Monday, September 22, 2014

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক- বড় আশা ছিল না, বড় হতাশাও নেই by এম হুমায়ুন কবির

দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জেসিসি (জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশন) বা যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভা হলো। এই বৈঠকে দুদিক থেকেই নিজ নিজ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এটা তৃতীয় জেসিসি বৈঠক। এ কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়। এটা একধরনের সহযোগিতা বিনিময়ের কাঠামো হিসেবে কাজ করে। সার্বিকভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে একে দেখা যায়।
জেসিসির এবারের সভায় যা হলো তাতে কয়েকটা বিষয় উল্লেখযোগ্য: প্রথমত, এ বৈঠক হলো দুই দেশেই নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয় আর ভারতে নতুন নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত। অবশ্য বাংলাদেশের বেলায় সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলেও ভারতে একেবারেই নতুন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দিক থেকে আটজন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে বলা হয় বহুমুখী। এ ধরনের সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের মন্ত্রণালয় জড়িত। তাই মন্ত্রণালয়ের সচিবদের উপস্থিতিতে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তাঁরা এর অংশীদার হন। ফলে এর বাস্তবায়নে তা প্রভাব ফেলে। এটা ভালো পদক্ষেপ।
জেসিসির বৈঠকের পর দুই দেশের তরফে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। এ বিবৃতিতে প্রায় ৩৬টি অনুচ্ছেদে অনেক বিষয় আলোচিত হয়েছে যেমন: নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্ত, জ্বালানি, নৌ ও সমুদ্র যোগাযোগ, শিল্প, মানবিক উন্নয়নসহ দুই দেশের বিরাজমান সব বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। এগুলোকে বলা যায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রুটিন রিভিউয়ের কর্মসূচি। তবে এবার কয়েকটা নতুন বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেমন: ভারত বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রযুক্তি, মহাকাশসম্পর্কিত বিষয়, টেক্সটাইল, মেরিটাইম যোগাযোগ, সমুদ্রসীমা, ফিশারিজ এবং বহুল আলোচিত ব্লু ইকোনমি নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিয়ে নতুন বাস্তবতায় এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। ভারত যে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা আদান-প্রদান করায় আগ্রহী, যৌথ বিবৃতিতে তার ছাপ রয়েছে।
এ ছাড়া উপকূলীয় নৌ–যোগাযোগ বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। অচিরেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্রে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর পরস্পরের দেশ সফর করার বিষয়েও কথা হয়েছে। দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষত ভারতে বাংলাদেশের পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাগুলো দূর করতে ভারত আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশও ভারতকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দিতে আগ্রহী। এর আগে জাপান ও চীনকেও এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ। একে তার ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখতে হবে। এ ধরনের অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টি বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগের জন্য হয়তোবা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমাদের জন্য আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে প্রধান হলো ভূসীমান্তবিষয়ক চুক্তি বাস্তবায়ন এবং তিস্তার পানিবণ্টনের চুক্তি। ভারত এর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা চাই বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হোক। বাধাগুলো দূর করতে হবে ভারতকেই। যেমন ভূসীমান্ত চুক্তি, এটা বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে। অথচ বিষয়টি অনেক দিন ধরে ঝুলে আছে। মনমোহন সিং সরকার গত বছর ডিসেম্বরে রাজ্যসভায় এ বিষয়ে একটা বিল উত্থাপন করে। সে সময় তৃণমূল কংগ্রেস এবং আসাম কংগ্রেস এর বিরোধিতা করে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন কিন্তু তখনকার বিরোধী দল বিজেপিও নীতিগতভাবে সেই বিলের বিরোধিতা করেছিল। জেসিসির তৃতীয় বৈঠকের বিবৃতিতে এ বিষয়ে এটুকু বলা আছে যে মনমোহন সিংয়ের সে সময়ে করা চুক্তিগুলো অনুসমর্থনের (র্যাটিফাই) বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু বিস্তারিত বলা নেই যে বিষয়টি প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে আছে এবং কোন সময়ের মধ্যে তা শেষ হবে। তাই আমরা যারা এ বিষয়ে দ্রুত সমাধানে আগ্রহী, তারা কিন্তু অন্ধকারেই রয়ে গেলাম।
তৃতীয় বিষয় হলো তিস্তার পানিবণ্টন। এ ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষ তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এই প্রত্যয় ব্যক্ত করা থেকে এ বিষয়ে আসলেই কোনো গতি আছে কি না, তা বোঝা যায় না। সুতরাং, এটা নিতান্তই আশ্বাস হিসেবে রয়ে গেল। তবে খেয়াল করার বিষয়, তিস্তার পানিবণ্টন প্রশ্নের সঙ্গে ভারত এবার ফেনী নদীর পানির বিষয়টি জুড়ে দিয়েছে। আমরা মনে করি, তিস্তার ইস্যু আলাদাই থাকা উচিত। এর সঙ্গে ফেনী নদীকে জুড়ে দিলে জটিলতা বাড়বে বৈ কমবে না। আমি বুঝতে পারছি না, দুটো নদীকে কেন একই ফ্রেমের মধ্যে আনা হলো।
ভারত নির্দিষ্টভাবে বলেছে, তারা নদী-সংযোগ প্রকল্প বিষয়ে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করবে না। এটা ইতিবাচক দিক। অন্য আরেকটা বিষয়, যা দৈনন্দিনভাবেই ঘটছে, তা হলো সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা। এই ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে দুই পক্ষই রাজি হয়েছে। কিন্তু অবাক বিষয় হলো, ওই একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের যে জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়নি, সেসব জায়গায় কাঁটাতার দেওয়ায় বাংলাদেশও সম্মত। অতীতে বাংলাদেশ কখনোই এই বেড়া দেওয়াকে সমর্থন করেনি। আমরা মনে করি, এ ধরনের কাঁটাতার দুদেশের বন্ধুত্বের সহায়ক নয়। এখন হঠাৎ করে বাংলাদেশ কী কারণে ভারতের কাঁটাতার নির্মাণে রাজি হলো, তা বোধগম্য নয়। কোন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এটা মেনে নিল, সেটাও এক রহস্যের বিষয়।
দুদেশের সহযোগিতার আরেকটা নতুন ক্ষেত্র হলো বিসিআইএম বা ইকোনমিক করিডর। ভারত এ ব্যাপারে মোটামুটি নিস্পৃহতা দেখিয়ে আসছে। জেসিসি বৈঠকে আশা করা হয়েছে যে বিসিআইএমের পরের যে বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে এতে আরও গতির সঞ্চার হবে। বিসিআইএমের অগ্রগতির জন্য ভারতের দিক থেকে আরও উদ্যোগের দরকার হবে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে তার বিশেষ আগ্রহের কথা বরাবরই বলে এসেছে। দুদিন আগে ভারত সফরে এসে চীনের প্রেসিডেন্টও অগ্রগতির আশা করেছেন। কিন্তু ভারত এ ব্যাপারে এখনো বিশেষ উদ্যোগী নয়।
জেসিসি বৈঠকের ঘোষণার সারাংশ হিসেবে বলা যায়, যে বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের আগ্রহ আছে, সেসব বিষয় যৌথ বিবৃতিতে এক বা দুই কথায় সংক্ষেপে এসেছে। এগুলো আরও বিশদভাবে আসা উচিত ছিল। আর ভারতের আগ্রহের কানেক্টিভিটি, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে বিশদভাবে বলা আছে। যেহেতু বৈঠকটা দিল্লিতে হয়েছে, সেহেতু ধরে নেওয়া যায় ভারতীয়রা এই বিবৃতির খসড়া তৈরি করেছে। সুতরাং তাদের আগ্রহের বিষয় সেখানে প্রাধান্য পাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলার আছে যে এই বৈঠকের ফল উল্লেখযোগ্য বা ব্রেক থ্রু মনে হয়নি। এবারের বৈঠকে বড় কিছু প্রত্যাশা যেহেতু ছিল না, সেহেতু বড় হতাশাও নেই।
তবে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার এ বৈঠক থেকে লাভবান হয়েছে, সেটা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লিতে থাকা অবস্থায় ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা। তাতে বর্তমান সরকারের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া গেল। আমি মনে করি, এতে করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের লাভ হলো। আর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দিক থেকে বলতে গেলে, এ ধরনের যেকোনো আলোচনাই দুদেশের মধ্যে বোঝাপড়া শক্তিশালী করে। তবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পেলে ভালো হতো, কারণ সেটাই প্রত্যাশিত।
সব দেশই তো নিজের স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। সুতরাং, আমাদের স্বার্থ আমাদেরই সংরক্ষণ করতে হবে। ভারত আমাদের তিন দিক বেষ্টন করে রয়েছে। ভারতের সঙ্গেই আমাদের থাকতে হবে, এটা বাস্তবতা। ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের সঙ্গে আমাদের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সহযোগিতা করলে আমাদেরই লাভ। বাংলাদেশের স্বার্থকে যদি ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে হয়, তাহলে আমাদেরও জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এ ব্যাপারে সব দল ও অংশভাগীদের মধ্যে জাতীয় সমঝোতা জরুরি। জাতীয় ঐক্য ছাড়া এ ধরনের সহযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট যেদিন ভারতে গিয়েছেন, সেদিনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়েছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা সেই ডামাডোলের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হলো। এতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ কী পরিমাণ অসম। এ জন্যই আমাদের জাতীয় অবস্থানের যতগুলো শক্তিশালী দিক আছে, সেগুলোর চূড়ান্ত ও নিষ্ঠাবান ব্যবহারে আরও মনোযোগী হওয়া উচিত। ভারত একই সঙ্গে আমাদের জন্য সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ। কোনটা প্রাধান্য পাবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের সরকারগুলোর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর। তা না করে যদি কোনো ক্ষুদ্র ও গোষ্ঠীস্বার্থকে সামনে আনি, তাহলে জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাবে না। তাতে আমাদের ক্ষতি হবে।
এম হুমায়ুন কবির: কূটনীতিক, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

স্বজন মিলছে না পরিচয় শুধু একটি ছবি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ঘটনাকাল ১৯৯৬ সালের ৬ই জুলাই। ওইদিন কুয়েতে কর্মরত অবস্থায় খুন হন আজিজুর রহমান নামের এক বাংলাদেশী। খুনি ফিলিপাইনি নাগরিক জোসেফ আরবিজতোন্ডো। আদালতের বিচারে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ১৭ বছর ধরে সেই সাজাই ভোগ করে চলেছে সে। ওই সময় সাজা মওকুফের বিকল্প ব্লাড মানি হিসেবে ৬০০০ কুয়েতি দিনার ধার্য করা হয়। এর বর্তমান মূল্যমান প্রায় ১৬ লাখ টাকা। কিন্তু খুনির পরিবার  তখন আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে সে টাকা দিতে অপারগতা জানায়। ওই টাকা না পরিশোধ করা পর্যন্ত আমৃত্যু জেলেই কাটাতে হবে তার। দীর্ঘ ১৮ বছর পর কুয়েতে অবস্থিত ফিলিপাইনি কমিউনিটি খুনিকে মুক্ত করার জন্য সমপরিমাণ টাকা যোগাড় করে। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিয়েছে অন্যখানে। বাংলাদেশে আজিজুর রহমানের পরিবারের সন্ধান মিলছে না। ওই টাকা গ্রহণের জন্য পাওয়া যাচ্ছে না কোন উত্তরাধিকারী। বিস্তারিত ঠিকানাও নেই। ওই সময়ে তোলা পাসপোর্টে সংযুক্ত ছবিটিই এখন একমাত্র মাধ্যম- যা বেশ অস্পষ্ট। আজিজুর রহমানের উত্তরাধিকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বছরখানেক আগে কুয়েতে অবস্থিত ফিলিপাইন দূতাবাস বিস্তারিত তথ্যের জন্য তাদের ঢাকাস্থ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও আজও পর্যন্ত তার হদিস মেলেনি। বিষয়টি জানার পর মাইগ্রেশন ফোরাম ইন এশিয়ার (এমএফএ) ফিলিপাইনি সদস্য সেন্টার ফর মাইগ্রেশন এডভোকেসি (সিএমএ-ফিল্‌স) খুনি জোসেফ আরবিজতোন্ডোকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন কমিনিউনিটি থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এরপর তারা এমএফএ’র মাধ্যমে আজিজুর রহমানের পরিবারের সন্ধান করতে থাকে। এমএফএ তাদের বাংলাদেশী সদস্য ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন ফর দ্য রাইটস অব বাংলাদেশী ইমিগ্রেন্টস (ওয়ারবি) ডেভেলপমেন্টস ফাউন্ডেশনকে নিহত আজিজুর রহমানের উত্তরাধিকারি পিতা, মাতা ও স্থায়ী ঠিকানা জানানোর জন্য অনুরোধ করে। আজিজুর রহমানের উত্তরাধিকারীর তথ্য সংগ্রহের সুবিধার জন্য এমএফএ ওয়ারবিকে তিনটি সাপোর্টিং পেপার পাঠায়। এর মধ্যে রয়েছে পাসপোর্টের ছবি সংবলিত এক পাতার ফটোকপি যাতে আজিজুর রহমানের ঠিকানা দেয়া আছে। এতে আজিজুরের জন্মস্থান ঢাকা, জন্ম তারিখ ২/৩/১৯৬৩, পেশা ড্রাইভার, পাসপোর্টের মেয়াদ ১৯/০৬/১৯৯৬ লেখা আছে। এমএফএ পাঠানো আরবিতে লেখা সাময়িক প্রবেশের অনুমতি সংক্রান্ত আরেকটি ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে। সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত ওই কাগজে দেখা যায় আজিজুর রহমানের জাতীয়তা বাংলাদেশী, কাজের স্থান: দিয়াত আল উকু। এছাড়া আরবিতে পাঠানো অপর ডকুমেন্টে লেখা আছে- কুয়েত রাষ্ট্র: সিভিল কার্ড, নাম: মনির হাসান আলী, জাতীয়তা: বাংলাদেশী, জন্ম ১০/১১/১৯৫৬, কার্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ২৫/১১/১৯৯৬, সম্পর্ককারীর সিভিল নাম্বার ২৫৬১১১০০১৭৯৮, আবাসন নাম্বার ১১৫৪১৫১৭৫। মালিক সালেহ আলী মোহাম্মদ আল শামুম, ঠিকানা: আল মালিবিখাত, সেকশন-২, জাদ্দাহ-১১, বিভাগ-৮০, ইউনিটের ধরন বাসা, ইউনিট নাম্বার- ফ্লোর-০০, টেলিফোন- ৪৫৮২৩৫৮, রক্তের গ্রুপ: এ+। তবে মনির হাসানের সঙ্গে নিহত আজিজুর রহমানের প্রকৃত সম্পর্কের কথা উল্লেখ নেই। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশী মনির হাসান নিহত আজিজুর রহমানের পরিবারের পক্ষ হয়ে আপসরফা করার জন্য মধ্যস্থতা করেছিলেন। কিন্তু ওই সময় ফিলিপাইনি পক্ষ টাকা দিতে না পারায় তার অগ্রগতি হয়নি। হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন সবাই। এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে ১৭টি বছর। বর্তমান তারা ওই টাকা যোগাড় করেছেন। এখন তা আজিজুরের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। এমএফএ-এর পাঠানো ওই সব ডকুমেন্ট নিয়ে ওয়ারবি আজিজুর রহমানের তথ্য জানার জন্য পাসপোর্ট অফিসে যায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এত আগের (১৯৮৮ সাল) ইস্যুকৃত কোন পাসপোর্টের কোন তথ্য বা ডাটা তাদের কাছে সংরক্ষিত নেই। গত ১৯শে জুলাই ওয়ারবি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)তে আজিজুর রহমানের তথ্য জানার জন্য আবেদন করে। বিএমইটি তাদের জানায়, পাসপোর্টের নাম্বারেও ভুল রয়েছে। নাম্বারে একটি ডিজিট কম রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে পাসপোর্টটি জাল ছিল। এদিকে প্রকৃত ওয়ারিশের কাছে সমুদয় অর্থ হস্তান্তর না করা পর্যন্ত মুক্তি পাচ্ছে না জোসেফ। ইমেইল বার্তায় সিএমএ-ফিল্‌স খুনিকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতে আজিজুর রহমানের ওয়ারিশদের খুঁজে বের করার অনুরোধ জানিয়েছে। এ ব্যাপারে ওয়ারবি’র মহাসচিব ফারুক আহমেদ বলেন, আজিজুর রহমানের প্রকৃত ওয়ারিশকে খুঁজে পেতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এ অর্থ পেলে ভিকটিমের পরিবার কিছুটা হলেও উপকৃত হতো। প্রকৃত ওয়ারিশদের সন্ধান পেলে তারা ওই ক্ষতিপূরণ পেতে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

‘গুলি করে দেব,এসপি স্যারের নির্দেশ আছে’ by ইকবাল আহমদ সরকার

হরতালের পক্ষে কোন ধরণের মিছিল বের করা হলে গুলি করার হুমকি দিয়েছে গাজীপুর থানা পুলিশ। এ নিয়ে জেলায় যোগ দেয়া নতুন এসপির নির্দেশনা রয়েছে বলে হরতাল সমর্থনকারিদের জানানো হয়। সকালে নগরের জোড়পুকুর এলাকায় বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম শামীমের নেতৃত্বে পিকেটিং করার চেষ্টা করে। পরে পুলিশের গুলি করার হুমকিতে মিছিল না করেই নেতাকর্মীরা চলে যায়। জেলা বিএনপির সহ প্রচার সম্পাদক ও পৌর বিএনপির সহসভাপতি আব্দুস সালাম মানবজমিনকে জানান, হরতালের পিকেটিং করার জন্য ছাত্রনেতা খান জাহিদুল ইসলাম, মনির হোসেনসহ ৩০-৩৫ জন নেতা কর্মী সাড়ে আটটায় জোরপুকুর মসজিদের সামনে জড়ো হই। এসময় পুলিশের কয়েকজন এসআই- এএসআই ১০ -১২ জন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে আমাদের বলেন, কোন মিছিল করবেন না, করলে গুলি করে দেব, নতুন এসপি স্যার আসছেন, ওনার নির্দেশ আছে, হরতালের পক্ষে কোন কর্মকান্ড করবেন না, যার যার মত চলে যান। পুলিশের এ হুমকির পর পর তারা ঝুঁকি নিয়ে আর মিছিল করেননি। যার যার মত চলে যায়। তবে কোন কোন এসআই বা এএসআই এ হুমকি দিয়েছে তাদের নাম জানাতে পারেননি ওই বিএনপি নেতা। মোহাম্মদ হারুণ অর রশীদ সম্প্রতি ঢাকা থেকে গাজীপুরে পুলিশ সুপার হিসেবে বদলী হয়েছেন। এর আগে সাবেক বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুককে হরতালে শারিরীকভাবে নির্যাতন করে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। এদিকে গাজীপুর জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে সকাল ১০ টায় জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ডা. মাজহারুল আলমের নেতৃত্বে হরতালের মিছিল বের করতে চাইলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। পরে সেখানে দাঁড়িয়েই হরতালের পক্ষে তারা কয়েক মিনিট বিক্ষোভ করে। হরতালের সকালে রাজপথে এমনকি দলীয় অফিসেও দেখা যায়নি জেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক সিনিয়র নেতাদের। তবে সকালে দলীয় কার্যালয়ে পৌর বিএনপি সভাপতি মীর হালিমুজ্জামান ননী, আহাম্মদ আলী রুশদী, ডা. মাজহারুল আলম মন্ডল, মুক্তিযোদ্ধা এসকে জবিউল্লাহ, জয়নাল তালুকদার, সৈয়দ হাসান সোহেল, আসাদুজ্জামান সোহেল, খন্দকার নাজমুল, মাহমুদ রাজু, বাপ্পীদেসহ কয়েকজন নেতাকে পুলিশ পাহারায় পার্টি অফিসে বসে থাকতে দেখা গেছে। গাজীপুরের সর্বত্র ঢিলেঢালা ভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চলাচল না করলেও নগর জুড়ে আঞ্চলিক সড়কের বাস ও সব ধরণের ছোট যানবাহন চলাচল করছে সকাল থেকে।

সাক্ষ্য দিতে ভারত যাচ্ছেন ফেলানীর বাবা by মিজানুর রহমান মিন্টু

কুড়িগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত আলোচিত ফেলানী হত্যার বিচার পুনরায় শুরু হয়েছে ভারতের বিশেষ আদালতে। আজ থেকে এ বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ভারতের কুচবিহারে বিএসএফ’র সেক্টর হেড কোয়ার্টারের বিশেষ এ আদালতে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুড়িগ্রাম ৪৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মোফাজ্জল হোসেন আকন্দ। তিনি জানান, ভারতের কুচবিহারের বিএসএফ’র সদর দপ্তরে স্থাপিত বিশেষ আদালতের স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্টে এ বিচার কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দুই একদিনের মধ্যেই সাক্ষ্য দিতে এবং আদালতকে সহযোগিতা করতে ভারত যাবেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম, মামা আব্দুল হানিফ, ৪৫ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্ণেল মোফাজ্জল হোসেন আকন্দ ও কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস এম আব্রাহাম লিংকন। এ ব্যাপারে ভারত সরকারের পক্ষে বিএসএফ পক্ষ থেকে যে কোন সময় আমন্ত্রণ জানাবে বলে জানা গেছে। ফেলানী হত্যার সঠিক বিচার না পেয়ে ২০১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনারের মাধ্যমে ভারত সরকারের নিকট পুনঃ বিচারের আবেদন করেন ফেলানীর বাবা। এর পর শুরু হয় কুটনৈতিক ও বৈদেশিক চাপ। পরে বিজিবি-বিএসএফ’র দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ফেলানী হত্যার পুনর্বিচরে সম্মত হয় বিএসএফ। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার পুণরায় বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন জানান, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রনে বিচার কার্যক্রমে অংশ নিতে তারা প্রস্তুতি নিয়েছেন। ৪ সদস্যের ভিসাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে রাজশাহীর ভারতীয় হাই কমিশন থেকে। সব কিছু ঠিক থাকলে দুই/তিন দিনের মধ্যে ভারতের কুচবিহারের বিএসএফ’র বিশেষ আদালতে পুণরায় ফেলানী হত্যা মামলার কার্যক্রমে তারা অংশ নেবেন। বিচার কার্যক্রমে ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম, মামা আবু হানিফ সাক্ষী দেবেন। এছাড়া কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট এস এম আব্রহাম লিংকন বাংলাদেশের আইনজীবি হিসাবে সাক্ষী ও আদালতকে সহায়তা করবেন। সার্বিক সহযোগিতা এবং বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে ৪৫ বিজিবি’ কমান্ডিং অফিসার লেফটেনেন্ট কর্ণেল মোফাজ্জল হোসেন আকন্দ এই টিমকে নেতৃত্ব দিবেন। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারী শুক্রবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে দালালের মাধ্যমে মই বেয়ে কাটাতারের বেড়া পাড় হবার সময় ভারতীয় বিএসএফ’র গুলিতে বিদ্ধ হয়ে আধাঘন্টা ধরে ছটফট করে নির্মমভাবে মৃত্যু হয় কিশোরী ফেলানীর। ভারত থেকে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাড়ী ফেরার সময় এ নৃশংসতার শিকার হয় ফেলানী। এর পর সকাল পৌনে ৭টার থেকে নিথর দেহ কাঁটাতাঁরের উপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘন্টা। পরে বিএসএফ লাশ নামিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এরপর বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে মৃত্যুর ৩০ ঘন্টা পর ৮ জানুয়ারী শনিবার লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। বাংলাদেশে আর এক দফা ময়না তদন্ত শেষে লাশ দাফন হয় ৭৩ ঘন্টা পর। মানাধিকার সংস্থাগুলোর অব্যাহত চাপের মূখে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কুড়িগ্রামে এসে ফেলানীর মা ও ভাই-বোনদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। আর ১৫ ফেব্রুয়ারী নিচ্ছিদ্রু নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তায় সারাদিন লুকোচুরি খেলা শেষে বিকেলে মা ও ভাই-বোনদের বাংলাদেশে ফেরত দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনাটি দেশ-বিদেশের গনমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমালোচনার ঝর তোলে। খোদ ভারতের গনমাধ্যমগুলোর সোচ্চার ভূমিকায় কোচবিহারের বিএসএফ’র বিশেষ আদালতে ২০১৩ সালের ১৩ আগষ্ট বিচারিক কার্যক্রম শুরু করে ভারত সরকার। আদালতে স্বাক্ষী দেন প্রত্যক্ষদর্শী বাবা নুর ইসলাম ও মামা আব্দুল হানিফ। কিন্তু অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমীয় ঘোষকে ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বেকসুর খালাস দেয় বিশেষ আদালত। পরে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় ভারতীয় হাইকমিশনারের নিকট আবেদন করে ফেলানীর পরিবার। দেশী-বিদেশী চাপে ভারত বিচার কার্যক্রম রিভিউ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসাবে সোমবার পুনরায় শুরু হয় ফেলানী হত্যা মামলার বিচার কাজ।

আফগানিস্তানে মতৈক্যের সরকার

আশরাফ ঘানি,আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ
আফগানিস্তানে জাতীয় মতৈক্যের সরকার গঠনে সম্মত হয়েছেন আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ ও আশরাফ ঘানি। গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী এ দুই প্রার্থী। এর মধ্য দিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা অচলাবস্থার অবসান হলো। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। পুরো অনুষ্ঠান স্থায়ী হয় প্রায় ১০ মিনিট। অভিনব এই ক্ষমতা ভাগাভাগির পর আফগানিস্তান নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। চুক্তি অনুসারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর একজন আশরাফ ঘানি প্রেসিডেন্ট হবেন। আর প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার প্রধান নির্বাহী (সিইও) পদে মনোনয়ন দেবেন আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেন, ‘আমি খুব খুশি। আমাদের দুই ভাই আশরাফ ঘানি ও আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ দেশের মঙ্গলে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে দেশে স্থায়ী শান্তি আসবে।’ গত ১৪ জুন অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে আশরাফ ঘানি ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলে প্রাথমিক ফলাফলে জানা যায়। এই ফলাফল প্রকাশের পর ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে আবদুল্লাহর সমর্থকেরা রাস্তায় নামেন। নির্বাচনে আবদুল্লাহ নিজেকে প্রকৃত বিজয়ী বলে দাবি করেন। জুলাইয়ে ভোট গণনা শেষ হলেও আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। দুই প্রার্থীর মধ্যে বৈরী অবসানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি আফগানিস্তানে আসেন।
দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর তাঁদের মতপার্থক্য কমে আসে। এরই ফলে গতকাল ক্ষমতা ভাগাভাগির এই চুক্তি হলো। এখন শিগগিরই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণারও প্রস্তুতি চলছে। মতৈক্যের বিষয়ে আবদুল্লাহর মুখপাত্র বলেন, একটি চুক্তির আওতায় আশরাফ ঘানিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিয়েছেন আবদুল্লাহ। চুক্তি অনুযায়ী আবদুল্লাহ মন্ত্রিসভার প্রধান নির্বাহীর (সিইও) পদে মনোনয়ন দেবেন। আশরাফ ঘানির মুখপাত্র ফয়জুল্লাহ জাকি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আর কোনো বিরোধ নেই। তারা প্রতিটি বিষয়ে শতভাগ একমত হয়েছে। নতুন আফগান সরকারের একটি মন্ত্রিসভা থাকবে। এর প্রধান হবেন প্রেসিডেন্ট। এখানে থাকবেন একজন সিইও, সঙ্গে তাঁর দুজন সহকারী। সিইওর মর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর সমতুল্য। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। প্রেসিডেন্ট কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো নেবেন। আর সিইওর নেতৃত্বে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ করবে মন্ত্রিসভা। কারজাইয়ের উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে যেভাবে সংকট তৈরি হয়েছিল, তাতে আফগানিস্তানে আবার জাতিগত সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। আবদুল্লাহ তাজিক ও হাজারাদের সমর্থনপুষ্ট। আর দেশের সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী পশতুনদের সমর্থন ঘানির প্রতি। আফগানিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্টের প্রথম কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর। এর ফলে আফগানিস্তানে অবস্থানরত কয়েক হাজার বিদেশি সেনা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ২০১৪ সালের পরও থাকতে পারবে। কারজাই এই চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। তবে ঘানি ও আবদুল্লাহ এই চুক্তি করতে রাজি।

দুই জোটে চরম টানাপোড়েন

উদ্ধব ঠাকরে
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনে ২৫ বছরের পুরোনো জোট রাজনীতি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। রাজ্যটিতে শিবসেনা-বিজেপি এবং কংগ্রেস-ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) জোট আছে। আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই জোটেই চলছে তীব্র টানাপোড়েন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি। আসন নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র দর-কষাকষির পালায় গতকাল রোববার শেষ পর্যন্ত হিন্দুত্ববাদী শিবসেনা শিরক বিজেপিকে ১১৯টি আসন দিতে চেয়েছে। জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা শেষে শিবসেনার সভাপতি উদ্ধব ঠাকরে বলেন,মহারাষ্ট্র রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ২৮৮ আসনের মধ্যে শিবসেনা ১৫১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রস্তুত।
বাকি ১৯টি আসন দিতে চায় ছোট শরিকদের। গতবারের বিধানসভা নির্বাচনে শিবসেনা ১৬৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এবার তারা আগের তুলনায় কম আসন চেয়েছে। বিজেপি আগের নির্বাচনেও ১১৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। উদ্ধবের এ প্রস্তাবে বিজেপি খুিশ হয়নি। মহারাষ্ট্রে দলটির দুই নেতা একান্ত খারসে ও বিনোদ তেওয়ারি বলেন, শিবসেনার চেয়ে মহারাষ্ট্রে বিজেপি বেশি আসন পেয়েছিল। দুই বিজেপি নেতা চার মাস আগে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রে বিজেপির ব্যাপক সাফল্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তাদেরকে ছোট শরিক মনে করার কোনো কারণ নেই। বিজেপির প্রস্তাব, তারা ও শিবসেনা উভয়েই ১৩৫টি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। এভাবে আসন ভাগের পক্ষে তাঁদের আরেকটি যুক্তি, ‘গত নির্বাচনে শিবসেনা ৫৯ আসনে হেরেছে। আমরা (বিজেপি) হেরেছিল ১৯ আসনে।
সেসব আসন যদি আবার দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের সুবিধা হবে।’ আসন ভাগাভাগি নিয়ে এ অচলাবস্থার মুখে আজ সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি আলোচনায় বসছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির সভাপতি অমিত শাহও উপস্থিত থাকবেন। ২৭ সেপ্টেম্বর এ বিধানসভা নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এদিকে আসন ভাগাভাগি নিয়ে এনসিপি-কংগ্রেস জোটের টানাপোড়েনও তীব্র আকার নিয়েছে। এনসিপি কংগ্রেসকে এক দিন সময় বেঁধে দিয়েছে তাদের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য। আবার কংগ্রেসও দুই দিন সময় দিয়েছে এনসিপিকে। দুটো দল নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার হুমকিও দিয়েছে একে অপরকে। এনসিপি নির্বাচনে ১৪৪ আসন চায়। কংগ্রেস তাদের দিতে চায় ১২৪টি। এনসিপি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, গত নির্বাচনেও তারা ১২৪টি আসন পেয়েছিল। এনসিপি সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের চেয়ে বেশি আসন পাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে বলছে, আগের নির্বাচনের ফর্মুলায় এবার হবে না।

বিলাওয়ালের কাশ্মীর নিয়ে মন্তব্যে বাস্তবতা নেই

বিলাওয়াল
কাশ্মীরের সম্পূর্ণ অংশকে ‘ভারতের দখলমুক্ত’ করে নিজ দেশের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে বিলাওয়াল ভুট্টোর বক্তব্য ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছে নয়াদিল্লি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল গত শুক্রবার ওই কথা বলেছিলেন। খবর পিটিআইয়ের। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন গত শনিবার বলেন, ‘যদিও আমরা পেছন ফিরে তাকানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমাদের দেশের সীমানা পাল্টে যাবে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ বিলাওয়ালের এই মন্তব্যকে ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ বলে আখ্যা দিয়ে আকবর উদ্দিন বলেন,
‘এ ধরনের মন্তব্য আমাদের গত শতাব্দীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।’ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল শুক্রবার পাঞ্জাবের মুলতানে পিপিপির এক কর্মসূচিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কাশ্মীরকে ভারতের দখলমুক্ত করব। সেখানকার এক ইঞ্চিও ছাড়ব না। এর সম্পূর্ণ অংশ ফিরিয়ে আনব। কারণ, কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ।’ এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি ও রাজা পারভেজ আশরাফ তাঁর পাশে ছিলেন। বিরোধপূর্ণ কাশ্মীরের দুটি অংশ ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। আকসাই চীন নামে এর একটি অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে, যা ভারত নিজের বলে দাবি করে।

আইএসের কাছে জিম্মি হেনিংয়ের স্ত্রীর আকুতি

অ্যালান হেনিং
ইরাক ও সিরিয়ার জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে জিম্মি থাকা ব্রিটিশ ট্যাক্সিচালক অ্যালান হেনিংকে মুক্তি দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। তিনি হেনিংয়ের মুক্তির বিষয়টি ‘নিজেদের হৃদয় দিয়ে বিবেচনা’ করতে জঙ্গিদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন। খবর বিবিসির। সিরিয়ার সংঘাতকবলিত এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অপহৃত হন অ্যালান হেনিং। সম্প্রতি আইএস জঙ্গিরা ডেভিড হেইনস নামের আরেক ব্রিটিশের শিরশ্ছেদ করে হত্যার যে ভিডিও প্রকাশ করে তাতে হেনিংকেও দেখানো হয়। যুক্তরাজ্য আইএসবিরোধী তৎপরতা থেকে সরে না গেলে এরপর হেনিংকেও একইভাবে হত্যা করা হবে বলেও ভিডিওতে হুমকি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অ্যালান হেনিংয়ের স্ত্রী বারবারা বলেন,
অ্যালান শান্তিপ্রিয় মানুষ। তিনি পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে সিরিয়ায় যানসংকটে পড়া মানুষগুলোকে সহায়তা করতেন। বারবারা হেনিং জানিয়েছেন, তিনি আইএসের কাছে বেশ কয়েকটি বার্তা পাঠিয়েছেন। তবে এর জবাব পাননি। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস অ্যালানকে আটক রাখা মানুষগুলো আমার বার্তার জবাব দেবে। আমি মিনতি করছি, তারা এই বার্তা পেলে যেন তা নিজেদের হৃদয় দিয়ে বিবেচনা করে আমার স্বামীকে মুক্তি দেয়।’

দুরবস্থায় পাঁচ রাষ্ট্রীয় ব্যাংক by শওকত হোসেন ও মনজুর আহমেদ

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বেড়েছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে, অবলোপন করে দেওয়া হয়েছে বিপুল পরিমাণ ঋণ। আর রয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা।

ব্যাংকগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে গত ছয় বছরে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা অর্থ আত্মসাতের জন্য বেছে নিয়েছেন জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে। আর বেসিক ব্যাংক তো পুরো সময়জুড়েই ছিল কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত। বিশ্বব্যাংক ২০১৩ সালের শেষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে ব্যাংক খাত খারাপ হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।
গত ছয় বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮৫ শতাংশ, সোনালীর ৬৫ শতাংশ, অগ্রণীর ৪০ শতাংশ এবং রূপালীর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে এখন এই চার ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে এই চার ব্যাংক প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করে রেখেছে। আর গত প্রায় ছয় বছরে এই চারটি ও বেসিক ব্যাংকে ঋণের নামে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি ব্যাংকগুলোতে এখন নতুন ঋণও যেভাবে খেলাপি হচ্ছে, তা-ও উদ্বেগজনক বলেই মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি ব্যাংকের ওপর করা একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কেবল ২০১৩ সালেই সোনালী ব্যাংকের নতুন খেলাপির পরিমাণ চার হাজার ২৬৬ কোটি টাকা, জনতায় তিন হাজার ৩৯২ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকে দুই হাজার ৬৯২ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকে নতুন খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৪৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই চার ব্যাংকে মাত্র এক বছরেই নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হয়েছে ১০ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা।
মূলত শুরু থেকেই ব্যাংকগুলোকে সরকার চালিয়েছে দলীয় স্বার্থে ও রাজনৈতিক বিবেচনায়। দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। একদিকে সরকারের নিয়োগ দেওয়া পর্ষদ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ—সব মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে খারাপ ব্যাংকে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচটি ব্যাংক। অসৎ ব্যবসায়ীরাও অর্থ আত্মসাতের জন্য বেছে নিয়েছেন সরকারি ব্যাংকগুলোকেই।
অথচ ছয় বছর আগেও দেশের অন্যতম সেরা ভালো ব্যাংক ছিল বেসিক। সরকারও যে ভালোভাবে ব্যাংক চালাতে পারে, তার উদাহরণ ছিল বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংকটিকেও ধ্বংস করে দিয়েছে এর মালিকই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ বিষয়ে নিজের মতামত দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু সরকার ব্যাংকগুলোকে সামলাতে পারছে না, রক্তক্ষরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, তাই আমি মনে করি যে সোনালীকে হাতে রেখে অন্য ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে।’
জিয়া ও এরশাদের আমলে ঋণের নামে অর্থ লুটপাটের কারণে সরকার নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা মূলধন দিতে বাধ্য হয়েছিল। সে সময় এই অর্থ দেওয়া হয়েছিল বন্ড আকারে। সেই মূলধন সরবরাহের ধারায় আবার ফিরে এসেছে সরকার। সম্প্রতি ব্যাংক চারটিকে মূলধন হিসেবে নগদ চার হাজার ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের আমানত নষ্ট করার পর আবার সেই সাধারণ মানুষের করের টাকাই দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান নিজের অভিজ্ঞতা থেকে প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে এই ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দিয়ে আসছে সরকার। কিন্তু এর যেন কোনো শেষ নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব এত দিনে এসে বলছেন যে ব্যাংকগুলোর পর্ষদে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ হবে না। কিন্তু তিনি মাঝখানে কীভাবে সেই নিয়োগ দিয়েছিলেন? বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধরনের নিয়োগ কোনো ইতিবাচক ফল দেয়নি। তাহলে তিনি কোন যুক্তিতে কী পরীক্ষা করতে গেলেন?’ আকবর আলি খান দীর্ঘদিন অর্থসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর সমস্যা হচ্ছে শাসনকাঠামোতে। সেখানেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি পরিষ্কারভাবে ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে সরকারকে পরামর্শ দেন।
১০ বছর আগে অন্তত তিনটি ব্যাংক বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ৩৯ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়, যা বর্তমান টাকার হিসাবে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। এর আওতায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে কোম্পানি হিসেবে গঠন করা হয়। কিন্তু এরপর আর কিছু হয়নি।
বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাজ্য সরকারের সাহায্য সংস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ বা ডিএফআইডির অর্থায়নে ‘শিল্প প্রবৃদ্ধি ও ব্যাংক আধুনিকীকরণ’ নামের প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালের জুনে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত তিনটি পন্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। দাতাদের পরামর্শ ছিল, সরকারের মালিকানায় কোনো ব্যাংক রাখারই প্রয়োজন নেই। তবে সরকারের ট্রেজারি ব্যাংক হিসেবে কাজ করে বলে সোনালী ব্যাংক সরকারের মালিকানায়ই থাকবে। রূপালী ব্যাংক বেসরকারীকরণ হবে সবার আগে। পাশাপাশি জনতা ও অগ্রণী ব্যাংককে তৈরি করা হবে বেসরকারীকরণের উপযুক্ত হিসেবে। তার পরই এই ব্যাংক দুটিকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
এ জন্য তিন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যেমন, সোনালী ও জনতায় নিয়োগ দেওয়া হয় একদল পরামর্শক, অগ্রণী ব্যাংকে বসানো হয় নতুন ব্যবস্থাপনা টিম এবং রূপালী ব্যাংক বিক্রি করে দেওয়ার জন্য দায়-দেনার হিসাব প্রস্তুত করতে নিয়োগ করা হয় একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এ জন্য তিন ব্যাংক থেকে কেবল পরামর্শকেরাই নিয়ে যান ১৩০ কোটি টাকা।
এত অর্থ খরচ করার পরও প্রকল্পের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার বদল হওয়ায় সিদ্ধান্তগুলোও বদলে যায়। বেসরকারি হাতে ছেড়ে না দিয়ে সরকার নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। দলীয় কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলো দেখভাল করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে গঠন করা হয় একসময়ে বাতিল করা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর পরই ব্যাংকগুলোর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। যে খারাপ পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল, ব্যাংকগুলো এখন সেই পরিস্থিতিতেই ফিরে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ’৯০ সালের দিকে এই ব্যাংকগুলোর চেহারা সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখন বিশ্বব্যাংক ঢাকায় এসে ব্যাংকগুলোতে বসে ব্যাপক সংস্কারের তদারক করে। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ আমলে এই ব্যাংকগুলোতে ভীতিকর, ভয়ংকর পরিস্থিতি হয়েছিল। এখন সেদিকেই যাচ্ছে মনে হয়। এর কারণ সরকার ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে সঠিক লোক নিয়োগ দিতে পারেনি।
ব্যাংক খাতের এই বিশেষজ্ঞ ভারতের সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেন। ঘুষ নিয়ে গ্রাহককে সীমার বেশি ঋণ দিয়েছিল ভারতের সিন্ডিকেট ব্যাংক। এই অভিযোগে গত আগস্ট মাসে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই সিন্ডিকেট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সুধীর কুমার জৈন, তাঁর শ্যালকসহ সন্দেহভাজন অন্তত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ভারতের পুলিশি তদন্ত সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)। অভিযোগ হলো, সুধীর কুমার মনমোহন সিংয়ের আমলে ৫০ লাখ রুপি (বাংলাদেশি টাকায় মাত্র ৬৩ লাখ ৬৪ হাজার) ঘুষ নিয়ে দুটি কোম্পানিকে ঋণসীমার চেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছিলেন।
অথচ দেশে বেসিক ব্যাংকে সব ধরনের নিয়মনীতি ভঙ্গ করে অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে শুধু দুই বছরের জন্য অপসারণ করেছে আর অর্থ মন্ত্রণালয় কেলেঙ্কারির মূল ব্যক্তি বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুকে ‘সম্মানজনক’ বিদায় দিয়েছে।

৪ ব্যাংকের মোট খেলাপি ১৯ হাজার কোটি টাকা
৬ বছরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির হার
জনতা ব্যাংক ৮৫%
সোনালী ব্যাংক ৬৫%
অগ্রণী ব্যাংক ৪০%
রূপালী ব্যাংক ১৭%
সরকারের বিশেষায়িত বেসিক ব্যাংকে ঋণের নামে আত্মসাৎ ৪৫০০ কোটি টাকা

কেরানির ছেলে বিখ্যাত ইংরেজ উপন্যাসিক! by ইমরান আলী

ভিক্টোরিয়ান যুগে চার্লস হাফ্যাম ডিকেন্স (ছদ্মনাম বজ) ছিলেন অন্যতম  লেখকদের একজন। বলা হয়, লেখকরা লেখেন তাদের মনের  খোরাক যোগাতে। সে খোরাক পাঠকদের মনের তৃষ্ণাও মেটায়। কিন্তু নিজের বেঁচে থাকা যখন কঠিন থেকে কঠিনতর হয় তখন কি  লেখক পারেন লেখা চালিয়ে নিতে কিংবা লেখার মতো মানসিকতা ধারণ করতে? হ্যাঁ পারেন। কারণ তারা শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিজেকে ছড়িয়ে রাখতে জানেন- পারেন পাঠককে প্রফুল্ল রাখতে।  তেমনই একজন ডিকেন্স। যিনি থেমে থাকেননি নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখে দাঁড়িয়েও। জীবন ধারণ করতে গিয়ে পড়েছেন নানান আর্থিক জটিলতায়। কখনও কাজ করতে হয়েছে রুটির দোকানে। এতকিছুর পরও  তার প্রতিটি লেখা শেষ হয়েছে সুন্দর সমাপ্তি দিয়ে। অথচ তার জীবনটা শুরু হয়েছিল চরম দারিদ্র্যতা, সংকটের মাঝে। ডিকেন্সের প্রথম জীবন শুরু হয়েছিল  জেলখানায়। জেলে থাকতে হয়েছিল কারণ তার বাবা একসময় ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন। বাবা ছিলেন নেভি পে অফিসের একজন পিয়ন। শুধু তাই নয়, অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল ডিকেন্সকে। স্কুল ছেড়ে কারখানায় কাজ করতে হয়েছিল বাবার ঋণ শোধ করতে। এতসব ভয়ানক কাজ করতে গিয়ে ডিকেন্স কিন্তু ভেঙে পড়েননি। স্কুলজীবন শেষে সাংবাদিকতা করেছেন অনেকদিন। কষ্ট, পরিশ্রম তার লেখাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা নতুন উৎসাহ। বাস্তব জীবনের কষ্টগুলোকে তিনি চিত্রিত করেছেন ব্যঙ্গ করে কৌতুক করে। কখনও সামাজিক নানা সমস্যার সমালোচনা করেছেন কঠোরভাবে। ডিকেন্সের লেখা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যা তার পূর্বসূরি লেখকদের জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে জনপ্রিয়তা এখনও অক্ষুণœ। উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ এই উপন্যাসিক লিখে গেছেন আমৃত্যু পর্যন্ত। রচনা করেছেন একের পর এক উপন্যাস। কোন উপন্যাসে লিখেছেন নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা কোনটায় পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা।

তার উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহের মধ্যে আছে- স্কেচেস বাই বজ, দি ওল্ড কিউরিসিটি শপ, অলিভার টুইস্ট, নিকোলাস নিকোলবি, আ  টেল অব টু সিটিজ, হার্ড টাইমস, আওয়ার মিউচুয়াল ফ্রেন্ড, দ্য পিকউইক পেপারস ইত্যাদি। ইংরেজি ১৮৮২তে ইংল্যান্ডের হাম্পশ্যায়ারে জন্ম নেয়া এই উপন্যাসিকের মৃত্যু হয় ১৮৭০-এ। ফিলাডেলফিয়াতে নির্মিত আছে চার্লস ডিকেন্সের স্মরণে স্ট্যাচু অব ডিকেন্স।

কৌশল বদলে ফের কিডনি কেনাবেচা by তৌহিদুল ইসলাম লায়নর

অভাবের কারণে কালাইয়ে ব্যাপক হারে কিডনি বিক্রির ঘটনা ঘটে ২০১১ সালে। তখন এ ঘটনা আলোচিত হয়েছিল দেশজুড়ে। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর কিডনি ব্যবসায় জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিল প্রশাসন। কয়েকজন দালালকে আটক করে কারাগারেও পাঠানো হয়েছিল। এর ঠিক তিন বছর পর ফের সক্রিয় হয়েছে ওই চক্রটি। আবার শুরু হয়েছে কিডনি কেনাবেচা। তবে এবার কৌশল পাল্টিয়েছে উভয় পক্ষই। ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে, পাসপোর্ট জাল করে, ভুয়া চিকিৎসাপত্র নিয়ে অনেকে বিদেশ যাচ্ছে কিডনি বিক্রির জন্য। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এ কাজ করছে সেই আগের চক্রই।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার ২৩ গ্রামের আরও অন্তত ৩৭ জন ঋণগ্রস্ত-অভাবী মানুষ হফ্‌কা ঋণ (দাদন) ব্যবসা ও এনজিও’র ঋণের কিস্তির ফাঁদে পড়ে নিরুপায় হয়ে বিদেশে গিয়ে তাদের দেহের মূল্যবান সম্পদ কিডনি ও যকৃৎ বিক্রি করেছেন। তবে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিখোঁজ রয়েছেন নারী-পুরুষ মিলে আরও অন্তত ১২ জন। কিডনি ব্যবসায় এখন কৌশল বদল করেছে দালালরা। এবার কিডনি বিক্রেতাদের নাম ঠিক রেখে পরিবর্তন করা হচ্ছে মূল ঠিকানা। ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া বাবা-মায়ের নাম। কিডনি গ্রহীতার সঙ্গে বিক্রেতার রক্তের সম্পর্ক দেখিয়ে নেয়া হচ্ছে কিডনি গ্রহীতাদের স্ব-স্ব এলাকার ইউনিয়ন/পৌরসভা থেকে কিডনি বিক্রেতার জন্মনিবন্ধন ও নাগরিকত্ব সনদ। এ ছাড়া তৈরি করা হচ্ছে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র। পাসপোর্ট প্রস্তুতের সময় পুলিশ পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিলের আগে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কিডনি বিক্রেতাদের পরিবর্তিত নতুন ঠিকানায় সশরীরে উপস্থিত দেখানো হয়।
এদিকে প্রশাসনের যথাযথ মনিটরিং না থাকায় জামিনে থাকা মূল হোতাসহ নতুন নতুন দালাল চক্রের বিরুদ্ধে অভিনব কৌশলে কিডনি কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। আগের চেয়ে বেশি দামে কিডনি কেনার লোভ দেখিয়ে নতুন দালালরা গোপনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-মহল্লার ঋণগ্রস্ত অভাবী ও খেটে খাওয়া মানুষের এখন নিত্যদিন এলাকা ছাড়া করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সরজমিনে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিডনি বিক্রি দালাল চক্রের মূল হোতা কালাই উপজেলার আবদুস সাত্তার, ঢাকার তারেক আজম, মাহমুদ, সন্ত্রাসী কবির, সিরাজগঞ্জের মকবুল ও বাগেরহাটের সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে নতুনভাবে কিডনি কেনাবেচার দালালি শুরু করেছে কালাই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের তাজুল ইসলাম, হেলাল, গাজী, নয়াপাড়া গ্রামের নূরনবী, বোড়াই গ্রামের উঁকুন খোরশেদ, টাকাহুত গ্রামের মোশাররফ, শফি, রাসেল ও শাহিন, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের মোস্তফা ও আবদুল মান্নান, নওয়ানা গ্রামের মোশারফ ও নারায়ণগঞ্জের মকবুলসহ অনেকে। তবে মামলা ও প্রচার মাধ্যমের সুবাদে দেশজুড়ে হইচই শুরু হওয়ার আগে যারা কিডনি বিক্রি করেছিল, তাদের অধিকাংশেরই কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল দেশের ঢাকাস্থ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। কিন্তু বর্তমানে দেশের কোন হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন না করার কারণে কিডনি বিক্রেতারা ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত কলম্ব এশিয়া হাসপাতাল, রবীন্দ্র-দেবীশেটি হাসপাতাল, মেডিকা হাসপাতাল ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে তাদের কিডনি প্রতিস্থাপন করছেন। নারায়ণগঞ্জের দালাল মকবুলের মাধ্যমে ভারতে কিডনি বিক্রি করতে গিয়ে দরদামে বনিবনা না হওয়ায় ফিরে এসেছেন কালাই উপজেলার বৈরাগী হাটের রিপন ও দুর্গাপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অভাবী মানুষ গত ৬ মাসে ফের নতুনভাবে কিডনি বিক্রি করেছেন অভিনব কৌশলে কিডনি গ্রহীতার সঙ্গে বিক্রেতার রক্তের সম্পর্ক দেখিয়ে নাম ঠিক রেখে মূল ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম, পাসপোর্ট ও ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে। এমন কয়েকজনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পর্যবেক্ষণকালে নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে। এমন কয়েকজন হলেন কালাই উপজেলার বোড়াই গ্রামের মোকাররম, বিনইল পশ্চিম গুচ্ছগ্রামের জবুনা বেগম, সিমরাইল গ্রামের আবদুর রহিম ও উলিপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা আজাদুল। জবুনাকে খুলনা বসুপাড়া এতিমখানা রোডের এবং আবদুর রহিমকে ফেনি সদরের স্থায়ী বাসিন্দা দেখানো হয়েছে। তবে আজাদুলের পাসপোর্টে তার প্রকৃত নাম ও ঠিকানার পরিবর্তন করে ব্যবহার করা হয়েছে মো. আজাদ হোসেন। স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে জাপান গার্ডেন সিটি বাংলাদেশ-১। অন্যজন হলেন কালাই উপজেলার বোড়াই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা জোসনা বেগম। জোসনার পাসপোর্ট ও ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্রে তার প্রকৃত নাম ও ঠিকানার পরিবর্তন করে ব্যবহার করা হয়েছে মাহফুজা বেগম। স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে সালামাইদ, গুলশান, ভাটারা, ঢাকা-১২১২। কালাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-মহল্লার নতুন করে কিডনি বিক্রির তালিকায় আছেন বোড়াই গ্রামের মোকাররম হোসেন, বেলাল উদ্দীন ও তার স্ত্রী জোসনা বেগম; বিনইল পশ্চিম গুচ্ছগ্রামের জবুনা বেগম, সিমরাইল গ্রামের আবেদুর রহমান, ইসলাম মিয়া, আবদুর রহিম, এনামুল, সাকোয়াত ও মোত্তালেব, আরবাব গ্রামের আফজাল, পাইকপাড়া গ্রামের শহীদুল ইসলাম, রঘুনাথপুর গ্রামের জাকারিয়া, ভেরেণ্ডির শফিক ও শাহারুল, পাইকপাড়া গ্রামের শহিদুল, দুর্গাপুরের রাজিয়া, বৈরাগিরহাটের তোফাজ্জল, ভূসা গ্রামের মানিক, আঁকলাপাড়া গ্রামের আনোয়ার, টাকাহুত গ্রামের সেলিনা, উলিপুর গ্রামের আজাদুল ইসলাম ও ছারভানু; কুসুমসাড়ার মোস্তফা, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের গোলাম হোসেনের মেয়ে শাবানা ও খাদিজা, ফুলপুকুরিয়া গ্রামের মুসা, সুড়াইল গ্রামের সাইফুল ও কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার বিপ্লব হোসেন ফকির। এ ছাড়া কিডনি বিক্রি উদ্দেশ্যে নিরুদ্দেশ রয়েছেন বিনইল পশ্চিম গুচ্ছগ্রামের মরিয়ম, মেরিনা, শেফালি, ইঁটাতলা গ্রামের মোজাহারের স্ত্রী, বোড়াই গ্রামের তানজিমা, দুর্গাপুর গ্রামের আনোয়ার, সুজাউল, শাহেনা, সেলিনা ও শাওনী, জয়পুর বহুঁতি গ্রামের জাহেদা বেগম ও বায়েজিদ; পাইকপাড়ার ছাইদুরসহ অনেকে। অন্যদিকে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের যকৃৎ বিক্রিকারী মেহেদুলের বুকের কাটা অংশ এখনও জ্বালা-পোড়া করে বলে তিনি জানান।
কিডনি বিক্রেতা বিনইল পশ্চিম গুচ্ছগ্রামের জবুনা বেগম জানান, অভাবের কারণে স্বামী ও তিন সন্তাকে নিয়ে অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটতো তাদের। এ জন্য দাদন ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ‘এনজিও’তে অনেক টাকা ঋণ হয়। দাদন ব্যবসায়ীর সুদের টাকা ও ‘এনজিও’র কিস্তির টাকা যোগাড় করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। নিরুপায় হয়ে একদিন তার স্বামী ঢাকার উদ্দেশে পাড়ি জমান। স্বামীর খোঁজে ঢাকায় মিরপুরের একটি বাসায় ঝিয়ের কাজ করতে যান জবুনা। এ সময় পার্শ্ববর্তী বাসার ভাড়াটিয়া সেলিমের ঝিয়ের সঙ্গে যবুনার পরিচয় হয়। সে জবুনাকে তার মালিক সেলিমের কিডনি নষ্টের কথা বলে। সে আরও বলে, কেউ কিডনি বিক্রি করলে তার মালিক মোটা দামে তা কিনে নেবে। দেনা শোধের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জবুনা তার কিডনি ভারতের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-দেবী শেঠি হাসপাতালে গিয়ে প্রতিস্থাপন করেন।
নয়াপাড়া গ্রামের ভুট্টুর ছেলে তাজুলের মাধ্যমে ভারতের মেডিকা হাসপাতালে গিয়ে ৪ লাখ টাকার চুক্তিতে কিডনি বিক্রেতা পাইকপাড়া গ্রামের শহিদুল জানান, দালাল তাজুলের মাধ্যমে ঋণের দায়ে ৪ লাখ টাকায় কিডনি বিক্রি করলেও তিনি পেয়েছেন মাত্র দেড় লাখ টাকা। বাকি আড়াই লাখ টাকা গেছে দালালের পেটে।
কিডনি বিক্রেতা সিমরাইল গ্রামের আবদুর রহিম জানান, মোসলেমগঞ্জ বাজারের কয়েকজন দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেয়া ছিল ৪০ হাজার টাকা, ৩টি এনজিও’ থেকে ঋণ নেয়াছিল ৬০ হাজার টাকা। তাই হফ্‌কা ঋণ ও এনজিও’র কিস্তির চাপে পড়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাতেন। বাড়িতে স্ত্রীসহ ৩ কন্যা ছিল। ঢাকায় একজনের সঙ্গে পরিচয় হলে ৩ লাখ টাকার চুক্তিতে ভারতের দেবীশেটি হাসপাতালে গিয়ে রহিম তার কিডনি বিক্রি করে ৪ মাস পরে বাড়ি ফিরেন।
আড়াই বছর আগে কিডনি বিক্রি করেছেন এমন একজন হলেন উপজেলার উতরাইল গ্রামের মিজান। তিনি জানান, বছর দুই আগে বৈরাগীর হাট মোরে ডিসি, এসপি, সিভিল সার্জনসহ ঢাকার বড় চিকিৎসকরা মিটিং করে চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন। শারীরিক সমস্যা হলে জয়পুরহাট জেলা সদর হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসা করার কথা জানান। কিডনি দেয়াতে মাঝেমধ্যে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে জয়পুরহাট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা চিকিৎসার পরিবর্তে তার সঙ্গে বিদ্রূপ করেন।

স্কটল্যান্ডে গণভোট- স্বাধীনতার স্বপ্ন মরে না!

স্কটিশ গণভোটে জনগণের মাথা কাজ করেছে। হূদয় কাজ করেনি। তারা অন্তত এ যাত্রা বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলে কে হতেন তার জাতির জনক? কে হতেন স্বাধীনতার ঘোষক? এ বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার বিপদ থেকে জনগণই তাদের বাঁচিয়ে  দিয়েছে। মি. স্যামন্ড (স্বাধীনতার জন্য গণভোটের জনক) ভোটের পরে বলেছেন, ‘স্কটল্যান্ডের জন্য ক্যাম্পেন শেষ হয়ে যায়নি। স্বাধীনতার স্বপ্নের কখনও মৃত্যু নেই।’ এই স্বপ্ন কি ভৌগোলিক? কেবল ভূগোল হলেই তা স্বপ্ন মেখে দিতে পারে? স্যামন্ড কোন জ্বালাময়ী বক্তব্য দেননি। স্বাধীনতার স্বপ্ন কি মাঝপথেই থমকে গেল? যে ভাবে দেখে। নেতারা যেখাবে দেখান। সেভাবেই কখনও স্বাধীনতার স্বপ্ন সৌধ আঁকা হতে পারে। যেমন এক লেবার নেতার কথায়, নতুন স্বপ্ন দেখা আটকাচ্ছে কে! “আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের গল্প করবো আমরা শুধু দেশটাকে অখণ্ডই রাখিনি, একসঙ্গে গড়েছি নতুন দেশ। এই বা কম কি!”

তবে ভোটের পরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সার্জ স্কিম্যান একটি অসাধারণ মন্তব্য করেছেন, ‘স্বাধীনতার পথে যাওয়ার বিতর্ক ও ভোটাভুটির পুরোটাই সভ্য, শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক আলাপ-আলোচনার মধ্যেই সীমিত থেকেছে। আর এ গণভোট একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন তুলেছে যে বিশ্বায়িত এ পৃথিবীতে জাতীয় পরিচয়সত্তার প্রতি অনুগত থাকার শক্তি কতখানি? কিন্তু যা-ই ঘটে থাকুন না কেন, কোন রাজনৈতিক দল গণভোটে কারচুপির আশঙ্কা করেনি।’ স্কিম্যান এমনকি মন্তব্য করেন যে, ‘ইউক্রেনে যেমনটা সম্প্রতি দেখা গেছে সে রকম সীমান্তের ওপার থেকে এসে কেউ স্বাধীনতা বিরোধীদের হুমকি দিয়ে যায়নি।’
ঢাকাতেও স্কটল্যান্ডের গণভোট বিরাট আগ্রহ-উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম হয়তো সেখানে থেকে এই শিক্ষা নিতে পারে যে, একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মতোই অসামান্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় সমগোত্রীয় বৃটিশ ও স্কটিশরা স্বাধীনতার প্রশ্নে সঙ্কীর্ণ অর্থে বিভক্ত হয়ে পড়েনি। গণভোটের ফলের পরে স্বাধীনতাকামী তরুণরা বিষণ্ন বদনে বসে থেকেছে। কিন্তু তারা দাঙ্গা করেনি। দোকানপাট কিংবা গাড়িবাড়িতে আগুন দেয়নি। 
বাংলাদেশী পর্যবেক্ষকদের অনেকেই একমত যে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোট ব্যবস্থা জাতীয় সঙ্কট উতরাতে সাহায্য করতে পারে। যা কোন বিদেশী বন্ধুত্ব বা সাহায্য নিশ্চিত করতে পারে না। যদি একটি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভোট ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশের অখণ্ডতার মতো সিদ্ধান্তও সেখান থেকে লাভ করা সম্ভব। অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে দেশকে বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে হয় না।
অবশ্য স্কটিশ স্বাধীনতাকামী নেতা স্যালমন্ড কেবল ভোটের রাজনীতি মানে সাংবিধানিক পথেই বিশ্বাসী ছিলেন। গণভোটের প্রশ্ন ছিল সোজা সাপ্টা- স্বাধীনতা চান কি চান না? ডেভিড ক্যামেরন জেনারেল ইয়াহিয়া খান হতে চাননি। ক্যামেরন সততার সঙ্গে বলেছেন, হে স্কটিশবাসী, তোমাদের ‘ছয় দফা’ আমি মানলাম। আমাদের সঙ্গে থাকলে তোমাদের স্বায়ত্তশাসন দেবো।      
স্বাধীন স্কটল্যান্ডের স্বপ্ন দেখেছিলেন তরুণ প্রজন্ম। তারা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছিলেন না। ছাত্র ধর্মঘটের মুখে তারা জনজীবন অচল করেননি। বেশির ভাগই প্রান্তিক মানুষজন, যেমন চাষি বা মৎস্যজীবী। নতুন রাষ্ট্র হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পেতেন তারা। আবেগপ্রবণ তরুণ প্রজন্মের কাছে আবার স্বাধীনতার স্বপ্নই সব চেয়ে দামি। কেউ বলেছেন, মাথা বনাম হূদয়ের লড়াইয়ে  প্রবীণদের হিসাবি পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত এত বড় তফাৎটা গড়ে দিল। এতটা ব্যবধান কেউ ভাবেনি। মোট ভোটারের ৫৫% আস্থা ঐক্যবদ্ধ বৃটেনে। স্বাধীনতার পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৫%। রাজধানী এডিনবরায় না-পন্থিরা যে জিতবেন, তা স্পষ্টই ছিল। তেমনই ডান্ডি, গ্লাসগোয় স্বাধীনতার পক্ষেই যে বেশি ভোট পড়বে, তা-ও ছিল প্রত্যাশিত।
শহরের কেন্দ্রস্থলে ওয়েস্ট পার্লামেন্ট স্কোয়ার। সেখানে একটি ভাস্কর্যের মাথায় কে একটা স্কটিশ নীল পতাকা চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছে। মূর্তির নিচের দিকে কেউ চক দিয়ে লিখে গিয়েছিল ‘ফ্রিডম ফ্রম দ্য টিরানি অব ওয়েস্টমিনস্টার’- ওয়েস্টমিনস্টারের দুঃশাসন থেকে মুক্তি চাই!
স্কটল্যান্ডবাসীই স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়ে বৃটেনের ৩০৭ বছরের জোট টিকিয়ে রাখলেন। আগের সমস্ত রেকর্ড ধুয়ে মুছে ভোট পড়ে প্রায় ৩৬ লাখ। যা মোট ভোটারের ৮৫ শতাংশ।
ফল বেরোনোর পর থেকেই যে প্রশ্নটা সব জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, একুশ শতকে এভাবে স্বাধীনতার সুযোগ কেন হাতছাড়া করলেন স্কটল্যান্ডবাসী? ভোটের হিসাব বলছে, এ ঐতিহাসিক গণভোটে গ্রাম-শহরের ফারাক প্রকট হয়ে উঠলো আরও।
শহুরে মধ্যবিত্ত, যারা ইতিমধ্যেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত, কোনও রকম অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াতে রাজি নন তারা। তারা উঠতি মধ্যবিত্ত হলে ফলটা পাল্টে  যেতো। কোন ২২ পরিবার ছিল না। স্কটিশ জনসংখ্যার একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছেন বিদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা। রয়েছেন অসংখ্য দক্ষিণ এশীয়। বাংলাদেশী  বংশোদ্ভূতরাও আছেন। স্বাধীনতার সঙ্গে একাত্মবোধ করার সুযোগ যেমন তাদের কম, তেমনই চেনা-পরিচিত কাঠামো ছেড়ে নতুনের সন্ধানে যাওয়াটাও বেশ ঝুঁকির।
বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অটোনমি কার্ড খেলেছেন। স্কটল্যান্ড আলাদা হয়ে গেলে দায় ঘাড়ে নিয়ে হয়তো পদ ছাড়তে হতো তাকে। একাত্তরে ইয়াহিয়াকে গদি ছাড়তে হয়েছিল।  ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরন বলেন, “স্কটল্যান্ডবাসী রায় জানিয়েছেন। আমি খুশি। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আরও কাছাকাছি আসতে হবে আমাদের। স্কটল্যান্ডবাসীর কথা শুনেছি। এ বার ইংল্যান্ডের বাসিন্দাদের কথা শোনার সময় এসেছে।” ভবিষ্যতে কর, উন্নয়ন, অর্থব্যয় কিছু কিছু প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সেখানকার পার্লামেন্ট। একই বিষয়ে এ রকম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকুক ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলসের পার্লামেন্টেরও, চান ক্যামেরন।
স্কটিশ স্বাধীনতার নেতা অ্যালেক্স স্যামন্ড নিরবে হার স্বীকার করে নিয়েছেন। স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার (স্থানীয় সরকারের প্রধান) এ অ্যালেক্স স্যামন্ড। ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পরেই জানিয়ে দেন, মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন। তার দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) নেতা হিসেবেও পদত্যাগ করবেন তিনি। তার কথায়, “স্বাধীন স্কটল্যান্ডের জন্য প্রচার শেষ হয়নি। স্বপ্নের কখনও মৃত্যু হতে পারে না।” আগামী নভেম্বরে দলের জন্য যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়ার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করবেন স্যামন্ড। তবে তারা হার থেকে শিক্ষা নেবেন না ইউরোপীয় অঞ্চল কাটালোনিয়া-র স্বাধীনতাকামী নেতা আর্তুর মাস। তিনি বলেন, স্পেনের প্রচণ্ড বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আগামী ৯ই নভেম্বরে স্বাধীনতার জন্য গণভোটের ডাক দেবেন।
বৃটেনের অঙ্গহানি হচ্ছে না, এ খবর পাওয়া মাত্র তার প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। ইউরো আর ডলারের তুলনায় পাউন্ডের দাম বাড়তে থাকে হু হু করে। গত দু’বছরের মধ্যে পাউন্ডের দাম ইউরোর তুলনায় এতটা বেশি বাড়লো। জোট ভেঙে গেলে রয়্যাল ব্যাঙ্ক অব স্কটল্যান্ড তাদের মূল দপ্তর সরিয়ে নিয়ে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু এবার আর তার দরকার নেই, জানিয়ে দিয়েছেন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। স্কটল্যান্ডবাসীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় কমিশনের সদস্যরা।

মিঠামইন থেকে বঙ্গভবনের রোডম্যাপ by কাজী সোহাগ

কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল মিঠামইন থেকে বঙ্গভবনের রোডম্যাপ লিখছেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ এডভোকেট। দিনের বেশির ভাগ সময় এখন তিনি ব্যয় করছেন বইয়ের পেছনে। নিজের জীবদ্দশায় বই লেখার কাজ শেষ করতে চান তিনি। বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশে থাকছে ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকার হিসেবে নিজের ভূমিকা। বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হচ্ছে বইয়ে। এছাড়া, ছাত্র জীবনের রাজনীতির আদ্যোপান্ত স্থান পাচ্ছে আত্মজীবনীতে। বইয়ের শেষ দিকে থাকছে বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা। প্রেসিডেন্টের আত্মজীবনী লেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট সংসদ সচিবালয় থেকে ৭ম, ৮ম ও ৯ম সংসদে তার ভূমিকার বিস্তারিত সংগ্রহ করেছেন। ১৩ই আগস্ট এ নিয়ে বঙ্গভবন থেকে চিঠি পাঠানো হয় সংসদ সচিবালয়ে। বঙ্গভবনের সিনিয়র সহকারী সচিব শওকত আলী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, ৭ম, ৮ম ও নবম সংসদে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বক্তব্য ও রুলিংয়ের হার্ড কপি ও সফট কপি রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ে রেকর্ড, রেফারেন্স সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। সংসদ সচিব চিঠিটি গ্রহণ করেন ১৪ই আগস্ট। ২০ দিন পর সংসদ সচিবালয় প্রেসিডেন্টের চাহিদামতো বক্তব্য ও রুলিংয়ের লিখিত কপি বঙ্গভবনে পাঠায়। তবে ৭ম সংসদের কোন কপি পাঠাতে পারেনি সচিবালয়। তাই প্রেসিডেন্টকে সরবরাহ করা ৩২১ পৃষ্ঠার ওই কপির সঙ্গে একটি চিঠিও সংযুক্তি করা হয়। সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ৮ম জাতীয় সংসদের ৪র্থ অধিবেশন (২০০২) থেকে সংসদ বিতর্ক সম্পাদনা কাজে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তখন থেকে কার্যাবাহের রিপোর্ট-এর সফট কপি সংরক্ষিত আছে। কিন্তু ৭ম জাতীয় সংসদের বিতর্কগুলো ছিলো হাতে সম্পাদিত (১৯৯৬ থেকে ২০০১)। সেগুলো বই আকারে মুদ্রণ করে ইতিমধ্যে ৭ম জাতীয় সংসদের এমপিদের মধ্যে ও লাইব্রেরিতে রেফারেন্স হিসেবে রাখার জন্য চামড়া দ্বারা বাঁধাই করে সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ করার মতো কোন অতিরিক্ত কপি না থাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হলো না। নিজের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অলিগলি আত্মজীবনীতে তুলে ধরতে চান প্রেসিডেন্ট। এর বড় একটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন সংসদে। নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ নানা সিদ্ধান্ত। আবার অধিবেশন কক্ষে হাস্যরস তৈরি করে অনেকের প্রিয়ভাজন হয়েছেন তিনি। আত্মজীবনীতে হিউমার ছড়ানো এসব বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আড্ডাবাজ হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে গিয়েও পরিবর্তন হননি। তবে শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছেন মাত্র। ২০১৩ সালের ৫ই আগস্ট বঙ্গভবনে সংসদ সচিবালয় বিটে কর্মরত কয়েক সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানান তিনি। ওই তালিকায় প্রতিবেদকও ছিল। ওই দিন তিনি প্রথমবারের মতো আত্মজীবনী লেখার কথা বলেন। ওই দিন আড্ডা দেন খোলামেলা। বলেন নানা কথা। নিজেকে এখন বন্দি মনে করছেন প্রেসিডেন্ট। যুক্তি তুলে ধরে বলেন, কেন মনে হবে না। আমি ছিলাম বরাবরই আড্ডাপ্রিয় একজন মানুষ। এখন আর আগের মতো আড্ডা দিতে পারি না। কথা বলতে পারি না। সংসদে কাটিয়েছি জীবনের বড় একটি অংশ। সেই সংসদ আমাকে টানে। কিন্তু মন বললেই সেখানে ছুটে যেতে পারি না। রসিকতা করে বললেন, ইচ্ছা করলে যেতে পারি মাত্র ১২ মিনিটে। কিন্তু যাই না। কারণ, রাজধানীর ট্রাফিক। এমনিতেই যানজট নিয়ে মানুষের ত্রাহি অবস্থা। এর ওপর আমি যদি সংসদে যেতে চাই তাহলে এক ঘণ্টা আগে থেকেই রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হবে। এতে জনসাধারণ আমার ওপর ক্ষেপবে। জ্যামে আটকে থেকে আমার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করবে। তিনি বলেন, মূলত সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা চিন্তা করে বেশি মুভ করতে পারি না। ইচ্ছা তো অনেক কিছুই হয়। কিন্তু সব পারি না। আমার মেয়ের বাসা লালমাটিয়ায়। সে একদিন বললো, বাবা তুমি তো আমার বাসায় একদিনও এলে না। আমি বললাম, তোমার বাসায় আমি আসতে পারি। তবে এতে অনেক মানুষের গালি শুনে আসতে হবে। এটা কি ঠিক হবে? তার চেয়ে বরং তুমিই মাঝে মাঝে আমাকে এসে দেখে যেও। রসিকতা করে প্রেসিডেন্ট বললেন, আগে কয়েকবার জেল খেটেছি। তখন আমার চারপাশে থাকতো পুলিশ। তারা আমার কোমরে দড়ি বাঁধতে চেয়েছিল। আমি উকিল মানুষ। কিছু বিষয় জানতাম। কোমরে দড়ি বাঁধলে পুলিশের সুবিধা হতো। ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পেতো। যেমন, কিছু উত্তম-মধ্যম দিয়ে বলতে পারতো পুলিশের ওপর আক্রমণ করার চেষ্টা করায় এ অবস্থা হয়েছে। তাই আমি তাদের অনুরোধ করতাম কোমরে দড়ি না বেঁধে হাতে বাঁধো। তারা তাই করতো। হাত বাঁধা থাকলে তো আর পুলিশ বলতে পারবে না আক্রমণ করতে যাচ্ছিল। যা-ই হোক, তখন পুলিশ হাত বেঁধে রাখতো দড়ি দিয়ে। আর এখন দড়ি লাগে না। এমনিতেই বাঁধা হয়ে আছি। উল্টো বাড়তি পাওনা হিসেবে কিছু স্যালুট পাই। রসিকতা করে তিনি বললেন, আগে জেলখানায় যখন ছিলাম তখন সন্ধ্যার পর জেলখানার বাইরে কারারক্ষীরা তালা দিয়ে রাখতো। এখন আর তালা লাগে না। মনে হয় অটো তালার মধ্যে রয়েছি। ইচ্ছামতো চলাচল করতে পারি না। একটি নির্দিষ্ট জায়গার পর যেতে চাইলে ইনফর্ম করা লাগে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিজেকে বোবা বলে মনে করেন আবদুল হামিদ এডভোকেট। তিনি বলেন, বোবার কোন শত্রু নেই। কোন বিষয়ে আমি কথা বলতে পারি না। সংসদে অনেক কথা বলেছি। দেশের এই অভিভাবক কিন্তু এখনও জনবিচ্ছিন্ন নন। তার নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জের মানুষ শত নিরাপত্তার মাঝেও বঙ্গভবনে এসে ভিড় করেন। তার সঙ্গে কথা বলতে, দেখা করতে বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রেসিডেন্টের পরিবারও চায় তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের সঙ্গে আড্ডা দেন। তা না হলে মানসিকভাবে হয়তো কিছুটা ভেঙে পড়তে পারেন। প্রেসিডেন্টের ভাই আবদুল হাই জানান, এলাকার মানুষ নাছোড়বান্দা। তারা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে বলে আমাদের হামিদ ভাইকে দেখবো। তার সঙ্গে কথা বলবো। নিরাপত্তার কথা তারা মানতে চান না। তাদের দাবি একটাই, আমাদের হামিদ মিয়াকে কেউ দূরে রাখতে পারবে না। তাই দুপুরের পর থেকেই এলাকার সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করেন বঙ্গভবনের গেটে। তারা জানেন ডাক একসময় পড়বেই। হয়ও তাই।

এক চট্টগ্রাম বন্দর দুই ক্ষুব্ধ নেতা by মহিউদ্দীন জুয়েল

নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে ক্ষুব্ধ মহিউদ্দিন চৌধুরী। দু’জনেই নিজেদের পক্ষে অনড়। তবে পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে মুখোমুখি তারা। বিষয়টি গড়াচ্ছে দলের উচ্চ পর্যায়েও। মন্ত্রী শাজাহান খানের  ক্ষোভ বাড়ছে। তার বক্তব্য, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আন্দোলনের নামে বন্দরকে অরক্ষার পাঁয়তারা করছেন। তিনি বন্দর নিয়ে যে সব কর্মসূচি দিচ্ছেন তা নৌমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের সঙ্গে  সাংঘর্ষিক। সরকারের বিরুদ্ধাচরণ। নিজের প্রভাব খাটানোর জন্য তিনি বন্দরকে কুক্ষিগত রাখার চেষ্টা করছেন। এই নিয়ে একাধিকবার তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বারবারই মহিউদ্দিন চৌধুরী অযৌক্তিক দাবি তুলে বন্দর রক্ষার আন্দোলনের কথা বলেছেন।  অন্যদিকে মন্ত্রী শাজাহান খানের কাছে বারবার দাবি দেয়ার পরও সেগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় ভীষণ রাগান্বিত চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র। বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শেখ হাসিনার আস্থাভাজন বলে পরিচিত মহিউদ্দিন চৌধুরী কয়েক মাস আগে নৌমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বন্দর রক্ষায় ১০ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। সেখানে কনটেইনার ওঠানামার কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। মূলত এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব। সর্বশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামে এসে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী শাজাহান খান। এই সময় তিনি সাবেক মেয়রকে যৌক্তিক দাবি নিয়ে কথা না বলার আহ্বান জানান। বক্তব্যে মন্ত্রী কড়া সমালোচনা করেন তার। বন্দর নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কর্ণফুলী নদী দূষণ রোধকল্পে খাল ও নদী খনন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে এসব কথা বলেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার জন্য যারা আন্দোলন করছেন, তারা আসলে বন্দর অরক্ষার আন্দোলন করছেন। তারা বারবারই বলছেন এই বন্দর নাকি মাফিয়াদের খপ্পরে পড়েছে। আমি মনে করি তারা সত্যি কথা বলছেন না।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষায় ১০ দফা দাবি দিয়েছিলেন। আমরা তার সঙ্গে বসেছিলাম। তিনি আলোচনায় দাবিগুলোর ব্যাপারে কোন জবাব দিতে পারেননি। এবারও তিনি ১০ দফা দাবি দিয়েছেন। ওনার দাবিগুলো অযৌক্তিক।
শাজাহান খান আরও বলেন, আমি বুঝি না কেন বলা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর মাফিয়াদের হাতে চলে যাচ্ছে। এসব কথাবার্তা ঠিক নয়। যারা বলছে, তাদের উদ্দেশ্য কি তা বুঝতে পারি না। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে বিদেশ  থেকে জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যাবে। এই বন্দর নিয়ে সারা বিশ্বে যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে তা নষ্ট হয়ে যাবে। মাফিয়ারা মানুষ খুন করে। মাফিয়ারা মাদক ব্যবসা করে। মাফিয়ারা অর্থ পাচার করে। এখানে কি এসব হচ্ছে?
অনুষ্ঠানে এই সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মনজুর আলম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা।
অনুষ্ঠান শেষে  নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম বন্দর অনেকখানি এগিয়ে গেছে। এই প্রতিষ্ঠানকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারও প্রতি আমার কোন রাগ নেই। তবে মাঝে মাঝে খুব অভিমান হয়। যখনই কোন সিদ্ধান্ত নিতে যাই তখনই হঠাৎ করে বাধা চলে আসে। তবে এ সব বাধা আমি ভয় পাই না। আমি আমার কাজ করে যাবো।
মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তিনি একজন বর্ষীয়ান নেতা। তার সঙ্গে আমার কোন বিরোধ নেই। তবে বন্দর নিয়ে তার যুক্তির সঙ্গে কিছুক্ষেত্রে আমার দ্বিমত রয়েছে। তিনি যেসব দাবি কিংবা অভিযোগ দিয়েছিলেন তা ঠিক নয়। এখানে কেউ যদি রাগও হয় তা আমার করার কিছু নেই। আমরা তার দেয়া ১০ দফা দাবি খতিয়ে দেখেছি। এগুলোর সত্যতা নেই।
মন্ত্রী বলেন, বন্দর রক্ষায় আবারও ১০ দফা দিয়েছেন তিনি। তাকে আহ্বান করবো আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। আসুন, বসুন, আলোচনা করি। আমি আলোচনায় বিশ্বাস করি। রাস্তায় কিছু না বলে আলোচনায় আসুন। আপনার  যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ। কিন্তু আপনার অযৌক্তিক দাবিগুলো আমরা দেখিয়ে দিয়ে বলবো এটি সঠিক নয়।
বন্দর নিয়ে শাজাহান খান বিচলিত না হলেও ভীষণ চিন্তিত সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী। ক্ষমতাসীন দলের এই প্রভাবশালী নেতা চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের ব্যানারে গত ৩ মাস ধরে সমাবেশ, অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। বন্দরের নানা অনিয়ম ও শর্ত ভঙ্গ করে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজ দেয়ার অভিযোগে তিনি কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বন্দরের শ্রমিকদের নিয়ে বিশাল সমাবেশও করেছেন। আর এই কাজটি করতে গিয়েই দূরত্ব তৈরি হয়েছে শাজাহান খানের সঙ্গে।
কিছুদিন আগে প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কেউ রাজনীতি করলে পরিণাম ভাল হবে না। সাইফ পাওয়ারটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান বন্দরে কিভাবে কাজ করছে তা আমার বোধগম্য নয়। আমি জানি, তারা অবৈধভাবে সেখানে আছে। চুক্তিভঙ্গ করে তারা বন্দরকে জিম্মি করে রেখেছে। ওদেরকে শেল্টার দিচ্ছেন ঘাপটি মেরে থাকা একটি প্রভাবশালী মহল। তারা নতুনভাবে রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন।
বক্তব্যে মহিউদ্দিন চৌধুরী শেল্টার কিংবা  কোন ধরনের ব্যবস্থা না নেয়ার যে কথা তুলে ধরেছেন তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এই নিয়ে শাজাহান খানের ওপরও তার ভীষণ রাগ বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সাইফ পাওয়ারটেক নামের ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অবস্থান নিয়েছেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার অভিযোগ, গত ৮ বছর ধরে একচেটিয়া চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কাজ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে হাতে রেখে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।
গত ২৫শে আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ওই সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে এই বিষয়ে আরও কথা বলেন বর্তমান নগর আওয়ামী লীগের এই সভাপতি। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, বন্দর অচলের কাজে যদি কেউ সাইফ পাওয়ারটেককে প্রশ্রয় দেয় তাহলে আমরা শ্রমিকদের নিয়ে তাদের প্রতিহত করবো। কিছুতেই দেশের স্বর্ণদ্বার বন্দরকে কুক্ষিগত হতে দেবো না। এই নিয়ে কোন ধরনের রাজনীতি চলবে না। ওই প্রতিষ্ঠান বন্দরের অনেক টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। এতে বন্দরের সঙ্গে জড়িত সব লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা একটি মাফিয়া। আমি এই মাফিয়াদের হাত থেকে চট্টগ্রামের মানুষকে বাঁচাতে আন্দোলন শুরু করেছি। এই বিষয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আমি ফেয়ার রাজনীতি করি। অন্যায়কে কখনওই প্রশ্রয় দেই না। বন্দরে কোন ধরনের অন্যায় কাজ চলবে তা আমি হতে দেবো না।  নগর আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, শাজাহান খানের কাছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের চুক্তি বাতিলের কথা জানিয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এই লক্ষ্যে তিনি ১০ দফা দাবিও পেশ করেছিলেন। কিন্তু শাজাহান খান তার অনুরোধ না রাখায় মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে এই নিয়ে চাপা বিরোধ সৃষ্টি হয়। দিন দিন এই ক্ষোভ আরও বাড়ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

ঢাকা: দৃশ্যান্তরের বর্ণচ্ছটা by ড. মাহফুজ পারভেজ

আজ থেকে ২০ বা ৩০ বা ৪০ বছর আগের ঢাকার দৃশ্যপট যারা দেখেছেন, তারা কি সবটুকু মনে রাখতে পেরেছেন? শৈশব বা কৈশোরের ঢাকার বিবরণ আজকে শুনলে রূপকথার মতোই মনে হবে। কেউ কি এখন বিশ্বাস করবে যে, রিকশায় চড়ে পুরো ঢাকা শহর একদা পরিভ্রমণ করা সম্ভব ছিল! আশির দশকেও নীলক্ষেত থেকে সাভারের জাহাঙ্গীরনগরে ৪০-৫০ মিনিটে বাসে চলে যাওয়া সম্ভব ছিল! কেমন যেন নিজের একান্ত শহর মনে হতো ঢাকাকে। আজকে যা খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। এই ঢাকার যে দৃশ্যান্তর বা পরিবর্তন, নগরায়নের তত্ত্বে সেটা উন্নয়ন না অবক্ষয়, তা নিয়ে তুমুল তর্ক হতে পারে। ঢাকার জীবনের সমাজতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক পালাবদলও ইতিবাচকতা আর নেতিবাচকতার তুলাদণ্ডে বিশ্লেষিত হওয়ার দাবি রাখে। নাগরিক জীবনের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির নিরিখে ঢাকার বিকাশ যথেষ্ট ভাবনার বিষয়। ঢাকাকে নাগরিক-বান্ধব ও পরিবেশ-অনুকূল এবং বাসযোগ্য রাখতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশবিদ, উন্নয়নকর্মী, নগরায়ন বিশেষজ্ঞরা এসব কথা হামেশাই বলছেন। যদিও এসব কথার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পেছনে জরুরিভাবে রয়েছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার বিষয়টি; তথাপি ঢাকা নিয়ে, এর যানজট ও জলাবদ্ধতা নিয়ে, প্রকৃতি-বিনাশ ও বিমানবিকীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা বিশেষ কিছুই বলছেন না। তারা বরং সহস্র জনতাকে জ্যামে আটকে রেখে ভেঁপু বাজিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতেই পছন্দ করেন। ঢাকা নিয়ে অন্য কেউ ভাবুক বা না-ভাবুক, কবি আর শিল্পীরা ঠিকই ভেবেছেন। কবিতা বা কথাসাহিত্যের মতোই চিত্রকলায় ঢাকার বিবর্তন উঠে এসেছে। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সংখ্যাতিরিক্ত-অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরীর ৭ম একক চিত্র প্রদর্শনীর শিরোনামও মন্তাজ বা দৃশ্যান্তর, যা উৎকীর্ণ করেছে ঢাকার পরিবর্তনমানতাকে। সমরজিৎ চড়া রঙ ব্যবহার করেন ছবিতে। ধূসর অতীতকে ধরে রাখতে চান; হারিয়ে ফেলতে নারাজ তিনি। তার একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে যখন প্রশ্ন করি, তখন শাঁখারীপট্টির আবহে আঁকা ছবিটি দেখিয়ে বললেন, ‘‘একদিন এলাকাটির এই টপোগ্রাফি বাস্তবে থাকবে না বটে। কিন্তু আমার দেখায় আর আঁকায় রয়ে যাবে।” কুমিল্লায় জন্ম নেয়া এই শিল্পীর পেশাগত বয়স পঞ্চাশ অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের কিবরিয়া, রশিদ চৌধুরীর আঁকার ধরন পছন্দ করেন তিনি। পছন্দ করেন পিকাসো ও মাতিসের কাজ। ঘুরেছেন পশ্চিম ইউরোপের প্রায় সবগুলো বিশিষ্ট চিত্রশালা। নিজের ছবিতে কিউবিক, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ধারার প্রয়োগেও পারঙ্গমতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। ঢাকার নানা দৃশ্যপট, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি ও পরিবেশ, যা একদা ছিল কিন্তু আজ আর নেই, এবারের প্রদর্শনীতে সে সবই বিষয়বস্তু হয়ে এসেছে। বললেন, “আমি রঙ আর আলো-ছায়ায় নানা দৃশ্যপটের কল্পনায় ফুটিয়ে তুলেছি। দেখার অনুভূতিকে ধরে রাখতে চেয়েছি। ঐতিহ্য ও আবহমানতা এভাবে আমার আঁকায় থেকে যাচ্ছে।”
সমরজিৎ রায় চৌধুরী মনে করেন, তথ্য-প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও কম্পিউটারের ব্যবহারের মাধ্যমে সাম্প্রতিক প্রজন্মের তরুণতম শিল্পীরা আঁকার অনেক বড় পরিধি পাচ্ছে। বিদেশী চিত্রকলা সম্পর্কে তারা অতি দ্রুত জ্ঞাত হতে পারছে। এতে তাদের কাজের মান বাড়ারই সম্ভাবনা। তারা যদি বাংলাদেশের চিরায়ত বিষয়বস্তুকে নিজস্ব শৈলীতে ধরে রাখতে পারে, তবেই আমাদের শিল্পকলা ও চিত্রশিল্পের প্রভূত মঙ্গল হবে। ঢাকা বা বাংলাদেশ নিয়ে শিল্পীর দু’ চোখ যে বাস্তব আর কল্পনার মিশেলে দৃশ্যপটের বর্ণচ্ছটা আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছেন, তা দেখে এই নগরের বাসিন্দা আর নীতিনির্ধারণের প্রকৃত-নয়ন উন্মিলিত হলেই অবক্ষয়ের কশাঘাত থেকে বাঁচতে পারবে প্রাচ্যের এই সুপ্রাচীন নগরী। তিলোত্তমা না হোক, অন্তত হতে পারবে মানুষের বসবাসযোগ্য। প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব নান্দনিক ঢাকা শুধু স্বপ্ন, কল্পনা আর স্মৃতিচারণের নস্টালজিয়ায় না থেকে বাস্তবের বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে, এটাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হওয়া দরকার। আধুনিক মানুষ হিসেবে আমাদের জীবনযাপনের ক্ষেত্র ঢাকাকে সুন্দর ও নিরাপদ করার কাজ আর কতদিন বাকি পরে থাকবে? সমরজিৎ সম্ভবত অলক্ষ্যে এ প্রশ্নটিই সকলের চৈতন্যে পৌঁছে দিয়েছেন তার একক চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে।

বউ ফিরে পেতে

>>আইফোন ৬ কিনে স্ত্রীকে খুশি করতে চান দারিয়ুজ ওলোদারস্কি। ছবি: ইউটিউবের সৌজন্যে
সম্পর্কের বাঁধন যখন টুটে যায়, শুধু ফুলের তোড়া যখন সে শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না—এমন অবস্থায় আপনি কী করতেন? এ ধরনেরই এক সংকটে পড়েছেন পোলিশ বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা দারিয়ুজ ওলোদারস্কি। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এর কারণ হচ্ছে আমি স্বামী ও বাবা হিসেবে ভালো ছিলাম না।’ যুক্তরাজ্যের এসডব্লিউএনএস-টিভিকে এক সাক্ষাৎকারে ওলোদারস্কি বলেন, ‘আমি জানতাম না আমার কাছে পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে ওলোদারস্কির বক্তব্য, ‘আমি যখন প্রথম তাকে আইফোন কিনে দিয়েছিলাম, খুব খুশি হয়েছিল সে।’
ছেড়ে যাওয়া স্ত্রীকে আবার খুশি করতে, তার মন পেতেই যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলে ক্যাবট সারকাস অ্যাপল স্টোরের সামনে ৪৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আইফোন ৬ কেনার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। নতুন আইফোন কিনে দিয়ে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চান বলেই জানিয়েছেন ওলোদারস্কি। ১৯ সেপ্টেম্বরে যখন আইফোন বিক্রি শুরু হয়, তখনই ক্যাবট সারকাস অ্যাপল স্টোরের সামনে লাইনের প্রথমে ছিলেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল পোস্টকে ওলোদারস্কি বলেছেন, ‘আমার স্ত্রী আইফোন ৬ পছন্দ করবে। এর আগে আমাকে বড়মাপের এই আইফোন কিনে দেওয়ার কথা বলেছিল। আমার এই ফোন কেনার সামর্থ্য না থাকলেও আমি তার জন্য এটা কিনতে চাই।’
অবশ্য ওলোদারস্কি আশঙ্কা করছেন, আইফোন ৬ কিনলেও হয়তো স্ত্রীকে আর বোঝাতে পারবেন না। এই আইফোন দিয়েও হয়তো খুশি করা যাবে না তাকে। তবে এই আইফোন কিনে দেওয়ার মাধ্যমে স্ত্রীকে তিনি বোঝাতে চান যে, ‘আবারও তিনি ভালো হতে পারেন।’

ওলোদারস্কি বলেন, ১৯ বছরের সংসার তাঁদের। বর্তমানে তিনি বেকার। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে আইফোন ৬ কিনছেন তিনি।
একটি উপহারের মাধ্যমে কি আবারও জোড়া লাগবে ওলোদারস্কির সংসার? সম্ভবত, মধুর সমাপ্তির আশা করাই যেতে পারে। কখনো কখনো উপহারেও তো মন গলানো যায়। (সিনেট)