Monday, November 2, 2015

‘যৌনকর্মী তৈরি করে পুলিশ, আমরা না’

‘আমাদের কাছে নতুন কোনো মেয়ে এলে, তাকে প্রথমে যশোর কোতোয়ালি থানার সদর ফাঁড়িতে নিতে হয়। তারা রাখার অনুমতি দিলেই আমরা তাকে রাখতে পারি। এ জন্য পুলিশকে ৫০-৬০ হাজার টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া প্রত্যেককে মাসে ২০-৩০ হাজার টাকা করে পুলিশকে দিতে হয়। তাই যৌনকর্মী তৈরি করে পুলিশ, আমরা না। আর এ নিয়ে কিছু বলতে গেলেই আমরা মামলার আসামি হই। তা কেন হবে?’
আজ সোমবার যশোর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এক যৌনকর্মী এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানান যৌনকর্মীরা।
সম্মেলনে অন্তত ১০ জন যৌনকর্মী পুলিশের অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন। তাঁদের ভাষ্য, বছরের পর বছর নির্যাতিত হলেও সদর ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা সাবেক কর্মকর্তা শহর উপপরিদর্শক (টিএসআই) রফিকুল ইসলামের ভয়ে তাঁরা এত দিন মুখ খোলার সাহস পাননি। সম্প্রতি রফিকুল যশোর থেকে বদলি হয়ে ঝিনাইদহ সদর থানায় যোগ দিয়েছেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তাঁরা অভিযোগ করার সুযোগ পেয়েছেন।
যৌনকর্মীরা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি যৌনপল্লিতে এক মেয়েকে যৌনকর্মে বাধ্য করার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। গত ২৯ অক্টোবর টিএসআই রফিকুল যশোরে এসে দুই যৌনকর্মীকে ডেকে নিয়ে তিন লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় তাঁদেরও ওই মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন রফিকুল। রফিকুলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান যৌনকর্মীরা।
অভিযোগ অস্বীকার করে রফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে হেয় করার জন্য এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।’
যশোর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ সুপার শাফিন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘রফিকুলের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তার কক্ষ তছনছ করলেন উপমন্ত্রী! by রোজিনা ইসলাম

যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের বিরুদ্ধে তাঁর মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের কক্ষে ভাঙচুর এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিবের কক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ব্যানারে উপমন্ত্রীর নাম না থাকায় তিনি এটা করেছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে জানানো হয়েছে। উপমন্ত্রী অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত যুব দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকতে না পারায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করা হয়। গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বীরেন শিকদারসহ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল ও মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান চলাকালে অনুষ্ঠান মঞ্চের পেছনে রাখা ব্যানারে নিজের নাম না দেখে ক্ষুব্ধ হন যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী। তিনি একাধিকবার অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতেও উদ্যত হন। মন্ত্রণালয়ের সচিব নূর মোহাম্মদ উপমন্ত্রীকে নিবৃত্ত করেন। শেষ পর্যন্ত যুব পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণার আগে উপমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুপুরে অনুষ্ঠান শেষ না হতেই উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় মন্ত্রণালয়ে ফিরে এসে যুগ্ম সচিব (যুব) মাশুক মিয়ার কক্ষে গিয়ে তাঁর কম্পিউটার ও টেলিফোন টেবিল থেকে ফেলে দেন। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব গোলাম কবিরের কক্ষেও তালা লাগিয়ে দেন তিনি।
জানতে চাইলে সচিব নূর মোহাম্মদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, একজন যুগ্ম সচিব যদি অফিসে দেখেন তাঁর কক্ষের কম্পিউটার থেকে শুরু করে সবকিছু মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ভেঙে ফেলেছেন, কোনো কর্মকর্তা যদি দেখেন তাঁর কক্ষে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন, তাহলে তাঁরা কী করে অফিস করবেন? এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে গেছেন। এ ধরনের ঘটনা এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে। এর একটা সমাধান দরকার।
সচিব বলেন, ‘আমার কাছে ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা এসেছিলেন। আমি বিষয়টি নিয়মানুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
দুপুরে আরিফ খান জয়ের কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার রুম থেকে অন্য রুমে গিয়ে কীভাবে কম্পিউটার ভাঙব? পুরো ঘটনাটাই বানানো।’
উপমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের একটি অশুভ চক্র এই মন্ত্রণালয়ের সফলতা দেখে এসব বাজে প্রচারণা চালাচ্ছে। সেভাবেই আপনি এমন তথ্য পেয়েছেন। যেমন কয়েক দিন আগে আমি বিদেশ থেকে এসে শুনেছি, আমি নাকি মানব পাচার করেছি।’ উপমন্ত্রী বলেন, ‘এ মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াতের হয়ে কাজ করেন। আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি।’
গতকাল বেলা সাড়ে তিনটায় যুগ্ম সচিব (যুব) মাশুক মিয়ার কক্ষে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি সহকারী সচিব গোলাম কবিরকেও। মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা বলেন, দীর্ঘ চাকরিজীবনে কোনো কর্মকর্তাকে কোনো মন্ত্রী দ্বারা এভাবে অপমানিত হতে দেখেননি। ওই দুই কর্মকর্তা ক্ষোভে-দুঃখে অফিস থেকে বের হয়ে গেছেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। তবে যা ঘটেছে, তা তো মন্ত্রণালয়ের সবাই দেখেছে। বিষয়টি সাংঘাতিক। এসব একদম ঠিক হয়নি।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাত্র ৮ ঘণ্টা সেবা by আরিফুল হক

দুজন চিকিৎসক আর একজন নার্স দিয়ে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ সেবাও আবার সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মাত্র আট ঘণ্টার।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় তিনটি পৃথক কক্ষে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রথমটি ওষুধের কক্ষ, মাঝে জরুরি ও বহির্বিভাগ। অপর কক্ষটি চিকিৎসকদের।
জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা গেল, একটি শয্যা, একটি হুইলচেয়ার, দুটি ট্রলি টেবিলের মধ্যে একটিতে প্রাথমিক চিকিৎসার দুটি ব্যাগ, গজ-ব্যান্ডেজ রাখার একটি পাত্র। কিছু জরুরি ওষুধ। আর একটি টেবিল রোগীর জন্য। এখানে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাত বছর পার হলেও এভাবেই শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন চিকিৎসাসেবা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিকেল পাঁচটার পর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ থাকে। ফলে অসুস্থ শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরেজমিনে দেখা যায়, ৪০ জন শিক্ষার্থী এসেছেন চিকিৎসা নিতে। তাঁদের অধিকাংশই জ্বর-সর্দি-কাশি, চোখ ওঠাজনিত সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। অল্প সময়ে এত শিক্ষার্থী আসায় মাত্র দুজন চিকিৎসক ও একজন নার্সের হিমশিম খাওয়ার উপক্রম।
গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলামকে দেখছেন চিকিৎসক এ এম এম শাহরিয়ার। শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত কার্ডে চিকিৎসক পরামর্শ দিলেন। এরপর সেখান থেকে বিনা মূল্যে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধও দিলেন চিকিৎসক। শাহরিয়ার বললেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাত্র আট ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা প্রদান করা উচিত। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক শিক্ষার্থীর প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানালেন ওই চিকিৎসক। তবে গরমের সময় রোগী দ্বিগুণ হয়ে যায়। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালেন তিনি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত সেকশন কর্মকর্তা এস এইচ এম ইকবাল বলেন, গত আগস্টে ২৩ কর্মদিবসে ২ হাজার ৩০০ রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ১৫ দিনের কর্মদিবসে রোগী ছিল ১ হাজার ৬০০ জন। আর ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৯২০ জন রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ক্যাম্পাসে অবস্থিত তিনটি হলে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী থাকেন। হলের শিক্ষার্থী ছাড়াও ক্যাম্পাসের বাইরে মেসে বসবাসরত শিক্ষার্থীরাও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন বাদে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে।
কর্তব্যরত চিকিৎসক শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসক-সংকট দূর হলে এ সমস্যা থাকবে না। তখন ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাবে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার মোরশেদ উল আলম বলেন, চিকিৎসক-সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিধ্বস্ত বিমানের লাশের খোঁজে ব্যাপক অনুসন্ধান

মিসরের সিনাই উপত্যকায় রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ধ্বংসাবশেষ ও লাশের সন্ধানে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালাচ্ছেন মিসরীয় উদ্ধারকর্মীরা। বিমানে থাকা ২২৪ আরোহীর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬৩ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনার একদিন পর আট বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে লাশ খুঁজে পাওয়ায় উদ্ধার এলাকা বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
উদ্ধার কাজে জড়িত একজন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মিসরের সরকারি বার্তা সংস্থা মিনা জানায়, রাশিয়ার তদন্তকারীরা ইতিমধ্যে কায়রো পৌঁছেছেন। তাদের সিনাই উপদ্বীপের বিধ্বস্ত এলাকায় যাওয়ার সুযোগ দেয়া হবে। বিমানটি ভূপাতিত করা সংক্রান্ত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দাবি নাকচ করেছে মিসর। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সিনাই উপত্যকার পাহাড়ি এলাকায় শনিবার রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে প্রযুক্তিগত ত্র“টি থাকতে পারে। মিসরে আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি জঙ্গিগোষ্ঠী এক টুইটার বার্তায় ওই বিমানটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে। এ দাবি নাকচ করে মিসরের প্রধানমন্ত্রী শরিফ ইসমাইল বলেন, ‘কোগালিমাভিয়া এয়ারলাইনসের ভাড়া করা এয়ারবাসটি (এ-৩২১) যে উচ্চতা দিয়ে ওড়ছিল, তাতে সেটিকে ভূপাতিত করা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন।’ রাশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ম্যাকসিম সকলভ বলেছেন, ‘আইএসের দাবি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিমানটিকে যে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ মেলেনি।’ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ আরোহী নিহত হওয়ার ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানটির ‘ব্ল্যাকবক্স’ বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। মিসরের নেতৃত্বাধীন তদন্তে রাশিয়া ও ফ্রান্সের তদন্তকারীরা যোগ দিয়েছেন।
এদিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি বলেছেন, বিধ্বস্তের কারণ জানতে তদন্ত প্রতিবেদন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সিরিয়ায় আইএসকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পরই দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার হুমকি দেয় আইএস। তবে ৩০ হাজার ফুটেরও বেশি ওপর দিয়ে উড়ন্ত একটি বিমানকে ভূপাতিত করার মতো অস্ত্রশস্ত্র এ গোষ্ঠীর কাছে আদৌ আছে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মিসরের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী হোসাম কামাল বলেছেন, ‘বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানটিতে কোনো সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল বিমানটির পাইলট জরুরি অবতরণের অনুরোধ করেছিলেন।’ রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম এনটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিধ্বস্ত বিমানের কো-পাইলট সের্গেই ত্র“খাশেভের স্ত্রী নাতালিয়ার দাবি, ফ্লাইটটি ছেড়ে যাওয়ার আগে বিমানটির ত্র“টিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন তার স্বামী। সিনাই এড়িয়ে যাচ্ছে ইউরোপের বিমান সংস্থাগুলো : মিসরে রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইউরোপের দুটি বৃহৎ বিমান পরিবহন সংস্থা সিনাই অঞ্চল এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মান বিমান পরিবহন সংস্থা লুফথানসা এবং ফরাসি সংস্থা এয়ার ফ্রেন্স ক্লেম সিনাই অঞ্চলের ওপর দিয়ে কোনো বিমান না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে শনিবার সংস্থা দুটোর মুখপাত্ররা জানিয়েছেন। আইএসের হামলা নয়, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে প্রযুক্তিগত ত্র“টি থাকতে পারে
শরিফ ইসমাইল
মিসরের প্রধানমন্ত্রী
বিধ্বস্তের কারণ
জানতে তদন্ত প্রতিবেদন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে
আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি
মিসরের প্রেসিডেন্ট

ভোট জালিয়াতিতে সতর্ক থাকুন

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী ও বিরোধীদলীয় নেতা অং সান সুচি আসন্ন নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি বন্ধে তার সমর্থকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে রোববার ইয়াঙ্গুনের এক নির্বাচনী প্রচারাভিযানে এ আহ্বান জানান তিনি। খবর এএফপির। মিয়ানমারে আসন্ন ৮ নভেম্বর নির্বাচন সামনে রেখে এক প্রচারাভিযানে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নেতা অং সান সুচি বলেন, জনগণের শক্তিই আমাদের প্রধান শক্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা জয়ী হই, ততক্ষণ আমরা সঠিক পন্থায় কাজ করব। এজন্য ভোট জালিয়াতি রোধে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।’ নোবেল বিজয়ী সুচি হাস্যোজ্জ্বল ভাব নিয়ে আরও বলেন, আমরা কোনো নোংরা রাজনীতির চর্চা করে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করব না। নির্বাচনের আগে রোববারের এ প্রচারাভিযান ছিল হাজার হাজার এনএলডি পার্টির সমর্থকদের সর্বশেষ একত্রিত হওয়া। সুচির সমর্থকরা হাতে লাল ব্যান্ড বেঁধে, গায়ে টি-শার্ট,
ক্যাপ এবং দলের পতাকা হাতে স্লোগান দিতে দিতে অগ্রসর হয়। পরিবর্তনের নির্বাচন (ভোট ফর চেঞ্জ), এনএলডির জন্য নির্বাচন- এমন স্লোগানে মুখরিত ছিল ইয়াঙ্গুনের রাজপথ। ছোট-বড়, যুবক ও বয়বৃদ্ধদের সম্মিলিত অংশগ্রহণে সুচির নির্বাচনী প্রচারাভিযান ছিল প্রাণবন্ত। এ প্রচারে অংশগ্রহণকারী ৬২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মিন্ট মিট চি বলেন, ‘আমি সুচিকে পছন্দ করি, আমি পরিবর্তন চাই। এ সরকারকে (জান্তা সরকার) ঘৃণা করি আমি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (সুচি) যখন ক্ষমতায় বসবেন তখনই আমাদের দেশ পরিবর্তন হবে।’ ৫০ বছর বয়সী সাউথ ড্রাগনের বাসিন্দা চোনিও বলেন, ‘তিনিই আমাদের উত্তম নেতা, যিনি আমাদের কল্যাণকামী হবেন।’ এদিকে, নির্বাচনে ভোট জালিয়াতিসহ ক্ষমতাসীন জান্তা সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধে সমর্থকদের কড়া নজরদারি রাখার আহ্বান জানান সুচি। ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সোলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) নির্বাচনী প্রচারে ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ের আÍবিশ্বাসী ঘোষণা দিলে সুচি এমন সতর্কবাণী দেন।

ঈশ্বরদীতে প্রতিদিন কোটি টাকার শিম বেচাকেনা

ক্রেতা-বিক্রেতার পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ঈশ্বরদীর মুলাডুলি সবজি আড়ত। এখানে প্রতিদিন আড়াই কোটি টাকার শিম বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে উৎপাদন কম এবং বাজার চড়া থাকলেও ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে আড়ত এলাকা জনারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।
প্রতিদিন গড়ে ৮০ ট্রাক শিম মুলাডুলি থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। প্রতি ট্রাকে ৩শ’ মণ শিম লোড করা যায়। সরজমিন মুলাডুলি শিমের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, আড়তের পুরো জায়গায় ক্রয়কৃত শিম স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাহাড়সম এসব স্তূপে শত শত মণ শিম। অন্যান্য এলাকার আড়ত সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বসলেও মুলাডুলির শিমের আড়ত বসে সপ্তাহে সাত দিনই।

অনন্য নেইমার

মৌসুমের শুরু থেকেই অসাধারণ খেলছেন নেইমার। লিওনেল মেসির অনুপস্থিতিতে বার্সেলোনায় প্রতি ম্যাচেই যেন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। গেটাফের বিপক্ষে আরেকবার জ্বলে ওঠা ব্রাজিলের এ ফরোয়ার্ডকে ‘অনন্য’ বলেছেন কোচ লুইস এনরিকে। শনিবার রাতে গেটাফেকে ২-০ গোলে হারায় বার্সেলোনা। এ জয়ে শীর্ষে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের পাশেই থাকল কাতালুনিয়ার দলটি। ২০১৩ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেয়ার পর প্রথম মৌসুম কিছুটা খারাপ কাটলেও গত মৌসুমে জ্বলে ওঠেন নেইমার। আর এ মৌসুমের শুরু থেকেই খেলছেন দারুণ। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মেসি চোট পেয়ে ছিটকে পড়ার পর নেইমার যেন বার্সেলোনার কাণ্ডারি হয়ে উঠেছেন। এ পর্যন্ত লা লীগায় সর্বোচ্চ ৯টি গোল করেছেন তিনি, যার পাঁচটিই করেন মেসির অনুপস্থিতিতে। গেটাফের বিপক্ষে যেমন জয়সূচক গোলটি নেইমারের পা থেকেই আসে। এটা ছাড়া পুরো ম্যাচেই দারুণ খেলেন ২৩ বছর বয়সী এ তারকা। নেইমারের প্রশংসায় সংবাদ সম্মেলনে এনরিকে বলেন, সে আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, সব বিষয়েই সে অনন্য। সে আমাদের জন্য গোল করে, করায়,
রক্ষণেও সাহায্য করে। দিন দিন সে উন্নতি করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে নেইমার তার উন্নতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এনরিকে। নেইমারের প্রশংসা করে সতীর্থ সুয়ারেজ বলেন, ‘সবাই জানে, দলে তাদের দায়িত্ব কি। আমি তিন-চারজনকে কাটাতে পারব না- এটা নেইমারের কাজ।’ মেসিকে নিয়ে মাথাব্যথা নেই এনরিকের ইনজুরির কারণে এক মাসেরও অধিক সময় ধরে দলের বাইরে লিওনেল মেসি। অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের আগে তার মাঠে ফেরা হচ্ছে না। তবে আর্জেন্টাইন তারকাকে ছাড়াই জয়ের ধারায় রয়েছে বার্সেলোনা। নেইমার-সুয়ারেজ নৈপুণ্যে মেসির অভাবটা যেন টেরই পাচ্ছে না কাতালানরা। কোচ লুইস এনরিকের কণ্ঠেও একই সুর। তার মতে, মেসির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বার্সা এখন আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং টিম কম্বিনেশনটাও দুর্দান্ত। গেটাফের বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন এনরিক। এ ম্যাচে নেইমার ও লুইস সুয়ারেজ দু’জনই গোল করেন।
এনরিক বলেন, ‘মেসির অনুপস্থিতিতে সবাই নিজেদের সেরাটা দিচ্ছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ইনজুরির কারণে সে দলে না থাকলেও আমি খেলোয়াড়দের ওপর কোনো ধরনের বাড়তি চাপ দিচ্ছি ?না। সবাই এমনিতেই নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিচ্ছে। দল হিসেবে আমরা এখন আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং সবাই নিজেদের খেলায় উন্নতি করছে।’ ২৬ সেপ্টেম্বর লাস পালমাসের বিপক্ষে হাঁটুর ইনজুরিতে ভুগে ৭-৮ সপ্তাহের জন্য ছিটকে যান মেসি। তার অনুপস্থিতিতে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সাত ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতেই জয়লাভ করে বার্সা। শুধু মেসিবিহীন প্রথম ম্যাচেই সেভিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে হার মানে কাতালানরা। আর গত ২৮ অক্টোবরের কোপা দেল রে’র ম্যাচে ভিলানোভার বিপক্ষে প্রথম সারির দল নামিয়ে হতাশা উপহার পান এনরিকে। গোলশূন্য ড্র করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। অন্যদিকে চ্যাম্পিয়ন লীগের ম্যাচে বেয়ার লেভারকুসেন ও বাতে বোরিসভের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় বার্সা। মেসিকে ছাড়া কাতালানদের জয়ের ধারা বজায় থাকবে কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়! ওয়েবসাইট।

মাহি নয় শাকিবই থাকছেন দেবাশিষের হিরোগিরিতে

প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়ে তামিল ছবির অনুকরণ করছেন দেবাশিষ বিশ্বাস। ১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল ছবি ‘হিম্মতওয়ালার’ অনুকরণে তৈরি হবে তার নতুন ছবি ‘হিরোগিরি’- সম্প্রতি যুগান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। এরইমধ্যে ছবির চিত্রনাট্যের কাজও প্রায় শেষ করেছেন তিনি। আগামী ৪ নভেম্বর ইমন সাহার সঙ্গীতে কুমার বিশ্বজিৎ ও আঁখি আলমগীরের কণ্ঠে একটি গান রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে ছবির কাজ শুরু হবে।
এ প্রসঙ্গে দেবাশিষ বলেন, ‘আমি ঘোষণা দিয়েই তামিল ছবির অনুকরণ করছি। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই। গল্পের কপিরাইট নিয়েই কাজ করব। অন্যদের মতো চুরি করে কিছু করার ইচ্ছা নেই। এতে দর্শকরা বিভ্রান্ত হন।’ ছবিতে নায়ক হিসেবে শাকিব খান অভিনয় করছেন। গুজব রটেছে, মাহিয়া মাহিকে এ ছবিতে কাস্ট করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি পুরোটাই গুজব বলে জানিয়েছেন পরিচালক। এ প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, ‘শাকিব খান অভিনয় করছেন এটা নিশ্চিত। তবে মাহির বিষয়টি পুরোটাই গুজব।’

‘দলীয়’ স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি কেমন হবে? by সোহরাব হাসান

সরকার স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর নির্বাচন দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে এর পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক চলছে। যারা এর পক্ষে, তাদের যুক্তি হলো নির্বাচনটি অরাজনৈতিক বলা হলেও রাজনৈতিকভাবেই হতো। রাজনৈতিক দলই প্রার্থীর সমর্থন দিত। দলের নেতারা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারও চালাতেন। তাহলে আর ঘোমটা দিয়ে লাভ কী?
আবার যারা এর বিপক্ষে, তাদের যুক্তি হলো দলীয় কারণে জাতীয় নির্বাচনে হানাহানির ঘটনা ঘটে। এখন তৃণমূলেও সেটি ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়া এলাকায় অনেক যোগ্য ও সৎ ব্যক্তি আছেন, যাঁরা দলের বৃত্তে আসতে চান না। এখন তাঁদের পক্ষে নির্বাচন করে জিতে আসা কঠিন হবে।
এত দিন স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল। অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি, পারছে না। প্রতিটি ব্যাপারে সরকারের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলতে হয়। দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে ভবিষ্যতে দলের কথাও শুনতে হবে? দলের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সম্পর্ক কী হবে? দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে কে মনোনয়ন দেবে—দলের স্থানীয় শাখা, না কেন্দ্রীয় কমিটি? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধন করে অনেক সংস্কার করা হয়েছিল, যার মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে করার কথা ছিল। কিন্তু সেটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে গ্রহণীয় মনে হয়নি। তাঁরা সেটি সংশোধন করেছেন। এভাবে আমরা সবকিছু কেন্দ্রায়িত করে ফেলেছি। আমরা একের পর এক বিভাগ করেছি। উপজেলার সংখ্যা বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে আমরা একজন ভাইস চেয়ারম্যানের স্থলে দুজন ভাইস চেয়ারম্যান করেছি। কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন হয়নি। তাদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
ক্ষমতাহীন স্থানীয় সরকার দলীয়ভাবে হোক আর নির্দলীয়ভাবে হোক মানুষ কেন আগ্রহী হবে? তারা দেখতে চাইবে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে ক্ষমতায়ন করা হচ্ছে কি না? স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কি না? সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে তিন স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার চালু আছে। গ্রামাঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদ, শহরাঞ্চলে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ। এর মধ্যে জেলা পরিষদে কখনোই নির্বাচন হয়নি। অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে জেলা পরিষদ চালানো হচ্ছে।
আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদ নিজের ক্ষমতার ভিত তৈরি করতে উপজেলা পরিষদ গঠন করে দুই দফা নির্বাচন করেন বিরোধী দলের বাধা উপেক্ষা করে। এরপর বিএনপির আমলে সেই উপজেলা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে উপজেলাব্যবস্থা পুনর্বহাল হলেও নির্বাচন হয় বহু বছর পরে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে। সেই নির্বাচন নিয়েও নানা বিতর্ক আছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোর নির্বাচন মোটামুটি নিয়মিতই হয়ে আসছে।
সব রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণায় স্থানীয় সরকার সংস্থাকে ক্ষমতায়িত করার কথা আছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেটি ভুলে যান। বর্তমানে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে স্থানীয় সাংসদকে। স্থানীয় প্রশাসন যেহেতু সাংসদকে উপজেলা চেয়ারম্যানের চেয়ে ক্ষমতাবান ভাবে, সেহেতু তারা তাঁকেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলো মোটামুটি কাজ করতে পারলেও রাজনৈতিক চাপ ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত নয়।
এখন যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী হবে? তারা কীভাবে মনোনয়ন দেবে? একজন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন, এতে মনোনয়ন বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে। দলের নেতৃত্ব সেই বাণিজ্য ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেবে? দলবদলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো কি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে, না হুকুম বরদার হবে? এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের। নতুন পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনটি করতে তারা প্রস্তুত আছে কি না?
এই নির্বাচনে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকাই বা কী হবে? ক্ষমতাসীন দল কি নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে করতে দেবে? বিরোধী দল কি নির্বাচনে অংশ নেবে? জাতীয় নির্বাচন জোটগতভাবে হয়েছে। এটিও কি তা-ই হবে? সরকারি দলের চ্যালেঞ্জ হবে নির্বাচনটি ঠিকভাবে করতে দেওয়া। বিরোধী দলের, বিশেষ করে বিএনপির চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনে গিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া যে ভুল ছিল, তা বিএনপির নেতারা এখন প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন। বিএনপি প্রকাশ্যে সভাসমাবেশ করতে পারছে না। এই নির্বাচন সামনে রেখে তারা সেই সুযোগটি নিতে পারে। প্রশ্ন হলো সরকারি দল সেই সুযোগ দেবে কি না? তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। সেটি তারা সেবারে করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এবারে পারবে কি? সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের পৌর নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মাস্তানির প্রতিবাদে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এ রকম দৃষ্টান্ত দেখানোর কেউ কি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে আছেন? না হুকুম বরদার হিসেবেই তাঁরা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে যাবেন?
দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার সংস্থার এই নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ হলে জাতীয় রাজনীতির কালো মেঘ অনেকটা কেটে যেতে পারে। আর যদি সেটি না যায়, তাহলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কপালে অনেক দুঃখ আছে।

যেমন আছ তেমনি এসো by উম্মে মুসলিমা

আলজেরিয়ান এক সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, একজন আলজেরিয়ান বর তাঁর নতুন বউয়ের বিরুদ্ধে ‘মানসিক শান্তিভঙ্গে’র অভিযোগে আদালতে ২০ হাজার ডলারের মামলা করেছিলেন। কারণ কী? না, তিনি বাসররাত শেষে সকালে উঠে বউকে চিনতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন কোনো চোর ঢুকেছে তাঁর বাসায়। সংবাদে আরও বলা হয়, বিয়ের দিন তিনি বউটিকে প্রসাধনচর্চিত যে রূপে দেখেছিলেন, পরদিন সে রকম তাঁকে পাননি। তাই প্রতারণার অভিযোগে তাঁর ওই মামলা। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলজেরিয়ার নারীরা এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত এবং বেশির ভাগ বিয়েই মা-বাবার সম্মতিতে হয়। এমনকি নারীরা অভিভাবক বা স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে বাইরে চাকরি করতে পারেন না। এটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে যেসব নারী বাইরে বেরোন, তাঁদের খুব কমই প্রসাধনহীন দেখা যায়।
আমেরিকার প্রখ্যাত গায়িকা-নায়িকা বিয়ন্স প্রসাধনহীন হয়ে বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন করে মিডিয়াজগতে ঝড় তোলেন। তিনি নারীদের প্রসাধনহীন হয়ে বিয়ে করতে অনুপ্রেরণা দেন। ক্যারোলিন মার্কে, যিনি কোনো মেকআপ ছাড়াই বিয়ে করেছিলেন, তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত প্রসাধন করি না। তাই বিয়েতেও সেটা করিনি, যাতে কারও আমাকে চিনতে কষ্ট হয়। এ রকম একটি বিশেষ দিনে আমার চামড়া অপেক্ষাও আরও গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার বিষয় ছিল।’
আমেরিকার ফ্যাশন ম্যাগাজিন ইনস্টাইল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন নারী তাঁর সারা জীবনে গড়ে ১২ লাখ টাকা শুধু প্রসাধনসামগ্রীতে ব্যয় করেন। আমাদের এ গরিব দেশেও মেয়েরা এ ক্ষেত্রে খরচ করেন। একটা ভালো বিউটি পারলারে শুধু বিয়ের দিনের মেকআপে খরচ ১৫ হাজার বা তার বেশি। হলুদ, বিয়ে, সংবর্ধনার প্যাকেজ প্রায় অর্ধলাখ টাকা। অনেকেই লক্ষ করে থাকবেন, কনে কখনোই সঠিক সময়ে অনুষ্ঠানে হাজির হতে পারেন না। কারণ, পারলারেও সিরিয়াল থাকে। রাতে বিয়ের অনুষ্ঠান হলে দুপুরের আগে গিয়ে পারলারে বসে থাকতে হয়। তারপর যখন সেখান থেকে তিনি বের হন, তখন তাঁকে চেনার কোনো উপায় থাকে না। মনে হয় এক বালতি গোলানো চুনের মধ্যে মাথার চুল ধরে তাঁকে কপাল অবধি চুবিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর আসল গায়ের রং বের করতে হলে ঝিনুক দিয়ে চাঁছা লাগবে। মুখের চেয়ে মুখোশই যেখানে পরিচয়ের বাহন। এক বিয়ের কনেকে মঞ্চে বসে থাকতে দেখেছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন প্রাণহীন পিতলের মূর্তি। অল্প দুঃখে রবীন্দ্রনাথ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘যেমন আছ তেমনি এসো, আর কোরো না সাজ’?
নারীর বেলায় ফরসা রংই যোগ্যতা। সেই সঙ্গে লম্বা ও ছিপছিপে হলে সোনায় সোহাগা। কিন্তু পুরুষের যোগ্যতা তাঁর গায়ের রং বা চেহারায় নয় নিজেকে সুন্দর দেখাতে কে না চায়? কিন্তু তার মানে কি নিজের সঙ্গে প্রতারণা করা? আমি যা নই, তা প্রকাশ করায় কৃতিত্ব কোথায়? এ যেন অনেকটা স্বরচিত রবীন্দ্রসংগীত। বিয়েতে পুরুষেরা কি এ রকম সাজেন? তাঁরা বড়জোর একটু ফেসিয়াল সেরে চুলটুল সেট করে আসেন। কনেকে কেন একবেলার জন্য অন্য কেউ হতে হবে? এ তো আর কিছুই নয়, সেই চিরকালীন ফরসা রঙের কাছে নতজানু হওয়া। ভারতের নন্দিত তারকা নন্দিতা দাশ ‘ডার্ক ইজ বিউটিফুল’ বা ‘কালোই সুন্দর’ নামে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তিনি বলেন, তাঁর কালো রঙের কারণে চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁকে গরিব ও নিম্নশ্রেণির নারীর ভূমিকায় অভিনয়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এমনকি ধনী চরিত্রে অভিনয়ের প্রয়োজনে তাঁকে তাঁর চামড়ার রং পরিবর্তনেরও উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন যে একবার নিজেদের জিজ্ঞেস করুন তো শুধু ফরসাই কি একমাত্র মানদণ্ড, যা আমাদের সুন্দর করে? কখনোই কালো বলে নিজেকে অসুন্দর ভাববেন না, তাহলে আপনার আশপাশের মানুষও তা-ই ভাববে। কারণ, কালো হওয়া বা ভারতীয় হওয়া আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী হয়নি। কালো ধনীরা গায়ের চামড়া পরিবর্তন করে বা অনেক দামি প্রসাধনসামগ্রী মেখে ‘ফরসা সুন্দরী’ হতে পারেন, কিন্তু আপামর কালো মেয়েরা সস্তা প্রসাধনসামগ্রী ব্যবহার করে চিরকালের জন্য ত্বকের দফারফা করে ফেলছেন এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পতিত হচ্ছেন।
শুধু নারীকে ফরসা বানিয়ে আর গালিগালাজ খেতে রাজি নন পুঁজিপুরুষেরা। তাই পুরুষের জন্যও রং ফরসাকারী ক্রিম বাজারে ছেড়েছেন। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুঁজি-বাণিজ্য। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য মুনাফার জন্য পুঁজি বিনিয়োগ। পুঁজির কর্তারা জানেন কোথায় বিনিয়োগ করলে তাঁদের বাজার রমরমা হবে। পুরুষবাদী সমাজ বলে দিয়েছে, ফরসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। ‘স্নো হোয়াইট’ না হতে পারলে রাজপুত্র এসে উদ্ধার করবে না। ফরসা সুন্দরী না হলে যতই তাঁর পায়ের মাপে কাচের জুতো খাপে খাপ হোক, রাজার ছেলে সে রকম সিনডারেলা চাইবে না। তাই আমরা আমাদের গায়ের রং ফরসা করতে চাই আর সুচতুর পুঁজিবাদীরা বিশ্বব্যাপী রং সাদা করার ক্রিম বিক্রি করে মুনাফা লুটতে চায়।
আমাদের সমাজে সাধারণভাবে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকারের উদাহরণ কোনটি? নিম্নবিত্ত পরিবারের একটি কালো মেয়ে। প্রথমত, তিনি পুঁজিবাদী সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার, পুরুষতান্ত্রিকতার কারণে লিঙ্গবৈষম্যের শিকার এবং শেষ পর্যন্ত বর্ণবৈষম্যের শিকার। নারীর বেলায় ফরসা রংই যোগ্যতা। সেই সঙ্গে লম্বা ও ছিপছিপে হলে সোনায় সোহাগা। কিন্তু পুরুষের যোগ্যতা তাঁর গায়ের রং বা চেহারায় নয়। তিনি কালো, মোটা, টেকো, বেঁটে—যা-ই হন না কেন, তিনি কতটা উচ্চশিক্ষিত ও ধনী, সেটাই তাঁর যোগ্যতার মাপকাঠি। অনেক সময় উচ্চশিক্ষাও পয়সার কাছে হার মানে। তাই শিক্ষিত-সচেতন-আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীদের নিজের প্রকৃত চেহারাকে ভালোবাসতে হবে।
নারীরা ঘরে-বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধা ও শ্রম দিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তাঁরা সুঠাম শারীরিক কাঠামো, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বক আর সুন্দর পোশাকে নিজেকে চৌকস ও কর্মক্ষম রাখবেন। মেধার চর্চায় অবয়বে ফুটিয়ে তুলবেন বুদ্ধিদীপ্ত। সাদা কাদা মেখে তা আড়াল করাই হবে বোকামি। এতে প্রকৃত সৌন্দর্যপ্রিয় পুরুষেরাও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করবেন। নারী-পুরুষ একে অন্যের কাছে মুখোশহীন হয়ে উপস্থিত হবেন, তা যেমন হবে প্রসাধনীমুক্ত, একই সঙ্গে সব ধরনের প্রতারণামুক্ত।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক ও জেন্ডার সমতাবাদী লেখক।
muslima.umme@gmail.com

এক অদ্ভুত বিপন্ন সময় by সাজেদুল হক

এ এক অদ্ভুত, বিষণ্ন সময়। চারদিকে অসহায়ত্ব, অস্থিরতা, উদ্বেগ ও আতঙ্ক। এ এমন এক সময় যখন পিতা তার সন্তানের হত্যার বিচার চান না। একের পর এক দুর্ঘটনায় বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ মানুষ। গোরস্তানমুখী এ মিছিল কোথায় নিয়ে যাবে এ জাতিকে- সে প্রশ্ন এখন উচ্চকিত। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাজনীতির খেলা বাংলাদেশকে এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা, সামনে আরও ঝড় আসছে।
তিন মাসের অবরোধ-পেট্রল সন্ত্রাসের পর প্রায় ছয় মাস ভালোই চলছিল দেশ। গণতন্ত্রের সংকট যদিও ছিল। নতুন একটি নির্বাচন নিয়েও রাজনীতির অন্দরমহলে আলোচনা চলছিল। কিন্তু গত ২৮শে সেপ্টেম্বর হঠাৎ এক নতুন বিপদের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। যখন রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা। জঙ্গি সংগঠন আইএস ওই হত্যার দায় স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার ওই দাবি নাকচ করে দেয়। তবে এখন জানা যাচ্ছে, ফাইভ আইজ নামে পাঁচটি দেশের গোয়েন্দা জোট সেপ্টেম্বরে তথ্য পেয়েছিল বাংলাদেশে বিদেশীদের ওপর হামলা হতে পারে। ‘ফাইভ আইজ’ জোটের দেশগুলো হলো- অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত হয়। কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, মার্কিন কর্মকর্তারা সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল, ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তৎপরতা বৃদ্ধি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপর ২৮শে সেপ্টেম্বর থেকে ১লা নভেম্বর। এ সময় সিজার তাভেলার পর খুন হয়েছেন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি। ঢাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি সভায় হামলা হয়েছে। এতে এ পর্যন্ত দুজন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার ঢাকায় দুটি প্রকাশনা দপ্তরে হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছেন এক প্রকাশক। আনসার আল ইসলাম (আল-কায়েদার ভারত উপমহাদেশ শাখা) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য এখনও এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনাই মনে করছেন। যদিও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার নিজের ওপরও হামলার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।
একের পর এক অঘটন বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও চাপে ফেলছে। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করলেও প্রকাশক হত্যা পুরো বিষয়টিকে আবার নাজুক করে ফেলছে। দেশী-বিদেশী সবার মধ্যেই বিরাজ করছে নিরাপত্তাহীনতা। সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও পশ্চিমা কোন দেশই এখনও সতর্কতা প্রত্যাহার করেনি। যদিও কিছু কিছু সংবাদ খাওয়ানোর চেষ্টা হয়েছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে কোন না কোন মাত্রায় আইএসের কার্যক্রম রয়েছে। খুব সহসাই বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে তারা মনে করেন না।
চলমান পরিস্থিতিতে সংকটের গোড়ার দিকেও অনেকে দৃষ্টিপাত করেছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এ বিপর্যয়ের মধ্যেও শুভবুদ্ধির উদয়ের আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি কোন বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’ এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক ফরহাদ মজহার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, অবিশ্বাস্য শোক মাথায় নিয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক এ কথাটা স্পষ্টভাবে বলতে পেরেছেন। আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পক্ষেই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকবো। আমরা কাঁদতে ভুলে যাবো। নিজ নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্তানের দিকে যাবো, আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে। কে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সেকুলার মুক্তবুদ্ধিওয়ালা আর কে ধর্মান্ধ বা ইসলামী জঙ্গি গোরস্তান তার বিচার করে না। শুধু কবরের ওপর ঘাস গজায়, আর একদা ঐতিহাসিকরা গবেষণা করতে বসে কীভাবে একটি জাতি তাদের বেয়াকুবির জন্য ধ্বংস হয়ে গেল। যেহেতু আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই, তাই জীবনের কোন মূল্য আমরা দিতে জানি না। আমি দেখছি, বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশে দুই দিক থেকে দুটো মিছিল গোরস্তানের দিকে যাচ্ছে। দীপন, আমি প্রাণপণ এ বিভক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। এ ভয়াবহ বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে আমি জানপরান সবাইকে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে যাবো। কিন্তু তাতে কি যারা চলে গেছে ফিরে আসবে? কেউই প্রত্যাবর্তন করে না। এ লাশের ভার অনেক ভারি, বাংলাদেশ বহন করতে পারবে কি? সেই দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার চর্চা আমরা করি না, যা আমাদের গোরস্তানের দিকে নয়, সপ্রতিভ জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কে জাগে?
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন, কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত ও মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝবো যে আলো নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, ‘বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা হিসেবে বক্তব্য সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত- তা হলো যদি এ সরকার ক্ষমতায় না থাকে দেশ জঙ্গি সন্ত্রাসীরা দখল করে নেবে, সাম্প্রদায়িকতা বাড়বে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী তৎপরতা বাড়বে। এ যুক্তিতে সরকার গণতান্ত্রিক অধিকারের অনেক কিছু নিশ্চিন্তে সংকুচিত করেছে, অনেক লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী বহু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও মুখ বন্ধ রেখেছেন পাছে এই সরকারের ক্ষতি হয়। একের পর এক যখন সন্ত্রাসী হুমকি, হামলা, লেখক-প্রকাশক খুন, সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, ধর্মান্ধতা, জাতিগত ধর্মীয় বিদ্বেষ, দখল-লুণ্ঠন ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা বেড়েই যাচ্ছে, তখন কি এ প্রশ্ন করতে পারি দেশে এখন কোন সরকার ক্ষমতায় আছে?’
সরকারি ভাষ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে একের পর এক হামলা, হত্যায় আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। অনিশ্চয়তার এক গভীর গর্তে পড়েছে বাংলাদেশ। আতঙ্কের জনপদে কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবন, কেউ জানেন না।
দীপন হত্যার দায় স্বীকার আনসার আল ইসলামের
জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক-মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে আনসার আল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন।
শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ (মিডিয়া) বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আনসার আল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন এই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমেও কারা এসব ঘটনায় জড়িত তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শনিবার রাজধানীর শাহবাগে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক-মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে। শাহবাগের আজিজ মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতির অফিস থেকে সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নিহত দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, আমরা দুপুরে টেলিভিশনে শুদ্ধ স্বরের প্রকাশকের ওপর হামলার খবর পেয়ে দীপনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। ছেলের বউও যোগাযোগ করেন। কিন্তু কেউই তাকে পাচ্ছিলেন না। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওর স্ত্রীসহ আমরা এসে দেখি রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে আছে।
জাগৃতি প্রকাশনীর ম্যানেজার আলাউদ্দিন জানান, তার গলার পেছনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে।
তিনি জানান, শাহবাগ আজিজ মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৩২ নম্বর রুমে তিনি একাই ছিলেন। এসময় দুর্বৃত্তরা ঢুকে তার ওপর হামলা চালায়। তবে কয়জন ছিল তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।

সঙ্কট থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন : দীপনের বাবা

আইনের বিচারে কেবল একের পর এক হামলা বা হত্যার সমাধান হবে না। এ সঙ্কট থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
তিনি বলেন, নিয়মানুযায়ী একটি মামলা করবেন তিনি। কারণ হিসেবে বললেন, আমি আইন মেনে চলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অথরিটি (কর্তৃপ) বলেছে একটি দরখাস্ত দিতে। আমি আজকে দেবো। আজকে না পারলে আগামীকাল দেবো। তার মানে এই নয় যে আমি এর ওপর নির্ভর করি। আমি শুভবুদ্ধির উদয় চাই। যারা ধর্মনিরপেতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন এবং যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় প দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পরে শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। বিচার, পুলিশ ও আইন-আদালত দিয়ে তো শুধু আমরা একজনকে শাস্তি দিতে পারি। কিন্তু জাতীয় উন্নতি হবে না। গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ছেলের লাশ নিতে এসে সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন প্রবীণ এই শিক্ষক।
ব্লগার হত্যার সম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিচার সম্পর্কে তিনি বলেন, ঘটনা ঘটছে। এর জন্য সরকার চেষ্টা করছে রীতি অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় আদর্শগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে আগে সমাধান করতে হবে। সেই সাথে নিতে হবে আইনগত ব্যবস্থা। যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা না যায়, শুধু আইনগত ব্যবস্থা দিয়ে এটি সমাধান করা যাবে না। এ ঘটনা আজ ভারত ও পাকিস্তানে ঘটছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে তো আছেই। তাই এটিকে রাজনৈতিকভাবে, আদর্শগতভাবে গভীরভাবে দেখা উচিত।
এসব ঘটনার সাথে আন্তর্জাতিক কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে। ব্যাপারটা অবশ্যই আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে আছে। আজকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে আলকায়েদা, তালেবান, আইএস। শুধু ধর্মের কারণে করা হচ্ছে মনে হয় না। এখানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে। আমরা আমাদের সরকারকে নিজেরা পরিবর্তন করতে চাইÑ এ রকম একটি জাতীয়তাবাদী মনোভাব আইএস, আলকায়েদা, তালেবান সবারই আছে। তবে সাংস্কৃতিকভাবে তারা এখনো ধর্মের পর্যায়ে আছে। সে জন্য ধর্মকে ধরে এবং পাশ্চাত্য গণমাধ্যম তাদের ধর্মের ব্যাপারটিকেই অনেক বড় করে দেখায়, অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলোকে একেবারে দেখায় না।
কয়টার দিকে দীপন নিহত হয়েছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, দীপন কয়টার সময় নিহত হয়েছে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে আমার অনুমান, বেলা ৩টার দিকে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি তাকে দেখতে পেয়েছি সন্ধ্যা ৬টার সময় গিয়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা, হয়তো কমও হতে পারে, ঘরে বন্দী অবস্থায় ছিল। আমি দুইবার গিয়েছি সেখানে। আমি অনুমান করতে পারিনি, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, এ রকম ঘটনা ঘটেছে ভেতরে। পরে মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট চাবি জোগাড় করে খুললেন। পরে আমি এবং ওই প্রেসিডেন্ট সাহেব একই সময় ঘরে ঢুকেছি। ঢুকে দেখেছি। তখন পুলিশ দেরি করেনি। খুব দ্রুতই এসেছে। এসে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেছে। আমাদের চাবি দিয়েই খুলেছে। একজন কমপোজিটর ছিল সে আসে নাই। তার কাছ থেকে চাবি এনে দরজা খোলা হয়েছে।
এ দিকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফয়সল আরেফিন দীপনের লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। বেলা সাড়ে ১১টায় লাশ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্সে (ঢাকা মেট্রো ছ-৭১-১১৩৩) লাশ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।

বিজেএমসি থাকুক অর্থমন্ত্রী চান না! by আবুল হাসনাত

আবুল মাল আবদুল মুহিত
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর আগে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু করে সরকার ‘মারাত্মক ভুল’ করেছে। আর এবার লিখলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনই (বিজেএমসি) বিলুপ্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। এই বিজেএমসি সরকারি ২৬টি পাটকল পরিচালনার কাজটি করে থাকে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে আমি বিজেএমসির কোনো ভূমিকাই দেখতে পাই না। অথচ তারা সব মিল নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সময়মতো পাট খরিদ করতে দেয় না। এসব কার্যাবলিতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করে এবং নানাভাবে মিলগুলোকে লাভজনক হতে দেয় না।’
অর্থমন্ত্রী এক চিঠিতে এমন সব মন্তব্য করে বিজেএমসিকে বিলুপ্ত করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। আর এই চিঠিটি গত ২৮ অক্টোবর পাঠানো হয়েছে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিককে। বিজেএমসি পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি সংস্থা।
বিজেএমসিকে বিলুপ্ত করা হলে পাটকলগুলো কীভাবে চলবে, তার পথও বাতলে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রতিটি পাটকল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। তখন এগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর এসব পাটকলের পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন এবং মূল্যায়ন করতে পাট মন্ত্রণালয়ে একটি ছোট সেল করা যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী শুধু চিঠিই লিখেননি, পাটমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নেন তার ফলাফল দেখার অপেক্ষায় আছেন। চিঠিতে তেমনটিই উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ূন খালেদ কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম প্রথম আলোকে বলেন, গত কেবিনেটে অর্থমন্ত্রী বিজেএমসি বিলুপ্ত করার বিষয়টি তুলেছিলেন। নানান যুক্তিও দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা খারিজ করে দেন। উল্টো তিনি বিজেএমসিকে আরও কার্যকর করা ও লোকসান কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পাটমন্ত্রীর কাছে অর্থমন্ত্রী চিঠিটি লিখেছেন আলীম জুট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জগলুল মাহমুদের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে। জগলুল মাহমুদ লিখেছেন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে তিনি এখন আলীম জুট মিলসের মালিক। রায় অনুযায়ী মিলটি হস্তান্তরের জন্য গত ১৯ ও ২৬ এপ্রিল তাদের সঙ্গে বিজেএমসির দুটি চুক্তি সই হয়। কিন্তু মিলটি এখনো তাদের সরেজমিন বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
জগলুল মাহমুদের দাবি, বিজেএমসির কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা আলীম জুট মিলসের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করছেন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসি ২০০৯ সালে একবার মিলটি হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়। তখন মিলটির দায়দেনা ছিল ১৩২ কোটি টাকা। এখন এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৬ কোটি টাকায়। দিন দিন দেনা বাড়ছেই। তিনি এর ভাগীদার হতে চান না। তিনি মিলটি নিজের অর্থে চালু করতে চান।
অর্থমন্ত্রীও তাঁর চিঠিতে বলেছেন, বিজেএমসির কারণেই আলীম জুট মিলসের দায়দেনা ৫৪ কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
বিজেএমসির দুর্নীতির বিষয়ে পাট প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কোন করপোরেশনে দুর্নীতি নেই। বিজেএমসিতে দুর্নীতির মাত্রাটা একটু বেশি। দুর্নীতি আর লোকসান বিজেএমসিকে শেষ করে দিয়েছে। তবে বিজেএমসির কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয় সেগুলো আমরা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছি। সেভাবে ব্যবস্থাও নিচ্ছি। আশা করি পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে সংস্থাটি আর লোকসানে থাকবে না।’
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘুরেফিরে বারবারই এসেছে পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা। এ জন্য সরকার বিজেএমসিকে প্রচুর টাকাও দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজেএমসিকে লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য ২০০৯ সালে পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসি একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিজেএমসির যাবতীয় দায়দেনা পরিশোধ করতে ৫ হাজার ২৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দেয়। গত অর্থবছরে আরও ২০০ কোটি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে সরকার গত অর্থবছর পর্যন্ত বিজেএমসিকে মোট ৫ হাজার ৪৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দেয়।
কিন্তু এত কিছুর পরও গত অর্থবছরে বিজেএমসির লোকসান ৪৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আগের দুই বছর মিলিয়ে সংস্থাটির লোকসান হয় ৩২৬ কোটি টাকা।

কেন বিচার চান না দীপনের বাবা

আইনের বিচারে কেবল একের পর এক হামলা বা হত্যার সমাধান হবে না। এ সঙ্কট থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একটি মামলা করবেন তিনি। কারণ হিসেবে বললেন, আমি আইন মেনে চলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অথরিটি (কর্তৃপক্ষ) বলেছে একটি দরখাস্ত দিতে। আমি আজকে দেব। আজকে না পারলে আগামীকাল দেব। তার মানে এই নয় যে আমি এর ওপর নির্ভর করি। আমি শুভবুদ্ধির উদয় চাই। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন এবং যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। যদি শুভবুদ্ধি উদয় হয়, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। বিচার, পুলিশ ও আইন-আদালত দিয়ে তো শুধু আমরা একজনকে শাস্তি দিতে পারি। কিন্তু জাতীয় উন্নতি হবে না।
আজ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ছেলের লাশ নিতে এসে সাংবাদিকদের কাছে এ সব কথা বলেন প্রবীণ এই শিক্ষক।
ব্লগার হত্যার সম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিচার সম্পর্কে আবুল কাসেম বলেন, ঘটনা ঘটছে। এর জন্য সরকার চেষ্টা করছে রীতি অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা বাহিনী দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় আদর্শগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে আগে সমাধান করতে হবে। সেই সাথে নিতে হবে আইনগত ব্যবস্থা। যদি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা না যায়, শুধু আইনগত ব্যবস্থা দিয়ে এটি সমাধান করা যাবে না। এই ঘটনা আজ ভারত ও পাকিস্তানে ঘটছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে তো আছেই। তাই এটিকে রাজনৈতিকভাবে, আদর্শগতভাবে গভীরভাবে দেখা উচিত।
এসব ঘটনার সাথে আন্তর্জাতিক কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে। ব্যাপারটা অবশ্যই আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে আছে। আজকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেখা দিয়েছে আল-কায়েদা, তালেবান, আইএস। শুধু ধর্মের কারণে করা হচ্ছে মনে হয় না। এখানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে। আমার দেশের সরকারকে হত্যা করছে। আমরা আমাদের সরকারকে নিজেরা পরিবর্তন করতে চাই। এ রকম একটি জাতীয়তাবাদী মনোভাব আইএস, আল-কায়েদা, তালেবান সবারই আছে। তবে সাংস্কৃতিকভাবে তারা এখনো ধর্মের পর্যায়ে আছে। সেজন্য ধর্মকে ধরে এবং পাশ্চাত্য গণমাধ্যম তাদের ধর্মের ব্যাপারটিকেই অনেক বড় করে দেখায়, অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলোকে একেবারে দেখায় না।
কয়টার দিকে দীপন নিহত হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল কাসেম বলেন, দীপন কয়টার সময় নিহত হয়েছে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে আমার অনুমান, দুপুর ৩টার দিকে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি তাকে দেখতে পেয়েছি সন্ধ্যা ৬টার সময় গিয়ে। এতক্ষণ প্রায় তিন ঘণ্টা, হয়তো কমও হতে পারে ঘরে বন্দি অবস্থায় ছিল। আমি দুবার গিয়েছি সেখানে। আমি অনুমান করতে পারি নাই, স্বপ্নেও ভাবতে পারি নাই, এ রকম ঘটনা ঘটেছে ভেতরে। পরে মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট তিনি চাবি জোগাড় করে খুললেন। আমি এবং ওই প্রেসিডেন্ট সাহেব একই সময় ঘরে ঢুকেছি। ঢুকে দেখেছি। তখন পুলিশ দেরি করেনি। খুব দ্রুতই এসেছে। এসে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেছে। আমাদের চাবি দিয়েই খুলেছে। একজন কমপোজিটর ছিল সে আসে নাই। তার কাছ থেকে এনে খুলেছেন।
এদিকে আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপননের লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লাশ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এম্বুলেন্সে (ঢাকা মেট্রো ছ- ৭১-১১৩৩) লাশ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

ভারতের সংখ্যালঘুদের মধ্যে যথেষ্ট ভীতি বিরাজ করছে -বললেন ইনফোসিস প্রতিষ্ঠাতা

এন আর নারায়ণমূর্তি
ভারতের সংখ্যালঘুদের মধ্যে যথেষ্ট ভীতি বিরাজ করছে। উদ্বেগ প্রকাশ করে কথাটি বলেছেন ভারতের শীর্ষ বহুজাতিক ব্যবসা পরামর্শক ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এন আর নারায়ণমূর্তি। সংবাদভিত্তিক চ্যানেল এনডিটিভিতে গতকাল শনিবার প্রচারিত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। খবর এনডিটিভির।
ভারতে বাড়তে থাকা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিষয়ে সম্প্রতি সোচ্চার হয়েছেন দেশটির অনেক লেখক, গবেষক ও অধিকারকর্মী। অনেকেই তাঁদের দেওয়া রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও পদবি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়ী মহল থেকে এ বিষয়ে প্রথম মুখ খুললেন নারায়ণমূর্তি। ‘দ্য এনডিটিভি ডায়ালগ’ অনুষ্ঠানে নারায়ণমূর্তি বলেন, ‘আমি রাজনীতিক নই। রাজনীতির বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহও নেই। তাই এ বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্যও দিতে চাইনি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের সংখ্যালঘুদের মধ্যে যথেষ্ট ভীতি আছে। নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য অঞ্চলে গিয়ে বাস করছে এমন মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট পরিমাণ ভীতি আছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, মুম্বাইয়ে বসবাসকারী দক্ষিণ ভারতীয় অনেকেই শিবসেনার সদস্যদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন।’
নারায়ণমূর্তি বলেন, তিনি মনে করেন যেকোনো রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম প্রাধান্য হওয়া উচিত প্রতিটি ভারতীয়র মনে আস্থা, শক্তি, উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনা। এ আস্থা তৈরি করা যাতে তারা মনে করতে পারে যে এটিই আমার দেশ, এখানে আমার সব অধিকার আছে এবং আমি নিরাপদ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থেই এটি করতে হবে।’
নারায়ণমূর্তি বলেন, ‘গত ৩০০ বছরের উন্নয়নের উপাত্ত আমাকে বলছে, কোনো সরকারই জনগণের মনে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাহীনতা বজায় রেখে গতিশীল উন্নয়ন করতে পারেনি। দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় যদি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালায়, তবে সেখানে উন্নয়ন নিশ্চিত হতে পারে না।’

সাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে বেগ দেবে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র!

দক্ষিণ চীন সাগরে গত আগস্টে মহড়ায় অংশ নেওয়া চীনের
একটি অত্যাধুনিক ডুবোজাহাজl এএফপির ফাইল ছবি
দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ অংশে চীনের তৈরি কৃত্রিম দ্বীপের কাছ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস লাসেন অতিক্রম করার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মনে করা হচ্ছে, ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য চীনের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াইজে-১৮ দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কাজ কঠিন করে তুলবে। খবর এনডিটিভির।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীনের অত্যাধুনিক এই ক্ষেপণাস্ত্রের কথা জানতে পারে কংগ্রেসে উপস্থাপন করা একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের ওই প্রতিবেদন গত ২৮ অক্টোবর তুলে ধরা হয়।
ওয়াইজে-১৮ ক্ষেপণাস্ত্র সাগরপৃষ্ঠের মাত্র কয়েক মিটার ওপর দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৬০০ মাইল গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটতে পারে। লক্ষ্যবস্তুর ২০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে পৌঁছে এটি শব্দের গতির (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৭৬৮ মাইল) তিন গুণ পর্যন্ত বেশি গতি পেতে সক্ষম হয়।
রিভিউ কমিশনের সদস্য ল্যারি উরৎজেল বলেন, শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির হওয়ায় ওয়াইজে-১৮ ক্ষেপণাস্ত্রকে জাহাজ থেকে গুলি করাও কঠিন। এই গতির কারণেই একে রাডারেও ধরা কঠিন।

সহিষ্ণুতার আহ্বান ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতি-বিষয়ক বিশ্লেষক সংস্থা মুডিজ অ্যানালিটিকসের সতর্কবার্তার পরের দিনই ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে ফের সরব হলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। একই সঙ্গে একতা, অখণ্ডতা, শান্তি ও সদ্ভাবনার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এত দিন ধরে একনাগাড়ে অসহিষ্ণুতার যে আবহ দেশে সৃষ্টি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর রঘুরাম রাজন, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কৈলাস সত্যার্থীও।
মুডিজের সতর্কবার্তা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে দেওয়া। সেই বার্তায় তারা বলেছে, দলের নেতাদের সামলান, না হলে দেশ ও বিদেশে আপনি ও আপনার সরকার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। গতি হারাবে প্রবৃদ্ধির হার। এই হুঁশিয়ারির ঠিক পরের দিনই রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি আরও একবার দেশের বহুত্ববাদী বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্র রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
গতকাল শনিবার দিল্লি হাইকোর্টের সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাদের দেশ যে এগিয়ে চলেছে তা “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে”র জন্য। পরমতসহিষ্ণুতার কারণে আমাদের বহুত্ববাদী সমাজ কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ভারতের প্রাচীন সভ্যতা শত শত বছর ধরে আমাদের বৈপরীত্যকে আগলে রাখতে শিখিয়েছে।’
গতকাল ছিল স্বাধীন ভারতের লৌহপুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মদিন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণ দিবস। এই উপলক্ষে রাজধানীর রাজপথে রাষ্ট্রীয় একতা দিবস উদ্যাপিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি, দেশকে নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করার প্রধান শর্ত একতা, শান্তি ও সদ্ভাবনা বজায় রাখা।’
মুডিজের সতর্কবার্তার রেশ টেনেই অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সরব হন রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর রঘুরাম রাজন। দিল্লি আইআইটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা জারি করে লাভ হয় না। তা আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। মানুষ মতামত দিতে ভয় পায়। দরকার এমন এক আবহ তৈরি করা, যেখানে একে অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেন, মর্যাদা দেন, সহিষ্ণুতার পরিচয় দেন। রাজন বলেন, দ্রুত উন্নতির জন্য মানুষকে প্রশ্ন করার অধিকার দিতে হবে। মানুষকে অপমান করার নেশাকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে পরে রাশ টেনে ধরাটা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৈলাস সত্যার্থীও একই সুরে বলেছেন, অসহিষ্ণুতা শুধু অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। মুডিজ মনে করছে, অসহিষ্ণুতার কারণে ভারতের প্রবৃদ্ধি হোঁচট খাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংস্কারে প্রয়োজনীয় বিলগুলো পাস করানো যাচ্ছে না। নতুন সরকারকে ঘিরে গগনচুম্বী প্রত্যাশায় শেয়ার সূচক যেখানে উঠে গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ১১ শতাংশ পড়ে গেছে।

পিতার লাশ রেখেই পরীক্ষা কেন্দ্রে রিদাত

পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রিদাত ফারহান। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কলম-পেন্সিল আর প্রবেশপত্র নিয়ে রওনা হবে জীবনের দ্বিতীয় পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্রে। সঙ্গে নিয়ে যাবে ছায়াসম পিতার দোয়া। কে জানতো জীবনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাকে শুনতে হবে সেই পিতারই মৃত্যুর খবর। এ যেনো পুরো আকাশসম যন্ত্রণা ঘিরে ফেলে রিদাতকে। তবু থেমে থাকেনি সে। এই যন্ত্রণা বুকে নিয়েই পরীক্ষার হলে গেল রিদাত। আর ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই প্রিয় বাবাকে চিরতরে বিদায় জানালো সে। শনিবার বিকালে রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় লেখক ও প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপনকে। বাবা-মা ও স্ত্রী ছাড়া দীপন স্মৃতি হিসেবে রেখে যান দুই সন্তান। এর মধ্যে মেয়ে হৃদমা ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। ছেলে রিদাত উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। গতকাল বাবার শেষ বিদায়ের দিন ছিল যার জেএসসি পরীক্ষা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, খুন হওয়ার কিছুক্ষণ আগে বেলা দেড়টার দিকে রিদাতের সঙ্গে শেষ কথা হয় দীপনের। তখন আজিজ সুপার মার্কেটেই ছিলেন দীপন। তিনি ছেলের পরীক্ষার প্রস্তুতির খোঁজ-খবর নেন। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। বাবার সঙ্গে কথা শেষ করে প্রথম পরীক্ষা বাংলা প্রথমপত্রের জন্য সর্বশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল রিদাত। ঠিক এমন একটি সময়ে একটি খবরে তার পুরো পৃথিবী যেনো অন্ধকারে ঢাকা পড়ে। রিদাতের একজন আত্মীয় জানান, ওই সময়ে বাবার জন্য হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠেন রিদাত ও হৃদমা। কিছুক্ষণ পরে পুরো নিস্তব্ধ হয়ে যায় রিদাত।
নিহত দীপন তার স্ত্রী রাজিয়া রহমান ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক কোয়ার্টার ‘প্রফুল্ল’ ভবনের ৬ষ্ঠ ফ্লোরে। রাজিয়া রহমান ওই হলের সিনিয়র চিকিৎসক। সেই সূত্রেই তাদের এই বাসা বরাদ্দ পাওয়া। ওই বাসাতেই একে একে সকল আত্মীয় স্বজন জড়ো হতে থাকেন। দীপনের মৃত্যুর খবরে সবাই যেমন শোকাহত, তেমনি চিন্তিত পরীক্ষার্থী রিদাতকে নিয়ে। সবাই রিদাতের মনে সাহস জোগানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। তাকে আলাদা একটি রুম দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে বললেন মা রাজিয়া রহমান। তার ভাষ্য, একটি বছর লস দেয়া ঠিক হবে না। রিদাতও ছিল পরীক্ষার ব্যাপারে  কিছুটা আত্ম-প্রত্যয়ী।
শোকার্ত ওই বাসায় সবার রাত যখন কেটেছে নির্ঘুমভাবে, তখন রিদাতকে নিরিবিল ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। কে জানে, হয়তো সেও না ঘুমিয়ে বাবার জন্য ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। সকাল বেলা রিদাতের মা ও সকল আত্মীয়স্বজন তাকে সান্ত্বনা দেন।  পরীক্ষার জন্য জামা-কাপড় পরে প্রস্তুত হতে বলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টার পরেই প্রাইভেটকারে রিদাতকে আজিমপুর পরীক্ষার হলে নিয়ে যায় তার এক আত্মীয়। এদিকে, বেলা পৌনে ১২টায় দীপনের লাশ নিয়ে আসা হয় সুফিয়া কামাল হলে। বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে বাবার লাশ বের করে নেয়ার সময় উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠে মেয়ে হৃদমা। এক আত্মীয় এসে তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। বেলা ১টার মধ্যেই জানাজার জন্য লাশ নিয়ে আসা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে। বেলা দেড়টার পরে স্কুলের ইউনিফর্ম পরিহিত রিদাতকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় মসজিদে। তখন তার মাথায় ছিলো একটি সাদা টুপি। বেলা পৌনে দুইটায় অনুষ্ঠিত হয় রিদাতের বাবার জানাজা।  জানাজা শেষে বাবার কফিনের পিছু পিছু আজিমপুর কবরস্থানে আসে রিদাত। পৌনে ৩টায় বাবার কবরে নিজ হাতে মাটি দিয়ে বাবাকে শেষ বিদায় জানায় সে।

দেশ বিভক্ত বলেই দুই পক্ষকে কবরস্থানে যেতে হচ্ছে -প্রকাশক হত্যায় বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া by মেহেদী হাসান

প্রতিবাদের নতুন ভাষা- ‘আমি বিচার চাই না’। শনিবারের হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হকের এ উক্তিই এখন প্রতিবাদের নতুন স্লোগান হয়ে ফিরছে মানুষের মুখে মুখে। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে একজন পিতা বলতে পারেন তিনি তার সন্তান হত্যার বিচার চান না তা দায়িত্বশীল সবার প্রতি অনুধাবনের অনুরোধ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা। অতি রাজনীতি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নীতি পরিহার করে জাতীয়ভাবে সমস্যা মোকাবেলার উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তা না হলে জাতিকে বড় আকারে এর খেসারত দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সাবেক প্রফেসর, সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ঘটনার পর অতি রাজনীতি করা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে আসল ব্যাপার চাপা পড়ে গেছে। অতীতে এ ধরনের কোনো ঘটনার সুরাহা হয়নি। পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে আজ এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশ নিয়ে ছেলেখেলা করা যায় না। দেশকে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। কিন্তু তার কোনো কিছু লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং মানুষে মানুষে দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টা চলছে শুধু। এটা আমাদের কারোর জন্যই শুভ নয়।
প্রকাশক দীপন হত্যার পর দার্শনিক ও কবি ফরহাদ মজহার লিখিত আকারে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, জাগৃতি প্রকাশনার দীপনসহ শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল ও অন্য দুই লেখক সুদীপ কুমার ও তারেক রহিমের খবর পেয়ে পাথর হয়ে আছি। দীপনের বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় প দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পরে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
অবিশ্বাস্য শোক মাথায় নিয়ে আবুল কাশেম ফজলুল হক এই কথাটা স্পষ্টভাবে বলতে পেরেছেন।
আমরা দেশকে বিভক্ত করে দিয়েছি। আমরা দুই পই আমাদের সন্তানদের হারাতে থাকব। আমরা কাঁদতে ভুলে যাব। নিজ সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে গোরস্থানের দিকে যাব আর সন্তানের রক্তে আমাদের শরীর ভিজে যাবে।
কে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সেকুলার মুক্ত বুদ্ধিওয়ালা আর কে ধর্মান্ধ বা ইসলামি জঙ্গি গোরস্থান তার বিচার করে না। শুধু কবরের ওপর ঘাস গজায়, আর একদা ঐতিহাসিকেরা গবেষণা করতে বসেন কিভাবে একটি জাতি তাদের বেকুবির জন্য ধ্বংস হয়ে গেলো।
যেহেতু আমরা মৃত্যু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই, তাই জীবনের কোনো মূল্য আমরা দিতে জানি না। আমি দেখছি, বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশে দুই দিক থেকে দুটো মিছিল গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। দীপন, আমি প্রাণপণ এই বিভক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। এই ভয়াবহ বিভাজনের পরিণতি সম্পর্কে আমি জানপরান সবাইকে হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করে যাব। কিন্তু তাতে কি যারা চলে গেছে তারা ফিরে আসবে?
ফরহাদ মজহার লিখেছেন, এই লাশের ভার অনেক ভারী, বাংলাদেশ বহন করতে পারবে কি? সেই দূরদর্শিতা ও বিচণতার চর্চা আমরা করি না, যা আমাদের গোরস্থানের দিকে নয়, সপ্রতিভ জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কে জাগে?
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন উঁচু স্তরের গুণী মানুষ। তার মতো লোক যখন বলেন, বিচার চাই না তখন আমরা বুঝতে পারি কতটা ক্ষোভ, দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে তিনি এ ধরনের কথা বলেন। কোনো ধরনের ব্যবস্থার প্রতি যখন আর কারোর কোনো বিশ্বাস থাকে না, আস্থা থাকে না তখনই মানুষ এ ধরনের কথা বলেন। তার এ কথার মধ্য দিয়ে সব কিছু স্পষ্ট। সব কথাই তিনি বলে দিয়েছেন। এটাই সবার কথা এখন।
তিনি বলেন, একের পর এক হত্যার পর আমরা শুধু রাজনৈতিক কথাবার্তা শুনে আসছি। দোষারোপের রাজনীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এ ছাড়া আর কিছু হয় না। কথায় কথায় জঙ্গিবাদ মৌলবাদ বলা হচ্ছে। এর পরিণতি ভালো হতে পারে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর আসিফ নজরুল প্রকাশক ও ব্লগার হত্যা বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, সার্বিক অবস্থার কতটা ধস নেমেছে তার প্রমাণ এটা। সন্তান হত্যার পর পিতা বলছেনÑ তিনি বিচার চান না। এর আগে আরেকজন বলেছেন, তিনি তার স্বামী হত্যার বিচার চান না। একজন প্রকাশক, যিনি নিজে লিখছেন না, অন্যের লেখা প্রকাশের কারণে তাকেও হত্যা করা হচ্ছে। দেশে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব চলছে। মানুষের মন থেকে বিশ্বাস ও আস্থা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। এ অবস্থায় একটি জাতি চলতে পারে না। পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেলে একজন মানুষ বলতে পারেন তিনি বিচার চান না তা অনুধাবন করা উচিত দায়িত্বশীল সবার।
প্রফেসর আসিফ নজরুল বলেন, সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে একের পর এক এ ধররের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রাজনীতি থাকতে পারে, সরকার হয়তো রাজনৈতিক ফায়দাও নিতে পারে কিন্তু সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে কিন্তু এর কোনো বিচার হচ্ছে না। প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ছে না। অনেক ঘটনায় অনেককে ধরে আমাদের সামনে হাজির করা হচ্ছে কিন্তু তারা আসল অপরাধী কিনা তা জানা যাচ্ছে না। কিছুদিন পর আর কোনো খোঁজখবর থাকে না। ফলে সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের সন্দেহ দানা বাঁধছে। মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফল অত্যন্ত খারাপ হতে বাধ্য। প্রফেসর আবুল কাসেম বিচার চাই না মর্মে যে উক্তি করেছেন তারপরও যদি কর্তৃপক্ষের টনক না নড়ে তাহলে সামনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একজন লিখেছেন, কে কার কাছে কিসের প্রতিবাদ করবে? কে কার কাছে কিসের বিচার চাইবে? কে চিহ্নিত করবে আততায়ীকে? রক্তের এই স্রোত, মৃত্যুর এই ধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? কতটা অন্ধকার নামলে আমরা বুঝব যে আলো নেই? কে জেগে আছে এই রাত্রির গুহায়? জীবনের এই অপচয়, এই অপঘাত, এই মৃত্যু, এই রক্তের স্রোত কি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাবেÑ আমি কী ভূমিকা পালন করেছিলাম?
একের পর এক হত্যা, ধর্ষণসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতা। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শনিবারের হামলায় আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বলেছেন, গোপন-অতর্কিত হামলা থেকে কেউই নিরাপদ নয়, আমিও নই। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পরিকল্পিত কিলিং মিশন প্রতিরোধ ঠেকানো সহজ নয়। অনেকে প্রশ্ন করেছেনÑ এ যদি হয় অবস্থা তাহলে সাধারণ মানুষের আর থাকল কী?
২০১৩ সালে নিহত হন ব্লগার রাজীব হায়দার। এরপর চলতি বছরই হত্যা করা হয় চারজন ব্লগারকে। সর্বশেষ গতকাল হত্যা করা হলো নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায়ের লেখার প্রকাশক ফয়সাল আরফিন দীপনকে।

চলমান পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহবান বিএনপির

একের পর এক ব্লগার-প্রকাশক হত্যাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ।
সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারি ফয়সল আরেফিন দীপনের শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা জানানোর পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি এই আহবান জানান।
হাফিজ উদ্দিন বলেন, এ ধরনের একটি পরিস্থিতিকে সরকার বিরোধী দল নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল মিলে আমরা প্রতিরোধ করতে চাই। আমরা সবাই মিলে এই ঘটনার নিন্দা জানাতে চাই, এর প্রতিবিধান ঘটাতে চাই।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সরকারকে পরামর্শ দেবো- তারা যেন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে এবং এসব ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে ঘটনাকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যান। দোষীদের যেন শাস্তির বিধান করা হয়।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাফিজউদ্দিন আহমেদ দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের বাসায় যান। শোকাহত বাবার পাশে বসে সান্ত্বনা জানান তিনি। এ সময়ে দলের সহ দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান ও চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।
ছেলের নিহত হওয়ার ঘটনায় বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বিএনপি নেতাকে বলেন, এধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। এজন্য সব দলই দায়ী। আমি বলেছি, আমি বিচার চাই না, শুভবুদ্ধির উদয় হউক। শুভবুদ্ধি বাদ দিয়ে বিচার দিয়ে কোনো ফল হয় না। জেল দিয়ে ফাঁসি দিয়ে কোনো প্রতিকার হবে না। দরকার শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া।
তিনি বলেন, আমি দেখছি, শুভ বুদ্ধির অভাব। এই ধারায় বিচারে কোনো সমাধান আসবে না। এটা রাগ ও ক্ষোভ থেকে বলছি না।
এ সময়ে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হকও উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ফজলুল হক জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরের অনুরোধে ছেলে হত্যার বিষয়টি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালযের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি দরখাস্ত করবেন।
পরে সাংবাদিকদের কাছে হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির পক্ষ থেকে শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা জানাতে এসেছি। তাদেরকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আমার নেই। মৃত ব্যক্তির পিতা আবুল কাশেম দেশের একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ। তিনি ধীর স্থিরভাবে বিজ্ঞব্যক্তির মতো এ শোককে মোকাবিলা করছেন। আমরা দীপন হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যার নিন্দা জানাই। বাংলাদেশে ভবিষ্যতে যেন এ ধরণের ঘটনা না ঘটে এটাই আমরা কামনা করি।
দীপন হত্যার দায় সরকার এড়াতে পারে না মন্তব্য করে সাবেক মন্ত্রী হাফিজ বলেন, দেশে চলছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সরকারের পুলিশ বাহিনী সন্ত্রাসীদের না খুঁজে গণতন্ত্রকামী লড়াকু মানুষদের খুঁজে বেড়ায় যারা জনগনের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে।
তিনি বলেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলকে নির্যাতন করা এটা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেকারণে এই অপরাধীরা একের পর এক পার পেয়ে যাচ্ছে।
দেশে গণতন্ত্র না থাকার কারণে ‘ধর্মান্ধ’ ব্যক্তিরা নানা ঘটনা ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আজকে যদি একটি নির্বাচিত সরকার থাকতো, দেশে গণতন্ত্র থাকতো, মুক্তবুদ্ধির চর্চার থাকতো তাহলে এ ধরণের হত্যাকাণ্ড অনেকাংশের কমে যেতো।
অবিলম্বে দীপন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান হাফিজউদ্দিন।
নিহত ফয়সল আরেফিন দীপন বাংলার অধ্যাপক ও লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে।

দীপন হত্যায় অংশ নেয় প্রশিক্ষিত দুর্বৃত্তরা- গোয়েন্দাদের সন্দেহ নেপথ্যে আনসারউল্লাহ বাংলা টিম by শহিদুল ইসলাম রাজী

নিহত ফয়সাল আরেফিন দীপনের লাশ জড়িয়ে ধরে
নির্বাক স্ত্রী ডা: রাজিয়া রহমান : নয়া দিগন্ত
দুপুর ১২টা ছুঁই ছুঁই। কাফনের কাপড়ে মোড়ানো ফয়সাল আরেফিন দীপনের লাশ। শেষ বিদায় জানাতে তখন বহু মানুষের ভিড়। এক দিন আগেও যে মানুষটি বাসা থেকে বের হয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে গিয়েছিলেন, তিনি স্বজনদের মাঝে ফিরলেন লাশ হয়ে। দীপনের নিথর দেহ ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। দৃশ্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের শিক কোয়ার্টারের সামনে। যখন দীপনকে চোখের জলে শেষ বিদায় জানাচ্ছিলেন স্বজনরা তখন তার বড় ছেলে রিদাদ পরীক্ষার হলে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। কোয়ার্টারের সামনে লাশ আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসেন দীপনের স্ত্রী রাজিয়া। তার বুকফাটা চিৎকার আর স্বজনদের চোখের জলে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। এর কিছুক্ষণ পরই লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে নামাজে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দীপনকে দাফন করা হয়। এ সময় পরীক্ষার হল থেকে সোজা বাবার নামাজে জানাজায় অংশ নিতে ছুটে আসে দীপনের বড় ছেলে রিদাদ। তবে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ হত্যার নেপথ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে সন্দেহ করছে গোয়েন্দারা।
পুলিশ বলছে, এর আগে ব্লগার রাজীব হায়দার, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয়, নীলাদ্রী নিলয়, অভিজিৎ ভট্টাচার্য হত্যাকাণ্ড ও আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যা চেষ্টার প্রতিটি ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত আনসারউল্লাহ বাংলাটিমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সবকটি ঘটনায় হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক কোপে হত্যা বা হত্যা চেষ্টা করেছে। গোয়েন্দারা বলছেন, আগের ব্লগার হত্যার ঘটনার ধরন ও দীপনকে হত্যা ও শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে হামলার ধরন একই। এ ছাড়া আগেকার ঘটনায় আনসার আল বাংলা, কখনো আনসার আল বাংলা সেভেন, কখনো বা আনসার আল বাংলা ফোর দায় স্বীকার করে। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে আসে আনসারউল্লাহ বাংলাটিমের নাম। এ জন্য পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, প্রকাশক হত্যার ঘটনাও অভিন্ন। হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছেও ঠিক একই সময়ে। ঘাতকেরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে হামলা করলেও নেপথ্যে কাজ করেছেন একই হুকুমদাতা। আর হামলাকারীরাও প্রশিক্ষিত। তবে লালমাটিয়ায় হত্যার মূল টার্গেট ছিল শুদ্ধস্বর প্রকাশনের মালিক আহমেদুর রশীদ টুটুল। তারেক রহিম ও রণদীপম বসু হয়তো ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কারণে হামলার শিকার হয়েছেন।
এ দিকে দীপনের হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে আজিজ সুপার মার্কেটের কোজসার্কিট ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজ সংরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এসব ফুটেজ এখনো পুলিশ জব্দ না করলেও তা পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হেফাজতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহীন ফকির। তিনি বলেন, যেহেতু দীপনের পরিবারের প থেকে এখনো এফআইআর করা হয়নি, সেহেতু ঘটনাস্থল থেকে কোনো আলামত তারা জব্দ করেননি। তবে যেসব জিনিস জব্দ করা হবে তা চিহ্নিত করা হয়েছে। দীপনের পরিবারের প থেকে জানানো হয়েছে যে, দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তারা মামলা বা এফআইআরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিবারের প থেকে মামলা বা এফআইআর করার পরই ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে পুলিশের হেফাজতে আনা হবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, দুই প্রকাশনা কার্যালয়ে হামলা কোনো সাধারণ ক্রাইম নয়। প্রশিক্ষিত তবে অপেশাদার কিলারেরা একই ছাতার নিচে থেকে পরিকল্পিতভাবে দু’টি ঘটনা ঘটিয়েছে। চাপাতি দিয়ে কোপানোর আলামত ও বিভিন্নভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের কাজ। তবে অন্য কোনো হত্যাকাণ্ডের সাথে এ দু’টি ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মনিরুল ইসলাম বলেন, লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয় থেকে পিস্তলের দু’টি তাজা গুলি ও একটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো দেশীয় পিস্তলের গুলি। আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা সাধারণত ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে; কিন্তু আত্মরক্ষার্থে তারা পিস্তলও সাথে রাখে। লালমাটিয়ার ঘটনায় কোনো ধরনের বাধা এসেছে মনে করেই হয়তো তারা গুলি চালিয়েছে। তবে তাজা বুলেট উদ্ধারের ঘটনায় হামলাকারীদের অপেশাদার মনে করছেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশীদ টুটুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পর পুলিশ তার হুমকির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছে। তিনি যখন নিরাপত্তা চেয়েছেন, নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। তবে আরো কোনো ব্লগার নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে পুলিশকে জানাতে পারেন। পুলিশও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি দেখছে। তিনি বলেন, পুলিশে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গঠন করা হলে এমন হামলার ঘটনা কমে আসবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম জানান, অভিজিৎ রায় হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের টিম এসে পুলিশের কাছ থেকে মামলার ১১ ধরনের আলামত নিয়েছিল। কিন্তু এখনো এসব আলামত পরীক্ষার ফলাফল আসেনি। মামলার তদন্তে তাদের সহায়তাও পাওয়া যায়নি।
গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে তৃতীয়তলার অফিসে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে বাইর থেকে দরজা বন্ধ করে চালে যায় দুর্বৃত্তরা। ওই দিন বেলা দেড়টায় শোরুমের সামনে থেকে তৃতীয়তলার অফিসে যান দীপন। বিকেল সাড়ে ৫টায় জাগৃতি প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আলাউদ্দিন অফিসে গিয়ে দেখেন কক্ষের লাইট ফ্যান বন্ধ। ভেতরে কোনো সারা শব্দ নেই। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখেন দরজাও আটকানো। বিষয়টি তার সন্দেহ হলে তিনি দরজার নিচে থেকে চেয়ে দেখেন রক্ত গড়িয়ে আসছে। এর পরপরই মার্কেট কমিটির সাধারণ সম্পাদককে ফোন করেন তিনি। পরে মার্কেট কমিটির লোকজন ও দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মিলে অফিসের দরজা ভেঙে দেখেন মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে দীপনের নিথর দেহ। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
মাথা ও ঘাড়ে চারটি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন : ফয়সল আরেফিন দীপনের মাথা ও ঘাড়ের সংযোগস্থলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে চারটি কোপ দেয় দুর্বৃত্তরা। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু। ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর গতকাল বেলা ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডা: কাজী মুহাম্মদ আবু শামা এ কথা জানান। এর আগে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে দীপনের লাশের ময়নাতদন্ত শুরু হয়। ৩৫ মিনিটে ময়নাতদন্ত শেষ করেন ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস।
ডা: কাজী মুহাম্মদ আবু শামা বলেন, মাথা ও ঘাড়ে চারটি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এখানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দুর্বৃত্তরা। এতে প্রচণ্ড রক্তরণের কারণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে খুনিরা প্রশিক্ষিত।
তিনি বলেন, ঘাড়ের পেছনের দিকে একটি বড় আঘাত করা হয়েছে, যেটি ছিল ১১ ইঞ্চি লম্বা, দুই ইঞ্চি চওড়া ও চার ইঞ্চি গভীর। এটি খুবই গুরুতর। ভারী ধারালো অস্ত্রের উপর্যুপরি কোপের মাধ্যমে একটি মারাত্মক গর্তের মতো করে মাথাটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সেখানে মেরুদণ্ডসহ মাথায় রক্ত সরবরাহকারী ব্লাড ভেসেল (রক্তনালি) সবই কেটে যায়। মাথার সামনের দিকে আরেকটি কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রত্যেক কোপেই হাড় কেটে যায়। এমনকি মাথার ভেতরে ব্রেন হেমারেজ (মস্তিষ্কে রক্তরণ) পাই আমরা।
দাফন সম্পন্ন : গতকাল বেলা ২টা ৪২ মিনিটে আজিমপুর কবরস্থানে ফয়সাল আরেফিন দীপনের দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও লেখক, প্রকাশক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক-শিার্থীরা এবং আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন। এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় ফয়সাল আরেফিন দীপনের লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লাশ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্সে (ঢাকা মেট্রো ছ-৭১-১১৩৩) লাশ বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় নিহত দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, শ্বশুর ডা: জালালুর রহমান ও বন্ধু আজিজুল ইসলাম ওয়ালি লাশ গ্রহণ করেন।

দীপনের বাবা হয়তো হত্যাকারীদের ‘মতাদর্শে’ বিশ্বাসী, বললেন হানিফ

নিহত প্রকাশক ফয়সালের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক খুনিদের রাজনৈতিক ‘মতাদর্শে’ বিশ্বাসী বলেই ছেলে হত্যার বিচার চান না বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। একজন বাবা হিসেবে অধ্যাপক ফজলুল হকের বক্তব্যে তিনি নিজেও লজ্জিত বলে মন্তব্য করেন হানিফ।
‘আমি কোনো বিচার চাই না’—জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা আবুল কাশেম ফজলুল হকের এমন মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকেরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এসব কথা বলেন হানিফ। আগামীকাল সোমবার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের জনসভা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রস্তুতি দেখতে আজ রোববার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যান হানিফ। সেখানেই সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘উনি পুত্র হত্যার বিচার চান না। হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক। আমি অবাক হয়েছি। আমার মনে হয়, যারা এই খবরটি পড়েছেন সবাই অবাক হয়েছেন। একজন পুত্রহারা পিতা সন্তানের হত্যার বিচার চায় না, এটা বাংলাদেশে প্রথম। পৃথিবীতেও এমনটা আমি দেখি নাই। এটার কারণ একটাই হতে পারে, যারা তাঁর পুত্রকে হত্যা করেছে, অধ্যাপক সাহেব হয়তো তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। ওনার দলের লোকজনদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না বলেই উনি এ ধরনের কথা বলেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। আমিও একজন বাবা। বাবা হিসেবে আমি নিজেও তাঁর এই বক্তব্যে লজ্জিত।’
সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, ‘দু-একটি ঘটনায় সরকার বিব্রত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে তো বহু আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিব্রত হয়ে যেত। ওখানে তো বহু ঘটনা ঘটেছে। এটা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আমরা সব সময় বলে এসেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে একাত্তরে পরাজিত শক্তিরা এ সব কাজ করছে। সরকার আর যাই করুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে সমঝোতা করতে পারে না।’
আওয়ামী লীগের সমাবেশে নাশকতার আশঙ্কার বিষয়ে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, ‘আমরা কোনো শঙ্কা প্রকাশ করছি না। আজকে যারা ব্লগার বা মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যা করছে এগুলোর সবকিছু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এ সময় ত্রাণমন্ত্রী ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুছ ছাত্তার, অসীম কুমার উকিল প্রমুখ হানিফের সঙ্গে ছিলেন।
হানিফের ব্যাখ্যা: মাহবুব উল আলম হানিফের বক্তব্য অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার পর সোয়া ১০টার দিকে তিনি টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘তাঁর দেওয়া বক্তব্যে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি তাঁর দেওয়া বক্তব্যে বোঝাতে চেয়েছেন ‘আমি কোনো বিচার চাই না’ আবুল কাশেম ফজলুল হকের এই মন্তব্যে তাঁর ছেলে দীপনের খুনিরাই বরং উৎসাহিত হবে।

রুশ বিমান বিধ্বস্ত: আইএসের দাবি নাকচ

রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা-সংক্রান্ত জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দাবি নাকচ করেছে মিসর। আজ রোববার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
মিসরের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সিনাই উপত্যকার পাহাড়ি এলাকায় গতকাল শনিবার রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকতে পারে।
মিসরে আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি জঙ্গিগোষ্ঠী এক টুইটার বার্তায় ওই বিমানটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে। এই দাবি নাকচ করে মিসরের প্রধানমন্ত্রী শরিফ ইসমাইল বলেন, কোগালিমাভিয়া এয়ারলাইনসের ভাড়া করা এয়ারবাসটি (এ-৩২১) যে উচ্চতা দিয়ে উড়ছিল, তাতে সেটিকে ভূপাতিত করা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন।
রাশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ম্যাকসিম সকলভ বলেছেন, আইএসের দাবি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিমানটিকে যে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ মেলেনি।
বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ আরোহী নিহত হওয়ার ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানটির ‘ব্ল্যাকবক্স’ বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে।
মিসরের নেতৃত্বাধীন তদন্তে রাশিয়া ও ফ্রান্সের তদন্তকারীরা যোগ দিয়েছেন।
কোগালিমাভিয়া এয়ারলাইনসের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় করা ফৌজদারি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ।
এদিকে এমিরেটাস, এয়ার ফ্রান্স ও লুফথানসা বিমান সংস্থা জানিয়েছে, ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সিনাই উপত্যকার ওপর দিয়ে বিমান না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাশিয়ার বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানান, এয়ারবাসটি সিনাইয়ের দক্ষিণের শারম আল-শেখ থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৫টা ৫১ মিনিটে উড্ডয়ন করে। গন্তব্য ছিল রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গ। সিনাই উপত্যকার প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে বিধ্বস্ত হওয়ার ২৩ মিনিট আগে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানটিতে যাত্রী ছিলেন ২১৭ জন।
এর মধ্যে ১৩৮ জন নারী ও ১৭ জন শিশু। যাত্রীদের বেশির ভাগ পর্যটক। বিমানটিতে ক্রু ছিলেন সাতজন।
রুশ কর্মকর্তারা জানান, বিমানের ২১৭ যাত্রীর মধ্যে ২১৪ জনই রাশিয়ার নাগরিক। বাকি তিনজন ইউক্রেনের।
বিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির ঘটনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আজ শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
মিসরের সিনাই উপত্যকায় বিধ্বস্ত রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখছেন মিসরের প্রধানমন্ত্রী শরিফ ইসমাইল। ছবিটি গতকাল শনিবার তোলা। ছবি: রয়টার্স