Wednesday, July 9, 2014

ব্রাজিল বিশ্বকাপে বিপ্লব by মতিউর রহমান চৌধুরী

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ এমন কিছু নজির স্থাপন করেছে, যা তাকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তুলেছে। এর অনেক ধ্রুপদী দিক যেমন আছে তেমনি অছে লঘু রসাত্মক। যেমন দেখা গেছে নেইমার রেফারির সঙ্গে করমর্দন করছেন। কিন্তু তা কখন? রেফারি যখন ব্রাজিলের পক্ষে সংশয়পূর্ণ বাঁশি বাজিয়েছিলেন। প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাসিখুশি করমর্দন এবারের বিশ্বকাপের খুব চেনা দৃশ্য নয়। তবে এটা সহজেই নজরে এসেছে যে, এক ব্যক্তি দু’রঙের বুট পরে মাঠে নেমেছেন। এই রোগ গোলরক্ষকদের গ্লাভসেও ছড়িয়েছে। একজন গোলরক্ষক। দুই হাতে দুই রঙের হাত মোজা। ব্রাজিল এবারে অনেক ক্ষেত্রেই বিপ্লব এনেছে। রেফারি সাদা স্প্রে করে  দিচ্ছেন। এটা কিন্তু ঐচ্ছিক নিয়ম। ‘পার্সিং’ ক্রেজ বেশ চোখে পড়েছে। পার্সিং হলো ডাইভরত অবস্থায় হেড দেয়া। ব্রাজুকা নিয়েও অনেক গরিমা করার আছে। কারণ এটা একেবারে গোল নয়। আবার খুব হালকা নয়। যথার্থ বল পেয়েছে বিশ্বকাপ।
কোচদের করণীয় কি হবে তারও নয়া পথ বাতলেছে ব্রাজিল। কোচরা খেলার কি কৌশল হবে তা ঠিক করতে তাঁর হাতে যথেষ্ট সময় নেই। সেই মিথ ভেঙে গেছে। চিলির জর্জ সামপোলি, মেক্সিকোর মিগুয়েল হেরেরা, আমেরিকার ক্লিনসম্যান ও জার্মানির জোয়াকিম লো দেখিয়ে দিয়েছেন কোচের দায়িত্ব কতটা প্রশস্ত হতে পারে। লো নিজেই ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনা করেছেন। যেন তিনি নিজেই ক্লাবটা পরিচালনা করছেন। ইংল্যান্ডের কোচ সম্পর্কে অবশ্য সেটা বলা যাবে  না।
 স্পেন গুঁড়িয়ে গেছে বলেই ‘টিকি-টাকি’ মারা যায়নি। তাদের প্রতিপক্ষরা তাদের ব্যর্থ করে দিতে যতটা ক্ষিপ্র ছিল, সেটা  রেখে দিতে তাদের তেমন প্রস্তুতি ছিল না। যখন তারা বুঝেছে তখন তারা প্ল্যান বি শুরু করেছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরেকটি মিথ ভেঙে গেছে। টিম কেবল প্রতিপক্ষ ব্যূহ ছিন্নভিন্ন করতেই মনোযোগী হবে। জয়লাভের জন্য তার অধিক সময় ধরে বল নিজেদের দখলে রাখার দরকার নেই। ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি ইতিমধ্যে কতিপয় টিমের ‘দুঃসাহসী’ কৌশলকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তবে জার্মানি বনাম ঘানা এবং যুক্তরাষ্ট্র বনাম বেলজিয়াম প্রমাণ করেছে যে, যারা সাহসী তারাই শ্রেষ্ঠ।
নতুন কিছু করো না হয় মরো। বিশ্বকাপের এই হলো ট্যাকটিক্যাল মন্ত্র। ইংল্যান্ড সে কারণেই হারলো। কারণ তারা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে ঠায় আঁকড়ে থাকলো। একটুও পরিবর্তন আনলো না। কিন্তু অনেক টিম কখনও ৩-৫-২ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনের বৈচিত্র্য ও চমক দুই উপহার দিয়েছে। জার্মানি তো স্ট্রাইকার ছাড়াই ৪-৩-৩ এবং চিলি ৩-৪-৩ ফরমেশনে খেলে চমকে দিয়েছে। কলম্বিয়া ৪-২-৩-১ আবার ৪-১-৪-১ কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। হল্যান্ডের লুইস ফন গাল নাটকীয় পরিবর্তন এনে মাস্টারক্লাস খেলা উপহার দিয়েছেন। স্পেনের বিরুদ্ধে খেলায় তিনি তাঁর টিমকে ৩-৫-২ থেকে সরিয়ে ৫-৩-২ করেছেন। আর  এটাই বাস্তবতা যে, ডাচ্রা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ৫-১ ব্যবধানে হারিয়েছে।
গোলরক্ষা মানে ত্রাণকর্তা।  মেসি ও নেইমারদের মতো সাক্ষাৎ যমদূতদের তারাই যম। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির ম্যানুয়েল নিউয়ার চমৎকার শিল্পকর্ম উপহার দিয়েছেন। জার্মান কোচ জোয়াকিম লো তাঁকে ঠিকই বলেছেন, লিবারো। নয়্যার কেবল রক্ষণাত্মক খেলা খেলেছেন তা-ই নয়, তিনি আক্রমণাত্মক খেলা খেলেছেন। তাঁর লং শটের যথার্থতা ছিল অসাধারণ। তবে এই বিশ্বকাপে তিনি একা নন। ফ্রান্সের হুগো লরিসও যথেষ্ট সাহসী নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন।
মধ্যমাঠে দ্বিমুখী কেন্দ্রবিন্দু সত্যি কি হওয়ার নয়? ২০১০ সালের বিশ্বকাপের চার সেমিফাইনালিস্ট স্পেন, জার্মানি, হল্যান্ড ও উরুগুয়ে মধ্যমাঠে এই দ্বিমুখী কেন্দ্রবিন্দুর (ফুটবলের পরিভাষায় যাকে বলে ডাবল পিভট) কৌশল অবলম্বন করেছে। তিন ‘ইউরো’ টিম ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলেছে। উরুগুয়ে ৪-৪-২ এর চেয়ে বেশি। কিন্তু তারা দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে সামনে বাড়তে বারণ করেছে। এর ফলে তাদের আক্রমণ ঘটেছে ৪-২-৪ ফরমেশনে। স্পেন গত এক দশক ধরে ৪-২-৩-১ খেলছে। এখন তারা বুঝতে পারছে যে, তারা সেকেলে হতে চলেছে। কারণ দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সহজেই কোন ত্রিভুজ আক্রমণে কুপোকাত হতে পারেন, যেটা দেখিয়েছে ইংল্যান্ড। এবারের বিশ্বকাপ এটাও দেখিয়েছে যে, মধ্যমাঠের সেই তারকাজোড় যদি হন স্টিভেন জেরার্ড ও জাবি অলোনসোর মতো মন্থরগতির কেউ তাহলে ‘ডাবল পিভটে’ ধরা খেতেই হবে।
এটা পরিহাসজনক যে, একটি বিশ্বকাপ কেবল চার বছর অন্তর সেরা তারকা খেলুড়েদের মহাআসর বসে বলেই বিশ্বকাপ বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে না। বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার সর্বস্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের উপকরণ হয়ে ওঠার বিষয়টি সত্যিকার অর্থে ছাপিয়ে যেতে পারে কেবল তখনই যখন খেলাটা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আর তার প্রাণভোমরা হলো অ্যাটাকিং পে। চারদিকে তারকা গিজ গিজ করছে। কিন্তু  রোবেন ও ফন পার্সি, করিম বেনজেমা, রোনালদো, নেইমার ও মেসিরা না থাকলে কি হতো? এক নেইমার নেই বলে বিশ্ব জুড়ে কত আহাজারি। যে ক্রন্দনরোল আকাশে, তার প্রকৃত আহাজারি আসলে বিশ্বকাপ থেকে অ্যাটাকিং-এর কমতি হবে বলেই। নয়  নম্বর তারকাটি এখন আর কেবল গোল-লোভী ব্যক্তি নন। বরং তাঁর এই পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে যে, তিনি নিঃস্বার্থ, পরিশ্রমী এক ঘোড়া, যার প্রচ- তাড়া এবং প্রতিপক্ষকে তাড়ানো, আর বলকে বাগে রেখে সতীর্থদের জন্য ঝোপ বুঝে কোপ মারার ফন্দি বের করে দেয়া। ব্রাজিলের ফ্রেড এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি গোল দিতে তাড়াহুড়ো করেননি। বরং নেইমারকে দিয়ে গোল দেয়ানোর প্রতি তাঁর অনবদ্য ঝোঁক প্রকাশ পেয়েছে। গঞ্জালো হিগুয়ানকেও মেসির জন্য ঠিক একই ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এছাড়া এবারের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের মতো অনেককেই নতুন করে ভাবতে শেখাবে। যেমন ইংল্যান্ড ভাবতে বসবে, আরে আমাদের টিমে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের তারকারা আছে, কিন্তু চিলিয়ান, কলম্বিয়ান ও কোস্টারিকানরা নেই কেন!
এবারের কাপে কতিপয় দেশ তিন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারকে দিয়ে খেলিয়েছে। আবার অনেকেই মাত্র একজন মিডফিল্ডার দিয়ে কাজ সেরেছেন। ফ্রান্সের রাফায়েল ভারেন, উরুগুয়ের হোসে হিমেনেথ কোস্টারিকার গঞ্জালেস মুগ্ধ করেছেন। তবে নবীন না প্রবীণ কারা চৌকস? মেক্সিকোর রাফায়েল মার্কেজ ও কলম্বিয়ার মারিও ইয়াপসের মতো প্রবীণ খেলোয়াড়রা প্রমাণ রেখেছেন পুরনো চালই ভাতে বাড়ে।

ইন্দোনেশিয়ায় আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

প্রাবোউ সুবিয়ান্তো, জোকো উইদোদো
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জোকো উইদোদো এ নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জিততে যাচ্ছেন বলে নির্বাচন-পূর্ব এক জনমত জরিপের ফলে দেখা গেছে। স্বৈরশাসক সুহার্তোর পতনের পর এই প্রথম সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।খবর এএফপির। ইন্দোনেশিয়ার সাইফুল মুজানি রিসার্চ অ্যান্ড কাউন্সিল গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন-পূর্ব সর্বশেষ জনমত জরিপের ফল প্রকাশ করে। জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি আভাস দিয়েছে, ১৯৯৮ সালে স্বৈরশাসনের অবসানের পর দেশটির তৃতীয় এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী জাকার্তার গভর্নর উইদোদো তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাবেক জেনারেল প্রাবোউ সুবিয়ান্তোর চেয়ে দুই দশমিক ৭ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন।
উইদোদোকে ইন্দোনেশিয়ার নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসনামলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যদিকে প্রাবোউ তাঁর উল্টো চরিত্র। সুহার্তোর তিন দশকের শাসনামলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। কয়েক মাস আগেও ৫৩ বছর বয়সী উইদোদোর পক্ষে বিপুল জনমত ছিল। তিনি প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে জিতবেন বলে আশা করা হচ্ছিল। তবে প্রাবোউর বাক্পটু প্রচারণায় উইদোদোর জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে কমেছে। মুজানি রিসার্চ অ্যান্ড কাউন্সিলের জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, আজকের নির্বাচনে উইদোদো ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং প্রাবোউ ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পাবেন। অবশ্য এ জরিপ চালানো হয়েছে দুই প্রার্থীর মধ্যে গত শনিবারের চূড়ান্ত বিতর্কের আগেই। ওই বিতর্কে প্রাবোউয়ের চেয়ে উইদোদো ভালো করেছেন। ৬৩ বছর বয়সী প্রাবোউ প্রেসিডেন্ট হলে ইন্দোনেশিয়া আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। সাবেক স্বৈরশাসক সুহার্তোর মেয়ে সিতি হেদিয়াতি সুহার্তোর সাবেক স্বামী প্রাবোউ। তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গণতন্ত্রপন্থী কর্মীদের অপহরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপর মোদি

নরেন্দ্র মোদি
প্রকৃত ভারতীয় কে, আর কে নন, তা নির্ধারণে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং গতকাল মঙ্গলবার লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে সেই উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। সরকারের উদ্যোগ নিয়ে লোকসভায় সরকারপক্ষের সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যদের তুমুল কথা-কাটাকাটি চলে। তৃণমূল সদস্যরা সরকারি উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেন, এভাবে সাম্প্রদায়িকতায় উসকানি দেওয়া ঠিক নয়। পাল্টা জবাবে বিজেপি সাংসদেরা বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা হচ্ছে। এ অবস্থা বরদাশত করা হবে না। প্রশ্নটি তোলেন বিহারের গোড্ডা আসনের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। তিনি বলেন, যে যেভাবে পারছে ভারতে আসছে। কারও জাল নোটের কারবার, কারও মাদকের।
কেউ আসছে নেপাল থেকে, কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ পাকিস্তান থেকে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনসংখ্যার প্যাটার্ন বদলে গেছে।আসাম, বিহার অথবা পশ্চিমবঙ্গ—সর্বত্র এক ছবি। নাগরিকত্বও দেওয়া হচ্ছে ভোটব্যাংকের রাজনীতি করার জন্য।বাংলাদেশিদের ভোট পেতে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিশিকান্ত যখন এই অভিযোগ করছেন, সেই সময় তৃণমূল কংগ্রেসের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, শতাব্দী রায়সহ প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন।স্পিকার বারবার বলা সত্ত্বেও তাঁরা শান্ত হন না। স্পিকারের উদ্দেশে কল্যাণ বলেন, এভাবে সাম্প্রদায়িকতা করতে দেবেন না।এ কথা বলার অনুমতি দেবেন না। নিশিকান্তকে বলতে শোনা যায়, ভোটব্যাংকের রাজনীতির দরুণই দেশের আজ এই হাল।গত ১০ বছরে ভারত ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ হয়ে গেছে। তিনি জানতে চান, এ অবস্থা রুখতে, অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার ‘পোটা’ জাতীয় কোনো আইন আনার কথা আবার ভাবছে কি না।
সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবিলায় ‘পোটা’ আইন আনা হয়েছিল এনডিএ আমলে।পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় এবং অবৈধ নাগরিকদের খোঁজে সরকারের উদ্যোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, অন্য দেশের নাগরিকদের এ দেশে আসার বিষয়টি কেন্দ্রের নজরে আছে। এটা রুখতে সরকার বদ্ধ-পরিকর। ভারত ও বাংলাদেশের চার হাজার ৯৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই হাজার ৮২৩ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ চালু রয়েছে। মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে বেড়া দেওয়ার প্রক্রিয়া ওই রাজ্য সরকারের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত হাতে নেওয়া হবে। ভারত ও প্রতিবেশীদের সীমান্তের বহু জায়গা অগম্য। এসব কথা বলার পর রাজনাথ তাঁর সরকারের উদ্যোগের বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, কে নাগরিক, কে নাগরিক নন, কে অনুপ্রবেশকারী তা নির্ণয় করতে সরকার কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। সম্প্রতি তিনি ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনপিআর) এবং ইউনিক আইডেনটিফিকেশন বা ইউআইডি বিভাগের বৈঠক ডাকেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেন, দুই বিভাগ একযোগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করুক কারা নাগরিক। রাজনাথ বলেন, দুই বিভাগ এটা ঠিক করার পর বৈধ নাগরিকদের সরকার একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেবে।

জন্মনিয়ন্ত্রণে কম্পিউটার চিপ

কম্পিউটার চিপ
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এমন একটি গর্ভনিরোধক কম্পিউটার চিপ আবিষ্কার করেছেন, যা দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের সাহায্যে চালনা করা যায়।খবর বিবিসির। নতুন আবিষ্কৃত এই চিপটি পরীক্ষামূলকভাবে একজন নারীর ত্বকের নিচে স্থাপন করা হয়েছে। এখন তাঁর শরীর থেকে অল্প পরিমাণে লেভোনরজেস্ট্রেল হরমোন নিঃসরণ হচ্ছে।এভাবে ১৬ বছর ধরে প্রতিদিন তাঁর শরীর থেকে হরমোন নিঃসরণ ঘটবে। তবে দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের সাহয্যে এই নিঃসরণ আবার যেকোনো সময় বন্ধও করা যাবে। বিশ্বের অন্যতম ধনী বিল গেটসের সহায়তায় প্রকল্পটির কাজ চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালে প্রাথমিক পরীক্ষার জন্য আগামী বছর প্রকল্পটি জমা দেওয়া হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১৮ সালের মধ্যে চিপটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর দামও গ্রাহকদের সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানীরা জানান, চিপটির ভেতরে ১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার আয়তনের ক্ষুদ্র আরেকটি যন্ত্র রয়েছে, যেখানে লেভোনরজেস্ট্রেল হরমোন সংরক্ষিত থাকে। এরপর স্বল্পমাত্রায় বৈদ্যুতিক প্রবাহে ওই হরমোনের অতি পাতলা আবরণ গলে যাবে। পরে শরীরে ছড়িয়ে পড়বে ৩০ মাইক্রোগ্রাম হরমোন। ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রবার্ট ফারা বলেন, ‘চিপটি চালু ও বন্ধ রাখার সামর্থ্য থাকায় পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য তা বেশ উপকারে আসবে।’ ২০ মি.মি. বাই ২০ মি.মি. বাই ৭ মি.মি. আয়তনের চিপটি প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে পাওয়া যাবে। বিজ্ঞানীদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট নারীর অনুমতি ছাড়া চিপটি যেন অন্য কেউ চালু বা বন্ধ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। ড. ফারা বলেন, দূরনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটি অবশ্য খুব দূর থেকে কাজ করবে না। দেহের যে অংশে চিপ স্থাপন করা হবে, তার ঠিক বাইরে দূর নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কাজ করবে।

মেসিকে চ্যালেঞ্জ, ৮০০ পুরুষকে হারানো এক আর্জেন্টিনা সুন্দরীর মডেলের

লিও মেসিকে ফুটবলে চ্যালেঞ্জ! তবে সেটা ফুটবল মাঠে নয়। ব্রাজিলের সমুদ্রসৈকতে। আর চ্যালেঞ্জার ও কোনও ফুটবলার নন। মেসিরই দেশের মডেল ফিওরেল্লা কাসতিলো। চব্বিশ বছর বয়সি আর্জেন্টিনিয়ান সুন্দরীকে বিশ্বকাপে অধিকংশ সময়ই দেখা যাচ্ছে ইপানেমা বিচে। ফিওরেল্লার দাবি, ব্রাজিল সমুদ্রসৈকতে তিনি এর মধ্যেই আটশো পুরুষকে বল জাগলিং, বল কন্ট্রোলে হারিয়েছেন। বাকি আছে এক জনকেই হারানো। আর সেই এক জন হলেন লিওনেল মেসি। “লিওর সঙ্গে বলের টক্করেও জিতব,” সুইৎজারল্যান্ডের সঙ্গে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মেসি নামার আগের দিন এলএম টেন অন্য চ্যালেঞ্জের সামনে। আর সেটা কিনা এল এক আর্জেন্টিনিয়ান সুন্দরীর থেকে!

সমুদ্রসীমার রায় কেউ হারেনি কেউ জিতেনি!

বাংলাদেশ-ভারত বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার রায়ে দুই দেশেরই জয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তার ভাষায়- ‘এই রায় উভয় রাষ্ট্রের জন্য বিজয় নিশ্চিত করেছে। এটি বন্ধুত্বের বিজয়। এটি বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণেরও বিজয়।’ তবে দক্ষিণ তালপট্টি নামে যে দ্বীপের দখল নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের তিন দশকের বিরোধ সে এলাকা ভারতের দখলে গেছে। দ্যা হেগ-এর আন্তর্জাতিক স্থায়ী সালিশি আদালত সোমবার উভয় দেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ওই রায় হস্তান্তর করেন। আদালতের নির্দেশনা মতে ঢাকা ও দিল্লি একসঙ্গে গতকাল এটি প্রকাশ করে। রায়ের বিস্তারিত জানাতে দুপুরে পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, মামলার এজেন্ট সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ডেপুটি এজেন্ট পররাষ্ট্র দপ্তরের মেরিটাইম ইউনিটের সচিব অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার এডমিরাল খুরশেদ আলমসহ মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে রায়ের কারিগরি দিকগুলো তুলে ধরেন পররাষ্ট্র দপ্তরের মেরিটাইম ইউনিটের সচিব। তিনি জানান, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ এলাকা ছিল প্রায় ২৫,৬০২ বর্গকিলোমিটার। আদালতের রায়ে এর মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে বাংলাদেশ, বাকিটা ভারতের। রায়ের ফলে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানানো হয়, এতদিন বাংলাদেশ ‘দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ’-এর মালিকানা দাবি করলেও এখন আর সেটির অস্তিত্ব নেই। সমুদ্র হিসাবেই এটি ভাগ হয়েছে। যে অংশে তালপট্টি অস্তিত্ব ছিল তা আইনগতভাবে ভারতে চলে গেছে বলেও জানানো হয়। প্রায় এক ঘণ্টার জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্র জয় ও ভারতের সঙ্গে জয়ের তুলনা, সদ্য ঘোষিত রায়ে বাংলাদেশে অর্জন এবং এক রায়ের দুই পক্ষের জয় পাওয়া সংক্রান্ত মন্ত্রীর দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। যে রায়ে কেউ হারেনি বা কেউ জিতেনি, সেখানে বাংলাদেশের ‘তালপট্টি’ কিভাবে হাওয়া হয়ে গেল এবং তা আইনগতভাবে ভারতকে ছেড়ে দেয়া হলো-সেই ব্যাখ্যাও চান সাংবাদিকরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মামলার এজেন্ট ও ডেপুটি এজেন্ট সব জিজ্ঞাসার জবাব দেয়ার চেষ্টা করেন। তবে তারা ঘুরে ফিরে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং সেই বন্ধুত্বের জয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। দীপু মনি বলেন, তালপট্টির অস্তিত্বই নেই। ভারত এ বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছে। তাই সমুদ্র হিসেবে ওই অংশটুকু ভাগ হয়েছে যা ভারতের দিকে চলে গেছে। তার বক্তব্য চলাকালেই এক সিনিয়র সাংবাদিক বলে ওঠেন- দ্বীপ হলে কি তা বাংলাদেশের আর সমুদ্র হলে ভারতের? প্রশ্নটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাস্যরসের সৃষ্টি হয় হলরুম জুড়ে। প্রশ্নোত্তরপর্বে দু’বছর আগে মিয়ানমারের সঙ্গে পাওয়া রায় ও ভারতের সঙ্গে রায়ের কোন তুলনা করতে রাজি হননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের জবাবে আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, প্রশ্ন অনেক বেশি হয়ে গেছে। রায়ের মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। কোন তুলনায় না গিয়ে রায় দু’টি বিচার-বিশ্লেষণের ভার তিনি সাংবাদিকদের ওপর ছেড়ে দেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধের প্রধান বিষয় ছিল দুই দেশের জলসীমা শুরুর স্থান নির্ধারণ। এছাড়া ভূমিরেখার মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়েও মতবিরোধ ছিল। ভারত সমদূরত্বের ভিত্তিতে রেখা টানার পক্ষে মত দিলেও বাংলাদেশ ন্যায্যতার ভিত্তিতে  রেখা টানার দাবি জানায়। বাংলাদেশের দাবি ছিল, বঙ্গোপসাগর ও ভূমির মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রির সোজা রেখা যাবে। তবে ভারত বলে- সমুদ্রতট বিবেচনায় এ রেখা হবে ১৬২ ডিগ্রি থেকে। বাংলাদেশের দাবি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। সেখানে জানানো হয়, আদালতের পাঁচ বিচারকের মধ্যে ভারতীয় বংশোদভূত বিচারক পেমারাজু শ্রীনিবাস রাও ঘোষিত রায়ের কিছু অংশের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। বাকি চার বিচারক রুডিগার ভোলফ্রাম, টমাস এ  মেনশাহ এবং আইভান শিয়েরার জ্যঁ-পিয়ের কৎয়ের মতামত অনুসারে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায়টি হয়েছে। ওই রায় মেনে নেয়ার জন্য ভারত সরকারকে সাধুবাদও জানানো হয়।
র‌্যাডক্লিফের ম্যাপ মতেই রায়: সংবাদ সম্মেলনে মেরিটাইম ইউনিট সচিব বলেন, ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রণীত র‌্যাডক্লিফের ম্যাপ বিবেচনায় নিয়েছে আদালত। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সমুদ্রে বাংলাদেশের দাবি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, সীমান্ত নদী হাড়িয়াভাঙ্গা, যেটি সমুদ্রে পতিত হয়েছে- র‌্যাডক্লিফের ম্যাপ অনুযায়ী সেখান থেকে সমুদ্রসীমা শুরু। ভারত উপস্থাপন করেছিল হাড়িয়াভাঙ্গা নদীটি রায়মঙ্গলে আছে। সেখান থেকে সমুদ্রসীমা শুরুর দাবিও করেছিল। এ দু’টোই ছিল মূল বক্তব্য। ১৯৪৭ সালে র‌্যাডক্লিফ যে ম্যাপ প্রণয়ন করেছিলেন বা আমাদের ইন্ডিপেন্টেন্ডস অ্যাওয়ার্ডে যে কথাগুলো বলে গেছেন সেই অনুযায়ী এটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ার কথা। রায়ে স্পষ্ট বলা আছে বাংলাদেশ রায়মঙ্গল নদী দিয়ে বাংলাদেশ যেমন অবাধে সমুদ্রে চলাচল করতে পারে ঠিক তেমনি পশ্চিমের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীটি ভারতে প্রবেশের জন্য দিয়ে দিয়েছে। এটি সত্য যে, হাড়িয়াভাঙ্গা নদীটা তাদের দিকে চলে গেছে। তবে আদালত ভারত প্রস্তাবিত সম-দূরত্ব পদ্ধতি মানেনি বলে জানান সচিব। ১০টি ব্লক নিয়ে ভারতের যে বিরোধ ছিল ওই রায়ের মধ্য দিয়ে ৪টি ব্লক সমন্বয় করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
৫ বছর ৯ মাসের আইনি লড়াই: তিন দশকের  বেশি সময় ধরে আলোচনার পর মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০০৯ সালের ৮ই অক্টোবর সালিশি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ জার্মানির হামবুর্গ ভিত্তিক সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (ইটলস) মামলা করে। এর রায় আসে ২০১২ সালের ১৫ই মার্চ। ভারতের সঙ্গে চূড়ান্ত শুমারি হয় ২০১৩ সালের ৯ থেকে ১৮ই ডিসেম্বর। এ দিনে উভয় পক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। শুনানি শেষে আদালতের মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। কার্যবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী, ৬ মাস পর অর্থাৎ জুনে এটি হওয়ার কথা থাকলেও ৭ই জুলাই রায়টি হস্তান্তর হয়। একই সময়ে আদালতের সেক্রেটারি জেনারেল হুগো এইচ সিবলেজ দু’দেশের প্রতিনিধির কাছে রায়ের কপি হস্তান্তর করেন। নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল ও ভারতের রাষ্ট্রদূত রাজেশ নন্দন প্রসাদ নিজ নিজ দেশের পক্ষে তা গ্রহণ করেন। ওই রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে ৫ বছর ৯ মাসের আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটলো।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আশাবাদ: রায় প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা যা উভয় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল তা আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে অবশেষে নিষ্পত্তি হলো। মন্ত্রী বলেন, ওই রায় উভয় রাষ্ট্রের নিজ নিজ সমুদ্র সীমানা চিহ্নিত করে দিয়েছে যার বিরুদ্ধে আপিল করার কোন সুযোগ নেই। এই রায়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত বাংলাদেশের মামলার পরিসমাপ্তি ঘটলো। আন্তর্জাতিক আইনগত প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের বিরাজমান এই সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে ভারতের সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানান তিনি।
মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা: ২০১৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর দ্য হেগের পিস প্যালেসে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণ মামলার চূড়ান্ত শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন এজেন্ট দীপু মনি, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এবং মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম। শুনানিতে বাংলাদেশের পক্ষে কৌঁসুলি হিসেবে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পল রাইখলার ও লরেন্স মার্টিন, যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক জেমস ক্রাফোর্ড, ফিলিপ স্যান্ডস ও অ্যালান বয়েল এবং কানাডার অধ্যাপক পায়াম আখাভান।  গতকালের সংবাদ সম্মেলনে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়। মামলায় বাংলাদেশের এজেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, আজ আমাদের আনন্দের দিন। ন্যায্যতার জয় হয়েছে। আর তাই বলে দু’পক্ষেরই জয় হয়েছে। এটা উইন-উইন সিচুয়েশন। আমাদের যা দরকার আমরা তা পেয়েছি। প্রতিবেশী দেশও তাদের যা পাওয়ার তা পেয়েছে।” দীপু মনি বলেন, আজকের দিনটি ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য গৌরবের। মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দীর্ঘ এ লড়াইয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার সহায়তা পেয়েছি। বিশেষ করে কমনওয়েলথ-এর। আজকের এই দিনে আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আমরা আর মামুরা by কাজল ঘোষ

বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। কংগ্রেস জামানার শেষদিকে একটি ঘটনা খুব তাক লাগিয়েছিল। লোকসভার অধিবেশনে মরিচের গুঁড়ো নিক্ষেপ। স্পিকার আহত হয়েছিলেন। তদন্ত কমিটি হলো। দোষীদের খোঁজার কাজ চললো। আমাদের স্পিকার শিরিন শারমিন সে সময় দিল্লিতে। রাষ্ট্রীয় সফরের ফাঁকে তিনি এই ঘটনাটি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ফিরি নিজ দেশে। এখানে স্পিকারের মরিচ গুঁড়োর টেনশন নেই। কারণ শক্তিশালী বিরোধী দল নেই। ধরে নিই, টিআইবি অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে এমন একটি বিরোধী দল নিয়ে তথ্য না জানালে আমাদের বুঝতে কি বাকি থাকতো। সরকারি টেলিভিশনের কল্যাণে সংসদের হাস্যরস মোটামুটি সকলেরই জানা। সবশেষ অধিবেশনের সমাপনীতে দেখা গেছে, একে অন্যের পিঠ চুলকিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটছে। তবে, লক্ষণীয় বিষয় পার্লামেন্টের বর্তমান বিরোধী দল বা সরকারি দলের পক্ষের চেয়ে সমালোচনা বেশি হচ্ছে প্রাক্তন বিরোধী দল নিয়ে। অর্থাৎ যারা এই পার্লামেন্টে নেই সেই বিএনপি-জামায়াত নিয়েই আলোচনা বেশি। টিআইবি’র গবেষণায় দেখা গেছে, দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপি-জামায়াত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে ৫৩১ বার। যেখানে নবম সংসদে একটি অধিবেশনে সংসদে থাকা বিরোধী দলের সমালোচনা হয়েছে ৩৪২ বার। নির্বাচিত বিরোধী দলের চেয়ে যারা প্রাক্তন হয়ে গেছেন তারাই কি অনেক বেশি শক্তিশালী এই প্রশ্নটি কেউ করলে নিশ্চয়ই অবান্তর হবে না। টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতার উপস্থিতি ছিল ৮৮.৮৮% এবং বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতি ছিল ৩৮.৮৮%। বিস্ময় লেগেছে শক্তিশালী বিরোধী নেতার ভূমিকায় যারা অভিনয় করছেন সেই নেত্রীর উপস্থিতি সংসদ নেতার চেয়ে অনেক কম। যেদিন এরশাদকে বাইপাস করে রওশন এরশাদ সংসদে বিরাধী নেত্রীর ভূমিকায় বসেছিলেন তখন ভেবেছিলাম এটি আর যাই হোক অলঙ্কারিক ফার্স্ট লেডির তকমা থেকে বেরিয়ে আসার চমৎকার সুযোগ। আর গণতান্ত্রিক সংসদে তো ছায়া সরকারের মাধ্যমে বিরোধী দলই সরকারের ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করে থাকে। বিএনপি যখন নির্বাচনে অংশ নেয়নি তখন সত্যিকার বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে জাতীয় পার্টি ও রওশন জাতির ইতিহাসের নতুন দিগন্ত রচনা করবে। প্রচ-ভাবে হতাশ হয়েছে দেশের মানুষ। কি এক তামাশার বিরোধী দল! একে অন্যের দিকে খেয়াল রেখেই এগিয়ে চলেছে সংসদ ও সরকার। কারণ, অদ্ভুত এই জমানায় বিরোধী দল সরকারেরও অংশ আবার বিরোধী দল হিসেবেতো আছেই। যদিও এই সংসদে ফরমালিন নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জায়গাটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাছাড়া, হাই অফিসিয়াল ডিপ্লোম্যাটরা, বিদেশী মন্ত্রীরা বিরোধী নেতার সঙ্গে কথা বলছেন দেশ, সরকার, রাজনীতি নিয়ে। এটাইতো অনেক পাওনা। অথচ বাহাত্তর পরবর্তীতে গুটিকয় সংসদ সদস্য বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। যা এখনও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। আজকের আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সে সময় বিরোধী দলে থেকে সরকারের কর্মকা- সমালোচনা করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। আজকের এই সংসদের মাধ্যমে অচেনা এই গণতন্ত্র বাঁচাতে বর্তমান সংসদের সদস্যদের ভোটার ছাড়াই জয় নিয়ে আসতে হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির একটি ব্যালটবিহীন নির্বাচন অদ্ভুত কিসিমের একটি পার্লামেন্ট এবং একই সঙ্গে একটি সরকার উপহার দেয়ার কাজটি করেছে। আর এতে আমাদের মান্যবর নির্বাচন কমিশন গৌরবের ঢেঁকুর তোলার সুযোগটি পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে ৫ তারিখের নির্বাচন কি ধরনের জগাখিচুড়ি হয়েছে তার একটি নজির। এতে দেখা যায়, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বাইরে যে ক’টিতে ভোট হয়েছে তার ৯০টিতে ভোটের হিসেবে গরমিল। প্রতিটি এলাকা থেকে পাঠানো রিটার্নিং অফিসার আর প্রিজাইডিং অফিসারের পাঠানো তালিকায় মিল নেই। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে একই কমিশনের কর্মকর্তাদের ভোটের হিসাবে দুই রকম হওয়ার কারণ কি থাকতে পারে। এতে কি কেবলই যোগের ভুল। নাকি ভোটের হার বাড়াতে এই টুকুতো করতেই হবে। যা হোক, মিডিয়াতে রিপোর্ট প্রকাশের পর তোলপাড় চলছে ইসিতে। একদিকে ভোট ছাড়াই সংসদে বসার অধিকার অন্যদিকে ভোটের গরমিলে যে গোঁজামিলের গণতন্ত্র তা কতটা শক্তিশালী রাষ্ট্র উপহার দেবে তা বিবেকবান নাগরিক মাত্রেরই জিজ্ঞাসা। সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে আর যাই হোক নৈতিকভাবে একটি রাষ্ট্র তার নীতির প্রশ্নে, সামজিক মূল্যবোধ প্রশ্নে, ন্যায়বিচার প্রশ্নে যোগ্য সরকার দাবি করতে পারে না। অমন ভঙ্গুর গণতন্ত্রের বড়াই নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। ক’দিন আগে টিআইবির আরেকটি রিপোর্ট নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেই দপ্তরের মন্ত্রী চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন। প্রয়োজন এই রিপোর্টের সত্যতা যাচাই করে শিক্ষার মান বাঁচাতে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়। কোন তদন্ত বা অনুসন্ধান ছাড়াই শিক্ষামন্ত্রী ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ নেয়ায় সত্যানুসন্ধানের পথ রুদ্ধ হলো। বরং টিআইবির রিপোর্ট আমলে নিয়েই সামনে এগোনো যেতে পারে। এতে মন্দের কিছু নেই। ভুল কিছু হলে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও যুগোপযোগী হতে পারে। একইভাবে সংসদের রিপোর্ট নিয়েও। বর্তমান বিরোধী দলের এটাই সুযোগ, নিজেদের যোগ্য বিরোধী দলের স্থানে নিয়ে যাওয়া। এরকমন সুযোগ কালেভদ্রে মিলে।

বুকের ওপর পা রেখে দাড়ি উপড়ায় ইরাকি সেনা by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বুকের ওপর পা তুলে, বন্দুক ঠেকিয়ে, প্লাস দিয়ে টেনে টেনে দাড়ি উপড়ে ফেলে ইরাকের সেনা। রাইফেলের বাঁট দিয়ে গিরায় গিরায় আঘাত করে। কোন রকম জান নিয়ে ফিরে এসেছি। ফিরে না এলে হয়তো ওরা আমাকে মেরেই ফেলতো। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা দেন ইরাক থেকে ফিরে আসা জালাল উদ্দিন। গত ২৮শে জুন বাংলাদেশীদের ওপর সেনাবাহিনীর সদস্যদের এ ধরনের লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দেন আরও অনেকে। সমপ্রতি ইরাকে শিয়া-সুন্নি সমপ্রদায়ের মধ্যে সংঘাতের ফলে বিদেশীরাও আক্রান্ত হয়। অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় সে দেশে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশীদের ওপর। কোরিয়ান কোম্পানি হানওয়া’র অধীনে বাগদাদের বিসমায়া নিউ সিটি প্রজেক্টে কর্মরত প্রায় ৪৫০০ বাংলাদেশী ওই নির্যাতনের পর আতঙ্কিত হয়ে দেশে ফিরতে শুরু করেন। গতকাল ভোর সাড়ে ৫টায় কাতার এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে নিজ খরচে ৪১ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। এছাড়া একই দিন ভারতীয় ৬ নাগরিকও দেশে ফিরেছেন। এর আগে ১লা জুলাই নিজ খরচে দেশে ফেরেন আরও ২৭ বাংলাদেশী। এখনও দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন আর ১৭০০ কর্মী। টিকিটের টাকার অভাবে ফিরতে পারছেন না আতঙ্কে থাকা প্রায় হাজার বাংলাদেশী। বাড়ি থেকে পাঠানো টাকায় গতকাল অনেকেই ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে দূতাবাস ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। তাদের অভিযোগ, যে কোন অসুবিধায় যোগাযোগের জন্য দেয়া দূতাবাসের হট লাইনে ফোন দিলে কেউ রিসিভ করেন না। আবার কখনও কখনও রিসিভ করলেও খারাপ আচরণ করেন। ফিরে আসা প্রত্যেকেই তাদের দুর্ভোগের জন্য ম্যানেজ পাওয়ার, ইউনিক, ক্যারিয়ার এবং রাজ ওভারসিজ নামে ৪টি এজেন্সিকে দায়ী করেন। তারা আরও অভিযোগ করেন এজেন্সিগুলো তাদের ইরাক পাঠানোর সময় যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে ভিডিও জবানবন্দিতে তার কম বলতে বাধ্য করেছে। এছাড়া সেখানে এজেন্সিগুলোর নিয়োজিত লোকজন কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে দেশে পাঠাচ্ছে না। নির্যাতনের শিকার মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার জালাল উদ্দিন জানান, তিনি ইউনিক এজেন্সির মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা খরচ করে ইরাকে কোরিয়ান কোম্পানি হানওয়া’র অধীনে বিসমায়া নিউ সিটি প্রজেক্টে ইলেক্টিশিয়ান হিসেবে কাজ নেন। কিন্তু শিয়া-সুন্নি সংঘাতের জের ধরে গত ২৮শে জুলাই তাদের ওপর হামলা করে ইরাকি পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, সেদিন আমার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে মুখের দাড়ি প্লাস দিয়ে টেনে টেনে তোলে। আমার ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখে আশেপাশের অনেকেই ভীত হয়ে পড়ে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে দাড়ি রাখি, অথচ ইরাকের শিয়ারা দাড়ি রাখার কারণেই আমার ওপর নির্মম অত্যাচার চালালো। এ সময় তিনি তার দাড়ি সংবলিত ছবিযুক্ত পাসপোর্ট দেখান। তিনি বলেন, আমি তবু জানে বেঁচে এসেছি। কিন্তু ওই দিনের নির্যাতনের শিকার ইমাম মাহবুব ও মান্নানের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, যারা এখনও ওই দেশে আছেন তাদের ভালভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন, তাদের বাঁচান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার সুমন সেখানে ক্রেন অপারেটরের কাজ করেন ইউনিক এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে। তিনি যান ৩ লাখ টাকা খরচ করে। ৭ মাসে তিনি ২ লাখ টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে কথা বলারও স্বাধীনতা ছিল না আমাদের। যখন তখন হুমকি ধামকি দিতো। এ কারণে আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। জবরদস্তি করে কাজ করানো হতো। প্রায়ই গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হতো। তিনি বলেন, আমরা থাকতাম অনেকটা জেলখানার মতো জায়গায়। ২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তারকাঁটা দেয়া। সেনাবাহিনীর কড়া প্রহরা। বাইরের কোন খবর আমাদের কাছে আসতো না। তবে আসার সময় এয়ারপোর্টে কর্মরত বাঙালিরা বলেছে অনেক বাঙালিকে নাকি নির্যাতন করেছে শিয়ারা। সুমন জানান, প্রায়ই সেনাবাহিনী এসে হুমকি দিতো- কাউকে সন্দেহ হলে যখন তখন যাকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। ওই ঘটনার পর থেকে তাই প্রতিটি দিন কেটেছে আতঙ্কে। বিসমায়া নিউ সিটি প্রজেক্টে ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতেন পাবনার শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আশপাশে প্রতিদিনই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেতাম।  এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম। তাই ফিরে এলাম। ফিরে আসা ঝালকাঠির কাইয়ুম বলেন, ৮ থেকে ১০ জন সেনাবাহিনীর লোক একটি রুমে আমাদের ৮ থেকে ১০ জনকে আটকে রেখে নির্যাতন করে। বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে। এলোপাতাড়ি লাথি মারে। এ সময় তারা ঊর্ধ্বতনদের বের করে দেয়। ২ লাখ টাকা দিয়ে ক্যারিয়ার এজেন্সির মাধ্যমে ইরাক যান ব্রহ্মণবাড়িয়ার সিরাজুল। তিনি বলেন, আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কোম্পানি ওপর। অথচ যখন হামলা হয় এবং বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি দেয়া হয় তখন কোম্পানি বলে- আমাদের কিছুই করার নেই। কোম্পানির লোকজনের সামনেই আমাদের মারধর করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, যাদের কাজ করি তারা যদি নিরাপত্তার দায়িত্ব না নেয় তাহলে কিভাবে থাকবো। ২ লাখ টাকা দিয়ে ম্যানেজ পাওয়ারের মাধ্যমে টেকনিশিয়ানের কাজ নিয়ে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাফেজ মো. জয়নাল আবেদীন। তিনিও ইরাক থেকে বিমান ভাড়া নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তিনি বলেন, এজেন্সির লোকেরা হানওয়া কোম্পানিকে বাংলাদেশীদের পাঠাতে নিষেধ করছে এবং টিকিট দিতেও নিষেধ করছে। তিনি বলেন, ১লা ও ২রা জুলাইয়েই প্রায় ১৭০০ জন অব্যাহতির আবেদন করেন। প্রথমে কিছু আবেদনপত্র গ্রহণ করলেও পরে আর গ্রহণ করছে না। তিনি জানান, ২৮শে জুনের ঘটনার পর ২রা জুলাই কোম্পানি নোটিশ দেয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য। কিন্তু আজও সে ধরনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তাই শঙ্কার মধ্যে ছিলাম। ফেরত আসা বাংলাদেশীরা অভিযোগ করেন, ৪ এজেন্সির ৪ ব্যক্তির কারণেই মূলত তাদের দেশে ফিরতে সমস্যা হচ্ছে। তারাই কোম্পানিকে বোঝাচ্ছেন যে বাঙালিদের যেতে দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু সেখানে মৃত্যুর মুখে কিভাবে কাজ করা যায়? তারা আরও অভিযোগ করেন, বেশির ভাগ কর্মীই ৩ লাখ টাকা খরচ করে ইরাক এসেছে। কিন্তু ভিডিও জবানবন্দিতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার কথা বলানো হয়েছে। দালাল ও এজেন্টদের চাপে তারা এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে জানান। তারা বলেন, ওই সময় এজেন্সি তাদের বলেছিল যদি এ স্বীকারোক্তি না দেয় তবে তাদের পাঠানো হবে না।

একদলীয় রাষ্ট্রে বাঙালিরা সমরাজনৈতিক অধিকার হারাবেন by উইলিয়াম বি মাইলাম

সম রাজনৈতিক অধিকারের প্রবল আকাঙক্ষা থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন বাঙালিরা। কিন্তু গত জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশে উত্থান ঘটেছে একদলীয় সরকারের। এর মাধ্যমে তাদের সেই সম রাজনৈতিক অধিকার ফের হারিয়ে গেছে। যদি এই একদলীয় সরকার ব্যবস্থা একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয় তাহলে বাঙালিরা সেই অধিকার হারাতে পারেন স্থায়ীভাবে। অনেক দেশের মধ্যে যারা কর্তৃত্বপরায়ণতায় ফিরে গিয়েছে, তাদের খুব কম সংখ্যকই ফিরে যেতে পেরেছে একেবারে শুরুর অবস্থায়। সম্প্রতি আমি লিখেছি ইতিহাসের জট সম্পর্কে। সেখানে আমি পরামর্শ দিয়েছি যে, (তৎকালীন) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সাংস্কৃতিক দ্বি-বিভাজনই রক্তাক্ত যুদ্ধের ভিত্তি রচনা করেছিল। পাকিস্তানের তখনকার এ দু’ অংশের মধ্যে এ লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগের বছরগুলোতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে প্রকাশিত মিডিয়ার দিকে যদি তাকানো হয় তাহলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাঙালিদের মধ্যে যে গুরুতর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণ কি। তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তাই বাঙালিদের তাৎক্ষণিকভাবে যে ইস্যুতে জাতীয় স্বার্থে একত্রিত করেছিল তা সাংস্কৃতিক ছিল না। তা ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। এর অর্থ এই নয় যে, সাংস্কৃতিক ব্যবধান কোন ভূমিকা রাখে নি। তবে ওই সময়ে বাঙালি বোদ্ধা মহলে এ ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় নি। এটা পরিষ্কার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্দশার আগেই এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মতপার্থক্য একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছিল বলেই আমার কাছে মনে হয়। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধ এগিয়ে চলতে থাকলো এবং বাঙালিদের ওপর নির্যাতন বেড়ে গেল বহু বহু গুণে। দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, সাংস্কৃতিক মতপার্থক্য অধিকতর ব্যবধান হিসেবে দেখা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পরিচালিত সরকারের মুখপাত্র ছিলেন ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) এ আর সিদ্দিকী। তিনি ২০০৬ সালে একটি ডায়েরি প্রকাশ করেছেন।
বাঙালিরা হিন্দু ভাবধারার ও সংস্কৃতে লেখা হস্তলিপি ধারণ করে, হিন্দুদের লেখা কবিতা ও গানের প্রতি তাদের রয়েছে ভালবাসা। এমন অভিযোগ তুলে পাকিস্তানি সেনা নেতৃত্ব বাঙালিদের উপহাস করতেন বলে লিখেছেন ফুকুইয়ামা। বাঙালিদের এসব কারণে দমন করা সহজ হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান ও তার সহযোগীরা। বাঙালিদের বিরুদ্ধে অভিযানের এটি অন্যতম একটি কারণ। এ মতপার্থক্য পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে  সাংস্কৃতিক দিক থেকে, এমনটা ধরে নেয়া হয়।
ইতিহাস এমন নিষ্ঠুরতায়ই পরিপূর্ণ। ফ্রাঁসিস ফুকুইয়ামা’র ‘দ্য এন্ড অব হিস্টরি’ শীর্ষক বিতর্কিত রচনার ২৫ বছর পূর্তি উদযাপিত হয় সম্প্রতি। একই সঙ্গে এ রচনার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। এ রচনার বার্ষিকী উদযাপন করা হয়। ১৯৮৯ সালের পূর্বাপর দিনগুলোতে গণতন্ত্র (কমপক্ষে নির্বাচিত গণতন্ত্রে) দৃশ্যত এগিয়ে যাচ্ছিল। এমনভাবে ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইন, ১৯৮৮ সালে পাকিস্তান, ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপ, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ, ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে যায় গণতন্ত্রের পথে । দক্ষিণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার অন্যান্য রাষ্ট্রে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করা হয়েছিল। সেখানে গণতন্ত্র, উদারতা ও বাজার ভিত্তিক অর্থনীতিকে স্বাগত জানানো হয়। তাই সহজেই বলা যায় যে, কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীকে একপেশে করে ফেলতে অব্যাহতভাবে চাপ দিয়ে যাবে গণতন্ত্র ।
কিন্তু এমন স্বপ্নের গণতন্ত্রের যাত্রাপথে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। গণতন্ত্রায়ণের তৃতীয় দফার যাত্রা শুরুর ত্রিশ বছর পরে এটা শুধু ধোঁয়াশায় পরিণত হয় নি। একই সঙ্গে এর যে জোয়ার ছিল তা অপসৃত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে নির্বাচনের মাধ্যমে যে গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছিল এখন তা নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। নির্যাস ছাড়া গণতন্ত্রে রয়েছে কিছু প্রতীকী বিষয়। রয়েছে সরকার ও তার কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি।
আমাদের যারা ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে উদযাপন করেছি তারা ভুলে গিয়েছি যে, স্থিতিশীল গণতন্ত্রে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু থাকতে হয়। কোন ইতিহাসের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও সবার অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান। মুক্তমনের সংস্কৃতি ও সহনশীলতা, যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় দেয়া ও নেয়ার সংস্কৃতি। এতে অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে থাকতেই হবে একটি বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ, যারা ব্যাপকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করবে। লালন করবে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যার সারকথা অবশ্যই ফাঁকা হবে না। থাকবে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি। সামাজিক প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে যারা সুশীল সমাজের কথা সরকারের কাছে ও রাজনীতিতে অনাগ্রহী সেনাবাহিনীর কাছে তুলে ধরবে।
ইতিহাস এখনও শেষ হয়ে যায় নি। নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র কোটি কোটি মানুষের উচ্চাশার গণতান্ত্রিক অবস্থান হতে পারে না। ফুকুইয়ামা উল্লেখ করেছেন, উদার গণতন্ত্রের চেয়ে উত্তম কোন মডেল যদি থাকতো তাহলে উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অভিবাসীর স্রোত এতটা প্রবল হতো না। এক্ষেত্রে একমাত্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দেশ হলো চীন। সেখানে একই সঙ্গে আছে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ঘটনা। পাশাপাশি আছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। কিন্তু এই মডেল আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম। তিনি ওয়াশিংটনের উড্র উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাকিস্তানি সংস্করণ দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ।

সংকট উত্তরণে চাই দৃশ্যমান পদক্ষেপ by সালেহউদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে যে খাতগুলো বড় ভূমিকা রাখছে, তার মধ্যে ব্যাংকিং খাত অন্যতম। ব্যাংকিং খাতের বিশেষ দিকে হচ্ছে এটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। ব্যাংকিং খাতে কোনো সমস্যা থাকলে এর প্রভাব শুধু সে খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। এটা সংক্রামক ব্যাধির মতোই দ্রুত অন্যান্য খাতকেও আক্রমণ করে। এটা হচ্ছে ‘ফিন্যান্সিয়াল কন্টাজিয়ন’, যা সংক্রামক ব্যাধির মতো উৎপাদন খাত ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে।
কিছু উদাহরণ জাজ্বল্যমান। ২০০৭ সালের বৈশ্বিক আর্থিক খাতের সংকটের সূত্রপাত হয় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং খাত থেকে। তারপর সেটা দেশটির অন্যান্য খাত ও পরে অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। সাইপ্রাস, স্পেন, গ্রিস, ইতালি প্রভৃতি দেশ এখানো এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কোনো নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েনি।
বছর কয়েক আগে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সুশৃঙ্খলভাবেই চলছিল। ব্যাংকগুলোতে নিয়ম-নীতিমালা পরিপালন করা হচ্ছিল, সেগুলো একরকম নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার কারণে খাতটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে এ থেকে উত্তরণের সুযোগ রয়েছে। দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অভিন্ন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন পরিচালনা পর্ষদ গঠন। পরিচালকদের নিয়োগ দেওয়া হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতা সব সময় বিবেচনা করা হয় না। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ আছে। এসব কারণেই হল-মার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটতে পেরেছে। এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও পরিবীক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা রয়েছে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থায়ই ফাটল ধরেছে।
সম্প্রতি বেসিক ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা সীমিত। এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই মুখ্য।বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব নিয়ম রয়েছে, সেগুলো যথেষ্ট ভালো ও আন্তর্জাতিক মানের। আমাদের ব্যাংক কোম্পানি আইনেও বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এসব নীতিমালা, বিধিবিধান সঠিকভাবে পরিপালন বা কমপ্লায়েন্স হচ্ছে না। এটি দেখভালের মূল দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর। দ্বিতীয়ত, এসব নীতিমালা সঠিকভাবে পরিপালন হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের।মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তাদের পক্ষ থেকে সময়োচিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।এই সমস্যা দূরীকরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে সচেষ্ট হতে হবে এবং দৃঢ়তা, সততা, দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে ব্যাংকটির ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাতে উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত নিরসন করতে না পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়বে। আর ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক দেশে আর্থিক খাতের অনিয়ম তদন্তের জন্য পৃথক সংস্থা থাকে। বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন সে কাজটি করে থাকে। কিন্তু এটা করতে যে পরিমাণ লোকবল দরকার, তাদের সেটা নেই। একই সঙ্গে সংস্থাটির দক্ষতার অভাবও প্রতীয়মান, তদন্তের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। সে কারণে বড় বড় আর্থিক দুর্নীতির তদন্তের জন্য আলাদা সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আর তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনাও জরুরি। ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের দৃশ্যমান ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সেটা করতে হলে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। ব্যাংকিং খাতে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান মানুষদের নিয়োগ দিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন সময় সংস্কার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কখনোই এসবের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যাংকিং খাতের সেবা নিয়েও গ্রাহকেরা অনেক অভিযোগ করছেন, চার্জও বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এটা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে আমাদের ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের গুণগত মান এবং সেবার মান উন্নত করতে হবে। শুধু শাখা বাড়িয়ে ও জমি কিনে এটা নিশ্চিত করা যাবে না। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ও অপচয় কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্য ব্যাংকগুলোকে সচেষ্ট হতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা মোকাবিলায় সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ যেমন দরকার, তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে সময়োচিত, যথাযথ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। এ খাতের বিরাজমান অব্যবস্থাপনার কারণে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরই প্রভাব পড়বে না, চূড়ান্তভাবে জনগণের ওপরই এর সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের দায়ভার জনগণ নেবে কেন? মনে রাখতে হবে, ব্যাংকিং খাতের উন্নতি হলে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়বে, টেকসই ও সুষম উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ: অর্থনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি by খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সাম্প্রতিককালে হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, বেসিক ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা জনমনে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। শাহজালাল ব্যাংকের একজন পরিচালক দুর্নীতির মামলায় জেলহাজতে রয়েছেন।চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ সম্বন্ধে উৎকণ্ঠা জাগানো অনেক ঘটনা অনুচ্চ স্বরে আলোচিত হচ্ছে। এসব ঘটনায় আটকে পড়া টাকার অঙ্ক কয়েক হাজার কোটি টাকা।এ ছাড়া অনুদ্ঘাটিত আটকে পড়া ঋণ এবং জালিয়াতি-আত্মসাতের ঘটনা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত টাকার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হবে বলে অনেকের ধারণা। ব্যাংকে জনগণের অর্থ জমা থাকে। তাই আমানতের খেয়ানত সীমা ছাড়িয়ে গেলে উদ্বেগ জন্ম নেয়।
সরকারি ব্যাংকের জালিয়াতি এবং বেসরকারি ব্যাংকের দুর্নীতির আকার-প্রকার ভিন্ন। ঘটক-অনুঘটকও ভিন্ন। সরকারি ব্যাংকের মালিক সরকার। সরকারের শক্তিধর ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিত, আনুকূল্য ও সহায়তায় সরকারি ব্যাংকে দুর্নীতি-জালিয়াতি ঘটে থাকে। সেই সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনার জন্য সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগদানে সরকারের সক্ষমতা প্রশ্নের সম্মুখীন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বেসিক ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার এক মাসের মধ্যেও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে চেয়ারম্যানকে ‘সসম্মানে’ পদত্যাগের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতার নজির রেখেছে। এর আগে হল-মার্কের ঘটনার পর অর্থমন্ত্রী হালকাভাবে বলেছিলেন, ‘চার হাজার কোটি টাকা এমন বেশি কিছু না, ব্যাংকে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে।’ এভাবে সরকার দুর্নীতিকে উৎসাহ জুগিয়েছে। শুধু বর্তমান সরকারই নয়, আগের সরকারও হাওয়া ভবন থেকে দুর্নীতি পরিচালনা করেছিল। ড্যান্ডি ডাইংসহ অনেক ঋণ-কেলেঙ্কারি তখন ঘটেছিল।
ব্যাংকের দুর্নীতির সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকে।আশির দশকে ব্যাংকে দুর্নীিতর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। জেনারেল এরশাদ দুর্নীতিকে বাধামুক্ত করার জন্য সবচেয়ে সৎ ব্যাংকারদের সামরিক আইনে জেলে পুরেছিলেন। সেসব স্বনামধন্য ব্যাংকার হলেন লুৎফর রহমান সরকার, মুশফেকুস সালেহীন, সৈয়দ আলী কবির প্রমুখ।সৎ ও দক্ষ ব্যাংকারদের শাস্তি দিয়ে এরশাদ দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করেছিলেন।সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সরকারগুলো ব্যাংকে হানা দিয়ে অর্থ লোপাটের অপসংস্কৃতির চর্চা করেছে।
দুর্ভাগ্য, বর্তমান সরকারও সরকারি ব্যাংকে অর্থ অপচয়ের ধারায় পানি সিঞ্চন করছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুপারিশ রাখতে চাই। সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, বোর্ড সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের সার্চ কমিটি গঠন করবে। এ কমিটির সদস্য হবেন এমন ব্যক্তিরা, যাঁরা নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী। শুধু সৎই নন, জনগণ তাঁদের সৎ মনে করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নররা, সুনামের অধিকারী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকাররা, সাবেক অর্থসচিবেরা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ হতে পারেন এই কমিটির সদস্য।সার্চ কমিটি একটি পদের জন্য দুজনের নাম সুপারিশ করবে। সরকার একজনকে নিয়োগ দেবে। উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচনে সরকারের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এই প্রক্রিয়া সহায়ক হতে পারে। সেই সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ায় কিছু সংশোধন আনা প্রয়োজন।বর্তমান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাংক পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় রিপোর্ট পেয়ে থাকে।অথচ বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। শুধু প্রাইভেট ব্যাংকের চেয়ারম্যান-পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। একই দেশে সরকারি ও প্রাইভেট ব্যাংকের জন্য দুই ধরনের আইন থাকা অনুচিত। ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটি সংশোধন করে প্রাইভেট ও সরকারি ব্যাংককে সমপর্যায়ে আনতে হবে। সরকারি ব্যাংকে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠায় এ ব্যবস্থা ফলপ্রসূ হবে।
প্রাইভেট ব্যাংকের বিষয়টি একটু ভিন্ন। প্রাইভেট ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের হলেও, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাইভেট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীসহ পুরো পর্ষদ অপসারণ করতে পারে, প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে এবং অন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, সে কারণে প্রাইভেট ব্যাংকের বিপর্যয়ের দায়দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বর্তায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগের কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতার এতটুকু ঘাটতি হলেই বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সম্ভবত তেমনটাই ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন বিভাগের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিভাগের পরিদর্শক থেকে ডেপুটি গভর্নর পর্যন্ত প্রতিটি কর্মকর্তাকে সন্দেহাতীতভাবে সৎ হতে হবে, সাহসী হতে হবে, দক্ষ হতে হবে। অনবরত রদবদলের মাধ্যমে এই বিভাগটিকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা এবং সততা ও দক্ষতার মান বজায় রাখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত গভর্নরের ওপর বর্তায়।
বিষয়গুলো জনগুরুত্বপূর্ণ। ‘ইগো’ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রে সুশাসনের চেয়ে জনগণের আমানতের ট্রাস্টি হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: ব্যাংকার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাকিবের নির্বাসন-প্রক্রিয়া না মেনে গুরুদণ্ড কেন?

দেশের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের শাস্তি তিনি একা নন, তাঁর লাখো-কোটি ভক্তও অনুভব করছেন।অসদাচরণের শাস্তি নিয়ে যতটা প্রশ্ন, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন শাস্তির মাত্রা ও প্রক্রিয়া নিয়ে। ক্রিকেটে পেশাদারি আনার বদলে তা বুমেরাং হয় কি না, সেটাই ভাবার বিষয়।
সাকিব আল হাসান দেশের অমূল্য সম্পদ। তাঁকে সামলানো ও আগলানোর দায়িত্ব ছিল ক্রিকেট বোর্ডের। কিন্তু তারা সাকিবকে সামলানোয় যত আগ্রহী, আগলে রেখে শেখানোয় ততটা নিষ্ঠাবান কি? এ ঘটনা ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে ক্রিকেটারদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের উন্মোচন ঘটাল। মনে রাখা দরকার, আইন কাউকে প্রতিপক্ষ মনে করে শাস্তি দেয় না, শাস্তি সেখানে ন্যায়ের অংশ। সাকিবকেও যেন কারও প্রতিপক্ষ মনে করা না হয়।
সাকিবের শাস্তি হয়েছে বোর্ডের সঙ্গে খেলোয়াড়দের করা চুক্তির শর্তে। আচরণবিধি ও শৃঙ্খলাসম্পর্কিত বিধির আওতায় তাঁর ‘বিচার’ হওয়াই ছিল সংগত। শৃঙ্খলা কমিটিতে শুনানি, ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির পর্যালোচনার পাশাপাশি অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। তাহলে বোর্ডের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনও হতো না।
তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে অতীতের বিভিন্ন ‘ঘটনা’র মিলিত ফল হিসেবে; কেবল লিখিত অনুমতিপত্র না নিয়ে বিদেশে খেলতে যাওয়ার জন্য নয়। অথচ কিছু শাস্তি তিনি আগেই ভোগ করেছেন। তাই সেসব প্রসঙ্গ টেনে বর্তমানের শাস্তিকে ‘চরম’ করা কেন?
দ্বিতীয়ত, ক্রিকেট বোর্ড গোড়া থেকেই দায়িত্বশীলভাবে শাসন-অনুশাসন করলে ঘটনা এত বড় হতো না। সাকিব তাঁর ভুল স্বীকার করেছেন।মৌখিক অনুমতি প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক শাস্তি মেনে দেশে ফিরেও এসেছেন। শ্রীলঙ্কার কোচ হাথুরুসিংহের কাছে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য অনুতপ্তও হয়েছেন। এত কিছুর পরে এমন গুরুদণ্ড দেওয়া জরুরি হলো কেন? পাশাপাশি ক্রিকেট পরিচালনা কর্তৃপক্ষকে নিয়েও অভিযোগের বহর বাড়ছে। এ ব্যাপারেও স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সাকিব আল হাসানের গুরুদণ্ড দেশের ক্রিকেটকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

রাজনীতিকদের নিষিদ্ধ করার ‘বোর্ড’ কই? by এ কে এম জাকারিয়া

রিকেটার সাকিব আল হাসান ‘দোষ’ করেছেন, এটা মেনে নিয়েই দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। সাকিবের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), অনেকেই এর বিরোধিতায় নেমেছেন, আবার পক্ষেও যুক্তির অভাব নেই। প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে পাঠকদের মতামতে দুই পক্ষেরই অবস্থান প্রায় সমানে সমানে। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। এসব বিতর্ক চলুক, বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, সাকিব বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটার, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড় ও আন্তর্জাতিকভাবে নাম্বার ওয়ান ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পাওয়া একজন, এমন এক খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞাসহ দেড় বছরের জন্য বিদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলা বন্ধের শাস্তিটি যে যথেষ্ট কঠোর!
এত কঠোর শাস্তি পাওয়ার কারণগুলো আমরা জেনেছি। বিসিবির মতে, সাকিবের ‘বিরাট আচরণগত সমস্যা’ রয়েছে এবং তাঁর এই সমস্যা ‘দলের অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত হচ্ছিল’। ফলে ‘দৃষ্টান্তমূলক’ শাস্তির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। নিজের ভুলের জন্য বিসিবির সভাপতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করেও পার পাননি সাকিব। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শৃঙ্খলার প্রশ্নে বিসিবি তো আর আপস করতে পারে না! দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে বা যাচ্ছে বলে যাঁরা আক্ষেপ করেন, তাঁদের উদ্দেশে বলি, দেখুন, বিসিবির মতো প্রতিষ্ঠান এখনো দেশে রয়েছে, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা যাদের রয়েছে! বর্তমান শাস্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কিছু করলে সাকিবকে যে আজীবন বহিষ্কার করা হতে পারে, সেই হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন।
ক্রিকেটের চেয়ে নিশ্চয়ই দেশ বড়। বিসিবির মতো প্রতিষ্ঠান আছে বলে হয়তো সাকিবের মতো খেলোয়াড়ের আচরণের ‘সমস্যা’ দূর করার চেষ্টা হবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে অন্যদের সতর্ক করা হবে। এর মধ্য দিয়ে হয়তো দেশের ক্রিকেট ‘বাঁচাবে’, কিন্তু দেশ বাঁচাবে কে? যাঁরা দেশ চালান বা যাঁরা ভবিষ্যতে দেশ চালাতে চান, তাঁদের আচরণের সমস্যা দূর করবে কে? তাঁরা ভুল করলে ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির’ ব্যবস্থা করবে কে? রাজনীতি থেকে নানা মেয়াদে ও প্রয়োজনে আজীবন তাঁদের নিষিদ্ধ করবে কে? ‘বিরাট আচরণগত সমস্যা’ থাকার পরও তো অনেক রাজনীতিবিদ দিব্যি রাজনীতি করে যাচ্ছেন। তাঁদের এই আচরণ কি দলের অন্যদের মধ্যে ‘সঞ্চারিত’ হচ্ছে না? এর পরও তো তাঁরা দল থেকে বরং বাহবাই পেয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। শৃঙ্খলার দরকার কি শুধুই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের, দেশ চালান যাঁরা বা যে রাজনৈতিক দল, তাদের দরকার নেই!
সাকিবভক্তরা হয়তো কষ্ট পাবেন, এর পরও বলি, আসুন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে আমরা আদর্শ মানি। এর আদলে ‘বাংলাদেশ রাজনীতি বোর্ড’ ধরনের কিছু একটা গড়ে তোলার আওয়াজ তুলি। তবে এই বোর্ডের সভাপতিকে অবশ্য বিসিবির সভাপতির চেয়েও কঠোর হতে হবে। কারণ, আচরণে ‘বিরাট সমস্যা’ থাকার পরও সাকিব বিসিবির নির্দেশে দেশে ফিরে এসেছেন। বোর্ডে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছেন, ভুল স্বীকার করে দুঃখও প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের কোনো রাজনীতিবিদ কবে কখন তাঁদের ভুল স্বীকার করেছেন বা এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন? দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিদেশে দিন কাটানো রাজনীতিবিদদের তো আদালতের নির্দেশও দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছে না। আরও শক্তিশালী বোর্ড ও আরও কঠোর চেয়ারম্যান ছাড়া রাজনীতিবিদদের সামলানো যাবে বলে মনে হয় না।
রাজনীতিবিদেরা নিশ্চয়ই বলবেন, তাঁদের জন্য ‘বাংলাদেশ রাজনৈতিক বোর্ড’ ধরনের কিছুর দরকার নেই। কারণ, তাঁরা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন, জনগণই হচ্ছে তাঁদের সেই বোর্ড। জনগণই বিচার করবেন কারা রাজনীতিতে থাকবেন বা থাকবেন না, রাজনীতিবিদদের শাস্তি বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা জনগণের হাতেই রয়েছে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর কি আর তা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে? নয় কোটি ২০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটার তাঁদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ‘জনগণের বোর্ড’ তো আর কাজ করছে না!
অন্যায় করলে দণ্ড নিশ্চিত এবং প্রয়োজনে তা ‘দৃষ্টান্তমূলক’ এবং গুরু দণ্ড—বাংলাদেশে এমন বিধান সম্ভবত দেশটির ক্রিকেট দলের জন্যই আপাতত প্রযোজ্য থাকছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়টিই এর বলি হোক! আমরা তো আর ক্রিকেট খেলি না, কেউ রাজনীতি করি, কেউ সাংবাদিকতা, আমাদের ভয় কী! আমাদের তো আর বোর্ড নেই!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

পাকিস্তানের ঘরের যুদ্ধ by শহীদ জাভেদ বারকি

বিগত কয়েক বছরের সিদ্ধান্তহীনতার পর, এই গত সপ্তাহে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশটির উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সন্ত্রাসীদের ভিত্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অপারেশন শুরু করেছে। বিভিন্ন বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠী সেখানে ঘাঁটি গেড়ে পুরো মুসলিম দুনিয়ায় জিহাদ করার লক্ষ্যে নেমেছে, এই অভিযান এদের তাড়ানোর উদ্দেশ্যেই চালানো হচ্ছে। কিন্তু এতে আবারও শরণার্থী-সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো সেখান থেকে উৎখাত হয়ে পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়তে পারে; দেশটির বড় শহর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র করাচিও তাদের সম্ভাব্য গন্তব্য।
আদিবাসী এলাকাগুলোতে ঘাঁটি গেড়ে এই সন্ত্রাসী দলগুলো পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দলগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশটির চারটি প্রতিবেশী দেশেও হামলা চালিয়েছে—আফগানিস্তান, চীন, ভারত ও ইরান। উজবেকিস্তানের ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান গত ৮ থেকে ৯ জুন করাচি বিমানবন্দরে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। এই ঘটনায় ১০ জন জঙ্গিসহ ৩০ জন নিহত হয়; এরাই এখন সবচেয়ে খতরনাক হয়ে উঠেছে।
এই উত্তর ওয়াজিরিস্তান অভিযানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথাকথিত ‘খারাপ’ ও ‘ভালো’ তালেবানদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল রাহেল শরিফ। কিন্তু কথা হচ্ছে, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরোধিতাকারী এই তালেবান ও হাক্কানিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এই ইন্টার-সার্ভিসেস অব ইনটেলিজেন্স (আইএসআই)—পাকিস্তানের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আগ্রাসন করলে এই হাক্কানিরা উত্তর ওয়াজিরিস্তানের আদিবাসী এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে বসে। কিন্তু আইএসআই এদের সমর্থন দিয়েছে এই চিন্তায় যে আফগানিস্তান থেকে ২০১৪ সালের শেষের দিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলে পশতু গ্রুপগুলো আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, হাক্কানিরা সে রকম কোনো দর-কষাকষিতে সায় দেয়নি; বরং তারা এই উজবেক জঙ্গিদের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে আশ্রয় দিয়ে করাচি বিমানবন্দরে হামলার সুযোগ করে দিয়েছে।
এই বিবাদ শিগগিরই মিটবে না। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের উভয় পার্শ্বে পশতুরাই প্রধান জাতিসত্তা। তারা যেসব দাবি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈধ মনে করে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য দুই দেশেই তারা তুমুল লড়াইয়ে নেমেছে। কথা হচ্ছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে যে সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে, তার আগুন থেকে শত মাইল দূরের করাচি শহরও রক্ষা পাবে না।
সেনাবাহিনী প্রথমে বিমান আক্রমণ চালিয়ে পরে সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, সে লক্ষ্যে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের আগেভাগেই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ইতিমধ্যে সে এলাকা ছেড়ে গেছে। সেনাবাহিনী ২০০৯ সালে সোয়াতে তালেবানদের ডেরা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, এবারও সেরূপ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের গৃহত্যাগ পাকিস্তান দেশটির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এই হামলার পাঁচ দিন পরই জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৩ সালের শেষে সারা বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৫১ দশমিক ২ মিলিয়ন, আগের বছরের তুলনায় যা ছয় মিলিয়ন বেশি। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই সর্বোচ্চ।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী মানুষের বসবাস হচ্ছে এই পাকিস্তানে। সেখানে দেড় মিলিয়ন মানুষ শরণার্থী তালিকাভুক্ত। এর সঙ্গে দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত সাড়ে তিন মিলিয়ন মানুষ তো আছেই।
আগের মতোই উত্তর ওয়াজিরিস্তানের বাস্তুচ্যুত মানুষ পার্শ্ববর্তী জেলায় তাদের জন্য স্থাপিত শিবিরে থাকবে না, তারা করাচির মতো বড় শহরগুলোর দিকে চলে যাবে। করাচি শহরের দুই কোটি মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে ৬০ লাখ পশতু আছে। কাবুল ও পেশোয়ার শহরের সম্মিলিত পশতু জনসংখ্যার চেয়েও এটা বেশি।
সে কারণেই করাচি কখনো কখনো ‘তাৎক্ষণিক শহর’ হিসেবে অভিিহত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর এই শহরটি বেশ কয়েকবার অভিবাসনের ধাক্কায় ৫০ গুণ বেড়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম ধাক্কায় ভারত থেকে আট মিলিয়ন মুসলমান পাকিস্তানে আসে, এর মধ্যে দুই মিলিয়ন করাচিকে বেছে নেয়।দ্বিতীয় ধাক্কায় পশতু নির্মাণশ্রমিকেরা এই শহরে আসে, যারা মূলত এই বাণিজ্যিক শহরের নির্মাণকাজে অংশ নেয়।আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর তৃতীয় ধাক্কায় আরও পশতু এই শহরে আসে। চতুর্থ দফায় আসে ২০০০ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময়, সে সময় পশতুরা সীমান্তের উভয় পার্শ্বেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে, আদিবাসী এলাকাগুলোতে ইসলামি চরমপন্থার সৃষ্টি হয়।
উত্তর ওয়াজিরিস্তান থেকে বর্তমান এই বাস্তুচ্যুতি আসলে উল্লিখিত চতুর্থ ধাক্কারই অংশ। সেনাবাহিনী এ এলাকা থেকে জঙ্গিদের বের করে দিতে সক্ষম হলেও বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ হৃদয়ে যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে শেষ পর্যন্ত করাচিতে এসে ভিড় করবে। সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এই জাতিগত সংখ্যালঘুদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে তারা শিগগিরই অস্ত্র ত্যাগ করবে, এমনটা মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে উত্তর ওয়াজিরিস্তানের এই সামরিক অভিযানের পরিণতি ভালো হবে না, পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে—সেটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শহীদ জাভেদ বারকি: পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী।

সাত খুনের মামলা-পুলিশের সহযোগিতা নিশ্চিত করুন

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার তদন্ত বস্তুত থেমে রয়েছে। এর ফলে জনমনে এমন আশঙ্কা আরও প্রকট হবে যে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পার পেয়ে যেতে পারেন; কারণ, তাঁরা ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী। কিন্তু সরকারের মনে রাখা উচিত যে হত্যাকারীদের বিচার ও আইনানুগ শাস্তির পক্ষে প্রবল জনমত রয়েছে। মামলাটির তদন্ত-প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে ও দ্রুতগতিতে শেষ করে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া না হলে আইনের শাসনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আদালতে এই মামলার চার আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির অনুলিপি নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সিআইডিকে না দেওয়ার ফলে মামলাটির তদন্তে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তার দ্রুত নিরসন ঘটানো প্রয়োজন। আদালতের নির্দেশে এই মামলার তদন্ত-প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সিআইডি কর্তৃপক্ষ আজ আদালতে যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেবে, সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সিআইডি সেই প্রতিবেদনে আদালতকে জানাবে যে তাদের পক্ষে এই মামলার তদন্ত করা সম্ভব নয়; কারণ, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ তাদের সহযোগিতা করছে না।
এটি একটি অদ্ভুত রকমের অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি: পুলিশেরই দুটি পৃথক কর্তৃপক্ষের যেখানে সহযোগিতার ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের পথ সুগম করার পরিবর্তে একটি পক্ষ অন্য পক্ষকে অসহযোগিতা করছে, আর ওই পক্ষটি নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। এ রকম পরিস্থিতিতে কোনো রাষ্ট্রের আইনের শাসন ঠিকমতো চলতে পারে না; অপরাধের শিকার নাগরিকেরা ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ চার আসামি আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, সেগুলোই এই মামলার মূল ভিত্তি। ওই সব জবানবন্দিতে রাজনৈতিক নেতা ও র্যাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নাম আছে বলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সিআইডিকে সেগুলোর অনুলিপি দিচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আদালত পুলিশকে অনুলিপি প্রদানের আদেশ দিলে ভালো হয়। নইলে যে উদ্দেশ্যে আদালত সিআইডিকে এই মামলার তদন্ত করতে আদেশ দিয়েছিলেন, তা অর্থহীন হয়ে যাবে।

আইনের শাসন সূচকের খুব নিচে by মিজানুর রহমান খান

রাঙামাটির আক্রান্ত ওসি মনু ইমতিয়াজের মন্তব্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শোচনীয় আইনের শাসনের সূচক আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ওসি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি এখনো চিকিৎসাধীন। সুস্থ হয়ে উঠলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এই হলো আইনের নিজস্ব গতি। ওসি যদি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকেন, তাহলে আইন ততটা পিছয়ে পড়বে। কথাটি হয়তো অসতর্ক, তবে আমরা প্রতীকী অর্থেই নিচ্ছি। যত বড় ধরনের ঘটনা বা বিপর্যয়, তত বড় কড়া নির্দেশ আসে। প্রধানমন্ত্রীরা খেয়াল করেন না যে অমুককে ধরতে কড়া নির্দেশের কারণে আইনের শাসনের শর্ত কীভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়। এ–ও ঠিক, তাঁরা এর মাধ্যমে স্বীকার করেন যে আইনের শাসন নেই, এ ধরেনর নির্দেশনির্ভর শাসনে বাংলদেশ চলছে।
তবে কিছুদিন আগে প্রকাশিত বিল গেটস ও ডেসমন্ড টুটুদের আশীর্বাদধন্য ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ২০১৪ সালের প্রতিবেদনটির আদ্যোপান্ত না পড়লে বুঝতেই পারতাম না কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমরা অনেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নেই বুঁদ। কিছু লোক কিছু দেশের সমর্থন পেয়ে এবং বিরোধী দলকে ধরাশায়ী রাখতে পেরেই আনন্দে আটখানা। তাঁরা যত সহজে ক্ষমতাসীন দলের কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির শাসন বোঝেন, তত সহজে কিংবা আদৌ আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশকে বুঝতে চান না। কিন্তু অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না।
আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের ৯৯টি দেশের মধ্যে ৯২তম অবস্থানে নেমে এসেছে। আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলটি প্রায় পুরোটাই মূল্যায়িত হয়েছে। টিআইয়ের মতো এই প্রতিবেদন বাংলাদশে ঘটা করে প্রকাশ করা হয়নি বলেই হয়তো এই সূচক নিয়ে হইচই কিংবা গালাগালি মিডিয়ায় চোখে পড়েনি। ওই সূচকে যে শোচনীয় ফলাফল এসেছে, তা আমাদের মোটেই বিস্মিত করেনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের নিরিখে নয়, ওই সূচক তৈরিতে দেখা হয়েছে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, আইন ও নিয়মকানুনের কার্যকারিতা, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা।
আইনের শাসনের হৃৎপিণ্ড হচ্ছে আইন ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে। সরকারের ক্ষমতাকে সংসদ, আদালত, অডিট নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত করে। আর বাংলাদেশে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সরকার চলে। আইনকে পর্যুদস্ত করে। ৯৯টি দেশের মধ্যে এই ফ্যাক্টরে বাংলাদেশের র্যাঙ্কিং ৮০। তবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়েও এক্ষেত্রে আমরা খারাপ, সেটা মানতে কষ্ট হচ্ছে, এটা একটা বড় খটকা। এ–ও ঠিক, বেসিক ব্যাংকে লুটপাট হয়েছে তো কী হয়েছে, চেয়ারম্যান কি পদত্যাগ করেননি? সাবাস অর্থমন্ত্রী, সাবাস! তিনি ওই ব্যাংকের বোর্ডকে ভেঙেচুরে নতুন করে সাজিয়েছেন।
দ্বিতীয় সূচক হলো দুর্নীতি। আর এতে আমরা যথারীতি টিআইয়ের মন্দ ঐতিহ্য সূচকের ধারা বজায় রাখতে পেরেছি। বাংলাদেশ নিচ থেকে পঞ্চম হতে পেরেছে। নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী ও পুলিশ এবং পার্লামেন্ট কী করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তা তারা বিবেচনায় নিয়েছে। আলোচ্য সমীক্ষায় দশমিক ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত হলো মার্কিং। যে কম পাবে, তার অবস্থা খারাপ আর যে বেশি পাবে, তার অবস্থা তত উন্নত। উন্মুক্ত সরকার হলো এই সমীক্ষার তৃতীয় ফ্যাক্টর। সরকার কতটা স্বচ্ছ, তথ্য অধিকারকে কেমন মর্যাদা দেয়, তারা সিদ্ধান্ত নিতে কতটা অংশগ্রহণমূলক, সেসবের বিবেচনায় বাংলাদেশ দশমিক ৩৭ পেয়ে ৮৫তম অবস্থানে, মানে একটু উন্নতি করেছে। তাই বলে চীন ও নাইজেরিয়ার চেয়ে নয়। এমনকি নেপালও দশমিক ৪৪ পেয়ে ৬১তম অবস্থানে রয়েছে। ভারত দশমিক ৫৩ পেয়ে ৩০ আর শ্রীলঙ্কা দশমিক ৪৮ পেয়ে ৪১তম অবস্থানে আছে।
চতুর্থ ফ্যাক্টর মৌলিক অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত বিভিন্ন ধরনের অধিকার ও স্বাধীনতার সুফল মানুষ কীভাবে ভোগ করছে, তার নিরূপণ ঘটেছে এই মূল্যায়নে। বিবেচ্য হয়েছে জীবনের অধিকার, ব্যক্তির নিরাপত্তা, ডিউ প্রসেস, অভিযুক্তের অধিকার, বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তির গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ, সমাবেশের স্বাধীনতা ও মৌলিক শ্রম অধিকার সুরক্ষা। এখানে বাংলাদেশ দশমিক ৪৩ পেয়ে ৮৭তম অবস্থানে এসেছে। তার চেয়ে এগিয়ে মালয়েশিয়া, কেনিয়া, ক্যামেরুন, তানজানিয়া, ফিলিপাইন। ভারত দশমিক ৫৪ পেয়ে ৬৩। আর শ্রীলঙ্কা দশমিক ৫৬ পেয়ে ভারতের চেয়ে সাত ধাপ ওপরে।
পঞ্চম ফ্যাক্টর আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। অপহরণ, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, রাজনৈিতক অস্থিশীলতাকে একটি বিশেষ বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হয়েছে। এসবকে কী করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার ক্ষোভ নিরসন বা প্রতিকারের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এই সমীক্ষায়। পুলিশ ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারানো বাংলাদেশ কী করে সামাল দিচ্ছে, সেটাই এতে ফুটে উঠছে। কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন কিংবা সম্পত্তি দখল বা অন্য যেকোনো ধরনের বিরোধ মেটাতে মানুষ পারতপক্ষে পুলিশ বা আদালতে ছোটে না। তারা অন্য বিকল্পগুলো বেছে নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ অবশ্য এখানে দশমিক ৬৪ পেয়ে তুলনামূলক উন্নত ৭৬তম অবস্থানে এসেছে; যদিও নেপালের চেয়েও পিছিয়ে। আমরা যদি ভাবি এখানে খুব ভালো আছি, তাহলে মনে রাখব যে মিয়ানমার দশমিক ৭২ পেয়ে ৬০ আর কামড়ে দিয়ে আলোচিত তারকা সুয়ারেজের উরুগুয়েও ৬৪তম, কমিউনিস্ট চীন ২৯তম আর দশমিক ৮৭ পেয়ে মালয়েশিয়া শীর্ষ ১২-তে পৌঁছে গেছে। ক্ষমতাসীনদের মিত্ররা প্রায়ই প্রবৃদ্ধি আর তাগড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গল্প শোনান। কিন্তু তাঁরা তুলনামূলক গল্প বলতে ভুলে গেছেন। আইনের শাসনের এই সূচক সম্পর্কে তাঁরা কিন্তু নীরব রয়েছেন।
ওই সূচকের ষষ্ঠ ফ্যাক্টর হচ্ছে রেগুলেটরি এনফোর্সমেন্ট। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এই আশায় যে জনগণের স্বার্থ ব্যক্তির স্বার্থের কাছে পরাস্ত হবে না। কিন্তু এখন এর জয়জয়কার চলছে। জাতীয় অর্থনীতির বহু খাত রয়েছে, যেখানে ব্যক্তি সমষ্টির স্বার্থকে জিম্মি করে রেখেছে। এই র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থা শোচনীয়দের দলে। এটা দেখে আমরা তাই অবাক হই না। নিচের দিক থেকে নবম। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানও অবশ্য নিম্ন দশে আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আইনের শাসনের আটটি সূচকেই শ্রীলঙ্কা এগিয়ে। অথচ দেশটি এই সেদিন গৃহযুদ্ধ থেকে উঠে দাঁড়াল। বারুদের গন্ধ এখনো বাতাসে মিলিয়ে যায়নি। বিএনপি ও এক-এগারোর লোকেরা আর যা-ই করুক, তারা তো আর বাংলাদেশকে জাফনা বানিয়ে যায়নি। তাহলে এত যে উন্নয়নের নহর ও উন্নয়নের নিনাদ, সেটা এই সমীক্ষায় ফুটে উঠল না কেন?
সপ্তম ফ্যাক্টর হচ্ছে দেওয়ানি বিচার। একটি শক্তিশালী বিচার বিভাগ কোনো ব্যক্তির, সরকারি কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেবে। আওয়ামী লীগের গত শাসনকালে বিচার বিভাগ এমন ভূমিকা রেখেছে, যাতে তার স্বাধীনতার রূপ দেখে নির্বাহী বিভাগ মুগ্ধ হয়েছে। তার চোখ দেখে আমরা বুঝেছি যে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। অথচ এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দশমিক ৩৬ নম্বর পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশটা গুয়াতেমালা ও পাকিস্তানের সমান্তরালে পৌঁছে গেছে। দশমিক ৩৪ পেয়ে ক্যামেরুন, বলিভিয়া ও কম্বোডিয়া একই কাতারে। আর দশমিক ৩৩ পেয়ে ভেনেজুয়েলা ৯৮তম ও দশমিক ২৭ পেয়ে আফগানিস্তান ৯৯তম অবস্থানে রয়েছে।
সমীক্ষার অষ্টম ও সবশেষ ফ্যাক্টর হলো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে এই সূচক। ডব্লিউজেপির এই প্রতিবেদন বলেছে, একটি কার্যকর ফৌজদারি ব্যবস্থায় পুলিশ, প্রসিকিউটর, আইনজীবী, বিচারক এবং কারা কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য নীতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তঁারা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অপরাধ প্রতিরোধ এবং ফৌজদারি অপরাধ মোকাবিলায় সার্মথ্যবান থাকবে। এর আগে এই ব্যবস্থায় দুর্নীতির কথা জেনেছিলাম। বাংলাদেশের অধঃপতন এখানে চরমে। অথচ এটাই আসল বিচারিক আদালত। এখানে আমাদের অবস্থান ৯৪। শাসনের তুলনা হবে তাহলে কার সঙ্গে, সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে তুলনা করেই যদি আমরা আমোদিত হই, তাহলে সে কথা আলাদা। আমরা এই ফ্যাক্টরে বলিভিয়া, মেক্সিকো, আফগানিস্তান ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে আছি। ভারতের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা যে শক্তিশালী, তার প্রতিফলন ঘটেছে এই সূচকে। এমনকি এটাও কি দেখব না যে দক্ষিণ এশিয়ায় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সূচকে বাংলাদেশ নিকৃষ্টতম। গতকালের (সোমবার) যুগান্তরের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ সরকার উপেক্ষা করছে।
তবে আমরা যে মিডিয়ার স্বাধীনতা ভোগের কথা বলি, এখানে আশাবাদ দেখি, তারও প্রতিফলন আছে এতে। আর সেটা একান্ত বাংলাদেশি নয়, গোটা দক্ষিণ এশীয় প্রবণতা। তবে ডব্লিউজেপির এই প্রতিবেদন স্পষ্টতই বলেছে, ‘আইনের শাসনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ঘাটতি আছে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার দুর্নীতিতে দেশটির র্যাঙ্কিং ৯৫।’ সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় তার অবস্থান সবার নিচে। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও তদীয় লোকলস্করের অসদাচরণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের শিথিল মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। তারা আরও বলেছে, প্রশাসনিক এজেন্সিগুলো ও আদালত অদক্ষ এবং তারা দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের দ্বারা প্রভাবিত।
এই সমীক্ষায় বাংলাদেশ যেখানে সবচেয়ে ভালো করেছে, সেটা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায়। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৭৬ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তার অবস্থান তৃতীয়। তবে সেখানেও সুশাসনের কৃতিত্ব দাবি কতটা করা যাবে, তা তর্কসাপেক্ষ। কারণ, সংখ্যাগত দিক থেকে অপরাধের ঘটনা কম হওয়ায় এই র্যাঙ্কিংয়ে তার উন্নতি ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক হলো ব্যক্তিগত সমস্যা মেটাতে সহিংসতার ব্যবহার। অন্য নিম্ন আয়ের দেশগুলোর তুলনায় সম্পদের অধিকার সুরক্ষা শক্তিশালী থাকার কথা উল্লেখ করে এতে বাংলাদেশের প্রশংসাও আছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জাসদ ও গণবাহিনীর ঠিকুজি by সৈয়দ আবুল মকসুদ

[প্রথম পর্ব >> সংসদে সংগীত, কবিতা ও গণবাহিনী by সৈয়দ আবুল মকসুদ]
শেষ পর্ব >> তথ্যমন্ত্রীর ভাষায় তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘রাজনৈতিক শয়তান’।তাঁকে মন্ত্রী অব্যাহতভাবে প্রতিদিন ‘জঙ্গিবাদী’ বলে গালাগাল করছেন।আমরা না জানলেও তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি জানেন খালেদা জিয়া একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী বিন লাদেনের মতো।একজন বয়স্ক মহিলাকে প্রকাশ্য জনসভায় ‘শয়তান’, ‘জঙ্গিবাদীদের মা’ প্রভৃতি বলা ভালো শোনায় না।

তথ্যমন্ত্রী অনেক দিন থেকে খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার কথা বলছেন।মাইনাসের রাজনীতি তাঁরাই শুরু করেন অক্টোবর ১৯৭২। ’৭২-৭৫-এ মাইনাস করার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন একজন—শেখ মুজিবুর রহমান। সে পরিকল্পনা অতি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। দ্বিতীয়বার মাইনাসের আওয়াজ ওঠে বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশকে। এবার দুজন—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। জনতার চাপে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। গণতন্ত্রের ক্লাবের সদস্যপদ হারানোর পর এবার খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার কথা শোনা যাচ্ছে। খালেদা জিয়াকে শারীরিক বা রাজনৈতিকভাবে মাইনাস বা বিয়োগ করা সম্ভব, কিন্তু ইতিহাস থেকে মাইনাস করা যাবে না।
খালেদা জিয়া ইতিহাসে কতটুকু জায়গা পাবেন, তা এখন বলা যাবে না।তাঁকে তাঁর সমসাময়িকরা অশালীন ভাষায় সংসদে এবং সংসদের বাইরে যদি গালাগাল করেন, তাতেও কিছু বলার নেই। কারণ, আমরা নিজের কানে শুনেছি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা টুঙ্গিপাড়ার মরহুম শেখ লুৎফর রহমান ও মরহুমা সায়রা খাতুনের ছেলেটিকেও একদিন ‘বাংলার মীরজাফর’সহ নানা অশ্রাব্য অভিধায় সম্বোধন করা হয়েছে পল্টন ময়দান থেকে। কোনো ইতিহাসবিদের বাবারও সাধ্য নেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসন থেকে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেন। তিনিই যখন মাফ পাননি, খালেদা তো তাঁর চেয়ে কত ছোট।
কোনো জ্যোতিষী জাসদের ঠিকুজি বা জন্মপঞ্জিকার খাতা নিয়ে বসে যাক—তা দলের নেতাদের কাম্য নয়। জাসদ নেতারা দাবি করতেন তাঁরা বিপ্লবী দল। বিপ্লব এক জিনিস আর সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও প্রতিহিংসামূলক নাশকতা আর এক জিনিস। বিপ্লবের জন্য তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে। ’৭৪-এর ১৭ মার্চ। থানা, রক্ষীবাহিনী, বিডিআর ক্যাম্পসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন আক্রমণ।
ওই দিন সন্ধ্যার আগেই ঢাকা নগরের পথঘাট জনশূন্য হয়ে যায়। সারা রাত আমি ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে ছিলাম। বাসস-এর বিশেষ প্রতিনিধি গোলাম তাহাবুরও ছিলেন অনেক রাত পর্যন্ত। আরও ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস শাখার এম সফিউল্লাহ, পরে তিনি রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছর আমি বঙ্গবন্ধুকে মেজাজ খারাপ করতে দেখিনি। সেদিনই দেখলাম তাঁর মেজাজ খুবই খারাপ। তিনি মস্কো যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চীনপন্থী বিপ্লবীরা তো ছিলেনই, নব্য বিপ্লবীদের কারণে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হচ্ছিল।
সংসদে কাজী সাহেব ও খান সাহেবের বাহাস আওয়ামী লীগের নেতারা সংগত কারণেই উপভোগ করে থাকবেন। বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থন করে রোববার জাসদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে হাসানুল হক ইনু ও শরীফ নুরুল আম্বিয়া এক বিবৃতিতে তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তাঁদের বিবৃতির বক্তব্যের তথ্যগত মূল্য রয়েছে। তাঁরা বলেছেন, ‘১৯৭৫ সালে যখন সংসদীয় রাজনীতি অনুপস্থিত, তখন প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েই জাসদ গণবাহিনী গঠন করে। গণবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কখনো গোপন ষড়যন্ত্র বা বেইমানির পথে পা বাড়ায়নি। বরং সে সময় যারা চাটুকারিতার আড়ালে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তারাই খোন্দকার মোশতাক বা কাজী ফিরোজ রশীদের মতো প্রথম সুযোগেই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পিঠে ছোবল হানে।’ [সমকাল]
কেন ’৭৫-এ সংসদীয় রাজনীতি অনুপস্থিত ছিল এবং কেন সংসদীয় রাজনীতি চলাকালেই তাঁরা ‘গণবাহিনী’ গঠন করেছিলেন, সে ব্যাখ্যায় তাঁরা যাননি। গণবাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁরা অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘গণবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।’ অস্ত্রের জোরে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা নিশ্চয়ই সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া, ’৭৪ সালেই যদি গণবাহিনী গঠন করা হবে, ’৭২-৭৪-এ ২০ হাজার নেতা-কর্মী নিহত হলেন কেন এবং কার হাতে।
সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু মার্চে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ওই নির্বাচনেরও জাসদ বিরোধিতা করে। আক্রোশটা বঙ্গবন্ধুর ওপর।জানুয়ারিতে জাসদ সভাপতি মেজর এম এ জলিল এক বিবৃতিতে উসকানিমূলক বক্তব্য রাখেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেন।তিনি বলেন:
‘আজ যখন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তখন সত্যই মর্মাহত হতে হয়—হৃদয় নিংড়ায়ে কান্না আসে। কারণ, যেসব বীর সৈনিকেরা সবকিছু বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আজ তাদের দুঃখের সীমা নেই, তাদের ঘর নেই, খাবার নেই, এমনকি অনেকেই রাজাকার বলে ধিক্কার পাচ্ছে। যুদ্ধের সময় শত্রুর ঘরে গ্রেনেড ফাটাতে গিয়ে সেই চার্জে আজ তারা অনবরত জেলেও যাচ্ছে। আবার সেদিনের ঘটনা, লে. কর্নেল যিয়াউদ্দিনকে ও লে. কর্নেল তাহেরকে আর্মি থেকে বিনা বিচারে Dismiss করা হয়েছে। অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির একটা সীমা থাকে, বঙ্গবন্ধু। হয়তো এইভাবে ধীরে ধীরে একদিন বাংলার গোটা সামরিক বাহিনী স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু কেন? এটা কি তাহলে তোমার ক্ষমতা লোভের প্রকাশ, না কোনো বন্ধু মহলের কুইঙ্গিত।’
নির্বাচনের ছয় মাস পরে ১ সেপ্টেম্বর ’৭৩ এক প্রচারপত্রে জাসদ বলে, ‘ভারতের পঁচাত্তরটি বিড়লা-টাটাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সোভিয়েতের ব্রেজনেভ কোসিগিন প্রতিক্রিয়াশীল চক্রে’র প্রতিনিধি শেখ মুজিবের ‘ফ্যাসিস্ট জাতীয় বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উৎখাত করার জন্য, ঘুণে ধরা এই সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে নূতন সমাজের ভিৎ রচনা করার জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করবো।’ এ জাতীয় বিবৃতির ভাষায় সরকারের প্রতি যেমন সাধারণ মানুষের ঘৃণার সৃষ্টি হতো, তেমনি বোকা সরল গোছের অনেক তরুণ মনে করত রুশ বিপ্লব ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চেয়ে বড় কোনো বিপ্লব এল বলে এবং মুজিবের পতন আসন্ন।
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল: ‘জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে একপর্যায়ে স্তব্ধ করে দিয়ে বিদেশী শক্তির সহায়তায় বর্তমান ক্ষমতাসীন চক্র যেদিন বাংলার মসনদে উড়ে এসে জুড়ে বসল, সেদিন থেকেই এ দেশের মানুষের আরেক দুঃখের রজনী শুরু হলো। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ নয় মাসের সমস্ত আশা সমস্ত স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে দেখল মানুষ।’
‘মেহনতী মানুষের সার্বিক মুক্তির’ লক্ষ্যে ‘ফ্যাসিস্ট মুজিব সরকারের উৎখাত’ দাবি করে ১৯৭৪-এ জাসদ এক প্রচারপত্রে ঘোষণা করে: ‘স্বৈরাচারী ক্ষমতাসীন চক্রের গত তেত্রিশ মাস দুঃশাসনের ফলে সোনার বাংলা আজ শ্মশান বাংলায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক সকল দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু ও অকর্মণ্য করে দেবার এক সুগভীর চক্রান্ত চালানো হয়েছে।...হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদেরকে ফ্যাসিবাদী কায়দায় জেলখানায় আটক রেখে তাদের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি মেজর এম এ জলিল, সাধারণ সম্পাদক জনাব আ স ম আবদুর রব ও দলীয় নেতৃবৃন্দ জনাব রুহুল আমিন ভূঁইয়া, জনাব এম এ আউয়াল, জনাব মেসবাহ উদ্দীন আহমদ ও মমতাজ বেগমসহ দলের অসংখ্য নেতা ও কর্মীরা আজ কারান্তরালে আটক।...বিদেশী স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষমতাসীন চক্র বাংলাদেশের জাতীয় অস্তিত্বকে পর্যন্ত বিপদজনক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ প্রশ্নে শেখ মুজিবচক্রের “মেনিমুখো” নীতি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্নে এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আগামী অক্টোবরে কিংবা নভেম্বরে ফারাক্কা বাঁধ চালু হলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ক্রমেই মরুভূমিতে পরিণত হবে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা–পরবর্তী পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছে জাসদ। তার বহু দলিল রয়েছে। ১৫ নভেম্বর ১৯৭৫ জাসদ ‘দেশবাসীর প্রতি আহ্বান’-এ বলে: ‘১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে যেয়ে এবং ১৯৭২ সালের মে মাসে শেখ মুজিবের ভারত-রাশিয়া ঘেঁষা আত্মঘাতী নীতি ও কুশাসনের বিরোধিতা করায় আমাদেরকে জেলজুলুমসহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।...সত্যিকারের “জনতার গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠাকল্পে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠন করি।...শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ প্রতিরোধের জন্য আমরা খুবই গোপনে অথচ তৎপরতার সাথে গড়ে তুলি সারা দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, প্রাক্তন সৈনিকদের সমবায়ে “বিপ্লবী গণবাহিনী”।অতি গোপনে আমরা সংগঠিত করি বাংলাদেশের প্রতিটি সেনানিবাসের সৈনিক ভাইদেরকে “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার” মাধ্যমে।এসবের খানিকটা আঁচ করতে পেরে শেখ মুজিব আমাদেরকেসহ জাসদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় কৃষক লীগের ১০ হাজারেরও বেশি কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করে।হত্যা করে এক হাজারেরও অধিক কর্মীকে।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে জাসদ ‘দেশ ও জাতির সামনে তিনটি মারাত্মক প্রশ্ন’ উত্থাপন করে। তার প্রথমটির ভাষা: ‘ভারত-রাশিয়া-আমেরিকা বিশেষ করে ভারতের আগ্রাসননীতির বিরুদ্ধে আমরা গোটা দেশ ও জাতি রুখে দাঁড়াব কি না?’ তারপর আট দফা ‘কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জঙ্গি জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তার প্রথমটি: ‘ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে “জনতার প্রতিরক্ষা কমিটি” গঠন করতে হবে। যেন কোনো ভারতীয় চর, চোরাচালানী ও পাচারকারী এ দেশের মাটিতে পা ফেলতে না পারে।’ এক হাজার সাত শ শব্দের ‘আহ্বান’ শেষ হয়েছিল ‘খোদা হাফেজ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানে।
এই জাতীয় বক্তব্য জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে সর্বোচ্চ শক্তি জোগায়। একাত্তরে যাদের বয়স ছিল ৪০-এর কাছাকাছি তাদের অনেকের মধ্যে ঐতিহাসিক কার্যকারণে ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী একটি মনোভাব ছিল। কিন্তু ২৫ বছরের কম তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতবিরোধী চেতনাকে সুদৃঢ় করেন জাসদ নেতারা।তা থেকে জাতি এখনো মুক্ত হয়নি।
পরোক্ষে জিয়ার নীতি-আদর্শ সমর্থন পেলেও জাসদ নেতাদের তাঁর সরকার কঠোর চাপে রাখে। মেজর জলিল, রব, আখলাকুর রহমান, কর্নেল তাহের, ইনুসহ বহু নেতা-কর্মীকে বিনা বিচারে জেলে রাখে। তাহেরের ফাঁসির দুই মাস আগে ‘জাসদ ও বিপ্লবী গণবাহিনী’ থেকে দেশবাসীর প্রতি যে আহ্বান জানানো হয়, তার শিরোনাম: ‘ভারতীয় হামলা রুখে দাঁড়াও: গ্রামে-গঞ্জে শহরে-নগরে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোল’/ ‘বিপ্লবী গণবাহিনী ও বিপ্লবী সিপাহীরা এক হও’। বলা বাহুল্য, তত দিনে সিপাহীরা কেউ আর জাসদের পক্ষে নেই, জিয়ার পক্ষে চলে গেছেন। ওই ইশতেহারে একটি ১২ দফা দাবি জানানো হয়েছিল। তার প্রথম দফা: ‘ভারতীয় আগ্রাসননীতির বিরুদ্ধে শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’ দ্বিতীয় দফা: ‘বিপ্লবী গণবাহিনী বিপ্লবী-সিপাহী-শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ ১২ নম্বর দাবি: ‘ভারত-রাশিয়া-আমেরিকা বিশেষত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত সমস্ত গোপন ও অসমচুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।’ শেষ হয়েছিল ‘বিপ্লব অনিবার্য। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ কথা দিয়ে।
জাপার কাজী সাহেব গণবাহিনী নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা সরকারের শরিক দলকে ‘আনন্দচিত্তে জবাই’ করার বিষয় নয়। জাসদ ও গণবাহিনীর ঠিকুজি ঘাঁটার বিষয়ও নয়। ইতিহাসের আলোচ্য বিষয়। ইতিহাস নিয়ে বেশি খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে কেঁচো নয়, বেরিয়ে পড়ে সাপ।
[প্রথম পর্ব >> সংসদে সংগীত, কবিতা ও গণবাহিনী by সৈয়দ আবুল মকসুদ]
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

সংসদে সংগীত, কবিতা ও গণবাহিনী by সৈয়দ আবুল মকসুদ

[শেষ পর্ব >> জাসদ ও গণবাহিনীর ঠিকুজি by সৈয়দ আবুল মকসুদ]
প্রথম পর্ব >> দশম জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনটি ছিল খুবই প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য—সাংসদদের উপস্থিতি যত কমই হোক। সংসদই হবে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র—এ কথা শুনে আসছি নেতাদের মুখে। সব কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও, তা আমাদের ধারণায় ছিল না।এবার সংসদের অধিবেশনে সংগীত পরিবেশিত হয়েছে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠে। প্রশস্তিমূলক গানটি সহজে শেষ হতো না, কিন্তু মাননীয়া স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কিঞ্চিৎ বেরসিকের মতো শিল্পীকে থামিয়ে দেন। সমাপনী অধিবেশনে হলো কবিতা আবৃত্তি। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কাব্যের প্রবীণ কবি আবৃত্তি করেন তাঁর স্বরচিত কবিতা, যা নজরুলের দেশাত্মবোধক কবিতার চেয়ে কিছুমাত্র কম শিল্পগুণসম্পন্ন তা বলার সাধ্য আমার মতো কোনো ক্ষুদ্র সমালোচকের নেই।

তবে সংগীত ও কবিতাচর্চা হলেও নৃত্য ও নাট্যাভিনয় হতে দেখা যায়নি। ধারণা করি, নাটক হতো জাতীয় পার্টির পরিবর্তে বিষবৃক্ষ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) সংসদে থাকলে। দেখা যেত নৃত্যানুষ্ঠানও। অপজিশন বেঞ্চ থেকে পুরুষ হোক নারী হোক ট্রেজারি বেঞ্চের দিকে কত্থক বা কথাকলি নৃত্যের তালে ছুটে যেতেন কেউ কেউ। সরকারি দলের সাংসদদের কেউ ভরতনাট্যমের ক্লাসিক্যাল ভঙ্গিতে ধেয়ে যেতেন বিপরীত দিকে। (সে দৃশ্য আগে দেখা গেছে)। অমন দৃশ্য দেখার দুর্ভাগ্য থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন দক্ষ ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান বেগম রওশন এরশাদ। নাটকের সংলাপ হতো আঞ্চলিক ভাষায়। মানুষ বুঝতে পারত এ দেশের নাগরিক হতে হলে চুপচাপ থাকতে হবে, চুদুরবুদুর চইলত ন।
‘বিরোধী দলের নেতা’ হিসেবে সমাপনী অধিবেশনে বেগম এরশাদেরই সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগে ভাষণ দেওয়ার কথা। কিন্তু বেগম এরশাদ ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে থাকায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান তাঁর প্রক্সি দেন। তাঁর দলীয় সভায় তাঁর কণ্ঠে যে স্পষ্টভাষিতা দেখা যায় সংসদে তেমনটি ছিল না। করুণ ছিল তাঁর কণ্ঠস্বর। তিনি মিনতি করে বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় আমাদের নিয়ে হাসাহাসি হয়। আমাদের নিয়ে হাসবেন না। এতে গণতন্ত্রের প্রতি অবিচার হবে।’ তিনি গণতন্ত্রের মানসসেনা।
এই দুঃখের দেশে যেখানে নদ-নদীর পানি আর নারী-পুরুষ-শিশুর চোখের পানি একাকার, কাউকে নিয়ে কেউ যদি হাসে তা কম কথা নয়।মন্ত্রিসভার বৈঠকে বা সংসদে হাসির রোল পড়লে মন্দ কী? কিন্তু সারা দেশের লোক যদি হাসির খোরাক পায় তা তাদের কম প্রাপ্তি নয়।কান্নাকাটির চেয়ে হাসাহাসি উত্তম।
পিল্লবন্ধু আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত নামের ওই বিষবৃক্ষ আপনারাই সৃষ্টি করেছেন। দিনে দিনে এখন তারা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।’ বিষ নয়, কবির প্রত্যাশা মধু। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আপনি যা খুশি করেন, আমরা সমর্থন দেব। এ সময় নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনান: ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু...গড়তে চাই প্রাণের বাংলাদেশ।’
সংসদে রাজনীতিবিদ পিল্লবন্ধুর চেয়ে কবি এরশাদ প্রাধান্য পেলেন। তাঁর পদ্যপাঠের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাততালি দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সমাপনী ভাষণে তাঁর বিশেষ দূতের উদ্দেশে বলেন, ‘উনার ভাবি (খালেদা জিয়া), যাঁকে উনি বাড়ি-গাড়ি দিয়েছিলেন, সেই ভাবি উনাকেসহ জাতীয় পার্টির সবাইকে জেলে পুরলেন। এত কবিতা লিখলেন, ভাবির জন্য একটা কবিতা লিখে কি তাঁর মন জয় করতে পারেননি।’
যে মন বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে গলে না, তা যে শুকনো কবিতায় গলবে সে সম্ভাবনা কম।
ভাবি সাহেবের বিষবৃক্ষের প্রতি কবির খুবই আক্রোশ। বিষবৃক্ষের উত্থানের দায় তিনি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাদের কাঁধে। বিষবৃক্ষটি রোপণ করেছিলেন সাবেক এই জেনারেলের ভাই জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সেদিনের তাঁর ভাষণে গভীরতম শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটেছে। আমি সেদিন প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকলে তাঁকে বলতাম, আপনি এই প্রবীণ কবি ও জেনারেলকে জিজ্ঞেস করুন ১৯৮২-এর
মার্চে ক্ষমতা দখল করে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়েছিলেন কি না, নাকি দুই মাসের মাথায় চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে গিয়ে স্যালুট দিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছিলেন। তিনি বিরাশিতে জিয়ার কবরে গেছেন, তিরাশিতেও গেছেন—এখন যেমন বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতারা যান প্রতিদিন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ায় জেনারেল এরশাদ অনায়াসে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে যেতে পারতেন। অথবা তিনি জিয়ার সমাধিতেও না যেতে পারতেন।কেউ তাঁকে যেতে বলেনি। কোনো প্রয়োজন ছিল না।তিনি গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে জিয়া–সমর্থকদের শান্ত রাখতে। তা ছাড়া তিনি নিজে ইসলামপন্থী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী। জিয়ার বিষবৃক্ষ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং তাঁর যষ্টিমধু পার্টি (জাপা) নীতি-আদর্শের দিক থেকে অভিন্ন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের আদর্শের সঙ্গেই তাঁর দলের কোনো মিল নেই।
তিনি তাঁর কবিতায় বলেছেন: ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু...’। (তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রকাব্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। পিল্লবন্ধুর অনেক আগে কবিগুরু বলেছেন: ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু এখন, ওগো কর্ণধার, তোমারে করি নমস্কার।/ এখন বাতাস ছুটুক, তুফান উঠুক, ফিরব না গো আর—।) পল্লিবন্ধুর একবার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিরাশির ২৪ মার্চ। সেযাত্রার সময়সীমা ছিল ৮ বছর ৯ মাস। এবার কোন যাত্রার কথা বলছেন এবং সেযাত্রা কত দিনের তা ভেবে মুখ শুকিয়ে গেছে দেশের বহু মানুষের। তাঁর কবিতার প্রথম পঙ্ক্তির ভাবসম্প্রসারণ দরকার। তাঁর ‘আমাদের’ শব্দটিও ব্যাখ্যা দাবি করে।
বাংলাদেশের দেশহিতৈষী নেতারা ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র, সমাজবিজ্ঞান এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসই বেশি ভালোবাসেন। এমন দিন নেই যেদিন তাঁরা দেশবাসীকে ইতিহাসে তালিম দেন না। গত অধিবেশনের শেষ দিনে তঁারা ইতিহাসের একটি প্রায়-ভুলে-যাওয়া অধ্যায়কে জনগণকে মনে করিয়ে দিয়েছেন।অধ্যায়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করার কথা আওয়ামী লীগেরই।কিন্তু প্রসঙ্গটি পেড়েছেন জাতীয় পার্টির সাংসদ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব টক শোতে যিনি ছিলেন সরকারের কঠোর সমালোচক।
জাসদের গণবাহিনী নিয়ে আলোচনার আগে কাজী ফিরোজ রশীদ পদ্মা সেতুর নির্মাণের চেয়ে সেতুর নামকরণ নিয়ে বেশি ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেছিলেন নামকরণের প্রস্তাব জানুয়ারির নির্বাচনের পর তাঁর ভাগ্য দ্বিতীয়বার খুলে দেবে। মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়বে না, তা বলা যায় না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সে গুড়ে বালি দিয়েছেন। কিন্তু পদ্মা সেতুর নামকরণের প্রস্তাবক হিসেবে তাঁর নাম রেকর্ডে রইল।
স্বাধীনতা-উত্তর জাসদের গণবাহিনীর প্রসঙ্গ টেনে কাজী সাহেব বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরে যেন প্রতিবিপ্লব না হয়, সে জন্য বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বাহিনীর একজন সিরাজুল আলম খান বিএলএফ থেকে বের হয়ে জাসদ তৈরি করেন। আমরা যারা ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগ করতাম, তাদের এই জাসদ আর গণবাহিনী মাঠেঘাটে হত্যা করেছে। সেদিন যদি জাসদ বা গণবাহিনী সৃষ্টি না হতো, তা হলে বঙ্গবন্ধুকে কেউ হত্যার সাহস পেত না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো নীলকণ্ঠ, উনি সব সহ্য করতে পারেন।’
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময় থেকে বঙ্গসন্তানেরা জানে ভাগ্য পরিবর্তন ও জাগতিক উন্নতির জন্য পথ একটাই, তা হলো চাটুকারিতা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে তার সমার্থক শব্দ চামচামি। মহাজোট সরকারে মার্ক্স ও মাইজভান্ডার একাকার হয়ে যাওয়ায় সবাই নিষ্পাপ, সব দোষ গিয়ে পড়ছে সিরাজুল আলম খানের ঘাড়ে। সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, সিরাজুল আলম খান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে প্রতিবিপ্লবের পথ সুগম করেছিলেন। সে সময় জাসদের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুসলিম লীগ পরিবার রাতারাতি জাসদ হয়ে গেল। আজকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ।
প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতাকে সপরিবারে হত্যার পেছনে পরোক্ষভাবেও যারা দায়ী তাদের কেউ ক্ষমা করতে পারেন, তারা ধন্যবাদ পেতে পারে না। জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, সরকারের শরিক একটি দলকে [জাসদ] আনন্দচিত্তে জবাই করা হচ্ছে। দলটির ঠিকুজি উদ্ধার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের মাইন ফিল্ডে হাঁটলে যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত জাসদ যা করেছে, ইতিহাস বলবে, তা সঠিক, নাকি ভুল ছিল। আমাদেরও ২০ হাজার লোক মারা গিয়েছিল।’
আওয়ামী লীগের দাবি, জাসদ তাদের ৩০-৩৫ হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছিল। জাসদ নেতাদের দাবি, সরকারি দল আওয়ামী লীগ তাদের ২০ হাজার নেতা-কর্মী হত্যা করেছে। এতে একজন বালকও মনে করবে দুই দলই গণহত্যার জন্য দায়ী, দুই দলই মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে রেকর্ড হয়ে রইল। আওয়ামী লীগ ও জাসদ পরস্পরের যত লোক হত্যা করেছে তার যোগফল ৫৫ থেকে ৬০ হাজার। এটা তাদেরই হিসাব, অন্যদের নয়। একদিন তারা মানুষকে ‘আনন্দচিত্তে জবাই’ করেছে, এখন ইতিহাসচর্চা করতে গিয়ে দুই দল দুই দলকে জবাই করছে।
খান সাহেব আরও বলেছেন, ‘হাসানুল হক ইনু ও আমি টেলিভিশনে বলেছি, পিতার (বঙ্গবন্ধুর) বিরুদ্ধে সমালোচনা করা ভুল হলে আজ তার কাফফারা দিচ্ছি।’ কাফফারা হলো পাপমোচনের জন্য দেয় জরিমানা। জাতি দেখছে তাঁরা পাপ করে পুরস্কৃত হয়েছেন। ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার চেয়ে বড় পুরস্কার পৃথিবীতে নেই।
সংসদে যখন জাসদ নিয়ে এ আলোচনা চলছিল, তখন দলটির সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সেদিন কিছু না বললেও পরদিন তিনি ময়মনসিংহে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া সেই নেত্রী, যিনি জঙ্গিবাদ সমর্থন করেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করেন ও সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেন। তিনি গণতন্ত্রের ক্লাব থেকে চলে গেছেন। উনি আর গণতন্ত্রের ক্লাব সদস্য নন। খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের তিনি কেউ নন।’ তিনি রাজনৈতিক সংলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা বলব ওরা রাজনৈতিক শয়তানি ছাড়েনি, তওবা করেনি, ভুল স্বীকার করেনি। সুতরাং জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার পক্ষের এই রাজনৈতিক শয়তানদের সঙ্গে কোনো মিটমাট হতে পারে না।’
গণতন্ত্রের ক্লাবঘর বলতে জাসদ নেতা নিশ্চয়ই লুই কানের নকশায় নির্মিত শেরেবাংলা নগরের ধূসর ভবনটিকে বুঝিয়ে থাকবেন। জনসমর্থন নেই বলে বেগম জিয়া সংসদ সদস্য নন। সুতরাং ওই গণতন্ত্রের ক্লাবের সদস্যও তিনি নন। কিন্তু জঙ্গিবাদ তিনি ছাড়েননি, এমন প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
[শেষ পর্ব >> জাসদ ও গণবাহিনীর ঠিকুজি by সৈয়দ আবুল মকসুদ]
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷