Thursday, October 26, 2017

বৌদ্ধ নেতাকে গ্রেফতারের নেপথ্যে? by ডয়চে ভেলে

বাংলাদেশে উ শি মং নামে এক বৌদ্ধ নেতাকে মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের মদত দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ তিনি বাংলাদেশের নাগরিক৷ তার স্ত্রী আরাকান লিবারেশন পার্টির নেতা৷ তার পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি একজন সমাজ সেবক৷
উ শি মং-এর বয়স ৬৭ বছর৷ মিয়ানমার যাওয়ার সময় ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ১৯ অক্টেবর তাকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) সদস্যরা৷ তার কাছ থেকে একটি ল্যাপটপও জব্দ করা হয়৷ আটকের পর তাকে ঢাকার বিমান বন্দর থানায় হস্তান্তর করে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দেয়া হয়েছে৷
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর-ই-আজম মিয়া ডয়চে ভেলেক জানান, ‘‘তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত৷ আমরা পুলিশ হেফাজতে এনে তাকে শিগগিরই জিজ্ঞাসাবাদ করব৷ এখন তিনি কারাগারে আছেন৷''
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি জানান, ‘‘তিনি মিয়ানমারে স্বাধীনতাকামীদের অর্থের জোগানদাতা৷ তার ল্যাপটপে কিছু ছবি পাওয়া গেছে, যা আমরা তদন্ত করে দেখছি৷ ওই সব ছবির মধ্যে সশস্ত্র অবস্থায় তার স্ত্রী'র ছবিও আছে৷''
ইন্দোনেশিয়ার সংবাদমাধ্যম জাকার্তা পোস্ট জানিয়েছে, সহিংসতায় জর্জরিত রাখাইন প্রদেশে ‘রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন' নামে একটি দাতব্য সংস্থা চালান উ শি মং৷
উ শি মং-এর বোন এথিন রাখাইন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ দলীয় একজন সাবেক সংসদ সদস্য৷ তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে চট্টগ্রাম থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন৷ এথিন রাখাইন বিদেশি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তার ভাইয়ের স্ত্রী মিরা রাজা লিন মিয়ানমারে থাকেন৷ তার সঙ্গেই দেখা করতে মিয়ানমারে যাচ্ছিলেন তার ভাই৷ তিনি দাবি করেন, উ শি মং-এর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা৷ তার মতে, উ শি মং রাখাইনে শান্তির জন্য কাজ করেন৷ মুসলিম ও বৌদ্ধদের সবাইকেই সাহায্য করার চেষ্টা করেন তার ভাই৷
এথিন রাখাইন আরো বলেন, ‘‘আমার ভাইয়ের স্ত্রী মিরা রাজা লিন মিয়ানমারে শান্তি আন্দোলনে ছিলেন৷ তিনি সেখানকার পরিচিত বিদ্রোহী নেতা৷''
তার পরিবারের এক সদস্য ফোনে দাবি করেন যে, ‘‘মং-এর স্ত্রীর সঙ্গে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি'র পরিচয় আছে৷''
রাখাইনে একটি নারীদের সংগঠনের প্রধান লিন৷ আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি)-রও একজন সিনিয়র সদস্য তিনি৷ লিন আগে গেরিলা নেতা ছিলেন৷
এদিকে বাংলাদেশী এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ‘‘এএলপি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাবিরোধী ছিল৷''
উ শি মং-এর বোনের স্বামী কেও শি অং কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মং-এর জন্ম বাংলাদেশে৷ তার পূর্ব পুরুষরাও এখানকার নাগরিক৷ উ শি মং-কে মিয়ানমারে যাওয়ার সময় আটক করা হয়৷ তাঁর স্ত্রী মিয়ানমারে থাকেন৷ তিনি সেখানেই যাচ্ছিলেন৷ তার কাছে একটি ল্যাপটপ এবং অল্প কিছু মিয়ানমারের মূদ্রা পাওয়া যায়৷''
তিনি বলেন, ‘‘মং-এর স্ত্রী আরাকান লিবারেশন পাটি ((এএলপি)-র নেতা৷ ওই দলটি বার্মায় কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয়৷ এখন ওই দলটি বার্মায় শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে কাজ করছে৷ মং-এর স্ত্রী চিফ পিস নেগোশিয়েটর হিসেবে কাজ করছেন৷ কিন্তু মং-এর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নাই৷ কারণ, মং বাংলাদেশের নাগরিক৷''
তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘মং অনেক দাতব্য কাজ করেন৷ তার এনজিও রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বরগুনা, পটুয়াখালী এবং কক্সবাজার এলাকায় কাজ করে৷ এছাড়া তিনি ওইসব এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ বাংলাদেশে তার ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প কারাখানা আছে৷''
তিনি দাবি করেন, ‘‘মং কোনো ধরনের সন্ত্রাসী বা উগ্রগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত না৷''
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধপন্থীদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ৷ জাতিসঙ্ঘের হিসেবে গত দু' মাসে এ পর্যন্ত ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে৷
‘‘মং-এর স্ত্রীর সঙ্গে সু চি'র পরিচয় আছে’’
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, কয়েক হাজার মানুষকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে৷ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ঘর-বাড়ি৷ মানবাধিকার সংস্থাগুলোও স্যাটেলাইটের ছবি'র মাধ্যমে দাবি করেছে, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ গ্রামেরই আর অস্তিত্ব নেই৷
এতে বলা হয়, বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমরা৷ পালিয়ে আসা আমিরুল ইসলাম নামের এক রোহিঙ্গা এএফপি'কে জানিয়েছেন, তার ভাইকে এক বাংলাদেশি মগ হত্যা করেছে৷
অভিযোগ রয়েছে, মগ নামের উপজাতি বৌদ্ধদের কেউ কেউ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনে সক্রিয় উগ্রবাদীদের সঙ্গে কাজ করছে৷ তাদের কেউ কেউ দেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতেও সক্রিয়৷

অপহৃত ও গণধর্ষিত এক রোহিঙ্গা নারীর দুঃস্বপ্ন

বেগম (ছদ্মনাম) মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের বাসিন্দা। ৪ সন্তান ও স্বামী নিয়ে জীবনটা মন্দ কাটছিলো না তার। আচমকা একদিন ওলটপালট হয়ে যায় সুখের সংসার। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো জাতি নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন এই রোহিঙ্গা নারী। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে কিভাবে বেঁচে আছেন তা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্কস টাইমস। মানবাধিকার সংস্থা কেয়ার-এর জেনিফার বোসের কাছে এই সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় সেই ভয়ঙ্কর দুঃসময়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন বেগম।
তার চোখেমুখে ভেসে ওঠে সীমাহীন আতঙ্ক আর ক্রোধের ছাপ। কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন তাঁবুতে বসে সাক্ষাৎকারটি দেয়ার সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার আগের তিনটি দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম দিন। হঠাৎ করে এক রাতে তারা (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর আমার চোখ বেঁধে ফেলে। ফলে আমি কিছুই দেখতে পারছিলাম না। এরপর তারা আমাকে অপহরণ করে। নিয়ে যেতে থাকে এক অজানা গন্তব্যে। এ সময় আমি চিৎকার করতে গেলে মেরে ফেলার হুমকি দেয় তারা। জীবন বাঁচাতে আমি চুপ হয়ে যাই। আমি এখনো জানি না তারা আমার স্বামীকে কি করেছে। জানি না তিনি আদৌ জীবিত আছেন নাকি মৃত! চোখ বাঁধা থাকার কারণে আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তা বুঝতে পারি নি। তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে, আমার সঙ্গে আরো অনেক মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দু’ঘণ্টা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবার সময়ে সামনে-পেছনে আরো অনেক নারীকণ্ঠের কান্না শুনতে পাই আমি। তারপর একটি ঘরে নিয়ে আমার চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। আমি দেখতে পাই, সেখানে আমি ছাড়া আরো ৩০ জন নারীকে ধরে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ জনই ছিলো অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকা। এরপর ৩০ জনের মতো সেনাসদস্য আমাদের ঘিরে ধরে।  নগ্ন করে ফেলা হয় প্রতিটি নারীকে। এসময় তারা আমাদের দেখে হাসতে থাকে। ১০-১৫ জনের একেকটি দল মিলে আমাদের প্রত্যেককে পালাক্রমে গণধর্ষণ করতে থাকে। প্রথমে তারা বাচ্চা মেয়েগুলোকে ধর্ষণ করে। এ সময় কেউ চিৎকার বা বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করলেই তাকে মেরে নিস্তেজ করে দেয়া হচ্ছিল। ভয়ঙ্কর এই পাশবিক নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে আমাদের অনেকেই মারা যান। যখন সেনারা আমার ওপর চড়াও হতে আসে, আমি তখন হাঁটু গেড়ে বসে তাদের কাছে করজোড়ে মিনতি করতে থাকি আমাকে ছেড়ে দিতে। উল্টো তারা আমাকে প্রহার শুরু করে। প্রচণ্ড মারের কারণে আমি অচেতন হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে সারা শরীরে বিশেষ করে, শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গগুলোতে প্রচণ্ড ব্যথা টের পাই। বুঝতে পারি আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ব্যথার ভয়াবহতায় আমি বুঝতে পারি যে, একজন দুজন নয়, আমার শরীরটা দলবেঁধে খুবলে খেয়েছে পুরো হায়েনার দল। দ্বিতীয় দিন তারা আবার আমাদের মাঝে যারা বেঁচে ছিলেন সবাইকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এসময় আমার মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে আমি বুঝি মরে যাবো। কিন্তু ফেলে আসা চারটি বাচ্চার নিষপাপ অসহায় মুখের কথা ভাবতেই আমার মনে হয়, যে করেই হোক আমাকে বাঁচতে হবে। শুধু মনের জোরের ওপর ভর করেই সম্ভবত বেঁচে ছিলাম আমি। তৃতীয় দিন আমরা হঠাৎ খেয়াল করি যে, সৈন্যরা সবাই ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। সেই সুযোগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের  ভেতরের ১০ জন পালানোর সিদ্ধান্ত নিই। কোনোমতে তাদের নজর এড়িয়ে বের হয়ে আমরা রাস্তা ধরে ছুটতে থাকি। ছুটতে থাকি জীবন হাতে নিয়ে। ছুটতে থাকি আমার বাচ্চাদের কথা ভেবে। একসময় চেনা রাস্তা ধরে একটি গ্রামে পৌঁছাই, সেখানে আমার কিছু আত্মীয়ের বসবাস। আমি তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রাতযাপন করি। আমার দুরবস্থা আর অত্যাচারে জর্জরিত শরীর দেখে আমার স্বজনেরা কাঁদতে থাকেন। আমার তখন নিজের কথা ভাবার সময় ছিল না। আমি তাদের কাছে আমার বাচ্চাদের খোঁজ জানতে চাই। আমার এক আত্মীয় পরদিন সকালে আমার চারটি বাচ্চাকেই খুঁজে নিয়ে আসেন। তাদেরকে জীবিত দেখতে পেয়ে দেহে প্রাণ ফিরে পাই। আমার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। শরীরের বেহাল অবস্থা দেখে আমার বড় সন্তান আমাকে অনুরোধ করে হাসপাতালে যেতে। তার অনুরোধে আমি আমার এক পুরুষ আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে লজ্জায় আমি চিকিৎসকের কাছে ধর্ষণের কথা চেপে যাই। শুধু ব্যথানাশক ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে আবার কিছু অস্ত্রধারী আততায়ী আমাদের ঘিরে ধরে। তারা ঘটনাস্থলেই আমার চোখের সামনে আমার আত্মীয়কে গুলি করে হত্যা করে। তখন আমি বুদ্ধি খাটিয়ে অচেতন হয়ে যাবার ভান করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। ঈশ্বরের কৃপায় তারা আমাকে এ যাত্রায় ফেলে যায়। তখন বুঝতে পারি যে, এখানে (মিয়ানমারে) আর থাকার মতো কোনো অবস্থা নেই। আমি বুঝতে পারি পালাতে হবে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। এ যাত্রায় আমার সঙ্গে যুক্ত হয় ওই গ্রামের আরো ৯টি পরিবার। আমরা হাঁটতে থাকি। পথিমধ্যে দেখতে পাই, এ যাত্রায় শুধু আমরাই নই, যোগ হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। ৮ দিন পায়ে হেঁটে অবশেষে আমরা পৌঁছাই বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে। এই দুর্গম যাত্রায় গায়ের কাপড়চোপড় ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের কাছে। কখনো কখনো পথের পাশের গ্রামবাসীরা আমাদের দয়া করে একটু খেতে দিলে খাবার জুটতো কপালে। বেশির ভাগ সময় অভুক্ত থাকতে হতো। দেড় মাস ধরে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে আরো একটি পরিবারের সঙ্গে একত্রে এক তাঁবুতে বসবাস করছি। এখানে আমি নিরাপদ বোধ করছি। বাংলাদেশের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং মানবতাবোধের কাছে আমার সীমাহীন কৃতজ্ঞতা। যদিও, এখনো আমাদের খাবারের চাহিদা পূর্ণমাত্রায় পূরণ হচ্ছে না। মাঝে মাঝেই চাল ফুরিয়ে যাচ্ছে, তখন বাচ্চাদেরকে কিছু খেতে দিতে পারছি না। এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো- বাচ্চাদের প্রতিবেলা পেটপুরে খেতে দেয়া। আমি চাই তারা আবার স্কুলে যাক। আমাদের নতুন জীবন শুরু হোক। মিয়ানমারের পরিকল্পিত জাতিগত নিধনের নৃশংসতায় এমন হতভাগ্যের শিকার শুধু বেগম একা নন, জানা গেছে আরো ৪ লাখ নারী কোনো না কোনোভাবে ধর্ষণ কিংবা শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

কানে হেডফোন ৪২২ মৃত্যু by শুভ্র দেব

কানে হেডফোন। কখনো হাসছে, কখনো নাচছে। আশেপাশে কি হচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই। আনমনে হেঁটে চলেছে রেললাইন ধরে। ট্রেনের বিকট হুইসেলও তার কানে পৌঁছায়নি। এক পর্যায়ে ট্রেন চলে যায় তাকে পিষ্ট করে।
কাটা পড়ে দেহ। খণ্ড-বিখণ্ড দেহ পড়ে থাকে রেললাইনের পাশে। এমন করুণ মৃত্যু বেশ ক’বছর ধরে অহরহ ঘটছে। কিন্তু তারপরও অসচেতন যুবকরা। কানে হেডফোন লাগিয়ে আনমনা হাঁটতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৪২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর নানাভাবে ট্রেনে কাটা পড়ে গত সাড়ে ৭ বছরে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ২৬৪ জনের। কানে হেডফোন লাগিয়ে ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ২০ বছরের টগবগে যুবক রায়হান হোসেন। রেললাইন ধরে বেখেয়ালে  হাঁটছিলেন রায়হান। এ সময়ই পেছন থেকে হুইসেল দিতে দিতে ছুটে আসে কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে দূর থেকে মানুষজনও চিৎকার করে ডাকছিল তাকে। ট্রেন আসছে, ট্রেন আসছে-সরে দাঁড়ান-এ চিৎকারও তার কানে পৌঁছায়নি। চোখের সামনে তরতাজা যুবক রায়হান ট্রেনে কাটা পড়ে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। এভাবেই ৪২২ মায়ের বুক খালি হয়েছে। কানে হেডফোন কেড়ে নিয়েছে এসব পরিবারের স্বপ্ন। কেউ হয়েছেন বিধবা। কোনো সন্তান হয়েছে পিতৃহারা। গত ৩রা সেপ্টেম্বরের কথা। ভৈরব থেকে ছেড়ে আসে ঢাকাগামী একটি ট্রেন। ট্রেনটি নরসিংদী স্টেশনে থামার জন্য আরশিনগর এলাকা অতিক্রম করছিল। ঠিক তখনই তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হচ্ছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার সৈয়দনগর চরসিন্দুর এলাকার বাসিন্দা মোবারক মিয়া। একই সঙ্গে রাস্তা পার হতে চান অজ্ঞাতনামা আরেক মহিলা। কিন্তু রেললাইন তারা পার হতে পারেননি। দু’জনকেই কেটে সবার সামনে দিয়ে চলে যায় ট্রেন। তাদের দু’জনের রক্তে লাল হয় রেললাইনের সাদা পাথর। কয়েক টুকরা হয় তাদের দেহ। দু’বছর আগের কথা চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি কলেজের প্রফেসর ওয়াজিউল্লাহ বেড়াতে আসেন ঢাকায়। নববিবাহিত ওয়াজিউল্লাহ ওঠেন তেজকুনিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাসায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠে রেললাইন ধরে হাঁটছিলেন। নববধূর সঙ্গে হেডফোনে কথা বলতে বলতেই ট্রেনের নিচে চলে যান। দেহ টুকরো হয়ে রেললাইনের দু’পাশে পড়ে থাকে। এমন বে-খেয়ালে রেললাইন ধরে হাঁটা বিপজ্জনক জেনেও মানুষ হাঁটছে। অকালে মারা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রায়ই শোনা যায় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা। রেলওয়ে পুলিশের হিসাবে দেখা গেছে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে মোট নিহত হয়েছেন ২২৬৪ জন। এর মধ্যে হেডফোনের কারণে নিহত হয়েছেন ৪২২ জন। এর মধ্যে ছাত্রছাত্রী রয়েছে ৫৬ জন।
ঢাকা জিআরপি থানাসূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তাদের আওতাধীন এলাকায় ২ হাজার ২৬৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১০ সালে ২০৩ জন (পুরুষ ১৬৫ ও মহিলা ৩৮), ২০১১ সালে ২৫৬ (পুরুষ ২১৫ ও মহিলা ৪১), ২০১২ সালে ৩০৬, (পুরুষ ২৬৭ ও মহিলা ৩৯), ২০১৩ সালে ৩১৮, (পুরুষ ২৭৮ ও মহিলা ৪০), ২০১৪ সালে ৩০৫ (পুরুষ ২৪২ ও মহিলা ৬৩), ২০১৫ সালে ২৯২, (পুরুষ ২৪৮ ও মহিলা ৪৪), ২০১৬ সালে ৩০৫ (পুরুষ ২৪৪ ও মহিলা ৬২) এবং ২০১৭ সালে ২৭৯টি নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জিআরপি থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। আবার দু,একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এসব দুর্ঘটনা রোধে নানা উদ্যোগ নিলেও কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না রেল দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি না হলে ট্রেনে কাটা রোধ করা যাবে না।
ঢাকা রেলওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, ওই সাড়ে সাত বছরে ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী মানুষ বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। এ বয়সের মধ্যে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৮৫ জন। ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী ২০৩ জন এবং ৫১ থেকে তদূর্ধ্ব ৩৪৮ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে। জিআরপি থানা সূত্রে জানা যায়, সাড়ে সাত বছরে মামলা হয়েছে ২ হাজার ৪৯টি। এর মধ্যে ২০১০ সালে ২০৩টি, ২০১১ সালে ২৫৬টি, ২০১২ সালে ৩০৬টি, ২০১৩ সালে ৩১৮, ২০১৪ সালে ৩০৫টি, ২০১৫ সালে ২৮৫টি, ২০১৬ সালে ৩০৫টি। নিহতের মধ্যে শিক্ষার্থী ৫৬ জন, শ্রমজীবী ৪২৬ জন, চাকরিজীবী ৩৭৯ জন, অন্যান্য পেশার ১ হাজার ৭৫ জন। নিহতদের মধ্যে কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনে হাঁটার জন্য ৪২২, ট্রেন লাইনের ওপর বসা বা চলাচলের জন্য ৫৫৪, রেলক্রসিং এ দ্রুত পারাপারের জন্য ৮৯৮, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ৫৫ ও টেম্পোর সঙ্গে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু রোধে কাজ করছে ঢাকা রেলওয়ে থানা। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত মাইকিং করা হয়েছে। এছাড়া লিফলেট বিলি করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য স্থানেও একই কাজ করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও ট্রেনে কাটা রোধ করা যাচ্ছে না। তবে এসব ঘটনায় অনেক সময় অপমৃত্যু মামলা করা হয় আবার বছরে এক দুইটি হত্যা মামলাও করা হয়। হত্যা মামলা নিয়ে রেলওয়ে থানার কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে হত্যা মামলার সংখ্যা খুবই কম। আর যে দুই একটা মামলা আছে এগুলোর তদন্ত কার্যক্রম খুব দ্রুতই শেষ করা হচ্ছে। ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, ট্রেনে কাটা পড়ে দেশের সব জায়গায়ই মানুষ নিহত হচ্ছেন। এর জন্য সচেতনতা দরকার। কারণ অসাবধানতার কারণেই এসব ঘটনা ঘটছে। তবে এসব অসাবধানতার জন্য তিনি অবৈধ রেলক্রসিং, অবৈধ স্থাপনা, রেললাইনের উপরে হাটবাজার, হেডফোন লাগিয়ে রেললাইন দিয়ে রাস্তা পার হওয়াসহ আরো কিছু কারণ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু রেললাইন দিয়ে যারা চলাচল করেন তারা যদি সচেতন না হন তাহলে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যাবে না।