Saturday, September 23, 2017

সাতকানিয়ায় ১৫ রোহিঙ্গা উদ্ধার

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমঃ মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১৫ জনকে সাতকানিয়া থেকে উদ্ধারের পর কক্সবাজারের উখিয়া শিবিরে পাঠিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে তাদের সাতকানিয়া থানার কালিয়াইশ ইউনিয়নের বিওসি মোড় এলাকার রাজমহল কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সাতকানিয়া থানার ওসি মো.রফিকুল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, কক্সবাজারে সীমান্ত দিয়ে ঢুকে তারা সাতকানিয়ায় এসেছিল।  খবর পাবার পর আমরা তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি।  মানবিকভাবে তাদের সেবা দিয়ে আবারও ‌উখিয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছি।
উদ্ধার হওয়া ১৫ জনের মধ্যে ২ জন পুরুষ, ৬ জন নারী ও ৭ জন শিশু বলে ওসি জানিয়েছেন।
গত ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনা চৌকিতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সেখানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।  কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন সীমান্ত পার হয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঢল নামে যা এখনও অব্যাহত আছে।
রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিভিন্ন নজরদারির মধ্যেই চট্টগ্রামহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের।

সুচির ক্ষমতা যাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে পাশ্ববর্তী বায়লাদেশে আশ্রয় নেয়ায় বিশ্ব সমালোচনা, পর্যবেক্ষণ, তিরস্কার ও নিন্দার মুখে রয়েছেন অং সান সুচি। রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে জাতি নিধনের এক ন্যক্কারজনক উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসেইন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যেভাবে নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। দেশের নেত্রী, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচির হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ২৫ আগস্টে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৩০টি পোস্টে হামলা চালায়। এতে ১২ নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। তারপর থেকে সেনাবাহিনী ও তাদের সঙ্গ নেয়া বৌদ্ধরা রাখাইন রাজ্যজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে। তারা টার্গেট করছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের। এটাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস’। দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া অথবা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলেছেন, তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বহু নিকটজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাদেরকে আর কখনও ফেরত দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎও হয়নি। অনলাইন সিএনএন-এ এ কথা লিখেছেন সাংবাদিক জেমস তারাবে। তিনি আরো লিখেছেন, ১৯৬২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার শাসন করে সামরিক জান্তা। এ সময় তারা গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন করায় গ্রেপ্তার করে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সুচিকে। জারি করে সামরিক আইন। প্রতিবাদীদের হত্যা করতে থাকে। সেই সামরিক বাহিনী এখনও দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ ও সরকারের মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এর ফলে করার মতো কিছুই আসলে নেই সুচির হাতে। সিডনিতে লোউয়ি ইন্সটিটিউটের ইস্ট এশিয়া প্রোগ্রাম বিষয়ক রিসার্চ ফেলো আরোন কোনলি বলেন, মিয়ানমারের সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চার্জ (মিয়ানমার সেনাবাহিনীর) নিজেই নিজের বস। তিনি অং সান সুচির কাছে রিপোর্ট করেন না।  দেশের নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সম্মানের মধ্যে পছন্দ বেছে নিতে বলা হয় যদি সেনাবাহিনীকে তাহলে তারা নিয়ন্ত্রণকেই বেছে নেবে। তবে এখানে প্রশ্ন হলো, তারা স্বেচ্ছায় (বেসামরিক প্রশাসনের হাতে) কতটুকু ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। আরোন কোনলি বলেন, ২০০৮ সালে মিয়ানমারে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছে তার বাইরে একদানাও তারা স্বেচ্ছায় ছাড় দেবে এমন কোনো প্রমাণ আমি দেখতে পাইনি।
কি আছে ২০০৮ সালের সংবিধানে
২০০৮ সালে মিয়ানমারে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। তাতে জাতীয় পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য এক-চতুর্থাংশ আসন বরাদ্দ রাখা হয়। এটা ছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি কৌশল। এর মধ্যমে তারা অচল অবস্থায় পড়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক সংস্কার, বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সুচিকে সাধারণ্যে নিয়ে এসে মিয়ানমারকে অচলায়তন থেকে বের করে আনে। কিন্তু সংবিধানের অধীনে সেনাবাহিনীকে পেশীশক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা দেয়া হয়। সেটা করা হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে তাদের স্বাধীনতা দিয়ে। এই সংবিধানেই রাখা হয়েছে সংঘাতময় কিছু ধারা। তাতে বলা হয়েছে, কোনো দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন ব্যক্তি (হতে পারে সেটা পিতামাতা বা সন্তান) মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। অং সান সুচির প্রয়াত স্বামী ছিলেন একজন বৃটিশ। তাই তাদের দু’সন্তানও বৃটিশ নাগরিক। এ কারণে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি সুচি। কিন্তু তিনি যাতে মূল দায়িত্ব পালন করতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন সে জন্য একটি বিশেষ পদ সৃষ্টি করা হয়। তা হলো স্টেট কাউন্সেলর। ২০১৫ সালে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচন হয়। তখন তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তার দল যদি বিজয়ী হয় তাহলে তিনি এমন একটি সরকার গঠন করবেন, যেখানে তিনি থাকবেন প্রেসিডেন্টের ওপরে। এটা একটি অতি সাধারণ বিষয়। কিন্তু সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চিফ, যিনি সেনা কর্তৃপক্ষেরও প্রধান, তিনি প্রেসিডেন্টেরও ওপরে। তার মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত আসনে কাকে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সেটা নির্ধারণ করেন তিনি। এ ছাড়া সংবিধানের অধীনে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কর্তৃত্বও কমান্ডার ইন চিফের হাতে। এটাকে বলা হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তি। এ ছাড়া সংবিধানে বাতিল করা হয়েছে অতীতের দণ্ডবিধি আইন। এর অধীনে সেনাবাহিনী অতীতে অং সান সুচিকে গৃহবন্দি রেখে, ১৯৯০ সালের নির্বাচনকে বাতিল করে দিয়ে যেসব অপরাধ করেছে সেই অপরাধের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১৯৯০ সালের নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে সেনাবাহিনী কার্যত তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে।
১৯শে সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে কূটনীতিকদের সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ রেখেছেন অং সান সুচি। এ সময় তিনি বলেছেন, এখনও তার সরকার তরুণ। মাত্র ১৮ মাস ক্ষমতার বাইরে ছিলো। এখনও দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেছেন, অর্ধ শতাব্দী বা তারও বেশি সময়  স্বৈরাচারের শাসনের পর আমরা এখন আমাদের জাতি গঠনের পথে রয়েছি। আমাদের সরকার তরুণ, নাজুক (ফ্রাজিল)। অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবু আমরা সেগুলোর সঙ্গে লড়াই করছি। আমরা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের বিষয়ে আবদ্ধ থাকতে পারি না।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যে নির্মমতা চালাচ্ছে তাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণতন্ত্রের পক্ষের মানুষরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। কিন্তু সুচির শাসনের অংশীদার কমান্ডার ইন চিফ সিনেটর জেনারেল মিন অং হ্লাইং যথারীতি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অং সান সুচি যখন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের ঘোষণা দিলেন, তখন মিন অং হ্লাইং     দেশে পররাষ্ট্র বিষয়ক কূটনীতিকদের আপ্যায়ন করছিলেন, সেনা কর্মকর্তাদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন এবং ডোনেশন গ্রহণ করছিলেন রাখাইনে বিদ্রোহীদের কারণে সৃষ্ট বিশৃংখলায় বাস্তুচ্যুত মানুষকে সহায়তার জন্য। তার আনুষ্ঠানিক সব কর্মকাণ্ডের কথা নিত্যদিনই ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হচ্ছে। এটি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের ভেরিফাই করা পেজ। সেখানে তার অনুসারীর সংখ্যা ১২ লাখ ৮০ হাজার। ১৫ই সেপ্টেম্বরে সেখানে তিনি ইংরেজিতে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তাতে বলেছেন, ২৫শে আগস্ট থেকে ‘এক্সট্রিমিস্ট বাঙালি’দের সঙ্গে ৯৩ টি সংঘর্ষ হয়েছে। তিনি এক্সট্রিমিস্ট বাঙালি বলতে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের বুঝিয়ে থাকেন, যারা উগ্রপন্থায় লিপ্ত। ওই পোস্টে তিনি আরো দাবি করেছেন, এসব উগ্রপন্থি রাখাইন রাজ্যে তাদের শক্ত ঘাঁটি গাড়তে চায়। তারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি চায়। মিয়ানমারে কোনোদিনও রোহিঙ্গা নামের কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই। বাঙালি ইস্যুটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সত্য তুলে ধরতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর আগে ১লা সেপ্টেম্বরে আরেকটি পোস্ট দেন তিনি। তাতে তিনি ১৯৪২ সালে রাখাইন রাজ্যে রাখাইনদের প্রাণহানীর দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, বাঙালিরা হামলা চালিয়েছিল। মানুষ হত্যা করেছিল। তাদের বাড়িঘর ছেড়েছিল। আমরা সেই ভয়াবহতা আবার ঘটতে দিতে পারি না কখনো। অং সান সুচি ও সেনাবাহিনী উভয় পক্ষই দাবি করছে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা করেছে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা। সুচি প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছেন, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মিয়ানমারের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কুসংস্কার বা ঘৃণা কাজ করে। ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশ শাসনের সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে শ্রমিক হিসেবে নেয়া হয়েছিল রাখাইনে। ওই সময় আরাকান ছিল বৃটিশ শাসিত ভারতের অংশ। তাই রোহিঙ্গা শ্রমিকদের স্থানান্তরকে বৃটিশরা দেখতো আভ্যন্তরীণভাবে একস্থান থেকে আরেক স্থানে চলে যাওয়া হিসে। বহু রোহিঙ্গা বলেছেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু মুসলিম ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা ছিলেন রাখাইনে এবং তারা তাদের পূর্বসুরি। এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে। বাস্তবে সেখানে জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মিশ্রণ ঘটেছে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব আইন পাস করে। তাতে বলা হয়, রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে যদি তারা সরকারিভাবে স্বীকৃত ভাষায় কথা বলতে পারে, প্রমাণ দেখাতে পারে তাদের পূর্ব-পুরুষরা মিয়ানমারের স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে সেখানে বসবাস করছে। কিন্তু বেশির ভাগ রোহিঙ্গা তাদের অতীতের রেকর্ডপত্র দেখাতে পারেননি এবং তার ফলে তারা কার্যত হয়ে পড়েন রাষ্ট্রহীন। মিয়ানমারে স্বীকৃত ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী আছে। এ তালিকায় রোহিঙ্গা নেই। সরকারি বিবৃতিতে তাই মিন অং হ্লাইয় রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করেননি। এর পরিবর্তে তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘বাঙালি’।
অস্ত্র বিক্রি ও নিষেধাজ্ঞা
পশ্চিমা দুনিয়ার সমালোচনা, নিন্দাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর কারণ কি? কারণ, তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দিলে কিছুই হবে না এমনটা মনে করে তারা। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের মতো আরো অনেক দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত আকারে রেখেছিল। মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করার পরিবর্তে সেখানে প্রতিরক্ষা বিষয়ক এটাচেকে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তাদেরকে যোগাযোগ রক্ষা করতে বলা হয় মিয়ানমারের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের অধীনে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্কে জোর দেয়া হয় আইনের অধীনে থেকে সেনা প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার ও বিপর্যয়ে থ্রাণ, বহুপক্ষের মহড়ায় অংশগ্রহণ বিষয়ে। আরোন কোনলি বলেছেন, কোথায় ওই সম্পর্ক বিদ্যমান। এখনও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তা সত্ত্বেও চীন, ভারত, রাশিয়া এমনকি ইসরাইলের মতো মিত্ররা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেনাবাহিনীকে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অস্ত্র ও সামরিক ব্যয় বিষয়ক সিনিয়র গবেষক সিমোন ওয়েজেম্যান বলেছেন, এশিয়ায় সবচেয়ে কম স্বচ্ছতার দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম। আপনি যদি দেখেন তাহলে মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো চীন। আমরা যেসব অস্ত্র মিয়ানমারের হাতে দেখতে পাচ্ছি তার বেশির ভাগই চীনের। হোক সেটা স্থল, আকাশ বা সমুদ্রে ব্যবহারের অস্ত্র। তিনি বলেন, মিয়ানমারকে রাশিয়া সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে হেলিকপ্টার ও হালকা যুদ্ধবিমান। ভারত সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে নৌবাহিনীর জন্য অস্ত্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেক ইউরোপিয়ান দেশ অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধকে কোন চোখে দেখে মিয়ানমার
মিয়ানমারের জাতীয় বাজেটের শতকরা ১৪ ভাগই বরাদ্দ রাখা হয় প্রতিরক্ষাখাতে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার পরেও মিয়ানমার অস্ত্র কিনতে ও হার্ডওয়্যার কিনতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ব্যবসায় তাদের যে সম্পদ রয়েছে তার অন্যতম মিয়ানমার ইকোনমিক করপোরেশন। এখান থেকে কলকারখানায় উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন এমন কি অন্যান্য খাতও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিগারেট ও জ্বালানি আমদানিতে ক্ষমতাসীন জেনারেলদের লোভ দেখানো হয় মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস লিমিটেড। দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন অংশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে, এমনকি শেয়ারহোল্ডারও হয়ে ওঠে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে এ কথা বলেছেন ইয়েশুয়া মোসের পুয়াংসুওয়ান। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও নিরেট নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে সেনাবাহিনী। বিশ্বনেতারা এখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবরোধ বাস্তবায়নের জোর আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর তাদের নৃশংসতা বন্ধ করে।

যে কথা বলেননি অং সান সুচি by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

যেন রাজনীতির দাবা। ঘোড়ার চাল দিয়ে আড়াই কোর্ট অতিক্রম করতে চেয়েছেন অং সান সুচি। আটকাতে চেয়েছেন ‘বিশ্ববিবেক’ নামের রাজাকে। কিন্তু পারেননি তিনি। উল্টো তার ঘোড়াই এখন দৌড়ের মুখে। বিশ্ববিবেক তাই সমালোচনায় মশগুল। জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণ নিয়ে কটাক্ষ হচ্ছে জনে জনে। কেন? উত্তর খুব সোজা। তিনি অনেক আশা দিয়েছেন ওই ভাষণে। কিন্তু সেইসব কথার মাঝে রয়েছে চোরাবালির মতো ফাঁদ। সেগুলোকে অতিক্রম করে রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি তার ভাষণে অনেক কিছুই এড়িয়ে গেছেন। তিনি সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে লোমহর্ষক ভিডিও ক্লিপ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ওইসব ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে সেনা সদস্যরা, বৌদ্ধরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। হত্যারও তো একটি রকমফের আছে। শুধু গলা কেটে, ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। ধর্ষিতা নারীর স্তন পর্যন্ত কেটে ফেলছে। তার হাত-পা কেটে ফেলছে। তারপর গলা কেটে মাথা আলাদা করছে। নগ্ন যুবতীকে গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে। জীবন্ত মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চোখের ভেতর লম্বা ধারালো ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে গলিয়ে দেয়া হচ্ছে। পিতামাতার সামনে টিনেজ, যুবতী মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। মানবাধিকারের কথা বলেছেন সুচি। কিন্তু এসব বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলেন নি। তিনি বলেননি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইটে ধরা পড়া গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণের বিষয়টি। তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। এখানে একটি তবে আছে। তা হলো, তার ভাষায়- যেসব রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চান তাদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা (রিফিউজি স্ট্যাটাস) যাচাই করতে প্রস্তুত মিয়ানমার। এর অর্থ হলো, তিনি বুঝাতে চেয়েছেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নয়, শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গারা কি শরণার্থীর মর্যাদার দাবিদার তার জন্মভিটায়, যেখানে তার পূর্বপুরুষরা যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের যে নাগরিকত্বের সুপারিশ করেছে কফি আনান কমিশন, এর মাধ্যমে সুচি তা একদিকে বাস্তবায়ন অন্যদিকে প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বেশির ভাগই এখনো রাখাইনে রয়েছেন। নিরাপদে রয়েছেন। তাদের বাড়িঘরে কোনো স্পর্শ লাগেনি সহিংসতার। খুবই ভালো কথা। এমনটাই শুনতে চায় বিশ্ববিবেক। এখানেও একটি কিন্তু আছে। তাহলো, যদি তা-ই হবে, যদি বেশির ভাগ রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটিতে থেকেই থাকেন, তাদের বাড়িঘর অক্ষত থাকে, তাহলে কি কারণে চার লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে! কি কারণে উত্তর নাফ নদ, বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন! কি কারণে কোনো মানুষ তার জন্মভিটা  ছেড়ে পঙ্গপালের মতো! কেন ২৫শে আগস্ট সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আক্রান্ত এলাকায় জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন, নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি। ২৫শে আগস্ট থেকে ১৯শে সেপ্টেম্বর প্রায় এক মাস সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে কেন কোনো পর্যবেক্ষককে ওই এলাকায় যেতে দেয়া হলো না! এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি সুচি। তিনি জানেন এর কোনো উত্তর তার কাছে নেই। তিনি জানেন, এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি গা বাঁচাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যে নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন, যেসব ভিডিও তারা দেখাচ্ছেন মোবাইলে সে সবই কি মিথ্যা! এপারে নাফ নদের ধার থেকে ওপারে রাখাইনে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার যে দৃশ্য দেখা গেছে, কালো ধোঁয়া আকাশকে গ্রাস করতে দেখা গেছে- সে সব কি মিথ্যা! সুচি জানেন ওই এলাকায় সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকদের প্রবেশ করতে দিলে তার সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। আর এই এক মাস নিশ্চয় হত্যা করা মানুষগুলোর লাশ গুম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে কি এটা ধরে নিতে হবে, গত প্রায় এক মাস ওই এলাকায় কোনো সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক প্রবেশ করতে না দেয়ার অর্থ হলো ওই লাশগুলো গায়েব করে দেয়া, যাতে তাদের কোনো নাম-নিশানা না থাকে! পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলার জন্য এ সময় নেয়া হচ্ছে! সুচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে তোয়াক্কা করেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। হ্যাঁ, এমন কথা রাজনীতির ভাষায় কার মুখে মানায় তা নিশ্চয়ই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত অং সান সুচির জানার কথা। কারণ, তিনি জীবনে ১৫ বছর জেলে কাটিয়েছেন। তিনি জানবেন না তো কে জানবে! সুচি তার বক্তব্যে একটিবারের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। এর অর্থ কি! তিনি তাহলে কাদের নিয়ে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন! তিনি ও তার সরকার, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে দেখে না। তারা রোহিঙ্গাদের দেখে বাঙালি অথবা সন্ত্রাসী হিসেবে। তিনি যে, এখনো সেই অবস্থানেই আছেন, ভাষণের মধ্যে একটিবার রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং তার সরকার দেশত্যাগীদের শরণার্থী মর্যাদার প্রক্রিয়াটি যাচাই করতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গারা যদি শরণার্থী হন তাহলে তাদের দেশ কোন্‌টি! তার যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া কি হবে সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন নি। কি পরিমাণ ‘শরণার্থী’ ফেরত নেবেন তাও তিনি বলেন নি। যদি তার যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ায় দুই হাজার রোহিঙ্গা  টেকেন তাহলে তাদেরকেই তিনি নেবেন! বাকিদের কি হবে! মনে রাখার কথা, ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বাইরে রাখা হয়। তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। এমন কি নিজের গ্রাম থেকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি নেই। এ নিয়ে বিশ্ব দরবারে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা, সমালোচনা। এবার যে পরিমাণে বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে এর আগে এতটা হয়নি। দৃশ্যত রোহিঙ্গা সংকট সমাধান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া বা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এ অবস্থায় সচেতন অনেকেই বলছেন, রাখাইন ও রোহিঙ্গা সংকট কি তবে ফিলিস্তিন, কাশ্মীরের মতো রূপ নিতে যাচ্ছে! যেখানে বহুপক্ষ জড়িত। মাঝখান দিয়ে দুর্ভোগে বাংলাদেশ। অং সান সুচি ভাষণ দেয়ার পরে আবার মুখ খুলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরাঁ, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বুহারি। তারা অবিলম্বে রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। আর মিয়ানমারের সেনাদের প্রশিক্ষণ আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে বৃটেন। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে এই রোহিঙ্গা, রাখাইন ইস্যু বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে কথা বলছেন বিশ্ব নেতারা। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সোচ্চার রয়েছেন। বিশ্বের অনেকের টনক নড়েছে। কিন্তু টনক নড়েনি চীন ও ভারতের। মিয়ানমারকে সমর্থন দেয়ার কথা প্রকাশ্যে বলে দিয়েছে চীন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রোহিঙ্গা সংকটের ভেতরে মিয়ানমার সফরে গিয়ে সুচির সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান জানিয়ে এসেছেন। মিয়ানমার হলো চীন, রাশিয়া, ইসরাইল, বৃটেন সহ আরো অনেক দেশের অস্ত্রের বাজার। তাছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতির কৌশলে কেউ কাউকে নাহি ছাড়ি অবস্থা। এতে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। কক্সবাজার উপকূলে আর্তনাদ ভারি হচ্ছে। রাখাইনের বাতাসে পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে। সে গন্ধ সুচির নাকে লাগছে না। তাই তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে মঙ্গলবার কূটনীতিকদের জড়ো করে তার অবস্থান প্রকাশ করলেন। কিন্তু কেবলই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের দুটো লাইন মনে পড়ছে- ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি’।

সুচি’র বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা by মাহমুদ ফেরদৌস

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নিধন করার অভিযোগ উঠেছে অনেকদিন হলো। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহ নিরবতা বজায় রাখার পর, দেশটির নেত্রী অং সান সুচি অবশেষে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। কিন্তু জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার ভাষণের পর, এই সংকট নিরসনে বিশ্ব আশাবাদী হওয়ার বদলে যেন আরও ক্ষুদ্ধ হয়েছে। বিতর্কিত এই বক্তব্যের পর তার সমালোচনা আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই বক্তব্যে তিনি অনেক কিছু বলেছেন, যেগুলো ‘নির্জলা মিথ্যা’ কিংবা ‘বিভ্রান্তিকর’। এরই প্রেক্ষাপটে বৃটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান সুচি’র বক্তব্যের কিছু আলোচিত অংশ যাচাই-বাছাই করে তুলে ধরেছে সেগুলোর সত্যতা কতটুকু। 
সুচির বক্তব্য: আমি মনে করি, আমার উচিত আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসেছে এখনও এমনকি ১৮ মাসও হয়নি।
গার্ডিয়ান: সত্য। ২০১৫ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরাট বিজয় অর্জন করেন সুচি। অবসান ঘটে কয়েক দশক ব্যাপী দীর্ঘ সামরিক শাসনের। তবে সেনাবাহিনী এখনও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছে: প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত। ফলে এই সংকটে বেসামরিক সরকার ছিল অনেক দুর্বল ও অনেকের মতে স্বল্প-কার্যকরী।
সুচি’র বক্তব্য: কয়েক মাস ধরে শান্ত পরিস্থিতি চলার পর, ২৫শে আগস্ট ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। এটা ঠিক যে, এবারকার সহিংসতার পর্ব শুরু হয়েছিল ২৫শে আগস্ট সহিংস রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর আক্রমণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু উত্তর রাখাইনে কখনই ‘শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি’ ছিল না। এই হামলার আগেও, শ’ শ’ রোহিঙ্গাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজে বা খাবার সংগ্রহে নড়তে দেয়া হচ্ছিল না। সেনাবাহিনী নিয়মিতই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ চালাচ্ছিল, যেগুলো ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতীও ছিল। আবার রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বিরুদ্ধেও সন্দেহভাজন সরকারি গুপ্তচরদের হত্যা করার অভিযোগ ছিল।
সুচি’র বক্তব্য: দায় ভাগাভাগি করা বা দায়িত্ব পরিত্যাগ করা মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সব ক’টি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনি সহিংস ঘটনার নিন্দা জানাই।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু মিয়ানমারের সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া সরাসরি এই সংঘাতের দায় ‘চরমপন্থি সন্ত্রাসী’দের ঘাড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে বারবার। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী বা জাতিগতভাবে বৌদ্ধদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়নি।
সুচি’র বক্তব্য: মানবাধিকার লঙ্ঘণ এবং স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করার সব ধরনের কার্যকলাপ কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারে মোকাবিলা করা হবে।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। রাখাইন রাজ্যে মোতায়েনরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার রেকর্ড খুবই কম। রোহিঙ্গাদের পেটানোর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, জানুয়ারিতে দেশটি চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায়। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কিনা, সেটি স্পষ্ট নয়। সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে গঠিত একটি সরকারি কমিটি ‘তদন্ত’ শেষে জানায়, ওই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
সুচি’র বক্তব্য: যাদেরকে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাদের মধ্যে শুধু মুসলিম বা রাখাইন নয়, অনেকেই আছে। আছে কিছু ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যেমন দাইং-নেট, ম্রো (কামি), থেট, ম্রামাগ্যি ও হিন্দু। এদের উপস্থিতির ব্যাপারে পুরো বিশ্ব সম্পূর্ণই অন্ধকারে।
গার্ডিয়ান: সত্য। আন্তর্জাতিকভাবে নজর দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর দিকে, যেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এবং নজর দেয়া হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গার দিকে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, এমন রিপোর্টও এসেছে।
সুচি’র বক্তব্য: ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে কোনো সশস্ত্র সংঘাত চলছে না। চলছে না কোনো ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা চলছেই। বাংলাদেশ থেকেও সেগুলো দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে গোলাগুলির আওয়াজ প্রায়ই শোনা গেছে রাখাইনে। এমনকি খোদ সু চি’র কার্যালয়ের ফেসবুক পাতায় বলা হয়েছে, ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে নিরাপত্তা বাহিনী ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ পরিচালনা করে আসছে।
সুচি’র বক্তব্য: মুসলিমদের ৫০ শতাংশ গ্রাম এখনও অক্ষত।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করার প্রক্রিয়া অনেকটাই পদ্ধতিগত বা সিস্টেমেটিক। অনেক বড় এলাকায় হলে বাছবিচারহীনভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি উদ্ধৃত করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২১৪টি গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে, সরকার বলেছিল যে, সেনাবাহিনীর যেসব গ্রাম টার্গেট করেছে, সেগুলোর ৪০ শতাংশ এখন খালি। সেখানে পোড়ানো তখনও থামেনি। রাখাইনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার মুক্ত না হওয়ায়, ঠিক কত শতাংশ গ্রাম ধ্বংস বা অক্ষত আছে, তা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। আবার রাখাইনে সব মুসলিমই রোহিঙ্গা নয়। ফলে মুসলিম আর রোহিঙ্গাদের এক কাতারে আনার মাধ্যমে সুচি এখানে সংঘাতকে পরিসংখ্যানে প্রকাশ করে বিকৃত করার চেষ্টা করছেন।
সিএনএন এক্ষেত্রে আরেকটি বিশ্লেষণ দিয়েছে: সুচি নিজের বক্তব্যে একবারই রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। তবে তা-ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করতে নয়। তিনি আরসা জঙ্গি গোষ্ঠী অর্থাৎ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে বোঝাতে একবার ‘রোহিঙ্গা’ উচ্চারণ করেছেন। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পেনি গ্রিন বলেন, ‘তিনি (সুচি) মূলত এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বোঝাতে। এর মানে হলো, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের একটি মাত্র পরিচয় হলো, তার মতে, সন্ত্রাসী। তিনি চান আন্তর্জাতিকভাবেও এই ধারণাটাই গৃহীত হোক।’
সুচি’র বক্তব্য: রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সকল মানুষের কোনো বৈষম্য ব্যতিরেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার রয়েছে।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে নাগরিকত্ব ও প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যসেবা খুবই সীমিত। অনেকেই বিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না। বিশেষ করে যেসব রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণ শিবিরে থাকেন, তাদেরকে শিবির থেকে বের হতেই বিশেষ অনুমতি লাগে!
সুচি’র বক্তব্য: ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে, স্থানীয় ও বিদেশি গণমাধ্যমকে রাখাইনের এমন সব জায়গায় প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে, যেগুলোতে আগে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না। ২৫শে আগস্টের সংঘাত শুরুর পর থেকেও আমরা আক্রান্ত এলাকায় বেশ কয়েকটি সাংবাদিক দলের সফরের ব্যবস্থা করেছি।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। সরকার সাংবাদিকদের জন্য সীমিত সংখ্যক সফরের আয়োজন করেছে। কিন্তু কিছু এলাকায় প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। সাম্প্রতিক সরকারি সফরের সময় বেশ কয়েকজন প্রতিবেদক খেয়াল করেছেন যে, রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে।
সুচি’র বক্তব্য: মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে অনেকে আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা যে কোনো সময় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য প্রস্তুত।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেছেন, সরকার শুধুমাত্র তাদেরই গ্রহণ করবে যাদের নাগরিকত্ব বা অন্য কোনো বাসিন্দা সনদপত্র রয়েছে। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে বহুবার সহিংসতার শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে জাতিগোষ্ঠী হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়া হয় না। তাদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে কার্যত মিয়ানমারে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়। এ কারণেই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন বলা হয়। অর্থাৎ, বর্তমান কাঠামোর অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য নন। তবে, সুচি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘যাচাইবাছাইকৃত’ শরণার্থীদের হয়তো ফেরানো হবে। এর এ-ও মানে হতে পারে যে, কেবল নাগরিক হলেই ফেরানো হবে, তা নয়।
সুচি’র বক্তব্য: অভিযোগ যেমন আছে, পাল্টা-অভিযোগও আছে।
গার্ডিয়ান: সত্য। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে, এমন দাবির স্বপক্ষে এখন বিপুল প্রমাণ রয়েছে। পোড়া দাগ বা গুলির ক্ষত নিয়ে বাংলাদেশে আসা অনেক শরণার্থীই সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়ে ছারখার, কিন্তু প্রতিবেশী বৌদ্ধদের বসতি অক্ষত। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, রাখাইনে যা ঘটছে, তা ‘জাতিগত নিধনের আদর্শ উদাহরণ।’ অপরদিকে, সরকার ও তার সমর্থকরা সব কিছুর জন্য কেবল ‘সন্ত্রাসী’দের দায়ী করেছে।
সুচি’র বক্তব্য: আমরা এখন আরেক দফা মানবিক ত্রাণ প্রদান আরম্ভ করছি। আমরা আশা করছি, ওই অঞ্চলের সকল মানুষ এতে উপকৃত হবে।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। মিয়ানমার হয়তো খাবার, পানি ও ওষুধ বিতরণ শুরু করবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা বন্ধের কারণে অনেকে সরকারের নিন্দা জানিয়েছেন। যেমন, সংঘাত-উপদ্রুত এলাকায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে প্রবেশ করতে দেয়নি সরকার। সম্প্রতি, রেডক্রস কমিটিকে সীমিত প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে।

‘সুচির পতন’

২৫শে আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সেনাবাহিনীর পোস্টে হামলা চালায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা বিদ্রোহী। ওইদিনই প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইটে রাখাইনের গ্রামগুলো জ্বলতে দেখা যায়। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই একটি একটি করে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে শহরতলীগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছিল। এরপর থেকে শুরু হয় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পালিয়ে আসা। বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে সেনাবাহিনীর শুরু করা সামরিক অভিযান থেকে বাঁচতে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে বাংলাদেশে। শরণার্থীরা ত্রাণকর্মীদের জানান, সেনারা তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের পালিয়ে আসার পথে পেতে রেখেছে স্থলবোমা। পলায়নরত নারী- শিশুদের উদ্দেশ্য করে ছুড়েছে গুলি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। তবে অন্যবারের চেয়ে এবার নির্যাতনের মাত্রার পার্থক্য বিশাল। তিন সপ্তাহে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ২০০ গ্রাম। ৪ লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এদের দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে শিশু। ইউনিসেফ ও মেডসান সন ফ্রন্টিয়ারের মতন মানবাধিকার সংস্থাকে সংঘর্ষ- আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান সামরিক অভিযানটিকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের একটি পরিষ্কার উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এতকিছুর মধ্যেও মিয়ানমারে একজন ব্যক্তি এ নিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে চুপ ছিলেন। তিনি হচ্ছেন, মানবাধিকার আইকন ও নোবেলজয়ী দেশটির সামরিক সরকারের কার্যত নেত্রী অং সান সুচি। এই নির্যাতনের প্রতি নিন্দা জানাননি তিনি। সুচির সতীর্থ নোবেলজয়ীরা খুব দ্রুতই এই অসঙ্গতিটি তুলে ধরেন। পাকিস্তানি মানবাধিকার কর্মী ও নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেন, সুচির কথা শোনার জন্য পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করছে। দক্ষিণ আফ্রিকান যাজক ডেসমন্ড টুটু পার্থনা করেন, যাতে করে সুচি পুনরায় তার সাহসী ও দৃঢ় হয়ে উঠতে পারেন। তবে সুচি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ না করে উল্টো সামরিক অভিযান নিয়ে ভুয়া তথ্য প্রচারের অভিযোগ তোলেন। তিনি ঘোষণা দেন, তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিবেন না।
রাখাইনের প্রথম গ্রামে আগুন জ্বলার ২৫ দিন পর বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বক্তব্য রাখেন সুচি। সেনা কর্মকর্তা ও বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে দেয়া মিয়ানমারের রাজধানী থেকে প্রচারিত ওই ভাষণে সুচি সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেননি। তার জায়গায় এই নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, তার সরকার রাখাইনে গ্রাম আগুনে জ্বলার খবর নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে সরকারকে এইসব অভিযোগ ও অভিযোগের বিরুদ্ধে দেয়া পাল্টা-অভিযোগ, সবই বিবেচনা করে দেখতে হবে। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সংঘর্ষ-আক্রান্ত এলাকার জায়গায় যেসব এলাকায় শান্তি বজায় আছে সেসব এলাকার দিকে বেশি মনযোগ দেয়া। তিনি দাবি করেন রাখাইনের বেশিরভাগ মুসলিমই এখনো সেখানেই রয়ে গেছেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসেননি। তিনি বলেন, এটা খুব কম মানুষেরই জানা যে রাখাইন রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রোহিঙ্গাই রাখাইন ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। এটা দুঃখজনক যে, আমাদের কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকের সময়, আমি শুধুমাত্র আমাদের অল্পকিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য। তার এই প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, তার ভাষণের মাধ্যমে জাতিগত নিধনযজ্ঞকে ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এভাবেই আইকনদের পতন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র সুচিকে শুধু মিয়ানমারের মহান উদ্ধারকারীই বানায়নি, একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অহিংস প্রতিবাদের একজন আদর্শ হিসেবেও তার নাম প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতিসংঘও মিয়ানমার থেকে ভালো কিছু দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। কারণ, মিয়ানমার বহুদিন ধরে তার নেতৃত্বের অধীনে রয়েছে। তবে এখন এসে তার অগ্রাধিকার ভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বেন রোডস বলেন, “তিনি এখন ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে পরিবর্তন ঘটতে থাকা মিয়ানমারের একজন রাজনীতিক হিসেবে দেখেন, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা আইকন হিসেবে না। মিয়ানমারের ভেতর রাজনৈতিক সংস্কার আনার তীব্র ইচ্ছা তার মধ্যে একটি জ্বলজ্বলে ও শোচনীয় ‘ব্লাইন্ড স্পটের’ সৃষ্টি করেছে।” এতে শুধু তার সুনামই ধ্বংস হচ্ছে না। মিয়ানমারের জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের দ্বিগুণ। চীন, ভারত, থাইল্যান্ডের মাঝখানে অবস্থিত দেশটিতে ভারসাম্যহীনতার কারণে যে কোনো মুহূর্তে সামরিক বাহিনী সরকারের দখল নিয়ে নিতে পারে। এতে করে পণ্ড হয়ে যাবে সকল গণতান্ত্রিক সংস্কার। রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতনকে নিজেদের দলে নতুন লোক ঢুকিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদা তো ইতিমধ্যে মিয়ানমারকে হুমকিও দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাঙ্গরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে চীন। সুচির আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ওপর, সেই বিদ্রোহী সুচি হিসেবে ওই নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত, বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়ার ওপর লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য নির্ভর করছে। গণতন্ত্র অর্জনের পথ প্রায়ই নোংরা থাকে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দেশটির সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর লড়াই বহুদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রয়েছে সামরিক বাহিনীর হাতে। এমনকি ক্ষমতা বাড়ছে বৌদ্ধ-জাতীয়তাবাদীদেরও। উভয়পক্ষ থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছেন সুচি। এদিকে, আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি নিয়ে গিয়ে চলা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, তারা এই জাতিগত সংঘর্ষ কিভাবে সামলাবে। ওবামার আমলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে কোনো কোনো আইনপ্রণেতা পুনরায় তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে চান। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি সীমিত করে দিতে চান। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন নিয়ে বিরল বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তবে চীনের বাধার কারণে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে থামানোর মতন প্রস্তাব এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর এসবের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পালানো অব্যাহত রয়ে গেছে।
বিশ্ব হতাশা থেকে ওঠে আসা নায়কদের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিতে ভালোবাসে। ৭২ বছর বয়সী সুচির জন্ম মিয়ানমারের সবচেয়ে আলোচিত পরিবারগুলোর একটিতে। তার বাবা জেনারেল অং সান দেশের আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪০’র দশকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। বৃটেন থেকে মিয়ানমারকে স্বাধীনতা এনে দেন তিনি। সুচির শিশুকালেই তাকে হত্যা করা হয়। শহীদের মর্যাদা পান তিনি। গৃহযুদ্ধে বিভক্ত হয়ে যায় দেশ। পরবর্তীতে সুচির মা’কে ভারত ও নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বড় হয়ে সুচি বিদেশে বসবাস শুরু করেন। রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। জাতিসংঘের হয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে কাজ করেন। ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন তিনি। পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা তখনই তার মাথায় ঢুকে যায়। প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি। গৃহবন্দি হয়ে কাটান পরবর্তী ১৫ বছর। গৃহবন্দি থাকার সময়ে ১৯৯০ সালে তার দল ব্যাপক ব্যবধানে নির্বাচনে জয় লাভ করে। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই জয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তিনি লড়ে যান। বাড়ির ভেতর থেকেই গণতন্ত্র নিয়ে ভাষণ দিতে থাকেন। এই দীর্ঘ গৃহবন্দি থাকাকালে একবার তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তার স্বামী বৃটেনে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছিলেন তখন। কিন্তু তিনি তার স্বামীকে দেখতে যাননি। তিনি জানতেন, একবার তিনি মিয়ানমার ছেড়ে গেলে, সামরিক জান্তারা পুনরায় তাকে আর সেখানে ঢুকতে দেবে না। ২০১০ সালে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে এমন আশার জন্ম হয়। ওবামা তাকে ‘এ হিরো অফ মাইন’(আমার একজন হিরো) বলে আখ্যায়িত করেন। সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন তার প্রশংসায় বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ও সাহসী প্রিজনার অফ কনসায়েন্স। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস পোষণের কারণে কাউকে আটক করে রাখা হলে তাকে প্রিজনার অফ কনসায়েন্স বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র তাকে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল দিয়ে সম্মান জানায়। তিনি গৃহবন্দি থাকাকালীন সময়েই তার নামে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে পান সাখারোভ প্রাইজ ফর ফ্রিডম অফ থট। ২১ বছর পর ১৯৯১ সালে ঘোষিত নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে। সে সময় ইউনিভার্সাল ডিক্লিয়ারেশন অফ হিউম্যান রাইটস থেকে তার প্রিয় বাক্যগুলো উচ্চারণ করে শোনান। তিনি বলেন, “যখন নোবেল কমিটি আমাকে ‘পিস প্রাইজ’ দিয়ে পুরস্কৃত করছে, তারা তখন বার্মার (মিয়ানমার) নিপীড়িত ও বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে বিশ্বের একটা অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘দ্য নোবেল পিস প্রাইজ’ আমার অন্তরে একটি দ্বার খুলে দিয়েছে।” এসব সুখবরের ভেতরে চাপা পড়েছিল একটি কুৎসিত বাস্তবতা।
 কয়েক দশক ধরে রাখাইন রাজ্যের মুসলিমরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই নির্যাতনের কারণ খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। ধর্মীয়, জাতিগত ও অর্থনৈতিক কারণ-সব কিছুর জন্যেই তারা নিপীড়নের শিকার। রোহিঙ্গা-সুন্নি মুসলিমদের সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠী। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করে আসছে। সে দেশের সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অস্বীকার জানিয়েছে, দেশটির ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় স্থান দিতেও। এমনকি মিয়ানমারের বাসিন্দাদের অনেকের ধারণা রোহিঙ্গারা অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী। রাখাইন, মিয়ানমারের দরিদ্র রাজ্যগুলোর একটি। আর সেখানে কয়েক দশক ধরে চলছে বহিষ্কার নীতি। এই নীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, রোহিঙ্গাদের ভোট দেয়ার অধিকার, সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণের অধিকার বাতিল করে দেয়া। এসব বহিষ্কার নীতি রোহিঙ্গা ও রাখাইনের অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা আরো গভীর করে তুলেছে।
বিশেষ করে সুচি তার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আগের সময়টুকু বেশি নির্মম ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অনুসারে, ২০১২ সালে মুসলিম গ্রামগুলোতে সরকারি বাহিনী সমন্বিতভাবে হামলা চালিয়েছে। গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে, ত্রাণ অবরোধ করে রেখছে। তৎকালীন সময়ে সরকারি বাহিনীর এসব কর্মকাণ্ডকে অনেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করার চেষ্টা ছিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুচি কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল গ্রহণের সময়ে পুনরায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে পালিয়ে যায় রাখাইন থেকে। ওই সময়ে ইউরোপে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রোহিঙ্গারা কি বর্মী (মিয়ানমারের বাসিন্দা) কি না! তিনি উত্তর দেন, আমি জানি না। তার এমন প্রতিক্রিয়া সমালোচনার সৃষ্টি করে। ওবামার আমলে মিয়ানমারে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেরেক মিচেল বলেন, সবাই অবাক হয়েছিল। তিনি কখনোই বহির্দেশে রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারেন নি।
২০১৫ সালে সুচি মিয়ানমারের একজন আইন প্রণেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। মিয়ানমারে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার দল ব্যাপক ব্যবধানে জয় লাভ করে। প্রধানমন্ত্রীর আদলে সুচির জন্যে নতুন পদ তৈরি করা হয়। তিনি হয়ে যান নতুন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর। তবে তার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। কেউ স্বীকার করতে না চাইলেও, গণতন্ত্রও হয়ে যায় আরো ভঙ্গুর। ২০০৮ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তাদের লেখা সংবিধান অনুসারে, পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন দেশের সেনাবাহিনীর অধীনেই থাকবে। পাশাপাশি, তারা যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনেও বাধা দিতে পারবে। সুচির সন্তানরা বৃটিশ নাগরিক হওয়ায় তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। আর হতে পারলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্ত বিষয়ক ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ প্রধান মন্ত্রণালয়গুলো সেনাবাহিনীই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাহিনীটির কমান্ডার ইন চিফ, জেনারেল মিন অং হ্লাইং। মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী চেরি জাহাও বলেন, এনএলডি ২০১৫ সালে করা নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তাদেরটাই হচ্ছে একমাত্র রাজনৈতিক দল যেটি সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারে। তাদের সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজও করতে হবে। ২০১৬ সালের মে মাসে সুচি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে বলেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলার জন্যে তার দেশের কিছু সময় প্রয়োজন। তিনি তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘রোহিঙ্গা’  শব্দটি ব্যবহার না করার জন্যে। তিনি জাতিসংঘের কাছে এ নিয়ে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ওই শব্দ ব্যবহার না করাটা সংহতির প্রচারণা করবে। কেরি বলেন, তিনি সবসময় এটা অনুভব করতেন যে, মিয়ানমারের বাইরের লোকেরা বিষয়টার জটিলতা বোঝে না। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করতেন কিন্তু এখন পর্যন্ত এরকম কৌশলগত যোগাযোগে সে খুব একটা ফলপ্রসূ প্রমাণিত হননি।
ওবামা প্রশাসন চেষ্টা চালিয়েছিল যাতে সুচি রাখাইনে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে সহায়তা করার সুযোগ দেয়। এ বিষয়ে ওবামা বা তার জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক ডজন বৈঠকে বসেন সুচি। ওবামার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রোডস জানান,  বৈঠকগুলোতে সাধারণত সঠিক বিষয়গুলোই উল্লেখ করত যেমন- মানবাধিকার রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা ও নাগরিকত্ব বিষয়ক সমাধান বের করার প্রয়োজোনীয়তা নিয়ে কথা বলতেন তিনি। তবে তিনি প্রতিবার এটাও বলতেন যে, তিনি এ বিষয়ে খুব কমই করতে পারবেন। রোডস বলেন, তিনি যুক্তি দেখাতেন যে, যদি তিনি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে সাহায্য করার দরজাটি খুলে দেন তাহলে, সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা কমে যাবে। রোডস বলেন, আমরাও বিশেষ করে আমাদের দূতাবাস এই ইস্যুটির দিকেই বেশি নজর দিতাম। আর মাঝে মাঝে তা নিয়ে অগ্রগতিও দেখা দিত, যেমন- আরো ভালো মানবাধিকার প্রবেশ। কিন্তু তাদের বিভক্ত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমরা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার মতো আরো নিরাপদ কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছি।
২০১৬ সালে ওবামা ও সুচি ওভাল অফিসে এক বৈঠকে বসেন। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সংস্কারের বার্তা বেশ ভালোভাবেই পৌঁছেছে, এমন প্রত্যাশা করে দুই দশক ধরে চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। রোডস বলেন, মূলত মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারে এমন ধরনের বিনিয়োগ আটকে রাখা হচ্ছিল (ওই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে)।  আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে, তিনি ও তার সরকার  তাদের অবস্থান নিয়ে আরো স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী ছিল। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে, এতে করে তারা রোহিঙ্গাদের পক্ষে ঝুঁকি নেয়ার মতো আরো শক্ত অবস্থানে থাকবে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক রথ বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে এই পদক্ষেপ যে বার্তা পাঠিয়েছে তা হলো, তারা গণতান্ত্রিক ত্যাগের একটি নিদর্শন দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে। তারা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে  পারে। অং সান সুচিকে নামমাত্র নেত্রী হোক কিন্তু জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্যাতন থামানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আর নিষেধাজ্ঞাগুলো সব ওঠে গেছে। তিনি বলেন, ওবামা প্রশাসন খুব জলদি নিজেদের জয়ী ভেবে বসেছিল। তাই এখন যা ঘটেছে তার কিছুটা দায় ওই প্রশাসনের ওপরেও পড়ে।
এদিকে, ইস্যুটির সঙ্গে ট্রামপ প্রশাসন অনেক কম জড়িত। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এনএসসি) এক মুখপাত্র জানান, অফিস গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত সুচির সঙ্গে কথাও বলেননি ডনাল্ড ট্রামপ। উত্তর কোরিয়া পলিসির জন্যে নিয়োজিত বিশেষ রাষ্ট্রদূত জোসেফ ইয়ুন জুলাই মাসে মিয়ানমার সফরে যান। সে সময় তিনি সুচি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তার সফরে তিনি শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্ক নিয়েই মনোনিবেশ করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মনযোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ওই সফর করা হয়নি। এখন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামপ্রতিক সহিংসতার মাত্রা হয়তো ট্রামপকে বাধ্য করতে পারে এদিকে নজর ঘুরাতে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নাজিব রাজাক যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসেন। তখন রাজাকের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ট্রামপ। সে আলোচনায় তারা দুজনেই সম্মত হন যে, মিয়ানমারকে এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে ও সেখানে মানবিক সাহায্য ঢুকতে দিতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন সুচিকে ফোন করে, মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দেশটিতে মানবিক সাহায্য নিয়ে প্রবেশাধিকার দেবার জন্যে আহ্বান জানান। পরবর্তী দিনই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের অতিরিক্ত ত্রাণ প্রদানের ঘোষণা দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি সুচির ভাষণে যোগ দিতে নেপিড’তে সফর করেন। সেখানে তিনি রাখাইনের রাজধানী সিত্তুয়ি শহর পরিদর্শন করেন। কিন্তু স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা তাকে বলেন যে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সংঘর্ষ-আক্রান্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে পারবেন না।
এনএসসি’র এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের মধ্যে সামরিক সমপর্ক এখন পর্যন্ত একেবারে শুরুর পর্যায়ে। আর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এই নির্যাতন ও বাস্ত্যচুত করার ঘটনা না থামায় তাহলে এ সমপর্ক সামনে এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাস্টিন হিগিনস বলেন, ‘আমরা অং সান সুচির প্রতিশ্রুতিকে স্বাগতম জানাই। যে প্রতিশ্রুতিতে তিনি বলেছেন যে, যখন নিরাপদ মনে হবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। আমরা মিয়ানমারকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার অনুমোদন দেয়ার আহবান যাচাই। এ বিষয়ে কংগ্রেসের বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সিনেট মেজরিটি লিডার মিচ ম্যাককন্নেল কয়েক দশক ধরে সুচিকে সমরথন করে আসছেন। সুচির ভাষণের আগে  তিনি তাকে ফোন দিয়েছেন। এমনকি সিনেটে তাকে প্রতিরক্ষা করে কথাও বলেছেন। তিনি বলেছেন, সুচি আগে যে মানুষ ছিলেন, এখনই সেই মানুষই আছেন। তিনি শুধু তার অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করছেন। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদকে ত্রাণ নিয়ে ঢুকতে না দেওয়ায় সুচির এই সমর্থনকারী সিনেটর তাকে তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে    একটি চিঠি লিখেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর ডিয়ানে ফেইন্সটেইন চান, কংগ্রেস মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সুচির সরকারের সঙ্গে সমপর্ক পুনরায় বিবেচনা করুক। উল্লেখ্য, ফেইন্সটেইন সুচিকে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল প্রদানের অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, অন্ততপক্ষে যে নেতারা জাতিগত নিধনযজ্ঞের এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছেন ও এর কার্যক্রম চালিয়েছেন তাদের সবাইকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা উচিত। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সকল প্রকার যোগাযোগ স্থগিত রাখা উচিৎ। আর মিয়ানমারের সঙ্গে পক্ষপাতমূলক সুবিধাও শেষ করা উচিত।
পোপ ফ্রান্সিস কতৃক নিয়োজিত মিয়ানমারের শীর্ষ ক্যাথলিক কর্মকর্তা কার্ডিনাল চার্লস মাওং বো বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি যে মোড় নিয়েছে, তাতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সামলানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অং সান সুচি শক্ত রশির ওপর দিয়ে হাটছে। ইতিমধ্যেই পুনরায় সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে কালো শক্তির আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে ।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো। বিশ্ব নেতারা, জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, ইউরোপীয়, এশীয় মন্ত্রীরা বিভিন্ন বৈঠক ও ভাষণে এ সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। তবে ট্রামপ ব্যতিক্রম ছিলেন। জাতিসংঘের কাছে এ বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি। এদিকে নিজ দেশে অবস্থান করা সুচি চান যে পুরো বিশ্ব একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা বুঝুক। তিনি তার এক বক্তব্যে বলেন, এটা (মিয়ানমার) নতুন এক গণতন্ত্র। বিশ্ব এমনটা প্রত্যাশা করতে পাওে না যে, এটি মাত্র ১৮ মাসেই এর সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ফেলবে। উল্লেখ্য, সুচি স্টেট কাউন্সেলর হয়েছেন ১৮ মাস হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের জবাবে তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, রাখাইনের মুসলিমরা সমানভাবে ও বৈষম্যহীনভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ভোগ করে থাকে। তিনি বৈদেশিক কূটনীতিকদের রাখাইন পরিদর্শনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু শুধুমাত্র সে অংশগুলোই পরিদর্শন করার সুযোগ দেয়া হয় যে অংশগুলো থেকে, মুসলিমরা এখনো পালিয়ে যায়নি। এর পেছনে কারণ ছিলো, এত করে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এটা শিখতে পারবে যে, কেন এই মুসলিমরা তাদের গ্রাম ছেড়ে পালায়নি। তিনি ভাষণ দেয়ার আগে তার সমর্থকরা রাজধানীতে তাকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন ব্যানার ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু অন্যরা হতাশ। মিয়ানমারের সাবেক রাজনৈতিক বন্দি, একজন গণতান্ত্রিক কর্মী চিত মিন ল্যা  বলেন, তিনি ছিলেন আমাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন, আমাদের আইকন, আমাদের নেত্রী। আমরা তাকে ভালোবেসেছিলাম তার মূল্যবোধের কারণে। কেউ কেউ বলেন তিনি প্রয়োগবাদী আচরণ করছেন। কিন্তু আমি জানি না, কেন তিনি এমন করছেন।
এখন থেকে দুই মাস পরে নতুন এক নৈতিক নেতা বিশ্বের দৃষ্টি রোহিঙ্গাদের দিকে নিয়ে যাবেন। পোপ ফ্রান্সিস নভেম্বরে মিয়ানমার সফর করবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশও সফর করবেন তিনি। মিয়ানমারের সঙ্গে ভ্যাটিকানের সমপর্কের বয়স মাত্র চার মাস। তিনি সবসময় রোহিঙ্গাদের প্রতিরক্ষা করে আসছেন। যেমনটা সুচি করেননি। পোপের এই সফর নিয়ে  দেশ-বিদেশে প্রত্যাশা যত বেশি তেমনি প্রতিবন্ধকতাও তত বেশি। বলেন, ‘আমি আশা করি তিনি মিয়ানমারের মানুষদের কাছে সবকিছু নিয়ে এমনভাবে কথা বলবেন যাতে করে সমাধান আসবে, ঘৃণা নয়। এটাও একটা বাধা, কারণ এখানের একটা গোষ্ঠী সত্যিকারের শান্তি দেখতে চায় না।’ এইসবের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেই। ওই অঞ্চলে থাকা মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, রাখাইনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যদিও সুচি দাবি করেন, রাখাইনে সামরিক অভিযান ৫ই সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে ১৪০০০ আশ্রয়ণ সহ নতুন একটি শিবির তৈরির পরিকল্পনা করছে। গত মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।  বাংলাদেশে নিয়োজিত জাতিসংঘের নাগরিক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনসের ধারণা, সব মিলিয়ে মিয়ানমার থেকে আরও ১ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, তাদের সবার কাহিনী একই। তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ধর্ষণ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যের হত্যা করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এক পরিবারের চেয়ে অন্য পরিবারের দুর্দশার কাহিনী বেশি শোচনীয়।
(মূল প্রতিবেদনটি আমেরিকান সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘টাইম’-এর অনলাইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন এলিজাবেথ ডিয়াস। অনুবাদ করেছেন রিফাত আহমাদ)।

Friday, September 22, 2017

অপহরণের পর নিখোঁজ তিন সৌদি যুবরাজ: কোথায় এরা?

প্রিন্স সুলতান বিন তুরকি, মাঝখানে
১৬ অগাস্ট ২০১৭: বিবিসির এক তদন্তে উঠে এসেছে যে ভিন্ন মতাবলম্বী এক সৌদি রাজপুত্রকে অপহরণ করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কয়েকজন পশ্চিমা সাক্ষী এই বিষয়ে কথা বলেছেন। এরা গত বছর প্রিন্স সুলতান বিন তুর্কী বিন আব্দুল আজিজের এক সফরের সঙ্গী ছিলেন।
তারা ভেবেছিলেন বিমানে চড়ে তারা ফ্রান্স থেকে মিশরে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রাইভেট জেট বিমান অবতরণ করে সৌদি আরবে। এরপর থেকে যুবরাজের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই অভিযোগের ব্যাপারে সৌদি সরকার মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিবিসির সংবাদদাতা রেদা আল মাওয়ি বলছেন, ইউরোপে বাস করতেন এমন তিনজন সৌদি যুবরাজ গত দু'বছরে নিখোঁজ হয়েছেন।
এরা তিনজনই সৌদি সরকারের সমালোচক ছিলেন।
এমন প্রমাণ আছে যে এই তিনজনকেই অপহরণ করা হয়েছে এবং বিমানে করে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে - এবং তার পর থেকে এদের কোন খোঁজখবর পাওয়া যায় নি।
জেনেভা শহরের উপকণ্ঠে ২০০৩ সালের ১২ই জুন একজন সৌদি প্রিন্সকে গাড়িতে করে একটি প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই প্রিন্সের নাম সুলতান বিন তুরকি বিন আবদুলআজিজ। প্রাসাদটি হচ্ছে তার চাচা প্রয়াত বাদশাহ ফাহদের ।
আর যিনি এই প্রিন্সকে প্রাতরাশের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তিনি হলেন বাদশাহ ফাহদের প্রিয় পুত্র প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন ফাহদ।
আবদুলআজিজ সুলতানকে বললেন, সৌদি আরবে ফিরে যেতে - কারণ সুলতান সৌদি নেতৃত্বের যে সমালোচনা করেছেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে এবং তার নিষ্পত্তি করতে হবে।
সুলতান তা মানলেন না। এর পর প্রিন্স আবদুলআজিজ একটা ফোন করতে ঘরের বাইরে গেলেন।
তার সাথেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন সৌদি আরবের ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রী শেখ সালেহ আল-শেখ।
কয়েক মুহূর্ত পরই ঘরে ঢুকলো মুখোশধারী কয়েকজন লোক।
প্রিন্স তুরকি বিন বান্দার, পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর সাথে
তারা সুলতানকে মারধর করলো, তার হাতে পরিয়ে দিল হাতকড়া। এর পর তার ঘাড়ে ঢুকিয়ে দেয়া হলো একটা ইনজেকশনের সূঁচ।
সুলতান সংজ্ঞা হারালেন। তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো জেনেভা বিমানবন্দরে। সেখানে অপেক্ষা করছিল একটি বিমান।
অনেক বছর পর সুলতান সুইজারল্যান্ডের এক আদালতে এ ঘটনার বর্ণনা দেন।
প্রিন্সি সুলতান কি করেছিলেন যে তার পরিবারের লোকেরাই তাকে এভাবে অপহরণ করলো?
এর আগের বছর ইউরোপে চিকিৎসার জন্য এসে প্রিন্স সুলতান সৌদি সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড, যুবরাজ ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সমালোচনা করে কিছু সাক্ষাৎকার দেন, এবং কিছু সংস্কারের আহ্বান জানান।
সৌদি আরবে ১৯৩২ সালে বাদশাহ আবদুলআজিজ ইবনে সৌদ ক্ষমতাসীন হবার পর থেকেই দেশটি একটি রাজতন্ত্র এবং এখানে ভিন্নমত সহ্য করা হয় না।
রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিবাদের কারণে প্রভাবশালী প্রিন্স তুরকি বিন বান্দার এর আগে জেল খেটেছেন। ছাড়া পাবার পর তিনি প্যারিসে পালিয়ে যান এবং সৌদি আরবে সংস্কার দাবি করে ইউটিউবে ভিডিও ছাড়েন।
তখন তার ওপর চাপ দেয়া হয় দেশে ফেরার জন্য। তাকে ফোন করেন ডেপুটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আল-সালেম।
সেই টেলিফোন আলাপ রেকর্ড করে রাখেন প্রিন্স, এবং পরে তা অনলাইনে প্রকাশ করেন। আলাপটি ছিল এইরকম:
"সবাই আপনার প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করছে। জাযাকআল্লাহ খায়ের।"
"আমার ফেরার জন্য? তোমার অফিসাররা যে আমাকে চিঠি লিখেছে 'বেশ্যার সন্তান, তোকে আমরা সুলতান বিন তুরকির মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবো।'"
প্রিন্স সউদ বিন সাইফ আল-নাসর
"ওরা আপনার গায়ে হাত দেবে না"- ডেপুটি মন্ত্রী আশ্বাস দিলেন। তুরকি বললেন, "না, ওরা তোমারই লোক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওদের পাঠায়।"
প্রিন্স তুরকি ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ভিডিও পোস্ট করেন। তার কিছুদিন পরই তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে যান।
সৌদি ব্লগার ওয়ায়েল আল-খালাফ বলেন, "পরে আমি একজন কর্মকর্তার কাছে শুনেছি যে তুরকি বিন বান্দার তাদের সাথেই আছেন। তার মানে তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে মরক্কোর এক পত্রিকায় দেখেছি তাকে মরক্কোতেই গ্রেফতার করা হয়, এবং সৌদি আরবের অনুরোধে সেথানে পাঠিয়ে দেয়া হয়।"
একই সময় প্রিন্স সৌদ বিন সাইফ আল-নাসর নামের আরেক জন যুবরাজেরও একই পরিণতি হয়। তিনি ইউরোপের ক্যাসিনো এবং ব্যয়বহুল হোটেল পছন্দ করতেন। ২০১৪ সালে তিনি সউদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা করে টুইট করতে শুরু করেন।
তার ভাষায় যেসব সৌদি কর্মকর্তা মিশরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসিকে উৎখাত করায় সমর্থন দিয়েছিলেন - তাদের বিচার দাবি করেন তিনি।
এর পর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আরো দুঃসাহসিক কাজ করেন। বাদশাহ সালমানকে উৎখাত করার আহ্বান জানিয়ে দুটি চিঠি লেখেন এক অজ্ঞাত যুবরাজ, এবং প্রিন্স আল-নাসর তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। রাজপরিবারে কেউ এর আগে এ কাজ করেন নি, এবং এটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
এর কয়েকদিন পরই তার টুইটার একাউন্টটি নিরব হয়ে যায়।
প্রিন্স খালেদ বিন ফারহান নামে আরেকজন ভিন্নমতাবলম্বী সৌদি যুবরাজ খালেদ বিন ফারহান ২০১৩ সালে জার্মানি পালিয়ে যান। কিন্তু সেখান থেকে তাকে কৌশলে রিয়াদে নিয়ে যায় সম্ভবত সৌদি গোয়েন্দারা - বলেন ব্লগার আল-খালাফ।
ইতিমধ্যে বন্দী অবস্থায় প্রিন্স সুলতান অসুস্থ হয়ে পড়ায় ২০১০ সালে রাজপরিবার তাকে আমেরিকার বস্টন শহরে চিকিৎসার জন্য যাবার অনুমতি দেয়। আর সেখান থেকেই প্রিন্স সুইস কোর্টে এক মামলা ঠুকে দেন - এবং তাতে তিনি তাকে অপহরণের জন্য প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন ফাহদ, এবং শেখ সালেহ আল-শেখকে দায়ী করেন।
তবে সুইস সরকার এ মামলায় তেমন কোন উৎসাহ দেখায় নি। কিভাবে সুইস বিমানবন্দর থেকে তাকে বিমানে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো তার তেমন কোন তদন্তও হয় নি।
প্রিন্স খালেদ
গত বছর জানুয়ারি মাসে সুলতান ছিলেন প্যারিসের একটি হোটেলে। তিনি কায়রোতে তার পিতাকে দেখতে যাচ্ছিলেন। তখন সৌদি কনস্যুলেট তার যাত্রার জন্য একটি প্রাইভেট জেট বিমান দেবার প্রস্তাব দেয়। ২০০৩ সালের ঘটনা সত্বেও প্রিন্স তা গ্রহণ করেন। তার সাথে ছিলেন তার নিজস্ব ডাক্তার এবং প্রায় ইউরোপীয় ও আমেরিকান দেহরক্ষী সহ ১৮ জন লোক।
পরে - নাম প্রকাশ না করার শর্তে - ওই দলের দুজন বর্ণনা করেছেন যে বিমানে কি হয়েছিল।
"আমরা একটি বিশাল বিমানে উঠলাম, তার গায়ে সৌদি আরবের নাম লেখা ছিল। আমরা দেখলাম তাতে প্রচুর ক্রু আছেন, এবং তারা সবাই পুরুষ। আমাদের কেমন যেন লাগলো।"
"বিমানের ভেতরে মনিটরে দেখা যাচ্ছিল আমরা কায়রো যাচ্ছি। কিন্তু আড়াই ঘন্টা পর মনিটরগুলো অন্ধকার হয়ে গেল।"
"প্রিন্স সুলতান ঘুমোচ্ছিলেন, তবে ল্যান্ডিংএর এক ঘন্টা আগে তিনি জেগে উঠলেন। জানলা দিয়ে তাকালেন। তাকে উদ্বিগ্ন মনে হলো।"
"আরোহীরা যখন বুঝতে পারলেন যে তারা সৌদি আরবে অবতরণ করতে যাচ্ছেন, তখন সুলতান ককপিটের দরজায় বার বার করাঘাত করতে লাগলেন, সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে লাগলেন। ক্রুদের একজন প্রিন্সের সঙ্গীদের সিটে বসে থাকতে বললো।"
বিমান নামার পর রাইফেলধারী কিছু লোক বিমানটি ঘিরে ফেললো। সৈন্য এবং কেবিন ক্রুরা মিলে সুলতানকে বিমান থেকে টেনে হিঁচড়ে নামালো। তিনি চিৎকার করে তার দলকে বলছিলেন আমেরিকান দূতাবাসে ফোন করতে।
প্রিন্স এবং তার চিকিৎসকদের একটি ভিলায় নিয়ে সশস্ত্র প্রহরায় আটকে রাখা হলো। তার সফর সঙ্গীদের তিনদিন হোটেলে আটকে রাখার পর যার যার দেশে ফেরত পাঠানো হলো।
অভিযোগের ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোন মন্তব্য করে নি
এ ঘটনার পর থেকে প্রিন্স সুলতানের কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।
এই অপহরণের অভিযোগের ব্যাপারে সৌদি সরকার মন্তব্য করতেও অস্বীকার করে।
প্রিন্স খালেদ যিনি এখনো জার্মানিতে আছেন, আশংকা করছেন তাকেও একদিন জোর করে রিয়াদে নিয়ে যাওয়া হবে।
তার কথা, সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনা করেছে এমন ওই পরিবারের চারজন সদস্য ইউরোপে ছিল।
তিনি বলেন, "তিনজনকে অপহরণ করে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু আমিই বাকি।"
এর পর কি তার পালা?
"আমি নিশ্চিত যে তাই। অনেক দিন ধরেই। তারা যদি পারতো এতদিনে কাজটা করেও ফেলতো। আমি খুবই সাবধানে থাকি, তবে এটা আমার স্বাধীনতার মূল্য।"

Thursday, September 14, 2017

সাড়ে তিন হাজার বছর আগের মমি উদ্ধার

মিসরের নীল নদের তীরবর্তী শহর লুক্সোরের কাছে একটি প্রাচীন সমাধিতে তিনটি মমির সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। বলা হচ্ছে, মমি তিনটি একজন নারী ও তাঁর দুই সন্তানের।
মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে ৪০০ মাইল দক্ষিণে লুক্সোরে রাজকীয় স্বর্ণকার আমেনেমহাতের সমাধি থেকে মমি তিনটি পাওয়া যায়। এককালে মিসরীয়দের কাছে বেশ ক্ষমতাশালী দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন আমুন। সেই আমুনের স্বর্ণকার ছিলেন আমেনেমহাত।
গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মমিগুলো সাড়ে তিন হাজার বছর আগের। মমিগুলো আমেনেমহাত ও তাঁর স্ত্রীর মমির কাছেই অন্য কবরে পাওয়া যায়। তবে আমেনেমহাতের সঙ্গে এই তিনজনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিন্ডিত হওয়া যায়নি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেছে, নারীর মমিটি ৫০ বছর বয়সী একজনের। হাড়ের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে ওই নারীর মৃত্যু হয়। তাঁর পাশে শায়িত দুই সন্তানের মধ্যে একজনের বয়স বিশের কোঠায়, অন্যজনের ত্রিশের কোঠায়।
মিসরের প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক মন্ত্রী খালেদ আল আনানি বলেন, ‘আমরা মমি, কফিন, গয়না, মূর্তিসহ বেশ কিছু জিনিস খুঁজে পেয়েছি। অনুসন্ধানকাজ এখনো শেষ হয়নি।’

Tuesday, September 12, 2017

‘ধর্ষকগুরু’র যৌন প্রাসাদ পানির নিচে

ধর্ষণের দায়ে ২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত কথিত ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের হরিয়ানার সিরসার ডেরায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ভারতের বিতর্কিত এই ধর্মগুরুর বিলাসী জীবনের নানা কাহিনি প্রকাশ পাচ্ছে। তাঁর ডেরায় পানির নিচে গোপন ‘সেক্স কেভ’ বা ‘যৌন গুহার’ সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ওই গোপন গুহার মধ্যেই নারীদের নিয়ে নানারকমের কুকীর্তি করতেন গুরুজি। জোর করে সেখানে তাদের নিয়ে গিয়ে যৌন হেনস্তা করা হতো। ‘ধর্ষকগুরু’র প্রাসাদ চত্বরে যে সুইমিং পুল রয়েছে, তার নিচেই ওই সেক্স কেভ অর্থাৎ যৌন গুহা গড়ে তুলেছিলেন ডেরাপ্রধান।
পুলিশ শিগগির ডেরাপ্রধানের প্রাসাদ চত্বরে তল্লাশি শুরু করবে। এবং সেখান থেকেই যাবতীয় তথ্যও উঠে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যৌন গুহা ছাড়াও ডেরার ভেতরে আছে বিলাসবহুল ১৫টি রিসোর্ট। এগুলো তার ব্যক্তিগত ডিজনিল্যান্ডের ভেতরে অবস্থিত। এ ডিজনিল্যান্ডের ভেতরে আইফেল টাওয়ার, ক্রুজ জাহাজ ও তাজমহলসহ বিখ্যাত ভবনের আদলে রিসোর্ট তৈরি করেন ধর্ষকগুরু।
এসব রিসোর্টে তিনি নারীদের (সাধ্বী) নিয়মিত যৌন নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ভোগবিলাসের যাবতীয় ব্যবস্থাসহ সুইমিং পুলও আছে। প্রতিটি রিসোর্টে দুই থেকে তিনটি কক্ষ রয়েছে।
ডেরার ভেতরের ওই ডিজনিল্যান্ডে রাম রহিমের পালক মেয়ে হানিপ্রীত ইনসানের প্রবেশাধিকার ছিল। এছাড়া অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী ছাড়া সেখানে আর কারও প্রবেশাধিকার ছিল না।
সাজানো বিলাসবহুল এ ডিজনিল্যান্ডেই তিনি সাধ্বীদের ধর্ষণ করতেন।
রোজ রাতে রাম রহিম প্রধান সাধ্বীকে ফোন করে একজন অল্প বয়সী মেয়েকে ব্যক্তিগত ডিজনিল্যান্ডে তার কক্ষে পাঠানোর জন্য বলতেন। আর সেখানেই তিনি ওই সাধ্বীকে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতন করতেন, যা ডেরায় ‘বাবার মাফি’ নামে পরিচিত।
ধর্ষণ মামলার এক তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, কথিত ধর্মগুরু রাম রহিমের ডেরায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ কনডম ও জন্মনিরোধক ওষুধ জব্দ করেছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)।

Monday, September 11, 2017

‘রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই মোদী সরকার এমন অবস্থান নিচ্ছে’ -মমতা

মায়ানমার থেকে উৎখাত হওয়া যে সব রোহিঙ্গা মুসলিম এ দেশে ঢুকেছেন, তাঁদের ‘পুশব্যাক’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। রাজ্যগুলিকে এই নীতি মেনে চলতে বলেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
কিন্তু সেই ফরমান মানতে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। নবান্নের শীর্ষ মহলের সিদ্ধান্ত, উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা এ রাজ্যে থাকতে চাইলে মানবিকতার খাতিরেই তাঁদের থাকতে দেওয়া হবে। কোনও অবস্থাতেই জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না।
রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, “রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই কেন্দ্র এমন অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্র অমানবিক হলেও আমরা তা হতে পারব না।”
মায়ানমারে সন্ত্রাসের বলি হয়ে গত কয়েক বছর ধরে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা সে দেশ ছেড়ে নৌকা করে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। গত ২৫ অগস্ট থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় সেই সংখ্যাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে ইতিমধ্যেই আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার জম্মু লাগোয়া এলাকায় রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি মায়নমারে গিয়ে এঁদের সকলকে ‘পুশব্যাক’ করার নীতি ঘোষণা করে এসেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা তেমন নয়। বনগাঁ-বসিরহাট সীমান্ত এবং উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু এলাকা দিয়ে কিছু রোহিঙ্গা এ রাজ্যে ঢুকেছেন। ধরা পড়ার পরে তাঁদের অনেকেই এখন জেলে। অসম-দাঙ্গার পর উত্তরবঙ্গেও বেশ কিছু রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এঁদের কাউকেই ‘পুশব্যাক’ করা হবে না বলে সরকারি স্তরে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যদিও কেন্দ্রের চাপে এ রাজ্যের বিভিন্ন হোমে বন্দি থাকা ২৩ জন মহিলা ও শিশুর পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইউনাইটেড নেশন হাইকমিশন ফর রিফিউজিস রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ পরিচয়পত্র দিচ্ছে। এ রাজ্যের হোমে বন্দিদেরও তেমন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজ্যের মুখ্যসচিব মলয়কুমার দে-কে ধমক দিয়ে সেই পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ করিয়েছেন।
এ দেশে ১ লক্ষ ২০ হাজার তিব্বতি, ৬০ হাজার পাখতুন, ১০ হাজার সিংহলি শরণার্থী রয়েছেন। এর পাশাপাশি, ৩০ লক্ষ থেকে ২ কোটি বাংলাদেশিও ঢুকে পড়েছেন বলে বিভিন্ন সংস্থার দাবি। কেন্দ্র কখনও এঁদের নিয়ে বিশেষ অবস্থান নেয়নি।
অথচ, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপরে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্বিচার হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে বহু দেশ তাঁদের জন্য দরজা খুলে দিলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বলেছেন, “সব রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুই অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের সকলকে ফেরত পাঠানো হবে।” রিজেজুর মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।
যার উত্তরে রিজিজু আবার বলেছেন, “গোটা বিশ্বে ভারতেই সব চেয়ে বেশি উদ্বাস্তুর বাস। অতএব উদ্বাস্তু সমস্যা ও তা সামলানোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের জ্ঞান দেওয়ার দরকার নেই।”
এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ‘পুশব্যাক’ করা এবং না করার সিদ্ধান্ত— দুয়ের পিছনেই রাজনীতির ছাপ দেখছেন অনেকে। তাঁদের মতে, হিন্দুত্বের রাজনীতি তুলে ধরতেই ‘পুশব্যাক’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদী সরকার। অন্য দিকে বাঙালি মুসলিমদের ‘পুশব্যাক’ না করে লাভের অঙ্ক কষছে তৃণমূল।
বস্তুত, এ নিয়ে রাজনৈতিক ইতিমধ্যেই চাপানউতোর শুরু হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর কটাক্ষ, “যাঁর মাথায় তোষণ ছাড়া আর কিছু নেই, তিনি তো রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাবেনই। কিন্তু এর পরে যদি হাজার হাজার রোহিঙ্গা এ রাজ্যে ঢুকতে শুরু করে, মুখ্যমন্ত্রী সামলাতে পারবেন তো?”
যার উত্তরে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দেশের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক। একটা মানবিক সরকারের পক্ষে যা করা উচিত, আমরা সেটাই করছি।”
(আনন্দবাজার)

হার্ট-অ্যাটাকের ‘ঝুঁকি কমাতে পারে ব্যাথার ওষুধ’: গবেষণা

হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারে প্রদাহ উপশমের ওষুধ। ১০হাজার রোগীর ওপর চালানো এক গবেষণায় এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে। আর্থারাইটিস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যাথার ওষুধ ‘ক্যানাকিনুমাব’ নিয়ে গবেষণাটি চালনো হয়। এতে দেখা যায় একবার হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের মধ্যে পূণরায় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কমেছে ১৫ শতাংশ। তবে, অনেকেই এই ওষুধটির ফলপ্রসূতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ওষুধ সেবন করা রোগীদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংক্রমনের ঝুঁকি বাড়তে দেখা গেছে।
তবে, বৃটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন (বিএইচএফ) বলছে, তারপরও নতুন এই পরীক্ষাটি অনেক জীবন বাঁচাতে পারে।
নতুন গবেষণাটি নিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হার্ট অ্যাটাক হওয়া রোগীদের পূনরায় অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করার জন্য কলোস্টেরল মাত্রা কমানোর ওষুধ স্ট্যাটিন এবং রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ (ব্লাড থিনিং ড্রাগস) নিয়মিত দেয়া হয়। এই গবেষণায় ১০ হাজার রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হয় যাদের অতীতে একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। তাদেরকে তিন মাসে একবার প্রদাহ উপশমের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। গবেষণার আওতাভূক্ত রোগীদের নেয়া হয় প্রায় ৪০ টি বিভিন্ন দেশ থেকে। সর্বোচ্চ ৪ বছর পর্যন্ত তাদের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। গবেষকরা বলছেন, যেসব রোগীরা শুধু স্ট্যাটিন নিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমতে দেখা গেছে। তবে, ব্যাথার ওষুধ প্রয়োগের পর অনেকের প্রানঘাতী সংক্রমনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে দেখা গেছে।
স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ইউরোপীয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলোজি’র এক সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণায় ব্যবহৃত ‘ক্যানাকিনুমাব’ নামের ব্যাথার ওষুধটি প্রস্তুত করেছে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান নোভার্টিস। রিউমেটয়েড আর্থারাইটিসের চিকিৎসায় এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে নোভার্টিস।  
হার্ট অ্যাটাক এমন একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যেখানে হার্টে রক্তের প্রবাহ হঠাৎ বাধাগ্রস্থ হয়। কিছু রক্তনালীর প্রদাহের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে অতীতে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, গবেষকরা বলছেন, এমন যোগসূত্র আগে কখনও মানবদেহের ক্ষেত্রে প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। সাম্প্রতিক গবেষণাটির শীর্ষ রচয়িতা এবং হার্ভাড মেডিকেল স্কুলের অঙ্গীভূত ব্রিগাম এন্ড ও উইমেন্স হাসপাতালের ড. পল রিডকার বলেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদে এই গবেষণাটি মাইলফলক’ হয়ে থাকবে। তিনি আরো বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমরা সুনির্দিষ্টভাবে দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে, কলেস্টরেল ছাড়াই প্রদাহ কমিয়ে আনলে কার্ডিওভাস্কিউলার ঝুকি কমে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকবে।’ ড. পল বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় আমি হৃদবিজ্ঞান প্রতিরোধের তিনটি বড় যুগ দেখার সুযোগ পেয়েছি। প্রথম যুগে আমরা শরীরচর্চা করা, ধূমপান বন্ধ করা এবং খ্যাদাভ্যাসের গুরুত্ব শনাক্ত করেছি। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা কলেস্টরোল কমানোর ওষুধ যেমন স্ট্যাটিন্সেরর ব্যাপক উপকারীতা দেখেছিল। এখন আমরা তৃতীয় আরেকটি যুগের প্রবেশপথে। দিস ইজ বেরি এক্সাইটিং।’
গবেষণা থেকে আশাব্যঞ্জক তথ্যপ্রমাণ মিলেছে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইন্সটিটিউটের পরিচালক গ্যারি গিবন্স আরো গবেষণা ও অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

দুই বছরে ১১ জনকে বিয়ে করলেন তরুণী, অতঃপর...

দুই বছরে ১১ জনকে বিয়ে করেছেন এক তরুণী। এর মধ্যে এক মাসেই চারজনকে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু কারও সঙ্গেই ঘর-সংসার করেননি। করতেও চাননি। কেননা, তিনি বিয়ে করেন বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। আর সেটি পূরণ হলেই তিনি লাপাত্তা।
পুলিশের কাছে অভিযোগের সূত্র ধরে থাইল্যান্ডের গণমাধ্যমে স¤প্রতি ওই তরুণীর বিষয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ওই তরুণী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। আস্তে আস্তে সম্পর্ক আরও গভীরতার দিকে নিয়ে যান। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে বিয়ে করেন। তারপর তাঁদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান।
ওই তরুণী এভাবে গত দুই বছরে ১১ জন পুরুষকে বিয়ের খেলার ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। থাইল্যান্ডের রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষই ওই তরুণীকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেন। ১১ জন স্বামীর প্রত্যেকের কাছ থেকে তিনি ৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত নিয়েছেন। অর্থ আদায়ের পরই তিনি কোনো এক অজুহাত দেখিয়ে সটকে পড়েন।
স¤প্রতি প্রতারিত ১১ জনের একজন পুলিশের কাছে অভিযোগ করলে ঘটনাটি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তখন অন্য প্রতারিত ব্যক্তিরা এসেও একই অভিযোগ করেন। পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে ১২ জন অভিযোগকারী ওই নারীর স্বামী বলে দাবি করেন। কিন্তু পরে ১১ জনের সঙ্গে তাঁর বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
থাইল্যান্ডের ইংরেজি ভাষার পত্রিকা ‘দ্য নেশন’ প্রতারিত ওই পুরুষদের আইনজীবীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সবার সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি একই রকম ছিল।

Sunday, September 10, 2017

‘রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বলছে, রামদা-তলোয়ার হাতে টহল দিচ্ছে বৌদ্ধ তরুণরা’

রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের নেত্রী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি যা-ই বলুন, বাস্তব অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। কোনো বিদ্রোহী কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, স্থানীয় বৌদ্ধ তরুণরাই সেখানকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তলোয়ার আর রামদা হাতে টহল দিচ্ছে সারাক্ষণ। তাদের সামনে পড়ার ভয়ে রোহিঙ্গারা নিজেদের ভিটেবাড়ি ফেলে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের এ অসহায় অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংবাদদাতা জোনাথন হেড।
বৃহস্পতিবার রাখাইন রাজ্য ঘুরে এসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের গাড়ি তখন মংডু জেলার গাউদু যারা গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণত গ্রামের চিহ্ন হিসেবে ধানক্ষেত থাকে। আমাদের পেছনে ধানক্ষেতগুলোর মধ্যে সারিবদ্ধ গাছের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পেলাম। আমরা গাড়ি থেকে বের হলাম এবং ধানক্ষেত পেরিয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলাম। প্রথমেই দেখতে পেলাম গ্রামের ভবনগুলো কেবল জ্বলছে।
গাওদু যারা গ্রামের বাড়িগুলো ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে ছাইয়ে পরিণত হয়ে গেল। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই এখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। একটু হেঁটে যাওয়ার পর একদল তরুণকে রামদা, তলোয়ার ও গুলতি হাতে চলে যেতে দেখলেন সাংবাদিকরা। তারা তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা ছিল সবাই রাখাইন বৌদ্ধ। তাদের মধ্যে একজন স্বীকার করল, সে গ্রামে অগ্নিসংযোগ করেছে এবং পুলিশ তাকে সহযোগিতা করেছে।'
মংড়ুর পরিস্থিতি দেখতে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ২৪ জন সাংবাদিকের একটি দলের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। জোনাথন হেড ছিলেন সেই গ্রুপেরই সদস্য। এ সফরে যোগ দেওয়ার পূর্বশর্ত ছিল সাংবাদিকরা দলবদ্ধ থাকবেন এবং স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারবেন না। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সরকারের বাছাই করা স্থানে যেতে হবে তাদের। সবসময় অন্যান্য এলাকায়, এমনকি কাছের কোনো স্থানেও তাদের যাওয়ার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছিল নিরাপত্তার অজুহাতে।
বিবিসির ওই প্রতিবেদনে অন্য আরও কয়েকটি গ্রামের রোহিঙ্গা চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেছেনথ ‘আমরা আর একটি গ্রামে গেলাম। সুনসান নীরবতা, কোনো মানুষই নেই। রাস্তার ওপর গৃহস্থালি সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, নারীদের কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। রাস্তার মাঝে একটি খালি জগ দেখতে পেলাম যেটার ভেতর থেকে তখনও পেট্রোলের ঝাঁজ বের হচ্ছিল, আরেকটি পড়ে থাকা জগে কিছুটা পেট্রোল অবশিষ্ট ছিল। যখন আমরা বের হয়ে আসছিলাম, তখন পোড়া বাড়িগুলোতে আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছিল চারপাশ। চলতি পথে মাঝে মাঝে যাদের দেখেছিলাম, তারা ছিল হামলাকারী।'
আরেকটু সামনে এগোনোর পর একটি মাদ্রাসা দেখতে পেলাম যেটির ছাদ তখনও জ্বলছে। আগুন আরেকটি বাড়ির পাশে ছড়িয়ে পড়ায় তিন মিনিটের মাথায় সেটি রীতিমতো নরকে পরিণত হলো।
মংড়ুর এক শহরের বর্ণনায় হেড লিখেছেন, ‘দক্ষিণের শহর আই লি থান কিয়াঅ পরিদর্শন শেষে আমরা ফিরছিলাম। শহরটি তখনও জ্বলছিল, যা দেখে বোঝা যায় বেশ কিছু সময় আগে এতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ আমাদের জানাল, মুসলমান বাসিন্দারাই তাদের নিজেদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। আমরা উত্তর দিকে বেশ কিছুটা দূরে কমপক্ষে ধোঁয়ার তিনটি কুণ্ডলী দেখতে পাচ্ছিলাম। এ সময় থেমে থেমে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।’