Friday, October 25, 2013

সংঘাত- আমারে এখন নামাইব ক্যাডা? by ফারুক ওয়াসিফ

বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধের কথা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দেশীয় দুই রাজনৈতিক পরাশক্তি ঠান্ডা যুদ্ধের পরোয়া করে না, তাদের যুদ্ধটা অতীব গরম। সবই ঘটছে ক্ষমতার ক্ষুধার জন্য। এক ক্ষুধার্ত যুবকের গল্প বলি।

যুদ্ধাপরাধীর পরিণতি by সরাফ আহমেদ

অপরাধটি অনেক পুরোনো, সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের। প্রায় ৬৮ বছর আগের ঘটনা। তবু জনতার ক্রোধের মুখে যুদ্ধাপরাধী এরিখ প্রিয়েবকের লাশটি পর্যন্ত প্রকাশ্যে সমাহিত পারেনি।

খোলা চোখে- আমেরিকায় ‘চাকা বন্ধের’ শিক্ষা by হাসান ফেরদৌস

আমেরিকার ‘চাকা বন্ধ’ থেকে একাধিক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে, শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও। পাক্কা ১৬ দিন বন্ধ থাকার পর আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ফের খুলেছে।

রাজনীতির নীতিকথা by সাযযাদ কাদির

দেশের রাজনীতি নিয়ে বলার কিছু নেই তেমন। ক্ষমতাসীন মহল জানে রাজনীতির নীতি তিনটি-  (১) নির্বাচিত হতে হবে, (২) পুনঃনির্বাচিত হতে হবে এবং (৩) পাগলা হলে চলবে না, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।

তারা বাঁকা পথে হাঁটছে- সাক্ষাৎকারে কাজী জাফর আহমদ by নিয়াজ মাহমুদ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে অসাংবিধানিক পন্থায় কেউ ক্ষমতায় এলে তাতেও সমর্থন দিতে পারে আওয়ামী লীগ। বুঝেশুনেই তারা এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

দুর্বৃত্তায়ন- নির্বাচন আসছে, পুঁজির পাচারও বাড়ছে by ড. মইনুল ইসলাম

সাম্প্রতিক কালে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিতণ্ডা দেশের জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাই তিন মাস ধরে বৈধ পথে দেশে আসা রেমিট্যান্স-প্রবাহে যে ঋণাত্মক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণ অনুসন্ধান তেমন গুরুত্ব পায়নি।

দেশজুড়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

দেশজুড়ে আতঙ্ক, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। দুই জোটের পাল্টাপাল্টি সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করে টান টান উত্তেজনা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলায় জেলায় সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। নামানো হয়েছে বিজিবি।

না জয়যুক্ত হয়েছে by শামীমুল হক

সংসদে পাত্তাই পেলেন না বিএনপির সংসদ সদস্যরা। অনেক আশা নিয়ে দেশবাসী বসেছিল টিভির সামনে। বিএনপির এমপিরা সংসদে যাবেন। তাদের প্রস্তাব তুলে ধরবেন। বুধবার মাগরিবের বিরতির পর সংসদ সদস্যরা একসঙ্গে সংসদ লবিতে প্রবেশ করেন।

সর্বত্র জনআতঙ্ক, তৃণমূলে রণপ্রস্তুতি by জাকারিয়া পলাশ

আলোচিত ২৫ শে অক্টোবরের সূর্যোদয় হয়েছে। আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় নিস্তব্ধ রাজপথ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্ক। বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা প্রস্তুত সমাবেশে অংশ নিতে। এরই মধ্যে বৃষ্টিও যুক্ত হয়েছে রাজধানীর রাজনীতিতে।

জঙ্গিদের পক্ষে লড়তে গিয়ে নিহত বাংলাদেশি-বংশোদ্ভূত তরুণ

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ একজন তরুণ সোমালিয়ার জঙ্গি গোষ্ঠী আল-শাবাবের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর এ খবর নিশ্চিত করেছে।

সারা দেশে সংঘর্ষ, নিহত-৮, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ- লালখান বাজার ও বহদ্দার হাটে ভাংচুর, সড়কে অগ্নি সংযোগ

১৮ দল ও আওয়ামী লীগের পাল্টা-পাল্টি কর্মসূচি চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে কক্সবাজার, নীলফামারি, সাতক্ষীরা ও চাঁদপুরে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েকশ নেতাকর্মী।

সরকারকে খালেদা জিয়ার দুই দিনের আলটিমেটাম- আজকালের মধ্যে আলোচনা না করলে ৬০ ঘণ্টার হরতাল

নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার নিয়ে আলোচনার জন্য ক্ষমতাসীন সরকারকে আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

সরকারকে অবৈধ বলা সংবিধানসম্মত নয় by মাহমুদ মেনন

বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া এবার বললেন, ২৭ অক্টোবরের পর সরকার পুরোপুরি অবৈধ হয়ে পড়বে। ২৫ অক্টোবর ১৮ দলের সমাবেশে দাঁড়িয়ে একথা উচ্চারণ করেন তিনি।

নির্বাচন আসছে, পুঁজির পাচারও বাড়ছে

সাম্প্রতিক কালে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বিতণ্ডা দেশের জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাই তিন মাস ধরে বৈধ পথে দেশে আসা রেমিট্যান্স-প্রবাহে যে ঋণাত্মক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণ অনুসন্ধান তেমন গুরুত্ব পায়নি। বাংলাদেশ থেকে হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় বিদেশে পুঁজি পাচার সম্প্রতি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণেই বৈধ পথে রেমিট্যান্স-প্রবাহ কমে গেছে।
বছর খানেক ধরে বাংলাদেশের টাকার বৈদেশিক বিনিময় হার মার্কিন ডলারের তুলনায় ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। এক ডলারের বিনিময়ে বছর দুয়েক আগে বৈধ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ৮৫ টাকা পাওয়া যেত, এখন পাওয়া যাচ্ছে ৭৮ টাকা। দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি হিসাবে বেশ কয়েক বছর ধরে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হওয়াতেই টাকার এই বিনিময় হারের উন্নতি হয়েছে। (ভারতের লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতি ভারতীয় রুপির বৈদেশিক মূল্যমানে বড়সড় ধস নামিয়েছিল, যা থেকে এখনো পুরোপুরি মুক্তি মেলেনি তাদের।) ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকা টাকা এ দেশের মুদ্রাস্ফীতির হারকেও খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে, ১০ থেকে ১২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির হার কমে ৭ থেকে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে গত এক বছরে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল। অতএব, লেনদেন ভারসাম্যের এই স্বস্তিকর অবস্থা বিশ্বকে জানান দিয়ে চলেছে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর কিংবা তাদের তল্পিবাহী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক-এডিবির করুণানির্ভর এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম। কিন্তু অর্থনীতির এই স্বস্তিকর অবস্থাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশের নানা দেশে পুঁজি পাচারের বিপজ্জনক প্রবণতা। এই পুঁজি পাচারকে সহজ করে দিচ্ছে প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির রেমিট্যান্স-পদ্ধতিতে গেড়ে বসে থাকা ‘হুন্ডি-ব্যবস্থা’।
কয়েক মাস ধরে প্রাতিষ্ঠানিক মুদ্রাবাজারের ডলারের দামের চেয়ে কার্ব মার্কেটের ডলারের দাম চার-পাঁচ টাকা বেশি পড়ছিল। প্রতিবছর হজ মৌসুমে কার্ব মার্কেটে ডলারের চাহিদার স্ফীতি দেখা দেয়। এ বছর ওই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যোগ হয়েছিল দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ছেলেমেয়েদের বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় শুরু হওয়া ‘ফল-সেমিস্টারের’ পড়াশোনার খরচ জোগান দেওয়ার জন্য বাড়তি ডলারের চাহিদা। কোরবানির ঈদের গরু চোরাচালানের মৌসুমটাও একই সময়ে ‘হুন্ডি ডলারের’ চাহিদার অস্বাভাবিক স্ফীতির জন্য খানিকটা দায়ী ছিল। কিন্তু ‘হুন্ডি ডলার’-এর উল্লিখিত খদ্দেরদের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে দুর্নীতিজাত কালোটাকা বিদেশে পাচারকারী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, দুর্নীতিবাজ ও দলবাজ আমলা এবং ব্যবসায়ী-ঠিকাদারদের বিশালসংখ্যক দেশ থেকে পলায়ন-ইচ্ছুক ব্যক্তি। এঁদের উৎসাহী করার জন্য উন্নত বিশ্বের মন্দাকবলিত কয়েকটি দেশ নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে। ভারত, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া—এসব দেশ বাংলাদেশ থেকে পলাতক পুঁজির প্রধান গন্তব্যের ভূমিকা পালন করে আসছে বহুকাল ধরে। বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্রই এ ধরনের ধনাঢ্য-পলায়নেচ্ছু পুঁজিপতিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভূস্বর্গ। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও ক্রমেই বহুল-কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পরিণত হয়েছে গত তিন দশকে।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী বিজয়ের পর অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘নীরব দেশত্যাগের’ বিষয়টিও গোপন নয়। কানাডার টরন্টো নগরের একটি এলাকায় কয়েক বছর ধরে এত বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবার ঘরবাড়ি কিনে বসতি স্থাপন করেছে যে ওই এলাকাটিতে ঠাট্টাস্থলে অন্য বাংলাদেশি অভিবাসীরা ‘বেগমপাড়া’ উপাধি দিয়েছেন। ওই পরিবারগুলোর ‘সাহেবেরা’ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে আয়-রোজগার করে তার বড়সড় অংশটা হুন্ডি-পদ্ধতিতে কানাডায় নিয়মিতভাবে পাচার করা সম্পত্তির মালিক হয়ে পরিবারকে সেখানে বসবাস করার ব্যবস্থা করেছেন। যথাসময়ে তাঁরাও কানাডায় হিজরত করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বড় বড় নগরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ আমলা-প্রকৌশলী-পেশাজীবীরা দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করে এভাবে তাঁদের নতুন ঠিকানা গড়ে তুলছেন—এ খবরটা অভিবাসন সম্পর্কে আমরা যারা গবেষণা করছি, তাদের কাছে পুরোনো খবর। এমনকি সত্তরের দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন পিএইচডি করছিলাম, তখন থেকেই ‘পুঁজি নিয়ে পলাতক’ অভিবাসীদের মার্কিন মুলুকে অভিগমনের প্রবাহটা জোরদার হতে দেখি। তখন ন্যূনপক্ষে ৪০ হাজার ডলার যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করলে মার্কিন ভিসা পাওয়া যেত।
কানাডায়ও একই ধরনের নিয়ম রয়েছে। মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতেও নির্ধারিত পরিমাণ পুঁজি নিয়ে যেতে পারলে রেসিডেন্টশিপ পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্পেন, ইতালি ও গ্রিস একই ধরনের নিয়ম চালু করেছে। আর বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশ।  পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, আমার গবেষণায় প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেছে যে বাংলাদেশের কয়েক শ ব্যবসায়ী-শিল্পপতি দেশের ব্যাংক-ঋণ হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় পাচার করে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে শিল্প-কারখানা, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া, মরিশাস, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে পাচার করা বাংলাদেশি পুঁজি বিনিয়োগ করার প্রমাণও রয়েছে সেই গবেষণায়। এ ধরনের পুঁজি পাচারকারী বৈদেশিক বিনিয়োগকারীর তালিকায় এফবিসিসিআইয়ের একাধিক সাবেক সভাপতিও রয়েছেন। এ পর্যায়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের জিজ্ঞাসা করছি: ওপরের খবরটা কি আপনাদের জানা নেই? যদি জানা থাকে, তাহলে ওই রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? বৈধ পদ্ধতিতে তো বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য পুঁজি স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেই।
তাহলে এসব বিনিয়োগকারী কীভাবে দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি নিয়ে গেলেন? ২৬ বছর আগে প্রকাশিত উইলিয়ামসনের ক্যাপিটাল ফ্লাইট-এ দেশে পুঁজি পাচারের ব্যাখ্যা থাকলেও, বাংলাদেশের পুঁজি পাচার গুরুত্ব পায়নি। কারণ, আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিচিত ছিল দান-খয়রাতনির্ভর তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে। স্বৈরাচারী এরশাদের দুর্নীতির খবর জানাজানি হওয়ার পরই বহির্বিশ্ব বাংলাদেশের শাসক মহল, আমলা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদারেরা বৈদেশিক সাহায্য লুটপাটের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা জানতে পারলেন। এ ছাড়া দারিদ্র্য নিরসনের নামে বাংলাদেশে নিয়ে আসা কোটি কোটি টাকা ঋণ/অনুদানের সিংহভাগ দুর্নীতির খোরাকে পরিণত হচ্ছে। ১৯৯০-৯১ সালে বিআইডিএস থেকে বাংলাদেশের চোরাচালানের ওপর গফুর-ইসলাম-ফয়েজের গবেষণা প্রকল্পের দুই খণ্ডের প্রতিবেদনে আমরা প্রথম জানিয়েছিলাম, কীভাবে চোরাচালান ও হুন্ডি-পদ্ধতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে প্রকাশিত খেলাপি ব্যাংকঋণ-সম্পর্কিত আমার গবেষণাগ্রন্থ আ প্রোফাইল অব ব্যাংক লোন ডিফল্ট ইন দ্য প্রাইভেট সেক্টর ইন বাংলাদেশ-এ আমি প্রমাণ করেছি, ব্যাংকঋণ খেলাপ হওয়ার সমস্যার সঙ্গে পুঁজি পাচার সমস্যাটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এবং ‘হুন্ডি-পদ্ধতি’ এ দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকে সহজ করে তুলেছে।
দুঃখজনক হচ্ছে, ১৯৯১-১৩ পর্বে গণতন্ত্রের আলখাল্লাধারী রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা-কর্মী-মাস্তানদের একটা বড় অংশ গত ২২ বছরে পুঁজি লুণ্ঠনের ফায়দাভোগীদের কাতারে শামিল হয়ে দেদার পুঁজি পাচার করছে। যে দল বা জোট যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশীর্বাদপুষ্ট নেতা-কর্মী-মাস্তানেরা অর্থ ও সম্পদ লুণ্ঠনের খেলায় মাতেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে তাঁরা বিদেশে পাড়ি জমাতে থাকেন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতাদের পরিবার ও কুটুম্বরা বাংলাদেশের এই পলাতক পুঁজির ফায়দাভোগী হয়ে বিশ্বের নানা দেশে আরাম-আয়েশে দিন গুজরান করছেন। রাজনীতিকদের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর ডাকসাইটে সাবেক কর্মকর্তা, বেসামরিক আমলা, প্রকৌশলী, বিভিন্ন আমলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক দলীয় নেতাদের পরিবার কে কোথায় বসতি গেড়েছে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা জানা অসম্ভব নয়। গত ২২ বছরে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই যেহেতু ক্ষমতাসীন দল/জোটের বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তাই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশ থেকে বিদেশে ‘পুঁজির পলায়ন’ও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। এবারে ‘হুন্ডি ডলারের’ প্রবল চাহিদার আসল মরতবা এখানেই।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স-প্রবাহ স্তিমিত হওয়ার প্রধান কারণও এটি। পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে চাই, ‘অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির’ তত্ত্বগুলোয় ব্যাখ্যা করা হয় যে, ‘পুঁজির পলায়ন’ প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় বিশ্ব থেকে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোকে পুঁজি পাচার বা পুঁজি স্থানান্তরের একটি অংশ মাত্র। পুঁজি স্থানান্তরের প্রধান প্রক্রিয়া চালু আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। অর্থনীতিবিদ ইমানুয়েলের ‘অসম বিনিময় তত্ত্বে’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যার মোদ্দা কথা হলো, তৃতীয় বিশ্ব থেকে উন্নত বিশ্বে শ্রমিক চলাচল কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে শ্রমিকের মজুরির হারের বিপুল পার্থক্য সৃষ্টি করে সস্তা শ্রমের উৎপাদিত সস্তা পণ্য বাণিজ্যের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোয় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলে পুঁজি পাচারের সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে পুঁজিবাদী দেশগুলো। পুঁজিবাদের প্রাণভোমরা ধারণ করে রয়েছে এই অসম বিনিময়ব্যবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ কার্যক্রম বিস্তারের মাধ্যমে পুঁজি স্থানান্তরকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে চলেছে বিশ্ব পুঁজিবাদীব্যবস্থা। বর্তমান ব্যবস্থায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক ও পেশাজীবী গোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে আগ্রহী উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো। অতএব, বর্তমান বিশ্বে ‘মেধা পাচার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মানবপুঁজি’ পাচারের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
বাংলাদেশ ‘মানবপুঁজি’ জোগানের দিক থেকে তেমন সফল না হলেও ৮০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি অভিবাসীর অন্তত লাখ পাঁচেক দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী রয়েছেন। বাকি ৯০ শতাংশ অভিবাসীই কম দক্ষ ও কম শিক্ষিত ক্যাটাগরির শ্রমিক, যাঁরা বিভিন্ন দেশে নিম্ন মজুরির হাড়ভাঙা খাটুনির কাজে ব্যাপৃত রয়েছেন। এসব কাজকে বলা হয় থ্রিডি জব (ডার্টি, ডেঞ্জারাস অ্যান্ড ডিমান্ডিং)। বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে রেমিট্যান্স পাঠান এই শ্রেণীর অভিবাসীরাই। গত অর্থবছরে বৈধ পথে বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, আরও ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স ‘হুন্ডি চক্রে’ প্রবেশ করছে। চোরাচালানি পুঁজি পাচারকারী, বিদেশে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রদানকারী ধনাঢ্য মা-বাবারা, বিদেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীরা এবং বিদেশে ভ্রমণকারীরাই এই বিপুল পরিমাণ ‘হুন্ডি ডলারের’ মূল ক্রেতা। বাংলাদেশি অভিবাসীরা ডলারের চার-পাঁচ টাকা বেশি দাম পেলে হুন্ডি-পদ্ধতি পছন্দ করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই বর্ধিত দামটা পাওয়া যাচ্ছে হুন্ডি ডলারের বিপুল চাহিদা সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং চোরাকারবারিদের দেশদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের কারণেই। আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতা তো এদের দখলেই রয়ে গেছে।
ড. মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

সরলতার ধোঁকা by মাসরুর আরেফিন

অ্যালিস মানরো
এ বছরের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে যখন অ্যালিস মানরোর নাম ঘোষণা করা হলো, তখন ইংরেজিভাষী লেখক-পাঠকের এই বিশাল পৃথিবী একটা ঘোর লাগা অবিশ্বাসের মধ্যে পড়ে গেল যেন। আমার অবিশ্বাস ছিল মাত্র চার বছরের ব্যবধানে আবার একজন নারী লেখকের নোবেলপ্রাপ্তি নিয়ে। আমার কথা বাদ থাক, পৃথিবীর অগুনতি পাঠকের ও প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকাগুলোর অবিশ্বাসের হেতু কী ছিল? সমকালীন লেখকদের মধ্যে মানরো বিরাট খ্যাতিমান এবং তা যুক্তিসংগত কারণেই। কোনো দেশে কেউ ছোটগল্প একটু ভালো লিখলেই এমন বলা একটা ফ্যাশন যে ‘ইনি আমাদের চেখভ’। জয়েস ক্যারল, উটস, রেমন্ড কার্ভার, জন আপডাইক, রোহিনতন মিস্ত্রি, অনিতা দেশাই—আরও কত! কিন্তু অ্যালিস মানরো সত্যিই আমাদের চেখভ—মানে ইংরেজি ভাষার চেখভ। মানরোর বিখ্যাত গল্প ‘দি বেগার মেইড’-এ ‘মেটারনিখ’ (Metternich) নামটা একজন ভুলভাবে উচ্চারণ করছে শুনে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রেমিক তার প্রেমিকাকে বলে: ‘এ ধরনের লোকজন কীভাবে তোমার বন্ধু হয়?’ তখন আমাদের চেখভের বিখ্যাত গল্পের কথা মনে পড়ে—‘দি রাশিয়ান মাস্টার’, যেখানে একটা চরিত্র ছিল যে কিনা অনবরত এক তরুণ শিক্ষককে জ্বালাত এই বলে—কেন সে ‘কখনোই লেসিং পড়েনি?’ মানুষের শূন্যগর্ভ আত্মশ্লাঘা নিয়ে কী রকম একই ধরনের খোঁচা! এই ঈদের ছুটিতে মোটামুটি ডজন খানেক গল্প পড়লাম অ্যালিস মানরোর। তাঁর সব ছোটগল্পই আসলে বড় গল্প—আয়তনে ২০ থেকে ৫০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।
চেখভের কথা মাথায় এল অনেকবারই। মানরোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প ‘দ্য বেয়ার কেইম ওভার দি মাউন্টেন’ যখন পড়ছি তখন ঝট করে মনে এল চেখভের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প ‘দ্য লেডি উইদ অ্যা ডগ’-এর কথা। সেই যে ইয়ালটায় বেড়াতে গিয়ে মস্কোর এক ভদ্রলোক পরকীয়ায় জড়াল আন্না সারগিয়েভ্নার, যে একাকী বেড়াতে এসেছিল ছোট একটা কুকুর সঙ্গে নিয়ে, স্বামীকে ফেলে। ১৯৯২ সালে আমরা যখন ভারতে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র, তখন আমাদের ‘তুলনামূলক সাহিত্য’-এর পাঠ্য তালিকায় তাজা তাজা ঢোকানো হয়েছিল মানরোর নতুন গল্প ‘মেনেসেটিয়াং’—কানাডার এক নদীর নামে নাম। চিরকুমারী এক মেয়ে নায়িকা সেটির, কবি সে। এক রাতে তার বাসার বাগানে তাড়া খেয়ে আসে এক মদ্যপ মহিলা। সে ভাবে মহিলা খুন হয়েছে। সাহায্যের জন্য সে ডেকে আনে এক ব্যাচেলর প্রতিবেশীকে; দুজনের মধ্যে কিছুই ঘটে না, গল্প এগোতে থাকে; একসময় মারা যায় মেয়েটি, মেনেসেটিয়াং নদীর পানি বয়ে যেতে থাকে আর পাঠককে ঘিরে ধরে দম বন্ধ করা বিষাদ। আমাদের আবার মনে পড়ে চেখভের কথা। কিন্তু চেখভের মতো মনে হলেই বা মানরো এ যুগের চেখভ বা প্রুস্ত যা-ই হোন না কেন, তাতেই কি শুধু ছোটগল্প লিখে কারও নোবেল মিলতে পারে? এই বোরহেস-কালভিনো-রবার্তো বোলানো-উত্তর যুগে সনাতনী ঘরানার ছোটগল্প লিখে নোবেল পুরস্কার জেতা কি সম্ভব? তাই আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ছিল, বড় লেখক হলেও মানরোর জায়গা হবে নোবেল না-পাওয়া বড় লেখকদের সারিতেই, যেখানে আছেন টলস্টয়, নবোকভ, জয়েস, বোরহেস, সেবাল্ড, বার্নহার্ড এবং হ্যাঁ, চেখভ নিজেও। যাক, সে রকম কিছু হলো না।
আমরাই বরং ভুল প্রমাণিত হলাম। পুরো ঈদের ছুটিটা মানরোতে ডুবে থেকে কতবার যে মনে হলো, নোবেল কমিটি এ বছর কত সঠিক এক সিদ্ধান্তই না নিয়েছে! কী আছে মানরোর লেখায়? প্রথমেই বলতে হয়, তাঁর গল্প বলার দক্ষতার কথা। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, মানরোর সুখপাঠ্য গল্পগুলি আপনি যদি একবার পড়া শুরু করেন তো কখনোই শেষ না করে ঘুমাতে যেতে পারবেন না। বাংলায় আমাদের হুমায়ূন আহমেদ যেমন। ধরুন আপনি হুমায়ূনের ফেরা বা শ্যামল ছায়া পড়া শুরু করেছেন; এখন আপনি কি চিন্তা করতে পারেন আজকের মধ্যে বইটা শেষ না করে বাকিটা কাল পড়ার কথা? মানরোও ঠিক তাই। তাঁর গল্পগুলির স্থান ও কাল এই আমাদের আধুনিক পৃথিবীর আধুনিক যুগই, তাঁর চরিত্রগুলো আমাদের অনেক চেনা, আর যেহেতু পড়া শুরু করলে তা শেষ না করে ঘুমাতে যাওয়া যাচ্ছে না, তখন কিন্তু সব মিলে একটা ঝুঁকিসর্বস্ব প্রশ্নই মনে তৈরি হয়, মানরো কি শুধুই পাঠকের চিত্তবিনোদন? এর উত্তর—একেবারেই না। মানরোর ছোটগল্পের পৃথিবী এত ঘন বুনোটে তৈরি আর তার তলদেশ পৃথিবীর মহৎ উপন্যাসগুলির মতো এত এত গভীরে যে, আপনি শুধু পড়ার আনন্দ নিয়েই মানরো শেষ করবেন না; বরং এই বোধও আপনার মধ্যে জাগবে—আরে, ইনি তো একজন জাদুকর! আর লেখকের স্রষ্টাসুলভ অহংটুকু সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে এ লেখক আমার প্রতি এ রকম দরদ দিয়ে এমন গূঢ় সত্য কথাটা লিখলেন কী করে? অ্যালিস মানরো মানুষের প্রগাঢ়-আনন্দ দেওয়া ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোর এক শক্তিমান রূপকার। গল্প থেকে গল্পে সেই অভিজ্ঞতাগুলোর একটা প্যাটার্নও দাঁড় করানো যায়: মোটামুটি বুদ্ধিমতী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত অবস্থানের কোনো মেয়ে বেড়ে উঠবে কানাডার ওন্টারিওর গ্রাম্য পরিবেশে, মেয়েটার বুকে অনেক আবেগ, ঝট করে প্রেম বা যৌন অভিজ্ঞতা লাভের ফাঁদে পা দিয়ে বসবে সে, তারপর পালাবে ওই ওন্টারিওর মফস্বল থেকে; এরপর তার বিয়ে হবে, বাচ্চা হবে এবং দেখা যাবে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পেছনে আমরা তাকে বেশি দোষ দিতে পারছি না।
সাহিত্যে নোবেল ২০১৩
তারপর তাকে আমরা দেখব রোমান্টিক নানা অ্যাডভেঞ্চারে ব্যস্ত, নিঃসঙ্গ ও জীবনবিমুখ। একদিন সে ফিরে আসবে শৈশবের সেই ওন্টারিওতেই, কিন্তু দেখবে সবকিছু কত বদলে গেছে। আরও দেখবে কেউ তাকে এখানে আর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে না। অর্থাৎ স্বাধীন হতে চেয়ে সে বরং জীবনের বেদনাদায়ক সব বঞ্চনা ও ক্ষতিরই শিকার হলো। মোটাদাগে এই হচ্ছে মানরোভিয়ান পৃথিবী; ঘর আর স্বাধীনতার মধ্যকার রশি টানাটানি। একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর অন্যদিকে এই বোধও যে, হায়, শেকড় তো মাটির অনেক গভীরে। মানরোর বিখ্যাত নায়িকারা—জর্জিয়ারা, সোফিরা বা ফিয়োনারা—সব সময়ই একরোখা, স্বপ্নচারী, আর শেকড় যেমন করে হোক ছিঁড়ে পালাতে গিয়ে রক্তাক্ত। এই রক্ত আর অশ্রুর কথা লিখতেই মানরো সিদ্ধহস্ত এবং তিনি তা লেখেনও বটে, একটাও আলগা, অসৎ, অপ্রয়োজনীয় বা নীরস বাক্য না লিখেই। ভি এস নাইপলের মতো লেখক স্বীকার করেছিলেন, ‘মানরো পড়লে মনে হয় যেন মানরোর মতো লেখা কত সহজ। কিন্তু আমি কয়েকবার চেষ্টা করে দেখেছি, তা অসম্ভব।’ মানরোভিয়ার পৃথিবীর ভূগোলেও আছে ওপরতলের আপাত সরলতা—তিনি অসম্ভব দরদ দিয়ে সোয়াশো’র মতো গল্পে লিখে গেছেন তাঁর মাটির মানুষদের জীবনের সাদামাটা কাহিনিগুলো, যে মাটির অবস্থান কানাডার লেক হুরোনের কাছে, এখন যাকে অনেকে ‘মানরোল্যান্ড’ও বলেন। কিন্তু ওটা তো মাত্র সরল চোখে দেখা ‘ভূগোল’। তার অসংখ্য চরিত্র মৃত্যুর পরে ছোট ছোট কবরফলক কপালের কাছে নিয়ে শুয়ে আছে ওই মাটিরই অদৃশ্য ভূগোলে। শুধু ম্যাপল বা উইলোর পাতাগুলোয় হেমন্তের রং ধরলেই কেবল আমরা শুনতে পাচ্ছি মানরোর ফিয়োনা কিংবা জর্জিয়াদের হাহাশ্বাস। এই হাহাশ্বাসগুলোই আর্কিটাইপাল অ্যালিস মানরো থিম: শ্রেণীচেতনা,
গেরস্থালি, যৌনবাসনা, পরকীয়া, বিশ্বস্ততা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যকার দ্বন্দ্ব, কামনা ও ঔচিত্যবোধের লড়াই, দায়িত্ববোধ ও স্বপ্নবিলাসিতার সংঘর্ষ। আর তাঁর শেষ তিন বইতে, বিশেষ করে টু মাচ হ্যাপিনেস (২০০৯)-এ দেখি ভায়োলেন্সের প্রগাঢ় ছোঁয়া। মানরো বাস্তববাদী ঘরানার লেখক। কিন্তু অধিকাংশ গল্পেই যেভাবে ও যেসব যুক্তিতে তাঁর চরিত্রেরা অতীতের মোকাবিলা করে, তাতে প্রায়ই একধরনের ধাঁধারও তৈরি হয়। চরম সব সংকট-মুহূর্তে মানরোর এই কুয়াশাঘেরা বাস্তবতা-প্রতিবাস্তবতার নির্মাণ প্রকরণের দিক থেকে পরাবাস্তবতাবাদী। তবে যেহেতু মানরো খুব মেপে লেখেন, কোনোকিছু খোলাসা করতে তাঁর যেহেতু মহা এক অনীহা, তাই তাঁর পরাবাস্তবতাবাদ আমাদের ফ্যান্টাসিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় না; বরং লোম দাঁড়িয়ে যাওয়া সব নাট্যমুহূর্তের মুখোমুখি করে। আমি কয়েকবার পড়ার পরও বুঝিনি কেন তাঁর শেষ বই ডিয়ার লাইফ-এর ‘গ্র্যাভেল’ গল্পের বাচ্চা মেয়েটিকে বরফে ভরা গর্তে পড়ে মারা যেতে হলো, কেন তার বড়ো বোন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখল কিন্তু সাহায্যের জন্য চিৎকার করল না। সে কি ভেবেছিল যে তার বাবা-মা (ঠিক বাবা নয় এই লোক, সে তার মায়ের বয়ফ্রেন্ড) দরজা আটকে সেক্স করছে, অতএব এখন ডেকে বকা খাওয়া যাবে না? কী প্রচ্ছন্ন এক ভায়োলেন্স! আর কী চমৎকার এক কলমের শক্তি যে তাঁর গল্পগুলি সারাংশ করে শোনাতে গেলে সে সব কত সেন্টিমেন্টাল কাহিনির মতো শোনায়, কিন্তু পড়তে গেলে সেগুলো কত অন্যরকম—কত নিরাসক্ত, নির্মম তাঁর ভঙ্গিমা;
আর যত পারা যায় কম বলে বরং পাঠককে জীবনের বিশালত্বের মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে কী তাঁর সুকৌশলী বাচনভঙ্গি! মানরো সম্বন্ধে শেষ কথা এটাই যে, মানরোর গল্প ভয়ংকরভাবে এ পৃথিবীর যেকোনো মানুষেরই জীবনের গল্প। অন্য অর্থে, মানুষের পক্ষে যে সবকিছু সম্ভব, সব সৌন্দর্য ও কদর্যতা যে একই মুঠির মধ্যে ধরা সম্ভব, সেই বিশাল অনুমান-অসম্ভব মানবিক সম্ভাবনাগুলোরই গদ্যশিল্পী তিনি। মানরোকে বুঝতে হলে আপনার তাঁর গল্প পড়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। ‘পৃথিবীর সব জিনিসের মধ্যে কত জটিলতা, একটা জিনিসের মধ্যে কত কত জিনিস—একদম মনে হয় যেন অনিঃশেষ’—মানরোরই কথা এটা। জীবনকে আমরা সাধারণত সাদা চোখেই দেখি বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বুঝতে পারি না যে একটা জিনিসের আড়ালে আরও কত কত অজানা জিনিস রয়েছে—কীভাবে যৌনবাসনার পেছনে আর্তনাদ করছে পাপবোধ আর কীভাবে ঈশ্বরবন্দনার আড়ালে হয়তো উঁকি মারছে মানুষ হত্যার মতো সর্পিল স্বপ্ন। তো এই যখন অবস্থা, তখন তো অ্যালিস মানরো আপনাকে পড়তেই হবে। আর মানরোর হুমায়ূন আহমেদীয় সরলতা যেহেতু বিশাল একটি ধোঁকা, তাই তাঁর গল্প না পড়ে তাঁর গল্প বিষয়ে অন্যের লেখা আপনি যতই পড়ুন না কেন, ধোঁকার সেই পর্দাটা সরাবেন কী করে?

ছেলে আর মেয়ে by অ্যালিস মানরো

আমার বাবা শিয়ালখামারি। খোপরায় মেটে শিয়াল পালেন তিনি। হেমন্তে বা শীতের শুরুতে যখন এদের লোম পুরু হয়ে যায়, তিনি সেগুলোকে মেরে চামড়া ছাড়িয়ে হাডসনস বে কোম্পানি বা মন্ট্রিল ফার ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করেন। আমাদের বাসার দেয়ালে ঝোলে এই কোম্পানিগুলোর ক্যালেন্ডার। ক্রিসমাসের আগে কয়েক সপ্তাহ বাবা রাতের খাওয়া শেষে বাসার সেলারে কাজ করেন। সেলারের দেয়াল সাদা চুনকাম করা। টেবিলের ওপর এক শ ওয়াটের বাল্ব জ্বলে। সিঁড়ির ওপরের ধাপে বসে আমি আর আমার ভাই লেয়ার্ড বাবার কাজ করা দেখি। বাবা শিয়ালের চামড়া ছাড়িয়ে সেটা উল্টে দেন। শেয়ালটাকে তখন ইঁদুরের মতো ছোট্ট লাগে। মৃতদেহগুলো একটা বস্তায় ভরে ময়লার খালে পুঁতে ফেলা হয়। একবার আমাদের কিষান হেনরি বেইলি করল কি, এ রকম একটা বস্তা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘বড়দিনের উপহার!’ মা রেগে গিয়েছিলেন। মা তো আসলে চামড়া ছাড়ানোর এই কাজটাকেই দেখতে পারতেন না। বলতেন, ‘এগুলো বাড়ির বাইরে করলে হয় না! সারা বাড়ি গন্ধ হয়ে থাকে।’ আমার কাছে অবশ্য এটা এই মৌসুমেরই গন্ধ বলে মনে হয়, কমলালেবু বা পাইন ফলের গন্ধের মতো। আমাদের ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ওপরে গিয়েও আমরা শিয়ালের গায়ের গন্ধ পাই, হেনরির হাসির আওয়াজ শুনি। নিচতলার উষ্ণ, নিরাপদ, উজ্জ্বল আলোয় ভেসে যাওয়া জগৎটা ওপরতলার ঠান্ডা বাতাসে মিশে থাকে। বাড়ির বাইরে গা-ছমছমে অন্ধকার দুনিয়া। তুষার পড়ে পড়ে স্তূপ হয়ে থাকে চারপাশে, শোঁ শোঁ বাতাস বয়। অন্ধকারে আমরা বিছানায় শুয়ে থাকি, চোখ সিঁড়িঘরের একচিলতে আলোর দিকে। ক্রিসমাসের গান গুনগুন করে ঘুমিয়ে যায় লেয়ার্ড। আমি তখন নিজেকে নিজে গল্প বলতে শুরু করি। নিজেকে নিয়ে বানানো গল্প, আমি যখন বড় হয়ে গেছি, সেই সময়কার সব ঘটনা। মরে যাওয়ার আগে শিয়ালগুলো আমার বাবার বানিয়ে দেওয়া জগতে বিচরণ করে। সেই জগৎটা উঁচু বেড়া দেওয়া—মধ্যযুগীয় শহরের মতো।
একটা গেট আছে, রাতে সেটায় খিল আঁটা। ভেতরে বড় বড় খোপরা। তাতে মানুষ সমান উঁচু দরজা, তার ভেতরে তক্তা বেছানো, শিয়াল তাতে লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি করে। সবকিছু খুব পরিপাটি আর বুদ্ধি খাটিয়ে বানানো। বাবা ভীষণ সৃজনশীল, পৃথিবীতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস রবিনসন ক্রুশো। শিয়ালগুলোর প্রতিটার আলাদা নাম আছে। টিনের পাতে প্রিন্ট করা সেই নাম ঝোলানো থাকে তাদের নিজ নিজ খোপরার দরজায়। বাবার রাখা নামগুলো হলো প্রিন্স, বব, ওয়ালি ও বেট্টি। আমার রাখা নাম স্টার, টার্ক, মরিন ও ডায়ানা। লেয়ার্ড নাম রেখেছে মড, এই নামে এক কিষানী কাজ করত আমাদের বাসায়, স্কুলের এক বন্ধুর নামে সে শিয়ালের নাম দিল হ্যারল্ড। আরেক শিয়ালের নাম মেক্সিকো। মেক্সিকো কেন? জবাব নেই। নাম রাখলেই তো আর সেগুলো পোষা হয়ে যায় না। এ জন্য বাবা ছাড়া আর কেউ যায় না খোপরার কাছে। দুবার শিয়ালের কামড় খেয়েছেন তিনি, বিষক্রিয়া হয়েছিল। আমি এদের কাছে পানি বয়ে আনি। তখন খোপরার মধ্যে বেছানো তক্তায় সেগুলো ছোটাছুটি করে, মাঝেমধ্যে ডাক ছাড়ে। জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। পানি বয়ে আনা ছাড়াও বাবার ঘাসবিচালি কাটার কাজেও আমি হাত লাগাই। তিনি কাস্তে দিয়ে কাটেন, আমি সেগুলো স্তূপ করে রাখি। তিনি শিয়ালের খোপরার ছাদে ছড়িয়ে দেন ঘাসবিছালি। তাতে খোপরা ঠান্ডা থাকে। একদিন সন্ধ্যার পর পর। আমি বাইরের গেটে খিল এঁটেছি। ভেতরে এগিয়ে দেখি রাতের আঁধারে গোলাঘরের সামনের উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে বাবা আর মা। বাবা সবেমাত্র তাঁর কসাইঘর থেকে বেরিয়েছেন। কাপড়ে তখনো রক্ত লেগে,
হাতের দু-এক জায়গায় মাংসের টুকরা। মা গোলাঘরের সামনে নেমে এসেছেন, একটু অবাক করা ঘটনাই। খুব জরুরি না হলে তিনি সাধারণত উঠোনের বাইরে পা রাখেন না। তাঁর কাপড় তখনো বাসন মাজার পানিতে ভেজা। রুমালে চুল বাঁধা, তবে দু-একটা চুল এলোমেলো খসে পড়েছে। মা ভীষণ ব্যস্ত। ইদানীং আমাদের পেছনের বারান্দায় জমে গেছে শহর থেকে কেনা পিচ ফল, আঙুর আর আতার ঝুড়ি। বাড়ির আঙিনা থেকে উঠছে পেঁয়াজ, টমেটো আর শসা। এগুলো দিয়ে আচার, জেলি আর সস বানানো হবে। রান্নাঘরে সারাক্ষণই চুলায় আগুন জ্বলছে। দিন-রাত কাচের বয়ামের টুংটাং। দম ফেলার অবসর নেই। শুনলাম মা বলছেন, ‘লেয়ার্ড আরেকটু বড় না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরো, তারপর তো তোমার সত্যিকারের একটা কাজের হাত জুটবে।’ জবাবে বাবা কী বললেন, শুনতে পেলাম না। কিন্তু মায়ের এই কথার মানে কী? লেয়ার্ড তো অকর্মার ধাড়ি। এই যে এই মুহূর্তে কোথায় সে? দোলনায় দোল খাচ্ছে, না হয় নিজে নিজে চরকি-পাক দিচ্ছে, না হয় শুঁয়াপোকা ধরে বেড়াচ্ছে। ‘তখন আমিও মেয়েটাকে ঘরের কাজে লাগাতে পারব,’ শুনলাম মা বলছেন। ‘ঘাড় ঘুরিয়েছি কি তোমার মেয়ে ভোগাট্টা। ঘরে যে একটা মেয়ে আছে, বোঝার জো আছে!’ আমি চুপচাপ গিয়ে গোলাঘরের কোনার একটা বস্তায় ঠেস দিয়ে বসলাম। মায়ের ওপর ভরসা করা যায় না। বাবার চেয়ে দরদ বেশি তাঁর, সেটা মানি। কিন্তু তাঁকে বোকা বানানো সোজা। আর আস্থা রাখা কঠিন। মায়ের কথাকে বাবা যেন আবার পাত্তাটাত্তা না দেন।
লেয়ার্ড করবে কাজ, তাহলেই হয়েছে। মায়ের বুঝ যে কত কম, এ থেকেই বোঝা যায়। শিয়ালগুলোকে কী খাওয়ানো হয়, সেটাই বলতে ভুলে গেছি। বাবার জামা-কাপড়ে লেগে থাকা রক্ত দেখে মনে পড়ল। শিয়ালকে দেওয়া হয় ঘোড়ার মাংস। কৃষকেরা বেশির ভাগই এখনো ঘোড়া পোষেন। কোনোটা একেবারে বুড়ো থুড়থুড়ে হয়ে পড়লে, বা পা ভেঙে খোড়া হয়ে গেলে, উঠে দাঁড়াতে না পারলে, তখন বাবাকে খবর দেওয়া হয়। তিনি হেনরিকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাক হাঁকিয়ে হাজির হন। সাধারণত বন্দুকের গুলি ছুড়ে ঘোড়াটাকে হত্যা করে সেখানেই মাংস কাটকুট করে নিয়ে আসেন তাঁরা। ঘোড়ার মালিককে পাঁচ থেকে বারো ডলার পর্যন্ত দেওয়া হয়। বাসায় আগে থেকেই মাংসের মজুত থাকলে তাঁরা ঘোড়াটাকে না মেরে জ্যান্ত বয়ে আনেন। কয়েক দিন আস্তাবলে রেখে দেওয়া হয় আবার মাংসের দরকার না পড়া পর্যন্ত। যুদ্ধের পর কৃষকেরা ট্রাক্টর কিনতে শুরু করেছেন। ঘোড়া খুব একটা কাজে লাগে না। শীতে কোনো অথর্ব ঘোড়া এলে আমরা বসন্ত পর্যন্ত সেটাকে রেখে দিই। যে শীতে আমি এগারোয় পা দিয়েছি, সেবার আমাদের আস্তাবলে দুটো ঘোড়া এসে উপস্থিত। এদের আগের নাম তো আর জানি না, আমরা নাম দিয়ে দিলাম ম্যাক আর ফ্লোরা। ম্যাক বুড়ো কালো জোয়ালবাহী ঘোড়া। ফ্লোরা ঘোড়ী, গাড়িটানা। ম্যাক খুব ঢিমেতেতালা, তাকে জুত করা সোজা। কিন্তু ফ্লোরা অস্থির, কিছুটা হিংস্রও। তবে আমরা তার বীরপুরুষী পছন্দ করি। শনিবার দিনে আমরা আস্তাবলে ঢুকে পড়ি, আর যখনই পশুগন্ধি উষ্ণ আঁধারে দরজা খুলি, ফ্লোরা ঝট করে মাথা তোলে, চোখ ঘোরায়, তীব্র হ্রেষাধ্বনিতে ফেটে পড়ে। বসন্ত এলে ঘোড়াগুলোকে গোলাঘরের সামনের আঙিনায় চরে বেড়াতে দেওয়া হলো। ম্যাক গোলাঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে গা ঘষছে।
কিন্তু ফ্লোরা এলোমেলো হেঁটে বেড়ায়, খুর দিয়ে বেড়ার গায়ে আঘাত করে। বরফ দ্রুত গলছে, বেরিয়ে পড়ছে শক্ত ধূসর মাটি। এক শনিবার আস্তাবলে ঢুকে দেখি, সবগুলো দরজা খোলা, আলো ঢুকছে। হেনরি সেখানে উপস্থিত। ‘তোমাদের বুড়ো বন্ধু ম্যাককে গুডবাই বলতে এসেছ?’ বলল হেনরি। ‘আসো, ওট খাওয়াও ওকে।’ লেয়ার্ডের মুঠোর মধ্যে কিছু ওট ঢেলে দিল হেনরি। লেয়ার্ড এগিয়ে গেল ম্যাককে খাওয়াতে। ম্যাকের দাঁত পড়ে গেছে। চিবাতে পারে না। হেনরি বলল, ‘বেচারা! ঘোড়ার দাঁত গেল, তো ধরে নাও ঘোড়াও গেল।’ ‘তোমরা কি আজই তাকে গুলি করবে?’ আমি জিজ্ঞেস করি। হেনরি জবাব দেয় না। উঁচু খনখনে গলায় গান ধরে। আমি কোনো ঘোড়াকে গুলি করা দেখিনি। কিন্তু জানি কোথায় ঘটনাটা ঘটে। বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। কাঁধে বন্দুক। ‘তোমরা এখানে কী করছ?’ তিনি জিজ্ঞেস করেন। ‘কিছু না।’ ‘যাও, বাসার ভেতরে গিয়ে খেলো।’ দুই সপ্তাহ পরে টের পেলাম, এবার ওরা ফ্লোরাকে গুলি করে মারবে। আগের রাতে বাবা-মায়ের আলাপ শুনেছি। মা জিজ্ঞেস করছিলেন, খড় বাড়ন্ত কি না। বাবা বললেন, ‘কাল থেকে তো থাকবে কেবল গরুটা। বাইরের ঘাসবিচালিই খাবে না হয়।’ পরদিন ঝকঝকে রোদ। আমরা উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, শীতের ঝড়ে ঝরে পড়া গাছের ডাল কুড়াচ্ছি। কানে এল ফ্লোরার তীব্র হ্রেষাধ্বনি। তারপর বাবার গলার আওয়াজ, তারপর হেনরির চিৎকার। গোলাঘরের দিকে ছুটলাম, ব্যাপার কী দেখতে। আস্তাবলের দরজা খোলা। হেনরি ফ্লোরাকে বাইরে আনামাত্র ফ্লোরা হাত থেকে ছুটে গেছে। এখন গোলাঘরের সামনের উঠোনময় ছুটে বেড়াচ্ছে, এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। আমরা বেড়ার ওপর উঠে বসলাম। ঘোড়ার ছোটাছুটি দেখতে মজা লাগছে। বাবা আর হেনরি পিছু ধাওয়া করছে,
চেষ্টা করছে লাগামটা হাতের মুঠোয় কবজা করতে। তারা একটু একটু করে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে ফ্লোরাকে। প্রায় পেরেই গিয়েছিল, শেষ মুহূর্তে দুজনার মাঝ-বরাবর ছুট লাগাল ঘোড়াটা, চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। হেনরি চিৎকার দিল, ‘আরে গেল, সে তো এবার মাঠে ঢুকে পড়েছে!’ তার মানে এবার ঘোড়াটা বাড়ির সামনের লম্বা এল-আকারের মাঠে এসে পড়েছে। মাঝামাঝি জায়গায় যদি চলে যেতে পারে, সেখানে বেড়ার গেট খোলা। এখনো বেরোতে পারেনি। দেখলাম, ঘোড়াটা উল্টোদিকে গেছে। এখন সে চোখের আড়ালে। নিশ্চয়ই দৌড়ে আবার এদিকে আসবে। গেটটা ভারী। আমি সেটাকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকলাম। মাঝামাঝি গেছি, দেখি ঘোড়াটা সোজা আমার দিকে দৌড়ে আসছে। শিকল লাগিয়ে দেওয়ার মতো সময় আছে মাত্র। লেয়ার্ড গর্ত বেয়ে চলে এসেছে আমাকে সাহায্য করতে। গেটটা বন্ধ করে দেওয়ার বদলে আমি সেটা মেলে ধরলাম, যতটা পারা যায়। কোনো রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে করিনি। এমনি এমনি হয়ে গেল। ফ্লোরা গতি কমাল না। আমার পাশ কেটে লাফিয়ে বেরিয়ে গেল। লেয়ার্ড আমার পাশে লাফাতে লাফাতে চেঁচাতে থাকল, ‘বন্ধ কর দিদি, গেটটা বন্ধ করে দে!’ একটু পরে বাবা আর হেনরি এসে পৌঁছাল। তারা কেবল ঘোড়াটাকে ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখেছে। আর কিছু দেখতে পায়নি। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করার সময় নেই তাদের হাতে। তারা দৌড়ে আবার গোলাঘরে গিয়ে বন্দুক আর ছুরি বের করল। সেগুলো তুলল ট্রাকে। ট্রাক ছুটল মাঠ পেরিয়ে। লেয়ার্ড চেঁচাল, ‘আমাকেও নাও। আমাকেও নাও।’ হেনরি ট্রাক থামাল। তাকে তুলে নিল ওরা। ট্রাক বেরিয়ে গেলে আমি গেট বন্ধ করে দিলাম।
(সংক্ষেপিত) অনুবাদঃ শিবব্রত বর্মন

আমারে এখন নামাইব ক্যাডা?

বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধের কথা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দেশীয় দুই রাজনৈতিক পরাশক্তি ঠান্ডা যুদ্ধের পরোয়া করে না, তাদের যুদ্ধটা অতীব গরম। সবই ঘটছে ক্ষমতার ক্ষুধার জন্য। এক ক্ষুধার্ত যুবকের গল্প বলি। সে মেলায় ঢুকেছে, কিছু লাভ হয় কি না দেখতে। সার্কাস তাঁবুর সামনে একটা নোটিশ ঝোলানো দেখতে পেল। সেখানে আহ্বান জানানো আছে: যে ৫০ ফুট খুঁটির ওপর উঠে নিচের জালে লাফিয়ে পড়তে পারবে, তাকে দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। বেপরোয়া যুবক ভাবল, এ আর এমন কী? খুঁটিটায় তেল মাখানো ছিল না, তাই উঠতে বেগ বা আবেগ কিছুই পোহাতে হলো না। কিন্তু সমস্যা বাধল ওঠার পরে। অত ওপরে উঠে নিচে তাকিয়ে তার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার জোগাড়। ওদিকে রিংমাস্টার চেঁচাচ্ছেন, ‘লাফ দে ব্যাটা, লাফ দে, নিচে তো জাল আছে, মরবি না।’ কিসের জাল আর কিসের লাফ! যুবকটির সোজা উত্তর, ‘লাফ দেওয়া তো দূরের কথা, আমারে এখন নামাইব ক্যাডা?’ নির্বাচন করতে হলে মাঠে-ময়দানে নামতে হবে। দুই নেত্রী এবং তাঁদের সভাসদেরা কি ভেবেছেন, তাঁরা যে ক্ষমতা আর গর্বের কুতুব মিনারে উঠে বসেছেন, নামতে পারবেন তো সেখান থেকে? রাজনীতির আকাশে কত কথাই তো ওঠে আর ঝড়ে উড়ে যায়।
নির্বাচনের বন্দোবস্ত নিয়ে আলোচনার কথা উঠতে না-উঠতেই পড়ে গেল। এখন আর পত্রমারফত কিছু মিলবে না। এখনকার খেলার নাম ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’। রাজপথ দখলে থাকবে যার, সিংহাসন হবে তার। ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল এ দেশে কোনোকালেই ঘটেনি; ঘটতে দেরি আছে। বাংলাদেশি গণতন্ত্রের ভাষা হলো বল প্রয়োগ। বল প্রয়োগের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, এই রাজনীতি। পারিবারিক কোন্দল থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিবাদ—সবখানেই বল প্রয়োগের ছড়াছড়ি। বিরোধী দলের প্রতিবাদ মানে আগুন-বোমা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ মানে গুলি-গ্রেপ্তার-নিষেধাজ্ঞা। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো বল প্রয়োগের শক্তিতে এখানে সব চলে। এখানে সংবিধান, আইন, ন্যায়-নৈতিকতার কথা বলা বাতুলতা। দিনাজপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হুংকার দিয়েছেন। যে বিএনপি-জামায়াতকে গত পাঁচ বছরে জনস্বার্থে আন্তরিক আন্দোলন করতে দেখা যায়নি, ক্ষমতার সম্ভাবনায় তারাও পাল্টা শক্তি প্রদর্শনে মরিয়া। এসবের ডামাডোলে কাগজের চিঠি উড়ে গেছে। আসলে দুই পক্ষই জনগণকে দেখাতে চায়, তারা কতই না চেষ্টা করেছে সমঝোতার জন্য! নইলে পাতলা চিঠি দলবল নিয়ে বয়ে নেওয়ার কারণই বা কী? মির্জা আর সৈয়দের ফোনালাপের নাটক এমনভাবে করার দরকার কী, যাতে দেশবাসী টেলিভিশনে তা দেখতে ও শুনতে পায়? রাজনীতিকেরা তর্ক করেন প্রকাশ্যে,
আপস করেন গোপনে। আলোচনার লারেলাপ্পা আসলে মায়ার খেলা। এখন সংঘাতের ঝাঁকুনিতে মায়ার পর্দা সরে গিয়ে ভেতরের হিংসাত্মক মূর্তিটা বেরিয়ে পড়ছে। দেশজুড়ে বিজিবি-পুলিশ, ধারা ১৪৪। জগতে সংঘাত মীমাংসার উপায় মাত্র দুটি। হয় দুই পক্ষকে এক ঘরে ঢুকিয়ে আলোচনায় বসাও, নইলে ঠেলে দাও যুদ্ধের মাঠে। সিংহ আর ভেড়াকে একবার আলোচনার জন্য গুহায় ঢুকিয়ে গুহার মুখটা আটকে দেওয়া হলো। ঘণ্টা খানেক পর দেখা গেল সিংহ হেলেদুলে বেরিয়ে আসছে। আর ভেড়া? সে তখন সব আলোচনার ঊর্ধ্বে; সিংহের পাকস্থলীতে সাঁতার কাটছে। বাংলাদেশে সরকারি দল বনমধ্যে সিংহরাজা। বাদবাকি সবাই তার চোখে ভেড়া। উভয়ের মধ্যে আলোচনা কীভাবে সম্ভব? আলোচনা তখনই সফল হবে, যখন তৃতীয় কোনো পক্ষ উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করবে যে, প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষের রান চিবাতে পারবে না। সে রকম তৃতীয় পক্ষ এখানে দৃশ্যমান না হলেও জনগণ বলে একটি কথা আছে। তারা সবই দেখছে... তাহলে কি লগি-বইঠার সঙ্গে দা-কুড়ালের যুদ্ধ হবে? কারা করবে সেই যুদ্ধ? এটা ষাট বা সত্তর বা আশির দশক নয়।
এই যুগে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা আরাম-আয়েশ ও বিত্তবৈভবের মজমায় এতই আসক্ত, বিপদ দেখলেই তাঁদের বিদেশে পাড়ি জমানো অথবা ছোট শ্যালিকার বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে থাকার কথা মনে আসে। বিরোধী দলের কর্মীদেরও জানা আছে, আজ হোক কাল হোক নির্বাচন হবে এবং তাঁরাও জমি-বন-ব্যাংক লোপাটের বিস্তর সুযোগ পাবেন। খামাখা মরে গিয়ে সেই সুযোগ তাঁরা হারাবেন কেন। জনগণও সংঘর্ষ চায় না। ঈদ ও পূজার ছুটির আমেজ এখনো ফুরায়নি। কোরবানির গরুর গোশত যাঁদের ফুরিয়েছে, তাঁরা এখন নেহারি খাবেন, ভুঁড়ি ভাজা খাবেন। মানুষ বোঝে, মসনদে যে-ই বসুন, যাঁর যাঁর তাকিয়া বা খাটিয়া তাঁকে তাঁকেই বইতে হবে। দুই জোটের চর দখলের লড়াইয়ে তাই তাঁরা দার্শনিক দূরত্ব বজায় রাখবেন। এভাবে রাজনীতি পরিণত হয়েছে পেশাদার ও ভাড়াটে ক্যাডারদের সহিংস হোলিখেলায়। লিও টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস উপন্যাসের কাহিনির প্রেক্ষাপট ছিল ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে রাশিয়ার অবস্থা যায় যায়। ফরাসি সেনারা রাজধানী প্রায় দখল করে ফেলল বলে। রুশ সেনাপতির হুঁশ নেই।
তো তাঁর জেনারেলরা দল বেঁধে তাঁকে ধরে বসলেন। দেশ ধ্বংস হয়ে গেল, অথচ আপনি বসে বসে দেখছেন, কেমন সেনাপতি আপনি? ইত্যাদি ইত্যাদি। বৃদ্ধ সেনাপতির উত্তর: ‘ঠিক আছে, আমি তোমাদের কথা শুনব, তার আগে বলো, তোমার জনগণ কী করছে?’ জেনারেলরা হড়বড় করে বলতে লাগল: সব ভীতুর ডিম, ওরা পালাচ্ছে। সেনাপতি মিটি মিটি হাসছেন। বললেন, আর কী করছে ওরা? ব্যবসায়ীরা পুঁজিপাট্টা বাঁচাচ্ছে, কৃষকেরা পানিতে বিষ ঢেলে, খেতখামারে আগুন দিয়ে গবাদিপশুদের নিয়ে পালাচ্ছে। হাসতে হাসতেই সেনাপতি বলেন, ওরা তোমাদের থেকে বিচক্ষণ। ওরা এসব করছে, যাতে ফরাসিরা ভাতে-পানিতে, অর্থাৎ রুটি-মাংসের অভাবে আর শীতের ঠান্ডায় কাবু হয়। মানুষ জানে, এটা যুদ্ধের সময় নয়। যুদ্ধ হবে শীতকালে, যখন ক্ষুধা আর শীতে ফরাসিরা ধুঁকবে; তখনই আমরা ওদের আক্রমণ করব। সেনাপতির কথা ফলেছিল। অসম যুদ্ধের সেনাপতির প্রধান ভরসা জনগণ। জনগণই যুদ্ধের কৌশল ঠিক করে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ দুই দলের সংঘাতের মধ্য দিয়ে কিছু অর্জিত হবে বলে মনে করে না। কৃষক এখন ফসল তুলে ভালো দামের আশায় আছে, শ্রমিকেরা মজুরি বাড়ানোর সংগ্রামে ব্যস্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আরেকটু সচ্ছলতার স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু ভাবতে নারাজ। বৃহত্তর জনগণ চায় শান্তি। বড়লোকদের কুছ পরোয়া নেই। তাদের এক পা আর অর্ধেক পরিবার তো বিদেশেই পড়ে আছে। তাঁদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে ফুরুৎ করেছেন। গণতন্ত্র কে না চায়।
তার থেকেও মানুষ বেশি চায় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা। যাতে দারা-পুত্র-পরিজন নিয়েবেঁচেবর্তে থাকতে পারে। তাই দুই জোট একা একা যতই গরম হোক, মানুষ ভীত হলেও শান্ত। মানুষ অপেক্ষা করছে নির্বাচনের। আগে হোক পরে হোক সেটা হতেই হবে। এ দেশের মানুষ দুর্নীতি সহ্য করলেও, নির্বাচনের পথ বন্ধ করা মানে না। এমন নির্বাচনমত্ত মানুষ আর কোথাও নেই। আমাদের ইতিহাসের সব কটি পালাবদলের পেছনে ছিল ঐতিহাসিক নির্বাচন। ১৯৩৭-এর নির্বাচনের পর মহাজনি ব্যবস্থা উচ্ছেদ হয়েছিল, ১৯৪৬-এর নির্বাচনের পর স্বাধীনতা যেমন-তেমন আসলে মিলেছিল জমিদারি ব্যবস্থা থেকে মুক্তি, ১৯৭০-এর নির্বাচন স্বাধীনতা অনিবার্য করে তুলেছিল। কিন্তু জনগণের ক্ষমতায়নের গণতন্ত্র একবারও আসেনি। এবারও আসবে না। তার পরও রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দেশ চালানো ও ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে স্থায়ী বন্দোবস্ত বা সেটেলমেন্ট জরুরি। হোক সেই বন্দোবস্ত এলিট মহলের মধ্যে; রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সেটা দরকার। সব অস্থিতিশীলতা বিপ্লবীসম্ভাবনা নয়। বল প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা বা ওঠার জায়গায় আপসের মাধ্যমে আগমন ও প্রস্থানের একটা নিয়ম তৈরি করতেই হবে। সব পক্ষ রাজি থাকলে সংবিধান কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু এটা করতে যদি দুই দলের নেতৃত্ব ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁদের অবস্থা হবে ওই যুবকের মতো, যে লোভে পড়ে খুঁটির মাথায় চড়ে আর নামতে পারেনি। তাকে ধরে নামাতে হয়েছিল। ক্ষমতা যেমন বাঘের মতো, যেমন এর পিঠে ওঠা বা নামা বিপজ্জনক, তেমনি ক্ষমতা হলো রসাতল এবং মাছির মৃত্যু হয় মিষ্টির রসে পাখনা ভারী হয়ে রসাতলে ডুবে। এই সরল দৃষ্টান্তগুলো দুই জোটেরই মনে রাখা দরকার।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

বেঁচে থাকবেন মান্না দে

মান্না দের গান কবে থেকে শুনি, সেটা ঠিক করে বলা যাবে না। আমি কেন, অনেক বাঙালিই জানেন না! মান্না দের এমন কিছু গান রয়েছে, যা শুনলে মনে হয় সব বয়সের শ্রোতার জন্য, কিশোর বয়স পার হওয়ার পর থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত; মনে হয় যেন গানগুলো তাঁর জীবন আর অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। লেখা আমাদের জন্য। যেমন অসাধারণ কথা, তেমন সুর, তেমনই গায়নভঙ্গি! নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে বিশ্বজিৎ সাহার গ্রন্থ আর গানের দোকান মুক্তধারা। একদিন সেখানে ঢুকে দেখলাম,
একটা সুদৃশ্য বড় পোস্টার। পোস্টারে লেখা বিশ্বজিতের আয়োজনে মুক্তধারা এই কিংবদন্তি গায়কের গানের আসর বসাচ্ছে নিউইয়র্ক শহরে। বিশ্বজিৎ আমাকে জানালেন, শো-এর আগে বা পরে মান্না দে একদিন দোকানে একঝলকের জন্য আসবেন বলে সম্মত হয়েছেন। সেই সময় বিশ্বজিৎ আমাকে ফোন করে দেবেন। আমি নীরবে চলে এলে কিছুক্ষণের জন্য এ শিল্পীর সঙ্গে গল্প করার সুযোগ ঘটবে। অন্যান্য কাজের চাপে সৌভাগ্য আমার পক্ষে থাকল না! মান্না দে যখন মুক্তধারায় এলেন, বিশ্বজিৎ ফোনে একটু ধরিয়ে দিলেন। আমি এত বড় শিল্পীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাইনি। তবু বিশ্বজিৎ যখন ধরিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে বললাম, আমি আসতে চাই আপনার কাছে। স্বচক্ষে আপনাকে দেখার স্বপ্ন অনেক দিনের। সেই সুযোগটা পরে আমাকে দেবেন। মান্না দে আমাকে কলকাতার একটা ফোন নম্বর দিলেন। আমি তো মহা আনন্দিত! এত বড় শিল্পীর সঙ্গে ফোনে অন্তত কথা বলতে পেরেছি, এটাও খুব কম নয়। দেশে ফিরে এলাম। রাধাকান্ত নন্দী একজন গুণী তবলা-শিল্পী।
মান্না দের গানের সঙ্গে তবলা-সংগত করতেন। একবার কাজে গিয়ে কলকাতায় রাধাকান্ত নন্দীর সঙ্গে কথা হলো। মান্না দের খোঁজখবর পেলাম তাঁর কাছ থেকে। তারপর বেশ কয়েকবারই কলকাতায় যাওয়া পড়েছে। তিনি দুবারই ফোনে কথা বলিয়ে দিয়েছেন শিল্পীর সঙ্গে। মুখোমুখি হওয়া যাচ্ছিল না আর। বারবার তাঁকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণও জানিয়েছি। কিন্তু তাঁর ব্যস্ততা আর নানা ঝামেলায় আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। দেখাও হচ্ছিল না কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত ব্যাটে-বলে একবার হলো। কলকাতায় সেবার গিয়ে পেলাম তাঁকে। কিন্তু সেদিনই তিনি চলে যাচ্ছেন ব্যাঙ্গালুরুতে। যেখানে তিনি বসবাস করেন স্ত্রীকে নিয়ে। সেই প্রথম আমি জানলাম, তিনি কলকাতায় থাকেন না। তরুণ বয়সে হিন্দি ছবির গানের ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন গায়ক হিসেবে থাকতেন মুম্বাইতে। পরে বিয়ে করেন ব্যাঙ্গালুরুতে। সেবার আমি নাছোড়বান্দা। জানালাম, তবে আমি ব্যাঙ্গালুরুতে আসছি। বললেন, আসো। তবে এমন কী কথা বলো তো, যে জন্য তুমি ব্যাঙ্গালুরু আসবে? বললাম, শুধু আপনার সঙ্গে গল্প করতেই আসতে চাই। তাঁর কাছে আমার অনেক প্রশ্ন। আমাদের জাদুকর-গায়ক! সেই সময় আনন্দলোক পত্রিকায় তাঁর একটা বড় সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল।
যেখানে তিনি বলেছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কোনো বড় মাপের শিল্পী নন। মান্না দের কাছে আমি সেই মন্তব্য নিয়েও জিজ্ঞেস করতে চাই সরাসরি। মনে খটকা লেগেছিল। এ কেমন কথা বললেন মান্না দে! মান্না দে যেমন বিশাল মাপের গায়ক, সে সময়ে হেমন্তও তো ছিলেন আরেক বটবৃক্ষ। ওই প্রজন্মে হেমন্ত মুখার্জি, মানবেন্দ্র, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ প্রমুখ একঝাঁক শিল্পী এসে সমৃদ্ধ করেছিলেন বাংলা গানকে। অবশ্যই তার মধ্যে মান্না দে ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। তাই বলে হেমন্ত সম্পর্কে এহেন মন্তব্য তাঁর মুখে কি মানায়? জীবনে অনেক ভক্তের মুখোমুখি হয়েছেন মান্না দে। কিন্তু কল্পনা করেননি, এত পাগলভক্তও তাঁর আছে। বাড়িতে ঢুকতেই বললেন মান্না দে, তোমাকে আমি আধঘণ্টার বেশি সময় দিতে পারব না। এমনকি চা-ও খাওয়াতে পারব না। তারপর যা হলো, আধঘণ্টা নয়, বললেন দুই ঘণ্টা কথা। জানালেন, আনন্দলোক কেমন করে হেমন্ত সম্পর্কে আমার বরাত দিয়ে এটা লিখে দিল আমি বলতে পারব না। এমন কথা কি আমি বলতে পারি? হাতে কলম আছে আর লিখে দিল সেটা? বললাম, প্রতিবাদ পাঠান। বললেন, লাভ কী?
সারা জীবন এমন বহু নিউজ ভুল ব্যাখ্যা করে ছাপা হয়েছে। সেসব নিয়ে যদি মাথা ঘামাই, তবে গানটা হবে না। আমার গানের কাজ আমি করে যাই। ওদের লেখার কাজ ওরা লিখে যাক। আরও জানালেন, আমার যারা ভক্ত, যেমন তুমি বুঝেছ। আমি এমন কথা বলতে পারি না। তারা তো ঠিক বুঝেছে, আমি কতটা সাধারণ মানুষ। এ ধরনের আলটপকা মন্তব্য লিখে দিয়ে কোনো কোনো কাগজ সেটা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে। বেশি বড় বড় মানুষের মুখোমুখি হতে ভয় পাই বলে আমার জীবনে কফি হাউসেই যাওয়া হয়নি। সে জন্য কলকাতা থেকে দূরে থাকি। আমার স্ত্রী বিদুষী। পড়াশোনা করা মেয়ে। গান আর তাঁর সঙ্গে জীবনযাপনের মধ্যেই আমার যত আনন্দ! মান্না দে বললেন, আমার গাওয়া গানের মধ্যেও আমি মারপ্যাঁচ করার চেষ্টা করি না। লঘুভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করি।
গায়কির কারণে যদি সেটা বিশেষত্ব পায়, পায় উচ্চাঙ্গ মর্যাদা, সেখানে আমার কোনো হাত নেই। আছেন সৃষ্টিকর্তা সহায়। বাংলা গানে হেমন্ত, হিন্দিতে রফি আর কিশোর কুমারের সঙ্গে নিজের একটা আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেটা ভেবেই তিনি অনেক তৃপ্ত। এর বেশি কিছু প্রত্যাশা করেন না! মান্না দে সবশেষে বললেন, আমি সবকিছুর পরেও খুব সাধারণ মানুষ হয়ে আজীবন থাকতে চাই। যে কারণে ভিড়ভাট্টা, মূল গণ্ডির বাইরে ব্যাঙ্গালুরুতে এসে থাকছি। আমি নিজের মতো করে নিজের সুখেই বাঁচতে চাই। কিন্তু কোনো শিল্পীই নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে পারেন না। তাঁকে বেঁচে থাকতে হয় শ্রোতাদের হূদয়ে, মনে। মান্না দেও তেমনিভাবে বেঁচে থাকবেন আমাদের অন্তরজুড়ে।
ফরিদুর রেজা সাগর: গণমাধ্যম-ব্যক্তিত্ব।

সংঘাতের পথ ছাড়ুন

নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় জনমনে যে গভীর আশঙ্কা-উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কিছুটা হলেও লাঘব হবে ঢাকায় আজকের বিএনপির সমাবেশ অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেওয়ায়। বিএনপি দলীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে অনুমতি চাইলেও তাদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে বলেছে ডিএমপি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আজ রাজধানীতে যে সমাবেশ অনুষ্ঠানের আহ্বান করেছে, তা তাদের সংবিধানপ্রদত্ত রাজনৈতিক অধিকার। সুর্নিদিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া তাদের এই অধিকার খর্ব করার এখতিয়ার পুলিশ কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের নেই। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও জননিরাপত্তা ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কার কথা বলে তাদের সমাবেশ অনুষ্ঠানের পথ বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। সে বিবেচনায় বিলম্বে হলেও সরকার বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। তবে সরকার ঢাকায় বিএনপিকে সমাবেশ করতে দিলেও চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, বগুড়া, রাজশাহীসহ বিভিন্ন শহরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে।
আবার অনেক শহরেই বিএনপি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা অগ্রাহ্য করে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। কয়েকটি স্থানে বিএনপির মিছিল-সমাবেশের বিপরীতে আওয়ামী লীগও অনুরূপ কর্মসূচি ঘোষণা করায় সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বগুড়ায় এ জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, যা বিএনপি ভঙ্গ করার হুমকি দিয়েছে। চট্টগ্রামেও বিএনপি আজ দুপুরের পর লালদীঘি ময়দানে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি পালন করবেই—এমন ঘোষণা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি কেবল উদ্বেগজনক নয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। সবকিছু মিলিয়ে যে মুখোমুখি সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটা অনিবার্য ছিল না। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অবিলম্বে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকারের উচিত নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে এখনই আলোচনায় বসা। কেননা তারা যে নাশকতার আশঙ্কা করছে, তা অপনোদনের উপায় আলোচনায় বসা।
বিরোধী দলের নেতা নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা থেকে আরও ছাড় দিতেও রাজি আছেন বলে বুধবার সংসদে জানিয়েছেন বিএনপির সাংসদেরা। সে ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাকে টেলিফোন করবেন কিংবা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে চিঠি লিখবেন—এই সংবাদ মোটেই মানুষকে আশ্বস্ত করেনি। তারা দুই পক্ষের মধ্যে দ্রুত একটি ফলপ্রসূ আলোচনাই দেখতে চায়। একইভাবে বিএনপিসহ সব বিরোধী দলের এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের সব কর্মসূচি হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তাতে ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও কিংবা জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কিছু ঘটবে না। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উভয় পক্ষের ধৈর্য ও সংযম।

স্বৈরশাসকদের শাস্তি হওয়া উচিত : নওয়াজ

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকারকে যারা উৎখাত করেছে এবং আত্মঘাতী বোমা হামলার সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের উদ্দেশে মঙ্গলবার দেয়া এক ভাষণে এসব কথা বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফররত পাক প্রধানমন্ত্রী।
পাকিস্তানে যারা আত্মঘাতী বোমা হামলা, বিচারকদের অপসারণ এবং নির্বাচিত সরকার উৎখাতের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে তাদের খুঁজে বের করার জন্য পাকিস্তানিদের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি। এ ধরনের কোনো কোনো অপরাধের জন্য ব্যক্তি হিসেবে পাকিস্তানের সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ দায়ী বলে উল্লেখ করেন নওয়াজ শরিফ। তিনি আরও বলেন, ‘২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর সৃষ্ট চাপের মুখে পারভেজ মোশাররফ সরাসরি নতজানু হয়ে গিয়েছিলেন।’
সামরিক শাসকদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে একাধিকবার নওয়াজ জোর দিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ সব ঘোষণার মাধ্যমে ওয়াশিংটন এ বার্তাই পেয়েছে যে মার্কিন প্রশাসন যেন পারভেজ মোশাররফ প্রতি কোনো সমর্থন না জোগায়। এ বছরের মার্চে স্বেচ্ছানির্বাসনের ইতি ঘটিয়ে দেশে ফেরার পর থেকে পারভেজ মোশাররফ গৃহবন্দি হয়ে আছেন। এছাড়া এ ভাষণে তিনি তালেবানদের সঙ্গে পাক সরকারের শান্তি আলোচনা করার সিদ্ধান্তের বিষয়েও কথা বলেন। তিনি এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, ‘ব্রিটেন যদি উত্তর আয়ারল্যান্ডে এ জাতীয় শান্তি আলোচনা করতে পারে তবে পাকিস্তান কেন পারবে না।’ তথ্যসূত্র : ডন অনলাইন।