Showing posts with label জলবায়ু ও পরিবেশ. Show all posts
Showing posts with label জলবায়ু ও পরিবেশ. Show all posts

Friday, September 4, 2026

‘সুপার সাইজড’ এল নিনোর কবলে বিশ্ব, সতর্কতা জাতিসংঘের

বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার এক ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ বা ডেঞ্জার জোনে প্রবেশের বার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ এবার ‘সুপার সাইজড’ বা অতি শক্তিশালী রূপ ধারণ করছে, যা বিশ্বজুড়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত উঠে এসেছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের এল নিনো গত ৭০ বছরের মধ্যে শক্তিশালী হতে পারে এবং এটি অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনে বিশাল আকার ধারণ করছে। বিজ্ঞান নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, আমাদের পৃথিবী এখন এক অচেনা এবং অনিশ্চিত জলসীমায় প্রবেশ করেছে, যা ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে।’

মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনিতেই বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, তার ওপর এল নিনোর এই শক্তিশালী উপস্থিতি উত্তাপকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের মাধ্যমে সাগরের উপরিভাগের পানিকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত করে তোলে। ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে।’

এর ফলে কোথাও দেখা দেবে দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও শক্তিশালী টাইফুন ও আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব চলবে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ১৯৫০ সালের পর সর্বোচ্চ। এমনকি সাগরের তলদেশের কোনো কোনো অংশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি দেখা গেছে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা কেবল প্রশান্ত মহাসাগরই নয়, ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানী ড. অ্যালিস্টেয়ার হবডে জানিয়েছেন, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কারণে এরই মধ্যে সাগরের কোরাল বা প্রবাল ধ্বংস হচ্ছে এবং শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তার ঘটছে। এবারের এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া এবং তাসমানিয়া অঞ্চলে সামুদ্রিক প্রাণীদের ব্যাপক মৃত্যু, শৈবাল আক্রমণ এবং জেলিফিশের উপদ্রব দেখা দিতে পারে।

ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থাগুলো আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ডব্লিউএমও জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাপক জনবিকাশ কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ছাড়া মৃত্যুর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম চিকিৎসা সহায়তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তবে এই এল নিনোর শক্তি এবং স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

Sunday, August 30, 2026

আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহত ফসল উৎপাদন

আরব নিউজঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরব বিশ্বে পানির সংকট, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে পানি-সংকটপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি আরব বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও বড় খাদ্য ও মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর তথ্য অনুযায়ী, আরব দেশগুলোতে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৫ শতাংশেরও কম। একই সঙ্গে মরুকরণও বাড়ছে। ফলে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

আরব বিশ্ব খাদ্যের জন্য ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। এফএওর হিসাবে, ২০৩১ সালের মধ্যে অঞ্চলটির মোট খাদ্য চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হতে পারে। উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এসব দেশ ঝুঁকিতে পড়বে।

মিসরের মতো দেশগুলোর ঝুঁকি আরও বেশি। দেশটি গমের প্রায় অর্ধেক আমদানি করে। গমের দাম বাড়লে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হয়, আর সীমিত অর্থের কারণে অন্য খাতের ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হয়।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) আঞ্চলিক পরিচালক সামের আবদেলজাবের বলেন, খাদ্য আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের সংকটের কাছে অঞ্চলটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কৃষি উৎপাদন কমাচ্ছে, মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং খাদ্যের দাম বাড়াচ্ছে।

সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং ইরাক ও লিবিয়ার কিছু এলাকায় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুতর বলে জানিয়েছে ডব্লিউএফপি। সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে অপুষ্টির হার সংঘাতমুক্ত দেশের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ মৌলিক পানীয়জল সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। একই সময়ে অঞ্চলটির প্রায় ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন উচ্চ বা অত্যন্ত উচ্চ পানিসংকটের এলাকায় বসবাস করছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় শুধু খাদ্য ও পানি সরবরাহ করলেই হবে না; বরং আগাম সতর্কতা, পানির কার্যকর ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরযোগ্য উৎস এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সমাধান ইতোমধ্যে রয়েছে—এখন প্রয়োজন তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা। 

আরব বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য ও পানির সংকট, মরুকরণে ব্যাহত ফসল উৎপাদন

Wednesday, August 26, 2026

মহাসাগরগুলোতে এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড

বিশ্বের মহাসাগরগুলো আগস্ট মাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দৈনিক তাপমাত্রায় পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট মেরু অঞ্চল বাদে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। ইউরোনিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

এটি ২০২৪ সালের মার্চে রেকর্ড হওয়া ২১ দশমিক ০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের সর্বোচ্চ দৈনিক তাপমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে আগস্ট মাসের আগের রেকর্ড ২০ দশমিক ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৩ সালে রেকর্ড হয়েছিল, সেটিও ভেঙে গেছে।

সাধারণত দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মের প্রভাবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমতে থাকে। কিন্তু এবার আগস্টে এসে নতুন রেকর্ড হওয়ায় বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এ সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রে অতিরিক্ত তাপ যোগ হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু এল নিনো দিয়ে এই রেকর্ড তাপমাত্রার ব্যাখ্যা করা যায় না। কয়েক দশক ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনও সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতার বড় কারণ।

পরিবেশবিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ সমুদ্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি ও তীব্রতা বাড়ায়। এতে প্রবালপ্রাচীর, সামুদ্রিক ঘাস ও অন্যান্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রজাতি নতুন এলাকায় চলে যাওয়ায় মৎস্য ও জলজ চাষও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

কোপার্নিকাসের তথ্য বলছে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুর তুলনায় বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। পানি উত্তপ্ত হলে তা প্রসারিত হয়, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে। পাশাপাশি উষ্ণ সমুদ্র বায়ুমণ্ডলে বেশি তাপ ও জলীয়বাষ্প সরবরাহ করতে পারে, যা কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ঝড়ের তীব্রতা বাড়াতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি বড় অংশ সমুদ্র শোষণ করে। কিন্তু পানি যত উষ্ণ হয়, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের সক্ষমতা তত কমে। ফলে পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কার্বন শোষক হিসেবে সমুদ্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: ইউরোনিউজ

সমুদ্রের তাপমাত্রা দিনে দিনে বাড়ছে। ছবি: এপি
সমুদ্রের তাপমাত্রা দিনে দিনে বাড়ছে। ছবি: এপি

Thursday, June 18, 2026

দেড় বছরে চীনের কার্বন নিঃসরণ কখনো কমেছে, কখনো স্থিতিশীল: বিশ্লেষণ

চীনে ১৮ মাস ধরে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণের হার কখনো স্থিতিশীল অবস্থায়, আবার কখনো কমতির দিকে থেকেছে। এক বিশ্লেষণে এমনটাই দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে বৃহত্তম দূষণকারী এ দেশটি প্রতিশ্রুত সময়সীমার অনেক আগে তার কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পেরেছে।

চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসে চীনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ৪৬ শতাংশ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দেশটির জ্বালানি খাতে কার্বন নিঃসরণের হার স্থিতিশীল থেকেছে। এমনকি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও কার্বন নিঃসরণ বাড়েনি।

চীন চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২৪০ গিগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৬১ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে আরও একটি রেকর্ড গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। গত বছর দেশটি ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি।

বিজ্ঞান ও জলবায়ুনীতিবিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফের জন্য বিশ্লেষণটি করেছে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ)। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণের হার আগের বছরের তুলনায় অপরিবর্তিত ছিল। যাতায়াত, সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পে নিঃসরণের হার কমে যাওয়াটা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চীনের কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ নিয়ে এমন সময়ে বিশ্লেষণটি প্রকাশ পেল যখন কি না, বৈশ্বিক নেতারা ব্রাজিলে কপ–৩০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলার তাগিদ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সম্মেলনটি হতে যাচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ব্রাজিলে চলমান জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেননি। তবে চীনা প্রতিনিধিদল আলোচনায় অংশগ্রহণ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এতে যোগ দেননি। তিনি আলোচনার জন্য কোনো প্রতিনিধিদলও পাঠায়নি।

গত ১০ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার ব্রাজিলীয় কূটনীতিক এবং কপ৩০-এর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে কোরেয়া দো লাগো সবুজ প্রযুক্তিতে অগ্রগতি করায় চীনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘চীন এমন সমাধান উদ্ভাবন করছে, যা সবার জন্য, শুধু চীনের জন্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ধনী দেশগুলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আগ্রহ হারিয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে চীনের দুটি লক্ষ্যমাত্রা আছে। এর একটি হলো ২০৩০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের হার কমতে শুরু করবে এবং ২০৬০ সাল নাগাদ তারা নিট কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করবে। গত সেপ্টেম্বরে চীন তার সর্বশেষ জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের দেশটি তাদের সামগ্রিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার সর্বোচ্চ হারের তুলনায় ৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে আনবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই লক্ষ্যগুলো বৈশ্বিক বিপর্যয় এড়াতে যথেষ্ট নয়। তাঁরা মনে করেন, বৈশ্বিক বিপর্যয় এড়াতে কার্বন নিঃসরণ ৩০ শতাংশ কমাতে হবে।

গত বছর চীন ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি
গত বছর চীন ৩৩৩ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল, যা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

Saturday, May 23, 2026

পলিথিন ও বিভিন্ন পণ্যের প্লাস্টিক মোড়ক

কাঁচাবাজার থেকে আধুনিক শপিং মল—সব জায়গায়ই এখন পলিথিনের রাজত্ব চলছে। লন্ড্রি থেকে কাপড় নিলে, আধা কেজি সবজি কিনলেও হাতে আসে দুটি করে পলিথিন ব্যাগ। কারণ, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পলিথিন উৎপাদনে খরচ খুবই কম। অথচ এই অপচনশীল পলিথিনের আয়ু নাকি ৫০০ বছর পর্যন্ত! কিছুদিন আগে খবরে দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ড্রেজিং করা যাচ্ছে না, কারণ সেখানে দুই থেকে সাত মিটার পর্যন্ত পলিথিনের স্তর জমে গেছে। ফলে অত্যাধুনিক ড্রেজিং মেশিনও কাজ করতে পারছে না। শুধু কর্ণফুলী নয়, দেশের প্রায় সব নদ-নদীরই এই মরণদশা এখন বাস্তবতা।

পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি চিপসের মোড়ক, বিভিন্ন প্লাস্টিক বোতল, ই-বর্জ্য—সব মিলিয়ে এখন দেশের পরিবেশ গভীর সংকটে। যদিও অন্যান্য বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ কঠিন, কিন্তু পলিথিন নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট আইন রয়েছে, যার অধীনে এর উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ।

কিছুদিন আগে এক দেশীয় বিজ্ঞানী পাট থেকে পলিথিনের বিকল্প উপাদান উদ্ভাবন করে প্রশংসিত হয়েছেন। বাণিজ্যিকভাবে তা উৎপাদন ও বাজারজাত করার দাবি উঠলেও অজানা কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো নীরব। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য। তাই বলা যায়, অন্তত পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

নূরুল আমিন, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2016%2F11%2F14%2F59e134ee9e94c13fcc9435db3c14ef8f-18.jpg?rect=25%2C0%2C750%2C500&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি চিপসের মোড়ক, বিভিন্ন প্লাস্টিক বোতল, ই-বর্জ্য—সব মিলিয়ে এখন দেশের পরিবেশ গভীর সংকটে। ফাইল ছবি

Friday, May 15, 2026

জাতিসংঘের প্রতিবেদন: জলবায়ু বিপর্যয়ে এক দশকে ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত

১০ নভেম্বর ২০২৫ঃ জলবায়ু সংকটের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ বছর ২৫ কোটি হিসাবে প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরবাড়ি ত্যাগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে কপ৩০ প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

‘নো স্কেপ-২: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ বা ‘পালানোর পথ নেই-২: আগামীর দিশা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা, ঝড়, খরা ও তীব্র তাপমাত্রার মতো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ও সংঘাত বাড়ছে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে আঘাত হানা বিভিন্ন দুর্যোগ, যেমন বন উজাড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাস্তুসংস্থান ধ্বংস, খাবার ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।

সংঘাত ও জলবায়ুর কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে—এমন দেশের সংখ্যা ২০০৯ সাল থেকে তিন গুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। এরপরও দুর্দশাগ্রস্ত ও সংঘাতে জর্জর যেসব দেশে শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে, ওই দেশগুলো প্রয়োজনের চার ভাগের এক ভাগ জলবায়ু সহায়তা পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা না রেখেও বাস্তুচ্যুতদের অনেক সময় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে।

দেশে দেশে দুর্যোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে শরণার্থী ও অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের চার ভাগের তিন ভাগ এমন সব দেশে বাস করছে, যেগুলো উচ্চ বা চরম জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে আক্রান্ত। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ইউএনএইচসিআর যতবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, তার তিন ভাগের এক ভাগের কারণ ছিল বন্যা, খরা, দাবানলসহ অন্যান্য চরম আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঘটনা।

উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের মে মাসে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের রিও গ্রানদে দো সুল রাজ্যে ভয়াবহ বন্যার কথা বলা হয়েছে। ওই বন্যায় ১৮১ জনের মৃত্যু হয়। বাস্তুচ্যুত হয় ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ৪৩ হাজার শরণার্থী ছিল। এর আগের বছরে এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় মোচা।

আফ্রিকার দেশ চাদে ১৪ লাখের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বসবাস করে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যার কারণে দেশটিতে ১৩ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ও আশ্রয়শিবির ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সুদানের শরণার্থীরা প্রতিদিনের ১০ লিটারের কম পানি পাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব মিলিয়ে আফ্রিকার ৭৫ শতাংশ ভূখণ্ডের অবস্থা খারাপ হচ্ছে।

যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০৪০ সাল নাগাদ চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে পড়া দেশের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৬৫–তে পৌঁছাতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ গাম্বিয়া, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, সেনেগাল ও মালির ১৫টি শরণার্থীশিবির বছরে প্রায় ২০০ দিন বিপর্যয়কর তাপমাত্রার মুখে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, ‘চরম জলবায়ুর প্রভাব থেকে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে তহবিলে কাটছাঁট। আমরা যদি স্থিতিশীলতা চাই, তাহলে মানুষ যেখানে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ করতে হবে। বাস্তুচ্যুত হওয়া থামাতে জলবায়ু তহবিল সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।’

পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে এগিয়ে চীন

আজ শুরু হওয়া কপ৩০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ১৯৪ দেশের প্রতিনিধিরা। প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সে বিষয়ে আলোচনা করবেন তাঁরা। একই সঙ্গে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করা যায় এবং দরিদ্র দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হবে।

তবে এসব লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ব্রাজিলের কূটনীতিক আন্দ্রে কোরেরা দো লাগো বলেন, জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো এই সংকট নিরসনের লড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়েছে। তবে ভালো করছে চীন। দেশটি সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করলেও পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী। অন্য দেশগুলোকে এটি অনুসরণ করতে হবে।

জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় শিকার দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। জাতিসংঘে পালাউয়ের রাষ্ট্রদূত এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের (এওসিস) মুখপাত্র ইলানা সেইড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বড় পরিসরে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য একটি বৈশ্বিক পথরেখা তৈরি করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন যতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা খুবই সামান্য। আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া জানি না, আমরা কোথায় যাচ্ছি।’

কপ৩০-এর আয়োজনে ব্রাজিল এমন বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে, যেগুলো নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধ, ২০৩০ সালের মধ্যে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তিন গুণ বাড়ানো এবং জ্বালানিবিষয়ক দক্ষতা দ্বিগুণ করা। তবে এওসিস আরও বেশি কিছু চায়। তাদের ভাষ্য, নীতি নির্ধারণ ছাড়া দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। সম্প্রতি নদের এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। সম্প্রতি নদের এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, May 12, 2026

বিশ্বের সবচেয়ে স্মার্ট শহর কোনগুলো, জেনে নিন

বিশ্ব দ্রুত স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট নগরায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নগরজীবনকে আরও নিরাপদ, আরামদায়ক ও টেকসই করার এই ধারায় ইউরোপ থেকে এশিয়া, আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সবখানেই বড় শহরগুলো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। উদ্দেশ্য একই—যানজট, দূষণ, জ্বালানি অপচয় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে নাগরিকবান্ধব একটি টেকসই নগরী গড়ে তোলা।

ইউরোপের বার্সেলোনা এ ক্ষেত্রে এগিয়েছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের মাধ্যমে তারা স্মার্ট লাইটিং ও স্মার্ট পার্কিং সিস্টেম চালু করেছে। সিসকোর প্রযুক্তি সহযোগিতায় শহরের বিদ্যুৎ খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। একইভাবে সেন্সরভিত্তিক পার্কিং ব্যবস্থা যানজট অনেকটাই হ্রাস করেছে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর ২০১৪ সালে ‘স্মার্ট নেশন প্রজেক্ট’ হাতে নিয়ে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে বিপ্লব ঘটিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় রোবটিক্স, বাসাবাড়িতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শহরজুড়ে সেন্সর নেটওয়ার্ক এটিকে বিশ্বের স্মার্ট সিটির মধ্যে অন্যতম করে তুলেছে।

আমস্টারডামও স্মার্ট সিটির আরেক বড় উদাহরণ। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া উদ্যোগে ‘ক্লাইমেট স্ট্রিট’ প্রকল্পে চালু হয়েছে জ্বালানি সাশ্রয়ী আলোকসজ্জা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিভিন্ন ব্যবস্থা। নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা নগর পরিকল্পনাকে আরও গতিশালী করেছে। অপরদিকে, কোপেনহেগেন ২০২৫ সালের মধ্যে কার্বন-নিউট্রাল হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সিমেন্সের সহযোগিতায় সেখানে চালকবিহীন ট্রেন প্রকল্প চালু হচ্ছে এবং স্মার্ট সিগন্যাল সিস্টেম সাইকেল যাতায়াতকে আরও সহজ করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল

প্রযুক্তিনির্ভর টোকিওতে ভূমিকম্প ও সুনামির মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় এআইভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। হিতাচির সহযোগিতায় তৈরি এ প্রযুক্তি শুধু জাপানের জন্যই নয়, দুর্যোগপ্রবণ বিশ্বের অন্যান্য শহরের জন্যও দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে নিউইয়র্কে ২০১৩ সালে চালু হওয়া স্মার্ট সিটি প্রকল্প নাগরিকদের ফ্রি ওয়াইফাই কিয়স্ক, ওপেন ডেটা উদ্যোগ ও স্মার্ট বিল্ডিং সেন্সরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডন

লন্ডনও তথ্যভিত্তিক শাসনের এক অনন্য উদাহরণ। এখানে লন্ডন ডেটা স্টোরের মাধ্যমে ৭০০-এর বেশি ডেটাসেট জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শহরের যানজট কমাতে সহায়তা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল আবার স্মার্ট সিটি উদ্যোগে ফ্রি ওয়াইফাই, এআই-চালিত ট্রাফিক সিস্টেম ও আইওটি সংযুক্ত অ্যাপার্টমেন্ট চালু করে এশিয়ার ডিজিটাল রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

নিউইয়র্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দুবাইয়ের স্মার্ট সিটি উদ্যোগ ভবিষ্যতের নগরব্যবস্থার রোল মডেল হয়ে উঠছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পে এখানে চালকবিহীন ট্যাক্সি, ব্লকচেইনভিত্তিক সরকারি সেবা ও স্মার্ট পুলিশ স্টেশন চালু হয়েছে যেখানে কোনো কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই সেবা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি পুরো শহরের ডিজিটাল টুইন ‘হেলসিংকি থ্রিডি প্লাস’ তৈরি করেছে। পরিবহন ব্যবস্থায় অ্যাপের মাধ্যমে বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি ও রেন্টাল বাইক—সব একসাথে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

টোকিও, জাপান

সব মিলিয়ে বলা যায়, স্মার্ট সিটি শুধু প্রযুক্তি নয়, নাগরিকবান্ধব পরিকল্পনা। বার্সেলোনা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে, সিঙ্গাপুর পরিবহন ব্যবস্থায়, টোকিও দুর্যোগ মোকাবিলায়, আর হেলসিংকি টেকসই ডিজিটাল জীবনে বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তথ্যসূত্র : সাসটেইনেবিলিটি ম্যাগাজিন। 

লন্ডন। ছবি : সংগৃহীত

Sunday, April 5, 2026

এত উষ্ণ যে আর টিকছে না, ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড ‘এ২৩এ’ (এ২৩এ)। প্রায় ৪০ বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এই বরফখণ্ড অবশেষে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন অক্ষত থাকা এই বরফখণ্ড এখন উষ্ণ সমুদ্রজলের আঘাতে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু মেইজার্স বলেন, এটি ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে… পানি এতটাই উষ্ণ যে, এটি আর টিকে থাকতে পারছে না।

তিনি আরও জানান, অধিকাংশ বরফখণ্ড এতদিন স্থায়ী হয় না, তবে এ২৩এ আকারে এত বড় হওয়ায় এতদিন টিকে ছিল।

১৯৮৬ সালে অ্যান্টার্কটিকা থেকে আলাদা হওয়া এই বরফখণ্ডটি একসময় গ্রেটার লন্ডনের দ্বিগুণ আকারের ছিল এবং ওজন ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন টন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘কোপার্নিকাস’-এর স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর আয়তন ছিল ১ হাজার ৭৭০ বর্গকিমি। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে প্রায় ৪০০ বর্গকিমি অংশ ভেঙে গেছে।

ওডেল সাগরে তিন দশকের বেশি সময় স্থির থাকার পর ২০২০ সালে বরফখণ্ডটি মুক্ত হয়ে ‘আইসবার্গ অ্যালি’ ধরে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করে। পরে সাউথ জর্জিয়া দ্বীপের কাছে কিছুদিন থেমে থাকলেও, গত মে মাসে এটি আবার উত্তরের দিকে ভাসতে শুরু করে। বর্তমানে দিনে প্রায় ২০ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে, যা দ্রুত বিলীন হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বরফখণ্ড ভাঙা নতুন কিছু নয়, তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকায় বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়ার হার এখন অনেক বেশি। উষ্ণ জল, ঢেউ ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে এ২৩এ-এর মতো বিশাল ‘মেগাবার্গ’ আর টিকে থাকতে পারছে না।

এ২৩এ-এর পতন জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশ্বকে হুঁশিয়ার করছে, পৃথিবীর বরফ আর নিরাপদ নেই, এবং আমাদের জলবায়ু নীতিতে অবিলম্বে পরিবর্তন আনা জরুরি। 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড অ্যান্টার্কটিকায়। ছবি: রয়টার্স
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফখণ্ড অ্যান্টার্কটিকায়। ছবি: রয়টার্স

Monday, March 30, 2026

কুমিরের হঠাৎ এই খ্যাপা আচরণ কেন? by গওহার নঈম ওয়ারা

পরিবেশের তৈরি স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলা নষ্ট করে রাতারাতি কিছু টাকা কামানো গেলেও আখেরে সেটা জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগীদের অভিযোজনে সাহায্য করবে না এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে না। সুন্দরবনের পটভূমিতে চলমান অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে লিখেছেন গওহার নঈম ওয়ারা

পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০ এ বছরের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনের প্রধান আলোচ্যসূচি হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিশেষত অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন।

পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়েই মানুষ বেঁচে আছে শুরু থেকে। অনেক প্রতিকূলতা আর বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে যায় শুধু মানুষ, কেউ কেউ বলেন, ‘তেলাপোকাও’! মানুষ কেবল টিকে থাকেনি, সে তার বিকাশের পথও আজ অবধি চালু রেখেছে। বিকাশ রুদ্ধ হলেই বিনাশ ত্বরান্বিত হয়।

দুনিয়াজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মাতম গবেষকদের স্পর্শ করার অনেক আগে থেকেই মানুষের এই পথপরিক্রমা জারি ছিল। বিকল্প জীবিকা আর বসতি খুঁজে নেওয়ার কাজ মানুষের মজ্জাগত। অভিযোজনের জ্ঞান তাকে গুহা থেকে গৃহে নিয়ে এসেছে। এনেছে জঙ্গল থেকে নগরে। কিন্তু গোল বেধেছে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অভিযোজন বিশেষজ্ঞদের তাড়াহুড়ো আর ব্র্যান্ডিং তৎপরতা নিয়ে। সে কথা বলতেই এই লেখার অবতারণা।

২.

সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী মোহসীন উল হাকিম গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ এক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, ‘কাঁকড়া ধরে ফিরছিলেন সুব্রতরা। পথে বড় খাল করমজল। এখানে কুমির আছে। মাঝে মাঝেই আক্রমণ করে। গত বছর মারা গেল মোশাররফ। তাই সবাই বেশ সতর্ক। পাঁচজনের কাঁকড়াশিকারির দল। সবাই পার হয়ে গেলেন। সুব্রত ছোটখাটো মানুষ। ওঠার সময় পানিতে একটু খাবি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এক মুহূর্ত। দুই পা একসঙ্গে কামড়ে ধরল বিশাল এক কুমির। সাথে সাথে সুব্রতর হাত ধরে ফেলল সহযাত্রীরা। শুরু হলো টানাটানি। চারজন মিলে প্রায় তিন মিনিট চেষ্টা করল। কিন্তু পানির নিচে থাকা কুমিরের শক্তির কাছে পরাস্ত হলো। সুব্রতকে নিয়ে গেল সুন্দরবনের কুমির।’

শুধু সুব্রত নন, ২০২৪ সালের ১৫ মে সুন্দরবন–সংলগ্ন ফকিরকোনা এলাকায় খাইরুল ইসলাম মোড়ল প্রাণ হারান কুমিরের আক্রমণে। একই বছর যুবক রাজু হাওলাদার নদীতে গোসল করতে গিয়ে কুমিরের কামড়ে আহত হন।

২০২৫ সালের ১১ মে শনিবার আবদুল কুদ্দুস কুমিরের আক্রমণে আহত হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরেন। কুদ্দুস ও হালিম দলবল নিয়ে ৩৫ থেকে ৩৬ বছর ধরে মাছ, কাঁকড়া শিকারে সুন্দরবনে যাতায়াত করেন, কিন্তু কুমিরের এ রকম মারমুখী আচরণ তাঁদের নজরে পড়েনি।

এর আগে ২০১৫ সালে মধু কাটতে তালপট্টি এলাকায় গিয়ে বাঘের কবলে পড়লেও কুমিরের তাড়া খাননি কখনো। কুমিরের এ রকম আক্রমণাত্মক আচরণ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সুন্দরবনের পশ্চিমবঙ্গ অংশেও বেশ বেড়েছে। কুমিরের হামলায় সেখানকার মানুষ তটস্থ।

২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনীল মণ্ডল সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের ট্রিবলিঘেরি লাগোয়া দত্ত নদে কাঁকড়া ধরতে যান। এলাকাটি পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন কোস্টাল থানার লাহিড়িপুর পঞ্চায়েতের মধ্যে। কাঁকড়া ধরার সময় আচমকা পেছন থেকে কুমির সুনীলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাঁকে টানতে টানতে নদীর মাঝখানে নিয়ে যায়।

৫০ বছরের সুনীল মণ্ডলকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কুমিরের আক্রমণে নিহত ও আহতের তালিকা ক্রমে বাড়ছে। বাড়ছে বাঘ–বিধবার মতো কুমির–বিধবার সংখ্যা। কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বা গ্রামের লাগোয়া নদীতে ঘরগৃহস্থালির কাজ করতে গিয়ে নারীরাও কুমিরের শিকার হচ্ছেন।

ওডিশা উপকূলের এক নারীকে কুমিরে টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে ভাইরাল হয়েছিল। ওডিশার জাজপুরের পালাতপুর গ্রামের সেই ঘটনা নদীর কাছেই উপস্থিত এক ব্যক্তি ভিডিও করেছিলেন বলে ঘটনাটি সবার সামনে এসেছিল, না হলে আর পাঁচটা নিখোঁজ ঘটনার সঙ্গে সেটাও সবাই গুলিয়ে ফেলতেন।

এদিকে দাকোপসহ সুন্দরবনের কাছাকাছি সব কটি লোকালয়ে কুমিরের আনাগোনার খবর আগের যেকোনো সময়ের থেকে এখন বেশি। বিশেষ করে নাগর নদী সংলগ্ন এলাকায় মানুষ কুমিরের উপস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছেন, যা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটা থামিয়ে দিয়েছে। দৈনন্দিন কাজে নদীর ব্যবহার নিয়ে ভয় বাড়ছে ক্রমে।

বাঁধের বাইরে আগেও সুতারখালীর (দাকোপ) মানুষ বসবাস করেছেন জোয়ার-ভাটার মধ্যেই। তাঁরা জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছেন।

৩.

কুমিরের হঠাৎ এই খ্যাপা আচরণ কেন?

করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রের কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সংবাদকর্মীদের জানান, খাবারের খোঁজে কিংবা আবাসসংকটে কুমিরগুলো পার্শ্ববর্তী নদীগুলোয় চলে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে কুমিরের খাদ্য, যেমন কাঁকড়া, মাছ ইত্যাদি কমে গেলে এরা মানুষের ওপর আক্রমণ করে। তা ছাড়া কাঁকড়ার খোঁজে মানুষ যখন কুমিরের এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন কুমির তাঁদের নিজেদের আক্রান্ত মনে করে এবং আক্রমণ করে।

কুমিরের খাদ্যনিরাপত্তায় কেন ব্যাঘাত ঘটছে?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের জনপ্রিয় অভিযোজন প্রচেষ্টার মধ্যে। বাংলাদেশ–পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন উপকূল থেকে ওডিশার বালেশ্বর ও ভদ্রক জেলায় একসময় ধুমসে চিংড়ির চাষ হতো।

নানা কারণে উপকূলে চিংড়ি চাষ মুখ থুবড়ে পড়েছে অনেক দিন। চিংড়ি আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জীবন-জীবিকাকে ক্ষতবিক্ষত করছে নানাভাবে। উপকূলে চিংড়ি চাষ বা সাদা সোনার লাগামহীন আবাদ লবণাক্ততা বাড়িয়ে মানুষকে দেশান্তরি করেছে।

অভিযোজন ব্যবসায়ীরা এখন ‘সাদা সোনার বদলে কালো সোনার’ ধান্দা ধরিয়ে দিচ্ছেন মানুষের হাতে। বলার চেষ্টা করছেন, কালা সোনা মানে কাঁকড়ার চাষ পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীবন ও জীবিকাবান্ধব। কথাটা কি ঠিক?

পরিবেশের তৈরি স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলা নষ্ট করে রাতারাতি কিছু টাকা কামানো গেলেও আখেরে সেটা না জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগীদের অভিযোজনে সাহায্য করবে, না জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। কেউ কেউ বলছেন, কাঁকড়ার হ্যাচারি করে সুন্দরবনের কাঁকড়া সুরক্ষা সম্ভব।

চিংড়ি চাষের স্বর্ণযুগেও একই কথা বলা হয়েছিল। চিংড়ির হ্যাচারি হয়নি আর সাগরের চিংড়ি পোনা ধরাও বন্ধ হয়নি এক দিনের জন্যও। তার ওপর হ্যাচারিতে কাঁকড়ার বেঁচে থাকার রেকর্ড ৩ শতাংশের আশপাশেই থাকছে। তাই সুন্দরবনের আর উপকূলের কাঁকড়া ধরার কোনো বিকল্প নেই। নির্বিচার কাঁকড়া ধরার কারণে কুমিরের খাবারে টান পড়ছে, তাই তারাও খেপে উঠছে, মানুষকে তাড়া করছে, শিকার করছে কাঁকড়ার বদলে আস্ত মানুষ, গবাদি প্রাণী।

৪.

আমরা জানি, সাতক্ষীরা, খুলনা, কক্সবাজারে কাঁকড়া চাষ এবং আহরণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিমওয়ালা কাঁকড়ার চাহিদা অনেক বেশি। ফলে চাষি ও জেলেরা বেশি মুনাফার আশায় যত পারছেন ডিমওয়ালা কাঁকড়া রপ্তানির জন্য প্যাকেটে ভরে ফেলছেন।

গবেষকেরা বলছেন, ডিমওয়ালা কাঁকড়া রপ্তানির উন্মাদনা কাঁকড়ার প্রজনন চক্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডিমওয়ালা কাঁকড়া প্রকৃতির পরবর্তী প্রজন্ম তৈরির মূল উৎস। এগুলো যদি রপ্তানির বাক্সে চলে যায়, তাহলে ডিম থেকে নতুন কাঁকড়া জন্মানোর সুযোগ কমে যায়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কাঁকড়ার প্রাকৃতিক সংখ্যা কমে গিয়ে কুমিরের খাদ্যশৃঙ্খলে বিরূপ প্রভাব ফেলবে ও ফেলছে।

অভিযোজনের নামে চিংড়ির বদলে কাঁকড়া চাষের ব্যবসা শুরুর আগে জালে ডিমওয়ালা কাঁকড়া উঠলে বনজীবীরা সেগুলো ছেড়ে দিতেন। সেটাই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের একটি জনপ্রিয় আচরণ। এখন মাদি কাঁকড়া ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয় সাতক্ষীরার কাঁকড়া মোকামে। মাদি কাঁকড়ার পেট ডিমে ভরে উঠলে সেটা বিক্রির উপযুক্ত হয়। তার মানে, কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই।

এখন কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় কুমিরের জন্য সহজলভ্য খাদ্যসংকট দেখা দিচ্ছে। বিশেষত ছোট ও মাঝারি বয়সী কুমির কাঁকড়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল। বলাবাহুল্য, খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে গেলে কুমিরদের পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাবে। পুষ্টির সংকটে প্রজননক্ষমতা হ্রাস পায়, বেঁচে থাকার হার কমে যায়। নিরুপায় কুমির তাই মানুষের বসতিতে চলে আসছে। সমস্যা বাড়ছে।

৫.

মনে রাখতে হবে, কাঁকড়া শুধু কুমিরের খাদ্য নয়, ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের মাটির গঠন ও পুষ্টি পুনঃচক্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোজনের নামে কালো সোনার কথা বলে নির্বিচার কাঁকড়া নিধন ও ডিমভরা কাঁকড়া রপ্তানিতে একদিকে কুমির যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে পুরো ইকোসিস্টেমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রান্তিক মানুষের বাঁচার নিজস্ব উদ্যোগকে অভিযোজনের নামে হেলাফেলা করা যাবে কি?

১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর ঘরবাড়িহারা নিঃস্ব মানুষেরা দাকোপের কালাবগি গ্রামে নদীর চরে লম্বা খুঁটির ওপর ঝুলন্ত পাড়া গড়ে তোলেন। জোয়ারে ডুবে যাওয়া এসব চর আবার ভাটিতে ভেসে ওঠে। এটা ছিল তাঁদের অভিযোজন কৌশল। কাঁকড়াগাছের খুঁটি, শিরীষ কাঠের পাটাতন ও গোলপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি করে নেন নিজেদের আবাস। ঘরেই চলে রান্না-খাওয়া, ঘুমানো। প্রতিটি ঘরের সঙ্গে রয়েছে ঝুলন্ত শৌচাগার।

এক–দুইটা করে বাড়তে বাড়তে ২০২২ সালে ঝুলন্ত পাড়ার ঘরের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়। সিডর ও আইলার আঘাতে বসতভিটা আর রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় পাড়াটির পরিধি বাড়তে থাকে। আগে কুমির কালেভদ্রে ভদ্রা বেয়ে সুতারখালী নদীতে আসত। এখন কুমিরের এই আনাগোনা প্রতিদিনের ঘটনা। দূরে বা ভাটায় ভেসে ওঠা চরে ক্ষণিকের রোদ পোহানো নয়, রীতিমতো ঘরের নিচে রাতদিন জোয়ারে, ভাটায় ঘুরঘুর করছে কুমির।

উপকূলের ভাঙনের মুখে আরেক দল মানুষ ছোট ছোট নৌকায় বসবাস করছেন। বিরূপ প্রকৃতিকে মোকাবিলা করে জীবন–জীবিকা রক্ষার এটাও একটা প্রচেষ্টা, এটাও অভিযোজন। ‘মান্তা’ নামে পরিচিত এসব হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষ পটুয়াখালী, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ভোলা অঞ্চলে সারা বছর নৌকাতেই থাকেন।

এটাই এখন তাঁদের বাঁচার পথ। এককালের মৎস্যজীবী এসব মানুষ স্থলভাগের জমি-ঘর হারিয়ে নৌকাতেই আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি জনগণনা বা মৎস্য জরিপে তাঁদের আলাদা করে ধরা হয় না।

ইলিশ রক্ষার নামে ইলিশ শিকার বন্ধের সময় তাঁদের নৌকাতেও শিকল পরানো হয়, মানে ভাসতে দেওয়া হয় না। সরকারি খাতায় তাঁদের নাম না থাকায় তাঁরা কোনো আপৎকালীন খাদ্যসহায়তারও হকদার নন।

মজার ব্যাপার, তাঁরা তাঁদের ছোট ছোট নৌকা নিয়ে মোহনার এমন দূরে যেতে পারেন না, যেখানে ইলিশ থাকে। তাঁরা মাছ ধরেন ছোট ছোট খাঁড়িতে, নদীসংলগ্ন খাল–বিল আর শাখা নদীতে। ইলিশ রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে তাঁদের রেহাই না দিলে এই মানুষগুলোর বাঁচার পথ থাকবে না।

ভবদহ অঞ্চলে জল বদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যাঁরা একসময় পুকুর আর ঘেরের প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন, তাঁরা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কী ক্ষতি তাঁরা করেছেন। জলাবদ্ধতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বাড়ছে লম্বায়, বহরে।

ফসলের জমিতে ফল চাষে আয় বাড়লেও খাদ্য আর সামাজিক নিরাপত্তা লাটে উঠছে। গোলপাতা বাঁচানোর ভ্রান্ত পদক্ষেপের গলি দিয়ে এসবেসটারের কোলে চড়ে সুন্দরবনের জনপদে যে মরণবিষ ছড়িয়ে পড়ছে, তার কী হবে। এসব নিয়ে অভিযোজন–যজমানরা নিশ্চয়ই আলোচনা করবেন!

* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক গবেষক
- wahragawher@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীতেও কুমিরের দেখা মিলছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীতেও কুমিরের দেখা মিলছে। ফাইল ছবি : প্রথম আলো

Tuesday, March 24, 2026

সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই by এম এ আজিজ

গোটা পৃথিবীতে সুন্দরবন আর নেই। এই সুন্দরবন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো বাদাবনে আজ বাঘও বেঁচে নেই। তাই বাদাবনের এই বাঘ দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের কাছে সব সময়ই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁরা সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা করেন। এই বাঘ তুখোড় সাঁতারু, প্রতিদিন ছোট-বড় কয়েকটি নদী পাড়ি দিতে হয় শিকার-প্রাণী কিংবা সঙ্গীর খোঁজে। অন্যান্য বাংলা বাঘের চেয়ে এরা আকারে খানিকটা ছোট। আর সবচেয়ে কম শিকার-প্রাণীর বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এই বাঘ এখনো টিকে আছে। ফলে এই বাদাবন আর অনন্য বৈশিষ্ট্যের বাঘ রক্ষায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্যের পাশাপাশি দেশের আপামর জনগণের ভূমিকা অপরিহার্য।

অতীতে আমাদের দেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে বাঘ ছিল। আমরা আমাদের শালবনের বাঘ হারিয়েছি গত শতকের গোড়ার দিকে, পাহাড়ি বনের বাঘও নির্বংশ হলো আমাদের চোখের সামনে। আজ শুধু সুন্দরবনের কাদাপানিতে কোনোরকমে বাংলার সর্বশেষ বাঘের এক খণ্ডাংশ পপুলেশন টিকে আছে। সুন্দরবনের মতো জলার বনে টিকে থাকা বাঘ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে—মানুষের সঙ্গে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে।

মাত্র দুটি শিকার-প্রাণীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা এই বাঘের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে সারাক্ষণ। প্রধান শিকার-প্রাণী চিত্রা হরিণ বাঘের খাবারের ৭৯ শতাংশ জোগান দেয়। অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবন থেকে চিত্রা হরিণ শিকার করে। সুন্দরবনের আশপাশের জেলার বাইরেও হরিণের মাংস পাচার হয়। সমাজে মুখোশধারী কিছু লোভী মানুষ এই মাংসের জন্য লালায়িত থাকে সব সময়। এরা সুন্দরবনের হরিণের নিয়মিত ভোক্তা।

সুন্দরবন বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ২০১০-১৫ সময়েও সুন্দরবনের ওপর এমন সংকট নেমে এসেছিল। ওই সময় চোরা শিকারি ও বনদস্যুরা সুন্দরবনের ওপর জেঁকে বসে। হরিণের পাশাপাশি বাঘ শিকারের এক মহোৎসবে নেমে পড়ে বনদস্যু ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা চোরা শিকারিরা। বনজীবীরাও চরম নিপীড়নের মধ্যে পড়ে। ওই সময় অনেক চোরাকারবারি বাঘের চামড়াসহ ধরা পড়ে। এসব বিপর্যয়ের প্রতিফলন পরবর্তী সময়ে আমরা বাঘ জরিপের ফলাফলে দেখতে পাই।

জুলাই বিপ্লবের পর সুন্দরবনের ওপর আবারও নেমে এসেছে তেমন এক বিপর্যয়। অতীতে আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বনদস্যু। নিরীহ বনজীবীদের জিম্মি করে অত্যাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি নিজেরাও বাঘ-হরিণ শিকারে জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ওত পেতে থাকা চোরা শিকারিরা হামলে পড়েছে সুন্দরবনে। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত অসংখ্য হরিণের ফাঁদ উদ্ধার হতে দেখছি। সম্প্রতি সেই ফাঁদে আহত বাঘ উদ্ধারের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন নির্মম ঘটনা আমাদের অজান্তে নিশ্চয় আরও ঘটছে।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। অন্যদিকে বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক, আমাদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এ ছাড়া এই দুই বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। ফলে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার।

রাষ্ট্র বন বিভাগের ওপর এদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র। কিন্তু বন বিভাগের রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা, আছে জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি। বিপরীতে সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য আছে স্থানীয় মানুষের তীব্র চাপ। ফলে সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের সবাইকে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

সুন্দরবন ও বাঘের এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

প্রথমত, সুন্দরবনকে অতিসত্বর দস্যুমুক্ত করতে হবে। এটি করতে হলে বন বিভাগের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, হরিণশিকারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনে নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী জেলেদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।

* এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়।
৪ জানুয়ারি ২০২৬ সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, March 22, 2025

রেকর্ড গতিতে গলছে হিমবাহ, কী বিপদ হতে পারে

বিশ্বের হিমবাহগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে। গত তিন বছরে রেকর্ড পরিমাণে হিমবাহ গলতে দেখা গেছে। আজ শুক্রবার জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

জেনেভায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের পরিচালক মাইকেল জেম্প বলেন, ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্বের হিমবাহগুলো থেকে ৯ হাজার গিগাটন পরিমাণ বরফ গলেছে। এ পরিমাণ বরফকে একসঙ্গে করলে জার্মানির আয়তনের সমান এবং ২৫ মিটার পুরুত্বের একটি বরফখণ্ড তৈরি করবে।

আর্কটিক থেকে আল্পস, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তিব্বতীয় মালভূমি পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে বরফ গলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলার পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে এবং নির্ভরযোগ্য পানির উৎস কমে গিয়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক সমস্যা দেখা দেবে।

বিশ্বের প্রথম হিমবাহ দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ইউনেসকো। এতে বিশ্বজুড়ে হিমবাহগুলোর সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেম্প বলেছেন, গত ছয় বছরের মধ্যে পাঁচ বছরই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে হিমবাহ গলার ঘটনা ঘটেছে। শুধু ২০২৪ সালেই হিমবাহের ভর ৪৫০ গিগাটন কমেছে।

পার্বত্য হিমবাহগুলো দ্রুত গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। এতে লাখ লাখ মানুষ ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে পড়ছে।

পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১১০ কোটি মানুষের ওপর হিমবাহ গলার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে।

গত বুধবার প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরের বাইরে রয়টার্সকে হিমবাহ বিশেষজ্ঞ এইদি সেভেস্ত্রে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে আমরা যে পরিবর্তন দেখেছি তা আক্ষরিক অর্থে হৃদয়বিদারক। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে এসব ঘটনা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত ঘটছে।’

সেভেস্ত্রে উগান্ডার রোয়েনজোরি মাউন্টেনস এলাকা এবং পূর্ব আফ্রিকার ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক কঙ্গোতে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব অঞ্চলে ২০৩০ সাল নাগাদ হিমবাহগুলো নাই হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইউনেসকোর নতুন প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, হিমবাহ গলার কারণে পূর্ব আফ্রিকায় পানিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সংঘাত বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এসব ঘটনার প্রভাব সামান্য হলেও বিশ্বজুড়ে হিমবাহ গলে যাওয়ার এ প্রবণতা ক্রমেই জটিল প্রভাব ফেলছে।

২০০০ সাল থেকে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পার্বত্য হিমবাহ গলার কারণে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৮ মিলিমিটার বেড়েছে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড গ্লেসিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের তথ্য বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিলিমিটার বাড়লে তিন লাখ মানুষ বার্ষিক বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহের বরফ গলার পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহের বরফ গলার পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

Saturday, February 1, 2025

চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে মেছোবিড়াল by আবু আজাদ

মেছোবিড়াল। শান্ত ও লাজুক স্বভাবের নিরীহ এক বন্যপ্রাণী। এক সময় যার বিচরণ ছিল দেশের সর্বত্র। হাওর, বাঁওড়, বিলসহ জলাভূমি এলাকা ছিল প্রাণীটির নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এ বন্যপ্রাণীটিকে মানুষ শত্রুজ্ঞান করছে, হত্যা করা হচ্ছে গণহারে। এতে অচিরেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে প্রাণীটি। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত মেছোবিড়াল সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে; নয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে প্রাণ-প্রকৃতির এই বন্ধু।

দেশের বনাঞ্চলে যে আট প্রজাতির বুনো বিড়ালের বাস, তার একটি এই মেছো বিড়াল (Fishing Cat)। স্থানীয় নাম বাঘুইলা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অনেক গণমাধ্যমেও প্রাণীটিকে মেছোবাঘ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নামের সঙ্গে বাঘ যুক্ত হওয়ার কারণেই হয়তো প্রাণীটি সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে। এ ঘটনাটিই হয়তো বিড়ালটির সর্বনাশকে ত্বরান্বিত করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে আজ ১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো মেছোবিড়াল দিবস পালিত হচ্ছে। মূলত উপকারী এ প্রাণীটির গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এটি সংরক্ষণে মানুষকে সচেতন করতে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।

বিড়ালকে বাঘ আখ্যা, হয়ে গেল শত্রু

বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই মেছোবিড়ালের বিচরণ রয়েছে। জলাভূমি আছে এমন এলাকায় বেশি দেখা যায়। প্রাণীটি জলাশয়ের মরা ও রোগাক্রান্ত মাছ খেয়ে মাছের রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ব্যাঙ, কাঁকড়া, ছোট পাখি ছাড়াও পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে কৃষকের উপকার করে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের সঙ্গে মেছোবিড়ালের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এতে প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছে প্রাণীটি। হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেছোবিড়াল সম্পর্কিত ৩৬১টি সংবাদ সংগ্রহ করা হয়। এর ১৬০টি সংবাদই ছিল মেছোবিড়াল হত্যার। যার ৪৬ শতাংশ সংবাদে বলা হয়, মেছোবিড়াল দেখামাত্র ধাওয়া করেছে মানুষ। ৮৩ শতাংশ সংবাদে মেছোবিড়ালকে বাঘ বা বাঘের বাচ্চা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গবেষণাটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টুডেন্ট কনফারেন্স অন কনজারভেশন সায়েন্স’ পুরস্কার জেতে।

বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা কালবেলাকে বলেন, প্রাণীটির প্রকৃত নাম মেছোবিড়াল হলেও অনেকে একে মেছোবাঘ নামেও ডাকে। বাঘ নামে ডাকার কারণে শুধু শুধু আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রাণীটি মানুষকে আক্রমণ করে না, বরং মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়। কিন্তু এ ধরনের একটি নাম নিরীহ বিড়ালটিকে আরও বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে। জনবসতি স্থাপন, বন ও জলাভূমি ধ্বংস, পিটিয়ে হত্যা ইত্যাদি কারণে বিগত কয়েক দশকে এই প্রাণীটির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

আড়মোড়া ভেঙেছিল বন বিভাগ

প্রকৃতিতে মেছোবিড়ালের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি কয়েক বছর আগে বন বিভাগের নজরে আসে। প্রাণীটির অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে সরকারি এই সংস্থাটি। সীমিত আকারে হলেও শুরু হয় গবেষণা।

২০২৩ সালের ২৫ মার্চ সিলেটে একটি পুরুষ মেছো বিড়ালের গলায় স্যাটেলাইট কলার বসিয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য- প্রাণীটির গতিবিধি ও জীবনধারা সম্পর্কে জানা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে হাওরে থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রাণীটি কোথায় যায়। যাতে ভবিষ্যতে সে এলাকায় বিড়ালটির নিরাপত্তার জন্য নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে বিড়ালটিকে হত্যা করেন এক কৃষক। এরপর সেখানেই থেমে যায় বন বিভাগ।

এ বিষয়ে গবেষণা দলের প্রধান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ আজিজ কালবেলাকে বলেন, স্যাটেলাইট কলার পরানো মেছোবিড়ালটি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেবার এক মাসও পেরোয়নি অথচ সেটিকে হত্যা করা হয়। এটিই প্রমাণ করে প্রাণীটির অস্তিত্ব কতটা হুমকির মুখে রয়েছে।

আছে সমন্বয়হীনতা ও স্বার্থের সাংঘর্ষ

হাওরাঞ্চলে মেছোবিড়ালের আধিক্য বেশি। কিন্তু হাওরের দেখভাল করে পরিবেশ অধিদপ্তর। আবার মেছোবিড়াল বন বিভাগের সম্পত্তি। তাই প্রাণীটি নিয়ে চিন্তিতও নয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে নেই তাদের কোনো প্রশিক্ষণও! পরিবেশ ও বন, এই দুই বিভাগের সমন্বয়হীনতার অভাবও মেছোবিড়ালকে সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক এমএ আজিজ হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একই মন্ত্রণালয়ের বিভাগের দুটি সমন্বয়হীনতার জন্য একটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কঠিন হয়ে উঠেছে, এটি বিস্ময়কর!

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অসহযোগিতার বিষয়টি এড়িয়ে যান বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি বরং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত করেন। এই বন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওরে হাঁসের চাষাবাদ অতিমাত্রায় বেড়েছে। এতে সেখানকার স্বাভাবিক প্রতিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিযায়ী পাখি, মেছোবিড়ালের অস্তিত্বসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

আইন ও প্রয়োগের দুর্বলতা

মেছোবিড়ালকে বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)। প্রাণীটি দেশের আইনে সংরক্ষিত। ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনেও মেছোবিড়াল হত্যা বা এর কোনো ক্ষতিকরা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই বললেই চলে।

যদিও অধ্যাপক আজিজ মনে করেন, শুধু আইন দিয়ে মেছোবিড়াল রক্ষা করা সম্ভব নয়। সবার আগে প্রয়োজন স্থানীয় মানুষকে প্রাণীটির উপকারিতা বোঝানো, সংরক্ষণে তাদের সম্পৃক্ত করা। আর এ জন্য বন বিভাগকে আদাজল খেয়ে নামতে হবে। আর এখানেই ব্যাপক ঘাটতি আছে বলে মনে করেন এই গবেষক।

নেই কোনো প্রকল্প, পরিকল্পনাও

২০২৩ সালে শুরু হওয়া গবেষণাটি থেমে যাওয়ার পর আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি বন বিভাগ। এই মুহূর্তে নেই কোনো প্রকল্প। এমনকি বিড়ালটি সংরক্ষণে সুর্নিদিষ্ট কোনো পরিকল্পনাও করেনি সরকারি সংস্থাটি। তবে মেছোবিড়াল সংরক্ষণে উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।

তিনি বলেন, মেছোবিড়ালের কলার পরানোর পর গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওই গবেষণাটি থেমে যায়। তবে এরপর নতুন করে আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিও এ নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করছি।

ইমরান আহমেদ বলেন, আসলে বন বিভাগের পরিকল্পনা ও প্রকল্পগুলো বড়প্রাণী বিশেষ করে মহাবিপন্ন প্রাণীগুলো নিয়ে আবর্তিত। তবে এখন সময় এসেছে ছোটপ্রাণীগুলোকে নিয়ে ভাবার।

তবে কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে মেছোবিড়াল?

জাপানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে ২০১৭ সাল থেকে প্রাণীটি নিয়ে গবেষণা করছেন অধ্যাপক আজিজ। তারমতে, দেশে মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যা করা হয় মেছোবিড়াল। হত্যার শিকার সব প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যেও এটি প্রথম দিকেই আছে।

তিনি বলেন, বড় বন্যপ্রাণীর জন্য নানা প্রকল্প পরিচালনা করছে বন বিভাগ। কিন্তু মেছোবিড়াল ছোটপ্রাণী হওয়ায় হয়তো সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। নেই প্রচার-প্রচারণাও। এরই ফাঁকে প্রাণীটি হারিয়ে যেতে বসেছে।

‘সারা দেশে যেভাবে গণহারে প্রাণীটিকে হত্যা করা হচ্ছে, তাতে দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দ্রুতই দেশ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে মেছোবিড়াল,’ যোগ করেন অধ্যাপক। 

চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে মেছোবিড়াল

Wednesday, January 29, 2025

বিশ্লেষণ: বায়ুদূষণের ভয়াবহতা বনাম আমাদের অপারগতা by খলিলউল্লাহ্

বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং এ বিষয়ে আমাদের অপারগতা নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্

বায়ুমানের স্কোর ৩০০ পার হলে সেটাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ ধরা হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারি সকালে ঢাকার স্কোর ৪৯৩ পর্যন্ত উঠেছিল। হরহামেশাই এখন ঢাকায় বায়ুর মানের স্কোর ৩০০ পার হচ্ছে। সারা বিশ্বের মধ্যে বায়ুদূষণে আমরা ঘুরেফিরেই শীর্ষে উঠে আসছি। বিগত ৯ বছরের ডিসেম্বর মাসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ডিসেম্বর ছিল ঢাকায় সবচেয়ে দূষিত মাস। তা ছাড়া ২০১৬-২৪ সময়ের মধ্যে গত বছর ছিল সবচেয়ে দূষিত বছর।

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলছে, কতটা ভয়ানক হুমকির মুখে আমরা রয়েছি। এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আবহাওয়ার ধরনের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের রোগের সঙ্গে ক্যানসারজনিত মৃত্যু ১৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

অন্যদিকে স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বব্যাপী শুধু ২০২১ সালেই ৮০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ করোনার মতো অতিমারিতেও বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪৯৯। একটা দেশের এত বিপুল মানুষের মৃত্যু যদি হয় বায়ুদূষণের কারণে, তাহলে এটাকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে আশু পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না?

সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, বায়ুদূষণে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। পৃথিবীতে কেবল ২০২১ সালেই বায়ুদূষণে ৫ বছরের কম বয়সী ৭ লাখ শিশু মারা গেছে। মানবশিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হলো মায়ের গর্ভ। কিন্তু শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে, যার প্রভাব সারা জীবন এসব শিশুকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে।

তা ছাড়া সাধারণত শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি দূষণের শিকার হয়। কারণ, তাদের শরীর, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক যখন গঠিত হতে থাকে, তখন তাদের বড়দের চেয়ে বেশি বায়ু গ্রহণ করতে হয়। ফলে বায়ু যদি দূষিত হয়, তাহলে দূষিত উপাদানও তারা বেশি গ্রহণ করে; অর্থাৎ আমরা শুরুতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামর্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অবস্থা এতটাই নাজুক যে এ কারণে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ৯ বছর। অথচ তামাকদ্রব্যের কারণে আয়ু কমেছে এর চেয়েও কম, ১ দশমিক ৬ বছর। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান পিএম ২ দশমিক ৫ আয়তনে মানুষের চুলের চেয়ে ৩০ গুণ ছোট। তাই সহজেই এগুলো মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর এটাই ভয়াবহতার অন্যতম কারণ।

বায়ুদূষণ কি নতুন

এটা ঠিক যে বায়ুদূষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীন মিসর, পেরু ও গ্রেট ব্রিটেনে মানবদেহের মমি থেকে দূষণে কালো হয়ে যাওয়া টিস্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের শিকার হয়েছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তৎকালীন রোমের বিচারক অ্যারিস্টো এক রায়ে চিজের দোকানের ধোঁয়া ভবনের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন।

মধ্যযুগে বায়ুদূষণের মূল উৎস ছিল ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে শিল্পবিপ্লবের পর দূষণের নতুন যুগে প্রবেশ করে পৃথিবী, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ কার্ল পোলানি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন: দ্য পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অরিজিনস অব আওয়ার টাইম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট বাজার অর্থনীতি কীভাবে আমাদের সমাজ ও পরিবেশ—দুটিরই অস্বাভাবিক ধ্বংস করেছে। এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের জীবনসহ অমূল্য সব বনজঙ্গল, উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদি প্রাকৃতিক পরিবেশের সবকিছুকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়। মুনাফার লক্ষ্যে চলে এসবের যথেচ্ছ ব্যবহার। আর এটিই হলো আমাদের সময়ের সামাজিক ও পরিবেশগত দুর্যোগের মূল কারণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে, সন্দেহ নেই। আর তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো ধারণা এসেছে। ভুটানের মতো দেশ তো প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকেই বের হয়ে এসেছে।

তা ছাড়া জিডিপির ধারণার বাইরে মানব উন্নয়ন সূচক ব্যবহারের পক্ষেও মতো জোরালো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামগ্রিক কল্যাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে পরিবেশগত মূল্যায়ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়সারাভাবে করা হয়। জিডিপির বিকল্প ভাবনাগুলো নিয়েও জোরালো কোনো আলাপ নেই।

দূষণের উৎস বন্ধে অগ্রগতি নেই

ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী শহরের আশপাশের ইটভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানালেও বহু ইটাভাটা অনুমোদনবিহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ সরকার চাইলে সরকারি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে। দেশে নির্মাণকাজের বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্প। নির্মাণকাজে বায়ুদূষণের সরকারি হিস্যাও তাই বেশি। পরিবেশবান্ধব ইট যদি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার শুরু হতো, তাহলে বেসরকারিভাবেও এর প্রচলন বাড়ত।

২০১৫ সালে গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। ইটভাটায় মাটির উপরিভাগ কেটে পোড়ানো হচ্ছে। মাটির পুষ্টি উপাদানের কারণেই ফসল উৎপাদন হয়। আর পুষ্টি থাকে এই উপরিভাগেই, যা গঠনে হাজার বছর সময়ও লাগতে পারে। অথচ কি অবলীলায় নিমেষেই আমরা মাটির উপরিভাগ নষ্ট করছি ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে! জাতিসংঘের হিসাবমতে, বর্তমান হারে মাটির উপরিভাগ ধ্বংস হতে থাকলে আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর পর তা শেষ হয়ে যাবে; অর্থাৎ আমরা আর ফসল ফলাতে পারব না।

অথচ বালু-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ব্লক ইটের বিস্তার ঘটাতে পারলে কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বায়ুদূষণও কমবে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী থেকে বালু তুলে এসব ইট বানালে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও উত্তোলিত বালু ব্যবহার করা যাবে। এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে পারলে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজার ব্যবহার করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে। অবৈধ বালু উত্তোলনে বর্তমানে নদীর প্রতিবেশ নষ্ট হয়ে জলজ প্রাণীরা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নদীভাঙনের শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ হচ্ছে বাস্তুহারা।

অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। শহর এলাকার বায়ুদূষণ রোধে মেক্সিকো আর চীনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে যানবাহনের লাইসেন্সের নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর এগুলোকে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়ে বায়ুদূষণ কমানো হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

প্রতিদিন চলতে-ফিরতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে পড়ে আছে নির্মাণকাজের ইট-বালু-সুরকির স্তূপ। সেগুলো গড়িয়ে পড়ছে রাস্তার ওপর। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও স্তূপ করে রাখা মাটিও বায়ুদূষণের বড় উৎস। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি সরকারি সংস্থাগুলো যদি সমন্বয় করে কাজ করত, তাহলে শহরের রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ যেমন কমত, তেমনি এসব উৎস থেকে দূষণ কমানোও সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ক্ষেত্রে কাউকেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতে দেখা যায় না। আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করে বায়ুমানের উন্নতির পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। বায়ুদূষণ রোধে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস গত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এদিকে বায়ুদূষণজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের মতো সংস্থা, যারা বায়ুদূষণের উৎসগুলো ঠেকানোর দায়িত্বে রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় বলেছে যে তাদের যথেষ্ট জনবল নেই। এত বড় একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান যদি জনবলের ঘাটতির কারণে আটকে থাকে, তাহলে জনবল কেন বাড়ানো হচ্ছে না? প্রয়োজনে বছরের যে মাসগুলোয় বায়ুদূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, সে সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়েও এর সমাধান করা যায়।

আইন-আদালতের দুর্বলতা

পরিবেশ রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ অন্য যেসব আইন ও বিধিমালা রয়েছে, সেগুলো আবার জাতীয় স্বার্থে ‘বরখেলাপ’ করা যায়। যেমন পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট বা রাস্তা বানাতে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনে দেওয়া হয়নি। ফলে গোড়াতেই একটা গলদ রয়ে গেছে। তা ছাড়া যা-ও আইন আছে, তা প্রয়োগের ঘাটতি তো রয়েছেই। জাতিসংঘের পরিবেশ–সংক্রান্ত সংস্থা ইউএনইপির হিসাব (২০১৯) অনুযায়ী, পরিবেশ বিষয়ে অনেক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই যেসব দেশে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা সদরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে পরিবেশ আদালত নেই। তা ছাড়া এই আইনের সীমাবদ্ধতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি এই আইনে মামলা করতে পারেন না, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে করতে হয়। আবার এসব আদালতে পরিবেশ–সংক্রান্ত মামলার চেয়ে অন্যান্য মামলাই বেশি।

২০২১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকার পরিবেশ আদালতে মোট মামলার মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায়। চট্টগ্রামে এই হার কিছুটা বেশি, ১৩ শতাংশ। এর ব্যাখ্যায় দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলে থাকেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তাই পরিবেশ আদালতে মামলা কম যায়।

২০২১ সালের ১৩ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত—দুটিতেই অপরাধীদের কারাদণ্ডের চেয়ে অর্থদণ্ড বেশি দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর সেই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ বছরে নিষ্পন্ন হওয়া ২০০ মামলার মধ্যে ১৪৭টি মামলায় পরিবেশ আদালত অর্থদণ্ড দিয়েছেন। আর পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৪৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাত্র ১৬৬ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আপিল করে ছাড়াও পেয়ে যান। বাংলাদেশ আইন কমিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৯৮ শতাংশ মামলার রায় আপিল আদালতে বাতিল হয়ে যায়।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির সৃষ্টি না হলে পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড থামবে না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রশ্ন রেখেছিলেন, শহরের কতজন ছিঁচকে চোর ধর্ম বা নৈতিকতার ভয়ে চুরি থেকে বিরত থাকে আর কতজন রাষ্ট্রের ডান্ডাবাড়ি খাওয়ার ভয়ে বিরত থাকে?

আমাদের মতো দেশের আরেকটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দেশে আইন-বিচার-রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি অপরাধের বিরুদ্ধে একধরনের সামাজিক প্রতিরোধও আছে। সাধারণ মানুষই সম্মিলিতভাবে অনেক অপরাধ ঠেকিয়ে দেন। মানুষের ভূমিকার কারণে অপরাধীদের বিরত থাকার অনেক নজিরও আছে। কিন্তু পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা কম থাকায় এ-সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সামাজিক এমন প্রতিরোধ জোরালোভাবে কাজ করে না। পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।

-খলিলউল্লাহ্ প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

বায়ুদূষণ
বায়ুদূষণ। অলংকরণ: আরাফাত করিম

Friday, November 15, 2024

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ৪০ শতাংশ প্রবাল

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে আছে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী। বিলুপ্তির ঝুঁকির তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সেই তালিকায় বিভিন্ন ধরনের প্রবালের অবস্থা সম্পর্কে শঙ্কার তথ্য দিয়েছেন। বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি প্রবালের বাসস্থান ও বাস্তুতন্ত্র তীব্র হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। নতুন গবেষণা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রবাল প্রাচীরের একটি বড় অংশ বেঁচে থাকবে কি না, তার সম্ভাবনা কমিয়ে দিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর রেড লিস্ট অব থ্রেটেনড স্পিসিস অনুসারে, বিশ্বব্যাপী রিফ-বিল্ডিং প্রবাল প্রজাতির প্রায় ৪৪ শতাংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন প্রবাল প্রজাতির বিরুদ্ধে প্রধান হুমকির মধ্যে রয়েছে ব্লিচিং, তেলদূষণ ও বিভিন্ন রোগের প্রভাব। অন্যান্য হুমকির মধ্যে রয়েছে মাছ ধরা, গভীর সমুদ্রে খনন, তেল ও গ্যাসের জন্য খনন বা গভীর সমুদ্রে স্থাপনা করার মতো কার্যক্রম প্রবালদের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইইউসিএন ২০০৮ সালে ৮৯২টি উষ্ণ পানির রিফ-বিল্ডিং প্রবাল প্রজাতির অবস্থা বর্ণনা করে। তখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই ঝুঁকির হার বেড়েছে। উষ্ণায়নের ঘটনা ও ব্লিচিংয়ের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। আইইউসিএন দুটি প্রবালের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। স্ট্যাগহর্ন প্রবাল ও এলখর্ন প্রবাল ক্যারিবীয় অঞ্চলের দুটি বিপন্ন প্রজাতির প্রবাল। উষ্ণতা বৃদ্ধি, দূষণ, ঘূর্ণিঝড় ও প্রবাল রোগের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এ বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) বিশ্বের চতুর্থ বৈশ্বিক প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনার কথা প্রকাশ করে। আগামী কয়েক মাসে আরও কয়েকটি প্রবাল ব্লিচিংয়ের ঘটনা দেখা যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। রাসায়নিক বা প্রাকৃতিক কারণে প্রবাল তার রঙের উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে, এ বিষয়টিকে ব্লিচিং বলা হয়।

প্রবাল রক্ষা করা না গেলে উপকূলীয় অনেক মাছ ও প্রাণী হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রবাল প্রাচীর উপকূলরেখা ও উপকূলীয় আবাসস্থলকে স্থিতিশীল রাখছে। এসব প্রাচীর ধ্বংস হলে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেন বিজ্ঞানীরা। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখতে পারে প্রবাল প্রাচীর। সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বিভিন্ন দেশের প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা।

সূত্র: এবিসি নিউজ

অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রবালও উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের প্রবালও উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। ছবি: অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস/রয়টার্স

Thursday, November 14, 2024

জলবিদ্যুৎ ভাগ করার জন্য দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরির আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

নেপাল ও ভুটানের উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ ভাগ করে নেয়ার জন্য একটি দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার বাকুতে জলবায়ু সম্মেলনের সাইডলাইনে সোশ্যাল বিজনেস গ্রুপের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো এক বার্তায় বিষয়টি জানানো হয়েছে।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে সংযোগকারী বিদ্যুতের গ্রিডের অভাবে হিমালয় দেশগুলোর বেশিরভাগ জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নেপালের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, দেশটির ৪০,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারত ও বাংলাদেশের মতো বড় দেশগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সহজেই নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনতে পারে, কারণ এটি বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে। নেপালের জলবিদ্যুৎও সস্তা হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানকে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রিড তৈরি করার কথা ভাবতে হবে।

জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বন্যারোধে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে, পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পানি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, পানি আমাদের প্রধান পরিবেশগত সমস্যা। আমাদের এমনভাবে পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে যাতে এটি প্রকৃতিকে সমর্থন করে।

অন্তর্বর্তী সরকার যুব উন্নয়ন ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সরকার জানুয়ারিতে তরুণদের জন্য একটি উৎসবের আয়োজন করবে। যখন দেশের ক্রিকেট বোর্ড তার বার্ষিক টি-টোয়েন্টি বিপিএল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করবে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং আইওসি প্রেসিডেন্ট টোমাস বাখ উৎসবে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নারী ফুটবলের জন্য একটি টুর্নামেন্টেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেশের সব জায়গায় উৎসব করার চেষ্টা করছি।

অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কেও কথা বলেন, যা শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ বর্বর স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। তিনি কপ২৯-এর মূল বিষয় এবং কার্বন ক্রেডিট নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আলোচনার বিষয়েও কথা বলেছেন।

mzamin

‘জিরো কার্বন’ ভিত্তিক জীবনধারার আহ্বান ড. ইউনূসের

পৃথিবীকে জলবায়ু বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে ‘শূন্য বর্জ্য ও শূন্য কার্বন’-এর ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন জীবনধারা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের আরেকটি সংস্কৃতি গঠন করতে হবে। একটি ভিন্ন জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে আরেকটি পাল্টা সংস্কৃতি গড়তে হবে। এটি হবে শূন্য বর্জ্যের ওপর ভিত্তি করে। এ সংস্কৃতি নিত্যপণ্যের ব্যবহারকে সীমিত করবে, কোনো বর্জ্য অবশিষ্ট রাখবে না। গতকাল আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কপ-২৯-এর ওয়ার্ল্ড লিডার্স ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। প্রফেসর ইউনূস বলেন, এই জীবনযাত্রাও হবে শূন্য কার্বনের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি থাকবে না, শুধু নবায়নযোগ্য শক্তি থাকবে। এতে এমন একটি অর্থনীতি হবে, যা প্রাথমিকভাবে সামাজিক ব্যবসার মতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে শূন্য মুনাফার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। এ সময় সামাজিক ব্যবসাকে সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের জন্য একটি মুনাফাহীন ব্যবসা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন তিনি। বলেন, সামাজিক ব্যবসার একটি বিশাল অংশ পরিবেশ ও মানবজাতির সুরক্ষায় মনোযোগ দেবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবন কেবল সুরক্ষিতই হবে না, গুণগতভাবে উন্নত হবে। এটি যুবকদের জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজতর করবে। উদ্যোক্তা হওয়ার নতুন শিক্ষার মাধ্যমে তরুণেরা প্রস্তুত হবে। চাকরিপ্রার্থী তৈরির শিক্ষা উদ্যোক্তা-কেন্দ্রিক শিক্ষা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে। তিনি বলেন, পরিবেশের সুরক্ষার জন্য একটি নতুন জীবনধারার প্রয়োজন। যে নতুন জীবনধারা চাপিয়ে দেয়া হবে না, পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে হবে। ড. ইউনূস বলেন, তরুণরা সেই জীবনধারাকে পছন্দ হিসেবে বেছে নেবে। প্রতিটি যুবক তিন শূন্যভিত্তিক ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠবে। এগুলো হচ্ছে শূন্য নেট কার্বন নির্গমন, শুধু সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলার মাধ্যমে শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীকরণ ও নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিণত করার মাধ্যমে শূন্য বেকারত্ব। তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ তিন শূন্যভিত্তিক ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠবে এবং সারা জীবন তিন শূন্যভিত্তিক ব্যক্তি হিসেবে থাকবে। এটি নতুন সভ্যতা গড়ে তুলবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা করতে আমাদের যা করতে হবে, তা হলো এ গ্রহের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন জীবনধারা গ্রহণ করা, যেখানে সবাই বসবাস করে। আজকের তরুণ প্রজন্ম বাকিটা করবে। তারা তাদের এই গ্রহকে ভালোবাসে। আশা করি, আপনারা এই স্বপ্ন দেখায় আমার সঙ্গে যোগ দেবেন। আমরা যদি একসঙ্গে স্বপ্ন দেখি, তবে তা সম্ভব হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জলবায়ু সংকট তীব্রতর হচ্ছে এবং সে কারণে মানবসভ্যতা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মানুষ আত্মবিধ্বংসী মূল্যবোধের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আত্মরক্ষাত্মক ও আত্মশক্তিবর্ধক একটি নতুন সভ্যতার ভিত্তি স্থাপনের জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, আর্থিক ও যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা এই গ্রহের মানব বাসিন্দারা এই গ্রহের ধ্বংসের কারণ। প্রফেসর ইউনূস বলেন, মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করছে এবং তারা এমন একটি জীবনধারা বেছে নিয়েছে, যা পরিবেশের বিরুদ্ধে কাজ করে। তারা একে একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে ন্যায্যতা দেয়, যা এই গ্রহব্যবস্থার মতো প্রাকৃতিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক কাঠামোটি সীমাহীন খরচের ওপর ভিত্তি করে চলছে। আপনি যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত বেশি প্রবৃদ্ধি পাবেন। যত বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবেন, তত বেশি অর্থ উপার্জন করবেন।

নেপাল ও ভুটানে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের জন্য দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরির আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার: এদিকে বাকুতে জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে সোশ্যাল বিজনেস গ্রুপের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নেপাল ও ভুটানে উৎপাদিত জলবিদ্যুতের জন্য একটি দক্ষিণ এশিয়া গ্রিড তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে সংযোগকারী বিদ্যুৎ গ্রিড না থাকায় হিমালয়ের দেশগুলোর বেশির ভাগ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভাবনা স্তিমিত রয়েছে। নেপালের কর্মকর্তারা জানান, দেশটির ৪০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারত ও বাংলাদেশের মতো বড় দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং ভুটানকে দক্ষিণ এশিয়ার গ্রিড তৈরি করার কথা ভাবতে হবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সহজেই নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনতে পারে কারণ এটি বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে। নেপালের জলবিদ্যুৎ সহজলভ্যও হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বন্যা রোধে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পানি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, পানি আমাদের প্রধান পরিবেশগত সমস্যা। আমাদের এমনভাবে পানি ব্যবস্থাপনা করতে হবে যাতে তা প্রকৃতিকে সমর্থন করে। ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুব উন্নয়ন ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আয়োজিত বার্ষিক টি-টোয়েন্টি বিপিএল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলাকালীন জানুয়ারিতে তরুণদের জন্য একটি উৎসবের আয়োজন করবে সরকার। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং আইওসি প্রেসিডেন্ট টমাস বাখ উৎসবে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নারী ফুটবলের জন্য একটি টুর্নামেন্টেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, আমরা দেশের সব জায়গায় উৎসব করার চেষ্টা করছি। ড. ইউনূস সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল সে সম্পর্কেও আলোচনা করেন।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার: জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এবং পৃথিবী ও মানুষের জন্য কল্যাণকর এমন নতুন সভ্যতা গড়ার প্রচেষ্টায় বিশ্বের একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো দরকার বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁর সঙ্গে এলডিসি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে কপ-২৯ সম্মেলনের ফাঁকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে পাঁচটি প্রধান জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ স্বল্পোন্নত দেশ- নেপাল, মালাউই, গাম্বিয়া, লাইবেরিয়া এবং বাংলাদেশ-এর নেতারা যোগ দেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের একটি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো দরকার যা পৃথিবী এবং এর মানুষের জন্য কল্যাণকর। একইসঙ্গে বিশ্বের তরুণদের জন্য একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্যে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকে হওয়া সম্মেলন ‘সামিট ফর দ্য ফিউচার’ এ সমর্থন জানাই। প্রফেসর ইউনূস বলেন, আমরা এমন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছি যার মূল হচ্ছে ভোগ, ভোগ এবং ভোগ। এটি শুধু বর্জ্য, বর্জ্য এবং বর্জ্য তৈরি করে। আমাদের শূন্য বর্জ্যের বিশ্ব তৈরি করতে হবে। প্রতি বছর কপ জলবায়ু সম্মেলন করা উচিত নয় উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বের কী প্রয়োজন তা আমরা জানি এবং এর জন্য আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা উচিত। এটি দেশ অনুযায়ী হওয়া উচিত। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি (বর্জ্য) নিরসনের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। আমাদের প্রতি বছর এখানে দেখা করার দরকার নেই। প্রতি বছর আলোচনার জন্য মিটিং করা সময়সাপেক্ষ, অপচয় এবং অপমানজনক। প্রধান উপদেষ্টা জলবায়ু আলোচনার জন্য একটি নতুন পদ্ধতির আহ্বান জানিয়ে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পদ্ধতিটি বিশ্বের বেশির ভাগ চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বড় অবিচারের সম্মুখীন হয়েছে। আমরা আপনাদের বলতে চাই যে, আমরা আপনাদের বিষয়ে গুরুত্ব দেই। জলবায়ু অভিযোজন এবং প্রশমনের জন্য একটি বৃহত্তর তহবিল সুরক্ষিত করার জন্য এলডিসিগুলোকে কঠোর আলোচনা এবং ‘গুরুতর প্রক্রিয়া’ তৈরি করতে হবে।

ঋণ প্রাপ্তিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান ড. ইউনূসের: প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় ঋণ প্রাপ্তি একটি মৌলিক অধিকার। জীবিকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঋণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গতকাল আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনের একটি সাইডলাইন ইভেন্টে দেয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। জলবায়ু সম্মেলনস্থলে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে ‘একটি বৈশ্বিক সংলাপ: ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য অর্থায়ন সুবিধা’ শীর্ষক এই ইভেন্টের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ হামিদুল্লাহ এবং এতে উপস্থিত ছিলেন নেদারল্যান্ডসের জলবায়ু দূত বোরবোন-পারমার ডাচ্‌ প্রিন্স জেইম বার্নার্ডো। ডাচ্‌ প্রিন্স উল্লেখ করেন কীভাবে ঋণ, বীমা, বিনিয়োগ, গবেষণা এবং অর্থায়ন কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে এবং জানান সারা বিশ্বের লাখ লাখ কৃষকের এখন এই সহায়তা প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইভোন পিন্টো। তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য ঋণ সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী ধান উৎপাদন বেড়েছে। ডাচ্‌ উদ্যোক্তা উন্নয়ন ব্যাংক এফএমও-এর পরিচালক জোরিম শ্রাভেন ঋণ প্রাপ্তির অধিকারের বিষয়ে নৈতিক সমর্থন দেয়ায় ড. ইউনূসের প্রশংসা করেন এবং জানান, এটি মানুষের তথ্য জানার অধিকার সম্পর্কিত। ইন্টার প্রেস সার্ভিসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আইপিএস নোরামের নির্বাহী পরিচালক ফারহানা হক রহমান বলেন, বর্তমানে ৫৫ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার বিশ্বব্যাপী দুই বিলিয়ন মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। প্রফেসর ইউনূস বলেন, যদি একজন কৃষককে ঋণের সুবিধা দেয়া হয় তবে সে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে। প্রত্যেক ব্যবসায় টাকা এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন কৃষক শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন করেন না, তিনি তা বাজারে বিক্রি করেন। এভাবে তার জীবনমানের উন্নতি হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কৃষকদের জন্য ঋণ সহজলভ্য করতে দেশে দেশে গ্রামীণ ব্যাংক মডেল অনুসরণ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা উচিত। তিনি বলেন, প্রত্যেক দেশে সামাজিক ব্যবসা ব্যাংকিং আইন থাকা উচিত। অন্যদিকে কপ-২৯ জলবায়ু সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত এক সাইডলাইন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও ওষুধ কোম্পানিগুলোকে নতুনভাবে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

mzamin

Friday, November 8, 2024

সেন্টমার্টিন নিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টার বক্তব্য অবৈজ্ঞানিক : স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি

নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপ (সেন্টমার্টিন) নিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টার বক্তব্য অবৈজ্ঞানিক ও বাস্তবতা বিবর্তিত বলে মন্তব্য করেছে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ (সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ছাত্র আন্দোলন)।

শুক্রবার (৮ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপে যাতায়াত ও অবস্থানে সরকারি বাধা দেশের সাবভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে’ ব্যানারে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা এমন মন্তব্য করেন। তারা পরিবেশ উপদেষ্টাকে বাস্তবসম্মত এবং দেশ ও জনগণের পক্ষ হয়ে কথা বলার আহ্বান জানান।

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক ঢাবি শিক্ষার্থী মুহম্মদ জিয়াউল হক বলেন, বিদেশি জার্নালের রেফারেন্স টেনে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেছেন, পর্যটকরা কোরাল তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তাই ২০৪৫ সালের মধ্যে নাকি সকল কোরাল ক্ষয় হয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ (নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপ) ডুবে যাবে। পরিবেশ উপদেষ্টার এই কথা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক। উপদেষ্টা মহোদয় কখনও দ্বীপে গিয়েছেন কি না, অথবা গিয়ে কখনও এসব জানার চেষ্টা করেছেন কি না সেটা আমরা জানি না। তবে গিয়ে থাকলে এমন অবাস্তব কথা তিনি বলতে পারতেন না।

তিনি বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে- দ্বীপের কোরালগুলো অনেক বড়, অনেক ওজন, অনেক ধারালো এবং পানির অনেক নিচে থাকে যেগুলো মানুষের পক্ষে তুলে আনা সম্ভব নয়। কোরাল নিয়ে আসা তো দূরের কথা, জীবন্ত কোরালে হাত দিলেই হাত কেটে যায়। কথিত বিদেশি জানান কিংবা পরিবেশবাদীদের কোরাল নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে যে বক্তব্য যেটি অসত্য ও মিথ্যা প্রচারণা। মূলত প্রাকৃতিক কারণেই কিছু কোরাল মারা যায়। আবার নতুন কোরাল জন্মায়। পর্যটকদের কেউ কেউ সাগরে ভেসে ওঠা সেই মৃত কোরাল অনেক সময় নিয়ে আসেন যেটাতে দ্বীপ কিংবা পরিবেশের ক্ষতি নয় বরং উপকার হয়, সাগর পরিচ্ছন্ন থাকে। তারপরেও সেসব মৃত কোরাল আনার ব্যাপারে যদি নিষেধাজ্ঞা থাকে যেটা সরকারিভাবে বাস্তবায়ন করলেই সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা অজুহাতে দ্বীপে যাওয়া ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার রহস্য জনগণ জানতে চায়।

জিয়াউল আরও বলেন, নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপ শুধু কোরাল দিয়েই তৈরি নয়, শক্ত পাথর দিয়েও তৈরি। কোরাল নয়, শক্ত পাথরই এর মূল ভিত্তি। তাই কোরাল যদি তুলেও নেওয়া হয়, তবুও পাথরের ভিত্তির উপর দ্বীপ টিকে থাকবে। কাজেই ‘২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপ হারিয়ে যাবে’ বিদেশি জার্নালের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক, কল্পনাপ্রসূত এবং এটাকে কন্সপিরেসি থিউরি (ষড়যন্ত্র তত্ত্ব) বললে অত্যুক্তি হবে না। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণেই নারিকেল দ্বীপ ২০৪৫ সালের মধ্যে তলিয়ে যাবে মর্মে বিদেশি জার্নালের যেই বক্তব্য প্রচার হচ্ছে সেটি পরিবেশবাদীদের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে। সেখানে গবেষক টিমে কারা ছিল, তারা কোন মতবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ তাদের গবেষণাটি কতটুকু সঠিক কিংবা বায়াসড ছিল, তাদের ফান্ডিং করেছে কোন সংস্থা, তাদের উদ্দেশ্য কী, রিসার্চের মেথডোলজি কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত ছিল, মাঠ পর্যায়ে কয়দিন গিয়েছে, কী কী বিষয়ের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে, কার কার বক্তব্য নিয়েছে, যাদের বক্তব্য নিয়েছে তারা কারা অর্থাৎ কথিত বিদেশিদের গবেষণার সম্পূর্ণ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে- এসব কিছুই খতিয়ে না দেখে দুএকটি বিদেশি জার্নালের রেফারেন্সে দেশীয় শিল্প বন্ধ করে দেওয়া হলো, আয়-রোজগারের পথ বন্ধ করে দিয়ে দ্বীপবাসীদের চরম মৌলিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হলো। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাচ্ছি, পরিবেশ উপদেষ্টা বিদেশি পরামর্শে চলছেন কিন্তু দেশের মানুষের পরামর্শ ও দাবি-দাওয়াকে পাত্তা দিচ্ছেন না। বিদেশি জার্নালের পরামর্শে তিনি নিজ দেশের পর্যটন শিল্প ও দ্বীপবাসীকে একটা মারাত্মক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। যেটা কোনো দেশপ্রেমিক মানুষের কাজ হতে পারে না।

পরিবেশ উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জিয়াউল হক বলেন, পরিবেশবাদীরা বলছে, দ্বীপের কোরাল ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, কোরাল ক্ষয় হয় না, বরং প্রতি বছর গড়ে প্রায় ০.৫-২.৮ সে.মি. হারে বৃদ্ধি পায়। দ্বীপে সরেজমিনে দেখা যায়, মৃত কোরাল জমে দ্বীপের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ উপদেষ্টা বলছেন, কোরাল ক্ষয়ে নাকি দ্বীপ হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে বিজ্ঞান ও বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না।

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ঢাবি শিক্ষার্থী মুহিউদ্দীন রাহাত বলেন, বাস্তবে নারিকেল দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হচ্ছে বেওয়ারিশ কুকুর। দ্বীপে কুকুরের মাত্রাতিরিক্ত আধিক্য জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস ডেকে আনছে। ক্ষুধার্ত কুকুরের পাল সৈকতে আসা বাল কাকড়াকে আক্রমণ করে, কচ্ছপের ডিম খেয়ে ফেলে। দ্বীপে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ হাজার বেওয়ারিশ কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দ্বীপ থেকে সেই কুকুর অপসারণ করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার কোনো উদ্যোগ পরিবেশ উপদেষ্টা এখন পর্যন্ত নেননি। উপদেষ্টা মহোদয় বৈদেশিক পরামর্শে চলছেন। তার সিদ্ধান্ত বরং পরিবেশকে যারা রক্ষা করেন সেই মানুষ অর্থাৎ দ্বীপবাসীকে বাস্তুচ্যুত করাবে। এ ছাড়া উপদেষ্টা মহোদয় থাইল্যান্ডসহ বিদেশী পর্যটন স্পটের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের নারিকেল দ্বীপে যাওয়ার ব্যাপারে কথা বলেছেন। উপদেষ্টা মহোদয়কে আমরা বলব, আমাদের নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপ ভ্রমণ মাত্র চার মাসের জন্য হয়ে থাকে, বাকি আট মাস বন্ধ থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশের দ্বীপগুলো দুই তিন মাস বন্ধ থাকে। বাকি সময়গুলো খোলা থাকে। সেটি কেনো বললেন না?

তিনি আরও বলেন, আমাদের দ্বীপটি ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি অবস্থানে আছে। দ্বীপে ভ্রমণ বন্ধ রাখলে এক সময় দ্বীপ জনশূন্য হয়ে যাবে। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের মগ, আরাকানি ও ভারতের জেলেরা একসময় দ্বীপটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাবে। ইতোমধ্যেই মিয়ানমার ও আরাকান আর্মি দ্বীপটিকে একাধিকবার তাদের বলে দাবিও করেছে। অর্থাৎ দেশের অখণ্ডতা রক্ষার তাগিদেই নারিকেল জিঞ্জিরা দ্বীপকে সবসময় জনবান্ধব ও জনগণের আসা যাওয়াকে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবেশবাদসহ কোনো কিছুর অজুহাতেই দ্বীপ ভ্রমণে বাধা দিলে দ্বীপটি আমাদের হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। 

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি : কালবেলা
স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি : কালবেলা

Tuesday, November 5, 2024

আনারকলি’র শহর বায়ুদূষণের ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন

পাকিস্তানের লাহোর, যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে বায়ুদূষণের চরম সমস্যায় আক্রান্ত। বিশেষ করে আনারকলি, যেখানে জীবন্ত ইতিহাসের ছোঁয়া রয়েছে, এখন বায়ুদূষণের ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।

দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে পরিচিত এই নগরী, যা প্রাচীন বাজার ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর জন্য বিখ্যাত, এখন দূষণের রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

রোববার (৩ নভেম্বর) লাহোরের স্থানীয় সরকার ঘোষণা করে, শহরের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হবে।

পাঞ্জাবের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভারতের দিক থেকে দূষিত বাতাস লাহোরের দিকে আসছে, তাই মন্টেসরি, প্লে গ্রুপ ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হচ্ছে।’ এই সিদ্ধান্তটি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই শহর ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। কুয়াশার সঙ্গে নিম্নমানের ডিজেলের ধোঁয়া, মৌসুমি কৃষিজমির খড় পোড়ানোর ধোঁয়া এবং শীতের সময় ঠান্ডা তাপমাত্রার ফলে তৈরিকৃত গ্যাসগুলো মিলিয়ে এ ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।

বায়ুদূষণের পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে তুলে ধরে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। তাদের তথ্যমতে, লাহোরের বায়ুর মান সূচক এক হাজারেরও বেশি, যা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাঞ্জাব সরকার আজকের বায়ুর মানের স্কোর রেকর্ড করেছে যা ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশটির আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগামী ছয় দিন বাতাসের পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার কথা বলা হয়েছে। লাহোরের পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আনোয়ার এএফপিকে বলেন, এই কারণে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ থাকবে।

মরিয়ম আওরঙ্গজেব শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই ধোঁয়াশা শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিদ্যালয়গুলোতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং উচ্চতর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা হচ্ছে।

বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের রোগ, হৃদ্‌রোগ, ফুসফুস ক্যানসার, শিশু জন্মের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অপমৃত্যু। শিশুরা বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, কারণ তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি, তাই তারা দূষিত বায়ু বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে।

লাহোরের আনারকলি এখন শ্বাসকষ্ট ও অসুস্থতার এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষতি করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।

সূত্র : এএফপি

অরেঞ্জ লাইন মেট্রো লাহোর শহরে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে ট্রেনটির যাত্রা। ছবি : সংগৃহীত

Saturday, November 2, 2024

নদীদূষণ ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে : গবেষণা

বাংলাদেশের নদীগুলোতে ভারী ধাতুর কারণে দূষণের মাত্রা ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। চলতি বছরের ১২ জুলাই ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য দেখা গেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০টি ভারী ধাতুর (এএস, পিবি, সিডি, সিআর, এফই, এমএন, সিইউ, সিইউ, সিও, এনআই, জেডএন) দূষণের প্রবণতা পরীক্ষা করে দেশের জলপথের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ একটি একাডেমিক জার্নাল। এটি জার্মানিভিত্তিক স্প্রিংগার নেচারের শাখা স্প্রিংগার প্রকাশ করে। দেবাশীষ পণ্ডিত ও মোহাম্মদ মাহফুজুল হকসহ একদল বিশেষজ্ঞ প্রিজমা ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করে পদ্ধতিগতভাবে ৫৫টি নথি পর্যালোচনা করেছেন।

গবেষণার ফলাফল দেখা যায়, ২০০১-২০১০ সালে যে পরিমাণ দূষণ হয়েছিল, সেই তুলনায় গত দশকের (২০১১-২০২০) দূষণের মাত্রা অনেক খারাপ ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো- ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণায় প্রধানত ৩টি বিভাগের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেগুলো- ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম। এসব এলাকার নদীগুলোর বেশিরভাগে ভারি ধাতুর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউএসইপিএ) এবং বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আর্সেনিক (এএস), সীসা (পিবি), ক্যাডমিয়াম (সিডি), ক্রোমিয়াম (সিআর), লোহা (এফই) ও ম্যাঙ্গানিজের (এমএন) গড় ঘনত্ব তিনটি ঋতুতেই গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর গ্রীষ্মের মাসগুলোতে সর্বাধিক দূষণ হয়।

ট্যানারি, টেক্সটাইল ও ইলেক্ট্রোপ্লেটিং কারখানাসহ শিল্প কারখানার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা। এসব শিল্প কারখানা ভারি ধাতুসম্পন্ন অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দেয়। এটি পরিবেশগত মারাত্মক সংকট তৈরি করে এবং যা বছরের পর বছর ধরে খারাপ হয়ে চলেছে।

গবেষণায় ভারি ধাতু দূষণের একাধিক উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক আবহাওয়া সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলোর পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃষি থেকে সার ও কীটনাশক, খনন, ইলেকট্রোপ্লেটিং, বস্ত্রশিল্প, কয়লা খনি ও শিল্প বর্জ্য যেমন ব্যাটারি ও রং নদীর পানির দূষণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এসব দূষক বাস্তুতন্ত্রে জমা হয়, যা জলজ জীববৈচিত্র্য, মানব স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে।

গবেষণায় দূষণ রোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- পানিসম্পদ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে শিল্প সংশ্লিষ্টদের ও জনগণকে শিক্ষিত করতে অব্যাহত পর্যবেক্ষণ, ব্যাপক গবেষণা এবং সচেতনতামূলক প্রচার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী অববাহিকা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে; যা টেকসই সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করে। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের নদীগুলো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এই গবেষণার অন্যতম গবেষক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ড জানান, আমাদের নদীগুলোতে বিশেষ করে ঢাকার মতো অঞ্চলে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত ভারি ধাতু জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় দূষিত পানি। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় দূষিত পানি। ছবি : সংগৃহীত



Tuesday, October 15, 2024

পলিথিন ও প্লাস্টিক বন্ধে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় চান ব্যবসায়ীরা

জাতিসংঘের পরিবেশ অ্যাসেম্বলির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত একবার ব্যবহার্য পলিথিন ও প্লাস্টিক বন্ধে সময় চান ব্যবসায়ীরা। সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) প্লাস্টিক খাতের ব্যবসায়ীদের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

এ সময় লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সামিম আহমেদ বলেন, গত ২৭ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৭টি একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের একটি তালিকা সম্বলিত গেজেট প্রকাশ করেছে। সে অনুযায়ী, একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বন্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে। ফলে প্লাস্টিক সেক্টরের ব্যবসা বাণিজ্য এবং লিংকেজ হিসেবে অন্যান্য সেক্টরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ আইনের কারণে শিল্প বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে এবং বাজারে নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এসময় খাদ্য নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, আয়োডিনযুক্ত লবণ প্লাস্টিক ছাড়া মোড়কীকরণ সম্ভব নয় উল্লেখ করে সামিম আহমেদ বলেন, অন্য কোনো পণ্য দিয়ে মোড়কীকরণ করা হলে তার গুণগত মান থাকবে না।এছাড়াও বর্তমান সরকার ভোজ্য তেলের সঙ্গে ভিটামিন-এ যুক্ত করতে চায় যা প্লাস্টিক কনটেইনার ছাড়া এটা সম্ভব নয়। তরল দুধ প্লাস্টিক প্যাকেজিং ছাড়া বাজারজাত সম্ভব নয় কারণ ইউভি লাইট সুরক্ষা না থাকলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়। ওষুধের গুণগত মান রক্ষায়ও প্লাস্টিক প্যাকেজিং ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এই ব্যবসায়ী বলেন, ইউএনইএ রেজ্যুলেশনে প্লাস্টিককে বর্তমান আধুনিক মানবসভ্যতায় তার ভূমিকা এবং অবদান লিপিবদ্ধ করেছে এবং স্বীকৃতি দিয়েছে। আইএনসি প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে চলমান আলোচনায়ও প্লাস্টিক বন্ধ করার কথা বলা হয়নি।

২০০২ সালের পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধের আইন বাস্তবায়নযোগ্য করার জন্য বিকল্প ব্যাগসমূহের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়ে সামিম আহমেদ বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তকরণ, জনগণের অংশগ্রহণ, যথেষ্ট পরিমাণে বিনের (ঝুড়ি) ব্যবস্থা করা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। যথেষ্ট পরিমাণ বিকল্প ব্যাগের ব্যবস্থা/সরবরাহ নিশ্চিত না করে কোনো অভিযান পরিচালনা সফল হবে না।
পরে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্লাস্টিকের পুনঃচক্রায়নের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো এবং মহাসাগরীয় প্লাস্টিক দূষণ রোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসময় তিনি জাতিসংঘের পরিবেশ অ্যাসেম্বলির একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০৩০ সাল পর্যন্ত পণ্যটি বন্ধে সময় নিতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যে লক্ষ্যে ২০২২ সালে প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ বন্ধ করে দেয় তা গত ২২ বছরে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সাশ্রয়ী মূল্য, গুণগত মান এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য শপিং ব্যাগের বিকল্প ছাড়া উৎপাদন ও সরবরাহ সম্ভব হয় না। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বন্ধ হলে প্লাস্টিক খাতের ৬০০০ হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে লক্ষাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকরি হারাবেন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে প্লাস্টিক ফাউন্ডেশন। এতে ফাউন্ডেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

mzamin