Sunday, April 5, 2015

যিশুর পুনরুত্থান মহোৎসব by ফাদার প্যাট্রিক গমেজ

আজ ৫ এপ্রিল, রোববার। সারা পৃথিবীতে খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা আজ মহাসমারোহে পালন করছে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রভু যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান মহোৎসব পাস্কা বা ইস্টার। সবাই উচ্চকণ্ঠে গেয়ে উঠছে: আলে­­লুইয়া! অর্থাৎ জয় জয়, প্রভুর জয়!! ৩ এপ্রিল ছিল গুড ফ্রাইডে বা পুণ্য শুক্রবার। স্মরণ করা হয়েছে যিশুর পরিত্রাণদায়ী মৃত্যু। মানুষ কৃচ্ছ্রসাধন করে, উপবাস বা রোজা থেকে নিজের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়েছে; নিজের পাপ স্বীকার করে ঈশ্বর ও মানুষের সঙ্গে হয়েছে পুনর্মিলিত। আজ আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে, পালন করা হচ্ছে প্রভু যিশুর গৌরবময় পুনরুত্থান।
পাস্কা: হিব্রু শব্দ পাস্কা মানেই হলো পেরিয়ে যাওয়া বা পার হয়ে যাওয়া। যিশুর পুনরুত্থান পাপের ওপর বিজয় এনেছে। মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত করেছে। এই অর্থে আজকের এই মহোৎসবের নাম পাস্কা। যিশুর পুনরুত্থানে মানুষের জীবনে উষার আলোর উদয় হয়েছে। তাই এই পর্বের নাম ইস্টার।
ইস্টারের বড় মোমবাতি: বস্তুত শনিবার রাত থেকেই এই নবজীবনের মহোৎসব শুরু হয়। শনিবার রাতে নিস্তার জাগরণী উপাসনায় যিশুর পুনরুত্থান ঘোষণা করা হয় এবং সবাই মেতে ওঠে পুনরুত্থানের আনন্দে। জ্বালানো হয় পুনরুত্থানের প্রদীপ, এক বিরাট আকারের মোমবাতি, যা ঘোষণা করে যিশুর পুনরুত্থান মানুষের জীবনে এনেছে নতুন আলো, নতুন জীবন; যিশুর পুনরুত্থান দূরীভূত করেছে পাপের অন্ধকার; মানুষ মৃত্যুঞ্জয়ী যিশুখ্রিষ্টের সঙ্গে হয়েছে একীভূত। আজকের এই মহোৎসব আলোর মহোৎসব। এই উৎসব আমাদের সবাইকে আলোকিত মানুষ হয়ে, যিশুর সঙ্গে পুনরুত্থিত হয়ে তাঁর আলোতে উদ্ভাসিত হতে আহ্বান জানায়।
একটি আহ্বান: পুনরুত্থিত বা আলোকিত জীবনের দৃশ্যনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী হতে পারে? যেখানে আছে মিলন ও ভ্রাতৃত্ব, যেখানে আছে শান্তি, যেখানে ঝগড়া-বিবাদ নয় বরং আছে ক্ষমা, যেখানে আছে সরলতা ও স্বচ্ছতা, যেখানে নেই ধর্ষণ বা মানব-নিধন, যেখানে নেই কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি, যেখানে নেই মিথ্যার ছড়াছড়ি, সেখানেই তো নবজীবন, পুনরুত্থিত জীবন। আসুন, অন্ধকারের সব কার্যকলাপ পরিত্যাগ করে আমরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠি আলোকিত মানুষ; আমাদের পরিবারকে, আমাদের সমাজকে, ব্যাপক পরিসরে আমাদের দেশকে করে তুলি আলোকিত। আজকের এই ইস্টার বা পুনরুত্থান পর্ব এমন অন্ধকারের জীবন থেকে বের হয়ে বাংলার মানুষকে আলোর রাজ্যে আসার আহ্বান জানায়।
বাংলার মানুষের মিলনের কৃষ্টি: বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই শান্ত মানুষ; ঐতিহ্যগতভাবেই আমাদের দেশের মানুষ মিলনের কৃষ্টির মানুষ; হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান একত্রে বাস করে আসছে যুগ যুগ ধরেই। অতএব আমাদের শক্তি আছে এই মূল্যবোধগুলো নিয়ে পাপময় বাস্তবতাগুলোর ওপর জয় করে পুনরুত্থিত মানুষে পরিণত হওয়া। আর এ প্রসঙ্গে যিশুর পুনরুত্থান আমাদের প্রত্যেকের জন্য পাপের ওপর বিজয়ী হওয়ার একটি বড় চেতনা ও প্রেরণা। পুনরুত্থান মহোৎসবের এই চেতনা-প্রেরণা শুধু খ্রিষ্টবিশ্বাসীদেরই নয়, এই মহোৎসবের আবেদন, তাগিদ ও এর আহ্বান সর্বজনীন।
পাস্কা ও বাংলা নববর্ষ: অত্যন্ত মজার দিকটা হলো, এ বছর পয়লা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল; অর্থাৎ এই পাস্কা বা ইস্টার সানডের একটি সপ্তাহ পরেই। নববর্ষ তো নতুন জীবনই ঘোষণা করে। নতুনকে স্বাগত জানিয়ে সেদিন গেয়ে উঠব: এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। একইভাবে আমরা এই পুনরুত্থান উৎসবে নতুন জীবনকে স্বাগত জানাই। আমাদের জীবন ঘোষণা করুক যে আমরা কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কে, ধর্মীয়, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনে হয়েছি নতুন।
উৎসবে আন্তধর্মীয় আমেজ: আজ নতুন সাজে খ্রিষ্টবিশ্বাসী সবাই পুনরুত্থানে তথা উপাসনায় অংশ নেবে। গির্জাঘর থাকে খ্রিষ্টভক্ত দিয়ে পূর্ণ। উপাসনা বা নামাজের পরেই চলে আপন আপন কৃষ্টিতে ইস্টারের শুভেচ্ছা বিনিময়। ঘরে ঘরে আজ আয়োজন করা হয় দই-চিঁড়া-মুড়ি-মুড়কির মতো হরেক রকম মুখরোচক আহার সামগ্রী। এতে অংশ নেবে ঘরের সবাই, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই। এই আসরে অনেক সময়ই নিমন্ত্রিত হয় হিন্দু-মুসলিম ভাইবোনেরাও। শুভেচ্ছা জানায় তারাও। এভাবেই প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি সমাজ, প্রতিটি ধর্মের মানুষ তথা গোটা বাংলাদেশ নতুন হয়ে ওঠে আন্তধর্মীয় আমেজে এই ইস্টার উৎসবে।
বড় আক্ষেপ: এই আনন্দের দিনেও একটি আক্ষেপ! ইস্টার তথা যিশুর পুনরুত্থান-রহস্য খ্রিষ্টধর্মের একটি প্রধান ধর্মীয় বিষয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের ভিত্তিই হলো যিশুর এই পুনরুত্থান। অন্যান্য ধর্মের যেমন প্রধান প্রধান ধর্মীয় পূজা বা ঈদ রয়েছে, ইস্টার তেমনিই একটি মুখ্য খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় মহোৎসব। পরিতাপের বিষয়, দিনটি ছুটির দিন নয়। এই দিনটিতে খ্রিষ্টবিশ্বাসীরা মুক্ত ধারায় মহোৎসবটি পালন করতে পারছে না। এমনকি এই দিনটিতেই ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার তারিখও পড়ে যায়। দেশের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিষয়টি বিবেচনায় আনবেন, এটি আমাদের প্রত্যাশা। এই ইস্টারেও খ্রিষ্টবিশ্বাসী আমাদের সবার বিনম্র অনুরোধ যে এই দিনটিকে ঐচ্ছিক নয় বরং সাধারণ ছুটি হিসেবে অনুমোদন দিলে পুনরুত্থান রোববারে মুক্ত মন নিয়ে খ্রিষ্টান ছাত্রছাত্রীরা, চাকরিজীবীরা অর্থাৎ সব পর্যায়ের খ্রিষ্টান নারী-পুরুষ গির্জায় যেতে পারবে এবং পারিবারিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে; সর্বোপরি সর্বজনীনভাবে খ্রিষ্টবিশ্বাসের কেন্দ্রীয় রহস্যভিত্তিক এই মহোৎসবটি সবার কাছেই সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে, পরিচিত হবে।
হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার প্রতি রইল শুভ পাস্কা পর্বের প্রীতিপূর্ণ শুভেচ্ছা। পুনরুত্থিত যিশুর শান্তি ও আনন্দ সবার ঘরে ঘরে বিরাজ করুক। শুভ পাস্কা, শুভ পুনরুত্থান।
ফাদার প্যাট্রিক গমেজ: ক্যাথলিক ধর্মযাজক, রাজশাহী ক্যাথলিক ডায়োসিস, আহ্বায়ক আন্তধর্মীয় সংলাপ কমিশন।

খালেদা ঘরে ফিরেছেন, গণতন্ত্রও ফিরে আসুক by সোহরাব হাসান

বিএনপি জোটের অবরোধে পেট্রলবোমায় দগ্ধ ব্যক্তিদের পাশে
স্বজনের আহাজারি। ছবি: প্রথম আলো
তিন মাস পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ রোববার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ঘরে ফিরেছেন। গত ৩ জানুয়ারি তিনি গুলশানের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’ থেকে বেরিয়ে তাঁর কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর খালেদা জিয়া প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বালুভর্তি ট্রাক দ্বারা অবরুদ্ধ হন। সেই অবরুদ্ধ অবস্থা না কাটতেই তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী অবরোধ ঘোষণা করে সেখানেই অবস্থান করেন। এমনকি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পরও তিনি সেখান থেকে নড়েননি। বলেছিলেন, যৌক্তিক পরিণতি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দেশবাসী গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করে যে এই অবরোধকে কেন্দ্র করে সারা দেশে একদিকে পেট্রলবোমার মহাতাণ্ডব, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দমনপীড়ন চলতে থাকে। গ্রেপ্তার ও গুমের কারণে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিদগ্ধ মানুষের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে অবরোধের পাশাপাশি দফায় দফায় হরতাল পালিত হতে থাকে। সপ্তাহে পাঁচ দিন। সর্বত্র শঙ্কা ও ভীতিকর অবস্থা।
এরই মধ্যে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার হলে বসতে হয়। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষা। এরই মধ্যে জীবনের ঝুঁকি দিয়ে শ্রমজীবী মানুষকে ঘরের বাইরে বেরোতে হয়। কাজ করতে হয়। কিন্তু তাঁরা সবাই ঘরে ফিরে আসতে পারেননি। অনেকেই পেট্রলবোমার ঘায়ে দগ্ধ হয়ে জীবন দিয়েছেন কিংবা এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
কিন্তু পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে মারা কিংবা বন্দুকযুদ্ধে নিহত মানুষের সারি আমাদের পাষাণ রাজনীতিকদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে পারেনি। সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থানটি ছিল এ রকম: মানুষ মরুক, দেশ গোল্লায় যাক, অর্থনীতি ধ্বংস হোক, কিন্তু তাদের আমিত্ব বজায় রাখতেই হবে। এভাবে জানুয়ারি পেরিয়ে ফেব্রুয়ারি। ফ্রেব্রুয়ারি পেরিয়ে মার্চ। কিন্তু নিজ নিজ অবস্থান থেকে কারও সরে আসার লক্ষণ নেই। মানুষ যারপরনাই হতাশ, বিচলিত ও বিক্ষুব্ধ। সবার প্রশ্ন: এভাবে কত দিন চলবে?
এরই মধ্যে তিন সিটি করপোরেশনের (ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) নির্বানের তফসিল ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নড়ে-চড়ে বসে। কোথায় যেন একটি সমঝোতার ক্ষীণ আভাস পাওয়া যায়। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিবেশ পেলে তারা নির্বাচনে যেতে রাজি আছে। সরকারের তরফেও কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ করা যায়। মন্ত্রীরা মুখে যতই বলেন খালেদা জিয়াকে জেলখানার ভাত খেতে হবে, বাস্তবে আদালতের পরোয়ানা থানায় পৌঁছায় না। এরপর দ্রুত কতগুলো ঘটনা ঘটতে থাকে। বিএনপি নেতারা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করেন।
এরপর গত শুক্রবার বিএনপির নয়াপল্টনের অফিসের সামনে থেকে পুলিশি প্রহরা তুলে নেওয়া হয়। গত শনিবার রাতে বিএনপি নেতারা গিয়ে অফিসের তালা খুলে দেন। খালেদা জিয়া রোববার সকালে আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন এবং সরকার নিযুক্ত আইনজীবীও তাঁর জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন না। এরপর খালেদা জিয়া জামিন নিয়ে অফিসে না গিয়ে ফিরোজায় ফিরে যান। ফিরোজা মানে ‘আকাশ-নীল’; সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতার প্রতীক।
এর আগেরবার খালেদা জিয়া যখন আদালতে গিয়েছিলেন, তখন ঢাকা শহরে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিছিল। সেই কাণ্ডে সরকারদলীয় সাংসদ জখম হয়েছিলেন। ছাত্রদলের কর্মীদের বেধড়ক পিটিয়েছিলেন সরকারদলীয় কর্মীরা। আদালত প্রাঙ্গণে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল।
কিন্তু এবারে কোনো অঘটন ঘটেনি। আইন নিজস্ব গতিতে চলেছে। সবাই আদালতের আদেশ মেনে চলবেন, এটাই স্বাভাবিক। মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। যাঁর যাঁর সীমা মেনে চলবেন। যে জনগণের জন্য তাঁরা রাজনীতি করেন, সেই জনগণকে জিম্মি করবেন না। আগুনে পুড়িয়ে মারবেন না। রাজনৈতিক বিরোধীকে গুম করবেন না। এটাই রাজনীতি। এটাই গণতন্ত্র।
খালেদা জিয়া ঘরে ফিরে গেছেন। এবার গণতন্ত্রও ‘ঘরে’ ফিরে আসুক।

চা-পল্লিতে উৎসবের আমেজ by উজ্জ্বল মেহেদী

আসছে পয়লা বৈশাখ। চলছে কেনাকাটা। সিলেটের লাক্কাতুরা
চা-পল্লিতে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে শাড়ি কিনছেন নারী
চা-শ্রমিকেরা। ছবিটি গতকাল সকালে তোলা l আনিস মাহমুদ
মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে গতকাল শনিবার। তাতে চিকচিক করছিল চা গাছের নতুন সবুজ পাতা। চা-পাতার ফাঁকে ছোট ছোট ঘরবসতির মানুষগুলোর মনেও নতুনের সাজ। সামনে বৈশাখ, বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চা-পল্লির ঘরদুয়ার ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করার কাজ চলছিল। সেই সঙ্গে কেনাকাটাও।
এ কেনাকাটা চা-পল্লির গণ্ডি পেরিয়ে নয়, কিংবা যেতে হচ্ছে না কোনো হাটেও। চা-পল্লিতে বসেই চলছিল নানা রঙের শাড়ি, রঙিন ছাপ দেওয়া পোশাকের কেনাকাটা। সকালে ঠেলাগাড়ি করে এক গাদা পোশাক নিয়ে চা-পল্লিতে ঢুকতেই খুব বেশি হাঁকডাক দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি বিক্রেতার। তাঁকে ঘিরে ধরলেন চা-পল্লির বাসিন্দা নারীরা। দামও তেমন চড়া নয়। প্রতিটি ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। ফলে বেশ জমে ওঠে কেনাবেচা।
লাক্কাতুরা চা-বাগানের দৃশ্য এটি। সিলেট নগরের উপকণ্ঠের চা-বাগান। গতকাল শনিবার সকালবেলা কয়েকটি চা-পল্লি ঘুরে দেখা গেল, নতুন বছরকে বরণ করতে সাধ্যমতো প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে। নতুন বছর বরণের উৎসবের একটি অনুষঙ্গ নতুন কাপড় কেনাকাটা। ফলে বেচাকেনা ভালোই হয়। সেই আসাতেই সকালবেলা ঠেলাগাড়ি নিয়ে লাক্কাতুরা চা-বাগানের পল্লিতে নতুন কাপড় নিয়ে এসেছিলেন ফেরিওয়ালা আজমল মিয়া।
আজমল জানালেন, উপলক্ষ বৈশাখ হওয়ায় বৈশাখী সাজের উপযুক্ত শাড়ি থেকে শুরু করে ছোটদের কাপড়ও নিয়ে এসেছেন তিনি। দামও রাখছেন হাটের কাপড় থেকে কম। এ কারণে চা-পল্লিতে প্রবেশ করতেই প্রচুর ক্রেতা এসেছেন কেনাকাটা করতে। কেউ কেউ আবার পছন্দের শাড়ির জন্য আগাম বায়নাও দিয়েছেন।
দিনমান শ্রম-ঘামের জীবন চা-শ্রমিকদের। বৈশাখ যেন এক নতুনের আনন্দ এনে দেয় একঘেয়ে জীবনে। লাক্কাতুরা চা-বাগানে বৈশাখকে বরণ করার জন্য প্রতিবছরই জমজমাট আয়োজন করা হয়। এই উৎসব শুরু হয় চৈত্রের শেষ দিন থেকে। চৈত্রসংক্রান্তিতে হয় চড়কপূজা। সিলেটের চা-বাগানগুলোর মধ্যে কেবল লাক্কাতুরা চা-বাগানেই চড়কপূজা ঘটা করে উদ্যাপিত হয়। সিলেট শহরতলির বিমানবন্দর সড়কের উভয় দিক তখন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। চড়কপূজার আয়োজনে পুরো চা-বাগান যেন উৎসবে মাতে। পরের দিন হয় নববর্ষ বরণের বৈশাখী উৎসব।
চড়কপূজার সঙ্গে বৈশাখ বরণ করার উৎসব উদ্যাপনে চা-পল্লির তরুণেরা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন বলে জানান ‘বাংলাদেশ চা-ছাত্র যুব পরিষদ’ সিলেটের আহ্বায়ক বিকাশ রঞ্জন দাস। লাক্কাতুরায় তিনটি টিলার মাঝখানে ফাঁকা চত্বরে চড়কপূজা হয়। এ উপলক্ষে ওই চা-বাগানসহ আশপাশ এলাকার বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলোর মধ্যে যেন মিলনমেলা বসে। এর আনন্দে নতুন কাপড়চোপড় কেনাকাটা চলছে। চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারগুলোতে বছরজুড়ে শ্রম থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। সারা বছরের সেই সঞ্চয়ের অর্থেই রঙিন হয়ে ওঠে চা-পল্লির মানুষগুলোর বৈশাখী উৎসব।

তিন মাসের আন্দোলন ফল শূন্য? by রিয়াদুল করিম

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন, বিনা বাধায় নিজের বাসভবনে ফিরে যাওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বিএনপি। তবে টানা তিন মাসের আন্দোলন, পরোয়ানা মাথায় নিয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অবস্থান শেষে বাসায় ফিরে যাওয়ার পর এমন প্রশ্নও আসছে, তিন মাসের এ আন্দোলনে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের অর্জন কী? আন্দোলনের অর্জন নিয়ে বিএনপির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। কারও মতে আংশিক সফলতা থাকলে কেউ মনে করেন, আন্দোলনের অর্জন শূন্য। তিন মাসের আন্দোলনে সরকারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলতে পারলেও নিজেদের প্রধান দাবি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা এ লক্ষ্যে সংলাপের কোনো আশ্বাস সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি বিএনপি। বরং এ সময়ে তিন সিটি নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এবং খালেদা জিয়ার বাসায় ফিরে যাওয়া নতুন বার্তা দিয়েছে। খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অবস্থানকে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ইতিপূর্বে বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে থাকতে চান। আর এ কারণে তিনি একুশে ফেব্রুয়ারি বা ২৬শে মার্চ শ্রদ্ধা জানাতেও যাননি।
গত ৩ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন গুলশানে নিজের কার্যালয়ে অবস্থানের পর আজ রোববার নিজের বাসভবনে ফিরে গেছেন খালেদা জিয়া। একতরফা জাতীয় নির্বাচনের এক বছরের মাথায় গত ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। পুলিশের বাধায় সে কর্মসূচিতে যেতে না ৬ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধের ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকে টানা অবরোধের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে আজ। দেশে টানা এত দিন ধরে এ ধরনের কর্মসূচি পালনের আর কোনো নজির নেই। এখনো অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে। অবশ্য গত প্রায় এক মাস দেশে অবরোধের কার্যকারিতা নেই বললেই চলে।
তিন মাসের আন্দোলনের মূল্যায়ন জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এটি খুব জটিল। বিএনপির সামনে কোনো পথ খোলা ছিল না বলেই আন্দোলনে গেছে। আন্দোলন এখনো চলছে। আন্দোলন পুরোপুরি সফল না হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্জন যে হয়নি তা নয়। বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জানান দিতে পেরেছে যে, দেশে একটি সংকট চলছে। আন্দোলনে নাশকতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হয়েছে, জ্বালাও-পোড়াও-এর সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয়। কোনো অপশক্তি এর সঙ্গে জড়িত।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির আন্দোলনের ফল এখন পর্যন্ত শূন্য। তিনি মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও দল গণ-আন্দোলন তৈরি করতে পারছে না। আর এটাও দলের অনেক নেতা বুঝতে চাচ্ছেন না যে, জনসমর্থন আর গণ-আন্দোলন এক না। যার ফলে আন্দোলনের কৌশল সঠিক হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন। বর্ষীয়ান ওই নেতা বলেন, ঢাকায় আন্দোলন না হলে সারা দেশে কী হলো না হলো তার তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না। এ তিন মাসের আন্দোলন রাজনীতির একটি বড় ‘শিক্ষা’ হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে বাসায় ফিরে যাওয়া, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ-এসবের ফলে মানুষ মনে করছে বিএনপির আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে। এক ধরনের স্বস্তিও পাচ্ছে মানুষ।
বর্তমানে খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করা-এ বিষয়গুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বিএনপি। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি ছিল, তাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। জানি না এ স্বস্তি কতদিন থাকবে। তবে আজ যা হয়েছে তা ইতিবাচক।
বিএনপির সূত্র জানায়, তারা সরকারের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছে। দলটি ঢাকা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছে। হার-জিত যাই হোক বিএনপি এ নির্বাচনে লাভবান হবে। টানা আন্দোলনে দলের নেতা-কর্মীরা ক্লান্ত। নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগই আছেন আত্মগোপনে। আন্দোলন কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় হুট করে আন্দোলন থেকে পিছু হটাও হবে বড় রাজনৈতিক পরাজয়। এ অবস্থায় বিএনপি মনে করছে, সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতা-কর্মীরা আবার সংগঠিত হতে পারবেন। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলেও চলে আসতে পারে। আপাতত আন্দোলন থেকে বের হওয়ার একটি পথ হিসেবে সিটি নির্বাচনকে দেখছেন নেতাদের কেউ কেউ। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিএনপির আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে।

সিইসির স্বেচ্ছাচারিতা- সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ইসিকে কাজ করতে হবে

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ মনে হয় নিজেকেই ‘নির্বাচন কমিশন’ (ইসি) ভাবতে শুরু করেছেন। একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন কমিশনারের সমন্বয়েই যে ‘নির্বাচন কমিশন’, সেটা সম্ভবত তাঁর বিবেচনায় নেই। ইসির চার নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা না করে এবং তাঁদের উপেক্ষা করে সিইসি যেভাবে কাজ করছেন, এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়ে পড়ে।
সংবিধানে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে যে ইসি গঠনের কথা বলা হয়েছে, তার মূল চেতনাটি হচ্ছে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন। সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ নির্বাচনসংক্রান্ত সব কাজকে সমন্বিতভাবে ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব’ (১১৯ অনুচ্ছেদ) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনে সিইসি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন কিন্তু এককভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে ইসিতে সম্প্রতি যেসব কর্মকাণ্ড হয়েছে, সেখানে চার নির্বাচন কমিশনারকে স্পষ্টতই উপেক্ষা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বৈঠকে কমিশনারদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বিএনপিপন্থী পেশাজীবী ও বিএনপির যে প্রতিনিধিদল ইসিতে গিয়েছিল, সেখানেও কমিশনারদের রাখা হয়নি, শুধু সিইসিই তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর এ ধরনের আচরণে কমিশনাররা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ, কিন্তু তিনি কেন এমন আচরণ করছেন, এর ব্যাখ্যা নেই।
এককভাবে কাজ করতে গিয়ে সিইসি বিভিন্ন আর্থিক ও অর্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ যেভাবে নিজে অনুমোদন দিচ্ছেন, তা খুবই বিপজ্জনক। একজন কমিশনার অভিযোগ করেছেন, ‘নিবন্ধন বিভাগে হাজার কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। কে করছে, কীভাবে করছে, তা আমরা জানি না।’ এসব কাজ নিয়ে এরই মধ্যে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে এই কাজগুলোর দায়িত্ব এককভাবে সিইসিকেই নিতে হবে।
এটা পরিষ্কার যে একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন বর্তমানে কাজ করতে পারছে না। এতে ইসি আরও দুর্বল ও অকার্যকর হবে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

রাজনীতিতে ব্যক্তিকর্তৃত্ব প্রকট

বেঙ্গল শিল্পালয়ে গতকাল ছিল রওনক জাহানের পলিটিক্যাল পার্টিজ
ইন বাংলাদেশ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ছবিতে বই হাতে
(বাঁ থেকে) গওহর রিজভী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, জি এম কাদের,
রওনক জাহান, আল মাসুদ হাসানুজ্জামান ও ইমতিয়াজ আহমেদ
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চার ব্যাপক অভাব রয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ব আরও প্রকট হয়েছে। দেশ ও সরকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। এ ক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকা হয়ে যায় গৌণ। গতকাল শনিবার বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক করতে ভাবনার সময় এসেছে। রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বইটির প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা প্রকাশন। বইয়ের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ তাত্ত্বিকভাবে গণতন্ত্র, সুষ্ঠু দলব্যবস্থা ও বহুত্ববাদের ধারক হলেও প্রয়োগের দিক থেকে বিশাল ফারাক রয়েছে। এখানে দল পরিচালিত হয় নেতা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নির্বাচনকে প্রায়শই গণতন্ত্রের লক্ষ্যপূরণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দলীয় উদাসীনতা দেখা যায়। যে দল হেরে যায় তার ওপর সুনামি শুরু হয়। দেশে সংসদীয় কাঠামো বজায় থাকলেও এর সুষ্ঠু কার্যকারিতা না থাকায় সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ও বিরোধী দলের বিরোধিতার নেতিবাচক আচরণ অব্যাহত রয়েছে। গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি পরিণত হয়েছে ‘পার্টিক্রেসি’তে ।
বইয়ের লেখক রওনক জাহান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ভালো সম্পর্ক থাকলে সংঘাতের রাজনীতি থাকত না। ’৯১-এর পর থেকে কে কীভাবে ক্ষমতায় যাবে, দলগুলো এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের মধ্যে সংঘাত বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে অন্তর্দলীয় কোন্দল বেড়ে যায়। ক্ষমতায় থাকাকালে নেতা যদি চান, দলকে সংগঠিত ও সংস্কার করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা তা করেন না। কারণ, তাঁরা মনে করেন, নির্বাচনে যদি হেরে যান, তখন মাস্তান লাগবে।
বিশিষ্ট এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দিক হলো, ৩০ বছর ধরে বড় তিনটি দলেরই প্রধান একই ব্যক্তি রয়ে গেছেন। সব কটি দলেই উত্তরাধিকারের নেতৃত্ব প্রাধান্য রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একই অবস্থা। এ ক্ষেত্রে মানুষের পছন্দের বিষয়টি গৌণ। এ প্রবণতার কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কাঠামোগত দিক থেকে দাঁড়াতে পারছে না বলে তিনি মনে করেন।
রওনক জাহান বলেন, দেশে ক্ষমতাসীনেরা আইন ভঙ্গ করে সুবিধা নিচ্ছে। বিরোধীদের শাস্তি দিচ্ছে। আইনের শাসন বলে কিছু থাকছে না। আইনে যা থাকুক না কেন, কেউ সেটা মানছে না। এটা যে শুধু কোনো একটি দল করছে তা নয়, যারা যখন ক্ষমতায় এসেছে, সবাই করেছে। তাই কেবল আইন করে বা সংবিধান পরিবর্তন করেও কোনো লাভ হবে না। এর জন্য মৌলিক কিছু নীতি থাকা উচিত। সেই মৌলিক নীতির মধ্যে থাকবে, যাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন তাঁরা আইন ভাঙবেন না।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র নেই, এটা অস্বীকার না করেই বলছি, তার পরও এই রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে কিছু দিতে পারছে। অনেক সমালোচনার মধ্যেও প্রধান দুটি দলের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা দিয়ে তারা বিপুলসংখ্যক ভোটারকে আকর্ষণ করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কয়েকটি কাউন্সিলে উপস্থিত থেকে যেমনটি দেখেছি, সভাপতি ও সাধারণ নির্বাচনের পর বাকি পদগুলো পূরণ করার দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে সমর্পণ করা হয়। একজনের এক ভোট—এ ব্যবস্থায় তাঁরা ভোটে যেতে চান না।’
গওহর রিজভী বলেন, নির্বাচন হচ্ছে ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে একটি চুক্তি। ভোটার কি প্রার্থীকে সংসদে না যাওয়ার জন্য ভোট দিয়েছেন? এটা দেখার জন্য ৯০ দিন কেন অপেক্ষা করতে হবে—এ নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সফল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন রাখেন, ‘আমাদের দেশে কি সেই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আছে? আমরা নির্বাচনে হেরে গেলে তা মেনে নিই না। এ সমস্যার সমাধানে কি পদ্ধতি বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে? এখন সময় এসেছে সংবিধান নিয়ে নতুন করে ভাবার।’
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে কর্তৃত্ববাদ এত বেশি আঁকড়ে ধরেছে যে এ থেকে বের হওয়া কঠিন। তাঁর মতে, একটি দায়িত্বশীল নির্বাচন কমিশন একটা রাজনৈতিক দলের চরিত্র ও কর্মকাণ্ড বদলে দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন এত অকেজো ও অথর্ব যে এর ওপর আস্থা রাখা যায় না।
ইনাম আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদের স্ফুলিঙ্গ হলে জিয়াউর রহমান ছিলেন যোগসূত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্য সত্যকে উপলব্ধি করতে চাই না।’ শ্রোতাদের একজন প্রশ্ন করেন, দলকে সংগঠিত করতে বিএনপি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে। জবাবে ইনাম আহমেদ বলেন, ‘এটা তো ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) ভালো বলতে পারবেন। পুলিশ বিএনপিকে কী কী কর্মসূচি করতে দিয়েছে, তার কাছে হিসাব আছে। আজ পত্রিকায় দেখলাম তিন মাস পর পুলিশ বিএনপি অফিস খুলে দিয়েছে।’
জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জি এম কাদের বলেন, পাশ্চাত্যের উদাহরণ হলো নিয়মিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এবং তার মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল হতে থাকলে নির্বাচনপদ্ধতি ও গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের একই পদ্ধতি প্রায় ২৪ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে, নির্বাচন ব্যবস্থা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক হয়নি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর হলেও রাজপথে আন্দোলন বন্ধ হয়নি; বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
‘গণতন্ত্রকে টেকসই করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা নিজেদের দলে ও দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা উৎসাহিত করবে’—বইয়ের লেখকের এমন বক্তব্য সমর্থন করে জি এম কাদের বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকারের ঘাটতি রয়েছে।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভেদ কমিয়ে আনতে একটি সামাজিক সনদ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কী কী ভূমিকা থাকবে, তা ওই সনদে উল্লেখ থাকবে। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধানে পরিবর্তন না আনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও দলগুলো বড়জোর ৩৫-৪০ শতাংশ ভোট পায়। ৬০ শতাংশ ভোটারকে বাইরে রেখে সংবিধান পরিবর্তন না করে এ ক্ষেত্রে গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত।
ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়ে গবেষণা করতে গেলে বাকশাল কেন তৈরি করা হয়েছিল, তার ওপরও আলোচনা হওয়া উচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, এক-এগারোর পর দলগুলোতে শীর্ষ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব আরও সুসংহত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাধান্য অব্যাহত রয়েছে। রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে এবং সেই সঙ্গে আছে অস্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন। দলগুলোতে অরাজনৈতিক উপাদানের অনুপ্রবেশ ও প্রভাব বিস্তার ঘটেছে, যা রাজনৈতিক মনোনয়নের সময় দৃশ্যমান হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়েছে, আরও এগোনোর সম্ভাবনা আছে। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে রাজনীতি। দেশের প্রধান চারটি দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর সমস্যা-সংকট নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান গবেষণা ও পর্যালোচনা তাঁর বইয়ে তুলে ধরেছেন। বক্তারা শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার, অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইদুজ্জামান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, ড. রওশন জাহান, সাবেক কূটনৈতিক সচিব ফারুক সোবহান, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর, অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, ইতিহাসবিদ শরীফ উদ্দিন আহমদ, লেখক মাহবুব আলম, সৈয়দ বদরুল আহসান, নিলুফার হুদা, মহিউদ্দিন আহমদ, আনোয়ার উল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক রওনক জাহান ঢাকা, হার্ভার্ড ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নারীবিষয়ক কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

কলকাতার ডাক্তার সেজে প্রতারণার ফাঁদ by ওমর ফারুক সুমন

বাড়ি আমার কলকাতার জলপাইগুড়ি। এমবিবিএস কলকাতা (নাক, কান ও গলা বিভাগ)। সম্পূর্ণ বিনা অপারেশনে ইনজেকশনের সাহায্যে নাকের পলিপাস, মক্সিলারি, সাইনোসাইটিস, গলার ফলিকিউলার, টন্সিলাইটিস, ফেরিনজাইটিস, কান পাকা, কানের পর্দা ছিদ্র প্রভৃতি জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ আরোগ্য করে থাকি। আমি কলকাতা থেকে এসে প্রতিমাসে দু’দিন করে একটি চেম্বারে রোগীর চিকিৎসা দেয়। যেখানে অপারেশন করে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয় সেখানে মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকায় সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়ে যায়। ইনজেকশন এবং অন্য ওষুধগুলো সরাসরি কলকাতা থেকে নিয়ে আসি। ঠিক এইরকম কিছু টকশো এবং সঙ্গে ব্যাগের ভিতর রক্ষিত বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রোগী দেখার চেম্বারের লিফলেট প্রদর্শনপূর্বক প্রায় ২৫ বছর ধরে ভুয়া ডাক্তার সেজে প্রতারণা করে আসছে। রোগীদের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। প্রতারিত হচ্ছে হাজার হাজার রোগী। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লা বাজারে গড়ে তুলেছে রাজপ্রাসাদ।
নাম তার ভবেশ চন্দ্র ঘটক, পিতা-মৃত সুধন্যকুমার ঘটক। বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের পাকুল্যা বাজারে। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার হালালিয়া গ্রামে। তবে এটি তার প্রকৃত ঠিকানা হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কলকাতার পরিচয় দিয়েই অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
অপরদিকে তার চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। আগে থেকেই ওষুধের নামসহ কম্পিউটারাইজ্‌ড করা থাকতো  প্রেসক্রিপশন। সকল রোগীর জন্য একই ধরনের প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করতো। রোগী মারা না গেলেও কোন রোগী সুস্থ হয়েছে কিনা এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তার কিছু রোগী দেখার চেম্বার খুঁজে পাওয়া যায়। মুন্সীগঞ্জের পুরাতন কাচারী রোডের সেবা মেডিক্যাল হল, দিন মোহাম্মদ সুপার মার্কেট (৩য় তলা) সামাদ সুপার মার্কেট, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকার সাউথ এশিয়ান চক্ষু হাসতাপাল, হাজী মুনাম উদ্দিন ওয়াক্‌ফ এস্টেট মার্কেট, ঢাকা রোড গাজীপুর চৌরাস্তার মেসার্স কুমিল্লা মেডিক্যাল হল, জারিয়া বাজার, পূর্বধলা, নেত্রকোনার বিস্‌মিল্লাহ্‌ মেডিক্যাল হল, খশির আবদুল্লাহপুর, বৈরাগীবাজার, বিয়ানীবাজার সিলেটের মেসার্স তাসমিয়া ফার্মেসি, ফুলপুর উপজেলার ময়মনসিংহের মেসার্স কায়সার ড্রাগ সেন্টার, শম্ভুগঞ্জ ময়মনসিংহের তামিম মেডিক্যাল হল। এছাড়া জানা-অজানা আরও অনেক ব্যাঙের ছাতার মতো চেম্বার রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। সে সমস্ত জায়গায় ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার সেজে প্রতারণা করে আসছে। কায়সার ড্রাগ সেন্টারের মালিক কায়সার আহমেদ জানান, আমার এখানে প্রায় ৫/৭ মাস রোগী দেখার জন্য প্রতি মাসের দুই মঙ্গলবার বসতেন। তার মাধ্যমে কোন রোগী ভাল হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই। হঠাৎ করে সে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। মোবাইল ফোন তার বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কাইসার ড্রাগ সেন্টারের মাইকিং ম্যান জুলহাস মিয়া জানান, এই চেম্বারে কমপক্ষে ২ হাজার রোগীর কাছ থেকে জন প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা নিয়েছে কিন্তু কোন রোগীই সুস্থ হয়নি। মুন্সীগঞ্জের সেবা মেডিক্যাল হলের জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঐ খানে তিনি মাসে দুইবার করে রোগী দেখতে যেতেন। কয়েক হাজার রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বর্তমানে তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। ঠিক এমনিভাবে কুমিল্লা মেডিক্যাল হলের সাদেকুর রহমান, মেসার্স তাসমিয়া ফার্মেসির সইবন আহমদ, বিসমিল্লাহ্‌ মেডিক্যাল হলের নূরুল আমিন জানান, ডাক্তার ভবেশ চন্দ্র ঘটক প্রথমে এসে আমাদের এখানে চেম্বার করে রোগী দেখার প্রস্তাব করেন। তিনি কলকাতা থেকে আসেন এবং বাংলাদেশে তার শ্বশুরবাড়ি। প্রথমে তাকে রোগী দেখতে দিলে তার চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তখন আমরা তার সার্টিফিকেট দেখতে চাইলে তিনি সেগুলো কলকাতায় রেখে এসেছেন বলে জানান। পরের তারিখে সার্টিফিকেট নিয়ে আসবেন বলে চলে যায় এবং পরবর্তীতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখে।
এছাড়া ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের তামিম মেডিক্যাল হলের মালিক মুস্তফা কামাল বলেন, ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটকের আরেক মহাজালিয়াতির কথা। তিনি জানান ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটকের মাইকিং ম্যান ফুলপুর উপজেলার জুলহাস উদ্দিনের মাধ্যমে তার পরিচয় ঘটে। রোগী দেখার চেম্বার দিতে চাইলে তিনি সরল মনে রাজি হন। ডা. ভবেশ কলকাতার জলপাইগুড়ির নাক, কান ও গলা বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এটা বিশ্বাস করেই চলে যায় ৮টি মাস। প্রতি মাসে ২দিন চলে রোগী দেখা। ভিড় জমতে থাকে রোগী দেখার সিরিয়াল। এরই মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জমায় মুস্তফা কামালের সাথে। ডা. ভবেশ মাঝে মধ্যেই নিয়ে যেতেন ময়মনসিংহের সেরা রেস্টুরেন্ট ধানসিঁড়িতে। করতেন তাকে জামাই আদর। মুস্তফাও বিশ্বাস করতে থাকে ডা. ভবেশকে। এই সম্পর্ককে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে। কলকাতার জলপাইগুড়ির দোকান বিক্রি করে বাসার কাজ কমপ্লিট করবেন কিন্তু দোকান বিক্রি না করতে পারায় এমন অজুহাতে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার দাবী জানান মুস্তফার কাছে। একই সঙ্গে কিছু লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছেন যে, কলকাতার জলপাইগুড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্যবসার সুযোগ করে দিবেন। এসব কথা বলেই মুস্তফার কাছ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর থেকে ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটক নিখোঁজ। রোগী দেখা তার বন্ধ। অনুসন্ধান চলতে থাকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় ডা. ভবেশকে। কোন চেম্বারের মালিকরা বলতে পারে না ভুয়া ডা. ভবেশ চন্দ্রের প্রকৃত ঠিকানা কোথায়। একই সাথে চলতে থাকে তাকে খোঁজার চিরুনি অভিযান। খুঁজতে খুঁজতে তাকে পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লা বাজারে ৬ তলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট অট্টালিকার ৪ তলা সমাপ্তকৃত একটি বিল্ডিং এর নিচের তলায়। প্রতারণার টাকা দিয়ে বিল্ডিংয়ের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করে চলছেন। অতঃপর কথা হয় তার সাথে। শুরুতে ধরা দিতে না চাইলেও এক সময় সকল কিছু ক্যামেরার সামনে অকপটে স্বীকার করেন। তিনি জানান, কলকাতায় তার কোন ঠিকানা নেই। ডাক্তারির সার্টিফিকেট দেখাতে বললে তা নেই বলে অস্বীকার করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ২৫ বছর ধরে তার চলছে এ অনিয়ম তা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শুধু আমি কেন আমার মতো বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রয়েছে যারা আমার মত এভাবে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবেশ চন্দ্র ঘটক ডাক্তার কিনা আমরা কখনও শুনিনি।

বাসায় ফিরেছেন খালেদা

তিন মাস নিজ কার্যালয়ে অবস্থানের পর আজ বাসায় ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দুই মামলায় হাজিরা দিতে সকালে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বের হন তিনি। মামলায় জামিন লাভের পর আদালত থেকে গুলশানের ভাড়া বাসা ফিরোজায় ফিরেন তিনি। ২০ দল ঘোষিত ৫ই জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবসের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ৩রা জানুয়ারি বিকাল থেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয় খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যার পর নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান তিনি। সেখানেও বাড়ানো হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। রাত ১০টার দিকে খালেদা জিয়া খবর পান নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থানরত দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। খবর পেয়ে তিনি কার্যালয় থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে বাইরে তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েন করা হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য। সেই সঙ্গে তার কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় দুইপাশে দেয়া হয় ব্যারিকেড। একপর্যায়ে দুইপাশে আড়াআড়িভাবে ১১টি বালু, ইট ও মাটিভর্তি ট্রাক রেখে অবরুদ্ধ রাখা হয় কার্যালয়। এভাবেই কার্যালয়ে দীর্ঘ অবস্থানের শুরু হয় খালেদা জিয়া। এরপর একে একে ঘটে গেছে নানা নাটকীয় ও বিয়োগান্তক ঘটনা। ব্যারিকেডের পর তালা লাগিয়ে দেয়া হয় তার কার্যালয়ের মূল ফটকে। ৫ই জানুয়ারি ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে গাড়িতে ওঠে বেরুতে চাইলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে সেখানে দাঁড়িয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচী ঘোষনা করেন তিনি। এ সময় তার ওপর পেপার স্প্রে ছুড়ে পুলিশ। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু ১৯শে জানুয়ারি ভোর রাতে বিনা ঘোষণায় খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে অবরোধ তুলে নেয় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। তবে কার্যালয়ের তিনদিকে কিছু দূরে পুলিশ মোতায়েন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়। সেদিনই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর প্রতি সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। পুলিশের ব্যারিকেড তুলে নেয়া হলেও কৌশলগত কারণে কার্যালয় ছেড়ে যাননি তিনি। তবে ২২শে জানুয়ারি থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সরকার সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন নানা ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু করে। ওদিকে ২৪শে জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। ওয়ান ইলেভেনের সময় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর চিকিৎসার উদ্দেশে থাইল্যান্ড এবং পরে মালয়েশিয়া যান কোকো। ছোট ছেলের আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। ওইদিন রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে তার কার্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, অপ্রস্তুতিসহ নানা কারণে তাকে অভ্যর্থনা জানাননি বিএনপি নেতারা। ওদিকে খালেদা জিয়া যখন ছেলে হারিয়ে শোকাহত তখনই তাকে হুকুমের আসামি করে দায়ের করা হয় একের পর এক মামলা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় দায়ের করার গাড়ি পোড়ানো মামলায় হুকুমের আসামি করা হয় খালেদা জিয়াকে। ৩০শে জানুয়ারি খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। ৩০শে জানুয়ারি শেষ রাতে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, কেবল টিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় সরকার। কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর সেখানে অবস্থানকারী দলের নেতা ও কর্মকর্তাদের তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যত কিছুই হোক কার্যালয় ছাড়বেন না। নানা মহলের সমালোচনার মুখে ১৯ ঘণ্টা পর তার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। ৩১শে জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ অভিযোগ করেন খালেদাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। ২রা ফেব্রুয়ারি অবরোধ ও হরতালে ৪২ জনকে পুড়িয়ে মারার অভিযোনে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে খালেদা জিয়া ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদকে আসামি করে নালিশি মামলা দায়ের করেন জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিকী। পরদিন ৩রা ফেব্রুয়ারি থেকে দ্বিতীয় দফায় কড়াকাড়ি আরোপ করা হয় খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে। ওইদিন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করার এক পর্যায়ে ওই সংগঠনের মফিজুল নামে এক নেতা পিস্তল হাতে কার্যালয়ের দিকে ছুটে যান। ৯ই ফেব্রুয়ারি নিজেদের সংলাপের উদ্যোগ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়াকে একটি চিঠি দেয় নাগরিক সমাজ। ১০ই ফেব্রুয়ারি বিকালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গুলশান কার্যালয়ে যান বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। ১১ই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অবস্থানকারীদের জন্য নেয়া খাবার ভ্যানটি ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। এরপর থেকে খালেদা জিয়া ছাড়া কার্যালয়ে অবস্থানকারীদের জন্য খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেয় পুলিশ। কার্যালয়ের গেটে একটি টেবিল ও খাতা-কলম নিয়ে বসে স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্যরা। কার্যালয়ের আশপাশের দূতাবাসের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই এলাকায় সচল করা হয় মোবাইল নেটওয়ার্ক। এরপর সরকারপন্থী সংগঠনগুলো প্রতিদিন গুলশান এলাকায় বিক্ষোভ করতে থাকে। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনের সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই সময় কুমিল্লা, খুলনা ও পঞ্চগড়েও কয়েকটি মামলা হয়। এদিকে সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি দেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। বিএনপির তরফে সে চিঠির জবাবও দেয়া হয়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে আদালত। ১লা মার্চ গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির অনুমতি দেয় আদালত। এ সময় তাকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে নানা গুঞ্জন ছড়ায় রাজনৈতিক মহলে। তবে খালেদা জিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে কোন পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছেন তিনি। গ্রেপ্তারের গুঞ্জনের মধ্যেই ৩রা মার্চ অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার গ্রেক উইলককের নেতৃত্বে অনেকটা নাটকীয়ভাবেই গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ১৬ কূটনীতিক। ১১ই মার্চ আত্মগোপনে থেকে দলের মুখপাত্রের দায়িত্বপালনকারী যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন। ১৩ই মার্চ সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন যৌক্তিক পরিণতি পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আরাফাত রহমান কোকোর সোনালী ব্যাংকের একটি ঋণ সংক্রান্ত মামলায় ১৬ই মার্চ খালেদা জিয়া ও কোকোর দুই মেয়েকে বিবাদী করা হয়। ১৮ই মার্চ নির্বাচন কমিশন ঢাকা ও চট্টগ্রাম তিন সিটি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে একদিন পর প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জানান বিএনপি নির্বাচনে ইতিবাচক। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরকে হরতালের আওতামুক্ত ঘোষণা দেয়া হয়। এদিকে চলমান আন্দোলন কর্মসূচির কারণে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজের রাজনৈতিক কার্যালয় ছেড়ে বের হননি খালেদা জিয়া। এমনকি ছেলের মৃত্যুর ঘটনায়ও তিনি ঘোষিত কর্মসূচি শিথিল করেননি। কর্মসূচির কারণে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনার ও ২৬শে মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধেও শ্রদ্ধা জানাতে যাননি তিনি। অবশেষে আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে ৯২দিন পর কার্যালয় থেকে বের হন বিএনপি চেয়ারপারসন।

অবরোধ-হরতালে ৪৯০০কোটি টাকার ক্ষতি

৮১ দিনের অবরোধ ও ৬৭ দিনের হরতাল দেশের অর্থনীতির ৪ হাজার নয়শ কোটি টাকার ক্ষতি। এতে প্রত্যেক দিনে অর্থনীতির কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত গয়েছে। জিডিপির দশমিক ৫৫ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৭ই মার্চ পর্যন্ত সময়ের ওপর  প্রতিবেদনটি তৈরি করে সিপিডি। সকালে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। মোট ১১টি খাতের ক্ষতির চিত্র তিনি তুলে ধরা প্রতিবেদনে। এর মধ্যে পোশাক খাতে ১৩১৮ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৩৯৮ কোটি টাকা, পোল্ট্রিতে ৬০৬ কোটি টাকা, ফ্রোজেন খাতে ৭৪১ কোটি টাকা, প্লাস্টিক খাতে ২৪৪ কোটি টাকা, পরিবহন খাতে ৭৪৪ কোটি টাকা, টুরিজমে ৮২৫ কোটি টাকা, ব্যাংক ও বীমায় ১৫৬ কোটি টাকা এবং খুচরা বাজারে ৪৪৮কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অনুষ্ঠানে সংস্থাটির সম্মানীত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, উদার বাজার অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে রাজনীতিতে উদারতা গড়ে তোলা দরকার। এটি না হলে ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়বে না। এছাড়াও অর্থনীতিতে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। আমাদের নেতৃত্বের সক্ষমতা না থাকায় এটি সম্ভব হয়নি। এজন্য নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, দেশে স্বাভাবিক কার্যক্রমে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা রয়েছে যা সরকারের পক্ষ থেকেও অনেক সময় বলা হচ্ছে।

স্বাধীন খাদ্যাভাসের অধিকার by কান্তি গাঙ্গুলি

ভারতে বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি জোট লোকসভার ৫২ শতাংশ আসনে জয় লাভ করেছি, যদিও ভোট পেয়েছিল মাত্র ৩১ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মাথারা ভালো করেই জানে ৩১ ভাগ জনসমর্থনের এই মোদি ম্যাজিক অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনের ফলাফলে সে লক্ষণও ক্রমশ ফুটে উঠছে। তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে বিরোধীদের সমর্থনে থাকা ৬৯ শতাংশ ভোটকে ভাগ করা দরকার। আর বহু ভাষা ও বহু ধর্মের এই দেশকে ভাগ করার শাসকশ্রেণীর ঐতিহাসিকভাবে চিরন্তন কৌশল হচ্ছে, এই কাজে ধর্ম-সম্প্রদায়গত ভাবাবেগকে কাজে লাগাও। মানুষ যত ভাগ হবে বিশ্বায়নের আগ্রাসী নীতিতে কর্পোরেট দুনিয়ার তত সুদিন আসবে এবং নির্বিত্ত গরিব মানুষ ততোধিক অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। একদিকে জলের দরে সরকারী সম্পত্তি বিক্রি হবে, শ্রম আইন মালিকদের অনুকূলে পালটানো হবে, বীমা-ব্যাঙ্ক চলে যাবে বিদেশী পুঁজির হাতে, খেতমজুর কৃষকদের গলায় পা দিয়ে জমি অধিগ্রহণ আইন আসবে; অন্যদিকে মানুষকে ধর্ম জাতপাতের পরিচয়ে বিভক্ত করতে হবে। কর্পোরেট পুঁজি আর তার তাঁবেদারদের এটাই হচ্ছে কৌশল। ইতোমধ্যেই ‘ঘরওয়াপসি’, ‘রামজাদা-হারামজাদা’ দিয়ে শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর প্রক্রিয়া, সংখ্যালঘুদের ধর্মস্থানে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে নির্বিচারে হামলা। পাশাপাশি সুচতুর কৌশলে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে মানুষের শান্তি সম্প্রীতির মনোজগৎকে। যে মনে জন্ম নেয় শ্রেণী চেতনা সেই মনটাকেই ভেঙে দাও, বিষিয়ে দাও—এই হচ্ছে আর এস এস-বি জেপি’র গোলওয়ালকর কথিত ‘হিন্দু জাতি পুনর্গঠিত’ করার ডকট্রিন। চিন্তার জগতের এই সাম্প্রদায়িকীকরণে যুক্ত করা হয়েছে বেশকিছু সংঘ ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে। আর এস এস ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী সুদর্শন রাওকে ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাবা রামদেবসহ ঘনিষ্ঠ ধর্মব্যবসায়ীদের পরামর্শে জাতীয় শিক্ষা নীতিকে ভারতীয়করণ অথবা গৈরিকীকরণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আর এই চক্রান্তের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে গোহত্যা ও গোমাংস নিষিদ্ধকরণ আইন। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে নতুন নির্বাচিত বিজেপি সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে উপরোক্ত আইন চালু করা। মহারাষ্ট্রের পর এবার বিজেপি শাসিত অন্য আর এক রাজ্য হরিয়ানাতেও একইভাবে আরও কঠোর গোহত্যা ও গোমাংস নিষিদ্ধকরণ আইন তৈরির জন্য বিল উত্থাপিত হয়েছে। এই দানবীয় আইনটি ব্যক্তির রুচি অনুযায়ী খাদ্যাভাসের সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি লঙ্ঘণ করছে। এই আইনের ফলে সংবিধানের ১৯নং ধারা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। অধিকন্তু গোমাংস জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিক মান্যতাপ্রাপ্ত খাদ্য। মহারাষ্ট্রে এই আইনে বলা হয়েছে, কেউ গরুর মাংস বিক্রয় করলে বা কারোর কাছে গরুর মাংস পাওয়া গেলে তার পাঁচ বছরের জেল এবং জরিমানা হবে। এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকে কাঁচা অথবা রান্না করা মাংস আনাও বেআইনী এবং শাস্তিযোগ্য। হরিয়ানায় প্রস্তাবিত বিলে ক্যান বা কৌটায়ভরা গোমাংস নিষিদ্ধ হতে চলেছে। এক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানা। প্রস্তাবিত আইনটির গালভরা নাম হচ্ছে ‘‘গরু সুরক্ষা, গরু সংরক্ষণ ও উন্নয়ন আইন’’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বুড়ো, অশক্ত গবাদি পশুগুলোকে নিয়ে উন্মুক্ত গোচারণ ক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনা আমাদের মতো গরিব দেশে কতটা বাস্তব প্রয়োজনের, যেখানে শিশুমৃত্যু, প্রস্রুতিমৃত্যু, প্রান্তিক মানুষদের যক্ষা, কুষ্ঠ — এমনকি সাপের কামড়ে মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমাদের মাথা হেঁট করে দেয়। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মাংস বিক্রেতারা জীবিকার সঙ্কটে নিমজ্জিত হবেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সেইসব কৃষকরা যারা বুড়ো অশক্ত গবাদি পশুকে বিক্রয় করে দোন। সিপিআই (এম) পলিট ব্যুরো এই দানবীয় আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। কেরালা বিধানসভায় ইতোমধ্যেই এই সর্বনাশা আইনের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সর্বনাশা আইন আসলে ধর্মীয় মেরুকরণকেই শক্তিশালী করবে। পূর্বতন বাজপেয়ী সরকারের ছিল মুখ ও মুখোশের কারসাজি, আর বর্তমান মোদি সরকারের ক্ষেত্রে একইসঙ্গে অনেক রূপ। আমরা বিপদটা কতটা অনুধাবন করতে পারছি, সেটাই হচ্ছে আসল কথা। নরেন্দ্র মোদির দ্বিচারিতা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। একদিকে গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে ‘বীর’, ‘দেশপ্রেমিক’ বানাবার অপকৌশল, অন্যদিকে গান্ধীজীর চশমার ছবিকে সামনে রেখে স্বচ্ছ ভারত অভিযান। একদিকে যেমন কর্পোরেট ক্ষেত্রের জন্য পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার শুল্প ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা, তেমনি একশোদিনের কাজ সহ বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে আনা। অতএব মোদিবাবুর সরকার যেমন সাধারণ মানুষের সুদিন আনতে পারেনি তেমনি এও নিশ্চিত গরুদের সুদিনও আসবে না। আসলে মানুষের খাদ্যাভাস তার রুচি এবং পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের এই দেশে খ্রিস্টান, মুসলমান, আদিবাসী, উপজাতি, দলিত, অরণ্যচারী, পাহাড়ী জনজাতির মানুষদের খাদ্যাভাসের রকমারি বৈচিত্রে আমরা বিস্মিত হই। সাপ, ব্যাঙ, গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বেজি, কচ্ছপ-হরেক কিসিমের পাখি, বনবিড়াল, শুকর; এমনকি পতঙ্গ পর্যন্ত বিভিন্ন অংশের মানুষের খাদ্যাভাসের সঙ্গে জড়িত। আবার দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে উত্তর ভারতের যেমন খাদ্যাভাসে পার্থক্য আছে; তেমনি পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত; আবার এইসব অঞ্চলের ভিতরও স্থানভেদে খাদ্যাভাসের বিবিধ পার্থক্য বর্তমান। কিন্তু শুধুমাত্র গরুর মাংস নিষিদ্ধকরণের ক্ষেত্রে সংঘ পরিবারের হিন্দুত্বের এজেন্ডাই সামনে আসে। ‘হিন্দু’ ধর্ম বলে যদিও হিন্দু ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ, মহাকাব্যে কোথাও স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই এবং ‘হিন্দু’ শব্দটা পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বহিঃশক্তির মানুষদের দ্বারা ‘সিন্ধু’র অপভ্রংশ হিসাবে উচ্চারিত একটি শব্দ। তদুপরি এই হিন্দু ধর্মও আবার বিভিন্ন ধরনের গুণ-কর্ম-স্বভাব-বিভাগে বিন্যস্ত। তবু ঋকবেদে গোমাংস নিষিদ্ধ নয়; বরং তা একটি বহুল প্রচলিত খাদ্য। আসলে যাযাবর আর্যদের ঋকবেদকালীন সময়ে খাদ্য নিয়ে কোনো বাছবিছারের অবকাশই ছিল না। (অধ্যাপক ডি এন ঝা) বৈদিক যুগে এবং তৎপরবর্তী সময়ে দেখা যাচ্ছে, গোমাংস যথেষ্ঠ পরিমাণে আকাঙ্ক্ষিত খাদ্য বস্তু হিসাবে মান্যতা পেত। শিক্ষক, ছাত্র, পুরোহিত, রাজা, রাজকর্মচারী, নববিবাহিত দম্পতি অতিথি হিসাবে বাড়িতে এলে নধর ষাঁড়, গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়নের রেওয়াজ ছিল এবং এই ‘অতিথি’ শব্দকে বৈদিক ভাষ্যে ‘গোঘ্ন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গো-হনন করা হয় যার নিমিত্ত। সিকিম এবং নেপালের ব্রাহ্মণরা গোমাংস আহার করতেন কেননা প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থায় আমিষ আহারের তেমন কিছু বিকল্প ছিল না। তাই ঋকবেদের দশম অধ্যায়ের (৮৫, ১৩-১৪) স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের গাভী আহারের ইচ্ছা প্রকাশ পাবার মধ্যে অন্যায় কিছু ছিল না। তৈত্তরীয় ব্রাহ্মাণে বিষ্ণু, ইন্দ্র, রুদ্র এবং সূর্যকে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন ধরনের ষাঁড় ও গাভী উৎসর্গ করা হয়েছে। সূত্র, কল্পসূত্র, গার্হস্থসূত্রে গোমাংসকে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে খাদ্য হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অশ্বমেধ এবং গোমেধ যজ্ঞ করা হতো নিশ্চয়ই শুধু বলি এবং নৈবদ্য নিবেদনের জন্য নয়, বরং প্রসাদ পাবার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাও অবশ্যই উল্লেখনীয়। ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তার ‘ধর্ম ও সমাজ’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন -‘‘প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা খাদ্য হিসাবে মাংস গ্রহণ করতেন। বৈদিক যুগে ছাগল, ভেড়া, গরু, ষাঁড় ও ঘোড়ার মাংস খাদ্য হিসাবে প্রচলিত ছিল।’’ এতসব আলোচনা করে গোমাংসের ন্যায্যতার প্রমাণ বা অপ্রমাণের সে অর্থে কোনো তাৎপর্য আজকের আধুনিক জীবনে নেই। মানুষ বেদ-উপনিষদ পড়ে জীবন চর্চা করেন তাও না, কিন্তু মানুষের মনে ধর্মবোধের একটা সুপ্ত আশৈশব ধারণা থাকে। আর ধর্ম ব্যবসায়ীরা এই জায়গাটা দখল করে কৌশলে ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতার বিষ ছড়ায়। তাই ধর্মগ্রন্থকে হাতিয়ার করেই এসব প্রশ্নগুলিকে আলোচনা করতে হয়। সংঘ পরিবারের কোনো এক উর্বর মস্তিষ্ক খাদ্যকে সত্ত, রজ ও তম - এই তিন সত্তা বিশিষ্ট হিসাবে বিভক্ত করেছেন এবং গোমাংস তারে মতে অবশ্যই তামসিক খাদ্য। এবং এই তামসের প্রভাবেই নাকি বর্তমান জনজীবনের মূল্যবোধ কলুষিত হচ্ছে। যদিও সারা পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত সব থেকে বেশি সংখ্যক নিরামিষাশি বসবাস করেন ভারতবর্ষেই। এত ব্যাপক সংখ্যায় নিরামিষাশি থাকার পরেও শুধুমাত্র গতকয়েক বছরে নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং নৃশংসতায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য বিষয়ক নীতি বলছে, সস্তায় পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে গোমাংস অবশ্যই একটি বিকল্প হতে পারে। যদিও যার যেমন রুচি, সংস্কার সেই অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করতে কোনো বাধা থাকা উচিত নয় এবং এই অধিকার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারও বটে। এক্ষেত্রে খাওয়া এবং না খাওয়ার অধিকার দুটোই একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য বক্তব্যে বিষয়বস্তুর সমালোচনা করতে গিয়ে যারা তির্যক মন্তব্য করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলা প্রয়োজন যে -হ্যাঁ, খাওয়ার দুটো অধিকারই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটা আর একটার থেকে ছোট বা বড়ো নয়। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাই আমাদের সকলকেই সাবধান ও সচেতন হতে হবে। হ্যাঁ, সকলকেই! এই লড়াইয়ে নামার সময় আমাদের নিজেদের সামনেও ধরতে হবে আয়নাটা। এই আয়না হচ্ছে আমাদের জীবন দর্শন, আমাদের মতাদর্শ। চোখ, কান, মন খোলা রেখে দেখতে হবে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা আমাদের সমাজের মর্মমূলে কিভাবে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার ফল্গু নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সম্প্রতি বেশকিছু সময় ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, শারদোৎসবের বিভিন্ন কমিটির কর্মকর্তা হচ্ছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীর মানুষরা। এঁরা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। আন্তরিকভাবেই তারা অংশগ্রহণ করছেন শারদোৎসবে। একইভাবে হিন্দু সন্তানরাও মুসলমান বন্ধুর বাড়ির উৎসবে-পার্বণে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু হজরত ইব্রাহিম এবং হজরত ইসমাইলের সর্বোত্তম ত্যাগের আদর্শে প্রাণিত কোরবানির উৎসবে আজ যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ উৎকণ্ঠিত হন, ব্যথার্ত হন, অভিমানী হন, তাহলে উৎসবের আনন্দে জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ হবে না। ছাগল একটা বিকল্প অবশ্যই, তবে দামের নিরিখে তা বেশ চড়া। অধিকন্তু তিন হক আদায়ের পরে গেরস্থের পাতে মাংস থাকবেইবা কতটা! কারণ অধিকাংশ গরিব মুসলমান পরিবারের পক্ষে দুম্বা খাসি বা উট সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, এমনটা নয়। মানুষের ঐক্য বিঘ্নিত হবে। একবার দেশটা ভেঙেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের অশ্রু, রক্তপাত, অভিমান, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের রাস্তা মাড়িয়ে আমরা এসেছি। তাই আমরা অবশ্যই চাইব — ‘‘ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি দাও আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’’। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যেন কোনভাবেই ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প না ঢোকে। এখানে অবশ্যই একটা কথা উল্লেখ করা দরকার, আর তা হল মুসলমান মাত্রই যেমন গোমাংস আহার করেন না, তেমনি আমাদের পরিচিত অনেক হিন্দু সন্তানও গোমাংস তৃপ্তি করে খান। অর্থাৎ শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকেও ব্যক্তিগত খাদ্যাভাসের একটি সর্বজনীন অধিকার অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যদি হয় জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ তাহলে সেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আমাদের আবার নতুন করে মানবতার অন্বেষণ জরুরী। আমাদের সমাজজীবনের ভিত্তিমূলে যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের রঙিন বর্ণমালা খোদাই করা আছে, তার পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজন। মনস্বী অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী সদর মফস্বলের আখ্যানে বিবৃত করেছে সেরকমই একটি মন ভালো করে দেওয়া শ্যামল কাহিনী। নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে নদীয়া জেলার অখ্যাত একটি গ্রাম চারাতলা সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল। গ্রামে ৮০০ ঘর মুসলমান এবং মাত্র এক ঘর হিন্দুর বাস। হিন্দু পরিবারটি জাতিতে কর্মকার। কাস্তে, কাঁচি, বঁটি, দা-কোদাল, গরুর গাড়ির চাকার লোহার বেড় দেওয়া ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। মুসলমান প্রধান গ্রামে হিন্দু পরিবারটি সম্প্রীতি ও সৌভ্রাত্বের আবহেই বসবাস করতো। উল্লেখ্য, এই যে মুসলমানরা সাধারণত হাপর দিয়ে কামারের কাজ তেমন জানে না। এমতাবস্থায় একদিন কর্মকার পরিবারের কর্তা কিছুদিন রোগভোগের পর নাবালক সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে প্রয়াত হন। এইরকম বিপদের দিনে ঐ হিন্দু পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়ায়, সাধ্যমতো গ্রামের সকলেই। মুসলমান ধর্মের এই গ্রামীণ মানুষেরা চাঁদা তুলে কর্মকারের মৃতদেহ যথাযথ সম্মান-মর্যাদা সহকারে হরিধ্বনি দিয়ে নবদ্বীপ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করে। গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে নিয়ম মতো শ্রাদ্ধশান্তি সহ কীর্তনের সমস্ত আয়োজন দাঁড়িয়ে থেকে সংগঠিত করে। লোকায়ত জীবনের মরমী গবেষক সুধীরবাবু তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হরিধ্বনি দেওয়ার সময় কোনো সংকোচ, আড়ষ্টতা হয়নি! উত্তরে একজন প্রায় নিরক্ষর বৃদ্ধ মুসলমান এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘‘দেখুনবাবু আমরা ধর্মের দিকটা ভাবিনি... আমরা শুধু আমাদের গাঁয়ের ছেলেটার গঙ্গার কথা ভেবেছি... তাতে আল্লা কোনো গোস্তাকি নেবেন না।’’ আসলে সাধারণ আমজনতার ধর্মবোধ অত্যন্ত সহজ সরল নির্বিরোধী, যেখানে ধর্মান্ধতার কোনো স্থান নেই। কিন্তু কি করে একটি অতি সাধারণ গ্রামীণ জীবনে এইরকম উদার সমন্বয়বাদী ভাবধারা বিকশিত হতে পারে - সুধীরবাবুর দরদী জিজ্ঞাসু মন সে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিল। ‘‘আসলে এই গ্রামের প্রায় সবাই সাহেবধনী লোকধর্ম সম্প্রদায়ের শিষ্য। আঠারো শতকের শেষে চরণ পাল নামে এক নিম্নবর্গের মানুষ হিন্দু মুসলমানকে একত্র করে এক উদার সমন্বয়বাদী সেকুলার ধর্ম ধারণার পত্তন করেছিলেন। এদের উপাস্য আল্লাও নয়, হরিও নয়। এদের উপাস্য দীনদয়াল। যারা এই ধর্মে দীক্ষিত তারা বাহ্যত হিন্দু-মুসলমান ধর্মের আচরণ পালন করেন, কিন্তু বিশ্বাসে তারা সেকুলারবাদী। ‘দীনদয়ালের ঘরে’ হিন্দু গুরুর যেমন মুসলমান শিষ্য থাকে, তেমনি মুসলমান গুরুর হিন্দু শিষ্যও থাকে।’’ এই লোকধর্মের মানবিক শিক্ষার কথাই বলে গেছেন কবীর লালনসহ লোকায়ত জীবনের বিশিষ্ট দার্শনিকরা। আজ শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই আমাদের আত্তীকরণ করতে হবে নিম্নবর্গের মানুষের এই সমন্বয়বাদী চেতনাকে। নদীয়ার অখ্যাত গ্রাম চারাতলা। যেখানে কোনো পাঠাগার নেই, সাকুল্যে দুটি সংবাদপত্র আসে। প্রাইমারি স্কুল একটি, তবে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। চাষ আবাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ধুলো কাদার মানুষগুলো চারাতলা গ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব পালন করেছে অনায়াসে, কোনো ভনিতা ছাড়াই। ধর্ম আর অধর্মের মাঝে আজ আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই দানবীয় আইনের বিরুদ্ধে, ধর্মসম্প্রদায়গত মেরুকরণের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের চেতনাকে কিভাবে অগ্রবর্তী করতে পারবো। নব্বইয়ের দশকে রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে যখন গোটা দেশটাই ঝলসে যাচ্ছিল, তখন সমাজের গভীরে ক্রিয়াশীল ছিল মানবিক সম্পর্কের এইরকম হাজারো আখ্যান। আসলে মানুষের সমাজে মানুষই হচ্ছে কেন্দ্রীয় বিষয়; গরু নয়। এবং গরু জানেও না, গরুকে নিয়ে এবং বিধ তৎপরতা শুরু হয়েছে যাতে করে মানুষের ঐক্য বিঘ্নিত হয়। তাই গরু এখানে উপলক্ষ্য; অন্য আরো বহুবিধ বিষয়কে সামনে এনে মানুষকে ভাগ করার ষড়যন্ত্র চলবে। আমরা সচেতন হব, সাবধান হব। কারণ দেশটা আমাদের, সংবিধানের উৎস হচ্ছে এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। আমাদের স্বাধীন রুচি এবং খাদ্যাভাসের অধিকার আমরা কেড়ে নিতে দেব না। আজ যদি আমরা প্রতিবাদে সামিল না হই তাহলে আগামীদিনে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মচারণ, মত প্রকাশ ইত্যাদি মৌলিক অধিকারও বিপর্যস্ত হবে। কেননা আমরা জানি, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পায় না’। কান্তি গাঙ্গুলি: ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মী

ফ্রান্সে অন্ধদের জন্য চলচ্চিত্র উৎসব

সিনেমা হলের আলো-আঁধারির রোমাঞ্চর অনুষ্ঠান কেবল চক্ষুষ্মানরা উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু চোখের আলো থেকে বঞ্চিত হতভাগ্য অন্ধদের জন্য তা অকল্পনীয়। তবে এবার সেই আনন্দ দৃষ্টিহীনদের জন্যও এনে দিয়েছে ফ্রান্সের চলচ্চিত্র উৎসব। প্যারিসে আয়োজন করা হয়েছে ‘অন্ধদের জন্য চলচ্চিত্র উৎসব’।
পুরোপুরি অন্ধ কিংবা আধা-দৃষ্টিহীন দর্শকরা এতে যোগ দিয়েছেন। বুধবার শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। শুক্রবার এএফপি এক প্রতিবেদনে জানায়, থিয়েটারে বসানো হয়েছে বড় পর্দা। প্রতিটি দর্শকের কানে লাগানো রয়েছে অডিও ভিজ্যুয়াল হেডফোন। এই হেডফোনে বিশেষ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অ্যাকশনগুলোর ‘সিনক্রোনাইজ ডেসক্রিপশন’ শুনতে পাবেন তারা। সাড়ে নয় বছরের একজন অন্ধ কিশোর ফাবিও বলেন, ‘আমি দৃশ্য কল্পনা করি এবং অনুভব করি যেন আমি ছবি দেখছি।’

জুনের মধ্যে চূড়ান্ত ইরান চুক্তি

আগামী জুনের শেষ নাগাদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হোয়াইট হাউস থেকে শুক্রবার দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
প্রেসিডেন্ট ওবামা পরমাণু চুক্তি করার ব্যাপারে ‘আত্মবিশ্বাসী’। ওবামা বলেছেন, সব কংগ্রেস নেতাদের অবিশ্বাস দূর করতে এর মধ্যে তিনি কাজ শুরু করে দিয়েছেন এবং তিনি সফল হবেন। শনিবার বিবিসি এ খবর দিয়েছে। তবে বিরোধী রিপাবলিকানদের বিশ্বাস, চুক্তিটি অন্যদিকে যেতে পারে।

কনে বাল্যবান্ধবী রায়না কি শাদি

ভারতের রাজধানী দিল্লির চাণক্যপুরি অঞ্চলের পাঁচতারা হোটেল দ্য লিলা প্যালেস। সুরেশ রায়না-প্রিয়াংকা চৌধুরীর বিয়ের মণ্ডপ। শুক্রবার ভারতের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাবলীর মধ্যে ‘রায়না কি শাদি’ ছিল একনম্বরে, যে শাদির অনুষ্ঠানে শুক্র-সন্ধ্যায় সস্ত্রীক ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি হাজির হন। ছিলেন সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের অন্যতম তারকা শিখর ধাওয়ানের পাশাপাশি রায়নার প্রিয় বন্ধু, ভারতীয় দলের সাবেক পেসার আরপি সিং, ইশান্ত শর্মা ও মোহাম্মদ সামি এবং অবশ্যই জুটিতে বিরাট-আনুশকা।
আইপিএল আটের পর রায়না-দম্পতি মধুচন্দ্রিমায় যাবেন মিলানে। যে দেশে বলতে গেলে ক্রিকেটের নামগন্ধ নেই, সেই ইতালি কেন সুপারস্টার ক্রিকেটারের মধুচন্দ্রিমার স্টেশন? হতেই পারে রায়নার স্ত্রী ক্রিকেটের চেয়ে বেশি ফুটবলভক্ত বলে! তবে চারবারের ফুটবল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেশের কেউ নন, প্রিয়াংকার ফেভারিট ফুটবলার হলেন লিওনেল মেসি এবং রবিন ভ্যান পার্সি। ক্রিকেটে নাকি তেমন আগ্রহই নেই রায়না-পত্নীর! কে বলতে পারে মিলানে মধুচন্দ্রিমার ফাঁকে এসি মিলান কিংবা ইন্টার মিলানের ম্যাচে মাইকেল এসিয়েন বা ‘অ্যালপাইন মেসি’ জারদান শাকিরি দেখতে গেলেন প্রিয়াংকা! নিজের বিয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও রায়না বললেন, ‘বিরাট-আনুশকা তো আমার কাছে একরকম আবদারই জুড়েছে যে, এবার আইপিএলে স্ট্যান্ড থেকে আমার জন্য গলা ফাটাক প্রিয়াংকা। কিন্তু সেটা বোধহয় হচ্ছে না।
আইপিএলের সময় ও তো নেদারল্যান্ডস ফিরে যাচ্ছে। ওখানকার ব্যাংকে ওর চাকরিতে বেশি দিনের ছুটি পায়নি।’ দু’জন বাল্যবন্ধু হলেও দেখা-সাক্ষাৎ প্রায় ছিল না বললেই চলে। সাত বছর আগে ২০০৮-এ একবার মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য রায়না-প্রিয়াংকার দেখা হয়েছিল। তাও এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে। প্রিয়াংকা যাচ্ছিলেন নেদারল্যান্ডসে নিজের কর্মস্থলে। আর রায়না চেন্নাইয়ে সিএসকের প্রস্তুতি শিবিরে। এরপর দু’জনের ফের চাক্ষুষ দর্শন এ বছরই। এই সেদিন বিশ্বকাপ শেষে। আধঘণ্টার জন্য। তারপর নিজেদের বিয়ের মণ্ডপে! রায়নার বিয়ের পুরো ব্যাপারটা দেখভাল করেছেন তার মা। রায়নার মায়ের সঙ্গে প্রিয়াংকা-পরিবারের বরাবরের ঘনিষ্ঠতা। অস্ট্রেলিয়ায় রায়নার সাম্প্রতিক থাকার একদিন তার মা সটান মোবাইলে জানিয়ে দেন, তোমার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে। প্রিয়াংকার সঙ্গে। সেলিব্রিটি ছেলে কোনো আপত্তি করেননি। তবে বাইশ গজে তার ব্যাটের মতোই বিয়েতেও রায়না ইম্প্রোভাইজেশন দেখালেন যেন! নিয়ম মতো তাদের পরিবারের সব বিয়েতে বরের মামা ঘোড়ার পিঠে ভাগ্নেকে চাপিয়ে বিয়ের আসরে নিয়ে আসেন। পারিবারিক সেই প্রথা কিন্তু ভেঙে দিয়ে সুরেশ রায়না ঘোড়ার পিঠে চেপে বিয়ে করতে আসেননি! ওয়েবসাইট।

নতুন ‘রাজনীতি’ সিটি নির্বাচন, কী পাবে ঢাকাবাসী? by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কারা প্রার্থী হচ্ছেন, কারা পাচ্ছেন সরকারি দলের সমর্থন? বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে তো? অবরোধ-হরতালের মতো আন্দোলন অব্যাহত রেখে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কৌশলটি কী? তাদের চূড়ান্ত প্রার্থীই বা কারা হবেন? এসব বিষয়ে আগ্রহ ও প্রশ্নের মধ্যেই এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে ঢাকাবাসী। বিএনপির সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর এ নিয়ে ‘রাজনীতি’ আরও জমে উঠেছে বলেই মনে হয়। ‘অরাজনৈতিক’ এই নির্বাচনের ‘রাজনৈতিক’ দিকই ঘুরেফিরে আলোচনার বিষয়। কিন্তু এই নির্বাচন থেকে আমরা ঢাকাবাসী কী পাব বা আদৌ কিছু পাব কি না—এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না।
ঢাকা নিয়ে ‘রাজনীতিই’ যে রাজনৈতিক দল ও সরকারগুলোর কাছে আসল, সেটা এত দিনে প্রমাণিত। ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ নির্বাচন হয়েছে ২০০২ সালে। এরপর এত দিন কেন নির্বাচন হয়নি? এর পেছনে কাজ করেছে রাজনীতি ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। নিজেদের একজনকে মেয়র নির্বাচিত করে তাঁর মাধ্যমে ঢাকাকে সব সময় সরকারগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ঢাকার উন্নয়ন, এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বা সেবার বিষয়গুলো আদৌ কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। ব্যবস্থাপনার সুবিধা হবে—এই দোহাই দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা শহরকে দুই ভাগে ভাগ করলেও এ ধরনের একটি নজিরবিহীন কাজের পেছনে যে বিষয়টি মুখ্য ছিল, তা আসলে ঢাকার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এটা পরিষ্কার যে ঢাকা সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠান, সরকারি দলের প্রার্থী বাছাই, তাঁর জয়লাভের সম্ভাবনা—এসব হিসাব-নিকাশ মেলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বিশ্বের বড় ও পুরোনো কোনো শহরের ক্ষেত্রে এমন নজির নেই। একক সিটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঢাকার চেয়ে বড় ও জনবহুল শহরগুলো চলতে পারলে ঢাকা কেন চলবে না?
আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা ভাগ করেছে সেই ২০১১ সালে। এর পরও দীর্ঘদিন সিটি নির্বাচন হয়নি। কেন? পরিষ্কার কারণটি হচ্ছে, সরকার চায়নি। সীমানা নিয়ে জটিলতার দোহাই দিয়ে এই নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। এখন যখন সরকারের মনে হয়েছে যে নির্বাচন করতে হবে, তখন সব বাধাই কেটে গেল। সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই তো মনে হচ্ছে দেশের আইন! এখন কেন নির্বাচন অনুষ্ঠান জরুরি হয়ে পড়ল? প্রথমত, বিরোধী দলের অকার্যকর হয়ে পড়া লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সরকারের নানা ধরনের দমন-পীড়নে বিরোধী বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপি সাম্প্রতিক লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির মতো ভুল রাজনৈতিক কৌশল এবং তা কার্যকর করতে গিয়ে নাশকতা, সন্ত্রাস ও বর্বরতার পথ ধরায় দলটির বিরুদ্ধে সরকারের দমন-পীড়ন বাড়িয়ে দেওয়ার কাজটি সহজ হয়ে যায়। বিএনপিকে ছিন্নভিন্ন করতে এই সুযোগকেই কাজে লাগায় সরকারি দল। বিএনপির বড় নেতাদের প্রায় সবাই এখন জেলে, অন্যদের বেশির ভাগই পালিয়ে আছেন। দলটির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ যে কায়দায় হাওয়া হয়ে গেলেন, তা দলের মধ্যে আতঙ্ক ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন একটি পরিস্থিতিতে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ বিএনপিকে চূড়ান্ত বেকায়দায় ফেলার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।
বিএনপির টানা অবরোধের প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এই দফার আন্দোলন যে ব্যর্থ হয়েছে, সেটা পরিষ্কার। এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটি বা চট্টগ্রাম সিটির নির্বাচন নিয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া বিএনপির জন্য সত্যিই কঠিন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছিল এমন মত নানা মহলেই জোরালো। এর এক বছরের মাথায় বিএনপি যখন সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দিয়ে ফেলেছে, তখন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক হবে, সেটা দলটির জন্য অবশ্যই একটি বড় ভাবনার বিষয়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এই নির্বাচনকে বিএনপির জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। কারণ, এতে ব্যর্থ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং বিএনপির ‘মুখরক্ষার’ একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিএনপি এতটা সরলভাবে বিষয়টিকে বিবেচনা করবে বলে মনে হয় না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বিবেচনা করে এর ‘খেসারত’ হিসেবে সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক ভুল করে বসে কি না, সেটা অবশ্যই তাদের বিবেচনার মধ্যে থাকবে।
----২.
ঢাকা সিটির নির্বাচন নিয়ে এসব নানা ‘রাজনৈতিক’ পাল্টাপাল্টি কৌশলে কোন পক্ষ কীভাবে লাভবান হবে বা কোন পক্ষকে কোণঠাসা করা যাবে, সেটা সামনে টের পাওয়া যাবে। কিন্তু শুরুতেই যে প্রসঙ্গ তুলেছি, সেই সূত্রে এই প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক যে এই নির্বাচন থেকে কী পাবে ঢাকাবাসী? সহজ উত্তর; ঢাকার দুই অংশে দুজন নির্বাচিত মেয়র। কিন্তু এই মেয়ররা আমাদের কী দেবেন বা কী দিতে পারবেন?
ঢাকার দুই অংশে মেয়র নির্বাচিত হয়ে যাঁরা আমাদের ‘সেবা’ করতে চান, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র কিনেছেন, জমাও দিয়েছেন। এই প্রার্থীদের অনেকের মুখে আমরা কিছু প্রতিশ্রুতির কথা শুনেছি। সাধারণভাবে তাঁরা একটি ‘আধুনিক ঢাকা’ উপহার দেওয়ার কথা বলেছেন। মনে প্রশ্ন জাগে, আধুনিক ঢাকা বিষয়টি আসলে কী? একটি আধুনিক শহরের যেসব সুযোগ-সুবিধা বা ব্যবস্থা থাকে, তা ঢাকায়ও তাঁরা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করবেন? ঢাকায় যথাযথ গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠবে, চাইলেই বাসে ওঠা যাবে বা পাওয়া যাবে ট্যাক্সিক্যাব? যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খল দশা দূর হবে, বাস নির্দিষ্ট জায়গায় থামবে, উল্টো পথে গাড়ি চলবে না, অসহনীয় যানজটে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে না, ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী হবে, পথে-ঘাটে অবর্জনার স্তূপ জমে থাকবে না, বর্ষায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে না, শহরের খাল, পার্কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, সাইকেলের জন্য আলাদা লেন থাকবে। বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রায় থাকবে, শব্দদূষণ বলে কিছু থাকবে না, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ—এসবের নিশ্চয়তা থাকবে? এই তালিকা আরও দীর্ঘ করা যায়, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বর্তমান দশা থেকে কিছু উন্নতি করা গেলেই সম্ভবত ঢাকাবাসী আনন্দে আটখানা হয়ে যাবে।
আমাদের যে মেয়ররা নির্বাচিত হবেন বা তাঁদের হাতে যে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পড়বে, তাঁরা কি এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবেন? এসব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার জন্য যে শক্তিশালী নগর কর্তৃপক্ষের দরকার, সেই কাঠামো কি সিটি করপোরেশনগুলোর রয়েছে? ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সিটি করপোরেশনে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে একটি ‘মেট্রোপলিটন সরকার’ করার দাবি জানিয়ে হয়রান হয়েও কিছুই করতে পারেননি। কারণ, সরকারগুলো আসলে ঢাকার ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায় কিন্তু ঢাকার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ দেখতে চায় না।
ঢাকার নানা দিক দেখার জন্য সরকারের কর্তৃপক্ষের অভাব নেই। দুই সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ট্রাফিক পুলিশ, রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ঢাকা ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ, পূর্ত মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা সেতু কর্তৃপক্ষ—এ ধরনের আরও যেসব প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ রয়েছে, এগুলোকে সমন্বয় করবে কে? একটি শহর দেখভাল, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা বা শহরটি নিয়ে পরিকল্পনা করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ থাকলে কাজটি সহজ হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু একক কর্তৃপক্ষ তো দূরে থাক, ঢাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পরিস্থিতি যেন আরও শোচনীয় করা হয়েছে। যে দুজন ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হবেন, তাঁরা আন্তরিকভাবে চাইলেও আদৌ কিছু করতে পারবেন কি?
ঢাকার দেখভালের জন্য কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই, আবার ঢাকার নানা দিক দেখে যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, এগুলোর মধ্যে সমন্বয় করার কোনো কাঠামো বা কর্তৃপক্ষও নেই। এখন ধরুন, যেখানে-সেখানে বাস থামানো বা এ ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্য সিটি করপোরেশন ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় অভিযান শুরু করল, তখন যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠনের পরিবহন শ্রমিকেরা মাঠে নামবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? অথবা যে মন্ত্রী-সাংসদেরা উল্টো পথে গাড়ি চালান, তাঁদের ঠেকানোর বুদ্ধি কী? ঢাকার জন্য একক শক্তিশালী কোনো কর্তৃপক্ষ বা অন্তত একটি সমন্বয় কর্তৃপক্ষ থাকলে সেখানে এসব প্রসঙ্গ আলোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হতো। গত বিএনপি সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ঢাকাসংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি কাঠামো থাকলেও বর্তমানে তেমন কিছু নেই।
চার বছর ধরে ঢাকা বিশ্বের বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তালিকায় ১ ও ২ নম্বরের মধ্যে ওঠানামা করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার একটি জরিপ করে আসছে। ২০১২ সালে ঢাকা হয়েছিল বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শহর। ২০১৪ সালে এক ধাপ ওপরে উঠে ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জায়গা হয়েছে ১৩৯ নম্বরে। ঢাকার চেয়ে খারাপ শহরটি হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, যেখানে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। বাসযোগ্যতার এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ইআইইউ পাঁচটি ক্ষেত্রের ৩০টি দিক বিবেচনায় নেয়। এগুলো হচ্ছে: ১. স্থিতিশীলতা, ২. স্বাস্থ্যসেবা, ৩. সংস্কৃতি ও পরিবেশ, ৪. শিক্ষা, ৫. অবকাঠামো। একটি শহরের এই দিকগুলোর দেখভাল, ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী মেট্রোপলিটন সরকার বা এ ধরনের কোনো কাঠামো। কিন্তু উল্টো ঢাকাকে ভাগ করা হয়েছে, এখন হয়তো ঢাকা দুজন মেয়র পাবে কিন্তু এর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার কাজটি সম্ভবত আরও জটিলই হবে।
সরকার সাফল্যের সঙ্গে সিটি নির্বাচনকে রাজনীতির নতুন বিষয়ে পরিণত করে সবাইকে মশগুল করে ফেলেছে। ঢাকা শহরটির আদৌ কী হবে, তা আগের মতো বিবেচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

তিনজনের চেষ্টায় ধরা পড়ল ওরা দুজন

রফিক হোসেনের এক হাত ভাঙা। কাঠ দিয়ে বেঁধে প্লাস্টার করা। নাশতার টেবিল থেকে ছুট লাগিয়েছিলেন তিনি। নাশকতাকারী ভেবে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শাহীন মিয়া ছুটেছিলেন খুনিদের ধরতে। হাজারো মানুষের মধ্য দিয়ে যখন খুনিরা ছুটে পালাচ্ছিল, পেছন থেকে রফিক আর শাহীন মিয়ার ‘ধর ধর’ চিৎকারেও কেউ এগিয়ে আসছিলেন না, তখনই শুধু দুই হাত দিয়ে তাদের আটকে দেন হিজড়া লাবণ্য। গত ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুরকে হত্যার পর পালাতে থাকা দুই জঙ্গি আরিফুল ইসলাম ও জিকরুল্লাহকে ধরতে এই তিনজনেরই ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে আলোচিত। ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে গতকাল শনিবার বেগুনবাড়ীর দীপিকার মোড়ে চায়ের দোকানে অপেক্ষা করছিলাম রফিক হোসেনের জন্য। গলির মাথায় রফিককে দেখে একসঙ্গে দু-তিনজন বলে উঠলেন, ‘ওই যে রফিক ভাই।’ জিজ্ঞেস করলাম, সবাই রফিককে চেনেন কি না। এক নারী বললেন, ‘ও তো আমাগো সাকিব খান। এক হাতেই কত বড় জঙ্গি ধাওয়াইছে।’ তবে রফিক আর তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত এলাকাবাসী। হিজড়া লাবণ্যর জন্যও তাঁর সহযোগীরা গর্বিত, একই সঙ্গে শঙ্কিতও। লাবণ্যকে চোখে চোখে রাখছেন তাঁরা। আর হাতেনাতে খুনিদের ধরে পুলিশকে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচানোর কৃতিত্ব শাহীন মিয়ার।
তবে দক্ষিণ বেগুনবাড়ী এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, জঙ্গিদের কে, কীভাবে ধরলেন—এসবের কৃতিত্ব নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পুলিশ না জনতা, লাবণ্য না রফিক—এসব নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন পক্ষের ভাষ্য ছাপিয়েছে। তবে সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, ভাঙা হাত নিয়েই জঙ্গিদের প্রথম ধাওয়া শুরু করেন রফিক। হোঁচট খেয়ে উল্টেপাল্টে পড়ে গিয়েও তিনি থামেননি। সেই রফিকের গল্প থেকেই শুরু করা যাক।
কাভার্ড ভ্যানের চালক রফিক হোসেনের বাঁ হাত কয়েক মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায়। সোজা করতে কাঠের সঙ্গে ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে হাতটি। হাত অচল, তাই বেকার রফিক। ৩০ মার্চ সকালে সেই অচল হাতটি গামছা দিয়ে ঢেকে মোড়ের দোকানে নাশতা করতে এসেছিলেন তিনি। হঠাৎই শোনেন ‘মাইরা ফালাইল, মাইরা ফালাইল’ বলে নারীকণ্ঠের চিৎকার। পাতে নেওয়া পরোটা ফেলে রফিক দৌড় দেন। গিয়ে দেখেন ওয়াশিকুরের রক্তাক্ত লাশ পেছনে ফেলে তিন তরুণ সজোরে হেঁটে মূল সড়কের দিকে যাচ্ছে। ‘ধর ধর’ চিৎকার দিয়ে রফিক ধাওয়া করা শুরু করলেন। ওই তরুণেরা দৌড়াতে শুরু করলে রফিকও পেছনে পেছনে দৌড় শুরু করেন। এবার চিৎকার করতে থাকেন ‘ডাকাত ডাকাত’। দীপিকার মোড় পেরিয়ে হোটেল আজমিরের সামনে তখন পুলিশের একটি দল অবস্থান করছিল। পুলিশ দেখে জঙ্গি তিন তরুণও ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে পুলিশকে পেরিয়ে গেলে রফিক পুলিশ সদস্যদের তাদের ধরার জন্য ছুটতে বলেন। তখন একজন পুলিশ সদস্য বলেন, ‘তুই ডাকাইত ডাকাইত চিল্লাস, হ্যারাও (তিন জঙ্গি) চিল্লায়।’ তখন রফিক ও অন্যরা আশ্বস্ত করেন যে আগে ধরা হোক, পরে সাব্যস্ত হবে কে ডাকাত। তখন পুলিশও দৌড়াতে শুরু করে। তখন সহকারী উপপরিদর্শক শাহীন মিয়া ও তাঁর পেছনে আরেক পুলিশ সদস্য দৌড়াতে থাকেন।
এএসআই শাহীন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, টহল ডিউটির মাঝে আজমিরের সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে পান খাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ দেখেন পেছন থেকে কয়েকটি ছেলে দুটি ছেলেকে ধাওয়া করছে। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছি হয় শিবির, নাইলে নাশকতাকারী কিছু একটা হবে। অস্ত্র-গোলাবারুদও থাকতে পারে। পেছন থেকে ওরা বলতাছে ডাকাত ডাকাত। তারপর আমিও দৌড় দিলাম।’
রফিক বলেন, পুলিশ দৌড় শুরু করার পরে সাতরাস্তার মূল সড়ক দিয়ে মগবাজারের দিকে দৌড়াতে থাকে জঙ্গিরা। এফডিসি সিগন্যালের আগে উত্তরা সেন্টারের সামনে গিয়ে তারা ধরা পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমি কিছু না ভাইবাই দৌড়াইতাছি। হঠাৎই চিকনাটা (আরিফুল) ব্যাগ থিকা চাপাতি বাইর করল। এই সময় ওই হিজড়ারা হ্যাগো থামায়।’
হিজড়া লাবণ্য প্রথম আলোকে বলেন, মগবাজার যাওয়ার জন্য উত্তরা সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিসহ তিনজন। এ সময় দেখেন, লোকজন দুই তরুণকে ধাওয়া করছে আর ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার করছে। রাস্তা তখন যানজটে থমকে আছে, কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছে না তাদের ধরার জন্য। এ সময়ই লাবণ্য পেছন থেকে দুজনকে ধরে ফেলেন। দুজনের গেঞ্জির পেছনের অংশ ধরে তাদের আটকে দেন লাবণ্য। তখন ওরা হাঁপাচ্ছিল। ওই দুজন নিজেদের ছাড়ানোর জন্য পেছনে ঘুরে কিল-ঘুষি মারলেও লাবণ্য ছাড়েননি। পরে পুলিশ ও জনতা এসে তাদের ধরে নিয়ে যায় বলে লাবণ্যর দাবি। এ ঘটনার পরে ভয় পেয়ে লাবণ্য এলাকা ছেড়ে তাঁর কাজে চলে যান।
এএসআই শাহীন মিয়া বলেন, ‘দৌড়াতে দৌড়াতে উত্তরা সেন্টারের সামনে চলে এলাম। আমি খালি চিল্লাইতাছি—ধরেন ধরেন। রাস্তায় অনেক মানুষ, কিন্তু কেউ ধরে না। এ সময় একজন ব্যাগ থেকে চাপাতি বাইর করল। তখন ওইখানে কয়েকজন হিজড়া ছিল। একজন সাহস করে দুই হাতে ওদের আটকানোর চেষ্টা করলে ওরা বাধা পায়া পইড়া যায়। চাপাতিটাও রাস্তায় পইড়া যায়। পরে আমি গিয়া চাপাতিটা কুড়ায় নিয়া কনস্টেবলের হাতে দিলাম। দুইজনরে ধরলাম। পরে লোকজনে কইল, ওরা মার্ডার কইরা পালাইতাছিল। আমি ওসি স্যাররে জানাইলাম।’ তিনি জানান, দৌড়ানোর সময় তাঁর কোমরে একটি পিস্তল ছিল। আর তাঁর পেছনে কনস্টেবলের হাতে ছিল শটগান।
রফিক বলেন, ‘রাস্তার মইদ্দে তহন মেলা লোক, কেউ আগায় না। ৮-১০ জন থাকলে তিনজনরে ধইরা এইহানেই কব্বর দিয়া দিতাম। মানুষডারে পশুর মতো মারছে।’
স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, যে ব্যবসায়ীরা ও বাড়ির বাসিন্দারা ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁরা এখন কেউ কোনো কথাই বলছেন না। এমনকি ঘটনার পর থেকে নিয়মিত দোকানও খুলছেন না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণমাধ্যমের কর্মীরা খোঁজখবর করতে যান। আর সবাই তথ্যের জন্য দেখিয়ে দেন রফিককে। এখন রফিকের পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
তবে রফিক বলেন, ‘এহন সবাই আমারে দেখায় দেয়। একটা লোক কুনো কথা কয় না। তয় আমি কাউরে ভয় পাই না। খুনি ধরতে গিয়া আমার লুঙ্গি ছিঁড়ছে, কোচায় ৩৬০টা ট্যাকা ছিল, তাও গেছে। এহন আবার মাইনষে কয় হ্যারা (জঙ্গিরা) নাকি ব্যাপক শক্তিশালী, সরকারও নাকি হ্যাগো লগে পারে না। খালি সরকাররে কন, আমি যেন আমার মায়রে নিয়া দুইডা ডাইল-ভাত খাইয়া বাঁইচা থাকপার পারি। আর কিছু চাই না আমি।’
লাবণ্যর জন্য চিন্তিত তাঁর সহযোগীরা। তাঁর গুরুমা স্বপ্না বলেন, লাবণ্যর জন্য হিজড়া সমাজ গর্বিত। কিন্তু হিজড়ারা পথেঘাটে টাকাপয়সা সংগ্রহ করে চলেন। এ অবস্থায় তাঁরা সবাই লাবণ্যর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। স্বপ্নার দাবি, ‘এখন সময় এসেছে হিজড়াদের মূলধারায় নিয়ে আসার। আমাদের লাবণ্য দেখিয়ে দিয়েছে।’

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথেই যেতে হবে

ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে (বাঁ থেকে) বিয়াকের
প্রধান নির্বাহী তৌফিক আলী, আইনজীবী রফিক-উল হক; আইনমন্ত্রী
আনিসুল হক, বিয়াকের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, আইনজীবী
ড. কামাল হোসেন, ট্রান্সকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান
এবং রাজা অ্যান্ড টানের আঞ্চলিক প্রধান ফ্রান্সিস জেভিয়ার
মামলা-মোকদ্দমা ব্যবসায়ের স্বার্থের পরিপন্থী। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের তাই নিজেদের স্বার্থেই মামলা-মোকদ্দমার পরিবর্তে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ বেছে নিতে হবে। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক) ও রাজা অ্যান্ড টান সিঙ্গাপুর এলএলপির যৌথ আয়োজনে রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ায় আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি বৃদ্ধি’ শীর্ষক সেমিনারে এমন অভিমত উঠে আসে। সেমিনারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রধান অতিথি ছিলেন। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন রাজা অ্যান্ড টানের ডিসপুট রেজুলেশন বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ফ্রান্সিস জেভিয়ার, ভি বালা সুব্রামানিয়াম এবং আইনজীবী¯সামির সাত্তার। বিয়াক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সেমিনারে সঞ্চালনা করেন। বক্তব্য দেন বিয়াকের প্রধান নির্বাহী তৌফিক আলী।
সেমিনারে সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান, কে এম হাসান, সৈয়দ জে আর মুদাসসির হোসেন, মো. তোফাজ্জুল ইসলাম, মোফজলুল করিম, বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, আওলাদ আলী, বিশিষ্ট আইনজীবী ড.¯কামাল হোসেন, রফিক-উল হক ও জিয়াউর রহমান খান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মাহবুব জামিল, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী ও রোকিয়া আফজাল রহমান, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ ও ফিদা এম কামাল, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহাজাহান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পুলিশের ফাইলবন্দি

একটি মামলায় ২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. মনির হোসেন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার একটি উপজেলার নেতা তিনি। ঐ মামলায় যুবলীগ নেতা ছাড়াও সাজা হয়েছে তার পরিবারের আরো ৪ সদস্যসহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে বিদেশে অবস্থানকারী ২ জন ছাড়া বাকি ৭ আসামিই এলাকায় রয়েছে। গত সপ্তাহে আদালত থেকে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পাঠানো হয়। কিন্তু পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করছে না। এনিয়ে মামলার বাদীসহ এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। জানা গেছে, ২০০৩ সালের ৮ই জুন উপজেলার মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদে এক সালিশ সভায় হামলা চালান ঐ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা যুবলীগ নেতা মনির হোসেন ও তার পরিবারের লোকজন। সালিশে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তারা চেয়ারম্যান কার্যালয়ে হামলা চালায় ও লোকজনকে মারধর করে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নান্নু  মিয়া বাদী হয়ে আখাউড়া থানায় দ্রুত বিচার আইনে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মো. মনির হোসেনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১লা নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দ্রুত বিচার আদালত যুবলীগের আহ্বায়ক মো. মনির হোসেনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন মনির হোসেনের পিতা মো. আব্দুস ছামাদ, চাচা আব্দুল ওহাব, ছোট ভাই বিপ্লব ও সোহেল এবং  উপজেলার গঙ্গাসাগরের সুমন মিয়া, ছোটন মিয়া, আলমগীর, শাহ আলম ছগির। মামলার বিচারকাজ চলতে থাকা অবস্থায় মনির হোসেনের এক ভাই রাসেল মৃত্যুবরণ করায় আদালত তাকে দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। বর্তমানে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি  সুমন মিয়া ও শাহআলম ছগির প্রবাসে আছেন। দ্রুত বিচার আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আসামিপক্ষ আদালতে আপিল করেন। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৯শে জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আদালতের দেয়া সাজা বহাল রাখেন। এ বছরের ২৪শে মার্চ আদালত সাজাপ্রাপ্ত ৯ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। গত সপ্তাহে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আখাউড়া থানায় পৌঁছে। কিন্তু পুলিশ রহস্যজনক কারণে তাদেরকে গ্রেপ্তার করছে না। এব্যাপারে মামলার বাদী ও  মোগড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নান্নু মিয়া বলেন, আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। তিনি জানান, গত ২৪শে মার্চ আদালত ৯ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু তারপরও আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  আখাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, তারা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলাফেরা করে। তবে তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এব্যাপারে যুবলীগের আহ্বায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে অনেক মামলাই আছে। এগুলো রাজনৈতিক মামলা বিবেচনায় আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। তবে ২০০৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করেছি।

বই, এস ডি বর্মন ও অবরোধের খোঁজে কুমিল্লায় by সোহরাব হাসান

শচীন দেববর্মনের বাড়ি পরিদর্শন করছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত বইমেলা উপলক্ষে গত শনিবার কুমিল্লায় গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিএনপি জোট আহূত পৃথিবীর সম্ভবত দীর্ঘতম অবরোধের চালচিত্র দেখে আসা। অবরোধ কার্যকর না থাকলেও তার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, সেটি উপলব্ধি করলাম কুমিল্লায় যাওয়া-আসার পথে।
সকাল পৌনে আটটায় মহানগর ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল কমলাপুর থেকে। সাড়ে সাতটায় স্টেশনে গিয়ে শুনলাম, ‘দেরি হবে।’ ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে চালু কথাটি হলো, ‘নয়টার ট্রেন কটায় ছাড়বে?’ কিন্তু এখন নয়টার ট্রেন কটায় গন্তব্যে পৌঁছাবে, সেটাই বড় চিন্তার বিষয়। ট্রেনটি কুমিল্লায় পৌঁছানোর কথা ছিল ১২টায়, পৌঁছাল পৌনে তিনটায়। পথে বিপত্তি নেই, অবরোধ আহ্বানকারীদের কেউ এসে রেললাইনের ফিশপ্লেটও খুলে নেয়নি। তার পরও এই বিলম্বের জবাব কী?
কমলাপুর স্টেশনে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের ডিজিটাল ছবিগুলো যত্ন করে টাঙিয়ে রাখা হলেও যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা। কোচগুলো অপরিচ্ছন্ন, চেয়ারগুলো ধুলায় ধূসরিত, কোনোটির হাতল ভাঙা, কোনোটির রেকসিন ওঠা। দুর্গন্ধের কারণে বাথরুমে যাওয়া যায় না। কিন্তু রেল বিভাগে এসব দেখার কেউ আছেন বলে মনে হলো না। পেট্রলবোমার ভয়ে ভীত যাত্রীরা অনেকটা নিরুপায় হয়ে ট্রেনে চড়ে। যেখানে যাত্রীদের জীবনই বিপন্ন, সেখানে ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? স্টেশনে দেখলাম, নারী যাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। হরতাল-অবরোধের রাজনীতি নারীকেই বেশি ‘গৃহবন্দী’ করে রাখে।
কুমিল্লা শহরে ঢুকেই ধন্দে পড়ে গেলাম, এখানেও কি নির্বাচন হচ্ছে? না, কুমিল্লায় কোনো নির্বাচন নেই। তা সত্ত্বেও শহরজুড়ে পথেঘাটে, দোকানে-ভবনে রংবেরঙের পোস্টারে, ফেস্টুনে স্থানীয় সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিনের ছবি। কোথাও তিনি প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কোথাও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তাঁকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। বিভিন্ন ভবনের সামনেও তাঁর ছবিসংবলিত বিশাল বিশাল ব্যানার। নামসংবলিত ফলক। কিন্তু শহরের শ্রীছাদ বলতে কিছু নেই।
কুমিল্লায় হরতাল-অবরোধের তেমন প্রভাব নেই। ফলে সেখানে বিরোধী দলের নেতা–কর্মীদের ওপর দমন–পীড়নও কম। চলমান কর্মসূচিতে দেশের অন্যান্য স্থানে বিএনপি-সমর্থক মেয়ররা দৌড়ের ওপর থাকলেও কুমিল্লা সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু নিরাপদে আছেন। নিয়মিত অফিস করছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনের গুঞ্জন হলো, আওয়ামী লীগের সাংসদ বাহাউদ্দিন এবং বিএনপির মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা আছে। সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের কাজটাও তাঁদের সমর্থকেরা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। মেয়রের সমর্থকেরা ৩০ শতাংশ, সাংসদের সমর্থকেরা ৩৫ শতাংশ। বাকি ৩৫ শতাংশ পান কাউন্সিলররা। জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সিটি করপোরেশন প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ করছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের মূল যে কাজ শহরের রাস্তাগুলো প্রশস্ত করা, সেদিকে মেয়রের আগ্রহ নেই। শহরে মানুষ বেড়েছে, কিন্তু রাস্তাগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। ফলে যানজট বাড়ছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল শহরের অন্তত দুটি এলাকায় মেয়রের মালিকানাধীন ভবনগুলো গড়ে উঠেছে ফুটপাত দখল করে। এ ছাড়া শহরের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ, সুয়ারেজ লাইন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত নাজুক। নগরবাসী কার কাছে প্রতিকার চাইবে? সবখানেই অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা।
কুমিল্লায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ করলাম। বছরের পর বছর সম্মেলন না করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দলীয় কার্যক্রম চালানো। ২০০৬ সালে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি হওয়ার পর থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি বা সম্মেলন হয়নি। বর্তমানে পরিকল্পনামন্ত্রী অ হ ম মুস্তফা কামাল এই কমিটির আহ্বায়ক এবং রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, সফিকুল ইসলাম শিকদার ও আফজাল খান যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সাংসদ বাহাউদ্দিন কোনো কমিটিতে নেই। যদিও ২০১৩ সালে বিরোধী দলের ‘আন্দোলন’ মোকাবিলায় তিনিই মাঠে সক্রিয় ছিলেন। কেবল আওয়ামী লীগ নয়, ছাত্রলীগ–স্বেচ্ছাসেবক লীগও চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। আর যুবলীগের কোনো কমিটিই নেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে দলীয় সভানেত্রী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আফজাল খান ও বাহাউদ্দিনকে এক মঞ্চে নিয়ে এলেও সেই ঐক্য টেকেনি। ২০১২ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আফজাল খান বিএনপির নেতা মনিরুল হক সাক্কুর কাছে হেরে যান এবং এর জন্য তিনি বাহাউদ্দিনকে দায়ী করেন।
কুমিল্লায় বিএনপির অবস্থাও ভালো নয়। কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন যত দিন কুমিল্লা বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন, তত দিন দলীয় কোন্দল ছিল না। তিনি বলতেন, ‘আমি প্রতিদিন ভোরে উঠে আফজাল খান ও বাহাউদ্দিনকে সালাম দিই। কেননা, তাঁদের মধ্যকার বিরোধ যত দিন থাকবে, তত দিন আমার কিছু করতে হবে না।’ কিন্তু সেই বিএনপি এখন দ্বিধাবিভক্ত। জেলা সভাপতি রাবেয়া চৌধুরীর সঙ্গে আছেন আমিনুর রশীদ ইয়াসিন, ফাজলুর হক ও মোস্তাক মিয়া। এর বিরোধী গ্রুপে আছেন মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও সাবেক সাংসদ মনিরুল হক চৌধুরী। নিষ্ক্রিয়তার জন্য এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করে।
এবার বইমেলার আয়োজন করা হয় কুমিল্লা টাউন হল (বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন) মাঠে। মেলায় ঢাকা থেকে ৬১টি প্রকাশনা সংস্থা অংশ নিয়েছে। কুমিল্লার লেখকদের বই নিয়ে আছে আলাদা স্টল। মেলায় প্রতিদিনই আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে। শনিবারের আলোচনার বিষয় ছিল ‘দারিদ্র্য বিমোচনে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা’। আলোচনাকারীদের মধ্যে মোস্তফা জব্বার, শান্তনু কায়সার, আসলাম সানী ও সানাউল হকের সঙ্গে আমিও ছিলাম। বললাম, অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এগোলেও রাজনীতিতে পিছিয়ে আছে।
কুমিল্লার এত হতাশাজনক খবরের মধ্যেও একটি সুখবর আছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ২৪ মার্চ বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে কুমিল্লাবাসীর বহুদিনের বকেয়া কটি দাবি পূরণ করেছেন। তিনি প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের (এস ডি বর্মন) বাড়িটিকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এ জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এক কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগরতলা সফরকালে শচীন দেববর্মনের বাড়িটি সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংস্কৃতিমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো। তবে ৬০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত পুরো বাড়ি নিয়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হচ্ছে না। একাংশ মুরগির খামার হিসেবেই থাকছে। কুমিল্লাবাসীর দাবি, মুরগির খামারটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুরো বাড়িটিতেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা হোক।
শনিবার বিকেলে যখন শচীন দেববর্মনের বাড়িতে যাই, লাল পতাকা দিয়ে তৈরি সীমানা চিহ্নগুলো দেখতে পাই। সবুজ গাছপালা ও পুকুরের পাশে পুরোনো ভবনগুলো তাঁর স্মৃতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। একটি ভবনের দেয়ালে লেখা আছে, ‘মহারাজ কুমার নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মন বাহাদুরের রাজবাড়ি। ১৯২২ সালে কবি নজরুল শচীনের সঙ্গে এই বাড়িতে সংগীত গাইতেন।’
উল্লেখ্য, ত্রিপুরার রাজবংশের সন্তান শচীন দেব কৈশোর ও যৌবনের একটি বড় সময় বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেববর্মন নির্মিত এই বাড়িতে কাটিয়েছেন। তিনি পড়াশোনাও করেছেন কুমিল্লা জিলা স্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজে। ১৯৫৬ সালে রাজপরিবারের সদস্যরা ত্রিপুরায় চলে গেলে পাকিস্তান সরকার বাড়িটি দখল করে মুরগির খামার প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান ভেঙে গেলেও মুরগির খামার বহাল আছে।
অনুষ্ঠান শেষে ওই দিন রাতেই ফিরে আসি ট্রেনে নয়, বাসে। অবরোধের কারণে বাসের তুলনায় যাত্রী কম। তাই যাত্রী ওঠানো নিয়ে দুই কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু যাত্রী ওঠার পর বাস ছাড়ার নাম নেই। যাত্রীরা মেজাজ গরম করেন, কেউ কেউ ভাড়া ফেরত চান। চালকও কম বুদ্ধিমান নন। বাস ছাড়ার ভান করতে করতে আধা ঘণ্টা পার করে দেন। বিলম্বের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় যে সংখ্যক বাস-ট্রাক চলত, এখন অস্বাভাবিক সময়ে চলে তার চার ভাগের এক ভাগ। এর পরও সিট খালি থাকলে পোষাবে কীভাবে?
রাত সাড়ে আটটায়ও শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে মোটামুটি যানজট ছিল। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে মহাসড়কে উঠতেই অবরোধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া টের পাই। রাস্তা প্রায় খালি, সুনসান। মাঝেমধ্যে দু-চারটি বাস-ট্রাক চলছে, দ্রুতগতিতে। চালক, হেলপার, যাত্রী সবার মধ্যে একধরনের ভয়, শঙ্কা। সড়কের পাশে মোড়ে মোড়ে পুলিশ-র্যাবের টহল। মেঘনার ওপারে এ রকম একটি টহল দলের সদস্যরা বাস থামালেন। ভেতরে উঠে কী কী আছে দেখলেন। তাঁদের একজন সামনের আসনে বসা এক যাত্রীর শরীর, ব্যাগ, এমনকি মানিব্যাগও তল্লাশি করলেন। অন্য কাউকে কিছু বললেন না। বোঝা গেল না এটি দৈবচয়ন না সন্দেহবশত।
পথের বাকি সময়টি মোটামুটি নির্বিঘ্নই ছিল। আমরা যখন গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ডে নামলাম, তখন রাত ১১টা। আড়াই ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছালাম। আর ট্রেনে লাগল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। তাহলে মানুষ কেন ট্রেনে যাবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

‘গুজরাটে হিন্দু, মুসলমানের জন্য আলাদা বসতি’

ভারতে গুজরাটের ভাডোদারাতে প্রায় সাড়ে চারশ’ মুসলিম পরিবারকে শহরের একটি হিন্দুপ্রধান এলাকায় পুনর্বাসন করার প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এই গরিব মুসলিম পরিবারগুলো থাকতো দুটি বস্তি এলাকায়, যা গত নভেম্বর মাসে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। -খবর বিবিসি বাংলা।
ভাডোদারার পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের একটি নতুন আবাসন প্রকল্পে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেও সেখানকার বাসিন্দারা স্মারকলিপি দিয়ে বলেছেন, ‘সমস্যা তৈরি করবে’ এমন লোকজনকে তারা এলাকায় থাকতে দিতে চান না। গুজরাটের ভাডোদারা শহরে হিন্দু ও মুসলিম সমপ্রদায়ের সহাবস্থান শত শত বছর ধরে, আবার সেখানে সামপ্রদায়িক বিদ্বেষ ও হিংসার ইতিহাসও বেশ পুরনো। সমপ্রতি সেখানে কল্যাণনগর ও কামাতিপুরা বস্তির বেশ কয়েকশ’ আশ্রয়চ্যুত গরিব মুসলিম পরিবারকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়তে হয়েছে, কারণ শহরের অভিজাত এলাকার বাসিন্দারা তাদেরকে নিজেদের এলাকায় ঘেঁষতে দিতে চাইছেন না। ভাডোদারা পৌর কর্পোরেশন এই মুসলিমদের জন্য শহরের কালালি ও সয়াজিপুরা এলাকায় নতুন আবাসনও তৈরি করেছে, কিন্তু বিজেপির স্থানীয় কাউন্সিলর দাদুভাই গাধভির নেতৃত্বে এলাকার বাসিন্দারা তাতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গুজরাটে হিন্দু এবং মুসলিম এলাকার মধ্যে দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। বিজেপি নেতা গাধভি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অনেক লোকে বলছে কল্যাণনগর বস্তির লোকরা যেখানে ছিলো সেখানেই থাকুক। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের এ ব্যাপারে কোনও বক্তব্য নেই, তবে স্থানীয় লোকরা যা বলছেন আমি শুধু সেই কথাটা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি বা বাধা দান থেকে মি. গাধভি নিজেকে দূরে রাখতে চাইলেও ঘটনা হলো, কর্পোরেশনে তার নামেই স্মারকলিপিটি জমা পড়েছে এবং দল হিসেবে বিজেপিও তাতে সায় দিচ্ছে বলে জানা গেছে। আসলে বস্তি থেকে আশ্রয় হারানোদের জন্য যে নতুন বাড়ি তৈরি করা হয়েছে, তার খুব কাছেই প্রোমোটার ও বিল্ডাররা নিউ মঞ্জিলপুর নামে অভিজাত একটি আবাসন প্রকল্পও তৈরি করেছেন। গরিব মুসলিমরা সে এলাকায় আসলে ওইসব ফ্ল্যাটের দাম কমে যাবে, এই আশঙ্কা থেকেই বিল্ডার লবি তাতে বাধা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে। তবে এক্ষেত্রে ঘটনা যাই হোক, ভাডোদারাতে হিন্দু-মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন এম.এস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ ইফতিকার খান। তিনি বলেন, ‘শহরে হিন্দু-মুসলিমদের আলাদা বসতি বা ঘেটো বানিয়ে থাকার প্রক্রিয়া চলছিলো আগে থেকেই, তবে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর থেকে সেটা যেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।’