Thursday, February 21, 2019

ছবি হাতে রোহানের খোঁজে স্বজনেরা by মোশতাক আহমেদ ও কমল জোহা খান

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্র তানজিল হাসান রোহান বন্ধুদের সঙ্গে গত রাতে খেতে গিয়েছিলেন চকবাজার এলাকায়। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল রাত ১০টা ১০ মিনিটে নন্দকুমার দত্ত সড়কের চুড়িহাট্টা মসজিদ গলির ওয়াহেদ ম্যানসনে আগুন লাগে। এরপর সেই আগুন পাশের কয়েকটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে।
রাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, ওয়াহেদ ম্যানসন পাশে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ রয়েছে। যেগুলোর প্রতিটিতে চার থেকে পাঁচটি করে গ্যাসের সিলিন্ডার রয়েছে। আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরিত হয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী সকাল সাড়ে আটটার দিকে ব্রিফিংয়ে জানান, ৭০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও লাশ থাকতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর রোহানের স্বজনেরা মর্গে রোহানের লাশের খোঁজ করছেন। এসেছিলেন ছোট ভাই, মা, নানি। রোহানের খোঁজে দুপুরে তাঁর পরিবার ও স্বজনদের ঢাকা মেডিকেলে এসে আহাজারি করতে দেখা যায়। তাঁরা জানান, রোহানসহ ৫ বন্ধু মিলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। ওয়াহেদ ম্যানসনের পাশে হোটেল খেতে গিয়েছিলেন তাঁরা।
স্বজনেরা জানান, রোহানের মোটরসাইকেলে ছিলেন আরাফাত। আরাফাতের লাশ পাওয়া গেছে। বাকি তিনজন বেঁচে আছেন। ওই তিনজন ছিলেন আরেক মোটরসাইকেলে।
রোহানের বাসার গৃহশিক্ষক তারেকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে রোহানের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এখন রোহানের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর খোঁজ করা হচ্ছে। রাত থেকে কোথাও তাকে না পেয়ে শেষে হাসপাতালে খুঁজতে এসেছেন। কিন্তু এখনো সন্ধান পাননি।
হাসপাতালের মর্গের সামনে তাঁর স্বজনেরা ছবি নিয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে যাচ্ছেন। সেখানে বয়স্ক এক ব্যক্তি একটি ছবি হাতে পুলিশের কাছে রোহানের খোঁজ করছিলেন। তাঁর নাম লোকমান খান। তিনি রোহানের চাচা।
লোকমান খান বলেন, গতকাল রাত এগারোটার পর থেকে রোহানের খোঁজ নেই। তাদের বাসা পুরান ঢাকার আগামসি লেনে। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে।
লোকমান খান বলেন, তার ভাতিজা নর্থ সাউথের বিবিএ পড়ত। গতকাল রাতে বন্ধুদের সঙ্গে খেতে যাওয়ার পর থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত তাকে শনাক্ত করা যায়নি। রোহানরা তিন ভাই এক বোন। তাদের মধ্যে রোহান বড়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এখন অনেক শোকার্ত মানুষের ভিড়। কেউ স্বজন হারিয়েছেন। কেউবা তাদের খোঁজে এসেছেন। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ জানান, এখানে ৬৭টি লাশ আনা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু লাশ পুড়ে কয়লার মতো হয়ে গেছে। কিছু লাশ আছে চেহারা দেখে শনাক্ত করা যাবে।

শামিমা ইস্যুতে হাত ধুয়ে ফেলেছে বৃটেন ও বাংলাদেশ -এএফপির রিপোর্ট

আইএসে যোগ দেয়া বৃটিশ শামিমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বৃটেন। অন্যদিকে তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ, যে দেশ থেকে তার পরিবার বৃটেনে এসেছে। এর ফলে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার মুখে টিনেজ বয়সে আইএসে যোগ দেয়া শামিমা বেগম। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
‘বৃটেন অ্যান্ড বাংলাদেশ ওয়াশ দেয়ার হ্যান্ডস অব আইএস টিন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শামিমার বয়স যখন মাত্র ১৫ বছর তখন ২০১৫ সালে তিনি সিরিয়া চলে যান। তিনি এখন বৃটেনে ফিরতে চান। গত সপ্তাহে তিনি সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দিয়েছেন। ওদিকে বৃটিশ সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়ায় শামিমা হতাশ।
নাগরিকত্ব বাতিল সংক্রান্ত বিষয় তার পরিবারের কাছে জানিয়ে দিয়েছে বৃটিশ সরকার।
রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, শামিমা এমনিতেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার বৈধতা রাখতে পারেন। কারণ, তার মা বাংলাদেশ থেকে বৃটেনে গিয়েছেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু শামিমাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, জন্মগতভাবে শামিমা বৃটিশ নাগরিক। তিনি কখনোই দ্বৈত নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে আবেদন করেন নি। এ ছাড়া তার পিতামাতার এ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনোই বাংলাদেশ সফরে আসেন নি। ফলে তাকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ওদিকে সিরিয়ার শরণার্থী ক্যাম্প থেকে বিবিসিকে শামিমা বলেছেন, তিনি একজন বৃটিশ। তার ভাষায়- ‘আমার একটিই নাগরিকত্ব আছে। যদি তা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়, তাহলে আমার আর কিছুই থাকবে না। আমার মনে হয় না তাদের এটা করার অধিকার আছে।
এর আগে তিনি আইটিভি নিউজকে বলেছে, তার নাগরিকত্ব বাতিলের বৃটিশ সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত নয়। তবে যেহেতু তার স্বামী, আইএস যোদ্ধা একজন ডাচ নাগরিক তাই তিনি নেদারল্যান্ডে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। ধারণা করা হয়, তার ওই স্বামী বর্তমানে সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনীর হাতে বন্দি আছেন। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শামিমা বেগম বলেন, আমি হল্যান্ডে নাগরিকত্বও চাইতে পারি। স্বামীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি তাকে হল্যান্ডে ফিরে যেতে দেয়া হয় এবং জেলে রাখা হয়, তাহলে তার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো সেখানে।
শামিমার এমন কথায় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ডাচ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শামিমার নাগরিকত্বের আবেদন গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, নাগরিকত্ব পেতে হলে চাহিদার লম্বা তালিকা পূরণ করতে হয়। 
ওদিকে শামিমার পারিবারিক আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জে বলেছেন, বৃটিশ সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তিনি আইনের সব দিক বিবেচনা করবেন।
এখন থেকে চার বছর আগে স্কুলপড়ুয়া বান্ধবী খাদিজা সুলতানা ও আমিরা আবাসকে সঙ্গে নিয়ে শামিমা সিরয়ায় চলে যান আইএসে যোগ দিতে। তখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক। এখন শামিমার ভবিষ্যত বা পরিণতি কি হবে তা নিয়ে চলছে আরো বিতর্ক। এ ঘটনাটি নিয়ে ইউরোপের বহু দেশ যে উভয় সঙ্কটে রয়েছে তা সামনে চলে এসেছে। তা হলো, জিহাদে যাওয়া বা আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীলদের কি দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি করা অনুমোদন দেয়া হবে নাকি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তাদেরকে আটকে রাখা হবে।
বুধবার বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ আইন প্রণেতাদের বলেছেন, নাগরিকত্ব বাতিল একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটা হালকাভাবে ব্যবহার হতে পারে না।
শিশুকে দুর্ভোগ পোহাতে দেয়া উচিত নয়
বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ বুধবার নাগরিকত্ব বাতিল ইস্যুতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন বলে যে, বৃটেন নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে শুধু যদি দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন, যদি তার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে, অথবা সীমাবদ্ধ কিছু ক্ষেত্রে তার অন্য কোথাও নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থাকে তখনই। তিনি ইঙ্গিত দেন, এক্ষেত্রে শামিমার নবজাতককে ভিন্নভাবে দেখা হতে পারে। তিনি বলেন, শিশুদের দুর্ভোগ পোহাতে দেয়া উচিত নয়। যদি কোনো শিশুর পিতামাতা বৃটিশ নাগরিকত্ব হারান তবে তাতে ওই শিশুর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
শামিমা তার সন্তানকে বৃটেনে বড় করার অনুমতি দেয়ার জন্য বৃটিশ কর্তৃপক্ষকে সহানুভূতি দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি বৃটেনে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দিয়েছেন গত সপ্তাহে দ্য টাইমসকে দেয়া প্রথম সাক্ষাতকারে। তাতে তিনি বলেছেন, জিহাদে যোগ দেয়ার জন্য তিনি অনুতপ্ত নন। তবে বিবিসিকে দেয়া সর্বশেষ সাক্ষাতকারে তিনি অধিক পরিমাণে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আশা করি বৃটেন বুঝতে পারবে যে আমি একটি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি। কারণ, ওই সময়টাতে আমার বয়স কম ছিল। তার আইনজীবী বলেছেন, শামিমার জন্ম বৃটেনে। তার কাছে কখনো বাংলাদেশী পাসপোর্ট ছিল না। তিনি দ্বৈত নাগরিকও নন।

এক সার্জেন্টের অবিশ্বাস্য বেঁচে যাওয়া! by আসাদুজ্জামান

লাশের খোঁজে সবাই তখন ব্যস্ত। সার্জেন্ট তৈয়েবুর রহমান তপু তখন খুঁজছিলেন একটি মোটরসাইকেল। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টার ধ্বংসস্তূপে দেখা যায় তাঁকে।
শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি খুঁজে পেলেন তৈয়েবুর। বললেন, ‘ভাগ্যগুণে আমি গতকাল বেঁচে গেছি। ভয়াবহ এই আগুনের মধ্যে আমিও পড়েছিলাম। আমিও এখানে ওদের মতো মরে যেতে পারতাম।’
সার্জেন্ট তৈয়েবুরের সামনেই গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চুড়িহাট্টার গলির রাজ্জাক ভবনে আগুন লাগে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েকটি ভবনে।
অন্যদিনের মতো সার্জেন্ট তৈয়েবুর গতকাল রাতে সোয়ারীঘাটে দায়িত্ব পালন শেষে মোটরসাইকেলে করে চকবাজারের চুড়িহাট্টার গলি হয়ে বাসায় ফিরছিলেন। চুড়িহাট্টা মসজিদের সামনে আসার পর তিনি দেখেন, গলিতে ভয়াবহ যানজট। গলিতে ঠাসা মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, প্রাইভেট কার ও ঠেলাগাড়ি। রাত সাড়ে ১০টার পর হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনতে পান তৈয়েবুর।
তৈয়েবুর বলছিলেন, ‘বিস্ফোরণের পর আমি যেখানে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যাই সেই জায়গাটা রাজ্জাক ভবন থেকে ২০-২২ ফুট দূরে। আমি বাইক থেকে পড়ে গিয়ে যদি বাইক উঠতে যেতাম, তাহলেই পুড়ে মরতাম।’ নিজের বাইকটি দেখিয়ে তৈয়েবুর বললেন, ‘মোটরসাইকেলটি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। আমারও একই অবস্থা হওয়ার কথা ছিল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।’
সার্জেন্ট তৈয়েবুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তখন মসজিদের সামনে। বিকট আওয়াজের পর দেখি চারদিকে আগুন। পড়ে গেলাম। কীভাবে আমি যেন মসজিদের বাঁ পাশের চাপা গলি দিয়ে দৌড় দিলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি, চুড়িহাট্টা গলির রাস্তার সব গাড়ি পুড়ছে, ভবন পুড়ছে।’
আগুন থেকে বেঁচে যাওয়ার পরই তৈয়েবুর বাসায় ফেরেননি। রাত তিনটা পর্যন্ত চুড়িহাট্টা গলিতে দাঁড়িয়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখেছেন।
তৈয়েবুর বললেন, ‘বিকট আওয়াজের ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে চুড়িহাট্টার গলিতে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। আমি যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে ১০ হাত দূরে থাকলে দৌড়ে পার পেতাম না। সঙ্গে সঙ্গে আগুনে পুড়ে আমি ওদের মতো লাশ হয়ে পড়ে থাকতাম।’
রাজ্জাক ভবনে লাগা আগুনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ভবন। রাত সাড়ে ১০টার পর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এই ভবনে আগুনের শিখা জ্বলতে দেখা যায়। তবে রাত ৩টার পর আগুনের লেলিহান শিখা কিছুটা কমে আসে। তখন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা লাশের খোঁজ শুরু করেন। এই প্রতিবেদক দেখেন, ওয়াহেদ ভবনের সামনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে একটি পিকআপ। আর পুরো গলির রাস্তায় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে আছে অন্তত ১৫টি মোটরসাইকেল, তিনটি প্রাইভেট কার। রাস্তায় পরতে পরতে আগুনে পোড়া রিকশা, ভ্যান আর ঠেলাগাড়ি। টর্চের আলোয় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা রাস্তা থেকে পুড়ে যাওয়া লাশ খুঁজে বের করেন।
চুড়িহাট্টার গলির রাস্তায় যানজট ছিল। দুটি হোটেলে ভিড় ছিল। আগুন লাগার পর পাঁচটি ভবনে তা ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর চুড়িহাট্টার বাসিন্দাদের প্রায় সবাই রাস্তায় নেমে আসেন। দূর থেকে দেখতে থাকেন আগুনের শিখা। কিছুক্ষণ পরপর দ্রুম দ্রুম আওয়াজ আসতে থাকে। তখন স্থানীয় লোকজন বলতে থাকেন, ‘ওয়াহিদ মিয়ার ভবনের নিচে কেমিক্যালের দোকান। সেখানে আছে বডি স্প্রের বোতল। বোতল ফুটে দ্রুম দ্রুম আওয়াজ আসছে।’
মোটরসাইকেল খুঁজে পাওয়া তৈয়েবুর ঘটনাস্থল ত্যাগ করার আগে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কপালগুণে আগুনের হাত থেকে আমি বেঁচে গেলাম।’

‘কিছুই নিতে পারিনি, তার আগেই সবশেষ’

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ। কয়েকটি সরু রাস্তার মিলনস্থল। আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্সলেন। সবগুলোই গলিপথ। একপাশে ওয়াহিদ ম্যানশন। অন্যপাশে বাচ্চু মিয়ার বাড়ি। বিপরীত পাশে চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ। ওয়াহিদ ম্যানশন, বাচ্চু মিয়ার বাড়ি ও চারপাশের বাড়িগুলো পুড়ে ছাই।
আতঙ্কিত মানুষের ভিড়। নিরাপত্তা কর্মীরা চারপাশের সড়কে নির্দিষ্ট স্থানে সড়কে বেরিকেড দিয়ে রেখেছেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ভিতরে এখনো খুঁজে দেখছে কোন লাশ পড়ে রয়েছে কিনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাচ্চু মিয়ার বাড়ির নিছে ছিল দাহ্য পদার্থের দোকান। এগুলো সবই এখন ধবংস্তুপ। আসগর লেনে এখন পড়ে আছে প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেলে ও রিকশা ভ্যানের অঙার। পোড়া বাড়িগুলো মানুষহীন নিরব নিস্তব্ধ। এসব বাড়ি এবং মসজিদের নিচে ছিল বিভিন্ন ধরণের মার্কেট ও দোকান। রাস্তার উপর বিল্ডিং ভেঙে অংশবিশেষ পড়ে রয়েছে।
চুড়িহাট্টা মসজিদের ইমাম আবদুল হক বলেন, রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়বো ঠিক এমন সময় বিকট শব্দ পাই। মসজিদ থেকে বের হতেই আগুনের লেলিহান শিখা দেখি। আগুনের ধোয়ায় মুহূর্তেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর মসজিদে যারা ছিলাম দ্রুত বের হই। রাস্তা সরু হওয়ায় এখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতেও বেগ পায়। ফজরের পরও আমরা আগুন জ্বলতে দেখি।
বাচ্চু মিয়ার বাড়ির পাশের বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, বাচ্চুর বাড়ির নিচের দোকানটি ছিল দাহ্য পদার্থের। রাস্তায় যে পোড়া পিক-আপ ভ্যানটি পরে আছে ওটা বিস্ফারণ ঘটে প্রথম। এখান থেকে আগুন এসে বাচ্চুর বাড়িতে লাগে। দাহ্য পদার্থ থাকায় মুহূর্তেই পাশের বাড়িগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে।
চুড়িহাট্টা মসজিদের পাশেই মটরসাইকেল ও ব্যাগ রেখে পাশের একটি ভবনে গেয়েছিলেন টাঙাইলের মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, আমি এখান থেকে যাওয়ার ৫ মিনিটের মাথায় একটা শব্দ পাই। এসে দেখি আগুন। হাতে দলিল ও পাসপোর্টের পোড়া অংশ দেখিয়ে বলেন, আমি কিছুই নিতে পারিনি। তার আগেই সবশেষ।
বুধবার রাতে লাগা আগুনের ঘটনায় নিহত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৭০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী ব্রিফিংয়ে জানান, ৭০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো লাশ থাকতে পারে। উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাশের সংখ্যা জানা যাবে না বলছে ফায়ার সার্ভিস।

শামীমাকে নিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যে ধাক্কা খেল যুক্তরাজ্য

সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দেওয়া শামীমা বেগম বাংলাদেশেরও নাগরিক—এমন যুক্তিতে তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য। প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শামীমা বাংলাদেশের নাগরিক নন। তাঁর বাংলাদেশে ফেরার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।
বাংলাদেশের এই বক্তব্য শামীমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা না করে ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই তড়িঘড়ি করে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শামীমার নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সমালোচনা চলছে। শামীমা ও তাঁর নবজাতক শিশুর নাগরিকত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া।
গতকাল বুধবার যুক্তরাজ্যের ইংরেজি দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, শামীমাকে ভুলভাবে বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করায় বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গণমাধ্যমের খবর থেকে শামীমার নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাংলাদেশ জানতে পারে বলে তিনি জানান।
শাহরিয়ার আলম বলেন, শামীমা বাংলাদেশের নাগরিক নন। তিনি জন্মগতভাবে যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তিনি কখনো বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদনও করেননি। ফলে, বাংলাদেশে তাঁকে ফিরতে দেওয়ার প্রসঙ্গও উঠতে পারে না।
পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন একাডেমির ছাত্রী শামীমা বেগম ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরও দুই বান্ধবীসহ সিরিয়ায় পাড়ি দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৫ বছর। সেখানে আইএসে যোগ দিয়ে তিনি ডেনমার্কের বংশোদ্ভূত এক ধর্মান্তরিত ‘জিহাদি’কে বিয়ে করেন। দীর্ঘ চার বছর পর গত সপ্তাহে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় আল-হওর শরণার্থীশিবিরে শামীমার দেখা পান এক ব্রিটিশ সাংবাদিক। সাক্ষাৎকারে শামীমা যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার আকুতি জানান। বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী শামীমা গত রোববার এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এর আগে তাঁর আরও দুই সন্তান ছিল। তারা অপুষ্টি ও অসুস্থ হয়ে মারা গেছে বলে জানান শামীমা। নবজাতককে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার আকুতি জানান।
যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিভাগ (হোম অফিস) গত মঙ্গলবার শামীমার মায়ের কাছে লেখা এক চিঠিতে জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ শামীমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শামীমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে থাকলে এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি যেন তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
গতকাল বুধবার আইটিভির এক সাংবাদিক নাগরিকত্ব বাতিলের ওই চিঠির একটি অনুলিপি শরণার্থীশিবিরে অবস্থানরত শামীমার হাতে দিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চান। শামীমা বলেন, এই সিদ্ধান্তে তিনি কিছুটা হতবাক। তিনি ও তাঁর সন্তানের প্রতি এটা অন্যায় বলে মন্তব্য করেন শামীমা। তাঁর স্বামী ডেনমার্কের নাগরিক। সেই সূত্রে তিনি ডেনমার্কের নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের চেষ্টা করবেন বলেও জানান।
পরে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শামীমা বলেন, তাঁর কেবল যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব আছে। সেই নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি। এখন তাঁর আর কিছুই থাকল না। শামীমা বলেন, তিনি বাংলাদেশে কখনো যাননি। তাঁর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নেই।
নাগরিকত্ব বাতিলের চিঠিতে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শামীমার মা বাংলাদেশের নাগরিক। তাই বাংলাদেশের আইনানুযায়ী শামীমাও বাংলাদেশের নাগরিক অথবা বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
শামীমার পারিবারিক আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জি নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার সংসদে জানান, প্রায় ৯০০ ব্রিটিশ নাগরিক সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয়। এদের অন্তত ২০ শতাংশ সেখানে নিহত হয়েছে। ৪০ শতাংশ যুক্তরাজ্যে ফেরত এসেছে। আইএসে যোগ দেওয়া প্রায় ১০০ ব্যক্তির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।
শামীমার নাম উল্লেখ না করেই সাজিদ জাভিদ বলেন, মায়ের নাগরিকত্ব বাতিল হলেও সন্তানের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না।
শামীমার নাগরিকত্ব বাতিলের বৈধতা ও তাঁর যুক্তরাজ্যে ফেরার অধিকার নিয়ে দেশটিতে এক অভিনব আইনি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী নাগরিকত্ব বাতিল করে কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রহীন করা যায় না।
যুক্তরাজ্যে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং সিরিয়ায় জঙ্গিবাদে জড়ানো কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশ কেন গ্রহণ করবে, সে প্রশ্নও উঠেছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই শামীমাকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে চালিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও হচ্ছে আলোচনা। যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে এনে শামীমাকে বিচারের মুখোমুখি করানোটাই যৌক্তিক বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

শামিমার সন্তানের নাগরিকত্ব কী!

জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসে যোগ দেয়া বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শামিমা বেগমের নবজাতকের পরিচয় কি হবে তা নিয়ে এক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার শামিমার বৃটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বৃটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯৮১ সালের বৃটিশ নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করা যাবে, যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করা জনগণের জন্য শুভ হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত হন এবং নাগরিকত্ব বাতিল করলে যদি ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন। শামিমা বেগম বলেছেন, তিনি তার বোনের বৃটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে সিরিয়ায় গেছেন। কিন্তু সীমান্ত পাড় হয়ে সিরিয়ায় প্রবেশের পরই তা তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিবিসি লিখেছে, শামিমা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বলে মনে করা হয়। এ বিষয়ে তার কাছে বিবিসি জানতে চেয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছেন, তার কাছে বাংলাদেশী কোনো পাসপোর্ট ছিল না।
এমন কি তিনি কখনো বাংলাদেশ সফরে আসেনও নি। এখন প্রশ্ন উঠেছে তার নবজাতক ছেলের পরিচয় নিয়ে। বৃটিশ আইন অনুযায়ী একটি শিশু তার মা বা বাবার নাগরিকত্ব বাতিল করার আগে যদি জন্মগ্রহণ করে থাকে তাহলে ওই শিশুকে একজন বৃটিশ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ওই শিশু যদি বৃটেনের বিরুদ্ধে বড় কোনো হুমকি হয়ে ওঠে তাহলে তার নাগরিকত্ব তাত্ত্বিকভাবে বাতিল করা যেতে পারে।
এখানে উল্লেখ্য, শামিমার সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে গত শনিবার। আর শামিমার নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার মঙ্গলবার। এই হিসেবে তার ওই সন্তান বৃটিশ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, গত কয়েকদিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলে এসেছেন যে, বৃটেন ও দেশবাসীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তাই তার অগ্রাধিকার। তবে এক্ষেত্রে তার মন্ত্রণালয় বিশেষ কোন ঘটনা বা মামলার উল্লেখ করে নি। তবে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি নেয়া হয়েছে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। এটাকে হালকাভাবে নেয়া হয় নি।
ওদিকে সন্ত্রাস বিষয়ক নিরপেক্ষ সাবেক একজন পর্যবেক্ষক ও আইনজীবী লর্ড কার্লাইল বলেন, শামিমা বেগমের মা একজন বাংলাদেশী। তার নাম জাহানারা। তিনি বাংলাদেশী নাগরিক হয়ে থাকলে বাংলাদেশী আইনের অধীনে শামিমা বেগমও বাংলাদেশী। ওদিকে বৃটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছেন বৃটেনের মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক চিফ সুপারিনটেন্ডেন্ট ও শামিমা বেগমের পারিবারিক বন্ধু দল বাবু। শামিমা বেগম কখনোই বাংলাদেশে আসেন নি উল্লেখ করে দল বাবু বলেন, এমন সিদ্ধান্ত উদ্ভট। আমি জানি না কিভাবে এই বিষয়টিতে বৈধতা দেয়া হচ্ছে।
ওদিকে সরকারি একটি সূত্র বলেছেন, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিতে দেশ ছাড়ার কারণে এ পর্যন্ত শতাধিক দ্বৈত্য নাগরিকত্বের অধিকারীরা বৃটিশ নাগরিকত্ব হারিয়েছেন। গত বছর আইএস সদস্য সন্দেহে দু’জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। সিরিয়ায় তাদেরকে আটক করার পর এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। উল্লেখ্য, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস তাদের বেশির ভাগ ঘাঁটিতে পরাজিত হয়েছে। তাদের কিছু সংখ্যক এখন সিরিয়া ও ইরাক সীমান্ত এলাকায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

মর্গে আছিয়া বেগমের কান্না, ‘আমার ভাইডারে আনে দাও’

মর্গের বাইরে অসংখ্য স্বজনের আহাজারি। মর্গ চত্বরে মজিবর হাওলাদারের লাশের অপেক্ষায় তার  ছেলে। থেকে থেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মামুন।  একটু পরপর মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। চেতন ফিরলেই আহাজারি করছেন, বাবা তুমি কেন কাল কাজের পরেও বাড়ি ফিরলা না। পাশেই মজিবর হাওলাদারের আরেক ছেলে নিথর দাঁড়িয়ে। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
রাজীব মৃধা সন্তানের লাশের জন্য আহাজারি করছেন। আগুন লাগার ১০ মিনিট আগেও তার ছেলের সাথে কথা হয় মোবাইলে।
রাজীব মৃধার একই কথা, আমার ছেলে মরতে পারে না। আমার ছেলে কই?
আছিয়া বেগম হারিয়েছেন ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইকে। মোবাইলে ছবি দেখিয়ে আহাজারি করছেন। লুটিয়ে পড়ছেন আর বলছেন আমার ভাইডারে আনে দাও। আমার ভাই স্কুলে যাবে।
এমন অসংখ্য স্বজনের কান্নায় ভাড়ি ঢাকা মেডিকেলেল মর্গ চত্বর।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থরে থরে সাজানো লাশ। অধিকাংশ লাশ পুড়ে গেছে। শনাক্ত করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে স্বজনদের। মর্গের বাইরে কান্নারত অবস্থায় অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। এক একটি গাড়ি করে লাশ আসছে আর ভিড় করছেন স্বজনরা। লাশ ঘিরে চলছে স্বজনদের গগণবিদারী হাহাকার।
শাহবাগ থানার এস আই মো, জসিম উদ্দিন জানান, এখন পর্যন্ত মর্গে এসেছে ৫৮ পুরুষ, ৫ নারী ও ৪ শিশুর লাশ। এছাড়াও তিনি জানান, বার্ণ ইউনিটে আছে ১২ জন ও আর আহত ২৬ জন ঢামেকে ভর্তি রয়েছেন।
এখন পর্যন্ত ১৯ জনের লাশ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তকরণ কাজে স্বজনরা তথ্য দিতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তথ্য নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি জানান, একটি পিক আপ ভ্যানের সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয় প্রথমে। এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে টান্সমিটারে। এর পর ট্রান্সমিটার ব্লাস্ট হলে বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ির ভিতর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ থাকায় তা ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত।
চকবাজার ট্রাজেডিতে তাসলিমা আক্তার হারিয়েছেন তার ২ দুই ভাই, ভাইয়ের ২ বাচ্চা। এখনও লাশ পাননি তিনি। ভাইয়ের খোঁজে এসেছেন কাজী এনামুল হক। তিনিও লাশ শনাক্ত করতে পারেননি।
অনেক স্বজনের অভিযোগ লাশ শনাক্ত করণের পরেও লাশ হস্তান্তর করা হচ্ছে না। পুলিশ বলছে অফিসিয়াল কিছু কাজের জন্য দেরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গতরাতে পুরনো ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে এখনও পর্যন্ত ৭০ জন নিহত হয়েছে।

বার্ন ইউনিটে ভর্তি ৯ জনই ঝুঁকিতে, একজন আইসিইউতে

গতরাতে পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় চুড়িহাট্টার রাজ্জাক ভবনে লাগা আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১৮ জন। এদের মধ্যে ৯ জন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি ৯ জন চিকিৎসাধীন আছেন। তাঁদের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। গতকাল বুধবার রাত ১১টা থেকেই এখানে দগ্ধ মানুষ আসতে থাকেন।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প¬াস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী অধ্যাপক সামন্তলাল সেন সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসাধীন ৯ জনের কেউই ঝুঁকিমুক্ত নন। এদের মধ্যে চারজন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়েছে। খুব দ্রুত আরও দুজনকে আইসিইউতে নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডি থেকে আমরা কেউই আসলে শিক্ষা নেয়নি।
বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ নানাভাবে অগ্নি দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। যা পৃথিবীর কোন দেশেই হয় না।
আহত যারা বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন তারা হলেন, আনোয়ার (৫৫), মাহমুদুল (৫২), সেলিম (৪৪), হেলাল (১৮), রেজাউল (২১), জাকির (৩৫), মোজাফ্ফর (৩২), সোহাগ (২৫), সালাউদ্দীন (৪৫)।
সোহাগের শরীরের ৬০ শতাংশ ও রেজাউলের শরীরের ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। ৯ জনের মধ্যে আনোয়ার, রেজাউল, জাকির ও সোহাগের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।

আইএস গার্ল শামিমাকে নিয়ে ঢাকায় চিঠি চালাচালি

আইএস গার্ল শামিমাকে নিয়ে ঢাকায়ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে তাকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তাকে গ্রহণ করার পক্ষে কেউই নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিদেশ মন্ত্রণালয়। ওদিকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসে যোগদানের জন্য কোনো অনুশোচনা না দেখানোয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক শামিমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বৃটেন।
ইতিমধ্যেই দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে শামিমার পরিবারকে বিষয়টি জানিয়েছে। ‘আইসিস ব্রাইড’ খ্যাত শামিমা বৃটিশ নাগরিক হলেও তার পিতা-মাতা দুজনই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক। তার বাবার পৈত্রিক নিবাস সুনামগঞ্জ জেলায়। সে অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবেন কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শামিমা ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বৃটেন শামিমার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে বাংলাদেশের ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেবে কি না সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শামিমাকে কোন অবস্থাতেই গ্রহণ করবে না বাংলাদেশ। তিনি বাংলাদেশের কেউ নন। কোনকালেই বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না, এখনও নেই।
শামিমার পরিবারকে দেয়া বৃটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, আপনাদের মেয়ে শামিমা বেগমের বৃটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যদি শামিমার সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ থাকে, বা শিগগিরই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত তাকে জানাবেন। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শামিমা স্পেশাল ইমিগ্রেশন আপিল কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাবেন। ইতিমধ্যেই বৃটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত শামিমা জানতে পেরেছেন। তিনি বিষয়টিকে হৃদয়-বিদারক আখ্যা দিয়েছেন। শামিমা বলেন, আমি ততটা বিস্মিত না, তবে কিছুটা শোকাহত। এটা হতাশাজনক খবর। আমি মনে করি, এটা আমার ও আমার সন্তানের প্রতি অবিচার। শামিমার আইনজীবী জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে তার পরিবার হতাশ। তারা এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছেন। তবে বাংলাদেশে ফেরত আসার সম্ভাবনা আগেই নাকচ করে দিয়েছেন শামিমা। জানিয়েছেন, তিনি কখনো বাংলাদেশে আসেননি। তার কাছ বাংলাদেশের পাসপোর্টও নেই।
প্রসঙ্গত, ১৯ বছর বয়সী শামিমা ৪ বছর আগে ২০১৫ সালে বৃটেন থেকে পালিয়ে যান। তিনি বসবাস করতেন পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকায়। সেখান থেকে সিরিয়া গিয়ে তিনি বিয়ে করেন আইএস যোদ্ধাকে। বর্তমানে তিনি আছেন সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকে গত সপ্তাহে বৃটেন ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। এ নিয়ে বৃটেনজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। বৃটেনে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করার সময় তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন। কয়েকদিন আগে ছেলে সন্তান প্রসব করেন তিনি। এমন অবস্থায় মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অনেকে তাকে বৃটেনে ফেরার সুযোগ দেয়ার কথা বলছেন। কিন্তু শামিমা আইএসে যোগদানের কারণে কোন অনুশোচনা প্রকাশ না করায় কট্টরপন্থিরা তার জন্য বৃটেনের দ্বার বন্ধ করার আহবান জানান।
এমন দ্বিধা-বিভক্ত পরিস্থিতিতেই তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার ঘোষণা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। যদিও লেবার রাজনীতিবিদরা শামিমার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেছেন। নাগরিকত্ব হারানোর প্রতিক্রিয়ায় শামিমা বলেন, এটা হৃদয়বিদারক সংবাদ। আমি শুনেছি, অন্যদেরকে বৃটেনে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। তাই বুঝতে পারছি না, কেন আমার বিষয়টি অন্যদের থেকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। শামিমা পরিবারের নিযুক্ত করা আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি ছিল। কেননা শত শত বৃটিশ নাগরিককে সরকার ফিরিয়ে নিয়েছে। এদের মধ্যে সন্দেহভাজন আইএস যোদ্ধাও রয়েছে। অথচ এই তরুণী আইএস যোদ্ধা ছিল না। সে বলেছে, একজন আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করে সে গৃহবধূর জীবন যাপন করতো। আকুঞ্জি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ শামিমার বৃটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে সচেষ্ট হওয়ায় আমি হতাশ। 
বৃটিশ নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের পর শামিমা এখন আরেকটি বিকল্পের কথা ভাবছেন। তার বর্তমান স্বামী নেদারল্যান্ডের নাগরিক। সেখানে তার পরিবারও রয়েছে। শামিমা এখন নেদারল্যান্ডের নাগরিকত্ব চাওয়ার কথা ভাবছেন। দেশে ফিরলে তার স্বামীকে জেলে পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে।  কিন্তু শামিমা তারও পরোয়া করেন না। তিনি জানান, যতদিন জেলে থাকবেন, শামিমা তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবেন।
এদিকে, বৃটিশ নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের ফলে শামিমাকে বাংলাদেশে আশ্রয় চাইতে বলা হবে কি না সে বিষয়ে বৃটেনের মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী শোয়েব খান মনে করেন, আইসিস ব্রাইড শামিমা বেগম বৃটেনের সমস্যা। এটা বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নয়। শামিমা বড় হয়েছেন বৃটেনে। তিনি উগ্রবাদী হয়েছেন বৃটেনে। তাই তার বিষয়টি বৃটিশ আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই আইনজীবী। শামিমার নাগরিকত্ব নিয়ে বৃটেনের অনলাইন মেট্রোতে একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন সাংবাদিক জো রবার্টস। যার শিরোনাম ‘আইসিস ব্রাইড শামিমা বেগম ইজ এ প্রবলেম ফর বৃটেন, নট বাংলাদেশ’।
এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, বৃটিশ সরকার মনে করছে শামিমার দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে। তার পিতামাতা বাংলাদেশি হওয়ায় তিনিও বাংলাদেশি নাগরিক। তাই তার নাগরিকত্ব বাতিল করে বৃটিশ সরকার তাকে বাংলাদেশে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে বলতে পারে। সাংবাদিক জো রবার্টস আরো লিখেছেন, ধারণা করা হচ্ছে বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন এজন্য যে, শামিমার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। কারণ, তার পিতামাতা বাংলাদেশি। অর্থাৎ শামিমা একই সঙ্গে বৃটিশ এবং বাংলাদেশি নাগরিক। আন্তর্জাতিক আইন কোনো মানুষকে যেহেতু রাষ্ট্রহীন করতে অনুমোদন দেয় না, তাই সাজিদ জাভিদ হয়তো শামিমাকে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যুক্তি দেখাতে পারেন। কিন্তু শামিমা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি কখনো বাংলাদেশে আসেননি। তার কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নেই। তিনি সিরিয়া গিয়েছেন তার বোনের পাসপোর্ট ব্যবহার করে। সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ায় পৌঁছার পর তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয়া হয়েছে।
মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী শোয়েব খান বলেন, যদিও শামিমার নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি আইনগত, তবু এটা হওয়া উচিত নয়। তিনি অনলাইন মেট্রোকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শামিমাকে উগ্রপন্থি করা হয়েছে বৃটেনে। তাই এর দায়ভার অবশ্যই বৃটেনকে নিতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে নির্বাসনের মতো মধ্যযুগীয় শাস্তি গ্রাহ্য হওয়া উচিত নয়। শামিমা যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন তাহলে বৃটিশ আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কিন্তু তাকে যদি বাংলাদেশে পাঠানো হয় তাহলে এর কোনোটাই সম্ভব হবে না। আর এতে বৃটেন আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
আইনজীবী শোয়েব খান আরো বলেন, শামিমা বেগমের নবজাতক শিশু বৃটিশ নাগরিক। তাই ওই শিশুটির স্বার্থের বিষয়টি আইনগতভাবে মানতে বাধ্য বৃটেন এবং তার যাতে ভালো হয়, সেজন্য সবকিছু আয়োজন করা উচিত। তিনি আরো বলেন, শামিমার ওই নবজাতককে বৃটেনে প্রবেশে সরকার যেকোনো রকম বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে তা অবশ্যই হবে বেআইনি। তাতে, তাকে জন্ম দেয়ার আগে তার মায়ের অবস্থান বা কর্মকাণ্ড যা-ই হোক না কেন। অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে এবং তাদেরকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে সন্ত্রাস মোকাবিলা করা যায়, তাদেরকে দেশের বাইরে রেখে এটা করা যায় না।
ওদিকে, বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে বলেছেন, বৃটিশ নন এমন মানুষদেরকে বৃটেনে নিষিদ্ধ করার মতো এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন বিপজ্জনক নাগরিকদের নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা আমার আছে। এভাবে শতাধিক মানুষের নাগরিকত্ব এরই মধ্যে কেড়ে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ কোনো ঘটনা নিয়ে এ আলোচনা করেননি। তিনি আরো বলেন, আমরা কাউকে রাষ্ট্রহীন করি না।

বিদেশি মিডিয়ায় চকবাজারের আগুন: আগেই সতর্কতা দেয়া হয়েছিল

উচ্চমাত্রায় প্রাণহানীকর এমন সতর্কতা দেয়া সত্ত্বেও বেশিরভাগ ভবন ব্যবহার করা হয় একই সঙ্গে আবাসিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। ২০১০ সালে এক অগ্নিকান্ডে কমপক্ষে ১২৩ জন নিহত হওয়ার পর এমন সতর্কতা দেয়া হয়েছিল। এসব ভবনকে বিধিবিধানের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে ফেলার। চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর বার্তা সংস্থা এপি একথা লিখেছে। বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে এ খবর। এর মধ্যে এপির রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন। এতে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ওই আগুন মুুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৯ জন। আহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন।
অগ্নিনির্বাপকরা ৯ ঘন্টারও বেশি সময় কঠোর চেষ্টা চালিয়ে বেশিরভাগ আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। অগ্নি নির্বাপণ বিষয়ক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ বলেছেন, বুধবার রাতে একটি ভবনে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত। দ্রুত তা অন্য ভবনগুলোতে চড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কন্ট্রোল রুমের একজন কর্মকর্তা মাহফুজ রিবেন বলেছেন, ঘটনার সময় বহু মানুষ ভবনগুলোতে আটকে পড়েছিলেন। নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯। তিনি বলেছেন, আমাদের টিম সেখানে কাজ করছে। কিন্তু উদ্ধার করা মৃতদেহগুলো চেনার কোনো উপায় নেই। আমাদের সদস্যরা লাশ বহনের ব্যাগে করে সেগুলো হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাচ্ছেন। অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি।
ওদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ড. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, নিহতের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। কারণ, আহত অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি বলেছেন, এমন আহত ৯ জনকে তার ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া ভবনগুলোর বেশ কিছু ফ্লোরে রাখা ছিল রাসায়নিক পদার্থ ও প্লাস্টিকের গুদাম। প্রত্যক্ষদর্শীরা স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বলেছেন, ওই ভবনগুলোতে বহু গ্যাস সিলিন্ডারের গুদাম ছিল। এগুলো একটির পর একটি বিস্ফোরিত হতে থাকে। এ ছাড়া ট্রাফিক জ্যামে আটকে যাওয়া অনেক গাড়ির জ্বালানির ট্যাংকেও আগুন ধরে বিস্ফোরিত হতে থাকে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে চ্যানেল নিউজ এশিয়া। এর শিরোনাম ‘ফায়ার কিলস ৬৯ ইন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল: অফিসিয়াল’।  এতেও প্রায় একই রকম তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয় ফায়ার সার্ভিসের প্রধান আলী আহমেদ বলেছেন, পুরনো ঢাকার চকবাজারে এতটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেইে এই অগ্নিকান্ডের সূচনা হয়ে থাকতে পারে। পরে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ভবনগুলোতে উচ্চ মাত্রায় দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ মজুদ করা ছিল। আগুন দ্রুত চারটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভবনে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম ছিল। এ সময় ওই এলাকায় ছিল মারাত্মক ট্র্যাফিক জ্যাম। ফলে মানুষজন সরে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। ওই এলাকার রাস্তাগুলোও খুব সরু। পাশেই একটি কমিউনিটি সেন্টারে চলছিল একটি বিয়ের অনুষ্ঠান।
এতে ওই অনুষ্ঠানের অনেকেই আহত হয়েছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার ইব্রাহিম খান বলেছেন, আগুনে কমপক্ষে দুটি গাড়ি ও ১০টি রিকশা পুড়ে গেছে। ভিকটিমদের মধ্যে রয়েছেন পথচারীও। কেউ কেউ তখন রেস্তোরাঁয় খাবার খাচ্ছিলেন।
অনলাইন বিবিসি বলেছে, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন মুহুর্তের মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকাকে গ্রাস করেছে। বুধবারের ওই আগুনে কমপক্ষে ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। একই রকম কথা লিখেছে বার্তা সংস্থা কিয়োদো নিউজ।

চকবাজার ট্রাজেডি- এ পর্যন্ত ৭৮ লাশ উদ্ধার

পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭৮ জনের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। রাত তিনটায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সকালে ভবনগুলো থেকে ধোয়া উড়ছিল। আগুন পুরো নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে নিহতদের লাশ বের করে আনছেন। সকাল আটটা পর্যন্ত ৬৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। আগুনে মৃতদেহগুলো ঝলসে গেছে। গত রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুনের সূত্রপাত। আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি ভবনের কমিউনিটি সেন্টারে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল।
পাশের ভবনগুলোতে আবাসিক বাসিন্দাও ছিলেন। চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত রোডের শেষ মাথায় মসজিদের পাশে ৬৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওয়াহিদ ম্যানসনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এলাকাবাসী বলছে, ওই ভবনের কারখানা থেকে আগুন ছড়িয়েছে। কারও কারও মতে, বিকট শব্দে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়ায়। ওয়াহিদ ম্যানসনের নিচতলায় প্লাস্টিকের গোডাউন ছিল। ওপরে ছিল পারফিউমের গুদাম। আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাত ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে জানানো হয়। সাড়ে ৩টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, এখানে আসার রাস্তাটির দু’পাশই সরু। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে ঢুকতে পারেনি। তবে শেষ পর্যন্ত কয়েকঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছি। ভবনে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মোট পাঁচটি ভবনে আগুন লেগে যায়। এদিকে সকালে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে আগুনে পোড়া ভবনে পানি দেয়া হচ্ছে। এদিকে ঘটনায় আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাতেই ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ চার জনের অবস্থা গুরুতর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশ রাখা হয়েছে। সেখানে ভিড় করছেন উদ্বিঘ্ন স্বজনরা। তাদের কান্নায় ঢামেক মর্গের আশপাশে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

ভারতের নাগরিকত্ব বিল কেন? -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশ্ন

ভারতে নাগরিকত্ব বিষয়ক সংশোধিত বিলের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ভারতে নাগরিকত্ব বিল কি নির্বাচনী তৎপরতা? এ বিলের অভিপ্রায় কি সে সম্পর্কে তিনি বুঝতে পারেন না বলে জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে গালফ নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এ কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বিনসাল আবদুল কাদের ও সমিহা জামান। এরই মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষ এই বিলটি পাস করেছে। তবে উচ্চকক্ষে গিয়ে তা বাতিল হয়ে গেছে। এ নিয়ে জানতে চাওয়া হয় শেখ হাসিনার কাছে। তিনি উত্তরে বলেন, কেন এই বিল, আমি বুঝতে পারি না।
মুখে হাসি নিয়ে তিনি বলেন, এটা কি রাজনৈতিক উদ্দেশে?
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশকে দায়ী করে এই বিল আনা হয়েছে বলে তিনি কখনো মনে করেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে বলেন, আমি তেমনটা মনে করি না। বাংলাদেশে এমন কোনো ঘটনা (ধর্মীয় নির্যাতন) নেই। কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে আমরা সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছি।
সাক্ষাৎকারটি প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটা শুধু বাংলাদেশেই আছে এমন নয়।
তিনি বলেন, তিনি জানেন এই বিলটি (নাগরিকত্ব বিল) নিয়ে ভারতের মানুষজনও খুশি নন। ‘আমি মনে করি তাদের (ভারতের) এমন কিছু করা উচিত হবে না, যা উত্তেজনা সৃষ্টি করে’। তিনি বলেন, আসাম ও ভারতের অন্যান্য স্থানে (বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো) বোমা হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী, যারা বাংলাদেশে বসে অপারেশন চালাতো, তাদের বিরুদ্ধে তার সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তারপর থেকে এমন বোমা হামলার ঘটনা আর ঘটে না। শেখ হাসিনা বলেন, একটি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এসব বিষয় তাদের (ভারতের) বিবেচনা করা উচিত।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল জনসংখ্যা ও দারিদ্র্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। তার ভাষায়, আমি প্রতিবেশী দেশগুলোকে বলেছি যে, আমাদের একটি অভিন্ন শত্রু আছে। তা হলো দারিদ্র্য। তার বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে লড়াই করতে হবে।
বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী ও অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের উদ্বেগের বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে তিনি বলেছেন, ২০১৬ সাল থেকে কোনো বুদ্ধিজীবী হত্যা হননি। তার ভাষায় ‘আমার দেশে ব্লগার ও অনলাইন অধিকারকর্মীদের হত্যাকাণ্ড দৃশ্যত একটি নতুন প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। জনগণ ও সরকার দ্ব্যার্থহীনকণ্ঠে এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব বিষয় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে তাতে নজরদারি করতে সৃষ্টি করা হয়েছে স্পেশাল টাস্কফোর্স। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা আইনগত ব্যবস্থা নেয়। যেসব মানুষকে হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে যোগাযোগ রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে পুলিশ স্টেশনগুলোকে। তিনি বলেন, ২০১৬ সাল থেকে কোনো ব্লগার অথবা অনলাইনের অধিকারকর্মী নিহত হননি। এটা তার সরকারের কার্যকারিতার প্রকাশ।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে অথবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেবো না কাউকে। কারণ, এতে আমার নিজের দেশের শান্তি বিনষ্ট হয়। আমাদের পরিষ্কার ঘোষণা হলো, যেকোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের শূন্য সহনশীলতা। যদি শান্তি বজায় থাকে তাহলে আপনি অতি দ্রুত উন্নতি করতে পারবেন।

নতুন বাজারে বাড়ছে পোশাক রপ্তানি

বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। বাজারগুলোতে গত ছয় মাসে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ২৮৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের পোশাক। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২১২ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশেরও  বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোই মূলত বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার হিসেবে পরিচিত। নতুন বাজারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিলি, চীন, ভারত, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্কসহ ২৫টি দেশ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, তৈরি পোশাকের প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেক উদ্যোগ চলমান।
অপ্রচলিত বা নতুন শ্রেণির রপ্তানি উৎসাহিত করতে ৪ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। নতুন এই দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে প্রায় প্রতি মাসেই যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি মিশন। এর সুফল হিসেবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানিতে ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ইপিবি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন বাজারের দেশগুলোতে গত ছয় মাসে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ২৮৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের গার্মেন্টস পণ্য। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২১২ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, যা ছিল মোট রপ্তানিকৃত গার্মেন্টসের ১৪.৩৯ শতাংশ।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গেল ছয় মাসে নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩৬.২১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল মাত্র ২.১৫ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরের (২০১৬-১৭) একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৮ শতাংশ।
নতুন বাজারের মধ্যে গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে জাপানে। দেশটিতে আলোচ্য সময়ে ৫৪ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। রপ্তানিকারকরা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটিতে চলতি বছর নাগাদ গার্মেন্টস রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি ৩৬ কোটি ডলার এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। আগের একই সময়ের তুলনায় বেশি হয়েছে ১৮ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৭ কোটি ডলারের আয় এসেছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিবেশী দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে রেকর্ড ১৪৩ শতাংশ। নতুন বাজার শ্রেণির আলোচিত বাজার চীনে রপ্তানি হয়েছে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বৃদ্ধি প্রায় ৬১ শতাংশ।
অন্যদিকে এ সময়ে নতুন বাজারের মধ্যে রপ্তানি কমে যাওয়া একমাত্র দেশ হলো তুরস্ক। দেশটিতে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ডলারে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় মাসে অস্ট্রেলিয়ায় গার্মেন্টস রপ্তানি বেড়েছে ১৮.৪৬ শতাংশ, ব্রাজিলে ১৫ শতাংশ, চিলিতে ৫৬ শতাংশ, চীনে ৬১ শতাংশ, কোরিয়ায় ৫৬ শতাংশ, মেক্সিকো ৩৯ শতাংশ, রাশিয়ায় ২১, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫৬ ও অন্যান্য দেশ মিলিয়ে ১৯ শতাংশ রপ্তানি বেড়েছে। উদ্যোক্তারা বলেছেন, বড় বিনিয়োগে কারখানার অবকাঠামো ও নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্কারের সুফল এখন সব বাজার থেকেই আসতে শুরু করেছে। জাপানের মতো বাজার থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া নতুন বাজারের মধ্যে ব্রাজিল, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক বাদে অন্য দেশগুলোতে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।
বিজিএমইএ সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির বলেন, গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পোশাক খাতের সংস্কারের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা গেছে। এ ছাড়া চীনের উৎপাদন মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তারা ক্রেতাদের সঙ্গে দরে মেলাতে পারছে না। ফলে তাদের ছেড়ে দেয়া ক্রেতাদের (নতুন বাজারের) কিছু অংশ বাংলাদেশে আসছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আলোচ্য সময়ে ২৮ জাতির জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে ১৯ শতাংশ। কানাডায় বেড়েছে ২০ শতাংশ। এই তিন বাজারকে প্রচলিত বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত-অপ্রচলিত সব বাজারে তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির পরিমাণ এক হাজার ৭০৮ কোটি ডলার।

মাদক রুট, তদন্তে ঢাকায় আসছেন শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দারা by শুভ্র দেব

শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান জব্দ ও তিন বাংলাদেশি নাগরিক আটকের পর ঢাকায় আসার প্রস্তাব দিয়েছে ওই দেশের গোয়েন্দারা। শ্রীলঙ্কান পুলিশ নারকোটিকস ব্যুরো ও স্পেশাল টাস্কফোর্সের একটি প্রতিনিধিদল ওই ঘটনার তদন্ত ও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈঠক করবেন। ইতিমধ্যে সার্ক ড্রাগ অফেন্স মনিটরিং ডেস্কের (এসডিওএমডি) বাংলাদেশের প্রধান ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) ড. এ এফ এম মাসুম রব্বানীর কাছে শ্রীলঙ্কা থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তাদের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলে শিগগিরই তাদের ঢাকা আসার আমন্ত্রণ জানানো হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার মানবজমিনকে বলেন, শ্রীলঙ্কান পুলিশের মাদক নিয়ে কাজ করেন এমন কর্মকর্তারা ঢাকায় আসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে তারা কোন দিন আসবেন সে বিষয়ে কিছু বলেন নি।  আমাদের পক্ষ থেকে যে তারিখ দেয়া হবে সেই তারিখেই তারা আসবেন। তিনি বলেন, ধারণা করছি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা বৈঠক করবেন।
এ ছাড়া তাদের দেশে বিপুল পরিমাণ হেরোইন আটকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত করবেন। কারণ ওই ঘটনায় ঢাকায় তিন নারীসহ আরো দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিনিধিদল হয়তো তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।
গত বছরের ৩১শে ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার মাউন্ট লাভিয়ানার টেম্পলার্স রোডের আবাসিক এলাকার এক বাসায় অভিযান চালিয়ে ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন উদ্ধার করে শ্রীলঙ্কার নারকোটিক ব্যুরো ও স্পেশাল টাস্কফোর্স। যার বাজার মূল্য তিনশ’ কোটি টাকার উপরে। এটি ছিল শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের মাদকের চালান আটক। মাদক উদ্ধার করা ছাড়াও ওই বাড়ি থেকে মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন ও দেওয়ান রফিউল ইসলাম নামের দুই বাংলাদেশিকেও তারা গ্রেপ্তার করেছিলেন।
তার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে একই এলাকা থেকে ৩২ কেজি হেরোইনসহ সূর্যমণি নামের আরেক বাংলাদেশি নারীকে গ্রেপ্তার করে শ্রীলঙ্কা পুলিশ। ১৫ দিনের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ মাদকসহ তিন বাংলাদেশি আটকের পর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার তদন্তের জন্য শ্রীলঙ্কার পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের সহায়তা চাওয়া হয়। এরপর থেকে বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে। আটক ওই তিন বাংলাদেশি কোনো আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত কিনা বিষয়টি উদ্‌ঘাটনের আলোচনা সামনে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ই জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহিদুল হকের সভাপতিত্বে শ্রীলঙ্কায় মাদকসহ আটক বাংলাদেশিদের নিয়ে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ঘটনার তদন্তের জন্য একটি প্রতিনিধিদল শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতিনিধিদলে গোয়েন্দা বাহিনীতে মাদক দমন ও আন্তর্জাতিক মাদক চক্রকে মনিটরিং করেন এমন সদস্যদের রাখার কথা বলা হয়।
এর কিছুদিন পরে ছয় সদস্যের একটি টিম বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কায় যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) ও পুলিশের ডিআইজি ড. এ এফ এম মাসুম রব্বানীর নেতৃত্বে অন্যরা হলেন- গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক জিয়াউল হাসান, সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মেজর মনিরুল ইসলাম ও ইমিগ্রেশনের পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান। টানা চারদিনের তদন্ত শেষে তারা ঢাকায় ফিরেন।
শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ওই প্রতিনিধিদলের কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, শ্রীলঙ্কান জেলে বন্দি বাংলাদেশি ওই তিনজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের কাছ থেকে অনেক তথ্যও পাওয়া গেছে। তারা মূলত বাহক হিসেবে কাজ করতো। বাংলাদেশ থেকে এসব মাদক পাচার করা হতো না। তারা বলেছে, আফগানিস্তান থেকে করাচি বন্দর হয়ে চালান যেত কলম্বো। আটক বাংলাদেশিরা শুধু বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে চালান পৌঁছে দেয়ার কাজ করতো। তিনি বলেন, তদন্তে বড় ধরনের একটি চক্রের তথ্য মিলেছে। আমরা তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি। এর আগে দেশে আটক চয়েজ রহমানের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি। এখন পর্যন্ত যারা আটক হয়েছেন তাদের সঙ্গে চয়েজ রহমানের একটা যোগাযোগ ছিল। তারা প্রত্যেকেই পোশাক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আটক চয়েজ রহমানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের যোগাযোগ রয়েছে। পোশাক ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। মাদকের পাচারের রুট নিয়ন্ত্রণ করে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব সিন্ডিকেট। শ্রীলঙ্কার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যে তিন বাংলাদেশি, চায়নায় ২ জন ও ঢাকায় র‌্যাবের হাতে আটক আরো ৫ জনই চয়েজ রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় ২৭২ কেজি হেরোইনসহ দুই বাংলাদেশি আটকের খবর পেয়ে সে দেশ থেকে পালিয়ে যান আরো দুই বাংলাদেশি। তারা হলেন- মো. আরিফ উদ্দিন ও শেখ আহমেদ সুমন। এই দুজনও চয়েজ রহমানের সঙ্গে কাজ করতেন। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তারা একই সঙ্গে তৈরি পোশাক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ব্যবসায়ীক দ্বন্দ্বের জন্য তারা আলাদা হয়ে যান। গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন আরিফ ও সুমনই এই নেটওয়ার্কের মূল হোতা। তাদের সঙ্গে একাধিক তরুণী জড়িত আছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরো কিছু নারীর নাম উঠে এসেছে। তাদেরকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা করা হচ্ছে।

নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্রও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র নিয়ে কোনো জাতি বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদায় দাঁড়াতে পারে না। নির্বাচন ব্যতীত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্রও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। মাহবুব তালুকদার বলেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছে।
এতে এই নির্বাচন জৌলুস হারাতে বসেছে। কিন্তু, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, নির্বাচনকে অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। আগামী উপজেলা নির্বাচন সার্বিকভাবে অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না, এই সত্যকে মেনে নিয়েই নির্বাচন করতে হবে।
ধারণা করা যায়, চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রায় প্রত্যেকেই নির্বাচিত হবেন এবং ওই পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না, এটাই বাস্তবতা। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য শব্দ দুটির ঔজ্জ্বল্য থাকে না। তারপরও আনুষ্ঠানিকতার কারণেই নির্বাচন করে যেতে হয়। আমি মনে করি, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নির্বাচনের মৌলিক কাঠামো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনের মৌলিক কাঠামো বলতে সংবিধান ও আচরণবিধিমালায় বর্ণিত সংশ্লিষ্ট সকলের দায়-দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পরিপালনের নির্দেশ মান্য করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছি।
মাহবুব তালুকদার বলেন, কর্মশালায় এসে আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে, আমরা নির্বাচন কেন করি? এর উত্তর অত্যন্ত সহজ- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। গণতন্ত্র কি? এ প্রশ্নের উত্তরও কঠিন নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের বেছে নেয়া এবং তাদের দিয়ে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে দেশ পরিচালনা। জাতীয় পর্যায়ের মতো স্থানীয় পর্যায়েও গণতন্ত্র একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু, বিশেষ কোনো আদেশ-নির্দেশে যদি সেই অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েন। এই অবস্থা কখনই কাম্য নয়। কিন্তু বর্তমানে উপজেলা পরিষদ যেভাবে দায়িত্ব পালন করার কথা তা সম্ভব হচ্ছে না। আমি আগেও বলেছি, উপজেলা পরিষদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী না হলে এর নির্বাচনও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই তো নির্বাচন। নির্বাচন কখনো গণতন্ত্রহীনতাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না।
তিনি বলেন, গতকাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনায় আমি বলেছি যে, আইন ও শৃঙ্খলা এই দুটি শব্দের মধ্যেই নির্বাচনের মূল দর্শনটি নিহিত রয়েছে। নির্বাচন অবশ্যই আইনানুগ হতে হবে। আইনানুগ হওয়ার অর্থ সবার প্রতি সম আচরণ ও সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। এছাড়া আইনের অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। অন্যদিকে শৃঙ্খলার অর্থ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে সম্পন্ন করা। আইন ও শৃঙ্খলা কথাগুলোর সঙ্গে নির্বাচনে আচরণবিধি পরিপালনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে কঠোরভাবে আচরণবিধি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনকে সার্বিকভাবে সাফল্যমণ্ডিত করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে আমরা যাদের বুঝি, কেবল তারা নয়, আপনাদের হাতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূল কর্তৃত্ব বর্তায়।
মাহবুব তুলুকদার বলেন, আমি এতক্ষণ যা কিছু বলেছি, তা কিছুটা তাত্ত্বিক।
এবার নির্বাচনের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কথা বলতে চাই। তবে এই ব্যবহারিক বিষয়ের কথা অনেকটা চর্বিত-চর্বণ মনে হতে পারে। এ ধরনের কর্মশালায় আমরা সাধারণত যে কথাগুলো বলে থাকি, তা হলো- নির্বাচন আইনানুগ হতে হবে, ভোটারগণ যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে, রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের দায়িত্বপালনে কোনো শিথিলতা সহ্য করা হবে না, আমরা প্রশ্নবিদ্ধ কোনো নির্বাচন করতে চাই না, নির্বাচনে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে- মোটামুটি এসব কথাই ঘুরে ফিরে আমরা বলে থাকি। যেহেতু আপনারা প্রায় প্রত্যেকেই ইতিপূর্বে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছেন, সেহেতু এসব বক্তব্যের সঙ্গে আপনারা পূর্ব পরিচিত। তবু কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে হয়। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়তাম, সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়। বারবার পড়ে কথাটি মুখস্থ করেছি। কেন মুখস্থ করেছি জানি না।
কিন্তু, বারবার পাঠ করেও তা মনঃস্থ হয়নি। আপনারাও হয়ত আমাদের নির্দেশাবলী মুখস্থ করে ফেলেছেন। কিন্তু, কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে, বিষয়সমূহ আপনাদের মনঃস্থ করার জন্য। আপনারা আমাদের বক্তব্য মনঃস্থ করলে বা হৃদয়ঙ্গম করলে কথাগুলো আর চর্বিত-চর্বণ মনে হবে না।
মাহবুব তালুকদার বলেন, এবারে ভোটারদের কথায় আসি। আমার মনে হয়, নির্বাচনে যারা ভোটার, বিশেষত উপজেলা নির্বাচনে যারা ভোটার, তাদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না হলে এবং কার্যত ভোটারদের নিরাপত্তা বিধান করা না গেলে তারা ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত হন না। নির্বাচনে ভোটারদের প্রাধান্য ও ভোটদানের স্বাভাবিকতার ওপরই নির্বাচনের সাফল্য নির্ভরশীল। উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থীরা যাতে ভোটারদের নিরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করে তাদের পদে আসীন হন, সেটাই প্রত্যাশা। কেউ অবাঞ্ছিত উপায়ে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করলে তিনি নিশ্চয়ই যোগ্য নন বা যোগ্যতা হারিয়েছেন। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সকলের কাছে একটাই চাওয়া- আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে ভোটারদের আকাঙ্ক্ষাই যেন প্রতিফলিত হয়।
তিনি বলেন, আর কয়েকদিন পর আমাদের স্বাধীনতার মাস শুরু হবে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। নির্বাচন ব্যতীত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্রও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্র নিয়ে কোনো জাতি বিশ্বসভায় আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের দামে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে আমরা গণতন্ত্র সমুন্নত রেখে পথ চলতে চাই। এজন্যই নির্বাচনকে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক বলে আমি মনে করি। সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের দেশ প্রেমের অভিব্যক্তি। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আগামী দুই দিনের এই কর্মশালায় আপনাদের আলোচ্য সূচির অনেক বিষয় আপনারা জানেন, আবার অনেক বিষয় আপনারা জানেন না। কর্মশালার মধ্য দিয়ে প্রতিটি বিষয়ে সামগ্রিক জ্ঞান অর্জন আপনাদের দুদিক থেকে সমৃদ্ধ করবে। প্রথমত, আপনাদের অধীত বিদ্যা এই কর্মশালায় শানিত হবে এবং অন্যদিকে নির্বাচনের আচরণবিধি ও বিধি-বিধান সম্পর্কে আপনাদের আহরিত জ্ঞান দায়িত্বপালনের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আত্ম বিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেবে। আত্ম বিশ্বাস না থাকলে কোনো কর্তব্য পালনই সুসম্পন্ন হতে পারে না।
জাতীয় নির্বাচনের পরে দেশব্যাপী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের গুরুত্ব কম নয়। বিভিন্ন কারণে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। এমতাবস্থায়, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে অন্তত আমরা যদি সমুন্নত রাখতে পারি, তাহলে দেশের মানুষের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে পারে। এই কাজে আপনাদের অবদান অনস্বীকার্য। আমি পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে আপনাদের সাফল্য কামনা করি।

মুখোমুখি মোদি-ইমরান

পালওয়ামা  হামলা  নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে কড়া জবাবের হুমকি দেন। প্রতিক্রিয়ায় গতকাল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, ভারত হামলা করলে পাকিস্তান পাল্টা প্রতিশোধ নেবে। প্রতিবেশী দু’দেশের এমন পাল্টাপাল্টি   হুমকিতে কাশ্মীর সীমান্তে আরেকটি যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। এরই মধ্যে পাকিস্তান সফর করেছেন সৌদি আরবের ক্ষমতাশালী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। একদিন বিরতি দিয়ে গতকাল রাতে ভারতে পৌঁছানোর কথা ছিল তার। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিন সালমান নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় পরস্পরের প্রতিবেশী দুই দেশে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সফর কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আধা-সামরিক বাহিনী সিআরপিএফ’র গাড়িবহরে হামলার পর এই ইস্যুতে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভারত যদি হামলা চালায় তাহলে প্রতিশোধ নেবে পাকিস্তান। ভারতের পক্ষ থেকে পালওয়ামা হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করা হলেও ইমরান খান তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ভারতের কাছে তাদের দাবির পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ চেয়েছেন। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী হামলার জন্য উল্টো ভারতের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, ভারতে সামনে নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইমরান খান বুঝাতে চেয়েছেন, সংকট ভারতের ভেতরকার। ইমরান খান আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেন। পাক প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য গতকাল দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচার করা হয়। এতে তিনি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া পাকিস্তানকে দোষারোপ বন্ধ করতে আহ্বান জানান। ইমরান খান বলেন, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি ভারতের কোনো অংশ থেকে যদি অভিযান চালানো হয়, তাহলে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই প্রতিশোধ নেবে। তবে পালওয়ামা হামলার তদন্তে ইসলামাবাদ দিল্লিকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানান ইমরান খান। তিনি এ জন্য সংলাপ আহ্বান করেছেন।
এদিকে, পাল্টা জবাবে ভারত পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের প্রাণকেন্দ্র আখ্যা দিয়েছে। গতকাল রাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পালওয়ামায় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলে মানতে নারাজ। কিন্তু আমরা এতে বিস্মিত নই। তিনি সহিংস এই হামলার নিন্দা জানাননি, একইসঙ্গে নিহতদের শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও প্রকাশ করেন নি। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হচ্ছে বলে ইমরান খানের দাবির বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এটা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকৃত বিষয় খুব ভালো করেই জানে যে, পাকিস্তান সন্ত্রাসের প্রাণকেন্দ্র। সন্ত্রাসী হামলার দায় অস্বীকার করা পাকিস্তানের পুরনো অজুহাত।  দেশটি বরাবরই এর পুনরাবৃত্তি করে আসছে।  
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনে জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ খবর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরাঁকে চিঠি লিখেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবকে কুরেশি লিখেছেন, জরুরিভিত্তিতে আমলে নিতে হবে এমন একটি অবস্থান থেকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছে ভারত। এতে আমাদের এ অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। চিঠিতে ওই হামলা কাশ্মিরী একজন বাসিন্দা চালিয়েছে বলে ভারতীয় বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি। তদন্ত হওয়ার আগে এক্ষেত্রে পাকিস্তানের কাঁধে দায় চাপানো উদ্ভট এক বিষয়। তবে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। তারা বলেছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সব রকম সমস্যার সমাধান হতে হবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে।
প্রসঙ্গত, পালওয়ামা হামলায় ভারতের আধা-সামরিক বাহিনী সিআরপিএফের ৪০ জনেরও বেশি জওয়ান নিহত হন। এর দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জৈশ-ই-মোহাম্মদ। তাৎক্ষণিকভাবে ভারত এ জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে। তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইমরান খান। দুই দেশই তাদের স্ব-স্ব দূতকে তলব করেছে।
১৪ই ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পালওয়ামা হামলার পর এ বিষয়ে প্রথম মুখ খুললেন ইমরান খান।

চকবাজার ট্রাজেডি- এ পর্যন্ত ৬৯ লাশ উদ্ধার

পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬৯ জনের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। রাত তিনটায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সকালে ভবনগুলো থেকে ধোয়া উড়ছিল। আগুন পুরো নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে নিহতদের লাশ বের করে আনছেন। সকাল আটটা পর্যন্ত ৬৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। আগুনে মৃতদেহগুলো ঝলসে গেছে। গত রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুনের সূত্রপাত। আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি ভবনের কমিউনিটি সেন্টারে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল।
পাশের ভবনগুলোতে আবাসিক বাসিন্দাও ছিলেন। চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত রোডের শেষ মাথায় মসজিদের পাশে ৬৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওয়াহিদ ম্যানসনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এলাকাবাসী বলছে, ওই ভবনের কারখানা থেকে আগুন ছড়িয়েছে। কারও কারও মতে, বিকট শব্দে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়ায়। ওয়াহিদ ম্যানসনের নিচতলায় প্লাস্টিকের গোডাউন ছিল। ওপরে ছিল পারফিউমের গুদাম। আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাত ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে জানানো হয়। সাড়ে ৩টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, এখানে আসার রাস্তাটির দু’পাশই সরু। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে ঢুকতে পারেনি। তবে শেষ পর্যন্ত কয়েকঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছি। ভবনে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মোট পাঁচটি ভবনে আগুন লেগে যায়। এদিকে সকালে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে আগুনে পোড়া ভবনে পানি দেয়া হচ্ছে। এদিকে ঘটনায় আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাতেই ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অগ্নিদগ্ধ চার জনের অবস্থা গুরুতর। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশ রাখা হয়েছে। সেখানে ভিড় করছেন উদ্বিঘœ স্বজনরা। তাদের কান্নায় ঢামেক মর্গের আশপাশে এক হৃদয়বিদারক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষার দাবিতে বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এদিন। বাঙালির আত্মগৌরবের স্মারক অমর একুশের গৌরবময় এদিনে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে মহান ভাষা শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছিলাম মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। যাদের ত্যাগে বাংলা বিশ্ব আসনে পেয়েছে গৌরবের অবস্থান। একুশের প্রথম প্রহর থেকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে মহান ভাষা শহীদদের। মধ্যরাতের পর মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পরে মন্ত্রীবর্গ ও দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিক বর্গ এবং উচ্চপদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভিসি অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। দিনটিকে ঘিরে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। মধ্যরাতের পর থেকে সারা দেশের শহীদ মিনারে শুরু হয় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। সকালে খালি পায়ে প্রভাতফেরির মাধ্যমে শহীদদের জানানো হবে শ্রদ্ধা।
প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই ঢল নামে সাধারণ মানুষের। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুল হাতে সারি বেঁধে এগিয়ে যান শহীদ বেদির দিকে। শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা গতকাল থেকেই ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। কয়েকটি সড়কে রাতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেন। শহীদ মিনার চত্বরে শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবীরা। এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সঙ্গে সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতেও একুশের প্রথম প্রহর থেকে চলে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা।
দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রেডিও, টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। 
এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১ জন বিশিষ্ট নাগরিকের হাতে একুশে পদক তুলে দিয়েছেন।
মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২-এ জীবন দিয়েছিল সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়েই আজকে মুখে মুখে বাংলা ভাষা। বাংলায় রচিত হচ্ছে হাজারো গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস আর অজস্র কথামালা। আজকের দিনটি শুধু সেই বীর ভাষাসৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর, যারা ভাষার জন্য অকাতরে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের দিনটি কেবল বাংলাদেশে নয় বিশ্বের সব প্রান্তে পালিত হচ্ছে বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুভেজা অমর একুশে। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।
এই দিনে বাংলার সংগ্রামী ছেলেরা যে ত্যাগ ও গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন, তারই পথ ধরে আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাভ করি লাল সবুজের পতাকা। ১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালি রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় একটানা এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়, চারজন চারজন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার।
ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলতে থাকে। বিকাল ৩টায় গণপরিষদের অধিবেশনের আগেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ। বিকাল ৪টায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। বুলেট কেড়ে নেয় জব্বার ও রফিকের প্রাণ। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত রাত পৌনে আটটায় হাসপাতালে মারা যান। তাদের মৃত্যু সংবাদে বাংলা ভাষার প্রাণের দাবি সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শহীদদের স্মরণে সারা দেশে তৈরি হয় অসংখ্য শহীদ মিনার। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আওয়ামী লীগের দু’দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকালে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সংগঠনের সকল শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও  কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন।
এ ছাড়া শুক্রবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সকল কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য দলের  নেতাকর্মীসহ সংগঠনের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ছাড়াও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, শিশু একাডেমি সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের  নেতৃত্বে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থান হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গমন ও পুষ্পস্তবক অর্পণ। বাদ জোহর অমর একুশে হলে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত, বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদুল জামিয়া, সকল হলের মসজিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত/শান্তি কামনা করে বিশেষ  মোনাজাত ও প্রার্থনা।
কঠোর নিরাপত্তা: শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা দেয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বুধবার সকাল থেকেই পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়। দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা মহড়া।
ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, শহীদ মিনার এলাকায় প্রবেশের আগে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে একাধিক আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে প্রবেশ করতে  দেয়া হবে। একুশে ফেব্রুয়ারির নিরাপত্তায় ঢাকা শহরজুড়ে মোতায়েন থাকবে ১৬ হাজার পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনারকেন্দ্রিক থাকবে ৬ হাজার পুলিশ সদস্য। প্রস্তুত থাকবে  সোয়াত ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে নিরাপত্তা দেবে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে সাংবাদিকদের একথা জানান র?্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, র?্যাবের  পেট্রোল, মোবাইল পেট্রোল, অবজারভেশন পোস্ট ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। শহীদ মিনার ও পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে র‌্যাবের নিরাপত্তা বলয় থাকবে। ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে একুশের দুপুর পর্যন্ত নিরাপত্তা বলবৎ থাকবে, প্রয়োজনে সেটা আরো বাড়ানো হবে।

শিশু জুঁইয়ের দেখার কেউ নেই: কারাবন্দি স্বামীকে দেখতে এসে লাশ হলেন স্ত্রী by এস আলম তুহিন

বাবা জেলে। মা নিহত। এক বছরের ছোট্ট মেয়ে জুঁই তার মাকে না পেয়ে শুধু কাঁদছে। বুঝতে পারছে না তার মা আর এ দুনিয়াতে নেই। তাকে কেউ সান্ত্বনা দিতে পারছে না। কোনো কিছুই সে খাচ্ছে না। মায়ের মমতা-স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এ শিশুটির দায়িত্ব নেবে কে। কে তার দুঃখ ঘোচাবে?
মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে মাগুরা-ঝিনাইদহ সড়কের মাগুরা সার্কিট হাউজ এলাকায় ইজিবাইকের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগে মেয়েটির মা রেশমা খাতুনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
মাগুরা শহরের পিটিআই পাড়ার বাসিন্দা রেশমা খাতুন মঙ্গলবার বিকালে তার স্বামী মাদকসহ একাধিক মামলার আসামি রাব্বি হোসেনকে মাগুরা জেলখানায় দেখতে ইজিবাইকে করে  যাচ্ছিলেন। ইজিবাইকটি মাগুরা সার্কিট হাউজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রেশমার গলার ওড়না চাকার সঙ্গে জড়িয়ে নিচে পড়ে যান। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রেশমা খাতুনের এ মর্মান্তিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বর্তমানে শিশুটির দাদি চম্পা খাতুন জানান, আমার পরিবার খুবই দরিদ্র। দরিদ্রের কারণে আমার ছেলে রাব্বীকে পড়াশুনা করাতে পারি না। ফলে সে ছোট বেলা থেকে সঙ্গদোষে নষ্ট হয়ে গেছে। তার ভালোর জন্য আমি  অনেক চেষ্টা করে গেছি  কিন্তু সে ভালো হয়নি। শহরের অনেক ভালো ভালো দোকানে তাকে রেখেছি কাজ করার জন্য। কিন্তু সে তাও করেনি। পরে অনেকের পরামর্শে তাকে শালিখা উপজেলার আড়পাড়া শলই গ্রামে বিয়ে দিই। বিয়ের কিছুদিন পরই তার ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় ছোট্ট একটি কন্যা শিশু। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সে। কিন্তু আমার ছেলে রাব্বী জড়িয়ে পড়ে সমাজের নানা অসঙ্গতিতে। মাদকসহ নানা মামলার আসামি হয়ে সে এখন জেলে।
অনেক আক্ষেপ করে তিনি বলেন, শিশু মেয়েটির দায়িত্ব এখন আমার। আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার স্বামী আমার পরিবার দেখাশুনা করে না। সে অন্যত্র বিয়ে করে বাইরে বসবাস করছে। আর আমি অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। আমার ছোট্ট ৯ বছরের একটি ছেলে সন্তান আছে। তার নাম রাসেল। তাকে নিয়ে আমি যেমন স্বপ্ন দেখি ঠিক তেমনি এ মা-মরা মেয়েটিকে আমি তার মায়ের স্নেহ দিয়ে মানুষ করার চেষ্টা  চালিয়ে যাচ্ছি।

ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সুরক্ষা করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মর্যাদার সাথে দেশের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে সুরক্ষা এবং চর্চার আহবান জানিয়ে বলেছেন, আসুন আমাদের মাতৃভূমিকে এমনভাবে গড়ে তুলি যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করতে পারে এবং আমরা এক অনন্য মর্যাদায় চলতে পারি।
তিনি একুশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে চলবে কারণ একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা যায়। কিভাবে নিজের মাতৃভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সবকিছুকেই রক্ষা করা যায়।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত একুশে পদক ২০১৯ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের ভাষার অধিকার আমাদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে রক্ষার চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের কর্তব্য। আমরা অনেক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যেটা অর্জন করেছি তার সুফলটা যেন আগামী প্রজন্ম ভোগ করতে পারে, তারা যেন একটা সুন্দর জীবন পায় সেটাই আমরা চাই।’
একুশে পদক বিজয়ীদের উদ্দেশ্যে সরকার প্রধান বলেন, ‘আজকে যারা একুশে পদক পেয়েছেন তারা গুণীজন। তাঁরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কীর্তিমান, তাঁদের বিশাল অবদান রয়েছে। সেই অবদানের কথা সবসময়ই আমরা স্মরণ করি এবং আমি মনে করি, আমাদের আগামী দিনের প্রজন্মও তাঁদের অনুসরণ করে নিজেদেরকে গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, আমরা বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ আমাদের দেশ, বাংলা আমাদের ভাষা- যে কথা জাতির পিতা বারবার বলে গেছেন। সেই দেশকেই আমরা গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের দরবারে একটি মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ যেন অধিষ্ঠিত হয় এবং বাঙালি জাতি যেন বিশ্বসভায় সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলতে পারে সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২১ জন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক ২০১৯ এ ভূষিত করেন।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই পদক বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে।
এ বছরের একুশে পদক বিজয়ীরা হচ্ছেন: ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য মরহুম অধ্যাপক হালিমা খাতুন (মরনোত্তর), যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু এবং অধ্যাপক মনোয়ারা ইসলাম। ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য একুশে পদক পেয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য। প্রয়াত পপ শিল্পী আজম খান (মরণোত্তর) ও নজরুল সংগীত শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিলের সঙ্গে এবার সংগীত বিভাগে এ পুরস্কার পান গায়ক সুবীর নন্দী। সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে লাকী ইনাম ও লিয়াকত আলী লাকী একুশে পদক পান অভিনয়ের জন্য। দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানম আলোকচিত্রে অবদানের জন্য এবং চিত্রশিল্পী জামাল উদ্দিন আহমেদ চারুকলায় এ পুরস্কার পান। গবেষণায় ড.বিশ্বজিৎ ঘোষ ও ড.মাহবুবুল হক এবং শিক্ষায় ড.প্রণব কুমার বড়ুয়াকে এ পদক প্রদান করা হয়।
এছাড়া ভাষা সাহিত্যে রিজিয়া রহমান, ইমদাদুল হক মিলন, অসীম সাহা, আনোয়ারা সৈয়দ হক, মইনুল আহসান সাবের ও হরিশংকর জলদাস একুশে পদক পান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশে পদক বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন এবং মরণোত্তর একুশে পদক বিজয়ী মরহুম অধ্যাপক হালিমা খাতুনের পক্ষে তাঁর কন্যা বেগম প্রজ্ঞা লাবনী এবং পপ সম্রাট আজম খানের পক্ষে তাঁর কন্যা বেগম ইভা খান পুরস্কার গ্রহণ করেন।
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। মন্ত্রী পরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং পদক বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠ করেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিচারপতি গণ, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী সহ বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ, পূর্বের একুশে পদক বিজয়ী ব্যক্তিবর্গ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককে ৩৫ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণপদক, এককালীন দুই লাখ টাকা ও একটি সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে সরকার ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত ৪৫৭ জন সুধী এবং ৩টি প্রতিষ্ঠানকে একুশে পদকে ভূষিত তরা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের যা কিছু অর্জন তা কিন্তু সবসময় আওয়ামী লীগ সরকারই এনে দিয়েছে। যার মধ্যে- ভাষা আন্দোলন ছাড়াও ৬দফা, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় রয়েছে।
আওয়ামী লীগ ১৯৫৬ সালে সরকার গঠন করেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময়ই ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং শহিদ মিনার নির্মাণের জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী কাজ শুরু হলেও ১৯৫৮ সালে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান মার্শাল ল ঘোষণা করেন এবং শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগের ফলেই ইউনেস্কো মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।
তিনি বলেন, প্রায় কুড়ি বছর আগে প্রয়াত রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামসহ কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির উদ্যোগে এবং ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আমাদের একুশ এভাবে পরিণত হয় পৃথিবীজোড়া মানুষের মাতৃভাষা দিবসে।
মাতৃভাষাকে রক্ষা, চর্চা এবং মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা করার জন্য তার সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ করার পর ২০০১ সালে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মত শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নির্যাতনের পাশাপাশি আন্তর্জাাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউট নির্মাণসহ আওয়ামী লীগ সরকারের সকল উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দেয়।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে পুণরায় সরকারের আসার পরই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউটের এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব পর হয়। যেখানে বর্তমানে বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষার নমুনা সংগ্রহ এবং মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
সরকার প্রধান বলেন, আমাদের মাতৃভাষা যেন সুরক্ষিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনষ্টিটিউটের মাধ্যমে আমরা সে উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার ওপরও এখানে নমুনা সংগ্রহ এবং গবেষণা কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে জাতির পিতার বাংলায় প্রদত্ত ভাষণের পদাংক অনুসরণ করে প্রতি বছর তাঁর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ প্রদানের কথাও উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে ১৯৫২’র মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে রফিক, সালাম, বরকতদের রাজপথ রঞ্জিত করার গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করে এই আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনে জাতির পিতার অনন্য ধারবাহিক অবদানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন।
তিনি বলেন, ‘ভাষার দাবিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষা দাবি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। সেই থেকেই প্রকৃতপক্ষে ভাষার দাবি রাজপথে গড়ায়।’
তিনি বলেন, ছাত্রলীগ ঐদিন ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস এবং অন্যান্য জায়গায় ব্যাপক পিকেটিং করে। পুলিশ ছাত্রদের লাঠিচার্জ করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অনেক ছাত্রকে আটক করে।