Saturday, September 21, 2013

গণতান্ত্রিক সমাজে রক্তাক্ত বিপ্লব কি কাম্য? by ফরহাদ মজহার

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম(অব.)
ট্রটক্সি একবার বলেছিলেন, বিপ্লব দারিদ্র্যের কারণে সংঘটিত হয়। সহস্র লোক রাস্তায় নেমে তাদের পুঞ্জীভূত বেদনা প্রকাশ করলে এবং যোগ্য কাজের সন্ধান বা পাত্তা না পেলে তারা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। গুলির সামনে থেকে পালিয়ে অন্যত্র আহার-বাসস্থানের সামান্য সম্ভাবনাও যদি না থাকে, তবে তারা গুলির সামনে দাঁড়াতে কুণ্ঠিত হয় না। আর গুলিবর্ষণকারী একসময় হতচকিত হয়। কতজনকে আর গুলি করা যায়! তার অবচেতন মনে একসময় প্রশ্ন জাগে- কার জন্য সে গুলি ছুড়ছে? প্রশ্ন জাগে গুলি ছোড়ার যৌক্তিকতা নিয়েও। ফলে দেখা যায়, প্রশাসন একসময় হাত গুটিয়ে বসে পড়ে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের দাবিতে রাজপথ প্রকম্পিত হওয়ার পর ঠিক এ অবস্থাই হয়েছিল। ইরানে রেজা শাহ পাহলভির সময়ে তার সিক্রেট পুলিশ দ্বারা মানুষ গুম করা শুরু হলে বিদেশ থেকে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে ইরানে ব্যাপক বিদ্রোহ ও আন্দোলনের কারণ শাহের গোপন পুলিশ বাহিনীর কার্যকলাপ। আবার ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায় সবজি বিক্রেতাদের আন্দোলন যেভাবে বিস্তৃত হয়েছিল, তাও ধারণার অতীত। অন্যদিকে আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে গড়ে তোলার নজির স্থাপিত হয়েছিল বেইজিংয়ের তিয়েনানমেন স্কয়ার দখলের মধ্য দিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় মিসরের তাহরির স্কয়ার ও তুরস্কের তাকসিম স্কয়ারে একই ঘটনা ঘটতে দেখা গেল। ইরানে ১৯৭৯ সালে শাহের শাসন অবসানের লক্ষ্যে আয়াতুল্লাহ্ খোমেনির নেতৃত্বে আন্দোলনে ৪৪৮ দিনে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তাদের এ আত্মত্যাগের ফলে রাজতন্ত্রের বিলোপ ঘটে। ঠিক ১০ বছর পর ১৯৮৯ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনানমেন স্কয়ারে ৫১ দিন ধরে অবস্থান করে ৩ হাজার মানুষ জীবনদান করলেও তাদের দুর্নীতিবিরোধী সে আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর দুষ্টু সরকারের (ঙঢ়ঢ়ৎবংংরাব ৎবমরসব) বিরুদ্ধে ১০ দিনের অন্দোলনে আনুমানিক ১ হাজার মানুষ নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। আন্দোলন সার্থক হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০৪ সালে ইউক্রেনে ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট বেন আলীর বিরুদ্ধে ৩০ দিনের আন্দোলন ১৪৭ জন মানুষের আÍত্যাগের মধ্য দিয়ে সফল হয়। ২০১১ সালে মিসরে ১৮ দিনের আন্দোলনে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হোসনি মোবারকের শাসনাবসান ঘটে।
মানুষ সাধারণত পরিবর্তনের প্রত্যাশী। বিদ্যমান বা চলমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে (অ্যান্টি ইনকামবেন্সি) তাদের অবস্থান নেয়াটা তাই অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। মানুষ সহজেই এতে আকৃষ্ট হয় এবং ‘আমরা পরিবর্তন চাই’ বলতে পাগল হয়। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। রাজনীতি বিষয়ের পণ্ডিতরা মনে করেন, যে সরকার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে এবং কোথায় কোথায় বিদ্রোহ বা আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে তা আগেই আঁচ করতে পারে, সে সরকারের পক্ষে আন্দোলন দমন করা সহজ। এরিক সেলবিনের বই ‘রেভোল্যুশন, রিবেলিয়ন, রেজিস্ট্যান্স’ এ বক্তব্য সমর্থন করে। আগের একটি লেখায় আমি বলেছিলাম, বিপ্লব বা বিদ্রোহ একদিনে সংঘটিত হয় না। পুঞ্জীভূত বেদনা ও বঞ্চনার বিষয়গুলো যদি সহানুভূতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দেখা না হয়, তাহলেই বিপদ। আর অঞ্চলে অঞ্চলে বিভেদ, নাগরিকে নাগরিকে বিভেদ এবং বিশেষ শ্রেণী বা পেশার মানুষকে অধিকতর সুযোগদান পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি হল আইনের শাসনের অভাব। এর ফলে জঙ্গলের শাসন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আশার কথা, ইদানীং শ্রীলংকায় ইমারজেন্সি সমস্যার সমাধানে, নেপালে মাওবাদীদের ক্ষমতায় আসা ও সহিংসতা পরিত্যাগে, ভুটানে জাতীয় জীবনে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসে’র প্রসারে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কঠিন পথ পাড়ি দেয়ার মাধ্যমে এ ধরনের সহিংস ঘটনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে সন্ত্রাসী গ্র“পগুলোর অস্ত্র পাচারের ঘটনা। উল্লেখ্য, অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনা সাধারণত মাদকের বিনিময়ে ঘটে থাকে।
ভারতের পশ্চাৎপদ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোয় নিুবর্ণদের প্রতি অবহেলা, শিক্ষা ক্ষেত্রে একঘরে করে রাখার প্রবণতা তাদের প্রতিবাদী করে তুলেছে। ভারতের ফুলন দেবী সুস্থ রাজনীতিতে ফিরে এলেও সমাজ তাকে রেহাই দেয়নি। তার দুঃখজনক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে। ভারতের নকশাল আন্দোলন বিলুপ্ত না হওয়া এবং অঞ্চলবিশেষে সরকারি বাহিনীর ওপর তাদের আক্রমণ সরকারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ-সংসার ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে আন্দোলনকারীরা এত ভয়ংকর হবে কেন? আর আইন রক্ষাকারীরা কেন তাদের প্রতিহিংসার শিকার হবে! অধুনা বাংলাদেশে পুলিশের ওপর আক্রমণও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে । নকশাল নেতা কাটাকাম সুদর্শন আনন্দ ছত্তিশগড় নরহত্যার জন্য দায়ী। দাতেওয়াদা অঞ্চলে ৭৬ সিআরপিএফ সদস্য হত্যা করে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে- ওই অঞ্চল তাদের। ওখানে তারা অন্যের শাসন চায় না। অথচ এটা কি ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের জনপ্রিয় দাবি? কাটাকাম কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড ও উড়িষ্যার মাওবাদীদের প্রধান নেতা হিসেবে কটেশ্বর রাওয়ের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। কাটাকাম কত কঠিন নেতা, দায়িত্ব নেয়ার পর তা তিনি এভাবে জানান দিলেন। মিডিয়া, জনসাধারণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজেকে পরিচিত করতে, সেই সঙ্গে তিনি যে একজন নিষ্ঠুর নেতা তা প্রকাশ করার জন্য হয়তোবা এ কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সুদর্শন অন্ধ্রপ্রদেশের একজন মানুষ। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বন্দুকের নলকে ক্ষমতার উৎস বলে বিশ্বাস করেন। নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক কোনো ধরনের আলোচনায় তিনি বিশ্বাসী নন বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় এ অঞ্চলে মাওবাদী অন্দোলনের অবসান ঘটবে বলে যে ধারণা ছিল, তা ভুল প্রমাণিত হল।
আগে অস্ত্র পাচারের রুট নেপাল ও ভারতের রেড করিডোর হয়ে শ্রীলংকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নেপালে মাওবাদীদের নতুন উপলব্ধি এবং সরকার পরিচালনায় নতুন অভিযাত্রা অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিপদে ফেলেছে। বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের ফলে এদেশের ভূমি ব্যবহার করে অস্ত্র চোরাচালানের হার বর্তমানে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এর ফলে নৃশংসতা ও গোলাগুলি কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যায়। এরপর থেকে যায় শুধু সুশাসন। নিজস্ব বাহিনী যদি নিজ জনগণের ওপর হিংস্র আচরণ করে, তবে তা রোধ করা অসম্ভব। সাধারণ মানুষ তখন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। আইন প্রয়োগকারীদের এজন্য ধৈর্যশীল ও নিজ জনগণের ওপর সহনশীল হওয়া অতি জরুরি। আপন দেশে যদি কেউ আপন না হয়, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! হতদরিদ্রের এ দেশে সুশাসন, সুবিচার ও গণতন্ত্রই হতে পারে বিদ্রোহ নির্মূলের আসল ওষুধ।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, পিএসসি (অব.) : তুরস্কে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক সামরিক অ্যাটাশে

গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তিন লক্ষ্য by ফরহাদ মজহার

সমাজবিজ্ঞানীরা কমবেশি সবাই মানেন যে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের উদ্ভব ও বিস্তার একটি মাত্রা অতিক্রম করলে পুরনো প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কগুলো ভেঙে পড়তে থাকে, সমাজের রূপান্তর ঘটা শুরু হয়। এ অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা ঘটে। প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক উৎখাত করে একটি জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিক উল্লম্ফনের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে তাদের যাত্রা শুরু করে। ইউরোপের ইতিহাস এ সাক্ষ্যই দেয়। মোটা দাগে এ বিপ্লবের লক্ষ্য থাকে তিনটি। এক. নাগরিক হিসেবে ব্যক্তির আবির্ভাব ও বিকাশ নিশ্চিত করা; দুই. প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়ে নতুন ও গতিশীল উৎপাদনশীল সম্পর্ক প্রবর্তন। তিন. অতীত ইতিহাসের সঙ্গে সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক মোকাবেলার পথ সাফ করা। প্রথম দুই লক্ষ্য কমবেশি আমাদের জানা থাকলেও শেষের লক্ষ্য সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট ভাবাভাবি করি না। এখানে একটু চেষ্টা করব। যদি ভাবি তো দেখব কোথায় ইউরোপীয় ইতিহাসের ছক থেকে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন বাঁক নিয়েছে। প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক নানা ধরনের হতে পারে। ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্র যেমন। কিংবা হতে পারে ‘এশীয় সামন্ততন্ত্র’। তার মধ্যে বর্ণাশ্রম প্রথা, জাতপাতের ভেদাভেদ ইত্যাদি। এশিয়ায়, আরও বিশেষভাবে দক্ষিণ এশিয়ায়, কিংবা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশে কী ধরনের সম্পর্ক বর্তমান ছিল এবং তাদের ঠিক কিভাবে শনাক্ত, শ্রেণীকরণ ও নামকরণ করা যায়, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একসময় আগ্রহ ছিল। তর্কবিতর্কও হয়েছে। আজকাল তেমন দেখি না। ইউরোপের ইতিহাসকে বোঝার জন্য ‘সামন্ততন্ত্র’ কথাটা যেভাবে ব্যবহার করা হয়, ভারতের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই ইউরোপীয় ক্যাটাগরির ব্যবহার কতটা যৌক্তিক কিংবা কাজের, তা নিয়ে তর্ক আছে। এটা তো ঠিক, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসকে তার নিজের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই বুঝতে হবে। অনেকে মনে করতে পারেন, এ ধরনের তত্ত্বকথা বা ইতিহাস বিচার আমাদের এখনকার রাজনৈতিক সমস্যা বোঝা বা নিরসনের ক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগে না। কথাটা ঠিক না। সে দিকটাই কিছুটা আজ বলার চেষ্টা করব।
বাংলাদেশের ইতিহাসের দিক থেকে আরেকটি গুরত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে, যা মনে না রাখলে প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক কথাটা অস্পষ্ট থেকে যায়। সেটা হল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে বাংলার জমিদারদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী জমিদাররা রাতারাতি জমির মালিক বনে যায়। ঔপনিবেশিক শাসন ও আইনি অর্থে জমির সবরকম স্বত্বের অধিকারী হয়ে যায় তারা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের শুধু জমির মালিক বানায়নি, জমির মালিক হওয়ার সুবাদে ইংরেজকে তারা যে খাজনা দিত সেই খাজনার হারও তাদের জন্য চিরস্থায়ীভাবে বেঁধে দেয়া হয়েছিল। ইংরেজ সরকার জমিদারদের খাজনার হার বাড়াবে না বলে চুক্তি করেছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সারকথা হচ্ছে জমিদারদের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্গত করে নেয়া। বাংলাদেশে জমিদারতন্ত্র কায়েম হয়েছে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও দখলের দরকারে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল হিসেবেই ঔপনিবেশিক জমিদারতন্ত্রের শহর হিসেবে কলকাতা গড়ে ওঠে। কলকাতায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হাতে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আধুনিকীকরণ কিংবা গরিমার্থে ‘বাংলার নবজাগরণ’ এই উচ্চবর্ণের হিন্দুদেরই নবজাগরণ। ‘বাঙালি’ নামে যে আত্মপরিচয় তার বোধ, চেতনা ও আত্মপরিচিতি এই হিন্দু জাগরণের ফলেই নির্মিত হয়েছে। পরিচয়টা হিন্দু বাঙালির, এর বিপরীতে রয়েছে বর্ণাশ্রম, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও জমিদারতন্ত্রের অধীনে নিপীড়িত, নিষ্পেষিত ও শোষিত নিম্ন বর্ণের হিন্দু, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও মুসলমান জনগোষ্ঠী।
কিন্তু তাই বলে ঔপনিবেশিকতার আশ্রয়ে উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালির নবজাগরণের অর্জনকে খাটো করে দেখার কিংবা তার নির্বিচার বিরোধিতার কোনো সুযোগ নাই। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ বা যার কথাই বলি না কেন, আধুনিক উচ্চবর্ণের ‘বাঙালি’ বা শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোকদের সংস্কৃতির মধ্যে বাংলাভাষীদের যে অর্জন সেটা ঐতিহাসিক। একে অস্বীকার করা ইতিহাসকে অস্বীকার করার শামিল। সমাজ ও ইতিহাসের বাইরে কেউ বাস করে না। হিন্দু কী মুসলমান কারও পক্ষেই ইতিহাসের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতার মধ্যে এখনকার লড়াই-সংগ্রামের চরিত্র বিচার করতে পারাই এখনকার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সে বিচারের দরকারে আমাদের সবসময়ই মনে রাখতে হবে, ‘মুসলমান’ পরিচয়ের বিপরীতে নিজেকে ‘বাঙালি’ বলা অসাম্প্রদায়িকতা নয়, বরং তা নিজের সাম্প্রদায়িক পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতারই লক্ষণ। বাঙালি মুসলমানের বিপরীতে কেউ ‘বাঙালি’ পরিচয় বহন করেন বলে তিনি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত নন। ইতিহাস বলে, সেই দাবি করার কোনো সুযোগ নাই। বরং এই ঐতিহাসিক অজ্ঞতা আরও অনেকগুলো বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়। সেই বিপদগুলো বুঝে নেয়া যাক।
এটা বোঝা সহজ যে, প্রথমেই জাতিগত অহমিকার কারণে বাঙালি ‘জাতি’ হিসেবে তিনি জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট। দ্বিতীয়ত, জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা ছাড়াও ঐতিহাসিক কারণেই তিনি ঔপনিবেশিকতার ঔরসে উচ্চবর্ণের হিন্দুর ‘জাগরণ’ থেকে তৈরি সাম্প্রদায়িক পরিচয়ই বহন করছেন। অথচ দরকার এই পরিচয়ের পর্যালোচনা এবং এর বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের যুক্তিসঙ্গত আপত্তিগুলো ঐতিহাসিকভাবে বোঝা, যাতে বাঙালি মুসলমান প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার গুহার অভ্যন্তরে ঢুকে না যায়। এ কাজটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের এই উপলব্ধির বিপজ্জনক ঘাটতি ঘটেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতি আরব, ইরান বা তুরানের সংস্কৃতি বা সভ্যতা নয়। বাংলার সনাতন ও লোকায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে সে নানান সূত্রে জড়িত। বাংলার জল-হাওয়াতেই গড়ে ওঠা। সে সূত্রগুলো তার এখনকার লড়াই-সংগ্রামে সে অবশ্যই ব্যবহার করতে প্রস্তুত। আর মানুষ তার মাতৃভাষাতেই বাস করে। তার ভাষা বাংলা। তৃতীয়ত, আমরা সম্প্রতি দেখেছি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষাবলম্বনের মধ্য দিয়ে কিভাবে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষাবলম্বন করা হয়। নিজেকে ‘বাঙালি’ বলার মধ্যে এই ফ্যাসিবাদ ধারণ করার চেতনা নিহিত। নিজেকে ‘বাঙালি’ বলাকে আমরা যতটা নিরপরাধ মনে করি, ব্যাপারটা অতো সোজাসিধা নয়।
সোজা কথা হচ্ছে, ঔপনিবেশিকতার ঔরসে গড়ে ওঠা ‘বাঙালি’ একটি অসাম্প্রদায়িক ধারণা নয়। ঘোরতরভাবে সাম্প্রদায়িক ধারণা। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই পরিচয় ধারণ করেই জনগণ শত্র“র বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, বাংলাদেশের জনগণের দিক থেকে এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর কারণ হচ্ছে, যে কোনো জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে একটি রণনীতিগত পরিচয়ের অধীনে জনগণকে সংগঠিত এবং শত্র“র বিরুদ্ধে লড়াই করতে অনুপ্রাণিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। যারা সাম্প্রতিকালে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে ‘উত্তরাধুনিক’ নামে পরিচিত, তারা এই বিশেষ আত্মপরিচয়ের প্রয়োজনীয়তার নাম দিয়েছেন রণনৈতিক পরিচয় (ংঃৎধঃবমরপ বংংবহঃরধষরংস)। অর্থাৎ এমন একটি সত্তায় নিপীড়িত জাতি, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেদের চিহ্নিত করে, যাতে নিজেদের মধ্যে শ্রেণী, লিঙ্গ, ধর্ম, আত্মপরিচয় বা আদর্শের বিরোধ থাকলেও একাট্টা হয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে তারা কথা বলতে পারে, প্রয়োজনে নিপীড়কের বিরুদ্ধে সংগ্রামও করতে পারে। উচিত ছিল এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেসব ঐতিহাসিক বিসংবাদ আবর্জনার মতো জমে ছিল, সেসব সাফ করা। ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন থাকলে অনায়াসেই বোঝা যেত একাত্তর ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল না, বাঙালি মুসলমান এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে সে তার অতীতের ঔপনিবেশিক ইতিহাস ভুলে যাবে।
দুই বাঙালার বাঙালিকে একই অর্থে বাঙালি ভাবেন অনেকে। এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে বাংলাভাষীদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক মজবুত করা দুই পক্ষের জন্যই ভালো। তবে অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি, পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের অনেকের ধারণা, ‘বাঙালি’ পরিচয়ই অসাম্প্রদায়িকতার মানদণ্ড। এটাই ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার হওয়ার পথ। এখানেই ফাঁকির জায়গা। বাংলাদেশের জনগণের মতো পশ্চিমবাংলার হিন্দুর ‘বাঙালি’ হয়ে ওঠার কোনো রাজনৈতিক কিংবা রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাস নাই। বাঙালি বনাম মুসলমানের লড়াই হিসেবে যে পুলসিরাত বাংলাদেশী জনগণকে পেরুতে হচ্ছে, সেই বিপদের হাত থেকে তারা মুক্ত। এর ফলে তারা হিন্দুই থেকে গিয়েছে এবং শেষতক হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতকেই তার আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ অখণ্ড ভারতকে যেমন মেনে নেয়নি, তেমনি পাকিস্তানকেও নয়। ভারতীয় বাঙালির সঙ্গে বাংলাদেশের বাঙালির এখানে বিরাট পার্থক্য।
‘বাঙালি’ শব্দের আগে আমরা ‘হিন্দু’ ব্যবহার করি না, কিন্তু মুসলমানিত্বকে বাঙালিত্বের ব্যতিক্রম গণ্য করি। এদিক থেকে ‘বাঙালি’ দ্বিগুণ সাম্প্রদায়িক। প্রথমত তার পরিচয়ের হিন্দুত্বকে সে লুকায়, দ্বিতীয়ত ‘বাঙালি’র ঝাণ্ডা দেখিয়ে সেও উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাসকে নাকচ করে। অথচ নির্বিচার ‘বাঙালি’ পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে উচ্চবর্ণের ঔপনিবেশিক হিন্দুত্ব বহন করে। তাকে সাফ না করে দাবি করা হয়, মুসলমানকেও বাঙালি হতে হলে এই হিন্দুত্বের ঐতিহাসিক আবর্জনাই বহন করতে হবে। ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি’- এ স্লোগানের মধ্য দিয়ে এই ঘোষণাই দেয়া হয় যে, বাংলাদেশের জনগণকে ইসলামের আগমন থেকে শুরু করে বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে মুক্তির লড়াইসহ তার শূদ্র ও নিুবর্গের জীবনের ইতিহাস ভুলে যেতে হবে। ভুলে যেতে হবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমি হারানোর স্মৃতি। ভুলতে হবে জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে কৃষক হিসেবে তার সংগ্রামের ইতিহাস। মেনে নিতে হবে, নয় মাসের ইতিহাসই এ দেশের জনগোষ্ঠীর একমাত্র ইতিহাস।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এ সাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে এ দেশের মানুষ ইতিহাসকে তাদের জায়গা থেকেই বিচার করার জন্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এখনও পথ অনেক পিচ্ছিল। কারণ ‘মুসলমান’ পরিচয়ের পেছনে যে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা সেটাও পথ হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছে। এই দাবি আংশিক সত্য। পুরোটা নয়। এর প্রধান কারণ, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধকে এ দেশের জনগোষ্ঠীর একমাত্র রাজনৈতিক ইতিহাস গণ্য করার অজ্ঞতা। সতর্ক ইতিহাস নিষ্ঠা এই মুশকিল কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট। ইতিহাস বিচ্ছিন্নভাবে ‘বাঙালি’ বা ‘মুসলমান’ নামক ধারণার কোনো অর্থ নাই। উভয়ের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব^-বিরোধকে বুঝতে হলে প্রথমেই বোঝা দরকার আত্মপরিচয় কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়, বরং ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ক্যাটাগরিকে আমরা যখন মনে করি গাছপালা পাহাড়-পর্বতের মতো প্রাকৃতিক সত্তা তখন সেটা বিপজ্জনক। অনেকেই মনে করেন, ‘হিন্দু’, ‘মুসলমান’, ‘বাঙালি’ ইত্যাদি সত্তা কিংবা পরিচয় প্রকৃতির মতোই একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। জন্মসূত্রে আমরা সিলছাপ্পড় গায়ে নিয়ে মায়ের পেট থেকে এসব দাগ নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। যদি আমরা এই খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তাহলে নতুনভাবে ইতিহাস পাঠ করা জরুরি।
ইতিহাসের মধ্যে থেকে ইতিহাস কিভাবে আমাদের গঠন করেছে এবং আগামী দিনে কিভাবে আমরা নিজেদের ঐতিহাসিকভাবে গঠন করতে চাই সেই মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে পারার মধ্য দিয়েই আমরা এখনকার বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারব। ইতিহাস বিচ্ছিন্নভাবে ‘বাঙালি’ কিংবা ‘মুসলমান’ হয়ে নয়। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শর্ত তৈরি হয়ে রয়েছে বহু আগে থেকে। সংস্কৃতি ও ইতিহাসের দিক থেকে এই বিপ্লবের অর্থ হচ্ছে, জমে থাকা সব ঐতিহাসিক আবর্জনা সাফ করা, যেন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশ তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে। বদ্ধ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসাই এখনকার কাজ।

রাশিয়া যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে by আসিফ রশীদ

এই লেখাটিকে আমার আগের দুটি নিবন্ধের (‘সিরিয়া সংকট থেকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ?’, ৩ সেপ্টেম্বর এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র কেন পিছু হটল’, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩) ধারাবাহিকতায় পরবর্তী অংশ বলা যেতে পারে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া আবার পরাশক্তি হিসেবে আÍপ্রকাশ করেছে এবং এর ফলে বিশ্ব ব্যবস্থায় আবার স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ফিরে আসছে অথবা বলা যায় ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছে। এ তিনটি লেখায় সে বিষয়টিই স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর নব্বইয়ের দশকের বেশিরভাগ সময় রুশ নীতিনির্ধারকরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতেই ব্যস্ত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে সেই সময়টা ছিল রাশিয়ার জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। বিশ্বের মোড় ফেরানো ওই ঘটনায় দেশটির যেসব খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল, প্রতিরক্ষা ছিল তার অন্যতম। সে সময় রুশ সরকারের জন্য এ বিভাগের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন হয়ে যাওয়া সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোয় অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল। সামরিক বাহিনীতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়ে পড়েছিল সংকুচিত। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামগুলো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় তাতে মরচে ধরতে থাকে। সব মিলিয়ে রাশিয়ার সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি সর্বনিু পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে ক্রেমলিনের হর্তাকর্তা হয়ে আসেন ভ­াদিমির পুতিন। তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার হাতে নেয়ার পর রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে দৃষ্টি দেন। তার শাসনামলের প্রথম ১০ বছরে রাশিয়ার সামরিক বাজেট তিনগুণ বাড়ানো হয়। এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের হিসাব মতে, বর্তমানে সামরিক খাতে রাশিয়ার বাজেট দেশটির জিডিপির ৪.৪ শতাংশ। অংকের হিসাবে যার পরিমাণ ৯ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। বস্তুত, ক্রেমলিনে বরিস ইয়েলৎসিন যুগের অবসানের পর এক দশকেরও বেশি সময় প্রেসিডেন্ট থাকাকালে, এমনকি দিমিত্রি মেদভেদেভ যে সময়টিতে প্রেসিডেন্টের পদে আসীন ছিলেন সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও ভ­াদিমির পুতিন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছেন, যাকে অনায়াসেই ‘পুতিন ডকট্রিন’ বলা যেতে পারে। বর্তমানে আবার প্রেসিডেন্ট পদে থেকে তিনি সেই একই নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। প্রকৃতপক্ষে পুতিন চাচ্ছেন সামরিক ও কূটনৈতিক প্রয়াস জোরদার করার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মস্কোর মর্যাদা ও প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে। মোদ্দা কথা, রাশিয়াকে আবারও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করতে চান তিনি। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি প্রধানত তিনটি পথ অবলম্বন করেছেন- যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনকি কখনো কখনো মার্কিন স্বার্থ নস্যাৎও করে দিয়েছে।
প্রথমত, পুতিন রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ- প্রাথমিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল থেকে ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ব্যবহার করে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপকভিত্তিক পুনর্গঠনে মনোযোগী হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, পুতিন যেসব মার্কিন পদক্ষেপকে রাশিয়ার স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর মনে করেছেন, সেগুলো ব্যর্থ করে দিতে বা সেগুলোতে বিঘœ সৃষ্টি করতে বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক প্লাটফরমকে ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে সাদ্দাম সরকারের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে জাতিসংঘের অনুমোদন লাভের জন্য একটি মার্কিন প্রস্তাব রাশিয়া সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থ করে দেয়। ফলে জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এ জন্য বিশ্বব্যাপী এমনকি নিজ দেশের জনগণের কাছেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ব্যাপকভাবে নিন্দিত হন। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ‘সীমিত আকারে শাস্তিমূলক হামলা’ চালানোর জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আন্তর্জাতিক অনুমোদন লাভের চেষ্টা করছেন, তখনও রাশিয়া তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাচ্ছে সক্রিয়ভাবে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময়ও রাশিয়া একই ধরনের আচরণ করছে।
তৃতীয়ত, পুতিন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কতগুলো রাষ্ট্রকে নিজ পক্ষে নিয়ে এক ধরনের সংঘ তৈরি করেছেন, যারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক বিষয়গুলোয় অভিন্ন মার্কিনবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। যেমন ওবামার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য ব্যর্থ করে দেয়ার ক্ষেত্রে চীন পরিণত হয়েছে রাশিয়ার প্রধান মিত্রে। ইরান বা সিরিয়ার ক্ষেত্রেই হোক কিংবা ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে হোক অথবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে হোক- যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার প্রশ্ন এলেই রাশিয়া আর চীন হয়ে গেছে একাট্টা। এ দুটি দেশই নিজ নিজ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত, নিশ্চিতভাবেই যার উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অত্যধিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে খর্ব করা। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক বিভেদ সৃষ্টিরও চেষ্টা করেছেন পুতিন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের সঙ্গে বহুবার সাক্ষাৎ করেছেন জাতিসংঘের ভেতরে ও বাইরে, তাদের যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের একটা চেষ্টা চালিয়েছিলেন। পুতিনের সন্তুষ্টির জন্য আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে তিনি পূর্ব ইওরোপে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনসহ কিছু বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল বা স্থগিত করেন। তবে এসব মার্কিন প্রয়াসকে অকার্যকর করে দেয় পুতিন ডকট্রিন। পুতিন বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবক্ষয় ঘটছে এবং দেশটির সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে। বস্তুত, সিরিয়া প্রশ্নে রাশিয়ার ক্ষমতা ও প্রভাব যখন বাড়ছে তখন এ ইস্যুতে মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেসের সতর্ক মনোভাব দেখে পুতিন মনে করছেন, এটা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার লক্ষণ।
সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার ব্যাপারে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে পুতিন যে কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাশিয়ারও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, সিরিয়ার ক্ষেত্রে পুতিনের এ উদ্যোগ হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস ও মার্কিন জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির একটি প্রয়াস। এ ধারণা সত্য হলে এক্ষেত্রেও পুতিন সফল হয়েছেন বলা যায়। সিরিয়ার বাশার সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এবং ওবামাকে প্রথমবারের মতো সেদিক থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে পুতিন তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও মার্কিন বিরোধিতার ইচ্ছাই ব্যক্ত করেছেন। ভবিষ্যতে সম্ভবত ইরানের ক্ষেত্রেও আমরা এই পুতিন ডকট্রিনের কার্যকারিতা দেখতে পাব। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছে দু’দশকেরও বেশি আগে। ইতিমধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধার করেছেন ভ­াদিমির পুতিন। এ ধারা বজায় থাকলে বিশ্বে নিশ্চিতভাবেই আবারও শক্তির ভারসাম্য ফিরে আসবে। বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে রাশিয়ার এ উত্থানকে উন্নয়নশীল বিশ্বের বিশেষ করে দুর্বল দেশগুলোর সরকার ও সাধারণ মানুষ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখবে।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থী সমাচার by ধীরাজ কুমার নাথ

কয়েক দিন আগে একটি বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দলের কর্মীদের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন দেয়ার অনুরোধ করা হয়। সব দেশেই দলের মনোনীত প্রার্থীকেই সমর্থন দেয়ার নিয়ম রয়েছে। বলা যায়, এটাই হচ্ছে অনুসৃত সংস্কৃতি, যা প্রতিপালন করতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। এটাই বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের পদ্ধতি। দলের পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন করার অনুরোধ না করা হলেও এটাই হচ্ছে দলীয় নেতাদের প্রত্যাশা, দলের মধ্যে শৃংখলার নির্দশন। এ ধরনের দলীয় রীতিনীতি থাকা সত্ত্বেও কেন এমন আবেদন করা হল। কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর আবির্ভাব ঘটে। দলের নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে নিজ দলের প্রার্থীকে হেয়প্রতিপন্ন করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এমনটি পৃথিবীর বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় ভাবাই যায় না। যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারতসহ যেসব দেশে ওয়েস্টমিন্স্টার পদ্ধতির সরকার ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বহাল আছে, সেখানে এ ধরনের বিদ্রোহী প্রার্থীর আবির্ভাব বিরল ঘটনা। এ ধরনের গৃহতল অতিক্রম (Floor crossing) করার অর্থ হচ্ছে দলের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা, যা দলীয় রাজনীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার পথে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এমন ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। তাই অনেকে মনে করছেন, সঠিক প্রার্থী মনোনয়ন দিতে না পারলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় সব দলের মধ্য থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর আবির্ভাব ঘটতে পারে, যা দলীয় রাজনীতির জন্য সৃষ্টি করবে সংকট এবং দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষার ক্ষেত্রে ঘটবে মহাবিপর্যয়।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এমন ঘটনার উদাহরণ বিরল হলেও এখানে দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে এমনটি হচ্ছে কেন? এ ব্যাপারে প্রধানত দুটি কারণ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রথম কারণ হচ্ছে, গৃহতল অতিক্রম করার জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই। পক্ষান্তরে নির্বাচনে জয় লাভ করলে বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিজেদের প্রার্থী বা সমর্থক বলে অভিনন্দিত করা হয়। কারণ হিসেবে ধরা হয়, বিদ্রোহী প্রার্থীর অনেক সমর্থক আছে, তারা অসন্তুষ্ট হবে। অথচ কোনো প্রার্থী বিদ্রোহ করলে নিয়ম হচ্ছে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা এবং তার কাছ থেকে দলীয় সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার এবং অসহযোগিতা প্রদানসহ সব ধরনের দলীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
মার্কস ও লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলের পদ্ধতি হচ্ছে, এমন অবাধ্যতার জন্য প্রার্থীকে দল থেকে বহিষ্কারসহ হরেক রকম শাস্তি প্রদান। তাই কমিউনিস্ট বিশ্বে মতভিন্নতার কারণে অনেকে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকে না এবং বিদ্রোহ করারও সাহস পায় না। দলীয় শৃংখলা প্রতিপালন করা হয় অত্যন্ত কঠোরভাবে। নিউজিল্যান্ডে নির্বাচনে ভোটিং পদ্ধতিতে এমএমপি (Mixed Member Proportionality) বা আনুপাতিক হারে সদস্যের হিসাব হয়। সেখানে দলচ্যুত হওয়া বা দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা দলকে পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, প্রার্থী কখনো দল করেনি বা দলের জন্য এক টাকাও চাঁদা দেয়নি অথচ দল যখন ক্ষমতায় আসে তখন রাতারাতি সে দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে যায়। বিশাল বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে টেন্ডারবাজি করতে শুরু করে এবং বিরোধীদলীয় দু-একজন নিরীহ লোককে রাস্তায় মারধর করে নিজেকে দলের আত্মনিবেদিত কর্মী হিসেবে জাহির করে। ঠিক এমনিভাবেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর অনেক তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধার আবির্ভাব ঘটেছিল। তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের খবরও রাখেনি। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর থেকে রাতারাতি বনে যায় বীর মুক্তিযোদ্ধা। তারাই জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে আক্রমণ করেছিল। অনেক সম্মানিত ব্যক্তির বাড়িতে হানা দিয়ে তাদের স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে সম্পত্তি দখল ও লুটপাট করতে শুরু করেছিল। আমরা তখন তাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ১৬তম ডিভিশন (16 Division FF) বলে আখ্যায়িত করেছিলাম। তাদের অনেকে আবার অত্যন্ত যতœসহকারে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে এবং এখনও নিচ্ছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও তাদের অনেকের পুত্র ও পৌত্রদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের ডিজিটাল তালিকায় সন্নিবেশিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনেক উদার ও মহৎ!
এসব ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে লাভ নেই। দলীয় আবেদন বা অনুশাসন না মানার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে দলের আদর্শ, লক্ষ্য বা মেনিফেস্টোর প্রতি অগাধ বিশ্বাস বা তা থেকে জনসেবার প্রতি আগ্রহ বা অনুপ্রেরণা লাভের ঘাটতি। সত্যি কথা বলতে কী, বাংলাদেশে বর্তমানে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির বড় আকাল পড়েছে। মহারাজ ত্রৈলক্যনাথ চক্রবর্তী অথবা কমরেড মুজাফফর আহমদের মতো রাজনীতিক আর হবেন বলে মনে হয় না। এখন লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বা টিকে থাকা। তাই নির্বাচনের আগে প্রতিশ্র“তিভিত্তিক মেনিফেস্টো তৈরি হয়, যা উন্নয়নের রাজনীতি বা বদলে দেয়ার অর্থনীতি নিয়ে দার্শনিক ভাবনায় ভরপুর। অবশ্য জনগণ তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে ভোট কেন্দ্রে যায়। কয়েক বছর যেতে না যেতে তারাই আবার ‘রাবিশ’ ও ‘বোগাস’ বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আসল বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনে মনোনয়নের প্রাক্কালে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই। বাংলাদেশে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে যখন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছিল, তখন টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক রসালো খবর প্রকাশিত হয়েছিল। নবম সংসদ নির্বাচনেও বিত্তবান বণিক শ্রেণীর প্রার্থীরাই প্রাধান্য পেয়েছিলেন এবং সংসদে দলীয় নিবেদিত কর্মীদের পরিবর্তে বণিক শ্রেণীর সম্মানিত ব্যক্তিরাই অধিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করেছেন। অনেকে মনে করছেন, দশম জাতীয় সংসদও ব্যতিক্রম কিছু হবে না। শেরে বাংলা নগরের সুবিশাল সংসদ ভবনে বিতর্কে অংশ নেবেন অনেক বণিক প্রতিনিধি, যাদের ছবি সরাসরি টেলিভিশনে দেখা যাবে। তারা লম্বা কাগজে একটি প্রশ্ন টাইপ করে নিয়ে গিয়ে তা সংসদে অনেক কষ্টে উপস্থাপন করবেন। প্রয়োজনে সংসদে খিস্তি খেউড় করবেন। তাতে কীবা আসে যায়! কথায় কথায় কেউ বলবেন, এমন উন্নয়ন কখনো হয়নি। অপর দল বলবে, এমন দুর্নীতি কেউ কখনো চোখে দেখেনি।
এসব কারণেই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় অনুশাসন, রীতিনীতি অনুসরণ করার প্রতি মনোযোগ নেই। কোনোভাবে মনোনয়ন পেলেই হল। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের তালিকায় নাম উঠে যাবে অনেক ওপরে। তাই তারা মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত। এটাই আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের দুর্বলতম দিক। তবে একথাও সত্য, জনগণ ভোট দেয় বিচার-বিশ্লেষণ করে, একটি আদর্শকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। যেমন ১৯৫৬ সালে জনগণ তদানীন্তন পাকিস্তানে হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিল গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। প্রার্থীর পরিচয়ও জানতে চায়নি জনগণ। ভোট দিয়েছে মার্কা দেখে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে বাঙালি জনগণের সমৃদ্ধির আশায় এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড আবেগে, যা রূপ লাভ করেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে। এমনকি ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জনগণ ভোট দিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এবং বদলে দেয়ার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশায়। তাই জনগণের ভরসা, এবারও যদি নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্র“তি কেউ দিতে পারে অথবা অর্থবহ ও বাস্তবধর্মী অগ্রগতির সঠিক নির্দেশনার পথ দেখাতে পারে, তবেই জনগণ ভোট কেন্দ্রে যাবে।
বহুদলীয় ও বহুমতের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং একে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে হলে অবশ্যই দলীয় রাজনীতিকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে জীবন উৎসর্গ করার মতো শিক্ষিত সমাজকর্মী, প্রকৃত জনগণের প্রতিনিধি। দলকে বণিকদের হাতে বিসর্জন দিলে দলে বাজিকরদের উপদ্রব এবং জনগণকে প্রতারিত করার প্রবণতা বাড়বে। তাই মনোনয়ন দেয়ার প্রাক্কালে দলীয় নেতারা যদি আর্থিক লেনদেনের চিন্তা বাদ দেন, তাহলে দলে বিদ্রোহী প্রার্থীর উপদ্রব হ্রাস পাবে। তখন আর দলের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য অনুরোধ করার প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে দলের মধ্যে শৃংখলা বিধান বা নির্দেশ প্রতিপালনের সংস্কৃতি তৈরি হবে। তবেই সংসদীয় ও দলীয় রাজনীতি হবে অর্থবহ। এমনটি না হলে দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেয়ার আবেদন ফলপ্রসূ নাও হতে পারে।
ধীরাজ কুমার নাথ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব