হলে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। এ ধরনের সব অভিযোগ ছাইপাস দিয়ে ঠাঁসা। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের দ্বারা ইন্টারনেটে প্রকাশিত অসত্য ছবি ও ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ আনা হয়েছে।
মালব্র“নট : মার্কিনরা দাবি করছে, আপনার ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তার সঙ্গে তাদের গোপন টেলিফোন আলাপ হয়েছে। তিনি তাদের বলেছেন সামরিক কর্মকর্তারাই রাসায়নিক হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : যদি মার্কিন, ফরাসি বা ব্রিটিশদের কাছে কোনো প্রমাণ থাকতো তাহলে প্রথম দিনেই তারা তা প্রকাশ করতে পারত। আমরা গুজবের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারি না। কারও কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে সে তা পেশ করতে পারে।
মালব্র“নট : আপনার অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো সেনা কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিতে পারে- এটা কি সম্ভব?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : আবারও বলছি, কোনো দেশের রাসায়নিক অস্ত্র আছে কি নেই সেটি বিষয় নয়। তবে তার ব্যবহার কেন্দ্র থেকেই হয়। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর বিশেষ একটি স্তরে এ ধরনের তথ্যগুলো থাকার কথা।
মালব্র“নট : কিন্তু এ ক্ষেত্রে জিহাদ মাকদিসি নামটি উচ্চারিত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : না, ওই সময় জিহাদ বলেছে, আমাদের কি এ ধরনের অস্ত্র রাখা উচিৎ? আমরা তা ব্যবহারও করতে পারি না। সমগ্র সিরিয়ায় এ ধরনের অস্ত্র থাকতেও পারে, নাও পারে।
মালব্র“নট : প্রেসিডেন্ট ওবামা সিরিয়ায় সামরিক হামলা স্থগিত করেছে। আপনি এটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : যুদ্ধ বিলম্ব করায় ওবামাকে অনেকেই দুর্বল মনে করছে। আবার যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় অনেকে তাকে ক্ষমতাধর ভাবছে। আমি মনে করি, যুদ্ধ প্রতিহত করাই প্রকৃত শক্তি, তার মধ্যে গুলিয়ে যাওয়া নয়। ক্ষমতা হল মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তি এবং ভুলগুলো শুধরে নেয়ার শক্তি। ওবামার যদি শক্তি থাকে তাহলে তার বলা উচিত সিরিয়া সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি। জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ দলের প্রতিবেদনের ফলাফল ও নিরাপত্তা পরিষদের মতামত পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিৎ। যাই হোক আমিও দেখছি, অভ্যন্তরীণ চাপ ও সামরিক হুমকির মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছেন ওবামা। আমি মনে করি, তারাই খাঁটি নেতা যারা যুদ্ধ রোধ করে, যুদ্ধ উসকে দেয় না।
মালব্র“নট : কংগ্রেসের ভোটে ঠিক হবে যুদ্ধ হবে, কি হবে না- এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : ভোটের আগে তারা নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করুক- আগের যুদ্ধগুলো থেকে আমেরিকা বা ইউরোপ কি পেয়েছে? লিবিয়া যুদ্ধ থেকে বিশ্ব কি অর্জন করেছে, শুধু সন্ত্রাসবাদ বিস্তার ছাড়া? এখন সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের সমর্থন দিয়ে তারা কি পেতে চাইছে?...
মালব্র“নট : যদি তারা হামলা করে তাহলে আপনি কীভাবে তাতে সাড়া দেবেন?
প্রেসিডেন্ট আল আসাদ : আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বলনোম্মুখ এক ব্যারেল বারুদ ভাবি তবে তা বিস্ফোরিত হওয়ার ক্ষণ ঘনিয়ে আসবে। তখন তা আর শুধু সিরিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রথম আঘাত থেকেই উত্তর পাবে তারা। ...
হামলার ভবিষ্যৎ হবে একদম অনিশ্চিত। তবে এটা ঠিক চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে তাণ্ডব, যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ।