Sunday, October 7, 2018

বৈচিত্র্যময়তার অনন্য বিন্যাস ‘ঊর্মিমুখর’

মানুষ যা পায়, তা নিয়ে সে কখনোই সন্তুষ্ট থাকে না। তাই সে নিজেকে প্রতিনিয়ত অতিক্রম করতে চায়। মানুষ নিজেকে নিয়ে আত্মতৃপ্ত নয়, তার বড় প্রমাণ হলো শিল্প। কথাগুলো অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর। সত্যিই শিল্পী তার শিল্প নিয়ে নিমগ্ন থাকেন নিরন্তর। আর সেই চর্চা তাকে নিয়ে যায় পরিবর্তন আর পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে উৎকর্ষতার চূড়ায়। কিন্তু একজন শিল্পীর কাছে তার প্রথম শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আবেদন একেবারেই অন্যরকম। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয় একজন শিল্পীর একক প্রদর্শনী সেই শিল্পীর জীবনে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয়।  বৈচিত্র্যময়তার অনন্য বিন্যাসের সমাহার খুঁজে পাওয়া যায় ‘ঊর্মিমুখর’ প্রদর্শনীতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস থেকে ইলাস্ট্রেশনে গ্র্যাজুয়েট তমা সাহার রঙের নানা মাধ্যম ফুটিয়ে তুলেছেন তিরিশের অধিক ছবিতে। শিল্পীর আঁকা একেকটি ক্যানভাস যেন কথা বলে একেকটি গল্পের; একেকটি মাধ্যমের। একেকটি ছবি যেন কথা বলে এককটি প্রস্ফুটিত শিল্পের। শিল্পীর আঁকা আন্দামান সিরিজের তিনটি ছবি তিনরকম প্রকাশ। বিলয় আন্দামান, বুদ্ধা আন্দামান আর মিস্ট্রি অব আন্দামান। আন্দামানের ত্রিমাত্রিক প্রকাশ এই ছবিগুলো। অন্যদিকে পেন্সিলে স্কেচে করা স্টিল লাইফের অনন্য প্রকাশ দেখা যায় কম্পোজিশন, ল্যাজিনেস বা ইনানিমেটেড লাইফ-এ। যেখানে যান্ত্রিক জীবন আর চলমান জীবনের নানা মাত্রিক প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। দেব দেবীর মুখ আমাদের কাছে অতি পরিচিত। কিন্তু শিল্পী তমা সাহা সেই পরিচিত মুখগুলোকেই শিল্পীর চোখে নিয়ে এসেছেন ভিন্নতা। তার প্রকাশ আমরা দেখি এনচান্টিং শঙ্করী-১, এনচান্টিং শঙ্করী-২, লর্ড গজানন-১, লর্ড গজানন-২-তে। ফ্রয়েডিয় মনস্তত্ত্বে আমরা স্বপ্নের নানা ব্যাখ্যার কথা জেনেছি। কিন্তু একজন শিল্পী তার রং তুলির মাধ্যমে স্বপ্নের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছেন। শিল্পী তার ড্রিম অব ডল-১, ড্রিম অব ডল-২, ড্রিম অব ডল-৩, ড্রিম অব ডল-৪-এ স্বপ্নের ভিন্নতা নিয়ে হাজির হয়েছেন। আবার মিশ্র মাধ্যমের আলগেই-১২, আলগেই-২, আলগেই-৩, আলগেই-৪ কথা বলে জীবনের নানা বৈচিত্র্যময়তার।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে তমা সাহার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী ‘ঊর্মিমুখর’-এর সাতদিনের আযোজনের সূচনা লগ্ন যেন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছিল শিল্পবোদ্ধাদের উপস্থিতিতে। 
প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ যা দেখি শুধু সেটাই কল্পনা করি, তার বাইরে করতে পারি না। কিন্তু যারা শিল্পী, তারা পৃথিবীর বাইরের কোনো পরাবস্তু নিয়ে কল্পনা করে শিল্পের মাধ্যমে তা উপস্থাপন করতে পারে। তমার সেন্টলেস ব্লু ক্লিটোরিয়া-২ তেমনই একটি ছবি। শিল্পের নিরলস সাধনা না থাকলে সেটা সম্ভব না। আর পেইন্টিং হচ্ছে সকল সুন্দরের প্রতিফলিত রূপ। চিত্রশিল্পী তমা সাহা তেমনই একজন শিল্পী, যিনি তার নিজস্ব কল্পনা দিয়ে প্রকৃতির সকল সুন্দরের প্রতিচ্ছবি দেখাতে পারেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি শিশু-সাহিত্যিক, সংগঠক আলী ইমাম বলেন, যন্ত্রণা না থাকলে সে শিল্প পরিণত হয় না। বিপর্যস্ত অবস্থায় একজন শিল্পী তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকাজ তৈরি করতে পারেন। তমা সাহার আঁকা ছবির ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে কিঞ্চিৎ যন্ত্রণাদগ্ধ হবার কথাও জানান তিনি।
নিজের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী নিয়ে তমা সাহা বলেন, শিল্প মানেই তো আনন্দ অথবা যা মানুষকে আনন্দ দেয় সেটাই তো শিল্প। আর একজন শিল্পীর জীবন তখনই ‘শিল্পীত’ হয় যখন তার শিল্পকর্ম সবার সঙ্গে উপভোগ্য হয়। আমার যত আনন্দ আর বিস্ময়, সেটা সবার সঙ্গে উপভোগ করার জন্যই ‘ঊর্মিমুখর’।
উদ্বোধনী আয়োজনে আরো উপস্থিত ছিলেন, কার্ডিয়াক সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর কবির, মীর মামুনসহ চিত্রশিল্প বোদ্ধারা। তমা সাহার একক চিত্র প্রদর্শনী ‘ঊর্মিমুখর’ চলবে ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত। প্রদর্শনী বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

যেমন করে নোবেল পেলেন নাদিয়া মুরাদ

নাদিয়া মুরাদ। পুরো নাম নাদিয়া মুরাদ বাসি তাহা। ইরাকের এক ইয়াজিদি কৃষক পিতামাতার সন্তান তিনি। তাকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বন্দি করেছিল। ওই সময়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে রক্ষা পেয়েছেন নাদিয়া মুরাদ। তারপর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। আর তার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়ে গেলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামী পুরস্কার শান্তিতে নোবেল।
তিনিই প্রথম ইরাকি এমন বিরল সম্মানে ভূষিত হলেন। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে অবস্থান করছেন। ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের এই যুবতী এখন একজন মানবাধিকার কর্মী। তিন মাসের জন্য ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা তাকে অপহরণ করে আটকে রেখেছিল। এবার ডেনিস মুকওয়েজের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিনি। তারা যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধের জন্য এবং সশস্ত্র লড়াইয়ে যৌন সহিংসতা বন্ধের জন্য কাজ করছেন।
নাদিয়া মুরাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন নাদিয়া’স ইনিশিয়েটিভ। গণহত্যা, গণহারে নৃশংসতা, মানবপাচারের মতো অপরাধে নারী ও যেসব বালিকা বা শিশু শিকারে পরিণত হয় তার এ সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়ায়। তাদের মানসিক ক্ষতকে সারিয়ে জীবন পুনর্গঠনের জন্য কাজ করে।
ইরাকের সিনজারে কোজো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন নাদিয়া মুরাদ। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের সন্তান তিনি। আর তার পরিবার হলো কৃষক। ১৯ বছর বয়সে ইরাকের সিনজারে অবস্থিত কোজো গ্রামে বসবাস করছিলেন নাদিয়া। তখন তিনি শিক্ষার্থী। ওই সময় তাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের কেউ যাতে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেতে না পারেন তা নিশ্বিত করে তারা। ওই ঘেরাও দিয়ে তারা হত্যা করে ৬০০ মানুষকে। এর মধ্যে নাদিয়ার ৬টি ভাই ও সৎভাই ছিলেন। এই হত্যাকান্ড চালিয়েই ক্ষান্ত হয় নি আইএস। তারা ওই গ্রামের যুবতীদেরকে দাস বানিয়ে নিয়ে যায়। ইরাকে ওই সময় আইএসের কাছে জেলে বন্দি ছিলেন ৬ হাজার ৭ শতাধিক ইয়াজিদি যুবতী। তাদের একজন ছিলেন নাদিয়া মুরাদ। তাকে মসুল শহরে দাসী বানিয়ে রাখা হয়েছিল। নিয়মিত প্রহার করা হতো তাকে। সিগারেটের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হতো শরীরের বিভিন্ন স্থান। যখনই তিনি পালানোর চেষ্টা করতেন তখনই তাকে ধর্ষণ করা হতো। তাকে আটকে রাখার দায়িত্বে ছিল যে ব্যক্তি, একদিন তিনি তার বন্দিশালা তালা না দিয়েই চলে যান। এ সময় নাদিয়া পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাকে আশ্রয় দেন প্রতিবেশী একটি পরিবার। তারা আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। উত্তর ইরাকের দুহোকে অবস্থতি একটি শরণার্থী শিবিরে গিয়ে ওঠেন তারা।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি। এ সময়ই প্রথম একটি বেলজিয়ান দৈনিক পত্রিকা লা লিব্রে বেলজিক’কে সাক্ষাতকার দেন নাদিয়া মুরাত। তখন তিনি রোয়ান্ডায় একটি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছিলেন একটি কন্টেইনারের ভিতর। ২০১৫ সালে তিনি সহ ১০০০ নারী ও শিশুকে জার্মানির বাদেন-উরতেমবার্গ সরকার শরণার্থী কর্মসুচির অধীনে সুবিধা দেয়। তারা সেখানে চলে যান। সেটাই হয়ে ওঠে নাদিয়া মুরাদের নতুন ঠিকানা।
মানব পাচার ও যুদ্ধ ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তিনি বক্তব্য রাখেন ২০১৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। মানব পাচারের বিষয়ে এ যাবত এটাই প্রথমবার নিরাপত্তা পরিষদকে ব্রিফ করা হয়। এ ইস্যুতে তিনি একজন এম্বাসেডরের ভূমিকা পালন করছেন। তিনি মানবপাচার ও শরণার্থী বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উদ্যোগগুলোর সঙ্গে অংশগ্রহণ করবেন। তিনি এরই মধ্যে বিভিন্ন শরণার্থী ও বেঁচে থাকা মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। তাদের নির্যাতিত হওয়া, গণহত্যার কাহিনী শুনেছেন নিজ কানে।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক বিভাগে বক্তব্য রাখেন এটর্নি আমাল ক্লুনি। তিনি সেখানে বলেন, আইসিস কমান্ডারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে তিনি একজন মক্কেল হিসেবে নাদিয়া মুরাদকে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেছেন ২০১৬ সালের জুনে।
ওদিকে কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন নাদিয়া মুরাদ। তারপরও নিউ ইয়র্ক সিটিতে নিজের প্রতিষ্ঠান নাদিয়াস ইনিশিয়েটিভ উদ্বোধন করেন তিনি। এতে যোগ দিয়েছিলেন টিনা ব্রাউন। গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের আইনগত ও অন্যান্য সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে এখান থেকে। ওই বছরেই তাকে প্রথমবারের জন্য জাতিসংঘের অধীনে ডিগনিটি অব সারভাইভারস অব হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের শুভেচ্ছাদূত বানানো হয়।
ভ্যাটিকান সিটিতে পোপ ফ্রাঁসিস ও আর্চবিশপ গ্যালাঘারের সঙ্গে ২০১৭ সালের ৩রা মে সাক্ষাত করেন নাদিয়া মুরাদ। ওই সাক্ষাতের সময় তিনি আইসিসের হাতে আটক ইয়াজিদিদের জন্য সহায়তা প্রার্থনা করেন। নাদিয়া মুরাদ তার জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনী নিয়ে লিখেছেন স্মৃতিকথা। এর নাম ‘দ্য লাস্ট গার্ল: মাই স্টোরি অব ক্যাপটিভিটি, অ্যান্ড মাই ফাইট এগেইনস্ট দ্য ইসলামিক স্টেট’। এটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের ৭ই নভেম্বর। প্রকাশক ক্রাউন পাবলিশিং গ্রুপ।

ইন্দোনেশিয়ার ভূমিকমপ: ‘পৃথিবী যেন জীবন্ত ব্লেন্ডারে পরিণত হয়েছিল’

ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৫৮। ভূমিকমেপর প্রায় এক সপ্তাহ পরে নিজের বোন ও তার মেয়ের লাশ খুঁজে পেয়েছে ইচসান হিদায়াত। ভূমিকমেপর কারণে সৃষ্ট লিকুইফিকশনে অসংখ্য বাড়িঘর তরল মাটিতে ডুবে গেলে তাদের মৃত্যু হয়। সেদিন সুলাওয়েসিতে ছিলেন না হিদায়াত। ৭.৫ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকমেপ সুলাওয়েসি দ্বীপের মাটি অবিশ্বাস্যভাবে তরল পদার্থের ন্যায় আচরণ শুরু করে। এতে তার বোন হুসনুল হিদায়াত ও তার ৪৩ দিন বয়সী মেয়ে আয়শা মারা যায়। উদ্ধারকারীরা হিদায়াতকে জানিয়েছেন যে, তার বোনের লাশ যখন পাওয়া যায় তখনো তিনি তার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হিদায়াত বলেন, আমি প্রার্থনা করছি তারা যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।
এটিই তাদের প্রাপ্য।
ইন্দোনেশিয়া মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম রাষ্ট্র। তবে, সুলাওয়েসি দ্বীপে কিছু খৃষ্টান ও অন্য ধর্মাবলম্বীরাও বসবাস করেন। এরমধ্যে পালু দ্বীপেই সব থেকে বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১৫৫৮ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে দেশটি। তবে, মৃতের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখনো এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তরল মাটিতে ডুবে যাওয়া অঞ্চলগুলোতে কত লাশ রয়েছে তা এখনো ধারণা করা যাচ্ছে না। দেশটির ন্যাশনাল ডিজাস্টার এজেন্সির হিসেবে প্রায় ১৭০০ বাড়ি মাটির মধ্যে ডুবে গেছে। ৪৪ বছর বয়স্ক হাসনাহ বলছিলেন, তিনি তরল মাটিতে তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজছিলেন। তার পরিবারের অর্ধেকেরও বেশি সদস্য ভূমিকমেপ নিহত হয়েছে। তিনি কাঁদছিলেন ও বলছিলেন, আমি গুনেও বলতে পারছি না আমি কতজনকে হারিয়েছি। আমার দুই সন্তান মারা গেছে, আমার চাচাতো ভাইবোনেরা মারা গেছে, আমার বোন ও আমার দেবর মারা গেছেন, তাদের সন্তানরাও মারা গেছে। হাসনাহ বলছিলেন, পৃথিবী যেন একটি জীবন্ত ব্লেন্ডারে পরিণত হয়েছিল। তিনি জানান, তার কাছে যথেষ্ট খাদ্য ও পানি রয়েছে। তবে, তার এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু হতে ছয় দিন সময় লেগেছে, এতে তিনি আশাহত হয়েছেন। তিনি বলেন, কর্মকর্তারা বলেছিলেন তারা ভারি যন্ত্র নিয়ে ফিরে আসবেন, কিন্তু তারা মিথ্যা বলেছেন। আশাহত হয়ে গ্রামবাসী নিজেরাই উদ্ধার অভিযানে নামে। কিন্তু মাটির নিচ থেকে লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পালুতে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। সেখানকার দোকান ও ব্যাংকগুলো খুলতে শুরু করেছে। দুর্গম এলাকাগুলোতেও ত্রাণ ও তেল পৌঁছাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কাল্লা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি জানান, পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। দেশটির বিভিন্ন অংশ থেকে ডাক্তাররা এখানে ছুটে আসছেন জরুরি সাহায্যের জন্য। হাসপাতালগুলো ভরে গেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকেই ইনফেকশনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা জানায়, লিকুইফিকশন ও কাদার কারণে আহতদের ইনফেকশনগুলো ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। সুলাওয়েসি দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার প্রধান পাঁচ দ্বীপের একটি। দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের মতো এটিও ভূমিকমপ ও সুনামির উচ্চ ঝুঁকিসমপন্ন এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

পোশাক কারখানায় হিজড়া কর্মী by এমএম মাসুদ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের আশি ভাগের বেশি আসা পোশাক খাতে প্রথমবারের মতো নিয়োগ পেলো হিজড়া সম্প্রদায়। প্রায় অর্ধশতাধিক হিজড়ার কর্মসংস্থানে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বেসরকারি খাতের তরুণ উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোস্তাফিজ উদ্দিন। দেশের পোশাক কারখানা হিসেবে এটাই প্রথম। ইউএসএআইডি ও হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বন্ধু সমাজ কল্যাণ সোসাইটির সহযোগিতায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমে ৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই ২ জন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। এরা হলেন- শিমা আক্তার ও দিলরুবা আক্তার। শিমা উৎপাদন কাঠামোর জুনিয়র সেফটি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছে। আর দিলরুবা হাউজকিপিং দলের একজন জুনিয়র সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছে।
সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে অবস্থিত ডেনিম এক্সপার্ট লি. এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পুরো কারখানায় ১৭০০ শ্রমিক কাজ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে কর্ম করে অর্থ উপার্জনের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছেন হিজড়া জনগোষ্ঠী। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা, ফ্যাশন ডিজাইনার, ব্যবসায়ী, এমনকি পার্লারের বিউটিশিয়ান হিসেবে কাজ করছে হিজড়ারা। সরকারও তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় আনতে বাজেটে বরাদ্দ রেখে বিভিন্ন উন্নয়মূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বেসরকারি খাতে কোনো উদ্যোগ ছিল না। বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড কারখানায় হিজড়াদের নিয়োগ দিয়ে একটি মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে অন্য কারখানার মালিকরাও এগিয়ে আসবেন বলে আশা তাদের।
এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, তৈরি পোশাকখাতে হিজড়াদের কাজে লাগানোর ধারণা আগে আমার ছিল না। এ ধরনের উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতার সৃ?ষ্টি হবে।
জানা গেছে, ২০১৩ সালে সরকার হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বীকৃতি পেলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। ওই সময় তাদের ট্রাফিক ?পুলিশে চাকরি দেয়ারও সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত পরে আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে সম্মানজনকভাবে অর্থ উপার্জন করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তারা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সংখ্যা আরো বেশি।
যেভাবে পোশাক কারখানায় হিজড়ারা: কয়েক মাস আগে মার্কিন দূতাবাস এবং ইউএসএআইডি সদস্যরা ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড কারখানা পরিদর্শন করেন। সঙ্গে ছিলেন হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বন্ধু সমাজ কল্যাণ সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ। হিজড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও মানবাধিকার বিষয়ক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে বন্ধু সমাজ কল্যাণ সোসাইটি যাত্রা শুরু করে। পরিদর্শন শেষে প্রস্তাব করা হয়, একটি বিশেষ কর্মসূচির ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যেখানে হিজড়া কমিউনিটির সদস্যরা পোশাক কারখানায় কাজ করার সুযোগ পাবেন। প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফিজ উদ্দিন। এর পর বন্ধু সমাজ কল্যাণ সোসাইটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করে ডেনিম এক্সপার্ট। কারখানা পরিদর্শন করার জন্য বন্ধু’র সদস্য এবং হিজড়া প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানায় ডেনিম এক্সপার্ট কর্মকর্তারা। পেশাদার পরিবেশে হিজড়াদের একসঙ্গে কাজ করা যেতে পারে এমন উপায় অন্বেষণ করেন তারা। এজন্য একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে অংশগ্রহণের জন্য কারখানার প্রত্যেক বিভাগের একজন কর্মকর্তাকে নির্বাচন করা হয়। বন্ধু সংগঠনের সদস্যরা এবং হিজড়াদের প্রতিনিধি শিমা আক্তার, দিলরুবা আক্তার, আখি সুলতানা ও মনিসহ প্রায় ৫০ জন হিজড়া কর্মশালায় অংশ নেন। ডেনিম এক্সপার্টের কর্মকর্তারা হিজড়াদের স্বীকৃতি প্রদানের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করেন। বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড বিশ্বাস করে, তাদের সমাজের মূলধারায় আনার এখনই সময়। এছাড়া জাতিসংঘের ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফিজ উদ্দিন বলেন, কর্মক্ষেত্র সবার জন্য সমান। হিজড়াদের মূল্যায়ন করা উচিত। হিজড়াদের নিয়ে লিঙ্গ, ধর্ম বা যৌন প্ররোচনা সত্ত্বেও সকলের সমান সুযোগ দেয়ার তাগিদ থেকেই তাদের কাজ দেয়ার চেষ্টা করছি। হিজড়াদের অন্যদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড ও বন্ধু সোসাইটির মাঝে একটি অংশীদারিত্ব হয়েছে। মোস্তফিজ উদ্দিন বলেন, শিমা আক্তার ও দিলরুবা আক্তার হিজড়া কমিউনিটির সদস্য। তারা আমার কারখানায় কাজ শুরু করেছে। এজন্য আমি খুবই গর্বিত। শিমা ও দিলরুবাও গর্বিত ও আনন্দিত। কারণ তারা কখনো ভাবেননি যে সমাজের এতো বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাস্তায়-বাসে-দোকানে সাহায্য নেয়ার নামে জোর করে টাকা আদায়ের মতো কাজ করে বলে হিজড়ারা সমাজের চোখে নেতিবাচক ইমেজের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে। হিজড়াদের অনেকেই স্বীকার করেছেন, পেটের দায়ে তারা এসব করেন।
তবে সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে হিজড়া শিমা আক্তার ও দিলরুবা নিজেকে পরিণত করেছেন দক্ষ শ্রমিক হিসেবে। নিজের মেধা আর অদম্য ইচ্ছা দিয়ে জয় করেছেন সকল বাধা। চট্টগ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপার্টা লিমিটেড নামের তৈরি পোশাক কারখানার নিরাপত্তা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে তারা এখন কারখানার সবার প্রিয় মুখ।
দিলরুবা আক্তার জানান, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড শুধু একটি কারখানা নয়, এটি আমার কাছে এখন একটি পরিবার। সমস্ত কর্মচারী আমাকে শ্রদ্ধা করে এবং আমার কাজে আমাকে সাহায্য করে। এই কাখানায় চাকরি করায় সমাজে আমার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এছাড়া এই চাকরি ইতিমধ্যে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা খুলতে সাহায্য করছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ডেনিম কারখানায় যোগদান করার আগে আমার পরিবার আমাকে অসম্মানিত করেছিল এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কিন্তু এখন আমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। দিলরুবার দায়িত্ব সুপারভাইজারের নির্দেশনায় অফিসের পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ।
শিমা আক্তার বলেন, পোশাক খাতের একজন কর্মী হয়ে আমি গর্বিত। আমার আর অন্যদের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এই করখানার সবাই খুব সহায়ক এবং আমাদের খুব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। কারখানা মালিক মোস্তাফিজ উদ্দিন আমাকে সম্মান করেন এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পর্ষদ খুব সহায়ক। আমি আমার সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে সেরা হওয়ার চেষ্টা করছি। শিমা উৎপাদন কাঠামোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার কাছে নিয়োজিত। এতে অগ্নি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সভার ব্যবস্থা করা, শ্রমিকদের পরিচয়পত্র এবং ইউনিফর্ম পর্যবেক্ষণ করা এবং নিরাপত্তা কমিটির সঙ্গে কাজ করা।
বন্ধু সমাজ কল্যাণ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী সালেহ আহমেদ বলেন, হিজড়ারা প্রায়শই সমাজ ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তখন এটা নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে সমাজ ও দেশে অবদান রাখতে পারবে। এজন্য বন্ধু এবং ইউএসএআইডি-এর সঙ্গে একটি অংশীদারিত্বের মধ্যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে হিজড়ারা ডেনিম এক্সপার্ট পরিবারে সদস্য হয়ে যান। অর্থাৎ বাংলাদেশে হিজড়াদের অন্তর্ভুক্তির পদক্ষেপ হিসেবে প্রথম পোশাক কারখানা এটি। কারখানায় শিমা ও দিলরুবাকে কোম্পানির শ্রমিকরা তাদের ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। তারা তাদের দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য শ্রমিকদের সঙ্গে ভালোভাবে কাজ করছে।
মোস্তাফিজ উদ্দিন বলেন, একজন উদ্যোক্তা হিসাবে চাই সবাই উপকৃত হোক। কেবল ডেনিম শিল্পেই হিজড়ারা কাজ করবে তা নয়। বিশ্বাস করি প্রত্যেক কারখানা মালিক যেন তাদের কর্মসংস্থানে এগিয়ে আসে। তিনি বলেন, হিজড়াদের নিয়ে কারখানায় কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা-বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ প্রদান, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজে সহায়তা প্রদান এবং এইচআর বিভাগের ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। কারখানায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের জন্য তাদের সবার সাফল্য কামনা করছি।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মাদ নাছির জানান, হিজড়াদের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নে আমাদের হাতে প্রকল্প রয়েছে। তবে প্রতিবন্ধীদের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিজিএমইএ সফলতা পেয়েছে। ইতিমধ্যেই সারা দেশের পোশাক কারখানায় প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার প্রতিবন্ধী শ্রমিক কাজ করছে। তারা যোগ্যতার সঙ্গে ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, যদি প্রতিটি কারখানায় অন্তত ৪ থেকে ৫ জন করে নিয়োগ দেয়া গেলে ৪ হাজার কারখানাতে বড় সংখ্যক হিজড়াদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতে পারতো। কিন্তু এটি এখনও হয়ে উঠেনি। তবে যেহেতু শুরু হয়েছে আগামীতে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।

হুইল চেয়ারে খালেদা by কাফি কামাল

চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। আদালতের নির্দেশে কারাকর্তৃপক্ষ গতকাল বিকালে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তাকে হাসপাতালের কেবিন ব্লকে ভর্তি করা হয়। তিনি বর্তমানে কেবিন ব্লকের ৬ষ্ঠ তলায় ৬১১ নম্বর ভিআইপি কেবিনে চিকিৎসাধীন। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান হিসেবে রয়েছেন বিএসএমএমইউ’র ইন্টারন্যাল মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডা. মো. আবদুুল জলিল চৌধুরী। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে আজ দুপুরে মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা বৈঠক করবেন। বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর তার আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা শুরু হবে। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনের সময় আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।
এদিকে কারাগার থেকে পুলিশের একটি সাদা রঙের পেট্রোল কারে করে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার পর হুইল চেয়ারে বসিয়ে কেবিন ব্লকের নির্ধারিত কক্ষে নেয়া হয়। এ সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে তার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গদলের কয়েকশ’ নেতাকর্মী।   
হুইল চেয়ারে খালেদা জিয়া : বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাসপাতালের উদ্দেশে বিকাল তিনটা ১০ মিনিটে কারাগার থেকে বের করা হয়। তিনটা ৪০ মিনিটে বিএসএমএমইউতে পৌঁছে খালেদা জিয়াকে বহনকারী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (রমনা জোন) সাদা রংয়ের একটি পেট্রোল কার। সামনে পেছনে পুলিশ ও র‌্যাবের পাহারায় কারাগার থেকে হাসপাতালে আনতে বৃষ্টির কারণে অতিবাহিত হয় ৩০ মিনিট সময়। বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে অনবরত বৃষ্টির কারণে হাসপাতালের কেবিন ব্লকের সামনে অবস্থান নেয়া নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা দুইপাশের ভবনের নিচে আশ্রয় নেন।
এ সময় তাদের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা দেয়াল তৈরি করে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। খালেদা জিয়াকে বহনকারী পুলিশের পেট্রোল কারটি কেবিন ব্লকের সামনে পৌঁছাতেই কারারক্ষীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চারদিকে কয়েক স্তরে দাঁড়িয়ে যান। ওই অবস্থায় খালেদা জিয়াকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনতে দুই মিনিটের মতো সময় অতিবাহিত হয়। বৃষ্টির কারণে তার মাথায় একটি ছাতা ধরেন এক নারী কারারক্ষী। গাড়ি থেকে নামিয়েই তাকে বসানো হয় একটি হুইল চেয়ারে। এ সময় তিনি পিংক কালারের একটি শাড়ি পরিহিত ছিলেন। তার চেহারা ছিল অনেকটাই বিধ্বস্ত। কিছুটা বিরক্তির ছাপও ছিল তার চোখে-মুখে। পরক্ষণেই দুইপাশ থেকে কয়েকজন মিলে খালেদা জিয়াসহ হুইল চেয়ারটি তুলে নিয়ে যান। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে দলের নেতাকর্মীসহ নির্ধারিত চিকিৎসকদের বাইরে কেউ ওই সময় কেবিন ব্লকে ঢুকতে পারেননি।
কারাগারে থাকা খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকেও গাড়ি থেকে নেমে হাসপাতালে উঠতে দেখা যায়। এদিকে ৭৩ বছর বয়সী সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর জন্য গতকাল সকালেই বিএসএমএমইউতে দুটি কেবিন প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিকালে খালেদাকে আনার আগে দুপুরে তার ব্যবহার্য বিছানাপত্র আনা হয় হাসপাতালে। খালেদা জিয়াকে কেবিন ব্লকে নেয়ার পর একটি পুলিশ ভ্যান থেকে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্রের কয়েকটি ব্যাগও নামানো হয়। বিএসএমএমইউর ভিআইপি কেবিনেই চিকিৎসাধীন থাকবেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চিকিৎসা: পরিচালক: হাসপাতালে ভর্তির পর গণমাধ্যমের সামনে এ ব্যাপারে একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করেছেন বিএসএমএমইউ’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এই মুহূর্তে কেবিন ব্লকের ৬ তলায় অবস্থান করছেন। উনি ভর্তি হওয়ার পরে উনার কেবিনে মেডিকেল বোর্ডের সভাপতি প্রফেসর ডা. আবদুল জলিল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপর চিকিৎসা শুরুর আগের ফরমালিটিজগুলো সম্পন্ন করেছেন। পরিচালক বলেন, রোববার বেলা ১টার পরে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
ওই বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা উনার চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। পরিচালক জানান, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠিত বোর্ডের সভাপতি হলেন- মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর আবদুল জলিল চৌধুরী। সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- রিমেটোলজি বিভাগের প্রফেসর ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, কার্ডিওলজি বিভাগের প্রফেসর ডা. সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জী, অর্থোপেডিক বিভাগের প্রফেসর ডা. নকুল কুমার দত্ত ও ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড  রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী প্রফেসর ডা. বদরুন্নেসা আহমেদ। খালেদা জিয়াকে কেমন দেখেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, দেখুন- প্রফেসর ডা. আবদুল জলিল চৌধুরী উনাকে দেখেছেন। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মেডিকেল বোর্ডের সভার পরে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবো।
খালেদা জিয়াকে খুবই অসুস্থ দেখা গেছে- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, উনি কিন্তু আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কুশল বিনিময় করেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয় দেখা করেছেন এবং উনার সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত কথাবার্তা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড যেটা করা হয়েছে তা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার এই হাসপাতালে আসার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সংবাদ ব্রিফিংয়ের সময়ে বিএসএমএমইউ’র অতিরিক্ত পরিচালক নাজমুল করীম মানিক ও সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেন সরকার উপস্থিত ছিলেন।
মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি: খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও ড্যাব মহাসচিব প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। বিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিফিং করার পর সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন তিনি। ডা. জাহিদ বলেন, আজকে যে মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছে তাতে আদালতের নির্দেশনার প্রতিপালন ও প্রতিফলন ঘটেনি।
হাসপাতালের পরিচালক যে নামগুলো বলেছেন, তাতে যে তিনজন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সে অন্তর্ভুক্তি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়নি। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে উনার (খালেদা জিয়া) চিকিৎসার জন্য যে মেডিকেল বোর্ড আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হওয়া উচিত ছিল তা যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়নি বলে আমরা মনে করি। ডা. জাহিদ বলেন, আদালতের নির্দেশনা ছিল মেডিকেল বোর্ডে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ (স্বাচিপ) ও ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর কেউ প্রাথমিক সদস্যপদও থাকতে পারবে না। এখানে বোর্ডে যাদের রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন, বিশেষ করে সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জী ও নকুল কুমার দত্ত তো স্বাচিপের লাইভ মেম্বার এবং বদরুন্নেসা আহমেদ স্বাচিপের সদস্য। আমি চিকিৎসক হিসেবে একথা বলা উচিত না যে- কে স্বাচিপ, আর কে ড্যাবের মেম্বার।
আমাদের সবার পরিচয় হওয়া উচিত চিকিৎসক। কিন্তু আজকে একথা বলতেই হচ্ছে। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়া এবং সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু আজকে যে মেডিকেল বোর্র্ড করা হয়েছে সেটা নিয়ে আমরা সন্দিহান। কারণ বোর্ডে এমন সদস্যও আছেন হাইকোর্টের আপিল বিভাগ যাদের মেডিকেল বোর্র্ড বাতিল করে দিয়ে নতুন বোর্ড করিয়েছিলেন। যখন মেডিকেল বোর্ড নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিলো তখন হাইকোর্টের আপিল বিভাগ এই কাজটি করেছিলেন। ডা. জাহিদ বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা যে ডাক্তার সম্পর্কে বলছেন- ‘সে বারে বারে আইসা আমাকে বলতেন আপনি অসুস্থ, অসুস্থ।’ সেই ডাক্তার সাহেবও এই বোর্ডের সদস্য। আমরা যেটা বলতে চাই, খালেদা জিয়াকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়ার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে এনেছেন। এই হাসপাতালে কার্ডিওলজি, রিমেটোলজি, ফিজিক্যাল মেডিসিন, অর্থোপেডিক্স, ইন্টারনাল মেডিসিন- প্রত্যেকটা বিভাগেই অত্যন্ত প্রফেশনাল চিকিৎসক আছেন। যাদেরকে নিয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিতর্কহীনভাবে মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা যেতো। আদালতের নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটানো যেতো।
এ ছাড়া খালেদা জিয়া ভর্তির আগেই হাসপাতালের পরিচালক মেডিকেল বোর্ডটি গঠন করেছেন। এখানে রোগী হিসেবে খালেদা জিয়ার পছন্দ-অপছন্দ ও স্বস্তি-অস্বস্তির বিষয়টিকে ন্যূনতম মূল্য দেয়া হয়নি। রোগীর মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগই দেয়া হয়নি। 
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মিছিল, স্লোগান: খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে আনা হবে কারা মহাপরিদর্শক এই তথ্য গণমাধ্যমে জানানোর পর থেকে হাসপাতালের আশেপাশে জড়ো হতে থাকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেয়ার আগে পুলিশ ধাক্কিয়ে ও হুইসেল বাজিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হাসপাতাল আঙ্গিনা থেকে সরিয়ে দেয়। যখন হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে আনা হয় তখন নেতাকর্মীদের সামলাতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। পুলিশের বাধায় আটকে বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন মহিলা দলের নেতাকর্মীরা। তবে পুলিশের বাধার কারণে তারা দলীয় নেত্রীর কাছে যেতে পারেননি। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে পুলিশের।
এক পর্যায়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয় পুলিশ। অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে দেখতে গতকাল দুপুর থেকে হাসপাতালের কেবিন ব্লকের প্রতিটি বেলকনিতে ভিড় করেছিলেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতালের ভেতরে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, ডা. একেএম আজিজুল হক, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা নাজিমউদ্দিন আলম, শিরিন সুলতানা, সানাউল্লাহ মিয়া, হেলেন জেরিন খান, শাম্মী আখতার, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদসহ কয়েকশ’ নেতাকর্মী। ওদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি’র চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

শাহবাগে সমাবেশ দুর্ভোগ চরমে: অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ঘোষণা

সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কয়েকটি সংগঠন। সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দাবি আদায়ে শাহবাগে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। বুধবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে আন্দোলনে নেমেছে কয়েকটি সংগঠন। গতকাল মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ এ নিয়ে এক সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করার আগ পর্যন্ত সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ চলবে। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের দাবি না মানা পর্যন্ত অবরোধ চলবে। সড়ক, নৌ ও রেলপথে অবরোধ চলবে।
পরিপত্র স্থগিত করে আগামী সোমবারের মন্ত্রী সভার বৈঠকে তা প্রত্যাহার করতে হবে। আমাদের একদফা একদাবি। তিনি বলেন, আমরা দেশের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বাঁচতে চাই না। আমরা ন্যায্য দাবি নিয়ে এখানে এসেছি, ভিক্ষার জন্য আসিনি। এ সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদেও দাবি না মানা পর্যন্ত আপনারা অবরোধ চালিয়ে যাবেন। গতকাল দুপুর ২টার পর থেকে শাহবাগ চত্বরে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন ব্যানারে জড়ো হতে থাকেন অনেকে।
চারপাশের সড়ক বন্ধ করে তারা ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’ ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’ ’জামায়াত-শিবির-রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’ ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগান দিতে থাকেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই তারা তাদের সমাবেশ চালিয়ে যান। সমাবেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মাধবপুরসহ আরো কিছু জেলার ব্যানার দেখা যায়। সমাবেশ চলাকালীন সময়ে শাহবাগ চত্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাঁটাবন, বাংলামোটর, মৎস্য ভবনগামী সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। আশেপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যান চলাচলে ধীরগতি ছিল। শাহবাগ মোড় দিয়ে ডাইভারশন থাকায় পথচারীরা টিএসসি দিয়ে ঘুরে গন্তব্যে যান। বাংলামোটর ও প্রেস ক্লাবগামী গাড়িগুলো দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকা পড়ে। ঢাকা মেডিকেল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে আসা এম্বুলেন্স প্রবেশ করতে বেগ পেতে হয়। সমাবেশের পাশেই শাহবাগ পুলিশ বক্সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
পঞ্চগড় থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের নাজমুল বলেন, ‘আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৩০ ভাগ কোটা পুনর্বহাল করা উচিত। এজন্য অবস্থান নিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিব বাহিনীর সদস্য কাজী শাহজাহান বলেন, কোটা বাতিলের মাধ্যমে রাজাকাররা আবারও ষড়যন্ত্র করছে। কোটা বাতিল করে আমাদের অসম্মান করা হয়েছে। আমরা আমাদের সম্মান চাই, অধিকার চাই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ডের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেশ নিয়ে এলো আর সেই মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হলো, এটা দুঃখজনক। আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্ববহাল চাই। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগসহ সারা দেশে আমাদের অবস্থান ও অবরোধ চলবে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ফেডারেশনের সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন মাসুদ বলেন, আমাদের একটাই দাবি ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল চাই। এটা পুনর্ববহাল না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান করবো। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজপথে জীবন দেব তবুও রাজপথ ছেড়ে যাবো না।

রাজনীতি এখন গরিবের বউয়ের মতো: প্রিয়াঙ্কার বঙ্গভবনে আসা হলো না -প্রেসিডেন্ট

রাজনীতি এখন গরিবের বউয়ের মতো হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে দেয়া বক্তৃতায় অবসর নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে আসার প্রবণতায় উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। লিখিত বক্তব্যের বাইরে তিনি এ নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় তার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামে প্রবাদ আছে গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ (ভাবি)। রাজনীতিও হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। যে কেউ  যেকোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে, বাধা নেই। আমি যদি বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের লেকচারার হইতাম চাই, নিশ্চয়ই ভিসি সাহেব আমারে নেবেন না। বা কোনো হাসপাতালে গিয়া বলি, এতদিন রাজনীতি করছি, হাসপাতালে ডাক্তারি করতে দেন।  বোঝেন অবস্থাটা কী হবে? এগুলো বললে হাসির পাত্র হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না।
যদি বলি এত বছর রাজনীতি করছি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুপারিনটেনডেন্টের পদ দিতে পারো। সেখানে আমাকে দিবে? কিন্তু রাজনীতি গরিবের ভাউজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের উদ্দেশে আবদুল হামিদ বলেন, ভিসি সাহেবও অবসরের পর রাজনীতি করবেন। যারা সরকারি চাকরি করেন, জজ সাহেব যারা আছেন ৬৭ বছর চাকরি করবেন। রিটায়ারের পর বলবেন, ‘আমিও রাজনীতিবিদ’।
আর্মির  জেনারেল হওয়া, সেনাপ্রধান হওয়া, সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, কেবিনেট  সেক্রেটারি রিটায়ার কইরা বলেন, আমি রাজনীতি করবো।’ কোনো রাখঢাক নাই। যার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা তখনই রাজনীতিতে  ঢোকে। চাকরি করে যা করার করছে। এরপর বলছে- রাজনীতি করবো। আমার মনে হয় সকল রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। হ্যাঁ এক্সপার্টের দরকার আছে। অনেক সময় বলা হয় পেশাভিত্তিক পার্লামেন্ট। হ্যাঁ পেশাভিত্তিক করেন। এমবিবিএস পাস করে সরাসরি রাজনীতি করেন। কোনো অসুবিধা নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরিতে না ঢুকে সরাসরি রাজনীতিতে  ঢোকেন।
প্রেসিডেন্ট বলেন, ৫৯ বছর, ৬৫ বছর, ৬৭ বছর পুলিশের ঊর্ধ্বতন ডিআইজি, আইজিরাও রাজনীতি করবেন। মনে মনে কই, রাজনীতি করার সময় এই পুলিশ  তোমার বাহিনী দিয়ে পাছার মধ্যে বাড়ি দিছো। তুমি আবার আমার লগে আইছো রাজনীতি করতে। কই যামু। রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এই যে রাজনীতিবিদদের সমস্যা এই সমস্যার কারণও এটা। বিজনেসম্যানরা তো আছেই... শিল্পপতি-ভগ্নিপতিদের আগমন এভাবে হয়ে যায়। এগুলো থামানো দরকার। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির শিক্ষা নেয়ার ওপর জোর দিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, এক্সপার্টের প্রয়োজন আছে। এক্সপারটাইজ হিসেবে তাদের মতামত নেন। তাদের কমিটি করে দেন, উপদেষ্টা করে দেন। ডাইরেক্ট রাজনীতির মধ্যে আইসা তারা ইলেকশন করবে, মন্ত্রী হয়ে যাবে- এটা যেন কেমন কেমন লাগে। এর জন্যই আমার মনে হয় আমাদের দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে না।
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আশার আলো দেখছি। ছাত্র সমাজের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাই। যখন তফসিল হয়, দেখা যাবে অনেক ক্যালকুলেশন হবে। ভেজাল সৃষ্টি করে দিতে পারে। অনেকে অনেক স্বার্থে করতে পারে। কিন্তু সমস্ত ছেলেমেয়েদের বঞ্চিত করা উচিত না। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে রেজিস্ট্র্রেশন করেন ২১ হাজার ১১১ জন গ্র্যাজুয়েট। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অংশগ্রহণ। কৃতী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৬টি স্বর্ণ পদক, ৮১ জনকে পিএইচডি ও ২৭ জনকে এম ফিল ডিগ্রি দেয়া হয় সমাবর্তনে। অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। আরো বক্তব্য  দেন ভিসি মো. অধ্যাপক আখতারুজ্জামান,  প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ।
শেষ পর্যন্ত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বঙ্গভবনে এলেন না: বক্তৃতায় উপস্থিত গ্রাজুয়েটদের সামনে রসিকতাও করেন প্রেসিডেন্ট। ভারতীয় অভিনেত্রী প্রিয়াংকা চোপড়ার বাংলাদেশ সফর নিয়ে রসাত্মক কথা বলতে হাসিতে ফেটে পড়ে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। প্রেসিডেন্ট বলেন, সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে দশ বছরের ছোট নিককে বিয়ে করলেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। কিন্তু যদি রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরকালে বঙ্গভবনে আসতেন তাহলে অন্যরকমের কিছু ঘটতেও পারতো। প্রেসিডেন্ট বিবাহিত জীবনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমি বিয়ে করেছি বিরানব্বই হাজার চারশ’ সেকেন্ড হয়ে গেছে।
আসলে আমাদের বিয়ের ৫৪ বছর দুইদিন হয়েছে। তার কারণ কম বয়সে বিয়ে করে ফেলেছিলাম। এই ৫৪ বছরের বিবাহিত জীবনে একজন মহিলা আমার সব কিছু বুঝে ফেলেছে। আমি কী ভালো, কী মন্দ করতে পারি। এটি কিন্তু তার কন্ট্রোলের ভেতরে। আমি যখন সাত আট বছর আগে স্পিকার ছিলাম তখন নারী নির্যাতন বিল পাস করার সময় কিন্তু সংসদে পুরুষ নির্যাতন বিল পাস করা দরকার বলেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী বললেন, এটা এখন প্রয়োজন নাই। যদি হয় তখন দেখা যাবে। প্রায় ছয় বছর চলে গেছে এখনো আইনটি পাস করে নাই। প্রধানমন্ত্রীরা তো খবর রাখেন না। শুধু আমার ঘরে না। সারা বাংলাদেশে যে পুরুষ নির্যাতন হচ্ছে না তা নয়। কিছুটা হলেও হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা টের পাচ্ছে। উদাহরণ টেনে প্রেসিডেন্ট বলেন, কয়েক মাস আগে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরে ঢাকায় এসেছিল।
সাধারণত বিদেশি অতিথিরা ঢাকায় এলেই বঙ্গভবনে আসেন। আমি স্ত্রীকে বললাম প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আসবে। আসার একদিন আগে তাকে বলেছি। পরে শুনেছি আমার স্ত্রী নাকি প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে বলেছে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বঙ্গভবনে আসার দরকার কি? এটা তো ষড়যন্ত্র। শেষ পর্যন্ত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর বঙ্গভবনে আসেনি। তার কয়েক মাস পরে শুনলাম আমেরিকায় নিক নামে তার চেয়ে দশ বছরের ছোট এক ছেলেকে বিয়ে করেছে প্রিয়াঙ্কা। আমি তার চেয়ে ৩০/৩৫ বছরের বড়। তো দশ-বারো বছরের নিচে যদি সে নামতে পারে। তাহলে তো ৩০, ৩৫, ৪০ বছরের উপরেও তো সে উঠতে পারতো। এ রকম সুযোগ নষ্ট করা ঠিক হয় নি। অন্তত এই উপমহাদেশের একটা মেয়ে যদি  আসতো, কোনো ঘটনা ঘটতো তাহলে তো সুদূর সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে তাকে আমেরিকায় নাও যেতে হতো। সবই কপাল।
নেতৃত্বে আসতে হবে তরুণদের: লিখিত বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ জাতির পিতার স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে তরুণদের, বিশেষ করে সদ্য গ্রাজুয়েটদের প্রতি আহ্বান জানান। বলেন, আমরা শুধুমাত্র আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়েছে, কিন্তু দেশ গড়ার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। ক্ষুধা ও নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়া না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।  প্রেসিডেন্ট গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশে বলেন,  তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ। আগামীতে  তোমরাই দেশ পরিচালনা করবে। তোমাদের সঠিক নেতৃত্বে দেশ হবে উন্নত, সমৃদ্ধ। জীবনে চলার পথে তোমাদের আদর্শ থাকতে হবে। সে আদর্শ হবে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে।  তোমরা কখনো সত্যের সঙ্গে মিথ্যার, ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের আপস করবে না।
প্রেসিডেন্ট ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির তুলনা করে বলেন, ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতি ছিল সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক। সেখানে ব্যক্তি বা  গোষ্ঠীর স্বার্থ মুখ্য ছিল না। প্রেসিডেন্ট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিপ্লোমা ও সান্ধ্যকালীন কোর্সের উল্লেখ করে ডিপ্লোমার নামে ডিগ্রি দেয়া যায় কিনা এবং সান্ধ্যকালীন  কোর্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও ঐতিহ্য ব্যাহত হয় কিনা, সে বিষয়টি ভেবে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ছাত্রদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করতে হবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতির প্রত্যাশা পূরণে সর্বদাই একজন চালকের ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি সময়ের চাহিদা এবং বৈশ্বিক জনশক্তির বাজারের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন বিভাগ সমপ্রসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে কাজ করছে সরকার -প্রধানমন্ত্রী

দেশে আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের যে ধারা সূচিত করেছে তা অব্যাহত রাখতে সবাইকে কাজ করার  আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকালে গণভবনে লায়ন এবং লিও ক্লাব আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের এই উন্নয়ন অভিযাত্রায় লায়ন এবং লিও সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা তাঁদের মানবসেবামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডে সব রকমের সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও বিশ্বে বাংলাদেশ একটি ক্ষুধা, দারিদ্র এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপীড়িত দেশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও আজ তা উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে আমরা বিশ্বে বাংলাদেশের হৃত মর্যাদাটা অন্তত ফিরিয়ে আনতে পেরেছি যেটা ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বাঙালি জাতি হারিয়ে ফেলেছিল। অনুষ্ঠানে লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের নবনির্বাচিত পরিচালক কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, সাবেক আন্তর্জাতিক পরিচালক শেখ কবির হোসেন, এরিয়া লিডার স্বদেশ রঞ্জন সাহা, চেয়ারম্যান অব মাল্টিপল ডিস্ট্রিক্ট-৩১৫ বি মমিনুল ইসলাম লিটন বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব। আমাদের লক্ষ্য-২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ  দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
সরকার শত বছরের ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক টেকসই উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। আর্থ-সামাজিক সূচকে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন ২০ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। আমরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেল স্থাপন, এলএনজি টার্মিনাল এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কাজ চলছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৩ হাজার ৮৪২ জন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে যাচ্ছে। রোগীদের বিনামূল্যে ৩০ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতি হাজারে শিশুমৃত্যুর হার ২৮ ও মাতৃমৃত্যুর হার ১ দশমিক ৭৬-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭২ বছরের বেশি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের লিও আন্দোলন কর্মসূচি আপনাদের সকল কর্মকাণ্ডে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
ভবিষ্যতে একটি সুশৃঙ্খল যুব শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি পেশাগত শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা ও তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।