Sunday, October 12, 2014

‘সরকারে না থাকলে সবই বিধিবহির্ভূত হয়ে যায়’ -মির্জা আব্বাস

সরকারে না থাকলে সবই বিধিবহির্ভূত হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস। বলেছেন, যারা সরকারে আছেন তারা যাই করেন তা সবই বিধিভুক্ত হয়ে যায়। আর যারা সরকারে  নেই, তাদের সবই বিধিবহির্ভূত হয়। আজ বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডকে প্লট বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়নি উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, সরকার চাইলে নকশা করতে পারে, আবার সরকার চাইলে নকশা বাতিল করতে পারে। এখানে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নকশা পছন্দ না হলে তারা নকশা বাতিল করতেই পারে। সাংবাদিকেরর প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, আমরা বিধি মোতাবেক করতে বলেছি। এখন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ যদি না করে তাহলে তো আর আমার কিছু করার নেই।
এদিকে সকালে একই ঘটনায় নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে  জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের শাজাহান খান বলেন, আমাকে সাক্ষী হিসেবে তলব করা হয়েছে। আমি আমার বক্তব্য দিয়েছি। তবে ওই সময় ঝিলমিল বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।   তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি মিলে (ঝিলমিল বহুমুখী সমবায় সমিতি) করি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন শ্রমিক সংগঠনের জন্য ঝিলমিল বরাদ্দ  দেয়া হয়। এর পর চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে ঢাকা সাংবাদিক সমিতিকে অনিয়ম করে সাত একর জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।  গত ২২শে  সেপ্টেম্বর এ মামলার তদন্তে সাক্ষী হিসেবে  নৌ পরিবহণ-মন্ত্রী শাজাহান খান এবং বিএনপি নেতা সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের বক্তব্য নেয়ার জন্য তলব করে দুদক।

আঁধার পেরিয়ে আলোর পথে by মশিউল আলম

এ বছর শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই ও ভারতের কৈলাস সত্যার্থী। দুজনেরই অবদানের ক্ষেত্র শিশু, শিক্ষা ও শৈশব। তাঁদের কাজের ওপর আলোকপাত করে প্রথম আলোর আয়োজন...

পাকিস্তানের তালেবান যখন ১৫ বছরের কিশোরী মালালা ইউসুফজাইকে মাথায় গুলি করে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, তখন তার হাতে ছিল বই। তার দুই বছর পর যখন তাকে জানানো হলো সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে, সে মুহূর্তেও তার হাতে ছিল খাতা-কলম; যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরে মেয়েদের একটি বিদ্যালয়ে সে রসায়নশাস্ত্রে পাঠ নিচ্ছিল। তালেবানের গুলি খেয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা অকুতোভয় শিক্ষাসংগ্রামী মালালা ইউসুফজাইয়ের এই স্বীকৃতি তার স্বদেশ পাকিস্তানের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পৃথিবীর যেসব দেশে মেয়েরা সবচেয়ে কম সংখ্যায় বিদ্যালয়ে যায়, সেগুলোর মধ্যে পাকিস্তান তৃতীয়। উপরন্তু মালালার বাসভূমি সোয়াত উপত্যকায় তালেবান মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তারা একের পর এক বোমা মেরে উড়িয়ে দিচ্ছিল মেয়েদের বিদ্যালয়গুলো।
মালালা ও তার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই তালেবানের নিষেধাজ্ঞা ও রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে সোয়াতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষালাভের অধিকারের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁদের সেই সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে মালালার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রতীকী তাৎপর্য সোয়াত উপত্যকা, পাকিস্তান কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সারা পৃথিবীর শিক্ষাবঞ্চিত শিশু, বিশেষত মেয়েশিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম উজ্জীবিত হবে মালালা ইউসুফজাইয়ের এই বিরল স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।
এ পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্ম ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় এক পাখতুন পরিবারে। তার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই একজন কবি। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তালেবানের সদস্যরা মালালার মাথায় গুলি করে।
প্রথমে পাকিস্তানে ও পরে যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসার ফলে তার প্রাণ রক্ষা পায়। এই ঘটনার বছর আড়াই আগে, মালালার বয়স যখন ১২ বছর, তখন তার লেখা ডায়েরির কয়েকটি পাতার বাংলা অনুবাদ আমরা এখানে প্রকাশ করছি। তালেবান-শাসিত সোয়াত উপত্যকার পরিবেশ, শিক্ষার প্রতি ছোট্ট মেয়েটির গভীর অনুরাগ ও পারিপার্শ্বিক কিছু খণ্ডচিত্র এখানে ফুটে উঠেছে।

শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০০৯
খুব ভয় করছে
কাল রাতে একটা ভয়ানক স্বপ্ন দেখলাম... মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালেবান। তবু সকালের নাশতা খেয়ে ভয়ে ভয়ে স্কুলে গেলাম। যাওয়ার পথে শুনলাম একটা লোক আমায় শাসাচ্ছে, ‘তোকে মেরে ফেলব।’ সোয়াতে সেনা অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এমন স্বপ্ন আমি প্রায়ই দেখি।

রোববার, ৪ জানুয়ারি ২০০৯
স্কুলে যেতে হবে
আজ ছুটি। ঘুম ভেঙেই শুনলাম গ্রিন চকে তিনটা লাশ পড়ে আছে, সেই নিয়ে কাদের সঙ্গে যেন আলোচনা করছে বাবা। সেনা অভিযান শুরুর আগে রোববারগুলোয় কত জায়গায় পিকনিক করতে যেতাম। কিন্তু দেড় বছর হলো সেসব বন্ধ। আগে রাতে খাওয়ার পর হাঁটতেও বেরোতাম। এখন সূর্য ডোবার আগেই ঘরে ঢুকতে হয়। কাল স্কুলে যেতে হবে। ভাবলেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।

সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০০৯
রঙিন জামা পরা বারণ
স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। তখনই মনে পড়ল ইউনিফর্ম পরে যাওয়া বারণ। তাই আমার প্রিয় গোলাপি জামাটা পরলাম। প্রার্থনার সময় আমাদের রঙিন পোশাক পরতে বারণ করা হয়। কারণ, সেটা তালেবান পছন্দ করবে না। বিকেলে বাড়ি ফিরে টিভিতে শুনলাম শাকার্দায় কারফিউ উঠে গেছে। বেশ আনন্দ হলো। স্কুলে যিনি ইংরেজি পড়ান, তিনি ওখানে থাকেন। আশা করি এবার স্কুলে আসবেন।

বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০০৯
গুলি নেই, ভয় নেই
মহররমের ছুটি কাটাতে এসেছি বুনেয়ার-এ। পাহাড় আর ঘন সবুজের জন্য এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দ। এখানে সোয়াতের মতো অশান্তিও নেই। পীর বাবার সমাধিতে প্রার্থনা করতে গিয়েছিলাম। মা কয়েকটা কানের দুল আর চুড়ি কিনেছে।

শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০০৯
মাওলানা ছুটিতে?
স্কুলে বন্ধুদের বুনেয়ার ভ্রমণের গল্প করলাম। আর আলোচনা হলো মাওলানা শাহ দওরানের মৃত্যুর গুজব নিয়ে। দিন কয়েক হলো উনি এফএমে বক্তৃতা দিচ্ছেন না। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা উনিই জারি করেছিলেন। বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন বলল, উনি মারা গেছেন। একজন বলল, উনি নাকি ছুটি নিয়েছেন! সন্ধ্যায় টিভিতে শুনলাম লাহোরে বিস্ফোরণ হয়েছে। কেন যে পাকিস্তানে এই বিস্ফোরণগুলো হয়!

বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০০৯
আর হয়তো স্কুলে যাওয়া হবে না
মন ভালো নেই। কাল থেকে শীতের ছুটি পড়ছে। কিন্তু কবে খুলবে জানা নেই। প্রিন্সিপ্যালও কিছু বলেননি। আমার মনে হয় ১৫ জানুয়ারি থেকে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালেবান। তাই কেউই এবারের ছুটি নিয়ে খুশি নয়। আজ স্কুলের শেষ দিন। তাই একটু বেশি সময়ই খেলা হয়। বাড়ি ফেরার সময় স্কুলবাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো আর বোধ হয় কখনো ওখানে যাওয়া হবে না।

দূরের নয় তো কাছেরই লোক by ফারুক ওয়াসিফ

এ বছর শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই ও ভারতের কৈলাস সত্যার্থী। দুজনেরই অবদানের ক্ষেত্র শিশু, শিক্ষা ও শৈশব। তাঁদের কাজের ওপর আলোকপাত করে প্রথম আলোর আয়োজন...

২০১৪ সালের শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার অবতরণ করল যেন শিশু-কিশোরদেরই কোলে। পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই আর ভারতের কৈলাস সত্যার্থীর জীবন, স্বপ্ন, ভালোবাসা ও সংগ্রামের কেন্দ্রে রয়েছে শিশু, শৈশব ও মুক্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি। কৈলাস সত্যার্থী যেন এক বিরাট শিশু। তাঁর কর্মী ব্যক্তিত্বে শিশুর সারল্য আর সাধুর নিষ্ঠা একাকার হয়ে আছে। কাজ ও চিন্তায় কৈলাসের মধ্যে তাই স্বাভাবিকভাবেই মহাত্মা গান্ধীর ছায়াপাত দেখেন অনেকে।
‘আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করি, যেখানে অনেক সময় কপটেরাই শক্তিশালী। তারা বলে একটা আর করে আরেকটা। আমেরিকার দিকেই দেখুন, করপোরেশনগুলোর অতিরিক্ত লোভের জন্য সেখানে সরকারকে বেইল-আউট কর্মসূচির নামে সাত ট্রিলিয়ন ডলার দিতে হচ্ছে। সবই যাচ্ছে ব্যাংক-বাজারের কাছে। অথচ শিশুদের শিক্ষার জন্য তারা মাত্র ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে রাজি নয়। সুতরাং গভীরভাবে এটা একটা নৈতিক প্রশ্ন।’ (৮–২–২০০৯, প্রথম আলো) ২০০৯ সালে বাংলাদেশে এসে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কথাগুলো। এটা তাঁর কথার কথা না, এটা তাঁর বিশ্বাস। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের ৮০ হাজার শিশু শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কৈলাস সত্যার্থী একাধারে বৈশ্বিক শিক্ষা অভিযান এবং শিশুশ্রমবিরোধী বৈশ্বিক পদযাত্রার প্রধান। তাঁর নেতৃত্বেই এ দুটি আন্দোলন তৃণমূল পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক দাবিতে পরিণত হয়। শিশুশ্রম বন্ধের দাবিতে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৯৯৮ সালে ১০০টি দেশে ৮০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা সংগঠিত করেন। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রভাবে অনেক দেশে শিক্ষা বিস্তার ও শিশুশ্রম বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের ছোট তালিকায় প্রথম তাঁর নাম আসে।
তিন দশক ধরে কৈলাস কাজ করছেন, অথচ শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে ‘বাচপান (শৈশব) বাঁচাও আন্দোলন’ চালু করেন তিনি। শিশুদের শ্রমদাসত্ব ও অশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা কৈলাসের কাছে নৈতিক প্রশ্ন বটে। কোনো দেশের শিশুদের বড় একটি অংশ যদি মুনাফা ও অবহেলার শিকার হতেই থাকে, তবে সেই দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের কীভাবে দায়মুক্ত ভাবেন?
সেই দায়টাই যেন শোধ করতে চান কৈলাস। সবকিছুরই মূল্য দিতে হয়, এমনকি জনসেবারও। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নিয়মিতভাবে হানা দেন কারখানায়, শিশু পাচারের আস্তানায়, বাল্যবিবাহের ঘাঁটিতে। ঝুঁকির খতিয়ানটা এমন: ‘আমার পা ভেঙেছে, মাথা ফেটেছে, পিঠ ভেঙেছে, কাঁধ ভেঙেছে। আমার সহকর্মীদের একজনকে গুলি করে এবং অন্যজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার অনুজ সহকর্মীদের বেশির ভাগই প্রহৃত হয়েছেন। এটা কোনো গোলাপযুদ্ধ নয়। অবশ্যই এটা এক চ্যালেঞ্জ। আমি জানি, এই লড়াই খুবই দীর্ঘ, কিন্তু দাসত্ব তো কোনোভাবেই মানা যায় না। এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। নৈতিকভাবে আমি আমার দেশে শিশুদের অধিকার হরণ কোনোভাবেই মানতে পারি না। এই অর্থে আমি অস্থির মানুষ। আমরা এ রকমটা আর চলতে দিতে পারি না।’ নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগের সপ্তাহেও তিনি ছুটে গেছেন শিশুশ্রম ব্যবহারকারী এক কারখানায়।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক নগর বিদিশায় জন্ম কৈলাসের; ১৯৫৪ সালে। বিদ্যুৎ প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষে যোগ দেন পেশায়। কিন্তু অচিরেই নেমে পড়েন স্বেচ্ছাসেবামূলক বেসরকারি উদ্যোগে। কেবল শিশুদের শ্রমদাসত্ব ও পাচারের হাত থেকেই নয়, তিনি শুরু করেন শিশুশ্রম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেও আন্দোলন। এভাবে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন অনেক তরুণের। সর্বকালের সেরা মানবাধিকারকর্মীদের তালিকায় তাঁকে আমরা পাই ডেসমন্ড টুটু, এলি ওয়েসেল ও দালাই লামার মতো ব্যক্তির পাশে। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দিকনির্দেশনায় জড়িত।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক হয়নি, এমন কোনো বছর যায়নি। অনেকের মনেই শান্তির বরমাল্যভূষণে মালালা ও কৈলাসের চেয়ে অন্য কেউ হয়তো বেশি গ্রহণীয়। কারও মতে, শান্তি পুরস্কার উত্তরোত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা এবং প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি করে ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সংগঠকদের বেছে নিচ্ছে; যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা গ্রামীণ ব্যাংক। তাহলেও কৈলাসকে নিয়ে বিতর্ক কম। অন্যদিকে তালেবানি শক্তির বিরুদ্ধে মালালা চরিত্রের রাজনৈতিক ব্যবহার ঘটলেও কৈলাসের বেলায় এই অভিযোগ বেমানান। কারণ, তিনি নিজেকে মানবিক ও সামাজিক সমতলেই নিয়োজিত রাখতে চান। এই বিনয় ও সাধুতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
এনজিও কার্যক্রমের নায়ক হলেও সরকার ও রাজনীতির ভূমিকাকে কৈলাস খাটো করেন না। প্রথম আলোকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তাই তিনি জোর দেন রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর: সবার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে শিক্ষা মৌলিক মানবাধিকার। এটা দান-খয়রাতের বিষয় নয়, এটা কেবল উদারতার ব্যাপার নয়, এটা কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়। আর অধিকার নিশ্চিত হয় অধিকারকেন্দ্রিক কর্মসূচি ও অধিকার-মনা পদ্ধতির মাধ্যমে। যদি আমরা শিক্ষাকে পণ্য করে তুলি, তাহলে সবচেয়ে ভালো মানের শিক্ষা কিনবে সবচেয়ে বেশি ক্রয়ক্ষমতার অধিকারীরা, অর্থাৎ উচ্চমধ্যবিত্ত। আবার যদি একে দয়ার ব্যাপার করে তুলি, তাহলে জনগণ সবচেয়ে খারাপ মানের শিক্ষাটাই পাবে। কিন্তু একে মৌলিক অধিকার মনে করলে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব এর সুবন্দোবস্ত করা। এই দায়িত্ব অন্য কারও হাতে অর্পণের প্রশ্নই আসে না।’
উপমহাদেশীয় হিসেবে, অভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশ হিসেবে এবং এই অন্ধকার সময়ে মানবতার জন্য ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠী হিসেবে কৈলাস সত্যার্থীকে দূরের নয়, কাছের লোক বলেই মনে হয়।

বাল্যবিবাহ ও ভয়াবহ পরিণতি -বিয়ের বয়স বিতর্ক by রওশন আরা বেগম

রাতের খবর শুনতে গিয়ে আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দুঃস্বপ্নের ঘোরে রাত কাটল। সকালে পত্রিকার খবরটি দেখে আমি আমার পরিচিত নারী সংগঠকদের ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে মতামত দেওয়ার কথা জানালাম। মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে নামিয়ে ১৬ বছর করার জন্য মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত হচ্ছে। আমি দীর্ঘ এ জীবনে প্রতিদিনের কার্যক্রমের মধ্যে সব সময়ই ব্যাপারটি নিয়ে ভাবছি—বয়সটি ১৮ থেকে আরও একটু বাড়ানো যায় কি না। গ্রামে কাজি সাহেবদের সঙ্গে আলোচনা করে বলেছি এই বয়সে বিয়ের ভয়াবহতার কথা। ইমাম সাহেবদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে বলেছি, খুতবা দেওয়ার সময় মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের ক্ষতিকারক দিকটা তুলে ধরে গর্ভকালটা যেন চিকিৎসকের পরামর্শে চলে, সে ব্যাপারে কিছু বলতে। সেই সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই ঘটনা। ষোড়শী একটি কন্যা তার নিজের দেহের পরিবর্তনটাই বুঝতে পারে না। খোলামেলাভাবে যদি বলি, ‘মাসিকের কাপড়টি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে’, ‘কয়বার ব্যবহার করতে হবে’, ‘কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে’—কিছুই সে জানে না। কারণ, বাড়িতে ব্যাপারটি লুকিয়ে রাখতে বলা হয়, কারও সামনে আলোচনা করা যাবে না। পাঠ্যবইয়ে প্রজননের ওপর কিছু জেনেছে সে তেলাপোকা এবং ব্যাঙের জীবন পড়ে, মানবদেহের পরিবর্তনের কথা তার অজানা। বাড়িতে মা-বোনদের সঙ্গে কথাটি আলোচনা করতে গেলে বলা হয় এটি লজ্জার ব্যাপার, এ ব্যাপারে কোনো আলোচনা নয়। কাজেই দেহের পরিবর্তনের ব্যাপারটা শুধুই লুকিয়ে রাখা, এর ভালো-মন্দ জানার অধিকার তার নেই। এরই মধ্যে তাকে যখন অন্য আরেকটি পরিবারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং পরিচিত-অপরিচিত একজন পুরুষের সঙ্গে একটি বাক্যবিনিময়ের মধ্যে সঙ্গমে পাঠানো হয়, সেটিকে ধর্ষণ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। কারণ, ১৬ বছর বয়সটিতে তার মানসিক এবং শারীরিক কোনো দিক থেকে সে নতুন এ জীবনটিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। জীবনের প্রথম ওই রাতের অভিজ্ঞতায় অনেকের জীবনই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা এলেই ডিভোর্সের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সন্তান না নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রক তার জন্য গ্রহণযোগ্য হয় না, সে গ্রহণ করতে পারে না এবং অতিদ্রুত সে গর্ভধারণ করে।

শরীরটা গর্ভ নেওয়ার জন্য পরিপূর্ণ তৈরি নয় বলেই অ্যাবরশনও বেড়ে যায়। সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায়, কুড়ির আগে এবং পঁয়ত্রিশের পর যারা গর্ভধারণ করে, তাদেরই অ্যাবরশন হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। শুধু তা-ই নয়, সময়ের আগেই তাদের সন্তান জন্ম হয়ে যায়, যাকে আমরা বলি প্রি–টার্ম ডেলিভারি এবং এই প্রি–ম্যাচিউর বাচ্চার মৃত্যুর হার অনেক বেশি এবং যেগুলো বেঁচে যায় তাদের জীবনের জটিলতাও অনেক বেশি এবং এসব জটিলতায় একটি বিশাল দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং দেশকে বহন করতে হয়। পূর্ণ সময়ে ডেলিভারি হলেও তাদের দেহ যেহেতু ঠিকভাবে তৈরি নয়, সে জন্য বাধাগ্রস্ত প্রসব এবং বিলম্বিত প্রসব তাদের বেশি হয়। ফলে মা ও শিশু দুজনের জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়। মায়ের যোনি ছিঁড়ে পায়খানা ও যোনিপথ এক হয়ে যায় এবং অনেক পরিবারে এভাবেই তাকে দীর্ঘ জীবন কাটাতে হয়, অনেকেরই প্রস্রাব ও যোনিপথ এক হয়ে গিয়ে সারাক্ষণ প্রস্রাব ঝরতে থাকে। এ ধরনের নারীকে স্বামী ত্যাগ করে, সংসার তাকে গ্রহণ করতে চায় না, ভয়ানক একটি দুর্বিষহ জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে তাদের জন্য একটি আলাদা বিভাগ (Fistula Centre) খোলা হয়েছে এর সংখ্যার ভয়াবহতার জন্য।
গর্ভকালীন ও গর্ভ-পরবর্তী সময়ে তাদের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো পুষ্টিই তারা পায় না, যার ফলে সন্তানটিও অপরিপক্ব হয় এবং নিজেও অপুষ্টিতে ভুগে পরবর্তী সময়ে যে কষ্টে ভোগে, স্বামীর ঘর করা তার জন্য কষ্টদায়ক হয়। তখন তাকে সূতিকা রোগী আখ্যা দিয়ে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
যাঁরা হয়তো বা কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই সময়টি পার করতে পেরেছেন, তাঁরা যদি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন, তবে তাঁদের দ্রুতই চাপ দেওয়া হয় পরবর্তী সন্তানের জন্য এবং সেটি যেন পুত্রসন্তান হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৮-১৯ বছরের মধ্যেই তিনি দুই-তিন সন্তানের মা হয়ে গেছেন। তাঁরা নিজেরাও অপুষ্টিতে ভোগেন, সন্তানেরাও কেউই ঠিক পরিমাণমতো বুকের দুধ পায় না এবং অপুষ্টিতে ভোগে। এর দায়ভারটি কি শুধুই তাঁর? সমাজ-সংসার এবং দেশকে কি এর দায়ভার নিতে হয় না?
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন হচ্ছেগর্ভধারণের সময়ের আরও একটি ভয়াবহ জটিলতা হলো একলাম্পশিয়া অথবা খিঁচুনি। এই জটিলতায় শিকারের সংখ্যাও বেশি এবং এতে মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি। এসব জটিলতার সংখ্যা বেশি হওয়াতে প্রতিটি মেডিকেল কলেজে আলাদা ওয়ার্ড (একলাম্পশিয়া ওয়ার্ড) খোলা হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে তাঁকে কোনো চিকিৎসা না দিয়ে জিন-ভূতের আছর বলে ঝাড়ফুঁক করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
সন্তান গর্ভধারণের বিভিন্ন জটিলতার পাশাপাশি তিনি স্ত্রীরোগের নানা জটিলতায় ভুগছেন। তার মধ্যে PID-এর (Pelvic Inflammatory Disease) কষ্টে ভুগছেন। সারাক্ষণ তলপেটে ব্যথা, গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব, জরায়ুর প্রদাহ ইত্যাদি নিয়ে ভুগতে ভুগতে স্বামী-সংসারজীবন তাঁর দুর্বিষহ হয়ে পড়ে, স্বামীর পরিবার তখন চিন্তা করে, মেয়েটি স্বামীর ঘর করার অনুপযুক্ত, তাই স্বামীর অন্যত্র বিয়ের প্রয়োজন। সবচেয়ে ভয়াবহ যে জটিলতা তাঁকে আক্রান্ত করে সেটি হলো জরায়ুর মুখের ক্যানসার। বাংলাদেশের এই অসুখের সংখ্যা অনেক বেশি এবং শুধু এই অল্প বয়সে বিয়ে এবং সন্তান নেওয়াই হচ্ছে এর প্রধান কারণ। এই ক্যানসার বন্ধ রাখার প্রকল্পে সরকার/এনজিও/বিভিন্ন সংগঠন গ্রামপর্যায় থেকে শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নানা ধরনের কার্যক্রম নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও প্রতিনিয়ত জরায়ুর মুখের ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে।
ইতিমধ্যে অনেক সভা-সমিতিতে সম্মানিত বক্তারা অনেক কথা বলেছেন। আমি শুধু স্বাস্থ্যগত দিক থেকে কীভাবে একটি ষোড়শী মেয়েকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়, তার খতিয়ান দিলাম। আমি জানি, বর্তমান সরকারই নারীকল্যাণমুখী সরকার, কাজেই তারা নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে আবারও ভাববে।
রওশন আরা বেগম: অধ্যাপিকা ও বিভাগীয় প্রধান (প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ), হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়- ষষ্ঠ পেরিয়ে সপ্তম বছরে by তুহিন ওয়াদুদ

দেশভাগের পর থেকে রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল রংপুরবাসীর। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি আবার জোরালো হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ রংপুরবাসীর আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিবেচনা করে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন (যদিও বর্তমানে সেই নামফলক এখন আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না)। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম লুৎফর রহমানকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের জন্য ৯৯ কোটি টাকা অনুমোদন দেয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত অবকাঠামোগত কোনো কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেনি। বরং রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় করে। যদিও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কখনো নিজের নামের সঙ্গে সচেতনভাবে ‘বেগম’ শব্দটি লেখেননি। সব বিভাগে রোকেয়া স্টাডিজ পড়ানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও পড়ানো হয় না।
দৃশ্যত কোনো কারণ ছাড়াই প্রথম উপাচার্যকে অব্যাহতি দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মু. আবদুল জলিল মিয়াকে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত, উপাচার্য হিসেবে তাঁর কী দায়িত্ব, সবকিছুই তিনি ভুলে যান এবং বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। তিনি যোগদানের এক বছরের মধ্যে প্রথম আলোয় ‘এটি একটি পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়’ শিরোনামের খবর হয়েছিল।
সরকার তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তিনি আত্মীয়বৃত্তের পরিধি বাড়াতে থাকেন, যা চল্লিশ সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়োগ-বাণিজ্য। এসব করতে গিয়ে তিনি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেননি। নিয়ম-নীতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি ‘নর্থ বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। যার সনদ দেওয়ার কথা ছিল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর মালিকানা ছিল তাঁর সঙ্গে তাঁর মেয়েরও। কয়েকজন শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষার্থী এর বিরোধিতা করে আন্দোলন করেন। আন্দোলন বন্ধ করতে তৎকালীন উপাচার্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পেটোয়া বাহিনীর দ্বারা আঘাত করেন, তাঁদের অনেককে সাময়িক বরখাস্ত করেন, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করেন। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের জামায়াতি সাজানোর চেষ্টাও কম হয়নি। শেষ পর্যন্ত সরকার উপাচার্যের মেয়াদ পূর্তির আগেই অব্যাহতি দেয়। যখন তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাউন্টে সাত-আট কোটি টাকা থাকার কথা থাকলেও ১৩৮ টাকা ছিল মাত্র। বর্তমানে তিনি দুদকের মামলায় অভিযুক্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।
অপরিকল্পিতভাবে মাত্র ছয় বছরে ২১টি বিভাগ খোলা হয়েছে। এতগুলো বিভাগ আর এত শিক্ষার্থীর জন্য যে পরিমাণ সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। শিক্ষকের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি বইয়ের সংখ্যাও খুবই নগণ্য। একেকটি বিভাগে তিন থেকে সাতজন শিক্ষক যখন ছয়টি ব্যাচের ক্লাস নিয়েই ক্লান্ত, তখন ইভিনিং এমবিএ চালু করা হয়েছে। অথচ অনেক বিভাগে শিক্ষক ও ল্যাবের দাবিতে আন্দোলনও চলছে।
প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্থানসংকটে পড়েছে। রংপুরের পশ্চাৎপদ এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল অত্যন্ত প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থীকে অনেক টাকা ব্যয় করে মেসে থাকতে হয়। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল এবং শহীদ মুখতার এলাহী হলে কয়েক শ শিক্ষার্থী অনায়াসেই থাকতে পারেন। আবার যে ভবনগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলো বাইরে থেকে সুন্দর মনে হলেও প্রয়োজন উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিভাগগুলোতে দেড় শ-দু শ শিক্ষার্থী পড়ে, অপরিকল্পিত কক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেখানে ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান করেছেন একজন অনভিজ্ঞ ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। আর এর কাজ বাস্তবায়ন করে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এদের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে ভবন পরিকল্পনা বিশ্ববিদ্যালয় মানে উন্নীত হতে পারেনি। মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন এনে ভবনকাঠামো পরিবর্তন করে নতুন আরও অনেক ভবন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট খোলা হয়েছে। সেখানে নামমাত্র গবেষণার জন্য এমফিল এবং পিএইচডি কোর্স চালু করা হয়েছে। জনবল নিয়োগ দিয়েই এখানকার কাজ শেষ করেছেন দ্বিতীয় উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়া। তৃতীয় উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম নুর-উন-নবী দায়িত্ব গ্রহণের অনেক দিন হলেও এ ইনস্টিটিউটটির গবেষণা কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-উপাচার্য নেই। কোষাধ্যক্ষ ড. এম এ ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বহিরাঙ্গন পরিচালক, ছাত্র উপদেষ্টা, কোনো কোনো অনুষদে ডিন, পরিবহন পুলের পরিচালক, অনেকগুলো বিভাগে বিভাগীয় প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প পরিচালকসহ অনেক পদের দায়িত্বে রয়েছেন উপাচার্য নিজেই। তিনি প্রশাসনিক কাজে অনেক সময় ঢাকায় থাকেন। যখন তিনি ঢাকায় থাকেন তখন একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। রেজিস্ট্রারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন একজন সহকারী রেজিস্ট্রার। এক বছর আগে অনার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও কোনো কোনো বিভাগে এমএ কোর্সের জন্য কোনো নীতিমালা করা হয়নি বলে ক্লাস এখন পর্যন্ত শুরু করা যায়নি। এসব কারণে পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় বছরে কোনো মিলনায়তন হয়নি, জিমনেসিয়াম হয়নি, এমনকি মাস্টারপ্ল্যানেও তা নেই। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জন্য নির্দিষ্ট বসার ব্যবস্থা নেই।
এ বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সে জন্য গবেষণাবান্ধব প্রশাসন জরুরি। তাজহাট জমিদারবাড়ি এবং রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এখানে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষক রয়েছেন, যাঁদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব। সাবেক উপাচার্য এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে যে গভীর সংকটে ফেলেছিলেন, তা থেকে উত্তরণে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
wadudtuhin@gmail.com

মোদি: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ by হাসান ফেরদৌস

মোদিকে বাহবা জানিয়ে কলাম লিখতে হবে, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে নিউইয়র্কে তাঁকে দেখে কিঞ্চিৎ উষ্মার সঙ্গেই কবুল করছি, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মুগ্ধ করেছেন। মোট ৮৮ জন সফরসঙ্গী নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেবিনেট সদস্য ছিলেন একমাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক বিতর্কে ভাষণ তো ছিলই, এর বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক, কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে ভাষণ, এ দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে অনুষ্ঠান। আরও ছিল সেন্ট্রাল পার্কে কনসার্টে একঝলক উপস্থিতি। এর বাইরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক তো ছিলই। মোদি একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা মাথায় রেখে এই সফরে এসেছিলেন। ঠিক ২০০ পারিষদ ও হাফ ডজন মন্ত্রী নিয়ে আনন্দ সফর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাঁর একটি ‘মেসেজ’ ছিল যে ভারতের প্রতিনিধি হয়ে তিনি এসেছেন, সে ভিন্ন এক ভারত। এক অতি পুরোনো সভ্যতার তিনি প্রতিনিধি, কিন্তু সেই পুরোনোর ওপর গড়ে উঠেছে এক নতুন সংস্কৃতি, যার ভিত্তিতে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিজ্ঞান। জাতিসংঘে মোদি হিন্দিতে ভাষণ দেন। সম্ভবত অটল বিহারি বাজপেয়ির পর তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় সরকারপ্রধান, যিনি রাষ্ট্রসভায় হিন্দিতে ভাষণ দিলেন। ওবামাসহ অধিকাংশ রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে আলাপচারিতার সময় হিন্দিতেই কথা বলেছেন। এমনকি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে পাঁচ থেকে দশ মিনিট তাঁর সৌজন্য কথোপকথন হয়, তাতেও মোদি হিন্দিতেই কথা বলেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজের হিন্দিজ্ঞানে মোদিকে বিস্মিত করেন বটে, কিন্তু নিজ ভাষায় অটল থেকে মোদি কিন্তু ‘ভাষাকন্যার’ কাছ থেকে নিজের জন্য বাড়তি নম্বর আদায় করে নিলেন।

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ২০ হাজার ভারতীয়র সামনে মোদি এক ঘণ্টা ভাষণ দেন কোনো কাগজ ছাড়া। বিজেপি নেতা, কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠানটি ছিল সব ভারতীয়র জন্য উন্মুক্ত। তাদের সবাই যে বিজেপি-সমর্থক, অথবা মোদির রাজনীতির প্রতি সদর্থক মনোভাব পোষণ করেন, তা-ও নয়। কিন্তু এই এক দিন, আমার মনে হয়েছে প্রায় সব ভারতীয় তাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছে। অল্পবিস্তর প্রতিবাদী লোক যে ছিল না, তা নয়; কিন্তু মোদির ‘রাজসম্মানে’ তা কোনো বিঘ্নের কারণ হয়নি। মোদিও তাদের বিমুখ করেননি। এমনিতে ভারতীয়রা নিজেদের মধ্যে যখন কথা বলে, নিজের দেশ ও তার রাজনীতিকদের বংশোদ্ধার ছাড়া অন্য কথা মুখে জোটে না। কিন্তু সেদিন—এবং তার পর—যত ভারতীয়র সঙ্গে আমার দেখা ও কথা হয়েছে, তারা প্রায় সবাই ভারতীয় হিসেবে গভীর শ্লাঘা বোধ করেছে। নিজের দেশ ও নেতা নিয়ে এর আগে ভারতীয়দের এমন প্রীত দেখিনি। এমন আশাবাদের বার্তাও শোনা যায়নি।
কী নিয়ে বললেন মোদি? তিনি জানালেন এক নতুন ভারতের কথা, যিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্ণ আস্থাবান। অন্য সবার চেয়ে ভারত ভিন্ন কারণ তার রয়েছে গণতন্ত্র, তরুণ জনশক্তি সোয়া কোটি মানুষের এক বিশাল বাজার। একসময় ভারত বলতে বোঝাত সাপুড়ে, আজ সে পরিচিত কম্পিউটারের ‘মাউস’-এর জন্য। মঙ্গল গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে সে। প্রবাসী ভারতীয়দের বললেন, ‘দেশে থাকো কি বিদেশে, ভারতে বিনিয়োগ করো।’ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানালেন, ভারত এখন বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যে প্রস্তুত। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার কোনো চেষ্টা করলেন না। স্বীকার করলেন, ভারত এখনো গরিব, সে দেশের অধিকাংশ মানুষের এখনো শৌচাগার নেই৷ অহেতুক ফালতু আইনের মারপ্যাঁচে সেখানে ব্যবসায়ী যেমন, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। এখনো দুর্নীতি সর্বত্র। সরাসরি বললেন, ‘এসব আমি বদলাতে চাই। প্রতিদিন যদি একটি করে ফালতু আইন বাতিল করতে পারি, তাহলে আমার চেয়ে সুখী আর কেউ হবে না।’
মোদি এই সফরে হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে কী সম্মান পেয়েছেন, আমি তার ফিরিস্তি দেব না। শুধু এটুকু বলি, প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজে টুরিস্ট গাইড হয়ে মোদিকে মার্টিন লুথার কিং মেমোরিয়াল ঘুরে দেখিয়েছেন। এমন ঘটনা দ্বিতীয় ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই। ওবামা ও মোদি যৌথভাবে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখেছেন, সেটিও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য প্রথম। মোদি আমাকে আশান্বিত করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ভীতও হয়েছি। মোদি শুধু ভারতীয় হিসেবে নন, একজন হিন্দু ভারতীয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। নিজের ধর্মপরিচয় জামার হাতলে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে নয় দিনজুড়ে যে নবরাত্রি উৎসব, তার অংশ হিসেবে তিনি এই পুরো সময় উপোস থাকবেন। অতি আচারমুখী ও রক্ষণশীল হিন্দু ছাড়া আর কেউ নবরাত্রিজুড়ে উপোস থাকেন, সে কথা শুনিনি। আচারসম্মত হিন্দু হিসেবে মোদি সে কাজ করতেই পারেন, কিন্তু নিজের ধর্মীয় পরিচয় তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন, সেটা কাম্য নয়। তিনি উপোস আছেন, সে কথা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজ, সবাই মুরগি-মুসাল্লাম চিবোচ্ছে, মোদি লেবু-জল দিয়ে আহার সারছেন। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ভারতীয়দের কিঞ্চিৎ উপহাসের সঙ্গে বলেছেন, তাদের গলায় জোর নেই কেন, উপোস তো রয়েছেন তিনি। বস্তুত সে ভাষণ শুরুই করেন ‘ভারত মাতা কি জয়’, এই স্লোগানে। জনসংঘ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস দীর্ঘদিন থেকে এই স্লোগান ব্যবহার করে আসছে। একইভাবে তারা ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানটিও ব্যবহার করে হিন্দু চেতনার সঞ্চারে। ভারতীয় মুসলমানদের কাছে উভয় স্লোগানই সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন বহন করে, সে জন্য দিল্লি জামে মসজিদের ইমাম আহমেদ বুখারি তাঁদের ‘ইসলামবিরোধী’ বলে তাঁর নিন্দা করেছিলেন। মোদি সে কথা জানেন, জেনেশুনেই সেই স্লোগান দিচ্ছেন, কারণ তিনি সবার আগে নিজের হিন্দু পরিচয়টি তুলে ধরতে চান।
এখানেই আমার ভয়। স্বাধীনতার পর প্রথম ভারতীয় নেতারা খুব সচেতনভাবে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক—সেক্যুলার—পরিচয় তুলে ধরতে আগ্রহী ছিলেন। অধিকাংশ ভারতীয়—তা দেশেই হোক বা বিদেশে—নিজেকে কখনো বুক ফুলিয়ে হিন্দু বলে পরিচয় দেয়নি। মোদি সেই ঐতিহ্য পাল্টাতে চান। বিষয়টা যাতে একদম গোড়া থেকেই ভারতীয়দের মাথায় ঢোকে, সে জন্য মোদি সরকার দেশের স্কুলের পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ কাজের দায়িত্ব পড়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী শিক্ষক দীননাথ বাতরার ওপর। এই সেই লোক, যাঁর আপত্তির কারণে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়েন্ডি ডনিজারের হিন্দুধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়। বাতরা বিশ্বাস করেন, ভারতের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে দেশে হিন্দু ঐতিহ্য অবহেলিত হয়েছে। তিনি এর পরিবর্তন চান। গুজরাটে পাঠ্যপুস্তক রচনার দায়িত্ব পেয়ে বাতরা সাহেব ছাত্রদের ‘অখণ্ড ভারত’-এর স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। এই অখণ্ড ভারতের যে মানচিত্রটি তিনি রচনা করেন, তাতে কেবল আজকের ভারত নয়, উপমহাদেশের অন্য সব দেশ—পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও অন্তর্ভুক্ত। বাতরা এখন শুধু গুজরাট নয়, পুরো ভারতের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় নেতৃত্ব পাচ্ছেন। ব্যাপারটা এতটাই উদ্বেগজনক যে নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকাকে সম্পাদকীয় লিখে প্রতিবাদ জানাতে হয়েছে। টাইমস-এর কথায়, মোদি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটি ভালো কথা। ‘কিন্তু ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার স্থান যদি দখল করে নেয় (হিন্দুত্ববাদী) ভাবাদর্শ,’ তাহলে তেমন শিক্ষা ভারতের প্রতিবেশীদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হবে।
মোদি যে ধর্মকে—তাঁর হিন্দুত্ববাদকে—রাজনৈতিক তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চান, গত মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তার এন্তার প্রমাণ মিলেছে। এই নির্বাচনে প্রধান প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন স্বামী রামদেভ, যাঁর মুখ্য স্লোগান ছিল ‘হিন্দুধর্ম বাঁচাও’। মুসলমানদের ‘লাভ জিহাদ’ চক্করে পড়ে ভারতীয় মেয়েরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে। এদের রক্ষা করতে হবে। বলাই বাহুল্য, রামদেবের উর্বর মস্তিষ্কোদ্ভূত এই প্রচারণার কারণেই উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি রীতিমতো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির বয়স ছয় মাসও নয়। যে নতুন ভারতের স্বপ্ন তিনি দেখাচ্ছেন, অধিকাংশ ভারতীয়ই তাতে অনুপ্রাণিত বোধ করছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদের উত্থান যদি সে স্বপ্নের অন্তর্গত হয়, তাহলে আশান্বিত হওয়ার বদলে ভীত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বৈঠক বনাম ফটোসেশন by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশের বিতর্কিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ১৮৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ ও যুক্তরাজ্য ঘুরে এসেছেন। এই সফরসঙ্গীদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, বিতর্কিত লতিফ সিদ্দিকীসহ তার পরিবারের লোকজনেরা ও জেলাপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। ছিলেন ব্যবসায়ীরাও। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী এই বিশাল বহরে অংশগ্রহণকারীদের সুনির্দিষ্ট কাজ কী ছিল, সেটি জানা যায়নি। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো বলেছে, সফরসঙ্গীদের অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন শুধু শপিংয়ে। ৭৫ জন ব্যবসায়ী অবশ্য নিজ খরচেই প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। বাকি ১১০ জনের ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করেছে। অথচ বিরাট দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরসঙ্গী ছিলেন মাত্র ৭৫ জন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ীরাও ছিলেন। সরকারি খরচে গিয়েছিলেন অল্প কয়েকজন। বাকি সবাই যার যার খরচে। শেখ হাসিনার এই সফরকে অত্যন্ত ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ও ‘সফল’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব ফোরামে হাজির হওয়ার সুযোগ পেলে পারতপক্ষে তার কোনোটাই হাতছাড়া করা হয় না। কখনো কখনো তা কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার চেয়ে ছোট হলেও। সে দিক থেকে অবশ্য জাতিসঙ্ঘ সফর মর্যাদার দিক থেকে কোনোমতেই ছোট ছিল না। এসব জায়গায় প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ঝটপট জবাব দেয়া, মন্তব্য করতে বিচার বিবেচনা না করা, এগুলোও কাজ করে। এখন এই জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া কিংবা অন্তত তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সে প্রচেষ্টা যে একেবারে বিফলে যায়, এমন কথা বলা যাবে না। সে দিক থেকে এই সফরকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ও ‘সফল’ বলে কেউ কেউ দাবি করতেই পারেন; কিন্তু দেশে বা আন্তর্জাতিক ফোরামে, বরাবরের মতোই জাতিসঙ্ঘের ভাষণেও সরকারের এক-দেশদর্শী নীতির প্রতিফলন অস্পষ্ট থাকেনি। কোনো ফোরামেই বাংলাদেশকে এ সরকার একটি অভিন্ন দেশ হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। দেশেও তারা পারেন না। জাতিসঙ্ঘে গিয়েও পারলেন না।
জাতিসঙ্ঘে গিয়ে মোদি ভারত তথা বিশ্বের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেছেন; কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেবল নিজ সরকারেরই সাফল্যগাথা তুলে ধরে এমন ধারণার সৃষ্টি করলেন তাতে মনে হতে পারে যে, তার সরকার ও দল ছাড়া দেশের উন্নয়নের আর কোনো পথ নেই। তিনি যেন থাকলেন অনেকটা আত্মপ্রশংসায় বিভোর হয়ে। মোদি যেখানে ঐক্যবদ্ধ ভারতের আওয়াজ তুললেন, সেখানে এ রকম একটি বিশ্ব ফোরামে শেখ হাসিনা দেশের বিরোধী দলকে একহাত নিয়ে ছেড়েছেন। নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ভারতের সর্বস্তরের প্রবাসীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আর বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ভাষণ দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে নয়, নিউ ইয়র্কে বসবাসরত আওয়ামী লীগারদের উদ্দেশে। কেউ কেউ বলতে পারেন, শেখ হাসিনা ঠিক কাজটিই করেছেন। কেননা, নিউ ইয়র্কে বিরোধীরা শেখ হাসিনাকে স্বাগত তো জানানইনি, বরং জাতিসঙ্ঘের সামনে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রাখতে চাইলে শেখ হাসিনা তাদের উদ্দেশেই ভাষণ দিতে পারতেন। তাদের কথা শোনার চেষ্টা করতে পারতেন; কিন্তু তা তিনি করেননি। কারণ দেশে বিরোধী দলের ওপর যে সীমাহীন নির্যাতন পেটোয়া বাহিনী চালাচ্ছে, তাতে ওইসব লোকের সামনে কথা বলার নৈতিক শক্তি সরকারের শীর্ষব্যক্তিদের আর অবশিষ্ট নেই। জানা যায়, জাতিসঙ্ঘের মূল গেট দিয়ে তিনি সম্মেলন কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেননি। পেছনের দরজা দিয়ে তাকে সম্মেলন কেন্দ্রে ঢুকতে হয়েছিল। যারা তাকে মূল দরজা দিয়ে জাতিসঙ্ঘে প্রবেশ করতে দিলো না, তার বিরুদ্ধে স্লেøাগান দিলো, তাদের উদ্দেশে তিনি কথা বলতে যাবেন কোন দুঃখে? কথা বলতে গেলে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। শেখ হাসিনা জানেন, সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার সামর্থ্য তার নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে নয়, আওয়ামী লীগারদের উদ্দেশে তাকে ভাষণ দিতে হলো।
মোদি তার ভাষণে দেশের বিরোধী দল সম্পর্কে কোনো কটূক্তিই করেননি; কিন্তু শেখ হাসিনার ভাষণের বেশির ভাগই ছিল বিরোধী দলের নিন্দা। ফলে মোদির ভাষণটি হয়ে উঠেছিল প্রেরণাদায়ী। অপর দিকে শেখ হাসিনার ভাষণ ছিল বিরক্তিকর। মোদি এই বলে অবনত ছিলেন যে, তিনি তার দেশের জনগণের সেবক। আর আমরা নিজেদের এই বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছি যে, আমরাই হলাম দেশের অবিসংবাদিত নেতা। মোদির ভাষণে প্রবাসী ভারতীয় তরুণেরা উজ্জীবিত হয়েছে। আমরা আমাদের প্রবাসীদের ম্র্রিয়মাণ করেছি। জনপ্রতিনিধিত্বহীন এই সরকারের বিরাট সফরসঙ্গী বহর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার ১৫ মিনিটের একটি বৈঠক এবং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে দেখা হওয়া। তা নিয়ে দেশে একেবারে হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড ঘটিয়ে দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ঢাকায় ফিরে এসে ৩০ সেপ্টেম্বর বলেছেন যে, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্য বৈঠকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তিনি জানান, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে মহাসচিব এক বাণীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে বৃহত্তর আঙ্গিকে সমঝোতার তাগিদ দিয়েছিলেন। হাসিনার মূল বৈঠকে রাজনৈতিক সংলাপ বা সমঝোতা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই বার্তায় তিনি যা বলেছেন, যেভাবে সংলাপ ও সমঝোতার তাগিদ দিয়েছেন, বৈঠকে তার বিন্দুমাত্রও বলেননি। বরং জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব নির্বাচন-পরবর্তীকালে দেশে যে স্থিতিশীলতা এসেছে, শেখ হাসিনা এটি যেভাবে ধরে রেখেছেন, তার প্রশংসা করেছেন। ওই বৈঠকের বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘আমি বলছি, নির্বাচন নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। বিশ্বাস না হলে বান কি মুন সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।’
নরেন্দ্র মোদির সাথে শেখ হাসিনার আলোচনার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিস্তা ও সীমান্ত সমস্যা এবং অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন মোদি। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে ট্রানজিটের বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চান। তবে ভারতের তরফ থেকে এর কী জবাব মিলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা জানাতে পারেননি। নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড সংখ্যক সফরসঙ্গী নিয়ে যাওয়া, জাতিসঙ্ঘ কার্যক্রমের তাদের সম্পৃক্ততা এবং বিশাল ওই বহরের ব্যয় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা; কিন্তু মন্ত্রী এগুলোর জবাব এড়িয়ে গিয়ে বিরক্তিসহকারে পররাষ্ট্র সচিবের দিকে মাইক্রোফোন ঠেলে দেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, অধিবেশনের সাইড লাইনে প্রায় ৫০টি ইভেন্ট হয়েছে। এসব ইভেন্টে সফরসঙ্গীরা অংশ নিয়েছেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে সরকারি দল ও জোটের জেলাপর্যায়ের নেতা সুনির্দিষ্টভাবে কোন ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন, দেশের জন্য কী বয়ে এনেছেন, অব্যাহতভাবে এমন প্রশ্ন আসায় ফের মাইক্রোফোন টেনে নেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এখানে কে গেছেন, কত খরচ হয়েছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সার্বিকভাবে আমরা কী অর্জন করতে পেরেছি। সেই অর্জন নিয়ে বেশি বেশি প্রশ্ন করার পরামর্শ দেন মন্ত্রী। এ অবস্থায় মনে হয়, কেবল প্রমোদ ভ্রমণের জন্যই এই বিশাল বহরকে নিউ ইয়র্ক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জাতির জন্য কী অর্জিত হয়েছে সেটি বড় কথা নয়। সফরের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
এর বাইরেও এই সফরের সাফল্য যে নিতান্তই অতিরঞ্জিত কিংবা ভিত্তিহীন সেটি প্রমাণিত হয়ে গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে, নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের দ্বিপক্ষীয় কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। শেখ হাসিনার সাথে তার বৈঠক বলে যে স্টিল ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, তা ছিল মূলত জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে প্রধানমন্ত্রীর একটি ফটোসেশন। কূটনৈতিক ভাষায় এটাকে বলা হয়, ‘ফটো অপরচুনিটি’। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে লিখিত বার্তায় জাতিসঙ্ঘ এ তথ্য জানিয়েছে। মহাসচিবের দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী গত ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে জেনারেল ডিবেট (মূল ভাষণ) শুরুর আগে সকাল ৯টায় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো রিড আউট (মিডিয়ার জন্য রেকর্ড) রয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে জাতিসঙ্ঘের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক মুখপাত্র ম্যাথিয়াস লিন্ডারম্যান ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাকে লিখিত বার্তায় জানান, উল্লিখিত শিডিউল মোতাবেক জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের যে সাক্ষাৎটি হয়েছে, তা এত অল্প সময়ের জন্য যে, এই সাক্ষাতের কোনো রিড আউট রেকর্ড আমাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, সাধারণ অফিসিয়াল বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক না হলে ওই বৈঠকের কোনো রিড আউট থাকে না। লিন্ডারম্যানের ওই লিখিত বার্তা পাওয়ার পর এ বিষয়ে আরো জানতে তাকে ফোন করা হলে তিনি পত্রিকার প্রতিনিধিকে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের ডেপুটি স্পোক্সপার্সন ফারহান হকের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। ফারহান হকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি লিখিত বার্তায় বলেন, ‘দিস ওয়াজ এ ফটো অপরচুনিটি। দেয়ার ওয়াজ নো রিড আউট।’ অর্থাৎ সাক্ষাৎটি ছিল প্রধানমন্ত্রী ও তার সিনিয়র ডেলিগেটদের সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের একটি ফটোসেশন। এটা কোনো অফিসিয়াল বা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল না। জাতিসঙ্ঘের প্রচলিত প্রথা মোতাবেক অধিবেশনে যোগদানকারী রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে ফটোসেশনের জন্য অনুরোধ জানাতে পারেন।
কিন্তু এ নিয়ে বিভ্রান্তি প্রচার শুরু হয়েছে নিউ ইয়র্ক থেকেই। ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলেই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে বলে শেখ হাসিনার সাথে সফরকারী মিডিয়া টিমকে ব্রিফ করেন। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘বান কি মুনের সাথে প্রধানমন্ত্রীর মিটিং অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন বান কি মুন। এভাবেই বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।’ ওই দিন বিকেলে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। তাতেও বলা হয় যে, শেখ হাসিনার সাথে বান কি মুনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বরও জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের কার্যালয়, জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র অফিস, জাতিসঙ্ঘের রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারির কার্যালয় এবং তার স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ক কর্মকর্তা হোসে লুইস দিয়াজের সাথে কথা বলে পত্রিকাটি নিশ্চিত হয় যে, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নেই। তারপরও সম্ভবত কেবল মুখ রক্ষার জন্যই নিছক একটি ফটোসেশনকেই ‘দ্বিপক্ষীয় বৈঠক’ বলে গল্প ফাঁদলো সরকার। কিন্তু তথ্য ও প্রযুক্তির এই যুগে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে পার পাওয়া কঠিন। আরো একবার প্রমাণিত হলো, সরকার যেমন জনগণনির্ভর নয়, তেমনি জনগণকে বিভ্রান্ত করতেই ব্যস্ত।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

কোরবানির ঈদঃ পুরনো দৃশ্য ও কিছু ব্যতিক্রম by মীযানুল করীম

এবার গরুর হাটে যেতে হলো তিনবার। পয়লা দফায় কারণ, ভিড় খুব বেশি। পরের দফায় কারণ, দাম খুব বেশি। তৃতীয় দফায় হাটের দরাদরি আর ঠেলাঠেলির ঝামেলায় না গিয়ে ঢোকার পথেই গরু কেনা হলো। হাটের শুরুতে যে গরুটি পছন্দসই মনে হলো, সেটা কিনেই ফিরতি যাত্রা। রাজধানীর এই গো-হাট অনেক বড়। গরু হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র হিসেবে গণ্য। সেই গো-দেবতা বিকিকিনির হাটটির পাশে দুর্গাপূজার মণ্ডপ। কোনো মারামারি, বাদবিসংবাদ নেই। সম্প্রীতির বাংলাদেশে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু পাশের দেশ ভারতে তা কোনো দিন সম্ভব হবে কি?
অনেক বছর ধরে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় কোরবানির হাট বসছে। শ্যামলী থেকে পূর্বমুখী প্রধান সড়কের দু’পাশে এ বাজার বসে। আগে থেকেই এলাকাটিতে ছিল পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং যক্ষ্মা কিনিক। গত কয়েক বছরে এর সাথে যোগ হয়েছে চু হাসপাতাল। আরো হাসপাতাল রয়েছে আশপাশে। অন্তত আধা ডজন গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল এবং সেই সাথে জাতীয় বেতার ভবনের মতো Key Point Installation বা নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থাপনা এখানেই। এসব সত্ত্বেও কোরবানির পশুর বিরাট হাট এবারো বসেছে এই জায়গাজুড়ে। হয়তো বিকল্প স্থান না পেয়ে এটা করতে হয়েছে। অতীতে আগারগাঁও পশুহাটের ইজারা পেতেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নূরু হাজী। দুই বছর আগে গুম হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন মহলের ঘনিষ্ঠ অন্যরা ইজারা পাচ্ছেন। যা হোক, এবার কোরবানির পশুহাটে অসংখ্য দ্বিপদ ও চতুষ্পদ প্রাণীর সমাগম, চলাচল ও কোলাহলে এলাকার বড় রাস্তার পাশের হাসপাতালগুলোকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বিরোধ মাথাচাড়া দেয় ঈদের আগেই। তখন মুখ খুলেছেন এক প্রতিমন্ত্রী। ঈদের পর ইস্যুটি কাইমেক্সে ওঠে, যখন একজন পুরো মন্ত্রী প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়লেন।
ঈদের আগেই পত্রপত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট ছাপিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় যে, কোরবানির পশুহাটের কারণে অন্তত চারটি প্রধান হাসপাতালে যাতায়াত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আমরা বড় রাস্তার পাশে হাট বসাতে নিষেধ করেছি; কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তা শোনেনি। উল্লেখ্য, এ মন্ত্রণালয়ের অধীন সিটি করপোরেশন ঢাকার পশুহাটগুলো ইজারা দিয়েছে। কোরবানির হাট দু’টি মিলিয়ে বড় একটি করা হয়েছে আগারগাঁওয়ে। গরুও এসেছে ধারণাতীত সংখ্যায়। ফলে উল্লিখিত হাসপাতালগুলোর রোগী, তাদের স্বজন, ডাক্তার-নার্স-কর্মচারীদের সমস্যায় পড়তে হয়। এ প্রেক্ষাপটে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে একহাত নিলেন। বুধবার সচিবালয়ে এ বিষয়ে দস্তুরমতো সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এতে মন্ত্রী বলেছেন, হাসপাতালের সামনে গরুর হাট বসাতে দিয়ে ওই কর্মকর্তা ক্রিমিনাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ) করেছেন। এ ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীন লোক প্রশাসনে থাকতে পারে না। তিনি কিসের বিনিময়ে কাজটি করেছেন?
ক্ষুব্ধ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এসব হাসপাতালে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে গরুর হাট বসানোর অনুমতি না দিতে দুই মাস আগেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলাম। তারা কথা দিয়েছিলেন যে, এখানে কোরবানির হাট বসবে না; কিন্তু পরে অন্যায়ভাবে হাট বসানো হয়েছে।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য হাটের মতো এটিরও ইজারা পেয়েছেন এই মন্ত্রীর দলের লোক, তথা অঙ্গসংগঠনের জনৈক নেতা। তার বিরুদ্ধে ‘ব্যবস্থা নেয়া হবে’ বলে তিনি জানালেও এর নিশ্চয়তা নেই। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক নিজে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। নানা অনিয়মের মাধ্যমে এবার হাটের ইজারা নিয়েছেন সরকারি দলের লোকেরাই। তাদের ইজারা না দিয়ে আমলাদের উপায়ও থাকে না। এ দিকে আগারগাঁওয়ের পশুহাটের বিষয়ে অভিযুক্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিন্তু কোনো বক্তব্য দেয়নি।
আগামী বছর থেকে হয়তো আগারগাঁওয়ের হাসপাতাল জোন এবং রেডিও অফিসের পাশে গরুর হাট বসতে দেয়া হবে না। তখন হাটটি উত্তর দিকে সরিয়ে দিতে হবে। যা হোক, বিরাট এই পশুহাটটি ঘুরে দেখা গেছে, গরুর ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রয়োজনে পশুচিকিৎসক পাওয়ার কথা থাকলেও সে ব্যবস্থা ছিল নেহাত অপ্রতুল। পুরো হাটে ‘হাসিল’ আদায়ের প্যান্ডেলগুলোতে প্রধানত একজন ডাক্তারের নাম লেখা ছিল। তা-ও তিনি সিরাজগঞ্জের বলে জানানো হয়েছে। তা হলে রাজধানীতে কি পশুচিকিৎসক নেই? শনিবার এই হাট থেকে ফেরার পথে রোকেয়া সরণিতে দেখলাম, একটা হৃষ্টপুষ্ট ও বড় সাইজের গরু অসুস্থ হয়ে রাস্তায় বসে পড়েছে। সেটি আর হাঁটতে পারছিল না। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে গরুটির মাথায় পানি ঢালা হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে গরুর চিকিৎসার উপায় কী?
এবার রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট অনেক জায়গায় এক দিন আগেই ভেঙে গেছে। ঢাকার যে বিশাল হাটে শনিবার রাতেও হাজার হাজার গরু-ছাগল আর অজস্র মানুষের ভিড়, পরদিন সকালেই তা অনেকটা ফাঁকা। রহস্য কী? দাম পড়ে যাওয়ায় মানুষ অল্প সময়েই অনেক পশু কিনে নিয়ে গেছে। লোকসানের আশঙ্কায় বিক্রেতা তাড়াতাড়ি গরু বেচে দিয়ে হাঁফ ছেড়েছেন। আরেকটা কারণ, সম্ভবত দর কমে যাওয়ায় ব্যাপারীদের গরু অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
রোববারে হাটের এই আকর্ষণহীনতার পরদিন জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতটি এবার ছিল আকর্ষণহীন। টিভির খবর, রাষ্ট্রপতি দেশে না থাকায় এবং বেশির ভাগ মন্ত্রী অনুপস্থিত থাকায় এই জামাত জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছিল কিন্তু রাজধানীর প্রধান জামাত জমজমাট হওয়া-না-হওয়া কোনো বিশেষ ব্যক্তি থাকা-না-থাকার ওপর নির্ভর করবে কেন? টিভির ক্যামেরায় চেহারা দেখাতে কেউ সেখানে যাওয়ার কথা নয়।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির সব বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। তারা অনেক ক্ষেত্রে তৎপর ছিল। তবে বহু এলাকায় রক্ত ও নাড়িভুঁড়ির দুর্গন্ধ ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে দু-তিন দিন পরও। ঈদের পরদিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের অল্প দূরে নাখালপাড়ায় দেখি, সদর রাস্তার পাশে গরুর বর্জ্য উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কাছে কোনো কোনো বাড়ির লোকেরা নিজ উদ্যোগেই ব্লিচিং পাউডার ছিটাচ্ছেন।
এবারো ঈদের ছুটিতে ‘মরণ মিছিল’ বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ৮-১০ জনের মৃত্যু যেন নিয়মিত ব্যাপার। ঈদের পরদিন টাঙ্গাইলে শোচনীয় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন আমার পরিচিত একটি পরিবারের একজন মহিলা ও কাজের মেয়ে। আহত কয়েকজন। প্রাইভেট কারে তারা ঢাকা থেকে বাড়ি যাচ্ছিলেন। ওই প্রবীণ মহিলা বাংলাদেশ ব্যাংকের জিএম মাসুদ বিশ্বাসের স্নেহময়ী জননী। এই ট্র্যাজেডি ঈদের আনন্দে অকস্মাৎ যবনিকা ফেলে সবাইকে বিষাদে নিমজ্জিত করেছে। টিভির নিউজে বলা হচ্ছিল, টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২; কিন্তু যারা আপনজন হারালেন চিরদিনের জন্য, তাদের কাছে এটা নিছক ‘২’ কিংবা ‘১’ নয়, বরং বিরাট শোক ও বেদনার কারণ। অনেকেই মনে করেন, ঈদপরবর্তী ফাঁকা সড়কে বেপরোয়া যান চালনার ফলে দু’টি গাড়ির সংঘর্ষ ঘটে অথবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা খায় কিংবা খাদে পড়ে যায়।
মানুষ যখন অধম হয়ে যায়, তখন সে নেমে যায় পশুর চেয়েও নিচের স্তরে। এবারো গরু কোরবানির মওসুমে এমন অনেক ঘটনা দেশে ঘটেছে, যা প্রমাণ করেÑ গরু নামের চতুষ্পদ প্রাণীটি ‘প্রকাশ্য গরু’, কিন্তু ‘মানুষ’ পরিচয়ের মুখোশের আড়ালে রয়েছে দ্বিপদ গরু, যাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। কারণ, পবিত্র ঈদের দিনেও টিভির সংবাদ শিরোনাম থেকে জানা গেছে, এক জেলায় কোরবানির গোশত ভাগ করা নিয়ে সংঘর্ষে একজন মারা গেছে। আরেক জেলায় গরুর ধান খাওয়াকে কেন্দ্র করে মারামারিতে একজন নিহত। অন্য এক জায়গায় ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি যাওয়ার সময় ছয়জনকে অজ্ঞান করে নিচে ফেলে দেয়া হয়েছে, তাদের একজন মারা গেছে। নিশ্চয়ই তার আগে এই হতভাগাদের সব টাকা-পয়সা, মোবাইল লুটে নেয়া হয়েছে। একই দিন সেই একই দল, অর্থাৎ ‘জাতীয় মলম পার্টি’ রাজধানীর উপকণ্ঠে দুইজন গরু বিক্রেতাকে কুপিয়ে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছে। ঈদের দুই দিন আগে ঢাকার পল্লবীতে অজ্ঞান পার্টি ১৫ জন গরু বিক্রেতাকে অচেতন করেছে এবং লুট করেছে আড়াই লাখ টাকা। একই দিনের আরেক খবর, এক জেলায় গরুর হাট নিয়ে সংঘর্ষে একজন নিহত, কয়েকজন আহত। সে জেলাতেই কোরবানির গোশত ভাগাভাগি নিয়ে ঈদের দিন আরো একজন প্রাণ হারিয়েছে। সবাই স্বীকার করবেন, গরু যতই গুঁতা দিক, অন্তত এই অমানুষগুলোর পর্যায়ে কোনো দিন ওরা নামবে না।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এক যুবকের প্রেমঘটিত ব্যাপারে তাকে ‘কোরবানি করা’র হুমকি দেয়া হয়েছিল এবার কোরবানির ঈদের আগে। সেদিন তাকে হত্যা করা না হলেও তিন দিন পরে বাড়ির অদূরে তাকে ধরে জবাই করা হয়েছে।
বড় বড় শহরে, অনেক ক্ষেত্রে রাজপথেও ঈদের জামাত হচ্ছে। কারণ, পাশের পাঁচ-ছয়তলা মসজিদেও স্থানসঙ্কুলান হয় না। তখন শত শত মানুষকে নোংরা খোলা রাস্তায় এবং ড্রেনের পাশে ঈদের নামাজ পড়তে হয়। ঈদের আগের দিন এসব স্থানে দুর্গন্ধ ও জীবাণু নাশের জন্য ওষুধ ছিটানো উচিত।
ঈদের জামাতে কিছু দৃষ্টিকটু আচরণ দেখা যাচ্ছে অনেকের। ইমাম সাহেব সালাম ফেরানো মাত্রই অনেকে উঠে চলে যেতে চান কিংবা এ দিক-ও দিক হাঁটাহাঁটি শুরু করে দেন। আর নামাজের সারিতে দাঁড়িয়ে বা বসে মোবাইলে কথা বলা তো চলছেই। অথচ তখন সবে খুতবা শুরু হয়েছে। মুনাজাত শেষ করে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই দেখা যায়, অনেকে গরু-ছাগল জবাই শেষ করে চামড়া ছাড়াচ্ছেন। তারা ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করার কারণ কী?
কোরবানি বা ঈদুল আজহার বিরুদ্ধে অপপ্রচার সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। ‘বিষাদ সিন্ধু’ প্রণেতা মীর মশাররফ হোসেন পর্যন্ত ‘গো-হত্যা’ বন্ধ করার ধ্বনি তুলেছিলেন। ত্রিশের দশকে রেজাউল করিম নামের জনৈক প্রগতিবাদী ব্যক্তি কোরবানির বিরুদ্ধে নিবন্ধ লেখায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তবে এ ধরনের পশুপ্রেমীক অর্বাচীনদের মোক্ষম জবাব দিয়েছিলেন মহান মানবপ্রেমীক কবি নজরুল। পরাধীন দেশের মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলোতে জাতিকে জাগাতে চেয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এ ক্ষেত্রে একটি বড় দৃষ্টান্ত তার বিখ্যাত ‘কোরবানী’ কবিতা।
সুদীর্ঘ কবিতাটির সূচনাপঙ্ক্তি বহুলপরিচিত, ‘ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন।’ কোরবানি নিছক গরু-ছাগল জবাই করা নয়, এর বিরাট তাৎপর্য রয়েছে। জাতি তা অনুধাবন করে জেগে ওঠার লক্ষ্যে নজরুল অপূর্ব ওজস্বী ভাষায় ও তেজস্বীভঙ্গিতে ছন্দে ছন্দে সাহস ও সংগ্রামের মহাবাণী উচ্চকিত করেছিলেন।
এই কবিতার প্রথম পর্বটি হলো :
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!/
দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খাম্খা ুব্ধ মন/
ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,/
আজিকার এ খুন কোরবানীর/
দুম্বা শির রুম-বাসীর/
শহীদের শির-সেরা আজি। রহমান কি রুদ্র নন?
মোট ন’টি পর্বের বড় কবিতাটির শেষ দু’টি পর্ব তুলে ধরা হচ্ছে এখানেÑ
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
মুসলিম রণ-ডঙ্কা সে,
খুন দেখে করে শঙ্কা কে?
টঙ্কারে অসি-ঝঙ্কারে,
ওরে হুঙ্কারে, ভাঙি’ গড়া ভীম কারা, লড়বো রণ-মরণ!
ঢালে বাজবে ঝন-ঝনন্।
সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
জোর চাই, আর যাচনা নয়,
কোরবানী দিন আজ না ওই?
বাজনা কই? সাজনা কই?
কাজ না আজিকে জানমাল দিয়ে মুক্তির উদ্ধারণ?
বলÑ‘যুঝবো জান ভি পণ!’
খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,
আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের পূত বোধন।
ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
কোরবানির ঈদ প্রতি বছর আসে, ভবিষ্যতেও আসবে। আরো বেশি দামে আরো বড় গরু কেনা হবে। উৎসবের আয়োজনও বাড়বে দিন দিন। খরচ বাড়বে তাল রেখে; কিন্তু কোরবানির শিক্ষা কতটুকু আমরা গ্রহণ করছি? ঈদুল আজহার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য উপলব্ধি করা না গেলে অবলা প্রাণীর প্রাণনাশই সার হবে, কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীটি কোনো ফায়দা পাবে না। ঈদে কোটি কোটি টাকার চামড়া সংগ্রহের টার্গেট থাকে; কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন পরকালের জন্য অমূল্য পুণ্য সংগ্রহের উদ্যোগ। আমরা জীবনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রের মতো ঈদের বেলায়ও লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষকে দিচ্ছি বেশি গুরুত্ব।
স্বার্থ, সঙ্কীর্ণতা, প্রবৃত্তির তাড়না, অর্থ-খ্যাতি-বিত্তবিলাসের মোহ, অবৈধ ক্ষমতা ও সম্পদ, ষড়রিপুর দাসত্ব প্রভৃতি কোরবানি করাই কোরবানির ঈদের লক্ষ্য; কিন্তু আমরা ত্যাগের নির্দেশ ভুলে ভোগে মত্ত থাকি। পার্থিব নানা অপশক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করার হীনতায় লজ্জা হয় না। অথচ সর্বজগতের একক অধিপতি, স্রষ্টা, প্রতিপালক বিধানদাতা এবং চূড়ান্ত বিচারকের কাছে আত্মসমর্পণের দায়িত্ব আমাদের ক’জন পালন করছে? যার যত বড় পদ ও ক্ষমতা, যত বেশি সম্পদ ও সুযোগ; তার তত বেশি কোরবানি দেয়া, অর্থাৎ ত্যাগ স্বীকার করা জরুরি। আমাদের সমাজের চিত্রটা এর বিপরীত। আমরা কথায় ত্যাগী : কাজের সময়ে ষোলোআনা ভোগ করতে মরিয়া হয়ে উঠি। এভাবে চললে ঈদুল আজহা পালন করা-না-করা একই।
টিভি চ্যানেলে ঈদ অনুষ্ঠানের ধুম, যেখানে ঈদের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই। গৎবাঁধা, কমার্শিয়াল, ছ্যাবলামি ইত্যাদি বিশেষণে এগুলোকে দর্শকেরা অভিহিত করে থাকেন। ছয় হালি চ্যানেলে ঈদ নাটক প্রচার হয় ডজন ডজন; কিন্তু এগুলোকে চমৎকার, মানসম্মত, রুচিশীল ও সুস্থ বিনোদন বলেন ক’জন? এর পাশাপাশি পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীর ঈদসংখ্যা ও বিনোদন ম্যাগাজিন। বিশিষ্টজনদের রঙ-বেরঙের ছবির সাথে রঙিন স্মৃতিচারণ। কিছু তথ্য, কিছু অতিরঞ্জন; কিছুটা আত্মপ্রচারও থাকতে পারে। যা হোক, দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদ বিনোদন সাময়িকীর প্রচ্ছদকন্যা অপু বিশ্বাস। চলচ্চিত্রের এই নায়িকার সাক্ষাৎকারধর্মী বক্তব্যের একটি অংশ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
পত্রিকার প্রতিনিধি বলতে চেয়েছেন, মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু হলে একটা সমস্যা থাকে। অপু বিশ্বাস হিন্দুর মেয়ে। তাকে এমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয় কি না, এ প্রশ্ন করার আগেই অপু তা বুঝে ফেলেন এবং বললেন, ‘এ দেশে সে ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপারে সমস্যা হয় না। মোটেই না। ...আমার একটা প্রশ্ন আছে; সেটা আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে নয়, বলিউড বা কলকাতার চলচ্চিত্র নিয়ে। আমার মনে হয়, ওপার বাংলায় এই ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে ইজমটা অনেকখানি। কারণ, দেখুনÑ ওদেশে কোনো ভালো চরিত্র মুসলিম হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। শাহরুখ, আমির, সালমান আজীবন হিন্দু চরিত্রেই কাজ করে গেলেন। কী অদ্ভুত ঘটনা! প্রায় প্রত্যেক ছবিতে মূল ভিলেন বা টেরোরিস্ট মানেই মুসলিম। আমার মনে হয়, সেদিক দিয়ে আমাদের দেশে আমরা অনেকটা সহনশীল। আমি একজন হিন্দু মেয়ে হয়েও এটা (ভারতের ব্যাপারটা) আমার কাছে খুবই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে।’
‘সেলফি’। শব্দটি অল্প ক’দিনের মধ্যেই বহুলপ্রচলিত হয়ে উঠেছে। সেলফোন দিয়ে বিশেষ করে নিজের নানা ভঙ্গি আর কর্মকাণ্ডের ছবির নাম সেলফি। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে অনেকের খায়েশ, তার কেনা কিংবা তাদের পরিবারের জন্য কেনা চতুষ্পদটির সাথে ছবি তোলা। এই পশুটির নাম গরু; ইংরেজিতে কাউ। অতএব, সেলফি এ ক্ষেত্রে ‘কাউফি’ হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে একটি রম্য সাময়িকীতে ঈদের আগে যে পরামর্শ ফ্রি দেয়া হয়েছে, তা তুলে ধরা হলো। ‘সেলফি তোলার সময়ে গরুকে সামনে রাখবেন, নাকি আপনি সামনে থাকবেন? এ সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত জরুরি। আগে আপনাকে জেনে নিতে হবে, আপনার গরুটি শিং চালাতে ওস্তাদ, নাকি পা চালাতে পারদর্শী। শিং চালাতে ওস্তাদ হলে গরুকে সামনে রেখে সেলফি তুলে ওস্তাদের পরিচয় দিন। আর পা চালাতে দক্ষ হলে আপনিই থাকবেন সামনে।’
পাদটীকা : কী মিয়া, তোমার গরুডা এমুন ঝিম ধইরা আছে ক্যান্? খোঁচা দিলেও যে নড়ে না।’ বড়ি খাওয়াইয়া আর ইনজেক্শন দিয়া তুমিও মোটা-তাজা বানাইবার কেরামতি করছো না কি?
: তোবা তোবা, কী যে কন্ স্যার। আমনেরা জ্ঞানী মানুষ, ভালো বুঝবেন। আসল ব্যাপার অইলো, মানুষের মইদ্যে যেমন চঞ্চল ও দুষ্টু টাইপের আছে, তেমনি আছে গম্ভীর ও শান্ত মানুষ। গরুর মইদ্যেও এই দু’কিসিম কি থাকতে পারে না? আর বিশেষ কইরা যহন কোরবানির দিন ঘনাইছে, তহন তো ভালা গরু মরণের কতা ভাইবা চুপচাপ থাকাই স্বাভাবিক।’

প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য -প্রতিশোধের রাজনীতি নয় by ডক্টর কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রম

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, ভোগের রাজনীতি বা জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করে টিকে থাকা নয়। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা এবং গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা; কিন্তু আমরা অতীত নিয়েই ব্যস্ত। ৪২ বছর আগে বা অতীতে কে কত বড় নেতা ছিল, এ দেশে কার কত বড় অবদান, কোন রাজনৈতিক দল কখন কী বলেছে, তা নিয়ে নিত্যদিনের ঝগড়াঝাটিতে আমরা ব্যস্ত। নেতিবাচক রাজনীতিতে আজ আমরা অভ্যস্ত। এতে করে আদৌ কি আমরা দেশ এবং জাতি হিসেবে উপকৃত হচ্ছি? বরং দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আমাদের ভাবমূর্তি দেশ-বিদেশে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। আসলে দেশ পরিচালনা করার মতো আমাদের মধ্যে সে ধরনের ত্যাগ, সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং মনমানসিকতা রয়েছে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কথা আগে ভেবে দেখা প্রয়োজন। আসলে তারা কি আমাদের দেশের চলমান রাজনীতি পছন্দ করে, না ঘৃণা করে? আমার দৃঢ়বিশ্বাস তরুণ প্রজন্ম হঠকারী রাজনীতি চায় না। কেউ রাজত্ব কায়েম করুক সেটাও তারা চায় না। তারা চায়, রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে তাদের নতুন নতুন চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটুক। দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক। মানুষ স্বস্তিতে এবং নিরাপদে নিজ নিজ পেশায় মনোযোগ দিয়ে কাজ করার সুযোগ পাক। কারো প্রতি যেন অবিচার বা অন্যায় না হয় তা নিশ্চিত করা হয়। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কাজ শেষ, সময় শেষ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একটি নাম ‘আল-কাহহারু’, সুতরাং আল্লাহর গজব থেকে আমরা কেউ রক্ষা পাবো না। কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে। অন্যায় করে কখনো কেউ পার পায়নি। আগামীতেও পাবে না। এটাই আল্লাহর বিধান। আসুন প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ পরিহার করি। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে, দেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাই।
এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় হবে, দেশের ও দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের জন্য পদক্ষেপ নেয়া।  বারবার সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে, হয়রানি করাই যেন রাজনীতির মূল লক্ষ্যে আজ পরিণত হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক। বহু দিন ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্থাগুলোতে সরকার তার দলীয় প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এই সংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন স্বাভাবিক রীতিনীতিতে পরিণত হয়েছে। সাংবিধানিক সংস্থাগুলো এবং সরকারি কর্মচারীদের যদি আমরা রাজনীতির বাইরে রাখতে না পারি, তাহলে দেশে কখনো শান্তি ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে না। জনগণও সুষ্ঠু নির্বাচন, সুবিচার, সুশাসন এবং ন্যায়বিচার থেকে হবে বঞ্চিত। সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বাভাবিকভাবে একধরনের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও কর্মচারীদের হাতে হবে জিম্মি, যা বর্তমানে বিদ্যমান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘মানুষই সৃষ্টির সেরা’। তবে বহু বছর ধরে রাজনীতিবিদদের আচার, আচরণ ও অশালীন ভাষার প্রয়োগ দেখলে মনে হয়, ক্রমশ আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্ব লোভ পাচ্ছে। কেউ কাউকে সমীহ বা সম্মান দেখিয়ে কথা বলার বা বক্তব্য দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। লাগামহীনভাবে একে অপরের অযথা সমালোচনা করে যাচ্ছি। অবশ্যই, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন গঠনমূলক সমালোচনা, প্রতিহিংসামূলক নয়। ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত। আমাদের ওপর থেকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। অথচ রাজনীতিবিদেরাই সমাজ বিনির্মাণের কারিগর। উন্নয়ন সাধনের প্রতীক। তবে কেন আমরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? মানুষ চায় সমাজে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সুশিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক উন্নতি, এক মুঠো ভাত এবং শান্তিতে ঘুমানো। বিগত ৪২ বছর ধরে আমরা কি তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এর মূল কারণ আমাদের মধ্যে একধরনের অহঙ্কার, অহমিকা এবং রাজত্ব কায়েম করার মনোভাব কাজ করছে।
জনগণ কষ্টে আছে, অশান্তিতে আছে। কারণ সরকার পরিচালনায় তাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই। মানুষের কষ্ট লাঘবের সব পথ বন্ধ। অনির্বাচিত ব্যক্তিরা দেশ পরিচালনা করছে। ফলে তাদের কর্মকাণ্ডে কোনো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নেই। কর্তা খুশি থাকলে সব ঠিক, চেয়ার ঠিক থাকলে সব ভালো। জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন না থাকলেও অসুবিধা নেই। আসুন আমরা দেশ ও জনগণের কথা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি। যথাশিগগির সম্ভব সুষ্ঠু, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পন্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করি। লোভ লালসা ত্যাগ করে, জনগণের মঙ্গল ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করি। দিন যত অতিবাহিত হবে, সমস্যা আরো জটিল ও প্রকট আকার ধারণ করবে। অন্ধকার গুহা থেকে বের হওয়া তখন সম্ভব না-ও হতে পারে। ক্ষমতার মোহ থেকে আমাদের সবাইকে বের হতে হবে।
আগামীতে সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর মানুষ নতুন কি পাবে, তা পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। হাতবদলের পালার ইতি টানতে হবে। ইতিবাচক সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে। সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, যেন এই দেশ থেকে চিরদিনের জন্য স্বৈরতন্ত্র বিতাড়িত হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তরুণ প্রজন্মের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে হবে। তরুণ সমাজ দেশ ত্যাগেও তখন নিরুৎসাহিত হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠলে মাঠে সভা সমাবেশ ও রাস্তায় মিছিল থাকবে না। হরতাল ও অবরোধ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে বেশি দূর আগানো সম্ভব নয়। তাই সব সময় আলোচনার রাস্তা খোলা রাখতে হবে। সমঝোতায় আসতে হবে। তবেই দেশ সঠিক ও সুন্দরভাবে চলবে। জনগণ শান্তিতে বাস করতে পারবে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।

ব্যাংক খাতে দুর্নীতি রোধে সংস্কার by হারুন-আর-রশিদ

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকায় লিড নিউজ হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। সম্প্রতি বেসিক ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই পদত্যাগ করেছেন। এর আগে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ নিয়ে ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক সম্পর্কেও। এসব আর্থিক কেলেঙ্কারি, অনিয়ম ও দুর্নীতি দেশের অর্থনীতিতেও মারাত্মক আঘাত হেনেছে। আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় তিন হাজার শতাংশ। এসব পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে (সূত্র : প্রথম আলো, ১০-১-২০১৩)।
গত ২৭ জুলাই প্রথম আলো পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক কোনো খাতেই অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার পেছনে দায়ী মাফিয়া চক্রের দৌরাত্ম্য। যেহেতু সরকারের ওপর এই মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি, তাই তারা বিচার না হওয়ার জন্য কাজ করে থাকে। ১৯৯৬ সালে বর্তমান সরকারের শাসনামলে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির শাস্তি তো দূরের কথা, বিচারই হয়নি। ২০১০ সালেও একই অবস্থা বিরাজমান। এসব দেখে মনে হয়, সরকারের ওপর মাফিয়া চক্রের প্রভাব খুব বেশি। এ কারণে আর্থিক খাতেও এর কালো ছায়া পড়েছে। বেসিক ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকিং খাতে যেসব অনিয়ম ঘটেছে, সেগুলোর ব্যাপারে (সরকারি ব্যাংক) বাংলাদেশ ব্যাংকের শাস্তিযোগ্য ব্যবস্থা নেয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ ব্যাংক কোম্পানি আইনে সরকারি ব্যাংকের কোনো পরিচালক বা চেয়ারম্যান অনিয়ম করলে তাকে অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেই। তবে বেসরকারি ব্যাংকের কোনো চেয়ারম্যান, পরিচালক অনিয়ম করলে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক অপসারণ করতে পারে;  কিন্তু সরকারি ব্যাংকের বেলায় সেই ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। ব্যাংকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, এক দেশে দুই ধরনের আইন চলতে পারে না।
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ একটি জাতীয় দৈনিকের লিড নিউজ ছিলÑ ব্যবসায়ীদের বিশ্বাসের জালে ২০ ব্যাংক। বিশ্বাসী ঋণের নয় হাজার কোটি টাকা খেলাপি, ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ বিপুল অঙ্কের অর্থ ভিন্ন খাতে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রামের ব্যাংকগুলো বিশ্বাসী ঋণ দিয়ে এখন বিপদের প্রহর গুনছে। এর বেশির ভাগ ঋণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আমদানিপণ্য বাজারজাত করতে স্বল্প সময় (৯০ থেকে ১২০ দিন) নেয়া বিশ্বাসী ঋণের (এলটিআর ঋণ) নয় হাজার ৩৫২ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণে (পাঁচ বছরের) পরিণত হয়েছে। এই মেয়াদি ঋণের বেশির ভাগ এখন খেলাপি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো এই বিশ্বাসী ঋণ (স্বল্পমেয়াদি) দিয়েছে ৪৮ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে অবস্থিত ২০টি ব্যাংকের এই ঋণ ফেরত না পাওয়াই এখন প্রধান সমস্যা। পত্রিকায় উঠেছে, এরই মধ্যে চট্টগ্রামের কয়েকজন ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ না করে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে। কয়েকটি কোম্পানি ব্যাংকঋণের অর্থ বিদেশেও পাচার করেছে। এ ধরনের দু’জন ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। এরা হলেন ইয়াসির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাহের হোসেন। ব্যাংকগুলোতে তার ৪৮১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। আরেকজন ব্যবসায়ী হলেন গিয়াসউদ্দিন কুসুম, জাহাজ ভাঙা শিল্পের সাথে জড়িত, যার কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ৩০০ কোটি টাকার মতো। অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও অনেক ব্যবসায়ী এসব মামলার বিপরীতে উচ্চ আদালতে আপিল করে স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, এর জামানত (মর্টগেজ) অপর্যাপ্ত। ব্যাংকের গুদামে পণ্য নেই এবং বাজারদরে ওঠা-নামা। আবার অসংখ্য আমদানিকারক বা গ্রাহক তাদের ঋণের টাকা ভিন্ন খাতে নিয়ে গেছেন। অর্থাৎ জমি কিনেছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন এবং নতুন ব্যবসায় খাটিয়েছেন। ব্যাংক খাতে কী যে অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে, বিস্তারিত বর্ণনা করলে তা একটি বড় গ্রন্থে রূপ নেবে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ জাতীয় দৈনিক লিখেছেÑ জনতা ব্যাংকের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নানা বিশেষণে অলঙ্কৃত করেছেন। তার মতে, অর্থমন্ত্রী একজন ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রড, মিথ্যাবাদী, তদবিরকারী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, হেয়কারী, আঞ্চলিকতায় পক্ষপাতদুষ্ট, এলিটিস্ট। অর্থমন্ত্রীর বর্তমান পদবির সাথে এসব নামের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. বারকাত। আরো একধাপ এগিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্থমন্ত্রীর ভূমিকা, অর্থাৎ ওই সময়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রী কী করেছেন তা জাতিকে জানানো উচিত।
বিগত অর্থবছরে (২০১৩-১৪) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৯টি ব্যাংকের মধ্যে নিট মুনাফা কমেছে ২১টির। এর মধ্যে বেশি কমেছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের, যার পরিমাণ প্রায় ১৮-২৩ শতাংশ। লোকসানে রয়েছে তিনটি ব্যাংক। মুনাফা কমে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক। মুনাফা বেড়ে যাওয়া ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক।
২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হলেও মূল বাজেটে নেয়া লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি। আইএমএফের চোখে বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিস্থিতির আরো অবনতি। ২০১২ সাল থেকে এই অবনতি শুরু হয়েছে। এই অবনতি ঠেকাতে সম্ভাব্য পুনঃমূলধনীকরণের জন্য জিডিপির প্রায় দেড় শতাংশ অর্থ প্রয়োজন। করণীয় নীতি হিসেবে আইএমএফ বলেছেÑ রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, যেন তাদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ঋণ দিতে অধিকতর বিচক্ষণতা ও বকেয়া ঋণ আদায়ে আগ্রাসী তৎপরতা প্রয়োজন (সূত্র : প্রথম আলো, ১১-৬-২০১৩)।
এখন প্রশ্ন হলোÑ ব্যাংকিং খাতে উদ্ভূত সমস্যা দ্রুত সমাধানে ব্যর্থ হলে দেশের প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি মুখথুবড়ে পড়বে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা সত্যিকার অর্থে কঠিন হয়ে পড়বে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪ পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতের যে চেহারা দেখলাম, তাতে মনে হলোÑ দীর্ঘ চার বছরেও শেয়ারবাজারে ব্যাংকিং খাত সর্বনি¤œ অবস্থায় রয়েছে। ফেস ভ্যালুর নিচে দাম রয়েছে কয়েকটি ব্যাংকের। ব্যাংকিং খাতে শেয়ার কেনাবেচা নেই বললেই চলে। লভ্যাংশও অনেক কমে গেছে। উল্লিখিত অব্যবস্থাপনায় ব্যাংকিং খাতে সংস্কার জরুরি।
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক
E-mail : harunrashid1952yahoo.com

ইবাদতের কাজে প্রতারণা বন্ধ করুন by আবদুল কুদ্দুস মাখন

হজ নিয়ে যারা ব্যবসায় করেন, তারা হাজীদের কাছ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার কথা। কারণ, এটি একটি সেবামূলক কাজ। এরা ধন্যবাদের পরিবর্তে মানুষের ধিক্কার পাচ্ছেন। ইবাদতের আড়ালে কত অজানা প্রতারণা রয়েছে তা এহেন কাজে যুক্ত না হলে অভিজ্ঞতা হয় না। হজের সময় আসলে পত্রপত্রিকায় হজ ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর নানা ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। প্যাকেজ-এ, প্যাকেজ-বি, প্যাকেজ-সি ইত্যাদি। এ, বি, সি এর অর্থ হলো সবচেয়ে কাছে, একটু দূরে, বেশি দূরে থাকার ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে বসে যখন এসব প্যাকেজের ব্যাখ্যা দেয়া হয় তখন বলা হয় পবিত্র হেরেম থেকে ৫০০ গজ থেকে শুরু করে ২ বা ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব; কিন্তু পবিত্র হেরেমে পৌঁছার পর দেখা যায় সে ৫০০ গজ হয়ে যায় ৫ মাইলের ও অধিক। এ তো গেল থাকার ব্যাপার।
থাকার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। এসি, নন-এসি; একরুমে ৫-৭ জন, বিল্ডিং এর ওপরে না নিচে। এভাবে বাসস্থান থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াতব্যবস্থা প্রতিটি স্তরে প্রতারণার জাল বিস্তীর্ণ রয়েছে। যেখানে কথা ও কাজের কোনো মিল নেই। শুধু লোক ম্যানেজ করতে পারলেই হয়। ধন্যবাদ তো সেসব হাজী সাহেব দিতেই পারেন যারা সঠিক সময়ে হজের টিকিট পেয়েছেন, বিমানের শিডিউল অনুযায়ী ফাইটে চড়ে সৌদি আরব পৌঁছেছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্য তো সেসব হতভাগাদের জন্য যারা স্ত্রী-পুত্র, শ্বশুর-শাশুড়ি, নাতি-নাতনী, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বড় বড় লাগেজ-ট্রলিসহ আশকোনা হজক্যাম্পে এসে দেখলেন তার ফাইটের কোনো খোঁজ নেই। আদৌ তিনি হজে যেতে পারবেন কি পারবেন না। তার সঙ্গী সাথীরা সবাই চলে গেছে। হায়রে কপাল! মাথায় হাত! বুকে যন্ত্রণা! এসব হজপ্রত্যাশী মানুষের আর্তনাদ কে দেখে?
যাত্রীদের কোনো ত্রুটি নেই। সহজ সরল মানুষ। এরা পড়েছেন দালালদের খপ্পরে। কম খরচে বেশি সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা তাদের হজে নেয়ার কথা বলে পাসপোর্ট নিয়েছিল; কিন্তু সৌদি আরব পর্যন্ত সব খরচের হিসাব মিলাতে না পেরে তারা উধাও। মড়ার ঘা এসে পড়েছে এসব সরল মানুষের ঘাড়ে। অবশেষে দেখা যায় এ সকল বিপদে পড়া মানুষগুলো আর হজেও যেতে পারেন না, টাকাও ফেরত পান না। শুধু তা-ই নয় হজ ও ওমরার কথা বলে কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করে। আবার কোনো কোনো ব্যবসায়ী তাদের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে কোনো কোনো চক্র বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। কারণ এসব ব্যবসায়ী তারা নিজেরাও জানেন এমন কিছু লোক আছে যারা হজের নামে বিদেশ গিয়ে চাকরি করবে। এরা আর দেশে ফিরে আসবে না। তাতে কী? লাইসেন্স বাতিল হলে হোক। তার তো মুনাফা হবে।  হজ এজেন্টদের নিকট আহ্বান। আপনারা ইবাদতের কাজে সহজ-সরল মানুষদের কষ্ট দেবেন না। যারা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায় হজ বা ওমরাহর নিয়ত করে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করতে চান তাদের সাথে প্রতারণা থেকে বিরত থাকুন।
আবদুল কুদ্দুস মাখন
লেখক : পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
smakhon@gmail.com

চট্টগ্রামে হোটেল ও রেস্টহাউজে কলগার্ল বাণিজ্য -২সপ্তাহে ৩শতাধিক আটক by ওমর ফারুক

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে আবাসিক হোটেল ও রেস্টহাউজগুলোতে কলগার্ল বাণিজ্য রমরমা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশী, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ, অলঙ্কার, পতেঙ্গা ও রেলস্টেশন এলাকায় কলগার্ল বাণিজ্য ও দেহব্যবসায় চলছে। এসব রেস্টহাউজ ও আবাসিক হোটেলকে ব্যবহার করে প্রতারক সুন্দরীদের ফাঁদে ফেলে একটি চক্র ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সর্বস্বান্ত করছে। নগরীর হোটেল ও রেস্টহাউজগুলোতে এ নিয়ে চলতি বছরে বেশ কয়েকজন কলগার্ল খুন হওয়ায় উদ্বিগ্ন প্রশাসন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) দুই সপ্তাহ ধরে নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও রেস্টহাউজগুলোয় অভিযান চালিয়ে তিন শতাধিক পতিতা,খদ্দের ও কলগার্ল আটক করেছে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে নগরীর উত্তর খুলশীর ৫ নম্বর সড়কের এন এস রেস্টহাউজে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত সাত মহিলাকে আটক করেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্্েরট শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এই অভিযান পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, খুলশী আবাসিক এলাকার এন এস রেস্টহাউজে অবৈধ মাদকদ্রব্যের বিপুল মজুদ থাকার খবরের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অভিযানকালে এই রেস্টহাউজে মাদকের বাইরে অভিজাত শ্রেণীর জন্য কলগার্ল বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। অভিযানকালে রেস্টহাউজের ব্যবস্থাপকসহ আটক মহিলাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রেস্টহাউজে অবস্থানকারী অতিথিদের চাহিদামতো কলগার্ল সরবরাহ করা হতো।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে বিভিন্ন হোটেলে অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১১ জন নারী-পুরুষকে আটক করেছে পুলিশ। সিএমপির মুখপাত্র ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার প্রকৌশলী হাছান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নগরীর হোটেলগুলোতে একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে শতাধিক নারী-পুরুষকে আটক করা হয়।
৯ অক্টোবর অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে নগরীর কোতোয়ালি থানার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ২৪ জন নারী-পুরুষকে আটক করেছে পুলিশ। কোতোয়ালি থানার  উপপরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন জানান, অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে নগরীর গেস্ট ইন, মার্টিন হোটেল, ঢাকা হোটেল, হোটেল তুনাজ্জিন, সুগন্ধ হোটেলে অভিযান চালিয়ে ২৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন মহিলা ও ১২ জন পুরুষ রয়েছে। তারা হোটেলে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
গত ১০ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে নগরীর বেশ কয়েকটি হোটেল থেকে ১১২ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন মহিলা ও ৫৫ জন পুরুষ, ৭৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দু’জন। নগর পুলিশ সূত্রে জান গেছে, গত কয়েক দিনে নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতে ধারাবাহিক অভিযানে এ পর্যন্ত তিন শ’ নারী পুরুষকে আটক করেছে সিএমপির বিভিন্ন থানার পুলিশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী-পুরুষ আটক হয়েছে নগরীর কোতোয়ালি থানায়। পুলিশ জানায়, দুই সপ্তাহ ধরে চলা পুলিশি অভিযানে আটক তিন শতাধিক ব্যক্তির মধ্যে শতাধিক কলগার্ল রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং প্রাইভেট কোম্পানির নারী কর্মচারী রয়েছে।
এ দিকে মহানগরীর জুবিলী রোড এলাকার সবচেয়ে অভিজাত হোটেল হিসেবে পরিচিত ‘হোটেল টাওয়ার ইন’-এ পরিচালিত অভিযানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কলগার্ল ও খদ্দের আটক করা হয়। এই আধুনিক হোটেলে এমন অসামাজিক কার্যকলাপ চলার বিষয়টি খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদেরও হতবাক করেছে। গেস্ট ইন ও হোটেল মার্টিন থেকে ৫৩ জন নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে নগরীর যেসব হোটেলে অভিযান চালানো হয়েছে সেগুলো হলোÑ আকবর শাহ এলাকার হোটেল স্টারমার্ক, গ্রিনওয়ে, সুপার প্রিন্স ১ ও ২, সুপার ইন ১ ও ২, লেকসিটি ও হাইওয়ে। সদরঘাট এলাকার সিলমুন, কোতোয়ালি থানা এলাকার টাওয়ার ইন, গেস্ট ইন ও মার্টিন এবং চান্দগাঁও থানা এলাকার ওয়েল প্লেস ও হোটেল নাদিয়া। চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার হাছান চৌধুরী জানান, চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬ থানায় অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

বোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় খুন হলেন ভাই

রাজধানীর ভাষানটেকে স্কুলছাত্রী ছোট বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় নাসির হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে বখাটেরা। গত শুক্রবার রাতে পশ্চিম ভাষানটেকের গোলটেকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

নাসিরের বড় ভাই মোশারেফ হোসেন জানান, এলাকার বখাটে আবুল, বাবলু, পাগলা মামুন, কানা আলম, দাঁত ভাঙা খোকনসহ আট-নয়জন বখাটে তার মামাতো বোনকে বেশ কিছু দিন ধরে রাস্তা ঘাটে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। শুক্রবার বিকেলে নাসির মামার বাসায় বেড়াতে যায়। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৪টায় বখাটেরা মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে। এ সময় বাসায় ফিরে মামাতো বোন নাসিরকে বিষয়টি খুলে বলে। সন্ধ্যায় নাসির ওই বখাটেদের কাছে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানায় এবং পুলিশে অভিযোগ করার কথা বলে সতর্ক করে দেয়। পরে রাত সাড়ে ৯টায় নাসির মজুমদার বাড়ি মোড়ে আজিজের চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। এ সময় ওই গ্রুপের একজন নাসিরকে গোলটেক এলাকায় নিয়ে যায়। এরপর হাত-পা বেঁধে জিআই তার ও পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন নাসিরকে উদ্ধার করে স্থানীয় কিনিকে নেয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দেড়টায় মারা যান নাসির।
পরিবার সূত্র জানায়, নাসিরের মামাতো বোন ভাষানটেক মুক্তিযোদ্ধা উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। তার বয়স আনুমানিক ১৩ বছর।
এ ব্যাপারে ভাষানটেক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম নবী বলেন, এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই মোশারেফ হোসেন বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামুন, বাবলু, কানা আলম, খোকন, চুক্কা, সোহেল, সুজনসহ আরো চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। আসামিদের গ্রেফতারে বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে।
জানা গেছে, নাসিরের বাবার নাম আবদুল মতিন সরদার। গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদীর মাগুরায়। তারা ভাষানটেকের ৯৩/১ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে নাসির ছিলেন সবার ছোট। তার জাহিদ নামে চার বছরের এক ছেলে সন্তান রয়েছে। স্ত্রীর নাম সেনু বেগম।

স্কুলছাত্র জুবায়ের হত্যার নেপথ্যে সমকামিতা

সমকামিতায় লিপ্ত না হওয়ায় রাজধানীর উত্তরায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ‘ও’ লেভেল পড়ুয়া জুবায়ের আহমেদকে হত্যা করেছে বিদেশী নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদের (৪৬)। ফুটবল প্রশিক্ষক আলজেরিয়ার এই নাগরিক পানিতে চুবিয়ে জুবায়েরকে হত্যা করে। এ ঘটনা জুবায়েরের বন্ধু ইসমাইল দেখে ফেললে তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন ও হুমকি দেয় কাদের। যে কারণে বন্ধু ইসমাইল হত্যার ব্যাপারে মুখ খোলেনি সে। বিদেশীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয় বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি শেখ নাজমুল আলম।
গোয়েন্দারা জানান, সমকামী বিদেশীর নাগরিক কাদেরের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল স্কুল ছাত্রটির ওপর। আবু ওবায়েদ কাদের কিশোরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে সমকামিতায় লিপ্ত হতেন।

রোববার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিসি শেখ নাজমুল আলম সাংবাদিকদের জানান, জোবায়েরের মা দিলারা জামান তার ছেলেকে হত্যার অভিযোগ এনে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা করেন। এতে আবু ওবায়েদ কাদেরকে প্রধান আসামি ও ইসমাইল নামে অপর একজনকে সহযোগী আসামি করা হয়। পরবর্তীতে আবু ওবায়েদ কাদের ও ইসমাইল হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইসমাইল হোসেন ইংরেজি মাধ্যমের নবম শ্রেণীর ছাত্র ও জুবায়েরের খেলার সাথী। দু’জনেই বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। জুবায়ের হত্যার পর থেকেই ইসমাইল কিশোরগঞ্জে তার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিল। গত শুক্রবার উত্তরা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল শনিবার তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
এর আগে গত রোববার আবু ওবায়েদ কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। গত শুক্রবার তাকে চারদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তার আগে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ নাজমুল আলম বলেন, গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদের জানিয়েছে- গত ৪ অক্টোবর বিকেল ৫টার পরে প্রশিক কাদের, জুবায়েরসহ আরো কয়েকজন উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের মাঠে ফুটবল খেলে। খেলা শেষে কাদের, জুবায়ের ও ইসমাইল মাঠের পাশের পুকুরে গোসল করতে নামে। এসময় প্রশিক্ষক কাদের জুবায়েরকে জড়িয়ে ধরে সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করে। এতে জুবায়ের বাঁধা দিলে তাকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে সেখানে লাশ ডুবিয়ে দেয়। বিষয়টি ইসমাইল দেখে ফেলায় তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন  দেখায়। এছাড়া বিষয়টি প্রকাশ না করতে হুমকি দেয়া হয় তাকে।
নাজমুল আলম জানান, জুবায়ের ওই দিন রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বাসায় না ফেরায় তাকে খোঁজা শুরু হয়। পরের দিন সকাল ৬টার দিকে আলজেরিয় নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদের, জুবায়েরের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানায় জুবায়ের কোথায় আছে তিনি তা জানেন। তার কথাবার্তায় সন্দেহ হলে বিষয়টি জুবায়েরের পরিবারের সদস্যরা থানা পুলিশকে অবহিত করেন। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কাদের জানায় জুবায়েরের লাশ পুকুরে আছে। পরে সেখান থেকে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
ডিসি শেখ নাজমুল জানান, আবু ওবায়েদ কাদের একজন সমকামী। সে পাসপোর্টবিহীন অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাস করছে। সে ফুটবল প্রশিক্ষণের নামে কিশোরদের সাথে সখ্য গড়ে তোলে এবং পরবর্তী সময়ে তাদেরকে সমকামিতায় বাধ্য করে থাকে। তার ফেসবুক ও  মোবাইল ফোনে সমকামিতার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ঈদের আগের দিন রোববার দুপুরে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক কল্যাণ সমিতির মাঠের পাশের পুকুর থেকে জুবায়েরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। তার আগের দিন শনিবার থেকে সে নিখোঁজ ছিল।

দুর্বৃত্তদের গুলিতে আরেকজন নিহত -জীবন ঝুকিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশী প্রবাসীরা by আবুল হাসান

দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আবদুল কুদ্দুছ ( ৩২) নামের আরো এক বাংলাদেশী ব্যবসায়ী খুন হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ইলিয়াছ ভূঞা নামের আরো এক বাংলাদেশী । নিহত কুদ্দুছ ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া পৌরসভার দক্ষিণ সতর গ্রামের মৃত রহিম উল্লাহর ছেলে । এদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের ওপর প্রতিনিয়ত হামলা ও খুনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠছেন সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা এবং দেশে থাকা তাদের স্বজনেরা । জানাগেছে, ছাগলনাইয়া পৌরসভার দক্ষিণ সতর গ্রামের আবদুল কুদ্দুছ আয় রোজগারের আশায় নয় বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যায় । কুমালাঙ্গার নেল স্ট্রিট নামক শহরে এক জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে তার দোকান- পাঠ রয়েছে । গত শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায় আবদুল কুদ্দুছ দোকান বন্ধ করে বাসায় আসলে পূর্ব থেকে বাসায় ঢুকে থাকা কৃঞ্চাঙ্গ ডাকাতরা কুদ্দুছ ও ইলিয়াছকে আটক করে টাকা দিতে বলে । টাকা না দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ডাকাতরা কুদ্দুছের পেটে গরম পানি ঢালতে থাকে । এ পর্যায়ে ডাকাতরা কুদ্দুছের মাথায় এলোপাথাড়ি আঘাত করে পরে গুলি করে ফেলে যায় । স্থানীয় টংগা হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন । দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়েকজন বাংলাদেশী জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে নানামুখি ঝুকির মধ্যেও বাংলাদেশীর অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন । আফ্রিকার নামিদামি সব শহরেই বাংলাদেশীরা দোকা পাট গড়ে তুলেছেন । অসংখ্য বাংলাদেশী বিভিন্ন দোকান পাটে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে ভাল রোজগার করছেন । কিন্তু আফ্রিকার হিংস্্র ও বেপরোয়া এক শ্রেণির কৃঞ্চাঙ্গ যুবকরা প্রায়ই ডাকাতি, চুরি ও চাঁদা দাবিতে হামলা ও খুনের নেশায় মেতে রয়েছে । সম্প্রতি ফেনীর দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়ার দুই বাংলাদেশীকে রাতে দোকানের মধ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা । সেখান থেকে কয়েকজন জানান, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীরা ব্যবসা বাণিজ্য করে আসছেন । কখন কার ভাগ্যে কি গড়ে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয় সব সময় তাদের । সেখানে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরাই দুর্বৃত্ত ও ডাকাতদের বেশি টার্গেটে বলে জানাগেছে ।  গত কয়েক বছরে ভাগ্যাণেষাণে আফ্রিকায় রোজগারের আশায় যাওয়া  ফ্রি ষ্ট্রেট ব্লুম পটিন, কেপটাউন, ডারবান, জোয়ান্সবার্গ, কমালাঙ্গা, পলকুয়ানি, ইষ্ট লন্ডন, প্যারিস, ডিননি,সুয়েটা, মিটারেন্স,নেটাল,জানিনসহ বিভিন্ন শহরে অসংখ্য ছোট-বড় দোকান পাট দিয়ে ব্যবসা করছেন বাংলাদেশী যুবকরা । দক্ষিণ আফ্রিকা ফেরত ও বর্তমানে আফ্রিকায় অবস্থানকারী বাংলাদেশীরা জানান, সততা,দক্ষতা ও কর্মতৎপরতার কারণে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের দিন দিন উথানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীরা বাংলাদেশীদের হিংসা করে ক্ষতি সাধনে তৎপর থাকে । আবার বাংলাদেশীরা ব্যবসায়িক দ্বন্ধের জেরে আফ্রিকানদের ভাড়া করে নিজ দেশের ভাইয়ের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটাচ্ছে সেখানে । প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে,কয়েক বছরে কুমিল্লার রোমান, নোয়াখালির মিলন,জয়নাল, ফেনীর দাগনভূঞার আলী, আজাদকে পুড়িয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা । এ ছাড়া ফেনীর রাজু, আইয়ুব,জনি, মাসুম, দাগনভূঞার কফিল,নয়ন,ছাগলনাইয়ার আলিম,কিরন, স্বপনসহ অসংখ্য বাংলাদেশী দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে জানান । অনেকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দেশে পাড়ি জমিয়েছেন । তবে , অসংখ্য বাংলাদেশী এখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা বানিজ্যে ও চাকুরী করে অর্থ উপার্জন করছেন এখনো । ব্যবসায়ীরা ঝুকি নিয়ে ব্যবসা করলেও চাকুরীজীবীদের সেখানে খুব বেশি সমস্যা নেই বলেও তারা জানিয়েছেন । সূত্রে জানাগেছে, সেদেশে বাংলাদেশীদের দোকান পাট ডাকাতি কালে বাঁধা দিলেই আফ্রিকানরা গুলি অথবা রাতে দোকানে আগুন দিয়ে মালিক ও দোকান পুড়িয়ে দিচ্ছে । আবার, বাংলাদেশীরা পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্ধের কারণে সে দেশের সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে এক বাংলাদেশী অপর বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে ভাড়া করে লেলিয়ে দেয়ারও অসংখ্য ঘটনা ঘটছে । আবার নারী গঠিত বিরোধের জের ধরেও সেখানে বাংলাদেশীদের ওপর হামলা, খুনের ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশীদের ওপর । এদিকে, গতকাল রোববার নিহত কুদ্দুছের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে তার বৃদ্ধ মা ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বুক দাফটিয়ে আহাজারি করে বাতাসভারী করে তুলছেন । সঙ্গে স্বজনদের গগণ বিধারি শোরচিৎকারে প্রতিবেশিরাও চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারেননি । গতকাল স্থানীয় সময় দুপুরে কুদ্দুছের লাশ বিমানে দেশে পাঠানোর কথা রয়েছে বলে নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে ।

ক্নিনটন ব্যাভিচার করেননি!

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্নিনটন মনিকা লিওনস্কির সাথে তার পরকীয়া নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে ইহুদি আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলে ফাঁস হওয়া একটি ইমেইলের সূত্রে  জানা গেছে। তাতে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, ক্নিনটন ব্যাভিচার করেননি, তিনি হস্তমৈথুনের মতো সাধারণ পাপ করেছিলেন।

১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ইমেইলটি পাঠিয়েছিলেন ডার্টমাউথ কলেজ জুইশ স্টাডিজ অধ্যাপক অধ্যাপক সুসানাহ হেসকাল ইমেইলটি পাঠিয়েছিলেন হোয়াইটহাউজের উপদেষ্টা সিডনি ব্লুমেন্থালকে। মনিকার সাথে ক্নিনটনের দৈহিক সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক সোরগোলের মধ্যে ইমেইলটি পাঠানো হয়েছিল এবং তা ব্যবহারও করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় অল্পের জন্য ইমপিচমেন্টের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন ক্নিনটন।
নিউ ইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায় বলা হয়েছে যে ওই ইমেইল দাবি করা হয়, ‘কাসিক্যাল ইহুদি আইন অনুসারে প্রেসিডেন্ট ক্নিনটন ব্যাভিচার করেননি। কারণ ব্যাভিচারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সেটা হলো কোনো বিবাহিত নারীর সাথে কোনো বিবাহিত পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক। কিন্তু মনিকা যেহেতু সিঙ্গেল, তাই কিনটন ব্যাভিচার করেননি।’
ইমেইল বার্তায় আরো বলা হয়, হস্তমৈথুনের মতো সাধারণ পাপ করেছেন। এই পাপ বেশির ভাগ ইহুদি পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় করে থাকে।’
সূত্র : টাইমস অব ইসরাইল।

হুদহুদের আঘাতে বিশাখাপত্তনম তছনছ, প্রাণহানি ৫

ঘূর্ণিঝড় হুদহুদের আঘাতে তছনছ হয়ে গেছে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম এবং আরো কয়েকটি নগরী। আক্রান্ত এলাকায় কেবল ধ্বংসের ছবি। ঘর-বাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, গাছপালা উপড়ে পড়েছে, বিদ্যুতের লাইন গেছে ছিড়ে। অন্তত পাঁচজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় প্রাণহানি তেমন হয়নি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় ১শ’ ৮০ কিলোমিটার বেগে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনাম ও শ্রীকাকুলামে আঘাত হানে হুদহুদ। হুদহুদের প্রভাবে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ হয় অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম। শ্রীকাকুলাওম মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়। প্রবল গতিতে ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টিতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় উপড়ে যায় বিদ্যুতের খুঁটি ও বড় বড় গাছ। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে টেলি যোগাযোগও। ওড়িষ্যাতেও হুদহুদের প্রভাব পড়ে। সেখানে সকাল থেকে ঝোড়া হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টি হয়। রাজ্যের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা গঞ্জাম, গজপতি, কোরাপুট, পুরী, কালাহান্ডি ও রায়গড়ে হুদহুদের তাণ্ডব চলে। ভারী বৃষ্টি হয় মালকানিগিরি, কন্ধল এবং ফুলবনি জেলায়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ায় অন্ধ্রপ্রদেশ ও উড়িষ্যার বিভিন্ন স্থানে গাছচাপা, দেয়ালচাপায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। হুদহুদ আঘাত হানার আগেই উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে কয়েক লাখ লোককে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। হুদহুদের কারণে স্থানীয় বেশ কিছু ট্রেন ও বিমানের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। অন্ধ্র প্রদেশের পাশাপাশি উড়িষ্যাতেও প্রবল বেগে ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

কুকুরের জন্য চাই মুগুর by কাজল ঘোষ

এবারের ঈদ ছুটিতে ছিলাম কুলাউড়ায়। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। বিধাতা এ এলাকাকে সবুজ দিতে কার্পণ্য করেননি। হয়তো মানুষের লোভের গ্রাসে এখনও উজাড় হয়নি বৃক্ষরাজি। না হলে এমন সবুজ এখান থেকেও হয়তো বিলুপ্তির তালিকায় নাম লেখাতো। পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে কিভাবে এ সবুজকে রক্ষা করা যায়। কারণ, গত ক’দিন আগে কৃষি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির একটি উদ্বেগ নজর কেড়েছে। সেখানে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা দিন দিন কৃষিজমি কমে যাওয়ায় করণীয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সংবাদটি পড়ে আমার খুব সহজেই একটি কথাই মনে পড়লো। তাহলো কৃষি জমিতে কোন বাড়ি বা অন্য কোন ধরনের স্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা। এ নিয়ে আর ভাবাভাবির কি আছে? তাই কি হয় এ দেশে। আমাদের এখানে যেমন খুশি তেমনভাবেই চলছে। কারণ, রাজধানী ঢাকায় ছয় তলার বেশি ভবন নির্মাণে রাজউকের এলাকাভিত্তিক একটি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু রাজউক কর্মকর্তারাই বিভিন্ন কারসাজিতে সমানতালে এই বে-আইনি স্থাপনাগুলোর বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন। আর রাজধানী ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে। প্রসঙ্গক্রমে ভুটান রাজার একটি গল্প বলতে চাই। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, পোলট্রি সেক্টরে বার্ড ফ্লু দেখা দেয়ায় দেশে-দেশে নানান ধরনের প্রতিষেধক নিয়ে আলোচনার কথা। সার্কভুক্ত এ দেশটির রাজা তখন সিনিয়র মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের নিয়ে বসলেন করণীয় ঠিক করতে। কথায় কথায় রাজা বললেন, আমার মনে হয় যত দিন প্রতিষেধক না আবিষ্কার হয়েছে তত দিন ডিম না খাওয়াই ভাল। এ আলোচনা ছড়িয়ে গেল ভুটানজুড়ে। আর পরদিন থেকেই পুরো রাজ্যে ডিম খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। অথচ আমাদের এখানে আইন করেও এর বাস্তবায়ন নেই। আর দেশের চলমান রাজনীতির মতোই এসব দেশরক্ষার ইস্যুতে আমাদের এখানে ঐক্য নেই।
যেখানেই থাকি না কেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই খোঁজ নিই চলমান ঘটনার। ঈদের পরদিন সকালে টেলিভিশনের একটি স্ক্রল মনকে বিষাদাচ্ছন্ন করে তুললো। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বখাটেরা নির্মমভাবে পেট্রলের আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে মা-তিন মেয়েকে। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নরপশু জাহাঙ্গীর এ ঘটনা ঘটিয়েছে। যখন এ লেখা লিখছি ঠিক সে সময়ই খবর এসেছে রাজধানীর ভাষানটেকে একই রকমের একটি ঘটনার। সেখানে বখাটেদের নির্যাতন থেকে বোনকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে ভাইকে। একইভাবে ধলপুরে এক বিমাতা তার নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে টয়লেটের ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছে।
ইত্তেফাক খবর দিয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার ৬৮০ জন খুন হয়েছেন। শুধু চলতি বছরেই আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ৩ হাজার ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে রাজধানীতে ১৭২ জন খুন হয়েছেন। এদের মধ্যে মাত্র ১০ জন খুন হয়েছেন রাজনৈতিক কারণে। বাকি ১৬২টি খুনের বেশির ভাগই ঘটেছে সামাজিক ও পারিবারিক কারণে। পারিবারিক কলহ, অর্থ লেনদেন, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই প্রতিপক্ষের হাতে এরা খুন হয়েছেন। পুলিশের ভাষ্যমতে গড়ে প্রায় ১৪-১৫টি খুনের ঘটনা ঘটছে। যার বেশির ভাগই রাজধানীতে। অথচ রাজধানীতেই যেখানে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা থাকার কথা।
কি মানসিক বিকৃতি নিয়ে আমরা বসবাস করছি। কোরবানি নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি চমৎকার কবিতা আছে। মনের পশুরে করো জবাই, পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই। চারপাশের এ ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে আমাদের মনের পশুরা আরও অতিমাত্রায় পশুতেই পরিণত হচ্ছে। না হলে কি অপরাধ ছিল মির্জাপুরের সোহাগপাড়ার মনিরা, মিলি ও মিমের। আর কি অপরাধ ছিল তাদের মা হাসনা বেগমের। একটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ে। তাকে বিয়ে করার যে লোভ তাতে রাজি না হওয়াই এ জিঘাংসা। কি দুর্ভাগ্য আমাদের। ৭ই অক্টোবর মঙ্গলবার এ ঘটনার পর পাঁচ দিন চলে গেছে এখনও পর্যন্ত ঘাতক জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। যদিও শেষ পর্যন্ত পুলিশ এ নরঘাতকে ধরতে লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। দেশবাসীর কাছে এ লেখার মাধ্যমে আবেদন রাখতে চাই, যেখানেই এ নরঘাতককে পাবেন ধরিয়ে দিন। আমরা আমাদের সন্তানদের একটি সুস্থ-সুন্দর সমাজ উপহার দিতে চাই। যেখানে থাকবে না কোন হানাহানি। থাকবে না রক্তপাত। আমাদের মেয়েরা কোন বখাটের ভয় মাথায় নিয়ে স্কুলে যাবে না। সরকারের প্রতি আবেদন রাখতে চাই, নরঘাতক জাহাঙ্গীরের দ্রুত বিচার আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। যেন কেউ এ ধরনের নৃশংস কর্মকাণ্ড করার সাহস না পায়। কথায় আছে, যেমন কুকুর তেমন মুগুর না হলে চলে না। এসব নরঘাতকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ গড়ে তুলুন।

ভাষা-মতিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি কোন মত বা দলের আদর্শ পোষণ করতেন তা নিয়ে বোধকরি রাজনীতি করা কোন সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। এ মানুষের বিদায়ে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নেমেছিল। কিন্তু নানা মহলের দাবি করা সত্ত্বেও ভাষা সেনাপতি আবদুল মতিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয়নি। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, পর্যাপ্ত প্রটোকল না থাকায় এ মানুষটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া যায়নি। ভাষা মতিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে প্রটোকলের ঘাটতি কতটা ফাঁপা বক্তব্য হতে পারে ভাবাই যায় না। আমাদের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, ভিআইপি, ভিভিআইপিদের প্রটোকলে কোন ঘাটতি নেই। অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি রকমের প্রটোকলে সাধারণের নাভিশ্বাস ওঠে। কিন্তু ওই প্রটোকলের অভাববোধ কেবল এবিএম মূসা আর ভাষা মতিনদের বেলায়ই ঘটে। ভাষা মতিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার ক্ষেত্রে এ রাষ্ট্রের অনুদারের ছোটখাটো যুক্তি হয়তো থাকতে পারে। কিন্তু প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসার বেলায়। তিনি তো সংসদ সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কই সব আইন ও বিধান থাকার পরও তো এ মানুষটির জানাজা সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সংসদের স্পিকারও এ ইস্যুতে রহস্যজনক কারণে নীরব থেকেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এবিএম মূসার মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষটিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান না নিয়েই চিরবিদায় নিতে হয়েছে। একইভাবে ভাষা-মতিনকেও। বলাবলি আছে, সরকারের বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে অবস্থান নেয়ায় এ দু’জনকে এভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র সম্মান না দিলেও কোটি মানুষের শ্রদ্ধার আসন থাকলো এ দু’জনের জন্য।

ভারতের একটি ঘটনায় বিস্মিত হয়েছি। ৩রা অক্টোবর দশেরা উপলক্ষে সেখানে এক মঞ্চে বসেছিলেন প্রণব মুখার্জি, নরেন্দ্র মোদি ও সোনিয়া গান্ধী। একই সুরে কথা বলেছেন ভারতের উন্নয়নে। অথচ অল্পদিন আগেই নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয় ঘটেছে বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের। তাতে কি গণতন্ত্রের মূল সুর যদি হয় জনগণের উন্নয়ন তার জন্য একমঞ্চে বসতে আপত্তি কি? দশেরা উপলক্ষে উন্মুক্ত জনসভায় ভারতের উন্নয়নে এক সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রণব মুখার্জি। অথচ কি বিপরীত চিত্র আমাদের এখানে। ঈদ-পরবর্তীতে প্রকাশিত পত্রপত্রিকা খুললেই দেখতে পাবো দু’নেত্রী ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন ভিন্ন দু’টি প্লাটফরমে। তাদের কথায় ছিল রাজনীতি। আর তাও আন্দোলন, সরকার ও বিরোধী পক্ষের নিজের এজেন্ডা নিয়েই পাল্টাপাল্টি। আমরা অন্তত এ উৎসবের দিনে টেলিভিশন বা অনলাইনে প্রচারিত সংবাদে কখনও অন্যের গিবত গাওয়ার পরিবর্তে ভাল কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না? এমন কঠিন গণতন্ত্রের মারপ্যাঁচে বন্দি বাংলাদেশ।

হুদহুদকে ধন্যবাদ দিতে হয় একপশলা বৃষ্টি উপহার দেয়ার জন্য। রাজধানীর পথঘাট পরিষ্কার আর কোরবানির বর্জ্য থেকে নির্গত গন্ধ থেকে মুক্তি দিতে এর বিকল্প ছিল না।

এবার ভিট টপ মডেলের উপস্থাপনায় ফারিয়া

প্রতিযোগিতামূলক রিয়েলিটি শো ‘ভিট-চ্যানেল আই টপ মডেল’-এর এবারের আয়োজন উপস্থাপনা করবেন এ প্রজন্মের জনপ্রিয় মডেল-উপস্থাপক নুসরাত ফারিয়া মাজহার। শো’র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনিই সঞ্চালনা করবেন বলে জানিয়েছেন। সমপ্রতি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন নুসরাত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপস্থাপনা আমার রক্তে মিশে গেছে। এখন নিয়মিতই উপস্থাপনা করছি। কিন্তু এ শোটি একটু ব্যতিক্রম বলেই আমার কাছে মনে হয়। শুধু এটি নয়, যে কোন প্রতিযোগিতামূলক শো সঞ্চালনায়ই ব্যতিক্রম লাগে। আশা করছি টপ মডেলের এ রিয়েলিটি শো-তে দর্শক আমাকে ভিন্নরূপেই দেখতে পাবেন। এদিকে বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার চলতি বেশ কিছু অনুষ্ঠান নিয়মিত উপস্থাপনা করছেন নুসরাত। পাশাপাশি রেডিও জকি হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই আমেরিকা ও কাতারে ভিন্ন দুটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে অংশ নেবেন জনপ্রিয় এ মডেল-উপস্থাপক। উল্লেখ্য, গতকাল শেষ হওয়া মাছরাঙা টেলিভিশনের ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘রাঙারাত’ উপস্থাপনা করে বেশ প্রশংসিত হয়েছেন নুসরাত ফারিয়া। পাশাপাশি বিটিভির ঈদ আনন্দমেলায় নৃত্য পরিবেশন করেও প্রশংসিত হয়েছেন।

জ্যাকুলিনের আবেদনময়ী পুল সং

‘কিক’ ছবির সফলতার পর থেকে বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই কাজ করছেন তিনি। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল ছবিও এটি। এদিকে বর্তমানে তিন তিনটি ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। ছবিগুলো হলো ‘রয়’, ‘বাঙ্গিস্তান’ ও ‘অ্যাকোর্ডিং টু ম্যাথিউ’। এর মধ্যে ‘রয়’ ছবিতে রণবীর কাপুর ও অর্জুন রামপালের বিপরীতে অভিনয় করছেন তিনি। রোমান্টিক অ্যাকশন থ্রিলারধর্মী এ ছবিটি পরিচালনা করছেন বিক্রমজিত সিং। সম্প্রতি এ ছবির একটি দৃশ্যে অভিনয় করে আবারও ব্যাপক আলোচনায় এলেন জ্যাকুলিন। ছবিতে একটি পুল সংয়ে পারফর্ম করেছেন তিনি। গানটি করতে গিয়ে অনেকটাই নগ্ন হয়েছেন তিনি। পুরো গানে সুইমিংপুলে কেবল টাওয়াল পরে নাচতে দেখা যাবে তাকে। মিঠুনের সংগীতায়োজনে এ পুল সংটি গেয়েছেন সুনিধি চৌহান। এ ধরনের গানে প্রথমবারের মতো এমনভাবে ক্যামেরাবন্দি হলেন জ্যাকুলিন। গণেশের কোরিওগ্রাফিতে এরই মধ্যে মুম্বইয়ের একটি পাঁচতারকা হোটেলে শুটিং হয়েছে গানটির। গোপনভাবে ধারণের চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি সম্ভব হয়নি। মিডিয়া সময় মতো পৌঁছে যায় শুটিং স্পটে। এরপর বেশ বিব্রত অবস্থায় পড়েন জ্যাকুলিন। জানা গেছে, ‘রয়’ ছবিটি মুক্তি পাবে আগামী বছরের প্রথম দিকে। এরই মধ্যে এর বেশিরভাগ অংশের শুটিং শেষ হয়েছে। ছবিতে নিজের পুল সং প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে জ্যাকুলিন মিডিয়াকে জানিয়েছেন, জীবনে প্রথমবারের মতো এরকম গানে পারফর্ম করলাম। অন্যরকম অভিজ্ঞতা। যেহেতু এটি সুইমিংপুলের গান, তাই আবেদনময়ীরূপেই উপস্থাপন করা হয়েছে আমাকে। আমি বিষয়টি নিয়ে অনেক এক্সাইটেড। তবে সবকিছু সহজ হয়ে গেছে কোরিওগ্রাফার গণেশ জি’র কারণে। তিনি অনেক সহজে আমাকে বুঝিয়েছেন গানের নাচের স্টেপ সম্পর্কে। আশা করছি দর্শক উপভোগ করবেন গানটি।

যেখানে আইন নেই কর দিতে হয় না

আজকের বিশ্ব অনেক বেশি ছোট আর সুবিধাজনক। এক ক্লিকের মাধ্যমেই আমরা চ্যানেল পাল্টিয়ে বিশ্বের সকল খবর মুহূর্তেই জেনে নিতে পারি, বিশ্বের দূরতম দেশের টিকিটটাও কেটে ফেলি। আমাদের খাদ্য উৎপন্ন হচ্ছে, নিজেদের পছন্দমতো জিনিস পৌঁছে যাচ্ছে ঘরের দ্বারে। বললেই ঘরে এসে পৌঁছে যাচ্ছে পছন্দসই পণ্য, স্বাস্থ্যখাত হয়েছে অনেক উন্নত, শিক্ষার অধিকার হয়েছে সুরক্ষিত। বলতে গেলে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে আমাদের জীবন পালটে গেছে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায়। তবুও আমরা কেন চাপ অনুভব করি, এতটা ভার বোধ করি কিংবা মুক্ত হতে চাই? এত এত সুবিধা কি আমাদের কিছুই দেয়নি? আমরা কি এমন কিছু ভুলে গেছি যেটি আমাদের পূর্বপুরুষেরা জানতেন? তারা তো সুখীই ছিলেন। আফ্রিকার হাদজা উপজাতিটির মধ্যে রয়েছে অতীতের মানুষের আচরণের সবচেয়ে কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য। তাঞ্জানিয়ার উত্তরে লেইক এয়াসি। এখানেই বসবাস করে বিশ্বের শেষ শিকার সংগ্রহকারী উপজাতিটি। তারা চাষবাস করে না, নিজেদের জন্য স্থায়ী ঘরও বানায় না। প্রায় ১০ হাজার বছর ধরে তারা একটি অপরিবর্তিত জীবনযাপন করে আসছে। তাদের জগৎটি হচ্ছে একটি চূড়ান্ত স্বাধীনতার জগৎ, যেটি আধুনিক সমাজ খুব সহজে কল্পনা করতে পারবে না। আর কখনও এমন জীবনধারণের চিন্তাটি আরও সুদূরপরাহত। এখানে কোন ফোন কল নেই, নেই বার্তা পাঠানোর উপায়। গাড়ি নেই, বিদ্যুৎও নেই। চাকরি নেই, তাই বসের ঝাড়ি খাবার ঝুঁকিও নেই। নেই কোন সময়ের তাড়া, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোন বাধ্যবাধকতা। কোন আইন নেই, করও দিতে হবে না কাউকে। সবচেয়ে আসল যে জিনিসটি, সেই টাকাও নেই এখানে। একে অপরের সঙ্গে খুব কমই বিভিন্ন জিনিস বিনিময় হয়ে থাকে। এটাই হচ্ছে মুদ্রার কাছাকাছি জিনিস। আর বিনিময় যেসব জিনিস হয়, সেগুলো হচ্ছে নিজের প্যান্ট কিংবা স্যান্ডেল জোড়া নিয়ে সামান্য ব্যবসা করা। হাদজা উপজাতিদের মধ্যে পুরুষরা বেবুন শিকারেই ব্যস্ত থাকে সারা দিন। এখানকার জলবায়ু বেশ উত্তপ্ত। তাদের শিকার অভিযানও বেশ বিপজ্জনক। সমস্যা সংকুল ঝোপ, বিষধর সাপ, মানুষখেকো সিংহ- কী নেই? তাঞ্জানিয়ার লেইক এয়াসিতে এখনও হাজারখানেক হাদজা উপজাতি বাস করে। এর সামান্য দক্ষিণে পাওয়া গিয়েছিল অনেক আগের হমিনিডসদের সবচেয়ে পুরোতন ফসিল। আধুনিক সকল দিক বিবেচনা করলে, এতদিনে হাদজা উপজাতিদের টিকে থাকার কথা নয়। তাদের টিকে থাকাটাই একটি ব্যতিক্রম। তারা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে না। তাদের মধ্যে মহামারি, অনাহারিও কখনো ছিল না। তাদের জনসংখ্যা শিকারের প্রাপ্তিতার তুলনায় কখনই খুব বেশি বাড়েনি।

তাদের খাদ্যাভ্যাসও অত্যন্ত সরল- পাখি, বেবুন, সারং ও মহিষের মাংস। এসব তারা নিজেদের হাতে তৈরি তীর কিংবা বর্শা দিয়ে শিকার করে। তাদের ভাষাকে মনে করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো প্রচলিত ভাষা, যেটি এখনও আছে লোকমুখে। আধুনিক মানুষের মতো ব্যস্ত নয় তারা, বরং প্রচুর পরিমাণে অবসর সময় পার করে। তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে খাবারের জন্য শিকার করা, প্রতিদিন পাঁচঘণ্টা সময় ব্যয় হয় এতে। ব্যাস! আর কোন কাজ নেই তাদের। হাজার হাজার বছর ধরে তারা এসব করে আসছে। এসব কেবল তাদের পদচিহ্নের অস্তিত্বই রেখে যাচ্ছে না পৃথিবীর বুকে, বরং এই হাদজা উপজাতি এমন সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে যেসব আমরা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি।

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ২৫০ রোগীর সেবায় ১০ চিকিৎসক by কাজী তানভীর মাহমুদ

নামেই আধুনিক, কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। চাপ বেড়েছে, তবে সেই চাপ সামলে ওঠার সামর্থ্য নেই। যেখানে কমপক্ষে ৪২ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে আছেন মাত্র ১০ জন। বেশির ভাগ বিভাগে কোন চিকিৎসকই নেই। এভাবেই নামমাত্র সেবা দিয়ে চলছে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল।

১৯৭০ সালে ৫০টি শয্যা নিয়ে শুরু হয়ে ২০০৩ সালে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয় হাসপাতালটি। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যেক দিন গড়ে আড়াইশ’ রোগী ভর্তি থাকছেন। সিট সঙ্কটের কারণে  ফ্লোরে, বারান্দায়, রাস্তায় শুয়ে সেবা নিচ্ছেন তারা। ফলে একদিকে সিট সংখ্যার চেয়ে প্রায় ৩ গুণ রোগী আর অন্যদিকে চিকিৎসক সঙ্কট নিয়ে অব্যাহত চাপ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালটি। রোগীরা এসে সেবা না পেয়ে হা-হুতাশ করেন। সামর্থ্যবানরা চলে যান অন্যত্র। কিন্তু যারা থাকেন তারা রীতিমতো বঞ্চিত থাকেন প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা থেকে। এখানে যে সব চিকিৎসক সেবা দিয়ে চলেছেন, তারা জনবল সঙ্কটের কারণে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এরসঙ্গে আছে হাসপাতালটির অবকাঠামোগত ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যা। ওষুধ সঙ্কট এখানে চিরাচরিত ঘটনা। এখন আর রোগীরা এনিয়ে কোন অভিযোগ করেন না। অনেকটাই যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। এখানে চিকিৎসকের অনেক কাজই চালিয়ে নেন নার্সরা। রাতে চিকিৎসক পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার।
সূত্র জানায়, সিট সঙ্কটের পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মচারীদের আবাসিক ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ। এখানে নিয়মিত সিজার, ডিএনসি, চোখের ছানি অপসারণ, সার্জারি, নাক-কান-গলাসহ সাধারণ অপারেশন হয়। বরাট ইউনিয়নের নবগ্রামের মনিরাম রবি দাসের ছেলে বিষ্ণু রবি দাস জানান, এখানকার খাবার মুখে নেয়া যায় না। আর পানি পুরোপুরিই ব্যবহারের অযোগ্য। বাথরুমে কোনভাবেই যাওয়া যায় না। মেডিসিন বিভাগে ভর্তি ৭০ বছরের রঞ্জিত কুমার চক্রবর্তী জানান, ৫ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। সকালে একবার ডক্তার আসেন। আর সারা দিন ডাকাডাকি করলেও চিকিৎসক পাওয়া যায় না। ভ্যানচালক মো. সেলিম মিয়া (৩৫) বলেন, দুপুরে মোটা চালের ভাত-পাঙাশ মাছের টুকরো আর পানির মতো ঝোল দেয়া হয়। রাতেও একই অবস্থা। ডাক্তাররা যে সব ওষুধ লিখে দেন তার সবই বাইরে থেকে কিনতে হয়। রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. মাহাবুবুল হক জানান, ১০০ শয্যার হাসপাতালে ৫০ শয্যার জনবলও নেই। কিন্তু সেবা দিতে হচ্ছে আড়াইশ’ রোগীর। এই চাপের কারণে স্বাভাবিক ভাবেই সেবায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন। শিগগিরই আরও কিছু ডাক্তার এখানে যোগ দিবেন। তাতে চিকিৎসক সঙ্কটের কিছুটা সমাধান হবে। তবে হাসপাতালে এখন পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। ওষুধের কোন ঘাটতি নেই। খাবারের মান নিয়েও কোন সমস্যা নেই।

বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়...

‘রাত তখন একটা। দরজায় টক টক শব্দ। ভাই এসেছে মনে করে দরজা খুলি। এমন সময় ধারালো ক্ষুর দিয়ে নির্মমভাবে আমার শরীরে একের পর এক আঘাত। প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি কি ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু গাল, গলা, পিঠ, ঊরু সবখানে আঘাত করলে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আর কিছু বলতে পারিনি। জ্ঞান ফিরলে দেখি-হাসপাতালের বেডে।’ এ কথা বলে অঝোর ধারায় কাঁদছিল সিলেটের মর্জিনা আক্তার কিরণ। গতকাল সে মানবজমিন-এর কাছে বলে, ‘এক সময়ের সহকর্মী টিটু তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। রাজি হয়নি। এরপর বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তাতেও আমার পরিবার রাজি হয়নি। প্রেম ও বিয়েতে সাড়া না পেয়ে আমাকে খুন করতে নির্মমভাবে ক্ষুর দিয়ে কুপিয়েছে।’ মর্জিনা সিলেট নগরীর পশ্চিম পীর মহল্লার বাসিন্দা। পেশা দর্জিগিরি। প্রায় ৬ বছর আগে তার বয়স যখন ১৬ বছর তখন গোলাপগঞ্জের এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় ওই স্বামী তাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে সংসার জীবনের ইতি ঘটে। সন্তান জন্মানোর পর মর্জিনা বেঁচে থাকার তাগিদে প্রায় ৪ বছর আগে নগরীর মীরের ময়দানের নাজমুন টেইলার্সে কারিগরের চাকরি নেয়। বেশ সুন্দরী মর্জিনাকে এরপর নিজের সম্ভ্রম রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই করতে হয়। ওই দোকানের আরেক কারিগর টিটুর নজর এড়াতে পারেনি সে। টিটুর নানা ছলে-বলে কৌশলে তার কাছে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সে সাড়া দেয়নি। এভাবে ৫-৬ মাস চলার পর টিটুর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মর্জিনা ওই দোকান থেকে চাকরি ছেড়ে দেয়। এর পরও টিটু পিছু ছাড়েনি মর্জিনার। তাদের বাসায় গিয়ে হানা দেয়। মর্জিনার মা ফাতেমা বেগম গতকাল জানিয়েছেন, সিলেট নগরীর মুন্সিপাড়ার মসজিদ গলির বাসিন্দা টিটু বিয়ে করতে প্রস্তাব দেয়। পরিপ্রেক্ষিতে টিটুকে জানানো হয় তার পিতা-মাতা যেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। পরে বিষয়টি ভেবে দেখা যাবে। কিন্তু টিটু তার পিতা-মাতাকে না পাঠিয়ে নিজেই প্রস্তাব দেয় এবং বিয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। ফাতেমা বেগম জানান, টিটুর উত্ত্যক্ত করা থেকে বাঁচতে তারা সিলেট নগরীর বাদামবাগিচা ও পীর মহল্লা এলাকায় পরপর চার দফা বাসা পরিবর্তন করেন। গেল ঈদুল আজহার সময় হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয় টিটুর সঙ্গে মর্জিনার। আর ওই সময় টিটু পিছু পিছু ছুটে যায় তাদের বাসায়। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার আবার দেয় বিয়ের প্রস্তাব। এ সময় মর্জিনার পরিবারের সদস্যরা টিটুকে গালাগাল করে তাড়িয়ে দেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মর্জিনা জানান, সন্ধ্যায় গালাগালের পর রাত একটার দিকে ৫-৬ জন যুবক নিয়ে তাদের পশ্চিম মহল্লাস্থ বাসায় গিয়ে মর্জিনার ক্ষুর দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে আসে। এরপর অজ্ঞান অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর টিটুর লোকজন তাদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেয়। আর মামলা না করতে শাসিয়ে যায়। এদিকে এ ঘটনার খবর পেয়ে সিলেটের বিমানবন্দর থানার এসআই আক্তারুজ্জামান পাঠান হাসপাতালে বক্তব্য নিয়েছেন। সে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর মামলা গ্রহণ করবেন বলে পরিবারকে জানিয়ে গেছেন তিনি। ফাতেমা বেগম জানান, তারা আজ-কালের মধ্যে থানায় মামলা করবেন।