Sunday, November 10, 2013

আজ-কাল-পরশু- দেশটা শুধু রাজনীতিবিদদের নয় by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

রাজনীতি কি একটি পেশা? আভিধানিক বা আক্ষরিক অর্থে রাজনীতি পেশা নয়। তবে বাংলাদেশে প্রধান কয়েকটি দলের নেতাদের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, ‘রাজনীতি’ করা তাঁদের পেশা।

সরকার কি সমঝোতার পথ ত্যাগ করল? বিএনপির নেতাদের আটক

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার করা হলো বিএনপির পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতাকে। ফলে, তাদের পূর্বঘোষিত হরতালের দৈর্ঘ্য আরও ১২ ঘণ্টা বেড়ে গেল।

দাহকালের কথা- প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, শুনুন... by মাহমুদুজ্জামান বাবু

গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস জন্মেছিলেন খ্রিষ্টের জন্মেরও ৪৯৫ বছর আগে এথেন্সের কাছাকাছি কলোনাস গ্রামে। পিতার নাম সফিলাস, যিনি যুদ্ধের বর্ম তৈরির কারিগর ছিলেন।

দিল্লির চিঠি- মোদিকে নিয়ে মাতামাতি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

মাস খানেক আগে এক নিবন্ধে নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক আচার-আচরণের মিল-অমিলের কিছুটা তুলনা চলে এসেছিল।

বিশেষ সাক্ষাৎকার : রাশেদ খান মেনন- হাসিনা সরলেও খালেদা নির্বাচনে আসবেন না

রাশেদ খান মেননের জন্ম ফরিদপুরে, ১৯৪৩ সালে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকা কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন।

প্রতি তিন ঘণ্টায় ভাঙছে একটি সংসার...: কেন মন ভাঙে? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর একজন প্রবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শামসুন্নাহারের (ছদ্মনাম)। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী চলে যান মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর কর্মস্থলে।

প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, শান্তি চাই: শেখ হাসিনা

বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়, শান্তি চান।

ফিলিপিন্সে সহস্রাধিক প্রাণহানি

স্থলে আঘাত হানা বিশ্বের স্মরণকালের সবচেয়ে প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড় হাইয়ানের আঘাতে ফিলিপিন্সে ১২০০ লোক মারা গেছে। যার মধ্যে দেশটির ট্যাকলোবান শহরে অন্তত ১,০০০ জন নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেডক্রসের বরাত দিয়ে বিবিসি’র এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়। সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড়টির আঘাতে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় এই শহরটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ফিলিপাইনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপ-মহাপরিচালক ক্যাপ্টেন জন অ্যান্ড্র–জের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর জানিয়েছে বিবিসি অনলাইন। প্রাণহীন দেহগুলো ট্যাকলোবানের রাস্তায় শায়িত ছিল বলে জানিয়েছেন অ্যান্ড্র–জ। শুক্রবার সকালে ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ৩৮৯ কিলোমিটার (২৩৫ মাইল) বেগে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ১৫ মিটার (৪৫ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসও উপকূলে আঘাত হানে,
পাশাপাশি ৪শ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বাতাসের এ প্রবল বেগে ট্যাকলোবান শহরের ভবনগুলো মারাÍক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাপক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। দুর্গত এলাকার বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার কালে ট্যাকলোবান শহরটি পানিতে ডুবে যায়। শহরটির বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিমানবন্দর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরটিতে পৌঁছতে ত্রাণ সংস্থাগুলোরে কর্মীদের রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। শুধু সামরিক বিমানযোগে শহরটিতে ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যান্ড্র–জ। দুর্গত এলাকা থেকে দ্রুত লোকজন সরিয়ে নেয়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রশংসা করেছে ফিলিপাইন সরকার। লোকজনকে দ্রুত সরিয়ে নেয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার তুলনায় মৃতের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা কয়েকদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হবে এবং অনেক বেশি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। হাইয়ানের কারণে ১ কোটি ২০ লাখ লোক সংকটজনক অবস্থায় আছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অক্টোবরে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে এলাকাটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই বিশ্বের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়লো অঞ্চলটি।

পিঠে বোঝা চোখে আশা

ভোগ-বিলাস, আনন্দ-অভিলাষের সুরায় হাবুডুবু পৃথিবী পানশালা সত্যিই রোমাঞ্চকর- নিত্য দিনের কামনা-বাসনা-সুখ-স্বপ্ন কোনটারই একরতি কমতি নেই যেন জলজ্যান্ত এক আনন্দনগর। ধনকুবের, বিত্তশালীদের কাছে বিরাট এ পৃথিবী সম্পর্কে এমন চাটু-উক্তি উপহাসের নয়। কিন্তু এর বাইরেও জীবন আছে। যাদের কাছে নিজের জন্মটা আজন্ম অভিশাপ তুল্য। অভাব-অনটনের পীড়ায় পীড়িত মানুষগুলোর কাছে পৃথিবীটা একটা নিরেট আঁস্তাবল। বেঁচে থাকার স্বপ্নীল বোঝা টানতে টানতে পিঠ কুঁজো হয়ে যায়। আর কতদিন .... আর কত ... ভাবতে ভাবতে শেষ চেতনাটুকুও বধির হয়ে যায় একসময়। এতকিছুর পরও দু’লোকমা অন্নের জোগাড় হলেই অচেনা আশার আলোয় চোখে জ্বালা ধরে যায়- বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে- এভাবেই বেঁচে থাকতে হয়! মরক্কোর সীমান্তবর্তী মানুষগুলো এখন এই দিন-গীতের বাউল- এ মতাদর্শেই চলছে তাদের বংশানুক্রমিক জীবিকা! মেলিলার বোঝাবহনকারী নারী হিসেবে তারা সুপরিচিত।
যদি তারা পণ্যসামগ্রী নিজেদের ঘাড়ে বহন করে নিয়ে যেতে পারেন তাহলে পণ্যগুলো মরক্কোতে শুল্কমুক্তভাবে ঢোকানো সম্ভব। স্পেন এবং মরক্কোর সীমান্তবর্তী একখণ্ড জায়গা হল মেলিলা। এটা উত্তর আফ্রিকায় পণ্যসামগ্রী প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্ত এলাকা। ভোর হতে না হতেই মেলিলাতে জমে যায় ব্যবসায়ীদের ভিড়। তাদের পণ্যতালিকার মধ্যে রয়েছে, ব্যবহৃত জামাকাপড়, সুতার বাণ্ডিল, টয়লেট সামগ্রী এবং বাসাবাড়ির ব্যবহারে প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র। এসব কিছুই সীমান্ত পেরিয়ে মরক্কোর বাজারে বিক্রি হয়ে থাকে। গাড়ির ইঞ্জিনের কানফাটা শব্দের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের উচ্চস্বরে বাক্য বিনিময়- সে রীতিমতো কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গাঁটবাঁধা পণ্যের বোঝা। প্রত্যেকটি বাক্স কার্ডবোর্ড, চট, কাপড় দিয়ে মোড়ানো এবং টেপ, দড়ি দিয়ে বাঁধা। আর বিশাল আকৃতির ওই সব বাক্সের ভারে অবনমিত অবস্থায় দেখা যায় মরক্কোর ওই বোঝাবহনকারী নারীদের। মেলিলা থেকে মরক্কো যেতে বারিও চিনো সীমান্তে প্রতিদিনই এ বাণিজ্য চলছে। মহিলারা এই বোঝা নিজে বহন করে নিয়ে গেলে এটা তাদের নিজের লাগেজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অবরুদ্ধ নগর ও চিন্তিত নগরবাসী by মোঃ মাহমুদুর রহমান

অসহনীয় অবস্থায় দেশের মানুষ। সরকার পক্ষ, বিরোধী পক্ষ ও সরাসরি কোনো পক্ষের সঙ্গে নয়- এমন সাধারণ মানুষ মিলেই প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে বাস করছি আমরা। তিনটি পক্ষই অসহনীয় অবস্থায়। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় সম্ভবত প্রশাসন ও পুলিশের সদস্যরা। ইদানীং রাস্তাঘাটে দেখা যায়, পুলিশের গাড়িতে বসে ঝিমুচ্ছে অনেকেই। দেখেই বোঝা যায়, একটানা ডিউটির ধকল আর সইছে না শরীরে। এ ছাড়া বিরোধী দলের কর্মসূচি নির্বিঘেœ পালনের সুযোগ দিলে সরকারের কাছে জবাবদিহিতা, আর বাধা দিলে আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে সব সময় পুলিশকে মাঠে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতায় যেতে হলে বিরোধী দলকে আন্দোলন তীব্র করতে হবে। ক্ষমতায় থাকতে হলে সরকারি দলকে আন্দোলন প্রতিহত করতে হবে। সাধারণ মানুষকে এ কর্মসূচি পালন ও প্রতিহতকরণের মধ্য দিয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক সব কর্মসূচি সহিংস হয়ে ওঠায় সত্যিকার অর্থেই মানুষ অস্বস্তিতে আছে। এ সমস্যা সমাধানের কোনো লক্ষণ ফুটে উঠছে না। তাই হতাশাও বাড়ছে দিন দিন।
বিরোধী দলের দাবি, জনগণের আন্দোলন কখনও বিফলে যায় না। তাই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে বাধ্য করতে আন্দোলন কঠোর থেকে কঠোরতর করতে হবে। সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে এসব কঠোর আন্দোলনের হুমকি মোকবেলার জন্য কঠোর মনোভাব পোষণ করে। উভয়পক্ষের কঠোরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় কঠিন ও কঠোর আন্দোলনে সাধারণ মানুষের জীবন থেঁতলে নরম হয়ে যায়। এ সরকারের মেয়াদে বিরোধী দলের আগের হরতালগুলোয় পিকেটিং করতে দেখা যেত না। মোটামুটি দায়সারা গোছের হরতাল করে রাজনৈতিক মাঠে থাকতেন তারা। এতে জনগণের খুব একটা সমস্যা হতো না। কিন্তু বিগত ২৭ অক্টোবর থেকে হরতালে যথেষ্ট পিকেটিং হচ্ছে। সঙ্গে ভয়ংকরভাবে যুক্ত হয়েছে ককটেল ও বোমার বিস্ফোরণ। ককটেল ও বোমা নতুন আতংক সৃষ্টি করেছে। আগে হরতালে রিকশায় অফিসে যেতে সমস্যা হতো না, ভয়ও করত না। কিন্তু বিগত তিনদিনের একটানা হরতালের সময় রিকশায় অফিসে যেতে কিছুটা ভীত ছিলাম মূলত ককটেল ও বোমার কারণে। রাস্তায় যখন মুখোমুখি হলাম জামায়াত-শিবিরকর্মীদের পিকেটিংয়ের, তখন তাদের বড় বড় চোখে তাকানো দেখে ভয় পেলাম, মনে হল কেউ কিছু জিজ্ঞেস না করে এখনই হয়তো ককটেল মারবে। ভাগ্য ভালো, যারা আমার রিকশার দিকে এগিয়ে এলো তাদের মধ্যে একজন আমাকে সালাম দিল, সাবেক শিক্ষক হিসেবে। এতে পুরো পরিস্থিতি আমার অনুকূলে চলে এলো। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর বিএনপি কর্মীদের পিকেটিংয়ে বাধ্য হয়ে রিকশা ছেড়ে দিতে হল। তারপর হেঁটে গন্তব্যের দিকে যাত্রা। এরকম অভিজ্ঞতা অনেকের আছে। সবাইকে ভীতি নিয়ে রাস্তায় বের হতে হচ্ছে এবং সামনেও বের হতে হবে। কারণ শহর, বন্দর, নগর সবই অবরুদ্ধ- সহিংসতায় পরিপূর্ণ। এরই মধ্যে চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রথম ইনিংসের হরতালে ২০টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। ২০টি পরিবারে শোকের মাতম চলছে। এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে। সরকার বলছে, বিরোধী দলের হরতালে প্রাণহানি হয়েছে, তাই বিরোধী দলকে দায়িত্ব নিতে হবে। বিরোধী দল বলছে, সরকার নিরপেক্ষ সরকারের বিধান সংবিধান থেকে বাতিল করায় এবং পুনঃসংযোজন না করার কারণে তারা বাধ্য হয়েছে হরতাল দিতে। আর হরতালে সরকারি দল ও পুলিশের সহিংসতায় প্রাণ গেছে, তাই দায়িত্ব তাদের। দায়-দায়িত্ব কার কতটুকু তা সঠিকভাবে নির্ণীত না হলেও কমবেশি সবার যে দায়িত্ব রয়েছে সে ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রতিপক্ষ দলের কর্মীদের মধ্যে এবং দায়িত্বরত পুলিশের সঙ্গে বিরোধী দলের সংঘর্ষ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এবার হরতালে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর হামলা। সরকার যেসব গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ মনে করে, তাদের ওপর আক্রমণ করে আইনি অস্ত্রের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে। ফলে এ মুহূর্তে সরকারবিরোধী কোনো কোনো সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচার বন্ধ রয়েছে। একজন সম্পাদকও জেলে বন্দি আছেন। অন্যদিকে যারা ক্ষমতায় নেই, হাতে আইন নামক অস্ত্র নেই- তারা হাতে তুলে নিয়েছে ককটেল ও বোমা। বোমার আঘাতে মিডিয়া ও মিডিয়া কর্মীরা আহত হয়েছেন- যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি অশুভ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারা কেউই ভিন্নমত সহ্য করতে পারেন না। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্যই ভিন্নমতের মধ্যে নিহিত। সবাই যার যার মত প্রকাশ করবে। মতের বিপরীতে মত আসবে, চিন্তার বিপরীতে চিন্তা। অবাধ ও অহিংস তর্কবিতর্ক হবে। আর মিডিয়ার মাধ্যমে এসব বিপরীতমুখী চিন্তা ও তর্কবিতর্ক জনগণ জানবে। যার যার পছন্দ অনুযায়ী যে কোনো চিন্তা গ্রহণ বা বর্জন করবে। রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে প্রগতির দিকে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
বর্তমানে প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য সীমিত। আমাদের চলাফেরার স্বাধীনতা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর মর্জির ওপর। অন্যদিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নির্ভর করে সরকারের সহিষ্ণুতা ও উদারতার ওপর। সরকারবিরোধী মত প্রকাশের জন্য পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ, টেলিভিশনের প্রচার নিষিদ্ধ হতে পারে। সঙ্গে রয়েছে সংশ্লিষ্টদের জেল-জুলুম ও হয়রানির মতো ঘটনা। সরকারের পক্ষে যেসব মিডিয়া রয়েছে এতদিন তারা নিরাপদ থাকলেও বোমা হামলার নামে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। সাংবাদিকরা এখন আর একমাত্র সরকার দ্বারা নিগৃহীত নয়, বিরোধী দলের আক্রোশেরও শিকার হয়ে বোমা ও ককটেলের আঘাতে আহত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি অবশ্যই নিন্দনীয়। বেশিরভাগ মানুষের চোখে এ অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী আমাদের নোংরা রাজনীতি, যা সমাজের প্রতিটি পেশা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার

প্রধানমন্ত্রী পদের সর্বাত্মক ক্ষমতা গণতন্ত্র বিকাশের অন্তরায় নয় কি? by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক ইতিহাসের ৪২ বছরে তিনবার রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সংবিধান প্রণয়ন অবধি রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা সরকার পরিচালিত হতো। এ সরকারটিকে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার বলা যায়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান প্রণয়ন করা হলে সে তারিখ থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী প্রবর্তন পর্যন্ত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকে। সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ পর্যন্ত সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রবর্তন অবধি অব্যাহত থাকে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী-পরবর্তী আবার যে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তা অদ্যাবধি অব্যাহত আছে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান এবং তার মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সরকারের কাছে দায়ী থাকে। অপরদিকে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারপ্রধান এবং কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তার জবাবদিহিতা না থাকলেও সংবিধান লংঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে তিনি অভিশংসনযোগ্য।
আমাদের রাষ্ট্রীয় ৪টি নীতির একটি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্র অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে দেশের শাসনকার্য পরিচালনা। ১৯৪৭ সালে ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও পরবর্তীকালে দেখা গেল দু’যুগেরও কম সময়ের ব্যবধানে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পুনঃবিভাজিত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটে।
আমাদের ৭২’র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৫(১), ৫৬(১), (২), (৩), (৪) ও (৫) এবং ৫৭ (৩), ৫৮(৪) ও (৫)-এর বিধানাবলীর সঙ্গে অনুচ্ছেদ নং ৭০-এর বিধানাবলী অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, দল ও সরকারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব যেন সুসংহত থাকে এবং একটি সরকারের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী বা পূর্ববর্তী নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তে আগের সরকারের আদলে তিনিই যেন সরকারপ্রধান থাকেন- সেসব বিষয় মাথায় রেখে সুকৌশলে সব বিষয়ের ওপর তার সর্বাত্মক ক্ষমতা প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ বিষয়টির ওপর স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হলে ৭২’র সংবিধানে উল্লিখিত অনুচ্ছেদগুলোয় কী ব্যক্ত করা হয়েছিল তা আলোচনা করা আবশ্যক।
৭২’র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৫(১)-এ বলা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করবেন, সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী নিয়ে এ মন্ত্রিসভা গঠিত হবে।
৭২’র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৬(১), (২), (৩), (৪) ও (৫)-এ পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা ছিল- ১. একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেরূপ নির্ধারণ করবেন, সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। ২. প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করবেন; তবে শর্ত থাকে যে, সংসদ সদস্য না হলে এ অনুচ্ছেদের (৪) দফা সাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি অনুরূপ নিয়োগ লাভের যোগ্য হবে না। ৩. যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। ৪. মন্ত্রী পদে নিযুক্ত হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য না থাকলে যদি তিনি অনুরূপ নিয়োগের তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হন, তাহলে তিনি মন্ত্রী থাকবেন না। ৫. সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এ অনুচ্ছেদের (২) বা (৩) দফার অধীন নিয়োগদানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত আগে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এ দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তারা সদস্যরূপে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হবে।
৭২’র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৭(৩)-এ বলা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকতে এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করবে না।
৭২’র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৫৮(৪) ও (৫)-এ বলা ছিল, (৪) প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা স্বীয় পদে বহাল না থাকলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হবেন; তবে এ পরিচ্ছেদের বিধানাবলী সাপেক্ষে তাদের উত্তরাধিকারীরা কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। (৫) এ অনুচ্ছেদে ‘মন্ত্রী’ বলতে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত।
সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাবিষয়ক অনুচ্ছেদ নং ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৫৮-তে বিবৃত বিষয়াবলী ক্ষমতার পালাবদলের কারণে একীভূত আকারে ৫৮নং অনুচ্ছেদে স্থান পায়। ৫৮নং অনুচ্ছেদটি ৭টি দফা সমন্বয়ে গঠিত ছিল এবং এ অনুচ্ছেদে পর্যায়ক্রমিকভাবে বলা ছিল- ১. রাষ্ট্রপতিকে তার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করার এবং পরামর্শদানের জন্য একটি মন্ত্রী পরিষদ থাকবে। ২. পরিষদ বা মন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দান করেছেন কি-না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না। ৩. রাষ্ট্রপতি তার বিবেচনায় সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে কিংবা সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একজন প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি যেরূপ আবশ্যক মনে করবেন সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগ করবেন; তবে শর্ত থাকে যে, কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পরিষদের সদস্য হবেন না। ৪. রাষ্ট্রপতি পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করবেন অথবা প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতিত্ব করতে নির্দেশ দিতে পারবেন। ৫. মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির সন্তোষানুযায়ী সময়সীমা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। ৬. রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে কোনো মন্ত্রী স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন। ৭. এ অনুচ্ছেদে ‘মন্ত্রী’ বলতে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত।
১৯৭৫ সালে দুঃখজনক ঘটনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে সামরিক শাসনের আবির্ভাব ঘটে এবং ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র আদেশ নং ওঠ দ্বারা মন্ত্রী পরিষদ সংক্রান্ত ৫৮নং অনুচ্ছেদটি প্রতিস্থাপনপূর্বক দফা (১) ও (৩) সংশোধন করে নতুনভাবে একটি দফা সংযোজন করা হয়।
পরবর্তীকালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংক্রান্ত ৭২’র সংবিধানের বিধান অক্ষুণœ রেখে অনুচ্ছেদ নং ৫৬ থেকে দফা (৪) অবলুপ্ত করায় একই অনুচ্ছেদের দফা (৫) এর স্থলাভিষিক্ত হয়।
৭২’র সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা ছিল, এ সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্যসব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হলে অনুচ্ছেদ নং ৪৮-এর দফা (৩)-এর বিধানটি অবলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীকালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে ৪৮নং অনুচ্ছেদের (৩) দফা সংশোধিত আকারে সন্নিবেশনের মাধ্যমে বলা হয়, এ সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্যসব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন; তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দান করেছেন কি-না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না।
৭২’র সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদে বলা ছিল, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি (ক) ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে, তবে তিনি সে কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না। অতঃপর ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭০নং অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনপূর্বক ব্যাখ্যা সংযোজন করে বলা হয়, যদি কোনো সংসদ সদস্য যে দল তাকে নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত করেছে, সে দলের নির্দেশ অমান্য করে (ক) সংসদে উপস্থিতি থেকে ভোটদানে বিরত থাকেন অথবা (খ) সংসদের কোনো বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তিনি ওই দলের বিপক্ষে ভোটদান করেছেন বলে গণ্য হবে। তাছাড়া মূল ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে ‘তবে তিনি সে কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না’ এ বাক্যটি অবলুপ্ত করা হয়। এরপর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হলে ৭০নং অনুচ্ছেদে (২) ও (৩)- এ দুটি দফা সংযোজন করা হয়, যদিও পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী ৭০নং অনুচ্ছেদ ৭২’র সংবিধান যেরূপে বর্ণিত ছিল সেরূপে প্রতিস্থাপিত হয়।
উপরোল্লিখিত ধারাগুলোর সংশোধন ও প্রতিস্থাপনের পর বর্তমানে সংবিধানের যে অবস্থান তা পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ, মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন, সরকারের সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদে পদায়ন প্রভৃতি কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতায় একক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়। ৭০ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীর কারণে কোনো সংসদ সদস্যের প্রধানমন্ত্রী ও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে সরকার ও দলীয়প্রধান হওয়ার কারণে দলের কোন সদস্যকে কী পদ দেয়া হবে, সংসদ নির্বাচনে কারা মনোনয়ন পাবেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে কারা নিয়োগ পাবেন, সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে কারা মন্ত্রিসভার অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং কারা সংসদে দলের চিফ হুইপ বা হুইপ নির্বাচিত হবেন- এসব বিষয় প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়ে থাকে।
সরকারের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাংবিধানিক এবং সামরিক-বেসামরিক সব উচ্চপদে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষায় নিয়োগ কার্য সমাধা করা হচ্ছে।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে এ সংক্রান্ত মামলাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আটজন অ্যামিকাস কিউরির (আদালতের বন্ধু) সাতজন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাছাড়া সুশীল সমাজের যারা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন, তাদের প্রায় শতভাগ এবং সংসদীয় কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষার কাছে অপর সবার অভিমত বা মতামত পরাভূত হয়েছে।
পৃথিবীর অপর সব সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও জ্যেষ্ঠদের পদায়ন করা হয়। কিন্তু একটি বিশেষ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব পদে এবং একটি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় যথাক্রমে দুই শতাধিকের কাছাকাছি এবং দুই শতাধিক সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে যথাযথ কারণ ছাড়া সার্বিক বিবেচনায় নিকৃষ্ট দু’জন কর্মকর্তাকে প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের নিয়োগের কারণে সুশাসন যে বিঘিœত হয় এবং বিভাগীয় শৃংখলা যে বিনষ্ট হয়, তা দেশবাসী এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। এ ধরনের হাজারও খারাপ নজির রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধের কলেবরের ব্যাপ্তি বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক হিসেবে শুধু দুটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা হল। এ দুটির সুবিধাভোগী দু’জন রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তাদের এ বেআইনি ও অবৈধ নিয়োগ দেশের সচেতন জনমানুষকে হতবাক ও বিস্মিত করেছে।
বর্তমান সরকারের সময় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে দলীয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে যে নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ঘটছে, তা অনুধাবন করার পরও পদ হারানোর ভয়ে দলের সবাই যেন এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অতিথি আপ্যায়নে ব্যয়ের কোনো নিয়মনীতি অনুসৃত না হওয়ায় আপ্যায়ন ব্যয়ভার ফি-বছর অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে। এ ব্যাপারেও যেন কথা বলার কেউ নেই।
প্রধানমন্ত্রী ও দলীয়প্রধান এক ব্যক্তি হলে যে কোনো সামরিক স্বৈরাচার বা একনায়ক থেকে অধিক স্বৈরাচার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সংবিধান এবং দল অনুসৃত বিধিবিধান সে সুযোগ করে দিয়েছে। সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী করা হলেও ক্ষমতার আধিক্যে তার একনায়ক হিসেবে আবির্ভাব অনিবার্য। আর তাই আমরা যদি প্রকৃতই গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকি এবং গণতান্ত্রিক শাসনের অনুশীলন চাই; তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান দ্বারা সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থায় সরকারের সর্বোচ্চ পদধারীর ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করা- যার মধ্যে নিহিত আছে গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুশাসন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

আশ্বিন গেল কার্তিক গেল এলো অগ্রহায়ণ- পেঁয়াজের ফুল তুমি ফুটবে কখন? by মোকাম্মেল হোসেন

প্রাতঃভ্রমণ শেষে বাসায় ফিরেছি। হঠাৎ কানে এলো-
: ধুরউ- ছাতার মাথা!
লবণ বেগমের গলা। বার বার তাড়ানোর পরও ত্যাদড় কোনো মাছি ঘুরেফিরে নাকের উপর বসলে, বজ্জাত কোনো মশা বিরামহীনভাবে পিঁ-পিঁ সুরে কানের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাইলে অথবা নাছোড়বান্দা মানবশিশু কোনো বায়না নিয়ে ক্রমাগত উঁ-উঁ সুরে ভেঁপু বাজালে মানুষ বিরক্ত হয়ে থাপ্পড় দিতে পারে। আবার শব্দের মাধ্যমেও বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে। কাজেই আমাকে বুঝতে হবে- ছাতার মাথা মানে হেড অব আমব্রেলা নয়। এটি একটি বিরক্তিসূচক শব্দ। সকালবেলাই কী যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়ে লবণ বেগম এ কথা উচ্চারণ করল, দেখার জন্য পাশের ঘরে গেলাম। দেখলাম- সে উপুড় হয়ে পুরনো পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করছে। নির্দিষ্ট কোনো তারিখের পত্রিকা খুঁজে না পেয়ে তার মুখে এ শব্দ উচ্চারিত হয়েছে ভেবে বললাম-
: কোন তারিখের পত্রিকা খুঁজতেছ- আমারে বল, আমি বাইর কইরা দিতেছি।
লবণ বেগম সরু চোখে আমার দিকে তাকাল। বলল-
: তারিখ ধইরা পত্রিকা খুঁজতেছি, এই কথা তোমারে কে বলল?
- তাইলে কী বিষয়ে বিরক্ত হইছ?
: তোমার সংসারে বিরক্ত হওয়ার মতো বিষয়ের অভাব নাই। কয়টার কথা বলব?
- প্রেজেন্ট মোমেন্টে কী লইয়া বিরক্ত হইছ- সেইটা বল।
লবণ বেগম কথা বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করতেই খাবার টেবিল থেকে কলরব ভেসে এলো।
চ্যানেল পাল্টিয়ে ওখান থেকেই ধমকের সুরে লবণ বেগম বলল-
: আবার কী হইল?
উত্তর দিল বড়জন। সে চেঁচিয়ে বলল-
: আম্মু, শাফিন ডিম রাইখ্যা দিছে!
- কেন, রাইখ্যা দিছে কেন?
সাক্ষীর বদলে এবার আসামি নিজে কাঠগড়ায় দাঁড়াল। আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলল-
: আম্মু, ডিম কি রসুন দিয়া ভাজছ?
- হ।
: কেন?
শাফিন মেজোজনের নাম। মেজো ছেলের কথা শুনে লবণ বেগম তেরছা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল-
: যাও। ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিয়া আস।
এর উত্তর একটাই। বাসায় পেঁয়াজ নেই। এজন্য ডিমে রসুন ব্যবহার করা হয়েছে। তারপরও জিজ্ঞেস করলাম-
: আব্বাজান, কী হইছে?
এই জেনারেশনের বাচ্চাকাচ্চারা মনে হয় রিপিটেশন পছন্দ করে না। শাফিন কপাল কুঁচকে বলল-
: কী হইছে- তুমি জান না?
- জানি।
: তাইলে প্রশ্ন করতেছ কী জন্য?
- প্রশ্ন করতেছি, বিষয়টা আরও ভালোভাবে বুঝবার জন্য। বল, সমস্যা কী?
: রসুন দিয়া ভাজা ডিম আমি খাই না।
- একদিন খাইলে কোনো অসুবিধা নাই।
: অসুবিধা আছে।
- অসুবিধার কিছু নাই রে বেটা! পেঁয়াজ-রসুন দুইটাই মসলাজাতীয় খাদ্য। আমরা কলের পানি খাই, আবার ডাবের পানিও খাই, তাই না! রসুনে বরং পেঁয়াজের চাইতে বেশি গুণ।
: তোমার লেকচার থামাবা? আমি এই ডিম খাব না, ব্যস।
- ঠিক আছে। এইটা আমার জন্য রাইখ্যা দেও। আমি দোকান থেইক্যা পেঁয়াজ আনতেছি। তোমারে নতুন কইরা ডিম ভাইজ্যা দেওয়া হবে।
ডাইনিং রুম থেকে লবণ বেগমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বললাম-
: শাফিনের সমস্যার সমাধান পাঁচ মিনিটের মধ্যে হইয়া যাবে। পত্রিকা লইয়া কী সমস্যা হইছে- বল।
- একটা নারকেল কুড়াব। কুড়ানির নিচে রাখার জন্য পত্রিকা নিতে আইসা মেজাজ খারাপ।
: কেন?
- আরে! যে পত্রিকাই হাতে লই- খুন-হত্যা, মারামারি-কাটাকাটি ছাড়া আর কোনো সংবাদ নাই। সকালবেলাই এইসব সামনে লইয়া বসতে কার ভালো লাগে!
: ভেতর থেইক্যা একটা পাতা নাও।
- সবখানেই এক অবস্থা।
এ সময় দরজার নিচ দিয়ে হকার পুছ করে পত্রিকা দিয়ে গেল। প্রথম পৃষ্ঠায় বিরাট সুসংবাদ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সফরকারী নিউজিল্যান্ড দলকে হারিয়ে সিরিজ জিতেছে। এটাকে বাংলাওয়াশ নাম দিয়ে পত্রিকায় বিরাট করে খবর ছাপা হয়েছে। লবণ বেগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম-
: এইটা নাও। এইটার মধ্যে অনেক বড় সুসংবাদ আছে।
- কী সুসংবাদ?
: বাঘা ধোলাইয়ে নিউজিল্যান্ড ছেড়াবেড়া হইয়া গেছে।
লবণ বেগম পত্রিকা হাতে নিল। কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখার পর বলল-
: এক খেলায় বাঘ হইয়া লাভ কী? পরের খেলায়ই দেখা যাবে বিড়ালের মতো মিউ-মিউ করতেছে!
কথাটা খেলা সম্পর্কিত হলেও আমি লবণ বেগমের কথার অন্য একটা অর্থ খুঁজে পেলাম। ১৯৭১ সালে এই জাতি বাঘের মতো গর্জে উঠেছিল। এরপর এতদিন ধরে এই যে এত অনিয়ম-অনাচার চলছে- সেই বাঘের গর্জন আর শোনা যাচ্ছে না। জাতি শুধু বিড়ালের মতো মিউ মিউ করছে। পেঁয়াজ কেনার জন্য দোকানে যাচ্ছি- রাস্তায় আতর আলীর সঙ্গে দেখা। কুশলাদি বিনিময় শেষে আতর আলী জিজ্ঞেস করল-
: কই রওনা হইলেন?
- দোকানে যামু। আপনে কই যাইতেছেন?
: সূচনা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে।
- ওইখানে কেন?
: খবর পাইলাম- ওইখানে নাকি টিসিবি পেঁয়াজ বিক্রি করবে। ৬৫ টাকা কেজি। ভাবলাম-সুযোগটা গ্রহণ করি।
আতর আলীর কথা শুনে বললাম-
: আরে! আমিও তো পেঁয়াজের কেইস লইয়াই দৌড়াইতেছি। চলেন যাই।
আতর আলীর সঙ্গে সূচনা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে গিয়ে দেখলাম অনেক মানুষের ভিড়। শুনলাম- মাথাপিছু দুই কেজি করে পেঁয়াজ দেয়া হবে। ৩০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ১২০ টাকা হওয়ার পর অগ্রহায়ণ মাসে বাজারে নতুন পেঁয়াজ উঠলে দাম কমবে- এই আশায় আধা কেজি করে পেঁয়াজ কিনে দিন পাড়ি দিচ্ছি। সেই পেঁয়াজ একসঙ্গে দুই কেজি হাতে নিতে পারব ভেবে মনটা খুশিতে নেচে উঠল। লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর ট্রাকের কোনো নিশানা না দেখে হতাশ হয়ে আতর আলীকে বললাম-
: সঠিক খবর পাইছেন তো!
- খবর সঠিক এই ব্যাপারে আপনে নিশ্চিত থাকেন। খবর সঠিক না হইলে এত লোক এইখানে জড়ো হইত?
সময় যত গড়াচ্ছে, মানুষের লাইন তত লম্বা হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম-
: এর আগে কলসি হাতে লাইনে দাঁড়াইয়া ওয়াসার পানি সংগ্রহ করছি। এখন পেঁয়াজের জন্য লাইন দিছি। পেঁয়াজও যে লাইনে দাঁড়াইয়া সংগ্রহ করতে হবে- কোনো দিন ভাবি নাই।
আতর আলী আমার কথা শুনে হাসল। বলল-
: লাইনে দাঁড়াইয়া ভোট দিয়া দেশ পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচন করছেন তো! ধইরা নেন- এইটা তার প্রতিদান পাইতেছেন!
ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর ভেতরে অস্বস্তি শুরু হল। অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমাকে উশখুশ করতে দেখে আতর আলী বলল-
: ভাই, প্রত্যেক বিষয়ের নেগেটিভ-পজেটিভ দুইটা দিকই আছে। পেঁয়াজের দাম বাইড়া একদিকে লাভ হইছে!
- কী রকম!
: কৃষি মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিছে- সারা বছর চাষ করা যায়, এমন জাতের পেঁয়াজ তারা উদ্ভাবন করবে। বারমাইস্যা জাত উদ্ভাবন হইলে শুধু অগ্রহায়ণ মাস না, সারা বছরই পেঁয়াজের ফুল ফুটবে। তখন পেঁয়াজ আমদানির জন্য ইন্ডিয়ার দরকার লাগব না। আর ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গঠন কইরা দামও বাড়াইতে পারবে না।
একে বলে গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। বিষণ্ন কণ্ঠে বললাম-
: ভাই রে! ঘোষণা দিতে তো কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা হইল তার রেজাল্ট লইয়া। এর অগে দোয়েল ল্যাপটপ লইয়া কী ঘোষণা দেওয়া হইছিল, মনে আছে আপনার? বলা হইছিল- ঘরে ঘরে প্রত্যেকের হাতে হাতে দোয়েল নামের ল্যাপটপ শোভা পাবে। সেই দোয়েল বর্তমানে ঠ্যাং-পাখা ভাইঙ্গা চিৎ হইয়া পইড়া রইছে।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বিফল মনোরথ হয়ে দোকান থেকে আধা কেজি পেঁয়াজ কিনে বাসায় ঢুকলাম। নাস্তার পাট চুকিয়ে ছেলেরা অনেক আগেই স্কুলে চলে গেছে। লবণ বেগম পেঁয়াজের পোটলার দিকে তাকিয়ে বলল-
: তুমি দোকানে পেঁয়াজ কিনতে গেছিলা, না গরুরহাটে গরু কিনতে গেছিলা?
সরাসরি এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লবণ বেগমকে একটা পয়ার শোনালাম। বললাম-
: আশায় হারাইলাম বাড়ি- বুদ্ধে হারাইলাম দাড়ি।
অবশেষে যেইখানের খাম সেইখানেই গাড়ি॥
বুঝতে না পেরে লবণ বেগম বলল-
: এর মানে কী?
- মানে বোঝাইতে গেলে তো অনেক কথা বলতে হয়। সংক্ষেপে বলতেছি- শোন। এক লোক সুন্দরী এক মহিলার প্রেমে পড়ার পর বিবাহের প্রস্তাব দিলে মহিলা বলল-
: বিবাহ করতে কোনো সমস্যা নাই। তবে আমার কিছু শর্ত আছে।
- কী শর্ত?
: তোমার পুরাতন টিনের বাড়িতে আমি থাকবার পারমু না। আমার জন্য দালান তুলন লাগব। তুমি আজকাই তোমার ভাঙাচোরা বাড়ি আগুন দিয়া জ্বালাইয়া দেও।
আগুন দিয়ে বাড়ি পোড়ানোর পর প্রেমিক পুরুষ সেই মহিলার কাছে যেতেই সে বলল-
: এইবার আরেকটা কাজ করন লাগব।
- কী কাজ?
: তোমার মুখের এই দাড়ি-গোঁফ আমার না-পছন্দ। এইগুলা কামাইয়া পরিষ্কার হইয়া আস।
পয়-পরিষ্কার হওয়ার পর লোকটা মহিলার কাছে গিয়ে বলল-
: তোমার কথামতো কাজ করছি। কবে বিয়া করবা কও?
এ কথা শুনে মহিলা বলল-
: তুমি কি পাগল হইছ- আমি তোমারে বিয়া করমু!
- বিয়ার কথা তো তুমিই বলছিলা!
: বলছিলাম- কিন্তু যে লোক অন্যের কথায় নিজের ঘরে আগুন দেয়, মুখের সুন্দর দাড়ি-গোঁফ চাঁইছ্যা ফেলে- সে যে অন্যের কথায় দুই দিন পরে আমারে খুন করবে না, তার গ্যারান্টি কী?
ব্যর্থ প্রেমিক কী আর করবে! পুড়ে যাওয়া টিন ও কাঠ দিয়ে ঘর মেরামত করতে গিয়া মনের দুঃখে উপরের ওই কথাগুলি বলতেছিল। আমার ঘটনাও অনেকটা একই রকম। সস্তায় দুই কেজি পেঁয়াজ পাওয়ার আশায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দঁড়ায়াছিলাম। পেঁয়াজ তো জুটলই না- অফিসেরও দেরি হইয়া গেল। শেষমেশ দোকান থেইক্যা আধা কেজি পেঁয়াজ কিইন্যা বাসায় আসতে হইল।
আমার দুরবস্থার কথা শুনে লবণ বেগম বলল-
: বাস্তবিকপক্ষেই তুমি যে একটা বোকা লোক- এইটা উপলব্ধি করতে পারছ শুইন্যা খুশি হইলাম।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

সিইসি আজিজ হবেন, না টিএন সেশন?

নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অনেক কথা বলছেন। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন। বিদেশিরা উপদেশ দান করছেন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও সজাগ থাকার কথা, সেই নির্বাচন কমিশনকে মনে হচ্ছে বোবায় পেয়েছে। কমিশনাররা নির্বাচন নিয়ে খুব একটা কথাবার্তা বলেন না। বললেও একজনের কথার সঙ্গে আরেকজনের কথার মিল পাওয়া যায় না। এ বেমিল নির্বাচন কমিশন দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কি না, সে ব্যাপারে আমরা সন্দেহমুক্ত নই। নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে মানুষের মধ্যে যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা, শঙ্কা ও ভয় বিরাজ করছে, তা উপশমের দায়িত্ব কার? অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের। রাজনীতিকদের ঝগড়াবিবাদ মিটুক আর না-ই বা মিটুক, নির্বাচনটি করতে হবে ইসিকেই। কিন্তু সেই প্রস্তুতি, আয়োজন ও সামর্থ্য আছে বলে জনগণের এখনো তারা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেনি। নির্বাচন কারও দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রশ্ন হলো, সেই দায়িত্বটুকু পালনের মানসিকতা নির্বাচন কমিশনের আছে কি না? নাকি তারা যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন করেই দায় সারতে চায়?
দুই অতীতে বাংলাদেশের নির্বাচনগুলো যেমন রক্তাক্ত অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে, তেমনি বিভিন্ন আমলের নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনও নিজেদের বিতর্কিত করেছে, স্বীয় আচরণ ও বক্তব্য বিবৃতির মধ্যে দিয়ে। গত ৪৪ বছরে আমরা যে ১২টি নির্বাচন কমিশন পেয়েছি, তাদের মধ্যে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার টিএন সেশনের মতো কেউ জোর গলায় বলতে পারেননি, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি নন, আমার কথাই চূড়ান্ত। রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়ে যতই বদনাম কুড়ান না কেন, ১৯৭০ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের একমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কৃতিত্ব বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে দিতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মুহাম্মদ ইদ্রিস ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সেই সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে পারেননি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও প্রার্থী অপহরণের মহড়ার শুরু তখন থেকেই। পরবর্তী সময়ে যাঁরা সিইসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিচারপতি নূরুল ইসলাম, বিচারপতি এ টি এম মাসুদ সামরিক শাসকের বরকন্দাজ হিসেবে কাজ করেছেন, ১০ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে হাজির না হলেও তাঁরা ৯০ শতাংশ ভোট সামরিক শাসককে পাইয়ে দিয়েছেন তথাকথিত গণভোটে। এরশাদ আমলে বিচারপতি নূরুল ইসলামের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ আপত্তি জানালে বিচারপতি এ টি এম মাসুদকে নতুন সিইসি পদে বসানো হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই মাসুদ ১৯৮৬ সালের ‘মিডিয়া ক্যুর’ নির্বাচনটি সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিচারপতি নূরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন। এরপর যথাক্রমে সিইসির দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, বিচারপতি আবদুর রউফ, বিচারপতি সাদেক, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ, বিচারপতি এম এ আজিজ, এ টি এম শামসুল হুদা। এঁদের মধ্যে কাউকেই পরাজিত দল সহজভাবে মেনে নেয়নি। আবার সিইসিদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক বিশ্বাস বা ভবিষ্যৎ সুবিধার কথা ভেবে বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেছেন, এ রকম নজিরও আছে। বিচারপতি এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিজেকে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করেছে এক কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার বানিয়ে। শেষ পর্যন্ত এম এ আজিজ কোনো নির্বাচনই করতে পারেননি। বিচারপতি সাদেক ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন করে জনগণের ধিক্কার কুড়িয়েছেন। এ পর্যন্ত আমরা যতজন সিইসি পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে তুলনামূলক সাহসী ভূমিকা রেখেছেন কোনো বিচারপতি নন, দুজন আমলা—মোহাম্মদ আবু হেনা ও এ টি এম শামসুল হুদা। নানা সীমাবদ্ধতার পর তাঁরা যথাক্রমে দুটি ভালো নির্বাচন জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে। কিন্তু সেই দুটি নির্বাচনে যাঁরা পরাজিত হন, তাঁরা ফল মেনে নেননি। নিজেদের ব্যর্থতার দায় চাপিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের ওপর।
তিন পরাজিত দলের নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ও বৈরিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি রাজনৈতিক অনাস্থা ও অসহিষ্ণুতার বীজ হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই নিজেদের বিরোধী দলে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এ সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণ হচ্ছে, ‘তাঁরা (বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা) নির্বাচনকে নিয়েছেন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবেশদ্বার হিসেবে এবং বৈধ-অবৈধ যেকোনো উপায়ে তাঁদের জয়ী হতেই হবে। যদি তাঁরা জয়ী হন, তাহলে সবকিছু ঠিক আছে। আর যদি জয়ী না হন, তখন তাঁরা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আবিষ্কার করতে থাকেন, যেন গোটা বিশ্বই তাঁদের পরাজিত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এর পরই তাঁরা নির্বাচনে কারচুপি অথবা ভোট ডাকাতির অভিযোগ আনতে শুরু করেন। (সূত্র: ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ, জালাল ফিরোজ, বাংলা একাডেমি, ২০১২) ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির প্রতিক্রিয়া দেখলে সেই ষড়যন্ত্রতত্ত্বই জোরদার হয়। আমি জিতলে সবই ঠিক আছে। আর না জিতলে দেশ, গণতন্ত্র, নির্বাচন কিছুই ঠিক নেই। এখন প্রশ্ন, বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ কী করবেন? তিনি কি পারবেন তাঁর পূর্বসূরি এ টি এম শামসুল হুদার মতো সব বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে? না, তিনি বিচারপতি সাদেকের মতো একতরফা না হলেও একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পথেই হাঁটবেন? নির্বাচনটি যেহেতু শতভাগ রাজনৈতিক বিষয়, সেহেতু রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে কমিশনের কোনো ভূমিকা থাকবে না এ কথা আমরা মানতে নারাজ। একটি বিতর্কিত নির্বাচন করার চেয়ে নির্বাচন না করা অনেক ভালো। সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় তাঁকে নিতে হলেও, একতরফা নির্বাচনের গ্লানি বইতে হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত এমন কোনো কাজ করেনি, যাতে তাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়; আবার এমন কোনো পদক্ষেপ নিতেও পারেনি, যাতে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর মানুষের আস্থা বাড়ে। তারা দাঁড়িয়ে আছে আশা-নিরাশা, আস্থা-অনাস্থার ঠিক মাঝখানে। বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যতই বিষোদ্গার করুক না কেন, পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সুফল তারাই ভোগ করছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে তারা যে জিহাদি মনোভাব দেখাচ্ছে, সেটিও সম্ভব হয়েছে ওই বিজয়ের ফলে। কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ সিইসির দায়িত্ব নিয়েছেন গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে তাঁর কার্যকাল এক বছর আট মাস। এই সময়েও তিনি কমিশনের কাজকর্মে যেমন শৃঙ্খলা আনতে পারেননি, তেমনি জনগণের আস্থা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছেন। বিগত তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন নিজেদের কর্মকাণ্ডে বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেমন সমন্বয় তৈরি করেছিল, বর্তমান কমিশনে তার প্রচণ্ড অভাব লক্ষ করা গেছে। পাঁচ সদস্যের কমিশন একেক সময় একেক কথা বলে, কারও কারও বক্তব্যে বিচারপতি এ আজিজের ছায়াও লক্ষ করা যায়। কিন্তু মৃদুভাষী রকিব উদ্দীন আহমেদ তাঁদের ভর্ৎসনা কিংবা বাচালতা বন্ধ করতে পারেননি। তিনি মুখস্থ বলে চলেছেন যে, নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত। কার্যক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতি তেমনটি দেখা যাচ্ছে না।
চার নির্বাচনের অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো, জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণবিধি। প্রথমটি করার দায়িত্ব সরকারের হলেও নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার নেই, সে কথা বলা যাবে না। কেননা নির্বাচনটি তো তারাই করবে। যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হয় কিংবা নির্বাচনী সততা বিচ্যুতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে ইসিকে অবশ্যই হস্তক্ষেপ করতে হবে। কিন্তু সিইসি এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে দায় এড়াতে চাইছেন। ক্ষমতাসীন দলটি ইতিমধ্যে ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন সংশোধন করে প্রার্থী হতে তিন বছর দলে প্রাথমিক সদস্য থাকার যে বিধান জারি ছিল, সেটি তুলে দিয়েছে। এটি যে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তাকে মাথায় রেখে করা হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের ধারণা, বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের অনেক নেতা-কর্মী সুড়সুড় করে আওয়ামী লীগে বা অন্য কোনো দলে নাম লিখিয়ে নির্বাচন করবেন। প্রথমত, এই সিদ্ধান্ত চরম সুবিধাবাদিতা। দ্বিতীয়ত, এটি তাঁদের জন্যও বুমেরাং হতে পারে। যদি শেষ মুহূর্তে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং তাদের জয়ের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতাদেরও বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়া অসম্ভব নয়। আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে আদর্শের চেয়েও সুবিধাবাদিতাই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নির্বাচন কমিশন খসড়া যে আচরণবিধি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে, তাতে, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলতে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সরকারের মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা, বিরোধী দলের উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী, তাঁদের মর্যাদাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি, সংসদ সদস্যদের বোঝানো হয়েছে। আগের আচরণবিধিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের বিষয়টির উল্লেখ ছিল না, কেননা সেই নির্বাচন হতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তখন সব মন্ত্রী-সাংসদই সাবেক হয়ে যেতেন। এখন মন্ত্রী পদে থেকেও কেউ কেউ নির্বাচন করবেন। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি ৩ক(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনপূর্ব সময়ে প্রকল্প অনুমোদন ও ফলক উন্মোচন ইত্যাদি নিষিদ্ধ। (১) নির্বাচনপূর্ব সময়ে কোনো সরকারি-আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলভুক্ত কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণা বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কিংবা ফলক উন্মোচন করা যাইবে না।’ উপবিধি (২)-এ বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনপূর্ব সময়ে কোনো সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বেচ্ছাধীন সরকারি-আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তহবিল হইতে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো প্রকার অনুদান ঘোষণা বা বরাদ্দ প্রদান বা অর্থ অবমুক্ত করিতে পারিবেন না।’ এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচনপূর্ব সময় বলতে ইসি কী বোঝাতে চাইছেন? সংবিধানে বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে। সেই হিসাবে ২৭ অক্টোবর থেকেই ৯০ দিনের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে। আর প্রধানমন্ত্রী সমানে বিভিন্ন স্থানে প্রকল্প উদ্বোধন করে চলেছেন। আচরণবিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাহার সরকারি কার্যসূচির সঙ্গে নির্বাচন কর্মসূচি যোগ করিতে পারিবেন না।’ অথচ মন্ত্রীরা একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প উদ্বেধন করছেন এবং দলীয় সভায় নির্বাচনী প্রচারণাও চালাচ্ছেন। আচরণবিধিমতে, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাহাদের নিজেদের বা অন্যদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি যান, সরকারি প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার বা অন্যবিধ সরকারি সুবিধাভোগ করিতে পারিবেন না এবং এতদুদ্দেশ্যে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্যবহার করিতে পারিবেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা তো সরকারি সুবিধা নিয়েই এসব জায়গায় যাচ্ছেন এবং দলীয় সভা করে নৌকায় ভোট চাইছেন। আমাদের বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার কথা বললেও পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। তাদের মনে ভয়, যদি বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে আসে। এ কারণেই আগাম নির্বাচনী প্রচারণা। ক্ষমতাসীন দলকে এ সুবিধা কেন দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন? এটি কি ইসির লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নমুনা?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

টকটাইম দিয়ে কেনাকাটা ও মুদ্রাস্ফীতি

টকটাইম দিয়ে কেনাকাটা
সম্প্রতি টকটাইম দিয়ে বাজার থেকে দ্রব্যাদিসহ বিভিন্ন মিউজিক ও সফটওয়্যার যেমন—মোবাইল অ্যাপস ক্রয় করার অনুমতি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি নিয়ে বিটিআরসি টকটাইম দিয়ে ৫০ টাকা পর্যন্ত কেনাকাটার অনুমতিও দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকারের মতে, টকটাইম দিয়ে দ্রব্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করতে দিলে দেশে একটি নতুন মুদ্রার আবির্ভাব ঘটবে। ফলে দেশে দুটি সমান্তরাল মুদ্রার প্রচলন ঘটবে, যার একটি হলো টাকা এবং অন্যটি হলো টকটাইম।
টাকার মুদ্রণ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে টকটাইম নামক মুদ্রা তৈরি করার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকবে মোবাইল কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। মোবাইল কোম্পানি সাধারণত এক টাকার বিনিময়ে এক টাকার টকটাইম তৈরি করে থাকে। তবে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী তারা কখনো কখনো এক টাকার পরিবর্তে দুই টাকার টকটাইমও দিয়ে থাকে (বোনাসসহ)। তেমনিভাবে কোনো টাকা না নিয়েও মোবাইল কোম্পানি কোনো একটি মোবাইলের বিপরীতে লাখো টাকার টকটাইম ভরে দিতে পারে। অর্থাৎ বাজারে টকটাইম নামের মুদ্রার প্রবেশ দেশের বা সরকারের বা মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করবে না। অন্য কথায়, দেশের জিডিপি বা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে মুদ্রা তৈরির কোনো মিল থাকবে না। তাতে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দেবে। আর টকটাইমের বিপরীতে কোনো টাকা না থাকায় বিনা মূল্যে দ্রব্যাদি ক্রয় করা যাবে। যেমন ধরা যাক, একটি মোবাইল কোম্পানি তার কর্মকর্তাদের বেতন টকটাইম হিসেবে প্রদান করল। তাতে কোম্পানির কোনো খরচ নেই, কিন্তু কর্মকর্তারা ওই টকটাইম দিয়ে বাজার থেকে বিভিন্ন সেবা ও দ্রব্যাদি ক্রয় করতে পারবেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা ওই মোবাইল কোম্পানির রিটেইলারদের কাছ থেকে টকটাইমের বিনিময়ে নগদ টাকাও নিতে পারবেন। এতে করে মার্কেটে নতুন টাকা প্রবেশে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক জিডিপি ও মুদ্রাস্ফীতির হার ও বার্ষিক মুদ্রা পোড়ানোর মূল্যের ভিত্তিতে প্রতিবছর নতুন মুদ্রা ছাপিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সেই মুদ্রা থেকে একটি টাকাও সরাসরি বাজারে ছাড়তে পারে না।
অতিরিক্ত মুদ্রাবাজারে প্রবেশের উপায় হলো দুটি। এক. রপ্তানি, এইড বা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে আসা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে সমমূল্যের টাকা প্রাপকের মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করা। দুই. বিভিন্ন বন্ড, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদির বিনিময়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি নগদ টাকা গ্রহণ করে তা উন্নয়ন কর্মসূচি বা অন্যান্য খরচের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করে। কিন্তু টকটাইম তৈরির মাধ্যমে মোবাইল কোম্পানিসমূহ বাজারে সরাসরি মুদ্রার প্রবেশ ঘটাতে পারবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, যেকোনো ই-মানি সার্ভিসের ক্ষেত্রে সার্ভিস প্রদানকারী সংস্থাকে সব সময় সমমূল্যের টাকা ব্যাংকে রাখতে হয়। যেমন: মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস গাইডলাইনে বলা আছে, সব মোবাইল ওয়ালেটের মধ্যে যে পরিমাণ ই-মানি থাকবে, কোর ব্যাংকিংয়ের ব্যালান্সশিটে তথা ব্যাংকের ভল্টে ওই পরিমাণ টাকা থাকতে হবে। কিন্তু টকটাইমের বিপরীতে সমপরিমাণ নগদ টাকা ব্যাংকে রাখা সম্ভব নয়।
কারণ, টকটাইম শুধু কেনাকাটা নয়, কথা বলতেও ব্যবহার করা হয়। টকটাইম দিয়ে ৫০ টাকা পর্যন্ত কেনাকাটার যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাতে হয়তো দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনুভূত হবে না, কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এর পরিমাণ বাড়ানো হলে দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ঠেকানো যাবে না। টকটাইম দিয়ে কেনাকাটা করার অনুমতি পৃথিবীর কোনো দেশে আছে কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু ভিন্ন ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট তৈরি করে, গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়ে ও ব্যাংকে ওই পরিমাণ টাকা সংরক্ষণ সাপেক্ষে, ওই ওয়ালেটে সমপরিমাণ ই-মানি সরবরাহ করে ওই ই-মানি দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কেনাকাটা করার রেওয়াজ আমাদের দেশেও প্রচলিত রয়েছে। গ্রামীণফোনের মোবিক্যাশ এমনই একটি সার্ভিস। তবে এই পদ্ধতিতেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। যেমন: মোবাইল কোম্পানিগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নেই, ফলে সার্ভিসটি যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা কোনোভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে পারবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে মোবাইল কোম্পানিগুলো অডিট করার কোনো সুযোগ নেই।
আবুল কাশেম মো. শিরীন: ডিএমডি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।

জবরদস্তির পরিবহন ধর্মঘট

বিরোধী দলের হরতাল শেষ হতে না-হতেই ঢাকাবাসী উপহার পেলেন সরকার-সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের পরিবহন ধর্মঘট। সবাই যদি দাবি আদায়ে জনগণকে একইভাবে কষ্ট দেয়, তাহলে দায়িত্বশীলতা আর জোরজুলুমের মধ্যে পার্থক্য কী থাকল? সরকারে থেকে যাঁরা বিরোধী দলের হরতালের বিরোধিতা করেন, তাঁরাই আবার কীভাবে ধর্মঘট ডেকে একই আচরণ করেন? এই স্ববিরোধিতার কারণেই তো বাংলাদেশে কোনো নিয়ম, মূল্যবোধ, নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। সরকার-সমর্থিত পরিবহন মালিক সমিতি নেতা খায়রুল আলম মোল্লা দুষ্কৃতকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। তিনি যাত্রাবাড়ী-ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সায়েদাবাদ আন্তজেলা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। নিহতের পরিবারের ভাষ্যমতে, সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনালের টোল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পরপরই তাঁর সংগঠন তথা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালসহ সারা ঢাকায় পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। অবশ্য পরে গতকাল দুপুর ১২টার পর ধর্মঘট প্রত্যাহারও করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আইন-আদালত থাকতে কেন হত্যার প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকতে হবে?
এমন নয় যে, হত্যার বিরুদ্ধে মামলা করা যাচ্ছে না। অথবা মামলা হয়েছে কিন্তু পুলিশ তদন্ত করছে না; এমনও নয় ঘটনাটি। অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি দলের নেতার হত্যার বেলায় পুলিশের গাফিলতির সুযোগ কম, যদি না হত্যাকারীরা একই দলের আরও ঊর্ধ্বতন কেউ হন। এ ক্ষেত্রে তেমন আলামতও দেখা যায়নি। তাহলে একটি খুনের দায়ে ঢাকার জনগণকে শাস্তি দেওয়া কেন? এর সঙ্গে ঢাকার মধ্যে এবং ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে চলাচলকারী যাত্রীদের কী সম্পর্ক? এভাবে যুক্তিহীনভাবে, স্বীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে দাপট দেখানোর কারণেই দেশটা দিন দিন রসাতলে ধাবিত হচ্ছে। এ ধরনের আচরণ করে কীভাবে জনগণকে বড় বড় নীতিকথা শোনানো যায়? বাংলাদেশে যাঁদের হাতেই সংগঠন রয়েছে, যাঁরা কিছু না কিছু প্রভাব বা ক্ষমতা রাখেন, তাঁরা মনে হয় তাঁদের সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সময় সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করেন না। অনেক সময় যে দল তাঁরা করেন, সেই দলের অবস্থানও তাঁদের কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয় না।
একেই বলে ক্ষমতার নৈরাজ্যকর ব্যবহার। এতে যে সব সময় তাঁদের লাভ হয় তা নয়। ক্ষমতার স্বভাবই হলো তা কারও না কারও ওপর প্রযুক্ত হতে চায়। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরীহ ও প্রতিরোধহীন মানুষের ওপরই তা চেপে বসে। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে এ বাস্তবতাই দেখা গেল। যদি জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হরতাল বা ধর্মঘটের অগণতান্ত্রিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিষেধকও তৈরি হতো। দুঃখের বিষয়, সরকার বা বিরোধী দল কিংবা তাদের প্রভাবিত কোনো সংগঠনই এসব বিবেচনার তোয়াক্কা করে না। আক্ষেপের সঙ্গেই তাই বলতে হয়, আমরা আর কবে ‘স্বাভাবিক’ হব?